মৃত্যু উপত্যকা

পল্লবী সেনগুপ্ত

বদ্ধ কুঠুরিটার রুক্ষ মেঝেতে একটা আধখাওয়া পাথরের টুকরো নিয়ে একমনে কী সব হাবিজাবি আঁকিবুঁকি যেন এক মনে কেটেই চলেছে এলোঝেলো বেশি এক যুবক। চোখ মুখ দেখে মনে হয় না সে অশিক্ষিত, কিন্তু তবুও আজ সে এইখানে বন্দি এই দুরূহ অবস্থায়। আপনমনে ক্রমাগত একটানা কী যেন বিড়বিড় করেই চলেছে সে, আর সারা মুখমণ্ডলে জুড়ে তার মারাত্মক এক আতঙ্কের ছাপ।

কিন্তু কী যেন হয়ে গেল হঠাৎ করে। তার সেই আঁকিবুকি সে থামিয়ে দিল আচমকা, মুখটা পুরো ঘোলাটে হয়ে গেছে অজানা আক্সমিক কোনো ভয়ের আগমনে। বিড়বিড়ানিও স্তব্ধ।

'আসছে আসছে এবার মেরে ফেলবে আমায়। মেরে ফেলবেই' কেমন যেন পাগলের মতো করে উঠল সে। কোনোমতে উঠে দাঁড়িয়ে এলোপাথাড়ি ভঙ্গিতে ছুটোছুটি করছে অশক্ত শরীরের যুবকটা।

'আ আ পারছি না। দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার। ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও'। এবার পাগলের মতো পরিত্রাহি স্বরে চিৎকার করছে সে। ছুটে এল তার চিৎকারে কয়েকজন। ওদেরকে দেখতে পেয়েই আরও করুণভাবে কাতরে উঠল সে যুবক। নিজের গলার কাছে দু-হাত চেপে পাগলের মতো ছটফট করছে সে। কোনোমতে কষ্ট করে বলল।

'বাঁচাও। বাঁচাও আমায়। বিশ্বাস কর দমবন্ধ হয়ে আসছে আমার। কাশি হচ্ছে। কাশির সাথে উঠে আসছে চাপ চাপ রক্ত।' কথাটুকু কোনমতে শেষ করেই সে অঙ্গুলি নির্দেশ করে দেখাবার চেষ্টা করল মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা টাটকা তাজা লাল রক্তের রেখার ধারার দিকে যেটা উঠে আসছে তার বুক চিরে গলা হয়ে। ভকভক করে রক্ত উঠছে ক্রমাগত আর পাশবিক যন্ত্রণায় ছটফট করছে যুবক। কিন্তু যাদের থেকে সে সাহায্য চাইল তারা কোনো দৃকপাতই করল না। নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে, কী দু-একটা ফিসফাস করে তারা চলে গেল যেদিক থেকে এসেছিল সেই দিকেই।

'হ্যাঁ বল কিংশুক'রেজার গালে টানতে টানতে মোবাইল কানে চেপে বলল তমাল।

'কী করছিস? নিশ্চয় সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ছাত্র পড়াতে যাওয়ার তোড়জোড় করছিস তাই তো'?

'হ্যাঁ মানে ওই আর কী' ক্লিষ্ট হেসে জবাব দিল তমাল।

'এভাবে আর কতদিন লোকের বাড়ি ঘুরে ঘুরে প্রাইভেট টিউশন পড়িয়ে বেড়াবি? ক্লান্ত লাগে না? নিজেকে ফেরিওয়লা বলে মনে হয় না?'

কিংশুকের কথাটা খট করে লাগল তমালের কানে। বলতে ইচ্ছে করল

'কী করব বল, আমি তো আর তোর মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি যে তিনবার ধরে হায়ার সেকেন্ডারি ফেল করার পরেও রাজার হালে স্ফূর্তি করে রমণীমোহন হয়ে জীবন কাটাব শুধু বাপের পয়সা আছে বলে'। কিন্তু বলতে ইচ্ছে করলেও সব কথা সব সময় বলা যায় না। তাই তমালও বলতে পারল না এটা। কেঁৎ করে কথাটা গিলে নিয়ে ও বলল,

'কী করব বল তুই তো সবই জানিস। অবস্থাপন্ন পরিবারের ছেলে হলেও আজ আমার কেমন নিরুপায় দশা। বাবার মৃত্যুর পর কেমন করে কাকারা ছলে বলে আমাদের সব কেড়ে নিল। তবুও বা যা কিছু ছিল মায়ের ক্যান্সারের চিকিৎসাতে সব জলের মতো বেরিয়ে গেল। মা ও থাকল না আর আমার পায়ের নীচের জমিটাটাও নড়বড়ে হয়ে গেল। আর চাকরির বাজার তো আর এখন সুবিধার নয় এমন কিছু, তাই হাই সেকেন্ড ক্লাস নিয়ে অনার্স পাশ করেও চাকরি আর কোথায় জোগাড় করতে পারলাম বল!'

'চাকরি! তোরা এই একপেশে ভাবনাটার বাইরে গিয়ে কোনো কিছু ভাবতে পারিস না কেন বল তো? চাকরি করে কটা টাকা রোজগার করা যায়? ওই কাগুজে বই পড়ার বাইরেও তো তোর অনেক কোয়ালিটি ছিল বস, সব কি নিজেই ভুলে গেছিস? দুর্দান্ত সাহস, লোকজনকে দিয়ে ধমকে ধামকে সব কাজ বের করে নেওয়া এগুলোতে তুই টপক্লাস ছিলি ভাই'।

'না রে ওসব আর মনে রাখার প্রয়োজন মনে করি না। এখন পেটের ভাত জোটানোটাই জীবনের পরম লক্ষ্য'। এবার একটু বিরক্ত স্বরে বলল তমাল।

'কিন্তু আমি তোর সেই গুনগুলো আজও ভুলিনি। কারণ তোর ওই সব কোয়ালিটি দেখেই আমি তোর সাথে বন্ধুত্ব করেছিলাম। আর আজ তোকে ফোন করার কারণও কিছুটা সেই বিষয়কই বলতে পারিস।'

'মানে? কী বলতে চাইছিস তুই'? এবার ভীষণ অবাক লাগল তমালের। বলতে কী চাইছে ছেলেটা?

এবার অল্প খাঁকারি দিল কিংশুক। তারপর একটু গলা নামিয়ে বলল

'তোর সাথে আমার খুব জরুরি কিছু কথা আছে। আসলে আমি একটা ব্যবসা করব ভেবেছি। টাকাকড়ি সবকিছু বাবা'ই ঢালবে। আর সেই ব্যবসাতেই আমি তোকে পার্টনার হিসেবে চাই। তোকে অনেকটাই দায়িত্ব নিতে হবে তমাল'।

''কী? আমায় পার্টনার করবি? কিন্তু কেন? না আছে আমার টাকা আর না আছে কোনো ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা। তাহলে আমায় পার্টনার করতে যাবি তুই কোন দুঃখে? আর কিসের ব্যবসা করতে চাইছিস তুই'?

'রিসোর্ট। একটা রিসোর্ট বানাব। মুসৌরিতে হবে রিসোর্টটা। আর তোকে পুরো প্রোজেক্টটায় আমার সাথে থাকতে হবে। শুরু থেকে শেষ অবধি। আর ওই রিসোর্টে তুই-ই হবি সি ই ও। তোর তো কোনো পিছুটান নেই। তাই তুই তো থাকতেই পারবি নিশ্চয় ওখানে। তবে তুই তা বলে ভাবিস না যে তোকে ওখানে আমার কর্মচারী হতে বলছি, তোর নামে শেয়ার থাকবে। তুই পার্টনারই হবি।'

'না না সে সব কথা বলছি না। কিন্তু আমি তো এটাই বুঝতে পারছি না রিসোর্টের ব্যবসায় আমায় কেন যুক্ত করতে চাইছিস? আমি সে ব্যবসার কি বুঝি? তুই তো আরামসে যে-কোনো এক্সপার্ট লোক পেয়ে যাবি যার এই ব্যাপারে ভালো অভিজ্ঞতা আছে'।

'উফফ আমি তোকে বলছি না আমার এমন একজন লোক চাই যার খুব সাহস আছে, ঠিক তোর মতো। কারণ যে জায়গায় রিসোর্টটা হবে সেটা ভারতবর্ষের এক অন্যতম অভিশপ্ত জায়গা। সেটাকে সকলে বলে ভৌতিক একটা জায়গা। একটা পরিত্যক্ত খনি সেটা, যে খনিতে বেশ কিছু বছর আগে একসাথে মারা গেছিল প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক বীভৎসভাবে। মুসৌরির মানুষদের কাছে এক সাক্ষাৎ আতঙ্ক এই জায়গাটা।'

'কী? কিন্তু কেন এমন একটা জায়গায় ব্যবসা শুরু করতে চাইছিস তুই?'

'সব বলব তোকে। তুই আজই একবার দেখা কর আমার সাথে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মুসৌরি পৌঁছতে হবে আমাদের। ফ্লাইট বুক করে নিতে হবে'। ঝপ করে ফোনটা কেটে দিল এবার কিংশুক। স্থবির হয়ে কয়েকমুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল তমাল। ওর চোখের সামনে ভেসে উঠছে এক অদ্ভুত দৃশ্য।

একটা খনি, সেখানে কাজ করছে শয় শয় মানুষ। কিন্তু আচমকা কি যেন একটা হয়ে গেল। ধপ ধপ করে লুটিয়ে পড়ছে কর্মরত মানুষগুলো। মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে ছটফট করছে ওরা। নিথর হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে তাদের দেহগুলো আর একটা বিষাক্ত কালো ধোঁয়ায় ভরে উঠছে চারিদিক।

প্লেনটা উড়তে শুরু করা মাত্রই বুকের ভেতরটা একটু ঢিপঢিপ করে উঠল তমালের। আড়চোখে একবার আলগাভাবে দেখে নিল কিংশুককে। তার কোনো হেলদোল নেই। দিব্য ইয়ার প্লাগ কানে গুঁজে গান শুনে যাচ্ছে। কিন্তু তমালের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করেই চলেছে। এখনও নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছে না যে শেষপর্যন্ত সত্যি ও কিংশুকের প্রস্তাব মেনে পাড়ি দিচ্ছে মুসৌরির পথে।

কিংশুক সত্যি রিসোর্টের ব্যবসা করার জন্য এখন খুব আগ্রহী হয়েছে। বড়লোকের ছেলে, কখন কী খেয়াল চাপে বোঝা দায়। কিন্তু সেই ব্যবসাতে কেন তমালকে ও জড়াবার জন্য এভাবে উঠে পড়ে লাগল সেটা বোঝা আরোই মুশকিল মনে হচ্ছিল তমালের। কিন্তু ওর সাথে দেখা করার পর ও যা শোনাল তা সত্যি নেহাতই অবাক হবার মতোই।

মুসৌরির কাছে নাকি এক বহু বছরের পরিত্যক্ত খনি আছে। সেই খনিতে নাকি নব্বই দশকের শুরুর দিকে কোন এক দুর্ঘটনার জেরে মারা গেছিল বহু শ্রমিক একসাথে। তারপর বহু বছর ধরে নাকি বন্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে ওই খনি। কেউ বেশি একটা যায় না ওইদিকে। স্থানীয় মানুষদের কথায় ওই জায়গাটা জুড়ে নাকি অপদেবতার বাস। মৃত শ্রমিকদের অতৃপ্ত আত্মা নাকি আজও ঘুরে বেড়ায় ওই খনি সংলগ্ন এলাকায়। লোকমুখে চাউর হওয়া এই সব ভূতের গল্প ক্রমেই ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে বেশ ভালোমতো। আস্তে আস্তে বদনাম হচ্ছে জায়গাটা। এইভাবে বেশিদিন চললে মুসৌরির মতো সুন্দর জায়গার সুনামে দাগ লাগতে পারে, পর্যটন ব্যবসায় আঘাত আসতে পারে। কিংশুকের পিসেমশাই? অঞ্চলের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্ব। তিনি তাই ভালো করেই জানেন রাজনৈতিক মহল অনেকদিন থেকেই এই বিশেষ ব্যাপারটা নিয়ে ভালই চিন্তিত। এইভাবে যদি ভূতের গুজব দিন দিন বাড়তে থাকে তাহলে সেটা তো মোটেই ভালো নয়। কিংশুকের বাবার বিস্তর টাকা রয়েছে আর তার সাথেই রয়েছে এক অপদার্থ গোছের ছেলে যে শুধু বাপের পয়সায় বাবুগিরি আর সুন্দরী মেয়েদের পদলেহন ছাড়া আর কিছুই পারে না। তাই এমতাবস্থায় নাকি কিংশুককে তার বাড়ির গার্জেনরা জানিয়েছে পিসের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বাবার অর্থ এই দুইকে কাজে লাগিয়ে কিংশুককে এবার কিছু একটা করে দেখাতে হবে। প্রমাণ করতেই হবে নিজের যোগ্যতা। ওই পরিত্যক্ত খনিটা ভেঙে ওই জায়গাতেই গড়ে তুলতে হবে এক সুদৃশ্য মনোরম রিসোর্ট যে রিসোর্ট, হবে দত্ত এন্ড সন্স অর্থাৎ কিংশুকদের কোম্পানি এবং উত্তরাখণ্ড সরকারের এক যুগ্ম প্রকল্প। নানা সমস্যা থাকার কারণে খুবই কম টাকায় এত সুবিশাল প্রপার্টি পেয়ে যাচ্ছেন কিংশুকের বাবা। তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করতে তিনি একেবারে রাজি নন। কিংশুকের নামে শেয়ার থাকবে। তমালকেও শেয়ারের টোপ দেওয়া হলেও সেটা যে আসলে ফাঁকা আওয়াজ সেটা বোঝার মত বুদ্ধি এখন তমাল ব্যানার্জির আছে। বস্তুত ওকে ওখানে চাকরিই করতে হবে। তবে তাতে ওর আপত্তি নেই। এই সকলের বাড়ি ঘুরে ঘুরে প্রাইভেট টিউশন পড়িয়ে দিন গুজরানটা ক্রমে ক্রমেই অসহ্য হয়ে উঠছে। আর তেঁতো সত্যিএটাই যে নিপাট গৃহশিক্ষকদের সকলে যথেষ্ট সম্মানও দেয় না। আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব মহলে তাই তমালের কেমন যেন নিজেকে উদ্বৃত্ত বলে মনে হয়। তাই সেই জীবন এর ইতি টেনে ওকে যদি রিসোর্টের ম্যানেজার এর চাকরি করতেও হয়, ভালো মায়নে যদি তাতে আসে সেক্ষেত্রে মোটেই খুব একটা আপত্তি নেই তমালের।

কিংশুককে এই কাজটা নিজেকে প্রমাণ করার সুযোগ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। ও নিজের কুঁড়েমি আর অপদার্থতার জন্য এর আগের নানা ভেঞ্চারে যেমন ব্যর্থ হয়েছে এবারেও যদি তেমন হয় তাহলে ওর জন্য আর কোনো পয়সা খরচ করবেন না ওর বাবা। ওর নিজের ব্যবস্থা ওকে নিজেকেই করে নিতে হবে। তেমনটাই নাকি ওর বাবা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন ছেলেকে। কিংশুক বেশ ভড়কেছে তাতে । তমাল বেশ ভালোই বুঝতে পারছে যে কিংশুক আগের থেকে সিরিয়াস হয়েছে। এই প্রোজেক্টটা সফল করতে ও বেশ মরিয়া।

তমাল চিরকালই সাহসী, বরঞ্চ একটু দুঃসাহসীই বলা যেতে পারে। স্কুল লাইফে থাকতে ভূতের বাড়িতে রাত কাটাতে যাওয়ার মতো কাজও করেছে একাধিক বার। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই ডানপিটে দুঃসাহসী স্বভাবে মরচে পড়ে গেলেও সেটা ফুরিয়ে যে যায়নি তা কিংশুকও জানে। সেই জন্যই বোধহয় ওকে এই প্রোজেক্টে অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে জুড়ে নিয়েছে ওর বন্ধু। তমাল বেশ খুশি, সত্যি যদি ওই একঘেয়ে প্রাইভেট টিউটরের জীবন থেকে মুক্তি মেলে তার চেয়ে আনন্দের তো আর কিছু হতেই পারে না। চাকরির চেষ্টা তো আর ও কম করেনি। কিন্তু শুধু একের পর এক ব্যর্থতা ছাড়া আর কিই বা জুটেছে ওর।

কিন্তু যে আনন্দটা নিয়ে এই প্রকল্পে ও যুক্ত হয়েছিল ক্রমে যেন সেই উৎসাহটা ফিকে হয়ে আসছে। যত মুসৌরি কাছে চলে আসছে তত যেন একটা চাপা অস্বস্তির অনুভূতি গ্রাস করছে ওকে। না ভূত বা অতৃপ্ত আত্মার মতো বিষয়কে ঘিরে ও যে ভয় পায় না সেটা বলাই বাহুল্য। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে এত বছরের পরিত্যক্ত খনি, যেটা নাকি আবার অভিশপ্ত, সেরকম জায়গায় রিসোর্ট তৈরি করাটা কি ঠিক হচ্ছে? বহু মানুষ নিজেদের উপার্জিত, সঞ্চিত টাকা খরচ করে একটু আনন্দ পাবার জন্য বেড়াতে বের হন। অনেক বিশ্বাস করে তারা রিসোর্ট বা হোটেলে নিজেদের কয়েকটা ছুটির দিনকে গচ্ছিত রাখেন। কিন্তু তেমনই হাজার হাজার মানুষের সাথে এটা অন্যায় হয়ে যাবে না তো? যদি তাদের কোনো বিপদ ঘটে? ভাবনাটা মাথায় আসা মাত্রই বুকটা একমন যেন ধক ধক করে উঠল ওর। ও প্রাণপণে নিজেকে বোঝাবার চেষ্টা করল

'দূর আমি এসব কী ভাবছি! ওই জায়গায় রিসোর্ট হলে কারই বা ক্ষতি হবে? বরঞ্চ কিছু কর্মহীন লোকের কাজের সংস্থান হবে'। নিজেকেই নিজে বোঝাল তমাল। কিন্তু সে বোঝানতেই জোর নেই খুব বেশি। সত্যি কী অপার্থিব শক্তি, বিদেহী আত্নার অস্তিত্ব একেবারে মিথ্যে? নানা ভৌতিক জায়গায় রাত কাটাতে গিয়ে বা প্ল্যানচেটের আসরে থাকার সময় সত্যি কী কখনো অন্যরকম কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি ওর? একথা কি ও জোরের সাথে বলতে পারে? বোধহয় না পারারই কথা।

'এই তমাল, এই কি হয়েছে তোর? মুখ চোখ এমন লাল লাগছে কেন? শরীর খারাপ লাগছে নাকি'? অল্প একটু ঠ্যালা দিল ওকে কিংশুক। প্লেন এগিয়ে চলেছে আকাশপথে যথারীতি নিজের গন্তব্যে।

'একটা কথা বলব? আমরা ওই জায়গায় রিসোর্ট বানাবার পরিকল্পনা করে সত্যি কোনো ভুল করছি না তো? জায়গাটা তো অভিশপ্ত। কত সহস্র মানুষের রক্তের দাগ লাগা জায়গা ওটা। এমন একটা জায়গায় রিসোর্ট বানিয়ে অন্য আরও কিছু মানুষকে সেখানে টেনে নিয়ে গিয়ে কোন ভুল হবে না তো''? বলতে না চেয়েও কেন যেন কথাগুলো বলেই ফেলল তমাল। নিজেকে আটকাতে পারল না কিছুতেই।

'কী? কী বলছিস এসব? তুই এসব বলছিস! তোর মতো সাহসী ছেলে যে কিনা স্কুল লাইফে ভূতুড়ে বাড়িতে রাত কাটাতে যেত একা, প্ল্যানচেটের আসর খুঁজে খুঁজে যে পৌঁছে যেত মিডিয়াম হতে, সে বলছে এসব? কী হল কী তোর? পঁচিশ বছর বয়সেই কি বুড়ো হয়ে গেলি নাকি'? তমাল দেখল কিংশুক বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বন্ধুকে কী উত্তর দেবে ঠিক ভেবে পেল না ও। তবুও কিছু একটা উত্তর যাহোক খুঁজে নিয়ে বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই শুনতে পেল বিমান সেবিকা ঘোষণা করছে প্লেন পৌঁছে গেছে গন্তব্যে, এইবার মাটিতে অবতরণ করবে সে কিছু সময়ের মধ্যেই।

গাড়িটা পার্ক করা হল নির্দিষ্ট একটা জায়গায়। এর পর হেঁটেই যেতে হবে, এমনটাই বলল গাইড মদন পান্ডে। গতকালই সবে মুসৌরি এসে পৌঁছেছে তমাল আর কিংশুক। আর আজই ওরা বেরিয়েছে উদ্দিষ্ট সেই পরিত্যক্ত খনিটা দেখার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে পেয়েছে মদন পাণ্ডেকে। মদনের সন্ধান পেয়েছে পিসের থেকেই। মদন পান্ডের একটা কোম্পানি আছে। সেই কোম্পানিতে পেশাদার গাইডরা কাজ করে। কিন্তু কিংশুকদের ক্ষেত্রে তো ব্যাপারটা আলাদা। প্রভাবশালী ব্যক্তির আত্মীয়, বড় প্রোজেক্টে ওরা এসেছে বলে কথা। তাই মদন নিজে চলে এসেছে ওদের সাথে।

মদন পান্ডে যদিও মূলত বিহারের লোক, কিন্তু এই এলাকাতেই তার জন্ম। বহুদিন ধরে এখানেই আছে সে।এখানকার সব নাড়ি নক্ষত্র একেবারে তার নখদর্পণে। সেই সব ভালোভাবে দেখিয়ে শুনিয়ে বুঝিয়ে দেবে ওদের। ওর কথামতোই একটা জায়গায় গাড়িটা রাখল কিংশুক। তারপর হাঁটতে শুরু করল পরিত্যক্ত খনিটার দিকে।

'খনিটার সমস্যা ছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থায়। খারাপ নিরাপত্তার ব্যবস্থার জন্যই ঘটেছিল অঘটন। নিরাপত্তার অব্যবস্থার জন্য শ্রমিক এর আগেও বহুবার মরেছে এখানে। বহু বছর ধরেই মরত শ্রমিক এখানে কম বেশি। তবে অনেক ক্ষেত্রেই চেপে যাওয়া হত সে সব খবরগুলো। কিন্তু নব্বই দশকের ঘটনার ভয়াবহতা ছিল একেবারে বলা কওয়ার বাইরে। একসাথে এতগুলো লোকের মৃত্যু...... উফফ! সেই সময়টা ভাবলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়। দলে দলে শ্রমিক মরছে মুখে রক্ত উঠে। একেবারে সাক্ষাৎ মৃত্যুমিছিল যাকে বলে আর কী ...... দলে দলে মৃতদেহ সারি দিয়ে পড়ে রয়েছে। সাদা চাদরে আপাদমস্তক ঢাকা দেওয়া কতগুলো নিথর শরীর। আবার কিছুর মুখ থেকে সরে গেছে চাদর দমকা হাওয়ার দাপটে। মুখগুলো সব বীভৎস। কারোর কারোর শরীরে যদি এক আধ ফোঁটা প্রাণ থেকেও বা থাকে তাহলে তাদের মুখ থেকে বের হচ্ছে শুধু অসহ্য যন্ত্রণার মরণ চিৎকার'। এক ভাবে খনি শ্রমিকদের ভয়াবহ দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর মিছিলের বিবরণ দিয়ে যাচ্ছে পান্ডে। সত্যিই গা শিরশির করে ওঠার মতোই কাহিনি। না কাহিনি তো আদপে নয়, একেবারে নিপাট বাস্তব। কিন্তু ওই যে বলে না, জলজ্যান্ত বাস্তব অনেকসময়ই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভয়ের গল্পের থেকেও অনেক বেশি ভয়ানক হতে পারে এটাও যেন খানিকটা সেইরকমই। তমাল এবারে তাকাল কিংশুকের দিকে। বোঝা যাচ্ছে ওর মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। না, তমাল এর ভয় ডরটা অনেকটাই কম। কিন্তু তবুও পান্ডের বিবরণ শুনে বেশ অস্বস্তি হচ্ছে ওর। এই লোকটা বেশ ভালোই বাংলা বলতে পারে। তাই ঝরঝরে বাংলায় কেমন যেন রেডিও জকির ভূতের গল্প শোনানোর ভঙ্গিতে সে বলেছে সবকিছু।

'আচ্ছা খনিটা পরিত্যক্ত হল কেন? মানে আমি বলতে চাইছি যে এত বড় একটা 'মাইন', কোনো সমস্যা থেকেও থাকলে সেটাকে তো আবার পুনর্নির্মাণ করাই যেত। নিরাপত্তার সমস্যা থাকুক বা যাই থাকুক সেটাকে শুধরে আবার নতুন করে শুরু করে না করার কী ছিল'? প্রশ্নটা পান্ডেকে জিজ্ঞাসা করল তমাল।

'না স্যার আসলে সেই ঘটনার ভয়াবহতা এতটাই বেশি ছিল যে চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। আর কেউ তারপর এদিকে কাজ করতে আসতে রাজি হলে তো! তা ছাড়া ......'একটু থামল পান্ডে। তারপর একটু দম নিয়ে নিচু গলায় বলল,

''আপনারা তো জানেনই এখানকার স্থানীয় মানুষজন কেমন কুসংস্কারে বিশ্বাস করে। সবাই বলে আজও নাকি ওই মৃত মজুরদের অতৃপ্ত আত্মারা আটকে পড়ে রয়েছে এখানেই। এই খনি নাকি অভিশপ্ত তাই এখানে আর কিছু হবে না। কিছু করতে গেলেই ওই বন্দি আত্মারা শেষ করে দেবে সব কিছু। মেরে ফেলবে সবাইকে। আসলে এখানে এত রকম এক্সিডেন্ট হয়েছে একের পর এক, এত লোক মরেছে তাতে যে মানুষজনের এই সব ধারণা আরও দৃঢ় হয়েছে দিনদিন। এই দিক দিয়ে যাবার পথে কত গাড়ি যে দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে, কত মৃত্যু যে ঘটেছে ... সেই জন্যই তো কোর্টের নির্দেশেই তারপর এই খনি বন্ধ হয়েছিল।'

'হুম জানি সব আমরা। কিন্তু এই সব ভুল ধারণা আর কুসংস্কারকে আঁকড়ে ধরে তো এত বিপুল জায়গা নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে পারে না দিনের পর দিন। সেই জন্যই এসেছি আমরা। নতুন রিসোর্ট হবে এখানে, বহু মানুষ কাজ পাবে। আপসেই এতদিনের ভুল ভাল ধারণা দূর হয়ে যাবে লোকজনের'। তমাল জোরের সাথে বলল মদনের সাথে সাথে নিজেকে শুনিয়েও।

'হ্যাঁ ভাল হলেই তো ভালো'। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অদ্ভুতভাবে বলল মদন পাণ্ডে।

'মানে'? একটু কাঁপা গলায় জিজ্ঞাসা করল কিংশুক।

'এসে গেছে স্যার। এই যে ব্লকটা দেখছেন এটা ছিল খনির অফিসারদের কাজের মানে প্রশাসনিক অফিস'। একটা ভাঙাচোরা বড় বিল্ডিং-এর সামনে এসে পড়েছে কখন যেন ওরা হাঁটতে হাঁটতে, এবার সেটা খেয়াল করল তমাল আর কিংশুক দুজনেই। একটা পুরোনো পরিত্যক্ত ভাঙাচোরা বেশ বড়সড় বিল্ডিং, দেখেই বোঝা যায় এককালে সেটা বেশ বড় অফিস বিল্ডিং ছিল। এখন সেটা লতা, গুল্ম আর আগাছার জঙ্গলে ভরতি অযত্ন আর অবহেলায়।

'আসুন স্যার'। ব্লকটার ভিতরে ঢুকছে পাণ্ডে। হ্যাঁ এবার ওদেরও যেতে হবে ভিতরে। সেইজন্যই তো এসেছে এখানে ওরা। কিংশুকের বুকের ভেতর আতঙ্কের দামামা বাজছে। এই সেই ভৌতিক আর অভিশপ্ত খনির ব্লক অফিস। এখানে সত্যি ঢুকতে হবে? কিন্তু যেতে তো হবেই। এই কাজেরই তো দায়িত্ব। এই ব্লকের আর অস্তিত্ব থাকবে না এখানে, তৈরি হবে বিলাসবহুল রিসোর্ট। আর এই বার এই কাজটা করে উঠতে না পারলে বাবা যে ওকে একেবারে বাতিল করে দেবে সেটা বিলক্ষণ জানে কিংশুক। কিন্তু বুকের ভেতর বইতে থাকা আতঙ্কের স্রোতকে কীভাবে থামাবে ও যুক্তি দিয়ে ওই হাত পা যে ঠান্ডা হয়ে আসছে ওর। তমালের দিকে তাকাল কিংশুক। না তাকে দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তমালটা সত্যিই সাহসী। এবার ফস করে তমালের হাতটা খামচে ধরল ও। তমাল ওর হাতে হাত রেখে আশ্বস্ত করল, ভাবখানা এমন যে আমি আছি তো।

তমালের হাত চেপে এবার কিংশুক পা রাখল ব্লক অফিসের ভিতরে। খাঁ খাঁ করছে ভিতরটা। কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে ভাব। মদন পান্ডে ঘুরে ঘুরে দেখাতে শুরু করল এবার ব্লক অফিসের ভেতরটা। এবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয় কেটে গেল কিংশুকের। অফিসের দেওয়ালে দেওয়ালে নানা প্রেমিক প্রেমিকার নাম লেখা, আনাচেকানাচে পড়ে আছে পোড়া সিগারেটের টুকরো, কোল্ড ড্রিঙ্কের ক্যান, লজন্সের প্যাকেট ; যেগুলো দেখে খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে এখানে নিয়মিত যাতায়াত আছে শরীরধারী ইহজগতের মানুষদের যারা লজেন্স, কোল্ড ড্রিঙ্ক বা সিগারেট খায়। এবার বুকে বেশ সাহস ফিরে এসেছে কিংশুকের। গলা ঝাড়া দিয়ে ও বলল

'পান্ডেজি এখানে নাকি ভয়ে মানুষজন আসেই না। কিন্তু আমার তো দেখে তেমন কিছু মনেই হচ্ছে না। এখানে তো নিয়মিত মানুষজনের যাতায়াত আছে বলে মনে হচ্ছে।''

''হ্যাঁ আছে। এখানে অনেক সময় সিনেমার শুটিং হয়, অনেক পিকনিক পার্টি আসে, অনেক টুরিস্ট সাইট ভিজিট করতেও আসে। দিনের বেলায় এদিকে মাঝে মাঝে লোকের আসা যাওয়া হয় বটে।'

'ওহ! তাই বলুন। তাহলে আবার কিসের ভূত কিসেরই বা ভূতুড়ে'? হেসে উঠে বলল কিংশুক।

'না স্যার। আপনি একটু ভুল করছেন। এই যে জায়গাটা আপনি দেখছেন এটা শুধুই খনির ব্লক অফিস। আসল খনিতে এখনও আমরা যাইনি, যেখানে মূলত মরেছিল হাজার হাজার মানুষ। সেই খনিটাই কিন্তু সত্যিকারের ভূতুড়ে, অভিশপ্ত বলে পরিচিত। এটা সেই আসল জায়গাটাই নয়। সেটা এখন থেকে আর একটু এগিয়ে তারপর যেতে হবে। এবার আমাদের সেখানেই যেতে হবে স্যার।'

'এখন? এখনই যাব আমরা সেখানে? না গেলে হবে না? দেখেই তো নিলাম এটা'। কাঁপা গলায় বলল কিংশুক। আবার ওর বুকের ভেতর ফিরে আসছে সেই আতঙ্কের ঢেউ।

'হ্যাঁ কিংশুক, আমাদের ওখানে যেতেই হবে।' গম্ভীর গলায় বলল এবার তমাল।

গলা শুকিয়ে আসছে কিংশুকের। ও লক্ষ করল আচমকা আকাশটা কেমন যেন কালো করে এল, কোথায় যেন বিচ্ছিরি কর্কশ স্বরে ডেকে উঠল কী একটা নাম না জানা অচেনা পাখি।

বুকের ভেতরের ঢিপঢিপ ভাবটা এখনও যেন রয়ে গেছে এমনটাই মনে হচ্ছে কিংশুকের। আজ যা গেল সারাদিন। ওই খনি মানে আসল 'মাইন এরিয়া' যেখানে মূলত কাজ করত খনি শ্রমিকরা এবং যেখানে কাজ করতে গয়ে মূলত মরেছিল ওরা সেই জায়গাটায় সত্যি যেতে হবে ভেবেই আজ প্রাণ শুকিয়ে গেছিল একেবারে। তমাল-এর জোরাজুরিতে আর পান্ডের জোগান ভরসাতেই শেষ অবধি সত্যি গিয়ে উঠতে পেরেছিল ও। অমন একটা অভিশপ্ত, ভয়ানক জায়গায় যে সত্যি ও শেষমেশ গিয়েছিল সেটা নিজেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না কিছুতে। উফফ কেমন খাঁ খাঁ করা একটা প্রান্তর। চতুর্দিক শুনশান। গা শিরশির করা একটা হাওয়া বইছিল জায়গাটায়। বোঝাই যাচ্ছিল যে এ জায়গায় মানুষের পা পড়ে না সচরাচর। বুকের ভেতর কেমন যেন হাজারটা হাঙর কামড়ানোর মতো অনুভব হচ্ছিল কিংশুকের। হ্যাঁ এতটাই ভয় করছিল। তবে জায়গাটা সুবিশাল। এই জায়গা যে এত কমে এভাবে পাওয়া যেতে পারে সেটা সত্যি-যে কোনো বিজনেসম্যান এর পক্ষে ভাবনার অতীত। এত সুবিশাল জায়গা জুড়ে বিলাসবহুল রিসোর্ট বানালে তা যে পর্যটকদের কাছে নিদারুণ আকর্ষণীয় হবে সেটা তো বলাই বাহুল্য।

জায়গা ঘুরে আসা হয়ে গেছে, এবার কাজ শেষ কিংশুকের। বেশ অনেক ছবিও তোলা হয়েছে। এগুলো সব দেখান হবে বাবাকে। আর তা ছাড়া তমাল তো রয়েইছে। ছেলেটা চিরকালের সিরিয়াস। এই প্রোজেক্টেও ভীষণ সিরিয়াস হয়েই কাজ করছে সে। পান্ডের কথা শুনতে শুনতে, সাইট দেখতে দেখতে অনবরত কত কিছুই নোট করছিল ও। ধুর এত সিরিয়াস হওয়া কিংশুকের পোষায় না। আর ও সিরিয়াস হবে না বলেই তো তমালকে এতে রাখা। যত খুশি একাত্ম হয়ে কাজ করুক ও। ব্যাটা প্রাইভেট মাস্টারি কাজ ছেড়ে এত ভালো একটা কাজ পেয়েছে, ওকে তো সিরিয়াস হতেই হবে। পয়সা কামিলে লাল হয়ে যাবে এবার। ভাগ্য তো খুলে গেল ওর। তবে প্রায় মিনিট কুড়ি মতো ছিল ওরা। আগামীকাল ফেরা হবে কলকাতায়। এরপর থেকে আর আসতে পারবে না কিংশুক। যা করার তমাল একাই করবে। তবে আসার পর থেকেই কেমন যেন পেঁচার মতো মুখ করে রয়েছে ছেলেটা। এখনও চাদর মুড়ি দিয়ে অদ্ভুতভাবে শুয়ে রয়েছে লাশের মত।

'এ ভাই ... এ ভাই ... কী হল রে তোর? দেখ এত সুন্দর অয়েদার। এত ঠান্ডা ঠান্ডা আমেজ, চল না ভাই একটু বিয়ার খাই'। বেশ হালকা চালে কথাটা ভাসাল কিংশুক। কোনো উত্তর দিল না তমাল। এবার বন্ধুকে আলগা ধাক্কা দিল কিংশুক। অমনি তড়াক করে উঠে বসল তমাল। কেমন যেন উদ্ভ্রান্তের মতো লাগছে ওকে । লালচে হয়ে রয়েছে ওর মুখ চোখ।

'কিংশুক শোন, আমার কথা খুব মন দিয়ে শোন। এই রিসোর্টের প্রোজেক্ট বাতিল কর। এখানে কোনো রিসোর্ট করা যাবে না। মানে করা সম্ভব হয়েই উঠবে না। এখানে কাজ করানোর জন্য অনেক লোককে তুই আনবি যারা ওই খনি ভেঙে খোলনালচে সব বদলে ফেলে সুদৃশ্য রিসোর্ট বানাবে তাই তো'? অদ্ভুত ভয়ার্ত গলায় কথাগুলো বলল তমাল।

'হ্যাঁ সে তো আনতেই হবে।'

'কেউ বাঁচবে না। যারা এখানে কাজ করতে আসবে কেউ বাঁচবে না। আবার দলে দলে মানুষ মরবে। আবার মৃত্যুমিছিলের সাক্ষী হবে এই আকাশ বাতাস। আবার অনাথ হবে অনেকগুলো পরিবার। তুই এটা হতে দিস না ভাই। প্লিজ তুই বন্ধ কর এসব'।

'মানে ? কী সব পাগলের মতো বলছিস তুই? কেন বন্ধ করব এই প্রোজেক্ট'? এবার বিরক্তভাবে বলল কিংশুক।

''কারণ আমি অনুভব করেছি ওখানে কিছু আছে। কোনো একটা নেগেটিভ এনার্জি, যেটা সব কিছু ভেঙে চুরে তছনছ করে দিতে চায়। ওই এনার্জিটা চায় সবকিছু যেমন আছে তেমনই থাক। এনার্জিটা ওই মজুরদের মৃত আত্মার অপশক্তি নয়, এটা অন্য কোনো অপশক্তি। যে অপশক্তি ওখানে হয়তো পুঞ্জীভূত ছিল বহু বছর ধরেই, বহু যুগ ধরেই। হয়তো অন্য কোনো ডাইমেনশন থেকে এখানে এসে আটকে রয়েছে ওই নেগেটিভ এনার্জিটা'।

'জাস্ট শাট আপ তমাল। কী সব বলছিস পাগলের মতো? আমিও তো ওখানে গেছিলাম, আমি তো এরকম কিছু বুঝতে পারলাম না। পান্ডেও ছিল। সেও কিছু বুঝলে নিশ্চয় আমাদের বলত। এসব কী বলছিস তুই? এতটা এগিয়ে এখন অকারণে পিছিয়ে যাব আমরা? তুই জানিস বাবার কতখানি রেপুটেশান লস হবে তাহলে? পিসের কত সমস্যা হবে তুই জানিস? আর আমি তো একেবারে ধ্বংস হয়ে যাব। বাবা তো একবারে বাতিল করে দেবে আমায়'। খুব রুক্ষ স্বরে বলল এবার কিংশুক।

'তোরা খুব ছোট ছোট ব্যাপারে ভাবছিস। কিন্তু আমি সেটা ভাবছি না । আমি ভয়ংকর ভবিষ্যৎটা দেখতে পাচ্ছি'।

'আমিও তোর ভবিষ্যৎটা দেখতে পাচ্ছি তমাল। তোর ভবিষ্যৎ শুধু টিউশন পড়িয়ে বেড়ানোতেই আটকে থাকবে। তোকে আমি আর এই প্রোজেক্টে রাখতে পারব না এই সব উলটো পালটা কথা বললে'। এবার কঠিন হল কিংশুকের স্বর।

'এক্ষুনি একবার চল। দিনের আলোয় না, রাতের অন্ধকারকে সঙ্গী কর চল ওখানে। তাহলে নিজেই সব বুঝতে পারবি'। অদ্ভুত হিসহিসে স্বরে বলল এবার তমাল।

'মাথাটা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে তোর? এই রাতে ওখানে কে যাবে? কোনো প্রশ্নই উঠছে না। আর আগামীকালই কলকাতা ফিরে যাচ্ছি আমরা।'

'যেতে তোকে হবেই কিংশুক, নইলে যে তুই বাঁচবি না'......

'তমাল একি করছিস তুই'? আর্তনাদ করে উঠল এবার কিংশুক। আচমকা টেবিল থেকে ফল কাটার ছুরিটা তুলে নিল তমাল। সেটা চেপে ধরেছে কিংশুকের গলায়। সমগ্র ঘটনার আক্সমিকতায় চূড়ান্ত হতচকিত হয়ে গেছে কিংশুক। এটা কী হয়ে গেল? তমাল কি মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে পুরোপুরি?

রাতের অন্ধকারকে চাকার নীচে পিষ্ট করে ছুটে চলেছে গাড়ি পরিত্যক্ত খনির দিকে। কিংশুকের এখনও বিশ্বাসই হচ্ছে না যে সত্যিই ও এগিয়ে চলেছে নিজের হাতে গাড়ি চালিয়ে ওই বিভীষিকাময় জায়গাটার দিকে। কিন্তু উপায় কী? নিজেকে তো তা না হলে বাঁচাতেই পারত না। কী যে হয়ে গেল হঠাৎ করে এখনও বুঝেই উঠতে পারছে না কিংশুক। হঠাৎ কেন এমন হিংস্র হয়ে গেল তমাল? কেন এই রাত্তির এর অন্ধকারে এখানে আসার জন্য ক্ষেপে উঠল ও? এমনকি ছুরি বসাতেও উদ্যত হয়েছিল ও নিজের বন্ধুর গলায়! ওকে দেখে মনে হচ্ছিল ঠিক যেন কোনো দানোয় পাওয়া শক্তি। ও কী এরকমই? অবশ্য এটা ঠিক যে ছেলেটা একা একা থাকে। বাপ মা ভাই বোন তিনকুলে কেউ নেই। চাকরিবাকরিও পাচ্ছে না। হাতে পয়সার টান। হাজারো ডিপ্রেশন এর শিকার। এই সব হতাশাজনিত কারণে তবে কি পাগল হয়ে গেছে তমাল? ওর সাথে খুব ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তো আর ছিল না কিংশুকের। তবে কি এই ছেলেটাকে প্রোজেক্টে সামিল করাটাই বিশাল বড় ভুল হয়ে গেল? কিন্তু এখন তো আর এসব ভেবে একেবারে কোনো লাভ নেই। কাঁপা হাতে যন্ত্রের মত স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে চলেছে কিংশুক। বুকের ভেতরটা খান খান হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে এক পা এক পা করে। মৃত্যুর উল্লাস ধ্বনি যেন ভেসে আসছে রাত্রির অন্ধকার ঢাকা বাতাস ছুঁয়ে। রক্তখেকো পিশাচরা জেগে উঠে যেন অপেক্ষা করছে ওদের। সবকিছু বুঝেও এখানে আসতেই হল ওকে। কারণ মৃত্যু যখন সামনে এসে দাঁড়ায় তখন তার থেকে কোনো মতেই পালানো যায় না। কিংশুকেরও আজ একেবারে সেই অবস্থা। এখানে তমালের কথা না মেনে এলে ওকে নির্ঘাত সেই মুহূর্তেই খুন করে ফেলত ওই ছেলেটা। পান্ডেকে একবার ফোন করেছিল কিংশুক যদি সে আসতে পারে বা কাউকে পাঠাতে পারে ওদের সাথে। কিন্তু সে সাফ জানিয়ে দিল রাতের বেলা এখানে আসতে কেউ রাজি হবে না, প্রচুর টাকা দিলেও না। কাঁপা গলায় কিংশুক এবার ডাকল তমালকে। পিছনের সিটে বসে অদ্ভুতভাবে দুলছে তমাল। ওর চোখ দুটো কেমন যেন জ্বলছে ভাটার মতো।

'তমাল তুই কেন এমন করছিস ভাই? কেন জোর করে মরণের গুহায় ঝাঁপ দিচ্ছিস'?

'মরণ নয়। জীবন ফিরিয়ে দিতে চাইছি। ওখানে গিয়ে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে হবে তোকে। তুই বলবি কোনো রিসোর্ট তুই বানাবি না ওখানে। একমাত্র তাহলেই হয়তো রক্ষা পাবি এ যাত্রা। নইলে কলকাতা ফিরে গিয়েও পরিত্রাণ নেই। এই সব শক্তির ক্ষমতা অপরিসীম। কোনো এক জায়গায় আটকে থাকে না এ শক্তি'। একটু থামল এবার তমাল। তারপর ফের বলল,

'শোন কিংশুক তুই জানিস আমি অনেকবার অনেক ভূতের বাড়িতে রাত কাটাতে গেছি। বহুবার কিছু প্ল্যানচেটের আসরেও থেকেছি। এমনকী মিডিয়ামও হয়েছি অনেক সময়। বেশ কিছু তান্ত্রিক, ওঝা বা প্রেত চর্চা করা মানুষের সাথে ব্যাক্তিগতভাবে সাক্ষাৎও করেছি। ভূতপ্রেত অলৌকিক এক সময় খুব টানত আমায়। তাই এই ব্যাপারগুলো আমি বুঝি। সাধারণ আর চার পাঁচটা লোকের থেকে এই ক্ষেত্রে আমার অনুভব শক্তিটা অনেকটাই বেশি। আমি তাই আজ অনুভব করতে পেরেছি ওখানে কিছু একটা আছে, কোনো একটা নেগেটিভ এনার্জি এবং সেই নেগেটিভ এনার্জি সবকিছু শেষ করে দিতে চায়। রক্তের পিপাসা মেটাতে চায় একের পর এক মানুষ মেরে। এই শক্তিই মেরে ফেলেছে ওই শ্রমিকদের আমি সে বিষয়ে নিশ্চিত। আর লোক মরতে দেওয়া যাবে না । এই নেগেটিভ এনার্জির ক্ষমতা অপরিসীম। এরা আমাকে বা তোকে কাউকে ছাড়বে না যতক্ষণ না ক্ষমা চাওয়া হবে তার কাছে।'

এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল কিংশুক। এই পাগলের প্রলাপের কোনো উত্তর হয় না।

''তুই ভাবছিস তো এই পাগলের প্রলাপের কোনো জবাব তুই দিবি না। কিন্তু যদি সত্যি ওই জায়গায় কোনো অপশক্তির অস্তিত্বের অনুভব তুই না করতিস তাহলে তুই নিজেই বা ওখানে যেতে ভয় পাচ্ছিস কেন? তোর নিজের জীবন খুব দামি না রে? আর পেটের দায়ে কাজ করতে আসা গরিব মানুষগুলোর জীবনের কোনো দাম নেই? কেন তোরা বড়লোকরাই খেটে খাওয়া মানুষদের মাথার দাম বারবার ধার্য করবি বল তো'? অদ্ভুত হিংস্র স্বরে এবার কথাগুলো বলল তমাল। বেশ খানিকটা চমকে উঠল কিংশুক। একি! তমাল ওর মনের ভাবনাও পড়ে ফেলতে পারছে নাকি? এগুলো হচ্ছেটা কী?

'এখানে থামা। গাড়িটা এখানেই পার্ক করে রাখ'। গম্ভীর স্বরে বলল তমাল। কিংশুক কোনো কথা বাড়াল না। গাড়িটা থামাল ওর কথামতো। মনে পড়ছে না সকালে এখানেই গাড়ি রাখা হয়েছিল কিনা। কিন্তু কথা বাড়াতেও ভালো লাগছে না। বিনা বাক্যব্যয়ে গাড়ি থেকে নেমে পড়ল ও। তমালও নামল। দুজনে এগোচ্ছে দিক ভ্রষ্টের মতো। উদ্দেশ্য ঐ ভূতুড়ে খনিতে যাওয়া, যদিও আদৌ ঠিক পথে এগোচ্ছে কিনা সেটা বুঝতে পারছে না নিজেরাই। চারদিকটা ঘুটঘুটে কালো অন্ধকারে ঢাকা, ঠান্ডা বাতাস যেন শরীরের চামড়া ভেদ করে কাঁপিয়ে দিচ্ছে হাড়গুলোকেও। মোবাইলের সার্চ লাইট জ্বেলে এগোচ্ছে দুজন নীরব চালে।

'আমি যাব না। তুই যা পারবি করে নে। কোনো মতেই আমি যাব না ওই খনিতে'। হঠাৎ চলা থামিয়ে দিয়ে বলে উঠল কিংশুক।

'কী? কী বললি'? হিংস্র স্বরে গর্জে ওঠার মতো করে বলল তমাল। যা শুনেছিস তুই আমি সেটাই বলেছি। আমি যাব না। আমি চললাম। উলটো দিকে পা বাড়াল কিংশুক। কিন্তু এগোতে পারল না। পিছন থেকে ওকে জাপটে ধরে ফেলেছে তমাল।

'যেতে তোকে হবেই কিংশুক। আমি তোকে কোনো মতেই ছাড়ব না'। তমাল শক্ত করে জাপটে ধরেছে কিংশুককে। ওর গায়ের জোরও অনেকটাই বেশি কিংশুক এর থেকে। কিছুতেই পেরে উঠছে না ও তমাল এর সাথে। মারাত্মক ধস্তাধস্তি চলছে দুজনের। হ্যাঁ কিংশুক হেরেই যাচ্ছে প্রায়, অদ্ভুত অসুরের মতো করে তমাল গলা টিপে ধরেছে ওর। মাটিতে ফেলে ওকে ধরাশায়ী করে ফেলেছে পুরোপুরি। দম প্রায় যখন বন্ধ হয়ে আসছে ওর ঠিক তখনই একটা অদ্ভুত সাদাটে আলো এসে ঝাপটা মারল কিংশুকের চোখের ওপর। আলগা হয়ে এল তমালের বন্ধন। আর সাথে সাথে ভেসে এল একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বর,

'বাবুজি আপনারা কারা আছেন? এখানে কী করছেন এত রাতে''?

একটা মিষ্টি নারী কণ্ঠ। কিন্তু এই প্রত্যন্ত ফাঁকা জায়গায় এমন এক মিষ্টি সুরেলা স্ত্রী কণ্ঠ এল কোথা থেকে? নিজের শরীরটা এবার কোনোমতে দাঁড় করাল কিংশুক। তমালও উঠে দাঁড়াল এবার। সামনের দিকে তাকাতেই চমকে উঠল কিংশুক। একটা কমবয়সি মানে বছর কুড়ির মেয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে সামনে। হাতে তার একটা আলো, এগুলোকেই বোধহয় ছোট হ্যাজাক বলে। সেই আলোতে মেয়েটার মুখটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মেয়েটা ভীষণ সুন্দর দেখতে, তবে স্থানীয় সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তার পোশাক পরিচ্ছদ আদবকায়দাই বলছে সে কথা।

'আপনারা কে বাবুজি? বাইরে থেকে আসছেন কি'? ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে আবার সে বলল একই কথা।

কিংশুক অনুভব করল মেয়েটার সৌন্দর্য ভীষণভাবে আকৃষ্ট করছে ওকে। সুন্দরী মেয়েদের প্রতি যে ওর একটা মারাত্মক মোহ এবং দুর্বলতা আছে বরাবরই।

'হ্যাঁ আমরা বাইরে থেকে এসেছি। কলকাতা। আমরা একটা হোটেল বানাব এখানে। ওই যে একটা খনি আছে সেটা ভেঙে হবে রিসোর্টটা। তাই ওই সাইটটা দেখব বলেই এসেছি। তুমি একটু সাহায্য করবে আমাদের'? মোলায়েম গলায় বলল কিংশুক।

'সাইট দেখতে এত রাতে কেন? দিনেও তো আসা যেত'। বলল মেয়েটা।

'দিনে দেখেছি। কিন্তু রাতেও দেখার দরকার। তা ছাড়া দিনের বেলা যখন এসেছিলাম তখন আমার অয়ালেট ভুল করে ফেলে গেছিলাম তাই সেটাও তো নিতে হবে। আমি আগামীকাল ফিরে যাব কলকাতা। তাই অগত্যা রাতেই আসতে হল'। যাহোক একটা হাবিজাবি যুক্তি সাজিয়ে উত্তর দেবার চেষ্টা করল কিংশুক।

'কিন্তু এত রাতে খুঁজে পাবেন তো ওই খনিটা এই অচেনা জায়গায়'?

'না পাচ্ছি না তো। তুমি একটু সাহায্য করবে? নিয়ে যাবে আমাদের যদি তোমার চেনা থাকে'? মিহি স্বরে বলল ফের কিংশুক।

মেয়েটা কোনো উত্তর দেবার আগেই এবার তমাল বলল,

'তুমি কে? তুমি এত রাতে এখানে কী করছ? এখানে তো নাকি রাতে কেউ আসেই না'।

'আমার নাম টিকলি বাবুজি। এখানে রাতে কেউ আসে না এটা ঠিক কথা নয়। আমদের মাঝে মাঝেই আসতে হয়। বিশেষ করে অমাবস্যার রাতে। অমাবস্যার কালো রাতে আমাদের অনেককেই এখানে দেখা যায়। আমরা সবাই যাই ওই খনিতে, যেখানে আমাদের বাপ ঠাকুরদারা মরেছিল। ওদের আত্মা আজও শান্তি পায়নি বাবুজি। তাই আমরা মানে ওই খনি মজুরদের বংশধররা, বউ ছেলেমেয়েরা প্রতি অমাবস্যায় ওই খনিতে পৌঁছে যাই। দীয়া জ্বালাই, মোম জ্বালাই ওদের শান্তির জন্য। আজও তেমনই একটা অমাবস্যা বাবুজি। ঠিক এমনই একটা অমাবস্যাতেই যে খনির মজুররা মরেছিল অনেক বছর আগে।'

'টিকলি আমাকেও নিয়ে চল তোমার সঙ্গে। আমি যাব।' বলে উঠল কিংশুক।

'বেশ তো আমার পিছে পিছে আসুন বাবুজি। আসল জায়গার একদম কাছেই তো আছি আমরা'। বলেই এবার অদ্ভুতভাবে হাসল মেয়েটা। কিংশুক এগোনর জন্য যেই পা বাড়াল অমনি ওর হাত চেপে ধরল তমাল। ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,

'আমাদের এক্ষুনি ফিরতে হবে কিংশুক। আমি চেয়েছিলাম সবকিছু বাঁচাতে ধ্বংসের হাত থেকে। তাই তোকে জোর করে, ভয় দেখিয়ে নিয়ে এসেছিলাম এখানে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আরও আগে আমাদের আসা দরকার ছিল। আরও আগে ওই খনিতে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে আসা উচিত ছিল ওই নেগেটিভ এনার্জির কাছে । কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে। ক্ষমা চাওয়ার আর অবকাশ নেই। এখন যা চেষ্টা করার কলকাতা ফিরেই করতে হবে। এখন ওই খনির পথে পা বাড়ালে আমরা দুজনেই কীটের মতো মরব।'

'জাস্ট শাট আপ এন্ড গেট লস্ট'। বলে তীব্র গতিতে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিল কিংশুক। মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করতে শুরু টিকলি নামের ওই অচেনা মেয়েটাকে।

******

অদ্ভুত এক ভঙ্গিমায় ওদের থেকে অল্প তফাত রেখে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে চলেছে টিকলি। কী রকম অদ্ভুত যেন লাগছে তাকে রাতের অন্ধকার জড়ান শুনশান রাস্তায়। মনে হচ্ছে যেন হাওয়ায় ভাসিয়ে রেখেছে মেয়েটা নিজের শরীরটা। কিংশুক মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে চলেছে টিকলিকে অনুসরণ করে। আসলে ও ছেলেটাই এরকম। চরিত্র বলতে একেবারে কিছু নেই। ও হয়তো ভাবছে এবার নানা অছিলায় এই মেয়েটার ঘনিষ্ঠ হবে। তারপর হয়তো আরও বার কয়েক এখানে চলে আসবে 'সাইট' দেখার বাহানায়। কালক্রমে মেয়েটাকে প্রেমের জালে ফাঁসিয়ে তাকে নিয়ে যাবে নিজের বিছানায়। কিংশুক তো এমনটাই। কিন্তু তমাল এর ষষ্ঠইন্দ্রিয় তো ওকে খুব স্পষ্টভাবে জানান দিচ্ছে যে আর নিস্তার নেই। কালব্যাপী আটকে থাকা ওই দুষ্টশক্তির চক্রব্যুহে আটকে পড়েছে ওরা। সে শক্তিকে অগ্রাহ্য করে খনি চালাতে গিয়ে যেমন ভাবে একসময় মরেছিল বহু মানুষ তেমনি এবার হয়তো ওদের পালা। আরও বেশি রক্তপিপাসা নিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ঐ রক্তলোলুপ শক্তি।

তমাল দেখছে কিংশুক এখনও নির্বাকভাবে কলের পুতুলের মতো অনুসরণ করেই চলেছে টিকলিকে। তমালেরও নিজের মস্তিষ্ক কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে ক্রমে ক্রমে। নিজের হাত পা যেন নিজেরই বশে নেই। কোনো তৃতীয় শক্তি যেন পরিচালনা করছে ওদের সেটা বেশ অনুভব করতে পারছে তমাল। কিংশুকও কি একই রকম কিছু অনুভব করছে? তমাল বুঝতে পারছে চাইলেও নিজের গতিকে রুদ্ধ করতে পারবে না এখন। যন্ত্রচালিতের মতো গড়গড় করে এগিয়েই চলেছে টিকলি নামের ঐ অপরিচিত মেয়েটার পদাঙ্ক অনুসরণ করে।

'কিংশুক ... এই কিংশুক''... বন্ধুকে ডাকতে গেল তমাল। কিন্তু ও বোধহয় শুনতেই পেল না একেবারে এক হাত দূরত্বের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও। আর ঠিক তখনই তমাল বুঝতে পারল ওরা ইতিমধ্যেই এসে পৌঁছেছে কুড়ি বছরেরও বেশি সময় ধরে পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে থাকা সেই অভিশপ্ত খনিতে। বোধহয় ওই খনি থেকে খুব বেশি দূরে ছিলই না ওরা। মিনিট সাতেক হবে। তাই অল্প কিছুটা হেঁটেই পৌঁছে গেছে সঠিক জায়গায়। সেই খাঁ খাঁ করা শুনশান পাহাড়ি প্রান্তর। কেউ কোথাও নেই। একটা কনকনে ঠান্ডা বাতাস ঝাপটা মেরে চলেছে ক্রমাগত। একটা অপার্থিব নিস্তব্ধতা দুর্ভেদ্য কালো অন্ধকারে মুড়ে রেখছে চারিদিক। কিন্তু একি! চারপাশটা হঠাৎ এত বেশি অন্ধকার লাগছে কেন? একটু আগেও তো এমন ছিল না। টিকলির হাতের ফ্যাকাসে সাদা আলোটা তো জেগেই ছিল অন্ধকারের বুক চিরে। কিন্তু সে আলোটা হঠাৎ গেল কোথায়? টিকলিই বা গেল কোথায়? আর এখানে তো কেউ নেই কোথাও শুধু একরাশ গাঢ় অন্ধকার আর দমচাপা আতঙ্কের কামড় ছাড়া। তবে মেয়েটা যে বলেছিল এখানে নাকি আজ মৃত মজুরদের বাড়ির লোকদের প্রার্থনা করতে আসার দিন!

অন্ধকারে নিজের পকেট হাতড়ে মোবাইলটা কোনোরকমে বের করল তমাল। সার্চ লাইটটা জ্বালাল কোনো মতে। কিন্তু একি এত ক্ষীণ আলো আসছে কেন? চার্জ ফুরিয়ে এসেছে নাকি? কিন্তু সেই ক্ষীণ আলোতেই দেখতে পেল ওর পাশেই কিংশুক দাঁড়িয়ে রয়েছে চূড়ান্ত ভয়ার্ত মুখে। মোবাইলের আলো জ্বলতে দেখেই সে বলে উঠল,

'তমাল, আমার ভীষণ ভয় করছে রে। চারদিকে এত অন্ধকার কেন? টিকলিই বা কোথায় উবে গেল আচমকা? ও যে বলেছিল আজ এখানে এখন লোকজন থাকবে, সবাই দীয়া মোম এইসব জ্বালাবে'......

'আমরা আটকে পড়েছি রে। যে নেগেটিভ এনার্জির কথা বলেছিলাম, তারই চক্রব্যূহে আমরা আটকে পড়েছি। আমি জানি না এর থেকে বের হতে পারব কিনা। তবে চেষ্টা তো করতেই হবে আমাদের। তুই শুভ শক্তির কথা ভাব। মনের সবটুকু জোর একত্র করে দৈব শক্তির কথা ভাব। ঈশ্বরের চিন্তা কর আর মনে মনে ক্ষমা প্রার্থনা কর এই অশুভ শক্তির কাছে কারণ এই জায়গাটাকে তুই বদলে ফেলতে চেয়েছিলি'। কিংশুকের কথা মাঝপথে থামিয়েই তাড়াহুড়ো করে বলে উঠল তমাল।

'বেশ। তাই করছি। আমি তাই করছি রে।' দু-হাত জোড় করে কপালে ঠেকাতেই যাচ্ছিল কিংশুক, কিন্তু ঠিক তখনই শূন্য থেকে যেন ভেসে এল টিকলির গলা।

'বাবুজি এদিকে আসুন। এদিকে আসুন, আমার কাছে আসুন। আমি এদিকে অপেক্ষা করছি তো আপনার জন্য'। ফ্যাসফ্যাসে অথচ আবেশ জড়ান অদ্ভুত একটা স্বরে ভেসে এল কথাগুলো। না টিকলিকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু মনে হচ্ছে তার গলা স্বর খুব কাছ থেকেই উড়ে আসছে যেন। টিকলির গলা শুনতে পাওয়া মাত্রই কী যেন হয়ে গেল কিংশুকের। সেই স্বর লক্ষ্য করে পাগলের মতো দৌড় লাগাল ও।

'আমি আসছি টিকলি ...' বলে অন্ধকার পেরিয়েই এলোপাথাড়ি দিশাহীন ভাবে ছুটে গেল ও।

'কিংশুক দাঁড়া, যাস না তুই। আমি বলছি তুই যাস না'। নিজের আপ্রাণ চেষ্টায় কোনোমতে কথাটা বলল তমাল। মনে হচ্ছে সহসা যেন ওর গলাটা আটকে গেছে। হাজার চেষ্টা করলেও যেন স্বর বেরোবে না ওর গলা থেকে এমনটাই মনে হচ্ছে তমালের। এদিকে মোবাইলের আলো ফিকে থেকে ফিকেতর হয়ে আসছে এবার। তমাল চেষ্টা করছে মরিয়া হয়ে কিংশুকের সাহায্যার্থে যাবার, কিন্তু কিছুতেই পারছে না। মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন পৃথিবীর সব থেকে বেশি শক্তিশালী আঠা দিয়ে মাটির সাথে সেঁটে দিয়েছে ওর পা দুটো। কিন্তু তবুও চেষ্টা করেই যাচ্ছে তমাল, এক চুল হলেও এগোবার। ষষ্ঠইন্দ্রিয় যে আবার সংকেত পাঠাচ্ছে। সে জানান দিচ্ছে মারাত্মক কোনো বিপদ ঘটতে চলেছে এবার। নেতিবাচক ওই শক্তিটা অসাড় করে দিচ্ছে ওকে সেটা বেশ বুঝতে পারছে তমাল। সে শক্তিই নির্ঘাত চেপে বসেছে কিংশুকের ওপরেও টিকলির ছদ্মবেশে, সে বিষয়ে এখন আর কোনো সন্দেহ নেই ওর।

'তমাল, তমাল আ... আ... বাঁচা আমায়। তমাল ...ল ল...' মিনিট কয়েকের মধ্যেই কিংশুকের গলায় একটা যন্ত্রণাক্লিষ্ট চিৎকার ভেসে এল অন্ধকারের বুক চিরে। ভয়াবহ সেই মরণ চিৎকারের প্রতিধ্বনি বিচ্ছুরিত হচ্ছে অশুভ শক্তির অভিশাপ জড়ানো এই ক্লেদাক্ত পাহাড়ি বাতাসে। এবার নিজের মনের সবটুকু সাহস আর শুভ ভাবনাকে প্রাণপণে একত্র করার চেষ্টা করল তমাল। মরিয়া প্রচেষ্টা করল এগোবার। হ্যাঁ শুভ শক্তির জোর আছে বইকি। পা দুটো অসম্ভব ভারী ঠেকলেও এবার কোনোমতে নিজের শরীরটা টেনে নিয়ে এগোতে পারছে তমাল, মোবাইলের ওই ফিকে আলোটাকে সঙ্গী করে। কয়েক পা এগোতেই দেখতে পেল ও দৃশ্যটা। মাটিতে পড়ে নিজের গলা চেপে ধরে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে কিংশুক। আর বলি চড়ান পশুর মতো ছটফট করছে অদ্ভুতভাবে।

'কিংশুক, কী হয়েছে তোর'? বন্ধুর কাছে গিয়ে তার গায়ে হাত দিয়ে জিজ্ঞাসা করল তমাল।

'আমার দম আটকে আসছে তমাল। গলার ভিতরে যেন কেউ ছুরি চালিয়ে দিয়েছে মনে হচ্ছে। আমার সারা শরীরে অদ্ভুত জ্বালা। মনে হচ্ছে যেন জীবন্ত পুড়ে মরছি আমি'। কোনোমতে কথাটুকু বলেই নিথর হয়ে গেল কিংশুক, ওর মুখের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের সরু ধারা।

'কিংশুক, কিংশুক কী হল তোর? কিচ্ছু হবে না তোর। এই নোংরা অশুভ শক্তিকে হারিয়ে দিয়ে পালাতেই হবে আমাদের'। তমাল শেষ কথাটা বলা মাত্রই ঘটে গেল এক অদ্ভুত বীভৎস ঘটনা। ও দেখতে পেল মুহূর্তের মাঝে অন্ধকার মোড়া এই জনমানবহীন প্রান্তরে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে এক অপার্থিব স্যাঁতসেতে নীল আলো। সারা শরীর পলকেই শিউরে উঠল তমালের। এ কোন আলো? মনে হচ্ছে যেন নরক থেকে চুইয়ে পড়ছে কোনো অভিশপ্ত নীলচে বাতির রেখা। কী ভীষণ দুর্গন্ধে সহসা ভরে গেছে চারিদিক। কী সব শব্দ হচ্ছে যেন। পাওয়া যাচ্ছে কিছু মানুষের গলার আওয়াজও।

'কে? কে আছেন এখানে'? বীভৎস ভয়ার্ত গলায় হেঁকে উঠল তমাল। ও বুঝতে পারছে কোনো নারকীয় শক্তি এবার ওর একেবারে খুব কাছ এসে পড়েছে। হঠাৎ করে বইতে শুরু করল এক অদ্ভুত সর্বগ্রাসী ক্ষ্যাপাটে ঝোড়ো হাওয়া। আর সেই হাওয়া আর নিলচে আলোর মাঝেই তমাল দেখতে পেল ওকে ঘিরে চারপাশে ছড়িয়ে রয়েছে একদল মানুষ। সকলের একই রকম পোশাক পরা, সরু সরু কঙ্কালসার তাদের শরীর আর সারা মুখে কালির ছোপ। ঠোঁটের পাশে জেগে রয়েছে শুকনো রক্তের দাগ। এদের সবার একই পোশাক কেন? এরাই কি তবে এই খনির সেই শ্রমিকরা যারা বহু বছর আগে কদর্যভাবে মরেছিল এখানে?

'কিংশুক ওঠ, এক্ষুনি পালাতে হবে আমাদের। ওঠ ভাই। আর যে সময় নেই। যে ভয়টা পেয়েছিলাম সেটাই হল শেষ অবধি। ওরা ঘিরে ফেলেছে আমাদের। সব মৃত শ্রমিকের আত্মাকে এখন দাস বানিয়ে ফেলেছে ঐ শয়তান শক্তি'। না আর উঠছে না কিংশুক। চিরজীবনের মতোই নিথর হয়ে গেছে ও। কিন্তু তমাল বোধ হয় বুঝতেই পারছে না সেটা। পাগলের মত ও ঝাঁকিয়েই চলেছে বন্ধুর অসাড় শরীরটা। কিন্তু বেশিক্ষণ না, কয়েক মুহূর্তের মাঝেই তমালের গলা চিরেও বেরিয়ে এল এক গগনভেদী মৃত্যু চিৎকার।

'আ... আ... আ'...... মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ছটফট করছে তমাল। ওর মাথার ঠিক মাঝখানে অসহ্য যন্ত্রণা। কেউ যেন দুশো মণের ভারী লোহার গদা নিয়ে আঘাত করেছে ওর মাথায়, এমনটাই মনে হল তমালের। অমানুষিক যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে ও। কাতরাতে কাতরাতে এক সময় স্থবির হয়ে গেল তমালের শরীরটাও, আবার চারদিক মুড়ে গেল ঘন কালো অন্ধকারে, সর্বত্র শুধুই পড়ে রইল অখণ্ড নির্জনতা।

খোলা জানালার ওপার থেকে বৃষ্টিঝরা দিনটাকে একদৃষ্টে দেখছিল জোনাকি দত্ত। আবার চোখ দুটো জলে ভরে এল তার। বৃষ্টি দেখতে ছেলেটা ছোটবেলায় কী ভালোই না বাসত! কেন এভাবে পুত্রহারা হতে হল শুধু তাকেই? আজ এত অর্থ, ঐশ্বর্য সবই তো মূল্যহীন, যে মায়ের কোল থেকে তার একমাত্র ছেলে চলে যায় তার আর কি থাকে জীবনে! মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে চলে গেল ছেলেটা, আর শুধু রেখে গেল একরাশ প্রশ্ন, যে প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই চলে যাবে অসহায় মা বাবার বাকি জীবনটা।

হ্যাঁ ছেলেটা খামখেয়ালি ছিল, দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিল, হয়তো স্বভাবের দোষও ছিল ; কিন্তু তবু সে ছিল তো কোলজুড়ে। দেখতে দেখতে আজ ছয়মাস হয়ে গেল তার চলে যাওয়ার। সবকিছুর জন্য দায়ী ওই লোকটা। কেশব দত্ত। হ্যাঁ ওই লোকটাকে নিজের স্বামী ভাবতেই ঘেন্না করে জোনাকির। বাবা হয়ে সে কী করে পারল নিজের ছেলেকে এভাবে বিপদের মাঝে ছুঁড়ে দিতে? একটাই কথা তখন বারবার বলত লোকটা, 'ছেলেটা অপদার্থ হয়ে যাচ্ছে দিনদিন তাই তাকে মানুষ করতে হবে'। এই ছিল তাকে মানুষ করার পরিণাম? সেই সময় জোনাকি যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেত যে ছেলেটাকে বড় দায়িত্ব দেবার নাম করে একটা অভিশপ্ত, পরিত্যক্ত খনি দেখার কাজে পাঠাচ্ছে কেশব তাহলে কিছুতেই জোনাকি যেতে দিতে না কিংশুককে।

'জোনাকি, সারা সকাল বয়ে গেল তুমি তো কিছুই খেলে না। এভাবে প্রতিদিন আর কত চোখের জল ফেলবে তুমি'? নরম স্বরেই স্ত্রীকে কথাটা জিজ্ঞাসা করলেন কেশব দত্ত। তিনি ঘরে এসেছেন সকালের মিটিংগুলো সেরে রোজকার মতোই।

'তোমার জন্য শেষ হয়ে গেছে আমার খোকা। তুমি মেরে ফেলেছ ওকে'। পলকেই হিংস্র হয়ে উঠল জোনাকি দত্ত।

'বিশ্বাস কর আমি বুঝিনি যে এত বড় সর্বনাশ হয়ে যাবে আমাদের। আমি শুধু চেয়েছিলাম ছেলেটার কাজে মতিগতি ফিরুক। এত বড় ব্যবসার দায়িত্ব ও সামলাতে পারে যাতে ভবিষ্যতে আমি শুধু সেইটুকুই চেয়েছিলাম। আর শুধুমাত্র সেই কারণেই ওকে একটা কঠিন কাজের দায়িত্ব দিয়ে পরখ করে নিতে চেয়েছিলাম'। নিজেকে এবং স্ত্রীকে কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতেই কথাগুলো বললেন কেশব দত্ত। সত্যি কথা বলতে কী, কিংশুকের মৃত্যুর জন্য আজ নিজেকেই সম্পূর্ণ দায়ী মনে করেন কেশব। আজও মনে পড়ে ছয়মাসের আগের সেই বিভীষিকাময় দিনটা যখন সেই ফোনটার দুঃসংবাদ গরম সিসার মতো কেউ ঢেলে দিয়েছিল কেশবের কানে।

'স্যার, আপনার ছেলে কিংশুকের খুব বড় এক্সিডেন্ট ঘটে গেছে। ওই খনি তে পড়ে ছিল কিংশুক আর তার বন্ধুর দেহ। এক্ষুনি আপনাকে একবার মুসৌরি আসতে হবে।'

মুসৌরি পৌঁছেছিলেন তড়িঘড়ি কেশব। সামনে রাখা ছিল একমাত্র ছেলের নিথর দেহটা। কেশব জানতে পেরেছিলেন আগের রাতেই নাকি কিংশুক আর তমাল গিয়েছিল ওই খনিতে। ওরা নাকি পান্ডেকে সন্ধ্যাবেলায় ফোন করে একজন গাইড পাঠাতে বলেছিল। কিন্তু স্বভাবতই ওই অভিশপ্ত জায়গায় যেতে কেউ রাজি হয়নি রাতের অন্ধকারে, শুধু তাই নয় পান্ডে নাকি ওদেরও যেতে বারণ করেছিল। কিন্তু কেন তবুও রাতের অন্ধকারে ওখানে গেছিল ওরা? অল্প দূরে ওদের গাড়িটাও পাওয়া গিয়েছিল। পোস্টমর্টেম রিপোর্ট থেকে জানা গেছিল ওইদিন রাতেই মৃত্যু হয়েছিল কিংশুকের, হঠাৎ করে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া ছিল ওর মৃত্যুর কারণ। কিন্তু কেন? এমন একটা জোয়ান ছেলের হঠাৎ করে শ্বাসরোধ হয়ে যেতে পারে কী করে? কিংশুকের মৃত দেহের থেকে অল্প দূরেই পড়ে ছিল ওর বন্ধু তমালের দেহটা। না নিষ্প্রাণ নয়, আধমরা। তার মাথায় ছিল ভারী কিছু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন। কিন্তু কে মাথায় আঘাত করতে পারে তমালকে? আর কেনই বা করবে কেউ এমন? না এই প্রশ্নেরও উত্তর মেলে না। কারণ তমালকে হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছিল গুরুতর অসুস্থ অবস্থায়। টানা তিনদিন অজ্ঞান ছিল সে। আর চেতনা ফেরার পর দেখা গেল তমাল সম্পূর্ণভাবে মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছে। সে এখন বদ্ধ উন্মাদ। মাথায় বিপুল আঘাতের কারণেই হয়েছে এমনটা। না, কোনো প্রশ্নটার উত্তর মেলেনি। জানা যায়নি কেন সেদিন রাতের অন্ধকারে ওরা দুজন গিয়েছিল ঐ খনিতে, জানা যায়নি কিংশুকের রহস্যময় মৃত্যুর কারণ, জানা যায়নি তমালের এই ভয়াবহ পরিণতির কারণ। ওখানকার কিছু স্থানীয় মানুষ বলেছিল ওখানে নাকি পৈশাচিক শক্তির বাস। সেই মৃত মজুরদের আত্মাই নাকি জাদুবলে টেনে নিয়ে গিয়েছিল ওদের কোনভাবে নিজেদের ঘাঁটিতে, তারপর তারাই মেরেছে ওদের। এর আগেও নাকি বহুবার এমন হয়েছে। ওখানে মানুষের উপস্থিতি নাকি সহ্য করতে পারে না ওই বন্দি আত্মা দল। তাই তারাই নাকি বারবার মানুষ মারার খেলায় মেতে ওঠে। কিন্তু এই সব আজগুবি কথা তো আর কোনো যুক্তিবাদী মানুষ মানতে পারে না। তাই স্বাভাবিকভাবেই কেশবও পারেননি। তাই তার কাছে আজও নিজের সন্তানের মৃত্যুরহস্য সম্পূর্ণ অজানা।

'আমি তমালের কাছে যাব। এক্ষুনি আমায় নিয়ে চল। আমি জানতে চাই কে মেরে ফেলেছে আমার খোকাকে? আমি জানতে চাই কী দোষ ছিল আমার খোকার? ও তো একমাত্র জানে সবটা। তুমি আমায় এক্ষুনি নিয়ে চল সেখানে'। হঠাৎ ছেলেমানুষের মতো অস্থির হয়ে উঠল জোনাকি। তারপরেই ডুকরে কেঁদে উঠল বাচ্চা মেয়ের মতো।

'সেখানে গিয়ে কী হবে জোনাকি? এর আগেও তো গেছ বেশ কয়েকবার। কিন্তু কোনো লাভ কি হয়েছে? দেখতেই তো পেয়েছ তার কী অবস্থা। মরে বেঁচে আছে সে। বদ্ধ উন্মাদ। সে তোমার প্রশ্নের কী উত্তর দেবে বল।'

'না আমি জানি না। আজ ছয়মাস হয়ে গেল আমার খোকা নেই। তবুও তার মৃত্যুর কোনো কিনারা হল না। এটা আমি মা হয়ে কিছুতে মেনে নিতে পারছি না। তুমি না নিয়ে গেলে আমি নিজেই চলে যাচ্ছি'। পাগলের মতো করছে জোনাকি।

'আচ্ছা। বেশ। তুমি শান্ত হও। আমি নিয়ে যাব তোমায় তমালের কাছে। আজই নিয়ে যাব'।

যুবকটা আবার এখন একটা ছোট কাঠের টুকরো নিয়ে মেঝেতে ঘষে চলেছে একমনে। ওর গরাদের বাইরে এসে এবার থামল লোকটা। মানে এই পাগলা গারদেরই গার্ড। পাগলটাকে তো দেখছে মাস ছয়েক। এমনিতে শান্তই থাকে, কিন্তু মাঝে মাঝে বীভৎস ক্ষেপে যায়। ভয়ে কাঁটা হয়ে দিয়ে চিৎকার শুরু করে। বারবার বলতে থাকে ওকে নাকি কারা মেরে ফেলতে আসছে। নিজের গলা চেপে ধরে চিৎকার শুরু করে। বলে নাকি রক্ত উঠছে ওর গলা চিরে। শুকনো মেঝের দিকে আঙুল দেখিয়ে চেঁচায়, বলে মেঝেতে নাকি ছড়িয়ে পড়ছে ওর রক্ত। উফফ! ছয় মাসেও কোনো উন্নতি হল না ৩১২ নম্বর এর।

হ্যাঁ এটাই এখন ওর পরিচয়। ৩১২ নম্বর। তমাল ব্যানার্জি নামটা আজ আর কারোর মনে নেই। ওর নিজেরও বোধহয় নেই। মুসৌরির সেই রাত ওর জীবনটা বদলে দিয়েছে পুরোপুরি। আজও প্রতি মুহূর্তে ওর সঙ্গী শুধুই আতঙ্ক। কাউকে সেটা বোঝাতে পারে না ও। পাগলা গারদের এই বদ্ধ কুঠুরিতে থাকতে থাকতে বাইরের পৃথিবীটাকে পুরোপুরিই ভুলে গেছে। এই স্যাঁতসেতে মেঝে, এই নোনা ধরা দেওয়ালের ঘরই এখন ওর পরম আপনজন। কিন্তু এইটুকুও তো মাঝে মাঝে হারিয়ে যায় ওর থেকে। এই ছোট্ট ফালি ঘর মাঝে মাঝেই বদলে যায় শুনশান সর্বগ্রাসী উপত্যকা খনির দৃশ্যপটে। ও আবার দেখতে পায় সেই নীলচে নারকীয় আলো, বহু লিকলিকে কঙ্কালসার খনি মজুর যাদের পচা গলা দেহগুলো ধেয়ে আসছে ওর দিকে। আর ওরা যত এগিয়ে আসতে থাকে তত বাড়তে থাকে ওর বুকের মধ্যে অসহ্য একটা কষ্ট। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে, কাশির সাথে বুক চিরে যেন রক্ত বেরিয়ে আসে। ওর মনে হয় এবার বুঝি প্রাণটা বেরিয়েই যাবে ওর।

'এই ৩১২ নম্বর, তোর ভিজিটর আছে। একদম ভালোভাবে কথা বলবি' কর্কশ গলায় আদেশের ভঙ্গিতে কথাটা বলল গার্ড। সাথে সাথেই প্রায় সামনে এগিয়ে এল এক আলুথালু বেশের ভদ্রমহিলা।

নিজের অশক্ত শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল ৩১২ নম্বর পাগল। ঘোলাটে চোখে দেখছে সে ভদ্রমহিলাকে। একটু চেনা লাগছে কি?

'বল তুমি তমাল সেদিন কী হয়েছিল? কে মেরে ফেলেছে আমার খোকাকে? তোমারই বা এমন অবস্থা হল কী করে? বল বাবা। আজ আর আমায় খালি হাতে ফিরিয়ে দিও না'। হাউহাউ করে কাঁদছে গরাদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা।

'নীল আলো ... নীল আলো ... নেগেটিভ এনার্জি। নীল আলো মেরে ফেলেছে। নীল আলোটা নরকের'। এলোমেলো কতগুলো শব্দ বলে চলেছে ৩১২ নম্বর।

'ম্যাডাম এর কোনো উন্নতি নেই। এর কাছ থেকে আপনি কিছু জানতে পারবেন না। কেন আসেন বারবার কষ্ট করে'? গার্ডটা বলল জোনাকি দত্তকে।

'ও কিছু বলুক বা না বলুক, আমি আর চুপ করে থাকব না। আমার ছেলের মৃত্যুর রহস্য আমি উদ্ধার করবই। আমি ঠিক করে নিয়েছি আমি মুসৌরি যাব লোকজন সঙ্গে নিয়ে। আমি ওই খনিতেও যাব। রাতও কাটাব। আমি দেখতে চাই কী শক্তি আছে ওখানে? সত্যি কোনো অপশক্তি নাকি কোনো স্মাগলিং চক্র যার বলি হতে হল আমার সন্তানকে। আমি নিজে চোখে দেখে নেব সবটা'। নিজেকে শোনানোর জন্যই যেন কথাগুলো বলে উঠল জোনাকি দত্ত।

'না আআ না আআ ... মরবে ... মরবে'... হিংস্র ভাবে আবার চিৎকার শুরু করল ৩১২ নম্বর পাগল। সেদিকে দৃকপাত করল না আর জোনাকি দত্ত। সে চলে গেল বেরোবার দরজার দিকে।

'না আ আ... না আআ'... হিংস্র হয়ে উঠছে আবার ৩১২ নম্বর। ঝটপট ফোন করল গার্ড কাউকে একটা। তড়িৎ গতিতে চলে এল নার্স। ঝট করে পাগলটাকে ফুটিয়ে দিল দক্ষ হাতে ইনজেকশান। আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়ছে ৩১২ নম্বর। ঘুমে ঢলে পড়ছে সে। কিন্তু বন্ধ চোখেও সে দেখতে পাচ্ছে আবার সেই নারকীয় নীল আলো জ্বলে উঠছে পরিত্যক্ত খনিতে রাতের ঘন কালো অন্ধকারের মাঝে। ঝপঝপ করে পড়ছে একের পর এক লাশ। মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে জোনাকি দত্ত, মরছে তার সাথে ওই খনিতে যাওয়া বাকি আরও অনেকগুলো মানুষ। পর পর সারিবদ্ধ ভাবে জমছে লাশ। আর পৈশাচিক উল্লাসে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে মুসৌরির পরিত্যক্ত খনিরূপী এক মৃত্যু উপত্যকা।

—সমাপ্ত—

নেপথ্য কাহিনি —মৃত্যু উপত্যকা

মৃত্যু উপত্যকা একটি সম্পূর্ণ কল্পিত কাহিনি। এই কাহিনিটির সমস্ত চরিত্র কাল্পনিক। কিন্তু এই কাহিনির প্রেক্ষাপটটি নির্মিত হয়েছে ভারতবর্ষের এক অন্যতম ভৌতিক স্থান 'লম্বি দেহের মাইনস'-এর আদলে।

প্রসঙ্গ —লম্বি দেহের মাইনস

'লম্বি দেহের মাইনস' ভারতবর্ষের অন্যতম একটি ভৌতিক স্থান হিসেবে চিহ্নিত। মুসৌরির কোলে অবস্থিত এককালীন এই জাগ্রত খনিটির মৃত হয়ে পড়ার এবং ভৌতিক হিসেবে পরিচিত হবার পিছনে দায়ী মর্মান্তিক কিছু মৃত্যু।

এই খনিটিতে মূলত চলত চুনা পাথর (Lime Stone)এর খনন কাজ। কিন্তু এখানকার খনি শ্রমিকদের জন্য ছিল না পর্যাপ্ত সুরক্ষার ব্যবস্থা। এমনকী যে খনন পদ্ধতি অবলম্বন করে এখানে খনন প্রক্রিয়া চালান হত সেটিও সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত ছিল না। দিনের পর দিন অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে খননকার্য চালাতে চালাতে এখানকার শ্রমিকরা ভয়াবহ এক ফুসফুসের অসুখে আক্রান্ত হয়ে পড়তে থাকে, যার ফলে বিপুল সংখ্যক খনি শ্রমিকের মৃত্যু ঘটতে থাকে শ্বাসরোধ ও রক্ত কাশি হয়ে। অফ দ্য রেকর্ড পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে মারা যায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার খনি মজুর যার মধ্যে সিংহভাগের মৃত্যুই ঘটেছিল নব্বই এর দশকের শুরুর দিকে। ১৯৯৬ সালে কোর্টের নির্দেশে পুরোপুরি ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এই 'লম্বি দেহের মাইনস'। তখন থেকে আজ অবধি এই খনি বন্ধই পড়ে আছে, এখানে সচরাচর কেউ যায় না। পরিত্যক্ত এই খনি ও তার ব্লক অফিস এখন আগাছার জঙ্গল। দিনের বেলায় মাঝে মাঝে কিছু পিকনিক এর দল, শুটিং পার্টি বা পর্যটক পরিদর্শনের জন্য এই জায়গাটিতে গেলেও সূর্যাস্তের পর অর্থাৎ অন্ধকার নামলে এখানে কেউ যেতে চান না।

স্থানীয় মানুষদের মতে লম্বি দেহের মাইনস পুরোপুরি অভিশপ্ত ও ভৌতিক। তারা মনে করেন মৃত শ্রমিকদের আত্মা আজও অধিষ্ঠান করে এখানে। তাদের মতে সূর্যাস্তের পর নাকি এই পরিত্যক্ত শুনশান এরিয়া থেকে ভেসে আসতে শোনা যায় যন্ত্রণাক্লিষ্ট কিছু মানুষের চিৎকার যেটাকে তারা মনে করেন ওই মৃত আত্মাদের গোঙানির শব্দ। সূর্যাস্তের পর সচরাচর কেউ ওই দিকে তেমন যাতায়াত করেন না, কিন্তু দু-একবার যারা কোনো প্রয়োজনে রাতের অন্ধকারে গেছেন ওদিকে তারা নাকি দেখতে পেয়েছেন রহস্যময় কিছু ছায়ামূর্তি। তারা শুনতেও পেয়েছেন কিছু অদ্ভুত শব্দ যেগুলো তাদের মতে কোনো অপার্থিব শব্দ। শুধু স্থানীয় মানুষরা নন, সূর্যাস্তের পর ওদিকে গিয়েছেন এমন কিছু টুরিস্টদের কাছ থেকেও অনেক সময় জানা গেছে তাদের অস্বস্তিকর অনুভূতির কথা ঐ বিশেষ জায়গাটিকে ঘিরে। স্থানীয় বহু লোকের মতো রাতের অন্ধকারে এই খনি এলাকায় নাকি প্রায়ই ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় এক রহস্যময় নারীমূর্তিকে যেটা তাদের মতে এক সাক্ষাৎ 'চুরেল' অর্থাৎ ডাইনি বা প্রেতিনী। প্যারানর্মাল সোসাইটির অন্যতম মুখ পাত্র গৌরব তিয়ারীর রিপোর্ট অনুসারেও 'লম্বি দেহের মাইনস' এ রাতের অন্ধকারে বেশ কিছু বিচিত্র অস্বস্তিকর অনুভূতির মুখোমুখি তিনি হয়েছেন।

'লম্বি দেহের মাইনস' এ সত্যি কোনো অপার্থিব শক্তি আছে কিনা তার কোনো মূর্ত প্রমাণ নেই ঠিকই তবে এটাও ঠিক যে এই জায়গায় একাধিক বার একাধিক দুর্ঘটনা ঘটেছে খনি বন্ধ হয়ে যাবার বহু সময় পরেও। কখনো এখানে ঘটে গেছে মর্মান্তিক ট্রাক দুর্ঘটনা, কখনো ঘটেছে গাড়ি এক্সিডেন্ট, আবার কখনো ঘটে গেছে বীভৎস ভাবে হেলিকপ্টার ক্রাশ এর মতো বিশ্রী দুর্ঘটনা। প্রাণ গেছে বহু মানুষের। এই ঘটনাগুলিই এখানকার মানুষদের মনে এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেছে যে এই জায়গাটি অভিশপ্ত এবং এখানে আজও আটকে পড়ে রয়েছে মর্মান্তিক ভাবে মৃত্যুর শিকার হওয়া সহস্রাধিক খনি শ্রমিকের অতৃপ্ত আত্মা।

'লম্বি দেহের মাইনস' এর হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যুর করুণ ইতিহাস এবং সেই ঘিরে প্রচলিত নানা বিশ্বাস আর তারই সাথে ঘটে যাওয়া পরবর্তীকালীন কিছু মর্মান্তিক ঘটনা মুসৌরির এই জায়গাকে করে তুলেছে দেশের অন্যতম ভৌতিক জায়গা এবং সেই প্রেক্ষাপটে ও ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে আমার এই কাল্পনিক কাহিনিটি।

অধ্যায় ৫ / ৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%