ননীচোরের মোহনবাঁশি

বাণীব্রত গোস্বামী

গল্পটা শুরু করার আগে, দু-একটা কথা বলে নেওয়া বিশেষ প্রয়োজন। একটি সত্য ঘটনার ছায়া অবলম্বনে গল্পটি লেখা। নাম পরিবর্তিত হলেও এ কাহিনির আমি চাক্ষুষ সাক্ষী। এটি একটি বাঁশির গল্প। ঐতিহাসিকভাবে অমূল্য সে বাঁশি। যে বাঁশির গায়ে লেগে আছে রক্তের দাগ, একটা নির্মম মৃত্যু। যার সুরে অবৈধ পরকীয়া প্রেমের মূর্ছনা, আর প্রতিটি পরতে রহস্যের জাল। ক্ষুরধার বুদ্ধির অস্ত্রে সেই জাল কেটে রহস্য উন্মোচন করতে আমি প্রতি পলে পাশ থেকে দেখেছি। যতটা পারলাম, তুলে ধরার চেষ্টা করছি। শুরু করা যাক।

মির্জাপুরের মেসবাড়ির দোতলার ছোট্ট ঘর। বাইরে ঝিমঝিম বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের ভেতর তক্তোপোশে বসে প্রত্যুষ সেন আর আমি অপূর্ব কর, যথাক্রমে হিন্দুস্কুলের বিজ্ঞান ও অঙ্কন শিক্ষক। এছাড়াও একটা পরিচয় আছে আমাদের, প্রত্যুষ শখের গোয়েন্দা, আর আমি লালবাজারের ফ্রিলান্স ক্রিমিনাল কম্পোজিট আর্টিস্ট, মানে ওই মৌখিক বর্ণনা শুনে যারা আন্দাজে অপরাধীদের কাল্পনিক ছবি আঁকে। তাই লালবাজারে একটু আধটু জানাশোনা আছে। ‘নরখাদক, বিকৃত মনোরোগী' কেসটা সমাধানের পর অল্প নামডাকও হয়েছে। মুড়ি আর গরম তেলেভাজা নিয়ে সবে দাবার ঘুঁটিগুলো সাজাচ্ছি, প্রত্যুষের মোবাইল বেজে উঠল। আমি বললাম, ‘ছাড়ো তো জাংক।’ প্রত্যুষ ভুরু কুঁচকে ঘাড় নেড়ে বলে উঠল ‘মনে হচ্ছে বুদ্ধির জং-এ আবার শান দিতে হবে।’

‘হ্যালো?’

‘নমস্কার, আমি চন্দননগর থেকে উদয় মহারাজ শেঠ বলছি, দিন পনেরো হল আমাদের কুলপুরোহিত মশাই খুন হয়েছেন, পুলিশ তদন্ত করছে, কিন্তু গতকাল একটা হুমকির চিঠি পেয়েছি, খুব আতঙ্কে আছি। আপনাকে একবার ‌আসতে হবে, অমত করবেন না। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব।’ এক নিঃশ্বাসে উনি কথাগুলো বলে গেলেন।

‘গাড়ি পাঠাতে হবে না। আমি ট্রেনেই যাব।’

‘ধন্যবাদ, আমাকে নিশ্চিন্ত করলেন। কখন আসছেন যদি দয়া করে জানিয়ে দেন, তাহলে স্টেশনে গাড়ি থাকবে।’

ঘাড় ঘুরিয়ে প্রত্যুষ বলল, ‘অপু কাল ভোর পাঁচটায় উঠতে হবে।’

‘স্কুলে তো আর ছুটি নেই?’

‘আরে, সামনে জন্মাষ্টমী, স্বাধীনতা দিবস, আর রবিবার ‌নিয়ে তিনদিন এমনিই ছুটি, এক-দুদিন কামাই হলে হবে।’

বুঝলাম আমার আর কিছুই করার নেই। অগত্যা মধুসূদন! যেতে আমাদের হচ্ছেই। তাহলে গোছগাছের ফাঁকে নিজেদের পরিচয়টা দিয়ে দিই। আমার নিজের সম্পর্কে বিশেষ কিছুই বলার মতো নেই। উচ্চতা খর্বাকায়, একেবারেই সাদামাটা দোহারা চেহারা। পুরুষ মানুষ হিসেবে আকর্ষণ নেই বললেই চলে। তবে ওই, হাতে তুলি নিলে রং-চং দিয়ে বেশ ছবি আঁকতে পারি, আর বাথরুমে ঢুকে গলা ছেড়ে দু'কলি গান গাইতে পারি। হ্যাঁ! তবে বর্ণনা করতে গেলে প্রত্যুষের কথা বলেও সুখ। পুরুষ মানুষ হো তো অ্যায়সা! চেহারা যেন ছেনি দিয়ে পাথরে খোদাই করা মাইকেল এঞ্জেলোর মূর্তি। উচ্চতা প্রায় ছ’ফুটের ওপর। ক্যারাটেতে ব্ল্যাক বেল্ট চাম্পিয়ানের প্রমাণ সারা চেহারায় ফুটে উঠেছে। এককথায় চাবুকের মতো নির্মেদ বলিষ্ঠ চেহারা। ফর্সা মুখের ওপর নাকটা তীক্ষ্ণ হলেও ওর মূল আকর্ষণ হল চোখ। অসম্ভব গভীর বুদ্ধিদীপ্ত আর ক্ষুরধার দৃষ্টিসম্পন্ন। চোখের শ্যেন দৃষ্টি যেন মানুষের শরীর ভেদ করে তার মনের যাবতীয় ভাষা পড়ে নিতে পারে। তবে আমার পাল্লায় পড়ে মাঝেমধ্যে গলা সাধতে চায়, কিন্তু সুরে অসুর হলেও গাওয়ার সাহসটা আমার থেকে বেশি। তবে ওর গানে একটা রহস্যের আভাস থাকে সবসময়। সেটা আর কেউ না বুঝতে পারলেও আমি বুঝি। যে কোনো রহস্যের জাল ছেঁড়ার আগাম পূর্বাভাস থাকে ওর গানের সুরে। ও গান ধরেছে মানে আসলে অপরাধীর কপালে শনি। রহস্যের পর্দা নামতে শুরু করেছে। যে কোনো মুহূর্তে দপ্ করে আলো জ্বলে উঠবে। সবার চোখের সামনে সব দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে যেন কিছুক্ষণের মধ্যেই। তবে গম্ভীর হলেও একটা চাপা রসিকতা আছে সবসময় ওর ভেতরে।

সকাল সাতটায় ব্যান্ডেল লোকালে উঠে উদয়বাবুকে ফোন করে দিল প্রত্যুষ। চন্দননগর স্টেশনে নামার পর এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন। বছর চল্লিশ বয়স। হাত জোড় করে বললেন, ‘নমস্কার, আমি পরিতোষ বাগচী। ও-বাড়ির ম্যানেজার‌, বাজার সরকার, যা বলবেন। আসুন।’

‘আমাদের আপনি চিনলেন কী করে?’

‘আরে…, আপনারা এখন বিখ্যাত মানুষ। কাগজে ছবি দেখেছি।’

‘চলুন।’ বলে প্রত্যুষ আর আমি এগিয়ে যেতে লাগলাম।

গাড়িতে বসে প্রত্যুষ জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যাপারটা একটু খুলে বলবেন।’

‘আমায় মাপ করবেন। যা বলার বড়োসাহেবই বলবেন। বাকি যা যখন দরকার লাগবে আমাকে বলতে পারেন।’

চন্দননগর শহরটা গাড়ি থেকে এক ঝলকে দেখে যেটুকু বুঝলাম, খুবই বর্ধিষ্ণু শহর। বেশ প্রাচীন। চারদিকে ফরাসি স্থাপত্য মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কোনোদিনই সেভাবে এই শহরকে কবজা করতে পারেনি। ফরাসিরা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ব্রিটিশদের থেকে অনেকটাই এগিয়ে। তার ছাপ এই শহরে সুস্পষ্ট। বেশ কিছু গির্জা, স্কুল, লাইব্রেরি, সরকারি দপ্তর ফরাসি গঠনশৈলীর আদলে গড়া। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন একটি শহর। আগে এর নাম ছিল ফরাসডাঙ্গা। ফরাসিরা চলে যাওয়ার পর আমরা এই শহরের নাম চন্দননগর বলেই সবাই জানি। নতুন শহরকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখার ফাঁকেই এসে গেল উদয়বাবুদের বাড়ি।

বিশাল জমিদার বাড়ির আদলে বাড়ি। বড়ো সিংহদরজা। গেটে দারোয়ান। ভেতরে বাগান। বাগান পেরিয়ে দুধসাদা শ্বেতপাথরের সিঁড়ি দিয়ে উঠে পুব দিকের একটা ‌ঘরে নিয়ে গিয়ে পরিতোষ বলল, ‘এটা আপনাদের ঘর, লাগোয়া বাথরুম আছে। আপনারা ‌ফ্রেশ হয়ে নিন, নীচে জলখাবারের টেবিলে বড়ো সাহেব দেখা করবেন। উনি আজ নিজে বাজারে গেছেন।’

দারুণ ঘর। বিছানায় ধবধবে সাদা চাদর। পূর্ব দিকের জানলা খুলতেই মা গঙ্গা। ঘর লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে প্রত্যুষ সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘ক’দিন মনে হচ্ছে ভালোই কাটবে।’

ন’টা নাগাদ পরিতোষ এসে খাবারের টেবিলে নিয়ে গেল। এলাহি আয়োজন। লুচি, ছোলার ডাল, তরকারি, আর থালা ভরতি অনেক রকম মিষ্টি। এক মিনিটের মধ্যেই উদয় মহারাজ চলে এলেন। গোলাপি গায়ের রং, সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা, সারা শরীরে আর্থিক স্বচ্ছলতার ছাপ স্পষ্ট। এক কথায় সুপুরুষ।

‘নমস্কার, দুঃখিত, একটু দেরি হয়ে গেল। নিন শুরু করুন। খেতে খেতে গল্প করা যাবে।’

প্রত্যুষ আপাদমস্তক একবার তাকিয়ে নিয়ে খেতে শুরু করে বলল, ‘হ্যাঁ বলুন।’

উদয়বাবু শুরু করলেন, ‘দিন পনেরো আগে, রাত্রি দশটা, সাড়ে-দশটা হবে, আমি টিভি দেখছি, হঠাৎ ঠাকুর-বাড়ির দিক থেকে একটানা আওয়াজ। আমরা সবাই ছুটে গেলাম। গিয়ে যে দৃশ্য দেখলাম, তা অকল্পনীয়। ঠাকুরমশাই উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। রক্তে ভেসে যাচ্ছে ঠাকুরদালান। পিছনের খিড়কির দরজা খোলা। ঠাকুরের গয়নাগাটি,‌ বাসনপত্র‌ কিছুই চুরি যায়নি।’

‘ওটা কি খোলাই থাকে?’

‘না, ওটা শুধু রবিবার খোলা থাকে। দারোয়ান ঝগড়ু খুলে দেয়। জমাদার আসে, চলে গেলে বন্ধ করে দেয়।’

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?’

প্রত্যুষ থামিয়ে বলে, ‘জলভরা, আর রসমাধুরীটা খেয়ে দেখো, এটা পয়সা দিলেও আর কোথাও পাবে না। আচ্ছা উদয়বাবু, আঘাতটা কোথায় ছিল?’

‘ঠাকুরের পিলসুজ দিয়ে মাথার পিছনে আঘাত করেছিল। কী নৃশংস! একটা আশি বছরের নিরীহ, নিষ্পাপ, শত্রুহীন মানুষকে কেউ এইভাবে যে মারতে পারে, তা অবিশ্বাস্য। উনি দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর রাতে ওইসময় এসে ঠাকুর ‘শয়ন’ দিয়ে যান। তারপর পরশু দিন এই চিঠিটা পাই।’

সাদা খামটা হাতে নিয়ে প্রত্যুষ দেখল, কোনো স্ট্যাম্প নেই, মানে কেউ সরাসরি ফেলে দিয়ে গেছে। চিঠিতে লেখা, ’সাবধান! পরিবারের কাউকে হারাতে পারেন। কথা শুনলে মঙ্গল হবে।’

‘আপনার বাড়িতে আর কে কে আছে?’

‘আমি বসার ঘরে সবাইকে ডাকছি, আজ রবিবার, সবার সঙ্গেই আলাপ‌ করিয়ে দেব। চলুন। তবে আপনি‌ আসার পর অনেকটা নিশ্চিন্ত বোধ করছি।’

বিশাল ড্রয়িং রুম। দেওয়ালে বাঘ, হরিণ, বাইসনের মাথা লাগানো। বংশের ঐতিহ্য আর বীরত্বের নিদর্শন। ঘরভরতি লোক। কাজের লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে, বাড়ির লোকেরা সবাই বসে।

পরিচয়পর্ব শুরু হল।

উদয়বাবুর স্ত্রী ছন্দারানি, মেজ ভাই প্রলয়, তার স্ত্রী কৃষ্ণা, ছোটো ভাই নিলয়, তার স্ত্রী মিলি, বড়ো ভাই মানে, উদয়বাবুর ছেলে প্রতীপ, তার বউ ঝুমকি, মেজ ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোটো ভাইয়ের এক ছেলে, এক মেয়ে দুজনেই নেই, কারণ পড়তে গেছে। আর উদয় বাবুর নাতি বল্টু। বছর ছয়েক বয়স। কাজের লোক; তিনজন মহিলা, আর ফাই-ফরমাশ খাটে হরি, মালি বলরাম।

প্রত্যুষ সবাইকে নমস্কার জানিয়ে বলল, ‘আমার যখন যাকে প্রয়োজন কথা বলে নেব। আপনারা সহযোগিতা করলে, আশা করি ঠাকুরমশায়ের খুনি ঠিক ধরা পড়বে। এখন একটু বাড়িটা ঘুরে দেখব।’

উদয়বাবু বলে উঠলেন, ‘আপনার এখন কাউকে কিছু জিজ্ঞেস ‌করার নেই! ঠিক আছে, পরিতোষ আপনাদের সব ঘুরে দেখাবে। আমি একটু বেরোব। দুপুরে খাওয়ার সময় আবার দেখা হবে।’

বিশাল বাগান। আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, আরও কত ফলের গাছ। একদিকে ফুলের বাগান। আর একদিকে ঘাট-বাঁধানো ছোটো পুকুর। মাঝখানে দশ-বারোটা সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঠাকুর-দালান। প্রণাম করে উঠল‌ প্রত্যুষ আর পিছনে আমি। সারা দালানে ছোটো ছোটো মার্বেলের ফলক। সব পূর্বপুরুষদের নাম লেখা। চন্দ্রবিন্দুর ছড়াছড়ি। প্রায় ফুট পাঁচেকের কালো কষ্টিপাথরের কৃষ্ণমূর্তি, রাধারানি একটু ছোটো। লোহার শিকের দরজার পাশে একটা ফলক। তাতে লেখা।

‘অষ্টতর শতনাম পেল নারায়ণ।

অষ্টপত্নী মাঝে সুখী রাখালরাজন।।

তবু রাধা‌ বিনা‌ কানু যেন শেষে হল ফণী।

বাজবে নাদীর ছিদ্রসম, গুণময় সে ননী।।’

মোবাইলটা বার করে ফলকটার একটা ছবি তুলে আমাকে প্রত্যুষ বলল, ‘চলো এবার গঙ্গার ধারে।‌ রবীন্দ্রনাথের পাতাল বাড়িটা দেখে আসি।‌ পরিতোষবাবু আপনার কিছু কাজকর্ম থাকলে করুন। আমরা একাই যাই।’

পরিতোষ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।

চন্দননগর স্ট্যান্ড রোডে গঙ্গার ধারে গিয়ে বসলাম আমরা দুজন। জায়গাটা অদ্ভুত সুন্দর। পাতাল বাড়িটার মাটির নীচে দুটো তলা। দেওয়ালে সারাক্ষণ গঙ্গাজল লেগে ঘর ঠান্ডা থাকত। কত যুগ আগে কী অসাধারণ প্রযুক্তি! রবীন্দ্রনাথ মাঝেমধ্যেই এসে এখানে থাকতেন। ওঁর অনেক বিশ্ববন্দিত অমূল্য সৃষ্টির নীরব সাক্ষী এই পাতালবাড়ি। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এখন ঢোকা বন্ধ।‌ পাতালবাড়ি দেখে‌ আমরা একটু দূরে গঙ্গার ধারে একটা বেঞ্চে বসলাম।

আমি জানি, ‘প্রত্যুষ যখন কোনো গভীর চিন্তা করে, ও‌ সুন্দর কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকে। কোনো কথা বলে না।’

হঠাৎ ও একটা লাল ইঁট তুলে নিল।‌ বেঞ্চের ওপর লিখল,‌ (১০৮+৮-১)=১১৫, তারপর লিখল ৫৭×৮=৪৫৬, কী বুঝলে?

আমি ঘাড় নেড়ে বললাম ‘কিচ্ছু‌ না।’

‘শোনো, অষ্টতর শতনাম মানে ১০৮, যোগ অষ্টপত্নী, মানে ১১৬, কিন্তু জোড় সংখ্যার অর্ধেক হয়, মাঝখান হয় না। তাই 'রাধা বিনা' মানে বিয়োগ ১, ‘মণি হারা ফণীর’ বদলে ‌লেখা আছে, ‘শেষে হল ফণী’। মানে খেয়াল করো, ১১৬-১ হল ১১৫ মানে 115, ইংরেজি পাঁচের মাথায় একটা সাপের জিভ লাগাও, দেখবে একদম ফণী। ‘মাঝে রাখালরাজন' এর অর্থ এপাশে ৫৭ ওপাশে ৫৭। এইবার এস শেষ লাইনে। প্রাচীন বেদে, বাঁশিকে নাদী বলা হয়েছে। বাঁশির ছিদ্র ক’টা দেখেছ? একটা বাজাবার, আর আটটা বাজার। এখানে ‘বাজবে নাদী ছিদ্রসম' মানে আটই নিতে হবে। এবং ‘গুণময় ননী' মানে আট দিয়ে গুণ। অর্থাৎ‌ ৫৭×৮=৪৫৬। এবার পরিষ্কার? দুধ নয়, এই ননী কিন্তু মাথা ঘেঁটে বার করতে হবে।’

‘কিন্তু এই সংখ্যা কী কাজে ‌লাগবে?’

‘সেটা বড়ো কথা নয়, কিন্তু সমাধান না করে কিছু মাথায় নিয়ে ঘোরা যায় না। তবে মনে হচ্ছে সংখ্যাটা কোনো কিছুর পাসওয়ার্ড। বাকিটা ইলিশ মাছ খেতে ‌খেতে বলব। তবে এই সংখ্যার জন্যই খুন। এখন চলো গঙ্গাস্নান।’

‘ইলিশ মাছ কী করে জানলে?’

‘বেরোবার সময় গন্ধটা খেয়াল করোনি? রান্নাঘর থেকে আসছিল।’

পরিতোষ বাবু হরিকে তেল, সাবান তোয়ালে দিয়ে ‌গঙ্গাস্নানের ব্যবস্থা করে দিল। প্রত্যুষ স্রোতের উলটোদিকে পাড় বরাবর খানিকটা সাঁতার কেটে আবার ফিরে এল। হরির সঙ্গে গল্প হল। ছোটো বাবু আর ছোটো বউদির সুখ্যাতিই বেশি করল হরি। মনে হয়, বকশিশটা ওখান থেকেই বেশি পায়। ফিরে এসে প্রত্যুষ বলল, ‘ওদিকটায় ভালো জঙ্গল আছে। একটা ছোটো পরিত্যক্ত লঞ্চঘাটও দেখলাম। ঘুরতে ঘুরতে বিকেলের দিকে যাব।’

আমি ভাবতে লাগলাম, এই ওর এক দোষ, যে কোনো কেস নিলে এমন জট পাকিয়ে দেবে প্রথমে, মাথাটা একদম‌ গুলিয়ে যাবে।

খাবার টেবিলে সবাই আবার একত্রিত হলাম। তিন বউ নিজের হাতে পরিবেশন করছে। ছোটো বউ প্রত্যুষের পাতে জোর করে আরও একটা ইলিশ মাছ দিল। ঝুমকি আমার পাতের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ওঁকে দাও।’ প্রত্যুষ উদয় বাবুকে জিজ্ঞেস করল, ‘ঠাকুর দালানে একটা সূত্র দেখলাম ওটা কীসের?’

উদয়বাবু একটু হকচকিয়ে গিয়ে, তারপর শুরু করলেন, ‘হ্যাঁ, ওই বাঁশির কথাটা আপনাকে বলা হয়নি। আমাদের কৃষ্ণের বাঁশির একটা আলাদা ইতিহাস আছে। আমাদের গুরুবংশ হল গোস্বামীঘাটের গোস্বামীরা। ওদের আদি পুরুষ হলেন সনাতন গোস্বামী। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রধান অনুগামী ও সর্বক্ষণের সঙ্গী। আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে, মহাপ্রভু তাঁর বৃন্দাবন ভ্রমণের পর ফিরে এসে এই বাঁশিটি ‌সনাতন গোস্বামীকে আশীর্বাদ স্বরূপ উপহার দেন। আমাদের পূর্বপুরুষ মহারাজ স্বর্ণনারায়ণ শেঠ তাঁর গুরুদেব সনাতন গোস্বামীর বংশধর ইন্দুভূষণ গোস্বামীর থেকে এই বাঁশিটি রক্ষা করার দায়িত্ব পান। তারপর প্রায় তিনশো বছর আগে, মহারাজ রত্ননারায়ণ যখন আমাদের পুরোনো মন্দির ভেঙে এই নতুন মন্দির তৈরি করেন, তখন এই চন্দননগরে ফরাসি আমলের সূত্রপাত।‌ ফ্রেঞ্চ ভাইসরয় জোসেফ ফ্র্যাঙ্কোশ ডুপ্লে, তাঁর খুব কাছের মানুষ ছিলেন। কারণ ফ্রান্সে‌ তখন আমাদের ‌বস্ত্র রপ্তানি হত।‌ তিনিই এই মন্দিরের উদ্বোধন করেন। আর সেই সময় থেকেই চন্দননগরের নাম ফরাসডাঙ্গা হিসাবে প্রচলিত হয়। তারপর তিনি ফ্রান্সের বিখ্যাত ক্লাবসেফ কোম্পানির থেকে বাঁশিটির মাঝখানের প্যাঁচে একটা কম্বিনেশন লক লাগান। বাঁশির দুদিকে দুটো হাতির মাথা। লক না খুললে বাঁশি বার করা যাবে না। তাহলে ঠাকুরের পাথরের আঙুল ভাঙতে হবে। লক খোলার পাসওয়ার্ড এ বংশের বড়ো ছেলেরই শুধু জানার অধিকার আছে। ব্যাংকের লকারে বন্ধ খামে পাসওয়ার্ড রাখা আছে। তাই বড়ো ছেলে হিসেবে আমিই শুধু জানি, তবে আমি কুলোপুরোহিতকে সংখ্যাটা বলেছিলাম। ওঁর বিশ্বস্ততা প্রশ্নাতীত। ওই বাঁশিটার যেন কোনো ক্ষতি না হয়, দেখবেন। তবে ওই লেখাটার অর্থ নিয়ে কোনোদিনই মাথা ঘামাইনি।’

আমি বললাম, ‘তাহলে তো বাঁশিটির মূল্য আকাশছোঁয়া। এর ঐতিহাসিক মূল্য তো অপরিসীম।’

‘হ্যাঁ প্রাইসলেস। তাছাড়া সম্পূর্ণ সোনার ওপর তিন রঙের সাদা, গোলাপি আর নীল হিরে বসানো। বিদেশেও এসব জিনিসের খুব চাহিদা।’

প্রত্যুষ এতক্ষণ কাঁটা বেছে ইলিশ মাছ খেয়েই চলেছে। মাথা নীচু করেই প্রশ্ন করল, ‘মাইক্রোআর্টে কী লেখা আছে?’

‘ও! বলতে ভুলে গেছি। গীতার কিছু শ্লোক ওতে লেখা আছে। আপনি কী করে জানলেন?’

‘পঞ্চদশ শতাব্দীতে এই শিল্পের খুব কদর হয়েছিল। আর তাছাড়া দূর থেকে দেখে মনে হল শুধু কল্কা নয়, কিছু একটা সংস্কৃত অক্ষরে লেখা। তবে ইলিশ মাছটা কিন্তু দারুণ।’

‘দাঁড়ান, মোদকের দই আছে।’

মেজভাই, ছোটোভাইও টুকটাক গল্প করছে। প্রতীপ নরখাদকের গল্পটা শুনতে চাইল। প্রত্যুষ আমার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ও ভালো বলতে পারবে। ইদানীং আবার সাহিত্যিক হয়েছে।’

প্রত্যুষ আসলে যখন খায়, কথা কম বলে। আর বাকিদের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখে। ও কখনওই শুধু একটা কাজ করে না। একসঙ্গে দু-তিনটে কাজ করতে পারে। ও বলে, মানুষের খাওয়ার ধরনের মধ্যে দিয়ে তার চরিত্র ও মনের অবস্থা ফুটে ওঠে।

খাওয়ার পর ঘরে এসে সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘নিলয়বাবু আর পরিতোষের খাওয়াটা দেখলে, এত ভালো খাবার, তাও কোনো তৃপ্তি নেই। ওদের পেটে অনেক কথা ‌আছে। বার করতে হবে। ঘুমোলে হজম হবে না।’

ছাদে একটা আওয়াজ হচ্ছে।

প্রত্যুষ বলল, ‘চলো ছাদে যাই।’

ছাদে গিয়ে দেখলাম, বল্টু ব্যাট করছে, পরিতোষ বল করছে। প্রত্যুষকে দেখে বল্টু জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি গোয়েন্দা? ভট্চায দাদুর খুনিকে ধরবে?’

প্রত্যুষ বলল, ‘তুমি জানো কে খুন করেছে?’

‘হ্যাঁ…।’

‘কে…?’

‘দাদু বলেছে, ঘরের শত্রু বিভীষণকে খুঁজে বার করতে হবে।’

‘তুমি জানো‌, বিভীষণ কে?’

‘বিভীষণ ভালো লোক না দুষ্টু লোক?’

পরিতোষ বলল, ‘বল্টু ব্যাট করো। না হলে আমি নীচে চলে যাই।’

প্রত্যুষ একটা সিগারেট বার করে পরিতোষের দিকে বাড়িয়ে দিল, পরিতোষ ইতস্তত করে নিল। প্রত্যুষ জিজ্ঞেস করল,‌ ‘ব্যবসার ভাগটা একটু বলুন তো।’

পরিতোষ বলল, ‘কাপড়ের ব্যবসা পেয়েছেন উদয়বাবু, চালডালের আড়ৎ পেয়েছেন প্রলয়বাবু,‌ আর কলকাতায় শেয়ারের ব্যবসা দেখেন নিলয়বাবু।’

‘ব্যবসার হাল কীরকম?’

‘লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারে চালডালের আড়ৎ আর কাপড়পট্টিতে কাপড়ের কারবার ভালোই চলছে। তবে কলকাতার শেয়ারের ব্যবসার কী খবর, আমার জানা নেই। আর প্রতীপকে ওর বাবা মশলার ব্যবসা করে দিয়েছে।’

‘আর বাঁশির ব্যাপারটা?’

‘ওটা ‌আমার বিষয় নয়।’

‘কিন্তু সূত্রটা তো এতদিন আছেন, খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই।’

‘আপনি ‌কি আমাকে সন্দেহ করেন?’

‘না, তাহলে আপনি পালিয়ে যেতেন। উদয়বাবুর মুখে শুনেছি, আপনার তো সাতকুলে কেউ নেই। এখানেই কি‌ এইভাবে জীবন কাটিয়ে দেবেন?’

‘কিছু ঠিক করিনি, তবে একটা মায়া পড়ে গেছে।’

‘মায়া না প্রেম?’

‘কী বলছেন প্রত্যুষবাবু, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘এই‌ যে রাধা-কৃষ্ণের প্রেম, এও তো‌ লীলাময় মায়া, তবে যাই বলুন, অবৈধ প্রেমের মজাটাই আলাদা।’

‘বামন হয়ে চাঁদে না হাত বাড়ানোই ভালো। আমার কী আছে বলুন তো,‌‌ কে প্রেম করবে আমার সঙ্গে?’

‘আর চাঁদ যদি বামনের হাতের মধ্যে চলে আসে, বা আগে থেকেই থাকে।’

এবার পরিতোষ আর চেপে রাখতে পারল না নিজেকে। ভেঙে পড়ল আমাদের সামনে।

‘হ্যাঁ মিলিকে আমি আগে থেকে ‌চিনতাম। কিন্তু আমি কোনো অপরাধ করিনি। ও আমার গ্ৰামের মেয়ে। আমরা পরস্পরকে ভালোবাসতাম। এ বাড়িতে ম্যানেজারের চাকরির খবরটা ওই আমাকে দেয়।‌ চাকরিটা হয়েও যায়। সেই থেকেই আছি। এটা জানাজানি হলে আমার চাকরিটা চলে যাবে।’

‘আমি তো এটা তদন্ত করতে আসিনি, আপনার কোনো চিন্তা নেই। কারণ খুন বা চুরি কোনোটাই আপনি ‌করবেন না। আর ছেলেমেয়ে ছেড়ে মিলি আপনার হাত ধরে পালাবে না। যেমন চালাচ্ছেন, আরামসে চালিয়ে যান। শুধু শুধু খাওয়ার সময় পাতের ওপর ডাল দিয়ে 'সাবধান' লিখে মিলিকে সতর্ক করতে গেলেন কেন? আপনি এখন আসতে পারেন।’

বেশ ঘাবড়ে গেল পরিতোষ এবার। কী বলবে বুঝে উঠতে পারছে না। আমি হেসে একটু পরিবেশটা সহজ করলাম। তারপর…

‘নমস্কার,’ বলে পরিতোষ চলে গেল।

বল্টু আগেই নীচে নেমে গেছে। আমরাও ঘরে চলে এলাম। বিকেলের চা নিয়ে বাড়ির ছোটো বউ দরজায় টোকা দিল। প্রত্যুষ বলল, ‘আসুন, আমি জানতাম আপনি আসবেন।’

উদয়বাবুর ছোটো ভাই নিলয়বাবুর স্ত্রী মিলি, হাতজোড় করে শুরু করল, ‘একটা অনুরোধ আছে, আমার স্বামীর ব্যাপারে একটা গোপন কথা আছে।’

‘অত ইতস্তত করার দরকার নেই, যা বলার সরাসরি বলুন।’

‘আমার স্বামী বাজারে ও পাড়ায়, মানে ওই বাজে পাড়ায় যায়, ওখানে ওঁর একজন রক্ষিতা আছে। নাম নীলিমা। এই ব্যাপারটা যেন পরিবারে জানাজানি না হয়। একটু দেখবেন।’

‘আর পরিতোষ?’

‘না, মানে…, ইয়ে, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘আপনি না বুঝতে পারলে তো আমাকে অনেক কেঁচো খুঁড়তে হবে, তখন কেউটে বেরিয়ে গেলে আমাকে দোষ দেবেন ন।’

এবার মিলি আত্মসমর্পণ করল। নীচু স্বরে সব কথাই খুলে বলা শুরু করল।

‘পরিতোষ আমার বাপের বাড়ি ধনেখালির ছেলে। আমরা দুজন দুজনকে ভালোবাসতাম। আমার বাবার তাঁত ছিল, কাপড় বুনতেন। আমার শ্বশুরমশাই সেসব কিনে নিতেন। আমি একদিন বাবার কারখানায় ছিলাম, উনি আমাকে দেখলেন, পছন্দ হয়ে গেল, আমাকে নিজের ছোটো ছেলের বউ করে নিয়ে যাবার ইচ্ছে হল ওঁর। বাবাকে কথাটা পাড়লেন। বড়ো ঘর, বাবা রাজিও হয়ে গেলেন। ব্যস! বিয়ে হয়ে গেল।’

‘কিন্তু চোখের আড়ালে পরিতোষ গেলেও মনের আড়ালে তো গেল না। আবার তো চোখের সামনে নিয়ে এলেন। কেন?’

‘ভুল‌ করেছি, প্রতিদিন আমাকে বলে, চলো পালাই। আমি বলি, তোমার টাকা পয়সা যা লাগবে ‌বল, আমি দেব। সোনাদানা ‌লাগলেও দেব। তুমি এখান থেকে চলে যাও। ও বলে, না, গেলে তোমাকে নিয়ে যাব। এই নিয়ে আমার খুব অশান্তি। কিন্তু আপনি দেখবেন আমার স্বামীর যেন কোনো অসম্মান না হয়। আমি আসি।’

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘কী বুঝলে?’

‘বৃন্দাবনের বাগানে বসে বংশী বাজায় বাঁশরী। বুঝলে! নারী মনের রহস্য, দেবা ন জানন্তি, কুত মনুষ্য। চল গোস্বামীঘাট‌ ঘুরে আসি। হেঁটেই যাব।’

‘তুমি চেনো?’

‘দেখো, আমার তো আর সিধু জ্যাঠা নেই, তবে গুগুলকাকা আছে।’

আমরা হাঁটতে লাগলাম। বোড়াইচন্ডীতলা হয়ে শ্মশান পেরিয়ে গোস্বামীঘাট। ওখানে গিয়ে জানতে পারলাম, গোস্বামীদের ইতিহাস জানতে গেলে নির্মল গোস্বামী হলেন সঠিক ব্যক্তি। ওঁর বাড়ি খুঁজে ওঁর সঙ্গে দেখা করলাম। ভারী সজ্জন মানুষ। সাত্ত্বিক বংশ, কথা-বার্তায় বোঝা যায়। আসল যে কথাটা জানা গেল যে, ঠাকুরমশাই মারা যাওয়ার দিন পড়ে গিয়ে রাধারানি’র বিগ্ৰহের পা ভেঙে গিয়েছিল। ওঁর কাছে বিধান নিতে এসেছিল, কী করা উচিত। উনি বলেছিলেন যে এখনই নতুন বিগ্ৰহ জয়পুর থেকে আনার প্রয়োজন নেই, পুরোনো বিগ্ৰহের পা স্ক্রু দিয়ে লাগিয়ে নিতে। সেই মতোই এখন চলছে। তার মানে সেদিন ধস্তাধস্তি হয়েছিল।

ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা প্রবর্তক স্কুলের পিছনে ‌পরিত্যক্ত লঞ্চঘাটের দিকে হাঁটা লাগালাম। এদিকটা গভীর জঙ্গল। কেন যাচ্ছি জানি না। চার-পাঁচটা ছেলে বসে গাঁজা খাচ্ছে। বলে উঠল, ‘কাকা ওদিকটা ফাঁকা। ভয় করবে তো!’

প্রত্যুষ বলে উঠল, ‘না ভাই তোমরা আছ তো।’

আমি জানি ও রেগে গেলে এরকম ঠান্ডা মাথায় কথা বলে। না হলে, সর্ব ভারতীয় স্কাউটে ফার্স্ট, ক্যারাটে ব্ল্যাক বেল্ট, এরকম চার-পাঁচটা ভাইপোকে জবাব দিতে ওর এক মিনিট লাগবে। কিন্তু অপ্রয়োজন। এদিকটা খুবই নির্জন। আলোও নেই। দুধারে ঝোপের মাঝখান দিয়ে হাঁটাপথ। গঙ্গার ধার অবধি গিয়ে আমরা আবার বটতলার সামনে রাস্তায় এসে উঠলাম। মানে গড়ের ধার। এখানে গড় মানে বড়ো ড্রেন। সামনেই গড়ান।‌ মানে ঢালু রাস্তা। আমরা চড়াইতে উঠতে লাগলাম। বোড়াইচন্ডীতলায় এসে প্রত্যুষ এক লাফে একটা রিক্সায় উঠে বসল, আমাকে ইশারায় ডাকল।

বলল, ‘বাজার চল।’

বাজারে নেমে একটা সরু গলিতে ঢুকল।

আমি বললাম, ‘কোথায় ঢুকছ?’

ও‌ বলল, ‘চা খেতে।’

গলির দুধারে মেয়েরা সেজেগুজে দাঁড়িয়ে, গায়ে গা লেগে যাবার জোগাড়। সবাই হাসাহাসি করছে। আমরা যে আনকোরা বোঝাই যায়। যাই হোক খুঁজে পেতে নীলিমা দেবীর ঘরে ঢুকলাম। ঢোকার সময় কানে এল, নীলিমা কী অফার দিচ্ছে! একসঙ্গে দুজন! একটা নিলে একটা ফ্রি! আর কত কী‌-ই যে কপালে লেখা আছে!

অপরূপ সুন্দরী নীলিমা দেবী। একটু ঢলঢলে গড়ন। যৌবন যাই যাই করেও থমকে গেছে শরীরে। তবে ভীষণ ভদ্র। পরিচয় দিতে যথেষ্ট খাতির করলেন। স্পষ্ট ভাষায় বললেন, ‘বলুন কী জানতে চান?’

প্রত্যুষ বলল, ‘নিলয়বাবু‌ সম্বন্ধে যা জানেন একটু বলুন।’

‘নিলয় আমার কাছে বছর‌ দশেক আসে। মদ্যপান করে। রাত বারোটা সাড়ে বারোটা অবধি থাকে। তবে ইদানীং ওর ব্যবসার অবস্থা ভালো যাচ্ছে না। খুব ‌দুশ্চিন্তা করে। আমার পাশের ঘরে মঙ্গল সিং আসে। ওর কাছ থেকে টাকাও ধার নিয়েছিল। সেই নিয়ে প্রায়ই কথা কাটাকাটি হয়। মঙ্গল লোকটা ভালো নয়। চোরাকারবারির ব্যবসা। খুন, জখম সব কেসই আছে পুলিশের খাতায়। কিছু একটা বড়ো সমস্যায় পড়েছে নিলয়। আপনাদের একটু চা দিতে বলি।’

প্রত্যুষ উঠে দাঁড়াল, হাতজোড় করে বলল, ‘আজ উঠি।’

নীচে নেমে বলল,‌ ‘এবার বুঝলে কেন জঙ্গলে ঢুকলাম। জঙ্গলেই মঙ্গল। এবার চলো মশলা পট্টি ।’

‘আবার মশলা কেন?’

‘আরে মশলা ছাড়া গোয়েন্দা গল্প জমে নাকি?’

প্রতীপের আড়তে গিয়ে দুজনে বসলাম। টুকটাক গল্প চলতে লাগল।

তার মধ্যে দরকারি কথা যেটা বোঝা গেল, পরিতোষকে ও একদম পছন্দ করে না। প্রথম কারণ, ওর বাবা পরিতোষকে খুব বিশ্বাস ও স্নেহ করে। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, ছোটো কাকিমার ব্যাপারটা মনে হয় কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। তবে বাবার ওপর অভিমান আছে। ওর বিয়েতে ওর বাবা পছন্দের থেকে বংশমর্যাদা আর অর্থকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। প্রতীপের মনে হয় একটু শহুরে আর আধুনিকা মেয়েই বেশি পছন্দ ছিল। চারিদিকে কত জটিলতা!

একটু পরে আমরা শেঠবাড়ি ফিরে এলাম। পরিতোষ এসে বলল, ‘বড়োবাবু খাবার টেবিলে অপেক্ষা করছেন। রাতে উনি তাড়াতাড়ি খান।‌ আপনারা গেলে ভালো হয়। চলুন।’

খেতে খেতে প্রত্যুষ উদয়বাবুকে জিজ্ঞেস করল, ‘ছেলের ব্যবসা কীরকম চলছে?’

‘আপনাকে গোপন করে লাভ নেই। ব্যবসায় একদম মন নেই। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ফুর্তি, বারে যাওয়া, ভাবলাম বিয়ে দিলে পরিবর্তন হবে, কোথায় কী! যে কে সেই। বুঝেছেন সবই অর্থের অভিশাপ।’

খাওয়া বেশ ভালোই হল। এবার বড্ড ঘুম পাচ্ছে। সেই ভোর পাঁচটায় উঠেছি। আমরা শুয়ে পড়লাম। আজ আর আমার ডায়েরি লেখা হল না।

পরদিন ভোরবেলা উঠে বারান্দায় দাঁড়ালাম। অপূর্ব দৃশ্য। মেঘলা আকাশ গঙ্গায় মিশে গেছে। ঠিক যেভাবে রহস্যের ভেতরে রোমাঞ্চ মিশে যায়। এক লরি বাঁশ এল শেঠ বাড়ির সামনে। কাল জন্মাষ্টমী। মহোৎসব। প্রত্যুষ এখনও ঘুমোচ্ছে। প্রত্যুষ অনেক দেরি করে উঠল। উদয়বাবু জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে গেলেন। গোয়েন্দা ঘুমোচ্ছে দেখে হয়তো একটু ভেঙেই পড়েছেন। ঘরেই জলখাবার পাঠিয়ে দিয়েছেন। এই লুজ্ বল দেওয়াটা ওর একটা ট্যাকটিস। অপরাধী যাতে মারতে গিয়ে আউট হয়। তবে আজকে ও মুডে আছে। জলখাবার খেতে খেতে বলল, ‘রাধার কী হল অন্তরে ব্যথা, পরে বলব সেসব কথা। এখন একটু থানায় যাব।’

‘একটু আভাস দাও। আমি তো এই কেসে ঢুকতেই পারছি না। আমার কোনো অবদানই থাকছে না।’

‘অভিসারে চলে রাধা, ছাদেরও ঘরে। আর দুঃখ কোরো না। গোলটা তুমিই দেবে। আমি পাশটা বাড়িয়ে দেব।’

‘বুঝেছি, এ…ই সত্যিই মিলি কাল রাতে গিয়েছিল পরিতোষের চিলেকোঠার ঘরে।’

‘ঠিক ধরে নিয়েছ, পরকীয়ার গন্ধ পেলে সবাই গোয়েন্দা।’ গান গেয়ে বলে উঠল, ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই, সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি। সে যে দিন দুপুরে চুরি করে, রাত্তিরে তো কথা নাই।’

‘তুমি হেঁয়ালি করছ? এই তুমি কাল রাতে আড়ি পেতেছিলে?’

‘শোনো জন্মাষ্টমীর পরদিন নন্দোৎসব। তালের বড়া খেলে দেখবে সব পরিষ্কার। তুমি এখন লালবাজার থেকে চন্দননগর থানার বড়োবাবুকে একটা ফোন করিয়ে দাও, যাতে করে কোনো অসুবিধা না হয়।’

‘হ্যাঁ, সেটা করিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু তোমার কি কেসটা সমাধান হয়ে গেছে?’

প্রত্যুষ দৌড়ে দরজার সামনে গেল। দেখে হরি দাঁড়িয়ে, হাতের ঝুড়িতে কটা লুচি। বলে উঠল, ‘মা ঠাকুরন পাঠালেন, আর লুচি লাগবে কিনা।’

‘না, লুচি লাগবে না। তবে তোমায় লাগবে।’

ভয় পেয়ে হরি‌ বলে ‘কেন বাবু?’

‘ভয়‌ নেই। ঠাকুরমশাই যেদিন মারা গেলেন সেদিন কে সবার আগে দৌড়ে এসেছিল? আর কে সবার শেষে এসেছিল?’

‘আজ্ঞে, সবার আগে পরিতোষ বাবু, আর সবার শেষে ছোটো কত্তা মানে নিলয়বাবু। আমি এখন আসব বাবু?’

‘এসো।’

‘তিনতলা থেকে পরিতোষ সবার আগে চলে এল, আর‌ নিলয় বাবুও নেশা না করে সাড়ে দশটার মধ্যে বাড়ি চলে এল। হরি হরি! কেশব। গোপাল।’

আমি বললাম, ‘মানে?’

‘মানে আর কি? চুরি করি, কারা সব? গরুর পাল। চল থানায় যাই।’

থানায় যাবার জন্য রিক্সায় উঠলাম। থানায় ঢুকতেই ইনস্পেকটর মিঃ পালিত বলে উঠলেন, ‘আরে আসুন আসুন, কী ব্যাপার হঠাৎ চন্দননগরে? কোনো কেস নিয়ে, না এমনিই?’

‘না, ওই শেঠ বাড়ির কেসটা নিয়ে।’

‘হ্যাঁ, গয়নাগাটি চুরি করতে এসেছিল, ঠাকুরমশাই হয়তো চিৎকার করতে যাচ্ছিল, প্রদীপের ডান্ডা দিয়ে মাথায় ঝেড়ে দিয়েছে। আশি বছরের বুড়ো, ও আর বাঁচে! প্রদীপটা আমরা সিজ করেছি। তবে যে মেরেছে হাইট সর্ট আছে। এলাকার দু’চারটে ক্রিমিনালকে তুলেছিলাম, মনে হচ্ছে ওরা করেনি। বাইরের কোনো মাল হবে। তবে চুরি কিছু করতে পারেনি। এখন আপনি এসে গেছেন আর কোনো চিন্তা নেই। আমার দিকটা একটু দেখবেন। যে কোনো হেল্প, একটা ফোন করবেন, তুরন্ত চলে যাব।’

‘মঙ্গল সিং, চেনেন?’

‘চিনি মানে, বিলক্ষণ। এপার থেকে চোলাই নিয়ে বেচত আগে ওপারে, নৈহাটী শ্যামনগর কারখানা বেল্টে। এখন চোরাকারবারি করে। দুটো মার্ডার করেছে। হাতেনাতে প্রমাণ পাচ্ছি না। না হলে, শুয়ো…সরি কবে ঢুকিয়ে দিতাম। জামিনে আছে এখন। ওর কাজ নাকি এটা?’

‘না সিওর না, তবে এখন যাব ওর সঙ্গে দেখা করতে।’

‘একা যাবেন না, ডেঞ্জারাস লোক মশাই। আমি সঙ্গে ফোর্স দিয়ে দিচ্ছি। যদি বলেন তো তুলে আনছি। কথা বলে নেবেন। তবে এখন আবার পলিটিকাল কানেকশন করেছে।’

‘বাঘের সঙ্গে দেখা বাঘের গুহায় করতে হয়। তবে বাঘ ভয় পায় আর ভুল করে।’

‘ভালো বলেছেন। তবে আমার নম্বরটা রেখে দিন। কোনো অসুবিধা দেখলে ফোন করবেন। ওর ঠেকটা হল, জগদ্দল লঞ্চঘাটের কাছে একটা বন্ধ জুটমিলের গোডাউনে। শ্যামনগর থানায় সাউজিকে আমি বলে দিচ্ছি। তবু আপনি সাবধানে যাবেন।’

‘আজকে আপনাকে আমার লাগবে না, তবে কালকে লাগতে পারে। এখন উঠি।’

সকালে যখন জামা গুঁজে পরেনি, তখনই জানি আমার কপালে আজ দুঃখ আছে। মানে আজকে ও আর নিরস্ত্র নয়। তবে ব্যবহার না হলেই ‌ভালো। আমার এসব ভয়ও লাগে আবার ছাড়তেও পারি না, ভালোও লাগে। গল্পের রসদ পাওয়ার কিছুটা লোভও আছে। যাই হোক স্ট্যান্ড থেকে ওপারের লঞ্চে উঠলাম, মঙ্গল অভিযানে। প্রাণ হাতে নিয়ে।

ওপারে জগদ্দল ঘাটে নেমে, একটু এগিয়ে মঙ্গলের অফিসের খোঁজ করলাম। একটা ছেলে এগিয়ে এল। সোনালি রং করা চুল, কানে বর্শা-মার্কা দুল, জামার দু’টো বোতাম খোলা, গলার লকেটে একটা ব্লেড। পাশের ছেলেটাকে আস্তে করে বলল, ‘টিকটিকি এসে গেছে সাপের গর্তে। আমি নিয়ে যাচ্ছি। দাদার কাছে।’ আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আসুন।’

বুঝলাম নেটওয়ার্ক খুব ভালোই আছে। লঞ্চঘাটে ওর লোক সবসময়ই থাকে। গোডাউনের ভেতর নিয়ে গেল। একটা বোর্ড রয়েছে 'সিং কনস্ট্রাকশান'। কাচের ঘর, এ.সি.চলছে। দরজা ঠেলে ঢুকলাম। বড়ো চামড়া-মোড়া চেয়ারে মঙ্গল বসে আছে। আপেলের মতো গায়ের রং। সাদা সাফারি পরা। মুখে গুটকা ভরা। বলল, ‘আসেন। আপনি নিজেই ডিলটা করতে এসেছেন, ভালোই হল। না হলে আমিই আদমি পাঠাতাম। বোলেন।’

প্রত্যুষ বলল, ‘তুমি ঠাকুরমশাইকে মারলে কেন?’

‘আপনার কাছে প্রমাণ আছে?’

‘সেটা প্রমাণ করতে সময় লাগবে না। তবে বাঁশিটা তুমি পাবে না।’

বুঝলাম প্রত্যুষ ইচ্ছে করেই ‘তুমি’ বলছে, রাগাবার জন্য।

মঙ্গল একটু হেসেই বলল, ‘কেন এসব লাফড়ায় নিজেকে জোড়াচ্ছেন? এ-একটা ছোটা বাঁসির জন্য বড়া বাঁস খেয়ে যাবেন। তার চেয়ে বোলেন, আপনার রেট কী আছে, তার ডবল লিয়ে নিন। আপনি ভি খুশ, আমি ভি খুশ। বোলেন কী খাবেন, ঠান্ডা না কোফি?’

প্রত্যুষ চোয়াল শক্ত করে চোখে চোখ রেখে বলল, ‘ও বাঁশির কথা তুমি ভুলে যাও মঙ্গল। ওটা তুমি ছুঁতেও পারবে না। এখন ভাবো খুনের কেস থেকে কীভাবে বাঁচবে?’

‘আপনি যদি লোকাল পুলিশের ওপর ভরসা কোরে এসব ডায়লগ দেন, তালে গলতি কোরবেন। এখানে আমি-ই শেস কোথা। তার চেয়ে বোলেন কোতো দিবো, আমি কোন বারগেন কোরব না।’

‘তুমি ভুল করছ মঙ্গল।’

মঙ্গল উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘রাজু… গাড়ি নিকাল। দেখেন সেনবাবু ও বাঁসি পারলে আপনি রুখুন, লেকিন আপনার সেফটির রেজপনছিবিলিটি আমি লিতে পারব না।’ বলে গটগট করে বেরিয়ে গেল।

আমরাও আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলাম। দু’জন আবার জামা তুলে আমাদের যন্ত্রপাতি দেখাল।‌ আমার আগে একটু গা শিরশির করত, এখন আর করে না। তবে প্রত্যুষের কোমরের পিছনে যেটা গোঁজা আছে সেটা ব্রহ্মাস্ত্র। অনেক দাম। প্রত্যুষ বলল, ‘চাউলপট্টিতে জগদ্ধাত্রী প্রণাম করে, কাপড়পট্টিতে প্রলয়বাবুর দোকানে যাব।’

আমি বললাম, ‘খুনি, বাঁশি চোর, সবই তো জানা‌ হয়ে গেল। আবার কী?’

‘শোন, দশফুট উঁচু ফলা আর কাঁটাতার লাগানো ওই পাঁচিল টপকে তো আর লোক ঢুকতে পারবে না। খিড়কি দরজার রহস্য উদ্ধার না হলে বাঁশি নিরাপদ নয়। লঞ্চের ডেকে গুনগুন করতে লাগল, ‘প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুলখেলা, নীরজনে প্রভু নীরজনে খেলিছ।’

আমি দূরে তাকিয়ে আছি যেখানে গঙ্গায় আকাশ মিশেছে। একটু যেন ভয় করছে। ভয়ের কারণ অবশ্যই মঙ্গল। আমার এই বয়সে আমি যেটুকু মানুষ দেখেছি বা চিনেছি তাতে মনে হয় আমরা বেশ ভয়ংকর অপরাধীর সঙ্গে মোকাবিলা করতে যাচ্ছি। সাধারণ চোর ডাকাত খুনি হলে কোনো অসুবিধে ছিল না। কিন্তু এই খলনায়ক হল একাধারে অর্থবান, বুদ্ধিমান ও গভীর জলের চালাক মাছ। যার শিকড় অনেক গভীরে। আর রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে এখন সে, যে সে মাছ নয়, একেবারে রাঘববোয়াল। সাধারণ খ্যাপলা জালে তাকে তোলা যাবে না। বরং তুলতে গেলে ভুলই হবে। ধরা তো যাবেই না, উলটে জাল ছিঁড়ে যেতে পারে। ওপরতলার নেতাদের চাপে উলটে মুখ পুড়তে পারে। বেশ আঁটঘাট বেঁধে হাতেনাতে প্রমাণ ছাড়া এগোনো মনে হয় উচিত হবে না। প্রত্যুষকে কী এটা বুঝিয়ে বলা উচিত? নাকি আগ বাড়িয়ে বেশি কথা বলাটা বেকারই হবে। ও নিজেই যথেষ্ট সাবধানী আর বিচক্ষণ। এইসব ভাবনার ফাঁকেই ঘাটে নৌকো ভিড়ল। আমরা হাঁটতে লাগলাম বাজারের পথে।

চাউলপট্টির ঠাকুর প্রায় তিনশো বছরের প্রাচীন। অনেক ইতিহাস আছে এই পুজোর। প্রত্যুষ বলল, ‘এবার জগদ্ধাত্রী পুজোয় আসতে হবে এখানে।’

প্রলয়বাবুর দোকানটা বেশ বড়ো।

চা খেতে খেতে প্রত্যুষ জিজ্ঞেস করল, ‘ব্যবসা কেমন চলছে।’

প্রলয়বাবু বললেন, ‘এমনি তো ভালোই চলছিল। গত বছর খুব লস খেয়ে গেলাম। দোকানে আগুন লেগেছিল। তবে আমার দাদা দেবতুল্য মানুষ। আবার টাকা ধার দিয়ে আমার ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিল। তবে আমি দাদাকে পার্টনার করে নিয়েছি। দাদা মাথার ওপর থাকলে, আমারও সাহস থাকবে। আর অর্থনীতির যা অবস্থা, বাজার শেষ হয়ে গেছে।’

‘হ্যাঁ, গত দুবছরে অর্থনীতির একটাই ভালো খবর, ওই বাঙালি অভিষেক ব্যানার্জীবাবুর নোবেলপ্রাপ্তি।’

‘আপনারা বাড়ি যাবেন তো, চলুন আমিও বেরোব, একসঙ্গে গাড়িতে চলে যাব।’

আমরা একসঙ্গেই বাড়ি ফিরলাম।

খেয়েদেয়ে উঠে বিছানায় একটু গড়িয়ে নিচ্ছি। প্রত্যুষ বলল ‘আজ সন্ধেবেলা তুমি নিলয়বাবুকে ফলো করবে।’

‘আর তুমি?’

‘আমার কাজ আছে। আমি টুনিলাইট দিয়ে সারা বাড়ি সাজাব। চন্দননগরের ছোটো টুনির কাজ পৃথিবী বিখ্যাত। আমেরিকার ইস্কন মন্দিরেও এই চন্দননগরের লাইটিং আছে।’

‘তুমি সাজাবে কেন?’

‘কাল জন্মাষ্টমী তাই। তোমাকে যেটা বলছি তুমি শুধু সেটা করবে।’

বুঝলাম যে কাজটা ও করবে সেটা আমাকে গোপন করতে চাইছে। ঠিক সাতটা‌ নাগাদ নিলয়বাবু কানে ফোন দিয়ে কথা বলতে বলতে বেরোল। আমি পিছু নিলাম। একটা রিক্সায় উঠলেন। আমি আর একটায়। গোস্বামীঘাটের দিকে যাচ্ছি। বটতলায় গিয়ে নামল। আমি একটু পিছনে নেমে গেলাম। আমার দুদিন ধরে আপশোশ ছিল, এই কেসে আমার কোনো অবদান‌‌‌ নেই। তাই বলে প্রত্যুষ আমাকে একা ছেড়ে দিল। বন্ধ লঞ্চঘাটের জঙ্গলের মধ্যে নিলয় ঢুকল। আমিও পিছু নিলাম। গঙ্গার কাছাকাছি আসতেই নিলয়বাবু মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে নাড়াতে লাগল। একটা ছোটো স্পিডবোট এসে থামল।‌ দুটো ছেলে নেমে এল। একটা গাঁট্টাগোট্টা একটু খর্বাকৃতি। নিলয়বাবু এগিয়ে গেল। আর একটা ছেলে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। আমি গাছের আড়াল থেকে দেখছি। ছেলেটা নিলয়বাবুকে বলল, ‘বাঁশি কোথায়?’

‘আরে, বাড়ি ভরতি লোক। আত্মীয়-স্বজন ভরতি। তারপর দাদা গোয়েন্দা লাগিয়ে দিয়েছে।’

‘নতুন পুরোহিতের নম্বর দে।’

‘কেন? আমি টাকা ফেরত দিয়ে দেব। ও বাঁশি পাওয়া যাবে না।’

‘মানে?’

‘মানে কিছু নেই। এরপর আমাকে ফোন করলে আমি পুলিশকে জানাব।’

‘শালা, গদ্দার এখন পুলিশ দেখাচ্ছ।’ বলেই রিভলবার বার করে নিলয়ের মাথায় ধরল। হঠাৎ‌ আমার গলাটা কে একজন চেপে ধরে একটা ছুরি ঠেকাল গলায়। আর চিৎকার করে বলল, ‘টিকটিকির চামচেটা এখানে।’

আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম আমার গলা ছেড়ে ছেলেটা ছিটকে গিয়ে ঝোপের ওপারে পড়ল। গর্জে উঠল প্রত্যুষের ‘হার্ড বলার' আগ্নেয়াস্ত্রটা। ছিটকে পড়ল আর একটা ছেলে। তার হাতের রিভলবারটা আমার পায়ের কাছে। আমি নীচু হয়ে তুলেই দেখলাম ছেলে দুটো এক লাফে স্পিডবোটে। বিদ্যুৎগতিতে বেরিয়ে গেল বোটটা। নিলয়বাবু মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে। প্রত্যুষ বলল, ‘বলুন, নিলয়বাবু।’

‘আপনি আমার প্রাণ বাঁচালেন।’

‘বাঁচালাম কী মারলাম, সেটা পরের কথা। খিড়কির দরজাটা ওইদিন খুলে দিলেন কেন? সব সত্যি বলুন, কোনো ভয় নেই। কিছু গোপন করবেন তো বেশি বিপদে পড়বেন।’

নিলয়বাবু শুরু করলেন, ‘আমি চড়া সুদে মঙ্গলের কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা ধার নিয়েছিলাম। সুদ দিতে অসুবিধে হচ্ছিল। মঙ্গল বলল, আপনার টাকা আমি মকুব করে দেব। আরও পাঁচ লাখ টাকা দেব। আপনি শুধু ঠাকুরের বাঁশিটা আমাকে পাইয়ে দিন। আমি ভাবলাম, সোনার বাঁশি কত আর দাম হবে। আমি তো আর চুরি করে বেচতে পারব না। ও বলেছিল আমি লোক পাঠিয়ে দেব, বুড়ো ঠাকুরমশাই চোখে ভালো দেখে না, রাতে যখন যাবে ঠাকুর শোয়াতে আমার লোক এক মিনিটে ওটা চেঞ্জ করে দেবে।’

‘ঠিকই ধরেছিলাম তাহলে, চেঞ্জ মানে?’

‘আমি ছবি তুলে একটা রূপোর ওপর সোনার জল করা নকল বাঁশি বানিয়েছিলাম। কথামতো রাত দশটায় খিড়কির দরজাটা খুলে দিলাম। কিন্তু ঠাকুরমশাই যে ওইভাবে ওকে জাপটে ধরে ‌চিৎকার করবে তা বুঝিনি। আর এটাও‌ বুঝিনি যে ও একদম খুনই করে দেবে।’

‘আপনি এত ঝামেলায় না জড়িয়ে দাদাকে তো সব বলতে পারতেন।’

‘ছাড়ুন দাদা! দাদা তো কিছু ‌টাকা ধার দিয়ে আমার ব্যবসায় ঢুকে যেত। মেজদা ভালো মানুষ, বুদ্ধি কম, কিছু বোঝে না। তদন্ত হলে, সব তদন্তই হোক। মেজদার দোকানে আগুন কীভাবে লাগল।‌ কতবার বলেছি, পরিতোষকে তাড়িয়ে দাও। সব জানে, সব বোঝে, আমার সংসারটা তছনছ করে দিল। সবাইকে নিজের কবজায় রেখে সংসারকে একান্নবর্তী রাখতে চায়। ছেলে রোজ পাঁচ হাজার টাকা ওড়াচ্ছে, তার বেলা কোনো ব্যাপার নয়। অভিশাপ বলে একটা ব্যাপার আছে। আমি বাড়ির ছেলে, আমি বাঁশি খোলার নম্বর জানব না কেন? ঠাকুরমশাই খুনের পর নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে, মিলি বলে, তুমি বাঁশির পাসওয়ার্ডটা আমাকে দাও, আমি পরেরদিন নিজে পরিতোষকে তাড়িয়ে দেব।’

‘নকল বাঁশিটা কোথায়?’

‘আমার ঘরে।’

‘ওটা আমার লাগবে।’

‘আমি সব দিয়ে দেব, আমাকে বাঁচান।’

‘চেষ্টা করব।’

আমরা বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালাম। কিছুক্ষণ পর নিলয়বাবু নকল বাঁশিটা দিয়ে গেলেন।

প্রত্যুষ বলল, ‘বড়ো বাড়ির কঙ্কাল তো বেরিয়ে পড়ছে। চলো অপু, তোমার আর একটা কাজ আছে।’

‘কী কাজ?’

‘ভালো করে শুনে নাও। পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে বাবা মারা যাওয়ার জন্য এখন পুজো করছে না। নতুন পুরোহিত মশাই রাত্রিবেলা এসে যখন মন্দির খুলবে, তুমি বাঁশিটা চেঞ্জ করে দেবে।’

‘মানে! বাড়ি ভরতি লোক। সারা বাড়ি, মন্দির আলো দিয়ে সাজানো। এ অসম্ভব!’

‘আরে সবাই তখন রাতের খাওয়া আর হৈ হৈ করতে ব্যস্ত। নিলয়বাবু ঠিক এক মিনিটের জন্য মেন সুইচটা অফ করে দেবে। আর আমি নতুন পুরোহিতকে জেরা করার নামে একটু পাশে নিয়ে যাব। তুমি মোবাইলের আলোয় কাজটা করবে। এখন নটা বাজে, তুমি প্র্যাকটিস কর। আমি একটু মালির সঙ্গে গল্প করে আসি। ওর ঘর থেকে ঠাকুরদালানটা দেখা যায়।’

‘আমি হরিকে বলে দিচ্ছি ঘরে খাবারটা দিয়ে দিতে।’

খানিকক্ষণ পর প্রত্যুষ ফিরে এল। এসে বলল, ‘ব্যাটা রাতে আফিম খায়, তোমার কোনো চিন্তা নেই। মনে আছে তো পাসওয়ার্ডটা, ৪৫৬।’

নতুন পুরোহিত এল। বাড়ির ভেতরে কুলুঙ্গিতে যেখানে চাবি থাকে, সেখান থেকে চাবিটা নিল। ঠাকুর ঘর খুলল। প্রত্যুষ ওকে ডাকল। তারপর কাঁধে হাত দিয়ে বাগানের দিকে নিয়ে গেল। তবে লোকটা খুব ঘাবড়ে আছে দেখলাম। হঠাৎ পুরো বাড়ি অন্ধকার। মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে মুখে মোবাইলটা কামড়ে এক মিনিটের আগেই সেরে ফেললাম। নকলটা প্যাঁচ দিয়ে আটকাতে যা সময় লাগল, তার থেকে সহজ লাগল আসলটা খুলতে।

পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে ঘরে চলে এলাম। ঘরে এসে বার করলাম। আমার হাত কাঁপছে। মহাপ্রভু’র হাতের ছোঁয়া আছে এই বাঁশিতে! দুদিকে দুটো গজমস্তক। পান্না বসানো জীবন্ত চোখ দুটো। অদ্ভুত সূক্ষ্ম কলকা আঁকা। সাদা, নীল, লাল, হিরেগুলো জ্বলছে।

প্রত্যুষ বলল, ‘লকের নীচে ফ্রেঞ্চ ক্যালিগ্ৰাফিটা দেখো। সালটা দেখলে? ১৮২০। দুশো বছর আগের প্রযুক্তি।’

‘না আমি ভাবছি, পাঁচশ বছর আগে স্বয়ং মহাপ্রভু এটা ধরেছিলেন আর এখন আমি ধরে আছি। গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।’

‘তাহলে গোলটা কে করল? এইবার খুশি তো।’

রাত্রিবেলা আজকে রুটি খাব বলেছিলাম। রুটি আর দুরকম তরকারির সঙ্গে একটা দারুণ জিনিস খেলাম, আনন্দনাড়ু।‌ উৎসবের আগের দিন হয়। কলকাতার দিকে পাওয়া যায় না।

প্রত্যুষ বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়ো, কাল আবার কৃষ্ণ জন্মাবে, তবে অনেকে মরবে।’

পরদিন সকালে উঠে দেখি এতো দুর্গাপুজোর মতো ব্যাপার। বাড়ি ভরতি লোক। হৈ হৈ কাণ্ড। বক্সে‌ কৃষ্ণকীর্তন বাজছে। সবাই খুব সেজেগুজে। জন্মাষ্টমীতে এ বাড়িতে নতুন জামা-কাপড় পরা রেওয়াজ। হরি দেখলাম, ঘরে দুটো পাঞ্জাবি দিয়ে গেল। প্রত্যুষের পুরুষালি চেহারায় সবই মানায়। ও জিনসের ওপর পাঞ্জাবি পরল। স্নান সেরে নীচে এলাম। প্রত্যুষের চোখ আজ খুব তীক্ষ্ণ। এই রকম সতর্ক আর গম্ভীর ওকে‌ কমই দেখা যায়। উদয়বাবু জিজ্ঞেস করলেন, ‘গত দুদিন আপনাদের কোনো খেয়াল রাখতে পারিনি, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?’

আমি বললাম, ‘রাজবাড়িতে আবার অসুবিধে! কোনো সমস্যা নেই।’

‘তদন্ত কেমন চলছে প্রত্যুষবাবু?’

চমকে দিয়ে ও বলল, ‘আজকেই সব শেষ।’

এইরকম উত্তরের জন্য উনি প্রস্তুত ছিলেন না। উদয়বাবু বেশ অবাকই হলেন। আমরা জানতে পারলাম, এবারে তিথি অনুযায়ী, প্রথমে সকালে রাধাকৃষ্ণের পুজো, তারপর ভোগ নিবেদন। এরপর ঠাকুরের সব গয়নাগাটি, বাঁশি খুলে চন্দনলেপন। তারপর দুধ গঙ্গাজল কর্পূর সহযোগে স্নান। স্নানের পর অঙ্গরাগ ও শৃঙ্গার।‌ সন্ধ্যারতির পর শ্রীকৃষ্ণকথা ও সঙ্গীতানুষ্ঠান। এবারে পুজো করবে নতুন পুরোহিত। শুধু বাঁশিটা খুলে দেবে মৃত পুরোহিত মশাইয়ের ছেলে। যেহেতু সংখ্যাটা শুধু ও-ই এখন জানে উত্তরাধিকার সূত্রে। আর অবশ্যই উদয়বাবু তো জানেনই। বাইরের প্রচুর লোকও আসছে পুজো দিতে। হঠাৎ প্রত্যুষ কনুই দিয়ে আমাকে একটা গুঁতো দিল। একজন ভদ্রমহিলার দিকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করাল। দেখলাম, পরনে রানি রঙের শাড়ি, সবুজ ব্লাউজ, গা ভরতি গয়না। হাতে একটা বড়ো পিতলের ডালা, ক্রুশে বোনা সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা। বেশ স্বচ্ছল ঘরের। প্রত্যুষ বলল, ‘কপালের সিদুঁরটা দেখো। লাল সিঁদুর দিয়ে কমলা রঙের মেটে সিঁদুর ঢাকা।’

আমি বলে উঠলাম, ‘উনি কি অবাঙালি?’

‘হতে পারে। দেখে যাও।’

উনি ডালাটা নিয়ে ঠাকুরের সামনে রাখলেন। দালানের সামনে রাখা চেয়ারে বসলেন। ধীরে ধীরে পূজাকর্মাদি এগোচ্ছে। প্রত্যুষ, ঠাকুর মশাই'র ছেলেকে জানিয়ে দিল, যে বাঁশিটা ‌পরানো আছে, তাতে কোনো লক নেই, সাধারণ প্যাঁচেই খুলে যাবে।

যথাসময়ে বাঁশি খুলে গয়নার থালায় রাখা হল। প্রত্যুষের চোখে বাজপাখির দৃষ্টি। আমাকে ইশারা করল। দেখলাম,‌ নতুন পুরোহিত নামাবলী আড়াল করে, বাঁশিটা ওই পিতলের ডালায়, ঢাকার নীচে ঢুকিয়ে দিল। মানে যে ডালাটি ওই আমাদের সন্দেহজনক অবাঙালি ভদ্রমহিলা এনেছেন।

প্রত্যুষ আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, ‘উদয়বাবুকে আস্তে করে বল, একটা গাড়ি আর ড্রাইভার রেডি রাখতে।’ প্রত্যুষের চোখে পলক পড়ছে না। পুজো শেষ হওয়ার পর নতুন পুরোহিত ওঁর হাতে ডালাটা দিয়ে দিলেন। উনি প্রণাম করে ডালাটা নিয়ে ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। আমরাও উঠে পড়লাম। বাইরে গিয়ে একটা সাদা বড়ো গাড়িতে বসলেন। প্রত্যুষ বলল, ‘পালিতসাহেবকে ফোন করে গাড়ির নম্বরটা বলে দাও, আর বলো জি.টি.রোডে ওপর বাজারের মোড়ে অপেক্ষা করতে।’

আমরাও গাড়িতে উঠে ওই বড়ো সাদা গাড়িটা ফলো করতে লাগলাম। বাজারের কাছে এসে দেখলাম, চার-পাঁচজন পুলিশ নিয়ে পালিতবাবুর গাড়িও আমাদের পিছনে।‌ প্রত্যুষ পালিতবাবুকে না বলা অবধি কোনো সরাসরি অ্যাকশান নিতে বারণ করল, শুধু ফলো করতেই বলল। ঠিক চন্দননগর আর চুঁচুড়ার বর্ডারে তালডাঙ্গার সামনের বড়ো সাদা গাড়িটা আর একটা গাড়ির পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই, প্রত্যুষের নির্দেশে আমাদের গাড়িটা ‌দুটো গাড়ির পথ আটকে দাঁড়াল। ভদ্রমহিলা নেমে সামনের গাড়িতে উঠে পড়ল। আর সামনের গাড়িটা আমাদের গাড়িটাকে হালকা ধাক্কা মেরে বাঁদিকে রাস্তা থেকে নেমে গিয়ে পালাতে গেল। অমনি প্রতু্ষের‌ অব্যর্থ টিপ গাড়িটার সামনের চাকাটা ফুটো করে ‌দিল। পালিতবাবুও চলে এসেছে। গাড়ির ভেতরে মঙ্গল বসে রয়েছে। প্রত্যুষ বলল, ‘নিন, মেয়ে জামাইকে‌ এবার আদর করে শ্বশুরবাড়ি নিয়ে যান। বামাল ধরা পড়েছে। আর খুনটাও ও করিয়েছে, পেটে চাপ দিলেই বেরিয়ে যাবে।’

মঙ্গলকে বলল, ‘একটা দু-চার হাজার টাকার বাঁশির জন্য এত বুদ্ধি লাগালে, এটা তো নকল।’

মঙ্গল চোখ কটমট করে বলল, ‘ফির মোলাকাৎ হোবে।’

প্রত্যুষ বলল, ‘তখন কফি খাব।’

হঠাৎ উদয়বাবু’র ফোন, ‘প্রত্যুষবাবু, গয়নার থালা থেকে বাঁশি‌টা চুরি হয়ে গেছে।’

প্রত্যুষ নিশ্চিন্ত করল বাঁশি ওর কাছে আছে। একটু পরে বাড়ি গিয়ে দিচ্ছে। আসলে যেটা চুরি হয়েছে সেটা তো নকল বাঁশি। মানে যেটা এখন মঙ্গল আর ওর বউ’র কাছে। যেটা চুরির দায়ে ওদের ধরা হল। আসল বাঁশি তো প্রত্যুষের নির্দেশে আমি আগেরদিন রাতেই সরিয়ে ফেলেছি। যেটা আছে এখন প্রত্যুষের কাছেই। আমরা থানার কিছু প্রয়োজনীয় কাজ সেরে শেঠবাড়িতে ফিরে এলাম। প্রত্যুষ ঘর থেকে আসল বাঁশিটা এনে উদয়বাবুর হাতে দিয়ে সাবধান করল। অনুরোধ করল, ‘এটা কিন্তু সারাবছর পরিয়ে রাখা যাবে না, আমি নকল বাঁশিটা থানা থেকে ফেরৎ পেলে আপনাকে দিয়ে দেব। একটা নকল বাঁশি সারাক্ষণ ঠাকুরের হাতে থাকাটাই বাঞ্চনীয় এবং নিরাপদ।

‘কী বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেব, তার কোনো ভাষা নেই। ঘরে চলুন।’

ঘরে গিয়ে উদয়বাবু একটা পঞ্চাশ হাজার টাকার চেক কেটে প্রত্যুষের হাতে দিল। বলল, ‘এটা আপনার সামান্য পারিশ্রমিক।’

‘আমার আর একটা জিনিস লাগবে, বল্টুর সঙ্গে একটা ছবি। কারণ ওর একটা কথাই এই তদন্তে সবচেয়ে সাহায্য করেছে।’

‘বল্টু…?’

‘হ্যাঁ, বিভীষণ ভালো লোক না দুষ্টু লোক। পৃথিবীর অনেক তাবড় পণ্ডিতের কাছেও এর উত্তর নেই। তিনি তো স্বয়ং ভগবান রামচন্দ্রের সাহায্যকারী অথচ বিশ্বাসঘাতক। ভগবানের বন্ধু, তবু ঘরের শত্রু। কী অদ্ভুত!’

সারা বাড়ি আলোর মালা দিয়ে সাজানো। আমি একটু ছাদে গেলাম। প্রত্যুষ ঘরেই শুয়ে রয়েছে। বিছানায় আধশোয়া হয়ে বালিশে পিঠ দিয়ে জুলিয়ান সাইমন্সের ‘ব্লাডি মার্ডার’ পড়ছে। একটা সিগারেট ধরালাম। সিঁড়িতে একটা হালকা পায়ের শব্দ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি ঝুমকি। আমি চমকে বললাম, ‘কী হল? সবাই নীচে অত আনন্দ করছে, তুমি ওপরে? কী ব্যাপার?’

‘আপনাকে ধন্যবাদ দিতে এলাম। আলাদা করে।’

‘আলাদা করে কেন?’

‘আমাদের বাড়ির সম্মান বাঁচিয়ে দিয়েছেন, তাই।’

‘সেটা তো নীচে বললেই হত।’

‘কেন? আপনাকে আলাদা করে বললে অসুবিধে আছে।’

‘না মানে…, একা ছাদে আমাদের কেউ দেখলে কিছু ভাবতে পারে।’

‘কেন? আপনার কি মহিলাদের সঙ্গে একা গল্প করতে ভয় লাগে?’

আমি কোনো উত্তর করলাম না। ক’দিন আগের রাখি পূর্ণিমার চাঁদ অনেকটা ক্ষয়ে গেছে। তবুও বেশ উজ্জ্বল। শ্রাবণের আকাশে মেঘ সরিয়ে জ্যোৎস্না ঢেলে দিয়েছে, কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে ছাদে। ঝুমকি গায়ে সেই নরম আলো মেখে আছে। হালকা বাতাসে অগোছালো চুল অবাধ্য হচ্ছে। পেলব হাতে সরিয়ে দিচ্ছে মাঝেমধ্যে। শ্বাসের ওঠানামা অস্বাভাবিক। জড়োয়ার কণ্ঠহার বুকের ওপর আলো আঁধারে মৃদু খেলছে। এক গা গয়না। এত অলংকারের মধ্যেও একটা অপরিতৃপ্তি। চোখেমুখে। কাঁচা হলুদ রঙের স্বর্ণকাতান শাড়ি, বক্ষমাঝে অগোছালো। তবু ঝুমকি উদাসীন। আমার পৌরুষ দ্বিধাগ্রস্ত। অস্বস্তির সুরে বললাম, ‘আমি যাই।’

আমার হাত চেপে ধরল ঝুমকি। আমি হাত ছাড়িয়ে নিলাম। তারপর মাথায় হাত দিয়ে মোলায়েম সুরে সান্ত্বনা দিলাম, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। ঈশ্বর সব ঠিক করে দেবে। ঘরের মানুষ মনে ধরা দেবে। দেখে নিও।’

‘‘ভীতু কোথাকার।’ বলে এক ছুট্টে চলে গেল। আমি নীচে নেমে এলাম। প্রত্যুষ আমার মুখের দিকে তাকাল। তারপর হেসে বলল, ‘একটু প্রেম না হলে গোয়েন্দা কাহিনি জমে নাকি? তবে সাবধান! শেঠ বাড়িতে সেঁটে যেও না। চলো নীচে যাই। সবাই অপেক্ষা করছে।’

‘হঠাৎ একথা বললে কেন?’

‘তুমি তো ছাদে গিয়েছিলে। দশ মিনিট আগে একটা নূপূরের শব্দ পেলাম, খুব ধীর তার লয়, আর এখন যেটা পেলাম, সেটা অনেক দ্রুত। যমুনায় যাওয়া আর আসার গতি তো আলাদা হবেই।’

‘দূর…, কী যে বল না!’

‘সব তদন্ত তো আমার করার দরকার নেই। চল।’

সন্ধেবেলা উদয়বাবু সংগীত অনুষ্ঠানের আগে আমাদের সংবর্ধনা দিলেন। তারপর থানায় নকল বাঁশিটা আনতে গিয়ে জানলাম খুনি ধরা পড়েছে মঙ্গলের গোপন ডেরা থেকে। যে ছেলেটা নিলয়ের মাথায় রিভলবার ধরেছিল ওই খুনি। বিট্টু, মঙ্গলের ডান হাত। আর ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম, ভদ্রমহিলা হল মঙ্গলের স্ত্রী। আদর্শ ধর্মপত্নী। রণে বনে চুরি চামারিতে সবসময় স্বামীর পাশে। রাতে শুতে একটু দেরিই হল আমাদের। তবে অনাবিল আনন্দে মন আপ্লুত। দারুণ অনুষ্ঠান। এই তিনদিন বাথরুমে গুনগুন করার বড়ো খেসারৎ দিতে হল আমাকে। সবাই ধরল, একটা গান গাইতে হবে। আমিও শর্ত রাখলাম, সঙ্গে কাউকে নাচতে হবে। ঝুমকি হলুদ শাড়ির লাল আঁচলটা, কাপড় সরিয়ে কোমরে গুঁজে নিয়ে কাকিশ্বাশুড়ির হাত ধরে টেনে নিল মঞ্চে। আমি ধরলাম 'মধুবনমে রাধিকা নাচে রে…'। গানের সঙ্গে মিলি আর ঝুমকির নাচ আমার অনেকদিন মনে থাকবে।

পরদিন একটু বেলা করেই উঠলাম। এদিন তালনবমী, নন্দোৎসবের আয়োজন সকাল থেকে। আমরা ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ায় উদয়বাবু অনুরোধ করলেন দুপুরে খেয়ে-দেয়ে যেতে। তালের বড়ার গন্ধ আসছে নীচে থেকে। প্রত্যুষকে বললাম, ‘এবার পুরো গল্পটা বল।’

প্রত্যুষ সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘বাঁশিও রক্ষা পেল, খুনিও ধরা পড়ল। কিন্তু কত কী যে অজানা থেকে গেল, তার হিসেব কে রাখে। যেমন অন্ধকারে থেকে গেল, প্রলয়বাবুর দোকানে কে আগুন লাগাল? নাকি সেটা শুধুমাত্রই দুর্ঘটনা। এত সুন্দরী স্ত্রী ঘরে থাকতেও প্রতীপ কেন রোজ বারে যায়, অতিরিক্ত মদ্যপান করে বা অন্য মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তিতে কী ভুলে থাকতে চায়? তার কি কোনো বিয়ের আগে ব্যর্থ প্রেম ছিল? নাকি বাবার অমতে প্রেমের পরিণতি বিবাহ না হয়ে বিরহ হয়েছে! অথবা ঝুমকি হয়তো ওকে আপন করে নিতে পারেনি। তার মনের গভীরে স্থায়ী জায়গা করে নিয়ে বসে আছে হয়তো অন্য কোনো পরপুরুষ! অথবা এর কোনোটিই নয়। হয়তো দুজনেই শারীরিকভাবে অসুখী। যার পরিণতি এই মানসিক দূরত্ব আর অবসাদগ্ৰস্ত প্রেমহীনতা। ওদিকে পরিতোষ মিলিকে এত ভালোবাসে, তাও ঘনিষ্ঠ মুহূর্তে কেন বলল, বাঁশিটা দিলে ও চলে যাবে? তাহলে কি অর্থ প্রেমের থেকেও বেশি আকর্ষণীয়? প্রেম হেরে যায় অর্থের কাছে? সম্পর্ক মাথা নত করে লক্ষ্মীর পায়ে! ‌কেন আমি কাউকে বলতে পারলাম না, খিড়কির দরজা কে খুলে দিয়েছিল? কীসের জন্য। নিলয়বাবু তো আমার কেউ নয়। তবু মিলির অনুরোধ ফেলতে পারলাম না কেন? সে কি আমার পৌরুষের দুর্বলতা? মঙ্গলের কাছ থেকে মেয়ে বউ-এর ক্ষতি হয়ে যাবার হুমকি পেয়ে, সেই ভয়ে নতুন পুরোহিত বাঁশিটা ওই ডালায় রেখেছিল। মঙ্গল অর্থও দিতে চেয়েছিল, কিন্তু উনি তা ফিরিয়ে দেন। কিন্তু তাও তো অপরাধ। আমি কাউকে বলতে পারলাম না কেন? দয়ায় না সহানুভূতিতে? কিন্তু সেটা তো গোয়েন্দাগিরির নিয়মবিরুদ্ধ। আসলে কী জানো অপূর্ব, গ্ৰিসের থেমিস দেবীর চোখদুটো বাঁধা থাকলেও মনটা বোধহয় খোলা।‌ যেখানে বিবেক, বুদ্ধি, ক্ষমা আবেগের ফাঁক গলে এইসব ছোটো ছোটো অপরাধ চিরকালের মতো অজানা থেকে যায়। তাই তার হাতে বিচারের দাঁড়িপাল্লাটাও একটু উঁচু নীচু, সমান নয়, তবুও অপূর্ব, একটা কথা বারবার মনে আসছে।

‘পরিত্রানায় সাধুনাম বিনাশায় চ দূষ্কৃতম।

ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে, যুগে।।’

আর অনাবিষ্কৃত থাকল তোমার আর ঝুমকির ছাদের কয়েক মুহূর্ত। বলে একটু ফিক করে হাসল প্রত্যুষ। বুঝলাম, ও সত্যিই মানুষের মন পড়তে পারে। রঞ্জন রশ্মি।

আমি বাকরুদ্ধ। মনে মনে ভাবলাম, এ গোয়েন্দা, জীবনে আমার কলমে অনেক আলো ভরে দেবে, যা দিয়ে দূর হবে বহু অন্ধকার।

দুপুরে খেয়ে উঠে আমরা ফেরার জন্য তৈরি হচ্ছি। কিন্তু মন ভারাক্রান্ত হচ্ছে কেন? মনে হচ্ছে কত নিকট আত্মীয়’র বাড়ি থেকে বিদায় নিচ্ছি। সবাই এসে দাঁড়িয়েছে সদর দরজায়। ঝুমকি হাতের মধ্যে একটা ফুল দিয়ে বলল, ‘এটা সবসময় কাছে রাখবেন, কত বিপদের মধ্যে যান। জগদ্ধাত্রী পুজোয় না এলে খুব কষ্ট পাব।’ আমরা ওপার দিয়ে শিয়ালদা ফিরব। লঞ্চের ডেকে উঠে ফুলটা আবার বার করে হাতে নিয়ে ঝুমকির হাসিটা ভাবছি আর ভাবছি আমার বিপদে ওর কী এসে যায়, তা মা গঙ্গাই জানে। ন্যায় অন্যায়ের ঊর্ধ্বে মানুষের বুকে যে রূপকথা লেখা হয়, তার স্রোত নিত্য, তার ধারা আবহমান।

সুখী গৃহকোণ, নভেম্বর, ২০২১

অধ্যায় ১ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%