মৌমিতা ঘোষ
‘আমি জাস্ট ভাবতেই পারছি না রাজর্ষি, তুই কি করে এই অসম্ভবকে সম্ভব করলি বল তো? মানে এখনও আমার বিশ্বাস হচ্ছে না৷ মা সত্যি সত্যিই তোকে পারমিশন দিয়ে দিল? কি বলেছিলিস বল তো তুই মাকে ঠিক?’ , জ্যোতিষ্কের গলায় এখনও বিস্ময়৷
ওরা হাওড়া থেকে সকাল সকাল ট্রেন ধরেছে৷ রাজর্ষির বাবা এসে ওদের ট্রেনে তুলে দিয়ে গেছেন৷ বর্ধমান স্টেশনে পিসেমশাই দাঁড়িয়ে থাকবেন৷ জ্যোতিষ্ককে মা যথিরীতি নিজের মোবাইলটা সঙ্গে দিয়ে পাঠিয়েছেন৷ তবে মা যে ছাড়বে ওকে, সেটাই ও ভাবতে পারেনি৷ মনসা পুজো উপলক্ষ্যে ওরা দু’জনে রাজর্ষির পিসির বাড়ি যাচ্ছে৷ ওর পিসির বাড়িতে মনসা মন্দির আছে৷ প্রতি বছর আষাঢ় মাসে সেখানে বড় করে মনসা পুজো হয়৷ শুধু তাই নয়, এই পুজো উপলক্ষ্যে একটা মেলাও বসে ওখানে৷ রাজর্ষি ছোটবেলায় বেশ কয়েকবার গেছে, ইদানীং আর স্কুলের চাপে যাওয়া হয় না৷ এবারে রাজর্ষির পিসি অনেক করে ওকে বলেছেন যেতে৷ তাই রাজর্ষি জ্যোতিষ্কর বাবা-মায়ের কাছে এসে আর্জি জানায় ওর বন্ধুকে নিয়ে যাবে বলে৷
মা প্রথমে রাজী হননি কিছুতেই৷ ইদানীং মায়ের মনে একটা ভয় ঢুকে গেছে যে জ্যোতিষ্ককে একা কোথাও ছাড়লেই ও কোনো ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে৷ আজকাল রোজ সকালে উঠেই এক কথা বলতে থাকে মা— ‘বাবু, কোনো গন্ডগোলে যাবে না’, ‘রাস্তায় যদি কোনো ঝামেলা দ্যাখো, সরে আসবে সেখান থেকে’, ‘অপ্রয়োজনীয় কথা বলবে না কারো সাথে’, ‘কেউ কিছু দিলে খাবে না’ , জ্যোতিষ্কর সামনের জানুয়ারীতে আঠেরো পূর্ণ হবে৷ ও মাঝে মাঝে ভাবে যে মা কি ভুলে যায় যে ওর বয়সটা আর পাঁচ নয়!
রাজর্ষি তাই প্রথম যখন ওকে বলেছিল ওর পিসির বাড়ি যাওয়ার কথা, ও বারণই করে দিয়েছিল৷ মা যেতে দেবে না মোটামুটি নিশ্চিত ছিল ও৷ কিন্তু তাও জেদ ধরেছিল রাজর্ষি, ‘আমি বলব কাকিমাকে, তুই প্লিজ না করিস না!’
‘আরে আমি না করার কে! মা-ই বারণ করে দেবে, তুই যা না বলতে’ , আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেছিল জ্যোতিষ্ক৷
‘ঠিক আছে, সেটা আমি বুঝে নেব কাকিমার সাথে’৷
সেদিন স্কুলের পরেই জ্যোতিষ্কর সঙ্গে ওর বাড়ি এসেছিল রাজর্ষি৷ ওরা অনেক ছোট থেকে বন্ধু৷ মা রাজর্ষিকে এমনিতে খুব ভালবাসেন৷ তবু সেদিন জ্যোতিষ্কর মন বলছিল, কিছু অশান্তি হতে পারে৷ কিন্তু রাজর্ষি যে কি জাদু করেছিল কে জানে! মিনিট পাঁচেকের জন্য মায়ের সঙ্গে আলাদা কথা বলতে গেল, আর মাকে রাজি করিয়ে ফেলল!
‘বাবু, রাজর্ষি যখন এত করে বলছে, ওর সাথে ঘুরেই আয় দু’দিন!’
বলেছিল মা৷
জ্যোতিষ্কর ট্রেনে উঠেও যেন বিশ্বাস হচ্ছে না৷ এর আগে অনেকবার ও রাজর্ষিকে প্রশ্নটা করেছে, যে ও ঠিক কি বলেছিল মাকে৷ কিন্তু প্রতিবারই রাজর্ষি এড়িয়ে গেছে ওকে৷ এখন আবার প্রশ্নটা করতে রাজর্ষি ঘুরে বসলো ওর দিকে, তারপর বলল—
‘শোন, আমি কিন্তু কাকিমাকে কথা দিয়েছি যে তুই ওখানে গিয়ে আমার সাথে সাথে থাকবি, কোনো ঝামেলায় জড়াবি না৷ সেই শর্তেই কিন্তু ছেড়েছে কাকিমা৷ তুই যদি ওখানে গিয়ে একটা বেয়াদপি করিস, তাহলে কিন্তু সেই মুহূর্তে তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব শেষ, এই বলে রাখলাম!’
‘অদ্ভুত! এমন কথাবার্তা বলছিস যেন আমি যেচে ঝামেলায় জড়াই!’ , নিরুত্তাপ গলায় বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘না না না, তুই যেচে জড়াবি কেন! সমস্যা তো পায়ে হেঁটে এসে তোর গলা জড়িয়ে ধরে আদর করে৷ শান্তিনিকেতন থেকে তো রাতুলবাবু অ্যাপয়েন্ট করেছিল তোকে! তারপর শেফালী কাকিমা তো জানতই যে ফেলু মিত্তির তাঁর বাড়ির পাশেই থাকেন!
হুহ, যত্তসব!’ একটু রাগের গলায় বলে রাজর্ষি৷
‘আরে বাবা রাগ করছিস কেন! আচ্ছা, তুই সত্যি করে বলতো, তোর ভাল লাগেনি সত্যিটা সামনে আসাতে? চোখের সামনে কোনো অন্যায় হতে দেখলে চুপ করে থাকা যায়?’ রাজর্ষিকে বোঝানোর চেষ্টা করে জ্যোতিষ্ক৷
‘দ্যাখ জ্যোতিষ্ক, তুই ভুলে যাচ্ছিস যে আমরা এখনও স্কুলে পড়ি৷ আমরা এতটাও বড় হয়ে যাইনি যে নিজেরা সবটা বুঝে নিতে পারব৷ তুই যদি ওইসব করতে গিয়ে কোনো বিপদে পড়তিস, তাহলে কি হত ভেবে দেখেছিস একবারও? সেই তো তখন বাবা-মার সাহায্য নিতে হত!’
‘ওরম কিছু হয় না৷ সত্যের জন্যে লড়াই করলে কিচ্ছু খারাপ হয় না’৷
রাজর্ষি বুঝতে পারে যে এ ছেলেকে বুঝিয়ে লাভ নেই৷ বাকি রাস্তাটা আর কোনো কথা হয়না ওদের মধ্যে৷ স্টেশনে রাজর্ষির পিসেমশাই নিতে এসেছিলেন ওদের৷ জ্যোতিষ্কর এই দ্বিতীয়বার এখানে আসা৷ প্রথমবার অবশ্য এসেছিল খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে, পিসির বাড়িতে একটুও বসার সময় পায়নি৷ এবারে ভাল করে দেখার সুযোগ হল চারদিকটা৷ বেশ একটা গ্রাম গ্রাম ভাব আছে বাড়িটার চারদিকে৷ পিসিদের যৌথ পরিবার৷ পুরোনো দিনের বিরাট বাডিতে একসঙ্গে থাকেন প্রায় চব্বিশজন সদস্য৷ পিসেমশাইয়ের বাবা, মা ,ওরা তিন ভাই, তাঁদের স্ত্রী আর সবার দুটি করে ছেলেমেয়ে, অর্থাৎ মোট চোদ্দজন৷ এছাড়া পিসেমশাইয়ের দুই কাকা, তাঁদের স্ত্রী, মেজো কাকার দুই ছেলে ও ছেলের বৌ এবং দু’জন কাজের লোক, সব মিলিয়ে চব্বিশজন থাকেন বাড়িতে৷ ছোট কাকা নিঃসন্তান৷ পিসেমশাইয়ের মেজো কাকার এক নাতি চাকরিসূত্রে কোলকাতায় থাকে৷ এই পুজোর সময় বাড়ি এসেছে৷ এছাড়া তাঁর এক নাতনির বিয়ে হয়েছে বর্ধমান টাউনে৷ তারও আসার কথা পুজোতে৷ সব মিলিয়ে বাড়িতে একটা বেশ জমজমাট পরিবেশ৷
রাজর্ষি আর জ্যোতিষ্ক গিয়ে পৌঁছতেই সবাই ওদের নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ল, যে ভারি অস্বস্তি হ’তে লাগল জ্যোতিষ্কর৷ ওদের দু’জনকে একটা আলাদা ঘর দেওয়া হল থাকার জন্যে৷ ঠাকুরের পুজো পরদিন৷ বাড়িতে লোকজন আসতে শুরু করেছেন৷
গোটা বাড়িটা আলো, ফুল দিয়ে সাজানো চলছে৷ খুব ভাল লাগছিল জ্যোতিষ্কর৷ মনে হচ্ছিল যেন দুর্গাপুজো এসে গেছে৷ মনসা পুজো যে এত ঘটা করে হয়, ওর ধারণা ছিল না৷
এতটা রাস্তা এসেছে ওরা ভোরবেলা বেরিয়ে, ক্লান্ত ছিল বেশ৷ দুপুরবেলা খেয়ে উঠে ঘুমিয়ে পড়েছিল ওরা দু’জনেই৷ আর বিকেলবেলা ওদের ঘুমটা ভাঙ্গল চেঁচামেচিতে৷
পিসির শ্বশুরবাড়িতে বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত এই মনসা মন্দির৷ দাদু, অর্থাৎ পিসেমশাইয়ের বাবা বলেন তিনিও নাকি জন্মের পর থেকেই দেখে আসছেন এই মনসা পুজো৷ আর এই পুজোর এক অন্যতম অলংকার হল ঠাকুরের সোনার সাপ৷ সারা বছর এই সাপ রাখা থাকে পিসিদের বাড়ির সিন্দুকে৷ শুধু এই পুজোর সময়েই বের করা হয় সেটা৷ পুজোর দু’দিন মায়ের মূর্তির গায়ে থাকে এই সোনার সাপ, তারপর আবার সেটি যথাস্থানে, অর্থাৎ সিন্দুকে রেখে দেওয়া হয়৷ বরাবর চলে আসছে এই রীতি৷ পিসেমশাইয়ের বাবা-মায়ের ঘরে পেল্লায় সাইজের এক সিন্দুকে রাখা থাকে এই সাপ৷
কাল পুজো, আজ তাই বিকেলবেলা ঠাকুমা, মানে পিসির শাশুড়িমা বের করতে গেছিলেন সাপটা সিন্দুক থেকে৷ কিন্তু সিন্দুক খুলেই চিৎকার করে মাটিতে বসে পড়েন তিনি৷ সিন্দুকের মধ্যে যে পিতলের থালার ওপর সাপটা বসানো থাকত, সেই থালাটা ফাঁকা৷ অর্থাৎ সাপ নেই সিন্দুকে!
খবরটা বাইরে বেরোনোর সাথে সাথেই শুরু হয়ে গেছে চিৎকার চেঁচামেচি, কান্নাকাটি৷ সকলে একের পর এক প্রশ্ন করে চলেছে ঠাকুমাকে৷ আসলে সিন্দুকের চাবি যে ঠাকুমার
আঁচলেই বাঁধা থাকত! আর ওই সিন্দুকে সাপ ছাড়া থাকত কিছু পুরোনো রূপোর কয়েন,
যেগুলো দাদু পয়লা বৈশাখের সময় বের করেন হলুদ-সিঁদুর মাখানোর জন্যে৷ সেইদিনই পুজোর পর আবার যথাস্থানে ফিরে যায় তাঁরা৷ বছরের এই দু’টি বিশেষ দিন ছাড়া সিন্দুক খোলাই হয় না প্রায় বলতে গেলে৷ চাবিও সবসময় ঠাকুমার আঁচলেই বাঁধা ছিল৷ এই বছর পয়লা বৈশাখের দিন যখন সিন্দুক খোলা হয়েছিল, তখনও নাগরাজ ছিলেন যথাস্থানে৷ তাহলে কবে যে ওই সাপ তাঁর সিংহাসন ছেড়ে চলে গেল, কেউ বুঝতে পারছে না৷
ঠাকুমা তো সেই তখন থেকে একনাগাড়ে কেঁদেই চলেছেন৷ তাঁর ধারণা এবার মা মনসার কোপে বড় কোনো বিপদ ঘনিয়ে আসতে চলেছে বাড়িতে৷ বাড়ির অন্যান্য সদস্যরাও বুঝতে পারছেন না কি করবেন৷ এমন একটা জিনিস হারিয়েছে, সেটা অন্যান্য জায়গায় খুঁজলেও পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে৷ উদ্দেশ্যহীন চেঁচামেচিতে তাই প্রথমে ভরে উঠেছিল বাড়ি৷ আর তখনই ঘুম ভেঙ্গে যায় জ্যোতিষ্কদের৷ ও এমনিতে দুপুরে ঘুমোয় না, কিন্তু ক্লান্তি আর ভরপেট খাওয়া অনুঘটকের কাজ করেছিল৷ গাঢ় ঘুমিয়ে পড়েছিল জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি দু’জনেই৷
চেঁচামেচিতে যখন ওদের ঘুম ভাঙ্গল, প্রথমটায় বুঝতে পারেনি কি হচ্ছে৷ বাড়িতে পুজো উপলক্ষ্যে অনেক আত্মীয়স্বজন এসে গেছেন, এমনিতেই গমগম করছিল বাড়িটা৷ তারওপর এতজনের চেঁচামেচিতে কেউ কারোর কথা আর বুঝতে পারছে না৷
‘কার এত বড় সাহস হবে বল তো ওই জিনিসে হাত ছোঁয়ানোর!’ ‘এত লোভ! পাপের ভয় নেই?’ ‘চাবি তো সবসময় মায়ের কাছেই থাকে, সিন্দুকটা খুলল কখন!’ , এরকম হাজারো টুকরো কথা ভেসে আসছিল ওদের কানে৷ কি করবে বুঝতে না পেরে ওরা সোজা চলে এসেছিল পিসির ঘরে৷ কিন্তু পিসি তখন ঘরে ছিল না৷ ঘর থেকে বেরোতেই বারান্দায় দেখা হয়েছিল পিসির বড় জায়ের মেয়ে কাজলদির সাথে৷ কাজলদির নভেম্বরে বিয়ে৷ বাড়িতে সারাক্ষণ ওইসব নিয়েই আলোচনা চলছে আজকাল৷ বিয়ের আগে এটা ওর শেষ মনসা পুজো৷ আর সেখানে এরকম একটা দুর্ঘটনা ঘটায় মুখ কালো করে ঘুরছিল মেয়েটা৷ জ্যোতিষ্করা তখনও বুঝতে পারেনি ঠিক কি হয়েছে৷ কাজলদিকে সামনে পেয়ে ওকেই ধরেছিল ওরা, ‘কাজলদি, কি হয়েছে গো? সবাই এরকম কান্নাকাটি, চেঁচামেচি করছে কেন?’
কাজলদি ওদের বলেছিল পুরো ব্যাপারটা৷ এমনকি এও বলেছিল যে সাপটা না পাওয়া
গেলে পুজো কি করে হবে সেই নিয়েও সংশয় তৈরী হয়েছে৷
যে কোনো ঘটনারই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া তীব্র হয়৷ তারপর আস্তে আস্তে ধামাচাপা পড়তে শুরু করে সেটা৷ সময় মানুষের মৃত্যুশোক ভুলিয়ে দেয়, আর এক্ষেত্রে তো একটা মূল্যবান জিনিস চুরি গেছে৷ জ্যোতিষ্করাও জানত যে পুজো নিশয়ই বন্ধ হবে না৷ পুজোয় সেই আনন্দটা না থাকতে পারে, তবে এতদিনের একটা পুজো কি আর বন্ধ হতে পারে!
সন্ধেবেলায় এলেন বাড়ির কুলপুরোহিত৷ ঠাম্মার ঘরে বসে শুনলেন পুরো ঘটনা৷ সিন্দুকটা তখনো খোলা৷ সিন্দুকের মধ্যে থেকে রূপোর পয়সাগুলো কিন্তু কিচ্ছু এদিক-ওদিক হয়নি৷ দাদু গুনে দেখেছেন, সব ঠিক আছে৷
পুরোহিতমশাই সিন্দুকের সামনে গিয়ে একবার খুঁটিয়ে দেখলেন থালাটা ভাল করে, যার ওপর সাপটা রাখা ছিল৷ তারপর গম্ভীরমুখে এসে বসলেন চেয়ারের ওপর৷ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে মাথা নেড়ে বললেন—
‘আমার কিন্তু মনে হচ্ছে না এটা চুরির ঘটনা বলে’৷
চমকে উঠলেন ঘরে উপস্থিত প্রত্যেকে৷ মানে? কি বলতে চাইছেন উনি?
‘ঠিক বুঝলাম না ঠাকুরমশাই আপনি কি বলতে চাইছেন?’, বললেন পিসেমশাই৷
‘দ্যাখো বাবা, আমার দেখে যা মনে হল, মা নিজের ইচ্ছেয় ছেড়ে চলে গেছেন৷ তোমরাই বলছ চাবি সবসময় বৌদির আঁচলে বাঁধা থাকে৷ আর তাছাড়া বাড়িতে বাইরের লোকও কেউ আসেনি তেমন৷ তাহলে কে এমন একটা দুঃসাহসিক কাজ করবে বলতে পারো? এই সাপ এখানে আছে প্রায় সত্তর বছর৷ আমি যা শুনেছি, কাকাবাবু, মানে তোমাদের স্বর্গীয় ঠাকুর্দা এটি বানিয়ে দিয়েছিলেন মাকে৷ তোমাদের বাবার ছেলেবেলায় একবার খুব কঠিন এক অসুখ হয়েছিল৷ কোনো ডাক্তার-বদ্যি সারাতে পারেনি৷ তখন কাকাবাবু মায়ের কাছে মানত করেন যে ছেলে সুস্থ হলে তিনি সোনার সাপ গড়িয়ে দেবেন মাকে৷ আর সেই কথা রাখতেই এই সাপ আসে বাড়িতে৷ আমার আগে আমার বাবাও মায়ের পুজো করে
গেছেন ওই সাপ সমেত৷ এবার তুমিই বলোতো, হঠাৎ করে কার এমন সাহস হবে আসন
থেকে মা মনসার বাহনকে সরানোর? না বাবা, আমার মনে হচ্ছে মা নিজেই তাঁর বাহনকে সরিয়ে নিতে চেয়েছেন, তাই চলে গেছেন, এখানে তোমার আমার কিছু করার নেই’, থামলেন ঠাকুরমশাই৷
এতক্ষন ধরে চুপ করে ঠাকুরমশাইয়ের কথা শুনছিলেন ঠাকুমা৷ শেষ হতেই আবার কেঁদে ওঠেন৷
‘মায়ের পুজো তাহলে কি হবে ঠাকুরমশাই?’, মুখে আঁচল চেপে জিজ্ঞেস করেন উনি৷
‘পুজো যেমন হওয়ার হবে৷ আমি ওই জায়গায় একটা মাটির সাপ নিয়ে আসব কাল, কোনো চিন্তা নেই৷ আরে বাবা, সত্তর বছর আগেও তো পুজো হত৷ তারপর মা চেয়েছিলেন অলংকার, তাই দিয়েছিলে৷ এখন মা চাইছেন না, তাই সরিয়ে নিয়েছেন৷ এতে এত ভাবনা কি আছে?’
‘এত বড় অনাচার হল, পাপ হল, আমাদের পরিবারের কোনো ক্ষতি হবে না তো ঠাকুরমশাই?’ , আবার জিজ্ঞেস করেন ঠাকুমা৷
‘দেখুন বৌদি, এই লাভ ক্ষতি শব্দগুলো বড় আপেক্ষিক৷ এই যে বন্যায় গ্রামগুলো ভেসে গেল, এত মানুষ খেতে পাচ্ছে না, এরা কার কি ক্ষতি করেছিল বলুন তো? অতএব এইসব ভাববেন না৷ ভক্তিভরে মায়ের পুজো করুন যেমন করছেন, সব ভাল হবে৷ আমি কাল সকাল সকাল চলে আসব’৷
চা-বিস্কুট খেয়ে চলে গেলেন ঠাকুরমশাই৷ আস্তে আস্তে উঠে আবার সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন পুজোর ব্যবস্থায়, কিন্তু কারোর মধ্যে যেন সকালের সেই আনন্দটা আর নেই৷ দাদু সকলকে ডেকে বললেন— ‘মন খারাপ কোরো না, যার যাওয়ার সে যাবে৷ তুমি বা আমি তাকে আটকে রাখতে পারব না৷ সবাই শান্ত মনে মায়ের পুজো করো’৷
জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি ওদের যে ঘরটা দেওয়া হয়েছে, সেখানে ফিরে এল৷ ওদেরও মনখারাপ৷
রাজর্ষি একসময় বলল—
‘আমি ছোটবেলায় যখন আসতাম মনসা পুজোতে, তখন দেখেছি ওই সাপটা৷ কি মোটা ভাবতে পারবি না৷ দূর থেকে দেখেছি আমি, কিন্তু এখনও মনে আছে৷ প্রচুর সোনা ছিল ওতে’৷
‘আমার না কেন জানিনা মনে হচ্ছে সাপটা চুরিই হয়েছে, আর সম্ভবত কয়েকদিনের মধ্যেই হয়েছে’ , হঠাৎ বলল জ্যোতিষ্ক৷
‘এই প্লিজ ভাই, তুই এখন চুরির কিনারা করতে বসিস না৷ তোর যা মনে হচ্ছে মনেই রেখে দে৷ ঠাকুরমশাই যাই বলুক, চুরি হয়েছে সেটা সবাই বুঝতে পারছে৷ একটা সোনার সাপ নিজে নিজে সিন্দুক থেকে বেরিয়ে চলে যাবে , এমন আজগুবি গল্প আজকের দিনে কেউ বিশ্বাস করবে না৷ কিন্তু ঠাকুরমশাই তো বংশ পরম্পরায় এ বাড়িতে পুজো করছেন, তাই ওনাকে কেউ ঘাঁটায় না বিশেষ৷ উনি যা বলছেন সবাই মেনে নিয়েছে৷ কিন্তু সবাই জানে এটা চুরি৷ আর এ বাড়ির লোকই যদি এটা ঘাঁটাতে না চায়, তুই আমি কে এসব বলার? প্লিজ জ্যোতিষ্ক, এসবের মধ্যে ঢুকিস না৷ আমি কাকিমাকে কথা দিয়ে এসেছি’ , কাতর গলায় শেষ কথাগুলো বলে রাজর্ষি৷
‘উফফ রাজর্ষি, তুই সবসময় এত ভয় পাস কেন বলতো? আমি কি বলেছি যে আমি কিছু করছি? আমি শুধু তোকে বললাম যে এটা চুরি৷ মানে কেউ সাপটা বের করে নিয়েছেন৷ আর সেটা করার সময় একটা চিহ্নও রেখে গেছেন, যার মাধ্যমে বোঝা যায় যে সাপটা নিজে থেকে চলে যায়নি’৷
‘কি চিহ্ন?’, হঠাৎ বেশ কৌতূহলী হয়ে ওঠে রাজর্ষি৷
‘এখন কেন হ্যাঁ? বলব না যাহ৷ যদি সত্যিই আমি ব্যাপারটা নিয়ে কিছু করি, তখন বলব৷ তার আগে আমাকে একটাও প্রশ্ন করবি না’৷
পরদিন সকাল সকাল উঠে চান-টান সেরে নিল ওরা৷ ঠাকুরমশাই ভোরবেলাতেই চলে এসেছেন৷ এই পুজোর সব জোগাড় নাকি বাড়ির লোক করতে পারে না, ঠাকুরমশাইয়ের অনেক কাজ থাকে৷ সেইজন্যে ভাল করে ভোরের আলো ফোটার আগেই এসে গেছেন ঠাকুরমশাই৷ জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি যখন পুজোর জায়গায় এল, তখন জায়গাটা লোকে লোকারণ্য৷ বাড়ির সব লোক থেকে শুরু করে আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, কে নেই! মনসা পুজো এখানে একটা উৎসবের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন৷ কিন্তু এবারে কোথায় যেন একটু সুর কেটে গেছে৷ সবাই হাসছে, কথা বলছে, আনন্দ করছে, কিন্তু পাশাপাশি সোনার সাপ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার গল্পটাও চলছে লোকমুখে৷ বাড়ির সিন্দুক থেকে এভাবে একটা মূল্যবান জিনিস অদৃশ্য হয়ে যাওয়া সকলের কাছেই খুব আশ্চর্যের৷
জ্যোতিষ্ক নিজের মত ঘুরছিল পুজোর জায়গাটায়৷ কেউ কেউ বসে গল্প করছে, কেউ হয়ত টুকটাক কাজ করছে কিছু, কেউ আবার একমনে পুজো দেখছে৷ মন্দিরের ঠিক সামনেটাতেই বসে আছেন দাদু আর ঠাকুমা৷ তাঁদের যেন কোনোদিকে মন নেই, একমনে পুজো দেখছেন৷ যে ঠাকুমা কাল অত কান্নাকাটি করছিলেন, তাঁর মুখে আজ একটা অদ্ভুত প্রশান্তি৷ মনে হচ্ছে যেন কোথাও কোনো দুঃখ-কষ্ট নেই, সব পেরিয়ে এসেছেন তিনি৷
পুজোর দিন বাড়িতেই রান্নার ঠাকুর এসে আয়োজন হয় রান্নার৷ বাজার-টাজার আগেই করা থাকে৷ কিন্তু এবারে দেখা গেল যা রান্না হওয়ার কথা তার থেকে প্রায় দ্বিগুন রান্না হচ্ছে৷ সাধারণত সব মিলিয়ে শ’তিনেক লোকের রান্না হয়৷ কিন্তু এবারে অত এলাহি আয়োজন দেখে যখন সবাই জিজ্ঞেস করে কি ব্যাপার, তখন নাকি ওনারা জানান যে বড়বাবু, অর্থাৎ পিসেমশাইয়ের বাবা এবারে নির্দেশ দিয়েছেন পাঁচশ’ লোকের রান্না করতে৷ সকলেই অবাক৷ কেউ জানতেন না এ ব্যাপারে যে এত লোক কোথা থেকে আসবে৷ বড়বাবুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন যে পাশের গ্রামে একটি অনাথ আশ্রম আছে , সেখানে শ’দুয়েক বাচ্চা থাকে৷ তাদের নেমন্তন্ন করেছেন তিনি আসার জন্য৷ দুপুরবেলা তাঁরা সকলে নেমন্তন্ন খেতে আসবে৷ এবারে তাই মেনুও আলাদা৷ প্রতিবার খিচুড়ি, তরকারি, ভাজা হয়, কিন্তু এবারে তার পরিবর্তে ফ্রায়েড রাইস, আলুর দম, চিলি পনির, ধোঁকার ডালনা, চাটনি, পাঁপড়, পায়েস, মিষ্টি৷
‘বাবা, এত লোকের জন্যে রান্নাতে খরচ তো অনেক বেড়ে যাবে!’, অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন পিসেমশাইয়ের বড় দাদা৷
‘খরচ নিয়ে তোমাদের ভাবতে হবে না খোকা, আমার রান্নার ঠাকুরকে সব টাকা দেওয়া হয়ে গেছে’ , জানিয়েছিলেন দাদু৷
সকলে আরও অবাক হয়েছিলেন৷ যে দাদু সারাজীবন অত্যন্ত সংযত ভাবে চলেছেন, অহেতুক খরচ কোনোদিনই করেননি বলতে গেলে, তিনি আজ পেনশনের সামান্য ক’টা টাকা থেকে হঠাৎ এরকম এলাহী আয়োজন করে ফেললেন! কিন্তু কেউ প্রশ্ন করতে পারেনি বাবার মুখের ওপর৷
পুজো শেষ হ’তে হ’তে বেলা গড়িয়ে গেছিল৷ আর তারপরেই বারোটা নাগাদ একটি অনাথ আশ্রম থেকে বাচ্চাদের নিয়ে এসেছিলেন সেই আশ্রমেরই পাঁচজন লোক৷ সবচেয়ে ছোট বাচ্চাটির বয়স তিন বছর৷ ওরা ভীষণ শৃঙ্খলাবদ্ধ, দেখে অবাক হয়ে গেল সবাই৷ প্রত্যেকে লাইন করে পরপর জুতো ছেড়ে রেখে প্রথমে পুজোর জায়গায় এল৷ ওদের যারা নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন ওদের সামনে ছিলেন, আর তাঁর পিছন পিছন লাইন করে যাচ্ছিল সবাই৷ ওদের প্রথমে মন্দিরের সামনে বসিয়ে প্রসাদ দেওয়া হল৷ প্রসাদ খেয়ে উঠে প্রত্যেকের পাতাটা এক জায়গায় করল ওদের মধ্যেই একটি বড় ছেলে৷ তারপর পাতা ফেলার জায়গায় সেটি ফেলে এল৷ দাদু বাধা দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ওদের যিনি এনেছিলেন, তাঁরা বললেন ওরা নাকি এভাবেই নিয়ম মেনে কাজ করে অভ্যস্ত৷
ওদের মধ্যে যে সবচেয়ে বড়, সে জ্যোতিষ্কদের বয়সীই হবে৷
ও-ই নাকি এই আশ্রমের প্রথম আবাসিক৷ ছেলেটি এখন ছোট বাচ্চাদের খেয়াল রাখে৷ ওদের দেখে খুব কষ্ট হচ্ছিল জ্যোতিষ্কর৷ ওরা হয়ত কিছুই পায়নি, তাও কোনো অভিযোগ নেই ওদের৷
এদিকে জ্যোতিষ্ক ভাবছিল যে ওরা এতকিছু পেয়েও কত অভিযোগ করে চলে প্রতিনিয়ত! এদের দেখলে মনে হয়, সত্যিই যে জীবন নিয়ে আমরা এত অভিযোগ করি, সেটা কত সুন্দর৷ সবসময় হাসিমুখে রয়েছে ওরা সবাই৷
ওরা যখন খেতে বসলো, দাদু নিজের হাতে পরিবেশন করছিলেন৷ জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষিও ছিল পরিবেশনের দায়িত্বে৷ এমনকি পুজো শেষে ঠাকুরমশাইও এসে যোগ দিলেন ওদের সাথে৷ ঠাকুরমশাইয়ের সাথে এই আশ্রমের চেনাশোনা আছে৷ ওঁর সূত্র ধরেই এদের নিমন্ত্রণ করেছিলেন দাদু৷ দাদুর হাত থেকে পনিরের গামলাটা নিতে গিয়েই হঠাৎ দাদুর ডানহাতের দিকে চোখ পড়ল জ্যোতিষ্কর, কড়ে আঙ্গুলের পাশটায় একটা বড় ক্ষত দগদগ করছে৷
‘ও দাদু, হাত কাটল কি করে তোমার?’, জিজ্ঞেস করে ও৷
‘ও কিছু নয় ভাই, এখন কাটেনি, ক’দিন আগে কেটে গেছিল’৷ ওকে পাত্তা না দিয়েই আবার পরিবেশনের দিকে এগোন উনি৷
সব মিটে যাওয়ার পর দাদুর কাছে বিদায় নিতে এলেন ওদের অধ্যক্ষ৷
‘আজ আসি বড়বাবু৷ খুব ভাল লাগল৷ বাচ্চারা এমন বাড়ির পুজোয় তো বড় একটা যায় না, খুব আনন্দ পেয়েছে ওরা এখানে এসে৷ এই যে আপনারা পরিবারের সবাই মিলে এমন বেঁধে বেঁধে থাকেন, এটা ওদের জানার, দেখার বড় দরকার! ওদের তো কোনো পরিবার নেই সেই অর্থে, ওরা যেন সবাই একসাথে মিলে একটা পরিবার গড়ে তুলতে পারে, আশীর্বাদ করবেন৷’
‘এভাবে আমাকে লজ্জা দেবেন না মাষ্টারমশাই৷ মায়ের পুজো তো প্রতিবার হয়, কিন্তু এবারে মা প্রাণ পেলেন সত্যিকারের৷ ওদের জন্যেই আজ আমার পুজো পরিপূর্ণ৷ শুধু আপনাকে একটাই অনুরোধ, আপনি বাচ্চাদের লেখাপড়াটা ভালভাবে চালিয়ে যাবেন৷ যখনই কিছু দরকার হবে, আমাকে জানাবেন৷ আমি ঠিক ব্যবস্থা করব’ , হাতজোড় করে বললেন দাদু৷
‘আপনার মত মানুষ দেখা যায় না বড়বাবু৷ আপনার জন্যেই আমার বাচ্চারা আজ স্কুলে যাবে৷ আজ ঠাকুরের কাছে একটাই জিনিস চাইলাম, আপনার মত মন যেন ঈশ্বর আরও কয়েকজনকে দেন৷ তাহলেই পৃথিবীটা বড় সুন্দর হবে৷ আপনি যা করলেন, আমি কোনোদিন ভুলব না’, দাদুর পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে গেলেন উনি৷ দাদু আটকালেন৷
ফেরার পথ ধরলেন ওনারা৷
পুজো মিটে যাওয়ার পর সবাই বেশ ক্লান্ত ছিল৷ সারাদিন পরিশ্রম গেছে৷ তার ওপর ছোট থেকে বড় সকলের মনেই কেমন যেন একটা খুঁত খতানি ছিল৷ যতই হোক, এতদিন ওই সোনার সাপ মায়ের গায়ে জড়িয়ে দিয়ে পুজোয় বসেছেন ঠাকুরমশাই, আর আজ সেই জায়গায় মাটির সাপ৷ পাশের গ্রাম থেকে এসেছিলেন পিসেমশাইয়ের এক মাসী৷ তিনি তো বলেই বসলেন—
‘সোনার বদলে মাটির গয়না! মায়ের মুখটাই কেমন যেন ম্লান লাগছে গো!’
পুজোর দিনে এমন একটা মূল্যবান জিনিস হারানো যে মোটেই শুভ লক্ষণ নয়, সে কথা কানাঘুষো বলতে লাগল সবাই৷ ঠাকুমার সামনে কেউ কিছু বলতে সাহস পাচ্ছিল না৷ আগেরদিন খুব কান্নাকাটি করেছেন ঠাকুমা৷ আবার যদি ওইসব বললে কান্নাকাটি শুরু করেন, অসুস্থ হয়ে পড়বেন তো! তাই আজ আলোচনাটা অনেকটাই চাপা পড়ে গেছে৷
পুজো শেষে রাজর্ষি আর জ্যোতিষ্ক বসেছিল পিসির ঘরে৷ রাজর্ষির পিসতুতো ভাই টুকাই ছাড়াও টুকাইয়ের খুড়তুতো-জ্যাঠতুতো ভাইবোনেরাও রয়েছে ওখানে৷ খানিকক্ষন এদিক-সেদিক কিছু কথার পর হঠাৎ উঠল সাপ চুরির প্রসঙ্গটা৷ জ্যোতিষ্কই তুলল৷ আসলে ব্যাপারটা সঠিকভাবে কিনারা করতে না পারলে ভারি অস্বস্তি হচ্ছিল ওর৷
‘হ্যাঁ রে টুকাই, কে নিতে পারে সাপটা বলে তোর মনে হয়?’, সরাসরি জিজ্ঞেস করে ও টুকাইকে৷
‘জানিনা রে বাবাইদা৷ ঠাম্মার আহচলেই তো চাবিটা বাঁধা ছিল বল! কার এত সাহস হবে, আমি তো বুঝতেই পারছি না’, এখনও অবাক ভাব কাটেনি টুকাইয়ের স্বরে৷
‘আমার কিন্তু একজনকে খুব সন্দেহ হয়’, গম্ভীর গলায় বলে কাজলদি৷
‘কাকে রে?’
‘জবা মাসি!’
‘জবা মাসি? হ্যাট, তুই পাগল নাকি রে!’, কাজলদির কথা একরকম উড়িয়ে দিয়েই টুকাই বলে, ‘জবা মাসি আজ কতদিন রয়েছে বল তো এ বাড়িতে? নিজের ছেলেমেয়ের মত দেখে আমাদের৷ জবা মাসি কখনো এ কাজ করতে পারে?’
‘শোন টুকাই, যেটা জানিস না সেটা নিয়ে কথা বলিস না৷ জবা মাসির ছেলে কত অসুস্থ তুই জানিস? হাঁপানি আছে ওর৷ কয়েকদিন আগে থেকেই আমি শুনছিলাম বলছিল যে কি একটা ওষুধ দিয়েছে ডাক্তার, অনেক দাম, তাই কিনতে পারছে না৷ এদিকে ছেলের শরীরটাও খারাপ করছে৷ মুখভার করে ঘুরছিল মাসি৷ আজ সকালে দেখলাম বেশ মন ভাল, হাসছে৷ আমি জিজ্ঞেস করলাম ছেলে কেমন আছে, বলল এখন ভাল আছে৷ অত অসুস্থ ছেলেটা ওষুধ ছাড়া কি করে হুট করে ভাল হয়ে যাবে তুই বল দেখি আমাকে!’, একনাগাড়ে বলে থামে কাজলদি৷
সবাই হঠাৎ চুপ করে যায় ঘরে৷ টুকাইদের জেনারেশনের সবাই জন্ম থেকে দেখে আসছে জবা মাসিকে৷ মাসির প্রতি ওদের একটা অদ্ভুত দুর্বলতা আছে৷ এ বাড়ির সব ছেলেমেয়েদেরই মাসি নিজের মত করে দেখে৷ কিন্তু ওনার ছেলের অসুস্থতার কথা ওরা সেভাবে কেউ জানত না৷ মাসি বলেনি৷ বেশ কিছুদিন ধরে মুখ কালো করে ঘুরত মাসি ওরা দেখেছিল, কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠেনি কি হয়েছে৷ যে মানুষটা ওদের সকলের খেয়াল রাখে, তাঁর খেয়াল কেউ রাখতে পারেনি ওরা সেভাবে৷ যে মানুষগুলোকে নিজের পরিবার ভেবেছিল মাসি, তাদের থেকে এত অবহেলা পেয়েই কি মরিয়া হয়ে চুরি করল মাসি? সম্ভব! ঠাকুমার ঘর থেকে শুরু করে এ বাড়ির প্রতিটি ঘরে মাসির অবাধ যাতায়াত৷ সেখানে সিন্দুকের চাবি নিয়ে সেটা খুলে ফেলা কিছু অসম্ভব নয়৷ দুপুরবেলা ঠাকুমা যখন ঘুমোন, তখন অনায়াসেই কাজ সেরে ফেলতে পারে মাসি৷ কাজলদির কথায় যুক্তি আছে৷ ভাবতে থাকে জ্যোতিষ্ক৷
‘তোরা কি জানিস পিকলু দার চাকরিটা আর নেই?’, পাশবালিশটার ওপর উপুড় হওয়া অবস্থাতেই গম্ভীর গলায় বলে বুবান৷
‘মানে?’ , একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে অনেকে৷
পিকলু দা, মানে ওদের মেজদাদুর নাতি কোলকাতায় থাকে, ওখানেই চাকরি করে৷ সরকারি
কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে কোলকাতায় দারুন চাকরি পেয়েছে পিকলুদা৷ ওদের ভাইবোনেদের মধ্যে এখনও অবধি ও-ই সবচেয়ে সফল বলা যায়৷ পিকলুদার বিয়ের কথাবার্তা চলছে বাড়িতে, আর এরই মাঝে শেষ মাস দুয়েক ও বাড়ি আসা একদমই কমিয়ে দিয়েছে৷ এমনকি বাড়ি থেকে ফোন গেলেও কোনোরকমে হু হাঁ করে রেখে দেয়৷ আজ সব ভাইবোনেরা মিলে আড্ডা হচ্ছে, সেখানেও ডাকা হয়েছিল পিকলু দাকে, কিন্তু মাথা ধরেছে বলে ও আসেনি৷ কিছু যে একটা গন্ডগোল হচ্ছে, সেটা সবাই বুঝতে পারছিল৷ কিন্তু এতবড় খবরটা কেউ জানত না৷
‘তুই কি করে জানলি?’, জিজ্ঞেস করে রাজর্ষি৷
‘আমার একটা বন্ধুর দাদা কাজ করে পিকলু দার অফিসে, সে-ই বলল তো যে গত মাসে নাকি অনেক ছাঁটাই করেছে ওদের অফিস, আর সেখানে পিকলুদাও ছিল’ , বিজ্ঞের মত জবাব দেয় বুবান৷
‘বুবান, তুই কি বলতে চাইছিস? পিকলু দা এই কাজটা করতে পারে? তুই কি পাগল? পিকলু দা এই বাড়ির ছেলে! ওর টাকার দরকার হলে বাড়ির কারোর থেকেই চেয়ে নিতে পারে৷ তার জন্যে বাড়ির জিনিস কেন চুরি করবে?’, রেগে গিয়ে বলে কাজলদি৷
‘আরে তুই কি পাগল? আমি কখন বললাম পিকলু দা চুরি করেছে? অদ্ভুত তো! তুই বললি জবা মাসির টাকার দরকার ছিল, আমি তাই বোঝাতে চাইলাম যে টাকার দরকার কার নেই! পিকলু দার ও টাকার দরকার৷ সেই প্রসঙ্গেই বললাম কথাটা’, উঠে বসে বলে বুবান৷
‘এখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করিস না৷ আমি খুব ভাল করেই জানি তুই কি ভেবে বলেছিস কথাটা৷ অল্প বয়সে অতিরিক্ত পেকে গেলে এই হয় জানিস তো!’ , রেগে গিয়ে ওদের আড্ডা ছেড়ে উঠে যায় কাজলদি৷
আড্ডাটা আর জমে না৷ সবাই এরপর যে যার মত ঘরে চলে যায়৷ জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষিও চলে আসে ওদের ঘরে৷ জ্যোতিষ্ক বিশেষ কথা বলেনি আড্ডায়, ও শুধু শুনছিল৷ সত্যি বলতে কি, গতকাল চুরির ব্যাপারটা শোনার পর থেকে ওর মনটা কেমন যেন খুঁতখুঁত
করছে৷ বাড়ির সকলে এটা ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে৷ গতকাল যদিও সকলে ভাবছিল যে হয়ত কোনো বড় বিপদ আসতে চলেছে বাড়িতে, এ তারই ইঙ্গিত৷ কিন্তু আজ ঠাকুরমশাইয়ের কথায় সকলে মনে একটু স্বস্তি পেয়েছে৷ ঠাকুরমশাই পুজো করে যাওয়ার সময় বলে গেছেন এ বারে মায়ের পুজো নাকি খুব ভাল হয়েছে৷ মা তুষ্ট হয়েছেন, তার ইঙ্গিত পেয়েছেন তিনি৷ বড়বাবু যে এতগুলো অনাথ বাচ্চাকে মনে আনন্দ দিলেন, ভালমন্দ খাওয়ালেন, এই কারণেই মা মনসা দু’হাত ভরে আশীর্বাদ করবেন৷ চুরির ব্যাপারটা কারোর মনে না রাখাই ভাল৷ হয়ত কারোর প্রয়োজন ছিল বলে নিয়েছে৷
ঠাকুরমশাইয়ের এই কথার পর জোড় হাত করে কপালে ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন ঠাকুমা৷ বিড়বিড় করে কি যেন বললেন তিনি৷ জ্যোতিষ্ক ঠাকুমার চোখে জল দেখেছিল৷ যে মানুষটা কাল এত ভেঙ্গে পড়েছিলেন, ঠাকুরমশাইয়ের কথা যে কিছুটা হলেও তাঁকে স্বস্তি দিয়েছে, এটাই সকলের নিশ্চিন্ত হওয়ার কারণ৷ এমনিই সিন্দুকে বন্দী একটা দামী জিনিস বছরে একবার বেরোয়, সেই নিয়ে বাড়ির ছেলেমেয়েদের অত মাথাব্যথা নেই৷ তবু মায়ের আঁচল থেকে চাবি নিয়ে কেউ ওটা চুরি করেছে, আর সেটা যে বাড়ির লোক, বা বাড়ির সাথে খুব ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কেউ ছাড়া অন্য কারোর পক্ষে সম্ভব নয়, সেটাও স্পষ্ট৷ কেন না চাবি ও সিন্দুকের এত খুঁটিনাটি বাইরের কেউ জানবে না৷ নিঃশব্দে কাজটি কখনো হত না৷ তাই এখন বাড়ির মানুষগুলোই পরস্পরকে সন্দেহের চোখে দেখছে৷ সেই প্রাণখোলা ভাবটা কোথাও যেন হারিয়ে গেছে৷
‘কি ভাবছিস বল তো তখন থেকে চুপ করে?’, হঠাৎ রাজর্ষির কথায় চমক ভাঙ্গে জ্যোতিষ্কর৷ ও সত্যিই এই সাপ হারানোর ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছিল৷
‘কই, কিছু না তো!’
‘দ্যাখ জ্যোতিষ্ক, তোকে আমি খুব ভাল করে চিনি৷ তোর এই চুপ করে থাকা আমার একদম ভাল লাগছে না৷
একটা কথা শুনে রাখ, তুই কিন্তু ভুলেও এইসব চুরি-টুরির কেসে জড়াবি না৷ এদের কাউকেই আমরা চিনি না সেভাবে৷ বেকার কিছু ভুলভাল হলে পিসির মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হবে’ , সতর্ক করে রাজর্ষি৷
‘আচ্ছা রাজর্ষি, তুই আমাকে কি ভাবিস বল তো হ্যাঁ? আমার জন্যে কোনোদিন কাউকে অসুবিধেয় পড়তে হয়েছে? আমি তোর সাথে দু’দিনের জন্যে বেড়াতে এসেছি, আজ বাদে কাল বাড়ি চলে যাব৷ আমার কি দরকার এসব ঝামেলায় যাওয়ার?’, নির্বিকার ভাব ফুটে ওঠে জ্যোতিষ্কর স্বরে৷
‘আমি তোকে খুব ভাল চিনি কিনা, তাই বলছি আর কি! এসব দেখে তোর মাথায় কি চলছে আমি দিব্যি আন্দাজ করতে পারি৷ তাই সতর্ক করলাম৷ এখন তুই যে ‘কিছু না, কিছু না’ করে চুপ করে আছিস, এটাই আমায় ভাবাচ্ছে৷ তোর মাথায় কি চলছে একবার আমাকে বল না জ্যোতিষ্ক?’
‘আমি ওই অনাথ আশ্রমের বাচ্চাগুলোর কথা ভাবছিলাম রে রাজর্ষি৷ বাচ্চাগুলো কত কম পেয়েছে বল জীবনে, তাও কত ডিসিপ্লিনড৷ আর আমাদের দ্যাখ, সারাক্ষন এটা চাই, ওটা চাই, এই পেলাম না, ওর কেন ওটা আছে আমার যেখানে নেই , এইসব করছি৷ ওদের দেখার পর মনটা খুব খারাপ লাগছে জানিস৷ কাল তো আমাদের দুপুরে ফেরার ট্রেন, ভোরবেলা উঠে একবার ঘুরে আসবি ওখান থেকে?’, জ্যোতিষ্কর গলাটা কেমন যেন দুঃখী দুঃখী শোনায়৷
রাজর্ষি প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু করলেও পরে রাজী হয়ে যায়৷ খুব বেশি সময় লাগবে না গিয়ে ফিরে আসতে৷ আর তাছাড়া ওই বাচ্চাগুলোকে দেখে ওরও খুব ভাল লেগেছে৷
পরদিন সকালে ওরা যখন ওই আশ্রমে গিয়ে পৌঁছল, বাচ্চারা তখন প্রার্থনায় বসেছে৷ আশ্রমের সামনের উঠোনে হাতজোড় করে লাইনে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করছিল ওরা৷ দাদুর থেকে ঠিকানা নিয়ে জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি দু’জনে মিলেই এসেছে৷ দাদু আসতে চেয়েছিলেন ওদের সাথে, কিন্তু ওরা বাধা দিয়েছে৷ একে আগেরদিন সারাদিন পুজোর ধকল গেছে, বয়স্ক মানুষ, এমনিই শরীর দুর্বল৷ তারপর এতটা পথ উজিয়ে এলে আবার শরীর খারাপ করবে৷ দাদুর প্রধান চিন্তা ছিল ওরা ঠিকঠাক চিনে যেতে পারবে না, হারিয়ে যাবে৷
‘আরে দাদু, আমরা সেই কোলকাতা থেকে বর্ধমান চলে এলাম দু’জনে মিলে, আর পাশের গ্রামে যেতে পারব না? তুমি যে কি ভাবো না আমাদের! আর কয়েকমাস পরে উচ্চমাধ্যমিক দেব’, হেসে বলেছিল রাজর্ষি৷
পিসিও সঙ্গত করেছিলেন ওদের সাথে, ‘ওরা ঠিক পারবে বাবা৷ শখ হয়েছে, একটু ঘুরে আসুক৷ আপনি ওদের ঠিকানা বুঝিয়ে দিন, ঠিক চলে যাবে৷ আপনি বিশ্রাম করুন’৷
দাদুর আপত্তি বিশেষ ধোপে টেকেনি তাই৷ ওরা ভোরবেলা বেরিয়ে চলে এসেছে আশ্রমে৷ প্রার্থনা শুরু হওয়ার পর ভেতরে এল ওরা৷ দাদুর পরিচয় দিতেই ওদের নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ভদ্রলোক৷ বাচ্চারা প্রার্থনা শেষে যে যার মত পড়তে বসল৷ ওদের ঘরগুলো ঘুরিয়ে দেখালেন উনি৷ অতগুলো বাচ্চা একসঙ্গে থাকে, অথচ কি শৃঙ্খলাবদ্ধ ওরা! অবাক হচ্ছিল জ্যোতিষ্ক৷ প্রতিটা ঘর অসম্ভব পরিষ্কার৷ জামাকাপড়, বইপত্র সব গুছিয়ে রাখা৷ কত সহজ-সরল-অনাড়ম্বর জীবনের মধ্যে দিয়ে ওরা বেড়ে উঠছে!
‘ওরা স্কুলে যায়?’ , জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
‘হ্যাঁ বাবা, কয়েকজন যেত৷ আসলে সবাইকে পাঠাবার মত সামর্থ্য ছিল না আমাদের৷ ছোটরা তাই বাড়িতেই পড়ত৷ কিন্তু বড়বাবু সাহায্য করার পর এখন আমরা সবাইকেই পাঠাব৷ ওদের জন্য পোশাক, জুতো, বইপত্তর কিনতে দিয়েছি আমি৷ বড় বাবুর মত মানুষ হয় না৷ এতগুলো শিশুর মুখে হাসি ফোটালেন উনি, ঈশ্বর আশীর্বাদ করবেন ওনাকে’, কথা
বলতে বলতে আবেগে ভদ্রলোকের গলা কেঁপে ওঠে৷
‘আচ্ছা দাদু কি এখানে প্রায়ই আসেন?’, একটু দোনামনা করেই জিজ্ঞেস করে ফেলে জ্যোতিষ্ক৷
‘না উনি বার দুয়েক এসেছিলেন ঠাকুরমশাইয়ের সাথে’৷
‘ঠাকুরমশাই বলতে?’ , আবার কৌতূহলী হয় জ্যোতিষ্ক৷
‘ওই যে তোমাদের বাড়ি যিনি পুজো করলেন! উনিই তো সব ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন!’
‘কিসের ব্যবস্থা?’
আচমকা জ্যোতিষ্কর প্রশ্নে একটু যেন থতমত খেয়ে যান ভদ্রলোক৷ আর ঠিক সেই সময়েই ওনার মোবাইলটা বেজে ওঠে সশব্দে৷ পুরোনো মডেলের একটা ফোন সরু দড়ি দিয়ে ওনার গলায় ঝোলানো, আর ফোনটা বুকপকেটে রাখা৷
ফোনটা বের করে ধরলেন উনি, ‘হরেকৃষ্ণ! বলুন ঠাকুরমশাই’৷
.... ... .. .
‘হ্যাঁ হ্যাঁ এসেছে তো’৷
.... ... .. .
‘না না, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন’৷
.... ... .. .
‘বড়বাবুকে চিন্তা করতে বারণ করবেন, কেমন?
রাখি তাহলে? আচ্ছা’৷
জ্যোতিষ্করা কেবল একপক্ষের কথাই শুনতে পাচ্ছিল৷ ফোনটা রেখে আগের কথার সূত্র ধরে বলেন উনি, ‘ব্যবস্থা মানে এই আর কি, বাচ্চাদের স্কুলের জন্যে উনি যে সাহায্য-টাহায্য করলেন, তারপর ওনার বাড়ির পুজোয় নেমন্তন্ন করলেন আমাদের , ঠাকুরমশাই না থাকলে তো এই যোগাযোগটাই হত না, তাই না? আমার তো মনে হয় ঈশ্বরই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন সব’৷
বেলা বাড়ছিল৷ ওদের আবার দুপুরে ফিরতে হবে৷ বিদায় নেয় ওরা৷ আর ফেরার পথেই জ্যোতিষ্ক বলে,
‘আমাকে একটি বার ঠাকুমশাইয়ের বাড়ি নিয়ে যাবি প্লিজ? ওনার সাথে কথা না হলে আমি বাড়ি ফিরেও শান্তি পাব না!’
‘আমি ঠিক জানতাম তুই মনে মনে কোনো ছক কষছিস! হ্যাঁ রে, তুই আবার ভাবছিস না তো যে ঠাকুরমশাই সাপটা চুরি করেছেন? দেখিস বাবা এসব ভাবলেও চেপে যাস৷ ইনি বংশ পরম্পরায় পিসিদের বাড়ির কুলপুরোহিত৷ এনার কোনো অস্মমান হলে দাদু কিন্তু তোর গর্দান নেবে এই আমি বলে দিলাম!’, উত্তেজিত হয়ে পড়ে রাজর্ষি৷
‘ওফ, তুই আমাকে নিয়ে চাপ নেওয়াটা একটু বন্ধ করবি? যেটা বললাম সেটা করতে পারবি কিনা বল? নিয়ে যেতে পারবি ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি?’
‘না বললে তুই ছাড়বি? নিজেই চলে যাবি ঠিক খুঁজে খুঁজে৷ তারপর গিয়ে কি না কি বলে আসবি , তার চেয়ে আমিই নিয়ে যাচ্ছি চল৷ কিন্তু তুই আমাকে কথা দিবি যে ওখানে গিয়ে তুই কিছু উল্টোপাল্টা বলবি না’৷
‘কথা দিলাম বন্ধু, চলো এবার’৷
ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি ওরা যখন এসে পৌঁছল, তখন রোদ বেশ চড়া৷ সময়টা বর্ষাকাল হলেও বেশ কিছুদিন ধরে বৃষ্টির দেখা প্রায় নেই বললেই চলে৷ ঠাকুরমশাই বাড়িতে ছিলেন না৷ ওঁর স্ত্রী বললেন কিছু নিত্যপুজো সারতে গেছেন, কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিরবেন৷
অতএব অপেক্ষা৷
আধঘন্টা পর ফিরলেন উনি, আর জ্যোতিষ্কদের বাড়িতে দেখে খুবই অবাক হলেন, ‘কি ব্যাপার, তোমরা এখানে?’
‘আসলে আমরা আজ ফিরে যাব৷ আপনার সাথে হয়ত আর দেখা হবে না, তাই একবার দেখা করতে এলাম’ , হাসিমুখে বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘তা বেশ বেশ, বড় আনন্দ পেলাম বাবারা৷ একটু বোসো, একটু মিষ্টি-জল মুখে দিয়ে যাও’৷
‘আমরা মিষ্টি খেয়েছি, আপনি ভাববেন না৷ আমার শুধু আপনাকে একটা প্রণাম করার ছিল৷ আমি ভাবতাম যারা পুজো করেন, বা ঠাকুরদেবতা নিয়েই শুধু থাকেন, তাঁরা কুসংস্কারাচ্ছন্ন হন৷ আপনাকে না দেখলে আমি ভাবতেই পারতাম না যে তাঁদের আপনার মত একটা বড় মন থাকে, যা সবার ওপরে উঠে মানুষকে শুধু মানুষের পরিচয় দিয়েই বিচার করেন৷ আপনি ভাল থাকবেন’৷
‘সংস্কার মানুষকে রুচিশীল করে, আর কুসংস্কার জীবনকে বদ্ধ করে৷ আমি আজীবন চেষ্টা করেছি কুসংস্কারকে এড়িয়ে যাওয়ার৷ সকলকে সেটাই শেখানোর চেষ্টা করি যে ঈশ্বর কখন কি রূপে সামনে হাজির হবেন, আমরা তো কেউ জানিনা, দৃষ্টিটা তাই স্বচ্ছ রাখতে হবে৷ আর মনের দরজাটা খোলা রাখতে হবে, যাতে সেখানে আলো-হাওয়ার চলাচল থাকে৷ ঈশ্বর কিন্তু কখনো কাউকে মানত করতে বলেন না, তিনি তাঁর সন্তানদের এমনিই রক্ষা করেন’, ঠাকুরমশাইয়ের মুখে একটা মৃদু হাসি৷
‘আপনি এমন করে এই ভাল থাকাটা আরও অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে দেবেন, যাতে দাদুর মত আমরাও কখনো এমন সুযোগ পাই’, কথাটা বলেই ঠাকুরমশাইয়ের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে বেরিয়ে এল জ্যোতিষ্ক, আর ওর পিছনে রাজর্ষি৷
পিছনে ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন ওদের ফেলে আসা পথের দিকে চেয়ে, চোখে অবাক দৃষ্টি৷
এদিকে অবাক হয়েছে রাজর্ষিও৷ জ্যোতিষ্কর শেষকালে বলা কথাগুলো ও কিছুই বুঝতে পারল না৷ ওইসব কেন বলল ছেলেটা?
জ্যোতিষ্কদের ট্রেন ছিল বিকেলে, হাতে একটু সময় নিয়েই বেরোনোর তোড়জোড় করেছে ওরা৷ পিসির বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে বড়দের সবাইকে নমস্কার করল ওরা৷ দাদুর কাছে গিয়ে নমস্কার করে উঠে দাঁড়াতেই দাদু ওদের চিবুক ধরে বললেন—
‘অনেক বড় হও দাদুভাই, মানুষের মত মানুষ হও’৷
‘আশীর্বাদ করো দাদু, যেন তোমার মত কিছু করতে পারি’, হাসিমুখে বলল জ্যোতিষ্ক৷
‘আমি আর কি করলাম ভাই জীবনে, তেমন তো কিছু করতে পারলাম না দাগ কেটে যাওয়ার মত! তবে প্রার্থনা করি তোমরা যেন মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারো৷ তোমরাই যে আমাদের ভবিষ্যৎ!’
‘অমন কথা বলবেন না বাবা’ , দাদুকে থামিয়ে হঠাৎ বলে ওঠে জবা মাসি, ‘আপনি আর মা না থাকলে আমার ছেলেটাকে বাঁচাতে পারতাম না৷ ভগবান তো মন্দিরে থাকে না, মানুষের মধ্যেই থাকে৷ আমার কাছে আপনিই ভগবান’৷
‘আঃ জবা, কথার মাঝে বড্ড কথা বলিস তুই৷ কাজে যা তো!
ছেলেটাকে বিকেলের খাবার দিয়েছিস?’, জবা মাসিকে থামিয়ে দিলেন দাদু৷
কিন্তু পিসেমশাই আর নিজের কৌতূহল চাপতে পারলেন না, ‘বাবা, আমি যদ্দূর জানি
জবার ছেলের ওষুধগুলো অনেক দামি ছিল৷ আর সবক’টা ওষুধ না কিনতে পারলে কোনো লাভ ছিল না৷ আমরা তাই জোগাড় করার চেষ্টা করছিলাম টাকাটা৷ অতগুলো টাকা তুমি কোথায় পেলে? পেনশনের টাকা সবটাই কি...’
‘আমার পেনশনে আর ক’টা টাকা আসে বাবা যে অত দামী ওষুধ কিনব! তোমার মাকে বলো৷ আমার কয়েকটা টাকার ওপর ওনার এক জোড়া সোনার দুল দিয়ে দিলেন৷ সেইটা থেকেই ওষুধ কেনার টাকা হল’, বলেন দাদু৷
‘তুমি নিজের গয়না বিক্রি করলে মা? তবু আমাদের একবার বলতে পারলে না?’ , এবার অবাক হওয়ার পালা পিসেমশাইয়ের৷
‘ওই গয়না এখন আর আমি পরি না খোকন৷ আর তাছাড়া একটা মায়ের চোখের জল দেখে আমি আরেক মা হয়ে কি করে কানে দুল পরে বসে থাকি বল তো? আজ ছেলেটা ভাল আছে, তবেই না মনটা এত ভাল লাগছে!’, জবাব দেন ঠাম্মা৷ একটু থেমে তিনি আবারও বলেন, ‘আর তাছাড়া এসব আমার মাথায় তোর বাবাই ঢুকিয়েছে, আমি আর কি করেছি, উনি যা করলেন...’
‘থামবে তোমরা! কি শুরু করলে কি! ছেলেদু’টো বেরোবে...’, একটু জোরেই বলে ওঠেন দাদু৷
আর তখন জ্যোতিষ্ক হঠাৎ বলে, ‘তুমি যে কাউকে না জানিয়ে এত বড় একটা কাজ করবে ঠিক করেছ দাদু, সেটা তো খুব ভাল কথা৷ কিন্তু তোমার এই কাজটা যদি সবাই জানতে পারত, তাহলে আমার মত আরো অনেকে এমন কাজ করতে আগ্রহ পেত, সেটা তুমি জানো কি? আমার তো মনে হয় তোমার কথাটা সবাইকে বলে দেওয়াই উচিৎ!’
‘বাবা আবার কি বলবেন?’
এতক্ষন চুপ করে থেকে এবার মুখ খোলেন পিসি৷
‘আমি বলব দাদু? তোমার অনুমতি নিয়ে?’, জ্যোতিষ্কর ঠোঁটের কোনে একটা মৃদু হাসি৷
‘সবই তো বলে দিলে দাদু৷ এটাই বা বাকি থাকে কেন! তুমিই বলে দাও’, হাল ছেড়ে দেন দাদু৷
‘আসলে দাদু চাননি এই কথাটা কাউকে জানাতে, কিন্তু আমার মনে হয়েছে এটা তোমাদের না জানালে একটা বড় কাজের যথাযথ সম্মান দেওয়া হত না৷ আর আমাদের মত আরও অনেকের জীবনের একটা পাঠ নেওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যেত৷ তাই আজ আমি তোমাদের জানাতে চাই সেই সোনার সাপের অন্তর্ধান রহস্য৷ সাপটা কিন্তু চুরি যায়নি’, এতখানি বলে থামে জ্যোতিষ্ক৷
‘চুরি যায়নি মানে? কোথায় তাহলে? আর তুই জানলি কি করে?’, রাজর্ষি কৌতূহলের সপ্তম স্বর্গে পৌঁছে গেছে৷
‘একটু চোখ-কান খোলা রাখলে তুইও জানতে পারতিস রাজর্ষি৷ কিন্তু তুই সেটা না করে সারাক্ষণ আমার ওপর নজরদারি করে গেছিস, তাই ধরতে পারিসনি৷ প্রথমদিন যখন সাপটা চুরি গেল বলে আমরা সবাই ঠাম্মার ঘরে গেলাম, সেদিন সিন্দুকের কাছে গিয়ে তুই আমি সবাই উঁকি দিয়ে দেখেছি৷ আর সেখানেই প্রাথমিক ক্লু-টা দেওয়া ছিল৷ সাপটা যেখানে ছিল তার পাশেই ছিল রক্তের শুকিয়ে যাওয়া দাগ, যা থেকে বোঝা যায় যিনি সাপটা বের করেছেন, কোনোভাবে তাঁর হাতে চোট লেগে কেটে যায়, এবং সেখানে একটু রক্ত পড়ে৷ রক্তের দাগ দেখে বোঝা যাচ্ছিল যে সাপটা বেশ কিছুদিন আগে বের করে নেওয়া হয়েছে৷ যেখানে রক্তটা পড়েছিল, সেটা দেখে মনে হচ্ছিল যে যিনি সাপটা নিয়েছেন, তাঁর ডান হাতে চোট লাগার সম্ভাবনা রয়েছে৷ আমি এরপর খেয়াল রাখছিলাম যে কারোর হাতে চোট দেখতে পাই কিনা৷ অদ্ভুতভাবে সবাইকে সন্দেহ করলেও দাদু বা ঠাম্মার কথা আমার একবারও মনে আসেনি৷ কিন্তু বাচ্চাদের খাবার দেওয়ার সময় দেখলাম দাদুর ডান হাতের কড়ে আঙ্গুলের পাশে একটা চোট, আর সেখান থেকে রক্ত পড়ছে৷ হঠাৎ চমকে উঠলাম আমি৷ দাদু কেন নিজের জিনিস এভাবে কাউকে না জানিয়ে নেবেন! আর এটা ভাবতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে এক এক করে জানলা গুলো খুলতে শুরু করল আমার সামনে৷ আমি শুনলাম দাদুর পেনশন এমন কিছু নয়, যাতে তিনি অতগুলো বাচ্চার স্কুলের দায়িত্ব নিতে পারেন৷ তারপর জবা মাসির ছেলেও হঠাৎ ভাল আছে শুনলাম, যার অর্থ জবা মাসি ছেলেকে ওই দামী ওষুধগুলো কিনে খাওয়াতে পেরেছেন৷ তাহলে কোত্থেকে
পেলেন উনি ওই টাকা? আর যাই হোক, জবা মাসির পক্ষে ঠাম্মার আঁচল থেকে চাবি নিয়ে সাপটা বের করা সম্ভব নয়৷ ওনাকে দেখে আমি এটুকু অন্তত নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি৷ তাহলে এমন কেউ এই কাজটা করেছেন যার ওই সিন্দুকে অবাধ অধিকার, এবং যিনি মন থেকে চেয়েছেন মানুষের পাশে সত্যি সত্যি দাঁড়াতে৷ তখনই দাদুর কথা মাথায় এল আমার, আর সব দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যেতে লাগল৷ আজ আমি অনাথ আশ্রম আর ঠাকুমশাইয়ের বাড়ি গেছিলাম ওনাদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হতে যে আমি যেটা ভাবছি সেটা ঠিক কিনা৷ ওনাদের কথাতেও বুঝলাম যে বিপুল খরচের দায়িত্ব দাদু নিয়েছেন, সেটা পেনশনের টাকায় সম্ভব না৷ অনাথ আশ্রমে সেইজন্যেই দাদু আমাকে ছাড়তে চাননি, উনি চাননি আমি ওখানে গিয়ে কিছু জানতে পারি৷ তাই ঠাকুরমশাইকে দিয়ে আশ্রমের অধ্যক্ষকে ফোন করিয়েছিলেন উনি, যাতে আমার সামনে উনি কিছু না বলেন৷ আর এমনই অদৃষ্ট, ফোনটা এল ঠিক আমারই সামনে৷ একপক্ষের কথা শুনতে পেলেও আমি সহজেই অনুমান করতে পারছিলাম উল্টোদিকে ঠাকুরমশাই কি বলছেন৷ ঠাকুরমশাইয়ের বাড়ি গিয়ে একরকম সরাসরি ইঙ্গিত দিয়ে কথাটা বললাম আমি৷ আমি জানতাম উনি সবটা জানতেন, না হলে সেদিন বিকেলে ওরকম একটা ঘটনা শুনে উনি অত নির্লিপ্ত থাকতে পারতেন না৷ অন্তত একজন ঠাকুরমশাইয়ের কাছে এটা অস্বাভাবিক৷ তবে ঠাম্মার কান্নাটা আসল ছিল৷ আমার মনে হয় ঠাম্মাকে প্ল্যানটা তুমি পরে বলেছ, তাই না দাদু?’, অনেকখানি বলে শেষে দাদুর দিকে তাকিয়ে শেষ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দেয় জ্যোতিষ্ক৷
‘আসলে ওই সাপটা এসেছিল এ বাড়িতে আমার জন্যে৷ একবার আমার খুব শরীর খারাপ হয়েছিল, তাই মা মানত করেছিলেন মা মনসার কাছে সোনার সাপ দেওয়ার জন্যে৷ অত দামী একটা জিনিস, এত বছর ধরে সিন্দুক বন্দী পড়ে থাকে, বছরে একদিন বের হয়৷ ওটার থাকা বা না থাকা আমার কাছে সমান৷ তার চেয়ে ওটা বিক্রি করে সেই টাকায় যদি একটু মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি ...সেই ভাবনা থেকেই বলেছিলাম ঠাকুরমশাইকে কথাটা৷ উনি দেখলাম খুব খুশি হলেন৷ সাথে সাথে আমাকে এমন এক জায়গার সন্ধান দিলেন, যেখানে যথার্থভাবে ব্যয় করতে পারি আমি এই মূল্য৷ কিছু টাকায় জবার ছেলেটাও ভাল হল৷ তবে হ্যাঁ, জবার ছেলের জন্য তোমাদের মা দুলটা বিক্রি করেছিলেন, এটা সত্যি৷ তোমাদের মা-কে আগে সাপের কথাটা বলিনি, কারণ আমি জানতাম উনি হয়ত প্রথমে নাও রাজি হতে পারেন৷ তাই জবার ছেলেকে ওনার দুল বিক্রি করে টাকাটা দিতে হল৷ কিন্তু পরে যখন বললাম, দেখি উনি আমার চেয়েও বেশি খুশি হলেন৷ বাচ্চাগুলো এল
আমার বাড়ি, একটু আনন্দ করে গেল, এবারে আমার পুজো পরিপূর্ণ৷ একটা মাটির সাপ এবারে সেই আনন্দটা এনে দিয়েছে, যা এত বছরে একটা সোনার সাপ পারেনি৷ আমার তো যাওয়ার সময় হল ভাই, যেতে যেতে ক’টা বাচ্চার মুখে যদি একটু হাসি ফুটিয়ে যাই, তার চেয়ে ভাল আর কি হয় বলো!’, হাসছেন দাদু৷
কারোর মুখে তখন আর কোনো কথা সরছে না, সকলের চোখে জল৷ সোনার সাপের এমন স্বর্গপ্রাপ্তি বোধহয় কেউই কল্পনা করতে পারেনি৷
পিসির বাড়ি থেকে বড়দের প্রণাম করে বিদায় নিল জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষি৷ এবার ওদের ট্রেন ধরতে হবে৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন