হেমেন্দ্রকুমার রায়
প্রথম
ঘটনাক্ষেত্র
এই নাটকীয় কাহিনীর ঘটনাক্ষেত্র হচ্ছে বোর্নিয়ো দ্বীপ। বাঙালি পাঠকের কাছে বোর্নিয়ো দ্বীপ যথেষ্ট অপরিচিত, সুতরাং গল্প বলবার আগে ঘটনাক্ষেত্রের কিছু কিছু পরিচয় দেওয়া দরকার।
বোর্নিয়ো পূর্ব ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত। এর উত্তরে আছে দক্ষিণ চিন-সমুদ্র, পশ্চিমে ও দক্ষিণে আছে কারিমাতা প্রণালী ও জাভা সমুদ্র এবং পূর্বদিকে আছে ম্যাকাসার প্রণালী ও সিলেবিস সমুদ্র। দ্বীপটি আকারে ২,৯০,০০০ বর্গমাইল এবং এর জনসংখ্যা হচ্ছে ২৬,৬০,০০০।
বোর্নিয়ো দ্বীপটি চার ভাগে বিভক্ত (১) ইংরেজ অধিকৃত উত্তর বোর্নিয়ো; (২) ব্রুনি-স্ট্রেট সেটেলমেন্টের অধীনস্থ একটি মুসলমান রাজ্য; (৩) সারাওয়াক—এখন ইংরেজদের অধীনস্থ রাজ্য, কিন্তু ঘটনার সময়ে তার সামন্ত বা করদ রাজা ছিলেন একজন ইংরেজ এবং (৪) ওলন্দাজদের অধিকৃত বোর্নিয়ো। ওলন্দাজদের বোর্নিয়ো আবার দুইভাগে বিভক্ত (১) পশ্চিম বোর্নিয়ো, এর জনসংখ্যা ৬.৮৫.৫৪৫ এবং (২) দক্ষিণ ও পূর্ব বোর্নিয়ো, জনসংখ্যা ১০,৯১,৩৪১।
বোর্নিয়োর বাসিন্দাদের ভিতরে প্রধান হচ্ছে ডায়াক জাতি, এবং তাদের ভিতরেও নানা বিভাগ আছে। চিনদেশের অনেক লোকও এখানে ব্যাবসা ও বাণিজ্য সূত্রে বসবাস করে। নদীর ধারে ধারে বাস করে মালয়জাতীয় লোকেরাও।
এই বিংশ শতাব্দীতেও বোর্নিয়ো দ্বীপকে রহস্যময় বলে বিবেচনা করা হয়। উপরে ইংরেজ, ওলন্দাজ ও অন্যান্য যে রাজত্বের কথা বলা হল, ওদের প্রত্যেকটি বোর্নিয়ো দ্বীপের এক-এক প্রান্তে অবস্থিত। কিন্তু দ্বীপের মধ্যভাগের কথা আজও ভালো করে জানা যায়নি। সেখানকার বাসিন্দারা প্রায়-অসভ্য। তাদের প্রকৃতি হচ্ছে অত্যন্ত বন্য ও হিংস্র। তাদের অনেকে নরমাংস ভক্ষণ করে এবং তাদের অনেকে আবার নরমাংস ভক্ষণ না করলেও শিকার করতে ভালোবাসে নরমুণ্ড।
দ্বীপের মধ্যভাগ গহন অরণ্যের দ্বারা আচ্ছন্ন। সেসব গভীর বনের মধ্যে পাওয়া যায় গাটাপার্চা, রবার, নারিকেল, সাগু, র্যাটান-বেতের ও মূল্যবান লোহাকাঠের গাছ। কয়লা, সোনা, হীরা, তামা, লোহা, টিন ও পেট্রোলিয়াম প্রভৃতির খনির জন্য বোর্নিয়োর বিশেষ খ্যাতি আছে। কেবল বড়ো বড়ো অরণ্যই নয়, বোর্নিয়ো দ্বীপে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড পর্বতও দেখা যায় নানাস্থানে।
বোর্নিয়োর আদিম বাসিন্দাদের কথা খুব অল্প জানা গিয়েছে। অনেক শতাব্দী আগে মালয়-জাতীয় লোকদের আক্রমণে তারা দ্বীপের মধ্যভাগে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই আদিম বাসিন্দাদের নানান জাতি এখন ক্লেমান্তান, মুরুত, কেয়ান, কেনিয়া ও পুনান প্রভৃতি নামে পরিচিত। তাদের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে 'ব্লো-পাইপ' (তার কথা পরে বলব), এবং তারা দিন কাটায় শিকার ও যুদ্ধবিগ্রহ নিয়েই।
বনের ভিতরে কেয়ান-জাতীয় লোকেরা যেসব বাড়িতে বাস করে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য নূতনত্ব আছে। সেগুলি 'লম্বাবাড়ি' বলে ডাকা হয়। এক-একখানি লম্বাবাড়িকে এক-একখানি গ্রাম বললেও অত্যুক্তি হবে না। কোনো-কোনো লম্বাবাড়ি দৈর্ঘ্যে প্রায় সিকি মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত! বন্য শত্রুদের কবল থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যে এই বাড়ির ঘরগুলি থাকে মাটি থেকে অনেক উঁচুতে। বাড়ির একদিকে থাকে একটানা সুপ্রশস্ত দালান। সেই দালানের সামনেই থাকে পাশাপাশি ঘরের পর ঘর এবং প্রত্যেক ঘরে থাকে এক-একটি পরিবার। কোনো-কোনো বাড়িতে পাঁচ-ছয় শত লোক পর্যন্ত বাস করতে দেখা গিয়েছে। দালানটিকে একাধারে বৈঠকখানা ও গ্রামের পথ বলেও গণ্য করা যায়।
অসভ্যদের সঙ্গে বোর্নিয়োর পাহাড়ে ও জঙ্গলে বাস করে ব্যাঘ্র, বন্যমহিষ, বন্যবরাহ, অজগর ও অন্যান্য হিংস্র জন্তু। তার গাছের ডালে ডালে লাফালাফি করে, ছোটোবড়ো নানা জাতের বানর। তার নদীতে নদীতে সাঁতার কেটে বেড়ায় মস্ত মস্ত কুমির। এছাড়াও বোর্নিয়োর মধ্যে এমন আর-একটি বিশেষ জীব বাস করে, যা সুমাত্রা ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। এই জীবটির পরিচয় গল্পের মধ্যেই পাওয়া যাবে।
একটু আগে ব্লো-পাইপ নামে যে অস্ত্রটির কথা উল্লেখ করেছি এইবারে তার সম্বন্ধেও কিছু বলা দরকার।
প্রথম-দৃষ্টিতে ব্লো-পাইপকে সাধারণ বর্শা-দণ্ড বলে ভ্রম হয়। ব্লো-পাইপের একদিকে বর্শার ফলক থাকে বটে, কিন্তু দণ্ডটির ভিতরটা একেবারে ফাঁপা। শিকারিরা এই ফাঁপা বর্শা-দণ্ডের ভিতরে সাগু-গাছের শক্ত কাঠ দিয়ে তৈরি ছোট্ট একটি শলাকা ঢুকিয়ে কোনো জন্তুকে লক্ষ্য করে বর্শা-দণ্ডের এক প্রান্তে মুখ রেখে জোরে ফুঁ দেয় এবং শলাকাটি তৎক্ষণাৎ বেগে বেরিয়ে গিয়ে সেই জন্তুটির দেহ বিদ্ধ করে। শলাকার উপরে মাখানো থাকে অতি-বিষাক্ত ইপো-গাছের রস, সুতরাং শলাকার দ্বারা বিদ্ধ হলে জন্তুটি অবিলম্বে মারা পড়ে। ফুঁয়ের জোরে শলাকাটি ৭০ গজ দূর পর্যন্ত ছুটে যেতে পারে। বোর্নিয়োর লোকেরা এই ব্লো-পাইপকে সুম্পিতান বলে ডাকে। কেবল বোর্নিও দ্বীপে নয়, দক্ষিণ আমেরিকার পেরু দেশের লালমানুষরাও ব্লো-পাইপের মতন অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে।
বোর্নিয়োর বাসিন্দারা এই সুম্পিতান ছাড়া প্যারাং ও ক্রিশ নামে বড়ো ও ছোটো জাতের ছুরিও ব্যবহার করে থাকে। নেপালিরা যেমন কুকরির ও শিখেরা যেমন কৃপাণের ভক্ত, বোর্নিয়োর বাসিন্দারাও তেমনি ক্রিশ ছুরিকে যারপরনাই ভালোবাসে। এই ক্রিশ সর্বদাই তাদের সঙ্গে সঙ্গে থাকে, কারণ সেখানে ক্রিশ হারালে সম্মানকেও হারাতে হয়। বোর্নিয়োর প্রবাদ বলে, টাকা দিয়ে সব কেনা যায়, কেনা যায় না খালি ক্রিশ।
বোর্নিয়োর আর একটি নাম হচ্ছে 'সূর্যকরের দ্বীপ'। কারণ এই স্বাস্থ্যকর দ্বীপটি যেন চিরনিদাঘের স্বদেশ। এখানে শীত-কুয়াশার অত্যাচার নেই বললেও চলে, তাই তার উপরে ঝলমল করে অম্লান সূর্যের পরিপূর্ণ কিরণ।
দ্বিতীয়
পলাতকের দল
তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র পৃথিবীর দিকে দিকে। এবং রহস্যময় বোর্নিয়ো হয়ে উঠেছে রীতিমতো ভয়াবহ!
তার আকাশ সমাচ্ছন্ন করে দলে দলে উড়ছে জাপানের বোমারু বিমান এবং তার সমুদ্রে সমুদ্রে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে জাপানের অসংখ্য যুদ্ধজাহাজ। বোর্নিয়োর নগরের পর নগরের উপর একসঙ্গে বর্ষিত হচ্ছে বিমান ও জাহাজ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বোমা, কামানের গোলা ও বন্দুকের গুলি। বোর্নিওর চতুর্দিক হয়ে উঠেছে শব্দময়, ধূম্রময় ও অগ্নিময়। শহরে শহরে মৃত্যুর তাণ্ডবনৃত্য, যেদিকে তাকানো যায় দেখা যায় রক্তের নদী এবং শোনা যায় ভীত ও আহতদের নিদারুণ ক্রন্দনধ্বনি! বোর্নিয়োর বুকের উপরে এসে লেগেছে প্রলয়ের বিষাক্ত নিঃশ্বাস!
ইংরেজ ও ওলন্দাজরা যথাসাধ্য বাধা দেবার চেষ্টা করলে, কিন্তু পারলে না। শত্রুরা অস্ত্রে ও সংখ্যায় ঢের বেশি বলবান। দেখতে দেখতে জাপানি সৈনিকরা পঙ্গপালের মতন বোর্নিয়োর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং নীরব হল ইংরেজ ও ওলন্দাজদের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো।
বাসিন্দারা ধন, মান ও প্রাণ রক্ষার জন্যে শহর ছেড়ে দূর গ্রামে গ্রামে পালিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু গ্রামে গিয়েও তারা নিস্তার পেলে না, কারণ জাপানিবাহিনীও ক্রমে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল ব্লটিংয়ের উপরে কালির ফোঁটার মতন। তখন গ্রাম ছেড়ে অনেকে ঢুকল গিয়ে দুর্গম অরণ্যের ভিতরে। যাদের সে-সাহস হল না, তারা নাচার হয়ে আত্মদান করলে শত্রুদের কবলে।
এইরকম একটি পলাতকের দল জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছিল। এই দলের ভিতরে ছিল নানা জাতের লোক—তাদের কেউ চিন, কেউ ভারতবর্ষ ও কেউবা মালয় দেশের বাসিন্দা। তাদের ভিতরে কেবল পুরুষ নয়, নারী ও শিশুর সংখ্যাও ছিল অনেক। তাদের অনেকের সর্বস্ব লুণ্ঠিত হয়েছে, অনেকে পালাবার সময় চোখের সামনে যা পেয়েছে মোটমাট বেঁধে কাঁধের উপরে বহন করে চলেছে। অনেকে পুত্র বা স্বামী বা ভাই বা অন্য কোনো আত্মীয়কে হারিয়ে শোকে অশ্রুত্যাগ করতে করতে অগ্রসর হচ্ছে। দলের ভিতরে রয়েছে প্রায় দুইশত প্রাণী, কিন্তু কারুর মুখে কোনো সাড়াশব্দ নেই। সকলেরই মুখে-চোখে আতঙ্ক ও হতাশার চিহ্ন, দেহে শ্রান্তির লক্ষণ। তারা পথ চলেছে ঠিক প্রাণহীন কলের পুতুলের মতন।
এই বৃহৎ দলটিকে চালনা করে নিয়ে যাচ্ছে যে ব্যক্তি তাকে দেখলেই বোঝা যায়, সে হচ্ছে ভারতবর্ষের লোক। তার হাবভাব ও হুকুম দেবার ভঙ্গি দেখলেই আন্দাজ করা যায়, সে বহুলোকের উপরে কর্তৃত্ব করতে অভ্যস্ত। সকলে তাকে সসম্ভ্রমে 'তুয়ান' বলে সম্বোধন করছে। এদেশি-ভাষায় 'তুয়ান' বলতে বোঝায় 'স্যার' বা 'মহাশয়'।
জাপানিদের অস্ত্রকে ফাঁকি দিয়েও অরণ্যের নানান বিপদকে তারা এড়াতে পারছে না। কেবল পথশ্রমেই তাদের দেহ অবসন্ন নয়, খাদ্যাভাবের জন্যেও তাদের কষ্ট পেতে হচ্ছে যথেষ্ট। সারাদিনে তারা মাইলের পর মাইল পথ পেরিয়ে এসেছে, কিন্তু এর মধ্যে দেখতে পায়নি একখানি মাত্র গ্রামও।
কেবল জঙ্গলের পর জঙ্গল। একটা জঙ্গল শেষ হতে না হতেই আবার নূতন জঙ্গল আরম্ভ হয়—সেই বিশাল অরণ্যপ্রদেশের ভীষণতা ও নিবিড়তা না দেখলে কল্পনা করা যায় না। শূন্য দিয়ে জাপানি বিমান উড়ে যাচ্ছে, তাদের বুক-চমকানো গর্জন শুনতে পাচ্ছে সকলেই, কিন্তু উপর থেকে বিমানচালক পলাতকদের একজনকেও দেখতে পাচ্ছে না। নীচের দিকে নানা জাতের ঘন লতার জালে সমাচ্ছন্ন হয়ে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড বনস্পতিরা আকাশকে ধরবার জন্যে যে একশো-দেড়শো ফুট উপরে উঠে গিয়েছে এবং তাদের ঘন ডালপালার আবরণ সূর্যালোকের পথ প্রায় বন্ধ করে রেখেছে। আকাশে নীলিমাও চোখে পড়ে কদাচ। গাছের শাখায় শাখায় ঝুলছে বা লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে হরেক রকমের অগুনতি বানর। অরণ্যের ভিতর অকস্মাৎ এই অভাবিত জনতার আবির্ভাব দেখে বানরেরা সচকিত হয়ে উঠেছে বিপুল বিস্ময়ে। ক্রুদ্ধ মুখভঙ্গি করে ও নিজেদের ভাষায় মানুষদের গালাগালি দিতে দিতে তারা আরও উপর-ডালে গিয়ে উঠে বসছে।
অরণ্যের ভিতরে সর্বদাই বিরাজ করছে যেন সন্ধ্যার আলো-আঁধারি এবং স্থানে-স্থানে জমাট বেঁধে আছে যেন অন্ধ রাত্রির স্তব্ধ অন্ধকার। সেখানে মানুষের চোখ চলে না, কিন্তু থেকে থেকে জ্বলে উঠেই নিবে যায় কাদের হিংস্র, ক্ষুধিত ও অমানুষিক দৃষ্টি। মাঝে মাঝে হঠাৎ শোনা যায় কোনো পশুর ভীষণ গর্জন। এবং সেইসঙ্গে মানুষের করুণ আর্তনাদ। তারপরই জনতার বহু কণ্ঠে জাগে ত্রস্ত কোলাহল এবং প্রকাশ পায় পলাতকদের দল থেকে অদৃশ্য হয়েছে কোনো হতভাগ্য মানুষ।
স্থানে স্থানে বৃহৎ প্যারাং অস্ত্রের সাহায্যে জঙ্গলের ঘন সন্নিবিষ্ট গাছপালা কেটে না নিলে আর অগ্রসর হবার উপায় থাকে না। স্থানে-স্থানে জঙ্গল শেষ হয়ে গিয়ে খানিকটা খোলা জায়গা পাওয়া যায় বটে, কিন্তু সেখানে চোখের সামনে দেখা দেয় কোনো বেগবতী নদী। সেখান থেকে ফেরবার বা সেখানে বসে বিশ্রাম করবার কোনো উপায়ই নেই, কারণ রাত্রি আসবার আগেই একটা লোকালয়ে গিয়ে পৌঁছতে না পারলে অধিকতর বিপদের সম্ভাবনা।
সকলেই যখন হতাশ হয়ে পড়ে, দলের ভারতীয় নেতা তখনও হাল ছাড়ে না। সকলকে উৎসাহ দিয়ে সে হাসিমুখেই বলে, 'কোনো ভয় নেই! প্যারাং চালিয়ে বাঁশঝাড় কাটো! তারপর র্যাটান-লতা কেটে নিয়ে তাই দিয়ে বাঁশগুলোকে বেঁধে ভেলা তৈরি করে নাও! আমরা সেই ভেলায় চেপে নদী পার হয়ে যাব। দেরি কোরো না, পিছনে তাকিও না—এগিয়ে চলো, এগিয়ে চলো। আমাদের বাঁচবার একমাত্র উপায় হচ্ছে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়া।'
মালয় দ্বীপের লোকদের প্যারাং চালাবার ক্ষমতা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা তিন-চারটে ভেলা তৈরি করে ফেলে এবং তারই উপরে চেপে তারা সবাই নদীর অন্য তীরে গিয়ে হাজির হয়। কিন্তু মৃত্যু এখানেও তাদের জন্যে অপেক্ষা করে থাকে। জলের ভিতর থেকে হঠাৎ ভেসে ওঠে একাধিক কুমিরের বীভৎস মুখ। আচম্বিতে তাদের বিপুল লাঙ্গুল ঊর্ধ্বে উৎক্ষিপ্ত হয় এবং পরমুহূর্তেই দেখা যায়, ভেলার প্রান্ত থেকে দুই বা তিনজন লোক ঠিকরে জলের ভিতরে গিয়ে পড়ল। যারা জলে পড়ে তারা আর উপরে ওঠে না।
নদীর ওপারে সকলকে গ্রাস করবার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকে আবার এক নিবিড় বন। নিজেদের হতভাগ্যের কথা ভাবতে ভাবতে আবার সেই অরণ্যের গর্ভে প্রবেশ করে ক্লান্ত পথিকরা।
বাইরে তখন দিনের আলো নিবু-নিবু এবং অরণ্যের ভিতরে নেমে এসেছে যেন দৃষ্টিহীন নিশীথ রাত্রি। সেখানে পাখিদের সন্ধ্যাসঙ্গীত নেই, কিন্তু ক্রমে ক্রমে বেশি করে জেগে উঠছে ঝিল্লী-ঝংকারের সঙ্গে যেন অসংখ্য অজানা বিভীষিকার কণ্ঠস্বর। দিনের বেলাতেও যা প্রায় অসম্ভব, রাতের অন্ধকারে পথিকরা কেমন করে এই অরণ্যের প্রাচীর ঠেলে অগ্রসর হবে? এইবারে যে সেই দলের সর্দারের স্থান গ্রহণ করেছিল সেই ভারতবাসীও যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতন হয়ে পড়ল।
সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যখন ভাবছে অতঃপর কী করা উচিত, তখন অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ের মতন হঠাৎ টর্চের একটা তীব্র আলো জ্বলে উঠে তার মুখের উপরে এসে পড়ল। আলোকশিখার তীব্রতায় দলপতির দৃষ্টি যেন অন্ধ হয়ে গেল।
আলোটা প্রায় আধ মিনিট কাল দলপতির মুখের উপরে স্থির হয়ে রইল, তারপর সেটা ফিরে জনতার চারিদিকে খানিকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে দপ করে আবার নিবে গেল।
চারিদিকে আবার অন্ধকারের পালা। ইতিমধ্যে দলপতি পকেটের মধ্য থেকে নিজের রিভলভার বার করে নিয়ে ভাবছে, এই বিজন গহন বনের ভিতরে টর্চ জ্বাললে কে! এ কি জাপানিদের চর, না নূতন কোনো শত্রু?
অন্ধকারের ভিতর থেকে ইংরেজিতে প্রশ্ন হল, 'কে আপনি?'
দলপতি উত্তর দিলে, 'আমি ভারতের সন্তান। জাতে বাঙালি।'
—আপনি যে বাঙালি সেটা দেখেই বুঝেছি। কিন্তু এমন অসময়ে এত লোক নিয়ে আপনি এই মারাত্মক বনের ভিতরে কেন?
দলপতি বললে, 'আপনার প্রশ্নের জবাব দেবার আগে জিজ্ঞাসা করতে পারি কি, আপনি কে?'
—আমার অন্য পরিচয় অনাবশ্যক। কেবল এইটুকু জেনে রাখুন যে, আমি আপনাদের শত্রু নই। এখন বলুন দেখি, এই বনের ভিতরে এত লোক নিয়ে কেন এসেছেন?
—আমরা জাপানিদের হাতে আত্মসমর্পণ করতে চাই না। তাই আমরা পালিয়ে যাচ্ছি।
—পালিয়ে যাবেন কোথায়?
—বনের ভিতর নূতন কোনো আশ্রয়ের সন্ধানে।
অন্ধকারের ভিতরে জেগে উঠল হা হা করে উচ্চ হাসির ধ্বনি। তারপর আবার শোনা গেল, 'বোর্নিয়োর বনে এসেছেন আশ্রয়ের সন্ধানে? আপনি কি জানেন না বাঘ-হাতি গন্ডারেরও চেয়ে ভীষণ জীব বাস করে এই বনের যেখানে-সেখানে? জাপানিদেরও চেয়ে তারা বেশি নিষ্ঠুর, বেশি সাংঘাতিক?
দলপতি বললে, 'আপনি কাদের কথা বলছেন? বোর্নিয়োর অসভ্যদের কথা?'
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, যারা নরমাংস খায় আর যারা নৃমুণ্ড শিকার করে! ভিন্ন জাতের মানুষদের তারা মানুষ বলেই মনে করে না।
দলপতি বললে, 'অসভ্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করবার মতন অস্ত্রশস্ত্র আমাদের কাছে আছে। প্রবল জাপানিদের আমরা বাধা দিতে পারব না বটে, কিন্তু এরকম সাধারণ শত্রুদের আমরা ভয় করি না।'
কণ্ঠস্বর আবার হেসে উঠে বললে, 'ভুল মশাই, ভুল। এই অরণ্যরাজ্যে খোঁজ নিলে অসাধারণ শত্রুরও অভাব বোধ করবেন না। তাকে দেখতে পাবার আগে সেইই আপনাকে আক্রমণ করতে পারে!'
দলপতি অত্যন্ত বিস্মিত হয়ে বললে, 'আপনি আশ্চর্য কথা বলছেন! এমন কোনো অসাধারণ শত্রুকে তো আমি জানি না!'
—জানেন মশাই, জানেন! সে শত্রু আপনার অপরিচিত নয়।
দলপতি সন্দিগ্ধ স্বরে বললে, 'আপনি কার কথা বলছেন?
—সেকথা এখন শুনে কাজ নেই। আপনার নাম জানতে পারি কি?
—আমার নাম প্রশান্ত চৌধুরী। আপনার নাম কী? আপনি এই বনের ভিতরে কী করছেন?
—আমার নাম জেনে লাভ নেই। তবে এই বনের ভিতরে আমি কী করছি, তা বলতে পারি। আমি এই বনে বনে ঘুরে বেড়াই বিপন্নদের সাহায্য করবার জন্যে।
—তার মানে?
—জাপানি দস্যুদের কবল থেকে মুক্তি পাবার জন্যে আজ শহর ছেড়ে যারা বনবাসী হচ্ছে, আমি তাদের আশ্রয় দেবার চেষ্টা করি।
—কেমন করে আপনি তাদের আশ্রয় দেন?
—এখান থেকে খুব কাছেই আমার অসভ্য বন্ধুদের গ্রাম আছে। যেসব বিপন্ন পথ হারিয়ে বনে বনে আশ্রয়ের সন্ধান করে, আমি তাদের নিয়ে সেই অসভ্য বন্ধুদের কাছে যাই।
—-এইযে বললেন, এখানকার অসভ্যেরা মানুষের মাংস খায়, নৃমুণ্ড শিকার করে?
—সব অসভ্যই একজাতের নয়। আমার অসভ্য বন্ধুরা শহুরে সভ্যদের চেয়েও ভালোমানুষ। আমি তাদের ভালোবাসি, তাদের নানা দিক দিয়ে সাহায্য করি, তাই তারাও মনে করে আমাকে আত্মীয়ের মতন। আপনাদেরও আমি তাদের কাছে নিয়ে যেতে পারি। রাজি আছেন!
প্রশান্ত মনে মনে ভাবতে লাগল : 'কে এই লোক? এর শুদ্ধ ইংরেজি কথা ও মার্জিত কণ্ঠস্বর শুনলে একে বিশেষ ভদ্রলোক বলেই মনে হয়। এ নিজের পরিচয় দিলে না বটে, কিন্তু আপাতত একে অবলম্বন করা ছাড়া আর কোনো উপায়ই নেই। এই ভীষণ বনে রাত কাটাতে গেলে বুনো জানোয়ারের কবলে পড়ে বা দারুণ আতঙ্কে অভিভূত হয়েই অনেকে মারা পড়তে পারে। তার উপরে ক্ষুধা-তৃষ্ণার অত্যাচারও আছে।'
এই রকম ভেবে-চিন্তে প্রশান্ত বললে, 'আমি আপনার প্রস্তাবে রাজি!'
কণ্ঠস্বর বললে, 'তাহলে এইখানে অল্পক্ষণ অপেক্ষা করুন। আমার বন্ধুদের খবর দিয়ে আসছি। তারা সকলকে যথাস্থানে নিয়ে যাবে।'
অন্ধকারে শুকনো পাতার উপরে পদশব্দ তুলে যে কথা কইছিল সে ক্রমেই দূরে চলে গেল। প্রশান্ত আবার অবাক হয়ে ভাবতে লাগল 'কে এই রহস্যময় ব্যক্তি? যে অসাধারণ শত্রুর ভয় দেখালে, এ নিজেই সেই লোক নয় তো? এ নিজের নামও বললে না, নিজের চেহারাও দেখালে না, অথচ টর্চের আলো ফেলে আমাকে বেশ ভালো করেই দেখে নিলে বলে বোধ হল! এর এতটা লুকোচুরির কারণ কী? আমার বড়োই সন্দেহ হচ্ছে, এর কাছে আশ্রয় চেয়ে ভালো করলুম কিনা কে জানে?'
প্রশান্ত যখন এইসব কথা নিয়ে মনে মনে নাড়াচড়া করছে, আচম্বিতে দূরের বন যেন জাগ্রত হয়ে উঠল!
তৃতীয়
অদ্ভুত শত্রু
প্রশান্ত দূরে তাকিয়ে দেখলে বনের একটা অংশ একেবারে আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। বড়ো বড়ো গাছ ও ঝোপঝাপের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যাচ্ছে লোকের পর লোক—তাদের অনেকেরই হাতে হাতে জ্বলছে মশালের আলো।
যখন তারা আরও কাছে এগিয়ে এল তখন দেখা গেল, তাদের অনেকেরই হাতে মানুষের মুখের নকশাকাটা লম্বা লম্বা কাঠের ঢাল এবং কোমরে সংলগ্ন ঝালর-ঝোলানো তরবারি।
প্রশান্তের সঙ্গে একজন মালয়দেশীয় দোভাষী ছিল—সে বোর্নিয়োর অধিকাংশ জাতিরই ভাষা জানত এবং তাদের আচার-ব্যবহার সম্বন্ধেও তার অভিজ্ঞতা বড়ো কম ছিল না। সে তাড়াতাড়ি তাকে কাছে ডেকে জিজ্ঞাসা করলে, 'যারা আসছে, ওরা কে বলতে পারো!'
দোভাষী বললে, 'পারি তুয়ান। ওরা হচ্ছে কেয়ান জাতের লোক। ওরা লড়াই করতে ভারি ভালোবাসে। ওদের ওই কাঠের ঢালে কালো কালো কী ঝুলছে দেখেছেন?'
প্রশান্ত বললে, 'দেখছি তো। কী ওগুলো?'
—মানুষের মাথার চুল। ওরা যেসব শত্রু হত্যা করে, তাদের মাথার চুলগুলো ছিঁড়ে নিয়ে নিজের নিজের ঢাল সাজায়।
প্রশান্ত বিলক্ষণ দমে গিয়ে বললে, 'তাহলে এই কেয়ানরাও মানুষের মুণ্ড শিকার করে?'
দোভাষী বললে, 'এক সময় ছিল যখন প্রত্যেক কেয়ানই নরমুণ্ড শিকার করত। এখন সে প্রথা ততটা প্রবল নেই বটে, কিন্তু এখনও ওদের অনেকেই সুযোগ পেলেই নরমুণ্ড শিকার করতে ভোলে না। এরকম শিকারের ফাঁক পেলে ওরা যে সবসময়ে বীরত্বের পরিচয় দেয়, তাও নয়। হয়তো হঠাৎ ওরা আবিষ্কার করলে আপনি স্থানে-অস্থানে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন, তখনই খাপ থেকে নির্গত হল ওদের তরবারি, আর আপনার মুণ্ডটি গেল উড়ে। আপনার ধড় রইল সেইখানে পড়ে, আর বিজয়-গর্বিত বীরের মতন নাচতে নাচতে আপনার মুণ্ডটি নিয়ে শিকারি চলে গেল ঘরে ফিরে।'
প্রশান্তের বুকটা ধড়াস করে উঠল। আর কোনো কথা বলবার আগেই সে দেখলে কেয়ানদের একজন লোক তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে সেলাম ঠুকলে। তখন দোভাষীর সাহায্যে তার সঙ্গে কথাবার্তা চলল।
প্রশান্ত জিজ্ঞাসা করলে, 'তুমি কে?'
সে বললে, 'আমি তুয়ান গজের ভৃত্য।'
—তুয়ান গজ আবার কে?
সে বললে, 'তুয়ান গজ এই বনরাজ্যের রাজা। তাঁর মতন শক্তিশালী এখানে কেউ নেই। কেবল বর্শা হাতে নিয়ে তিনি একটা বৃহৎ হস্তী বধ করেছিলেন, তাই সবাই তাঁকে তুয়ান গজ বলে ডাকে।'
—আমার কাছে তোমাদের কী দরকার?
—তুয়ান গজ হুকুম দিয়েছেন, আপনাদের গ্রামের ভিতরে নিয়ে যাবার জন্যে। আমরা আপনাদের নিয়ে যেতে এসেছি।
প্রশান্ত সন্দিগ্ধ চোখে লোকটার ঢালে সংলগ্ন মানুষের চুলের গোছার দিকে তাকিয়ে শুকনো স্বরে বললে, 'আমরা যদি তোমার সঙ্গে না যাই?'
লোকটি আবার সেলাম করে বললে, 'তুয়ান গজের আদেশ হচ্ছে ঈশ্বরের আদেশের মতন। আপনারা না গেলে সকলকে আমরা জোর করে ধরে নিয়ে যাব।'
প্রশান্ত মুখ তুলে তাকিয়ে দেখলে, ইতিমধ্যেই বনের ভিতরটা কেয়ান যোদ্ধাদের দ্বারা প্রায় পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে— সংখ্যায় তারা কয়েক শতের কম হবে না। সে বুঝলে দূরে থাকলে তাদের সঙ্গে যে আট-দশটা বন্দুক আছে, তারই সাহায্যে এই তরবারিধারী বন্য যোদ্ধাদের বাধা দেওয়া বা ভয় দেখানো চলত। কিন্তু এখানে এদের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে বাধা দেবার চেষ্টা করা পাগলামি ছাড়া আর কিছু নয়। নাচার ভাবে সে বললে, 'বেশ, তোমাদের তুয়ান গজের কাছেই আমাদের নিয়ে চলো!'
যে লোকটা এতক্ষণ প্রশান্তের সঙ্গে কথা কইছিল, সে ফিরে দাঁড়িয়ে নিজের লোকদের কী ইশারা করলে, অমনি বনের ভিতর থেকে মস্ত একটা জয়ঢাক বেজে উঠল। ঢাকটা বার-তিনেক বেজেই আবার নীরব হল। তার মিনিট খানেক পরেই বহু দূর থেকে নৈশ স্তব্ধতা ভঙ্গ করে ভেসে এল, আর একটা ঢাকের আওয়াজ। কয়েক সেকেন্ড পরে সে ঢাকটাও বোবা হয়ে গেল।
প্রশান্ত আশ্চর্য হয়ে বললে, 'এ আবার কী ব্যাপার?'
লোকটা বললে, 'ঢাক বাজিয়ে তুয়ান গজকে জানিয়ে দিলুম আপনারা যাচ্ছেন, আপনাদের অভ্যর্থনার জন্যে একখানা 'লম্বা-বাড়ি' প্রস্তুত রাখতে। গ্রামের ঢাক জবাবে বললে, আপনাদের জন্যে সব প্রস্তুত। আসুন তুয়ান, আমাদের পিছনে পিছনে এই পথে আসুন।'
আবার যাত্রা শুরু। আগে আগে চলল কেয়ান যোদ্ধার দল, তাদের পিছনে পিছনে প্রশান্ত ও তার সঙ্গীরা। এ বনের ভিতর দিয়ে যে কোনো নির্দিষ্ট পথ আছে, প্রশান্ত এতক্ষণ সেটা আবিষ্কার করতে পারেনি। কিন্তু তারই ভিতর দিয়ে কখনও ডাইনে ও কখনও বাঁয়ে মোড় ফিরে কেয়ানরা যে একটা সুপরিচিত নির্দিষ্ট পথ ধরেই অগ্রসর হচ্ছে, সেটা বোঝা গেল বেশ ভালো করেই। তারা হচ্ছে এই বনরাজ্যের প্রজা, দুর্গম অরণ্যের প্রত্যেক রহস্য আছে তাদের নখদর্পণে।
ভেড়ার দল যেমন আশেপাশে আর কোনো দিকে না তাকিয়ে অগ্রবর্তী একমাত্র নেতার দিকে দৃষ্টি রেখেই অগ্রসর হয়, প্রশান্ত এবং তার দলবলও ঠিক সেইভাবেই সামনের জ্বলন্ত মশালগুলোর দিকেই লক্ষ্য রেখে এগুতে লাগল ধীরে ধীরে। মশালগুলোর আলো সামনে ওদিককার বন-জঙ্গলকে সমুজ্জ্বল করে তুললেও ভালো করে তাদের কাছে এসে পড়ছিল না, তাদের দু-পাশের বন আধা-আলোয় ও আধা-ছায়ায় হয়ে উঠেছিল আরও বেশি রহস্যময়। মাঝে মাঝে মশালগুলো মোড় ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে জঙ্গলের এদিকটা হয়ে যাচ্ছিল প্রায় অন্ধকার।
ঠিক এমনি একটা মোড়ের উপরে এসে প্রশান্ত যেই ডানদিকে বেঁকেছে, অমনি তার পাশের একটা বড়ো ঝোপ হঠাৎ সশব্দে দুলে উঠল। বিদ্যুতের মতন তার সামনে জেগে উঠল যেন অসম্ভব এক দুঃস্বপ্ন—দুটো প্রজ্বলিত বিস্ফারিত চক্ষু এবং ঝকমকে শুভ্র করাল দন্তের সারি! পরমুহূর্তে তাকে ছোবল মারলে যেন একটা কালো অজগর সাপ— সে নিজের কণ্ঠের চারিপাশে অনুভব করলে ভীষণ এক শ্বাসরুদ্ধকর লৌহমুষ্টির চাপ। সে একবারও আর্তনাদ করবার অবকাশ পেলে না, অজ্ঞান হয়ে যাবার আগে কেবল এইটুকুই বুঝতে পারলে যে, আক্রমণকারী অত্যন্ত অনায়াসেই তাকে শূন্যের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে!
এই অদ্ভুত কাণ্ডটা এত সহজে ও এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল যে, প্রশান্তের পশ্চাদবর্তী সঙ্গীরা কিছুই আন্দাজ করতে পারলে না।
কিন্তু তুয়ান গজের প্রধান অনুচর প্রশান্তের ঠিক আগে-আগেই অগ্রসর হচ্ছিল। সে হচ্ছে বনবাসী মানুষ, তার অনুভূতি ও শ্রবণশক্তি অত্যন্ত তীক্ষ্ন। সে তখনই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে একবার ঝোপটার দিকে তাকালে, তারপর মুখ ফিরিয়ে দেখলে সেখান থেকে প্রশান্ত অদৃশ্য হয়েছে।
সে নিজের ভাষায় চিৎকার করে কি বললে, অমনি অগ্রবর্তী কেয়ান যোদ্ধারা সবাই ফিরে দাঁড়িয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল। তারপর তারা খাপ থেকে তরবারি খুলে দলে দলে পাশের জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করতে লাগল।
অনুচর আবার চিৎকার করে আদেশ দিলে, সঙ্গে সঙ্গে জয়ঢাকের উপরে আবার পড়তে লাগল ঢুলির কাঠি।
তৎক্ষণাৎ দূর বনের ভিতর থেকে জবাব দিতে লাগল আর একটা সংবাদবাহী দামামা।
চতুর্থ
তুয়ান গজ
কতক্ষণ পরে তার জ্ঞান হল প্রশান্ত তা জানে না।
আসল ঘটনা যে কী ঘটেছে প্রশান্ত প্রথমটা সেটাও আন্দাজ করতে পারলে না। কেবল এইটুকু অনুভব করলে, তার কণ্ঠদেশে ও অঙ্গের নানা স্থানে অত্যন্ত যন্ত্রণা হচ্ছে। তখনই ধাঁ করে তার মাথার ভিতর দিয়ে খেলে গেল সেই বিষম দুঃস্বপ্নের ইঙ্গিত। সে তাড়াতাড়ি উঠে বসবার চেষ্টা করলে, কিন্তু পরমুহূর্তেই কে তাকে অত্যন্ত রূঢ়ভাবে মারলে এক জোর ধাক্কা। মাটির উপরে আছড়ে পড়ে যন্ত্রণায় সে আর্তনাদ করে উঠল।
প্রশান্ত আর ওঠবার চেষ্টা করলে না। এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল, সে কোন শত্রুর কবলে এসে পড়েছে?
কিন্তু কিছুই দেখতে পেলে না। তার চারিদিকে—উপরে নীচে ডাইনে বামে থমথম করছে কেবল সূচিভেদ্য অন্ধকার। সে নিজের দেহের তলায় কেবল অনুভব করলে, ঠান্ডা মাটির তৃণশয্যা। তার হাত পাঁচ-ছয় উপরে তিন-চারটে জোনাকি জ্বলছে আর নিবছে, জ্বলছে আর নিবছে। জোনাকিদের তুচ্ছ আলোর আভাস দেখেই বোঝা যায়, উপর দিকে রয়েছে একটা ঝুপসি ঝোপ।
কে এই মহাবলবান, নীরব, অজ্ঞাত শত্রু? তাকে নিয়ে সে কী করতে চায়? সে যে বাঘ-ভাল্লুকের মতন কোনো চতুষ্পদ জীব নয় এ-বিষয়ে একটুও সন্দেহ নেই। কারণ, যে হাত প্রশান্তর গলা টিপে ধরেছিল, তা মানুষেরই বাহু!
এইসব ভাবতে ভাবতে সে আর একটা সত্যও আবিষ্কার করলে। উত্তরে, দক্ষিণে, পূর্বে ও পশ্চিমে বেজে বেজে উঠছে দামামার পর দামামা! দামামার মহা নাদে অন্ধ রাত্রির সমস্ত স্তব্ধতা জাগ্রত হয়ে যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। উৎকর্ণ হয়ে সেই শব্দ শুনতে শুনতে প্রশান্ত এটাও বুঝতে পারলে যে, দামামাগুলোর একতান চতুর্দিক থেকে যেন মণ্ডলাকারেই এগিয়ে আরও এগিয়ে আরও এগিয়ে আসছে।
সেইসঙ্গে শোনা যাচ্ছে আরও একটা শব্দ—মাটির উপরে তালে তালে পড়ছে যেন অনেকগুলো পা, দুম-দুম-দুম, দুম-দুম-দুম, এবং পৃথিবীর বুক করছে থর-থর-থর, থর-থর-থর, থর-থর-থর!
তারপরেই দেখা গেল বহুদূরে অন্ধকারের ফাঁকে ফাঁকে চঞ্চল আলোকের খেলা! আলোগুলোও আসছে ক্রমে এগিয়ে।
ব্যাপার কিছুই বুঝতে না পেরে আড়ষ্ট ও অভিভূত হয়ে চুপ করে শুয়ে রইল প্রশান্ত। তার মুখের উপর এসে পড়ল একটা দুর্গন্ধ, উত্তপ্ত ও প্রবল নিঃশ্বাস! এই বন্য নিঃশ্বাসের ভিতরে যেন উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠছে কেমন একটা নিষ্ঠুর হিংসার ভাব, তার সঙ্গে নাগরিক জীবনের কোনো সম্পর্কই নেই।
আচম্বিতে ঝোপটা যেন দুলে দুলে উঠল, এবং তার পরমুহূর্তেই ক্ষুরধার আলোক-বর্শার মতন একটা টর্চের তীক্ষ্ন আলোকশিখা সেই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের বুক ছিন্নভিন্ন করে দিলে, শোনা গেল একটা বীভৎস গর্জন, তারপরেই একটা বন্দুকের প্রচণ্ড শব্দ, তারপরে একটা পাশবিক আর্তনাদ এবং তারপরে পৃথিবীর মাটি কাঁপিয়ে একটা লম্ফত্যাগের ধ্বনি! প্রশান্তের মনে হল অদূরে যেন একটা মত্ত হস্তী লাফিয়ে পড়ল! কিছুই আন্দাজ করতে না পেরে সে ভয়ে আরও বেশি আড়ষ্ট হয়ে রইল।
টর্চের শিখাটা একটু এদিকে-ওদিকে ঘোরাঘুরি করে প্রশান্তের মুখের উপর নেমে এসে স্থির হল। তারপর ইংরেজিতে কথা শোনা গেল—'প্রশান্তবাবু, ধরণীশয্যা ত্যাগ করুন—আর কোনো ভয় নেই!' বনের ভিতরে একটু আগে অন্ধকারে প্রশান্ত যার সঙ্গে কথা কইছিল, এর কণ্ঠস্বর তারই মতন। পাছে ঝোপের ভিতর থেকে শত্রু আবার তাকে ধাক্কা মারে, সেই ভয়ে অত্যন্ত জড়সড়ো ভাবে প্রশান্ত আস্তে আস্তে উঠে বসল।
কিন্তু আর কেউ তাকে ধাক্কা মারলে না। সে তখন কিঞ্চিৎ আশ্বস্ত হয়ে বললে, 'খানিক আগেও আপনার গলা শুনেছি। কিন্তু আপনি কে তা আমি জানি না, তবু আপনি আমার ধন্যবাদ গ্রহণ করুন।'
—আমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছেন কেন?
—বোধহয় আপনার দয়াতেই আমি এইমাত্র কোনো দুর্দান্ত শত্রুর কবল থেকে রক্ষা পেয়েছি।
—এমন ভয়াবহ বন-জঙ্গলে প্রত্যেক মানুষেরই হওয়া উচিত প্রত্যেক মানুষের বন্ধু। এজন্যে ধন্যবাদ নিষ্প্রয়োজন।
—কিন্তু আমার এই দুর্দান্ত শত্রুটি কে?
—যথাসময়ে আপনি নিজেই জানতে পারবেন। আপাতত খালি এইটুকু শুনে রাখুন, কিছুক্ষণ আগে আপনাকে আমি যে শত্রুর সম্বন্ধে সাবধান করেছিলুম, এ হচ্ছে তারই লীলা।'
—এ কি মানুষ?
—না, অমানুষ।
—অমানুষ!
—প্রশান্তবাবু, অমানুষ আপনি কাকে বলেন? আমি বলি যার মধ্যে মনুষ্যত্ব নেই সেই-ই হচ্ছে অমানুষ। মানুষের মতন হাত-পা-মুখ থাকলেই কারুকে আমি মানুষ বলি না।
প্রশান্ত ধীরে ধীরে বললে, 'আপনার কথাগুলো অত্যন্ত রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে। আপনার কথা শুনেও আমার শত্রুর কোনো পরিচয় জানতে পারলুম না।'
—শত্রু তার নিজের পরিচয় নিজেই দেবে বলে মনে করি। আমার পক্ষে কিছু বলা বাহুল্য মাত্র।
—বেশ, শত্রু যেদিন আত্মপরিচয় দেবে, আমি সেই দিনের জন্যে অপেক্ষা করব। কিন্তু আপনার নিজের পরিচয় না দিন, আপনার নামটাও কি আমাকে বলবেন না?
—আমাকে সবাই এখানে তুয়ান গজ বলে ডাকে।
—আপনিই তুয়ান গজ?
—হ্যাঁ। ইচ্ছা করেন তো এইবারে আমার স্বরূপ দর্শনও করতে পারেন। ওই দেখুন, আমার লোকজনরা আলো নিয়ে এখানে এসে হাজির হয়েছে।
দেখতে দেখতে চারিধার বন্য যোদ্ধাদের দ্বারা পরিপূর্ণ হয়ে গেল, তাদের প্রত্যেকেরই এক হাতে ঢাল আর এক হাতে বর্শা বা তরবারি। যাদের ঢাল নেই তারা বাম হাতে ধারণ করে আছে জ্বলন্ত মশাল।
প্রশান্ত গাত্রোত্থান করে দেখলে, তার সুমুখেই দাঁড়িয়ে আছে এক কবাটবক্ষ, সিংহকটি, সুদীর্ঘ মূর্তি! তার মাথায় বাহারি পালকবসানো টুপি, কণ্ঠে মালার মতন একটি গহনায় ঝুলছে দুটি গোলাকার সোনার ধুকধুকি, তার কটিদেশে বর্ণ-বিচিত্র কৌলীনের চেয়ে কিছু বড়ো বস্ত্র। তার দেহের অন্যান্য সব অংশ অনাবৃত। সে এক হাতে ধরে আছে একটি বন্দুক এবং আর এক হাতে একটি বড়ো টর্চ। তার কোমরবন্ধে সংলগ্ন রয়েছে ছোরা, তরবারি ও রিভলভার।
প্রশান্ত অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে তুয়ান গজ মুখ টিপে হাসতে হাসতে বললে, 'আমাকে দেখে কি আপনি বিস্মিত হয়েছেন?
—তা হয়েছি বই কি!
—কেন?
—আপনাকে দেখতে তো বোর্নিয়োর লোকদের মতন নয়!
—হ্যাঁ, আমি এখানকার লোকদের চেয়ে মাথায় বেশি উঁচু বটে।
—কেবল তাই নয় তুয়ান গজ, বোর্নিয়োর লোকদের মুখ কতকটা মঙ্গোলীয় আদর্শে গড়া। কিন্তু আপনার মুখে মঙ্গোলীয় ভাবের ছায়াও নেই।
তুয়ান গজ বললে, 'এজন্যে আশ্চর্য হবার দরকার নেই। প্রাচ্য দেশে প্রত্যেক জাতির ভিতরেই নানাদেশি আদর্শের মানুষ দেখা যায়। এই আপনাদের ভারতবর্ষের কথাই ধরুন। পৃথিবীতে বোধহয় এমন জাতের মানুষ নেই, ভারতবর্ষের ভিতরে যার প্রতিমূর্তি দেখতে পাওয়া যাবে না। কিন্তু এসব কথা এখন থাক। আপনার শত্রুর মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়েছি, কে বলতে পারে সে আবার নূতন শক্তি সংগ্রহ করে ফিরে আসবে কিনা? সে আবার যদি আক্রমণ করে, হয়তো আমরাও আপনাকে আর রক্ষা করতে পারব না।'
প্রশান্ত বললে, 'বারংবার কাকে আপনি আমার শত্রু বলে উল্লেখ করছেন? এদেশে আমি নতুন এসেছি, এখানে কারুর সঙ্গে আমার বিবাদ নেই, এখানে কে আমার শত্রু থাকতে পারে?'
তুয়ান গজ হেসে বললে, 'এখানে কে যে আপনার শত্রু, তা আপনিও জানেন, আমিও জানি। সুতরাং ও-বিষয় নিয়ে এখন আর মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই। চলুন, আপনাকে আমাদের গ্রামে নিয়ে যাই। আপনার সঙ্গীরা এতক্ষণে সেখানে গিয়ে পৌঁছেছে।'
পঞ্চম
লম্বাবাড়িতে
'লম্বাবাড়ি'র কিছু কিছু বর্ণনা গোড়াতেই দেওয়া হয়েছে। নদীর ধারে একখানি ছায়াকোমল তরুশ্যামল গ্রাম। এবং তারই ভিতরে এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে আছে খান-পাঁচেক লম্বাবাড়ি। সেই পাঁচখানি মাত্র লম্বাবাড়ির ভিতরে বাস করে প্রায় দুই হাজার লোক। তুয়ান গজ এইরকমই একখানা বাড়ি প্রশান্ত ও তার সঙ্গীদের জন্যে ছেড়ে দিয়েছে।
প্রশান্তের জন্যে যে কামরাখানি নির্দিষ্ট হয়েছিল, আকারে সেখানি মস্ত বড়ো। তার মেঝে ও দেওয়াল বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং মেঝের উপরে পাতা আছে ঘাসের ম্যাটিং। ছাদ হচ্ছে পাতা দিয়ে ছাওয়া। ঘরের একদিকে বিছানা পাতা। এদিকে-ওদিকে কতকগুলি দরকারি আসবাব ও তৈজসপত্র। দেওয়ালের গায়ে রয়েছে ব্লো-পাইপ, তরবারি ও ছোরাছুরি প্রভৃতি অস্ত্র।
পরদিন সকালে প্রশান্তর পাশে বসে তুয়ান গজ নানান কথা নিয়ে আলোচনা করছিল।
প্রশান্তর জিজ্ঞাসার উত্তরে তুয়ান গজ বলছিল, 'ঠিক বলেছেন প্রশান্তবাবু, জাভার এই বনবাসীদের ঠিক অসভ্য বলে মনে করা চলে না। এদের অসভ্য বলে পরিচিত করে কেবল ইউরোপীয়রাই। আমি এদের অসভ্য বলি না। লেখাপড়া না জানলেও এরা নানান শিল্পকার্যে দক্ষ। এদের কথাবার্তায়, আচার-ব্যবহারে আর পোশাক-পরিচ্ছদে বেশ একটি রুচিকর প্রাচীন রীতির পরিচয় পাওয়া যায়। এদের সব কিছুরই পিছনে আছে যে একটি পুরাতন ঐতিহ্যের ধারা সে-বিষয়েও সন্দেহ নেই। এদের অসভ্য বলে ডাকলে ভারতবর্ষের অধিকাংশ পল্লীগ্রামের লোকদেরও অসভ্য বলে মেনে নিতে হয়। ভালো কথা, সকালে বোধহয় চা-পানের অভ্যাস আছে?'
প্রশান্ত হেসে বললে, 'অভ্যাস তো আছে, কিন্তু এই দুর্গম বনের ভিতরে চা পাব কোথায়?'
—চা পাবেন আমার কাছেই। কারণ বনবাসী হয়েও ও বিলাসিতাটি ছাড়তে পারিনি। একটু অপেক্ষা করুন, আপনার জন্যে একটু আগেই আমি চা তৈরি করতে বলে এসেছি।
প্রশান্ত বললে, 'আপনার কথায় আমার মৃত দেহে যেন জীবনসঞ্চার হল। এমনি বদ অভ্যাস করে ফেলেছি মশাই, চা না পেলে আমার কিছুতেই চলে না।'
—চা অবশ্য আপনি পাবেন, যত চান ততই পাবেন। কিন্তু অন্যদিকে আপনার খাওয়া-দাওয়ার বিশেষ কষ্ট হবে বোধহয়।
—কেন?
—বোর্নিয়োর লোকেরা সাধারণত খাবার বলতে বোঝে খালি ভাত আর মাছ, মাছ আর ভাত। দিনে তারা দুবার করে খায়, আর খায় ওই ভাত আর মাছ, আর মাছ আর ভাতই। খালি ভাত আর মাছ আপনার পছন্দ হবে কি?
প্রশান্ত বললে, 'আরে, রেখে দিন মশাই পছন্দ আর অপছন্দ! আপনার দয়ায় যে প্রাণে বেঁচেছি এইই আমার পরম সৌভাগ্য। এর ওপরে আবার ভালো ভালো খাবারের জন্য বায়না ধরব, এমন শিশু আমি নই।'
এই সময়ে আর একটি নূতন লোক ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল। তারও সাজপোশাক তুয়ান গজের মতোই এবং তাকে দেখলেও বোর্নিয়োর লোক বলে মনে হয় না।
প্রশান্ত জিজ্ঞাসু চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তুয়ান গজ বললে, 'প্রশান্তবাবু ইনি হচ্ছেন আমার বন্ধু তুয়ান উলু। আমাদের দুজনের দেহ ভিন্ন বটে, কিন্তু দুজনে হচ্ছি একেবারে একপ্রাণ, একমন। আপনি ওভাবে উলুর দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? আপনি কি ওকে চেনেন?
প্রশান্ত তুয়ান উলুর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বললে, 'ঠিক চিনি বলতে পারি না, তবে মনে হচ্ছে ওঁকে যেন এর আগে আর কোথায় দেখেছি। ঠিক সেই চোখ, সেই নাক, সেই মুখ—অথচ কোথায় কী যেন মিলছে না। তুয়ান, উলু, আপনি কি কখনও ভারতবর্ষে গিয়েছিলেন?'
ইতিমধ্যে চায়ের সরঞ্জাম হাতে নিয়ে এক ভৃত্য ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে। উলু কোনো জবাব না দিয়ে তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে চায়ের সরঞ্জাম নিয়ে নিযুক্ত হয়ে রইল। প্রশান্তের সন্দেহ হল, উলু সত্য বা মিথ্যা কোনো কথাই বলতে রাজি নয়। চা-পান করতে করতে সে বারংবার উলুর দিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগল। উলু কিন্তু তার সঙ্গে আর একবারও চোখোচোখি করলে না।
তুয়ান গজ প্রসঙ্গ বদলে বললে, 'প্রশান্তবাবু, একটা বিষয়ে আপনাকে সাবধান করে দিতে চাই।'
—বলুন।
—জাপানিরা এখানকার সমস্ত দ্বীপ দখল করেছে; লড়াই হয়তো এখন বেশ কিছুকাল চলবে। যদি বন্দি হতে না চান, তাহলে দীর্ঘকালের জন্যে আপনাদের হয়তো আমাদের সঙ্গে এইখানেই থাকতে হবে। কিন্তু এখানে আপনাদের বড়োই সাবধানে থাকতে হবে।
—কেন? জাপানিরা কি এই বনের ভিতরে এসেও আমাদের আক্রমণ করবে?
—খুব সম্ভব করবে না। আপনাকে প্রস্তুত হয়ে থাকতে হবে আর এক শত্রুর জন্যে।
—সে আবার কে?
—আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে না পড়লে কালকেই আপনি তাকে স্বচক্ষে দেখবার সুযোগ পেতেন।
—তাহলে আপনি তাকে চেনেন?
—হুঁ, কিছু কিছু চিনি বই কি। সে এক দুর্দান্ত লোক। জাপানিদের ভয়ে যারা দলে দলে শহর ছেড়ে বনের ভিতরে পালিয়ে আসছে, বিশেষ করে তার দৃষ্টি সেই অসহায়দের উপরেই। বনের ভিতরে হঠাৎ সে সেই পলাতকদের উপরে গিয়ে হানা দেয়, তারপর খুন বা জখম করে তাদের যথাসর্বস্ব কেড়ে নিয়ে আবার অদৃশ্য হয়।
—তার কথা আপনি আরও কি জানেন?
—বেশি কিছুই জানি না, তবে এইটুকু আমার সন্দেহ হচ্ছে যে, বিশেষ করে আপনার উপরেই যেন তার বেশি আক্রোশ আছে।
প্রশান্ত চমকে উঠল। একটু চুপ করে থেকে বললে, 'আপনার এমন সন্দেহের কারণ কী?'
—নইলে কাল সে আপনাকে চুরি করবার চেষ্টা করেছিল কেন?
—আপনি কি অনুমান করেন, তার উদ্দেশ্য ছিল আমাকে চুরি করা?
—সে যখন আপনাকে হত্যা করেনি, অথচ আপনাকে ঘাড়ে করে নিয়ে অন্য কোথাও যাচ্ছিল, তখন এই সন্দেহটাই কি মনের ভিতরে প্রবল হয়ে ওঠে না?
—কিন্তু আমাকে চুরি করে তার কী লাভ হত?
—সেটা আমার চেয়ে আপনিই ভালো করে বলতে পারেন।
—আমি? আমি কেমন করে জানব?
—প্রশান্তবাবু, আমি আপনার বন্ধু। আমার কাছে আপনি লুকোচুরি করছেন কেন?
—তুয়ান গজ, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
—বেশ বুঝতে পারছেন প্রশান্তবাবু, বেশ বুঝতে পারছেন। আপনি কে, আমি তা শুনেছি।
—শুনেছেন।
—কেন যে আপনি বোর্নিয়ো দ্বীপে এসেছেন, তাও জানতে আমার বাকি নেই।
প্রশান্তর দুই চক্ষে ফুটে উঠল গভীর সন্দেহের ভাব। কিন্তু সে আর কোনো কথাই বললে না।
গজ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'প্রশান্তবাবু আজ আর আপনাকে বেশি ব্যস্ত করব না, আপনি বিশ্রাম করুন। কিন্তু খুব সাবধান। নমস্কার। এসো উলু, প্রশান্তবাবু এখন বোধহয় আমাদের কথা নিয়ে কিঞ্চিৎ গবেষণা করবেন। ততক্ষণে আমরা অন্য কাজে যেতে পারি।'
গজ আর উলু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। প্রশান্ত স্তব্ধ হয়ে বসে বসে ভাবতে লাগল—কে এই তুয়ান গজ? আমাকে সে চিনলে কেমন করে? সে থাকে বোর্নিয়োর দুর্গম বনে, আর আমি হচ্ছি ভারতবর্ষের মানুষ। কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আমি এই বোর্নিয়োর মাটিতে পা দিয়েছি, সেটাও তো তার জানবার কথা নয়। সে কি সত্যই আমার বন্ধু? না, বাজে মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে সে আমাকে এখানে বন্দি করে রাখতে চায়? আর ওই উলু লোকটাই বা কে? ওকে যে আমি আগে দেখেছি, সে-বিষয়ে একটুও সন্দেহ নেই। কিন্তু কোথায় দেখেছি? ভারতবর্ষে? কলকাতা শহরে? কিন্তু তাই বা হবে কেমন করে? এ যে বড়োই রহস্যের কথা! এ-রহস্য ভেদ না করতে পারলে আমার আর শান্তি নেই। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।
রাত্রির বিভীষিকা
সন্ধ্যার মুখে খুলে গেল আকাশের জলযন্ত্র। মুষলধারে নামল বৃষ্টি। জেগে উঠল দুরন্ত ঝড়, নদীর বুকে গর্জন করছে অশান্ত তরঙ্গদল, অরণ্যের মধ্যে চিৎকার করছে প্রমত্ত বনস্পতির দল। কালো আকাশের পটে আগুন অক্ষরে বিদ্যুৎ লিখছে সর্বনাশের কাব্য, বজ্র-দামামা তার সঙ্গে করছে সংগত।
প্রশান্তের ভয় হল এই মস্ত বাড়িখানার চালা হয়তো উড়ে যাবে ঝড়ের তোড়ে যে কোনো মুহূর্তে। বাড়ির দেওয়াল ও মেঝেও কাঁপছে থরথর করে—না কাঁপছে না, যেন তারা থেকে থেকে দুলে দুলে উঠছে প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কায়।
তার অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ হতে লাগল। এমন দুর্গম বিজন বনের মধ্যে ঝড়-বৃষ্টি যে কতখানি বিভীষিকার সৃষ্টি করতে পারে, এটা ছিল তার ধারণার বাইরে। ভৃত্য এসে তার জন্যে ঢাকনা চাপা দিয়ে রাত্রের খাবার রেখে গিয়েছিল। সে আজ একটু তাড়াতাড়িই খেয়ে নিলে। তারপর উঠে জানলাটা একটু খুলে একবার বাইরের রূপটা দেখবার চেষ্টা করলে।
কিন্তু তাকিয়ে দেখলে কেবল শব্দময় অন্ধকার পৃথিবী। অন্ধ আকাশের পৃষ্ঠপটে অস্পষ্ট রেখায় দেখা যায় কেবল তাণ্ডব নৃত্যে উন্মত্ত বৃক্ষদের চঞ্চলতা আর শোনা যায় কেবল বাড়ির সুমুখের পথ দিয়ে কলকল শব্দে ছুটন্ত জলস্রোতের কোলাহল।
হঠাৎ ভিজে ঝড়ের একটা কনকনে ঝাপটা এমনভাবে তার মুখের উপরে এসে আঘাত করলে যে, বাইরের দিকে তাকাবার ইচ্ছা আর তার রইল না। সে তাড়াতাড়ি জানলার পাল্লা টেনে বন্ধ করতে যাচ্ছে, এমন সময় আকাশ ও পৃথিবীর উপর দিয়ে বয়ে গেল একটা বৈদ্যুতিক অগ্নিকাণ্ডের উচ্ছ্বাস। বিদ্যুৎ জ্বলল আর নিবল, কিন্তু তারই ভিতরে একটা গাছের তলায় প্রশান্তের সচকিত চোখ যেন দেখে নিলে কী-একটা অসম্ভব দৃশ্য। কালো অজগরের মতন মোটা দুখানা অতি দীর্ঘ বাহু বিস্তার করে বসে বসে দুলছে অমানুষিক এক মনুষ্যমূর্তি!
আবার জাগল অন্ধকার এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে আকাশ ফাটানো বজ্রের গুরুগুরু হুংকার। নিশ্চয়ই চোখের কোনো ভ্রম হয়েছে ভেবে প্রশান্ত জানলা আর বন্ধ করলে না, আর একবার বিদ্যুৎ আলোকে সেই অপার্থিব মূর্তিটা দেখবার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। বিদ্যুতের অগ্নিময় হিজিবিজি আবার উঠল জ্বলে, প্রশান্ত সাগ্রহে ঝুঁকে পড়ে গাছের তলার দিকে তাকালে, কিন্তু সেই অদ্ভুত মূর্ত্তিটা আর সেখানে নেই। তখন সে নিজের চোখের ভ্রম সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে জানলাটা আবার বন্ধ করে দিলে, কিন্তু পরমুহূর্তেই তার দুই চক্ষের উপরে এসে পড়ল যেন একটা নিবিড় অন্ধকারের যবনিকা! কেউ তার মুখের উপরে পরিয়ে দিলে একটা পুরু কাপড়ের অবগুণ্ঠন এবং সঙ্গে সঙ্গে তিন-চার জোড়া হাত তাকে সজোরে চেপে ধরে একেবারে কাবু করে ফেললে। প্রশান্ত অনুভব করলে কারা তার হাত-পা শক্ত দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলছে! তারপরই তার দেহ উঠল ঊর্ধ্বে, এবং কারা যেন তাকে কাঁধাকাঁধি করে বহন করে কোথায় নিয়ে চলল।
একটু পরেই ঝড়ের প্রবল নিঃশ্বাস ও তুহিনশীতল বৃষ্টির ঝরঝর বিন্দু তার সর্বাঙ্গে এসে পড়তে লাগল, সে বেশ আন্দাজ করতে পারলে তাকে নিয়ে কারা বাইরে পথের উপরে বেরিয়ে এসেছে।
সে তখন চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না, কিন্তু তার কান হয়ে উঠেছিল রীতিমতো সজাগ। প্রথমে সে অনুভব করলে ও শুনতে পেলে কেবল বৃষ্টিধারার স্পর্শ ও ঝড়ের কাতরানি এবং তারপরেই সেই সঙ্গে জেগে উঠল বৃষ্টিপুষ্ট ও ঝটিকাতাড়িত নদীর গভীর জলকল্লোল। কারা তাকে বহন করে নদীর ধারে নিয়ে এসেছে।
তারপরেই প্রশান্ত শুনলে মালয় ভাষায় কে কর্তৃত্বের স্বরে বলছে, 'এই মাঝি, এখনই আমাদের পার করে দিতে হবে।' সে কিছু কিছু মালয় ভাষা শিক্ষা করেছিল।
উত্তরে শোনা গেল—অর্থাৎ মাঝিই বললে, 'না, তুয়ান, এই ঝড়ে আমরা নৌকা বাইতে পারব না।'
জোর ধমক দিয়ে কে বললে, 'তোকে পার করে দিতেই হবে। নইলে এই রিভলভারের গুলিতে তোর মাথার খুলি যাবে উড়ে।'
মাঝি হঠাৎ ভীষণ ভয়ে চিৎকার করে বললে, 'না তুয়ান, আমি পারব না, আমি পারব না! আপনাদের সঙ্গে ও কে এসেছে? ও তো মানুষ নয়, ও যে ভূত! আমি পারব না তুয়ান, আমার মাথা ঘুরছে, আমি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে যাব!'
কে অট্টহাস্য করে উঠল হা হা হা হা করে! তারপরেই সে বললে, 'ভয় নেই রে মাঝি, ভয় নেই! ও আমাদের সঙ্গে যাবে না, ও খালি আমাদের পৌঁছে দিতে এসেছে। ও সব করতে পারে, কিন্তু জলকে ওর বিষম ভয়!...এই, চলে যা তুই এখান থেকে! আর তোকে এখানে থাকতে হবে না—মাঝি তোকে এখানে দেখে ভয় পাচ্ছে।'
তারপরই শোনা গেল ভারী ভারী শব্দ— কোনো-একটা বিপুল দেহ যেন এখান থেকে মাটি কাঁপিয়ে চলে যাচ্ছে!
মাঝি তবু আশ্বস্ত হল না। সে বললে 'না তুয়ান, যারা ভূত পোষে তাদের সঙ্গে আমি নৌকোতে উঠতে পারব না।'
লোকটা ভয়ানক রেগে গিয়ে কর্কশ কণ্ঠে বললে, 'দ্যাখ মাঝি, তুই যদি বেশি চালাকি করিস তাহলে তোর ঘাড় মটকাবার জন্যে এখুনি আমি ওকে ডেকে আবার ফিরিয়ে আনব। ভালো চাস তো এখনই নৌকোয় গিয়ে ওঠ।'
মাঝি বললে, 'আপনি অন্যায় রাগ করছেন তুয়ান! এই ঝড়-জলে নৌকো যদি ডুবে যায়, তার জন্যে দায়ী হবে কে?'
লোকটা অধীর স্বরে বললে, 'দায়ী হব আমি। তাড়াতাড়ি আমাদের নিয়ে চল—আজ আমাদের নদী পার হতেই হবে।'
মাঝি বললে, 'কিন্তু কাঁধে করে ও কাকে আপনারা নিয়ে যাচ্ছেন?'
লোকটা বললে, 'অত খোঁজে তোর দরকার কী বাপু? যা বলছি কর! নৌকোয় গিয়ে ওঠ!'
প্রশান্ত বুঝলে, তাকে নিয়ে তারা আবার অগ্রসর হল। খানিক পরেই তার দেহটাও যে গিয়ে পড়ল নৌকোর পাটাতনের উপরে, এটাও অনুভব করতে পারলে। ঠিক এই রকম আর একটি বৃষ্টিধৌত, ঝটিকাতাড়িত রাত্রির কথা তার স্মরণ হল। মহাদেও গুন্ডা তাকে নৌকোয় তুলে নিয়ে গঙ্গাজলে বিসর্জন দিতে গিয়েছিল এবং বিসর্জন দিয়েও ছিল। সেবারে অভাবিত ভাবে সলিলসমাধি থেকে তাকে উদ্ধার করেছিল দীনুডাকাত। সেবারে ঘটনাক্ষেত্র ছিল তার স্বদেশে, কিন্তু এবারে সে এসে পড়েছে বহুদূরের এক অজ্ঞাত দ্বীপে, এখানে তাকে উদ্ধার করতে পারে এমন কোনোই বন্ধু নেই।
অভ্রান্ত বৃষ্টিধারায় ভিজতে ভিজতে ও প্রবল শীতে কাঁপতে কাঁপতে সে শুনতে লাগল ঝঞ্ঝার আক্রমণে ক্রুদ্ধ নদীর গর্জনের পর গর্জন।
সে কারুকে চোখে দেখতে পাচ্ছিল না, কারণ তার মুখের উপর থেকে তখনও কাপড়ের গুণ্ঠন সরিয়ে নেওয়া হয়নি। নৌকোয় উঠে তার শত্রুরাও আর কোনো বাক্যব্যয় করলে না। তারা যে কারা, প্রশান্ত সেটাও অনুমান করবার চেষ্টা করলে বারংবার। তুয়ান গজ তার কাছে যে শত্রুর ইঙ্গিত দিয়েছিল, সে কি এই দলেই আছে? তা যদি হয়, তাহলে সে তাকে নিশ্চয়ই চিনতে পারবে। কারণ তার সন্ধানেই সে আজ এই বোর্নিয়ো দ্বীপ পর্যন্ত ছুটে এসেছে। তার বড়োই ইচ্ছা হতে লাগল, প্রশ্ন করে শত্রুদের মুখ থেকেই এই দরকারি কথাটা জেনে নেয়। কিন্তু সে উপায়ও নেই। মুখ বেঁধে তারা তাকে একেবারে বোবা করে রেখেছে।
কিন্তু প্রথম দিনেই যে অমানুষিক শত্রু তাকে হরণ করবার চেষ্টা করেছিল, কে সে? আজ রাত্রে গাছের তলায় চকিতের জন্যে সে যে অদ্ভুত ছায়ামূর্তিটাকে দেখেছে, এর সঙ্গে তার কি কোনো সম্পর্ক আছে? আর একে দেখেই কি মাঝি ভূত ভেবে ভয়ে শিউরে উঠেছে?
প্রশান্ত এইসব ভাবছে, হঠাৎ আকাশের মুখে ফুটে উঠল এমন একটা তীব্র অগ্নিক্রীড়া, গুণ্ঠনের ভিতর থেকেও সে তা দেখতে পেলে।
তারপরেই নৌকোর ভিতর থেকে সেই পূর্বপরিচিত কণ্ঠস্বর যেন দস্তুরমতো সচকিত হয়ে বলে উঠল, 'মাঝি, মাঝি! আমাদের পিছনে পিছনে একটা বড়ো নৌকো ছুটে আসছে কেন?'
আর একজন সবিস্ময়ে বলে উঠল, 'তুয়ান, তুয়ান! সামনের দিক থেকেও একখানা নৌকো এইদিকেই ছুটে আসছে!'
প্রথম ব্যক্তি আবার বললে, 'মাঝি, এই ঝড়ে নৌকো চালায়, কে ওরা?'
মাঝি বললে, 'কী করে জানব তুয়ান? ওদেরও হয়তো আপনার মতন নৌকো চালিয়ে ঝড় দেখবার শখ হয়েছে।'
লোকটা ত্রস্ত স্বরে বললে, 'না, না, এসব ভালো কথা নয়! ভ্যাগিস বিদ্যুৎটা জ্বলেছিল, তাইতো আমরা নৌকো-দুখানা দেখতে পেলুম।'
তারপরেই মাঝি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, 'আরে আরে, তুয়ান, করেন কী—করেন কী! জলে ঝাঁপ দিলে বানের মুখে ভেসে যাবেন যে!'
পরমুহূর্তে ঝপাঝপ শব্দ শুনেই প্রশান্ত বুঝতে পারলে যে, নৌকো ছেড়ে কারা নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
মাঝি বললে, 'বরাত দেখছি বড়োই মন্দ! হতভাগা বিদ্যুৎ হাসবার আর সময় পেলে না! কেন বাবা, আর একটু পরে হাসলেই তো চলত, তাহলে ওরা তো আর নৌকো-দুখানা দেখতে পেত না!' তারপরই সে খুব জোরে চেঁচিয়ে যেন কাদের ডেকে বললে, 'ভাইসব! নৌকোর শিকার জলে গিয়ে পড়েছে। ভালো করে খোঁজ নিয়ে দ্যাখো, যদি কারুর পাত্তা পাও।'
বিপুল বিস্ময়ে প্রশান্ত দুই কান পেতে সব শুনতে লাগল। সে বহুদর্শী পুলিশকর্মচারী, সুতরাং তার বুঝতে বিলম্ব হল না যে, এই নৌকোর লোকগুলোকে ধরবার জন্যে কারা যেন গোপনে কোনো ফাঁদ পেতে রেখেছিল। কিন্তু তারাই বা কারা? এক বিপদ থেকে তাকে আবার কোনো নতুন বিপদের মুখে গিয়ে পড়তে হবে না তো?
খানিকক্ষণ কাটল। ঝড়, বৃষ্টি ও নদীর অশান্তি ক্রমেই যেন বেড়ে উঠেছে। খুব কাছেই কোথায় যেন বজ্রপাত হল।
মাঝি আবার চিৎকার করে বললে, 'সবাই ফিরে ডাঙার দিকে চল! নদীর স্রোত ছুটছে এখন বন্দুকের বুলেটের মতন বেগে, যারা জলে পড়েছে, আর তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না।' তারপরেই কে এসে প্রশান্তের হাত, পা ও মুখের বাঁধন খুলে দিতে লাগল।
বন্ধন থেকে মুক্তি পেয়ে প্রশান্ত উঠে বসে দেখলে তার পাশে হাঁটু গেড়ে রয়েছে একটি মূর্তি। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায় না।
প্রশান্ত জিজ্ঞাসা করলে, 'তুমি কে?'
মূর্তি বললে, 'আমি এই নৌকোর মাঝি।'
প্রশান্ত বললে, 'তুমি মাঝিই হও আর যেইই হও, আমি তোমাকে ধন্যবাদ দিচ্ছি।'
মাঝি হঠাৎ তার কণ্ঠস্বর বদলে বললে, 'প্রশান্তবাবু, আপনার কাছ থেকে এই দ্বিতীয়বার আমি ধন্যবাদ লাভ করলুম।'
প্রশান্ত সচমকে বললে, 'তুয়ান গজ!'
—হ্যাঁ প্রশান্তবাবু, অধীনের ওই নাম।
—তাহলে আপনি মাঝি নন?
—কে বললে আমি মাঝি নই? মানুষ যখন যে কাজ করে, তখন সেই কাজ হিসাবেই তার নাম হয়। এখন আমি নৌকোর কর্ণধার, এখন আমি মাঝি বই কি!
—তাহলে আপনিই আবার আজ আমাকে রক্ষা করেছেন?
তুয়ান গজ হেসে উঠে বললে, 'ঠিক আপনাকেই রক্ষা করবার জন্যে আজ আমি মাঝি সাজিনি। আমি জানতুম, আজ হোক, কাল হোক আপনাকে ধরবার জন্যে এখানে শত্রুদের আবির্ভাব হবেই। আর তারা যদি আসে তাহলে জলপথের সাহায্য না নিলে চলবে না। তাই আমি মাঝির রূপ ধারণ করেছিলুম।'
প্রশান্ত সবিস্ময়ে বললে, 'আপনি আশ্চর্য লোক দেখছি।'
তুয়ান গজ ধীরে ধীরে বললে, 'প্রশান্তবাবু, একটা কথা বললে আপনি রাগ করবেন না তো?'
—আপনার মতন বন্ধুর কথায় রাগ করা আমার পক্ষে অসম্ভব।
তুয়ান গজ বললে, 'প্রশান্তবাবু, শিকারিরা বাঘ-সিংহকে লোভ দেখিয়ে বন্দুকের সীমানার মধ্যে আনবার জন্যে কী উপায় অবলম্বন করে, জানেন তো?'
—জানি। একটা ছাগল কী ভেড়াকে বনের ভিতরে বেঁধে রেখে দেয়!
—ঠিক। আপনাকে আমি এখানে এনে রেখেছি একটা বড়ো শিকারকে ধরবার জন্যে। আপনি যেখানে থাকবেন সেই শিকার যে সেখানে আসতে বাধ্য, এ-বিষয়ে আমি একেবারে নিশ্চিত।
প্রশান্তের দুই চক্ষু ক্রমেই বেশি বিস্ফারিত হয়ে উঠতে লাগল। সে বললে, 'আমার শত্রু কি আপনারও শত্রু?'
—হ্যাঁ।
—আপনার সঙ্গে তার শত্রুতার কারণ কী?
—কারণ প্রকাশ করবার সময় এখনও আসেনি।
প্রশান্ত খানিকক্ষণ নিরুত্তর হয়ে রইল। তারপর বললে, তুয়ান গজ, আমি বেশ বুঝতে পারছি, কী একটা রহস্যের ঘেরাটোপে নিজেকে আপনি ঘিরে রেখেছেন। যদিও আপনাকে এর আগে আমি দেখেছি বলে মনে হয় না, তবে মাঝে মাঝে আপনার চোখের ভিতরে যে ভাব ফুটে ওঠে, তা যেন আমার কাছে অপরিচিত নয়। কবে, কোথায় কার চোখে ঠিক যেন ওইরকম ভাব ফুটে উঠত।'
—তার নাম কি প্রশান্তবাবু?
—এখানেই হয়েছে মুশকিল, তার নাম আমি মনে আনতে পারছি না।
তুয়ান গজ সরে গিয়ে নৌকোর হাল ধরে বললে, 'প্রশান্তবাবু, দুর্যোগ ক্রমেই বেড়ে উঠছে। চলুন, আমরা ডাঙায় নামবার চেষ্টা করি।'
নৌকোর মুখ আবার তীরের দিকে ঘুরে গেল।
সপ্তম
গজের মুখোশ ত্যাগ
—তুয়ান উলু, আমি নিশ্চয়ই আপনাকে আগে কোথাও দেখেছি। পরদিন সকালে বারান্দায় বসে উলুর সঙ্গে চা-পান করতে করতে প্রশান্ত এই কথা বললে।
উলু হা হা করে হেসে উঠে বললে, 'প্রশান্তবাবু, ঠিক এই এক প্রশ্ন আপনি কবার করেছেন, সে হিসেব রেখেছেন কি?'
প্রশান্ত বললে, 'না, হিসাব রাখিনি বটে, তবে আপনাকে দেখলেই ওই প্রশ্নটাই আমার মনের ভিতর জেগে ওঠে। কিন্তু আজ পর্যন্ত প্রশ্নের উত্তর আমি পেলুম না।'
—উত্তর পাননি তার কারণ, ও প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই। আমি হচ্ছি বোর্নিয়োর বাসিন্দা, আর আপনি আসছেন সুদূর বাংলাদেশ থেকে। আপনার সঙ্গে আমার দেখা হবে কেমন করে?
—এখনও আপনি সরাসরি উত্তর দিচ্ছেন না, কেবল কথার পর কথা সাজিয়ে যুক্তি দেখাচ্ছেন। এটাও আমার সন্দেহজনক বলে মনে হচ্ছে।
উলু আবার হেসে বললে, 'দেখছি আপনি সন্দেহ করতে বেশ অভ্যস্ত।'
প্রশান্ত হঠাৎ গম্ভীর হয়ে বললে, 'ঠিক ধরেছেন তুয়ান উলু, আমি সন্দেহ করতে অভ্যস্ত বটে।'
—তার মানে?
—এতদিন আপনাদের আমি বলিনি, কিন্তু আর আমার আত্মগোপন না করলেও চলবে। আমি হচ্ছি কলকাতার এক পুলিশকর্মচারী।
উলুর মুখে কোনোরকম ভাবান্তর হল না। সে সহজ স্বরেই বললে, 'কিন্তু বোর্নিয়োয় এসেছেন কেন?
—একজন পলাতক আসামির সন্ধানে।
—কে সেই আসামি?
—সে এক গুরুতর অপরাধের আসামি। ডাকাতি আর রাহাজানি ছিল তার পেশা। কিছুদিন ধরে পুলিশকে সে জ্বালিয়ে মেরেছিল। তার নাম শঙ্করলাল!
উলু বললে, 'সে কি একবারও ধরা পড়েনি?'
—হ্যাঁ, আমি তাকে গ্রেপ্তার করেছিলুম। বিচারে তার উপরে দ্বীপান্তর বাসের হুকুম হয়। কিন্তু তাকে দ্বীপান্তর পাঠাবার আগেই পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে সে পালিয়ে গিয়েছিল। সে হচ্ছে চার বছর আগেকার কথা। গেল তিন বছর আমরা তার কোনো খোঁজ পাইনি। তারপর কিছুদিন আগে খবর পেয়েছি, শঙ্করলাল এই বোর্নিয়ো দ্বীপে এসে নতুন নাম নিয়ে চারিদিকে ডাকাতি, রাহাজানি করে বেড়াচ্ছে। তাকে আবার বন্দি করবার জন্যেই এই দ্বীপে আমি এসেছিলুম। কিন্তু দৈব আমার প্রতি বিরূপ। শঙ্করলালকে বন্দি করব কী, জাপানিদের হাতে বন্দি হবার ভয়ে আমাকেই এখন বনবাস করতে হচ্ছে। তার উপরে আমি বেশ বুঝতে পারছি, আর আপনার বন্ধু তুয়ান গজও বোধহয় আন্দাজ করতে পেরেছেন, শঙ্করলালও আমাকে বন্দি করবার চেষ্টায় আছে।
উলু কোনো কথা না বলে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে লাগল।
প্রশান্ত নিজের পেয়ালা নামিয়ে রেখে বললে, 'কিন্তু একটা কথা আমি ভালো করে বুঝতে পারছি না। তুয়ান গজও শঙ্করলালকে বন্দি করতে চান কেন? শঙ্করলালের সঙ্গে কি তাঁরও কোনো বিবাদ আছে?'
উলু বললে, 'থাকতে পারে, আমি জানি না।'
—আপনি জানেন না!
—না!
—অসম্ভব। তুয়ান উলু, পুলিশের চাকরি নিয়ে চুল পাকিয়ে ফেললুম। লোকের মনের ভিতরে প্রবেশ করবার কিছু কিছু শক্তি আমার হয়েছে। আমার বিশ্বাস আপনি অনেক কথাই জানেন, কিন্তু মুখে কিছু প্রকাশ করতে রাজি নন। কেন বলুন দেখি?' এই পর্যন্ত বলেই প্রশান্ত হঠাৎ উলুর হাতের দিকে তাকিয়ে চকিত স্বরে বলে উঠল 'তুয়ান উলু, আপনার মণিবন্ধের ওপরে ও দাগটা কিসের? এতদিন তো ওটা আমার চোখে পড়েনি!
নিজের হাতখানা ঘুরিয়ে ঊরুর উপরে রেখে উলু বললে, 'ও হচ্ছে একটা জড়ুলের দাগ।'
প্রশান্ত বললে, 'হতে পারে, কিন্তু ঠিক ডান মণিবন্ধের উপরেই ওই রকম দাগ দুজন মানুষের থাকতে পারে না বোধহয়?'
উলু মুখ টিপে একটু হেসে বললে, 'আপনার কথাগুলো হেঁয়ালি বলে মনে হচ্ছে।'
প্রশান্ত মর্মভেদী দৃষ্টিতে একবার উলুর পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে নিয়ে বললে, 'এইবারে আমার স্মরণ হয়েছে আপনাকে আমি কোথায় দেখেছি?'
—কোথায় দেখেছেন
—বাংলাদেশে। কলকাতা শহরে। আপনি হচ্ছেন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক অরুণবাবু। আর আপনার বন্ধু হচ্ছে—' বলতে বলতে প্রশান্ত এক লাফে আসন ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে উঠল এবং বিস্মিত ও অভিভূত কণ্ঠে আবার বললে, 'মনে পড়েছে—মনে পড়েছে—আর একটা কথাও মনে পড়েছে! আপনার বন্ধু হচ্ছে দীনুডাকাত, আর সেই দীনুডাকাতই আজ এখানে ছদ্মবেশে তুয়ান গজ নামধারণ করেছে। হ্যাঁ, কোনো সন্দেহ নেই—তুয়ান গজের মুখের উপরে আমি ফুটে উঠতে দেখেছি দীনুডাকাতের মুখের ভাব। এতদিন আমি কি অন্ধ হয়ে ছিলুম? এতবড়ো সহজ সত্যটাও আমার চোখে ধরা পড়েনি?
পিছন থেকে পরিষ্কার বাংলা ভাষায় শোনা গেল, 'সত্যের সন্ধান পাওয়া সহজ নয় প্রশান্তবাবু। কত মুনি-ঋষি আজীবন তপস্যা করেও সত্যের সন্ধান পাননি। আপনি তাদের চেয়ে ভাগ্যবান।'
প্রশান্ত তাড়াতাড়ি ফিরে দাঁড়িয়ে দেখলে, ঘরের ভিতরে এসে হাস্যমুখে দাঁড়িয়ে আছে তুয়ান গজ।
প্রশান্ত বললে, 'তুয়ান গজ—'
—আর আমাকে তুয়ান গজ বলে ডাকছেন কেন?
—দীনবন্ধুবাবু—
—এখন ও নামও আর আমার নয়।
—তাহলে কী বলে আপনাকে ডাকব?
—আপনি তো জানেন, আমি হচ্ছি অরুণের বন্ধু বরুণ। দীনুডাকাতের মৃত্যু হয়েছে। সে যেন আজ জন্মান্তরের সুখস্মৃতি।
—সুখস্মৃতি?
—হ্যাঁ, প্রশান্তবাবু। বড়োই সুখের স্মৃতি! সেই ঘটনাময় বিচিত্র জীবন, পাপীর শাস্তি-বিধান, দীনের দুঃখ মোচন, এসবই ছিল পরম আনন্দের। আজ সে আনন্দ থেকে আমি বঞ্চিত হয়েছি।
অরুণ বললে, 'তোমার আনন্দের তালিকা থেকে একটা বিষয় বাদ দিয়েছ বরুণ!'
—বাদ দিয়েছি নাকি?
—হ্যাঁ। অশান্তবাবু নামক গোয়েন্দাকে বারংবার হয়রান করেও তুমি যে পরম আনন্দলাভ করতে, সে-কথাটা বলতে ভুলে গেলে কেন?
—অরুণ, এ তোমার অন্যায় অভিযোগ। অশান্তবাবু নিজেই হয়রান হয়ে আনন্দলাভ করতেন। না প্রশান্তবাবু?
কিন্তু এ রসালাপ প্রশান্তের কানে ঢুকল বলে মনে হল না। সে স্তব্ধ হয়ে খানিকক্ষণ কী ভাবলে, তারপর কতকটা যেন নিজের মনেই মৃদুস্বরে বললে, 'নতুন এক নাটক অভিনয়ের জন্যে অপূর্ব এক রঙ্গমঞ্চ তৈরি হয়ে উঠেছে। যেন নিয়তিরই এক কঠিন আকর্ষণে সুদূর ভারতবর্ষের অভিনেতারা ছুটে এসেছে এই সাগরপারের বন্যদ্বীপের দুর্গম অরণ্যের ছায়ায়—'
যেন প্রশান্তের মুখের কথা কেড়ে নিয়েই বরুণ বললে, 'হ্যাঁ, সেই শঙ্করলাল, সেই দীনুডাকাত, সেই কবি অরুণ আর গোয়েন্দা প্রশান্ত চৌধুরী! আশ্চর্য এই যোগাযোগ! কিন্তু এই যোগাযোগের পরিণাম যে কী হবে, একথা আমরা কেউ জানি না। জানব কেমন করে? আমরা তো নিয়তির হাতের খেলার পুতুল ছাড়া আর কিছুই নই! প্রশান্তবাবু, আর একটা কথাও আপনি বোধহয় বুঝতে পেরেছেন?'
—কোন কথা?
—দুনিয়ার এত দেশ থাকতে শঙ্করলাল এই বোর্নিয়ো দ্বীপে এসে আশ্রয় নিয়েছে কেন?
—পুলিশ তার সন্ধান পাবে না বলে।
—না। সে এসেছে চরম প্রতিশোধ নেবার জন্যে!
—চরম প্রতিশোধ?
—চরম প্রতিশোধ! শঙ্করলালকে কে ধরিয়ে দিয়েছিল, আপনি তা জানেন?
—হ্যাঁ, তাকে বন্দি করে পুলিশের হাতে সমর্পণ করেছিলেন আপনি!
—তার উপরে শঙ্করের দাদা মহাদেওকেও ধরিয়ে দিয়েছিলুম আমি। আমার জন্যেই মহাদেওয়ের ফাঁসি হয়েছে। এসব কথা শঙ্করলালের পক্ষে ভোলা অসম্ভব। আমি যে এখানে এসেছি পুলিশ সে খবর পায়নি বটে, কিন্তু শঙ্করলাল এ তথ্য আবিষ্কার করে ফেলেছে। তাই এখানে হয়েছে শঙ্করলালের আবির্ভাব। যদিও ভারতের দীনুডাকাতই যে বোর্নিয়োর তুয়ান গজ, এ-কথাটা এখনও সে জানতে পেরেছে বলে মনে হয় না। আমার বিশ্বাস, সে কিছু জানতে পারবার আগেই আমি আবার তাকে বন্দি করতে পারব।
অরুণ বললে, 'নিজের ওপরে তোমার অতটা অন্ধবিশ্বাস থাকা ভালো নয়। শঙ্করলাল তো কাল এখানে এসেছিল, তুমি চেষ্টা করেও তাকে ধরতে পারোনি।'
—কালই সে ধরা পড়ত, কিন্তু বাদ সাধলে যে আকাশের বিদ্যুৎ। দুখানা বড়ো নৌকোয় ছিল আমার পঞ্চাশজন লোক। বিদ্যুৎ না চমকালে শঙ্করলাল তার সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে অন্ধের মতনই তাদের হাতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হত। যাক, একবার বিফল হয়েছি বলে আমি হাল ছাড়ব না। প্রশান্তবাবু যখন আমাদের অতিথি হয়েছেন তখন শঙ্করলাল যে আবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবে, এ-বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।
প্রশান্ত মাথা নেড়ে বললে, 'বরুণবাবু, আমি আর আপনার আতিথ্য স্বীকার করতে পারব না।'
বরুণ বিস্মিত কণ্ঠে বললে, 'কেন প্রশান্তবাবু, অতিথি সৎকারে আমাদের কোনো ত্রুটি হয়েছে নাকি?'
প্রশান্ত বললে, 'না বরুণবাবু অতবড়ো মিথ্যে কথাটা বলতে চাই না। এখানে আমি পরম সুখে আছি। তার উপরে স্বদেশে—এমনকি এই দূর-প্রবাসেও আপনার কাছে আমি বারংবার উপকৃত হয়েছি। এইবার নিয়ে আপনি আমার জীবনরক্ষা করলেন তিনবার। আমি পুলিশের লোক হলেও অকৃতজ্ঞ নই। কিন্তু আমি পুলিশের লোক বলেই আপনার কাছ থেকে আমাকে বিদায় গ্রহণ করতেই হবে।'
বরুণ হাসতে হাসতে বললে, 'আপনি আমার মতন পাপীর সংস্পর্শে থাকতে রাজি নন?'
—না বরুণবাবু দয়া করে আমাকে ভুল বুঝবেন না। ভেবে দেখুন, আমি হচ্ছি সরকারের চাকর, নিমকের মর্যাদা রাখতে আমি বাধ্য। ধরলুম, আগেকার পেশা আপনি ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু সরকারের কাছে আজও তো আপনি পলাতক আসামি বলেই গণ্য?
—হ্যাঁ, ব্রিটিশ সরকারের কাছে। কিন্তু আজ আমি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাইরে বাস করছি। এখানটা আগে ছিল ওলন্দাজদের রাজ্য, কিন্তু এখন হয়েছে জাপানিদের হস্তগত। আপনি যে-আইনের দাস, এখানে তা অচল।
—না বরুণবাবু, আপনার মতো আমিও তো এখনও ইংরেজ সরকারের সম্পর্ক ত্যাগ করিনি, আমাকে বিদায় নিতেই হবে।
—কিন্তু আপনি এখান থেকে চলে গেলে শঙ্করলালকে আর কখনও হয়তো ধরতে পারবেন না, এটা বুঝতে পারছেন তো?
প্রশান্ত মাথা নেড়ে দুঃখিত ভাবে বললে, 'সব বুঝতে পারছি। কিন্তু আমি নিরুপায়!'
অরুণ বললে, 'প্রশান্তবাবু, দলপতি হয়ে আপনি এই যে এতগুলো অসহায় অভাগাকে মৃত্যুর মুখ থেকে দূরে নিয়ে এসেছেন, এদের কি আবার মৃত্যুর মুখেই নিক্ষেপ করবেন!'
প্রশান্ত বললে, 'আমি এতটা নির্বোধ আর নির্দয় নই অরুণবাবু! এরা আপাতত আপনাদের আশ্রয়েই থাকুক না! ভারতবর্ষ থেকে আমার সঙ্গে এসেছে দশজন লোক, আমি কেবল তাদেরই নিয়ে চলে যেতে চাই।'
বরুণ একটা নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বললে, 'আপনি যখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তখন আমার আর কিছুই বলবার নেই।'
অষ্টম
সেলাদাং!
বলা বাহুল্য, প্রশান্তের যে দশজন লোক ভারতবর্ষ থেকে বোর্নিয়ো পর্যন্ত এসেছে, তারা সকলেই হচ্ছে পুলিসকর্মচারী। অপরিচিত দেশে, নিবিড় জঙ্গলের বিভিন্ন বিভীষিকার কবলে পড়ে তাদের হতভাগ্য প্রাণপক্ষীর অবস্থা হয়ে উঠেছিল তখন দেহপিঞ্জর ত্যাগ করবার মতো। তাই জঙ্গল ছেড়ে বাইরে যাবার প্রস্তাবে তারা সকলে সায় দিলে একবাক্যে এবং বিপুল আনন্দেই!
খুব ভোরে বনমুরগিরা ঝাঁকে ঝাঁকে শূন্যপথ দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল পরিচিত জলাশয়ের সন্ধানে। সিন্দুর-তিলকা ঊষার আবির্ভাবে দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়ে অন্যান্য দিবাচর বিহঙ্গরাও পুলকচঞ্চল কণ্ঠে রচনা করছিল তরুণ আলোকের প্রশস্তিগাথা।
প্রশান্ত নিজের দলবল নিয়ে বনপথের উপরে এসে দাঁড়াল।
বিদায়ী নমস্কার জানাবার জন্যে বরুণ ও অরুণও বাইরে বেরিয়ে এল।
প্রশান্ত মৃদুহাস্য করে বললে, 'বরুণবাবু, ঋণের মাত্রা আরও খানিকটা না বাড়িয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আজ আমাকে বিদায় নিতে হচ্ছে।'
বরুণও সকৌতুক হেসে উঠে বললে, 'ঋণ! কীসের ঋণ?'
—আমার কৃতজ্ঞতার ঋণ।
—না প্রশান্তবাবু, বাঘ আর হরিণের মধ্যে কৃতজ্ঞতার কোনো সম্পর্কই থাকতে পারে না। আপনি যে পুলিশকর্মচারী আর আমি যে ভূতপূর্ব দস্যুদলপতি, একথা আজও আপনার হাড়ে হাড়ে গাঁথা আছে। সুতরাং এখানে কৃতজ্ঞতার প্রশ্ন উঠতে পারে না।
প্রশান্ত দুঃখিত কণ্ঠে বললে, 'বিদায়ের মুহূর্তে আমাকে আর আঘাত দেবার চেষ্টা করবেন না।'
—না প্রশান্তবাবু, আমি হক কথাই বলছি! আপনি কি আজকের বিদায়কে চিরবিদায় বলে মনে করেন?
—নিশ্চয়ই নয়!
—আচ্ছা, আবার যদি আমাদের দেখা হয়, তাহলে আপনি আমাকে কীভাবে সম্বোধন করবেন? বন্ধুভাবে, না শত্রুভাবে?
—আজ এ-প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অসম্ভব।
—কেন?
—এর উত্তর নির্ভর করে স্থান, কাল আর অবস্থার উপরে।
বরুণ উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠে বললে, 'দেখছি আপনি মনের কথা সরলভাবে বলতে নারাজ। কারণ, উত্তর দিচ্ছেন আইন বাঁচিয়ে।'
সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে প্রশান্ত বললে, 'এইটেই কি আমার পক্ষে স্বাভাবিক নয় বরুণবাবু? আইন বাঁচিয়ে কাজ করাই যে আমার পেশা। কথায় কথায় বেলা বাড়ছে, ওই দেখুন, জঙ্গলের ঝিলিমিলির ফাঁকে দেখা যাচ্ছে সূর্যের মুখ। আর নয়, বিদায়। নমস্কার।'
বরুণ এবং অরুণ একসঙ্গে বললে, 'নমস্কার।'
প্রশান্ত পায়ে পায়ে অগ্রসর হল এবং তার সঙ্গের লোকেরাও চলল পিছনে পিছনে।
আচম্বিতে জঙ্গলের নির্জন নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে দিকে দিকে পরিত্রাহি চিৎকার জেগে উঠল, 'পালাও! পালাও! পালাও!'
আড়ালে আড়ালে শোনা গেল বহু পলায়মান মানুষের দ্রুত পদশব্দ এবং অনতিবিলম্বেই দেখা গেল, এখানে-ওখানে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছে ঝোপের পর ঝোপ।
বরুণ ও অরুণের আশেপাশে দাঁড়িয়ে ছিল কয়েকজন স্থানীয় লোক, তারাও অত্যন্ত ত্রস্তভাবে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করতে উদ্যত হল।
বরুণ বিস্মিত স্বরে বললে, 'ব্যাপার কী?'
—সেলাদাং, সেলাদাং!
—ভয় কী? তোমাদের কাছে অস্ত্র রয়েছে, আত্মরক্ষা করো!'
বেগে পালাতে পালাতে তারা বললে, 'তি-দর, বুল্যি তুয়ান' (করা যাবে না হুজুর)!
বন্য গো-মহিষ জাতীয় জীবদের মধ্যে সেলাদাং হচ্ছে সবচেয়ে বৃহৎ, বলিষ্ঠ এবং হিংস্র— এদের পাওয়া যায় খালি এই অঞ্চলেই। ভয়াবহ বন্য মহিষরাও বিপদ দেখলে ঝোপঝাপের আড়ালে গা ঢাকা দেবার চেষ্টা করে, এরা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে নির্ভীক ও মরিয়া এবং মানুষ দেখলেই তেড়ে এসে আক্রমণ করে। এরা কখনও পোষ মানে না বা জীবন্ত অবস্থায় ধরা পড়ে না, তাই পৃথিবীর কোনো পশুশালাতে সেলাদাংয়ের নমুনা দেখা যায় না। শিকারিদের মতে, সেলাদাং হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক জানোয়ার।
জঙ্গল ভেঙে বেরিয়ে এল সাক্ষাৎ মৃত্যুদূতের মতন প্রকাণ্ড একটা সেলাদাং—তার দুই চক্ষু যেন অগ্নিবর্ষী!
প্রশান্ত সদলবলে হতভম্বের মতন দাঁড়িয়ে পড়েছিল—বিপদের কারণ না বুঝেই। তারপর ভালো করে কিছু বুঝতে না বুঝতেই সেই ভীষণ জীবটা একেবারে তার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন এক বজ্রঝটিকার মতন—সে নিজের বন্দুকটাও তোলবার অবসর পেলে না!
মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী বুঝে প্রশান্ত দুই চোখ মুদে ফেললে এবং সেই অবস্থাতেই শুনতে পেলে উপর-উপরি দুইবার বন্দুকের গর্জন ও খুব নিকটেই একটা গুরুভার দেহপতনের শব্দ।
সে চোখ চেয়ে দেখলে, বরুণ ও অরুণের বন্দুকের মুখে লেগে রয়েছে বিলীয়মান ধোঁয়ার রেখা এবং তার পায়ের তলায় পড়ে মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করছে সেলাদাংটার মস্তবড়ো রক্তাক্ত দেহ।
শুকনো হাসি হেসে প্রশান্ত বললে, 'দেখছেন বরুণবাবু, যতক্ষণ এখানে থাকব ততক্ষণ আপনাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার ঋণ ক্রমশ বেড়েই চলবে। এ হচ্ছে সাংঘাতিক অরণ্য, আপনাকে সাধুবাদ দেবার জন্যেও আর আমি এখানে অপেক্ষা করতে রাজি নই।'
সঙ্গীদের নিয়ে প্রশান্ত তাড়াতাড়ি প্রস্থান করলে।
সেলাদাংয়ের দেহটা ততক্ষণে মরে একেবারে আড়ষ্ট হয়ে গেছে। বরুণ ও অরুণ এগিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৃতদেহটা পরীক্ষা করতে লাগল।
অরুণ বললে, 'বোর্নিয়োয় প্রশান্তবাবুর সঙ্গে আর বোধহয় আমাদের দেখা হবে না। কিন্তু তিনি যা বললেন, মিথ্যে নয়। আমরা যেখানে আছি, এ হচ্ছে সাংঘাতিক অরণ্য। এখানে পদে পদে অপঘাত মৃত্যুর সম্ভাবনা। ভাই বরুণ, আমিও এই বনের বাইরে যেতে পারলেই সুখী হই!'
বরুণ স্মিতমুখে বললে, 'এখনই তুমি অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছ, তবু এখানকার ভয়ংকর অজগর আর বিষম খেঁকি কালো চিতাবাঘের সঙ্গে তোমার কোনো পরিচয় হয়নি। বোর্নিয়োর আর এক বিশেষত্ব হচ্ছে—ওরাং-উটাং। প্রাতরাশ এখনও প্রস্তুত হয়নি। ইতিমধ্যে একটা ওরাং-উটাঙের গল্প শুনবে?'
দূর বনের মাথায় মুকুটের মতো দেখাচ্ছিল উদীয়মান প্রভাকরকে এবং আকাশ-বাতাসকে কলধ্বনিময় করে তুলছিল পাখিদের প্রভাত-ফেরি।
একটা গাছের তলায় বসে পড়ে অরুণ বললে, 'গল্প শুনতে আমি সর্বদাই প্রস্তুত।'
বরুণও বন্ধুর পাশে আসীন হয়ে বললে, 'চার্লস মেয়ার হচ্ছেন একজন পৃথিবী বিখ্যাত শিকারি। তাঁর কর্মক্ষেত্র প্রধানত বিস্তৃত ছিল মালয়, সুমাত্রা ও বোর্নিয়ো প্রভৃতি অঞ্চলের জঙ্গলে। তাঁর শিকার ছিল দুই রকম। তিনি পশুদের কখনও বধ করতেন ও কখনও বন্দি করতেন। বন্দি পশুরা সংগৃহীত হত পৃথিবীর নানা দেশের পশুশালা ও সার্কাসের জন্যে। সুমাত্রা ও বোর্নিয়োর গভীর অরণ্যে বাস করে ওরাং-উটাং বা বনমানুষ। লাঙ্গুলহীন সুবৃহৎ বানরদের মধ্যে গরিলার পরেই ওরাংয়ের স্থান। চার্লস মেয়ার একবার জঙ্গলে গিয়েছিলেন ওরাং-উটাং বন্দি করবার জন্যে। বনমানুষ বধ করা সহজ, কিন্তু বন্দি করা অতিশয় কঠিন, হাতি, গন্ডার, সিংহ ও ব্যাঘ্র প্রভৃতি বন্দি করার চেয়েও কঠিন ও বিপজ্জনক। এরকম কাজে কতখানি বুদ্ধি, সাহস, ধৈর্য, তোড়জোড় ও লোকবলের দরকার হয়, এই কাহিনিটি শুনলেই তুমি উপলব্ধি করতে পারবে। কাহিনিটি বর্ণনা করেছেন চার্লস মেয়ার স্বয়ং। অর্থাৎ আমার মুখ দিয়ে তুমি শুনছ যেন তাঁর মুখের গল্প!'
... ... ...
জঙ্গলের মধ্যে একটি গ্রামের ভিতরে পেতেছিলুম আস্তানা।
অবশেষে অনেক খোঁজাখুঁজির পর একজোড়া মস্তবড়ো ওরাংয়ের খবর পাওয়া গেল। মদ্দা ও মাদি। তারা বাসা বেঁধেছে প্রকাণ্ড একটা গাছের উপরে। জায়গাটা হচ্ছে গ্রাম থেকে দুই ঘণ্টার পথ।
আমার সঙ্গী ছিল ওমার ও মুন্সি। তাদের নিয়ে লোকজনদের ডেকে এনে আমরা পরামর্শ করতে বসলুম। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে চলল পরামর্শ।
একসঙ্গে একজোড়া ওরাংকে জ্যান্ত অবস্থায় বন্দি করা যে-সে কথা নয়। প্রাপ্তবয়স্ক ওরাং যে কী অমিত শক্তির অধিকারী, আমার তা অজানা নেই। ওরাংকে স্বচক্ষে দেখেছি, এক ইঞ্চি পুরু লোহার ডান্ডাকে এক হাতের এক মোচড়ে রবারের মতো দুমড়ে ফেলতে। সবচেয়ে বলিষ্ঠ হচ্ছে তার বাহু। দুইদিকে বিস্তার করলে তার বাহুযুগলের মাপ হয় দশ ফুট। তার কাঁধ থেকে কটিদেশ পর্যন্ত আকারে মানুষের মতোই, কিন্তু তার পা দুটো হচ্ছে ছোটো ছোটো। ওরাং পারতপক্ষে মাটির উপর দিয়ে হেঁটে আনাগোনা করে না, দুইহাত দিয়ে ডাল ধরে ঝুলে পড়ে এক ডাল থেকে আর এক ডালে দোদুল্যমান অবস্থায় এগিয়ে যায়। যেসব অরণ্যে ওরাংয়ের বাস, সেখানকার বৃক্ষদল এমন ঘনসন্নিবিষ্ট যে, তার পক্ষে মাটির উপরে পদচালনা না করলেও চলে। ডালপালা ভেঙে বাসা বেঁধে সে রাত্রে গাছের উপরেই শয়ন করে। তারা এক-এক জায়গায় দলবদ্ধ হয়ে বাস করতে ভালোবাসে এবং চল্লিশ থেকে ষাটটা পর্যন্ত ওরাং এক-এক দলে থাকে।
আক্রান্ত ও ক্রুদ্ধ হলে ওরাংয়ের প্রকৃতি হয় অত্যন্ত হিংস্র। শত্রুদের সংখ্যা বেশি বলে যখন সে গাছের উপর থেকে নামতে সাহস করে না, তখন বিষম আক্রোশে যেন একেবারে খেপে যায়। নিজেরই হাত কামড়ে ছিঁড়ে ক্ষতবিক্ষত করে ফেলে। এবং একসঙ্গে একটা গাছে দুটো ওরাং থাকলে তারা পরস্পরকেই জড়িয়ে ধরে কামড়াকামড়ি করে। আহত হলে সে গাছ থেকে নেমে পড়ে দলবদ্ধ মানুষদেরও আক্রমণ করতে ভয় পায় না এবং কোনো বিশেষ মানুষ সে-সময়ে ওরাংয়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে মৃত্যু তার নিশ্চিত।
ওরাংদের বন্দি করতে যাওয়া প্রায় যুদ্ধযাত্রারই শামিল। যে দুটো জীবের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল, আগে থাকতে ভালো করে তদারক করবার জন্যে একদিন আমি সদলবলে যাত্রা করলুম।
সে এক গহন বন। পথপ্রদর্শকের পিছনে পিছনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে পায়ে পায়ে বাধা পেয়ে অসংখ্য ঝোপঝাড় ভেঙে অবশেষে যথাস্থানে গিয়ে উপস্থিত হলুম। যে গাছে তারা বাস করে তার উপরে নীচে থেকেই দেখতে পেলুম তাদের বাঁধা মাচান। সৌভাগ্যক্রমে তারা তখন বাসায় ছিল না।
সঙ্গের লোকজনদের একজায়গায় দাঁড় করিয়ে রেখে কেবল ওমার আর মুনশিকে নিয়ে আমি গাছটার চারিপাশে এক চক্কর ঘুরে এলুম। গাছটা যেখানে ছিল তার চারিদিকের জঙ্গল ভীষণ ঘন। গাছের পর গাছ দাঁড়িয়ে আছে পরস্পরের গায়ে পা ঠেকিয়ে। এর ডালপালা মিশে গেছে ওর ডালপালার সঙ্গে এবং তাদের উপরে আবার জাল বুনে দিয়েছে নানা জাতের লতা। অস্ত্র দিয়ে পথ না কেটে নিলে এক পদ অগ্রসর হওয়া অসম্ভব। সেখানে আর সব গাছের মাথা ছাড়িয়ে উঠেছে ওরাংদের গাছটাই।
সেইখানে বসে বসে ঘণ্টাখানেক মাথা ঘামাবার পর ওরাংদের বন্দি করবার ফন্দি স্থির করে ফেললুম। ওমার ও মুনশিকে বললুম, 'চারিদিকের জঙ্গল এমনি কৌশলে কেটে সরিয়ে ফেলবে যে, ওরাংরা আর তাদের গাছ থেকে লাফ মেরে পালাতে পারবে না।' কৌশলটা কী, তাও আমি বুঝিয়ে দিলুম।
তারপর ফিরে এসে আমার লোকজনদের ডেকে জঙ্গলের লতাডালগুলো আগে কেটে ফেলতে বললুম। লতার বাঁধন ছেদন না করলে গাছগুলো কেটে ফেললেও তাদের ভূতলশায়ী করা সম্ভবপর নয়।
দলে দলে লোক শীঘ্রহস্তে প্যারাং চালিয়ে বড়ো গাছটার চতুর্দিকবর্তী প্রায় ষাট ফুট লতাজাল কাটতে নিযুক্ত হল। এ-অঞ্চলের লোক দুই রকম অস্ত্র ব্যবহার করে—ক্রিশ আর প্যারাং। ক্রিশ ছোটো ছোরা এবং প্যারাং হচ্ছে তার চেয়ে বড়ো অস্ত্র। প্যারাং চালনায় এদের অদ্ভুত নিপুণতা এবং এত তাড়াতাড়ি এরা কাজ করতে পারে, দেখলে অবাক হতে হয়।
লতার বাঁধন কেটে ফেলা হল বটে, কিন্তু সরিয়ে ফেলা হল না। বাহির থেকে দেখলে তাদের অবিচ্ছিন্ন বলেই মনে হয়। তারপর গাছগুলোর গুঁড়ির উপরে অস্ত্রাঘাত হতে লাগল। কিন্তু এমন কায়দায় গুঁড়ি কাটা হল যে, গাছগুলো তখনকার মতো সোজা খাড়া হয়েই রইল। সবশেষে ঠিক সেইভাবেই ওরাংদের গাছটারও মূলোচ্ছেদ করা হল।
প্যারাংয়ের শব্দ ও বিপুল জনতার গোলমাল শুনে বনবাসী জন্তুরা কৌতূহলী হয়ে ব্যাপার কী জানবার জন্যে দলে দলে তদারক করতে বেরিয়ে এল—এমন কি অনেকগুলো ছোটো আকারের ওরাং পর্যন্ত। আমরা তাদের দিকে ভ্রূক্ষেপ করলুম না দেখে অধিকতর সাহস সঞ্চয় করে তারা আরও কাছে এগিয়ে এল। তখন দলবদ্ধ বন্য দর্শকদের কিচিরমিচির চিৎকারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল চতুর্দিকে!
সেদিনকার মতো প্রাথমিক কাজ সেরে আমরা আবার গ্রামে ফিরে এলুম। সন্ধ্যার আগে ওরাংরাও ফিরে কোনো সন্দেহ করতে পারবে বলে মনে হয় না, কারণ, জঙ্গলের মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ করতে পারবে না।
গ্রামে এসেই আমরা এই বিপজ্জনক অভিযানের জন্যে আয়োজন শুরু করে দিলুম। বড়ো বড়ো গাছ কেটে পুরু তক্তা বানিয়ে দুটো খাঁচা তৈরি করা হল। কিন্তু মহাবলবান ওরাং পাছে সেই খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে পড়ে, সেই ভয়ে র্যাট্ট্যানের মজবুত দড়ি জড়িয়ে খাঁচার চারিদিক ভালো করে ঘিরে ফেলা হল। খাঁচা ভাঙতে পারলেও ওরাংরা র্যাট্ট্যানের এই জাল ছিঁড়ে ফেলতে পারবে না। জোরে লোহার ডান্ডা দুমড়ে ফেলা সহজ, কিন্তু র্যাট্ট্যানের দড়ি ছেঁড়া সহজ নয়।
র্যাট্ট্যান হচ্ছে দ্রাক্ষালতার মতো একরকম লতা—তার দৈর্ঘ্য একশো ফুটের চেয়েও বেশি হতে পারে। মাটি থেকে বড়ো গাছ বেড়ে বিসর্পিত গতিতে তা উপরদিকে উঠে গিয়ে আবার নেমে আসে নীচের দিকে। বাজারে যে বিখ্যাত মালাক্কা বেত পাওয়া যায়, তা সবচেয়ে মোটা র্যাট্ট্যান লতা দিয়ে তৈরি।
ওই র্যাট্ট্যানের দড়ি দিয়েই দুটো জালও তৈরি করা হল, ওরাংরা ভূতলে অবতীর্ণ হলেই ওই জাল দুটো সর্বাগ্রে তাদের উপরে নিক্ষেপ করা হবে।
তারপর কেমন করে সব দিক সামলে কাজ করতে হবে, তা বোঝাবার জন্যে কয়েক দিন ধরে চলল জোর রিহার্সাল। ক্রমে ক্রমে প্রত্যেক ব্যক্তিই রীতিমতো পোক্ত হয়ে উঠল।
দিন-চারেক আমি আর জঙ্গলের মধ্যে পদার্পণ করিনি। আমার আদেশে কেবল দলে দলে লোক গিয়ে ওরাংদের গাছের চারিপাশ ঘিরে রাশি রাশি শুকনো ঘাস ও লতাপাতা স্তূপীকৃত করে রেখে এল।
তারপর একদিন পঞ্চাশজন চতুর ও নিপুণ লোক বেছে নিয়ে চললুম আমি জঙ্গলের ভিতরে। সঙ্গে রইল ওমার ও মুনশি। আমার বিশ্বস্ত অনুচর আলিও বন্দুক নিয়ে চলল সঙ্গে সঙ্গে।
যাত্রা শুরু হয়েছিল রাতের অন্ধকারে এবং যখন যথাস্থানে গিয়ে হাজির হলুম তখন সবে ফুটে উঠেছে ভোরের আলো। দেখতে পেলুম, ওরাংরা নিশ্চিন্ত মনে মাচানের উপরে নিদ্রাচ্ছন্ন হয়ে আছে।
ত্রিশজন লোক চারিদিকের গাছগুলো মাটির উপরে পেড়ে ফেলবার জন্যে নীরবে এগিয়ে গেল। দশজন লোক প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বড়ো গাছটাকে ভূতলশায়ী করবার জন্যে, তারও গুঁড়িটা বেঁধে ফেলা হল মোটা কাছি দিয়ে। সেখানে রইল আরও দশজন লোক, ওরাংরা ভূমিতলে অবতীর্ণ হলেই তারা জাল নিক্ষেপ করবে তাদের উপরে। এক-এক দিকে গিয়ে খবরদারির ভার গ্রহণ করলে ওমার ও মুনশি। যথা সময়ে পিস্তল ছুড়ে সংকেত দেবার ভার রইল আমার উপরে। আমার পাশে এসে দাঁড়াল বন্দুকধারী আলি।
ছুড়লুম আমি পিস্তল। সঙ্গে সঙ্গে সারা দুনিয়ার ভয়াবহ হট্টগোল যেন জাগ্রত হয়ে উঠল সেই অরণ্যের মধ্যে। জনতার কান ফাটানো হই হই চিৎকার, দমাদ্দম ঢাক-ঢোলের আওয়াজ, গাছের গুঁড়িতে গুঁড়িতে প্যারাং চালনার শব্দ! ওরাং দুটো আতঙ্কে জেগে ধড়মড় করে মাচানের উপরে উঠে বসে সভয়ে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল চতুর্দিকে।
ওদিকে গাছের পর গাছ মাটির উপরে শুয়ে পড়ছে ধপাধপ, ধপাধপ। দেখতে দেখতে চারিদিকের জঙ্গল সাফ—জমির উপরে একলা খালি দাঁড়িয়ে রয়েছে বড়ো গাছটা। তার তলায় দাউ-দাউ করে জ্বলছে শুকনো ঘাসলতাপাতার স্তূপ।
আতঙ্কগ্রস্ত ওরাং দুটো পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে আর্তচিৎকার করতে লাগল। একটা ওরাং নীচে নেমে আসতে উদ্যত হল। আমি তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে বন্দুকটা নিয়ে বাগিয়ে ধরলুম। কিন্তু খানিকটা নেমেই পুঞ্জীভূত ধোঁয়ার তাড়নায় সে আবার মাচানের উপরে গিয়ে উঠল এবং চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে আশপাশের ডালপালাগুলো মড়মড় করে ভেঙে ফেলতে লাগল। ক্রমে ধূম্ররাশি যখন আরও ঘন হয়ে মাচানের কাছে গিয়ে পৌঁছোল, তারাও আরও উপরে উঠে একেবারে টঙে গিয়ে বসে রইল পরস্পরের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায়। একেবারে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিল তারা তখন।
ধোঁয়ায় ধোঁয়ায় তখন চারিদিক আচ্ছন্ন, চোখের সুমুখ থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল বড়ো গাছটা পর্যন্ত।
ওমার ছুটে এসে খবর দিলে, 'সব ব্যবস্থা প্রস্তুত! বড়ো গাছটা ভূতলশায়ী হলে আমাদের লোকজনরা জাল ফেলে ওরাংদের বন্দি করতে পারবে। কেবল আপনার হুকুমের অপেক্ষা!' আমি হুকুম দিলুম।
দ্বিগুণ জোরে জেগে উঠল প্রচণ্ড হট্টগোল, ঢাক-ঢোলের ধুমধাড়াক্কা এবং প্যারাংয়ের খনখন-খটাখট। বড়ো গাছটা হঠাৎ দুলে উঠতেই ওরাংরা সভয়ে আর্তনাদ করতে লাগল। গাছটা প্রথমে ধীরে ধীরে, তারপর হুড়মুড় করে মাটির উপরে এসে আছড়ে পড়ল। সে এক হুলস্থুল কাণ্ড।
জালে আবদ্ধ হয়ে ওরাংরা প্রথমটা দারুণ আতঙ্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। তারপর সমূহ বিপদ বুঝে হাত-পা-দাঁত দিয়ে জালের বাঁধন কাটবার জন্যে যুঝতে লাগল প্রাণপণে।
একটা ওরাং আচমকা জালের ছিদ্র দিয়ে তার সুদীর্ঘ বাহু বাড়িয়ে খপ করে ধরে ফেললে একজন লোককে এবং সঙ্গে সঙ্গে মট করে তার ঘাড় ভেঙে দিয়ে নিক্ষেপ করলে তার দেহটাকে শূন্যের দিকে। কয়েক গজ দূরে ধপাস করে মাটির উপরে এসে পড়ল বেচারার মৃতদেহ, তার নাক ও মুখ দিয়ে হুহু করে রক্ত নির্গত হতে লাগল।
আমি চেঁচিয়ে বললুম, 'শীগগির দ্বিতীয় জালটাও ছুড়ে ওদের চাপা দিয়ে সেটাকে বেঁধে রাখো গাছের সঙ্গে!'
ওরাংরা যথাসাধ্য বাধা দেবার চেষ্টা করতে করতে শেষটা নিজেরাই বাঁধা পড়ল। এ জাল এমন দুর্ভেদ্য!
আমি আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে খবরদারি করছি, আচম্বিতে জাল ভেদ করে আবার একটা প্রকাণ্ড থাবা বিদ্যুৎবেগে বেরিয়ে এসে চেপে ধরলে আমার পায়ের গোড়ালি। এক হ্যাঁচকা-টানে আমি হলুম পপাতধরণীতলে, কিন্তু সেই অবস্থাতেই তাড়াতাড়ি চেপে ধরলুম একটা গাছের গুঁড়ি।
তারপর অনুভব করলুম একটা বিষম আকর্ষণ, অসাড় হয়ে গেল আমার পা এবং গাছের গুঁড়ি থেকে প্রায় খুলে এল আমার হাতের বাঁধন!
আর সকলে প্রথমটা আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল হতভম্বের মতন। আমি মনে করলুম এইবারে এসেছে আমার অন্তিম মুহূর্ত!
কিন্তু সর্বাগ্রে নিজেকে সামলে নিয়ে এক লাফে এগিয়ে এসে, একগাছা মোটা লাঠি দিয়ে ওমার সজোরে বারংবার আঘাত করতে লাগল ওরাংয়ের বাহুর উপরে। সঙ্গে সঙ্গে সে আবার জালের ভিতরে হাত গুটিয়ে নিলে।
ফাঁড়া উতরে গেল বটে, কিন্তু আমার পায়ের গোড়ালির হাড় সরে গিয়েছিল এবং শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসকের অধীনে আমাকে শয্যাশায়ী হয়ে থাকতে হয়েছিল বেশ কিছুকাল।
ওরাংরা বন্দি হল এবং সমুদ্রপথে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হল আন্টওয়ার্পের চিড়িয়াখানার জন্যে। কিন্তু শেষপর্যন্ত স্বাধীনতাহীনতা ও স্বদেশত্যাগের দুঃখ তারা সহ্য করতে পারলে না, প্রাণত্যাগ করলে অনাহারে।
নবম
বরুণের ভোজবাজি
দিন তিনেক পরে ভোরবেলায় বরুণের ঘরের ভিতরে এসে অরুণ দেখলে, সে চুপ করে দুই চোখ মুদে শয্যার উপরে শুয়ে আছে।
অরুণ আশ্চর্য হয়ে বললে, 'কী হে বন্ধু, এমন অসময়েও তুমি তন্দ্রাদেবীর পূজা করছ নাকি?'
বরুণ চোখ খুলে বললে, 'না বন্ধু, তুমি তো জানোই, চিন্তাকুল হলে আমি চক্ষু মুদে থাকতে ভালোবাসি!'
অরুণ বললে, 'তোমার আবার কীসের চিন্তা?'
—অনেক চিন্তা ভাই, অনেক চিন্তা! এইমাত্র আমার চর এসে কী খবর দিয়ে গেল জানো?
—কী খবর?
—শঙ্করলাল তার আড্ডা থেকে নিরুদ্দেশ হয়েছে।
—একেবারে নিরুদ্দেশ!
—আড্ডা থেকে বেরিয়ে সে প্রথমে নানায়োপিনো গ্রামের ওপরে গিয়ে হানা দেয়। তারপর সেখানে লুটপাট করে দলবল নিয়ে কোথায় যে চলে গিয়েছে, কেউ তা জানে না। বনের ভিতরে তার আড্ডা খালি হয়ে পড়ে আছে।'
অরুণ খুশি হয়ে বললে, 'বেশ তো আপদ বিদেয় হয়েছে। এ জন্যে তোমার চিন্তার কারণ কী?'
বরুণ বিছানার উপরে উঠে বসল, মুখ গম্ভীর। কঠিন স্বরে বললে, 'তুমি ভুলে যাচ্ছ অরুণ, আমি কী প্রতিজ্ঞা করেছি।'
অরুণ বললে, 'কিছুই আমি ভুলিনি। তোমার প্রতিজ্ঞা ছিল, দস্যু শঙ্করলালকে পুলিশের হাতে সমর্পণ করবে। সে প্রতিজ্ঞা তুমি রক্ষা করেছ তো!'
বরুণ মাথা নেড়ে বললে, 'এরকম প্রতিজ্ঞা রক্ষার কোনো অর্থই হয় না। শঙ্করলাল পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে আবার সমাজের ওপর অত্যাচার শুরু করেছে, আবার দিকে দিকে আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। যদিও আমি আর দীনুডাকাত নই, তবু দীনদরিদ্রের ওপরে যে অত্যাচার করে, আমার শেষ-নিশ্বাস পড়বার আগে তাকে আমি ক্ষমা করব না, কখনোই ক্ষমা করব না! তারপরে আমাকে তুমি কী ভাবো বলো দেখি? আমি কি কাপুরুষ? সে আমাকে খুঁজে বেড়াবে, আর আমি লুকিয়ে থাকব? না অরুণ, এ হতে পারে না। এবারে আমি শঙ্করলালের বিষদাঁত ভেঙে তবে ছাড়ব!'
অরুণ কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীরে ধীরে বললে, 'বরুণ, তোমাকে আমি কত ভালোবাসি, তা তুমি জানো। তোমার পূর্বজীবন যতই উত্তেজনাপূর্ণ হোক, আমি কোনোদিনই তার পক্ষপাতী ছিলুম না। বোর্নিয়োয় এসে তুমি আবার নূতন জীবন যাপন করবে শুনেই আমিও তোমার সঙ্গে এখানে এসেছি। এখন যদি শঙ্করলালকে উপলক্ষ্য করে আবার তুমি পূর্ব-মূর্তি ধারণ করতে চাও, আমি আর তোমার দলে নেই। এজন্যে তোমাকে যদি ত্যাগ করতে হয়, তবে সে দুঃখ পেতেও আমি নারাজ নই!'
বরুণ উঠে দাঁড়িয়ে খিল খিল করে হেসে বললে, 'আচ্ছা, তোমার এইসব মূল্যবান যুক্তি নিয়েও পরে আমি রীতিমতো মস্তিষ্ক চালনা করব। আপাতত শান্তি, শান্তি। আজকের সকালটিকে ভারি মিষ্টি বলে মনে হচ্ছে, নয়? এমন সুন্দর প্রভাতে কী করা উচিত বলো দেখি?'
—তুমিই বলো না কী করতে চাও?'
—রক্তপাত!
—রক্তপাত করে শান্তির সাধনা? চমৎকার!
অরুণের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বরুণ হাসিমুখে বললে, 'রক্তের নামেই চমকে যেয়ো না ভায়া! আমি রক্তপাত করব বটে, কিন্তু এ-রক্ত হচ্ছে তোমার কাছেও লোভনীয়!'
—কীরকম?
—খালি ভাত আর মাছ আমার আর সহ্য হচ্ছে না। আজ আমরা দুই বন্ধুতে যদি বন্যকুক্কুটের সন্ধানে যাত্রা করি, তাহলে তোমার আপত্তি আছে কি?
—অরুণ হেসে ফেলে বললে, 'বনমুরগির নাম শুনেই আমার আপত্তি শঙ্করলালের মতোই নিরুদ্দেশই হয়ে গিয়েছে।'
বরুণ বললে, 'চলো, চলো তবে পোশাক পরে বন্দুক নিয়ে বেরিয়ে পড়ি।'
.... .... ....
সত্যই এ সূর্যকরের দ্বীপ। গাঢ় নীলাকাশ থেকে ঝরে পড়ছে যেন সোনালি আলোর ধারা। নদীর ওপারে একটি খোলা মাঠ, তার ওপারে দেখা যাচ্ছে নীল বনের দীর্ঘ রেখা এবং বনের ওপাশে অনেকটা দূরে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বদেবতার অভ্রভেদী বিরাট দেউলের মতন একটি পর্বতশিখর। চারিধার থেকে ভেসে আসছে পাখিদের সুখের গান ও প্রজাপতিদের রঙের ইঙ্গিত।
নদীর পারঘাটে গিয়ে তারা দেখলে, একদল লোক সেখানে দাঁড়িয়ে উত্তেজিত ভাবে কথাবার্তা কইছে এবং একটি নারী করুণ স্বরে কাঁদতে কাঁদতে নষ্ট করে দিচ্ছে এমন শান্ত প্রভাতের সমস্ত সৌন্দর্য।
তাদের দেখেই লোকগুলো ছুটে কাছে এসে দাঁড়াল। বরুণ তাদের চিনলে, কারণ তারা এই অঞ্চলেরই পল্লীবাসী। একজন তার পায়ের কাছে ধপাস করে বসে পড়ে বললে, 'তুয়ান, তুয়ান, আমাদের রক্ষা করুন!'
যে কাঁদছিল সেও আকুল স্বরে বললে, 'তুয়ান, আমার সর্বনাশ হয়েছে!'
বাকি সকলেও নানা ভাবে ও ভঙ্গিতে একসঙ্গেই অভিযোগ করতে লাগল।
বরুণ তাদের কতকটা সংযত করে যা জানতে পারলে তা হচ্ছে এই : নদীর এখানে নাকি একটা বিপুলদেহ কুমির দেখা দিয়েছে। প্রায়ই সে ঘাটের কাছে এসে মানুষ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। আজ সকালেই সে এক স্ত্রীলোকের স্বামীকে ধরে নিয়ে গিয়ে ডুব মেরেছে। তার ভয়ে নদীর জল ব্যবহার করাও অসম্ভব হয়ে উঠেছে। কেউ জলের ধারে পর্যন্ত এসে দাঁড়াতে সাহস করে না। এখন তুয়ান যদি তাদের রক্ষা না করেন, তাহলে তাদের এ অঞ্চল ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনোই উপায় নেই। ইত্যাদি।
বরুণ বললে, 'অরুণ, এখানকার সরল মানুষগুলিকে সমস্ত বিপদে-আপদে সাহায্য করতে চেষ্টা করি বলেই এরা আমাকে এতটা শ্রদ্ধা-ভক্তি করে। কিন্তু জলের কুমির মানুষ মুখে করে পাতালে ডুব মেরেছে, আমি এদের কী সাহায্য করি বলো দেখি?'
অরুণ বললে, 'কুমিরটাকে দেখা গেলেও বন্দুক ছুড়তে পারতুম, কিন্তু তার তো কোনো পাত্তাই নেই!'
বরুণ বললে, 'কিন্তু কুমির দেখা না গেলেও আমাকে একটা উপায় করতেই হবে। এরা জানে আমি হচ্ছি মস্তবড়ো জাদুকর! এদের সে বিশ্বাসকে আমি আহত করতে চাই না।'
অরুণ হেসে বললে, 'কিন্তু কী করতে পারো তুমি? তুমি কি জলে ঝাঁপ দিয়ে ডুব-সাঁতারে পাতালে গিয়ে কুমিরের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে প্রবৃত্ত হবে?'
বরুণ বললে, 'ছিঃ বন্ধু, তুমি কি জানো না আমার এই মস্তিষ্কটি হচ্ছে নব নব দুষ্টুবুদ্ধির আকর? এই দ্যাখো না, কুমিরবাবাজিকে আমি কেমন জব্দ করে দিই!' বলেই সে লোকগুলোকে ডেকে হুকুম দিলে—'শীগগির একখানা নৌকো নিয়ে এসো। কুমিরের হাত থেকে আজই আমি তোমাদের উদ্ধার করব।'
অরুণ হতভম্বের মতন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতে লাগল, লোকগুলি তুয়ান গজের নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে দৌড়ে চলে গেল এবং অনতিবিলম্বেই একখানা বড়ো নৌকা বেয়ে কয়েকজন লোক ঘাটের কাছে নিয়ে এল।
বরুণ বললে, 'এসো বন্ধু, আমরা নৌকোয় গিয়ে আরোহণ করি।'
বরুণের সঙ্গে অরুণ বিনা বাক্যব্যয়ে নৌকায় গিয়ে উঠল। তারপর বরুণের কথায় মাঝিদাঁড়িরা নৌকাখানাকে মাঝনদীর দিকে নিয়ে চলল।
নৌকা যখন নদীর মাঝ-বরাবর এসে পৌঁছেছে, তখন নদীর ধারে সারে সারে এসে দাঁড়িয়েছে শত শত গ্রামবাসী। ভাব-ভঙ্গি তাদের উৎসাহিত, মুখে মুখে তাদের উচ্চ চিৎকার।
অরুণ বললে, 'তুমি যে এতগুলো লোককে ধাপ্পা দিয়ে মাতিয়ে তুললে, এখন কী করে মুখরক্ষা করবে? কোথায় তোমার কুমির? সে এখন জলের তলায় বসে বসে নরমুণ্ড চর্বণ করছে, উপরে আসবার জন্যে তার বয়ে গেছে!'
বরুণ বললে, 'কিন্তু তাকে জলের উপরে আসতেই হবে!'
—কেমন করে? ফুস মন্ত্রে?
বরুণ আর কিছু না বলে নিজের ব্যাগের ভিতর থেকে বার করলে একটি ডিনামাইটের স্টিক, তার সঙ্গে সংলগ্ন রয়েছে একটি সুদীর্ঘ পলিতা! অরুণের দুই চক্ষু বিস্ফারিত হয়ে উঠল।
বরুণ বললে, 'দেখো ভায়া, ডিনামাইটের স্টিকটি এই আমি জলের ভিতরে নিক্ষেপ করলুম, কিন্তু পলতেটি রইল আমার হাতে। তুমি তো জানোই, এই পলতের আগুন জলের ভিতরে গিয়েও নিববে না? তারপর এই দেখো, দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে দিলুম আমি, পলতের মুখে আগুন! অতঃপর কী হয়, দেখা যাক।'
অগ্নি জলের ভিতরে প্রবেশ করে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার কয়েক মুহূর্ত পরেই নদীর ভিতরে জাগল একটা চাপা বিস্ফোরণের অদ্ভুত শব্দ এবং সঙ্গে সঙ্গে নদীর বুকে উথলে উঠল বড়ো বড়ো ঢেউয়ের পর ঢেউ।
হাতের বন্দুকটা উদ্যত করে বরুণ তীক্ষ্ন দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে লাগল সেই উদ্বেলিত নদীর দিকে দিকে। বেশিক্ষণ অপেক্ষাও করতে হল না, একদিকে দেখা গেল শ্বেবতবর্ণ সুদীর্ঘ কী একটা জিনিস নদীর জলে ভেসে উঠেছে।
বরুণ চেঁচিয়ে বললে, 'ওই দেখো অরুণ কুমিরটা চিৎ হয়ে জলের উপরে ভাসছে। ও কেবল স্তম্ভিত কী অচেতন হয়ে গেছে! শীগগির বন্দুক ছোড়ো—জলে ডোববার আগেই ও-দেহের ভিতরে কর অগ্নিবৃষ্টি!'
বরুণ ও অরুণ একসঙ্গে দুইবার করে বন্দুক ছুড়লে! তারপর বরুণ হেঁট হয়ে জলের উপরে ঝুঁকে পড়ে কুমিরের আড়ষ্ট ল্যাজটা টেনে ধরে দাঁড়িদের ডেকে বললে, 'তোমরাও কেউ কেউ এসে আমাকে সাহায্য করো। বাকি সবাই নৌকোখানাকে আবার ঘাটের দিকে নিয়ে চলো।'
নৌকা যখন ঘাটে এসে লাগল তখন আকাশ-বাতাস কেঁপে কেঁপে উঠছে তুয়ান গজের নামে জয়ধ্বনিতে! বিপুল আনন্দের আবেগে অনেকে পাগলের মতন নৃত্য করতে লাগল।
মেপে দেখা গেল, মৃত কুমিরের দেহটা লম্বায় প্রায় বারো হাত।
দশম
ছোটো মাঠ, ছোটো নদীর ধারে
ভোজবাজি দেখিয়ে গ্রামবাসীদের অভিনন্দন লাভ করে বরুণ ও অরুণ আবার এগিয়ে চলল।
মাঠের পরে আরম্ভ হল অরণ্যরাজ্য।
অরুণ চমৎকৃত চক্ষে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললে, 'দেখ বরুণ, এখান থেকে বনকে দেখাচ্ছে কত সুন্দর! পাখির গানের তালে তালে নেচে উঠছে তরুণ শ্যামলতা, ফুলে ফুলে গুঞ্জন করছে মধুকররা, বড়ো বড়ো বনস্পতিকে বেষ্টন করে দুলছে পুষ্পিত লতারা, যেখানে তাকাই সেখান থেকে উঁকি মারছে অর্কিডদের রংমশাল! আর এ-সমস্তরই উপরে স্বচ্ছ সোনার প্রলেপ বুলিয়ে দিচ্ছে শিল্পী সূর্যকর!'
বরুণ বললে, 'কিন্তু একবার এই বনের ভিতরে ঢুকে খানিকটা এগিয়ে যাও, আর কোনো সৌন্দর্য দেখতে পাবে না—তখন তোমাকে ঠেলে চলতে হবে অন্ধকার, মাড়িয়ে চলতে হবে অন্ধকার! এমন ঘন বন পৃথিবীর আর কোথায় আছে? জানি না। কেবল কি অন্ধকার? তার মধ্যে আছে আবার কত ভয়! হাতি আছে, বাঘ আছে, ভাল্লুক আছে, অজগর আর বিষাক্ত সাপ আছে! এইটুকু একটা দ্বীপে যত হিংস্র পশু আছে, সমস্ত ইউরোপ-আমেরিকা খুঁজলেও তা পাওয়া যাবে না! তার উপরে আছে আবার নৃমুণ্ড শিকারি মানুষের দল! অথচ আমাদের এই বনের ভিতরেই ঢুকতে হবে, নইলে আমরা বন্য কুক্কুটের দর্শন পাব না।'
—বনমুরগিরা কি অন্ধকারে বাস করতে ভালোবাসে?
—না! আমি বনের একটা পায়ে-চলা পথের সন্ধান জানি। সেই পথে মাইল দেড়েক এগুলে পর পাব চারিদিকে বন-দিয়ে-ঘেরা একটা ছোটো মাঠ আর একটা ছোটো পাহাড়ে নদী। সেই জায়গাটা হচ্ছে বনমুরগিদের প্রিয় বিচরণক্ষেত্র। চলো, দুর্গা বলে বনের ভিতরে ঢুকে পড়ি।
অরুণ কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে বললে, 'কিন্তু আমি তো বনের ভিতরে ঢোকবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আসিনি। আমি এনেছি একটা পাখিমারা দোনলা বন্দুক। অবশ্য এ বন্দুকেও চলে, সঙ্গে এমন গোটাকয়েক S.S.G. টোটা নিয়ে এসেছি—তার সাহায্যে বড়োজোর ছোটোখাটো জানোয়ারদের বাধা দেওয়া যাবে, কিন্তু কোনো বড়ো জন্তুর সামনে দাঁড়ানো চলবে না!'
বরুণ বললে, 'মাভৈ! আমারও অবস্থা তোমারই মতন! কিন্তু আজ তো আমাদের 'বিগ-গেম' শিকারির ভূমিকায় অভিনয় করতে হবে না! একে দিনের বেলা, তায় আমরা থাকব বনের সীমান্তে, কোনো বাঘ-ভাল্লুক আমাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করতে আসবে না বলেই মনে করি। চলে এসো।'
দুজনে বনের ভিতরে প্রবেশ করলে। প্রথম খানিকক্ষণ গাছপালার ঝিলিমিলির ভিতর দিয়ে আকাশের আলোরেখাগুলো চারিদিক থেকে তাদের উপরে এসে পড়তে লাগল, তারপরেই দেখা গেল দিনের দীপ্তি ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসছে। আরও কিছুক্ষণ পরেই এল সেই চিরসন্ধ্যার রাজত্ব, দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই যার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। তারই মাঝে মাঝে অন্ধকার হয়ে উঠেছে আবার নিরেট কষ্টিপাথরের মতন কালো, সেদিকে তাকালেও দৃষ্টি যেন ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে।
অরুণ বললে, 'বরুণ বনের সীমান্তের অবস্থাই তো দেখছি চূড়ান্ত! তোমার সেই ছোটো মাঠ আর ছোটো নদী আরও কতদূরে আছে?'
বরুণ বললে, 'এই তো আমরা পথের শেষে এসে পড়েছি।'
—একেই কি তুমি পথ নামে ডাকতে চাও? কোথায় যে পথ, কোথায় যে তার ল্যাজা আর কোথায় যে তার মুড়ো, কিছুই আমি উপলব্ধি করতে পারছি না। একে পথ বা বিপথ বা কুপথ বা অ-পথ কোনো নামেই ডাকা চলে না, এ পথই নয়।
বরুণ হেসে বললে, 'বুঝো জন যে জানো সন্ধান! তুমি বনে এসেও শহুরে জীবনকে ভুলতে পারোনি, তাই বনপথের সন্ধান পাওয়া তোমার পক্ষে অসম্ভব। দাঁড়াও, তোমার সামনেই একটি মস্তবড়ো বাঁশঝাড় আছে। দেখতে পাচ্ছ?'
অরুণ বললে. 'আমি দুচোখে দেখছি খালি অন্ধকার।'
—বেশ, তুমি আমার হাত ধরে সঙ্গে সঙ্গে এসো। এই বাঁশঝাড়টা বাঁদিকে রেখে আমাদের ঘুরে যেতে হবে। এই বাঁশঝাড় পর্যন্ত এসেই পথ শেষ হয়ে গিয়েছে। কই, আমার হাত ধরলে না?
অরুণ কাতর স্বরে বললে, 'তোমার হাত ধরবার আগে আমি আর এক আক্রমণকারীর হাত ছাড়াবার চেষ্টা করছি।'
বরুণ আশ্চর্য হয়ে বললে, 'তার মানে? তুমি আবার কার হাত ছাড়াবার চেষ্টা করছ হে?'
—একটা কাঁটাঝোপের! অন্ধের মতো আমি তার উপরে গিয়ে পড়েছি, আর সেও আমাকে চারিদিক থেকে আলিঙ্গন করে ধরেছে।
বরুণ টর্চের আলো ফেলে দেখলে অরুণের জামা ও কাপড় একটা কাঁটাঝোপের কবলগত হয়েছে। সে অনেক কষ্টে তাকে কাঁটাঝোপের আলিঙ্গন থেকে মুক্ত করে নিয়ে বললে, 'তোমার হাতে, পায়ে, গায়েও যে কাঁটা বিঁধে গেছে দেখছি! আচ্ছা, তুমি ততক্ষণ এইখানে দাঁড়িয়ে টর্চের আলোতে কাঁটাগুলো উৎপাটন করো, আমি একবার ওদিকটায় উঁকি মেরে আসি।'
অরুণ অভিযোগের স্বরে বললে, 'তোমার সঙ্গে টর্চ আছে তো এতক্ষণ জ্বালোনি কেন? তাহলে তো আমার এ-দুর্দশা হত না!'
বরুণ বললে 'আমি ভেবেছিলুম, তুমিও আমার মতন চক্ষুষ্মান!'
—চুলোয় যাক তোমার চক্ষু আর তোমার বনের পথ আর তোমার বনমুরগি! আর আমি এখান থেকে 'পাদমেকং ন গচ্ছামি'!
বরুণ কৃত্রিম বিস্ময় ভরে বললে, 'অপরংবা কিং ভবিষ্যতি! আমার বন্ধু অরুণ কিনা আজ তুচ্ছ কাঁটার ঘায়ে বন্যকুক্কটের মহিমা ভুলে গেল! এর পরেও কি বলতে ইচ্ছা হয় না, ভগবতী বসুন্ধরে, তুমি দ্বিধাবিভক্ত হও?'
অরুণ খাপ্পা হয়ে বললে, 'যাও যাও আর ঠাট্টা করতে হবে না!'
—আচ্ছা ভাই, আমি যাচ্ছি। কাঁটাগুলো তুলে ফেলে টর্চ জ্বেলে আধ-মিনিট সোজা এগুলেই তুমি এই বনের অন্ধকার-প্রাচীর ভেদ করতে পারবে। ততক্ষণে আমি দেখে আসি আমার প্রিয় বনমুরগিরা নদীর ধারে খোলা মাঠে বসে কী করছে! তাদের চোখ ভরে দেখবার জন্যে আমার আর তর সইছে না! বলতে বলতে বরুণ পায়ে পায়ে অগ্রসর হল এবং দেখতে দেখতে শুকনো পাতার উপরে ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে মিলিয়ে গেল তার পায়ের শব্দ।
অরুণের দেহের অবস্থা হয়েছে অত্যন্ত করুণ। তার গায়ে এতগুলো কাঁটা বিঁধেছে যে তাকে এখন মানুষ শজারু বললেও অত্যুক্তি হবে না। শরশয্যায় শুয়েও পিতামহ ভীষ্মের অঙ্গে এতগুলো ছিদ্রের সৃষ্টি হয়নি। থেকে থেকে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করতে করতে ও কাঁটা তুলতে তুলতে তার বেশ খানিকক্ষণ কেটে গেল। তারপর তার দেহ যখন কণ্টকমুক্ত হল তখন তার সর্বাঙ্গ রীতিমতো রক্তাক্ত। মুখ টিপে একটুখানি হেসে সে নিজের মনেই বললে, 'বরুণ বলেছিল, আজকের এই সুন্দর প্রভাতে তার রক্তপাত করবার সাধ হয়েছে! তা আজ বেশ রক্তপাতই হল বটে-বনমুরগির না হোক, অন্তত আমার...কিন্তু বরুণের আর কোনো সাড়া-শব্দ নেই কেন? বনমুরগিদের দেখে সে একেবারে ধ্যানস্থ হয়ে পড়ল নাকি? এগিয়ে দেখতে হল তো!'
সামনের দিকে টর্চের আলোকরেখা ফেলে অরুণ সবে কয়েক পদ অগ্রসর হয়েছে, এমন সময় বন্দুকের প্রচণ্ড গর্জনে সে একেবারে চমকে উঠল—বেশ বুঝলে কে একসঙ্গে বন্দুকের দুটো ব্যারেলই খালি করে দিলে এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা ভয়ংকর চিৎকার বা হুংকার! সেরকম বীভৎস চিৎকার অরুণ জীবনে আর কখনও শ্রবণ করেনি—সে চিৎকার যে কোন ভয়াবহ জীবের তাও সে আন্দাজ করতে পারলে না।
সে কয়েক মুহূর্তে স্তম্ভিত ও আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। তারপরেই শুনতে পেলে কে যেন সশব্দে ঝোপের পর ঝোপ দুলিয়ে এবং মড়মড় করে গাছের সব ডাল ভাঙতে ভাঙতে পৃথিবীর মাটি কাঁপিয়ে দূরে চলে গেল!
তখন তার সাড় হল। সে প্রাণপণে চেঁচিয়ে ডাকলে, 'বরুণ! বরুণ! বরুণ!'
কেউ সাড়া দিলে না। বরুণ বলে গেল সে আধমিনিটের বেশি এগিয়ে যাবে না। সে যদি এতই কাছে থাকে, তবে সাড়া দিচ্ছে না কেন?
সে আবার ডাকলে, 'বরুণ! বরুণ! তুমি কোথায় আছ? সাড়া দাও!'
উত্তরে কারুর কণ্ঠস্বরই সেই অন্ধকার বনের নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করলে না।
উৎকণ্ঠায় অরুণের হৃৎপিণ্ড যেন ধড়ফড় করে উঠল। সে আর ডাকাডাকি না করে প্রথমে নিজের দোনলা বন্দুকের ভিতরে দুটো S.S.G টোটা ভরে নিলে। তারপর ডান হাতে বন্দুকের কুঁদোটা বগলদাবা করে ও বামহাতে টর্চের আলোটা সামনে ফেলে পরম সাবধানে অগ্রসর হল এদিকে-ওদিকে তাকাতে তাকাতে।
চারিদিকে ঘোর জঙ্গল। পথের অস্তিত্ব দেখবার মতো দৃষ্টি তার নাকি নেই। কোথাও দু-দিক থেকে হেলে-পড়া মাথার উপরকার কাঁটাঝোপের তীক্ষ্ন স্পর্শ থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যে হামাগুড়ি দিয়ে এবং কোথাও কোনো সাধারণ ঝোপ ভেদ করে খানিকক্ষণ অগ্রসর হয়ে হঠাৎ সে যেখানটায় এসে পড়ল সেখানে গাছ বা ঝোপ বা অন্ধকারের কোনো বাধাই আর নেই।
প্রখর একটা সূর্যালোকের দীপ্তি যেন তার চক্ষের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল, এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে অত্যন্ত বিস্মিতভাবে সে দেখলে, সামনেই পড়ে আছে একটি তৃণশ্যামল ছোটো মাঠ এবং তারই একপাশ দিয়ে রবিকিরণের চিকমিকে হীরার হার বুনতে বুনতে বয়ে যাচ্ছে একটি তটিনী। তারই ওপার থেকে আবার আরম্ভ হয়েছে মস্তবড়ো আর একটা অরণ্যদুর্গ এবং দূরে— বহুদূরে আকাশ ও পৃথিবীর মিলনরেখা আবৃত করে অনন্তের স্বপ্ন দেখছে একটি বৃহৎ পর্বত!
তারপরেই অরুণের চোখে পড়ল আর একটা দৃশ্য। মাঠের উপরে শূন্যপথ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে অনেকগুলো বড়ো বড়ো পাখি। তাদের ওড়বার ধরন দেখেই অরুণের বুঝতে বিলম্ব হল না যে, তারাই হচ্ছে বরুণের সেই কুক্কুটের দল। মাঠ ছেড়ে তারা আকাশে উড়েছে নিশ্চয়ই বন্দুকের ডবল ব্যারেলের গর্জন শুনে ভয় পেয়ে।
কিন্তু বরুণ কোথায়? বনমুরগিরা আকাশে উড়ে গিয়েছে, মাঠে জনপ্রাণীর ছায়া নেই।
অরুণ আবার পিছন ফিরে জঙ্গলের দিকে তাকালে। সেই মহাবনের গাছপালার ভিতরে আর কোনো চঞ্চলতাই নেই— এমনকি একটা পাখির ডাক পর্যন্ত সেখানে শোনা যাচ্ছে না। অরুণ আবার চিৎকার করলে, 'বরুণ! বরুণ!' স্থির অরণ্য, স্তব্ধ চতুর্দিক।
আচম্বিতে অরুণের চোখ পড়ল নীচের দিকে। মাটি ও শুকনো পাতার উপরে রয়েছে টকটকে রাঙা টাটকা রক্তের ভয়াবহ প্রলেপ! অরুণ শিউরে উঠে ভাবলে, আমার বন্ধু বরুণ কোথায় গেল? এ কার রক্ত? কে বন্দুক ছুড়লে? কে অমন ভয়ানক চিৎকার আর হুংকার করলে? সশব্দে ঝোপ দুলিয়ে গাছের ডাল ভাঙতে ভাঙতে বনের আঁধারে কে কোথায় মিলিয়ে গেল? কে সে? কে সে? বরুণ? না আর কেউ?
তার সমস্ত অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠতে চাইলে। কিন্তু সে অনেক কষ্টে আত্মসংযম করে নিজের মনে মনেই বললে, এ হচ্ছে সর্বনাশের স্বদেশ, মৃত্যুই হচ্ছে এখানকার মহারাজা! এখানে হতাশভাবে নারীর মতন হাহাকার করা আর আত্মহত্যা করা একই কথা!
তারপরে এদিকে-ওদিকে তাকাতে তাকাতে অরুণ লক্ষ করলে, সামনেকার একটা গাছের নীচের দিকের ডাল টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ে রয়েছে। একটা ভাঙা ডাল সে হাতে করে তুলে নিয়ে পরীক্ষা করে দেখে বুঝলে, এ ডাল সদ্যই ভাঙা হয়েছে। আর এরকম ডাল যে ভাঙতে পারে সে মত্ত হস্তীরও চেয়ে কম ক্ষমতাশালী নয়।
তারপরেই আরও লক্ষ করলে, এখান দিয়ে সামনের ঝোপঝাপ উৎপাটন করতে করতে এবং মাথার উপরকার গাছের ডাল ভাঙতে ভাঙতে কোনো আশ্চর্য অতিকায় জীব যেন নিজের চলবার পথ তৈরি করে নিয়ে গভীর বনের ভিতরে প্রবেশ করেছে।
অরুণ আবার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ চিন্তা করলে : কোনো অভাবিত জীব এমন অনায়াসে এত বড়ো বড়ো গাছের ডাল ভাঙতে ভাঙতে এই নিবিড় অরণ্যের ভিতর দিয়ে নিজের পথ তৈরি করে নিয়েছে? খুব সম্ভব তার বন্ধুই বন্দুক ছুড়েছে, কিন্তু এ-রক্ত কার? তার বন্ধুর না আর কোনো ভয়াবহ জীবের? কিন্তু তার বন্ধু এখানে নেই কেন? সে তার এত ডাকেও সাড়া দিচ্ছে না কেন? তবে কি তার বন্ধু বরুণ আর ইহলোকে বর্তমান নেই?'
ছিন্নভিন্ন ঝোপ ও ভাঙা ডালপালা ছড়ানো মাটির উপর দিয়ে তিন-চার পা অগ্রসর হয়েই অরুণ সভয়ে দেখলে, একটা বন্দুক দুই-খণ্ডে বিভক্ত হয়ে মাটির উপরে পড়ে রয়েছে! অরুণের চিনতে বিলম্ব হল না, এ-বন্দুক তারই বন্ধুর!
বুঝেই প্রথমটা তার মাথা ঘুরে গেল। একটা গাছের উপরে ঠেস দিয়ে সে কোনোরকমে নিজেকে মাটির উপরে পতন থেকে রক্ষা করলে। তারপর আত্মসংবরণ করে সেই ছেঁড়া ঝোপ আর ভাঙা ডালপালা ছড়ানো পথ দিয়ে অগ্রসর হতে হতে তীক্ষ্নদৃষ্টিতে লক্ষ করতে লাগল, কোথাও বরুণের দেহ অচেতন বা মৃত অবস্থায় পড়ে আছে কিনা।
সামনেই হঠাৎ একটা বিষাক্ত সর্প ফণা ধরে ফোঁস করে উঠল। কিন্তু অরুণ তখন উন্মত্ত! তার বন্দুকের কুঁদোর এক আঘাতেই সেই ফণাধারী সর্পের মস্তক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল এবং সে তার লটপটে দেহটা অনায়াসে দুপায়ে মাড়িয়ে সামনের দিকে ছুটে অগ্রসর হতে লাগল।
ছিন্নভিন্ন ঝোপ, আর গাছের ভাঙা ডালপালা! এই হল অরুণের পথের নিদর্শন! অরুণ বুঝলে, বরুণের দেহ এবং তার শত্রু যখন এখানে নেই, তখন এই পথ দিয়েই তার বন্ধুর মৃত বা জীবন্ত দেহ নিয়ে কোনো অজ্ঞাত শত্রু অরণ্যের অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করেছে।
অরুণ প্রতিজ্ঞা করলে, সে বরুণের মৃত বা জীবন্ত দেহকে উদ্ধার করবে এবং সেই সঙ্গে তার যে-কোনো শত্রুকে সামনে পাবে, তাকে দেখবামাত্রই হত্যা করবে! এ প্রতিজ্ঞা রক্ষার জন্যে যদি তাকে আত্মবিসর্জন দিতে হয়, তাতেও তার কিছুমাত্র আপত্তি নেই। কারণ, বরুণ নেই যে-পৃথিবীতে সে-পৃথিবী হচ্ছে অরুণের পক্ষে মরুভূমির মতো!
একাদশ
ভয়াবহ অভিনয়
বিচিত্র এক নাটকীয় দৃশ্যের অভিনয় হচ্ছে।
দৃশ্যপটের দিকে তাকালে দেখা যাবে— বনের ভিতরেই আধা আলো আধা ছায়ামাখা একটুখানি জায়গা, লম্বায়-চওড়ায় তিরিশ-চল্লিশ হাত। তার চারিদিকেই যুগযুগান্তরের প্রাচীন বনস্পতির ভিড়। প্রত্যেক বৃক্ষই এমন প্রকাণ্ড ও এমন সুদীর্ঘ পত্রবহুল বাহু বিস্তার করে দাঁড়িয়ে আছে যে, মাথার উপরকার আকাশ প্রায় অদৃশ্য বললেই চলে। এবং প্রত্যেক গাছের তলায় ও ফাঁকে ফাঁকে ছোটো বড়ো ঝোপঝাপ ও র্যাট্যান বেতের জঙ্গল মিলে সৃষ্টি করেছে একটি স্বাভাবিক ও দুর্ভেদ্য প্রাচীর।
একটা বড়ো গাছের ছায়া যেখানটায় অন্ধকার আরও বেশি নিবিড় করে তুলেছে, সেইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জটলা করছে জন ছয়-সাত মালয়দেশীয় লোক। তাদের দিকে ভালো করে লক্ষ করলে বোঝা যায়, দলের একজন লোক যদিও মালয়দেশীয় পোশাক পরে আছে, কিন্তু আসলে সে হচ্ছে বিদেশি। লোকটার চেহারা রীতিমতো লম্বা-চওড়া এবং তার দেহও হচ্ছে অতিশয় পেশীবহুল, বলিষ্ঠ। তার ভাবভঙ্গির ভিতর দিয়েও ফুটে উঠছে একটা পাশবিক শক্তির ভয়াল উচ্ছ্বাস।
তাদের পায়ের তলায় মাটির লম্বা লম্বা বুনো ঘাসের উপরে পড়ে আছে একটা অচেতন ও সুবৃহৎ মানুষের দেহ। সকলেই সাগ্রহে তাকিয়ে ছিল সেই অচেতন দেহের দিকে।
সেই বিপুলবপু লোকটি বললে, 'মনে হয় একে যেন কোথায় দেখেছি, কিন্তু চিনতে পারছি না।'
সঙ্গীদের একজন জবাব দিলে, 'তুয়ান, একে আমরা দেখেছি তিন-চার দিন আগেই। এ ব্যাটা হচ্ছে সেই নৌকোর মাঝি।'
বিপুলবপু বললে, 'আর দুর, এ-যে সেই মাঝি তা আমিও জানি! কিন্তু মনে হচ্ছে আমি একে দেখেছি আরও অনেক দিন আগে। কিন্তু কোথায়, কবে, কী সূত্রে সেসব কিছুই স্মরণ করতে পারছি না।'
—একে সবাই এখানে তুয়ান গজ বলে ডাকে। আমরা জানি আপনার মতো এও এদেশের লোক নয়।
—এদেশের লোক নয়! আমার সন্দেহ যে আরও বেড়ে উঠল!
এমনি সময়ে সেই ভূতলশায়ী দেহটির উপরে অল্প অল্প চেতনার লক্ষণ ফুটে উঠল। আর বোধহয় বলে দিতে হবে না যে এই লোকটি আমাদের বরুণ ছাড়া অন্য কেউ নয়।
বিপুলবপু বললে, 'ওরে, এর জ্ঞান হয়েছে! শীগগির এর হাত-পা বেঁধে ফ্যাল।'
দুজন লোক তাড়াতাড়ি দুগাছা দড়ি দিয়ে বরুণের দুই হাত ও দুই পা শক্ত করে বেঁধে ফেললে।
বরুণ কাতর, অর্ধ আচ্ছন্ন কণ্ঠে বললে, 'অরুণ, অরুণ!'
বিপুলবপু সবিস্ময়ে বলে উঠল, 'আরে, ব্যাটা যে বাংলা বুলি বলে! অরুণ, অরুণ বলে কাকে ডাকছে? কে অরুণ? ওটাও তো বাংলা নাম!' বিস্ফারিত চক্ষে খানিকক্ষণ সে বরুণের মুখের পানে তাকিয়ে রইল, তারপর হঠাৎ সচকিত কণ্ঠে চেঁচিয়ে বললে, 'চিনেছি, চিনেছি! যে শিকারের তল্লাশে আমি এতদূর ছুটে এসেছি, এ হচ্ছে সেই দীনুডাকাত নিজেই! অরুণ হচ্ছে দীনুর এক বন্ধুর নাম! জয় মা কালী! এ যে মেঘ না চাইতে জল!'
বরুণ তখন প্রশান্ত চোখে বিপুলবপুর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। বিপুলবপু চিবিয়ে চিবিয়ে বললে, 'কী হে দীনু, আমাকে চিনতে পার?'
মৃদু হাসি হেসে বরুণ বললে, 'পুরোনো বন্ধুকে কি ভোলা যায়? তুমি হচ্ছ শ্রীহীন শঙ্করলাল। তুমি হচ্ছ সরকারের ভক্ত প্রজা। সরকার হুকুম দিয়েছে তোমাকে দ্বীপান্তরে বাস করতে, তাই তুমি এসেছ এই বোর্নিয়ো দ্বীপে।'
হো হো করে হেসে উঠে শঙ্করলাল বললে, 'আমাকে ভোলোনি দেখে খুশি হলুম। কিন্তু সত্যি বলছি বাঙালিবাবু, প্রথমটা তুমি আমার চোখকেও ফাঁকি দিয়েছিলে। দিব্যি সেজেছ যা হোক, বলিহারি! আমি দীনুডাকাতকে ধরবার জন্যে আজ ফাঁদ পাতিনি! বোর্নিয়োর সামান্য একটা মাঝি আমাকে বন্দি করবার চেষ্টা করলে কেন, সেইটে বোঝবার জন্যেই তোমাকে আজ গ্রেপ্তার করেছি। তুচ্ছ একটা কেঁচো খুঁজতে গিয়ে আমি যে এমন একটা অজগর সাপ শিকার করতে পারব, একথা আগে কে জানত? খুব আমার বরাতজোর, কী বলো?'
বরুণ বললে, 'হ্যাঁ, শঙ্করলাল, তোমার অদ্ভুত সৌভাগ্য দেখে আমারই মনে হিংসার উদয় হচ্ছে। নাকুর বদলে নরুন পেলুম তাক-দুমা-দুম-দুম!'
—আবার মশকরা করা হচ্ছে?
—ভায়া, পুরোনো স্যাঙাতের সঙ্গে মশকরা করাই তো উচিত। তুমিও তো আমার সঙ্গে আজ কম ঠাট্টাটা করনি।
—আমি আবার তোমার সঙ্গে কী ঠাট্টা করলুম?
—এই যে আজ আমাকে বনমুরগির ঝোল খেতে দিলে না, চুপিচুপি যমদূত পাঠিয়ে ধরে আনলে, এখন আবার আদর করে হাত-পা বেঁধে ফেলে রেখেছ, এসব ঠাট্টা নয় তো কী বলব দাদা?
—তুই কি এসব ঠাট্টা বলে মনে করছিস?
—আরে আরে, এত তাড়াতাড়ি নিজের স্বভাবের পরিচয় দিতে শুরু করলে কেন?
—মানে?
—হচ্ছিল ভদ্রলোকের মতন কথা, হঠাৎ তুই-মুই ধরলে কেন?
—তুই কী ভাবছিস, তোর সঙ্গে আমি আজ্ঞে, আপনি, হুজুর বলে কথা কইব?
—ঠিক দাদা, ঠিক! আমারই বোঝবার ভুল হয়েছে। তুমি যে বেশিক্ষণ ভদ্রলোকের মতন কথা কইতে পারবে না, এটা আমার জানা উচিত ছিল।
—আমাকে আবার ছোটোলোক বলে গালাগাল দেওয়া হচ্ছে? তোর মুখে থুতু দিই— বলেই শঙ্করলাল বরুণের মুখের উপরে নিষ্ঠীবন ত্যাগ করলে সজোরে।
বরুণের মুখে কোনোরকম ভাবান্তর হল না। তেমনই হাসতে হাসতেই সে বললে, 'লোকের গায়ে থুতু দেয় শিশুরা। তোমাকেও আমি শিশু বলেই ক্ষমা করছি।'
—আমাকে তুই ক্ষমা করবি? সিংহকে ক্ষমা করবে ভেড়ার বাচ্চা? হাসালে দেখছি।
—হেসো না শঙ্করলাল হেসো না। হাসি মানায় না তোমার চাঁদমুখে।
শঙ্করলাল অবরুদ্ধ ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে বললে, 'দ্যাখ দীনুডাকু, তোর হাসি-ঠাট্টা রেখে দে। জানিস আমি কে?'
—আমার যম!
হঠাৎ চিৎকার করে শঙ্করলাল বলে উঠল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ, ঠিক তাই! তোর সামনে আমি মূর্তিমান যমই বটে! আজ আমার বহুদিনের বাসনা পূর্ণ হবে! তোকে বারবার ধরেছি, তুই বারবার আমার হাত ছাড়িয়ে পালিয়ে গিয়েছিস! কিন্তু আমি জানি, শেষপর্যন্ত আমাকে ঠকিয়ে তুই কখনোই পালাতে পারবি না— দুনিয়ার যেখানে যাবি, নলরাজার পিছনে শনির মতো আমি থাকব তোর পিছনে পিছনে। মা কালীর কৃপায় আজ আমার প্রতিশোধ নেবার দিন এসেছে! আজ তোর আসন্নকাল উপস্থিত, এখন হাসি-মশকরা ভুলে, হরিনাম কর!'
বরুণ বললে, 'তোমার সামনে কেমন করে হরিনাম করব শঙ্করলাল? তোমাকে দেখলেই হরিভক্তি উড়ে যায় যে!'
শঙ্করলাল হুংকার দিয়ে বলে উঠল, 'ফের ঠাট্টা? নাঃ, আর সহ্য হচ্ছে না! একটা হেস্তনেস্ত করেই ফেলি! ওরে, একে ধরে দাঁড় করিয়ে দে তো!'
দুজন লোক দুদিক থেকে ধরে বরুণকে তুলে মাটির উপরে দাঁড় করিয়ে দিলে।
শঙ্করলাল বললে, 'মা কালীর কাছে দুটো বলি নিবেদন করেছি। আজ হবে প্রথম নরবলি!'
বরুণ তখনও হাসছে। বললে, 'দ্বিতীয় নরটি কে শঙ্করলাল?'
—পুলিশের প্রশান্ত চৌধুরী!
—তাকে বলি দিয়ে কী সুখ পাবে?
—তাকে বলি দেব না? সে ব্যাটা এখানেও এসেছে আমাকে ধরতে! হাতি ঘোড়া গেল তল, ভেড়া বলে কত জল! বড়ো বড়ো হোমরা-চোমরাদের গোঁফ কামিয়ে দিলুম, আর সেই খুদে-পিঁপড়ে চায় কিনা আমাকে কামড়াতে? তোর পরেই আসবে তার পালা!
—বেশ তো, তাহলে একটু তাড়াতাড়ি আজকের পালাটা শেষ করে দাও না কেন?
উৎকট আনন্দে অট্টহাসি হাসতে হাসতে শঙ্করলাল বললে, 'তাড়াতাড়ি শেষ করে দেব? না, তাড়াতাড়ি আমি শেষ করব না! আমি তোকে মারব একটু একটু করে জিরিয়ে জিরিয়ে। তবেই তো খেলা জমবে ভালো!'
—বেশ, তাহলে খেলাটা আরম্ভ করে দাও না!
শঙ্করলাল আশ্চর্য হয়ে বললে, 'দীনু, এখনও তোর ভয় হচ্ছে না'!
এইবারে দীনু হাসলে হা হা অট্টহাসি। তারপর বললে, 'নির্বোধ, সামান্য পতঙ্গরা আগুনে পুড়ে মরতে ভয় পায় না, আর মানুষ হয়েও মরতে আমি ভয় পাব কেন? মরতে ভয় পায় অমানুষরা, মরতে ভয় পায় কাপুরুষরা, মরতে ভয় পাবে তোমরা! আমি মরব হাসিমুখে!'
শঙ্করলাল তীব্র কণ্ঠে বললে, 'দেখ না, তোর হাসিমুখকে আজ আমি কাঁদিয়ে ছাড়ি কিনা!'
—বেশ, সেই চেষ্টা করে দেখো। আমি প্রস্তুত।
শঙ্করলাল বললে, 'আমি তোকে কেমন করে মারব সেটাও শুনে রাখ। আমি প্রথমেই কেটে নেব তোর ডান হাতখানা।'
—তারপর?
—তার পাঁচ মিনিট পরে তোর ডান আর বাঁ কান, তারপর তোর নাক।
—বলে যাও ভায়া, বলে যাও।
—তার পাঁচ মিনিট পরে তোর বাঁহাত যাবে উড়ে। এমনি ভাবেই থেমে থেমে একে একে তোর পা-দুখানা কেটে নিয়ে আমরা করব রক্তারক্তির খেলা। কিন্তু তোর মুণ্ডটা আমরা কাটব না।
—এতটা দয়া কেন?
—দয়া নয় রে হনুমান, দয়া নয়! মুণ্ডু কাটলে তো তুই তখুনি মরে যাবি! তোর হাত-পা কাটা দেহটা এইখানে পড়ে পড়ে তিলে তিলে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে থাকবে আর আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দিতে দিতে দেখব সেই সুখের দৃশ্যটা। বুঝেছিস?
—বুঝেছি। তাহলে শুভকার্যটা আরম্ভ করে দাও।
—তোর আপত্তি নেই?
—একটুও না।
—তবু তুই হাসি থামাবি না? দেখি, তোর হাসি থামাতে পারি কিনা।
বরুণ এইবারে আরও জোরে খিলখিল করে হাসতে লাগল।
শঙ্করলাল দুই চোখ পাকিয়ে কুস্তিগিরের মতন পাঁয়তারা কষতে কষতে বললে, 'আমার গা জ্বলে যাচ্ছে তোর হাসি দেখে— মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাব— ভয় হচ্ছে রাগ সামলাতে না পেরে শেষটা হয়তো গলা টিপেই তোকে বধ করে ফেলব! ওরে, একজন প্যারাং নিয়ে এদিকে এগিয়ে আয় তো, আর দেরি নয়— কাজ আরম্ভ করে দে!'
আগেই বলা হয়েছে প্যারাং হচ্ছে একরকম বড়ো ছুরি। আসলে তাকে ছোটো তরবারি বলাও যায়।
প্যারাং নিয়ে একজন লোক বরুণের সামনে এসে দাঁড়িয়ে শঙ্করলালের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলে, 'এইবারে কী করব তুয়ান?'
—ঘ্যাঁচ করে ওর ডান হাতখানা কেটে নে!
ফুরুল না তখনও বরুণের হাসির ফোয়ারা। ঘাতক শূন্যে তুলে ধরলে তার শানিত অস্ত্র—
—এবং সেই মুহূর্তে গর্জন করে উঠল কার বন্দুক! বিকট আর্তনাদ করে ঘাতক লুটিয়ে পড়ল মাটির উপরে। দু-একবার কাটা-পাঁঠার মতন ছটফট করে তার দেহটা স্থির, আড়ষ্ট হয়ে গেল।
দ্বাদশ
বিভীষণের আবির্ভাব
এক লাফে ফিরে দাঁড়িয়ে শঙ্করলাল দেখলে, পিছনকার একটা বড়ো ঝোপ ভেদ করে আবির্ভূত হয়েছে দশ-এগারোটা মনুষ্যমূর্তি! অসম্ভব বিস্ময়ে তার দুই চক্ষু হয়ে উঠল ছানাবড়ার মতো।
আগন্তুকদের প্রত্যেকেরই হাতে একটা করে বন্দুক। একজনের বন্দুকের নল থেকে তখনও ধোঁয়া বেরিয়ে আসছিল। প্রশান্ত। সে কঠিন স্বরে চিৎকার করে বললে, 'সকলেই মাথার উপরে হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকো। কেউ একটু নড়লেই গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেব।'
শঙ্করলাল ও তার দলের প্রত্যেকেই উপলব্ধি করলে, এ কথাগুলো মিথ্যা শাসানি নয়। তারা মাথার উপরে হাত তুললে বিনা বাক্যব্যয়ে।
বরুণের মুখের হাসি তখনও অদৃশ্য হয়নি। সে বললে, 'আমাকে মাপ করবেন প্রশান্তবাবু! দেখতেই পাচ্ছেন, আমার দুটো হাতই বাঁধা?'
প্রশান্ত কোনো জবাব না দিয়ে কেবল একটু হাসলে। তারপর নিজের সঙ্গীদের দিকে ফিরে ইঙ্গিত করলে। তারা সকলেই অগ্রসর হয়ে শঙ্করলাল ও তার দলের লোকদের পিছন দিকে গিয়ে বন্দুক তুলে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর প্রশান্ত নিজে গিয়ে দাঁড়াল বরুণের সামনে। সহাস্যে বললে, 'আসুন বরুণবাবু, আগে আপনাকে বন্ধনমুক্ত করি।'
বরুণের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে দিয়ে সে বললে, 'এইবারে আমাকে দ্বিতীয় কর্তব্য পালন করতে হবে। ওহে, তোমাদের কেউ এগিয়ে গিয়ে এই হতভাগাদের হাতে হাতকড়ি পরিয়ে দাও তো।'
যখন তার কথামতো কাজ করা হল, তখন বরুণ বললে, 'প্রশান্তবাবু, এবারে আমার জীবন রক্ষা করে আপনি খুব তাড়াতাড়ি কৃতজ্ঞতার ঋণ শোধ করে ফেললেন দেখছি! অতঃপর আমার কী ব্যবস্থা করবেন? এক ঢিলেই দুই পাখি মারবেন নাকি?'
প্রশান্ত বললে, 'মানে?'
—শঙ্করলালের সঙ্গে কি দীনুডাকাতকেও নিয়ে আপনি ভারতবর্ষের দিকে ধাবমান হতে চান?
প্রশান্ত জিভ কেটে বললে, 'ছিঃ বরুণবাবু, শয়তানকে আপনি অত বেশি কালো করে আঁকতে চান কেন? আপনাকে গ্রেপ্তার করবার ওয়ারেন্ট আমার কাছে নেই। আমি অনধিকার চর্চা করব না।'
বরুণ বললে, 'শুনে আশ্বস্ত হলুম। আমি ভাবছিলুম, তপ্ত কড়া থেকে জ্বলন্ত উনুনে গিয়ে পড়লুম বুঝি? যাক, ও-দুশ্চিন্তা যখন দূর হল তখন আপনাকে দু-একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?'
—জিজ্ঞাসা করুন।
—আপনি আজকের ঘটনাস্থলের সন্ধান পেলেন কেমন করে?
—সন্ধান আমি পাইনি, সন্ধান দিয়েছেন ভগবান!
—কীরকম?
—এই গোলকধাঁধার মতন বনের ভিতরে পথ হারিয়ে কাল থেকে আমরা অন্ধের মতন ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম। ঘুরতে ঘুরতে দৈবগতিকেই এখানে এসে পড়েছি।
—বড়োই ভালো কাজ করেছেন মশাই, বড়োই ভালো কাজ করেছেন! আপনি দয়া করে পথ না হারালে এতক্ষণে হয়তো আমার আত্মার সঙ্গে দেহের কোনো সম্পর্কই থাকত না। পথ হারিয়ে আপনি যে শুধু আমারই প্রাণরক্ষা করলেন তা নয়, সেই সঙ্গে নিজেরও কার্যোদ্ধার করবার মস্ত-এক সুযোগ পেয়ে গেলেন। আপনি পথ না হারালে শঙ্করলালকে আজ গ্রেপ্তার করতে পারতেন না।
প্রশান্ত একগাল হেসে বললে, 'সবই ভগবানের দয়া বরুণবাবু! অসাধুকে শাস্তি দেওয়া আর সাধুকে রক্ষা করা হচ্ছে তাঁরই কাজ। কিন্তু শঙ্করলাল আপনাকে বন্দি করলে কী করে?'
—যেভাবে বনের ভিতরে সে আপনাকে বন্দি করেছিল, ঠিক সেই ভাবেই।
প্রশান্ত শিউরে উঠে বললে, 'বলেন কী? কোথায় সেই ভয়ংকর শত্রু?'
—জানি না।
—আপনি তাকে দেখেছেন?
—হ্যাঁ।
—কে সে?
—শঙ্করলালকেই জিজ্ঞাসা করুন না!
প্রশান্ত ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, 'এই শঙ্করলাল! কাকে লেলিয়ে দিয়ে তুই বরুণবাবুকে ধরে এনেছিস?'
শঙ্করলাল তখন একটা হেলেপড়া গাছের গুঁড়ির উপরে পা ঝুলিয়ে বসে ছিল। প্রশান্তের কথায় সে জবাব দিলে না। নিজের মনেই হঠাৎ শিস দিতে শুরু করলে।
প্রশান্ত রুক্ষ স্বরে বললে, 'হঠাৎ তোর শিস দেবার শখ হল কেন রে? এইবারে গান-টান ধরবি নাকি?'
—তা ধরতে পারি বই কি!
—হাতকড়ি পরে তোর শিস দেবার ইচ্ছেও হচ্ছে?
—কেন হবে না?
—আজ বুঝি তোর ভারি আনন্দের দিন?
—মরতে বসে দীনু যখন হাসতে পারে, হাতকড়ি পরে আমিও-বা শিস দিতে পারব না কেন?
—ও, আমাদের সামনে বাহাদুরি দেখানো হচ্ছে? বরুণবাবুকে তুই নিজের সমকক্ষ বলে মনে করিস নাকি?
শঙ্করলাল সে প্রশ্ন যেন কানেই তুললে না। নিজের মনেই শিস দিতে লাগল। তার শিসের আওয়াজ ক্রমেই হয়ে উঠল উচ্চতর।
বরুণ সন্ধিগ্ধ কণ্ঠে বললে, 'প্রশান্তবাবু, এখনি ওর শিস বন্ধ করবার ব্যবস্থা করুন!'
—কেন বলুন দেখি?
—আমার মনে হচ্ছে, ও শিস দিচ্ছে বিশেষ কোনো কারণে।
—মানে?
—ওর শিস হয়তো সংকেতধ্বনি।
উত্তরে প্রশান্ত কী বলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ আবার উপর-উপরি দুইবার বন্দুকের শব্দে চারিদিক কেঁপে উঠল এবং পরমুহূর্তেই একটা অতিকায় কৃষ্ণবর্ণ জীব উপর থেকে বিষম শব্দে মাটির উপরে পড়ে কাঁপিয়ে তুললে পৃথিবীর বুক।
বরুণ বিদ্যুতের মতন হাত চালিয়ে স্তম্ভিত প্রশান্তের কাছ থেকে বন্দুকটা কেড়ে নিলে এবং সেই বিপুলকায় দানবের মতন জীবটা নিজেকে সামলে নেবার আগেই তার দিকে করলে দুই-দুইবার বুলেট-বৃষ্টি।
সেই বিভীষণ জীবটা বিকট স্বরে আর্তনাদ করে একবার উঠে বসেই সুদীর্ঘ দুই বহু দুইদিকে ছড়িয়ে আবার মাটির উপরে আছড়ে পড়ল— তার একখানা বিস্তৃত হাত গিয়ে ধরলে শঙ্করলালের দেহখানা এবং চোখের পলক পড়তে না পড়তেই দেখা গেল, শঙ্করলালের দেহটা শূন্যে উঠেই আবার এসে পড়ল মাটির উপরে সশব্দে।
শঙ্করলাল একবার চিৎকারও করলে না, তালগোল পাকিয়ে একেবারে নিশ্চল হয়ে রইল।
কয়েক মুহূর্ত সকলেই নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল স্তম্ভিতের মতো।
তারপর প্রথমে কথা কইলে বরুণ। বললে, 'প্রশান্তবাবু, ওই জীবটাই আমাদের বন্দি করেছিল।'
—ও যে দেখছি প্রকাণ্ড একটা ওরাং-উটাং।
—হ্যাঁ, একটা পোষমানা, শিক্ষিত ওরাং-উটাং। এই বোর্নিয়ো হচ্ছে ওরাংদের স্বদেশ। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, শঙ্করলাল শিস দিয়ে একেই আহ্বান করছিল।
—কিন্তু দু'দুবার বন্দুক ছুড়ে উপর থেকে ওকে মাটির উপরে পেড়ে ফেললে কে?
—এখন সেইটেই তো হচ্ছে প্রশ্ন!
পিছন থেকে শোনা গেল : 'সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি আমি।'
বরুণ ও প্রশান্ত ফিরে দেখলে, বন্দুক হাতে করে হাস্যমুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে অরুণ।
অরুণ বললে, 'বরুণকে খুঁজতে খুঁজতে আমি এখানে এসেই দেখি, ওই ভীষণ ওরাংটা খুব সন্তর্পণে আর নিঃশব্দে গাছের উপর থেকে নীচের দিকে নেমে আসছে। দেখেই আমি একেবারে বন্দুকের দুটো নলই খালি করে দিয়েছি।'
বরুণ উৎফুল্ল কণ্ঠে বললে, 'ভ্যালা মোর ভাই, আচ্ছা মদ্দ! তুমি এসে না পড়লে আমাদের পটোল তোলা ছাড়া আর কিছুই করবার উপায় ছিল না! একেই বলে, রাখে কৃষ্ণ মারে কে?'
অরুণ বললে, 'কিন্তু যদিও আমি এস-এস-জি মার্কা গুলি ছুড়েছি, তবু আমার হচ্ছে পাখিমারা বন্দুক, ওরাং গাছ থেকে পড়ে গিয়েও মরেনি, তাকে বধ করেছে বন্ধুবর বরুণই।'
বরুণ মাথা নেড়ে বললে, 'না ভাই অরুণ, ওরাং-বধের জন্যে বাহাদুরি নিতে পারো তুমিই। কারণ তুমি ওটাকে গাছ থেকে পেড়ে কাবু না করলে ফেললে আমি বন্দুক ছোড়বার ফুরসতই পেতুম না।'
প্রশান্ত বন্দুকে আবার টোটা ভরে ওরাংকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়বার চেষ্টা করছে দেখে বরুণ হেসে বললে, 'মড়ার ওপরে আবার খাঁড়ার ঘা কেন প্রশান্তবাবু? নিজের প্রভুকে সঙ্গে নিয়ে ওরাং করেছে মহাপ্রস্থান! শঙ্করলাল এবার সত্যি সত্যিই আপনাকে ফাঁকি দিয়ে সরে পড়তে পেরেছে! তা যাক, শঙ্করলালের জন্যে আমরা কেউই বোধহয় অশ্রু বিসর্জন করব না। কী বলেন?'
প্রশান্ত বললে, 'সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই। কিন্তু কথা হচ্ছে, পোষমানা ওরাং তার প্রভুকেই বধ করলে কেন?'
—মৃত্যু-যন্ত্রণায় অন্ধের মতো হয়ে সে হাতের কাছে যাকে পেয়েছে, তাকেই তুলে আছাড় মেরেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন