গ্যানচেম্পো গুম্ফার লামা

জয়দীপ চক্রবর্তী

অরুণাংশু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমি কিছুতেই তোমার এই সিদ্ধান্তটা মেনে নিতে পারছি না পরি৷ ভুলে গেলে চলবে না, আমরা এখন প্রায় পঞ্চাশে পৌঁছেছি৷ তাছাড়া নিয়মিত ট্রেকিং-এর অভ্যাসেও তুমি নেই৷ গ্যানজালা গিরিবর্ত্মের পথ অত্যন্ত দুর্গম৷ ঝোঁকের মাথায় ওখানে যাওয়ার ব্যাপারে দুম করে হ্যাঁ বলে দেওয়াটা একেবারেই উচিত হয়নি তোমার—’

পরিদাদুকে খুবই অসহায় দেখাচ্ছিল৷ একটু দুর্বল গলাতেই তিনি বললেন, ‘কিন্তু অরুণ, কী-ই বা করতে পারতাম আমি? তাসি আমার বহু দিনের বন্ধু৷ এর আগে তার সঙ্গেই আমি ধুনচে থেকে গোঁসাইকুণ্ড ঘুরে থারেপাতি, পাতিভঞ্জুন হয়ে কাঠমান্ডু এসেছিলাম৷ সেবারে পুরো পথটাই সে আমাকে বলতে গেলে একেবারে আগলে রেখেছিল৷ তাছাড়া আলাপ থাকলে বুঝতে, তাসি মানুষটাও ভারি চমৎকার৷ আজ বিপদে পড়ে সে আমার সাহায্য প্রার্থনা করছে৷ আর আমি স্বার্থপরের মতো তার মুখের ওপরে ‘না’ বলে দেব!’

‘কিন্তু আমার কথাটাও ভেবে দেখ একবার’, অরুণাংশু আবার বললেন, ‘এই বয়সে ওই ধকল তুমি নিতে পারবে?’

‘বয়সটা ফ্যাক্টর নয় অরুণ’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আমার থেকেও বেশি বয়সে কত লোক এভারেস্টে চড়তে যাচ্ছে৷ কিন্তু একটা কথা তুমি ঠিকই বলেছ, দৌড়ঝাঁপ করার অভ্যাসটা ইদানীং সত্যিই কমে গেছে আমার৷ বিশেষত অতিমারির দুটো বছর আমাদের সকলকেই কমবেশি ঘরকুনো করে দিয়েছে৷’

শাওন পরিদাদু আর বাবার কথা শুনছিল চুপ করে বসে৷ কৌতূহল দমন করতে না পেরে এবারে সে জিজ্ঞেসই করে ফেলল, ‘এই যে গ্যানজালা না কী একটা নামের গিরিবর্ত্মের কথা বলছ, ওটা কোথায় পরিদাদু?’

‘নয়া কাংগা এবং পোনগেন ডাকপু শৃঙ্গকে জুড়েছে যে গিরিশিরা, তারই মাঝখানে এই গ্যানজালা গিরিবর্ত্ম৷ হাজার পাঁচেক মিটারের খানিক বেশি উচ্চতার এই গিরিশিরাটি আসলে ল্যাংট্যাং রবং হেলাম্বু উপত্যকাকে জুড়ে রেখেছে...’

‘সেখানে যাওয়া খুব কঠিন বুঝি?’ শাওন জিজ্ঞেস করল৷

‘অস্বীকার করব না’, পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘পথটা দুর্গমই বটে৷’

শাওন খানিক দমে গেল৷ পরিদাদু যখন এসে বললেন যে নেপাল যাওয়ার একটা পরিকল্পনা চলছে, মনে মনে খুশিই হয়েছিল শাওন৷ সে নিশ্চিত ছিল, আর একটা রোমহর্ষক অভিযানে নিশ্চিত পরিদাদুর সঙ্গে শামিল হতে যাচ্ছে সে৷

সুছন্দা চা আর কুকিজ এনে পরিদাদু আর অরুণাংশুর সামনে রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ওই বন্ধু তাসি হঠাৎ কী এমন বিপদে পড়ল যে তোমাকে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে অত দূরে দৌড়তে হচ্ছে?’

পরিদাদু কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন৷ লম্বা কয়েকটা চুমুক দিলেন চায়ের কাপে৷ তারপর বললেন, ‘তাসির তুতো ভাই পাসাং ওই অঞ্চলে অত্যন্ত দক্ষ অভিযাত্রী এবং গাইড হিসেবে পরিচিত৷ পুরো ল্যাংটাং উপত্যকাটাই তার একেবারে হাতের তালুর মতো চেনা৷ কয়েক দিন আগে দু’জন বাঙালি অভিযাত্রীকে নিয়ে সে গ্যানজালা গিরিবর্ত্মের উদ্দেশে রওনা দেয়৷ কিন্তু কিয়াংজিন থেকে রওনা দিয়ে ল্যাংট্যাং খোলার ওপরে যে সেতু সেটা পার হয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর প্রায় ভোজবাজির মতোই অদৃশ্য হয়ে যায় পাসাং৷ আজ পর্যন্ত তার কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি৷’

‘খাদে টাদে?’...

‘উঁহু’, অরুণাংশুর প্রশ্ন মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে পরিদাদু বলেন, ‘সে জায়গাটায় ছিল রডোডেনড্রনের জঙ্গল৷ সে জঙ্গল পেরিয়ে একটা বুগিয়াল৷ সেখানে খাদে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না৷’

‘তাহলে?’ সুছন্দা চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন৷

‘এই তাহলের কোনও উত্তর নেই’, পরিদাদু বললেন, ‘যে দু’জন অভিযাত্রীকে নিয়ে পাসাং রওনা দিয়েছিল, তারা অভিযান স্থগিত রেখে ফিরে এসেছিল৷ তাদের মুখে একটা অদ্ভুত কথা শোনা গেছে৷’

‘কী রকম?’

‘রডোডেনড্রনের আড়াল থেকে রোদ্দুরে মাখামাখি হয়ে যে আকাশ উঁকি দিচ্ছিল, সেখানে তারা নাকি লালচে বাদামি রঙের কিছু একটা উড়ে যেতে দেখেছিল...’

‘পাখি টাখি হতে পারে’, শাওন বলল, ‘পাহাড়ে তো কত পাখিই থাকে৷’

‘উঁহু’, গম্ভীর মুখে মাথা নাড়েন পরিদাদু, ‘যে জিনিস তারা উড়তে দেখেছিল, তার অবয়ব নাকি মানুষেরই মতো৷’

‘ধ্যাত’, সুছন্দা বললেন, ‘অমন হয় নাকি? নিশ্চিত ভুল দেখেছিল তারা৷’

‘আর একটা জিনিস তারা দেখতে পেয়ে তুলে নিয়ে এসেছিল?’

‘কী?’

‘একটা টুপি’, পরিদাদু বললেন, ‘বুগিয়াল পার হয়ে আর কিছু পথই এগিয়েছিলেন সেই দুই বাঙালি অভিযাত্রী৷ নাগে গং পেরিয়ে আরও ঘণ্টাখানেক৷ মানে সাকুল্যে ঘণ্টা চারেকের চড়াই৷ সেখানে বসে লাঞ্চ ব্রেক করার সময়েই টুপিটা চোখে পড়ে তাদের৷ পাসাংকে ছাড়া আর এগোতে ভরসা হয়নি তাদের৷’

‘টুপিটা কি পাসাং-এরই ছিল পরিদাদু? জিজ্ঞেস করে শাওন৷

‘হ্যাঁ’, সম্মতিসূচক মাথা নাড়েন পরিদাদু, ‘তাসি দেখামাত্র টুপিটাকে শনাক্ত করতে পেরেছিল৷’

‘তাসি তোমাকে কী রকম সহযোগিতার কথা বলছেন পরিকাকু?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওখানে কি তুমি পাসাংকে খুঁজতে যাবে ভাবছ?’

‘হ্যাঁ, মেল করে তাসি আমাকে তেমন প্রস্তাবই দিয়েছে’, পরিদাদু বললেন, ‘গ্যানজালা গিরিবর্ত্ম পর্যন্ত আমাদের যেতে হচ্ছে না, আপাতত তেমনটাই মনে হচ্ছে৷ যেখানে পাসাং-এর টুপি পাওয়া গিয়েছিল, আমাদের যাত্রাপথ এখন সেই পর্যন্তই৷’

‘তা হলে পথ তো তেমন দুর্গম রইল না আর’, শাওন খুশি খুশি গলায় বলে উঠল৷

‘তার মানে এই নয় যে তুমি অমনি পরিদাদুর সঙ্গে দৌড়বে ওই বিপজ্জনক জায়গায়’, সুছন্দা এক ধমক দিলেন শাওনকে৷

‘না, না শানু, আমিও এই ঝামেলার মধ্যে তোকে জড়াতে চাই না’, পরিদাদু চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে বললেন, ‘খুকু ঠিকই বলেছে৷ তোর এবারে আমার সঙ্গে না যাওয়াই ভালো৷’

সকলকে অবাক করে দিয়ে অরুণাংশু উলটো কথা বলে উঠলেন, ‘আমি বরং চাইছি শানু পরির সঙ্গে যাক৷’

‘মানে?’ সুছন্দা চোখ পাকিয়ে বললেন, ‘ওইটুকু একটা ছেলে এই বিপদের মধ্যে গিয়ে পড়বে? তুমি কি পাগল হয়ে গেলে নাকি?’

‘শানু এখন ছেলেমানুষ নেই৷ ক্লাস এইট হয়ে গেছে’, অরুণাংশু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘পরির সঙ্গে এর আগে অনেক বিপদেরই মুখোমুখি হয়েছে সে৷ এখন স্বার্থপরের মতো আমরা কি শুধু ছেলের কথাই ভাব্ব? পরিকে দেখভাল করার জন্যে শানুর সঙ্গে থাকা যে জরুরি, এ কথা ইচ্ছে করে কেন ভুলে থাকব খুকু?’

সুছন্দা মুখ নামিয়ে ফেললেন৷ শানু লাফিয়ে উঠে অরুণাংশুকে জড়িয়ে ধরল দু’হাত দিয়ে, ‘থ্যাংক ইউ বাবা৷’

পরিদাদু আবার বললেন, ‘ভেবে ডিসিশন নাও অরুণ৷ আবেগের বশে হঠকারী সিদ্ধান্ত নিও না৷’

‘আমি ভেবেই বলেছি’, অরুণাংশু বললেন, ‘টিকিট করে ফেল৷ কী ভাবে যাবে ভাবছ? রক্সৌল, বীরগঞ্জ হয়ে কাঠমান্ডু?’

‘উঁহু’, মাথা নাড়লেন পরিদাদু, ‘হাতে সময় নেই বেশি৷ এয়ারে কাঠমান্ডু চলে যাব সরাসরি৷’

নাগে গং ওঠার সময়েই পিঠের রুকস্যাক ক্রমশই যেন বেশি ভারী হয়ে উঠছিল৷ তাসিকে দেখে অবিশ্যি মনে হচ্ছিল না, এই চড়াই ভাঙা কতটা কষ্টসাধ্য৷ পরিদাদু আর শাওনের থেকে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন তিনি৷ পরিদাদু মাঝেমধ্যেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ছিলেন৷ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, খুবই কষ্ট হচ্ছে তাঁর৷ শাওনেরও কষ্ট হচ্ছিল৷ বুকের মধ্যে চাপ বোধ হচ্ছে৷ এমন হাঁফ ধরে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে এক্ষুনি দম আটকে আসবে৷ তবু পরিদাদুর কাছে পৌঁছে সে জিজ্ঞেস করল, ‘খুব কষ্ট হচ্ছে, না গো পরিদাদু?’

পরিদাদু হাসলেন, ‘তোর বাবা ঠিকই বলেছিলেন রে শানু৷ আমি সত্যিই বুড়ো হচ্ছি এইবার৷’

শাওনও হাসল, ‘তুমি আমার থেকে ইয়াং পরিদাদু৷ তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে, অন্তত আমার মতো কাহিল তুমি হওনি৷’

‘তোর বড্ড কষ্ট হচ্ছে, বুঝতে পারছি’, পরিদাদু শাওনের মাথার ওপরে একটা হাত রাখলেন, ‘ওই জন্যেই বলেছিলাম, আসিস না৷’

সামনের বরফে মোড়া শৃঙ্গগুলোর দিকে চেয়ে শাওন বলল, ‘ভাগ্যিস এসেছিলাম৷ নইলে এ দৃশ্য কি ছবিতে দেখে উপভোগ করা যায় কখনও?’

তাসি হাঁক দিলেন, ‘বেশি সময়ের জন্যে রুখবেন না পরিমল বাবু৷ সামনে অনেকখানি পথ যেতে হবে আমাদের৷’

নাগে গং পেরিয়ে আরও ঘণ্টা দেড়েক হেঁটে একটা সুবিধেমতো জায়গায় তাসি বসে পড়লেন৷ বললেন, ‘এইখানে বসেই আজকের লাঞ্চ সেরে নেওয়া যাক, বুঝলেন৷’

‘বেশ’, পরিদাদু শাওনকে হাতের ইশারায় বসতে বলে নিজেও একটা কালচে পাথরের ওপরে বসে পড়লেন৷ আকাশ ঝকঝকে নীল৷ তার মাঝে একটু আধটু সাদা মেঘ ভাসছে৷ এক্ষুনি বৃষ্টি আসবে বলে মনে হচ্ছে না৷ তাসি আপন মনে শিস দিতে দিতে কাগজের থালায় খাবার বাড়ছিলেন৷ সবই শুকনো খাবার৷ রান্না করে খাওয়ার কোনও উপায় এখানে হবে না, সে কথা জানা ছিল বলে তাসির পরামর্শ মোতাবেক রেশন সঙ্গে নিয়ে আসা হয়েছে৷

পরিদাদু চুপ করে দূরের সাদা পাহাড়চূড়ার দিকে তাকিয়েছিলেন৷

তাসি বললেন, ‘আমাদের হাতে সময় বেশি নেই৷ পাসাং-এর টুপিটা যেখানে পাওয়া গিয়েছিল, সেই জায়গায় প্রায় পৌঁছে গেছি আমরা৷ ও জায়গাটা একটু বিপজ্জনক৷ বেলা যত বাড়বে, সে বিপদও তত বাড়বে৷’

‘কেন?’ শাওন জিজ্ঞেস করল৷

‘এরপর আমরা বরফের রাজত্বে গিয়ে পড়ব শানুবাবু৷ সে বরফ যে কত উঁচু হয়ে জমে আছে কে জানে! রোদের তাপে বরফ তো গলতে থাকে৷ সেই নরম বরফে চলতে ফিরতে খুব তকলিফ হয়ে যায় অভিযাত্রীদের...’

হলও তাই৷ লাঞ্চ শেষ করে রওনা দেওয়ার পরেই কালচে পাথর আর হলুদ হয়ে যাওয়া ঘাসের ওপরে বরফের আস্তরণ চোখে পড়ল শাওনের৷ চড়াই পথে সেই বরফের আস্তরণে পা পিছলে যাচ্ছে৷ পরিদাদু একবার পিছনে তাকিয়ে বললেন, ‘খুব সাবধান শানু৷ কোথায় পা রাখছিস খেয়াল রাখবি সবসময়৷’

‘তুমিও সাবধানে চলো পরিদাদু’, শাওন জবাব দিল৷ তারপর শরীরের সব শক্তি জড়ো করে সেই পথে ওপরে উঠতে লাগল সাবধানে পা ফেলে৷

খানিক উঠে আসার পরেই কিছুটা সমতল৷ পেরিয়ে আসা পথের ওপরে যে আকাশ, সেখানে এখনও মেঘ নেই তেমন৷ কিন্তু সামনের আকাশে ঝকঝকে নীল সরে গিয়ে কালচে ঝুলের মতো মেঘ জমতে শুরু করেছে৷ আর সেই মেঘের মধ্যে থেকেই উঁকি দিচ্ছে নয়া কাংগা শৃঙ্গটি৷

তাসি বললেন, ‘নয়া কাংগাকে ডান দিকে রেখে এগোতে হবে আমাদের৷ যে উড়ন্ত লামাদের ওই দুই বাঙালি অভিযাত্রী দেখতে পেয়েছিলেন, তাঁরা এই পথে এসেই অচানক মিলিয়ে গিয়েছিলেন৷ আমার ধারণা, তাঁদের হদিশ যদি আমরা পেয়ে যাই, পাসাংকে খুঁজে পেতেও অসুবিধা হবে না৷’

‘উড়ন্ত লামা?’ পরিদাদু অবাক হয়ে তাকালেন তাসির দিকে, ‘তুমি যে লিখেছিলে, ওই দুই পর্যটক ঠিক কী যে উড়তে দেখেছিল, তা স্পষ্ট করে বলতেই পারেনি৷’

‘হ্যাঁ, তাই লিখেছিলাম’, তাসি মাথা নাড়লেন, ‘কারণ আমি নিজেও ব্যাপারটা সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম না৷’

‘তা হলে এখন নিশ্চিত হচ্ছ কী ভাবে?’

‘এখনও নিশ্চিত নই৷ আমি অনুমান করছি, ওই দুই বাঙালি পর্যটক গ্যানচেম্পো গুম্ফার রহস্যময় লামাদেরই দেখেছিল৷’

‘গ্যানচেম্পো গুম্ফা ?’ পরিদাদু অবাক হয়ে বললেন, ‘এ অঞ্চলে এমন গুম্ফার নাম তো কই শুনিনি আগে!’

‘তিব্বত থেকে একদল লামা পালিয়ে এসে বড় গোপনে নির্মাণ করেছিলেন এই গুম্ফা৷ সে গুম্ফা এখনও সাধারণ মানুষের দৃষ্টির বাইরেই থেকে গেছে’, বলেই একদম চুপ করে গেলেন তাসি৷

তাসির কথামতোই নয়া কাংগাকে ডান দিকে রেখে পথ চলা শুরু হল৷ পরিদাদু শাওনের এক্কেবারে পাশে পাশেই হাঁটছিলেন৷ তাসি যথারীতি এগিয়ে গেছেন শাওনদের থেকে৷ লাঞ্চ ব্রেকের পর থেকেই পরিদাদুকে কেমন যেন গম্ভীর লাগছিল শাওনের৷ এখন পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে শাওন দেখল, তাঁর ভ্রু দুটো আগের থেকেও বেশি কুঁচকে গেছে৷ খুব গভীরভাবে কিছু একটা যেন ভাবছেন পরিদাদু৷ অন্যমনস্কতায় একবার নরম বরফে পাও ঢুকে গেল তাঁর৷

শাওন নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে পরিদাদু?’

পরিদাদু চাপা গলায় বললেন, ‘একটা খটকা লাগছে রে শাওন৷’

‘কী খটকা পরিদাদু?’ শাওন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল৷

‘তাসি সত্যি কথা বলছে না’, পরিদাদু চিন্তিত মুখে বললেন, ‘ওর কথায় বিশ্বাস করে দুম করে চলে আসাটা বোকামিই হয়ে গেল মনে হচ্ছে৷ আমি নিশ্চিত তাসি কিছু একটা লুকোচ্ছে আমাদের কাছ থেকে?’

‘তোমার হঠাৎ এমন কেন মনে হচ্ছে পরিদাদু?’

‘যে সময় লাঞ্চ করছিলাম আমরা, তাসিকে দেখে অস্বাভাবিক কিছু মনে হয়নি তোর?’

‘কী বলো তো?’

‘ভেবে দেখ, ক-দিন আগে তাসির অতি নিকটজন পাসাং হারিয়ে গেছে রহস্যজনকভাবে৷ পাসাং তাসির এতই প্রিয় যে তাকে খুঁজতে প্রাণ বাজি রেখে এই দুর্গম এলাকায় পাড়ি দিয়েছে সে৷ তা হলে তার মনে এত ফুর্তি আসে কোথা থেকে?’

‘ঠিক তো!’ শাওন বলে, ‘যতই আমরা এই পথে এগোচ্ছি, ততই লোকটা যেন আরও চনমনে হয়ে উঠছে৷ একটু আগে মনের আনন্দে শিস দিচ্ছিল তাসি আংকল৷’

‘সে আনন্দ কি শুধুই পাসাংকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনার কথা ভেবে?’

‘তুমি কি কিছু সন্দেহ করছ পরিদাদু?’

‘ঠিক সন্দেহ নয়, তবে একটা সম্ভাবনা৷’

‘কী সম্ভাবনা পরিদাদু?’

তাসির চিৎকারে পরিদাদু ফিরে তাকালেন৷ শাওনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হল না তাঁর৷ নরম বরফের এই উপত্যকায় এখানে ওখানে ছড়ানো ছিটানো অজস্র কালচে পাথর মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে বরফের মধ্যে থেকে৷ কিছুক্ষণ ধরেই অমন পাথর দেখলেই কাছে গিয়ে সেগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করছিলেন তাসি৷ আইস অ্যাক্স দিয়ে পাথরের ওপরের বরফ সরিয়ে সরিয়ে কী যেন খুঁজছিলেন তিনি৷ পরিদাদু একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কী অত খুঁজছ হে তাসি?’

‘পরিমল সাব, এই পাথরগুলো গ্যানজালার পথের দিক নির্ণায়ক৷ বুঝতেই তো পারছেন, এই নরম বরফ বড় বিপজ্জনক৷ যে কোনও সময় এর মধ্যে আপনি কোমর পর্যন্ত ডুবে যেতে পারেন৷ চোরাবালির মতো বরফের মধ্যে পুরোপুরি তলিয়েও যেতে পারেন তেমন অসতর্ক হলে৷ এই পাথরগুলো আসলে মাইলস্টোন বুঝলেন তো? আগের অভিযাত্রীরা চিহ্ন দিয়ে রেখেছেন, কোন পথে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে৷’

‘ও’, পরিদাদু মাথা নেড়েছিলেন৷ তারপর বলেছিলেন, ‘আচ্ছা, এমন কোনও বরফের আস্তরণ দেওয়া লুকনো গহ্বরের মধ্যে তলিয়ে যায়নি তো পাসাং?’

‘হো সাকতা, জরুর হো সাকতা’, তাসি মাথা নাড়তে নাড়তে বলেছিল৷ তবে তার কণ্ঠে খুব একটা উদ্বেগ বা শোক ফুটে উঠতে দেখা যায়নি৷

এখন যতখানি উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠলেন তাসি, বুঝতে অসুবিধা হয় না, সে উচ্ছ্বাস শুধুমাত্র গ্যানজালার পথের হদিশ পাওয়ার জন্যে নয়৷

পরিদাদু এবং শাওন দুজনেই যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব, তাসির কাছে পৌঁছলেন দ্রুত পা চালিয়ে৷ তাসি উত্তেজনায় থরথর করে কাঁপছিল৷ পরিদাদু পাশে এসে দাঁড়াতেই তাসি তাঁর দিকে ফিরলেন৷ তাঁর চোখদুটো যেন সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছিল৷ পরিদাদুর হাত দু’খানা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিয়ে তাসি প্রায় অনুনয়ের সুরে বলে উঠলেন, ‘আসা করছি সঠিক জায়গায় এসে পৌঁছেছি আমরা৷ এইবার আমার একখানা কাম করে দিতে হবে পরিমলবাবু৷’

‘কী কাজ?’ তাসির দিকে চেয়ে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷

তাসি উঁচু হয়ে থাকা একখানা কালচে চ্যাটালো পাথরের ওপরে বসে পড়ল৷ তারপর বলল, ‘বাপ পিতামহের কাছে ছোটবেলা থেকেই গ্যানচেম্পো গুম্ফার কথা শুনে আসছি আমরা সব্বাই৷ তাঁরা বলতেন, গ্যানচেম্পো শৃঙ্গের আশপাশেই কোথাও সেই লুকনো গুম্ফার অবস্থান৷ সবাই বিশ্বাস করে, সে গুম্ফা সোনাদানা আর হাজার বহুমূল্য রত্নে ঠাসা৷ আর সেখানে যে লামারা থাকেন, তাঁরা মায়াবী৷ পাখির মতো উড়তে পারেন তাঁরা৷ চাইলে দিনকে রাত আর রাতকে দিন বানিয়ে দিতেও পারেন৷ যুগ যুগ ধরে সেই লামাদের সন্ধান করে এসেছি আমরা৷ সেই গুম্ফারও৷ কিন্তু আজ পর্যন্ত না দেখতে পেয়েছি সেই উড়ন্ত লামাদের, না সন্ধান পেয়েছি সেই গুম্ফার৷ সম্প্রতি ওই দুই বাঙালি পর্যটকের কথা শুনে আমার এবং পাসাং-এর মনে হয়েছিল, তারা ওই লামাদের কাউকেই উড়তে দেখেছিল এখানকার আকাশে...’

‘দাঁড়াও, দাঁড়াও’, পরিদাদু মাঝপথে থামিয়ে দিলেন তাসিকে, ‘পাসাং-এর মনে হয়েছিল বললে না এক্ষুনি? তার মানে এখান থেকে ফিরে যাবার পরেও পাসাং-এর সঙ্গে তোমার যোগাযোগ হয়েছিল?’

তাসি থমকালেন৷ তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘হয়েছিল৷ সে নরম বরফের মধ্যে আটকে পড়েছিল একটা পাথরের আড়ালে৷’

‘তারপর?’

‘প্রায় গলা পর্যন্ত বরফের মধ্যে ঢুকে গিয়ে সে একা যখন এই অভিশপ্ত নরম বরফের উপত্যকায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে, তখনই যেন মাটি ভেদ করে একজন লামা উঠে এসে দাঁড়াল তার সামনে৷’

‘তিনিই উদ্ধার করলেন পাসাংকে?’ শাওন জিজ্ঞেস করল৷

‘হ্যাঁ’, মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন তাসি, ‘তারপর তিনিই তাকে এক অজানা সুড়ঙ্গ পথে কিয়াংজিনে পৌঁছে দিয়ে যান৷’

‘বেশ তো’, পরিদাদু বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘তা হলে আমাকে শুধু শুধু মিথ্যে কথা বলে এত দূরে টেনে নিয়ে এলে কেন তুমি?’

‘বলছি’, বলে বুক ভরে খানিক দম নিলেন তাসি৷ তারপর বললেন, ‘কিয়াংজিন পৌঁছনোর পর সেই সুড়ঙ্গ পথ আর দেখতে পায়নি তাসি৷ পথের মুখটা যেন উবে গিয়েছিল মুহূর্তের মধ্যে৷ সেই লামা চলে যাওয়ার আগে পাসাং-এর হাত চেপে ধরে তিনটি কথা বলেছিলেন, ‘আমাদের আশীর্বাদ রইল৷ গ্যানচেম্পোর কাছে ঋণী থেকো আজীবন৷ লোভীরা গ্যানচেম্পোকে খুঁজতে এলে বিপদ৷’

‘অদ্ভুত ব্যাপার তো!’ শাওন একটা পাথরের ওপরে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে বলে৷

‘অদ্ভুত ব্যাপারের বাকি আছে শানুবাবু’, তাসি চোখ গোল গোল করে বলেন, ‘সন্ন্যাসী অদৃশ্য হবার পর যে হাত সন্ন্যাসী ধরেছিলেন, সে হাতের মুঠো খোলে পাসাং৷ আর তখনই চোখে পড়ে, সেখানে একটা চকচকে টাকার মতো কিছু৷ সে টাকার ধাতুটা অজানা৷ সেটা তামাটে কিন্তু ভীষণ উজ্জ্বল৷ তার ওপরে একটা অদ্ভুত চিহ্ন আঁকা ছিল৷ ঠিক যেমন চিহ্ন আঁকা রয়েছে এই পাথরটার গায়ে’, বলেই যে পাথরটা দেখে ভীষণ উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলেন তাসি, তার পাশটিতে এসে দাঁড়ালেন৷

‘সবই তো বুঝলাম’, পরিদাদু কড়া গলায় বললেন তাসিকে, ‘কিন্তু আমাকে কী সাহায্য করতে হবে সেটাই তো বুঝতে পারলাম না৷’

‘পরিমলবাবু, আপনি আমাকে গ্যানচেম্পো গুম্ফায় ঢোকার পথটা খুঁজে দেবেন৷’

‘আমি?’ অবাক হয়ে বললেন পরিদাদু, ‘যে গুম্ফার সন্ধান কেউ পায়নি আজ পর্যন্ত, তার সন্ধান আমি কী করে পাব?’

‘আপনাকে আমি জানি৷ কত দুঃসাহসিক অভিযানে আপনি সফল হয়েছেন এর আগে৷ আমার বিশ্বাস এবারেও আপনি নিশ্চিত সফল হবেন৷ আর সেইজন্যেই আমার বিপদের কথা বলে আপনাকে মেল করেছিলাম৷ জানতাম, সত্যি কথাটা বললে আপনি আসতেন না৷’

‘সত্যিই আসতাম না’, পরিদাদু বললেন৷

‘যাক গে ওসব কথা’, তাসি হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘এসেই যখন পড়েছেন, জায়গাটা খুঁজে দিন আমাকে৷’

‘আমার পক্ষে সত্যিই এ কাজ দুরূহ’, পরিদাদু বোঝানোর চেষ্টা করলেন তাসিকে, ‘বরং পাসাং এ কাজে খানিক সাহায্য করতে পারত তোমায়...’

‘পাসাংকে অনেকবার বলেছিলাম আমি৷ সে রাজি হয়নি৷ বরং বার বার বোকার মতো বোঝাতে চেয়েছে আমায়, গ্যানচেম্পোর পথ খুঁজতে চাইলে সেখানকার প্রাচীন লামাদের অভিশাপ লাগবে৷ ওই উপত্যকা থেকে ফেরা হবে না আমার...’

‘তুমি তার কথা শুনলে না কেন?’ পরিদাদু আবার জিজ্ঞেস করলেন৷

‘খানিকটা কৌতূহল আর বাকিটা—’ বলে একটু থামলেন তাসি৷ তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘একটা লোভনীয় বিজনেস ডিল৷’

‘বিজনেস ডিল?’ অবাক হয়ে বলেন পরিদাদু৷

‘হুঁ’, তাসি ঠান্ডা গলায় বলেন, টাকার অঙ্কটা কম নয়৷ আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পায়রোতে একটা হোটেল বানানোর৷ জায়গাটা ভারি সুন্দর৷ ওখান থেকে গোঁসাইকুণ্ড যাওয়ার পথ৷ বিদেশিরা পায়রো উপত্যকায় থাকতে খুব পছন্দ করে৷ গ্যানচেম্পোর রাস্তাটা দেখিয়ে দিলে সিন জিং-এর দেওয়া টাকায় পায়রোতে আমি নিজস্ব হোটেলটা বানিয়ে ফেলতে পারব৷’

‘সিন জিং কে?’ পরিদাদু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷

‘তিনি একজন চিনা অভিযাত্রী৷ আমার পরিচিত৷ প্রায়ই তিনি গ্যানজালা গিরিবর্ত্মের এই পথে আসেন৷ ল্যাং ট্যাং, কিয়াংজিন, গ্যানজালা, তারকেঘিয়াং, তিম্বু; এই রুটটা দীর্ঘদিন ধরেই একেবারে চষে ফেলছেন তিনি...’

‘আশ্চর্য!’ পরিদাদু দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট চেপে ধরলেন৷

শাওনের বুকের মধ্যে গুড়গুড় করছিল৷ মন বলছে কিছু একটা বিপদ ঘটতে চলেছে তাদের৷ আর ঠিক তখনই, যে চড়াই ভেঙে একটু আগেই নেমে এসেছে তারা, সেখান থেকে আর একজন ছোটখাটো কিন্তু শক্ত সমর্থ চেহারার মানুষ নেমে এসে দাঁড়ালেন পরিদাদুদের সামনে৷ বুঝতে অসুবিধা রইল না, ইনিই সিন জিং৷

বরফ ফুঁড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাথরটার গায়ে অদ্ভুত কিছু নকশা চোখে পড়ল৷ তাসি বললেন, ‘মুদ্রাটার গায়ে এমন নকশাই আঁকা ছিল, আমার স্পষ্ট মনে আছে৷’

পরিদাদু গম্ভীর মুখে চারদিকে ঘুরে ঘুরে পাথরটাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন৷ মাঝে মাঝে পাথরটার গায়ে বিভিন্ন জায়গায় হাত বুলিয়ে দেখতে লাগলেন পরিদাদু৷ তাঁর মুখ ক্রমশই গম্ভীর হয়ে উঠছে৷ তাসির দেখানো পাথরটা ছাড়াও অন্য যে পাথরগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে রয়েছে, সেগুলোকেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন তিনি৷

সিন জিং আদেশের স্বরে বললেন, ‘ফালতু টাইম ওয়েস্ট করছেন কেন মিস্টার চ্যাটার্জি? তাসি তো একটা পাথরকে আইডেন্টিফাই করেই ফেলেছে৷’

পরিদাদু সিন জিং-এর কথার উত্তর দিলেন না৷ ঘুরে ঘুরে পাথরগুলো দেখতেই থাকলেন৷ তাসিও বললেন এইবার, ‘পরিমলবাবু, বেলা পড়ে আসছে৷ দ্রুত কাজ করতে হবে আমাদের৷ আকাশ কালো করে মেঘ জমছে৷ বৃষ্টি শুরু হলেই নতুন করে বরফ পড়তে শুরু করবে এইখানে৷ বরফের এই চোরাবালি পেরনো অসম্ভব হয়ে যাবে তখন৷’

পরিদাদু একটা পাথরের ওপরে একেবারে ঝুঁকে পড়েছিলেন৷ তাসির কথায় সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ালেন৷ ধীর পায়ে তাসি এবং সিন জিং-এর সামনে হেঁটে এসে তিনি বললেন, ‘আমার মনে হয়, এক্ষুনি আমাদের এ জায়গা থেকে চলে যাওয়া উচিত৷ নরম বরফের এই প্রান্তর সত্যিই অভিশপ্ত তাসি৷’

‘মানে? ইয়ার্কি নাকি?’ সিন জিং রেগে গিয়ে বলে উঠলেন, ‘গ্যানচেম্পোর এত কাছে এসেও আমরা ফিরে যাব? আপনি কি পাগল নাকি মশাই?’

‘গ্যানচেম্পো গুম্ফা যেমন গুপ্ত আছে, তেমনই থাকতে দিন৷ তাতেই সকলের মঙ্গল’, পরিদাদু দৃঢ় গলায় বললেন, ‘তাসি, আমি এই কাজে থাকতে চাইছি না৷ শাওনকে নিয়ে আমি ফিরে যেতে চাই৷’

‘পরিমলবাবু ভেবে দেখুন’, তাসি বোঝানোর চেষ্টা করলেন, ‘সিন জিং যে টাকা আমাকে দেবেন, তার একটা অংশ আমি আপনাকে দেব৷ প্রমিস৷ বিশ্বাস করুন, বিনা পারিশ্রমিকে আপনার সাহায্য নেবার মতলব আমার নেই৷’

‘টাকার লোভ আমার নেই তাসি’, পরিদাদু আবার বললেন, ‘তাছাড়া তুমি মিথ্যে কথা বলে ডেকে এনেছ আমাকে৷ অসৎ এবং মিথ্যুক মানুষের সঙ্গ আমি অপছন্দ করি৷’

‘তাই?’ তাসির গলার আওয়াজটা হঠাৎ করেই কেমন যেন বদলে গেল৷ পায়ে পায়ে শাওনের কাছে এগিয়ে এসেই কোমরে গুঁজে রাখা কুকরিটা এক টানে বের করে ফেললেন তাসি৷

শাওনকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে আর এক হাতে কুকরিটা তার গলায় ঠেকালেন তাসি৷ পরিদাদুর দিকে চেয়ে বিচ্ছিরি রকম মুখ করে হেসে তিনি বললেন, ‘আশা করি এইবারে আপনি আর অবাধ্য হবেন না৷’

তাসি শাওনের গলায় কুকরিটা ধরতেই বেশ ঘাবড়ে গেলেন পরিদাদু৷ নিজের মৃত্যুতে তিনি ভয় পান না৷ সেনাবাহিনীতে চাকরি করার সময় থেকেই মৃত্যুর জন্যে সর্বদা প্রস্তুত থাকতেই তিনি অভ্যস্ত৷ কিন্তু তাঁর জন্যে শানুর যদি কোনও বড় বিপদ হয়ে যায়, ফিরে গিয়ে খুকুকে কী সান্ত্বনা দেবেন তিনি? ভাবনাটা মাথায় আসতেই পরিদাদুকে চমকে দিয়ে তাঁর কানের পাশ থেকে কে যেন স্থির, গম্ভীর স্বরে বলে উঠলেন, ‘চিন্তার কারণ নেই৷ গ্যানচেম্পো ভালো মানুষদের রক্ষা আর লোভী মানুষদের শাস্তি দিয়ে এসেছে চিরকাল৷ তোমাদের কোনও ক্ষতি হতে দেব না৷’

পরিদাদু এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলেন না৷

কণ্ঠস্বর আবার বললেন, ‘আমার প্রকট হবার সময় এখনও আসেনি৷ সূক্ষ্মে থেকে যা বলতে বলব তোমাকে, বলে যাও৷’

‘আচ্ছা’, অস্ফুটে বললেন পরিদাদু৷

তাসির হাতের শক্ত বাঁধনে থেকেও শাওন দেখতে পেল সিন জিং-এর হাতেও ততক্ষণে একটা চকচকে আগ্নেয়াস্ত্র উঠে এসেছে৷ দেখলেই বোঝা যায়, যন্ত্রটা দেখতে ছোট্ট হলেও কাজে কম ভয়ঙ্কর হবে না৷ সিন জিং অস্ত্রটা পরিদাদুর মাথার দিকে তাক করলেন৷ তারপর ধমকে উঠে বললেন, ‘কথা না বলে কাজ শুরু করুন এইবার৷’

শাওনের ভয় করছিল খুব৷ বেলা মরে আসছে৷ আকাশ দ্রুত কালো মেঘে ভরে যাচ্ছে৷ এখন যেখানে রয়েছে তারা, টেন্ট পিচ করা অসম্ভব৷ সঙ্গে দু’জন অস্ত্রধারী উন্মাদ৷ শাওন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল পরিদাদুর দিকে৷ পরিদাদু কথা বললেন না৷ কিন্তু চোখের ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন শাওনকে৷ চোখের ভুল কি না কে জানে, এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তার মনে হল, পরিদাদুর ঠোঁটের কোণে যেন এক চিলতে হাসি আটকে আছে৷

তাসিও চিৎকার করে উঠলেন এইবার, ‘পরিমলবাবু, কুইক৷ কাজ শুরু করুন৷ হাতে আর বেশি সময় নেই আমাদের৷’

পরিদাদু তাসির দেখিয়ে দেওয়া পাথরটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ তিনবার প্রদক্ষিণ করলেন পাথরটাকে৷ তারপর মনে মনে কী একটু হিসেব করে নিয়ে বললেন, ‘পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি কোণ করে পঁয়তাল্লিশ পা৷’

‘চালাকি করার চেষ্টা করলে কিন্তু ছেড়ে কথা বলব না আমরা’, সিন জিং বললেন৷ তাসি নরম গলায় বললেন, ‘আমি আপনার ক্ষতি চাই না পরিমলবাবু৷ কিন্তু সিন জিং আপনাকে রেয়াত করবেন না৷’

পরিদাদু কথা না বলে চুপচাপ এগোতে শুরু করলেন৷ শাওনও অন্যদের সঙ্গে চলতে লাগল দুরু দুরু বুকে৷ পরিদাদু যেখানে থামলেন, সেখানেও একটা কালচে পাথরের থাম্বা৷ সেই পাথরের গা থেকে বরফ সরিয়ে দেখা গেল তার ওপরেও কিছু ছবি আঁকা৷ আগের পাথরের থেকে এই ছবি কিছুটা অন্য রকম৷

তাসি বললেন, ‘এইবার?’

পরিদাদু বললেন, ‘নিজের বাঁ দিকে আবার ষাট ডিগ্রি বেঁকে ষাট পা৷’

মোটামুটি একটা চতুর্ভুজ সম্পূর্ণ করে পরিদাদু থামলেন৷ তাঁকে ক্লান্ত দেখাচ্ছিল৷ থেমে থেমে তিনি বললেন, ‘গ্যানচেম্পোর রহস্য ভেদ না করে ফিরে যাও তাসি৷’

তাসি এবং সিন জিং দু’জনেই হেসে উঠলেন৷ পরিদাদুর কপালে অস্ত্রটা চেপে ধরে সিন জিং বললেন, ‘দরজাটা কোথায় বলো৷’

‘এই যে এইখানে’, একটা গমগমে কণ্ঠস্বরে সকলেই চমকে ফিরে তাকাল৷

এক জ্যোতির্ময় পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন একটু আগে সম্পূর্ণ করা চতুর্ভুজটির মাঝমধ্যিখানে৷ এই প্রবল ঠান্ডাতেও একটিই গৈরিক বস্ত্র তাঁর গায়ে৷ মুণ্ডিত মস্তক অনাবৃত৷ সিন জিং আর তাসির দিকে চেয়ে তিনি হাসলেন, ‘তোমরা গ্যানচেম্পোর রত্নভাণ্ডার লুট করতে চাও?’

‘না, আমরা সেই গুপ্ত গুম্ফাকে আবিষ্কার করতে চাই’, সিন জিং বললেন৷

লামার ফর্সা মুখ হাসিতে ভরে উঠল, ‘বেশ৷ উত্তম অভিপ্রায়৷ তা হলে এগিয়ে এস৷ এই চতুর্ভুজের ঠিক মাঝখানে, যেখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি, সেইখানে এসে দাঁড়াও তোমরা৷’

‘ওখানেই কি প্রবেশ পথের দরজা?’ তাসি জিজ্ঞেস করল৷

‘হ্যাঁ’, সন্ন্যাসী হাসলেন, ‘কিন্তু সামনে দাঁড়িয়েও সে দরজা অনেকেই দেখতে পায় না৷’

‘কেন?’

‘শুদ্ধ চিদঅণু দিয়ে তৈরি সে দরজা নিজেই নিজের অধিকারীকে চিনে নেয়৷ যারা লোভ নিয়ে আসে, যারা অসততা ও অসূয়া নিয়ে আসে, গ্যানচেম্পোর দরজা তাদের জন্যে খোলে না৷’

‘মানি না এইসব বুজরুকি’, চেঁচিয়ে উঠল সিন জিং, ‘কত কাল ধরে খুঁজে বেড়াচ্ছি এই গুপ্ত দরজা৷ আজ যখন পেয়েছি, আর ছাড়ব না কিছুতেই’, গ্যানচেম্পো গুম্ফার লামার দিকে রিভলভারটা তাক করলেন সিন জিং৷

‘না, না, না’, শাওন চিৎকার করে উঠল৷ তাসির হাত ছাড়িয়ে ছুটে গেল সে সন্ন্যাসীর দিকে৷ সিন জিং-এর হাত তখন ট্রিগারে৷

পরিদাদুও লাফিয়ে গিয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন লামা আর শাওনকে আড়াল করে৷ যা হয় তাঁর হোক৷

‘তা হলে তুইই আগে মর শয়তান’, পরিদাদুর দিকে ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে বলল সিন জিং৷ রিভলভারের ট্রিগারে তর্জনির চাপ পড়ল৷ আর তখনই আকাশ চিরে গোলাপি বিদ্যুতের রেখা ছড়িয়ে পড়ল এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে৷ সঙ্গে বিকট শব্দে বজ্রপাত৷ দূরের কিমশুন আর ইয়ানসা তেনজি পর্বতশৃঙ্গে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল সেই শব্দ৷ সিন জিং-এর হাতে রিভলভার ধরাই থাকল৷ মুহূর্তের মধ্যে যেন কালো কাঠকয়লায় রূপান্তরিত হল সে৷ টুপ টাপ বৃষ্টি নামল৷ বৃষ্টির ফোঁটা বরফ হয়ে জমে যেতে লাগল সেই কালচে মূর্তির ওপরে৷

তাসি ঠকঠক করে কাঁপছিলেন৷

পরিদাদু লামাকে বললেন, ‘ওকে ক্ষমা করে দিন৷’

‘লোভীদের ক্ষমা হয় না’, লামা গম্ভীর গলায় বললেন, ‘যারাই লোভ নিয়ে এসেছে, তারা সকলেই এখানে কালো পাথরের থাম্বায় রূপান্তরিত হয়েছে৷ তুমি তো নিজেই তাদের পরীক্ষা করে দেখেছ৷’

শাওন পরিদাদুর দিকে ফিরে বিস্ময়জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘ওই কালো পাথরগুলো সব তাহলে...’

‘হ্যাঁ, মানুষেরই দেহাবশেষ’, পরিদাদু মাথা নাড়লেন৷ তাসি দু’হাত জড়ো করে ক্ষমা ভিক্ষা চাইছিলেন বার বার৷

লামা বললেন, ‘ঠিক আছে, প্রাণ ভিক্ষা দিলাম৷ কিন্তু পাহাড়ের পথে আর কখনও হাঁটার ক্ষমতা থাকবে না তোমার৷’

যা দুর্যোগ শুরু হয়েছিল, পরিদাদুদের বেঁচে ফেরা কঠিনই হত সে রাতে৷ গ্যানচেম্পো গুম্ফার সেই আশ্চর্য লামা রাতটুকুর জন্যে গুম্ফারই বাইরের অংশে আশ্রয় দিয়েছিলেন তাঁদের৷ রাতের খিদে মেটানোর জন্য সুস্বাদু খাবারও দিয়েছিলেন সব্বাইকে৷ তারপর রাত পোহানোর আগে তিনিই গোপন গুহাপথে তাঁদের এনে ছেড়ে দিয়েছিলেন নিরাপদ অঞ্চলে৷ ফিরতি পথে রওনা দেবার আগে মুখে স্মিত হাসি নিয়ে একবার তাসিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন সন্ন্যাসী, ‘গ্যানচেম্পোর রত্নভাণ্ডারটা একবার চোখে দেখে যাবে নাকি হে?’

শিউরে উঠে প্রাণপণে দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে তাসি বলেছেন, ‘কক্ষনও না, একদম না৷’

বাড়ি ফিরে আসার সপ্তা তিনেক পরে তাসির ফোন এসেছিল৷ বিচ্ছিরি একটা দুর্ঘটনায় দুটো পাই ভেঙে গুঁড়িয়ে গেছে বেচারার৷ তার মধ্যে একটা ঠিক হবে হয়তো, কিন্তু অন্যটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে হাঁটুর ওপর থেকে৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%