জয়দীপ চক্রবর্তী
সুছন্দা এক কথায় বলে দিলেন, ‘না, না, এখনও ঘুরে বেড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে মোটেই পৌঁছইনি আমরা৷ সংক্রমণ খানিক কমেছে ঠিকই, কিন্তু সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ যে অবশ্যম্ভাবী, সে কথাও তো পই পই করে বলছেন বিজ্ঞানীরা৷’
‘তোমার কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়, এ কথা হাজার বার মানছি৷ কিন্তু এইভাবে ঘরে বসে কতদিনই বা কাটানো যায় বলো!’ অরুণাংশু দু’দিকে মাথা নাড়তে থাকেন প্রবল বেগে, ‘গত মাসখানেক ইনফেকশন রেট নেগলিজিবল স্মল৷ তাছাড়া ফেসবুক খুললেই এ, ও, সে, পাহাড়, সমুদ্রে বেড়াতে যাওয়ার ছবি সাঁটছে দেখতে পাচ্ছি৷ কাঁহাতক সহ্য করা যায় এই ভাবে?’
অরুণাংশু এমনভাবে কথাটা বললেন যে পরিদাদু হেসে উঠলেন হো হো করে৷
পরিদাদুকে হাসতে দেখে অরুণাংশু যেন আরও উৎসাহ পেলেন৷ তাঁর দিকে চেয়ে বলেন, ‘আচ্ছা পরি, তুমিই বলো, এই কি একটা জীবন? তাছাড়া শানুটার শাস্তির কথা ভাবো একবার! বছর ঘুরে গেল৷ ইশকুল নেই পাঠশাল নেই৷ খেলার মাঠ খাঁ খাঁ করছে৷ সারা দিন-রাত্তির হাঁ করে বসে আছে ল্যাপটপের সামনে৷ ভার্চুয়াল ক্লাস, ক্লাসের পরে অনলাইন স্টাডি মেটেরিয়াল, একজাম...’
‘ঠিক’, মাথা নাড়লেন পরিদাদু, ‘শানুটার জন্যে এক-দুটো দিনের জন্যে অন্তত একটু ঘুরে টুরে আসতে পারলে সত্যিই ভালো হত৷ এমন চললে ছেলেটা ক’দিন পরে অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বে৷’
‘তোমার বন্ধুর না হয় মাথায় ছিট আছে, তাই বলে তুমিও ওর হুজুগে সায় দিচ্ছ পরিকাকু?’ সুছন্দা রাগ রাগ গলায় বলে উঠলেন পরিদাদু আর অরুণাংশুর সামনে চায়ের কাপ নামিয়ে রাখতে রাখতে৷’
‘দেখ খুকু, তোর কথা যেমন একশো ভাগ সত্যি, আবার অরুণাংশুর কথাটাও উড়িয়ে দেবার মতো নয়৷’
‘মানে?’
‘দীর্ঘদিন চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে থাকতে থাকতে ছোটদের মানসিক অবসাদ আসছে এটা পরীক্ষিত সত্য৷ বড়রা তবু লকডাউন উঠে যাওয়ার পর অফিস-কাছারি বাজারহাট যাচ্ছে৷ কিন্তু শানুর মতো যারা, ওদের এখনও স্কুল বন্ধ৷ একবার ভেবেছিস ওদের মনের অবস্থাটা? মনে রাখিস, স্কুল শুধুমাত্র পড়াশোনার জায়গাই নয়, এই বয়েসের ছেলে-মেয়েদের কাছে স্কুল দম ফেলে বাঁচবারও জায়গা৷ স্কুলই ওদের ধীরে ধীরে সামাজিক করে তোলে৷ তাছাড়া পারস্পরিক মত বিনিময়ের এমন সুযোগ আর কোথায় পায় ওরা বল? বাড়িতে এমন করে মুখ বুজিয়ে ল্যাপটপ, মোবাইলে ডুবে থেকে ওদের মনের সঠিক বিকাশ কি সম্ভব?’
‘তাহলে? কী উপায় তুমিই বলো? অরুণের কথা শুনে এখন কি ট্রেনের রিজার্ভেশন করতে ছুটব সবাই মিলে?’
‘মোটেই নয়৷ এ বিষয়ে আমি তোর মতকেই সমর্থন করছি৷ দূরে বেড়াতে যাওয়ার সময় এখনও আসেনি৷’
‘কাছাকাছির মধ্যে কোথায় যাবে বলছ? শান্তিনিকেতন? তারাপীঠ?’ অরুণাংশু বলে উঠলেন৷
‘উঁহু৷’
‘তা হলে কি পুরুলিয়া, অযোধ্যা পাহাড়? নাকি গড়বেতা?’
‘কোথাও নয়৷ দল বেঁধে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অ্যাভেল করার পক্ষপাতী আমি আপাতত নই৷’
‘কী হেঁয়ালি শুরু করলে বলো দেখি?’ অরুণাংশু চায়ের কাপে লম্বা চুমুক দিয়ে বলেন, ‘এ যেন সুকুমারের সেই ছড়ার মতো, খাচ্চি, কিন্তু গিলচি না... বেড়াতে যাব, কিন্তু পাবলিক ট্রান্সপোর্ট অ্যাভেল করব না...’
‘একটা গাড়ি ভাড়া করে একদিন চিড়িয়াখানা বা বোটানিক্যাল গার্ডেন যাওয়া যায়’, এতক্ষণ চুপ করে শোনার পর এইবার কথা বলে উঠল শাওন৷
‘তা যাওয়া যায়’, অরুণাংশু মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলেন, ‘কিন্তু দুটো জায়গাই তো তোর আগে ঘুরে আসা৷ আবার গিয়ে ভালো লাগবে?’
‘আমি বলি কী, একদিনে ভিড় ভাড়াক্কার মধ্যে টো টো করে ঘুরে আসা নয়৷ হাতে দুটো-তিনটে দিন নিয়েই ঘুরে আসি বরং৷ ফাঁকায় ফাঁকায়৷ লোকজনের ভিড় এড়িয়ে৷ রোগের ভয় থাকল না, আবার দু’দিনের একটা ছোট্ট টুরও হয়ে গেল’ পরিদাদু চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা ডিশের ওপরে নামিয়ে দিয়ে বললেন৷
‘কোথায়?’ অরুণাংশু, সুছন্দা দু’জনেই বলে উঠলেন একসঙ্গে৷
‘ক্যানিং, গোসাবা৷’
‘ধ্যাত, ক্যানিং একটা বেড়াতে যাওয়ার মতো জায়গা হল?’ সুছন্দা চোখ কুঁচকে বললেন, ‘মাছের ভেড়ি ছাড়া আর কী আছে সেখানে? তবু যদি বলতে সুন্দরবন তা হলে বুঝতাম৷’
‘এই মুহূর্তে তো দল বেঁধে সুন্দরবন বেড়াতে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর কথা ভাবছিলাম’, পরিদাদু গম্ভীর মুখে বললেন, ‘ক্যানিং গেছিস আগে?’
‘একবার গিয়েছিলাম বোধহয়’, অরুণাংশু মাথা চুলকে বললেন, ‘আমার এক অফিস কোলিগের ছেলের বিয়ের নেমন্তন্ন খেতে৷’
‘পোর্ট ক্যানিং কোম্পানির কুঠিবাড়ি দেখা হয়েছে?’
‘সে আবার কী?’ চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু৷
পরিদাদু লম্বা করে শ্বাস ছাড়লেন, ‘কত টাকা খরচ করে দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাস খুঁজতে যাই আমরা৷ অথচ ঘরের পাশের যে ইতিহাস, সে সম্পর্কে না আছে আমাদের সচেতনতা না আছে সে ইতিহাস সংরক্ষণের প্রয়োজনবোধ৷ তা যদি থাকত তা হলে নীলকুঠি আর গোলকুঠি এমন অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যেত না...’
‘সেগুলোও ওই ক্যানিং-এই ছিল বুঝি?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘হ্যাঁ৷ পোর্ট ক্যানিং ল্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট রিক্ল্যামেশন অ্যান্ড ডক কোম্পানি তিনটি কুঠি তৈরি করেছিল ওই অঞ্চলে৷ তার মধ্যে পড়ি পড়ি করেও ওই একখানিই দাঁড়িয়ে আছে এখনও পর্যন্ত৷ ক’দিন থাকবে তা অবিশ্যি বলতে পারি না৷ আমার বন্ধু অসিত রায় অনেকদিন থেকেই একবার যেতে বলছে ওখানে৷ গত পরশুও ফোন করে বলছিল খুব দ্রুত একবার তার কাছে যাওয়ার জন্যে৷ যাবও হয়তো আমি দু’-একদিনের মধ্যে৷ তাই ভাবছিলাম, রাজি থাকলে তোমাদেরও আমার সঙ্গী করে নিই৷’
‘অসিতবাবু ক্যানিংয়েই থাকেন বুঝি?’
‘হ্যাঁ৷ মিঠেখালিতে৷ যে জীর্ণ কুঠিবাড়িটা পড়ি পড়ি অবস্থাতে দেড়শো বছর অতিক্রম করেও কোনওক্রমে দাঁড়িয়ে আছে এখনও, অসিতের বাড়িটা সে কুঠির কাছেই৷’
‘আরিব্বাস, সে তো দারুণ ব্যাপার হবে তাহলে’, অরুণাংশু বলে উঠলেন৷
‘মিঠেখালি নামটাও কী মিষ্টি বলো?’ সুছন্দা বললেন৷
‘ওদিকের জায়গাগুলোর অমনই নাম৷ নামের শেষে একটা করে খালি জুড়ে দেওয়া৷ নদীনালা, খাল-বিলের দেশ তো! তাই বোধহয় অমন নাম৷ ঝড়খালি, সজনেখালি, মিঠেখালি...’ অরুণাংশু বললেন শাওনের দিকে চেয়ে৷
‘তা হলে আমার সঙ্গে তোমাদের যাওয়ার ব্যাপারটা পাক্কা তো?’
‘নিশ্চয়ই৷’
‘অসিত আমার অনেকদিনের বন্ধু৷ ভারি সজ্জন মানুষ৷ আশা করি তার আতিথ্য তোমাদের খুব একটা খারাপ লাগবে না...’
‘কী যে বলো পরিকাকু’ সুছন্দা লজ্জা পাওয়া গলায় বলেন৷
‘তা হলে অসিতকে কী বলব? তোমরা যাচ্ছ আমার সঙ্গে?’
‘আলবাত যাচ্ছি’, অরুণাংশু শাওনের দিকে তাকায়, ‘কী বলিস রে শানু?’
‘নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই’, হাততালি দিয়ে বলে ওঠে শাওন৷
‘আমরা পরশু বেরোচ্ছি তাহলে’, পরিদাদু বললেন, ‘একটা গাড়ি ঠিক করে নেব৷ ক্যানিং পৌঁছে দেবে আমাদের৷ ফেরার বন্দোবস্ত অসিতের৷’
অরুণাংশু সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন৷ শাওনের মন বলছিল, এইরকম বেয়াড়া সময়ে, যখন অতিমারি পুরোপুরি শেষ হয়নি, পরিদাদুর এমন তাড়াহুড়ো করে বন্ধুর বাড়িতে যাওয়াটা নিছক বেড়ানোর জন্যে হতেই পারে না৷ নিশ্চিত অন্য কিছু একটা কারণ আছে৷ পরিদাদু নিজে থেকে সে কারণ বলেননি মানে তাঁকে জিজ্ঞেস করেও কোনও লাভ নেই এই মুহূর্তে৷ শাওন জানে৷ কাজেই কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতেই হবে তাকে এখন উৎকণ্ঠা নিয়ে৷
অসিতদাদু সত্যিই ভারি অমায়িক মানুষ৷ তাঁর বাড়ির অন্যেরাও তাঁরই মতো দিলদরিয়া আর হুল্লোড়প্রিয়৷ অসিতদাদুর মেয়ে মেঘলীনা দিদি ক্লাস নাইনে পড়ে৷ শাওনের থেকে মাত্রই এক ক্লাস উঁচুতে৷ মেঘলীনার সঙ্গে খুবই ভাব জমে গেল শাওনের৷ মেঘলীনা দিদি খুব ভালো ছাত্রী৷ ইতিহাস শানুর তেমন ভালো লাগে না, কিন্তু মেঘলীনা দিদির ওইটাই সবচেয়ে প্রিয় বিষয়৷ বিশেষ করে স্থানীয় ইতিহাস সম্পর্কে দারুণ উৎসাহ ওর৷
মেঘলীনার কাছ থেকেই শাওন জানল, উনিশ শতকের মাঝামাঝি লর্ড ক্যানিং-এর নামেই এই এলাকার নাম হয়েছিল ক্যানিং৷
পরিদাদু সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, ‘লর্ড ক্যানিং কে ছিলেন জানা আছে তোর, শানু?’
‘হুঁ’, মাথা নাড়ে শাওন, ‘ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল এবং প্রথম ভাইসরয়—’
‘ভেরি গুড’ শাওনের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলেন অসিতদাদু, ‘এই ক্যানিং সাহেবের আমলেই মাতলা নদীর তীরবর্তী আমাদের এই অঞ্চল হুগলি বন্দরের বিকল্প হিসেবে নির্বাচিত হয়৷ আর সেই বন্দরের উন্নতি, ডক এবং ট্রাম লাইন তৈরি করার উদ্দেশ্যে গড়ে উঠল পোর্ট ক্যানিং ল্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট রিক্ল্যামেশন অ্যান্ড ডক কোম্পানি৷’
‘সে ডকে সত্যিই জাহাজ আসত?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন চোখ গোল গোল করে৷
‘আসতো বইকি’ অসিত বলেন, ‘আঠারোশো পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি নাগাদ ছাব্বিশটা জাহাজ এই বন্দরে এসে ভিড়েছিল৷’
‘আরিব্বাস’, অরুণাংশু বলে উঠলেন৷
‘কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আঠারোশো একাত্তরে বন্দরটি সরকারিভাবেই পরিত্যক্ত ঘোষিত হয়৷’
‘যাহ, কেন?’ অরুণাংশু বললেন আবার৷
‘কে জানে!’ ঠোঁট ওল্টালেন অসিত রায়, ‘সায়েব সুবোদের খেয়াল...’
‘এই কোম্পানিই তো কুঠিবাড়িগুলো তৈরি করেছিল তাই না পরিদাদু? তুমি বলছিলে সেদিন?’ শাওন বলল৷
‘হ্যাঁ’, পরিদাদু ঘাড় নাড়লেন৷
‘কিন্তু সেগুলো তো আমরা রাখতেই পারলাম না দাদুভাই’, অসিত রায় আক্ষেপের সঙ্গে মাথা নাড়তে লাগলেন, ‘মানুষের লোভ যে বড় খারাপ জিনিস ভাই৷ সে ভালো-মন্দ উচিত-অনুচিত বোঝে না৷ তা নইলে ভাবো, যে গোলবাড়িতে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ এসে রাত কাটিয়েছিলেন, সেই বাড়িটা পর্যন্ত প্রোমোটারের গ্রাসে চলে গেল! নিজেদের এত সংস্কৃতিমনস্ক জাত বলে অহংকার করি আমরা, অথচ এই বিচ্ছিরি ঘটনাগুলো কি আটকাতে পারছি কেউ? আসলে মুখে বড় বড় কথা বললে কী হবে, সত্যি সত্যিই আমরা একটা আত্মঘাতী জাত৷’
‘রবীন্দ্রনাথ এখানে রাত কাটিয়ে গেছেন?’ অবাক হয়ে বলে শাওন৷
‘হ্যাঁ’, মেঘলীনা বলে হাসতে হাসতে, ‘আমাদের ক্যানিং খুব ফেলনা জায়গা নয় শাওন৷ ড্যানিয়েল হ্যামিলটন সাহেবের আমন্ত্রণে উনিশশো’ বত্রিশ সালের দিকে একবার তাঁর গোসাবার বাংলোয় বেড়াতে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ৷ শীতে৷ গোসাবা যাওয়ার পথে এই গোলকুঠিতেই রাত্রিবাস করেছিলেন তিনি৷’
‘ইশ, এমন একটা ঐতিহাসিক ভবনের সংরক্ষণ হল না?’ সুছন্দা বিরক্ত হয়ে বললেন৷
‘ইতিহাস এবং প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতাই আমাদের অতীতটাকে মুছে ফেলছে মিসেস...’
‘খুকু, ব্যস৷ ও আমার ভাইঝি মানে তোমারও ভাইঝি৷ অমন ফরম্যালিটি করার দরকার নেই ওর সঙ্গে’, অসিতবাবুকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বললেন পরিদাদু৷
‘আচ্ছা আচ্ছা তাই’, অসিত রায় হাসলেন, ‘এরপর আর ভুল করব না৷’
সুছন্দাও হাসলেন৷
অরুণাংশু বললেন, ‘যে কুঠিটা এখনও টিকে আছে সেটাকে অন্তত দেখে আসা যাক, কী বলো পরি?’
‘নিশ্চয়ই, পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘সেটাও ক’দিন থাকবে আর কে জানে! পলেস্তরা খসে যা জীর্ণ দশা হয়েছে বাড়িটার! সম্পূর্ণ ধসে পড়ার আগে তোমাদের ওই ঐতিহাসিক বাড়িটা দেখানোর জন্যেই তো টেনে নিয়ে এলাম এখানে৷’
‘কখন যাব পরিদাদু?’ শাওন জিজ্ঞেস করল উৎসাহের সঙ্গে৷
‘ওখানে তো যখন খুশি যাওয়া যায়’, মেঘলীনা বলল হাসতে হাসতে, ‘আমাদের বাড়ির কাছেই তো৷ হেঁটে বড়জোর মিনিট পাঁচেক...’
‘চলো তা হলে এখনই ঘুরে আসি’, শাওন বলে৷
‘না এখন নয়’, অসিতদাদু হেসে শাওনের পিঠে হাত রাখলেন, ‘দুপুরের খাওয়া-দাওয়া হলে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরিও৷ মেঘলীনা তোমাদের সঙ্গে যাবেখন৷ অসুবিধা হবে না৷ চারপাশটা ঘুরে দেখে-টেখে নিয়ে সন্ধের আগে ফিরে এসো...’
‘তুমি যাবে না?’ শাওন জিজ্ঞেস করল তাঁকে৷
‘আমি আর কতবার দেখব দাদু?’ অসিত হাসলেন, ‘আমি আর তোমার পরিদাদু না হয় ওই সময়টা বসে খানিক গল্পগাছা করে নেবখন...’
‘পরিদাদুও যাবে না?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল শাওন৷
‘তোমরাই ঘুরে এসো না’, অসিত হাসলেন, ‘আমাদের টানাটানি করে লাভ কী? দুই বন্ধুর কতদিন পরে দেখা হল৷ চুটিয়ে আড্ডা মেরে নিই বরং দুটো দিন... তাছাড়া আজ আমার কাছে মিস্টার পানিগ্রাহীর আসার কথা আছে৷ আমি চাইছিলাম ওই সময়টা পরিমল আমার সঙ্গে থাকুক৷’
‘মিস্টার পানিগ্রাহী কে?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন চোখ সরু করে৷
‘মস্ত বিজনেসম্যান’ অসিত রায় বললেন, ‘কলকাতায় নানান রকমের ব্যবসা আছে শুনেছি৷ সম্প্রতি এদিকে নিজের বিজনেস এক্সটেন্ড করতে চাইছেন৷’
‘কী বিজনেস?’
‘আমার একটা জমি আছে নদীর কাছেই৷ ওই রাজার লাট-এ৷ ওই জমিটা ভদ্রলোক কিনতে চাইছেন৷ আমার জমি সংলগ্ন জমি নাজির মণ্ডলের৷ তাঁর সঙ্গেও নাকি কথা বলেছেন তিনি৷ এক লপতে অনেকখানি জমি নিয়ে তিনি ভেড়ি, সঙ্গে একটা বাংলো টাইপ বাড়ি বানাতে চাইছেন বেশ বাগান-টাগান করে৷ বলছেন শহরের ধুলোবালির জীবনে অনেক তো থাকা হল৷ এখন একটু ফাঁকা জায়গায় থাকতে চাইছেন৷ মাঝেসাঝে এখানে এসে কয়েক দিন থেকে ফুসফুসে অক্সিজেন বাড়িয়ে নিতে চান নাকি৷’
শাওন চুপ করে শুনছিল এতক্ষণ৷ কথা বলেনি কোনও৷ কিন্তু অসিতদাদুর কথা শুনতে শুনতে মনের মধ্যে তার একটা খটকা তৈরি হচ্ছিল৷ অসিতদাদু পৈতৃক জমি বিক্রি করবেন কি করবেন না, এ সিদ্ধান্ত তো তাঁর নিজেরই৷ তা হলে এই আলোচনায় তিনি পরিদাদুকে সঙ্গে চাইছেন কেন? তা হলে ব্যাপারটার মধ্যে কি কোনও রহস্য আছে? আড়চোখে পরিদাদুর দিকে চাইল সে৷ দেখল পরিদাদুও তার দিকেই তাকিয়ে আছেন৷ শাওনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই মিটিমিটি হাসলেন তিনি৷ তারপর শাওনকে আশ্বস্ত করেই বলে উঠলেন, ‘উঁহু, আমি শাওনদেরই সঙ্গী হতে চাইছি অসিত৷ ওই বাড়িটা তো দেখতে চাইছিই, তার আগে তোর জমিটাও নিজের চোখে দেখে নিতে চাইছি একবার৷ এমন সুযোগ আমিই বা ছেড়ে দিই কেন? চাই কি, দরদাম পোষালে জমিটা আমি নিজেও তো কিনে নিতে পারি!’
‘তুই?’ অসিতদাদু অবাক হয়ে বললেন৷
‘অবাক হওয়ার কী আছে?’ পরিদাদু হাসলেন, ‘আমি কিনতে পারি না?’
‘তা পারবি না কেন?’ অসিতদাদু মাথা দোলালেন দু’দিকে, ‘কিন্তু কিনে করবিটা কী?’
‘অক্সিজেন আমারও তো দরকার নাকি? বয়েস বাড়ছে৷ ফুসফুস আমারও তো কমজোরি হচ্ছে ক্রমাগত...’
‘তোর অক্সিজেনের জোগান দেওয়ার জন্যে তো আমরাই রয়েছি’ অসিত রায় পরিদাদুর পিঠের ওপরে হাল্কা চাপড় মেরে বলেন, ‘তার জন্যে পয়সা খরচা করে জমি কেনার কী আছে!’
পরিদাদু হেসে উঠলেন, ‘তা ঠিক, তা ঠিক৷’ তারপরেই কবজি উলটে ঘড়ি দেখলেন তিনি৷ তারপর ব্যস্তসমস্ত হয়ে বললেন, ‘নাহ, আর একটুও সময় নষ্ট করা যাবে না৷ চল শানু, আমরা বেরিয়ে পড়ি৷ ছানবিন করে আসি আশপাশটা৷ আর শোন, মাস্ক পরে নিস সবাই৷ পকেটে স্যানিটাইজারের ছোট্ট বোতলটা নিতেও ভুলে যাস না যেন৷ সবসময় মনে রাখবি, সাবধানের মার নেই...’
পোর্ট ক্যানিং কোম্পানির কুঠিবাড়িটার অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ৷ প্রায় পড়ি পড়ি করেই দাঁড়িয়ে আছে মস্ত বাড়িটা৷ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে সমান চৌকো বাড়িটার ওপর-নীচ মিলিয়ে এগারোটা ঘর৷ তার প্রায় পুরোটাই পরিত্যক্ত৷ বাড়িটার মধ্যে মাটির নীচের ঘর-টরও কিছু রয়েছে, যদিও সেগুলোতে ঢোকার এখন আর উপায় নেই কোনও৷ শাওন বলছিল, ‘ওই মাটির নীচের ঘরগুলোয় যাওয়া গেলে বেশ হত, বলো পরিদাদু? বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চার হয়ে যেত৷’
সুছন্দা অমনি ধমকে উঠলেন, ‘আর অ্যাডভেঞ্চার করে লাভ নেই৷ অনেক অ্যাডভেঞ্চার করেছ, আর আমাকে চিন্তায় চিন্তায় আধমরা করে ফেলেছ৷ পুরো মেরে ফেলার প্ল্যান এক্ষুনি আর করার দরকার নেই৷ দুটো দিন শান্তিতে ঘুরতে দাও বাপু৷’
সুছন্দা এমনভাবে কথাগুলো বললেন সকলে হেসে উঠলেন হো হো করে৷
এত বড় বাড়িটা শুনশান, একা একা দাঁড়িয়ে আছে আকাশে মাথা ঠেকিয়ে৷ মস্ত কুঠিবাড়ির একটা ছোট্ট অংশেই শুধু মানুষের বাস রয়েছে এখনও৷
মাত্র দোতলা হলে কী হবে, বাড়িটা বেজায় উঁচু৷ অরণাংশু বলছিলেন, ‘বাড়িটার যা হাইট, একালের চারতলার সমান হয়ে যাবে প্রায়৷’
‘তা হবে’, পরিদাদু মাথা নেড়ে সায় দিলেন তাঁর কথায়৷
পরিদাদুদের অমন উৎসাহ নিয়ে বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখতে দেখে একজন বৃদ্ধ মানুষ এগিয়ে এলেন৷ মাথায় কাঁধ পর্যন্ত লম্বা অবিন্যস্ত পাকা চুল৷ গায়ে হাফ হাতা ফতুয়া৷ পরনে চেক লুঙ্গি৷ মুখের চামড়া কুঁচকে গেছে৷ তাঁর চোখের দৃষ্টিটা কেমন যেন অদ্ভুত মনে হল শাওনের৷
পরিদাদুর দিকে চেয়ে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘শহর থেকে আসচেন বুঝি?’
‘হ্যাঁ’, মাথা নাড়লেন পরিদাদু৷
কলকাতা থেকে আসছেন শুনে পরিদাদুর দিকে কিছুক্ষণ স্থির ঘোলাটে দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন বৃদ্ধ৷ তারপর কর্কশ গলায় বললেন, ‘প্রতাপাদিত্যের সম্পদ খুঁজতে এসেছেন বুঝি?’
‘মানে?’ অবাক হয়ে বললেন পরিদাদু৷
‘একদল লুটেরা ঘুরে বেড়াচ্ছে সারাক্ষণ৷ জানেন তো এককালে এইসব খাঁড়ি অঞ্চলে মগ আর পর্তুগিজ জলদস্যুদের উৎপাত ছিল খুব?’
‘শুনেছি’, পরিদাদু মাথা নেড়ে সায় দিলেন৷ বৃদ্ধ লোকটির কথাবার্তার ধরন অস্বাভাবিক৷ খানিক অসংলগ্নও৷ শাওনের অস্বস্তি হচ্ছিল৷ সুছন্দাও একটু দূরে সরে গিয়ে দাঁড়ালেন ইচ্ছে করে৷ শাওনকে হাতছানি দিয়ে ডেকে বললেন, ‘এদিকে আয় শানু৷’
শাওন অবশ্য পরিদাদুর পাশ থেকে নড়ল না৷
‘এরা তাদের থেকেও মারাত্মক৷ এরা শেকড়বাকড় সুদ্ধু এখানকার মাটিটাকেই তুলে নিয়ে যেতে চাইছে৷ আমি পাহারা দিচ্ছি সারা দিন সারা রাত৷ কিন্তু তাদের হাত থেকে বাঁচাতে পারব কি?’ বৃদ্ধ হতাশায় মাথা নাড়াতে লাগলেন দু’দিকে৷
‘আপনি এখানেই থাকেন?’ পরিদাদু খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলেন৷
‘এই পাশেই’, বৃদ্ধ কোমরের কাছ থেকে একটা কৌটো বের করে তার থেকে দু’ আঙুলে নস্যি নিয়ে নাকে দিলেন৷ নিজের ফতুয়ার খুঁট দিয়েই নাকটাকে মুছে নিয়ে একটু নাকি সুরে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘শহর থেকে মাঝেমধ্যে দু’-একজন আসেন৷ ছবি-টবি তোলেন৷ তারপর চলে যান৷ কিন্তু বাড়িটার কোনও উন্নতি নেই৷ সরকারের নজর পড়ল না এদিকে অ্যাদ্দিনেও৷ সবই শেষ হয়ে যাবে এমনি করে৷ পুরনো স্মৃতি আর কিছুই বোধহয় থাকবে না... তার ওপরে দস্যুদের আসা-যাওয়া...’
‘খুবই দুঃখের ব্যাপার’ পরিদাদু বৃদ্ধের কথায় সায় দিলেন৷
‘কী জায়গা ছিল এ অঞ্চল আর কী হল’, মাথা নেড়ে আক্ষেপ করতে লাগলেন বৃদ্ধ, ‘বাপ পিতাম’-র কাছে শুনেছি, রাজা প্রতাপাদিত্যর রাজ্যের মধ্যে ছিল এইসব এলাকা৷ এ ছিল তাঁর খাস তালুক৷’
‘রানা প্রতাপের নাম শুনেছি, কিন্তু এই প্রতাপাদিত্য আবার কে?’ হাল্কা গলায় বললেন সুছন্দা৷ দূর থেকেই৷ তাঁর ভয় বোধহয় খানিক কাটছে এইবার৷
‘সে কী রে খুকু, সত্যি সত্যিই প্রতাপাদিত্যের নাম শুনিসনি?’ পরিদাদু বললেন৷
‘উঁহু৷’
‘তিনি তো মস্ত জমিদার ছিলেন, বারো ভুঁইয়ার একজন৷ যশোরের রাজাও ছিলেন’, মেঘলীনা বলে উঠল৷
‘সাবাস’ তারিফকরে উঠলেন পরিদাদু৷ সেই বৃদ্ধ মানুষটার দু’চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল৷ মেঘলীনার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী নাম মা তোমার?’
‘মেঘলীনা৷’
‘তুমিও কলকাতা থেকেই এসেছ বুঝি এঁদের সঙ্গে?’
‘উঁহু, আমার এখানেই বাড়ি তো, মিঠেখালি৷
‘ও, তাই নাকি? কার মেয়ে তুমি?’
‘আমার বাবার নাম অসিত রায়৷’
একটু চোখ বুজিয়ে ভাবলেন তিনি৷ দু’দিকে মাথা নাড়লেন, ‘চিনতে পারছি না৷ ঠাকুদ্দার নাম?’
‘রমেশচন্দ্র রায়৷’
‘ওরে বাবা, আগে বলবে তো, তুমি আমাদের রমেশদাদার নাতনি৷ বড় ভালো মানুষ ছিলেন৷ এলাকার মানুষজনের জন্যে খুব করতেন৷ বড় ভালো লাগল তোমায় দেখে৷ তা হলে চিন্তা নেই৷ তোমরা ডাকাতদের দলে থাকতেই পারো না৷ তোমাদের বিশ্বাস করা যায়৷’
পরিদাদু বলতে শুরু করলেন, ‘প্রতাপাদিত্য সামান্য রাজা ছিলেন না৷ ষোড়শ শতকের বাংলার স্বাধীনতার প্রতীক তিনি৷ কাউকে পরোয়া করেননি৷ মুঘল সম্রাটের অধীনতা অস্বীকার করে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেছিলেন৷ টাকশাল তৈরি করিয়েছিলেন নিজের মুদ্রা তৈরি করার জন্যে৷ দিল্লির সম্রাট ভালো চোখে দেখেননি এসব৷ যথারীতি সেনা পাঠিয়েছিলেন তাঁকে দমন করতে৷ নিজের দাপট ধরে রাখতে কী লড়াইটাই না লড়েছিলেন দিল্লির মোগল সম্রাটের সৈন্যের সঙ্গে৷’
‘কিন্তু ফল তো গোল্লাই হল৷ হার স্বীকার করতে হল তাঁকে শেষ পর্যন্ত৷ আর হবে নাই বা কেন? পাপের ফল সকলকেই ভোগ করতে হয় হে৷ যত বড় তালেবর হও না কেন, একজনের কাছে কিছুতেই নিস্তার নেই কারও৷ একটা কথা আছে না, পাপ বাপকেও ছাড়ে না? প্রতাপেরও হল তাই৷’ বৃদ্ধকে এখন অনেকটাই সহজ মনে হল৷ তাঁর দু’চোখে যে সন্দেহ আর ভয় ভয় ভাবটা ছিল, সেটা কেটে গেছে এখন৷
‘কী পাপ?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে৷
‘জ্ঞাতিহত্যা’, বৃদ্ধ বললেন, ‘আগ্রায় গিয়ে আকবরের আনুকূল্য নিয়েই ফিরে এসেছিল প্রথমে প্রতাপ৷ আর সেই বলে বলীয়ান হয়েই, দেশে ফিরেই পরিবারের সক্কলকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করল সে৷ সক্কলকে বললাম বটে, কিন্তু একজন বেঁচে গেল ফাঁকতালে৷ সে তার খুড়তুতো ভাই...’
‘আশ্চর্য!’ পরিদাদু বলে উঠলেন৷
‘তারপর?’ শাওন আর মেঘলীনা দুজনেই প্রায় একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল৷ একটা হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের রোমাঞ্চকর গল্প তাদের কিশোর মনে শিহরন জাগিয়ে তুলছিল সেই অপরাহ্নে৷
‘সেই পাপেই ছারখার হয়ে গেল প্রতাপের বিশাল সাম্রাজ্য৷ তার মৃত্যুর পর সেনাপতি রুদ্রাদিত্য দেশান্তরী হল৷’ বলেই গলাটাকে খাদে নামিয়ে আনলেন তিনি, ‘রাজা প্রতাপের কত সোনা-দানা ধনসম্পদ যে ছড়িয়ে আছে সুন্দরবনের এই অঞ্চল জুড়ে তার ইয়ত্তা নেই...’
‘গুপ্তধন?’ শাওন বলে উৎসাহের সঙ্গে৷
‘তা বলতে পারো’ বৃদ্ধ বললেন, ‘এ অঞ্চলে একাধিক দুর্গ বানিয়েছিলেন প্রতাপাদিত্য৷ সেই সব দুর্গ বানাতে মাটি খুঁড়তেই বেরিয়ে এসেছিল ঘড়া ঘড়া সোনার মোহর৷’
‘অ্যাঁ, বলেন কী! মোহর? সোনার?’ অরুণাংশু অবিশ্বাসী গলায় বলে ওঠেন৷
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷ মোহর৷ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রা৷ তাছাড়া দুর্গে তাঁর নিজস্ব সোনাদানা তো ছিলই৷ রুদ্রাদিত্য আদিগঙ্গা ধরে চলে গিয়েছিল মোগল সেনাপতিদের চোখের আড়ালে৷ আদিগঙ্গার সেসব অঞ্চলে তখন গহীন অরণ্য৷ আর বাকি সম্পদ পড়ে রইল এই জল-জঙ্গলের দ্বীপরাজ্যেই৷ ভাগে ভাগে, নানা দুর্গে গোপন জায়গায় তাদের লুকিয়ে ফেলা হল৷ মাঝে মারী এল৷ মড়ক হল৷ এ অঞ্চল শ্মশান হয়ে গেল৷ নদী গ্রাস করে নিল দুর্গ, প্রাসাদ৷ জঙ্গলও মুড়ে ফেলল সব৷ কালের পলির নীচে হারিয়ে গেল সেই রত্নভাণ্ডার৷ লোভে পড়ে ইদানীং কত লোকই তো এল৷ কত খোঁড়াখুঁড়ি করল এই দ্বীপভূমি জুড়ে৷ কিন্তু সেই বিশাল ঐশ্বর্যের কিছুই প্রায় উদ্ধার হল না’, বৃদ্ধ পরিদাদু এবং অরুণাংশুর এক্কেবারে কাছে সরে এলেন৷ তারপর খুব গোপন কথা বলার ঢঙে প্রায় ফিসফিস করে বললেন, ‘আপনাদের দেখে আমার ভালো লোক বলেই মনে হচ্ছে৷ তাই চুপি চুপি বলছি, খুব সাবধান৷ এখনও অনেকেই সেই সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার তালে এই অঞ্চলে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ তারা লোক সুবিধের নয়৷ তাদের হাতে এইসব সম্পদ পড়লে খুব মুশকিল৷ আমি তাই গোপনে সম্পত্তি পাহারা দিচ্ছি৷ কিছু কিছু গচ্ছিত রাখছি ব্যাংকের ভল্টের মধ্যে...’
‘ইন্টারেস্টিং!’ অরুণাংশু বললেন, ‘আপনি এতসব জানলেন কী করে সেইসব লোকের সম্বন্ধে?’
‘তারা যে আমার কাছেও এসেছিল৷’
‘আপনার কাছে কেন?’
‘রাজকোষের নাগাল পেতে’, বলে রহস্যময় হাসি হাসলেন বৃদ্ধ৷
‘আপনার নাম জানতে পারি?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন তাঁকে৷
‘আমার নাম?’ একটু থামলেন বৃদ্ধ৷ তারপর আবার বললেন, ‘প্রতাপাদিত্যের পরে তার কাকার ছেলেকে সিংহাসনে বসতে রাজি করানো যায়নি৷ কে শেষ পর্যন্ত বসল জানেন?’
‘কে?’
‘ভবানন্দ মজুমদার৷’
‘তিনি কে?’
‘ছেলেটা একসময় রাজবাড়িতে পুরোহিতের কাজ করত’, বৃদ্ধ হাসলেন, ‘কপালে থাকলে কী না হয়! কিন্তু একটা কাজে ভেজে গেলেই তো হয় না৷ সে কাজে অধিকারী হতে হয়৷ তা না হলে যা হওয়ার আমার পূর্বপুরুষটির তাই হল৷ ঘেঁটে ঘ হয়ে গেল সব...’
‘আপনার পূর্বপুরুষ?’ পরিদাদু অবাক হয়ে বললেন৷
‘হ্যাঁ’, মাথা নাড়লেন বৃদ্ধ, ‘এই প্রায় ভিখিরি উমানাথ মজুমদারেরই পূর্বপুরুষ তিনি’, বলতে বলতেই একবার পিছন দিকে চাইলেন উমানাথ৷ তারপরেই ভয় পাওয়া গলায় বললেন, ‘ওই সম্রাটের পেয়াদা ধরতে আসছে আমায়৷ আমি চলি৷’
আর একবারও পরিদাদুদের দিকে না তাকিয়ে হন হন করে হাঁটতে লাগলেন উমানাথ মজুমদার৷ কুঠিবাড়ি পেরিয়ে নদীর দিকে৷
পরিদাদু কয়েক মুহূর্ত উমানাথবাবুর দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ তারপর নিজের মোবাইলটা নিয়ে পরপর কয়েকটা ছবি তুলতে শুরু করলেন কুঠিবাড়িটার আর তার আশপাশের এলাকার৷
তখনই ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন পরিদাদুদের সামনে৷ নিপাট ভালোমানুষের মতো চেহারা৷ পরনে শার্ট-প্যান্ট৷ একটু লাজুক ভঙ্গিতে বললেন, ‘মাস্টারমশাই খুব বোর করছিলেন নিশ্চয়ই আপনাদের?’
‘মাস্টারমশাই?’ পরিদাদু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘আপনারা কি বাইরে থেকে এসেছেন? এখানকার স্থানীয় লোক নন?’
‘না, আমরা এখানে থাকি না৷’
‘ওহ, ওইজন্যে৷ এখানকার একটু বয়স্ক লোকেরা ওঁকে চেনেন৷ একসময় স্কুলে পড়াতেন৷ কী ভূত মাথায় ঢুকল কে জানে! এ অঞ্চলের ইতিহাস খুঁড়ে বের করবেন! সেই করতে গিয়ে মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল৷’
‘উনি পাগল?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু, ‘কথা শুনে তেমন মনে হয় না কিন্তু৷’
‘অতীত আর বর্তমান গুলিয়ে তালগোল করে ফেলেন৷ উমানাথকাকু আজকাল মনে করেন তিনি রাজ পরিবারের সদস্য৷ সেইমতো নানান কথা বলে যান নিজের খেয়ালে৷ সেসব অসংলগ্ন কথা শুনলে আপনারাও বুঝবেন তাঁর মাথা ঠিকমতো কাজ করছে না...’
‘আমাদেরও বলছিলেন৷’ সুছন্দা বললেন৷
‘কী বলছিলেন?’ ভদ্রলোক হাসলেন৷
‘ওই তিনি ভবানন্দ মজুমদারের বংশধর...রাজ পরিবারের ঐশ্বর্য রক্ষা করার চেষ্টা করছেন তিনি প্রাণপণে...’
‘এইটাই সমস্যা বুঝলেন’ ভদ্রলোক মাথা নাড়লেন, ‘এমনিতে চট করে কিছু বুঝবেন না৷ অন্যান্য অনেক পাগলের মতো উনি অ্যারোগ্যান্ট নন৷ কিন্তু ওই একটা কল্পনার রাজত্বে বাস করেন৷ সেখানে কাউকে কাউকে শত্রু ভেবে ফেলেন, কাউকে মনে করেন আপনার লোক৷ তাঁর ধারণা একদল লোক তাঁর সম্পদ হাতিয়ে নেওয়ার জন্যে নাকি সারাক্ষণ ঘুরে বেড়াচ্ছে তাঁর পিছন পিছন৷ কী আর বলি আপনাদের! হাসির কথাই মশাই৷ ওঁর সম্পত্তি বলতে ঘরের একটা পুরনো তক্তপোষ, কিছু পোকায় খাওয়া বই আর কিছু ইট পাটকেল নুড়ি পাথর...’
পরিদাদু হাসলেন, ‘আপনার পরিচয়?’
‘আমার নাম তড়িৎ সেনগুপ্ত’, ভদ্রলোক দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে নমস্কার জানালেন, ‘উমানাথবাবু আমার দূর সম্পর্কের আত্মীয় হন৷ কাকা ডাকি ওঁকে৷ ওঁর বাড়ির পাশেই থাকি৷ যতটকু সম্ভব দেখাশুনো করি৷ অন্যদিন আপিস থাকে৷ আমি একটা বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করি৷ এসপ্ল্যানেডের দিকে৷ আজ ছুটি নিয়েছিলাম৷ কাকার সঙ্গেই ক্যানিং এসেছিলাম৷ কিন্তু মানুষটা কিছুতেই আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকতে চায় না...’
পরিদাদু সেদিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ৷ তারপর বললেন, ‘অদ্ভুত মানুষ তো!’
‘আমার হয়েছে জ্বালা’, ভদ্রলোক আবার হাসলেন, ‘আসি৷ দেখি কোথায় গেল মানুষটা৷ যদি বুঝিয়ে শুনিয়ে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারি৷ নইলে রাতে ভিতে পথে-ঘাটে কোথায় যে পড়ে থাকবে...’
তড়িৎ সেনগুপ্তও দ্রুত হাঁটা লাগালেন৷ উমানাথ মজুমদার যে পথে হেঁটে গেছেন একটু আগে, সেই দিকেই৷
‘কী বুঝছ?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন হাসতে হাসতে, ‘রহস্যের গন্ধ উড়তে শুরু করল নাকি তোমার নাকের কাছে?’
পরিদাদুও হাসলেন৷ জবাব দিলেন না এ কথার৷ বরং তাড়া দিয়ে বললেন, ‘চলো মেঘলীনা৷ নদীর পাড়ে তোমাদের জমিটার দিক থেকে ঘুরে আসা যাক৷ হাতে সময় নেই বেশি৷ যে কোনও সময় অসিতের ফোন এসে যেতে পারে৷ তখন ফিরতে হবে আমাদের৷’
‘চলুন’, মেঘলীনা মিষ্টি করে হাসল, ‘এই মানুষটার কথা শুনেছি মনে হয়৷’
‘কে উমানাথবাবু?’
‘হ্যাঁ৷’
‘কে ভদ্রলোক?’
‘সত্যিই উনি রাজার বংশধর কি না জানি না৷ তবে আমাদের স্কুলের ইতিহাসের স্যার ওঁর কথা বলেছিলেন একবার৷ নামটা শুনে মনে পড়ল৷’
‘কী বলেছিলেন?’ হাঁটতে হাঁটতেই উৎসাহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷
‘একসময় গোসাবার একটি স্কুলে ইতিহাস পড়াতেন উমানাথ মজুমদার৷ সুন্দরবন-সহ গোটা দক্ষিণবঙ্গের ইতিহাস এবং পুরাতত্ত্ব নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা ছিল তাঁর৷ সুন্দরবনের বিভিন্ন দ্বীপে ঘুরেছেন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শ সংগ্রহের জন্যে৷ এই অঞ্চলের অতীত ইতিহাস খুঁজে বেড়ানোই ছিল তাঁর নেশা৷ এই নেশাতেই মাঝ বয়েসে পৌঁছে চাকরি-বাকরি ছেড়ে দেন৷’
‘আশ্চর্য!’ পরিদাদুর কপালে ভাঁজ পড়ল৷
‘এই অঞ্চলে কিছু জায়গায় মাটি খোঁড়ানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন উদ্যোগী হয়ে৷ বাবা জানে৷ কুমড়োখালি থেকে বহু পুরনো কালো পাথরের একটা বিষ্ণুমূর্তি বেরিয়েছিল তখন৷ মূর্তিটা পাল সেন আমলের সম্ভবত৷’
‘তারপর?’ পরিদাদু উৎসাহিত হয়ে বলেন৷
‘সাত নম্বর দিঘির পাড়ে একটা নারায়ণ মন্দির আছে৷ সেই মন্দিরে এখনও মূর্তিটার পুজো হয়৷’
‘কিন্তু আজ উমানাথবাবুকে যে অবস্থায় দেখলাম...’
খুবই বাজে ব্যাপার’, পরিদাদুর কথার মাঝখানেই বলে ওঠে মেঘলীনা, ‘পরের দিকে ওঁর কিছু সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডার ধরা পড়ে৷ অসংলগ্ন কথা বলতেন৷ ক্রমশই সে অবস্থার অবনতি হয়৷ একা মানুষ ছিলেন৷ চিকিৎসা কিছুই হয়নি বলতে গেলে৷ এখন পাগলের মতো ঘুরে বেড়ান আর আজব সব কথা বলেন৷ এদিকের বয়স্ক মানুষেরা বলেন, তিনি নাকি নদীর পাড়ের দুগ্গা ঢিবি খুঁড়তে গিয়েছিলেন৷ সেই অভিশাপেই এই অবস্থা তাঁর৷’
‘সে জায়গাটা কোথায়?’
‘আমরা ওইদিকেই যাচ্ছি এখন৷’
‘তুমি এত কিছু জানলে কীভাবে মেঘলীনা? তুমি তো ছোট৷ এত কথা তোমার তো জানার কথাই নয়৷’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷
মেঘলীনা মিষ্টি করে হাসল, ‘আমার এই অঞ্চলের ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ আছে বলে আমাদের ইতিহাস স্যার ওঁর কথা গল্প করেছিলেন৷ বাবার কাছেও শুনেছি কিছুটা পরে৷ স্যার একদিন দুঃখ করে বলছিলেন, উমানাথ মজুমদার সুস্থ থাকলে এই অঞ্চলের ইতিহাস আজ হয়তো নতুন করে লেখা হত৷’ মেঘলীনা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, ‘আমাদের এখানকার মানুষের দুর্ভাগ্য৷ এমন একজন প্রতিভাবান মানুষ উন্মাদ হয়ে গেলেন৷ ওঁকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল আমার৷ আজ যখন নিজের পরিচয় দিলেন, খুব ইচ্ছে করছিল আর একটু কথা বলার, কিন্তু মানুষটা আর দাঁড়ালেনই না৷’
‘ভদ্রলোক থাকেন কোথায়?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘বাসন্তী৷ নারায়ণতলা স্কুল থেকে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে৷ কিন্তু মুশকিল হল, বাড়িতে তো থাকেন না তিনি৷ নিজের খেয়ালে পুরো তল্লাট ঘুরে বেড়ান৷ আমি একবার খুব বায়না করে গিয়েছিলাম বাবার সঙ্গে৷ দেখা হয়নি৷ বাড়ি বাইরে থেকে তালা বন্ধ ছিল৷’
‘ভদ্রলোকের কথাবার্তার মধ্যে কিছুটা অসংলগ্নতা আছে ঠিকই, কিন্তু তাঁকে উন্মাদ বলে মনে হল না আমার’, পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাদা করে খানিক কথা বলতে পারলে ভালো হত৷’
অসিতদাদুদের জমিটা মাতলা নদীর কাছাকাছিই৷ মেঘলীনা বলল, ‘এ জায়গাটা রাজার লাটের অংশ৷’
‘রাজার লাট? এমন অদ্ভুত নাম কেন?’ শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘এই লাট শব্দটার মানে কী মেঘলীনা দিদি?’
‘মানে?’ মেঘলীনাকে খানিক অপ্রতিভ মনে হল, ‘লাট তো জমি জায়গাকেই বলে৷ এসব অঞ্চল একসময় রাজারই ছিল তো৷ তাই হয়তো...’
‘কোন রাজা? প্রতাপাদিত্য?’ আবার জিজ্ঞেস করে শাওন৷
‘বোধহয় নয়’, পরিদাদু বললেন হাল্কা গলায়, ‘লাট শব্দটা ইংরেজি ‘lot’ শব্দ থেকে এসেছে৷ যার মানে হল জমিদারির অংশ৷ ব্রিটিশ আমলে লাট বলতে জমিদারির এমন অংশ বোঝাত, যা বকেয়া খাজনার দায়ে কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্য নিলামে বেচে দিতে পারতেন...’
‘তা হলে আমরা যে লাটসাহেব বলি কথায় কথায়, বা ধরো বড়লাট... তখন তো তোমার এই শব্দার্থ মিলছে না হে?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন চোখ সরু করে৷
‘ও অর্থটা এসেছে ইংরেজি ‘lord’ শব্দের অপভ্রংশ হিসেবে৷ রাজ্যপাল টাজ্যপাল জাতীয় উচ্চ পদের কোনও মানুষজন বোঝাতে’ পরিদাদু হাল্কা হাসলেন, ‘অবিশ্যি লাটসাহেব কথার অর্থের অপকর্ষ হয়েছে ইদানীং...’
অরুণাংশু আবার কী একটা প্রশ্ন করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একটা বাচ্চা ছেলে সামনে এসে দাঁড়াতে চুপ করে গেলেন তিনি৷
ছেলেটার হাতে পায়ে ধুলো মাটি৷ নোংরা ছেঁড়া পোশাক৷ মাথায় জট পড়া উস্কোখুস্কো চুল৷ দেখলেই বোঝা যায় সে চুলে তেল পড়েনি বহুদিন৷
সুছন্দার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ডান হাতের মুঠোটা খুলল সে, ‘এটা কিনবে?’
‘কী এটা?’ সুছন্দা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘টাকা৷ মাটির নীচে থেকে পেয়েছি’, ছেলেটা মাথা নেড়ে বলল, ‘মাটির নীচ থেকে পাওয়া জিনিস অনেকেই তো দাম দিয়ে কিনে বাড়িতে সাজিয়ে রাখতে চায়৷ এটা রাখো না মাসি৷ ধনুক হাতে একটা কী ঠাকুরের ছবি খোদাই করা আছে টাকাটায়৷ বাড়িতে রেখো৷ ভালো হবে...’
সুছন্দা হেসে ফেললেন, ‘দারুণ কথা বলিস তো তুই৷ আচ্ছা দে দেখি...’
অরুণাংশু বাধা দিলেন বিরক্ত গলায়, ‘একদম নয়৷ আজকাল এই ব্যবসাটা খুব চালু হয়েছে৷ আমাদের পাড়াতেও ঘুর ঘুর করত কয়েকজন৷ একই ডায়ালগ৷ বাবু, আমি রাজমিস্তিরির জোগাড়ের কাজ করি৷ অমুক জায়গায় ফ্ল্যাট উঠছে৷ ভিতের মাটি খোঁড়ার সময় এই টাকাটা পেয়েছি৷ রাম সীতার ছাপ দেওয়া৷ আপনাদের ঠাকুর, ভাবলাম যদি কিনে নেন...বেশি নয়, শ দুই টাকা দিলেই দিয়ে দেব৷ আমি একবার একটা কিনেওছিলাম৷ ভেবেছিলাম অ্যান্টিক জিনিস৷ আমার এক বন্ধু আছে৷ কলকাতায় কিউরিও শপ আছে ওর৷ ওকে দেখাতে বলল নকল অ্যান্টিক৷ ফালতু জিনিস...’
‘মাসি নাও না’, ছেলেটা আবার বলল ঘ্যানঘেনে গলায়, ‘বেশি দাম দিতে হবে না৷ একশো টাকা দিলেই হবে৷’
‘একশ টাকা? বলিস কী?’ সুছন্দা হাসি হাসি মুখ করে বললেন৷
‘কী বলছ?’ ছেলেটা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘মাটির নীচের জিনিসের অনেক দাম...’
‘কী করে জানলি?’ পরিদাদু এগিয়ে এসে ছেলেটার সামনে দাঁড়ালেন এইবার৷
‘কিছু ভাঙা কলসি আর থালার টুকরো পেয়েছিলাম একদিন৷ আর একটা ভাঙা মূর্তির মুন্ডু৷ ছোট্ট৷ কালো রঙের৷ তাই একজন বাবু দেখতে পেয়ে ছুট্টে আমার কাছে এসে দুশো’ টাকা দিয়ে কিনে নিল৷’
‘বলিস কী?’ সে কোন বাবু, চিনিস?’
‘না’, ছেলেটা দু’দিকে মাথা নাড়ে, ‘কলকাতা থেকে এসেছিল৷ খুব ফর্সা৷ মাথায় টাক৷ চোখে গোল সোনালি ডাঁটির চশমা৷ দু’হাতে প্রায় খান পাঁচ-ছয় আংটি, নানা রঙের পাথরের...’
‘সেই বাবুর সঙ্গে কোথায় দেখা হল তোর?’
‘এইখানেই৷ সেই বাবু এইখানেই ঘুরছিল৷ সঙ্গে আরও দু’তিনজন লোক ছিল৷ কী সব মাপামাপি করছিল৷ সামনেই একটা ঢিবি মতো আছে৷ সেখানে গিয়ে খুব খুঁটিয়ে দেখছিল৷ হাত-পা নেড়ে অন্য লোকগুলোকে কী সব বলছিল...’
‘তুই ওগুলো কোথায় পেয়েছিলি?’
‘ওই ঢিবির পিছন দিকে৷ খানিকটা দূরে৷ নদীর এক্কেবারে গায়ের কাছে গত্ত খুঁড়ছিলুম...’
‘কেন?’
‘আমি ওরকম গত্ত খুঁড়ে রাখি নদীর জলের কাছাকাছি৷ জোয়ারে জল এসে গত্তে পড়ে৷ আবার জল সরে যায় যখন, অনেক সময় ওই গত্তে মাছ থাকে, কাঁকড়া থাকে...’
‘এই গর্ত কোথায় করেছিলি দেখা৷’
ছেলেটা যেখানে নিয়ে গেল সেটা অসিত রায়েরই জমির পিছন দিক দিয়ে নদীর কাছে নেমে গিয়ে৷ পরিদাদু চোখ কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন একটুক্ষণ৷ জমিটার পাশেই বেশ উঁচু ঢিবি৷ গাছপালায় ঢেকেছে তার মাথা৷ কিছু বাণী গাছ ঢিবির ওপর থেকে হেলে আছে নদীর দিকে৷ মেঘলীনা বলল, ‘এই ঢিবিটাকে লোকে বলে দুগ্গা ঢিবি৷ আশপাশের অনেকেই ওখানে পুজো দেয়৷ ঢিবির গায়ে সিঁদুর লেপে দিয়ে সেই সিঁদুর মাথায় পরে৷’
ঢিবিটা অনেকখানিই লম্বা৷ বিস্তার উত্তর দক্ষিণে৷ পরিদাদুকে ওদিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেঘলীনা বলল, ‘ওই ঢিবিটার গায়ে কেউ পা দেয় না৷ ঢিবির মাথাতেও ওঠে না কেউ ওই জন্যে৷ মাঝেমধ্যে গরু-ছাগল উঠে পড়ে অবশ্য৷ ও জায়গাটাও আমাদেরই৷’
‘পানিগ্রাহী এই জমিটাই কিনতে চাইছেন? তুমি কিছু জানো মেঘলীনা?’
‘হ্যাঁ৷’
‘আই সি’ পরিদাদুর কপালে ভাঁজ পড়ল৷ ছেলেটার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘দে টাকাটা, দেখি৷’
‘কিনবে কাকু?’
‘আগে দে দেখি৷’
ছেলেটা মাটি মাখা টাকাটা পরিদাদুর হাতে দিল৷ পরিদাদু সেটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুই যে মূর্তির মাথাটা বাবুকে দিয়েছিলি সেটা কেমন দেখতে মনে আছে?’
‘একটা মাথা৷ মাথায় জটার মতো৷ টানা টানা চোখ, বন্ধ৷ কানদুটো লম্বা...’
‘বুদ্ধমূর্তির মাথা—’ শাওন বলে উঠল৷
‘একশোয় একশো’ পরিদাদু বলে উঠলেন৷ তারপর নিজের পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতে করতে বললেন, ‘এই টাকাটাও কি ওই নদীর পাড়ের গর্ত থেকেই পেয়েছিস?’
‘উঁহু৷’
‘তাহলে?’
‘কুঠিবাড়ির নীচের গর্ত থেকে৷’
‘মাটির নীচের ঘরে ঢুকেছিলি নাকি?’
‘না না, সেসব ঘর তো বুজে গেছে৷ ঢোকা যায় না আর...’
‘তবে মাটির নীচের কোন গর্ত আবার?’
‘ওই বাড়িটার নীচের দিকে বড় বড় ফোকর আছে...’
‘হ্যাঁ গো কাকু’, মেঘলীনা বলল, ‘ওই বাড়ির পিছনদিকে মানে যেদিকটা ওদের শৌচালয়গুলো ছিল, সেখানে এমন বন্দোবস্ত ছিল যে জোয়ারের সময় নদীর জল ঢুকে পড়ত আবার ভাটার টানে সেই জল সব পরিষ্কার করে ফিরে যেত নদীতে...’
‘অদ্ভুত তো!’ অরুণাংশু বললেন৷
এখনও অমন ব্যবস্থা আছে?’
‘এখন তো নদীর পাড় অনেক উঁচু হয়ে গেছে৷ অত জল আর আসতে পারে না৷ তবে একটা জল আসা-যাওয়ার সরু স্রোত বওয়া খাল এখনও আছে কুঠিবাড়ি থেকে নদী পর্যন্ত৷’
‘কিন্তু ওদিকটা তো জঙ্গল হয়ে আছে৷ সাপখোপের আড্ডা৷ ওখানে কী করতে ঢুকেছিলি তুই?’
‘পাগলাদাদুকে দেখে ভয় পেয়ে লুকিয়েছিলুম৷’
‘কোন পাগলাদাদু, উমানাথ মজুমদার?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘নাম তো জানি না৷ ওই যে একটু আগে ওই বাড়ির দিক থেকেই এদিকে এলেন৷ পাগল গো৷ দিন নেই রাত নেই, নদীর চরে ঘুরে বেড়ায়৷ মাটির ওপরে কান পেতে শুয়ে পড়ে কীসব শোনে৷ এই জমিতে, ওই দুগ্গা ঢিবিতেও প্রায়ই আসে৷ এমনকি রাতের বেলাতেও...’
‘রাতের বেলা আসেন তুই কী করে জানলি?’
‘একদিন কাক ভোরে এসেছিলুম এদিকে কাঁকড়া ধরতে, দেখি কী, ঢিবির গায়ে হেলান দিয়ে বসেই ঘুমোচ্ছে পাগলা দাদু...’
‘তারপর?’
‘আমি ওর গায়ে ঠেলা দিয়ে বললাম, এই যে বুড়ো, তোমার ভয় ডর নেই? এই দুগ্গা ঢিবিতে মরতে রাত কাটাতে এসেছিলে?’
‘উনি কী বললেন?’
‘ওরেব্বাবা’, ছেলেটা হেসে উঠল, ‘বুড়োর কী রাগ! একেবারে খ্যাঁকম্যাক করে উঠল আমার ওপর৷ বলল, এখেনে এই জলা জঙ্গলে মশার কামড়ে কি আর এমনি এমনি পড়ে আছি? আমি গড় পাহারা দিচ্ছি৷’
‘সে কী?’
‘মাথাটা তো গেছে’, ছেলেটা আবারও হাসতে থাকে হো হো করে৷
‘তুই ওঁকে ভয় পাস কেন?’ পরিদাদু একটুও না হেসে প্রশ্ন করলেন৷
‘যেদিন ওই ভাঙা থালার টুকরোগুলো আর ওই মাথাটা বিক্কিরি করছিলুম, বুড়ো দেখে ফেলেছিল৷ আর তাই দেখে আমার ওপরে কী রাগ...’
‘কী বললেন?’
‘চিৎকার করতে লাগল, ঘরের জিনিস পরকে দিচ্ছিস কেন রে হতভাগা, এসব যে সোনার চেয়েও দামি... সব কি বেচে দিবি একে একে? তারপর আরও কত কী!’
‘সেই বাবু ছিলেন তখন?’
‘হ্যাঁ৷’
‘তিনি কিছু বললেন না?’
‘এক দৃষ্টে দেখছিলেন পাগলাদাদুকে৷ খুব রেগে গিয়েছিল মনে হল৷ আমিই বললাম, ছেড়ে দিন৷ ওর কথা ধরবেননি৷ পাগল ছাগল মানুষ...’
পরিদাদু অন্যমনস্কভাবে একটা একশো টাকার নোট বের করলেন৷ ছেলেটার হাতে দিয়ে বললেন, ‘তুই থাকিস কোথায়?’
‘ক্যানিং স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শেডের নীচে৷ টিকিট কাউন্টারের কাছে৷’
‘তোর বাড়ি-ঘর নেই?’
‘উঁহু৷’
‘তোর নাম?’ পরিদাদুর গলা নরম হয়ে গেল৷
‘বিলু৷’
‘কার সঙ্গে থাকিস? মা-বাবা?’
‘কেউ নেই আর৷ আমি একা’, বিলু হাসে৷ হলুদ দাগ ধরা দাঁত বের করে৷
‘এরপর যদি অমন কিছু পাস দু’-একদিনের মধ্যে, কাউকে দিবি না৷ রেখে দিবি নিজের কাছে৷ আমি নেব৷ ভালো দাম দেব তোকে৷’ পরিদাদু বললেন৷
‘আচ্ছা৷’
‘আমি কাল হয়তো তোর কাছে যেতে পারি৷ বিকেলের দিকে৷ প্ল্যাটফর্মেই থাকিস৷ যাস না কোথাও৷’
‘আচ্ছা৷’
বিলু শাওনের দিকে চাইল, ‘তোমরা কোথায় থাকো?’
মেঘলীনাই জবাব দিল, ‘ওরা তো অনেকটাই দূরে থাকে৷ ওর নাম শাওন, তোমার শাওন দাদা৷ আর আমি মেঘলীনা দিদি৷ আমি কাছেই থাকি৷ মিঠেখালি৷ ওখানে আমার নাম বললেই যে কেউ আমার বাড়ি দেখিয়ে দেবে৷ ওরা আমাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছে কয়েকদিনের জন্যে৷’
‘ও৷’ বিলু হাসল৷
মেঘলীনাও হাসল মিষ্টি করে, ‘ইচ্ছে হলে আমার বাড়ি এসো৷ তোমার সঙ্গে গল্প করব৷ আমার কাছে নীচু ক্লাসের গল্পের বই আছে৷ দেব তোমাকে৷’
‘আমি তো পড়তেই পারি না৷’
‘আমার এখন ছুটি৷ তোমাকে আমি পড়তে শিখিয়ে দেব৷’
বিলু কী একটা বলতে যাচ্ছিল, তখনই পরিদাদুর ফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল৷ অসিত রায় ফোন করছেন৷ পরিদাদু বললেন, ‘আমি আসছি এক্ষুনি৷ ভদ্রলোককে বসা৷ আর শোন, জমিটা কিছুতেই বিক্রি করা যাবে না কিন্তু...’
অসিত কী বললেন শোনা গেল না৷ পরিদাদুর মুখ গম্ভীর হল একটু৷ তিনি আবার বললেন, ‘দাম যতই চড়াক না কেন, তুই অনড় থাকিস৷ তোর সত্যিই তো এই মুহূর্তে টাকার দরকার নেই৷ জানবি টাকার চেয়েও আরও বড় সম্পদ ধরে রেখেছে এই মাটি৷ তা হল আমাদের ইতিহাস৷ সেই ইতিহাস যদি খুঁড়ে বের করতে পারি, তা সোনার চেয়েও দামি রে অসিত৷ অর্থ দিয়ে তার পরিমাপ হয় না৷’
অসিতদাদুর বসার ঘরের সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন ভদ্রলোক৷ চোখে পড়ার মতোই লম্বা চওড়া চেহারা৷ টকটকে ফর্সা রং৷ মাথায় টাক৷ চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা৷ দু’ হাতের আঙুলগুলোর অধিকাংশেই রং বেরঙের পাথর বসানো আংটি৷ মিস্টার পানিগ্রাহীকে দেখেই পরিদাদুর হাত ধরে আলতো টান দিল শাওন৷
পরিদাদু চোখের ইশারায় বোঝালেন তিনিও চিনতে পেরেছেন৷ এই মানুষটির কথাই বিলু বলছিল একটু আগে৷
পরিদাদুকে দেখেই অসিতদাদু পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘এই যে আমার বন্ধু, পরিমল চট্টোপাধ্যায়৷ ওর কথাই বলছিলাম আপনাকে৷’
‘নমস্কার’, পরিদাদু দুই হাত বুকের কাছে তুলে আনলেন৷
পানিগ্রাহীও প্রতিনমস্কার জানালেন সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে৷
পরিদাদু খুব আন্তরিকভাবে বললেন, ‘বসুন, বসুন৷’
মেঘলীনা শাওনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘চল শানু আমরা ঘরে যাই৷’
শানুর ঘরে যেতে ইচ্ছে করছিল না৷ পরিদাদু পানিগ্রাহী নামের লোকটাকে কী বলেন জানতে ইচ্ছে করছিল খুব৷ শানু বেশ বুঝতে পারছিল, এই মানুষটা সুব সহজ মানুষ নয়৷ আর অসিতদাদুর জমিটা কেনার পিছনেও নিশ্চিত অন্য কোনও গোপন উদ্দেশ্য আছে তাঁর৷ কিন্তু পরিদাদুও মেঘলীনার কথায় সায় দিয়ে বললেন, ‘সেই ভালো৷ তোরা বরং ঘরে গিয়ে গপ্প সপ্প কর৷ আমাদের বুড়োদের মধ্যে থেকে তোদের কাজ নেই৷’
কাল যতক্ষণ জেগে ছিল, শাওন দেখেছে পরিদাদু কেমন যেন অস্থির৷ নিজের মোবাইল ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বসে আছে৷ মাঝে মাঝে নিজেই নিজের মাথার চুল চেপে ধরছে৷ হাতের তালুতে থুতনি রেখে কী যেন ভাবছে এক মনে৷ শাওন একবার জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কী এত ভাবছ পরিদাদু?’
‘যা ভাবছি তা যদি সত্যি হয় তা হলে মারাত্মক ব্যাপার হবে রে শানু৷’
‘কী রকম?’
‘বুঝতে পারছিস না, অসিতের এই জমিটা প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে খুব গুরুত্বপূর্ণ? যেসব জিনিসপত্র উঠে আসছে এখানকার মাটির তলা থেকে সেগুলো সাধারণ জিনিস নয়৷ অত্যন্ত প্রাচীন প্রত্নবস্তু৷’
‘ওই ভাঙা থালা বাটি, বুদ্ধমূর্তি, সব?’
‘অবশ্যই৷ তা না হলে কি আর এমনি এমনি রতন পানিগ্রাহী অত দাম দিয়ে জমিটা কিনতে চান? দেখলি তো ভদ্রলোক কতটা মরিয়া এ ব্যাপারে?’
‘উনিও তার মানে এই প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের ব্যাপারটা জানেন৷’
‘জানেন তো বটেই৷ নইলে বিলুর থেকে ওগুলো কিনে নেন পয়সা খরচা করে?’
‘ওগুলো খুব দামি বুঝি?’
‘হুঁ৷ প্রত্নবস্তু যত প্রাচীন হয়, তার দামও তত বেশি হয়৷’
‘কত বছরের পুরনো হলে প্রত্নতাত্ত্বিক বস্তু বলা যায়?’
‘অন্তত একশো বছর৷’
‘এ-ক-শো?’
‘হুঁ৷’
‘ওই ভাঙা টুকরোগুলো কি তার চেয়েও বেশি পুরনো?’
‘অনেকই বেশি’, পরিদাদু হাই তুললেন, ‘যা ভাবছি তা সত্যি হলে এগুলো অন্তত ষোলো-সতেরোশো বছরের পুরনো৷’
‘অ্যাঁ!’ অবাক হয়ে বলে শাওন৷
‘আর ওই টাকাটা?’
‘টাকাটা যে সে জিনিস নয় শানুবাবু৷ একেবারে যাকে বলে মোহর৷’
‘মানে?’
‘স্বর্ণমুদ্রা৷’
‘ওটা সোনার?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ৷’
‘কোনও রাজার মুদ্রা নিশ্চয়ই?’
‘সে তো বটেই৷’
‘কোন রাজার?’
‘আমি ঠিক শিওর নই৷ শশাঙ্ক বা জয়নাগ, এমনকি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রাও হতে পারে৷ তমোঘ্নকে ছবি তুলে মেইল করেছি৷ ফোনে একটা ব্রিফও দিয়েছি৷ দেখা যাক কী বলে ও৷’
তমোঘ্ন ভট্টাচার্যের সঙ্গে গত বছরে বহরমপুরে আলাপ হয়েছিল শাওনের৷ খুব ভালো মানুষ৷ আর কী প্রচণ্ড পড়াশোনা৷ খুব ভালো লেগেছিল ওঁকে৷ শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘পরিদাদু তমোঘ্নদাদু কি এখানে আসবেন?’
‘দেখা যাক৷’
‘মুদ্রাটা সত্যি সত্যিই যদি চন্দ্রগুপ্তের হয় তা হলে দারুণ ব্যাপার হবে বলো?’
‘এখন ঘুমিয়ে পড়৷ কয়েকটা বিষয় চুপ করে একটু ভাবতে দে আমায়’, বলে শাওনের উল্টোদিকে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন পরিদাদু৷
শাওন ঘুমিয়ে পড়ল একটু পরে৷
সকালে ঘুম থেকে উঠে পরিদাদুকে দেখতে পেল না শাওন৷ সুছন্দা বললেন, ‘পরিকাকুর যা স্বভাব৷ সাতসকালে ঘুম থেকে উঠেই বলল, কী সব কাজ আছে৷ বেরতে হবে৷ কখন ফিরবে ঠিক নেই৷ অসিতকাকুকে বলল একটা অটো ব্যবস্থা করে দিতে৷ উনি বললেন, একটু ওয়েট কর৷ ড্রাইভারকে ফোন করে ডেকে নিচ্ছি৷ আমার গাড়িটা নিয়ে বেরোস৷ তা সে কথা তার পছন্দ হল না৷ মানুষটা চিরকাল একইরকম গোঁয়ারগোবিন্দ রয়ে গেল৷’
শাওন মনে মনে উত্তেজনা বোধ করছিল৷ পরিদাদুর এই আচরণ তার জানা৷ যে বিষয়গুলো নিয়ে ধন্দে ছিলেন পরিদাদু, নিশ্চিত তার জট অনেকটাই কাটিয়ে ফেলেছেন তিনি৷ দু’একদিন পরেই তাদের ফিরে যাওয়ার কথা৷ তার আগেই সম্ভবত কিছু একটা ঘটতে চলেছে এদিকে৷
মেঘলীনা এগিয়ে এসে নীচু গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘এই শানু, কী ভাবছিস রে?’
‘কিছু না’, শাওন এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল৷
‘কিছু না বললে হবে? নিশ্চিত পরিকাকু আর তুই মিলে কিছু একটা প্ল্যান করেছিস৷ আমাকে বলতে চাইছিস না৷’
‘আমি বেশি কিছু জানি না৷ শুধু এইটুকু জানতে পেরেছি তোমাদের ওই জমিটা খুব দামি৷ পরিদাদু বলছিলেন কাল৷’
‘ওই রতন পানিগ্রাহী অনেক দাম দিয়েই কিনতে চাইছে তো জমিটা...’
‘সেই দাম নয়’, শানু হাসল, ‘এই জমি প্রত্নতাত্ত্বিক দিক দিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ৷ পরিদাদু বুঝতে পেরেছেন৷’
‘সত্যি?’ মেঘলীনা উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘এখানে তা হলে এক্সকাভেশন হবে? দারুণ ব্যাপার হবে তাহলে৷ বইতে পড়েছি, নেটে দেখেছি আগে৷ এখন চোখের সামনে দেখব মাটির নীচের চাপা পড়া ইতিহাস কেমন ধীরে ধীরে ওপরে এক্কেবারে চোখের সামনে উঠে আসছে৷’
‘অত কিছু আমি জানি না৷’
‘এক কাজ করবি?’ মেঘলীনা ফিসফিস করে বলে৷
‘কী?’
‘চল দুজনে গিয়ে আমাদের জমি আর দুগ্গা ঢিবিতে একটা প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আসি...’
‘কখন যাবে?’
‘খেয়ে উঠে৷ দুপুরবেলা৷’
‘আচ্ছা৷’
‘আমাদের বাড়িতে একটা ছোট্ট শাবল আছে আর একটা হাত কোদাল৷ সঙ্গে নিয়ে যাব?’
‘যাহ, ওইভাবে মাটি খুঁড়ে কিছু পাওয়া যায় নাকি?’
‘যেতেও তো পারে৷ দেখলি না বিলু কেমন পেয়ে গেল৷ ওই ভাঙাচোরা টুকরোগুলো নিশচয়ই দামি৷ নইলে পানিগ্রাহী আঙ্কল ওগুলো কিনলেন কেন?’
স্বর্ণমুদ্রাটার কথা বলতে গিয়েও চেপে গেল শাওন৷ শুধু মাথা নেড়ে সায় দিল মেঘলীনার কথায়৷
‘দু-জনে মিলে তখন থেকে কী এত পরামর্শ চলছে শুনি?’ মেঘলীনার মা অঞ্জনা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘কিছু না’, বলে নিজের ঘরে চলে গেল মেঘলীনা৷
পরিদাদু যখন ফিরলেন, বেলা গড়িয়ে গেছে৷ মাঝে একবার ফোন করে বলে দিয়েছিলেন পরিদাদু ওঁর জন্যে যেন কেউ অপেক্ষা করে বসে না থাকে৷ ফিরতে দেরি হলে দুপুরের খাওয়া যেন সেরে ফেলে সবাই৷ কিন্তু বড়রা কেউই সে কথা শোনেননি৷ শাওন আর মেঘলীনাও তাই খেতে চাইছিল না৷ অনেকক্ষণই ‘খাবে না’ বলে জেদ ধরে বসেছিল৷ শেষ পর্যন্ত জবরদস্তিই ওদের খাইয়ে দিয়েছেন সুছন্দা এবং অঞ্জনা৷
খাওয়া-দাওয়া সেরে সবে উঠেছে ওরা, পরিদাদু ঢুকলেন৷ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, বিস্তর ঘোরাঘুরি করেছেন৷ মাথার চুল উস্কোখুস্কো৷
‘কোথায় ছিলে এতক্ষণ?’ পরিদাদু ঘরে ঢুকতেই একরাশ বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন সুছন্দা, ‘বয়েস হচ্ছে৷ এত দস্যিপনা শরীরে সইবে আর?’
‘বলছি বলছি’, পরিদাদু বললেন, ‘আগে হাত-পা ধুই৷ স্নান সারি, জামাকাপড় পাল্টাই৷’
‘সেই সাতসকালে বেরিয়ে গেলি৷ সারা দিনে পেটে কিছু পড়েছে?’ অসিতদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘নাহ৷’
‘ইশ’, সুছন্দা আবার বললেন৷
‘কিন্তু যে কাজে বেরিয়েছিলাম সে কাজগুলো হয়েছে’, পরিদাদু হাসলেন, ‘যা ভেবেছিলাম তার বেশিই হয়েছে৷’
‘হেঁয়ালি না করে গিয়েছিলে কোথায় সেইটে বলো দিকিনি’, অরুণাংশু বললেন৷
‘কোথায় নয়?’, পরিদাদু বললেন, ‘ফ্রম কলকাতা টু বাসন্তী৷’
‘বাসন্তী?’ অবাক হয়ে বললেন অসিত রায়৷
‘ইয়েস স্যার৷’
‘কোথায়?’
‘উমানাথ মজুমদারের বাড়ি৷’
‘অ্যাঁ! সেখানে কেন?’
‘তিনিই যে রাজ ঐশ্বর্যের পাহারাদার৷ তাঁর কাছে না গেলে সে সম্পদের হদিশ পাব কী করে?’
‘মানে?’
‘মানেটা পেটে একটু তেল কয়লা দেওয়ার পরে বলছি’, পরিদাদু সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে গেলেন একটা টাওয়েল টেনে নিয়ে৷
মেঘলীনা ফিসফিস করে শানুকে বলল, ‘আমাদের অভিযানটা একটু পিছিয়ে দিই কী বল শানু? পরিকাকুর কথা না শুনে চলে যাওয়ার মানেই হয় না৷’
‘একদম’, মেঘলীনার কথায় ঘাড় নেড়ে সায় দিল শাওন৷
পরিদাদুর দুপুরের খাওয়া সারতে বিকেল হয়ে গেল৷ অন্যদেরও তাই৷ খেতে খেতেই পরিদাদু ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন, ‘দক্ষিণবঙ্গের এই অঞ্চল প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে অত্যন্ত ইমপর্ট্যান্ট৷ জল জঙ্গলে ঘেরা এই যে শ্বাপদসঙ্কুল দ্বীপভূমি, আপাতভাবে মনে হতেই পারে যে এইসব অঞ্চলে মানুষের বসবাস বহু শতাব্দী আগে কিছুতেই সম্ভব হতে পারে না৷’
‘সত্যিই তাই’, অসিত রায় বললেন, ‘মাতলা নদীর ওপারের অনেক দ্বীপই তো মানুষের বসবাসযোগ্য ছিল না৷ ওসব ছিল সুন্দরবনের অংশ৷ গহীন জঙ্গলে বাঘ ঘুরে বেড়াত৷ বিশ শতকের গোড়ায় হ্যামিলটন সাহেব জঙ্গল হাসিল করে গোসাবা দ্বীপের পত্তন করলেন৷ সুন্দরবনের অভাবী মানুষদের কল্যাণের কথা ভেবে সমবায় ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন হ্যামিলটন সাহেব৷’
‘আরিব্বাস’, অরুণাংশু বললেন৷
‘সে সমবায় ব্যবস্থা এমনই সার্থক রূপ নিল, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ তা দেখতে এলেন৷’
‘কিন্তু এইখানে আমার কিছু কথা থেকে যাচ্ছে যে’, পরিদাদু বললেন৷
‘কী কথা?’ অসিত রায় চোখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘এ বিষয়ে খোঁজখবর রাখেন এমন সকলেই জানেন, হ্যামিলটন সাহেব জঙ্গল হাসিল করে গোসাবা পত্তন করার প্রায় হাজার দুয়েক বছর আগে থেকেই ও অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল৷’
‘দু’হাজার?’ সুছন্দা চোখ বড় বড় করে বলেন৷
‘প্রায়’, পরিদাদু বলতে থাকেন, ‘হ্যামিলটনের বাংলোর সামনে যে দিঘিটা, তার নীচে সাবেকি ইটের চাতাল, সিঁড়ি এবং ঘাটের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে৷ লোক না থাকলে কারা বানিয়েছিল এইসব? তাছাড়া এই গোসাবা অঞ্চল থেকেই গুপ্তযুগের বিষ্ণুমূর্তি এবং দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের স্বর্ণমুদ্রাও...’
‘বলিস কী?’ অসিত দাদু বললেন বিস্মিত কণ্ঠে, ‘এটা জানা ছিল না তো!’
‘গাঙ্গেয় বঙ্গভূমির একটি বিস্তীর্ণ অঞ্চল গুপ্ত রাজাদের অধীন ছিল৷ পাল সেন রাজাদের হাত ঘুরে যা পরে প্রতাপাদিত্যের রাজত্বের মধ্যে আসে’, পরিদাদু বলতে শুরু করলেন আবার, ‘এই সময়টাই আমাদের কাছে সবথেকে বেশি দরকারি এই মুহূর্তে৷’
‘কেন?’
রাজকার্যের সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যে সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে প্রতাপাদিত্য কিছু দুর্গ নির্মাণ করেন৷ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি দুর্গ হল ‘হায়দর গড়’ বা ‘হায়দর দুর্গ’৷ মাতলা নদীর গায়ে এই দুর্গ নির্মাণ করিয়েছিলেন বলে প্রতাপের এই দুর্গটিকে অনেকে ‘মাতলা দুর্গ’-ও বলেন৷’
‘প্রতাপাদিত্যের তৈরি দুর্গের নাম হায়দর গড় হল কী করে?’ এতক্ষণ চুপ করে পরিদাদুর কথা শুনছিল শাওন৷ এইবার কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল সে৷
পরিদাদু হাসলেন, ‘দুর্গের নামকরণটা হয়েছিল হায়দর মানক্লী-র নামে৷’
‘সেটা আবার কে?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘হায়দর মানক্লী ছিলেন প্রতাপের বিখ্যাত সেনাপতি’, খেয়ে দেয়ে উঠে মস্ত একটা ঢেকুর তুলে অসিত রায়ের স্ত্রী-র কাছ থেকে মুখে দেওয়ার জন্যে ভাজা জোয়ান আর মৌরি চেয়ে নিলেন পরিদাদু৷ তারপর বিছানায় মৌজ করে বসে বলতে লাগলেন, ‘সে-ই ছিল মাতলা দুর্গের অধ্যক্ষ৷ এই দুর্গ খনন করার সময় মাটি থেকে কয়েক কলসি সোনার মোহর ওঠে৷’
‘অ্যাঁ!’ সকলের মুখ হাঁ, ‘কয়েক কলসি সোনার মুদ্রা?’
‘হ্যাঁ৷ দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের আমলের৷’
‘উমানাথ মজুমদার তো এমন কথাই বলছিলেন পরিদাদু?’ শাওন অবাক হয়ে বলে৷
‘তিনি ঠিকই বলছিলেন৷ তর্কের খাতিরে যদি ধরেই নিই অনেক কথাই তিনি পাগলের খেয়ালে বলেন, তবু এ কথা মানতেই হবে, ইতিহাস তিনি একটুও ভোলেননি৷’
‘তার মানে সত্যি সত্যিই হায়দর গড়-এর অন্দরে সেই ঘড়া বোঝাই স্বর্ণমুদ্রা রয়ে গেছে?’
‘সবটা কি আর আছে?’ পরিদাদু হাসলেন, ‘তার কিছু রুদ্রাদিত্য নিয়ে পালিয়েছিলেন সে কথা তো উমানাথবাবুর মুখেই শুনলি?’
‘সত্যি?’
‘হলফ করে তো বলা যায় না’, পরিদাদু শাওন আর মেঘলীনার মাথার ওপরে আলতো হাত বুলিয়ে দিলেন আদর করে, ‘কিন্তু শুনলে আশ্চর্য হবি, আদিগঙ্গার তীরেই, এখন যেখানে কালীঘাট, হেস্টিংস-এর আমলে মাটির নীচ থেকে সত্যি সত্যিই পাওয়া গিয়েছিল গুপ্ত যুগের স্বর্ণমুদ্রা৷ এক-আধটা নয়, দুশোটারও বেশি৷’
‘মাই গড’, অসিত রায়ের হাঁ মুখ বন্ধই হতে চাইছে না আর৷
‘তা হলে বাকি ধন সম্পদ তো হায়দরগড়েই থেকে গেল কোনও গোপন জায়গায়?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘উমানাথবাবুর কথা সত্যি হলে শুধু ‘হায়দর গড়’ নয়, এই অঞ্চলের আরও কিছু দুর্গে সেগুলো ভাগ করে পাচার করে দেওয়া হয়েছিল৷’
‘হায়দর গড় তো মাতলার গায়েই বলছিলে?’ সুছন্দা আবার জিজ্ঞেস করলেন৷
‘হুঁ৷’
‘সে জায়গাটা ঠিক কোথায়? সে গড়ের কোনও অস্তিত্বই কি আর নেই এখন?’
‘উঁহু, কিছুই নেই’, পরিদাদু হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন, এমনকি ‘হায়দর গড়’-এর সঠিক অবস্থান যে কোথায় ছিল, আজ পর্যন্ত বুঝে ওঠা যায়নি৷ শুধু একটা অনুমান...’
‘কী অনুমান?’ অসিত পরিদাদুর কথার মাঝখানেই বলে উঠলেন৷
‘জায়গাটা ক্যানিং-এর উত্তর-পূর্বে৷ মাতলা ও বিদ্যাধরীর মোহনার কাছে৷’
‘এও তো শুধু অনুমান?’ অরুণাংশু বললেন৷
‘হ্যাঁ৷’
‘সে অনুমান তো ভুলও হতে পারে৷’
‘পারে৷’
‘কিন্তু ইতিহাসের ইঙ্গিত, অনুমান আর কিছু চান্স ফাইন্ডিংস-এর ওপরে ভিত্তি করেই আমাদেরকে সত্যের কাছে পৌঁছতে হয়৷ তেমনই একটা সত্যের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছি আমরা এই মুহূর্তে৷’
‘কী রকম?’ ভীষণ উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন অসিত রায়৷
‘তোমার জমির কাছাকাছি জায়গা থেকে এমন কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন উঠে এসেছে, যা বহু প্রাচীন৷ তার কিছু গুপ্ত যুগের, কিছু পাল সেন যুগের৷ সেগুলোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অসীম৷ কিন্তু আর যে জিনিসটি এই অঞ্চল থেকেই পাওয়া গেছে তা সোনার জিনিস হলেও আসলে তা সোনার চেয়েও দামি৷’
‘কী জিনিস?’ শাওন আর মেঘলীনা ছাড়া প্রায় সকলেই একইসঙ্গে বলে উঠলেন৷
‘দাঁড়াও, জিনিসটা দেখাই তোমাদের’, পরিদাদু উঠে তাঁর ব্যাগ থেকে মুদ্রাটা বের করে এনে নিজের হাতের চেটোর ওপরে রেখে হাত মেললেন, ‘দেখে নাও, এ জিনিস এত কাছ থেকে আর কখনও দেখার সৌভাগ্য হয়তো হবে না৷’
‘এ তো সেই ওই ছোঁড়াটার দেওয়া টাকাটা’, অরুণাংশু বললেন৷
‘হ্যাঁ’, পরিদাদু মাথা নেড়ে সায় দিলেন৷
‘এটা কি সত্যিই অ্যান্টিক নাকি?’
‘শুধু প্রাচীন নয়, মারাত্মক মূল্যবান...’
‘এটা কবেকার?
‘চতুর্থ শতাব্দী...’
‘বলেন কী! এ যে হাজার বছরেরও বেশি আগের সময়!’ এতক্ষণে হাতের কাজ সামলে নিয়ে অঞ্জনাও এসে যোগ দিলেন আলোচনার মধ্যে৷
‘এতক্ষণ যে স্বর্ণমুদ্রাদের কথা হচ্ছিল, ইনি তাঁদেরই একজন...’
‘আরিব্বাস’, অঞ্জনা আবার বিস্ময় প্রকাশ করলেন৷
‘ওই কুঠিবাড়ির নীচেই কি তা হলে সেই দুর্গটা, যেখানে...’ শাওন জিজ্ঞেস করল চোখ গোল গোল করে৷
‘না’, পরিদাদু কথা শেষ করতে দিলেন না তাকে, ‘ওখানে এই মুদ্রাটা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল৷’
‘কে রাখতে পারে?’
‘উমানাথ মজুমদার৷ তিনিই পেয়েছিলেন এই মুদ্রাটা৷ এই একটাই পেয়েছিলেন নাকি একটার বেশি তা অবিশ্যি আমি জানি না এখনও...’
‘ওই কুঠিবাড়ির নীচে একসময় নিয়মিত নদীর স্রোত বইত জোয়ারের সময়৷ তখনই কোনওভাবে এটা...’ অসিত একটা যুক্তি খাড়া করতে চাইছিলেন৷ পরিদাদু মাঝপথে থামিয়ে দিলেন তাঁকে, ‘সম্ভবত না৷’
‘উমানাথের ব্যাপারটায় এতখানি নিশ্চিত হচ্ছ কী করে?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘মনে করে দেখ, তিনি আমাদের কাছে আশংকা প্রকাশ করেছিলেন, যে রাজ সম্পত্তি পাহারা দিচ্ছিলেন তিনি, তা দখল নেওয়ার চেষ্টা করছে কেউ কেউ৷ তিনি তাই সেই গচ্ছিত সম্পত্তির কিছু কিছু ব্যাংকের ভল্টে সরিয়ে রাখছেন...’
‘হ্যাঁ বলেছিলেন৷ কিন্তু এ কথার তো মানেই হয় না৷ তিনি কি সত্যিই সেগুলো ব্যাংকের লকারে টকারে...’ অসিত দু’দিকে মাথা নেড়ে বলার চেষ্টা করলেন৷
‘উঁহু উঁহু’, পরিদাদু মাঝপথে থামিয়ে দিলেন তাঁকে, ‘উনি আসলে আমাদের বিশ্বাস করে একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন৷ আমরা সেই মুহূর্তে বুঝতে পারিনি৷’
‘কী ইঙ্গিত?’ অরুণাংশু রীতিমতো উত্তেজিত৷
পরিদাদু হাসলেন, ‘কুঠিবাড়ির নীচে যে খিলানের মতো স্ট্যাকচার দেখেছিলে, যার নীচে দিয়ে মাতলার জল আসত জোয়ারের সময়, ওটি আসলে একটি টিপিকাল ইউরোপীয় স্থাপত্য রীতি৷ কুঠি নির্মাণে এই পঞ্চ খিলান পোর্টিকোর ব্যবহার এবং ব্যারেল ভল্ট স্থাপত্যরীতি উমানাথ মজুমদারের মতো পণ্ডিত মানুষের অজানা নয়৷ এই ব্যারেল ভল্ট বা টানেল ভল্ট শব্দটাকেই ঘুরিয়ে ব্যাংকের ভল্ট করে দিয়েছিলেন ভদ্রলোক...’
কলিং বেলের উপর্যুপরি আওয়াজে কথা থামালেন পরিদাদু৷ অসিত বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন, ‘কার এত তাড়া বাপু, বারবার বেল বাজাচ্ছে এমন করে?’
মেঘলীনা বলল, ‘তোমরা বসো, আমি দেখছি৷’
বাইরে বেরিয়েই বিস্ময় মাখা গলায় বলে উঠল মেঘলীনা, ‘কী রে, তুই!’
বাইরে থেকে বিলুর উদ্বিগ্ন গলা পাওয়া গেল, ‘পাগলাদাদুর খুব বিপদ৷ কারা যেন পাগলাদাদুকে মেরে ফেলে দিয়ে গেছে দুগ্গা ঢিবির পিছন দিকের ঝোপের মধ্যে৷’
পরিদাদু, অরুণাংশু, অসিত সকলেই বেরিয়ে এসেছিলেন৷ পরিদাদু চিৎকার করে উঠলেন, ‘কী বলছিস রে তুই? উনি বেঁচে আছেন তো এখনও?’
‘মনে হয় বেঁচে আছে৷’
‘চল আমি এক্ষুনি আসছি৷’
অসিত বললেন, ‘আমিও যাব তোর সঙ্গে৷ দেখি একটা টোটো পাওয়া যায় যদি৷ তেমন হলে হসপিটালাইজ করতে হবে ভদ্রলোককে এক্ষুনি৷’
অরুণাংশু বললেন, ‘আমিও যাব?’
‘নাহ’, পরিদাদু বললেন, ‘দরকার নেই৷ তোমরা বাড়িতেই থাকো৷’
ওঁরা বিলুকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন৷ বাইরে সন্ধের অন্ধকার গাঢ় হয়ে গেছে ততক্ষণে৷
দুপুরে তড়িৎ আজ বেশ তরিবত করে খাওয়াল৷ কেন, কে জানে! ছেলেটার মায়া-দয়া আছে৷ তাঁকে দেখভাল করে৷ খেতে দেয়৷ বোতলে করে জল রেখে যায় রাতে৷ তবে বাইরে বেরোতে গেলেই আজকাল বড্ড বকাবকি করে ছেলেটা৷ কাল রাতে বাড়ি ফেরার পর খুব চেল্লামেল্লি করেছে৷ বলেছে, দরজায় তালা মেরে রাখবে এবার থেকে৷ কথাটা বিশ্বাস হয়নি প্রথমটা৷ কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে উমানাথ বাড়ির মূল দরজাটা খুলতে গিয়ে দেখলেন, সত্যিই সেটা বাইরে থেকে বন্ধ৷ মনে মনে খুব রাগ হয়ে গেল উমানাথের৷ তাঁর কি ঘরে বসে থাকলে চলে! মস্ত কাজের দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে ঘুরছেন৷ রাজ সম্পদের পাহারাদারির ভার নেওয়া চাট্টিখানি কথা নয়৷ এ কাজে ঝুঁকি আছে৷ শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে সম্পদের ঠিকঠাক সংরক্ষণ করা চাই৷ তাছাড়া অন্তর্ঘাতের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না৷ এ পৃথিবীতে কে কার? স্বয়ং প্রতাপাদিত্যই কি রেয়াত করেছিল রক্তের সম্পর্ককে?
লোভ বড় বিচ্ছিরি জিনিস৷ দু’দিকে মাথা নাড়াতে থাকেন উমানাথ৷ সামলাতে না পারলেই সর্বনাশ৷ কাল তোমাকে সেই লোভের শাস্তি দেবেই দেবে৷ মহাকালের দণ্ড প্রতাপকেও ছাড়েনি৷
ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করতে থাকেন উমানাথ৷ তাঁর পূর্বপুরুষদের কাছে মাথা হেঁট হয়ে যাচ্ছে৷ একটা বাচ্চা ছেলে তাঁর ইচ্ছে, তাঁর চলাফেরার ওপরে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে!
সাধারণত নিজের কাছে ইদানীং রাজসম্পত্তি তিনি তেমন বেশি কিছু রাখেন না৷ সামান্যই কিছু গচ্ছিত ছিল এই বাড়িতে৷ কিন্তু বার বার মনে হচ্ছে তাতেও কার যেন হাত পড়েছে৷ কেউ যেন গোপনে সরিয়ে ফেলতে চাইছে সেই সম্পদ৷ কোথায় কী যে ঘটে যাচ্ছে অগোচরে ঠিক বুঝতে পারছেন না উমানাথ৷ আজকাল সবকিছু মাথায় ঢুকতে চায় না ঠিকমতো৷
পুরনো টালি, পাতলা ইট, ভাঙা থালা-কলসির কিছু টুকরো এখনও আছে বাড়িতে৷ তাদের সঙ্গে রোজ রাতে একলা একলা কথা কন তিনি৷ তাদের মধ্যে ইদানীং কী একটা যেন কষ্ট বাজছে৷ সঙ্গী হারানোর কষ্ট! কে চলে গেছে তাদের মধ্যে থেকে? কারা চলে গেছে? আজকাল মাথা ঘামতে চায় না৷ জুত করে কিছু ভাবতে বসলে মাথা ঝিমঝিম করে৷ কষ্ট হয়৷ তখনই মনে হয়েছিল, রাজসম্পদ দ্রুত লুকিয়ে ফেলা দরকার৷ সুরক্ষার অভাবে সেগুলো শত্রুর হাতে পড়ে গেলে অনর্থ হতে বাকি থাকবে না আর কিছু৷ দিন কয়েক আগে কিছু মূল্যবান সম্পদ লুকিয়ে রেখে এসেছেন ব্যারেল ভল্টের নিশ্চিন্ত নিরাপত্তায়৷ আর যা কিছু অতি মূল্যবান বলে মনে হচ্ছিল, তা ফিরিয়ে দিয়ে এসেছেন গড়ের ভেতরেই৷ যেখানকার জিনিস সেখানে রাখাই ভালো৷ কিন্তু তাই বলে নজরদারি তো বন্ধ করা চলে না৷ তাই দিনে রাতে ওই অঞ্চলে নজর রাখতে হচ্ছে তাঁকে৷ বারবার ফিরে ফিরে যেতে হচ্ছে কুঠিবাড়ির নীচে৷ মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে মিলিয়ে নিতে হচ্ছে কোষাগারের সঞ্চিত অর্থ-সম্পদ৷ তারপর গড়ে ফিরে গিয়ে রিপোর্ট জমা করা৷ অনেক কাজ, অনেক৷
তক্তপোশের নীচে ঢুকে পুরনো টিনের ট্রাঙ্কটাকে বের করে আনলেন উমানাথ৷ এক টানে তার ডালাটাকে খুলে ফেললেন৷ ট্রাঙ্কটা অদরকারি কাগজপত্রে ঠাসা৷ একবার ফাঁকা ঘরেই চারদিকে নজর বুলিয়ে নিলেন উমানাথ৷ তারপর সেই পুরনো কাগজপত্র ছেঁড়া ন্যাকড়া সরিয়ে সন্তর্পণে বের করে আনলেন কালো পাথরের একটা ইঞ্চি চার-পাঁচ লম্বা আর ইঞ্চি তিনেক চওড়া মূর্তি৷ মূর্তিটা পেয়েছিলেন সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্তর্গত লোথিয়ান দ্বীপ থেকে৷ অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পৌঁছেছিলেন সেখানে৷ ঘন জঙ্গলের মধ্যে মৃত্যুকে পাশ কাটিয়েছিলেন একটুর জন্যে৷ সেইখানেই একটি অংশে লক্ষ করেছিলেন, বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে গাছপালা নেই৷ একটু অনুসন্ধান করতেই একটি বহু প্রাচীন পাতলা ইটের ধ্বংসাবশেষ চোখে পড়েছিল৷ সেইখানে পেয়েছিলেন মূর্তিটাকে৷ কাউকে কখনও বলেননি এটার কথা৷ অনেকদিন ধরে যত্ন করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন৷ মূর্তিটার ওপরে মায়া পড়ে গিয়েছিল ভীষণ৷ কতবার মনে হয়েছে, গড় থেকে নাই বা পেলাম, এ অঞ্চলের সব সম্পদই রাজসম্পত্তি৷ মূর্তিটা গড়ে রেখে আসাই ভালো৷ কিন্তু হয়ে ওঠেনি৷ চোয়াল শক্ত করলেন উমানাথ৷ যে কোনও সময় যুদ্ধ শুরু হতে পারে৷ শত্রুর চর ঘোরাফেরা করছে সর্বক্ষণ৷ বাইরের দরজায় আওয়াজ হতেই দ্রুত মূর্তিটা আবার লুকিয়ে ফেললেন উমানাথ৷ ট্রাঙ্কটা ঠেলে দিলেন তক্তপোশের নীচে৷
তড়িৎ ঢুকে তাঁর দিকে চেয়ে হাসল, ‘কী, কেমন জব্দ? বাইরে বেরনো কিন্তু একদম বন্ধ আপনার?’
‘কেন?’
‘কোথায় কোথায় ঘুরে বেড়ান পাগলের মতো৷ ওসব চলবে না৷’
‘আমি কি এমনি ঘুরি?’ উমানাথ বিরক্তি প্রকাশ করেন, ‘রাজকার্যে কি ফাঁকি দেওয়া যায় হে?’
‘কোন রাজা?’
‘আমার পূর্বপুরুষ, ভবানন্দ৷’
‘আজ একুশ শতকে দাঁড়িয়েও আপনি সেই রাজার হয়ে কাজ করছেন?’ তড়িৎ হো হো করে হেসে ওঠে৷
‘গড়ের মধ্যে সময় থমকে আছে৷ আমি জানি৷ তোমরা এসব বুঝতে পারো না৷’
‘গড় কোথায়?’
‘আছে৷’
‘এখানেই? মানে আমাদের কাছাকাছিই?’
‘হ্যাঁ৷’
‘আপনি জানেন জায়গাটা?’
‘জানি৷’
‘কোথায়?’
‘বলব না৷’
‘কেন?’
‘যদি সেনা নিয়ে গিয়ে গড় লুঠ করো তোমরা?’
‘কী এমন আছে সেখানে? সেনা টেনা নিয়ে লুঠ করে পোষাবে তো আদৌ?’
‘যা আছে তা সোনার চেয়েও দামি’, বলেই চুপ করে যান উমানাথ৷
‘আমি আসি৷ লক্ষ্মী হয়ে থাকবেন৷ আমি নিজেই আপনাকে নিয়ে বেরব না হয়৷ একা একা বেরতে যাবেন না খবরদার...’
দুপুরে খাবার দাবার পাঠিয়ে দিয়েছিল তড়িৎ৷ নিজে এসেও দেখে গেল একবার৷ বলল, ‘বিকেলে বেরোবেন আমার সঙ্গে? চলুন একসঙ্গে আপনার গড়ে ঘুরে আসি নাহয়৷ আপনার সঙ্গে আমিও লেগে পড়ি পাহারাদারির কাজে৷’
উমানাথ চুপ করেই রইলেন৷
তড়িৎ হেসে বলল, ‘কী, প্রস্তাবটা পছন্দ হল না বুঝি?’
উমানাথ দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, ‘রাজকোষের পাহারাদার হওয়া কি এতই সহজ? রাজার কাছে কত পরীক্ষা দিতে হয়৷ কত ভাবে বাজিয়ে দেখে নেন তিনি পাহারাদারের বিশ্বাসযোগ্যতা কতখানি, কতটা নির্লোভ সে...’
‘আপনিও পরীক্ষা দিয়েছেন?’
‘আলবাত৷ দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষা দিয়েছি৷ এখনও সে পরীক্ষা শেষ হয়নি৷’
‘বলেন কী!’
‘তা হলে আর বলছি কী?’
‘কে পরীক্ষা নিচ্ছে?’ লঘু গলায় জিজ্ঞেস করে তড়িৎ৷
‘বলব না, আর কিচ্ছু বলব না’, রেগে গিয়ে বলেন উমানাথ৷
উমানাথকে রেগে যেতে দেখে তড়িৎ উঠে পড়ল, ‘আচ্ছা আমি আসছি৷ আবার বলছি, একা একা বেরিয়ে পড়বেন না যেন৷’
‘তুমি আমাকে বন্দি করতে চাইছ?’
‘ছি ছি, কী যে বলেন মাস্টারমশাই’ তড়িৎ লজ্জা পেয়ে যায়, ‘আপনার সেফটির জন্যেই... কোথায় যেতে কোথায় চলে যাবেন৷ দিনকাল ভালো নয়...’
তড়িৎ বেরিয়ে যাওয়ার পরে একটুক্ষণ অপেক্ষা করলেন উমানাথ৷ তারপর ধীরে ধীরে বাইরের দরজার কাছে গিয়ে দেখলেন, দরজাটা এখনও খোলাই আছে৷ বাইরে থেকে তালা লাগানো হয়নি এখনও৷ দ্রুত ফিরে এসে ট্রাঙ্ক থেকে ছোট্ট মূর্তিটা বের করে নিয়ে কাপড়ে মুড়ে কাঁধব্যাগে ভরলেন উমানাথ৷ তারপর সেই ব্যাগ কাঁধে নিয়ে ঘরের বাইরে পা রেখেই হনহন করে হাঁটতে শুরু করলেন বড় রাস্তার দিকে৷
নারায়ণতলা হাই স্কুল পেরতেই একটা টোটো উমানাথের পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল৷ উমানাথ রাস্তার আরও ধারে সরে এসে দাঁড়ালেন৷ চালক মুখ বাড়িয়ে হেসে বলল, ‘মাস্টারমশাই, কোথায় যাবেন? ক্যানিং?’
‘হ্যাঁ৷’
‘আসুন৷ উঠে পড়ুন৷ আমি পৌঁছে দিচ্ছি৷’
‘আমার কাছে টাকা নেই৷’
‘আপনাকে আমি চিনি৷ আসুন৷ টাকা লাগবে না৷’
উমানাথ গাড়িতে উঠে পড়লেন৷ টোটো চলতে শুরু করল৷ ফুর ফুর করে হাওয়া লাগছিল গায়ে৷ বেশ আরাম লাগছিল উমানাথের৷ চোখ বুজে আসছিল৷ সামনে বসে ছেলেটা গাড়ি চালাতে চালাতেই ফোনে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে নীচু গলায়৷ কী বলছে উমানাথের কানে এল না৷ একধারে মাথা হেলিয়ে চোখ বন্ধ করলেন তিনি৷ চোখে ঘুম নামল তাঁর৷
ছেলেটার ডাকেই ঘুম ভাঙল৷ গাড়ি থেমেছে৷ ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, ‘যাবেন কোথায় এখন?’
‘মিঠেখালির দিকে৷’
‘চলুন দিয়ে আসি৷’
‘না থাক’, বলে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন উমানাথ৷ কাঁধের ব্যাগটার ভেতরে হাত ঢুকিয়ে একবার দেখে নিলেন ভালো করে৷ তারপর হনহনিয়ে হাঁটা দিলেন কোনও দিকে না তাকিয়ে৷
কুঠিবাড়ির কাছে যখন পৌঁছলেন, বিকেল সন্ধের দিকে গড়াতে শুরু করেছে৷ চারদিকটা একবার দেখে নিলেন উমানাথ৷ না, কেউ নেই আপাতত এই চত্বরে৷ দ্রুত কুঠিবাড়ির পিছন দিকে চলে গেলেন তিনি৷ প্রায় হামাগুড়ি দিয়ে ঝোপ-জঙ্গল সরিয়ে ঢুকে পড়লেন একটা নির্দিষ্ট খিলানের মাঝখানের ফাঁকটার মধ্যে৷ কিছুদূর এগিয়ে একটা জায়গায় তিনি থামলেন৷ স্থির চোখে চাইলেন মাটির দিকে৷ দু’চোখের ভ্রু কুঁচকে উঠল তাঁর৷ মাটি ঝুরো ঝুরো কেন এখানে? কেউ কি মাটি খুঁড়েছিল তাহলে? কে? রাজার সম্পদ কি লুঠ হল তা হলে সত্যি সত্যিই? ব্যাগ থেকে ছোট্ট হাত শাবলটা বের করে উন্মাদের মতো মাটি খুঁড়তে লাগলেন উমানাথ৷ আর তখনই ভারী গমগমে কণ্ঠস্বরটা কানে এল তাঁর, ‘কী খুঁজছেন ওখানে উমানাথবাবু?’
যেটুকু মাটি খোঁড়া হয়েছিল, তাড়াতাড়ি গর্তের মুখে চাপা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন উমানাথ৷ লোকটা একটু তফাতে দাঁড়িয়ে আছে৷ বড়সড় চেহারা৷ ফর্সা৷ মাথায় চকচকে টাক৷ হাতের আঙুলে অনেকগুলো আংটি৷ উমানাথের বুকের ভেতরে ছাঁত করে উঠল৷ শত্রুসৈন্য পৌঁছে গেছে তাঁর কাছে৷ আর রক্ষা নেই৷ এই লোকটাই স্টেশনের ওই ছোঁড়াটার কাছ থেকে রাজার সম্পদ লুটে নিচ্ছিল একদিন৷ এরা লোভী৷ সবাই লোভী৷
গায়ের রক্ত গরম হয়ে উঠছে উমানাথের৷ খুব শিগগিরই একটা যুদ্ধ বাঁধতে চলেছে৷ দু’-এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন উমানাথ৷ তারপর চকিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, এক্ষুনি লোকটাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করে লাভ নেই৷ বরং এখন গড় সামলানো বেশি জরুরি৷
সোনালি ফ্রেমের চশমা পরা ফর্সা লোকটা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুদ্দাড় দৌড় লাগালেন উমানাথ দুগ্গা ঢিবির দিকে৷ একবারও থামলেন না আর৷
দুগ্গা ঢিবির পিছন দিকে নদীর পাড় যেদিকে সেই আড়াল মতো জায়গার কাছে এসে যখন দাঁড়ালেন উমানাথ, তখন হাঁপরের মতো ওঠা নামা করছে তাঁর বুক৷ এমন হাঁপিয়ে গেছেন মনে হচ্ছে হৃৎপিণ্ড, ফুসফুস সব ফেটে যাবে এক্ষুনি৷ উমানাথ হাঁ করে খানিক প্রশ্বাস নিলেন৷ তারপর একটু ধাতস্থ হয়ে নিয়ে জঙ্গলে মোড়া ঢালু পথ ধরে ধীরে ধীরে উঠে পড়তে শুরু করলেন দুগ্গা ঢিবির ওপর দিকে৷ এই ঢিবিটা তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা৷ দিনে-রাতে কতবার যে এটা ঢুঁড়ে বেড়িয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই৷ প্রায় তিন-চতুর্থাংশ উঠে যাওয়ার পরে ঢিবিটার গায়ে একটা গভীর খাঁজ আছে৷ সেই খাঁজের নীচে ঢুকে গিয়ে তিনি একটু বসলেন৷ জিরিয়ে নিলেন মিনিট পাঁচ-সাত৷ তারপর একটা আকন্দ গাছের কোনাকুনি ফুট তিনেক তফাতে গর্ত করতে শুরু করলেন৷
গর্তটা খোঁড়া হয়ে গেলে ব্যাগ থেকে মূর্তিটা বের করলেন উমানাথ৷ সন্তর্পণে শুইয়ে দিলেন গর্তের মধ্যে৷ আর তখনই কী একটা ভারী জিনিসের আঘাত নেমে এল তাঁর মাথার ঠিক নীচে ডান কাঁধের পাশটিতে৷ উমানাথ টাল সামলাতে পারলেন না৷ পড়ে গেলেন৷ কাঁধের পাশে, পিঠে টনটন করে উঠল৷ ঝোপ জঙ্গলে ঠোক্কর খেতে খেতে গড়িয়ে নেমে এলেন অনেকখানি৷ উমানাথ বুঝতে পারছেন হাত-পা ছিঁড়ে যাচ্ছে, কেটেকুটেও যাচ্ছে খানিক৷ গায়ের জামাটা বোধহয় ছিঁড়েও গেল৷ গড়িয়ে পড়তে পড়তেই একটা বড় গাছের গুঁড়িতে ধাক্কা খেলেন উমানাথ৷ মাথা ঠুকে গেল৷ চরাচর জুড়ে আঁধার নামছে তখন৷ সে অন্ধকারের চেয়েও আরও ঘন অন্ধকার নেমে এল তাঁর চোখ জুড়ে৷
পরিদাদুরা যখন ফিরলেন তখন বেশ রাত হয়ে গেছে৷ মাঝে হসপিটাল থেকে অসিতদাদু একবার ফোন করেছিলেন৷ জানিয়েছিলেন, উমানাথের যথেষ্ট চোট লেগেছে ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে প্রাণসংশয় আর নেই৷ প্রাথমিক চিকিৎসা হয়েছে৷ শরীরের কাটা ছেঁড়া জায়গাগুলোয় ড্রেসিং করে ওষুধ লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ স্টিচ করতে হয়নি কোথাও৷ তাঁকে ক্যানিং সাব ডিভিশনাল হাসপাতালেই ভর্তি করে দিচ্ছেন তাঁরা আপাতত৷ পুলিশকেও পুরো বিষয়টা ইনফর্ম করা হয়েছে৷ তাঁরাও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন যা তাঁদের নেওয়ার৷ শাওনরা খানিক নিশ্চিন্ত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু উৎকণ্ঠা ছিলই৷ পুরো ব্যাপারটা শোনার জন্যে মন আনচান করছিল শাওনের৷ মেঘলীনার অবস্থাও তথৈবচ৷
শাওনের দিকে চেয়ে সুছন্দা রাগ দেখিয়ে বলছিলেন, ‘এসব ঘটনার কথা শুনলে আমার ভয়ে হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়৷ আর শানুটাকে দেখ৷ ঝামেলা ঝঞ্ঝাট দেখল তো আহ্লাদে আটখানা৷ পরিকাকুর যোগ্য নাতি৷ রহস্য দেখল তো নাচতে শুরু করল৷’
‘সঙ্গে আরও একজন জুটেছে এখন’, অঞ্জনাও তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললেন হাসতে হাসতে৷
পরিদাদু ফিরেই বললেন, ‘এক কাপ চা খাওয়াও৷’
অঞ্জনা একবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নিয়ে অসিতের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এত রাতে চা? একেবারে রাতের খাবার খেয়ে নিলেই তো পারো সবাই৷ যা ধকল গেল সন্ধে থেকে!’
অসিত বললেন, ‘ওইজন্যেই তো চা দরকার এক রাউন্ড৷’
‘আচ্ছা বেশ, আমি চায়ের জল চড়িয়ে দিচ্ছি৷ তোমরা হাত-মুখ ধুয়ে নাও তাড়াতাড়ি’, অঞ্জনা অরুণাংশুর দিকে তাকালেন, ‘আপনিও খাবেন নাকি এক কাপ?’
‘আলবাত৷ এক যাত্রায় পৃথক ফল হবে নাকি?’ অরুণাংশু হাসলেন৷
পরিদাদু আর অসিতদাদু চায়ের টেবিলে এসে বসতেই অরুণাংশু বলে উঠলেন কৌতূহলী গলায়, ‘কী ব্যাপার বলো দেখি পরি? কেস কি গোলমেলে নাকি?’
‘পরিকাকু উপস্থিত রয়েছে অথচ কেস গোলমেলে হবে না? তুমিও যেমন! এমন হয়েছে কখনও আজ পর্যন্ত? বুঝতে পারছ না, পুলিশ পর্যন্ত গড়িয়েছে ব্যাপারটা৷ কেস গোলমেলে না হলে থানা পুলিশ আসবে কেন এর মধ্যে?’
‘আহ, থামো না’, সুছন্দাকে থামিয়ে দিলেন অরুণাংশু, ‘পরিকে বলতে দাও৷’
‘ব্যাপারটা সত্যিই খুব সরল নয়’, পরিদাদু হাসলেন, ‘একটা অন্তর্ঘাত, একটা ষড়যন্ত্র তো আছেই৷ নইলে বৃদ্ধ উমানাথকে আঘাত করে ঢিবির ওপর থেকে কারও ফেলে দেওয়ার দরকার হবে কেন?’
‘আচ্ছা তুই এ বিষয়ে এত নিশ্চিত হচ্ছিস কী করে বল তো?’ অসিত রায় বললেন, ‘উমানাথ মজুমদার ভদ্রলোক তো ওই দুগ্গার ঢিবি-র দিকে প্রায়শই যাতায়াত করতেন৷ ওই ঢিবি-র ওপরে উঠতেনও৷ অন্যেরা মা দুর্গার স্থান বলে ঢিবিটাকে এড়িয়ে গেলেও উনি ওসব মানতেন না৷ মাথা খারাপ থাকলে যা হয়... তখন তো আর এইসব জ্ঞানগম্যি থাকে না মানুষের... গোঁ ভরে ঢিবির ওপরে উঠতে গিয়ে বয়স্ক মানুষ, নিজেই হয়ত পড়েছেন পা ফা পিছলে গিয়ে...’
‘আজ্ঞে না স্যার’ পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘ওই ঢিবিতে অন্য লোক ছিল৷’
‘কী করে জানলে?’ মেঘলীনা জিজ্ঞেস করল৷
‘আমি ঢিবিতে উঠেছিলাম৷ সেখানে মোবাইলের টর্চের আলোয় দেখেছি গুটখা-র প্যাকেট পড়ে আছে৷ টাটকা৷ তাছাড়া ওখানে আরও এমন কিছু সূত্র আমি পেয়েছি...’
‘কী ভয়ানক!’ মেঘলীনা ডান হাতের চেটো নিজের মুখের কাছে তুলে আনল আতঙ্কে৷ পরিদাদুকে কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল, ‘তুমি দুগ্গা ঢিবিতে পা দিলে? তোমার ভয় করল না?’
‘ভয় করবে কেন?’ পরিদাদু মিটিমিটি হাসতে লাগলেন৷
‘ওটা যে দুগ্গা ঢিবি, মা দুর্গার থান৷ ওখানে পা দেওয়া বারণ৷ ওখানে ওঠার জন্যেই তো উমানাথদাদু পাগল হয়ে গেলেন...’ মেঘলীনা আবার বলে৷
‘ওটা দুর্গাঢিবি নয় মেঘলীনা’, পরিদাদু মিটিমিটি হাসছেন এখন৷
‘নয়, কী বলছেন? সবাই তো বলে...’ অঞ্জনা বলে উঠলেন৷
‘একটা কথা দীর্ঘদিন ধরে মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে খানিক বদলে গেছে৷ অবিশ্যি বদলে গেছে বলেই রক্ষে৷ নইলে সবই লুঠপাট হয়ে যেত এতদিনে৷’
‘তুইও যে উমানাথবাবুর মতো কথা বলতে শুরু করলি পরি!’ অসিত রায় বললেন৷
‘মানে?’ অরুণাংশু অবাক হয়ে বললেন৷
‘জ্ঞান ফেরার পরে উমানাথবাবুকে যতবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে তিনি পড়লেন কীভাবে আর কেনই বা ওখানে উঠেছিলেন তিনি, ততবারই ক্ষীণ কণ্ঠে একটাই কথা বলেছেন তিনি, গড় লুঠ হয়ে যাচ্ছে, গড় রক্ষা করতে পারলেন না তিনি...’
‘আশ্চর্য!’ অঞ্জনা, সুছন্দা দু’জনেই বললেন একসঙ্গে, ‘দুগ্গা ঢিবির কাছে আবার গড় কোথায়?’
‘আছে৷ তিনি ঠিকই বলেছেন’, পরিদাদু গম্ভীর মুখে বললেন৷
‘আছে?’ এবারে অসিত নিজেও অবাক৷
‘আছে বলেই তো তোমার জমিটার অমন আকাশছোঁয়া দাম হয়ে গেছে হঠাৎ করে৷ বাড়ি এসে পানিগ্রাহী এমনি এমনি কি খোশামোদ করছেন তোমায় জমিটা তাঁকে বেচে দেওয়ার জন্যে?’
‘মানে?’
‘ওই যে একটু আগে বলছিলাম, একটা শব্দ কালের স্রোতে খানিক বদলে গিয়ে উচ্চারিত হচ্ছে এখন, আর সেই ভুল উচ্চারণই আড়াল করে রেখেছে এই অঞ্চলে থাকা প্রতাপাদিত্যের প্রাচীন দুর্গটাকে৷’
‘একটু খুলে বলো না পরিকাকু’, সুছন্দা অস্থির গলায় বললেন৷
‘দুর্গাঢিবি নয়, ওটা দুর্গঢিবি’, পরিদাদু বললেন, ‘দুর্গটা ধ্বংস হওয়ার পর গাঁয়ের লোকেরা ওটাকে দুর্গঢিবিই বলত নিশ্চিত একসময়৷ পরে সেটা মুখে মুখে দুর্গাঢিবি বা দুগ্গাঢিবিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়...’
‘তাই তো, তাই তো’ লাফিয়ে উঠলেন অসিত রায়, ‘এই সামান্য কথাটা আমার নিজের মাথাতেই তো আসা উচিত ছিল এত দিনে৷ আমি সত্যিই গবেট রে পরি৷’
‘নিজের সম্পর্কে এতদিনে একটা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলে অবশেষে’, অঞ্জনা ফুট কাটলেন, ‘থ্যাংক ইউ পরিমলদা৷’
হো হো করে হেসে উঠলেন সুছন্দা, পরিদাদু এবং অরুণাংশু৷ এমনকি অসিত নিজেও৷
‘কাল উমানাথদাদুর ওপরে অ্যাটাকটা ওই রতন পানিগ্রাহীই করেনি তো পরিদাদু?’ শাওন বলে উঠল৷
‘হতেই পারে৷ কাল রতন পানিগ্রাহীকে এ অঞ্চলে দেখাও গেছে বিকেলের দিকে৷ বিলু বলেছে আমাকে৷ ওর সঙ্গেও দেখা করেছিল লোকটা...’
‘তা হলে ওই লোকটাকে ডেকে পুলিশকে দিয়ে যদি জেরা করানো যায়...’ অরুণাংশু বললেন৷
‘দেখছি’, পরিদাদু মাথা নেড়ে সায় দিলেন, ‘তমোঘ্নকে জানিয়েছি সব৷ প্রতিদিনই ফাইন্ডিংসগুলোকে ব্রিফ করে যাচ্ছি ওকে৷ কাল ও আসছে৷ সকাল দশটার মধ্যে৷ আমাকে বলেছে তার মধ্যে আমি নিজে থেকে আর কিচ্ছুটি যেন না করি৷ সেইজন্যেই৷ নাহলে...’
‘না হলে কী পরিদাদু?’ শাওন বলে৷ তার খারাপ লাগছিল৷ মনে হচ্ছিল, পরিদাদুর হাত থেকে রহস্যের শেষ মোড়ক খোলার কাজটা যেন তমোঘ্নদাদুর হাতে চলে যাচ্ছে ক্রমাগত৷ ব্যাপারটা তার ভালো লাগছিল না একটুও৷
পরিদাদু যথারীতি সক্কালবেলা ঘুম থেকে উঠে এক রাউন্ড ঘুরে এসেছেন বাইরে থেকে৷ ফিরে এসে বললেন, কতকগুলো বিষয়ে ডাউট ক্লিয়ার করার দরকার ছিল৷’
অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন, ‘ডাউট ক্লিয়ার হল?’
‘হল’, পরিদাদুকে বেশ ফুরফুরে লাগছিল, ‘আমার যে বয়েস হচ্ছে তা বেশ মালুম হচ্ছে৷ মাঝে মধ্যেই মাথার ঘিলুটা গোবরে পরিণত হচ্ছে আজকাল৷’
‘সত্যিই যদি এই উপলব্ধিতে পৌঁছও তো বাঁচি বাপু’ সুছন্দা বললেন, ‘এইসব রহস্য-টহস্যের পিছনে দৌড়নো বন্ধ হয় তাহলে৷’
অরুণাংশু হাত নেড়ে বললেন, ‘বাজে কথা রাখো৷’ তারপর পরিদাদুর দিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তা পরি, তোমার এই ডাউট ক্লিয়ারিং-এর জন্যে সকাল থেকে কোথায় কোথায় যেতে হল?’
‘স্টেশনে বিলুর কাছে, হাসপাতালে উমানাথ মজুমদারের কাছে আর বাসন্তীতে তড়িৎ সেনগুপ্তের কাছে৷’ পরিদাদু হাসলেন৷
‘তড়িৎ সেনগুপ্তের কাছে কেন?’
‘ওঁকে আজ এখানে আসার জন্যে নেমন্তন্ন করলাম’, পরিদাদু বললেন, ‘বিলুকেও আসতে বলেছি৷ আর তমোঘ্ন তার এক বন্ধুকে নিয়ে আসছে বলল৷ অঞ্জনার আপত্তি নেই তো? আজ কিন্তু সকলেই আমাদের অতিথি৷ দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত কিন্তু সকলের এখানেই৷’
‘আরে দারুণ ব্যাপার৷ অনেক দিন পর বেশ একটা পিকনিক পিকনিক ভাব আসছে৷ যাই, আমি তা হলে একপ্রস্থ বাজার থেকে ঘুরে আসি’, বলে উঠে পড়লেন অসিত রায়৷
‘কখন আসছেন তা হলে আমাদের অতিথিরা?’ অঞ্জনা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাকে তো সেইভাবেই তৈরি থাকতে হবে৷ আতিথ্যে ত্রুটি হলে যে আপনার বদনাম পরিমলদা৷ সে বদনাম আমি কি হতে দিতে পারি?’
‘তমোঘ্ন বেরিয়ে পড়েছে ভোরবেলাতেই৷ এতক্ষণে ক্যানিং-এ পৌঁছেও গেছে হয়তো৷’
‘ওঁকে কি তোমায় আনতে যেতে হবে?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷
‘না, দরকার হবে না৷ আমি এ বাড়ির ডিটেইলস দিয়ে দিয়েছি৷ অসুবিধা হবে না৷’
‘তা হলে এসেই তো পড়বেন উনি এক্ষুনি’, অঞ্জনা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন৷
‘অত ব্যস্ততার দরকার নেই’ পরিদাদু ঘড়ি দেখলেন, ‘এখন সওয়া ন’টা৷ ওর আসতে আসতে সাড়ে দশটা-এগারোটা হবে৷ বিলুকেও ওইরকম সময়েই আসতে বলে দিয়েছি আমি৷ তড়িৎ আসবে আর একটু পরে৷ এই ধরো সাড়ে বারোটা-একটা নাগাদ...’
‘তমোঘ্নবাবু এতক্ষণ কোথায় কাটাবেন? দুগ্গাঢিবি ঘুরে আসবেন নাকি?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘সে সম্ভাবনা তো আছেই৷’
‘আর ওঁর বন্ধু? একসঙ্গেই আসছেন তো?’
‘বন্ধু আপাতত ক্যানিংয়েই আছেন৷ তাঁর কাছেই এসে উঠছে তমোঘ্ন৷ ওরা একসঙ্গেই আসবে এখানে৷’
‘বন্ধু ক্যানিংয়ে? এখানেই বাড়ি? কে পরিকাকু? আমরা চিনি?’ মেঘলীনা আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করল৷
‘আপাতত এর বেশি বলছি না কিছু৷ সাসপেন্স’, পরিদাদু হাসলেন, ‘বাকিটা নাটকের শেষ দৃশ্যে৷’
তমোঘ্ন ভট্টাচার্য ঢুকলেন এগারোটা বেজে কুড়ি মিনিট নাগাদ৷ কলিং বেলটা বাজতেই দৌড়ে গেল শাওন আর মেঘলীনা৷ দ্রুত দরজা খুলল৷ আর দরজা খুলেই বেজায় চমকে গেল দু’জনেই৷ তমোঘ্ন ভট্টাচার্যের সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন যিনি তাঁকে বিলক্ষণ চেনে তারা৷ ফর্সা, বড়সড় সুগঠিত চেহারা৷ দু’হাতের আঙুলে অনেকগুলো আংটি৷ চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা৷ পরিদাদু উঠে এসে অভ্যর্থনা জানালেন, ‘ওয়েলকাম তমোঘ্ন৷ ওয়েলকাম এগেইন মিস্টার বোস৷’
‘মিস্টার বোস?’ অবাক হয়ে পরিদাদুর দিকে চাইল শাওন৷ মেঘলীনাও একেবারে অবাক৷
ঘরে ঢুকেই তমোঘ্ন বললেন, ‘সময়টা অন্যরকম৷ ফর সেফটি, আমরা আগে হাত-মুখটা ধুয়ে নিই৷ তারপর কথা৷’
ঘরে সকলে বসার পরে পরিদাদু পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘তমোঘ্ন, এই আমার বাল্যবন্ধু অসিত, তার বেটার হাফ অঞ্জনা আর কন্যা মেঘলীনা৷ বাকিদের তুমি তো চেনো৷’
‘হ্যাঁ বহরমপুরে আলাপ হয়েছিল’, মাথা নাড়লেন তমোঘ্ন ভট্টাচার্য৷
‘আর আমার বন্ধু তমোঘ্ন’, পরিদাদু তমোঘ্ন ভট্টাচার্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘ভারতের পুরাতত্ত্ব বিভাগের একজন হোমরা চোমরা৷’
‘আর এই আমার বন্ধু রজতাভ বসু’, তমোঘ্ন আলাপ করিয়ে দিলেন, ‘গোয়েন্দা বিভাগের অত্যন্ত করিৎকর্মা মানুষ৷ সারা ভারতবর্ষ জুড়েই আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের স্মারকগুলিকে পাচার করার একটা দুষ্টচক্র ছড়িয়ে আছে৷ বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন বেআইনি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত এরা৷ রজতাভরা সেই চক্রের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সক্রিয়৷ ওর মতো সৎ এবং সাহসী মানুষদের জন্যেই আমরা আমাদের ইতিহাসকে অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারছি৷’
‘এটা আমার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে৷ আমি বাড়তি কিছুই করিনি’, লাজুক গলায় বললেন রজতাভ৷
‘আর কী আশ্চর্য, আমরা তো আপনাকেই পাচারকারী ভেবে বসে ছিলাম প্রথম থেকে৷ বিলুর কাছ থেকে পুরাতাত্ত্বিক জিনিস কেনা, আমার জমির দিকে ডবল দাম দিয়ে হাত বাড়ানো...’ অসিত লজ্জিত ভঙ্গিতে বললেন৷
‘আর আমি সন্দেহ করেছিলাম আপনাকে’, হো হো করে হেসে উঠলেন রজতাভ, ‘ভেবেছিলাম ওই তড়িৎ সেনগুপ্তদের সঙ্গে নিশ্চিত যোগ আছে আপনারও৷ আপনার জমির কাছ থেকে অ্যান্টিক জিনিসপত্র পাওয়া যাচ্ছে, টুকটাক বিক্রিও হচ্ছে তা, সে বিষয়ে আপনার হাত থাকবে এটাই স্বাভাবিক৷ রতন পানিগ্রাহী সেজে তাই আপনাকে টোপ দিয়ে দেখলাম৷ কথাবার্তা বলে আপনাদের মোটিভ বোঝার চেষ্টা করলাম৷ দ্বিতীয় দিনে কথা বলার সময় পরিমলবাবুকে দেখে সন্দেহ বাড়ল বই কমল না৷ কিন্তু হিসেব গোলমাল হয়ে গেল পরিমলবাবুর ছবি তমোঘ্নকে হোয়াটস অ্যাপ করার পরেই...’
‘আমার ছবি কখন কীভাবে তুললেন?’ পরিদাদু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷
‘ঠিক যেমন আমার ছবি তুলেছিলেন আপনি, আমাকে জানতে না দিয়ে৷ আর সে ছবি ওই তমোঘ্নকেই পাঠিয়েছিলেন খোঁজখবর করার জন্যে৷ আপনার এক বন্ধুকেও তো পাঠিয়েছিলেন৷ কলকাতায়৷ কিউরিও শপ আছে যাঁর...’ রজতাভ হেসে ফেললেন৷
পরিদাদু লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে ফেললেন৷
অরুণাংশু বললেন, ‘তড়িৎ-এর ব্যাপারে কী যেন বলছিলেন?’
‘হ্যাঁ, তড়িৎ’, রজতাভ অসিতের দিকে চাইলেন, ‘শুরুতেই একটা ইনফর্মেশন আপনাদের দেওয়া উচিত ছিল আমার৷ আমি সামহাউ মিস করে গেছি৷’
‘কী বলুন তো?’ অসিত জিজ্ঞেস করলেন অবাক হয়ে৷
‘আজকের লাঞ্চ-এ আপনাদের অতিথিদের তালিকায় কিন্তু তড়িৎ সেনগুপ্ত থাকছেন না৷’
‘সে কী, তাকে যে দরকার৷’
‘দরকারটা আমি মিটিয়েই এসেছি পরিমলবাবু’, রজতাভ হাসলেন, ‘তড়িৎ এখন পুলিশ কাস্টডিতে৷ উমানাথবাবুর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে কিছু বহু প্রাচীন মৃৎপাত্র, তামার মাদুলি এবং একটি প্রাক বঙ্গলিপিযুক্ত মৃৎফলক বিভিন্ন সময় সরিয়ে ফেলে তড়িৎ৷ এগুলিই কলকাতায় বিক্রি করার সময় আমাদের নজরে আসে সে৷ বিভিন্ন সূত্র থেকে খবর নিয়ে আমরা তার ওপরে নজরদারি করতে শুরু করি৷’
‘বাপ রে!’ অঞ্জনা অবাক হয়ে বলেন৷
‘আসলে প্রথমটা সে এত বুঝে কাজটা করেনি৷ একটা জিনিস গোপনে সরিয়ে নিয়ে কলকাতায় পুরনো জিনিসের দোকানে বিক্রি করতে গিয়ে ভালো দর পেয়ে গিয়ে মাথা ঘুরে যায় ছেলেটার’, পরিদাদু বলেন৷
‘এগজ্যাক্টলি’, রজতাভ সায় দেন তাঁর কথায়, ‘তড়িতের ফোন নাম্বার হাতে এসে যাওয়ার পর আমি ক্রেতা সেজে ওকে ক্রমাগত টোপ দিতে থাকি৷ নিজেও চলে আসি এই এলাকায়৷ তদন্ত করে এই এলাকার প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনা সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তমোঘ্নকে ইনফর্ম করি আমি৷ উমানাথবাবুর সঙ্গে বারবার কথা বলে আমি বুঝতে পারছিলাম, শুধু কিছু মৃৎপাত্র বা তাম্রমাদুলি নয়, তাঁর সন্ধানে আরও মূল্যবান কিছু বস্তু রয়েছে৷ কিন্তু সেগুলো কী, তা আমি জানতে পারছিলাম না কিছুতেই৷ যে কোনও কারণেই হোক, তিনি আমাকে বিশ্বাস করতে চাইছিলেন না৷ এর মধ্যেই পরিমলবাবু পুরো বিষয়টির মধ্যে ইনভলভড হলেন৷’
‘ব্যাপারটা যে তলে তলে এত দূরে গড়িয়ে গেছে তা আমি বুঝতেই পারিনি৷ তমোঘ্নও কিচ্ছুটি বলেনি আমায় আগে৷’ পরিদাদু বললেন৷
‘আমিই বারণ করেছিলাম’, রজতাভ হাসলেন, ‘তবে এ কথা মানতেই হবে, আপনি সঙ্গে থাকায় আমাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে গেছে৷ আর সত্যি সত্যিই যদি এই কেসে ম্যান অফ দা ম্যাচ কাউকে বাছতে হয় সে হল...’
‘ডিং ডং ডিং ডং শব্দে কলিং বেল বেজে উঠল অনভ্যস্ত হাতে৷’
মেঘলীনা বলল, ‘বিলু৷’
‘ম্যান অফ দা ম্যাচ কে বলছিলেন যেন?’ অরুণাংশু রজতাভের কথার খেই ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন৷
‘ওই যে তিনি এসে গেছেন’, রজতাভ হাসলেন, ‘কী বলেন পরিমলবাবু?’
‘বিলু?’ অবাক হয়ে বলে শাওন৷
‘ইয়েস, বিলু’, ওপর নীচ মাথা নাড়েন রজতাভ, পরিদাদু দু’জনেই, ‘মূলত ওর জন্যেই উমানাথবাবুর কাছে গচ্ছিত সবচেয়ে মূল্যবান দুটি বস্তুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে আমাদের পক্ষে৷’
‘তার মধ্যে গুপ্তযুগের একটি স্বর্ণমুদ্রা৷ আর অন্যটি?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘স্বর্ণমুদ্রা একটি নয়, পাঁচটি’, রজতাভ তাঁর ব্যাগ খুলে পরপর চারটি মুদ্রা টি টেবিলের ওপরে সাজিয়ে রাখলেন, ‘আর একটি আছে পরিমলবাবুর কাছে৷’
‘কোথায় পেলেন এগুলো, কুঠিবাড়ির টানেল ভল্ট-এ? মাটির নীচে?’
‘হ্যাঁ’, রজতাভ বলে চললেন, ‘উমানাথবাবু বুঝতে পারছিলেন, কে বা কারা তাঁর সঞ্চিত প্রত্নবস্তুগুলো সরিয়ে ফেলছে ঘর থেকে৷ মাথা পুরোপুরি কাজ না করলেও এই বস্তুগুলো যেহেতু তাঁর প্রাণাধিক প্রিয় ছিল তাই চুরির হাত থেকে বাঁচাতে এগুলো একটা সেফ কাস্টডিতে রাখতে চাইছিলেন তিনি৷’
‘আমাকেও এ কথা তিনি বলেছিলেন৷ ইন ফ্যাক্ট আজ সকালে আমি ব্যারেল ভল্টের মাটি খুঁড়েওছিলাম৷ পাইনি কিছু৷ ভেবেছিলাম মুদ্রা তা হলে বোধহয় একটাই ছিল’, পরিদাদু বললেন৷
‘আমি এই কাজটা কালই সেরে ফেলেছিলাম৷ তারপরেই দেখলাম উমানাথবাবু মুদ্রাগুলো না পেয়ে পাগলের মতো ছুটলেন দুগ্গাঢিবি, আই মিন দুর্গঢিবির দিকে৷ আমার মনে হয়েছিল, নিশ্চিত সেখানেও কিছু লুকানো সম্পদ আছে তাঁর৷ আমি তড়িৎকে ফোন করি৷ তখনও জানতাম না, সে উমানাথবাবুর পিছনে লোক লাগিয়েছে৷ রাতে উমানাথবাবুর দুর্ঘটনার খবর পেলাম তমোঘ্নর কাছ থেকে৷ তার কিছুক্ষণ পরেই তড়িতের ফোন, ভালো মাল আছে৷’
‘তারপর?’ শাওন জিজ্ঞেস করে৷
‘আজ সকালে বিলুর কাছে গিয়ে জানতে পারলাম, দুগ্গাঢিবিতে খোঁড়াখুঁড়ির কথা৷’
‘তুই কী করে জানলি?’ মেঘলীনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল বিলুকে৷
‘কাল বিকেলে স্টেশনের বাইরের চা দোকানে তড়িৎদার সঙ্গে কয়েকজনের শলাপরামর্শ হচ্ছিল৷ তাদের মধ্যে একজন টোটো চালায়৷ সে বলছিল, ‘ঠিক সময়েই পৌঁছে দিয়েছি প্ল্যান মতন৷ ব্যাগে একটা কিছু ছিল৷ শিওর৷ আমায় বলেছিল মিঠেখালি যাবে৷ কিন্তু খানিক পিছু নিয়ে দেখলাম দুগ্গাঢিবির দিকে ছুটল... শুনেই কাদের যেন ফোন করল তড়িৎদা৷ বলল, ‘মনে আছে তো? যেমন বলেছিলাম...’
‘কই কাল আমাদের কিছু বলিসনি তো?’ অসিত বললেন বিরক্ত হয়ে৷
‘কাল বিকেলে যখন কথাগুলো শুনেছিলাম বুঝতে পারিনি ওরা পাগলাদাদুকে নিয়ে কথা বলছে৷ তারপর সন্ধেবেলায় ওই কাণ্ড ঘটে গেল৷ তখন আর মাথার ঠিক ছিল না৷ আজ সকালে মাথায় এল ঘটনাটা৷ আপনাদের দু’জনকেই তো বললাম সেকথা সকালবেলা’, বিলু পরিদাদু আর রজতাভর দিকে তাকাল৷
‘ঠিক আছে৷ দারুণ কাজ করেছিস’ অসিত বললেন, ‘কিন্তু রজতাভবাবু, উমানাথ কী যেন একটা নিয়ে দুগ্গাঢিবিতে রাখতে গিয়েছিলেন...’
‘আমার টোপ গিলে সেইটে বিক্রি করতে এসেই তো বেচারা তড়িৎ অ্যারেস্ট হয়ে গেল আজ৷’
‘জিনিসটা কী, দেখতে পাওয়া যাবে একবার?’
‘নিশ্চয়ই’, রজতাভ তমোঘ্নকে ইশারা করলেন৷
তমোঘ্ন তুলোর প্যাডের মধ্যে খুব যত্ন করে রাখা একটা ছোট্ট কালো পাথরের মূর্তি বের করলেন ব্যাগ থেকে৷ লম্বায় চার-পাঁচ ইঞ্চি, চওড়া তিন ইঞ্চি মতো৷
সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন, ‘মূর্তিটা কোন দেবতার?’
‘বিষ্ণু৷’
‘কতদিন আগের?’
‘সম্ভবত পাল-সেন আমলের তমোঘ্ন’ বললেন, ‘আর একটু স্টাডি করে তবে নিশ্চিত হতে পারব৷’
সুছন্দা বললেন, ‘একবার আমার হাতে দেবেন, কপালে ঠেকাব?’
তমোঘ্ন এবং রজতাভ ফেরার সময় পরিদাদু এবং অসিত দু’জনেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘দুর্গঢিবির কী হবে তাহলে?’
‘আমরা এখনও পর্যন্ত যা পেয়েছি তার সবটাই চান্স ফাইন্ডিং৷ অর্থাৎ হঠাৎ করেই প্রত্নবস্তুগুলো আমাদের হাতে এসেছে, যা প্রমাণ করছে জায়গাটির প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব আছে৷ এইবার সরকারিভাবে আমরা চেষ্টা করব যাতে এই অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে উৎখননের কাজ শুরু হয়৷’
‘সে কাজ শুরু হতে কতদিন?’
‘তা তো বলতে পারি না’, তমোঘ্ন হাসলেন, ‘বোঝেনই তো সব৷ সরকারি কাজ...’
‘আপাতত দুটো কাজ করা যায়, ভেবে বলো তো?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷
‘কী কাজ?’ তমোঘ্ন বললেন৷
‘উমানাথের সঠিক চিকিৎসা আর বিলুর জন্যে একটা সঠিক পুনর্বাসন৷’
‘হুঁ’, মাথা নাড়লেন তমোঘ্ন, ‘আমরা নিশ্চিত চেষ্টা করব৷’
‘যতদিন সে ব্যবস্থা না হয় বিলু আমার কাছেই থাকুক’, অঞ্জনা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘কী রে থাকবি তো? আমি তোকে পড়াব৷ স্কুলে ভর্তি করে দেব তোকে৷’
বিলু উত্তর দিল না৷ মাথা নীচু করল সে৷ তার চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসে বৃষ্টির ফোঁটার মতো টপ টপ করে ঝরে পড়তে লাগল মেঝের ওপরে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন