পল্লবী সেনগুপ্ত
গাড়িটি ছেড়ে দিল। ওরা রওনা হয়ে গেল এয়ারপোর্টের দিকে। আজ ওরা ফিরে যাবে নিজেদের জায়গায়। লনের ঘাসের ওপর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গাড়িটার চলে যাওয়া দেখছিলেন সাদা চুলের সেই ব্যক্তি। আস্তে আস্তে গাড়িটা অদৃশ্য হয়ে গেল তার দৃষ্টিসীমার ওপারে। সাদা চুলের সে ব্যক্তি তবুও দাঁড়িয়ে রইলেন একই ভাবে। তার সন্তানও গেল আজ ওদের সাথেই। না, হিংসার মন্ত্র কোনোদিনই তিনি শেখাতে চাননি তার সন্তানদের। কিন্তু সব সময় সবকিছু তো আর বাবা মায়ের হাতেও থাকে না। পরিস্থিতি, আর ঘটনাক্রম বলেও তো একটা কথা থাকে। যাদের জীবনে চূড়ান্ত হিংস্রতা আর বর্বরতার মুখোমুখি হতে হয় তাদের জন্য অহিংসার শিক্ষা একেবারে ঢক্কানিনাদেই বোধহয় পর্যবসিত হয়। না তিনি নিজে কোনোদিন কোনো প্রতিশোধের কথা ভাবেননি। কিন্তু তার সন্তানদের ভাবনাও যে সেই একই খাতে বইবে তার তো সত্যিই কোনো মানে নেই। আজ তাই চেয়েও নিজের আত্মজকেই আটকাতে পারলেন না তিনি।
রাতের অন্ধকার আর কুয়াশার চাদর সরে আস্ত আস্তে দিনের আলো ফুটছে। পাখির ডাক জাগতে শুরু করেছে প্রকৃতির বুকে। দাঁড়িয়ে থাকতে এবার বেশ কষ্ট হচ্ছে তার। ধীর পায়ে এগোলেন তিনি। এই সময়টা তার জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়।
সৃজিত এর মনটা আজ সত্যি বেশ আনন্দে ভরপুর। আজ খুব খুশি শিল্পাও। এতদিন পর আজ ফাইনালি নিজেদের স্ট্যাটাস প্রমাণ করার মতো একটা বড় সুযোগ এসেছে হাতে। আজও মনে পড়ে কলেজে পড়ার সময় প্রায়ই শিল্পা বলত,
'জানিস সৃজিত আমার ভীষণ ইচ্ছা আমাদের ডেসটিনেশন ম্যারেজ হবে। এই সব চেনা জানা শহর ছেড়ে অনেকটা দূরে কোথাও গিয়ে আমাদের বিয়েটা হবে। অনেকটা সিনেমায় যেমন দেখায় বা বলিউড তারকা বা ক্রিকেটারদের যেমন হয় আর কী। একেবারে তাক লাগান বিয়ে। খুব ধুমধাম হবে। ভীষণ হইচই হবে'। শিল্পার কথাগুলো শুনে তখন চুপ থাকত সৃজিত কিংবা অল্প করে হাসত কখনো। হ্যাঁ সৃজিত বেশ উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারেরই ছেলে, কিন্তু তা বলে ডেসটিনেশন ম্যারেজ করতে পারার সামর্থ্য কোথায়! তারপর আস্তে আস্তে শেষ হয়ে গেল পড়াশুনা। চাকরির জন্য সংগ্রাম শুরু হল আর পাঁচটা ছেলের মতোই সৃজিতের। কিন্তু কেন কে জানে সেই সময়ে একেবারে ভাগ্য সাথ দিচ্ছিল না ওর। যে চাকরির জন্যই চেষ্টা করে তাতেই বিফলতা ছাড়া আর কিছুই জোটে না। আস্তে আস্তে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছিল সৃজিত, শিল্পাও কেমন যেন অধৈর্য হয়ে পড়ছিল ধীরে ধীরে। অবশ্য সেটা খুব অস্বাভাবিকও নয়। সেই সময় শিল্পাকেও বাড়ি থেকে ক্রমাগত চাপ দেওয়া হচ্ছিল বিয়ের জন্য। কিন্তু তবুও ওকে কোনো আশ্বাসই দিতে পারছিল না সৃজিত।
'আমার মনে হয় তুই কোনোদিনই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবি না। আমি আর তোর জীবনে থাকতে চাই না সৃজিত। বাবার দেখা পাত্রকেই বিয়ে করা বা আত্মহত্যা করা ছাড়া আর আমার সত্যি কোনো উপায় আছে বলে মনে হচ্ছে না'। এই কথাগুলো বলে শিল্পা যেদিন ওর বুকটা খানখান করে ভেঙে দিয়ে চলে গেছিল জলভরা দুই চোখ নিয়ে, কী এক অদ্ভুত জাদুবলে যেন ঠিক তার পরের দিনই সৃজিতের হাতে এসে পৌঁছেছিল ওর জীবনের প্রথম চাকরির নিয়োগপত্র। একেবারে অঞ্জন দত্তর বিখ্যাত সেই গান 'বেলা বোস' এর প্রেমিকের কায়দাতেই সেদিন ও শিল্পাকে ফোন করে বলেছিল,
'চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি শোন সত্যি, এখন আর কেউ আটকাতে পারবে না'। খবরটা শুনেই খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছিল ওর 'বেলা বোস' মানে শিল্পা।
'সত্যি বলছিস? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না। কী চাকরি পেয়েছিস তুই সৃজিত? সরকারি না বেসরকারি'? গদগদ গলায় বলেছিল শিল্পা।
'সেনার চাকরি। ভারতীয় সেনাবাহিনীতে আমি চাকরি পেয়েছি'। ওর উত্তরটা শুনে পলকেই যেন নিভে গেছিল শিল্পা। ভাঙা গলায় বলেছিল
'আর্মি! সে তো ভয়ানক বিপজ্জনক চাকরি। পদে পদে মৃত্যুর সাথে ঘর করা।'
'কিন্তু কী আর করা যাবে বল। অন্য অনেক কিছুই তো চেষ্টা করেছিলাম। কিছুই তো হল না। আর আমাদের এক হবার জন্য আমার এই মুহূর্তে যেকোনো একটা চাকরিই খুব দরকার সেটা তো মানবি।'
'হুম। হয়তো তুই ঠিকই বলছিস। আমি বাবার সাথে আজই কথা বলব'। বলেছিল শিল্পা। কিন্তু কথা বলে মোটেই খুব একটা লাভ হয়নি সেদিন। ওর বাবা সৃজিত এর কথা শুনেই নাকি তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন। গর্জে উঠে বলেছিলেন,
'ভুলে গেছ তুমি কোন পরিবারের মেয়ে? তোমার বিয়ে হবে রাজপুত্রের সাথে, কোনো উলুখাগড়ার জায়গা তোমার জীবনে থাকতে পারে না।'
হ্যাঁ শিল্পাকে সত্যিই রাজপরিবারের মেয়েই বলা যেতে পারে। বর্ধমানের রাজপরিবারের বংশধর ওরা। সেখানে সৃজিত এক খুবই সাধারণ পরিবারের ছেলে। হ্যাঁ বাড়ির বেশ ভাল টাকাপয়সা, দেশের বাড়ির দিকে কিছু জমি জিরেত থাকলেও সেই বংশগরিমা আর কোথায়? আর তার মধ্যে আবার এমন একটা চাকরি যেখানে কিনা জীবনের কোনো নিশ্চয়তাই নেই। কোন বাবাই বা চাইবেন মেয়ের জন্য এমন পাত্র! অবশ্য শিল্পা সেদিন বাবার রক্তচক্ষু দেখে ভয় পায়নি মোটেই। সে ওই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল শুধু সৃজিতকে ভালোবেসে। পরিবারের অমতেই বিয়ে হয়েছিল ওদের রেজিস্ট্রি করে। যে মেয়েটা একদিন ডেসটিনেশন ম্যারেজের স্বপ্ন দেখত তার বিয়ে হয়েছিল ছোট্ট একফালি রেজিস্ট্রি অফিসে। স্বপ্ন হেরে গেলেও ভালোবাসা সেদিন জিতে গেছিল। কিন্তু বিয়ের অল্প দিন পরেই নতুন বউয়ের চোখ ভরা জলকে উপেক্ষা করেই ওকে নিরুপায় হয়েই যোগদান করতে যেতে হয়েছিল নিজের কাজে।
হ্যাঁ সৃজিতকে ভালোবাসলেও ওদের সম্পর্কের মধ্যে সব সময় কাঁটার মত বিঁধে থাকত ওর চাকরিটা। কিন্তু ওই বা কী করবে! শিল্পা কখনো চাইত না সৃজিত এই চাকরিটা করুক। সব সময় কান্নাকাটি করত ও। মাঝে মাঝে ঝগড়াও করত। ওর একটাই দাবি, এই চাকরিটা ছাড়তে হবে ওকে। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে এসেছিল ওদের সন্তান অংশু। অংশুর জন্মের পরে এক নাম করা জ্যোতিষীর কাছে নবজাতকের জন্মছক তৈরি করতে দিয়েছিল শিল্পা। এইসবে ওর খুব বিশ্বাস। সেই জ্যোতিষী ছেলের জন্মছক বানিয়ে শিল্পাকে বলেছিলেন,
'এই ছেলের কোষ্ঠীতে বড় অশুভ যোগ আছে মা। এর পিতৃভাগ্যযোগ ভালো না। এর বাবার পেশার কারণে জীবনে বড়সড় বিপদ আসবে। ছেলের পাঁচ বছর বয়সের পর পরই এমন কিছু ঘটবে যাতে বদলে যাবে তোমাদের সকলের জীবন। তছনছ হয়ে যাবে সবকিছু। তোমার স্বামীর সেনাপদের চাকরিই কিন্তু তার জন্য মূলত দায়ী থাকবে'।
এই কথা জানার পর থেকেই কেমন যেন পাগল পাগল হয়ে গেছিল শিল্পা। ও সৃজিতকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল আর এক বছরের মধ্যে সেনাবাহিনীর চাকরি না ছাড়লে শিল্পা ডিভোর্স দেবে ওকে। ছেলেকে নিয়ে চলে যাবে ও। সৃজিত কোনোদিন আর খোঁজও পাবে না ওদের। শিল্পা বরাবরই খুব জেদি। আর সেদিন ওর চোখে দৃঢ়তার স্ফুলিঙ্গ দেখতে পেয়েছিল সৃজিত। ও বুঝতে পেরেছিল এবার কিছু একটা না করলে সত্যিই হয়তো কিছু একটা করে বসবে শিল্পা। কিন্তু সেনাবাহিনীর চাকরিতেও আস্তে আস্তে বেশ উন্নতি করছিল ও। তাই সে চাকরি হঠকারীর মতো ছাড়তেও ঠিক ভরসা হচ্ছিল না। কিন্তু শিল্পাকে সামলানটা ক্রমশই কঠিন হয়ে পড়ছিল। আর সত্যি বলতে কী সৃজিতের নিজের মনেও একটা অদ্ভুত ভয় যেন ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছিল। সেনাপদে নিযুক্ত হবার সাথে সাথেই ভয় জিনিসটা আস্তে আস্তে মুছে গেছিল এটা ঠিকই, কিন্তু তবুও নিজের জন্য ভয় আর সন্তানের জন্য ভয় এই দুয়ের ভেতর সত্যিই বিস্তর ফারাক আছে। তাই ওর পেশার কারণে অংশুর বিপদ হতে পারে এই কথা জানার পর থেকেই একটা চোরা আতঙ্কে ভুগতে শুরু করেছিল ও। মরিয়া হয়ে পথ খুঁজছিল এই পেশা থেকে পালানোর। আর ভাগ্য সেই সময় সত্যি ম্যাজিকের মতো সাহায্য করেছিল ওকে। ঠিক সেই সময়েই হঠাৎ মারা গেলেন সৃজিতের দাদু মানে মায়ের বাবা। দাদুর একমাত্র সন্তান সৃজিতের মা। তাই তার মৃত্যুতে তার পুরো সম্পত্তির মালিকানাই পেল তার মা। মা সব টাকা তুলে দিয়েছিলেন ছেলের হাতে। বলেছিল,
'মেয়েটা তোকে ভালবেসে নিজের বাপ-মা পরিবার সব ছেড়ে চলে এসেছিল একদিন। তোকে ভালোবেসে অনেক করেছে সে। এবার তোর পালা বাবু। তুই এই চাকরিটা ছাড়। আমারও মন সায় দেয় না তোর এই চাকরিতে। তুই এ টাকাগুলো নিয়ে ব্যবসা শুরু কর ভালো করে।'
সৃজিত তাই করেছিল। নিজের এম সি এ ডিগ্রিটা কাজে লাগাবে এবার ঠিক করে নিয়েছিল। ও শুরু করেছিল একটা আই টি স্টার্ট আপ। নিজের পেশাগত দক্ষতা মানে মিলিটারি জগতের শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা এগুলো এবং পড়াশুনার জ্ঞান আর তার সাথে বাস্তব বুদ্ধি ও বিচক্ষণতা কাজে লাগিয়ে খুব কম সময়েই সৃজিত উন্নতি করে নিয়েছে বড্ড বেশি। এখন ওর কোম্পানি কলকাতা শহরের উদীয়মান আই টি কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম। অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে ও। কোম্পানির আরও শাখা তৈরি হয়েছে ভুবনেশ্বর, রাঁচির মতো অন্যান্য শহরেও। খুব তাড়াতাড়ি মুম্বাইতেও শুরু হতে চলেছে নতুন শাখা। শিল্পা ভীষণ খুশি এখন। আস্তে আস্তে সম্পর্ক ঠিক হয়েছে শিল্পার তার নিজের পরিবারের সাথেও। মোটের ওপর এখন বেশ সুখি ওরা।
আর কয়েকদিনের মধ্যেই ওদের ছেলে অংশু পাঁচ বছরে পা দিতে চলেছে। সৃজিত ভেবেই রেখেছিল ছেলের পাঁচ বছরের জন্মদিনটা খুব ধূমধাম করে করবে। আর তাই অবশেষে এই প্ল্যানটা পাকা করেই শিল্পাকে চমকে দিয়েছিল ও। ওদের ডেসটিনেশন ম্যারজের স্বপ্ন পূরণ না হলেও ছেলের ডেসটিনেশন বার্থডে পার্টি হবে।
রাজস্থান কোটার এক রাজকীয় হোটেল অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া নিয়েছে সৃজিত। চম্বল নদীর তিরে এই রয়্যাল রিসোর্টেই হবে অংশুর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো এই ভবনটি সুবিশাল ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। আগে এটি অন্য খাতে ব্যবহৃত হত, কিন্তু কিছু বছর আগে এই ভবনটি পুনর্নির্মাণ করে একে হোটেলে বানানো হয়। শিল্পার বাবা মা সহ ওদের বেশ কিছু আত্মীয় আমন্ত্রিত। সবার যাবার ব্যবস্থা সৃজিতই করছে। এবার সবাই বুঝতে পারছে সৃজিত জানার স্ট্যাটাসটা বর্তমানে কী। বহু বিদেশি ক্লায়েন্টকেও তাদের পরিবার সহ নিমন্ত্রণ করেছে ও। সবকিছু মিলিয়ে একেবার ঝাঁ চকচকে অনুষ্ঠান যাকে বলে। হঠাৎ পিঠে চেনা হাতের ছোঁয়া অনুভব করল ও। শিল্পা এসে আলগা করে হাত রেখেছে। বউয়ের হাত ধরে তাকে নিজের সামনে বসাল সৃজিত। মিহি গলায় জিজ্ঞাসা করল,
'এই, তুমি খুশি তো আজ?'
শিল্পা মাথা ঝাঁকাল। ওর মুখটা মারাত্মক থমথমে লাগছে। চমকে গেল সৃজিত। একি! কী হল ওর? ও তো বেশ খুশিই ছিল।
''আমার খুব ভয় করছে সৃজিত। ভীষণ ভয় করছে।'' আচমকা বরের হাত চেপে ধরল মেয়েটা। দু-চোখে তার জল।
'কেন? কেন ভয় করছে তোমার? আমায় বল। সবকিছু তো ভালো হচ্ছে শিল্পা।'
'তোমার মনে আছে সেই জ্যোতিষী কী বলেছিলেন অংশুর জন্মের পর? তিনি বলেছিলেন আমাদের ছেলের পাঁচ বছরের জন্মদিনের পর পর নাকি ভয়াবহ কোনো বিপদ আসবে। ওর পাঁচ বছরের জন্মদিন তো এসেই গেল বল।'
'শিল্পা, তুমি মনে হয় ভুলে গেছ পুরো কথাটা। তিনি বলেছিলেন আমার সেনাবাহিনীর চাকরির জন্য হয়তো কিছু একটা সমস্যা ঘটলেও ঘটতে পারে।কিন্তু সে চাকরি তো বহুদিন হল ছেড়ে দিয়েছি আমি। তাহলে ভয় কিসের?'
'আমি জানি না। জানি না কেন আমার প্রচণ্ড ভয় করছে। বারবার মনটা কু গাইছে। মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু ঘটতে চলেছে বোধহয়। আমি একটু আগে একটা ভীষণ বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখেছি। তারপর থেকে আমার মনটা বড্ড অস্থির লাগছে।'
'দূর পাগলি। অকারণে কেউ টেশান করে? কিচ্ছু হবে না। সব ঠিক থাকবে।' কথাটা বলতে গিয়েই সহসা কেমন যেন কেঁপে উঠল সৃজিতের গলাটা, সেটা নিজেই বুঝতে পারল ও। আসলে এই ভয় জিনিসটা বোধ হয় বড্ড বেশি সংক্রামক।
বিছানায় শুয়ে ঘুমের ভান করে পড়েছিল অংশু। আসলে না ঘুমাতে দেখলে মা ভীষণ রাগ করে, বকা দেয়। এমনিতেই মা ভীষণ রাগী। তাই মাকে একটু বুঝেই চলার চেষ্টা করে ও। এই যেমন বাবা আর মা মিলে চলে এল কত দূরের একটা জায়গায় ওর জন্মদিন সেলিব্রেট করতে। ওর একেবারে ভালো লাগছে না এই ব্যাপারটা। যদিও দিদুন, দাদু,ঠাম্মা সকলেই এসেছে কিন্তু তবুও একেবারে ভালো লাগছে না ওর। এখানে ভীষণ একা লাগছে। ওর বয়সি কেউ নেই। সব বড় মানুষদের ভিড়। কোনো বন্ধু আসবে না এখানে। কেউ নেই এমন যে খেলতে পারে ওর সাথে। কিচ্ছু ভালো লাগছে না তাই।
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেই চলেছে অংশু। আজকেই সবে এখানে এসে পৌঁছেছে ওরা। বাবা মা এখন গভীর ঘুমে ডুবে আছে। রাত কত হল কে জানে! কিন্তু ওর দু-চোখে ঘুম আসছে না কিছুতেই। হঠাৎ খুট করে কী যেন একটা শব্দ হল। সেটা শুনতে পেল অংশু। মনে হচ্ছে যেন খুব কাছেই হল শব্দটা। বিছানায় আস্তে আস্তে এবার উঠে বসল ও। বাবা মায়ের ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি এখনও । আর ওমনি ও দেখতে পেল খুব আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে ওদের ঘরের দরজাটা। অংশু আস্তে আস্তে উঠে গেল দরজার কাছে। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা ছেলে। অংশুর থেকে হয়তো একটু বড় হবে। হাতছানি দিয়ে অংশুকে ডাকল ছেলেটা। ভীষণ সুন্দর দেখতে তাকে। টকটকে ফর্সা তার গায়ের রং, মাথার চুল বাদামি আর চোখ দুটো একেবারে ঝকঝকে নীল পাথরের মতো। অংশুকে দেখেই অদ্ভুতভাবে হাসল ছেলেটা। আবার হাতছানি দিয়ে ডাকল ওকে। ছেলেটাকে ভারী ভাল লাগল অংশুমানের। একেবারে হ্যারি পটার সিনেমার এর হ্যারি-এর মতোদেখতে। আর বয়সটাও সেরকমই হবে বোধহয়। এই বড় মানুষদের ভিড়ে একটা প্রায় সমবয়সি কাউকে দেখে অংশুর মনটা দারুণ ভালো হয়ে গেল। ও পা টিপে সন্তর্পণে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, ছেলেটার ডাক যেন কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছে না।
ছেলেটা এগোচ্ছে। অংশুও এগোচ্ছে ওর পিছু পিছু। কী একটা অদৃশ্য অমোঘ আকর্ষণ যেন টেনে নিয়ে চলেছে পাঁচ বছরের বাচ্চাটাকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অংশু বুঝতে পারল এই বিশাল হোটেলটার ছাদে এসে পৌঁছেছে ওরা। ছাদটা বিশাল বড়। অন্ধকার। চাঁদের আলো অবিন্যস্ত ভাবে বিছিয়ে রয়েছে খোলা ছাদের যত্রতত্র। কেউ কোথাও নেই। এবার বেশ খানিকটা ভয় লাগল অংশুর। হ্যারি পটার এর মতো দেখতে ছেলেটা পিছন করে দাঁড়িয়ে আছে এবার ওর থেকে অল্প দূরে। একটু ভিতু গলায় এবার অংশুমান বলল,
'হাই। আমি অংশুমান। তুমি কে? তুমি আমায় ছাদে নিয়ে এলে কেন?'
এবার আস্তে আস্তে ওর দিকে ফিরল সেই ছেলেটা। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল,
'আমি জানি তোমার নাম অংশুমান আছে। আমি তোমায় চিনতে পেরেছি। আমি সেই জন্যই তোমায় এখানে ডেকে এনেছি। তোমার বাবা একজন ইন্ডিয়ান সিপয় আছে তাই না'? সিপয় মানে কি সেটা অংশু জানে না। তবে ও ঠাম্মার কাছে শুনেছে যে ওর বাবা নাকি আগে একজন 'ব্রেভ সোলজার' ছিল। সেই কথাটাই পাখির মতো আউড়ে দিল ও।
'আমার বাবা এখন বিজন্যাস ম্যান। কিন্তু আগে আমার বাবা একজন ব্রেভ সোলজার ছিল। আমাদের দেশের জন্য ফাইট করত আমার বাবা।' খুব গর্বের সাথে বলল ও। এবার খুব বিদঘুটেভাবে হাসল ছেলেটা। আর তারপরই হঠাৎ কেমন যেন হিংস্র হয়ে উঠল তার মুখটা। দাঁতে দাঁত চিপে সে বলল,
'আমি ঠিকই বুঝেছি তাহলে। তাহলে তুমি আমার 'এনিমি'। 'এক্সট্রিম এনিমি' তাহলে তুমি আমার। আমি তো তোমায় ছাড়বো না।' খুব হিংস্র ভাবে কথাটা বলল ছেলেটা। আর বলা মাত্রই সে হুট করে চেপে ধরল অংশুর গলা।
'মা আ আ'... কাতর কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল অংশু। ওর মনে হল যেন একটা লোহার শেকল নিমেষে পেঁচিয়ে ধরেছে ওর গলাকে। যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল ও। ওর মনে হল অমানুষিক যন্ত্রণার জেরে এবার জ্ঞান হারাবে।
'নো ... নো মাই সন'... হঠাৎ ভেসে এল একটা গুরুগম্ভীর গলা। আবছা দৃষ্টিতে অংশু দেখতে পেল ছাদে উঠে আসছে একজন সাদা চুলের বয়স্ক মানুষ, যে বাধা দিতে চাইছে এই কম বয়সি ছেলেটাকে।
'সৃজিত, এই সৃজিত'... শিল্পার উদ্বিগ্ন স্বরে আর অনবরত ধাক্কায় ঘুমটা ভেঙে গেল সৃজিতের। চোখ মেলতেই ও চোখের সামনে দেখতে পেল বউয়ের ঘর্মাক্ত আর উদ্বিগ্ন মুখটা।
'কী হয়েছে শিল্পা? কী হয়েছে তোমার?'
'সৃজিত সর্বনাশ হয়ে গেছে। অংশু নেই। ওকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না'। এবার ডুকরে কেঁদে উঠল শিল্পা।
'মানে? কি যা তা বলছ তুমি'? এবার গলা কেঁপে গেল সৃজিতেরও।
'হ্যাঁ আমি ঠিকই বলছি। হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেছিল আমার একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে। তাকিয়ে দেখি অংশু বিছানায় নেই। বুকটা ধক করে উঠেছিল আমার। তখন তবু ভেবেছিলাম হয়তো ছেলেটা বাথরুমে গেছে। তারপর দেখি বাথরুমেও নেই। তখন আমি বাবা মায়ের ঘরে নক করলাম। তোমার মাকেও জিজ্ঞাসা করলাম। আমাদের যে সকল লোকজন আছে সকলকে জিজ্ঞাসা করলাম। অংশু কোথাও নেই সৃজিত। কারোর কাছে যায়নি ও। আমার ছেলেটা কোথায় হারিয়ে গেল সৃজিত'? হাপুস নয়নে কেঁদেই চলেছে শিল্পা।
'তুমি দরজা লক করে শোয়নি? সে লকড দরজা তো ওতটুকু ছেলের পক্ষে খুলতে পারা সম্ভব নয়'।
'আমি অবশ্যই লকড করেছিলাম। কিন্তু ...... আমি তোমায় বলেছিলাম না আমার মন কু গাইছে। দেখলে তো সব তছনছ হয়ে গেল।'
'একদম ফালতু কথা বলবে না শিল্পা । তোমার এই সব বোগাস ভাবনা চিন্তার জন্যই এই অবস্থা। নিশ্চয় এই সব ভাবনাচিন্তা করতে করতে দরজাটাই লক করনি, তাই বাইরে বেরিয়ে গেছে ছেলেটা'। এবার চিৎকার করে উঠল সৃজিত।
'কী? কী বললে তুমি? আমার জন্য অংশু বাইরে বেরিয়ে কোথাও চলে গেছে? কেমন হোটেল এটা? এত বড় রয়্যাল হোটেল কিন্তু কোনো সিকিউরিটি নেই। আমায় আবার ফালতু দোষ দিচ্ছ তুমি'? এবার গর্জে উঠল শিল্পাও।
আবার কিছু বলতে যাচ্ছিল সৃজিত কিন্তু বলা হল না। ঠিক তখনই দরজা নক করল কেউ।
'স্যার, স্যার একবার দরজা খুলুন'। বাইরে থেকে একজনের গলা পাওয়া গেল। পড়িমরি করে গিয়ে দরজাটা খুলে দিল সৃজিত। হোটেলেরই এক কর্মচারী বাইরে দাঁড়িয়ে গম্ভির মুখে । আর তার পিছন থেকে উঁকি বাড়াচ্ছে অংশু। ভীষণ ভয়ার্ত লাগছে ওর মুখটা। সৃজিত দরজা খুলতেই হোটেলের? কর্মচারী অংশুকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে এল।
'বাবা, আমার সোনা ছেলে কোথায় গেছিলে তুমি মানিক'? ছেলেকে দেখতে পেয়েই দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরল শিল্পা।
'স্যার আমি আপনাদের তো বলেইছিলাম একটু বেশি রাত হয়ে গেলে ছাদ, লন বা সেন্ট্রাল হলের দিকে না যাওয়াই ভালো। আর দরজা লক রাখতেও বলেছিলাম। তবুও এই বাচ্চাটা মাঝরাত্তিরে কী করে ছাদে চলে গেল স্যার? ছাদে বসে একা একা অন্ধকারে ভয়ে কাঁপছিল ও, ভাগ্যিস আমাদের একজন স্টাফ ছাদে গেছিল। নইলে তো সারারাত ওখানেই বসে কাঁপত ছেলেটা'। ভীষণ গম্ভীর গলায় কথাগুলো বলল লোকটা।
ওকে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় করে ছেলের কাছে এসে বসল সৃজিত। অংশুর মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে বলল,
'তুমি ছাদে কেন গেছিলে বাবা? তুমি ছাদ চিনলেই বা কি করে?'
'আমায় একজন ডাকছিল'। কাঁপা গলায় বলল অংশু।
কে ডাকছিল'?
একটা ছেলে। তাকে হ্যারি পটারের মতো দেখতে। নীল চোখ সেই ছেলেটার, ব্রাউন চুল। আমার খুব ভালো লেগেছিল তাকে। আমার মনে হয়েছিল সে আমার সাথে খেলবে। সেই আমায় ডেকে ছাদে নিয়ে গেল।কিন্তু ছেলেটা একদম ভালো না। খুব পচা। সে বলছিল আমি নাকি তার 'এনিমি'। আমি কোনো ফাইট করিনি তবুও আমায় বলল 'এনিমি'। আমার গলা টিপে ধরেছিল। আমায় মেরে ফেলত জান। কিন্তু হঠাৎ একটা আঙ্কেল চলে এসেছিল। আঙ্কেলটাও খুব সুন্দর দেখতে। খুব ফর্সা। তারও চুল গোল্ডেন। চোখটাও নীল তার। সেই আঙ্কেল আসার পর ওই ছেলেটা ছেড়ে দিল আমায়। আঙ্কেলটা খুব বকল তাকে। তারপর হঠাৎ করে ভ্যানিশ হয়ে গেল যেন তারা। তখন আমি ছাদে বসে কাঁদছিলাম।'। খুব ভয়ার্ত স্বরে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে কথাগুলো বলল অংশু।
'সৃজিত, এটা কী বলছে অংশু? আমার তো ভীষণ ভয় করছে। এসব কী হয়েছে ওর সাথে'? আতঙ্কে দিশেহারা শোনাল শিল্পার গলাটা। মিনিট পাঁচেক গম্ভির হয়ে রইল সৃজিত। তারপর নিজেই আচমকা হেসে উঠল হো হো করে।
'কী হল হাসছ কেন অমন করে'? বলল শিল্পা।
সৃজিত এবার অংশুর গালে একটা আলতো চুমু খেয়ে শিল্পার দিকে তাকিয়ে বলল,
'বুঝলে না? আরে পিটার। আমাদের বিদেশি ক্লায়েন্ট পিটার। তোমার সাথে আলাপ করালাম তো। ওরই তো ছেলে জোন্স। বছর দশেকের ছেলে, কিন্তু খুব বিচ্ছু। এসে থেকেই খোঁজ নিচ্ছিল অংশুর। আমি তখন ওকে বললাম অংশু ঘুমাচ্ছে, কাল আলাপ করাব। সেই জোন্সই নিশ্চয় এসে ডেকে নিয়ে গেছিল ওকে। তারপর বদমাইশি করে ভয় দেখিয়েছে আমাদের অংশুটাকে। আর পিটার সেটা টের পেয়ে এসে ধমকে ধামকে নিয়ে গেছে ওকে।
বেটা তুমি একদম চিন্তা কর না। কালই জোন্স তোমার ফ্রেন্ড হয়ে যাবে।' ছেলের গালে আলতো টোকা দিল সৃজিত।
'কিন্তু আমি তো দরজা লক করে দিয়েছিলাম, তাহলে কী করে জোন্স ডাকতে পারল অংশুকে? তা ছাড়া পিটার আমাদের ছেলেটাকে ওভাবে ছাদে ফেলে রেখে চলে এল? সাথে নিয়ে আসতে পারল না? আর সবচেয়ে বড় কথা জোন্স কেনই বা টিপে ধরবে অংশুর গলা? কিসের শত্রুতা ওদের'? শিল্পা একঝাঁক প্রশ্ন করল একবারে।
'দরজা তুমি নিশ্চয় লক করতে ভুলেছিলে। আর পিটার, জোন্স ওরা বিদেশি। ওদের তুমি নিজের ভাবনাচিন্তা দিয়ে বুঝতে পারবে না'। এবার একটু বিরক্ত গলায় বলল সৃজিত। কিন্তু শিল্পার বুকের ভেতর ধড়াস ধড়াস করেই যাচ্ছে। ওর কোলে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ছে অংশু। ঘুমন্ত ছেলেকে আঁকড়ে ধরল ও। সৃজিতের যুক্তিগুলো বড্ড বেশি দুর্বল। তাই ওগুলো একেবারে মানা যায় না। শিল্পার মন বলছে খুব বড় কোনো বিপদ আজ ছুঁয়ে বেরিয়ে গেছে অংশুকে। কিন্তু সে বিপদ যদি আবার আসে? সেই জ্যোতিষীর কথা মনে পড়ছে বারবার। ভয়ে বুকটা হিম হয়ে আসছে শিল্পার।
গমগম করছে আজ রাজকীয় হোটেলের হল এরিয়াটা। সকলেরই খুশি মাখা মুখ চোখ। এখানেই আজ পালন হচ্ছে ধূমধাম করে সৃজিত আর শিল্পার একমাত্র ছেলের পাঁচ বছরের জন্মদিন। কিন্তু সবাই বেশ আনন্দের মুডে থাকলেও শিল্পার মুখটা থমথমে হয়ে রয়েছে। বুকের মাঝে যেন চেপে বসে রয়েছে আধমণ ভারী কোনো একটা পাথর। ক্রমাগত আতঙ্কের একটা চোরা কাঁটা ক্ষতবিক্ষত করেই চলেছে ওকে। মনে হচ্ছে যে-কোনো মুহূর্তেই বোধহয় ঘটে যেতে পারে মারাত্মক অশুভ কোনো ঘটনা। কয়েকজোড়া অদৃশ্য চোখ সারাক্ষণ ওদের সকলকে নজরে রেখেছে এমনটাই কেন যেন মনে হয়ে চলেছে শিল্পার ক্রমাগত।
না ওর একটা ভাবনাও অমূলক নয়। গতকাল রাতে যে সাঙ্ঘাতিক কোনো আতঙ্ক এসে হানা দিয়েছিল ওর অংশুর ওপর সে বিষয়ে এখন শিল্পা একশোভাগ নিশ্চিত। আজ সকাল হতে না হতেই পিটারের সাথে দেখা করতে ওর রুমে ঢুঁ মেরেছিল সৃজিত। শিল্পাও সাথেই ছিল। আর সেখানে গিয়ে যা শুনল তাতে হাড় হিম হয়ে গেছিল ওর। কাল রাত্রিবেলা থেকেই পিটারের ছেলে জোন্সের শরীরটা একেবারে ভালো নেই। বেশ জ্বর এসেছে তার। সেইজন্য ছেলেটা নাকি কাল সারারাত মরার মতো ঘুমিয়েছে। পিটার নিজেও ক্লান্ত ছিল ভীষণ। তাই সে নিজেও একটিবারের জন্যও জাগেনি। তাই তার বা তার ছেলের মাঝরাতে ছাদে যাবার কোনো প্রশ্নই উঠছে না। সর্বোপরি পিটার এর ছেলে জোন্সকে দেখে অংশু নিজেও নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে ছেলে গতকাল রাতে ওকে ছাদে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল সে মোটেই জোন্স নয়।
'তাহলে কে কাল গলা টিপে ধরেছিল আমার ছেলের'? আঁতকে উঠে প্রশ্ন করেছিল শিল্পা। হোটেল কর্তৃপক্ষের থেকে খবর নিয়ে জানাও গেছে যে এই মুহূর্তে এই হোটেলে পিটার আর জোন্স ছাড়া আর অন্য কোনো শ্বেতাঙ্গ বাসিন্দা নেই।
'তাহলে? তাহলে কাল কি ঘটেছিল'? ভয়ে আতঙ্কে পাগল হয়ে ফের শিল্পা আছড়ে পড়েছিল।
'সবকিছুতে এভাবে প্যানিক করলে হয় না শিল্পা। অংশু একটা বাচ্চা ছেলে। সবকিছু দেখা বা বোঝার নিখুঁত ক্ষমতা ওর তৈরি হয়নি সেটা কি তুমি বোঝ না। হয়তো বিদেশি কেউ না, হয়তো ফর্সা নীল চোখের কোনো ভারতীয় ছেলেকেই দেখেছে ও। ফর্সা রং, নীল চোখ আর বাদামি চুল হলেই কি তাকে পাশ্চাত্য দেশের হতেই হবে নাকি? ভারতীয় অনেকেই যেমন কাশ্মীরিরাই অনেক সময় ওইধরনের দেখতে হয়। হয়তো সেরকমই কোনো হোটেল আবাসিক এর ছেলেকে দেখেছিল অংশু'। হ্যাঁ আবার সৃজিত নিজের মতো একটা যুক্তি সাজিয়ে নিয়ে চিন্তা ঝেড়ে ফেলেছে। সৃজিত সেনাবাহিনীতে বেশ অনেকদিন ছিল, ওর সাহসটা অন্যরকম। তাই ও অনেক কিছুই সহজে ঝেড়ে ফেলতে পারে। কিন্তু শিল্পা সেটা পারে না। ওর ওত সাহস নেই। আর সবথেকে বড় কথা হল, ও যে মা। মা এর জ্বালা যে অনেক বড় জ্বালা। আজ সারাদিনে মুখে ভাল করে জলটুকু তুলতে পারেনি ও। খাওয়াদাওয়াও প্রায় কিছুই করেনি। বুকেরমধ্যে অবিরাম একটা ভয় ধড়ফড় করে চলেছে। সবকিছু মিটিয়ে ভালোয় ভালোয় ফিরতে পারলে হয়। অংশুকে আজ এক মুহূর্তের জন্যও কাছছাড়া করেনি শিল্পা। আর করবেও না। প্রয়োজনে আজ সারা রাত দু-চোখের পাতা এক করবে না ও।
এখন অংশু কেক কাটছে। বিশাল বড়, তিনতলা কেক। খুব হাসছে ছেলেটা। সকলে হাততালি দিয়ে অংশুকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে। খুব হাসি মুখে কেক কাটছে ছেলেটা। সন্তানের হাসিমুখটা দেখে জুড়িয়ে যাচ্ছে মায়ের প্রাণ। সব মা-ই তো শুধু এটাই চায় যে তার সন্তান ভালো থাকুক। কিন্তু হঠাৎ কী একটা যেন হয়ে গেল। শিল্পা বুঝতে পারল আস্তে আস্তে ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে ওর চোখের দৃষ্টি। বুকের কাছটায় একটা অসহ্য যন্ত্রণা করছে। মাথাটা বনবন করে ঘুরছে একবারে লাট্টুর মতো। একি! এটা কী হয়ে গেল হঠাৎ? এমন লাগছে কেন সহসা? তবে কি শিল্পা মারা যাচ্ছে? নিজেকে ধরে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করল শিল্পা। এই মুহূর্তটা কিছুতেই ও নষ্ট হতে দিতে পারবে না। কিন্তু ও যে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। ক্রমেই যে কমে আসছে পায়ের জোর। চোখের সামনে অন্ধকার ঘনাচ্ছে একটু একটু করে। না আর পারল না ও। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই চেতনা হারিয়ে হুড়মুড় করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল শিল্পা।
সবাই আচমকা একটা ভারী শব্দ পেয়ে যেই ওদিকে তাকাল তৎক্ষণাৎ সকলে বুঝতে পারল অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে শিল্পা।
'এই, এই কী হল তোমার'? পড়িমরি করে ওর কাছে ছুটে এল সৃজিত এবং আর সকলেই। মাকে আচমকা ওভাবে অজ্ঞান হয়ে যেতে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছে অংশুও। সেও ছোট ছোট পা ফেলে এগিয়ে এল মায়ের দিকে। মা দু-চোখ বন্ধ করে মাটিতে পড়ে রয়েছে।
'মা কী হয়েছে তোমার'? বলতেই যাচ্ছিল অংশু, কিন্তু ওর বলা হল না। ও অনুভব করল একটা ঠান্ডা ছুরির মতো শিরশিরে অথচ ভীষণ ধারাল হাত চেপে ধরেছে ওর মুখটা। অংশু চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু পারল না। কোনো দানবীয় শক্তি যেন চেপে ধরেছে ওর মুখটা। বেশি কিছু ও বুঝে ওঠার আগেই যেন ঝড়ের গতিতে শূন্যে ভাসিয়ে সেই দানবীয় শক্তিটা ওকে ছুঁড়ে নিয়ে ফেলল অন্ধকার ঘুপচি একটা জায়গায়।
জায়গাটা এতই অন্ধকার যে প্রথমে কিছু বুঝেই উঠতে পারল না অংশু। তবে মিনিট কয়েকের মধ্যেই ও দেখতে পেল একটা অন্য মূর্তিকে নিজের সামনে। সেই ছেলেটা, গতকাল রাতে যাকে ছাদে দেখেছিল ও। সেই নীল চোখ, সেই বাদামি চুল, সেই সাদা চামড়া।
'আজ তোমায় কেউ সেভ করতে পারবে না অংশু। যেমন করে আমি কষ্ট পেয়েছিলাম, আজ তোমাকেও ঠিক তেমন করেই কষ্ট পেতে হবে। শুধু তুমি নয় তোমার পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফেলব আমি। তোমার ফাদার, ওই সিপয়কে আমি তোমার থেকেও বেশি কষ্ট দিয়ে মারব। শুধু তোমার ফাদার কেন, সমস্ত সিপয়কে আমি মেরে ফেলব। এত বছর ধরে আমি যে শুধু ওদের শেষ করার অপেক্ষাতেই আছি অংশু'। ভীষণ হিংস্র ভঙ্গিতে চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল ছেলেটা। ও যে কী বলতে চাইছে, ওর কথার আসল মানে কী সেটা অংশুর ছোট্ট মাথাতে কিছুই ঢুকল না। ও শুধু কাঁচুমাচু স্বরে বলল,
'আমি মায়ের কাছে যাব।'
হা হা হা হা করে নরপিশাচের ভঙ্গিতে হাসল ছেলেটা। তার সুন্দর মুখটা ক্রমেই হিংস্র থেকে হিংস্রতর হয়ে উঠছে। এবার খপ করে সে চেপে ধরল অংশুর গলাটা। আগের দিনের থেকেও বেশি যন্ত্রণা অনুভব করল পাঁচ বছরের নিষ্পাপ প্রাণটা।
'মা আ আ'... বলে চিৎকার করে উঠতে গেল ও। কিন্তু পারল না। গলা বন্ধ হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে ফুরিয়ে আসছে ওর প্রাণ বায়ু। চোখের সামনে আস্তে আস্তে ছেয়ে যাচ্ছে মিশমিশে কালো অন্ধকার। অকথ্য একটা যন্ত্রণায় ডুবে যাচ্ছে ছোট্ট অংশু।
'নো ... নো মাই সন। লিভ হিম'। শেষ বারের মত চোখটা বোজার আগে অংশু শুনতে পেল আর একটা কণ্ঠস্বর। ও বুঝল গতকাল রাতের সেই ভালো আঙ্কেল আসছে আবার ওকে বাঁচাতে। কিন্তু সে আসার আগেই ওর দু-চোখের সামনে নেমে এক ভয়াল কালো অন্ধকার।
কোনোরকমে চোখ মেলল শিল্পা। চোখ খুলতেই দেখল সৃজিত, ওর বাবা, মা, শাশুড়ি সহ সব মানুষই ওকে ঘিরে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
'শিল্পা, কেমন লাগছে এখন'? প্রশ্নটা জিজ্ঞাসা করল সৃজিত। ও কিছু উত্তর দেবার আগেই উত্তর দিলেন ওর কাকাশ্বশুর। তিনি পেশায় ডাক্তার।
'আমি জানি বউমা এখন অনেক ভালো বোধ করছে। কি তাই তো? আসলে ওর ভীষণ গ্যাস হয়ে গিয়েছিল। সেই থেকেই ঘুরে গেছিল মাথাটা। ছেলের জন্মদিনের আনন্দে ভালো করে খাওয়া দাওয়া হয়নি আজ তাই না?'
না আনন্দে নয়, উৎকণ্ঠায়। ছেলের জন্য উৎকণ্ঠায় আজ মুখে কিছু দিতে পারেনি ও। কিন্তু সে কথা তো আর সবার সামনে বলা যায় না। কিন্তু গেল কোথায় ছেলেটা? কই অংশুকে তো দেখা যাচ্ছে না। পলকেই বুকটা কেঁপে উঠল শিল্পার।
'সৃজিত, অংশু কোথায়'? আতঙ্কিত গলায় বলল ও। সত্যি তো অংশু তো নেই সবার মাঝে। সকলেরই খেয়াল পড়ল এবার। কোথায় গেল ছেলেটা? অংশু এর নাম ধরে সবাই ডাকাডাকি করছে পাগলের মতো। ওদের নেওয়া সব কটা রুম দেখা হল। ছাদেও দেখা আসা হল। কোথাও নেই অংশু। হাউহাউ করে কাঁদছে এবার শিল্পা। কাঁপছে সৃজিতও। হোটেলের স্টাফরাই সাহায্য করছে ওদের।
'লনটা একবার ভাল করে দেখে নেবেন স্যার'? হোটেলের একজনই বলল কথাটা। পড়িমরি করে ছোটা হল লনের দিকে। শিল্পাও এগোল সে দিকে। আলো ঝলমল লন তন্ন তন্ন করে খোঁজা হল। কিন্তু কোথাও বাচ্চাটার চিহ্ন মাত্র নেই। কিন্তু আচমকা শিল্পা হঠাৎ ছুটে গেল লনের পিছন দিকটায়, মানে যেদিকটায় তেমন আলো নেই সেদিকে।
'শিল্পা, কোথায় যাচ্ছ তুমি'? ওর পিছু পিছু ছুটল সৃজিতও। কিন্তু দু এক পা এগিয়েই থমকে গেল ও। শিল্পা দাঁড়িয়ে রয়েছে পাথরের মত। সৃজিতের পা দুটোও স্থবির হয়ে গেল যেন। ঘাসের ওপর পড়ে রয়েছে অংশুর নিথর ছোট্ট দেহটা। গলায় কালশিটের দাগ। ঠোঁটের কষ বেয়ে নেমেছে সরু রক্তের ধারা। বোঝাই যাচ্ছে আর প্রাণের লেশমাত্র নেই ও শরীরে।
'সব শেষ! সব শেষ হয়ে গেছে সৃজিত'। পাগলের মতো করে হাহাকার করে উঠল শিল্পা। বোবা হয়ে গেছে সৃজিতও। ওর মাথা কাজ করছে না আর। এতক্ষণে এদিকে এসে পড়েছেন বাকিরাও। সৃজিতের কাকা ছুটে গেলেন অংশুর নিথর দেহটার কাছে। পরীক্ষা করে ভাঙা গলায় কোনমতে কান্না চেপে বললেন
'শক্ত হও বউমা। যার যাবার সে যে যাবেই।'
'না আ আ আ'...... উন্মাদিনীর মতো করে উঠল শিল্পা। ছেলের প্রাণহীন দেহটা কোলে চেপে গগনভেদী আর্তনাদ করে উঠল সে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই সকলকে চমকে দিয়ে চোখ মেলে তাকাল অংশু। ক্ষীণ গলায় বলল
'মা কি হয়েছে? তুমি এমন কেন করছ? আমি এখানে কেমন করে এলাম?'
'তুই ঠিক আছিস বাবা? ভালো আছিস তুই'? শিল্পা যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছে না এবার। সৃজিতও গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল ছেলের বুকের ওপর।
'মা এখানে আমি আর থাকব না মা। এখানে থাকলে ওরা আমায় মেরে ফেলবে। আজই আমায় নিয়ে চল প্লিজ'। ভীষণ করুণ স্বরে কথাগুলো বলল বাচ্চাটা।
'আর এক মুহূর্তও নয় সৃজিত। নেক্সট ফ্লাইটেই কলকাতা ফিরব আমরা'। দৃঢ় গলায় শিল্পা। আর আপত্তি করল না সৃজিতও। বাধ্য ছেলের মতো ঘাড় নেড়ে বলল,
'আচ্ছা শিল্পা, তাই হবে।'
* * *
ভোরের আলো ফুটতে এখনও দেরি আছে খানিকটা, তবুও অন্ধকারের মধ্যেই বেরিয়ে পড়ল ওরা। ভোর রাতের কলকাতা যাবার ফ্লাইটই বুক করে নিয়েছিল সৃজিত। অংশু মারাত্মক গুম হয়ে রয়েছে, ভালো করে কারোর সাথে কথা বলছে না। খায়ওনি ঠিকমতো। তবে ওকে বেশি ঘাঁটায়নি শিল্পা বা সৃজিত কেউই। যা কথা বলার তা কলকাতায় ফিরেই বলা হবে।
অন্ধকার রাতকে সঙ্গী করেই তল্পিতল্পা নিয়ে গাড়িতে উঠল ওরা। স্টার্ট করল গাড়ি। রাজস্থানকে পিছনে ফেলে, রাজকীয় হোটেলকে পিছনে ফেলে, অনেকগুলো অমীমাংসিত রহস্যকে পিছনে ফেলে অন্ধকারের বুক চিরে হুহু করে ছুটে চলেছে গাড়িটা।
শিল্পা সস্নেহে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। কেন কে জানে অসম্ভব ঠান্ডা হয়ে রয়েছে অংশুর সারা শরীর। শিল্পা ব্যাগ থেকে বের করল ছেলের সবচেয়ে প্রিয় মিল্ক চকলেট। ওর মুখের সামনে ধরে বলল,
'সোনা খা এই চকলেটটা। তোর ফেভারিট চকোলেট দেখ'।
'না আমি খাব না। এটা আমার ভালো লাগে না। আমি ব্লাড খাব'। অদ্ভুতুড়ে গলায় বলল অংশু।
'কী! কীবলছিস কী তুই'? আঁতকে উঠে বলল শিল্পা।
'আমি ব্লাডবাইট রোজ চকোলেট এর কথা বলছি মা'।
'কিন্তু তুই তো ওটা ভালোবাসিস না সোনা'।
এবার আর কোন উত্তর দিল না অংশু। শিল্পাও আর কথা বাড়াল না। ছেলেটা আসলে বড্ড স্ট্রেসড হয়ে রয়েছে। এবার জানলার বাইরে মুখ রাখল শিল্পা। হুহু করে ছুটে চলেছে গাড়ি। অন্ধকার মাখা রাস্তাঘাট দেখছে শিল্পা আর সৃজিত ঢুলছে সামনের সিটে বসে, আর সেইজন্যই বোধহয় ওরা কেউই টেরই পেল না আস্তে আস্তে অংশুর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠছে একটা ত্রু«র নিষ্ঠুর হাসি যেটা কোনো পাঁচ বছরের শিশুর নিষ্পাপ ওষ্ঠে জাগতেই পারে না। ওরা কেউ দেখতেই পেল না অংশুর চোখের মাঝে আর কালো মণি নেই, এখন সে রঙ বদলে হয়ে গেছে নীল আর সেই নীল চোখেই ধিকধিক করে জ্বলছে প্রায় একশো ষাট বছরেরও বেশি সময় ধরে জিইয়ে থাকা একটা প্রতিশোধের আগুন।
চম্বল নদীর থেকে ভেসে আসা মৃদু মন্দ বাতাস ভিজিয়ে দিচ্ছে বার্টন সাহেবের মনের আত্মাকে। কিন্তু ভীষণ অস্থির লাগছে আজ। যা হল সেটা বোধহয় ভালো হল না। ওই বাচ্চা ছেলেটা অংশু, বা তার পরিবারের তো সত্যিই সেভাবে কোনো দোষ নেই ; কিন্তু তবুও শাস্তি পেতে হল ওদের আর হবেও। আসলে সব সময় তো সবকিছু ক্ষেত্রে ঠিক ভুলের তেমন কোনো চুলচেরা বিশ্লেষণ হয় না। চার্লস বার্টন ও তার ছেলেদেরই বা কী দোষ ছিল যে শতাধিক বছর আগে অমন নির্মমভাবে মরতে হয়েছিল তাদের! এতটাই যন্ত্রণা পেয়ে মরতে হয়েছিল সেদিন যে আজ পর্যন্ত মুক্তি হল না বন্দি আত্মাদের। প্রতিশোধের আগুন বা ভাবনা চার্লস-এর মনেও যে কোনোদিন সৃষ্টি হয় না তা মোটেই বলা যায় না, কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সে ভাবনা স্তিমিত হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার ছেলেদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন হয়নি। তাদের মধ্যে প্রতিশোধের সে আগুন কোনোদিনও নেভেনি। ভারতীয় সিপাইদের হাতে নির্মমভাবে মরতে হয়েছিল তাদের প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি সময় আগে। সেই থেকেই প্রতিশোধের আগুনটা জ্বলে উঠেছিল। বার্টনপুত্ররা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল সমস্ত ভারতীয় সিপাইরাই তাদের শত্রু। এর আগেও কোনো সিপাই বা তার পরিবার কখনো এই হোটেল ভবনে থাকতে এলেই প্রতিশোধ নিতে বারবার উদ্যত হয়েছে তারা। এইবারেও তার ব্যত্যয় হল না।
অংশুর আত্মাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রাস করা থেকে বার্টন আটকাতে পারেননি ছেলেকে। এখন অংশুর শরীরের দখল নিয়েছে তার ছেলে পুরোপুরি। অংশুর শরীর এখন আর সে শিশুর নিজের আয়ত্তে নেই, সে এখন বার্টনপুত্রের দাস। সৃজিত, তার গোটা পরিবার এবং আরও অনেক ভারতীয় সিপাইয়ের পরিবার ধ্বংস করতে আজ বার্টন-এর ছেলে ছক সাজাচ্ছে অংশুর শরীরকে আধার বানিয়ে। হিংস্র সে আত্মার প্রতিশোধ হয়তো এবার একসাথে ছারখার করে দেবে বহু মানুষের জীবন।
রাতের অন্ধকার আর কুয়াশার চাদর সরে আস্ত আস্তে দিনের আলো ফুটছে। পাখির ডাক জাগতে শুরু করেছে প্রকৃতির বুকে। দাঁড়িয়ে থাকতে এবার বেশ কষ্ট হচ্ছে বার্টন সাহেবের। ধীর পায়ে এগোলেন তিনি। এই সময়টা তার জন্য একেবারেই উপযুক্ত নয়। যে-কোনো মুক্তি না পাওয়া বিদেহী আত্মাদের জন্যই দিনের আলোর ছোঁয়া যে একেবারে বিষের মতো কাজ করে।
—সমাপ্ত—
নেপথ্য কাহিনি —একশো ষাট বছর পর
'একশো ষাট বছর পর' একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক কাহিনি। কিন্তু এই কাহিনিটি অনুপ্রাণিত হয়েছে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহকালীন এক ঐতিহাসিক ঘটনা ও এক বাস্তব চরিত্রের দ্বারা।
প্রসঙ্গ —ব্রিজরাজ ভবন প্যালেস, কোটা
রাজস্থানের কোটা শহরে বর্তমানে ব্রিজরাজ ভবন নামে যে সুসজ্জিত হোটেলটি রয়েছে সেটি বস্তুত ১৮০ বছরের পুরোনো। চম্বল নদীর তীরবর্তী এই ভবনটি নির্মিত হয়েছিল ১৮৩০ সালে ব্রিটিশ ভারতে। ভারতবর্ষে বসবাসকারী ব্রিটিশ আধিকারিকদের জন্যই আবাসনরূপে মূলত বানানো হয়েছিল এটি।
এই ভবন নির্মাণের কিছু সময় পরে মেজর চার্লস বার্টন কোটা পরিদর্শনে আসেন এবং এই ভবনে আবাসিকরূপে থাকতে শুরু করেন পরিবারসহ।
এর পর ১৮৫৭ সালে ঐতিহাসিক সিপাহি বিদ্রোহের সময় ঘটে যায় এখানে এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড। এই বিদ্রোহের সময় ভারতীয় সৈন্যদের একটি দল আক্রমণ করে বর্তমান এই ব্রিজরাজভবন অর্থাৎ তৎকালীন সময়ে যেটি ছিল চার্লস বার্টন-এর আবাসস্থল। তারা ভবনটির একাংশ খারাপ ভাবে ভেঙে দেয়। বার্টন বুঝতে পারেন তার বিপদ আসন্ন। তিনি তাই পালাবার মরিয়া চেষ্টা করেন। কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হয় না। বার্টন পালাবার আগেই ধরা পড়ে যান এবং ভারতীয় সিপাইরা তাকে এবং তার দুই পুত্রকে হত্যা করে নির্মম ভাবে। এই ঘটনার পর তাদের মৃতদেহগুলি উদ্ধার করেন কোটার তৎকালীন রাজা এবং তাদের সৎকার করা হয় এই ভবনের সংলগ্ন অঞ্চলেই।
এই ঘটনার পর থেকেই আস্তে আস্তে এই ভবন 'ভৌতিক' আখ্যা পেতে শুরু করে। অনেকেই বলতে শুরু করেন যে সূর্যাস্তের পর এখানে কিছু ছায়ামূর্তির অকস্মাৎ উপস্থিতি লক্ষ করা যায় এবং নাকি কিছু রহস্যজনক শব্দও প্রত্যক্ষ করা যায়।
অতঃপর ভারতবর্ষের স্বাধীনতার পর সত্তরের দশকে এই ভবনকে পুনর্নির্মাণ ও পুনর্গঠন করে একে একটি সুসজ্জিত হোটেল বানানো হয়। এই হোটেলে আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধিও।
১৯৮০ সালে কোটার মহারানি এই হোটেলে কয়েকদিনের জন্য অতিথি হয়েছিলেন। তিনি কোন এক জনৈক ব্রিটিশ সাংবাদিককে তার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান যে ওই হোটেল ভবনটিতে থাকাকালীন সময়ে তিনি মেজর বার্টন-এর অস্তিত্ব প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি স্টাডি এরিয়াতে এক সাদা চুলের বৃদ্ধকে দেখেছিলেন যিনি মুহূর্তের মাঝেই হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিলেন।
হোটেলে থাকা বহু আবাসিক বহুবার নানা মাধ্যমে জানিয়েছেন যে তারা ব্রিজরাজভবনের সেন্ট্রাল হল এলাকায় বেশ কিছু অস্বস্তিকর অনুভূতি প্রত্যক্ষ করেছেন (কিছু প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে বার্টন এর সৎকার যে স্থানে করা হয়েছিল সেটাই বর্তমানের সেন্ট্রাল হল এরিয়া)। হোটেলে থাকতে আসা আবাসিকদের অনেক সময়েই সন্ধ্যার পর সেন্ট্রাল হল, লন বা ছাদের দিকে যেতে নিষেধ করা হয় হোটেল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। এই হোটেলে কর্মরত কয়েকজন গার্ডও কয়েকবার তাদের বিবৃতিতে জানিয়েছিল যে অনেক সময় তারা বার্টন-এর অশরীরী অস্তিত্ব অনুভব করেছে। তাদের মত অনুযায়ী ডিউটিচলাকালীন কোনোভাবে ঝিমুনি এলে নাকি শরীরবিহীন কোনো শক্তি তাদের থাপ্পড় মারছে বলে মনে হয়েছে কখনো কখনো, তবে সে শক্তিকে দেখতে পায়নি তারা কেউই। যদিও এই বিবৃতির স্বপক্ষে কোন সঠিক প্রমাণ বা তথ্য নেই।
বর্তমানে ব্রিজরাজভবন একটি বিলাসবহুল সুসজ্জিত হোটেল। এখানকার মনোরম পরিবেশ, পাখির কলকাকলি, সুদৃশ্য আসবাব সহ বিলাসপূর্ণ ঘরই এই হোটেলের মূল আকর্ষণ। যদিও কাল্পনিক গল্পে বিদেহী আত্মার প্রতিশোধের কথা লেখা হয়েছে, কিন্তু বস্তুত এখানে যারা আসেন তাদের কারোর কোনো ক্ষতিসাধন হয়েছে বলে জানা যায় না। এই গল্পে যে জিঘাংসার কথা লেখা আছে তা নিছকই কল্পনা। তবে ব্রিজরাজভবনে এই অশরীরী আত্মার উপস্থিতির কাহিনি অতিবাহিত হয়ে চলেছে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের কাছে। বহু মানুষ বিশ্বাস করেন আজও চার্লস বার্টন এর আত্মা বাস করেন ওখানেই, আর এইভাবেই কোটা শহরের এই রাজকীয় বিলাসবহুল হোটেল নিজেকে আতিশয্যে মুড়ে নিলেও মুছতে পারেনি নিজের নামের সাথে যুক্ত হয়ে যাওয়া 'ভৌতিক' আখ্যা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন