মৌমিতা ঘোষ
জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষির অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী এখন ওদের পরিচিত মহলে বেশ ছড়িয়ে পড়েছে৷ ওদের বন্ধুদের মধ্যে তো ওরা এখন মধ্যমণি বলা চলে৷ প্রায়ই ওদের কাছে এসে জিজ্ঞেস করে কেউ কেউ, ‘কিরে, আর নতুন কোনো কেস পেলি?’ কিংবা, ‘এবারে তোরা কোথায় যাচ্ছিস রহস্যভেদ করতে?’
সৈকত তো আবার আর এক কাঠি ওপরে৷ একদিন কাঁচুমাচু মুখ করে এসে জ্যোতিষ্ককে বলেছিল, ‘জ্যোতিষ্ক, আমার একটা উপকার করবি ভাই?’
‘হ্যাঁ বল না, কি হয়েছে তোর? মুখটা এরকম করে আছিস কেন?’
‘আসলে আমি না এবারে প্রি-টেস্টে অঙ্কে পাশ করতে পারিনি৷ হেডস্যার বলছে ফাইনালে অ্যালাও করবে না৷ এদিকে একবছর নষ্ট হলে বাবা কেটে ফেলবে৷ এইসময় একমাত্র তোরাই পারিস আমাকে বাঁচাতে’৷
‘আমি? মানে ঠিক বুঝতে পারলাম না৷ আমি এখানে কি করব?’
‘তুই তোর পরের অ্যাডভেঞ্চারটায় আমাকে সাথে নে৷ ফেলুদার যেমন তোপসে, ব্যোমকেশের অজিত, তেমনি আমিও থাকব তোদের সাথে৷ আমি তোদের সবকিছু লিখেও দিতে পারি বইয়ের মত করে৷ তারপর তোরা যখন কেসটা সলভ করে ফেলবি, তোদের অনেক নাম হবে, তখন আমারও একটু একটু নাম হবে৷ স্কুলে বেশ ক্যামেরা-ট্যামেরা আসবে৷ আর হেডস্যার গলে গিয়ে আমাকে অ্যালাও করে দেবে৷ বুঝতে পারলি?’
আর হাসি চাপতে পারে না জ্যোতিষ্ক৷
সৈকতের সিরিয়াস কথা শুনেও হেসে ফেলে হো হো করে৷ আর সেই দেখে সৈকত আরও
ঘাবড়ে যায়৷
‘হাসছিস কেন রে? আমি কি কিছু ভুল বললাম? এই প্ল্যানটা খারাপ বল তো?’
‘না না, খুব ভাল প্ল্যান’ , কোনোরকমে হাসি চেপে বলে জ্যোতিষ্ক, ‘তবে একটা ছোট্ট সমস্যা আছে, বুঝলি সৈকত৷ সামনে উচ্চমাধ্যমিক তো, তাই আমরা এখন কোনো কেস হাতে নিচ্ছি না৷ কোনো কেস আসছেও না তেমন বলতে পারিস৷ সেইজন্যে এই মুহূর্তে তোর এই প্ল্যানটা কাজ করবে বলে মনে হয় না’৷
‘আলবাত করবে৷ এটা একটা কথা হল? আমি দেব তোকে কেস৷ এইজন্যে তুই চিন্তা করছিস? ওয়েট ফর আ ডে ব্রাদার, আমি কালকেই তোর কেস নিয়ে আসছি’৷
জ্যোতিষ্ককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ঝড়ের মত ওখান থেকে চলে যায় সৈকত৷
ছেলেটা পুরো পাগল হয়ে গেছে! মনে মনে ভাবে জ্যোতিষ্ক৷
পরেরদিন টিফিনের সময় আবার জ্যোতিষ্ককে ধরে সৈকত৷ জ্যোতিষ্ক তখন ওর ফিজিক্সের প্র্যাক্টিকাল খাতা তৈরী করছিল৷ আগের সপ্তাহের অ্যাসাইনমেন্টের লেখাটা শেষ হয়নি৷ মন দিয়ে লিখছিল ও একটা ফাঁকা ক্লাসরুমে বসে, তাই সৈকত কখন ঢুকেছে ঘরে খেয়াল করেনি৷
হঠাৎ ওর হাতটা ধরে সৈকত, মুখে একগাল হাসি, ‘জ্যোতিষ্ক, ব্যবস্থা হয়ে গেছে৷ একদম পাক্কা প্ল্যান৷ তুই শুধু আমাকে এবার তোর দলে নিয়ে নে!’
আচমকা কাজের মাঝখানে সৈকতের কথায় একবার একটু বিরক্তই হয় জ্যোতিষ্ক, ‘মানে?
কিসের ব্যবস্থা? কার দল? কিসব বলছিস তুই আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’
‘আশ্চর্য! তোর কি পিঁপড়ের মেমরি নাকি রে হ্যাঁ? কাল অত কথা হল, আর আজ বেমালুম সব ভুলে মেরে দিলি?’
‘তোকে কে বলল পিঁপড়ের স্মরণশক্তি কম? জানিস পিঁপড়েরা...’
‘ওফফফফ, থামবি তুই? কাজের কথাটা শুনবি না এইসব বকবক করে যাবি?’, এবার জ্যোতিষ্ককে হাত তুলে থামায় সৈকত৷
‘কাজের কথা আবার কি? তোকে আমি বললাম না এখন কোনো কেস-ফেস নেই৷ উচ্চমাধ্যমিকটা যাক আগে৷ তারপর যদি তেমন কিছুতে জড়াই, তোকে জানাব’ , সৈকতকে কাটিয়ে দিয়ে আবার ফিজিক্স খাতায় মন দিতে যায় জ্যোতিষ্ক৷ আর তখনই আবার নতুন উদ্যমে শুরু করে সৈকত—
‘আরে বাবা, সেই কথাটাই তো বলছি৷ তোকে আর কেস খুঁজতে হবে না, আমি একদম তোর জন্যে হাতেগরম কেস নিয়ে চলে এসেছি৷ তুই শুধু সলভ করে দে এবার, আর রাজর্ষির সাথে আমাকেও একটু সাথে রাখ প্লিজ’, শেষ কথাটা বলার সময় মুখটা কেমন যেন কাঁচুমাচু হয়ে যায় সৈকতের৷
‘আরে দাঁড়া তো! কিসব বকে যাচ্ছিস তখন থেকে? কেস নিয়ে এসেছিস মানেটা কি? আমি এখন উচ্চমাধ্যমিকের আগে এসব কিছুতে জড়াব না তোকে আগেই বলেছি সৈকত৷ আমার এমনিই প্রিপারেশন ভাল না৷ এরপর এইসব করলে আর দেখতে হবে না৷ মা বাড়ি থেকে বের করে দেবে একেবারে!’
‘কাকিমাকে আমি ম্যানেজ দেব গুরু, তোর কোনো চিন্তা নেই৷
তুই শুধু ভৌমিক কাকুকে বাঁচা প্লিজ! লোকটা নয়ত যে কোনোদিন মরে যাবে’৷
‘এই ভৌমিক কাকু আবার কে?’
‘আমার বাবার বন্ধু৷ বিশাল বড়লোক৷ একা একটা প্রাসাদের মত বাড়িতে থাকে৷ বিয়ে-থা করেনি, কাজেই উত্তরাধিকারী কেউ নেই৷ তো সেই ভৌমিক কাকুর বিশাল বাড়িতে হঠাৎ করেই ভীষণ ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে৷ ভূতের ভয়ে ভৌমিক কাকুর শেষ দু’মাসে হার্টের রোগ ধরে গেছে৷ তুই একটু কেসটা দ্যাখ না রে!’
‘তোর কি আমাকে ওঝা মনে হয় নাকি রে হ্যাঁ? আশ্চর্য তো! কোথায় কাকে ভূতে ধরেছে, সেখানে আমি কি করব? বেকার জ্বালাস না তো, ভাগ এখান থেকে৷ আমাকে ফিজিক্স প্র্যাক্টিকালটা লিখতে দিলি না, দেখলি তো? বিরক্তিকর!’, জ্যোতিষ্কর চোখেমুখে বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে৷
আর সেটা লক্ষ্য করেই উঠে পড়ে সৈকত৷ বলে, ‘আজ আমাকে পাত্তা দিলি না তো? ঠিক আছে, ভৌমিক কাকু নিজে যখন তোকে ফোন করবে, তখন দেখিস৷ তবে আমি একটা কথা বলব, কাগজে নাম বেরোলে কিন্তু আমারও ছোট্ট করে একটু নাম চাই , এই বলা রইল৷ টাইটেল থাকুক বা না থাকুক, নামটুকু অন্তত দিস! আমিই কিন্তু তোকে প্রথম কেসটার কথা বললাম!’
কথাটা বলেই আর দাঁড়ায় না সৈকত, বেরিয়ে যায় ঘর থেকে৷ জ্যোতিষ্ক আবার মন দেয় ফিজিক্স প্র্যাক্টিকাল খাতায়৷ সৈকতকে ওরা কেউ কোনোদিন সিরিয়াসলি নেয়নি৷ আজও ওর এইসব আজগুবি ভূতের গল্পে কান দেয়নি জ্যোতিষ্ক৷
কিন্তু ও তখনও জানত না, যে ওর জন্য কিছু অন্যরকম ঠিক করা ছিল ভাগ্যের৷
রবিবার সকালটায় বাবার সঙ্গে ওদের ছাদের ফুলগাছগুলোর পরিচর্যায় অনেকখানি সময় যায় জ্যোতিষ্কর৷ গাছেদের নিয়ে থাকতে ওর খুব ভাল লাগে৷ আজও সেটাই করছিল, হঠাৎ নিচে থেকে ডাকল মা— ‘বাবু, একবার নিচে আয় তো, তোকে একজন ডাকছেন!’
সাধারণত জ্যোতিষ্ককে ডাকতে বাড়িতে কখনো এমন কেউ আসেননি যাকে মা বা বাবা চেনেন না৷ কিন্তু মায়ের গলার স্বর থেকে এখন এটা পরিষ্কার যে যিনি ডাকতে এসেছেন, তিনি মায়ের কাছে অচেনা৷ বেশ অবাক হয়েই সিঁড়ি দিয়ে নিচে আসে জ্যোতিষ্ক৷
বসার ঘরে যে ভদ্রলোককে মা বসিয়েছেন, তাকে জ্যোতিষ্ক আগে কখনো দেখেনি৷ পরনে সাদা ধোপদুরস্ত ধুতি-পাঞ্জাবি, গলায় মোটা সোনার চেন, আর হাতে একটা ছড়ি, যার মাথাটা সোনা দিয়ে বাঁধানো৷ দেখলেই বোঝা যায় বনেদী বড়লোক৷ আজকাল এরকম মানুষ বড় একটা দেখা যায় না৷
জ্যোতিষ্ক পরে আছে একটা হাফপ্যান্ট আর প্রায় ন্যাতা করার অবস্থায় পৌঁছানো একটা টি-শার্ট৷ তারওপর এতক্ষন মাটি ঘাঁটার ফলে হাতে পায়ে মাটি ভর্তি হয়ে আছে৷ ভদ্রলোকের সামনে এসে একটু ইতস্তত করে ও৷ কিন্তু ভদ্রলোক ওকে দেখেই হাসিমুখে উঠি দাঁড়ান,
‘তুমিই তাহলে জ্যোতিষ্কবাবু, আমাদের জুনিয়র ফেলুদা, তাই তো?’
‘এ বাবা, না না, সেরকম কিছু না৷ আমি তো কয়েকটা ঘটনায় জাস্ট অ্যাকসিডেন্টালি জড়িয়ে গেছি৷ আপনি বসুন না!’
‘হ্যাঁ বসছি’, আবার সোফায় আগের জায়গায় বসে পড়েন ভদ্রলোক৷
জ্যোতিষ্ক লক্ষ্য করল, ভদ্রলোক বসার সময় পাঞ্জাবীটি এমনভাবে সামলে বসলেন, যাতে কুঁচকে না যায়৷ ভদ্রলোক বেশ শৌখিন, বোঝাই যাচ্ছে৷
‘কিন্তু বাবা জ্যোতিষ্ক, আমি যে তোমার কাছে একটা দাবী নিয়ে এসেছি! তুমি কিন্তু সামনে পরীক্ষা বলে আমাকে ফেরাতে পারবে না এই বলে দিলাম! পরীক্ষা এখনো মাসতিনেক দেরী, আর আমি জানি তুমি পড়াশুনোয় বেশ ভাল৷ তোমার সারাক্ষন না পড়লেও চলে৷ কিন্তু এদিকে তুমি আমাকে না বাঁচালে আমি যে বেঘোরে মারা পড়ব!’
‘কিন্তু কাকু, আমি তো আপনাকে ঠিক...’
‘ও হ্যাঁ হ্যাঁ, দেখেছ, কি ভুলো মন হচ্ছে আমার! আসলে বয়স হচ্ছে তো, মনে রাখতে
পারি না কিছুই৷ আমার নাম সর্বেশ্বর ভৌমিক৷ বরাহনগর থেকে আমি আসছি৷ আমার বন্ধুর ছেলে সৈকতের কাছ থেকে আমি তোমার কথা শুনেছি’ , দু’হাত জড়ো করে নমস্কার করলেন ভদ্রলোক৷ জ্যোতিষ্ক দেখল পিছনে চায়ের ট্রে হাতে মা এসে দাঁড়িয়েছেন৷
এরপরে ভদ্রলোক সংক্ষেপে যা বোঝালেন, তা থেকে মানেটা অনেকটা এরকম দাঁড়ায় যে ওনার বাড়ি, অর্থাৎ বরাহনগরের ভৌমিক ভিলায় বেশ কিছুদিন ধরে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে৷ প্রায়ই মনে হচ্ছে কেউ যেন ছায়ার মত সবসময় ওনার পিছনে পিছনে চলেছে৷ এদিকে বাড়ি থেকে বেরোলেই তার অস্তিত্ব গায়েব! সর্বেশ্বর বাবু জীবিকার জন্য কোনোদিন কোনো কাজ করেননি৷ তাঁর পৈতৃক ব্যবসা থেকে বিপুল লাভ ছিল আগে৷ বহু বছরের সোনার ব্যবসা ছিল ওনাদের৷ কিন্তু বেশ কিছু বছর আগে সর্বেশ্বরবাবু মোটা টাকার বিনিময়ে সে ব্যবসা এক মারোয়াড়ী ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেন৷ নিজে জীবনে বিয়ে-থা করেননি, জীবনের বাকি দিনগুলো কেবল আরাম করতে চেয়েছিলেন৷ কিন্তু আচমকা এই ভূতের উপদ্রব তাঁকে বেশ বিপর্যস্ত করে তুলেছে৷ স্বভাবগতভাবে একটু অলস প্রকৃতির হলেও ভূতের ভয়ে তাঁকে এখন দিনের বেশিরভাগ সময়টাই বাড়ির বাইরে কাটাতে হচ্ছে৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, এই ভূতের ব্যাপারটা বাড়িতে তিনি ছাড়া আর কেউ টের পাচ্ছে না৷ ঠাকুর-চাকর মিলিয়ে বাড়িতে লোকসংখ্যা মন্দ নয়৷ যারা আগের আমল থেকে ছিলেন, তাঁরা রয়েই গেছেন৷ কিন্তু ভূত যে হঠাৎ করে সকলকে ছেড়ে তাঁর পিছনেই কেন পড়েছে, তিনি বুঝতে পারছেন না৷
চা-জলখাবারের ট্রে নামিয়ে রেখে জ্যোতিষ্কর মা জাহ্নবী দেবীও এতক্ষণ শুনছিলেন ভদ্রলোকের কথা৷
এবার ভদ্রলোকের একটু থামার সুযোগে বলে ওঠেন তিনি—
‘কিছু মনে করবেন না দাদা, আপনার সাথে যেটা হচ্ছে সেটা নিঃসন্দেহে খুবই দুঃখজনক৷ কিন্তু জ্যোতিষ্ক এখানে কি করবে বলুন? আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ও আগামী বছর উচ্চমাধ্যমিক দেবে৷ বুঝতেই পারছেন, এরকম একটা ক্রুশিয়াল সময়ে ওর কি এসব ঝামেলায় জড়ানো ঠিক হবে?’
‘আমি আপনার কথা বুঝতে পারছি দিদি, কিন্তু কি বলুন তো, আমি জ্যোতিষ্কর ব্যাপারে যা শুনেছি, তাতে ওর আমার বাড়ির এই ভূতরহস্যভেদ করতে দিন পনেরোর বেশি লাগবে না৷ ওর পড়াশুনোর কোনো ক্ষতি হবে না, আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে৷ ক’টাদিন না হয় ও বইপত্র নিয়ে আমার বাড়িতে গিয়েই থাকল!’
‘অসম্ভব!’, সোফা থেকে প্রায় লাফিয়ে ওঠেন মা, ‘দেখুন সর্বেশ্বরবাবু, আপনার বাড়িতে কি অসুবিধে আছে জানিনা, ভূতে আমার বিশ্বাস নেই, তাই বলতে পারব না, তবে নিশ্চয়ই কিছু এমন অসুবিধে আছে, যে কারণে আপনি দিনের বেশিরভাগ সময়েই বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন৷ এবার আপনি ওই পরিবেশে এই বাচ্চা ছেলেটাকে নিয়ে যাওয়ার কথা কি করে ভাবছেন আমি তো বুঝতে পারছি না!’, মায়ের গলার আওয়াজ বেশ কঠিন শোনায় জ্যোতিষ্কর কানে৷
সামাল দিতে ও বলে ওঠে, ‘ আসলে কাকু, আমি তো ওরকম শখের ডিটেক্টিভ নই, আমার মনে হয় আপনি যদি পুলিশের কাছে একবার যেতেন ভাল হত৷ আর তাছাড়া আপনার যদি একান্তই মনে হয় আমার সাহায্য লাগবে, তাহলে না হয় পরীক্ষার পরে...’
‘জ্যোতিষ্ক, তোমার পরীক্ষা শেষ হওয়া অবধি যদি আমি আর না বাঁচি? যদি একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে শোনো যে ভৌমিক কাকু কাল রাতে হার্টঅ্যাটাকে... তখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে তো? আমি তোমার কাছে হাতজোড় করছি বাবা, আমাকে বাঁচাও!’
আরও বেশ কিছু কথাবার্তার পর একটু অসন্তাোষ নিয়েই নিমরাজি হন মা, জ্যোতিষ্কর যদিও প্রথম থেকেই ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল, কিন্তু মায়ের ভয়ে বলতে পারছিল না
কিছু৷ তারপর মা রাজি হয়ে যাওয়ায় ও টের পেল ওর পেটের মধ্যে আচমকা যেন কয়েক হাজার প্রজাপতি উড়ছে৷
জ্যোতিষ্ক ব্যাপারটা দেখবে বলায় বেশ খুশিমনে উঠে দাঁড়ান সর্বেশ্বর ভৌমিক৷ ওনাকে সদর দরজা অবধি এগিয়ে দিয়ে ফেরার সময় জ্যোতিষ্ক টের পেল মা মাটন চাপিয়ে দিয়েছে৷ অদ্ভুত এক পাগল করা গন্ধ ভেসে বেড়াচ্ছে সারা বাড়িতে৷ হঠাৎ ভীষণ খিদে পেয়ে গেল ওর৷
সেদিন সর্বেশ্বর ভৌমিক ফিরে যাওয়ার পর বাড়িতে মোটামুটি একটা সুনামি হয়ে গেছিল৷ মায়ের চিৎকারে প্রায় পাড়া-প্রতিবেশী জড়ো হয়ে যাওয়ার অবস্থা! শেষে বাবা এসে সামলেছিলেন সবটা৷ বাবা বরাবরই জ্যোতিষ্কর এইসব অ্যাডভেঞ্চার বেশ পছন্দ করেন৷ বাবা ছোট থেকে ওকে বলেন—
‘জীবনটা সবসময় বাঁচবি, বুঝলি? যা ইচ্ছে হবে সেটাই করার চেষ্টা করবি, যাতে কখনো কোনো আফশোস না থাকে৷ জানবি আর কেউ না থাকুক, আমি সবসময় তোর সঙ্গে আছি৷ আমাদের বেশিরভাগের ভালভাবে জীবন কাটানোর চক্করে আর বাঁচা হয়না৷ ডোন্ট পাস দ্য টাইম, লিভ ইন ইট!’
জ্যোতিষ্ক ছোটবেলায় বুঝত না এসব কথা অত ভালভাবে, তবে এখন বোঝে৷ আর তাই
এখন ও জীবনটা বাঁচার চেষ্টা করে৷ পড়াশুনোর পিছনে মোটামুটি একটা সময় দিলে হয়ে যায়৷ কিন্তু মা সেটা বোঝে না৷ মায়ের মতে উচ্চমাধ্যমিক আসছে মানে ওকে সবসময় পড়াশুনো নিয়েই থাকতে হবে৷ যখন পড়বে না, তখনও পড়ার কথা ভাবতে হবে৷
এখন অন্যকিছুর পিছনে সময় দেওয়া মানেই মনটা ঘুরে যায়৷ তাহলে সাফল্যের নিশ্চয়তা আর থাকে না৷
মাকে সামলানোর দায়িত্বও বাবার৷ জ্যোতিষ্কর মনে হয় বাবা বোধহয় ম্যাজিক জানে! যে মা কিছুক্ষন আগে ভিসুভিয়াস হয়েছিল, তাঁকে ঘরে নিয়ে গিয়ে মিনিট দশেকের মধ্যে কি যে বোঝাল! জ্যোতিষ্ক দেখল মা ঘর থেকে যখন বেরোলো, তখন আগ্নেয়গিরির মুখে জল পড়েছে৷ দুমদুম করে রান্নাঘরে গিয়ে মাংস কষতে লাগল৷ মাংসের গন্ধে জ্যোতিষ্কর মনে হচ্ছিল এক্ষুনি এক টুকরো খেতে না পারলে ও এবার অজ্ঞান হয়ে যাবে৷ সবে যখন মায়ের কাছে টেস্ট করার জন্য ও এক পিস চাইতে যাবে ভাবছে, ঠিক সেই সময়ে বলে উঠল মা— ‘তোমাদের বাপ-ছেলের ব্যাপারে আজ থেকে আমি আর নেই৷ যা খুশি করো তোমরা, উচ্চমাধ্যমিকে ফেল করলে আমাকে আর বলতে এসো না!’
সেদিন আর ‘টেস্ট’ করার জন্য আলাদা করে মাংস চাওয়া হয়নি জ্যোতিষ্কর, একেবারে
ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতে হয়ছিল৷ তবে ভৌমিক ভিলায় ওদের জন্য যে বিশাল আয়োজন ছিল, সেটা দেখে বেশ অস্বস্তি হল জ্যোতিষ্কর৷ ও আদৌ কিছু করতে পারবে তো?
আসলে পেশাগতভাবে ডিটেক্টিভরা এইসব ব্যাপারকে কিভাবে দেখেন ও জানেনা৷ এর আগে অবধি যে ঘটনাগুলোর সাথে ও জড়িয়েছে, সেগুলো নেহাতই ঘটনাচক্রে৷ সত্যিটা খুঁজে বের করার তাড়নায় একটু ঘটনাগুলোর ভিতরে ঢুকতেই ওর চোখে পড়েছে এমন কিছু জিনিস, যা অনেকে দেখেও দেখেনি৷ কিন্তু অফিসিয়ালি এভাবে সত্যানুসন্ধান করতে কোনোদিন আসেনি ও৷
জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি দিন সাতেক থাকবে এই বাড়িতে৷ ও বলেছে যদি ওর পক্ষে সম্ভব হয়
সত্যিটা খুঁজে বের করা, তাহলে এর মধ্যেই ও পারবে৷ রাজর্ষির বাড়ি থেকেও প্রথমে খুবই আপত্তি করা হয়েছিল এই সময়ে এসব ব্যাপারে জড়ানোয়, কিন্তু রাজর্ষি সেটা ম্যানেজ করেছে৷ সৈকতকে জানিয়েছে ওরা গোটা ব্যাপারটা, সৈকত আসতে চেয়েছিল ভীষণভাবে৷ কিন্তু জ্যোতিষ্ক ওকে বুঝিয়েসুঝিয়ে ঠান্ডা করেছে৷ এইসময়ে বেশি লোক এই বাড়িতে ভিড় করলে ভূত পালিয়ে যেতে পারে৷ তাই সৈকতের এখন আসার দরকার নেই৷ জ্যোতিষ্ক ওকে কথা দিয়েছে, যদি ও রহস্যটা সমাধান করতে পারে, তাহলে আলাদাভাবে সৈকতের নাম উল্লেখ করা থাকবে সব জায়গায়৷ সৈকত না থাকলে তো ওরা কেসটাই পেত না!
নিজের নাম থাকবে, এই ব্যাপারটায় নিশ্চিত হওয়ার পর শান্ত হয়েছে সৈকত৷
ভৌমিক ভিলায় সর্বেশ্বর ভৌমিক ছাড়া বাকি যারা আছেন, তাঁরা বহুদিনের পুরোনো কাজের লোক৷ সর্বেশ্বর বাবু ছোট থেকে দেখে আসছেন তাঁদের৷ জ্যোতিষ্ক বাড়িতে আসার পর সকলের সঙ্গে একবার দেখা করতে চেয়েছিল৷ কিন্তু জ্যোতিষ্কর পরিচয়টা কি দেওয়া যায় সকলের কাছে, সেই নিয়ে একটু চিন্তায় পড়েছিলেন সর্বেশ্বরবাবু৷ উদ্ধার করেছিল জ্যোতিষ্কই৷
‘বলবেন রাজর্ষি আপনার বন্ধুর ছেলে, আর আমি তার বন্ধু৷ বাইরে থাকি, কোলকাতার কলেজে ভর্তি হব, তাই খোঁজখবর নিতে এসেছি এখানে’৷
ব্যাপারটা বেশ মনে ধরেছিল সর্বেশ্বরবাবুর৷ বাড়ির সকলকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন তাঁর বন্ধুর ছেলে ও তার বন্ধুর যেন কোনোরকম কষ্ট না হয়৷
আর এই কথাবার্তার সুযোগে জ্যোতিষ্ক একবার খুঁটিয়ে দেখে নিয়েছিল এ বাড়ির অন্য বাসিন্দাদের৷
রান্না করেন যে বামুন দিদি, তাঁর বয়স প্রায় সত্তর ছুঁই ছুঁই৷ ছোটখাটো চেহারা৷ দেখে মনে হয় একটু চুপচাপ, লাজুক প্রকৃতির৷ কারোর অত সাতে পাঁচে থাকেন না৷ সর্বেশ্বরবাবু যতক্ষন কথা বলছিলেন, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিলেন উনি৷
বাজার করা, ঘরদোর পরিষ্কার করা এবং সর্বেশ্বরবাবুর টুকটাক ফাইফরমাশ করে দেওয়ার
জন্য আছে সাধন৷ পঞ্চাশের ওপর বয়স, বেশ তাগড়াই চেহারা, আগেকার দিনে ডাকাত হলে বেশ ভাল মানাত৷
ওনার স্ত্রী ঘর ঝাঁট দেওয়া - মোছা, বাসনমাজা, কাপড় কাচা, এইসব কাজগুলো করে দেন৷
এছাড়া আছে রমেন৷ অল্পবয়স৷ সর্বেশ্বরবাবুর গাড়ি চালায়, আর বাড়ির সামনের বাগানটারও দেখাশোনা করে৷ রমেনকে শুধু সর্বেশ্বরবাবু কাজে বহাল করেছেন৷ বাকিরা বংশ পরম্পরায় থেকে গেছে বছরের পর বছর৷ সকলের কথাবার্তাই বেশ সহজসরল, দেখে মনে হয়না এরা কেউ সর্বেশ্বরবাবুকে ভয় দেখাতে পারে বলে৷
প্রাথমিক আলাপপর্বের পর ঘরে চলে গেল জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি৷ এখন জ্যোতিষ্কর মাথায় অনেকগুলো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে৷ ওদের হাতে সময়ও খুব বেশি নেই৷ যত তাড়াতাড়ি সম্ভব প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে হবে জ্যোতিষ্ককে৷
দুপুরবেলা এলাহী আয়োজন হয়েছিল ওদের জন্য৷ বড় বড় কাঁসার থালায় সরু চালের ভাত, মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল, অনেকরকম ভাজা, মাছ, মাংস, চাটনী, পায়েস, কি নেই! অবস্থা পড়তির দিকে হলেও সর্বেশ্বরবাবুরা যে এককালে বনেদী বড়লোক ছিলেন, বোঝা যায়৷ যে ঘরটায় ওদের থাকতে দেওয়া হয়েছে, সেখানে সেগুন কাঠের বিশাল পালঙ্ক, নরম গদি, সেগুন কাঠ দিয়ে তৈরী আলমারি , সমস্ত আসবাবে বনেদীয়ানার ছাপ স্পষ্ট৷ খাওয়াদাওয়ার পর বিছানায় শোওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই রাজর্ষির হালকা নাক ডাকার আওয়াজ পেল জ্যোতিষ্ক৷ কিন্তু ওর কিছুতেই ঘুম আসছে না৷ অনেক কিছু জানার বাকি৷ সর্বেশ্বরবাবু বললেন মোটামুটি সন্ধের পর থেকে শুরু হয় ভূতের উপদ্রব৷ আশ্চর্যের ব্যাপার হল, সর্বেশ্বরবাবু ছাড়া এ বাড়ির অন্য কেউ ভূত দেখেনি কখনো৷ তাই ধারণা করা গেছে যে ভূতটা নিশ্চয়ই সর্বেশ্বরবাবুর ঘরের আশেপাশেই ঘোরাঘুরি করে৷
জ্যোতিষ্কদের ঘরটা সর্বেশ্বরবাবুর ঘরের কাছাকাছি৷
ও ঠিক করল আজ সন্ধেবেলা ও ঘরেই থাকবে৷
দেখা যাক ভূতটা আসে কিনা৷
জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি ব্যাগে করে কয়েকটা বই নিয়ে এসেছে৷ এই সাতদিন ধরে তো আর চব্বিশঘন্টা ভূত খুঁজবে না ওরা! যখন একটু ফাঁকা সময় পাবে, ঠিক করেছিল পড়বে৷ বিকেলবেলা চা আর পকোড়া দিয়ে গেছিল সাধনকাকুর স্ত্রী শ্যামলী মাসী৷ এই ভদ্রমহিলাকে বেশ মা মা দেখতে, কিন্তু সবসময় উনি যেন কেমন মনমরা থাকেন৷ জ্যোতিষ্কদের খুব যত্ন করে খাওয়ালেন উনি, কিন্তু জ্যোতিষ্কর কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে
ওনার ওই ফিকে হাসির পিছনে কোনো চাপা যন্ত্রণা লুকোনো আছে৷ তাছাড়া একটু ভালো
করে লক্ষ্য করলে দেখা যায় রমেনের চোখেমুখে সবসময় যেন একটা অতিচালাক ভাব৷ সকলের ব্যাপারে একটু বিস্তারিত জানতে হবে , মনে মনে ঠিক করেছিল জ্যোতিষ্ক৷
সন্ধেবেলা চা-জলখাবার খেয়ে ঘরেই পড়তে বসেছিল ওরা৷ এখন তো আর কিছু করার নেই, তাই একটু বইয়ের পাতা উল্টোচ্ছিল দু’জনে৷ ঘরের দরজা ভেজানো ছিল হালকা করে৷ জ্যোতিষ্ক এই ভৌমিক ভিলার কথা ভাবতে ভাবতেই কখন যে ফিজিক্স বইয়ে ডুব দিয়েছিল, ওর নিজেরও খেয়াল নেই৷ আচমকা সর্বেশ্বরবাবুর ঘর থেকে বিকট চিৎকারটা শোনার পর চমক ভাঙ্গল ওদের৷ নির্ঘাত মারাত্মক কিছু একটা হয়েছে৷ বইপত্র ফেলে রেখে সর্বেশ্বরবাবুর ঘরের দিকে দৌড়ে গেল ওরা দু’জনে৷
ঘরের দরজা হাট করে খোলা৷ খাটের সামনে মেঝের ওপর বসে আছেন সর্বেশ্বরবাবু, চোখমুখ বিস্ফারিত৷ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে কোনো কারণে ভীষণ ভয় পেয়েছেন তিনি৷ ওদের দেখে আঙ্গুল তুলে দেখালেন ঘরের সামনের লম্বা বারান্দাটার দিকে, কিন্তু জ্যোতিষ্করা দেখল বারান্দাটা ফাঁকা, কেউ কোত্থাও নেই৷ এ বাড়ির বাকি মানুষগুলো থাকে একতলায়, কাজে সর্বেশ্বরবাবুর চিৎকার তাঁদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়৷
‘কি হয়েছে কাকু, ভয় পেলেন কেন?’, জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
‘ও আবার এসেছিল’, একইরকম ভয় পাওয়া গলায় হাঁপাতে হাঁপাতে বলেন সর্বেশ্বরবাবু৷
‘কে এসেছিল?’ ‘রুমকি!’
কথা বলতে বলতে বারবার বুকে হাত দিচ্ছিলেন উনি৷
এই শীতেও প্রচন্ড ঘামছিলেন৷
রাজর্ষি গিয়ে পালস টিপে বলল, ‘ফাস্ট ফাস্ট, এক্ষুনি ডাক্তারকে খবর দে জ্যোতিষ্ক! প্রচন্ড ফাস্ট যাচ্ছে পালস৷’
ঘটনার প্রাথমিক ধাক্কাটা ততক্ষনে সামলে উঠেছিল ওরা৷ জ্যোতিষ্ক ছুটে গেল একতলায়,
রমেনদাকে খবর দিতে হবে ডাক্তারকে নিয়ে আসার জন্য৷ ও নিশ্চয়ই জানবে সর্বেশ্বরবাবুর ডাক্তারের ঠিকানা!
ডাক্তারবাবু যখন এলেন, তখন পরিস্থিতি অনেকটা সামলেছে৷ সর্বেশ্বরবাবুকে বিছানায় ধরে ধরে শুইয়েছে ওরা৷ পাখাটা চালিয়ে দিয়েছে৷ ওনার ওষুধের ব্যাগ থেকে ওনারই কথামত সরবিট্রেট বার করে দিয়েছে ওনার জিভের তলায়৷
ডাক্তারবাবু এসে বললেন— ‘ভাগ্যিস সরবিট্রেটটা দিয়েছিলে তোমরা, নয়ত বড়সড় বিপদ হয়ে যেত৷ এত কিসের চিন্তা বলুন তো আপনার সর্বেশ্বরদা? আজকাল দেখছি প্রায়ই অসুস্থ হচ্ছেন! একা মানুষ, সংসারও করেননি৷ ছেলের চাকরি, মেয়ের বিয়ে , কিছুই চিন্তা নেই, তাও চল্লিশ পেরোতেই হার্টের রোগ ধরিয়ে ফেললেন!’
‘চিন্তা কি আর সাধে করি রে ভাই, চিন্তা যে পায়ে হেঁটে আমার কাছে চলে আসে!’, আস্তে আস্তে বললেন সর্বেশ্বরবাবু৷
ডাক্তারবাবু কিছু ওষুধ লিখে দিয়ে গেলেন, আর রমেনকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন ওষুধগুলোর ব্যাপারে৷ খাটের পাশে রাখা দেরাজটা খুলে টাকা বের করে ওষুধগুলো আনতে চলে গেল রমেন৷ ডাক্তারবাবুও বিদায় নিলেন রমেনের সাথেই৷ আর জ্যোতিষ্কর মাথার মধ্যে সব কেমন যেন আরও জট পাকিয়ে গেল৷ এই রুমকি আবার কে?
এখন যা অবস্থা, এই মুহূর্তে সর্বেশ্বরবাবুকে কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ নেই৷ ওনাকে বিশ্রাম করতে বলে ঘরে চলে এল ওরা৷
‘কিছু বুঝলি?’, ঘরে আসার পর প্রথম মৌনতা ভাঙল রাজর্ষি৷
‘রুমকির ভূত সন্ধে হলেই ভৌমিক ভিলায় হানা দেয়, তবে সে আর কাউকে দেখা দেয় না, শুধু সর্বেশ্বরবাবুকে ভয় দেখিয়ে কেটে পড়ে৷ আর কেউ কোনোদিন ভুল করেও দেখেনি
তাকে, নাহলে শুনতাম৷ এখন প্রশ্ন হল, কে এই রুমকি?’— ঘরে পায়চারি করতে করতে
বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘তোর কি মনে হয় আমরা সর্বেশ্বর ভৌমিককে যথেষ্ট চিনেছি?’
‘কেন তোর এমন মনে হচ্ছে?’, ভুরু কুঁচকে বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘জানিনা কেন, তবে আমার প্রথম থেকে মনে হচ্ছে সর্বেশ্বর বাবু কিছু একটা লুকিয়ে যাচ্ছেন আমাদের কাছে, এবার সেটা কি, আমি বুঝতে পারছিনা’, বলে রাজর্ষি৷
‘সাবাশ তোপসে! তোর আর আমার ভাবনাটা আজকাল বেশ এক সরলরেখায় যাচ্ছে দেখছি তো! আর কি বুঝলি বল দেখি?’, উজ্জ্বল হয়ে ওঠে জ্যোতিষ্কর চোখমুখ৷
‘আর তেমন কিছু তো এই মুহূর্তে বুঝলাম না!’
‘আমার একটা খটকা লাগছে জানিস তো! এত বড় বাড়ি, এদিকে তেমন কোনো দাবীদার নেই? সর্বেশ্বরবাবুর পর বাড়িটা জাস্ট প্রোমোটারদের হাতে চলে যাবে!’
‘তো সেটা ওনাকে জিজ্ঞেস করলেই হয়!’
‘হুম, কাল সকালে করব৷ আরও অনেকগুলো প্রশ্ন করার আছে আমার৷ এখন চল খেয়ে আসি, বেশ খিদে পেয়েছে আমার৷ খিদে পেলে আমার আবার মাথা কাজ করে না!’
সর্বেশ্বরবাবুর সাথে পরদিন আবার ওদের ব্রেকফাস্ট টেবিলে দেখা হল৷ আগেরদিন ডিনার করতে এসে ওরা শুনল যে রমেন ওনাকে দুধ, মিষ্টি খাইয়ে শুইয়ে দিয়েছে৷ এত বড় একটা ধাক্কা গেল, উনি আর বিশেষ কিছু খাবেন না৷ ওদের খাবার পরিবেশন করে দিচ্ছিলেন শ্যামলী মাসী, সাধনবাবুর স্ত্রী৷ জ্যোতিষ্ক একবার ভেবেছিল জিজ্ঞেস করবে রুমকির ব্যাপারটা, কিন্তু কি ভেবে চেপে গেল৷
সকালবেলা ব্রেকফাস্ট টেবিলে সর্বেশ্বরবাবুকে আবার আগের মত মুডেই পেল ওরা৷ আগেরদিনের ভয় পাওয়া ভাব উধাও৷ তবে চোখের নীচে বেশ কালি পড়ে আছে৷ দেখলেই মনে হচ্ছে আগেরদিন রাতে ঘুম হয়নি ভাল৷
‘গুড মর্নিং, সব ঠিক আছে তো? রাতে ঘুম হয়েছিল ঠিকঠাক?’, একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলেন উনি৷
‘হ্যাঁ কাকু, আপনি ঠিক আছেন?’
‘একদম ফাইন৷ আসলে কাল এমন একটা হল! কিছু মনে কোরো না, তবে তোমাদের কাছে লুকিয়ে লাভ নেই’, একটু থামলেন উনি৷ তারপর আবার বললেন, ‘এই কারণেই ডেকেছিলাম তোমাদের৷ এটা এখন প্রায়ই হচ্ছে৷ জানিনা আমার কোনো চোখের ভুল কিনা, কিন্তু এত স্পষ্ট দেখি আমি রুমকিকে, সেটা কি চোখের ভুল হ’তে পারে কখনো? তোমরাই বলো? আচ্ছা জ্যোতিষ্ক, আগের পাপ কি সত্যিই তাড়া করে বেড়ায়?’
ভদ্রলোকের মুখটা বেশ অসহায় লাগছে৷ জ্যোতিষ্ক একটু সময় দিল ওনাকে, তারপর আস্তে আস্তে বলল—
‘কিসের পাপ কাকু? আর রুমকিই বা কে? যদি একটু খুলে বলেন, আমাদের বুঝতে সুবিধে হয়!’
‘বলব, সব বলব তোমাদের৷ খেয়ে নাও তোমরা, খেয়ে আমার ঘরে এসো৷ ভাবিনি
কোনোদিন আবার এইসব পুরোনো কথা নিয়ে ঘাঁটতে হবে৷ কিন্তু পাপ হয়ত এইভাবেই তাড়া করে বেড়ায়৷ তোমাদের সব বলতেই হবে’৷
একগ্লাস ফলের রস খেয়ে আবার ওপরে ঘরে চলে গেলেন উনি৷ জ্যোতিষ্ক খেয়াল করল রুমকির কথাটা বলার পর থেকেই ভদ্রলোক কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন৷ নিজের মনেই কিসব বিড়বিড় করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছিলেন উনি৷
জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি এরপর বিশেষ মন দিতে পারল না ব্রেকফাস্টে৷ ব্রেকফাস্ট টেবিলে ওদের পরিবেশন করার জন্য তেমন কেউ ছিল না৷ শ্যামলী মাসী ওরা এসে বসার পর সব সাজিয়ে দিয়ে চলে গেছে৷ বিভিন্ন রকম খাবার ছিল৷ দু’টো করে টোস্ট আর অমলেট দিয়ে কোনোরকমে খাওয়া শেষ করে সর্বেশ্বরবাবুর ঘরে এল ওরা৷ সর্বেশ্বরবাবু তখন জানলার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন একটু অন্যমনস্ক হয়ে৷ ওরা গিয়ে ডাকতেই একটু যেন চমকে উঠলেন৷ পরমুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন—
‘ওহ, তোমরা! দাঁড়িয়ে কেন? বসো!’
সোফাতে বসল ওরা দু’জন৷ জ্যোতিষ্কর মনে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিন্তু ও নিজে থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছিল না৷ যতই হোক, সর্বেশ্বরবাবু প্রায় ওর বাবার বয়সী, মনে আসা সব প্রশ্ন ওনাকে তো সেইভাবে করা যায় না! আর এই কথাটা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই আরেকটা জিনিসও মনে এল ওর, যেটা এর আগে কখনো মনে হয়নি! সত্যানুসন্ধান করতে গিয়ে যদি এত দ্বিধা আসে মনে, তাহলে ও সত্যিটা খুঁজে বের করবে কিভাবে?
‘কাকু, আমাদের যদি এবারে রুমকির ব্যাপারে একটু বলেন৷ মানে সত্যিটা খুঁজে বের করতে হলে আমাদের তো সবটা জানা দরকার!’— বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সেইজন্যেই তো তোমাদের ডাকা৷ তোমাদের তো আমাকে সবটা জানাতেই হবে৷ আসলে কি বলোতো, গল্পটা না একটু বড়৷ আমি শুরু করছি, তোমাদের কোনো জায়গায় বুঝতে অসুবিধে হলে আমাকে থামিয়ে জিজ্ঞেস কোরো, কেমন?’
ঘাড় নেড়ে সম্মতি দেয় ওরা৷
‘আমাদের এই ভৌমিক ভিলার বয়স প্রায় একশ’ কুড়ি বছর৷ আমার দাদুর দাদু কর্মসূত্রে কোলকাতায় এসে জায়গাটি কিনেছিলেন, আর তারপর এই বাড়ি তৈরী করেন৷ তারপর থেকে বংশপরম্পরায় সবাই এখানেই থেকে আসছেন৷ এবার ব্যাপারটা হল, আমার জেনারেশনেই হয়ত থেমে যাবে আমাদের এই ভৌমিক ভিলার ইতিহাস৷ এরপর এখানে ফ্ল্যাট হয়ে যাবে হয়ত, কিন্তু যাই হোক, আমার বেঁচে থাকতে অন্তত কিছু হবে না৷ আমার জীবদ্দশায় এ বাড়ির একটা ইঁটও আমি খুলতে দেব না কাউকে’৷
‘আচ্ছা, আপনি ছাড়া এ বাড়ির কোনো দাবীদার নেই? মানে আপনার কোনো কাজিন বা আগের জেনারেশনের কেউ?’ , সর্বেশ্বরবাবুর কথার মাঝখানে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে জ্যোতিষ্ক৷
‘দ্যাখো, আমি আমার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান৷ সুতরাং আমার নিজের ভাইবোন কেউ নেই৷ তবে হ্যাঁ, আমার এক পিসি আছেন৷ কিন্তু তিনি ওয়াশিংটনে পুরো পরিবার নিয়ে সেটল্ড৷ তিনি বা তাঁর ছেলে-মেয়েদের এই বাড়ির প্রতি কোনো দাবী থাকবে বলে মনে হয় না৷ অন্তত আমাকে তো কোনোদিন বলেননি৷ আর তাছাড়া আমাদের বাড়ির একটা অলিখিত নিয়ম আছে৷ এ বাড়ির মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাপের বাড়ির সম্পত্তির ওপর আর কোনো দাবীদাওয়া থাকে না৷ প্রত্যেকেই উইল করার সময় এই নিয়মটি মেনে চলেন৷ কাজেই আমার দাদু যখন উইল করেছিলেন, তখন আমার পিসি কিছুই পাননি এ বাড়ির মালিকানা৷ সবটাই পেয়েছিলেন আমার বাবা’৷
‘আচ্ছা, তার মানে আপনার পথ এই সম্পত্তির দিক থেকে মোটামুটি পরিষ্কার৷ আপনার কোনো জ্যাঠা বা কাকা ছিলেন না, না?’
‘দ্যাখো, সত্যি বলতে কি আমি ছোট থেকে জেনে এসেছি আমার কোনো জ্যাঠা বা কাকা নেই৷ তবে আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা কথা বলে যান৷ প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমার বাবা কিন্তু বেশ অল্প বয়সে মারা গেছিলেন, মানে তখন যাওয়ার বয়স নয় আর কি! তখন তিনি বাষট্টি৷ অসুস্থতাও ছিল না বিশেষ, তবে মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে থেকে ভীষণরকম অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন৷ আমাদের গয়নার দোকানে গিয়ে বসতেন
রোজই৷ একদিন দোকান থেকে ফিরে আমাকে বললেন—
‘‘এবার একটু ব্যবসায় মন দাও, নয়ত তো যে কোনোদিন কেউ এসে ব্যবসা হাতিয়ে নেবে! সবসময় ওরকম বাউন্ডুলের মত ঘুরে বেড়ালে হবে?’’
একটু হকচকিয়ে গেলাম আমি৷ তখন আমার পঁচিশ বছর বয়স৷ আজ থেকে ধরো বছর পনেরো আগের কথা৷ এখন আমার চল্লিশ, দেখে যদিও অনেক বেশি লাগে জানি, আসলে এটা আমাদের বংশের ধারা৷ বয়সটা কম বয়স থেকেই বড্ড বেশি জাঁকিয়ে বসে৷ আমিও তাই চল্লিশে বুড়িয়ে গেলাম৷ যাই হোক, যে কথা বলছিলাম, বাবা আমাকে কোনোদিন ব্যবসা-ট্যবসার কথা বলেননি৷ আমিও ছিলাম নিজের মতই৷ গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে একটু বখে গেছিলাম বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে৷ হাতে পয়সা থাকলে যা হয় আর কি! তারপর যখন বন্ধুরা সবাই নিজের নিজের জীবনে দাঁড়িয়ে গেল, তখন বুঝলাম মস্ত ভুল হয়ে গেছে, নিজের জীবনটাও গুছিয়ে নেওয়া উচিৎ ছিল৷ তখন যে একেবারেই সময় ছিল না, এমন নয়৷ কিন্তু কি বলোতো, ইচ্ছে হল না৷ আসলে সম্পত্তি আর পয়সাটা দেখে নিয়েছিলাম তো৷ ভাবলাম আমি যাই করি না কেন, এর চেয়ে বেশি কামানোর যোগ্যতা আমার নেই৷ পড়াশুনোয় সাধারণ৷ কোনো বিশেষ গুণও নেই, যার মাধ্যমে কিছু করতে পারি৷ তাই জীবনটা যেমন চলছে, সেরকমই ছেড়ে দিলাম৷
এদিকে বাবা যখন ব্যবসায় যোগ দেওয়ার কথা বললেন, আমি পড়লাম মহা মুস্কিলে৷ তখন কোনো কাজের নামে গায়ে জ্বর আসত৷ মনে হত আমি তো কিছুই পারি না! আমি কি করে ব্যবসা দেখব? বাবার মুখের ওপর সে কথা বলতেও পারছি না! বাবার মন রাখতে কয়েকদিন সঙ্গে গেলাম দোকানে৷ আমাদের দোকানের বেশ রমরমা ব্যবসা ছিল, বুঝলে? প্রচুর কর্মচারী৷ সবাই দেখতাম ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে৷ আমি বাবার সাথে ক্যাশে বসে অবাক হয়ে দেখতাম সব৷ রমেনও তখন আমাদের দোকানে কাজ করত৷ আমার থেকে খানিকটা ছোট হলেও ও-ই একমাত্র আমার কাছাকাছি বয়সী ছিল৷ রমেনের সাথে একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আমার৷ আর এটা একদমই পছন্দ করতেন না আমার বাবা৷
একদিন আমাকে ডেকে বললেন, ‘‘বন্ধুত্ব সবসময় সমানে সমানে করা উচিৎ, নয়ত তোমারও তোমার কাকার মত দশা হবে’’৷
এই কথাটায় চমকে উঠেছিলাম আমি৷ আমার আবার কাকা কোত্থেকে এল?’, একনাগাড়ে অনেকখানি বলে থামলেন সর্বেশ্বরবাবু৷
জ্যোতিষ্ক এমনভাবে ঢুকে গেছিল গল্পের মধ্যে, যে সর্বেশ্বরবাবু হঠাৎ থেমে যাওয়ায় অস্থির হয়ে পড়ে ও৷ ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করে, ‘তারপর কি হল?’
‘সেদিন আমি প্রথম বাবার থেকে জানতে পারলাম যে আমার এক কাকা ছিল৷ অল্প বয়সে যাত্রাদলে নাম লেখানোয় দাদু তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেছিলেন৷ তারপর থেকে আর কেউ তাঁর খোঁজ রাখেনি৷ কিন্তু হিসেবমত এই ভৌমিক ভিলাতে আমার কাকারও দাবী আছে৷ আমার বাবার তখন হঠাৎ চিন্তা হয়েছিল যে আমার কাকা যদি ফিরে এসে বাবার অবর্তমানে আমার থেকে সম্পত্তির ভাগ চায়, তাহলে আমি কিভাবে সামলাব? যাই হোক, সেসব সমস্যা আমাকে পোহাতে হয়নি৷ তবে এর কিছুদিন পরেই আমার বাবা হঠাৎ মারা যান৷ হার্ট-অ্যাটাক৷ আমি কিছুদিন চেষ্টা করেছিলাম ব্যবসাটা চালাতে, কিন্তু একসময় দেখলাম যে এ আমার কাজ নয়৷ তাই সব বেচে দিলাম৷ সব কর্মচারীদেরও এককালীন কিছু করে টাকা দিয়ে ছুটি দিয়ে দিলাম৷ কিন্তু রমেনকে শুধু রেখে দিলাম৷ হয়ত ওর সাথে এক অসম বন্ধুত্বের সূত্রেই মায়ায় পড়ে গেছিলাম৷ আর তাছাড়া ও বলল ওর নাকি যাওয়ার জায়গা তেমন নেই৷ আমি যদ্দিন আছি, এ বাড়িতে থাকার জায়গার তো অভাব হবে না৷ তাই ওকে এই ড্রাইভারের চাকরির অফারটা দিলাম, ও রয়ে গেল৷ এখন শুধু বই পড়ি, সিনেমা-থিয়েটার দেখি, আর নিজের মত কাটাই জীবনটা৷ আমার এক অনন্ত অবসর, বুঝলে?’, হাসতে লাগলেন সর্বেশ্বর ভৌমিক৷
‘কিন্তু কাকু, এর মধ্যে তো রুমকির কথা কোথাও পেলাম না!’
এতক্ষণ ধরে মন দিয়ে সর্বেশ্বরবাবুর কথা শোনার পর বেশ হতাশ হয়েই জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
আর এই প্রশ্নটা করার পরেই ও লক্ষ্য করল, হঠাৎ করে কেমন যেন প্রচন্ড এক বিষণ্ণতা এসে গ্রাস করে ভদ্রলোককে৷ মিনিট কয়েক চুপ করে থেকে বললেন—
‘রুমকি আমার জীবনের একমাত্র নারী৷ আমি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, চূড়ান্ত অসফল একজন মানুষ হিসেবে, এর জন্যে রুমকিই দায়ী৷ রুমকি হয়ত আমার জন্যেই আজ পৃথিবীতে নেই, আর আমি থেকেও নেই হয়ে আছি’৷
‘মানে? কাকু আপনি কি বলছেন আমরা তো ঠিক?’ , ভদ্রলোকের একটু থামার সুযোগেই বলে ওঠে রাজর্ষি৷
ওর হাতের ওপর চাপ দিয়ে ওকে থামায় জ্যোতিষ্ক৷ রাজর্ষির কথা যেন ওনার কানেই পৌঁছয়নি৷ কিছুক্ষণ উদাসভাবে জানলার বাইরে তাকিয়ে থেকে আবার ওদের দিকে ফেরেন উনি৷
‘রুমকি কে বলোতো? নিচে সাধন আর শ্যামলীকে দেখলে, মনে আছে? রুমকি ওদের মেয়ে’৷
‘সেকি! আপনি যে বললেন ওনারা বহু বছর আপনাদের বাড়িতে কাজ করছেন? তাহলে ওনাদের মেয়ের সাথে আপনার কি করে...’, আবারও উত্তেজিত হয়ে পড়ে রাজর্ষি৷
এবার একটু হাসেন ভদ্রলোক৷ নিজেকে একটু গুছিয়ে নিয়ে বলেন—
‘তোমাদের এসব কথা কিভাবে বলব জানিনা, তবে সত্যানুসন্ধানে যখন তোমাদের ডেকেছি, তখন কিছু লুকিয়ে রাখা বা সত্য গোপন করাও আমার শোভা পায় না৷ আমাকে সবটাই বলতে হবে তোমাদের৷
সাধন বহুদিন থেকেই আমাদের বাড়ি আছে৷ মানে আমি ছোট থেকেই দেখছি ওকে৷ তখন ওরও বয়স কম ছিল৷ তারপর আমার ঠাকুর্দাই দেখেশুনে ওর বিয়ে দিয়েছিলেন৷ সাধনদের বাড়ি বীরভূমের কোনো এক গ্রামে৷ কোথায়, সেটা আমিও সঠিক জানিনা৷ শ্যামলী দি যখন সন্তানসম্ভবা, তখন ওকে নিয়ে সাধন দেশে চলে গেল৷ বলল একেবারে বাচ্চা নিয়ে ফিরবে৷ আমার তখন বছর সাত-আট বয়স৷ কিন্তু আমি সাধনকে ছোট থেকে নাম ধরেই ডাকতাম৷ হয়ত বাড়ির সকলকে ডাকতে দেখে অভ্যেস হয়ে গেছিল৷ বড় হয়েও
সেটা আর বদলায়নি৷ ওর বৌকে যদিও ‘দিদি’ বলি৷
তো যাই হোক, মাস তিনেক পরে সাধন আর শ্যামলী দি ফিরে এল, কোলে ছোট্ট রুমকি৷ অত ছোট বাচ্চা আমি প্রথম দেখলাম চোখের সামনে৷ আমাদের বাড়িতেই থাকত, আমার চোখের সামনেই বড় হয়ে উঠতে লাগল৷ রুমকি আমার থেকে অনেকটাই ছোট৷
আমার ফেলে দেওয়া খেলনা নিয়ে খেলে বড় হয়েছে ও৷ সাধারণত বাড়ির কাজের লোকের সন্তানদের ব্যাপারে আমাদের কাছে তেমন খোঁজখবর থাকত না৷ আর আমিও বড়লোক বাবার একমাত্র ছেলে, স্বেচ্ছাচারী জীবনযাপন করেছি৷ বাড়িতে আশ্রিত ছিল বেশ কিছু লোক, সবাইকে আমি চিনতামও না৷
একদিন বাবার সঙ্গে দোকান থেকে ফিরছি, হঠাৎ রুমকিকে দেখলাম বাড়ির সামনে৷ ওর তখন বোধহয় চোদ্দ-পনেরো বছর বয়স৷ আমি ওর থেকে প্রায় দশ বছরের বড়৷ তবু ওই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখে কি অদ্ভুতভাবে ভীষণ ভাল লেগে গেল আমার৷ তখনও আমি জানতাম না ও কে৷ পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম যে ও সাধন আর শ্যামলীদির মেয়ে৷ তখন অল্প বয়স তো, অত ভাল মন্দের জ্ঞান ছিল না৷ মনে হল, যাই হয়ে যাক, রুমকিকে আমার চাই৷ আর কিরকম অদ্ভুত ব্যাপার জানো, রুমকিও যেন হাবেভাবে আমাকে বোঝাতে লাগল যে ওরও হয়ত আমাকে ভাল লাগে৷
তোমাদের আমি বোঝাতে পারছি কি ব্যাপারটা?’, কথা বলতে বলতে হঠাৎ করেই থেমে গিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন সর্বেশ্বরবাবু৷
‘আমরা বুঝতে পারছি কাকু, আপনি বলুন তারপর কি হল’, জবাব দেয় জ্যোতিষ্ক৷
‘তারপর কিছুদিন কেমন যেন স্বপ্নের মত, জানো! একটা বাচ্চা মেয়ের সাথে কি অদ্ভুত একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেলাম৷ আমরা দু’জনেই যদিও জানতাম যে এই সম্পর্কের হয়ত কোনো পরিণতি নেই, কিন্তু তাও তখন নিজেদের আটকাতে পারিনি৷ লুকিয়ে চুরিয়ে দেখা করতে লাগলাম বাড়ির আশেপাশে৷ আর তার ফলও পেলাম জানো! একদিন আমার বাবার কানে কেউ গিয়ে তুলেছিল আমাদের মেলামেশার কথা৷ আর তার ফল হল মারাত্মক৷ বাবা সাধনকে কাজ থেকে প্রায় ছাড়িয়ে দেন আর কি! ওরা গরীব মানুষ, কাজ চলে গেলে খাবে কি? বাবার হাতেপায়ে ধরে অনেক অনুরোধ করায় সাধনের কাজটা টিকে যায়৷ তবে বাবা হুকুম দেন যে রুমকিকে গ্রামে গিয়ে রেখে আসতে হবে, ওই মেয়েকে তিনি কিছুতেই বাড়িতে রাখবেন না৷
সেদিন রাত্রে শ্যামলীদি রুমকিকে খুব মেরেছিল৷ কিন্তু আমি এসব কিছুই তখন জানতে
পারিনি যদিও৷ আমাকে তখন একটা ঘরে প্রায় বন্ধ করে রাখা হয়েছিল৷ আর সেই রাত্তিরেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করল রুমকি৷ অল্প বয়সের মেয়ে তো, খুব ভালবেসে ফেলেছিল৷ ধাক্কাটা মেনে নিতে পারেনি৷ আর ওর এই চলে যাওয়াটা আমাকে কেমন যেন এলোমেলো করে দিল৷ মনে একটা অসম্ভব জেদ এসে গেছিল আমার, যে যাই হয়ে যাক, আমি বাবার কোনো কথা শুনব না৷ তখন মনে হত রুমকির এভাবে অকালে চলে যাওয়ার জন্য বাবাই দায়ী৷ আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারিনি৷ কিন্তু অদ্ভুত শান্ত দেখেছিলাম সাধন আর শ্যামলীদিকে৷ মেয়ের চলে যাওয়াটা ওদের ওপর যেন কোনো প্রভাবই ফেলল না তেমন৷ আমি একটু অবাক হয়েছিলাম, তারপর ভেবেছিলাম অভাব বুঝি এমনই হয়! কিন্তু আমি মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে আমার মত করে প্রতিবাদ করে যাব৷ দোকানে যাওয়া প্রায় বন্ধ করে দিলাম৷ বাড়িতে খুব অশান্তি হলে মাঝেমধ্যে এক-আধদিন যেতাম, সেও না যাওয়ার মতই৷ আই ওয়াজ জাস্ট পাসিং দ্য টাইম৷ বাবা আমাকে নিয়ে খুব দুশ্চিন্তা করতেন, বুঝতে পারতাম৷ আর এরকমই এক সময়ে হঠাৎ একদিন রাত্তিরে ঘুমের মধ্যে চলে গেলেন বাবা৷ হার্টঅ্যাটাক৷ ধাক্কা খেয়েছিলাম খুব, তবে ভেঙ্গে পড়িনি৷ কিন্তু মা মেনে নিতে পারেনি ব্যাপারটা৷ বাবা চলে যাওয়ার কয়েকমাসের মধ্যে মাও চলে গেল৷ আর সবকিছু এসে পড়ল আমার ঘাড়ে৷
দায়িত্বের ভারে রুমকি তখন একটু একটু করে মাথা থেকে সরতে শুরু করেছে৷ ব্যবসা গুটিয়ে দেব ভেবেই দোকানে যাওয়া শুরু করলাম তখন৷ সব পুরোনো কর্মচারীদের ছুটি দিয়ে দিলাম একে একে৷ রমেনকে ভাল লেগে গেল, ওকে তাই ড্রাইভার হিসেবে বহাল করলাম৷ তারপর এই করেই কেটে গেল এতগুলো বছর৷ এখন বেশ আছি৷ এমনি সব ঠিকই ছিল, আমি আমার জীবন নিয়ে বেশ খুশিই বুঝলে৷ এখন যেভাবে দিন কাটে, খারাপ লাগে না আমার৷ বেশ নিজের মত বই পড়ি, গান শুনি, ঠিকই আছে৷ শুধু মরতে খুব ভয় পাই৷ হঠাৎ করে মারা যাওয়ার এত বছর পর রুমকি যে এভাবে ফিরে আসবে, আমাকে এভাবে ভয় দেখাবে, আমি ভাবতেও পারি না!’, কথা শেষ করে এবার বেশ
জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলেন উনি৷
জ্যোতিষ্ক ভাবতেই পারেনি যে ব্যাপারটা এমন জটিল হবে৷ রুমকির ব্যাপারটা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেল ও৷ এখন অতদিন আগেকার কথা কাকে জিজ্ঞেস করবে? সাধনদা আর শ্যামলীদিকেই একমাত্র জিজ্ঞেস করা যায়, কিন্তু এতদিনের আগের ক্ষত
খুঁচিয়ে ঘা করলে ওদের কতটা খারাপ লাগবে, সেটা ভেবেই একটু দোনামনা করছিল ও৷ কিন্তু সর্বেশ্বরবাবুর কথাটা একবার যাচাই করে নেওয়ার জন্য ওদের সাথে কথা না বলে উপায় নেই৷ জ্যোতিষ্ক ওনাদের দু’জনের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলতে চাইল৷ বামুনদি এবং রমেনের সঙ্গেও একবার কথা বলতে চাইল ও৷ ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন সর্বেশ্বরবাবু৷ রাজর্ষিকে বলা ছিল, যখন ও প্রশ্ন করবে, রাজর্ষি যেন ছোট ছোট করে নোট নিতে থাকে৷ সেইমতই একটা ডায়রিতে সবকিছু নোট করেছে রাজর্ষি৷
জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব শেষে ওরা যখন ঘরে এল, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলতে শুরু করেছে৷ এই জিজ্ঞাসাবাদ পর্ব চালাতে গিয়ে ওদের দুপুরে খাওয়া হয়নি৷ শ্যামলীদি যদিও বারবার এসে ওদের বলেছিলেন খাওয়ার জন্য, কিন্তু জ্যোতিষ্ক পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিল যে কাজ শেষ না করে ওরা খেতে পারবে না৷ এখন হঠাৎ জ্যোতিষ্ক অনুভব করল যে ওর খুব খিদে পেয়েছে৷
চান করে খেয়েদেয়ে উঠে রাজর্ষির লেখা নোটসগুলো দেখতে বসল জ্যোতিষ্ক৷ প্রথমেই রয়েছে রান্নার বামুনদিদির কথোপকথন৷
জ্যোতিষ্ক : কতদিন হল এবাড়িতে আছেন আপনি?
বামুনদিদি : তা প্রায় তিরিশ-চল্লিশ বছর হয়ে গেল৷
‘মানে আপনি ছোট থেকে আছেন?’
‘হ্যাঁ, সেই বেধবা হবার পর থেকেই’৷
‘এনারা কেমন মানুষ?’
‘আমাকে ভাতকাপড়ে রেখেছেন এত বছর৷ এনারা ছিলেন বলে বেঁচে আছি৷
খারাপ বলি কেমনে?’
‘আপনার তাহলে এনাদের নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই?’
‘আজ্ঞে না বাবা’৷
‘আচ্ছা, আপনি রুমকিকে চিনতেন তো?’
‘চিনব না? সেই এত্তটুকুন বয়সে মায়ের কোলে চেপে এল৷ আমারই কোলেপিঠে মানুষ হল তো! রুমকিকে কি করে ভুলি!’, বলতে বলতে চোখের কোনে আঁচল চেপে ধরেন বামুনদিদি৷
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ওনাকে সামলে নিতে সময় দিয়েছিল জ্যোতিষ্ক৷ তখন ঘরে ও, রাজর্ষি আর বামুনদিদি ছাড়া আর কেউ ছিল না৷ তারপরে আবার ও জিজ্ঞেস করেছিল—
‘আচ্ছা, আপনার মনে হয়নি যে রুমকিকে এই বাড়ির লোকেদের জন্য মরতে হল?’
‘না বাবা, মনে হয়নি৷ রুমকি ভুল করেছিল৷ বামন হয়ে কি চাঁদকে ছোঁয়া যায় বলোতো? হাতে তো ছ্যাঁকা লাগবেই! দুঃখ একটাই, মেয়েটা নিজেকে শেষ করে দিল৷ বাপ-মায়ের কথা একবারও ভাবল না’৷
‘বেশ, আপনাকে এবার শেষ একটা প্রশ্ন করব৷ সর্বেশ্বরবাবু কেমন মানুষ?’
‘ভাল’৷
‘আচ্ছা, এবার আপনি আসতে পারেন’৷
বামুনদিদির পর লেখা হয়েছে সাধনবাবুর কথা৷
জ্যোতিষ্ক : এ বাড়িতে থাকতে ভাল লাগে সাধনদা?
সাধন : যে বাড়ি আমায় রুজি-রুটি দেয়, সেখানে খারাপ কেন লাগবে বলতে পারেন?
‘রুমকি মারা যাওয়ার পর ভাবেননি এবাড়ি ছেড়ে দেওয়ার কথা?’
‘না ভাবিনি, কারণ আমার মেয়ের মত আমার সাহস ছিল না৷ আমি মরতে পারতাম না, তাই থেকে গেছিলাম’৷
‘কেন? আপনার গ্রামে গিয়ে অন্য কোনো কাজ পেতেন না?’
‘না ভাই, আমি অন্য কোনো কাজ পারি না৷ আর তাছাড়া তোমরা যে ভাবো না, গ্রামে অনেক কাজ, তেমনটা ঠিক নয়৷ তেমন হলে গ্রামের মানুষ কাজের খোঁজে শহরে আসত না’৷
‘আচ্ছা একটা কথা বলবেন সাধনদা, আপনার কখনো মনে হয়নি রুমকির সাথে যে অন্যায়টা হল তার প্রতিশোধ নেবেন?’
‘প্রতিশোধ কিসের? দোষটা তো আমার মেয়ের ছিল৷ আর ওকে তো কেউ মেরে ফেলেনি৷ এনারা অনেক ভাল মানুষ, চাইলে অনেক খারাপ কিছু করতে পারতেন রুমকির সঙ্গে৷ কিন্তু এনারা সেসব কিছুই করেননি৷ গরীবদের অত মান-অপমান থাকতে নেই বাবা৷ খেটে খেতে এসেছি আমরা৷ অন্যায় করলে বাবুরা জুতো মারলেও হজম করতে হবে৷ রুমকির হয়ত আমাদের মত ঘরে জন্মানো উচিৎ হয়নি’৷
জ্যোতিষ্ক লক্ষ্য করছিল কথা বলতে বলতে কেমন যেন কঠিন হয়ে যাচ্ছিল সাধনদার মুখটা৷
ওঁর সঙ্গে আর বেশি কথা বাড়ায়নি ও৷ ডেকে নিয়েছিল শ্যামলী বৌদিকে৷
জ্যোতিষ্ক : কেমন আছেন শ্যামলীদি?
শ্যামলী : ভালই৷ আমরা কখনোই খারাপ থাকি না৷ যাদের সকালবেলা চোখ খুলেই কিভাবে খিদের আগুন নিভবে, সেই চিন্তা করতে হয়, তাদের খারাপ থাকলে চলে না৷
‘আপনি আপনার মেয়ের মৃত্যুটা মেনে নিতে পারেননি না?’
‘কোনো মা কি পারে তার সন্তানের মৃত্যু মেনে নিতে? রুমকি আমার প্রথম সন্তান ছিল৷ প্রথম মা ডাক শুনেছি আমি ওর মুখ থেকে৷ কি করে সেই মেয়ের আমার বুকের ওপর দিয়ে ওইভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নেব বলো বাবা?’, গলা ধরে আসে শ্যামলীদির৷
‘প্রথম সন্তান মানে? রুমকির পর আপনার আর কোনো সন্তান ছিল নাকি?’
এবার একটু যেন থতমত খেয়ে যান শ্যামলী দি৷ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলেন—
‘আসলে রুমকির একটা জমজ বোন ছিল, ওর থেকে মিনিট দুয়েকের ছোট৷ কিন্তু জন্মের পরেই সে আমাদের ছেড়ে চলে যায়’, মুখে আঁচল চাপেন শ্যামলী দি৷ ওনাকে একটু সামলে নেওয়ার সময় দেয় জ্যোতিষ্ক৷ মিনিট কয়েকের মধ্যেই নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বলেন শ্যামলী দি—
‘আসলে মা ডাক শোনাটা বোধহয় আমার কপালে নেই জানো? নয়ত কেন এমন হবে বলোতো? দু’টো সন্তানের জন্ম দিয়েও কেন মা হতে পারলাম না?’
জ্যোতিষ্কর ভীষণ চোখটা জ্বালা করছিল৷ সত্যানুসন্ধান করতে এসে যে এক মায়ের এত করুণ এক আর্তির মুখোমুখি হ’তে হবে ওকে, সেটা ও ভাবতেও পারেনি৷ শ্যামলীদিকে যেতে দিল ও৷
এরপর কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ও ডেকে পাঠিয়েছিল রমেনকে৷ রমেন ছেলেটাকে প্রথম থেকেই খুব একটা সুবিধের লাগে না রাজর্ষির৷ ছেলেটার যেন চোখমুখ কথা বলে৷ ও জ্যোতিষ্ককে কয়েকবার বলেওছে সে কথা৷ কিন্তু জ্যোতিষ্ক পাত্তা দেয়নি বিশেষ৷ জ্যোতিষ্কর মতে যে মানুষটাকে প্রথম থেকে সবচেয়ে নিরীহ গোবেচারা মনে হয়, সেও ক্রিমিনাল হতে পারে৷ তাই সন্দেহের তালিকায় রমেন যেমন আছে, তেমনি সর্বেশ্বরবাবুও আছেন৷
‘সর্বেশ্বরবাবু আছেন মানে? উনি তো নিজে ভূত দেখে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, আমাদের
ডেকে পাঠালেন সত্যিটা খোঁজার জন্যে৷ উনি তাহলে কি করে থাকবেন এর মধ্যে? আর
তাছাড়া সেদিন উনি সত্যিই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন৷ আমি নিজে ওনার পালস দেখেছি’, বলেছিল রাজর্ষি৷
‘হতে পারে উনি সকলের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে এটা করছেন৷ পালস অনেকভাবে বাড়ানো যায় রাজর্ষি, বোকা বোকা কথা বলিস না’, বলেছিল জ্যোতিষ্ক৷
আর এটা শুনেই রাজর্ষির মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেছিল৷ সর্বেশ্বরবাবু মানুষটাকে কিছুতেই খারাপ ভাবতে পারছিল না ও৷
জ্যোতিষ্কঃ আপনি পড়াশুনো কতদূর করেছেন রমেন দা?
রমেন ঃ মাধ্যমিক পাশ করেছি৷ তারপর আর পড়া হয়নি৷
জ্যোতিষ্কর প্রথম প্রশ্নে একটু যেন চমকে উঠে বলে রমেন৷ হয়ত এমন একটা প্রশ্ন প্রথমেই ও আশা করতে পারেনি৷ কিন্তু জ্যোতিষ্কর মধ্যে কোনো ভ্রূক্ষেপ দেখা যায় না৷ রমেনের চমকে ওঠাটা ওর চোখ এড়ানোর কথা নয়৷ সেদিকে কোনো প্রসঙ্গ না তুলে আবার প্রশ্ন করে ও— ‘তারপর আর পড়েননি কেন?’
‘আসলে পড়াশুনোয় ভাল ছিলাম না বিশেষ৷ তারপর মাধ্যমিকের পরেই বাবা মারা যায়৷ বাড়িতে মা, দিদি সবাই রয়েছে , আমি কিছু না করলে তখন না খেয়ে মরতে হত সব্বাইকে৷ তাই বাধ্য হয়েই কাজে বেরিয়েছিলাম’৷
‘আপনার দিদির বিয়ে হয়নি?’
‘হয়েছিল, কিন্তু জামাইবাবু মারা যাওয়ার পর দিদি আবার আমাদের কাছে ফিরে আসে’, মাথা নীচু করে বলে রমেন৷
‘আচ্ছা রমেনদা, আপনার এখন বয়স কত?’
জ্যোতিষ্কর এই প্রশ্নটায় একটু থমকে যায় রমেন৷ কয়েক মুহূর্ত ভাববার সময় নিয়ে বলে, ‘পঁচিশ’৷
‘বেশ৷ এবার আমাকে একটা কথা বলুন তো, আপনি তো বললেন আপনি মাধ্যমিক পাশ করেছেন৷ তা সেইটুকু পড়াশুনো নিয়ে সোনার দোকানের কাজে কোনো অসুবিধে হত না? আপনাকে কাজে কে বহাল করেছিলেন?’
‘আমাকে হিসেবের কাজ দেখতে হয়নি কোনোদিন, তাই অসুবিধে হয়নি তেমন৷ আমি বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টে ফাইলপত্তর দেওয়া নেওয়ার কাজ করতাম৷ এছাড়া কাস্টোমারদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেওয়া, যেমন কোনখানে হার, কোথায় দুল, কোথায় ছেলেদের গয়না পাওয়া যায় , এগুলোতে সাহায্য করতাম’৷
‘আপনাকে কে কাজে বহাল করেছিলেন? মানে আমি জানতে চাইছি আপনি এই চাকরিটা পেলেন কিভাবে?’
‘আমার গ্রামের একজনের পরিচিতের সূত্র ধরে বড়বাবু, মানে সর্বেশ্বরবাবুর বাবার কাছে এসেছিলাম৷ ওনার হয়ত আমাকে দেখে মায়া হয়েছিল, তাই কাজে রেখেছিলেন৷ তারপর তো বড়বাবু চলে যাওয়ার পর ছোটবাবু দোকান বেচে দিলেন৷ সব স্টাফদের ছুটি হয়ে গেল৷ কিন্তু ভগবানের দয়ায় ছোটবাবুর কি মনে হল, আমাকে রেখে দিলেন কাজে৷ ড্রাইভিংটা শিখতে হল, উনিই শিখিয়েছিলেন৷ আর এখন এই স্টিয়ারিং-টাকেই ভালবেসে ফেলেছি৷ কোনোদিন গাড়ি চালানো ছাড়া অন্য কোনো কাজ করেছি বলে মনেই হয় না!’, এই কথাগুলো বলার সময় চোখদু’টো যেন জ্বলজ্বল করে ওঠে রমেনের, আর সেটা জ্যোতিষ্করও চোখ এড়ায় না৷
এরপর হঠাৎই প্রসঙ্গ পালটে জ্যোতিষ্ক প্রশ্ন করে— ‘আচ্ছা, আপনি কতদিন অন্তর বাড়ি যান?’
রমেন বোধহয় বুঝতে পারে না যে এ বাড়িতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর সঙ্গে ওর বাড়ি যাওয়ার কি সম্পর্ক৷ তাও জ্যোতিষ্কর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে ও—
‘এখন বছরে দু’বার যাই৷ আমাকে ছাড়া ছোটবাবুর চলে না যে একদম!’
‘তাহলে আপনি বাড়ি গেলে কি করেন আপনার ছোটবাবু?’
‘উনি ওই সময়ে সপ্তাহখানেক বাড়ি থেকে বিশেষ বেরোন না৷ যদি খুব প্রয়োজন হয় বেরোনোর, তাহলে ট্যাক্সি নিয়ে নেন বলে শুনেছি’৷
‘আচ্ছা রমেনদা, আমি তো দেখলাম সর্বেশ্বরবাবু এমনিই বাড়ি থেকে একটু কম বেরোন৷ নিজের নিয়েই থাকতে পছন্দ করেন৷ তাহলে সেক্ষেত্রে আপনার কাজও তো বিশেষ থাকে বলে মনে হয় না৷ কি করেন আপনি সারাদিন?’
‘আমি এমনি বিশেষ কিছু করি না৷ কখনো প্রয়োজন পড়লে এদের একটু বাজার-দোকান করে দিই, কখনো পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানটায় আড্ডা মারি, আর নয়ত বই-টই পড়ি’৷
‘বাহ, আপনার বই পড়ার নেশা আছে নাকি?’
‘ওই আর কি!
ছোটবাবুর কাছে তো অনেক বই, সেখান থেকেই পড়ি কিছু নিয়ে মাঝেমাঝে৷ বেশ কেটে যায় সময়টা’৷
‘বেশ, শেষ প্রশ্ন করব এবার রমেনদা, আপনার মায়ের বয়স কত?’
‘আমি তো সঠিক জানিনা, তবে যা মনে হয়, বাষট্টি-তেষট্টি হবে’৷
‘আচ্ছা, আপনি আসতে পারেন’৷
রমেন চলে যাওয়ার পর জ্যোতিষ্কর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল রাজর্ষি৷
‘কি দেখছিস?’
‘তোকে৷ বোঝার চেষ্টা করছি তোর মাথার মধ্যে কি চলছে’৷
‘মানে? তুই জানিস না আমার মাথায় এখন কি চলছে?’
‘না ভাই, জানিনা৷ তোর চিন্তাভাবনার তল পাওয়ার সাধ্য আমার নেই৷ রমেনদাকে কিসব প্রশ্ন করলি তুই? মানে কেন করলি? ওকে তো গল্প করে ভাগিয়ে দিলি! কি ইনফরমেশন পেলি তুই ওর থেকে?’, বেশ বিরক্তি ফুটে ওঠে এবার রাজর্ষির স্বরে৷
‘তিষ্ঠ বৎস, তিষ্ঠ ক্ষণকাল৷ একটা সূত্র পাচ্ছি বলে মনে হচ্ছে৷ ওয়াইল্ড গেস৷ তবে সেইটার সত্যতা প্রমাণ পেতে হলে এই ভৌমিকভিলায় বসে থাকলে আমাদের চলবে না’৷
‘মানেটা কি? কোথায় যেতে হবে আবার?’
‘বিষ্ণুপুর’৷
‘কেন? হঠাৎ বিষ্ণুপুর যাব কেন আমরা?’
‘পোড়ামাটির মন্দির দেখতে যে নয়, সেটা আশা করি বুঝতেই পারছিস৷ অন্য কাজ আছে৷ তবে সেটা কি কাজ, সে ব্যাপারে এখন এ বাড়ির কাউকে কিছু বলা যাবে না৷ শুধু সর্বেশ্বরবাবুকে বলতে হবে, কারণ উনি আমাদের জন্য গাড়ির ব্যবিস্থা করবেন৷ কিন্তু সেই গাড়িটা যেন রমেন না চালায়৷ শুধু রমেন নয়, সর্বেশ্বরবাবু বাদে এ বাড়ির প্রতিটা লোক জানবে আমরা ফিরে যাচ্ছি৷ এইসব ভূতের কারণে আমাদের বাড়ির লোক চাইছে না আমরা এখানে আর বেশিদিন থাকি’৷
সেইমতই সর্বেশ্বরবাবুকে বলেছে ওরা৷ উনি কোনো প্রশ্ন করেননি, ওনার পরিচিত এক কার সার্ভিসে বলে গাড়ির ব্যবস্থা করে দিয়েছেন৷ পরদিন সকালে জ্যোতিষ্করা বেরোবে ঠিক হল৷ আর সেইমতই গাড়ি বললেন উনি৷ বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা গিয়ে ওরা গাড়িতে উঠবে ঠিক হল৷ সর্বেশ্বরবাবু বিকেলবেলা সকলকে ডেকে জানালেন জ্যোতিষ্কদের ফিরে যাওয়ার কথা৷ ভাবলেশহীন মুখগুলোতে বিশেষ পরিবর্তন যদিও দেখা গেল না এই খবরটায়,
শুধু বামুনদিদি বলে উঠলেন, ‘এত তাড়াতাড়ি চলে যাবে ওরা? তেমন কিছু তো খাওয়ানোই হল না ওদের!’
‘আমরা আবার আসব বামুনদিদি, তখন না হয় একেবারে খাইয়ো!’, হেসে বলে জ্যোতিষ্ক৷
ওদের সঙ্গে জিনিসপত্র খুব বেশি নেই৷ সপ্তাহখানেকের জন্য এসেছিল ওরা৷ তার মধ্যে চারদিন কেটে গেছে৷ আর তিনদিনের মধ্যে ব্যাপারটার একটা নিষ্পত্তি না হলে জ্যোতিষ্ক শান্তিতে পড়াশুনোটাও করতে পারবে না৷ সন্ধেবেলা ঘরে জিনিসপত্র গোছাচ্ছিল ওরা, ঘরের দরজা বন্ধ ছিল৷ হঠাৎ জ্যোতিষ্ক দৌড়ে যায় দরজার কাছে৷ কি মনে হতে দড়াম করে খুলে ফেলে ঘরের দরজাটা৷ রাজর্ষিও আসে পিছনে৷ আর ঠিক তখনই ওরা দেখে ছায়ামূর্তিটা৷ একটা মেয়ের ছায়া৷ সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাচ্ছে মেয়েটা, আর তার ছায়া পড়েছে দেওয়ালে৷ লম্বা বারান্দা পেরিয়ে ওরা যতক্ষণে সিঁড়ির কাছে আসে, ততক্ষণে আর কেউ কোত্থাও নেই৷
বারান্দার অন্য প্রান্তে সর্বেশ্বরবাবুর ঘর৷ দৌড়ে ওনার ঘরে যায় ওরা৷ বিছানার ওপর বসে হাঁপাচ্ছেন ভদ্রলোক৷
‘রুমকি এসেছিল?’, জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
ভীষণ জোরে চমকে উঠে ওদের দিকে ফিরে তাকান উনি৷ জ্যোতিষ্করা দেখল সর্বেশ্বরবাবুর চোখে জল৷ ‘হ্যাঁ’ সূচক মাথা নাড়েন উনি৷
তারপর বলেন—
‘আমি রুমকিকে ঠকাতে চাইনি বিশ্বাস করো৷ আমি তো ওকেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম৷ হয়ত একটা কিছু ব্যবস্থাও করতাম, কিন্তু তার আগেই রুমকি এমন একটা কান্ড করে ফেলল! ওর ডেডবডিটা যখন নিয়ে গেল, আমি ওপরের ঘরের জানলা দিয়ে দেখেছি৷ একবারও কাছ থেকে শেষ দেখাটাও হয়নি৷ রুমকি কেন ভাবছে বলোতো, যে আমি ওর সাথে অন্যায় করেছি? ও কি দেখতে পাচ্ছে না যে কতটা খারাপ আছি আমি?’, ভদ্রলোকের দু’গাল বেয়ে জল পড়ছে৷
খারাপ লাগে জ্যোতিষ্কর৷ ওনার পাশে গিয়ে হাত রাখে সর্বেশ্বরবাবুর পিঠে, তারপর বলে,
‘আপনি চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে৷ আমাকে শুধু একটা শেষ প্রশ্নের জবাব দিন তো, রুমকি এখন যখন আপনার কাছে আসে, তখন কি আপনাকে কোনো কথা বলে? না এমনি দেখা দিয়ে চলে যায়?’
‘নাহ, বলে তো! রোজ বলে৷ ও আমাকে বলে যে আমাকে ছাড়বে না, দেখে নেবে আমাকে৷ আমাকে ওর কাছে নিয়ে যাবে৷ আচ্ছা জ্যোতিষ্ক, তুমি একটা কথা বলো আমাকে, ওর যদি আমাকে মেরে ফেলতেই হয়, তো ফেলুক! এমনভাবে তিলে তিলে মারার কি প্রয়োজন?’
সর্বেশ্বরবাবুর ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ওরা৷ ভদ্রলোক সত্যিই একটা অদ্ভুত অবস্থার মধ্যে রয়েছেন৷
সর্বেশ্বরবাবু ছাড়া ও বাড়ির কেউই আর জানতে পারেনি ওরা কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে৷ ওরা বাড়ি যাচ্ছে ভেবে রমেন ওদের ছেড়ে দিয়ে আসতে চেয়েছিল, কিন্তু রাজী হয়নি ওরা৷ তবে রমেন যে ওদের এই হুট করে চলে যাওয়াটা খুব একটা ভাল চোখে দেখেনি, সেটা জ্যোতিষ্ক বেশ বুঝতে পেরেছে৷ বাড়ির সকলে শুনেছিল যে পড়াশুনোর কারণে ওরা কলেজের খোঁজ করতে এসেছে৷ কিন্তু সর্বেশ্বরবাবুর অসুস্থ হয়ে পড়ার পর ওরা যেভাবে সকলের সঙ্গে কথাবার্তা বলল, বা বলা ভাল জেরা করল, তাতে সকলের সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক৷
সর্বেশ্বর ভৌমিক সকলকে বলেছিলেন যে ওরা নিছক কৌতূহলবশেই এই ভৌতিক ব্যাপারটায় আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে৷ ছোটবাবু বলেছিলেন জ্যোতিষ্ক যা জিজ্ঞেস করবে, সবাই যেন ঠিকঠাক জবাব দেয়৷ কেউ অগ্রাহ্য করেনি সেকথা৷ কিন্তু জ্যোতিষ্কদের আসল উদ্দেশ্য নিয়ে রমেনের মনে যে প্রথম থেকেই একটা সন্দেহ ছিল, সেটা জ্যোতিষ্ক আগাগোড়া টের পেয়েছে৷
আজ ওরা বেরোনোর সময়েও রমেন একবার ফাঁক বুঝে ওর পাশে এসে খুব আস্তে বলেছিল, ‘সত্যিই বাড়ি যাচ্ছেন তো আপনারা?’
জ্যোতিষ্ক কোনো জবাব দেয়নি, শুধু তাকিয়েছিল রমেনের দিকে৷ আর তাতেই রমেন যা বোঝার বুঝে নিয়েছিল৷ তাড়াতাড়ি বলে উঠেছিল—
‘না আপনারা বাড়ি গেলে আমি পৌঁছে দিয়ে আসতাম আর কি! আমি তো সারাদিন বসেই আছি!’
‘প্রয়োজন নেই’, ছোট্ট করে বলেছিল জ্যোতিষ্ক৷
ওকে আর কিছু প্রশ্ন করতে সাহস পায়নি রমেন৷ বাড়ি থেকে বেরোনোর পর ব্যাগ কাঁধে নিয়েই বেশ কিছুটা হেঁটে এল ওরা৷ জ্যোতিষ্ক বারবার লক্ষ্য রাখছিল আশেপাশে, ওর খালি কেমন যেন মনে হচ্ছিল যে কেউ ওদের দেখছে, ওদের ফলো করছে৷
সর্বেশ্বরবাবুর বলে দেওয়া রাস্তাতেই কার সার্ভিসে গিয়ে কথা বলে নির্দিষ্ট গাড়িতে উঠে বসল ওরা৷ সর্বেশ্বরবাবু আগেই বলে রেখেছিলেন, তাই অসুবিধে হয়নি বিশেষ৷ গাড়িতে উঠে রাজর্ষি কিছুক্ষণ পর জ্যোতিষ্কর দিকে তাকিয়ে বলল—
‘তুই কাল অত রাত অবধি জানলার কাছে দাঁড়িয়েছিলি কেন?’
‘তুই দেখেছিস?’, একগাল হেসে মুখ ঘোরায় জ্যোতিষ্ক৷
‘দেখেছি, শুধু তাইই নয়, তারপর দেখলাম ঘরের বাইরে গেলি, ফিরলি মিনিট পনেরো পর৷ জানতাম তখন জিজ্ঞেস করলে কিছু বলতিস না, উল্টোপাল্টা গল্প দিতিস৷ তাই তখন
কিছু বলিনি৷ এখন বলা যাবে কি?’, রাজর্ষির গলা শুনেই মনে হচ্ছে যে ও বেশ বিরক্ত৷
‘আমি জানলা দিয়ে রুমকিকে দেখলাম, তারপর মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল, তাই রুমকির
ছোটবেলার বন্ধুর কাছে তার গল্প শুনতে গেলাম’, এই বলে গাড়ির সিটে হেলান দিয়ে চোখ বোজে জ্যোতিষ্ক৷ রাজর্ষি স্পষ্ট বুঝতে পারল আর ওর মুখ দিয়ে একটা কথাও বের করতে পারবে না৷ জানলার দিকে মুখ ফেরাল ও৷
হাইওয়ে দিয়ে ছুটে চলেছে গাড়ি৷ কখন যে ওদের চোখটা লেগে গেছিল, কেউই টের পায়নি৷ ওদের গন্তব্যে পৌঁছনোর কথা বিকেল চারটে নাগাদ৷ এদিকে গাড়ির ঝাঁকুনিতে যখন ওদের দু’জনেরই তন্দ্রা ভাঙ্গল, ঘড়িতে তখন বেলা সাড়ে বারোটা৷ ওরা দেখল একটা ভাঙ্গাচোরা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ওদের গাড়ি৷
‘কি হল দাদা? এটা কোথায় এলেন?’
জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
ওর প্রশ্নের কোনো জবাব না দিয়েই গাড়ি থেকে নেমে যায় ড্রাইভার৷ সামনের সিটে এর মধ্যেই আরেকজন উঠে বসেছে কখন ওরা টের পায়নি৷ বোঝাই যাচ্ছে লোকটিকে ওদের পাহারায় বসিয়ে রাখা হয়েছে৷ লোকটিকে কিছু জিজ্ঞেস করেও বিশেষ লাভ হবে না, বুঝতে পারল জ্যোতিষ্ক৷ লোকটা বসে আছে রোবটের মত, কিন্তু চেহারা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে লোকটার গায়ে প্রবল শক্তি৷ ওরাও বসে রইল চুপচাপ৷
রাজর্ষির মুখ দেখেই মনে হচ্ছে বেশ ভয় পেয়েছে৷ ওর দিকে তাকিয়ে ইশারায় জিজ্ঞেস করতে চাইল এসব কি হচ্ছে? জ্যোতিষ্ক ওকে মুখে আঙ্গুল দিয়ে চুপ করে বসে থাকতে বলল৷ জ্যোতিষ্কর মুখ দেখে মনে হচ্ছে না ওর কোনো টেনশন হচ্ছে বলে৷ কিন্তু রাজর্ষি কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না৷
এভাবে কেটে গেল বেশ কিছুক্ষণ৷ আশেপাশে ফাঁকা মাঠ৷ গাড়িটা যে কোন জায়গায় এসেছে, ওরা সেটাও বুঝতে পারছিল না৷ তবে এটা ঠিক যে ওরা কোলকাতা থেকে খুব বেশি দূরে নেই৷ ওরা বরাহনগর থেকে বেলা দশটা নাগাদ বেরিয়েছিল৷ আড়াই ঘন্টায় খুব বেশিদূর আসা সম্ভব নয়৷ রাজর্ষি একবার ভাবছিল গাড়ি থেকে নেমে দৌড়বে কিনা, কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল জ্যোতিষ্ক আছে৷ ও নিশ্চয়ই এখন পালানোর কথা ভাবছে না৷ আর কোনো বিপদের মুখে ও জ্যোতিষ্ককে একা ফেলে কিছুতেই পালাতে পারবে না৷
অতএব অপেক্ষা করা ছাড়া ওদের সামনে আর কোনো রাস্তা নেই৷ ভীষণ রাগ হচ্ছে রাজর্ষির৷ জ্যোতিষ্কর পাকামোর জন্য আজ ওদের এই অবস্থা৷ কি দরকার ছিল এরকম একটা ব্যাপারে জড়ানোর! ও কি নিজেকে ফেলুদা বা ব্যোমকেশ ভাবছে নাকি? এখনও স্কুল পাশ করেনি ওরা, এর মধ্যেই যদি বড় কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে যায়, বেঁচে ফিরতে পারলেও কেরিয়ারটা তো মাটি হয়ে যাবে! মায়ের মুখটা মনে পড়ছিল রাজর্ষির৷ মা এসব জানতে পারলে আগে এসে দু’ঘা পিঠে দিয়ে দেবে, তারপর অন্য কথা৷ ওর বাড়ি থেকে একদম সায় ছিল না এই ব্যাপারটাতে এত জড়িয়ে পড়ায়৷ রাজর্ষি অনেকভাবে বুঝিয়েছে৷ ও বলেছিল যে ব্যাপারটা না মিটলে ও ঠিক এক সপ্তাহ পর ফিরে আসবেই, সে যাই হয়ে যাক৷
কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে ও আর কোনোদিন বাড়ি ফিরতে পারবে কিনা সন্দেহ! চোখটা কেমন যেন জ্বালা করে ওঠে রাজর্ষির৷ জ্যোতিষ্ক একইভাবে ভাবলেশহীন মুখে বসে আছে৷ কতক্ষণ ওইভাবে কেটে গেছে খেয়াল নেই ওদের, হঠাৎ ওরা দেখল একটু দূরে ভাঙা বাড়িটার মধ্যে থেকে বেরিয়ে এল এই গাড়ির ড্রাইভার ছেলেটি৷ গাড়ির দরজা খুলে দিয়ে ইশারায় নামতে বলল ওদের৷ দ্বিরুক্তি না করে নেমে পড়ল ওরা৷ ওর পিছন পিছন ওরা চলল বাড়িটার মধ্যে৷
বাড়িটা বাইরে থেকে দেখতে ভাঙাচোরা হলেও ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায় যে নিয়মিত ব্যবহার হয়৷ ওদের যেখানে নিয়ে গিয়ে বসাল, সেই ঘরে শুধু একটা চৌকি পাতা৷ ওদের ইশারায় চৌকিতে বসতে বলে বেরিয়ে গেল ড্রাইভার ছেলেটি৷
‘অদ্ভুত তো, বোবা তো নয়! কথা বলছে না কেন বল তো এরা তাহলে?’, চৌকির ওপর হাত-পা ছড়িয়ে বসে রাজর্ষিকে জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷ ওকে দেখে মনে হচ্ছে যেন কোথাও ছুটি কাটাতে এসেছে৷
‘জ্যোতিষ্ক, আমার মনে হয় এখানে কেউ কথা বলছে না কেন, সেটা না ভেবে আমরা এখন এখান থেকে কিভাবে পালাব সেইটা তোর ভাবা উচিৎ’, রাজর্ষির গলায় ক্ষোভ ঝরে পড়ে৷
‘যাববাবা, তুই এমন রেগে যাচ্ছিস কেন রে? তোর ভাল্লাগছে না? কি সুন্দর একটা থ্রিলিং ব্যাপার হচ্ছে বলতো, সেই যেমন থ্রিলার বইগুলোতে হয়৷ নয়ত এমনি এমনি গিয়ে যদি ভূতকে ধরে ফেলতাম, মজা হত নাকি? প্রতিপক্ষকেও তো একটুখানি বুদ্ধি ধরতে হবে নাকি? আমার তো বেশ মজা লাগছে’৷
‘এখানে যদি আমাদের মেরে ফেলে রেখে দিয়ে যায়, কাকপক্ষীতেও টের পাবে না, বুঝলি? তখন বেরিয়ে যাবে তোর থ্রিলিং অ্যাডভেঞ্চার’৷
‘আমাদের মারবে না বাবুয়া, তিষ্ঠ ক্ষণকাল!’
জ্যোতিষ্কর কথা শেষ হ’তে না হ’তেই ঘরে ঢোকে রমেন, সঙ্গে আরেকজন ভদ্রমহিলা৷ মহিলাটির ঘোমটায় মুখটা পুরো ঢাকা ছিল, তাই তাঁকে ঠিক চিনতে পারেনি ওরা৷ রাজর্ষি চমকে উঠেছিল রমেনকে দেখে, কিন্তু জ্যোতিষ্কর মধ্যে খুব একটা পরিবর্তন দেখা যায় না৷ যেন রমেনদার আসার ব্যাপারটা ওর জানাই ছিল৷
রমেনকে দেখে হেসে চৌকি থেকে উঠে দাঁড়াল ও— ‘আমি জানতাম তুমি আসবে’৷
‘অল্প বয়সে নিজেকে বেশি চালাক মনে করছ তো? কোরো না৷ বেশ তো ছিলে বাড়িতে স্কুল-লেখাপড়া নিয়ে, কেন এসব করতে গেলে বলো তো?’
‘কারণ সত্যিটা খুঁজে না পাওয়া অবধি আমার যে শান্তি হয় না রমেন দা! আমি হয়ত ব্যাপারটায় এতটা জড়াতাম না, কিন্তু তুমিই আমার জেদটা বাড়িয়ে দিয়েছ জানো তো?’
‘আমি?’
জ্যোতিষ্কর কথায় এবার যেন একটু অবাক হয় রমেন৷
‘হ্যাঁ তুমি৷ আমরা আসার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ঘরে চিরকুট লিখে ফেললে, ‘ফিরে যাও’ বলে৷ আমরা ফেলুদা দেখে বড় হওয়া বাচ্চা রমেন দা, আমাদের এত সহজে কি ফেরানো যায়? আর তাছাড়া আমার জেদটাও আরও বেড়ে গেল, যে এর শেষ দেখে ছাড়ব’৷
‘কিন্তু আমি তো কোনো চিরকুট দিইনি!’, ভীষণই অবাক হয় রমেন৷
সঙ্গে সঙ্গে ওর পাশে ঘোমটার আড়াল থেকে মেয়েটি বলে ওঠে, ‘আমি দিয়েছি’৷
‘আমাকে না জিজ্ঞেস করে কেন এসব পাকামো করিস তুই?’, রমেনের গলা শুনেই মনে হচ্ছে যে ও ভীষণ রেগে গেছে৷
‘আসলে ঝুমকি দি আমাদের গোয়েন্দা গল্প পড়েনি তো ছোট থেকে, তাই জানে না৷ এসব চিরকুট বা সাবধানবাণী তো আমাদের জেদ আরও বাড়িয়ে দেয়৷ আমি ওটা পেয়েই বুঝতে পারলাম, যে বাড়ির মধ্যেই কোনো প্ল্যান হচ্ছে৷ আমার সন্দেহ প্রথম থেকেই তোমার ওপর ছিল ঠিক কথাই, কিন্তু তোমার উদ্দেশ্যটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না রমেনদা৷ মনে হচ্ছিল তুমি কেন এসব করবে? কেন ঝুঁকি নেবে এতটা? দিব্যি তো আছো ভৌমিক বাড়িতে, কাজও তেমন নেই? অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছিলাম না৷ তারপরেই হঠাৎ একদিন মনে হল তোমার ব্যাপারে একটু খোঁজ নেওয়া উচিৎ, মানে তোমার বাড়ি কোথায়, সেইসব ব্যাপারে৷ তুমি আর আমি মোটামুটি একই লাইনে ভাবছিলাম, মানে আমি আসার পর তুমি আমার ভাবনাগুলোকে ঠিকঠাকই ধরতে পারছিলে, কিন্তু এখানেই তোমার ভাবনার থেকে একটু এগিয়ে গেছি আমি৷ তুমি ফেলুদা বা ব্যোমকেশের সময়ে আটকে আছো রমেন দা, কিন্তু এখন তো মোবাইল এসে গেছে৷ তোমার ব্যাপারে খোঁজ নেওয়ার জন্য আমাকে এখন নিজেকে বিষ্ণুপুর যেতে হবে কেন, আমি তো তোমার খোঁজ কবেই পেয়ে গেছি!
আমার মামা পুলিশ৷ মামা নিজে গিয়ে তোমাদের গ্রাম থেকে সব খোঁজখবর নিয়ে এসেছে৷ আসলে আমার প্রথম সন্দেহ হয় শ্যামলীদির কথায়৷ উনি বলে ফেলেছিলেন যে রুমকি-ঝুমকি ওনার জমজ সন্তান ছিল, কিন্তু ঝুমকি নাকি মারা গেছে৷ আমার তখনই একটা খটকা লেগেছিল৷ জীবিত সন্তানকে অত সহজে মৃত সাজিয়ে দিতে কোনো মা পারে না, তাঁর গলা কাঁপবেই, সে তোমরা তাঁকে যতই শিখিয়ে দাও৷ শ্যামলী মাসিও কায়দা করে বলে যে ঝুমকি ওনাকে ছেড়ে চলে যায়৷ চলে যায় বলতে ওপরে চলে যায়, সেটাই ধরে নেওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এইখানে আমার খটকা লাগে৷ মেয়ের মারা যাওয়ার কথা বলতে মায়ের চোখে জল আসবে না, উলটে কেমন যেন ভয় পাওয়া গলায় বলবে, এমন আবার
হয় নাকি!’, জ্যোতিষ্ককে হঠাৎ থামতে হল বাইরে অনেকগুলো গাড়ির হর্ন শুনে৷
জানলা দিয়ে মুখ বাড়াল রাজর্ষি৷ বেশ কয়েকটা পুলিশের জীপ এসে দাঁড়িয়েছে বাড়িটার সামনে৷ সামনের জীপটা থেকে নামলেন সর্বেশ্বরবাবু৷ ওনার সঙ্গে বেশ কয়েকজন
উর্দিপরা পুলিশ ঢুকে এলেন বাড়ির ভেতরে৷
‘সর্বেশ্বরবাবু এসে গেছেন, উনি আসলেই না হয় পুরোটা বলি আমি?’, বলে জ্যোতিষ্ক৷
রমেন ধপ করে বসে পড়ে চৌকির ওপর৷ ওকে কেমন যেন বিধ্বস্ত লাগছে৷
‘জ্যোতিষ্ক, কিসব বলছিস তুই, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না! আমি তো কোনো চিরকুট দেখিনি?’, এতক্ষণ চুপ করে থাকার পর বলে ওঠে রাজর্ষি৷
‘আমি ইচ্ছে করেই দেখাইনি তোকে৷ কারণ আমি জানতাম তুই দেখলেই ভয় পেয়ে যাবি, ফিরে যেতে চাইবি৷ তাই তোর চোখে পড়ার আগেই লুকিয়ে ফেলেছিলাম’৷
ওদের কথার মাঝখানেই ঘরে ঢুকে আসেন সর্বেশ্বরবাবু৷ পিছন পিছন আসেন পুলিশের দু’জন অফিসার, সাধন দা আর শ্যামলী দি৷ ঘরে ঢুকেই জ্যোতিষ্ককে দেখে বলে ওঠেন উনি— ‘আমি দেরি করে ফেলিনি তো জ্যোতিষ্ক?’
‘না না কাকু, আপনি একদম ঠিক সময়ে এসেছেন৷ আমি আপনার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম৷ আপনারা সকলেই হয়ত কম-বেশি পুরো ব্যাপারটা জানেন, তাও আমি আরেকবার বলছি পুরোটা৷
সর্বেশ্বরবাবু যখন প্রথম আমার বাড়িতে আসেন, তখন শুধু এটুকুই বলেছিলেন যে ওনার বাড়িতে ভূতের উপদ্রব শুরু হয়েছে হঠাৎ, আমাকে এর পিছনের সত্যিটা খুঁজে বের করতে হবে৷ সত্যি বলতে কি, বিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ার সুবাদে কোনোদিন এসব ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করিনি৷ আমার স্থির বিশ্বাস ছিল যে কেউ ইচ্ছা করে ভয় দেখাচ্ছে সর্বেশ্বর বাবুকে৷ কিন্তু ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যটা বুঝতে পারছিলাম না৷ ওনার অনেক সম্পত্তি, কাজেই মালিকানা নিয়ে যদি কারোর সাথে বিরোধ থেকে থাকে, তাহলে এরকম উপদ্রব হলেও হতে পারে৷ কিন্তু এ বাড়িতে এসে যা শুনলাম, এই সম্পত্তির তেমন কোনো দাবীদার নেই৷ অতএব ভয় দেখানো হচ্ছে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে৷ তখনও আমি জানতাম না রুমকির ব্যাপারটা, অনেকগুলো বিষয় তাই তখন হাতড়ে বেড়াচ্ছিলাম৷ সর্বেশ্বরবাবু আমাকে বিস্তারিত
জানানোর পর ঠিক করলাম বাড়ির সকলের সঙ্গে আমি কথা বলব৷
সর্বেশ্বরবাবুর বন্ধুর ছেলের পরিচয়ে এ বাড়িতে আসলেও আমি যে নিছক পড়াশুনোর প্রয়োজনে আসিনি ওই বাড়িতে, ততদিনে সেটা রমেনদা ও আরও অনেকে সন্দেহ করেছেন আমি জানতাম৷ সর্বেশ্বরবাবু অসুস্থ হওয়ার দিন পাছে উনি উত্তেজিত হয়ে আমাকে আরও কিছু বলে ফেলেন, তাই সেদিন ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে ওনার ঘরে যেতে দেওয়া হল না৷ আমি আন্দাজ করেছিলাম, তাই আর জোর করিনি৷ তাতে ওদের সন্দেহ আরও বাড়ত৷
কিন্তু পরদিন সকালে সবটা ঘুরে গেল৷ আমি সর্বেশ্বরবাবুর কাছ থেকে শুনলাম আগেকার সব ঘটনা৷ একবার আমার মনে হয়েছিল রুমকি হয়ত মারা যায়নি৷ হয়ত অনেকদিন পর ফিরে এসে এখন ওনাকে ভয় দেখিয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু তারপর শুনলাম সর্বেশ্বরবাবু তখন নাকি ওপরের ঘর থেকে দেখেছিলেন রুমকির মৃতদেহ নিয়ে যেতে৷ আর উনি এখন যাকে দেখছেন, সেও রুমকি৷ রুমকিকে চিনতে ওনার ভুল হবে না৷
এইখানটায় একটু ঘাবড়ে গেছিলাম আমি৷ আমি বুঝতে পারছিলাম না কিভাবে ব্যাপারটা সম্ভব৷ ভূত বা অলৌকিক কিছুতে কোনোদিনই আমার বিশ্বাস নেই৷ আমি নিজে যা চোখে দেখি বা কানে শুনি, সেটাই বিশ্বাস করি৷ তাই এক্ষেত্রে সেই মুহূর্তে একটু ধন্দে পড়ে গেছিলাম৷ ভাবার চেষ্টা করছিলাম কি হ’তে পারে৷ সেইজন্যেই ওই বাড়ির বাকি মানুষগুলোর সাথে, অর্থাৎ যারা কাজের জন্য বহুদিন ধরে আছেন, তাঁদের সাথে কথা বলতে চাইলাম৷ যদি অন্ধকারটা একটু কাটে! আর ঠিক তাই হল৷ আমার সব ধন্দের অবসান ঘটালেন শ্যামলী দি৷
উনি আমাকে জানালেন যে রুমকির নাকি একটা জমজ বোন ছিল, যে জন্মের পরেই ওনাদের ছেড়ে চলে যায়৷ এদিকে সর্বেশ্বরবাবু আমাকে বলেছিলেন যে সাধন দা সন্তান হওয়ার পর শ্যামলী বৌদি আর রুমকিকে নিয়ে ফিরে আসেন কোলকাতায়৷ তাহলে রুমকির জমজ বোনের কি হল? এখানে একটা কথা খেয়াল করবেন সবাই, আমাকে শ্যামলী দি বলেছিলেন ঝুমকি, অর্থাৎ রুমকির জমজ বোন জন্মের পর ওনাদের ছেড়ে চলে গেছিল৷ উনি কিন্তু একবারও বলেননি যে ঝুমকি মারা গেছিল৷ এই কথাটা আমার কানে খট করে লাগে৷ আমি কায়দা করে পরে খাওয়ার সময় শ্যামলীদির থেকে জেনে নিয়েছিলাম ওদের বাড়ি কোথায়, কিভাবে যেতে হয়৷ শ্যামলীদি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছিল সব৷ আমি বলেছিলাম গ্রামে গেলে একদিন যাব ওনাদের বাড়ি৷
সেই মুহূর্তেই আমি মামাকে জানাই ওই এলাকায় কাউকে দিয়ে খবর নেওয়াতে যে ঝুমকির কি হল৷ মামার পুলিশের চাকরির সুবাদে সব জায়গাতেই কম বেশি চেনাজানা আছে৷ সেই চেনাজানা, এবং তাঁদের পরিচিতের সূত্র ধরে কয়েকঘন্টার মধ্যে ঝুমকির খবর পেলাম আমি৷
জন্মের পরেই ঝুমকিকে দত্তক নেন ওঁর জ্যেঠু এবং জ্যেঠিমা, অর্থাৎ সাধনবাবুর দাদা এবং বৌদি৷ শ্যামলী দি চাননি, কিন্তু স্বামী জোর করায় আপত্তি করতেও পারেননি শেষ পর্যন্ত৷ সাধনদার দাদা-বৌদি নিঃসন্তান ছিলেন৷ ঝুমকিকে পেয়ে ওনারা যেন প্রাণ ফিরে পেলেন৷ অত্যন্ত যত্নে মানুষ করেন মেয়েকে৷ রুমকির থেকে একটু বেশিই আদর-যত্নে বড় হয়েছিল ঝুমকি৷
ঝুমকির যখন বছর পাঁচেক বয়স, তখন ওর ভাই হয়৷ সন্তান হয় সাধনবাবুর দাদা-বৌদির৷ ঝুমকির জ্যেঠিমার মনে একটা ধারণা হয় যে ওই মেয়ের জন্যেই তাঁর ছেলে এসেছে৷ মেয়ে তাঁর লক্ষ্মী৷ ফলে মেয়ের আদর আরো বেড়ে যায়৷ ঝুমকি বা তার ভাই, কেউই জানত না যে ওরা খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাইবোন৷ প্রথম জানতে পারে রুমকি মারা যাওয়ার পর৷ সাধনবাবু আর শ্যামলী বৌদি গ্রামে গিয়ে সব কথা জানান ওদের৷ মেয়ের মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি ওনারা৷ ঝুমকিও তখন বড় হয়েছে৷ সবটা জেনে ওর মধ্যেও প্রতিশোধ নেওয়ার তীব্র একটা ইচ্ছে হতে থাকে৷ এতদিন ও দেখে এসেছে যে রুমকি আর ওকে একেবারে একরকম দেখতে৷ সেই মেয়ে যে ওর জমজ বোন জানত না৷ দূরে থাকলেও ওদের দুজনের মধ্যে ভীষণ টান ছিল৷ রুমকি হঠাৎ মারা যাওয়ার পর যখন ঝুমকি সত্যিটা জানতে পারল, তখন ও কথা দেয় সাধনবাবু আর শ্যামলীদিকে যে বোনের মৃত্যুর প্রতিশোধ ও নেবে৷ তক্ষুনি না হলেও নেবেই৷
এরপর ঝুমকির বিয়ে হয়ে যায়৷ কিন্তু কপালের ফেরে বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই মারা যায় ওর স্বামী৷ আবার বাপের বাড়িতে ফিরে আসে মেয়ে৷ ঝুমকির জ্যেঠিমা যেহেতু ছোট্ট থেকে মেয়েকে কোলেপিঠে করে মানুষ করেছেন, ওনার অন্যরকম মায়া ছিল মেয়ের প্রতি৷ ঝুমকিকে আর শ্বশুরবাড়ি ফিরতে দেননি উনি৷ এদিকে ততদিনে ঝুমকির ভাইও
বেশ বড় হয়েছে৷ ভাইবোনে মিলে সিদ্ধান্ত নেয় রুমকির জন্যে এবার কিছু করবে৷
ওদের প্ল্যানের কথা যদিও তখনও ওদের বাড়ির লোক জানতেন না৷ প্ল্যানমাফিক আগে কোলকাতায় আসে ঝুমকির ভাই৷ কাজ নেয় ভৌমিকদের সোনার দোকানে৷ একটু একটু করে মালিকপক্ষের নজরে আসার চেষ্টা করে৷ পড়াশুনো তেমন না জানলেও ছেলেটির ব্যবহার এবং কথাবার্তায় খুব সহজেই ওকে আপন করে নেন সর্বেশ্বরবাবু৷ ছেলেটির প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল সর্বেশ্বরবাবুর বাবার ওপর প্রতিশোধ নেওয়া৷ কিন্তু তিনি হঠাৎই একদিন মারা যাওয়ায় ‘টার্গেট’ বদলে যায় সর্বেশ্বরবাবুর ওপর৷ এখানে খুব বুদ্ধির সঙ্গে ছক সাজিয়েছিল রমেনদা, তাই না?’
এতক্ষণ সবাই একমনে জ্যোতিষ্কর কথা শুনছিল৷ ওর মুখে রমেনের নামটা শোনার পর অবাক দৃষ্টিতে রমেনের দিকে তাকান সর্বেশ্বরবাবু৷ তখন দু’হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে নিয়েছে রমেন৷
‘মানে এটা কি হল? রমেন ঝুমকির ভাই?’, সর্বেশ্বরবাবুর গলায় এখনো অবিশ্বাস স্পষ্ট৷
‘আজ্ঞে হ্যাঁ কাকু৷ শুধু তাই নয়, রমেনের পাশে যে মেয়েটি বসে আছে, সে হল রুমকির জমজ বোন ঝুমকি৷ আপনি ওর মুখটা দেখলেই বুঝতে পারবেন৷ এদের পরিবারের খবর মামা আমাকে দিয়েছিলেন, কিন্তু আমি নিজে ঝুমকিকে কখনো দেখিনি, সেই প্রথমদিন ছাড়া৷
কাল হঠাৎ শুয়ে পড়ার পর একটা আওয়াজ পেলাম বাগানের দিক থেকে৷ আমি ঘরের আলো নিভিয়ে চুপিচুপি গেলাম জানলার কাছে৷ দেখলাম ঝুমকিকে, কথা বলছে রমেনের সাথে৷ আপনার কাছে রুমকির আগে একটা ছবি দেখছিলাম৷ ঐ অন্ধকারেও তাই বুঝতে অসুবিধে হল না যে দু’জনকে দেখতে প্রায় এক৷ কাজেই সর্বেশ্বরবাবুর ভুল হওয়া কিছু অসম্ভব নয়৷
ওদের সম্ভবত প্ল্যান ছিল রাত্রে ঘুমের মধ্যে কোনোভাবে আপনার ওপর হামলা করবে৷ তবে ওরা আপনাকে খুন করতে চায়নি৷ ঝুমকি চেয়েছিল আপনি রুমকির মত কষ্ট পেয়ে একটু একটু করে মারা যান৷ সারাদিন শ্যামলী দির ঘরে লুকিয়ে থাকত ও৷ সাধন দা, শ্যামলী দি আর রমেন নিজেদের থেকে কিছুটা খাবার বাঁচিয়ে ঝুমকিকে খাওয়াত৷ বামুন
দিদিও এই কয়েকমাসে টের পায়নি ঝুমকির অস্তিত্ব, সেখানে সর্বেশ্বরবাবু তো ওপরে থাকেন!
সারাদিন ঘরের মধ্যে লুকিয়ে থেকে সন্ধের পর বেরোত ও৷ সর্বেশ্বরবাবুর ঘরে গিয়ে দেখা দিয়ে আসত৷ এমনভাবে ঘুরে বেড়াত যেন ও অশরীরি৷ সর্বেশ্বরবাবু যেহেতু ঝুমকির অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনোদিনই জানতেন না, তাই উনি ভয় পেয়ে গেলেন৷ আর সেই ভয় এমনই মারাত্মক হয়েছিল যে উনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বাধ্য হয়ে আমার সাহায্য নেন৷
আমাকে বা রাজর্ষিকে প্রথমে ভৌমিক ভিলায় কেউই বিশেষ ধর্তব্যের মধ্যে নেননি, শুধু রমেনদা আর ঝুমকিদি ছাড়া৷ কিন্তু আমি যখন জেরা করা শুরু করলাম সবাইকে এবং সর্বেশ্বরবাবু বললেন সবাইকে আমার সঙ্গে সহযোগিতা করতে, তখন সন্দেহ হয় সবার, যে আমরা সত্যিই পড়াশুনোর কারণে এসেছি তো?
আমি ইচ্ছে করেই বিষ্ণুপুর যাওয়ার কথাটা তুলেছিলাম৷ আমি জানতাম রমেনদা এত সহজে আমাকে যেতে দেবে না৷ আর কথাটা সর্বেশ্বরকাকুকে গোপন রাখতে বললেও আমি জানতাম রমেনদার কানে খবর যাবেই৷ আমি রমেনদাকে দেখেছি এর আগেও ওই কার সার্ভিসে গিয়ে গল্প করতে৷ কাজেই ওখান থেকে গাড়ি নিলে ওর পক্ষে যে আমাদের হাইজ্যাক করা সম্ভব হবে, সেটাও জানতাম৷ আমি এই পরস্থিতিরই অপেক্ষা করছিলাম৷ বিষ্ণুপুর না গিয়েও আমি ওখানকার সব খবর পেয়ে গেছি৷ গাড়িতে উঠে আমি মামাকে হোয়াটসঅ্যাপে আমার লাইভ লোকেশন শেয়ার করে দিয়েছিলাম৷ মামা আমার হাফ কিলোমিটার পিছনে আসছিল৷ আমি বলেছিলাম কোনো সময় আমার লোকেশন শেয়ার যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে মামা যেন তক্ষুনি চলে আসেন শেষ ট্রেস করা জায়গায়৷
আমার কথামতই মামা আসার আগে সর্বেশ্বরবাবুকে তুলে নেন গাড়িতে৷ আর এই টেকনোলজির মঙ্গলেই আজ আমরা এখানে, এত সহজে মিটে গেল সবকিছু৷ রমেনদা গল্পের বই পড়ত, বিশেষ করে ডিটেক্টিভ গল্পের বই৷ সেইমতই প্ল্যান করেছিল সবকিছু৷ শুধু ভুলে গেছিল যে এখন টেকনোলজির জন্য আমাদের সুবিধে অনেক৷ গাড়িটা হাইজ্যাক করাতে পেরেছিল ও সহজেই, কিন্তু আমার মোবাইলটা আমার কাছেই রয়ে গেছিল৷ ফলে
শেষরক্ষা হল না’, থামল জ্যোতিষ্ক৷
ঘরে উপস্থিত পুলিশ অফিসারটি এগিয়ে এলেন রমেনের দিকে, ওকে অ্যারেস্ট করার জন্যে৷ আর ঠিক তখনই বাধা দিলেন সর্বেশ্বরবাবু—
‘দাঁড়ান অফিসার, ওদের অ্যারেস্ট করবেন না প্লিজ! ওরা কিছু করেনি৷ রুমকির চলে যাওয়াটা আমি আজও মেনে নিতে পারিনি, আর সেখানে রুমকি তো ওদের বোন ছিল! যা হয়েছে ভুলে যান, ওদের কোনো দোষ নেই’, বলেন সর্বেশ্বরবাবু৷
রমেন আর ঝুমকির চোখে একটা অদ্ভুত অবাক ভাব ফুটে ওঠে৷ এত অপরাধ করার পরেও সর্বেশ্বরবাবু যে ওদের এভাবে ছেড়ে দেবেন, কেউই ভাবতে পারেনি৷
জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি বেরিয়ে আসে বাড়িটা থেকে৷ এবার সত্যি সত্যিই ওদের বাড়ি ফিরতে হবে৷ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাটা এসে গেল বলে৷ এইসব গন্ডগোলকে বিশেষ ভয় না পেলেও মাকে ভীষণ ভয় পায় জ্যোতিষ্ক৷ ও জানে রেজাল্ট খারাপ হলে মা ওর কি ভয়ানক হাল করতে পারে৷ এখন এই শেষ ক’দিন আর পড়াশুনো ছাড়া কোনোদিকে নজর দেওয়া যাবে না৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন