ব্যাধের ফাঁদ

হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম

বন্দী দীনবন্ধু

দৈনিক 'বিশ্ববন্ধু'র উক্তি : দীনুডাকাত ধরা পড়িয়াছে এবং তাহাকে গ্রেপ্তার করিয়া গোয়েন্দা বিভাগের ইনস্পেকটর শ্রীযুক্ত প্রশান্ত চৌধুরীর নাম আজ কতখানি বিখ্যাত হইয়া উঠিয়াছে, সে সংবাদ কাহারও কাছে অবিদিত নাই।

যদিও গ্রেপ্তারের পূর্বমুহূর্তে অজ্ঞাত কোনো আততায়ীর গুলিতে আহত না হইলে দীনু হয়তো আবার পুলিশকে ফাঁকি দিতে পারিত, তবু প্রশান্তবাবুর বিশেষ যোগ্যতার কথা স্বীকার না করিয়া পারা যায় না।

সকলেই জানেন, দীনু সাধারণ দস্যু নয়। যাহারা দীনের শত্রু তাহাদের টাকা কাড়িয়া লইয়া সে দরাজ হাতে বিতরণ করিত গরিব-দুঃখীদের মধ্যে এবং সেইজন্য তাহার এই দুর্দিনে জনসাধারণের সহানুভূতি রীতিমতো জাগ্রত হইয়া উঠিয়াছে। এবং জনসাধারণের উপরে তাহার প্রভাব যে কতটা অসাধারণ, সম্প্রতি দীনুর বিচার আরম্ভ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেটা বিশেষরূপেই প্রমাণিত হইয়াছে।

প্রতিদিন তাহাকে একবার চোখের দেখা দেখিবার জন্য বিচারালয়ের সম্মুখভাগে বিরাট এক জনতার সৃষ্টি হয়— পুলিশ লাঠি চালাইয়াও সে-জনতাকে ঠেকাইতে পারে না! পুলিশের লাঠির কোনো তোয়াক্কা না রাখিয়া অনেকে চিৎকার করিয়া ওঠে— 'জয়, দীনবন্ধুর জয়!' জনতার প্রত্যেক লোকের মুখের ভাব দেখিলে মনে হয়, তাহারা যেন দেবদর্শন করিতে আসিয়াছে! যেমন বাহিরে, বিচারালয়ের ভিতরেও তেমনই লোকারণ্য। সময়ে সময়ে জনতার কোলাহলে বিচারকার্যেও বাধা উপস্থিত হয়। কোনো অপরাধীর এমন জনপ্রিয়তা কল্পনা করা যায় না।

কিন্তু যে দীনুডাকাতের দোর্দণ্ডপ্রতাপে একদিন অসাধু ও অত্যাচারী ধনীরা ছিল ভয়ে থরহরি কম্পমান, আজ তাহার দশা দেখিলে মনে দুঃখের সঞ্চার হয়। আজ দীনুর কেশ বিশৃঙ্খল, দৃষ্টি ভীত ও নিস্তেজ, মুখ কাঁদো-কাঁদো, বর্ণ মলিন এবং দেহ এমনি দুর্বল যে, চলিতে গেলে সে টলিয়া পড়ে। সে কোনোদিকে তাকায় না, জেলখানার গাড়ি থেকে নামিয়া হেঁটমুখে একেবারে বিচারালয়ের মধ্যে গিয়া প্রবেশ করে। তাহাকে অভিনন্দন দিবার জন্য এমন যে বিপুল জনতার সৃষ্টি হইয়াছে, এটা লক্ষ করিবার আগ্রহও তাহার নাই! আজ দীনুকে দেখিলে সন্দেহ হয়, এতদিন তাহার সাহস ও বীরত্বের যেসব আশ্চর্য কথা শুনা গিয়াছিল, তাহার মূলে কোনোই সত্য নাই। রাজদণ্ডের ভয়ে সাধারণ কাপুরুষ অপরাধীর মতোই সে একেবারে ভাঙিয়া পড়িয়াছে!...'

এইটুকু পড়েই অরুণ খবরের কাগজখানা ক্রোধভরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলে উঠল, 'বরুণের সঙ্গে সাধারণ অপরাধীর তুলনা! বরুণ কাপুরুষ! হতভাগ্য সম্পাদক আমার বন্ধুকে চেনে না!'

সে খানিকক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। তারপর নিজের মনে-মনেই বললে, 'কিন্তু খবরের কাগজের এ বর্ণনা কি সত্য? পুলিশের আর বাইরের লোকের কাছে বরুণ দীনুডাকাত নামে পরিচিত বটে, কিন্তু সাধারণ ডাকাতের মতো আইনের ভয়ে কাবু হবার ছেলে তো সে নয়! তবে কেন তার মুখ কাঁদো-কাঁদো, কেন তার দেহে দুর্বলতার লক্ষণ?'

ভেবে কোনো কূল-কিনারা না পেয়ে অরুণ ডাক দিলে, 'শ্রীধর! ও শ্রীধর! এক কাপ চা নিয়ে এসো তো!'

জবাব এল, 'আজ্ঞে, যাই।'

অরুণ খবরের কাগজখানা আবার মাটির উপর থেকে তুলে নিলে। তারপর গত বিচারের দিনে কে কী সাক্ষ্য দিয়েছে মন দিয়ে তা পাঠ করতে লাগল।

চায়ের পেয়ালা নিয়ে প্রবেশ করলে শ্রীধর। যাঁরা গোড়া থেকে বরুণ বা দীনবন্ধু বা দীনুডাকাতের জীবনকাহিনি পাঠ করেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই শ্রীধরকে ভোলেননি। সে আগে ছিল সাধারণ ডাকাত, কিন্তু বরুণের প্রভাবে পড়ে ডাকাতি ছেড়ে এখন হয়েছে অরুণের বিশ্বস্ত ভৃত্য।

চায়ের পেয়ালা হস্তগত করে অরুণ বললে, 'শ্রীধর, কাগজওলারা কী বলে জানো?'

—কী বলে?

—বরুণ নাকি কাপুরুষ!

শ্রীধর তার ঝাঁটাগোঁফের তলায় একটুখানি হাসির রেখা ফুটিয়ে বললে, 'তোমার কথা শুনে নিধুবাবুর একটা গান মনে পড়ছে।'

—কীরকম?

—ওই গানে আছে—

'মাতঙ্গ পড়িলে দলে,

পতঙ্গতে কি না বলে,'

আজ হাতি পাঁকে পড়েছে বলে ব্যাঙেরা সব লাফালাফি শুরু করেছে। করুকগে— তাতে তোমারই বা কী, আমারই বা কী, আর বড়দাদাবাবুরই বা কি?'

—এতে আমাদের অনেকখানিই আসে-যায় শ্রীধর! বরুণ যে আমাদের সব!

—তুমি কিছু ভেবো না ছোটদাদাবাবু, আমার বড়দাদাবাবু আবার আমাদের কাছে ফিরে আসবেন।

—শ্রীধর, তুমি পাগলের মতন কথা বলছ। বরুণ কখনও নরহত্যা করেনি বটে, কিন্তু তার নামে ডাকাতির মামলা আছে একটা-দুটো নয়, অনেকগুলো। হয়তো তাকে দ্বীপান্তরে যেতে হবে— হয়তো কেন, নিশ্চয়ই।

—তবু আমি ভাবি না। বড়দাদাবাবুকে ওরা যদি দীপান্তরে পাঠায়, তাহলে তিনি সাঁতরে কালাপানি পার হয়ে আবার বাংলাদেশে ফিরে আসবেন!

—কী যে বলো শ্রীধর! বরুণ মানুষ, সে অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারবে না।

—আমার কাছে বড়দাদাবাবু মানুষ নন, তিনি সর্বশক্তিমান দেবতা! বলেই বরুণের উদ্দেশে একটা প্রণাম করে শ্রীধর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল।

চায়ের পেয়ালা তুলে নিয়ে অরুণ মনে মনে বললে, 'বরুণের শক্তির ওপরে শ্রীধরের অসীম বিশ্বাস! এমন বিশ্বাস যদি আমারও থাকত তাহলে বরুণের শোকে আজ আমাকে এমন হতভাগ্য জীবনযাপন করতে হত না।'

তার চা-পান যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, বৈঠকখানার বাইরে হঠাৎ পায়ের শব্দ হল। চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে পেয়ালাটি নামিয়ে রেখে অরুণ ফিরে দেখলে, ঘরের ভিতরে প্রবেশ করছে ইনস্পেকটর প্রশান্ত চৌধুরী।

অরুণের মুখের উপরে ফুটে উঠল বিরক্তির চিহ্ন।

প্রশান্ত একটু হাসবার চেষ্টা করে বললে, 'অরুণবাবু কি আমার ওপরে রেগেছেন?'

—কেন, রাগব কেন?

—আপনার বাল্যবন্ধু বরুণ— অর্থাৎ দীনুডাকাতকে আমি গ্রেপ্তার করেছি বলে?

—আপনি পুলিশের লোক। নিজের কর্তব্য পালন করেছেন। রাগ করবার অধিকার আমার নেই।

—কিন্তু বিশ্বাস করুন অরুণবাবু, দীনুকে গ্রেপ্তার করেও আমি সুখী নই।

—কেন?

—দীনু একদিন আমার প্রাণ রক্ষা করছিল। এজন্যে তার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।

—পুলিশের কৃতজ্ঞতার কোনো মূল্যই নেই, সুতরাং ও-কথা যেতে দিন। এখন বলুন দেখি, এখানে আবার কেন আপনার অশুভ আবির্ভাব? আপনি আমাকেও গ্রেপ্তার করতে চান নাকি?

—আপনাকে গ্রেপ্তার করব? কী আশ্চর্য, কেন?

—বরুণের বন্ধু বলে?

—অরুণবাবু, আপনি কি আমাকে এতবড়োই গাধা বলে মনে করেন?

—রক্ষা করুন মশাই, পুলিশকে গাধা মনে করবার দুঃসাহস আমার নেই। কিন্তু এটুকু আমি মনে করি, অধীনের গরিবখানায় যখন এসেছেন, তখন নিশ্চয়ই আপনার কোনো উদ্দেশ্য আছে।

—হ্যাঁ, এটা আপনি মনে করতে পারেন।

—তাহলে বলে ফেলুন মশাই, দয়া করে বলে ফেলুন! কী উদ্দেশ্য আপনার? বরুণের বিরুদ্ধে আমার মুখ থেকে নতুন কোনো তথ্য সংগ্রহ করতে চান?

—অরুণবাবু, আপনাকে আমি বন্ধুর মতন দেখি।

—অন্যায় করেন। বরুণের শত্রুকে আমি কোনোদিন বন্ধু বলে মানতে পারব না।

আপনি বড়োই নিষ্ঠুর।

—মানলুম। কিন্তু ছেঁদো কথা ছেড়ে দিন। স্পষ্ট ভাষায় বলুন, আপনার কোন হুকুম আজ আমাকে মানতে হবে?

—হুকুম নয় অরুণবাবু, অনুরোধ।

—অনুরোধ? পুলিশের অনুরোধ? জোনাকির কাছে চাঁদের আলোকপ্রার্থনা? প্রশান্তবাবু, এইবারে আপনি হাসালেন মশাই!

এতক্ষণ পরে প্রশান্ত একখানা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়ে বললে, 'আপনি তো আমাকে বসতে বললেন না, কাজেই নিজেকে নিজের সাহায্য করতে হল।'

—আজ পুলিশের এই অসম্ভব বিনয় দেখে সত্যিই আমার ভয় হচ্ছে।

এইবারে প্রশান্ত বিরক্ত স্বরে বললে, 'অরুণবাবু, আপনি দেখছি এক হাতেই তালি বাজাতে চান। আমি ভালো বললেও আপনি ঝগড়া করবেন! পুলিশ, পুলিশ, পুলিশ! হ্যাঁ, আমি পুলিশ, সরকারি নিমক খেয়ে কর্তব্যপালনের চেষ্টা করি বটে! কিন্তু আমার এই ইউনিফর্মের তলায় কি সাধারণ মানুষেরই হৃদয় নেই? পুলিশের লোকের কি মা বাবা ভাই বোন স্ত্রী পুত্র কন্যা বন্ধুবান্ধব কেউ নেই? আর, দেশের আর দশের উপকারের জন্যেই কি পুলিশের সৃষ্টি নয়? কর্তব্যপালনের পরেও কি পুলিশ সাধারণ মনুষ্যত্বের পরিচয় দিতে পারে না? আজ কেন আমি এখানে এসেছি জানেন? দীনুডাকাতকে বাঁচাবার জন্যে!'

অরুণ হতভম্বের মতন থেমে থেমে বললে, 'দীনুডাকাতকে— বাঁচাবার জন্যে! মানে?'

প্রশান্ত গম্ভীর স্বরে বললে, 'আবার বলি, বিশ্বাস করুন অরুণবাবু! দীনুকে গ্রেপ্তার করেই আমার কর্তব্য শেষ হয়েছে, এখন আর আমি তার শত্রু নই— কারণ তার দয়াতেই আজ আমি এই দুনিয়ায় বেঁচে আছি। আমি দীনুর মৃত্যু দেখতে চাই না, আমি চাই তাকে বাঁচাতে!'

অরুণ বিস্মিত ভাবে বললে, 'আপনার কথা এখনও কিছুই বুঝতে পারছি না। বরুণের কী হয়েছে?'

—আপনার বন্ধু ধীরে ধীরে অগ্রসর হয়েছে মৃত্যুর পথে।

অরুণ বিদ্যুতাহতের মতন উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'মৃত্যুর পথে! বরুণ কি পীড়িত?'

—হ্যাঁ, তাই আমি মনে করি। আজ আপনার বন্ধুকে দেখলে আপনিও হয়তো চিনতে পারবেন না!

—কী অসুখ হয়েছে তার?

—জানি না। হয়তো বনের পাখি খাঁচায় এলে এমনই অবস্থা হয়। দীনু হাঙ্গার-স্ট্রাইক করেনি বটে, কিন্তু খাওয়া-দাওয়া প্রায় ছেড়ে দিয়েছে।

—বরুণ খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে?

—প্রায়। সে যা খায়, তাকে খাওয়া বলে না। তার ওজন কমে গেছে পঁচিশ পাউন্ড। সে কারুর সঙ্গে— এমনকি আমার সঙ্গেও কথা কয় না। দিনরাত বিছানায় শুয়ে থাকে, আর কী যে ভাবে সেই-ই জানে! কোর্টে এসে কাঠগড়ার ভিতরে সে চুপ করে বসে-বসে প্রচণ্ড মাতালের মতন যেন ঝিমোতে থাকে— চারিদিকে জনতা, উকিল-ব্যারিস্টারের তর্কাতর্কি, বিচারকের প্রশ্ন,— কিন্তু সে যেন পাথরের পুতুলের মতন নির্বিকার, কোনোদিকে তাকায় না, তার চোখ থাকে মাটির দিকে, কারুর কোনো কথা শুনছে বলেও মনে হয় না! কেবল তার মনের নয়, দীনুর দেহেরও যে ভঙ্গুর অবস্থা, তাতে তার হাতে হাতকড়ি দেওয়াও মড়ার ওপরে খাঁড়ার ঘা দেওয়ার মতো! কিন্তু বড়োসাহেবের হুকুম, হাজত থেকেই তার হাতে যেন হাতকড়ি পরিয়ে কোর্টে আনা হয়— কারণ সে হচ্ছে বিপজ্জনক ব্যক্তি! আমরা হুকুমের চাকর, হুকুম পালন করছি, এছাড়া উপায় কী বলুন? কিন্তু তবু আমি ভুলতে পারি না, এই দীনুই আমার জীবনরক্ষা করেছে— নিজের জীবনও বিপন্ন করে! আমার কি বিশ্বাস জানেন? দীনুকে কেউ দণ্ড দিতে পারবে না,— বিচার শেষ হবার আগেই তার মৃত্যু হবে!

অরুণ চিন্তিত ভাবে বললে, 'প্রশান্তবাবু, আপনার কথা শুনে আমার ভয় হচ্ছে। পৃথিবীতে বরুণের চেয়ে আর কারুকে আমি বেশি ভালোবাসি না।'

প্রশান্ত বললে, 'কিন্তু আমার বিশ্বাস, আপনি চেষ্টা করলে আপনার বন্ধুকে হয়তো বাঁচাতে পারেন। আর সেই কথা বলবার জন্যেই আজ আমি এসেছি।'

—আমি কী চেষ্টা করব, কিছুই তো বুঝতে পারছি না।

—হাজতে গিয়ে দীনুর সঙ্গে আপনি একবার দেখা করবেন?

—কেন?

—দীনুকে উৎসাহিত করবার জন্যে। তাকে ভালো করে বুঝিয়ে আসুন, এভাবে আত্মহত্যা করে কোনোই লাভ নেই। আপনার কথায় সে আবার উচিতমতো পানাহার করতে পারে।

অরুণ একটু ভেবে বললে, 'প্রশান্তবাবু, আপনি জানেন, বরুণ ধরা পড়বার পর থেকেই আমি আর তার সঙ্গে দেখা করিনি? বরুণকে বন্দিঅবস্থায় দেখা আমার পক্ষে অসম্ভব। সে করুণ দৃশ্য সহ্য করতে পারব না।'

প্রশান্ত বিস্মিত কণ্ঠে বললে, 'সে কী, বন্ধুর প্রাণরক্ষার চেষ্টা করবেন না!'

অরুণ বললে, 'আমার চেষ্টায় কোনো ফল হবে বলে মনে হচ্ছে না। যে নিজে মরতে চায় তাকে আমি উৎসাহিত করব কেমন করে? আর কীসের জন্যেই বা উৎসাহিত করব? আপনাদের জেলখানায় চিরকাল বাস করবার জন্যে? না, না, আমারও মতে সে-অপমান সহ্য করার চেয়ে বরুণের পক্ষে মৃত্যুই শ্রেয়!'

প্রশান্ত খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বললে, 'দেখছি আপনারা দুই বন্ধুই এক ধাতুতে গড়া।'

—হ্যাঁ প্রশান্তবাবু, তা নইলে আমাদের বন্ধুত্ব এতটা প্রগাঢ় হতে পারত না। আমি বরুণকে ভালো করেই জানি। সে হচ্ছে তেপান্তরের মুক্ত বাতাসের মতন, কোনোদিনই কারুর অধীন হতে পারবে না। ভাবছেন, বন্দি করে আপনারা বরুণকে শাস্তি দেবেন? না, সে-সুযোগ সে দেবে না। আমারও বিশ্বাস, দণ্ডলাভের আগেই তার মৃত্যু হবে।

প্রশান্ত মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, 'বড়োই দুঃখের কথা, বড়োই দুঃখের কথা! দীনুর মতন লোক যে এমনভাবে নিজেকে মৃত্যুমুখে টেনে নিয়ে যাবে, এ আমার মোটেই ভালো লাগছে না। আর সব দিক দিয়েই দীনু হচ্ছে উজ্জ্বল রত্ন, তার একমাত্র অপরাধ, রাজার আইনকে সে মানে না।'

অরুণ বললে, 'দীনুর পথ ভালো কী মন্দ, তা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। তবে তার পরিণাম যে এমন শোচনীয় হল, এইটেই হচ্ছে আক্ষেপের কথা। দেখুন প্রশান্তবাবু, একদিন আমি একটি কাঠবিড়ালীর বাচ্চা ধরেছিলুম। তার জন্যে একটি ছোট্ট বাসা তৈরি করে দিলুম আর তাকে খেতে দিলুম ভালো ভালো খাবার— সেরকম লোভনীয় খাবার বোধহয় কখনও সে খেতে পায়নি। কিন্তু তবু সে এক কণা খাবারও স্পর্শ করলে না। অনাহারেই সে দুদিন কাটিয়ে দিলে— কোনো রকমেই তাকে খাওয়াতে পারলুম না। একটা সামান্য কাঠবিড়ালীও বন্দিজীবনের চেয়ে মৃত্যুকেই বরণীয় মনে করলে। তৃতীয় দিনে দেখলুম তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তখন পাছে সে মারা পড়ে সেই ভয়ে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলুম।'

প্রশান্ত গাত্রোত্থান করে বললে, 'কিন্তু রাজার আইন বড়োই কঠিন অরুণবাবু! দীনু না বাঁচলেও আইন তাকে মুক্তি দেবে না।'

দ্বিতীয়

দীনুর কাণ্ড

আজ দীনুডাকাতের বিচারের দিন। অন্যান্য দিনের মতন আজও বিচারালয়ের ভিতরে ও বাইরে দেখা যাচ্ছে সেই একই দৃশ্য— চারিদিকে কেবল কৌতূহলী মানুষের ভিড়। বরং আজ যেন জনসমাগম হয়েছে আরও বেশি। কেবল বাঙালি নয়, জনতার ভিতরে দেখা যাচ্ছে আরও নানান-জাতের লোক। সকলেই জেলখানার গাড়ি আসবার জন্যে অপেক্ষা করছে সাগ্রহে।

রাস্তাতেও যতদূর চোখ চলে দেখা যায় কেবল লোকের পরে লোক। বিচরালয়ের আঙিনায় আর তিলধারণের ঠাঁই নেই বলে তারা আশ্রয় নিয়েছে পথের উপরেই। যদিও তারা জানে যে জেলের গাড়ির দরজা-জানলা ভিতর থেকেই বন্ধ থাকবে এবং দীনুকে সেখান থেকে দেখবার কোনো উপায়ই নেই, তবু দীনুর গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও তারা যেন কৃতার্থ হতে চায়! মাঝে মাঝে জনতার ভিতরে হচ্ছে যষ্টিধারী পুলিশের আবির্ভাব, কিন্তু লোক সরাতে এসে পুলিশই যেন তলিয়ে যাচ্ছে সেই বিরাট জনসাগরের মধ্যে। সার্জেন্ট ও পাহারাওয়ালাদের ধাক্কায় একদল লোক যদি সরে যায়, অমনি আর একদল লোক এগিয়ে এসে সেই শূন্য স্থানটুকু আবার পূর্ণ করে দেয়— যেন একটা তরঙ্গের পরে আসছে আর একটা তরঙ্গ। সে-জনতাকে সামলানো অসম্ভব। থেকে থেকে ভিড়ের মধ্যে কোনোরকমে পথ করে নিয়ে মোটরের পর মোটর আসছে এবং গাড়ির ভিতর থেকে নামছেন উকিল, ব্যারিস্টার ও বিচারকরা।

হঠাৎ খানিক দূরে জনসাগর যেন উথলে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে বহুকণ্ঠে উচ্চ চিৎকার শোনা গেল— 'জয় দীনবন্ধুর জয়, জয় দীনবন্ধুর জয়, জয় দীনবন্ধুর জয়!' অমনি জনতার প্রত্যেক লোকই বিপুল আগ্রহে উদগ্রীব হয়ে উঠল। এবং কারাগারের গাড়ি উঠোনে যেখানে এসে দাঁড়াবার কথা, দলে দলে লোক সেইদিকে ছুটে যাবার চেষ্টা করতে লাগল। ভিড়ের ভিতরে বারংবার বাধা পেয়ে জেলখানার গাড়িখানা অবশেষে বিচারালয়ের অঙ্গনের মধ্যে প্রবেশ করলে এবং গাড়ির ভিতর থেকে প্রথমে নামল একজন সশস্ত্র সার্জেন্ট। তারপর দেখা গেল দীনুডাকাতকে।

প্রশান্ত চৌধুরী দীনুর সম্বন্ধে অত্যুক্তি করেনি। সত্যিই আজ তার অবস্থা শোচনীয়, মলিন মুখ, শীর্ণ দেহ, নুয়ে পড়া মাথা— এ যেন সে দীনুই নয়। এ যেন একটা জ্যান্ত মড়া!

আচম্বিতে জনতার ভিতরে জাগল বিষম এক চাঞ্চল্য। বিকট চিৎকার, গালাগালি, মারামারি! সূর্যালোকে হঠাৎ শূন্যে জ্বলে উঠল কয়েকখানা চকচকে ছোরা।

গাড়ির দরজার কাছে যে সার্জেন্টটা দাঁড়িয়ে ছিল, সচকিতে মুখ ফিরিয়েই সেই দিকে সে তাকিয়ে দেখলে এবং পরমুহূর্তে গাড়ির ভিতর দিকে আবার মুখ ফিরিয়ে দেখলে যে, এতক্ষণ মরো-মরোর মতো দীনুডাকাত যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, সে আর সেখানে দাঁড়িয়ে নেই!

বিচারালয়ের দোতলার বারান্দার উপরে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে স্বয়ং প্রশান্ত চৌধুরী। উপর থেকে সে সবিস্ময়ে দেখলে, গাড়ি থেকে নেমেই মৃতকল্প দীনুর দেহ হঠাৎ যেন অত্যন্ত জীবন্ত হয়ে উঠল! সার্জেন্টের একমুহূর্ত অসতর্কতাই তার পক্ষে হল যথেষ্ট। বিদ্যুতের মতন সে একলাফে ভিড়ের ভিতরে গিয়ে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার চারিদিক ঘিরে দাঁড়াল এমন-এক জনতার নিরেট প্রাচীর, যা ভেদ করে আর কোনো চক্ষুই তাকে আবিষ্কার করতে পারলে না।

প্রশান্ত উপর থেকে প্রাণপণে চেঁচিয়ে উঠল, 'পাকড়ো! পাকড়ো! আসামি ভাগতা হ্যায়। সেপাই, সেপাই!' এবং সেইভাবে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতেই সে বেগে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল নীচের দিকে।

ততক্ষণে জনতার যেখানে মারামারি হচ্ছিল, পাহারাওয়ালারা সেইদিকে ছুটে গিয়েছিল। দেখতে দেখতে মারামারি থেমে গেল এবং ছোরাগুলো হল আবার অদৃশ্য! পুলিশের লাঠির আঘাতে কয়েকজন লোক জখম হল, বাকি লোকগুলো যে যেদিকে পারলে ছুটে পালাতে লাগল।

প্রশান্তের উদভ্রান্ত দৃষ্টি ঘুরতে লাগল চারিদিকে। কোথয় দীনু, কোথায় দীনু? ভিড় যেন তাকে গপ করে গিয়ে ফেলেছে!

না, না—ওই যে দীনু! ওই যে দীনু! হ্যাঁ, ফটকের সামনে দিয়ে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে দীনু স্বয়ং! প্রশান্ত ফটকের দিকে ছুটতে ছুটতে আবার চেঁচিয়ে উঠল, 'ওই, ওই আসামি পালাচ্ছে! ধরো, ধরো— ওকে ধরো!'

সার্জেন্ট ও পাহারাওয়ালারা দৌড়ে গিয়ে বাঘের মতন দীনুর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দীনু তাদের এড়াবার চেষ্টা করেও পারলে না, সকলে মিলে তাকে চেপে ধরে টানতে-টানতে আবার ভিতরের দিকে নিয়ে আসতে লাগল।

দুই-হাতে নিজের মুখ চেপে ধরে দীনু মাটির উপরে বসে পড়ল। তার ভঙ্গি দেখেই বোঝা যায়, মনের দুঃখে সে কেঁদে ফেলেছে।

প্রশান্ত তার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললে, 'দীনু, পুলিশকে ফাঁকি দেওয়া কি এতই সহজ?'

দীনু সেইভাবেই বসে রইল, কোনো জবাব দিলে না।

—শুনছ দীনু, মুখ তোলো।

কিন্তু দীনু মুখ তুললে না।

—মুখ দেখাতে লজ্জা হচ্ছে বুঝি? কিন্তু লজ্জা করে আর লাভ কী ভায়া, উঠে দাঁড়াও। কোর্টের ভিতরে চলো।

তবু দীনু ওঠবার চেষ্টা করলে না।

তখন একজন সার্জেন্ট এগিয়ে গিয়ে জোর করে টেনে তাকে আবার দাঁড় করিয়ে দিলে, কিন্তু তখনও দীনু হাত দিয়ে মুখ ঢাকবার চেষ্টা করছে।

প্রশান্ত নিজের দুই হাত দিয়ে দীনুর হাত-দুখানা টেনে নীচের দিকে নামিয়েই সবিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'এ কি! কে তুই? তোকে দীনুর মতন দেখতে বটে, কিন্তু তুই তো দীনু নস!'

সত্য, তাকে দেখতে প্রায় দীনুর মতোই বটে। তার মুখ, দেহ ও কাপড়-চোপড় সমস্তই দীনুর মতো, কিন্তু একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায়, সে হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যক্তি।

প্রশান্তের মনের ভিতরে আসল ব্যাপারটা ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠতে লাগল। দীনুর শিষ্যরা আজ এখানে একটা সুপরিকল্পিত নাটকীয় দৃশ্যের অভিনয় করে গেল। সমস্ত বন্দোবস্তই আগে থাকতে ঠিক করা ছিল। ওই আকস্মিক মারামারিটা হচ্ছে একটা সাজানো ব্যাপার। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের চোখকে হঠাৎ অন্যমনস্ক করা। তারপর পুলিশ যখন নকল দীনুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থাকবে, আসল দীনু সেই ফাঁকে সকলকে কলা দেখিয়ে অদৃশ্য হবে যবনিকার অন্তরালে। খুবই সহজ কৌশল, কিন্তু কী ফলপ্রদ!

হতাশভাবে জেলখানার গাড়ির ভিতর দিকে তাকিয়েই প্রশান্তের দৃষ্টি আবার চমকে উঠল!

গাড়ির তলায় পড়ে রয়েছে একজোড়া হাতকড়া— যা পরানো ছিল দীনুডাকাতের হাতে!

তৃতীয়

নীলপত্র

রাত তখন এগারোটা।

ফিরতে দেরি হবে বলে প্রশান্ত বাড়িতে বলে গিয়েছিল, তার খাবার যেন ঢাকা-চাপা দিয়ে রাখা হয়। জামা-কাপড় ছেড়ে সে খাবার জায়গায় গিয়ে বসল, কিন্তু লোহার ঢাকনাখানা তুলেই তার চক্ষু হল স্থির!

থালায় খাবারের সঙ্গে রয়েছে একখানা নীল রঙের খাম— তার উপরে লাল কালিতে নাম লেখা, শ্রীযুক্ত অশান্ত চৌধুরী। আবার সেই বিখ্যাত নীল পত্র! এ পত্র যে কোথা থেকে আসছে প্রশান্তর তা বুঝতে দেরি হল না। এতদিন নীল পত্রের লেখক ছিল হাজতের মধ্যে আবদ্ধ।

সে নীল পত্রের দিকে স্থির চক্ষে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর চিৎকার করে নিজের স্ত্রীকে ডাকলে।

তার স্ত্রী ঘুমিয়ে পড়েছিল, স্বামীর চিৎকারে হল তার নিদ্রাভঙ্গ। তাড়াতাড়ি নিচে এসে শুধোলে, 'খেতে বসে অত গর্জন করছ কেন? হল কী?'

প্রশান্ত ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'হবে আবার কী, আমার ঘরে এসেছে শনির ভেট! থালার দিকে তাকিয়ে দেখ।'

তার স্ত্রীর কাছেও নীল পত্র অপরিচিত ছিল না। থালার দিকে তাকিয়েই সে চমকে উঠল!

প্রশান্ত বললে, 'গারদ থেকে বেরিয়েই দীনু আবার নীল পত্র ব্যবহার করতে শুরু করেছে? কিন্তু কথা হচ্ছে, চিঠিখানা খাবারের থালায় এনে রেখে গেল কে?'

স্ত্রী বললে, 'কেমন করে জানব বলো? তোমাদের দীনুডাকাত সব করতে পারে! মনে আছে, একদিন সে দলবল নিয়ে তোমার বাড়িতেই নিমন্ত্রণ খেতে গিয়েছিল?'

প্রশান্ত বললে, 'মনে নেই আবার! কেবল কি খেয়েই গিয়েছিল? তোমার সঙ্গে ভাব করে গল্প করে আসর জমাতেও বাকি রাখেনি! দেখছি আবার সে আমাকে হাড়ে-মাসে জ্বালিয়ে মারবে। কিন্তু বলো দেখি, আমার খাবার সাজিয়ে রেখে গিয়েছিল কে?'

স্ত্রী বললে, 'বামুনঠাকুর।'

—ঠাকুর? সে এখন এখানে নেই তো?

—না, রেঁধে-বেড়ে বাসায় চলে গিয়েছে।

রহস্যটা বুঝতে প্রশান্তর বিলম্ব হল না। তাদের পুরানো রাত-দিনের পাচক আজ সকালেই ছুটি নিয়ে একমাসের জন্যে দেশে চলে গিয়েছে এবং যাবার সময় দিয়ে গিয়েছে এই নতুন ঠিকা লোকটাকে।

প্রশান্ত বললে, 'এ নিশ্চয়ই সেই ব্যাটার কাজ। দীনুর চর হয়ে সে এখানে এসেছে। কাল আর কাজ করতে আসবে না বোধহয়।'

স্ত্রী ভয় পেয়ে বললে, 'ওগো, ও খাবার আর তোমাকে খেতে হবে না! ওর সঙ্গে যদি বিষ-টিষ কিছু মিশিয়ে গিয়ে থাকে?'

প্রশান্ত চিঠিখানা তুলে নিয়ে মাথা নেড়ে বললে, 'না গিন্নি, দীনুকে আমি চিনি। সে খুনি নয়। এখন চিঠি পড়ে দেখি, কী সংবাদ!'

খামের ভিতর থেকে চিঠি বার করে নিয়ে প্রশান্ত পড়তে লাগল :

'অশান্ত-ভায়া,

মেজাজ আজ নিশ্চয়ই ভালো নেই? তা থাকবে কেমন করে? দীনু আবার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখালে তো?

ভেবেছিলে, দীনুকে জোর করে পাঠাবে আন্দামান ভ্রমণ করতে? তোমার বড়ো আশার বাতি নিবে গেল, না?

তুমি জানো অশান্ত, দেশে দেশে ভ্রমণ করতে আমি খুব ভালোবাসি? আন্দামানে হয়তো আমি গেলেও যেতে পারতুম, তবু আমার আপত্তি কেন শুনবে? ও-জায়গাটা স্বাস্থ্যকর নয়। ওখানে গেলে নাকি খালি দেহ নয়, অসুস্থ হয়ে পড়ে মনও।

গর্দভাবতার, তুমি ভেবেছিলে হাজতে মনের দুঃখে দীনু করেছিল আহার-নিদ্রা পরিত্যাগ? মোটেই নয়, মোটেই নয়। আমি অভিনয় করতুম তোমাদের ভোলাবার জন্যেই। খাওয়া-দাওয়া খুব কমিয়ে দিয়েছিলুম, কারণ আমি চেয়েছিলুম দেহকে রোগা করতে। সর্বদা মন-মরার মতন পড় থাকতুম, যাতে তোমরা ভাবো আমার জীবনীশক্তি ক্রমেই কমে যাচ্ছে আর ক্রমেই আমি চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়ছি। আমি জানতুম এইভাবে অভিনয় করলে পুলিশের রাহুর দৃষ্টি ক্রমেই অসতর্ক হয়ে পড়বে। পুলিশ ভাববে আমার আর পালাবারও ক্ষমতা নেই। কেমন, তোমরা তাই ভাবোনি কি?

আমাকে বন্দি করে তোমরা খুব নিশ্চিন্ত ছিলে। কিন্তু আমার মস্তিষ্ককে বন্দি করতে পেরেছিলে কি? হাজতের অন্ধকারে বসেও আমি রীতিমতো মস্তিষ্ক চালনা করতুম। আর বাইরের জগতের সঙ্গে আমার যে রীতিমতো খবরের আদান-প্রদান চলত, এ-খবর কি পেয়েছিলে তোমরা? বেঁচে থাক আমার চ্যালা ছোট্টুলাল। আমার প্রত্যেক ইঙ্গিতটি বুঝে সে গড়ে তুলেছিল এক সুন্দর নাটকের পরিকল্পনা। আজ সকালেই তোমরা সেই নাটকের রূপটি স্বচক্ষে দেখেছ।

যেদিনই আমি বন্ধ গাড়িতে চড়ে বিচারালয়ে বেড়াতে যেতুম, সেইদিনই প্রায় তোমাদের চোখের সামনে— অথচ সকলের অগোচরেই হত সেই চমৎকার নাটকটির নিয়মিত রিহার্সাল। ঠিক কখন কোথায়, কাকে কীভাবে কোন কাজ করতে হবে, আগে থাকতেই ঘড়ির কাঁটা ধরে সমস্তই ঠিক করা ছিল। জনতার ভিতরে আমার দ্বারা নিযুক্ত কত লোক ছিল, তুমি কল্পনা করতে পারো? চুপিচুপি বলি শোনো। মোট তিনশো জন।

তারপর, দ্বিতীয়— অর্থাৎ নকল-দীনবন্ধু সঙ্গে আলাপ হয়েছে তো? তাকে ছেড়ে দিয়ো। আমি দরকার হলে তাকে ব্যবহার করব বলে মাসে মাসে মাইনে দিয়ে আসছি বটে, কিন্তু সে আমার দলের লোক নয়। আমার গুপ্তকথা সে কিছুই জানে না। আসলকে যখন পেলে না, নকলকে নিয়ে আর কী করবে বলো?

যতই রিভলভার আর বন্দুকের ছড়াছড়ি করো, চারিদিকে যতই সেপাই-সান্ত্রী সাজিয়ে রাখো, এ-সবের কোনোই মূল্য নেই। মানুষের মন বড়ো মজার জিনিস। অস্ত্র-শস্ত্রের পিছনে থাকে মানুষের যে মন, আগে জানা দরকার সেই মনেরই গুপ্তকথা। কোন সময়ে কোন ঘটনা মানুষের মনের উপর কীরকম কাজ করবে, এটা দেখতে ও বুঝতে কখনও আমি ভুলি না। আমি বেশ জানতুম, যথাসময়ে বিচারালয়ের সামনে একটি মিথ্যা দাঙ্গা-হাঙ্গামার অভিনয় করলে বিশেষ সতর্ক প্রহরীর দলও ভুলে যাবে স্থান-কাল-পাত্রের কথা। আর সেই সময়টিই হচ্ছে আমার পক্ষে মাহেন্দ্রক্ষণ। সেই সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করেছি, আজ আবার তাই আমি স্বাধীন।

তোমরা নকল দীনুর দিকে ধাবিত হলে সদলবলে, আসলের দিকে চোখ রাখলে না কেউই। পুলিশের লাঠির ভয়ে লোকজনরা যখন দিকে দিকে পালাতে লাগল, আমিও তাদের সঙ্গে ছুটলুম ফটকের বাইরে। ফটকের কাছে সেপাই ছিল, সে আমাকে দেখেও দেখলে না। আর আমার সেই ধাবমান মূর্তিকে হঠাৎ দেখলেও সে বোধহয় চিনতে পারত না। কারণ ভিড়ের ভিতরে গা-ঢাকা দিয়েই বন্ধুদের অনুগ্রহে আমি পেয়েছিলুম ছোট্ট একটি গোঁপ আর দাড়ি। সে দুটি জিনিস যথাস্থানে সংলগ্ন করতে আমার তিন-চার সেকেন্ডের বেশি লাগেনি। এক জোড়া চশমাও পেয়েছিলুম। কাজেই সহজে আমাকে চেনবার জো ছিল না।

শুনেছি, তোমরা ভেবেছিলে— রাস্তায় গিয়ে আমি কোনো মোটরে চড়ে পলায়ন করেছি। সেই কাল্পনিক মোটরখানাকে গ্রেপ্তার করবার জন্যে পুলিশের লোকরা আজ পথে পথে হানা দিয়ে বেরিয়েছে, তবু সেখানাকে আবিষ্কার করতে পারেনি কেন, জানো? কারণ আমি কোনো মোটরই ব্যবহার করিনি, করেছিলুম কেবল নিজের শ্রীচরণভরসা। আমি দৌড়াদৌড়িও করিনি, ধীরে-সুস্থে আর পাঁচজনের সঙ্গে বাসায় ফিরে এসেছি পদব্রজে। মোটর ব্যবহার করলে হয়তো তোমরা আমাকে আবার ধরে ফেলতে পারতে।

যাক, তুমি প্রতিজ্ঞা করেছিলে একদিন আমাকে গ্রেপ্তার করবে। আর আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, বিচারকের দণ্ড আমি গ্রহণ করব না। আমরা দুজনেই প্রতিজ্ঞা পালন করেছি। গায়ে-গায়ে শোধ হয়ে গিয়েছে, কেমন?

স্বাধীন হয়েই আমি প্রথম কী কাজ করেছি শুনবে? মহাদেওগুন্ডার ভাই শঙ্করলালের সন্ধানে দিকে দিকে চর পাঠিয়েছি। জানো, শঙ্করলাল একদিন আমাকে জীবন্ত অবস্থায় কবর দেবার চেষ্টা করেছিল। তারপর তোমার মতন নির্বোধও আমাকে ধরতে পেরেছিল কেবলমাত্র তারই জন্যে। যতদিন না প্রতিশোধ নিতে পারি, শঙ্করলালকে আমি ভুলব না।

জাগ্রত হও অশান্ত চৌধুরী, যুদ্ধে জয়-পরাজয় আছেই, কখন কে হারে, কে জেতে বলা যায় না। অতএব দুঃখ ত্যাগ করো— শীঘ্রই আবার আমার সংবাদ পাবে।

হ্যাঁ, ভালো কথা। ভবিষ্যতে সুযোগ পেলেও আমার হাতে মিছামিছি হাতকড়ি পরাবার চেষ্টা কোরো না। ওটা ব্যর্থ শ্রম মাত্র। কারণ, খুব সহজেই হাতকড়ি খোলবার একটি সুন্দর কৌশল আছে। ইতি

'দীনবন্ধু'

... ... ...

পরের দিন সকালেই প্রশান্ত আবার অরুণের বাড়িতে গিয়ে হাজির।

তাকে দেখে অরুণ মুখ টিপে হাসতে লাগল।

প্রশান্ত মুখভার করে বললে, 'ও হাসির মানে কী?'

অরুণ বললে, 'ভাবছি, আজ থেকে আমি আবার আপনার নজরবন্দি হলুম তো?'

—নজরবন্দি?

—বরুণ-মাছ ধরবার জন্যে আমি হচ্ছি আপনার প্রধান টোপ। আপনি জানেন, বরুণ আমার সঙ্গে দেখা করবেই। তাই আমি হব আপনার নজরবন্দি, আমার বাড়ির চারিধারে থাকবে পুলিশের গুপ্তচরের পাহারা। এ-ব্যাপার আগেও হয়েছে। এতদিন বরুণ ছিল হাজতে, তাই আমিও আপনাদের শুভদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়েছিলুম। কিন্তু এখন আবার চাকা ঘুরেছে, তাই আমার জন্যে আবার ঘনঘন আপনার টনক নড়বে,—কী বলেন?

কথাটা ঘুরিয়ে নেবার জন্যে প্রশান্ত বললে, 'আজ আমি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে আসিনি। এই পথ দিয়ে যাচ্ছিলুম, হঠাৎ আপনার কথা মনে পড়ল—'

—বুঝেছি। তা বেশ করেছেন এসেছেন। তবে আর একটু আগে এলেই ভালো করতেন।

—কেন?

—কারণ একটু আগেই বরুণ এসে আমার সঙ্গে দেখা করে গিয়েছে!'

প্রশান্ত সচকিত কণ্ঠে বললে, 'দীনু তাহলে এর মধ্যেই এখানে এসেছিল?

—এসেছিল, বসেছিল, হেসেছিল, গল্প করেছিল, খাবার খেয়েছিল— আরও কিছু শুনতে চান?

—দেখছেন অরুণবাবু, আপনার বাড়ির উপরে নজর রেখে আমরা কিছু অন্যায় করি না?

—কিন্তু আপাতত আমার বাড়ির উপরে নজর রেখেও আপনি আর কিছু সুবিধা করে উঠতে পারবেন না।

—তাই নাকি? কেন বলুন দেখি?

—কারণ মাস-তিনেকের জন্যে আমি বিদেশে যাচ্ছি।

—বিদেশ? কোথায়?

—পশ্চিমের নানা জায়গায়।

—বেড়াতে?

—হ্যাঁ। অবশ্য বাড়িখানাকে আমি মাথায় করে নিয়ে যাব না। তার উপরে আপনি যতখুশি নজর দিতে পারবেন।

—খালি বাড়ির উপরে নজর দিয়ে লাভ?

—লাভ-লোকসান আপনি বুঝবেন।

একটু চুপ করে থেকে প্রশান্ত বললে, 'একটা প্রশ্নের জবাব দেবেন?'

—কী প্রশ্ন?

—দীনু কি কিছুদিন এখন চুপচাপ থাকবে? না, আবার আমাকে জ্বালাবে?

—তা আমি কেমন করে বলব? তবে সে যে চুপচাপ থাকবার ছেলে নয়, এ আমি জানি। তার মাথায় নিত্য-নূতন ফন্দির উদয় হয়। সে জড়ের মতন বসে থাকতে পারে না। বরং তার সঙ্গে তুলনা করা যায় ঘূর্ণাবর্তের।

প্রশান্ত নিরাশ ভাবে বললে, 'বড়োই সমস্যায় পড়ে গেলুম মশাই! দেখছি, দীনুই হবে আমার যমদূত। কারাগারেও যাকে ধরে রাখা যায় না, তাকে সামলানো কি বড়ো চাট্টিখানিক কথা?' একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বিদায় নিলে।

চতুর্থ

শঙ্করলাল

চোর, ডাকাত, গুন্ডাদের সর্দার মহাদেওর কাহিনি আগেই বলা হয়েছে।*

তার ভাই শঙ্করলালও আপনাদের অপরিচিত নয়।

বরুণ অর্থাৎ দীনুর জন্যেই মহাদেও ফাঁসিকাঠে চড়ে এবং শঙ্করলাল তাই বরুণকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেয়।

মহাদেও ছিল বিপুল সম্পত্তির মালিক। তার সন্তান ছিল না, কাজেই এখন এই সম্পত্তির অধিকারী হয়েছে শঙ্করলালই।

শঙ্করলাল বাস করে রাজ-রাজড়ার মতো। সুসজ্জিত প্রকাণ্ড অট্টালিকা, দলে দলে দাস-দাসী, দ্বারবান, কর্মচারী, খান-পাঁচেক মোটরগাড়ি—ঐশ্বর্যের কোনো উপকরণেরই অভাব নেই তার। প্রতি সন্ধ্যায় তার বাড়িতে বসে গান-বাজনার মজলিজ—দেশ-বিদেশের বড়ো বড়ো গাইয়েরা এসে শঙ্করবাবুর চিত্তবিনোদন করে।

শঙ্করলাল পশ্চিমের লোক, কিন্তু তাকে দেখলে বাঙালি ফুলবাবু ছাড়া আর কিছু মনে হয় না। সে কেবল বাঙালির পোশাকই পরে না, কথাও কয় বাংলায়— যদিও তার কথার টান বুঝিয়ে দেয় যে, সে বাঙালি নয়। কিন্তু শঙ্করের বাইরের চেহারা বিলাসীবাবুর মতন হলে কী হয়, যার দৃষ্টি তীক্ষ্ন সে অনায়াসেই লক্ষ করতে পারবে যে, তার চোখ-মুখের ভিতর থেকে যখন-তখন ফুটে ওঠে হিংস্র ও নিষ্ঠুর বন্য ভাব!

আর সত্যসত্যই তার ভিতরটাকে ভয়ানক ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। তার এই বাইরের জাঁকজমক ও বিলাসিতা হচ্ছে পৃথিবীর চক্ষে ধূলিনিক্ষেপের জন্যে, কিন্তু এর পিছনে লুকানো আছে মারাত্মক রহস্য। আসল ব্যাপার হচ্ছে, শঙ্করলালও আজকাল তার দাদা মহাদেওর মতন হয়েছে শয়তানদের সর্দার।

কলকাতার ভিতরে ও বাংলার বাইরে তার তাঁবে আছে বড়ো বড়ো বদমাইশের দল এবং এইসব দলে আছে শত শত চোর, জালিয়াত, ডাকাত ও হত্যাকারী। ভারতের দেশে দেশে তারা নিরীহ গৃহস্থদের উপরে গিয়ে হানা দেয়— অথচ তার দলভুক্ত পাপিষ্ঠদের কেউ জানে না, তাদের প্রধান দলপতি কে!

শঙ্করের সহকারী রূপে কাজ করে জনকয় বাছা-বাছা বিশ্বস্ত লোক, সর্দারকে চেনে কেবল তারাই। কিন্তু তাদেরও শঙ্করের বাড়িতে আসবার হুকুম নেই। তাদের কাছে দলপতির আদেশ বহন করে নিয়ে যায় পিয়ারীলাল— সে হচ্ছে শঙ্করের ডানহাতের মতো। এইভাবে কলকাতার মান্যগণ্য লোকদের মাঝখানেই বসে শঙ্করলাল যবনিকার অন্তরাল থেকে সুতো টেনে তার হাতের সাংঘাতিক পুতুলগুলোকে খুশিমতো নাচিয়ে নিজের কাজ সারে।

দেশের লোকদের চিত্ত জয় করবার জন্যে শঙ্করলাল পরম ধার্মিক ও দাতার ভূমিকাতেও অভিনয় করে। বহু মঠ, হাসপাতাল ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানে প্রায়ই সে অর্থ সাহায্য করতে ভোলে না। নিজের বাড়ির সামনেও নিয়মিত ভাবে শত শত কাঙালি ভোজন করায় এবং খবরের কাগজের প্রসাদে এসব কথা চারিদিকে প্রচারিত হয়ে যায়। দেশে দাতা বলে তার খ্যাতি রটে গিয়েছে। এমনকি অনেকের বিশ্বাস, সরকার থেকে শীঘ্রই তার উপাধি লাভের সম্ভাবনা।

মাঝে মাঝে শঙ্করলালের দলের লোকেরা ধরাও পড়ে, শাস্তিও পায়। মাঝে মাঝে তার প্রতি পুলিশের সন্দেহও জাগে। কিন্তু তবু সে এমন নিরাপদ ব্যবধানে থাকে যে, পঙ্গু আইনের দৃষ্টি তার কাছ পর্যন্ত পৌঁছোতে পারে না।

সেদিন দুপুরে আহারাদির পর শঙ্করলাল বৈঠকখানায় তাকিয়া ঠেস দিয়ে বসে তাম্রকূট সেবন করছে, এমন সময়ে দ্রুতপদে পিয়ারীলাল এসে হাজির হল।

মুখ থেকে গড়গড়ার নলটা খুলে শঙ্করলাল বললে, 'কী হে পিয়ারী, তোমার মুখের ভাব অমনধারা কেন?'

পিয়ারীলাল ঢালা বিছানার একধারে বসে পড়ে বললে, 'এইমাত্র খবর পেলুম, দীনুডাকাত পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়েছে।'

শঙ্করের মুখের ভাব বদলাল না বটে, কিন্তু তার চোখদুটো চমকে উঠল চকিতের জন্যে। নীরবে তামাকের নলে গোটাকয় টান মারলে। তারপর সহজ স্বরেই বললে, 'সত্যি খবর?'

পিয়ারীলাল বললে, 'সত্যি বই কি বাবুজি! শহরময় হই চই পড়ে গিয়েছে!'

—কেমন করে পালাল?

পিয়ারীলাল সমস্ত বর্ণনা করলে।

শঙ্করলাল বললে, 'আজব খবর বটে। এমন কড়া পাহারার ভিতর থেকে এত সহজে কেউ পালাতে পারে? বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হচ্ছে না।'

—কিন্তু বাবুজি, বিশ্বাস না করেও উপায় নেই।

—উপায় নেই? বেশ, তাহলে বিশ্বাস করলুম। কিন্তু তুমি এতটা উত্তেজিত হয়েছ কেন?

—বলেন কী বাবুজি, উত্তেজিত হব না? জানেন, দীনু আপনার বন্ধু নয়?'

শঙ্করলাল একটু হেসে বললে, 'আমার শত্রুর অভাব নেই। না হয় আর একজন বাড়ল। এতে ভয় পাবার কী আছে?'

—দীনু যদি প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা করে?

—মারা পড়বে। আর, সে প্রতিশোধ নেবার চেষ্টা না করলেও আমি তাকে ছাড়ব না। সে আমার দাদার হত্যাকারী। গেল-বারে তার রক্ত দেখেছি। এবারে তার মরা মুখ দেখব। আর তাকে পুলিশের হাতে সঁপে দেব না— এই আমার প্রতিজ্ঞা।

শঙ্করলাল ঘনঘন তামাকের নল টানতে লাগল, পিয়ারীলাল চুপ করে বসে রইল। খানিকক্ষণ পরে সে বললে, 'বাবুজি, আমি বলি দীনুকে আর ঘাঁটিয়ে কাজ নেই।'

—কেন বল দেখি?

—দীনুর দলও হালকা নয়। হয়তো সে আমাদের অনেক খবর রাখে। ভেবে দেখুন, বাইরের বহু লোকের সাহায্য না পেলে কেউ এমনভাবে পালাতে পারে না। হাজতের ভিতরে বসে যে এমন আশ্চর্য ব্যবস্থা করতে পারে, সে কি সহজ মানুষ?

—না পিয়ারী, আমি দীনুকে ভয় করি না। আমার কী বিশ্বাস জানো? হয় বাংলাদেশের পুলিশ ঘুমন্ত, নয় দীনুর কাছে ঘুষ খেয়ে পুলিশ তাকে পালাতে দিয়েছে।

পিয়ারীলাল তবু মাথা নাড়তে নাড়তে বলে, 'কী জানি বাবুজি, ব্যাপারটা আমার কেমন ভালো লাগছে না। যেচে কালসাপকে খোঁচানো উচিত নয়। একদিকে পুলিশ, আর একদিকে দীনুর শত্রুতাকে নিয়ে আমরা দুদিক সামলাতে পারব কি?'

তাকিয়া ছেড়ে সোজা হয়ে উঠে বসে শঙ্করলাল বললে, 'পারতে হবে পিয়ারী, পারতে হবে। বুদ্ধিবলই হচ্ছে সেরা বল। যা বলি শোনো। শহরের চারিদিকে চর পাঠাও। দীনুর আড্ডার খোঁজ নাও। ভালো করে ফাঁদ পাতো। আমি নিজে হাতেনাতে কাজ করি না বটে, কিন্তু দাদার হত্যাকারীকে বধ করব আমি স্বহস্তেই।'

পঞ্চম

কদিন ধরে প্রশান্ত হচ্ছে ভেবে ভেবে সারা। দীনুডাকাত পলায়ন করে তাকে নিক্ষেপ করে গিয়েছে ভাবনাসমুদ্রে।

দীনুর পলায়ন-প্রহসনের জন্যে তাকে কেউ দায়ী বলে মনে করেনি। সব ঝুক্কি পড়েছে গিয়ে জেলগাড়ির রক্ষী সার্জেন্টের উপরে। সে যদি বন্দির উপরে তার দৃষ্টি সমান সজাগ রাখত, তাহলে দীনু পালাবার কোনো সুযোগই পেত না।

কাজেই এজন্যে প্রশান্তের মন ক্ষুণ্ণ হবার কথা নয়। কিন্তু মনে মনে এই সত্যটা বারংবার অনুভব করতে পারছিল যে, ঘটনাক্ষেত্রে সে নিজেও উপস্থিত থেকে দীনুকে কোনোরকম বাধাই দিতে পারেনি, বরং নকল দীনুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে থেকে আসল দীনুর পলায়নপথ করে দিয়েছিল আরও সুগম।

প্রশান্ত বারংবার মানসচক্ষে দর্শন করে, দীনুডাকাত নিজের আড্ডায় বসে তার গাধামির কথা স্মরণ করে অট্টহাস্যে যেন ঘরের ছাদ ফাটিয়ে দিচ্ছে! সেই বিশ্রী অট্টহাস্য শুনে তার আত্মসম্মান যেন কুঁচকে পড়তে চায়! মনে মনে সে পণ করে, এ বাহাদুরির সুখ বেশিদিন আমি দীনুকে ভোগ করতে দেব না— করব, করব, আবার তাকে গ্রেপ্তার করব!

কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করা যত সহজ, দীনুকে গ্রেপ্তার করা ততটা সহজ নয়। পালিয়ে গিয়ে সে যে কোথায় ডুব মেরেছে তা আবিষ্কার করা যেন অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

এক উপায় ছিল অরুণের এবং তার বাড়ির উপরে সজাগ দৃষ্টি রাখা, কারণ অরুণ আর দীনু পরস্পরকে না দেখে থাকতে পারে না। কিন্তু আজকের ট্রেনে অরুণও করেছে পশ্চিমের দিকে যাত্রা। সুতরাং এদিক থেকেও আর কোনোরকম সূত্র পাওয়া সম্ভবপর হবে না।

তাহলে উপায়?

টেবিলের উপরে একজোড়া পা তুলে দিয়ে চেয়ারে বসে প্রশান্ত ভাবতে আর ভাবতে আর ভাবতে লাগল। তারপর হঠাৎ টেবিলের উপর থেকে মেঝের উপরে পা দুটোকে সশব্দে নামিয়ে ফেলে, চেয়ার ছেড়ে উঠে একটি ছোটোখাটো লম্ফত্যাগ করলে এবং তার উল্লসিত মন যেন সচিৎকারে বলে উঠল— 'হয়েছে, হয়েছে, একটা উপায় হয়েছে!'

দীনুর লেখা নীল পত্রের একটা জায়গা তার মনে পড়ে গেল : 'যতদিন না প্রতিশোধ নিতে পারি, শঙ্করলালকে আমি ভুলব না!'

এ যে একটা মস্ত সূত্র! কেন সে এটা নিয়ে একবারও মাথা ঘামায়নি?

দীনু যখন জিদ ধরেছে, শঙ্করলালকে নিশ্চয়ই ছাড়বে না!

শঙ্করলাল একাধিক বার তাকে প্রাণে মারবার চেষ্টা করেছিল, তারপর তাকে ধরিয়ে দিয়েছিল বলতে গেলে একরকম সেই-ই!

দীনু যে রকম একরোখা লোক, শঙ্করলালকে নিশ্চয়ই শাস্তি দেবে! সে আর যাইই হোক, নিজের বাক্যরক্ষা করে। বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে প্রশান্ত হাড়েহাড়ে টের পেয়েছে এই পরম সত্যটা। কতদিন সে পুলিশকে আগে থাকতেই জানিয়ে দিয়েছে, কোন তারিখে কোথায় গিয়ে সে চুরি বা ডাকাতি করবে! তারপর বিপদ ও ধরা পড়বার ভয়েও নিজের বাক্যরক্ষা করতে পশ্চাৎপদ হয়নি— পুলিশের চোখের উপরেই যথাসময়ে কেল্লা ফতে করে তবে সে আবার অদৃশ্য হয়েছে!

অতএব দীনু অবশ্যই আসবে শঙ্করলালের বাড়িতে!

এবং তাকেও যক্ষের মতন আগলে বসে থাকতে হবে শঙ্করলালের বাড়িখানা।

কিন্তু এই শঙ্করলাল সম্বন্ধেও সন্দেহ আছে। সবাই বলে সে খুব দানী ও ধার্মিক— দেশের ও দশের মাঝখানে এই অল্পদিনেই তার প্রভাব-প্রতিপত্তি যথেষ্ট বেড়ে উঠেছে। কিন্তু তাকে নিয়ে নানারকম কানাঘুষাও শোনা যায়— যদিও প্রমাণ অভাবে তাকে ধরবার ছোঁবার উপায় নেই।

দীনু বলে বটে শঙ্করলাল বারবার তাকে খুন করবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু এক্ষেত্রেও দীনুর মুখের কথা ছাড়া আর কোনো প্রমাণ বা সাক্ষী নেই।

কিন্তু শঙ্করলালের দাদা হচ্ছে নামজাদা গুন্ডা মহাদেও। আর পুলিশ গোপনে খোঁজ নিয়ে দেখে দেখেছে, নানা ব্যাঙ্কের হিসাবে তার জমা টাকার পরিমাণ মাসে মাসে বেড়ে উঠছে আশ্চর্য ভাবেই। তার এত টাকার আমদানি হচ্ছে কোথা থেকে?

যাক, শঙ্করলালকে নিয়ে পরেও মাথা ঘামালে চলবে, আপাতত দরকার কেবল দীনুডাকাতকে।

সেইদিন থেকেই শঙ্করলালের বাড়ির উপরে বসল পুলিশের পাহারা। দিনের চেয়ে রাতেই দীনুর আগমন-সম্ভাবনা বেশি বলে সন্ধ্যার পর থেকে প্রত্যহ প্রশান্ত নিজেই ছদ্মবেশ পরে রাত জেগে যথাস্থানে রাখে খর দৃষ্টি।

এমনি করে দিনের পর দিন যায়, প্রশান্ত একমনে করে দীনুর ধ্যান ধারণা, কিন্তু তবু দেখা দেয় না নিষ্ঠুর দীনু!

প্রশান্ত কিন্তু নাছোড়বান্দা! সে মনে মনে রবিবাবুর একটি গানের লাইন স্মরণ করে—

'নিশিদিন ভরসা রাখিস, ওরে মন হবেই হবে!'

সে বিলাতের পৃথিবীবিখ্যাত স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডস-এর সত্যিকার গোয়েন্দাদের কাহিনি পাঠ করেছে। তারা উপন্যাসের কাল্পনিক গোয়েন্দাদের মতো তুড়ি মেরে কেল্লা ফতে করতে পারে না বটে, কিন্তু ছোটো বা বড়ো একটিমাত্র সূত্র আঁকড়ে মাসের পর মাস ধরে বসে থেকে শেষটা প্রায়ই কাজ হাসিল করে।

অতএব প্রশান্ত বুড়ি ছেড়ে নড়ল না, কপাল ঠুকে বসে রইল সবুরে মেওয়া ফলে কিনা দেখবার জন্যে!

... ... ...

ঢালের অন্য পিঠেও উঁকি মারবার চেষ্টা করি।

বরুণ এখন কী করছে সেটাও এইবারে দেখা দরকার। আমরা— অর্থাৎ ঔপন্যাসিকরা হচ্ছি অদ্ভুত লোক। দশটা বেজে এক মিনিটের সময়ে আমরা স্বর্গে উঠে ভগবানের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারি, আবার দশটা বেজে দু-মিনিটের সময়ে নরকে নেমে আলাপ করে আসতে পারি স্বয়ং শয়তানের সঙ্গে! আমাদের মনোরথের আশ্চর্য গতির কাছে যে-কোনো বেগবান এরোপ্লেনকেও মনে হবে উড়ন্ত শামুকের মতো। আমাদের গতিই কেবল অবাধ নয়, আনাগোনা করবার অধিকার আমাদের আছে স্বর্গ-মর্ত-রসাতলের সর্বত্রই।

সুতরাং চোখের পলকেই আমরা যদি প্রশান্তের কাছ থেকে বরুণের কাছে গিয়ে হাজির হই, তাহলে তোমরা অবাক হোয়ো না। বাঘের গর্তে আর গোরুর গোয়ালে আমাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ নয়।

পূর্ব আকাশে তখন সবে ফুটে উঠেছে উষাকুমারীর হাসির আভা।

এরই মধ্যে বরুণ মুগুর ভেঁজে ও ডন-বৈঠক দিয়ে নিয়ে বসে বসে হাঁপ ছাড়ছে।

এমন সময়ে ছোট্টুলালের দেখা পাওয়া গেল।

বরুণ শুধোলে, 'কী রে ছোট্টু, খবর কী?'

ছোট্টু বললে, 'নতুন খবর কিছুই নেই।'

—প্রশান্ত এখনও হাল ছাড়েনি?

—না। কালও সারা রাত সে শঙ্করের বাড়ির পাশে কানা গলির ভিতরে একটা রোয়াকে অন্ধকারে গা ঢেকে বসে ছিল। তার অন্য অন্য চরেরাও নানারকম পোশাক পরে আনাচে-কানাচে ঘোরাঘুরি করেছে।

—তাহলে আমার পক্ষে ও-অঞ্চলে যাওয়া এখন বিপজ্জনক?

—হ্যাঁ হুজুর।

—তাহলে কেমন করে শঙ্করলালকে শাস্তি দিই বলো দেখি?

—আমি কেমন করে বলব হুজুর?

—তাহলে তুই বলতে পারবি না? কেন রে ছোট্টু, তোর মাথা তো খুব সাফ?

ছোট্টু লজ্জিত ভাবে বললে, 'কী যে বলেন হুজুর, আপনার মাথা আর আমার মাথা? কথায় বলে—'কীসে আর কীসে? না, সোনায় আর সিসে'!'

বরুণ তার পিঠ চাপড়ে বললে, 'বা রে ছোট্টু, বাঃ! তুই যে বাংলা প্রবাদ কপচাতেও শিখেছিস দেখছি!'

—হ্যাঁ হুজুর, বাংলাদেশেই আমি জন্মেছি, এখন তো আমি বাঙালি!

—বেশ, বেশ। কিন্তু শঙ্করলালকে নিয়ে যে সমস্যায় পড়া গেল! রামধনীর খবর কী?

—সে শঙ্করলালের বাড়িতে নিরাপদেই কাজ করছে। কেউ তাকে সন্দেহ করেনি।

—শঙ্করলাল কি এখনও আমাকে খুঁজছে? রামধনী কী বলে?

—রামধনীর মুখে শুনলুম, শঙ্করলাল তার চরদের ডেকে বলেছে— যে আপনার খবর দিতে পারবে তাকেই হাজার টাকা বকশিশ দেবে!

বরুণ হা হা করে হেসে উঠে বললে, 'জানিস ছোট্টু, আমাকে ধরবার জন্যে পুলিশ থেকেও পাঁচ হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা হয়েছে? আমি এখন বড়োই মূল্যবান জীব রে! আমাকে পাবার জন্যে সবাই লালায়িত হয়ে উঠেছে!'

ছোট্টু বললে, 'কিন্তু আপনার খবর যারা রাখে, পঞ্চাশ হাজার টাকা পেলেও তারা বিশ্বাসঘাতকতা করবে না।'

—সেই সুখেই তো বেঁচে আছি ভাই! বিশ্বস্ত বন্ধুর ভালোবাসা পাওয়া কি কম ভাগ্যের কথা? আচ্ছা, রামধনীর মুখে আর কিছু শুনলি?

—শঙ্করলালের লোহার সিন্দুকে কী আছে সে জানতে পেরেছে।

—এটা সুখবর।

—সিন্দুকে আছে একশোখানা হাজার টাকার নোট, জড়োয়া গয়নায় আর সোনা-দানাতেও আছে আরও লাখ টাকার জিনিস।

—এত টাকা বাড়িতে রাখার কারণ?

—শঙ্করলাল নাকি সর্বদাই বিপদের জন্যে প্রস্তুত! হঠাৎ পালাবার দরকার হলে সে এই সম্পত্তি নিয়ে অদৃশ্য হতে চায়।

বরুণ মুখ নামিয়ে স্তব্ধ হয়ে খানিকক্ষণ কী ভাবলে। তারপর হাসতে হাসতে বললে, 'ঠিক ছোট্টু, ঠিক! হয়েছে!'

—কী হুজুর?

—শঙ্করলালকে আমি প্রথমেই কী শাস্তি দেব জানিস? ওই দুই লক্ষ টাকার নোট আর গয়না তার কাছ থেকে আমি জরিমানা স্বরূপ আদায় করব।

—কেমন করে হুজুর? তার বাড়ির চারিধারে যে পুলিশের পাহারা!

বরুণ উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'তাতে কিছু আসে যায় না। রামধনীকে জানিয়ে রাখিস, আসছে অমাবস্যার রাতে সে যেন শঙ্করলালের বাড়ির খিড়কির দরজা ভিতর থেকে খুলে রাখে। আর তার কাছে আমি যে ওষুধের শিশি দিয়েছি, বাড়ির চাকর-দারোয়ানদের জলের কলশিতে কী খাবারের জিনিসে যেন সেটা ব্যবহার করে।'

অমাবস্যার রাত

কালো ঘুটঘুটে মুখোশপরা অমাবস্যার রাত এসেছে ব্ল্যাক-আউটের অন্ধকারমাখা কলকাতার শিয়রে।

তার উপরে আজকের অবস্থা আরও ভয়াবহ। শূন্য দিয়ে ছুটে চলেছে কয়লারঙা মেঘের পর মেঘ— কড়-কড়-কড় ডাকছে বজ্র, ঝক-মক-ঝক জ্বলছে বিদ্যুৎ, ঝর-ঝর-ঝর ঝরছে বৃষ্টিধারা!

বিশ্বের যত কালিমা, যত কোলাহল আর যত অশ্রুজল যেন আজ একসঙ্গে জড়াজড়ি করতে চাইছে। পৃথিবী যেন আজ বিভীষিকার রঙ্গমঞ্চ।

শঙ্করলালের অট্টালিকাখানা যেন আজ রাস্তার উপর থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে এবং সেই স্থানটা অধিকার করে আছে জমাটবাঁধা অন্ধকার। কিছুই দেখা যায় না—

তবু সেই দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে গলির এক ভিজে রোয়াকের উপরে বসে ঠান্ডায় ঠক ঠক করে কাঁপছে প্রশান্ত চৌধুরী এবং তার আপাদমস্তক জুড়ে বয়ে যাচ্ছে বৃষ্টির জল।

বাজ, বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার শব্দ ছাড়া শহরের কোথাও আর কারুর সাড়া নেই। আজকে এ যেন মৃতজীবের পৃথিবী।

থেকে থেকে প্রশান্তের সন্দেহ হতে লাগল যে, তার অনুচররাও বোধহয় এখান থেকে সরে পড়ে কোনো নিরাপদ জায়গায় মাথা গোঁজবার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে।

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের বিখ্যাত গোয়েন্দাদের আদর্শ সামনে রেখেও প্রশান্ত আর ধৈর্যধারণ করতে পারছে না। তার দৃঢ়বিশ্বাস হল যে, এমন ভীষণ রাতে মানুষ দীনু কেন, একটা পথের কুকুরও পথে বেরুবার জন্যে আগ্রহ প্রকাশ করবে না! সে নিতান্ত নির্বোধ, তাই অন্ধকারে অন্ধ হয়ে বৃষ্টিতে ভিজে আর ঝড়ে কেঁপে কঠিন কোনো ব্যাধিকে আমন্ত্রণ করতে চাইছে!

শঙ্করলালের অতবড়ো বাড়ির একটা ঘরেও আলো জ্বলছে না। জ্বলবে কেন? কর্তা, গিন্নি, ছেলেমেয়ে, চাকর-দরোয়ান সবাই এখন আপন আপন বিছানায় সুখনিদ্রায় অচেতন। এমন ঝড়-জলে ঘুম যে আরও ঘন হয়ে ওঠে! দীনু এখন কী করছে? নিশ্চয়ই নরম বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে আরামে কুঁকড়ে খাসা একটি ঘুম দিচ্ছে! দুর্ভাগ্য কেবল তারই।

নিজের শয়নগৃহের গরম বিছানার কথা ভেবে প্রশান্তের মন যখন অত্যন্ত অধীর হয়ে উঠছে, তখন আচম্বিতে খুব কাছ থেকেই ঝড়-বৃষ্টির শব্দ ডুবিয়ে জেগে উঠল বিষম এক যন্ত্রণার আর্তনাদ!

স্প্রিং-টেপা পুতুলের মতন প্রশান্ত তড়াক করে লাফিয়ে উঠল। এবং সঙ্গে সঙ্গে গলির ভিতরকার একখানা বাড়িতে দপ করে জ্বলে উঠল বৈদ্যুতিক আলো।

পরমুহূর্তে শোনা গেল দুম করে একটা ভারী দরজা খোলার শব্দ এবং তার পরেই কে চিৎকার করলে, 'খুন! খুন! খুন!'

প্রশান্ত রোয়াক থেকে লম্ফত্যাগ করে নীচে নেমে সেইদিকে ছুটে গেল।

টর্চ টিপে দেখলে বাড়ির সদর দরজার সুমুখে দাঁড়িয়ে একটি বুড়ো ভদ্রলোক থরথর কাঁপছেন— বিষম আতঙ্কে তাঁর দুই চক্ষু বিস্ফারিত!

প্রশান্ত তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করলে, 'হয়েছে কী? কোথায় খুন হয়েছে?'

বৃদ্ধ জবাব দিতে পারলেন না, কেবল বাড়ির দোতালার দিকে করলেন অঙ্গুলিনির্দেশ।

কোমরের খাপ থেকে একটানে রিভলভারটা বার করে নিয়ে প্রশান্ত বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে বললে, 'আসুন আমার সঙ্গে।'

বৃদ্ধ ক্ষীণ কণ্ঠে সভয়ে বললেন, 'আমি যেতে পারব না— সে দৃশ্য আমি আর দেখতে পারব না— উঃ, কী ভয়ানক!'

প্রশান্ত ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'কী আশ্চর্য, তাহলে আমাকে পথ দেখাবে কে?'

বৃদ্ধ অবশ হয়ে মাটির উপরে বসে পড়ে বললেন, 'পথ দেখাতে হবে না, সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠেই ডানদিকের প্রথম ঘর। হে ভগবান, আমার কী সর্বনাশ হল!'

প্রশান্ত আর দাঁড়াল না, দ্রুতপদে এগিয়েই সামনে পেলে সিঁড়ির সার। সেখানে এবং বাড়ির উপরে আলো জ্বলছিল। সে টপাটপ সিঁড়িগুলো পার হয়ে দোতলায় গিয়ে হাজির হল। ডানদিকেই বারান্দা ও একখানা আলোকিত ঘর। কিন্তু তার ভিতরটা স্তব্ধ।

প্রশান্ত সন্তর্পণে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে। কিন্তু তারপরেই যে দৃশ্য দেখা গেল, তাতে প্রাণ-মন শিউরে ওঠে!

ঘরের এদিকে-ওদিকে উল্টে পড়ে আছে একটা টেবিল ও খানকয় চেয়ার এবং চারিদিকে বিষম ঝটাপটির স্পষ্ট চিহ্ন! মেঝের উপরে এখানে-ওখানে রক্তের ধারা এবং দুই পাশের দুই দেওয়ালের কাছে লম্বা হয়ে পড়ে আছে দুজন পুরুষের রক্তাক্ত দেহ! তাদের আড়ষ্ট মুখ, স্থির দৃষ্টি ও নিস্পন্দ দেহ দেখলেই বুঝতে বিলম্ব হয় না যে, তারা আর বেঁচে নেই!

কিন্তু হত্যাকারী কোথায়? নিশ্চয়ই বাড়ির অন্য কোথাও লুকিয়ে আছে! পালাবার আগেই তাকে ধরতে হবে।

দোতলায় মোট চারখানা ঘর। রিভলভার বাগিয়ে ধরে প্রশান্ত একে একে চারখানা ঘর খুঁজেও কারুকে দেখতে পেলে না। সিঁড়ি দিয়ে আরও উপরে উঠে গেলে দোতলার শূন্য ছাদ। বাকি রইল একতলা।

আবার নীচে নেমে সে একতলাতেও হত্যাকারীকে আবিষ্কার করতে পারলে না। কিন্তু বাড়ির উঠান পার হয়ে ওপাশে আর একটা দরজা পাওয়া গেল। সে দরজা খোলা। হত্যাকারী যে ওই দরজা খুলেই সরে পড়েছে সে-বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই!

প্রশান্ত আবার ছুটে প্রথম দরজার কাছে এল। বাইরে মুখ বাড়িয়ে সেই বৃদ্ধকে খুঁজতে লাগল। কিন্তু তার পাত্তা পাওয়া গেল না।

তখন তাকে নিয়ে আর মাথা না ঘামিয়ে প্রশান্ত তার সংকেত-বাঁশিতে ফুঁ দিলে। তখনই চারিদিক থেকে তার অনুচররা ছুটে এল দ্রুতবেগে।

প্রশান্ত বললে, 'এ-বাড়িতে ডবল খুন হয়েছে। জন-চার লোক আমার সঙ্গে এসো, বাকি সবাই এইখানে দাঁড়িয়ে থাকো।'

প্রশান্ত আবার দোতলায় উঠল। সেই ভয়াবহ ঘরের কাছে গিয়ে বললে, 'এই ঘরে খুন হয়েছে। ডবল খুন, একজোড়া লাশ।'

সকলে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে। তারপর এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে প্রশান্তের মুখ-চোখ হয়ে উঠল উদভ্রান্তের মতন! দু-দুটো মৃতদেহের একটাও সেখানে নেই!

সপ্তম

ডবল খুনের পর

প্রশান্তের সহকারী সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করলে, 'একজোড়া লাশ কোথায় স্যার?'

প্রশান্ত হতভম্বের মতন বললে, 'এইখানে দেখে গিয়েছি। কিন্তু এখন আর দেখতে পাচ্ছি না!'

সহকারী বললে, 'কী আশ্চর্য, তাও কি সম্ভব? ঘর ভুল করেননি তো?'

—নিশ্চয়ই নয়! চেয়ে দেখ, ঘরময় রক্তের ছড়াছড়ি! ওইখানে একটা লাশ পড়ে ছিল, আর একটা লাশ ছিল ওইখানে। চেয়ার-টেবিল উল্টে পড়ে আছে সেইভাবেই! ঠিক ঘরেই এসেছি!

সহকারী মাথা চুলকোতে বললে, 'এমন অদ্ভুত কাণ্ড তো কখনও দেখিনি!'

প্রশান্ত বললে, 'বুঝেছি। আমি যখন তোমাদের ডাকবার জন্যে নেমে রাস্তায় গিয়েছিলুম, লাশ লোপাট হয়েছে সেই সময়েই। এ খুন একজনে করেনি, তারা দলে ভারী।'

সহকারী দুই চক্ষু ছানাবড়ার মতন করে মুখ তুলে বললে, 'বলেন কী স্যার! এমন সাহসী খুনির কথা তো কখনও শুনিনি! পুলিশের চোখের উপর থেকে লাশ লোপাট! ওরে বাবা!'

প্রশান্ত ব্যস্তভাবে বললে, 'শীগগির নীচে চল! সবাইকে ডাকো! খুনিরা দুটো লাশ নিয়ে এখনও বেশিদূর পালাতে পারেনি। ও-দরজা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এখনই ব্যাটাদের পিছনে ছোটো! আর দেরি নয়— এসো!'

এক-এক লাফে দু'তিনটে করে সিঁড়ি পার হয়ে এবং বাঁশি বাজাতে বাজাতে প্রশান্ত নীচে নেমে গেল— তার পিছনে পিছনে নামল অন্যান্য পুলিশের লোক। বাড়ির সামনে বাকি যারা দাঁড়িয়ে ছিল, বাঁশির আওয়াজ শুনে তারা সবাই ভিতরে এসে দাঁড়াল।

প্রশান্ত খুব কম কথায় সমস্ত ঘটনা সবাইকে বুঝিয়ে দিয়ে বললে, 'ওদিকের দরজা দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়ো! পথে যে-কোনো গাড়ি বা যে-কোনো লোককে দেখবে, সবাইকে পাকড়াও কোরো! দেখি, শয়তানদের ধরতে পারি কিনা!'

বাড়ির ওধারেও প্রথমে একটা সরু গলি, তারপর বড়ো রাস্তা। গলি পার হয়ে সকলে বেগে বড়ো রাস্তার উপরে গিয়ে পড়ল।

তখনও অমাবস্যার রাত, কাজল মেঘ ও নিষ্প্রদীপ কলকাতা চতুর্দিকে সেই দৃষ্টি-অন্ধ-করা বিপুল কালিমাকে বিস্তৃত করে রেখেছে— যেদিকে তাকানো যায় কেবল অন্ধকার, অন্ধকার, অন্ধকার! রমঝম বাদলধারা তখনও ঝরছে, ভৈরব বজ্র তখনও হুংকার দিচ্ছে, উন্মত্ত ঝটিকা তখনও হাহাকার করে ছুটে বেড়াচ্ছে। পথে জনমানব নেই, কোনো গাড়ির শব্দ নেই, একটা কুকুর-বিড়ালেরও পদশব্দ নেই।

এই প্রচণ্ড অন্ধকারের রাজ্যে কারুকে আবিষ্কার করবার চেষ্টা বৃথা। তবু প্রশান্ত ও তার দলবল দিকে দিকে অনেক দূর পর্যন্ত খুঁজে আর ছুটে বেড়ালে, কিন্তু তাদের সমস্ত পরিশ্রমই হল ব্যর্থ! এ পৃথিবী আজ যেন কোনো অভাবিত বিভীষিকার ছদ্মবেশ ধারণ করেছে, যার বুক জুড়ে বইছে কেবল তিমিরসাগরের তরঙ্গের পর তরঙ্গ!

সহকারী বললে, 'স্যার, বুনোহাঁসরা পালিয়ে গিয়েছে, আর তাদের পিছনে ছুটে লাভ নেই। এখন কী করব বলুন?'

প্রশান্ত একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললে, 'এসেছিলুম দীনুর খোঁজে, কিন্তু সে তো হয়েছে ডুমুরের ফুল! তার ওপরে ঘাড়ে চাপল আবার একটা ডবল-খুনের মামলা। আমারই বরাত! চলো, আর একবার শঙ্করলালের বাড়ির ওদিকেই যাই!'

ইতিমধ্যে প্রায় দশ মিনিট কেটে গিয়েছে। কিন্তু খানিক দূর অগ্রসর হয়েই তারা সবিস্ময়ে দেখলে, শঙ্করলালের বাড়ির সুমুখটা আলোয় আলোয় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠল আচম্বিতে! তারপরেই শোনা গেল যেন কাদের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর!

ধাঁ করে প্রশান্তের মাথার ভিতর দিয়ে খেলে গেল একটা বিশেষ সন্দেহের বিদ্যুৎ! সে প্রায় অবরুদ্ধ স্বরে বললে, 'আমার সঙ্গে ছুটে এসো— শিগগির!'

অনেকগুলো ভারী ভারী দ্রুত পদশব্দে চারিদিক কাঁপিয়ে পুলিশবাহিনী উপস্থিত হল শঙ্করলালের অট্টালিকার সামনে। রাস্তায় দাঁড়িয়েই তারা দেখতে পেলে, এতক্ষণ যে-বাড়ি মগ্ন হয়ে ছিল অন্ধকারের অতলে, এখন তার উপরকার ঘরে ঘরে ছুটোছুটি করছে লোকের পর লোক এবং তারা চিৎকারও করছে নানান রকম কণ্ঠস্বরে! নিশ্চয়ই বাড়ির ভিতরে আজ ঘটেছে কোনো অসাধারণ ঘটনা!

প্রশান্ত দৌড়ে গিয়ে শঙ্করলালের বাড়ির ফটকের উপর ধাক্কা মারতে মারতে চিৎকার করে বললে, 'ফটক খোলো, ফটক খোলো! এখানে এত গোলমাল কীসের?'

বাড়ির উপর থেকে কর্কশ স্বরে চেঁচিয়ে কে বললে 'কে তোমরা! কী চাও?'

প্রশান্ত অধীর কণ্ঠে বললে, 'কী হয়েছে এখানে? আমরা পুলিশের লোক।'

উপর থেকে কণ্ঠস্বর এল, 'অপেক্ষা করুন। এখুনি ফটক খুলে দিচ্ছি।'

মিনিট-খানেকের মধ্যেই নীচে নেমে ফটক খুলে দিলে স্বয়ং শঙ্করলাল।

প্রশান্ত টর্চের আলোকশিখা তার মুখের উপরে নিক্ষেপ করে বললে, 'আপনিই বোধহয় শঙ্করবাবু?'

জবাব হল, 'হ্যাঁ।'

—কী হয়েছে বলতে পারেন?

—আমার লোহার সিন্দুক থেকে দু-লক্ষ টাকা চুরি গিয়েছে!

—দু-লক্ষ টাকা চুরি গিয়েছে! কেমন করে?

—তা বলতে পারি না। চোরেরা কিন্তু আমার লোহার সিন্দুক খুলেছে, চুরি করেছে, আর পালিয়েও গিয়েছে।

প্রশান্তের বুকটা ধড়ফড় করে উঠল। সে প্রায় ক্লান্ত স্বরেই বললে, 'চোরেরা কেমন করে আপনার বাড়ির ভিতরে ঢুকল? শুনেছি আপনার অনেক দরোয়ান আর চাকর আছে, তারা কি চোরেদের সাড়া পায়নি? তারা কী করছিল?'

শঙ্করলাল একটুখানি ম্লান হাসি হেসে বললে, 'তারা ঘুমোচ্ছিল। তারা এখনও ঘুমোচ্ছে। অনেক ডাকাডাকি করেও তাদের জাগাতে পারছি না। মনে হচ্ছে তাদের কেউ কিছু খাইয়েছে।'

—আপনি কেমন করে চুরির খবর পেলেন? আপনিও নিশ্চয়ই ঘুমোচ্ছিলেন?

—আজ্ঞে হ্যাঁ, ঘুমোচ্ছিলুম। কিন্তু হঠাৎ কোনো শব্দ শুনেই হোক বা আর যে-কারণেই হোক আমার ঘুম গেল ভেঙে। মনে কেমন সন্দেহ হল। তাড়াতাড়ি দরজা খুলে বাইরে বেরিয়েই দেখি, চার-পাঁচজন লোক ছুটে তেতলা থেকে নীচের দিকে নেমে গেল। আমিও তাদের পিছনে পিছনে নেমে এলুম— কিন্তু আর তাদের দেখতে পেলুম না। নীচে এসে দেখি, বাড়ির খিড়কির দরজাটা খোলা রয়েছে।

প্রশান্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল, তার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা ফুটল না।

শঙ্করলাল বললে, 'আপনি আমাকে চেনেন না বোধহয়, কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আপনিই তো প্রশান্তবাবু?'

প্রশান্ত ক্ষীণ স্বরে বললে, 'হুঁ।'

—আপনার নামে একখানা চিঠি আমার লোহার সিন্দুকের ওপরে পড়ে ছিল।

প্রশান্ত অত্যন্ত অবসন্নভাবে বললে, 'বুঝতে পারছি, সে চিঠি কার লেখা!

—একখানা নীল রঙের খাম, ওপরে লাল কালিতে আপনার নাম লেখা। এই নিন।

প্রশান্ত অত্যন্ত নাচারের মতন পত্রখানা শঙ্করলালের হাত থেকে গ্রহণ করলে। তারপর কৌতূহলী দৃষ্টির কবল থেকে অব্যাহতি পাবার জন্যে একটু সরে গিয়ে টর্চের আলোকে পাঠ করলে :

'ভাই প্রশান্ত,

তুমি 'ঢেঁকিশাল দিয়ে কটকে' যাবার চেষ্টায় ছিলে, না? কিন্তু পারলে কি?

তোমার যুক্তি ছিল এই : যেহেতু শঙ্করলালের বাড়িতে হবে আমার আবির্ভাব, সেই হেতু ওখানে পাহারা দিলেই তুমি করবে আমাকে লাভ।

কিন্তু এটা হচ্ছে উল্টো যুক্তি। তুমি কী ভেবেছ, তোমার গতিবিধির উপরেও নজর রাখিনি? যেচে ব্যাধের ফাঁদে পা দিয়ে আমার এই বহুকষ্টার্জিত স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হব, এমন কাঁচা ছেলে আমি নই। স্বাধীনতাকে আমি বরাবরই ভালোবাসতুম। কিন্তু অধীনতার যাতনা যে কতখানি মর্মান্তিক, তোমার বাঁধন-দড়ি পায়ে পরবার আগে আমি ভালো করে অনুভব করতে পারিনি। সাতমাসকাল আমি ছিলুম ইচ্ছার বিরুদ্ধেও ফিরিঙ্গী রাজার অতিথি। সেই সাতমাসব্যাপী দুঃস্বপ্নকে ভুলব না, আমি জীবনে ভুলব না। এবার ধরা পড়বার আগে করব আত্মহত্যা।

তোমার বিদ্যা-বুদ্ধির দৌড় তো আমি জানি। তাই বুঝেসুঝে আজ আমি পেতেছিলুম ব্যাধভোলানো ফাঁদ।

এতক্ষণে ব্যাপারটা তুমি যে কতক-কতক আন্দাজ করতে পেরেছ, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু বোধহয় এখনও তোমার কাছে সব রহস্য পরিষ্কার হয়ে যায় নি? আচ্ছা, আমি সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিচ্ছি।

'খুন! খুন!' চিৎকার শুনে বন্য মহিষের মতো গলির যে বাড়িখানার দিকে তুমি ধাবিত হয়েছিলে, কিছুকাল আগে ওখানা ভাড়া নিয়েছি আমিই। কেন জানো? শঙ্করলালের আর তোমাদের উপরে তীক্ষ্ন দৃষ্টি রাখবার জন্যে। কতদিন যে আমি তোমারই মতন সজাগ পাহারাওয়ালার সুমুখ দিয়েই ও-বাড়িতে গিয়ে ঢুকেছি তার আর সংখ্যা নেই। তোমার ধ্যানের ঠাকুর তোমারই সামনে দিয়ে চলে গিয়েছে, আর তুমি হতভাগ্য বসে বসে দেখেছ কেবল অন্ধকারের স্বপ্ন! অবশ্য এ-কথা না বললেও চলবে যে, আমি ধারণ করতুম ছদ্মবেশ।

তারপর শোনো। ও-বাড়ির দোতলায় উঠে তুমি দুটো লাশ দেখেছিলে তো? কিন্তু তারা মড়া নয়, জ্যান্ত মানুষ। তারা মৃত্যুর ভান করে ছিল মাত্র। যা দেখে তুমি মনে করেছ রক্ত, তা হচ্ছে রাঙা রং! অর্থাৎ ওখানে কোনো খুনই হয়নি!

যেই তুমি সাহায্যের জন্যে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলে, অমনি মড়ারা উঠে খিড়কির দরজা দিয়ে চম্পট দিলে। তারপর তোমরা যখন লাশ ও খুনির খোঁজে দিগবিদিকে ছুটোছুটি আরম্ভ করেছ, সেই ফাঁকে আমি ঢুকেছি শঙ্করলালের বাড়ির ভিতরে। কোন কৌশলে তা বলব না, কারণ সেটা হচ্ছে আমার গুপ্তকথা।

আমার পরিকল্পনা ভালো লাগছে? তাহলে আর একটা কথাও শুনে রাখো। আমার এই পরিকল্পনার সফলতা সম্বন্ধে আমি এতটা নিশ্চিত যে, কোনো ঘটনা ঘটবার আগেই— অর্থাৎ ঘটনাক্ষেত্রে যাত্রা করবার আগেই তোমার জন্যে এই পত্ররচনা করতে বসে আমার মূল্যবান সময় নষ্ট করছি!

এইবারে আজকের ঘটনাগুলোর পিছনে কী অর্থ আছে বোঝবার চেষ্টা করো। এখন বলো দেখি, আজ তোমার প্রত্যেকটি কার্যের কর্মকর্তা ছিল কে? তুমি? না আমি? আজ তুমি নিজের ইচ্ছায় একটিও কাজ করনি! আমি যা যা হুকুম করেছি, পরম অনুগতের মতো তুমি তার প্রত্যেকটিই পালন করেছেন, একবারও অবাধ্য হওনি। এজন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ! তোমার মতন ভৃত্য পাওয়া সৌভাগ্য!

আমার একটা উপদেশ শুনবে? শঙ্করলালের উপরে তীক্ষ্নদৃষ্টি রাখতে ভুলো না। সে হচ্ছে ভয়াবহ ব্যক্তি। তার বাইরের সাধুতা মুখোশ মাত্র। ভিতরে ভিতরে সে হচ্ছে একেবারে সর্বনিম্নস্তরের মহাপাপী। এ-বিষয়ে আমিও তোমাকে সাহায্য করব। যেদিনই তার বিরুদ্ধে আইনে মানে এমন প্রমাণ ও সাক্ষী সংগ্রহ করতে পারব, সেই দিনই স্মরণ করব আবার তোমার মতন পুরাতন বন্ধুবরকে। আজ এই পর্যন্ত।

'দীনবন্ধু'

অষ্টম

বুদ্ধুর সুসংবাদ

—আমি মুণ্ডু চাই, দীনুর মুণ্ডু! আমি তাকে দেখে নেব, আমি তাকে কুচিকুচি করে কেটে ফেলব! চেঁচিয়ে বললে শঙ্করলাল।

তার বাড়িতে চুরি হবার পর পনেরো দিন চলে গিয়েছে, কিন্তু সে এখনও শান্ত হতে পারেনি।

পিয়ারীলাল বললে, 'বাবুজি, একটু আস্তে কথা বলুন। এতটা অধীর হলে চলবে কেন?'

রাগে ফুলতে ফুলতে শঙ্করলালের প্রকাণ্ড দেহ হয়ে উঠল প্রকাণ্ডতর। সে আরও জোরে চিৎকার করে বললে, 'অধীর হব না? এতেও অধীর হব না? আমার দলে এত লোক, আজও তবু কেউ দীনুর একটা খবর আনতে পারলে না! তুমি কী ভাবছ দু-লাখ টাকা হারিয়ে আমি এতটা অধীর হয়ে পড়েছি? একথা মনে কোরো না পিয়ারীলাল। অমন দু-লাখ আমি হাসিমুখেই বিলিয়ে দিতে পারি। আমি অধীর হয়েছি প্রতিশোধ নেবার জন্যে। দীনু আমার বাড়িতে এসে হানা দেবে, আমাকে ঠকিয়ে যাবে, এ আমি সহ্য করতে পারব না। বাঘ কখনও শেয়ালের পদাঘাত সহ্য করতে পারে? তার উপরে ভুলে যেয়ো না, দীনুর জন্যেই আমার দাদার মৃত্যু হয়েছে, আজও তার শোধ নেওয়া হল না! তবু আমি অধীর হব না পিয়ারীলাল?'

পিয়ারীলাল আবার বললে, 'আপনার পায়ে পড়ি বাবুজি, একটু আস্তে কথা বলুন।'

শঙ্করলাল বললে, 'কার ভয়ে আস্তে কথা কইব বল দেখি? বিশ্বাসঘাতক রামধনী তো আর বাড়িতে নেই!'

পিয়ারীলাল বললে, 'জানি বাবুজি। কিন্তু রামধনী যতদিন আমাদের এখানে ছিল, আমরা কি তাকে সন্দেহ করতে পেরেছিলুম? চুরির পরেই সে পালিয়ে গিয়েছিল বলেই তো তার আসল রূপ ধরতে পেরেছি। রামধনী নেই, কিন্তু দীনুর আরও কোনো চর এখানে আছে কিনা কে বলতে পারে?'

শঙ্করলালের রাগে-ফোলা দেহ যেন চুপসে গেল। সে গদির উপরে বসে পড়ে স্বর নামিয়ে বললে, 'পিয়ারীলাল, তোমার কথা শুনে আমার রাগ যে আরও বেড়ে উঠতে চাইছে! দীনুর অন্য কোনো চরও আমার বাড়িতে আছে নাকি?'

—থাকতেও পারে, না থাকতেও পারে।

—তাহলে এক কাজ করলেই তো হয়, বাড়ির সমস্ত চাকর-দরোয়ানদের তাড়িয়ে নতুন একদল লোক রাখব নাকি? তুমি কী পরামর্শ দাও?

পিয়ারীলাল একটু হেসে বললে, 'নতুন লোক রাখলে বিপদের সম্ভাবনা বাড়বে বই কমবে না। নতুন লোকজনদের অনেকেই আসবে হয়তো দীনুর আড্ডা থেকে। বাবুজি, দীনুডাকাতকে আপনি যতটা তুচ্ছ বলে ভাবছেন সে তা নয়। শুনেছি তার মনের জোর, বুদ্ধির জোর আর গায়ের জোর এই তিন জোরই আছে।'

শঙ্করলাল হো হো করে হেসে উঠে বললে, 'ভেতো বাঙালি, তার আবার গায়ের জোর! তুমি আমাকে হাসালে পিয়ারীলাল।'

—আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন, অতবড়ো পালোয়ান মহাদেওবাবুজিকে দীনু একলাই কাবু করেছিল?

—হতে পারে। দাদার বয়েস হয়েছিল, বুড়োকে কাবু করা শক্ত নয়। তুমি জানো তো, ছেলেবেলায় আমিও কুস্তি শিখেছি, দাদার কাছেই? দাদা যখন-তখন বলতেন, 'শঙ্করলাল, বড়ো হলে তুই আমার চেয়েও জোয়ান হবি।' আমি জোর-গলায় বলতে চাই, দীনুর মতন বাঙালিকে আমি ঠিক খোকার মতন তুলে আছড়ে মেরে ফেলতে পারি! এ খালি আমার মুখের কথা নয়, ভগবান যদি দিন দেন, তুমি তাহলে স্বচক্ষে দেখতে পাবে যে আমার কথা সত্যি কিনা!'

এই সময়ে ঘরের দরজায় বাহির থেকে করাঘাত হল। পিয়ারীলাল উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে বললে, 'কী রে বুদ্ধু, তুই যে হঠাৎ এখানে? কোনো খবর-টবর আছে নাকি?'

বাহির থেকেই গলা শোনা গেল, 'হ্যাঁ বাবু, মস্ত সুখবর!'

—তাই নাকি? আয়, ভিতরে আয়।

বুদ্ধু ঘরের ভিতরে এসে শঙ্করলালকে অভিবাদন করলে। তাকে দেখতে ছিপছিপে, কিন্তু তার দেহ রীতিমতো কঠিন ও সবল। রং কালো, বয়স ত্রিশ-বত্রিশ আর তার মুখচোখের উপরে ফুটে উঠেছে শয়তানীর স্পষ্ট ছাপ!

শঙ্করলাল একটু কৌতূহলী হয়ে বললে, 'হ্যাঁ রে বুদ্ধু, তুই এমন কী সুখবর এনেছিস?'

বুদ্ধু একগাল হেসে বললে, 'আমি হাজার টাকার বকশিশ নিতে এসেছি হুজুর!'

শঙ্করলাল চমকে উঠল। ভ্রূ সংকুচিত করে বললে, 'তার মানে? কীসের জন্যে বকশিশ?'

বুদ্ধু বললে, 'আজ আমি রামধনীকে দেখতে পেয়েছি!'

শঙ্করলাল আবার যেন নিবে গিয়ে বিরক্ত স্বরে বললে, 'ধ্যেৎ! এই তোর মস্ত সুখবর? রামধনী তো চুনোপুঁটি, তার জন্যে আবার বকশিশ কীসের রে?'

বুদ্ধু মুখ টিপে হাসতে হাসতে দুই হাত জোড় করে বললে, 'গোলামের সব কথা আগে শুনুন হুজুর!'

—আচ্ছা, কী বলতে চাস বল।

বুদ্ধু মাটির উপরে উবু হয়ে বসে বললে, 'হুজুর, আজ পথ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ দেখতে পেলুম রামধনীকে। কিন্তু সে আমাকে দেখতে পায়নি। হুজুরের বাড়িতে সে যে কী কাণ্ড করে পালিয়েছে আমার তো জানতে বাকি নেই, কাজেই সে কোথায় যায় দেখবার জন্যে আমিও লুকিয়ে লুকিয়ে তার পিছু ধরলুম। এ-রাস্তা ও-রাস্তা দিয়ে এগিয়ে রামধনী শেষটা হাটখোলার গঙ্গার ধারে একখানা খুব পুরোনো বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢুকল। আমার কেমন সন্দেহ হল। রামধনী যখন দীনুডাকাতের চর তখন এ বাড়িখানা আর কার হতে পারে? বাড়ির চারিদিকে বার-কয়েক ঘোরাঘুরি করলুম, পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে কিছু কিছু খোঁজখবরও নিলুম। তারপর বাড়ির ভিতরটা একবার উঁকি মেরে দেখবার জন্যে আমার মন যেন ছটফট করতে লাগল। তখন সন্ধে হয়েছে, দোতলার একটা ঘরে আলো জ্বলছে। ঠিক সেই ঘরের পাশেই ছিল একটা বড়ো বটগাছ। আমি চুপিচুপি সেই গাছে গিয়ে উঠলুম। খানিকটা উঠেই ঘরের ভিতরটা বেশ দেখতে পেলুম। হুজুর, বললে আপনি হয়তো বিশ্বাস করবেন না, সেই ঘরের ভিতরে কাকে দেখলুম জানেন?'

খানিকটা কল্পনা করে নিয়ে শঙ্করলাল রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলে, 'কাকে? কাকে?'

—দীনুডাকাতকে হুজুর, দীনুডাকাতকে!

শঙ্করলাল উত্তেজিত ভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বিষম আগ্রহে বললে, 'তুই ঠিক বলছিস বুদ্ধু ? তুই ঠিক দেখতে পেয়েছিস? তুই দীনুকে চিনিস তো?'

বুদ্ধু বললে, 'তা আর চিনব না হুজুর? দিনের পর দিন তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি আদালতের কাঠগড়ায়। তার চেহারা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। আর ঘরের ভিতরে জোর আলো জ্বলছিল, দীনুর মুখ বেশ ভালো করেই দেখে নিয়েছি।'

শঙ্করলাল বিপুল উৎসাহে বুদ্ধুর পিঠের উপরে প্রচণ্ড এক চড় বসিয়ে দিয়ে বললে, 'শাবাশ, বাহাদুর!'

বুদ্ধু নিজের পিঠে হাত বুলোতে বুলোতে কাতর স্বরে বললে, 'এত জোরে আমাকে আর একবার আদর করলেই আমাকে পটল তুলতে হবে হুজুর!'

শঙ্করলাল হেসে ফেলে বললে, 'আচ্ছা, আর চড় মেরে আদর করব না! এখন বল দেখি, দীনু কী করছিল?'

—শুয়ে ছিল। বিছানার উপরে চাদরে বুক পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে ছিল। দেখেই মনে হল, তার খুব শক্ত ব্যামো হয়েছে। রামধনী তাকে ওষুধ খাইয়ে দিচ্ছে, তাও আমি দেখে এসেছি। দীনু বোধহয় বিছানা ছেড়ে নামতে পারে না।

শঙ্করলাল মহা আনন্দে নৃত্য করতে করতে বলে উঠল, 'জয় মা ভবানী! জয় মা কালী! তাহলে আজ রাত্রেই দেব নরবলি!'

পিয়ারীলাল জিজ্ঞাসা করলে, 'আপনি কী করতে চান বাবুজি?'

শঙ্করলাল বললে, 'কী আবার করতে চাইব? আজ পনেরো দিন ধরে সারাক্ষণই যে আশার স্বপ্ন দেখে আসছি, তাই-ই সফল করে তুলব! দীনুকে বধ করব— হ্যাঁ, নিজের হাতেই বধ করব— এমনি, এমনি করে'— বলেই সে আত্মবিস্মৃতের মতো দু-হাত বাড়িয়ে বুদ্ধুর গলা টিপে ধরতে গেল! কিন্তু বুদ্ধু ভারি হুঁশিয়ার ব্যক্তি, তড়াক করে এক লাফ মেরে শঙ্করলালের নাগালের বাইরে গিয়ে পড়ল।

পিয়ারীলাল তাড়াতাড়ি শঙ্করলালের দুই হাত চেপে ধরে বললে, 'শান্ত হোন বাবুজি, শান্ত হোন! বুদ্ধুকে আপনি দীনু মনে করবেন না।'

বুদ্ধু ত্রস্ত ভাবে বললে, 'হুজুর, আজ আর আমার বকশিশ চাই না, আমি কাল আবার আসব!'

শঙ্করলাল প্রায় গর্জন করে বললে, 'তুই চুপ করে ওইখানে দাঁড়া। তোকে আজ আমার সঙ্গে দীনুর বাড়িতে যেতে হবে। পিয়ারীলালও যাবে, আরও কেউ কেউ যাবে। আজ আর কিছুতেই দীনুকে আমি ছাড়ব না।'

পিয়ারীলাল ভয়ে ভয়ে বললে, 'বাবুজি, আপনার হুকুম আমরা সবাই মানতে রাজি আছি। কিন্তু এইসব গোলমালের ভেতরে আপনার মতন লোকের যাওয়া উচিত কি?'

মুখ-চোখ বিকৃত করে শঙ্করলাল নিষ্ঠুর কণ্ঠে বললে, 'প্রতিহিংসা চাই, প্রতিহিংসা চাই, প্রতিহিংসা চাই! দীনুকে স্বহস্তে বধ না করলে আমার মন তৃপ্ত হবে না! আজ আমি দেখব সেই ভেতো বাঙালি কতটুকু শক্তি ধরে! আমি এক-একখানা করে তার দেহের প্রত্যেক হাড় ভেঙে গুঁড়িয়ে দেব, তার জিভ টেনে বার করব, তার দুই-চোখ উপড়ে নেব!'

পিয়ারীলাল বললে, 'বাবুজিকে আমরা আর কী বলব? আপনি যা ভালো বোঝেন, করুন। আমরা কখন যাব?'

—রাত বারোটার পরেই!

নবম

দীনুর মুণ্ডচ্ছেদ

চাঁদনি রাত, কিন্তু চাঁদ দিয়েছে আজ মেঘের চাদর মুড়ি। চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে আলোমাখা অন্ধকার। খানিক দেখা যায়, খানিক দেখা যায় না।

রাত সাড়ে বারোটা। এ অঞ্চলটা এ সময়ে একেবারে নীরব ও নির্জন হয়ে পড়ে। খালি শোনা যায় গঙ্গার সুমধুর কলধ্বনি।

চাঁদ মুখ না ঢাকলে গঙ্গাকে দেখায় যেন নর্তকী। সে তালে তালে নাচে, আর তার হীরক-খচিত জল-নূপুর করে ঝকমক ঝকমক। কিন্তু আজ হারা চাঁদের শোকে গঙ্গাকে দেখাচ্ছে যেন বিধবার সাদা কাপড়ের মতো। তার বুকে নেই আলোক-রেণু, নেই কোনো চাঞ্চল্য।

একখানা মাঝারি বাড়ি। সেকেলে, ময়লা, ফাট-ধরা। তার দোতলায় একখানি মাত্র ঘরে জ্বলছে উজ্জ্বল আলো। খোলা জানলার এই ঔজ্জ্বল্যটুকু না থাকলে মনে হত, এ-বাড়িতে কেউ বাস করে না। কারণ বাড়ির আর সব দরজা-জানলা বন্ধ এবং তার ভিতরটাও একেবারে নিঃসাড়।

একদিকে একটুকরো খোলা জমি। বাড়ির গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে বেশ বড়োসড়ো একটা বটগাছ। এবং সেই গাছের তলায় দেখা যাচ্ছে যেন কয়েকটা অন্ধকারের ছায়ামূর্তি।

এরা হচ্ছে শঙ্করলাল ও তার দলবল। তারা ফিসফিস করে কী পরামর্শ করছে।

দলের যারা প্রধান এবং বুদ্ধি ও শক্তির জন্যে যাদের সুনাম আছে, শঙ্করলাল কেবল তাদেরই সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে। গুনতিতে তারা আটজন।

শঙ্করলাল বলছে, 'পিয়ারীলাল, বুদ্ধুর কথা মিথ্যা নয়। গাছে চড়ে আমিও এইমাত্র দেখলুম, একখানা খাটের উপরে বুক পর্যন্ত মুড়ি দিয়ে যে লোকটা ঘুমুচ্ছে, সে দীনুডাকাত ছাড়া আর কেউ হতেই পারে না। আর একটা ব্যাপারও আমি লক্ষ করেছি। দীনুর ঘরের দরজা খোলা।'

পিয়ারীলাল তবু বোঝ মানল না, বললে, 'কী জানি বাবুজি, আমার মন কেমন খুঁত খুঁত করছে!'

—তোমার মন খুঁত খুঁত করছে কেন?

—মনে হচ্ছে ও-বাড়িতে ঢুকলে আমরা বিপদে পড়তে পারি!

—কী বিপদ?

—জানি না।

—ও তোমার মনের ভ্রম।

—ধরুন, বাড়ির ভিতরে দীনুর দল যদি আমাদের চেয়ে ভারী হয়?

এবার বুদ্ধু কথা কইলে! বললে, 'সন্ধের সময়েই আমি এ পাড়ায় খবর নিয়ে জেনেছি, বাড়ির ভিতরে দুজন চাকর আর দীনু ছাড়া অন্য কেউ থাকে না।'

শঙ্করলাল বললে, 'শুনলে তো পিয়ারীলাল?'

পিয়ারীলাল জবাব দিলে না।

শঙ্করলাল বললে, 'এখন কথা হচ্ছে, বাড়ির ভিতরে ঢুকি কেমন করে? সদর বন্ধ, দরজা ভাঙা তো চলবে না!'

দলের একজন বললে, 'সর্দারজি, আমি একটা দড়ির সিঁড়ি এনেছি। হুকুম দেন তো সেই সিঁড়ি নিয়ে আমি ছাদের ওপরে উঠতে পারি।'

—কেমন করে?

—ওই জলের নলটা বয়ে।

—আরে বাহবা! তাহলে তো আর কোনো ভাবনাই থাকে না।

—ছাদে উঠে সিঁড়িটা আমি নামিয়ে দিচ্ছি। তারপর—

—থাক, আর বলা বাহুল্য। এখন তাড়াতাড়ি ছাদে ওঠ দিকি বাপু!

লোকটা কাজের। নল ধরে এত সহজে ছাদে গিয়ে উঠল যে দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। তারপর দড়ির সিঁড়ি ছাদ থেকে মাটি পর্যন্ত ঝুলে পড়ল। মিনিট-কয় পরেই দেখা গেল, ছাদের উপরে উঠে দাঁড়িয়ে আছে শঙ্করলাল ও তার দলবল।

শঙ্করলাল চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললে, 'ওই তো দেখছি ছাদের সিঁড়ি। বুদ্ধু, তুই পা টিপে নীচে নেমে যা। তারপর সদর দরজাটা খুলে রাখ। কী জানি, যদি কোনো হাঙ্গামা হয়, পালাবার রাস্তা সাফ থাকবে। তুই সেইখানে দাঁড়িয়েই পাহারা দিবি—বুঝেছিস?'

বুদ্ধু তখনই ছাতের উপর থেকে অদৃশ্য হল।

পিয়ারীলাল বললে, 'বাবুজি, একটা কথা রাখবেন?'

—কী কথা? আবার কি আমাকে ফিরে যেতে অনুরোধ করবে?

—না বাবুজি।

—তাহলে বলো।

—দীনুকে জাগাবেন না। ভোজালির এক কোণে তার মুণ্ডুটা ধড় থেকে উড়িয়ে দিন।

—কেন বলো দেখি?

—এটা একে বেপাড়া, তায় শত্রুপুরী। যত চুপিচুপি আর তাড়াতাড়ি কাজ সারা যায় ততই ভালো।

—ঠিক বলেছ পিয়ারীলাল, আমিও তাই ভাবছিলুম। বেশ, খালি তুমি আমার সঙ্গে এস। বাকি সবাই ছাতের ওপরেই থাকো। তোমাদের দরকার হলে ডাকব— কিন্তু বোধহয় দরকার হবে না। এসো পিয়ারীলাল!

শঙ্করলাল ভোজালিখানা বার করে হাতে নিয়ে অগ্রসর হল। পিয়ারীলাল চলল পিছনে পিছনে।

সিঁড়ি বয়ে তারা দোতলায় নামল। তারপর দাঁড়িয়ে কান পেতে শুনতে লাগল। কোথাও কোনো সাড়া নেই। বাড়িভরা এক ভীরু স্তব্ধতা যেন নর রক্তের কলঙ্ক মাখবার জন্যে প্রস্তুত হয়ে আছে! নিশ্চদ্র রাত্রির খানিকটা যেন বাড়ির ভিতরে ঢুকে ব্যাপার দেখে শিউরে শিউরে উঠছে আতঙ্কে!

পিয়ারীলালের গা টিপে শঙ্করলাল একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে দেখালে, একটা খোলা দরজা দিয়ে বাইরের বারান্দায় এসে পড়েছে খানিকটা আলো।

পিয়ারীলাল অস্ফুট স্বরে বললে, 'বোধহয় ওই ঘর!'

—চুপ!

নিঃশব্দে এগিয়ে তারা দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। পাশ থেকে ঘরের ভিতরে উঁকি মারলে। হ্যাঁ, তারা যথাস্থানেই এসেছে! বিছানার উপরে ওই যে দীনুডাকাত নিশ্চিন্ত মুখে উপভোগ করছে নিদ্রাসুখ! আহা, সে জানে না তার ঘুম আর এ-জীবনে ভাঙবে না!

সাবধানে দুজনে ঘরের মধ্যে ঢুকল।

শঙ্করলাল বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল— তার চক্ষে জ্বলেছে হত্যার আগুন, তার মুখে ফুটেছে পিশাচের হাসি!

ভোজালিখানা ধীরে ধীরে মাথার উপরে তুলে সে লক্ষ্য স্থির করলে। পরমুহূর্তে বিদ্যুৎবেগে ভোজালি নামল নীচের দিকে এবং পরমুহূর্তে দীনুর ছিন্নমুণ্ড ছিটকে সশব্দে লুটিয়ে পড়ল গৃহতলে এবং পরমুহূর্তে—

হ্যাঁ, পরমুহূর্তেই পিছনে গম্ভীর স্বর শোনা গেল, 'এখুনি মাথার উপরে হাত তুলে স্থির হয়ে দাঁড়াও! একটু নড়লে বা টুঁ শব্দ করলেই কুকুরের মতন গুলি করে মেরে ফেলব!'

ভীষণ বিস্ময়ে ও সচমকে দুই মূর্তি পিছন ফিরে দেখলে, এইমাত্র যার মুণ্ডচ্ছেদ করা হল, ঘরের ভিতরে দাঁড়িয়ে আছে সেই দীনুডাকাত স্বয়ং, এবং তার দুই হাতে দুই রিভলভার!

এ কী স্বপ্ন? এ কী ভেল্কি? এ কী সত্য?

বাহির থেকে ভিতরে প্রবেশ করলে আরও চারজন লোক— তাদেরও প্রত্যেকের হাতে একটা করে রিভলভার!

বরুণ বললে, 'মনে করছ তোমাদের ছাতের স্যাঙাতদের ডাকবে? ও-আশা ত্যাগ কর বন্ধুগণ, ও-আশা ত্যাগ কর! তাদের অবস্থাও এতক্ষণে তোমাদের মতনই হয়েছে! সিংহের গর্তে ঢুকলে ভেড়া কখনও পালাতে পারে? ছোট্টুলাল, এদের কাছ থেকে অস্ত্র কেড়ে নে— এদের হাত-পা বেঁধে ফ্যাল!'

তখনও শঙ্করলালের ও পিয়ারীলালের আচ্ছন্ন আর হতভম্ব ভাব কেটে যায় নি, তারা বিনা-বাধায় আত্মসমর্পণ করলে, তাদের হাতে-পায়ে পড়ল কঠিন দড়ির বাঁধন!

বরুণ হাসতে হাসতে বললে, 'শঙ্করলাল, এখনও অবাক হয়ে কী ভাবছ বলো দেখি? ভাবছ, আমার কাটা মুণ্ড কেমন করে আবার জোড়া লাগল! পিছনদিকে চেয়ে দেখ, তুমি হত্যা করেছ আমার এক মোমে-গড়া প্রতিমূর্তিকে!'

শঙ্করলাল মুখ ফিরিয়ে চকিত চক্ষে দেখলে, প্রতিমূর্তির কাটা মুণ্ডটা নিশ্চিন্ত ঘুমন্ত মুখে মাটির উপরে পড়ে রয়েছে, তার গলদেশে এক ফোঁটাও রক্ত নেই! গভীর আক্ষেপে সে ফেললে একটা সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস!

বরুণ অট্টহাস্য করে বললে, 'দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করছ বৎস? তোমার দুঃখে আমিও সহানুভূতি প্রকাশ করছি!'

এতক্ষণ পরে শঙ্করলাল মৌনব্রত ত্যাগ করলে। নিজের সঙ্গীর দিকে ফিরে ভাঙা-ভাঙা গলায় বললে, 'পিয়ারীলাল, আমরা বোকার মতন ফাঁদে পড়ে গিয়েছি!'

পিয়ারীলাল বিরক্তভাবে বললে, 'বাবুজি, আমি তো আগেই আপনাকে সাবধান করে দিয়েছিলুম! কেন আপনি আমার কথা শুনলেন না? কেন আপনি এখানে এলেন?'

ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বরুণ বললে, 'তুমি সাবধান করে দিয়েছিলে নাকি? ভ্যালা মোর শুভাকাঙ্ক্ষী রে! কিন্তু বাপু, তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন, আসন্ন কালে মানুষের বিপরীত বুদ্ধি হয়?'

শঙ্করলাল হঠাৎ খাপ্পা হয়ে বললে, 'ওহে দীনুডাকাত, ভারি যে তোমার চ্যাটাং-চ্যাটাং কথা দেখছি! তুমি আমাদের নিয়ে কী করতে চাও শুনি?'

—আমাকে নিয়ে তুমি যা করতে চেয়েছিলে!

—তুমি আমাদের খুন করবে?

—উঁহু! আমি তোমাদের ফাঁসিকাঠে ঝোলাব— যেমন ঝুলিয়েছিলুম তোমার গুণধর বড়দাদা মহাদেওকে!

—কী বললি দীনুডাকাত?

—আমি নামে ডাকাত হতে পারি— কিন্তু ডাকাতি করি নরকের কীটদের উপরে, আর সেই টাকা বিলিয়ে দিই গরিব সাধুদের ভিতরে। আমি তোর মতন জাল-জুয়াচুরি-গুন্ডামি করি না, জীবনে কোনোদিন মানুষের রক্তে কলঙ্কিত করি নি আমার এই হাত। আজ আমি তোর সাধুতার ঘোমটা খুলে দুনিয়াকে দেখাতে চাই আড়ালে রয়েছে কী কুৎসিত বীভৎসতা, কী জঘন্য পশুত্ব, কী অসম্ভব শয়তানি!

শঙ্করলাল ঠিক উন্মাদগ্রস্তের মতন হা হা হা হা করে হাসতে শুরু করে দিলে। তারপর অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বললে, 'ওরে দীনুডাকু, জানিস আমি শঙ্করলাল? জানিস আমার নাম সকলের মুখে মুখে? জানিস আমার দানের কথা? তুই যেসব কথা বললি তার প্রমাণ কোথায়? তোর মতন ডাকাতের কথায় কে বিশ্বাস করবে?'

বরুণ কিছুমাত্র বিচলিত না হয়ে সহজ স্বরেই বললে, 'তোর পাপের প্রমাণ দেবার মতন লোকের অভাব নেই।'

—তাই নাকি?

—তোর সঙ্গে আজ যে দুর্লভ জীবগুলিকে পাকড়াও করেছি, তোর বিরুদ্ধে সাক্ষী দেবে তারাই।

—হা হা হা হা! কী হে পিয়ারীলাল? তুমি আমার পাপের কথা কী জানো?

পিয়ারীলাল বললে, 'ওসব কথা কিছুই আমি জানি না বাবুজি! আমি খালি জানি আপনি হচ্ছেন আমার অন্নদাতা প্রভু!'

গর্বিত কণ্ঠে শঙ্করলাল বললে, 'ওরে ডাকু, শুনলি তো?'

বরুণ হেসে উঠে বললে, 'শঙ্করলাল, অতটা আশ্বস্ত হয়ো না। তোমার মুখে পুরু করে কালি মাখাতে পারে এমন সাক্ষী আমার কাছেই আছে।'

শঙ্করলাল আশ্চর্যভাবে বললে, 'তোর কাছে? বলিস কী রে!'

—হ্যাঁ, ওই কথাই বলি।

—কে সে?

—বুদ্ধু।

শঙ্করলাল দুই চোখ কপালে তুলে বললে, 'বুদ্ধু? সে তো আমার দলের লোক—সে তো আমারই হুকুমের দাস!'

বরুণ বললে, 'ওরে একচক্ষু হরিণ, তোর দেখবার ক্ষমতা কতটুকু? আজ তোকে এখানে কে ভুলিয়ে এনেছে জানিস? তার নাম হচ্ছে বুদ্ধু!'

শঙ্করলাল তখনও বিশ্বাস করতে পারলে না। দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে সে বললে, 'বুদ্ধু? অসম্ভব!'

বরুণ বললে, 'হ্যাঁ গো সিংহচর্মাবৃত গর্দভ! বুদ্ধুকে পাঠিয়েই আজ তোমাদের এই ফাঁদে এনে ফেলেছি।'

শঙ্করলাল স্তম্ভিতের মতন চুপ করে রইল।

পিয়ারীলাল বললে, 'বুদ্ধু তো আমাদেরই দলের লোক। আমরা যা করেছি, সেও তো তাই করেছে। আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিয়ে সে নিজের গলা বাঁচাবে কেমন করে?'

বরুণ হাসিমুখেই বললে, 'বোকারাম কোথাকার, ইংরেজি-আইনে 'রাজার সাক্ষী' বলে এক জীব আছে তাও কি তোদের মনে নেই?'

শঙ্করলাল হঠাৎ বিকট কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠে বললে, 'বুদ্ধুকে এনে দাও— বুদ্ধুকে আমার কাছে এনে দাও! আমি এখুনি তাকে খুন করে ফেলব!'

বরুণ ঘাড় নাড়তে নাড়তে কৌতুকভরে বললে, 'আহা আমার ছাতুভুক! হাতে-পায়ে দড়ি বাঁধা, সুমুখ দিয়ে একটা মাছি উড়ে গেলেও কিছু করতে পারবে না, সে আবার বলে কিনা, খুন করব! বলিহারি ছাতুর গুণ! বুদ্ধির বালাই নিয়ে মরি!'

দুই হস্ত প্রাণপণে বন্ধনমুক্ত করবার জন্যে বিফল চেষ্টা করতে করতে শঙ্করলাল সচিৎকারে বললে, 'কী বলব রে ভেতো বাঙালি! আমার হাত-পায়ের দড়ি খোলা থাকলে দেখে নিতুম আজ তোকে!'

বরুণ নিজের মুখ শঙ্করলালের মুখের কাছে নিয়ে গিয়ে বললে, 'ছাতুখোর, তুমি আমায় চোখের সামনেই দেখছ! তুমি কি এর চেয়েও ভালো করে আমাকে দেখতে পারো?'

শঙ্করলাল নিষ্ফল আক্রোশ আর সামলাতে না পেরে হঠাৎ বরুণের মুখের উপরে নিষ্ঠীবন ত্যাগ করে বলে উঠল, 'হ্যাঁ রে চিংড়িমাছখেকো ভাতের পোকা,—হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ! একবার আমার বাঁধন খুলে দিয়ে দ্যাখ না।'

বরুণ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের মুখের থুতু কোঁচার খুঁট দিয়ে মুছতে মুছতে গম্ভীর স্বরে ডাকলে, 'ছোট্টুলাল!'

ছোট্টুলাল তখনই ভিতরে এসে বললে, 'হুজুর!'

—শঙ্করলালের হাত-পায়ের বন্ধন খুলে দাও।

ছোট্টুলাল সভয়ে বললে, 'কী বলছেন হুজুর!'

বরুণ অধীর ভাবে মাটির উপরে পদাঘাত করে বললে, 'প্রতিবাদ কোরো না! যা বলছি শোনো! শঙ্করলালের বাঁধন খুলে দিয়ে তোমরা দরজার কাছে গিয়ে রিভলভার নিয়ে দাঁড়াও। এই হতভাগ্য যদি আমাকে হারিয়ে এখান থেকে চলে যেতে পারে, তোমরা পথ ছেড়ে দেবে! কিন্তু তার আগে যদি পালাবার চেষ্টা করে, তোমরা তখুনি একে গুলি করে কুকুরের মতন মেরে ফেলবে।'

মিনিট দশেকের মধ্যেই বিচিত্র এক অভিনয়ের জন্যে রঙ্গমঞ্চ প্রস্তুত হল। শঙ্করলাল বন্ধনমুক্ত, স্বাধীন!

বরুণ নিজের পাঞ্জাবিটা খুলে দরজার কাছে ছুড়ে ফেলে দিলে। তারপর মালকোঁচা মেরে কাপড় পরে অত্যন্ত শান্তভাবেই বললে, 'এসো ছাতুর ট্রেডমার্ক! বাংলাদেশে বসে, বাঙালির রক্তশোষণ করে তুমি আজ গালাগাল দিচ্ছ বাঙালিকেই? দেখি আজ ছাতুর বীরত্ব! আমি প্রস্তুত।'

শঙ্করলাল কোনো কথা বললে না, সেও নিজের জামা খুলে ফেললে! তারপর একবার দরজার বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলে, পালাবার পথ জুড়ে চকচক করছে চার-চারটে রিভলভার! তারপর সে নিজের গেঞ্জিটাও খুলে ফেললে। তখন দেখা গেল তার বিরাট বক্ষ ও বাহুমূলের স্ফীত মাংসপেশী— যা দেখলে রীতিমতো বলিষ্ঠ ব্যক্তির মনও একেবারে দমে যায়।

সে বললে, 'দীনু, তুই সত্যি কথা বলছিস তো?'

—কী?

—তোকে হারাতে পারলে আর কেউ আমাকে বাধা দেবে না? আমি এখান থেকে চলে যেতে পারব?

—আমি শঙ্করলাল নই, আমার কথার মূল্য আছে!

—দ্যাখ তবে মজাটা! বলেই শঙ্করলাল তার সুদীর্ঘ বাহু বিস্তার করে বরুণকে ধরবার জন্যে প্রকাণ্ড এক লম্ফত্যাগ করলে!

বরুণ হেঁট হয়ে বিদ্যুৎবেগে এক পাশে সরে গেল এবং শঙ্করলাল মুখ থুবড়ে পড়ল গিয়ে ঘরের কঠিন দেওয়ালের উপরে। সেই আঘাতের যন্ত্রণা সামলাবার আগেই সে আচ্ছন্নের মতন অনুভব করলে, পিছন থেকে তার কোমর ধরে কে তাকে অত্যন্ত অনায়াসে শূন্যে তুলে সজোরে নিক্ষেপ করলে ঘরের মেঝের উপরে! সঙ্গে সঙ্গে তার দেহের ধাক্কা লেগে কাচের গেলাস ও কুঁজো সমেত একটা তেপায়া সশব্দে উল্টে মেঝের উপরে গিয়ে পড়ল।

শঙ্করলাল কাতর কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠল এবং সেই আর্তধ্বনি স্তব্ধ হবার আগেই বরুণ আবার তার দীর্ঘ কেশ ধরে আকর্ষণ করে তাকে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলে। তারপরেই তার উপরে হতে লাগল অবিশ্রাম মুষ্টির পর মুষ্টির আঘাত! কী তার হয়েছে, কে তাকে মারছে, সেসব কিছু বোঝবার আগেই শঙ্করলাল আবার হল পপাত ধরণীতলে!

বরুণ উদ্যত বজ্রের মতন গর্জন করে বললে, 'শঙ্করলাল! তুই কি এখনও ভেতো বাঙালির শক্তি-পরীক্ষা করতে চাস?'

কিন্তু শঙ্করলাল নিশ্চেষ্ট হয়ে বোবার মতন পড়ে রইল— কারণ, তখন তার কথা কইবার বা ওঠবার আর কোনো ক্ষমতাই ছিল না।

বরুণ বললে, 'লড়তে আমি ভালোবাসি! কিন্তু যে-লড়াই এত সহজে শেষ হয়ে যায়, সে হচ্ছে ছেলেখেলা! ছোট্টুলাল!'

—হুজুর!

—এই অপদার্থটাকে আবার ভালো করে বেঁধে ফ্যালো!

আদেশ পালন করতে ছোট্টুলালের বিলম্ব হল না।

নিক্ষিপ্ত পাঞ্জাবিটা তুলে নিয়ে তার ভিতরে মাথা গলিয়ে বরুণ বললে, 'ভাই ছোট্টু!'

—হুজুর!

—এখন আমাদের কী করা উচিত বল দেখি?

—হুজুরই জানেন!

—না ছোট্টুলাল, তোরা সবাই আমার সঙ্গে বড়ো গোলামের মতন কথা বলিস। তোরা কি আমার গোলাম? তোরা যে আমার ভাই!

ছোট্টুলাল হঠাৎ হেঁট হয়ে পড়ে দুই হাতে বরুণের দুই পা জড়িয়ে ধরে অভিভূত স্বরে বললে, 'না হুজুর, আমরা আপনার ছেলে!'

বরুণ খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, 'বা রে ছোট্টু, বেশ যে কথা কইতে শিখেছিস! তাহলে শোনো পুত্রবর! আমার পদযুগল ত্যাগ করে উঠে দণ্ডায়মান হও! তোমাকে এখুনি একবার টেলিফোনের কাছে যেতে হবে। ইনস্পেকটর অশান্ত অর্থাৎ প্রশান্ত চৌধুরীর ঠিকানায় ফোন করে দাও যে, এখানে তাঁর জন্যে অনেকগুলি জীবন্ত রত্ন অপেক্ষা করে আছে। বুদ্ধু এখানে থাকবে। অশান্তকে জানিয়ে রেখো, বুদ্ধুই হবে 'রাজার সাক্ষী'! তাকে আরও বলে রেখো যে, তারপরে তার যদি কিছু জানবার দরকার থাকে আমার পত্র যথাসময়ে হাজির হয়ে জানিয়ে দেবে।'

—আচ্ছা, হুজুর!

—ফোন করবার পরে আমরা কী করব ছোট্টু?

—আপনিই জানেন হুজুর!

—ছোট্টুলাল, তারপরে এস্থান হবে আমাদের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক! কারণ, তারপরে অশান্ত চৌধুরী এখানে এসে একসঙ্গে রথ দেখতে আর কলা বেচতে চাইবে! অর্থাৎ সে শঙ্করলালদেরও ধরবে আর আমাদেরও ছাড়বে না! দরকার কী অত গোলমালে ভাই? তোমার 'ফোনের' কথা শেষ হলেই আমি সদলবলে অদৃশ্য হব! কী বল? সেইটেই কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে না?'

ছোট্টুলাল নতমুখে বললে, 'আপনিই জানেন হুজুর!'

বরুণ রেগে উঠে বললে, 'ছোট্টু, তোর কথা ভালো লাগে না, তুই চলে যা আমার সুমুখ থেকে! তুই হচ্ছিস আমার বাজে প্রতিধ্বনি! যা, ফোন করগে যা!'

দশম

ডাণ্ডার কাণ্ড

বরুণ ও ছোট্টুলাল ঘরের ভিতর থেকে অদৃশ্য হল। তারপর শোনা গেল সিঁড়ির উপরে অনেকগুলো পায়ের শব্দ। তারপর আর জনপ্রাণীর সাড়া নেই— শোনা যায় কেবল অদূরবর্তিনী গঙ্গার জলদলকলরব।

এতক্ষণে শঙ্করলালের দর্প চূর্ণ হয়েছে। কষ্টে নিঃশ্বাস টানতে টানতে সে বললে, 'পিয়ারীলাল, আর আমাদের রক্ষা নেই। এখনই পুলিশ এসে পড়বে।'

হাত-পা-বাঁধা পিয়ারীলাল ঘরের মেঝের উপরে গড়িয়ে গড়িয়ে শঙ্করলালের পাশে গিয়ে হাজির হল। তারপর ফিশ ফিশ করে বললে, 'ভয় নেই বাবুজি! আমরা বোধহয় এখান থেকে লম্বা দিতে পারব!'

—যাও, যাও, বাজে বোকো না!

—ঠিক বলছি হুজুর, ঠিক বলছি! ভাগ্যে ওরা আলো নিবিয়ে দিয়ে যায় নি!

—আরে নির্বোধ, আলো নিবিয়ে দিলে আমাদের এর চেয়ে বেশি আর কী অসুবিধা হত?

—আমরা চোখে দেখতে পেতুম না।

—মূর্খ!

—চোখে দেখতে পাচ্ছি বলেই আমি পালাবার উপায়ও দেখতে পাচ্ছি!

—পিয়ারীলাল, তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি? আমাদের হাত-পা বাঁধা, আমরা—

পিয়ারীলাল বাধা দিয়ে বললে, 'আস্তে বাবুজি, বুদ্ধুকে এখানে পাহারায় রেখে গেছে। চেয়ে দেখুন ওই ভাঙা কাচের গেলাস আর কুঁজোর দিকে!'

তাদের মারামারির সময়ে তেপায়া-উল্টে-পড়ে-যাওয়া সেই কাচের গেলাস ও কাচের কুঁজোর ভাঙা টুকরোগুলো মেঝের উপরে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। কিন্তু সেদিকে তাকিয়েও শঙ্করলাল কিছুই বুঝতে পারলে না।

পিয়ারীলাল বললে, 'ভাঙা কাচে ক্ষুরের মতো ধার হয় জানেন তো বাবুজি? আমি একখানা খুব ধারালো কাচ বেছে নিয়ে আগে আপনার হাতের দড়ি কেটে দেব। তারপর আপনি কেটে দেবেন আমার বাঁধন!'

—'পিয়ারীলাল, তোমার মাথায় বুদ্ধি আছে বটে, কিন্তু তোমারও যে হাত-পা বাঁধা, এটা ভুলে যাচ্ছ কেন?'

—'কিন্তু আমার মুখ আর দাঁত তো বাঁধা নেই! ভাঙা কাচ দাঁতে চেপে ধরে আমি আপনার হাতের দড়ি ঠিক কেটে দিতে পারব। সেই সময়ে এক ভয় বুদ্ধুকে, কিন্তু সে হচ্ছে একের নম্বরের ভিতু, আড়ালে বসে পাহারা দিচ্ছে বটে, কিন্তু আপনার সামনে মুখ দেখাতে ভরসা করবে বলে মনে হচ্ছে না।'

মিনিট-পাঁচেকের মধ্যেই শঙ্করলালের হাতের বাঁধন খসে পড়ল এবং তারপর তাদের উভয়েরই বন্ধনমুক্ত হতে বেশি দেরি লাগল না।

... ... ...

বরুণ ও ছোট্টু চলে যাবার পর বুদ্ধু একতলায় সদর দরজার সামনে পুলিশের অপেক্ষায় উৎকর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পিয়ারীলালের অনুমান মিথ্যা নয়, একে শঙ্করলালকে সে মূর্তিমান যমের মতন ভয় করত, তার উপরে সে করেছে দারুণ বিশ্বাসঘাতকতা, ভয়ে ও চক্ষুলজ্জায় উপরে যেতে তার পা উঠল না। আর উপরে যাবার প্রয়োজনীয়তাও সে অনুভব করলে না, আষ্টেপৃষ্ঠে যাদের বেঁধে রাখা হয়েছে, তাদের নিয়ে আবার মাথা ঘামাবার দরকার কী? অতএব বুদ্ধু নিশ্চিন্ত মনে বিড়ি ফুঁকে সময় কাটাতে লাগল।

ইতিমধ্যে একখানা আরও কালো এবং আরও পুরু মেঘ এসে চাঁদনি-রাতকে একেবারে গ্রাস করে ফেললে। সেই ঘনঘটায় বাইরের খোলা জমিটা হারিয়ে গেল নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের অন্তরালে। চমকে উঠল তীব্র বিদ্যুৎশিখা, গর্জন করে উঠল ক্রুদ্ধ বজ্র, হুহু করে ছুটে এল একটা দমকা ঝোড়ো হাওয়া— বৃষ্টি পড়তে বোধহয় আর দেরি নেই।

ঠাণ্ডা বাতাস থেকে আত্মরক্ষা করবার জন্যে গায়ের কাপড়খানা ভালো করে মুড়ি দিয়ে বুদ্ধু যখন ভাবছে—পুলিশ এখনও আসে না কেন, ঠিক সেই সময়ে অদূরে জেগে উঠল রাত্রির বুক মথিত করে দ্রুতগামী মোটরগাড়ির চিৎকার!

মুখের বিড়িটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে বুদ্ধু বলে উঠল, 'নিশ্চয়ই পুলিশের গাড়ি!'

সিঁড়ির উপরে পদশব্দ! সচমকে মুখ ফিরিয়ে বুদ্ধু সভয়ে দেখলে অসম্ভব দৃশ্য! মারমুখো হয়ে দুমদাম করে নেমে আসছে শঙ্করলালের বিভীষণ প্রকাণ্ড দেহ এবং তার পিছনে পিছনে পিয়ারীলাল!

তারপর কী করা উচিত, সেটা স্থির করতে তার কালবিলম্ব হল না। বাড়ির বাইরে লম্বা এক লাফ মেরে বুদ্ধু হারিয়ে গেল অন্ধকারের ভিতরে।

শঙ্করলাল তার পশ্চাতে ধাবমান হবার চেষ্টা করতেই পিয়ারীলাল বলে উঠল, 'হুঁশিয়ার বাবুজি! পুলিশের গাড়ি কাছে এসে পড়েছে!'

পুলিশের নাম শুনেই শঙ্করলাল থেমে দাঁড়িয়ে পড়ে ত্রস্ত চক্ষে দেখলে, পূর্বদিকের রাস্তা ধরে একখানা বাসের মতন মস্ত গাড়ি হেড লাইট জ্বেলে বেগে ছুটে আসছে।

পিয়ারীলাল বললে, 'দৌড়ে চলুন— আমরা গঙ্গায় লাফিয়ে পড়ব!'

আচম্বিতে কোন অদৃশ্য কণ্ঠে জাগ্রত হল ব্যঙ্গপূর্ণ হো হো অট্টহাস্য!

কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতন শঙ্করলাল বলে উঠল, 'ও কে? ও কে হাসে রে?'

—তোর যম!

—কে তুই? বেরিয়ে আয় সামনে!

প্রমাদ গুনে পিয়ারীলাল বললে, 'এখুনি সর্বনাশ হবে! গঙ্গার দিকে— গঙ্গার দিকে চলুন!'

কিন্তু গঙ্গার দিকে অগ্রসর হতে না হতেই কী-একটা জিনিস কোথা থেকে সজোরে ধাঁ করে শঙ্করলালের ডান পায়ের উপরে এসে পড়ল এবং সঙ্গে সঙ্গে 'বাপরে বাপ' বলে সে হল গোড়াকাটা কলাগাছের মতন পপাতধরণীতলে!

—কী হল বাবুজি! উঠুন—উঠুন! বলে পিয়ারীলাল দুইহাতে প্রাণপণে শঙ্করলালকে টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে দিলে।

আবার ধপাস করে বসে পড়ে যন্ত্রণাবিকৃত স্বরে শঙ্করলাল বললে, 'আমার ডান পা বোধহয় ভেঙে গিয়েছে— আমি আর চলতে পারছি না!'

হা হা হা হা করে হাসির সঙ্গে অন্ধকারের ভিতর থেকে শোনা গেল— 'আমি দীনু! বৎস ছাতু, আমাকে ফাঁকি দেওয়া এত সহজ নয়, তুমি যাতে চলতে না পারো সেই ব্যবস্থাই আমি করেছি!'

দুর্জয় ক্রোধে দিগবিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে শঙ্করলাল দাঁড়িয়ে উঠে এক বিকট হুংকার দিয়ে লম্ফত্যাগ করলে এবং তারপর আবার মাটির উপরে পড়েই বিষম আর্তনাদ করে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল।

পরমুহূর্তেই ঘটনাস্থলে হুড়মুড় করে পুলিশগাড়ির আবির্ভাব। ভিতর থেকে হন্তদন্তের মতন প্রশান্ত বেরিয়ে এল সদলবলে।

মাঠের নীরন্ধ্র অন্ধকারকে বিতাড়িত করেছে হেডলাইটের উগ্র ছটা। পিয়ারীলাল তখন অদৃশ্য, ভূমিতলে নিশ্চেষ্ট হয়ে পড়ে আছে কেবল শঙ্করলালের প্রায়-অচেতন দেহ।

এদিকে-ওদিকে দৃষ্টিচালনা করে প্রশান্ত মাটির উপর থেকে তুলে নিলে লোহা দিয়ে বাঁধানো ও এক হাত লম্বা একটা খেঁটে বা ছোটো ডাণ্ডা। বিস্মিত চোখে সেটা সে পরীক্ষা করতে লাগল।*

একাদশ

আবির্ভাব ও অন্তর্ধান

প্রশান্ত পথ চলতে চলতে হঠাৎ সবিস্ময়ে দেখলে, অরুণের বাড়ির সমস্ত দরজা ও জানলা খোলা! তবে কি অরুণ আবার কলকাতায় ফিরে এসেছে?

সদর দরজার কাছে গিয়ে প্রশান্ত ডাকলে, 'ও অরুণবাবু, অরুণবাবু!'

ডাক শুনে অরুণ নীচে নেমে এল। বললে, 'আরে, প্রশান্তবাবু যে! কলকাতায় পা দিতে না দিতেই আপনার মুখদর্শন! তাহলে এখনও আমাদের বাড়ির ওপরে আপনাদের পাহারা বজায় আছে দেখছি!'

প্রশান্ত মস্তকান্দোলন করে বললে, 'না মশাই, না! খালি-খাঁচার ওপরে পাহারা দেব, আমরা এতটা মূর্খ নই! আপনি যে ফিরেছেন তাও আমি জানতুম না। এই পথ দিয়ে যেতে যেতে বাড়ির জানলা-দরজা খোলা দেখে খবর নিতে এলুম। সেটাও কি অন্যায়?'

—না, না, এসেছেন— বেশ করেছেন! চলুন, বৈঠকখানায় চলুন।

—সময় নেই মশাই, সময় নেই! একটা নতুন মামলা সাজাতে হচ্ছে।

—অন্তত এক কাপ চা আর টোস্টের স্বাদ নিয়ে যান। ফেরবার পথে বর্ধমান থেকে সীতাভোগ আর মিহিদানা নিয়ে এসেছি, তারও দু-চারটে নমুনা পরীক্ষা করলে কম খুশি হব না!

—লোভ দেখিয়ে জব্দ করলেন দেখছি। চলুন তাহলে।

দুজনে বৈঠকখানায় গিয়ে বসল!

অরুণ ডাকলে, 'শ্রীধর! অ শ্রীধর!'

—আজ্ঞে!

—দুজনের জন্যে টোস্ট, চা, সীতাভোগ, মিহিদানা।

—পাঠিয়ে দিচ্ছি বাবু!

অরুণ ফিরে বসে বললে, 'তারপর প্রশান্তবাবু, নতুন কি মামলার কথা বলছিলেন না?'

—হ্যাঁ মশাই, ভারি জটিল মামলা!

—শঙ্করলালের মামলা বুঝি?

—সে খবরও রাখেন?

—কাগজে পড়েছি। আপনি খুব বড়ো বড়ো আসামিকে গ্রেপ্তার করেছেন দেখছি। এই সেদিন ধরলেন মহাদেওগুন্ডাকে, তারপর দীনুডাকাতকে। তারপর আবার এই শঙ্করলালকে। আপনার বাহাদুরি দেখলে অভিভূত হতে হয়।

—ঠাট্টা করছেন?

—কেন, ঠাট্টা কেন?

—আপনি তো জানেন, মহাদেওকে ধরিয়ে দিয়েছে দীনু, আর দীনুকে ধরিয়ে দিয়েছে শঙ্করলাল। আবার শঙ্করলালকে ধরিয়ে দিয়েছে কে, দুদিন পরে তাও শুনতে পাবেন।

—এখনই শুনি না।

—শঙ্করলালকে ধরিয়ে দিয়েছে আপনার বন্ধু—

—বরুণ?

—হ্যাঁ।

—আমি তা জানি।

—কী করে জানলেন? খবরের কাগজে তো ও-কথা বেরোয়নি, আর আপনি ছিলেন কলকাতার বাইরে— সুতরাং দীনুর সঙ্গেও আপনার দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি।

—এক-মহূর্তেই আপনার পুলিশ প্রাণ জেগে উঠল যে! একেবারে জেরা শুরু করে দিলেন?

—না মশাই, আমি জেরা-টেরা করছি না। কিন্তু যে কথা আপনার জানা অসম্ভব, আপনি তা জানলেন কেমন করে? তাই বিস্মিত হচ্ছি।

অরুণ দরজা দিয়ে একবার বাইরের দিকে তাকিয়ে নিয়ে বললে, 'এইতেই বিস্মিত হচ্ছেন? তাহলে অধিকতর বিস্মিত হবার জন্যে প্রস্তুত হোন প্রশান্তবাবু!'

—মানে?

—আমাকে মানে বলে দিতে হবে না— নিজেই বুঝতে পারবেন!

পরমুহূর্তেই প্রশান্ত যা দেখলে সেটা তার কল্পনাতীত!

চায়ের ট্রে হাতে করে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে যে লোকটি, অরুণ তাকে বরুণ বলে জানে, আর প্রশান্ত জানে দীনুডাকাত বলেই!

প্রশান্ত চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠল পরম বিস্ময়ে!

বরুণ একগাল হেসে মিষ্টি গলায় বললে, 'আমাকে দেখে ব্যস্ত হবেন না প্রশান্তবাবু। এখন আমি দীনুডাকাত নই। আমার নাম শ্রীবরুণকুমার।'

প্রশান্ত একেবারে স্তম্ভিত হয়ে গেল। যে দীনুকে গ্রেপ্তার করবার জন্যে সে দিবারাত্র জল্পনা-কল্পনা করে, যাকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে পাঠাবার জন্যে রাজশক্তি আকুল আগ্রহে অপেক্ষা করছে, সেই-ই কিনা স্বেচ্ছায় আজ তার সুমুখেই এসে হাজির! অপরাধীর এতখানি বুকের পাটা দেখেছে কেউ কখনও?

ট্রে-খানা টেবিলের উপরে নামিয়ে রেখে বরুণ তেমনই হাসিমুখেই বললে, 'আজ আপনাকে পরিবেশন করবার সৌভাগ্য অর্জন করে এই অধমের জীবন আর দেহ আর মন সার্থক হয়ে গেল! টোস্ট খান, সীতাভোগ খান, মিহিদানা খান, চা খান! আরও কিছু চান?'

হঠাৎ কঠিন হয়ে উঠল প্রশান্তের মুখ-চোখের ভাব!

বরুণ নরম গলাতেই বললে, 'এমন ভাবে দেখা হয় না বাঘ আর হরিণের— না প্রশান্তবাবু? কিন্তু আমি জানি এ-বাড়ির ওপরে যখন আর পুলিশ পাহারা নেই, তখন নিরাপদেই পদার্পণ করতে পারি আমি। তারপর অকস্মাৎ মহাশয়ের আবির্ভাব। কিন্তু বিবেচনা করে দেখলুম, আপাতত আপনি যখন নিরস্ত্র, আর আমার পকেটে আছে একটি অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র, তখন নির্ভয়ে আপনার সঙ্গে দু-চারটে বাক্যালাপ করে গেলে মাথার ওপরে আকাশ ভেঙে পড়বে না! আপনি কী বলেন?'

প্রশান্ত কিছুই বলতে পারলে না, শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল বরুণের মুখের পানে।

বরুণ খিলখিল করে হেসে উঠে বললে, 'আমার দিকে অমন বোবার মতন তাকিয়ে থাকলে একটুও লাভ হবে না। খাবার আর চা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। বসতে আজ্ঞা হোক। কিঞ্চিৎ উদরসেবা করে আমার আর অরুণের জীবন ধন্য করুন। ...আচ্ছা, এই দেখুন, আগে আমিই আরম্ভ করছি— আপনাকে উৎসাহিত করবার জন্যে!' এই বলে সে একখানা টোস্ট হাতে করে তুলে নিলে।

অরুণ বললে, 'নিন প্রশান্তবাবু, আরম্ভ করুন।'

প্রশান্ত নীরস স্বরে বললে, 'অনুরোধ যখন করছেন, ভদ্রতার খাতিরে রাখতেই হবে। কিন্তু আমার চা ছাড়া আর কিছুই চলবে না।'

বরুণ বললে, 'তাহলে এই খাবারগুলো কেন এখানে এল?'

—আপনারা গ্রহণ করবেন বলে। আমার হাতে আর সময় নেই, আমাকে এখনই বিদায় নিতে হবে। প্রশান্ত তাড়াতাড়ি চা শেষ করবার জন্যে পেয়ালায় চুমুক দিতে লাগল ঘন ঘন।

বরুণ হেসে বললে, 'মাপ করবেন প্রশান্তবাবু। তাড়াতাড়ি চা শেষ করলেও আপনি এখন পালাতে পারবেন না!'

—মানে?

—আমার আগে আপনি এখান থেকে অদৃশ্য হতে পারবেন না।

—এটা কি আদেশ?

—উঁহু, অনুরোধ।

—এমন আশ্চর্য অনুরোধের কারণ?

—অনুমান করুন।

—অনুমান করতে পারছি না।

—এটা কি সত্যকথা?

—হ্যাঁ।

—না!

—আপনি কি আমাকে মিথ্যাবাদী বলতে চান?


* 'বজ্র আর ভূমিকম্প' দ্রষ্টব্য।

* দূরের কোনো লোককে অক্ষম করবার জন্যে বাংলাদেশের সেকালকার ডাকাতরা এইরকম খেঁটে বা ছোটো ডাণ্ডা ব্যবহার করত। আজকাল এর ব্যবহার উঠে গিয়েছে বটে, কিন্তু আগে অভ্যস্ত হাতে এই অস্ত্র হত অব্যর্থ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%