মৌমিতা ঘোষ
‘ও বাবা, মা কোথায় গো?
কখন থেকে ডাকছি, সাড়াই পাচ্ছি না’ , একটু বিরক্ত হয়েই নিজের ঘর থেকে ডাইনিং রুমে এসে বলে জ্যোতিষ্ক৷
ওর বাবা প্রীতম সেন অফিস থেকে ফিরে সোফায় গা এলিয়ে খবর শুনছেন৷ এইসময়টা প্রীতমবাবু একটু নিজের মত থাকতেই পছন্দ করেন৷ ওনার স্ত্রী জাহ্নবী দেবী কিছু বলতে এলেও বিরক্ত হন৷ খবর দেখে বা বইয়ের পাতা উলটে সন্ধে সাতটা থেকে রাত ন’টা অবধি সময়টা নিজের মত করে কাটান উনি৷
জ্যোতিষ্ক এইসময় নিজের ঘরে পড়াশুনো করে৷ কিছু দরকার হলে মাকে একটা হাঁক দিলেই মা নিয়ে চলে আসে৷ কিন্তু আজ অনেকক্ষন ধরে মাকে ডেকেও সাড়া পায়নি ও৷ তাই বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে৷ ভেবেছিল মাকে রান্নাঘরেই পাবে, কিন্তু সেখানেও নেই৷ অতএব বাবার শরনাপন্ন হওয়া৷ এমনিতে বাবাকে প্রয়োজন হয় না বিশেষ, শুধু এই প্রয়োজনের সময়গুলোতে মাকে খুঁজতে বাবাই ভরসা৷
‘তোর মা মনে হয় ছাদে৷ পাশের বাড়ির শেফালী বৌদির সাথে গল্প করছিল একটু আগে দেখলাম তো!’ , টিভি থেকে চোখ না সরিয়েই নির্বিকারভাবে জবাব দেন প্রীতমবাবু৷
জ্যোতিষ্কর রাগটা মুহূর্তে যেন আরও বেড়ে যায়৷ এই সন্ধে সাড়ে সাতটার সময় কেউ ছাদে দাঁড়িয়ে গল্প করে? আর গল্প করার এমনই ধুম, যে আজ জ্যোতিষ্ককে একবারও জিজ্ঞেস করল না যে ও কি খাবে৷ সন্ধেবেলা রোজই এই সময়টা ওর একটু খিদে খিদে পায়, আর খিদে পেয়ে গেলে পড়ায় একটুও মন বসাতে পারে না জ্যোতিষ্ক৷ মায়ের গল্প করতে করতে খেয়ালই নেই যে ওর বিকেল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি!
‘মা, ও মা’ , ছাদের সিঁড়ির কাছে গিয়ে এবার বেশ জোরে হাঁক দেয় জ্যোতিষ্ক৷
‘আসছি বাবু, পাঁচ মিনিট’, ছাদ থেকে জবাব দেয় মা৷
আর কিছু না বলে নিজের ঘরে এসে গোঁজ হয়ে খাটের ওপর বসে থাকে জ্যোতিষ্ক, মায়ের কাছে ওর খিদের থেকে শেফালী জ্যেঠিমার সাথে গল্প করাটা বেশি জরুরী হল! পড়ায় মন দিতে চেষ্টা করে ও, কিন্তু কিছুতেই মন বসছে না৷ ছোট থেকেই খিদে পেয়ে গেলে কোনো কাজে মন বসাতে পারে না জ্যোতিষ্ক৷ একবার ভাবল ফ্রিজটা খুলে দেখবে ক্যাডবেরি আছে কিনা, কিন্তু বাবা ওখানে বসে আছে৷ একবার যদি বুঝতে পারে যে মা ওকে খেতে না দিয়ে ছাদে গল্প করছে, তাহলে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করবে৷ চুপ করে সেইসব মানুষদের কথা ভাবার চেষ্টা করে জ্যোতিষ্ক, যারা দিনের পর দিন খেতে পায়না৷ আর ঠিক এইসময়েই একটা বড় প্লেটে করে ধোঁয়া ওঠা দু’টো ফিশ ফ্রাই নিয়ে ঘরে ঢোকে মা৷
‘এই নে বাবু, আজ দুপুরেই ফ্রাইগুলো গড়ে রেখেছিলাম, ভেবেছিলাম তোর বাবা অফিস থেকে এলে ভাজব৷ এই শেফালীদির সাথে কথা বলতে বলতে এমন দেরি হয়ে গেল! খুব সমস্যায় পড়েছে বেচারা৷ নে খেয়ে নে গরম গরম, আর দেরি করিস না’ , টেবিলে প্লেটটা রেখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় মা৷
এবার মনে মনে বেশ লজ্জা পায় জ্যোতিষ্ক৷ মা ওদের সবার কত খেয়াল রাখে, অথচ আজ পাঁচ মিনিট খিদে সহ্য করতে না পেরে ও মনে মনে মায়ের ওপর কত রাগ দেখিয়ে ফেলল! নিজের কাছেই খুব লজ্জিত হয়ে পড়ে জ্যোতিষ্ক৷
ফিশ ফ্রাইতে কামড় দিয়ে ও শুনতে পায় বাইরে মা চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বাবাকে বলছে পাশের বাড়ির শেফালী জ্যেঠিমার কথা৷ ওদের বাড়িতে নাকি কিসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে আরম্ভ করেছে আজকাল৷ জ্যেঠিমার ঘরের এদিক-ওদিক প্রায়ই কিসব অদ্ভুত জিনিস খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, আর এইসব ঘটনার পর থেকেই জ্যেঠিমা এবং ওনার স্বামী পরিমলজ্যেঠু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন৷ ফিশ ফ্রাইয়ের প্লেটটা হাতে করে বাইরের ঘরে এল জ্যোতিষ্ক, ‘কি হয়েছে গো মা ওদের বাড়ি?’ ওকে দেখে সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হয়ে যান মা৷ কথা বলতে বলতে থেমে গিয়ে ওর দিকে ফিরে বলেন, ‘কিছু না বাবু, তোমাকে এসব নিয়ে ভাবতে হবে না৷ তুমি গিয়ে পড়তে বসো গে যাও’৷
কয়েকমাস আগে শান্তিনিকেতনে সেই বুলবুলির ঘটনাটার পর খবরের কাগজে একদিন জ্যোতিষ্কদের নিয়ে একটা খবর বেরিয়েছিল ছোট করে৷ কোলকাতা থেকে তিনটে ছেলে নিজেদের ইচ্ছেয় এতদূর গিয়ে সত্যিটা সকলের সামনে আনল, এই খবরটা সকলকে জানানো উচিৎ বলে একটি প্রতিবেদন বেরিয়েছিল বহুল প্রচলিত একটি খবরের কাগজের ভেতরের পাতায়৷ এটা যে রাতুলবাবুর কাজ, সেটা বুঝতে বাকি ছিল না জ্যোতিষ্কর৷ ওরা ফেরার পরেও অনেকবার কথা হয়েছে ভদ্রলোকের সঙ্গে ফোনে৷ ওদের উনি বারবার ধন্যবাদ দিয়েছেন সত্যিটা এভাবে সামনে নিয়ে আসার জন্যে৷ বুলবুলির পড়াশোনা আর ওর ঠাকুমার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন রাতুলবাবু৷ এছাড়া জয়দেববাবুকে একটা ভাল কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন৷ বুলবুলিরা এখন ভাল আছে৷
শান্তিনিকেতন থেকে ফিরে আসার পর বাড়িতে ওখানকার কথা কিছু বলেনি জ্যোতিষ্ক৷ রাজর্ষি আর কুশলদাকেও বলতে বারণ করেছিল৷ কিন্তু খবরের কাগজে যেদিন খবরটা বেরোলো সেদিন আর কিছুই অজানা রইল না৷ বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন৷ ওদের বাড়িতে অন্য কাগজ আসে৷ অফিস থেকে ওই খবরের কাগজটা নিয়ে ফিরেছিলেন বাবা৷ আর তারপর জাহ্নবী দেবীর সামনে খবরটা মেলে ধরে বলেছিলেন, ‘কি গোয়েন্দার মা, ছেলে যে এতবড় একটা কান্ড করে ফেলল, জানতেও পারলে না?’
খবরটা পড়ে চোখভর্তি অবশ্বাস নিয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিলেন মা, ‘তুই আমাকে মিথ্যে বললি বাবু?’
তখন বেশ অস্বস্তি হয়েছিল জ্যোতিষ্কর৷ আসলে মাকে ও খুব ভালবাসে৷ ওর কারণে মাকে কষ্ট পেতে দেখলে খারাপ লাগে খুব৷ তক্ষুনি মাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, ‘কি করব, তোমাকে বললে তো তুমি যেতে দিতে না! এদিকে আমি কাগজে পড়েই বুঝেছিলাম কিছু একটা গন্ডগোল হচ্ছে৷ আমরা না গিয়ে পৌছলে বয়স্ক মানুষটা খুব ঠকে যেত মা!’
মা তখন আর কিছু বলেননি, তবে জ্যোতিষ্ক লক্ষ্য করেছে, ওই ঘটনার পর থেকে মা কিছু
গন্ডগোলের খবর শুনলেই সেটা ছেলের থেকে আড়াল করেন৷ আর জ্যোতিষ্কর যত এইসব দিকেই ঝোঁক৷
কর্মকার কাকুদের বাড়িটা ওদের সঙ্গে প্রায় গা লাগানো বলতে গেলে৷ পুরোনো দিনের বেশ বড় বাড়ি৷ আগেকার দিনের মত খড়খড়িওলা বড় বড় জানলা, কড়িকাঠ , সবকিছুতেই একটা নস্টালজিয়া মাখানো আছে৷ জ্যোতিষ্কর খুব ভাল লাগে ওদের বাড়িটা৷ ছোটবেলায় তো খুব যেত৷ শেফালী জ্যেঠিমা ওকে নিজের ছেলের মতই ভালবাসতেন৷ বাড়িতে একটা কিছু ভাল তরকারি হলেও সেটা চলে আসত জ্যোতিষ্কর জন্যে৷ ওদের বাড়িতে লোকও অনেক৷ পরিমলকাকুরা তিন ভাই, আর তাঁদের স্ত্রীয়েরা তো থাকেনই, সাথে আরও দুই ভাই ও তাঁদের বৌরাও থাকেন৷ কয়েকমাস আগে শেফালী জ্যেঠিমার ছেলে তাতানদার বিয়ে হল৷ খুব আনন্দ করেছিল ওরা সবাই, প্রায় বাড়ির বিয়ের মতই৷ এখন তাই বাড়িতে নতুন বৌও আছে৷ পরিমল জ্যেঠুর মেজো ভাই অমল কাকুর মেয়ে ব্যাঙ্গালোরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে, আর ছোটভাই বিমল কাকুর ছেলে টুবলু জ্যোতিষ্কর থেকেও ছোট, ওর এবার ক্লাস টেন৷ ওদের বাড়িতে ঘরের অভাব নেই৷ এতগুলো লোক হলেও থাকতে অসুবিধে হয় বলে মনে হয় না৷ পরিমল জ্যেঠুদের দোতলায় দু’টো ঘর৷ একটায় উনি আর শেফালী জ্যেঠিমা থাকেন, আরেকটায় তাতান দা আর বৌদি৷ অমল কাকুদের একটা ঘর দোতলায়, আর আরেকটা একতলায়৷ আর বিমল কাকুরা দু’টো ঘর নিয়ে একতলাতেই থাকেন৷ শেফালী জ্যেঠিমা একা প্রায় সংসারটা ধরে রেখেছেন এখনও৷ এখনও ওদের একসঙ্গে রান্না হয়৷ পাড়ার সকলের কাছে ওদের বাড়িটা তাই খুব আশ্চর্যের৷ এভাবে এখনও যৌথ পরিবার টিকিয়ে রাখার ঘটনা চট করে দেখা যায় না৷ আর ওদের বাড়িতে সকলে মিলেমিশে থাকেন বেশ, ঝগড়াঝাঁটিও শোনা যায় না বিশেষ৷
কর্মকারকাকুদের বাড়িটা যে তাই পাড়ার অনেকেরই আলোচনার বিষয়, সেটা পাড়ার ছোটরাও জানে৷ সেই বাড়িটায় আজকাল নাকি কিসব অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে! তেমনটাই শুনল জ্যোতিষ্ক৷ আসলে মা ওকে কিছুতেই খুলে বলতে চাননি কি হয়েছে৷ সেই শান্তিনিকেতনের ঘটনাটার পর থেকে মায়ের ধারণা হয়েছে যে কোনোরকম ঝামেলার দিকেই জ্যোতিষ্কর আকর্ষণ বেশি, আর ও সেখানে জড়িয়ে পড়বেই৷ তাই মা এইসব ঝুট-ঝামেলার খবর সবসময় ওর থেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন৷ এদিকে জ্যোতিষ্করও একটা স্বভাব আছে, কোথাও কিছু গন্ডগোলের গন্ধ পেলে সেটা সঠিক ভাবে না জানা অবধি ওর শান্তি হয় না৷
শেফালী জ্যেঠিমার বাড়ির খবরটা মায়ের থেকে যে ঠিক করে পাওয়া যাবে না, ও বুঝতেই পারছিল৷ এদিকে ওদের বাড়ি থেকে এসব খবর পাঁচকানও হবে না৷ মাকে জ্যেঠিমা খুব ভালবাসেন বরাবরই, তাই হয়ত বাড়ির কথা গল্প করে বলেছেন৷ অন্য কারোর পক্ষে এসব খবর জানা সম্ভব নয়৷ মায়ের থেকে সেদিন একটু আভাস পাওয়ার পর থেকেই জ্যোতিষ্কর মনটা খচখচ করছে৷ মাকে অনেকবার ভাল করে বুঝিয়েও লাভ হয়নি, মা ওর সামনে মুখ খুলতে রাজি নন৷ তাই জ্যোতিষ্ক অপেক্ষা করছিল সঠিক সময়ের৷
অদ্ভুতভাবে সেই সময়টা এসে গেল আজ স্কুল থেকে ফেরার সময়৷ গলির বাঁকে ঘুরতেই শেফালি জ্যেঠিমার মুখোমুখি৷ জ্যেঠিমা কোথাও যাচ্ছেন, খুব ব্যস্ত ভঙ্গী৷
‘কি গো, আমাকে তো আজকাল ভুলেই গেছ৷ কিছু আর রান্না করেও পাঠাচ্ছ না’ , সাইকেলের ব্রেক চেপে বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘দেব রে বাবু, আসলে যা চলছে, অনেকদিন ভাল কিছু করা হয়নি৷ এই রোববারই দেখছি তোর পছন্দের কিছু একটা করব’ , ওর গাল ধরে বলেন জ্যেঠিমা৷
‘কি চলছে? আর তুমি যাচ্ছই বা কোথায় এখন এত ব্যস্ত হয়ে? আমায় তো আজকাল কিছুই বলো না!’
‘তোর মা জানে৷ তোকেও বলব, এখন খুব দেরি হয়ে গেছে রে৷ একটু ঘুরে আসি আজ, তুই রোববার আসিস, বলব সব৷ খুব সমস্যায় আছি রে সোনা’ , ওর মাথায় হাত বুলিয়ে পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যান জ্যেঠিমা৷
জ্যোতিষ্ক বুঝতে পারে, রোববার অবধি অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই৷
‘প্রথম কবে সমস্যাটা শুরু হয়েছিল তোমার মনে আছে?’, শেফালী জ্যেঠিমার ঘরের সোফায় গা এলিয়ে জ্যেঠিমাকে প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷
‘হ্যাঁ, ওই তো যেদিন আসন বুনছিলাম এই জানলার সামনে বসে বসে, উঠে দেখলাম আমার পিছনদিকে অনেক ছেঁড়া চুল পড়ে আছে৷’
‘সেটা কবে? দিনটা মনে আছে?’
‘দিনটা তো সঠিক মনে নেই রে বাবু, তবে মাস দুয়েক হয়ে গেছে’ , একটু মনে করার চেষ্টা করে বলেন জ্যেঠিমা৷
এই ক’দিনে চিন্তায় ওনার দু’চোখের নিচে কালি পড়েছে৷ বোঝাই যাচ্ছে রাতে ঘুম হয় না৷ জ্যোতিষ্ক দুপুরবেলা আজ খাওয়াদাওয়ার পর মা ঘুমিয়ে পড়লে বেরিয়ে এসেছে৷ মা জানলে কিছুতেই ওকে এ বাড়িতে আসতে দিত না৷ বাবাকে বলে এসেছে ও বন্ধুর বাড়ি যাচ্ছে, একসাথে পড়বে৷ জ্যেঠিমাকে আগেই বলা ছিল৷ ও নিচের গেটটা খুলতেই জ্যেঠিমা ওপর থেকে নেমে এসে দরজা খুলে দিয়েছেন৷ তারপর দু’জনে মিলে সোজা ওপরে জ্যেঠিমার ঘরে৷ আজ রোববার হলেও দুপুরবেলা বাড়িটা অদ্ভুত শুনশান৷ তাতানদা দিন দুই হল বৌদিকে নিয়ে বৌদির বাপের বাড়ি গেছে, বিকেলে ফেরার কথা৷ পরিমল জ্যেঠু পাশের ঘরে শুয়ে আছেন৷ বাকি কাকুদের ঘর থেকেও কোনো আওয়াজ নেই৷ শুধু মেজ কাকিমা, মানে অমল কাকুর স্ত্রী জ্যোতিষ্ককে ঢুকতে দেখে একটু হাসলেন৷ ইনি আবার মাকে না বলে দেন, বড্ড যেচে যেচে বেশি কথা বলা স্বভাব ভদ্রমহিলার! মনে মনে ভাবল জ্যোতিষ্ক৷
‘তুমি এবার একটু শান্ত হয়ে বোসো তো, আর আমার কয়েকটা প্রশ্নের একটু মনে করে করে ঠিক ঠিক জবাব দাও’ , জ্যেঠিমার হাতটা ধরে ওর পাশে বসিয়ে বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘সে নয় আমি বলছি, কিন্তু দ্যাখ তোর মা জানতে পারলে কিন্তু খুব রাগ করবে বাবাই৷
তুই এমনিই ক’দিন আগে শান্তিনিকেতনে গিয়ে যা সব কান্ড করে এলি! এরপর যদি শোনে যে আমি তোকে বাড়িতে ডেকে এসব শোনাচ্ছি, তোর সাথে সাথে আমিও বকুনি খাব’, কাঁচুমাচু মুখে বলেন শেফালী জ্যেঠিমা৷
‘আরে তুমি শান্তিতে বোসো তো! কেউ জানতে পারবে না৷ একটু ধীরেসুস্থে আমাকে প্রথমে বলো যে তুমি এত ভয় কেন পাচ্ছ?’
‘ভয় পাব না বল তো? প্রথমে তো আমি অত পাত্তা দিই নি৷ প্রথম যেদিন ওরকম চুল-টুল পাওয়া গেল, ভাবলাম হয়ত কোথাও থেকে উড়ে এসেছে৷ কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, চুল উড়ে আসলে ঠিক আমি যেখানে বসেছিলাম, তার চারপাশেই অমন গোল হয়ে পড়ে থাকবে কেন! এদিক-ওদিক তো উড়ে যাওয়ার কথা! যাই হোক, সত্যি বলতে কি তখন অতটা ভাবিনি৷ ঠিক তার পরেরদিনই পড়ে গিয়ে হাতটা ভাঙ্গল আমার৷ বললে বিশ্বাস করবি না, তখনও কিন্তু একবারের জন্যেও আমার ওই আগেরদিনের চুল পড়ে থাকার কথা মনে হয়নি৷ কিন্তু তারপর না একের পর এক গন্ডগোলের জিনিসপত্র শুরু হল৷ একদিন তারপর সুধা, মানে আমার মেজো জা আমাকে বলল এই কথাটা, যে দিদি যা সব কান্ড হচ্ছে, তার সঙ্গে এই দুর্ঘটনাগুলোর কোনো সম্বন্ধ নেই তো? আর সেদিনই আমি প্রথম ভাবলাম এটা নিয়ে, যে সত্যিই তো, যেদিন গুলোয় এরকম কিছু হচ্ছে, ঠিক তার দিন দুয়েকের মধ্যে কোনো অশান্তি শুরু হয়ে যাচ্ছে৷ আর এটা একবার নয়, পাঁচ-ছ’ বার একই জিনিস’, থামলেন জ্যেঠিমা৷
‘এবার তুমি আমায় আরেকটা জিনিস বলোতো, তোমার প্রথম কবে মনে হল যে এগুলোর সাথে বৌদি, মানে তাতানদার বৌ জড়িয়ে আছে?’
‘দ্যাখ বাবাই, এগুলো বলতে আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগছে৷ আমি কোনোদিন ভাবিইনি যে আমার একমাত্র ছেলের বৌকে নিয়ে এসব চিন্তা করতে হবে আমাকে৷ আমি প্রতিনিয়ত ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করছি যেন আমি যা ভাবছি তা ভুল হয়, কিন্তু তাও ভাবনাটা তো তাড়াতে পারছি না!’
‘এটা কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব হল না জ্যেঠি৷ আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করলাম যে কবে
তোমার প্রথম মনে হল যে এগুলোর সাথে বৌদি জড়িয়ে আছে? আমার যদ্দূর মনে পড়ছে, তাতানদার নিশ্চয়ই দু’মাস বিয়ে হয়নি?’
‘না না, তাতানের বিয়ের সাতমাস পূর্ণ হল তো এই তিন তারিখ৷ প্রথম প্রথম কিচ্ছু হয়নি জানিস তো, ভালই ছিল ওরা৷ তারপর হঠাৎ একদিন আমার সাথে খুব অশান্তি হল রিমলির, মানে তোর বৌদির৷ সেটাও একদম সামান্য সাংসারিক অশান্তি, মিটেও গেছিল৷ যাই হোক, সেই অশান্তির দু’দিনের মধ্যে শুরু হল এসব৷ তুই তো জানিস, আমি কোনোদিন ওরকম কারোর পিছনে লাগার মত মানুষ নই৷ এসবের সাথে যে রিমলির কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে, সেটা হয়ত আমার কল্পনাতেও আসতো না যদি না সুধা আমাকে দেখাত’৷
‘সুধা মানে? মেজো কাকিমা?’
‘হ্যাঁ৷ তোর জ্যেঠুর যেদিন প্রথম অ্যাটাকটা হল, তার ঠিক দু’দিন আগে আমাদের খাটের তোষকের তলায় কতগুলো জবাফুল পাই আমি৷ মানে এমনি গাছ থেকে তোলা ফুল নয়, সিঁদুর লাগানো, পাপড়িগুলো ছেঁড়া ছেঁড়া৷ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে পুজো করা ফুল ওগুলো৷ আমার মনটা কেমন কু ডাকছিল জানিস ওই ফুলগুলো পাওয়ার পর৷ মনে হচ্ছিল আবার কোনো অঘটন ঘটবে না তো! আর ঠিক তার দু’দিনের মধ্যে মাঝরাত্তিরে তোর জ্যেঠুর অ্যাটাক হল৷ তাও ভাগ্য ভাল অল্পের ওপর দিয়ে গেছে, বুকে স্টেন বসাতে হল, কিন্তু মানুষটাকে তো ফিরে পেলাম! যেদিন তোর জ্যেঠুর অপারেশন হল, সেদিন আমি হাসপাতাল থেকে ফেরার পরেই সুধা ডাকল আমাকে৷ তাতানের ঘরের পাশের ঘরটাতেই সুধা আর অমল থাকে৷ ও বলল ও নাকি অনেকদিন এমন কিছু দেখেছে, যাতে ওর মনে হয়েছে যে রিমলি এইসব তুকতাক করে৷ আমি তো প্রথমে উড়িয়েই দিয়েছিলাম৷ আজকালকার দিনের একটা মেয়ে, ওসব হয় নাকি! সুধা বলল ও নাকি নিজের চোখে দেখেছে কিছু জিনিস, এমনকি চাইলে ও আমাকেও দেখাতে পারে৷ আমি তখন বললাম যে আমি নিজের চোখে দেখে তবেই বিশ্বাস করব’, থামলেন জ্যেঠিমা৷
‘তারপর? তুমি দেখতে পেলে?’, ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
‘হ্যাঁ, মানে সুধা সেদিন আমাকে দেখাল একটা জিনিস৷ তাতান আর রিমলি অফিসে বেরিয়ে
যাওয়ার পর ও আমাকে নিয়ে ওদের ঘরে ঢুকেছিল৷ সাধারণত রিমলি ঘরের বাইরে থেকে শিকল দিয়ে যায়৷ ওরা না থাকলে আমরা কেউ ওঘরে ঢুকি না৷ কিন্তু ও তালা দেয়নি কোনোদিন ঘরে৷ সেই সুযোগে সুধা সেদিন দুপুরে শিকল খুলে আমাকে নিয়ে ঢুকল ওই ঘরে৷ এমনিতে পরিপাটি সাজানো, কোথাও কিচ্ছু নেই৷ কিন্তু সুধা যেন কি খুঁজছিল৷ আমার খুব অস্থির লাগছিল৷ ছেলে-বৌয়ের ঘরে ওভাবে ঢোকা মানায় নাকি! বারবার ওকে বলছিলাম যে চল চলে যাই, আর ঠিক তখনই ও দেখতে পেল জিনিসটা’৷
‘কি জিনিস?’
‘একটা ছোট বাক্স৷ তোদের এই অনলাইন ডেলিভারি আসে যে বাক্সগুলোতে, ওইরকম একটা বাক্স৷ আলনার পিছনদিকে একটু যেন লুকিয়ে রাখা৷ সুধা আমাকে বলল ও নাকি এই বাক্স থেকেই রিমলিকে জবা ফুল বের করতে দেখেছে৷ বাক্সটা বের করে এনে খুলল ও৷ তোকে বলব কি বাবাই, আমার এখনও ভাবলেই গা গুলিয়ে ওঠে৷ কি পচা গন্ধ বাক্সটায়! শিশি করে কিসব পচা জল-টল রাখা৷ সুধা হাত দিচ্ছিল, আমার তো মনে হচ্ছিল বমি হয়ে যাবে৷ পচা ফুল, ছেঁড়া চুল, টিকটিকির ল্যাজ, কি না নেই! রিমলি ওসব নিয়ে কি করে বলতে পারিস? আমার খুব ভয় করছে জানিস তো, আমার ছেলেটার ক্ষতি হবে না তো কিছু?’
‘বাক্সটা তারপর তোমরা কি করলে? ওখানেই রেখে চলে এলে?’ , জ্যেঠিমার প্রশ্ন অগ্রাহ্য করে আবার জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷
‘হ্যাঁ৷ সুধা রেখে দিল৷ তারপর ওরকমভাবে দরজা টেনে দিয়েই বেরিয়ে এলাম আমরা৷ জানিস বাবাই, ওই দিনটার পর থেকে আমি রিমলির সাথে ভাল করে কথা বলতে পারছি না৷ খালি ওগুলো মনে পড়ছে৷ তাতানের সঙ্গে একসাথে পড়ত মেয়েটা, আজকালকার দিনের মেয়েরা এমন হয় নাকি রে? আমরা ওর কি ক্ষতি করেছি বল তো যে ও আমাদের এমন সর্বনাশ করবে!’
‘আচ্ছা, একটু ভাল করে ভেবে বলো তো জ্যেঠি, বৌদি বাদে এবাড়িতে তোমার আর কাউকে সন্দেহ হয়?’
‘দিদি, তুমি এখানে? কখন থেকে খুঁজছি তোমাকে! বলছি তোমার ওই উইপোকা মারার ওষুধটা একটু দেবে গো? আমার ঘরের ওয়ার্ডরোবটার পিছনে আবার উই ধরেছে’ , ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন সুধা কাকিমা৷ বন্ধ হয়ে যায় ওদের আলোচনা৷
‘গন্ডগোল তো একটা কিছু হচ্ছে রে রাজর্ষি, আমি ধরতে পারছি না’ , পেন দিয়ে টেবিল খোঁচাতে খোঁচাতে বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘তোর যে লোকের বাড়ির সমস্যা ধরতে যাওয়ার কি এত দরকার, সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না!’, একটু বিরক্ত হয়েই বলে রাজর্ষি৷
‘বাজে বকিস না তো! শেফালী জ্যেঠিমারা আমার পর নাকি? ছোট থেকে আমাকে কত ভালবাসে জ্যেঠি! আজ সেই জ্যেঠির এমন বিপদের দিনে আমি চুপ করে থাকবো?’
‘তোর যা খুশি কর, আমাকে প্লিজ এর মধ্যে জড়াস না৷ এমনিই শান্তিনিকেতন যাওয়ার নাম করে ওইসব কান্ড করেছিলাম, মা বিশাল ফায়ার হয়ে গেছিল৷ আবার যদি এইসব কেসে জড়াই, আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দেবে এবার’, বলে রাজর্ষি৷
জানলার ধারে গিয়ে চুপচাপ একা একা দাঁড়ায় জ্যোতিষ্ক৷ ওদের এই স্কুল বিল্ডিংটা অনেক পুরোনো, সেই ব্রিটিশ আমলে তৈরী৷ বড় বড় জানলাগুলো প্রায় মেঝে অবধি নেমে গেছে৷ জ্যোতিষ্কর এরকম জানলা খুব ভাল লাগে৷ মনে হয় অনেকখানি আলো-হাওয়া যেন ও মেখে নিতে পারছে গায়ে৷ খুব মনখারাপ হলে কখনো, ও এই জানলার সামনে এসে দাঁড়ায়৷ সামনেই স্কুলের মাঠ৷ যতদূর চোখ যায়, পরিষ্কার নীল আকাশ৷ মনটা হঠাৎ ভাল হয়ে যায় বেশ৷ ছোটবেলায় শেফালী জ্যেঠিমাদের ছাদে তাতানদার সাথে খেলতে যেত ও৷ তখনও টুবলু হয়নি৷ ওর মনে আছে, একবার খেলতে খেলতে ওদের ন্যাড়া ছাদের একদম ধারে চলে গেছিল জ্যোতিষ্ক৷ ও বা তাতানদা কেউই খেয়াল করেনি৷ আর ঠিক সেই সময়েই গাছে জল দিতে ছাদে এসেছিল জ্যেঠিমা৷ জ্যোতিষ্ককে ওরকম বিপজ্জনক জায়গায় দেখে ছুটে গিয়ে ওকে কোলে তুলে নিয়েছিল, আর তারপর খুব বকেছিল তাতানদাকে৷ তারপর কয়েকদিনের মধ্যেই জ্যেঠুকে বলে ছাদে রেলিং তুলে দিয়েছিল জ্যেঠিমা৷ জ্যেঠিমা ওকে কোনোদিন তাতানদার থেকে আলাদা করে দেখেনি৷ মনে মনে ঠিক করে জ্যোতিষ্ক, যাই হয়ে যাক, শেফালী জ্যেঠিমার পরিবারের কোনো ক্ষতি ও হতে দেবে না৷
স্কুল থেকে বাড়ি ঢোকার পরেই মায়ের থেকে খারাপ খবরটা পেল জ্যোতিষ্ক, শেফালী জ্যেঠিমার গায়ে ফুটন্ত গরম জল পড়ে গিয়ে জ্যেঠিমা নাকি হাসপাতালে৷ সারা গায়ে বড় বড় ফোস্কা পড়ে গেছে৷ তাতান আর রিমলিকে অফিসে ফোন করা হয়েছে৷ ওরা আসার আগেই যদিও পাড়ার ছেলেরা মিলে হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছিল৷ জ্যোতিষ্ক ফেরার জন্যেই অপেক্ষা করছেন ওর মা৷ ওকে খেতে দিয়ে উনিও যাবেন৷
‘তুমি একটু দাঁড়াও মা, আমি চেঞ্জ করে আসি, আমিও যাব তোমার সাথে’ , বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘তুই তো এই এলি বাবু৷ একটু রেস্ট নে, কিছু খা, সেরম হলে কাল না হয় যাস!’ , ওকে বোঝানোর চেষ্টা করেন মা৷
‘আর আমাকে আড়াল করে রেখো না মা৷ তুমি তো জানো জ্যেঠিমা ছোট থেকে আমার জন্যে কত করেছে! সেখানে আজ ওনার এত বড় বিপদের দিনে আমি যদি ওনার পাশে না দাঁড়াতে পারি, তুমি কি খুব খুশি হবে বলো তো? তুমিই না আমাকে ছোট থেকে শিখিয়েছিলে যে সকলের কথা ভাবতে হয়!’
আর কোনো কথা সরে না জাহ্নবী দেবীর মুখে৷ ছেলেকে নিয়ে রওনা দেন হাসপাতালের দিকে৷
জ্যেঠিমাকে আই সি ইউ-তে রাখা হয়েছে৷ ডাক্তার বলেছেন অবস্থা স্থিতিশীল, তবুও চিন্তামুক্ত হতে পারছে না বাড়ির লোক৷ নীচে ঢোকার সময় দেখা হল অমল কাকু, বিমল কাকু আর কাকিমাদের সাথে৷ ওদের দেখে তো সঙ্গে সঙ্গে শুরু করে দিলেন সুধা কাকিমা— ‘যবে থেকে ওই অপয়া মেয়ে বাড়িতে ঢুকেছে, তবে থেকে একের পর এক অশান্তি! আমি কবে থেকে বলছি দিদিকে, ওদের আলাদা করে দাও৷ নয়ত আমরা কবে মরব তার ঠিক আছে? কিসব করে জানো তো ওই মেয়েটা৷ বাণ মারে বোধহয়৷ নয়ত একের পর এক এমন অ্যাকসিডেন্ট হয় বলো তো?’, জ্যোতিষ্কর মাকে উদ্দেশ্য করে বলেন উনি৷
‘এখন এখানে এইসব কথা রাখো না সুধা দি৷ শেফালী দিকে কত তাড়াতাড়ি সুস্থ করে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি, সেটাই আমদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিৎ’, বললেন জ্যোতিষ্কর মা৷
‘হ্যাঁ তা তো বটেই! আমি তো তাই এক্ষুনি বলছিলাম ছবিকে, আমাদের বিয়ে হয়ে আসার পর দিদি আমাদের মায়ের মত আগলে রেখেছে৷ সেখানে আমরা থাকতে দিদির আর কোনো ক্ষতি হতে দেব না৷ দরকার হলে ওই মেয়েকে বাড়ি ছাড়া করব, তবু দিদির আর কিচ্ছু হবে না’ , ঘুরেফিরে সেই একই কথায় ফিরে আসেন সুধা কাকিমা৷
পাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন বিমল কাকুর স্ত্রী ছবি কাকিমা৷ জ্যোতিষ্ককে নিয়ে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে আসেন ওর মা৷ আই সি ইউ-র কাছে দু’জনের বেশি যেতে দিচ্ছে না একসাথে৷ নিচ থেকেই তাই তাতানদাকে ফোন করে জ্যোতিষ্ক৷ তাতানদা আর বৌদি নিচে এসে ওদের নিয়ে যায় ওপরে৷ জ্যেঠিমার সাথে দেখা করতে দিচ্ছে না, তবে ডাক্তার বলছে এমনি কিছু অসুবিধে তেমন নেই৷ শুধু বড় বড় ফোস্কা পড়েছে৷ ওগুলো শুকোতে ইন্ট্রাভেনাস অ্যান্টিবায়োটিক লাগবে৷ কাকিমার আবার সুগার আছে বলে একটু চিন্তা৷
জ্যোতিষ্ক আড়চোখে তাকাল একবার বৌদির দিকে৷ কেমন যেন ভয়ে ভয়ে গুটিয়ে আছে
বৌদি৷ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে যে নিশ্চয়ই ওকে কেউ কিছু বলেছে৷
‘হ্যাঁ রে তাতান, তোরা অফিস থেকে এসে তো কিছু খাসনি৷ একটু আমার সাথে নিচে চল, চা খেয়ে আসবি’, বলেন জাহ্নবী দেবী৷
‘না না কাকিমা, তুমি কিছু চিন্তা কোরো না৷ আমরা চা-বিস্কুট-কেক খেয়ে নিয়েছি’, ব্যস্ত হয়ে বলে তাতান দা৷
‘রিমলির মুখটা তো শুকিয়ে গেছে রে৷ ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দে না৷ ও এখানে থেকে আর কি করবে?’
‘আমি থাকি কাকিমা, আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না৷ আমি ওর সাথেই ফিরব’, খুব আস্তে আস্তে বলে রিমলি বৌদি৷
জ্যোতিষ্ক খুঁটিয়ে দেখছে ওদের সবাইকে৷ তাতানদার সাথে কথা বলাটা একবার দরকার৷ ভিজিটিং আওয়ার্স শেষে ফিরে এল ওরা৷ অমল কাকু, বিমল কাকু আর সুধা কাকিমা, ছবি কাকিমা ওদের সাথেই চলে এসেছেন৷ তাতানদা আর বৌদি থেকে গেছে৷ সারা রাস্তা বৌদির নামে বলতে বলতে চলেছেন সুধা কাকিমা৷ ছবি কাকিমার মুখে যদিও একটাও কথা নেই৷
‘জ্যেঠু কি বাড়িতে একা আছেন?’ , হঠাৎই প্রশ্ন করে বসে জ্যোতিষ্ক৷
‘হ্যাঁ, দাদাকে তো তাতান বাড়ি থাকতে বলল৷ টুবলুও বাড়িতে’, এতক্ষনে একটা কথা বলেন ছবি কাকিমা৷
‘আমি একটু জ্যেঠুর সাথে কথা বলে বাড়ি যাব’ , গম্ভীরভাবে বলে জ্যোতিষ্ক৷ আর ওর বলার সাথে সাথে হঠাৎ চুপ করে যায় সবাই৷ থেমে যায় এতক্ষনের আলোচনা৷
পরিমল জ্যেঠু ঘরেই শুয়েছিলেন চুপ করে৷ ঘরটা অন্ধকার৷ জ্যোতিষ্ক ঘরে ঢোকার আগে ডাকল বাইরে থেকে, ‘জ্যেঠু, আসব?’
‘কে, বাবাই?’, ভেতর থেকে সাড়া দিলেন পরিমলবাবু৷
‘হ্যাঁ’৷
‘আয়, আয় ভেতরে আয়’৷
ও ঘরে ঢোকার সাথে সাথে বেড স্যুইচ টিপে টিউবলাইটটা জ্বালান জ্যেঠু, ‘কেমন দেখলি তোর জ্যেঠিকে?’
‘ভালো আছে৷ তুমি চিন্তা কোরো না বেশি৷ ডাক্তার বলেছেন ভয়ের কিছু নেই৷ তুমি কেমন আছো?’
‘আমি ভালই আছি৷ আমার আর কি! কি যে শুরু হয়েছে বাড়িতে একের পর এক, আমি তো ভাবতেই পারছি না৷ কিভাবে যে এর থেকে মুক্তি পাব, ঈশ্বর জানেন’, হতাশা ঝরে পড়ে জ্যেঠুর গলায়৷
‘আচ্ছা জ্যেঠু, তুমি আমাকে একটা কথা বলো তো, এই যে জ্যেঠিমা-কাকিমারা যা বলছে, তুমি সেগুলো বিশ্বাস করো? তুমি বিশ্বাস করো যে বৌদি কিছু করছে?’
‘আমি এসব কোনোদিনই বিশ্বাস করি না রে বাবাই৷ তোর জ্যেঠিমাও করত না৷ ইদানীং কেন যে এসব শুরু করেছে, জানিনা৷ শোন তোকে একটা কথা বলি, আমার হার্টের প্রব্লেম অনেকদিন থেকে ছিল৷ নিয়মিত ওষুধ খাই আমি৷ ডাক্তার বছর দেড়েক আগেই বলেছিল অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির কথা৷ এবার ওষুধ দিয়ে চলছিল কোনোরকমে, কিন্তু এটা করতেই হত৷ আর তোর জ্যেঠিমাও জানত সে কথা৷
সেদিন অমলের জন্মদিন ছিল, পাঁঠার মাংস করেছিল সুধা৷ আমি বললাম খাব না, কিন্তু অমল জোর করল একটু খাও একটু খাও করে, ছেলেটার জন্মদিন, আমিও না করতে পারলাম না৷ অত তেল ঘি দেওয়া মাংস , আমার সহ্য হয় বল তো বাবা? তোর জ্যেঠিমাকে বুঝিয়ে বললাম সে কথা, কিন্তু ওর মাথায় যে কি ঢুকে বসে আছে! আর তাছাড়া আরেকটা কথা...’
‘দাদা, বলছি চা দেব আপনাকে একটু?’, হঠাৎই ঘরে আসেন সুধা কাকিমা৷
‘না সুধা, সন্ধে হয়ে গেছে, এখন চা খেলে অ্যাসিড হয়ে যাবে আবার’৷
‘একটু কালো চা করে দিই?’
‘নাহ থাক৷ আজ আর চা খাব না’৷
‘দাদা, আপনার ছোট ভাই বলছিল আপনার সাথে কি কথা আছে, এখন আসবে বলছিল৷ আসতে বলব? আসলে চা খেতে ওপরে এসেছিল তো৷ বারবার সিঁড়ি দিয়ে ওপর-নীচ করতে কষ্ট হয়, বোঝেনই তো!’
জ্যোতিষ্ক বুঝতে পারল স্পষ্ট ওকে চলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিল কাকিমা৷ এখন আর বসে থেকে লাভ নেই, কারণ ওর মনে হচ্ছে এবার কেউ না কেউ এসেই যাবে৷ জ্যেঠুর সাথে আর একা কথা বলার সুযোগ হবে না৷
‘আজ আসি জ্যেঠু৷ ভাল থেকো আর সাবধানে থেকো৷ আমি পরে আসব আবার’৷
সিঁড়ি দিয়ে নামার মুখে সুধা কাকিমার একটা ঘর৷ ও দেখল অমল কাকু শুয়ে আছেন ঘরে৷ সিঁড়ি দিয়ে নেমে ওদের আরেকটা ঘর, আর তারপর বিমল কাকুদের দু’টো ঘর৷ এখন বিমল কাকু গেলেন জ্যেঠুর সাথে কথা বলতে৷ ওনাদের ঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু কেউ নেই৷ ছবি কাকিমা সম্ভবত রান্নাঘরে৷ একবার ওই ঘরে উঁকি দিল জ্যোতিষ্ক৷ আর তারপর আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল বাড়িটা থেকে৷ মনে একটা খটকা লাগছে৷ ওই বাড়িটা থেকে বেরিয়ে একবার ঘুরে তাকাল জ্যোতিষ্ক৷ বাড়িটার সামনে জ্বলজ্বল করছে নামটা ‘কর্মকার ভবন’৷ শখ করে নাম রেখেছিলেন পরিমল জ্যেঠু, এই বাড়ির বড় ছেলে৷ পরিমল জ্যেঠু বরাবর তাঁর ভাইদের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালবাসেন৷ বিয়ের পর নাকি জ্যেঠিমাকে বলেছিলেন যে তাঁর ভাইদের মায়ের মত আগলে রাখতে পারলে তবেই জ্যেঠুর মন পাবেন৷ জ্যেঠিমা প্রায়ই গল্প করেন এই কথাটা সবাইকে৷ সেই থেকে নাকি উনি ঠিক করেছিলেন, যাই হয়ে যাক, এই সংসার কখনো ভাঙতে দেবেন না৷ তাতান বা ওর খুড়তুতো ভাইবোনেরাও ছোট থেকে মা-জ্যেঠিমা-কাকিমার তফাৎ বোঝেনি বিশেষ৷ সেখানে হঠাৎ বাইরের একটা মেয়ে বৌ হয়ে আসার পর সব কিছু এমন বদলে যাবে, এটা যেন কেউই ঠিক মেনে নিতে পারছেন না৷
রাতে অল্প খেয়ে শুয়ে পড়ল জ্যোতিষ্ক৷ শুনতে পেল বাইরে খাবার টেবিলে মা বাবাকে বলছেন,
‘আজকাল কি যে হয়, সব কি আমরা জানি? আমার বাবা এসব শুনে খুব ভয় করছে৷ আর ছেলেটাকে এত করে বলি, মোটে কথা শোনে না৷ ওদের বাড়ির ব্যাপার, আমাদের কি দরকার বলোতো এত জড়ানোর? সত্যিই যদি রিমলির ওরকম কিছু ক্ষমতা থাকে, যদি সত্যিই ও আমার ছেলের কিছু ক্ষতি করে দেয়! আমি কি নিয়ে থাকব বলো তো?’ , মায়ের গলাটা ধরে আসছে, বুঝতে পারছে জ্যোতিষ্ক৷
‘তুমি বড্ড বাজে জিনিস নিয়ে চিন্তা করো জানো তো! আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এসব কেউ ভাবে? ছিঃ ছিঃ ছিঃ ছিঃ, তোমার থেকে আমি এটা আশা করিনি জাহ্নবী৷ তুমি একটা শিক্ষিত মেয়ে হয়ে এসব কি বলছ? আর ছেলেকে তুমি এই শেখাবে যে রিমলি তোকে কালাযাদু করে ক্ষতি করতে পারে, তাই ওদের বাড়ি যাবি না? তুমি ভুলে যেও না, বাবু কিন্তু সায়েন্সের স্টুডেন্ট’, বাবা বোঝানোর চেষ্টা করেন মাকে৷
‘এই তুমি থামো তো৷ বেশি সায়েন্স দেখিও না সবেতে৷ মনে রাখবে পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আজও হয়, বিজ্ঞান যার ব্যাখ্যা দিতে পারে না, বুঝেছ? আজও হয়৷ সেটা মেনে নিতে শেখো৷ এই তো সুমিত্রা সেদিন বলছিল, ওদের পাড়ায় নাকি একটা বাচ্চা হারিয়ে গেছিল, তারপর কে গুনে বলে দিয়েছিল যে রাতের মধ্যেই পাওয়া যাবে বাচ্চাটাকে৷ ঠিক তাই৷ রাত্তিরবেলা বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ডোবার ধারে বাচ্চাটাকে পাওয়া যায়৷ এটা কোন সায়েন্স দিয়ে বিচার করবে তুমি? দ্যাখো আমিও এসব মানতে চাই না, কিন্তু আমার ছেলের ব্যাপারে আমি কোনো রিস্ক নিতে পারব না৷ আমি চাই না আমার বাবু কোনো ঝামেলায় জড়াক৷ তুমি কাল সকালে ওকে বলে দেবে, ও যেন এখন কয়েকদিন কর্মকার ভবনে না যায়, ব্যস!’, হুকুম দেওয়ার মত করে শেষ কথাগুলো বলে দেয় মা৷
‘কি আশ্চর্য, তুমি তো আমাকে ভিলেন বানাবে ছেলেটার কাছে দেখছি! তুমিই তো এই কথাগুলো বলতে পারো ওকে৷ আমার চেয়ে ও তোমার কথা বেশি শোনে’ , কাতর গলায় বলে বাবা৷
‘ওরকম মনে হয়৷ ও মোটেই আমাকে মানে না৷ তুমি বললে তাও শুনবে৷ প্লিজ আমার জন্যে এটুকু করো তুমি, ছেলেটাকে এমন বিপদে ঠেলে দিও না লক্ষ্মীটি!’ , এবার কাঁদো কাঁদো হয়ে যায় মা৷
‘আচ্ছা দাঁড়াও দেখছি কি করতে পারি!’ , মাকে ঠান্ডা করতে বলল বাবা, শুনতে পেল জ্যোতিষ্ক৷
বাবা এই ব্যাপারটা নিয়ে বলতে এলে চাপ হবে না৷ বাবাকে অন্তত এসব ক্ষেত্রে ঠিক ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে৷ তবে এবার থেকে যা করতে হবে, আবার মায়ের চোখে ধুলো দিয়ে৷ কাজটা অনেকটা কঠিন হয়ে গেল৷
রাজর্ষি জানলার ধারে বসেছে, আর জ্যোতিষ্ক ওর পাশে৷ ট্রেনে ভিড় নেই খুব একটা৷ ওদের পরনে স্কুল ড্রেস৷ অনেকেই একটু সন্দেহের নজরে দেখছিল ওদের দিকে, তবে ওরা গ্রাহ্য করেনি৷ রাজর্ষিও প্রথমে চেষ্টা করেছিল জ্যোতিষ্ককে নিরস্ত করতে, কিন্তু তারপর বুঝে গেছে জ্যোতিষ্ক একবার যেটা ঠিক করবে, সেটা থেকে ওকে সরানো যাবে না চট করে৷ আর এই সত্যানুসন্ধানের নেশা এখন ওর মাথায় চেপেছে৷ যতদিন এটা চলবে, রাজর্ষিকেও ওর সাথে থাকতে হবে৷
কর্মকারকাকুদের ব্যাপারটা প্রথমে রাজর্ষি শোনেইনি, কিন্তু তারপর একদিন বাধ্য হয়ে শুনতে হল৷ আর তখন ও-ই পরামর্শ দিয়েছিল জ্যোতিষ্ককে —
‘শোন, অন্ধকারে না হাতড়ে যারা এসব জানে, সেরকম কারোর সাথে একবার কথা বল৷ তুই তো জানিসই না যে এসবে আদৌ কিছু হয় কিনা৷ একবার সঠিক কারোর থেকে জেনে নে না’৷
‘দ্যাখ রাজর্ষি, আমি এসবে বিশ্বাসই করি না৷ সেখানে এরকম কারোর কাছে গিয়ে তাঁর কথা শোনা মানে এই জিনিসগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া, তাই না?’
‘ওরে বাবা, তুই তাঁর কাছ থেকে তাঁর মতটা শুনবি৷ বিশ্বাস করতে কে বলেছে? আমি বলছি একটা ধারণা তো পাবি! যারা এসব নিয়ে চর্চা করে তাঁরা তো অ্যাটলিস্ট তোকে বলতে পারবে যে ওদের বাড়ি যেগুলো হচ্ছে সেগুলোর কোনো ভিত্তি আছে কিনা!’
রাজর্ষির কথা শুনে কিছুক্ষন চুপ করে ভেবেছিল জ্যোতিষ্ক, তারপর বলেছিল, ‘এরকম লোককে আমি খুঁজে পাব কোথায়?’
‘আমি দেখছি দাঁড়া৷ আমার পিসির বাড়ি বর্ধমানের ওদিকে একটা গ্রামে৷ ওদের ওদিকে এখনও এসব আছে মনে হয়৷ আমি ওর সাথে একবার কথা বলে দেখব’৷
‘তোর বাড়িতে কিছু জানতে পারবে না তো?’ , নিশ্চিত করতে চেয়েছিল জ্যোতিষ্ক৷
‘আরে না রে বাবা, পিসি আমার বন্ধুর মত৷ চাপ নেই’, রাজর্ষি আশ্বাস দেয়৷
আর সেইমতই ওর পিসির চেনাশোনা একজনের সাথে কথা বলতে ওরা আজ হাওড়া থেকে বর্ধমান লোকালে চেপে বসেছে সকাল সকাল৷ বাড়ি থেকে সকালে তাড়াতাড়ি বেরিয়েছে এই বলে যে একটা কোচিং-এ জয়েন্টের ক্লাস করাবেন স্যার, সেখান থেকে সোজা স্কুল যাবে ওরা৷ মা ভোরবেলা উঠে কষ্ট করে দু’কৌটো টিফিন করে দিয়েছে, এতক্ষনে কয়েকবার খিদে পাবে বলে৷ জ্যোতিষ্ক চায় না মাকে মিথ্যে বলতে, কিন্তু মা এত টেনশন করে, যে মাঝেমধ্যে আর কিছু করার থাকে না৷ মা বুঝতেই চায় না যে ও বড় হয়ে গেছে!
বর্ধমানে ওরা যখন পৌঁছল, তখন ঘড়িতে বেলা এগারোটা৷ রাজর্ষির পিসেমশাই ওদের জন্যে স্টেশনে অপেক্ষা করছিলেন৷ ওখান থেকে পিসেমশাইয়ের স্কুটারে পিসির বাড়িতে এসে পৌছল ওরা৷ যে ভদ্রলোকের কাছে ওরা যাবে, তিনি পিসির পরিচিত৷ এসব কালাযাদু নিয়ে চর্চা করতেন এককালে, কিন্তু এখন আর করেন না৷ তবে ব্যাপারগুলো জানেন ভাল৷ রাজর্ষি চেয়েছিল ফোনে একবার ওনার সাথে কথা বলতে, কিন্তু উনি চাননি৷ ওনার মতে ফোনে সব কথা হয় না৷ তাই বাধ্য হয়ে আজ এত কান্ড করে ওদের এখানে আসতে হয়েছে৷
‘পিসি, তুই তাড়াতাড়ি চল৷ আমাদের স্কুল টাইম শেষ হওয়ার মধ্যে বাড়ি ফিরতে হবে কিন্তু!’, ব্যস্ত হয়ে বলে রাজর্ষি৷
‘আরে তোদের জন্যেই তো বসে আছি সকাল থেকে৷ যাব তো, কিন্তু এতদূর থেকে এলি, একটু কিছু খেয়ে যা৷ আমি তোদের জন্যে লুচি করলাম যদি ভাত খেতে না চাস সেই ভেবে...’, বলেন রাজর্ষির পিসি৷
জ্যোতিষ্ক মনে মনে অস্থির হচ্ছিল, এভাবে দেরি করা ঠিক হচ্ছে না৷ রাজর্ষি ওর মনের কথাটা বুঝতে পেরেই যেন পিসির হাত ধরে প্রায় টেনে আনে,—
‘আরে সেসব পরে হবে, তুই আগে যে কারণে এসেছি, সেখানে নিয়ে চল আমাদের’৷
রাজর্ষির পিসির বাড়ি থেকে পায়ে হেঁটে মিনিট দশেক লাগল পৌঁছতে৷
একটা টালির চালের ঘর৷ ঘরের সামনে দড়িতে জামাকাপড় মেলছিলেন এক ভদ্রলোক৷ ষাটের মত বয়স হবে৷ তাঁকে গিয়েই সরাসরি বললেন পিসি—
‘কাকু, এই যে আমার ভাইপো আর ওর বন্ধু৷ আজকে আসবে বলেছিল না ওরা? তোমার কাছে কিসব জানতে চায়! বাড়ি থেকে লুকিয়ে এসেছে তোমার সাথে দেখা করবে বলে৷ ওদের একটুখানি সময় দেবে?’
‘ওমা একি কথা! দু’টো বাচ্চা ছেলে আমার সাথে দেখা করবে বলে অতদূর থেকে এসেছে, আর আমি তাদের সময় দেব না? এমন আবার হয় নাকি! এসো, এসো, ভেতরে এসো তোমরা’৷
ভদ্রলোকের সাথে ওরা তিনজন ওনার বাড়ির ভেতরে ঢোকে৷ কথা শুরু করার আগেই উনি ভেতরে গিয়ে ওদের জন্যে একটা প্লেটে করে মিষ্টি-জল নিয়ে আসেন৷
‘এতটা পথ উজিয়ে এসেছ, আগে কিছু মুখে দাও তো! তারপর শুনছি তোমাদের কথা৷ প্রীতি, তুইও নে’ , শেষ কথাটা রাজর্ষির পিসিকে উদ্দেশ্য করে বলেন উনি৷
‘ওদের আসলে বিশাল তাড়া৷ বাড়িতে লুকিয়ে এসেছে তো! স্কুল টাইম শেষ হওয়ার আগে তাই বাড়ি ঢুকতে হবে৷ আমার বাড়ি গিয়ে একগ্লাস জলও খায়নি’, বললেন পিসি৷
‘সে কি কথা? বাড়িতে লুকিয়ে আসতে হল কেন? কি এমন সমস্যা?’ , কপালে ভাঁজ পড়ে ওনার৷
‘আমি বলছি আপনাকে পুরোটা’, শুরু করে জ্যোতিষ্ক৷ প্রথম থেকে শুরু করে আজ অবধি প্রতিটা ঘটনা ও যা জানে, খুঁটিয়ে বলে ভদ্রলোককে৷ ওদের সাথে শেফালী জ্যেঠিমাদের সম্পর্কের কথাও বলে৷
সব শুনে কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকেন ভদ্রলোক৷ তারপর বলেন —
‘দ্যাখো, যদিও আমি জায়গাটা না দেখে কিছু বলতে পারব না, তবু তোমার কথা শুনে আমার যা মনে হচ্ছে বলছি৷ তার আগে আমাকে একটা কথা বলোতো, এগুলো যে কালাযাদুর
জন্যে হচ্ছে, সেটা কে বলেছিল? মানে কোনো বিশেষজ্ঞর মতামত নিয়েছিলেন ওনারা?’
‘আমি যতদূর জানি, না৷ ওই বাড়ির মেজো ভাইয়ের স্ত্রী যিনি, মানে সুধা কাকিমা প্রথম শেফালী জ্যেঠিমার মাথায় ঢুকিয়েছিল কথাটা’৷
‘হুম’, বলে আবার কিছুক্ষন চুপ করে যান উনি৷ তারপর পাঁচ মিনিট পর আবার মুখ খোলেন,
‘দ্যাখো, তোমার কথা শুনে আমার যা মনে হচ্ছে, এগুলো কালাযাদুর প্রভাবে হতে পারে, আবার নাও হতে পারে৷ এইসব অপশক্তি প্রয়োগবিদ্যায় ‘বাণ মারা’ বলে একটা কথা হয়৷ মানে কেউ কারোর ক্ষতি করতে চাইলে তাঁকে বাণ মারবে৷ কিন্তু তুমি যার কথা বলছ, আমার মনে হয়না সেই মেয়েটির এত শিক্ষা থাকবে৷ সে পড়াশুনো করে চাকরি করছে, এখন সংসারও৷ এইসব যারা করে, তাঁদের অনেকখানি সময় এর পিছনে দিতে হয়৷ সেক্ষেত্রে এই মেয়েটির পক্ষে কি করে সম্ভব বাড়ির লোকের চোখ এড়িয়ে এসবের পেছনে এতখানি সময় দেওয়া! আমার মনে হয় না সম্ভব বলে৷ তবু যদি সম্ভব হয়, আমি বলব সেই পথেও বাধা আছে৷ আর সেটা হল শুভশক্তির বাধা৷ তোমরা বাবা আজকালকার দিনের ছেলে তো, এগুলো হয়ত অতটা বিশ্বাস করো না, কিন্তু আমার জীবনের অনেকখানি সময় আমি এগুলো নিয়ে পড়াশুনো করতে দিয়েছি৷ এমনকি একসময় এমন এক গুরুর সঙ্গ ধরেছিলাম, যে নিজের জীবনেরও পরোয়া করিনি৷ আর সেইজন্যে বিয়ে-থা করে সংসারী হওয়াও হয়নি৷ আর আমার এতদিনের অভিজ্ঞতায় একটা জিনিস বুঝেছি, অপশক্তির প্রভাব থাকলেও শুভশক্তির প্রভাব কিন্তু তার চেয়ে ঢের বেশি৷ তার কারণ কি বলো তো? তোমার যারা খারাপ চায়, তাঁদের থেকে তোমার ভাল চাওয়ার মানুষগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি৷ আর তাঁদের ওই ভালবাসার শক্তি তোমার কোনো ক্ষতি হতে দেয় না৷ এটা শুধু তুমি বলে না, সব মানুষের ক্ষেত্রে সত্যি৷ কিন্তু যখন এই খারাপ শক্তির প্রভাবটা বেড়ে যায়, তখন আমাদের ভাবতে হবে যে যার ওপর এই ঘটনাগুলো ঘটছে, সে কি এমন কোনো অন্যায় করেছে যাতে তাকে ভালবাসার বা তার ভালো চাওয়ার লোক কমে গেছে? দ্যাখো এগুলো আমার ভাবনা, আমার উপলব্ধি৷ আমি তোমাদের বুঝিয়ে বলছি মাত্র৷ কিন্তু তোমরা ওখানে ব্যাপারটা সামনে থেকে প্রত্যক্ষ করেছ, তোমরা অনেক ভাল জানবে৷ আমি শুনে যা বুঝছি, তার থেকে কয়েকটা ব্যাপার তোমাদের বলতে পারি—
প্রথমত, মেয়েটা হয়ত কঠিন সাধনা করছে, যার ফলে সে এখন প্রবল শক্তির অধিকারী৷
সেটা সঠিক কিনা তোমাদের জানতে হবে৷ যদি সত্যিই সেরকম কিছু হয়, তাহলে এমন কারোর কাছে যেতে হবে যে ওর চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখেন৷ আমি চিনি তেমন একজনকে, তবে এখন কি...
যাক গে বাদ দাও, আগে দ্যাখো তো৷ আমার মনে হয় না এটা ঠিক হবে৷ আমার মনে হচ্ছে এটা নির্ভেজাল বদমায়শি করছে কেউ ভয় দেখানোর জন্য৷ আর দুর্ঘটনাগুলো নেহাতই কাকতালীয়৷ কিন্তু আরেকটা ব্যাপারও হতে পারে, তোমার জ্যেঠু-জ্যেঠিমা যদি কারোর খুব ক্ষতি কিছু করে ফেলেন, তাহলে কিন্তু অনেক সময় এমন ভুগতে হয়৷ কিন্তু তুমি যা বলছ, তাতে তো মনে হয়না যে ওনারা ওরকম কারোর ক্ষতি করার মানুষ বলে৷ তাই না?’, এতক্ষন ধরে একনাগাড়ে কথা বলতে বলতে শেষে হঠাৎই জ্যোতিষ্কর দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন উনি৷
ওরা মন দিয়ে শুনছিল৷ আচমকা প্রশ্নে একটু থতমত খেয়ে যায় জ্যোতিষ্ক৷ তবে সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘না না, শেফালী জ্যেঠিমা বা পরিমল জ্যেঠু এমন কাজ করার মত মানুষই নন৷ এ অসম্ভব!’
‘তাহলে তো বাবা মনে হচ্ছে আমার ধারণাটাই ঠিক৷ এটা কেউ নির্ঘাত বদমায়শি করার জন্যে করছে৷ কেউ হয়ত ভয় দেখাতে চাইছে তোমার জ্যেঠু-জ্যেঠিমাকে৷ এবার সেটা কেন বা কি নিয়ে ভয় দেখাতে চাইছে, সেটা তোমাকে জানতে হবে৷ যে মেয়েটির বিরুদ্ধে এত অভিযোগ উঠছে, তুমি সম্ভব হলে একবার তার সাথে কথা বলে দেখো তো! আমার মনে হয় অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে’৷
ওনার বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে উনি ওদের কিছু পুতুল দেখিয়েছিলেন৷ আচমকা দেখলে মনে হবে বাচ্চাদের খেলার ছোট ছোট মাটির পুতুল৷ কিন্তু ওই পুতুলের নাকি বিশেষ ক্ষমতা আছে৷ কালাযাদুর প্রয়োগে কেউ যদি অন্য কারোর ক্ষতি করতে চায়, তাহলে যার ক্ষতি করা হবে, তাঁকে ভেবে এরকম পুতুল বানিয়ে সেই পুতুলের ওপর ‘বাণ মারা’ হয়৷ জ্যোতিষ্কর আর ভাল লাগছিল না৷
ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে বেরিয়ে এল ওরা৷ জ্যোতিষ্কর মনে হচ্ছে ও একটু একটু আলো দেখতে পাচ্ছে৷ ইসস, এই ব্যাপারটা যে কেন আগে মাথায় আসেনি!
মাঝে মাঝে জ্যোতিষ্কর খুব আফশোস হয় একটা মোবাইলের জন্যে৷ মনে হয় কত কাজ কত সহজ হয়ে যেত শুধু ওই মুঠোফোনটা থাকলে! কিন্তু এখন বাড়িতে বলে কোনো লাভ নেই৷ মা উচ্চমাধ্যমিক শেষ হওয়ার আগে কিছুতেই ফোন কিনে দেবে না৷ মায়ের ধারণা একবার ফোন হাতে পেলেই আর লেখাপড়া হবে না জ্যোতিষ্কর৷ ওর মাধ্যমিকে ভাল রেজাল্টের পর জ্যোতিষ্কর মামা ওর জন্যে একটা ফোন কিনে এনেছিলেন৷ কিন্তু মা ঝগড়া করে ফেরত পাঠিয়েছিল সেই ফোন৷ জ্যোতিষ্ক জানে ফোনের জন্যে ওকে অপেক্ষা করতে হবে আরো একটা বছর৷
তাতানদার সাথে শেষ তিনদিন ধরে যোগাযোগের চেষ্টা করছে ও, কিন্তু কিছুতেই পারছে না৷ আগে মাঝেমধ্যেই কোচিং থেকে ফেরার সময় দেখা হত, অফিস থেকে ফিরত তাতান দা৷ কিন্তু আজকাল সেটাও হচ্ছে না৷ মায়ের জন্য ও বাড়ি যাওয়ার রাস্তাও বন্ধ৷ ছটফট করছিল জ্যোতিষ্ক, বড্ড সময় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে৷ তাতানদার সাথে এক্ষুনি একবার যোগাযোগ না করতে পারলে খুব মুস্কিল!
একটু মনখারাপ করেই বিকেলবেলা ছাদে উঠেছিলো ও৷ আজ পড়তে যাওয়া নেই৷ শুক্রবার করে পড়া থাকে না সকালে, এইসময়টায় তাই ও একটু ছাদে পায়চারি করে৷ আর ঠিক তখনই খুট করে খুলে গেল শেফালী কাকিমাদের ছাদের দরজাটা৷ জ্যোতিষ্কর তক্ষুনি লাফিয়ে উঠে ফেলুদার মত বলতে ইচ্ছে করছিল, ‘আছে, আছে, আমার টেলিপ্যাথির জোর আছে!’
হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরে ছাদে উঠেছে তাতানদা৷ আজকাল সবাই এত ব্যস্ত হয়ে গেছে, যে পাশের বাড়ির সেই দাদাটা, যার সঙ্গে একসময়ে দিনের প্রায় বারো ঘন্টা খেলত ও, তার একবার দেখা পাওয়ার জন্যে এত অপেক্ষা করতে হয়৷ অনেক কিছু বলতে চাইছিল জ্যোতিষ্ক, কিন্তু ওর খালি মনে হচ্ছিল মা চলে আসতে পারে যে কোনো সময়ে৷ ছাদে দাঁড়িয়ে এসব কথা হবে না৷
‘তাতান দা, তোমার সাথে আমার খুব জরুরী একটা দরকার আছে৷ প্লিজ এক্ষুনি একবার
রেডি হয়ে বেরোও বাড়ি থেকে৷ নতুন যে কফিশপটা হয়েছে মোড়ের মাথায়, ওখানে যাবে৷ আমি দশ মিনিটের মধ্যে আসছি৷ আর হ্যাঁ, ব্যাপারটা কিন্তু কনফিডেন্সিয়াল৷ তুমি কাউকেই বলবে না যে তুমি আমার সাথে দেখা করতে যাচ্ছ’ , হুড়মুড়িয়ে বলে জ্যোতিষ্ক৷
প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও জ্যোতিষ্ক যতটা পারে বুঝিয়ে দেয় ব্যাপারটা যে কেন ওদের ছাদে কথা বলা সম্ভব নয়৷ তাতানও সম্ভবত ওর বাড়িতে কিছু গন্ডগোল আঁচ করতে পেরেছিল৷ খুব একটা দেরি না করে তাই ও নেমে যায় ছাদ থেকে, দশ মিনিটের মধ্যে কফিশপে পৌঁছে যাবে বলে৷ তাতান যাওয়ার একটু পরে জ্যোতিষ্ক হাতে একটু সময় নিয়েই বেরোয়, যাতে কেউ ওদের একসঙ্গে দেখতে না পায়৷ ওদের পাড়ার মোড়ে এই কফিশপটা নতুন হয়েছে৷ একটা কোণের টেবিলে একা বসে আছে তাতান, মোবাইলে কিছু খুটখাট করছে৷ এখন এই সকালবেলা চেনা কেউ কফিশপে আসবে বলে মনে হয় না৷
‘কিগো’ , ওর সামনে গিয়ে চেয়ারটা টেনে বসে জ্যোতিষ্ক৷
‘বল, হঠাৎ জরুরী তলব করলি যে?’ , হাসে তাতান৷ জ্যোতিষ্ক বুঝতে পারছে তাতান কষ্ট করে হাসল৷ ওর বাড়িতে যা চলছে, তাতে কারোরই মন ভাল থাকার কথা নয়৷
সময় নষ্ট না করে তাই কাজের কথায় চলে যায় জ্যোতিষ্ক, ‘তাতান দা, আমি জানি তোমার বাড়িতে কি চলছে৷ সবটা না জানলেও কিছু কিছু জানি৷ জ্যেঠিমার লাস্ট অ্যাকসিডেন্টটা হওয়ার আগে আমার একদিন জ্যেঠিমার সাথে কথা হয়েছিল, তারপর সেদিন জ্যেঠুর সাথেও কথা বলে এসেছি৷ কিছু কিছু জিনিসে আমার কয়েকটা জিজ্ঞাস্য আছে, তাই আজ তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাইলাম৷ তোমার যদি প্রব্লেম না থাকে, আমি তাহলে তোমাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?’
‘আর কিছু করতে পারবি না বাবাই, তোর করার মত কিছু নেই৷ সব আমাদের হাতের বাইরে চলে গেছে৷ আমার আর রিমলির ডিভোর্স হয়ে যাবে খুব শিগগির৷ রিমলি ওর বাপেরবাড়ি চলে গেছে’ , ম্লান হেসে বলে তাতান দা৷
হঠাৎ যেন থমকে যায় জ্যোতিষ্ক৷ এ কি শুনছে ও!
‘মানেটা কি? এসব আবার কবে হল? হুট করে এরকম সিদ্ধান্ত কেন?’
‘এটা হওয়ারই ছিল রে৷ অশান্তিটা আমার বিয়ের পর থেকেই জট পাকাচ্ছিল, আমি বুঝতে পারছিলাম৷ দ্যাখ, তুই বড় হয়েছিস, তোকে একটা কথা বলি, মেজ কাকিমার একটু গন্ডগোল করা স্বভাব আছে সবেতে, আমি জানি৷ বরাবর করে আসছে৷ তোরা হয়ত বাইরে থেকে বুঝিস না, কিন্তু বাড়িতে যারা থাকে, টের পায়৷ কিন্তু মা যে এরকম বদলে যাবে, আমি ভাবতে পারিনি রে৷ জানিস, হাসপাতাল থেকে ফিরে এসে মা সরাসরি চার্জ করল রিমলিকে৷ বলল ও অপয়া৷ ও আমাদের বাড়িতে আসার পর নাকি এসব ঝামেলা হচ্ছে৷ ও নাকি তুকতাক করে সকলের খারাপ করছে! এরপর আর কোনো মেয়ে থাকে বল?’
‘তুমি কিছু বললে না?’
‘কি বলব আমি? আমি বললাম যে রিমলিকে নিয়ে আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি৷ তখন কাকু-কাকিমারা আমাকে খুব সাপোর্ট করল৷ কিন্তু মা ফট করে কেমন যেন হয়ে গেল৷ আমাকে বলল, তুই বৌয়ের জন্যে মাকে ছেড়ে দিবি বাবু? ব্যস, ওটা শুনে রিমলি তক্ষুনি জামাকাপড় গুছিয়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে, আমার আর কোনো কথাই শুনল না!’
‘তুমি তারপর জ্যেঠিমাকে কিছু বোঝাওনি? জ্যেঠু কি বলছে?’
‘বাবা অদ্ভুতভাবে পাল্টে গেছে জানিস তো! এটাই আমার কাছে খুব আশ্চর্যের৷ ক’দিন আগে অবধি বাবা বলছিল যে এসব কিছু হয় না, এদিকে সেদিন ওই অশান্তির পর থেকে বাবা অন্য কথা বলছে৷ বলছে হলেও হতে পারে, দুনিয়ার কতটুকুই বা আমরা জানি! এবার আমি কি করব তুই বল বাবাই?’ , তাতানদার গলাটা খুব অসহায় লাগছে৷
কিছুক্ষন চুপ করে বসে থাকে জ্যোতিষ্ক৷ তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা তাতানদা, তুমি একটা কথা বলোতো, সবাই যা বলছে তুমি কি সেরকম কিছু দেখেছ কোনোদিন তোমাদের ঘরে? বা বৌদির কোনো ব্যবহারে মনে হয়েছে যে ও অস্বাভাবিক কোনো কাজ করে?’
‘একদমই না, বরং রিমলি খুব ওপেন মাইন্ডেড জানিস৷ ও ঠাকুরও মানে না, সেই নিয়েও বিয়ের পর মা-কাকিমাদের সাথে লেগেছিল একটু৷ কিন্তু ওকে ওর জায়গা থেকে কেউ সরাতে পারেনি৷ সেখানে এসব তুকতাক, কালাজাদু , আমাকে স্বয়ং ভগবান এসে বললেও আমি বিশ্বাস করব না যে রিমলি এসব করতে পারে’৷
‘আচ্ছা, একটা কথা বলো তো, রিমলি বৌদির সঙ্গে তোমার ডিভোর্স হয়ে গেলে তুমি কি বাড়িতেই থাকবে? সেই নিয়ে কথা হয়েছে কিছু?’
‘হ্যাঁ হয়েছে৷ বাড়িতে আমি আর থাকব না, ইনফ্যাক্ট আমি এই শহরেই আর থাকব না৷ পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছি আমি৷ যাদের মনে এত বিষ, তাদের সাথে আমি ঘর করতে পারব না’৷
‘তা তোমার কথায় বাড়ির সকলের কি রিয়্যাকশন?’
‘মা কান্নাকাটি করছিল অনেক, কাকিমারা শুনলাম বোঝাচ্ছিল কিসব, যে আমাকে নতুন করে শুরু করার জন্য সময় দিতে হবে, রিমলি নাকি আমাকে জাদু করেছে অ্যান্ড অল৷ আমি শহরের বাইরে না গেলে রিমলি আমার ঘাড় থেকে নামবে না৷ ছোট কাকিমা বলছে টুবলুকে আমার ঘরে শিফট করে দেবে, তাহলে মায়ের আর মনখারাপ করবে না৷ ওরা সব প্ল্যান করেই ফেলেছে, শুধু আমাদের যাওয়ার অপেক্ষা৷ যা পারে করুক, আমি এখান থেকে যেতে পারলে বাঁচি!
জানিস তো বাবাই, আজকাল বাড়ি থাকলে মাঝেমধ্যে ভাবি যে আমি কত সালে বাস করছি!’
‘তোমাদের বাড়িটা কে ভাগ করে গেছিল আমাকে বলতে পারবে তাতান দা?’
হঠাৎ প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷
আর এরকম একটা প্রশ্নে একটু ঘাবড়ে যায় তাতান, ‘অ্যাঁ! বাড়ি ভাগ মানে?’
‘মানে এই কোন ঘরে কে থাকবে, এটা কে ঠিক করে দিয়েছিল?’
‘সম্ভবত আমার ঠাকুর্দা৷ মানে বাবার কাছে উইলে সেরকমই লেখা আছে শুনেছি৷ কেন বল তো? হঠাৎ বাড়ি ভাগের কথা জিজ্ঞেস করলি?’
‘না এমনি৷ হঠাৎ মনে হল৷ আচ্ছা, তুমি আমাকে আর একটা জিনিস বলতে পারবে, তোমাদের বাড়িতে কি কখনো এরকম সুযোগ পাওয়া যাবে যখন আমি সব ঘরগুলোয় একবার করে ঢুকে দেখতে পারি? সে সময়ে কেউ না থাকলেই ভাল হয়, তবু কেউ যদি থাকেও, তাঁরা যেন আগে থেকে না জানেন আমার যাওয়ার কথা’৷
‘দ্যাখ, আমার ঘরে বা বাবা-মায়ের ঘরে তো কোনো অসুবিধে নেই৷ কাকিমাদের ঘরে কি হবে আমি জানিনা৷ তবু আমি চেষ্টা করব৷ তুই কবে আসবি বল?’
‘আজ বিকেলে? আর বেশি দেরি করতে চাইছিনা আমি’৷
‘বেশ, তাই আয়৷ আমি দেখছি কি করা যায়’৷
‘তাতান দা, তোমাদের ঠাকুরঘরটা কোথায়?’, বাড়িতে ঢুকেই প্রথম প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷
‘ওপরে৷ যাবি? না আগে নিচের ঘরগুলো দেখে নিবি?’
‘কাকিমারা নেই?’
‘রান্নাঘরে সবাই’৷
‘তাহলে চলো, নিচের কাজটা সেরে নিই আগে’৷
প্রথমেই ওরা ঢোকে বিমলকাকুর ছেলে টুবলুর ঘরে৷ টুবলু ঘরেই ছিল, খাটের ওপর শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে সিনেমা দেখছিল৷ জ্যোতিষ্ককে দেখে উঠে বসলো খাটে, ‘বাবাইদা, তুমি?’
‘এমনি রে, এই একটু ঘুরতে এলাম তোদের বাড়ি৷ কি সিনেমা দেখছিস?’, টুবলুর ল্যাপটপে উঁকি মারে জ্যোতিষ্ক৷ ওর সাথে দু’একটা এদিক-ওদিক কথা বলে বেরিয়ে আসে ওর ঘর থেকে৷
এর পাশের ঘরটাতেই বিমলকাকু আর ছবি কাকিমা থাকেন৷ ঘরে ঢুকেই হঠাৎ বিছানার গদিটা উঠিয়ে কি যেন খোঁজে জ্যোতিষ্ক৷
‘কি দেখছিস ওখানে?’, ওর পাশে এসে প্রশ্ন করে তাতান৷
‘আমার সন্দেহ যদি ঠিক হয়, তাহলে এখানেই আছে তোমাদের কালাজাদু রহস্যের চাবিকাঠি৷ এক মিনিট দাও আমাকে প্লিজ’, ঘরের মধ্যে তিরিশ সেকেন্ডের একটা ঝড় বইয়ে কি যেন একটা পকেটে ঢোকায় জ্যোতিষ্ক৷ তারপর তাতানের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘এবার ঠাকুরঘরে চলো’৷
কর্মকার বাড়িতে ঠাকুরঘরটা বেশ বড়৷ অনেক ঠাকুর সুন্দর করে সাজানো ফুল দিয়ে৷ বোঝাই যাচ্ছে ঠাকুররা বেশ যত্ন পান৷
‘রোজ এত ফুল কোত্থেকে আসে গো? তোমাদের তো গাছ নেই, কিনে আনে?’ , প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷
‘বোধহয়৷ এসব কঠিন প্রশ্ন আমাকে কেন করছিস বল তো বাবাই? আমি পারতপক্ষে ঠাকুরঘরে ঢুকি না৷ ঠাকুরের ফুল কে কেনে, সেটার জবাব দেওয়া আমার পক্ষে বিশাল চাপ’, হাসে তাতান৷
জ্যোতিষ্কও হাসে৷ তারপর বলে, ‘তোমার ঘরটা ফাঁকা এখন?’
‘হ্যাঁ, আমার ঘরে আর কে থাকবে!’ , একটু যেন হতাশা ঝরে পড়ে তাতানের গলায়৷
‘বেশ৷ তুমি এবার চট করে বাড়ির সকলকে ডেকে ফেলো তো তোমার ঘরে৷ বলবে না আমি ডাকছি৷ বলবে একটা জরুরী দরকার, তাই সবাই যেন আসে৷ তুমি ডেকে আনো,
আমি তোমার ঘরে গিয়ে বসছি’ , তাতানের ঘরের দিকে চলে যায় জ্যোতিষ্ক৷
ওকে আজ এ বাড়িতে আসার পর শুধু টুবলু দেখেছে৷ কাজেই আশা করা যায় যে সবাই আসবে৷ তাতানের খাটের ওপর গিয়ে বসল জ্যোতিষ্ক৷ ঘরটা খুব পরিপাটি করে সাজানো৷ বৌদি চলে গেছে, কিন্তু তার ছাপ যেন রয়ে গেছে সব জায়গায়৷
মিনিট দুয়েকের মধ্যে ঘরে এলেন শেফালী জ্যেঠিমা, পরিমল জ্যেঠু, সুধা কাকিমা, ছবি কাকিমা আর টুবলু৷ পেছন পেছন তাতান ঢুকল৷
‘কি ব্যাপার বাবাই, তুই এখানে?’ , অবাক হয়ে প্রশ্ন করেন জ্যেঠি৷
‘বলছি৷ তার আগে টুবলু তুই ঘরে যা, তোর এখানে থাকার দরকার নেই’, এই বলে টুবলুকে ঘরে পাঠায় ও৷ তারপর তাতানের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘অমল কাকু আর বিমল কাকু বাড়ি নেই?’
‘না, কাকারা নেই দেখলাম তো!’
‘বেশ, তাহলে কি আর করা যাবে, তোমাদেরকেই বলি’ , একটু হতাশ গলায় বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘কি এমন বলবি তুই বাবাই, যে হঠাৎ বাড়ির সবাইকে দরকার?’ , শেফালী জ্যেঠিমা আর কৌতূহল চেপে রাখতে পারছেন না৷
‘তোমাদের বাড়িতে এতদিন ধরে যে বিচ্ছিরি ঘটনাটা হচ্ছে, সেটা যাতে আর না হয়, সেই কথাই বলব তোমাদের জ্যেঠি৷ আর একটা কথা শুনে রাখো, আমার কথা শেষ হলেই কিন্তু তোমাকে রিমলি বৌদিকে আনতে যেতে হবে৷ তৈরী থেকো’৷
‘আমি প্রাণ থাকতে ওই মেয়েকে আর বাড়ি ঢোকাব না’ , কঠিন গলায় বলেন জ্যেঠি৷
‘বেশ, পরে কিন্তু কান্নাকাটি কোরো না৷ কেন না রিমলি দিকে তোমরা সম্পূর্ণ বিনা দোষে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেছ৷ তোমরা অন্যায় করেছ একজন নিরপরাধ মানুষের সাথে৷ এই দোষে যদি তোমাদের সত্যিই কিছু ক্ষতি হয় সেটা সামলাতে পারবে তো জ্যেঠি? এতদিন অবধি তোমাদের বাড়িতে যা হয়েছে, সেগুলো তো মানুষের তৈরী করা৷
কিন্তু যে ঠাকুরের এত পুজো করো, সেই ঠাকুর যদি পাপ দেন, সামলাতে পারবে তো?’
‘এসব কি বলছিস তুই? ঠাকুর পাপ দেবে কেন? আমি জ্ঞানত কারোর কনো ক্ষতি করিনি৷ সেখানে এইসব কথা উঠছে কেন?’, জ্যেঠির গলায় বিরক্তি স্পষ্ট৷
‘জ্ঞানত না করলেও তুমি যে অজ্ঞানত মারাত্মক ভুল করে ফেলেছ জ্যেঠি৷ তুমি অন্যায়ভাবে একটা মেয়েকে ভুল দোষ দিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেছ৷ তোমাদের বাড়িতে এসব কালাজাদুর কোনো ঘটনাই ঘটেনি৷ যা হয়েছে, সেটা মানুষের তৈরী পরিস্থিতি, তোমাদের ভয় দেখানোর জন্যে’৷
‘মানে? আমাদের আবার কে ভয় দেখাবে? কেনই বা দেখাবে?’
‘আচ্ছা জ্যেঠু, আমাকে একটা কথা বলো তো, তোমাদের বাড়িটা যখন দাদু, মানে তোমার
বাবা ভাগ করে দিলেন, মানে কোন ছেলে কোন ঘরে থাকবে ঠিক করলেন, তখন তোমার ভাইরা আপত্তি করেনি তুমি দোতলায় দু’টো ঘর পেলে বলে?’, জ্যেঠিমাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পরিমল জ্যেঠুকে প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷
একটু থতমত খেলেও জ্যেঠু সামলে নেন নিজেকে৷ বলেন, ‘তখন তো ওরা খুব ছোট৷ বাবা যা দিয়ে গেছেন, আমরা মেনে নিয়েছি৷ এসব তো কখনো মাথায় আসেনি!’
‘সেইদিনই না বুঝে মস্ত বড় ভুলটা করে ফেলেছিলে জ্যেঠু৷ সেদিন যদি বুদ্ধি করে কেউ বলতে দাদুকে যে তিন ভাই একটা করে ঘর দোতলায়, আর একটা করে ঘর একতলায় পাবে, তাহলে আজ আর এই অশান্তি হত না’৷
‘মানে? কি বলছিস তুই বাবাই আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না!’
‘জ্যেঠু তুমি দু’টো ঘর নিয়ে দোতলায় রয়েছ, ঠাকুরঘর, রান্নাঘর সব দোতলায়৷ অন্যদিকে অমল কাকুর একটা ভাগ একতলায়, বিমলকাকু পুরোটাই একতলায়৷ তাঁরা মানবে কেন বলতে পারো? তুমি তো তোমার ভাইদের তুলনায় প্রিভিলেজড! আর এটাই তোমার ভাইদের রাগের কারণ, যার থেকে আজ এই পরিস্থিতি তৈরী হল৷ এই প্ল্যানটা পুরোটাই ছবি কাকিমার৷ কাকিমাই সবটা করেছেন, শুধু এক্সিকিউট করতেন সুধা কাকিমা৷ বিমল কাকুও জানতেন পুরো ব্যাপারটা, কেননা ওনার ঘরেই এইসব জাদু করার জিনিসপত্র রাখতেন ছবি কাকিমা৷ অমল কাকু জানতেন কিনা আমার জানা নেই...’
‘এসব কি আজগুবি বকছিস তুই বাবাই? তোর মাকে ডাকব? আমাদের বাড়ি বয়ে এসে এভাবে অপমান করছিস! বড়দের সাথে এভাবে কথা বলতে শিখেছিস?’, হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠে ছবি কাকিমা৷
‘একটু দাঁড়াও কাকিমা৷ আমি প্রথম থেকে শুরু করি? প্রমাণ ছাড়া আমি কোনো কাজ করি না৷ প্রতিটা ঘটনা ক্ল্যারিফাই করে দেব৷ তুমি চাইলে আমার মাকে ডাকতেই পারো৷ তুমি যদি চাও পাড়ার লোক ডেকে তাঁদের সামনে তোমার অপমান হোক, সেটা তোমার ব্যাপার!’, আত্মবিশ্বাসের সাথে বলে জ্যোতিষ্ক৷
‘দাদা, আপনি কি করে শুনছেন ওর কথা এতক্ষন বুঝতে পারছি না৷ কালকের ছেলে, নিজেকে বিশাল কিছু ভাবছে৷ আমাদের বাড়ির ব্যাপার, ও এসে জ্ঞান দেবে আর আমাদের শুনতে হবে? মনগড়া কাহিনী বানিয়ে এখন আমাদের দোষী সাজানোর চেষ্টা করছে৷ রিমলি চলে যাওয়ার পর এ বাড়িতে আর কোনো অঘটন হয়েছে আপনি বলুন তো?’ , উত্তেজিত হয়ে পরিমল জ্যেঠুকে বলেন ছবি কাকিমা৷
‘তুমি দাঁড়াও ছবি, বাবাই কি বলছে আমাকে শুনতে দাও আগে৷ তারপর আমি ঠিক করব কে ঠিক আর কে ভুল’ , দৃঢ় গলায় বলেন পরিমল জ্যেঠু৷
মুখটা কালো হয়ে যায় ছবি কাকিমার৷ আবার শুরু করে জ্যোতিষ্ক,
‘আমার প্রথম থেকেই সন্দেহ ছিল যে বৌদির দ্বারা হয়ত এসব কাজ সম্ভব নয়৷ তারপর মনে হল কে এরকম করতে পারে? কোনো বাইরের লোক কি তোমাদের এমন ক্ষতি চাইবে? আর চাইলে কেনই বা চাইবে! অনেক ভেবেছি এটা নিয়ে৷ তারপর একদিন এলাম জ্যেঠিমার কাছে, আর তখনই হঠাৎ একটা কথোপকথন কানে এল আমার৷ জ্যেঠি হয়ত শোনেনি, আমি শুনেছি৷ জ্যেঠির ঘর থেকে কথা বলে বেরিয়ে যখন রান্নাঘরের সামনে দিয়ে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিলাম, শুনলাম চাপাস্বরে কি যেন গজগজ করছে ছবি কাকিমা৷ জ্যেঠি তখন সুধা কাকিমাকে উইয়ের ওষুধ দিতে গেছে৷ আমি একটু লুকিয়ে দাঁড়ালাম রান্নাঘরের দরজার পাশে৷ শুনলাম কাকিমা বলছে যে জ্যেঠিরা ওপরের দু’টো ঘর দখল করে রেখেছে, একবারও ভাবে না বাড়ির অন্য লোকেদের কথা৷ ছেলের বিয়ে দিয়েও ওপরে রাখল, এদিকে কাকিমাদের হাঁটুর ব্যথা নিয়ে ওপর-নীচ করতে করতে জীবন যায়৷ তার ওপর এত লোকের রান্নার বেশিটাই ছবি কাকিমাকে সামলাতে হয় আজকাল৷ জ্যেঠির বয়স হচ্ছে বলে অতটা পারে না এখন৷ নতুন বৌকে জ্যেঠি খুব প্রশ্রয় দেয়, সে নাকি সংসারের কুটোটা ভেঙ্গে দু’টো করে না৷ যাই হোক, সব বাড়িতেই এরকম চাপা অসন্তাোষ থাকে অনেকের মনে, এটা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি৷ আমি হয়ত এটা পাত্তাও দিতাম না যদি না শেষ কথাটা শুনতাম৷
ঠিক চলে যাওয়ার সময় শুনলাম কাকিমা বললেন, ‘‘দাঁড়াও না, তোমার ওই আদরের বৌকে এমন টাইট দেব যে পালাতে পথ পাবে না৷ দোতলায় রাজত্ব করা বার করছি!’’
আমি কিন্তু এটা শোনার পরেও বিশ্বাস করতে পারিনি যে সত্যিই কাকিমা এমন করতে পারেন৷ তবে সন্দেহটা মনে সেদিনই ঢুকে গেছিল৷ আর এটাও বুঝেছিলাম যে এই কাজে ছবি কাকিমাকে মদত দিচ্ছেন সুধা কাকিমা, কারণ উনিও ওপরের রাজত্ব পাননি পুরোপুরি৷ তাও যথেষ্ট প্রমাণের অভাবে আমি কিছু করতে পারছিলাম না৷ আর এর মধ্যেই ঘটে গেল জ্যেঠির দুর্ঘটনাটা৷ আপনারা সবাই এটা দুর্ঘটনা ভাবলেও আমি কিন্তু জানতে পেরে গেছি আসলে কি হয়েছিল৷ এখনও অবধি আপনাদের বাড়িতে ঘটা প্রতিটি দুর্ঘটনার প্ল্যান ছবি কাকিমার, আর সেগুলিকে কাজে ফুটিয়ে তুলেছেন সুধা কাকিমা৷
কাকিমার অ্যাক্সিডেন্টের পরদিন সকালে আমি চুপচাপ ঘরে বসেছিলাম, এই ঘটনাটা নিয়েই ভাবছিলাম৷ এইসময় ঘর ঝাঁট দিতে ঢুকল সুমিত্রা মাসী৷ মাসী আমার সাথে প্রায়ই গল্প করে ঝাঁট দিতে দিতে৷ সেদিন মাসী চুপ ছিল প্রথমে একদম৷ আমাকে চুপ করে বসে থাকতে দেখে ঘর থেকে বেরোনোর আগে জিজ্ঞেস করল আমি কি ভাবছি৷ আমি সাধারণত আমার ভাবনাচিন্তা কাউকে বলি না, কিন্তু সেদিন কি খেয়ালে মাসীকে যে বলে ফেললাম জানিনা৷ সুমিত্রা মাসী তোমাদের বাসন মাজে৷ সুধা কাকিমা সেদিন যখন গরম জলের হাঁড়িতে তেল লাগিয়ে দিয়েছিলে, খেয়াল করোনি যে তোমার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছিল সুমিত্রা মাসী, এঁটো বাসন নিয়ে কলতলায় যাবে বলে৷ তুমি হাঁড়ির চারদিকে বেশ ভাল করে তেল মাখিয়ে দাও, যাতে জ্যেঠি গরম জল শুদ্ধু ওটা নামাতে গেলেই হাত স্লিপ করে গায়ে পড়ে৷ সুমিত্রা মাসী দেখে ভয় পেয়েছিল, কিছু বলতে পারেনি৷ জ্যেঠিকে বারবার বলেছিল গরম অবস্থায় হাঁড়িটা না নামাতে, কারণটা বলতে পারেনি, ও ভেবেছিল কেউ ওকে বিশ্বাস করবে না৷ কিন্তু জ্যেঠি ওকে আশ্বাস দিলেও ওর কথা শোনেনি৷ সেদিন বোধহয় জ্যেঠির কোথাও বেরোনো ছিল, তাই একটু তাড়াহুড়ো করছিল’, একটু থামে জ্যোতিষ্ক৷
আর তখনই মুখে আঁচল দিয়ে হঠাৎ কেঁদে ওঠে শেফালী জ্যেঠিমা, ‘তুই আমাকে মেরে ফেলতে চাইলি সুধা? সেই বিয়ের পর থেকে তোদের সবসময় ছোট বোনের মত দেখেছি৷ একটা ঘরের জন্যে আমাকে মেরে ফেলতে চাইলি তোরা? আর আমি শুধু শুধু রিমলিকে কি না কি বলেছি...ছি ছিঃ ছিঃ ছিঃ’৷
‘আমার কথা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি জ্যেঠি’, শেফালী জ্যেঠিমাকে আবার থামিয়ে বলে
জ্যোতিষ্ক, ‘আমার এখনও বলা বাকি যে কালাজাদুর নিদর্শন হিসেবে তোমরা যেগুলো দেখতে, সেগুলো আসলে কি’৷
সুধা কাকিমা আর ছবি কাকিমা ঘরের এক কোনে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে, কাঁদছেন কিনা বোঝা যাচ্ছে না৷ জ্যেঠু খাটের এক পাশে বসে পড়েছেন মাথায় হাত দিয়ে, আর জ্যেঠিমার চোখ বিস্ফারিত৷
‘জ্যেঠুর পাঁঠার মাংস পুরোপুরি বন্ধ৷ এমনিই হার্টের সমস্যা আছে৷ সেখানে তেল ঘি দেওয়া পাঁঠার মাংস খাওয়ালে জ্যেঠুর যে শরীর খারাপ হবেই, সেটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা যায়৷ জ্যেঠু ডিনার করে তাতান দা ফেরার আগে, কাজেই বারণ করার কেউ ছিল না৷ এবার এই দুর্ঘটনাগুলো ঘটার আগে একটু জবাফুলের পাপড়ি ছড়ানো, বা ছেঁড়া চুল ছড়িয়ে দেওয়া, কিংবা বৌদি বেরোনোর পর ওর ঘরে লুকিয়ে এইসব জিনিসের বাক্স রেখে নিজেই তারপর সেটা খুঁজে দেখানো খুব কি শক্ত কাজ জ্যেঠি? তোমার এগুলো একবারও মাথায় এল না? আমি কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্য এমন একজনের কাছে গেছিলাম, যিনি এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন৷ তিনি সব শুনে বলেছিলেন এগুলো কেউ ভয় দেখানোর জন্যে করছে৷ আমি তখন আরও নিশ্চিত হই৷ আরেকটা কথা বলি, আমি আজই কেন তাড়াহুড়ো করে এই কথাগুলো জানাতে এলাম৷ আজ আমি না এলে হয়ত আজ আরেকটা দুর্ঘটনা ঘটত তোমাদের বাড়ি৷ আজ ভোরবেলা ঘুম ভেঙ্গে যাওয়াতে ছাদে উঠেছিলাম৷ কিন্তু ছাদের দরজা খুলে বেরোনোর আগেই সিঁড়ির জানলা দিয়ে দেখলাম ছবি কাকিমা হাত বাড়িয়ে আমাদের জবা গাছ থেকে ফুল তুলছে৷ কেমন যেন সন্দেহ হল আমার৷ তারপর ভাগ্যক্রমে তাতানদার সাথে দেখা হয়ে গেল, আর আজ তোমাদের বাড়ি আসার সুযোগও৷ আমি তোমাদের ঠাকুরঘরে যেতে চেয়েছিলাম আজ একবার, কারণ আমার দেখার দরকার ছিল সত্যিই জবাফুলগুলো ঠাকুরের কাছে গেছে কিনা৷ কিন্তু সেখানে জবাফুলের কোনো চিহ্ন পেলাম না৷ জবাফুল তো আর কেউ ঘর সাজাতে ব্যবহার করেন না, ফুলগুলো পাওয়া গেল ছবি কাকিমার তোষকের তলায়, পাপড়ি ছেঁড়া অবস্থায়৷ এক জায়গায় জড়ো করে রাখা৷ হয়ত আমি না আসলে এতক্ষনে ওদের জায়গা হত অন্য কারো ঘরে৷ আর তারপর আবার কোনো দুর্ঘটনা...তারপর বলা হত বৌদি যাওয়ার আগে শেষ বাণটা মেরে গেছে৷ আমার ধারণা আজকের টার্গেট ছিল তাতানদা, কারণ তাহলে জ্যেঠিকে বোঝানো সুবিধে হত যে তাতানদাকে তাড়াতাড়ি এই বাড়ির বাইরে বা শহরের বাইরে না পাঠালে ওই মেয়েকে ঘাড় থেকে নামানো যাবে না৷ আর তাতানদার মত ছেলে এইসব কারণে যদি একবার বাড়ি ছাড়ে, তাহলে ও যে আর কোনোদিন সম্পত্তির ভাগ চাইতে আসবে না, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়৷’
থামল জ্যোতিষ্ক৷ পকেট থেকে ছেঁড়া ফুলগুলো বের করে দেখাল৷ ঘরে মনে হচ্ছে পিন পড়লেও শব্দ পাওয়া যাবে৷ মিনিটদুয়েক পর কথা বললেন পরিমল জ্যেঠু —
‘তাতান, একটা ট্যাক্সি ডাক৷ আমি রিমলিকে আনতে যাব৷ আমার পাপের শেষ নেই, একটুর জন্যে হলেও বোধহয় আমি মেয়েটাকে অবিশ্বাস করেছিলাম৷ আমাকে আজ ওর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে৷ আর আজ থেকে আমি নীচে বিমলের ঘরে থাকব৷ সত্যিই আমি ওদের বঞ্চিত করেছি৷ এভাবে কেন যে কোনোদিন ভাবিনি! বড় ভুল হয়ে গেছে আমার, বড় ভুল৷ ভাগ্যিস বাবাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল!’
‘দাদা, আমাদের ক্ষমা করুন৷ আপনি দয়া করে নীচে যাবেন না৷ আমরা যেমন আছি তেমনই থাকব৷ আপনি চাইলে এ বাড়ি ছেড়েও চলে যেতে পারি৷ আপনি আর দিদি যেমন আছেন তেমন থাকুন৷ ঝোঁকের মাথায় কি যে করে গেছি, নিজেদের খেয়াল নেই৷ আমাদের আরেকটা সুযোগ দিন দাদা’ , পরিমল জ্যেঠুর পায়ের কাছে বসে কাঁদছে ছবি কাকিমা৷
সুধা কাকিমাও এগিয়ে এসেছে ক্ষমা চাইতে৷
ওদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল জ্যোতিষ্ক৷ মনটা আজ হালকা লাগছে অনেকদিন পর৷ এখন ওদের মধ্যে যেন সব অশান্তি তাড়াতাড়ি মিটে যায়, রিমলি বৌদি তাড়াতাড়ি ফিরে আসে, এটুকুই চায় ও৷ ওর কাজ ছিল সত্যিটা সকলের সামনে তুলে আনা, সেটুকু যে ও করতে পেরেছে, এতেই ওর শান্তি৷
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন