বজ্র আর ভূমিকম্প

হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম

নীল চিঠির পুনরাবির্ভাব

প্রশান্ত চৌধুরীর দুশ্চিন্তার সীমা নেই। মাস-ছয়েক গোলমাল ছিল না। বারে বারে পদে পদে তাকে অপদস্থ করে দীনুডাকাত হঠাৎ কোথায় ডুব মেরেছিল। কলকাতায় এবং ভারতবর্ষের দিকে দিকে পুলিশের দল যথেষ্ট সচেতন হয়েও দীনুকে আর পুনরাবিষ্কার করতে পারেনি। শেষটা সকলে এই ভেবে আপন আপন মনকে প্রবোধ দেবার চেষ্টা করলে যে, দীনু হয় পীড়ায় বা অপঘাতে মারা পড়েছে, নয়তো ভারতীয় আইনকে বলা দেখাবার জন্যে ভারতবর্ষের বাইরে গিয়ে নিরাপদে করছে অজ্ঞাতবাস।

দীনুর সঙ্গে শক্তি পরীক্ষায় শেষপর্যন্ত জয়ী হতে না পেরে প্রশান্ত যে মনে মনে ক্ষুব্ধ হল যথেষ্ট, সে-কথা বলা বাহুল্য। খবরের কাগজের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, উপরওয়ালাদের ধমক, নিদারুণ আত্মগ্লানি, এই-সবই কেবল তাকে নীরবে হজম করতে হল। গোয়েন্দাগিরিতে দেশজোড়া নাম কিনেও এবং বারংবার দীনুকে হাতের কাছে পেয়েও কোনোদিন সে তার ছায়া স্পর্শ করতেও পারেনি। দীনু ছিল যেন পুতলো-বাজির খেলোয়াড় আর সে ছিল তার হাতের পুতুল—লুকিয়ে দড়ি টেনে সে তাকে স্বেচ্ছামতো উঠিয়েছে বসিয়েছে ছুটিয়েছে ঘুরিয়েছে ফিরিয়েছে নাচিয়েছে। এ অপমানের জ্বালা কি ভোলবার?

প্রতিশোধ নেওয়া হল বটে, কিন্তু একটা কথা ভেবে প্রশান্ত একাধিক অস্বস্তির নিশ্বাস ফেললে। দীনু দেশছাড়া হলে তার ঘাড় থেকে যেন একটা ভূত নামে। আর সে যদি মারা পড়ে থাকে, তাহলে তার ফাঁড়া তো কেটেই গিয়েছে! দীনুকে সে খালি ঘৃণা করে না, রীতিমতো ভয়ও করে!

কিন্তু হঠাৎ এল আবার কালরাত্রি, আকাশে হল বিপজ্জনক মেঘের উদয়, জাগ্রত হল বজ্রের হুংকার।

পরে পরে ঘটল তিনটে ঘটনা।

প্রথম ঘটনা ঘটে দেওঘরে। কোটিপতি মানিকলাল ঝুনঝুনওয়ালা গিয়েছিলেন সেখানে বায়ু-পরিবর্তনে। এক রাত্রে বৃহৎ একদল ডাকাত এসে তাঁর বাড়িতে হানা দেয়।

ডাকাতদের বাধা দিতে গিয়ে চারজন দারোয়ান আহত ও দুইজন নিহত হয়। প্রায় চল্লিশ হাজার টাকার সম্পত্তি নিয়ে ডাকাতরা সরে পড়ে।

ছোটো-বড়ো-মাঝারি ডাকাতির খবর তো প্রায়ই পাওয়া যায়। সেটা কিছু নতুন কথা নয়। কিন্তু এ ডাকাতির একটু বিশেষত্ব আছে—অন্তত পুলিশের কাছে।

ডাকাতরা চলে যাবার পর মানিকলাল ঘটনাস্থলে একখানি নীল রঙের খাম কুড়িয়ে পান। তার ভিতরে একখানি নীল রঙের কাগজ। সেই কাগজে বড়ো বড়ো হরপে লেখা—

'দীনু'

দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে বাংলার একটি বড়ো গ্রামে। ডাকাতি হয় নতুনপুরের জমিদার-বাড়িতে। সেখানেও ডাকাতদের আক্রমণে একজন লোক নিহত ও ছয়জন লোক অল্পবিস্তর আহত হয়। সেখানেও ডাকাতরা হাজার ত্রিশ টাকার সম্পত্তি নিয়ে পালায়। এবং সেখানেও পাওয়া যায় নীল রঙের খামে একখানা নীল রঙের কাগজ—

তাতে শুধু লেখা—

'দীনু'

তৃতীয় ঘটনাস্থল হচ্ছে—হাওড়া। চন্দ্রনাথ সামন্ত একজন বড়ো ব্যাবসাদার,—প্রচুর টাকার মালিক। ডাকাতদের কবলে চন্দ্রনাথের কয়েকজন লোক জখম হয় এবং মারা পড়েন চন্দ্রনাথ নিজেই। ডাকাতরা নগদ পঁচিশ হাজার টাকা হস্তগত করে অদৃশ্য হয়। সেখানেও পাওয়া যায় নীল খামের ভিতরে একখানি নীল কাগজ এবং তাতে লেখা কেবল—

'দীনু'

ডেপুটি কমিশনারের কাছ থেকে জোর-তলব আসতে দেরি হল না।

সাহেবের মুখ গম্ভীর। চোখে বিরক্তি।

প্রশান্তও নিজে থেকে কোনো কথা জিজ্ঞাসা করলে না।

খানিকক্ষণও পরে সাহেব বললেন, 'কেন ডেকেছি বুঝতে পারছ কি?'

প্রশান্ত মৃদুকণ্ঠে বললে, 'আজ্ঞে, কিছু কিছু আন্দাজ করতে পারছি।'

—প্রশান্ত, আমরা এতদিন নির্বোধের স্বর্গে বাস করছিলুম। দীনু মারাও পড়েনি, দেশ ছেড়েও পালায়নি।

—সেই রকমই তো মনে হচ্ছে। সেই 'দীনু-নামের মার্কা-মারা নীল কাগজ!

—হুঁ। প্রথমে সাঁওতাল পরগনায়, তারপর বাংলার পল্লিগ্রামে, তারপর হাওড়ায়। দীনু আবার ধাপে ধাপে কলকাতার উপকণ্ঠে এসে হাজির হয়েছে।

—স্যার, দীনু লোকটা বড়োই নাম-পাগলা। এইজন্যেই শেষটা তাকে ধরা পড়তে হবে।

—কীরকম?

—দেশে ডাকাতি তো লেগেই আছে। দীনু যদি নীল কাগজে এভাবে নিজের নাম জাহির না করত, তাহলে এসব ডাকাতি যে দীনুরই কীর্তি একথা আমরা জানতেও পারতুম না—সে আমাদের কাজ যথেষ্ট সহজ করে দিচ্ছে, আমাদের আর অন্ধকার হাতড়ে মরতে হবে না।

সাহেব তিক্ত হাসি হেসে বললেন, 'দীনু তোমাদের তোয়াক্কা রাখে না, সে স্বেচ্ছায় আত্মপ্রকাশ করে সকলকে স্রেফ বোঝাতে চায়, তোমরা হচ্ছ প্রথম শ্রেণির গর্দভ, হাতের কাছে পেলেও তাকে তোমরা ধরতে পারবে না। তোমাদের মতন অপদার্থের জন্যে পুলিশের মান বুঝি আর থাকে না।'

প্রশান্ত দুঃখিতভাবে নিরুত্তর হয়ে রইল।

সাহেব বললেন, 'চুপ করে থাকলে চলবে না প্রশান্ত! এ বিষয় নিয়ে তুমি কিছু চিন্তা করেছ কি না বলো।'

প্রশান্ত বললে, 'স্যার, কিছু কিছু ভেবে দেখেছি বটে, কিন্তু সেসব কথা বলে লাভ নেই।'

—কেন?

—দীনুর মামলা আপনি আর কারুর হাতে দিলেই সুখী হব।

সাহেব ক্রুদ্ধ-স্বরে বললেন, 'এটা কি তোমার আদেশ?'

—না স্যার, বিনীত অনুরোধ।

—এমন অনুরোধের কারণ?

—আমার উপরে আপনি বিশ্বাস হারিয়েছেন।

—প্রশান্ত, তোমার এ-রকম অভিমান করা অন্যায়। আমারও অবস্থাটা একবার ভেবে দ্যাখো দেখি? আমি তো সর্বপ্রধান কর্তা নই—দীনুর জন্যে উপরওয়ালাদের কাছ থেকে আমাকেও কম গঞ্জনা সহ্য করতে হচ্ছে না। মনের দুঃখে যা বলেছি ভুলে যাও। তোমার যোগ্যতার উপরে আমার যথেষ্ট বিশ্বাস আছে। কেবল মুশকিল কী জানো? দীনুর কাছে গেলেই তুমি যেন মস্তিষ্কের সব শক্তি হারিয়ে ফ্যালো। এর কারণ কী জানি না, কিন্তু এটা সত্যকথা।

প্রশান্ত ঘাড় হেঁট করে নীরবে বসে রইল। তার প্রতিবাদ করবার মুখ নেই।

দ্বিতীয়

মাধবীকুঞ্জে হিপোপটেমাস

রোজ সকালে বৈঠকখানায় বসে চা-পানের পর বিখ্যাত লেখক অরুণকুমার রচনাকার্যে নিযুক্ত হত।

কিন্তু আজ আর অরুণের লিখতে মন বসছে না। মেজাজ খারাপ।

শ্রীধর এল টেবিলের উপর থেকে চায়ের কাপ-ডিশ সরাতে। শ্রীধর হচ্ছে একাধারে তার বিশ্বস্ত ভৃত্য ও পরামর্শদাতা বন্ধু।

—শ্রীধর!

—আজ্ঞে!

—শ্রীধর, আগে তুমি ডাকাত ছিলে?

—ছিলুম ছোড়দা...সে কী সুখের দিনই গিয়েছে! শ্রীধর একটা দুঃখের নিশ্বাস ত্যাগ করলে।

—সুখের দিন?

—হ্যাঁ বাবু, সুখের দিন বই কি! নিজের জীবনের ওপরে মায়া নেই, পরের জীবনেরও ওপরে দরদ নেই—বোশেখির ঝড়ের মতন, বনের বাঘার মতন মনের আনন্দে দরাজ বুকে দিকে দিকে ছুটে বেড়াতুম অবাধে—কেউ বাধা দিতে এলে তার মুখ বন্ধ হয়ে যেত চিরদিনের মতন, কেউ—

অরুণ বাধা দিয়ে বললে, 'থামো শ্রীধর, থামো, তোমার ডাকাত-জীবনের কথা শুনে-শুনে কান আমার পচে গিয়েছে। আচ্ছা, মানুষ মারতে তোমার একটুও কষ্ট হত না?'

—কিছু না বাবু, কিছু না! মানুষের জীবন কী? পিদিমের আলোর মতন। পিদিমের আলো জ্বলছে, ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে দিলুম—ব্যস, ফুরিয়ে গেল।

—চমৎকার মত! আমার জীবনও তোমার কাছে নিরাপদ নয় দেখছি।

শ্রীধর জিভ কেটে বললে, 'ছি ছোড়দা, ও কী কথা! লোকে রাস্তার উটকো কুকুরকে ঢিল ছুড়ে মারে, কিন্তু নিজের পোষা কুকুরকে কি সেইভাবে মারতে পারে?'

—তাহলে আমাকে তুমি মনিবের মতন নয়, পোষা কুকুরের মতন দ্যাখো? শুনে সুখী হলুম।

শ্রীধর আবার জিভ কেটে বললে, 'কী যে বলো বাপু, তোমাকে নিয়ে পারা দায়! তুমি যে আমার অন্নদাতা। একটা বাজে উপমা নিয়ে এত টানাটানি করলে আমি আর কোনো কথাই বলব না।'

—না শ্রীধর, না। তুমি মুখবন্ধ কোরো না। তবে কী জানো, তোমার উপমা বিপজ্জনক। যাক ও-কথা। হ্যাঁ, যে কথা হচ্ছিল। আগে তুমি ডাকাত ছিলে?

—ছিলুম।

—তারপর তোমাকে ও-পথ থেকে ফিরিয়ে আনে তোমার বড়দা, অর্থাৎ আমার বন্ধু বরুণ?

—হ্যাঁ বাবু।

—বরুণকে সবাই ডাকে, 'দীনবন্ধু' বা 'দীনুডাকাত' বলে। পুলিশের চোখে সে-ও ডাকাত বটে, কিন্তু দেশের লোক তাকে বন্ধুর মতন ভালোবাসে। কারণ, ডাকাতি করে সে অত্যাচারী, স্বার্থপর, নির্দয় ধনীদের ওপরে, আর ডাকাতির সব টাকা সে দীন-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়। তার ওপরে, সে কখনও খুনখারাপির ধার দিয়েও যায় না।

—এ-কথা আমার কাছে বলছ কেন ছোড়দা, এসব কথা তো সবাই জানে।

—কিন্তু এ-কথা কি জানো শ্রীধর, তোমাকে পাপ-পথ থেকে ফিরিয়ে এনে বরুণ নিজেই তোমার মতন সাধারণ ডাকাত হয়ে দাঁড়িয়েছে?

শ্রীধর প্রবল মাথা-নাড়া দিয়ে বললে, 'অসম্ভব। এ-কথা আমি বিশ্বাস করি না।'

—আজ সকালেই খবরের কাগজে কী বেরিয়েছে শুনবে?

—যে খবর বিশ্বাস করব না, তা শুনে কী লাভ?

—তবু শোনো।

অরুণ টেবিলের উপর থেকে একখানা খবরের কাগজ তুলে নিয়ে উচ্চস্বরে পাঠ করতে লাগল:

'কলিকাতার বিখ্যাত ও দানশীল ধনকুবের শ্রীযুক্ত পরমানন্দ চৌধুরীর আলয়ে গতকল্য রাত্রে ভীষণ এক ডাকাতি হইয়া গিয়াছে। বিশেষ কোনও কারণে পরমানন্দবাবু কল্য ব্যাঙ্ক হইতে এক লক্ষ টাকা তুলিয়া আনিয়াছিলেন—এক শতখানি এক হাজার টাকার নোট। টাকা তাঁহার শয়নকক্ষেই ছিল। রাত্রে একদল লোক কী উপায়ে তাঁহার বাড়ির মধ্যে গোপনে প্রবেশ করে, তাহা এখনও জানা যায় নাই। পরমানন্দবাবুর অনেক রাত্রি পর্যন্ত পাঠের অভ্যাস ছিল, সুতরাং তখনও তাঁহার শয়নকক্ষের দ্বার বন্ধ করা হয় নাই।

'হঠাৎ পরমানন্দবাবুর কাতর আর্তনাদে বাড়ির আর-সকলের নিদ্রাভঙ্গ হয়। সবাই পরমানন্দবাবুর ঘরের দিকে ছুটিয়া যাইবার সময়ে আট-দশজন লোকের পদশব্দ শুনিতে পায়—কারা যেন সিঁড়ি দিয়া দ্রুতপদে উপর হইতে নীচের দিকে নামিয়া যাইতেছে। কেউ কেউ তাহাদের অনুসরণ করিবার জন্য অগ্রসর হয়, কিন্তু চার-পাঁচ বার রিভলবারের শব্দ শুনিয়া ভয়ে আবার পিছাইয়া আসে। দস্যুদল তখন অবাধে বাড়ির বাহিরে গিয়া 'ব্ল্যাক আউটে'র অন্ধকারে কোথায় মিলাইয়া যায়।

'তারপর সকলে পরমানন্দবাবুর ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া দেখে এক ভয়াবহ দৃশ্য! রক্তাক্ত শয্যার উপরে পড়িয়া রহিয়াছে পরমানন্দবাবু ও তাঁহার সহধর্মিণীর মৃতদেহ—দুইজনেরই সর্বাঙ্গে ধারালো অস্ত্রের দ্বারা আঘাতের চিহ্ন। তারপর দেখা যায়, টেবিলের দেরাজ খোলা এবং এক লক্ষ টাকার নোট অদৃশ্য। নোটের পরিবর্তে সেখানে রহিয়াছে একখানা নীল রঙের খাম। খামের ভিতরে একখানা নীল রঙের কাগজ—তাতে লেখা :

'দীনু'

'আজ আমরা এ-সম্বন্ধে কোনো মতামত প্রকাশ করিব না, কারণ, এখনও এই শোচনীয় ও মর্মভেদী কাহিনীর সমস্ত কথা জানিতে পারা যায় নাই।'

কাগজ পড়া শেষ হওয়া মাত্র শ্রীধর অধীর-স্বরে চিৎকার করে উঠল, 'মিথ্যা কথা, মিথ্যা কথা—একেবারে মিথ্যা কথা! বড়দা করবেন খুন? অসম্ভব!'

অরুণ তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে শ্রীধরের একখানা হাত চেপে ধরে বললে, 'হাতে হাত দাও শ্রীধর, হাতে হাত দাও! তুমি আমার প্রাণের কথাই টেনে বলেছ! এতক্ষণ সন্দেহের কুয়াশায় আমার মনের আকাশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল, তোমার দৃঢ়বিশ্বাসের প্রবল বাতাসে এখন সব কুয়াশা কেটে গিয়েছে। বরুণ করবে হত্যা! আবার যে-সে হত্যা নয়, স্ত্রীহত্যা! অসম্ভব! কিন্তু শ্রীধর, কেবল এই ব্যাপারে নয়, আরও তিন-তিনটে ডাকাতি আর খুনোখুনির ব্যাপারে নীল কাগজে লেখা 'দীনু'র নাম পাওয়া গিয়েছে। এই রহস্যের কারণ তো বুঝছি না!'

শ্রীধর কোনো জবাব দেবার আগেই সদর দরজার সামনে একখানা মোটর সশব্দে এসে থেমে পড়ল। তারপরই দেখা গেল প্রশান্ত চৌধুরীর মূর্তি।

বৈঠকখানায় ঢুকতে ঢুকতে সহাস্যবদনে প্রশান্ত বললে, 'এই যে অরুণবাবু, নমস্কার—কেমন আছেন?'

—'নমস্কার। কেমন আছি জিজ্ঞাসা করছেন? এক মুহূর্ত আগেও ভালো ছিলুম।'

দুই ভুরু কপালের দিকে উত্তোলন করে প্রশান্ত বললে, 'তার মানে?'

—'তার মানে, আপনার আবির্ভাবের সঙ্গে-সঙ্গেই নিজেকে আর ভালো বোধ করছি না। পুলিশের মুখে হাসি দেখলেই আমার বুক ঢিপ ঢিপ করে।'

প্রশান্ত একখানা চেয়ারের উপরে ধুপ করে বসে পড়ে বললে, 'তাহলে কি পুলিশের চোখে অশ্রু দেখলেই আপনার হৃদয় পরম শান্ত হয়?'

—পুলিশের চোখে অশ্রু? সর্বনাশ,— সে যে চরম অশান্তি! ব্যাং-কে দেখে সাপের কান্না? সেটা আরও অসহনীয়।

—এ আপনার অবিচার! এগুলেও আবাগের বেটা, পেছুলেও আবাগের বেটা? ভুলে যাবেন না, পুলিশে চাকরি করি বটে, কিন্তু আমরাও সামাজিক জীব।

ঠিক এই সময়ে বৈঠকখানার সামনে এসে আর-এক মূর্তি অরুণকে সেলাম করলে। একমুখ দাড়ি-গোঁফ, একটা চোখ কানা, গায়ে আধ-ময়লা মের্জাই, পরনে লুঙ্গি।

অরুণ জিজ্ঞাসা করলে, 'কে তুমি?'

—আজ্ঞে, বাণী পুস্তকালয়ের দপ্তরি।

বাণী পুস্তকালয় থেকেই অরুণের সমস্ত গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

অরুণ বললে, 'আমার কাছে কী দরকার?'

—আজ্ঞে, বড়বাবু আপনার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। আপনার নতুন কেতাবের মলাটের জন্যে কতগুলো কাপড়ের নমুনা এনেছি, আপনাকে পছন্দ করে দিতে হবে।

—বেশ, একটু পরে দেখব—এখন বাইরে গিয়ে বোসো।

—আচ্ছা হুজুর। তবে আমার বসবার সময় নেই। নমুনার কাপড়গুলো এই টেবিলের ওপরেই রেখে গেলুম, আপনি পছন্দ করে রাখবেন, আমি ও-বেলায় এসে নিয়ে যাব। সেলাম।

দপ্তরি প্রস্থান করলে।

প্রশান্ত বললে, 'আপনার নতুন কী বই বেরুচ্ছে?'

—প্রশান্তবাবু, আপনি যে আমার এখানে সাহিত্যচর্চা করতে আসেননি, এটুকু অন্তত বুঝতে পারছি। আপনার শুভাগমনের কারণটা জানতে পারি কি?

প্রশান্ত হাসতে হাসতে বললে, 'দেখছি আমার সঙ্গে আপনি বাজে কথা কইতে মোটেই রাজি নন। বেশ, তবে কাজের কথাই হোক। আমার প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, আপনার বন্ধু বরুণবাবুর খবর কী?'

অরুণ বললে, 'হঠাৎ বরুণের খোঁজ কেন?'

এইবারে প্রশান্তর কণ্ঠে জাগল পুলিশের কঠোর স্বর। নীরস স্বরে সে বললে, 'প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করবেন না। আমার কথার জবাব দিন। বরুণবাবুর খবর কী?'

অরুণ বিরক্ত-কণ্ঠে বললে, 'বরুণের খবর জানতে চান তো তার বাড়িতে যান। এটা বরুণের বাড়ি নয়, আমিও তার অভিভাবক নই।'

—এ-কথা আমিও জানি। কিন্তু বরুণ যে আপনার বাড়িতে আনাগোনা না করে পারে না, এটাও কি জানতে আমার বাকি আছে?*

অরুণ বললে, 'যদি বিশ্বাস করেন তাহলে বলতে পারি, আজ ছ-মাসের মধ্যে বরুণকে আমি দেখিনি, বা তার কোনো খবরই পাইনি।'

প্রশান্ত খানিকক্ষণ চুপ করে কী ভাবলে। তারপর বললে, 'বরুণ এখন কোথায় আছে, বলতে পারেন?'

—না। তবে কলকাতায় আছে বলে মনে হয় না।

—কেন?

—কলকাতায় থাকলে খবর পেতুম।

—অর্থাৎ আপনি বলতে চান, বরুণ কলকাতায় থাকলে অন্তত আপনার সঙ্গে দেখা করতে আসত?

অরুণ ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললে, 'আমি কিছুই বলতে চাই না।'

—আহা, রাগ করেন কেন?

—রাগ করাই উচিত।

—উচিত?

—হ্যাঁ।

—আমি বন্ধু-ভাবে কথা কইছি, তবু আপনি রাগ করবেন?

—আপনি বন্ধুর মতন কথা কইছেন না। কথায় কথায় কথার ফাঁদ পাতবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু অন্ধকারে এত ঢিল ছোড়াছুড়ির দরকার কী মশাই? আমি কি বুঝতে পারছি না, আপনার এই আকস্মিক আবির্ভাবের কারণ কী? ডাকাতির পর ডাকাতি হচ্ছে, দীনুর নাম-সই-করা নীল কাগজ পাওয়া যাচ্ছে—

প্রশান্ত বাধা দিয়ে বললে, 'থামুন। আপনার বোধশক্তি দেখে আমি বিস্মিত হচ্ছি।'

অরুণ তিক্তস্বরে বললে, 'বিস্মিত হবার মতন বুদ্ধি আপনার আছে শুনে সুখী হলুম। কিন্তু এই যে সব ডাকাতি হচ্ছে—'

—এগুলোর সঙ্গে আপনার বন্ধু বরুণ ওরফে দীনবন্ধু জড়িত নেই। কেমন, এই বলতে চান তো?

—হ্যাঁ।

—ধরুন, আমিও এ-কথা বিশ্বাস করি!

অরুণ বিস্মিত-কণ্ঠে বললে, 'কী আশ্চর্য, তবে আপনি আমার কাছে এসেছেন কেন?'

—বরুণ এখন কোথায় তাই জানতে। সে যে এখন কলকাতার বাইরে আছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ পেলে আমাদের কাজের যথেষ্ট সুবিধা হয়। আর এ-রকম স্পষ্ট প্রমাণ দিতে পারে কে? একমাত্র আপনি। তাই—

—মশাই—

—থামুন, বাধা দেবেন না। অস্বীকার করবেন না যে, পৃথিবীতে আপনার চেয়ে শ্রেষ্ঠ বন্ধু বরুণের আর কেউ নেই।

—অস্বীকার করছি না। কিন্তু আপনি কি আমাকেও দীনুডাকাতের দলের লোক বলে মনে করেন?

—মোটেই না, মোটেই না। আপনি কবি হতে পারেন, কারণ, 'কাকে' আর 'বকে' মেলাতে পারলেই—এমনকি আজকাল মেলাতে না পারলেও—বাংলা দেশের অনেকেই 'সুকবি' বলে নিজের বিজ্ঞাপন জাহির করে। আপনিও কবি হতে পারেন, কিন্তু ডাকাত হবার শক্তি আপনার নেই। রাতের চাঁদনি, মলয় হাওয়া আর ফুলের মধু সেবন করে যাদের দিন কেটে যায়, তারা কখনোই ডাকাত হতে পারে না। ডাকাত তো দূরের কথা, মাঝে মাঝে আমার সন্দেহ হয়, তারা যথার্থ মানুষ নামের যোগ্য কি না!

—এই অভিনন্দনের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, কবিদের সম্বন্ধে আপনার ধারণা যখন এতই উদার, তখন ডাকাতের সন্ধান নেবার জন্যে আপনি মাধবী-কুঞ্জে হুড়মুড় করে হিপোপটেমাসের মতন ঢুকে পড়ে এত গোলমাল করছেন কেন?

—অকারণেই যে গোলমাল করছি না, তার চাক্ষুষ প্রমাণ দেখুন ওই—বলেই প্রশান্ত একদিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করলে।

অরুণ মুখ ফিরিয়ে সচকিত-চোখে দেখলে, যে-টেবিলের উপরে দপ্তরি মলাটের কাপড়ের নমুনা রেখে গিয়েছিল, তার তলায় পড়ে রয়েছে একখানা নীল রঙের খাম!

অরুণ সবিস্ময়ে ওঠবার উপক্রম করতেই—চিল যেভাবে খাবারের ঠোঙার উপরে ছোঁ মারে ঠিক সেই ভাবেই প্রশান্ত খামখানার উপরে গিয়ে পড়ল। তারপর নিজের চেয়ারের উপরে এসে বসে খামের ভিতর থেকে বার করলে একখানা নীল রঙের কাগজ।

প্রশান্ত কাগজখানা চোখের সামনে তুলে ধরে কী পড়তে লাগল। অরুণ লক্ষ করলে, তার মুখের উপরে ভাবের পরিবর্তন হচ্ছে অতি-দ্রুত।

পড়া শেষ করেই প্রশান্ত এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বৈঠকখানা থেকে বেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ল।

অরুণ অবাক হয়ে ভাবতে লাগল, ব্যাপার কী? নীল খাম, নীল কাগজ! টেবিলের তলায় এল কেমন করে? তবে কী—

প্রশান্ত হুড়মুড় করে আবার ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল। দুই হাত নেড়ে চিৎকার করে বললে, 'আবার ঠকালে—আবার চোখে ধুলো দিলে! আমি একটি গাধা! আমি একটি উল্লুক!'

অরুণ সকৌতুকে বললে, 'নিজেকে এমন সব নিম্নশ্রেণির জীবের সঙ্গে তুলনা করছেন কেন? হল কী?'

—হল কী? হল আমার মাথা আর মুন্ডু!

—মাথা আর মুন্ডু তো আপনার কাঁধের ওপরে আগেও বিদ্যমান ছিল, এখনও আছে। কিন্তু এত বেশি, চ্যাঁচাচ্ছেন কেন?

—চ্যাঁচাচ্ছি কি সাধে? আপনার বন্ধু দেখছি আমাকে পাগল না বানিয়ে ছাড়বে না!

—আমার বন্ধু?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ,—আপনার বন্ধু বরুণ, অর্থাৎ আসল দীনুডাকাত দপ্তরির ছদ্মবেশে এইমাত্র ঘরে এসে আমাকে ফাঁকি দিয়ে আবার সরে পড়েছে!

—আসল দীনুডাকাত, দপ্তরির ছদ্মবেশে! কী বলছেন আপনি!

—ধন্য, ধন্য! দীনুডাকাতের সাহস ধন্য, কৌশল ধন্য, ছদ্মবেশ ধন্য।

—প্রশান্তবাবু, ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলবেন কি?

—বোঝাবার কিছুই নেই। এই চিঠিখানা পড়ে দেখুন বলে প্রশান্ত সেই নীল রঙের কাগজখানা টেবিলের উপরে ফেলে দিলে।

অরুণ কাগজখানা নিয়ে পড়তে লাগল:

বন্ধু হে, অশান্ত চৌধুরী?

আবার বোধ করি তোমার টনক নড়েছে?

কিন্তু বেশি ব্যস্ত হোয়ো না ভায়া, বেশি ব্যস্ত হোয়ো না। ব্যস্ততা হচ্ছে গোয়েন্দার মস্ত শত্রু। ব্যস্ত লোক শায়েস্তা হয় সস্তায়, সে পাহারাওয়ালাও হবার যোগ্য নয়।

সাত নকলে আসল খাস্তা হয়, নকলে নকলে বাজার গেছে ভেস্তে। নকল হীরা, নকল মুক্তো, নকল সোনা, নকল রুপো। তার উপরে আবার খবর পেলুম, বাজারে নাকি নকল দীনবন্ধুরও আবির্ভাব হয়েছে?

অবশ্য, শ্রেষ্ঠ জিনিসেরই নকল হয়। অতএব নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভেবে দূরে বসে নিরাপদ আত্মপ্রসাদ উপভোগ করতে পারতুম অনায়াসেই। ছিলুম অজ্ঞাতবাসে এবং সেখানে আমার প্রতিবেশী ছিল কেবল অম্লান সুনীল আকাশ, দূরে বরফেমোড়া। আর কাছে শ্যামলতায়-ছাওয়া পাহাড়ের পর পাহাড়, বনস্পতির ছন্দ, পাখিদের পাওনা আর ঝরনার নাচ। সেখানে ছিল না শহরের হই হই, মোটরের ভেঁপু, লালপাগড়ির ছুটোছুটি আর অশান্ত চৌধুরীর গর্দভ-গর্জন। বিশেষ করে শেষোক্ত ব্যাপারটা আমার কানে লাগত বড়োই বেসুরো আর বেতালা। হাতির লাথি সইতে রাজি, গাধার গঞ্জনা সহ্য করা অসম্ভব।

অশান্ত,—আমি তোমাকে প্রশান্ত বলে কখনও ডাকতে পারব না, কারণ তুমি প্রশান্ত নও। অশান্ত আমার উক্ত সুখের বাসাটির ঠিকানা জানবার জন্যে তোমার প্রাণ বোধহয় স্বর্গসন্ধানলোভী সাধুর মতন ছটফট করছে? কিন্তু তোমায় আমি ঠিকানা দেব না—কিছুতেই না! তোমাদের উৎপাতে কলকাতা যখন আমার পক্ষে অত্যন্ত উত্তপ্ত হয়ে উঠবে, তখন কলকাতাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ প্রদর্শন করবার জন্যে ওই শান্তি-নিকেতনেই (বোলপুরের নয়) গিয়ে আমাকে আশ্রয় গ্রহণ করতে হবে। তোমরা সারা জীবন ধরে চেষ্টা করলেও আমাকে আবিষ্কার করতে পারবে না।

আমার এই পরম নিভৃত শান্তি-নিকেতন ছাড়লুম কেন জানো? নকল দীনুর অত্যাচারে। নকল দীনুর বোধহয় বিশ্বাস পুলিশ হচ্ছে গাধা-গোরুর চেয়েও নির্বোধ জীব। তাই সে আমার নাম ধারণ করে তোমাদের বিপথে চালনা করতে চায়। তোমরা ব্যস্ত হয়ে থাকবে আমার অন্বেষণে, আর ওই ফাঁকে সে আড়ালে থেকে অনায়াসে ডাকাতির পর ডাকাতি করে বেড়াবে। ফন্দিটা মন্দ নয়। তবে আমার বিশ্বাস, তুমি গাধা হতে পারো, কিন্তু গাধার চেয়ে হাঁদা জীব নও। অন্তত নকল দীনুর এই কাঁচা চালাকিটা ধরে ফেলবার মতন বুদ্ধি আছে তোমার ঘটে।

বাংলাদেশের জনসাধারণের মধ্যে গোপালের মতন সুবোধ বালকরাই দলে বেশি ভারী। (জানো তো, 'গোপাল বড়ো সুবোধ বালক, সে যা পায় তাই খায়, যা পায় তাই পরে'?) নকল দীনুর কীর্তিকলাপ দেখে তারা নিশ্চয়ই ধরে নেবে, আমি হয়ে উঠেছি এক স্বার্থপর, অধম, রক্তপিপাসী নরদানব—স্ত্রী-হত্যা করতেও আমার হাত কাঁপে না। অন্তত তুমি মানবে, আমার কার্যকলাপ আইনসংগত না হলেও, আমি খুনিও নই আর নিজের লাভের লোভেও চুরি-ডাকাতি করি না। আমার ডাকাতির অভিনয় হচ্ছে মাত্র Charity Performance-এর মতোই সাধারণ ব্যাপার।

কোনো হতভাগা নকল দীনুকেই আমার নামে কলঙ্ক-কালি মাখাতে দেব না। সে যত বড়ো শক্তিমানই হোক, আমি তাকে দমন করবই। তাকে খুঁজে বার করবার জন্যেই আমার কলকাতায় আগমন। এবং আমি তোমার মতন গাধা নই বোধহয়, কী বলো হে? সুতরাং নকল দীনুর গর্তের ঠিকানা জানবার জন্যে আমার খুব বেশি দেরি হবে না বলেই আশা করি।

নকল দীনুর ঠিকানা পেলেই তোমাকে আমি খবর দেব। মধুর অভাবে লোকে গুড় খেয়েই খুশি হয়। আসল দীনুর বদলে নকল দীনুকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও তোমার যশ হবে দেশব্যাপী। তোমার পক্ষে সেটা অল্প লাভ নয়।

নীল কাগজে লেখা আমার আরও চিঠি তুমি আগেও পেয়েছ। কিন্তু সেসব চিঠিতে তুমি কোনোদিন কি আমাকে কেবল 'দীনু' বলে নাম-সই করতে দেখেছ? না। যখনই আমি কারুকে চিঠি পাঠাই, তার তলায় লিখি—

'দীনবন্ধু'

পত্র পাঠ করে অরুণ নীরবে প্রশান্তের মুখের পানে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

প্রশান্ত বললে, 'দেখছেন অরুণবাবু, আমি এখানে এসে কিছুমাত্র ভুল করিনি? যেমন চাল-ডাল দরকার হলে লোকে যায় মুদির দোকানে, তেমনি দীনুডাকাতকে পেতে হলে সকলকে আসতে হবে আপনারই বাড়িতে! আমি যে জানি, দীনুডাকাত যদি কলকাতায় থাকে, তাহলে সে চুম্বকের টানে লোহার মতন এখানে না এসে থাকতে পারবে না!'

অরুণ বললে, 'আজকের ব্যাপারের পর আমি আর প্রতিবাদ করবার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। তাহলে বলতে পারেন কি, কবে আমার নামে ওয়ারেন্ট জারি হবে?'

প্রশান্ত বললে, 'যে-কোনো ভাবে ওয়ারেন্ট এনে যাকে-তাকে গ্রেপ্তার করা আমার স্বভাব নয়। দীনুডাকাত যে আপনার আহ্বানে এখানে আসে না, এটা আমার অজানা নেই। কোনো পাগলা কুকুর কারুর বাড়িতে ঢুকে কারুকে কামড়ালেই যে সেই বাড়ির মালিককে দায়ী করতে হবে, এতখানি নির্বুদ্ধিতা আমার নেই।'

অরুণ বললে, 'আপনার সুবুদ্ধিকে অগুনতি ধন্যবাদ!'

প্রশান্ত ঘরের বাইরের দিকে যেতে যেতে ফিরে অপ্রসন্ন-স্বরে বললে, 'আমার সুবুদ্ধিকে আপনি তো ধন্যবাদ দিচ্ছেন! কিন্তু এর চেয়ে আমি খুশি হই, আপনার বন্ধু বরুণের সঙ্গে দেখা হলে যদি আপনি দয়া করে বলেন যে, আমি গাধার চেয়ে হাঁদা জীব নই। অর্থাৎ আজকের নীল কাগজে লেখা চিঠি পাবার আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলুম যে, এই নকল দীনু আর বরুণ ওরফে দীনুডাকাত একই লোক নয়!'

অরুণ মুখ টিপে হেসে বললে, 'দীনুডাকাতের সঙ্গে আর কি আমার দেখা হবে?'

প্রশান্ত দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে দুই হাত ভঙ্গিভরে নেড়ে নেড়ে বললে, 'আ-হা-হা, মরে যাই আর কী! কবিদের মেয়েলি ঢং দেখে গা যেন জ্বালা করে! দীনুডাকাতের সঙ্গে আপনার আর দেখা হবে না? মৌচাকে মৌমাছি আসবে না, এও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে নাকি?'

অরুণ বললে, 'আজ ক্রমাগত আপনার উপমার অত্যুক্তি দেখে বিস্মিত হচ্ছি।'

প্রশান্ত আবার পদচালনা করে বললে, 'কারণ আমি কবির বাড়িতে এসেছি। সঙ্গদোষে আমিও হয়ে পড়েছি কবি!'

তৃতীয়

নকল দীনুর ঘোমটা মোচন

দুই নৌকোয় পা দিয়ে প্রশান্ত ঠেকেছে ভারি মুশকিলে।

'দীনু' নাম নিয়ে যে-ধড়িবাজ লোকটা ক্রমাগত ডাকাতি করে বেড়াচ্ছে, সে যে আসল দীনুডাকাত নয়, প্রশান্ত এটা বুঝতে পেরেছিল সত্য-সত্যই। দীনুডাকাতের কার্যপদ্ধতির সঙ্গে এই নকল দীনুর কোনো ব্যাপারেরই মিল ছিল না। প্রশান্তের মতন পাকা পুলিশ কর্মচারীর চোখে এত সহজে ধূলিনিক্ষেপ করা সম্ভবপর নয়।

এই নকল দীনুকে অন্ধকার থেকে আলোকে আনবার জন্যে ইতিমধ্যেই সে চারিদিকে চর পাঠিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু চরেরা কোনো সন্তাোষজনক সংবাদ আনবার আগেই নাট্যমঞ্চে হল আসল দীনুডাকাতের নাটকীয় আবির্ভাব! এর জন্যে প্রশান্ত প্রস্তুত ছিল না। একসঙ্গে এই আসল আর নকলের ভার বহন করা তো বড়ো চাট্টিখানি কথা নয়।

অনেক ভেবে-চিন্তে শেষটা সে স্থির করলে যে, আপাতত পারদের মতন পিছল দীনুডাকাতের আশা ত্যাগ করাই উচিত। নকল দীনুকে ফাঁসিকাঠের দোলনায় দোলাবার ব্যবস্থা করবার পর আসলকে নিয়ে 'চোর-চোর খেলা'র অবসর পাওয়া যাবে যথেষ্ট।

কিন্তু দু-দিন পরেই বোঝা গেল, এই নকলটিও বড়ো সোজা জীব নয়। কলকাতায় সমস্ত বদমাইশ ও গুন্ডার আড্ডায় আড্ডায় খোঁজখবর নিয়েও নকল দীনুর টিকির ইঙ্গিতটুকু পর্যন্ত পাওয়া গেল না। পরে পরে দেওঘর, হাওড়া ও কলকাতা-চমকপ্রদ ডাকাতি করতে পারে, এমন একটা বৃহৎ দল বিপুল পুলিশ বাহিনীর সতত সতর্ক তীক্ষ্নদৃষ্টির সামনেও কী করে যে বেমালুম আত্মগোপন করতে পারে, প্রশান্ত এটা কিছুতেই আনতে পারলে না ধারণায়।

দীনুডাকাত তাকে ভরসা দিয়েছে, নকল দীনুকে সে আবিষ্কার করবে। কিন্তু দীনুডাকাতের মতন পরমশত্রুর কাছে উপকৃত হবার ইচ্ছা তার একটুও নেই। যদিও সব দেশেরই পুলিশ বিভাগে কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার মতন চোরের সাহায্যে চোর ধরবার ব্যবস্থা প্রচলিত আছে, কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে সে ব্যবস্থা অচল। দীনুডাকাত বার বার তাকে ফাঁকি দিয়েছে, তার জন্যে প্রশান্তের সুনামই কেবল ক্ষুণ্ণ হয়নি, দেশের ও দশের সামনে বার বার তাকে হতে হয়েছে দস্তুরমতন হাস্যাস্পদ। এখন তার জীবনের একমাত্র উচ্চাকাঙ্ক্ষা হচ্ছে, দীনুডাকাতকে গ্রেপ্তার করে সমস্ত অপমানের প্রতিশোধ নেওয়া। দীনুডাকাতের কাছে সে কৃতজ্ঞ হবে? কখনও না, কখনও না!

দীনুডাকাতের আগেই নকল দীনুকে ধরে ফেলবার জন্যে প্রশান্ত উঠে পড়ে লেগে গেল। কিন্তু তার সমস্ত বুদ্ধি-চাতুর্যই হল নিষ্ফল। সে বুঝলে, আসলের মতন এই নকলটিও হচ্ছে 'অগাধ জলের মকরে'র মতন।

তার পরেই হল নৈহাটির এক ধনী ও ব্যবসায়ী মাড়োয়ারির বাড়িতে ভীষণ এক ডাকাতি। সেখানে মারা পড়ল চারজন লোক ও আহত হল সাতজন। এবং সেখানেও পাওয়া গেল 'দীনু' নাম-লেখা নীল চিঠি।

প্রশান্ত প্রায় মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে হতাশভাবে বললে, 'নকলের অত্যাচার আর সাহস ক্রমেই বেড়ে উঠছে দেখছি। আমার মানসম্ভ্রম সবই গেল!' উপরওয়ালাদের কাছ থেকে তাকে যেসব কথা শুনতে হল, কোনো কম্পোজিটারই তা 'কম্পোজ' করতে রাজি হবে না।

তিন দিন পরে প্রশান্তর নামে ডাকযোগে এল একখানা নীল রঙের খাম। আবার কী নতুন হাঙ্গাম ভেবে সে ভয়ে ভয়ে নীল খামের ভিতর থেকে একখানা নীল কাগজ বার করে পড়তে লাগল :

'অশান্তভায়া,

বোধহয় মহাদেও মিশিরের নাম শোনোনি? না শোনাই সম্ভব। কারণ সে কাজ করে যবনিকার অন্তরালে বসে।

মহাদেওয়ের দেশ হচ্ছে—মির্জাপুরে। কিন্তু সে কলকাতায় আছে ছেলেবেলা থেকে। কিছু কিছু লেখাপড়া শিখেছে আর বাংলা বলে বাঙালির মতন।

তার আছে দুটো বড়ো বড়ো গোরুর গাড়ির আড্ডা, মস্ত বড়ো কোকেনের ব্যবসায়, দুটো জুয়াখানা আর চোর-পকেটমার-গুন্ডার বৃহৎ দল। কিন্তু সাক্ষাৎ সম্পর্কে বা কাগজে কলমে কোনো দলের সঙ্গেই তার যোগ নেই। কয়েকজন ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ছাড়া কেউ তাকে মালিক বলে জানে না। আর বেনামে ব্যাবসা চালায় বলে কোনোদিনই সে পুলিশের দয়াদৃষ্টিগোচর হয়নি।

আজ কিছুকাল হল মহাদেও ডাকাতি-ব্যবসায়ও ধরেছে। কিন্তু সে এ ব্যাবসায়ও চালায় বেনামে—অর্থাৎ আমার নামে। কারণ সেই-ই হচ্ছে নকল দীনু।

যাদের নিয়ে সে ডাকাতের দল গড়েছে, তাদের কারুকেই সে কলকাতায় থাকতে দেয় না। বাংলাদেশের কয়েকটি জায়গায় তার ভিন্ন ভিন্ন আড্ডা আছে। দলের প্রত্যেক লোকই দিনের বেলায় সাধুর মতন নানা কাজ বা চাকরি করে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিকে ফাঁকি দেয়। কেবল কোনো ডাকাতির সময়ে তারা এক জায়গায় সমবেত হয়, তারপর আবার ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।

মহাদেওকে আমি দেখেছি। মাথায় সে প্রায় সাড়ে-ছয় ফুট উঁচু। রং প্রায় কালো। সারা মুখে বসন্তের দাগ। দৃষ্টি বিষম তীক্ষ্ন—যার দিকে তাকায় যেন আলপিনের মতন খোঁচা মারে, কিন্তু চোখদুটো অসম্ভব-রকম ছোটো। খ্যাঁদা নাক। কাটা ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হলদে-হলদে দাঁত দেখা যায়। সুতরাং তাকে সুপুরুষ বলা যায় না। আমার মতে, সে তোমারও চেয়ে কুৎসিত।

মহাদেও পোশাক পরে বাঙালিবাবুর মতন। তার শৌখিনতাও কম নয়। ওই চেহারায় আবার শখ করে রেখেছে বাবরি-কাটা চুল। বিড়ির বদলে 'স্টেট-এক্সপ্রেস' সিগারেট টানে। গলায় পরে বা হাতে জড়ায় ফুলের মালা। পিতলে-বাঁধানো পাকা বাঁশের লাঠির বদলে ব্যবহার করে সরু ফিনফিনে সোনা-বাঁধানো ছড়ি। সর্বদাই জামায় এসেন্স ছড়ায় ও হাতে-মুখে 'স্নো' মাখে। গিলে-করা চুড়িদার পাঞ্জাবি। কোঁচানো দিশি কাপড়। পায়ে লপেটা। তার বেশভূষা দেখলে মনে হয়, নিজেকে সে কার্তিকের প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে।

সে ফুলবাবু সাজতে চায় বটে, কিন্তু তার দেহ ফুলের ঘায়ে কাতর হবার মতন নয়। তার বুকের বেড় বোধ করি চুয়াল্লিশ ইঞ্চির কম নয়। শুনেছি তার গায়ে হাতির মতন জোর আছে। পালোয়ানদের আসরেও এক সময়ে সে ছিল সুবিখ্যাত। মহাদেওয়ের বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। তার গলার আওয়াজও অদ্ভুত। সে যখন চেঁচিয়ে কথা কয়, মনে হয় যেন কোনো স্টিমারের 'সাইরেন' সবাক হয়ে উঠেছে।

মহাদেওয়ের একখানি অবিকল ফোটোগ্রাফ তোমাকে উপহার দিলুম। এখন তাকে দেখলেই চিনতে পারবে তো?

তার আর-একটি বিশেষত্ব আছে। সে যত বেশি রাগে তত বেশি হাসে, আর তত বেশি আস্তে কথা কয়।

একটিমাত্র ব্যবসায় সে প্রতিনিধির দ্বারা চালনা করে না। প্রত্যেক ডাকাতির সময়ে দলের সঙ্গে হাজির থাকে। তার নেতা হবার যোগ্যতা আছে। তার উপস্থিতিতে দলের প্রত্যেক লোক আরও মরিয়া, আরও উৎসাহিত হয়ে ওঠে।

মহাদেও ভয়ংকর নিষ্ঠুর ও রক্তলোভী। মানুষকে নতুন নতুন উপায়ে যন্ত্রণা দিয়ে হত্যা করবার সুযোগ ছাড়ে না।

আমার এক বিশ্বস্ত অনুচর ডায়ামন্ডহারবারের জঙ্গলের ভিতরে মহাদেওয়ের একটি গুপ্ত আস্তানা আবিষ্কার করেছে। চিঠির সঙ্গে একখানি ম্যাপ এঁকে দিলুম। এই ম্যাপ দেখে যে-কোনো শিশুও আস্তানাটা চিনে নিতে পারবে। আমার বিশ্বাস, খুব সম্ভব তুমি শিশুর চেয়ে বুদ্ধিমান। তোমার কী বিশ্বাস?

আগামীকাল, রাত নয়টার পর ওই আস্তানায় মহাদেওয়ের এক পরামর্শসভা বসবে। যদি সাধ আর সাধ্য হয়, মহাদেওকে গ্রেপ্তার করে গৌরব অর্জন কোরো। এই প্রথম সুযোগ আমি তোমাকেই দিলুম। যদি অক্ষম হও, দ্বিতীয় সুযোগ গ্রহণ করব আমি নিজেই।

কিন্তু একটি অনুরোধ, তোমার জন্যে আমি এত পরিশ্রম করলুম, তোমাকেও আমার একটি কথা রাখতে হবে। আমার চর মহাদেওয়ের দলের সঙ্গেই আছে। ঘটনাচক্রে সে-ও যদি ধরা পড়ে, তাকে তোমরা মুক্তি দিয়ো। পুলিশকে সাহায্য করতে গিয়ে সে বেচারা শাস্তি ভোগ করবে কেন?

আপাতত আমার সম্বন্ধে তুমি নিশ্চিন্ত থেকো। মহাদেওকে পথ থেকে না সরিয়ে আর আমি কোনো বেআইনি কাজ করে তোমার শান্তিভঙ্গ করব না। তারপর আবার আরম্ভ হবে আমাদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ। ইতি

আপাতত তোমার বন্ধু

দীনবন্ধু'

পত্রখানা পাঠ করবার পর প্রশান্তর হল হরিষে বিষাদ।

এতদিন পরে নকল দীনুর একটা পাত্তা পাওয়া গেল বটে, কিন্তু আবার তাকে পরাজয় স্বীকার করতে হল দীনুডাকাতের কাছে। এই বিপুল পুলিশ বাহিনীর সাহায্য পেয়েও সে যে- মহাদেওয়ের টিকি পর্যন্ত দেখতে পায়নি, দীনুডাকাত তাকেই এনে দিলে তার হাতের মুঠোর কাছে! মহাদেওকে গ্রেপ্তার করতে পারলে তার সুনাম বাড়বে বটে, কিন্তু এ সুনামের মধ্যে ফাঁকি থাকবে যে কতখানি, সে নিজে এটা তো কোনোদিনই ভুলতে পারবে না!

দীনুডাকাতের এই অমূল্য সাহায্যের জন্যে প্রশান্ত কৃতজ্ঞতা অনুভব করতে পারলে না, বরং দীনুর উপরে তার রাগ আর আক্রোশ আরও বেড়ে উঠল।

প্রশান্ত ডায়ামন্ডহারবারের অভিযানের জন্যে প্রস্তুত হতে লাগল।

চতুর্থ

হানাবাড়ির জঙ্গলে

ডায়ামন্ডহারবার। জঙ্গলের মধ্যে একখানা সেকেলে মস্ত বাড়ি। সংস্কারের অভাবে বাড়িখানার দুরবস্থা হয়েছে যৎপরোনাস্তি। বহু স্থলেই তার উপর থেকে চুন-বালির প্রলেপ বিলুপ্ত হয়েছে এবং তার চারিদিককার ইট-বার-করা দেওয়াল ও ছাদ হয়েছে বুনো গাছপালার আশ্রয়-নীড়।

বাহির থেকে দেখলে কেউ বলতে পারবে না যে, এই পোড়োবাড়ির মধ্যে শৃগাল-কুকুর-সর্প ছাড়া মনুষ্যজাতীয় জীবের অস্তিত্ব আছে। জঙ্গলের ভিতরে পথের চিহ্ন পর্যন্ত নেই এবং স্থানীয় লোকেরা দিনেরবেলাতেও এ-বাড়ির ত্রিসীমানায় আসতে রাজি হয় না। সকলেরই বিশ্বাস, এ হচ্ছে হানাবাড়ি। যারা পথ ভুলে এখানে এসে পড়ে স্বচক্ষে মূর্তিমান ভূত-পেত্নী দর্শন করেছে, এমন-সব লোকেরও অভাব নেই। জিজ্ঞাসা করতে-না-করতেই তারা তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কাহিনি তোমার কাছে বর্ণনা করতে রাজি হবে সাগ্রহে। যাদের এরকম চাক্ষুষ পরিচয় লাভের সৌভাগ্য হয়নি, এমন একাধিক ব্যক্তি জঙ্গলের কাছ দিয়ে যেতে যেতে অমানুষিক পুরুষ ও নারীকণ্ঠে সানুনাসিক স্বরে হাস্য ও ক্রন্দনধ্বনি পর্যন্ত শুনতে ভোলেনি। হানাবাড়ির জঙ্গলের নাম তুললে এ অঞ্চলের দুষ্টু ছেলেরাও শান্ত না হয়ে পারে না।

রাত সাড়ে-নয়টা। চাঁদ-তারা-মোছা আকাশের বুকে জমে আছে পুরু মেঘের কালিমা। মাঝে মাঝে জাগছে প্রখর বিদ্যুতের হিজিবিজি আলোর টান এবং বাজের গড় গড় গড় গড় আওয়াজ। অশ্রান্ত বৃষ্টির ঝংকারে এবং গাছ-দোলানো ঝোড়ো হাওয়ার হুংকারে চতুর্দিক পরিপূর্ণ। যেন ভৌতিক রাত্রি।

হানাবাড়ির জঙ্গল আজ যেন আরও অপার্থিব হয়ে উঠেছে। সেদিকে তাকালে অন্ধকারের বিভীষিকা ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ে না। বিদ্যুতের ক্ষণিক দীপ্তি যেন দেখিয়ে দেয়, একটা বিরাট কালো চাপ-বাঁধ অভিশাপ পৃথিবীর বুকে চেপে বসে করছে ছটফট ছটফট। বাঁশবনে ঝড়ের ঝাপটা ঢুকলেই মনে হয়, ভূত-প্রেতরা যেন পরস্পরের সঙ্গে করছে ঠকাঠক লাঠালাঠি।

এক-একবার সন্দেহ হয়, অন্ধকারের ভিতরে কারা যেন ফিসফিস করে কথা কইছে আর পা টিপে টিপে চলা-ফেরা করছে। মন বলে, এখানে বসেছে কায়াহীন ছায়ামূর্তিদের ষড়যন্ত্রসভা।

আচম্বিতে জঙ্গলের বক্ষ ভেদ করে জাগল শেয়ালের তীব্র চিৎকার। একবার, দুইবার, তিন বার।

কে চুপিচুপি ভয়ে ভয়ে বললে, 'স্যার, শেষটা পাগলাশেয়ালের কামড় খেয়ে মরব নাকি?'

—মূর্খ! পাগলাশেয়াল নয়, মানুষের চিৎকার! সংকেত-ধ্বনি! এ প্রশান্তর কণ্ঠস্বর।

—মানুষের চিৎকার! সংকেত-ধ্বনি!

—হ্যাঁ, হ্যাঁ! আমরা ধরা পড়ে গেছি। বনের ভিতরে মহাদেওয়ের চর আছে। সংকেত করে সে আমাদের কথা জানিয়ে দিলে!

—তাহলে?

—ওরা পালাবার আগেই আমাদের আক্রমণ করতে হবে। প্রশান্ত পকেট থেকে বাঁশি বার করে খুব জোরে দিলে ফুঁ!

সঙ্গে সঙ্গে নিবিড় বন্য অন্ধকার 'টর্চে'র আলোক-বাণে হয়ে গেল ক্ষতবিক্ষত! চারিদিকে উঠল দলে দলে মানুষের দ্রুত পদশব্দ!

প্রশান্ত চিৎকার করে বললে, 'সবাই বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ো! সব ঘর খুঁজে দ্যাখো!' সে নিজেও জনাপাঁচেক লোক নিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করলে। প্রত্যেকের এক হাতে রিভলভার, আর এক হাতে টর্চ।

আগাছায় ভরা মস্ত উঠোন, চারদিকে সারবন্দি ঘর। এক-এক দল পুলিশের লোক এক-এক দিকে ছুটে গেল। কিন্তু কোনোদিকেই কেউ বাধা দিতে এগিয়ে এল না।

প্রশান্ত একটা শূন্য ঘর পার হয়ে প্রকাণ্ড একখানা হলের ভিতর প্রবেশ করলে। মেঝের উপর মস্ত শতরঞ্জ পাতা। এক দিকে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে চুপ করে একা বসে আছে বিরাট এক মূর্তি।

তার মুখের উপরে টর্চের আলো ফেলে প্রশান্ত তাকে ভালো করে দেখতে লাগল। দীনুডাকাতের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে গেল। প্রশান্তর মন ভারি খুশি হয়ে উঠল। এত সহজে যে দুর্ধর্ষ মহাদেওয়ের দেখা পাওয়া যাবে, এটা সে ভাবতেও পারেনি।

মহাদেও মুখ টিপে টিপে হাসছিল। প্রশান্তর মনে পড়ল দীনুর আর-একটা কথা। মহাদেও যত বেশি রাগে, তত বেশি হাসে।

প্রশান্ত বললে, 'কে তুমি? এই পোড়োবাড়িতে অন্ধকারে বসে কী করছ? আর হাসছইবা কেন?

লোকটা তেমনি হাসিমুখেই খুব শান্ত ও মৃদুস্বরে বললে, 'তোমাদের দেখে। আমি একটিমাত্র মানুষ, আর তোমাদের ছ-জনের হাতে ছ-টা চকচকে রিভলভার। হাসব না?'

—হাসি এখনই বার করছি। তোমার নাম কী?

—মহাদেও।

—আমি তোমাকে গ্রেপ্তার করলুম।

—কেন?

—তুমি ডাকাত।

—তোমার কাছে ওয়ারেন্ট আছে?

—আছে।

মহাদেও আচমকা ভয়ংকর উচ্চস্বরে গর্জন করে উঠল—মানুষের কণ্ঠে তেমন তীব্র ও তীক্ষ্ন বীভৎস চিৎকার কেউ কখনও শোনেনি—সকলেই চমকে বিহ্বলের মতন তার মুখের পানে চেয়ে রইল—অন্তত এক মুহূর্তের জন্যে স্থান-কাল-পাত্র ভুলে।

কিন্তু যাদের দরকার তাদের পক্ষে সেই এক মুহূর্তের অন্যমনস্কতাই হল যথেষ্ট!

নিঃশব্দে পিছন দিকের দেওয়ালের দুটো দরজা খুলে গেল এবং চোখের পলক পড়তে-না-পড়তেই দশ-বারোজন যমদূতের মতন মূর্তি মহা বেগে ছুটে এসে পুলিশের লোকেদের উপরে চালাতে লাগল ধড়াদ্ধড় লাঠি। প্রশান্ত ও তার সঙ্গীরা মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ে একেবারে অজ্ঞান। আগন্তুকরা এত তাড়াতাড়ি কাজ সেরে ফেললে যে, কেউ বাধা দেবার বা টুঁ-শব্দটি পর্যন্ত উচ্চারণ করবার এতটুকু সময় পেলে না।

মহাদেও টপ করে দাঁড়িয়ে বললে, 'চটপট এ-ঘরে আসবার দরজাগুলো বন্ধ করে দে!'

কথামতো কাজ হতে দেরি লাগল না।

মহাদেও হেসে বললে, 'দেখলি আলগু, এক হুমকিতেই কেল্লা ফতে? একটা হুমকি শুনেই যারা ভড়কে যায় তারা এসেছে আমার সঙ্গে লাগতে! আরে ধেৎ!'

আলগু বললে, 'শাবাশ বাবুজি!'

মহাদেও চিন্তিত-স্বরে বললে, 'কিন্তু একটা ভাবনার কথা হচ্ছে, পুলিশকে আড্ডার খবর দিলে কে? আমার দলে কোনো বেইমান আছে নাকি?'

হঠাৎ ঘরের বন্ধ দরজার উপরে পড়তে লাগল দুমদাম লাথি!

মহাদেও ব্যস্তভাবে বললে, 'ডবল মজবুত দরজা—নতুন করে বানিয়েছি, ভাঙতে দেরি লাগবে। আলগু, তার আগেই সুড়ঙ্গ দিয়ে আমাদের সরে পড়তে হবে!'

ভূপাতিত অচেতন দেহগুলোর দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে আলগু বললে, 'আর এই আদমিগুলো!'

মহাদেও বললে, 'কাতলামাছ আছে খালি একটা—বাকি সব চুনোপুঁটি। ওই লোকটা হচ্ছে গোয়েন্দা প্রশান্ত চৌধুরী—ওকে ছাড়া চলবে না। ওটাকে তুলে সঙ্গে নিয়ে চল।'

পঞ্চম

থলি-বন্দি

জ্ঞান হতেই প্রশান্ত বুঝলে, তার হাত আর পা দড়ি দিয়ে বাঁধা। উঠে বসবার উপায় নেই।

চোখ মেলেও দেখলে কেবল অন্ধকার। তারপরেই অনুভব করলে, তার দেহের চারিপাশে রয়েছে কীসের আবরণ। সেই বন্দি অবস্থাতেও যথাসম্ভব অঙ্গ-সঞ্চালন করে সে জানবার চেষ্টা করলে, কীসের এই আবরণ?

সঙ্গে সঙ্গে মহাদেওয়ের কণ্ঠস্বর জাগল: 'কী প্রশান্তবাবু, অত ছটফট করছ কেন?'

প্রশান্ত জবাব দিলে না।

মহাদেও বললে, 'ছটফট করে লাভ নেই বাপু। তোমাকে আমরা একটা থলির ভিতরে পুরে রেখে দিয়েছি।'

—কেন?

—একটু পরেই জানতে পারবে।

—আমি এখনই জানতে চাই।

—তোমার হুকুম তামিল করবার লোক এখানে নেই।

খানিকক্ষণ নীরবে কাটল। প্রশান্ত মনে মনে ভাবতে লাগল, আমাকে নিয়ে এরা কী করতে চায়?

মহাদেও আবার মুখ খুললে। ধীরে ধীরে বললে, 'প্রশান্তবাবু, তুমি ছাড়া পেতে চাও?'

প্রশান্ত ক্রুদ্ধকণ্ঠে বললে, 'এ-কথা জিজ্ঞাসা করাও বাহুল্য।'

—মাইরি বলছি, আমি তোমাকে ছেড়ে দেব।

—তুমি ভারি দয়ালু দেখছি।

—কিন্তু এক শর্তে।

—শর্তটা শুনি।

—কী করে আমার খোঁজ পেলে, সেই কথাটা আমাকে বলতে হবে।

—তোমার মতন গুণী ব্যক্তির খোঁজ নেওয়াই হচ্ছে আমার পেশা।

—কিন্তু কে তোমাকে আমার নাম-ঠিকানা বাতলে দিলে?

—বলব না।

—বললে এখনই ছাড়ান পাবে।

—আর, না বললে?

—মারা পড়বে।

—এত সাহস তোমার হবে?

মহাদেও কর্কশ-কণ্ঠে বললে, 'আমার সাহসের কতটুকু খবর তুমি রাখো হে বাপু? মহাদেও যমকে ডরায় না।'

—তাই বুঝি নিজের নাম লুকিয়ে, দীনুর নামের আড়ালে ডাকাতি চালাতে? বলিহারি সাহস!

মহাদেও পাগলের মতন হা হা করে হাসতে হাসতে থলের উপরে প্রচণ্ড এক চপেটাঘাত করে বললে, 'চোপরাও গাধা! যতবড়ো মুখ নয় ততবড়ো কথা!'

প্রশান্ত বললে, 'আমার হাত-পা খোলা থাকলে চড় মারার ফল তোমাকে দেখাতুম।'

মহাদেও আবার হা হা করে হেসে বললে, 'তুই আবার কী করতিস রে! আমি যে তোকে বাঁ হাতে তুলে ধরে দশ হাত দূরে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি! বাংলা বলছি বটে, কিন্তু আমি কুচো-চিংড়ি-খেকো বাঙালিবাবু নই,—বুঝেছিস?'

—বাজে মুখ-শাবাশি রাখো মহাদেও, এখন আমাকে নিয়ে কী করতে চাও বলো।

—বললুম তো।

—কী বললে?

—তোমাকে ছেড়ে দেব।

—ওই শর্তে?

—আলবত!

—রাজি নই।

—বাঁচতে চাও না?

—সব কথা স্বীকার করলেও আমি মুক্তি পাব বলে মনে হচ্ছে না।

—কেন?

—তোমার কথায় বিশ্বাস কী?

—আমি শপথ করছি।

—বাঘ শপথ করলেও রক্তলোভ ছাড়ে না।

—বটে! কিন্তু তোমার মুখ থেকে এখনই আমি সব কথা আদায় করে নিতে পারি তা জানো?

—চেষ্টা করে দ্যাখো।

—জ্যান্ত রেখে তোমাকে মৃত্যু-যন্ত্রণা সহ্য করাব। তোমার সর্বাঙ্গে বিঁধিয়ে দেব আগুনে-পোড়ানো শত শত সূচ। একে একে তোমার কান কেটে নেব, নাক কেটে নেব, ঠোঁট কেটে নেব, তারপর—

—থামো, থামো, তারপর আরও কী কী করবে সে-ফর্দ আমি জানতে চাই না। যেটুকু বললে, তাই শুনেই শরীর রোমাঞ্চিত হওয়া উচিত।

—কেমন, এইবার পিলে চমকে গেল তো?

—ধরো, তাই।

—তাহলে রাজি?

—না।

—মানে?

—মারো-ধরো, কষ্ট দাও, যা-খুশি করো। আমি বোবা হয়েই থাকব।

—তবে রে হারামজাদা!

—চুপ কর পাজি পশু! বাইরে থাকলে আমি তোর মুখে থুতু দিতুম। আমি তোর আর কোনো কথার জবাব দেব না।

—বেশ, তবে মজা দেখ!

পদশব্দ শুনে প্রশান্ত বুঝলে, মহাদেও সেখান থেকে উঠে চলে গেল। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ।

প্রশান্ত ভাবতে লাগল। অতঃপর এরা কী করবে? তাকে হত্যা করবে, না যন্ত্রণা দেবে?

প্রথমটা প্রশান্তর সন্দেহ হয়েছিল, দীনুডাকাতেরই ষড়যন্ত্রে আজ সে ফাঁদে পড়েছে। সেই-ই বুঝি কৌশলে তাকে পথ থেকে সরাতে চায়!

এখন বোঝা যাচ্ছে, দীনুর সঙ্গে মহাদেওয়ের কোনো সম্পর্ক নেই। থাকলে, মহাদেওয়ের এত বেশি আগ্রহ হত না—কে তার নাম-ঠিকানা দিয়েছে, জানবার জন্যে।

হ্যাঁ, এ সত্য অস্বীকার করবার জো নেই যে, দীনু—ডাকাত হলেও উচ্চশ্রেণির ডাকাত। বিলাতের রবিনহুডের মতন, সেকেলে—বাংলার বিশুডাকাতের মতন সে গরিবের মা-বাপ। তার উচ্চ আদর্শ আছে—যদিও সেই আদর্শের কাছে গিয়ে পৌঁছোবার জন্যে দীনু যে-পথে পা বাড়িয়েছে তা সুপথ নয়, কুপথ। কিন্তু সে সাধু ও দানী ধনীর উপরে হানা দেয় না। মানুষকে প্রাণে মারে না। ডাকাতির এক পয়সাও নিজে ছোঁয় না। হয়তো দীনুকে সাধু ডাকাত বলেও ডাকা চলে!

তার এই দুর্দশার জন্যে দীনুকে দোষও দেওয়া যায় না। দীনু তো তাকে ঠিক পথই বাতলে দিয়েছিল, আর সে-ও এসেছিল সদলবলে, দস্তুরমতো সশস্ত্র হয়ে। সে প্রস্তুত থাকলে কেউ তাকে ফাঁকি দিতে পারত না কিছুতেই। মহাদেও তাকে ঠিক ছেলেমানুষেরই মতন ভুলিয়ে প্যাঁচে ফেলেছে। তুচ্ছ একটা চিৎকার শুনে সে যদি চমকে আচ্ছন্নের মতন হয়ে না পড়ত, তাহলে কেউ কি তার গায়ে হাত দিতে পারত? তার সঙ্গে ঘরের ভিতর অস্ত্রধারী পুলিশ, ঘরের বাইরে ও বাড়ির আশেপাশে ছিল আরও দু-ডজন পুলিশ, মহাদেওয়ের দল লড়াই করেও আত্মরক্ষা করতে পারত না।

মনের দুঃখে নিজের অজ্ঞাতসারেই প্রশান্ত চেঁচিয়ে উঠল, 'আমি গাধা, আমি গোরু, আমি বাঁদর!'

সঙ্গে সঙ্গে মহাদেওয়ের গলা শোনা গেল। টিটকিরি দিয়ে সে বললে, 'আরে ছ্যা ছ্যা প্রশান্তবাবু! তুমি গাধা নও। কারণ, গাধাও ঠ্যাং ছুড়ে লাথি ঝাড়তে পারে, তুমি তা পারো না। তুমি গোরু নও। কারণ, গোরুও শিং নেড়ে গুঁতিয়ে দিতে পারে, তোমার শিং নেই। তুমি বাঁদর নও। কারণ, বাঁদররা চতুর আর তুমি হচ্ছ হাঁদা-গঙ্গারাম। অবশ্য একটা কোনো জানোয়ারের সঙ্গে তোমার তুলনা চলতে পারে, তবে সে জানোয়ারের নাম আমি জানি না।'

আবার মহাদেও এসেছে! প্রশান্ত লজ্জিত হয়ে চুপ করে রইল।

মহাদেও বললে, 'তুমি নিজেকে হরেক-রকম পশু বলে ভাবছ কেন প্রশান্তবাবু? তবে কি আমার কথা রাখোনি বলে তোমার অনুতাপ হয়েছে?'

প্রশান্ত দাঁতে দাঁত চেপে বললে, 'অনুতাপ! তোমার কথা রাখিনি বলে আমি আনন্দিত!'

—ওহো হো, তাই নাকি? আলগু!

—হ্যাঁ বাবুজি!

—যা যা বলেছি মনে আছে তো?

—হ্যাঁ বাবুজি।

—তাহলে প্রশান্তবাবুকে নিয়ে আমার সঙ্গে আয়।

প্রশান্ত বুঝলে, চার-পাঁচ জন লোক তাকে ধরাধরি করে শূন্যে তুললে, তারপর অগ্রসর হল।

এরা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? কিছুই আন্দাজ করবার উপায় নেই। মুখবন্ধ পুরু থলি ভেদ করে নজর চলে না।

তবে এইটুকু অনুভব করা গেল যে, তারা আর বদ্ধ ঘরের ভিতরে নেই। মাথার উপরে খোলা আকাশ,—কারণ বৃষ্টি পড়ছে, ঠান্ডা বাতাস বইছে।

জায়গাটা নিশ্চয়ই নির্জন। নইলে এদের এত সাহস হত না।...

কী একটা শব্দ শোনা যাচ্ছে না? গম্ভীর ও একটানা! জলকল্লোল! কোনো বড়ো নদীর জলকল্লোল!

এ অঞ্চলে কোন বড়ো নদী থাকতে পারে? গঙ্গা? তারা কি ডায়ামন্ডহারবারের প্রায় সমুদ্রের মতন বৃহৎ গঙ্গার কাছ দিয়ে যাচ্ছে? কিন্তু কেন?

অবিলম্বেই জানা গেল। প্রশান্ত বেশ বুঝতে পারলে, লোকগুলো তাকে যেখানে নামিয়ে দিলে সেখানটা টলমল করছে, অর্থাৎ দুলছে! নৌকো? নিশ্চয়ই!

ঝপাঝপ দাঁড়ের আওয়াজ! নৌকো ছেড়ে দিয়েছে। এরা তাকে নিয়ে কোথায় পালাতে চায়? কী এদের বুকের পাটা! শেষটা গোয়েন্দা-চুরি! বাবা, এ যে উপন্যাসের ব্যাপার হয়ে উঠল!

খানিকক্ষণ নৌকা চলবার পর মহাদেও কথা কইলে। 'নৌকো থামা।'

দাঁড়ের শব্দ আর শোনা গেল না।

মহাদেও বললে, 'প্রশান্তবাবু!'

প্রশান্ত জবাব দিলে না।

—কী হে, নৌকোবিহার করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লে নাকি?

প্রশান্ত ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'এভাবে ঘুমোবার অভ্যাস আমার নেই।'

—তবে মুখে রা নেই কেন?

—নরপশুর সঙ্গে কথা কইবার সাধ হয় কার?

—আমাকে গালাগাল?

—পশুকে পশু বললে গালাগাল হয় না।

—একটা লাথি খাবে নাকি?

—মারো।

—তোমাকে এই শেষবার জিজ্ঞাসা করছি। কেমন করে আমার খবর পেলে?

প্রশান্ত প্রাণপণে চেঁচিয়ে বললে, 'বলব না, মরে গেলেও বলব না!'

—বহুৎ আচ্ছা। আলগু!

—বাবুজি!

—প্রশান্তর থলের তলায় ওই বড়ো বড়ো পাথর দু-খানা বেঁধে দে।

প্রশান্ত সচমকে বললে, 'তার মানে?'

—আজ তোমার পাতাল-প্রবেশ হবে।

—তুমি আমাকে ডুবিয়ে মারবে?

—ঠিক তাই।

—তারপর ধরা পড়লে তোমার অবস্থা কী হবে জানো?

—আমি ধরা পড়লে তো?

—সব পাপীই তাই মনে করে।

—বেশ তো, যা জানতে চাইছি বলে আমাকে নরহত্যার দায় থেকে উদ্ধার করো না প্রশান্তবাবু। তুমি তো সাধ করেই মরতে চাইছ, আমার দোষ কী?

—দ্যাখো মহাদেও, তোমার মতন বহু শয়তানকেই আমি চিনি। বেশ জানি, তুমি যা জানতে চাইছ তা বললেও আমি মুক্তি পাব না। অতএব, মরবার সময়ে বিশ্বাসঘাতক হবার ইচ্ছা আমার নেই। তোমার যা খুশি করতে পারো।

—আলগু, পাথর বাঁধা হয়েছে?

—হ্যাঁ বাবুজি।

—থলেটা জলে ফেলে দে। নমস্কার প্রশান্তবাবু!

প্রশান্ত স্তম্ভিত ভাবে অনুভব করলে, থলেসুদ্ধ সে উঠল শূন্যে!...ঝপ করে শব্দ হল। কনকনে ঠান্ডা জল। তারপর কম ঠান্ডা। প্রশান্ত বুঝলে, সে গভীর জলের দিকে নেমে যাচ্ছে। প্রাণপণ শক্তিতে হাত-পায়ের দড়ি ছেঁড়বার চেষ্টা করলে। পারলে না।

ছটফট করতে করতে অনুভব করলে, থলি আর নীচের দিকে নামছে না। তাহলে সে গঙ্গার তলদেশে এসে হাজির হয়েছে। এই তার শেষ শয্যা!

এইবারে দমবন্ধ হওয়ার কষ্ট। ক্রমে সে কষ্ট উঠল চরমে। চোখের সামনে ফুটতে লাগল রাশি রাশি আগুনের রেণু। ...ধীরে ধীরে তার বুদ্ধি আচ্ছন্নের মতন হয়ে এল, সমস্ত দেহ হয়ে পড়ল নিশ্চেষ্ট। তখন মৃত্যুকে মনে হল বন্ধুর মতন। তার কানের কাছে কে যেন চুপি চুপি বারবার বলতে লাগল—ভয় কী, ভাবনা কী; ভয় কী, ভাবনা কী—এখনই সব জুড়িয়ে যাবে...! ঘুম, ঘুম, ঘুম—মৃত্যু যেন ঘুমের মতন!

হঠাৎ জ্যান্ত কী-একটা এসে থলের গায়ে ধাক্কা মারলে। তারপরেই থলে ধরে কে টানলে!

আচ্ছন্ন অবস্থাতেও সে চমকে উঠল। কুমির, না হাঙর? মনে মনে বললে, আর একটু অপেক্ষা কর বাপু, ঘুমোতে-না-ঘুমোতেই টানাটানি কেন? কামড় মারলে এখনও লাগবে যে!

থলি আবার উপর দিকে উঠছে। এ তো ভারি আশ্চর্য! প্রশান্তর মন আবার সজাগ হবার চেষ্টা করলে।

তারপরেই বুঝলে, সে আর থলির ভিতরে নেই! এক হাতে তার দেহ জড়িয়ে ধরে, আর একহাতে কে তার বাঁধন-দড়ি—বোধহয় যেন—কেটেই দিচ্ছে!

প্রশান্ত ভাবলে, স্বপ্ন! মরবার আগে মানুষ এমনি সব বাজে স্বপ্ন দেখে নাকি?

কিন্তু না, এই যে সে জলের উপরে! এই যে তার মাথায় বৃষ্টি পড়ছে, ঝোড়ো হাওয়া লাগছে! ওই যে কালো রাতের আঁধার আকাশে বিদ্যুতের ছিনিমিনি!

কানের কাছে কে বললে, 'কতটা জল খেয়েছ?'

প্রশান্ত বললে, 'রামঃ মোটেই তেষ্টা পায়নি, খামোখা জল খেয়ে মরব কেন?'

—হুঁ। কথা শুনে বোধ হচ্ছে, বিপদ তোমাকে কাবু করতে পারেনি। সাঁতার জানো?

—জানি। ভালো সাঁতারই জানি।

হাতের বাঁধন খুলে গেল। প্রশান্ত সাঁতার কাটতে কাটতে তার উদ্ধারকর্তার মুখ দেখবার চেষ্টা করলে। কিন্তু অন্ধকারে বিশেষ কিছুই দেখতে পেলে না। বললে, 'কে আপনি, জানি না। কিন্তু—'

—তোমার গলার আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছে, তুমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের চেষ্টায় আছ। আপাতত ও-চেষ্টা ছেড়ে দাও। ওই দ্যাখো—

জলের উপরে চার-পাঁচটা আলোকরেখা। রেখাগুলো একবার এদিকে, একবার ওদিকে সরে সরে যাচ্ছে।

প্রশান্ত বললে, 'ও তো দেখছি টর্চের আলো!'

—হ্যাঁ। মহাদেওয়ের সন্দেহ হয়েছে। তার লোকেরা টর্চ জ্বেলে চারিদিক খুঁজছে। ওদের নৌকোখানাও এগিয়ে আসছে। তুমি ডুবসাঁতার দাও। মাঝে মাঝে ভেসে উঠে শ্বাস নিয়ে ওইদিকে যাও। ডাঙা বেশি দূরে নেই।

—আর আপনি?

—ওই আমার নৌকো।

প্রশান্ত মুখ ফিরিয়ে কাছেই দেখতে পেলে একখানা নৌকোর ছায়া। সবিস্ময়ে বললে, 'আপনি আমার প্রাণরক্ষা করলেন, অথচ আপনার নৌকোয় আমাকে ঠাঁই দেবেন না।'

—বাঘ আর গোরুর ঠাঁই একসঙ্গে হয় না।

ধাঁ করে প্রশান্তের মনের ভিতর দিয়ে একটা সন্দেহের বিদ্যুৎ খেলে গেল। তাড়াতাড়ি সামনের মূর্তির দিকে অগ্রসর হতে হতে উদভ্রান্ত-স্বরে সে বললে, 'কে আপনি? বলুন আপনি কে?'

সাঁতার কেটে সরে যেতে যেতে মূর্তি বললে, 'মহাদেওয়ের নৌকো আসছে।'

—আসুক। কে আপনি?

—মূর্খ! একসঙ্গে ধরা পড়লে আমরা কেউ রক্ষা পাব না। শিগগির ডুবসাঁতার দাও।

—আগে বলুন আপনি কে?

—আমি দীনবন্ধু।

—হা ভগবান!

—ডুবসাঁতার দাও প্রশান্ত, ডুবসাঁতার দাও!

প্রশান্ত আর কিছু ভাবতে পারলে না, জলের তলায় ডুব দিলে।

গঙ্গার বুকে

বরুণ সাঁতরে নিজের নৌকোর উপরে গিয়ে উঠল। তার পরনে ভিজে শার্ট ও প্যান্ট—গঙ্গায় ঝাঁপ দেবার সময় কোটটা খুলে নৌকোর উপরেই রেখে গিয়েছিল। কিন্তু দুর্যোগের রাতে জলে ভিজে এখন তার গায়ে জাগল প্রবল শীতের কম্প। তাড়াতাড়ি কোটটা টেনে নিয়ে পরতে পরতে ডাকলে, 'শ্রীধর!'

—বড়দা!

—তোমার ছোড়দা আর বোধহয় তোমাকে দেখতে পাবে না! তোমাকে আমন্ত্রণ করে ভালো করিনি।

—কেন বড়দা?

—মহাদেওকে আজ হয়তো ফাঁকি দিতে পারব না। ওই দ্যাখো তার নৌকো আমাদের কত কাছে এসে পড়েছে। ওরা দলে ভারী, আমরা দুজনে ঠেকাতে পারব কি?

—আমি হাল ধরি, তুমি খুব জোরে দাঁড় টানো।

—আর সে-চেষ্টা মিছে। একলা দাঁড় টেনে বেশিক্ষণ পাল্লা দেওয়া অসম্ভব।

—তুমি রিভলভার আনোনি?

—এনেছি। কিন্তু ওরাও কি আর বন্দুক আনেনি—ওরা যে ডাকাত! যুদ্ধ করেও আমরা বাঁচব না। মিছেই কেবল রক্তপাত হবে।

—পাষণ্ডদের রক্তপাত করলে পাপ হয় না।

—হয়তো হয় না শ্রীধর। কিন্তু রক্ত দেখলে আমরা আত্মা কষ্ট পায়।

—একটা কথা না বলে থাকতে পারছি না বড়দা। স্ত্রীলোকের মন নিয়ে তুমি চাও যুদ্ধজয় করতে?

—স্ত্রীলোকের মন নয় ভাই, বীরপুরুষের মন। কুরুক্ষেত্রের রক্তধারা দেখে মহাবীর অর্জুনও একদিন অস্ত্রচালনা করতে রাজি হননি।

—ওরা যে এসে পড়ল বড়দা!

—উপায় কী? ঘটনাচক্রে এমন বিপদে পড়তে হবে, কে তা জানত?

অন্ধকার ভেদ করে একখানা মস্ত নৌকা কাছে এসে পড়ল। অনেকগুলো টর্চের আলো এসে স্থির হল বরুণ ও শ্রীধরের মুখের উপরে। জনা-চারেক লোক লাফ মেরে বরুণের নৌকার উপরে গিয়ে উঠল—তাদের প্রত্যেকের হাতে রিভলভার।

একখানা বীভৎস মুখ এগিয়ে এল বরুণের মুখের কাছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন—কে তুই?

বরুণ অল্প হেসে বললে, 'মানুষ ছাড়া আর কিছু বলে মনে হচ্ছে নাকি?'

মহাদেও বললে, 'এখানে কী করছিস?'

—হাওয়া খাচ্ছি।

—এই নিশুত রাতে, এই ঝড়-জলে পাগল ছাড়া আর কেউ নৌকোয় হাওয়া খেতে বেরোয়?

—তাহলে আমি পাগল।

—এখানা দেখছি ইলিশমাছ ধরবার নৌকো। তোরা জেলে ন'স। এ নৌকো কোথায় পেলি?

—ভাড়া নিয়েছি।

—জেলেরা এ নৌকো ভাড়া দেয় না।

—তাহলে আমরা নৌকো-চোর!

—আলগু!'

—হ্যাঁ বাবুজি!

—নৌকোর ভিতরটা ভালো করে খুঁজে দ্যাখো, আরও কেউ লুকিয়ে আছে কি না?

আলগু তার অন্বেষণ-কার্য শেষ করে বললে, 'কিছু পেলুম না বাবুজি।'

শ্রীধরকে দেখিয়ে দিয়ে মহাদেও বললে, 'ও বেটা আবার কে? দৈত্যের মতন দেখতে?'

বরুণ বললে, 'আমার বন্ধু।'

—রামনারায়ণ, লোকটার মাথার কাছে রিভলভার ধরে দাঁড়া। একটু নড়লেই গুলি করবি।

ইতিমধ্যে আলগু বরুণের পকেট হাতড়াতে শুরু করে দিয়েছে। রিভলভারটা টেনে বার করে সে চেঁচিয়ে উঠল, 'বাবুজি!'

মহাদেও বরুণের পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে চকিত কণ্ঠে বললে, 'রিভলভার! তোর পকেটে রিভলভার কেন?'

—ও আমার শখ!

—তোর সব শখই অদ্ভুত দেখছি যে! চড়েছিস ইলিশমাছ ধরবার নৌকোয়, হাওয়া খেতে বেরিয়েছিস রাত-আঁধারে ঝড়-জলে, পকেটে রেখেছিস রিভলভার! আসল ব্যাপার কী বল দেখি?

—আমিও তোমাকে ঠিক ওই প্রশ্নই করতে পারি। তোমরাও তো কম যাও না।

মহাদেও খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থেকে বললে, 'আর সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলির দরকার নেই। বেশ বোঝা যাচ্ছে তোরা পুলিশের লোক।'

বরুণ হো হো করে হেসে উঠে বললে, 'কী লক্ষণ দেখে এতবড়ো আবিষ্কারটা করলে দাদা?'

—আলবত তোরা পুলিশের লোক! খবরদার, আমার সামনে তুই আর হাসবি না! তোর হাসি দেখে আমার মাথা গরম হয়ে উঠছে!

—বেশ, তোমার মাথা ঠান্ডা করবার জন্যে এই আমি গম্ভীর হলুম!

—দ্যাখো, সাক্ষাৎ যমের সঙ্গে হাসি-মশকরা করিসনে বলে দিচ্ছি!

—তবেই তো মুশকিলে ফেললে দেখছি। তুমি হাসলেও চটবে, না-হাসলেও চটবে? তাহলে এ নৌকো থেকে সরে পড়ো দাদা, সরে পড়ো!

—চোপরাও রাসকেল। আমি কোনো কাদা-চিংড়ি-খেকো বাঙালিবাবুর দাদা নই! ফের আমাকে দাদা বলে ডাকলে মারব গালে এক চড়! বুঝলি শুয়োরের বাচ্চা!

পরমুহূর্তে বরুণের প্রচণ্ড এক পদাঘাতে মহাদেও ঠিক প্রকাণ্ড এক কাপড়ের বস্তার মতন ঠিকরে নৌকার বাইরে গিয়ে পড়ল! ডাকাতের দল হতভম্ব!

বরুণ চিৎকার করে ডাকলে—'শ্রীধর!' তারপরেই দিলে জলে ঝাঁপ! রিভলভারধারী রামনারায়ণের বিস্মিত দৃষ্টি তখন অন্ধকার গঙ্গায় অদৃশ্য মহাদেওকে খুঁজতে চাইছে, সেই ফাঁকে শ্রীধরও জলে ঝাঁপ দিতে দেরি করলে না।

সামনেই আর-একখানা নতুন নৌকো ভেসে যাচ্ছিল। ততক্ষণে আত্মসংবরণ করে ডাকাতরা পাঁচ-ছয়টা রিভলভার ছুড়তে শুরু করলে। গুলিবৃষ্টি থেকে অব্যাহতি পাবার জন্যে বরুণ ও শ্রীধর তাড়াতাড়ি সেই নৌকায় গিয়ে উঠল।

অন্ধকারে প্রশ্ন হল, 'কে?'

বরুণ হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, 'শিগগির নৌকো চালিয়ে এগিয়ে যাও! নইলে মহাদেওডাকাতের পাল্লায় পড়বে!'

সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে একদল লোক বরুণ ও শ্রীধরের উপরে লাফিয়ে পড়ল। এই নতুন বিপদের জন্যে তারা প্রস্তুত ছিল না, বাধা দেবার কোনো সুযোগই পেলে না। তারা বন্দি হল।

এ নৌকা থেকে চেঁচিয়ে কে ডাকলে, 'মহাদেওবাবু, মহাদেওবাবু!'

অন্য নৌকা থেকে আলগু ডাক ছেড়ে বললে, 'কে রে, বদরি নাকি?'

—হ্যাঁ ভাই, আমি! তোদের এত দেরি দেখে আমাদের ভয় হয়েছিল। তাই খোঁজ নিতে এসেছি।

—তোদের নৌকোয় গোলমাল শুনলুম না?

—হ্যাঁ। দুটো বাংগালি ভাগছিল, তাদের আমরা পাকড়ে ফেলেছি?

মহাদেওয়ের গর্জন-স্বর শোনা গেল—বড়ো আচ্ছা কাজ করেছিস রে বদরি! দু-ব্যাটা দুষমনকেই ধরেছিস তো?

—হাঁ হুজুর!

—তোকে তিনশো টাকা বকশিশ দেব! নৌকো নিয়ে আমাদের সঙ্গে চল। খুব সাবধানে, ওরা আবার পালায় না যেন!

নৌকো দু-খানা যখন কাছাকাছি হল, বরুণ তখন শুনতে পেলে ডাকাতদের নৌকা থেকে কে বলছে, 'বাবুজি, ও দুটো আপদকে আর সঙ্গে নিয়ে যাওয়া কেন? ওদের হাত-পা বেঁধে জলে ফেলে দিন!'

মহাদেওয়ের গলায় শোনা গেল, 'না, না! ওদের কাছে থেকে অনেক খবর পাওয়া যেতে পারে—ব্যাটারা সহজ লোক নয়! ...আলগু, আর এদিকে থাকা চলবে না, আমাদের অন্য আড্ডায় চল!'

...বন্দি শ্রীধরের কানে কানে বন্দি বরুণ বললে, 'কপাল বড়োই খারাপ! ভেবেছিলুম এখানা হচ্ছে সাধারণ নৌকো!'

শ্রীধর বললে, 'আমার কিছু ভয় হচ্ছে না বড়দা! জানি, তুমি যখন আছ আমার কোনোই ভয় নেই! মহাদেও তোমার কী করবে?'

সপ্তম

কাচ-কাগজের কেরামতি

নৌকো যখন থামল, রাত শেষ হতে দেরি নেই। বৃষ্টি ধরেছে বটে, কিন্তু আকাশ তখনও মেঘে-থমথমে।

তারা কোথায় এসেছে বোঝবার জন্যে বরুণ চারিদিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগল, কিন্তু কালো অন্ধকারের মধ্যে কতকগুলো আরও-কালো গাছপালার ছায়া ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টিগোচর হল না।

সকলে একখানা বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলে। লন্ঠনের আলোতে দেখা গেল একটা প্রকাণ্ড উঠান, তার চারিদিকে বিশৃঙ্খলভাবে ছড়ানো রয়েছে অনেকগুলো 'প্যাকিং' বাক্স।

মহাদেও বললে, 'ও দু-বেটাকে তেতলার গুদামঘরে বন্ধ করে রেখে আয়। আজ ভারি মেহনত হয়েছে, খানিক ঘুমিয়ে না নিলে চলবে না। কাল আমার খিদিরপুরে হাজির থাকা চাই—পরশু এসে ওদের ব্যবস্থা করব।'

—এদের কী খেতে দেব বাবুজি?

—কিছু না, খালি জল। জানোয়ারদের পোষ মানাতে হয় উপোসি রেখে। পেটের ভিতরে কিছু না ঢুকলে পরশু ওদের পেটের কথা বাইরে বেরোয় কি না দেখে নেব।

তেতলায় উঠে একখানা আলোকহীন ঘরের ভিতরে বরুণ ও শ্রীধরকে ধাক্কা মেরে ঢুকিয়ে দিয়ে আলগু বললে, 'খবরদার, কেউ চেল্লাচিল্লি করবি না! তাহলে হাত-পা-মুখ বেঁধে ফেলে রাখব—বুঝলি?'

—বুঝেছি।

—বাবুজির হুকুম শুনলি তো? খালি জলযোগ করেই পরশু পর্যন্ত কাটাতে হবে। এই নে, জলের কুঁজোটা রাখ!

দড়াম করে দরজা বন্ধ হল।

বরুণ বললে, 'শ্রীধর, ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে।'

শ্রীধর বললে, 'আমারও।'

—তাহলে আমাদের সর্বপ্রথম কর্তব্য হচ্ছে, নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়া? কী বলো?

—হ্যাঁ বড়দা!

মিনিট-পাঁচেকের মধ্যে ডবল নাসিকার 'ডুয়েট'-সংগীতে ঘর-জোড়া অন্ধকার যেন পরিপূর্ণ হয়ে উঠল। আদুড় মেঝে, ভিজে পোশাক, অদূর ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা এবং দলবদ্ধ মশকদের হুল এসব কিছুই তাদের সেই দারুণ নিদ্রাকে বাধা দিতে পারলে না।...

...পরদিন সকালে শ্রীধর চোখ খুলে দেখলে, বরুণ একটা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে।

'দুর্গা দুর্গতিনাশিনী' বলে দুর্গার উদ্দেশে নমস্কার করে শ্রীধর উঠে বসল।

বরুণ ফিরে বললে, 'শ্রীধর, দুর্গা আমাদের দুর্গতি নাশ করবেন বলে তুমি বিশ্বাস করো?'

শ্রীদুর্গার উদ্দেশে আরও তিনটে প্রণাম ঠুকে শ্রীধর বললে, 'বিশ্বাস করি বই কি বড়দা।'

—তাহলে প্রথমেই আমাদের কী দুর্গতি দ্যাখো। সকালে এক পেয়ালা চা আর দু-খানা 'টোস্ট' পর্যন্ত পাবার আশা নেই।'

শ্রীধর একটা দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে।

—দুপুরে দুটি অন্ন আর একটু আলু-ভাতে পর্যন্ত জুটবে না।

শ্রীধর এবারে একটা নয়, দু-দুটো দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করলে।

—শ্রীধর, তোমার দীর্ঘশ্বাসের সংখ্যা বাড়ছে, আর এই অপ্রীতিকর আলোচনায় কাজ নেই।

—আমরা কোন দেশে আছি বড়দা?

—বাংলা দেশেই নিশ্চয়ই। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়েও এর বেশি কিছু বোঝা যায় না। এ বাড়িখানা প্রকাণ্ড এক বাগানের মাঝখানে আছে। চারিধারে এত বড়ো বড়ো গাছের ভিড় যে, তাদের ভিতর দিয়ে চোখ চলে না। দূর থেকেও লোকালয়ের কোনো সাড়া পাচ্ছি না।

শ্রীধর বিরক্ত স্বরে বললে, 'ডাকাতব্যাটাদের কোনো লোকও সে ঘরে ঢুকছে না। তাহলে তাদের কাছ থেকে কিছু খবর নেবার চেষ্টা করতুম।'

—আমার বিশ্বাস কালকের আগে ওরা কেউ আর এমুখো হবে না। পরশু আমাদের একেবারে ডাক পড়বে মহাদেওয়ের বিচারসভায় যাবার জন্যে।

—আমরা লম্বা দিলুম কি না, সে খোঁজও নিতে আসবে না?

—ও-বিষয়ে ওরা নিশ্চিন্ত আছে। এটা একখানা তিনতলা বাড়ির উপরকার ঘর। আমরা চড়ুইপাখি নই যে জানলার ফাঁক দিয়ে গলে ফুড়ুৎ করে উড়ে পালাব। তিনতলা থেকে লাফ মারাও সম্ভব নয়, আর সে অসম্ভবের পথও বন্ধ করে আছে ওই লোহার গরাদগুলো।

শ্রীধর ফিক করে হেসে ফেললে।

—হাসছ বড়ো যে?

—বড়দা, আমি কি তোমার গায়ের জোর জানি না? ওই লোহার গরাদ তুমি কি হাতের চাপে টিনের মতন বেঁকিয়ে ফেলতে পারো না?

—তা হয়তো পারি। কিন্তু তারপর? তারপর কি লাফ মেরে আত্মহত্যা করব?

—হায় হায়, কোনোরকমে কি একগাছা লম্বা দড়ি জোগাড় করা যায় না?

—যদি আমরা ধুতি পরে আসতুম তাহলে দড়ির অভাব মেটানো যেত অনায়াসে। কিন্তু আমি পরেছি কোট-প্যান্ট আর তোমার পরনে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি।

—বাবা, কাপড়ের যা দাম, তাই তো লুঙ্গি পরি।

—যাক, বাজে কথায় সময় কাটিয়ে কাজ নেই। মহাদেও কাল বলছিল এটা গুদোমঘর। কিন্তু এটা কীসের গুদোম?

শ্রীধর অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বিরক্ত স্বরে বললে, 'হতভাগা মহাদেওয়ের গুদোমঘর নিয়ে আমি মাথা ঘামাতে চাই না।'

বরুণ হাসতে হাসতে বললে, 'তাই নাকি? তাহলে আমি নিজের মাথাকেই ঘর্মাক্ত করবার চেষ্টা করি।'

সেটা হচ্ছে মস্ত হলঘরের মতন। মাঝখানটা খালি। কিন্তু চারিদিকেই প্রায় কড়িকাঠসমান উঁচু মাল-পত্তর।

বরুণ পরীক্ষা করতে করতে বললে, 'এদিকটা দেখছি প্যাকিং-বাক্সে ভরতি। বাক্সগুলোর ভিতরে কী আছে? আরে, এ যে হরেক-রকম বিলিতি ওষুধের শিশি-বোতল। সবই দেখছি ওষুধে ভরা। 'হরলিকস'ও রয়েছে গাদা গাদা! ব্যাপারটা বুঝেছ শ্রীধর?'

—কিছুই বুঝছি না বড়দা।

—মহাদেও এই যুদ্ধের সময়ে 'ব্ল্যাক মার্কেটে'র কারবারও চালায়। ভারি হুঁশিয়ার ব্যক্তি। ওদিকে বড়ো বড়ো সিগারেটের বাক্স। কোনো বাক্সই বোধহয় খালি নয়। কতগুলো বাক্স আছে গুনে দ্যাখো তো শ্রীধর!

শ্রীধর গুনে কিছুক্ষণ পর বললে, 'বাক্স আছে মোট হাজারটা।'

বরুণ বললে, 'প্রত্যেক বাক্সে আছে পঞ্চাশ প্যাকেট করে সিগারেট। তাহলে হাজার বাক্সে আছে পঞ্চাশ হাজার প্যাকেট। শ্রীধর, তুমি সিগারেট খাও?'

—না বড়দা। আর খেলেও এখন আমি সিগারেট-ফিগারেট নিয়ে মাথা ঘামাতুম না।

—কেন শ্রীধর?

—মাথার ওপরে যখন খাঁড়া ঝোলে তখন কে সিগারেটের কথা ভাবে বলো?

—আমি ভাবি শ্রীধর, আমি ভাবি। আমিও সিগারেট খাই না, তবু সিগারেটের কথাই ভাবছি।

—ভেবে লাভ? সিগারেট দিয়ে তুমি কি স্বর্গের সিঁড়ি বানাতে চাও?

—না শ্রীধর। কিন্তু আমি যে সিঁড়ি বানাতে চাই, তা দিয়ে সরাসরি স্বর্গে ওঠা যাবে না, তবে চটপট মর্তে নামা চলবে।

—বিপদে পড়ে তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে বড়দা, বাজে ভুল বকছ।

শ্রীধরের কথা বরুণ আমলেও আনলে না। হঠাৎ উৎসাহিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'শ্রীধর, মাভৈ!'

—কী বলছ?

—কিছু ভয় নেই আর! কেল্লা মার দিয়া!

—আরে বাজে বোকো না বড়দা, তোমার পায়ে পড়ি!

—উপায় হয়েছে শ্রীধর, উপায় হয়েছে!

—কীসের উপায়?

—পালাবার!

—কেমন করে!

—আগে লোহার গরাদ ভাঙব।

—তারপর?

—তারপর দুজনে একে একে বাগানে গিয়ে নামব।

—হাওয়ার সিঁড়ি ধরে?

—না রে মুখ্যু, না! এই দেখ!

বরুণ সিগারেটের একটা বাক্স নামালে। একটা প্যাকেট বার করলে। প্যাকেটের উপরকার পাতলা ও ঠিক কাচের মতই স্বচ্ছ কাগজের আবরণটা খুলে নিয়ে বললে, 'শ্রীধর, এটা কী?'

—আমরা তো ওকে কাচ-কাগজ বলে ডাকি।

—বেশ, আমিও তোমার ভাষায় একে কাচ-কাগজ বলেই ডাকব। কিন্তু এর বিলিতি নাম হচ্ছে 'সেলোফেন'।

শ্রীধর অবহেলা-ভরে বললে, 'তা হবে। কিন্তু কাগজ চিবিয়ে তো আর পেটের খিদে মিটবে না!'

বরুণ কোনো জবাব না দিয়ে সেই 'কাচ-কাগজ' খানা পাকিয়ে পাকিয়ে একেবারে সরু-লিকলিকে করে ফেললে। তারপর সেটা শ্রীধরের হাতে দিয়ে বললে, 'তুমি এটা ছিঁড়তে পারো?'

শ্রীধর রীতিমতো বলবান ব্যক্তি। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললে, 'কী যে বলো বড়দা!'

—চেষ্টা করে দ্যাখো।

দু-হাতে পাকানো-কাগজের দু-দিক ধরে শ্রীধর এক টান মারলে। ছিঁড়ল না। সে খুব জোরে টান মারলে। তবু ছিঁড়ল না। তার চোখে-মুখে ফুটল বিস্ময়ের আভাস। অপ্রতিভ কণ্ঠে বললে, 'কী আশ্চর্য, এত শক্ত!'

—আরও জোরে টানো শ্রীধর, আরও জোরে! তুমি না পালোয়ান ছিলে?

আরও বার-তিনেক টানাটানি—প্রবল টানাটানির পর কাগজখানা পট করে ছিঁড়ে গেল।

—শ্রীধর, এই 'সেলোফেন' অর্থাৎ কাচ-কাগজই আজ আমাদের বাঁচাবে!

শ্রীধর অবিশ্বাসের স্বরে বললে, 'কীরকম?'

বরুণ নীরবে কয়েকটা প্যাকেট থেকে কয়েকখানা 'কাচ-কাগজ' খুলে নিলে। তারপর একখানা কাগজ আবার পাকিয়ে পাকিয়ে খুব সরু করে ফেললে। তারপর আর একখানা। পরে পরে এমনি কয়েকখানা। তারপর সাধারণ দড়ির মতন গেরো দিয়ে কাগজগুলো পরস্পরের সঙ্গে বেঁধে প্রায় সাত হাত লম্বা একটা কাগজের দড়ি তৈরি করে ফেলল।

বললে, 'শ্রীধর, তুমিও আমাকে সাহায্য করো। এসো, আমরা এই মাপের আরও ক-গাছা দড়ি তৈরি করি।'

কিছুক্ষণের মধ্যে আট গাছা সাত হাত লম্বা দড়ি তৈরি হল। তারপর আট গাছা দড়িকে একত্র করে এক গোছা দড়িতে পরিণত করে বরুণ বললে, 'শ্রীধর, তুমি দড়ির ওদিকটা ধরো। আচ্ছা, এইবার 'টাগ-অফ-ওয়ার' শুরু করা যাক।'

কাগজ-দড়ির দুই প্রান্ত ধরে দুজনে খানিকক্ষণ টানাটানি করতে লাগল। দুইজনেই বলবান, কিন্তু তবু দড়ি ছিঁড়ল না।

বরুণ হাসতে হাসতে বললে, 'কী বুঝছ শ্রীধর?'

শ্রীধর মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, 'কাচ-কাগজের এত গুণ, আগে কে জানত বড়দা?'

—শ্রীধর, আমি যে পথের পথিক, সে পথ বড়ো বিপজ্জনক, এখানে পদে পদে ফাঁড়া কাটাতে হয়। এখানে সাধারণ জিনিসকে অসাধারণ করে তোলবার ক্ষমতা না থাকলে কেউ বাঁচতে পারে না। যখনই সময় পাই তখনই আমি যে-কোনো দ্রব্যগুণ-পরীক্ষায় নিযুক্ত থাকি। তাই পুলিশকে বহুবার ফাঁকি দিয়ে পালাতে পেরেছি।

—বড়দা, তোমার পায়ের ধুলো দাও।

—এখনও পায়ের ধুলো নেওয়ার সময় হয়নি শ্রীধর, এখনও অনেক কাজ বাকি।

—কী করতে হবে বলো।

—তিনতলা থেকে একতলার মাটি পর্যন্ত পৌঁছোতে পারো এমন লম্বা আট-দশ গাছা কাচ-কাগজের দড়ি তৈরি করতে হবে। আমাদের হাতে আছে পঞ্চাশ হাজার সিগারেটের প্যাকেট, সুতরাং মালের অভাব হবে না। সেই আট-দশ গাছা দড়িকে একসঙ্গে চেপে ধরে আজ রাত্রে আমরা বাগানে নামবার চেষ্টা করব।

শ্রীধর খুশির চোটে অস্থির হয়ে নাচতে শুরু করে বললে, 'জয় মা দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী!'

বরুণ বললে, 'কাল সকালে মহাদেওয়ের শ্রীবদনখানি কী ভাব ধারণ করবে, আমি এখনই স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি!'

অষ্টম

ছোট্টুলাল

পরদিন বৈকালে প্রশান্ত ঝোড়ো কাকের মতন ভগ্নদেহে ফিরে এল কলকাতায়।

হানাবাড়ির জঙ্গলে সে একজন ডাকাতকেও গ্রেপ্তার করতে পারেনি, উলটে পুলিশের দুজন হত ও তিনজন আহত হয়েছে এবং তার নিজের প্রাণও যেতে যেতে কোনোরকমে বেঁচে গিয়েছে।

তার মন সবচেয়ে খারাপ হয়ে আছে আর এক কারণে।

যে-দীনুকে সে নিজের সবচেয়ে মারাত্মক শত্রু বলে মনে করত, যার কাছে পদে পদে হরেক-রকম নাকাল হয়েছে, যাকে গ্রেপ্তার করাই হচ্ছে তার জীবনের প্রধান উচ্চাকাঙ্ক্ষা, সে প্রাণরক্ষা করতে পেরেছে একমাত্র তারই অনুগ্রহে! দীনু কেবল তাকে পরাজয়ের গ্লানিই দান করেনি, তার উপরে দিয়েছে জীবন ভিক্ষা! প্রশান্তের কাছে এর চেয়ে যাতনাদায়ক আর কিছুই নেই।

উপরওয়ালার কাছে চোরের মতন নত-মস্তকে 'রিপোর্ট' দাখিল করে এবং বহু অকথা-কুকথা সহ্য করতে বাধ্য হয়ে সন্ধ্যার কিছু আগে সে বাসার দিকে ফিরল অপরাধীর মতন। পথে আসতে আসতে বার বার তার মনে হতে লাগল, পুলিশের চাকরি ছেড়ে দেওয়া উচিত কি না?

বাসার সামনে এসে দেখে, পথের ধারের রোয়াকের উপরে বসে আছে একটা লোক। তাকে দেখেই লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে সেলাম ঠুকলে।

প্রশান্ত তীক্ষ্ন-দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে। বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ, সুদর্শন মুখ, সুগঠিত দেহ, পোশাক বাঙালির, কিন্তু চেহারা বাঙালির নয়।

প্রশান্তর মনে হল, মুখখানা যেন চেনা চেনা। সে বললে, 'কে তুমি?'

—আমি ছোট্টুলাল।

—তোমায় কোথায় দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।

—আজ্ঞে, দেখেছেন বই কি! কালই দেখেছেন।

—কাল?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—কোথায়?

—মহাদেও মিশিরের দলে।

প্রশান্ত সবিস্ময়ে দুই পা পিছিয়ে এল।

—ভয় নেই বাবুজি!

প্রশান্ত অপ্রতিভ কণ্ঠে বললে, 'আমি ভয় পাইনি। কী মতলব তোমার?'

—আমার মতলব মন্দ নয়। আমি আপনার কাছে এসেছি জরুরি কাজে।

প্রশান্ত হঠাৎ বাঘের মতন ছোট্টুলালের উপরে লাফিয়ে পড়ল। দুই বজ্রমুষ্টিতে তার দুই হাত চেপে ধরে বললে, 'আমার কাছে তোর জরুরি কাজ? তবে রে পাজি!'

ছোট্টুলাল কিছুমাত্র অভিভূত না হয়ে বললে, 'হাত ছাড়ুন বাবুজি। আমি মহাদেওয়ের লোক নই।'

—অথচ মহাদেওয়ের দলে থাকিস?

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—তুই কি আমাকে কচি খোকা পেয়েছিস?

—আজ্ঞে না। কচি খোকার গোঁফ থাকে না। আপনার মস্ত গোঁফ আছে।

—আবার মশকরা হচ্ছে?

—আজ্ঞে না। সত্যি কথা বলছি।

—বল তুই, কেন এসেছিস?

—আমি দীনবন্ধুর লোক। তাঁরই হুকুমে মহাদেওয়ের দলে আছি। এইবারে হাত ছেড়ে দেবেন?

প্রশান্তর তখন মনে পড়ল, দীনুডাকাতের পত্রে তার এক গুপ্তচরের কথা আছে।

ছোট্টুলাল বললে, 'আমি আপনার কাছে এসেছি মহাদেওকে ধরিয়ে দিতে।'

তার হাত ছেড়ে দিয়ে প্রশান্ত বললে, 'মহাদেও এখন কোথায়?'

—সব বলব বলেই এসেছি। কিন্তু রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা কওয়া কি ভালো?

ছোট্টুলালকে ইঙ্গিতে সঙ্গে আসতে বলে প্রশান্ত বাড়িতে ঢুকে বৈঠকখানায় গিয়ে বসল। ছোট্টুলাল সামনে দাঁড়িয়ে রইল।

প্রশান্ত বললে, 'এইবারে তোমার কথা বলো?'

—আমি মহাদেওয়ের কাছে আপনাকে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু এক শর্তে।

—তোমার আবার শর্তে আছে!

—আছে বই কি বাবুজি! বিনা স্বার্থে আমি আপনার উপকার করতে আসিনি।

—শর্তটা শুনি?

—আমি মহাদেওকে ধরিয়ে দিতে এসেছি একজনকে বাঁচাবার জন্যে।

—বাঁচাবার জন্যে?

—হ্যাঁ।

—ব্যাপারটা বুঝলুম না।

—মহাদেও কাল নিশ্চয়ই তাঁকে খুন করবে।

—কে সে?

—যিনি কাল আপনার প্রাণ বাঁচিয়েছেন।

—কী বললে?

—দীনবন্ধুবাবুর কথা বলছি।

প্রশান্ত চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিপুল বিস্ময়ে। তার দুই চক্ষু বিস্ফারিত!

—দীনবন্ধুবাবু আপনাকে বাঁচাতে গিয়েই ধরা পড়েছেন।

—দীনু হয়েছে মহাদেওয়ের বন্দি! দীনু—দীনু—যাকে আমি এত চেষ্টা করেও স্পর্শ করতে পারিনি?

—আজ্ঞে হ্যাঁ। বন্দি হয়েছেন আপনার জন্যেই!

—সব কথা খুলে বলো।

ছোট্টুলাল সংক্ষেপে সমস্ত বর্ণনা করে বললে, 'আমি মহাদেওয়ের কাছে আপনাকে নিয়ে যেতে পারি, যদি মহাদেওকে গ্রেপ্তার করে আপনি দীনবন্ধুবাবুকে ছেড়ে দিতে রাজি হন।'

—তাহলে দীনুই তোমাকে পাঠিয়েছে?

—না, তাঁর সঙ্গে আমি কথা বলবার ফাঁক পাইনি। কিন্তু তিনি আমার অন্নদাতা। তাঁকে বাঁচাবার আর কোনো উপায় না দেখে আমি নিজেই লুকিয়ে পালিয়ে এসেছি।

প্রশান্ত কিছুক্ষণ স্তব্ধ থেকে শুষ্কস্বরে বললে, 'ছোট্টুলাল তুমি জানো না তোমার শর্তমতন কাজ করা আমার পক্ষে কতটা কঠিন! আমার কাছে দীনুর নামে 'ওয়ারেন্ট' আছে। আমি পুলিশ কর্মচারী, দীনুকে হাতে পেলে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য।'

—কী বলছে আপনি! কাল দীনবন্ধু না থাকলে আজ কি এখানে দাঁড়িয়ে আপনি এতবড়ো অধর্মের কথা উচ্চারণ করতে পারতেন?

প্রশান্ত বিষম সমস্যায় পড়ে গেল। মাথা নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তার এক দিকে সরকারি চাকরির কর্তব্য, আর এদিকে মনুষ্যত্বের কর্তব্য! এখন সে কোন দিকে সামলাবে? অবশেষে হতাশভাবে বসে পড়ে ভাবতে লাগল।

ছোট্টুলাল বললে 'তাহলে আমার শর্তে আপনি রাজি নন?'

—কী করে রাজি হই ছোট্টুলাল!

—নমস্কার বাবু, আমি চললুম।

—দাঁড়াও।

—আর দাঁড়িয়ে কী লাভ?

—মহাদেও এখন কোথায়?

—বলব না।

—কেন?

—আমি পুলিশের লোক নই। মহাদেওয়ের ঠিকানা দিয়ে আমার বাবুকেও বিপদে ফেলতে পারব না।

—তুমি জেনো ছোট্টুলাল, তোমার বাবুকে গ্রেপ্তার করলে মহাদেওয়ের মতন তারও ফাঁসি হবার ভয় নেই। তোমার বাবু আজ পর্যন্ত খুন করেনি।

—তা আমি জানি।

—বড়োজোর তার দ্বীপান্তর হতে পারে।

—ভারী সুখবর দিলেন! বাবুকে আমি পাঠাব দ্বীপান্তরে! তার চেয়ে বাবুর মৃত্যু ভালো। আপনার সঙ্গে আর কথা কইতে চাই না, আমি চললুম।

—যদি তোমাকে যেতে না দিই? দীনুডাকাতের চর বলে যদি তোমাকে গ্রেপ্তার করি?

—পুলিশের যোগ্য কথাই বললেন! বাবুজি!

প্রশান্ত অত্যন্ত কাতর মুখে দুই হাতের ভিতরে মুখ রেখে মনে মনে আবার কিছুক্ষণ ধরে কী চিন্তা করলে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে গম্ভীর স্বরে বললে, 'শোনো ছোট্টুলাল! মহাদেও হচ্ছে ভীষণ অপরাধী। সে স্বাধীন থাকলে আরও অনেক নরহত্যা হবে। বিশেষ, তার জন্যে আজ আমাকে অত্যন্ত অপমানিত হতে হয়েছে। তাকে ধরবার এ সুযোগ আমি ছাড়তে পারব না। তোমার শর্তে আমি রাজি। দীনুকে গ্রেপ্তার করব না।'

ছোট্টুলাল সন্দিগ্ধ ভাবে বললে, 'আপনার কথায় আর আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।'

—কেন?

—হয়তো আপনার মুখের কথা আর মনের কথা এক নয়!

—আমি ভগবানের নাম নিয়ে শপথ করছি। কিন্তু ছোট্টুলাল আমার গোয়েন্দা-জীবনের শেষ কাজ হচ্ছে এই মহাদেওকে গ্রেপ্তার করা।

—শেষ কাজ? কী বলছেন বাবুজি?

—হ্যাঁ ছোট্টুলাল। মহাদেওকে গ্রেপ্তার করেই আমি চাকরিতে ইস্তফা দেব।

—কেন বাবুজি?

—দীনুকে গ্রেপ্তার না করে নিমকের মর্যাদা নষ্ট করেছি বলে। লোকের কাছে আমি নিমকহারাম হতে চাই না—নিজেকে শাস্তি দেব নিজেই।...এখন মহাদেওয়ের কথা বলো।

পরদিন প্রভাতের সূর্যোদয়ের সঙ্গে-সঙ্গেই দেখা গেল, সেই মস্তবড়ো বাগানওয়ালা বাড়িখানার চতুর্দিকে বসেছে পুলিশের পাহারা।

একদল সশস্ত্র পুলিশ কর্মচারীর সঙ্গে প্রশান্ত বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলে। তার পাশে ছোট্টুলাল।

বাড়ির ভিতরটা সমাধির মতন স্তব্ধ। একতলা, দোতলা, তেতলা সব করছে খাঁ-খাঁ। কোথাও কোনো ঘরে নেই জনপ্রাণী।

প্রশান্ত বললে, 'এ কী হল ছোট্টুলাল!'

ছোট্টুলাল শুকনো গলায় বললে, 'মহাদেও কেমন করে খবর পেয়ে দলবল নিয়ে সরে পড়েছে!'

—তোমার বাবু?

—ওই ঘরে ছিলেন। কিন্তু ও-ঘরের দরজাও তো খোলা দেখছি!

প্রশান্ত ঘরের ভিতরে ঢুকল। কেউ নেই।

ছোট্টুলাল ছলছলে চোখে বললে, 'আমার বাবু বোধহয় বেঁচে নেই!'

প্রশান্ত বিস্মিত হয়ে বললে, 'ও-জানলাটার দুটো গরাদ অমন করে বাঁকিয়ে ফাঁক করলে কে?'

ছোট্টুলাল বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল।

—ওহে ছোট্টু, ওটা তোমারই বাবুর কীর্তি নয়তো? দীনু হয়তো লম্বা দিয়েছে—আমার সাহায্যের অপেক্ষা রাখেনি।

ছোট্টুলাল মাথা নেড়ে বললে, 'অসম্ভব। তিনতলা থেকে লাফ মেরে কেউ পালাতে পারে নাকি?'

—আরে, লাফ মারবে কেন, গরাদের সঙ্গে দড়ির মতন এই যে কী একটা বাঁধা রয়েছে। এ আবার কী রে বাবা? কাগজের দড়ি?' নীরবে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে হতবুদ্ধির মতন প্রশান্ত বললে, 'এ যে দেখছি 'সেলোফেন' কাগজ পাকিয়ে তৈরি! একেবারে তাক লাগিয়ে দিলে যে বাবা!' খানিকক্ষণ মুখ বিকৃত করে বিষম জোরে টানাটানির পর আবার বললে, 'এ দিয়ে মোষ বাঁধা যায় যে ছোট্টু! এমন কথা কে কবে শুনেছে?

ছোট্টুলাল প্রথমটা হতভম্বের মতন ছিল, তারপর মহা উল্লাসে এক লাফ মেরে বলে উঠল, 'এতক্ষণে সব বুঝেছি! বাবু পালিয়েছেন দেখেই মহাদেওরা ধরা পড়বার ভয়ে চম্পট দিয়েছে!'

প্রশান্ত বললে, 'দীনু পালাতে পেরেছে বলে আজ আমি দুঃখিত নই। আমাকে আর নিমকের মর্যাদা নষ্ট করতে হল না। কিন্তু এমন অসাধারণ যার বুদ্ধি, সে কিনা করে চুরি-ডাকাতি। তোমার বাবুকে বোলো ছোট্টুলাল সে যেন এবার চুরি-ডাকাতি ছেড়ে দেশান্তরে চলে যায়। নইলে আমি নিরুপায়। তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য হব।'

নবম

দৌড় প্রতিযোগিতায় প্রশান্ত

সন্ধ্যার পরে অরুণ একখানা সোফার উপর দুই পা ছড়িয়ে কোনো সাপ্তাহিক কাগজের ছবির পাতার পর পাতা ওলটাচ্ছে আর মনে মনে বিরক্ত ভাবে বলছে—'আজকালকার বাংলা কাগজওয়ালাগুলো ভাবে, পত্রিকার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় সিনেমার যত রাবিশ, অ-রাবিশ, কম-রাবিশ, বেশি-রাবিশ নট-নটীদের ছবি দিলেই অনায়াসে গ্রাহকদের পকেট-কাটা চলবে, পত্রিকার সঙ্গে সুলেখকদের সম্পর্ক রাখবার একটু দরকার নেই'—এমন সময়ে হঠাৎ ঘরের ভিতরে ঝড়ের মতন প্রবেশ করলে প্রশান্ত।

অরুণ সোফার উপরে সোজা হয়ে উঠে বসল।

প্রশান্ত ধপাস করে একখানা কৌচের উপরে বসে পড়ে হাঁ-করা মুখে বেজায় হাঁপাতে লাগল।

অরুণ বিস্মিত কণ্ঠে বললে, 'কী হয়েছে প্রশান্তবাবু' অমন কাতর ভাবে হাঁপাচ্ছেন কেন?'

প্রশান্ত ম্লান হাসি হেসে হাঁপ থামাবার চেষ্টা করতে করতে বললে, 'দৌড় প্রতিযোগিতায় জয়লাভ করে!'

—বলেন কী মশাই, আপনার এই বয়সে দৌড় প্রতিযোগিতা!

—সত্যি তাই। ভীষণ প্রতিযোগিতা!

—জিতল কে?

—আমি।

—কী লাভ হল?

—পৈতৃক প্রাণ।

—বুঝলুম না।

—বোঝবার কথা নয় মশাই, ভাববার কথা।

—কীসের ভাবনা?

—আমার পিছনে প্রাণঘাতী শত্রু লেগেছে।

—কে? দীনুডাকাত?

—না মশাই, না! আপনার বন্ধু দীনু আমার বন্ধু না হলেও এমন নিম্নশ্রেণির শত্রু নয়।

—নিম্নশ্রেণির শত্রু আবার কী?

—যে প্রাণে মারবার চেষ্টা করে।

—বলেন কী! আপনার এমন শত্রুও আছে?

—আছে বই কি!

—সে কে?

—মহাদেও।

—মহাদেও? যে পাষণ্ড আপনার কঙ্কালকে পাতাল রাজ্যের বাসিন্দা করতে চেয়েছিল?'

প্রশান্ত চমকে উঠে বললে, 'আপনি কেমন করে জানলেন? এ খবর তো খবরের কাগজে প্রকাশ করা হয়নি!'

অরুণ মুখ টিপে হেসে বললে, 'খবরের কাগজে না বেরুলেও অনেক খবর জানা যায়। এই যে আজ সকালে আপনি চা পান করেছেন, ডাল-ভাত-ঝোল খেয়েছেন, তা কি আমি জানি না? কিন্তু এ খবর কি খবরের কাগজে বেরিয়েছে?'

প্রশান্ত মাথা নেড়ে বললে, 'ভুল। আজ অমাবস্যা, আমি ডাল-ভাত-ঝোল ছুঁইনি।'

—কিন্তু চা খেয়েছেন তো?

—তা খেয়েছি। আর এক 'কাপ' পেলেও খেতে পারি। অনেকটা পথ দৌড়োতে হয়েছে কিনা!

—শ্রীধর! অ শ্রীধর! শ্রীধর হে! আরে, সাড়া দাও না কেন বাবা? বলি, সন্ধ্যা হতেই নাক ডাকানো বুঝি?

উপর থেকে শ্রীধরের সাড়া এল—'না গো ছোড়দা, নাক আমার বোবা হয়েই আছে। কী বলছ?'

—খুব ভালো করে এক 'কাপ' চা তৈরি করে আনো। মনে রেখো, প্রশান্তবাবু খাবেন। বড়ো যে-সে লোক নন, চা খারাপ হলে তোমার নামে জরুরি ওয়ারেন্ট বেরুবে।

প্রশান্ত দীন ভাবে কাঁচুমাচু মুখে বললে, 'আমার পাতাল-প্রবেশের কাহিনি আপনি কী করে জানলেন বলবেন না? দীনুডাকাতের সঙ্গে দেখা হয়েছিল বুঝি?'

—আপনার পাতাল-প্রবেশের পর? না?

—তবে?

অরুণ জানে, সেদিনকার ব্যাপারের সঙ্গে জড়িত আছে বরুণের সঙ্গে শ্রীধরও— প্রশান্তর যা অজ্ঞাত। তাই এ প্রসঙ্গ চাপা দেবার জন্যে বললে, 'এর বেশি আর কিছূ শুনে কাজ নেই। কিন্তু ও-কথা থাক। আজকের দৌড় প্রতিযোগিতার ব্যাপারটা কী?'

প্রশান্ত তখন নাচার হয়ে ও-প্রসঙ্গ ত্যাগ করে বললে, 'সন্ধ্যার পর থানা থেকে বেরুলুম। স্থির করলুম, শ্রীচরণ-ভরসা করেই বাসায় ফিরব। পূর্ণ 'ব্ল্যাক আউটে'র রাজত্বে কলকাতার সমস্ত পথই আজকাল অন্ধকারে রহস্যময় হয়ে উঠেছে, জানেন তো? চক্ষুষ্মান ব্যক্তিকেও আন্দাজে আঁধারে ঢিল ছুড়তে ছুড়তে অগ্রসর হতে হয়। খানিক পরে একটা বড়ো রাস্তা পার হবার দরকার হল। রাস্তায় নেমে ওপাশে ফুটপাথের কাছে গিয়ে হাজির হয়েছি, হঠাৎ wrong side দিয়ে একখানা মোটর ঘণ্টায় হয়তো পঞ্চাশ মাইল বেগে হুড়মুড় করে একেবারে আমার ঘাড়ের উপরে এসে পড়ল। ভাগ্যে আমি অত্যন্ত সতর্ক ছিলুম, কোনো রকমে লাফ মেরে ফুটপাথে উঠে পড়ে এ-যাত্রা প্রাণে বেঁচে গেলুম! ফিরে মোটরের দিকে তাকাবার আগেই সেখানা বায়ুবেগে অদৃশ্য হয়ে গেল।

'তারপরেই লক্ষ করলুম, সেখানে অন্ধকার প্রায় মিলিয়ে জন-তিনেক লোক ঠিক মূর্তির মতন স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতবড়ো একটা দুর্ঘটনার উপক্রম দেখেও তারা একটুও নড়ল না, আমার কাছে এসে কিছু জিজ্ঞাসা করলে না, কোনোরকম আগ্রহই প্রকাশ করলে না—যেন একটা মানুষের দেহ চোখের সামনে জড়পিণ্ডে পরিণত হওয়া ধর্তব্যেরই মধ্যে গণ্য নয়! মোটরচালক যে স্বেচ্ছায় আমার উপরে এসে পড়েছিল, মনে স্পষ্ট এই ধারণা হল। আমি যে মরলুম না সেটা তার হাতযশ নয়, আমারই পরমায়ুর জোর! তার উপরে এই লোকগুলোর সন্দেহজনক ব্যবহার দেখে আমি আর সেখানে দাঁড়ালুম না, তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে দিলুম। লোকগুলোর নিশ্চেষ্টতা অমনি দূর হয়ে গেল, তারাও আসতে লাগল আমার পিছনে পিছনে। আমি ধীরে চলি, তারাও ধীরে চলে; আমি জোরে চলি, তারাও জোরে চলে; আমি দাঁড়াই, তারাও দাঁড়ায়! তারা আমারই অনুসরণ করছে!

'একটা সরু গলিতে ঢুকলুম। পিছনে পিছনে তারাও ঢুকল। খালি ঢুকল না, আরও বেগে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। একে ঘুটঘুটে অন্ধকার রাত, তার উপরে এই পথিকহীন গলি। গতিক সুবিধের নয় দেখে ছুটতে আরম্ভ করলুম—আমার পকেটে একটা পেনসিল-কাটা ছুরি পর্যন্ত ছিল না। কিন্তু যেমনি ছোটা, পিছনে অমনি রিভলভারের আওয়াজ! সঙ্গে সঙ্গে একটা ধস্তাধস্তির শব্দ! তারপরেই আবার আমার পিছনে পদশব্দ! কিন্তু আমি তখন পায়ের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছি। গলি থেকে বেরিয়ে সামনে আপনার বাড়ি দেখে এইখানেই ঢুকে পড়তে বাধ্য হয়েছি। এই হচ্ছে আমার দৌড় প্রতিযোগিতার বিবরণ।'

অরুণ অবাক হয়ে সব শুনে বললে, 'আপনার বিশ্বাস এইসব ব্যাপারের পিছনে আছে মহাদেও?'

—তা নয়তো কী? আমার ওপরে তার বিজাতীয় রাগ হবার কারণ আছে। প্রথমত, আমি তার দুটো বড়ো বড়ো আস্তানা আক্রমণ করেছি। দ্বিতীয়, এতদিন সে নিরাপদে সকলের চোখের আড়ালে অজ্ঞাতবাস করছিল, কিন্তু আমার জন্যে আজ তার আসল স্বরূপ জাহির হয়ে পড়েছে—'

অরুণ বাধা দিয়ে বললে, 'আমি এ-কথার প্রতিবাদ করি। মহাদেওকে খুঁজে বার করেছে বরুণ।'

প্রশান্ত হেসে বললে, 'বেশ, তাই। তৃতীয়ত, মহাদেওয়ের পরিচয় প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশের কাজ রীতিমতো সহজ হয়ে পড়েছে। আমি মহাদেও আর তার দলের গতিবিধির অনেক খবরই পাচ্ছি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, খুব শীঘ্রই তার হাতে হাতকড়ি পরাতে পারব। মহাদেও এটা আন্দাজ করতে পেরেছে। কাজেই সে আমাকে দুনিয়া থেকে সরাতে চায়।'

এমন সময়ে কিছু জলখাবার ও চায়ের 'ট্রে' নিয়ে শ্রীধর ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলে এবং 'ট্রে'-খানা টেবিলের উপরে রাখলে।'

প্রশান্ত স্তম্ভিত চোখে দেখলে, 'ট্রে'র উপরে খাবারের রেকাবি ও পিরিচ-পিয়ালার সঙ্গে রয়েছে একখানা নীলরঙের খাম।

সে ক্রুদ্ধ স্বরে বললে, 'আবার নীল চিঠি!'

শ্রীধর গম্ভীর অথচ সহজভাবেই বললে, 'ওই নীল খামখানা ঘরে ঢোকবার দরজার সামনে পড়ে ছিল।' বলেই চলে গেল।

প্রশান্ত বললে, 'খামের উপরে আমারই নাম। পত্রলেখক কে, তাও বুঝতে পারছি। অরুণবাবু, আপনার বাড়িতে আমি এলেই দীনু কেমন করে জানতে পেরে বলুন দেখি?'

—কে জানে!

—সত্যি মশাই, এই নীলপত্রবৃষ্টি দেখে দেখে ক্রমেই আমি শ্রান্ত হয়ে পড়ছি। আর ভালো লাগে না।

—আমারও মতে, এ যেন বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে।

—এ তো চিঠি নয়, শমন! নতুন বিপদের অগ্রদূত!

—চিঠিতে বিপদের কথা না থাকতেও পারে। একবার পড়েই দেখুন না!

—দেখি।

চিঠিখানা এই—

'ভায়া অশান্ত,

তোমার গদাই-লশকরি চাল দেখলে কারুর কোনোদিন সন্দেহ হবে না যে, ব্যাঘ্র-তাড়িত হরিণের মতন কত দ্রুতবেগে তুমি দৌড়োতে পারো! আজ আমার একটা নতুন অভিজ্ঞতা লাভ হল।

একটা পরামর্শ নাও। যতদিন-না মহাদেও ধরা পড়ে, তুমি পদব্রজে পথ চোলো না।

আজ কী হত বলো তো? ভাগ্যে আমি আর আমার দুই বন্ধু মহাদেওয়ের চ্যালাদের উপরে লক্ষ রেখেছিলুম, তাই আজ ইহলোকের সঙ্গে তোমার সকল সম্পর্ক ঘুচে যায়নি। গলির ভিতর ঢুকে তারা একবারের বেশি রিভলভার ছোড়বার অবকাশ পায়নি—আমাদের পাল্লায় পড়ে হয়েছিল পপাতধরণীতলে!

তারপর তুমি আহত হয়েছ কি না জানবার জন্যে ছুটে গিয়ে দেখি, শত শত হস্তের ব্যবধানে কোথায় তুমি—কোথায় আমি! শাবাশ ভায়া, আশ্চর্য তোমার retreat করবার ক্ষমতা! তুমিই বঙ্গবীর!

দীনবন্ধু'

পত্র পাঠ করে প্রশান্ত গম্ভীর মুখে বললে, 'অরুণবাবু, দীনুর সঙ্গে দেখা হলে জানাবেন, সে যেন আমাকে আরও-বেশি কৃতজ্ঞতা-পাশে বাঁধবার চেষ্টা না করে।'

—কেন বলুন তো?

—কারণ কৃতজ্ঞতা-ঋণ স্বীকার বা পরিশোধ করবার শক্তি আমার নেই।

—নেই?

—না। আমি সরকারের চাকর। নিমকের মর্যাদা মানি। দীনুকে গ্রেপ্তার করবার জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। হাতে পেলে তাকে আমি মুক্তি দিতে পারব না। এই বলেই প্রশান্ত হঠাৎ উঠে চা ও খাবার স্পর্শ না করেই উত্তেজিত ভাবে ঘরের ভিতর থেকে বেরিয়ে গেল।

দশম

মহেন্দ্রনারায়ণ

তমলুক। এখানকার উপপীঠের অধিষ্ঠাত্রী বর্গভীমাদেবীর নাম বাংলা এবং বাংলার বাইরে দেশ-বিদেশে বিখ্যাত। দেবমূর্তির শত্রু কালাপাহাড়ও বর্গভীমার প্রতি শ্রদ্ধা দেখিয়েছিলেন। এবং পাছে দেবী অসন্তুষ্ট হন সেই ভয়ে বর্গি-দস্যুরা পর্যন্ত কোনোদিন তমলুকে এসেও স্থানীয় বাসিন্দাদের উপরে অত্যাচার করেনি।

মন্দিরের কাছে রূপনারায়ণ নদ। আগে এখানে 'কপালমোচন' নামে সরোবর ছিল, এখন তা রূপনারায়ণের গর্ভে স্থান পেয়েছে। কিন্তু আজও বারুণীর দিন তমলুকের রূপনারায়ণে অবগাহন করলে কপালমোচন তীর্থস্নানের ফল হয়। তাই ওই সময়ে নানা দেশ থেকে অসংখ্য মেয়ে-পুরুষ এখানে পুণ্যসঞ্চয় করতে আসে।

দক্ষযজ্ঞস্থলে আবির্ভূত হয়ে শিব করলেন দক্ষবধ। কিন্তু ব্রহ্মহত্যার পাপে দক্ষের মস্তক বা কপাল শিবের হাতে সংলগ্ন হয়েই রইল। শিবের মহা বিপদ! কত তীর্থে ঘুরলেন, কিন্তু সেই অস্বস্তিকর নরকপালের কবল থেকে অব্যাহতি নেই! অবশেষে বিষ্ণুর পরামর্শে তমলুকের সরোবরে এসে স্নান করবার পর শিবের হাত থেকে দক্ষের মস্তক বিচ্ছিন্ন হল এবং সেইদিন থেকে সরোবরের নাম হল 'কপালমোচন'।

এবারে বারুণী উপলক্ষ্যে তমলুকে এসেছেন আসামের এক মস্ত বাঙালি জমিদার, নাম তাঁর মহেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী। একখানি উদ্যান-সংলগ্ন বাড়ি ভাড়া নিয়ে মাসাধিক কাল তিনি এখানে বাস করছেন।

এর মধ্যেই মহেন্দ্রনারায়ণের অর্থ, দান ও দরাজ হাতের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে লোকের মুখে মুখে। তাঁর বাড়িতে রোজ শত শত গরিবের পাত পড়ে। বর্গভীমাদেবীর মন্দিরে রোজ তিনি পুজো পাঠান অনেক টাকার। স্থানীয় দীনদরিদ্রদের অভাব-অভিযোগের কথা শুনলেই তিনি নিজেই ব্যস্ত হয়ে তাদের কুটিরে ছুটে যান এবং সাহায্য করে আসেন মুক্তহস্তে। এক মাসের মধ্যেই তিনি নাকি জনসাধারণের মধ্যে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন পঞ্চাশ হাজার টাকা।

লোকে বলে, মহেন্দ্রনারায়ণের জামার বোতামে ও হাতের আংটি-দুটিতে যেসব হীরা আছে, তারই মূল্য তিন লক্ষ টাকা।

মহেন্দ্রনারায়ণের সহধর্মিণী নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান এবং তাঁর কোনো আত্মীয়স্বজনও নেই। মৃত্যুর সময়ে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নাকি দেশের ও দশের হিতে তিনি দান করে যাবেন। তমলুকে তাঁর সঙ্গে আছে কেবল কয়েকজন কর্মচারী, দারোয়ান ও বেয়ারা।

মহেন্দ্রনারায়ণের বয়স প্রায় সত্তর বৎসর। যেন পাকা আমটি, সুন্দর গৌরবর্ণ। ফোকলা বদনবিবরে একটিমাত্র দাঁতের অস্তিত্ব নেই। বয়সাধিক্যের জন্যে দেহখানি সামনের দিকে দুমড়ে পড়েছে। একমাথা ও একমুখ দীর্ঘ শ্বেত কেশ। কিন্তু তাঁর দৃষ্টি এখনও সতেজ। লাঠি না ধরে হাঁটতে পারেন না বটে, কিন্তু বেশভূষায় যুবাজনোচিত শৌখিনতা ও বিলাসিতা আজও তিনি ত্যাগ করতে পারেননি।

বারুণীর দুই দিন আগে তাঁর ম্যানেজার এসে খবর দিলে, এক পুলিশ কর্মচারী দেখা করতে চায়।

পুলিশ কর্মচারীটি আর কেউ নয়, আমাদের প্রশান্ত!

প্রশান্তের পরিচয় পেয়ে মহেন্দ্রনারায়ণ সবিস্ময়ে বললেন, 'আপনি ডিটেকটিভ? কলকাতা থেকে এসেছেন আমার সঙ্গে দেখা করতে?'

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—এতবেশি সৌভাগ্যের কারণ কী?

—আপনার সমূহ বিপদ।

—বিপদ! কী বিপদ?

—আজ রাত্রে আপনি খুন হতে পারেন!

বিষম উত্তেজনায় বয়সের ভার উপেক্ষা করে বৃদ্ধ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠলেন, কিন্তু তারপরেই দুমড়ে পড়তে বাধ্য হয়ে আবার আসনগ্রহণ করলেন। দন্তহীন মুখব্যাদান করে ঘাড় নেড়ে, অবিশ্বাসের স্বরে বললেন, 'খুন? আমি হব খুন? অসম্ভব! আমার তো শত্রু নেই!'

—সাধুদের মধ্যে আপনার শত্রু হয়তো নেই। কিন্তু অসাধুরা লোভে পড়লে কারুকে বন্ধু বলে ভাবে না।

—এমন অসাধু কে?

—মহাদেও মিশিরের নাম শুনেছেন?

—না।

—খবরের কাগজে পড়েননি?

—না। পয়সা খরচ করে মিথ্যেকথা পড়ে লাভ কী?

—ঠিক। আমিও মানি। কিন্তু কাগজওয়ালারা মহাদেও সম্বন্ধে ঠিক খবরই দিয়েছে।

—এক আনা সত্যের খাতিরে পনেরো আনা মিথ্যাকে সহ্য করা অসম্ভব। মহাদেও মিশির কে?

—ডাকাত।

—তাই নাকি?

—হ্যাঁ। চারিদিকে দেশে দেশে সে ডাকাতি করে বেড়ায়। ডাকাতির সঙ্গে সঙ্গে খুন না করেও ছাড়ে না।

—বাবা!

—সেই মহাদেও স্থির করেছে, আজ রাত্রে এই বাড়িতে ডাকাতি করবে।

—আপনারা কেমন করে খবর পেলেন?

প্রশান্ত মুরুব্বিয়ানার চালে রহস্যময় হাসি হেসে বললে, 'পুলিশের খবর পাবার হাজার উপায় আছে!'

খানিকক্ষণ নীরবে ভেবে মহেন্দ্রনারায়ণ বললেন, 'আমার এতগুলো দরোয়ান কী করতে আছে? ঘাস কাটতে?'

—মশাই, মহাদেও আর তার দলের কথা আপনি জানেন না। তারা বন্দুক-রিভলভার নিয়ে ডাকাতি করে, পুলিশকেও তারা গ্রাহ্য করে না। নরহত্যায় তাদের বিকট আনন্দ!

মহেন্দ্রনারায়ণের মুখে-চোখে ফুটল ভয়ার্ত বিস্ময়ের চমক। কম্পিত, দুর্বল কণ্ঠে তিনি বললেন, 'তাহলে আমি এক ঘণ্টার মধ্যে তমলুক ছাড়বার ব্যবস্থা করছি!'

—সর্বনাশ!

—কীসের সর্বনাশ? আমি এখনই পালাব!

—আরে পালাবেন কী মশাই?

—পালাব না তো বুড়োবয়সে অপঘাতে মারা পড়ব নাকি?

—না, না, আপনার পালানো-টালানো হবে না!

—দেখুন পালাই কি না! পালাবই পালাব!'

—মশাই, আপনাকে এইখানেই থাকতে হবে!

—বিলক্ষণ! জবাই হবার জন্যে?

—আমরা আছি, ভয় কী?

—ভরসাই বা কীসের?

—আমরা এখানে পাহারা দেব।

—কিন্তু মহাদেও যদি পাহারা ভেদ করে আমার কাছে গিয়ে হাজির হয়?

—অসম্ভব!

—কেন অসম্ভব?

—আমরা সঙ্গে থাকবে তিন ডজন লোক, সবাই সশস্ত্র।

—বুঝেছি, আপনি আমাকে গোরু বা ছাগল রূপে এখানে বন্দি করে রাখতে চান!

—মানে?

—শিকারে গিয়েছেন?

—গিয়েছি।

—শিকারিরা বাঘকে লোভ দেখাবার জন্যে নির্দিষ্ট জায়গায় একটা গোরু কী ছাগল বেঁধে রেখে দেয়। বাঘ যখন আসে, ছাগলের মনের অবস্থা কীরকম হয় জানেন?

—ও হো, আপনি এই কথা বলতে চান? তা—

—ছাগল করে ব্যা-ব্যা, বাঘ করে গাঁ-গাঁ, শিকারির বন্দুক ডাকে গুড়ুম গুড়ুম তারপর দেখা যায় শিকারির বন্দুক ফসকে গেছে, আর বাঘ সরে পড়েছে ছাগলকে মুখে করে।

—ভয় নেই, আমরা আট ঘাট বেঁধে তৈরি হয়ে থাকব।

—সময়ে সময়ে দেখা যায়, শিকারির বন্দুক ফসকায়নি, বাঘ মরেছে—কিন্তু ছাগলকে মেরে। শিকারির লাভ হল, কিন্তু ছাগলের কী লাভ? না মশাই, বুড়োবয়সে আমি ছাগল হতে রাজি নই!

—আপনি আমাদের উপরে নির্ভর করুন, আপনার গায়ে একটা আঁচড়ও লাগতে দেব না।

—কেন বাজে স্তোকবাক্য শোনাচ্ছেন মশাই? অসুর সংহারের জন্যে দধীচি মুনি নিজের বুকের অস্থি দান করেছিলেন। আমি বড়োজোর অর্থদান করতে পারি, অস্থিদান করবার শক্তি আমার নেই।

—আমি কথা দিচ্ছি, আপনাকে অর্থ বা অস্থি কিছুই দান করতে হবে না। আপনি আজ খালি দয়া করে ঘটনাস্থলে হাজির থাকুন।

তবু মহেন্দ্রনারায়ণ হতাশভাবে ক্রমাগত মাথা নাড়েন এবং থেকে থেকে আরও বেশি দুমড়ে পড়েন। প্রশান্তর আশ্বাস-বাণী শুনে কিছুতেই উৎসাহিত হবার লক্ষণ দেখান না।

অবশেষে আরও প্রায় ঘণ্টাখানেক চেষ্টার পর প্রশান্ত তাঁকে রাজি করাতে পারলে। তখনকার মতন বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রশান্ত মনে মনে বললে, 'এখনই সব পণ্ড হতে বসেছিল আর কী! বুড়ো থুত্থুড়ো, শ্মশানের যাত্রী, তিনকাল গিয়ে এককালে ঠেকেছে, এখনও এত মরবার ভয়!'

একাদশ

রাতের অতিথি

রাত। আবার চাঁদ-হারানো মেঘলা রাত—যার নিশ্ছিদ্র কালিমা দেখলে চোর-ডাকাতরা খুশি হয়ে ভাবে, তাদের পরে দেবতাদের করুণার সীমা নেই।

কিন্তু যারা এমন রাতে নিজেদের অজ্ঞাতসারেই শিকারে পরিণত হতে অগ্রসর হয়, তারা ভুলেও মনে আনে না যে, এই আঁধারে শিকারিদেরও লুকিয়ে থাকবার সুবিধা আছে কতখানি!

দেবতারা ঘুমন্ত নন, নির্বোধও নন। ধর্মের কল বাতাসে নাড়বার জন্যে এই দেখতে— নিরাপদ অন্ধকারের টোপ ফেলে তাঁরা অসাধুদের গর্তের ভিতর থেকে বাইরে টেনে আনেন।

মফসসলের অন্ধ রাত্রি। শহরে বসে আমরা তার নিবিড়তা অনুভব করতে পারব না যথার্থভাবে। তারই কালো পক্ষপুটের মধ্যে লুকিয়ে উদ্দাম হাওয়া চ্যাঁচায় হত্যাকারী উন্মত্তের মতন, বুড়ো বুড়ো গাছের দল সর্বাঙ্গ আন্দোলিত করে আর্তনাদ করতে থাকে হিংস্র প্রেতাত্মাদের মতন, প্রকাণ্ড রূপনারায়ণের প্রচণ্ড তরল দেহ বিপুল জলোচ্ছ্বাসে আকাশ-বাতাস ভরিয়ে তোলে পরলোকের খেয়ায় মৃত্যুদূতের গর্জন-স্বরের মতন।

আরও কত ধ্বনি ও প্রতিধ্বনি! জাগছে ঝিল্লিদের ঝরঝরে ঝাঁজরা কণ্ঠের কর্কশ ঝিঁ-ঝিঁ-ঝিঁ-ঝিঁ, জাগছে ওঁদা প্যাঁচাদের চেরা গলার চ্যাঁ-চ্যাঁ চিৎকার, জাগছে ব্যাদড়া বাদুড়দের বন্য ডানার ঝটাপট ঝটাপট এবং জাগছে কোন দূরে শ্মশান-শিবাদের পৃথিবী-স্তম্ভিত-করা ক্ষুধিত ক্রন্দন-কোলাহল!

কালো রাতে দিকে দিকে কালো ছায়া, দুঃস্বপ্নের ইঙ্গিত, ভয়ংকরের আবির্ভাব! মানুষ তাই সৃষ্টির আদিম কাল থেকে এই কৃষ্ণা রাত্রিকে অভিনন্দন দিতে রাজি হয়নি। এরই নিষ্ঠুর কবল থেকে উদ্ধার করেন, তাই সূর্যই হয়েছেন মানুষের প্রথম দেবতা।

গভীর রাত যখন ঝিম-ঝিম-ঝিম-ঝিম করে নীরব সুরে কাঁদতে কাঁদতে ঝিমিয়ে পড়েছে, আচম্বিতে মহেন্দ্রনারায়ণের উদ্যানবাটীতে জাগ্রত হয়ে উঠল বিচিত্র এক নাটকীয় দৃশ্যের সাংঘাতিক অভিনয়! এক মুহূর্তে রাত্রির অন্ধ ঘোমটা গেল টুটে, পৃথিবীর সকল বিজনতা গেল ছুটে!

মহাদেওর কাছে তৃতীয়বার ঠকবে না বলে প্রশান্ত আজ সব দিক সামলে অবতীর্ণ হয়েছে ঘটনাক্ষেত্রে।

মহেন্দ্রনারায়ণের বাসাবাড়ির ভিতরে-বাহিরে সে রেখেছিল পুলিশের সেপাইদের সন্তর্পণে লুকিয়ে।

মহাদেওর সাঙ্গোপাঙ্গরা মস্তবড়ো একটা ঢেঁকি নিয়ে যে মুহূর্তে মহেন্দ্রনারায়ণের বাড়ির সদর দরজাটা সশব্দে ভেঙে ফেললে, অমনি তারা হল দুই দিক—অর্থাৎ বাড়ির ভিতর-বাহির—থেকে আক্রান্ত! সঙ্গে সঙ্গে পেট্রলের লন্ঠনের তীব্র আলোকে চারিদিকের অন্ধকার হয়ে পড়ল যেন মরণাহত!

ঘন ঘন বন্দুক ও রিভলভারের গর্জন, হুংকার ও আর্তনাদ, গুরুভার দেহপতনের শব্দ, দ্রুত পদধ্বনি!

সকলের মাথার উপরে জেগে আছে সুদীর্ঘ এক দানব-দেহ। ধারালো দাঁত-বার-করা কাটা ঠোঁট, ক্রুদ্ধ সাপের মতন তীব্র-তীক্ষ্ন-ক্রুর চোখ! দেখলে প্রাণ আঁতকে ওঠে! রিভলভারের গুলিতে, প্রবল পদাঘাতে, লৌহবৎ মুষ্টির তাড়নায় কয়েকজন লোককে ধরাশায়ী করেও সে যখন দেখলে এদিক-ওদিক থেকে আরও নতুন নতুন শত্রুর আবির্ভাব হচ্ছে, তখন একান্ত নিরুপায়ের মতন পশ্চাৎপদ হল—কারণ তার রিভলভার এখন গুলিশূন্য হয়ে মৃত্যু ছড়াবার শক্তি থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

প্রশান্ত উন্মত্তের মতন চিৎকার করে বললে, 'ধর, ধর! ওই মহাদেও, ডাকাতের সর্দার! আগে ওকে ধর!'

মহাদেও তখন এক এক লাফে তিন-চারটে সিঁড়ির ধাপ পার হয়ে উপরে উঠছে—কেউ তাকে ধরতে পারলে না।

দোতলার বারান্দায় কাঠের মতন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন মহেন্দ্রনারায়ণ—সেখানে আলো নেই।

মহাদেও তাঁকে দেখতে পেলে না—দেখবার অবসরও ছিল না। সে দোতলার ছাদে ওঠবার সিঁড়ি ধরে তিরবেগে অদৃশ্য হল। তারপরেই দম করে একটা দরজা বন্ধ হবার শব্দ!

রুদ্ধশ্বাসে প্রশান্ত বারান্দার উপরে এসে উঠল—তার ডান হাতে তখনও ধূমায়মান রিভলভার, বাম হাতে প্রজ্জলিত টর্চ!

টর্চের আলোতে দেখলে, বারান্দার এক কোণে লাঠির উপরে আরও-বেশি দুমড়ে পড়ে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ মহেন্দ্রনারায়ণ শিবনেত্র হয়ে ভয়ে ঠক ঠক করে কাঁপছেন। প্রায় ভিরমি যাবার অবস্থা আর কী!

প্রশান্ত বললে, 'মহাদেও ওপরে উঠেছে! কোন দিকে গেল সে?'

মহেন্দ্রনারায়ণ জবাব দেবেন কী, একান্ত অসহায় ভাবে মাটির উপরে দুই পা ছড়িয়ে বসে পড়লেন। অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়, সটান লম্বা হয়ে মূর্ছিত হতে আর দেরি নেই।

প্রশান্ত তাড়াতাড়ি কাছে এসে তাঁকে চাঙ্গা করবার জন্যে বারকয়েক ঝাঁকানি দিয়ে বললে, 'আরে মশাই, এখন অজ্ঞান-টজ্ঞান হলে চলবে না। মহাদেও কোনদিকে গেল, দেখেছেন?'

তবু মহেন্দ্রনারায়ণের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরুল না, থর থর কম্পিত হাত তুলে উপরে-ওঠবার সিঁড়ির দিকে কেবল অঙ্গুলিনির্দেশ করলেন।

প্রশান্ত তাঁকে ছেড়ে দিয়ে একসঙ্গে তিন-চারটে সিঁড়ি পেরিয়ে অদৃশ্য হল। ততক্ষণে আরও কয়েকজন পুলিশের লোক দোতলায় এসে হাজির। মহেন্দ্রনারায়ণ তাদেরও পথ দেখিয়ে দিলেন। তারপর মেঝের উপরে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন।

কিন্তু প্রশান্ত উপরে উঠে দেখলে, ছাদের সিঁড়ির চিলেকোঠার দরজা ওপাশ থেকে বন্ধ!

সে গর্জন করে চললে, 'ভাঙো দরজা!'

দুম দুম দুম! পদাঘাতের পর পদাঘাত—পদাঘাতের পর পদাঘাত! মিনিট দেড়েকের মধ্যেই দরজা পড়ল ভেঙে।

প্রকাণ্ড ছাদ—একসঙ্গে সেখানে বসিয়ে হাজার লোক খাওয়ানো যায়। কিন্তু শূন্য ছাদ করছে ধুধু। সেখানে জনপ্রাণীকে আবিষ্কার করা গেল না।

প্রশান্ত উদভ্রান্তের মতন ছাদের উপরে ছুটাছুটি করতে লাগল। কোথায় গেল মহাদেও? হাতের মুঠোর ভিতরে এসেও ফাঁকি দিয়ে পালাল? ছাদের ইটগুলোর ফাঁকে সে কি অদৃশ্য হল কোনো জাদুমন্ত্রবলে? এবারেও অক্ষম হয়ে আমায় কি আত্মহত্যা করতে হবে?

এমনি ভাবনা ভাবতে ভাবতে ছাদের ধারে এসে প্রশান্ত দেখলে, বৃহৎ একটা গাছের মাথা ছাদ ছাড়িয়েও উপরে উঠেছে এবং তারই কতকগুলো মোটা মোটা ডাল প্রায় বাড়ির দেওয়ালকে এসে স্পর্শ করেছে।

এখান দিয়ে পালাবার খুব সুবিধা! প্রশান্ত হেঁট হয়ে নীচের দিকে টর্চের আলো ফেলে দেখবার চেষ্টা করলে।

ঝুপসি গাছ, তার তলদেশ চোখের আড়ালে। টর্চের শিখাও সেখানে পৌঁছায় না।

কিন্তু গাছের তলা থেকে একটা সন্দেহজনক শব্দ তার কানে এল। সেখানে কারা যেন ধস্তাধস্তি করছে! কে যেন কঠিন স্বরে কথা কইছে!

প্রশান্ত আর দাঁড়াল না। 'সবাই আমার সঙ্গে এসো' বলে বেগে ছুটে সিঁড়ি ধরে আবার নীচের দিকে নামতে লাগল।

ওদিকে মহাদেও ছাদ থেকে গাছের উপরে গিয়ে পড়ল এবং তারপর তাড়াতাড়ি নীচের দিকে নেমে গাছ থেকে লাফিয়ে পড়ল—

—এবং সঙ্গে সঙ্গে দু-খানা পাথরের মতন কঠিন বাহু তাকে প্রায় যেন লুফে নিলে!

তার বিস্ময়ের প্রথম চমক ছোটবার আগেই ভয়ংকর এক আঘাতে সে মাটির উপরে লুটিয়ে পড়ল আচ্ছন্নের মতন! সে আচ্ছন্ন অবস্থাতেই ক্ষীণভাবে অনুভব করলে, অত্যন্ত কৌশলী ও দ্রুত হস্তে কে যেন হাত ও পা দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলছে! মুহূর্ত-পরেই তার আচ্ছন্ন ভাব গেল ছুটে। তাড়াতাড়ি সে ওঠবার চেষ্টা করলে, পারলে না!

অন্ধকারেই কে চাপা গর্জন করে বললে, 'চুপ করে শুয়ে থাক। তুই আমার বন্দি!'

মহাদেও দাঁত ঠোঁট কামড়ে বাঁধন ছেঁড়বার জন্যে বৃথা চেষ্টা করতে করতে বললে, 'কে তুই?'

—যম! তুই আমার সুনামে কালি দিতে চেয়েছিলি তাই আজ তোর এই দুর্দশা!

—কে তুই? কে তুই?

—পুলিশের কাছে প্রথম তোর খবর পাঠিয়েছিলুম আমিই। গঙ্গার বুকে গোয়েন্দা প্রশান্তকে তোর কবল থেকে উদ্ধার করেছিলুম আমিই। তোর বুকে লাথি মেরে তোকে জলে ফেলে দিয়েছিলুম আমিই। তোর আস্তানায় বন্দি হয়েও তোকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে ছিলুম আমিই। তমলুকে এসে তুই লুকিয়ে আছিস খবর পেয়ে প্রশান্তকে এখানে ডেকে এনেছি আমিই! আর আজ তোকে শিশুর মতন কাবু করেছি আমিই!

মহাদেও দাঁত কড়মড় করতে করতে বললে, 'কে তুই? তোর নাম কী?'

—আমার নাম দীনুডাকাত!

বিপুল বিস্ময়ে ভয়ানক চমকে আবার ওঠবার চেষ্টা করতে করতে মহাদেও বললে, 'কী! কী বললি?'

—আমি দীনুডাকাত! আমার নাম নিয়ে তুই ছেলেখেলা করেছিস, তাই তোর এই দুর্দশা!... ওই প্রশান্ত আসছে! আমি চললুম—তোর ফাঁসিকাঠের দোলনার ব্যবস্থা করে!

দীনুডাকাতের মূর্তি অন্ধকারের মধ্যে সাঁৎ করে অদৃশ্য হয়ে গেল—প্রাণপণে চিৎকার করে মহাদেও বলে উঠল, 'দীনুডাকাত পালায়! ধর, ধর—দীনু ডাকাত পালায়!'

প্রশান্ত হন্তদন্তের মতন ছুটে এসে সচমকে বললে, 'কে? কে পালায়?... ...আরে, এই যে মহাদেও! কী আশ্চর্য, এর হাত-পা যে বাঁধা!

মহাদেও বিষম চিৎকার করে বললে, 'দীনুডাকাত—দীনুডাকাত! আমার এ-দশা করবার শক্তি আছে কেবল দীনুডাকাতের!'

প্রশান্ত হতভম্বের মতন বললে, 'এখানেও দীনুডাকাত?'

মহাদেও ছটফট করতে করতে বললে, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ! তুই প্রশান্ত গোয়েন্দা তুই তো ছার পতঙ্গ, তোর সাধ্য কি যে আমার মতন মাতঙ্গকে ধরিস? আমাকে ধরেছে দীনুডাকাত!'

প্রশান্ত বললে, 'কোথায় তোর দীনুডাকাত?'

—ওইদিকে পালিয়েছে!

—কোন দিকে?

—ওইদিকে! দীনুডাকাতের সঙ্গে যদি ফাঁসিকাঠে চড়তে পারি সে আমার সৌভাগ্য!

প্রশান্ত ভয়ংকর চটে উঠে বললে, 'কী বললি তুই হারামজাদা? তোর সঙ্গে দীনুডাকাত চড়বে ফাঁসিকাঠে? আকাশের চাঁদ নামবে জোনাকির পাশে?'

মহাদেও টিটকিরি দিয়ে বললে, 'আরে কেয়াবাত—কেয়াবাত! দীনুডাকাত বলতে যে অজ্ঞান দেখছি! সে কত ঘুষের টাকা দেয়? আমি তার ডবল টাকা দেব—আমার হাতপায়ের দড়ি খুলে দাও দেখি মানিক!'

মহাদেওয়ের মুখের উপরে সজোরে এক পদাঘাত করে প্রশান্ত চেঁচিয়ে বললে, 'এই সেপাইরা! হাঁ করে এখানে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? খোঁজ—খোঁজ—দৌড়ে যা, ধরে আন দীনুডাকাতকে! যে দীনুডাকাতকে ধরতে পারবে, আমি নিজে তাকে দু-হাজার টাকা বকশিশ দেব! একসঙ্গে দীনু আর মহাদেও! এদের দুজনকে যদি কলকাতায় নিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমি অমর হব!'

সেপাইরা বন্দুক আন্দোলন করে বিপুল উৎসাহে ছুটে গেল দিকে দিকে।

কিন্তু প্রশান্ত কিছুমাত্র আশ্বস্ত হল না। নিজের মনে-মনেই বললে, 'হাতের মুঠোর ভিতরে পেয়েও যাকে বারে বারে হারাই, সেই দীনুডাকাতকে ওরা ধরবে? ধেৎ! আমার কেবল পুরস্কার ঘোষণাই সার!

হ্যাঁ, প্রশান্তর অনুমান মিথ্যা নয়, তার কেবল পুরস্কার ঘোষণাই সার হল, দীনুডাকাতের পাত্তা মিলল না।

কিন্তু পরদিনই ডাকযোগে দীনুর বদলে এল দীনুর এক পত্র। সেই নীল চিঠি!

পত্রের ভাষা এই

'অশান্তভায়া,

আমার বাক্যরক্ষা করেছি। তোমার করকমলে মহাদেওকে দিয়েছি উপহার। সাবধান, সে যেন তোমাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ না দেখায়।

প্রস্তুত হয়ে থাকো। নকল দীনু ধরা পড়ল। এইবারে আসল দীনবন্ধু করবে আত্মপ্রকাশ। এবারে আমি তো আর তোমাকে সাহায্য করব না, দীনবন্ধুর দিকে তোমার পঙ্গু বাহু বিস্তার করে তাকে হৃদয়ে ধারণ করতে পারবে তো?

গর্দভরাজ, তুমি গতকল্যও আমাকে হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়েছিলে, এমন সন্দেহ তোমার হয়েছে কি?

তুমি অন্ধ। বার বার আমাকে সামনে পেয়েও দেখতে পাওনি। বুড়ো জমিদার মহেন্দ্রনারায়ণ কে জানো? সে আমি। শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলে বোধহয়?

ফোকলা মহেন্দ্রনারায়ণের ভূমিকায় আমার অভিনয় নিশ্চয়ই মন্দ হয়নি? 'স্টেজে' নামলে আমি যে শিশির ভাদুড়ীর চেয়ে কম নাম কিনতুম না, এ-সম্বন্ধে তুমি আমাকে একখানি প্রশংসাপত্র দিলে পরম আনন্দিত হব। দেবে?

আমার আসল চেহারার সঙ্গে পরিচয় থাকলে তুমি হয়তো চিনতে পারতে, কী বলো? কিন্তু আসল চেহারা আমি কারুকে দেখাই না।

চরের মুখে খবর পেয়েছিলুম, কলকাতার পুলিশকে অত্যন্ত জাগ্রত দেখে মহাদেও এসে লুকিয়েছিল তমলুকে। আমি জানতুম, 'স্বভাব না যায় মলে'। মহেন্দ্রনারায়ণের মতন একটা মস্ত এবং সুলভ শিকারকে হাতের কাছে হাজির দেখলে মহাদেও লোভ সংবরণ করতে পারবে না কিছুতেই।

যা ভেবেছিলুম, তাই। আমার সাহায্যে তোমার মতন তৃতীয় শ্রেণির গোয়েন্দার গৌরবর্ধন করবার জন্যে সে যেচে দিয়েছে ফাঁদে পা। অতএব, জয় অশান্ত-গোয়েন্দার জয়!

আশা করি, এর ফলে হবে তোমার পদ-বৃদ্ধি—যদিও চতুষ্পদের পদবৃদ্ধি আমি পছন্দ করি না। ইতি

দীনবন্ধু'

পত্র পাঠ করে প্রশান্তর কণ্ঠদেশ বিশুষ্ক হয়ে গেল সাহারার মতন। অস্থির কণ্ঠে সে হাঁকলে, 'জল! শিগগির এক গেলাস জল!'


* হেমেন্দ্রকুমার রায় রচনাবলীর সপ্তদশ খণ্ডে 'মায়ামৃগের মৃগয়া' দেখুন।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%