জয়দীপ চক্রবর্তী
সুছন্দা প্রথমটা আপত্তিই করেছিলেন৷ পরিদাদু প্রস্তাবটা দিতেই নাক সিঁটকে বলে উঠেছিলেন, ‘এতদিন ঘরবন্দি থাকার পর বেড়াতেই যদি বেরোই, অমন ঘরের মধ্যে আটকে থাকতে যাব কেন? তার চেয়ে বরং গ্যাংটক চলো, সঙ্গে পেলিং টেলিং-ও ঘুরে আসা যাবে৷ তা না হলে সিমলা টিমলা...’
অরুণাংশু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কেন হলং-এ সমস্যাটা কোথায় তোমার?’
‘ওই যে পরিকাকু বলল শুনলে না, জায়গাটা একেবারে নিরিবিলি৷ জলদাপাড়ার জঙ্গলের বলতে গেলে একেবারে মাঝ মধ্যিখানেই৷ কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়েই হাতি-টাতি দেখা যেতে পারে কপাল ভালো থাকলে...’
‘সেটাই তো ভালো৷ অমন জায়গাতেই তো মানুষ বেড়াতে যায় পয়সা খরচা করে৷ প্রকৃতির কোলে থাকা৷ নাগরিক আওয়াজ-টাওয়াজ কানেই আসবে না দু’-তিনটে দিন৷ রাতের অন্ধকার চিরে ঘরের মধ্যে শুয়ে শুয়েই হাতির ডাক শুনব৷ ভোরবেলা ময়ূরের ডাকে ঘুম ভাঙবে...’
‘ময়ূরের ডাককে কী বলে, জানিস শানু?’ অরুণাংশুর কথার মাঝখানেই জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷
‘হুঁ জানি’, শাওন হাসল, ‘কেকা৷’
‘ভেরি গুড’, পরিদাদুর গলায় তারিফ ফুটল, ‘আর হাতির ডাক?’
‘বৃংহন—’
‘বাঃ৷’
‘মুখে মুখে বাংলা শব্দছক শুরু করলে নাকি পরিকাকু?’ টি টেবলের ওপরে চায়ের ট্রে-টা নামিয়ে রাখতে রাখতে সুছন্দা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘একটু লোকজন দোকান-পাট না থাকলে বেড়াতে যেতে ভালো লাগে? ফিরে এলেই চেনা-জানা বন্ধু প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করবে বেড়াতে গিয়ে কী কিনে আনলুম৷ তখন কী জবাব দেব তাদের?’
‘ঠিকই তো’, পরিদাদু গম্ভীর গলায় মাথা নেড়ে নেড়ে বলতে লাগলেন, ‘খুকুর এই সমস্যাটার কথা তো আমার মাথায় আসেনি আগে৷ এ সত্যিই ভারী গভীর সমস্যা হে অরুণ...’
কথাটা শেষ করে এমন মুখ করে তাঁর দিকে চাইলেন পরিদাদু যে অরুণাংশু হো হো করে হেসে উঠলেন৷
সুছন্দা রেগে গেলেন৷ মুখ ভার করে বললেন, ‘খালি আমাকে নিয়ে মজা করো তোমরা পরিকাকু৷ একদম ভাল্লাগে না আমার...’
পরিদাদু এবারে সত্যি সত্যিই গম্ভীর মুখে তাকালেন সুছন্দার দিকে, ‘আমি বলছি৷ তুই দেখে নিস খুকু, জায়গাটা ভালো লাগবে তোর৷ শোন, দৈনন্দিন জীবনের একঘেয়েমি কাটাতেই তো প্রকৃতির কাছে আশ্রয় চাই আমরা৷ সেই নির্মল আশ্রয়ে নিজের কাছে ফেরার খানিক অবকাশ পায় মানুষ৷ বাইরের দশ রকম কৃত্রিম আওয়াজে সেই নিভৃতি যে ছিঁড়ে যায়—’
‘ডুয়ার্সে তুমি তো আগেও গেছ৷ ভালো লাগেনি বলো?’ অরুণাংশুও পরিদাদুর সঙ্গে সুর মিলিয়ে বললেন সুছন্দার দিকে চেয়ে৷
‘তা লেগেছে৷ তবে আমার বাপু নিরিবিলি জায়গার থেকে একটু জমজমাট জায়গাই বেশি ভালো লাগে’, সুছন্দা হাসলেন, ‘এছাড়াও আর একটা কারণও ভাবছি৷’
‘কী কারণ?’ পরিদাদু চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘তোমার সঙ্গে যেখানেই গেছি সুখে শান্তিতে বেড়ানো তো কপালে জোটেনি কখনও৷ একটা না একটা ঝঞ্ঝাট ঠিক এসে জুটেছে৷ চারপাশে লোকলস্কর থাকলে তবু বিপদের সময় খানিক সাহায্যের আশা থাকে৷ কিন্তু ওই বনে বাদাড়ে...’
পরিদাদু এত জোরে হো হো করে হেসে উঠলেন যে সুছন্দার বাকি কথা চাপা পড়ে গেল৷
অরুণাংশু এবারে কিন্তু সুছন্দার কথাতেই সায় দিলেন, ‘তোমার এ কথাটা সত্যিই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না খুকু৷ পরি যেখানেই যায় কোনও না কোনও একটা রহস্যকে নেমন্তন্ন করে সঙ্গে নিয়ে যায়৷’
‘সে রহস্য সমাধানের পরে মনে মনে একটা রোমাঞ্চ আসে কি না সে কথাটাও বলো৷’ পরিদাদু মুচকি মুচকি হাসছেন এখনও৷
‘রোমাঞ্চ না ছাই’, সুছন্দা মুখটাকে বেঁকিয়ে বলেন, ‘একবার করে তোমার সঙ্গে বাইরে বেরোই আর টেনশনে ভুগে ভুগে দু’-পাঁচ বছর করে আয়ু খুইয়ে ফিরে আসি৷’
‘তা হলে আমার সঙ্গে তোদের আর না বেরনোই বোধহয় ভালো’, পরিদাদুর হাসিটা মুখ থেকে দপ করে নিভে গেল৷
শাওন দেখল, এ তো মহা বিপদ হল৷ মায়ের এমন বেফাঁস মন্তব্যে ট্যুরটাই না বাতিল হয়ে যায়৷ তাছাড়া সত্যিই যদি পরিদাদুর সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়ে আর পাঁচজন সাধারণ মানুষেরই মতো ঘুরে বেড়িয়ে ফিরে আসে তা হলে তো তার আর মনই ভরবে না৷ পরিদাদুর সঙ্গে নানান অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়ে সে ইতোমধ্যেই বন্ধু এবং শিক্ষক মহলে একটা আলাদা পরিচিতি এবং সম্ভ্রম পাচ্ছে আজকাল৷ পরিদাদু মায়ের কথায় সত্যি সত্যিই যদি তাকে ছাড়াই অভিযানে বেরোতে শুরু করেন, তা হলে তার এই বাড়তি সম্মান যে ধুলোয় মিশে যাবে আর কদিন পর৷ ট্যুরটা যাতে বাতিল না হয়ে যায় সেইজন্য সে তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা পরিদাদু, এই হলং জায়গাটা ঠিক কোনখানে বলো তো?’
‘যে বাংলোতে থাকার প্ল্যান করছি সেটা নিউ জলপাইগুড়ি রেল স্টেশন থেকে খুব বেশি হলে একশো কুড়ি পঁচিশ কিলোমিটার৷ জঙ্গলের অন্তত আট-দশ কিলোমিটার ভেতরে অনেকখানি জায়গা জুড়ে কতকগুলো ছড়ানো ছিটানো কটেজ বানিয়ে চমৎকার ব্যবসা করছেন মিস্টার ঘোষ৷ আমাকে হোয়াটস অ্যাপে কটেজগুলোর ছবি পাঠিয়েছিলেন ভদ্রলোক৷ বাঁশের কাজ করা দেওয়াল, সিলিং... খোলামেলা লন, ব্যাডমিন্টন কোর্ট, বার বি কিউ-এর বন্দোবস্ত, সব মিলিয়ে বিউটিফুল অ্যামবিয়েন্স৷ ভদ্রলোক বললেন, সম্প্রতি তিনি নাকি একটা ওয়াচ টাওয়ার বানিয়েছেন৷ সেখান থেকে হরিণ, ময়ূর, গাউর টাউর তো দেখা যায়ই, এমনকি মাঝেমধ্যেই হাতির দল এবং জলদাপাড়ার বিখ্যাত একশৃঙ্গ গন্ডারও এসে দেখা দিয়ে যায় সামনের জঙ্গল থেকে কটেজের সামনে উঁকি ঝুঁকি মেরে...’
‘দারুণ ব্যাপার তো’, উত্তেজনায় হাততালি দিয়ে উঠে বলল শাওন৷
‘দারুণ বলে খুব তো লাফিয়ে উঠছিস’, শাওনের দিকে চেয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন সুছন্দা, ‘আর যদি ওগুলো বাংলোর মধ্যে ঢুকে পড়ে?’
‘তা অবিশ্যি পড়ে মাঝেমধ্যে’, চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে নিয়ে বললেন পরিদাদু, ‘তার জন্যেই সন্ধে থেকে সারা রাত্তির পাহারাদারির ব্যবস্থা রয়েছে ওখানে৷ আর রাতে কটেজের সামনের যে লন, তার ওপাশের জঙ্গলের পথে পা বাড়ানো স্ট্রিক্টলি প্রহিবিটেড৷’
পরিদাদুর কথা শুনে গা ছমছম করে উঠল শাওনের৷ আবার আনন্দও হল খুব৷ সত্যিই যদি হলং-এর কটেজের বারান্দায় বসে সামনের জঙ্গলে হাতির পাল বা গন্ডার দেখা যায়, তা হলে ফিরে এসে স্কুলে গিয়ে বন্ধুদের কাছে জমিয়ে গল্প করা যাবে৷
এতক্ষণে বোধহয় সুছন্দাও মনে মনে খানিক উৎসাহ পেয়েছেন৷ হাতের কাজ তাড়াতাড়ি সেরে নিয়ে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে পরিদাদুর পাশে এসে বসলেন তিনি৷ তারপর আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই যে একটু আগে মিস্টার ঘোষ না কার কথা বললে যেন পরিকাকু, তা এই ভদ্রলোককে পেলে কোথা থেকে?’
‘ফেসবুক’, পরিদাদু হাসলেন, ‘অনেকেই এইসব আধুনিক গ্যাজেটগুলোকে তোড়ে গাল পাড়ে শুনতে পাই৷ আমি কিন্তু বাপু বলি, বিজ্ঞান আমাদের যে সুযোগগুলো দিচ্ছে সেগুলোকে চুটিয়ে ব্যবহার করে নেওয়াই ভালো৷ তবে হ্যাঁ, দেখতে হবে সেই ব্যবহার যেন সুব্যবহার হয়৷ বিজ্ঞানের অপব্যবহার বড় ভয়ংকর, বড় আত্মঘাতি...’
‘ঠিক’, মাথা নেড়ে সায় দিলেন অরুণাংশু৷
এতসব কথা শোনার আগ্রহ ছিল না শাওনের৷ সে জিজ্ঞেস করল, ‘যাওয়াটা তা হলে হচ্ছে তো মা?’
‘হচ্ছে, আলবাত হচ্ছে’, পরিদাদু তার পিঠে আলতো চাপড় মেরে বললেন৷ তারপর সুছন্দার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী বলিস খুকু, যাওয়া হচ্ছে তো?’
‘চলো, ঘুরেই আসা যাক’, বলে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন সুছন্দা, ‘তবে একটা শর্ত আছে আমার৷’
‘এর মধ্যে আবার শর্তের কথা আসছে কেন?’ অরুণাংশু বিরক্ত হয়ে বললেন৷
‘কারণ আছে’, বলে হাসলেন সুছন্দা৷
‘কী শর্ত?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘আমরা কিন্তু নিছক বেড়াতেই যাব পরিকাকু৷’
‘আমারও তাই ইচ্ছে’, পরিকাকু নিজেও হাসলেন, ‘কিন্তু পরিস্থিতির ওপরে তো আর সবসময় আমার নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না—’
শাওনের তর সইছিল না৷ অরুণাংশুর দিকে চেয়ে সে বলল, ‘এত কম সময়ের মধ্যে টিকিট পাওয়া যাবে বাবা?’
‘দেখছি’, বলেই মোবাইলটা হাতে নিয়ে তার স্ক্রিনের ওপরে চোখ রাখলেন অরুণাংশু৷
‘হলং পান্থ নিবাস’ মূল রাস্তা থেকে অনেকই ভিতরে৷ কিন্তু এখান থেকে জাঙ্গল সাফারি করার ক্ষেত্রে সুবিধে একটু বেশি৷ যেখান থেকে সরকারিভাবে এলিফ্যান্ট সাফারি হয়, সে জায়গাটা এখান থেকে দূরে নয়৷ এখন অবশ্য জঙ্গল সাফারি বন্ধ৷ সেপ্টেম্বর মাসের পনেরো তারিখের পর আবার সাফারি চালু হবে৷ ভারতবর্ষের সমস্ত জঙ্গলেই এই নিয়ম৷ বর্ষার শুরু থেকে এই তিন মাস জঙ্গলের পশু-পাখিদের নিজেদের মতন থাকতে দেওয়া হয়৷ মানুষ তাদের এলাকায় ঢুকে পড়ে অহেতুক বিরক্ত করতে পারে না৷
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনের বাইরেই গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল৷ আলুয়াবাড়ি পেরোতেই পরিদাদু ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে নিয়েছিলেন ফোনে৷ পরিদাদুর বন্ধু ঘোষ আঙ্কল হোয়াটস অ্যাপ করে ড্রাইভারের নাম, ছবি, ফোন নম্বরের সঙ্গে গাড়ির নম্বরও দিয়ে দিয়েছিলেন৷ ড্রাইভারের বয়েস খুব বেশি নয়৷ দেখে মনে হল পঁচিশ-ছাব্বিশ৷ ঝকঝকে মুখ, স্মার্ট৷ ট্রেন থেকে নেমে মস্ত ব্রিজটা পেরিয়ে নিচে নামতেই ছেলেটাকে দেখতে পাওয়া গেল৷ জিন্সের ওপরে মেরুন রঙের টি শার্ট পরে দাঁড়িয়েছিল৷ মাথায় জিন্সের ক্যাপ৷ দূর থেকে শাওনদের দেখতে পেয়েই ছেলেটা হাত নাড়তে লাগল হাসি মুখে৷
পরিদাদু তাকে দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন, ‘যাক চিন্তা নেই৷ সঞ্জীব একদম ঠিক সময়ে এসে গেছে৷’
সঞ্জীব ছেলেটি বেশ চটপটে৷ দ্রুত শাওনদের লাগেজগুলো গাড়ির মাথায় তুলে দিয়ে শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলল৷ তারপর পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘ট্রেন থেকে কি সকালের চা খেয়ে নেমেছেন, নাকি দাঁড়াব? এক রাউন্ড চা খেয়ে নিয়েই তা হলে রওনা দিই আমরা?’
অরুণাংশু বললেন, ‘এখানে চা খাওয়ার জন্যে সময় নষ্ট না করে তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে পড়ি বরং৷ পথে একটা ভালো জায়গা দেখেই দাঁড়ানো যাবে৷ চা টিফিন একসঙ্গেই করে নেব আমরা৷’
দু’হাত নেড়ে একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল সঞ্জীব, ‘রথীনকাকু আমাকে খুন করে ফেলবেন৷ গাড়ি নিয়ে বেরনোর সময় বার বার করে বলে দিয়েছেন রাস্তায় যেন একদম দেরি না করি৷ আপনাদের জন্যে ব্রেকফাস্ট রেডি করে অপেক্ষা করবেন উনি৷’
‘রথীনকাকু?’ সুছন্দা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘মিস্টার ঘোষ’, পরিদাদু বললেন, ‘ওঁর পুরো নাম রথীনকুমার ঘোষ৷ একসময় কলকাতাতেই থাকতেন৷ সক্রিয় রাজনীতিও করতেন আট-নয়ের দশকে৷ এখন সব ছেড়েছুড়ে বনবাসী হয়েছেন৷’
পরিদাদুর কথা শুনে সঞ্জীব হেসে উঠল, ‘ভালোই বলেছেন৷ বনবাসীই বটে৷ বছর সাতেক হবে কাকু এখানে জায়গা কিনে এই হোটেল-টোটেল বানিয়েছেন৷ কিন্তু এর মধ্যেই আশপাশের আদিবাসী গ্রামগুলোতে তুমুল জনপ্রিয়তা তৈরি করে নিয়েছেন৷ এখানকার গরিবগুর্বো মানুষ রথীনকাকুকে দেবতার চোখে দেখে৷’
‘কেন?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন, ‘খুব দান-ধ্যান করেন নাকি ভদ্রলোক, নাকি রাজনীতির জীবন ভুলতে না পেরে এখানেও গরিব কল্যাণের উদ্দেশ্যে ট্রেড ইউনিয়ন টিয়ন...’
‘না না সেসব কিছু না’, সঞ্জীব পাশের দোকান থেকে চায়ের কাপ নিতে নিতে বলে, ‘রাজনীতি থেকে কাকু এখন শত যোজন দূরের মানুষ৷ তিনি কোনও রাজনৈতিক রং ছাড়া একজন মানুষ হিসেবেই এখানকার গাঁ-গঞ্জের আদিবাসী মানুষের জন্যে কী না করেন! ওষুধ -বিষুধ, বাচ্চাদের জামাকাপড়, খাবার এসব তো আছেই, এদের মধ্যে কত লোককে যে কাজ দিয়েছেন কাকু তার হিসেব নেই কোনও...’
‘কী কাজ?’ চা ভর্তি কাগজের কাপে সাবধানে চুমুক দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷
‘যার যেমন যোগ্যতা’, বলে একটু থামল সঞ্জীব৷ তারপর বলল, ‘যেমন আমাকে তিনি এই ড্রাইভারের কাজটা দিয়েছেন৷ বিশ্বাস করে আমার হাতেই এ গাড়িটা ছেড়ে রেখেছেন দিন-রাত...’
‘আর কাকে কী ধরনের কাজ দিয়েছেন? হোটেলেরই কাজ, নাকি অন্য কিছুও৷ মানে আমি বলতে চাইছি...’
‘ওই, আবার শুরু হয়ে গেল’, পরিদাদুকে কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলেন সুছন্দা, ‘বাংলায় একটা প্রবাদ আছে না, স্বভাব যায় না ম’লে... তোমার হয়েছে তাই৷ অমনি গোয়েন্দাদের মতো জেরা শুরু করে দিলে ছেলেটাকে৷
‘না না জেরা টেরা নয়’, পরিদাদু অপ্রস্তুত গলায় বলেন, ‘এমনিই কৌতূহল৷’
‘তোমার সব বিষয়ে এত কৌতূহল কেন বলো দেখি পরিকাকু? ছেলেটা কী ভাববে তোমায়?’
‘না না, এতে ভাবার কী আছে মাসিমা?’ সঞ্জীব হেসে বলল৷
‘তা রথীনবাবুর কলকাতার বাড়িটা কি নেই আর, বিক্রি করে দিয়েছেন?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদুর দিকে চেয়ে৷
‘না, না, বাড়িটা আছে৷ ওঁর ছেলে বউমা থাকেন কলকাতার বাড়িতে৷ ছেলে কলকাতা থেকে এই রেসর্টের অনলাইন বুকিং টুকিংগুলো সামলায়৷ রথীনবাবু নিজে ডাকসাইটে মানুষ হলে কী হবে তেমন একটা টেকশ্যাভি নন...’
‘আচ্ছা’, অরুণাংশু মাথা নাড়লেন৷
‘ভদ্রলোক কি একাই থাকেন এখানে?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘ওঁর স্ত্রী থাকেন’, পরিদাদু হাসলেন, ‘দু’জনেই বেজায় প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ৷ শহরের ভিড় থেকে দূরে এখানে জমি কিনে রেসর্ট বানিয়েছেন৷ ব্যবসাও হচ্ছে, নিজেদের থাকার জন্যেও সম্প্রতি দিব্যি সুন্দর একটা দোতলা বাড়ি বানিয়ে নিয়েছেন ভদ্রলোক৷ তোফা আছেন৷ কলকাতা যাওয়ার নামও মুখে আনতে চান না চট করে...’
‘সত্যিই তাই’, সঞ্জীব মাথা নেড়ে সায় দেয়, ‘দৈবাৎ যদি যানও কলকাতায়, সে ওই দু’তিনদিনের জন্যে৷ কাকু বলেন, শহরের হাওয়ায় ওঁর দম আটকে আসে৷ নিশ্বাস নিতে পারেন না৷ কাকিমাও তাই৷ দু’জন দু’জনের একেবারে যোগ্য পার্টনার বলতে পারেন৷’
গাড়িটা বেশ কিছুক্ষণ আগেই পাকা রাস্তা ছেড়ে লালচে কাঁকর বিছানো রাস্তা দিয়ে চলতে শুরু করেছে৷ দু’দিকেই গাছপালা ক্রমশ ঘন হচ্ছে৷ গাছের ডালে দারুণ সুন্দর কয়েকটা পাখি বসে থাকতে দেখল শাওন৷ একবার একটা গাঢ় নীল আর বাদামি মেশানো ছোট্ট পাখি দেখে মাকে ডেকে শাওন বলল, ‘মা দেখ পাখিটা কী সুন্দর!’
সঞ্জীব মাথা না ঘুরিয়েই গাড়ি চালাতে চালাতে বলল, ‘পুরো ডুয়ার্স জুড়ে কত যে পাখি আছে তার ইয়ত্তা নেই৷ ইদানীং মোবাইল টাওয়ার ফাওয়ার বসিয়ে পাখি খানিক কমেছে ঠিকই, তবু যা আছে তা দেখলেও চোখ জুড়িয়ে যায়৷’
‘ঠিক’, সায় দেন পরিদাদু, ‘আমার কয়েকজন বন্ধু আছে বার্ড ওয়াচার৷ ওরা তো সুযোগ পেলেই গলায় ক্যামেরা ঝুলিয়ে এদিকে চলে আসে৷’
বাঁ দিকে বেঁকে বেশ কিছুটা পথ এগিয়ে সঞ্জীব গাড়িটাকে ডান দিকের খানিক নিচু পথটায় নামিয়ে দিতেই রেসর্টের বড় গেটটা চোখে পড়ল৷ রথীনবাবু এবং তাঁর স্ত্রী দু’জনেই দাঁড়িয়েছিলেন গেটের কাছে৷ গাড়ি গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকে দাঁড়াতেই এগিয়ে এলেন তাঁরা৷ শাওনরা গাড়ি থেকে নামতেই রথীনবাবু এগিয়ে এসে দু’হাত বাড়িয়ে পরিদাদুর হাতদুটো চেপে ধরলেন৷ আন্তরিক গলায় বললেন, ‘পথে কষ্ট হয়নি তো?’
‘এক্কেবারেই না’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আপনার ব্যবস্থাপনার তারিফ করতেই হয়৷’
‘ব্যবসার স্বার্থে এটুকু তো করতেই হয়’, দরাজ গলায় হেসে উঠলেন ভদ্রলোক অরুণাংশু-সুছন্দাদের দিকে চেয়ে, ‘পরিমলবাবু বিখ্যাত মানুষ৷ তিনি ফিরে গিয়ে আমার রেসর্ট সম্পর্কে পাঁচজনের কাছে যদি গুড রিভিউ দেন, সে তো আমারই লাভ...’
অরুণাংশু হেসে উঠলেন তাঁর কথা বলার ভঙ্গিতে৷ সুছন্দারও মানুষটাকে ভালো লাগছিল৷ এই জায়গাটাও৷ ভারি সুন্দর সাজানো গোছানো রেসর্ট৷ গেট দিয়ে ঢুকেই ডান দিকে কিচেন কাম ডাইনিং৷ আর একটু এগিয়ে বাঁ দিকে ঘুরেই সারি দিয়ে কটেজগুলো৷ সিঙ্গলরুম এবং ডাবল রুম দু’ধরনের কটেজেরই বন্দোবস্ত রয়েছে৷ শাওনদের জন্যে ডাবল রুম কটেজ বুক করা আছে৷ রথীন ঘোষ হেঁকে বললেন, ‘এই সঞ্জু, চ্যাটার্জিবাবুদের লাগেজ তিন নম্বরের বারান্দায় পৌঁছে দাও৷ দুটো রুমের যে ঘরে যাঁরা থাকবেন, তাঁদের লাগেজ বারান্দা থেকে নিয়ে নেবেন ঘরে৷’
শাওনরা কটেজের দিকে এগোতেই আর একবার দাঁড় করালেন রথীন ঘোষ, ‘একটা কথা৷ ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ... বাইরের জুতো বারান্দায় খুলে ঘরে ঢুকবেন, প্লিজ... আর দ্রুত ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং রুমে চলে আসবেন৷ ব্রেকফাস্ট রেডি৷’
ব্রেকফাস্টে গরম গরম লুচি, সবজি, ডিমের ওমলেট আর মিষ্টি৷ রথীন আঙ্কলের স্ত্রী মঞ্জুকাকিমা এগিয়ে এসে শাওনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘রান্না পছন্দ হয়েছে তো শানুবাবু?’
‘খুউব’, শানু মাথা নাড়ল৷
কাকিমা মানুষটিকে ভারী ভালো লেগে গেছে শাওনের৷ মায়ের সঙ্গেও এর মধ্যেই খুব ভাব হয়ে গেছে তাঁর৷ সুছন্দাকে চোখ পাকিয়ে বলে দিয়েছেন তিনি, ‘আমাদের একদম আপনি আজ্ঞে করা যাবে না৷ আমি নিজে ফর্মালিটি করতে পারি না৷ কেউ অযথা অতিরিক্ত ফর্মাল হলে সহ্যও করতে পারি না৷ তুমি বাপু বয়েসে আমার চেয়ে ঢের ছোট৷ আমি তাই তোমাকে নাম ধরে ডাকব আর তুমি আমাকে মঞ্জুদি এবং তুমি বলবে৷’
‘বেশ৷ তাই হবে’, সুছন্দা হেসে একদিকে ঘাড় কাত করেন, ‘পরিকাকু আর উনি আমাকে খুকু বলে ডাকেন৷ তুমিও তাই বলে ডেকো৷’
পরিদাদু খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডাইনিং রুমে তো শুধু আমরাই৷ আপনার পান্থশালায় আর কোনও অথিথি নেই বুঝি?’
‘আছেন একজন’, রথীন বললেন, ‘আপনাদের ঠিক পাশের সিঙ্গল কটেজে৷ খুব ইন্টারেস্টিং লোক মশাই৷’
‘কেন?’
‘তিনি তান্ত্রিক৷ পিশাচসিদ্ধ৷ ভূত প্রেত তাঁর কথায় ওঠে বসে একেবারে৷’
‘অ্যাঁ—’ চমকে উঠে বলেন সুছন্দা৷
‘হ্যাঁ’, মঞ্জু মাথা নাড়লেন, ‘মাঝে মাঝে আসেন এখানে৷ দু’চারদিন থেকে যান৷ এবারে এসেছেন আজ দু’দিন হল৷ পেল্লায় চেহারা৷ লাল লাল চোখ, পরনে কালো জোব্বা৷ গোঁফ দাড়িতে ঢাকা মুখ৷ দেখলেই ভয় করে৷ কোন্নগরে আশ্রম৷ তবে সেখানে থাকেন তিনি খুব কম সময়েই৷ সারা ভারতের সমস্ত জঙ্গল আর পাহাড় পর্বত পরিক্রমা করে বেড়ান৷ এখন এখানে এসেছেন আসাম থেকে৷ বললেন, এই জঙ্গলের ধারে যে প্রাচীন শ্মশান আছে, সেখানে নাকি কীসব গুহ্য ক্রিয়া আছে তাঁর৷ কাল রাতে সঞ্জুকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন৷ বলেছিলেন আজও বেরোবেন৷ গাড়ির জন্যে বাড়তি পে করে দেবেন আমায়৷’
‘ইন্টারেস্টিং’, পরিদাদুর ভ্রু কুঁচকে গেছে, ‘কাল রাতে কোথায় গিয়েছিলেন সঞ্জীব কিছু বলেছে?’
‘উঁহু’, দু’দিকে মাথা নাড়লেন রথীন, ‘বেশ কিছুটা পথ গিয়ে সঞ্জুকে দাঁড় করিয়ে রেখে একা অন্ধকারে ঢুকে গিয়েছিলেন জঙ্গলের পথে৷ সঞ্জুকে বারবার সাবধান করে দিয়েছিলেন, সে যাতে আর না এগোয়৷’
‘কেন?’ কৌতূহলী হয়ে বলে শাওন৷
‘ওঁদের সাধনপথটা তো খুব সুবিধের নয়’, চোখে মুখে সম্ভ্রম ফুটিয়ে তুলে বললেন রথীন ঘোষ, ‘মারণ, উচাটন, বশীকরণ কত সব ভয়ংকর কাজ করেন ওঁরা মন্ত্র-তন্ত্র দিয়ে...’
‘মারণ, উচাটন আবার কী জিনিস?’ শাওন অবাক হয়ে বলে৷
‘ওসব বড় গোলমেলে জিনিস’, মঞ্জু ভয় পাওয়া গলায় বললেন, ‘মানুষের ক্ষয়ক্ষতিও হয় ওসব বিদ্যের সাহায্যে৷ আমি বাপু ভদ্রলোককে এক্কেবারে ঘাঁটাই না৷ যখন আসেন নিজের মতো থাকেন৷ যা খেতে চান, ব্যবস্থা করে দিই৷ রাতের খাবার বরাবর উনি নিজের ঘরে নেন৷ আমি কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিই...’
‘উনি তার মানে এখানে নতুন নন?’ পরিদাদু চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করেন৷
‘উঁহু’, মাথা নেড়ে বলেন রথীন, ‘আগে বার তিনেক এসেছেন৷ হুট করেই আসেন৷ দিন তিন-চার থাকেন৷ আবার চলে যান৷’
‘এই যে তিন-চারবার এসেছেন, সেটা কত দিনের মধ্যে?’
‘কেন বলুন তো?’
‘না এমনিই, কৌতূহল৷’
‘তা ধরুন গত দু’আড়াই বছরের মধ্যে৷’
‘পিক সিজনে অমন হুট করে এলে ঘর খালি পাওয়া তো মুশকিল এখানে৷’
‘খুব পিক সিজনে উনি আসেন না৷ বলেন, সংসার ছাড়ার পর মানুষের থিকথিকে ভিড় নাকি নিতে পারেন না আর৷ তাছাড়া যেহেতু সিঙ্গল কটেজ নেন ভদ্রলোক, সাধারণত অসুবিধা হয় না৷ এখানে সাধারণত টুরিস্টরা আসে হয় ফ্যামিলি নিয়ে তা নাহলে বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে৷ কাজেই ডাবল রুম ফ্যামিলি কটেজের চাহিদাই বেশি থাকে৷ যেমন কটেজ আপনাদের দেওয়া হয়েছে৷ সিঁড়ি দিয়ে বারান্দায় উঠে দু’হাতে দুটো ঘরের দরজা৷ দুটো ঘরই অ্যাটাচড বাথ, ডাবল বেড... সিঙ্গল কটেজগুলো ছোট৷ স্পেশালি যেটায় উনি থাকেন, সেটা খানিকটা ইউনিকই বলা যেতে পারে...’ বলে ভদ্রলোক থেমে গেলেন৷ মাথা নিচু করলেন৷ তাঁর মুখে যেন খানিক ছায়া ঘনাল৷
মঞ্জু নরম গলায় বললেন, ‘আসলে এই প্রোজেক্টটা শুরু করেছিলেন আমার কত্তা আর তাঁর বাল্যবন্ধু মানস মিত্র, এই দু’জনে মিলে৷ মানসদা বিয়ে-থা করেননি, ব্যাচেলর৷ এই সিঙ্গল বেডেড কটেজটা বানানো হয়েছিল তাঁর নিজের থাকার জন্য৷’
‘তিনি কোথায়? তাঁকে তো দেখলাম না?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷ ব্রেকফাস্ট শেষ হয়েছে৷ রথীন ঘোষ কিচেনের দিকে চেয়ে হাঁক মারলেন, ‘এই চা রেডি কর৷’ তারপর পরিদাদুর দিকে ফিরে বললেন, ‘দুধ, চিনি সব থাকবে তো চায়ে?’
‘থাকবে’, পরিদাদু হাসলেন৷
‘হ্যাঁ, মানসবাবুর কথা বলছিলাম আমরা’, অরুণাংশু আবার বললেন, ‘তাঁর সঙ্গে তো আলাপ হল না আমাদের...’
‘সেই সুযোগ আর সে দিল কই?’ রথীন ঘোষ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, ‘বরাবরই মানস ছিল ডাকাবুকো আর বেপরোয়া৷ শেষ পর্যন্ত ওর ওই ডোন্ট কেয়ার ভাবই কাল হল...’
‘কেন?’ সুছন্দা চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে উঠলেন৷
‘জঙ্গলে থাকতে থাকতেই বুঝেছি প্রকৃতির সঙ্গে কক্ষনও চ্যালেঞ্জ করতে নেই৷ আর তুমি যতই সাহসী হও না কেন, জঙ্গলে থাকলে তোমাকে জঙ্গলের নিয়ম মেনে চলতেই হবে৷ অযথা বাহাদুরি দেখাতে গেলে বিপদ আসবেই৷ কতবার বারণ করেছি৷ কিন্তু মানস কোনওদিন আমার কথা কানেই তোলেনি৷ নিজের জীবন দিয়ে সে থামল অবশেষে...’ রথীনবাবুর গলা বুজে এল৷
‘কী হয়েছিল?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘এই কটেজগুলো পেরিয়ে পিছনের জঙ্গলের দিকে একটা ছোট্ট গেট আছে৷ আপনারা এখনও দেখেননি৷ দেখবেন ঘুরে টুরে৷ ওদিকটা ভারী সুন্দর৷ সামনেই ঘন জঙ্গল৷ ওয়াইল্ড নেচার যাকে বলে৷ ওই বেড়ার গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটু হেঁটে গিয়ে আমাদের জঙ্গলমহল, মানে নিজেদের থাকার বন্দোবস্ত’, মঞ্জু বলতে শুরু করলেন, ‘আগে ওদিকটা ফাঁকাই ছিল৷ আমরা মানসদার পাশের ডাবল রুমঅলা কটেজে থাকতাম তখন৷ মানসদা চলে যাওয়ার পর আর ওখানে থাকতে ইচ্ছে করল না৷ বছর খানেক হল এই বাড়িটা বানিয়ে উঠে এসেছি আমরা৷ একতলাটা ফাঁকাই থাকে৷ দু’জনে দোতলায় থাকি৷ বারান্দায় বসে জন্তু-জানোয়ার দেখি, তাদের ডাক শুনি৷ আমাদের এখন আর কলকাতা যেতে ইচ্ছে করে না৷ যাইও না বড় একটা...’
‘মানসবাবুর কী হয়েছিল?’ প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে দেখে পরিদাদু তাঁকে কথার খেই ধরিয়ে দিলেন৷
‘এখন আমাদের বাড়ি যেদিকটায়, ওখান থেকে আরও এগিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আধঘণ্টাটাক হেঁটে গেলে একটা নালা আছে৷ বর্ষার সময় ভালোই জল থাকে ওটায়, কিন্তু অন্য সময় প্রায় শুকনোই থাকে নালাটা৷ ওই নালায় জল খাবার জন্যেই বোধহয় ওয়াইল্ড অ্যানিম্যালের আসা যাওয়া আছে খুব৷ ওখানে বনদপ্তরের একটা পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ার আছে...’
‘পরিত্যক্ত কেন?’ পরিদাদু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘সে কথার উত্তর তো জানা নেই আমার পরিমলবাবু’, রথীন দু’দিকে মাথা নাড়ালেন, ‘ওটা বনদপ্তরের লোকেরাই বলতে পারবেন৷’
‘হ্যাঁ, ওয়াচ টাওয়ারটা নিয়ে কী যেন একটা বলতে চাইছিলেন আপনি’, অরুণাংশু রথীনকে আবার মূল বিষয়ে ফেরাতে চাইলেন৷
‘মানস মাঝেমধ্যেই সরু নালার কাছের ওই ওয়াচ টাওয়ারটার দিকে যাতায়াত করত...’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কিন্তু কেন?’
‘খেয়াল’, রথীনবাবু মাথা নাড়ালেন অসহায় ভঙ্গিতে, ‘ওই খেয়ালই কাল হল ছেলেটার৷ কতবার বারণ করেছি, আমি মঞ্জু দু’জনেই৷ কিন্তু কথা শুনলে তবে তো! নির্জনতার মধ্যে সে এই অরণ্যকে তার মতো করে নাকি আবিষ্কার করতে চাইত৷ ওয়াচ টাওয়ারটার টুকটাক মেরামতিও করিয়েছিল সে৷ ইচ্ছে হলেই একলা গিয়ে ওটার ওপরে বসে থাকত চুপটি করে৷ কখনও কখনও সারা রাত৷ অবিশ্যি রাতেও যে সে ওখানে যেত তা আমরা জেনেছি অনেক পরে৷ মানে যখন সবকিছু শেষ হয়ে গেল...’
‘ওয়াচ টাওয়ারটা এখনও আছে নিশ্চয়ই?’
‘আছে হয়ত৷ তবে সেটার কন্ডিশন এতদিনে নড়বড়ে হয়ে গেছে নিশ্চিত৷ ওদিকে মানুষের চলাচল এমনিতেই নেই৷ আগে গ্রামের দু একজন যদিও বা দিনের বেলা শুকনো পাতা বা কাঠকুটো কুড়োতে যেত এখন সেটাও বন্ধ৷’
‘কেন?’
‘মানসের মৃত্যুটা এমন ভয়ংকর ছিল...’ বলে একটু থমকালেন রথীন৷ তারপর নিচু গলায় বললেন, ‘আপনারা মানেন কি না জানি না, ইন ফ্যাক্ট আমি নিজেও মানতাম না আগে, কিন্তু মানস চলে যাওয়ার পর আমি নিজেও অনেকখানিই বদলে গেছি৷ গ্রামের লোকেদের কথা সত্যি হোক বা মিথ্যে, আর কখনও ওদিকে যাইনি৷ মানে যাওয়ার ইচ্ছেই করেনি কোনওদিন৷ ওখানে যাওয়ার কথা ভাবলেই বিচ্ছিরি একটা অস্বস্তি কাজ করে মনের মধ্যে৷ ভয় করে...’
‘ভয়?’ সুছন্দা বললেন, ‘কীসের ভয়?’
‘ভূতের’, লাজুক মুখে বললেন রথীন, ‘আপনারা মনে মনে নিশ্চিত আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবেন জানি৷ তবু আপনাদের সঙ্গে আমার রিলেশনটা অন্যরকম বলেই বলছি, মারা যাওয়ার পরেও মানস ওই ওয়াচ টাওয়ারের মায়া কাটাতে পারেনি৷ সন্ধের পরে বা নির্জন দুপুরে সে এখনও ওই ওয়াচ টাওয়ারে এসে বসে৷ গ্রামের এক-আধজন দেখেছে তাকে৷ আর সেই থেকেই জঙ্গলের ওদিকটা আমাদের কাছে বলতে গেলে একপ্রকার নিষিদ্ধই হয়ে গেছে ইদানীং...’
‘কিন্তু ওই ওয়াচ টাওয়ার তো আপনার পান্থশালার অন্যতম আকর্ষণ হতে পারত৷ ঠিকমতো জায়গাটাকে প্রোমোট করতে পারলে শুধু ওখানে যাওয়ার জন্যেই টুরিস্টরা আপনার পান্থশালায় আসার জন্যে ভিড় জমাত৷’
‘তাতে আমার বিপদ বাড়ত৷’
‘কেন?’
‘এই জঙ্গল খুব নিরাপদ নয় পরিমলবাবু৷ আর সেইজন্যেই তো মানস অমন বিচ্ছিরিভাবে...’ রথীন থেমে গেলেন৷ বিষাদের ছাপ পড়ল তাঁর চোখে-মুখে৷
‘মানসবাবু যখন ছিলেন, তখনও পান্থশালার টুরিস্টদের আপনারা অ্যালাও করতেন না ওয়াচ টাওয়ারে?’
‘আমি অন্তত এ ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহ দেখাতাম না’, রথীন দু’দিকে মাথা নাড়লেন, ‘অতি উৎসাহী কেউ মানসের কাছে ওয়াচ টাওয়ারের কথা শুনে জোর করলে সকালের দিকে নিয়ে যেতাম হয়তো৷ তবে তা কদাচিৎ৷ আমি সত্যি বলতে কী, ডিসকারেজই করতাম বোর্ডারদের৷ আর সেটা করতাম তাদের সেফটির জন্যেই৷ জঙ্গলের ওদিকটা হাতির নিত্যি আনাগোনা৷ তাছাড়া পাইথনের উৎপাতও আছে৷ বেড়াতে এসে আমার অতিথিদের মধ্যে একজনও যদি বিপদে পড়েন, সে রিস্ক কে নেবে বলুন? আমাদের টুরিস্ট বাংলোরই বদনাম হত তেমন কিছু হলে৷ ব্যবসারও দফারফা হত...’
‘হুঁ’, মাথা নাড়লেন পরিদাদু, ‘তা হলে ওই ওয়াচ টাওয়ারে মানসবাবু একাই যেতেন?’
‘হ্যাঁ৷ এবং যেটা ওর দোষ ছিল, ওখানে যাওয়ার সময় কক্ষনও আমাদের ও কিছু জানাত না৷’
‘কেন বলুন দেখি?’
‘আমরা যদি বারণ করি সেই ভয়েই হয়তো৷ আর এটা ঠিক, জানিয়ে যেতে গেলে বারণ আমরা নিশ্চিত করতাম...’
‘যেদিন ঘটনাটা ঘটেছিল, সেদিনও তার মানে আপনারা জানতেনই না যে কখন তিনি পান্থনিবাস থেকে বেরিয়ে গেছেন?’
‘না৷ একজন সুস্থ মানুষ রাতে একা ওই বিপজ্জনক জঙ্গলে যে ঢুকতে পারে, সে কথা ভাবতেই পারিনি আগে৷’
‘উনি রাতে ওখানে যে যেতেন, সে খবর আপনারা শেষ পর্যন্ত জানতে পারলেন কী করে?’
‘ওই ঘটনার পরে’, মঞ্জু বললেন, ‘সেদিনও মানসদা রাতে জঙ্গলে চলে গিয়েছিলেন৷ একা৷ শুধু হাতে একটা টর্চ আর একটা লাঠি নিয়ে৷ জঙ্গলে হাতির দলের সামনে পড়ে যান৷ পরদিন যখন বডি পাওয়া গেল, তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল একেবারে...’
‘ইশ—’ সুছন্দা বলে উঠলেন৷
‘বডি কে দেখতে পেয়েছিল প্রথম?’
‘গ্রামের লোক৷ এই যে আমাদের পান্থনিবাস দেখছেন, এর আশপাশে জঙ্গলের গায়ে গায়ে কিছু গ্রাম আছে৷ বলছিলাম না, ওরা দিনের বেলা জঙ্গলে ঢুকে শুকনো কাঠ, পাতা সংগ্রহ করে জ্বালানির জন্যে৷ ওদেরই চোখে পড়েছিল প্রথম৷ তারপর তো ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকজনও এল, তাদের নিয়ম-কানুন মোতাবেক কাজকর্ম করল...’ বলতে বলতে চুপ করে গেলেন রথীন৷ মঞ্জুও৷ পরিদাদুও আর কথা বাড়ালেন না৷
গেট দিয়ে একটা গাড়ি ভেতরে ঢুকে এসে দাঁড়াল৷ গাড়ির দরজা খুলে একজন ঝকঝকে যুবক এবং এক তরুণী নেমে এলেন৷ সঙ্গে চেন দিয়ে বাঁধা একটা পেল্লায় কুকুর৷
রথীন তাড়াহুড়ো করে উঠে পড়লেন, ‘আপনারা দেখছি আমার জন্যে খুবই লাকি অতিথি পরিমলবাবু৷ এখন সিজন নয়, আগে থেকে বুকিং-ও নেই, তবু আপনারা আসার পর থেকেই দেখছি নতুন বোর্ডার ঢুকছে আমার পান্থনিবাসে৷’
পরিদাদু লাজুক মুখে হাসলেন৷ এ কথার কোনও উত্তর দিলেন না৷
মঞ্জুও উঠে দাঁড়ালেন, ‘আসি৷ আমার বাড়িতে চলে আসুন বিকেলবেলা৷ দোতলার বারান্দা অথবা ছাদে বসবেন৷ জঙ্গলের ভালো ভিউ পাবেন৷ কপাল ভালো থাকলে বন্যপ্রাণীও চোখে পড়ে যেতে পারে...’
‘কী দেখা যাবে?’ শাওন উৎসাহ পেয়ে জিজ্ঞেস করল৷
‘ময়ূর আর হরিণ তো দেখা যাবেই৷ চাই কি হাতি, বাইসনের সঙ্গেও দেখা হয়ে যেতে পারে৷’
‘তাই নাকি?’ চোখ গোল গোল করে বলেন সুছন্দা, ‘বাড়ির এত কাছে হাতি চলে আসে বলছেন৷ আপনাদের ভয় করে না?’
‘নাহ’, মঞ্জু হাসলেন, ‘ওদের নিয়েই তো আছি৷ ওরা আমাদের প্রতিবেশীই বলতে পারেন৷’
‘ওরা তো বাড়ির চৌহদ্দিতেও ঢুকে পড়তে পারে?’
‘পড়তে পারে কী, পড়েই তো’, মঞ্জু স্বাভাবিক মুখে বললেন, ‘বাড়ির সামনে আমার কত্তা টুকটাক শাক সবজি ফলান৷ সেসবের ওপরে প্রায়ই নজর পড়ে ওদের৷ ক’দিন আগেই তো হাতি ঢুকে নিচের কল টল ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে গেছে৷’
‘সর্বনাশ’, সুছন্দার চোখে মুখে আতঙ্ক ফুটল৷
‘তবে কি জানেন তো, মানুষের মতো ভয়ঙ্কর এ পৃথিবীর কোনও জানোয়ারই হতে পারেনি আজ পর্যন্ত৷’
‘এ কথাটা কিন্তু এক্কেবারে ঠিক বলেছেন মিসেস ঘোষ’, পরিদাদু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘আমরা নিজেদের সভ্য বলে বড়াই করি বটে, কিন্তু নিজেদের কীর্তি-কলাপের জন্যে মানুষের সত্যিই লজ্জা পাওয়া উচিত৷ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের চেয়ে পশুরা ঢের বেশি ডিসিপ্লিনড৷’
‘মিসেস ঘোষ নয়, আমাকে মঞ্জু বলে ডাকবেন দাদা৷’
‘বেশ’, পরিদাদু হাসলেন৷
মঞ্জু দ্রুত পা চালিয়ে ডাইনিং হলের বাইরে চলে গেলেন নতুন বোর্ডারদের আপ্যায়ন করার জন্যে৷
পরিদাদু বললেন, ‘চলো যাওয়া যাক৷ আবহাওয়াটা ভারী সুন্দর৷ বনবাংলোর আশপাশের অঞ্চলটা খানিক ঘুরে দেখে আসি৷’
‘আমি যাব?’ শাওন জিজ্ঞেস করল৷
‘চল৷’ পরিদাদু তার পিঠে চাপড় মেরে বললেন, ‘তবে চপ্পল ছেড়ে পা ঢাকা জুতোটা পরে আয় চট করে৷ জঙ্গলে ঢুকতে গেলে পা ঢাকা জুতো কিন্তু মাস্ট৷’
‘তোমরা জঙ্গলে ঢুকবে মানে?’ সুছন্দা ভয়ার্ত কণ্ঠে বললেন, ‘এতক্ষণ কী শুনলে তা হলে?’
‘কী?’ পরিদাদু চোখ নাচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন হাসতে হাসতে৷
‘জঙ্গলটা মোটেও ভালো নয়৷ যে কোনও সময় হাতির পাল অ্যাটাক করতে পারে৷ মানসবাবুর কথা তো নিজে কানেই শুনলে...’
‘সে কথাটা মনে রাখলি আর আসল কথাটা ভুলে গেলি?’
‘কোন কথা?’
‘পশুরা মানুষের মতো ভয়ানক নয়...’
‘ফাজলামি কোরো না পরিকাকু৷ মনে রেখ, শানু তোমার সঙ্গে যাচ্ছে...’
‘শানু তোর মতো অমন ভীতু নয়’, সুছন্দাকে আরও রাগিয়ে দেওয়ার জন্যে বললেন পরিদাদু৷
‘পরিদাদু সঙ্গে থাকলে আমার কোনও বিপদ হতেই পারে না’, শানু আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে উঠল বুক চিতিয়ে৷
‘মুশকিলে ফেললি রে শানু’, পরিদাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘আমি তো আজকাল উলটো কথাটাই বিশ্বাস করি৷’
‘কী রকম?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে শাওন৷
‘আমি এখন বিশ্বাস করি, তুই সঙ্গে থাকলে আমার কোনও বিপদ হতেই পারে না৷’
‘যাঃ৷’
‘সত্যিই’, পরিদাদু হাসলেন, ‘তুই কি আর আগের মতো ছোট্টটি আছিস? এখন বড় হচ্ছিস৷ তোর ওপরে নির্ভর তো করতেই হবে আমাকে৷’
শাওনের খুব ভালো লাগছিল মনে মনে৷ সে ভাবছিল, একদিন সে নিজেই কত বিপদসংকুল জায়গায় যাবে একা একা৷ এ পৃথিবীতে আজও পর্যন্ত সমাধান না হওয়া কত যে রহস্য! পরিদাদুর মতো সেও বুদ্ধি দিয়ে, সাহস দিয়ে সেই সব রহস্যের জট খোলার চেষ্টা করবে একদিন একা একা, কারও সাহায্য না নিয়েই৷
পরিদাদু তার পিঠে আলতো চাপড় মারলেন, ‘আর দেরি নয়, চল৷ লাঞ্চের আগে ফিরে আসতে হবে৷ হাতে বেশি সময় নেই আমাদের৷’
হলং পান্থনিবাসের চৌহদ্দি পেরিয়ে একটু এগোতেই চারদিক একেবারে থমথমে হয়ে গেল৷ বড় বড় গাছ সোজা আকাশের দিকে উঁচু হয়ে উঠে গেছে৷ মূলত এখানে শাল আর সেগুন গাছই বেশি৷ আর এক ধরনের গাছও ডালপালা ছড়িয়ে রয়েছে আকাশের দিকে৷ তাদের তেমন পাতা নেই৷ ডালগুলোকে দেখলে মনে হয় যেন অসহায়ের মতো দু’হাত ছড়িয়ে রেখেছে তারা প্রার্থনার ভঙ্গিতে৷ তেমনই একটা গাছের ডালে একটা পেল্লায় ময়ূর পেখম ঝুলিয়ে বসেছিল৷ পরিদাদু শাওনকে বললেন, ‘এই জঙ্গলে প্রচুর ময়ূর আছে৷ অনেক গাছেই বাসা তাদের৷ গাছগুলোর দিকে নজর রাখিস৷ মাঝে মধ্যেই ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে৷’
শাওন অবশ্য মাথার ওপরে নজর রেখে হাঁটতে পারছিল না তেমন৷ জঙ্গল এখানে বেশ ঘন৷ সরু সরু জংলি গাছের ঝোপ সরিয়ে এগোতে হচ্ছে তাদের৷
পরিদাদু মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখলেন তাকে৷ হেসে জিজ্ঞ্যেস করলেন, ‘কী রে চলতে অসুবিধা হচ্ছে খুব?’
‘উঁহু৷’ শাওনও হাসল৷
‘ভয় পাচ্ছিস না তো?’ আবার জিজ্ঞ্যেস করলেন পরিদাদু৷
‘কীসের ভয়?’
‘এই জঙ্গলে, এখন আমরা যেখানে আছি, তার আশপাশে হাতি কিন্তু প্রায়ই আসে’, পরিদাদু থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন, ‘রথীনবাবু মিথ্যে বলেননি, তাঁর পান্থশালায় হাতি ঢুকে পড়া খুব অসম্ভব কিছু নয় রে শাওন৷’
শাওনও পরিদাদুর পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ পরিদাদুর নজর অনুসরণ করে দেখল একটু দূরেই হাতির দলের ঝোপ-জঙ্গল ভেঙেচুরে এগিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট চিহ্ন৷ এখানে ওখানে হাতির বিষ্ঠাও পড়ে রয়েছে৷ পরিদাদু বললেন, ‘খুব বেশিক্ষণ নয়৷ দেখে মনে হচ্ছে, ঘণ্টা খানেক, ঘণ্টা দুয়েক আগেই ওরা এই পথ দিয়ে চলে গেছে৷’
‘আমাদের কি এখন ওই পথে এগনো উচিত হবে পরিদাদু?’ শাওন নিচু গলায় জিগ্যেস করল৷
‘হ্যাঁ, এখনই বরং এগনোটা ঠিক হবে’, পরিদাদু আবার হাঁটা শুরু করলেন, ‘এক্ষুনি ওরা আর এই পথে ফিরবে না৷ এই সুযোগে চল, মানসবাবুর ব্যবহার করা ওয়াচ টাওয়ারটা দেখে আসি৷’
শাওন চমকে উঠল৷ পরিদাদুর দিকে চেয়ে উত্তেজিত গলায় সে বলে উঠল, ‘আমরা এখন সেই ওয়াচ টাওয়ারটা দেখতে যাচ্ছি?’
‘হ্যাঁ’, পরিদাদু না থেমে হাঁটতে হাঁটতেই উত্তর দিলেন৷
‘তুমি কি মানসবাবুর মৃত্যুর ব্যাপারে অস্বাভাবিক কিছু সন্দেহ করছ?’
‘আমি কিছুই সন্দেহ করছি না এক্ষুনি৷ স্রেফ কৌতূহল মেটাতে জায়গাটা দেখে আসতে চাইছি৷’
‘আমার কিন্তু তা মনে হচ্ছে না পরিদাদু৷’
‘কেন?’
‘নিছক কৌতূহল মেটানোর জন্যে যদি এখানে আসতে, তা হলে রথীন আঙ্কলের পান্থশালার লোকজন কাউকে নিয়েই তো আসতে পারতে তুমি৷ এমনকি সরাসরি রথীন আঙ্কলকেও বলতে পারতে, জায়গাটা তুমি দেখতে চাও৷ এমনকি এখানে আসার সময়ও তুমি কিন্তু কাউকে জানতে দাওনি আমরা এই ওয়াচ টাওয়ারটা দেখতে আসছি৷ আমার বাবা-মা পর্যন্ত জানে না...’
‘সাবাস’, পরিদাদু শাওনের পিঠে আলতো চাপড় মারলেন, ‘আর কিছুদিন পরে আমিই তোর অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে যাব৷’
‘ধ্যাত, কী যে বলো তুমি!’ লজ্জা পেয়ে গিয়ে বলে শাওন৷
পরিদাদু গম্ভীর মুখ করে বললেন, ‘তা হলে বুঝতেই যখন পারছিস সব, আপাতত ফিরে গিয়েও কাউকে বলা যাবে না, আমরা এদিকে এসেছিলাম...’
‘আচ্ছা’, মাথা নেড়ে সায় দিল শাওন৷
আর কয়েক পা এগোতেই ওয়াচ টাওয়ারটা চোখে পড়ল৷ ওয়াচ টাওয়ারের চারপাশে অনেকখানি জায়গাই বেশ ফাঁকা৷ গাছপালা নেই৷ জঙ্গলের মধ্যে গোল, ফাঁকা, পিকনিক করার জায়গার মতো৷ পরিদাদু শাওনকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ মোটা মোটা শালখুঁটির ওপরে গোলাকার ওয়াচ টাওয়ার৷ মাথায় টিনের আচ্ছাদন৷ একটা লোহার সিঁড়ি ছিল, কিন্তু সেটা জং ধরে ভেঙে গেছে নিচের দিকে৷ তবে ওপরের দিকে সিঁড়ির ধাপগুলো এখনও ব্যবহারযোগ্য৷ জংলি লতাপাতা সিঁড়ির লোহার রেলিং জড়িয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে৷ পরিদাদু ওয়াচ টাওয়ারের ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে রইলেন একটুক্ষণ৷ তারপর গম্ভীরভাবে চুপচাপ ঘুরতে লাগলেন তার চারপাশে৷
‘কিছু খুঁজছ?’ শাওন জিজ্ঞেস করল৷
‘তুইও খুঁজতে থাক’, পরিদাদু হাসলেন৷
‘কী?’
‘আপাতত টাওয়ারের ওপরে তাকিয়ে দেখ মানসবাবুর ভূতকে দেখতে পাস কি না৷ ভদ্রলোক সত্যিই যদি ভূত হয়ে এখানে এসে বসে থাকতেন, বড় উপকার হত৷ অনেক প্রশ্নের উত্তর সরাসরি তাঁর থেকেই জেনে নেওয়া যেত...’
শাওন হেসে ফেলল৷
‘হাসছিস যে বড়?’ পরিদাদুও গা দুলিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘ওরা যে ভূতের গপ্প টপ্প বলে এত ভয় পাওয়াতে চাইল আমাদের, সেটা গ্রাহ্যই করছিস না যে বড়?’
শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা পরিদাদু, ওরা আমাদের ভয় দেখাতে চাইছে কেন বলো তো?’
‘তার নির্দিষ্ট কারণ তো জানা নেই৷ তবে অন্তত এটুকু নিশ্চিত, ওরা চাইছে না আমরা এই ওয়াচ টাওয়ারের ধারে কাছে আসি৷’
‘কেন?’
‘হয়তো আমাদের নিরাপত্তার কারণেই’, বলতে বলতেই টাওয়ারের ভাঙা রেলিংদুটো ধরেই খানিকটা দোল খেয়ে সিঁড়ির কিছুটা ওপরে উঠে গেলেন পরিদাদু৷ তারপর আর একটু কসরত করে তিনি পৌঁছে গেলেন সিঁড়ির না-ভাঙা ধাপের ওপরে৷ শাওন অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি কি এটার ওপরে উঠবে নাকি?’
‘না হলে এত দূরে এসে তো কোনও লাভই হবে না শানুবাবু৷’
পরিদাদু তরতর করে উঠে গেলেন টাওয়ারের মাথার ওপরে৷ নিচে একা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পরেই কেমন যেন অস্বস্তি শুরু হল শাওনের মনে৷ স্পষ্ট মনে হল, একটু দূরের একটা ঘন ঝোপ হঠাৎ নড়ে উঠেই থেমে গেল আবার৷ গা শিউরে উঠল শাওনের৷ কেউ কি আড়াল থেকে লক্ষ রাখছে তাদের দিকে? যে লক্ষ রাখছে, সে তো ভালো লোক না হতেও পারে৷ লোকটা যদি এক্ষুনি আক্রমণ করে তাকে? পরিদাদুকে কি সে ডাকবে চিৎকার করে? পরক্ষণেই নিজেই নিজেকে শাসন করল শাওন৷ এমন ভীতু হলে তো চলবে না৷ পরিদাদুর সঙ্গে আগেও কতবার কত রকম বিপদের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে৷ সামান্য কারণে ভয় পেলে পরিদাদু তাকে এরপরে তো আর সঙ্গেই নেবেন না৷ শাওন ঠিক করল, ভয় না পেয়ে মাথাটাকে এখন ঠান্ডা রাখা দরকার৷
ঝোপটার দিকে নজর রেখেই একটু ঘুরে পিছন দিকে চলে গেল শাওন৷ একটা গাছের আড়ালে এমনভাবে দাঁড়াল, যাতে ঝোপ থেকে তাকে কিছুতেই আর দেখা না যায়৷ তারপর একটুখানি সময় অপেক্ষা করে নিচু হয়ে একটা মাটির ঢিল কুড়িয়ে নিয়ে সে সেটা হঠাৎই ছুঁড়ে দিল ঝোপটার দিকে৷ ঢিলটা ঠিক জায়গাতেই গিয়ে পড়েছে৷ ঝোপটার এক্কেবারে মাঝামাঝি৷ ঠিক তখনই একটা হরিণ ঝোপ থেকে লাফিয়ে বাইরে বেরিয়ে তির বেগে দৌড় দিল জঙ্গলের অন্যদিকে৷ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল শাওন৷ গাছের আড়াল ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল সে৷
পরিদাদুও টাওয়ারের ওপর থেকে নিচে নেমে এলেন৷ পরিদাদুর মুখ গম্ভীর৷ শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘কী দেখলে পরিদাদু?’
‘যা দেখলাম তা বড়ই গোলমেলে শানুবাবু’, পরিদাদুর ভ্রু কুঁচকে উঠল, ‘কিছু একটা ব্যাপার মানুষের চোখের আড়ালে এখানে ঘটছেই৷ আর যা ঘটছে, তা খুব ভালো ব্যাপার-স্যাপার মোটেই নয়...’
‘কী করে বুঝলে?’
‘রথীনবাবু টাওয়ারটাকে যতই পরিত্যক্ত বলে দেগে দিতে চান না কেন, এখানে মানুষের নিত্য আনাগোনা আছে৷’
‘তেমন চিহ্ন কিছু পেলে বুঝি ওপরে?’
‘পেলাম৷’
‘তুমি কি কাউকে সন্দেহ করছ?’
‘আমি তো এখন সকলকেই সন্দেহ করছি৷’
‘সকলকে মানে? রথীন ঘোষকেও?’
‘রথীন ঘোষ, তাঁর স্ত্রী মঞ্জু, ওই তান্ত্রিক, তারপর মনে কর কুকুর নিয়ে যাঁরা গাড়ি থেকে নামলেন৷ এমনকি সঞ্জীবকেও৷’
‘সঞ্জুদাকেও সন্দেহ করছ?’
‘হুঁ৷’
‘আমার সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে পরিদাদু৷’
‘আমারও’, বলেই পরিদাদু শাওনের দিকে ফিরলেন, ‘চল ফেরা যাক এইবার৷ নইলে দেরি হয়ে যাবে৷ আর হ্যাঁ, ওখানে পৌঁছনোর পর কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কোন দিকে গিয়েছিলি, বলবি জানকি রেসর্টের দিকে৷’
‘সেটা আবার কোন দিকে?’
‘আমাদের রাস্তার একদম উল্টোদিকে৷ আমরা জঙ্গলের পথে এখন সেদিকেই গিয়ে উঠব৷ টাওয়ারের ওপর থেকে এই এলাকার বেশ স্পষ্ট একটা ম্যাপ তৈরি করে ফেলেছি মনে মনে৷ বলেই শাওনের হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন পরিদাদু৷ বিশ-পঁচিশ পা এগোতেই জঙ্গলের মধ্যে দিব্যি একটা পথ চোখে পড়ল৷ সে পথে গাড়ি চলাচলের চিহ্ন স্পষ্ট৷ পরিদাদু সেই রাস্তা ধরে হাঁটতে লাগলেন৷
পরদিন সকাল থেকেই পরিদাদুকে একটু অস্থির লাগছিল৷ শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে?’
‘কিছু না’, বলে এড়িয়ে গেলেন পরিদাদু৷ যথারীতি ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে হাঁটতে বেরিয়েছিলেন তিনি৷ শাওন তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি৷ সে ঘুম থেকে উঠে ব্রাশ করতে করতে বাংলোর সামনের লন পেরিয়ে রথীন আঙ্কল যেদিকে থাকেন সেদিকে চলে গিয়েছিল একা একা৷ রথীন আংকলের বাড়ির পিছন দিকে জঙ্গল বেশ ঘন৷ তবে ভেতরে ঢোকা যেতেই পারে৷ লোক চলাচলের পায়ে হাঁটা হাল্কা পথের চিহ্নও চোখে পড়ল শাওনের৷ তার ইচ্ছে ইচ্ছে করছিল ভেতরে ঢোকার৷ কিন্তু ওদিকে কয়েক পা এগোতেই একটা লোক কোথা থেকে যেন হাঁ হাঁ করে ছুটে এল৷ পিছন দিক থেকে শাওনের হাত টেনে ধরে বলে উঠল, ‘ওদিকে যেও না৷ বোর্ডারদের ওদিকে যাওয়া মানা৷’
‘কেন?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শাওন৷
‘কিছুদিন আগে ওখানে মস্ত একটা অজগর দেখতে পাওয়া গিয়েছিল’, চোখ গোল গোল করে বলল লোকটা, ‘আমাদের একটা ছাগলকে গিলে নিয়েছিল সাপটা৷’
শাওন শুনে ভয় পেয়ে গিয়েছিল৷ ফিরে আসার সময় সে দেখল সঞ্জীবদার সঙ্গে রথীন আঙ্কলের খুব ঝগড়া হচ্ছে কিছু একটা বিষয় নিয়ে৷ রথীন আঙ্কল খুব চিৎকার করছিলেন৷ একটা কথাই শুধু কানে এল শাওনের৷ তিনি বারবার সঞ্জীবদাকে বলছিলেন, ‘শিবুর এত সাহস কী করে হয়? আমার পারমিশন ছাড়া কী করে সে গাড়ি নিয়ে যায় বাংলো থেকে? আর তোর জন্যে কী করিনি আমি? সেই তুইও শেষে শিবুর সঙ্গে হাত মেলালি? অনেকদিন ধরেই তোর মতিগতি ভালো লাগছে না আমার৷ সাবধানও করেছি কয়েকবার৷ তুই এবারে সত্যিই যদি বিপদে পড়িস, আমার কিন্তু দায় থাকবে না বলে দিলুম৷ সোজা পথে থাক সঞ্জীব, আবারও বলছি...’
মর্নিং ওয়াক সেরে পরিদাদু ফিরে আসার পর এই কথাগুলো বলতেই তাঁর সেই অস্থির অস্থির ভাবটা যেন আরও বেড়ে গেল৷ উত্তেজিত গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, রথীনের বাড়ির পিছনের জঙ্গলে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়েছিল তোর?’
‘জঙ্গলের বেশি ভেতরে তো ঢুকতেই পারলাম না৷’
‘তবু যেটুকু ঢুকতে পেরেছিলি, তার মধ্যে?’
‘তেমন কিছু নয়৷’
‘আর একটু ভেবে দেখ...’
একটুক্ষণ চুপ করে থাকল শাওন৷ তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘একটাই অদ্ভুত ব্যাপার, বুঝলে...’
‘কী?’
‘ওই জঙ্গলে অনেক বাঁশ কেটে রাখা আছে, কিন্তু আশেপাশে বাঁশগাছ চোখে পড়ল না৷’
‘হুঁ’, পরিদাদু বললেন, ‘অন্য জায়গা থেকে কিনে এনেও রাখতে পারে৷ এই বাংলোর ইন্টেরিয়র ডেকরেশনের প্রায় পুরোটারই প্রধান উপাদান যখন বাঁশ, তাহলে...’
‘কিন্তু এই বাংলোয় আন্ডার কন্সট্রাকশন কিছু তো চোখে পড়ল না পরিদাদু?’ কথার মাঝখানেই বলে উঠল শাওন৷
‘সব ঘরের ভেতরে তো আর ঢুকে দেখিনি আমরা৷ কোথাও রিপেয়ারিং-এর কাজ থাকতেই পারে৷’
‘তা অবশ্য পারে’, শাওন একটু মন খারাপ নিয়েই বলল৷ সে ভেবেছিল তার এই পর্যবেক্ষণ নিয়ে হয়তো পরিদাদু খানিক প্রশংসা-টশংসা করবেন৷
দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে ঘরে এসে পরিদাদু যেন একেবারে গুম মেরে গেলেন৷ মুখ বুজিয়ে চুপ করে বসে রইলেন ঘরের দেওয়ালের দিকে টি টেবলের সামনে রাখা চেয়ারের ওপরে৷ শাওন বিছানায় শুয়েছিল কিন্তু ঘুম আসছিল না৷ আড়চোখে পরিদাদুর দিকে মাঝেমাঝেই তাকিয়ে দেখছিল সে৷ পরিদাদু একই ভঙ্গিতে বসে আছেন চুপ করে৷ মাঝেমধ্যে ডান হাতের আঙুলগুলো দিয়ে মাথার চুলের মধ্যে বিলি কাটছেন আপনমনে৷ খুব গভীরভাবে কিছু চিন্তা করলে পরিদাদু এমনই করেন, শাওন আগেও দেখেছে৷ কিছু একটা রহস্য যে দানা পাকিয়ে উঠেছে হলং বাংলোকে কেন্দ্র করে, স্পষ্ট বুঝতে পারছিল শাওন৷ কিন্তু পরিদাদুকে এ বিষয়ে এক্ষুনি কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই৷ সে জানে, পরিদাদুর কাছ থেকে এখন কোনও সদুত্তর পাওয়ার আশা নেই৷ কিছুক্ষণ বিছানায় গড়াগড়ি করে উঠে বসল শাওন৷ বিছানা থেকে নেমে পরিদাদুর সামনের চেয়ারটায় গিয়ে বসল৷ পরিদাদু মুখ তুলে তাকালেন তার দিকে৷ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী হল, উঠে এলি? ঘুম আসছে না?’
‘উঁহু৷’
‘ভালোই হয়েছে’ পরিদাদু চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন, ‘আমি একটু বেরোচ্ছি৷ তুই দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দে৷’
‘কোথায় যাবে এখন?’ শাওন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল৷
‘দূরে কোথাও না’, পরিদাদু বললেন, ‘বাংলোটাকেই আর একটু ভালো করে দেখে নিতে চাইছি৷’
‘দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পরে আমরা ঘরে ঢুকে পড়ারও কতক্ষণ পরে তুমি ঘরে ঢুকলে৷ তখনও কি বাংলোর বিশেষ কিছু জায়গা পর্যবেক্ষণ করছিলে?’
‘উঁহু৷’
‘তা হলে?’
‘বাংলোর অন্য বোর্ডারদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করছিলাম৷’
‘মানে ওই যাদের সঙ্গে কুকুর? ওরা তো আমাদের ঠিক আগেই লাঞ্চ করে গেল ডাইনিং হল থেকে৷ আমি যখন হলে ঢুকছি তখন কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে ভদ্রলোক বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন৷’
‘হ্যাঁ, ওঁরা এক এক করে লাঞ্চ করেছেন’, পরিদাদু বললেন, ‘মিসেস মিত্র যখন খাচ্ছিলেন, সুনন্দ মিত্রকে দেখলাম কুকুরটাকে সঙ্গে নিয়ে ওদিকের জঙ্গলের দিক থেকে বাংলোর লনের দিকে আসছেন৷ আমাকে দেখে খানিক অপ্রস্তুত লাগল ভদ্রলোককে৷’
‘কেন?’
‘কারণ জানি না৷ তবে আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সুনন্দ বললেন, ডিঙ্গোকে টয়লেট করাতে জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিলেন৷’
‘কুকুরটার নাম ডিঙ্গো?’
‘হ্যাঁ৷ তাই তো শুনলাম তাঁর মুখে’, পরিদাদু হাসলেন, ‘পরে অবিশ্যি ওঁদের সঙ্গে অনেক গল্পই হল৷ আমাদের লাঞ্চ হয়ে যাওয়ার পরে৷ তখন লনের শেষ প্রান্তে যে দোলনাটা ওটার ওপরে বসে ছিলেন দু’জনে...’
‘আর তান্ত্রিক? তাঁর সঙ্গে আলাপ হয়নি?’
‘হুঁ, তাঁর সঙ্গেও আলাপ পরিচয় সেরে রাখতে হল বৈকি৷ তবে তাঁর জন্যে যেচে তাঁর ঘরে যেতে হল৷ খারাপই লাগল খানিক বুঝলি শানু৷ ভদ্রলোক বোধহয় দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে যোগনিদ্রায় ছিলেন...’
‘বললেন তাই?’
‘তা অবিশ্যি বলেননি৷ বরং বললেন, শাস্ত্রে দ্বিপ্রাহরিক নিদ্রা নিষিদ্ধ৷ তিনি দুপুরে কক্ষনও শোন না...’
‘তা হলে বুঝলে কী করে যে তিনি ঘুমোচ্ছিলেন?’
‘অনুমান৷ বেল বাজানোর পরে দরজা খুলতে তা না হলে অত দেরি হল কেন?’
‘তাঁর সঙ্গে কী কথা হল পরিদাদু?’
‘সে কথা পরে বলবখন’, পরিদাদু তাড়াহুড়ো করে দরজার কাছে এগিয়ে গেলেন, ‘এখন একটু ঘুরে আসি বুঝলি৷ মা-বাবাকে এক্ষুনি কিছু বলার দরকার নেই৷ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে অরুণ যদি কিছু জিজ্ঞেস করে বলবি আমি তক্ষুনিই বেরিয়েছি৷ আশপাশেই আছি কোথাও...’
‘আচ্ছা’, ঘাড় নেড়ে সায় দিল শাওন৷
‘দরজাটা বন্ধ করে দে’, বলে পরিদাদু বাইরে বেরিয়ে গেলেন৷
সন্ধেবেলা রুম সার্ভিসে যখন চা পকৌড়া দিয়ে গেল, তখনও পরিদাদুর দেখা নেই৷ অরুণাংশু বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘পরিকে নিয়ে এই এক জ্বালা৷ কী যে করে আর কোথায় যায় কে জানে! কস্মিনকালেই আমাদের কিছু জানিয়ে কাজ করা ওর ধাতে নেই৷’
সুছন্দা শাওনের দিকে চেয়ে কড়া গলায় বললেন, ‘সত্যি করে বল তো শানু, ব্যাপারটা ঠিক কী?’
‘কী ব্যাপার?’ শাওন উদাসীন থাকার চেষ্টা করে৷ পরিদাদু বলে গেছেন এক্ষুনি মা-বাবাকে কিছু না জানাতে৷
‘একদম ন্যাকামি করবি না’, সুছন্দা ধমকে উঠলেন, ‘যেমন গুরু তেমনই চ্যালা৷ পরিকাকু নিশ্চিত আবার কিছু একটা গোলমাল পাকাচ্ছে৷ পরিকাকুর সঙ্গে যেখানেই যাই, শান্তিতে বেড়ানো যেন আমাদের কুষ্ঠিতে লেখা থাকতে নেই...’
শাওন বলল, ‘ওইজন্যেই তো আমার কেবল পরিদাদুর সঙ্গেই বেড়াতে ইচ্ছে করে৷’
‘তা তো করবেই’, সুছন্দা মুখ বিকৃত করেন, ‘তুমি যে মস্ত বীরপুরুষ হয়েছ...’
অরুণাংশু কিছু একটা বলতে গিয়েও দরজার কড়া নাড়ার শব্দে থেমে গেলেন৷ সুছন্দা উঠে দরজার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে?’
‘ভেতরে আসতে পারি?’ বাইরে থেকে রথীন ঘোষের গলার আওয়াজ শোনা গেল৷
‘আসুন, আসুন’, সুছন্দা দরজা খুলে দিয়ে আপ্যায়ন করে চেয়ারে বসালেন তাঁকে৷ রথীনবাবু হাসলেন, ‘বসব না৷ জিজ্ঞেস করতে এলাম, পকৌড়া খেতে ভালো হয়েছে তো?’
‘খুব সুন্দর’, অরুণাংশু বললেন৷
‘আর এক প্লেট দিয়ে যেতে বলব?’ রথীন হাসলেন, ‘কমপ্লিমেন্টারি ডিশ৷ আমার তরফে...’
‘না না লাগবে না’, সুছন্দা বললেন, ‘এমনিতেই যা পাঠিয়ে দিয়েছেন তাই খেয়ে শেষ করতে পারছি না...’
‘পরিমলবাবুকে দেখছি না, কোথায় গেলেন?’ রথীনবাবু ঘরের মধ্যে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘একটু আগে বেরল৷ বলল, চারপাশটা ঘুরে দেখে আসি একবার’, অরুণাংশু বললেন, ‘পরিমল ওই রকমই৷ স্থির হয়ে বেশিক্ষণ এক জায়গায় বসে থাকতে পারে না৷ কত বকাবকি করি আমরা এই নিয়ে৷ বয়েস তো বাড়ছে ক্রমশ৷ এখনও কি পঁচিশ-তিরিশ বছরের যুবক আছে সে, বলুন? কিন্তু কে শোনে কার কথা...’
‘সে ঠিক আছে’, রথীন মাথা দুলিয়ে বললেন, ‘মন থেকে আমিও বুড়ো না হয়ে পড়ার পক্ষপাতী৷ নিজেকে বুড়ো ভেবে ফেললে যে শক্তিটুকু শরীরে অবশিষ্ট আছে এখনও, তার ওপর থেকেও ভরসা চলে যায়৷ চিন্তা আসলে একটাই৷ আমার বাংলোটা তো বলতে গেলে জঙ্গলের একেবারে মাঝমধ্যিখানেই৷ পরিমলবাবু যদি একা একা জঙ্গলে ঢুকে পড়েন তাহলেই মুশকিল৷ জঙ্গলে যে কত রকমের বিপদ! বাইরের লোকেরা কল্পনাই করতে পারবে না৷ বিশেষ করে সন্ধের অন্ধকার নেমে যাওয়ার পরে তো জঙ্গল আরও আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে যায়...’
‘জঙ্গলে ঢুকবে না’, ইচ্ছে করেই বলল শাওন, ‘আজ সকালেই তো আমাকে বলছিল পরিদাদু, জঙ্গলের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই যেন গা ছম ছম করে ওঠে৷ মনে হয়, আমি দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু জঙ্গলের পশু-পাখিরা যেন লুকিয়ে নজর রেখেছে আমার ওপরে...’
রথীন মনে হল যেন একটু অবাকই হলেন৷ কেমন যেন একটু সন্দেহের সুরে বলে উঠলেন, ‘তাই নাকি? পরিমলবাবুকে দেখে তো অমন ভীতু টাইপ মনে হয় না?’
‘ভীতু একেবারেই নয়’, সুছন্দা বলে উঠলেন, ‘বরং বলতে পারেন একটু বেশিই সাহসী৷ আর বাইরে বেরোলে সেইটেই সবসময় আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে এসেছে বরাবর৷ এখানে এসব বলেছে হয়তো নাতিকে কিছুটা বাগে রাখার জন্যে৷ নইলে শানু নিজেই ফাঁক পড়লে জঙ্গলে ঢুকে পড়বে, এই ভয় পেয়েছে হয়তো৷ নাতিকে নিজের মতোই বাউন্ডুলে তৈরি করছে কিনা...’
‘তা হতে পারে’, রথীন ঘোষ শাওনের দিকে চেয়ে হাসলেন, ‘শাওনবাবুও কি দাদুর মতো রহস্য-টহস্যের পিছনে দৌড়ে বেড়ানো শুরু করে দেবে নাকি আর একটু বড় হলেই?’
‘দেবে কী বলছেন দাদা, অলরেডি শুরু তো করেই দিয়েছে’, সুছন্দা বললেন বিরক্তির সুরে, ‘সেইটেই তো অশান্তি আমার৷ কবে যে কোন বিপদ ডেকে আনে বেশি পাকামি মারতে গিয়ে...’
‘কী ব্যাপার, আমার নাতির নামে রথীনবাবুর কাছে কী বদনাম করছিস রে খুকু?’ বলতে বলতে ঠিক এই সময়েই পরিদাদু ঘরে ঢুকলেন৷ তাঁকে দেখে বেশ খুশি খুশি মনে হল শাওনের৷ পরিদাদু ঘরে ঢুকে বিছানার ওপরে বসে পড়লেন৷ সুছন্দার দিকে চেয়ে বললেন, ‘চা ঢাল খুকু৷’
‘সে ঢালছি’, সুছন্দা পরিদাদুর জন্যে উপুড় করে রাখা চায়ের কাপটা সোজা করে ডিশের ওপরে রেখে বললেন, ‘কিন্তু আর একটু আগে এলে পকোড়াগুলো আর একটু গরম পেতে...’
‘গরম গরম এক প্লেট পাঠিয়ে দিতে বলি না হয়’, রথীন ঘোষ উঠে দাঁড়ালেন৷
‘আরে না, না, লাগবে না আপনি বসুন’, পরিদাদু সামনে রাখা প্লেট থেকে একটা পকোড়া হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা রথীনবাবু, মানসবাবু মারা গেছেন কতদিন হল?’
‘বছর দুই হবে’, বলে পরিদাদুর মুখের দিকে চাইলেন তিনি, ‘কেন বলুন তো?’
‘তাঁর শেষ কাজ এখানেই হয়েছিল?’
‘হ্যাঁ৷ এখান থেকে মিনিট কুড়ি গাড়িতে গেলে একটা প্রাচীন শ্মশান আছে...’ বলে একটু থামলেন রথীন৷ তারপর বললেন, ‘কাল আমরা ওই শ্মশানে যাব একবার৷ রাত্রিবেলা৷ আপনি আমাদের সঙ্গে যাবেন পরিমলবাবু?’
‘রাত্রিবেলা শ্মশানে, কেন?’ আতঙ্কিত গলায় বলে উঠলেন সুছন্দা৷
‘মানসের মৃত্যুর পর থেকে এই এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ধারণাটা বদ্ধমূল হয়ে আছে, সেটার অবসান চাইছি এবার পরিমলবাবু...’ রথীন ঘোষ নিচু গলায় বললেন৷
‘মানে?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘এখানকার অনেকেই মনে করে, মৃত্যুর পরেও মানস এখানেই আছে৷ অনেকেই এখানে তার প্রবল উপস্থিতি অনুভব করতে পারে প্রায়ই৷ কেউ কেউ তো পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ারে তাকে বসে থাকতেও দেখেছে৷ সে কথা তো আপনাকে আগেই বলেছি...’
‘আপনি তাঁকে অনুভব করতে পারেন?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন আগ্রহের সঙ্গে৷
‘পারি৷’
‘লাস্ট কবে এমন অনুভূতি হয়েছে আপনার?’
‘গতকাল রাতে৷’
‘তাই নাকি? কখন?’
‘তখন গভীর রাত৷ দুটো-তিনটে হবে বোধহয়৷ চারদিক নিস্তব্ধ৷ মঞ্জু অঘোরে ঘুমোচ্ছে৷ টয়লেট করার জন্যে বিছানা ছেড়ে উঠতেই একটা খুব হাল্কা শব্দ পেলাম আমি বাইরে থেকে৷ অনেক সময় রাতের দিকে জঙ্গলের জানোয়ার বাড়ির হাতার মধ্যে চলে আসে৷ প্রথমটা তেমনই ভেবেছিলাম৷ কিন্তু পরে মনে হল, খুব চাপা গলায় কারা যেন নিচে বাঁধানো বড় ছাতা টাঙানো বসার জায়গাটা থেকে কথা বলছে৷ আমি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না৷ আর তখনই পেলাম সেই গন্ধটা...’
‘কোন গন্ধ?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন কৌতূহলী কণ্ঠে৷
‘একটা নির্দিষ্ট বডি স্প্রে৷ যেটা এখানে কেবল মানসই ব্যবহার করত...’
‘আশ্চর্য!’ পরিদাদু বললেন৷
মানসবাবুর এই আনকেনি প্রেজেন্সটা বন্ধ করার জন্যে কী একটা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছিলেন যেন একটু আগে?’ সুছন্দা পুরনো কথাটার খেই ধরিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন রথীনবাবুকে৷
‘হ্যাঁ’, রথীন মাথা নাড়লেন, ‘কাল যোগানন্দজিকে দিয়ে শ্মশানে একটা ক্রিয়া করাতে চাইছি৷’
‘কীসের ক্রিয়া?’ পরিদাদুর ভ্রু কুঁচকে উঠেছে আবার৷
‘মানসের আত্মার শান্তি কামনায়৷ যোগানন্দজি বলেছেন, মানসের আত্মাকে তিনি মুক্তি দেবেন এইবার৷’
সুছন্দার চোখে মুখে যোগানন্দ সম্পর্কে বেশ একটা সম্ভ্রমের রেখা ফুটে উঠল৷ রথীন ঘোষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘এই ভদ্রলোকের অনেক আধ্যাত্মিক ক্ষমতা, তাই না দাদা?’
‘আমি ঠিক জানি না৷ তবে উনি নিজে যেটুকু বলেন তাইতে মনে হয় মন্ত্র-তন্ত্রের বিষয়ে অন্তত চর্চায় থাকেন ভদ্রলোক৷ হাজার হোক এই নিয়েই পড়ে আছেন যখন, কিছু সিদ্ধি তো নিশ্চিত করায়ত্ত হয়েছে এতদিনে...’
‘সে তো বটেই’, সুছন্দা তাঁর কথায় সায় দিলেন, ‘একবার শাওনকে সঙ্গে নিয়ে ওঁর কাছে যাব আলাপ করতে৷ আমার ছেলেটার ভবিষ্যৎ নিয়ে যদি দু’কথা বলেন...’
শাওন একটু বিরক্ত হল৷ চোখ কুঁচকে তাকাল মায়ের দিকে৷ কিন্তু পরিদাদু তাকে চোখের ইশারায় কিছু না বলতে বললেন৷ চুপ করে গেল শাওন৷
দুপুরে লাঞ্চের পর ঘরে ঢুকে সটান বিছানায় শুয়ে পড়লেন পরিদাদু৷ শাওন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল?’
‘শরীরটা খুব একটা ভালো বলছে না শানুবাবু’, পরিদাদু ম্লান হাসলেন, ‘যতই জোয়ান থাকার চেষ্টা করি না কেন, বয়েস আমাকেও ছেড়ে কথা কইছে না রে...’
‘অসুবিধাটা কী হচ্ছে?’
‘মাথাব্যথা’, বলে একটু থামলেন পরিদাদু৷ তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘মাথার আর দোষ কী বল৷ এখানে এসে থেকে যে পরিমাণ ঘামাতে হল মাথাটাকে...’
শাওনের চোখ চক চক করে উঠল৷ পরিদাদু তার মানে কিছু একটা রহস্যের সমাধান খুঁজছিলেন মনে মনে আর এখন নিশ্চিত সে রহস্যের কিনারা করে ফেলেছেন৷ বিছানায় উঠে এসে পরিদাদুর পাশে বসে খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করল শাওন, ‘ওয়াচ টাওয়ারটায় কারা যায় পরিদাদু? অযথা ভয় দেখিয়ে আমাদের সেখানে যেতে বারবার বাধাই বা দিতে চাইছিলেন কেন রথীন আঙ্কল?’
‘সে প্রশ্নের জবাব খুব সম্ভবত আজ রাতেই পাওয়া যাবে৷’
‘কী করে বুঝলে?’
‘চোখ-কান খোলা রাখলে বোঝা যায়’, পরিদাদু চিত হয়ে শুয়ে চোখ বুজিয়ে বললেন, ‘আজ রাতেই যদি যোগানন্দজির কৃপায় মানসবাবুর ভূত ওয়াচ টাওয়ার থেকে মুক্ত হয়ে যায় তা হলে তো আর ওদিকটাকে অমন নিষিদ্ধ অঞ্চল বলে দেগে রাখার মানে থাকবে না৷ তখন টুরিস্টদের আনাগোনা শুরু হবে ওয়াচ টাওয়ারে৷ তা হলে যারা ওখানে নিরিবিলিতে জড়ো হয় কিছু বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে, তাদের নিজেদের জরুরি কাজকর্ম আজ রাতের মধ্যেই তো সেরে ফেলতে হয় আপাতত৷ আর আজ রাতটা বড় সুবিধেরও...’
‘কেন?’
‘এটা না বোঝার কী আছে?’ পরিদাদু চোখ খুলে বিরক্ত মুখে চাইলেন শাওনের দিকে, ‘আজকে এখানকার লোকজনের অ্যাটেনশন থাকবে শ্মশান এবং যোগানন্দের দিকে...’
‘যোগানন্দ লোকটাকে তোমার কেমন মনে হয় পরিদাদু?’
‘খুবই গোলমেলে৷’
‘কেন?’
‘অনেকগুলো কারণ৷’
‘যেমন?’
‘এক, লোকটা যদি রাবারের স্ট্র্যাপ দেওয়া খড়ম পরতেই অভ্যস্ত হয় তা হলে তার পায়ে স্ট্র্যাপের মাপ অনুযায়ী সাদা দাগ থাকার কথা৷ কিন্তু লোকটার পা এক্কেবারে পরিষ্কার৷ বুট পরে অভ্যস্ত মানুষের মতো৷ দুই, ওর মাথার বড় বড় যে চুলগুলো দেখছিস সেগুলো নকল৷ সম্ভবত দাড়িটাও...’
‘বলো কী গো?’
‘হ্যাঁ৷ আর সেইজন্যেই আমি যেদিন আলাপ করার জন্যে ওর ঘরে গিয়েছিলাম, মেক আপ করার জন্যেই ওর দরজা খুলতে দেরি হয়েছিল...’
‘লোকটা ভণ্ড তার মানে?’
‘ভণ্ড কী না জানি না, তবে লোকটা ছদ্মবেশে রয়েছে যে, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই৷’
‘লোকটা তো আগেও এখানে এসেছে, অন্তত রথীন আঙ্কলের কথা থেকে তাই তো মনে হয়েছে৷ আগেও তার মানে সে ছদ্মবেশেই এসেছে৷’
‘অন্তত যোগানন্দ সেজে যে তিন-চারবার সে এসেছে তা রথীনবাবু তো স্বীকার করেইছেন...’, পরিদাদু হাসলেন৷
শাওন ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘তার মানে লোকটা আসল চেহারাতেও অন্য নামে এই বাংলোয় আসে বলছ?’
‘হুঁ৷’
‘কিন্তু পরিদাদু, বাংলোয় থাকার জন্যে তো আমাদের কাছ থেকে ফোটো আইডেন্টিটি কার্ড চেয়ে নিল৷ এটাই যদি নিয়ম হয় তা হলে ওই যোগানন্দ নামের ভণ্ড সাধুটা কোন আই কার্ড দেখাল?’
‘এটা একটা ভালো পয়েন্ট’, পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘কথাটা আমার মাথাতেও আসেনি তা নয়৷ কিন্তু ফোটোশপে আজকাল তো অনেক কিছুই করা যায়৷ এসব হোটেল বাংলোয় যেসব কাগজ আমরা জমা দিই সেগুলোকে কি আর ভেরিফাই করে কেউ? গোলমাল কিছু না হলে ওসব নিয়ে কে আর মাথা ঘামায় বল...’
‘এ লোকটা তা হলে জাল আই কার্ড দিয়ে থাকে এখানে?’
‘হতেই পারে’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আবার এমনও হতে পারে, লোকটার আসল পরিচয় রথীনের জানা৷ সব জেনেশুনেই এ লোকটাকে অমন ছদ্মবেশে অ্যালাও করছে সে...’
‘লোকটা তো তা হলে বেশ বিপজ্জনক৷’
‘বিপজ্জনক কি না বলতে পারব না, তবে সন্দেহজনক৷’
‘আজকে যে উদ্দেশ্য নিয়ে শ্মশানে যাচ্ছেন রথীন আঙ্কল, সেটা তো তা হলে পূর্ণ হওয়ার কোনও সম্ভাবনাই নেই...’
‘রথীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তুই কি নিঃসন্দেহ নাকি?’
‘মানে?’ চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করে শাওন৷
‘এমনও তো হতে পারে রথীন ঘোষ যোগানন্দের আসল পরিচয় জানেন৷ জেনে বুঝেই লোকটাকে সঙ্গে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার নাম করে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আজ রাতে বাংলো থেকে৷ এবং আমার সম্পর্কে যেহেতু খানিক ধারণা তাঁর আছে, তাই আমাকেও কৌশলে সরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন৷ চোখে চোখে রাখতে চাইছেন আমাকে আজ রাতের খানিকটা সময়...’
‘ওই সময় এমন কোন ঘটনা ঘটতে চলেছে পরিদাদু যার থেকে তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছেন তিনি?’
‘সেটা খানিক অনুমান করতে পারছি৷ তবে সে বিষয়ে এক্ষুনি কিছু বলার সময় আসেনি৷ শুধু এটুকু বলতে পারি, কাল সকালে রথীনের বাড়ির পিছনের বাঁশগুলোর কথা বলে তুই বড় উপকার করেছিস আমার৷’
পরিদাদু উঠে পড়লেন৷ ঘরের দেওয়ালের ওপরে মাঝখান থেকে চিরে নেওয়া ফাঁপা বাঁশের আস্তরণের ওপরে হাত বুলোতে লাগলেন সন্তর্পণে৷
শাওন হাসল, ‘তোমার শরীর মোটেই খারাপ নয়৷ তুমি আপাতত অসুস্থতার ভান করছ৷’
‘বুদ্ধি খুলছে দেখছি৷’ পরিদাদু হাসলেন৷
‘রাত্তিরে যাতে শ্মশানে না যেতে হয় তার ফিল্ড তৈরি করতে চাইছ তুমি এখন থেকে৷’ শাওনও হাসল৷
‘এই চাতুরিটুকু না করে যে উপায় ছিল না শানুবাবু৷ আজ তো আমার শ্মশানে গেলে চলবে না৷ আজ যে আমার ডিউটি অন্য জায়গায়৷’
‘ওয়াচ টাওয়ার?’
‘হুঁ৷’
‘আমিও কিন্তু তোমার সঙ্গে যাচ্ছি৷’
‘নো স্যার৷’
‘এটা কিন্তু ঠিক হচ্ছে না পরিদাদু’, আহত গলায় বলল শাওন, ‘তোমার সঙ্গে কত বিপদের জায়গাতেই তো আমি থেকেছি৷ আজ আমাকে বারণ করলে আমি কিন্তু কিছুতেই শুনব না৷ হাজার হোক আমি তোমার অ্যাসিস্ট্যান্ট...’
‘এটা ছেলেখেলার সময় নয় শানু৷ আজ রাতে কী হতে চলেছে আমি নিজেও জানি না ভালো করে৷ যা ভাবছি তা যদি সত্যি হয় তা হলে আজকের রাতের অভিজ্ঞতা ভয়ঙ্কর হতে পারে৷ ওই বিপদের মধ্যে আমি তোকে কিছুতেই নিয়ে যেতে পারি না...’
‘এর আগে কি আমরা বিপদে পড়িনি পরিদাদু?’
‘কিন্তু তখন বিপদে পড়েছি না বুঝে৷ ঘটনাচক্রে বিপদের মধ্যে আমরা জড়িয়ে পড়েছিলাম৷ কিন্তু এই কেসটা আলাদা৷ বিপদ সামনে অপেক্ষা করে আছে আমি জানি৷’
‘কী ধরনের বিপদ?’
‘যদি শিবশংকর গুছাইতের কথা ছেড়েও দিই, রাতের জঙ্গলটাও তো নিরাপদ নয়...’
‘শিবশংকর গুছাইত আবার কে? সে এর মধ্যে ঢুকে পড়ল কোথা থেকে?’ উত্তেজিত গলায় বলে শাওন৷
‘তুই ই তো তার কথা বললি আমায়’, পরিদাদু শাওনের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিলেন, ‘এবারে সত্যিকারের হিরো তো আসলে তুই৷ ঠিক সময়ে সঠিক দিকে আমার নজর ঘুরিয়ে দিয়েছিস একাধিক বার৷ তা নাহলে ব্যাপারটা এত সহজে আমি কিছুতেই ছকে নিতে পারতাম না...’
‘তোমার কথা তো কিছুই বুঝতে পারছি না পরিদাদু’, অবাক হয়ে বলে শাওন৷
‘রথীনের সঙ্গে সঞ্জীবের বাকবিতণ্ডার সময় শিবু নামটা এসেছিল৷ তুই-ই আমাকে বলেছিলি, মনে করে দেখ৷’
‘হ্যাঁ, হ্যাঁ’, মাথা নাড়ে শাওন, ‘মনে পড়েছে৷’
‘তোর কাছ থেকে নামটা পেয়ে শিবু সম্পর্কে খানিক খোঁজ তল্লাশ তো করতেই হল’, পরিদাদু চেয়ারে বসে বললেন, ‘খবর যা পেলাম তাতে দেখলাম, সে তো বলতে গেলে মহাপুরুষ একেবারে...’
‘কেন?’
‘লোকটা কাঠের ব্যবসায়ী’, পরিদাদু বললেন, ‘জঙ্গলে তাই তার অবাধ যাতায়াত৷ আইনি এবং বেআইনি কাঠের ব্যবসায় দু’ভাবেই দেদার টাকা কামিয়েছে লোকটা৷ পুলিশ প্রশাসনেও জমাটি প্রভাব লোকটার...’
‘কী করে জানলে?’
‘এমনি এমনিই কি আর ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি রে?’ পরিদাদু সামনের টি টেবলের ওপরে আঙুলের টোকা দিতে দিতে আপন মনে বললেন, ‘কিন্তু কাঠের ব্যবসার আড়ালে তার আর একটা ব্যবসা আছে৷ সেটার খবর সকলে রাখে না৷ সে ব্যবসাটি গোপন এবং লাভজনক...’
‘কী ব্যবসা?’
‘মাদকের৷’
‘অ্যাঁ?’
‘হ্যাঁ’, পরিদাদু বললেন, ‘এবং সেইসব মালপত্তর সে লোড করত ওই ওয়াচ টাওয়ারের কাছে৷ তারপর তার গাড়ি ওই টাওয়ারের পাশের রাস্তা দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে যেত...’
‘চেকিং থাকে তো৷ ধরা...’
‘ধুস’, পরিদাদু হেসে উঠলেন, ‘কে ধরবে? ভূত তো সর্ষের মধ্যেও রয়েছে৷ তাছাড়া তার মাল পাচারের পদ্ধটিটাও ভারী অভিনব...’
‘কী রকম?’
‘বাঁশের মধ্যে করে মাদক পাচার করে লোকটা৷ মাঝখান থেকে চ্যালা করে মাল ঢুকিয়ে আবার আটকে দেয় বাঁশগুলো৷ অন্য বাঁশ আর কাঠের মধ্যে ওগুলোও পাচার হয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছে যায় নিরাপদে...’
‘উরিব্বাস৷’
‘সেদিন টাওয়ারের ওপরে উঠে আমি তাদের প্রস্তুতির খানিক নমুনা সেখানে পড়ে থাকতে দেখেছি৷ তারা তো ভাবেনি পরিমল চাটুজ্জে দুম করে হলং পান্থনিবাসে এসে হাজির হবে এবং অমন ভয়ংকর সব গল্প শোনার পরেও সটান গিয়ে হাজির হবে জঙ্গলের মধ্যে ওয়াচ টাওয়ারের কাছে৷ তারপর সুড়সুড় করে সিঁড়ি ভেঙে রাখা সত্ত্বেও গোঁয়ারের মতো টাওয়ারের মাথায় চড়ে যাবে এই বুড়ো বয়েসেও...’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আমার অনুমান সঠিক হলে আজ রাতেই ওখান থেকে মালগুলো সরানোর চেষ্টা করবে শিবু আর তার শাগরেদরা...’
‘এই রকম একটা দুর্ধর্ষ সময়ে তুমি আমাকে নিয়ে যাবে না বলছ, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না পরিদাদু’, শাওন মরিয়া হয়ে বলে৷
‘অযথা জেদ করিস না শানু’, পরিদাদু ধমক লাগান তাকে৷
শাওন চুপ করে গেল৷ আর কোনও কথা বলল না পরিদাদুর মুখের ওপরে৷
রাতে ডাইনিং হলে গেলেন না পরিদাদু৷ রথীন উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, ‘পরিমলবাবু এলেন না?’
পরিদাদুর শরীরটা ঠিক নেই৷ শুয়ে আছে’, শাওন বলল৷
‘সে কী! কী হয়েছে?’ রথীনবাবু ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘জ্বর-টর এসেছে নাকি?’
সুছন্দা, অরুণাংশুও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন৷ অরুণাংশু চিন্তিত গলায় বললেন, ‘কই আমাদের কিছু বলিসনি তো এতক্ষণ? দুপুরে তো একসঙ্গেই খাওয়া-দাওয়া করলাম৷ সন্ধেবেলা একসঙ্গে চা-ও তো খেল৷ তখনই অবিশ্যি দেখেছি বেশি কথা বলছে না৷ গুম মেরে আছে কেমন৷ তবে অমন তো অনেক সময়েই থাকে৷ ভাবলাম আবার কিছু একটা নিয়ে মনে মনে মেতেছে হয়তো৷ কিন্তু শরীর খারাপ তা তো বুঝতে পারিনি...’
‘না না তেমন কিছু নয়’, শাওন বলল, ‘খুব মাথা ধরেছে৷ বলল প্যারাসিটামল খেয়েছি৷ একটু রেস্ট নিতে দে, ঠিক হয়ে যাব৷’
‘আমার সঙ্গে তার মানে রাতে আর উনি বেরোতে পারবেন না আজকে?’ রথীন ঘোষ বললেন৷
‘আজ রাতে পরিদাদুর কোথাও বেরনোর মতো ক্ষমতা নেই দেখলাম শরীরে’, শাওন যতটা সম্ভব সিরিয়াস মুখ করে বলল, ‘আমি খেতে আসার সময় উঠে দরজা বন্ধ করতেও এল না৷ বলল, তুই দরজা বাইরে থেকে লক করে দিয়ে যা...’
‘ইশ’, সুছন্দা বললেন অরুণাংশুর দিকে তাকিয়ে, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও৷ পরিকাকুর জন্যে চিন্তা হচ্ছে৷ চলো দেখি কেমন আছে৷ অন্য কোনও ওষুধ-টসুধ যদি লাগে...’
রথীন ঘোষকে চিন্তান্বিত দেখাচ্ছিল৷ ডাইনিং হলের মধ্যে পায়চারি করতে করতে তিনি বললেন, ‘পরিমলবাবু সঙ্গে থাকলে খানিক নিশ্চিন্ত হতে পারতাম...’
শাওন আড়চোখে তাঁর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়েই খাওয়ায় মন দিল৷ পরিদাদুর জন্যে খারাপ লাগছিল৷ আজ রাতের খাবারে দারুণ মেনু৷ গরম রুটি, সুস্বাদু তরকারি, চিকেন৷ সঙ্গে দু’ রকমের দুর্দান্ত মিষ্টি৷ বেচারা পরিদাদু৷ বলেছে, রাতে চুপি চুপি ছাতু ভিজিয়ে খেয়ে নেবে...
পরিদাদু বলল, ‘আওয়াজ না করে পাশের ঘরের দরজায় কান পেতে দেখে আয় তো শাওন মা-বাবা ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা৷’
‘ঠিক আছে, দেখছি’, শাওন দরজার দিকে এগোয়৷’
‘আশপাশেও খেয়াল রাখিস৷’
‘আচ্ছা৷’
একটু আগেই যোগানন্দকে সঙ্গে নিয়ে রথীন ঘোষ বেরিয়ে গেছেন সঞ্জীবদার গাড়িতে৷ সঙ্গে বাংলোর আরও দু’একজনও ছিল৷ শ্মশানে ক্রিয়া করার সময় যে জিনিসপত্তরগুলো লাগবে, সেগুলো গুছিয়ে দিয়ে আসার জন্যে৷ বেরনোর সময় রথীন অরুণাংশুকেও জিজ্ঞেস করেছিলেন একবার, ‘আপনার আগ্রহ-টাগ্রহ আছে নাকি এসব বিষয়ে? গেলে যেতে পারেন কিন্তু আমাদের সঙ্গে৷ পরিমলবাবু তো যেতে পারলেন না...’
অরুণাংশু দোনামোনা করছিলেন৷ বোধহয় ব্যাপারটা দেখে আসার ইচ্ছে তাঁর ছিল৷ কিন্তু সুছন্দা এক ধমক দিলেন তাঁকে, ‘খবরদার নয়৷ ওসব ভূত-পিশাচের ব্যাপারে একদম মাথা গলাবে না তুমি৷ তাছাড়া কাল বিকেলেই আমাদের ফেরা৷ সে কথাটাও মাথায় রাখা দরকার৷ মনে রেখ, তুমি আর এখন ছেলেমানুষ নেই৷ সারা রাত শ্মশানে নেচেকুঁদে এসে কাল যদি শরীর খারাপ করে তাহলেই হয়ে গেল৷ একজন তো ইতিমধ্যেই উলটে পড়েছে৷ এবার কি নিজে শুয়ে না পড়লে চলছে না তোমার?’
সুছন্দার ওই মূর্তি দেখে রথীন আর দ্বিতীয়বার অনুরোধ করেননি অরুণাংশুকে৷ অরুণাংশু নিজেও তাঁর সঙ্গে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে সাহস করেননি৷ চুপচাপ ঢুকে গেছেন ঘরের মধ্যে৷
রথীন যখন পান্থনিবাস থেকে বেরিয়ে পড়লেন, সুনন্দ মিত্র ডিঙ্গোকে সঙ্গে নিয়ে লনে হাঁটছিলেন৷ শাওনকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন তিনি, ‘তোমার দাদু, আই মিন পরিমলবাবুকে দেখছি না তো?’
‘ওঁর শরীরটা বিশেষ ভালো নেই’, শাওন হাসল৷
‘শুনেছিলাম উনি নাকি এই বোগাস ব্যাপারটা দেখতে যাবেন বলেছিলেন?’
‘পরিদাদু যাবেন বলেননি, রথীন আঙ্কলই যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করেছিলেন ওঁকে...’
‘আচ্ছা’, সুনন্দ হাসলেন, ‘উনি ওইসব ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করেন নাকি রথীনবাবুর মতো?’
‘আপনি তো করেন না, তাই না?’ শাওন ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল ভদ্রলোককে৷
‘উঁহু’, সুনন্দ হাসলেন, ‘সুপারস্টিশনকে আমি এক্কেবারেই এনকারেজ করি না৷ তুমি তো এখনও ছোট, তাই বলছি, তুমিও কোরো না৷ ছোট থেকেই যুক্তি ও বিজ্ঞানকে আশ্রয় করে বড় হওয়ার চেষ্টা করাই উচিত আমাদের...’ বলেই কনুই থেকে বাঁ হাত ভাঁজ করে ঘড়ি দেখলেন তিনি৷ তারপর হেসে বললেন, ‘আসি৷ রাত হচ্ছে৷ আমি আবার আর্লি টু বেড অ্যান্ড আর্লি টু রাইজ-এর দলে...’
শাওনও ঢুকে পড়েছিল ঘরের মধ্যে৷
এখন বাইরে বেরিয়ে পুরো পান্থনিবাসটাকেই যেন বড় বেশি শান্ত আর নির্জন মনে হচ্ছিল শাওনের৷ কোথাও এতটুকু শব্দ নেই৷ কী এক অজানা আশংকায় চারদিক যেন থম মেরে আছে৷ মা-বাবার ঘরের সামনের দরজায় গিয়ে কান পাতল সে৷ নাঃ, চুপচাপ৷ ঘুমিয়ে পড়েছে দুজনেই৷ বাবার নাক ডাকার আওয়াজ আসছে বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে৷ বারান্দা থেকে লনে নামল শাওন৷ এগিয়ে দেখল যোগানন্দের ঘরে তালা ঝুলছে৷ কিন্তু সুনন্দ মিত্রের ঘর বন্ধ৷ জানলা দিয়ে ভিতর থেকে আলো আসছে না কোনও৷ নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়েছেন ওঁরাও৷
ঘরে ফিরে এসে শাওন বলল, ‘পরিদাদু অল ক্লিয়ার৷ এবার আমরা বেরোতে পারি৷’
‘আমরা নয়, আমি’, স্থির ঠান্ডা গলায় বললেন পরিদাদু, এবারেও৷
থতমত খেয়ে চুপ করে গেল শাওন৷
দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে শাওনের দিকে একটা সরু টর্চ এগিয়ে দিলেন পরিদাদু, ‘কাছে রেখে দিস৷ ঘরে একা থাকবি৷ বাই চান্স পাওয়ার কাট হয়ে গেলে কাজে লাগবে৷ আর হ্যাঁ, সাবধানে থাকিস৷’
শাওন উত্তর দিল না৷ পরিদাদু তার অভিমান ভাঙানোর চেষ্টাই করলেন না৷ বরং দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েও আবার থমকালেন৷ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘সুনন্দ মিত্রের ঘরের সামনে গিয়ে দেখে এসেছিস?’
‘বারান্দার ওপরে উঠিনি৷ লন থেকে দেখেছি, দরজা বন্ধ৷’
‘কাছে গিয়ে একবার দেখা উচিত ছিল’, দাঁত দিয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে বললেন পরিদাদু, ‘ওদের ঘর থেকে কোনও শব্দ শুনিসনি? কুকুরের ডাক?’
‘না তো৷’
‘আচ্ছা’, বলে সন্তর্পণে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেলেন পরিদাদু৷ শাওন দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করল৷ কিন্তু বিছানার দিকে আদৌ এগোল না সে৷ বরং দ্রুত ট্রাক শুট এবং জুতো মোজা পরে নিয়ে পরিদাদুর দেওয়া টর্চটাকে ট্রাক স্যুটের পকেটে রাখল সে৷ তারপর চেয়ারে বসে অপেক্ষা করতে লাগল৷ এক্ষুনি নয়, পরিদাদু জঙ্গলের পথে আর কিছুটা এগিয়ে যাক, তারপর...
পরিদাদু বেরনোর মিনিট কুড়ি পরে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল শাওন৷ দরজা বন্ধ করে তালা লাগাল ধীরেসুস্থে৷ তারপর চাবিটাকে পকেটে পুরে বারান্দা থেকে লনে নামল৷ চারদিকে সাবধানে নজর বুলিয়ে নিল খানিক৷ তারপর জঙ্গলের পথ ধরল৷ পথ অন্ধকার৷ আকাশে চাঁদ থাকলেও বড় বড় গাছের ফাঁকফোকর গলে সে আলোর খুব উজ্জ্বল হয়ে জঙ্গলের পথ পর্যন্ত পৌঁছনো অসম্ভব৷ খানিকটা আন্দাজেই আগের দিনের রাস্তা ধরল সে ওয়াচ টাওয়ারের দিকে যাওয়ার জন্য৷
কিছুটা পথ হাঁটার পরে অন্ধকার চোখে সয়ে এল৷ জঙ্গল এখানে খুব ঘনও নয়৷ ছোট ছোট ঝোপ আর ফাঁক ফাঁক কিছু বড় গাছ৷ আবছা আলোয় কিছু কেটে ফেলা গাছকে শুয়ে থাকতে দেখতে পেল শাওন৷ আগের দিন এগুলো দেখেনি তারা৷ তার মানে গাছগুলো দু’একদিনের মধ্যেই কাটা হয়েছে৷ হয়তো আজই৷ মন খারাপ হয়ে গেল শাওনের৷ এই ভাবেই মানুষের লোভের সামনে এই পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর সব শেষ হয়ে যাবে ধীরে ধীরে৷
পকেট থেকে টর্চ বের করে দু’একবার জ্বালিয়ে দিক ঠিক করে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল সে একটু আগে৷ তারপর নিজেরই মনে হয়েছে কাজটা ঠিক হচ্ছে না৷ অন্ধকার জঙ্গলে টর্চ জ্বালানো মানে অন্যের চোখে নিজের অস্তিত্বের জানান দিয়ে দেওয়া৷ এখন সে অন্ধকারের মধ্যেই হাঁটছিল৷ আর এভাবে হাঁটতে হাঁটতেই এক সময় জঙ্গলের মধ্যে দিক ভুল হয়ে গেল শাওনের৷ গাছ কেটে সাফ করে ফেলা একটা গোল ফাঁকা জায়গায় এসে সে থেমে গেল৷ মাথার ওপরে হঠাৎ করেই আকাশটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে৷ গোল খোলা আকাশ থেকে চাঁদের আলো ঠিকরে এসে পড়েছে মাটির ওপরে৷ এমন কোনও জায়গায় তো পরিদাদুর সঙ্গে সেদিন আসেনি সে! গা ছমছম করে উঠল শাওনের৷ এই মস্ত জঙ্গলে ভুল করে অন্য পথে চলে গেলে চরম বিপদের মুখে পড়তে হতে পারে তাকে৷ বাড়ি ফিরতে তো পারবেই না, বন্য জন্তুদের কবলে পড়লেও রক্ষা নেই আর৷ এই প্রথম শাওনের মনে হল, ঘর থেকে পরিদাদুর কথা না শুনে একা একা বেরিয়ে আসাটা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হয়নি৷
চুপ করে দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে করতে আপন মনেই বলে উঠল শাওন, ‘কোন দিকে যাই এখন? ওয়াচ টাওয়ারটা কোন দিকে গেলে পাব?’
‘ডানদিকে৷ সোজা ডানদিকে ফিরে নাক বরাবর হাঁটতে থাকো৷ আর কোনওদিকে ঘুরবে না৷ অন্যমনস্কও হবে না৷ জঙ্গলে হাজার বিপদ লুকিয়ে থাকে৷ বিশেষত রাত্রিবেলা৷ চোখ-কান খোলা রাখতে হয় তাই সবসময়৷ খুব বোকামি করে ফেলেছ শাওন৷ এইভাবে কাউকে কিছু না বলে একা ঘর থেকে বেরিয়ে দাদুকে ধাওয়া করা একেবারেই উচিত হয়নি তোমার...’ অন্ধকারের মধ্যে থেকে কণ্ঠস্বরটা কানে আসতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল শাওনের৷ সে তা হলে অনেকক্ষণ আগেই ধরা পড়ে গেছে৷ কেউ তাকে এতক্ষণ ধরে ফলো করছিল জঙ্গলের পথে অথচ সে বুঝতেই পারেনি একটুও৷ নিজের ওপরে খুব রাগ হয়ে গেল শাওনের৷ নাঃ, কিছুতেই পরিদাদুর মতো হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না তার পক্ষে৷
নিজের ভয় পেয়ে যাওয়া ভাবটা লুকিয়ে রেখে বেশ তেড়িয়া হয়েই বলে উঠল শাওন, ‘কে আপনি?’
‘এখনই সেটা জানার দরকার নেই শাওন’, কণ্ঠস্বর আড়াল থেকেই বলে উঠল, ‘নষ্ট করার মতো সময় আমাদের হাতে নেই৷ তোমার বোকামি এবং অতি অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়তার জন্যে এমনিতেই আমরা অনেকখানি সময় নষ্ট করে ফেলেছি৷ মিস্টার চ্যাটার্জি আদৌ এতক্ষণ পর্যন্ত অক্ষত আছেন কি না কে জানে! আমার অর্ডার ছাড়া এন্টায়ার অ্যাকশনটাই থমকে থাকবে...’
লোকটাকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছিল না শাওন৷ চুপ করে দাঁড়িয়েই ছিল সে৷ অন্ধকার ঝোপের মধ্যে থেকে লোকটা এবার গর্জে উঠল, ‘কী হল? মুভ, কুইক৷ অ্যাজ ফাস্ট অ্যাজ ইউ ক্যান...’
তার গলায় এমন কিছু ছিল, শাওন সে আদেশ অমান্য করতে পারল না৷ দ্রুত ডানদিকে ঘুরেই সোজা হাঁটা লাগাল সে৷ অচেনা মানুষটা তার সঙ্গে সঙ্গে চলল কি না, সে বিষয়ে কৌতূহল নিরসনের আর কোনও চেষ্টাই করল না শাওন৷ একবার অন্ধকারে পথ ঠাওর করতে না পেরে পকেট থেকে টর্চটা বের করতে যেতেই সেই গম্ভীর গলা যেন একেবারে তার পাশ থেকেই চাপা গলায় বলে উঠল, ‘একদম নয়৷ আলো জ্বালাতে যেও না৷ আমরা ধরা পড়ে যাব তাহলে৷ ভয় নেই, আমি সঙ্গে আছি তোমার৷ ওয়াচ টাওয়ারের কাছে প্রায় এসেই গেছি আমরা৷ ভালো করে লক্ষ করো৷ দেখ গাছপালার ফাঁকে মৃদু আলোর রেখা দেখা যাচ্ছে৷ ওই আলোই আমাদের গন্তব্য৷’
পরিদাদু সাবধানে এগোচ্ছিলেন৷ জঙ্গলের পথ৷ তাও আবার রাত৷ নির্দিষ্ট লক্ষ্যে দিক ঠিক করে এগিয়ে চলা সহজ ছিল না৷ কিন্তু জীবনের প্রথম দিকে পনেরো বছর সেনাবাহিনীতে কাটানোয় সাধারণ মানুষের পক্ষে বিস্তর কঠিন মনে হওয়া অনেক কাজই তাঁর কাছে এখনও নেহাত জলভাত৷ আজও ওয়াচ টাওয়ারের দিকে বেশ সাবলীল ভাবেই তিনি এগোচ্ছিলেন৷ রাতের জঙ্গলে চলাফেরায় বাড়তি সতর্কতার সঙ্গে কানদুটোকেও সজাগ রাখতে হয়৷ সামান্য নড়াচড়ার শব্দ, শুকনো পাতার খসখস, গাছের ডালে পাখিদের ডানা নাড়া, সবই খেয়াল রাখতে হয় সাবধানতার সঙ্গে৷
ওয়াচ টাওয়ারের কাছাকাছি পৌঁছে নিরাপদ দূরত্বে একটা ঝোপের আড়ালে বসে পড়লেন তিনি৷ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে জায়গাটা৷ শিবু গুছাইতের লোকজনের তৎপরতা চোখে পড়ছে এখান থেকেই৷ ওরা পরিদাদুকে দেখে ফেলবে এমন সম্ভাবনা কম৷ যেহেতু নিজেদের কাজের জায়গায় কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে ওরা, বাকি জঙ্গলটা ওদের চোখে এখন আরও বেশি অন্ধকার৷
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন পরিদাদু৷ এখনও পর্যন্ত সবকিছু পরিকল্পনামাফিকই চলছে৷ মিত্রর লোকজনের এতক্ষণে এখানে এসে পজিশন নিয়ে নেওয়ার কথা৷ নিশ্চয়ই সুবিধামতো জায়গায় অন্ধকারে মিশে সুনন্দ মিত্রের আদেশের জন্যে অপেক্ষা করছে ওরা৷ শিবু গুছাইতের লোকজনের মতো তিনিও তাদের অস্তিত্ব টের পাচ্ছেন না এতটুকুও৷ দ্রুত কাজ করছে এখন লোকগুলো৷ আবছা আলো অন্ধকারে ওদের ব্যস্ত ছুটোছুটি দেখে বোঝা যাচ্ছে খুব বেশি সময় ওরা এখানে থাকতে চাইছে না আর৷ তবে কি ওরাও সন্দেহ করেছে কিছু? এখানে ওদের ধরার জন্যে যে ফাঁদ পাতা হবে আজ, তার আগাম আঁচ পেয়ে গেল কি লোকগুলো?
গাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে টাওয়ারের ঠিক পিছনেই, রাস্তার ওপরে৷ বাঁশের গোছা বয়ে নিয়ে গিয়ে তোলা হচ্ছে গাড়িতে৷ সঙ্গে কিছু কাঠের গুঁড়িও৷ এদের মধ্যে থেকে মাদক ভরা বাঁশ আলাদা করে শনাক্ত করা সত্যিই কঠিন৷ তার চেয়েও বড় কথা এমন ভাবে কাজটা চালিয়ে যাচ্ছে এরা, হঠাৎ করে সন্দহই হবে না কারও৷ গাড়িতে করে যে কাঠ জঙ্গল থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে, নিশ্চিত তার অনুমতিপত্রে-টত্রে কোথাও ফাঁকফোকর রাখেনি এরা৷ অন্তত বনদপ্তর যে পথের কাঁটা হবে সে আশঙ্কা আপাতত নেই এদের সামনে৷ মনে মনে একটা অদ্ভুত অস্থিরতা টের পাচ্ছিলেন পরিদাদু৷ সময় দ্রুত বয়ে যাচ্ছে৷ গাড়ি লোডিং-এ আর খুব একটা বেশি সময় লাগার কথা নয় এদের৷ তারপরেই এখান থেকে রওনা দেবে লোকগুলো৷ তখন আর প্রমাণ সমেত এদের ধরে ফেলার রাস্তা থাকবে না হাতের মুঠোর মধ্যে৷ কিন্তু সংকেত দিতে এত দেরি করছে কেন সুনন্দ? তবে কি...
বুকের মধ্যে ছ্যাঁত করে উঠল পরিদাদুর৷ শাওনকে একা রেখে এসেছেন বলে দুশ্চিন্তা কাজ করছে সর্বক্ষণ৷ শানুকে বিলক্ষণ চেনেন তিনি৷ তাঁর সঙ্গে এই অপারেশনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে ষোলো আনারও বেশি ইচ্ছে ছিল তার৷ তিনি একা বেরিয়ে আসার সময় শানুর নির্বিবাদে চুপ করে মেনে নেওয়াটা খুব স্বাভাবিক ঠেকেনি৷ সঙ্গে আসার বায়না সে করেছিল ঠিকই, কিন্তু তিনি বারণ করার পর খুব বেশি জোরও সে করেনি৷ সুনন্দকে তাই বলে রেখেছিলেন, শানুর ওপরে নজর রাখতে৷ সে ঘুমিয়েছে এটা নিশ্চিত হওয়ার পরেই যেন সে আসে৷ তবে কি শানু কোনও গোলমাল পাকাল? যদি তা সত্যি হয় তা হলে কী ধরনের গোলমাল? শানু কোনও বিপদে পড়েনি তো? না হলে সুনন্দ এত দেরি করবে কেন?
লোকগুলোর কাজ প্রায় শেষ৷ এবার এ জায়গা থেকে সরে যাবে ওরা৷ গাড়ির দিকে এগোচ্ছে লোকগুলো৷ সুনন্দর লোকেরা তো আছেই৷ প্রয়োজনে তাঁর সাহায্যে নিশ্চিত এগিয়ে আসবে ওরা৷ পরিদাদু ঝোপের অন্ধকার থেকে উঠে দাঁড়ালেন৷ তারপর সোজা এগিয়ে গেলেন ওদের দিকে৷ এই মুহূর্তে যে করেই হোক কিছুক্ষণের জন্যে হলেও ওদের আটকে রাখা দরকার এইখানে৷
জঙ্গল ফুঁড়ে পরিদাদুকে হঠাৎ সামনে এগিয়ে আসতে দেখে প্রথমটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও পরক্ষণেই নিজেদের সামলে নিল লোকগুলো৷ ওদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে সটান পরিদাদুর জামার কলারটা খামচে ধরল শক্ত হাতে৷ তাঁর চোখের ওপরে চোখ রেখে হিংস্র গলায় বলে উঠল, ‘কে আপনি, কী চান এখানে?’
পরিদাদু খুব অবাক হয়ে যাওয়ার ভান করে বললেন, ‘তবে যে শুনেছিলাম এ জায়গায় কেউ আসে না৷ এই টাওয়ারটা ভূতুড়ে৷ রাতে এখানে ভূত দেখতে পাওয়া যায়!’
‘কে বলেছে?’
‘রথীন ঘোষ’, পরিদাদু বোকা বোকা মুখ করে বললেন, ‘আমি ওঁরই পান্থনিবাসে উঠেছি কিনা৷ ওঁর মুখে এ কথা শুনে আর লোভ সামলাতে পারলাম না৷ ভূত দেখব বলে...’
‘মাঝরাত্তিরে অন্ধকার জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন?’ পরিদাদুকে কথা শেষ করতে না দিয়েই চিৎকার করে উঠল লোকটা, ‘আসল মতলবটা কী বলুন দেখি? সঙ্গে আর ক’জনকে নিয়ে এসেছেন?’
‘সঙ্গে তো কেউ নেই’, পরিদাদু একই রকম বোকা বোকা ভঙ্গিতে বলে চললেন, ‘ভূত দেখার শখ আমার বহুদিনের বুঝলেন মশাই৷ ভূত দেখার জন্যে কোথায় না ঘুরেছি৷ শ্মশান, গোরস্থান...’
‘আপনি পাগল নাকি?’
‘না, সত্যিই’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আপনাকে আর দোষ দিই কী করে৷ আমার নিকট আত্মীয়রাও অনেকেই আমাকে পাগল বলে...’
‘ঠিকই বলে’, লোকটা বিরক্ত হয়ে বলে৷ ততক্ষণে ওদের দলের আরও দু’একজনও এগিয়ে এসেছে৷ তাদের মধ্যে একটা লোককে চেনা ঠেকল পরিদাদুর৷ এ লোকটিকে হলং বাংলোয় দেখেছেন তিনি৷ নাম সম্ভবত অনন্ত৷ কিচেনের দায়িত্বে আছে লোকটা৷ তার দিকে চেয়ে পরিদাদু হাসলেন, ‘আপনাকে তো পান্থনিবাসে দেখেছি৷ আপনিও এখানে ভূত দেখতে এসেছেন বুঝি?’
লোকটা কটমট করে তাকাল পরিদাদুর দিকে৷ তারপর গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘এই মানকে, লোকটাকে দড়ি দিয়ে বাঁধ তো শক্ত করে৷ লোকটা বাংলোয় আসা থেকেই সন্দেহ হয়েছিল আমার৷ বড্ড কৌতূহল এর৷ প্রথম দিন থেকে একেবারে চরকি পাক খাচ্ছে চারদিকে৷ এ ব্যাটা নিশ্চিত পুলিশের খোঁচর৷ যতই ন্যাকা সাজুক এখন, এর মতলব একেবারেই সুবিধের নয়...’
‘তালে বেঁধে কী হবে, একেবারে শেষ করেই দিই না’, পাশ থেকে একজন বলল৷
‘এখন আমরা এমনিতেই একটা লাফড়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি৷ তার মধ্যে বাড়তি হুজ্জোতি কাঁধে নিয়ে লাভ নেই৷ গুলি গোলা চালালে আওয়াজ হবে৷ তাতে বিপদ আমাদেরই বাড়বে৷ লোকটাকে এখানে বেঁধে রেখে আমাদের মাল নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়া দরকার এখন এখান থেকে৷ বস অপেক্ষায় আছে কিন্তু মালটার জন্যে...’
‘কিন্তু এ লোকটা কোনওভাবে যদি বেঁচে ফিরে যায়?’
অনন্ত হেসে ওঠে হা হা করে, ‘এই অন্ধকার জঙ্গলে গাছের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় থাকবে সারা রাত৷ সাপের কামড়, হাতির আক্রমণ, বাঘের খিদে এড়িয়ে লোকটা যদি বেঁচে ফেরে তা হলে একে মহাপুরুষ বলতে হবে তো৷ তাছাড়া ওর হাত পা-র বাঁধন খুলতে কে আসবে এখানে?’
দুটো লোক টেনে হিঁচড়ে পরিদাদুকে নিয়ে চলল টাওয়ার থেকে খানিক দূরের একটা মোটা সেগুন গাছের দিকে৷ আর ঠিক তখনই অন্ধকার জঙ্গল ফুঁড়ে একটা তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ ঠিকরে উঠল সকলকে মারাত্মক চমকে দিয়ে৷
দূরে লালচে অস্পষ্ট আলোর রেখা দেখে থমকে দাঁড়াল শাওন৷ সেই কণ্ঠস্বর বলল, ‘এখানে নয়৷ আর একটু এগিয়ে বাঁদিকের ঝোপটার আড়ালে বসে পড়ো৷ আমি কাছেই থাকব৷ যা কিছুই ঘটুক, ভয় পেও না৷’
‘আপনি কে?’
‘তুমি তো রহস্য ভালোবাসো৷ ঝোপের আড়ালে বসে আপাতত মন দিয়ে আমার পরিচয়টা ভেবে বের করার চেষ্টা করতে থাকো’, চাপা হাসির শব্দ শুনল শাওন, ‘যদি বুঝতে না পারো, আর একটু পরে নিজের পরিচয় দিয়ে দেব আমি৷’
‘পরিদাদু কি আপনাকে চেনেন?’
‘তাঁর কাছে নিজেকে আড়াল করে রাখা যে কঠিন তা তো তুমি জানোই শাওন’, বলে তিনি থামলেন৷ শাওন ঝোপটার কাছে পৌঁছে গেছে ততক্ষণে৷ ঠিক তার পাশের ঝোপের আড়াল থেকে সেই কণ্ঠস্বর বলে উঠল, ‘কোনও কথা নয়৷’
কথা বলার পরিস্থিতিতে তখন ছিলও না শাওন৷ একটা লোক পরিদাদুর কলার চেপে ধরেছে গায়ের জোরে৷ শাওন উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়তে যাচ্ছিল৷ অচেনা কণ্ঠস্বর চাপা ধমক দিল, ‘এখনও সময় হয়নি৷ অপেক্ষা করো৷’
ভেতরে ভেতরে ছটফট করছিল শাওন৷ কী কথা হচ্ছে ওদের পরিদাদুর সঙ্গে, কিছুই বোঝা যাচ্ছে না এখান থেকে৷ লোকগুলো এবার পরিদাদুকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে৷ লোকগুলো একেবারেই ভালো নয়৷ জঙ্গলের মধ্যে বনকর্মী এবং পুলিশকে এড়িয়ে যারা মাদকের ব্যবসা করতে পারে, তাদের ক্ষমতা যথেষ্টই৷ ওদের পথে বাধা তৈরি করলে ওরা যে ছেড়ে কথা কইবে না সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশই নেই কোনো৷ ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল শাওনের৷ বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে উঠল তার৷ ওরা পরিদাদুকে কি মেরে ফেলবে নাকি? আর এভাবে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকার মানেই হয় না কোনও৷ কারও কোনও বারণই সে শুনবে আর৷ যে করেই হোক পরিদাদুকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে হবে তাকে৷ জঙ্গল সরিয়ে সামনে এগোতে গেল শাওন৷ আর ঠিক তখনই তার পাশের ঝোপ থেকে একটা তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ বেজে উঠল৷
মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের সমস্ত জঙ্গল যেন জেগে উঠল৷ কয়েকটা ঝোপ যেন চলতে শুরু করল সামনের দিকে৷ যে লোকগুলো পরিদাদুকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল, তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে৷ গাড়ির কাছে ছিল যারা, তাদের একজন হাতে আগ্নেয়াস্ত্র তুলে নিতেই অন্ধকার থেকে একটা গম্ভীর গলা গর্জে উঠল, ‘পুরো এলাকাটাই সশস্ত্র বাহিনী ঘিরে রয়েছে এখন৷ হাতের অস্ত্র মাটিতে না নামিয়ে রাখলে তোমাদের সক্কলকেই ঝাঁঝরা করে দেব আমরা৷’
লড়াইটা খুব একটা জমল না৷ প্রায় বিনা যুদ্ধেই আত্মসমর্পণ করল লোকগুলো৷ আসলে লড়াইয়ের প্রস্তুতিও তেমন ছিল না এদের৷ ওরা ভাবতেও পারেনি আজ সুনন্দ মিত্র এবং পরিদাদু মিলে এমন ফাঁদ পেতে রেখেছেন তাদের জন্যে৷
পরিদাদু সুনন্দ মিত্রের দিকে চেয়ে হাসলেন, ‘এদিকে তো মিটল৷ ওদিকের কী খবর?’
‘ঠিকঠাক’, সুনন্দ হাসলেন, ‘আত্রেয়ীকে দেখলে বোঝা যায় না, কিন্তু এই ধরনের অপারেশনে আমার থেকেও বহুগুণ শার্প ও৷’
শাওন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল৷ পরিদাদুই বললেন, ‘যিনি মিসেস মিত্র সেজে সুনন্দর সঙ্গে বাংলোয় ছিলেন, তিনিও নারকোটিক ডিপার্টমেন্টের ঝানু গোয়েন্দা আত্রেয়ী শর্মা৷ ডিঙ্গোকে সঙ্গে নিয়ে যোগেশ আনন্দকে ধরার দায়িত্ব আজ তাঁরই ছিল৷ আর হ্যাঁ, সঞ্জীবকেও অ্যারেস্ট করা হয়েছে৷ এই অঞ্চলে আনন্দ-এর ডান হাত হিসেবে কাজ করছিল সে-ই৷’
‘যোগেশ আনন্দ কে পরিদাদু?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শাওন৷
‘স্বামী যোগানন্দ নামে যিনি অধিষ্ঠান করছিলেন রথীন ঘোষের পান্থনিবাসে৷ তিনিই তো এই র্যাকেটটার মূল পান্ডা৷’
বাংলোয় ফিরে গরম কফিতে চুমুক দিতে দিতে সুনন্দ আর পরিদাদু বলছিলেন, ‘পুরো ঘটনাটার আসল নায়ক কিন্তু রথীনবাবুই৷’
‘আমি আর কীই-বা করলাম’, লাজুক ভঙ্গিতে বললেন রথীন৷
‘আপনি সাহস করে পুরো ব্যাপারটা অ্যারেঞ্জ না করলে ওরা কিছুতেই ধরা পড়ত না৷’
সুছন্দা এবং অরুণাংশুও এখন অবাক হয়ে শুনছিলেন পুরো ঘটনাটা৷ দু’জনেই অবাক৷ এত কিছু ঘটে যাচ্ছে এখানে ক’দিন ধরে, অথচ তাঁরা কিছুই জানতে পারেননি...
মঞ্জু বলছিলেন, ‘মানসদার মৃত্যুটা উনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি৷ তখনই আমাকে বলেছিলেন, এই মৃত্যু দুর্ঘটনা হতেই পারে না৷ এর পিছনে অন্য ষড়যন্ত্র আছে...’
‘আর তখন থেকেই আপাত ঔদাসীন্যের আড়ালে তিনি খোঁজ তল্লাশি শুরু করে দিয়েছিলেন৷ গ্রামের মানুষদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে মিশে তাদের আস্থা অর্জন করেছেন, তথ্য সংগ্রহ করেছেন দিনের পর দিন৷ এদের গতিবিধির ওপরেও নজর রেখে গেছেন সন্তর্পণে...’ পরিদাদু বললেন৷
‘ঠিকই’, রথীন লাজুক হাসলেন, ‘শুধু যোগানন্দকেই ঠিকমতো চিনতে পারিনি৷ ভাবতেই পারিনি সাধুর ছদ্মবেশে এই লোকটাই আসল শয়তান...’
‘আর সঞ্জীব?’ আত্রেয়ী হাসলেন৷
দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রথীন, ‘ওর জন্যে কী না করেছি৷ আর মানস? সে তো ওকে নিজের ছেলের মতো ভালোবাসত৷ অথচ সে যখন ওদের কাজ কারবারটা নিজের চোখে দেখে ফেলল তাকে পথ থেকে সরাতেও হাত কাঁপল না সঞ্জীবের...’
‘মানস আঙ্কলকে খুন করা হয়েছিল? তিনি দুর্ঘটনায় মারা যাননি?’
‘না’, সুনন্দ বললেন, ‘এরা তাঁকে মেরে হাতিদের চলাচলের রাস্তার ওপরে ফেলে রেখে এসেছিল রাত্রিবেলা৷’
‘কেন?’
‘ওই যে ওই টাওয়ার থেকে এদের কাজ কারবার, মুভমেন্ট দেখে ফেলেছিলেন...’
‘ছিঃ’, সুছন্দা বলে উঠলেন৷
‘কিন্তু তোমরা হঠাৎ একসঙ্গে এখানে এসে জুটলে কী করে? এ কি কাকতালীয় ঘটনা?’ অরুণাংশু সুনন্দ এবং আত্রেয়ীর দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে পরিদাদুকে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘উঁহু’, পরিদাদু হাসলেন, ‘পুরোটাই রথীনবাবুর পরিকল্পনা৷ ওইজন্যেই তো বলছিলাম, উনিই এই কাণ্ডের আসল নায়ক৷’
‘মানে?’ অরুণাংশু বোকার মতো মুখ করে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘প্ল্যানটা মাথায় আসে রথীনবাবুর৷ নারকোটিক ডিপার্টমেন্টে তিনিই খবর দেন৷ আমাকেও ঠিক এই সময়েই এখানে আসার আমন্ত্রণ জানান ফেসবুক মেসেঞ্জার মারফত৷ ভেবেছিলেন, মাদকচক্রটাকে ধরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি মানসবাবুর মৃত্যুর পিছনে থাকা অজানা সত্যিটাও সামনে আসুক৷ আর বাকিটা নিয়তি’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আমরা আসার ঠিক আগে আগেই যোগানন্দজিও এসে পড়লেন হলং বাংলোয়৷ হঠাৎ করেই৷’
‘তার মানে তুমি সবটাই আগে থেকে জানতে?’
‘উঁহু’, পরিদাদু গা দুলিয়ে হেসে উঠলেন, ‘আমাকে উনি শুধু বলেছিলেন এই সময়ে যদি আসতে পারি, আমার জন্যে দারুণ রোমাঞ্চকর একটা অভিজ্ঞতা অ্যাসিওর করছেন উনি...’
‘সে অভিজ্ঞতাটা কী তা নিয়ে কোনও আভাস দেননি আগে?’ মঞ্জু জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়৷
‘না’, পরিদাদু কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টি টেবলের ওপরে নামিয়ে রেখে বললেন, ‘জানলে এই বিপদের মধ্যে এদের নিয়ে আসতাম নাকি! আমি একাই আসতাম এ বিষয়ে আগে থাকতে ওয়াকিবহাল থাকলে...’
‘খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছ তুমি পরিদাদু, ভয়ানক স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছ দিন কে দিন’, শাওন বলে উঠল অভিমানী গলায়৷
সক্কলে হেসে উঠল হো হো করে৷
রথীন বললেন, ‘আমার শেষে একটা কথা ছিল৷ অনুরোধই বলতে পারেন...’
‘বলুন৷’ সুনন্দ বললেন৷
‘আপনারা সকলেই তো কাল ফিরছেন,’
‘হ্যাঁ, সে রকমই তো কথা,’ পরিদাদু বললেন৷
‘কাল আমাদের হলং পান্থনিবাসের ডাইনিং হলে একটা গ্ল্যান্ড লাঞ্চ অরগানাইজ করতে চাইছি আমি৷ কমপ্লিমেন্টারি৷ সেখানে আপনাদের সকলকে একসঙ্গে উপস্থিত থাকতে হবে৷ আর মেনু আমি ঠিক করব...’
‘কিন্তু ডিঙ্গোকে নিয়ে...’ আত্রেয়ী ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন৷
‘সে চিন্তা আমার’, রথীন বললেন, ‘ডিঙ্গোকে বাদ দিয়ে এই আয়োজন হতেই পারে না৷ সেও আমার গেস্ট৷ কাল আমার প্রাণ বাঁচাতে তার তৎপরতাও তো কম ছিল না৷ ডিঙ্গো না থাকলে যোগেশ কাল আমাকে বেঁচে ফিরতে দিত না কিছুতেই...’
ডিঙ্গো বসে ছিল খানিক তফাতেই৷ কী বুঝল কে জানে, রথীনবাবুর কথা শেষ হতেই লেজ ফেজ নাড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে আদুরে গম্ভীর স্বরে ভৌউউউ করে ডেকে উঠল সে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন