পল্লবী সেনগুপ্ত
সূর্য ওই দিগন্তরেখার ওপার থেকে বিদায় নিয়েছে বেশ খানিকক্ষণই হল। অন্ধকার নেমে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে এখন পৃথিবীর কোণা। অঙ্কিত এবার নিজের মুঠোর মধ্যে চেপে ধরল নির্মলার হাত আরও শক্ত করে। নির্মলার মুখে হালকা ভয়ের ভাব। ও নিজের সদ্যবিবাহিতা স্ত্রীয়ের কানে মুখ লাগিয়ে ফিসফিস করে বলল
'এই, কী হল? ভয় করছে নাকি'?'
নির্মলা ঘাড় দোলাল জোরে। অর্থাৎ তার ভয় করছে। আসলে অঙ্কিত খুব এডভেঞ্চার প্রিয় সেই ছোটবেলা থেকেই। হানিমুনে এসেও সে নেশা ছাড়তে পারেনি। এমন একটা বিতর্কিত জায়গায় আসার সুযোগ এত কাছে এসেও ছেড়ে দেওয়াটা একেবারে সম্ভব ছিল না অঙ্কিতের মতো একটা ভয়ডরহীন, দাপুটে ছেলের পক্ষে। তাই নির্মলার আপত্তি থাকলেও এখানে ওকে নিয়ে এসেছে খানিকটা জোর করেই।
'অঙ্কিত আমাদের তো কথা ছিল আমরা সকালে আসব, এই জায়গাটা দেখব আর তারপর চলে যাব। কিন্তু এখন তো অন্ধকার নেমে গেল। এবার তো চল। আমার সত্যি এবার আর ভালো লাগছে না। ভীষণ ভয় করছে। সবাই তো বলছিল এইখানে সন্ধ্যা নামার পর কেউ আসে না। কেউ থাকে না। তাই এবার এখানে থাকাটা মোটেও সেফ হচ্ছে না'। প্রায় কাঁদোকাঁদো গলায় বলল নির্মলা।
'আরে আমরা তো ফিরেই যাব। গাড়ি তো অপেক্ষাই করছে আমাদের জন্য। কিন্তু দেখ সমুদ্রের এত সুন্দর রূপ, এমন বাঙময় নিস্তব্ধতা আর এই সবকিছুর মাঝে শুধু তুমি আর আমি; মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীর সেই আদিম যুগ থেকে নেমে এসেছি আমরা দুজন আদম আর ইভ এর মতো। জান এই জায়গাতেই রামচন্দ্র নির্মাণ করেছিলেন সেই বিখ্যাত পৌরাণিক রামসেতু দেবী সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কা যাবার পথে, যাকে আদম ব্রিজও বলা হয়। এমন জায়গায় তোমায় নিয়ে দু-দণ্ড নির্জনতা উপভোগ না করলে এই জায়গাটায় এত কাঠ খড় পুড়িয়ে আসাটাই যে বৃথা হয়ে যাবে'। নির্মলাকে আবেগঘন গলায় বলল অঙ্কিত।
'হ্যাঁ কিন্তু মানে' শেষ হল না নির্মলার কথাটা তার আগেই ওর গলা চিরে বেরিয়ে এল একটা বীভৎস আর্ত চিৎকার।
'অঙ্কিত অঙ্কিত আমায় বাঁচাও। দেখো কী আসছে, কী আসছে ওটা? নাআ, না আ আ'' একটা চিৎকার মিশে গেল সমুদ্রের ছলাত শব্দের সাথে সাথে।
* * *
'আপনি সত্যি করে বলুন মিস্টার অঙ্কিত হাজরা সেদিন ঠিক কী করেছিলেন আপনি নির্মলা দেবীর সাথে? একজন জলজ্যান্ত মহিলা চোখের পলকে গায়েব হয়ে গেল? আপনি নাকি তার বিন্দু বিসর্গ জানেন না? ইয়ার্কি মারছেন আপনি আমার সাথে'? গর্জে উঠলেন দুঁদে পুলিশ অফিসার সুমন্ত জোয়ারদার।
গতকাল হানিমুন থেকে উদ্ভ্রান্তের মতো অবস্থায় ফিরে এসেছে অঙ্কিত। নির্মলা ওর সাথে ফেরেনি। নির্মলা কোথায়, কেনই বা সে ওর সাথে এল না তার কোনো সঠিক জবাব দিতে পারছে না অঙ্কিত। সব প্রশ্নের উত্তরেই শুধু বলছে,
'আমি জানি না, কিচ্ছু জানি না আমি'। পাগলের মতো ব্যবহার করছে ছেলেটা। ক্রমাগত অসংলগ্ন কথাবার্তা বলেছে। নির্মলার বাবা মা পাগলের মতো করছেন। বারবার তারা জিজ্ঞাসা করছেন।
'বল অঙ্কিত কি হয়েছে নির্মলার? কোথায় আমাদের মেয়েটা'। সব কথার উত্তরেই দু-হাত দিয়ে নিজের দু-কান চেপে বীভৎস ভাবে শুধু চিৎকার করছে ও। সেই একই চিৎকার—
'আমি জানি না। জানিইই না'। নিজের মাথার বালিশটা আজ চিবাচ্ছিল অঙ্কিত। দেওয়াল চাটছিল। কিন্তু নির্মলার বাবা মা হিংস্র হয়ে উঠেছেন। অঙ্কিতের সমস্ত অসংলগ্নতাই তাদের চোখে এই মুহূর্তে ভান, নিছক অভিনয়। তাদের দৃঢ় ধারণা নির্মলাকে কোনো ভাবে খুন করেছে অঙ্কিত। তারপর আইনের হাত থেকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নিয়েছে ছলনার। তাই তারা অঙ্কিতকে গ্রেফতার করিয়েছেন। নির্মলার বাবা শহরের দুঁদে উকিল। তিনি বারবার বলছেন তার মেয়ের সাথে হওয়া এই অন্যায় এর তিনি শেষ দেখে ছাড়বেন।
'শুনুন মিস্টার হাজরা, কোনো চালাকি করে কিন্তু আপনি পার পাবেন না। আমরা নির্মলা দেবীর মায়ের থেকে জেনেছে ওই জায়গায় যেতে একেবারে রাজি ছিলেন না নির্মলা দেবী। সে কথা বারবার নির্মলা মোবাইল ফোনে জানিয়েওছিলেন তার মাকে। তাহলে কেন আপনি জোর করেছিলেন ওকে? বলুন কী উদ্দেশ্য ছিল আপনার'? ফের গর্জে উঠলেন সুমন্ত জোয়ারদার।
'জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না। আমি জানি না আ আ আ' আবার নিজের দুই কান চেপে ধরে বদ্ধ উন্মাদের মতো করে আর্তনাদ করে উঠল অঙ্কিত।
নিজের সিট থেকেই নয়ন এর দিকে খানিকক্ষণ খর চোখে তাকিয়ে রইল বিতস্তা। কিন্তু নয়ন এর কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। কোন দিকে তাকাচ্ছেই না ও। একভাবে কম্পিউটারে মুখ গুঁজে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু খবরটা পাবার পর থেকে বিতস্তা যে আর কোনোভাবেই সামলে রাখতে পারছে না নিজেকে। এত বড় সাঙ্ঘাতিক সিদ্ধান্তটা কী করে নিতে পারল ও? একবারও কী বিতস্তার কথা ও ভাবল না!
'সত্য সংবাদ' এর দফতরে আজ বিতস্তা চাকরি করছে বছর দুয়েক হল। আর চাকরির প্রথম দিন থেকেই নয়ন নামের এই ছেলেটাকে কেন কে জানে ভীষণ ভালো লেগে গেছিল ওর। নয়ন ওর থেকে কিছুটা সিনিয়র। ওর বছর দেড়েক আগেই ঢুকেছিল এখানে। কিন্তু কাজের প্রতি নিদারুণ নিষ্ঠা। সাংবাদিকতা পেশাটার প্রতি নয়নের নিষ্ঠা বরাবরই ভীষণ মুগ্ধ করত বিতস্তাকে। প্রথম দিকে কাজ শেখার ক্ষেত্রে নয়ন ওকে অনেক সাহায্য করেছে। বিতস্তারও ভীষণ ভালো লাগত ওই ছেলেটার কাছাকাছি থাকতে, ওর থেকে কাজ শিখতে। কিন্তু ওর যেটা ভালো লাগত না সেটা হল ওই মানুষটার অতিরিক্ত গম্ভীর থাকা। পেশার বাইরে যেন বেশি ভাঙতেই চায় না সে। সব সময় ভালবাসে নিজেকে এক অদ্ভুত দুর্ভেদ্য খোলসে মুড়ে রাখতে। তবুও আস্তে আস্তে এই খোলস চাপা মানুষটাকেই কেন কে জানে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছিল বিতস্তা। বেশিদিন লুকিয়েও রাখতে পারেনি সে কথা। তার তরফ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাবার আশা নেই জেনেও একদিন বলেই ফেলেছিল টুক করে নিজের মনের কথাটা। ওর আবেগ ভরা অনুভূতির শব্দগুলো শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে ছিল নয়ন। তারপর ওকে চমকে দিয়ে বলেছিল
'আমায় ভালোবাসা, আমার সাথে থাকা অনেক কঠিন কাজ বিতস্তা। তুমি কি সত্যিই সেটা পারবে? সেটা পেরে ওঠা যে-কোনো মেয়ের পক্ষে কিন্তু সহজসাধ্য নয়। আমার জীবনে একটা লক্ষ্য আছে। একটা রহস্যভেদের লক্ষ্য। এমন এক রহস্য, এমন কিছু প্রশ্ন যেগুলো একদিন তোলপাড় করে রেখে দিয়েছিল আমার জীবনকে। এক নিমেষে তছনছ করে দিয়েছিল সব কিছু। সেই রহস্য ভেদ করাই আমার জীবনের সব থেকে বড় লক্ষ্য ধরে নিতে পার। একদিন না একদিন সেই লক্ষ্যপূরণে পথে আমায় বেরোতেই হবে। আমি জানি না আমি পারব কিনা কালো পর্দার ওপারে থাকা সেই রহস্য উৎঘাটন করতে, হয়তো আমার মৃত্যুও হতে পারে সেটা করতে গিয়ে। কিন্তু তবুও সেটাই যে আমার জীবনের ধ্যান জ্ঞান। ধরে নিতে পার সেই উদ্দেশ্য নিয়েই এই সাংবাদিকতার পেশাটা বেছে নিয়েছি আমি। আমার বিশ্বাস এই পেশাই একদিন আমার সে লক্ষ্যপূরণের পথকে সুগম করে দেবে'।
'কি রহস্য আছে তোমায় ঘিরে নয়ন'? বিস্ময়ভরা গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল বিতস্তা।
'আছে। তবে এখন সে নিয়ে আমি কথা বলতে চাই না। সময় এলে আমি নিশ্চয় তোমায় জানাবো।' বলেছিল নয়ন গম্ভীর স্বরে।
'বেশ আমি তোমায় জোর করব না। যেদিন তুমি নিজে উচিত মনে করবে সেদিনকেই আমায় জানিও। কিন্তু আমি এতটুকু তোমায় কথা দিতে পারি যদি তোমায় ভালোবাসার অধিকার দাও আমায় তবে তোমার জীবনের লক্ষ্যকে আমি নিজের জীবনের লক্ষ্য থেকে আলাদা করে ভাবব না। তোমার যে-কোনো কাজে সব সময় আমায় পাশে পাবে'।
বিতস্তার এই কথার প্রতিক্রিয়ায় সেদিন কোনো উত্তর দেয়নি নয়ন। শুধু নিজের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরেছিল ওর হাত। সেই থেকেই সম্পর্কের শুরু। দেখতে দেখতে প্রায় বছর খানেক তো হয়েই গেল। এই কদিনেও নয়ন যে খুব সহজ হয়ে গেছে ওর কাছে তা নয়, কিন্তু আগের থেকে একটু নিজেকে উন্মোচন করেছে একথা ঠিক। আসলে আজ থেকে দশ বছর আগে একটা ঘটনায় সত্যি একেবারে এলোমেলো হয়ে গেছিল ওর জীবন। তখন বোধহয় নয়ন স্কুলে। ওর দাদা আত্মহত্যা করেছিল, সেই খবর পেয়ে তৎক্ষণাৎ হার্টফেল করে মারা যান ওর বাবা। ওর মা খুব কষ্ট করে মানুষ করেছে ওকে। কিন্তু সেই ভদ্রমহিলাকেও দেখলেই মনে হয় যেন সাক্ষাৎ বিষাদের প্রতিমা। বিতস্তা বোঝে নয়নের কষ্টটা। প্রতি মুহূর্তে ওর মনের ক্ষতগুলোতে প্রলেপ দেবার চেষ্টা করে যায়। ও সত্যি প্রাণ দিয়ে ভালোবাসে নয়নকে। কিন্তু নয়ন কি ওকে একেবারেই একটুও ভালোবাসে না? ভালোবাসলে কি এরকম একটা সিদ্ধান্ত নিতে পারত ও?
আর নিজেকে সামলাতে পারল না বিতস্তা। সোজা চলে গেল ওর কিউবিকলের কাছে। নয়ন দেখতেই পেল না। সে কাজে মগ্ন। খুব দৃঢ় গলায় এবার বলল,
'নয়ন তোমার সাথে কিছু খুব দরকারি কথা আছে, সেটা আমি এক্ষুনি বলতে চাই'। চোখ তুলল নয়ন।
'বাইরে এস'। আদেশের চালে বলল বিতস্তা।
নয়ন বাইরে এলে অফিসের করিডরে দাঁড়িয়েও এবার গলা চড়েই গেল বিতস্তার। বেশ জোর গলায় বলল
'এসবের মানে কী নয়ন? তুমি নাকি তামিলনাড়ুর ঐ বর্ডারের কেসটা নিয়েছ? ওটা কভার করতে নাকি তুমি যাচ্ছ?'
''হ্যাঁ আমিই যাচ্ছি।'
'কেন? কিসের জন্য? এত রিস্কি একটা কেসে তুমি কেন? আর কেউ ছিল না?'
'ছিল হয়তো। তবু আমিই যাব। কুন্তলদাকে বিশেষ অনুরোধ করে এই প্রোজেক্টটা আমি নিয়েছি।'
'কেন নিয়েছ? সেটাই তো জানতে চাইছি আমি'। এবার চিৎকার করে ফেলল বিতস্তা।
'কারণ এই কেসটা একেবারে আলাদা। এই ঘটনার কথা এখনও খুব বেশি সংবাদ মাধ্যমের কাছে পৌঁছয়নি, আর বাংলার সংবাদ মাধ্যমদের কাছে তো নয়ই। তবে এসব খবর পৌঁছতে খুব বেশি দেরি লাগার কথা নয় তাদের কাছে । আমাদের চ্যানেল মাত্র পাঁচ বছরের। অনেক নবীন এখনও আমরা। নিজেদের জমি শক্ত করতে আমাদের এরকমই একটা সুযোগ দরকার। বড় চ্যানেলগুলো লাফিয়ে পড়ে স্টোরি তৈরি করার আগে আমরা যদি পুরো জিনিসটা উৎঘাটন করে সবকিছু প্রকাশের আলোয় নিয়ে আসতে পারি তাহলে আমাদের চ্যানেল এর টি আর পি কোথায় পৌঁছাবে ভাবতে পারছ? এক ধাক্কায় আমরা অনেকটা পথ টপকে যাব। আর এরকম কাজে আমার মতোই একজনকে দরকার ছিল যে নিজের কাজটা নিয়ে প্যাশনেট। যে মরতে ভয় পায় না। আর এই প্রজেক্টটায় যদি সফল হই আমি তাহলে আমি এক লাফে কতটা উন্নতি করে নেব একবার ভেবে দেখেছ'?
'ওহ! উন্নতি। কেরিয়ার। তোমার কাছে শুধু এগুলোই গুরুত্বপূর্ণ তাই না? আমি কেউ না। এই এত বড় বিপজ্জনক কাজে তুমি যাওয়ায় আমার কতটা চিন্তা হবে তুমি ভেবে দেখেছ? আমি কত রাত আতঙ্কে ঘুমাতে পারব না একটুও ভেবেছ? শুধুই কেরিয়ার তোমার কাছে আজ বড় হল'? এবার কেঁদে ফেলেছে বিতস্তা। ওর কান্নাভেজা লালচে মুখটার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল নয়ন। তারপর গলা খাদে নামিয়ে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,
'না বিতস্তা, কেরিয়ারের জন্য এসব আমি করছি না। আমি এই প্রোজেক্টটা নিয়েছি কারণ এর থেকে ভালো সুযোগ আমি আর পাব না তাই।'
'মানে'?
'এটাই সেই জায়গা বিতস্তা, যেখানে লুকিয়ে আছে আমার জীবন তছনছ করে দেওয়া অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর। যে রহস্যভেদ করার লক্ষ্য নিয়ে আমি বিগত দশ বছরের প্রতিটা দিন অতিবাহিত করেছি সেই রহস্যভেদের সুযোগ আমায় এনে দিয়েছে এই প্রোজেক্টটা। আর কে বলতে পারে ওখানে যে রহস্যময় ঘটনাগুলো ঘটেছে সেগুলো হয়তো আমার জীবনে জড়িয়ে থাকা প্রশ্নগুলোর সাথেই কোনো না কোনো ভাবে যুক্ত।'
'মানে? এসব কী বলছ তুমি'? নয়নের শেষ কথাটায় মাথার মধ্যে সব তালগোল পেকে গেছে বিতস্তার। কিছুই বুঝতে পারছে না ও। একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ও ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল নয়নের দিকে।
ভারত আর শ্রীলঙ্কার বর্ডার, ধনুষকোডি। এটাই ভারতবর্ষ ও শ্রীলঙ্কার একমাত্র বর্ডার। বছর ষাট আগেও এই ধনুষকোডি ছিল বেশ সুন্দর ছিমছাম একটা সাজানো গোছানো ছোট শহর। কিন্তু ১৯৬৪ সালের এক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ে ধ্বংস হয়ে যায় এই ছোট শহরটি। প্রাণ হারায় বহু মানুষ। তারপর থেকেই নাকি ভূতুড়ে বলে বদনাম রটে যায় জায়গাটার। এই ফাঁকা পরিত্যক্ত শহরটাকে বসবাসের অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা করা হয় মাদ্রাজ সরকারের পক্ষ থেকে। আর যেহেতু রাতারাতি বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে একেবারে বাতিল হয়ে গেছিল এই শহর তাই ভূতের, অপশক্তির আধার হিসেবে জায়গাটার দুর্নাম রটতে খুব বেশি সময় লাগেনি। তাই দিনের বেলায় এখানে কিছু মানুষজনের সমাগম হলেও রাতের অন্ধকার হয়ে যাবার পর থেকেই একেবারে খাঁ খাঁ করে সমুদ্রতীরবর্তী পুরো অঞ্চলটা।
কিন্তু কিছুদিন আগের একটা চাঞ্চল্যকর তথ্য হঠাৎ নাড়িয়ে দিয়েছে সাংবাদিক মহলকে। যদিও ঘটনাটা খুব বেশি প্রকাশের আলোয় আসেনি, আর বাংলায় তো নয়ই তবে যতটুকু জানা গেছে তা বেশ গা ছমছমে। বিশেষ মাধ্যমসূত্রে খবরটা এসে পৌঁছেছিল নয়নদের দফতরে। এই অঞ্চলে অর্থাৎ সমুদ্রের তীরে নাকি আচমকা পাওয়া গেছে দুজন মানুষের মৃতদেহ। তাদের শরীরটা নাকি পুরো রগুশূন্য অবস্থায় পড়েছিল। মনে হয়েছিল যেন পুরো শরীরের রক্ত কেউ বের করে নিয়েছিল টেনে তাদের দেহ থেকে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট অনুযায়ী জানা গিয়েছিল ওই দুই ব্যাক্তির মৃত্যু হয়েছিল রাত তিনটে নাগাদ। ওই লোকগুলোর মুখ পুরো বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। লাশ শনাক্ত হবার কোনো উপায় ছিল না সেই জন্য। তাই জানা যায়নি ওরা কারা ছিল, কেন এসেছিল আর কিই বা করছিল ওত রাতে। তবে প্রাথমিক তদন্ত চালিয়ে মনে করা হয়েছিল লোকগুলো সম্ভবত আন্ডার ওয়ার্ল্ডের। এমন একটা পরিত্যক্ত শুনশান জায়গা পেয়ে তারা এখানে ঘাঁটি গাড়ার মতলবেই ছিল বোধহয়। এখানে আস্তানা বানাতে চেয়েছিল, বানাতে চেয়েছিল চোরাই মালের গুদাম।
তবে এই ঘটনার কয়েকদিন পর তদন্তের জন্য এখানে এসে রাতে পাহারায় ছিলেন পুলিশবিভাগের বিশেষ তদন্ত শাখার দুজন অফিসার। তারা পরখ করতে চেয়েছিলেন রাতে ঠিক কী ঘটে এই জনমানবহীন প্রান্তরে। কিন্তু খুব অস্বাভাবিকভাবে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কোথায় গেল তারা? তন্ন তন্ন করে খোঁজ চালিয়েও কোনো হদিশ মেলেনি। এখানকার স্থানীয় লোকরা বলছে নাকি সাইক্লোনে মরে যাওয়া সেই সকল মানুষদের অতৃপ্ত আত্মারা এখানে আজও ঘুরে বেড়ায়। তারাই নাকি মেরে ফেলে লোকজনকে। গায়েবও করে দেয় কখনো সখনো। মোট কথা অন্ধকার নামার পরে এখানে কেউ থাকলে তার আর নিস্তার নেই। তাকে মরতেই হবে। বহুবছর ধরেই নাকি চলছে এই মৃত্যুর খেলা। এর আগেও নাকি বহু সময় অনেক মানুষই মরেছে এখানে নৃশংসভাবে, গায়েবও হয়েছে অনেকেই।
ওই দুজন অফিসারের মৃত্যুর পর আর কেউ তদন্তে এসেছিলেন কিনা বা আর কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল কিনা সেটা আর জানা নেই নয়নের। শুধু নয়ন কেন, অনেকেরই জানা নেই। আসলে এই চাঞ্চল্যকর খবরটা সারা ভারতের সর্বত্র সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েনি সেভাবে। হতে পারে হয়তো সরকারের পক্ষ থেকেই খবরটা ছড়িয়ে পড়তে দেওয়া হয়নি। তাহলেই তো হুহু করে ছুটে আসবে খবরখেকো সাংবাদিকদের দল, মিডিয়া। চঞ্চল হয়ে উঠবে ভারত শ্রীলঙ্কার বর্ডার এরিয়া। হয়তো সরকার থেকে একেবারে গোপনে কোনরকম তদন্ত চালান হচ্ছে এমনটাও হতে পারে। তবে সে যাই হোক না কেন এই সুযোগ হাতছাড়া করার কোনরকমে অবকাশ ছিল না নয়নের। সত্য সংবাদ-এর অন্যতম কর্ণধার কুন্তলদাকে বলে এই প্রোজেক্টটায় জোর করে ঢুকে গেছে ও। প্রায় অন্তরালে থাকা এই চাঞ্চল্যকর খবরটা পেয়েছিল 'দৈনিক সত্য'। কুন্তল দা খুব কম লোককেই জানিয়েছিল এই ব্যাপারটা। নয়ন বেশ অনেকদিন আছে এই চ্যানেলের সাথে, নিজের কাজের কাজের প্রতি খুব সৎ ও। তাই উঁচু মহলের অনেকেই পছন্দ করেন ওকে। কুন্তলদাও তাদের মধ্যে একজন। তাই কুন্তলদাকে বাগ মানাতে বেশি কষ্ট করতে হয়নি নয়নকে।
'কুন্তলদা, বুঝতে পারছ এখনও বেশি কোনো চ্যানেল বা মিডিয়া খবরটার নাগাল পায়নি। এই অবস্থায় আমরা যদি একটা কাঁপিয়ে দেওয়া স্টোরি করে দিতে পারি, যদি একটু খোঁজখবর নিয়ে আসতে পারি ভাবতে পারছ কী হবে? এক ধাক্কায় চ্যানেল এর টি আর পি এক নম্বরে চলে যাবে। হাইফাই চ্যানেলদের বিট দিয়ে দেব আমরা।'
'সবই তো বুঝতে পারছি কিন্তু পাঠাব কাকে সেটাই তো মাথায় আসছে না। আর সবচেয়ে বড় কথা অমন একটা বিপজ্জনক জায়গায় রাতের বেলায় কে থাকতে চাইবে বল।'
'আমি তো আছি কুন্তল দা।'
'তুমি? তুমি যাবে? আর ইউ শিওর নয়ন?'
'হ্যাঁ আমিই যাব। নিজের কথা ভেবে এই নয়ন হাজরা কি কোনোদিনও কোনো চ্যালেঞ্জিং কাজ নিতে পিছপা হয়েছে তুমি বল?'
হ্যাঁ এইভাবেই কুন্তল দাকে ম্যানেজ করিয়ে এই প্রোজেক্টে যুক্ত হয়েছে নয়ন। এখন ধনুষকোডির দিকেই সাঁই সাঁই করে ছুটে চলেছে ওদের চারজনের টিমসহ গাড়িটা। সরু রাস্তা পেরিয়ে ছুটছে গাড়ি। চারজনের টিম এসেছে 'সত্য সংবাদ'-এর পক্ষ থেকে। অখিল, তন্ময়, বর্ণিল আর নয়ন নিজে। এই চারজনেই ' সত্য সংবাদ ' এর বেশ বাহাদুর সাংবাদিক বলে পরিচিত। এরাই পরিদর্শন করবে জায়গাটা। স্টোরি করবে যতটা চিত্তাকর্ষকভাবে সম্ভব আর তার সাথে সত্যটা জানার চেষ্টা করবে আপ্রাণ। অন্তত নয়ন তো করবেই। সব রকম প্রচেষ্টা করবে ও। তন্ময়, বর্ণিল আর অখিল ফিরে যাবে। কিন্তু নয়ন ফিরবে না। ও আজ রাতটা এখানেই থাকবে। থাকতেই হবে ওকে। ও যে দশ বছর ধরে এই রাতটার জন্যই অপেক্ষা করেছিল। তবে বিতস্তা খুব চিন্তা করছে নিশ্চয়। কিন্তু সবটা তো ও বুঝিয়ে বলে এসেছে মেয়েটাকে। বিতস্তা ওকে সত্যিই ভালোবাসে। কাজেই নিশ্চয় বুঝবে সে।
'নয়ন, তোর সাথে আমার একটা কথা ছিল''। হঠাৎ তন্ময় ওর কানের কাছে মুখ লাগিয়ে বলল কথাটা।
'কি কথা?'
'আমিও তোর সাথে আজ রাতে ধনুষকোডিতে থাকব।'
'কী! পাগল নাকি তুই? কোনো প্রশ্নই নেই'।
'আমি থাকবোই। তুই আমায় আটকাতে পারবি না। আর যদি না রাখিস আমায় তাহলে আমি সমুদ্রে লাফ মারব'।
'তন্ময় প্লিজ, প্লিজ এরকম করিস না'। মরিয়া হয়ে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করল নয়ন।
'কেন রে শালা? কী ভেবেছিস তুই? সব ফুটেজের গুড় শুধু তুই একা খাবি? আমি থাকলে তোর ফুটেজ ভাগ হয়ে যাবে তাই ভয় পাচ্ছিস? আমি ফুটেজের ভাগ কিছুতেই ছাড়ব না।'
এবার আর কোনো উত্তর দিল না নয়ন। শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। ও জানে তন্ময় ফুটেজের লোভে কিছুই করছে না, সব করছে ওর জন্য। ওকে রাতে একা ওখানে ছাড়বে না বলে। সাংবাদিকতা পরার সময়ে ইউনিভার্সিটিতে তন্ময়ই ছিল নয়নের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। ওর জীবনের অনেকটাই জানে তন্ময়। কিন্তু পড়াশুনা শেষের পর কিছুতেই চাকরি পাচ্ছিল না ছেলেটা। প্রায় দু-বছর ঘরে বসে বসে ডিপ্রেশনে চলে গেছিল ও। সেই সময়েই কতকটা নয়নের সুপারিশেই তন্ময়ের চাকরিটা হয়েছিল সত্য সংবাদ-এ। বন্ধুত্বের সাথে সাথে অপরিসীম কৃতজ্ঞতাও যোগ হয়েছে তারপর থেকেই। যদিও তন্ময় অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে প্রমাণ করেছে দারুণভাবে। অনেকগুলো চ্যালেঞ্জিং প্রোজেক্টে ভীষণ ভালো কাজ করে অনেকটা সুনাম অর্জন করেছে ও। সেইজন্যই তো আজ ধনুষকোডি-এর মতো এত গুরুত্বপূর্ণ প্রোজেক্টেও ওকে পাঠান হয়েছে।
'এই কী ব্যাপার? চুপ করে রইলি কেন? কিছু বল'। ওকে ধাক্কা মারল তন্ময়।
'তুই যখন একবার বলে দিয়েছিস তখন তোকে আটকাবার ক্ষমতা শুধু আমি কেন দুনিয়ায় কারোর যে নেই তা আমি বিলক্ষণ জানি'।
'ব্যস মনে থাকে যেন'। আদেশের সুরে বলল তন্ময়। ওর বলার কায়দাটা দেখে এত উদ্বেগের মধ্যেও ফিক করে হেসে ফেলল নয়ন।
'মিস্টার অসিত হাজরা বলছেন? আমি থানা থেকে বলছি।'
'হ্যাঁ বলুন। কী হয়েছে?'
'আপনার বড় ছেলে অঙ্কিত হাজরা লক আপেই আত্মত্যা করেছেন গতকাল গভীর রাতে। আপনাদের একবার আসতে হবে দেহ শনাক্ত করার জন্য।'
'কী! কী বলছেন'! হাত থেকে ফোনের রিসিভারটা পড়ে গেল ষাটের বৃদ্ধের। বুক চেপে ধরে চিৎকার করছেন তিনি।
'নিভা নিভা, বড় খোকা আর নেই'। বুক চেপে ধরে পাগলের মতো করছেন তিনি। দরদর করে ঘাম হচ্ছে। ঠোঁটটা বেঁকে যাচ্ছে।
'বাবা, কী হয়েছে তোমার? বাবা আ আ' দৌড়ে গেল সেই বৃদ্ধের কাছে তার স্কুল পড়ুয়া ছোট ছেলে। ছটফট করতে করতে এবার নিথর হয়ে গেল বৃদ্ধের দেহ।
'মা, মা গো শিগগির এস একবার। দেখ না বাবা কেমন করছে।' কিন্তু এগিয়ে এলেন না মা। তিনিও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন দেওয়ালে হেলান দিয়ে।
চোখ খুলল নয়ন। আজও চোখ বুজলেই সেই বীভৎস দিনের স্মৃতিপট মূর্তিমান হয়ে দাঁড়ায় চোখের সামনে। ঠিক আজ থেকে দশ বছর আগের কথা, এক লহমায় তছনছ হয়ে গিয়েছিল ওদের সাজান সংসার। কিন্তু কেন সেই উত্তর আজও জানা নেই। হয়তো আজ জানা যাবে। সেই আশাতেই তো বিপদের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে এত দূর ছুটে এসেছে নয়ন।
দশ বছর আগে ধূমধাম করে বিয়ে হয়েছিল নয়নের দাদার খুব বড় পরিবারের মেয়ের সাথে। বিয়ের পর পর হানিমুনে বেরিয়েছিল ওরা। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় দাদা সাইট সিন এর তালিকায় রেখেছিল ধনুষকোডি ভ্রমণ। এই জায়গা নাকি অভিশপ্ত, নানা কানাঘুষো শোনা যায় এই জায়গাটা নিয়ে। সেই কারণেই এই রহস্যময় জায়গা টেনেছিল দাদাকে। বউদির খানিক আপত্তি সত্ত্বেও তাই এই জায়গা দেখতে এসেছিল ওরা। কিন্তু তারপর কী হয়েছিল কেউ জানে না। এখান থেকেই আশ্চর্যভাবে গায়েব হয়ে গিয়েছিল বউদি। কী হয়েছিল তার আজও জানা নেই। আর দাদা এখান থেকে ফিরেছিল পুরো উন্মাদপ্রায় অবস্থায়। কিচ্ছু বলতে পারেনি সে কী হয়েছে তার স্ত্রীয়ের। তারপর দাদার ওপর বউকে খুনের অভিযোগ দায়ের করেন বউদির বাবা। দাদা গ্রেফতার হয়। গ্রেফতার হবার ঠিক পরের দিনই মাঝরাতে লক আপেই আত্মহত্যা করে নিয়েছিল সে। আর সেই মুহূর্তেই তছনছ হয়ে গিয়েছিল নয়নদের সংসার। আর ঠিক সেই দিন থেকেই নয়ন ঠিক করে নিয়েছিল যে অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো, রহস্যগুলো শেষ করে দিল ওদের সবকিছু সেই রহস্য আসলে ঠিক কী সেটা জেনেই ছাড়বে ও। প্রয়োজনে প্রাণ দেবে, কিন্তু জানতে ওকে হবেই।
অবশেষে ভাগ্য ওকে সে সুযোগ দিয়েছে। এসে পৌঁছেছে ওরা ধনুষকোডিতে। এখানে এক কালে ছোট একটা শহর ছিল। কিন্তু ১৯৬৪ এর সেই বিধ্বংসী ঘূর্ণি ঝড়ের পর সব ধ্বংস হয়ে যায়। তারপর থেকেই পরিত্যক্ত প্রান্তর হিসেবে পড়ে রয়েছে এই জায়গাটা। এখানে দিনের বেলায় টুকটাক লোকজন আসে মাঝে মাঝে। কিন্তু অন্ধকার নামলে আর কেউ থাকে না। সকলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে যে আজও এখানেই আটকে আছে মৃতদের আত্মা, আর তারাই ক্ষতি করতে চায় ইহজগতের মানুষদের। এখানে এসে আজ ওরা দেখল কিছু ছোটখাটো ঝুপড়ি মতো দোকান রয়েছে। এই চা বিস্কুট, কলা, ডাব এই সব বিক্রি করা হয় দোকানগুলোতে, দিনের বেলায় সাইট দেখতে আসা মানুষদের জন্য। যারা এখানে দোকান চালায় নিতান্তই গরিব। ওদেরই একজনের সাথে কথা বলছিল আজ নয়ন। ওরা খবরের চ্যানেলের লোক শুনে বেশ উৎসাহিত হয়েছিল সে দোকানদার।
'তোমার নাম কি'? হিন্দিতেই জিজ্ঞাসা করেছিল নয়ন।
'জি আমার নাম ভানু বাবু'। ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বলেছিল মধ্যবয়সি লোকটা।
'তা ভানু সবাই যে বলে এই জায়গা নাকি ভূতুড়ে, পুরোপুরি অভিশপ্ত তাহলে এমন জায়গাতে কেন দোকান করলে তুমি বা তোমার মতো আরও কয়েকজন'?
'খুলেছি কী আর সাধে বাবু? খুলেছি পেটের দায়ে। অন্য কোথাও জায়গা নিয়ে দোকান খোলার সাধ্য আমাদের নেই। এদিকে ঘরে বুড়ো মা বাবা, বউ, দুটো বাচ্চা। এতগুলো পেট চালাতে হবে। তবে আমরা কেউই এখানে থাকি না। আমরা সবাই থাকি রামেশ্বরম-এ। এখানে সকালে দোকান করি, যে বাবুরা এ জায়গা দেখতে আসে তাদের বিক্রি করি জিনিস আর সূর্য ডোবার আগেই দোকানের ঝাঁপ ফেলে চলে যাই নিজেদের বাসায়। আপনারা টিভিতে বলবেন বাবু এখানে আমাদের কী কষ্ট করে চালাতে হয় দোকান শুধু পেটের দায়ে।'
লোকটার কথা শেষ হতে না হতেই নিজের পকেট থেকে একটা দু-হাজার টাকার নোট বের করে নয়ন বাড়িয়ে দিয়েছিল তার দিকে। হাসিমুখে বলেছিল,
'নাও ভানু। এটা রাখ'।
'কেন বাবু? এটা কেন দিচ্ছেন? আমরা গরিব আছি, ভিখারি নই'। আত্মসম্মানজ্ঞান সম্পন্ন গরিব লোকটা প্রতিবাদ করেছিল সাথে সাথে।
'এসব কী বলছ ভানু? তোমায় আমি কি অপমান করতে পারি? এটা দিচ্ছি ভাড়া বাবদ। আজ রাতটা আমি তোমার দোকানে থাকব। এখানেই শোব। তাই এই ভাড়াটা দিলাম তোমায় সেই বাবদ।'
'মানে? আপনার মাথার ঠিক আছে তো বাবু? এসব কী বলছেন আপনি? এই জায়গায় কেউ থাকে না রাতে। ভুল করেও আসে না। আর আপনি আমায় দোকান খোলা রাখতে বলছেন?'
'না না। তোমায় আমি দোকান খোলা রাখতে বলছি না। তোমায়ও থাকতে বলছি না। শুধু বলছি যে আজ রাতে আমি আর আমার এই বন্ধু এখানে থাকবে। তুমি দোকান বন্ধ করে রোজকার মতোই চলে যাবে। শুধু বন্ধ দোকানের ভেতর থেকে যাব আমরা দুজন। কারণ আমাদের দেখতে হবে রাতের বেলায় ঠিক কী হয় এখানে? এটা নিয়ে তদন্ত করতেই সুদূর কলকাতা থেকে এসেছি আমরা।'
'বাবু এটা অসম্ভব। ক-দিন আগেই এখানে খারাপ ভাবে মরে পড়েছিল কয়েকজন। এখানে রাতে থাকলেই গায়েব হয়ে যায় মানুষ। সেখানে আপনাকে আমি কিছুতে থাকতে দিতে পারব না। এখানে থাকা মানে তো মরণের কুয়োতে ঝাঁপ দেওয়া'।
'মানুষজন কেন গায়েব হচ্ছে সেটাই তো জানতে হবে আমাদের। তুমি চাও না এই জায়গাটার বদনাম কাটুক? তুমি চাও না এখানে লোক সমাগম আরও বাড়ুক, আরও ব্যবসা বড় হোক তোমাদের?'
কোনো কথাতেই রাজি হচ্ছিল না ভানু। তাই অগত্যা আরও একটা দু-হাজার টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়েছিল নয়ন ওর দিকে। টাকার বশ তো গোটা দুনিয়াটা। আর ভানুর মতো একজন গরিব লোকের পক্ষে এক ধাক্কায় চার হাজার টাকার লোভ কাটিয়ে ওঠা শুধু কঠিন নয়, অসম্ভব। তাই টাকাটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে সে বলেছিল,
'আচ্ছা বাবু। যা ভালো বোঝেন করুন। কিন্তু সাবধানে থাকবেন'।
'মরবি ... তোরাও মরবি'। ভানুর হাতে টাকাটা দেওয়া মাত্রই প্রায় গর্জন করার মতো করেই কেউ একজন বলে উঠেছিল হিন্দিতে এই শব্দ দুটো তৎক্ষণাৎ। চমকে উঠে সে আওয়াজ অনুসরণ করে তাকিয়েছিল ও আর তন্ময়। একটা পাগল। কখন যেন গুটিগুটি পায়ে এসে দাঁড়িয়েছে দোকানের সামনে। কি ভীষণ হিংস্র তার চেহারা। কালো মিশমিশে শরীর, মুখে দাড়ি গোঁফের জঙ্গল আর পরনের কাপড় প্রায় নেই বললেই চলে।
'কে এটা ভানু'? রুক্ষ গলায় জিজ্ঞাসা করেছিল তন্ময়।
'এই তুই আবার এসেছিস? যা ... যা'... লোকটার হাতে একটা বিস্কুট দিয়ে ভাগিয়ে দিয়েছিল তাকে ভানু। তারপর তন্ময়ের দিকে তাকিয়ে বলেছিল,
'এটা একটা পাগল বাবু। প্রায়ই চলে আসে। উলটোপালটা কথা বলে। সবাই বলে ষাট বছর আগের সেই ঘটনার সময় ও ছিল এই শহরেই। তখন নাকি ও নেহাত খোকা। ও সেই ঝড়ে মরেনি। কোনোভাবে বেঁচে গেছিল। আর তাই নিজের পরিবারজনদের খুঁজতে ও নাকি ঘুরে বেড়ায় এখানে। সত্যি মিথ্যা জানি না বাবু। এগুলো সব শোনা কথা। লোকমুখে চাউর হওয়া। ও সবসময় বলে এখানেই নাকি অন্যরূপে আজও রাতের অন্ধকারে ঘুরে বেড়ায় সেই বহুকাল আগে ঝড়ে মরে যাওয়া সকল লোকগুলোর আত্মা। আর জ্যান্ত মানুষ দেখলেই তাদের মেরে ফেলে নিজেদের দলে শামিল করে নেয় তাদের, নয়তো রক্ত শুষে ফেলে রাখে তাদের সমুদ্রের তীরে'।
ভানুর কথাগুলো শুনে একবার চোখ চাওয়াচাওয়ি করেছিল নয়ন আর তন্ময়। কিন্তু কোনো উত্তর দেয়নি ওর কথার। যাই হোক যথাসময়ে দোকান এর ঝাঁপ ফেলে চলে গেছে ভানু আর বন্ধ দোকানের ভেতর রয়ে গেছে ওরা দুজন। খুব টিমটিমে শিখার একটা ছোট্ট মোম জ্বলছে দোকানের ভেতর। আলো আঁধার মিলিয়ে ছোট্ট পরিসরের এই দোকান ঘরেই সৃষ্টি করছে অহরহ বিচিত্র সব ছায়া। বাইরে বিছিয়ে রয়েছে ঘন কালো অন্ধকার আর অখণ্ড নিস্তব্ধতা ঘেরা রহস্য আর তার সাথে শুধু সংগত করে চলেছে সমুদ্রের ঢেউয়ের ছলাত ছলাত শব্দ আর বাতাস বইবার শন শন আওয়াজ। দোকান ঘরের ঝাঁপ বন্ধ থাকলেও হালকা ফাঁক রেখে দিয়েছে নয়ন, এমন ফাঁক যা দিয়ে বাইরেটা মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। তবে ভেতরের আলো যাতে বাইরে না আছড়ে পড়ে সেদিকেও সজাগ থাকতে হচ্ছে। যদি কোনো মাফিয়া রাজ চলে এখানে তাহলে তারা যদি টের পেয়ে যায় এখানে কেউ আছে তবে তো ঘোর বিপদ। আজ যাই ঘটুক সেটা নিজের চোখে দেখতে চায় নয়ন, মন বলছে দশ বছর ধরে কুরে কুরে খাওয়া প্রশ্নগুলোর কিছু উত্তর মিলবেই। এখানে মোবাইলে টাওয়ার নেই, তবে ঘড়ি বলছে এখন রাত আড়াইটা। নয়নের চোখে ঘুমের লেশমাত্র নেই। যেন অজানা কোন অমঙ্গলের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে ও । তন্ময় ঢুলে পড়ছে মাঝে মাঝে, আর তখনই ওকে খোঁচা মারছে নয়ন। দুজনের কাছেই রয়েছে শক্তিশালী লেন্সের মাইক্রো ক্যামেরা যাতে লুকিয়ে ছবি তুলে নিতে পারে ওরা পরিস্থিতি বুঝলেই।
ঘড়ির কাঁটা যেন বড্ড ধীরে ঘুরছে আজ। দুটো তিরিশ থেকে সবে দুটো পঁয়ত্রিশ হল অথচ মনে হচ্ছে যেন দু-তিন ঘণ্টা কেটে গেছে। হঠাৎ নয়নের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় কী যেন একটা আভাস দিল। বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠল ওর। সমুদ্রের এক ঘেয়ে শব্দ ছাপিয়ে অন্য কিছু শব্দ হচ্ছে কি? হ্যাঁ হচ্ছে তো? বাতাসের বেগ বাড়ার শব্দ। বাতাস যেন আগের থেকে অনেক বেশি জোরে বইছে হঠাৎ। তার হিংস্র শনশন শব্দ যেন শোনাচ্ছে ঠিক যেন রাক্ষসের হাসির মতো। মুহূর্তের মাঝেই তীব্র খ্যাপাটে হয়ে উঠল সে বাতাস। থরথর করে কাঁপছে ওদের আজকের আশ্রয় স্থল এই ছোট্ট দোকানঘরটা। সমুদ্রের গর্জনও এক লহমায় যেন বেড়ে গেছে কুড়ি গুণ। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে যেন নরকের তাণ্ডব নৃত্য শুরু হয়েছে ধনুষকোডি-এর এই জায়গাটা জুড়ে।
'নয়ন, একি হয়ে গেল? কী হচ্ছে বল তো? আবার কোন বিধ্বংসী ঝড় এল নাকি এখানে'? তন্ময় বলে উঠল কাঁপা গলায় আর ওর কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই বিকট একটা শব্দ করে উড়ে গেল ওদের আশ্রয়দাতা দোকানঘরের চালটা। বীভৎস প্রলয় নৃত্য শুরু হয়েছে যেন গোটা পৃথিবী জুড়ে। প্রায় দু-মুহূর্তের ব্যবধানে ভেঙে পড়ল দোকান ঘরের দেওয়াল।
'নয়ন, এক্ষুনি পালাতে হবে আমাদের'। পাগলের মতো করে বলল তন্ময়।
'কিন্তু রাতের এই অন্ধকারে, এই অচেনা জায়গায়, এই দুর্যোগে কোথায় পালাব আমরা'? অদ্ভুতভাবে বলল নয়ন।
'তবে কি বাঁচার চেষ্টা টুকুও করব না? তাহলে তুই থাক মরার জন্য। আমি গেলাম'। পাগলের মতো সমুদ্র উপকূলবর্তী প্রান্তর দিয়ে ঝড়ের মধ্যে ছুটতে শুরু করল তন্ময়। কিন্তু নয়ন এগোচ্ছে না। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে সে আর ঝড়ের আঘাত সইছে নিষ্প্রাণের মতো। ও দেখতে পাচ্ছে হাওয়ার ঘূর্ণিতে আটকে পড়েছে তন্ময়ের শরীরটা, আর সেই ঘূর্ণির মধ্যেই এলোপাথাড়ি ছুটছে ও। আস্তে আস্তে ওকে ঘিরে ফেলছে একটা কালো পর্দা যে কালো পর্দা ঘিরে রেখেছে নয়নকেও। কালো পর্দাটা কিন্তু ঝড়ের নয়, ধুলোরও নয়। ওই মিশমিশে কালো পর্দা বুনেছে আসলে প্রায় কয়েকশো কুদর্শন ডানাওয়ালা বৃহৎআকার একদল প্রাণী। না ওরা কোনো পাখি নয়, বাদুড়ও নয়। আরও অনেক বেশি হিংস্র, অনেক বেশি কুদর্শন কোনো প্রাণী ; যাদের শরীরটা হুবুহু ধেড়ে বাদুড়ের মতো হলেও মুখাবয়ব একেবারে মানুষের মতো। ওরাই ঘিরে ফেলেছে তন্ময়কে। ওরাই ঘিরে ফেলেছে নয়নকেও।
'নয়ন বাঁচা আমায় ... বাঁচা আ আ'... একটা মরিয়া চিৎকার বেরিয়ে এল তন্ময়ের গলা চিরে। তারপরই আবার সব চুপচাপ। শুধু বয়ে চলেছে খ্যাপাটে ঝড় আর হিংস্র সমুদ্রের শব্দ। আস্তে আস্তে পাতলা হচ্ছে সে কালো পর্দা যেটা ঘিরে রেখেছিল তন্ময়কে। এবার একেবারে সরে গেল। কোনো পর্দা নেই আর। পড়ে রয়েছে শুধু ধু ধু করা সমুদ্রতট। আর কোথাও লেশমাত্র চিহ্ন নেই তন্ময়ের। এবার আরও এক ঝাঁক ওই ডানাওয়ালা প্রাণী তেড়ে আসছে নয়নের দিকে। আরও দুর্ভেদ্য হচ্ছে ওকে ঘিরে থাকা কালো পর্দাটা। সবার মুখ হিংস্র রক্তখেকো মানুষের মতো। ওদের রক্তের পিপাসা মেটাতে ধেয়ে আসছে ওরা নয়নের দিকে। নয়ন হাসছে মিটিমিটি কারণ ও সব রহস্য সত্যিই ভেদ করতে পেরেছে। জীবন শেষ হলেও জীবনে আটকে থাকা প্রশ্নগুলোও শেষ হয়েছে এবার। কারণ যে হিংস্রমুখ গুলো ওর দিকে ধেয়ে আসছে ডানা ঝাপটে তার মধ্যে দুটো মুখ যে ওর ভীষণ চেনা। একটা ওর বেষ্ট ফ্রেন্ড তন্ময় যে একটু আগে অবধিও সাথে ছিল ওর, আর একটা দশ বছর আগে রহস্যজনক ভাবে হারিয়ে যাওয়া ওর নির্মলা বউদি।
'আ আ আ'... মরণ চিৎকার ঠিকরে এল এবার নয়নের গলা চিরে। কিন্তু কেউ শুনতেও পেল না। নির্জন ফাঁকা প্রান্তরে পাক খেতে খেতে মিলিয়ে গেল চিৎকারটা। ঝড়ের তাণ্ডব আর সমুদ্রের গর্জন যদিও ততক্ষণে শান্ত হয়ে গেছে।
দেখতে দেখতে দশদিন হয়ে গেল সব কিছু শেষ হয়ে গেছে বিতস্তার। না ওর ভালোবাসার মানুষটা আর ফিরে আসেনি ধনুষকোডি এর অভিশপ্ত প্রান্তর থেকে। ফিরেছিল তার মৃতদেহ। একেবারে রক্তশূন্য দেহ। এক ফোঁটাও রক্তের লেশ ছিল না নয়নের লাশে। চারজনের টিম গেছিল চ্যানেল এর তরফ থেকে। এর মধ্যে তন্ময় আর নয়ন রাতে ওখানে ছিল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আর বাকি দুজন ফিরে গেছিল রামেশ্বরম-এ। সেই দুজন পরের দিন সকালে এসে সমুদ্র তীরে খুঁজে পায় নয়নের রক্তশূন্য মৃতদেহ। সে মৃতদেহ ঘিরে নাকি অলরেডি ততক্ষণে ভিড় জমে গেছিল স্থানীয় মানুষদের। তাদের মধ্যে এক স্থানীয় দোকানদার ভানু জানায় তার দোকানেই নাকি আগের রাতে আশ্রয় নিয়েছিল নয়ন আর তন্ময়। তার দোকান যেমন ছিল তেমনই রয়েছে, শুধু শেষ হয়ে গেছে নয়ন। কী করে মরেছে কেউ জানে না, আর তন্ময় এর কোনো চিহ্নই নেই। যেন পুরো গায়েব হয়ে গেছে ও। নয়নের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট বলছে শরীরের রক্ত শেষ হয়ে গিয়ে মরে গেছে ও। কিন্তু একটা জোয়ান ছেলের শরীর থেকে কী করে হঠাৎ শেষ হয়ে যেতে পারে সব রক্ত? না কোনো উত্তর নেই। নয়নের মৃত্যু, তন্ময়ের উধাও হয়ে যাওয়া বিশাল বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছে গোটা সাংবাদিক মহলকে।
এই দশদিন ধরে অনবরত শুধু চোখের জল ফেলে গেছে বিতস্তা। কিন্তু না আর কাঁদবে না ও। চোখের জল আজ মুছে নিল সাংবাদিক বিতস্তা ভৌমিক। একদিন নিজের ভালোবাসার মানুষকে ও কথা দিয়েছিল তার জীবনের লক্ষ্যকে নিজের লক্ষ্য এর থেকে আলাদা ভাববে না ও। আজ সে কথা রাখার দিন। নয়ন তার জীবনে উত্থিত হওয়া সে রহস্য ভেদ করতে পেরেছিল কিনা শেষ অবধি সেটা জানে না বিতস্তা, কিন্তু ও এবার নিজে সেই পথেই হাঁটবে। আজই ও কথা বলবে কুন্তল দায়ের সাথে অফিসে গিয়ে। এবার ও যাবে ধনুষকোডি, রাত ও কাটাবে সেখানে। উৎঘাটন করবেই ও নিজের প্রেমিকের মৃত্যুরহস্য। কুন্তল দা মানলে ভাল, সাথে টিম দিলে খুবই ভালো, কিন্তু তা না হলেও কিছু যায় আসে না। প্রয়োজনে একাই যাবে ও। ভালোবাসার জন্য তো মানুষ সব পারে, ওই বা তাহলে পারবে না কেন। ছোটবেলা থেকে তো কবিগুরুর শেখান মন্ত্র শিখতে শিখতেই বড় হয়েছে বিতস্তা ভৌমিক আর সবার মতোই আর এবার সে মন্ত্র জীবনে প্রয়োগ করার সময় এসেছে।
'যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চল রে'
—সমাপ্ত—
নেপথ্য কাহিনি —কালো পর্দার ওধারে
কালো পর্দার ওধারে একটি সম্পূর্ণ কল্পিত গল্প, সমস্ত চরিত্রগুলিও কাল্পনিক। কিন্তু এই গল্প অনুপ্রাণিত হয়েছে ১৯৬৪ সালের ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া এক বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় আর তার দ্বারা মৃত্যু প্রাপ্ত ধনুষকোডি শহরের বহু মানুষ ও ধ্বংস হয়ে যাওয়া শহরের বাস্তব উপাখ্যান দ্বারা।
প্রসঙ্গ —ধনুষকোডি
ধনুষকোডি একটি পরিত্যক্ত শহর। এটি পামবান দ্বীপের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। এর সাথে প্রায় ২৪ কিমি দূরত্ব রয়েছে শ্রীলঙ্কার তালাইমান্নার অঞ্চলের।
ধনুষকোডি ১৯৬৪ সালে রামেশ্বরম ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত হয় ও পরবর্তীকালে পরিত্যক্ত হয়। ১৭ ডিসেম্বর ১৯৬৪ সালে একটি নিম্নচাপ হয় দক্ষিণ আন্দামান সাগরে। ১৯ ডিসেম্বর এই নিম্নচাপ সাইক্লোনের আকার ধারণ করে। ২১ ডিসেম্বর দক্ষিণ বরাবর এটি চলে যায় এবং এর গতিবেগ ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ কিমি / দিন। এটি ২২ ডিসেম্বর শ্রীলঙ্কার ভাবুনিয়া হয়ে ধনুষকোডি তে আছড়ে পড়ে। এই সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ২৮০ কিমি / ঘণ্টা এবং ঢেউয়ের উচ্চতা ছিল প্রায় ৭ মিটার। এই সাইক্লোনে প্রায় ১৮০০ লোকের মৃত্যু হয় এবং পামবান ধনুষকোডি প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ১১৫ জন যাত্রী মারা যান। বহু মানুষের ঘর বাড়ি মাটিতে মিশে যায়। পুরো শহর জলমগ্ন হয়ে যায় এবং অতঃপর মাদ্রাজ সরকার এটিকে ভূতুড়ে ও বাসের অযোগ্য শহর হিসেবে ঘোষণা করেন।
এই ঘটনার ৪০ বছর পরে ২০০৪ সালে জলমগ্ন ধনুষকোডি থেকে সমুদ্র ৫০০ মিটার পিছিয়ে যায় এবং জলমগ্ন শহরের একাংশ লোকচক্ষুর সামনে আসে।
অনেকে পর্যটক রামেশ্বরম থেকে ধনুষকোডি দেখতে যান দিনের বেলায়। হিন্দু মহাকাব্য রামায়ণ অনুসারে রামচন্দ্র এক সেতু তৈরি করেন দেবী সীতাকে উদ্ধারের জন্য লঙ্কা যাবার পথে হনুমানের সহায়তায়। রামেশ্বরম দ্বীপ ও মান্নার দ্বীপকে যুক্ত করতে এই সেতু নির্মিত হয়েছিল যাকে আবার আদম ব্রিজও বলা হয়। কিন্তু অতঃপর শ্রীরাম রাবণ ভ্রাতা ও পরবর্তী লঙ্কা নরেশ বিভীষণের অনুরোধে নিজ ধনুক দ্বারা এই যোগসূত্র ছেদ করেন, তাই এই জায়গার নাম হয় ধনুষকোডি।
বর্তমানে স্থানীয় বহু মানুষ বিশ্বাস করেন ধনুষকোডি একটি অভিশপ্ত ভূতুড়ে শহর, তাই এখানে আর কখনো গড়ে ওঠেনি জনবসতি। অনেকেই মানেন যে এখানে আজও আটকে পড়ে আছে সেই বীভৎস ঘূর্ণিঝড়ে বেঘোরে মরে যাওয়া বহু মানুষের আত্মা।
আমার 'কালো পর্দার ওধারে' গল্পটি এই স্থানীয় বিশ্বাস ও কিছু পুরাতন বিপর্যয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন