জয়দীপ চক্রবর্তী
পরিদাদু প্রথম যখন প্রস্তাবটা দিলেন, অরুণাংশু প্রায় উড়িয়েই দিয়েছিলেন৷ চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ধুস, কোথাকার কোন ধ্যাদধেড়ে মাঝপুকুর না দমদমা, ওই একটা যাওয়ার মতো জায়গা হল?’
সুছন্দাও রান্নাঘর থেকে এই ঘরে এসে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে বললেন, ‘সত্যি পরিকাকু, ওইসব গণ্ডগ্রামে যাওয়ার পরিকল্পনা পাল্টে, চলো বরং দিন কয়েক বাইরে কোথাও থেকে ঘুরে আসি৷ পাহাড় কিংবা সমুদ্র...’
‘দূরে কোথাও কি অমন হুট বলতেই যাওয়া যায়?’ পরিদাদু খানিক বিব্রত কণ্ঠে বলেন, ‘তার জন্যে তো আগে থেকে পরিকল্পনা করতে লাগে খুকু৷ তারপর ধর আগে থেকে টিকিট কাটা, হোটেল বুক করা...’
‘তাই বলে উত্তরভাগ পেরিয়ে দমদমা না মাঝপুকুর, ওইখানে? একদিনের পিকনিক টিকনিক হলেও না হয় একটা কথা ছিল৷ ওখানে গিয়ে থাকা যায় নাকি!’
‘আমরা ক্যানিং যাওয়ার সময়েও তো তোমরা নাক সিঁটকেছিলে৷ কিন্তু সেখানে যাওয়ার পরে কি খুব খারাপ লেগেছিল আমাদের?’
শাওন বরাবরের মতোই পরিদাদুর পক্ষ নিয়ে বলল, ‘পরিদাদু যখন বলছে, নিশ্চিত ভাবনাচিন্তা করেই বলছে...’
‘তোর পরিদাদুর কথা বাদ দে’, সুছন্দা ভেংচি কেটে বললেন, ‘বাস্তববোধ অনেক সময়েই কাজ করে না পরিকাকুর৷ তা নইলে তোর মতো একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে কতবার কত বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছে বল৷ বিবেচক মানুষ হলে অমন রিস্ক কেউ নেয় নাকি?’
পরিদাদু অবিশ্যি সুছন্দার কথাটাকে তেমন আমল দিলেন না৷ ভাগ্যিস দিলেন না, শাওন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল খানিক৷ পরিদাদু রেগে গিয়ে তাকে যদি পরে আর সঙ্গী না করেন, সব গেল৷ পরিদাদুর অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গী হয়ে স্কুলে বন্ধুদের কাছে কলার তোলার যে সুযোগটা পায় সে, মা বোধহয় প্রতিজ্ঞা করেছে, সে সম্ভাবনাটা যে করেই হোক বন্ধ করে দেবে এইবার৷ পরিদাদু সুছন্দার কথায় রেগে না গিয়ে মুচকি হাসছে দেখে সে বলে উঠল, ‘পরিদাদু, ওই দমদমা না মাঝপুকুর বলছ, জায়গাটা কি খুবই গ্রাম? মানে গল্পের বই টইতে যেমন পড়ি আমরা? ঘুটঘুট্টি অন্ধকার, ইলেকট্রিক ফিলেকট্রিক নেই, মাটির বাড়ি, খড়ের চাল৷ বাড়ির সামনে শেয়াল চরছে ভর সন্ধেবেলায়...’
‘ধুস, অমন গ্রাম আজকাল খুব কমই আছে৷ বরং অরিন্দম যে বাড়িটায় থাকে ওখানে, তার আশপাশে দোকান, বাজার, আলো বাতি কোনও কিছুরই অভাব নেই৷ নিজের গাড়ি আছে বলে কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগের তেমন অসুবিধা নেই৷ সড়কপথে তো আসা-যাওয়া করাই যায়৷ আর ট্রেন পথের জন্যে ওখান থেকে ক্যানিং বা তালদি দুটো স্টেশনেই অনায়াসে পৌঁছে যাওয়া যায়৷ দুটো স্টেশনের কোনওটাই এমন কিছু দূরে নয়...’
‘তাই?’ অরুণাংশু একটু অবাক হয়ে বললেন৷
‘আজ্ঞে হ্যাঁ’, পরিদাদু হাসলেন তাঁর দিকে চেয়ে, ‘এসব জানার জন্যে বাড়ি থেকে বেরোতে হয়৷ নিজের চারপাশটা না জেনে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়িয়ে ফেসবুকে ছবি আপডেট করলেই চলবে হে?’
অরুণাংশু হো হো করে হেসে উঠলেন পরিদাদুর কথায়৷ তারপর চোখ সরু করে তাঁর দিকে তাকিয়ে হঠাৎই সিরিয়াস গলায় বলে উঠলেন, ‘এইবার একটা জরুরি প্রশ্ন করি?’
‘করো৷’ পরিদাদুও হাসলেন৷
‘তোমার ওখানে যাওয়ার আসল মতলবটা কি দয়া করে বলবে এবার?’
‘মানে?’ পরিদাদু মিটি মিটি হাসতে লাগলেন অরুণাংশুর দিকে চেয়ে৷ পরিদাদুর মুখে পরিচিত সেই হাসির রেখা দেখে মনে মনে নেচে উঠল শাওন৷ তার বুঝতে বাকি রইল না যে যথারীতি এবারেও তাদের বেড়ানো যথেষ্টই রোমাঞ্চকর হয়ে উঠতে চলেছে৷
‘এতদিন পরে দুম করে এই যে তোমার অরিন্দমদার বাড়ি যাবার কথা মনে হল, নিশ্চিত তা শুধুই আমাদের নিয়ে দিন দুই গ্রামের শুদ্ধ অক্সিজেন সেবনের লোভে নয়?’ অরুণাংশুর প্রশ্নে সুছন্দাও কৌতূহলী হয়ে পরিদাদুর একেবারে পাশটিতে গিয়ে বসলেন৷
এতক্ষণ পরে পরিদাদু নিজেও খানিক নড়েচড়ে বসলেন৷ তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল৷ চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, ‘একটা সময় দমদমা মাঝপুকুর অঞ্চলটার মারাত্মক কুখ্যাতি ছিল৷ ওদিকে ডাকাতের উৎপাত ছিল খুব৷ একটু সম্পন্ন মানুষ যাঁরা, ভয়ে ভয়েই থাকতে হত তাঁদের৷ হঠাৎ আসা বিপদের জন্যে তাঁদের অনেকেই বাড়িতে টুকটাক অস্ত্র রেখে দিতেন৷ লাঠিখেলা, বর্শা ভোজালি চালানোও শিখে রাখতেন বিপদের মোকাবিলা করার জন্যে৷ ইদানীং অবিশ্যি দিনকাল বদলেছে৷ মানুষের নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে৷ প্রান্তিক মানুষের হাতে পয়সাও বেড়েছে৷ কিন্তু সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটা ঘটনায় অরিন্দম একটু বিচলিত বোধ করছে...’
‘কী রকম?’ অরুণাংশু গল্পের গন্ধ পেয়ে সোজা হয়ে বসেছেন এইবার৷ পরিদাদুর বন্ধু অরিন্দম মল্লিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় আছে৷ ভদ্রলোক কলেজে পড়ান৷ পণ্ডিত মানুষ৷ তবে অনেক পণ্ডিত মানুষেরই মতো তাঁরও কিছু খ্যাপামি আছে৷ নিজে হাতে সবজি চাষ করেন৷ মাছ ধরেন জাল ফেলে৷ সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়ান গ্রামের পথ ধরে...
কলকাতায় ফ্ল্যাট থাকা সত্ত্বেও তিনি পাকাপাকিভাবে শহরমুখী হতে চাননি৷ এমনকি কলকাতার দিকে সুযোগ পেয়েও কলেজ বদল করেননি তিনি৷ একমাত্র ছেলেকেও গ্রামের সরকারি পাঠশালায় পড়ানোরই ইচ্ছে ছিল তাঁর৷ অরিন্দমের ধারণা, গাঁয়ের আর পাঁচজন গরিবগুর্বো ঘরের ছেলের সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বড় হলে ছেলের নিজের গ্রামের প্রতি, গ্রামের মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং কর্তব্যবোধ শক্তপোক্ত হবে আরও৷ তাঁর স্ত্রী রেখা অবিশ্যি এই ইচ্ছেকে সত্যি হতে দেননি৷ তিনি প্রায় জোর করেই ছেলেকে একটা আবাসিক ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন প্রি প্রাইমারি লেভেল পার হবার পরপরই৷
‘ওদের বাড়িতে বহুদিন ধরে একটা মস্ত খড়্গ ছিল৷ বলাই বাহুল্য, বহুদিন ধরেই সেটা অবিশ্যি ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না৷ স্বাভাবিকভাবেই অস্ত্রটায় জং ধরে গেছে’, পরিদাদু আবার বলতে শুরু করলেন, ‘তবু পারিবারিক সম্পদ হিসেবেই সংরক্ষিত ছিল সেটা৷ ওটা নিয়ে একটা সেন্টিমেন্টও আছে ওদের৷ কিন্তু সম্প্রতি সেই খড়্গটা অরিন্দমদের বাড়ি থেকে গায়েব হয়েছে৷’
‘খড়্গ নিয়ে কী এমন সেন্টিমেন্ট?’ সুছন্দা জিগ্যেস করলেন আগ্রহের সঙ্গে৷
‘আগে ওই অঞ্চলে ডাকাতের উপদ্রব ছিল সে-কথা তো আগেই বলেছি’, পরিদাদু বললেন, ‘একবার অমনই ডাকাত পড়েছিল অরিন্দমদের বাড়িতে৷ ওর ঠাকুরমা তখন সাক্ষাৎ মা কালীরই মতন খোলা চুলে ওই খাঁড়া হাতে এসে দাঁড়িয়েছিলেন বাড়ির সদর দরজা আগলে৷ তাঁর সেই রূপ দেখে ডাকাত সর্দার অস্ত্র ফেলে দিয়ে তাঁর পায়ে মাথা রেখে শুয়ে পড়েছিলেন মাটির ওপরে৷ ডাকাতি করেননি সেদিন৷ পুরো ডাকাত দলকে ওই ঠাকুরমাই লুচি বেগুন ভাজা করে খাইয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন সেই রাত্রে৷’
‘বলো কী?’ সুছন্দা অবাক হয়ে বললেন, ‘এসব তো গল্পের বইতে পড়ি গো৷’
‘এলাকার মানুষের বিশ্বাস, স্বয়ং মা কালীই সেদিন ওই মহিলার রূপ ধরে ডাকাত তাড়িয়েছিলেন৷ এ খড়্গটাকেও তারা মায়ের হাতের খাঁড়া বলেই মান্য করে এসেছে এ যাবৎ৷ তখন থেকেই মানুষের মনে বিশ্বাস জন্মে গিয়েছিল, এ খড়্গের হেফাজতকারীর নিরাপত্তা ও ঐশ্বর্যের ঘাটতি হবে না কোনওদিন৷
সেই থেকে পুরো এলাকা জুড়েই ওই খড়্গের কদর৷ সকলেই এক কথায় স্বীকার করে, ওই খড়্গ শুধু অরিন্দমদের পরিবার নয়, সমস্ত গ্রামকেই রক্ষা করে এসেছে এখনও পর্যন্ত৷’
‘তারপরে গ্রামে আর কখনও ডাকাতি হয়নি বুঝি?’ অরুণাংশু খানিক ব্যঙ্গ করেই জিগ্যেস করলেন৷
‘আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সত্যিই ওই গ্রামে আর কখনও ডাকাতি হয়নি সে রাতের পর থেকে৷ ডাকাতেরাও ওই খাঁড়াকে মায়ের খাঁড়াই মনে করেছে চিরকাল’, পরিদাদু একটু থেমে বললেন, ‘চমৎকারিত্ব দেখানোর পর থেকেই অরিন্দমদের বাড়িতে প্রতি বছর পৌষ সংক্রান্তির আগের দিন ওই খড়্গের পুজো শুরু হয়েছিল ধুমধাম করে৷ এখনও হয়...’
‘আশ্চর্য তো!’ শাওন এতক্ষণ গল্প শুনছিল মন দিয়ে৷ এইবার বলে উঠল চোখ গোল গোল করে৷
‘পৌষ সংক্রান্তি তো এসেই পড়ল...’ অরুণাংশু বললেন পরিদাদুর দিকে চেয়ে৷
‘হুঁ’, গম্ভীর হয়ে মাথা নাড়লেন পরিদাদু, ‘আর সেইজন্যেই তো মুশকিল৷ খাঁড়াটা পাওয়া না গেলে পুজো হবে কী করে?’
‘কিন্তু এতদিন পরে হঠাৎ সেই খড়্গটা চুরি হল কী করে? কার প্রয়োজন পড়ল ওটা? এমন তো নয় যে বস্তুটা খুব দামি৷ চুরি করে বিরাট আর্থিক লাভ হবে কারও...’ সুছন্দা বিস্মিত হয়ে বললেন৷
‘প্রশ্ন তো সেইটাই’ পরিদাদু সুছন্দার কথায় সায় দিয়ে বললেন৷
‘আমরা কি তা হলে ওই হারিয়ে যাওয়া খড়্গ খুঁজতেই মাঝপুকুরে যাচ্ছি পরিদাদু?’ শাওন উত্তেজিত গলায় বলে উঠল৷ তার মনের মধ্যে বাস্তবিকই আনন্দের স্রোত বইছিল৷ হঠাৎ করেই পরিদাদুর সঙ্গে আরও একটা রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হবার সুযোগ আসতে চলেছে তার সামনে৷
‘খুঁজে পাব কি না জানি না, তবে ব্যাপারটা সম্পর্কে খানিক কৌতূহল তো আমার মনে তৈরি হয়েইছে’, পরিদাদু শাওনের কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তাছাড়া অরিন্দম আমার অনেক দিনের বন্ধু৷ এমনিতে তো আর ওর ওদিকে যাওয়া হয় না৷ যোগাযোগ যা কিছু তা ওই ফোনে ফোনেই৷ এই সুযোগে অনেকদিন পর মুখোমুখি দেখা হয়ে যাবে পুরনো বন্ধুর সঙ্গে৷’
উত্তরভাগ পেরিয়ে আরও কিছুটা গিয়ে ডানদিকে ঢুকে পড়ল গাড়ি৷ পরিদাদু নিজেই ড্রাইভ করছিলেন৷ মাস চারেক হয়েছে নতুন গাড়ি কিনেছেন তিনি৷ সুছন্দা আওয়াজ দিয়েছিলেন খুব, ‘পরিকাকু, এতদিনে তুমি সত্যিই বিখ্যাত হয়েছ৷ বড়লোকও হয়েছ বোঝা যাচ্ছে৷’
পরিদাদু হেসেছিলেন৷ বলেছিলেন, ‘নিজেদের একটা গাড়ি থাকলে ভারী সুবিধে৷ সুযোগ থাকলেই কাছে পিঠে কোথাও একটা বেরিয়ে পড়া যাবে৷ আর আমি তো তোমাদের অনারারি ড্রাইভার হিসেবে থেকেই যাব, যদ্দিন বাঁচি৷’
অরুণাংশু জিগ্যেস করলেন, ‘আরও কি অনেক পথ যেতে হবে পরিমল?’
‘আর বেশি দূর না’, বলতে বলতেই মূল রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে কংক্রিটের বাঁধানো রাস্তায় ঢুকে পড়লেন পরিদাদু৷ এ রাস্তাটিও যথেষ্টই চওড়া৷ রাস্তার দু’দিকে বড় বড় গাছ৷ তাদের ডাল পাতারা চাঁদোয়ার মতো মাথার ওপরের আকাশ ঢেকে রেখেছে আলতো ছায়ায়৷ রাস্তার দু’পাশে ধানের খেত৷ ধান কেটে নেওয়া ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে শন শন শব্দে হাওয়া বইছে৷ সাদা পাখা মেলে বকের দলও উড়ে চলেছে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তের দিকে৷
সুছন্দা বলে উঠলেন, ‘বাঃ, অপূর্ব!’
শাওনেরও ভারী ভালো লাগছিল৷ এইবারে বাঁদিকে মোড় নিয়ে অপেক্ষাকৃত একটা সরু রাস্তা দিয়ে সামান্য এগিয়েই গাড়ি থামালেন পরিদাদু৷ গাড়ির মধ্যে থেকেই চওড়া লোহার গেট চোখে পড়ল শাওনের৷ ভিতর থেকে বন্ধ৷ পরিদাদু বার দুই হর্ন বাজাতেই গেট খুলে গেল৷ গেট দিয়ে গাড়ি ঢুকতে না ঢুকতেই খোলা উঠোনের ওদিক থেকে বাড়ির সদর দরজা খুলে এক অত্যন্ত সুঠাম শরীরের মাঝবয়েসি মানুষ দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন৷ শাওনের বুঝতে অসুবিধা রইল না, ইনিই অরিন্দমদাদু৷
উঠোনের দু’দিকেই নানান সবজির চাষ হয়েছে৷ ফুলকপি, বাঁধাকপি, পালং শাক, বেগুন...
সুছন্দা অবাক হয়ে দেখছিলেন৷ অরিন্দম এগিয়ে এসে হেসে বললেন, ‘সারা বছর আমাদের চাল, সবজি, মাছ কিনে খেতে হয় না৷ চাষ এবং নিজেদের পুকুর থেকেই সব বন্দোবস্ত হয়ে যায়...’
‘দারুণ তো’, সুছন্দা মুগ্ধ হয়ে বললেন৷ সবজি বাগানে দু’জন লোক কাজ করছিলেন৷ অরিন্দম গলা তুলে হাঁক পাড়লেন, ‘সত্য, গদাই, বাবুদের ব্যাগগুলো ঘরে তুলে দিয়ে আয় না বাবা...’
সত্য, গদাই দু’জনেই হাতের কাজ ফেলে দিয়ে তড়িঘড়ি খেতের পাশের টিউবওয়েল থেকে দুটো হাত ধুয়ে নিয়ে এগিয়ে এল৷ তারপর শাওনদের ব্যাগগুলো হাতে তুলে নিল৷ হেসে বলল, ‘আসুন৷’
দুপুরে দুর্দান্ত খাওয়া দাওয়া হল৷ খুবই সাধারণ ঘরোয়া খাবার৷ কিন্তু এমন সুস্বাদু খাবার যেন বহুদিন পরে খাচ্ছি মনে হল প্রায় প্রত্যেকেরই৷ পরিদাদু অরিন্দমের স্ত্রী রেখার দিকে চেয়ে বললেন, ‘তোফা রান্না হয়েছে বউঠান...’
রেখা হাসলেন, ‘কী আর এমন খাওয়াতে পারলাম দাদা, আমাদের গাঁ গঞ্জে যা পাওয়া যায়...’
‘এইটিই তো মহার্ঘ’, অরুণাংশু বললেন, ‘শহরে মাথা খুঁড়ে মরলেও তো এমন টাটকা সবজি পাওয়া যাবে না...’
খেয়ে উঠে অরিন্দম পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন, ‘ভাত ঘুমের অভ্যেস তৈরি হয়েছে নাকি ইদানীং?’
‘ধুস’, পরিদাদু উড়িয়ে দিলেন তাঁর কথা, ‘ডিফেন্সে ছিলাম ভাই এক কালে৷ এসব বদ অভ্যাস কত্তারা বরদাস্ত করতেন না কক্ষনও৷’
‘সে তো দূর অতীত ভাই’, অরিন্দম হাল্কা গলায় বললেন, ‘কোভিড পরবর্তী পৃথিবী অনেকের জীবনচর্চাই তো পালটে দিয়েছে...’
‘আমি অন্তত বদলাইনি’, পরিদাদু রেখার বাড়িয়ে দেওয়া কৌটো থেকে খানিকটা ভাজা জোয়ান মুখে ফেলে দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন৷
‘তা হলে আমার ঘরে চল৷ আরাম করে বসে গপ্পো করি৷’
‘হুঁ’, পরিদাদু মাথা নাড়লেন৷
‘আমরা কি সেই গপ্পে যোগ দিতে পারি?’ অরুণাংশু বললেন৷
‘অফ কোর্স’, অরিন্দম অরুণাংশুর কাঁধে আলতো চাপড় মারলেন, ‘ডোন্ট বি ফরমাল৷’
অরিন্দমের ঘরে বসেই হুট করে পরিদাদু কাজের কথা পাড়লেন, ‘এবার বল, অত দিনের পুরনো খাঁড়াটা গায়েব হল কী করে? মানে তোর দিক থেকে এনি গেস?’
‘নাঃ’ বলে দু’দিকে মাথা নাড়ান অরিন্দম, ‘এই বাড়িতে আমরা যে দুই শরিক থাকি, তাদের মধ্যে কাউকে সন্দেহ করার প্রশ্নই ওঠে না৷ সকলেই বাড়ির লোক৷ তারা তো এতদিন ধরেই খড়্গটাকে নিরাপদে আমাদের জিম্মায় থাকতে দিয়েছে৷ এ নিয়ে কারও কোনও ক্ষোভ কোনওদিন আমার চোখে পড়েনি৷ আজ এতদিন পরে দুম করে... না, না এ হতে পারে না...’
‘হঠাৎ ক্ষোভের প্রসঙ্গ উঠছে কেন?’ চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷
অরিন্দম একটু থামলেন৷ তারপর বড় করে শ্বাস নিয়ে বললেন, ‘একটা পারিবারিক বিশ্বাস৷ বিশ্বাসটা অন্ধও হতে পারে...’
‘কী বিশ্বাস?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন কৌতূহলী গলায়৷
আমার ঠাকুর্দা মনে করতেন এই খড়্গ স্বয়ং জগজ্জননী মায়ের৷ এই খড়্গের মধ্যে দিয়ে তিনিই প্রকৃতপক্ষে রক্ষা করছেন এই পরিবার৷ তিনি বিশ্বাস করতেন, এই খড়্গ শ্রদ্ধা এবং ভক্তি সহকারে যারা রক্ষা করবে, মায়ের বিশেষ কৃপাও থাকবে তাদের ওপরে...’
‘কী রকম?’ পরিদাদু যেন বেশ মজা পেয়েছেন এই কথা শুনে৷
‘ধর্ম, অর্থ, মোক্ষ যে কোনও বিষয়েই বিশেষ কৃপা’, অরিন্দম বললেন, ‘আমার অন্য শরিক, মানে আমার খুড়তুতো ভাইয়েরা মনে করে আমার পড়াশুনোয় উন্নতি, কেরিয়ার, চাকরি, আর্থিক সচ্ছলতা, সবকিছুর মূলে আসলে এই খড়্গটিই...’
‘তাই নাকি? তারা সরাসরি বলে এ কথা?’ পরিদাদু আবার জিজ্ঞেস করেন৷
‘বলে’, অরিন্দম ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানান, ‘ওদের পড়াশুনো খুব বেশি দূর এগোয়নি৷ এগনোর কথাও ছিল না৷ পড়াশোনার বিষয়ে আগ্রহ আমার কাকারও তেমন ছিল না, তাঁর দুই ছেলের মধ্যেও সে তাগিদ গড়ে ওঠেনি কস্মিনকালেই৷ দেদার জায়গা জমি, পুকুর বাগান আছে পারিবারিক সূত্রে৷ সে সব থেকে আয় রোজগারও মন্দ নয়৷ কাজেই পড়াশুনোর পথে ওরা হাঁটেনি আর...’
‘আপনাকে কি ভাইয়েরা ঈর্ষা করে?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘না ঠিক তা নয়’, অরিন্দম ম্লান হাসেন, ‘তবে হাল্কা একটা দূরত্ব রেখে চলে ওরা আমার সঙ্গে৷ সহজভাবে মিশতে পারে না বোধহয়৷ খড়্গ পুজোর দিন আসে সকলেই, কিন্তু পারিবারিক পুজোর ব্যয়ভার পুরোপুরি আমাকেই বইতে হয় বহু বছর ধরে...’
‘বাড়ির এই অংশে যাতায়াত আছে তো ওঁদের?’
‘তা আছে৷ বউদির সঙ্গে খুবই ভাব-ভালোবাসা ওদের’, রেখা হেসে বললেন, ‘আমার কাছে ওদের আব্দারেরও শেষ নেই৷’
‘যেমন?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘এই তো ক’দিন আগেই হঠাৎ পিকনিক করার বায়না তুলল ওরা৷ বাড়ির ওই অংশের লাগোয়া যে বাগান সেখানে ত্রিপল টাঙিয়ে রাত্রিবেলা রান্নাবান্নার আয়োজন হল৷ বাড়ির সবাই, এমনকি ওদের কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে হইচই হল খুব...’
‘তুমিও গিয়েছিলে তো?’ পরিদাদু অরিন্দমের দিকে চাইলেন৷
‘উঁহু’, অরিন্দম মাথা নাড়লেন, ‘আমি রাত জাগতে পারি না৷ ন’টার মধ্যে ডিনার সেরে নিয়ে শুয়ে পড়তে হয়৷ রাতে দুটো ওষুধ খাই রোজ৷ প্রেশার আর অ্যালার্জির জন্য৷ ওষুধের প্রভাবেই সম্ভবত ঘুম ছাড়তে চায় না চট করে৷ অন্তত ছ’সাত ঘণ্টা আমাকে ঘুমোতেই হয় একটানা...’
‘আচ্ছা৷’ পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘ওই পিকনিকের দিনেও নটার পরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলে?’
‘হ্যাঁ৷’
‘ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে?’
‘দরজার পাল্লা ভেজিয়ে দিয়ে৷ ঘরে আমি একাই শুই৷ রেখা আমাকে দরজা ভিতর থেকে লক করতে বারণ করে৷ আসলে ভয় পায়৷ বয়েস বাড়ছে৷ যদি হঠাৎ শরীর টরীর...’
‘খড়্গটা কোথায় রাখা ছিল?’ পরিদাদু তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে উঠলেন৷
‘এই যে এইখানে’, অরিন্দম উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের একটা মোটাসোটা বড় লোহার হুকের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন, ‘এইখানে ঝোলানো ছিল৷’
‘পিকনিকের পরদিন থেকেই নিখোঁজ ওটা?’
‘সবাই তাই বলছে, কিন্তু আমি সেইটা ঠিক মনে করতে পারছি না’, অরিন্দম ঠোঁট ওল্টালেন, ‘খুব যে নজর রাখি জিনিসটার দিকে, এমন তো নয়৷ ক’দিন আগে মনে হল, পৌষ মাস শেষ হতে খুব বেশি তো দেরি নেই৷ খড়্গটা নামিয়ে বরং খানিক ঝাড়া-মোছা করে নিই৷ তখনই নজর পড়ল, দেওয়াল ফাঁকা...’
পরিদাদু উঠে দেওয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন৷ খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন যেখানে খাঁড়াটা ঝোলানো ছিল তার আশপাশের জায়গা৷ একটা চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়ে তার ওপরে উঠে দাঁড়িয়ে যে হুকে খড়্গটা টাঙানো ছিল তার কাছাকাছি দেওয়ালের এক জায়গায় নাক ঠেকিয়ে বার কয়েক শুঁকলেনও পরিদাদু৷ তারপর চেয়ার থেকে নেমে এসে ঘরের মেঝে, অরিন্দমের খাটের নীচে সর্বত্র চোখ বোলাতে লাগলেন তিনি৷ শাওন উঠে গিয়ে পরিদাদুর পাশে দাঁড়াল৷ চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘কোনও ক্লু পেলে পরিদাদু?’
‘ধুস’, পরিদাদু হাসলেন৷
‘এই ঘরের জানালার পিছনে যে বাগান সেদিকটা থেকে একবার ঘুরে আসবে পরিদাদু?’
‘কেন?’
‘যদি কারও পায়ের ছাপ টাপ থাকে...’
‘এ কি গোয়েন্দা গপ্পো পেয়েছিস নাকি?’ পরিদাদু হো হো করে হেসে ওঠেন, ‘পায়ের ছাপের ক্লু থেকে গোয়েন্দা খুনিকে ধরে ফেলল খপাৎ করে...’
শাওন ভারী অপ্রস্তুত বোধ করতে লাগল৷ পরিদাদু মাঝেমধ্যেই যেন বড় নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে৷ শাওনের মান-সম্মানের কথা তখন আর মনে থাকে না তাঁর৷ একটা সম্ভাবনার কথা সে না হয় বলেইছে৷ সত্যিই তো অনেক গোয়েন্দা গল্পে এমন হয়েই থাকে৷ তার জন্যে সকলের সামনে তাকে এমন হ্যাটা করার কী দরকার বাপু?
শাওনের দিকে এক ঝলক তাকিয়ে ওর মনটাকে পড়ে ফেলেই বোধহয় পরিদাদু এগিয়ে এসে ওর মাথায় হাত রাখলেন, ‘ঘটনাটা তো আর আজ-কালের মধ্যে ঘটেনি শানুবাবু৷ বাগানের দিক থেকে সত্যি কেউ যদি এসেও থাকে সেদিন, এখন তার চিহ্ন কী করে খুঁজে পাওয়া যাবে? বর্ষাকাল হলে তবু পায়ের ছাপ টাপ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ কিন্তু এখন তো সে উপায়ও নেই...’
শাওন কিছু বলার আগেই একটা কচি গলা দরজার কাছ থেকে বলে উঠল, ‘তুমিই নিশ্চয়ই পরিদাদু?’
পরিদাদু আর শাওন, দু’জনে প্রায় একইসঙ্গে দরজার দিকে ফিরল৷ ছোট্ট ছেলেটা একজন বয়স্ক মানুষের হাত ধরে দাঁড়িয়েছিল৷ মানুষটির বয়েস হলে কী হবে, চেহারা বেশ বলিষ্ঠ৷ পরনে লুঙ্গি, ফতুয়া৷ ফতুয়ার ওপরে চাদর জড়ানো৷ অরিন্দম বললেন, ‘বাসুদেবদা, আমার জেঠতুতো দাদা আর আমাদের নাতিবাবু সপ্তর্ষি৷’
শাওনের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে পরিদাদুর কাছে এগিয়ে গেল সপ্তর্ষি৷ তারপর বিষণ্ণ গলায় বলল, ‘আমার খুব মন খারাপ পরিদাদু—’
‘কেন, কী হয়েছে তোমার?’ শাওন নিজে থেকেই কথা বলে ভাব জমানোর চেষ্টা করল ছেলেটার সঙ্গে৷
‘কালুয়া হঠাৎ করেই মরে গেল ক’দিন আগে৷ অথচ আগের দিনও সে সুস্থ ছিল৷ আমার সঙ্গে কত খেলল...’
পরিদাদু অরিন্দমের দিকে চাইতে তিনি হেসে বললেন, ‘কুকুর৷ ঠিক আমাদের পোষা নয়, কিন্তু এ বাড়িতেই থাকত৷ বাইরে পাহারাদারের মতো৷ আমরা খেতে টেতে দিতাম...’
‘কালুয়া খুব মিষ্টি কুকুর ছিল৷ আমার সব কথা ও বুঝত৷ আমিও বুঝতাম ওর কথা...’ সপ্তর্ষি আবার বলল৷
‘কালুয়া কবে মারা গেল সপ্তর্ষি?’ পরিদাদু এগিয়ে এসে সপ্তর্ষির কাঁধের ওপরে একটা হাত রেখে খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন৷
‘গত সপ্তায়’, সপ্তর্ষি বলল, ‘বুধবার ছিল বোধহয় সেদিন৷ ঘুম থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে দেখি সদর দরজার বাইরে কালুয়া চোখ বুজে শুয়ে আছে৷ মুখের এক কোণ থেকে গ্যাঁজা বেরিয়ে গেছে৷ আমি অনেক ডাকলাম, তবু সে তাকাল না৷ সবাই বলল, কালুয়া মরে গেছে...’ চোখ ছল ছল করে উঠল ওর৷
বাসুদেব আলগা হেসে বললেন, ‘ঋষির ধারণা কালুয়ার মৃত্যু স্বাভাবিক নয়৷ আপনি এসেছেন শুনে তাই আমাকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে এল এখানে৷ নিন, এবার আপনিই ঠিক করুন, এই খুদে ক্লায়েন্টের কেস আপনি নেবেন নাকি নেবেন না...’
‘তোমার ডাক নাম বুঝি ঋষি?’ সুছন্দা বললেন, ‘ভারী সুন্দর নাম৷’
সপ্তর্ষি সে কথার উত্তর দিল না৷ পরিদাদুর দিকে তাকিয়ে সে আবার বলল, ‘পরিদাদু, কালুয়াকে নির্ঘাৎ কেউ মেরে ফেলেছে৷ তুমি সেই খুনিকে ধরে শাস্তি দাও...’
‘বড় অফার পেয়েছেন দাদা’, বাসুদেব পরিদাদুর দিকে চেয়ে হাসলেন, ‘দেখুন এই সাঙ্ঘাতিক কেসটা নেবেন কি না?’
পরিদাদু কিন্তু একটুও হাসলেন না৷ বরং খুব সিরিয়াস মুখ করে অরিন্দমকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কুকুরটা কি খড়্গ চুরি হবার আগেই মারা গিয়েছিল?’
‘হ্যাঁ, দু’দিন আগে’, সপ্তর্ষিই উত্তর দিল৷
‘যে রাতে কুকুরটা মারা গেল সেই রাতে সে কি খুব ডাকাডাকি করছিল?’
‘না তো!’ সপ্তর্ষি ভ্রু কুঁচকে বলল৷
‘আপনি কি সত্যিই ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নিচ্ছেন নাকি?’ বাসুদেব অবাক চোখে তাকালেন পরিদাদুর দিকে৷
‘নিচ্ছি’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আমার ধারণা ঋষির অনুমানই সঠিক৷’
‘মানে?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘কালুয়াকে কেউ মেরেই ফেলেছে৷’
‘একটা রাস্তার কুকুরকে মেরে ফেলার দরকার কার পড়বে?’ অরিন্দম বললেন, ‘তুমি মিথ্যে ব্যাপারটাকে এত গুরুত্ব দিচ্ছ পরি৷’
‘দরকার তো কারও নিশ্চয়ই ছিল৷’
‘আমাদের বাড়িতে বাইরের লোকের আসা-যাওয়া তো তেমন নেই৷ আর যারা আসে তারাও পুরনো, বিশ্বাসী মানুষজন৷’ অরিন্দম আবার বললেন৷
‘যেমন?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘সত্য আর গদাইকে তো দেখেইছ এ বাড়িতে আসার পরেই’, অরিন্দম বলতে শুরু করলেন, ‘এ ছাড়া এ বাড়িতে অবারিত দ্বার বলতে আর দু’জনের নামই বলতে হয়৷ ওই অংশের কাজের মেয়ে মিনু আর মালি দিবাকর...’
‘আর হরিকাকা’, সপ্তর্ষি বলল৷
‘তিনি কে?’
‘আরে ওর কথা ছাড়ুন তো’, বাসুদেব উড়িয়ে দিলেন, ‘আমার কাছে আসে মাঝেমধ্যে৷ একসঙ্গে বসে দাবা টাবা খেলি...’
‘আপনার কয় ছেলেমেয়ে বাসুদেবদা?’ পরিদাদু প্রসঙ্গ পালটে বললেন৷
‘আমার একটিই ছেলে৷ আর এই তার একমাত্র পুত্র’, বাসুদেব সপ্তর্ষির পিঠে আলতো চাপড় মারলেন, ‘এক মেয়েও আছে৷ তার বিয়ে হয়ে গেছে বছর পাঁচেক আগে৷ কোন্নগরে থাকে৷’
‘ছেলে কী করে?’ আবার জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷
‘ব্যবসা৷’ বাসুদেব বললেন৷
‘কীসের ব্যবসা?’
‘বিল্ডিং মেটেরিয়ালস৷’
‘কেমন চলছে ব্যবসা?’
‘খুব চালু ব্যবসা’, বাসুদেব মাথা নাড়েন, ‘তাছাড়া আমাদের চাষের জমি টমিও আছে৷ অভাব নেই দাদা আমাদের এই পরিবারে...’
‘বাবার কিন্তু এখন টাকাপয়সার অভাব যাচ্ছে৷’ ফস করে বলে উঠল সপ্তর্ষি৷
‘শুধু পাকা পাকা কথা’, সপ্তর্ষিকে ধমকে উঠলেন বাসুদেব, ‘বড়দের কথার মাঝখানে সবসময় কথা বলতে নেই, কতবার বলেছি তোমাকে...’
পরিদাদু হেসে উঠলেন, ‘তুমি কী করে জানলে সপ্তর্ষি যে তোমার বাবার টাকাপয়সার অভাব যাচ্ছে?’
‘গত মাসে বাবাকে একটা নতুন ক্রিকেট ব্যাট কিনে দিতে বলেছিলাম, বাবা বলল হাতে একদম টাকাপয়সা নেই৷ পরে ভাবা যাবে এসব কথা...’
বাসুদেবও হেসে উঠলেন এইবার৷ পরিদাদুর দিকে চেয়ে বলে উঠলেন তিনি, ‘কেমন ক্লায়েন্টের কাজ নিতে চাইছেন বুঝতে পারছেন তো পরিমলবাবু?’
‘হুঁ’, পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘কিন্তু তবুও ওর কাজটা আমি নিচ্ছি...’
বিকেলবেলা যথারীতি পরিদাদু একা একা বেরিয়ে গেলেন৷ অরুণাংশু একবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কোথায় চললে এখন? এদিকে ঠান্ডা কিন্তু ঢের বেশি৷ একান্তই যদি বেরোতে হয় প্রোটেকশন নিয়ে বেরিও...’
‘হ্যাঁ, নিয়েছি’, পরিদাদু আলগা হাসলেন৷
‘এখন যাচ্ছটাই বা কোথায়?’ সুছন্দা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার পায়ের নিচে কি সর্ষে আটকানো আছে? ঘরে মন টেকে না কিছুতেই!’
নতুন জায়গায় এলে এলাকার মানুষজনের সঙ্গে আলাপ পরিচয় করতে ভালো লাগে আমার৷ কথাবার্তায় পুরো এলাকাটার ইতিহাস, ভূগোল সম্পর্কে একটা স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হয়ে যায়...’
‘আমি কি তোমার সঙ্গে যাব?’ শাওন আগ্রহী গলায় জিজ্ঞেস করল৷
‘না, দরকার নেই’, পরিদাদু দু’দিকে মাথা নাড়লেন, ‘তুই মা-বাবার সঙ্গে বাড়িতেই থাক৷ নতুন জায়গা৷ টেম্পারেচারের ডিফারেন্স ভালোই৷ চট করে ঠান্ডা লেগে গেলেই চিত্তির...’
শাওনের মন খারাপ হয়ে গেল৷ সে জানে, ঠান্ডা লেগে যাবার ব্যাপারটা কথার কথা৷ আসলে পরিদাদু এখন একাই যেতে চাইছেন৷ সে বেশ বুঝতে পারছিল, পরিদাদু নিশ্চিত এই খড়্গ চুরির বিষয়েই খোঁজ-খবর করতে বেরোচ্ছেন৷ নিছক এলাকা ঘুরে বেড়ানোটা আদৌ উদ্দেশ্য নয় তাঁর৷
রাতে পরিদাদুর সঙ্গে একসঙ্গেই শোয়ার বন্দোবস্ত হয়েছে শাওনের৷ সুছন্দা একবার বলেছিলেন, ‘শানু আমাদের ঘরের বিছানাটা পেল্লায় বড়৷ আয় আমরা তিনজনেই একসঙ্গে শুয়ে পড়ি৷’
শাওন রাজি হয়নি৷
পরিদাদু বিছানায় আসতেই চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল সে, ‘আজ কার কার সঙ্গে কথা বললে পরিদাদু?’
‘অনেকের সঙ্গে৷’
‘যেমন?’
‘হারান মুদি, ওষুধের দোকানের বিপিন সামন্ত, রবীন নাপিত, সুখেন নস্কর...’
‘সুখেন নস্কর কে পরিদাদু?’
‘বাজারের মধ্যে ওর সারের দোকান৷ ওর কাছ থেকেই মকবুল মিস্ত্রির ঠিকানা জোগাড় করে তার কাছেও গেসলাম...’
‘কেন?’
‘দরকার যে ছিল তা তো বুঝতেই পারছিস...’
‘কাজ হল? কিছু সূত্র পেলে?’
‘সূত্র তো আগেই পেয়েছিলাম৷ আমি শুধু দুই, দুই আর তিনে মিলে সাত করার চেষ্টা করছি এখন...’
‘মানে?’
‘কালই বলব সকলের সামনে’, পরিদাদু হাসলেন, ‘অবিশ্যি তার মধ্যেই খড়্গটার একটা সন্ধান-টন্ধান মিলে যাওয়াটাও আশ্চর্যের নয়...’
‘খড়্গ তুমি উদ্ধার করে ফেলেছ?’
‘ঠিক উদ্ধার করিনি৷ তবে তার সুলুক-সন্ধান সম্ভবত জেনে ফেলেছি৷ আর সেটা জেনেই টোপ দিয়েছি একটা৷ চোর খুব বুদ্ধিমান মানুষ নয়৷ আমার ধারণা সে এই টোপটা গিলে নেবে...’ বলেই পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন পরিদাদু৷ একটু পরেই ফুর ফুর করে তাঁর নাক ডাকতে লাগল৷
খড়্গটা কে চুরি করতে পারে তাই নিয়ে কিছুক্ষণ আকাশ-পাতাল ভাবল শাওন৷ তারপর একসময় সে নিজেও ঘুমিয়ে পড়ল৷
সকালে বেশ তাড়াতাড়িই ঘুম ভেঙে গেল শাওনের৷ আর ঘুম ভাঙার পরেই ঘরের বাইরে বেশ একটা হইচই কানে এল তার৷ একসঙ্গে অনেকেই খুব উত্তেজিত স্বরে কথা বলছিল৷ পরিদাদু বিছানায় নেই৷ চিরকালই শাওন ঘুম থেকে ওঠার অনেক আগেই উঠে পড়েন তিনি৷ ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ, দাড়ি কাটা সেরে বেরিয়ে পড়েন মর্নিং ওয়াকে৷ শাওন ধড়মড় করে উঠে বসল৷ দ্রুত বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে জল দিয়ে বেরিয়ে এল ঘরের বাইরে৷
বাইরে বেশ জটলা চলছে তখন৷ সেখানে তার মা-বাবা, এমনকি পরিদাদুকেও দেখতে পেল সে৷ অরিন্দমও ছিলেন৷ শাওন বাইরে আসতেই সুছন্দা এগিয়ে লেলেন, ‘কাণ্ড শুনেছিস শানু?’
‘কী হয়েছে?’ অবাক হয়ে মা-কে জিজ্ঞেস করে শাওন৷
‘খড়্গটা পাওয়া গেছে৷’
‘কোথায়?’ জিজ্ঞেস করেই পরিদাদুর দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে নিল শাওন৷
পরিদাদু মুচকি হাসলেন৷
অরিন্দম উত্তেজিত স্বরে বললেন, ‘সত্য আজ ভোর রাতে স্বপ্ন পেয়েছে৷ এক নারীকণ্ঠ তার কানে কানে বলে গেছে, তাঁর খড়্গ নাকি আমাদের খিড়কি পুকুরের জলের মধ্যে ডুবে রয়েছে৷ সেই কণ্ঠ আরও বলেছে, দীর্ঘদিন অবহেলায় উপোসী পড়ে থেকে রাগে অগ্নিশর্মা হয়েছে ওই খড়্গ৷ তাই সেই নারী তাকে পুকুরে ডুবিয়ে ঠান্ডা করার ব্যবস্থা করেছিলেন৷ স্বপ্ন পেয়ে রাত ভোর হবার আগেই সত্য ছুটে এসে পুকুরে নেমেছিল৷ তখনই তার হাতে উঠে আসে খড়্গটি...’
সুছন্দা কপালে হাত ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠলেন, ‘মায়ের কী লীলা, বলো পরিকাকু৷ তুমি তো সহজে কিছু বিশ্বাস করতে চাও না৷ এখন নিজের চোখেই দেখো৷ কী বলবে বলো এইবার...’
‘আমার যা বলার আজ বিকেলেই বলব অরিন্দম’, মুচকি হেসে বললেন পরিদাদু, ‘তুমি শুধু আমার কথামতো সকলকে জড়ো কোরো তোমার বৈঠকখানা ঘরে...’
বিকেলে অরিন্দমের বসার ঘরে বাড়ির সদস্যেরা তো ছিলেনই, সঙ্গে সত্য, গদাই, দিবাকর আর হরিশংকরকেও ডাকা হয়েছে৷ সপ্তর্ষি এবং তার মা-কে পরিদাদু এই আসর থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন৷ আর বলেছেন মিনুরও এখানে থাকার কোনও দরকার নেই৷ কাজেই তারা উপস্থিত নেই আজ৷
রেখা চা আর স্ন্যাক্সের বন্দোবস্ত রেখেছিলেন৷ চায়ে চুমুক দিয়ে হাল্কা গলায় তিনি বললেন, ‘বেশ একটা গোয়েন্দা গল্পের ক্লাইম্যাক্সের ফিলিংস আসছে পরিমলদা৷’
পরিদাদু হাসলেন৷ তারপর তারপর চায়ে লম্বা চুমুক দিয়ে বললেন, ‘বেশি কথা কিছু বলার নেই৷ আমার ঘাড়ে প্রথম যে দায়িত্ব অরিন্দম চাপিয়েছিল, সে সমস্যার সুরাহা হয়ে গেছে৷ খড়্গ ইতোমধ্যেই পাওয়া গেছে৷ বাকি রইল শুধু সপ্তর্ষির থেকে পাওয়া কেসটা৷’
‘মানে কালুয়ার খুনের তদন্ত...’ শাওন বলল৷
‘কালুয়াকে কি সত্যিই মেরে ফেলা হয়েছিল নাকি?’ অরিন্দম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘হ্যাঁ’, মাথা নাড়লেন পরিদাদু৷
‘কে এমন কাজ করল?’ রেখা বললেন বিমর্ষ স্বরে, ‘একটা অবলা প্রাণী...’
‘অবলা নয় বলেই তো তার অমন বিপদ ঘটল বউদি’, পরিদাদু হাসলেন, ‘তার চিৎকার থামাতেই তো আগেভাগে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল...’
‘মানে?’
‘নইলে কি আপনাদের বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে ওই খড়্গটাকে অমন নিরাপদে অরিন্দমের ঘর থেকে বের করে নেওয়া যেত? কালুয়া চিল্লে পাড়া মাথায় করত না? অরিন্দমের ঘুমও সে চেল্লানিতে নির্ঘাৎ ভেঙে যেত...’
‘কালুয়াকে তার খুব চেনা লোকই মেরেছিল৷ রাতের খাবারের সঙ্গে বিষ দিয়ে৷ তাই তো দিবাকর?’ বলেই মালি দিবাকর দাসের দিকে কড়া চোখে চাইলেন পরিদাদু৷
‘আমি কালুয়াকে মারিনি, বিশ্বাস করুন’, দিবাকর দু’হাত জোড় করে বলল, ‘আমি তো রাতে এ বাড়িতে থাকি না হুজুর...’
‘জানি’, পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কিন্তু বিষ তুমিই কিনেছিলে, আমি দোকানে গিয়ে খোঁজ নিয়েছি৷’
‘গাছের পরিচর্যার জন্যে বিষ ওকে তো কিনতেই হয়...’ বাসুদেবের ছেলে কুন্তল বলে উঠল বিরক্ত হয়ে৷
‘কিন্তু দু’দিনের ব্যবধানে বিষ আগে কখনও তো কিনতে হয়নি কুন্তল!’ পরিদাদু চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন, ‘আমি ঋষিকে ইচ্ছে করেই রাখিনি এখানে৷ আমি চাইনি, নিজের বাবা সম্পর্কে তার মনে অশ্রদ্ধা কিংবা অবিশ্বাস জন্মাক...’
‘কিন্তু যেদিন খড়্গটা চুরি হল, সে রাতে আমি তো বাড়িতেই ছিলাম না৷ পিকনিকে ব্যস্ত ছিলাম সকলের সঙ্গে৷ তা হলে আমি খড়্গটা চুরি করব কী ভাবে?’
‘তুমি চুরি করেছ, সে কথা তো বলিনি হে’, পরিদাদু কুন্তলের চোখে চোখ রাখলেন, ‘আমি বলতে চাইছি, তুমি চুরিতে সহযোগিতা করেছ...’
‘এ আপনি কী বলছেন মশাই?’ বাসুদেব উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘বাড়ির জিনিস চুরি করিয়ে কুন্তলের কী লাভ?’
‘লাভ দুটো’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আপনি নিজেও খুব ভালো করেই তো সবটা জানেন বাসুবাবু৷ প্রথম লাভ, হরিশংকরকে খড়্গটা পাইয়ে দিয়ে ধার দেনা থেকে মুক্ত হওয়া, আর দ্বিতীয় লাভ, জ্ঞাতির বাড়বাড়ন্ত খানিক ব্যাহত করা...’
‘কী বলছ পরিমল’, অরিন্দম ব্যথিত গলায় বললেন, ‘এ হতেই পারে না...’
‘বাস্তব বড্ড নিষ্ঠুর অরিন্দম’, পরিদাদু আবার বলতে শুরু করলেন, ‘ইদানীং সত্যিই কুন্তলের ব্যবসা ভালো চলছিল না৷ মহাজনের কাছে ধার বাড়ছিল৷ পাড়ার মুদির দোকানের ধার মেটানোও কঠিন হয়েছিল তার পক্ষে৷ হরিশংকর এই দুর্দিনে খানিক সাহায্য করছিলেন তাঁদের, কিন্তু বিনা স্বার্থে তিনিই বা কত টানবেন? কাজেই এই অন্যায় আব্দারটি করে বসলেন তিনি৷ এ গ্রামে সবাই জানে, মায়ের এই খড়্গ সৌভাগ্যের প্রতীক৷ যে ঘরে থাকবে...’
‘তাই বলে আমি চুরি করব?’ হরিশংকর রুখে উঠলেন৷
‘তা বলতে গেলে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে অন্যকে দিয়ে খড়্গটা দেওয়াল থেকে পাড়িয়েও কেউ যদি সেটা হস্তগত করে তাকে চুরিই বলতে হয়...’
‘কে নামিয়ে এনেছিল ওটা?’
‘গদাই’, পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন৷
‘কক্ষনও নয়’, প্রতিবাদ করে উঠল গদাই৷
‘একদম মিথ্যে কথা নয়’, গর্জে উঠলেন পরিদাদু, ‘এই যে দেওয়ালে তোমার আঙুলের স্পষ্ট ছাপ লেগে আছে৷ হুক থেকে ধরে নামানোর সময় হাতে খড়্গের গায়ে মাখানো সিঁদুর লেগেছিল৷ সেই সিঁদুর এই যে দেওয়ালে মুছেছ তুমি গদাই...’
‘আমিই যে হাত মুছেছি, কী প্রমাণ আছে তার?’
‘আছে, আছে’, পরিদাদু হেসে উঠলেন, ‘ছোট্ট একটা ভুল করেছ যে হে৷ ভুলে গিয়েছিলে, তোমার ডান হাতে একটা আঙুল মাঝখান থেকে কাটা...’
গদাই থরথর করে কাঁপছিল৷
হরিশংকর বললেন, ‘কিন্তু আমি ছিলাম সে কথা এত জোর দিয়ে বলছেন কী ভাবে?’
‘এই নস্যির ডিবেটার জন্যে...’ পরিদাদু পকেট থেকে কৌটোটা বের করলেন, ‘অসাবধানে পড়ে গিয়েছিল হাত থেকে৷ দেওয়ালেও অবিশ্যি খানিক নস্যি লেগেছিল গদাইকে সাহায্য করার সময়... পরদিন আবার নস্যির কৌটো কিনতে হল দোকান থেকে...’
হরিশংকর ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারের ওপরে৷
অরিন্দম হতাশ গলায় বললেন, ‘এত কিছুর কী দরকার ছিল রে কুন্তল? আর বাসুদা, তুমিই বা কী! বাড়িতে এমন অনটন আমাকে একবার জানাতে পারলে না? আমরা কি মরে গেছি?’
বাড়ি ফেরার সময় শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা পরিদাদু, হরিশংকর দুম করে খড়্গটা ফিরিয়ে দিয়ে গেল কেন বলো তো?’
‘গুড কোয়েশ্চেন’, অরুণাংশু মাথা নাড়লেন, ‘আমারও এই প্রশ্নটাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে তখন থেকে৷’
‘লোকটা সুপারস্টিশাস, বুঝতেই তো পারছিস৷ নইলে খড়্গ দিয়ে কেউ ভাগ্য ফেরাতে চায়? আমি কায়দা করে রটিয়ে দিয়েছিলাম, অন্যায়ভাবে এই খড়্গ কেউ নিজের বাড়িতে রাখতে চাইলে এক বছরের মধ্যে বংশনাশ হয়৷ এ বিষয়ে কালী মন্দিরের ধনঞ্জয় ঠাকুর অনেকটাই সাহায্য করে দিয়েছিলেন৷ তাঁর মাধ্যমে শাস্ত্রবাক্যের নামে দু’-একটা শ্লোক-টোকও ঝেড়ে দিয়েছিলাম বানিয়ে৷ এদের সংস্কৃতজ্ঞান তো জানি! নিশ্চিত ছিলাম, ধরতে পারবে না...’
পরিদাদুর কথা শুনে শাওন হেসে উঠল হো হো করে৷ সুছন্দা আর অরুণাংশুও সে হাসিতে যোগ দিলেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন