পল্লবী সেনগুপ্ত
প্রাণপণে ছুটছে একটা মেয়ে। কেন ছুটছে বোঝা যাচ্ছে না। তবে একটা মাত্রাতিরিক্ত তাগিদ যে ওকে ছোটাচ্ছে সেটা বোঝা যাচ্ছে বেশ ভালোই। তাগিদটা কিসের? নিজেকে বাঁচানোর নাকি অন্য কিছু বাঁচানোর? জায়গাটা কোনো জনবহুল লোকালয় নয়, ফাঁকা বিস্তীর্ণ একটা এলাকা। চারপাশে বিছিয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত প্রগাঢ় নৈঃশব্দ। কেমন যেন অন্য পৃথিবীর একটা দেশ মনে হচ্ছে চারদিকটা দেখে।
মেয়েটা এখনও ছুটেই চলেছে। ওর পিছনে ওটা কী? ক্ষিপ্র গতিতে ওকে ধাওয়া করে ছুটে আসছে একটা বীভৎস নারকীয় মূর্তি। কে ওই মূর্তি? ও কি কোনো মানুষ নাকি অন্য জগতের কোনো পিশাচ? কী চায় ও? মেরে ফেলতে চায় কি মেয়েটাকে? মেয়েটা এখনও ছুটেই যাচ্ছে। আর ওর পিছনেই অমানুষিক গতি নিয়ে দৌড়াচ্ছে ওই নারকীয় অবয়ব। ক্রমেই দূরত্বের ব্যবধান কমে আসছে ওদের। এইবার বোধহয় ঝাঁপিয়েই পড়বে ওই হিংস্র মূর্তিটা সর্বশক্তি নিয়ে মেয়েটার ওপর। কিন্তু ওই মেয়েটার কোনোদিকেই ভ্রূক্ষেপ নেই। পাগলের মতো এলোপাথাড়ি শুধু ছুটেই যাচ্ছে ও। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কি?
ধপাস করে একটা বিচ্ছিরি আওয়াজ হল হঠাৎ করে। মেয়েটা মুখ থুবড়ে পড়ে গেছে কিছুতে পা বেধে। ও উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। পৈশাচিক উল্লাসের একটা হাসির শব্দ শোনা গেল এবার। ওই বীভৎস মূর্তিটা হাসছে। তার শিকার এবারে একেবারে তার বাগে যে!
স্বপ্নটা ভেঙে যেতেই ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল মেয়েটা। এখনও ঠকঠক করে কাঁপছে সে। আবার এসেছিল সেই দুঃস্বপ্নটা! কেন এই মারাত্মক স্বপ্ন বারবার তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায় ওকে?
চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বিষণ্ণ ভাবে তাতে ছোট একটা চুমুক দিল ইলিনা। ঘড়ির দিকে তাকাল একবার। সবে এখন বিকাল পাঁচটা। তার মানে শিলাদিত্যর ফিরতে এখনও অনেকটা দেরি আছে। প্রায় ঘণ্টা তিনেক তো বটেই। আচ্ছা আজ কি শিলাদিত্য একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে পারে অফিস থেকে? মনে হয় না। কেনই বা ফিরবে? ইলিনা কি এখন তার সেই কলেজ জীবনের প্রেয়সী নাকি যে তার জন্মদিনে হাতে উপহার, ফুল, কেক সবকিছু সাজিয়ে নিয়ে হুট করে অফিস কেটে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে সারপ্রাইজ দেবে ও! ইলিনাই বোধহয় এখন শিলাদিত্যের জীবনের সবথেকে বড় কাঁটা, যাকে ও না পারছে গিলতে আর না পারছে উগরাতে। যে স্ত্রী বিয়ের নয় বছর পরেও একটা সন্তান তার স্বামীর কোলে তুলে দিতে পারে না তার থেকে যে-কোনো স্বামীই যে মুক্তি চাইবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু শিলাদিত্য তেমন মানুষ নয়। সে অত্যন্ত ভদ্র, রুচিশীল এক মানুষ। সে কোনোদিন ইলিনার অক্ষমতা নিয়ে ভুল করেও একটা শব্দ উচ্চারণ করে না। কিন্তু তাই বলে ইলিনা কি বোকা? ও সব বুঝতে পারে। ও বুঝতে পারে আস্তে আস্তে শিলাদিত্য কেমন করে বদলে গেল। ইউনিভার্সিটির সেই হাসিখুশি প্রাণখোলা ছেলেটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে আজ।
আসলে ইলিনা তো জানে শিলাদিত্য ভীষণ বাচ্চা ভালোবাসে চিরকাল। আজ থেকে তো আর ওকে চেনে না ইলিনা। চেনে সেই ইউনিভার্সিটির দিনগুলো থেকেই। যখন ওরা সেকেন্ড ইয়ারে সেই সময় শিলাদিত্যর দিদির ছেলে জন্মেছিল। উফফ! সে কী আনন্দ তখন ওর। মামা হয়েছে বলে কথা। তখন থেকেই ইলিনাকে ও বলত,
'জানিস ইলিনা ছোট বাচ্চাদের আমার ভীষণ ভালো লাগে। ঠিক যেন মনে হয় জ্যান্ত পুতুল। বিয়ের পরে আমাদের যখন বেবি হবে তখন তোকে কিচ্ছু করতে হবে না। আমিই সব সময় ওকে আগলে রাখব দেখিস'।
আর সেই মানুষটার কপালে সন্তান সুখই জুটল না। কত ডাক্তার, কত চিকিৎসা তো হল। কিন্তু কিছুতেই কিছু লাভ হল না এখনও অবধি। না শিলাদিত্যর কোনো শারীরিক সমস্যা নেই সেটা ডাক্তারি পরীক্ষায় প্রমাণিত। সামান্য কিছু সমস্যা ইলিনার তরফ থেকেই ছিল। তার যথাযোগ্য চিকিৎসাও করা হয়েছে, কিন্তু তবুও কেন যে কিছু ঠিক হচ্ছে না কে জানে! তবে এখনও হাল ছাড়েনি ইলিনা। আর কোনোদিন সেই হাল ছাড়বেও না। শেষ অবধি ও লড়ে যাবে ভাগ্যের সাথে। ডাক্তারের সব নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলে ও। সব ওষুধ পত্র ঠিকমতো খায় একেবারে নিয়ম করে, ডাক্তারের বেঁধে দেওয়া দিনক্ষণ সময় মেনে নিয়ম করে চলছে শারীরিক মিলনও। হ্যাঁ শুধুই শরীরের মিলন, আর কিচ্ছু নয়। ইলিনা খুব ভালো করে অনুভব করে মিলনের ওই সময়টায় শিলাদিত্য একেবারে যন্ত্রের মতো করে পালন করে নিজের ভূমিকাটুকু। সেখানে কোনো মনের অনুভূতি থাকে না।
চোখ দিয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল ইলিনার। কিন্তু সেটা মোছার কোনো চেষ্টাই করল না ও। কী হবে চোখের জল মুছে! ঈশ্বর যার গোটা জীবনটাই অশ্রু সাগরে নিমজ্জিত করেছে দু-ফোঁটা চোখের জল মুছে সে আর কিই বা করবে! কেন ঈশ্বর কিছুতেই সদয় হচ্ছেন না ওর প্রতি কে জানে! হ্যাঁ ইলিনা এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে সবকিছু তথাকথিত বিজ্ঞানের আওয়তাতেই যে সব সময় পড়ে তা নয়। বিজ্ঞানের বাইরেও অনেক সময় অনেক কিছু থাকে, অনেক মিরাকল ঘটে। তাই শুধু ডাক্তারি বিদ্যায় যে ও ভরসা রেখে বসে আছে এমনও নয় ; নানা পুজো, উপোষ, তাবিচ, কবচ, মন্দির, মসজিদ ছুটোছুটি এগুলোও সমান তালে জারি রেখেছে ও। বলা তো যায় না কোনটায় কী কাজ হয়! তবে এই সবই ওকে করতে হয় শিলাদিত্যকে সম্পূর্ণ লুকিয়ে। কারণ শিলাদিত্য এগুলো জানলে মারাত্মক রেগে যাবে। বিজ্ঞান আর যুক্তির বাইরে কোনো কিছুতে ওই মানুষটার এক ফোঁটাও বিশ্বাস নেই।
ঘ্যার ঘ্যার করে মোবাইল ফোন ভাইব্রেট হবার শব্দে ভাবনার ঘোরটা ছিঁড়ল ইলিনার। স্ক্রিনে মায়ের নম্বর। আজ সকাল থেকে মা অনেকবার ফোন করেছে। ইলিনা ধরেনি। একদম ইচ্ছা করছিল না। যে নিজের ঘরের মানুষটাকেই সামান্য শান্তি দিতে পারে না তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা, ভালোবাসা এগুলো পাবার কোনো যোগ্যতা নেই এই ভাবনা থেকেই ধরেনি ফোনটা। অবশ্য মাকে কষ্ট দিয়েই বা কী হবে! একা মানুষটা তো পড়ে রয়েছে সেই সুদূর মেদিনীপুরে আর ও কলকাতায়। তার সাথে দেখাও তো হয়নি কতদিন।
'হ্যালো''ঘ্যাসঘেসে স্বরে ফোন ধরল ইলিনা।
'ইলু মা, কী হয়েছে তোর? কেন ফোন ধরলি না সারাদিন''?
'ভালো লাগছে না তাই'।
'কী হয়েছে রে মা তোর? গলাটা এমন ভার কেন লাগছে? আজকের দিনেও কি এমন করে মন খারাপ করতে হয় বল তো?'
'মা আমি আর পারছি না। বুকের ভেতর এই যন্ত্রণার পাহাড় আমি আর সত্যি বয়ে বেড়াতে পারছি না বিশ্বাস কর। আমার মনে হচ্ছে আমি পাগল হয়ে যাব। সব সময় মনটা ছটফট করে। আমার মনের মধ্যে চেপে বসেছে একটা অদ্ভুত ভয়। জান মা, আমি রাতে ঘুমাতেও পারি না ভালো করে। দু-চোখের পাতা এক করলেই বারবার একটা বীভৎস দুঃস্বপ্ন ঘিরে ধরে আমায়। একটা হাড় হিম করা স্বপ্ন। আমি প্রতিবার দেখি কেউ ধেয়ে আসছে আমার দিকে, মেরে ফেলতে চাইছে আমায়, কেড়ে নিতে চাইছে আমার সবকিছু'। হাউহাউ করে কাঁদছে এবার ইলিনা। মায়ের কাছে বিবৃত করছে নিজের কষ্টটুকু। বুকের মধ্যে জমে থাকা ভয় আর প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ান দুঃস্বপ্নটার আজ প্রথমবার ইলিনা বলছে কাউকে। ঠক ঠক করে কাঁপছে ও বলতে গিয়ে। বলতে বলতেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে ক্রমাগত তাড়া করে বেড়ান ভয়াবহ সেই স্বপ্নটার কদর্য দৃশ্যপট।
হোটেল বুকিংটা কনফার্ম করে একটা বড় করে স্বস্তির শ্বাস নিল শিলাদিত্য। হোটেল ঠিক নয়, অনেকটাই হোমস্টে টাইপের ব্যাপারটা। ঘরোয়া পরিবেশে থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা প্রকৃতির কোলে। খরচও বেশ অনেকটাই কম লাগছে ব্যানার্জিদার পরিচিতির দৌলতে। কতদিন পর আবার ইলিনার সাথে একটু একান্তে সময় কাটানোর মতো সুযোগ এসেছে অবশেষে রোজকার এই একঘেয়ে জীবনের ফাঁকে।
আসলে শিলাদিত্য বেশ ভালোই বোঝে দিন দিন কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছে ওর আর ইলিনার সম্পর্কের মাধুর্যটা। ইলিনা আজকাল দরকারের বাইরে খুব বেশি কথাই বলে না। কেমন যেন হারিয়ে থাকে ও অন্য একটা জগতে। সব সময় কী যেন ভাবতেই থাকে, দু চোখে বিছিয়ে থাকে বিষাদের ছায়া। অবশ্য শিলাদিত্য নিজেই বা তার থেকে আলাদা কিসে! আজকাল সেই বা কতটুকু সময় দেয়! আসলে ওরা দুজনেই জীবনের একটি মাত্র অপ্রাপ্তিকেই বোধহয় বড্ড বেশি প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছে। তাই আজ জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ বর্ণ, সম্পর্কের সহজ সমীকরণটুকুও হারিয়ে ফেলেছে নিজেরাই।
কিন্তু আর না। এই অপ্রাপ্তির বেদনাকে বুকে জড়িয়ে আর জীবনের দিনগুলো পের করবে না ওরা। নিজেদের সম্পর্কটাকে মেরামত করতে হবে, জীবনটাকেও পুনর্গঠন করতে হবে। নিজেদের ছোট ছোট খুশিগুলো নিয়ে আবার ভাবা শুরু করতে হবে। আর সেই পথে এগোবার জন্য প্রতি পদক্ষেপটা আজ নিয়েছে ও। ইলিনাকে না জানিয়েই নিয়েছে। কতদিন তো ওকে সারপ্রাইজ দেওয়া হয়নি।। এই ট্রিপ টা না হয় বহুদিন পরের সেই সারপ্রাইজই হোক।
পাহাড়ে বেড়াতে যাবার বন্দোবস্ত করেছে শিলাদিত্য। পাহাড় যে সেই ইউনিভার্সিটির সময় থেকেই ইলিনার আর ওর দুজনেরই ভীষণ প্রিয়। বিয়ের পর পর বেশ কয়েকবার পাহাড়ের কোলে বেড়াতেও গিয়েছিল ওরা। কিন্তু সে সব পার্ট চুকে গেছে বহুদিন হয়ে গেল। কিন্তু আবার নতুন করে শুরু করতে হবে, তাই পাহাড়ে বেড়ান দিয়েই শুরুটা হোক না হয়। এর আগে পাহাড় বলতে একবার ওরা গেছিল গ্যাংটক, একবার উটি আর একবার কালিম্পং। কিন্তু এইবার ঠিক সেরকম চেনা ছকে বাঁধা কোন জায়গা প্ল্যান করেনি শিলাদিত্য। এবারের জায়গাটা একেবারে অন্যরকম। আধুনিক প্রজন্মের ভাষায় যাকে বলে 'হটকে 'আর কী! খুব বেশি লোক এই জায়গাটার ব্যাপারে জানেও না। এটা হিমাচল এর সোলান নামের জেলার একটা ছোট্ট ক্যান্টনমেন্ট শহর। টুরিস্ট স্পট হিসেবে এই জায়গাটা এখনও খুব একটা খ্যাতি লাভ করেনি, খুব বেশি হোটেল বা থাকার জায়গা যে এখানে আছে এমনও নয়। তবে অফিসের ব্যানার্জিদার পরিচিতির সুবাদে একটা বেশ ভালো হোমস্টে পাওয়া গেছে যেখানে কয়েকটা দিন বেশ নির্বিঘ্নেই কাটানো যাবে প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়ে।
মোবাইলে ইলিনার নম্বরটা ডায়াল করল শিলাদিত্য। দু একবার রিং হবার পরেই ফোন রিসিভ করল ইলিনা। যথারীতি বিষণ্ণ গলা।
'হ্যালো'
'কী করছিলে ইলিনা'? সেই অনেক দিন আগের মতো আবেগঘন করে বলতে চেষ্টা করল শিলাদিত্য।
'তুমি? হঠাৎ এমন অসময়ে ফোন করলে যে! ফিরতে দেরি হবে বুঝি'?
'না ফিরতে দেরি হবে না'।
'তবে কেন ফোন করলে হঠাৎ? অন্য কোনো দরকারি কথা আছে?'
'কেন ইলিনা আজকাল আমাদের মধ্যে দরকারি কথা ছাড়া আর কি অন্য কোনো কথা থাকতে পারে না? কেন আমরা নিজেদের মধ্যে এত দূরত্ব বাড়িয়ে ফেললাম বল তো? সন্তান না আসাটা কেন এভাবে তিল তিল করে আমাদের দুজনের ভালোবাসাটা মেরে ফেলছে'? ভীষণ আকুতি নিয়ে কথাগুলো বলল শিলাদিত্য। তারপর একটু থেমে ফের বলল,
''গত মাসে তোমার জন্মদিনেও তো তেমন ভালো কিছু উপহার দেওয়া হল না। তাই আমি তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ উপহার প্ল্যান করেছিল ইলিনা। একটা টুর, তাও আমাদের সবচেয়ে প্রিয় পাহাড়ে। আবার আমরা একসাথে বেড়াতে যাব। কয়েকদিন সব সমস্যা ভুলে প্রাণ খোলা শ্বাস নেব প্রকৃতির মাঝে, দুজন দুজনের সান্নিধ্য উপভোগ করব সেই আগের দিনগুলোর মতো। আমি সব ফাইনাল করে ফেলেছি। তুমি যাবে তো ইলিনা?'
'সত্যি? সত্যি বলছ তুমি? তুমি এখনও আমায় নিয়ে এত ভাব? আজও ভালোবাসা আমায়? সত্যি আবার সেই আগের মতো খানিকটা সময় ফিরে পাব আমরা?' আবেগে ভিজে গেছে ইলিনার গলাটা। শিলাদিত্য ফোনের এপার থেকেও বুঝতে পারল বহুদিন পর আবার ভীষণ খুশি হয়েছে ওই মানুষটা। সেই খুশি প্রতিফলিত হচ্ছে ওর মুখ থেকে নির্গত প্রতিটা শব্দে।
'হ্যাঁ ইলিনা আমরা সত্যি আবার নতুন করে শুরু করব।' ভালোবাসা জড়িয়েই বলল শিলাদিত্য।
'কোথায় যাচ্ছি আমরা? খুব দূরে কোথাও নাকি কাছে পিঠেই'? পলকেই ইলিনার স্বর যেন আদুরে সেই পুরোনো দিনগুলোর মতোই।
'একটু দূরে। শিমলা কালকা হাইওয়েতে। এটা একটা ছোট্ট ক্যান্টনমেন্ট শহর। খুব পরিচিত নাম নয়, তবে ভীষণ সুন্দর একটা জায়গা। একেবারে অন্যরকম ডেসটিনেশন যাকে বলে আর কি'।
'কোন জায়গা গো? নাম কী'?
'দাগশাই। জায়গার নাম দাগশাই। অনেক রকম ঐতিহাসিক দেখার জায়গাও আছে এখানে।'
'কী! দাগশাই! কী বলছ কি তুমি? দাগশাই'? শিলাদিত্য বুঝতে পারল এবার গলা কাঁপছে ইলিনার। স্বর জড়িয়ে আসছে যেন। মুহূর্তের মাঝেই ওর স্বর থেকে সবটুকু খুশি গায়েব। মনে হচ্ছে যেন জায়গাটার নাম শুনেই মারাত্মক ভয় পেয়ে গেছে ও। কিন্তু কেন? এমন একটা অচেনা অজানা জায়গার নাম শুনে কেনই বা ভয় পেতে যাবে ও?
'ইলিনা কী হল তোমার? তুমি কি ভয় পেলে নাকি কোনো কারণে'? মোলায়েম স্বরেই জিজ্ঞাসা করল শিলাদিত্য। কিন্তু কোনো জবাব এল না। কারণ ততক্ষণে ওপার থেকে কেটে গেছে ফোনের লাইন।
জানলার কাচের এপার থেকেই ওপারে বিছিয়ে থাকা মেঘভরা আকাশটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল ইলিনা। গতকাল এসে পৌঁছেছে ওরা এই জায়গাটায়। দাগশাই, ছোট একটা ছিমছাম শৈল শহর। সত্যি কথা বলতে কি এখানে আসার একেবারে ইচ্ছা ছিল না ওর। জায়গাটার নাম শুনেই শিউড়ে উঠেছিল ও। কিন্তু তারপর পলকেই সামলে নিয়েছিল নিজেকে। কারণ শিলাদিত্য। সে মানুষটা ভীষণ খুশি ছিল এই ট্রিপটা নিয়ে। মন খুলে এই সফরটা একেবারে নিজের মনের মতো করে সাজিয়েছিল সে। কতদিন পর আবার প্রাণ খুলে হাসছিল ছেলেটা। ও ভীষণ ভাবে চাইছে নিজেদের মাঝের সমস্ত দূরত্বটুকু মুছে দিয়ে আবার সব নতুন করে শুরু করতে। একটা ছোট বাচ্চাকে দত্তক নেবার কথাও বলছিল শিলাদিত্য। হ্যাঁ ইলিনাও তাই চায়, মনেপ্রাণে তাই চায়। যে ধরা দিতে চায় না তার জন্য হা হুতাশ করে নিজের মানুষটাকে হারাতে ও নিজেও তো চায় না। ও ভীষণ ভাবেই চায় আবার নিজেদের অগোছালো হয়ে যাওয়া সম্পর্কটাকে সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে। আর শুধুমাত্র সেই কারণেই নিজের মনের সবটুকু অস্বস্তি আর উৎকণ্ঠাকে দমন করে শিলাদিত্যর হাত ধরে এসেছে এই জায়গাটায়।
আসলে এই দাগশাই জায়গাটার নাম বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অজানা হলেও ইলিনার কাছে এটা অপরিচিত ছিল না কোনোদিনই। অনেক ছোটবেলা থেকেই এই নামটা যেন স্মৃতির মধ্যে গেঁথে রয়েছে ওর। ঠাম্মার কাছে গল্প শুনেছিল ও অনেকবার, এই দাগশাই-এর ব্যাপারেই। ভারতবর্ষ তখন পরাধীন, এই দাগশাই বা দাগাশাহীতেই ছিল ব্রিটিশ সরকার নির্মিত এক কুখ্যাত জেল। এই জেলে বন্দি থাকা আসামিদের ওপর নানা সময়ে নানারকম ভাবে চলে এসেছে নানা অত্যাচার। এমনকী অন্যায় ভাবে মরতেও হয়েছে বহু মানুষকে। ব্রিটিশ ভারতের সময়কালে এই দাগশাহি জেলেরই এক অন্যতম অত্যাচারী অফিসার ছিলেন গডউইন গোমস। এই অ্যাংলো ইন্ডিয়ান অফিসার ছিলেন আদতে ইলিনাদেরই এক পূর্বপুরুষ। গডউইন এর অত্যাচারে তটস্থ থাকত সেই সময় জেলের কয়েদিরা এবং তার প্রতাপেই ১৯২০ সালে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত একাধিক আইরিশ সেনাকে যারা শুধু নিজেদের মাতৃভূমির অর্থাৎ আয়ারল্যান্ডের মুক্তি যুদ্ধির সমর্থনে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সরব হতে চেয়েছিল। সেই সব মৃত মানুষদের আত্মা নাকি আজও শান্তি পায় না এমনটাই বলত ঠাম্মা। তারা নাকি আজও প্রতিশোধ খুঁজে ফেরে এই দাগশাহির পাহাড়ি বাতাসেই। গডউইন গোমসও নাকি ভীষণই অদ্ভুতভাবে অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন ১৯২৫ সাল নাগাদ, আর তাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। ঠাম্মা বলতেন ওদের সব ভাইবোনকে,
'শুনে রাখ দিদিভাই, দাদাভাইরা জীবনে আর যেখানেই পা রাখ না কেন এই দাগাশাহির মাটিতে ভুলেও কখনো পা দিও না। আজও কিন্তু ওখানে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রয়েছে একদল অতৃপ্ত আত্মার প্রেতশক্তি। গডউইন এর রক্তে আজও যে তাদের বড় তেষ্টা। গোমস পরিবারের কাউকে বাগে পেলে তারা যে ছিঁড়ে খুঁড়ে উল্লাস করবে।'
ইলিনা বুঝত না এই কথাগুলোর কি কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে নাকি এগুলো শুধুই ছেলেভুলানো গল্প। কিন্তু যাই হোক না কেন সেই ছেলেবেলা থেকেই এই গল্পগুলো ভীষণ গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল ইলিনার মনে। ও ঘুমালেই যেন দেখতে পেত ও পৌঁছে গেছে একটা পাহাড়ি জায়গায়, যেখানে ওর দিকে ছুটে আসছে কোনো পিশাচ। ও প্রাণপণে পালানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু শেষ রক্ষা কিছুতেই হচ্ছে না। হ্যাঁ সেই ছোটবেলা থেকেই এই স্বপ্নটা তাড়া করে বেড়াত ওকে। আজকাল জীবন আরও বেশি একাকীত্বময় হয়ে গেছে বলে এই স্বপ্ন যেন আরও বেশি করে কামড় বসায় ওর দুর্বল মনে। ঘুমের মধ্যেও ভয় ঘেমে নেয়ে ওঠে ও, আতঙ্কে অসাড় হয়ে আসে ওর হৃৎপিণ্ড।
কিন্তু আজ কি তবে সেই সব আতঙ্কের উৎসস্থলেই এসে পৌঁছেছে ইলিনা? ইলিনা চক্রবর্তী তো আসলে ইলিনা গোমসই। বিয়ের পর মেয়েদের পদবি, জাতপাত পরিবর্তন হলেও রক্ত তো আর পরিবর্তন হয় না। ইলিনার ধমনিতে তো প্রবাহিত প্রতি মুহূর্তেই হয়ে চলেছে সেই অত্যাচারী ধুরন্ধর অফিসার গডউইন গোমসের রক্ত। কিন্তু এসব কথা ও কখনো বলেনি শিলাদিত্যকে, বলবেও না। আগে কখনও বলেনি কারণ মনে হত ওর এই সব আজগুবি ভয় বা স্বপ্নের কথা শুনলে হয়তো ছেলেটা হো হো করে হাসবে আর পরে কখনো বলতে ইচ্ছেই করেনি। যে মানুষটা ওকে নিয়ে এমনিতেই জেরবার তাকে আর এই সব কথা ও বলতে বসবে কোন লজ্জায়!
মন থেকে জোর করে অন্ধকারময় ভাবনাগুলো সরানোর চেষ্টা করল ইলিনা। আস্তে আস্তে সরে এল জানালার কাছ থেকে। ভোরের আলো ফুটছে। ঘড়ি বলছে এখন ভোর সাড়ে পাঁচটা। বিছানায় অকাতরে ঘুমিয়ে রয়েছে শিলাদিত্য। আস্তে আস্তে ওর সামনে এসে দাঁড়াল ইলিনা। গায়ে চাদর টেনে দিল ভালো করে মানুষটার। নাহ, ও আর এসব ভাববে না। নিজের মানুষটার চাওয়াটাকে সম্মান করে আবার নতুন করে শুরু করবে জীবন।
হঠাৎ তলপেটটা মোচড় দিয়ে উঠল ওর। আর অমনি বুকের ভেতর ধক করে উঠল ইলিনার। তবে কি এটা পিরিয়ড হবার পূর্বাভাস? গত মাসে ঋতুস্রাব হয়নি ইলিনার। এই মাসেও সময় পেরিয়ে গেছে। অবশ্য এরকম ওর মাঝে মাঝেই হয়। কখনো কখনো তিন মাস বন্ধ থেকেই আচমকা শুরু হয়েছে রক্তপাত। কিন্তু তবুও বুকের মধ্যে এবার কেমন একটা ধুকপুক করছে ইলিনার। আচমকা কী একটা মনে হল যেন ওর। খুব সন্তর্পণে ও হাত ব্যাগ থেকে বের করে নিল প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট। প্যাকেটটা হাতে নিয়েই সোজা দৌড়ে চলে গেল বাথরুমে। নিয়মমাফিক পরীক্ষা করে ফল দেখেই শিউড়ে উঠল ও। দুটো লাল দাগ জেগে রয়েছে সাদা পাতের ওপর। একটা গাঢ় লাল আর অন্যটা বড্ড ফিকে সরু সুতোর মতো দাগ। তবে কি এটা পজেটিভ? তাহলে সত্যি কি শেষমেশ দুঃখের শেষ হল ইলিনার। মনটা খুশিতে পূর্ণ হতে গিয়েও ঝপ করে নিভে গেল। আচমকা মনে পড়ে গেল বছর দুয়েক আগেও একবার এমন হয়েছিল। কিন্তু সেইবার ডাক্তারবাবু বলেছিলেন এমন এলেই সব সময় পজিটিভ হয় না। ইলিনারও নেগেটিভই ছিল সেইবার। তাহলে এইবারও কি তাই হবে? আচ্ছা, শিলাদিত্যকে ডেকে কি একবার দেখাবে ও? ভাবনাটা ভেবেও তারপর মত বদলে নিল ইলিনা। দরকার নেই। মানুষটা সবে একটু স্বাভাবিক হতে চাইছে, এর মধ্যে যদি আচমকা আশা জেগে আবার আশা ভঙ্গ হয় ওর হয়তো আর তাহলে কোনোদিনই সম্পর্কটা স্বাভাবিক হবে না ওদের দুজনের। তার চেয়ে এখন না বলাই ভালো। বরঞ্চ আরও কদিন যাক। কলকাতায় ফিরে ভালোভাবে নিশ্চিত হয়ে তারপর দেখা যাবে। কিটটা প্লাসটিক জড়িয়ে একটা কোণায় সরিয়ে রাখল ইলিনা আর তৎক্ষণাৎ শুনতে পেল দুমদুম করে ওদের ঘরের দরজায় কেউ ধাক্কা মারছে বাইরে থেকে।
তড়িঘড়ি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এল ইলিনা। শিলাদিত্য জেগে গেছে। ঘুম জড়ান গলায় সে কোনোমতে বলল,
'কে ডাকছে দেখ তো'...
দরজাটা খুলে কাউকেই দেখতে পেল না ইলিনা। শুধু এক পলক শিরশিরে বাতাস ছুঁয়ে দিল ওকে। কিন্তু কেউ তো কোথাও নেই। বুকের ভেতরটা কেমন যেন কাঁপছে ওর। কেউ নেই তো তবে এভাবে দরজায় ধাক্কা মারছিল কে?
'কে? কে আছ'? অশক্ত গলায় হাঁক ছাড়ল ইলিনা। আর অমনি মাটি ফুঁড়ে ওর সামনে এসে দাঁড়াল এক মূর্তি যাকে দেখে আতঙ্কে শিউড়ে উঠল ও। একি! কে এ?
'কে? কে তুমি'? আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল শিলাদিত্যর বউ। সেই শুনে বিছানা ছেড়ে দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে এল শিলাদিত্য। আর সাথে সাথেই চমকে উঠল সেও। সামনে দাঁড়িয়ে এক গা শিউড়ে ওঠা পুরুষ মূর্তি। বয়স হয়তো বাইশ তেইশ হবে। সাদাটে তার গায়ের রং, রোগা ডিগডিগে, মাথাটা পুরো ন্যাড়া, দাড়ি গোঁফ নেই, আর দু-চোখের একটায় মণি নেই, শুধু বীভৎসভাবে জেগে রয়েছে শুধু সাদা অংশটা আর ঠোঁট দুটো পোড়া আর মুখে আরও কিছু ক্ষতচিহ্ন ।
'এই কে তুমি?' নিজের বুক ধড়ফড়টা লুকাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল শিলাদিত্য। এদিকে ইলিনা কাঁপছে ঠকঠক করে।
'রুম সার্ভিস। রুম সার্ভিস বাবু'। ভাঙা ভাঙা স্বরে বলল ছেলেটা।
'এত সকালে কেউ রুম সার্ভিস করতে আসে'? একটু কঠিন হবার বৃথা চেষ্টা করল ইলিনা।
'আমি আজ থেকেই এখানে নতুন কামে লাগলাম বাবু। নিয়ম তাই ঠিক করে জানি না'। ফের বলল ছেলেটা।
'না। আমার দরকার নেই রুম সার্ভিস। তুমি চলে যেতে বল ওকে'। ইলিনা বরের শার্ট খামচে ধরে বলল এবার।
'ভাবীজি আমি বড্ড গরিব আছি। আপনারা তাড়িয়ে দিলে আমায় এরাও নকরি থেকে বের করে দেবেন। আমার সাথে না ইনসাফি করবেন না ভাবীজি'। এবার খুব করুণ স্বরে বলল ছেলেটা।
শিলাদিত্যর বড্ড মায়া লাগল এবার। বউয়ের কানে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে ও বলল,
'ছেলেটা গরিব। শুধু দেখতে অদ্ভুত বলে ওকে এভাবে তাড়িয়ে দেওয়াটা কি উচিত হবে বল'?
'বাবু আমার নাম শিয়া। এখানেই থাকি অনেক বচ্ছর হবে। একবার ছোটবেলায় দিওয়ালির সময় বাজির আগুন লেগে পুড়ে গেল মুখটা। তাই'...... হিন্দি বাংলা মিশিয়ে এলোমেলোভাবে বলল এবার শিয়া।
'ঠিক আছে। তুমি ভিতরে এস'। এবার নিজে থেকেই বলল ইলিনা। সেটা শুনে ঘাড় হেলাল শিয়া। চৌকাঠ ডিঙিয়ে ওদের ঘরের ভেতর ঢুকে গেল ও।
'কী নাম তোমার'? ছেলেটাকে হালকা স্বরে জিজ্ঞাসা করল শিলাদিত্য।
'রামাই স্যার'। সুন্দর করে হেসে বলল গাইড ছেলেটা। বেশ ভালো লাগছে ওর সাথে কথা বলতে শিলাদিত্যর।
'বাহ, রামাই তুমি তো বেশ ভালো বাংলা বল''।
''হ্যাঁ আমার মা তো বাঙালি ছিল।'' আবার হাসল রামাই।
রামাইয়ের সাথেই ছোট ছোট পা ফেলে এগোচ্ছে শিলাদিত্য আর ইলিনা। রামাইকে ওদের হোমস্টে-এর ম্যানেজারই ঠিক করে দিলেন। এই ছেলেটা ওদের ঘুরিয়ে আশেপাশের নানা জায়গা দেখিয়ে দেবে। শিলাদিত্যর মনটা তো বেশ ফুরফুরেই লাগছিল। এত সুন্দর মনোরম পাহাড়ি জায়গা, প্রকৃতির এত কোমল সান্নিধ্য, এর মাঝে শহরের ঝঞ্ঝা থেকে সরে ইলিনার হাত ধরে ঘুরে বেড়ানোটা তো নিঃসন্দেহে খুব ভালো লাগারই কথা, অন্তত শিলাদিত্য তো সেইরকমই চেয়েছিল। কিন্তু ইলিনা বোধহয় সেটা একেবারেই চায় না। ওকে বোধহয় আর একেবারেই ভালোবাসে না আজ ইলিনা। তাই জন্যই নিজেদের মাঝের দূরত্বটা ঠিক করার কোনো প্রচেষ্টাই নেই। কেমন যেন অন্য জগতে হারিয়ে ডুবে রয়েছে। যন্ত্রের মতো টুকটুক করে এগিয়ে চলেছে। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে যে ইলিনার শুধু শরীরটাই বোধহয় এখানে রয়েছে, মনটা পড়ে রয়েছে অনেকখানি দূরে অন্য কোথাও।
'স্যার চলুন, এবার আমরা দেখে আসি মেম এর কবর'। হালকা হেসে বলল রামাই।
'সেটা কি'? জিজ্ঞাসা করল শিলাদিত্য।
'মেমের কবর মানে ম্যাডাম মেরির কবর। সে অনেক বছর আগের কথা। মেরি ম্যাডাম মরে গেছিলেন একটা অ্যাক্সিডেন্টে। পেটে তখন তার আট মাসের বাচ্চা। তখন বিলেত থেকে ওনার স্বামী জর্জ মার্বেল পাথর এনে বাঁধিয়ে দিলেন তার কবরটা নিজের না জন্ম নেওয়া বাচ্চা আর বউয়ের স্মৃতির উদ্দেশ্যে। অনেকে বিশ্বাস করে আমাদের এখানে নাকি আজও রাতবিরেতে বা ভর সন্ধ্যাবেলায় এদিকে সেদিকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় তাকে। আসলে মেম এর তো নাকি বাচ্চা হত না। কিন্তু যখন ভগবান পেটে বাচ্চা দিলেন তখন সে না নিজে বাঁচল আর না তো বাঁচল বাচ্চাটা। আসলে বাচ্চার মায়া যে বড় মায়া স্যার। আর কী জানেন অনেকে বলে, আমিও ছোটবেলাতেও শুনেছি যে সব মায়েদের কোলে বাচ্চা আসে না তারা যদি ঐ মেমের কবরের পাথর ভেঙে নিয়ে সেই ধোয়া জল খায় আর মেমের আশীর্বাদ নিয়ে আসে তাহলে তাদের কোলে বাচ্চা চলে আসে। সত্যি মিথ্যা জানি না, তবে এমনটাই অনেকে মনে করে। তবে এখন সে কবরের অবস্থাও ভালো না। ভেঙে চুরে একাকার হয়ে গেছে'।
'সত্যি? সত্যি মেমের কবরের পাথর ধোয়া জল খেলে শূন্য কোল ভরে যায়? এটা কি সত্যি কথা'? দীর্ঘক্ষণের নীরবতা ভেঙে এবার কথা বলে উঠল ইলিনা খুব ক্ষীণ স্বরে।
'সত্যি কি মিথ্যা তা তো জানি না ম্যাডাম ঐ যে বললাম। তবে এমনটাই সবাই বিশ্বাস করেন আমাদের দাগশাহি-তে। মনে করা হয় যে মেম-এর কবরের কাছে গিয়ে ওনার আশীর্বাদ নিয়ে আসলে কোল ভরে।'
'আচ্ছা তাহলে এক্ষুনি একবার যাওয়া যায় সেখানে'? কেমন যেন অপ্রকৃতিস্থের মতো করে বলল ইলিনা। ওর স্বরটা ভালো লাগল না শিলাদিত্যর। ইদানীং সত্যি যেন বড্ড অন্যরকম হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা। নিজেদের জীবনের অপ্রাপ্তিটা নিয়ে শিলাদিত্যও ভীষণ অস্থির থাকে এটা ঠিক। কিন্তু ইলিনার ব্যাপারটা কেমন যেন মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ও যেন রাতদিন ঐ একই ভাবনা নিয়ে ডুবে থাকে। আর সেই জন্যই কেমন যেন অদ্ভুত বদল ঘটছে ওর মধ্যে।
'না। ওই সব কবর টবর এর কাছে আমি যাব না রামাই। তুমি অন্য কোনো জায়গা দেখাতে নিয়ে চল'। এবার একটু কঠোর স্বরেই বলল শিলাদিত্য।
'কিন্তু আমি বলছিলাম' কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল ইলিনা, কিন্তু হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিল শিলাদিত্য।
'না ইলিনা। নো আর্গুমেন্ট প্লিজ'। দৃঢ় গলায় বলল আবার শিলাদিত্য।
রামাই বোধ হয় বুঝতে পারল যে জোরদার কোনো দাম্পত্য কলহ এবার লাগতে চলেছে । তাই ও নিজে থেকেই বলল,
'ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমরা এখন মিউজিয়ামটা দেখে আসি। ওটা বন্ধ হয়ে গেলে মুশকিল হবে। চলুন ওদিকে'।
এবার আর কোনো প্রতিবাদ করল না ইলিনা।
* * *
মিউজিয়ামের কাছে এসে পৌঁছনোমাত্রই আবার রামাই বলতে শুরু করল সেটার গল্প।
'এই যে মিউজিয়াম দেখছেন স্যার এটা কিন্তু আগে ছিল দাগশাহি সেন্ট্রাল জেল। ব্রিটিশ ভারতে ১৮৪৯ সালে এই জেলটা তৈরি হয়েছিল। এই জেলের সাথেই জড়িয়ে আছে অনেক অন্ধকারময় ইতিহাস। এখানেই এক সময় প্রাণ দিয়েছে বহু মানুষ । কারোর প্রাণ গেছে ফাঁসির দড়িতে, কেউ মরেছে গুলিতে আবার কেউ রাতের অন্ধকারে নৃশংস অত্যাচারের বলি হয়ে মরেছে। তা ছাড়া...
'না আ আ আমি যাব না। আমি কিছুতেই যাব না এই মিউজিয়ামের ভিতর। অপয়া, অলুক্ষুনে, রক্তখেকো এই জেল তথা মিউজিয়াম'। তীব্রভাবে এবার চেঁচিয়ে উঠল হঠাৎ ইলিনা।
'কী হল? কী হল কী তোমার'? শশব্যস্ত হয়ে উঠল শিলাদিত্য।
'আমি এখানে যাব না। ইচ্ছা করছে না আমার'।
'তুমি কেন এমন করছ ইলিনা? আমার সাথে এখানে এসে কি তোমার ভীষণ খারাপ লাগছে? কেন এত চঞ্চল হয়ে রয়েছ তুমি? কতদিন পর তো আমরা বাইরে এসেছি বল' বড্ড অসহায় লাগল এবার শিলাদিত্যর স্বর। ইলিনা একবার ভালো করে তাকাল মানুষটার মুখের দিকে। সত্যি কী ভীষণ বিধ্বস্ত লাগছে ওর চোখ দুটো। পলকের জন্য ইলিনার মনে পড়ে গেল ইউনিভার্সিটির সেই উজ্জ্বল চোখের শিলাদিত্য নামের ছেলেটাকে। এই মানুষটাও তো জীবন যুদ্ধে আজ ত্রস্ত। তবুও নতুন করে নিজের জীবনে রং ভরে নিতে চাইছে শুধু ইলিনার মুখের দিকে তাকিয়ে। তাহলে ইলিনারও কি উচিত নয় আজ এই মানুষটার দিকে নিজের ভালোবাসার শক্ত হাতটা বাড়িয়ে দেওয়া? নিজেকে এবার সামলাল ইলিনা। হাত বাড়িয়ে দিল শিলাদিত্যর দিকে। অল্প হাসার চেষ্টা করে বলল,
'সরি। চল ভিতরে'।
রামাইয়ের সাথে সাথে ভিতরে চলে এল ওরা। এটা এখন মিউজিয়াম, কিন্তু আগে যে জেল ছিল সেটা বেশ বোঝাই যাচ্ছে গঠন প্রকৃতি দেখে। রামাই একটানে শুনিয়েই চলেছে গল্প। কীভাবে ব্রিটিশ সরকার এই জেলে বন্দিদের অত্যাচার করত, কীভাবে মেরে ফেলত, কীভাবে এখানে নিষ্ঠুর ভাবে প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে তৎকালীন সময়ে কর্মরত বহু আইরিশ বিদ্রোহী সেনা সহ তাদের নেতা জেমস ডালিকে।
'জানেন স্যার এত লোকের প্রাণ গেছে এখানে যে মনে করা হয় তাদের অতৃপ্ত আত্মারা নাকি আজও বন্দি হয়ে আছে এই দাগশাহির জেলেই। অনেকে বলেন এই দাগশাহি নাকি বড্ড অভিশপ্ত। এখানে নাকি সেই সমস্ত অন্যায়ভাবে মরে যাওয়া সেনাদের আত্মারা জোটবদ্ধভাবে একটা নেগেটিভ শক্তির বলয় তৈরি করে রেখেছে। সেই কালো শক্তির বলয় নাকি প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে কোনো সূক্ষ্ম প্রাণে ঢোকার, সব ধ্বংস করার। তবে এগুলো সবই লোকের মুখে মুখে চাউর হওয়া গল্প। সত্যি সত্যি কতটা'......রামাইয়ের কথাটা শেষ হল না। তার আগেই একটা চিৎকার বেরিয়ে এল শিলাদিত্যর গলা ঠেলে।
'ইলিনা ... ইলিনা ......' ইলিনা লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে।
বিছানায় শুয়ে আছে ইলিনা চোখ বন্ধ করে। শিলাদিত্য বোধহয় ভেবেছে ও ঘুমাচ্ছে। কিন্তু আসলে ও ঘুমায়নি। চোখ বন্ধ করে শুয়ে রয়েছে। আসলে ঘুমাতেও তো ভীষণ ভয় করে ইলিনার। সেই জন্যই তো ও চেষ্টা করে যতটা সম্ভব না ঘুমিয়ে থাকার। ঘুমালেই যে থাবা বসায় সেই বীভৎস স্বপ্নের দৃশ্যগুলো।
এই মুহূর্তে শিলাদিত্য সামনে নেই। ও বাইরে রয়েছে। ফোনে কথা বলছে বেশ অনেকক্ষণ ধরে। বোধহয় অফিসের কোনো ফোন। গত পরশু দিনের সেই ঘটনার পর থেকে আর এই হোটেল রুম-এর বাইরে পা রাখেনি ওরা কেউই। শিলাদিত্য বারবার ওকে জিজ্ঞাসা করেছে কী হয়েছিল ওর সেদিন। কেন ওভাবে আচমকা সেদিন জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েছিল? ওর কি খুব শরীর খারাপ লাগছিল? মাথা ঘুরে গেছিল নাকি অন্য কোনো সমস্যা হয়েছিল? কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি ইলিনা। কী বলত ও? কী যে হয়েছিল সেটা তো ঠিকভাবে ইলিনা নিজেও এখনো বুঝেই উঠতে পারেনি। আর যেটা অনুভব করেছিল সেটা কি আদৌ কাউকে বলা যায়? না একেবারেই যায় না। আবার ঝপ করে সেই ভয়ানক মুহূর্তটা মনে পড়ে গেল ইলিনার। শিলাদিত্যর কথায় না বলতে চায় না বলেই সেদিন নিজের মনের সায় না থাকা সত্ত্বেও ওই জেল মিউজিয়ামের ভিতরে ঢুকতে রাজি হয়েছিল ও। কিন্তু ঢোকা মাত্রই কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি ঘিরে ধরেছিল ওকে। আচমকা একটা কনকনে শৈত্য প্রবাহ যেন আস্তে আস্তে অবশ করে দিচ্ছিল ওর শরীরের সমস্ত স্নায়ুগুলো। পা চালাতে পারছিল না ইলিনা, আটকে যাচ্ছিল চলার গতি। বন্ধ হয়ে আসছিল নিশ্বাস। কিন্তু তবুও শিলাদিত্যর পাশে পাশে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল ও আপ্রাণ। কিন্তু হঠাৎ কী যেন একটা হয়ে গেল। আচমকা ও দেখতে পেল তিব্র গতিতে ওর দিকে ধেয়ে আসছে একটা কালো মতো ছাইয়ের কুণ্ডলি। সেই কুণ্ডলিটা এসে সোজা ধাক্কা দিল ওর পেটে। একটা অসহ্য যন্ত্রণায় মুহূর্তের মাঝে ছেয়ে গেল ওর শরীরটা। ব্যস! আর কিচ্ছু মনে নেই ওর। জ্ঞান হবার পর ও নিজেকে দেখতে পেয়েছিল এই বিছানায় আর সামনে উদ্বিগ্ন মুখে বসে রয়েছে শিলাদিত্য আর ঘরের ভিতরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে রামাই।
'ইলিনা, কী হয়েছে তোমার? কেমন আছ তুমি এখন'? একরাশ উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করছিল শিলাদিত্য। কোনোরকমে ঘাড় নাড়িয়েছিল ও। ম্যানেজারকে বলে স্থানীয় ডাক্তারও ডেকে এনেছিল শিলাদিত্য। তিনি ওকে দেখে বলেছেন সম্ভবত আচমকা গ্যাস হয়ে গিয়ে এমনটা হয়েছে। তবে তিনি কয়েকটা টেস্টও দিয়েছেন যেগুলো হয়তো কলকাতায় ফিরে গিয়ে করতে হবে ওকে, যার মধ্যে প্রেগন্যান্সি টেস্টও রয়েছে। অন্য সময় হয়তো এমন সম্ভাবনা বুঝতে পারলেই ভীষণ খুশি হত ইলিনা। কিন্তু এখন পারছে না। অদ্ভুত একটা ভাবনা ক্রমাগত আসছে ওর মাথায় কারণ ভীষণ ভয়ানক কিছু ও অনুভব করেই চলেছে সেদিনের পর থেকে। ওর প্রতি মুহূর্তে যেন ওকে প্রতি মুহূর্তে কেউ নজরে রেখেছে, যেন অদৃশ্য এক ছায়া সর্বক্ষণ অনুসরণ করেই চলেছে। যখনই ও একা হচ্ছে এই যেমন বাথরুমে বা অন্য কোথাও ওর যেন মনে হচ্ছে ওর একেবারে পিছনে এসে দাঁড়িয়ে রয়েছে কোনো একটা ছায়া শরীর। ভয়ে আতঙ্কে প্রতি মুহূর্তে দমবন্ধ হয়ে আসছে ওর। শুধুই কী তাই, ভুল করেও কখনো দু-চোখের পাতা এক হলেই আবার আছড়ে পড়ছে সেই বীভৎস স্বপ্নটা, যে স্বপ্নে প্রতিবার তাড়া করে কোনো বীভৎস নরপিশাচ। এই সবকিছু মিলিয়েই কেমন যেন একগুচ্ছ অশুভ চিন্তা কাবু করেছে ওকে ভীষণভাবে। কেমন যেন ও বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে-কোনো নেগেটিভ শক্তি আস্তে আস্তে আচ্ছন্ন করে ফেলছে ওকে, সেই নেগেটিভ শক্তি যার কথা সেদিন বলেছিল রামাই। সেই শক্তিই কি তবে শেষ করে ফেলবে ওকে নাকি তারা দখল করতে চায় ওর গর্ভে যে ভ্রূণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে তাকে? কী করবে তাকে কেড়ে নিয়ে? কোনো শয়তান বানাবে? নাকি অন্য কিছু? ভাবনাটা মাথায় আবার আসতেই ধড়মড় করে উঠে বসল ও বিছানায়। আর ঠিক তক্ষুনি দরজা খোলার শব্দ হল ক্যাচঁ করে বিদঘুটে ভাবে।
'কে? কে? শিলাদিত্য'? কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল ইলিনা।
'আমি ভাবিজি। শিয়া, রুম সার্ভিস'। ঘরে ঢুকে এসেছে শিয়া। সেই পোড়া চামড়া ঢাকা মুখ, সেই বীভৎস মণিবিহীন চোখ। আবারও ওকে দেখে কেঁপে উঠল ইলিনা।
ঘরের ভিতরটা মুছছে শিয়া। লম্বা লাঠির মপ দিয়ে। ইলিনা ঠক ঠক করে কাঁপছে বিছানায় বসে। শিলাদিত্য কোথায় গেল? কেন ও আসছে না ঘরে? ওর কি ফোনে কথা বলা এখনও হয়নি?
'ভাবিজি আপনি কি কোনো কারণে পরেশান আছেন'? আচমকা ইলিনার দিকে ঘুরে প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করল শিয়া।
'আমি? না। একেবারে না'। নিজেকে লুকাবার মরিয়া চেষ্টা করল ইলিনা।
'না আসলে আপনার কপালে পসিনা কে বুঁদ এই ঠান্ডাতেও তাই মনে হল। আসলে অনেক মানুষজন তো দেখি আমরা। তাই মনে হল। দাগশাহীতে এসে কেউ পরেশান হয়ে ফিরে যায় না ভাবিজি। যদিও এটাও ঠিক যে এখানে পরেশান হবার মতো অনেক কিছু আছে। কালো শক্তির ডেরা আছে এই দাগশাহি। অনেক কালো শক্তি মিলে সব তছনছ করে দিতে চায় । আপনাকেও ওই কালো শক্তিই পরেশান করছে না তো ভাবিজি'? বেশ কোমল স্বরেই কথাগুলো বলল এবার শিয়া।
ইলিনার মনটা কেমন যেন দুলে উঠেছে হঠাৎ করে। এই শিয়াও কালো শক্তির কথা বলছে, তার মানে নেগেটিভ এনার্জি। এই নেগেটিভ এনার্জির কথাই তো সেদিন রামাইও বলেছিল, আর ঠিক এই নেগেটিভ এনার্জির ভয়ই ক্রমাগত গ্রাস করে চলেছে ইলিনাকে। কিন্তু ও কোন উত্তর দিল না শিয়ার কথার। চুপ করেই রইল। শিয়া আবার বলতে শুরু করল,
'ভাবিজি কেউ মানুক না মানুক আমি মানি কালো শক্তি আছে। আমি নিজের তার প্রমাণ পেয়েছি। সেই কালো শক্তি একদিন মেরে ফেলতে চেয়েছিল আমাকেও। কিন্তু পারেনি। আমার মুখটা শুধু পুড়িয়েই ফিরে যেতে হয়েছে তাকে। কারণ বুঢা বাবা। বুঢা বাবার কাছে বারবার হার মেনে যায় কালো শক্তি। বুঢা বাবা যে তার যম। আমাকেও তো ওই জন্যই সে মেরে ফেলতে পারেনি। আমি দেখেছি কালো শক্তিকে। ধুলোর ঝড়ের মতো ধেয়ে আসে সে'।
চমকে উঠল ইলিনা। আরে! কী বলছে শিয়া! ঠিক এরকমই কালো ধুলোর বা ছাইয়ের মতো কুণ্ডলীই তো দেখেছিল ও নিজেও। এই ছেলেটার কথা তো হুবুহু মিলে যাচ্ছে ওর সেই তাৎক্ষণিক অনুভবের সাথে।
'কে? কে এই বুঢা বাবা? কীভাবে দেখা করা যায় তার সাথে? প্লিজ আমায় বল শিয়া'। পলকেই শিয়াকে নিয়ে সব অস্বস্তি কেটে গেছে ইলিনার। ও যেন মরিয়া হয়ে উঠেছে ঐ বুঢা বাবার কাছে যাবার জন্য। ঠিক যেমন মাঝ সমুদ্রে ডুবন্ত মানুষ আচমকা কোনো খড়কুটো পেলেও চোখ বন্ধ করে আঁকড়ে ধরতে চায় তাকে, ইলিনাও ঠিক তেমনই করছে।
'ভাবিজি বুঢা বাবার সাথে তো অনেক সকাল বেলাতে ছাড়া দেখা করা যায় না। ভোর বেলা তাহলে যেতে হবে আপনাকে। ভোর চারটে। যাবেন ভাবিজি'?
'হ্যাঁ নিশ্চই যাব। আগামীকালকেই যাব'।
'জি আচ্ছা। আমি বলে দিচ্ছি কীভাবে যাবেন' বলল শিয়া। কিন্তু ইলিনা নিভে গেল পলকেই। ও কী করে যাবে একা ওই অচেনা জায়গায়? এই সব তো শিলাদিত্যকে জানানোই যাবে না, কাজেই ওর সাহায্য আশা করাই বৃথা। শিলাদিত্য এই সব অতিপ্রাকৃত কে এক বর্ণ বিশ্বাস করে না। উলটে পাগলামি মনে করে। সে ও যা খুশি মনে করুক, ইলিনা তো অতিপ্রাকৃত অক্ষরে অক্ষরে মানে। সবকিছু যে সব সময় তথাকথিত বিজ্ঞানের আওতায় পড়বে কোথায় লেখা আছে এসব কথা? কিন্তু শিলাদিত্যকে তা বোঝানো যাবে না। সবটা শুনলে ও কিছুতেই যেতেই দেবে না ইলিনাকেও।
'শিয়া, আমায় একটা সাহায্য করবে প্লিজ। আমি তোমায় তার জন্য ভালো টাকা দেব। তুমি কাল সকালে ভোর চারটের একটু আগে এই হোটেলের বাইরে চলে আসবে একটু? তুমি অপেক্ষা কর আমার জন্য। আমি ঠিক বেরিয়ে আসব। তারপর তুমি ভাই একটু নিয়ে যাবে আমায় বুঢা বাবার কাছে? তোমার বাবু তখন ঘুমাবে। তাই তিনি টের পাবেন না। আমি তাকে জানাতেও চাই না। আমি চাই দেখা করে আবার ঠিক সময়ে মানে শিলাদিত্য ঘুম থেকে ওঠার আগেই ফিরে আসতে। বল হবে না? আমায় সাহায্য করবে তো তুমি'? অগ্র পশ্চাৎ না ভেবেই কথাগুলো বলে ফেলল ইলিনা।
'জি ভাবিজি। তাই হবে। আমি চলে আসব ঠিক সময়ে'। বলেই এবার দরজার দিকে এগিয়ে গেল শিয়া। ও বেরিয়ে যাওয়া মাত্রই ঘরে ঢুকল শিলাদিত্য। ইলিনাকে বিছানায় বসে থাকতে দেখে একটু যেন শান্তি পেল ও। ক্লান্ত স্বরে বলল,
'কেমন বোধ করছ এখন? মনে তো হচ্ছে দেখ একটু ভালো। কি তাই তো'?
দম দেওয়া পুতুলের মতো বরের কথায় ঢক করে ঘাড় কাত করে সম্মতি জানাল ইলিনা।
গোটা রাতটা জেগেই কাটিয়েছে আজ ইলিনা। উত্তেজনায় প্রতিনিয়ত উথালপাতাল করেছে ওর বুকের ভিতরটা। নানা প্রশ্ন এবং অজস্র ভালো খারাপের দ্বন্দ্ব ওকে আন্দোলিত করে চলছে ওকে অহরহ। শিয়ার কথা গুলো কি ঠিক? শিয়ার মতো প্রায় অপরিচিত একটা ছেলেকে বিশ্বাস করে শিলাদিত্যকে কিছু না জানিয়ে ওই বুঢা বাবার কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কি আদৌ ঠিক হচ্ছে? কিন্তু ইলিনা যে সত্যি বড্ড অসহায় আজ এই মুহূর্তে। কালো শক্তি যে ওর শরীরে ভেতর থাকা সম্ভাব্য প্রাণটাকে ছারখার করে দিতে চাইছে সেই অনুভবটা তো বেশ করতে পারছে ও। তাই আজ এই ঝুঁকিটা তো ওকে নিতেই হবে। নিজের প্রাণের মায়া কোনোদিনই নেই ইলিনার, তাহলে আর ভয়টা পাবে ও কিসের জন্য? নাহ, তাই আজকের এই দুঃসাহসী পদক্ষেপটা নিয়েই দেখবে ও। শিয়া তো ওর কোনো শত্রু নয়, তাই সে খামোখা ওর কোনো ক্ষতি করতেই বা চাইবে কেন? তা ছাড়া সে তো একবারও বলেনি যে সে নিজে ইলিনাকে নিয়ে যেতে চায়, বরঞ্চ ইলিনাই তো ওকে অনুরোধ করেছে সাথে যাবার জন্য। কাজেই শিয়াকে সন্দেহ করাটা নেহাতই অমুলক। তাছাড়া ইলিনা বরাবরই মনের কথায় চলে, মস্তিষ্কের ধার কোনো কালেই খুব বেশি ধারে না। আর তাই আজকেও মনের ডাকেই সাড়া দেবে ও।
নিস্তব্ধ রাতে ঘড়ির টিকটিক শব্দটাও যেন বড্ড বেশি কানে লাগছে। সময় বলছে এখন ভোর পৌনে চারটে। এবার আস্তে আস্তে বিছানা থেকে সন্তর্পণে উঠল ইলিনা। বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করছে । যদি কোনোক্রমে শিলাদিত্য জেগে যায় তাহলে তো কেলেঙ্কারি। অবশ্য গভীর নিদ্রায় মগ্ন রয়েছে সে। নাক ডাকার আওয়াজ ভাল করে জানান দিচ্ছে সেটা। ঈশ্বরের নাম স্মরণ করে এবার ঘর থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেল ইলিনা। আস্তে করে দরজাটা বন্ধ করেই দ্রুত পায়ে চলে এল বাইরে। চারপাশটা মুড়ে রেখেছে ঘন কাল অন্ধকার। প্রথমটায় কেমন যেন দিশেহারা লাগল ইলিনার। একি! কোথায় শিয়া? সে আসেনি তো। কিন্তু মুহূর্তের মাঝেই যেন মাটি ফুঁড়ে আবির্ভাব ঘটল তার। আপাদমস্তক নিজেকে কালো চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে শিয়া । শুধু ওর বীভৎস চোখ দুটো বেরিয়ে আছে গোটা শরীরের মধ্যে। বাইরে এখন বৃষ্টি হচ্ছে ঝিরঝির করে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইছে অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছে সে হাওয়া যেন শরীরের চামড়া ভেদ করে ছিঁড়ে খুঁড়ে দেবে সকল অস্থি মজ্জা। ইলিনা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিল শালটা। একটু চাপা গলায় তারপর শিয়াকে জিজ্ঞাসা করল,
'এবার আমরা কোথায় যাব শিয়া'?
'আমার পিছু পিছু আসুন ভাবিজি। একদম আমার পিছু পিছু। আমি আপনাকে ঠিক নিয়ে যাব'। কেমন যেন হিসহিসে স্বরে জবাব দিল শিয়া।
ঘাড় নাড়ল ঢক করে ইলিনা। তারপর যন্ত্রের মতো এগোতে শুরু করল শিয়ার পিছু পিছু। অন্ধকারের গহ্বর ঠেলে যেন হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছে শিয়া, আর ইলিনা তার পিছনে দ্রুত পায়ে এগোচ্ছে হনহন করে। এত জোরে হাঁটা অভ্যাস নেই ওর, তবুও শিয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে তো এগোতেই হবে ওকে। ক্রমশ যেন ছোটায় পরিণত হচ্ছে ওর গতি, বুকটা অসম্ভব ধড়ফড় করছে এবার, নিশ্বাসটা যেন বন্ধ হয়ে আসছে এবার।
'শিয়া, শিয়া একটু আস্তে চল। আমি যে আর পারছি না' বলতে চেষ্টা করল ইলিনা। কিন্তু পারল না। গলা থেকে এক ফোটা আওয়াজও বের হল না ওর। গলা বুজে গেছে পুরোপুরি। পা দুটো যন্ত্রণায় অবশ হয়ে গেছে। শিরদাঁড়া বেয়ে নামছে একটা হিমেল স্রোত। না, শিয়াকেও আর দেখতে পাচ্ছে না ও। একি! শিয়া কোথায় গেল? এক্ষুনি তো ছিল ওর থেকে দু-চার পা আগেই,তাহলে মুহূর্তের মাঝে কোথায় গায়েব হয়ে গেল ও? আর শিয়াকে অনুসরণ করতে করতে এটা কোথায় চলে এসেছে ও? কী ভীষণ অন্ধকার, কেমন যেন জঙ্গলাকীর্ণ। একি! এগুলো কী দেখছে ও? চার পাশে জেগে রয়েছে কতগুলো ফলক। তার মানে এটা কি কোনো কবর স্থান? গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল এবার ইলিনার। হে ঈশ্বর! এটা কী করেছে ও? ও কী নিজের ভুলে নিজে থেকেই এসে ধরা দিয়েছে কোনো মারাত্মক অপশক্তির ফাঁদে?
না, যাই হয়ে যাক পালাতে হবে। যে ভাবেই হোক এবার পালাতে হবে ইলিনাকে। কিন্তু কী করে? ওর চলনশক্তি যে একেবারে নিঃশেষ হয়ে গেছে। পা দুটো যে অবশ হয়ে গেছে পুরোপুরি। ও তো আর দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছে না। শরীরটা ঠক ঠক করে কাঁপছে ওর। মাথা ঘুরছে বনবন করে। ইলিনা বুঝতে পারছে আর ও দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। কাটা কলাগাছের মতো এবার চকিতেই রুক্ষ পাহাড়ি জমিতে লুটিয়ে পড়ল ইলিনা আর ঠিক সেই মুহূর্তেই শুনতে পেল একটা বিদঘুটে হাসি সহ শিয়ার গলা,
'ভাবিজি কি হল? বুঢা বাবার কাছে যাবেন না'? চমকে উঠে এবার পিছন ফিরে তাকাল ইলিনা। আর সাথে সাথেই আতঙ্কে রক্ত হিম হয়ে গেল ওর। ধীরে ধীরে শরীরটা দানবের আকার নিচ্ছে শিয়ার। লকলক করে ওর মুখের ভিতর থেকে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসছে একটা লাল টকটকে জিহ্বা।
'আমাদের ভাইলোগদের যে অনেক রক্ত ঝরেছে ভাবিজি। এবার যে আমাদের রক্ত খাবার পালা'।
'না শিয়া না' তীব্র ভাবে চিৎকার করতে চাইল ইলিনা। কিন্তু আবারও পারল না। বাকশক্তি একেবারে লোপ পেয়েছে ওর। সরীসৃপের মতো এবার মাটিতে ঘষটে বুকে হেঁটে পালাবার চেষ্টা করল ইলিনা। কিন্তু না। শরীরটা সরছে না একচুলও। পিছনে বিশ্রীভাবে বেড়ে চলেছে নারকীয় অট্টহাসির দমক। ইলিনা বুঝতে পারছে বহু কাল ধরে ওকে তাড়া করে বেড়ান সেই দুঃস্বপ্নটার আড়ালেই আসলে লুকিয়ে ছিল ওর ভবিষ্যৎ, অনাগত অন্তিম পরিণতি। আজ সেই অন্তিম পরিণতিই এসে উপস্থিত। অদৃষ্টের নিষ্ঠুর খেলায় ও নিজেই এসে ধরা দিয়েছে সেই বীভৎস নিয়তির হাতে। একটা কিটের মতো করে এই অপশক্তির হাতে মরবে এবার ও। কিন্তু তবুও ইলিনা চেষ্টা করবে। শেষ অবধি লড়াই করার চেষ্টা করবে ও। নিজের ঈশ্বরকে স্মরণ করল ইলিনা। শরীরের সমস্ত শক্তিকে একত্র করে বুকে ভর দিয়েই আবার পালানোর চেষ্টা করল ও। কিন্তু সামান্য একটু এগোতেই ভয় অসাড় হয়ে গেল ওর পুরো শরীরটা। কারণ ইলিনা দেখতে পেয়ে গেছে ঠিক ওর তলপেট লক্ষ্য করে তীব্র গতিতে ধেয়ে আসছে একটা মিশমিশে কালো মেঘের কুণ্ডলী। হ্যাঁ ইলিনা চেনে ঐ নারকীয় বলয়কে। এটাই ওই অপশক্তির বলয়। আতঙ্কে চোখ বুজে ফেলল ইলিনা। পিছনে নারকীয় অট্টহাসির দমক আর সামনে থেকে পৈশাচিক এক শব্দ সহযোগে ধেয়ে আসছে ওই কালো শক্তি। মৃত্যু তো এবার অনিবার্য। কিন্তু মুহূর্তের মাঝেই কি যেন হয়ে গেল। হঠাৎ থেমে গেল সেই নারকীয় শব্দগুলো। তার বদলে একটা স্নিগ্ধ বাতাস যেন ছুঁয়ে দিল ইলিনাকে। চকিতেই যেন কেটে গেল ইলিনার শরীরের অবশ ভাবটা, বুকের তীব্র কষ্টটা। পুরো ঘটনার আকস্মিকতায় নিদারুণভাবে চমকে গেল ও। সাথে সাথেই শুনতে পেল একটা নারী কণ্ঠের মিষ্টি ডাক।
'ইলিনা, ইলিনা ওঠ মাই ডিয়ার। কিচ্ছু হয়নি। আমি আছি তো। ওরা আর তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আমি এসে গেছি। তুমি এখন সেফ। কোনো ভয় নেই মাইচাইল্ড''। মন শক্ত করে এবার চোখ খুলল ইলিনা। ভোরের আলো একটু একটু করে ফুটছে। কেটে যাচ্ছে বীভৎস রাতের কালো অন্ধকার। সদ্য ফোটা ভোরের আলোয় ইলিনা দেখল একজন খুব সুন্দরী বিদেশিনি নারী দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে, পরনে তার সাদা ধবধবে গাউন। ইলিনা শক্তি ফিরে পাচ্ছে শরীরে। আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াল ও।
'ম্যাডাম ম্যাডাম' কিচ্ছু বলতে পারছে না ইলিনা। সব কথা যেন জড়িয়ে গেছে। শুধু চোখ দিয়ে জল ঝরছে।
'কিচ্ছু বলতে হবে না ডিয়ার। আমি সব জানি। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি আর তোমার হাজব্যান্ড তোমাদের বেবিকে নিয়ে খুব ভালো থাকবে'। এবার মহিলা হাত রাখল ইলিনার মাথায়। সাথে সাথেই যেন হাই ভোল্টেজ শক খেল ও। মাটিতে জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ল ইলিনা।
জীবনে প্রথমবার নিজের সন্তানকে কোলে নেবার অনুভূতিটা যে স্বর্গসুখের থেকে কোনো অংশে কম নয় সেটা আজ হাড়ে হাড়ে অনুভব করছে ইলিনা। গতকালই এই পৃথিবীতে এসেছে ওদের মেয়ে। কাল সারাদিন সিজার এর অপারেশন এর প্রভাবে বড্ড কাহিল ছিল ইলিনা, তাই কোলে নিতে পারেনি ওকে। আজ তাই প্রথমবার কোলে পেয়েছে। ছোট্ট ছোট্ট হাত পা নাড়িয়ে খেলা করছে ছোট্ট পুতুলটা। উফফ কী যে শান্তি। এই মুহূর্তটার জন্য যে কতকাল চাতকের মতো করে অপেক্ষা করেছিল ইলিনা।
কিন্তু আজ ওর বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে দশ মাস আগের কিছু ঘটনা। সেই দাগশাহি, সেই রামাই, সেই জেল মিউজিয়াম, সেই কবরস্থান আর সেই শিয়া। শিয়ার কথা মনে পড়লেই আজও কেঁপে ওঠে ইলিনা। কে ছিল ওই শিয়া? কোন অপশক্তির দূত যে মায়ার ছলনে ভুলিয়ে নিয়ে গিয়ে শেষ করে ফেলতে চেয়েছিল ইলিনা আর ওর বাচ্চাকে?
সেই দিন জ্ঞান হবার পর নিজেকে হোটেলের বিছানায় দেখতে পেয়েছিল ইলিনা। শিলাদিত্য ছুটে এসে ওকে বলেছিল...
'কেন তুমি এমন করছ ইলিনা? তুমি কি চাও? তুমি কী আর আমার সাথে থাকতে চাও না? কেন মাঝরাতে তুমি বাইরে গিয়েছিলে? জান তোমায় দেখতে না পেয়ে আমি কী ভীষণ ভয় পেয়ে গেছিলাম। আমি ম্যানেজার বাবুকে নিয়ে পাগলের মতো খুঁজছিলাম ভোর পাঁচটা থেকে। টানা এক ঘণ্টা খোঁজার পর ওই কবরস্থানের কাছে খুঁজে পেলাম তোমার অচেতন শরীরটা। কী হয়েছিল তোমার ইলিনা? কেন ওখানে গেছিলে তুমি'? শিলাদিত্যকে অমন উদ্ভ্রান্ত আর তটস্থ দেখে বুকটা মুচড়ে উঠেছিল ইলিনার। বরকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে ও হাউহাউ করে কেঁদে উঠেছিল আর বলেছিল।
'আমরা এই অভিশপ্ত জায়গায় আর একটা দিনও থাকব না। তুমি প্লিজ এক্ষুনি আমায় নিয়ে চল। আমি কলকাতা ফিরে সব তোমায় বলব।'
পরের দিনই চলে এসেছিল ওরা। আর ঠিক পরের দিনেই ডাক্তারের চেক আপ করতে গিয়ে ওরা জানতে পেরেছিল মা হতে চলেছে ইলিনা। খুশিতে পাগল হয়ে গিয়েছিল শিলাদিত্য। ইলিনারও মনে হয়েছিল সবটা যেন স্বপ্ন দেখছে ও। কিন্তু মা হবার খবর জানার পরই ও শিলাদিত্যকে বলেছিল,
'দাগশাহিতে সেই রাতে কি হয়েছিল আমায় তুমি এই দশ মাস জিজ্ঞাসা কর না প্লিজ। যেদিন আমাদের সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে নেবে সেদিন আমি তোমায় বলব সব'। হ্যাঁ আজ সেই দিন এসেছে। এবার ইলিনা জানাবে সবটা শিলাদিত্যকে । জানাবে কীভাবে দাগশাহিতে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা সেই অপশক্তি শেষ করে দিতে চেয়েছিল ওদের। আর তার সাথেই এটাও বলবে কী ভাবে শেষ পর্যন্ত বেঁচে ফিরে এসেছে ও নিজের সন্তান সহ। হ্যাঁ মেরী ম্যাডাম। ইলিনা নিশ্চিত মেরী ম্যাডামের পবিত্র আত্মাই সেদিন বাঁচিয়েছিল ওকে। সেই পবিত্র আত্মার আশীর্বাদেই আজ সুস্থ ভাবে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিতে পেরেছে ও। তিনি নিজের সন্তানকে জন্ম দিতে পারেননি এই পৃথিবীর বুকে, তাকে মরতে হয়েছিল অপঘাতে। কিন্তু তিনি কখনোই চান না সেরকম মর্মান্তিক পরিণতি আর কোনো মায়ের হোক। সেই জন্যই হয়তো দাগশাহির আনাচে কানাচে আজও মাঝে মাঝে দেখতে পাওয়া যায় তাকে। তাকে দেখেই তো ইলিনা বুঝতে পেরেছে প্রেতশক্তি মানেই তা অশুভ নয়, প্রেতশক্তি মঙ্গলময়ও হতে পারে।
'ইলিনা, কেমন আছ তুমি'? ঘরের দরজা ঠেলে ভিতরে এসেছে শিলাদিত্য। ও হ্যাঁ ভিসিটিং আওয়ার তো শুরু হল এখন।
'আমি ভালো আছি শিলাদিত্য। আমাদের মেয়েও ভালো আছে'। হাসিমুখে বলল ইলিনা।
'তাই বুঝি? মেয়ে তো দেখছি মায়ের কোল ছাড়ছেই না'। ইলিনার খাটের পাশে রাখা চেয়ারে বসে হাসি ছড়িয়ে দিল শিলাদিত্য।
'আমার তোমায় কিছু বলার আছে। আজ আমি তোমায় বলব দাগশাহীর সেই রাতে কি হয়েছিল'।
'ছাড় না ইলিনা। আজকের এই শুভ মুহূর্তে আমি এসব শুনতে চাই না। আমি তোমায় বিশ্বাস করি। সেটাই আমার কাছে যথেষ্ট। আমি আর কিছু শুনতে চাই না'।
'বেশ। তুমি শুনতে না চাইলে আমিও তোমায় জোর করব না। কিছু অনুভব না হয় আমার একান্ত নিজের হয়েই থাকুক। কিন্তু আমার একটা অনুরোধ আছে। তুমি রাখবে বল'। বরের হাত ধরে বলল ইলিনা।
'বল কী অনুরোধ''?
'আমাদের মেয়ের নাম মেরী রাখবে প্লিজ?'
'মেরী? কেন মেরী কেন?'
'ধরে নাও না মাদার মেরীর আশীর্বাদেই আমার কোল ভরেছে তাই এমন নাম রাখতে চাইছি। আমি জানি আমি খ্রিস্টান হলেও তুমি হিন্দু ব্রাহ্মন।সন্তান, তাই এমন টিপিক্যাল খ্রিস্টান নাম হয়তো'...
'প্লিজ ইলিনা। তুমি জান আমি শুধু মানবতার ধর্মে বিশ্বাস করি, তারপরেও বলছ এমন কথা! মা দুর্গা আর মাদার মেরি আমার কাছে একই, তাই আমার মেয়ের নাম দুর্গা হোক বা মেরী তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তুমি যা চাইবে তাই হবে। মেরি চক্রবর্তী গোমস নামেই পরিচিত হবে আমাদের সন্তান।'
পবিত্র এক ভালোবাসার অঙ্গীকার নিয়ে শিলাদিত্যর কাঁধে মাথা রাখল ইলিনা। এবার যে সত্যি ওদের সংসার পূর্ণ হল, যে সংসার ভরে উঠেছে মা দুর্গা, মাদার মেরীর সাথে সাথে সেই প্রেতশক্তির আশীর্বাদেও যে একদিন অনেকটা অপূর্ণতা নিয়ে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল নিয়তির নিষ্ঠুর খেলায়।
—সমাপ্ত—
নেপথ্য কাহিনি —স্বপ্নের আড়ালে
স্বপ্নের আড়ালে একটি সম্পূর্ণ কল্পিত কাহিনি। এই কাহিনির সমস্ত চরিত্রই সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কিন্তু এই কল্পিত কাহিনি অনুপ্রাণিত হয়েছে অনেকটাই আড়ালে থেকে যাওয়া কিছু অন্ধকারাচ্ছন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা ও মর্মান্তিক অতীতকে ভিত্তি করে।
প্রসঙ্গ দাগশাহি
দাগশাহি শহরটি অবস্থিত হিমাচল প্রদেশের সোলানে। দাগশাহি শব্দের মূল অর্থ হল দাগ —ই - শাহি বা রাজকীয় ছাপ (Royal Stain) . এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে কেন এইরূপ নামকরণ এর হেতু। কথিত আছে মুঘল আমলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত আসামিদের পাঠানো হত সেই সময় হিমাচল এর একটি গ্রামে শাস্তি স্বরূপ নির্বাসনে। আর সেই থেকেই সে গ্রামের নাম হয়ে যায় দাগশাহি।
তবে এবার আসি এই দাগশাহির একটি ঐতিহাসিক ঘটনার সংক্ষিপ্ত আলোচনায়। ১৮৪১ সালে দাগশাহি শহরের পত্তন হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারা। পাটিওয়ালা মহারাজা ভুপিন্দর সিং-এর থেকে ৫টি গ্রাম অধিগ্রহণ করে তৈরি হয়েছিল এই শহরটি । এই পাঁচটি গ্রামের মধ্যে দাগশাহি গ্রামটিই ছিল আয়তনে সবথেকে বড়, তাই সেই নামেই নামকরণ করা হয় সমগ্র শহরটির।
১৮৪৯ সালে এই দাগশাহি শহরেই গড়ে ওঠে দাগশাহি সেন্ট্রাল জেল। তবে এই জেল ভবনটি আলোচনার কেন্দ্রে ও সকলের পরিচিতির সমক্ষে আসে নির্মাণের বেশ কিছু সময় পরে, ১৯২০ সাল নাগাদ। সেই সময় ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে কর্মরত আইরিশ সৈনিকদের এক বিপুল সংখ্যা অংশগ্রহণ করে একটি বিপ্লবে, যেটি বেশ আলোড়ন তৈরি করেছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে । সেই বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আয়ারল্যান্ডের মুক্তি সংগ্রামের সমর্থনে। এই বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী আইরিশ সেনাদের ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত করা হয় ব্রিটিশ সরকার দ্বারা এবং তাদের মৃত্যুবরণ করতে হয় এই দাগশাহি জেলের অন্দরেই। শুধু তাই নয় ১৯২০ সালের ২ নভেম্বর এই বিপ্লবীদের নেতা একুশ বছর বয়সী যুবক জেমস ডালিকে ব্রিটিশ সেনারা এই জেলের প্রাঙ্গণেই গুলিবিদ্ধ করে নিহত করে। এই জেলের কবরস্থানেই অতঃপর কবরস্থ করা হয় তার দেহ। দীর্ঘদিন ব্যাপি তার দেহ প্রোথিত ছিল এই দাগশাহি জেলখানাতেই। ১৯৭০ সালে তার দেহাবশেষ আয়ারল্যান্ডে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে পূর্ণ সামরিক সম্মান সহযোগে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়।
বর্তমানে এই দাগশাহি সেন্ট্রাল জেল ভবনটিকে মিউজিয়ামে রূপায়িত করা হয়েছে এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে MES। তবে দাগশাহি শহরের স্থানীয় লোকেরা অনেকেই আজও মনে করেন বহু মানুষের রক্তে ধৌত এই জেলভবনটি আজও অভিশপ্ত। যে সকল তাজা প্রাণগুলিকে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয়েছিল বহুবছর আগে, তাদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও বিক্ষিপ্তভাবে ঘুরে বেড়ায় দাগশাহী শহর এর আনাচে কানাচেই। সেই জন্যই দাগশাহীকে চিহ্নিত করা হয় ভারতবর্ষের অন্যতম ভৌতিক স্থান রূপে।
তবে প্রসঙ্গত আর একটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত উল্লেখও প্রয়োজন, যে ঘটনা এই অঞ্চলের লোকজনের মুখে মুখে কথিত হয়ে থাকে আজও। দাগশাহী নামের এই আর্মি ক্যান্টনমেন্ট শহরে উনিশ শতকের শুরুর দিকে থাকতেন মেজর জর্জ ওয়েসটন নামের এক চিকিৎসক। তার স্ত্রী ছিলেন পেশায় একজন নার্স। এই দম্পতি ছিলেন নিঃসন্তান এবং সন্তান না থাকার কারণে জর্জের স্ত্রী বেশ দুঃখী থাকতেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই তারা সাক্ষাৎ পান এক মুসলমান ফকির এর। সেই ফকির মেরীর মিষ্টি ব্যবহারে খুব আনন্দিত হন এবং তাকে একটি তাবিচ প্রদান করেন। এই ঘটনার অল্পদিন পরেই মেরী গর্ভবতী হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে গর্ভাবস্থার অষ্টম মাস চলাকালীন সময়ে একটি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়ে যায় মেরী ও তার গর্ভস্থ সন্তানের। স্ত্রী ও আসন্ন সন্তানের আকস্মিক এই মৃত্যুতে ভীষণ শোকাহত হয়ে পড়েন জর্জ খুব স্বাভাবিকভাবেই। জর্জ এই সময় তার মৃতা স্ত্রী ও সন্তানের পুণ্য স্মৃতির উদ্দশ্যে তাদের কবরে একটি মার্বেলের ফলক নির্মাণ করিয়ে দেন যে মার্বেল নাকি আমদানি করা করা হয়েছিল সরাসরি ইংল্যান্ড থেকে।
তবে সময়ের সাথে সাথে এক অদ্ভুত বিশ্বাস ও গুজব রটনা হতে থাকে মেরির এই কবরকে ঘিরে। কীভাবে যেন ওই এলাকার এবং আশেপাশের এলাকার মানুষদের মনে একটা অদ্ভুত ধারণা তৈরি হয় যে কোনো নিঃসন্তান মহিলা ওই কবরের মার্বেলের অংশবিশেষ কেটে নিয়ে নিজের কাছে রাখলে সে সন্তানসম্ভবা হবে বা কোনো গর্ভবতী নারী ওই মার্বেলের টুকরো নিজের কাছে রাখলে নাকি সে পুত্র সন্তানের জন্ম দেবে। এই অন্ধ বিশ্বাসের প্রভাবে ধীরে ধীরে ধ্বংসপ্রাপ্ত হতে থাকে মেরীর কবরের মার্বেল মোড়ক।
মেরী মারা গেছিলেন ১৯০৯ সালে, তবে মৃত্যুর পর প্রায় ১০০ বছরের ও বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দাগশাহির বহু স্থানীয় মানুষ আজও বিশ্বাস করেন যে তাকে নাকি এখনও দেখা যায় তার কবরের আশেপাশে। কখনো কখনো দাগশাহি শহরের এদিক সেদিকে নাকি আজও গভীর রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় তার অস্পষ্ট ছায়াশরীর যিনি শুভকামনা দিতে চান মা হতে চলেছে এমন মহিলাদের।
দাগশাহির আনাচেকানাচে ছড়িয়ে থাকা কিছু ইতিহাস, অতীত আর লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া মিথ যেগুলো এই শহরকে বানিয়েছে দেশের এক উল্লেখযোগ্য ভূতুড়ে জায়গা ; তাদের ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে আমার কাল্পনিক গল্প 'স্বপ্নের আড়ালে'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন