হেমেন্দ্রকুমার রায়
প্রথম
নীলপত্রের প্রথম আবির্ভাব
যবনিকা ওঠবার আগে 'প্রোগ্রামে' নাটকের পাত্র-পাত্রীদের চিনিয়ে দেবার নিয়ম আছে। কিন্তু উপস্থিত ক্ষেত্রে বোধ করি ও-নিয়ম না মানলেও অনিয়ম হবে না।
কারণ, এবারে আমরা বলতে বসেছি দীনুডাকাতের তৃতীয় কীর্তির কথা। যাঁরা 'মায়ামৃগের মৃগয়া'য় এবং 'বজ্র আর ভূমিকম্পে' দীনুডাকাত ওরফে বরুণ, তার বন্ধু অরুণ, তাদের বিশ্বস্ত অনুচর শ্রীধর এবং দীনু বা বরুণের কাছে বারবার পরাজিত গোয়েন্দা প্রশান্ত চৌধুরী প্রভৃতির সঙ্গে সুপরিচিত হয়েছেন, তাঁদের কাছে ও-লোকগুলির আর নূতন পরিচয়ের দরকার কী?
—'দীনুডাকাতের কীর্তি' হচ্ছে চিনে-নাটকের অভিনয়ের মতো। সাধারণত চিনে-নাটকের আকার হয় প্রকাণ্ড। এত প্রকাণ্ড যে, একদিনে তার সমগ্র অভিনয় সম্ভবপর হয় না। তাই চিনে-নাটকের অভিনয় হয় ক্রমশ। প্রথম দিনে এক অংশের অভিনয়ের পর যবনিকা পড়ে। দ্বিতীয় দিনে দেখানো হয় আর এক অংশ। তারপর দিনে-দিনে তার অন্যান্য অংশের অভিনয় চলতে থাকে— পালা শেষ না হওয়া পর্যন্ত। এবং দর্শকদের কাছে প্রথম দিনের পর নাটকের প্রধান প্রধান পাত্র-পাত্রীগণকে বারবার পরিচিত করবার আবশ্যক হয় না। কারণ, দর্শকরা সকলকেই চেনে।
আমরাও আশা করি, দীনুডাকাতের এই কীর্তিকাহিনি জানবার জন্যে যাঁরা আজ উৎসুক হয়েছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই তার প্রথম ও দ্বিতীয় কীর্তির সঙ্গে অপরিচিত নন। অতএব চেনা বামুনের পইতের দরকার কী?
গোয়েন্দা প্রশান্তের সঙ্গে দীনু বা দীনবন্ধু ওরফে বরুণের শেষ দেখা— তমলুকে। সেখানে দীনবন্ধু কীভাবে প্রশান্তের চক্ষে ধূলি নিক্ষেপ করেছিল, 'বজ্র আর ভূমিকম্পে'র পাঠকরা নিশ্চয়ই সে-কথা এরই মধ্যে ভুলে যাননি? এও বোধহয় সকলের মনে আছে যে, নীল কাগজে, লাল কালিতে চিঠি লিখে সে প্রশান্তকে জানিয়েছিল— এইবারে আমি আবার ঘটনাক্ষেত্রে অবতীর্ণ হব!
তারপর থেকে প্রশান্ত প্রতিদিন দেখতে আরম্ভ করেছে সেই ভয়াবহ সম্ভাবনার দুঃস্বপ্ন!
সর্বদাই তার সন্দেহ হয়, জনসমাজে আবার তাকে অপদস্থ করবার জন্যে দীনু না-জানি কোন অভিনব ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে বসেছে।
দীনুডাকাত কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হবার আগেই তাকে গ্রেপ্তার করবার জন্যে প্রশান্ত উঠে-পড়ে কোমর বেঁধে লেগে গেল।
কিন্তু দীনু যেন জলাভূমির আলেয়া! দীনু যেন মেঘলা আকাশের বিদ্যুৎ! দীনু যেন মরু প্রান্তরের মরীচিকা! আচম্বিতে স্বেচ্ছায় দেখা দেয়, ধরা দেয় না!
সর্বক্ষণই তার মনে হয়, দীনু তার চোখের আড়ালে আছে বটে, সে কিন্তু দীনুর চোখের আড়ালে নেই! সে কী করছে না-করছে সমস্তই দীনুর নখদর্পণে! দীনু তার পিছনে-পিছনে আছে অদৃশ্য ছায়ার মতো! গোয়েন্দার পক্ষে এমন অনুভূতি কেবল অস্বস্তিকর নয়, অপমানকরও বটে! সে যেন একান্ত অসহায়!
প্রশান্ত দিকে দিকে চর পাঠিয়ে দিলে, দীনুকে আবিষ্কার করবার জন্যে। কিন্তু দিনের পর দিন তারা একই খবর নিয়ে ফিরে আসে—উত্তরে-দক্ষিণে-পূর্বে পশ্চিমে কোথাও দীনুর টিকি দেখবার জো নেই। অথচ প্রশান্তের দৃঢ়বিশ্বাস, দীনু আছে এই কলকাতার মধ্যেই।
অরুণের কথা প্রশান্ত ভোলেনি। সে নিশ্চিতরূপেই জানে যে, দীনু ওরফে বরুণ তার বন্ধু ও সাহিত্যিক অরুণকে কোনোদিনই ত্যাগ করতে পারবে না। কলকাতায় থাকলে সে অরুণের বাড়িতে পদার্পণ করবেই।
অতএব অরুণের বাড়ির চারিদিকে বসল পুলিশের কড়া পাহারা।
ছদ্মবেশধারণে দীনু যে কীরকম কৌশলী শিল্পী, সেটাও প্রশান্তের অজানা নেই। দীনু যে কতবার কতরকম আশ্চর্য ছদ্মবেশের মধ্যে নিজের আসল চেহারা লুকিয়ে তার সুমুখে এসে তাকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গিয়েছে, এ-কথা কি প্রশান্ত কোনোদিন ভুলতে পারবে? দীনুর প্রকৃত স্বরূপ কী, তাও দেখবার সুযোগ সে কোনোদিনই পায়নি, কাজেই অরুণের বাড়িতে যারা আনাগোনা করে তাদের মধ্যে কে যে দীনু আর কে যে দীনু নয়, সেটা বোঝবার কোনোই উপায় নেই। তাই যে-কোনো লোক অরুণের বাড়িতে ঢোকে, পুলিশের সন্দেহ তারই উপরে গিয়ে পড়ে। গুপ্তচররা পিছনে পিছনে আঠার মতন লেপটে থাকে। এবং যতদিন না তাদের সমস্ত পরিচয় ভালো করে জানা না যায় ততদিন তারা অব্যাহতি পায় না পুলিশের অশুভদৃষ্টি থেকে।
সেদিন প্রশান্ত রাস্তা দিয়ে আসছে, হঠাৎ অরুণের সঙ্গে দেখা।
অরুণ তাকে দেখেও যেন চিনতে পারলে না, অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে।
অরুণের এমন ব্যবহারের কারণ বোঝা কঠিন নয়। কিন্তু চক্ষুলজ্জার খাতির রাখতে গেলে গোয়েন্দাগিরি চলে না। অতএব প্রশান্ত হনহন করে এগিয়ে গিয়ে অরুণের পথরোধ করলে। হাসিমুখে বললে, 'এই যে অরুণবাবু, নমস্কার!'
—নমস্কার।
—আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন না?
—দুনিয়ায় এমন সব জীবও আছে, যাদের চিনতে পারা নিরাপদ নয়।
—আমার ওপরে বড্ডই রেগেছেন দেখছি।
—সেটা কি অস্বাভাবিক?
—আমি তো তাই বলি।
—আপনি যা বলেন, আমার কাছে তা বেদবাক্য নয়।
—কেন?
—আবার জিজ্ঞাসা করছেন! আপনার অত্যাচারে আমার আর আমার আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের জীবন দুর্বহ হয়ে উঠেছে। এখন সকলেই আমার বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে ভয় পায়। আমি কি ক্রিমিন্যাল, যে পুলিশ পাহারার মধ্যে আমাকে জীবনযাপন করতে হবে?
—মোটেই নয়, মোটেই নয়! রাম রাম, আপনাকে নিয়ে আমি মোটেই মাথা ঘামাই না। যারা পদ্য লেখে, তাদের নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় আমার নেই।
—তাহলে দয়া করে নির্দয় হয়ে আমার মতন তুচ্ছ ব্যক্তিকে ত্যাগ করলেই বাধিত হব।
—তাও সম্ভব নয়।
—কেন মশাই?
—কেন, তাও বলতে হবে? দীনুডাকাত যে প্রায়ই আপনার এখানে হাওয়া খেতে আসে, এ-কথা তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না?'
—ওই অছিলায় আপনি কি আমার বাড়ির মশা-মাছিকেও দীনু বলে সন্দেহ করবেন?
—অরুণবাবু, বহুরূপীবিদ্যায় দীনু যে কতবড়ো ওস্তাদ, এ পরিচয় কি আমি পাইনি? কবে, কখন, কোন বেশে দীনু আপনার সঙ্গে আলাপ করতে আসবে, কেমন করে আমি জানতে পারব বলুন?
—প্রশান্তবাবু, আপনি আমার কথায় বিশ্বাস করবেন?
—কেন করব না?
—তাহলে শুনে রাখুন, বরুণ আজকাল আর আমার বাড়িতে আসে না।
—কেন? আপনার সঙ্গে কি তার ঝগড়া হয়েছে?'
—না।
—তবে?
—আমি তাকে আমার বাড়িতে আসতে মানা করে দিয়েছি।
—কারণ?
—পুলিশের টিকটিকিদের কবল থেকে মুক্তি পাব বলে।
—দীনু আপনার কথা রাখবে?
—আমার বিশ্বাস, রাখবে।
—শুনে সুখী হলুম। আচ্ছা মশাই, নমস্কার!
অরুণ প্রতিনমস্কার করে চলে গেল।
প্রশান্ত চলতে চলতে ভাবতে লাগল, অরুণ সত্য কথা বললে কি না? যদি সত্যকথা বলে থাকে, তাহলে এ এক দুঃসংবাদ! অরুণের বাড়িতেই একদিন-না-একদিন দীনুকে গ্রেপ্তার করবার সুযোগ মিলবে ভেবে সে কতকটা আশ্বস্ত হয়েছিল, কিন্তু এখানেও যদি তার পাত্তা পাওয়া না যায়—
ধাঁ-করে তার মাথার ভিতর দিয়ে খেলে গেল এক দারুণ সন্দেহ!
দীনু অরুণের বাড়িতে আসবে না, মানলুম। কিন্তু অরুণ তো বাড়ি থেকে বেরিয়ে অন্য কোথাও গিয়ে অনায়াসেই বন্ধু-সম্ভাষণ করে আসতে পারে!
হয়তো আজই সে বেরিয়েছে দীনুর সঙ্গে দেখা করবার জন্যে!
প্রশান্ত তাড়াতাড়ি ফিরে দেখলে, অরুণ বিডন বাগানের ভিতরে প্রবেশ করলে। সেও পায়ে পায়ে অগ্রসর হল। বাগানের ভিতরে ঢুকল। প্রথমে অরুণের সন্ধান মিলল না। খানিক খোঁজাখুঁজির পর দেখা গেল, একখানা বেঞ্চির উপরে বসে অরুণ একটি প্রাচীন ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইছে।
প্রশান্ত আরও কয়েক পা এগিয়ে লক্ষ করতে লাগল। ভদ্রলোকের বয়স পঁয়ষট্টির কম হবে না। মাথায় বড়ো-বড়ো সাদা চুল, সাদা দাড়ি-গোঁফ, চোখে কালো কাচের চশমা।
প্রশান্তের মন হয়ে উঠল চাঙ্গা। পাকা চুল, পাকা গোঁফ-দাড়ি, রঙিন চশমা— এ-সব হচ্ছে সন্দেহজনক বস্তু। ছদ্মবেশধারীরা প্রায়ই এইসব জিনিসের সাহায্য গ্রহণ করে! তদন্ত করা দরকার।
হঠাৎ অরুণ মাথা তুলে তাকে দেখতে পেলে। প্রথমে তার মুখে-চোখে ফুটল বিরক্তির ভাব, তারপরেই সে হো হো করে হেসে বলে উঠল, 'আরে, প্রশান্তবাবু যে! এখনও আমার মায়া কাটাতে পারেননি?'
প্রশান্ত অপ্রস্তুত হবার ছেলে নয়। এগুতে এগুতে হাস্যমুখে বললে, 'আপনার মায়ার টানে এখানে আসিনি অরুণবাবু! সারাদিনের পরিশ্রমের পর একটু বায়ুসেবন করতে এসেছি।'
—বেশ করেছেন, খুব ভালো করেছেন। পবিত্র বায়ুর মতন জিনিস আর নেই। করুন— প্রাণপণে বায়ুসেবন করুন!
অরুণের কণ্ঠস্বরে চাপা ব্যঙ্গের ইঙ্গিত। সে নিশ্চয়ই তার উদ্দেশ্য ধরে ফেলেছে। কিন্তু সেসব গ্রাহ্যের মধ্যেও না এনে প্রশান্ত বেঞ্চির উপরে বসে পড়ল।
প্রাচীন ভদ্রলোকটি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, 'অরুণ, তুমি বন্ধুর সঙ্গে কথা কও। আমি এখন উঠি।'
কী মুশকিল, শিকার পালায় যে! মুহূর্তে মৌখিক ভদ্রতার মুখোশ ত্যাগ করে প্রশান্ত বললে, 'সে কী মশাই, এখনই উঠবেন? আর একটু বসুন না! খাসা হাওয়া বইছে!'
সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তির মুখে এরকম ঘনিষ্ঠ সম্ভাষণ শুনে ভদ্রলোক অত্যন্ত বিস্মিত ভাবে নীরবে প্রশান্তের মুখের পানে তাকিয়ে রইলেন।
প্রশান্ত নির্লজ্জের মতন হাসতে হাসতে বললে, 'মশাই কি রাগ করলেন?'
—রাগ করিনি, বিস্মিত হয়েছি।
—কেন?
—আপনার সঙ্গে পরিচয় নেই, অথচ—
—অরুণবাবু ইচ্ছে করলেই আমাদের পরিচিত করে দিতে পারেন।
—কিন্তু আপনার পরিচয় জানবার ইচ্ছা আমার নেই।
রীতিমতো অপমানকর উক্তি। প্রশান্ত তবু দমল না, বললে, 'কিন্তু আমি মশাইয়ের পরিচয় চানতে পারি কি?'
অরুণ হাসির উচ্ছ্বাস দমন করতে করতে বললে, ওঁর পরিচয় আমি দিতে পারি প্রশান্তবাবু।'
—ভালো কথা।
—প্রথমত, উনি দীনুডাকাত নন।
—আমিও কি তা বলছি?
—দ্বিতীয়ত, ওঁর নাম সুরেন্দ্রমোহন সেন।
—নমস্কার, সুরেনবাবু!
—তৃতীয়ত, উনি হচ্ছেন আমার পিসেমশাই।
—ও!
—চতুর্থত, উনি আপনারই শ্রেণিভুক্ত।
—অর্থাৎ?
—পুলিশের লোক।
—পুলিশের লোক? প্রশান্তের স্বর সচকিত।
—হ্যাঁ, একসময়ে উনি পুলিশের লোকই ছিলেন। উনি ছিলেন ডেপুটি পুলিশ সুপারিনটেন্ডেন্ট। এখন অবসর গ্রহণ করেছেন।
প্রশান্ত ঘাড় হেঁট করে পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল।
সুরেনবাবু বললেন, 'অরুণ, তোমার এই বন্ধুটি পুলিশের কোন বিভাগে কাজ করেন?'
—গোয়েন্দা-বিভাগে। ওঁর নাম প্রশান্ত চৌধুরী। আসলে উনি নির্বোধ নন, কিন্তু দীনুডাকাতের গন্ধ পেলেই ও'র সব বুদ্ধিসুদ্ধি কর্পূরের মতন উবে যায়। উনি আপনাকে ভেবেছিলেন ছদ্মবেশী দীনুডাকাত।
সুরেনবাবু অট্টহাস্য করে বললেন, 'প্রশান্তবাবু, আমাকে দেখলে ডাকাত বলে মনে হয় নাকি?'
প্রশান্ত নতমুখে হাত জোড় করে বললে, 'আমাকে মাপ করবেন।'
—মাপ করবার কথা নয় মশাই, হাসবার কথা। আজ আপনি যে হাসির খোরাক জোগালেন, তার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ! অতঃপর আমাকে বিদায় হবার হুকুম দিন!
—হুকুম? আর লজ্জা দেবেন না।
সুরেনবাবু হাসতে হাসতে চলে গেলেন।
প্রশান্ত করুণ স্বরে বললে, 'অরুণবাবু, এই কি আপনার উচিত হল?'
—কী?
—আমাকে এমনভাবে অপদস্থ করা?
—আমি আপনাকে অপদস্থ করলুম!
—তা নয়তো কী? প্রথমেই আপনি সুরেনবাবুর পরিচয় দিতে পারতেন!
—সে সময় আপনি দিয়েছিলেন কি? আপনি যে এসেই রক্ত নিশান দেখে ক্ষিপ্ত ষণ্ডের মতন আমার পিসেমশাইকে আক্রমণ করলেন!
—আপনার পিসেমশাই? মিথ্যাবাদী!—এই বলে হঠাৎ চিৎকার করে প্রশান্ত লাফিয়ে উঠল এবং জনতাপূর্ণ উদ্যানের চারিদিকে উদভ্রান্তের মতন তাকাতে লাগল।
—কী ব্যাপার প্রশান্তবাবু? সত্যি-সত্যিই খেপে গেলেন নাকি?
—খেপিনি, এইবারে খেপব!' প্রশান্ত বেঞ্চির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করলে।
অরুণ বিস্ফারিত চক্ষে দেখলে, বেঞ্চির এক প্রান্তে পড়ে রয়েছে একখানা নীল রঙের খাম।
হতভম্বের মতন বললে, 'ওখানে ওখানা কেমন করে এল?'
—আপনার সাজানো পিসেমশাই রেখে গিয়েছেন! এই বলে প্রশান্ত তাড়াতাড়ি খামখানা তুলে নিয়ে দ্রুত পদচালনা করবার উপক্রম করলে।
তার অভিপ্রায় বুঝতে পেরে অরুণ তাকে বাধা দিয়ে বললে, 'কোথা যান?'
—আপনার পিসেমশাইকে ধরতে! এখনও সে বাগান থেকে বেরুতে পারেনি।
—প্রশান্তবাবু, যেচে নিজের অপমানকে ডেকে আনবেন না।
—পথ ছাড়ুন আপনি!
—উনি সত্যিই আমার পিসেমশাই! এবারে ওঁকে বিরক্ত করলে উনি নিশ্চয়ই আপনাকে ক্ষমা করবেন না। আপনি বিপদে পড়বেন!
—তাহলে এই নীল চিঠি এখানে কেমন করে এল?
—এতক্ষণে একটা কথা মনে পড়ছে। সুরেনবাবুর পরিচয় পেয়ে আপনি যখন স্তম্ভিত, সেইসময়ে একজন লোক বেঞ্চির পাশ দিয়ে চলে গিয়েছিল।
—সেদিকে তখনই আমার দৃষ্টি-আকর্ষণ করেননি কেন?
—সরকারি বাগান, কত লোক আসছে যাচ্ছে উঠছে বসছে বেড়িয়ে বেড়াচ্ছে, কে সকলের দিকে লক্ষ রাখে?
অরুণের কথা প্রশান্তের মনে লাগল। খামের দিকে তাকিয়ে ভাবতে ভাবতে বললে, 'সেই নীল কাগজ, লাল কালিতে আমার নাম লেখা। দীনুর মার্কামারা চিঠি! আশ্চর্য! সে কেমন করে জানলে, আমি এখানে থাকব?'
অরুণ বললে, 'মশাই, আপনি যেমন দীনুর জন্যে চারিদিকে চর পাঠিয়েছেন, দীনুও তেমনি আপনার গতিবিধির উপরে লক্ষ রাখবার জন্যে চর নিযুক্ত করতে পারে, এতবড়ো সহজ কথাটা ভুলে যাচ্ছেন কেন?'
প্রশান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললে, 'এমন ধড়িবাজ আর দেখিনি, আমাকে জ্বালিয়ে মারলে! আমি তাকে খুঁজে পাই না, সে কিন্তু আমাকে ঠিক খুঁজে পায়!... আবার নীল চিঠি! নিশ্চয়ই আবার কোনও নতুন বিপদের বার্তা!'
অরুণ বললে, 'চিঠিতে কী আছে তা জানবার আগ্রহ হচ্ছে।'
—মাপ করতে হল, আপনার আগ্রহ নিবারণ করব না। এ চিঠি আমি বাড়িতে গিয়ে একলা পড়ে দেখব। নমস্কার!
দ্বিতীয়
নীলপত্রের আত্মকাহিনি
বাড়িতে ফিরে প্রশান্ত নীলপত্র খুলে পাঠ করলে :
'অশান্তভায়া (রাগ কোরো না; জানো তো তোমাকে অশান্ত বলেই ডাকতে ভালোবাসি?)'
আমি তোমার দেবতা, আর তুমি আমার ভক্ত সাধক,— কেমন, তাই নয় কি? আমাকে দেখবার আর লাভ করবার জন্যে তুমি যে কী কঠোর সাধনাই করছ, আমার তা অজানা নেই। বৎস, তোমার সাধনায় আমি প্রীত হয়েছি। এইবারে তোমাকে দেখা দেব।
দেবকীচরণ পালের নাম শুনেছ তো? যুদ্ধের বাজারে গরিবদের মুখের অন্ন কেড়ে নিয়ে সে কোটিপতি হয়েছে। ব্ল্যাক মার্কেটেও তার মতন অসাধু ব্যবসায়ী খুব কমই আছে। তোমরাও অনেকবার চেষ্টা করে তাকে আইনের পাকে বাঁধতে পারোনি।
দু-বছর আগেও দেবকীচরণের সম্বলের মধ্যে ছিল একখানা ছোটো মুদির দোকান। তার গা থাকত আদুড়, পায়ে ছিল না জুতো, আর ময়লা বা আধ ময়লা কাপড় হাঁটুর নীচে নামত না।
এই দেবকীচরণ আজ কলকাতায় পাঁচখানা প্রাসাদের মতন মস্ত বাড়ির মালিক, তার মোটর আছে চারখানা আর বড়ো বড়ো কারবার আছে কত রকম তার সঠিক হিসাব দেবার সময় নেই। আসল কথা, সে এখন অনেক রাজা-মহারাজার চেয়ে ধনী লোক।
এই সেদিন সে ছিল দরিদ্র। কিন্তু টাকার কাঁড়ির উপরে আসন পেতে এর মধ্যেই দরিদ্রদের ভুলে গিয়েছে। কলকাতার রাজপথের ধূলিশয্যায় আজ অনাহারে মৃত দরিদ্রদের রাশি রাশি শবদেহ এবং অনাহারে মৃতকল্প হাজার হাজার চলন্ত কঙ্কালের হাহাকার, কিন্তু বাবু দেবকীচরণ সাজানো বৈঠকখানায় পুরু গদির উপরে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে নির্বিকার ভাবে বসে, সুখে স্তিমিত চোখে রুপোর নলে তাম্রকূট সেবন করেন। কোনো গরিবই তার কাছ থেকে মুড়ি কেনবার জন্যে একটি আধলাও চেয়ে পায়নি। বুভুক্ষু জ্যান্ত মড়ারা তাঁর ফটকের সামনে গিয়ে যদি সক্রন্দনে আবেদন 'জানায়— 'ওগো, একটু ফেন খেতে দাও'— অমনি আমাদের হঠাৎ-বাবুজির গালপাট্টাওয়ালা ডাল-রুটি-চোট্টা দ্বারবানরা হই-হই রবে তেড়ে গিয়ে বীরত্ব প্রকাশ করে!
এই দেবকীচরণকে আমি কিঞ্চিৎ শিক্ষা দিতে চাই। অবশ্য, তাকে একেবারে ফতুর করবার সুযোগ ও ক্ষমতা আমার নেই, কিন্তু লক্ষ লক্ষ দরিদ্রের ছিন্ন বস্ত্রের গ্রন্থি খুলে যে সোনা-রুপোর পাহাড় সে তৈরি করেছে, আমি তারই কতক অংশ কেড়ে নিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে আবার বস্ত্রহীন অন্নহীন আশ্রয়হীন হতভাগ্যদের মাঝখানে ছড়িয়ে দিতে চাই। অর্থাৎ, আইনের সাহায্যেও তোমরা যাকে স্পর্শ করতেও পারোনি, বেআইনির দ্বারা আমি তাকে যতটা পারি শাস্তি দেবার চেষ্টা করব।
হে অসাধুর শত্রু! বুঝতেই পারছ, আমি অসাধু নই। কিন্তু তোমাদের তথাকথিত আইনের ধারায় সাধুতার যেসব লক্ষণ আছে, আমার ব্যবহারের সঙ্গে সেগুলো মিলবে না বলে তোমরা নিশ্চয়ই আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করবে। অন্তত মনে মনে আমাকে সমর্থন করলেও দাসত্বের মানরক্ষার জন্যে তোমরা দীনবন্ধু দীনুডাকাতকে দ্বীপান্তরে প্রেরণ করবার আগ্রহে অধীর হয়ে উঠবে! কেমন, তাই নয় কি?
উত্তম! তোমাদের পতঙ্গবুদ্ধিকে ব্যর্থ করবার জন্যে মাতঙ্গদীনবন্ধু চিরদিনই প্রস্তুত।
আগামীকল্য রাত্রি একটার পর আমি শ্রীমান দেবকীচরণের বসতবাড়িতে আবির্ভূত হব। আপাতত এর বেশি আর কিছু বলতে রাজি নই।
তুমি তোমার দেবতা দীনবন্ধুর দেখা পাবার আশায় প্রায় উন্মত্ত হয়ে উঠেছ। তোমার এই উন্মত্ততার জন্যে আমার একমাত্র বন্ধু অরুণের জীবন ভারবহ হয়ে উঠেছে— এও আমি জানি।
অতএব তোমাকে দেখা দেবার তারিখ ও সময় আগে থাকতেই জানিয়ে রাখলুম। কিন্তু যদিও তোমার সাহায্যের জন্যে রাজশক্তি ও বিপুল পুলিশবাহিনী প্রস্তুত হয়েই আছে, তবু তোমাদের কাছে তুচ্ছ এই দীনবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার ক্ষমতা তোমার আছে কি? দেখা যাক।
ইতি
দীনবন্ধু
চিঠিখানা হাতে করে প্রশান্ত গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হল।
এই ট্রেন-ট্যাক্সি ফোন-টেলিগ্রাফ-বেতার-এরোপ্লেন-ইলেকট্রিকের যুগে দীনু ডাকাতি করতে চায় সেকালের বিশুডাকাতের মতন! সে খবর পাঠিয়ে ডাকাতি করে! না, এক হিসেবে সে বিশুরও চেয়ে এগিয়ে গিয়েছে। বিশু খবর পাঠাত যার বাড়িতে হানা দেবে তাকেই। কিন্তু দীনু খবর পাঠায় খোদ পুলিশের কাছে!
কিন্তু এ খবরে মন আমার আহ্লাদে নেচে উঠছে না! এর মধ্যে কোনো গভীর অর্থ আছে বলেই সন্দেহ হচ্ছে। হয়তো আমাকে কোনো নতুন প্যাঁচে ফেলবার ফিকির!
আর একবারও সে আমাকে ডাকাতির সঠিক তারিখ জানিয়েছিল।* ফলে আমাকে পরিণত হতে হয়েছিল একটি আস্ত গর্দভে! সে প্রায় আমার চোখের উপরই ডাকাতিও করলে— সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও দিলে ফাঁকি!
আমাকে খবর পাঠিয়ে আবার উদারতা প্রকাশ করা হয়েছে! শঠ, ধূর্ত, শয়তান! নিশ্চয়ই এ হচ্ছে দেশ ও দশের মাঝখানে আমার গালে চুনকালি মাখাবার নূতন চেষ্টা! যে ইঁদুর একবার ফাঁদে পড়ে, সে কি আর কখনও ফাঁদের দিকে ফিরে তাকায়? আমি তো ইঁদুরের চেয়ে অধম জীব নই! আর কী আমি ভুলি বাবা?
যথাসময়ে যথাস্থানে যথাযথ আয়োজন করে আমি যে উপস্থিত থাকব সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। দীনু যখন মুখশাবাশি করে খবর পাঠিয়েছে, তখন নিজের মুখরক্ষার জন্যে ঘটনাস্থলে আবির্ভূত হবেই। তার কোনো প্যাঁচেই আমি আর অন্যমনস্ক হব না। দেখি, বাঘের ঘরে ঢুকে এবারে হরিণ কেমন করে পালায়?
কিন্তু আমার বুক ঢিপ ঢিপ করে কেন? বাঁ চোখটাই-বা এত নাচছে কেন? আবার কি দীনু আমার উপরে টেক্কা মারবে?
ধেৎ, অসম্ভব! চোর নাকি নিজে যেচে আমার নাগালের ভিতরে এসে দাঁড়াবে, আর এত লোকজন নিয়ে আমি তাকে ধরতে পারব না? তাও কখনও হয়? এবারকার বাজি আমি মারব, মারব, মারবই! হে মা কালী, আর আমাকে ছলনা কোরো না, আমি জোড়া পাঁঠা মানছি!
তৃতীয়
দেবুমুদি
প্রশান্ত সত্যি সত্যিই কালীঘাটে গিয়ে মা কালীকে পুজো দিলে।
ভক্তিভরে মায়ের চরণামৃত পান করে এবং কপালে সিঁদুরের ফোঁটা পরে মনের ভিতরে যেন একটা দৈবশক্তি অর্জন করলে।
মা কালীর লকলকে সোনার জিভের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললে, 'মাগো, তোমার আশীর্বাদ নিয়ে চললুম। এবারে এসপার কী ওসপার! এবারেও যদি চরণে ঠেলো মা, জোড়াপাঁঠাতেও তোমার পেট না ভরে, তাহলে কালীনামের নিন্দে হবে মা, নিন্দে হবে!'
মন্দিরের বাইরে আসবার পর হঠাৎ তার একটা কথা মনে হল।
আচ্ছা, শুনি তো ডাকাতদের বড়ো দেবতা হচ্ছেন কালীঠাকরুণ! দীনুও যদি আজ কালীপুজো করে থাকে, আর একজোড়ার বদলে দিয়ে থাকে দুজোড়া পাঁঠা বলি, মা কালী কি তাহলে তার প্রতিই হবেন বেশি সদয়?
যদিও আমি হচ্ছি সাধু, আর পামর দীনু হচ্ছে ছার চোর, তবু বলা তো যায় না। পৌরাণিক দেব-দেবীগুলি হচ্ছেন বড়োই খামখেয়ালি, তাঁদের বরে পাপিষ্ঠ অসুররা কতবার স্বর্গ থেকে অন্যান্য দেবতাদেরই গলাধাক্কা দিয়েছিল, সেসব ইতিহাস কে না জানে?
দোহাই মা কালী, অন্তত এবারে আর দীনুর দিকে ঢোলো না, কার্যসিদ্ধি হলে আমার কাছ থেকে আরও দু-জোড়া পাঁঠা উপহার পাবে!
মা কালীকে নূতন লোভ দেখিয়ে কতকটা নিশ্চিন্ত হয়ে প্রশান্ত গেল দেবকীচরণের বাড়িতে।
দেবকীচরণের ছোটোখাটো গোলগাল দেহখানি যেন ফুটবলের বৃহত্তর সংস্করণ। মাথার আধখানায় খোঁচা খোঁচা চুল— যেন মরুভূমির সীমান্তে জন্মেছে কণ্টকঅরণ্য!
সম্প্রতি তার কুচকুচে কালো রঙের উপরে বিপুল বিক্রমে ভিনোলিয়া হোয়াইট রোজ সাবানের আনাগোনা শুরু হয়েছে বটে, কিন্তু তবু সেই বহুবর্ষব্যাপী তৈলপক্ব চামড়ার তেল-চকচকে ভাবটা কিছুতেই আর ঘুচতে চায় না!
এত তাড়াতাড়ি বড়োলোক হয়ে এখনও নিয়মিত ক্ষৌরকার্য সমাধা করবার অভ্যাস হয়নি, তাই তার গালে ও দাড়িতে ছড়ানো রয়েছে কাঁচা-পাকা কেশের অঙ্কুর। চোখদুটি ছোটো-ছোটো, কিন্তু চটুল চড়াইপাখির মতন চঞ্চল এবং তাতে মাখানো রয়েছে যেন কাকচক্ষুর চালাকির ভাব। অধিকাংশ জীবন কেটে গিয়েছে তার মুদির দোকানের খরিদ্দারদের মন রাখতে রাখতে, কাজেই মুখের উপর থেকে এখনও পরম অনুগত দ্যাখন-হাসির ভাবটুকু লুপ্ত হবার সময় পায়নি।
হাতের কবজিতে তার সোনার হাতঘড়ি, দুই হাতের আঙুলে গোটাপাঁচেক হীরা ও অন্যান্য দামি পাথর বসানো আংটি, পাতলা ফিনফিনে পাঞ্জাবিতে মুক্তোর বোতাম, পরনে জরিপাড় কোঁচানো মিহি কাপড়, পায়ে ইয়ং কোম্পানির শৌখিন চটি।
টাকা অত্যন্ত সুলভ হলে যতটা মূল্যবান ও জমকালো সাজসজ্জা করা সম্ভব, তার কিছুরই ত্রুটি হয়নি, কিন্তু ভগবানের এমনি মার যে, তবু ময়ূরপুচ্ছের ভিতর থেকে প্রকাশ্যভাবে উঁকি মারছে দাঁড়কাকের স্বরূপটি।
অকস্মাৎ অর্থ দিয়ে কেউ আভিজাত্য ক্রয় করতে পারে না, আভিজাত্যকে আনে কতকটা জন্ম ও আবহ এবং প্রধানত শিক্ষা-দীক্ষা-সংস্কৃতি।
প্রশান্ত সকৌতুকে দেবকীচরণের এই বিশেষত্বগুলি লক্ষ্য করতে লাগল। মনে মনে বললে, দেবকীর সর্ব্বস্ব চুরি গেলেও আমার মনে কিছুমাত্র সহানুভূতির সঞ্চার হবে না। দীনু যদি আগে এর লোহার সিন্দুক সরিয়ে ফেলে আমার হাতে ধরা দিত, তাহলেই আমি হতুম বেশি খুশি!
কিন্তু কোনো পুলিশকর্মচারীরই মুখ ফুটে এমন কথা বলবার অধিকার নেই, তাই বাইরের ভদ্রতার ও নিজের কর্তব্যের খাতিরেই সেদিনকার দেবুমুদিকে আজ সে 'দেবকীবাবু' বলেই ডাকতে বাধ্য হল।
দেবকী প্রথমটা ধনীসুলভ গর্বিত গাম্ভীর্যের ভাবটা বজায় রাখবার চেষ্টা করলে। মস্ত বড়ো কেওকেটার মতন ভালো করে প্রশান্তের দিকে নজরই দিলে না। জিজ্ঞাসার জবাবও দিতে লাগল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। কিন্তু তারপরেই কুবিখ্যাত দীনুডাকাতের নাম ও তার সাংঘাতিক অভিপ্রায়ের কথা শুনেই ধনীর ভূমিকায় অভিনয় করবার সকল শক্তিই তার বিলুপ্ত হয়ে গেল। খসে পড়ল সিংহের চামড়া— বেরিয়ে পড়ল গর্দভমূর্তি।
ঠক ঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সোফা থেকে নেমে একেবারে প্রশান্তের পা দুটো জড়িয়ে ধরে বলে উঠল, 'হুজুর মা-বাপ! আমাকে রক্ষে করুন!'
দেবুমুদি নিজের মূর্তি ধরেছে দেখে প্রশান্তও মনে-মনে হেসে দেবকীনাথের সঙ্গে এতক্ষণ যে সম্ভ্রমসূচক 'বাবু' উপাধিটি ব্যবহার করছিল, সেটিকে তুলে নিয়ে করলে অত্যন্ত আরাম বোধ!
বললে, 'ওঠো দেবকী, ওঠো! এখন খোকার মতন আকুল হবার সময় নয়!'
দেবকী দুই চক্ষু ছানাবড়ার মতন করে তুলে বললে, 'বলেন কী হুজুর! আকুল হব না? দীনুডাকাতের নাম শুনেই আমার হাত-পা পেটের ভিতরে সে�ধিয়ে যাচ্ছে!'
—মূর্খ! হাত-পা তোমার পেটের বাইরেই আছে। উঠে বোসো।
দেবকী সক্রন্দনে বললে, 'ওরে বাবা, দীনুডাকাত! সে যে সর্বনেশে লোক গো!'
—দীনুকে তুমি তো যেচেই নিজের বাড়িতে ডেকে আনতে চাও!
—আমি?
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমিই!
—ওরে বাবা, এ আবার কী কথা!
—দীনু গুণী, দানী ধনীদের ওপরে অত্যাচার করে না। আমরা পুলিশের লোক, আমরা কি জানি না, কতটা অসৎ উপায়ে দুঃখীদের মুখের গ্রাস কেড়ে নিয়ে আজ তুমি হঠাৎ-ধনী হয়ে উঠেছ? দেবকী, বুকে হাত দিয়ে বল দেখি, এই দুর্ভিক্ষের দিনে কজন সর্বহারার মুখে তুমি একটুখানি হাসি ফোটাবার চেষ্টা করেছ?
দেবকী মাথা নীচু করে বোকার মতন বসে রইল।
—বুঝেছ বাপু? এই অপরাধেই দীনু তোমাকে শাস্তি দিতে আসবে।
—কসুর হয়ে গেছে হুজুর, বড্ড কসুর হয়ে গেছে! কিন্তু দীনুর সঙ্গে কি আমার একটা চুক্তি হয় না?
প্রশান্ত বিস্মিত হয়ে বললে,—'চুক্তি! কীসের চুক্তি?'
—দীনু যদি আমার বাড়িতে আজ না আসে, তাহলে কাল থেকে রোজ আমি পঞ্চাশজন করে গরিবকে পাত পেতে খাওয়াব। আর এই হপ্তার মধ্যেই দুঃখীদের জন্যে পাঁচ হাজার টাকার বস্ত্রদান করব!
—ও, মরণকালে তুমি হরিনাম করতে চাও? কিন্তু বাপু, চোরে-কামারে দেখা নেই, চুক্তি হবে কেমন করে? বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে যাবে কে?
—হুজুরের কথা বুঝতে পারছি না।
—বলি, দীনু তো আজ একেবারে আসবে 'যুদ্ধং দেহি' বলে, তার আগে তোমার চুক্তির কথা শোনাতে যাবে কে?
দেবকীর মুদিবুদ্ধি এতক্ষণে ব্যাপারটা বুঝতে পারলে। খানিকক্ষণ হতাশভাবে মাথা চুলকে বললে,— হুজুর কি কোনোরকমে কথা দীনুডাকাতের কানে তুলে দিতে পারেন না?
—আমি? প্রশান্ত হেসেই অস্থির! 'গাড়ল কোথাকার! আমি যদি দীনুর ঠিকানা জানতুম, তাহলে সে কি আজ এখানে আসতে পারত?'
—তবে আমার কী হবে হুজুর?
—ওসব বাজে কথা যেতে দাও। শোনো। তোমার বাড়িতে টাকাকড়ি কি আছে?
—আজই ব্যাঙ্ক থেকে নগদ তিন লক্ষ টাকা তুলে এনেছি।
—কেন?
—কাল একটা জরুরি কাজের জন্যে দরকার।
—টাকা কোথায় রেখেছ?
—শোবার ঘরে লোহার সিন্দুকে!
—হুঁ। দীনু তোমার সব খবর রাখে দেখছি।
—কী করে হুজুর, কী করে?
—খুব সম্ভব তোমার চাকর-বাকরদের দলে দীনুর চর আছে।
—ও বাবা, বলেন কি? এখুনি আমি সব ব্যাটাকে দূর করে দেব!
—এখন তাতে আর বিশেষ কিছু সুবিধে হবে না। দীনু যা জানবার তা জেনেছে।
—তাহলে টাকাকড়ি সব নিয়ে এখুনি আমি পালিয়ে যাব!
—আমি তোমাকে পালাতে দেব না।
—দেবেন না হুজুর?
—উঁহু, কিছুতেই না। আমি চাই তোমার টাকার লোভে দীনু আজ এখানে আসুক! দেবকী হতভম্ব বলির পাঁঠার মতন কাঁপতে লাগল।
—আমি চাই দীনু আসুক, আর আমি তাকে গ্রেপ্তার করি।
—হায় হুজুর, রাজায় রাজায় যুদ্ধু হয় আর উলুখড়ের প্রাণ যায়!
—এখানে পুলিশ পাহারায় থাকলে প্রাণ তোমার যাবে না। বরং পালাতে গেলেই মরবে।
—অ্যাঁ!
—দীনুর নজর সব দিকে। পালিয়েও বাঁচতে পারবে না। সে তোমার সঙ্গে সঙ্গে যাবে।
—সঙ্গে সঙ্গে যাবে হুজুর?
—আলবত!
—ইস, তবে আমি পালাব না।
—এই হল সুবুদ্ধির কথা।
—মরতে যদি হয়, বাড়িতেই মরা ভালো।
—মরবে কেন? দীনু কারুকে প্রাণে মারে না। বড়োজোর তোমার তিনলাখ টাকা লোপাট হবে।
—তাহলেও আমি মারা পড়ব। অত টাকার শোক সামলাতে পারব না।
—ভয় নেই, বাড়ির ভিতরে-বাইরে থাকবে দলে দলে পুলিশ।
—হুজুর, দীনুকে যে ধরতে পারবে, আমি তাকে পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেব।
—সে-কথা পরে হবে। তোমার বাড়িতে ফোন আছে?
—আছে হুজুর।
—কোথায় আছে দেখিয়ে দাও। এখনই আমাকে থানায় ফোন করতে হবে।
চতুর্থ
দীনুডাকাতের কণ্ঠস্বর
গভীর রাত্রি। নিবিড় তিমিরের অতল কোলে শুয়ে নগরী পড়েছে ঘুমিয়ে।
নিষ্প্রদীপ কলিকাতা, জাপানি বোমাকে ফাঁকি দেবার জন্যে খুলে রেখেছে হাজার-নরী আলোর হার।
আলোকের অভাবে বাদলের পতঙ্গরা যেমন অদৃশ্য হয়, শহুরে মানুষরাও তেমনি করেছে অন্ধকার রাজপথকে পরিত্যাগ।
অনেক উপরে তারকার চিকে-ঘেরা নিশ্চন্দ্র আকাশ নিঃশব্দ-বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে নিস্তব্ধ ধরিত্রীর দিকে।
উপরওয়ালাদের দৃষ্টি আজ অন্ধ জেনে নিশ্চিন্ত হয়ে রাতের পাহারাওয়ালারা রোয়াকে-রোয়াকে লম্বমান হয়ে স্বপ্নদেবীকে অভ্যর্থনা করবার জন্যে নাসিকার ভেঁপু বাজাতে শুরু করে দিয়েছে।
দেবকীর মস্ত বাড়ির অন্যান্য ঘরে এখন কী হচ্ছে জানি না, কিন্তু একটি ঘরের দৃশ্য বেশ দেখতে পাচ্ছি!
মাঝখানে একটি বড়ো টেবিল। তার একপাশে রয়েছে টেলিফোনযন্ত্র এবং তার সামনে রয়েছে একখানা চেয়ার। সেই চেয়ারের উপরে উপবিষ্ট প্রশান্ত। উপর থেকে একটি ঘোমটাপরা আলোর রেখা এসে পড়েছে তার সর্বাঙ্গে।
প্রশান্ত আজ অত্যন্ত জাগ্রত। ঘুমকে করেছে দস্তুরমতো বয়কট। এমনকি, তন্দ্রার একটু ঢুলুনি পর্যন্ত আমলে আনতে রাজি নয়।
নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালে। একটা বাজতে দশ মিনিট। দীনু বলেছে, একটার পর ডাকাতি করতে আসবে। একটার পর কখন? বলা তার উচিত ছিল! একটার পরে আছে দুটো— না দুটোর পরে সে আসবে না নিশ্চয়ই! তাহলে বলত, 'দুটোর পরে আসব।
অতএব বোঝা যাচ্ছে, দীনু আসবে একটা থেকে দুটোর মধ্যেই। তবে আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না! শেষরাতে একটু গড়াবার সময় পাওয়া যাবে।
কিন্তু জিজ্ঞাসা হচ্ছে, সে আসবে কি?
প্রশান্তের সন্দেহ হতে লাগল। প্রথমত, দীনু হচ্ছে চোর, গুন্ডা, ডাকাত। তার কথায় বিশ্বাস কী? দ্বিতীয়ত, প্রশান্তকে হাস্যাস্পদ করবার চেষ্টা হচ্ছে তার মজ্জাগত! কেবলমাত্র তাকে হয়রান করবার জন্যেই সে হয়তো চিঠিখানা লিখেছে।
এই কথা ভেবেই প্রশান্ত বড়োই অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। দীনুর সবচেয়ে বদ স্বভাব হচ্ছে, পুলিশকে নাকাল করবার পর গাঁটের কড়ি খরচ করে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনস্তম্ভে সেই খবর হাড়-জ্বালানো ভাষায় সবাইকে জানিয়ে দেয়। আর তাই শুনে সারা বাংলা—খালি বাংলা কেন—গোটা ভারতবর্ষ—হয়তো ইউরোপ-আমেরিকা পর্যন্ত—বিপুল কৌতুকে অট্টহাস্য করতে থাকে!
আধুনিক যুগের ডাকাত স্থান-কাল-পাত্র আগে থাকতে পুলিশকে জানিয়ে ডাকাতি করতে চায়, আর পুলিশও সেই খবর বিশ্বাস করে সাত ঘাটের জল খেয়ে ও সর্বাঙ্গে কাদা মেখে 'গর্দভত্বে'র পরিচয় দেয়! এর চেয়ে হাসির ব্যাপার আর কী থাকতে পারে?
দীনু আজ আসবে না— এই বিশ্বাস প্রশান্তের মনে যখন রীতিমতো সুদৃঢ় হয়ে উঠেছে, হঠাৎ টেলিফোনযন্ত্র বেজে উঠল ক্রিং, ক্রিং, ক্রিং, ক্রিং!
এত রাত্রে কে ফোন করে? থানার কেউ নাকি? প্রশান্ত রিসিভারটা তুলে নিয়ে বললে, 'হ্যালো!'
—হ্যালো, অশান্তবাবু আছেন?
প্রশান্তের চোখ-মুখ চমকে উঠল। 'অশান্ত' বলে তাকে ডাকে কেবল এক ব্যক্তি! হয়তো কানের ভুল হয়েছে ভেবে বললে, 'কাকে খুঁজছেন?'
—অশান্তকে। অশান্ত চৌধুরীকে।
অপ্রসন্ন কণ্ঠে প্রশান্ত বললে, 'এখানে অশান্ত চৌধুরী বলে কেউ নেই।'
—আপনার নাম কী?
—প্রশান্ত চৌধুরী।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে হাস্য-গুঞ্জন ভেসে এল।
—আরে বাঃ! আমি যে আপনাকেই খুঁজছি!
ক্রুদ্ধস্বরে প্রশান্ত বললে, 'আমার নাম অশান্ত নয়।'
—কিন্তু বন্ধু, আমি যে ওই নামেই তোমাকে ডাকতে ভালোবাসি! অশান্ত, অশান্ত, অশান্ত— আহা, কী মিষ্টি নাম রে!
প্রশান্ত বহুকষ্টে নিজের কণ্ঠস্বরের উত্তেজনা দমন করে বললে, 'কে তুমি?'
—দীনু। অর্থাৎ দীনবন্ধু। অর্থাৎ বরুণ।
প্রশান্তের হৃৎপিণ্ডের তাল হয়ে উঠল দ্রুত। বললে, 'তুমি দীনুডাকাত?'
—গোলাম হাজির।
—বটে? তুমি কি ফোনে আমার কাছে হাজিরা দিতে চাও?
—উঁহু!
—তবে এর মানে কী?
—অত্যন্ত স্পষ্ট।
—স্পষ্টই বটে!
—নয়? তুমি কি ঝাপসা দেখছ? রাত জাগার ফলে চোখের সামনে নাচছে সর্ষে ফুল?
—মোটেই নয়। ব্যাপারটা বুঝেছি।
—ছাই বুঝেছ।
—ঠিক বুঝেছি।
—কী বুঝেছ?
—বুঝেছি, চিঠি লিখে তুমি আমাকে ধাপ্পা দিয়েছ! নেহাত বাজে ধাপ্পা! দস্তুরমতো অভদ্র ধাপ্পা!
—ওঃ, তাই নাকি?
—তা ছাড়া আর কিছু নয়। আমি বেশ জানতুম, এখানে আসবার সাহস তোমার হবে না।
—তবে জড়ভরতের মতো, একচক্ষু হরিণের মতো ওখানে স্থির হয়ে বসে আছ কেন?
—ভুলেও তুমি সত্য কথা বলো কিনা দেখবার জন্যে।'
আবার কৌতুকহাসির সাড়া! সে হাসি যেন আর থামতেই চায় না!
রাগে প্রশান্তের শরীর করতে লাগল রি-রি! মনে তার প্রচণ্ড বাসনা জাগল, জাদুমন্ত্রবলে এখনই শব্দতরঙ্গে পরিণত হয়ে ফোনের তারের ভিতর দিয়ে উল্কাগতিতে ছুটে গিয়ে আক্রমণ করে দুরাত্মা দীনুর কণ্ঠদেশকে।
আবার প্রশ্ন : 'অশান্ত, তুমি নিজেকে কী বলে মনে কর?'
—তুমি আমাকে যা মনে কর, তাই।
—অর্থাৎ?
—নিরেট গাধা বলে।
—স্বীকার করছ তাহলে?
—উপায় কী? গাধা না হলে কেউ চোর-জোচ্চোর ডাকাতের কথায় বিশ্বাস করে?
—তাহলে তুমি বুঝেছ ঘোড়ার ডিম।
—ঠিক! অসাধুর মুখের 'সত্যকথা' আর ঘোড়ার ডিম দুই-ই যে সমান অলীক, আজ আমি এইটেই বুঝলুম। তবে আর এ প্রহসনের দরকার কী? তুমি তো আসবে না?
—ও-কথার জবাব দেবার আগে আমি তোমাকে আর একটা শুভ-সংবাদ দিতে চাই।
—এর পরেও শুভ-সংবাদ?
—হ্যাঁ, এর পরেও। নিয়তিচক্র সর্বদাই ঘুরে যাচ্ছে— কখনও আনে অশুভ, কখনও শুভ।
—দার্শনিক হবার চেষ্টা ছেড়ে দাও। সোজা কথায় বলো, ব্যাপারটা কী?
—মতিলাল আগরওয়ালার নাম শুনেছ?
—সেদিন ওই-নামধারী এক ব্যক্তি পুলিশ কোর্টে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে বাধ্য হয়েছে।
—হ্যাঁ, সেই মতিলাল।
—তারপর?
—জানো তো, শ্রীমান দেবকীচরণের মতন মতিলালও চোরা-বাজারের আর-এক মস্ত ব্যাবসাদার? রাজপুতানা থেকে তিনি এসেছেন বাংলার ক্ষুধিতদের অন্ন হরণ করতে।'
—জানি।
—আর খানিকক্ষণ পরেই যাতে মতিলালবাবু কাবু হন, আমি এখন সেই চেষ্টাতেই নিয়ুক্ত আছি।
—মানে?
—আজ মতিলালই আমার প্রধান শিকার।
—তুমি ওখানে ডাকাতি—
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, ডাকাতি— অর্থাৎ তোমাদের ভাষায় ডাকাতি! আমার ভাষা— অসাধুর টাকা নিয়ে দীনদরিদ্র নারায়ণদের সেবায় ব্যয় করাকে ডাকাতি বলে স্বীকার করে না। দেবকীচরণ তো হাতের মুঠোতেই আছে, আর তুমি কিছু হাওয়া হয়ে আকাশে মিলিয়ে যাবার ছেলে নও— আজ আমার প্রথম লক্ষ্য মতিলাল আগরওয়ালা!
প্রশান্ত রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলে, 'তুমি কখন ওখানে যাবে?'
—সময় সম্বন্ধে একটু সন্দেহ আছে।
—তাহলে তুমি আজ আমার সামনে আসবে না?
—তোমার মাথায় গাধার বুদ্ধি না থাকলে আজকেই অনায়াসে আমার দেখা পেতে পারো। মনে রেখ, মতিলাল আগরওয়ালা— বাড়ি তার বালিগঞ্জে!
—ধূর্ত, শয়তান! তুমি আমাকে ধাপ্পা দিয়ে এইখানে ব্যস্ত রেখে, বালিগঞ্জে গিয়ে কাজ হাসিল করতে চাও? এতক্ষণে বুঝলুম আসল ব্যাপারটা!
আবার কৌতুকহাসির ধ্বনি! এক-একটা হাসির টুকরো যেন আগুনের টুকরোর মতন প্রশান্তের কানের ভিতরে ঢুকতে লাগল। সে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে বললে, 'যদি সাহস থাকে তাহলে বলো, কখন তুমি মতিলালের বাড়িতে যাবে?'
—তোমার বুদ্ধির বালাই নিয়ে মরি!
—বলবে না?
—না। তুমি কি আমার প্রাণের বন্ধু?
—আচ্ছা, আমি এখনই যাচ্ছি মতিলালের ওখানে। দেখি, তোমার কত সাধ্য!
—এসো। আমি তোমাকে সাদর আহ্বান জানাচ্ছি।
—ভারি যে স্পর্ধা! মতিলালের বাড়িতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আর-একবার ওই কথা বলতে পারবে?
টেলিফোনে আর জবাব এল না।
প্রশান্ত দাঁড়িয়ে উঠে চিৎকার করে বললে, 'দীনু!'
টেলিফোন নীরব। দীনুডাকাত ফোন ছেড়ে দিয়েছে।
প্রশান্ত কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দীনু তাহলে তাকে ভয় করে! তাকে বিপথে বাজে কাজে ব্যস্ত রেখে তার চোখের আড়ালে নিরাপদে বসে কেল্লা ফতে করে আবার অন্ধকারে ডুব মারতে চায়! হ্যাঁ, দীনু তাকে ভয় করে! এও একটা আত্মপ্রসাদ!
কিন্তু এ আত্মপ্রসাদের মূল্য কতটুকু? লোকে তো বলবে, কৌশলে তাকে বোকা বানিয়ে দীনু নিজের কার্যোদ্ধার করেছে! দীনু পাবে বাহাদুরি, আর তার ভাগ্যে লাভ শুধু অপযশ!
মতিলালের বাড়ি বালিগঞ্জে। এখান থেকে নিশুত রাতের জনশূন্য শকটহীন পথে জোরে মোটর চালিয়ে গেলে সেখানে পৌঁছোতে বেশিক্ষণ লাগবে না। খুব সম্ভব, দীনুর আগেই বা তার সঙ্গে-সঙ্গেই সে মতিলালের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হতে পারবে। হয়তো দীনু এখনও তার হাতের নাগালের মধ্যেই আছে!
প্রশান্ত চিৎকার করে ডাকলে, 'দেবকী? দেবকী?'
ক্ষীণ সাড়া এল, 'যাই হুজুর!'
—শিগগির এসো! দৌড়ে!
দেবকী দৌড়ে এল না, এল রীতিমতো মন্থর চরণে। তার দৌড়োবার ক্ষমতা নেই। তার মুখ ফ্যাকাশে। তার চোখের চঞ্চলতা ও চাতুর্য লুপ্ত হয়েছে। ভয়ে সে আধমরা। তার ধারণা, দীনুডাকাতের আবির্ভাব হয়েছে।
প্রশান্ত অধীর কণ্ঠে বললে, 'আরে গেল, চলতে পারছ না কেন? তোমার হল কী?'
—হুজুর!
—রাখো তোমার হুজুর-হুজুর! শোনো যা বলি। আমরা এখন চললুম।
—বলেন কী হুজুর? হাড়িকাঠে আমাকে বেঁধে রেখে আপনারা পালিয়ে যাচ্ছেন?
—না হে মুখ্যু, না। আমরা চলে যাচ্ছি বটে, কিন্তু পালাচ্ছি না।
—পালানো আর কাকে বলে হুজুর?
—আর জ্বালিয়ো না দেবকী, আমাদের বিশেষ তাড়া আছে। দীনুডাকাত আজ আর আসবে না।
এতবড়ো খবর শুনেও দেবকী কিছুমাত্র আশ্বস্ত হয়েছে বলে বোধ হল না। অবিশ্বাসের স্বরে বললে, 'কেমন করে জানলেন?'
—যেমন করে হোক জেনেছি। তোমাকে অত কৈফিয়ত দিতে পারব না। দীনুডাকাত আজ আর আসবে না, আমরা চললুম। এ যাত্রা তুমি বেঁচে গেলে— যদিও তোমার মরাই উচিত ছিল!
প্রশান্ত এরকম দৌড়েই ঘরের বাইরে গিয়ে পড়ল।
দেবকী ঊর্ধ্বমুখে ফ্যালফেলে চোখে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল!
অনেকক্ষণ পরে সে ক্ষীণ স্বরে বললে, 'পুলিশ হচ্ছে ঘুষখোর। বেশ বোঝা যাচ্ছে, দীনুর কাছে মোটা ঘুষ পেয়ে ওরা পথ ছেড়ে দিয়ে সরে পড়ল! আমি এখন কী করি রে বাবা? ওমা রক্ষেকালী, বলে দাও মা, আমি এখন কী করি?'
কিন্তু রক্ষেকালীর কাছ থেকে কোনো ভরসাই পাওয়া গেল না।
পঞ্চম
প্রশান্ত থ
প্রশান্ত সদলবলে চলল মোটর ছুটিয়ে! পথে বাধা পাবার মতন কিছুই ছিল না, কারণ নিদ্রা, নীরবতা এবং নির্জনতা এখন নগরব্যাপী। চারিদিক করছে খাঁ-খাঁ।
বালিগঞ্জের মতিলাল আগরওয়ালার বাড়ি আজকাল কলকাতা পুলিশের কাছে সুপরিচিত। এই বাড়ির মালিক সম্বন্ধে নানা কানাঘুষা শোনা যায়। ইতিমধ্যেই তাকে বারকয়েক আসামিরূপে পুলিশকোর্টে হাজির হতে হয়েছে। টাকার জোরে প্রত্যেক বারেই সে আইনের কোনো না কোনো ছিদ্র দিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছে— যদিও শেষ বারে তাকে দিতে হয়েছে মোটা অর্থদণ্ড। কিন্তু পুলিশ আশা করে, মতিলালের সামনে জেলখানার ফটক খুলতে আর বেশি দেরি নেই।
মতিলালকে বলির পশুরূপে নির্বাচন করে দীনু কিছুমাত্র ভুল করেনি। এজন্যে তার উপরে প্রশান্ত রাগ করতে চায় না। তার রাগের আসল হচ্ছে, দীনু কেন আজ দেবকীর বাড়িতে এসে তার সঙ্গে দেখা করলে না? ধাপ্পা মেরে কেন তাকে মিছিমিছি কষ্ট দিলে?
মানুষ স্বার্থপর। যেখানে স্বার্থের গন্ধ, সেখানে সে অন্ধ। সেখানে তার চোখ আসল যুক্তিকে দেখতে পায় না। নইলে প্রশান্ত বুঝতে পারত, ডাঙার মানুষের পক্ষে জলের কুমিরের আমন্ত্রণ রক্ষা করা স্বাভাবিক নয়। মানুষের এই অনিচ্ছার জন্যে কুমির মুখভার করলেও উপায় নেই। আত্মরক্ষাই হচ্ছে জীবের কর্তব্য।
মতিলালের ফটকের ভিতরে প্রবেশ করেই প্রশান্ত সবিস্ময়ে দেখলে, সেখানে পুলিশের লোকদের ভিড়। আর চিত্ত হল সচকিত! এখানে এমন সময়ে তার আগেই স্থানীয় পুলিশ এসেছে কেন? তবে কি এর মধ্যেই হয়েছে দীনুর আবির্ভাব ও অন্তর্ধান? হা অদৃষ্ট!
প্রশান্ত গাড়ির ভিতর থেকে লাফিয়ে পড়ল। কে জিজ্ঞাসা করলে, 'প্রশান্তবাবু নাকি?'
—হ্যাঁ অসিতবাবু। ব্যাপার কী?
—এখানে মস্ত ডাকাতি হয়ে গেছে। ডাকাতরা নগদে আর গহনায় প্রায় দুই লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়েছে।
—দীনুডাকাত এসেছিল?
—তাইতো শুনছি। লোকটা আশ্চর্য চটপটে। ঠিক যেন ঘড়ি ধরে দশ মিনিটের মধ্যেই কাজ সেরে সরে পড়েছে। কিন্তু আপনাকে কে খবর দিলে?
দীনুডাকাত।
—কী বললেন?
—আমাকে খবর দিয়েছে দীনু নিজে।
—দীনু নিজে আপনার কাছে খবর দিতে গিয়েছিল?
—সশরীরে নয়, টেলিফোনে।
—ওঃ, তাই বলুন! আপনার কথা শুনে আমি চমকে গিয়েছিলুম।
—কথা শুনেই চমকে যাচ্ছেন অসিতবাবু, কিন্তু দীনুর ভার যদি আপনার কাঁধে পড়ত, তাহলে আপনাকে আজ ডাক ছেড়ে কেঁদে বলতে হত— 'হে ধরণী, দ্বিধা হও, আমি তোমার ভিতরে প্রবেশ করি!' আর নয়, এইবারে আমাকে হাল ছাড়তে হবে দেখছি!
—সবুরে মেওয়া ফলে প্রশান্তবাবু, চোরের দশদিন— সাধুর একদিন!
—ওসব সেকেলে প্রবাদবাক্য আমার ভাগ্যে বোধহয় ফলবে না। দীনু খবর দিয়ে ডাকাতি করেও যখন বারবার পালাতে পারছে, তখন আর কোনো আশাই নেই।
—আশ্চর্য কথা বটে। খালি আশ্চর্য নয়, অসম্ভব বলা যায়।
—হ্যাঁ। আশ্চর্য আর অসম্ভব—দুইই।
—দীনু আপনাকে কী খবর দিয়েছিল?
—আজ এখানে হানা দেবে।
—তবু আপনি তাকে ধরতে পারলেন না? এটাও আশ্চর্য বলে মনে হচ্ছে।
—যেখানে দীনু আছে সেখানে হয়তো আশ্চর্য বলে কিছুই নেই।
—কেন? সে তো অশরীরী নয়!
—তা নয়। তবে এই দেখুন না কেন, যে মুহূর্তে খবর পেয়েছি, তখনই বায়ুবেগে ছুটে এসেছি, তবু সে চম্পট দিয়েছে।
—আপনি খবর পেয়েছেন কখন?
—রাত একটার সময়ে।
অসিত হো হো করে হেসে উঠল।
প্রশান্ত খাপ্পা হয়ে বললে, 'আপনার হাসি ভালো লাগছে না।'
—মজার কথায় কে না হাসে?
—এটা মজার কথা হল বুঝি? দিব্যি মজায় আছেন দেখছি!
—মজার কথা নয়?
প্রশান্ত আরও খাপ্পা হয়ে বললে, 'মজলুম আমি, আর আপনি দেখছেন মজা!'
—দীনু আপনাকে খবর দিয়েছে একটার সময়ে। কিন্তু সে মতিলালের বাড়ি থেকে অদৃশ্য হয়েছে রাত বারোটা বাজবার আগেই।
দারুণ বিস্ময়ে মুখব্যাদান করে প্রশান্ত বললে, 'কী বললেন?'
—ডাকাতির পালা সাঙ্গ করবার পরই দীনু হয়েছে খবরদার। তবু আপনি তাকে পাবার আশায় এতটা পথ ছুটে এসেছেন!
প্রশান্ত থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল উদভ্রান্তের মতো। তারপরেই হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলে, দুটো বাজে-বাজে।
তারপর স্প্রিং-টেপা পুতুলের মতো হঠাৎ একলাফে মোটরে উঠে চিৎকার কর বললে, 'দেবকীর বাড়িতে! সবাই দেবকীর বাড়িতে চলো! জোরে চলো, উড়ে চলো, বুলেট-বেগে চলো!'
গাড়ি বোঁ করে বেরিয়ে গেল।
অসিত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, প্রশান্তের মস্তিষ্ক হঠাৎ বিকৃত হয়ে গেছে কিনা?
গাড়ির অন্ধকারে প্রশান্তের মাথার ভিতর দিয়ে তখন খেলে যাচ্ছে নানা সম্ভাবনার ইঙ্গিত! দীনুর নীল পত্র, টেলিফোনের কথা সবই ক্রমে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে! দীনু চিঠি লেখে, তার সঙ্গে কথা কয়,— এ কেবল তাকে বিপথে চালনা করবার জন্য। যেন প্রভুর মতন দীনু হুকুম দিচ্ছে, আর সে অনুগত ভৃত্যের মতন করে যাচ্ছে তার আদেশ পালন— না, তার অবস্থা আরও খারাপ। ভৃত্যের তবু কিছু নিজস্ব ইচ্ছা আছে, তার যেন তাও নেই। সে যেন দীনুর হাতের দাবাখেলার বোড়ে। দীনু যেদিকে নিয়ে যাবে, তাকে যেতে হবে সেই দিকেই। দীনুকে ধরবে কী, সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে তারই ব্যক্তিত্বের প্রভাবে।
না, এভাবে কাজ করলে তার গোয়েন্দাজীবনের উপর যবনিকা পড়তে দেরি হবে না। তাকে নিজের কার্যপদ্ধতি বদলাতে হবে।
নীল পত্রের ও ফোনের কথাগুলো নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করে প্রশান্ত বুঝলে, দীনু সত্য ছাড়া মিথ্যা বলেনি। সে যা বলে হয়তো তাই-ই করে। কিন্তু মাঝে মাঝে এমন সব কথা উহ্য রেখে যায়, যার সাহায্যে পুলিশের চক্ষে করে নিশ্চিত ভাবে ধূলিনিক্ষেপ।
ভবিষ্যতে প্রশান্ত সাবধান হবে। দীনুর প্রকাশ্য কথাগুলোকে অবিশ্বাস করবে না বটে, কিন্তু অনুমানের দ্বারা আবিষ্কারের চেষ্টা করবে, তার উক্তির কোথায় কোথায় উহ্য বা গোপন কথা আছে বা থাকতে পারে। এই লুকোনো অকথিত উক্তিগুলোকে ধরতে পারলেই দীনুকে ধরা শক্ত হবে না।
কিন্তু সে তো ভবিষ্যতের কথা, এখন বর্তমানকে নিয়েই যে প্রশান্তের দুর্ভাবনার অন্ত নেই। সে যা ভয় করছে তা যদি সত্য হয়, তবে এই বর্তমানের ঠেলা সামলাতেই তার হবে প্রাণান্ত-পরিচ্ছেদ।
বিনা রিহার্সালে নাট্যাভিনয়
গাড়ি যথাস্থানে এসে দাঁড়াল। প্রশান্ত নেমে দুরুদুরু বুকে অগ্রসর হল, কিন্তু চলতে যেন তার পা আর সরছে না।
দেবকীর বাড়ির ভিতরে ঢুকেই সে উত্তেজনার সাড়া পেলে। উপরে-নীচে লোকজনের চিৎকার, ব্যস্ত পদে আনাগোনা। উঠানের উপরকার দালানে বসে কে কাতর কণ্ঠে চেঁচিয়ে কাঁদছে, 'ওরে আমার কী হল রে, ওরে আমার সর্বনাশ হল রে, ওরে আমি আর বাঁচব না রে!'
প্রশান্ত এগিয়ে গিয়ে লোকটার মুখ দেখে বললে, 'দেবকী, কাঁদো কেন?'
দেবকী হাউমাউ করে বলে উঠল, 'অন্তিমকালে আর কী দেখতে এলেন হুজুর,—ওরে বাবা রে, মা রে, কী হল রে!'
—কী মুশকিল, হয়েছে কী তাই বলো না!
—হবে আর কী, আমার সর্বনাশ হয়েছে, আমার সর্বস্ব নিয়ে গেছে!
—তোমার টাকা চুরি গেছে?
—তিন-তিন লাখ টাকা গো, তিন-তিন লাখ টাকা! হায় হায় হায় হায়— ও হো হো হো, বুক বুঝি ফাটল গো!
—তাহলে দীনুডাকাত এসেছিল?
—দীনু এসেছে কী আমার যম এসেছে, কিছুই জানিনে রে বাবা! আমি দেখেছি কেবল হুজুরের সাঙ্গোপাঙ্গদের!
—আমার সাঙ্গোপাঙ্গদের!
—হ্যাঁ গো হ্যাঁ, পুলিশ—লালপাগড়ি—জমাদার—দারোগা!
—তোমার বাড়িতে আমি যাবার পর পুলিশ এসেছিল?
—হ্যাঁ গো হুজুর!
প্রশান্ত হতভম্বের মতন মাথা চুলকোতে এবং দেবকী আবার মড়াকান্না কাঁদতে শুরু করলে।
অনেক মাথা চুলকেও হদিস না পেয়ে প্রশান্ত বললে, 'দেবকী, আমার যাবার পর তুমি কি ভয়ে আবার থানায় খবর দিয়েছিলে?'
কান্না না থামিয়েই দেবকী মাথা নেড়ে ইঙ্গিত জানালে, না, সে থানায় খবর দেয়নি।
—পুলিশ চলে গেল কখন?
—জানি না।
—যাবার সময়ে তারা জানিয়ে যায়নি?
—না।
—পুলিশ এসে তোমায় কী বললে?
দেবকী জবাব দেয় না, তখন দ্বিগুণ উৎসাহে কান্নায় নিযুক্ত।
এইবারে প্রশান্ত ধৈর্য হারালে। 'তোর নিকুচি করেছে' বলে দেবকীর দুই কাঁধ ধরে খুব জোরে বারকয়েক ঝাঁকানি দিলে।
দেবকী ষাঁড়ের মতন চেঁচিয়ে উঠে বললে, 'আর নাড়া দেবেন না হুজুর গো! তাহলে প্রাণের যেটুকু এখনও ভেতরে আছে তাও ফুড়ুক করে বেরিয়ে যাবে!'
প্রশান্ত গর্জন করে বললে, 'কান্না থামাও! সব কথা খুলে বলো!'
দেবকী কোঁচার প্রান্ত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে বললে, 'হুজুর তো আমাকে অভয় দিয়ে চলে গেলেন। আমি কিন্তু মনের ভিতর থেকে কোনোই জোর পেলুম না। আজ ভোরে উঠেই একটা অপয়া কাকের মুখ দেখেছিলুম, ঠিক জানতুম একটা কিছু অমঙ্গল হবেই! বসে বসে আকাশ-পাতাল ভাবছি, হঠাৎ অনেকগুলো জুতোর গটগট শব্দে চমকে উঠে দেখি, একদল লালপাগড়ির সঙ্গে একজন দারোগাবাবু আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন—'
প্রশান্ত বাধা দিয়ে বললে, 'আমি যাবার কতক্ষণ পরে?'
—মিনিট দশেক হবে।
—তারপর কী হল বলো।
—দারোগাবাবু আমাকে ডেকে বললেন, 'কী হে, তোমার নাম দেবকী?'
আমি বললুম, 'আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর!'
তিনি বললেন, 'দীনুডাকাত একটু পরেই আসবে!'
আমি তো প্রথমটা হকচকিয়ে গেলুম! তারপর আপনার কথা বললুম।
দারোগা হেসে বললেন, 'ও, অশান্ত চৌধুরীর কথা বলছ? সে বেটা নিরেট গাধা, বড়োসাহেব তাইতো আমাকে পাঠিয়ে দিলেন—'
প্রশান্ত বাধা দিয়ে মারমুখো হয়ে চিৎকার করে বললে, 'কী! আমি 'বেটা'? আমি—'
দেবকী ভয়ে আঁতকে তাড়াতাড়ি জোড়হাতে বললে, 'আমি বলিনি হুজুর, সেই দারোগাবাবু—'
—দারোগা, না ছাই! সেই রাসকেলই দীনুডাকাত! এতক্ষণে সব বুঝেছি!
—কী বললেন হুজুর? দারোগা দীনুডাকাত!
—হ্যাঁ! তোমার বাড়িতে পুলিশ সেজে দীনু আর তার দলবল এসেছিল! বুঝতে পারলে হনুমান?
এইবারে দেবকী দাঁত খিঁচিয়ে মূর্ছা যাবার চেষ্টা করলে। তার মুখ-চোখের ভাব দেখে প্রশান্ত পর্যন্ত ভয় পেয়ে গেল। তাড়াতাড়ি জল আনিয়ে খানিকক্ষণ তার মাথায় ও মুখে ঝাপটা দিয়ে তবে তাকে কিঞ্চিৎ চাঙ্গা করে তুলতে পারলে।
দেবকী আবার কাঁদতে কাঁদতে বললে, 'ওগো বাবা গো, দীনুডাকাত দারোগা কী গো! তবে কি আমি যমের সঙ্গে কথা কয়েছি নাকি গো!'
প্রশান্ত বললে, 'বাজে কান্না থামাও! এখন যা বলছিলে বলো।'
—গলা যে শুকিয়ে যাচ্ছে হুজুর!
—তুমি যদি সব কথা না বলো দেবকী, তাহলে তোমার গলা শুকোবার আগেই আমি তোমার গলা টিপে ধরব।
দু-তিনটে ঢোঁক গিলে দেবকী নাচার ভাবে আবার বলতে শুরু করলে:
দারোগাবাবু বললেন 'দেবকী, কোন ঘরে তোমার লোহার সিন্দুক আছে?
আমি কিছু সন্দেহ করলুম না, দেখিয়ে দিলুম। ডাকাত যে পুলিশ সাজবে, কেমন করে জানব হুজুর?
দারোগা বললেন, 'দেবকী, এইবারে তোমার বাড়ির সব লোকজন নিয়ে নীচের কোনো ঘরে ঢুকে দরজায় খিল দিয়ে চুপটি করে বসে থাকো গে যাও। খবরদার, একটি টুঁ শব্দ কোরো না, কী বাইরে উঁকিঝুঁকি মেরো না।'
আমি বললুম, 'কেন হুজুর?'
দারোগা বললেন, 'দীনুডাকাতটা আস্ত খুনে। তোমাদের দেখতে পেলেই আগে কচুর মতন কুচিকুচি করে কেটে ফেলবে।'
আমি ভয়ে কাঠ হয়ে বললুম, 'কিন্তু আমার লোহার সিন্দুকে যে তিন লাখ টাকা আছে?'
দারোগা হাসতে হাসতে বললেন, 'আমরা তবে এসেছি কেন? ও সিন্দুক রক্ষা করব আমরাই। এই দেখ আমার রিভলভার! দীনুডাকাত এলে গুলি মেরে তার মাথার খুলি উড়িয়ে দেব! যাও, যাও, দেরি কোরো না!'
আমাতে তখন আর আমি ছিলুম না, দারোগার কথামতো বাড়ির সবাইকে নিয়ে নীচের একটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে রইলুম। মনে মনে ইষ্টদেবতাকে ডাকি আর ভয়ে ঠকঠকিয়ে কাঁপি। সে যে কী কাঁপুনি হুজুর, দার্জিলিং পাহাড়ে গিয়ে খালি গায়ে বসে থাকলেও লোকে তেমনভাবে কাঁপতে পারে না।
এইভাবে খানিকক্ষণ যায়। কোথাও কারুর সাড়া কী শব্দ নেই! না দীনুর, না পুলিশের।
হঠাৎ ঘরের দরজায় ধাক্কা! ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যাই আর কী!
তারপরেই একটা চাকরের সাড়া পেলুম। সে বলছে, 'বাবু, পুলিশ চলে গিয়েছে, বাইরের ফটক কি খোলা থাকবে?'
বিশ্বাস হল না। শুধোলুম, 'পুলিশ চলে গিয়েছে কী রে?'
—হ্যাঁ বাবু, গিয়েছে।
—নিজের চোখে দেখেছিস?
—হ্যাঁ বাবু।
—ডাকাতরা আসেনি?
—না বাবু, কোথায় ডাকাত?
—আচ্ছা, তাড়াতাড়ি ফটক বন্ধ করে দে।
অবাক হয়ে সাহসে ভর করে বাইরে এলুম। মনে কেমন সন্দেহ হল। ডাকাতরাই যে পুলিশ সেজে এসেছে যদিও এটা আন্দাজ করতে পারলুম না, তবু ছুটে উপরের শোবার ঘরে ঢুকলুম।
—তারপর? ও হো হো হো! তারপর আর বেশি কী বলব হুজুর, সবই তো বুঝতে পারছেন! গিয়ে দেখলুম সিন্দুক খোলা, ভিতরে ছিল গহনাগাঁটির সঙ্গে তিনলাখ টাকা, স্বপ্নের মতো সব কোথায় উড়ে গিয়েছে, সিন্দুকের ভিতরে পড়ে আছে খালি একখানা খাম—'
প্রশান্ত প্রায় রুদ্ধস্বরে বললে, 'খাম?'
—হ্যাঁ, একখানা নীল পত্রের খাম, তার ওপরে লাল কালিতে অশান্ত চৌধুরীর নাম লেখা।
—সে খাম তুমি খুলেছ?
—খাম খোলবার মতন মনের অবস্থাই আমার বটে! আমার তিন-তিন লাখ—
—কোথায় সে কাম? এখনই নিয়ে এসো।
দেবকীর হুকুমে একটা বেয়ারা উপরে গিয়ে খামখানা নিয়ে এল।
প্রশান্ত খামখানা ছিঁড়ে বিস্ফারিত চক্ষে চিঠি পড়লে :
'অশান্তভায়া হে,
মনের ভাবগতিক এখন কেমন? আমার পক্ষে নিশ্চয়ই আশাপ্রদ নয়? হয়তো এই মুহূর্তে আমাকে হস্তগত করতে পারলে তুমি হত্যাকারী হতেও নারাজ হবে না?
সন্দেহ হচ্ছে, আমাকে তুমি সত্যবাদী যুধিষ্ঠির বলে ভাবছ না। কিন্তু স্মরণ করো সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরের সেই অমর উক্তি—'অশ্বত্থামা হত ইতি গজঃ'! যুদ্ধক্ষেত্রে এর চেয়ে বেশি সত্যকথা বলা অসম্ভব।
তবে আমার আগেকার পত্রে এবং টেলিফোনে আমি তোমাকে যুধিষ্ঠিরের চেয়েও সত্যকথা বলেছি। কেবল মাঝে মাঝে তোমাকে দু-একটা মনের কথা বলিনি এই মাত্র! হাঁদারাম, এটাও বুঝতে পারোনি, সব গোপন কথা কি পুলিশের টিকটিকিদের কাছে খুলে বলা যায়? তোমার পক্ষে না হলেও— আমার পক্ষে সেটা যথাসময়, ঠিক তখনই আমি মতিলাল এবং দেবকীর বাড়িতে গিয়েছি। বিশেষ, দেবকীর বাড়িতে আমি গিয়েছি ঘড়ি ধরে— ঠিক একটার পরে, অর্থাৎ যে সময় আমি যাব বলেছিলুম! তুমি যদি জেনেশুনেও যথাস্থানে হাজির না থাকো, সেটা আমার দোষ নয়! মূর্খ, গাধা, গোরু! কেন তুমি মতিলালের বাড়িতে আমাকে খুঁজতে গেলে? আমি স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলুম, আজ রাত একটার পরে দেবকীর বাড়িতে তোমার সঙ্গে দেখা করব। কেন তুমি 'বুড়ি ছুঁয়ে' বসে রইলে না? কেন তুমি নতুন টোপ খেতে ছুটে গেলে?
তবে একটা কথা মানি। জানতুম, মতিলালের বাড়িতে আমি যাব শুনলে, তুমি কখনোই দেবকীর বাড়িতে আমার অপেক্ষায় বসে থাকবে না। পাগলের মতন আলেয়ার আলোক ধরবার জন্যে লম্বা দৌড় মারবে বালিগঞ্জের দিকে।
দেখ অশান্ত, মনোবিজ্ঞানের অগুনতি পুথি আমি খুব মন দিয়েই পড়ে দেখেছি। নর-চরিত্র সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা অর্জনের চেষ্টাও করেছি যথেষ্ট। কী কৌশলে তুমি ভুলবে, আর কী কৌশলে ভুলবে অশিক্ষিত দেবকী, এসব জানতে আমার বাকি নেই।
একদিন নয়, দুইদিন নয়— উপর-উপরি কয়েকদিন ধরে ধীরে ধীরে আমি এক অভিনব নাটকের পরিকল্পনা মনে মনে নিখুঁত করে গড়ে তুলেছি। স্থান কাল পাত্র— কিছুই ভুলে যাইনি। আমি আগে থাকতেই জানতুম, আমার পত্র নির্বোধের মনের উপরে কীভাবে কাজ করবে এবং যথাসময়ে ফোনে কথা কইলে জনৈক গোয়েন্দা কীভাবে উদভ্রান্ত হয়ে উঠবে এবং তারপর কোনো হঠাৎ-বাবু ও একদামুদিকে অভিভূত করবার জন্যে কীরকম কৌশলের আশ্রয় নিতে হবে!
এখন সগর্বে বলতে পারি, আমার পরিকল্পিত নাট্যাভিনয় হয়েছে ঠিক আমারই মনের মতন। নাট্যমঞ্চের প্রত্যেক অভিনেতা প্রবেশ ও প্রস্থান করেছে একেবারে নির্দিষ্ট সময়ে, পার্ট না দেখেও কেউ তার পার্ট ভুলে যায়নি! তারা অভিনয়ও করেছে আমার নির্দেশ অনুসারে— যদিও আমি স্বশরীরে উপস্থিত থেকে একদিনও এই নাটকে র রিহার্সাল দিইনি। আসলে এ-নাট্যাভিনয়ের রিহার্সালই হয়নি! অথচ কোনো নটই নিজের ভূমিকায় করেনি ভুল অভিনয়! এজন্যে তোমার কাছ থেকে আমি এক অভিনব অভিনন্দন দাবি করতে পারি। আমার সফলতা দেখে আমি নিজেই কিঞ্চিৎ বিস্মিত হয়েছি। তুমি এত বোকা! ভগবান তোমাকে রক্ষা করুন— যদিও ভগবানের উচিত নয় এতবড়ো গণ্ডমূর্খকে রক্ষা করা। তিনিই আমাদের সৃষ্টি করেছেন বটে, কিন্তু স্বাধীনভাবে চিন্তা করবার জন্যে মানুষকে তিনি একটি অমূল্য নিধি দান করেছেন। তার নাম কী জানো? মস্তিষ্ক।...যারা এই মস্তিষ্কের যথাব্যবহার করতে শেখে না, তাদের জন্যে তিনি দায়ী নন। তারা ভগবানের পরিত্যক্ত জীব। মানুষ নামের অযোগ্য তারা।
আর একটা কথা শুনলে তুমি বিস্মিত হবে। তোমাকে কোত্থেকে ফোন করেছিলুম সে ঠিকানা দেব না বটে, কিন্তু জেনে রেখো, আমি ফোন করেছিলুম দেবকীর পাড়াতেই বসে। তখন আমার এবং আমার বন্ধুদের সঙ্গে ছিল পুলিশের ইউনিফর্ম! (চেষ্টা করে দেখো, যদি সেই বাড়িটা আবিষ্কার করতে পারো।) কারণ আমরা নিশ্চিতরূপেই জানতুম, ফোনে খবর পেয়েই তুমি পাগলা কুকুরের মতো কীভাবে কোথায় দ্রুত পদচালনা করবে!
ভয় অসাধুকেও করে সাধু। আমার ভয়ে হঠাৎ-ধনী দেবুমুদি আজ দাতা হবার সংকল্প করেছে। সে নাকি অন্ন এবং বস্ত্র বিতরণ করতে চায়! এ খবর আমি উপস্থিত না থেকেও কেমন করে পেলুম, সেকথা জিজ্ঞাসা কোরো না। কারণ আমি উত্তর দেব না। তবে দেবুমুদিকে অনায়াসে এইটুকু জানিয়ে রাখতে পারো, সে যদি অদূর-ভবিষ্যতে নিজের বাক্য রক্ষা করে, তাহলে আর কখনও তার প্রতি আমার নির্দয় 'দয়া' বৃষ্টি করব না। আমি জানি, এখনও সে বহু লক্ষ টাকার মালিক। কিন্তু সে যদি কথা না রাখে, তাহলে আবার তার সঙ্গে আমার দেখা হবে এবং তারপর হবে তার টাকার গর্ব একেবারেই চূর্ণ!
পত্র দীর্ঘ হয়ে গেল, আর নয়। তোমার পরাজয় তুমি তুষ্ট মনে গ্রহণ কোরো— কারণ তুমি শ্রেষ্ঠতর ব্যক্তির কাছে পরাজিত হয়েছ। পরে হয়তো আবার দেখা হবে।
ইতি
দীনবন্ধু'
সপ্তম
প্রশান্ত খুনি নন, খুনিদের যম
নিষ্প্রদীপ নিশীথিনীর বুকচাপা অন্ধকারের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে কলকাতা এখন সদ্যজাগ্রত আলোকের ঝর্নাধারায় স্নান করছে।
এই মরুর মতন শুষ্ক বিরাট ইষ্টকস্তূপের মুল্লুকে নিরালা বনভূমির শ্যামল আশীর্বাদ নেই, কিন্তু তবু এখানেও হয় বিহঙ্গদের সংগীতছন্দে নির্মল প্রভাতের অভ্যর্থনা এবং নীলাম্বরের পূর্বতোরণ খুলে দেয় নিত্য নূতন রংমহলের ইন্দ্রধনুস্বপ্ন। এবং যাদের রসিক চোখ আর মন আছে, তারা এই বিশ্রী হট্টশালাতেই বসে ষড়ঋতুর আকাশব্যাপী নাট্যশালার দিকে দিকে দেখতে পায় কত নব-নব চিত্রকাব্যের বিচিত্র মহোৎসব!
কিন্তু এদিক দিয়ে দেখলে আমাদের প্রশান্ত-গোয়েন্দার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য কিছুই আশা করা যাবে না। তার চোখ আর মন কোনোকালেই 'রসিক' উপাধিলাভের লোভে ব্যস্ত হয়নি। রামা-শ্যামাদের মতন সেও চাঁদকে কেবল 'চাঁদ' এবং আকাশকে কেবল 'আকাশ' বলে ডেকেই তুষ্ট হয়, তাদের মধ্যে যে আরও কিছু ভাববার বোঝবার দেখবার আর উপভোগ করবার বস্তু থাকতে পারে, এটা কোনোদিনই খেয়ালে আনবার সময় পায় না।
যাক, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। লোকে কবির কাছ থেকেই আশা করে কবিতা এবং পুলিশের কাছ থেকে আশা করে বড়োজোর চোখরাঙানি, হুমকি এবং রুলের গুঁতো।
সুতরাং আজ সকালে বাড়ি থেকে রাস্তায় বেরিয়ে প্রশান্ত যে সোনালি সূর্যকরের স্বচ্ছ সৌন্দর্যের দিকে একবারও দৃষ্টিপাত করলে না, এজন্যে আমাদের বিস্মিত হবার দরকার নেই।
বিশেষত এখন তার মনের অবস্থাও কাব্যাহত হবার উপযোগী নয়। কারণ মাত্র তিনদিন আগেই দুষ্ট দীনুডাকাত তাকে কেবল নাকে দড়ি দিয়ে টানাটানি করেই ক্ষান্ত হয়নি, উপরন্তু তাকে দস্তুরমতো ঠকিয়ে একই রাত্রে মতিলালের ও দেবকীর বাড়িতে দুটো বড়ো বড়ো ডাকাতি করে তার মাথা লুটিয়ে দিয়ে গিয়েছে পথের ধুলোয়।
শুধু কি তাই? আজ ভোরে উঠে প্রশান্ত খবরের কাগজ পড়তে বসে স্থিরচক্ষে দেখলে, তার সে রাত্রের অ্যাডভেঞ্চারের কাহিনি ছাপার হরফের ভিতর দিয়ে উজ্জ্বল ভাবে ও ভাষায় আত্মপ্রকাশ করেছে।... আড়ষ্ট হয়ে সেইখানেই বসে বসে সে শুনতে পেলে দেশব্যাপী হো হো হাসির হররা!
কাগজখানা তখনই ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে রাস্তায় এসে হাঁক দিলে— 'রিকশা! রিকশা!'
ঠুন ঠুন করে ঘণ্টা বাজিয়ে এক রিকশাওয়ালা তার সামনে ছুটে এল। লোকটা আধাবয়সি, জোয়ান; কিন্তু তার একটা চোখ নেই!
—আইয়ে বাবুজি!
—যা ব্যাটা, পালা! তোর ডান চোখ কানা— যদি ওপাশ থেকে মোটর-টোটর ঘাড়ে এসে পড়ে, কিছুই দেখতে পাবি নে!
—কুছ ডর নেহি বাবুজি, উঠিয়ে!
এদিকে-ওদিকে তাকিয়ে দ্বিতীয় রিকশায় দেখা না পেয়ে অগত্যা সে এই একচক্ষু সারথিকেই অবলম্বন করতে বাধ্য হল। কিন্তু সারথির ডান চক্ষুর অভাবটা যথাসম্ভব পূরণ করতে করতে চলল নিজের সতর্ক দক্ষিণ চক্ষুর সাহায্যে; সুতরাং কোনো মোটরই তার অজ্ঞাতসারে এসে তাকে চাপা দেবার সুযোগ গ্রহণ করতে পারল না।
অরুণের বাড়ির সুমুখে এসে সে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। রিকশাকে অপেক্ষা করতে বলে প্রবেশ করল বাড়ির ভিতরে।
বৈঠকখানায় বসে অরুণ খবরের কাগজ পড়ছিল। তাকে দেখেই ফিক করে হেসে ফেললে।
প্রশান্ত মুখ ভার করে বললে, 'বুঝেছি—বুঝেছি! ছিঃ অরুণবাবু!'
—এসেই ধিক্কার দিতে শুরু করলেন যে!
—অন্তত ভদ্রতার খাতিরেও আমার সামনে আজ আপনার গম্ভীর হয়ে থাকা উচিত ছিল।
—হয়তো উচিত ছিল। কিন্তু কী করব বলুন, আমার গাম্ভীর্যও আজ আমার হাসিকে দমন করতে পারলে না।'
আসন গ্রহণ করে প্রশান্ত বললে, 'কাগজের রিপোর্টে আমার যে ছবি দেখেছেন, ওটা কি আমার ফোটো বলে মনে হয়?'
—হয় না নাকি?
—না। ও হচ্ছে আমার ক্যারিকেচার। রীতিমতো আপত্তিকর ক্যারিকেচার। মানহানির মামলা আনলে আমি জিতে যাব।
—তা হয়তো যাবেন, কিন্তু লোকে আরও জোরে হাসবে। হেসে হেসে লোকের গলা ভেঙে যাবে।
—জানি। তাই মামলা আনবার লোভ আমাকে সংবরণ করতে হবে।
—শ্রীধর, প্রশান্তবাবুকে চা খাওয়াও।
—আমি চা খেতে আসিনি।
—তবে কী আদেশ বলুন।
—আমি এসেছি অভিযোগ করতে।
—অভিযোগ! কার বিরুদ্ধে?
—দীনুর বিরুদ্ধে।
—দীনুর বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে এসেছেন আমার কাছে?
—হ্যাঁ।
—কী আশ্চর্য! আমি কি দীনুর অভিভাবক?
—না। কিন্তু আপনি হচ্ছেন দীনুর সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু। আমি বেশ জানি, আপনার কাছে যা বলব তা দীনুর কানে উঠবে।
—আপনার কথা আমি স্বীকার বা অস্বীকার কিছুই করছি না। কিন্তু আপনার কথা শুনতে আমি রাজি আছি।
—কথা হচ্ছে, দীনু আর আমি হচ্ছি প্রতিদ্বন্দ্বী। মানি। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতা কি আর-একটু ভদ্রভাবে করা যায় না? আমার তরফ থেকে নয়, দীনুর তরফ থেকে?
—ব্যাপারটা স্পষ্ট করে বলুন!
—দীনুর কাজ— ডাকাতি করা, আমার কর্তব্য তাকে ধরা! সে ডাকাতি করে চলে গেল। তারপর খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গেলুম। তদন্তের পর আমি চেষ্টা করে দেখব, তাকে ধরতে পারব কি না! সোজাসুজি ব্যাপারটা এই ছাড়া আর কিছু নয় তো?
—ওই বটে।
—কিন্তু দীনু কী করছে? প্রায়ই চিঠি লিখে আমাকে জানিয়ে দিচ্ছে— অমুক জায়গায় ডাকাতি করতে গিয়ে অমুক সময়ে আমি তোমার সঙ্গে দেখা করব! এর অর্থ কী? সে কি আত্মসমর্পণ করতে চায়?'
—বিড়ালের কাছে ইঁদুর কোনোদিন আত্মসমর্পণ করতে চেয়েছে বলে শুনিনি।
—হুঁ। তবে এই চিঠির চালাকির অর্থ কী?
—ওই যা বললেন, তাই।
—কী বললুম?
—ওই যে বললেন, চালাকি। হ্যাঁ, ওটা দীনুর চালাকিই বটে।
—আহা, এই চালাকির মানে কী বলুন না!
—দীনু আপনাকে একটু খ্যাপাতে চায় আর কী!
—খালি খ্যাপাতে নয় মশাই, দীনু চায় আমাকে নাচাতে আর আমাকে দিয়ে লোক হাসাতে।
—হয়তো তাই।
—তাতে তার লাভ?
—শত্রুকে হাস্যাস্পদ করতে চায় না কে?
—এর ফলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি হতে পারে।
—আপনার মতন শত্রু পথ থেকে সরে গেলে দীনুর লাভ হবে না কি?
—অথচ ওই দীনুই একদিন নিজের জীবন বিপন্ন করে আমার জীবন রক্ষা করেছে!*
—সে হয়তো আপনাকে হাতে না মেরে, ভাতে মারতে চায়!
—আর ঠিক এই উদ্দেশ্যেই দীনুর প্ররোচনায় বা সাহায্যে কাগজওয়ালারা আমার দুর্দশার অতিরঞ্জিত কাহিনি যখন-তখন প্রকাশ করে দিচ্ছে।
—'আধুনিক যুদ্ধের একটা প্রকাণ্ড ব্যাপার হচ্ছে প্রোপাগান্ডা। এর দ্বারা শত্রুকে কেবল বিপথেই চালনা করা যায় না, তার বুদ্ধি-বিবেচনাকেও বিশৃঙ্খল করে দেওয়া যায়। প্রশান্তবাবু, এসব হচ্ছে দীনুর প্রোপাগান্ডা। আপনি তার চিঠি বা খবরের কাগজের রিপোর্ট পড়েন কেন?'
—'হ্যাঁ অরুণবাবু, আমিও স্থির করেছি ওসব পড়ে আর মাথা খারাপ করব না। অন্তত নীল পত্র পড়ে যে দীনুকে ধরা যাবে না, এ সম্বন্ধে আর কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু তবু আপনি দীনুর কাছে আমার এই বিশেষ অনুরোধ জানাবেন যে, সে যেন আর আমার কাছে নীল পত্র না পাঠায়। ওই নীল খাম দেখে দেখে শেষটা আমার বুকের ব্যামো হবে দেখছি। প্রত্যেক খাম বহন করে আনে নূতন নূতন দুর্ভাগ্যের বীজ!' প্রশান্ত একটা নিঃশ্বাস ফেলে স্তব্ধ হল।
তারপরেই ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে শ্রীধর— তার হাতে একখানা নীল রঙের খাম!
মুহূর্তে প্রশান্ত ও অরুণ দুজনেই সচমকে জাগ্রত হয়ে উঠল!
প্রশান্ত দাঁড়িয়ে উঠে তীব্র স্বরে বললে, 'তুমি কী করে এ চিঠি পেলে?'
শ্রীধর বোকার মতন ভাবহীন মুখে বললে, 'রিকশার কুলি এখানা আমার হাতে দিলে।'
—ডেকে আনো কুলিকে!
—আজ্ঞে, সে রিকশা নিয়ে চলে গেছে।
—চলে গেছে মানে? আমি তো তাকে দাঁড়াতে বলেছি!
—জানি না হুজুর।
—নিশ্চয়ই দীনুর চর! কুলিটা কতক্ষণ চলে গেছে?
—তা সাত-আট মিনিট হবে।
—চিঠি এতক্ষণ আমাকে দাওনি কেন?
—আজ্ঞে প্রথমে ভেবেছিলুম ওখানা আমার বাবুর চিঠি। খানিকক্ষণ পরে হঠাৎ দেখলুম, চিঠির ওপরে আপনারই নাম লেখা রয়েছে।
প্রশান্ত দেখলে, খামের উপরে লাল কালিতে লেখা রয়েছে—শ্রীমান অশান্ত চৌধুরী। রাগে লাল হয়ে বললে, 'কে তোমাকে বললে আমার নাম অশান্ত?'
শ্রীধর নির্বিকার ভাবে বললে, 'কেউ বলেনি হুজুর, আমি আন্দাজ করেছি।'
—আন্দাজ করেছ! ভারি আন্দাজ করেছ তো! অশান্ত আর প্রশান্ত বুঝি এক নাম হল?
—শুনতে আর দেখতে কি কতকটা একরকম নয় হুজুর?
—কিন্তু দুটো নামের মানে একেবারে আলাদা।
—মুখ্যু-সুখ্যু মানুষ, জানব কেমন করে? ও দুটো নামের মানে কী হুজুর?
—যাও আমি বলব না! বেরোও, এখনই আমার সুমুখ থেকে বিদেয় হয়ে যাও!
শ্রীধর হাবলার মতন মাথা চুলকোতে চুলকোতে ঘরের বাইরে চলে গেল।
প্রশান্ত বললে, 'রত্নটিকে কোত্থেকে সংগ্রহ করলেন অরুণবাবু?'
—ও আমার পুরানো চাকর।
—হতে পারে। কিন্তু ওর ওপরে আমার সন্দেহ হচ্ছে।
—কী সন্দেহ?
—লোকটা ধূর্ত। অশান্ত মানে কী, বোঝে।
—জানি না। কিন্তু বাজে কথা থাক। চিঠিখানা আমায় দিন।
—আপনাকে দেব কেন?
—পড়ে দেখব।
—আমার নামে চিঠি, আপনি পড়ে দেখবেন মানে?
—এই যে বললেন, আপনি স্থির করেছেন নীলপত্র আর পাঠ করবেন না?
—ভবিষ্যতে সে-কথা ভেবে দেখা যাবে। আপাতত চিঠিখানা আমি পড়ে দেখতে চাই। জানি না, দীনু আবার আমাকে জ্বালাবার কী আয়োজন করেছে।
আসনে বসে প্রশান্ত পত্রপাঠ করতে লাগল। অরুণ লক্ষ করলে, পড়তে পড়তে তার মুখের উপর দিয়ে পরে-পরে এই তিনটি ভাবের স্পষ্ট প্রভাব ফুটে উঠল—প্রথমে বিষম কৌতূহল, তারপর অসীম বিস্ময়, তারপর দারুণ ক্রোধ!
চিঠিখানা টেবিলের উপরে সশব্দে নিক্ষেপ করে প্রশান্ত তেরিয়ার মতো বললে, 'অরুণবাবু!'
—কী সংবাদ?
—আপনার বন্ধু দীনু আমাকে কী ভাবে?
—কেমন করে জানব?
—সে কি ভেবেছে আমি গুন্ডা— আমি খুনি?
—না ভাবাই তো উচিত। কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
—চিঠিখানা পড়ে দেখুন।
অরুণ পত্র নিয়ে পড়লে :
'অশান্ত চৌধুরী,
তুমি কি রূপান্তর গ্রহণ করতে চাও? তোমার কি দুরাত্মার ভূমিকায় অভিনয় করবার সাধ হয়েছে?
এতদিন আমাদের একমাত্র অস্ত্র ছিল বুদ্ধি এবং বুদ্ধির দ্বারা আমরা পরস্পরকে পরাস্ত করবার চেষ্টায় ছিলুম ব্যস্ত। এবং এ চেষ্টায় কে বেশি সফল হয়েছে, সেটা তোমাকে বলা বাহুল্য।
কিন্তু এতদিন পরে তুমি বোধহয় আবিষ্কার করতে পেরেছ যে, তোমার ঘটে বুদ্ধি নামক পদার্থের অস্তিত্ব নেই, কিংবা যেটুকু আছে তা একেবারে অকেজো, ভোঁতা, মরচে-পড়া।
তাই তুমি কি রূপান্তর গ্রহণ করে অস্ত্রান্তর গ্রহণ করতে চাও? ধারণ করতে চাও এমন কোনো অস্ত্র, যার জন্যে দরকার নেই বুদ্ধির, দরকার শুধু পশুশক্তির!
কিন্তু ও শক্তিটা হচ্ছে অত্যন্ত সেকেলে। মনে রেখো, দুর্দান্ত মহাবলিষ্ঠ পশুরাজ সিংহও পরাজিত হয়ে বন্দি হয় নখদন্তহীন দুর্বল ক্ষুদ্র মানুষের কাছে।
শোনো :
কাল সন্ধ্যার সময়ে একলা বসে ছিলুম জানলার ধারে, নিজের বাড়িতে। ঘরে আলো জ্বলছিল, বাইরে অন্ধকার।
আচমকা বাহির থেকে বন্দুকের শব্দ হল। পরমুহূর্তে জানলার সামনেকার দেওয়ালের উপরে একখানা ছবির কাচ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। গুলিটা দয়া করে উপহার দেওয়া হয়েছিল আমাকেই, কিন্তু বন্দুকধারীর দুর্ভাগ্যক্রমে তার বাসনা পূর্ণ হয়নি।
এর অর্থ কী প্রশান্ত? তুমি কি আমার পিছনে কোনো হত্যা হত্যাকারী গুন্ডা নিযুক্ত করেছ? কিছুতেই আমাকে আর এঁটে উঠতে পারলে না বলে শেষটা নিজের মানরক্ষার জন্যে আমাকে দুনিয়ার থিয়েটার থেকে একেবারে গলাধাক্কা দিতে চাও?
সত্য বলছি, তোমার সম্বন্ধে এখনও এতটা কুধারণা আমি পোষণ করতে পারছি না। কারণ বোকা হওয়া এক, আর খুনে হওয়া এক। যদিও শেষপর্যন্ত খুনে হয়ে দাঁড়ায় বোকারাই।
কিন্তু আমাকে বন্দুক নিয়ে আক্রমণ করতে পারে, এমন কোনো শত্রুকেই আমি চিনি না। কলকাতার সাধারণ কোনো বদমাইশের দলের সঙ্গে আমার সামান্য সম্পর্কও নেই। সুতরাং কোনোরকম স্বার্থহানির সম্ভাবনায় তাদের কেউ আমার প্রাণপক্ষীকে শিকার করতে আসবে না। এ সম্প্রদায়ে আমার একমাত্র শত্রু ছিল মহাদেও মিশির। কিন্তু তাকে তো আমি স্বহস্তে তুলে দিয়েছি তোমার হাতে এবং তুমি তাকে তুলে দিয়েছ ফাঁসিকাঠের দোলমঞ্চে।*
তবে এমন ব্যাপার কেন হল?
না বললেও চলবে যে, আমি সে বাড়ি ছেড়ে নতুন বাসায় উঠে এসেছি। আমার শত্রুরা এখন সে-বাড়ির উপরে যতখুশি গুলিবৃষ্টি করতে পারে।
হ্যাঁ, একটা কারণে আমার সন্দেহ তোমার দরজা থেকে ফিরে আসতে চাইছে। আমার বাড়ির ঠিকানা জানলে তুমি হয়তো পুলিশবাহিনী নিয়েই আমাকে সরাসরি আক্রমণ করতে আসতে, গুপ্তঘাতকের সাহায্য গ্রহণ করতে না।
কিন্তু এও তো হতে পারে যে, বারবার আমাকে হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়েও হারিয়েছ বলে তুমি আজ মরিয়া হয়ে উঠেছ। সম্মুখযুদ্ধে, বুদ্ধির প্রতিযোগিতায় জয়লাভের আশা ত্যাগ করেছ! তাই কি?
কিন্তু উপায় কী বল দেখি? আমি তো কতবার তোমার সামনে গেলুম, পাশে গেলুম, তোমার সঙ্গে কথা— এমনকি গল্পও করলুম, তবু তুমি আমার হাতে তোমার বড়ো সাধের লোহার বালা পরাতে পারলে না! হায় অশান্ত, কবে তুমি সাবালক হবে?
বলব কী ছাই, এই আজকের ব্যাপারটাই দেখ না! আমি সাজলুম রিকশার কুলি, তুমি ভাড়া করলে আমার গাড়ি, এমনকি আমার 'কানা' ডানচোখটা তোমার পক্ষে নিরাপদ হবে কিনা ভেবে সন্দেহ প্রকাশ করতেও ছাড়লে না, তবু একবারও তোমার সূক্ষ্ম গোয়েন্দাদৃষ্টি দেখতে পেলে না, যে দ্বিপদ জীবটি তোমাকে প্রকাশ্য দিবালোকে আকর্ষণ করে নিয়ে যাচ্ছে, তার নাম হচ্ছে—
'দীনবন্ধু'
চিঠি পড়ে অরুণ অবাক হয়ে বসে রইল।
প্রশান্ত রাগে গসগস করতে করতে বললে, 'এ চিঠি পড়ে কী মনে হয়?'
—বাস্তবিক, আশ্চর্য কথা! বরুণের এমন মারাত্মক শত্রু কে আছে যে—
—আমি সে-কথা ভাবছি না। আমি হলুম গিয়ে খুনিদের যম, আর আমাকেই কিনা—
—হ্যাঁ। বোধহয় বরুণের এ অভিযোগ সত্য নয়।
—বোধহয়? বোধহয় কী মশাই?
—আচ্ছা, 'বোধহয়' কথা দুটিকে ত্যাগ করছি। আমার বিশ্বাস আপনি নিশ্চয়ই বরুণকে খুন করবার জন্যে লোক লাগাননি।
—হ্যাঁ, নিশ্চয়ই তাই। আপনার বন্ধুকে বলবেন যে, তার কাছে লক্ষ বার অপদস্থ হলেও লোক লাগিয়ে তাকে আমি যমের বাড়ি পাঠাতে চাই না! দীনু আমাকে আর যাই-ই বলুক, তার এ-কথা আমি কিছুতেই সহ্য করব না! আরে গেল যা! আমাকে খুনি বলা? উঃ, কী রাগ যে হচ্ছে!
—ঠান্ডা হোন প্রশান্তবাবু, ঠান্ডা হোন।
—আরে মশাই, ঠান্ডা হই কী করে? বুকে আগুন জ্বেলে দিলে কেউ ঠান্ডা হতে পারে? এই আপনার বন্ধুর বুদ্ধি? আমি নাকি নাবালক!
—কিন্তু কে এই গুপ্ত শত্রু?
—আমাকে জিজ্ঞেস করছেন যে? আমি জানব কেমন করে? আমি কি গণৎকার?
—মহাদেও মিশিরের ফাঁসি হবার পর আমিও তো বরুণের এমন কোনো শত্রুর কথা ভাবতে পারছি না!
—মশাই, আপনার বন্ধুটি তো আদর্শ সাধু-সজ্জন নন! তার উপাধি 'ডাকাত'। জানি, সে কেবল দুষ্ট লোকের টাকা কেড়ে নেয়। কিন্তু সেইজন্যেই তো তার বেশি ভয়! হয়তো সেই দুষ্টদেরই কারুর প্রতিশোধ নেবার বাসনা হয়েছে।
—খুব সম্ভব, তাই।
উঠে দাঁড়িয়ে প্রশান্ত বললে, 'দেখুন অরুণবাবু, আর আপনার কাছে আসবার ইচ্ছে আমার নেই।'
—কেন বলুন দেখি?
—আপনার কাছে এলেই প্রায় নীল পত্র পাই। এ রহস্যের কারণ কী জানি না, কিন্তু এটা ভালো করে ভেবে দেখবার কথা!
অষ্টম
ঘুগনিদানার মালিক
রাত দশটা।
কাল রাত নটা সাড়ে-নটার সময়ে খ্যাঁদা জাপানিদের উড়োজাহাজরা কলকাতার উপরে কালীপুজোর বাজির মতন কতগুলো বোমা ছুড়ে সরে পড়েছিল। আজ তাই এর মধ্যেই শহরের রাস্তাগুলোর উপর থেকে পথিকরা হয়েছে অদৃশ্য।
এমনকি, দোকানিরাও ঝাঁপ তুলে দিয়েছে তাড়াতাড়ি! কে জানে বাবা, বলা তো যায় না—
কিন্তু জনবহুল পথে পথে না ঘুরলে যাদের পোড়াপেট চলে না, আজ সেই গরিব-বেচারিদের বড়োই দুর্দশা! ঘুগনিদানা, কাবলিমটর ও আলুসিদ্ধ এবং কুলফি বরফ প্রভৃতির বিক্রেতারা পথে পথে ঘুরে ঘুরে পা ব্যথা করে মরছে, তাদের মাল সাবাড় করবার লোকের একান্ত অভাব!
এক বুড়ো ঘুগনিদানাওয়ালা প্রায় পূর্ণ ঘুগনির হাঁড়ি কাঁধে করে শ্রান্ত পদে যেন ধুঁকতে-ধুঁকতে পথ চলছে। তবু গলার আওয়াজকে নানারকমে অধিকতর লোভনীয় করে তোলবার জন্যে তার প্রাণপণ চেষ্টার অভাব নেই। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বারবার সে ছড়া কাটছে—
'আলু-নারকেল-ঘুগনিদানা!
না খেলে ভাই যায় না জানা!
গরমা-গরম, ঝাল-মিঠে-টক,—
যাও খেয়ে যাও, যার আছে শখ!
সঙ্গে আছে মামলেট আর
ডিম, আলুর দম— শখের আহার!'
তবু কারুর দেখা নেই— বোমাভীতু খরিদ্দাররা আজ তাকে বয়কট করেছে!
কিন্তু সে হতাশ হয় না, তার তারস্বরে চিৎকার থামে না, সে যেন অনন্ত দম-দেওয়া কলের পুতুল, জনশূন্য মরুভূমিতে ছেড়ে দিলেও তার কণ্ঠের মুখরতা স্তব্ধ হবার নাম করবে না।
হঠাৎ অভাবিতভাবে বুঝি তার অদৃষ্ট কিঞ্চিৎ প্রসন্ন হল। একটা গলির মোড়ের বাড়ির তলায় লম্বা রোয়াকে বসে কয়েকজন লোক গুলতানি করছিল। খুব সম্ভব পাড়ার ডানপিটে বেকার ছোকরার দল— রাস্তার ধারের রোয়াকে রোয়াকেই হয় যাদের আলোচনা-সমিতির নিয়মিত অধিবেশন! তারা গুরুজনদেরও মানে না, বোমার ভয়ও রাখে না। তারা হচ্ছে সেই শ্রেণির ছেলে, বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়— ভূতের ভয় দেখালেও যারা ভূত দেখতে চায়!
রোয়াকের উপর থেকে আহ্বান এল— 'ও ঘুগনিদানাওয়ালা!'
ফিরিওয়ালা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে শুধোলে, 'আজ্ঞে বাবু!'
—কী কী আছে?
ফিরিওয়ালা আবার তার স্বরচিত ছড়াটির আবৃত্তি শুনিয়ে দিলে।
—মামলেটের দাম কত?
—আজ্ঞে বাবু, দু-আনা।
—দু-আনা? বলো কী?
—আজ্ঞে বাবু, আজকাল ডিমের দাম জানেন তো?
—কেন বলো দেখি? হাঁসরা আজকাল কি ডিম দিতে রাজি নয়? তারা ডিমের মায়া ত্যাগ করেছে?
—না বাবু, হাঁসেদের দোষ নেই। তারা গন্ডায় গন্ডায় আন্ডা ছাড়ে, কিন্তু সেগুলো আজকাল পাচার হচ্ছে লড়ায়ে-গোরাদের জন্যে।
—তুমি তো খুব খলিফা ঘুগনিদানাওয়ালা দেখছি। দিব্যি ছড়া কাটো, এত খবর রাখো!
—আজ্ঞে বাবু, যে পুজোর যে মন্ত্র! নইলে পেট চলবে কেন?
—বেশ, বেশ! তোমার কথায় খুশি হলুম। রোয়াকে উঠে বোসো তো চাঁদ। আগে আনা-চারেকের ঘুগনি দাও দেখি!
ফিরিওয়ালা রোয়াকের উপরে উঠে বসে নিজের পশরার ভিতরে হস্তার্পণ করলে—
এবং সঙ্গে সঙ্গে রোয়াকে যারা বসে ছিল তারা সকলে মিলে তার ঘাড়ের উপরে লাফিয়ে পড়ল দলবদ্ধ বাঘের মতো! ঘুগনিওয়ালা কিছু জানবার বা কোনোরকম বাধা দেবার আগেই তারা তাকে রোয়াকের উপরে নির্জীব পদার্থের মতন পেড়ে ফেললে এবং মিনিট তিন পরেই দেখা গেল, তার মুখ-হাত-পা সব বাঁধা!
একটা লোক বললে, 'জানি স্যাঙাত, তুমি এই পথেই ফিরবে। আমরা তোমার জন্যেই বসে ছিলুম!'
আর-একটা লোক তীব্র স্বরে শিস দিলে!
কোথা থেকে দুখানা বড়ো-বড়ো মোটরগাড়ি ছুটে এসে সেইখানে দাঁড়িয়ে পড়ল।
লোকগুলো ঘুগনিওয়ালাকে ধরাধরি করে তুলে ধরে একখানা গাড়ির আসনের তলদেশে স্থাপন করলে। তার দেহের উপরে নিক্ষেপ করলে চটের মতন কী একটা জিনিস— তখন বাহির থেকে কারুর কৌতূহলী দৃষ্টি যে তাকে দেখবে, এমন কোনো উপায়ই রইল না। যদিও এতটা সাবধানতার দরকার ছিল না, কারণ কলকাতার রাত্রি এখন নিষ্প্রদীপ— দুই হাত দূরেও মানুষের দেহ হয় প্রায়-অদৃশ্য।
লোকগুলো মিনিট পাঁচ-ছয় রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে কী পরামর্শ করলে। তারপর একে একে সকলে দুইখানা গাড়ির ভিতরে উঠে বসল। গাড়ি ছেড়ে দিলে।
গাড়ি ছুটছে কলকাতার ভীত, মৃত অন্ধকারকে মথিত ও শব্দিত করে। একে একে এ-পথ ও-পথ পার হয়ে গাড়ি দুখানা ক্রমে শহরের প্রান্তে এসে পড়ল। দেখতে দেখতে শহর পড়ে রইল পিছনে।
অন্ধকার আরও ঘনীভূত। কোথাও জনমানবের সাড়া নেই— শোনা যাচ্ছে শুধু শীতল ঝোড়ো বাতাসের দীর্ঘশ্বাস এবং বনে বনে উচ্ছ্বসিত পত্রমর্মর। আকাশের ক্ষীণ চাঁদের আলো ভেদ করতে পারছে না পৃথিবীর তিমিরাবগুণ্ঠন।
গাড়ি দুখানা আরও বেগে ছুটতে আরম্ভ করলে। যেন তারা হচ্ছে দুটো বন্য ও হিংস্র জন্তু— অন্ধকারের গর্ভে পেয়েছে কোনো পলাতক শিকারের সন্ধান। শিকার পালাচ্ছে, তারাও পশ্চাদ্ধাবন করছে!
যন্ত্রযুগের দুই যন্ত্রদানব—প্রচণ্ড গতির আবেগে ক্রমেই বেশি আত্মহারা হয়ে উঠছে। মানুষ তাদের পৃষ্ঠে আরোহণ করে, আবার তাদের তলাতেও পড়ে জীবন সমর্পণ করতে বাধ্য হয়! মানুষ প্রভু, না যন্ত্রপ্রভু, বোঝা যায় না!
এতক্ষণ গাড়ির আরোহীরা একটাও কথা কয়নি।
এইবারে একটা হেঁড়ে গলা শুধোলে, 'আলগু'!
—বাবুজি!
—শখের ঘুগনিওয়ালার সঙ্গে দুটো গল্প করবার সাধ হচ্ছে। ওর মুখের বাঁধন খুলে দে।
—যদি চ্যাঁচায়?
—এই বনবাদাড়ে অন্ধকারে শুনবে কে? তা ছাড়া আমাদের হাতের রিভলভারগুলো কী করতে আছে? ও চ্যাঁচালে, রিভলভার ঘুমোবে না।
আলগু বন্দির মুখের বাঁধন খুলে দিলে।
হেঁড়ে গলা মনের খুশিতে আগে খানিকটা হুড়হুড় করে হাসির বন্যার সৃষ্টি করলে। তারপর বললে, 'কেমন লাগছে হে দীনুবাবু?'
বরুণ বললে, 'ভালো লাগছে বলব না। সেটা হবে মিছে কথা।'
—তুমি সত্যবাদী ডাকাত?
—মাঝে মাঝে সত্যকথা বলার চেষ্টা করি।
—আজ কত ঘুগনি বেচলে?
—চার আনার।
—এ ব্যাবসা কতদিন ধরেছ?
—আমি কবে কোন ব্যাবসা ধরি কিছুরই ঠিক নেই।
—পোষায়?
—না পোষালে চলবে কেন?
—আমি কে বলো দেখি?
—অন্ধকারে তোমার চাঁদমুখ দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু মধুর কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে, এর আগে তোমাকে চোখেও দেখিনি।
—তা দেখনি।
—তুমি কে?
—শঙ্করলাল।
—তুমি বিখ্যাত ব্যক্তি নও। নাম শুনেও চিনলুম না।
—না, আমি চোর ডাকাত গুন্ডা নই— তুমি যাদের চেনো।
—তবে তুমি কি বুদ্ধ আর খ্রিস্টের মামাতো ভাই?
হা হা-রবে হেসে শঙ্করলাল বললে, 'তুমি বেটা রসিক আছ দেখছি। কিন্তু আমি হচ্ছি মহাদেও মিশিরের নিজের ভাই।'
বরুণ স্তব্ধ হয়ে রইল।
—কী হে, চিনলে?
—খানিকটা পরিচয় পেলুম বটে।
—ভয় হচ্ছে না?
—আমার ভয় নেই।
—আচ্ছা, দেখা যাবে।
—কীরকম?
শঙ্করলাল ক্রুদ্ধ স্বরে বললে, 'তোমাকে যে আদর করব তেমন আদর কখনও কল্পনাও করনি!'
—আমি আদর পেলে খুশি হই।
শঙ্করলাল আরও ক্রুদ্ধ এবং হিংস্র কণ্ঠে বললে, 'তোমাকে কীরকম আদর করব জানো?'
—জানতে আগ্রহ হচ্ছে বই কি।
—তবে শোন। শহর গ্রাম থেকে দূরে এমন এক গভীর জঙ্গলে যাব, যেখানে মানুষ ঢোকে না— যেখানে সূর্যের আলোও আসে না! তারপর মাটির ভিতরে খুঁড়ব একটা গর্ত। তারপর হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় তোর সমস্ত দেহটা রাখব সেই গর্তের মধ্যে— উপরে জেগে থাকবে কেবল তোর বাঁদরের মতন মুখটা। গর্তের সব ফাঁক ভরিয়ে দেব আবার মাটি ঢেলে। তারপর তোর মুখের কাছ থেকে একহাত তফাতে রাখব এক কুঁজো জল, আর একথালা খাবার। তারপর আমরা সবাই সেখান থেকে চলে আসব!
বরুণ সহজ স্বরেই বললে, 'রীতিমতো মাথা খাটিয়েছ দেখছি। এতটা মেলো-ড্রামাটিক না হলে প্ল্যানটিকে হয়তো ভালো বলেই স্বীকার করতুম।'
মানসচক্ষে যেন একটি সুন্দর দৃশ্য দেখতে দেখতে উৎফুল্ল কণ্ঠে শঙ্করলাল বললে, 'তারপর কী হবে জানো? মাটির ভিতরকার হাজার হাজার কীটপতঙ্গ তোমার সর্বাঙ্গে দংশন করতে থাকবে। রাতের পর দিন আসবে, দিনের পর রাত— এমনি তিন-চার দিন আর রাত। হয়তো আরও দু-একটা দিন-রাত। তোমার তেষ্টা পাবে—সামনে দেখবে ঠান্ডা জল, কিন্তু পান করতে পারবে না। তোমার ক্ষুধা পাবে— সামনে দেখবে রকম-বেরকম খাবার, কিন্তু খেতে পারবে না। কীটের দংশনে, অনাহারে তোমাকে মরতে হবে তিলে তিলে, কেঁদে-কঁকিয়ে, আর যদি কোনো শিয়াল-কুকুর সন্ধান পায়, তাহলে তোমার জ্যান্ত মাথাটা ধীরে-সুস্থে বসে বসে চিবিয়ে চিবিয়ে খাবে। কী গো দীনুবাবু, এমন আদর তোমার পছন্দ হবে তো?'
—আমার পছন্দে-অপছন্দে কিছু আসে-যায় কি?
—কিছু না!
—শুনেছি তোমার ভাই মহাদেও, নূতন নূতন উপায়ে যন্ত্রণা দিয়ে নরহত্যা করতে ভালোবাসত। দেখছি তুমিও তার যোগ্য ভাই।
—তোমাকে সহজভাবে মারলে আমার দাদার আত্মা পরিতৃপ্ত হবে না।
—তোমার কথা সত্য।
—তোমাকে এত আদর করব কেন জানো?
—না।
—তুমি আমার দাদার হত্যাকারী।
—মহাদেওয়ের ফাঁসি হয়েছে বিচারকের সুবিচারে।
—কিন্তু দাদাকে ধরিয়ে দিয়েছ তুমি।
—তাই এই প্রতিশোধ?
—হ্যাঁ রে শয়তান! তুই লক্ষ টাকা দিলেও তোকে আমি ছেড়ে দেব না।
মাপ করতে হল। আমি তোমাকে এক আধলাও দিতে চাইব না।
—একটু পরেই মরবার ভয়ে তোর মুখ দিয়ে নতুন কোন সুর বেরোয়, তাও আমরা শুনতে পাব।
বরুণ সকৌতুকে হেসে উঠল।
—হাসছিস! শঙ্করলালের স্বর বিস্মিত।
—কেন হাসব না?
—এখনও তোর ভয় হচ্ছে না?
—দেখ শঙ্করলাল, যে-পথে পা দিয়েছি এ তো সাক্ষাৎ মৃত্যুর পথ! কাপুরুষ হলে আমি কি এ পথের পথিক হতুম? তবে মৃত্যুকে ভয় করব কেন?
—বাঙালিবাবুদের বীরত্ব আমি অনেক দেখেছি।
—তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে তুমি কিছুই দেখনি। থাক সে-কথা। আমি একটা কথা জানতে চাই।
—কী?
—আমাকে গুলি করে মারবার চেষ্টা করেছিল কে?
—আমি।
—যাক, সন্দেহ মিটল।
—সন্দেহ?
—হ্যাঁ! আমি ভেবেছিলুম, প্রশান্ত চৌধুরী আমাকে পথ থেকে সরাতে চায়!
—গোয়েন্দা প্রশান্ত চৌধুরীর কথা বলছ?
—হ্যাঁ।
—তারও শেষদিন ঘনিয়ে এসেছে।
—এসেছে নাকি?
—তোমার পরেই তার পালা।
—কেন?
—যে যে আমার দাদার ফাঁসির মূলে আছে, আমি তাদের কারুকেই রেহাই দেব না।
—তুমি যে দেখছি পরশুরামের মতন একরোখা লোক। মাতৃহত্যা করনি তো?
শঙ্করলাল সে-কথার জবাব না দিয়ে গর্জন করে ডাকলে, 'আলগু!'
—বাবুজি!
—দীনুর সঙ্গে আর কথা কইতে ভালো লাগছে না। ফের ওর মুখ বাঁধো। ভালো করে বাঁধো। দুনিয়ায় ওর এই বাঁধন আর খুলবে না।
বরুণ আবার তরল স্বরে হাসি শুরু করে দিলে।
শঙ্করলাল বললে, 'দীনু, ভেবেছ আজ হেসেই জিতে যাবে?'
বরুণ বললে, 'পাগল! যার হাত-পা বাঁধা, সে কখনও জিততে পারে?'
—হাত-পা খোলা থাকলে জিততে পারতে?'
—একবার খুলে দিয়েই দেখ না!
এইবারে শঙ্করলালের হেঁড়ে গলায় জাগল অট্টহাস্য! তেমনি হাসতে হাসতেই সে বললে, 'হাত-পা খুলে দিলে তুমি কী করবে শুনি?'
—একবার খুলে দিয়েই দেখ না!
—ওরে বাঙালিবাবু, খবর রাখিস কী, দেশ-বিদেশের বড়ো বড়ো পালোয়ানও আমার সঙ্গে লড়তে সাহস করে না?
—না, ও খবর রাখি না শঙ্করলাল। কারণ কুস্তি আমার ব্যাবসা নয়।
—হ্যাঁ, তোর ব্যাবসা ডাকাতি, তা আমি জানি। কুস্তির খবর তুই কী রাখবি? এই আলগু! আমি কি বললুম, শুনছিস? এই বাঙালি কুত্তাটার মুখ আবার ভালো করে বেঁধে দে।
আলগু হুকুম তামিল করলে।
গাড়ি ছুটছে। পাণ্ডু চাঁদের অতিম্লান আলোতে চতুর্দিকে দেখাচ্ছিল পরলোকের রহস্যময় দৃশ্যের মতো। দেখার চেয়ে না-দেখাই যাচ্ছিল বেশি। আকাশপটে অরণ্যশ্রেণীকে মনে হচ্ছিল প্রকাণ্ড ধ্যাবড়া কালির মতো।
শঙ্করলাল বললে, 'গাড়ি থামাও।'
গাড়ি থামল মস্তবড়ো এক ঝুপসি জঙ্গলের পাশে।
শঙ্করলাল বললে, 'জায়গাটা জুতসই বলে বোধ হচ্ছে। শ্যামলাল, তুমি রিভলভার নিয়ে দীনুবাবুকে পাহারা দাও।'
শ্যামলাল ড্রাইভার। বললে, 'আচ্ছা, হুজুর।'
শঙ্করলাল বলল, 'আলগু আর বৃন্দা আমার সঙ্গে আসুক। জঙ্গলে ঢুকে একটা মনের মতো জায়গা বেছে নিয়ে গর্ত খুঁড়তে হবে। ও গাড়ি থেকে শাবল আর কোদাল আনো। দেখছ দীনুবাবু, আমরা একেবারে তৈরি হয়ে এসেছি?'
সাড়া এল না, বন্দির মুখ বন্ধ।
আলগু বললে, 'বাবুজি, দীনু ভারি ধড়িবাজ। মহাদেওবাবুকে ফাঁকি দিয়েছিল আজব কায়দায়। ওকে কি এখানে রেখে যাওয়া ঠিক হবে? সঙ্গে নিয়ে গেলে হয় না?'
—না আলগু, ঢের অসুবিধে আছে। জঙ্গলের ভিতরে হয়তো জায়গা বাছবার জন্যে আমাদের অনেক ঘোরাঘুরি করতে হবে। হয়তো ঠিক জায়গা না পেয়ে আবার হবে ফিরে আসতে। অতবড়ো একটা জোয়ান লোককে তোমরা কতক্ষণ ঘাড়ে করে বয়ে বেড়াবে? সে যে ভারি ঝঞ্ঝাট!
—কিন্তু—
—কিন্তু কীসের আলগু? দীনুর হাত-পা বাঁধা। এ গাড়িতে রইল রিভলভার হাতে শ্যামলাল। পিছনের গাড়িতে রইল আমাদের দুজন লোক। হাত-পা খোলা থাকলেও দীনু পালাতে পারবে না।
—তবু বাবুজি, আমার মন সরছে না। দীনু সেবারে পালিয়ে গিয়ে মহাদেওবাবুকেও হতভম্ব করে দিয়েছিল!
—আলগু, বাজে কথায় সময় নষ্ট কোরো না। এখনও অনেক কাজ বাকি। চল, সাবধান শ্যামলাল!
শ্যামলাল মনে মনে হেসে ভাবলে, আমার হাতে রিভলভার আর একটা মড়ার মতন আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা মানুষ। তার ওপরে আবার সাবধান হয়ে পাহারা দেব কি?
লণ্ঠন নিয়ে শঙ্করলাল, আলগু ও বৃন্দা বনের ভিতরে প্রবেশ করলে। একটু পরেই নিবিড় জঙ্গলের আড়ালে মিলিয়ে গেল লণ্ঠনের আলোর আভা।
ঝিম ঝিম করছে আঁধার রাত। ঝিঁঝিদের নির্বোধ চিৎকার। গাছের পাতাদের একটানা কানাকানি। বাতাসের কাতরানি। কোথা থেকে হঠাৎ-জাগা বকশিশুদের রোমাঞ্চকর কান্না! আকাশে তারাদের শোকসভায় মৃত্যুন্মুখ চাঁদ।
শ্যামলালের এসব ভালো লাগছিল না। পিছনের গাড়িতে গিয়ে একটু গল্প করে আসবারও জো নেই।— বাবুজি তাকে পাহারায় রেখে গিয়েছেন।
গুনগুন করে গান গাইবার চেষ্টা করলে। তাও ভালো লাগল না। রিভলভারটা কোলের উপরে রেখে পকেট থেকে বিড়ি ও দেশলাই বার করলে। বিড়ি ধরালে।
বিড়ি শেষ করে শ্যামলাল কী করত জানি না, কিন্তু তার বিড়ি আর শেষ হল না।
আচম্বিতে সে কণ্ঠদেশে অনুভব করলে নির্দয়, কঠিন, প্রচণ্ড লৌহবন্ধন! সঙ্গে সঙ্গে দুখানা আশ্চর্য বলিষ্ঠ বাহু তাকে এমনভবে আসনের উপর চেপে ধরলে যে তার মনে হল, যেন ত্রিশ-বত্রিশ মন ওজনের তলায় সে নিষ্পেষিত হয়ে যাচ্ছে! তার হাত থেকে বিড়ি গেল পড়ে, সে উঠতে বা একটু নড়তে বা একটা টুঁ শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করতে পারলে না— দুই চক্ষু কপালে তুলে দেখতে দেখতে এলিয়ে পড়ে সে অজ্ঞান হয়ে গেল!...
বরুণ মনে মনে হেসে বললে, 'আমাকে এরা দড়ি দিয়ে হিন্দুস্থানি মড়ার মতন বেঁধে রাখবে? নির্বোধরা জানে না, কী কৌশলে, কত সহজে এরকম বাঁধন খুলে ফেলা যায়! ভাগ্যে এরা আমার হাত দুখানা পিছমোড়া করে বাঁধেনি— তাহলে পরলোকের টিকিট কেনা ছাড়া হতভাগ্য দীনবন্ধুর কোনো উপায়ই থাকত না!'
তখনও তার শরীরের নীচের দিকটা ছিল দড়ি-জড়ানো—সে বসে-বসেই কাবু করেছে শ্যামলালকে। চটপটে-হাতে সে পায়ের বাঁধন খুলে ফেললে। তারপর উঠে শ্যামলালের দেহটা ঠিক হালকা কোনো খেলার পুতুলের মতোই এদিকে টেনে এনে, দড়ি দিয়ে নিজের মনের মতো কৌশলে বেঁধে ফেললে। তারপর সামনের দিকে গিয়ে ড্রাইভারের আসনে বসে পড়ল এবং শ্যামলালের পরিত্যক্ত রিভলভারটা তুলে নিলে।
মনে মনে বললে, 'আলগু রাসকেল বড়োই হুঁশিয়ার ব্যক্তি দেখছি। শুনেছি ও মহাদেও মিশিরের ডানহাতের মতো ছিল। ভবিষ্যতে ওর ওপরে নজর রাখবার চেষ্টা করব।'...
... পিছনের গাড়ির লোকরা দেখলে, সামনের গাড়িখানা হঠাৎ স্টার্ট দিয়ে ধীরে-ধীরে মোড় ফিরল।
কে বললে, কী রে শ্যামলাল, ব্যাপার কী?'
শ্যামলালের গাড়ি ধীরে ধীরে পিছনের গাড়ির পাশের দিকে এল—
এবং তারপরেই বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো উপর-উপরি দুই-দুইবার রিভলভারের শব্দ এবং সেইসঙ্গে দ্বিতীয় গাড়ির একদিককার সুমুখ ও পিছনের দুখানা টায়ার ফাটার বিষম আওয়াজ! তারপরেই শ্যামলালের গাড়ি ছুটে চলল উল্কাবেগে!
পিছনের গাড়ির লোকগুলো কয়েক মুহূর্ত হতভম্ব ও স্তম্ভিতের মতন আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল। তারপর তারা টপাটপ গাড়ির ভিতর থেকে লাফিয়ে পড়ল বটে, কিন্তু আসল ব্যাপার কিছুই ঠিকমতো বুঝতে পারলে না।
বুঝলেও, উপায় নেই! দুখানা বিদীর্ণ টায়ার! মোটরের যন্ত্র চললেও, গাড়ি আর ছুটবে না!
নবম
দীনের বন্ধুকে দেখেন ভগবান
শ্রীধর বাজারে যাচ্ছিল। হঠাৎ অরুণের মুখের ভাব দেখে দুই ভুরু আন্দোলিত করে শুধোলে, 'কী হয়েছে ছোড়দা? তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি যেন একটা গোটা নিমগাছ খেয়ে ফেলে হজম করতে পারোনি।'
অরুণ বিরক্তভাবে বললে, 'ঠাট্টা নয় শ্রীধর! বোধহয় বরুণ কোনো বিপদে পড়েছে!'
—কে, বড়দা? তা বড়দা বিপদে পড়লেও আমাদের ভাববার দরকার নেই।
—মানে?
—বড়দা বিপদে পড়লেও বিপদকে ফাঁকি দেবার মতন বুদ্ধি আছে তাঁর লক্ষ-রকম!
অরুণ আরও বিরক্ত হয়ে বললে, 'দেখ শ্রীধর! 'অতি' জিনিসটাই মন্দ। বড়দার ওপরে তোমার এই অতি বিশ্বাস সব সময়ে আমার ভালো লাগে না। মনে রেখো, বড়দা পৃথিবীর মানুষ, অলৌকিক শক্তিশালী দেবতা নন।'
—মানি ছোড়দা। কিন্তু কী হয়েছে বল দেখি?
—আজ ভোর পাঁচটার সময়ে ছোট্টুলাল এসেছিল।
—ছোট্টুলাল? ও, বড়দার সেই পেয়ারের ছোকরা? কই, আমি জানি না তো?
—তোমার নাক তখন ভীষণ ডাকাডাকি করছে। বারো-তেরো ঘণ্টা ধরে স্বপ্ন না দেখলে তো তোমার নাকের গান থামে না, কাজেই তোমাকে না ডেকেই আমি নিজে নীচে গিয়ে ছোট্টুলালকে দরজা খুলে দিলুম।
—বেশ করেছ ছোড়দা, ভারি বুদ্ধিমানের মতন কাজ করেছ। ভাগ্যিস আমার ঘুম ভাঙাওনি! কিন্তু তারপর?
—ছোট্টুলালের মুখে শুনলুম, বরুণ ঘুগনিদাওয়ালা সেজে 'রাত বারোটার ভিতরে আসব' বলে বেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু ভোর পাঁচটার সময়েও আর বাসায় ফেরেনি!
—তাই তুমি ভাবছ বড়দা কোনো বিপদে পড়েছে?
—হ্যাঁ। জানো তো শ্রীধর, বরুণ যা করে— ঘড়ির কাঁটা ধরে করে। বিষম বিপদে না পড়লে তার কথার নড়চড় হওয়া অসম্ভব। সেইজন্যেই ভাবছি।'
শ্রীধর খানিকক্ষণ চুপ করে কী ভাবলে। তারপর বললে, 'হ্যাঁ ছোড়দা, একটু ভাবনার কথা বটে। কিন্তু বেশি ভাববার দরকার নেই। বড়দা আমাদের দীনবন্ধু, গরিবের মা-বাপ। ভগবান নিশ্চয়ই তাঁকে অমঙ্গল থেকে রক্ষা করবেন।' এই বলে পরম নিশ্চিন্ত ভাবেই বাজার করতে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু অরুণের মন প্রবোধ মানলে না। শ্রীধরের মতন বরুণের প্রতি তার অন্ধবিশ্বাস নেই। সে জানে তার বন্ধু বাস করছে অতি-ভঙ্গুর কাচের ঘরে। যে কোনো মুহূর্তেই সেই কাচের ঘর যে-কোনো ব্যক্তির এক আঘাতে ভেঙে পড়তে পারে!
নীচে নেমে বৈঠকখানায় বসে খবরের কাগজ পড়বার চেষ্টা করলে। সেইসব শুকনো, এক কায়দায় সাজানো বাজে যুদ্ধের খবর। এমন পৃথিবীব্যাপী কল্পনাতীত মহাসমর চলছে— কুরুক্ষেত্রের রূপকথাও যার কাছে হার মেনে যায়, প্রতিদিন এবং রাত্রে যেখানে হাজার হাজার বীর সন্তানের বুকের রক্তে মাতৃভূমি পিতৃভূমি মহাগৌরব অর্জন করছে, তার কোনো সংবাদের মধ্যেই এতটুকু বৈচিত্র্য নেই— প্রতিদিনের খবর যেন পূর্ববর্তী আর একদিনের পুরাতন সংবাদের পুনরাবৃত্তি— সেসব যেন কেরানিদের একঘেয়ে হিসাবের খাতা! বেশ বোঝা যায়, যেসব খবর পড়ছি তা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আসছে না— আসছে কেরানিদের আপিসের টেবিল থেকে স্পষ্ট সত্যকে গোপন করে স্পষ্ট মিথ্যার প্রচারের জন্যে!
'ধেৎ' বলে অরুণ খবরের কাগজগুলো ছুড়ে ফেলে দিলে। তারপর সোফার একদিকে দুই পা তুলে চুপ করে শুয়ে রইল। অলসভাবে ঘরের দেওয়ালে টাঙানো অসংখ্যবার দেখা ছবিগুলোর উপরে চোখ বুলিয়ে গেল। কিন্তু তাদের মধ্যেও নূতনত্ব নেই।
এমন সময়ে শ্রীধরের পুনরাবির্ভাব। মুখ তার হাসি-হাসি।
অরুণ সোজা হয়ে উঠে বসে বললে, 'এত হাসির বাড়াবাড়ি কেন? গোটা বাজারটা লুট করে নিয়ে এলে নাকি?'
—তার চেয়ে ভালো খবর। বড়দার চিঠি!
অরুণের সমস্ত জড়তা ঘুচে গেল। সোফা ত্যাগ করে বললে, 'বরুণের চিঠি?'
—হ্যাঁ। এই নাও। শ্রীধর এক টুকরো কাগজ বার করে অরুণের হাতে সমর্পণ করলে।
—চিঠি কোত্থেকে পেলে?
—বাজারে ভিড়ে দাঁড়িয়ে মাছ কিনছি, হঠাৎ একটা লোক পাশ দিয়ে যেতে-যেতে চিঠিখানা আমার হাতে গুঁজে দিয়ে গেল।
—বড়ো খুশি হলুম শ্রীধর! যা ভাবছিলুম!
—আমি তো বললুম ছোড়দা, যাঁর জন্যে মাথা ঘামাচ্ছেন স্বয়ং ভগবান, তাঁকে নিয়ে আমাদের ভাবনার দরকার নেই।
চিঠিতে লেখা ছিল—
অরুণ, শুনলুম যথাসময়ে বাড়িতে আসিনি বলে ছোট্টু চিন্তিত হয়ে তোমার কাছে গিয়েছে। তুমিও আমার জন্যে ভাবছ বুঝে এই ক-লাইন লিখছি।
কিছু ভেবো না। ছোট্ট একটি বিপদে পড়েছিলুম। ফাঁড়া এখনও কাটেনি বটে, কিন্তু প্রথম ধাক্কা সামলেছি। সব কথা বলবার জন্যে নিজেই তোমার কাছে যেতুম, কিন্তু জানো তো, পুলিশের গুপ্ত দৃষ্টি তোমার বাড়ির উপর থেকে নড়ে না, তাই আমার যাওয়া অসম্ভব। পারো তো আজ সন্ধ্যার সময়ে আমার এখানেই উঁকি মেরে যেয়ো। চিঠির উপরে আমার নতুন বাসার ঠিকানা দিলুম। ইতি—
'বরুণ'
* * * *
বরুণের মুখে অরুণ কালকের রাত্রের সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করলে।
সব শুনে অরুণ বললে, 'মহাদেওর প্রস্থান এবং শঙ্করলালের প্রবেশ! ওদিকে নিশিদিন জাগ্রত প্রশান্ত চৌধুরী! বরুণ, কিছুদিনের জন্যে তুমি নিরুদ্দেশ হলেই কি ভালো হয় না?'
—অর্থাৎ দেশ ছেড়ে অজ্ঞাতবাস করব?
—হ্যাঁ।
—আপত্তি ছিল না। কারণ তুমি তো জানোই, আমার জীবন হচ্ছে অর্ধেক শ্রমশীলতা আর অর্ধেক বিলাসিতা দিয়ে গড়া। কখনও করি কুলিগিরি, কখনও করি বাবুগিরি। আমার মন্ত্র হচ্ছে, খানিক খাটো— খানিক ঘুমোও। আপাতত কলকাতায় আমার বিশেষ কাজ নেই। অনায়াসেই ছুটি নিতে পারতুম, কিন্তু তা আমি নেব না। ইচ্ছার বিরুদ্ধেই ছুটি দেব না।
—কেন?
—তাহলে শঙ্করলাল ভাববে, আমি তারই ভয়ে গা-ঢাকা দিয়েছি।
—তাহলে শঙ্করলাল যা খুশি ভাবুক গে। তার জন্যে তোমার মাথাব্যথা কেন?
—শঙ্করলাল আমাকে জাত তুলে গালাগাল দিয়েছে। বলে বাঙালিরা ভীরু কাপুরুষ। আমি তাকে কানে ধরে বুঝিয়ে দিতে চাই, বাঙালি কাপুরুষ নয়।
—এই আত্মগর্ব হচ্ছে তোমার দুর্বলতা।
—না, আমার সবলতা।
—বেশ, তুমি কী করতে চাও শুনি।
—শঙ্করলাল এখনও পুলিশের কাছে সুপরিচিত নয়। এখনও সে খুন-ডাকাতির ব্যাবসা ধরেনি। কিন্তু সে যখন তার দাদা মহাদেওর ভাঙা দল আবার নতুন করে গড়ে তুলেছে, তখন এ ব্যাবসা ধরতে তার বেশি দেরি হবে বলে মনে হচ্ছে না। একবার আইনের শৃঙ্খল ভাঙলেই আমি তাকে ধরিয়ে দেব।'
—কী দরকার? তুমি কি গোয়েন্দা?
—না। আমি প্রতিশোধ নিতে চাই— সে আমাকে ভয়াবহ মৃত্যুর কবলে নিক্ষেপ করতে চেয়েছিল। সে বাঙালিকে কাপুরুষ বলেছিল। তার এসব অপরাধ আমি মার্জনা করব না। আমিও তাকে হত্যার চেষ্টা করতে পারতুম। কিন্তু হত্যাকে আমি মহাঅপরাধ বলে মনে করি। তাই তাকে আমি শাস্তি দেব আইনের সাহায্যেই।
—বেশ, আমার কথা যখন শুনবে না, নিজে যা ভালো বোঝো, করো। কিন্তু শ্যামলালের কী হল বললে না তো?
—শত্রুদের নাগালের বাইরে এসে তাকে পথের উপরে নামিয়ে দিয়েছি।
—সে কী, তাকে ধরিয়ে দিলে না কেন?
—'অরুণ, এইবার তুমি হাসালে। আমি শ্যামলালকে যদি কোনো পুলিশকর্মচারীর হাতে সমর্পণ করতুম, তাহলে প্রথমেই প্রশ্ন হত—'ওর অপরাধ কী?' আমি ভালোমানুষের মতন বলতুম—'একদল লোক আমাকে খুন করতে চেয়েছিল, ও হচ্ছে তাদেরই একজন।' তারপর প্রশ্ন হত— 'আপনি কে মশাই?' (অবশ্য আমি হয়তো মুখ ফুটে আত্মপরিচয় দিতুম না—কিন্তু শ্যামলাল নিশ্চয়ই আমার পরিচয় দিতে দেরি করত না।) কাজেই আমি বলতে বাধ্য হতুম,— 'অধীনের নাম দীনুডাকাত।' অমনি প্রচণ্ড উৎসাহে আর বিষম চিৎকারে হুকুম হত—'ওরে, দীনুডাকাতের জন্যে হাতকড়া নিয়ে আয় রে!' ব্যাপারটা কি এইরকমই দাঁড়াত না ভাই? তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন, আমি তো তোমাদের মতন আইনভীত শান্তিপ্রিয় লোক নই— রাজদ্বারে আমার স্থান কোথায়? যতই গরিবের উপকার করি, আর পাপীকে শাস্তি দিই,— কিন্তু আমি হচ্ছি সমাজের পরিত্যক্ত জীব, সমাজ মনে মনে আমাকে দয়া করলেও মুখে তা স্বীকার করবে না, সমাজে অতি নিম্নচরিত্র লোকেরও যে অধিকার আছে, আমার তা নেই!'
অরুণ দুঃখিত ভাবে বললে, 'ভাই, তুমি তো অনায়াসেই এই ঘৃণিত অভিশপ্ত জীবন ত্যাগ করতে পারো!'
বরুণ মাথা নেড়ে বললে, 'পারি না বন্ধু, পারি না! বিপদ, রোমাঞ্চ, দুঃসাহসিকতা, ঘটনার পর ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাত— এসব আমাকে আকর্ষণ করে মাধ্যাকর্ষণের মতো। সভ্যতার এই সামাজিক যুগে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে পড়েছে একশোবার-পড়া উপন্যাসের মতন একঘেয়ে। এক্ষেত্রে যারা বিপদ, রোমাঞ্চ আর ঘটনা খুঁজতে যায়, সাধারণত তাদের হতে হয় পাপী— অর্থাৎ চোর বা গুন্ডা বা খুনি। আমি নিজের লাভের লোভে সাধারণ পাপী হতে পারি না— কারণ সে শিক্ষা কখনও পাইনি। কাজেই আমি হয়ে পড়েছি সাধুর শত্রুদের যম, দীনের বন্ধু দীনুডাকাত! আমি বেআইনি কাজ করি বটে, কিন্তু পাপী নই। পৃথিবীর আইন আমাকে দাবি করতে পারে, কিন্তু আমার উপরে নরকের দাবি নেই। এইটুকুই আমার সান্ত্বনা!'
অরুণ বললে, 'তোমার দিব্যজ্ঞান নিয়ে তুমি থাকো, আমার আর কিছু বলবার নেই। কিন্তু আর একটা কথা জানবার আছে।'
—কী কথা?
—শঙ্করলালরা তোমাকে তো আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল, সে বাঁধন খুললে কোন কৌশলে?
বরুণ হাসতে হাসতে বললে, 'খুবই সহজ কৌশলে। ওরা আমার দেহকে দড়ি দিয়ে জড়িয়ে বেঁধেছিল, আমার হাত দুখানা সংলগ্ন হয়ে ছিল দেহের দুই পাশে। তুমি জানো, এখনও রোজ আমি গুরুতর ব্যায়াম অভ্যাস করি? শ্বাস নিয়ে বুকের ছাতি বাড়াতে পারি চার ইঞ্চি। সেইভাবে দেহের অন্যান্য মাংসপেশিগুলোকেও ফুলিয়ে কম-বেশি পরিমাণে বাড়িয়ে তুলতে পারি। আমি রক্ষা পেয়েছি muscle control করে! ওরা যখন আমাকে দড়ি জড়িয়ে বাঁধতে শুরু করলে, আমিও অন্ধকারে সমস্ত দেহটা যতটা সম্ভব ফুলিয়ে বাড়িয়ে তুললুম। তারপর ওরা যখন আমাকে গাড়ির ওপরে তুলে চট ঢাকা দিয়ে ফেলে রাখলে, তখনই আমার দেহ ফিরে এল স্বাভাবিক অবস্থায়— সঙ্গে-সঙ্গে আলগা হয়ে পড়ল চারিদিকের বাঁধন। সেই আলগা বাঁধনের ভিতর থেকে হাত-দুখানা বার করতে আমার এক মিনিটও লাগেনি। আমি প্রস্তুত হয়েই ছিলুম— মরবার আগে একবার চরম লড়া লড়বার জন্যে। কিন্তু তখনও আমি ভাবতে পারিনি যে, ওরা একান্ত নির্বোধের মতন আমাকে গাড়িতেই রেখে নেবে যাবে! বোধকরি দীনের বন্ধু দীনবন্ধুর ওপরে দয়া করে ভগবানই ওদের মাথায় দিয়েছিলেন ওই দুর্বুদ্ধি!'
অরুণ হেসে বললে, 'শ্রীধরেরও বিশ্বাস তাই। সে বলে, ভগবানের আশীর্বাদে কোনো বিপদই তোমার ক্ষতি করতে পারবে না।'
—ঠিক কথাই বলে। কিন্তু আলগু-হতভাগা আর একটু হলেই ভগবানের আশীর্বাদ থেকে আমাকে বঞ্চিত করেছিল আর কী! এই আলগুকে তুমি দেখনি অরুণ! তার মুখের উপরে শয়তানের হাতের ছাপ যেন স্পষ্ট। মহাদেও যখন আমাকে বন্দি করেছিল, তখন সেই-ই ছিল আমার কারারক্ষক। মন বলছে, তার সঙ্গে আবার আমার দেখা হবে!
অরুণ বললে, 'আমার মন কী বলছে জানো?'
—শুনি তোমার মনের উক্তি!
—তুমি ধাপে ধাপে ধ্বংসের দিকে নেমে যাচ্ছ। এ পথের যা নিশ্চিত পরিণাম, তার কবল থেকে তুমি মুক্তি পাবে না।
—পাব না?
—না।
—কারণ?
—মৃত্যুকে তুমি পরিহাস করে তাচ্ছিল্য করতে চাও। মৃত্যু পরিহাসের ভক্ত নয়। হয়তো অকালেই নিজের প্রাপ্য আদায় করবার জন্যে সে প্রস্তুত হচ্ছে।
—হয়তো তাই-ই আমার অদৃষ্টের লিখন।
—না, এ লিখন তোমার নিজের হাতের। অদৃষ্টকে মানে নির্বোধরা।... আমি আজ চললুম বরুণ!
দশম
বাগানবাড়ি
অরুণ চলে যাবার পর বরুণ বসে বসে কী ভাবলে খানিকক্ষণ। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
এ বাসায় আগে সে নিয়মিত ভাবে বাস করত না বটে, কিন্তু এ বাড়িখানা ভাড়া নিয়েছে অনেকদিন। কলকাতার ভিতরে এবং শহরতলিতে এরকম ভাড়া নেওয়া বাড়ি আছে তার কয়েকখানা। যে অনিশ্চিত জীবন তার, কখন কী হতে পারে পূর্বমুহূর্তেও তা জানা অসম্ভব। কবে কোন আশ্রয়নীড় হঠাৎ ভেঙে যাবে, সেজন্যে বরুণ প্রস্তুত হয়ে থাকত সর্বদা।
ব্যারাকপুর ট্রাঙ্ক রোডের এই বাড়িখানি আগে ছিল এক ধনীর শখের প্রমোদভবন। চারিধারে বড়ো বাগান, একটা মস্ত পুকুর ও একটা সুদীর্ঘ ঝিলও আছে।
ধনীর বংশধররা আজ দরিদ্র। ফলে বাগানবাড়ির অত্যন্ত দুরবস্থা। তার রং বিবর্ণ এবং বাইরের দেওয়ালের গায়ে বড়ো বড়ো ক্ষতচিহ্নের ভিতর দিয়ে বেরিয়ে পড়েছে কুৎসিত ইষ্টককঙ্কাল। বাগানের একটা ফুলগাছও আর বেঁচে নেই—চারিদিকে কেবল ছোটো-বড়ো জঙ্গলের প্রভাব। ঝিল ও পুকুরের অধিকাংশ জুড়ে বিরাজ করছে সবুজ পানার চাদর।
বরুণ বাড়ির বাহির দিকে এবং বাগানের কোনোখানেই সংস্কারের দিক দিয়েও যায়নি—সে কৌতূহলী দৃষ্টি আকর্ষণ করতে নারাজ। কিন্তু বাড়ির ভিতরকার ঘরগুলো বাসের উপযোগী ও নিজের মনের মতো করে নিয়েছিল। ভিতরের ঘরে বসে কেহই আন্দাজ করতে পারবে না যে, বাড়ির বাহিরে আছে এমন বন্য কদর্যতা।
জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বরুণ দেখলে, বাগানের ওপাশে বৃহৎ রাজপথ দিয়ে তীব্র ও দীপ্ত চক্ষু দানবের মতন মিলিটারি লরিগুলো দলে দলে ছুটে যাচ্ছে সবেগে ও সশব্দে।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ, কিন্তু ক্ষয়প্রাপ্ত চাঁদ উঠবে আজ অনেক রাতে। জঙ্গলভরা বাগানের উপরে নেমে এসেছে কালো যবনিকা। অন্ধকারের শত শত আগুনচোখের মতো জোনাকিগুলো জ্বলছে আর নিবছে— অন্ধকার যেন চোখ মুদছে আর চোখ খুলছে!
বরুণ ভাবছে! ভিতরে ঘরে এই উজ্জ্বল আলো, বাইরে দেখি ওই নিরন্ধ্র অন্ধকার। আলোক থেকে অন্ধকারে যেতে এক ধাপ। জীবন থেকে মৃত্যুরও ব্যবধান মাত্র এক ধাপ। আমি কি সেই ধাপে এসে দাঁড়িয়েছি? অরুণ আজ আমার মন খারাপ করে দিয়ে গেল।
অরুণ—আমার একমাত্র বন্ধু অরুণও বলে, এই পথের নিশ্চিত পরিণামের কবল থেকে আমিও মুক্তিলাভ করব না। নিশ্চিত পরিণাম? ভালোর পরিণামে ভালো আর মন্দের পরিণামে আসে মন্দ। এই তো স্বাভাবিক নিয়ম। আমি কি এই নিয়মের বাইরে? কেন? আমি তো স্বার্থসিদ্ধির জন্য দস্যুতার আশ্রয় নিইনি! আমি তো দুষ্টকেই দমন করবার চেষ্টা করি— আমি তো ভগবানের নিজের হাতের চাবুক! মানুষের তৈরি রাজদণ্ডের চেয়ে কি ভগবানের চাবুকের মর্যাদা বেশি নয়? 'তস্মিন তুষ্টে জগৎ তুষ্টম'! ঈশ্বরের তুষ্টিতে নিখিল বিশ্ব তুষ্ট হয়— এই কথাই তো জেনে আর মেনে আসছি! আমি কি ঈশ্বরের অভিপ্রেত কার্যসাধন করছি না— যার ফলে অসাধু হয় লাঞ্ছিত আর সাধু হয় আনন্দিত? তবে? তবে আমি কেন ঘৃণ্য পাপীর মতন শাস্তির আশা করব?...
হঠাৎ কতকগুলো কাক কা কা করে চেঁচিয়ে উঠল এবং তারপরেই ডানার শব্দে অন্ধকারকে যেন আন্দোলিত করতে করতে দিকে দিকে উড়ে গেল।
সচকিত বিস্ময়ে বরুণ সোজা হয়ে উঠল এক-মুহূর্তে।
হঠাৎ কাকগুলো ভয় পেয়ে উড়ে পালাল কেন? প্যাঁচার আবির্ভাব হয়েছে? কাকেরা কি প্যাঁচাদের শিকার? না, কোনো ক্ষুধার্ত সর্প ভূমিতল ছেড়ে গাছে চড়েছে খোরাক খোঁজবার জন্যে?
কাকরা যখন অন্ধকারে অন্ধ হয়েও রাত্রির বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে, তখন নিশ্চয়ই তার বিশেষ কারণ আছে। কিন্তু মনে মনে সন্তাোষজনক কারণ খুঁজে না পেয়ে বরুণ সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল।
টপ করে দিলে ঘরের আলোটা নিবিয়ে। তারপর টেবিলের উপর থেকে টর্চটা তুলে নিয়ে আবার জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কান পেতে তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে অন্ধকারের নিবিড়তা ভেদ করবার চেষ্টা করলে।
গাছের অংশবিশেষ যেন দুলছে! একটু একটু পাতার শব্দও হচ্ছে। কেউ যেন সন্তর্পণে গাছের উপরে উঠছে! সে কে হতে পারে?
ছোট্টুলাল বাগানের ভিতরে পাহারায় নিযুক্ত আছে। সন্দেহজনক কিছু দেখলে নিশ্চয়ই সে সংকেতধ্বনি করত। তবে কি সেই-ই কোনো কারণে গাছে উঠছে?
বরুণ ডাকলে, 'ছোট্টু!'
সাড়া নেই!
—ছোট্টু! ছোট্টু!
সাড়া নেই। কী হল ছোট্টুর?
বরুণ টর্চ টিপে মুক্ত করলে প্রখর আলোর ধারা।
গাছের পাতার ফাঁকে দেখা যাচ্ছে একখানা মুখ! লোকটা তাকিয়ে আছে বরুণের ঘরের দিকেই। সচমকে সাঁৎ করে সরে গেল সেই চমকিত মুখখানা!
কিন্তু যেটুকু দেখেছিল বরুণের পক্ষে তাই-ই হল যথেষ্ট! তিনলাফে সে ঘরের ভিতর থেকে অদশ্য হল।
বাগানের ভিতরে বাজল বাঁশির তীক্ষ্ন সংকেতধ্বনি! পুলিশের বাঁশি! জাগল গোলমাল! শোনা গেল সব ছুটন্ত পায়ের শব্দ!
বরুণ একতলায় নেমে দৌড়ে একটা কোণের ঘরের ভিতরে ঢুকল। ছোট্ট ঘর। বেশি আসবাব নেই। একদিকে একটা দেওয়াল-আলমারি।
বরুণ আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়াল। একদিকে হাত দিয়ে হয়তো কোনো স্প্রিং টিপলে।
নিজের মনেই বললে, 'একবার যদি বাইরে যেতে পারি, কে আমাকে ধরতে পারে দেখব!'
সমস্ত আলমারিটা ধীরে একখানা কপাটের মতন খুলে গেল— সঙ্গে সঙ্গে বাহির থেকে ভেসে এল বায়ু-তরঙ্গ। গুপ্তদ্বার!
বরুণ একবার উঁকি মেরে দেখলে। সামনের অনেকখানি জায়গা জুড়ে দেখা যায় কেবল পুঞ্জ-পুঞ্জ অন্ধকার। তারপরে দূরে এখানে-ওখানে আলো নিয়ে লোকজন ছুটোছুটি করছে। পুলিশ! বাড়ির ভিতরেও শোনা গেল অনেক লোকের পদশব্দ এবং দরজার পর দরজা খোলার আওয়াজ! পুলিশ ঘরে ঘরে তাকে ব্যস্তভাবে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
প্রশান্ত চৌধুরীর গলার আওয়াজ এল—'নীচের ওই কোণের ঘরটা দেখ!'
বরুণ হেসে মনে মনে বললে, 'এসো বন্ধুবর! হারাধন খুঁজে পাবে না। এবারেও কলা দেখালুম!' সে অদৃশ্য হল।
অন্ধকারের আবরণে নিজেকে ঢেকে বরুণ শিকারি জন্তুর মতন নিঃশব্দে অগ্রসর হল।
আচমকা তাকে দুই হাতে প্রাণপণে জড়িয়ে ধরলে কে! অতি-বলবান বাহুর বন্ধন!
চাপা হেঁড়ে-গলায় কে বললে, 'কোথায় পালাবি? তুই পুলিশকে ফাঁকি দিতে পারিস, আমাকে পারবি না!' শঙ্করলালের গলা!
প্রচণ্ড এক ঝটকান মেরে বরুণ নিজেকে মুক্ত করে নিলে। বেগে দৌড় মারলে। অন্য সময় হলে শঙ্করলালকে শিক্ষা না দিয়ে এখান থেকে এক পা নড়ত না। এখন কিন্তু পালানো ছাড়া উপায় নেই।
কিন্তু তাকে বেশিদূর যেতে হল না। একটা রিভলভার গর্জন করলে। পরমুহূর্তে বরুণ মাটির উপরে ঘুরে পড়ে গেল। একেবারে অজ্ঞান!
* * *
হাসপাতাল। শয্যার উপরে শুয়ে আছে বরুণ। তার বুকে ব্যান্ডেজ বাঁধা।
প্রশান্ত ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে। তার মুখ উৎফুল্ল।
বরুণও মুখ টিপে একটুখানি হাসলে।
প্রশান্ত বললে, 'ভয় নেই বরুণবাবু! ডাক্তার বললে, আপনার আঘাত সাংঘাতিক নয়।'
—তাহলে ধরা পড়েও আপনাকে ফাঁকি দিতে পারলুম না?
—অনেকবার ফাঁকি দিয়েছেন। একবার না-হয় ধরাই পড়লেন!
—তা বটে। মাঝে মাঝে মুখ বদলানো দরকার।
—কিন্তু আপনাকে গুলি করলে কে?
—আপনার বন্ধু।
—আমার বন্ধু!
—নিশ্চয়ই! সে গুলি না ছুড়লে আমি তো আবার পালাতুম! সে আপনার যথার্থ বন্ধুর কাজই করেছে।
—কে সে?
—শঙ্করলাল।
—চিনি না।
—মহাদেও মিশিরের ভাই।
—আপনাকে গুলি করলে কেন?
—মহাদেওকে ধরিয়ে দিয়েছি বলে।
—ও, এতক্ষণে বুঝলুম! এটা হচ্ছে প্রতিশোধ? কিন্তু সে গেল কোথায়?
—জানি না। এইবারে আপনার পালা।
—আমার?
—হ্যাঁ।
—কেন?
—মহাদেওকে ধরেছেন বলে।
—বটে! তার আড্ডা জানেন?
—না।
—আচ্ছা, তার কথা এখন থাক। আপনি কিছু কষ্টবোধ করছেন?
—করছি। মনের কষ্ট, দেহের কষ্ট। ছোট্টুর খবর আর রাখেন?
—রাখি বই-কি। চুপিচুপি বাগানে ঢুকে আগে তাকেই গ্রেপ্তার করেছিলুম।
—বাগানের ঠিকানা দিলে কে, বলবেন?
—কেন বলব না;
—কে?
—অরুণবাবু।
—কী! বিশ্বাস করি না। অরুণ নিজের জিভ কেটে ফেলবে, তবু আমার ঠিকানা দেবে না।
—অরুণবাবু নিজের মুখে ঠিকানা দেননি। আমি কৌশলে তাঁর কাছ থেকে আদায় করেছি।
—তাই নাকি অশান্তবাবু?
প্রশান্ত দুঃখিত স্বরে বললে, 'বরুণবাবু, আমি তো আপনাকে 'দীনু' বলে ডাকছি না, তবে আপনি আমাকে ও-নামে ডাকছেন কেন? ও-নাম শুনলে—'
—আপনি সত্যিই অশান্ত হয়ে ওঠেন?
—তাই! রাগে আমার গা জ্বলে যায়।
—কী করব মশাই, অনেক দিনের অভ্যাস কিনা? নামটা মুখস্থ হয়ে গেছে।
—ও-বদঅভ্যাস ছাড়ুন।
—আচ্ছা। তারপর, কী বলছিলেন?
—বরুণবাবু, আপনি খুব চালাক লোক হতে পারেন, কিন্তু আমি হচ্ছি বড়ো জেদি লোক। যে জিদ ধরি, আর ছাড়ি না, হাজার নাকাল হলেও না। আমি এই জিদের জোরেই জিতেছি।
—জিদটা কী?
—বরুণবাবুর অভাবে অরুণবাবুকেই কামড়ে ধরে পড়ে থাকব। কারণ, আমি জানতুম বরুণবাবুর একটি মস্ত দুর্বলতা আছে, আর সেই দুর্বলতাই হয়েছে আমার স্বর্গের চাবি। 'ফলে মধুর অভাবে গুড় নয়, গুড়ের প্রভাবে পেলুম মধুকেই।
—আমার এই দুর্বলতাটা কী শুনি?
—মাঝে মাঝে অরুণবাবুকে না দেখে আপনি থাকতে পারেন না।
—সত্যি। ওটা হচ্ছে বন্ধুত্বের দুর্বলতা।
—দিনের পর দিন যায়, আমি অরুণবাবুকে এক মিনিটও চোখের আড়াল করি না— আড়ালে আবছায়ায় থেকে সর্বদাই পাহারা দিই। এজন্যে অপদস্থ হয়েছি অনেকবার। তবু আমার জিদ রেখেছি বজায়! অরুণবাবু বাড়ি থেকে বেরুলেই আমার লোক নেয় তাঁর পিছু।
বরুণ বললে, 'বুঝেছি, আর ব্যাখ্যার দরকার নেই।। কাল আপনার চরকে পিছনে নিয়ে অরুণ আমার বাসায় এসেছিল?'
প্রশান্ত গর্বিত কণ্ঠে বললে, 'হ্যাঁ। আমার জিদেরই জয়!'
—আচ্ছা, ভবিষ্যতে আরও সাবধান হব।
—হতে পারেন— কিন্তু অদূর-ভবিষ্যতে নয়।
—তাহলে আপনার বিশ্বাস, আমাকে বহুকাল ধরে কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
—কেন, আপনিও কি এটা বিশ্বাস করেন না?
—না।
—আপনার বিরুদ্ধে রুজু হবে ডাকাতির মামলা। একটা-দুটো ডাকাতি নয়, অনেকগুলো ডাকাতির জন্যে।
—আমি ডাকাত নই। আমি পাপীকে শাস্তি দিই, গরিবের উপকার করি।
—আপনি শাস্তি দেবার কে? পাপীকে শাস্তি দেবার জন্যে আছেন রাজা। রাজার রাজদণ্ড যে নিজের হাতে নেয়, রাজা তাকে ক্ষমা করেন না। শিশুও একথা জানে।
—আমিও জানি। আর রাজদণ্ড এড়াবার উপায়ও আমার অজানা নয়।
—জেল ভেঙে পালাবেন ভাবছেন? কিন্তু জানেন কি, আপনার জন্যে বিশেষ পাহারার ব্যবস্থা করবার হুকুম হয়েছে?
—সে হুকুম যারা পালন করবে, তারাও আমাকে জেলের ভিতরে ধরে রাখতে পারবে না। আমি পালাবই পালাব। এই নিয়ে আমি বাজি রাখতেও রাজি আছি।
প্রশান্ত বললে, 'বাজি রাখবার দরকার নেই বরুণবাবু। কর্তব্যের খাতিরে প্রতিজ্ঞা করেছিলুম, আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করব। আমার সে প্রতিজ্ঞা সফল হয়েছে। আপনার ওপরে আমার আমার কোদো রাগ বা আক্রোশ নেই। এরপর আপনি মুক্তি পেলেও আমি দুঃখিত হব না।'
প্রশান্তের একখানা হাত নিজের হাতের মধ্যে গ্রহণ করে বরুণ হাসতে হাসতে বললে, 'ধন্যবাদ।'
* মায়ামৃগের মৃগয়া
* 'বজ্র আর ভূমিকম্প' দ্রষ্টব্য।
* 'বজ্র আর ভূমিকম্প' দ্রষ্টব্য।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন