রাণী রহস্য

মৌমিতা ঘোষ

সকালে খবরের কাগজটা আসতেই মায়ের হাত থেকে প্রায় ছোঁ মেরে কাগজটা নিয়ে পিছনের পাতাগুলো উল্টোতে শুরু করে জ্যোতিষ্ক৷ আজ চার-পাঁচদিন ধরে খবরটা পিছনের দিকের পাতাগুলোতেই থাকছে৷

‘কি হলটা কি বাবু? এরকমভাবে নিলি কেন কাগজটা?’, একটু বিরক্ত হন মা৷

‘একটু পরে দিচ্ছি মা প্লিজ প্লিজ৷ একটা জরুরী খবর দেখার আছে৷ তুমি বাবাকে আজ শুধু চা দাও, বলো অফিস থেকে ফিরে কাগজ দেখতে’ , মায়ের উত্তর শোনার অপেক্ষা না করেই ঝড়ের বেগে কাগজটা নিয়ে নিজের ঘরে চলে যায় জ্যোতিষ্ক৷ ও জানে যে বাবা সকাল বেলায় চায়ের সাথে একটু খবরের কাগজটা উলটে দেখেন মিনিট পনেরো, তারপরেই কাগজটা মুক্ত৷ কিন্তু আজ ওর সেটুকু ধৈর্যও যেন ধরছে না৷

একটু অবাক হন মা৷ ছেলের এমন ব্যবহার তো খুব একটা দেখা যায় না! খেলার পাতাটা দেখার জন্যে একটু ছটফট করে বটে, তবে এমন তো নয়! যাই হোক, সকাল বেলায় তাঁর অনেক ব্যস্ততা৷ তাই জ্যোতিষ্কর ব্যবহার একটু অস্বাভাবিক লাগলেও বেশিক্ষন মাথায় ঠাই পায় না৷

এদিকে জ্যোতিষ্ক তখন খাটের ওপর কাগজটা বিছিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে তার ওপর৷ বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রামের খবর, হয়ত বেশিরভাগ মানুষেরই চোখ এড়িয়ে গেছে৷ আজ বেশ কয়েকদিন ধরে নিয়মিত বেরোচ্ছে খবরটা, আর সেটাই জ্যোতিষ্কর মনে প্রচন্ড কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে৷ প্রথমদিন খবরটার শিরোনাম ছিল অদ্ভুত, ‘আবার মুকুল!’

সেটা দেখেই ভুরু কুঁচকে গেছিল জ্যোতিষ্কর৷ পড়তে শুরু করেছিল ও খবরটা৷ বীরভূমের এক প্রত্যন্ত গ্রাম, শালতলি৷ বোলপুর স্টেশন থেকে যেতে হয় প্রায় ঘন্টা দুয়েক গাড়িতে, আর তারপর হেঁটে৷ ওখানে গাড়িঘোড়ার অতটা চলাচল নেই বললেই চলে৷ সেই গ্রামেই নাকি জন্ম নিয়েছে এক জাতিস্মর! এমনটাই উঠে আসছে খবরে৷ বেশ কয়েকদিন খবরটির সম্পর্কে পড়ে জ্যোতিষ্ক যা বুঝেছে, ওই গ্রামেরই এক বাচ্চা মেয়ে বুলবুলি, আর তাকে ঘিরেই তৈরী হয়েছে এই বুলবুলি রহস্য৷ মেয়েটির মাত্র পাঁচ বছর বয়স, আর এই সময়েই সে গড়গড় করে বলে চলেছে তার আগের জন্মের কথা৷ মেয়েটির কথা ফুটেছে তিনবছর বয়সে, কিন্তু বরাবরই সে একটু চুপচাপ৷ প্রথম প্রথম কয়েকটিমাত্র শব্দ উচ্চারণ করত সে৷ কিন্তু ইদানীং তার বলা কথাগুলো বেশ চাঞ্চল্য তৈরী করেছে এলাকায়৷ সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, মেয়েটি যা বলছে, তা হুবহু মিলে যাচ্ছে প্রান্তিকে বসবাসকারী এক ব্যবসায়ী বাড়ির ঘটনার সঙ্গে৷ মেয়েটির বাবা আগে কাজ করতেন ওই বাড়িতে, তাই তিনি আরও ভাল করে জানেন ঘটনাটি৷

ওই বাড়ির একমাত্র মেয়ে নাকি আত্মহত্যা করেছিল বছর পাঁচেক আগে, অর্থাৎ বুলবুলির জন্মের কয়েকমাস আগে৷ বুলবুলির দাবী, সে আগের জন্মে ওই মেয়েটি ছিল৷ মেয়েটির জীবনের অনেক কথাই বাচ্চা মেয়েটি নিখুঁতভাবে বলে চলেছে, যে কারণে অনেকেই বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে বুলবুলিই কয়েক বছর আগে হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া রাণী!

সত্যজিত রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ দেখার পর কম বেশি অনেকের মনেই আগ্রহ তৈরী হয়েছিল এই জাতিস্মর নিয়ে৷ তবে চোখের সামনে জলজ্যান্ত উদাহরণ দেখার সুযোগ বড় একটা পাওয়া যায় না৷ অনেকের নজরই তাই টেনে নিয়েছে এখন বীরভূমের শালতলি গ্রামের বুলবুলি সাঁপুই৷

‘আরে তুই কি পাগল হলি? কি বলছিস মাথার ঠিক আছে? এখন হঠাৎ বীরভূম যাব বললে বাড়ি থেকে ছাড়বে নাকি?’ , ফোনের ওপারে চেঁচাতে থাকে রাজর্ষি৷

‘আমি জানি তো ছাড়বে না, সেইজন্যেই তোকে বলছি৷ তুই প্ল্যান ভাব, কি করে বাড়িতে ম্যানেজ দেওয়া যায়’ , ফোনের এপাশে জ্যোতিষ্কর শান্ত স্বর৷

দুপুরবেলা মা ঘুমোচ্ছে, আর সেই সুযোগেই চলছে চাপা স্বরে দুই বন্ধুর ফোনপর্ব৷ রাজর্ষির তাও মোবাইল আছে বলে যেখানে-সেখানে গিয়ে কথা বলতে পারে, কিন্তু জ্যোতিষ্কর এখনও সেই সুযোগ হয়নি৷ বাবা বলেছে উচ্চমাধ্যমিকে রেজাল্ট ভাল হলে কিনে দেবে৷ তাই এখনও বাড়ির ল্যান্ডফোনই ভরসা৷ রাজর্ষির সঙ্গে ওর সেই নার্সারি থেকে বন্ধুত্ব৷ মায়ের কাছে শুনেছে প্রথমদিন স্কুলে ঢুকেই নাকি জ্যোতিষ্ক রাজর্ষির হাতটা ধরে ফেলেছিল খপ করে, আর রাজর্ষি আধো আধো স্বরে বলেছিল ‘বন্দু’!

ওদের অবশ্য সেসব কথা মনে নেই, ওরা দু’জনে দু’জনকে ছাড়া কোনোদিন ছিল বলে তো মনেই পড়ে না৷

‘তুই আগেরজন্মে আমার ভাই ছিলিস জানিস তো!’, রাজর্ষিকে প্রায়ই বলে জ্যোতিষ্ক৷ ও যে জ্যোতিষ্ককে কতটা ভালবাসে, সেটা ওদের ক্লাসের কারোর আর জানতে বাকি নেই৷ টেনের টেস্ট পরীক্ষার আগে হঠাৎ পক্স হয়েছিল জ্যোতিষ্কর৷ রাজর্ষি তখন রোজ ওর বাড়িতে গিয়ে বসে থাকত বন্ধুর মাথার পাশে৷ ওর সঙ্গে গল্প করত, আবার কখনো কখনো ওকে কোনো পাঠ্য বিষয়ের পড়া পড়ে শোনাত আস্তে আস্তে৷ চুপ করে চোখ বুজে শুনত জ্যোতিষ্ক৷ জ্যোতিষ্কর মা অনেকবার বারণ করতেন ওকে ওইসময়ে আসতে, ‘রাজর্ষি, পক্স খুব ছোঁয়াচে সোনা৷ এখন যদি তুই অসুস্থ হোস, পরীক্ষার সময় কি হবে বল তো! যতই কষ্ট হোক, এখন তুই ক’টাদিন আসিস না বাবু’৷

কিন্তু ছেলে সে কথা কানেই তুলত না৷ বন্ধুর ভালবাসায় জ্যোতিষ্কও সুস্থ হয়ে উঠেছিল তাড়াতাড়ি৷ টেনের ফাইনালে রাজর্ষি জ্যোতিষ্কর চেয়ে দু’নম্বর কম পেয়েছে, কিন্তু ওদের বন্ধুত্বে এর কোনো প্রভাব পড়েনি৷ দু’জনেই একই স্কুলে আবার ভর্তি হয়েছে সায়েন্স নিয়ে৷ জ্যোতিষ্ক একটু আবেগী, দুমদাম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে৷ তুলনায় রাজর্ষি বয়স হিসেবে একটু বেশিই পরিণত৷ সবদিক ভাবনাচিন্তা করে সিদ্ধান্ত নেয় ও৷ রাজর্ষিকে না জানিয়ে জ্যোতিষ্ক তাই কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না৷ এই যেমন আজ জাতিস্মরের খবরটা কয়েকদিন ধরে ভালভাবে খুঁটিয়ে পড়ার পর ওর ইচ্ছে হয়েছে যে ও শালতলি যাবে৷ বুলবুলি সাঁপুইয়ের সঙ্গে যেভাবে হোক একবার দেখা করতেই হবে ওকে, আর সেই কারণেই রাজর্ষিকে ফোন৷

প্রথমদিন খবরটা দেখার পরেই বলেছিল ও রাজর্ষিকে৷ তারপর কয়েকদিন ধরে রোজ যা পড়ছিল, সেটাও বলত৷ রাজর্ষির বিশেষ আগ্রহ আছে বলে মনে হয়নি৷ জ্যোতিষ্ক বললে ও চুপচাপ শুনত, ঘুরিয়ে কোনো প্রশ্ন করেনি কোনোদিন৷ কিন্তু আজ যখন ও কাগজে দেখল যে আজই প্রতিবেদনের শেষদিন, এরপর আর কোনো খবর পাওয়া যাবে না ওই কাগজ থেকে বুলবুলি সাঁপুই সম্পর্কে, তখন সিদ্ধান্ত নিতে আর দু’বার ভাবেনি জ্যোতিষ্ক৷ তক্ষুনি রাজর্ষিকে ফোন করে বলে যে ওদের যেতেই হবে শালতলি৷ রাজর্ষি ওকে অনেকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে যে বাড়ি থেকে কিছুতেই ছাড়বে না ওভাবে ওদের এতদূরে৷ এই গত বছর ক্লাস টেন থেকে একা একা টিউশন আর স্কুল যায় শুধু, বাকি সব জায়গায় মা নয়ত বাবার সঙ্গে৷ কিন্তু জ্যোতিষ্ক কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়, ও সমানে বলতে থাকে যেভাবে হোক রাজর্ষিকে ম্যানেজ করতে হবে৷

বিকেলে ওদের পড়া ছিল কুণাল স্যারের বাড়িতে৷ টেন থেকে স্যারের কাছে ফিজিক্স পড়ছে ওরা৷ জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষির টিউশনগুলো মোটামুটি একই৷ রাজর্ষি শেষে ওকে বলল, ‘বিকেলে স্যারের বাড়িতে কথা বলছি ডিটেলে, এখন ফোন রাখ’৷

জ্যোতিষ্ককে ফোনে কিছুতেই বোঝানো যাবে না, বুঝতে পেরেছিল রাজর্ষি৷ এদিকে জ্যোতিষ্ক সারাদিন মনে মনে ছটফট করতে থাকে ব্যাপারটা নিয়ে৷ ও চান করছে, খাচ্ছে, পড়তে বসছে সবই ঠিক, কিন্তু কিছুতেই যেন মন দিতে পারছে না৷ ওর চোখে বারবার ভাসছে খবরের কাগজে দেখা বুলবুলি সাঁপুইয়ের ছোট্ট মুখের ছবিটা, বাচ্চাটার মুখটা বড্ড করুণ৷ সময় যত এগোতে থাকে, মনে মনে আরও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় জ্যোতিষ্ক, যে করেই হোক ওকে শালতলি যেতেই হবে৷ রাজর্ষি যদি কোনোভাবেই যেতে রাজি না হয়, তাহলে ও একাই যাবে৷ দরকার হলে বাড়িতে না বলে যাবে, কিন্তু ও যাবেই৷

কুণাল স্যার ওদের দু’জনকে জগাই-মাধাই বলে ডাকেন৷ মাঝেমধ্যে ‘মানিকজোড়’ও বলেন৷ ওদের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ছেলেমেয়েরা অবশ্য বলে ‘ব্রাদারস ফ্রম অ্যানাদার মাদার’৷ স্কুলে ক্লাসে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষায় কথা বললে ওদের ফাইন দিতে হয়৷ সেইজন্যে স্কুলের সময়টা ওরা নিজেদের মধ্যে ইংরেজিতে কথা বলতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে৷ স্কুলে সবই যেন বড্ড বেশি নিয়মে বাঁধা৷ শুধু খেলার সময়টায় ওরা বাঁধনছাড়া৷

কুণাল স্যারের কোচিং-এ ওদের অবাধ রাজত্ব৷ স্যারের বাড়ির একতলার একটা ঘরে টিউশন পড়ান উনি৷ স্যার একটু আপনভোলা গোছের মানুষ৷ পঞ্চাশের ওপর বয়স, সারাক্ষণ কেমন যেন একটা নিজের খেয়ালে থাকেন৷ মাঝেমাঝেই স্যারের মেয়ে এসে ডেকে নিয়ে যায়, স্যার নাকি প্রায়ই চান করতে বা খেতেও ভুলে যান৷ ওদের সাথে অনেক কিছুর গল্প করেন স্যার, কখনো মিশরের পিরামিডের গল্প, তো কখনো পিসার হেলানো টাওয়ারের গল্প৷ আবার কখনো হারিয়ে যাওয়া কোনো সভ্যতার অজানা ইতিহাস, নয়ত বা আফ্রিকার কোনো অজানা উপজাতির জীবনধারণ পদ্ধতি উঠে আসে সেই গল্পে৷ জ্যোতিষ্ক একবার জিজ্ঞেস করেও ফেলেছিল স্যারকে, ‘স্যার, আপনার কি ইতিহাস প্রিয় ছিল?’

‘কেন বল তো?’, একটু অবাক হয়েছিলেন স্যার৷

‘না, আসলে আপনার গল্পগুলো শুনে মনে হয় ফিজিক্সের চেয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়লে আপনি বোধহয় বেশি আনন্দ পেতেন’ , একটু ইতস্তত করে বলেই ফেলেছিল জ্যোতিষ্ক৷

হেসেছিলেন স্যার৷ তারপর বলেছিলেন, ‘এ জগতে যা কিছু হয়, পদার্থবিদ্যা ছাড়া কিছু হয় না রে বাবা৷ তোকে যা যা বললাম, সবকিছুর পিছনে আছে ফিজিক্সের কনসেপ্ট৷ যাক গে, সেসব গল্প পরে কখনো বলব৷ আজ আমরা যেন কি শুরু করব?’ , এভাবেই গল্প থেকে হুট করে পড়ায় ফেরেন স্যার৷

স্যারের পড়ানো কিন্তু অদ্ভুত রকমের ভালো৷ ফিজিক্সের জটিল চ্যাপ্টারগুলো এমনভাবে সহজ করে বুঝিয়ে দেন, এমন বাস্তবিক উদাহরণ দিয়ে ওদের সামনে ফুটিয়ে তোলেন, যে ওরা আর কখনো সেগুলো ভুলতে পারে না৷ স্যার যখন বলেন, ওরা মুগ্ধ হয়ে

শোনে৷ কুণাল স্যারের ক্লাস তাই ওরা কখনো ভুলেও মিস করে না৷

কিন্তু জ্যোতিষ্ক সকাল থেকে ওই শালতলি গ্রামের ঘটনাটা নিয়ে এতটাই অন্যমনস্ক ছিল, যে প্রায় ভুলেই গেছিল কোচিং-এর কথা৷ রাজর্ষির সঙ্গে কথা বলার জন্য ওর মন আনচান করছিল ঠিকই, কিন্তু বুলবুলির ঘটনাটা ওকে বেশি ভাবাচ্ছিল৷ সারাদিনে নিজের মনে অনেকগুলো দৃশ্যপট সাজিয়েছে ও৷ ওর বাড়ি থেকে সাইকেলে স্যারের বাড়ি যেতে মিনিট পনেরো লাগে৷ পাঁচটায় পড়া থাকে বলে ওরা স্কুল থেকেই সোজা চলে যায় পড়তে৷ এখন গরমের ছুটি চলছে বলে বাড়ি থেকে যাওয়া৷ সাড়ে চারটে নাগাদ সাইকেল নিয়ে বেরোয় ও৷ কিছুক্ষন ওখানে গিয়ে বন্ধুদের সাথে গল্পগুজব হয়৷ আজ পৌনে পাঁচটা নাগাদ মা এলেন জ্যোতিষ্কর কাছে, ‘হ্যাঁ রে বাবু, আজ পড়তে যাওয়া নেই তোর?’

বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে জ্যোতিষ্ক৷ কোনোরকমের পাজামাটা বদলে, গেঞ্জীটা গলিয়ে টেবিল থেকে ব্যাগটা তুলেই দৌড় দেয় সাইকেলের দিকে৷ যেতে যেতে চেঁচিয়ে বলে মাকে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ মা, ভাগ্যিস মনে করালে! আমি ভুলেই গেছিলাম!’

ছেলে বেরিয়ে যাওয়ার পর একটু চিন্তার ভাঁজ পড়ে জ্যোতিষ্কর মা জাহ্নবী সেনের কপালে৷ ছোট থেকে কোনোদিন পড়াশুনো নিয়ে ছেলেকে কিছু বলতে হয়নি৷ জ্যোতিষ্ক বরাবরই পড়াশুনোর ব্যাপারে বেশ সিরিয়াস৷ কিন্তু আজ ছেলেটাকে সকাল থেকেই বেশ অন্যমনস্ক দেখছেন তিনি৷ দুপুরে খেতে বসেও ভাল করে খেল না৷ ছেলেটা ক’দিন বাড়িতে আছে বলে ওর পছন্দের রান্নাই হচ্ছে৷ টকডাল খেতে খুব ভালবাসে জ্যোতিষ্ক৷ কিন্তু আজ যেন ওর কিছুতেই মন নেই৷ ভাতগুলোকে কোনোরকমে একটু নাড়াচাড়া করে খেয়ে উঠে গেল, টকডালটা খেলই না প্রায়৷ এদিকে বিকেলবেলা টিউশনের কথাও বেমালুম ভুলে গিয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে কি যেন ভাবছিল৷ ছেলেটা বড় হচ্ছে, এইসময়ে ওদের মনে কত কিছু চলে, বাবা-মায়েরা হয়ত সব টেরও পাননা৷ আজ ছেলে ফিরলে ওর সাথে কথা বলবেন, মনে মনে ভাবেন জাহ্নবী দেবী৷

‘রাজর্ষি, কি কি নিচ্ছিস বল তো? পাঁচ ছ’টা টি-শার্ট, দু’টো বারমুডা আর দু’টো পাজামা নিলে হবে?’, ফোনে রাজর্ষিকে জিজ্ঞেস করে জ্যোতিষ্ক৷

‘মোর দ্যান এনাফ৷ দু’দিনের জন্যে আর কি নিবি তুই? আর তাছাড়া এখন বীরভূমে কি গরম তুই জানিস?’

ওদের শান্তিনিকেতন যাওয়াটা হচ্ছে, আর সেইজন্যেই চলছে এই গোছগাছ পর্ব৷ সেদিন কুণাল স্যারের কোচিং-এ পড়তে গিয়ে বেশ অদ্ভুত ভাবেই সুযোগ হয়ে গেছিল জ্যোতিষ্কর ইচ্ছে পূরনের৷ স্যারের ছেলে কুশলদা পড়াশুনো করে বিশ্বভারতীতে৷ সেখান থেকে কয়েকদিনের ছুটিতে বাড়ি এসেছিল৷ সেদিন ওদের ক্লাস চলাকালীন হঠাৎই কুশলদা এসে বলে যে ও কিছু পাস পেয়েছে কলেজ থেকে, ওর পরিবার বা পরিচিত পাঁচজনকে বিশ্বভারতী ও শান্তিনিকেতনের দর্শনীয় জায়গাগুলো বিনামূল্যে ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে৷ জ্যোতিষ্করা কেউ যেতে চায় কিনা জিজ্ঞেস করেছিল কুশলদা৷

জ্যোতিষ্ক প্রথমে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না৷ কয়েক মুহূর্ত পরে যখন বুঝল যে ও যা শুনেছে সেটা ঠিক, সত্যিই শান্তিনিকেতন যাওয়ার এক অভাবনীয় সুযোগ এসেছে ওর সামনে, তখন আর বিন্দুমাত্র দেরি করেনি৷ লাফিয়ে গিয়ে কুশলদার হাতটা ধরে বলেছিল, ‘আমি আর রাজর্ষি যাব দাদা, প্লিজ তুমি আমাদের দু’জনের ব্যবস্থা করে দাও!’

‘হ্যাঁ রে বাবা, তুই যাবি নয় বুঝলুম, রাজর্ষি যাবে কিনা ওকে একবার জিজ্ঞেস তো করে নে’, পিছন থেকে বলেছিলেন স্যার৷

‘ও যাবে স্যার, আজ সকালেই আমাদের কথা হচ্ছিল শান্তিনিকেতন যাওয়া নিয়ে৷ ওখানে আমাদের যেতেই হত কয়েকদিনের মধ্যে’, উত্তেজনায় নিজেকে আর সামলাতে পারে না জ্যোতিষ্ক৷

‘কেন রে? যেতেই হত কেন? ওখানে তোদের কি কাজ বাবা? রবিবুড়োর আত্মাকে প্ল্যানচেট করে নামাবি নাকি?’ , কৌতূহলী হন স্যার৷ আর ওনার বলার ধরণে হো হো করে হেসে ওঠে সারা ক্লাস৷

একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেও তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নেয় জ্যোতিষ্ক, ‘না না স্যার, আসলে রাজর্ষি কোনোদিন শান্তিনিকেতন যায়নি তো, তাই আমি ওকে বলছিলাম যে এই গরমের ছুটির মধ্যেই যদি ঘুরে আসা যেত’৷

‘এখন এই চাঁদিফাটা গরমে তোরা বীরভূমে যাবি বাবা?

ওখানে তো আরও গরম! দেখিস আবার শরীর-টরীর খারাপ করিস না যেন!’

একটু চিন্তিত হয়েছিলেন স্যার৷

‘তুমি চিন্তা কোরো না বাবা, আমার এক প্রফেসরের বাড়িতে উনি থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছেন৷ ওখানে সম্ভবত এ সি-ও আছে, কোনো চাপ হবে না৷ আর তাছাড়া ওরা বাচ্চা ছেলে, তুমিই তো বলো এই বয়সে রোদে-জলে খেলতে হয়৷ এখন অত আহা-উহু করলে হয় নাকি!’, ম্যানেজ দিয়েছিল কুশল দা৷

‘না ঠিক তা না, সে ওরা আনন্দই করবে আমি জানি, তবু একবার ওদের বাবা-মায়েদের সঙ্গেও তো কথা বলাটা দরকার!’, একটু দোনামনা করেছিলেন স্যার৷

অনেক কষ্টে স্যারকে বুঝিয়ে সেদিন সব ঠিক করে ফেলেছিল জ্যোতিষ্ক৷ দু’দিন পরেই ওদের যাওয়া৷ ফেরার সময় মনে মনে ভেবে নিয়েছিল বাড়িতে ঠিক কিভাবে বললে গন্ডগোল হওয়ার সম্ভাবনা কম৷ জ্যোতিষ্ক জানত ওর মা বরাবরই বাংলা ভাষার ব্যাপারে একটু বেশিই দুর্বল৷ উনি চেয়েছিলেন ছেলে যাতে বাংলা মিডিয়ামে পড়ে৷ কিন্তু বাবার চাপেই একরকম ওকে এই স্কুলে ভর্তি হতে হয়েছিল৷ মায়ের মনে সবসময় একটা আক্ষেপ থাকে যে ছেলে হয়ত বাংলাটা ঠিক করে শিখছে না, ওদের সংস্কৃতিটা জানছে না৷ এজন্য ছেলেকে মাঝেমধ্যেই বাংলা গল্পের বই এনে দেন৷ জ্যোতিষ্কর যদিও ডিটেকটিভ গল্প ছাড়া অন্য কিছু ভাল লাগে না বিশেষ৷ ফেলুদা, কাকাবাবু তো ওর কবেই শেষ! মায়ের মাধ্যমেই ব্যাপারটা বাড়িতে জানাতে হবে, ভেবে নিয়েছিল ও৷

‘মা দ্যাখো, আমাদের স্কুল থেকে তো আর কোনোদিন রবীন্দ্রনাথ বা তাঁর ব্যাপারে এত ভাল করে জানাতে শান্তিনিকেতন নিয়ে যাবে না বলো? কুশলদার বিশ্বভারতী থেকে এমন একটা সুযোগ এসেছে৷ রবিঠাকুরকে এর থেকে ভাল করে জানার সুযোগ আর পাব না৷ রাজর্ষিও যাবে৷ তুমি প্লিজ বাবাকে একটু ম্যানেজ করো!’, করুণ মুখ করে মাকে বলেছিল জ্যোতিষ্ক৷

ও বুঝতে পেরেছিল যে মায়ের মনের একটা অংশ এই ব্যাপারটায় বেশ খুশি হলেও সায় দিতে পারছে না, কারণ ও কোনোদিন বাবা-মাকে ছাড়া এভাবে একা কোথাও যায়নি৷

‘তুই একটা জিনিস বুঝতে পারছিস না বাবু, তুই এখনও অনেক ছোট৷ আজ যদি তুই কলেজে পড়তিস, আমি আপত্তি করতাম না৷ কিন্তু তুই সবে ইলেভেনে পড়ছিস, কোনোদিন আমাদের ছেড়ে কোথাও যাসনি, থাকিসনি, সেখানে আমি ওরকম একটা অজানা জায়গায় তোদের দু’টো বাচ্চা ছেলেকে কিভাবে ছেড়ে দিই? না না, এটা একদমই সম্ভব নয়৷ তোর শান্তিনিকেতন যাওয়ার ইচ্ছে হলে বল, আমি তোর বাবাকে বলব অফিস ছুটি নিয়ে ব্যবস্থা করতে’৷

‘ওফফ মা, তুমি বুঝতে পারছ না, বাবা বা তোমার সাথে গেলে কি এভাবে সবজায়গায় অ্যাক্সেস পাব, যেটা কুশলদার সূত্রে গেলে হবে? পাব না৷ আর তাছাড়া আমি তো বড় হচ্ছি মা, সব জায়গায় বাবা-মার হাত ধরে গেলে কি সেটা ভাল দেখায়? তুমি তো বোঝো বলো! তুমি কি অন্য মায়েদের মতন?’ , ইচ্ছে করে শেষে মায়ের সেন্টিমেন্টে একটু ধাক্কা দিয়ে দেয় জ্যোতিষ্ক৷

ও বড় হওয়ার সাথে সাথে খুব ভাল করে বুঝে গেছে যে ঠাকুর অনুযায়ী পুজোর ফুল আলাদা আলদা হবে৷ আগে বুঝে নিতে হবে যে কোন ঠাকুর কি ফুলে সন্তুষ্ট৷ আর ওর ধারণাকে একদম সত্যি করে দিয়ে মা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে বললেন, ‘বেশ, আমি বলব তোর বাবাকে৷ তবে তুই আমাকে কথা দে বাবু, যে ওখানে এমন কিছু করবি না যাতে আমাদের দুশ্চিন্তা হয়?’

‘আচ্ছা মা, শান্তিনিকেতনে গিয়ে আমি তোমাদের দুশ্চিন্তা বাড়ানোর মত কি করতে পারি বলোতো? চিল মাম্মি!’, মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে ও৷

মা ম্যানেজ হয়ে গেছে, এবার বাবাকে সামলে নেওয়ার দায়িত্ব মায়ের৷ পরশু সকাল দশটায় ট্রেন৷ রাজর্ষি টিকিট কেটে নেবে ওদের দু’জনের, শুধু যাওয়ার আগে কুশলদাকে ওদের আসল উদ্দেশ্যটা একটু হালকা করে বলে রাখতে হবে৷

‘ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং, কিন্তু তোদের প্ল্যানটা কি? মানে মেয়েটার সাথে দেখা করে কি করবি?’ , ট্রেনে বসে কুশলদাকে গোটা ব্যাপারটা খুলে বলার পর উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করে কুশল দা৷

আপাতত ওরা তিনজনেই যাচ্ছে, ওখানে কুশলদার এক বন্ধু তার আরও দুই পরিচিতকে নিয়ে আসছে৷ সবাই মিলে বেড়ানোর প্ল্যান হয়েছে৷ কিন্তু জ্যোতিষ্কর উদ্দেশ্য বেড়ানো নয়৷ তাই কুশলদার কাছে কিছু রাখঢাক না করেই গোটা ব্যাপারটা বলে ও৷ ও ভেবেছিল কুশলদা হয়ত খুব রেগে যাবে আগে থেকে কিছু না বলে আসার জন্যে, কেননা একরকম ওর ওপর ভরসা করেই রাজর্ষি আর জ্যোতিষ্কর বাবা-মা ওকে বাড়ি থেকে এত দূরে ছেড়েছেন৷ সেখানে এতদূরের একটা অজানা জায়গায় যেতে গেলে যদি বিপদ-আপদ কিছু হয়, কুশলদা ভয়ানক সমস্যায় পড়বে৷ তাই ওরা ভেবেছিল যে কুশলদা হয়ত এড়িয়েই যেতে চাইবে৷

রাজর্ষির খুব একটা ইচ্ছে ছিল না এসবে জড়ানোর৷ অনেকবার ও জ্যোতিষ্ককে বারণও করেছে৷ কিন্তু যখন বুঝল যে কিছুতেই ওকে আটকানো যাবে না, তখন পাঁচন গেলা মুখ করে সঙ্গ দিয়েছে প্রিয় বন্ধুর৷ ও ভেবেছিল গাড়িতে উঠে কুশলদাকে বললে কুশলদা নিশ্চয়ই জ্যোতিষ্ককে বুঝিসুঝিয়ে কাটিয়ে দেবে৷ কিন্তু কুশলদা সেসবের ধার দিয়েও গেল না৷ বরং রাজর্ষি দেখল যে কুশলদাও ব্যাপারটায় বেশ আগ্রহ পেয়ে গেছে৷ অতএব ওকেও জড়িয়ে পড়তেই হল, আর কোনো উপায় রইল না৷

কুশলদা রাস্তা থেকেই ওর বন্ধুদের ফোন করে বলে দিয়েছিল যে ওরা শান্তিনিকেতন আসতে

পারছে না, শেষ মুহূর্তে একটা জরুরী কাজ পড়ে গেছে৷ ঠিক হল বোলপুর থেকে একটা ছোট গাড়ি ভাড়া করে শালতলির উদ্দেশ্যে রওনা দেবে ওরা৷ কিন্তু রাজর্ষি বা জ্যোতিষ্কর কাছে খুব বেশি টাকা ছিল না৷ অতটা রাস্তা গাড়ি করে যেতে টাকা তো লাগবে! ওদের সঙ্গে যা আছে, তাদে যদি না হয়?

উপায় বাতলালো কুশলদাই৷ ওর সাথে একটা এ টি এম কার্ড থাকে সবসময়৷ কলেজে যদি কোনো দরকার লাগে, তাই কুণাল স্যার দিয়ে রাখেন৷

‘তোরা এত ভাবছিস কেন হ্যাঁ? আমি আছি তো নাকি! আমার কার্ডটা তো রয়েইছে৷ টাকা নিয়ে ভাবিস না৷’

বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে জ্যোতিষ্ককে ওর মা ওনার মোবাইলটা দিয়ে দিয়েছেন, যাতে যখন-তখন ফোন করে ছেলের খোঁজটুকু অন্তত পান৷ যদিও ও বলেছে যে সময়ে সময়ে ফোন করে জানাবে, মা যেন খুব দরকার ছাড়া ফোন না করে৷ বোলপুরে ওরা যখন নামল, ঘড়িতে দুপুর সোওয়া একটা৷ মাথার ওপর গনগনে রোদের মতই ওদের পেটের খিদেটাও জানান দিচ্ছিল তার উপস্থিতি৷ কুশলের এখানে অনেক জানাশোনা৷ স্টেশনের বাইরেই একটা ভাতের হোটেলে পঞ্চাশ টাকা প্লেট হিসেবে ভাত, ডাল, আলুভাজা আর মাছের ঝোল বেশ তৃপ্তি করে খেল ওরা৷ জ্যোতিষ্কর খুব খিদে পেয়ে গেলে আর মাথা কাজ করে না৷ পেট ঠান্ডা হওয়ার হওয়ার পর তিনজনে আলোচনায় বসল ওরা৷ এখন যদি একটা গাড়ি ভাড়া করে রওনা দেওয়া যায়, বিকেলের মধ্যে শালতলি পৌঁছে যাবে৷ কিন্তু ওখানে গিয়ে থাকবে কোথায়? ওদের তো চেনাপরিচিত কেউ নেই৷ আর সারারাত রাস্তায় থাকারও বিপদ আছে৷ কিন্তু ওদের হাতে সময়ও নেই বেশি৷ পরেরদিনটাই হাতে আছে শুধু, তারপরের দিন দুপুরে ফেরার ট্রেন৷ এখন যা অবস্থা, কোনোভাবেই এর বেশি থাকা সম্ভব নয়৷ অতএব সবদিক ভেবে ওরা তক্ষুনি শালতলি রওনা হওয়া মনস্থির করল৷

বেশ কয়েকজনের সাথে কথা বলে একটা গাড়ি ঠিক করে ফেলল কুশল৷ ছোট যে ম্যাজিক গাড়িগুলো আজকাল উঠেছে, ওইরকম একটা গাড়ি৷ ওই গাড়ির ড্রাইভারও নাকি শালতলি থাকে৷

কুশল শালতলি যাবে শুনে নিজেই বলেছিল, ‘বুলবুলির বাড়ি যাবেন নাকি বাবু?’

একটু দোনামনা করেই ‘হ্যাঁ’ বলেছিল কুশল৷ ছেলেটার থেকে আরও কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে৷ ছেলেটা আবারও জিজ্ঞেস করেছিল, ‘খবরের কাগজের লোক?’

এবারেও সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়েছিল কুশল৷ ও জানত এইসব এলাকার মানুষেরা খবরের কাগজের লোকেদের বেশ একটু সম্মানের নজরে দেখে৷ আর হলও ঠিক তাই৷ এতক্ষন ধরে দর কষাকষি করছিল যারা, তাদের সবাইকে ঠেলে সরিয়ে ছেলেটি ওর হাত ধরে নিয়ে গিয়ে তুলেছিল গাড়িতে, ‘আপনার যা খুশি তাই দেবেন স্যার, শুধু দেখবেন খবরটা যেন ভাল করে বেরোয় কাগজে৷ আমাদের গ্রামের নামটা যেন থাকে’৷

চোখের ইশারায় একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা জ্যোতিষ্ক আর রাজর্ষিকে গাড়িতে উঠে পড়তে বলল কুশল৷ গাড়িতে যেতে যেতে অনেক কথা বলছিল ছেলেটা, বেশিরভাগই ওদের জানা কথা৷ ওর নাম মহেশ৷ একসময় মহেশ ওদের জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আপনারা কাগজের লোক, ছবি তুলবেন না বুলবুলির? আপনাদের সাথে তো কোনো ক্যামেরা দেখছি না!’

একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে ওরা, কিন্তু প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই জ্যোতিষ্ক সামলে নিয়ে বলে, ‘আসলে দামী ক্যামেরা তো, তাই গলায় ঝুলিয়ে ঘোরা যায় না৷

এই যে আমার এই ব্যাগে রেখেছি’ , ওর ব্যাগটা উঁচু করে দেখায়৷

ওরা বুঝতে পারে যে কথাটা মহেশের বেশ মনঃপূত হয়েছে৷ মহেশের কাছ থেকে ওরা আরেকটা যে খবর পায়, সেটা হল যে ভদ্রলোকের মৃত মেয়ে বলে বুলবুলি নিজেকে দাবী করেছে, সেই মেয়েটি যখন মারা গেছিল, তখন তার ঊনিশ বছর বয়স৷ মেয়েটির নাম ছিল রাণী৷ বুলবুলি নাকি সেই মেয়েটির সেই সময়কার সব কথা ওর আধো আধো উচ্চারণে বলছে৷

ওরা যখন শালতলি পৌঁছল, তখন রোদের তেজ কমে গেছে৷ বিকেলের একটা নরম ভাব চারদিকে৷ অল্প অল্প হাওয়া দিচ্ছে৷ গ্রামে ঢোকার পর রাস্তাঘাট খুবই খারাপ, গাড়ি চলার রাস্তা একেবারেই নেই৷ মহেশ যে কি করে তার মধ্যে দিয়ে নিয়ে এল, ও-ই জানে৷ খানিকটা আসার পর একটা বুড়ো বটগাছের তলায় খানিকটা চাতাল মত জায়গায় গাড়ি থামায় মহেশ৷

‘স্যার, ওদিকে আর গাড়ি যাবে না৷ এবার আপনাদের হেঁটে যেতে হবে৷ ওই যে বাঁশঝাড়

দেখছেন, ওটা বাঁ দিকে রেখে নাক বরাবর আশি পা হেঁটে যান, তারপরেই বাঁ দিকে বুলবুলিদের ঘর৷ ওর বুড়ি ঠাকমা বাড়ির বাইরের দাওয়াতেই বসে বসে বিড়বিড় করে দিনরাত৷ আপনারা দেখলেই বুঝতে পারবেন৷ কোনো অসুবিধে হবে না, এগিয়ে যান’, একগাল হেসে বলে মহেশ৷

ওরা মহেশকে অনেক করে অনুরোধ করেছিল বুলবুলির বাড়িটা অন্তত চিনিয়ে দিয়ে আসতে, কিন্তু মহেশ রাজি হয় না৷ বুলবুলির বাবা নাকি আজকাল বাইরের লোক কেউ এলে রেগে যাচ্ছে৷ সেখানে যদি সে শোনে যে মহেশ খবরের কাগজের বাবুদের নিয়ে এসেছে, তাহলে কেলেঙ্কারির একশেষ হবে৷ মহেশকে ওর প্রাপ্য ভাড়া মিটিয়ে ওর দেখানো পথেই এগিয়ে যায় ওরা তিনজনে৷

‘তা ওর এখন বয়স কত হল?’

‘এই মাঘে পাঁচ পুরোলো’, একটু রুক্ষভাবেই জবাব দেয় বুলবুলির মা৷ মেয়েটা ঘরের সামনের জায়গাটায় ছুটে ছুটে খেলছে নিজের মনে৷ জ্যোতিষ্করা এসেছে আধঘন্টা হল, কিন্তু এখনও বুলবুলির বাবার দেখা পায়নি৷ ওর মায়ের থেকে বিশেষ কিছুই জানা যাচ্ছে না৷ ভদ্রমহিলা শুরু থেকে একটা কথাই বলে চলেছেন তোতাপাখির মতো,

‘ওর বাবা এলে জেনে নেবেন’৷

মহেশের বলে দেওয়া রাস্তাতেই এসে বাড়ির বাইরে বুলবুলির ঠাকুমাকে বসে থাকতে দেখে বাড়িটা খুঁজে পেতে অসুবিধে হয়নি ওদের৷ একমনে নিজে নিজেই কিসব বিড়বিড় করে বকবক করছিলেন উনি৷ জ্যোতিষ্করা এসে দাঁড়িয়েছিল চুপচাপ, বুঝতে পারছিল না কিছু জিজ্ঞেস করে লাভ হবে কিনা৷ তারপর উনি একসময় নিজেই মুখ তুলে ওদের দেখে বললেন, ‘কাকে চাই? বুলি?’

ঘাড় নাড়ল জ্যোতিষ্ক৷

ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে ভেতরে কাউকে উদ্দেশ্য করে চেঁচিয়ে উঠলেন উনি, ‘অ বৌ, বুলিকে নিয়ে একবার বাইরে আয় দেখি৷ কারা সব এয়েচেন’৷

মাথায় ঘোমটা টেনে কোলে বাচ্চা মেয়েটিকে নিয়ে বাইরে এলেন যিনি, তিনি যে বুলবুলির মা, সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না৷ এদের সকলের চেহারায় অভাবের ছাপ ভীষণ স্পষ্ট৷ ভদ্রমহিলার পরনের শাড়ি ময়লা এবং শতচ্ছিন্ন৷ কোলের বাচ্চাটি যদি বুলবুলি হয়, তাহলে বয়সের তুলনায় মেয়েটি ভীষনই ছোটখাটো৷ নাক দিয়ে সর্দি পড়ছে, শুধু রোগা চেহারায় চোখদু’টো ভীষণ উজ্জ্বল মেয়েটার৷ একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ওর দিকে৷ ব্যাগপত্তর নিয়ে ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু বিরক্তি নিয়েই জিজ্ঞেস করেন বুলবুলির মা, ‘কি চাই?’

‘আসলে আমরা কোলকাতা থেকে আসছিলাম, খবরের কাগজের লোক৷ বুলবুলির খবরটা আমাদের কাগজে...’

‘ক্ষমা করেন বাবু, মেয়েটাকে আর কষ্ট দেবেন না, ও আর পারছে না৷ এত লোক এল আপনাদের শহর থেকে, এত প্রশ্ন , এইটুকুনি মেয়ে পারে কখনো? আপনারা আজ আসেন, ভুলে যান যে বুলবুলি আর পাঁচটা বাচ্চার থেকে আলাদা৷ ওর কোনো খবর করতে হবে না’, দৃঢ় গলায় বলেছিল বৌটি৷

আর ভদ্রমহিলার বলার ধরণে ভীষণ অবাক হয়েছিল ওরা৷ সাধারণত এই গ্রাম্য মহিলাদের সম্বন্ধে তথাকথিত শহরের মানুষদের যা ধারণা থাকে, বা এনাকে দেখলে যেমন মনে হয়, বুলবুলির মা তার থেকে একেবারেই আলাদা৷

ভদ্রমহিলার চরিত্রে এক অসম্ভব দৃঢ়তা রয়েছে, যার সামনে জ্যোতিষ্কদের প্রায় কথা হারিয়ে ফেলার অবস্থা৷

‘বলছি কি দিদি, একটা কথা ছিল৷ আমরা আসলে অনেক দূর থেকে আসছি তো, আপনাদের খুব একটা বিরক্ত করব না৷ কয়েকটা প্রশ্নের একটু উত্তর দেবেন? তারপরেই

আমরা চলে যাব কথা দিচ্ছি’ , হঠাৎই সামনে এসে হাতজোড় করে বলে রাজর্ষি৷

ওর বলার ধরণে এমন একটা ভাব ছিল, যার কারণে ওই ভদ্রমহিলাও এড়িয়ে যেতে পারেননি ওর কথা৷ কিছু না বলে পাশ থেকে একটা খাটিয়া টেনে এনে রেখেছেন ওদের সামনে৷ বসতে বলেননি, তাও ওরা বসেছে৷ আর তারপর থেকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই খালি একটাই কথা বলছেন, ‘ওর বাবা এলে জেনে নেবেন’৷

মেয়েটা খেলতে খেলতে আপনমনে কিছু গুনগুন করছে৷ একটু কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করল জ্যোতিষ্ক, কিন্তু কিছুই বোঝা যাচ্ছে না৷ বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামল৷ কুশল দা একবার উঠে গিয়ে আশেপাশে ঘুরে এসেছে, এদিকে বুলবুলির বাবার ফেরার নাম নেই৷ জ্যোতিষ্ক আর থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল, ‘কখন ফিরবেন উনি?’

‘এই তো এসে যাবে এবার’, জবাব দিয়েছিল বৌটি৷

ঘরের সামনে উনুন জ্বালিয়ে রান্না চাপিয়েছে বুলবুলির মা৷ মেয়েটাকে একবাটি মুড়ি দিয়ে বসিয়ে দিল একজায়গায়, ওরা অবাক হয়ে দেখল মেয়েটা বসে বসে সবটুকু মুড়ি খেয়ে নিল৷ অথচ ওদের ঘরে এই বয়সের বাচ্চাকে খাওয়ানোর জন্য খেলনা, মোবাইল, কার্টুন , কত কিছু দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে হয়! খিদে বোধহয় মানুষকে এমনিই বড় করে দেয়৷ ঘন্টাদুয়েক কেটে যাওয়ার পর অবশেষে ফিরলেন বুলবুলির বাবা৷ সাইকেলটা ঘরের বাইরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখতে রাখতে একবার আড়চোখে দেখলেন ওদের দিকে৷ দৃষ্টিটা কেমন যেন অদ্ভুত, একটু অস্বস্তি হল জ্যোতিষ্কর৷ কুশলদাই এগিয়ে গিয়ে কথা শুরু করল৷ বোঝাই যাচ্ছে ও বেশ আগ্রহ পেয়ে গেছে৷ সংক্ষেপে ভদ্রলোককে জানাল ওদের এখানে আসার কারণ, খবরের কাগজের লোক বলেই পরিচয় দিল নিজেদের৷ ভদ্রলোকের নাম জয়দেব সাঁপুই ৷ কাছেই একটা ইটভাটায় কাজ করেন৷ আগে প্রান্তিকে এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে বাজার দোকান করে দেওয়ার কাজ করতেন, যা পেতেন, তাতে দিব্যি চলে যেত সংসার৷ তারপর সেই ভদ্রলোকের মেয়ে আত্মহত্যা করল, উনিও কেমন যেন হয়ে গেলেন৷ তিনমাসের টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে দিলেন জয়দেবকে৷ সেসব বছর পাঁচ-ছয় আগের কথা৷

এরপর জয়দেব সাঁপুইয়ের মেয়ে হয়েছে, সংসার বেড়েছে৷ এখন আর এখানে ওখানে ঠেকার কাজ করে সংসার চলছে না৷

অনেক কষ্টে কয়েকমাস আগে ইটভাটার কাজটা পেয়েছেন৷ কিন্তু যে টাকা আসে, তাতে এতগুলো পেট চলে না৷

‘আপনি আপনার পুরোনো মালিকের কাছে গেলেন না কেন একবার? আপনি তো বলছেন উনি খুব ভাল ছিলেন৷ উনি যদি কিছু কাজ জোগাড় করে দিতে পারতেন...’ , আচমকাই প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷

‘গেছিলাম বাবু, লাভ হয়নি কিছু৷ মেয়ে চলে যাওয়ার পর বাবু যেন কেমন হয়ে গেছে৷ কোনোদিকে মন নেই, সারাক্ষন মেয়ের ঘরেই পড়ে থাকেন, তাঁর জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করেন৷ মনে হয় যেন যাওয়ার দিন গুনছেন৷ মানুষটাকে কিছু বলবেন কি, ওনাকে দেখলেই মায়া হবে আপনার’, জবাব দেয় জয়দেব৷

‘আপনার মেয়ে বুলবুলি যে আপনার পুরোনো মালিকের মৃত মেয়ে বলে নিজেকে দাবী করছে, এটা আপনি জানিয়েছিলেন আপনার বাবুকে?’

‘হ্যাঁ, প্রথম যেদিন বুঝতে পারি, তার পরের দিনই জানিয়েছিলাম৷ উনি এসে দেখেও গেছেন’৷

‘কিছু বলেননি?’

‘নাহ৷ উনি এখানে আসতেই বুলি ‘বাপি’ বলে ওনার কাছে এগিয়ে গেল৷ আর তখনই উনি কেমন যেন হয়ে গেলেন৷ মেয়ের মাথায় হাত বোলালেন কিছুক্ষন, একটু আদর করলেন, আর তারপর মেয়েকে খাওয়ানোর জন্য আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে চলে গেলেন’৷

‘আচ্ছা জয়দেব বাবু, আপনাদের আর বেশি বিরক্ত করব না৷ আমরা একটু আপনার মেয়ের সাথে কথা বলতে পারি?’

‘হ্যাঁ বলুন৷ তবে কি বলুন তো, বাচ্চা তো, এমনিই খুব ভয় পেয়ে গেছে এই কদিন ধরে এত প্রশ্ন শুনে৷ পারলে বেশি কিছু জিজ্ঞেস করবেন না’৷

বাবার হাতের ইশারায় গুটিগুটি পায়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়াল বুলবুলি৷ মেয়েটা সবে

পাঁচ পেরিয়ে ছ’য়ে পড়েছে৷ এইসময়ে বাচ্চাদের সামনে যা বলা হয়, ওরা শুনে শুনে তাই বলে৷ আর সেখানে এই মেয়ে নাকি গড়গড়িয়ে নিজের আগের জন্মের কথা বলছে! ব্যাপারটা সত্যিই ভীষণ আশ্চর্যের৷ জ্যোতিষ্ক ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বের করে এগিয়ে ধরল বাচ্চাটির দিকে৷ আসার সময় ভাগ্যিস মনে করে ফ্রিজ থেকে বার করে ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছিল চকলেটটা! কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, বাচ্চাটা কিছুতেই চকলেটটা নিচ্ছিল না৷ খালি ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছিল ওর বাবার দিকে৷

‘এটা নাও, বাবা কিচ্ছু বলবে না’ , হেসে বলে জ্যোতিষ্ক৷

ওর কথায় এমন কিছু ছিল, যে এতক্ষন ধরে গম্ভীর মুখে থাকা বাচ্চা মেয়েটা একটু হাসল৷ হাত বাড়িয়ে নিল চকলেটটা৷

‘তোমার নাম কি?’, ওর গাল টিপে আবার প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷

আর অদ্ভুতভাবে বুলবুলি আবার তাকায় ওর বাবার দিকে৷ যে মেয়ে নিজের আগের জন্মের কথা গড়গড়িয়ে বলে যায়, তার নিজের নাম বলতে বাবার সাহায্য লাগার কথা নয়! কিছু একটা ইশারা করেন ওর বাবা৷ আর মেয়েটি ওদের দিকে ফিরে খুব আস্তে করে উত্তর দেয়, ‘রাণী’৷

বুলবুলির সাথে খুব বেশি কথা বলতে পারেনি ওরা৷ মেয়েটিকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই কেমন যেন ভয়ে ভয়ে ওর বাবার দিকে তাকাচ্ছিল৷ ওর বাবা বললেন এতদিন ধরে এত লোক, ক্যামেরা, আলো দেখে নাকি ভয় পেয়ে গেছে একরত্তি মেয়েটা৷ স্বাভাবিক! কতটুকুই বা বয়স ওর! এইসময়ে যদি এত চাপ পড়ে মনের ওপর, তাহলে তো ওর শৈশবের স্বাভাবিক ছন্দটাই হারিয়ে যাবে! ওরা তাই খুব বেশি আর কথা বাড়ায়নি, ফিরে এসেছিল৷ চুপচাপ হেঁটে এসেছে সেই বটতলা অবধি ওরা তিনজনে, যেখানে মহেশ ওদের নামিয়ে দিয়েছিল৷ এখন কোথায় যাবে জানা নেই৷ এই জায়গাটা এমনই গ্রাম, যে কোনো হোটেল বা লজও নেই৷ রাস্তার পাশে একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে ওরা, ‘দাদা এখানে কোথাও থাকার হোটেল আছে?’

লোকটি যা বলে, সেটা শুনে বেশ মুস্কিলে পড়ে ওরা৷ এখান থেকে সবচেয়ে কাছাকাছি হোটেল যেতে নাকি গাড়িতে ঘন্টাখানেক লাগবে৷ এখন গাড়ি কোথায় পাবে ওরা? অতএব হাঁটাই ভরসা৷ সেই কোন সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে তিনজনে, শরীর ভীষণ ক্লান্ত লাগছে৷ তার ওপর যে উদ্দেশ্য নিয়ে আসা, সেটাও তেমনভাবে সফল হল না৷ হাতে যদিও কালকের দিনটা আছে, তবু কালকেও যে খুব একটা ভাল কিছু হবে, এমন আশা নেই বললেই চলে৷ সন্ধে হয়ে গেছে কিছুক্ষন আগেই৷ ওরা বুঝতে পারল যে সকলেরই বেশ খিদে পেয়েছে৷ মা ইতিমধ্যেই বার দুয়েক ফোন করেছে৷ কোনোরকমে হুঁ হাঁ করে রেখেছে জ্যোতিষ্ক৷ জ্যোতিষ্কর খুব অপরাধী লাগছিল নিজেকে৷ ওর জন্যে রাজর্ষি আর কুশলদাকেও এত কষ্ট পেতে হচ্ছে! আসলে খবরটা দেখার পর কি যে নেশা চাপল ওর মাথায়! এখন যেন বড্ড হতাশ লাগছে৷

আর কোনো উপায় নেই দেখে হাঁটাই মনস্থির করে ওরা৷ আর ঠিক সেই সময়েই দেবদূতের মত প্রায় ওদের সামনে এসে দাঁড়ায় মহেশ৷

‘আরে দাদা, কাজ হল? কথা বললেন বুলবুলির সাথে?’

‘হ্যাঁ মানে ওই আর কি, তেমন কিছু কথা বলল না বাচ্চাটা৷ মহেশ, একটা উপকার করবে ভাই?’, একটু অনুনয় করে বলে কুশল৷

‘হ্যাঁ বলুন না’৷

‘আমাদের সবচেয়ে কাছাকাছি যে হোটেল আছে, সেখানে তোমার গাড়ি করে একটু পৌঁছে দিয়ে আসবে? আমরা ভাড়া দিয়েই যাব৷ আসলে আর হাঁটার ক্ষমতা নেই গো এতটা!’

‘আরে দাদা, কি যে বলেন না! আমি থাকতে আপনারা হোটেলে থাকবেন কেন? এই গরীবের বাড়িতেই থেকে যান না আজকের দিনটা৷ একটু হয়ত কষ্ট হবে, তবে খুব অসুবিধে হবে না৷ আপনাদের যা যা লাগবে, আমি সব ব্যবস্থা করে দেব’, মহেশের গলায় স্পষ্ট আন্তরিকতা টের পায় ওরা৷

এমন একটা সুযোগ যে আসতে পারে, ওরা কেউ ভাবতেও পারেনি৷ ওদের কাছে এটা প্রায় হাতে চাঁদ পাওয়ার মত৷ তবু একটু ইতস্তত করে রাজর্ষি বলে, ‘কিন্তু দাদা, আমাদের থাকতে দিলে তো তোমাদের অসুবিধে হবে!’

‘কিচ্ছু অসুবিধে হবে না ভাই৷ আরে আমার বাড়িতে এ বছর আমার জন্যে একটা আলাদা ঘর করেছি, আষাঢ় মাসে বিয়ে করব তো’ , একটু যেন লজ্জা পায় মহেশ৷ তারপরেই আবার বলে, ‘সেই ঘরটায় তোমাদের থাকতে দেব৷ আমি বলছি দ্যাখো, কোনো অসুবিধে হবে না’৷

এত ভালবেসে কেউ ডাকলে ফেরানো যায় না৷ ওরাও আর দ্বিরুক্তি না করে মহেশের পিছন পিছন এগিয়ে যায় ওর বাড়ির দিকে৷ ওদের বাড়িতে মহেশ আর ওর বাবা-মা থাকেন৷ ওরা যাওয়াতে সবাই ওদের ভীষন আন্তরিকভাবে অভ্যর্থনা জানায়৷ মনে হয় যেন কতদিনের চেনা! ভীষন একটা ভাললাগায় ভরে যায় ওদের মনটা৷ কিছুক্ষন আগের হতাশা যেন হঠাৎ উধাও৷ জ্যোতিষ্কর কেমন যেন মনে হতে থাকে, এবার সব ভালই হবে৷

রাত্তিরবেলা গরম ধোঁয়া ওঠা মোটা চালের ভাত, ডাল, আলুভাজা, আর ডুমুরের তরকারি তৃপ্তি করে খায় ওরা৷ মাসীমা, মানে মহেশের মা এত যত্ন করে খাওয়াচ্ছিলেন ওদের, তাতে যেন খাবারগুলো অমৃতের মত লাগছিল৷ মহেশের ঘরে একটা তক্তাপোশ রয়েছে, সেখানে বড়জোর দু’জন শুতে পারে৷ ওদের কাঁচা বাড়ি, মাটির দেওয়াল৷ এই গরমের দিনেও কি ঠান্ডা! ঘরে একটা টেবিল ফ্যান রয়েছে শুধু, আর তাতেই ঘরটা বাইরের গরমের তুলনায় বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে৷ মহেশ বলল ঘরের দেওয়ালে, মেঝেতে রোজ নাকি জল দেয় ওরা, তাতে ঘর ঠান্ডা থাকে৷

রাজর্ষি আর কুশলদাকে জোর করে তক্তাপোশের ওপর শুইয়ে মেঝেতে একটা মাদুর পেতে শুয়ে পড়ে জ্যোতিষ্ক৷ ওকে মেঝেতে শুতে দেখে খুব অস্বস্তিতে পড়ে গেছিল মহেশ৷ বারবার বলছিল পাশের বাড়ি থেকে একটা ক্যাম্প খাট চেয়ে এনে দেবে৷ কিন্তু জ্যোতিষ্ক রাজি হয়নি কিছুতেই, ওকে অনেক কষ্টে বুঝিয়েছে যে বাড়িতেও গরমকালে ও মাটিতেই শোয়৷ শুধু একটা মাদুর আর বালিশ হলেই ওর আর কিছু লাগবে না৷ ওদের পরিষ্কার চাদর, বালিশ দিয়ে, ঘরে জল রেখে তারপর শুতে গেছে মহেশ৷ বারবার বলে গেছে রাতে কোনো অসুবিধে হলেই যেন ওকে ডাকে ওরা৷ ও পাশের ঘরেই আছে, একটা হাঁক দিলেই চলে আসবে৷

শুয়ে পড়ার পর ঘড়ি দেখল জ্যোতিষ্ক, সবে সাড়ে ন’টা৷ বাড়িতে থাকলে এইসময়ে পড়াশুনো

করে ও৷ খেতে খেতে সেই এগারোটা৷ আজ এত তাড়াতাড়ি শুয়ে ঘুম আসছিল না ওর কিছুতেই৷ এদিকে তক্তাপোশের ওপর কুশলদা নাক ডাকছে৷ রাজর্ষির নিঃশ্বাসের শব্দ বলছে ও অনেকক্ষনই ডুবে গেছে গভীর ঘুমে৷ শুধু জ্যোতিষ্কর মনের মধ্যেই কি যেন একটা খচখচ করে চলেছে৷ আপাতদৃষ্টিতে যা হচ্ছে, তাতে অস্বস্তি হওয়ার কিছু নেই৷ বুলবুলির মধ্যে হয়ত সত্যিই এমন কোনো ক্ষমতা আছে, যা সাধারণ দৃষ্টিতে স্বাভাবিক নয়৷ যদিও ওরা এখনও তার কিছু প্রমাণ পায়নি, তবে এতগুলো মানুষ, মিডিয়া , সবাই তো আর ভুল বলতে পারে না! তবু জ্যোতিষ্কর কিসের যেন একটা অস্বস্তি হচ্ছে৷ এইসব ভাবনার মাঝেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল ও, টের পায়নি৷

ঘুমটা যখন ভাঙ্গল, মোবাইলে দেখল পাঁচটা দশ৷ কুশলদা আর রাজর্ষি তখনও একইভাবে ঘুমোচ্ছে৷ ওদের আর ডাকল না জ্যোতিষ্ক৷ আস্তে করে দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল বাইরে৷ তখন সবে ভোরের আলো ফুটছে, রাস্তায় লোকজন প্রায় নেই বললেই চলে৷ গ্রামেরই দু’একজন হয়ত কোনো কাজে যাচ্ছেন, তাঁরা অবাক হয়ে তাকালেন জ্যোতিষ্কর দিকে৷ ওর পরনে বারমুডা আর ঘরে পরার একটা গেঞ্জি, রাতে শোয়ার আগে পরেছিল৷ একটু দোনামনা করে সেটা পরেই হাঁটতে শুরু করে ও৷ মোবাইলটা সঙ্গে নিয়েছে৷ ওরা উঠলে ফোন করে নেবে৷

বুলবুলির বাড়ির কাছে যখন জ্যোতিষ্ক গিয়ে পৌঁছয়, তখন দিনের আলো বেশ পরিষ্কার৷ ও ইচ্ছে করেই একটু লুকিয়ে ছিল, যাতে ওকে কেউ দেখতে না পায়৷ ঘরের ভেতর থেকে হালকা কথাবার্তার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে৷ দেওয়ালে কান পেতে কথা শুনতে চেষ্টা করে জ্যোতিষ্ক৷ যদিও ও জানে এভাবে কারোর ঘরের ব্যক্তিগত কথাবার্তা শোনা ঠিক নয়, তবু কি যেন এক অসম্ভব প্রবল কৌতূহল থেকে ও কান পেতে শুনতে থাকে ওদের ঘরের কথাবার্তা৷ বেশ কিছুক্ষন কান খাড়া করে রেখে ও বুঝতে পারল বুলবুলির বাবা জয়দেব সাঁপুই কথা বলছেন৷

‘আমি না আসা অবধি কাউকে ঢুকতে দেবে না বললাম তো৷ তারপরে আবার এত কথা বলছ কেন?’

‘কালকের মত কেউ এসে যদি জোর করে?’ , খুব আস্তে আস্তে বলেন ওনার স্ত্রী৷

‘কাল যেমন বাইরে বসিয়ে রেখেছিলে, তেমন রাখবে৷ বলবে তুমি কিছু জানো না, আমি এলে কথা হবে’৷

‘একটা কথা, বলছি মেয়েটা কিন্তু খাওয়াদাওয়া করছে না তেমন৷ কেমন যেন ভয় পেয়ে রয়েছে সবসময়৷ আমি কিছু জিগেস করলেও ভেবেচিন্তে জবাব দিচ্ছে৷ এমন হলে তো রোগে পড়বে!’

‘কটা দিন একটু কষ্ট করো, এরপর সারাজীবন মেয়ে যাতে ভাল করে খেতে পারে সেই ব্যবস্থাই করছি৷ কষ্ট না করলে কি আর কেষ্ট পাওয়া যায়!’

ওদের ঘরের দরজাটা খুলে যায়৷ জ্যোতিষ্ক টের পায় জয়দেব সাঁপুই বেরোচ্ছে সাইকেল নিয়ে৷ দৌড়ে বাড়ির পিছনের দিকে গিয়ে একটা গাছের ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে ও৷ মিনিট দুয়েকের মধ্যে দেখতে পায় সাইকেল নিয়ে চলে যাচ্ছে জয়দেব৷ আরও পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করার পর আস্তে আস্তে বাইরে আসে ও৷ বুলবুলিদের ঘরের সামনেটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে৷ সম্ভবত উনুনে ধোঁয়া দিচ্ছে বুলবুলির মা৷

এখানে আর কিছু এখন হবে না বুঝতে পেরে ফেরার পথ ধরে জ্যোতিষ্ক৷

মাথার মধ্যে অনেককিছু গিজগিজ করছে ওর৷

মিস্টার রাতুল সেনগুপ্তর বাড়িতে ওরা যখন ঢুকল, ঘড়িতে তখন ঠিক সকাল দশটা পাঁচ৷ একজন আর্দালি গোছের ভদ্রলোক এসে ওদের নিয়ে গিয়ে একতলার বসার ঘরে বসালো৷ পুরোনো দিনের সিনেমায় যেমন বসার ঘর দেখা যায়, এটিও অনেকটা সেরকম৷ সোফাসেটগুলো চকচক করলেও ডিজাইনটা যে বেশ পুরোনো, বোঝা যায়৷ ঘরের একটা দেওয়ালে সিলিং পর্যন্ত বইয়ের আলমারি৷ জ্যোতিষ্ক একটু লক্ষ্য করে দেখল বিভিন্ন ভাষার বিভিন্ন বিষয়ের ওপর অগুনতি বই সেখানে৷ এক জীবনে একজন মানুষের পক্ষে এত বই পড়ে শেষ করা সম্ভব হয় না৷ বুক শেলফের পাশের দেওয়ালে একটা বড় জানলা, আর তার পাশেই একটা সিন্দুক রাখা৷ এছাড়া ঘরে রয়েছে একটি দেরাজ এবং তার ওপর রাখা একটি গ্রামোফোন৷ মেঝেতে এই গরমেও পুরু কার্পেট পাতা৷ মার্বেল পাথরের তৈরী সেন্টার টেবিলের ওপর ফুলদানিতে সাজানো টাটকা ফুল৷ বাড়িটায় ঢোকার মুখে একপাশে ফুলের বাগান দেখেছিল জ্যোতিষ্ক, সম্ভবত ফুলগুলো সেই বাগান থেকেই তোলা৷ ভদ্রলোক এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও চল্লিশের বা পঞ্চাশের দশককে যে বেশ বাঁচিয়ে রেখেছেন নিজের বাড়িতে, বোঝা যাচ্ছে৷

জ্যোতিষ্ক ঘরের প্রতিটা জিনিস বেশ খুঁটিয়ে লক্ষ্য করছিল, আর এইভাবে কতক্ষন কেটে গেছে ওর খেয়াল নেই৷ হঠাৎ ও সচকিত হল পেটে কুশলের কনুইয়ের খোঁচা খেয়ে৷ ঘরে ঢুকেছেন এ বাড়ির কর্তা মিস্টার সেনগুপ্ত৷ ওরা তিনজনেই উঠে দাঁড়াল ভদ্রলোককে দেখে৷ ওদের তিনজনকে হাতের ইশারায় বসতে বললেন ভদ্রলোক৷ তারপর নিজে বসলেন ওদের সামনে রাখা সিঙ্গল সোফায়৷ ভদ্রলোকের পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী, মাথার সব চুল সাদা, চোখে গোল্ডেন ফ্রেমের চশমা, পরিষ্কারভাবে কামানো দাড়িগোঁফ, গায়ের রঙ একটু চাপার দিকেই, উচ্চতা পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চির বেশি নয়৷ বয়স খুব বেশি হলে চুয়ান্ন-পঞ্চান্ন হবে৷ ভদ্রলোক ভালভাবে খুঁটিয়ে দেখলেন ওদের, তারপর বললেন, ‘তোমরা আমার মেয়ের থেকেও বয়সে ছোট, তোমাদের তাই তুমি করেই বলছি৷ আমার কাছে তোমাদের কি দরকার ঠিক বুঝতে পারলাম না৷ বলো তোমাদের জন্যে কি করতে পারি?’

‘আসলে কাকু’, শুরু করে কুশল, ‘আমরা কোলকাতা থেকে আসছি৷ শালতলি গ্রামের বুলবুলি সাঁপুইয়ের ব্যাপারে খবর পেয়েই আমাদের এখানে আসা৷ আমি বিশ্বভারতীতে

পড়ি, আর আমার এই দুই ভাই এখনও স্কুলে৷ মূলত ওদের আগ্রহেই এখানে এসেছি৷ আপনি তো জানেন বুলবুলির ব্যাপারে, তাই এই ব্যাপারে আপনি কি ভাবছেন যদি একটু বলতেন আমাদের...’

রাগে দাঁত কিড়মিড় করতে থাকে জ্যোতিষ্ক৷ কুশল দা-টা এত পাকা না! পুরো জিনিসটা ঘেঁটে দিল৷ এভাবে কেউ কথা বলে! এবার ভদ্রলোক না ওদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেন!

‘তোমরা হঠাৎ কেন বুলবুলির ব্যাপারে আগ্রহী হলে বলোতো?’ , পালটা প্রশ্ন করেন মিস্টার সেনগুপ্ত৷

‘আসলে কাকু, আমার পরিচিত এক দিদির একইরকম একটি ঘটনা ঘটেছে৷ আমার বাবার বন্ধুর মেয়ে৷ সেও ঠিক আপনার মেয়ের মতই কয়েকমাস আগে স্যুইসাইড করে৷ তারপর থেকে তার বাবা-মা পাগলের মত হয়ে গেছে৷ কাগজে এই খবরটা দেখে ওনারা কেমন যেন হয়ে যান৷ বারবার বলছেন যে ওনাদের মেয়েও কি তাহলে এভাবে অন্য কোথাও জন্ম নিচ্ছে! সত্যি বলতে কি আমি অনেকটা সেই কারণেই এসেছি আপনার সাথে কথা বলতে৷ আমরা তো ঘটনাগুলোর সত্যি-মিথ্যে বুঝিনা, আমি শুধু এটুকুই জানতে চাই, আপনার কি মনে হয় যে বুলবুলিই আপনার মেয়ে?’, কুশলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এবার হাল ধরে জ্যোতিষ্ক৷

অবলীলায় নিরীহ মুখে বলে যায় ও কথাগুলো৷ ওর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রাজর্ষি আর কুশল৷ ওর বলা শেষ হলে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে কি যেন ভাবেন মিস্টার সেনগুপ্ত৷ তারপর বলেন, ‘একজন বাবা-মায়ের জন্যে এটা যে কত বড় আঘাত, সেটা যাকে ওই সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, সে-ই জানে৷ রাণীর যখন বছর পাঁচেক বয়স, তখন আমার স্ত্রী মারা যান৷ আমি পাগলের মত কাজ করতাম৷ খালি ভাবতাম প্রচুর টাকা করতে হবে আমাকে, যাতে আমার রাণীকে সত্যিকারের রাণীর মত রাখতে পারি৷ টাকা হয়ত হল, কিন্তু মেয়েটা যে কখন এত একা হয়ে গেল, আমি টেরও পেলাম না৷ মা-মরা মেয়ে, একটু সঙ্গ চেয়েছিল আমার৷ সেটুকুও দিতে পারিনি আমি৷ আমি এক ব্যর্থ বাবা৷ মেয়েটা যখন চলে গেল, ভাবলাম আমিও একইভাবে শেষ করে দিই নিজেকে৷ কিন্তু পারলাম না জানো? আমার তো পৃথিবীতে কেউ নেই, তবু কি জন্যে যে আটকে গেলাম, জানিনা৷ হয়ত আমার রাণীই আবার বুলবুলির মধ্যে দিয়ে ফিরে আসবে বলে আমাকে বাঁচিয়ে রাখল৷ প্রথমদিন যখন ওখানে গেলাম, আমার কাছে এসে মেয়েটা ডাকল ‘বাপি’! আমার আর কোনো সন্দেহ নেই বাবা৷ আমি নিশ্চিত ও আমার রাণী৷ আমার উকিলের সাথে কথা বলেছি আমি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি ওকে আমার কাছে এনে রাখব’৷

থামলেন ভদ্রলোক৷ ওরা দেখল ওনার দু’চোখ দিয়ে জল পড়ছে৷ খোলা জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছেন উনি৷ কেমন যেন শূন্য দৃষ্টি৷

ওনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল ওরা৷

ঠিক গেটের মুখেই দেখা ওই আর্দালী ভদ্রলোকের সঙ্গে, যিনি ওদের প্রথমে ঘরে বসিয়েছিলেন৷

‘একি আপনারা এক্ষুনি চলে যাচ্ছেন?’

‘হ্যাঁ, মানে আমাদের কথা হয়ে গেছে’, বলে কুশল৷

‘না না না, তা কি করে হয়! আপনারা চা-জল কিছু মুখে না দিয়ে চলে যাবেন, বাবুর পরে হুঁশ ফিরলে খুব বকবেন আমায়’, ব্যস্ত হয়ে পড়েন উনি৷

আর ভদ্রলোকের কথায় একটু চমকে ওঠে ওরা সবাই, ‘হুঁশ ফিরলে মানে?’

‘মানে বাবু তো আর এখন নিজের মধ্যে নেই! রাণী দিদিমনির কথা উঠলে কোথায় যেন হারিয়ে যান৷ আর শুধু এখন বলে নয়, রাণী দিদিমনি চলে যাওয়ার পর থেকেই বাবু কেমন যেন হয়ে গেছেন৷ সারাক্ষন একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন৷ মেয়ের জিনিসপত্র নাড়াচাড়া করেন৷ ওইজন্যে তো বাবুর মাথায় হাত বুলিয়ে যে যা পারছে করছে৷ আমি আছি বলে তাই এখনও রক্ষে, নয়ত এ বাড়িও হয়ত আর থাকত না এদ্দিনে৷ যা শনির নজর পড়েছে! মাঝেমধ্যে আবার হঠাৎ আগের মত হয়ে যান বাবু জানেন! মনে হয় যেন হঠাৎ হুঁশ ফিরে এসেছে৷ আবার আগের মত আমাদের সকলের ওপর চোটপাট করেন৷ সত্যি বলতে কি, তখন বড় স্বস্তি পাই মনে৷ নয়ত মানুষটাকে দেখলে বুকের ভেতরটা যেন হু হু করে৷ অমন দাপুটে লোকটা আজ যেন সংসারে থেকেও সন্ন্যাসী! তাই বলছি, আপনারা চা-টুকু অন্তত না খেয়ে যাবেন না৷ বাবুর এখন এমন অবস্থা, আমিই সব দেখি৷ সেই ছোট্ট থেকে রয়েছি তো এ বাড়িতে, দয়া করে একটু এসে বসুন!’, অনুনয় করে বলেন ভদ্রলোক৷

জ্যোতিষ্করা অনেক করে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে এটা বলে ফিরে আসে যে ওরা খুব শিগগির আবার আসবে এ বাড়িতে৷ সেদিন ভরপেট জলখাবার খেয়ে যাবে৷ সেনগুপ্ত বাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পর জ্যোতিষ্ক টের পায় ওর মনের খচখচানিটা আরও বেড়ে গেছে৷ ওই আর্দালি ভদ্রলোকের কথা যদি ঠিক হয়, তাহলে তো মিস্টার সেনগুপ্ত এক ভয়ানক মানসিক রোগের শিকার! আর সেক্ষেত্রে যে কেউ ওনাকে খুব সহজেই ঠকিয়ে নিতে পারে! কিন্তু আর্দালি ভদ্রলোকের কথাবার্তা খুব সন্দেহজনক৷ ‘বাড়িও হয়ত আর থাকত না এদ্দিনে’ মানে? রাতুলবাবুর কে এমন শত্রু আছেন যে ওনার বাড়ি নিয়ে নিতে চাইবেন?

এতদিন ধরে মনের মধ্যে খচখচ করে চলা কাঁটাটা আজ যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে জ্যোতিষ্কর সামনে৷

পরেরদিন দুপুরে ওদের ফেরার ট্রেন, হাতে সময় চব্বিশ ঘন্টারও কম৷ কিন্তু জ্যোতিষ্কর কিছুতেই মন চাইছিল না বুলবুলি রহস্যটা এমন অধরা ফেলে রেখে চলে যেতে৷ ওর ভীষনভাবে মনে হচ্ছে যে সকলের চোখের সামনেই এমন কিছু একটা ব্যাপার আছে, যেটা এই রহস্যের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে৷ কিন্তু ওদের কারোর সেটা চোখে পড়ছে না৷ যত সময় এগোচ্ছিল, তত অস্থির হয়ে পড়ছিল ও৷ সকালবেলাতেই মহেশের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে প্রান্তিকের কাছাকাছি একটা লজে এসে উঠেছে ওরা৷ এখান থেকে মিস্টার সেনগুপ্তর বাড়িটা খুব কাছে৷ দুপুরবেলা খেতে বসেও খুব অন্যমনস্ক ছিল জ্যোতিষ্ক৷ হঠাৎ করেই খাওয়া ফেলে উঠে দাঁড়াল ও৷

‘কিরে, উঠলি কেন? এখনও তো মাছ দেয়নি?’, একটু আশ্চর্য হয়ে প্রশ্ন করে রাজর্ষি৷

জ্যোতিষ্ক খুব খেতে ভালবাসে৷ খাওয়া ফেলে উঠে যাওয়ার ছেলে ও নয়৷

‘শোনো তোমরা মন দিয়ে, আমাকে এক্ষুনি একবার বেরোতে হবে৷ মাথায় একটা প্ল্যান এসেছে৷ তোমরা যদি রাজী থাকো, এক্ষুনি চলো আমার সঙ্গে৷ আমার মনে হচ্ছে এই প্ল্যানটা এক্সিকিউট করে গেলে আজই বুলবুলি রহস্যভেদ হবে’ , উত্তেজিত হয়ে বলে ও৷

‘মানেটা কি? কি বলছিস তুই পাগলের মত? বুলবুলি রহস্যভেদ মানে? একটা বাচ্চা মেয়ে জাতিস্মর, হতেই পারে! এতে এত রহস্যের কি আছে? আমাদের জানার বাইরেও তো অনেক কিছু হয় নাকি!’, একটু বিরক্ত হয়েই বলে কুশল৷

‘দ্যাখো কুশল দা, জাতিস্মর হয় কি না, সেই তর্কে আমি যাচ্ছি না৷ সেটা আমার আলোচনার বিষয় না৷ আমার প্রথম থেকে একটা জিনিসই মনে হচ্ছে, সেটা হল বুলবুলির ব্যাপারটা নিছক জাতিস্মরের কেস না৷ এর মধ্যে নির্ঘাত অন্য কোনো ব্যাপার আছে৷ এতক্ষন কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না, এখন মনে হচ্ছে জটটা ছাড়াতে পারছি৷ যদি আমার অনুমান মিলে যায়, তাহলে কিন্তু তোমরাও খুব খুশি হবে এটুকু বলতে পারি৷ আমি এক্ষুনি শালতলি যাব৷ এবার তোমরা ঠিক করো আমার সাথে যাবে কিনা’ , ওদের উত্তরের অপেক্ষা না করেই

বেসিনের কাছে হাত ধুতে চলে যায় জ্যোতিষ্ক৷

একটু বিরক্ত হয়েই ওকে অনুসরণ করে কুশল আর রাজর্ষি৷

লজ থেকে রেডি হয়ে বেরিয়ে প্রথমেই ওরা যায় মিস্টার সেনগুপ্তর বাড়ি৷ ঘড়িতে তখন দুপুর দু’টো পনেরো৷ মিস্টার সেনগুপ্ত দুপুরের খাওয়াদাওয়ার পর এইসময় একটু ঘুমোন, ওরা সকালে গিয়েই শুনেছে সেটা৷ উনি ওঠেন বিকেল চারটেয়৷ তারপরের সময়টা ওনার নিজস্ব৷ বাইরের কারোর সঙ্গে ওইসময় উনি দেখা করেননা৷ গেট খুলে ভেতরে ঢুকতেই ওদের দেখে বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসেন আর্দালি ভদ্রলোক, ‘আপনারা এখন? বাবু তো এখন একটু শুয়েছেন!’

‘না না এখন আমরা আপনার বাবুর সঙ্গে দেখা করতে আসিনি, এখন আপনাকেই শুধু একটা কথা বলতে এসেছি৷ আপনি প্লিজ আপনার বাবু উঠলে বলে দেবেন যে উনি যেন আজ সন্ধেবেলা আমাদের জন্যে অপেক্ষা করেন৷ তাহলে ওনার মেয়েকে ফিরে পেতে পারেন আজ’, ঝড়ের মত কথাগুলো বলেই আর কিছু শোনার অপেক্ষা না করে পিছন ফিরে একরকম দৌড় লাগায় জ্যোতিষ্ক৷ ওকে এক্ষুনি একটা গাড়ি পেতে হবে, এই মুহূর্তে শালতলি যাওয়া ভীষন দরকার৷

হতভম্ব মুখ করে ওর পিছু নেয় রাজর্ষি আর কুশল৷

দুপুরবেলা এরকম মাঝরাস্তা থেকে হুট করে শালতলির গাড়ি পাওয়া মুখের কথা নয়৷ তাও যদি বোলপুর স্টেশনের কাছাকাছি হত, কথা ছিল৷ দু’মিনিট দাঁড়িয়েই ভয়ানক অস্থির হয়ে পড়ছিল জ্যোতিষ্ক, পারলে দৌড়েই চলে যায় শালতলি৷ রাজর্ষি একবার বলতে চেষ্টা করল,

‘আচ্ছা তুই কি ভাবছিস আমাদের কি বলা যাবে?’

‘এখন দাঁড়া একটু, আমি নিজেই ঘেঁটে আছি৷ দেখতেই পাবি, একটু সময় দে’, জ্যোতিষ্কর

গলা শুনেই বোঝা যাচ্ছিল ও বেশ টেনশনে আছে৷

প্রায় মিনিট দশেক অপেক্ষা করার পর একটা ছোট ম্যাটাডোর দেখতে পেল ওরা৷ দুধের গাড়ি৷ বোলপুরে জিনিস পৌঁছে এখন শালতলি ফিরছে৷ তবে আগেরদিন যত অবধি মহেশের গাড়ি গেছিল, এ গাড়ি অতদূর যেতে পারবে না৷ গাড়ির রাস্তা যতটা আছে, ততদূর পৌঁছে দেবে ও৷ উঠে পড়ল ওরা৷ আর গাড়িতে উঠে হঠাৎ রাজর্ষির খেয়াল হল, ওদের কাছে তো মহেশের ফোন নম্বর আছে! এতক্ষনে একবারও মহেশকে ফোন করার কথা কেন যে মনে পড়েনি!

শালতলি যখন পৌছল ওরা, ঘড়িতে তখন বিকেল সাড়ে চারটে৷ গাড়ি থেকে নেমে জ্যোতিষ্ক প্রায় দৌড়তে শুরু করল বুলবুলির বাড়ির দিকে৷ ভাড়া মিটিয়ে কুশল আর রাজর্ষিও ওর পিছু নিল৷ বুলবুলির ঘরের সামনে একই দৃশ্য, ওর বুড়ি ঠাকুমা আপনমনে কিসব বিড়বিড় করে চলেছে ঘরের সামনে বসে, বুলবুলির মা উঠোন ঝাঁট দিচ্ছিল৷ বুলবুলিকে কাছাকাছি কোথাও দেখা যাচ্ছে না৷

‘বুলবুলি কোথায়?’

দাঁড়িয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে জ্যোতিষ্ক৷

ওকে দেখে কেমন যেন চমকে ওঠেন বুলবুলির মা৷ ঝাঁটাটা হাত থেকে ফেলে ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকান, কিন্তু কিছু বলেন না৷

‘বৌদি, তাড়াতাড়ি বলুন বুলবুলি কোথায়? আমাদের হাতে বেশি সময় নেই৷ মিস্টার রাতুল সেনগুপ্ত আমাদের পাঠিয়েছেন বুলবুলিকে এক্ষুনি ওনার বাড়ি নিয়ে যেতে’, আবার ব্যস্ত হয়ে বলে জ্যোতিষ্ক৷

ও যে কি বলছে আর কি করছে, রাজর্ষির কিছুই মাথায় ঢুকছে না৷ সেনগুপ্তবাবুর বাড়িতে গিয়ে একবার বলে এল তৈরী থাকতে, আবার এখানে এসে বলছে সেনগুপ্তবাবু বুলবুলিকে ডেকে পাঠিয়েছেন! ওর মনে যে কি চলছে, সেটা বুঝতে পারা শিবেরও অসাধ্য৷ কুশল আর রাজর্ষি নীরব দর্শক হয়ে দেখে চলেছে ওদের সামনে ঘটে চলা কর্মকান্ড৷ ওরা দেখল রাতুলবাবুর নাম শুনে কেমন যেন মুখের ভাব পাল্টে গেল ভদ্রমহিলার৷ ওরা এসে পৌঁছনোর পর ওনার মুখে আস্তে আস্তে যে বিরক্তি এসে জমা হচ্ছিল, এখন সেটা বদলে যাচ্ছে ভয়ে৷ ওনাকে দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে উনি ভয় পেয়েছেন৷ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বললেন, ‘বুলির বাবা তো এখনও কাজ থেকে ফেরেননি৷ এক্ষুনি কি করে যাবে ও? উনি ফিরলে আমি নাহয় বলব বুলিকে নিয়ে যেতে...’

‘দেখুন বৌদি, রাতুলবাবুর বাড়িতে উকিলবাবু এসে বসে আছেন৷ উনি দলিল তৈরী করছেন৷

সম্ভবত উনি ওনার সম্পত্তি ওনার হারিয়ে যাওয়া রাণীকে দিয়ে যেতে চান৷ সেইজন্যেই

এত তাড়াহুড়ো করে আমাদের পাঠালেন৷ এবার উকিলবাবু তো আর রাত অবধি বসে থাকবেন না৷ বুলবুলির একটা টিপ সই দরকার ওখানে৷ সেইজন্যেই আমাদের পাঠালেন ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্যে৷ ওর বাবার ফিরতে দেরি হলে আপনিই চলুন না হয়! বৌদি, এমন সুযোগ কি সবসময় আসে?’ , অদ্ভুত আত্মবিশ্বাসের সাথে কথাগুলো বলল জ্যোতিষ্ক৷ এখন ওকে দেখে আর মনে হচ্ছে না ক্লাস ইলেভেনের সেই বাচ্চা ছেলেটা৷

একটু দোনামনা করে ওদের দাঁড়াতে বলে ভেতরে ঢুকে গেল বৌটি৷ মিনিট পাঁচেক পর বেরিয়ে এল শাড়ি বদলে, মেয়ের হাত ধরে৷ শাশুড়ির কাছে এসে জোরে জোরে বলল,‘ছেলে এলে বলবে বড়বাবু ডেকে পাঠিয়েছেন, তাই মেয়েকে নিয়ে গেলাম৷ বুঝতে পারলে?’

একবারও ওদের দিকে না তাকিয়ে ঘাড় নাড়ল বুড়ি৷ বুলবুলির হাত ধরে ওদের পিছু নিলেন

ভদ্রমহিলা৷ জ্যোতিষ্ক লক্ষ্য করল উনি ঘরের দরজাটাও বন্ধ করলেন না৷ হয়ত এখানে মানুষ মানুষকে বিশ্বাস করে, চুরি হওয়ার সম্ভাবনা নেই৷ অথবা এও হতে পারে, এদের হয়ত চুরি যাওয়ার মত কিছুই নেই৷ তাই দরজা বন্ধ করার দরকার পড়ে না৷

বুলবুলিদের বাড়ি থেকে বেরোনোর পর ওদের খেয়াল হল যে গাড়ির ব্যবস্থা হয়নি৷ এখন একমাত্র ভরসা যদি মহেশকে বাড়িতে পাওয়া যায়৷ মহেশের বাড়ির দিকে প্রায় দৌড় লাগাল জ্যোতিষ্ক৷ ওর বাড়ির সামনে দাঁড় করানো রয়েছে গাড়িটা৷ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ও, তার মানে মহেশ বাড়িতেই আছে৷ খানিকক্ষন আগে ফিরে খেয়েদেয়ে একটু শুয়েছিল মহেশ৷ জ্যোতিষ্ক ওকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে প্রায় হিড়হিড় করে তুলে এনেছে বিছানা থেকে৷ কোনোরকমে বেরোনোর আগে জামাটা গায়ে দিতে পেরেছে মহেশ৷

‘আচ্ছা কোথায় যেতে হবে বলবে তো?’ , গাড়িতে উঠে বলে মহেশ৷

‘প্রান্তিকে, রাতুল সেনগুপ্তর বাড়ি৷ যত তাড়াতাড়ি পারো, চলো’ , উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে জ্যোতিষ্ক৷

ওরা যখন রাতুলবাবুর বাড়ি এসে পৌঁছল, তখন ঘড়ির কাঁটা প্রায় সাড়ে ছ’টার ঘর ছুঁইছুঁই৷ মহেশ একরকম উড়িয়ে এনেছে ওদের, নয়ত আরও অনেক দেরি হওয়ার কথা৷ রাতুলবাবু ওদের জন্যেই অপেক্ষা করছিলেন৷ ওদের দেখে এবং সাথে বুলবুলিকে দেখে ভীষনই অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন—

‘কি ব্যাপার? কি হচ্ছে আমি তো কিছুই বুঝতেপারছি না’৷

‘আর একটুখানি ধৈর্য ধরুন কাকু, এক্ষুনি সব পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ আপনি প্লিজ আমাদের সকলকে একবার আপনার মেয়ের ঘরে নিয়ে যাবেন?’

দ্বিরক্তি না করে ওদের পথ দেখিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢোকেন রাতুলবাবু৷

আস্তে আস্তে সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে এসে উনি দাঁড়ান একটি ঘরের সামনে৷ ঘরের দরজাটা এমনি ভেজিয়ে রাখা, কোনো তালা নেই৷ জ্যোতিষ্ক এগিয়ে গিয়ে খোলে দরজাটা৷ তারপর ওদের সবাইকে বলে ঘরের ভেতর আসতে৷ একে একে ঘরে ঢোকেন রাতুলবাবু, বুলবুলি, ওর মা, রাজর্ষি, কুশল, মহেশ এবং রাতুলবাবুর আর্দালি৷

ঘরের মধ্যে খাট, বিছানা, ড্রেসিংটেবিল, পড়ার চেয়ার-টেবিল, ফুলদানিতে সাজানো টাটকা রজনীগন্ধা ফুল, গল্পের বইয়ের তাক সুন্দর করে সাজানো৷ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে যে নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়৷ শেষ পাঁচ বছর এই ঘর যে কেউ ব্যবহার করেনি, সেটা দেখে বোঝার উপায় নেই৷ সবাই দাঁড়িয়ে আছে৷ ঘরের জিনিসগুলো এত সুন্দর করে সাজানো, তাই কেউ বসার সাহস পাচ্ছে না৷ সকলকে একটু ধাতস্থ হওয়ার জন্যে মিনিটখানেক সময় দিল জ্যোতিষ্ক৷ বুলবুলি অবাক হয়ে চারিদিক দেখছে৷ ওকে হাত নেড়ে কাছে ডাকে জ্যোতিষ্ক৷ তারপর বলে, ‘আচ্ছা বুলবুলি, তোমার নামটা কি তুমি আমাদের একবার বলবে?’

একটু ভয় পেয়ে মায়ের দিকে তাকায় মেয়েটা৷ সঙ্গে সঙ্গে জ্যোতিষ্ক ওর মাথায় হাত রেখে বলে, ‘কোনো ভয় নেই, তোমাকে কেউ কিছু বলবে না৷ তুমি বলো৷ এই দাদুটা তোমাকে অনেক ক্যাডবেরি দেবে’ , এই বলে রাতুলবাবুর দিকে দেখায় ও৷

ক্যাডবেরির কথায় একটু হাসি ফোটে মেয়েটার মুখে৷

আস্তে আস্তে বলে, ‘রাণী’৷

‘বেশ৷ তোমার নাম রাণী৷ আচ্ছা তোমার কি এই একটাই নাম না আর কোনো নাম আছে?’

ঘাড় নাড়ে বুলবুলি৷ অর্থাৎ তার অন্য কোনো নাম নেই৷

‘আচ্ছা, রাণী কোথায় গেছে বলতে পারো?’

আবার প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷

‘রাণী তো মরে গেছে’, চটপট জবাব দেয় বুলবুলি৷ ওর কথার ধরণে বোঝা যাচ্ছে যে ওর ভয় কাটছে একটু একটু করে৷

‘ও আচ্ছা৷ তা রাণী কি করে মরে গেল?’

‘বাপির সাথে ঝগড়া করে নিজে নিজে মরে গেছে’৷

জ্যোতিষ্ক দেখে বুলবুলি এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠেন রাতুলবাবু৷

‘মিস্টার সেনগুপ্ত, আপনি প্লিজ একটু শক্ত হন৷ দেখুন আমি এখানে কিন্তু একটা জরুরী ব্যাপার আপনার সামনে তুলে ধরব বলে এসেছি৷ আপনার সাহায্য আমার ভীষন দরকার৷ সেখানে আপনি এরকম ভেঙ্গে পড়লে কিন্তু চলবে না’৷

চোখের জল মোছেন রাতুলবাবু৷ জ্যোতিষ্ক আবার বুলবুলির দিকে ফেরে৷

রাতুলবাবুকে দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এই দাদুটাকে তুমি চেনো বুলবুলি?’

ঘাড় নাড়ে বুলবুলি, অর্থাৎ চেনে৷

‘কে ইনি?’

‘বাপি’, চটজলদি জবাব দেয় বুলবুলি৷

‘ইনি কার বাপি?’

আবার প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷

এবার কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় বুলবুলি, কোনো জবাব দিতে পারে না৷

জ্যোতিষ্ক ওকে ভয় না পেতে দিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা বুলবুলি, তোমার কি খেতে ভাললাগে সবচেয়ে?’

‘ডিম’ , একগাল হেসে বলে ও৷

‘বাহ, আজকে রাত্তিরে আমরা ডিমের ঝোল আর ভাত খাব৷ আমারও ডিম খেতে খুব ভাল লাগে৷ তুমি কি জানো রাণীর কি খেতে ভাল লাগে?’

এবার ঘাড় নাড়ে বুলবুলি, অর্থাৎ জানে না৷ জ্যোতিষ্ক তাকায় রাতুলবাবুর দিকে, উনি বলেন,

‘রাণীর ডিমে অ্যালার্জি ছিল৷ ও চিকেনটা খুব ভালবাসত’৷

‘আচ্ছা বুলবুলি, তুমি রাণীর ব্যাপারে আর কি জানো আমাদের একটু বলবে?’, আবার বুলবুলির দিকে ফেরে ও৷

‘আমি রাণী৷ আমি খুব ভাল মেয়ে ছিলাম৷ বাপিকে খুব ভালবাসতাম৷ অনেক বই পড়তাম আর বাগানে ঘুরতাম৷ আমার একটা সাদা জামা ছিল, সেটা আমার খুব প্রিয়৷ একদিন বাপির সাথে ঝগড়া হল, তখন সেই সাদা জামাটা পরে আমি মরে গেলাম’ , প্রায় মুখস্থের মত গড়গড় করে বলে বুলবুলি৷

‘আচ্ছা বুলবুলি, এই ফুলটা তোমার ভাললাগে?’, ফুলদানিতে রাখা রজনীগন্ধাটা দেখিয়ে প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷

আবার ঘাড় নাড়ে বুলবুলি, অর্থাৎ তার ভাল লাগে না৷ জ্যোতিষ্ক তাকায় রাতুলবাবুর দিকে৷

‘রাণীর প্রিয় ফুল ছিল এটা’, আস্তে আস্তে বলেন উনি৷

‘বুলবুলি তুমি রাণীর ঘরে গেলে চিনতে পারবে?’ ঘাড় হেলায় ও৷ অর্থাৎ চিনতে পারবে৷

‘এই ঘরটা চেনো তুমি? আগে কখনো দেখেছ?’ , সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক৷

জোড়ে জোরে মাথা নাড়ে বুলবুলি, অর্থাৎ এই ঘরটা তার অচেনা৷ আর ঠিক এইসময় ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায় জয়দেব সাঁপুই, বুলবুলির বাবা৷ ওনার মুখচোখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে ভীষন রেগে গেছেন৷ চিৎকার করে ওঠেন জ্যোতিষ্কর দিকে তাকিয়ে, ‘কি হচ্ছে কি এসব? আমার মেয়েটাকে নিয়ে কি শুরু করলেন আপনারা?’

‘আপনি চুপ করুন জয়দেব বাবু, আপনার মেয়েকে নিয়ে আপনি শুরু করেছেন এই নোংরা খেলাটা৷

আমি শুধু খেলাটা শেষ করতে এসেছি’, প্রায় হুঙ্কার দেয় জ্যোতিষ্ক৷

সঙ্গে সঙ্গে জয়দেবের মুখটা কেমন যেন সাদা হয়ে যায়৷ ঘরে মনে হচ্ছে একটা পিন পড়লেও

শব্দ পাওয়া যাবে৷ কিছুক্ষন চুপ করে থেকে আবার মুখ খোলে জ্যোতিষ্ক, ‘আমি এখন বুলবুলিকে একটা শেষ প্রশ্ন করব, আর এই প্রশ্নটার সাথে সাথেই আপনাদের কাছে সবকিছু ছবির মত পরিষ্কার হয়ে যাবে৷ আপনারা যে যেখানে আছেন থাকুন, দয়া করে বাচ্চাটির সামনে কেউ কোনো অতিরিক্ত আবেগ দেখাবেন না’ , এই বলে বুলবুলির দিকে ঘোরে ও৷ বুলবুলির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ওর কাঁধে হাত রেখে প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা বুলবুলি, তোমাকে আমি একটা শেষ প্রশ্ন করব৷ আগের গুলোর মত এটারও ঠিকঠিক জবাব দেবে কেমন? মিথ্যে কথা বললে কিন্তু বাবাকে পুলিশে ধরে নিয়ে যাবে৷ তাই মিথ্যে বলবে না, ঠিক আছে?’

আবারও ‘হ্যাঁ’ সূচক ঘাড় নাড়ে বুলবুলি৷ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে একটু ভয় পেয়েছে মেয়েটা৷ ‘তোমাকে বাবা বলেছে তো বাইরের লোকের সামনে তোমার নাম রাণী বলতে,

তাই না?’

উপর নীচে ঘাড় নাড়ে বুলবুলি৷ আর এই দেখে হঠাৎ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কেঁদে ওঠে বুলবুলির মা৷ সেদিকে একবার আড়চোখে দেখে নিয়ে আবার প্রশ্ন করে জ্যোতিষ্ক, ‘তুমি কি চেনো রাণীকে? দেখেছ কোনোদিন?’

এবার দু’পাশে মাথা নাড়ে বুলবুলি, যার অর্থ ‘না’ বোঝায়৷

বুলবুলিকে ছেড়ে এবার উঠে দাঁড়ায় জ্যোতিষ্ক৷ ঘরে উপস্থিত সকলকে উদ্দেশ্য করে বলে,

‘আমার কাজ শেষ৷ আশা করি আপনারা এবার বুঝতে পেরেছেন যে এই বাচ্চা মেয়েটি কতটা চাপের মধ্যে দিয়ে গেছে? ও জাতিস্মর নয়, ওকে জোর করে জাতিস্মর বানানোর চেষ্টা করেছেন ওর বাবা, দিনের পর দিন’৷

‘আমি প্রথম দিন থেকে বলছি, এসব কোরো না কোরো না৷

আমার কথা শুনলে তো!

খেতে না পাই না পাব, এমন করে এবার কি হল বলুন তো সবার সামনে’, এতক্ষনে মুখ খুললেন বুলবুলির মা৷ সমানে কেঁদেই চলেছেন উনি৷

‘এবার আমি আপনাদের আরেকটু বুঝিয়ে বলি যে আমি ব্যাপারটা কি করে বুঝলাম’, আবার শুরু করে জ্যোতিষ্ক, ‘আমার প্রথম সন্দেহ হয়েছিল যখন খবরের কাগজের পাতায় খবরটা দেখি৷ আমি দেখছিলাম সাংবাদিকরা যা ইন্টারভিউ করেছেন, বেশিরভাগই বুলবুলির বাবার কথা৷ ওর মুখের কোনো কথা নেই৷ এবার এটা মনে হতেই পারে যে ওইটুকু বাচ্চা মেয়েকে কেউ চায়নি অত লোকের সামনে কথা বলতে দিতে, তাই ওর হয়ে হয়ত ওর বাবাই সামলে নিয়েছেন সবটা৷ কিন্তু আমার মনে জানিনা কেন একটা খচখচানি দেখা দিল৷ মনে হল ওর বাবা যদি মেয়েকে এত লোকের সামনে বের করতে না-ই চাইবেন, তাহলে তো খবরটাই চেপে রাখতেন৷ এত সংবাদমাধ্যম বা লোক জানাজানি হতই না৷ সেই সন্দেহ থেকেই আমি একরকম জেদ করে আসি এখানে৷ প্রথমদিন মহেশকে আমরা মিথ্যে কথা বলেছিলাম, যে আমরা কাগজের লোক৷ আমরা কেউ নই, সাধারণ মানুষ, যারা সত্যটা জানতে চায়৷ আর সেইজন্যে আমাকে যে করেই হোক পৌঁছতে হত বুলবুলির কাছে৷ কিন্তু বুলবুলির বাড়িতে পৌছেও লাভ হল না বিশেষ৷ আমি দেখলাম মেয়েটি ওর বাবার শিখিয়ে দেওয়া কথাই আওড়ে চলেছে তোতাপাখির মত৷ ওকে কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই ও আগে ওর বাবার দিকে তাকায়, তারপর বাবার ইশারায় কথা বলে৷

বুলবুলির যা বয়স, তাতে ওকে যা শেখাবে, ও তাই শিখবে৷ আর সেটা বুঝেই নিজের কাজটা খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে নিয়েছিলেন জয়দেব বাবু৷ উনি অনেকদিন কাজ করেছেন এই বাড়িতে৷ রাতুলবাবুর স্বভাব, বা ওনার মেয়ের প্রতি অন্ধ স্নেহ কিছুই অজানা ছিল না৷ সেই মেয়ে চলে যাওয়ার পর মানুষটার জীবনের স্থিতিটাই যে অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছিল, সেটা জয়দেববাবু খুব ভাল করে জানতেন৷ তাই ঠান্ডা মাথায় প্ল্যান করেন বুলবুলিকে ওনার মেয়ে হিসেবে দেখানোর৷ বুলবুলির জন্ম রাতুলবাবুর মেয়ের মৃত্যুর ঠিক পরেই৷ তাই যারা বিশ্বাস করেন, তাঁদের পক্ষে এরকম একটা ধারণা হওয়া স্বাভাবিক যে রাণীই হয়ত আবার ফিরে এসেছে বুলবুলি হিসেবে৷ জয়দেব বাবু জানতেন যে মেয়ের মুখে একবার ‘বাপি’ শুনলেই আর নিজেকে ধরে রাখতেপারবেন না নিজেকে রাতুলবাবু, আর উনি মানুষটার সেই ক্ষত বা আবেগের সুযোগ নিয়েই খুব সুন্দরভাবে গুছিয়ে ফেলেছিলেন নিজের কাজটা৷

উনি জানতেন যে রাতুলবাবুর মনে যদি এই বিশ্বাসটা একবার ঢুকিয়ে দেওয়া যায় যে বুলবুলিই রাণী, তাহলে বুলবুলি সত্যিই রাণীর হালে থাকবে৷ ওই মেয়ের নামে তাঁর সবকিছু লিখে দিতে রাতুলবাবু আর দু’বার ভাববেন না৷

আমার যদ্দূর ধারণা এই ব্যাপারটি খানিকটা আঁচ করে ফেলেছিলেন অনুকূল বাবু, রাতুলবাবুব

আর্দালি৷ উনি হাবেভাবে চেষ্টা করতেন রাতুলবাবুকে নিরস্ত করতে, কিন্তু উনি জানতেন যে বাবু মেয়ের ব্যাপারে কতটা দুর্বল৷ এক্ষেত্রে তাঁর কথা যে প্রাধান্য পাবে না সেটা উনি খুব ভাল করেই জানতেন৷ অনেকগুলো বিষয়ে শেষ দু’দিনে খটকা বাড়ছিল আমার৷ শেষে আজ দুপুরে হঠাৎ দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেললাম৷ অনেকটা অনুমানের ওপর ভর দিয়েই এক মুহূর্তে সাজিয়ে ফেলেছিলাম সারাদিনের প্ল্যানটা৷ জানিনা আমার অনুমানে একটু ভুল হলে কি হত, তবে শেষ পর্যন্ত যে আপনাদের সকলকে সত্যিটা জানাতে পেরেছি, এতেই আমি খুশি’ , থামল জ্যোতিষ্ক৷

ঘরে সবাই বেশ কিছুক্ষন চুপচাপ, মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে জয়দেব সাঁপুই , আর মুখে

আঁচল চেপে দাঁড়িয়ে আছেন ওনার স্ত্রী৷ হঠাৎ কথা বললেন রাতুলবাবু, ‘আমি একটা কথা বলতে চাই৷ রাণী চলে যাওয়ার পর আমার সত্যিই মাথার ঠিক নেই৷ আমি কখন কি করছি নিজেই জানিনা৷ অনুকূল আমাকে আগলে রাখে৷ আজকের ঘটনাটা আমাকে খুব দুঃখ দিল ঠিক কথা, কিন্তু আমি জয়দেবকে বিশেষ দোষ দিতে পারছি না’, রাতুলবাবুর কথায় ঘরের সবাই চমকে উঠে তাকায় ওনার দিকে৷

‘তোমরা সবাই অবাক হচ্ছ জানি, তোমাদের চোখে হয়ত জয়দেব অপরাধী, কিন্তু আমার চোখে নয়৷ আমি আর জয়দেব আজ একটা জায়গায় একদম এক৷ আমরা দু’জনেই বাবা৷ তাই আমি জানি একজন বাবা তাঁর মেয়ের জন্যে কি করতে পারে৷ জয়দেব তাঁর মেয়ের ভবিষ্যৎটা সুরক্ষিত করতে ভেবেছিল যদি একটু ভালভাবে থাকা যায়৷ এতে তো দোষের কিছু নেই! একজন বাবা তাঁর মেয়ের ভালটা চিন্তা করবেন, এটাই তো স্বাভাবিক! সেখানে যদি অন্য একজনকে একটু ঠকতে হয় তো হবে! আমিও অন্যায় করেছি৷ রাণী চলে যাওয়ার পর কোনোদিকে খেয়াল ছিল না আমার৷ জয়দেবের কাজটা চলে গেছিল৷ আমি ভাবিওনি ও ওর পরিবারকে, সদ্যোজাত বাচ্চাটাকে কি খাওয়াচ্ছে৷ আমার অপরাধ তো কিছু কম নয়!

আমি শুধু নিজের কষ্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম৷ তাই আজ আমি আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই৷ আমি আমার সম্পত্তির কিছুটা অংশ লিখে দেব বুলবুলিকে৷ আর আজ থেকে ওর লেখাপড়ার সব দায়িত্ব আমার৷

রাণীকে যা পারিনি, বুলবুলি যাতে সেই সব সুযোগটুকু পায় আমি দেখব, ওকে দশজনের একজন করে তুলব আমি’ , থামলেন রাতুল সেনগুপ্ত৷

জয়দেব আর ওনার স্ত্রী ওঁর পায়ের কাছে বসে কাঁদছেন৷ একটু দূরে অবাক চোখে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে বুলবুলি৷ ও বোধহয় বুঝতেও পারছে না ওকে নিয়ে কি কি হয়ে গেল৷

সকলের কাছে বিদায় নিয়ে আস্তে আস্তে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে কুশল, রাজর্ষি আর জ্যোতিষ্ক৷ ওদের মনটা খুব ভাল হয়ে গেছে৷ পৃথিবীর সব মানুষ যদি রাতুলবাবুর মত করে ভাবত, তাহলে হয়ত এত সমস্যাই হত না৷ গেটের কাছে পৌঁছতেই ওদের পেছন থেকে ডাকেন রাতুলবাবুর আর্দালি ভদ্রলোক৷ ঘুরে দাঁড়ায় ওরা৷

জ্যোতিষ্কর হাতে একটি খাম ধরিয়ে উনি বলেন, ‘বাবু দিলেন, আবার আসবেন’৷

খামটা খোলে জ্যোতিষ্ক৷ গার্ডার দিয়ে মোড়া ‘কুড়িটা পাঁচশ টাকার নোট, আর সাথে একটি ছোট্ট কাগজ৷ কাগজে লেখা—

‘এমন করেই সর্বদা সত্যের পথে থেকো বাবা, আমার আশীর্বাদ রইল৷’

— রাতুল সেনগুপ্ত’৷

অধ্যায় ১ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%