শৈলেন ঘোষ
আমি ছিলুম ভীষণ দুঃসাহসী। যেমন দুঃসাহসী, তেমনই দুরন্ত। সবাই বলে আমি নাকি হাতে-পায়ে দুরন্ত। যারা এ-কথা বলে, তারা একদম ঠিক বলে না। ভুল! আমার আবার হাত কোথা থেকে আসবে! আমার যা আছে, তার সব কটি-ই পা। দুটি সামনে, দুটি পেছনে। কালই পেছনের পা ছুড়ে এমন একখানি চাট দিয়েছি বানরটাকে! দ্যাখো এখন, ক-দিনে ধাক্কা সামলায়!
বানরটা আমায় যথেষ্ট চেনে। জানে, কেমন আমার মেজাজ। আমাকে রাগালে যে আমি ছেড়ে কথা বলি না, এ তার অজানা নয়। তবু আমার পেছনে লাগা তার স্বভাব। এমন নচ্ছার, আমায় দেখলেই ভেংচি কাটবে। দূর থেকে। কাছে এসে ভেংচি কাট! দেখি তোর কত মুরোদ! তা কাটবে না। দূর থেকে কেটেই তিড়িং! মার লাফ! ভোঁ কাট! আর তাই আমার রাগ হলেও কিছুই করতে পারি না। নচ্ছার বানরটা সেদিন করেছে কী, একেবারে হুস-স-স করে আমার পিঠে চড়ে বসেছে। কী আস্পর্ধা বলো! বানর, তুই কী বলে আমার পিঠে বসিস! যদিও আমার পিঠে যার বসার হুকুম সে বানরেরই বংশধর, তবু সে একজন সভ্য-ভব্য মেয়ে। দেখতে ভালো। ঝলমলে পোশাক পরে সাজগোজ করলে আরও ভালো। সেই পোশাক পরে আমার পিঠের ওপর যখন খেলা দেখায়, তখন আরও, আ-র-ও ভালো। কতরকমের কসরত জানে মেয়েটা। মনে করো, আমি একটা সার্কাসের রিং-এর ভেতর টগবগ, টগবগ করে ছুটছি। মেয়েটা দু-হাত দু-দিকে ছড়িয়ে আমার পিঠের ওপর দাঁড়িয়ে পড়েছে। ঝলমলে পোশাক আলোয়-আলোয় ঝিকমিক করছে। তারপরেই সে টপাস করে আমার পিঠের ওপর একটা ডিগবাজি মারল। মেরেই আমার গলা ধরে ঝুলে পড়ল। আমি চোখের পলকে সামনের দু-পা তুলে সটান দাঁড়িয়ে পড়লুম। দাঁড়িয়ে পড়তেই মেয়েটা এমন ভঙ্গি করল, তোমার মনে হবেই হবে, যেন একটি পরি প্রজাপতি সেজে উড়ে যাচ্ছে। অমনই সঙ্গে সঙ্গে হাততালি। হইহই কাণ্ড। এমন খেলা কোথায় দেখতে পাওয়া যায়, আশা করি, তোমাদের আর বলে দিতে হবে না। এর নাম সার্কাস। আর এওবোধ হয় তোমরা বুঝতে পেরেছ, আমি এক সার্কাসের ঘোড়া। আর ওই যে গুণধর বানরটার কথা বললুম, তিনি যে আমাদেরই দলের, সে-কথা কি-আর বলে দিতে হয়। তিনিও খেলা দেখান। হায় রে, কী খেলার ছিরি! কী, না, পিচকিরিতে জল ভরে হোলি হ্যায়! আচ্ছা বলো, পিচকিরিতে জল ভরে কেউ হোলি খেলে? তার পরে কী, জল ছুড়ে দেবে একেবারে ওই যারা পুঁচকে-পুঁচকে ছেলে-মেয়ে সার্কাস দেখতে আসে, তাদের গায়ে! কী অসভ্য দেখেছ!
দ্যাখো বাপু, সার্কাসে এমন বন্দি হয়ে খেলা দেখাতে আমার একদম ভালো লাগে না। তোমরা আমার খেলা দেখে হাততালি দিলেও না। সত্যি কথা বলতে কী, আমরা তো সার্কাসে নিজের ইচ্ছেয় কিছু করি না। আমাদের আছে ট্রেনার। মানে, যারা খেলা শেখায় আর কি! এক-একটা খেলা, তার এক-একজন ট্রেনার। বাঘ-সিংহের ট্রেনার। হাতি-ঘোড়ার ট্রেনার। বানর-ভেড়ার ট্রেনার। ট্রেনারনারের ছড়াছড়ি। যে-লোকটা বাঘ-সিংহের ট্রেনার, সে কিন্তু দস্তুরমতো হিম্মতদার। নিজের মাথাটা বাঘের মুখের গর্তে যখন ঢুকিয়ে দেয়, তখন সত্যি বলছি, আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। যদিও, যার মাথা, তার নিজেরই যখন মাথার ভয় নেই, তখন আমার লোম খাড়া হলেই বা কী, আর, না-হলেই বা কী! বাঘের ওই ট্রেনারকে আমার ভীষণ ভালো লাগে। কী দুর্দান্ত সাহস বলো! আমার মতো এমন একটা ডাকাবুকো ঘোড়াই যখন বাঘ দেখলে থরহরি, তখন, ট্রেনার লোকটার তারিফ না- করে থাকা যায়! কিন্তু যিনি আমার ট্রেনার? থাক, তার নাম আর মুখে আনতে হবে না। আহা মরি! কী চেহারা তার! খ্যাংরাকাটির মাথায় যেন আলুর দম। যেমন রোগাপটকা, তেমনই মুখের ছিরি! তার ওপর নাকের ঠিক নীচ থেকে দু-ঝুরি গোঁফ ঝুলে পড়েছে। আমার দু-চক্ষের বিষ! অথচ তাকে সবাই ডাকে ট্রেনার-সাহেব বলে! হেসে মরি! ভদ্রলোকের কোনখানটা যে সাহেবের মতো! কী বলব তোমাদের নাকে দড়ি দিয়ে খাটায় আমাকে। একটু এদিক-ওদিক হলেই চাবুক! সেই চাবুক তোমাদের পিঠে পড়লে বুঝতে তার জ্বালার ঠেলা কেমন! এই ভালো যে, তোমরা ঘোড়া হয়ে জন্মাওনি! লোকটার শরীরে দয়ামায়া বলে যদি কিছু থাকে। জল্লাদ! জল্লাদ! ক-দিন হল, চোখে চশমা নিয়েছেন। একদিন তাল পেলে এমন একখানি দেব! ওই চশমা পরা ঘুচে যাবে! এমন শয়তান, চাবুক ছাড়া এক পা-ও নড়বে না। আমার কাছে আসবে, তা-ও হাতে চাবুক!
আসলে কী জানো, আমার ভাগ্যটাই খারাপ। ভগবান আমাকে বেছে-বেছে ঘোড়াই করেছেন। তা, যখন তাঁর ইচ্ছে হয়েছে, করেছেন। করুন, তাতে আমার আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু শেষকালে পাকেচক্রে সার্কাসের মতো একটা ওঁচা জায়গায় আমি এসে পড়লুম। কেন, বেশ তো ছিলুম নিজের দেশে। সার্কাস তো একটা বন্দিশালা। অমন যে বাঘ-সিং, যাদের কথায় বলে রাক্ষস-খোক্কসের যম, তাদের কী দুর্দশা দ্যাখো! লোহার খাঁচায় বন্দি হয়ে, কেঁচোর মতো দিন কাটাচ্ছে! হাঁক ছাড়ো কি গাঁক করো, বয়ে গেছে! কেউ কান দেবে না। অবশ্য আমি একটু অন্যরকমের বন্দি। আমার গলায় লাগাম। খাঁচায় বন্দি, আর গলায় লাগাম বাঁধা অবস্থায় বন্দি, এই দুই বন্দির কোনটা বেশি খারাপ সে আর আমি কী বলব! সে বলবে তোমরা। আসলে, তোমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্যেই তো আমরা বন্দি। সেখানে লোহার খাঁচাই হোক, কি, চামড়ার লাগাম, দুটোই সমান।

তা হলে সবটাই বলি তোমাদের। বলি, আমার কথা। আমার দেশের কথা। বলি, কেমন করে এলুম আমি তোমাদের এই দেশে। কেমন করে বন্দি হলুম সার্কাসে। আসলে আমার দেশ ছিল আরবে। আমার মা-ও আরব দেশের, বাবাও। আমার জন্ম আজ থেকে ঠিক চার বছর আগে। আমি জন্মেছিলুম, মরুভূমির তপ্ত বালিতে। আমার বাবা ছিল মরুভূমির এক দস্যুসর্দারের ঘোড়া। বাবার পিঠে চেপে, দলবল নিয়ে, ঘোড়া ছুটিয়ে, দস্যুবৃত্তি করত। আমিও কাঁচা বয়েস থেকে ছুটতে শিখেছিলুম মরুভূমির বালির ওপর। শিখেছিলুম, কেমন করে দস্যুকে পিঠে নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। কিংবা লড়াই করে বাঁচতে হয় মরুভূমির ঝড়ের সঙ্গে। হ্যাঁ, এই ঝড়ের জন্যেই আমি যেমন নিজে হারিয়ে গেছি, তেমনই হারিয়ে গেছে আমার সব কিছু। আমি এখন একা। আমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই। আমার সেই একার গল্পই আমি তোমাদের শোনাতে বসেছি, একা-একা!
যখন আমার একটু জ্ঞানগম্যি হয়েছিল, তখন আমার প্রায়ই মনে হত, দস্যুসর্দারের ঘোড়া হতে না পারলে জীবনটাই বৃথা। অবিশ্যি আমার মনে হলেই বা কী! এখনই তো আমি সর্দারের ঘোড়া হতে পারছি না। তা ছাড়া দস্যুসর্দারের ঘোড়া হওয়া যার-তার কম্মও নয়। দস্তুরমতো পাকা ওস্তাদ না হলে, ওই বাসনা মনের ভেতরই গোপন রাখা ভালো। মরুভূমির রোদ-ঝলসানো বালির ওপর দিয়ে তিরবেগে ছোটার ক্ষমতা যদি কারও না-থাকে, কিংবা না-থাকে আচমকা শত্রুর ওপর চড়াও হওয়ার দুর্দান্ত সাহস, তবে তাকে কেউ ওস্তাদ বলবে না। কিন্তু আমার বাবা ছিল এমনই ওস্তাদ। সর্দার এমনি-এমনি মুখ দেখে বাবাকে তার ঘোড়া করেনি। কত যে সাঙঘাতিক বিপদ থেকে বাবা সর্দারকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তা বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু সেদিন যে কী হল!
তবে, আমি জানি, এখন আমি না পারলেও একদিন আমি সর্দারের ঘোড়া হবই। অবশ্য বাবার পিঠে বসে এখন যে-সর্দার দস্যুবৃত্তি করে, বোধহয় তার ঘোড়া আমি কোনোদিন হতে পারব না। তবে, আমার পিঠে বসে যে-দস্যু বন্দুক ছোড়ে, সে-ই যে একদিন সর্দার হবে, সে-কথাটা সবাই জানে। কারণ, সে সর্দারেরই ছেলে। তার বাবার যেদিন সর্দারি করার সামর্থ্য আর থাকবে না, বুড়ো হয়ে যাবে, সেইদিন তো এই ছেলেই দখল করবে বাবার জায়গা। তখন আমি হব তার ঘোড়া। কবে যে সর্দার বুড়ো হবে, কে জানে! তবে এখন আমাদের দু-জনেরই বয়েস কম। তা বলে যেন ভেবো না, সর্দারের ছেলে একেবারে কচি-খোকা। গাল ভর্তি যেমন দাড়ি তার, তেমনই তার তাকত। যদিও আমার পিঠে বসে ঘোড়দৌড়ের বাজিতে সে একবারও জিততে পারেনি, তাতে অবশ্য আমার লজ্জার কিছু নেই। আমার বরং বুক ফুলে ওঠারই কথা। কেননা, আজ পর্যন্ত যতবার দৌড়বাজি হয়েছে, দস্যুসর্দারকে পিঠে নিয়ে বাবা হয়েছে প্রথম। আর আমি? থাক সে-কথা। বরং বলি ঘোড়দৌড়ের গল্পটা।
ঘোড়দৌড়, সে একটা দারুণ গা-শিউরে ওঠা রেষারেষির খেলা এই মরুর দস্যুদের। পঞ্চাশ-ষাটটা ঘোড়ার পিঠে পঞ্চাশ-ষাটজন দস্যু। বালির ওপর দিয়ে ছোটাও ঘোড়া একসঙ্গে। বালির ওপরে আমাদের পায়ের টগবগানির শব্দ একটুও শুনতে পাবে না। দেখবে, আমাদের খুরের আঘাতে ছিটকে পড়ছে বালি। তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে মরুভূমি। যেন উড়ন্ত বালির ঢেউ উঠেছে তার বুকে। আমাদের মুখে কোনও শব্দ নেই। আমাদের নিশ্বাসের শব্দ মরুর তপ্ত বাতাসে ছড়িয়ে-ছড়িয়ে নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে খানখান করে। সে কী উত্তেজনা। তেষ্টায় তুমি মরে গেলেও তোমার গলায় একফোঁটা জল দেবে না কেউ। মাথা খুঁড়ে মরে গেলেও না। কিন্তু একবার যদি পৌঁছতে পারো, তার ওপর যদি প্রথম হও, তা হলে আর কথাই নেই। তোমার তো খাতির বাড়বেই, সেইসঙ্গে তুমি নজর কাড়বে সর্দারের। হায় রে, সে-আশা মিথ্যে! কেননা, যে প্রথম হবে, সে তো প্রতিবারই প্রথম হয়। সে ওই সর্দারেরই ঘোড়া। আমার বাবা। আর আমি কেঁদে-ককিয়ে যদি দশের মধ্যে একটা জায়গা পাই, তবে জানবে যথেষ্ট করেছি। এই ফাঁকে একটা কথা তোমাদের কানে-কানে বলি, বাবাকে আমার ভীষণ হারিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। আর সত্যি আমি যদি হারাতে পারি, তখন সে একটা দারুণ কাণ্ড হবে। আসলে, আমরা যখন একসঙ্গে ছুটি, তখন মনে-মনে তো সবাই ভাবি, প্রথম হব। কিন্তু আমাদের ভাবাই সার। কারণ, বাবার সঙ্গে কে পারবে! প্রথম যে একজনই হয়। কী আশ্চর্য! বাবা একবার তো আমার কথা ভেবে হোঁচটও খেতে পারে! কিংবা পায়ে-পায়ে জড়ামরি!
ছিঃ, ছিঃ, আমি পারি না বলে, ছেলে হয়ে এই কথাটা মুখে আনা কি ঠিক হল! ভাগ্যিস, কথাটা মুখ ফসকে অন্য কাউকে বলে ফেলিনি! বলে ফেলেছি তোমাদের। তোমরা আমার বন্ধু। তোমরা যে অন্য কাউকে বলবে না, এ আমি জানি। আমার বাবা কেন, অন্য কেউ হলেও কি এইসব অলক্ষুণে কথাবার্তা ভাবা উচিত! সত্যি বলছি, এর পরে যেদিন দৌড় হবে, আমি বাবার কাছেই থাকব না। দূরে-দূরে ছুটব। বলা তো যায় না। যদি সত্যিই বাবার পায়ে পা লেগে যায়!
সে-সবের আর ভয় নেই। কারণ, আর-একবার যখন দৌড়ের বাজি হল, সেই হল আমাদের শেষ দৌড়। সেই দৌড়ে আমরা সক্কলে মরুভূমির বালিতে হেরে ছত্রখান হয়ে গেলুম। সে কী ভয়ঙ্কর ঘটনা।
আসলে কী জানো, এই যে মরুভূমির কথা তোমাদের বলছি, এর অগ্নিমূর্তি তোমরা কেউ দ্যাখোনি কোনোদিন। কোনোদিন দেখতে পাবে কি না, সে আর আমি কেমন করে বলব! এপারে বালি, ওপারে বালি, মধ্যিখানেও ধু-ধু বালি। কোথায় যে শেষ তা, তোমাদের সাধ্যি নেই খুঁজে বের করো। তার ওপর মস্ত-মস্ত বালির পাহাড়। বালি জমে-জমে স্তূপ হয়ে আছে। একফোঁটা জল নেই কোথাও! আর যেখানে জল আছে, তার খবর উটকো লোক আর জানবে কী করে! এমন মরুভূমিতে কে আর শখ করে হাওয়া খেতে আসবে! আর কেউ যদি একগুঁয়েমি করে হাওয়া খেতে আসেও, বিপদ তার পেছন ছাড়বে না। এই যে দেখছ দস্যুদের, শুনে রাখো, মরুভূমিটা এদেরই দখলে। কেউ হাওয়া খেতেই আসুক, কি উটের পিঠে মরু ডিঙিয়ে বাণিজ্যে যাওয়ার চেষ্টা করুক, এরা একবার টের পেলে হয়, তার নির্ঘাত সর্বনাশ! যথাসর্বস্ব লুঠ তো হবেই, সেইসঙ্গে যদি প্রাণটিও যায়, তবে আশ্চর্য হবে না কেউ।
কিন্তু সেবার যা ঘটল, সে কী মারাত্মক ঘটনা। সে অবশ্য লুঠতরাজের ঘটনা নয়। সে আমাদের দৌড়বাজির ঘটনা। সে-কথা যখন এখনও ভাবি, আমার বুক কেঁপে ওঠে।
সেদিন ঠিক হয়েছে আমাদের দৌড়বাজি হবে। তারই সব তোড়জোড় চলছে। মুখে-মুখে লাগাম এঁটে যে-যার নিজের-নিজের ঘোড়ার পিঠে বসেছে এক-একজন দস্যু। দ্যাখার মতো তাদের বেশভূষা। মাথায় তাদের পাগড়ি। পাগড়ির ল্যাজটা দিয়ে দস্যুরা জড়িয়ে ধরেছে যে-যার নিজের মুখ। মরুর গনগনে হাওয়াটা না মুখে ঝাপটা মারে। শুধু চোখ দুটি খোলা। গায়ে তাদের লম্বা আলখাল্লা। কোমর বাঁধা। পায়ে আঁটোসাঁটো চপ্পল। চামড়ার। কোমরে ভোজালি। আর পিঠে বন্দুক। একজন নির্দয় দস্যুকে যেমন দেখতে হয়, ঠিক তেমনই তাদের চেহারা। তেমনই অস্ত্রশস্ত্র। যেখান থেকে ছুট শুরু, সেখান থেকে আমাদের যেতে হবে মরুভূমির ভেতরে। অনেকখানি। যেতে হবে সেইখানে, যেখানে জলের প্রস্রবণ আছে। বালির ভেতরে গর্ত। সেই গর্তে জল। যে প্রথম যাবে, তারই জুটবে প্রথম জল। তেষ্টা মেটাবার। টানা ছুটলে সেইখানে পৌঁছতে কতক্ষণ লাগবে, সেই সময়ের হিসেব আমি জানি না। এখন সকাল। আমার পেছনে সূর্য ঢলে আছে এখনও। আমরা যখন ওই প্রস্রবণের কাছে পৌঁছব, তখন প্রায় আমাদের মাথার ওপর সূর্যের পৌঁছবার কথা। এতক্ষণ রোদ মাথায় নিয়ে ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে পড়লেও, একফোঁটা জল কোথাও জুটবে না। তখন কী যে কষ্ট হয় আমাদের, বোঝাতে পারব না আমি। ভাবো তো একবার, কোথাও কিছু নেই, চারদিকে খালি বালি। রোদে তেতে-আগুন সেই বালি পায়ে যেমন জ্বালা ধরায়, তেমনই সারা গায়েও। ছুটতে ছুটতে থামবার জো নেই। একটু যে জিরিয়ে নেবে, তারও উপায় নেই। ছায়া কই? গাছও নেই। আশ্রয়ও নেই ছায়ার। পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছে পা থেকে মাথা পর্যন্ত। গলা শুকিয়ে কাঠ। সুতরাং প্রস্রবণের জল কে আগে পাবে, তারই জন্য প্রাণপণে ছোটো!
প্রাণটি হাতে নিয়ে, এমনই বিপদের মধ্যে সেদিন আমাদের দৌড় শুরু হল। যেমন প্রতিবার হয়, এবারও আমি দেখতে পাচ্ছি, দস্যুসর্দারকে পিঠে নিয়ে বাবা আগে-আগেই ছুটছে। আমি ছুটেছি সর্দারের ছেলেকে পিঠে নিয়ে। সর্দারের ছেলে তড়পে-তড়পে আমায় তাড়া মারছে। লাগাম ধরে একটু উঠে, উপুড় হয়ে ঝুঁকে পড়েছে আমার পিঠের ওপর। আমার পা পড়ছে জোরকদমে। তোমরা দেখলে আশ্চর্য হয়ে যেতে, এবার আমি ছুটছি বাবার প্রায় পেছনে-পেছনে। আমার ছুট দেখে তোমরা এবার কিছুতেই বলতে পারবে না, আমি এবারও গোহারান হারব। আমার ভীষণ রোখ চেপে গেছে। আমি প্রায় ধরেই ফেলেছি বাবাকে। সর্দারের ছেলে রেকাবে পা দিয়ে আমার পেটের দু-দিকে এমন ঠেলা মারছে, আমি দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছি না। আমার মনে হচ্ছে, এবার বোধ হয় বাবা আমার কাছে হেরেই যাবে। দ্যাখো, বাবা কেমন বীরের মতো ছুটছে! আর কী চমৎকার দেখতে লাগছে বাবাকে! যেমন স্বাস্থ্য, তেমনই গায়ের রং। আমার গায়ের রংটা একটু নীলচে কালো। বাবার গায়ের রং তেমনই গাঢ় বাদামি। বাবার গায়ের ওপর রোদ পড়েছে। গায়ে বিন্দু-বিন্দু ঘাম। মনে হচ্ছে, ঘামের বিন্দুগুলি যেন গা-ভর্তি মণিমুক্তো। ঝলমল করছে। কিন্তু আমি? আমার গায়ে কোনও মণিমুক্তো ঝলমল করছে কি না, আমি জানি না। আমি শুধু জানি, আর একটু যদি গতি বাড়াতে পারি, বাবাকে পেছনে ফেলে আমি এগিয়ে যাব। সুতরাং চোখ-কান বুজে দৌড় মারো! কী আশ্চর্য! দ্যাখো, দ্যাখো, বাবা পিছিয়ে পড়ছে। আমি বাবাকে হারিয়ে দিচ্ছি! এই দিলুম হারিয়ে! হুর-র-র-রে!
ঠিক এই সময়ে বিকট চিৎকার করে উঠল বাবা, চিঁ-হিঁ-হিঁ! আমি থতমত খেয়ে চমকে উঠলুম। দেখলুম বাবা সামনের দু-পা তুলে ঝটকা মারল তার পিঠের সওয়ারি দস্যুসর্দারকে। সর্দার সাত হাত দূরে ছিটকে পড়ল। সর্দারকে ফেলে দিয়েই বাবা একটা পাগলা ঘোড়ার মতো উলটো দিকে ছুটতে লাগল। ছুটতে-ছুটতে ঘুরতে লাগল। ঘুরতে-ঘুরতে একে ধাক্কা মারে। ওকে গোত্তা দেয়। আমি টাল খাই। বেসামাল হয়ে থমকে দাঁড়াই। এ পড়ে ওর ঘাড়ে, ও পড়ে তার ঘাড়ে। নিমেষে ভণ্ডুল হয়ে গেল সব উত্তেজনা। কোথায় দৌড়বাজি আর কোথায় কী! আমরা হাঁসফাস করে হাঁপাচ্ছি, আর বাবার কাণ্ড দেখে আঁতকে উঠছি।
হঠাৎ এ কী দেখি! মনে হচ্ছে বাবা যেন পালাচ্ছে! বাবাকে পালাতে দেখে ঘোড়ার পিঠে বসা অন্য দস্যুদের যেন চমক ভাঙল। এতক্ষণ হতভম্বের মতো বাবার কাণ্ডকারখানা দেখছিল দস্যুরা। তারা রে-রে-রে করে হাঁক পাড়ল, 'ঘোড়া পালাচ্ছে, ঘোড়া পালাচ্ছে।' বলতে-বলতেই তারা বাবার পিছু নিল। নিজের-নিজের ঘোড়া ছোটাল বাবাকে ধরবার জন্যে।
চিৎকার আর চেঁচামেচিতে বাবা হয়তো হকচকিয়ে গেছল। ছুটতে-ছুটতে দাঁড়িয়ে পড়ল বাবা। চোখের পলকে তারা ঘিরে ফেলল বাবাকে। আর পালিয়ে যাওয়ার পথ নেই। বাবা যে লাফ দিয়ে ডিঙিয়ে পালাবে, তারও উপায় নেই। দস্যুদের হাতে বন্দুক। এখন একটু বেয়াড়াপনা করলেই, দুম! সুতরাং বাবা ধরা পড়ল। তারপর শুরু হল বেদম চাবুক। যার সঙ্গে আমার এতদিনের বন্ধুত্ব, সেই সর্দারের ছেলেই এখন একাই একশো। সপাসপ এমন চাবুক চালাতে লাগল যে, বাবা প্রায় আধমরা হয়ে গেল। আমি ছেলে হয়ে সেই দৃশ্য দেখে কেমন করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি! পারিনি। আমি চিৎকার করে প্রতিবাদ করলুম, চিঁ-হিঁ-হিঁ!
আমার চিৎকার শুনে এবার দস্যুসর্দারের ছেলে আমার পিঠেই চাবুক মারল। সর্দারের ছেলে মারতে-মারতে চেঁচাল, 'থাম! নইলে তোরও পিঠের ছাল-চামড়া তুলে নেব!'
হ্যাঁ, বাবার গায়ের ছাল-চামড়া ওরা মারতে-মারতে তুলেই নিয়েছিল বলতে পারো। বাবার সারা গায়ে চাবুকের দাগগুলো দগদগ করছে। ফেটে-ফেটে রক্ত গড়াচ্ছে। ঝকঝকে দেহটা রক্তের ফোঁটায় টকটক করছে। আর দৌড়! দৌড় তখন মাথায় উঠেছে। বাবাকে টানতে-টানতে নিয়ে আসা হল আস্তানায়। নিয়ে আসা হল দস্যুসর্দারকেও। বাবাকে আচ্ছা করে বেঁধে রাখা হল। তারপর, বাবা তার পিঠ থেকে যাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে, সেই দস্যুসর্দারকে নিয়ে এখন সবাই ব্যস্ত হয়ে উঠল। ঘোড়া নামের এই জানোয়ারের চেয়ে, এখন মানুষ নামের এই দস্যুটাই তাদের কাছে অনেক বড়ো। তাদের দুর্ভাবনা এখন দস্যুসর্দারকে নিয়েই। কেননা, বাবার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ে, লোকটা এখনও বেহুঁশ হয়ে আছে। অবশ্য, অনেক তুকতাক করে অনেকক্ষণ পরে তার হুঁশ ফিরেছিল। কিন্তু আর তাকে ঘোড়ার পিঠে উঠতে হয়নি কোনোদিন। এমনকী, তার সর্দারি করাও বোধ হয় ঘুচে গেছল চিরদিনের মতো। কারণ, কোমর ভেঙে লোকটা পঙ্গু হয়ে গেছল তখনই। আর সেই ভাঙা কোমর নিয়ে আরও কতদিন বেঁচে ছিল সর্দার, আমি জানি না। জানব কেমন করে! এবার যে আমিই পড়লুম আর এক ভয়ঙ্কর বিপদে।
সত্যি বলতে কী, আমি সেদিন পর্যন্ত ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারিনি বাবা হঠাৎ কেন অমন একটা কাণ্ড করে বসল। তবে কি বাবা সেদিন নিজের ছেলের কাছে দৌড়বাজিতে হেরে যাচ্ছিল বলে মাথার ঠিক রাখতে পারল না! হতে পারে! দেমাকের তো আর বাছবিচার নেই! মানুষের হলে ঘোড়ার হবে না, এমন কথা না-ভাবাই ভালো। আর সেই দেমাক যদি একবার ভাঙে, তবে কী না হয় দেখলে তো!
এখন এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ দস্যুদের সর্দার কে হবে? হ্যাঁ, কোমর-ভাঙা দস্যুসর্দারের ছেলেই এবার বাবার জায়গা নিল। আর আমি হলুম তার ঘোড়া। সত্যি কথা বলতে কী, এভাবে সর্দারের ঘোড়া হওয়ার ইচ্ছে তো আমার ছিল না। বাবা থাকতে, আমি সর্দারের ঘোড়া হব, এমন কথা তো ভাবিনি কখনও। ছেলে হয়ে, বাবার সামনে মাথা উঁচিয়ে সর্দারের ঘোড়া হয়ে দেমাকে পা ফেলব, এটা কি ভালো দেখায়! কিন্তু এখন থেকে আমাকে যে তা-ই করতে হবে। আমি কী করি এখন!
আমার কিছু করার থাকলে তো তবে কিছু করব! আমি কিছু করলুম না বটে, কিন্তু উলটে বাবাই আর একটা যা-তা কাণ্ড করে বসল! করল কী, দস্যুসর্দারের ছেলেকে আমার পিঠে বসে সর্দারি করতে দেখে বাবা রেগে তুলকালাম শুরু করে দিল। যে-দড়ি দিয়ে বাবাকে বেঁধে রাখা হয়েছিল, সেই দড়িটাই টানাটানি করে ছেঁড়বার উপক্রম করল। কে তখন সামলায় তাকে! বাবার মনের কথাটা আমি ছাড়া তখন কে আর বুঝবে! আমি অবশ্য অনেক চেঁচিয়ে, অনেক পা ঠুকে, ল্যাজ নেড়ে বাবার রাগের কারণটা সমঝাবার চেষ্টা করলুম, কিন্তু আমার চেষ্টাই সার। ঘোড়ার এমন বেয়াদপি মানুষ কখনও সহ্য করে! তার ওপর সেই মানুষ যদি হয় মরুভূমির দস্যু। এমন পাগলা ঘোড়া নিয়ে তো আর দস্যুবৃত্তি করা যায় না। তখন মানুষ-দস্যু ভাবতেই পারে, এই একটা পাগলা ঘোড়ার হাওয়া লেগে অন্য ঘোড়াও যদি পাগল হয়ে যায়! তবে তো আরও বিপদ! কাজেই বাবাকে নিয়ে দস্যুরা পড়ল মহা ফাঁপড়ে। কী করা যায় এখন? দস্যুরা সব মাথা ঘামাতে বসল। কেউ বলল, 'ঘোড়াটাকে জঙ্গলে ছেড়ে দাও।' কেউ-কেউ বলল, 'ঘোড়াটাকে বেচে দাও।' আবার অনেকে বলল, 'রোগের ইলাজ করে পোষ মানাও।'
যখন এমনই সব নানা মুনির নানা মত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে, তখন নতুন সর্দার হুকুম করল, 'ঘোড়া যদি একবার পাগলা হয়ে যায়, তবে যখন-তখন সে যাকে-তাকে জখম করতে পারে। এমন ঘোড়া বাঁচিয়ে রাখলেই বিপদ। সুতরাং ঘোড়াটাকে মেরে ফেলা হোক!'
সর্দারের হুকুম। না-মানার কোনও কথাই নেই। বাবাকে মেরে ফেলাই স্থির হল। যাকে মেরে ফেলা হবে, আমি তার ছেলে। আমি কান পেতে শুনলুম সে-কথা। কিন্তু আমি ঘোড়া হলেও তো আমারও একটা মন আছে। মানুষের মনের সঙ্গে ঘোড়ার মনের কতখানি তফাত, আমি জানি না। তবে মানুষেরও খিদে পায়, আমাদেরও। মানুষের গায়ে আঘাত করলে যেমন ব্যথা লাগে, আমাদের তার চেয়ে কম লাগে না। মানুষের যেমন কষ্ট আছে, কষ্ট আছে তেমনই আমাদেরও। দুঃখের সময় মানুষের যেমন কান্না পায়, আমরাও তেমনই কাঁদি। তাই এখন বাবাকে মেরে ফেলা হবে শুনে আমি কেঁদে ফেললুম। আমার চোখে জল। কেউ হয়তো দেখতে পেল না। আর দেখতে পেলেও যে তারা আমার দুঃখে হাপুস নয়নে কেঁদে গড়াগড়ি খাবে, এমন আজগুবি চিন্তা আমি করি না। কিন্তু তোমরা শুনলে শিউরে উঠবে কি না জানি না, ঠিক হল, বাবাকে মেরে ফেলা হবে গুলি করে। আর সেই গুলি মারবে নতুন সর্দার নিজে, আমারই পিঠে বসে। পাছে অন্য সব ঘোড়ার সামনে বাবাকে গুলি মারলে অন্যরকম বিপত্তি ঘটে যায়, তাই ঠিক হল বাবাকে নিয়ে যাওয়া হবে অন্য সব ঘোড়ার চোখের আড়ালে। মরুভূমির একটু ভেতরে। বালির স্তূপ জমে যেখানে পাহাড় হয়ে আছে, তার আড়ালে। এ-ও ঠিক হল, ছ-জন তাগড়াই দস্যু বাবাকে দড়ি বেঁধে ধরে নিয়ে যাবে সেখানে। পায়ে হেঁটে। নতুন সর্দার যাবে আমার পিঠে চেপে। সেই বালির স্তূপের আড়ালে বাবাকে যখন গুলি করা হবে, আমাকে চোখ মেলে তাই দেখতে হবে! কী নিষ্ঠুরতা!
তোমরা শুনলে বোধ হয় আমাকে ছ্যা-ছ্যা করবে, আমি এমন একটা জুলুমবাজির কথা জেনেও বেঁকে বসলুম না। যখন আমার বাবাকে ছ-জন দস্যু টেনে-হিঁচড়ে সেই স্তূপের কাছে নিয়ে চলল, তখনও আমার মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত বেরোল না। বাবা চেঁচায়। বাবা লাফায়। বাবা বে-দম হয়ে হাঁপায়। আমি দেখি। তবু না-দেখার ভান করি। খুনে-দস্যুরা বাবার গলাটা এমন ফাঁস দিয়ে বেঁধেছে, দেখি, জোরে টান পড়লেই বাবার চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসে। আমি সহ্য করি। আমি জানি, বাবাকে যেতেই হবে, ওই স্তূপের আড়ালে। বাবার আর একগুঁয়েমি করার জো নেই। জেদাজেদি করলেই আমার পিঠে বসে নতুন সর্দার বাবাকে সপাং-সপাং করে চাবুক মারে। আমার কী করার আছে! এমনকী, বাবার পেটে ধাক্কা মারার জন্যে নতুন সর্দার আমার লাগাম ধরে টান মারলেও আমি আপত্তি করি না। আমি বাবাকে ধাক্কা মারি। বাবা চমকে ওঠে আমার ধাক্কা খেয়ে। বাবার মুখখানা কি রাগে ছটফটিয়ে উঠল? বাবা কি ভাবে, ছেলেটা শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে শত্রুতা করল?
বাবা যদি সত্যিই পাগল হয়ে গিয়ে থাকে, তবে, এসব কথা না-ও ভাবতে পারে। পাগলের শত্রুই বা কী, আর দোসরই বা কী! সব সমান। এমনকী, পাগল বোধ হয় অভিমানও করতে জানে না। সে পাগল-মানুষই হোক, কিংবা ঘোড়ার মতো জানোয়ার। কাজেই আমার ধাক্কা খেয়ে বাবা বোধ হয় পাগলামিই করল।
আচ্ছা, আমার মা কি তবে সেদিন অভিমান করেছিল! আমার মাকে তো কেউ তা বলে পাগল বলতে পারবে না। আহা, আমার মা! আমি তখন সবে একটু-একটু ছুটতে শিখছি মায়ের গা-ঘেঁষে। একটু-একটু করে বালির ওপর লাফ দিতে শিখছি। ভার বইবার শক্তি পাচ্ছি। মা আমার পাশে-পাশে আমাকে রক্ষা করছে। কিন্তু ঠিক তখনই ওই কোমর-ভাঙা দস্যুসর্দার মাকে বেচে দিল ভিনদেশি এক সওদাগরের কাছে। কই, তখন তো বাবা বাধা দেয়নি? তখন মায়ের জন্যে আমার যে অত কষ্ট হল, কই, তখন তো বাবা আমাকে একটুও সান্ত্বনা দেয়নি। তবে কি বাবা তখন দস্যুসর্দারের ঘোড়া বলে এসব থোড়াই কেয়ার করেছে? এই যে চিরদিনের মতো মাকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল, তার জন্যে বাবার কি একটুও আপত্তি করা উচিত ছিল না? এখন ছেলের কাছে হেরে গিয়ে যে-বাপ পাগল হয়ে যায়, সেই বাপের সামনে তার ছেলের মাকে যখন বেচে দিল দস্যুসর্দার, তখন তো সেই বাপ টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না! আশ্চর্য! তবে কি বাবা আমার ঘোড়া নামের শুধুই একটা জানোয়ার! তার বুঝি দয়া-মায়া থাকতে নেই? সে বুঝি শুধুই দস্যুদের পিঠে নিয়ে অন্যের ধনরত্ন লুঠ করতেই জানে? তা যদি হয়, তবে বাবার জন্যে আমার মনে কেন দয়া আসবে? আমার মায়ের কথা যে ভাবল না, আমি কেন ভাবব তার কথা?
ভাবতেই হল। সে যে আমার বাবা।
যেখানে বাবাকে হত্যা করা হবে, সেখানে আমরা এসে পড়েছি। সারাটা পথ বাবা যেমন করেছে, এতখানি পথ রোদে এসেও সে-দৌরাত্ম্যর শেষ হয়নি। বাবা অবাধ্যের মতো এমন ছটফট করছে যে, বাবার কপালে গুলি মারাই দায়! হ্যাঁ, বাবার কপালেই গুলি মারা হবে। তাতে কষ্ট কম। কিন্তু বাবা এমন অস্থির হলে কপালে গুলি মারা যাবে কেমন করে! গুলি শরীরের যেখানে-সেখানে লেগে যাবে। যেখানে-সেখানে লাগা মানে সঙ্গে-সঙ্গে প্রাণ যাবে না। অনেক রক্ত ঝরবে। অনেক কষ্ট পাবে।
বাবা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না। বাবা যতই লম্ফঝম্ফ করছে, ততই পা লেগে বালি ছুটছে চতুর্দিকে। ছ-টা দস্যু সামাল দিতে দমসম হয়ে যাচ্ছে। রোদের আগুনে ঝলসে যাচ্ছে তারা। নতুন সর্দার হয়তো বুঝতে পারল, এ-ঘোড়াকে বাগে আনা যাবে না। তাই বাবার কপালে গুলি মারার কথা আর না-ভেবে, বুকে মারাই স্থির করল। কষ্ট পায় পাক। বন্দুক তুলে নিল নতুন সর্দার। বাবার বুকে টিপ করল। সঙ্গে-সঙ্গে আমার মাথা গেল ঘুরে। আমি চিৎকার করে উঠলুম চিঁ-হিঁ-হিঁ। লাফ মারলুম এলোপাথাড়ি। দৌড় দিলুম তিরবেগে যেদিকে পারি সেইদিকেই।
নতুন সর্দার আমার এমন আচরণের জন্যে একেবারেই তৈরি ছিল না। এমন ঘাবড়ে গেছল, যে, তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোল না। তারপর হুঁশ হতেই সে প্রথমটা শান্ত গলায় আমাকে ঠান্ডা করার জন্যে মোলায়েম সুরে আদর করতে লাগল, 'আ-আ-আ।' আমি কি আর সে আদরে গলি! আমি সর্দারকে পিঠে নিয়ে যেদিকে পারি সেইদিকেই ছুটি হুড়োহুড়ি করে। আমি কিছুতেই বাবাকে গুলি করতে দেব না।
আমার পিঠের নতুন সর্দার তখন বুঝতে পারল আমার মতিগতি। এবার আর আদর নয়। আমার কেশর ধরে আমাকে কড়কে উঠল, 'থাম, নইলে গুলি মারব তোরই মাথায়!'
আমি জানি, আমাকে গুলি করতেই পারবে না লোকটা। আমাকে গুলি করলে সে নিজেই বিপদে পড়বে। কারণ এলোমেলো ছুটতে-ছুটতে নতুন সর্দারকে নিয়ে আমি এখন যেখানে ছুটে এসেছি, সেখানে কোনো জনপ্রাণী নেই। সেই ছয় দস্যু যে এখান থেকে কত দূরে আছে, সে আর কে জানে! তাদেরও দেখা যাচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে না আমার বাবাকেও। সুতরাং আমাকে মেরে ফেললে, লোকটা নিজেই বিপদে পড়বে। এই দুপুরে, এই তপ্ত বালির ওপর দিয়ে সে কখনোই একা-একা পথ খুঁজে নিজের আস্তানায় যেতে পারবে না। আমি তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারলুম না। আমার মাকে যখন এরা বেচে দেয়, তখন আমার বাবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখেছে। আমার মা মনে দুঃখ নিয়েই ভিনদেশে চলে গেছে। আমি মনে করি, সেদিন বাবার উচিত ছিল বাধা দেওয়া। কিন্তু বাবা কিছুই করেনি। কিন্তু তা-ই বলে আমার বাবাকে আমার চোখের সামনে গুলি করে মারবে, আর আমি তাই চোখ বের করে দেখব! এ অত্যাচার কেমন করে সহ্য করব আমি? আমি পারিনি। আমি নিজেই যেন এখন একটা বদ্ধ পাগল। আমি মরব তবু ভালো, কিন্তু আমার বাবাকে আমি কিছুতেই মরতে দেব না। আমি তাই নতুন এই সর্দারকে পিঠে নিয়ে যতদূরে পারি ছুটে যাই। আমি এই সর্দারকে প্রাণে মারব না। কিন্তু তাকে আমি এমন শিক্ষা দেব, যাতে সে আর কোনোদিন দস্যুগিরি করার নাম উচ্চারণও করতে না পারে। তাই আমি তাকে নিয়ে মরুর এই বালির সমুদ্রের ওপর ছুটতে-ছুটতে দিক হারিয়ে ফেললুম। সে চিৎকার করে আমার পিঠের ওপর। চিৎকার করতে-করতে আমার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ার চেষ্টা করে। পারে না। আমার এই ভয়ঙ্কর গতিকে অগ্রাহ্য করে সে যদি লাফ মারে, তবে তারও দুর্দশা তার বাপের মতোই হবে। সে বোধ হয় আমার মূর্তি দেখে ভয় পায়। আতঙ্কে গলা তার থমকে যায়। তেষ্টায় নিশ্চয়ই তার গলা এখন শুকিয়ে গেছে। আমি জানি, একটু জলের জন্যে আমারও প্রাণ যেতে পারে। তবু আমার বাবাকে পাগল ঠাউরে যে বন্দুক তোলে, তার শাস্তি হওয়ার পর আমি মরলে আমার কোনো খেদ থাকে না।
এতক্ষণ এক দমবন্ধ উত্তেজনায় আমার কিছুই হুঁশ ছিল না। আমি নজর করিনি, আকাশে মেঘ দেখা দিয়েছে। তবে কি ঝড় উঠবে! এ কী! এ আমি কোথায় চলে এসেছি! আমার চারপাশে বালির পাহাড়! আমি যে সেই পাহাড়ের মাঝখানে এখন! হ্যাঁ! ওই শোনো, ধীরে-ধীরে বাতাসের গতি বাড়ছে। ঝড় উঠছে। এবার ওই পাহাড়ের বালি উড়ে-উড়ে আমাদের ঢেকে ফেলবে! আকাশটা, দ্যাখো, হঠাৎ কেমন বেগুনি-নীল হয়ে গেল। ঝড় উঠল। ওই ঝড়ের শব্দ কী ভীষণ! যেমন তার শব্দ, তেমনই তার তাত। মনে হচ্ছে, যেন আগুনের হলকা, এখনই আমাদের পুড়িয়ে ছাই করে দেবে। মরুতে যারা বাস করে, তারা সবাই জানে এ-ঝড়ের নাম 'সাইমুন'। এ এক ভয়াবহ দৃশ্য। চেয়ে দ্যাখো, রাশি-রাশি বালি উড়তে উড়তে আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। বালির আস্তরণে আঁধার নেমে এসেছে মরুর চারদিকে। এতক্ষণ যেগুলো ছিল বালির পাহাড়, এখন ঝড়ের প্রচণ্ড ধাক্কায় সেগুলো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ধসে পড়ছে। সে-বালি উড়ে চলেছে আরও অন্য কোথাও। এ-পাহাড় ভেঙে আবার অন্য কোথাও আর-এক পাহাড় গড়ে উঠবে এই উড়ন্ত বালির। এমনই হয় মরুভূমিতে। এবার ভাবো, আমার কথা। আমি এই আগুন-গনগন বালির ঝাপটার মধ্যে নাকানি-চোবানি খাচ্ছি। আমি জানি না, এখন বাঁচব, না মরব। আর ছুটতেও পারছি না। আশ্চর্য! কখন যে আমার পিঠ থেকে পড়ে গেছে সেই দস্যুটা, আমি একদমই টের পাইনি। কোথায় গেল সে। সে কি বেঁচে আছে! কে জানে! এখন আমি বাঁচি কি না তাই দ্যাখো! যেন জ্বলন্ত আগুনে-পোড়া লোহার ছ্যাঁকা এই বাতাস! কতক্ষণ সহ্য করতে পারব আর! আমার চোখ দুটোকে এখন যদি বাঁচাতে পারি এই বালির ঝাপটা থেকে! দুটো চোখই যদি যায়, তবে যে বেঘোরে মরতে হবে এই মরুভূমিতে। তাই যেদিকে বাতাস ছোটে, আমিও টাল খেতে-খেতে ছুটি সেইদিকেই। কিন্তু পারি না। এলোমেলো বাতাস নিমেষে সব ওলটপালট করে দেয়। আমার কিছুই করার নেই। নিজেকে ভাসিয়ে দিই বাতাসের সঙ্গে। তারপরে যে খড়কুটোর মতো কোথায় উড়ে যাই, নিজেও জানি না।
তারপর?
তারপর যেমন হয় মরুভূমিতে, আচমকা ঝড় উঠেছিল, আচমকাই থামল। আকাশের অন্ধকার কেটে গেল। পলকে আবার রোদ উঠল ঝাঁ-ঝাঁ। আবার সুনসান মরুভূমি আগের মতো। পায়ের নীচে ছড়িয়ে আছে আগের মতোই বালির রাশি। ক্ষণেক আগে এমন যে একটা ভয়াবহ তাণ্ডবে মত্ত ছিল মরুভূমি, এখন তার রূপ দেখলে তোমার তা মনেই হবে না। এখন সব শান্ত। কেবল রোদের আগুন ছাড়া। সে যেন দাউ-দাউ করছে।
কিন্তু আমি? বড্ড ক্লান্ত। আর পারছি না। আগুনের তাপে ঝলসে গেলে তোমাদের মতো মানুষের কেমন কষ্ট হয়, আমি জানি না। কিন্তু রোদে-ঝলসানো বালির এ-ঝটকা আমার শরীরে জ্বালা ধরিয়ে দিয়েছে। এখন একটু কেউ জল দিতে পারো আমাকে? কী প্রচণ্ড তেষ্টা পেয়েছে! আমার গলা থেকে বুক শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখন একটু জল দাও! একটু জল! আমি বোধ হয় আর বাঁচব না। তা যদি হয়, তবে এখনও মরছি না কেন! একটু জলের জন্য এমন কষ্ট আর যে সহ্য করতে পারছি না।
তবু যতক্ষণ প্রাণ আছে ততক্ষণ বাঁচার জন্যে কে আর চেষ্টা না করে! আমিও তাই অসহ্য কষ্ট অগ্রাহ্য করে বুকে বল আনলুম। পা ফেললুম বালির ওপর। চার পায়ে টলতে-টলতে হাঁটলুম। জানি না, কোথায় যাচ্ছি। জানি না, কতক্ষণ এমন করে চলতে পারব! চলতে-চলতে যদি হোঁচট খাই! পড়ে যাই! তবে যে আর উঠতে পারব না। যেখানে পড়ব, সেইখানেই পড়ে-পড়ে জীবনটা শেষ হয়ে যাবে। মুখে কেউ একফোঁটা জলও দেওয়ার থাকবে না। সে আর কী করা! এই তো দস্তুর মরুভূমির। এমন যে কত হচ্ছে, কে তার খোঁজ রাখছে। মরছে এই বালির ওপর আমাদের মতো কত জানোয়ার রোজ, কিংবা তোমাদের মতো মানুষজন। মরুভূমিতে জানোয়ার আর মানুষে কোনও তফাত নেই। সবাই সমান। অজান্তে যারাই মরে তারাই পড়ে-পড়ে পচে। শেষকালে সূর্যের তেজে হাড়গোড়গুলো শুকিয়ে গড়াগড়ি খায় বালির ওপর।
ভাবতে-ভাবতে এখন আমি কোনদিকে চলেছি, বলতে পারি না। ক-পা এসেছি, তাও জানি না। কেউ নেই কোনোদিকে। এ-সময় দস্যুগুলোকে আমি যদি দেখতে পাই, তা হলে হয়তো বেঁচে যাই। কিন্তু এই ঝড়ের দাপটে তারাই যে বেঁচে আছে, তারই-বা ঠিক কী। সব কেমন ছত্রখান হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। ভালোই হয়েছে। কিন্তু আমার বাবার কী হল? কে বলতে পারে, বাবা হয়তো বেঁচেই গেছে! বাবাকে মারার জন্যে বন্দুক হাতে নতুন সর্দারটার যে আচ্ছা শিক্ষা হয়েছে, এতেই আমি খুশি। ঝড়ের আক্রোশে লোকটা যে নিজেই মরেনি, তাই-বা কে বলতে পারে!
ওঃ! কী ভয়ঙ্কর একা, আমি, এখন। মরুর বালি আর বাতাস ছাড়া এখন আমার আর কেউ সঙ্গী নয়। তবে এ-সঙ্গীকে বিশ্বাস নেই। কখন যে হিংসার ঝাঁঝ দিয়ে আমার গলাটা খামচে ধরবে, কেউ জানে না। হয়তো আর কিছুক্ষণ পরে, আমার চোখে অন্ধকার নেমে আসবে। আমি হয়তো বেহুঁশ হয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাব—এই কথা মনে হতেই আমি আঁতকে চিৎকার করে উঠলুম, চিঁ-হিঁ-হিঁ। আচ্ছা, আমি কী বোকা! কে শুনবে আমার ডাক! কে ছুটে আসবে আমার চিৎকার শুনে! আমার চিৎকারটা বালির আগুনে পুড়তে-পুড়তে ছাই হয়ে ছড়িয়ে পড়ল বোধ হয় মরুর আকাশ থেকে এধারে-ওধারে!
এমন সময়ে যেন কী একটা অদ্ভুত শব্দ আমার কানে ভেসে এল। হঠাৎ। মনে হচ্ছে, একটু দূরে বাতাসে যেন অনেক নূপুরের ঝুনঝুনি বাজছে। এই দুর্দান্ত মরুর পড়ন্ত দুপুরে কাদের এখন এমন সাধ হল নূপুর বাজানোর! আমার বুকের ভেতরটা উথলে উঠল। আমি বোধ হয় তবে মানুষের দেখা পেলুম। আমি তাই, ওই শব্দ যেদিক থেকে আসে সেইদিকেই পা চালালুম। আশ্চর্য! এসেছি মাত্র ক-পা, হঠাৎ যেন মনে হল, আমি যেদিকে হাঁটছি, শব্দ তো সেদিকে নয়। শব্দ তো আমার পেছন থেকেই আসছে। আমি ঘুরে দাঁড়ালুম। ভালো করে কান পেতে শুনলুম। হ্যাঁ, ঠিক তো বটে। শব্দ তো আমার পেছনেই। আমি আরও ভালো করে শুনলুম। শুনতে-শুনতে আনমনে সেইদিকেই পা ফেললুম। সত্যি বলছি, তখন আমার মনে হল, কারা যেন নূপুরের মধুর সুরে আমাকে ডাক দিচ্ছে। আমার মনে হল, আমাকে যেতেই হবে ওই শব্দের কাছে। আমি একটা ঘোড়া। কাদের এমন সাধ হল, আমাকে নূপুর বাজিয়ে ডাক দেওয়ার! কারা ডাকে! কেন ডাকে? কোথায় তারা? কোন গোপন আস্তানা থেকে এমন নাচের নূপুর বেজে ওঠে!
উফ! আমি হোঁচট খেয়েছি। আঃ। ভীষণ লেগেছে। এমন মুখ উঁচিয়ে উদোর মতো কেউ হাঁটে! খুব রক্ষে, এত বড়ো দেহটা নিয়ে আমি মুখ থুবড়ে উলটে পড়িনি! তেমন করে পড়ে গেলে হয়তো আমি আর উঠতেই পারতুম না। হয়তো আমার পা ভাঙত। নয়তো চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়তুম বালির ওপর। ভাগ্যিস শুধু গর্তেই পা পড়েছে! সঙ্গে-সঙ্গে তুলেও নিয়েছি।
কিন্তু এ কী! আমার পায়ে জল লাগল কেমন করে! তোমরা বিশ্বাস করো, ঠিক সেই সময় আমাকে তোমরা যদি দেখতে, আমার এত কষ্ট দেখে তোমাদের একটুও দুঃখ হত না। হাসি পেয়ে যেত! কেননা, আমি যে-গর্তে পা ফসকে পড়ে গেছি, সেই গর্তেই এখন আমি মুখ ঠেকিয়ে জল চুষছি। কে জানত, এটা মরুভূমির সেই গর্ত, যাকে সবাই বলে প্রস্রবণ। আসলে এটা ঠিক প্রস্রবণের মতো কি না জানি না, কিন্তু এমন জলের গর্ত মরুভূমির কোথাও-কোথাও দেখতে পাওয়া যায়। যাদের মরু পেরোতে হয় কাজে-কর্মে, তাদের এই গর্তের জলই জীবন। এই জল তারা পেট ভরে পান করে নেয়। ভরে নেয় পাত্র। আমার পাত্র ভরার তো কোনও কথা নয়। আমার পেটই আমার পাত্র। আমি তাই পেট ভরে জল খেয়ে নিলুম। আঃ, কত জল! যত খাই, তত যেন আরও খেতে ইচ্ছে করে। কিছুতেই তেষ্টা মেটে না। তারপর যখন তেষ্টা মিটল, আমি প্রাণে বাঁচলুম।
সত্যি, আমার বাঁচার কথা ছিল না। কিন্তু কারা যে অমন করে নূপুর শুনিয়ে আমায় জলের গর্তে টেনে আনল! তারা কি আমার বন্ধু! বুঝি, আমার কষ্ট দেখে তাদেরও কষ্ট হচ্ছিল? কিন্তু, কী আশ্চর্য দ্যাখো, এখন আর নূপুরের টুংটাং শব্দ শোনা যাচ্ছে না! একেবারে নিশ্চুপ। আমি অবশ্য পরে শুনেছি, ওই শব্দ নূপুরের শব্দই নয়। মরুর বালির ওপর বাতাস যখন লুটোপুটি খায়, তখনই শোনা যায় এই শব্দ। যেন নাচের ছন্দে কাদের পায়ে নূপুর বাজছে। বাতাস আর বালির এই নূপুরের জন্যেই তো তোমাদের কাছে আমি আমার এ-গল্প শোনাতে পারছি। একটু জল না-পেলে আমি বাঁচতুম কেমন করে? আমার গল্প পৌঁছত কার কানে? আমার প্রাণের সঙ্গে এই গল্পও হারিয়ে যেত। কোথায়? তা আর আমি জানব কেমন করে?
কিন্তু এখন? প্রাণ তো ফিরে পেয়েছি। এর পর কী করব আমি? বেলা পড়ে আসছে। এখন মাথার সূর্য ঢলে পড়ছে। খানিক পরে আঁধার নামবে। সূর্য ডুববে। গোলেমালে কোথায় যে চলে এসেছি, তাও ঠাওর করা আমার কম্ম নয়। তোমরা শুনে রাখো, আমি এখন বুঝতে পারছি, মরুর এই গোলকধাঁধায় আমি হারিয়ে গেছি। কোন পথে হাঁটলে যে ঠিক পথটি পেয়ে যাব, আমি জানি না। আবার, পথ খুঁজতে গিয়ে যদি বেপথে পড়ে যাই, তা হলে সে আরও সর্বনাশের কথা। অবশ্য, তোমরা বলতে পারো, এখন তো আমি পথহীন এই মরুভূমির বিপদ মাথায় নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি। নতুন করে আর কী বিপদ হবে! আশ্চর্য, কেমন করে যে নতুন সর্দারটা আমার পিঠ থেকে পড়ে গেল, আমি বুঝতেই পারলুম না। আমি এও জানি, ঝড় না-উঠলে আমার বাবাও নির্ঘাত মরত এই লোকটার বন্দুকে। অবিশ্যি তার বন্দুক ছোড়ার আগে আমিও যদি ছুটতে-ছুটতে হুলুস্থুলু না-বাধাতুম, তবে বাবাকে তখনই গুলি খেতে হত। আচ্ছা, বাবার কী হল? এখন বাবা কোথায় থাকতে পারে! বাবাও কি আমার মতো ঝড়ের ঝাপটায় হারিয়ে গেছে মরুভূমিতে! হারিয়ে যাক, সে তবু ভালো। বাবা যেন বেঁচে থাকে! আমি যেন খুঁজে পাই বাবাকে, এইখানে, এই মরুভূমিতে, আচমকা। আঃ! তা হলে সে না-জানি কী আনন্দের। আমি জানি, আমি মরুর পথ ভুল করলেও বাবা করবে না। বেপথ থেকে বেরিয়ে আসার সব পথই বাবার জানা আছে। কিন্তু বাবার বদলে এখন যদি কোমর-ভাঙা সর্দারের সেই ছেলে, সেই নতুন সর্দার আমাকে দেখতে পায়, তবে আমার বিপদ কেউ ঠেকাতে পারবে না। আবার বন্দিদশা। আবার দস্যুকে পিঠে নিয়ে নির্দোষ মানুষের সর্বস্ব লুঠ করতে তাদের সঙ্গী হওয়া। না, আর আমি কিছুতেই দস্যুর ঘোড়া হতে চাই না। এখন, এই মরুভূমির বালির রাজ্যে আমি পথ যদি খুঁজে না পাই, আমার যদি প্রাণ যায় যাক, তবু আমি দস্যুকে আর পিঠে নিতে চাই না। তাদের অপকর্মের ভাগিদার হতে চাই না আমি। যারা আমারই পিঠে বসে, আমারই চোখের সামনে আমার বাবাকে মারার জন্য বন্দুক তোলে, আমি আর সেই পিশাচগুলোর মুখ দেখতে চাই না। আমার আনন্দ এই যে, আমি নিশ্চয়ই এই পিশাচদের হাত থেকে বাবাকে বাঁচাতে পেরেছি। এখন আমার একমাত্র আশা, আমরা দু-জন দু-জনকে যেন আবার ফিরে পাই। আমরা মানুষ নই, দুটো জানোয়ার। ঘোড়া। কিন্তু জোর গলায় বলি, আমরা মানুষের মতো দস্যু নই। যে-মানুষ খুন করে না, মুখে মুখোশ এঁটে দস্যুবৃত্তি করে না, তাদের আমরা বন্ধু।
আমি আবার চমকে উঠি কেন এমন আচমকা! বুকের ভেতরটা কেন উঠল ধক করে হঠাৎ! দূর থেকে ও কীসের শব্দ ভেসে আসছে! আমি ভয়ে অস্থির হয়ে গেলুম। নিজের ল্যাজটা পর্যন্ত নাড়তে সাহস হল না। কান আমার খাড়া। দাঁড়িয়ে রইলুম পাথর হয়ে।
হ্যাঁ, ঠিকই, শব্দই। ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে এদিকেই। যতই এগিয়ে আসছে আমি বুঝতে পারছি, এ-শব্দ নূপুরের মতো ঝুনঝুন করে বাজছে না। এ যেন অনেক ঘন্টার শব্দ। টুংটাং একসঙ্গে বাজছে। বাজতে-বাজতে এলোমেলো ছড়িয়ে পড়ছে। তবে এ কি চলন্ত উটের গলায় দুরন্ত ঘন্টার শব্দ! না কি, এই হয়-হয় সাঁঝে এ কোনও মরু-পিশাচের কারসাজি! সে কি জাদুর মায়ায় ভুলিয়ে-ভালিয়ে আমাকে বেপথে নিয়ে প্রাণে মারতে চায়!
হবে বোধ হয়। কারণ, আমি আমার মায়ের কাছে গল্প শুনেছি, জিন নামের এমন পিশাচ মরুতে বাস করে। যেমন দেখতে তাদের বিকট দৈত্যর মতো, তেমনই ভয়ঙ্কর হিংস্র তাদের স্বভাব। এই বালির রাজ্যে কাউকে একা পেলে তারা ছেড়ে দেয় না। অনেক দূর থেকে নাম ধরে এমন ডাক দেবে, মনে হবে, ঠিক যেন আপনজন কেউ ডাকছে। সেই ডাক যে শুনবে তার নিস্তার নেই। তাকে ছুটতেই হবে সেই ডাক যেদিক থেকে আসছে সেইদিকে। তারপর সে পথ ভুলবে। ভুল পথে নাস্তানাবুদ হয়ে তার জীবন শেষ হয়ে যাবে।
না, এ জিন নামের সেই পিশাচ নয়। আমার স্পষ্ট মনে হল, উট হাঁটছে। এই টুংটাং শব্দ তাদেরই গলার ঘন্টার। মনে হল সঙ্গে ঘোড়াও আছে। কারণ ঘোড়ার গন্ধটাও আমার নাকে এল। যতই হোক, আমার জাত ভাইয়ের গন্ধটা আমার নাক এড়িয়ে যাবে, এ তো হতে পারে না। তবে কি কোনও সওদাগরের দল আসছে এই পথে! হতে পারে। সুতরাং, হঠাৎ যেন আমার মনটা কেমন হালকা হয়ে গেল। মনে হল, এ যদি সওদাগরের কোনও দল হয়, তবে, আমায় হয়তো আর বেঘোরে মরতে হবে না। অনেক প্রাণ কি আমার মতো একটা অসহায় প্রাণীকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে আসবে না?
ওই তারা আসছে! আমি এখন দেখতে পাচ্ছি তাদের। সেই অনেক দূরের অস্পষ্ট শব্দ, এখন অনেক কাছে এগিয়ে এসেছে। না, তা বলে আমার এখন, এরকম বোকার মতো এখানে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক নয়। কে বলতে পারে, যাদের আমি সওদাগর ভাবছি, তারা তো সওদাগর না-ও হতে পারে। না হলে, ওরাও কি দস্যু! বলা যায় না। সওদাগর আর দস্যু ছাড়া মরুভূমিতে শখ করে কে আর হাওয়া খেতে আসে! যদি দস্যু হয়, তবে আবার গেছি। সুতরাং, আর দেরি নয়, লুকিয়ে পড়ো!
কিন্তু কোথায় লুকোই। শেষ-নেই এই বালির সমুদ্রের, লুকোবার ঠাঁই কই?
আছে, আমার চোখের সামনেই আছে। ওই দ্যাখা যাচ্ছে একটা বালির স্তূপ। স্তূপটা পাহাড়ের মতো উঁচু না হলেও ওর আড়ালে আমার মতো ঘোড়া স্বচ্ছন্দে লুকিয়ে থাকতে পারে। আমি ছুটলুম। আর ছুটতে গিয়েই আমার মালুম হল, আমার খিদে পেয়েছে। কিন্তু প্রাণের চেয়ে তো আর খিদে বড়ো নয়। এখন প্রাণটাই বাঁচুক আগে। তারপর খিদের কথা ভাবা যাবে। যদিও জানি, মরুভূমিতে একা-একা খিদের জ্বালায় মাথা কুটে মরে গেলেও আমার মুখে একমুঠো ঘাসও কেউ গুঁজে দেবে না। যতই খাই-খাই করি, খেতে হলে খাও বালি! বালি ছাড়া কিছু নেই। কোন দেশে কে আর বালি খেয়ে খিদে মেটায়!
আমি চটপট লুকিয়ে পড়লুম সেই বালির স্তূপের আড়ালেই। যেখানে লুকোলুম, সেখান থেকে উঁকি মেরে স্পষ্ট দেখা যায় মরুর সামনেটা। অবশ্য বেশিক্ষণ আমায় লুকিয়ে থাকতে হল না। একটু দাঁড়াতেই দেখতে পেলুম সার বেঁধে দলটা এগিয়ে আসছে। ক-টা ঘোড়া দেখলুম সামনে। ক-টা পেছনে। তাদের পিঠে সওয়ার। এরাই বুঝি সওদাগর। মধ্যিখানে উটের সারি। তাদের পিঠে মাল-মশলার বোঝা। বিকিকিনি করতে চলেছে মরু পেরিয়ে শহরের বাজারে। দ্যাখো, দিনের এই শেষ আলোয় ঘোড়সওয়ারদের কোমরে বাঁধা তরোয়ালের খাপগুলো কেমন ঝকঝক করছে।
অনেকটাই কাছে এগিয়ে এল তারা। মনে হচ্ছে, ওই জলের প্রস্রবণের দিকেই তারা এগিয়ে যাচ্ছে। যতই এগোচ্ছে, আমিও স্পষ্ট সব দেখতে পাচ্ছি। সাজের বহর দেখেছ ঘোড়াগুলোর! সব ক-টা ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝুলে পড়েছে ছোটো-বড়ো ঘন্টা। মাথায় পালক। রঙিন। হাওয়ায় দুলছে। সওয়ারিদেরও কী জাঁকালো পোশাক। মাথায় সাদা পক্কা। তাতে সব কতরকমের কাজ করা। ঝকমক করছে। সব ক-জনের দাড়ি। লম্বা। গাল-ভর্তি। যদি জিজ্ঞেস করো, দলে তারা কতজন, তা আমি বলতে পারব না। তবে তারা যে দস্যু নয়, এটা আমি জোর করেই বলতে পারি। কেননা, এতদিন তো আমি দস্যুদের সঙ্গেই ঘর করে এসেছি।
শেষমেশ সত্যিই তারা প্রস্রবণের কাছেই এল। তারা যে যার ঘোড়ার পিঠ থেকে নামল। যে-লোকটাকে আমার চোখে বেশি-বেশি ব্যস্ত লাগল, মনে হয়, সে-ই দলের নেতা। দেখলুম, প্রথমেই জলের প্রস্রবণে সবাই হামলে পড়ল। মুখ-চোখ জলে ভিজিয়ে, হাত-পা জলে চুবিয়ে ঢক-ঢক করে জল গিলতে লাগল। শুধু মানুষ নয়, মানুষের সঙ্গে জল খায় উট আর ঘোড়াও। আঃ! গলায় আওয়াজ ওঠে ঢক-ঢক, তাদেরও। তেষ্টা যেন আর মিটতে চায় না। তারপরেই শুরু হয়ে গেল কাজ। কেউ-কেউ উটের পিঠ থেকে মাল নামায়। কেউ-কেউ ঘোড়ার সাজ-পোশাক খুলে দেয়। একদল হাতে-হাতে তাঁবু খাটায়। একটা ইয়া পেল্লাই নীল তাঁবু। এদিকে-ওদিকে খুদে খুদে আরও তাঁবু। তাঁবুরই কাছ বরাবর বাঁধা হল ঘোড়া আর উটগুলোকে। তাদের মুখের সামনে ঘাস, ছোলার বস্তা খুলে দেওয়া হল। তারা জাবর কাটে। আর এখানে দাঁড়িয়ে আমি পেট কোলে করে তাই দেখি। আমার নোলা দিয়ে জল গড়ায়। খিদে বাড়ে। আর ভাবি, তা হলে কি দলটা এখানেই আজ রাত কাটাবে?
একটু পরেই ঘোড়সওয়াররা বিশ্রাম নিতে ঢুকল তাঁবুর ভেতর। সন্ধে নামছে। বাতাস ঠান্ডা হচ্ছে। শীত একটু-একটু মালুম দিচ্ছে। আলোর রোশনি দেখা যাচ্ছে তাঁবুর ভেতরে-ভেতরে। আকাশে তারা ফুটছে। আর আমার চোখের দৃষ্টি অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এখন যাও-বা একটু আবছা দেখছি, এর পর তা-ও দেখতে পাব না। তখন কী করব?
আমার খিদে বাড়ছে। ঘোড়া আর উটগুলোর বোধ হয় খাওয়া হয়ে গেছে। তাদের আমি আর দেখতে পাচ্ছি না। তবে মাঝে-মাঝে ঘোড়ার ডাক শুনতে পাচ্ছি। ঘোড়ার ডাকের এ-ভাষা তোমরা বুঝবে কেমন করে! আমি নিজে ঘোড়া, তাই আমার বুঝতে কষ্ট নেই। বুঝতে পারছি, ওরা চিঁ-হিঁ-হিঁ করে ডাক দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। আর আপসোস করছে, 'আহা রে! মানুষ হয়ে জন্মালে ভালো-মন্দ খেয়ে বাঁচতুম। ঘাস, ছোলা খেয়ে-খেয়ে অরুচি ধরে গেল!'
হ্যাঁ, তখন সত্যিই সওদাগরবাবুদের তাঁবু থেকে ভালো-মন্দ খাবারের গন্ধ ভেসে আসছিল। আমি এখান থেকে মালুম পাচ্ছি। বলতে লজ্জা নেই, এখন নোলার সঙ্গে নাকও সুড়সুড় করতে লাগল।
হঠাৎ আমার এক জাতভাই রঙ্গ করে টিপ্পুনি কেটে তার সঙ্গীকে বলল, 'তা হলে গন্ধের গুণ আছে বল! ভালো-মন্দ খাবারের গন্ধ নাকে সেঁদুতেই যখন তোর মানুষ হওয়ার ইচ্ছে, তখন না-জানি, গোলাপের গন্ধ নাকে এলে বলে না বসিস, মাথায় পাগড়ি পরে বিয়ের বর হতে ইচ্ছে করছে।'
তার কথা শুনে সব ক-টা ঘোড়াই তখন এমন চিঁ-হিঁ-হিঁ করে হেসে উঠল যে, আমিও থাকতে পারলুম না। আমিও হেসে ফেললুম। এমনকী, আমার হাসির স্বরটা বেশ জোরেই আমার গলা ছিটকে বেরিয়ে এল। বুঝতেই পারছ, এদের কথাবার্তা যখন আমি এখান থেকে শুনতে পাচ্ছি, তখন ওরাও যে আমার গলার স্বর শুনতে পাবে ওখান থেকে, এতে কোনও সন্দেহই নেই। আর, শুনতে পেল বলেই ওরা কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। বলতে কী, বেশ কিছুক্ষণ আর তাদের কথা শুনতে পেলুম না। মনে হয়, তাদের তখনও ঘোর কাটেনি। নিশ্চয়ই তখন তারা এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছিল।
অবশ্য ঘোর তাদের বেশিক্ষণ ছিল না। একটু পরেই ধন্দ কাটতেই একটা ঘোড়া বলে উঠল, 'কী ব্যাপার বল তো?'
অন্য একটা ঘোড়া বেশ চিন্তিত স্বরেই উত্তর দিল, 'দূর থেকে একটা ঘোড়ার হাসি ভেসে এল।'
'গলাটা চেনা-চেনা মনে হল না তো!' আর-একটা ঘোড়া সন্দেহে ঘাড় নাড়ল।
'ঠিক বলেছিস।'
'কেউ আমাদের ভেংচি কাটল কি?' আর-একটা ঘোড়া জিজ্ঞেস করল।
'হতে পারে।'
'আর-একবার হেসে দেখব?'
'দেখতে পারো।'
আর সত্যি-সত্যি রহস্যটা কী, জানার জন্যে সব ক-টা ঘোড়া আবার হেসে উঠল একসঙ্গে। কিন্তু এবারের হাসিটা সেবারের মতো হল না।
হাসি না পেলে, ইচ্ছে করে হাসলে যেমন কাঠখোট্টা লাগে, তাদের এবারের হাসিটা তেমনই শুকনো-শুকনো লাগল। মনে হল, ওরাই যেন ভেংচি কাটছে।
খেপেছ! আর আমি মুখ খুলি! একবার ভুল করে বেমক্কা হেসে ফেলেছি বলে, বারবার কি আর ভুল হয়! সুতরাং আমার গলার সাড়া-শব্দ না পেয়ে, এবার বোধ হয় তারা একটু বেশি রকমেই ঘাবড়ে গেল। অন্য একটা ঘোড়া বলেই ফেলল, 'জিন-টিন-নয় তো!'
যে-ঘোড়াটা এই কথাটা বলল, সে যে একটু ভিতু গোছের, তাতে আমার কোনোও সন্দেহ নেই। বলতে-বলতে তার গলাটা, স্পষ্ট শুনতে পেলুম, কেঁপে উঠল। ছি-ছি, তুই একটা মরুভূমির ঘোড়া হয়ে, এমন ভয়ে কেঁচোর মতো কাঁপিস কী বলে! এই দ্যাখ আমাকে! আমি এখানে একাই দাঁড়িয়ে আছি। আমার কোনও ভয় দেখছিস! ছোঃ জিন, না ছাই।
ব্যস! ওই 'ছাই' কথাটি মনে যেই না এসেছে, অমনই ধড়াস করে উঠেছে আমার নিজেরই বুক। ইস! জিনকে আমি ছাই বলে ফেললুম! এখন যদি জিন সত্যিই আমার সামনে উপস্থিত হয়! আমার ঘাড়টা ধরে মটকে দেয়। অন্যকে ভিতু বলতে গিয়ে এখন এ যে দেখি, আমি নিজেই ভয়ে কেঁচোর মতো কাঁপছি। সত্যি কথাই তো! অন্ধকারে খাঁ-খাঁ করছে সারা মরুভূমি। যে-কোনোও দিক থেকে 'গাঁক' করে হাঁক পেড়ে জিন আমার সামনে লাফিয়ে পড়তে পারে! তাই তো! আমি কী করি এখন! কী ভীষণ ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল আমার! মনে হচ্ছে, জিন বুঝি আমারই পিঠের ওপর নিশ্বাস ফেলছে! তার নিশ্বাসের ঝাপটা লেগে আমার গায়ে কাঁটা দেয়! এই বুঝি এসে তার মস্ত দুটো হাত বাড়িয়ে খামচে ধরে আমায়। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না। পালাতেও পারছি না। এমনকী, ঘাড় ঘুরিয়ে যে দেখব, সে-সাহসও নেই আমার। মনে হচ্ছে, সে যেন আমার পেছনে তার ইয়া লম্বা লাল-টকটকে জিভ বার করে দাঁড়িয়ে আছে! দাঁতগুলো তার কড়মড় করছে! বুঝি কামড়ে উপড়ে নিল ল্যাজটা! উফ! না, আর নয়। মরি মরব, আমি পালাই! সঙ্গে-সঙ্গে আমি মারলুম ছুট। সেই বালির স্তূপের আড়াল থেকে। না, আমি ছুটতে পারছি না। আমার যে পা কাঁপছে। আমি তাড়াতাড়ি পা ফেলার চেষ্টা করছি। কিন্তু মনে হচ্ছে, কে যেন আমায় পেছন দিকে টেনে ধরছে। আমি ঠিক তখনই গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলুম, 'আমাকে বাঁচাও! চিঁ-হিঁ-হিঁ!'
অন্ধকার মরুভূমি। সেই অন্ধকারে আমার গলার শব্দ তিরের মতো ছুটে গেল। আর চিৎকার করে আমিও তিরবেগে ছুটতে শুরু করলুম। যতই পা কাঁপুক আর বুক ধড়ফড় করুক, আমি আর থামলুম না।
খেয়াল ছিল না আমি কোনদিকে ছুটছি। তখন আমার মনে হচ্ছিল, এখন যদি কারো গায়ে গা ঠেকিয়ে একটু দাঁড়াতে পাই! তা হলে বুঝি বেঁচে যাই! এতদিন আমি দল বেঁধে মরুর বুকে কত ছোটাছুটি করেছি। আমার পিঠে মানুষ ছিল। আজ আমি একা। তার ওপর এখন রাতের অন্ধকার। এই গা-ছমছম রাতের মরুভূমি যে কী ভয়াবহ, আজ আমি হাড়ে-হাড়ে তা টের পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, ভয় কাউকে ছেড়ে কথা বলে না! মানুষের যেমন ভয়, তেমনই ঘোড়ারও। কিন্তু এখন আমার মনে হচ্ছে, মানুষের চেয়ে ঘোড়া তো দেহে অনেক বড়ো, তাই ঘোড়ার ভয়টাও অনেক বেশি। নইলে অমন আহাম্মকের মতো আমি চেঁচাই! ছিঃ-ছিঃ!
এ কী! এ কোথায় আমি ছুটে পালিয়ে এসেছি আমারই অজান্তে! এ যে একেবারে সওদাগরের তাঁবুর পেছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি। ভয় পেলে সবার বুঝি এমনই হয়! যেখানে এক টুকরো আলো দেখতে পায়, ছোটে সেইদিকেই। নইলে আমিই-বা এলুম কেন? আঃ! আমার যেন ধড়ে প্রাণ এল। অন্তত এখন আমি মনে করতে পারছি, আমি আর একা নই। তাঁবুর ভেতর থেকে মানুষের গলার স্বর ভেসে আসছে। আমি চুপচাপ এইখানেই দাঁড়িয়ে পড়লুম। তাঁবুর ফাঁক-ফোকরের আলোয় আমি এবার আবছা-আবছা দেখতে পাচ্ছি এদিক-ওদিক, চারদিক। উটগুলো জিরোচ্ছে। আমার জাতভাই ঘোড়াগুলো একটু দূরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে পা ঠুকছে। নয়তো, ফররর-ফররর করে নাকের হাওয়া ছাড়ছে। কিংবা এমনও হতে পারে, আমার সেই 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকার শুনে নিজেরাই ব্যস্ত হয়ে হাঁকপাক করছে। ঘোড়াগুলো যে আমাকে দেখতে পায়নি, এটা বোঝাই যাচ্ছে। তা যদি পেত, তবে এখনই একটা শোরগোল তুলে আমায় গণ্ডগোলে ফেলে দিত। সুতরাং ওরা যেমন আছে তেমনই থাক। আমায় যেন না দেখতে পায়। ওদের চোখের আড়ালে যতক্ষণ থাকি, ততক্ষণই নিশ্চিন্তি। কিন্তু না, ওদের চোখের আড়ালে থাকলেই কি-আর নিশ্চিন্তে থাকা যায়। একটু পরেই পাহারাদার বেরিয়ে পড়বে তাঁবুর ভেতর থেকে। তারা সারারাত পাহারা দেবে এই তাঁবু। কখন, কোনদিক থেকে বিপদ আসে কে বলতে পারে! দস্যুদের আর গুণের কথা বলতে হবে না। কখন অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব লুঠ করে পালাবে কেউ জানে না। কাজেই পাহারার ব্যবস্থা করতেই হয় সব সওদাগরের দলকে।
কিন্তু তখন আমার কী হবে! আমি তো আর খেজুর বিচির মতো এইটুকু নই যে, আমায় দেখতে পাবে না পাহারাদার। এই পেল্লাই দেহটা নিয়ে তখন কোথায় লুকোব! তবে রক্ষে এই যে, আমার গায়ের রংটা নীলচে-কালো। অন্ধকারে এমন মিশে যায়, সহজে দেখা যায় না। তবে আমাকেও খুব সতর্ক থাকতে হবে। গায়ের রংটা অন্ধকারে মিশে যায় বলে, নাকের শব্দটা তো আর অন্ধকারে মিশে যাবে না! অসাবধানে যদি একবার হেঁচে ফেলি, কি ডেকে উঠি, তখন বুঝতেই পারছ, কী হালত হবে আমার!
সওদাগরের তাঁবুতে গড়গড়া টানার কেমন ভুড়ুক ভুড়ুক শব্দ উঠেছে! তামাকের সুগন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে ম-ম করে। আঃ! তামাকের গন্ধটা বেড়ে লাগছে নাকে। কিন্তু ওরা এত বকবক করছে কেন তাঁবুর ভেতর! কী কথা হচ্ছে এত! কান পাতলুম। যেমন গড়গড়ার শব্দটা ফুরফুরে গন্ধ ছড়িয়ে ভেসে আসছিল, তেমনই, একজনের আলতো গলার স্পষ্ট-স্পষ্ট মুখের কথা আমি শুনতে পাচ্ছিলুম। আর একটু ভালো করে কান পাততেই আমার মনে হল, কেউ একজন বেশ গুছিয়ে-গুছিয়ে গল্প বলছে। শুনছে যারা, তারাই মাঝে-মাঝে হইহই করে উঠছে। না-হয় উত্তেজনায় হাঁসফাঁস করছে। আর নয়তো চুপ মেরে যাচ্ছে।
এখন আর মরুভূমির সেই ভয়ঙ্কর মূর্তি নেই। যত রাত ঘন হবে, ততই ঠান্ডা বাড়বে। দিনে যেখানে খটখটে রোদ্দুর, রাতে সেখানে ঠকঠকে ঠান্ডা। সারাদিন একনাগাড়ে পথ চলে যারা, রাতে, এই ঠান্ডায় কম্বল মুড়ি দিয়ে তাঁবুর ভেতর গল্পের আসর গরম করে তারা। মানুষের গলায় গল্প শুনে আমার মতো যে একটা ঘোড়ারও মেজাজ শরিফ হয়ে যেতে পারে, সে তোমাদের কেমন করে বিশ্বাস করাব। আমার কানে যখনই গল্পের ঘটনাগুলো ভেসে আসতে লাগল, আমি ততই কেমন যেন গল্পের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেললুম। আমি কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শুনতে লাগলুম। গল্পটা এই রকম : এক শাহজাদি মরুর পাতালে বন্দি হয়েছে। এক জিন তাকে ধরে এনেছে। সে ছোট্ট। সে কাঁদছে। একা-একা সেই পাতাল গহ্বরে। কাঁদতে-কাঁদতে সে ডাকছে তার আপনজনকে। তার আববাজান এক শাহেনশা। আম্মা তার সুলতানা। আর তার দাদা এক সাহসী শাহজাদা। এই মরুর বুকের ওপর দিয়েই যাচ্ছিল তারা। রাজ-পরিবার। চলেছে তারা মক্কায়, ঘোড়ার পিঠে। হজ করতে। তাদের সঙ্গে চলেছে সৈন্য-সামন্ত। উটের পিঠে ঘরসংসার। জিনিসপত্তর। খানাদানা। বেশ ক-দিনের রাস্তা, এখান থেকে। মরুর দেশে কোথায় কোন বিপদ লুকিয়ে আছে, কে বলবে! কাজেই কী ইলাহি ব্যবস্থা। কোনও ফাঁক না থাকে কোনও কিছুর। কোনও বিপদ না ঘটে শাহেনশার। কিন্তু এত করেও শাহজাদিকে কেমন করে হরণ করল মরুর জিন!
লোকটা গল্প বলছে নীল-তাঁবুর ভেতরে। আমি শুনছি আড়ি পেতে। সে বলছে : সেও ছিল এমনই এক রাত। মরুর পথে চলতে-চলতে যেমন করে দিন কাটে, সেদিনও তেমনই করে দিন বয়ে গেছল। শাহেনশার শিবির তৈরি হয়েছিল এক মরূদ্যানে। ক্লান্ত তীর্থযাত্রীরা শিবিরের তাঁবুতে ঘুমিয়ে আছে। প্রহরীরা ঘিরে রেখেছে তাদের তাঁবু। তাদের হাতে তরোয়াল। সতর্ক প্রহরা। বলা তো যায় না! মরুর রাজ্যে সবই যেন রহস্যে ঘেরা। কখন কোথা দিয়ে কী হয়ে যায়, কেউ জানে না। তার ওপর তাদের গা-ভর্তি কত মহামূল্যবান অলঙ্কার। কত মণি-মাণিক্য, সোনা-চাঁদি। কত সাজপোশাক। তার দামের হিসেব কষা যায় না।
রাতটা গড়িয়ে গেছে ভালোয়-ভালোয়। ভোরের আকাশ অবশ্য তখনও আলোর ছ-টায় ভরে ওঠেনি। ভোরের বাতাসে তখনও ঘুমের আবেশ ছড়িয়ে আছে। অকাতরে তখনও ঘুমোচ্ছে সবাই। ক্লান্ত প্রহরীরা তখনও ঘোড়ার পিঠে বসে-বসে নজরদারি করছে। হয়তো-বা কেউ-কেউ আর পারছিল না। হয়তো, মাঝে-মাঝে জড়িয়ে আসছিল চোখের পাতা। ঘোড়ার পিঠে বসে-বসেই হয়তো ঢুলে পড়ছিল কেউ-কেউ। এমনই সময়ে শোনা গেল আর্তনাদ। এমনই সময়ে আঁতকে উঠল প্রহরীরা। তাদের তন্দ্রা ছুটল। তারা দেখতে পেল, তাদের চোখের সামনে এক ভয়ঙ্কর জিন। দৈত্যের মতো একটা বিকট মূর্তি। উড়ন্ত উল্কার মতো সে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে শাহজাদিকে।
ছোট্ট মেয়েটার রূপের কাছে সেই জিন যেন একটা কালো পাথরের মস্ত চাঁই। মনে হল, সেই কালো পাথরের ওপর যেন একটি ঝরনা তোলপাড় করতে-করতে হারিয়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ, সত্যিই ঝরনার মতো. শাহজাদিও অদৃশ্য হয়ে গেল। তার কান্না আর শোনা গেল না। কিন্তু শোনা গেল তার আববাজান, শাহেনশার দরাজ গলার গর্জন, 'আমার মেয়েকে জিন ধরে নিয়ে যাচ্ছে! তাকে বাঁচাও।' তার গর্জন শুনে সুলতানা ছুটে আসতে-না-আসতেই সব শেষ। জিনকে আর দ্যাখা গেল না। দ্যাখা গেল না শাহজাদিকে।
ঘোড়া ছুটল।
ঘোড়ার পিঠে সৈন্য ছুটল। যেদিকে শাহজাদির কান্না তখনও শোনা যাচ্ছিল একটু-একটু আবছা, সেইদিকেই সেনাদের ঘোড়া ধেয়ে গেল। সেইদিকেই তারা তন্ন-তন্ন করে ঢুঁড়ে ফেলল মরুর বালি। কিন্তু সব মিথ্যে। আর কান্নাও শোনা গেল না। একেবারেই ফুরিয়ে গেল শব্দ। হারিয়ে গেল মেয়ে।
শাহেনশার বুক গেল ভেঙে।
সুলতানার মুখখানা বোবা কান্নায় ছমছম করছে।
'আর কিছু ভাবতে পারে না শাহেনশা।
একফোঁটা কাঁদতে পারে না সুলতানা। থমথম করছে।
শাহেনশা বলল, 'আর কী হবে গিয়ে মক্কা-মদিনায়? ফিরে চলো!'
সুতরাং আবার রাজধানীতে ফিরে যাওয়ার জন্য বাঁধাছাদা শুরু হল।
সাজল ঘোড়া, সৈন্য-সামন্ত। বাজল ঘন্টা, উটের গলায়। আর দেরি নয়। এবার বুঝি ঘরে ফেরার যাত্রা শুরু।
এমন সময়ে রাজপুত্তুর শাহজাদা, তার বাপের সামনে মাথা নামিয়ে বলল, 'আববাজান, গোস্তাকি মাফ কোরো। তুমি শাহেনশা। দেশের রাজা। যে-সঙ্কল্প তুমি একবার মুখে উচ্চারণ করেছ, সে-সঙ্কল্প থেকে তোমার পিছিয়ে যাওয়া শোভা পায় না। যে-সঙ্কল্প মনে গেঁথে তুমি এতটা পথ এত কষ্ট করে পার হয়ে এলে, সে কি মিথ্যে হয়ে যাবে! হতে পারে না। তাতে যে খোদাতাল্লা দুঃখ পাবেন।'
শাহেনশা চমকে তাকাল ছেলের মুখের দিকে। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'ওরে ছেলে, বাপের চোখের সামনে এক হিংস্র জিন যদি তার মেয়েকে হরণ করে নিয়ে যায়, তবে কি বাপের দুঃখটাও দেখতে পাবেন না খোদাতাল্লা! মেয়েকে হারানোর দুঃখ নিয়ে আমি তীর্থে যাব কোন মুখে! আমি পিশাচ! ওই জিনকে হত্যা করে যতদিন না আমি আমার মেয়েকে উদ্ধার করতে পারছি, ততদিন আমার আর অন্য কোনোও চিন্তা নেই। থাক আমার মক্কা যাত্রা।'
ছেলে উত্তর দিল, 'আববাজান, জিন হল এই মরুভূমির সম্রাট। তাকে তুমি খতম করবে কেমন করে? সে যে বালির নীচে লুকিয়ে থাকে।'
শাহেনশা বলল, 'তবে শোন রে ছেলে, আমিও কম যাই কীসে! আমি মরুভূমির সমস্ত বালি একটি-একটি করে তুলে সাফ করে ফেলব। সেই বালির আড়াল থেকে তাকে খুঁজে বার করে তার দৌরাত্ম্যি আমি চূর্ণ করব। আমি শাহেনশা। সে জিন নামে এক তস্কর। আমি যুদ্ধ করি সামনাসামনি। বীরের মতো। আর জিন কাপুরুষের মতো হরণ করে সেই বীরের মেয়ে। সে তো চোর।'
'আববাজান, আমি বুঝতে পেরেছি, তুমি খুবই কষ্ট পেয়েছ।' ছেলে উত্তর দিল, 'কিন্তু আববাজান, মরুভূমির সব বালি তুমি কেমন করে সাফ করে ফেলবে? আববাজান, একটু ভাবো, পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের সব জল তুলে ফেলে আমরা কি পৃথিবীটাকে জলশূন্য করতে পারি? পারি না। আর তা যদি পারতুম, তবে পৃথিবীটা আর পৃথিবী থাকত না। মানুষ থাকত না। তোমার মতো শাহেনশা থাকত না। কিছুই থাকত না। হয়তো থাকত শুধু পাথর আর পাথর। তার চেয়ে আববাজান, ওসব কথা না ভেবে, ভাবতে বলি, অন্য কথা। বলি, তুমি যেমন বীর, তোমার ছেলে হয়ে আমিও তোমার মতো বীর হতে চাই। আমি বড়ো হয়েছি। আজ তোমার এই দুর্ভাগ্যের দিনে ছেলে হয়ে তোমার পাশে যদি না দাঁড়াই তবে আমি কীসের ছেলে। তাই বলি, আমার আম্মাকে নিয়ে তুমি এগিয়ে যাও তীর্থে। আমি থাকি এখানে। আমি আমার বোনকে যেমন করে পারি উদ্ধার করব, এ আমার প্রতিজ্ঞা। উদ্ধার করে, আমার আম্মার আর আববার কোলে ফিরিয়ে দিতে না পারলে, আমার এ-জীবন মিথ্যে হয়ে যাবে। আমার ওপর বিশ্বাস রাখো আববাজান। আমি তোমায় নিরাশ করব না। তীর্থ সেরে তোমরা যখন আবার এই মরূদ্যানে ফিরে আসবে, আমার বোনকে তোমাদের কাছে ফিরিয়ে দেব। নইলে আমিই জীবন দেব।'
শাহেনশা শিউরে উঠল ছেলের কথা শুনে। বলল, 'ওরে ছেলে, তুই কী বলছিস, তুই নিজে জানিস না। তুই আমার একমাত্র ছেলে। আমি তোকে কেমন করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিই। ওরে, জিন যে ভয়ঙ্কর!'
ছেলে বলল, 'আমি আরও ভয়ঙ্কর। কেননা, আমার মনে ভয় নেই, ভয় নেই বলেই, তোমার সামনে মাথা তুলে বলতে পারছি, আমি আমার বোনকে উদ্ধার করবই জিনের কবল থেকে। কিন্তু আববাজান, তুমি যদি এ বিপদে ভেঙে পড়ে তীর্থযাত্রা থেকে পিছিয়ে পড়ো, তবে যে আমিও হেরে যাই! আববাজান, ভয়ঙ্করকে ভয় পেয়ে আমি যদি পিছিয়ে যাই, তবে তোমার ছেলে হওয়ার গৌরব আমি কেমন করে অর্জন করব?'
ছেলের কথা শুনে কেমন যেন হকচকিয়ে গেল শাহেনশা। হঠাৎ যেন শাহেনশার বুকখানা ফুলে উঠল। মুখখানা গর্বে ঝলসে উঠল। ছেলের কাঁধে হাত রাখল শাহেনশা। কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, 'ঠিক বলেছিস তুই। তুই আমার চোখ খুলে দিলি। আমি বিপদে পড়ে যদি আমার সঙ্কল্প থেকে পিছিয়ে পড়ি, তবে সেটা শাহেনশার গৌরব নয়। আমি তোর আম্মাকে নিয়ে তীর্থেই যাই। আমার সোনার টুকরো ছেলে যে আমার সম্মান রাখতে পারবে, এ-বিশ্বাস আমি আজ করতে পারি। তোর জয় হোক!'
তারপর? শাহেনশা আর সুলতানা ছেলের মাথায় হাত রেখে প্রাণভরে আশীর্বাদ করল. তার কপাল জুড়ে অনেক চুমো দিল। আর অনেক চোখের জল ঝরিয়ে, ছেলেকে মরুভূমির সেই নির্জন রাজ্যে একা রেখে মক্কায় তীর্থযাত্রা করল।
এখন একা শাহজাদা। তার সঙ্গে রইল শুধু একজন সহচর। একটি ঘোড়া। একটি তাঁবু। সহচর তাঁবু আগলায়। খানাপিনা বানায়। শাহাজাদার ফাইফরমাশ তামিল করে।
একটি-একটি দিন গড়ায়। ঘোড়ার পিঠে একা-একা খুঁজে বেড়ায় বোনকে, শাহজাদা। কই বোন? একটু চিহ্ন নেই তার কোথাও।
কোথায় তার হদিস করবে! অথচ, আর মাত্র ক-দিন। আর মাত্র ক-দিন পরে তার আম্মা আর আববাজন তীর্থ করে ফিরবে এই মরূদ্যানে। তার আগেই যে বোনকে উদ্ধার করার কথা। যদি না পারে, তবে কোন মুখে সে তাদের সামনে দাঁড়াবে! সে-লজ্জা সে কেমন করে ঢাকবে? ঘুম নেই শাহজাদার। মরুর আঁধারে যেন কত রহস্য। সেই রহস্যের অন্ধকারে, একা-একা, ঘোড়ার পিঠে সে ঘুরে বেড়ায়। সজাগ তার কান। কোথাও কি শুনতে পায় শাহজাদা তার বোনের আর্তস্বর? কই, না তো!
কিন্তু একদিন সে শুনতে পেল।
সেদিন তখন গভীর রাত। তার সহচর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘোড়াটা তাঁবুর পেছনে বাঁধা। হয়তো ঘোড়ার চোখেও ঘুম জড়িয়ে ছিল। কেবল একা-একা জেগে ছিল শাহজাদা। কিছুতেই ঘুম আসছিল না। দুশ্চিন্তা। তার আম্মা আর আববাজান ফিরে এলে সে কেমন করে মুখ দেখাবে! কেমন করে বলবে, সে কথা রাখতে পারেনি। উদ্ধার করতে পারেনি তার ছোট্ট বোনকে। শাহজাদা এখন বুঝতে পেরেছে, কথা দেওয়া সহজ। কিন্তু কথা রাখা অনেক, অ-নে-ক শক্ত। সে হেরে গেছে।
আঁতকে ওঠে কেন শাহজাদা, এমন করে হঠাৎ? কে গান গায়, এই নিস্তব্ধ মরুভূমিতে এই রাতে, অন্ধকারে, এখন?
বিছানা ছেড়ে ধড়ফড় করে উঠে পড়ল শাহজাদা। তাঁবুর পরদা সরিয়ে সে সাবধানী পায়ে এগিয়ে আসে। দূরে চোখ মেলে দেয়। সন্ধানী চোখ দুটো তাঁর আঁতিপাতি তালাশ করে এদিক-ওদিক। বালির রাজ্যে এখন অন্ধকার জমাট। কাউকে সে দেখতে পায় না। শুধু ভেসে আসে গান। যেন আঁধার কাঁপিয়ে ভেসে ওঠে গানের সুর।
এগিয়ে যায় শাহজাদা। আরও ক-পা।
চমকা ডেকে ওঠে ঘোড়াটা—চিঁ-হিঁ-হিঁ।
চমকে থামে শাহজাদা। ফিরে তাকায় ঘোড়ার মুখের দিকে. ঘোড়া আবার ডাকে। ঘোড়া ছটফট করে ওঠে। যেন বলতে চায়, একা যেয়ো না শাহজাদা! আমায় সঙ্গে নাও! আমার পিঠে উঠে বোসো!
আর মুহূর্তও দেরি করল না শাহজাদা। ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়ল। লাগাম ধরে টান দিল। কিন্তু আশ্চর্য, ঘোড়া ছুটল না! আবার সে ডেকে উঠল। কী বলতে চায় ঘোড়া? কেন সে ছোটে না? কেন সে ডাক দেয়? তবে কি, শাহজাদার পরনে যে ঘুমের পোশাকটা রয়েছে, সেটা পালটাতে বলছে? না কি, তরোয়ালটা সঙ্গে নিতে বলছে?
সত্যিই তো ! পরনে পোশাক যাই থাক, সঙ্গে তরোয়ালটা না নিলে যে ভীষণ আহম্মকির কাজ হয়ে যায়।
নেমে পড়ল শাহজাদা ঘোড়ার পিঠ থেকে। তুরন্ত হাত বাড়িয়ে টেনে নিল তরোয়ালটা। কোমরে বাঁধল। ঘোড়া ছোটাল।
কিন্তু কোথায় ছুটছে সে! দূরে, আরও দূরে কোথায় যায়! যতই ছোটে সে শুধু গানই শুনতে পায়। কাউকে তো দেখতে পায় না! শুনতে পায়, একটি মেয়ের গানের সুর সারা মরুভূমি উতল করে ছড়িয়ে পড়ছে।
থমকে দাঁড়ায় শাহজাদার ঘোড়া। চমকে তাকায় শাহজাদা। এই অন্ধকার রাতে ও কে ওখানে? আকাশ-ভর্তি তারার আলো অন্ধকারের গা বেয়ে নেমে এসেছে। সেই আলো মেয়েটির সাদা পোশাক ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যেন জোনাকির মতো ঝিলিক দিচ্ছে। আঃ! কী সুন্দর! সুন্দর যেমন সাজ-পোশাক, তেমনই তার গান। একটি-একটি গানের সুর যেন হাজার সুরের হাওয়ার পালে দোলা দিয়ে ভেসে যাচ্ছে।
শাহজাদাকে পিঠে নিয়ে ঘোড়া ওই দিকেই এগিয়ে যায়। এবার ঘোড়া ছোটে না। ধীরে-ধীরে হাঁটে। এখন সাবধানেই পা ফেলবে ঘোড়া। সাবধানেই সে এগিয়ে যাবে। কে বলতে পারে, মেয়েটি যদি হঠাৎ দেখতে পায় ঘোড়াকে! কিংবা ঘোড়ার পিঠে শাহজাদাকে! হয়তো তখন থমকে থেমে যাবে তার গান। হয়তো ঘোড়ার পিঠে একটা অচেনা মানুষকে দেখে সে হতচকিত হয়ে ছুটে পালাবে! লুকিয়ে পড়বে। তখন ?
সত্যিই, কী অপরূপ দেখতে বলো মেয়েটিকে! এই অন্ধকারেও তার রূপের ডালি যেন উথলে পড়ছে। কিন্তু শাহজাদা? মৌটুসকির পাশে যেন কেলেকিষ্টি কাক।
মেয়েটি তবে কি মরুকন্যা? সে বুঝি এই অন্ধকার রাতে মরুর বাতাসে গান ছড়িয়ে দেয়! আর-বুঝি দিনের তাপে সে হারিয়ে যায় তপ্ত-বালির আগুনে!
বসে ছিল মেয়েটি। বালির ওপর একা। তার গলা দিয়ে সুর ঝরে যায়। আর সেই সুরে-সুরে ছড়িয়ে দেয় মেয়ে মুঠি-মুঠি বালি এদিকে-ওদিকে। সে খেয়াল করে না কিছুই। দেখে না, ঘোড়ার পিঠে বসে এক শাহজাদা। ঘোড়া দাঁড়িয়ে। শাহজাদা দেখছে তাকে অবাক-চোখে। আনমনা সেই মেয়ে নিজের গানে নিজেই যেন বিভোর হয়ে আছে। শাহজাদার কানে সেই গান যতই ঝঙ্কার তোলে, ততই তার যেন মনে হয়, পৃথিবীর মাটি যত সুন্দর, তার চেয়েও সুন্দর এই মরুভূমি। কেননা, এমন গান যে সে কোনোওদিন পৃথিবীর মাটির বুকেও শুনতে পায়নি। সেই গানের সুরে হারিয়ে গেল যেন শাহজাদা নিজেই।
এ কী তবে স্বপ্ন! শাহজাদা ঘোড়ার পিঠে নিথর হয়ে বসে রইল। যেন পাথর-কাটা একটা মূর্তি। দাঁড়িয়ে রইল ঘোড়াও। তার মুখেও কোনও সাড়া নেই। যেন সে ডাকতে জানে না।
বাহ বাঃ! এই রে, মুখ ফসকে তারিফ করে ফেলল শাহজাদা! সে আর থাকতে পারল না।
চমকে উঠল মেয়ে। ফিরে তাকিয়েই সে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। চোখের পলক পড়ার আগেই মেয়েটি যেন মরুর অন্ধকারের সঙ্গে অন্ধকার হয়ে মিলিয়ে গেল। তারপর সব নিস্তব্ধ। যে-সুর এতক্ষণ উছলে উঠছিল থেকে-থেকে ঢেউ তুলে, সে-সুরের এক ফোঁটা ঝংকারও আর শোনা যায় না। এখন থমথমে শিহরনে কেঁপে উঠছে মরুভূমি।
সঙ্গে-সঙ্গে নিজের মুখে হাত ঢাকল শাহজাদা। ছি-ছি, এ কী করল সে! বুকের ভেতরটা তার হায়-হায় করে উঠল। নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিয়ে আফসোস করতে লাগল।
কিন্তু এ কেমন করে হয়! এরই নাম কি জাদু! এইমাত্র যে ছিল তার চোখের সামনে, সে কেমন করে হারিয়ে গেল চোখের পলকে! এই কি তবে সেই মরুর মরীচিকা!
আর মুহূর্ত দেরি করল না শাহজাদা। যেই তার চমক ভেঙেছে, সে চিৎকার করে উঠেছে, 'কে তুমি? অমন করে লুকিয়ে পড়লে কেন? দয়া করে দেখা দাও! শোনো মেয়ে, আমি এক শাহেনশার ছেলে! শাহজাদা। আমাকে তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমার বোনকে মরুর জিন হরণ করেছে। তাকে আমি তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়াচ্ছি। কিন্তু তার খোঁজ আমি পাচ্ছি না। না-পাচ্ছি জিনের খোঁজ, না আমার বোনের। আমার আম্মা আর আববার কাছে পণ করেছি, যেমন করে পারি আমি জিনকে জয় করে আমার বোনকে উদ্ধার করবই। কিন্তু আমার সেই পণ বুঝি বিফল হয়ে যায়। ওগো মেয়ে, সেই ভাবনায় আমি বড্ড ক্লান্ত। তুমি দেখা দাও! আমি তোমার গান শুনে ক্লান্তি দূর করব।'
কিন্তু কেউ আর গান গাইল না। কিন্তু শোনা গেল অদৃশ্য সেই মেয়ের গলায় হাসি। মনে হল, মরুর বাতাসে সেই হাসি যেন লুটোপুটি খেতে-খেতে শাহজাদার ওপর ঝাপটা মারছে। অস্থির হয়ে ঘোড়া ছোটায় শাহজাদা। অন্ধকারেই চিৎকার করে, 'কে তুমি?'
সঙ্গে-সঙ্গে সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে উত্তর আসে, 'আমি মরুর মরীচিকা।'
'মরীচিকা!' অবাক হয় শাহজাদা। জিজ্ঞেস করে, 'তবে কি তুমি আমায় গান শুনিয়ে সম্মোহন করতে চাও?'
'মরীচিকার কাজই তো এই। মায়ার জালে মানুষকে বন্দি করা।' সেই অদৃশ্য মেয়ে হাসতে-হাসতে উত্তর দিল।
'তবে কি আমি এখন বন্দি?'
'সে বলল, 'ওহে শাহজাদা, আমি তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য একটি সুন্দরী মেয়ের রূপ ধরে গান গাইছিলুম। তুমি চোরের মতো লুকিয়ে-লুকিয়ে আমার গান শুনছিলে। শুনতে-শুনতে এমন বিভোর হয়ে গেলে যে, নিজের প্রতিজ্ঞার কথাই ভুলে বসলে। শাহজাদা, প্রতিজ্ঞা ভুলে আমার গান শোনার লোভ যাকে পেয়ে বসে, সে কোনোদিনই লক্ষ্য খুঁজে পায় না। তার যত প্রতিজ্ঞা, যত পণ সব মিথ্যে হয়ে যায়। মানুষকে লোভ দেখিয়ে ঠকানোই তো মরীচিকার কাজ। আমিও তোমাকে ঠকাতে পেরেছি বলে বুঝতেই পারছ আমি কত খুশি।' বলে মরীচিকা আবার হাসল।
'শাহজাদার মুখখানা সেই অন্ধকারেও যদি স্পষ্ট দেখা যেত, তবে না-হেসে কেউ থাকতে পারত না। কী বোকা-বোকা দেখাচ্ছে তাকে। শাহজাদা অবশ্য নিজেকে সামলে নিতে বেশি সময় নিল না। চকিতে সে চিৎকার করে উঠল, 'ওহে মরীচিকা, তুমি ঠিকই বলছ, তোমার গানে আমি মুগ্ধ হয়ে সব ভুলে বসেছি। আমি তো নেহাতই তুচ্ছ একজন শাহজাদা। তুমি পৃথিবীর কত পরাক্রান্ত সুলতান-সম্রাটকে তোমার লোভের জালে বন্দি করে ধবংস করে দিয়েছ। আমি স্বীকার করছি, আমিও তোমার জালে ধরা পড়েছি। কিন্তু মরীচিকা, তুমি কি শুধু মানুষকে ঠকাতে জানো? যার কণ্ঠে ভরা অমন মধুর সুর, সে এত নির্দয় হয় কেমন করে? তার হৃদয়ে কি একটুও দয়ামায়া থাকতে নেই?'
সে এবার বেশ জোরেই হেসে উঠল। এবার সে বলল, 'দয়া যদি থাকত, তবে বোধ হয় আমার নাম মরীচিকা হত না। আমি তখন কেমন করে বিপদে ফেলতুম তোমাদের? পারতুম কি বিপদে ফেলে তোমাদের নাজেহাল করতে? আর মানুষকে নাজেহাল না করতে পারলে, আমরা বাঁচতুম কী নিয়ে? মজা পেতুম কেমন করে?'
'ছিঃ!' ধিক্কার দিল শাহজাদা।
এবার আর মরীচিকার হাসি শোনা গেল না। মনে হল, সে এবার একটু রেগেছে। গলা তার গম্ভীর। সে বলল, 'আমাকে তুমি ছিঃ বললে, আমিও তোমাকে ছিঃ বলতে পারি। আমার দয়ামায়া নেই—তোমার এ-কথাটা না-হয় মেনে নিলুম। কিন্তু শুনি, তুমিও কি খুব বুদ্ধিমান? তোমার যদি কিছু বুদ্ধি থাকত, তবে আমার সঙ্গে তর্ক করে তুমি যত সময় নষ্ট করছ, সে-সময়টা তুমি তোমার বোনের সন্ধানে অনায়াসে খরচ করতে পারতে।'
মরীচিকার কথা শুনে যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল শাহজাদা। সত্যি কথাই তো! সময় যে চলেই যাচ্ছে। বোকার মতো সে অদৃশ্য এক মরীচিকার সঙ্গে তক্কাতক্কি করছে। না করে সে তো মরীচিকাকেই জিজ্ঞেস করতে পারত তার বোনের কথা। জিজ্ঞেস করতে পারত, কোথায় গেলে তার খোঁজ পাবে! ইস, এখন কোন মুখে সে বোনের কথা জিজ্ঞেস করে মরীচিকাকে? জিজ্ঞেস করলেই সে যদি আবার হেসে উঠে। তবে যে তার লজ্জা রাখার জায়গা থাকে না। সুতরাং সে আর কথা বলতে পারল না। বোকার মতো মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে রইল।
শাহজাদাকে ঘোড়ার পিঠে অমন বোকার মতো চুপচাপ বসে থাকতে দেখে, মরীচিকা বোধ হয় মুচকি হাসল। তারপর বলল, 'এরই নাম মরীচিকা। এমন করেই মানুষকে আমরা আসল কথা ভুলিয়ে দিই। নকলের লোভ দেখাই। নকলের পেছনেই মানুষ ছুটে মরে।'
শাহজাদা আর কথা বাড়াল না। কথা বলবে কী, লজ্জায় যেন মাথা কাটা যাচ্ছে। এখান থেকে পালাতে পারলেই যেন বাঁচে। তবু পালাবার আগে ভদ্রতা করে একটা-দুটো কথা তো বলতেই হয়। তাই সে বলল, 'তুমি আমায় উচিত শিক্ষাই দিয়েছ। এখন বুঝতে পারছি, তুমিই আমার আসল বন্ধু। তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলি, তুমি ছাড়া এখন আর আমার কেউ নেই। তুমিই এখন আমাকে বাঁচাতে পারো।'
'মরীচিকা উত্তর দিল, 'কেউ কাউকে বাঁচায় না শাহজাদা। বাঁচতে হবে তোমাকে নিজে, তোমার নিজেরই বুকের জোরে। এখন তোমার বন্ধু আমি নই, বন্ধু তোমার ঘোড়া। ঘোড়া ছোটাও এখনই, এই মরুর উলটো হাওয়ায়। যদি হাওয়াকে জয় করতে পারো, তবে খোঁজ পেতে পারো সেই জিনের, যে তোমার বোনকে হবণ করেছে। আমি শুধু এইটুকু বলতে পারি, চোখের দৃষ্টি তোমার যেন সজাগ থাকে। নইলে আবার ঠকবে।'
শাহজাদার বুকখানা আনন্দে উছলে উঠল। তবু সন্দেহ যেন এখনও তার মনে উঁকি মারছে। তাই সে আবার জিজ্ঞেস করল, 'এ তোমার নকল, না, আসল কথা? আমাকে আবার মরীচিকার পেছনে ছুটতে হবে না তো?'
মরীচিকা বলল, 'শাহজাদা, মানুষের চেয়ে মানুষের বন্ধু জন্তুরা অনেক বিশ্বাসী। তুমি মনে বিশ্বাস রেখে ঘোড়ার মুখ ফেরাও। তোমার ঘোড়া যদি বাতাসের বাধা কাটিয়ে ওই পথে ছোটে, তবে জানবে আর তোমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মরীচিকার পেছনে ছোটে মানুষ। কোনও জন্তু নয়। কেননা, জন্তুর কোনও লোভ নেই।'
শাহজাদা আর অমান্য করল না মরীচিকাকে। তার কথা শুনল। কিন্তু যার মুখের কথা শুনে ঘোড়ার মুখ হাওয়ার উলটো দিকেই ঘুরিয়ে দিল, সেই মরীচিকার মুখ সে দেখতে পেল না মুহূর্তের জন্যেও। মরীচিকা তার কাছে রহস্যই থেকে গেল। তবু সে অন্ধকারে হাত তুলে বলল, 'ধন্যবাদ মরীচিকা।'
মরীচিকা সেই ঘন অন্ধকারের ভেতর থেকে কেমন এক রহস্য-জড়ানো গলায় বলে উঠল, 'তোমার জয় হলেই আমি খুশি হব।'
শাহজাদার ঘোড়া ছুটল। যেমন কথা, ঘোড়া তেমনই ছুটল, হাওয়ার উলটো দিকে। কিন্তু কোনদিকে ঘোড়া ছোটে! এ কী উত্তর, না, দক্ষিণ! পূর্ব, না পশ্চিম! অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করতে পারে না শাহজাদা। তবু সে বাধা দেয় না ঘোড়াকে। বাতাসের কী প্রচণ্ড দাপট। সে-বাতাস পদে-পদে ঝঞ্ঝা তোলে। কিন্তু ঘোড়া ছুটেই চলে। শাহজাদার চোখের দৃষ্টি স্থির। বাতাস পারে না সেই দৃষ্টিকেও আঘাত করতে।
এ কী! অন্ধকার কেন আরও অন্ধকার হয়ে আসে! ওই তো, আকাশে আলোর তারাগুলি তেমনই তো ফুটফুট করে জ্বলছে। কোনও মেঘ নেই। কোনও ছায়া নেই। তবে এ কীসের অন্ধকার! জমাট!
থমকে দাঁড়াল ঘোড়া। অন্ধকার কাঁপিয়ে কে যেন গর্জে উঠল, 'হা-হা-হা।'
ডাক দিয়ে সামনের দু-পা তুলে লাফিয়ে উঠল ঘোড়া। চমকে যায় শাহজাদা।
'কে!' আঁতকে উঠল শাহজাদা।
অমনই সঙ্গে-সঙ্গে সেই জমাট অন্ধকারের ভেতর থেকে যেন একসঙ্গে হাজারটা সমুদ্রের ঢেউ জাঁকার দিয়ে লাফিয়ে উঠল। মরুর বুক কেঁপে উঠল।
শাহজাদার ঘোড়া দু-পা পিছিয়ে আসে।
শাহজাদা চোখের পলকে এক হাতে তরোয়াল তুলে ধরল। আর-এক হাতে ঘোড়ার পিঠে হাত বোলাতে লাগল। আদর করে। বলে, 'ভয় পাস নারে বন্ধু, এই দ্যাখ, আমার হাতে তরোয়াল। ওই অন্ধকারই যদি জিন হয়, তবে ওই অন্ধকারটাকে আমি টুকরো-টুকরো করে কেটে ফেলব।'
সঙ্গে-সঙ্গে আবার শোনা গেল সেই অট্টহাসি। আবার কেঁপে উঠল বাতাস। তারপর সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে কে যেন কাল-বোশেখের বজ্রের মতো হাঁক পেড়ে বলে উঠল, 'কাট দেখি, তুই কত বীর! জেনে রাখ রে ঊনপাঁজুরে, আমার নামই জিন। আমিই তোর বোনকে হরণ করেছি। পৃথিবীতে কারো ক্ষমতা নেই তাকে আমার জিম্মা থেকে কেড়ে নেয়।'
'তুমি মিথ্যুক। মিথ্যেই আমার পথ আটকাও। তোমার এই শক্তির বড়াইকে আমি থোড়াই কেয়ার করি। তুমি যদি এতই শক্তিমান, তবে শুনি, আমার বোনকে হরণ করে লুকিয়ে রেখেছ কেন? যে ভয় পায় সে লুকোয়। সে মিথ্যে বলে।'
'তাই নাকি!' হুঙ্কার দিয়ে দম ফেলল সেই অন্ধকারের জিন।
সঙ্গে-সঙ্গে মনে হল, অন্ধকারটা যেন গা-ঝাড়া দিয়ে থরথর করে কেঁপে উঠেছে। কাঁপতে-কাঁপতে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। শাহজাদা বুঝি ভয় পায়! পাওয়ারই কথা। কেননা, তখনই মরুভূমিতে ভয়ঙ্কর কম্পন শুরু হল। মনে হল, এখনই বুঝি মরুভূমি চৌচির হয়ে ফেটে পড়ে। বালি উড়ল ঝাঁকে-ঝাঁকে। ঝাপটা মারে শাহজাদার চোখেমুখে। চোখের পাতা বুজে যায়। কিছুই দেখতে পায় না সে। অন্ধকারের সঙ্গে তার চোখের দৃষ্টিও অন্ধকার। তার ঘোড়াও অস্থির হয়ে লম্পঝম্ফ শুরু করে দেয়। তারপরেই শিউরে ওঠে শাহজাদা। হঠাৎ কে কেঁদে ওঠে! এ যে একটি ছোট্ট মেয়ের কান্না! চকিতে চোখ খুলে সামনে তাকায় শাহজাদা। অশান্ত ঘোড়াও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। শাহজাদার চোখের সামনে ও কে? শূন্যে, অন্ধকারের ওপর হাত-পা ছুড়ে কাঁদছে!
শাহজাদা আর থাকতে পারল না। ব্যস্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, 'আমার বোন! আমার বোন!'
'হা-হা-হা!' আবার বাজখাঁই গলায় হেসে উঠল জিন। আবার থরথর করে কেঁপে উঠল দিগবিদিক। আবার সে বলে উঠল, 'তা হলে বিশ্বাস করতে পারছিস, আমি মিথ্যে বলিনি!'
'আমার বোনকে তুমি আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।' দাবি করল শাহজাদা।
'তোর বোনকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আমি ধরে আনিনি।' শাহজাদার দাবি অগ্রাহ্য করল অন্ধকারের জিন।
'তবে, কেন তাকে ধরে এনেছ?'
'জানিস না, মানুষকে মেরে ফেলা আমার নেশা? এই দ্যাখ, তোর বোন এখন শূন্যে। এই দ্যাখ, আমার হাতের মুঠোয় সে ঝুলছে. তোর চোখের সামনে আমি তোর বোনকে আছাড় মারব। মেরে, তোকেও নিস্তার দেব না। হা-হা-হা।'
শাহজাদা তরোয়াল ঘোরাল। বাতাস কাটল তরোয়ালের আঘাতে। শব্দ উঠল সাঁই-সাঁই।
জিন আবার হুঙ্কার ছাড়ল, 'হে-হে-হে! টিনের তরোয়াল নিয়ে আস্ফালন দেখাস! ওরে টিকটিকির ছানা, শুনে রাখ, আমি যদি এখনই তোকে ফুঁ দিই, তুই কোথায় যে উড়ে যাবি, তার ঠিক-ঠিকানা কেউ হদিস করতে পারবে না কোনোদিন। তোর এই বোনকেও আমি যদি আমার দু-আঙুল দিয়ে চেপটে ধরি, সে কপালে চোখ তুলে এই পৃথিবী থেকে হাওয়া হয়ে যাবে। আর, তোর ঘোড়ার পেটে যদি ক্যাঁত করে একখানি লাথি মারি, তবে আর দেখতে হবে না। হাউয়ের মতো হুশ-শ-শ করে আকাশে উড়ে চরকি খাবে। ফুঃ! তরোয়াল দেখাস আমাকে!'
শাহজাদা বুক চেতিয়ে উত্তর দিল, 'ওহে জিন, মরতে যখন হবেই, তখন ভয় কীসের! তবে তুমি যে কত বড়ো বীর, সে তো বুঝতেই পারছি। নইলে অন্ধকারে লুকিয়ে-লুকিয়ে দেমাক দেখাও! শূন্যে আমার বোনকে আমি দেখতে পাচ্ছি, কিন্তু তুমি কেমন, টের পাচ্ছি না। তোমার মুখের হাঁকার শুনতে পাচ্ছি, কিন্তু তোমার হাঁ-মুখটা দেখতে কেমন, জানতে পারছি না। তুমি লম্ফ দিচ্ছ, সেটাও আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু তুমি ছারপোকা না তালফুলুরি, তা তো আমি জানতে পারছি না। সাহস থাকে তো তোমার চাঁদমুখটা একবার বার করো! তখন মালুম পেয়ে যাবে আমার হাতের তরোয়ালটা টিনের, না, অন্য কিছুর।'
'শাহজাদার কথা শুনে অন্ধকারের জিন কি-আর চুপ থাকতে পারে! কোথাকার কে একটা তুচ্ছ শাহজাদাকে সে ঠোট বেঁকিয়ে ফুস-স-স করে তাচ্ছিল্যের শব্দ তুলে ভেংচি কাটল। তারপর বলল, 'বলিস কী রে পেট-ড্যাংরা ফড়িং! তোর যে দেখি ভয়ানক আস্পর্ধা। তবে তাই হোক! আগে তুই আমার হাতে মরতে চাস, না আগে তুই আমাকে দেখতে চাস?'
শাহজাদা উত্তর দিল, 'মরে গেলে তো আর তোমাকে শায়েস্তা করতে পারব না। তাই তোমাকে শায়েস্তা করে মরতে চাই।'
'তাই নাকি!' জিনের মুখ দিয়ে এই কথাটা ছিটকে বেরোতেই সেই কালো অন্ধকারটা আচমকা ভীষণ লাল হয়ে গেল। সেই লালের ভেতর থেকে আগুনের ভাটার মতো ড্যাবডেবে দুটো চোখ জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠল। মস্ত-মস্ত দুটো কান পতপত করে নড়ে উঠল। দু-হাত লম্বা ঠোঁঠ দুটোর ফাঁক দিয়ে এক হাত লম্বা দাঁতগুলো ঝিলিক মারতে লাগল। মাথা-ভর্তি শনকাঠির মতো শুকনো খটকটে চুলের গোছা হাওয়ায় ঝটাপটি করতে লাগল। আর মান্ধাতা আমলের বাড়ির থামের মতো পা দুটো এমন ছোড়াছুড়ি করতে লাগল, যেন মনে হল, এখনই সে শাহজাদার বোনকে আছড়ে মেরে ফেলবে।
তাই-না দেখে শাহজাদার চক্ষু চড়কগাছ।
জিন হেসে উঠল। সমুদ্দুরের ঢেউ-এর মতো তার ঠোঁট দুটো উথালপাথাল করে আছাড় খেতে লাগল।
শাহজাদা থরথর করে কেঁপে উঠে চোখ বুজে ফেলল। আর, তার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই শাহজাদার ঘোড়া চিৎকার করে ডেকে উঠল।
শাহজাদা চোখ খুলে চেয়ে দেখার সময়ও পেল না। তার আগে ঘোড়া মারল লাফ। অতর্কিতে। ঘোড়ার লক্ষ্য শাহজাদার বোন। কিন্তু তার আগেই ঘোড়া তার সামনের দুটো পা ঢুকিয়ে দিয়েছে জিনের চোখের ভেতর। জিন আর্তনাদ করে উঠল। আচমকা চোখ খুলেই শাহজাদা হকচকিয়ে গেছে। তার চোখের সামনেই সে দেখতে পেয়েছে তার বোনকে। জিনের হাতের মুঠোয় সে তখনও ঝটপট করছে একটি বন্দি পাখির মতো, হাত-পা ছুড়ে। চোখের পলকে শাহজাদার তরোয়াল আঘাত করল জিনের হাতে। টুকরো হয়ে গেল জিনের হাত। ছিটকে পড়ল বালির ওপর শাহজাদার বোন, জিনের টুকরো হাতের সঙ্গে। তাকে টেনে তুলে নিল শাহজাদা ঘোড়ার পিঠে, মুহূর্তের মধ্যে। যন্ত্রণায় বালির ওপর গড়িয়ে পড়ল জিন। যেন একটা পাহাড়ের চুড়ো গড়াগড়ি খাচ্ছে আর আর্তনাদ করছে। তার দুটো চোখই কানা। সে কিছুই দেখতে পায় না। কিছুই করতে পারে না। শুধু গলা ফাটায়। আর বালি ধামসায়।
'শাবাশ!' খুশিতে উছলে চিৎকার করে উঠল শাহজাদা। ঘোড়ার মুখের কাছে মুখ এনে আদরে জড়িয়ে ধরল। ঘোড়া ছুট দিল নিজেদের আস্তানায়। আর শাজাদার ছোট্ট বোন দাদার কোলের ভেতর লুকিয়ে বসে হাঁপাতে লাগল।
বোনকে উদ্ধার করে ফিরে গেল শাহজাদা নিজের তাঁবুতে।
তারপর?
তারপর ফিরে এল তাদের আম্মা আর আববাজান তীর্থ থেকে।
তারপর কত হাসি, কত আনন্দ, আর কত হইহই। সেই সঙ্গে গল্পেরও শেষ।
'শাবাশ।' আনমনে আমিও চেঁচিয়ে উঠেছি। চেঁচিয়ে বলে ফেললুম, 'শাবাশ রে জাতভাই! শাবাশ ঘোড়া!'
'কে হে তুমি?' কে ডাকল!
এই রে! গল্প শুনতে-শুনতে আমি এমনই বিভোর হয়ে গেছিলুম, আমার কিছুই খেয়াল ছিল না। খেয়াল ছিল না, আমার আশপাশে আমার আরও সব জাতভাই আছে। আশ্চর্য! কখন যে গুটি-গুটি পায়ে তাদের প্রায় নাগালের মধ্যে চলে এসেছি, তারও হুঁশ ছিল না আমার।
কাজেই আমি শাবাশ বলে চেঁচাতেই ওদের নজরে পড়ে গেছি। ভাগ্যি ভালো, আমার এক জাতভাই ঘোড়াই আমাকে দেখতে পেয়েছে, অন্য কেউ নয়। আর তাই, সে যখন 'কে হে তুমি' বলে দুম করে হাঁক দিল, তখন আমি একেবারেই বুদ্ধু বনে গেছি। এতই ঘাবড়ে গেছিলুম যে, বোঁত করে আমার কানে একঝলক হাওয়া ঢুকে গেল। ঢুকে কানের ভেতর ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল। আমি যে মাথাটা নেড়ে-নুড়ে কান দুটো ঝেড়ে নেব, তেমন সাহসও আমি হারিয়ে ফেললুম। কাজেই হাঁদার মতো বুঁদ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। আমার মনে হল, এই অন্ধকারে বোধ হয় আমার জাতভাই ঘোড়া আমার হাঁদা-মার্কা মুখখানা দেখতে পায়নি। দেখতে পেলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে হাসাহাসি শুরু হয়ে যেত। এমন সুযোগ পেলে কে আর ছেড়ে দেয়! তার ওপর আমিও যখন তাদেরই স্বজাতি। মানে ঘোড়া।
'কী হে ভাই, তুমি যে দেখছি আমার কথার উত্তর দেওয়া প্রয়োজনই মনে করছ না! বলি, এই অন্ধকারে ঘুরঘুর করছ, তুমি কে বটে,' আমার সেই জাতভাইটিই কড়কে উঠল।
এবার আমি গেছি। পালাব নাকি? অবশ্য অন্য কেউ হলে এতক্ষণে কেটেই পড়ত। কারণ, ধরা পড়লে গর্দানটা যে রক্ষা করা যাবে, এমন কথা কেউ বলতে পারে না। কে আর আগ বাড়িয়ে বিপদে পড়তে চায়! আচ্ছা, ঠিকা আছে, না-হয় গর্দানটা বাঁচল, কিন্তু ইজ্জতটা? সেটি তো আর অত সহজে আগলে রাখা যাবে না। কাজেই ভেগে পড়ো।

আর সেই কারণেই সবাই ভেগে পড়েও। আমিও তাই...
হঠাৎ সেই দলের অন্য একটা ঘোড়া ফট করে বলে বসল, 'এই মূর্তিমানটিই বোধ হয় তখন বিয়ে-শাদির ঠাট্টা শুনে আমাদের ভ্যাংচাচ্ছিল।'
'তাই নাকি? এই হতভাগাটা?' আর-একটা ঘোড়া ফুট কাটল।
আমি আর থাকতে পারলুম না। আমার ভেগে পড়া দূরে থাক, আমি রুখে দাঁড়িয়ে পড়লুম। গলা চড়িয়ে বললুম, 'আজ্ঞে না, তোমরা ঠিক বলছ না। তখন আমি মোটেও ভ্যাংচাইনি। তখন তোমাদের মুখে বর সাজার ঠাট্টা শুনে আমি ফট করে হেসে ফেলেছিলুম। তা, রগড় শুনে হাসলে সেটাকে ভ্যাংচানি বলে কোন দেশে, তাতো আমি জানি না।'
'জানবার দরকার নেই।' প্রথমে যে ঘোড়া কথা শুরু করেছিল সে আমায় ধমকে উঠল। তারপর বেশ কড়া সুরেই বলল, 'তখন যে তোকে জিজ্ঞেস করলুম তুই কে, তা সে-কথার উত্তর না দিয়ে, এখন কথা-কাটাকাটি শুরু করে দিলি! কী, ব্যাপারটা কী? অ্যাঁ? জানিস, আমার নাম মুরুবিব! মানে, আমি আমাদের দলের সব ঘোড়ার বড়োকর্তা!'
আমি বললুম, 'অ, এ-কথা আমার জানা ছিল না।'
'এখন জেনেও যে আমার খুব উপকার হল, তেমন তো মনে হচ্ছে না!' সেই মুরুবিব-ঘোড়া রেগে-রেগেই উত্তর দিল। তারপর বলল, 'মনে হচ্ছে, এখনও তোর একফোঁটাও কাণ্ডজ্ঞান হয়নি। হলে এতক্ষণে একটার জায়গায় দু-দুটো সেলাম ঠুকতিস আমাকে।' বলতে-বলতে মুরবিব-ঘোড়া নাক ঝাড়ল। তার নাক ঝাড়ার সেই বাজখাঁই শব্দটা আমার কানে সেঁধোতেই আমি ধড়ফড় করে উঠেছি। সঙ্গে-সঙ্গে আমার নাকটাও কেমন সড়সড় করে উঠল। মনে হল আমার বোধ হয় হাঁচি পাচ্ছে। এই বোধ হয় হেঁচেই ফেললুম। কিন্তু না, হল না। মুরুবিব-ঘোড়া আমায় হাঁচতে দিল না। মানে, মুরুবিব আবার ধমক মারল, 'তুই ওখানে আড়ি পেতে দাঁড়িয়ে কী করছিলি?'
আমি বললুম, 'গল্প শুনছিলুম।'
'তোর দেশ কোথা?' মুরুবিব-ঘোড়া জিজ্ঞেস করল।
আমি বললুম, 'হেথায়।'
'তা হেথাকার ঘোড়া যে গল্প শোনে, এমন উদ্ভট কথা তো আমি কস্মিনকালেও শুনিনি।' বলতে-বলতে এমন ঠাট্টার সুরে হেসে উঠল যে, ওখানে আর যতগুলো ঘোড়া ছিল তারাও সবাই হাসতে-হাসতে তাল দিল।
তখন আমার লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার গোত্তর। যেমন লজ্জা পেলুম, তেমনই রেগেও গেলুম। রেগে তেড়েমেড়ে উত্তর দিলুম, 'থামো, থামো! হাসবার কিছু নেই। খিদের সময় খাই-খাই করে মরে গেলেও যখন একমুঠো ঘাস জোটে না, তখন গল্প শোনা ছাড়া আর কী নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে আমার মতো ঘোড়া? তেমন গল্প হলে অন্তত কিছুক্ষণের জন্যেও তো খিদেটা ভুলে থাকা যায়!'
'তোর বুঝি খিদে পেয়েছে?' হঠাৎ মুরুবিব-ঘোড়ার রাগটা যেন ফস করে উবে গেল।
'তবে বলছি কী।' আমি জবাব দিলুম।
'কই, কখন আবার বললি?'
'এই তো বললুম।'
'এতক্ষণ বলিসনি কেন?'
'বলে কী হবে?'
'ওরে মুখ্য, খিদে পেলে তুই উপোস করে মরবি, আর আমরা তোকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করব, এমন জানোয়ার আমরা নই।' মুরুবিব-ঘোড়া উত্তর দিল।
আমিও ছাড়বার পাত্তর নই। আমি বললুম, 'খিদে পেলেও যে আমি হ্যাংলার মতো তোমাদের খাবারে নজর দেব, এমন অসভ্য ঘোড়াও আমি নই।'
'খুব হয়েছে, আর বড়াই করতে হবে না। আয় ইদিকে! এই বস্তার ভেতরে খাবার আছে খা!' আমায় ডাক দিল মুরুবিব-ঘোড়া।
যদিও আমার খিদেটা তখন পেটের মধ্যে খুবই চাগাড় দিচ্ছিল, তবুও আমি এক ডাকেই পা বাড়ালুম না। হ্যাংলার মতো হুট করে হাঁ বাড়িয়ে এগিয়ে যাওয়াটা একদমই ঠিক না। তুমি তো আর অন্যের মনের কথা জানতে পারছ না। শেষে খাবারের লোভ বিপদে ফেললে তখন! তার চেয়ে বাবা রয়ে-সয়ে কিছু করাই ভালো। তাই, আমি যেখানে ছিলুম, সেইখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলুম।
মুরুবিব-ঘোড়া আমার কোনও সাড়াশব্দ না পেয়ে একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'কই, এলি না?'
আমি উত্তর দিলুম, 'ভাবছি।'
'কী ভাবছিস?'
'ভাবছি, তোমাদের খাবারের ভাগ বসানোটো কি উচিত হবে! ফুরিয়ে গেলে তোমরা কী খাবে?'
'এখন আমাদের খিদের ভাবনা নেই। অনেক খেয়েছি। পেট আইঢাই করছে।'
'আবার খিদে পেলে তখন?' আমি জিজ্ঞেস করলুম।
'তখন দ্যাখা যাবে,' মুরুবিব-ঘোড়া উত্তর দিল। তারপর আবার বলল 'তোর অত জমা-খরচের কী দরকার বল দিকি? এখনই আয়! নইলে, পাহারাদার যদি এসে পড়ে, তখন বুঝবি! তখন মাথা কুটে মরে গেলেও এক টুকরো দানা জুটবে না।"
ব্যস, ওই পাহারাদারের নাম শুনেই আমার বুকের পাঁজর ঢিলে হয়ে গেল! উরিবাবা!পাহারাদারদের আমি হাড়ে-হাড়ে চিনি! পাহারাদার যে কী জিনিস! একবার মুখোমুখি হলে আর দেখতে হবে না। দেখলেই ঠ্যাঙানি। কাজেই আমি আর দোনোমনো করলুম না। সটান মুরুবিব-ঘোড়ার সামনে হাজির হলুম।
'এই যে, এই বস্তায় দানা আছে।' মুরুবিব-ঘোড়া একটা মুখ-খোলা বস্তা দেখিয়ে বলল, 'খেয়ে নে!'
আমি মুরুবিব-ঘোড়ার মুখের দিকে চকিতে একবার তাকিয়ে নিলুম। অন্ধকারে মুখখানা যতখানি আন্দাজ করা গেল, ততখানিই আন্দাজ করে বুঝলুম, যা ভয় পাচ্ছিলুম, তেমন নয়। সেই মুখ একটুও বেজার তো নয়ই, উলটে এক টুকরো হাসি দেখা যাচ্ছে। সেই হাসি দেখেই আমি সাহসে ভর করে, বস্তায় মুখ ঠেকালুম।
উফ! কী খিদেই না পেয়েছিল। ভাবো, সেই কখন থেকে উপোস করে আছি। এখন তাই আমার খাওয়ার ধরন দেখলে তোমাদের বোঝা মুশকিল, এটাকে খাওয়া বলে, না গোগ্রাসে গেলা বলে।
'কী রে, তোর অনেকক্ষণ পেটে কিছু পড়েনি বুঝি?' বোধ হয় আমার খাওয়ার ধরন দেখেই মুরুবিব-ঘোড়া জিজ্ঞেস করল।
আমি উত্তর দিতে পারলুম না। তখন আমি ছোলার দানাগুলো নিয়ে দাঁতে চটকাতে ব্যস্ত ছিলুম। কাজেই বস্তার ভেতর থেকে মুখ বার করে মুরুবিব-ঘোড়ার মুখের দিকে একঝলক আড়চোখে তাকানো ছাড়া তখন আর কিছুই করতে পারলুম না। শুধু গিলতেই থাকলুম।
'কী জানি বাবা! তোর ব্যাপার-স্যাপার কিছুই বুঝছি না। মুখে একটা উত্তরও দিবি তো?' মুরুবিব-ঘোড়া আবার বলল।
আমি তবুও উত্তর দিতে পারলুম না। কিন্তু আমি উত্তর দিতে না-পারলেও দলের অন্য একটা ঘোড়া ফুট কাটল, 'ওকে এখন জিজ্ঞেস করা বৃথা। দেখছ না, কেমন করে খাচ্ছে! যেন কতদিন খেতে পায়নি!"
"আদেখলে!'
ব্যস, আমার খাওয়া হয়ে গেল। আদেখলে বলতেই আমার মাথায় রক্ত উঠে গেল চড়াং করে! কোন সাহসে ওই ঘোড়াটা আমায় আদেখলে বলে বদনাম পাড়ল। না হয় দুটো খেতে দিয়েছে। তাই বলে অমন করে অভদ্রের মতো খোঁটা দেবে! তোমরা তো জানো কোন অবস্থার গতিকে আমার এই দুর্দশা। কে জানে, বাবা এখনও বেঁচে আছে কি না। বাবার জন্যে মন আমার এমনিতেই খিঁচড়ে ছিল। সুতরাং আদেখলে বলতেই আমার মেজাজ গেল আরও বিগড়ে। চুলোয় যাক খাওয়া। রুখে দাঁড়ালুম, 'মুখ সামলে কথা বলো হে তুমি! দুটো খেতে দিয়ে কি মাথা কিনে নিয়েছ! আমি বিপদে পড়েছি বলেই না তোমাদের কাছে এসেছি। নইলে কে তোমার কথার ধার ধারে! আমাকে যদি ফেলনা ঘোড়া ভেবে থাকো, তবে জেনো, সে-ভাবনা তোমার ঘাড় থেকে নামিয়ে দেওয়ার আমার যথেষ্ট ক্ষমতা আছে!'
মুরুবিব-ঘোড়া বহুত সমঝদার। আমার মনের অবস্থাটা বুজতে তার একটুও দেরি হল না। তৎক্ষণাৎ তার দলের ঘোড়াটাকে কড়কে উঠল, 'তুই থামতো! কে তোকে ফোঁপরদালালি করে এসব আজেবাজে কথা বলতে বলেছে? মরুভূমিতে কার কখন কী বিপদ হয়, কেউ বলতে পারে? মরুর আকাশে যেমন ঝঞ্ঝা আছে, তেমনই বালির নীচে জিন আছে, দানো আছে। আবার হিংস্র দস্যুও আছে। কে, কখন কার পাল্লায় পড়বে, কেউ জানে না। বিপদ এসে তোরও যে ঘাড়ে চাপতে পারে, এটাও তোর জেনে রাখা ভালো।' এই পর্যন্ত বলে মুরুবিব-ঘোড়া আমার মুখের দিকে তার নিজের মুখখানা ঘুরিয়ে বলল, 'ছাড় ওর কথা! তুই খেয়ে নে তো!'
'আমার খাওয়া হয়ে গেছে।' বেশ রেগেই আমি উত্তর দিলুম।
'পেট ভরেছে?' মুরুবিব-ঘোড়া জিজ্ঞেস করল।
'না-ভরলেও, আর খেতে ইচ্ছে নেই।' আমার সাফ উত্তর। মুরুবিব-ঘোড়া আমার মেজাজটাকে ঠান্ডা করার জন্যে বেশ নরম গলায় তোয়াজ করে বলল, 'আরে দুর বোকা, খাবারের ওপর রাগ করলে নিজেই পস্তাবি।'
আমি অবশ্য তার তোয়াজে ভেতরে-ভেতরে কিছুটা নরম হলেও কাউকে বুঝতে দিলুম না। উত্তর দিলুম, 'সে-আর নতুন কথা কী! সারাদিনই তো না-খেয়ে ছিলুম। এখনও তোমরা দুটো খেতে না বললে উপোস করেই থাকতুম। তুমি একটা ঘোড়ার দলের মুরুবিব। মানে, নেতা। নেতার কথা অমান্য করাটা কি একটা ন্যায্য কাজ! আর সেই কারণেই দুটো দানা গালে দিয়েছি। তার জন্য তোমার দলের ওই ঘোড়াটির অমন অপমানজনক কথা বলাটা কি উচিত কাজ হল? আমিও কম যাই না। আমিও এক দস্যুদলের ঘোড়া।'
'অ্যাঁ, বলিস কী রে!' আমার কথা শুনে যেন আঁতকে উঠল মুরুবিব-ঘোড়া।
'তবে!' আমিও নাক ফুলিয়ে উত্তর দিলুম।
'বাববা, কী সাঙঘাতিক কথা! তুই দস্যুদলের ঘোড়া!'
'শুধু দস্যুদলের নয়। দস্যুদলের যে-সর্দার, তার ছেলের নিজস্ব ঘোড়া আমি। আর সেই ছেলে যখন আমার বাবাকে মারবার জন্যে বন্দুক তুলল, তখন এই আমিই তাকে নাস্তানাবুদ করে নাকানিচোবানি খাইয়েছি।'
'তুই?' মুরুবিব-ঘোড়ার চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল।
'তবে!' আবার যেমন আমার নাকটা ফুলে উঠল, তেমনই এবার বুকটাও দেমাকে নড়ে উঠল।
'তোর বাবা বুঝি অন্যায় কিছু করেছিল?' মুরুবিব ঘোড়া অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।
'কিচ্ছু না, কিচ্ছু না।' আমি উত্তর দিলুম, 'দস্যুসর্দারের ছেলেটা আমার বাবাকে মিথ্যে-মিথ্যে পাগলা ঘোড়া বলে এমন চাউর করে দিল যে, সবাই সেই মিথ্যেটাকেই সত্যি বলে ভেবে বসল। তারপর মতলব আঁটল, আমার বাবাকে মেরে ফেলবে। এমন শয়তান ছেলে! ঠিক করল, আমার পিঠে বসেই বাবাকে গুলি করবে। কী আস্পর্ধা! তোমরাই বলো, ছেলে হয়ে, আমি এই ভয়ঙ্কর নৃশংসতা কেমন করে সহ্য করতে পারি। আমি ঠিক করলুম, বাবাকে আমি যেমন করে হোক বাঁচাবই। তাই, দস্যুদের ছেলে যখন বাবাকে মারবার জন্যে আমার পিঠে বসে বন্দুক তুলল, তখন আমিও মারলুম ছুট। আর, এমন আনতাবড়ি-বেলতাবড়ি ছুটলুম যে, সে আর সুযোগই পেল না, বাবাকে তাক করবার। তারপর—'
'চুপ!' আমার কথার মাঝখানে হঠাৎ মুরুবিব-ঘোড়া চাপা গলায় আমাকে কথা বলতে বারণ করল।
'কী?' আমিও গলা নামিয়ে মুরুবিব-ঘোড়ার মুখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলুম।
মুরুবিব-ঘোড়া তাঁবুর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে আমাকে বলল, 'ওই দ্যাখ!'
আমি দেখলুম, তাঁবুর ভেতর থেকে বেশ ক-জন প্রহরী বেরিয়ে আসছে। মনে হল, তাদের সবার হাতেই বন্দুক, আমি ভীষণ ভয় পেলুম। ভয়ে-ভয়ে মুরুবিব-ঘোড়াকে জিজ্ঞেস করলুম, 'কী হবে?'
মুরুবিব-ঘোড়া আমাকে সাবধান করল, 'একদম কথা বলবি না। দেখতে পেলে মুশকিল হয়ে যাবে।'
আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'পালাব?'
সে বলল, 'দুর বোকা, ধরা পড়ে যাবি। বরং আমার গা-ঘেঁষে লুকিয়ে থাক। অন্ধকারে ওরা ঠাওর করতে পারবে না।'
আমিও তাই করলুম। মুরুবিব-ঘোড়ার গা-ঘেঁষেই লুকিয়ে পড়লুম। মুরুবিব-ঘোড়া বলল, 'একদম নট নড়ন-চড়ন।'
সে আর বলতে! নট নড়ন-চড়ন তো বটেই। সেইসঙ্গে নট বকবকানিও।
তা, কতক্ষণই-বা এই অবস্থায় থাকা যায়! বলতে কী, পেটটা আবার খিদে-খিদে করছে। করবেই তো। তখন ফালতু রাগারাগি করে পেট ভরে খাওয়া হল না। অথচ বস্তার ভেতর তখনও যা দানা ছিল, যথেষ্ট। সবটা পেটে গেলে খিদের জন্য অন্তত আজকের রাতটা খুঁতখুঁত করতে হত না। দানার বস্তাটা আমার চোখের সামনেই রয়েছে। কিন্তু এমনই ভাগ্য মুখ বাড়িয়ে খাবার জো নেই। পাহারাদার দেখতে পেলেই বিপদ। দেখা যাক, কতক্ষণ ওরা নজরদারি করে! একবারও কি ওদের চোখে তন্দ্রা আসবে না! সত্যি কথা বলতে কি, পেটে খিদে অথচ মুখের সামনে খাবার দেখে নট নড়ন-চড়ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা যে কী অসহ্য কষ্টের, তা আমার মতো যারা কোনোদিন এরকম দুর্ভোগে পড়েনি, তারা বুঝতে পারবে না। আমি উঁকি মেরে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, পাহারাদার তাঁবুর চারপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করে দিয়েছে। বেশ ক-জনকেই আমি দেখতে পাচ্ছি। এখন রাত নিঝঝুম। মরুর বালিতে তাঁবু। তাঁবুর ভেতর টিমটিম করে আলো জ্বলছে। ভেতরের মানুষগুলো নিশ্চয়ই শুয়ে পড়েছে। তাদের সাড়া-শব্দও থেমে গেছে। মরুর বাতাস থেকে-থেকে ঝাপটা মারছে তাঁবুর গায়ে। চত্বরটা একেবারে সুনসান। মাঝে মাঝে আমাদের কারো-কারো নাকে দমকা শব্দ উঠছে দম ফেলার। শব্দ উঠলেই মনে হচ্ছে, অন্ধকারটা যেন চমকে উঠছে। নিস্তব্ধ এই মরুভূমির রাতে আকাশের তারাগুলোর দিকে চেয়ে দ্যাখো, ঠিক যেন মুঠো-মুঠো আলোর থোকা। ওই তারার একটি আলো যদি এখনই টুপ করে নেমে আসে আকাশ থেকে! নেমে এই চত্বরটা আলোয় উপচে দেয়! তখন আমার নির্ঘাত মরণ!
দুর, আর ভালো লাগে না! এমন চোরের মতো আর কতক্ষণ লুকিয়ে থাকব! আরে বাবা, আমার মতো একটা টগবগে ঘোড়া চোরের মতো কি আর সারাক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারে স্পিকটি নট হয়ে! ঠিক আছে, না-হয় মুখে রা কাড়লুম না। কিন্তু হাঁচি পেলে, কিংবা কাশি পেলে তখন? কোনটাকে সামলাব! সামলাতে পারলুম না বলেই মুরুবিব-ঘোড়ার গায়ে একটা ঠেলা মারলুম। মুরুবিব-ঘোড়া মুখে টুঁ-শব্দটি না করে আমার দিকে এমন কটমট করে তাকাল যে, আমার বুঝতে বাকি রইল না, মুরুবিব-ঘোড়া অমন করে দৃষ্টি হেনে আমায় কী বোঝাতে চাইছে। কিন্তু আমি কী করব! এমন করে লুকিয়ে থাকতে আমার যে হাঁফ ধরে যাচ্ছে। তাই, থাকতে না পেরে আবার ঠেলা দিলুম মুরুবিব-ঘোড়াকে।

'কী হচ্ছে কী?' মুরুবি-ঘোড়া গলাটাকে একেবারে না-শোনার মতো নীচে নামিয়ে আমাকে ধাঁতানি দিল।
আমিও মুরুবিব-ঘোড়ার মতো আমার গলাটা আরও নীচে নামিয়ে বললুম, 'থাকা যাচ্ছে না।'
'চুপ!' সে এবার কড়কে উঠল চিঁ-চিঁ-নি গলায়। তারপর বলল, 'থাকতে হবে।'
'কী করে থাকব?' আমি জিজ্ঞেস করলুম।
সে বলল, 'যেমন করে আমরা আছি।'
আমি বললুম, 'তোমরা থাকবে না কেন। আমার মতো তোমাদের তো অবস্থা হয়নি।'
'কেন, কী হয়েছে তোর? খিদে পাচ্ছে?' সে জিজ্ঞেস করল।
'না।' আমি উত্তর দিলুম।
'তেষ্টা?'
'না।'
'তবে?'
'চুলকানি পাচ্ছে।'
'সহ্য করে থাক।'
'পারছি না।'
'তুই তো আচ্ছা বিপদে ফেললি। একটা বাচ্চা-ঘোড়ার মতো ঘ্যানঘ্যানানি শুরু করে দিলি! একটুও সহ্যগুণ নেই!'
'থাকলে আমি কি তোমায় বিরক্ত করতুম! দাও, আমার পিঠে তোমার দাড়িটা একটু ঘষে দাও! ভীষণ চুলকোচ্ছে।'
'আঃ খেলে।' মুখ নাড়া দিল মুরুবিব-ঘোড়া। তারপর বলল, 'কী আবদার! আমায় বলে পিঠে দাড়ি ঘষতে! ওরে, আকাট মুখ্যু, নিজের ল্যাজটা দিয়ে পিঠটা ঝেড়ে নিতে পাচ্ছিস না?'
'ওহো!' আমিও দু-কথা শুনিয়ে দিলুম, 'খাসা বটে তোমারও বুদ্ধি! চুলকোচ্ছে আমার পিঠের মাঝখানে, আর ঝাড়তে বলছ ল্যাজ! অত দূরে ল্যাজ যাবে কী করে? আর গেলেও ল্যাজ নিয়ে নাড়ানাড়ি করাটা কি ঠিক হবে? ওরা যদি দেখতে পায়?'
'আর, আমি দাড়ি নাড়লে ওরা দেখতে পাবে না?'
'নাড়লেও, আপনজনের দাড়ি তো, অত সন্দেহ করবে না। কিন্তু পরেরজনের ল্যাজ দেখলেই চিনতে পারবে। ল্যাজ বড়ো সাঙঘাতিক জিনিস।'
মুরুবিব-ঘোড়া এবার আমার কথায় কাত। আর অন্য কিছু বলার না পেয়ে বেশ বিরক্ত হয়েই বলল, 'তোকে এত জ্ঞান দিতে হবে না। আমি দাড়ি ঘষতে পারব না।'
আমি বললুম, 'কিন্তু আমার যে ভীষণ চুলকোচ্ছে। আমি কী করব?'
সে বলল, 'চুলকোতে দে। আমার কিছু করার নেই।' বলে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
'তুমি চুলকে না-দিলে আমি কিন্তু চেঁচিয়ে ফেলব।'
'কী সববনেশে ঘোড়া রে তুই! অ্যাঁ! নিজেও মরবি, আমাকেও মারবি!' বলে আধখানা রাগ, আর আধখানা দরদ দেখিয়ে বলল, 'আয় ইদিকে। তুই আমার জাতভাই না হলে, বয়ে গেছল দাড়ি ঘষতে। কই? কোনখানটায়?'
আমি পিঠটা এগিয়ে দিয়ে বললুম, 'এই যে, এইখানটায়।' আমার জোরাজুরিতে অতিষ্ঠ হয়ে মুরুবিব-ঘোড়া দাড়ি ঘষতে শুরু করে দিল। সেই সঙ্গে আমাকে পাহারাওলাদের দিকে নজর রাখার জন্যে সাবধান করতেও ভুলল না। অবিশ্যি, রেগে একটু গজগজ তো করবেই। সে দাড়ি ঘষে আর গজগজ করে, 'মুরুবিব-ঘোড়ার মান-ইজ্জত বলে একটা কথা আছে, বুঝলি! আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে বলতে সাহস করেনি, পিঠ চুলকোচ্ছে, দাড়ি ঘষে দাও। অন্য সময় এই ঘষাঘষির কথা বললে কামড়ে কান ছিঁড়ে দিতুম। তুই বিপদগ্রস্ত একটা ঘোড়া বলে তাই! তোর ওপর আমার একটা মায়া পড়ে গেছে বলে তাই! নইলে আমার গরজ কেঁদেছে তোর পিঠ চুলকে দিতে।' বলে দাড়িটা আমার পিঠ থেকে তুলে খেঁকিয়ে উঠল, 'হয়েছে?'
যদিও মুরুবিব-ঘোড়ার দাড়ির ঘষটানি খেয়ে আমার চুলকানির কষ্টটা তখন পুরোপুরি দমেছে, তবু আমি রাগের ভান করে বললুম, 'যাক তোমায় আর চুলকোতে হবে না। খুব হয়েছে। একটু চুলকে দিয়ে অত কথা! কেন, তোমার যদি কোথাও চুলকোত, তখন, তুমি বললে কি আমি চুলকে দিতুম না? তুমি সওদাগরের মুরুবিব-ঘোড়া বলে অত বড়াই করলে, আমিও দস্যুর ঘোড়া বলে দেমাক করতে পারি। বুঝলে!'
আমি ভেবেছিলুম, মুরুবিব-ঘোড়া আমার জাঁক দ্যাখানোর চালে হয়তো কাত হয়ে যাবে। কিন্তু মুরুবিব বলে কথা! অত সহজে ছাড়ার পাত্তর! আমার কথা শুনে ফোঁস করে উঠল। বলল, 'যাঃ! যাঃ! অমন অনেক দস্যু দেখেছি। দস্যুর ঘোড়া বলে কি মাথা কিনে নিয়েছিস! ফুঃ।'
ব্যস! 'ফুঃ' বলতেই অপমানে আমার সারা গায়ে জ্বালা ধরে গেল। কী, আমাকে 'ফুঃ' বলে হেয় করা। আমি গলা ফাটিয়ে তেড়ে উঠলুম, 'আমি ফুঃ হলে, তুমি থুঃ।' বলেই আমি পিক করে একধাবড়া থুতু ফেললুম। একেবারে মুরুবিব-ঘোড়ার মুখের সামনে।
মুরুবিব-ঘোড়ার মাথায় খুন চাপল! বলব কী, একেবারে চোখের পলকে খপাত করে আমার পিঠটা কামড়ে ধরল। উফ! আমি গেলুম রে, মলুম রে! পিঠের মাংস বুঝি খাবলে তুলে নেয়! আমি যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে মারলুম লাফ। লাফ মেরেই দে এক ধাক্কা। এক ধাক্কাতেই মুরুবিব-ঘোড়ার দাঁতের পাটি আমার পিঠ থেকে ছিটকে গেল। দাঁত খুললে কী হবে! পা দিয়ে আমায় মারল এক ল্যাং! আমিও সটান তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লুম। তারপর লেগে গেল ঝটাপটি।
আমার অবশ্য বোঝা উচিত ছিল, একা-একা, এখানে মারামারি করা খুবই বোকার কাজ। আমি এদের কাছে একেবারেই একটা অপরিচিত ঘোড়া। বেপাড়ার ঘোড়া আর-এক পাড়ায় গিয়ে মারামারি করলে যে তার ফলটা ভালো হয় না, এটা আমার জানা উচিত ছিল। হলও তাই। হল কী, মুরুবিব-ঘোড়ার দলের আর সব ঘোড়া একসঙ্গে এমন চিৎকার জুড়ল আর লাফিয়ে-লাফিয়ে চাট ছুড়তে লাগল যে, কার সাধ্যি তাদের কাছে এগোয়! অবিশ্যি একটা বাঁচোয়া যে, সবাই বাঁধা আছে। নইলে, যদি ছাড়া থাকত, এতক্ষণে আমার ভুষ্টিনাশ করে দিত। বাঁধা বলেই আমিও যা মন চাইছে, তাই বলে গাল পাড়ছি। ভেংচি কাটছি। লাথি ছুড়ছি।
উরি বাববা! কী সাংঘাতিক রেগেছে ঘোড়াগুলো। কী চিৎকার! আমিও কম যাই না। আমিও ছেড়ে কথা বলতে জানি না। আমি কি কারো গায়ে পড়ে আগে ঝগড়া করতে গেছি! মুরুবিব-ঘোড়াই তো আমার পিঠে কামড়ে দিয়েছে প্রথম। মুখে-মুখে কথা কাটাকাটি হচ্ছিল, ঠিক আছে। ঝট করে কামড়ে দেওয়ার তুমি কে!
এ কী! আচমকা কী পড়ল আমার মুখের ওপর! আমার নাকটা টনটন করে উঠল কেন! এ কী ! সেই খাবারের বস্তাটা কে ছুড়ে দিল আমার মুখের ওপর! দ্যাখো, আমার চোখ দুটো কানা করে দেবে বলে দানাসুদ্ধু বস্তাটা পা দিয়ে আমার মুখের ওপর ছুড়ে দিয়েছে মুরুবিব-ঘোড়াটা। ছোলা-দানা ছড়িয়ে একেবারে নৈরেকার। ভাগ্যিস, চোখে লাগেনি! কী তেএঁটে ঘোড়া দেখেছ? ঘোড়া না, ঘোড়ার ডিম! নে, তোরা যত পারিস চেঁচা ! আমি এবার দানাগুলো পেটে পুরি। বোকাগুলো চেয়ে-চেয়ে দ্যাখ!
সপাং, সপাং! কী হল? চাবুকের শব্দ! আমি যন্ত্রণায় কুঁচকে গেছি। আমার পিঠে চাবুক পড়েছে। আমার ছাল-চামড়া উঠে গেল বুঝি!
আমার দানা খাওয়া মাথায় উঠল। ধড়ফড়িয়ে এদিক-ওদিক চোখ তুলে দেখি, আমার সামনে শত্রুবাহিনী, পাহারাদার। তাদের হাতে চাবুক। দে ছুট!
কিন্তু আমায় পালাতে দিচ্ছে কে! সেই শত্রুবাহিনী পাহারাদার আমায় ঘিরে ফেলল। তারপর এমন সব অকথা-কুকথা বলে আমাকে হেনস্থা করতে লাগল যে, আমি অপমানে কাঁপতে লাগলুম। তবু সে-অপমান-ও না-হয় সহ্য করা গেল, কিন্তু যখন আমার চোর-ঘোড়া বলে চাবুক উঁচিয়ে তেড়ে এল, তখন আর আমি থাকতে পারলুম না। পিঠে চাবুকের জ্বালা আর মনে অপমানের খোঁচায় আমার মাথা গেল বিগড়ে। যা থাকে কুল-কপালে! আমি লাফিয়ে পড়লুম একজন পাহারাদারের ঘাড়ে! পড়েই আবার দে ছুট! কিন্তু হলে কী হবে, আমি একা, একটা ঘোড়া, আর ওরা মানুষ, অতজন। তার ওপর আছে ওদের দলে একপাল ঘোড়া। শোনো , ঘোড়াগুলোর কী চিৎকার! কান ফাটিয়ে চেঁচাচ্ছে! তা, একটা নিরেট বোকা-মানুষেরও যতটুকু বুদ্ধি আছে, আমাদের মতো গায়ে-গতরে ধুমসো ঘোড়ারও ততটুকু বুদ্ধি নেই। তা যদি থাকত, তা হলে আমি তোদের জাতভাই, আমার পেছনে কী বলে চেঁচামেচি করে মানুষ লেলিয়ে দিস! কোথায় তোরা আমায় বিপদ থেকে রক্ষা করবি, তা নয়, তোরা মানুষকেই সাহায্য করিস! সাধ করে কি আমাদের মানুষের চাকর বলে! মানুষ আমাদের ধরছে, পোষ মানাচ্ছে আর ঘাড়ে বোঝা চাপাচ্ছে! ছিঃ! ছিঃ! অবশ্য এত কথা বলার ইচ্ছে আমার ছিল না। তোমরা নিশ্চয়ই বলতে পারো , একই গোষ্ঠীর জীব হয়ে যে অন্যের কাছে সেই গোষ্ঠীর বদনাম করে, সে নিজেও তো সেই বদনামের ভাগীদার হয়! ঠিক কথা। একশো কেন, কথাটা হাজারবার সত্যি। কিন্তু হাতে-নাতে প্রমাণ দ্যাখো! আমায় ছুটে পালাতে দেখে, একজন পাহারাদার মুরুবিব-ঘোড়ার বাঁধন খুলে তার পিঠে চেপে পড়েছে। পাহারাদারকে পিঠে নিয়ে সেই মুরুবিব-ঘোড়া আমার দিকেই তেড়ে আসছে। আরও দ্যাখো, যতগুলো পাহারাদার সেখানে হাজির ছিল, সবাই ঘোড়ার বাঁধন খুলে, পিঠে চেপে আমায় তাড়া লাগালে। কই, আমার স্বজাতি কোনো ঘোড়াই তো অবাধ্য হয়ে বেঁকে বসল না। আবার বলি, আমি একা। অতজনের সঙ্গে পারলুম না। ধরা পড়লুম। বলতে পারো, আমাকে ধরিয়ে দিল আমার স্বজাতিরাই। সুতরাং একটা 'চোর-ঘোড়া' ধরা পড়লে যা হয়, আমার কপালে তাই জুটল। আমার পিঠে চাবুক পড়ল। গলায় দড়ির ফাঁস পড়ল। আমাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসা হল ওদের আস্তানায়। আমাকে আটক করা হল। আজকের রাতটা এই অবস্থায় বন্দি থাকি। তারপর রাত কাটলে জানা যাবে, আমার বরাতে কী আছে।
বুঝতেই পারছ, এই অবস্থায় আমার চোখে ঘুম আসার কথা নয়। সুতরাং সারারাত জেগেই ছিলুম। সুখের কথা, আমার মুখের গোড়ায় রসদ পৌঁছে গেল। রসদ মানে, দানাপানি আর- কি। আসলে আমার মুখে আর দানা রোচার কথা নয়। তেষ্টা পেয়েছিল খুবই। তাই দানার দিকে দৃষ্টি না দিয়ে, পানির সবটাই ঢকঢক করে গিলে ফেললুম। তারপর ভাবতে বসলুম, আমায় বন্দি তো করল, এবার এদের ফন্দিটা কী! বাবার মতো আমাকেও এরা বন্দুক দেখাবে নাকি! দেখা যাক!
জলটা খেয়ে আমি যেন গায়ে একটু বল পেলুম। মনে-মনে ভাবলুম, আমার গলায় বাঁধা দড়িটা একটু টেনেটুনে দেখলে কেমন হয়! যদি ছিঁড়ে ফেলতে পারি! ছিঁড়তে না পারলে নিদেন যদি খুলেও যায়, তা হলেও তো কেল্লাফতে! একটু আগেও যে-ঘোড়াগুলো আমায় টিটকিরি কেটে যা-নয় তাই বলেছে, এখন দেখছি, তারা সব চুপচাপ হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ঘুমে ঢুলুঢুলু। পাহারাদারগুলোরও কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে না।
অবিশ্যি, তাদের আবছা-আবছা দ্যাখ্যা যাচ্ছে। এখন আমার ওপর আলাদা করে নজর রাখার দরকার মনে করে না ওরা। এখন মোটামুটি সব শান্ত। শুধু ভয় একটাই, মরুদস্যুর। আচমকা এই সওদাগরের দলটার ওপর যদি ঝাঁপিয়ে পড়ে, তো সব গেল! সোনাদানা, পণ্যসামগ্রী চোখের পলকে সব লুট হয়ে যাবে। তাই নজর এখন সেইদিকেই। সজাগ পাহারাদার।
তবে সজাগ পাহারাদারদের এখনও পর্যন্ত কোনও দস্যু মোকাবিলা করতে না হলেও, একটা চোরকে তারা পাকড়াও করেছে। সে-চোর একটা ঘোড়া। আমি। তবে আমি কতটা চোর, আর কতটা ঘোড়া, সে বিচার তোমরা কোরো। তোমাদের কাছে আমার তো কিছু লুকোছাপার নেই। তোমরা নিজেরাই দেখেছ, আমার তখন কী ভীষণ খিদে পেয়েছিল। ওই খাবারের বস্তাটার ওপর লোভও আমার হয়েছিল খুবই। তবে, কেউ বলতে পারবে না, আমি চুরি করে খেয়েছি। ওই মুরুবিব-ঘোড়াটা খাবার জন্যে আমায় কত সাধাসাধি করল, সে-ও তো তোমরা দেখলে! তারপর তার নিজের দলেরই একটা ঘোড়া ঝুটমুট 'আদেখলে' বলে আমাকে অপমান করল। অবিশ্যি, সেটাও মিটমাট হয়ে গেছল। শেষে বাধল ওই চুলকানি নিয়ে। সেটাও তোমাদের অজানা নয়। তা হলেই বলো আমার দোষটা কোথায়?
মনে হচ্ছে, ঘোড়াগুলো ঘুমিয়েই পড়েছে। এই তাল। দেখা যাক গলার দড়িটাতে টান দিয়ে। ভাগ্যটাকে যাচাই করার এমন সুযোগ দু-বার না-ও আসতে পারে। কাজেই আমি মারলুম টান। মানে, নিজেরই গলা টেনে, হ্যাঁচকা মেরে দড়িটা খোলার চেষ্টা আমার। বাববা! কী শক্ত দড়ি! মার টান! আবার টান! বারবার মারি টান! দড়িও খোলে না, খুঁটিও নড়ে না। কিন্তু নড়ে উঠল আমার মাথার ঝিকুর। কে যেন খ্যাঁক করে উঠল,"এই বিটলে, ফের দুষ্টুমি করছিস!'
আমি থতমত খেয়ে গেছি। চমকে দেখি, তিনি, মানে, মুরুবিব-ঘোড়া! তার চোখে ঘুম নেই, না আমার হ্যাঁচকা টানের শব্দ শুনে তার তন্দ্রা ছুটে গেল, আমি বুঝতে পারলুম না। সে আবার খেঁকিয়ে উঠল, 'ছিপটির জ্বালাটা এরই মধ্যে ভুলে গেলি। কী বেহায়া রে তুই! আবার যখন দেবে, তখন বুঝতে পারবি! ঘুমো হতচ্ছাড়া!'
আমি প্রথমটা একটু ঘাবড়ে গেলেও, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়েছি। আমার তো এমনিতেই মুরুবিবটার ওপর রাগ ছিল, তাই তাকে তোয়াক্কা না করেই আমি দড়ি টানাটানি চালিয়ে গেলুম।
'মরবি, মরবি ! ওরে আহম্মক, ওই দড়ি ছেঁড়া তোর কম্ম নয়। একবার যখন এদের হাতে ধরা পড়েছিস, তখন জেনে রাখ, আর ছাড়ান পাচ্ছিস না। তোর ওই লম্ফঝম্ফই সার। ভালো চাস তো ঘুমিয়ে পড়!' বলতে বলতে মুরুবিব-ঘোড়া বোধ হয় একটা হাই তুলল।
'হুঁঃ' আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল একটা তাচ্ছিল্যের শব্দ। আমি তার কথা কানে না-নিয়ে আবার দিলুম টান দড়িতে।
কিন্তু মুরুবিব-ঘোড়াকে অগ্রাহ্য করলেও, এটা বুঝতে পারলুম, দড়ি টানতে-টানতে ঘাড় থেকে আমার মুণ্ডুটা উপড়ে গেলেও দড়ি ছিঁড়বে ন। অথচ মুরুবিব-ঘোড়ার কথা গ্রাহ্য করেই এক্ষুনি-যদি টানাটানিটা বন্ধ করি, তবে তো মুরুবিবর কথাই শোনা হয়ে যায়! কাজেই আমি একগুঁয়ের মতো গোঁয়ার্তুমি চালিয়ে গেলুম।
এবার মুরুবিব-ঘোড়া বেশ চটিতং হয়েই গলা চড়াল। বলল, 'দেখবি, আবার চেঁচামেচি করব!চেঁচালেই পাহারাদার হাজির হবে! তখন বুঝবি! বলছি, ভালোয়-ভালোয় ঘুমিয়ে পড়, তা নয়! একটু শান্তশিষ্ট হয়ে থাকলে যে এরা ভালোবাসবে, এই সাদা বুদ্ধিটা পর্যন্ত তোর মগজে নেই। ওরে মুখ্যু, ভালো হয়ে থাকলে ভালো-ভালো খাবার পাবি। কত যত্ন-আত্তি পাবি। কত-শহর-বন্দরে যাবি। কত দেশ দেখবি। আর তা না হলে, এই মরুভূমিতেই থাকবি! বালিতে পুড়বি, আর দস্যুবৃত্তি করবি! বেকুব! বেকুব! এই দ্যাখ দিকিনি, আমরা কেমন সুখে আছি। খাচ্ছিদাচ্ছি আর এ-দেশ-ওদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছি। তবে হ্যাঁ, একজন সওয়ারিকে পিঠে বয়ে নিয়ে যেতে হচ্ছে বটে। কিন্তু, সে তো তোমাকে বইতেই হবে। বসিয়ে-বসিয়ে কে আর তোমার মুখে দুধভাত তুলে দেবে! সেদিন আর নেই। এখন গতর না খাটালে কিছুই মিলবে না। তা ছাড়া কুঁড়ের মতো বসে থাকাটাও কি তোর মতো এমন অল্পবয়সী ঘোড়ার উচিত? ভাব, ভাব, একটু ভেবে দ্যাখ!'
ভাবো, এবার তোমরাই ভাবো! উপদেশটা আমায় কে দিচ্ছে? না, মুরুবিব-ঘোড়া! মানে, যে-ঘোড়াটা এই একটু আগে আমার পিঠে দাঁত বসিয়ে কামড়ে দিয়েছে। বলতে গেলে, তার জন্যেই আমার পিঠে চাবুক পড়েছে। সে যে এখন আমার একনম্বরের দুশমন, এ-কথাটা বোধ হয় তোমাদের আর নতুন করে বলে দিতে হবে না। সুতরাং সেই দুশমনের উপদেশ মেনে নেওয়া মানেই তো তার কাছে মাথা হেঁট করা! হার স্বীকার করা! ছোঃ!
কিন্তু আমি হেরেই গেলুম। কোথায় গেল আমার একগুঁয়েমি, আর কোথায় গেল দস্যিপনা। আমি যেন এখন মুরুবিব-ঘোড়ার কেনা গোলাম হয়ে গেলুম। মন আমার থেকে-থেকেই বলে উঠছিল, আহা-হা! কী কথাই না শোনালে তুমি মুরুবিব! না, নাL ভালো ভালো খাবার আমার চাই না। যত্ন-আত্তিও আমার দরকার নেই। আমি দেশে-দেশে ঘুরে বেড়াতে চাই। নতুন-নতুন শহর-বন্দর দেখতে চাই। এই মরুভূমি আর আমার ভালো লাগে না। আমার এখন ভীষণ ভালো লাগছে তোমাকে। আর কাউকে নয়, মরুবিব-ঘোড়া তোমাকে! তুমি আর একবার আমার পিঠে কামড়ে দাও! আমি একটুও চিল্লাচিল্লি করব না। শুধু আর একবার বলো, আমি ঠান্ডা হয়ে থাকলে সওদাগর আমাকে শহরে নিয়ে যাবে। নানা দেশে নিয়ে যাবে! ওহো! সে কী মজা! আমি যে আর থাকতে পারছি না! আমার যে এখনই যেতে ইচ্ছে করছে। এই দ্যাখো, এখন আমি একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছি। একটু ঢেঁটামি করছি না। আমি একটি ভদ্র ঘোড়া এখন, এই মুহূর্তে।
সত্যি বলছি, অনেকক্ষণ আর আমি একটুও মাথা গরম করলুম না। একেবারে শান্ত-শিষ্ট। মুখে নো কথা। নাকে নো শব্দ। চুপচাপ। আমাকে অনেকক্ষণ এমনই শান্ত থাকতে দেখে, অন্য আর কোনো কথা না বলে মুরুবিব-ঘোড়া শুধু বলল, 'ঘুমিয়ে পড়! কাল ভোর থাকতেই উঠতে হবে। আবার বালি ভেঙে পথ চলা।'
আমি বলতে পারব না, তখন কত রাত হয়েছিল। কতখানি রাত কাবার হলে যে ভোর হবে, তার হিসেবও আমার জানা ছিল না। এমনকী, আমার বাকি রাতটা ঘুমিয়ে কেটেছিল কি না, তাও আমি মনে করতে পারছি না। শুধু মনে আছে, আকাশে তখন ভোরের আলো ফুটেছে। সওদাগরের যাত্রার তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। তাঁবুগুলো এরই মধ্যে গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। উটগুলোর জলপানি পেটে পড়েছে। ঘোড়াগুলোর ছোলাদানা খাওয়া হয়েছে। আমারও ভাগ্যে জুটেছে নিয়মমাফিক খানার বরাদ্দ। আমাকে নিয়ে সওদাগরদের মধ্যে ফিসফিসানিও চলেছে। শুনতে পাচ্ছি। কেউ-কেউ চোখ টেরিয়ে আমাকে শুধুই দেখছে। কেউ-কেউ হাত দিয়ে আমার গা-টা পরখ করছে। আবার কেউ-কেউ নিজেদের মধ্যে আমার খোঁজখবর নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। আসলে, আমি যে একটা দলছুট ঘোড়া, এ-ব্যাপারে সবাই একমত। বটেই তো! বনজঙ্গল হলে এক কথা ছিল। আমাকে তখন 'বুনো' বলে চালিয়ে দিতে কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু মরুভূমি তো আর ঘোড়ার চারণ-খেত নয় যে, আমি মনের সুখে চরে বেড়াব। কাজেই সওদাগরের দল ধরেই নিল, হয় মরু-ঝঞ্ঝায় আমি ছিটকে এসেছি, আর, নয়তো দাঙ্গা-হাঙ্গামার কবলে পড়ে আমি পালিয়ে বেড়াচ্ছি। অতএব এখন তারা আমাকে নিয়ে কী করবে, সেই নিয়েই বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা-ভাবনা করল। কিন্তু শেষপর্যন্ত কী ঠিক হল, তা আমি বুঝতে পারলুম না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলুম, আমাকে ওরা সঙ্গে নেবে। আমাকে শহরে নিয়ে যাবে।
মনে-মনে আনন্দে শিউরে উঠলুম আমি। আমার গায়ে কাঁটা দিল। আমার চারটে পা-ই যেন একসঙ্গে নেচে উঠল। তবুও ভেতরে-ভেতরে একটা ভয়ও মাঝে-মাঝে উঁকি মেরে আমাকে খোঁচা দিচ্ছিল। অন্য কিছুর ভয় নয়। ভয়টা হল দস্যুর। আবার যদি দস্যুর হাতে ধরা পড়ে যাই! তা হলে, শহর দেখার শখ আমার চিরদিনের মতো ঘুচে যাবে! কিন্তু পথে যেতে-যেতে যদি হঠাৎ বাবার সঙ্গে দেখা হয়ে যায়! তা হলে তো কথাই নেই। বাবাকেও তখন বলব, 'আমাদের সঙ্গে চলো! আমরা শহরে যাচ্ছি। তুমিও তো শহর দেখোনি কোনোদিন।' আঃ! কী ভালো হয় তখন!
ভোরবেলা সব গোছগাছ করে যখন যাত্রা শুরু হব-হব করছে, তখন আমি দেখলুম, মুরুবিব-ঘোড়াকে সববার আগে দাঁড় করানো হল। আশ্চর্য হয়ে গেলুম দেখে, আমাকেও ঠিক তার কাছেই টেনে নিয়ে গেল। আমি দাঁড়ালুম তার পেছনেই। দাঁড়িয়ে আমি লক্ষ করলুম , মুরুবিব-ঘোড়া উসখুস করছে। আমার মনে হল, সে বোধ হয় আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি তাই নিজেই তাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'কিছু বলবে?'
সে আমাকে ইশারা করল। বুঝতে পারলুম, সে আমাকে তার কাছে এগিয়ে যেতে বলছে। আমি এগিয়ে গেলুম। তখন চারপাশে সওদাগরের লোকজন ছিটিয়ে-ছড়িয়ে যাত্রার ব্যবস্থায় ব্যস্ত। আমি খুবই গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'কী?'
মুরুবিব-ঘোড়া আমার গলার চেয়েও নিজের গলার স্বর আরও নিচু করে বলল, 'আর একদম দস্যিপনা করবি না। ওরা যেমন-যেমন হুকুম করবে, মেনে চলবি। অবাধ্য হলেই আবার ছিপটি দিয়ে পিট্টি দেবে। কালকের পিটুনির দাগ তোর পিঠে এখনও দগদগ করছে। আমি দেখতে পাচ্ছি। তার ওপর যদি আবার পড়ে, ফেটে রক্ত গড়াবে। কাজেই আমার কাছছাড়া হবি না একদম। যতটা পারবি, আমায় ঘেঁষে-ঘেঁষে চলবি। কষ্ট হলে আমায় বলবি।'
আমি উত্তর দিলুম, 'আচ্ছা।'
বললুম বটে, 'আচ্ছা', কিন্তু কষ্ট তো আমার এখন যথেষ্টই হচ্ছে। কাল থেকে শরীরের ওপর কী জুলুম চলছে! তা হলেও আমার মুখ দেখলে সেটা কেউ আন্দাজ করতে পারবে না। যাই হোক, আমার কাছে আনন্দের কথা এই যে, আমার পিঠে কোনো মালের বোঝা চাপানো হল না। অবশ্য সওদাগরের একজন দোসর আমার পিঠে সওয়ার হল। আমায় যথারীতি লাগাম পরানো হল। গলায় ঘন্টা। একদম ফিটফাট। তারপর যাত্রা শুরু।
মরুভূমির নির্জন বুকে হঠাৎ কোনো নিরীহ যাত্রীদলের ওপর ঝাঁপিয়ে দস্যুদের সাহায্য করা ছিল আমার এতদিনের কাজ। কতদিন এমন কত সওদাগরের কত যে ধনদৌলত লুঠের সঙ্গী হয়েছি আমি, তা বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু আজ দ্যাখো, আমি সওদাগরেরই দলের এক সহচর ঘোড়া। চলেছি শহরে। কে জানে এর পর কী আছে কপালে!
মনে হচ্ছে, আরও তিনদিন হাঁটলুম বালির ওপর। আরও তিনরাত্তির তিন মরূদ্যানে তাঁবু পড়ল সওদাগরের। তারপর যতই এগোচ্ছি, আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। আমার চোখের দৃষ্টি যেন ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। বালি কমছে। কমছে নির্জনতা। পথের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে মানুষজন। আমাদের পায়ে-পায়ে শব্দ উঠছে টগবগ, টগবগ। মানুষের গলায়-গলায় শোনা যাচ্ছে খকখক, বকবক। দেখতে পাচ্ছি, জলের ভিস্তি পিঠে নিয়ে গাধা চলেছে এপথ-সেপথ। পিঠে মালের বোঝা নিয়ে মানুষ চলেছে এদিক-ওদিক। একটি -একটি গাছ দেখা যাচ্ছে এধারে-ওধারে। ফেরিওলা পসরা সাজিয়ে এটা-ওটা বিকিকিনি করছে।
আমি মুরুবিব-ঘোড়ার গা ঘেঁষে হাঁটছি। যতই দেখছি, ততই হতভম্ব হয়ে যাছি। তারপর আর থাকতে না পেরে চুপিসারে মুরুবিবকে জিজ্ঞেস করলুম, 'এর নাম শহর?'
সে বলল, 'দুর বোকা, এর নাম গাঁ। এখনও এমন দুটো গাঁ পেরোলে তবে শহর!
'তা হলে কি শহর আরও দূরে?' আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম।
মুরুবিব-ঘোড়া উত্তর দিল, 'আরে বাবা, দূরে, না কাছে, এসব নিয়ে তোর অত মাথা ঘামাবার কী আছে? দেখতে-দেখতে হাঁট! দ্যাখ কেমন করে 'ছুঃ মন্তরে' শহর তোর নাকের ডগায় এসে পড়ে।'
ব্যাপার-স্যাপার দেখে, সত্যি বলতে কী, আমি একদম ভ্যাবাচাকা-হাম্বা। আমার মুখখানা সেই সময়ে তোমরা কেউ যদি দেখতে, নিশ্চয়ই হেসে কুটোকুটি হয়ে যেতে। আমার মনে হল, সেই কারণেই বোধ হয় মুরুবিব-ঘোড়ারও হাসি পেয়েছিল। নইলে, সে অমন হাসিটাকে লুকিয়ে-ছাপিয়ে আমার দিকে তাকাবার চেষ্টা করবে কেন?
চেষ্টা করলে কী হবে! আমার চোখকে তো আর ফাঁকি দিতে পারবে না। আমি ধরে ফেলেছি। ধরেই আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'তুমি হাসছ যে?'
'হাসি পাচ্ছে।' সে উত্তর দিল, 'তুই যে শুধু নামেই দস্যুর ঘোড়া, এতক্ষণে বুঝতে পেরেছি। তুই একটা আস্ত গেঁয়োভূত।'
সত্যি বলছি, তখন চারদিক দেখতে-দেখতে অবাক-খুশিতে আমার চোখ দুটো এমন ভরে গেছল যে, মুরুবিব-ঘোড়ার ওসব কথা কানেই নিলুম না। তাই চুপচাপ হাঁটতেই থাকলুম। আর ভাবতে লাগলুম, এতদিন বালির রাজ্যটাকেই মনে হত পৃথিবী। এখন দেখছি, পৃথিবীটা আরও কত আশ্চর্যের। কত জৌলুস। কত জমজমাট।
সত্যিই তাই। কারণ, আরও অনেকটা হাঁটার পর আমি যা দেখতে পেলুম, তাতে আমার চক্ষু চড়কগাছ। এমন জিনিস আমি জীবনে আর কখনও দেখিনি। দেখলুম কী, ঠিক আমার চোখের ওপর দিয়ে একটা ঘোড়া দুটো চাকা গড়গড় করে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দেখতে-দেখতে অবাক হয়ে গেলুম, আরও অনেক ঘোড়া, আরও অনেক চাকা টানতে টানতে ছুটছে! বা রে! ভারি মজার তো! আমি আর থাকতে পারলুম না। মুরুবিবর কানের কাছে মুখ এনে বললুম, 'কী তাজ্জব কাণ্ড দ্যাখো!'
'কই?' সে জিজ্ঞেস করল।
'ওই তো। আমার জাতভাই ওই ঘোড়াগুলো কেমন চাকা টানছে।' আমি উত্তর দিলুম।
সে এবার ফিক করে হেসে উঠে বলল, 'সাধ করে কি তোকে আমি গেঁয়ো বলেছি! ওরে আহম্মক, ওগুলো সব ঘোড়ায়-টানা গাড়ি। এক্কাগাড়ি।'
আমি তার কথা শুনে চুপসে গেলুম। আর মনে-মনে ভাবলুম, একবার একটা এক্কাগাড়ি যদি এই সময় টেনে পরখ করা যেত! মনে হচ্ছে, দেখে যত মজ্জা পাচ্ছি, টানলে বোধ হয় মজাটা আরও বেশি হত!
'ওই দ্যাখ!' হঠাৎ মুরুবিব-ঘোড়া তার ল্যাজ দিয়ে আমায় ঝাপটা মেরে সামনেটা দেখতে বলল।
আমি থতমত খেয়ে সামনে মুখ তুলে দেখি, হু-ই-ই অনেক দূরে, উঁচুমতো কী একটা, আসমানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। আমি এবারও কাত! কী রে বাবা ওটা! রক্ষে, এবার আর বোকার মতো আমায় জিজ্ঞেস করতে হল না। মুরুবিব-ঘোড়া নিজেই বলল, 'ওইটা শহরের মিনার!'
'ওখানে কী আছে?' আমি ওই মিনারের দিকে অবাক-চোখে চেয়েই জিজ্ঞেস করলুম।
সে বলল, 'ওই মিনারের ওপর উঠলে গোটা শহরটা একনজরে দেখতে পাওয়া যায়।'
আমি উত্তেজনায় অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'আমরাও উঠব?'
'দুর বোকা, ওর ওপর ওঠা ঘোড়ার কম্ম নয়। মানুষ ছাড়া কেউ উঠতে পারে না।'
মুরুবিবর উত্তর শুনে আমি আবার কেমন মনমরা হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম।
আমার মনের অবস্থাটা বুঝতে পেরেই বোধ হয় মুরুবিব-ঘোড়া আমাকে চাঙ্গা করার জন্য বলল, 'ওই মিনারের নীচেই বাজার। ওইখানেই আমাদের যেতে হবে।'
অবিশ্যি আমার যা মনে হল, এখান থেকে মিনারের চুড়োটা দেখতে পাওয়া গেলেও, ওখানে যেতে এখনও বেশ খানিকটা পথ হাঁটতে হবে। তাই মুরুবিব-ঘোড়াকে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'ওখানে যেতে আরও কতক্ষণ লাগবে?'
'দাঁড়া, এখনও শহরের ফটকই এল না।'
'ফটক!' আমার আবার অবাক হওয়ার পালা।
'হ্যাঁ রে বাবা। ফটক, ফটক। শহরের দরোয়াজা। ইয়া উঁচু। অ্যাত্তোখানি চওড়া। অ্যাইসা মোটা-মোটা পাথর দিয়ে তৈরি।' মুরুবিব-ঘোড়া বলতে-বলতে কদম ফেলল।
ততক্ষণে যে শহরের আরও কাছাকাছি চলে এসেছি, সেটা বুঝতেই পারছি। কারণ, এখান থেকেই অসংখ্য মানুষের হইহল্লা শুরু হয়ে গেছে। অনেক গাড়ি-ঘোড়ার আনাগোনা নজরে পড়ছে। অনেক উট হাঁটছে। অনেক গাধা। ভেড়ার পাল। কী নেই! মরুভূমির চেহারার সঙ্গে একবারেই মিল নেই এখানকার, একটুও। অবিশ্যি, গরমটা এখানে কম, কম ঠেকলেও, বলতে পারবে না, হাওয়া ভেসে বেড়াচ্ছে আরামের গন্ধ ছড়িয়ে। গরম খুবই। তবে মরুতে যেমন গাছ নেই, ছায়া নেই, এখানে সে-সবের ছড়াছড়ি। চোখ ফেরালেই দেখবে, খেজুর গাছের সার। কত বাড়িঘর। ছোটো-বড়ো। মাটির, পাথরের। কত পান্থশালা। সব ছায়া ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইচ্ছে করলেই, ছায়ার নীচে খানিক আরাম করে আবার হাঁটো। আমি যতই দেখছি, ততই থমকে যাচ্ছি।
'শহরের ফটক এসে গেল রে।' আমায় সজাগ করে দিল মুরুবিব-ঘোড়া।
'কই?' আমি চমকে তাকালুম। তারপরেই নজরে পড়ল। আমি একটু ব্যস্ত হয়ে তড়বড় করে পা ফেললুম। আমার পিঠের সওয়ার আমাকে ধমকালো, 'আস্তে চল।'
আমার দিকে ফিরে তাকাল মুরুবিব-ঘোড়া। আমাকে চোখ মটকাল। আমি সামলে গেলুম। আসলে আমি এখন চারদিকের হইহই কাণ্ড দেখে এমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছলুম, আমার পিঠে যে একটা মানুষ আছে, সেটার খেয়ালই ছিল না। তারই হুকুম মেনে যে আমায় পা ফেলতে হবে, এই নিয়মটাও আমি ভুলে বসেছিলুম সেই মুহূর্তে। যাই হোক, এখন আর আনমনা হচ্ছি না। চোখ আমার সামনে। মন আমার পিঠে। পিঠে আমার সওয়ারি। সওয়ারি আমাকে ওই ফটকের দিকেই চালিয়ে নিয়ে চলল। সঙ্গে সওদাগরের গোটা দলটা।
দেখতে-দেখতে শহরের গেটটা একেবারে আমাদের চোখের সামনে চলে এসেছে। দূর থেকে যা মনে হচ্ছিল, কাছ থেকে যেন আরও বিরাট লাগল। ফটকের নীচে যখন একসঙ্গে আমাদের গোটা দলটা ঢুকে পড়ল, গমগম করে উঠল ফটকের নীচটা। বাববা! এই যদি ফটক হয়, তবে ফটকের যে মালিক তার বাড়িটা না জানি কত বড়ো। ফটকের ভেতরে, বাইরে, সব দিকেই বাহারি রঙের সাজে ঝকমক করছে। চোখ সেই রং দেখলে ফিরতে চায় না। আমাদের পায়ের শব্দে প্রতিধবনি উঠল ফটকের দেয়ালে। আমরা ফটক পেরিয়ে শহরের মধ্যে ঢুকে পড়লুম। এখন আমাদের লক্ষ্য ওই মিনার। আমাদের দল সেইদিকেই এগিয়ে চলল।
জীবনে এই প্রথম শহর দেখছি। আগে কত গল্প শুনেছি শহরের। এক-একজনের মুখে এক-একরকমের গল্প। যা ভেবেছিলুম, তার চেয়েও যেন আশ্চর্য লাগছে এই শহর। দোকান-পসরার কথা ছেড়ে দাও। শহরে যে এত মানুষ থাকতে পারে, তা আমার ধারণারও বাইরে। এত লোক থাকে কোথা? শহরে অসংখ্য মানুষই যেন আমার চোখে এক আজব দৃশ্য। আর আশ্চর্য ওই কান ঝালাপালা করা হট্টগোল। চিৎকার-চেঁচামেচি। গান-বাজনা। কী উদ্ভট ব্যাপার, কিছুই থেমে নেই। শহর যেন শব্দের কারখানা। গাড়ি ছুটছে, শব্দ। ঘোড়া হাঁটছে, শব্দ। ভেড়া ডাকছে, শব্দ। মানুষে-মানুষে কথা হচ্ছে , শব্দ। দোকানে-দোকানে কেনাকাটার দরদস্তুর হচ্ছে, শব্দ। গান হচ্ছে, বাজনা বাজছে, তাও শব্দ। এত শব্দ কানে নিয়ে আমারই মাথার ভেতরটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। মনে হচ্ছিল, থামলে বাঁচি। কিন্তু কে থামবে! শহরে কেউ থামতে জানে না। থামলে বোধ হয় কেউ আর শহর বলবে না। শব্দ না থাকলে শহর মানায় কখনও!
দেখতে-দেখতে আমরা সেই মিনারের নীচেই চলে এলুম। এখানে মস্ত একটা ফাঁকা জায়গা। তখন বেলা পড়ছে। দেখলুম, আমাদের এই দলটার মতো আরও দু-একটা দল, ফাঁকা জায়গাটার একদিক জুড়ে তাঁবু খাটিয়ে সংসার বানিয়ে ফেলেছে। আমাদের দলটাও সেইদিকেই এসে থামল। আঃ! এতক্ষণে একটু আরাম পেলুম। যতই হোক, একনাগাড়ে হাঁটলে পায়ে টান ধরতেই পারে। যদিও আমার পায়ে টান ধরেনি, তবু যেন জান ঠান্ডা হল। আমার পিঠের ওপর থেকে সওয়ারিও নেমে পড়ল। বাঁচলুম। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মুরুবিব-ঘোড়ার দিকে মুখ ফেরাতেই মুরুবিব-ঘোড়া জিজ্ঞেস করল, 'কী রে, খুব কাহিল হয়ে পড়েছিস বুঝি?'
আমি বললুম, 'তেমন না।'
'তবে লম্বা-লম্বা নিশ্বেস ফেলছিস?'
আমি উত্তর দিলুম, 'নিশ্বেসের আর দোষ কী! পথটা তো কম নয়।'
'তা বটে। বলে মুরুবিব ল্যাজ দিয়ে নিজের পিঠটা ঝেড়ে নিল।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'আমাদের কি এইখানেই থাকার ব্যবস্থা?'
'হ্যাঁ।'
'ঘুম হলে বাঁচি।'
'কেন?'
'চারপাশে যা হইহল্লা।'
মুরুবিব-ঘোড়া আমার কথা শুনে মুচকি হাসল। তারপর বলল, 'ওরে বাবা, এই হল্লা শুনেই ঘাবড়ে যাচ্ছিস, তা হলে, কাল যখন এখানে বাজার বসবে, তার হল্লা শুনলে তো তিষ্ঠোতে পারবি না।'
আমি উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'কোথায় বাজার বসবে?'
মুরুবিব বলল, 'কেন, এইখানে। দেখতে পাচ্ছিস না, কত বড়ো খোলা ময়দান। কাল সকাল থেকেই দেখবি, হইহই কাণ্ড, দেখবি ময়দান জুড়ে বাজার বসে গেছে। দেখবি, কেনাকাটার ধুম।'
আমি জিজ্ঞেস করলুম, 'আমরা এখানে ক-দিন থাকব?'
মুরুবিব বলল, 'একদিনও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে। যদ্দিন না বেচাকেনা শেষ হচ্ছে, তদ্দিন থাকব।'
'আচ্ছা ধরো, বেচাকেনা একদিনেই শেষ হয়ে গেল। তা হলে কি আমরা পরদিনেই চলে যাব?' আমি জিজ্ঞেস করলুম।
মুরুবিব উত্তর দিল, 'নিশ্চয়ই। এটাই নিয়ম। কে আর বসে- বসে ঝুটমুট সময় নষ্ট করতে চায়!'
'না', আমি বলুলম, 'ক-দিন থাকলে শহরটা একটু ঘুরে ফিরে দ্যাখা যেত, এই আর কী!'
মুরুবিব বলল, 'ও বাবা! তোর তো শখ খুব! কোন দেশের কোন মানুষ, কোনকালে ঘোড়াকে শহর দ্যাখায় রে মুখ্যু! তুই তো আচ্ছা ক্যাবলাকান্ত! কিচ্ছু জানিস না!'
মুরুবিব-ঘোড়ার কথা শুনে মনটা আমার যদিও খুব মুষড়ে গেল, তবুও হাল ছাড়লুম না। বললুম, "আচ্ছা মুরুবিব, মানুষে আমায় শহর না দেখালেও তুমি তো দেখাতে পারো?'
মুরুবিব একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'কীরকম?'
'এই ধরো, রাত্তিরে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, তখন তুমি আর আমি দু-জনে চুপিচুপি তো বেরিয়ে শহর দেখতে পারি।'
'নাঃ, বুদ্ধিতে তুই ভীষণ কাঁচা।'
'কেন?'
'তুই ভাবছিস সওদাগরের সহচররা রাত্তিরে আমাদের ছেড়ে দিয়ে নিজেরা নাক ডাকিয়ে ঘুমোবে। আরে বাবা, আমাদের যেমন গলা আছে লম্বা-লম্বা, ওদের তেমনই দড়িও আছে শক্ত-শক্ত। গলায় পরাবে আর খুঁটিতে বাঁধবে। এক পা-ও নড়তে হচ্ছে না। এখন যা দেখছিস তাই দ্যাখ। এই মিনার দেখেই চোখ সার্থক কর। তার ওপর আর যদি কিছু দেখতে পাস, তবে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করিস।' বলে মরুবিব-ঘোড়া হাই তুলল। ঘুম পেয়েছে।
আমি অবশ্য হাই তুললুম না, মুখখানা আকাশের ওপরে তুলে মিনারের চুড়োটা দেখবার চেষ্টা করলুম। সত্যিই, খুব উঁচু এই মিনারটা। আকাশের ভেতর যেন মুণ্ডুটা ঢুঁ মেরে ঢুকে পড়েছে। আচ্ছা ধরো, মিনারটা যদি কোনোদিন ঘাড় মটকে এই মাটির ওপর ধসে পড়ে! বাববা, সেদিনের সেই ভয়ঙ্করের কথা ভাবলেই গা শিউরে ওঠে!
মুরুবিব-ঘোড়া একটু আগে যেমন বলল, ঠিক তেমনই হল। আমাদের লাগাম ধরে টানতে-টানতে নিয়ে চলল সওদাগরের লোকেরা। যেখানে আমরা থাকব, সেখানেই নিয়ে চলল। এইটুকু সময়ের মধ্যেই তাঁবু পর্যন্ত খাটানো হয়ে গেছে। আমাদেরও জায়গা হল, তাঁবুরই লাগোয়া। দেখতে-দেখতে আমাদের ঘাস-পাতার খাদ্যও মুখের কাছে চলে এসেছে। যাইহোক, খাওয়াটা ভালোই লাগছে। ছোলা-দানা খেয়ে-খেয়ে এমন একঘেয়ে হয়ে গেছল, আজ তাই শহরে এসে সবুজ পাতার মিষ্টি সোয়াদ ভালো না লেগে পারে! তেষ্টাও পেয়েছে ভীষণ। উটগুলোর অবস্থা আরও কাহিল। এদের নিয়ে তেমন ঝঞ্ঝাট নেই। মরুভূমিতে যাত্রার আগে পেট ভরে খেয়ে নেবে। খাবার, জল, দুই-ই। তারপর কী মজা, কিছু না-খেয়ে দিনের পর দিন হাঁটতে পারে! ওই যে, ওদের পিঠের ওপর কুঁজটা দেখছ, ওটা হল ওদের খাবারের ভাঁড়ার ঘর। যতই খাবে, ততই ওদের ওই ভাঁড়ার ঘর ভর্তি হবে। খিদে পেলেই ওই ভাঁড়ার ঘর থেকে খাবার গলে-গলে শরীরে ছড়িয়ে পড়বে। আসলে কুঁজটা চর্বি। ওই চর্বিই দরকারমতো শরীরের খিদে মেটায়। তোমরা যদি এখনই আমাদের দলের এই উটগুলোকে দ্যাখো তো আঁতকে উঠবে। কেননা, এখন কী বিচ্ছিরি চেহারা হয়েছে ওদের! কুঁজটা চুপসে পিঠের সঙ্গে মিশে গেছে। হাড়গোড় একেবারে বেরিয়ে পড়েছে। এই দ্যাখো, আবার খাওয়া শুরু করেছে। আবার দ্যাখো, ওই কুঁজটা মোটাসোটা হয়ে ফুলেও উঠবে, ওরা শরীরেও বল পাবে। আচ্ছা, আমাদেরও শরীরে এরকম একটা ব্যবস্থা থাকলে তো খিদের জন্য খাই-খাই করতে হত না।
সত্যি কথা বলতে কী, শরীর আর বইছে না কারও। যেন একটু বেশ তেড়ে ঘুমোতে পারলে শরীরটা ঝরঝরে হয়। এদিকে সন্ধেও নেমে আসছে। শহর ঘিরে আলোর রোশনাই বেরোচ্ছে। আমার চোখে এও এক আশ্চর্য দৃশ্য। ভাবছি, ঘুমিয়ে পড়লে আরও হয়তো অনেক কিছু দেখতে পাব না। কিন্তু চোখ কি না-ঘুমিয়ে থাকতে পারবে! বরঞ্চ দেখাটা কালকের জন্যে তোলা থাক। আজ ঘুমিয়ে পড়ি।
অনেক সকালেই আমি জেগে উঠেছিলুম। ঘুম যে আমার তেমন হয়েছিল, তা নয়। মাঝে-মাঝেই ছ্যাঁত-ছ্যাঁত করে জেগে উঠছিলুম। অচেনা জায়গায় এমন বোধ হয় সবারই হয়। তা-ও ভোরের দিকে একটু ভালোই ঘুম এসেছিল। কিন্তু ঘুমোয় কার সাধ্যি। সেই ভোর থাকতেই দলে-দলে সব মানুষজন, বিকিকিনির পসরা নিয়ে হাজির হচ্ছে বাজারে। তা মুখ বুজে তো আর কেউ দোকান সাজাচ্ছে না। এটা সেই হাট-বাজারের মতো আর-কি। দলে-দলে যেমন মানুষ আসছে জিনিসপত্তর মাথায় নিয়ে বিক্রি করতে, তেমনই দল বেঁধে ক্রেতা আসছে টাকা-পয়সার থলি নিয়ে নানা জিনিস কেনাকাটা করবার জন্যে। দেখতে-দেখতে বাজার ভিড়ে ভিড়। আমি তো একেবারে হতভম্ব হয়ে গেছি দেখেশুনে। কী নেই বাজারে! ফলফুলুরি থেকে শুরু করে সাজপোশাক, বাসনকোসন, মশলাপাতি, গয়নাগাটি, খাবারদাবার, ছাগল-ভেড়া, এমনকি, উট, ঘোড়াও। গোটা ময়দান থিকথিক করছে। একসঙ্গে এত মানুষের ভিড় আমি এই প্রথম দেখছি। সুতরাং বুঝতেই পারছ, আমি একেবারে ক্যাবলাকান্তের মতো ড্যাবড্যাব করে সব দেখছি। ভোরটা যে কখন, কেমন করে সকাল হয়ে গেল, আর সকালটা যে কেমন করে দুপুরে গড়িয়ে এল, আমি তা একেবাবেই খেয়াল করতে পারিনি। এরই মধ্যে খেয়েছি-দেয়েছি, আমাদের সওদাগরকে তার নিজের লোকজনের সঙ্গে কথাবার্তাও বলতে দেখেছি। আবার খদ্দেরের সঙ্গে দাম-দর নিয়ে কথা কাটাকাটিও করতে শুনেছি। কিন্তু তারই ফাঁকে এমন যে একটা ভয়াবহ ঘটনা হঠাৎ ঘটবে, আমি তা কল্পনাও করতে পারিনি। তোমরাও পারবে না। হঠাৎই একজন ধোপদুরস্ত ভদ্রলোক সওদাগর আর তার সহচরদের সঙ্গে আমারই সামনে এসে দাঁড়াল। আমাকে তন্নতন্ন করে দেখতে লাগল। আমার গায়ে হাত দিল। টিপেটাপে কিছু বোঝবার চেষ্টা করল। আমার গায়ের রংটার তারিফ করল। তারপর আমার বয়েস নিয়েও দু-একটা কথাও বলাবলি করল। আমি হাঁ করে তাদের দিকে চেয়ে-চেয়ে দেখতে লাগলুম। ভয় পেলুম। ভাবতে লাগলুম, কে ভদ্রলোক! আমাকে নিয়েই বা কিসের এত আলোচনা! তবে কি লোকটা পুলিশের লোক! জানতে পেরেছে, আমি দস্যুর ঘোড়া!
অনেকক্ষণ ধরেই আমাকে নিয়ে তারা অনেক আলাপ-আলোচনা করল। শেষমেশ সওদাগরের সঙ্গে ভদ্রলোক তাঁবুর ভেতর ঢুকে গেল। তারপর যে তাদের কী কথা হল, আমি শুনতে পেলুম না। অগত্যা আমি খুবই ব্যস্ত হয়ে মুরুবিব-ঘোড়ার কাছ-বরাবর এগিয়ে গেলুম। দেখলুম, মুরুবিব-ঘোড়ার মুখখানা খুবই গম্ভীর হয়ে আছে। অন্য ঘোড়াগুলোও আমার দিকে কেমন যেন করুণ চোখে তাকাচ্ছে, আর নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করছে। আমি থাকতে পারলুম না। মুরুবিবকে জিজ্ঞেস করলুম, 'তুমি এমন গম্ভীর হয়ে আছ কেন? ওরা সব আমার দিকে অমন করে তাকিয়ে ফিসফিস করে কী কথা বলছে? সওদাগরের সঙ্গে ওই লোকটা এসে আমাকে অমন করে কী দেখল? আমার কথা কি সব জানাজানি হয়ে গেছে?'
মুরুবিব-ঘোড়া তেমনই গম্ভীর হয়েই উত্তর দিল, 'সেসব কিছু না।'
আমি উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'তবে?'
'আরও সাঙঘাতিক ব্যাপার।'
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
'তুই একদম বোকা।'
'কেন?' আতঙ্কে আমার গলার স্বর আটকে এল।
'সওদাগর ওই লোকটার কাছে তোকে বিক্রি করে দেবে। ওই লোকটা একজন ঘোড়ার ব্যাপারি।' উত্তর দিল মুরুবিব-ঘোড়া।
'না-আ-আ!' আমি চিৎকার করে উঠলুম।
মুরুবিব-ঘোড়া বলল, 'দ্যাখ, আর চেঁচালেও তোর কথা কেউ শুনবে না। তোকে দেখতে পেয়ে এরা মরুভূমি থেকে ধরে এনেছে। তুই কার ঘোড়া, কাদের ঘোড়া এসব নিয়ে সওদাগরের দল মাথা ঘামায় না। তোকে বিক্রি করে দিলে যা পাবে, তাই এদের লাভ। আর তা ছাড়া আর একটা কথাও তো ভাবতে হয়, তোকে সওদাগর সঙ্গে রাখবে কেমন করে? তোর মালিক যদি কোনোরকমে টের পেয়ে যায়, সওদাগর তখন নিজেই তো তার হাতে চুরির দায়ে ধরা পড়বে। তার চেয়ে বিক্রি করে দেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আর সহজও।'
'না-আ-আ, আমি মরুভূমি ছেড়ে কোথাও যাব না। এখানে আমার বাবা আছে।'
'ওরে বোকা, ঘোড়ার বাবাই থাক কি মা, সে নিয়ে মানুষের কোনো মাথাব্যথা নেই। তোর দুঃখ নিয়ে মানুষ কেন ভাবতে যাবে! তুই জানোয়ার হয়ে জন্মেছিস। জানোয়ার হয়েই তোকে থাকতে হবে সব দুঃখ-কষ্ট নিয়ে। কাজেই তোকে সব ভুলতে হবে, সব কিছু।'
মুরুবিব-ঘোড়ার কথা শুনে আমার সারা শরীর যেন থরথর করে কেঁপে উঠল। হায় রে! এ আমার কী হল! আমি এখন কী করব! আমি আবার মুরুবিব-ঘোড়াকে কাকুতি-মিনতি করে বললুম, 'তুমি ছাড়া আমার এখন আর কেউ নেই। তুমি ছাড়া এখন আর কেউ আমাকে বাঁচবার রাস্তা বাতলে দিতে পারবে না। তুমি দয়া করো।'
মুরুবিব উত্তর দিল, 'আর আমি কিচ্ছু করতে পারব না। তুইও যা, আমিও তা-ই। আমাকেও যদি আজ এরা কেটে ফেলার ইচ্ছে করে, আমি নিজেকে বাঁচাতে পারব না। মানুষের হাতে আমরা বন্দি। মানুষের চেয়ে দেহে আমরা অনেক বড়ো। গায়ের জোরে আমরা অনেক বলবান। কিন্তু মানুষের বুদ্ধির কাছে আমরা অচল। মানুষের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আমাদের কম্ম নয়। সুতরাং, ওরে দুর্ভাগা ঘোড়া, আমাকে তুই ক্ষমা কর!' বলতে-বলতে গলা কেঁপে উঠল মুরুবিব-ঘোড়ার।
আমার চোখে জল এল। আমার সারা শরীর ভয়ে আর ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠল। আমি আর কিছু উপায় না দেখে, আবার আমার গলার বাঁধনটা টানাহ্যাঁচড়া করতে লাগলুম। কিন্তু হায় কপাল, এ-বাঁধন খোলার নয়।
একটু পরেই আমি দেখলুম, সওদাগরের তাঁবুর ভেতর থেকে সেই খরিদ্দার লোকটা বেরিয়ে গেল। তারপর, আরও খানিক পরে সেই খরিদ্দারটাই আবার ফিরে এল। সঙ্গে তার বেশ ক-জন লোক। লোকগুলো যেমন তাগড়াই তেমনই তাকতদার। তাদের হাতে দড়িদড়া। একজনের হাতে একটা কালো কাপড়।। আমার একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল তারা। আমার বুক দুরুদুরু করে উঠল। আমি বুঝতে পারলুম, এবার আমায় বাঁধা হবে। আমার সামনে সমন হাজির।
অন্য আর কিছু না পেয়ে আমি একটা অবাধ্য ঘোড়ার মতো চিৎকার শুরু করে দিলুম। আমার সেই মরা-কান্নার মতো চিৎকার শুনে চোখের পলকে আমার চারপাশে ভিড়ে-ভিড়াক্কার। কিন্তু হলে কী হবে! কেউ আমায় বাঁচাতে এল না। মজা দেখতে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকারে আমার গলা ফেটে গেলেও কেউ এতটুকু দয়া দেখাল না। আমি হেরে গেলুম। সেই যে-লোকটার হাতে কালো কাপড়টা ছিল, সে যে কখন আচমকা আমার পিঠের ওপর লাফিয়ে উঠে পড়ল, আমি তা একদমই আঁচ করতে পারিনি। উঠেই, আমার চোখের ওপর কালো কাপড়টা পলকের মধ্যে জড়িয়ে আঁট করে বেঁধে ফেলল। আমি এমন হকচকিয়ে গেলুম যে, কিছুই করতে পারলুম না। শুধু একবার দুরন্ত জোরে লাফ মারলুম। কিন্তু তাতেও কিছু হল না। নিমেষের মধ্যে আমি যেন অন্ধ হয়ে গেলুম। সারা দুনিয়া এখন আমার চোখে অন্ধকার। আমি কিছুই দেখতে পাই না। এমন দিশেহারা হয়ে গেলুম যে, কখন লোকটা আমার পিঠ থেকে নেমে পড়ল, তা-ও বুঝতে পারলুম না। সুতরাং এখন প্রাণের দায়ে চার পা ছোড়াছুড়ি করা ছাড়া আর কিছুই করতে পারি না। আমি একেবারেই অসহায়। যার দৃষ্টি নেই, তার কিছুই নেই। শত্রু এখন কোনদিকে, তা-ও যেমন জানা নেই, তেমনই জানি না, আমাকে জব্দ করার জন্যে তারা এখন কী মতলব আঁটছে। সুতরাং এখন কালো কাপড়ের এই ঠুলি-পরা চোখে, আনি-মানি করে পা ছোড়াই নিজেকে বাঁচাবার সহজ উপায় বলে মনে হল।
কিন্তু সে-উপায়ও কাজে এল না। তারা আমার পেছনের পা দুটো হঠাৎ দড়ি জড়িয়ে বেঁধে ফেলল। এখন সামনের দুটো পা-ই সম্বল কিন্তু সে পা-ও যদি এখন ছোড়াছুড়ি করি, নির্ঘাত মাটির ওপর উলটে পড়ব। কাজেই, আর কিছুই করতে পারি না। কিন্তু বুঝতে পারি, আমার গলায় আবার দড়ি বাঁধা হল। আমার পিঠের ওপর দিয়ে আর পেটের তলা দিয়ে দড়ি পাকিয়ে বাঁধা হল। সবশেষে আবার পায়ের দড়ি খুলে আমার গলায় টান মারা হল। আমি বুঝতে পারলুম, এবার আমায় যেতে হবে। আমার যাত্রা শুরু। আমি আবার চিৎকার করে উঠলুম। আবার পেছনের পা ছুড়লুম। আবার লাফালুম। অবাধ্যের মতো গলার দড়িতে টান দিলুম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। উলটে আমার গায়ে চাবুক পড়ল। আঃ! আবার লাগল ভীষণ। কিন্তু কে মারল আমায়, কারা টানছে আমায়, আর কোনদিকে যাচ্ছি আমি, কিছুই ঠাওর করতে পারলুম না। কারণ, কালো কাপড়ের বাঁধনটা আমার চোখের আলো চেপে রেখেছে। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না। দেখতে পেলুম না, সেই সওদাগর বা তার লোকজনদের। দেখতে পেলুম না সেই একদঙ্গল উটকে, কিংবা আমার জাতভাই ঘোড়াদের। এমনকী এই কালো কাপড়ের ফাঁক দিয়ে দেখতে পেলুম না মুরুবিব-ঘোড়াকেও। তার চোখে চোখ রেখে বলতে পারলুম না, বিদায় বন্ধু, বিদায়।
একটা অসহায় প্রাণী একা কতক্ষণই বা যুঝতে পারে অত মুসকো লোকের সঙ্গে! আমিও পারলুম না। নিজেকে বাঁচাবার জন্যে ধস্তাধস্তি করতে-করতে ক্লান্ত হয়ে পড়লুম। এখন মনে হচ্ছে, আমার গলা শুকিয়ে আসছে। বলতে ইচ্ছে করছে, আমাকে আর অমন করে টেনো না. আমি নিজেই যাব। দয়া করে একটু দাঁড়াও! আমি দম নিতে পারছি না। আমায় একটু জল দাও! বড্ড তেষ্টা পাচ্ছে। কিন্তু আমার কথা কে বুঝবে! বুঝলেই বা কে শুনবে! তাই ধুঁকতে-ধুঁকতেই আমাকে হাঁটতে হল।
কপাল ভালো, আর বেশিক্ষণ আমায় কষ্ট করতে হল না। আমাকে যেখানে টেনে আনা হল, মনে হয় সেটা একটা ছায়া-ঘেরা জায়গা। আঃ! বাঁচলুম! অন্তত, একটু আরামও তো মিলল। বলতে নেই, লোকগুলো আমায় আর বেশি কষ্ট দিল না। অবিশ্যি, আমার চোখের বাঁধন যেমনকে তেমনই রইল। কিন্তু আমার মুখের সামনে জলের পাত্র ধরে, আমার মুখখানা তাতে ঠেকিয়ে বলল, 'নে, খা!'
আমি জলে চুমুক দিলুম। একচুমুকে কতখানি যে জল গিলে ফেললুম তা আন্দাজে বলতে পারব না। যতক্ষণ পাত্রে জল ছিল, ততক্ষণই গিলেছি, আর দম নিয়েছি, দম ফেলেছি। তৃপ্তিতে বুক ভরে গেল আমার। খাবারও এসে গেল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে। ঘাসপাতা, ছোলাদানা। একটা থলি-ভর্তি খাবার আমার মুখের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হল। আমি চিবোতে শুরু করে দিলুম।
আমার চোখ বাঁধা। তাই আমি কেমন করে বলব এখন কত বেলা হয়েছে। যদিও আমি ছায়ার নীচে আশ্রয় পেয়েছি, তবুও হাওয়ায় গরম ভাব যথেষ্ট মালুম দিচ্ছে। তবে, এ-হাওয়া মরুর হাওয়ার মতো জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে না। পায়ের তলায়, বালির সেই জ্বলনও নেই। অনেক, অ-নে-ক আরাম। তাই, খেতে-খেতেই আমার চোখ দুটো ঘুমে ঝিমঝিম করতে লাগল। সত্যি বলতে কী, এখানে সেই বাজার-হাটের হট্টগোল একদমই নেই। বেশ শান্ত। আমি স্বচ্ছন্দে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারি। আচ্ছা, আমি তো আর একটুও গোঁয়ার্তুমি করছি না। এবার তো ওরা আমার চোখের বাঁধনটা খুলে দিতে পারে! ওরা কি বোঝে না, আমার চোখ দুটো বাঁধা বলে, আমার খুবই অস্বস্তি লাগছে! কে জানে, কী মতলব এদের!
আমি সত্যিই ঘুমিয়ে পড়লুম। কেউ আমার চোখের বাঁধনও খুলে দিল না। কেউ আমার মুখ থেকে খাবারের থলিটাও সরিয়ে নিল না। সেই অবস্থাতেই আমি ফুসফুস করে নাক ডাকতে শুরু করে দিলুম। কষ্ট বা আরাম কোনওটাই এখন আর খেয়াল নেই। আসলে, ঘুমিয়ে পড়লে সাড় থাকে না কিছুরই। বলতে গেলে, নিজের কথাই মনে থাকে না একফোঁটা, তো অন্যকিছু!
আমি হঠাৎ একটা ছোট্ট ঠেলা খেয়ে ধড়ফড় করে জেগে উঠেছিলুম। ঘুমের ঘোরে ঠেলায় যেমন চমকে ওঠে সবাই, আমারও সেই দশা! কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানি না। কখন যে আমার মুখ থেকে খাবারের থলিটা খুলে নেওয়া হয়েছে টের পাইনি। অবশ্য, দেখতে পাচ্ছি না এখনও কিচ্ছু। আমার চোখের বাঁধনটা এখনও চোখে বাঁধা আছে। কাজেই এখনও আমার চোখে সব অন্ধকার। আমি বলতে পারব না এখন দিন, না রাত। কিংবা বলতে পারব না, এই মানুষগুলো, সেই মানুষ, না অন্য কেউ।
আমি বুঝতে পারলুম, এবার আমায় আবার অন্য কোথাও নিয়ে যাওয়া হবে। যেমন করে আমায় বেঁধে আনা হয়েছিল, এবারও আমায় তেমনই করে বাঁধা হল। আমার চোখের বাঁধনটা আলগা হয়ে গেছে কিনা, দেখা হল। আমার মুখে আবার একটা টাটকা খাবার-ভর্তি থলি বেঁধে দেওয়া হল। তারপর, আমায় টানতে-টানতে নিয়ে এল যেখানে, সেখানে রোদ। আমার গায়ে লাগল। সুতরাং বুঝতে পারলুম এখন দিন। তবে বেলা যে বেশি হয়নি, গায়ে নরম রোদের ছোঁয়া লাগতেই সেটাও বোঝা গেল। একটা কথা বলে রাখি, আমাকে ঘুম-ভাঙানোর পর থেকে যেন মনে কোরো না সব কাজ নিঃসাড়ে হচ্ছে। গোল লেগেই আছে। এ ডাকছে, ও হাঁকছে। হই-হট্টগোলের কামাই নেই। আমায় যেখানে টেনে আনা হল, সেখানে রোদে দাঁড়িয়ে এটাও ঠাওর করতে পারলুম, আমি শহরেই আছি। শহরের রাস্তার ওপর দিয়ে এবার আমি হেঁটে চলেছি। আমার পায়ে এখন পাথরের শক্তপথ ঘসটে যাচ্ছে। কাজেই চেষ্টা করছি, পা চারটে তুলে-তুলে হাঁটতে।
এরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে আমায়? কতক্ষণ হয়ে গেল। রোদের ঝাঁঝ বাড়ছে। বাড়ছে বাতাসেরও দাপট। মাঝে-মাঝে এদের মুখে বন্দর আর জাহাজের কথা শুনতে পাচ্ছি। সে কি তবে আমাকে নিয়েই এইসব কথাবার্তা হচ্ছে! আমাকে কি এরা বন্দরে নিয়ে যাচ্ছে! হবে হয়তো। আমি তো চোখে কিছুই দেখছি না। কানে যেটুকু শুনতে পাচ্ছি, তাতে মনে হল, আমি এখনও ভেতর দিয়েই হাঁটছি। লোকজনের আনাগোনা, গাড়ি-ঘোড়ার শহরের গড়গড়ানি কিংবা ফেরিওলার হাঁকাহাঁকি সবই কানে আসছে। অবশ্য, ফেরিওলা নামের লোকদের আমি আগে কখনওই দেখিনি। শহরে ঢুকে ওদের নাম শুনলুম, চোখে দেখলুম। কিন্তু এখন আমার চোখ বন্ধ। কাজেই ওরা যখনই চেঁচিয়ে উঠছে, 'খেজুর লিবে, মেওয়া লিবে, আঙুর লিবে,' তখনই বুঝতে পারছি এ-ডাক ফেরির ডাক। তবে একে-একে সব ডাকই শেষ হয়ে আসছে। ভেসে আসছে জলের শব্দ। বাতাসে এখন আর তেমন তাত নেই। ঠান্ডা-ঠান্ডা। আমাকে এইখানেই থামতে হল। কিছুক্ষণের জন্যে। তারপর আবার আমায় ঠেলা দিল ওরা, 'হ্যাট, হ্যাট।'
আমি একটা কাঠের পাটাতনের ওপর উঠে পড়লুম। সামনে যে-লোকটা আমার গলার দড়ি ধরে ছিল, সে আমায় দড়িতে টান দিয়ে ডাকল, 'আয়, আয়!'
আমি এগিয়ে গেলুম। বুঝতে পারলুম, একটা কাঠের পাটাতনের ওপর দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে আমি একটা চড়াই ডিঙোচ্ছি। জলের শব্দ বাড়ছে। হাওয়ায় আরাম বাড়ছে। রোদ গায়ে লাগলেও তেমন জ্বালাচ্ছে না। মরুভূমির সঙ্গে এখানকার রোদ আর বাতাসের কত তফাত। যেমন নরম, তেমনই মোলায়েম। আঃ! মরুভূমিতে রোদের ছোঁয়ায় বাতাস অমন আগুনপারা কেন!
এ কী! এ কী! আমি হুড়মুড়িয়ে কোথায় নামছি। এখনই যদি হোঁচট খাই, ছিটকে পড়ব যে! আমি চোখে দেখছি না। তোমরা একটু সাবধানে নিয়ে যাবে তো!
না, পড়লুম না আমি। আমি হুড়মুড় করতে-করতে যেখানে এসে দাঁড়ালুম, সেখানটা দুলছে। জলের যতই শব্দ উঠছে ছলাত-ছলাত, আমি ততই দুলছি দোদুল-দোদুল। এ আবার কী! এ আমায় কোথায় নিয়ে আসা হল?
এর নাম জাহাজ।
কোথায় নিয়ে যাবে আমাকে?
আর-এক দেশে। নদী পেরিয়ে, সমুদ্র পেরিয়ে অনেক দূরে।
আমার চোখের বাঁধনটা খুলে দাও! আমি নদী দেখব, সুমুদ্দুর দেখব। আমি জানি না, নদী কেমন দেখতে। দেখিনি, সমুদ্দুরের ঢেউ কখনও।
না। আমার চোখের বাঁধন কেউ খুলে দিল না। জাহাজের কোন গহ্বরে নিয়ে গিয়ে যে আমায় বেঁধে রাখল, আমি জানতে পারলুম না।
শুধু দোলা লাগছে। জাহাজ দুলছে। আমি দুলছি। আমার মন দুলছে। কোথায় যাচ্ছি আমি?
আমি যাচ্ছি তোমাদের দেশে।
হ্যাঁ, তোমাদের এই সেই দেশ। এক সার্কাস দলের মালিক আমাকে কিনে এখানে নিয়ে এসেছে। আমাকে শিখিয়ে-পড়িয়ে তৈরি করেছে সার্কাসের ঘোড়া। আমি এখন সার্কাসে খেলা দেখাচ্ছি। সেই সার্কাসের কথা দিয়েই তো শুরু করেছিলুম আমার এই গল্প। কত দূর-দূর দেশে যাই আমি দলের সঙ্গে। কখনও গাড়িতে, কখনও রেলে, কখনও জাহাজে। আমাদের দলের কত নামডাক। কত দেশের কত জন্তু আমাদের দলে। কত সব দূর-অদূর দেশ থেকে তারা এসেছে। যেমন আমি এসেছি মরুভূমির বালির রাজ্য থেকে। যেমন আজ তারা ভুলে গেছে তাদের দেশের কথা, তাদের আপনজনের কথা, তেমনই আমিও। খেলায়-খেলায় এত ব্যস্ত থাকি, আর মনে পড়ে না কাউকে। এখন খেলা, শুধুই খেলা দেখাই। আর সেইসব খেলার খবর তো তোমরা আগেই শুনেছ আমার মুখে। কিন্তু একটি কথা তোমাদের এখনও শোনা হয়নি। একটি মেয়ের কথা। সেই মেয়ের নাম শকুন্তলা। আর...
এই সেই শহর। এখন এই শহরে আমরা খেলা দেখাতে এসেছি। কত জাঁকজমক এই শহরে। যত রং, তত আলো। যত গান, তত আনন্দ। একদিন এই শহরে হইহই করে এসে হাজির হলেন এক মস্ত দৌলতদার। এক মহারাজা। তাঁর মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে। এই দৌলতদারের ছিল অনেক ধনদৌলত। অনেক গাড়িঘোড়া। অনেক লোকলস্কর। সৈন্যসামন্ত। আর ছিল এ-মহল ও-মহল জুড়ে রাজপ্রাসাদ। তাতে মণিমুক্তোর ছড়াছড়ি। এই রাজপ্রাসাদের রাজসিংহাসনে বসে তিনি স্বর্গটাকে জয় করার স্বপ্ন দেখতেন। আর ভাবতেন, যেখানে যত সোনা মজুত আছে, সব তিনি জিতে নেবেন। কারণ, তিনি ছিলেন রাজার চেয়ে বড়ো এক মহারাজা। পৃথিবীর সবচেয়ে যে বলবান রাজা, তাঁর চেয়েও তিনি শক্তিশালী। কিন্তু হায় রে! একদিন তাঁর সব স্বপ্নই বুঝি শেষ হয়ে যায়! একদিন তাঁর দেশের মানুষই বলল, 'ওই মণি, ওই মুক্তো আমাদের। ওই ধন, ওই দৌলত আমাদের। তুমি ফিরিয়ে দাও! নইলে তোমার এই রাজপ্রাসাদ ভেঙে আমরা তা লুঠ করে নেব।'
মহারাজা ভয় পেলেন। মানুষের হুঙ্কারকে ভয় পায় না কোন রাজা? কোন মহারাজা? মহারাজার চেয়ে মানুষ যে অনেক শক্তিশালী, এটা জানা নেই কোন রাজার? কোন মহারাজার? যদিও এই মহারাজার বয়স ছিল অনেক কম, তবু তাঁর বুদ্ধি ছিল ধীর-স্থির। ভয় পেলেও বুদ্ধি হারালেন না মহারাজা। তাদের ডেকে বললেন, 'শোনো ভাইসব, আমাকে তোমরা ভুল বুঝো না। আমার ভাণ্ডারে যত সোনাদানা আছে, যত ধনদৌলত আছে, সব তোমাদেরই সম্পদ। আমি শুধু তোমাদের সেই অমূল্য সম্পদ রক্ষা করেছি। তোমরা যখনই তা চাইবে, আমি তোমাদের ফিরিয়ে দেব। কিন্তু তোমরা কেমন করে সেই ধনদৌলত ফেরত নেবে, সেটা তোমরাই ঠিক করে এখনই জানালে আমি রত্নভাণ্ডারের চাবি এই মুহূতেই তোমাদের হাতে তুলে দেব।'
মহারাজার কথা শুনে সেই মানুষের দল চিৎকার করে উঠল, 'আগে তুমি চাবি দাও, তারপর অন্য কথা।'
মহারাজা বললেন, 'এই দ্যাখো, এই আমার হাতে চাবি। বেশ, চাবি দিচ্ছি। কিন্তু আমি যে এতদিন তোমাদের সম্পদ রক্ষা করলুম, তার জন্য আমায় কিছু দেবে না?'
'কী চাও তুমি?' মানুষের দল চিৎকার করে শুধোল।
'আমি অন্য কিছুই চাই না। আমার এই প্রাসাদটা আমার থাকলেই আমি খুশি।' মহারাজা উত্তর দিলেন।
'বেশ, তাই থাকবে।' একস্বরে সবাই সায় দিল।
'তবে এই নাও।' মহারাজা চাবিটি মানুষের ভিড়ে ছুড়ে দিলেন। তারপর সেই চাবি নিয়ে লেগে গেল তুলকালাম কাণ্ড। সেই চাবি নিয়ে অসংখ্য মানুষের মধ্যে লেগে গেল কাড়াকাড়ি। কাড়াকাড়ি থেকে মারামারি। মারামারি থেকে রক্তের ছড়াছড়ি। সেই চাবিটাই আগে নিতে চায় সবাই। যে পাবে প্রথম, সে-ই তো সবার আগে রত্নভাণ্ডার লুঠ করতে পারবে। সে একাই লুঠ করে নেবে। কাউকে দেবে না একটুকরোও।
কিন্তু না। সেই চাবি কেউ কাউকে দিল না। সেই চাবি নিয়ে সবাই ধুন্ধুমার লড়াই করল। কিন্তু কেউ পেল না। লড়াই করতে-করতে তাদের নিজেদের শক্তি ক্ষয় হয়ে গেল। নিস্তেজ হয়ে পড়ে-পড়ে তারা হাঁপাতে লাগল। আর ভাবতে লাগল, মানুষই মানুষের প্রধান শত্রু। মানুষই মানুষকে মারে লোভে, হিংসায়।
আমি যে তোমাদের এত কত বললাম, ভেবো না যেন, না-জেনে মিথ্যে বলছি। আমি জেনেছি। সব জেনেছি। আর জেনেছি একটি ছোট্ট মেয়ের মুখ থেকে। ভাবছ হয়তো, সেই মেয়েটি কে? তার কথা জানতে পারবে একটু পরেই।
আমাদের তাঁবুতে একদিন খবর এল, সেই মহারাজা তার মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে সার্কাস দেখতে আসবে। অমনই সাজসাজ রব পড়ে গেল। সার্কাসের যে-খেলাগুলো সবচেয়ে চটকদার, ঠিক হল, সেইসব খেলাই দেখানো হবে মহারাজা আর তার মেয়ে সেই খুদে দর্শককে। বাঘ কী খেলা দেখাবে, হাতির কোন খেলাটা সবচেয়ে সাঙঘাতিক, কিংবা বানর নিয়ে কোন মজার খেলাটা জমবে ভালো, সে সবই ঠিক হল। আর ঠিক হল, আমি নাচ দেখাব! আমার নাচের কথা শুনে তোমরা হয়তো অবাক হয়ে যাচ্ছ। ভাবছ, আমি বুঝি তোমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছি। ঘোড়ার নাচের কথা শুনে হয়তো হাসিও পাচ্ছে তোমাদের। না, অবাক হওয়ার কোনই কারণ নেই। হাসতেও হবে না। আমি ঠাট্টা মোটেও করছি না। আমি সত্যিই নাচব। এই সার্কাসে এসে আমি নাচ শিখেছি। তোমরা হয়তো ঘোড়ার নাচ কেউ দ্যাখোনি কোথাও কোনওদিন। আমার সঙ্গে যদি কখনও তোমাদের বরাতজোরে দেখা হয়ে যায়, তবে আর একটুও সন্দেহ থাকবে না তোমাদের। আমি অনেক কষ্ট করে এ নাচ শিখেছি। কত পিটুনি খেয়েছি। আমার চারটে পায়ের দিকে এখনও যদি তাকাও, তবে হয়তো দু-একটা পিটুনির দাগ চোখেও পড়ে যেতে পারে। সত্যি বলছি, এই নাচের খেলাটা দেখাতে আমার কী যে মজা লাগে! অবশ্য কষ্টও যে হয় না, তা যেন মনে কোরো না! কিন্তু, যখন তাঁবু-ভর্তি খুদে দর্শকরা আমার নাচ দেখে আনন্দে হাসে আর হাততালি দেয়, তখন আমার কোনও কষ্টই আর কষ্ট বলে মনে হয় না। যতই বাজনা বাজে, ততই আমার নাচও পায়ে-পায়ে দুলে ওঠে। সত্যি, আমার নাচের বাজনাটাও কী সুন্দর। সে বাজনা শুনলে শুধু আমি ঘোড়া কেন, ভালুকটা পর্যন্ত থাকতে পারে না। আমি হলফ করে বলতে পারি, তোমাদেরও সাধ্যি নেই চুপচাপ বসে থাকার। তোমাদেরও নাচতেই হবে। এমন জাদু সেই বাজনার সুরে।
তাই, যেদিন মহারাজা মেয়েকে নিয়ে সার্কাস দেখতে এল, সেদিন আমি নাচ দেখালুম। ভালুক সাইকেল চালাল। বাঘের দল পিরামিড তৈরি করল। বানর যে কতরকমের বাঁদরামি করল, বলে শেষ করা যায় না। কিন্তু সববার মন কেড়ে নিল ঘোড়ার নাচ। মানে, আমার নাচ, এমনকী মন জয় করলুম মহারাজার মেয়েরও। সেদিন যেন আর ক-দিনের চেয়েও অন্যরকম। কী উৎসাহ আর হইহই কাণ্ড!
সেদিন যে কী আনন্দে কাটল আমাদের সকলের, বলে শেষ করা যায় না।
হঠাৎ দেখি পরের দিন সকালে মহারাজার এক দূত এসে হাজির। মহারাজার দূত। কাজেই বুঝতে পারছ, কানাকানি হতে-হতে আমাদের কানেও খবরটা তূরন্ত পৌঁছে গেল! কী ব্যাপার।
ব্যাপার আর কী? ব্যাপার তো আমাকে নিয়ে। কী? না, মহারাজার মেয়ের বায়না, সার্কাসের ঘোড়াটা তার চাই। রাজপ্রাসাদের ফুলবাগানে আমি নাচব। সে আমার পিঠে বসে দোল খাবে। সুতরাং ঘোড়া তার চাই-ই চাই!
তা, আবদার যখন ধরেছে মেয়ে, সে আবদার না-রেখে উপায় আছে মহারাজার? যত পয়সা লাগে ঘোড়ার জন্যে, সব পাবে। এমনকী সোনাদানা যদি চাও, তাও পাবে। সুতরাং মহারাজার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তো আর সার্কাসের কর্তা যেতে পারে না। সার্কাসের কর্তা একগাদা সোনাদানা আর টাকাকড়ি নিয়ে আমায় সত্যি-সত্যি বিক্রি করে দিল মহারাজের কাছে। আমি এবার রাজপ্রাসাদে চললুম।
একবার ভেবে দ্যাখো আমার কথাটা। কোথায় কোন মরুভূমিতে আমার জন্ম। ভেবে দ্যাখো, কেমন করে হারিয়েছি আমি আমার মা-বাবাকে। কোথা থেকে কেমন করে এখন এসেছি আমি তোমাদের এই শহরে। ছিলুম দস্যুর ঘোড়া। হয়েছি সার্কাসের ঘোড়া। খেলা শিখেছি হরেকরকম। এখন নাচ শিখেছি। দেশে-দেশে ঘুরেছি। কত খেলা দেখিয়েছি। আবার আজ চলেছি এক মহারাজের মেয়ের আবদার রাখতে রাজপ্রাসাদে। জানি না, রাজপ্রাসাদে কী আছে। জানি না, কেমনতর রাজপ্রাসাদ। জানা নেই মহারাজকে কিংবা তার মেয়েকেও। যাই বলো, সার্কাসে এতদিন আছি। ছেড়ে যেতে মায়া তো লাগবেই। অমন যে বানরটা যখন-তখন বাঁদরামি করে, তাকে পর্যন্ত ছেড়ে যেতে মন কেমন করছে। একদিন বানরটাকে চাট মেরেছিলুম। এতদিন মনে ছিল না। আজ যাওয়ার সময় মনে পড়ছে। মন কেমন করছে আমার ট্রেনারের জন্যে। তার হাতে কত মার খেয়েছি। খেয়েছি ঠিকই। কিন্তু সে তো আমায় এত খেলা সব শিখিয়েছে। আর আমার পিঠে যে-মেয়েটি খেলা দেখায়, তার জন্যে আমার যে কী খারাপ লাগছে, কাকেই বা বলি। সবাই ভাবে, ঘোড়া সকলের কথা শুনবে। না শুনলেই দোষ। কিন্তু ঘোড়ার মনের কথা কারও বোঝার দরকার নেই। তার দুঃখই হোক, কিংবা কষ্ট, সে আর কে জানতে পারছে! আমাকে এতদিন ধরে দেখে, এই সত্যি কথাটা তোমরা যদি না মানতে চাও, তবে আমি তো আর তার জন্যে কারও সঙ্গে ঝগড়া করতে যাব না। আমার কথা আমারই মনের ভেতর চাপা থাকবে। আমার কষ্ট, আমারই থাক। আমি তোমাদের কষ্ট দেব কেন?
আসলে কী জানো, এতদিন ধরে আমি সার্কাসে খেলা দেখালেও রাজপ্রাসাদে যাওয়ার লোভটা যে আমার একদমই হয়নি, তা আমি বলব না। মনটা আমার দোনোমনো একটু করছিলই। কিন্তু দ্যাখো, সার্কাসের মালিকই যখন টাকার লোভে আমাকে বিক্রি করতে আপত্তি করল না, তখন আমার তো কিছু করার নেই। আর দেখেছ তো, যখন আমি নিজে কারও কোনো অন্যায় কাজে বেঁকে বসেছি, তখন তার শাস্তি আমায়ই পেতে হয়েছে। কাজেই আর আমার ওজর-আপত্তি করার ইচ্ছেও নেই। আমি তাই মানে-মানে রাজপ্রাসাদের দিকেই পা বাড়ালুম।
আমায় নিয়ে যাওয়ার জন্য মহারাজার দু-জন পাকা ঘোড়সওয়ার এসেছিল এখানে। অবশ্য দু-জন না হলেও চলত। কারণ, তারা হয়তো ভেবেছিল, আমি তাদের সঙ্গে যেতে চাইব না। হয়তো দুরন্তপনা করব।
না, এখন আর অবাধ্য হওয়ার ইচ্ছে নেই আমার। মনে-মনে পণ করলুম, আমি ভালো হব। মহারাজার মেয়ের যখন ভালো লেগেছে আমাকে, আর সেই সুযোগে যখন রাজপ্রাসাদে আমার জায়গা মিলল, তখন বোধ হয় আমার ভাগ্য ফিরবে এবার। কোনও রাজা-মহারাজার মেয়ের ঘোড়া হওয়া তো আর যে-সে কথা নয়, এমন ভাগ্য ক-টা ঘোড়ার জোটে?
সার্কাসের তাঁবু থেকে রাজপ্রাসাদের সিংহদরজা পর্যন্ত আসতে আমি একটুও ব্যাদড়াপনা করিনি। আসলে, এখন আমার মনে হচ্ছে, মানুষের দয়ায় যখন বেঁচে থাকতে হবে, তখন মানুষের কথা শুনেই চলা ভালো। বলব কী, রাজপ্রাসাদের সিংহদরজাটা যখনই আমার নজরে পড়েছে, সেই তখন থেকেই কত সব আজগুবি ভাবনা আমাকে পেয়ে বসল। মনে হয়েছে, ওই সিংহদরজা পেরোলেই বোধহয়, একটা অবাক জগৎ আমার চোখের ওপর ভেসে উঠবে। সেই কতদিন আগে মরুভূমির ওপর লুকিয়ে-লুকিয়ে শাহেনশার গল্প শুনেছিলুম। সে-গল্প তোমাদের বলেওছি। হয়তো মনে আছে। তারপর যখন যেখানে গেছি, আরও কত গল্প শুনেছি। কত রাজা-বাদশার গল্প, না-হয়, দস্যু-তস্করের। আর ভেবেছি, গল্প কি শুধু বানানো কথা, একটুও সত্যি নয়!
কিন্তু আজ আমি এক সত্যি রাজার রাজপ্রাসাদের সিংহদরজার সামনে পৌঁছে গেছি। আজ আমি রাজা আর রানিকে দেখতে পাব। দেখতে পাব তাদের মেয়েকে। সে রাজকন্যা। গল্পের রাজকন্যার রূপের কথা শুনতে-শুনতে আমার মুখস্থ হয়ে গেছে। মুখস্থ হয়ে গেছে তার গায়ের রং কেমনতর। সবাই বলে, রাজকন্যার কুঁচবরন গায়ের রং, মেঘবরন কেশ! সে রং কেমন আমি জানি না। মিথ্যে বলব না, মেঘবরন কেশটা যে কী, আমি তাও জানি না। তোমরা মুচকি হাসছ নিশ্চয়ই আমার বোকা-বোকা কথা শুনে! হাসলে আর আমি কী করতে পারি! আমি তো আর তোমাদের মতো মানুষ নই! একটা চারপেয়ে ঘোড়া।
রাজপ্রাসাদের সিংহদরজা পেরিয়ে আমি এখন সত্যি-সত্যি প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়েছি। নতুন একটা ঘোড়া আমি। কাজেই চোখ ড্যাবড্যাব করেই সবাই আমার দিকে তাকিয়ে রইল। অবশ্য একটা কথা তোমাদের বলে রাখি, আমি তোমাদের সঙ্গে বোকার মতো কথা বলছি বলে, যেন ভেবো না, রাজপ্রাসাদের ভেতরে ঢুকেও ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছি। অত কাঁচা আমি নই। আমার মনের কথাটা আমি কেন বুঝতে দেব অন্যকে! আর, তা ছাড়া আমিই বা কীসে কম যাই! সার্কাসে যখন লোকে আমার খেলা দেখতে আসত, তখন আমার খেলার কেরামতি দেখে তারা বেমালুম তাজ্জব বনে যেত! আরে বাবা, এই মহারাজার আর তার মেয়ের কথাই ধরো না! তারা আমার ওস্তাদি দেখে অবাক হয়েছে বলেই না, আমাকে রাজপ্রাসাদে নিয়ে এসেছে! এমনি-এমনি কি এই সম্মান জোটে!
হইহই পড়ে গেল। রাজপ্রাসাদের মস্ত চত্বরে আমি দাঁড়াতেই কত লোক যে পিলপিল করে বেরিয়ে এল প্রাসাদের চারপাশ থেকে! এত বড়ো রাজপ্রাসাদ। হাতে-গুনতি গুটিকয় লোক নিয়ে তো আর রাজপ্রাসাদ চলে না। প্রহরী আর সৈন্যসামন্ত, মন্ত্রীসান্ত্রি আর পাত্রমিত্র, এরা তো আছেই। তার সঙ্গে আছে হাতিশালে হাতি। ঘোড়াশালে ঘোড়া। কত মাহুত। কত সহিস। বাগানে মালী। ভাঁড়ারে ভাণ্ডারী। রসুইখানায় রাঁধুনি। অন্দরমহলে চুল-বাঁধুনি। গা- টিপুনি। ঘরঝাড়ুনি। গানগুনুনি। সে একেবারে জমজমাট কেজো মানুষের কাজের হাট! দেখলে মনে হবে, রাজপ্রাসাদে কাজের যেন চরকি ঘুরছে বনবন করে। তা, আমার পৌঁছনোর খবরটা অন্দরমহলে চাউর হতে সময় লাগল না একটুও। ছুটে এল মহারাজা। মহারানি, রাজকন্যা। সক্কলে। লোকে বলে চাঁদের হাট। আমি বাপু সত্যি কথা বলছি, চাঁদ দেখেছি। কিন্তু চাঁদের হাট যে কী, তা দেখিনি কখনও। আজ দেখলুম। চক্ষু সার্থক। কপালের জোর না থাকলে কি এমন হাট দ্যাখা যায়! সত্যি বলছি, কী রূপ মহারানির। কী রূপ রাজকন্যার। তেমনই সুপুরুষ মহারাজা। আমি হাঁ! আর বলব কী তাদের একেবারে দেখা দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে এমন একটা সুগন্ধ ফুরফুর করে আমার নাকের ভেতর সেঁদিয়ে গেল যে, আমি বুঁদ হয়ে গেলুম। মনে হল, সেই সুগন্ধ যেন ভেসে এল মহারানি আর তার মেয়ের রং-ঝলমল পোশাকের গা ছুঁয়ে।
এমন সময়ে হঠাৎ রাজকন্যা জিজ্ঞেস করল, 'মাগো, মাগো, আমার ঘোড়ার নাম কী মা?'
তার রাজরানি মা বলল, 'জানি না তো বাছা।'
'কেন জানো না মা?'
'আমাকে যে কেউ বলেনি ঘোড়ার নাম।'
'কেন বলেনি মা?'
'বোধ হয় ঘোড়ার নাম নেই বলে।'
মেয়ে তখন মায়ের মুখের দিকে চেয়ে কাকুতি-মিনতি করে বলল, 'তা হলে মা, আমি ঘোড়ার একটা নাম রাখব।'
মা জিজ্ঞেস করল, 'কী নাম?'
মেয়ে বলল, 'আমার ঘোড়ার নাম আজ থেকে ঘোড়া।' বলে মেয়ে মায়ের আঁচল ধরে লাফিয়ে উঠল।
ওহো! কী মিষ্টি নাম! মিষ্টি মেয়ের আমার সেই মিষ্টি নাম শুনে আমি মনে-মনে ভাবলুম, নাম রাখার কী ছিরি দ্যাখো! কী? না, ঘোড়ার নাম ঘোড়া! এ আবার কোন দেশি নাম! ঘোড়ার নাম ঘোড়া হবে না তো কি টিকটিকি হবে! বলব কী, আমার ভীষণ হাসি পেয়ে গেল। হাসি তো পেলই, হাসির সঙ্গে নাচও পেয়ে বসল। মনে হল, এমন একটা অখাদ্য নাম রাখার জন্যে রাজকন্যাকে এখনই একটা ভেংচি-কাটা নাচ দেখানো উচিত। তাই আমি চার পা তুলে যেই নাচতে গেছি—ফক্কা!
সেটা কী?
ফক্কা! মানে, আমার পা লাফ মারল, কিন্তু নাচ হল না। আমি আবার চেষ্টা করলুম। এবার আমার পা লাফও মারল না। পা যেখানে পড়ে ছিল, সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই কাল পর্যন্ত যে পা আমার নেচে মানুষকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে, সেই পায়ের আজ কী হল! পা আমার নড়ে না। তালে-তালে পড়েও না। তবে কি আমি নাচতে ভুলে গেলুম! এই রে! এবার বোঝো ঠেলা! কী হবে!
কিছু হল না। সে-যাত্রায় আমি বেঁচে গেলুম! রক্ষে, আমি নিজেই নাচতে গিয়ে পারিনি। মহারাজা কিংবা রাজকন্যা আমাকে নাচতে বলেনি। বললে আমার যে কী দুর্দশা হত, কে জানে! নির্ঘাত বিপদে পড়তুম। আচ্ছা, একটা নাচ-পোক্ত ঘোড়া হয়েও, আমি নাচতে পারলুম না কেন? ব্যাপারটা কী!
ঠিক এই সময়েই মহারাজা রাজপ্রাসাদের অশ্বপালককে হুকুম করল, 'এখন ঘোড়াকে নিয়ে যাও! অশ্বশালার অন্য ঘোড়ার সঙ্গে যেন একে না রাখা হয়। তদ্বির-তদারকের যেন ত্রুটি না থাকে। আজ ঘোড়া বিশ্রাম নেবে। কাল ঘোড়া নাচবে।' বলে মহারাজা রাজদূতের দিকে ফিরে তাকাল। দূতকে বলল, 'আমার প্রজাদের ঢোল-শোহরত করে জানিয়ে দাও ঘোড়ার খবর। ঘোষণা করে দাও, এই আশ্চর্য ঘোড়া কাল নাচ দেখাবে। সে-নাচ রাজ্যের সব প্রজাই দেখতে পাবে। আমি তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছি নাচ দেখার জন্যে।'
রাজার প্রধান অশ্বপালক আমাকে অশ্বশালায় নিয়ে গেল। রাজবাড়ির অশ্বশালা। বুঝতেই পারছ, তকতক করছে। মহারাজার আদেশমতো আমার কাছে আর অন্য ঘোড়াকে ঘেঁষতে দেওয়া হল না। খাবারদাবারও এসে গেল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে। রাজবাড়ির খাবার। সে এক এলাহি ব্যাপার। খিদেও পেয়েছিল তেমনই। পথটা তো একটুখানি নয়! সেই সার্কাসের তাঁবু, আর এই রাজার প্রাসাদ। সুতরাং খাও গপাগপ! অবিশ্যি মাথায় একটা দুশ্চিন্তা ঘুরঘুর করে মনটাকে মাঝে-মাঝে অন্যমনস্ক করে দিচ্ছে। সেই নাচের দুশ্চিন্তা! একপক্ষে এই নিরিবিলি জায়গাটা পেয়ে আমার ভালোই হয়েছে। অন্তত নির্বিঘ্নে একা-একা পা চারটে ছোড়াছুড়ি করা যাবে। দেখা যাবে, সত্যি আমি নাচতে ভুলে গেছি কি না! আর সত্যি যদি ভুলে গিয়ে থাকি, তবে তো, কেলেঙ্কারি! দ্যাখা যাক! চেষ্টা করতে তো কোনো দোষ নেই।
হায়! হায়! কী দুর্ভাগ্য আমার! সারাদিন ধরে এই ফাঁকা অশ্বশালায় আমি যে কতবার কতরকম কসরত করলুম, কিন্তু আমার পা একটুও নাচল না। নট নাচন, নট কুদন।
এরই মধ্যে আর-এক কাণ্ড হয়ে গেল। রাজবাড়ির ওস্তাগর এসে আমার আগাপাস্তলা মেপে গেল। আমার গায়ের পোশাক তৈরি হবে। নাচের পোশাক। বটেই তো, সারা দেশ জুড়ে দলে-দলে মানুষ আসবে রাজবাড়িতে আজব ঘোড়ার নাচ দেখতে, সে-ঘোড়ার আদুল গায়ে নাচ দেখানো কি শোভা পায়! লোকে ঘোড়ার যত না নিন্দে করুক, মহারাজাকে কিপটে বদনাম দিতে কেউ ছাড়বে না। আর তা ছাড়া যে-ঘোড়া নাচতে জানে, তার পরনে নাচের পোশাক না থাকলে নাচটা খোলতাই হবে কেন! এই ফাঁকে বলে নিই, ইতিমধ্যে আমার চারটি পায়ের দুই জোড়া ঘুঙুরও এসে গেছে। আয়োজনের কোনো ত্রুটি পাবে না। আর সারা রাজবাড়ি জুড়ে ব্যস্ততার সে কী ঘটা! দেখলে মনে হবে, যেন পৃথিবীর কোনো মস্ত নাচিয়ে এসেছে রাজবাড়িতে নাচ দেখাতে। শুনে তোমাদের নিশ্চয়ই খুব হাসি পাচ্ছে, না? উঁহু! একদম হাসি নয়! তা হলেই কিন্তু ঘ্যাচাং! গর্দান যাবে!
অবশ্য আমার হাসি-টাসি অনেক আগেই সাফ হয়ে গেছে। যার জন্যে এত তোড়জোড়, সেই নাচটাই যে আমি ভুলে বসেছি! শেষপর্যন্ত কী হবে কে জানে! কী ভীষণ ভয় লাগছে। এই ভয় বুকে নিয়ে সারারাত আমি আনচান করেছি। চোখের পাতা এক করতে পারিনি। এই দুর্ভাবনায় ঘুম হয় কারও!
ভোরের দিকে মনে হল একটু ঘুম-ঘুম পাচ্ছে। হায় কপাল! আর ঘুম! সেই ভোর থেকেই এমন হইহল্লা শুরু হয়ে গেল যে, কী বলব তোমাদের। রাজবাড়ির খোলা ময়দানে সেই ঝাপসা ভোর থেকেই মানুষজনের জমায়েত শুরু হয়ে গেছে। তাদের ক্যাঁচর-ম্যাচরের জ্বালায় ঘুমোয় কার সাধ্যি! একটু পরেই ওস্তাগরও এসে পড়ল আমার সাজ-পোশাকের ধড়াচুড়ো নিয়ে। অশ্বশালার অন্য লোকজন নিয়ে সে লেগে পড়ল আমার সাজগোজের কাজে। অবশ্য এটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। সার্কাসে সেজেছি আমি অনেক। সে-সাজও কি কম চটকদারি ছিল! তাই যখন মসলিনের তৈরি ঘেরাটোপটা আমার গায়ে পরিয়ে দেওয়া হল, তখন আমার একটুও অবাক লাগল না। তবে ঘেরাটোপের ওপর নকশার কারিকুরির তারিফ না করে থাকতে পারবে না কেউ। কত ফুল আর লতাপাতার আঁকিবুকি। আমার মাথায় পরিয়ে দেওয়া হল টুপি। তাতে সাজানো রং-বেরঙের পাখির পালক। পায়ে ঘুঙুর। আমার পিঠে একটি মখমলের আসন। সেই আসনে রাজকন্যা বসবে। আসনের দু-দিকে ঝুলন্ত ঘন্টা। ছোট্ট-ছোট্ট। আমি যখন রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে নাচব, সেই ছোট্ট-ছোট্ট ঘন্টা টুং-টুং করে বাজবে।
সাজগোজ করতে করতেই সময় হয়ে গেল। এর ফাঁকে আমার খাওয়াদাওয়ার পাটও চুকেছে। ইতিমধ্যে রাজকন্যাও এসে পড়েছে। তারও সাজের বহর কী! সে-ও আমার পিঠে বসল। প্রধান অশ্বপালক, আমাকে নিয়ে এল ময়দানে। মহারাজ এল। মহারানি এল। মন্ত্রী-অমাত্য, পাত্র-মিত্র, সিপাই-সান্ত্রি সক্কলে। উরি ববাস! এদিকে ময়দানে কত লোক জমায়েত হয়েছে! মনে হচ্ছে গোটা রাজ্যের মানুষ যেন নাচ দেখতে ভেঙে পড়েছে! সেই মানুষের বাঁধ টপকে আমাকে নিয়ে আসা হল ময়দানের ঠিক মধ্যিখানে। ময়দানের একদিকে রাজার আসন। তার পাশে রানির আসন। আশপাশে মন্ত্রী আর সভাসদরা। তারপর যেদিকে চাও গিজগিজ করছে মানুষ আর মানুষ। তার সঙ্গে হাসি আর হাসি। সবার মুখ হাসিতে মাখামাখি। অবশ্য আমার পিঠে বসে রাজকন্যা হাসছে, না কাঁপছে, সে আমি বলতে পারব না। তবে, একটু-একটু মজা সে নিশ্চয়ই পাচ্ছে। কেননা, আমার পায়ে ঘুঙুর। আমি হাঁটছি যত, ঘুঙুর বাজছে তত। ঘোড়ার পায়ে ঘুঙুরের শব্দ শুনলে কার না মজা লাগে শুনি!
মহারাজা উঠে দাঁড়াল। ওই অসংখ্য লোকের হট্টগোল থিতিয়ে গেল চোখের পলকে। সবার দৃষ্টি এখন মহারাজার দিকে। রাজা কী বলবে এখন? রাজা বলল, 'শোনো আমার প্রিয় প্রজাগণ, তোমাদের এখানে আমন্ত্রণ করে আনার কারণ, নতুন করে বলার নেই। তোমাদের চোখের সামনে সেই আজব ঘোড়া উপস্থিত। সেই ঘোড়ার পিঠে আমার মেয়ে বসে। আমার হুকুম শুনলেই ঘোড়া নাচন শুরু করে দেবে। এখন তোমরা বললেই নাচ শুরু করতে পারি।'
সঙ্গে সঙ্গে জনতা চেঁচিয়ে উঠল, 'শুরু হোক, শুরু হোক!'
তখন রাজা শুরু করল .
এই ঘোড়া শোন, ঘোড়া রে,
নাচ দেখি তুই তাধিন ধিন,
মন ভরিয়ে নাচিস যদি
বানিয়ে দেব সোনার জিন!
কে নাচবে? আমি? আমার নাচের কিছুই মনে নেই তো আমি নাচব কেমন করে? আমি বোকার মতো এদিক-ওদিক জুলজুল করে দেখতে লাগলুম।
সবাই হাঁ।
আবার মহারাজা ডাক পাড়ল .
এই ঘোড়া শোন, ঘোড়া রে
কে জানে তুই কাহার ছা,
মন ভরিয়ে নাচিস যদি
কিনে দেব চাইবি যা।
এবারও আমার সাড়া নেই।
সবাই থ।
এবার মহারাজা কড়কে উঠল .
এই ঘোড়া তুই অসভ্য
আমায় করিস অসম্মান!
জানিস আমি রাজার রাজা
এক্ষুনি তোর ছিঁড়ব কান!
আমার বয়েই গেছে। আমি নাচিও না, হাঁটিও না। যেন একটা জবুথবু পাথরের চাঁই। বুঝতে পারছি, মহারাজা ভীষণ খেপেছে। মহারাজা রেগে লাল হচ্ছে। এদিকে মহারাজার অবস্থা দেখে সবাই মুখ লুকিয়ে ফিকফিক করে হাসতে লেগেছে।
মহারাজা রেগে নিজের আসন ছেড়ে তড়বড় করে আমাকে তেড়ে এল। আমার লাগাম ধরে মারল টান, 'নাচ!'
উফ! আমার লাগল। কিন্তু হায়, হায়! আমার নাচের 'না'-ও মনে পড়ে না, 'চ'-ও না।
সবাই তখন আরও একটু, আরও একটু হাসতে হাসতে হো হো করে হেসে উঠল।
মহারাজার লজ্জায় মাথা কাটা যাওয়ার গোত্তর। সত্যিই তো, ঢোলশোহরত করে প্রজাদের ডেকে এনে, এত কাণ্ডকারখানা করে শেষে কি না ঘোড়াই তাকে ডোবাল! না, ঘোড়ার ছাড়ান নেই! নাচতেই হবে। এবার রাজা আমার লাগাম ধরে মারল হ্যাঁচকা, 'নাচ ব্যাটা, নাচ!' বলতে-বলতে লাগামটা এমন টানাটানি করতে লাগল যে, তাই দেখে সবাই ভ্যাবাচাকা! এ কী রে বাবা! রাজার এ কী কাণ্ড! ঘোড়ার লাগাম ধরে টানাটানি! রাজা কি পাগল হয়ে গেল!
না, মহারাজা পাগল হয়নি। বেশি টানাটানি করতে গিয়ে এইমাত্র মহারাজার হাত ফসকাল। পা পিছলে মহারাজা চিতপটাং হয়েছে! ব্যাস! সঙ্গে-সঙ্গে গোটা ময়দান জুড়ে হো-হো, হি-হি, হা-হা! হাসির তুফান ছুটল। ধর, ধর, মহারাজাকে ধর! দ্যাখ, দ্যাখ লাগল কোথায়!
খুব রক্ষে। কাউকে ধরতে হল না। মহারাজা নিজেই উঠে পড়েছে। ওই দ্যাখো, খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে হাঁটতে লেগেছে। ঠিক সেই সময়ে একটা মেয়ে ভিড়ের ভেতর থেকে ঠেলেমেলে বেরিয়ে এসেছে। মেয়েটা একটু-একটু ছোট্ট। একটুখানিক বড়ো। মেয়ের কাপড় আছে। গায়ে জামা নেই। আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে পিঠে ছড়িয়ে আছে। ময়লা। ফুটো। ছুটতে ছুটতে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে, হাত ঘুরিয়ে পা দুলিয়ে নাচল। নাচতে নাচতে গাইল.
ভেককি ঘোড়া, ভেককি ঘোড়া,
নাচ জানে না দুয়ো,
নাচবে ঘোড়া, বাজল ঢেঁড়া
রাজার কথা ভুয়ো।
আজব যত গাল গপপো
ফালতু মিছিমিছি,
রাজা বলেন মিথ্যে কথা
লজ্জা এ কী ছি ছি!
সত্যি বলছি, মেয়েটার দিকে এতক্ষণ আমার নজরই পড়েনি। অত ভিড়ের মধ্যে কে আর কাকে আলাদা করে দ্যাখে! কিন্তু সেই ভিড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ সে বেরিয়ে এসে আচমকা গাইতে-গাইতে নেচে উঠল, আমি হকচকিয়ে গেছি। ওইটুকু মেয়ের ভয়ডরের কথা ছেড়েই দাও, সে তো নেই-ই, কিন্তু কী দুঃসাহস, মহারাজার মুখের সামনেই গান গেয়ে নাচ করছে! কী বলব, তার সেই কাণ্ড দেখে, ময়দান-ভর্তি দঙ্গল-দঙ্গল লোক একেবারে তাজ্জব।
কিন্তু আমার কী হল? আমি যে আর থাকতে পারছি না। তার গান শুনে, আর নাচ দেখে আমার পা চারটে এমন সুড়সুড় করছে কেন! বেজে ওঠল কেন আমার পায়ের ঘুঙুর! হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার মনে পড়ে গেছে! মনে পড়ে গেছে নাচের কথা! আমি নেচে উঠলুম। তাই আমার ঘুঙুর বেজে উঠল সেই মেয়েটির সঙ্গে। তার গানের তালে। ঝুমুর-ঝুমুর। পলকের মধ্যে সব কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল! আমি রাজার মেয়েকে পিঠে নিয়ে এমন উদ্দাম হয়ে নাচতে শুরু করে দিলুম যে, সে-মেয়ে ভয়ে ভ্যাঁ-অ্যাঁ-অ্যাঁ! কান্না জুড়ে দিল। আর সেই পুঁচকে মেয়েটা গাইতে গাইতে হাততালি দিতে লাগল। শুনলে, অবাক হয়ে যাবে, আমার নাচের বহর দেখে, আর সেই ছোট্ট মেয়ের গানের বাহার শুনে, ওই এক ময়দান মানুষজনও ভুলে গেল সব কিছু। ভুলে গেল মহারাজার কথা। মহারানির কথা। রাজকন্যার কান্নার কথা। তারাও আমার সঙ্গে নাচতে লাগল। আর ভীষণ, ভী-ষ-ণ চিৎকার করে গাইতে লাগল। সে যেন আনন্দের হাটখানা!
কিন্তু হলে কী হবে, রাজার মেয়ের কান্না যে আর থামে না। ভয়তরাসে আমার ঘাড়ের বালামচি টেনে ধরে চিল-চেঁচিয়ে ভ্যাঁ-ভ্যাঁ করতে লাগল। মেয়েকে অমন করে কাঁদতে দেখে মহারাজাই বা কেমন করে স্থির থাকতে পারে। আর কেমন করে চুপ থাকতে পারে মহারানিই বা! মহারাজা হাঁক পাড়ল, 'নাচ থামাও!'
মহারানি ফিনফিনে গলায় চিনচিন করে চেঁচিয়ে উঠল, 'থামো, থামো!'
তখন কে আর তাদের কথা শোনে!
রানি কেঁদে উঠল, 'ঘোড়াকে মারো!'
মারবে কে? অশ্বপালক? তবেই হয়েছে। দ্যাখো, সে-ও তো নাচছে।
তবে মারুক সান্ত্রি-সিপাই!
হায় রে! নাচে-গানে সবাই মশগুল!
মহারাজা গলা ফাটাল, 'মন্ত্রী কী হবে?'
মন্ত্রী গলা চড়িয়ে উত্তর দল, 'একটা কিছু ব্যবস্থা করতে হবে।'
মহারানি জিজ্ঞেস করল, 'কখন করতে হবে?'
মন্ত্রী বলল, 'এখুনি করতে হবে।'
মহারাজা ভাঙা গলায় তারস্বরে চেঁচাল, 'এখুনি কী ব্যবস্থা করতে হবে?'
মন্ত্রী বলল, 'ঘোড়ার মাথায় জল ঢালতে হবে।'
রানি বলল, 'তা হলে ঢালো, ঢালো এক্ষুনি ঢালো। নইলে গেল, গেল, মেয়ে আমার মরে গেল।'
মন্ত্রী বলল, 'আগে আমাদের সভা ডাকার দরকার। জল ঢালার আগে সভা ডেকে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, জল ঢালা উচিত কি না!'
রাজা রেগে কাঁই, 'কেন উচিত নয়?'
মন্ত্রী উত্তর দিল, 'অতিরিক্ত জলের তোড়ে ঘোড়াটা যদি গলে যায়!'
রানি ধমকে উঠল, 'মুখ্যু।'
রাজা কড়কাল, 'উজবুক।'
আর, ঠিক তক্ষুনি রাজকন্যা ধপাস! আমার পিঠ থেকে একেবারে মাটিতে। তারপর যে কী লণ্ডভণ্ড কাণ্ড ঘটল, সে আমি সবটা না-বললেও তোমরা অনেকটা বুঝতে পারছ। রাজা ছুটে মেয়েকে উদ্ধার করতে গেল, ভিড়ের চাপে পারল না। রানি হায়, হায় করে আঁতকে উঠে মেয়েকে ধরতে গেল, ভিড়ের ঠেলায় রানি হারিয়ে গেল। মন্ত্রী লাফায়-ঝাঁপায়, গলা-ফাটায়, কেউ গ্রাহ্যও করছে না। রাজকন্যা মাটিতে একবার এদিকে গড়ায়, আর-একবার উদিকে। একবার ভ্যাঁ করে কাঁদে, একবার উুঁ করে। ভ্যাঁ-উঁ, ভ্যাঁ-উঁ!
মহারাজার মুখেচোখে রাগ ঠিকরে পড়ছে।
রানি পাগলের মতো হাত-পা হাঁকপাক করছে।
শেষমেশ আর থাকতে পারল না মহারাজা। সেনাপতির দাড়িটা খামচিয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, 'নাচ থামাও। চাবুক চালাও!’
সেনাপতি নাচতে-নাচতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ছিঃ ছিঃ, সেনাপতিও নাচছে! লজ্জায় এতখানি জিব বার করে ফেলল মুখের ভেতর থেকে। তারপর, মহারাজার খামচে-ধরা মুঠোর কবজা থেকে নিজের দাড়ি ছাড়িয়ে চাবুক তুলল।
সেনাপতিকে চাবুক তুলতে দেখে যেসব সেনা এতক্ষণ মশগুল হয়ে নাচছিল, তারাও নাচ থামাল। চাবুক বার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল জনতার ওপর। আর আমার ওপর। মার! মার! সপাং! সপাং! জনতা 'বাবা রে, মা রে' বলে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিলে। আমিও 'চিঁহি, চিঁহি' চিৎকার করে টগবগানি লাগিয়ে দিলুম। জনতার গাদাগাদি থেকে কোনওক্রমে একদল সেনা রাজকন্যাকে উদ্ধার করল। মহারানির কাছে পৌঁছে দিল। মহারাজা তক্ষুনি-তক্ষুনি আমার দিকে তেড়ে এল। চাবুক তুলে আমাকে মার শুরু করল, সাঁই-সাঁই, সপাসপ!
অমনই সেই গান-গাওয়া মেয়েটা দুড়দাড়িয়ে ছুটে এল আমার কাছে। আমাকে আড়াল করে দু-হাত ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল মহারাজার সামনে। আস্ত-ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'ঘোড়াকে মেরো না! ঘোড়াকে মেরো না!'
কে আর তার কথা শুনছে! সপাং-সপাং চাবুক পড়ল তারও পিঠে। মেয়ে আমাকে ছেড়ে একটুও সরে না। চাবুক খেতে-খেতে মেয়েটা চেঁচায়! জনতা ছত্রাকার হয়ে যে যেদিকে পারল পালায়। আমিও তালেগোলে দৌড় মারি। মেয়েটার যে কী হল, আমি জানতেও পারলুম না।
আমি দৌড়চ্ছি তো দৌড়চ্ছিই। কোনদিকে যাচ্ছি, কোথায় দৌড়চ্ছি, তখন আর সেসব চিন্তা কার মাথায় আসে। বিপদের সময় মানুষের যেমন বাঁচার তাগিদ, আমারও তাই। অবশ্য মানুষের যেখানে-সেখানে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা সহজ। কিন্তু আমার সেই সুবিধে নেই। আমি তো আর ছোট্টখাট্টটি নই যে, সুট করে গর্তের মধ্যে ঢুকে পড়ব! কিংবা প্রাণের ভয়ে মানুষের শোবার ঘরের খাটের নীচে হামাগুড়ি দেব!
না, আমাকে ধরতে পারেনি মহারাজার সেনারা। ছুটে আমার সঙ্গে টক্কর দেওয়া কি অত সোজা! এমনকী, অমন যে জনতা, প্রাণের ভয়ে ছুটতে-ছুটতে কোথায় যে তারা বেপাত্তা হয়ে গেল, আমি টেরও পেলুম না। তবে কি এখন একটু দাঁড়ানো যায়? পিছু ফিরে দেখলেই বা কেমন হয়?
আমি দাঁড়ালুম। হাঁফাতে-হাঁফাতে ঘাড় ফেরালুম। ভোঁ-ভোঁ। একটি জনপ্রাণীরও টিকি দেখা যাচ্ছে না এখানে এখন আমি একেবারেই একা! কোথায় চলে এসেছি, কতদূরে, তার আড়বাড় কিছুই ঠাওর করতে পারছি না। আমার তো আর পথঘাট চেনার কথা নয়! অবশ্য এখন আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেটা পথও নয়, ঘাটও নয়। একটা মস্ত ফাঁকা মাঠ। দু-একটি গাছের মাথা যে একেবারেই দেখা যাচ্ছে না, তা নয়। গাছও আছে, ঘাসও আছে। তবে শহরের একফোঁটা চিহ্ন নেই। তবে কি শহর ছাড়িয়ে আমি অনেক দূরে পালিয়ে এসেছি। কী করি এখন! যা হয় হবে? এখন তো একটা গাছের ছায়ায় দাঁড়ানো যাক!
আমার গায়ের সেই রাজপোশাকের কী অবস্থা হয়েছে দ্যাখো! ছিঁড়ে-ছুঁড়ে ফর্দাফাই। মাথার টুপিটা যে হাঙ্গামার সময় কোথায় গায়েব হয়ে গেল কে জানে! এখন ছেঁড়া পোশাক গায়ে ঝুলিয়ে আমার এমন মূর্তি হয়েছে, কেউ দেখলেই ভাববে আমি একটি সঙ, নয়তো পাগল। তার ওপর যদি আবার দু-চার ঘা পড়ে, তবে তো আর বলার কিছু নেই। রাজার চাবুকের চোটের পর, সেটা জমবে ভালো। ভাগ্য এমন, যেদিন থেকে জন্মেছি, সেইদিন থেকে চাবুকই আমার সঙ্গী। হায় রে, ঘোড়ার কপাল কাকে বলে! সারাজীবন চাবুক খাও, আর নয়তো ছোলা-দানা চিবোও! ভালো রে ভালো!
আমার তো এখনও পর্যন্ত মাথায় ঢুকছে না, রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে নাচতে আমি কেন পারলুম না। দু-দিন আগেও আমি অত লোকের সামনে অমন তাকলাগানো নাচ দেখিয়েছি, অথচ, রাজার সামনে চুপসে গেলুম! কিন্তু দ্যাখো, সেই মেয়েটা যেই আমাকে দুয়ো দিয়ে গান গেয়ে উঠল, তখনই আমি নেচে উঠলুম! আচ্ছা বলো, ওই 'ভেককি ঘোড়া' বলে টিটকিরি দিলেও কোনো ঘোড়ারই কি বেহায়ার মতো নাচা উচিত? নিশ্চয়ই নয়। যে ভেককি বলল, তাকে একটা মোক্ষম শিক্ষা দেওয়া উচিত। ঘোড়ারও যে মান-সম্মান বলে একটা বস্তু আছে, সে-কথাটা একবারও আমার মাথায় এল না। আমি তার গান শুনে ধেই-ধেই করে নাচতে শুরু করে দিলুম।
না নেচে উপায় ছিল না। আমার কথা ছেড়ে দাও। অমন যে রাজার সেনাপতি, সৈন্য-সামন্ত আর ওই হাজার-হাজার মানুষ, তারাই বা কেন নাচল? মজা, মজা, সেইটাই তো মজার কথা! সেই ছোট্ট মেয়ের গান যার কানে যাবে, তাকে নাচতেই হবে। তোমরা শুনলে, আমি হলপ করে বলতে পারি, তোমাদেরও নাচতে হত। যেমন মিষ্টি তার গলা, তেমনই জাদু তার গানে। অথচ দেখলে তো, কী দুর্দান্ত সাহস সেই মেয়ের? মহারাজা যখন চাবুক তুলে আমাকে মারতে এল, সে একাই রুখে দাঁড়াল। মহারাজার চাবুক তার পিঠে পড়ল। তবু সে নড়ল না। আমি পালিয়ে বাঁচলুম। কিন্তু তার যে কী হল, আমি জানতেও পারলুম না। ছিঃ ছিঃ! এ আমার কেমন আক্কেল! যে আমার জন্যে নিজে শাস্তি পেল, তাকে একা ফেলে আমি পালিয়ে এলুম! একেই বোধ হয় বলে পশুর মতো নিষ্ঠুর। হ্যাঁ, আমি তো পশুই। এমন কাজ পশু ছাড়া আর কে করবে! মেয়েটা ছোট্ট। অথচ গায়ে-গতরে আমি একটি গোদা ধুমসো জন্তু। আমার সঙ্গে তার তুলনাই চলে না। সে পারল। অথচ আমি ভয়ে পালিয়ে এলুম। কী লজ্জা! আমি লুকিয়ে থাকার আড়াল খুঁজছি! ভিতু! ভিতু! আমি একটা আস্ত ভিতু পশু! আমি কেন পালিয়ে এলুম! কেন আমি ওই ছোট্ট মেয়েটার জন্যে প্রাণ দিলুম না! ধিক আমাকে!
এখানে আর বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক নয়। যা হোক, একটা ব্যবস্থা করতেই হয়। আমি আবার হাঁটা দিলুম। যার পথঘাট কিছুই জানা নেই, তার হাঁটা মানে আনাড়ির মতো টইটই করে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু এই দিনদুপুরে সেটা যে মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়, এ-কথা কাউকে শেখাতে হয় না। তবে, এই ফাঁকা মাঠে গাছের নীচে চোরের মতো দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে হাঁটা অনেক ভালো। কাজেই এখন হেঁটে এগিয়ে চলো! আর যতটা পারো, মানুষের দৃষ্টি এড়িয়ে হাঁটার চেষ্টা করো। কিন্তু কী আশ্চর্য,, দেখতে পাচ্ছ এখনও পর্যন্ত একটি মানুষও নজরে পড়ল না! তবে কি এখানে, কাছে-পিঠে মানুষ থাকে না? হবেও বা।
'এই ধরে ফেলেছি!' এ কী! হঠাৎ কে আমার পেছনে এসে আমাকে এমন করে চমকে দিল! কে আমার পিঠের ছেঁড়া পোশাকের খুঁট ধরে টান মারল! ফিরে তাকাতেই আমার বুকটা ধড়াস করে উঠেছে! এ যে দেখি, সেই ভেককি-বলা ছোট্ট মেয়ে! আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম।
সে বলে উঠল, 'এই ঘোড়া, তুই তো দেখি বুদ্ধির জাসু। রাজকন্যাকে পিঠ থেকে ফেলে দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস! চ' রাজবাড়িতে।' বলে আমায় ঠেলা মারল।
তা, আমাকে ঠেলা মেরে ওই খুদে মেয়ে নড়াতে পারবে কেন! আমি অবাক-চোখে তার দিকে তাকালুম। তখনও তার গায়ে, কাপড়ের ফাঁক দিয়ে, চাবুকের দাগগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। আশ্চর্য, তখন আমাকে বাঁচাবার জন্য নিজে মহারাজার হাতে চাবুকের মার খেয়েছে। এখন সে-ই আমায় রাজবাড়িতে যেতে বলছে! আমি নড়লুম না।
মেয়ে বলল, 'যাবি না? না-গেলে ভালো হবে না কিন্তু! তুই না মহারাজার নাচের ঘোড়া!'
না, আমি মহারাজার নাচের ঘোড়া নই। আমি সার্কাসের ঘোড়া। মহারাজা নিজের মেয়ের মন রাখতে আমাকে কিনে এনেছে। আমার এইসব কথা তাকে কেমন করে বলি! কেমন করে বলি, নিজে বাহাদুরি নেবে বলেই মহারাজা রাজ্যের প্রজাদের ঢেঁড়া পিটিয়ে আমার নাচ দেখতে রাজপ্রাসাদে ডেকে এনেছিল। কিন্তুু যে-মুহূর্তে আমি রাজপ্রাসাদে ঢুকেছি, হায় রে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই আমি নাচতে ভুলে গেছি! আমি যে সার্কাসে কেমন করে নাচতুম, আমার কিছুতেই মনে পড়ছিল না। কিন্তু অবাক কাণ্ড, তুমি যেই গেয়ে উঠলে, অমনই আমার পায়ের ঘুঙুর বেজে উঠল। বিশ্বাস করো, আমি ইচ্ছে করে রাজকন্যাকে আমার পিঠ থেকে ফেলে দিইনি। সে নিজেই ভয়ে হাত ফসকে পড়ে গেছল। তার জন্যে আমাকে কেন দোষ দেবে? কেন চাবুক মারবে?
এসব কথার একটি অক্ষরও আমি তাকে বলতে পারলুম না। ঘোড়ার ভাষা তার বোঝার কথা নয়। তাই সে নাছোড়বান্দা। আমাকে একনাগাড়ে ঠেলছে, নয় টানছে আর চেঁচাচ্ছে, 'চ, চ, বলছি! নইলে আমি মহারাজাকে খবর দিয়ে দেব। মহারাজার লোকলস্কর এসে তোকে বেঁধে নিয়ে যাবে। তখন মজা বুঝবি।'
আমি তার কথায় কানই দিলুম না। উলটে মনে-মনে বললুম, কেন, তুমি আমাকে তোমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে পারো না! আমি তোমার কাছে যাব সে ভি আচ্ছা, তবু রাজপ্রাসাদে কিছুতেই নয়। তা, আমার ইচ্ছে মনে-মনেই বলছি আমি। সে তো আর জানছে না। তাই সে-ও ঠেলছে আমায়, আমিও নড়ছি না। গায়ের জোরে আমার সঙ্গে পারবে কেন? শেষে আমাকে ভয় দেখাল, 'তুই তা হলে যাবি না? বেশ, তা হলে আমিই যাচ্ছি। মহারাজাকে খবরটা দিয়ে আসি। বলে আসি, তুই এখানে পালিয়ে এসেছিস।' বলে মেয়েটা ছুটতে গেল। সে যে আমাকে মিথ্যে-মিথ্যে ভড়কি দিয়ে ছুটতে গেল, এটা আমি বুঝতে পারলুম না একেবারেই। আরে বাবা, রাজবাড়িটা যে এখান থেকে অনেক দূরে, একছুটে যাওয়া যায় না, সেটাও তো আমার বোঝার কথা। আমি নিজে কতক্ষণ ধরে ছুটে এসেছি, এরই মধ্যে আমি বোকার মতো ভুলে গেলুম কী করে সেই কথাটা! আমার এই জায়গায় আসার কতক্ষণ পরে মেয়েটা এখানে এসেছে বলো! এসব সাতপাঁচ কিচ্ছু ভাবলুম না আমি। করলুম কী, মেয়েটা যেই ছুটতে গেল, আমি তাকে আটকাতে গিয়ে দিয়ে ফেললুম অসাবধানে এক রামধাক্কা। মেয়েটার যে খুব লাগল, সে তো ধাক্কা মেরেই আমি বুঝতে পেরেছি। আর আমার কিচ্ছু করার নেই। সে বেচারি হোঁচট খেয়ে ছিটকে পড়ল। তারপর নড়েও না, চড়েও না। অজ্ঞান হয়ে গেল।
ইস! আমি আবার এ কী বিপদে পড়ে গেলুম! আমি এখন কী করি? আমি কি পালিয়ে যাব! ছি, এ-কথা আমার মনে এল কী করে? যে-মেয়ে আমাকে বাঁচানোর জন্যে রাজার চাবুকের সামনে নিজের বুক পেতে দেয়, তার এই বিপদের সময় তাকে একা ফেলে পালিয়ে যাওয়ার কথা আমার মতো পশুরাই বুঝি ভাবতে পারে! না, আমি একে ছেড়ে কোথাও যাব না! আমি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকব। এই ফাঁকা মাঠে একা। আমার যা হয় হবে। কিন্তু এই ছোট্ট মেয়েটির আমি কোনো ক্ষতি হতে দেব না। যে-অন্যায় আমি করে ফেলেছি, তার শাস্তি নিতে আমি আর ভয় পাই না। শুধু দেখতে চাই ওর জ্ঞান ফিরে এসেছে। ফিরে আসুক ওর জ্ঞান এক্ষুনি। আমি তোমাদের সকলের কাছে প্রতিজ্ঞা করছি, ওকে আর আমি কষ্ট দেব না। ও যা চায়, আমি তাই করব। ওর ইচ্ছেমতো আমি রাজপ্রাসাদেই চলে যাব। আমি রাজকন্যার নাচের ঘোড়াই হব। রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে আমি নাচব।
অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলুম আমি অচেতন মেয়েটির পাশে। মাঝে-মাঝে দৃষ্টি মেলে ওই দূরের দিকে তাকাচ্ছিলুম। যদি কোনো মানুষের দেখা পাই। যদি কোনো মানুষ এদিক দিয়ে যায়! যদি কেউ মেয়েটিকে দেখে দয়া করে। না, কাউকে দেখা যাচ্ছে না। কোনো শব্দও কানে আসছে না। সুনসান। নির্জন চারদিক। শুধু মাঝে-মাঝে মেয়েটির দীর্ঘশ্বাসের শব্দে নিস্তব্ধতা ভেঙে যাচ্ছে। রোদের তেজ এখন আর তেমন ঝলসানো নয়। সিধে তার মুখে এসে পড়েছে। আমি সূর্যকে আড়াল করে দাঁড়ালুম। মেয়েটির মুখের রোদ আমার পিঠে ছড়িয়ে পড়ল।
না, এখনও তার চোখের পাতা খুলল না। ওর চোখের পাতা কি আর খুলবে না কোনোদিন? আঁতকে উঠলুম আমি। আমার মুখখানা নামিয়ে দিলুম ওর কপালের ওপর। আলতো-আলতো বোলাতে লাগলুম। আরও কমেছে রোদের তেজ। কিন্তু মেয়েটির তো এখনও হুঁশ ফিরল না! কেন? তবে কি তার খুবই আঘাত লেগেছে!
দ্যাখো, সাঁঝ নামছে। দিনের আলোর আজকের মতো ছুটি। ঝাপসা রঙের রেশম-বোনা একখানা ওড়না যেন দুলে-দুলে নেমে আসছে আকাশ থেকে মাটিতে। আকাশে তারা ফুটছে। ওই তো, চাঁদও র্উকি দিচ্ছে। আজ কি পূর্ণিমা? আমি পূর্ণিমার মানে জানি না। জানি না চাঁদটা এত্তখানি বড়ো হয়ে আকাশে উছলে উঠলে কেন তাকে পূর্ণিমা বলে। আর কেনই-বা একটি-একটি দিন, রাতের আঁধারে হারিয়ে গেলে, চাঁদও ক্ষয়ে-ক্ষয়ে আকাশে মিলিয়ে যায়! অবশ্য এসব নিয়ে আমার মতো একটা ঘোড়ার মাথা ঘামাবার কোনো দরকার পড়ে না। কিন্তু এখন, ওই পূর্ণিমার আলো এই মেয়েটির সারা শরীরে ছড়িয়ে না পড়লে আমার দুশ্চিন্তা আরও বাড়ত। অন্ধকার যদি আমার চোখও অন্ধ করে দিত ! তখন আমি মেয়েকে দেখতে পেতুম কী করে!
দ্যাখো! দ্যাখো! ওর যেন হাতের ক-টি আঙুল একটু-একটু নড়ে উঠল! ওর যেন নরম দুটি ঠোঁটে দোলা লাগল! চোখের দুটি পাতা থরথর করে শিউরে উঠল! উৎকণ্ঠায় আমার হৃৎপিণ্ড অস্থির হয়ে উঠল। আমার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়তে লাগল। উত্তেজনায় আমি ছটফট করছি। আমি বুঝতে পারলুম, তার জ্ঞান ফিরছে। এবার তা হলে আমি কী করব?
সে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। আমাকে দেখল। আমি হতভম্বের মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। সে হাসল। একটুকরো হাসি ঝলক দিয়ে মিলিয়ে গেল তার ঠোঁটেই। তারপর শুয়ে-শুয়েই সে মাথা হেলিয়ে চাঁদের দিকে তাকাল। আলো! আলো! আকাশ উছলে, আলোর ছটা ছড়িয়ে পড়েছে তার সারা গায়ে। এ কী! সে যে উঠে বসার চেষ্টা করছে। আমি ব্যস্ত হলুম। মুখে বলতে পারলুম না, উঠো না! উঠো না!
কিন্তু সে সত্যি-সত্যি উঠে বসল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে তার দিকে তাকালুম। সে তার ছেঁড়া কাপড়টা পরিপাটি করে গুছিয়ে নিল। তার মাথা-ভর্তি চুলের ভেতর ছড়িয়ে পড়া ময়লা-কুটো হাত দিয়ে সরিয়ে দিল। তারপর যেন অনেকদিনের চেনা এক বন্ধুর মতো আমার দিকে হাত বাড়াল। আমার নাগাল পেল না। হঠাৎ ক্লান্ত গলায় সে কথা বলল, 'ও মা! জ্যোছনা নেমেছে আকাশ থেকে! কী লজ্জা! আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলুম!' বলতে-বলতে সে তার চোখের দৃষ্টি আমার দিকে মেলে ধরল। কী ভাবল জানি না। আমার মুখের দিকে চেয়ে সে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুই বুঝি সেই তখন থেকে দাঁড়িয়ে আছিস?'
আমার মুখে কথা নেই।
'সারাদিন তুই আমাকে পাহারা দিয়েছিস!'
আমি মুখ নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলুম।
'ওরে ঘোড়া, তুই আমার জন্যে এত কষ্ট করলি?'
আমি উত্তর দিতে পারলুম না, 'ওগো মেয়ে, মহারাজা যখন চাবুক তুলে আমাকে মারতে এল, তুমি আমাকে আগলে দাঁড়ালে। নিজে মার খেলে। আমার এই কষ্ট কি তোমার সেই কষ্টের চেয়ে বেশি?'
মেয়েটি যেন উঠে দাঁড়াতে চায়! না, না, উঠো না মেয়ে, তুমি পড়ে যাবে। —আমি এ-কথা বললেই বা কে বুঝছে? কে শুনছে?
সে উঠে দাঁড়াল। তার কষ্ট হল। তার পা দুটি টলমল করে দুলে উঠল। অমন বারবার ভেঙে-ভেঙে নুয়ে পড়ছে কেন? দেখে মনে হয়, ঠিক যেন একটি আহত পাখি! ভাঙা দু-খানি ডানা ছড়িয়ে সে উড়তে চায়। ওড়ার আগে মাটিতে দাঁড়াতে চায় সে! আমি যদি একটু সাহায্য করতে পারি! কেমন করে তার হাতখানি আমার হাতের মুঠোয় টেনে নেব? আমার হাত কই! ঘোড়ার হাত কবে কে দেখেছে!
তার ক্লান্ত দেহটা টানতে-টানতে সে আমার কাছেই এগিয়ে এল। তার দু-খানি ছোট্ট হাত আমার গলার ওপর তুলে দিল। বোধ হয় আমার গলাটি জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু ও যে ছোট্ট। কেমন করে ধরবে? আমি তাই যতটা পারি ঝুঁ কে আমার গলাটা বাড়িয়ে দিলুম। ও ছুঁতে পারল। তার ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমার গলা। তারপর বলল, 'আমার জন্যে তোর কষ্ট হল!'
আমিও বলতে পারতুম, তোমার এখনও যে-কষ্ট হচ্ছে, সে তো আমারই জন্যে। এই চাঁদের আলোয় তোমার মুখখানি যতই সুন্দর দেখাক, মুখের ক্লান্তি তো তাতে ঢাকা পড়ছে না। সেই ক্লান্তি ছেয়ে আছে তোমার চোখেও।
সে আমার গলা জড়িয়ে আমাকে আদর করে বলল, 'কী বোকা ঘোড়া রে তুই! মহারাজার কথার তুই অবাধ্য হলি! ও রে ঘোড়া, রাজপ্রাসাদ ছেড়ে কেউ পালায়! জানিস, সেখানে কত সুখ, কত আহ্লাদ! সেখানে রাজা-রানির যেমন স্নেহ পেতিস, তেমনিই রাজকন্যার আদর। শেষকালে তুই কিনা এই সুযোগ পায়ে ঠেললি। তুই কী বলে রাজকন্যাকে তোর পিঠ থেকে ফেলে দিলি? ধ্যাত!' বলে, আমার গলা থেকে হাত নামিয়ে নিল।
মেয়ের এসব কথার উত্তর যে আমার জানা ছিল না, তা যেন ভেবো না তোমরা। আমি তার মুখের দিকে চেয়ে মনে-মনে বলি, ওগো মেয়ে, যে-রাজার হাতে চাবুক ওঠে, সেই রাজার প্রাসাদে যত সুখই থাক, সেখানে আনন্দ নেই। তোমার মতো একটি ছোট্ট মেয়ের গায়ে হাত তুলতে যে রাজার বাধে না, সে-রাজা মানুষই নয়।
সে আমার গলা ছেড়ে আর দাঁড়াতে পারল না। বসে পড়ল। কিন্তু এ কী, সে যে শুয়ে পড়ল মাটির ওপর। তবে কি খুব কষ্ট হচ্ছে তার? হ্যাঁ, সে যে আর কথা বলছে না! আমার কোনো সাড়া না পেয়ে তার বুঝি রাগ হয়েছে ! ভীষণ খারাপ লাগছে আমার। আমার কথা যদি সে বুঝতে পারত, তবে, আমি এখন, চিৎকার করে বলে উঠতুম, 'ওগো মেয়ে, দয়া করে তুমি আমার ওপর রাগ কোরো না! আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, তোমার যা ইচ্ছে, তা-ই হবে। আমি রাজপ্রাসাদেই যাব। রাজকন্যার ঘোড়া হয়ে তাকে পিঠে নিয়ে নাচব আমি।' আমার মনের এই কথাটাই তাকে বোঝাবার জন্য কাছে ছুটে গেলুম। উত্তেজনায় আমি এমন অন্যমনস্ক হয়েছিলুম, আমার পায়ে যে ঘুঙুরগুলো বাঁধা আছে, ভুলেই গেছি। কিন্তু এবার আমি পা ফেলতেই, আমার পায়ে ঘুঙুর বেজে উঠল। আমি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। সেই ছোট্ট মেয়ে মুখ ফিরিয়ে দেখল আমায়। আমার পায়ের দিকে। হাসল। হাসতে-হাসতে উঠে বসল।। তারপর কী ভাবল কে জানে, সে ক্লান্ত গলায় গুনগুন করে গেয়ে উঠল .
আলো দেখি, ভালো দেখি,
আকাশ-আকাশ
নাচ দেখি, ওরে ঘোড়া,
দেব রে যা চাস।
দিতে পারি মুঠো-মুঠো
খুশি, হাসি, গান,
সোনা নেই এককণা
আছে কলতান।
আর আছে ভালোবাসা
ওরে ঘোড়া শোন,
তোর তরে সে আমার
আলোর রতন।
সে-গান আলোর জ্যোছনায় ভেসে-ভেসে কেমন মধুর সুরে ছড়িয়ে পড়ছিল, আমি তা বোঝাতে পারব না। বলতে পারব না, কেমন মিষ্টি সে-সুর! ও আমার ছোট্ট বন্ধুরা, আমার পায়ে-পায়ে ঘুঙুরের ঝনাতকার আবার বেজে উঠল। নিস্তব্ধ চতুর্দিক। শুধু একটি গান একটি ছোট্ট মেয়ের গলায়। সেই গানের সুরে আমি নাচি, একটি ঘোড়া। কেউ দেখার নেই সেই নাচ। কেউ শোনার নেই সেই গান। শুধু আমি আর সে। আমি তার গান শুনছি। সে আমার নাচ দেখছে। শুনলে অবাক হয়ে যাবে, যে-মেয়ে এই কিছুক্ষণ আগেও ছিল বেহুঁশ হয়ে পড়ে, এই একটু আগে টালমাটাল করছিল যার ছোট্ট দুটি পা ক্লান্তিতে, এখন যেন তার শরীরেকোনো কষ্টের লক্ষণই নেই। তার মুখখানি স্ফূর্তিতে উছলে উঠছে। যেন সবাই আমার সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে দুলছে। আজ মনে হচ্ছে, আমি আর মানুষের গোলাম নই। মানুষ নামের একটি ছোট্ট মেয়ের আমি বন্ধু। সে আমার গান। আমি তার খুশি।
একসময় নাচতে নাচতে আমার মনে হয়েছিল, আমার এই নাচ অথবা মেয়ের ওই গান বুঝি-বা কোনোদিন থামবে না। অনেকক্ষণ সে গান গাইল। যতক্ষণ তুমি ভাবতে পারো, তার চেয়েও অনেকক্ষণ। আমিও অনেকক্ষণ নাচলুম তার গানের সঙ্গে। তারপর তারও যেমন মনে হল, এবার একটু থামা যায়, তেমনই আমারও। আচমকা সে গান থামিয়ে ছুটে এল আমার কাছে। আমার ঝুঁকে-পড়া গলা তার দুটি হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, 'শাবাশ, শাবাশ ঘোড়া, শাবাশ!'
আমিও খুশিতে চিৎকার করে উঠেছিলুম তখন। আমার সেই চিৎকারের সে যদি কোনো মানে খুঁজে পেত, তবে সে বুঝতে পারত, আমিও তাকে বাহবা দিয়ে তার গানের তারিফ করছি। বলছি, 'বহুত আচ্ছা, বহুত আচ্ছা!'
সে কাঁপছে। যেন অনেক আনন্দ এক সঙ্গে উপছে পড়ছে তার সমস্ত শরীর বেয়ে। যেন ঝরে পড়ছে তার দুটি ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে রাশি-রাশি হাসি। হাসতে-হাসতে উছলে উঠে, সে বলল, 'ওরে ঘোড়া, আজ থেকে তুই আমার সত্যিকারের বন্ধু। তুই আমার আপন। আমি জানি ঘোড়া, জানি, তুই রাজপ্রাসাদে যেতে চাস না। রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে গোলামের মতো থাকতে চাস না সেখানে। না ঘোড়া, না, আর তোর সেসবের দরকার নেই। যেতে হবে না তোকে রাজপ্রাসাদে। আজ থেকে তুই আর আমি একসঙ্গে থাকব। ওরে ঘোড়া, আমি জানি, রাজারা শুধু মারে। বিশ্বাস কর, আমি তোকে ভালোবাসব।'
তার কথা শুনতে-শুনতে আমার গায়ে কাঁটা দিল।
সে এবার হাত সরিয়ে নিল আমার গলা থেকে। আমার সামনে দাঁড়াল স্থির হয়ে। আমার মুখের দিকে চেয়ে অপলকে দাঁড়িয়ে রইল মুহূর্ত। তারপর আবার অস্ফুটস্বরে বলে উঠল, 'এ আর কে না-জানে, তুই একা! তোর দেশও হারিয়ে গেছে। তেমনই অন্য দেশে তোরই মতো তোর মা-ও হারিয়ে গেছে। তোর বাবাও। তাদের কথা তোর মনে পড়লে, তোর চোখ দুটি যখন কান্নায় ভিজে যায়, হয়তো মানুষের হুকুমে তখনই তোকে নাচতে হয়। কেউ বোঝে না তোর দুঃখু। কেউ দ্যাখে না তোর চোখের জল। সবাই তোর নাচই দ্যাখে। আনন্দে চিৎকার করে। আর তালি বাজায়।
'ওরে ঘোড়া, তবে শোন, আমারও কেউ নেই।' বলে সে হঠাৎ থামল। আমার মুখের দিকে চকিতে তাকিয়ে তার নিজের মুখ আকাশের দিকে মেলে ধরল। আমি চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পেলুম, তার চোখ ছলছল করছে! তবে কি তার চোখেও জল! আমি চমকে উঠলুম। আর ঠিক সেই সময়ে সে আবার কথা বলল। সে বলল, 'একদিন আমারও মা ছিল, বাবা ছিল। আমাদেরও একটা ঘর ছিল। ঘর-ভর্তি আমার কত ছিল খেলনাপাতি। ওরে ঘোড়া, আমিও বাবার কাঁধে চেপে এখানে-ওখানে কত ঘুরেছি। মায়ের মুখে কত শুনেছি গল্প। এমনই জ্যোছনা রাতে আমাদের ছোট্ট ঘরের জানলা টপকে যখন আলো উপচে পড়ত, তখন, মা আমাকে গান শোনাত। কিন্তু আজ আর আমায় কেউ কাঁধে নিয়ে হাটেও যায় না, গঞ্জেও না। আজ আর আমায় কেউ গল্প বলে না, গানও না। এখন আমিও একা, আমারও কেউ নেই।' বলতে-বলতে সে আবার থামল। মনে হল সে দম নিল। আমি তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলুম। তারপর সে মুখে একটা অদ্ভুত শব্দ করে চাপা স্বরে বলে উঠল, 'ডাকাত!'
আমি চমকে উঠলুম। আমার চমকানি তার চোখ এড়াল না। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠল, 'তোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই ঘোড়া। শুনলে বোধ হয় অবাক হয়ে যাবি, আমায় এক ডাকাত ছিনিয়ে এনেছিল, আমার মা আর বাবার কাছ থেকে। ওরে ঘোড়া, আমি যখন বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়াতুম, তখন আমি নেহাতই ছোটো। মায়ের মুখে গান শুনে যখন আমার চোখে ঘুম নামত, তখন আমার কতই বা বয়েস। তখনই এক নৃশংস ডাকাতের খপ্পরে পড়েছিল আমার মা, বাবা। আর তার সঙ্গে পড়েছিলুম আমিও। সেদিনের সেই ভয়ঙ্কর ঘটনার কথা আমার কিছুই মনে ছিল না। ক-দিন আমি বাবা আর মায়ের জন্যে কেঁদেছিলুম সেই ডাকাতের আস্তানায়, তারও কোনো কথাই আমি মনে করতে পারি না। তারপর সেই ডাকাতের আস্তানায় আমি ধীরে-ধীরে বড়ো হয়েছি। সেই ডাকাতই তখন আমার আপনজন। আপনজনের মতোই সে আমাকে ভালোবেসেছে। আমার মন থেকে মুছে গেছে তখন একে-একে মনে রাখার সব কথা। ভুলে গেছি মাকে, বাবাকে। ভুলে গেছি আমাদের সেই ছোট্ট ঘরখানাকে। কোথায় যে হারিয়ে গেল আমার খেলনাপাতি। হারিয়ে গেল আমার পুতুল। হারিয়ে গেল আমার পুতুলের ঘরকন্না। তখন আমার মন জুড়ে বসেছে সেই ডাকাত-মানুষটা। এখন, আমি যেন তারই মেয়ে। তার কষ্ট দেখলে, আমারও কষ্ট হয়। তার মুখখানা ভাবনায় ছেয়ে গেলে, আমি পেছন থেকে তার পিঠখানা ঝাঁপিয়ে ধরে লাফিয়ে উঠলে, সে আনন্দে হো-হো করে হেসে ওঠে। তাই, সে যখন রাতে আমাকে একলা ফেলে ডাকাতি করতে যেত, আমি ভাবতুম, সে কাজ করতে যাচ্ছে! একবারও ভাবতুম না, রাতের অন্ধকারে কী কাজ করে লোকটা! আসলে, এসব কথা ভাববার মতো তখনও তো বয়েস হয়নি আমার। আর তা ছাড়া, আমি যখনই যা চাই, সে দেয়। আমার সুখ ছাড়া সে যেন আর কিছুই জানে না। আর আমিও ভাবতুম, এই মানুষটা আমার আপন। তারও যেমন আমার ওপর মায়া পড়ে গেল, তেমনই আমারও। সে আমার আদর করে নাম রেখেছিল, 'শকুন্তলা'। আর আমি তাকে ডাকতুম 'তই' বলে। কেন যে তাকে 'তই' বলে ডাকতুম আর কেনই বা এই অদ্ভুত নামটা আমার মাথায় এসেছিল, তা আমি বলতে পারব না।
'ওরে ঘোড়া, একদিন আমার এত আনন্দ, তাও শেষ হয়ে গেল! এত সুখ, এত আদর সব মিথ্যে হয়ে গেল। এল এক ভয়ঙ্কর রাত। সেই রাতের কথা মনে পড়লেই, আমি ভয়তরাসে আঁতকে উঠি। সে-রাত তখন গভীর। আমি অকাতরে ঘুমোচ্ছিলুম। এমন সময়ে কে যেন আমাকে ডাকল 'শকুন্তলা।' আমার চোখে ঘুম এলে সহজে ভাঙে না। আমি তো ছোটো! কিন্তু সে-রাতে এক ডাকেই আমি জেগে উঠেছি। সাড়া দিয়েছি, 'কে?' তারপর চোখ চেয়েই ধড়ফড় করে উঠে পড়েছি। দেখি কী, আমার ঘরের দরজা ঠেলে কে একজন আমার বিছানার দিকে ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে আসছে। তার মূর্তি দেখে আমার কথা বলার শক্তি হারাল। তার মুখখানা কালো কাপড়ে ঢাকা। শুধু চোখ দুটি বেরিয়ে আছে। কপালে যেন কিসের চোট লেগেছে। রক্ত ঝরছে। তার পেছনে তারই মতো মুখে কালো কাপড় ঢেকে আর-একটা লোক। আমি পাছে ভয়ে চিৎকার করে উঠি, তাই সে আমার মুখখানা তার হাত দিয়ে চেপে ধরল। তখন প্রাণপণে হাত-পা ছুড়তে লাগলুম। হঠাৎ সে চোখের কালো কাপড়টা সরিয়ে ফেলল। আমি চমকে উঠলুম। চেয়ে দেখলুম, এ যে আমারই তই! হাঁপাচ্ছে। মনে হচ্ছে যন্ত্রণায় ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তার। আমি তার হাতখানা আমার মুখ থেকে সরিয়ে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'কী হয়েছে?'
'সে বলল, 'তোকে এক্ষুনি এখান থেকে চলে যেতে হবে।'
'আমি ভয়েময়ে জিজ্ঞেস করলুম, 'কোথায়?'
'সে তার পেছনের লোকটাকে দেখিয়ে বলল, 'ও তোকে যেখানে নিয়ে যাবে।'
'আমার যেন কেমন সব তালগোল পাকিয়ে গেল। আমি বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে দেখতে লাগলুম। আমার যেন মনে হল, ঘুমের ঘোরে হঠাৎ বুঝি আমি স্বপ্ন দেখছি। আমি মনে জোর আনলুম। তাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'তোমার কপালে রক্ত কেন?'
'গুলি লেগেছে। আমার কপালে। আমার বুকে। তুই এখানে থাকলে বিপদ হবে।' বলতে-বলতে সে যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল।
'আমি হতভম্ব হয়ে গেলুম। আমার মাথায় যেন বাজ পড়ল। আমি আকুল হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলুম, 'কে তোমাকে গুলি মারল?'
'সে আমাকে উত্তর দিল না, ধমক দিল, 'চুপ! কেন কথা বলছিস? যা বলছি তাই কর! চলে যা এখান থেকে!'
'আমি কেঁদে ফেললুম। তই আমায় বকল! তই তো আমায় কোনোদিন বকে না! কাঁদতে-কাঁদতে বললুম, 'তই, আমি তোমার শকুন্তলা। আমাকে বকছ তুমি?'
'তই আমার কথা কানে নিল না। বুঝতে পারছি যন্ত্রণা তার অসহ্য। সেই যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে সে আমার চুলটা খামচে ধরল। বলল, 'তুই এখান থেকে যাবি কি না বল?'
'এ তোমার কেমন কথা? তুমি ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথায় যাব?' ভয়ে আমি কাঁপতে লাগলুম।
'না, তুই আমার কেউ নোস। আমিও তোর কেউ না।'
'আমি চমকে তার মুখের দিকে তাকালুম। আমার ঘরে প্রদীপের আলো, অন্ধকার ঘুচিয়ে যেটুকু আভা দিচ্ছিল, সেই আভায় তার সেই মুখ দেখে আমার ভয় হল। আমি অস্ফুটস্বরে বলে ফেললুম, 'আমাকে তুমি একা পথে বার করে দিচ্ছ?'
'সে এখন যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠছে। তার কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তবুও সে বলল, 'তোকে আমি তোর বাবা-মা-র কাছ থেকে ছিনিয়ে এনেছিলুম। একটা ছোট্ট মেয়েকে এভাবে ছিনিয়ে এনে, আমার দুঃখের শেষ ছিল না। তোর কচি মুখখানা যখনই আমার চোখের ওপর ভেসে উঠেছে, তখনই আমি মনে-মনে নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি, আর ভেবেছি, তোকে আমি কোনোদিনই কষ্ট দেব না। তোকে আমি আমার মেয়ের মতো পালন করব। তাই করেছি। কিন্তু আজ আমি ধরা পড়ে গেছি। আজ আমার বিপদ। আমার বিপদের সঙ্গে তুইও বিপদে পড়িস, এ আমি চাই না। এ আমি সহ্য করতে পারব না। তাই বলছি, তুই আমাকে ছেড়ে চলে যা। শকুন্তলা, তুই যে আমার আদরের ধন।'
'ভেবে দ্যাখ ঘোড়া, আমার কথা! আমার বয়েস যদি এখন দশ হয়, ভেবে দ্যাখ, তখন আমি আরও কত ছোটো। আমি কেঁদে ফেললুম। জিজ্ঞেস করলুম, 'তোমায় ছেড়ে কোথায় যাব?'
'সে কর্কশ গলায় কড়কে উঠল, 'জানি না!'
'আমি কাঁদতে-কাঁদতে বললুম, 'ওগো তই, তোমার কপালে রক্ত। বুকে রক্ত। তোমার মুখখানা দেখলে কে বলবে না, তোমার কষ্ট হচ্ছে! এই কষ্ট দেখে, তোমায় একা ফেলে আমি কোথাও যেতে পারব না। আমার বিপদ হলেও না।'
'তখন তই তার পিছনের লোকটাকে হুকুম করার মতো ডাক দিয়ে বলল, 'তুই মেয়েটাকে ধরে নিয়ে যা।'
'সে আমাকে ধরতে এল। আমি শিউরে উঠলুম। বললুম, 'ধরে নিয়ে যেতে হবে না। আমি নিজেই যাচ্ছি।' বলে তইকে জড়িয়ে ধরলুম। আমার মাথায় সে হাত রাখল। আমার বুক কাঁপছে। তার হাত কাঁপছে। আমি আর কিছুই দেখলুম না। বেরিয়ে এলুম তই-এর ঘর থেকে। একা, অন্ধকারে। হারিয়ে গেলুম।'
মেয়েটি চুপ করে গেল। আমিও থমকে গেলুম। অনেকক্ষণ দু-জনেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলুম। তারপর সে-ই আবার কথা শুরু করল। বলল, 'সেই থেকে আমি পথে-পথেই ঘুরি। ওরে ঘোড়া, আজ আমার ঘরও নেই, কিচ্ছু নেই। আমি একা। একা-একাই গান গাই। একা-একা গান গেয়ে পথে-পথে ঘুরে বেড়াই। লোকে ভাবে আমি ভিক্ষে চাইছি। গান শুনে খুশি হয়ে কেউ দুটি খেতে দিলে খাই। আর না-দিলে কষ্ট নেই আমার। মা আর বাবাকে খুঁজতে-খুঁজতে খিদের কথা মনেই থাকে না। তুই বল, মা-বাবা না-থাকলে আদর করে কে খেতে দেবে?'
আমি আর থাকতে পারলুম না। আমারও মনে পড়ে গেল মায়ের কথা, বাবার কথা। আমারও কেউ নেই। দুঃখে আমারও বুক ভরে ওঠে। আমি ধীরে-ধীরে ক-পা এগিয়ে গেলুম, সেই মেয়েটির কাছে। সে-ও এগিয়ে এল। আমার সামনের পা-দুটির ঠিক কাছে এসে দাঁড়াল। আমার বুকের নীচে। তারপর আমার গায়ে মাথা ঠেকিয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তুই আমার বন্ধু হবি ঘোড়া?'
আমার সারা শরীর শিউরে উঠল। আমি চিৎকার করে উঠলুম, 'চিহিঁ-হিঁ!' বলতে চাইলুম হব! হব!
সে বলল, 'দ্যাখ ঘোড়া, তোরও কেউ নেই, আমারও কেউ নেই। তোকেই-বা কে দেখবে, কেই-বা দেখবে আমাকে? তুই আমার বন্ধু হলে আমি গান গাইব, তুই নাচবি।'
আমি আবার চেঁচিয়ে উঠলুম। দ্বিগুণ জোরে চেঁচিয়ে ডাক দিলুম, চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ। হ্যাঁ, হ্যাঁ নাচব। নিশ্চয়ই নাচব। তোমার গান শুনে নাচব। তোমার গান শুনে নাচা, সে যে আমার স্বপ্ন!
বুঝি-বা সে বুঝতে পারল আমার কথা। কেননা, আনন্দে আমি থাকতে পারিনি। আমার পা তখনই আপনা থেকেই নেচে উঠেছিল। আমার সব খুশিটুকু অনেক খুশি হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে দুলে উঠছে। সেই খুশিতে লুটোপুটি খায় শকুন্তলা নামে সেই ছোট্ট মেয়ে। সে আমার পিঠে উঠতে চায়। হাত বাড়ায় নাগাল পাওয়ার জন্যে। আর মিষ্টি গলায় সে চিৎকার করে, 'ওরে ঘোড়া, একটু বোস, একটু বোস! আমি তোর পিঠে উঠব। আমি তোর পিঠে উঠে চাঁদের কাছে হাত পেতে বলব, 'ওগো চাঁদ, আমার এ-বন্ধুকে তুমি আমার কাছ থেকে আর কোনোদিন কেড়ে নিয়ো না! আমরা অন্ধকার চাই না চাঁদ! আমাদের আলো দাও!'

তোমরা শুনলে খুশি হবে কি না জানি না, সেই ছোট্ট মেয়ে শকুন্তলা আমার পিঠে বসে ছিল। সে আমার পিঠে বসে চাঁদের দিকে হাত বাড়িয়ে গেয়ে উঠেছিল একটি গান। সে-গানের সুর ছড়িয়ে পড়েছিল দিকে-দিকে। আমি পারিনি স্থির থাকতে। তাকে পিঠে নিয়ে আমারও সে কী নাচ! আমার যদি পাখির মতো ডানা থাকত, তা হলে তোমরা সে-দৃশ্য দেখলে নিশ্চয়ই বলতে, পক্ষিরাজ যেন রাজকন্যাকে পিঠে নিয়ে, জোছনায় উথাল-পাথাল করে ভেসে বেড়াচ্ছে!
হ্যাঁ, সেই সোনার মেয়ে শকুন্তলা এখন আমার বন্ধু। সে গান গায়, আমার পিঠে বসে দুলে-দুলে। আমি নাচি। আমার পায়ে ঘুঙুর। ঝুমুর-ঝুমুর। ওগো বন্ধুরা, তোমাদের সঙ্গে আমাদের কবে দেখা হবে? কবে তোমরা শুনতে পাবে, আমার ছোট্ট বন্ধু শকুন্তলার গান? আর, সেইসঙ্গে আমার নাচ? সেদিন কী মজা হবে বলো!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন