বাণীব্রত গোস্বামী
‘এক একটা নিমন্ত্রণ জোগাড়ও করো বটে, তোমার এলেম আছে, তবে গোয়েন্দাকে কেউ বিনা কারণে খেতে ডাকে না, তাই একটু সন্দেহ হচ্ছে।’ কথাগুলো হাসতে হাসতেই বলল প্রত্যুষ।
তবু আমি ঘাবড়ে গেলাম। ও কী অন্তর্যামী! সব আগে থেকে বুঝে যায় কী করে? তা সত্ত্বেও স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করলাম। কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললাম, ‘তোমার না ইচ্ছে হয় তুমি যাবে না। বিনা পয়সায় থাকা খাওয়া, সুন্দর জায়গা… এ সুযোগ যদি হাতছাড়া করতে চাও, যেও না। তোমাকে আমি জোর করব না।’
‘আরে না না, আমি সে-কথা বলিনি। বলছি, বাড়িতে ডাক্তারকে নিমন্ত্রণ করলে, দেখবে ঠিক খেতে খেতে দু’টো রোগের গল্প করে নেবে। তাই বলছিলাম।’
এ’বার আমার একটু টেনশন হচ্ছে। নাহ… পুরো কথাটা বলা যাবে না। সেটা যেতে যেতেই বলব। এখন বললে রাজিই হবে না। সেটা কেন, একটু শুনলেই বুঝতে পারবেন।
ইদানীং আমাদের একটু নামডাক হয়েছে কপালজোরে। সেই সূত্রেই আমার এক ছাত্রের বাবা অনুরোধ করেছেন, তাদের দেশের বাড়িতে কয়েকদিন কাটিয়ে আসতে। তবে তার পিছনে একটা ছোট্ট উদ্দেশ্য আছে। যেটা প্রত্যুষকে এখন বলা যাবে না। ওটা সরাসরি আমার ছাত্র প্রসেনজিতের বাবা মনোজিৎবাবুর কাছ থেকেই শুনব। যাক প্রত্যুষকে যে শেষ অবধি রাজি করানো গেছে, সেটাই অনেক বড়ো ব্যাপার। মনে হয় বড়দিনের ছুটিটা ভালোই কাটবে। আশাকরি লেখারও একটা ভালো মশলা পাব।
মনোজিৎ বাবুদের দেশের বাড়ি টাকিতে। ইছামতী নদীর ধারে। প্রসেনজিৎ বলেছে, দারুণ জায়গা। দেখা যাক, কতটা সত্যি। বেরিয়ে পড়লাম বড়দিনে। যাবার আগে প্রত্যুষকে একটু হালকা করে বললাম, ‘যদি তোমাকে কোনো সমস্যার কথা বলে, তুমি মন দিয়ে শুনবে, তারপর যাহোক বলে কাটিয়ে দেবে।’
‘বুঝলাম, ধীরে ধীরে ফাঁসাচ্ছ। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো, তুমি কী আমায় ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছ। নাকি ক’দিন মনের বিশ্রামের বদলে বুদ্ধির জট পাকাবে। তবে যাই বলো অপু, আমি কিন্তু কোনো জটিলতায় ঢুকব না। আমার নিখাদ ছুটি চাই।’
‘আরে হ্যাঁ রে বাবা। তুমি খামোকা বেশি ভাবছ।’
গাড়ি ছুটছে ভিআইপি রোড দিয়ে। এয়ারপোর্ট থেকে উঠল প্রসেনজিৎ, ওর বাবা মনোজিৎ আর প্রসেনজিতের মা ভারতীদেবী। গাড়িতে উঠে পরিচয়-পর্ব সারা হল। হালকা চা-পানের বিরতি বেড়াচাঁপায়। চা খাওয়ার পর গাড়িতে উঠে গল্প জুড়লেন মনোজিৎবাবু। প্রত্যুষ সিগারেট ধরিয়ে মন দিয়ে শুনছে আর আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমার মুখটা তখন অপরাধীর মতো। কারণ গল্পটা প্রথমদিকে স্বাভাবিক আর পাঁচটা গল্পের মতোই ছিল। কিন্তু হঠাৎ একটা রহস্যের দিকে বাঁক নিল। গল্পটা আমি নিজে বলব না, মনোজিৎবাবুর কথাটাই পুরো তুলে ধরি, ‘আমাদের প্রায় দু’শো বছরের বাস এই টাকিতে। বেশ বর্ধিষ্ণু পরিবার আমরা। আমাদের পরিবারের বেশিরভাগই সব বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। আমাদের গ্ৰামে যে পৈতৃক ভিটে, সেটা বহুদিনই ভগ্নপ্রায়। জমিজমা প্রচুর ছিল, অনেকদিন আগেই সে’সব বিক্রি হয়ে গেছে। তারপর আমার বাবা সর্বজিৎ ভট্টাচার্য ইছামতীর ধারে জমি কিনে এই নতুন বাগানবাড়ি বানায়। আমার বাবা টাকি পুরসভায় কাজ করতেন। আমার বড়দা মানে রঞ্জিত ভট্টাচার্য ছিলেন গভর্নমেন্ট কন্ট্রাক্টটার। সরকারি কাজের কিছু বরাত বাবা পাইয়ে দিতেন। এ সবই আমার শোনা কথা। কারণ বড়দা আমার বাবার মতো। আমার থেকে প্রায় কুড়ি বছরের বড়ো। বড়দা পাঁচ বছর হল মারা গেছেন। তার একটি মেয়ে আছে। এই বাড়িতেই থাকে। নাম অর্চনা। কিছুদিন হল ওর স্বামী মেঘনাদ নাকি আত্মহত্যা করে, সেটা আত্মহত্যা না দুর্ঘটনা ঠিক বলতে পারব না। পুলিশই পারল না, আমি কী বলব! তবে যদি আত্মহত্যা করেও থাকে, সে কারণও আমার জানা নেই। তবে এটুকু বলতে পারি, ওর বাড়ির যা পারিবারিক ও সাংসারিক পরিবেশ পরিস্থিতি, তাতে কোনোভাবেই আত্মহত্যার স্বপক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য যুক্তি খাড়া করতে পারে না। আমি যদিও এখানে থাকি না, তবে যেটুকু কানে শুনেছি, ওর আর্থিক অবস্থাও নাকি বেশ ভালো। এখন মতিভ্রম হলে কিছু বলার নেই। তবে দুর্ঘটনা হতেই পারে। সে তো আর কারও হাতে নেই। ঈশ্বরই একমাত্র বলতে পারবেন, সঠিক কী হয়েছিল। আপশোশ একটাই, বডিও পাওয়া গেল না। অনেক খোঁজাখুঁজি করা হয়েছিল। ইছামতী তোলপাড় করা হল। কোনো লাভ হল না। ফলে শ্রাদ্ধ-শান্তি কিছুই করা গেল না। ওটাই সর্বক্ষণ মনে খচখচ করে। তারপর থেকেই অর্চনা এখন বাপের বাড়ি। ওর একটি ছেলে আছে, ছোটো। তবে শুনেছি ওর এক মামাতো দেওর নাকি কিছুদিন হল এসে উঠেছে, অবিবাহিত। একবারই দেখেছিলাম, নামটা মনে করতে পারছি না। আর আছে দীনুকাকা। দীনুকাকা ছোটোবেলা থেকেই এ’বাড়িতে। বাবার আমলের লোক। আমি যেহেতু আমার বাবা মায়ের বেশি বয়সের সন্তান, তাই মোটামুটি দীনুকাকার কোলেপিঠেই বড়ো হয়েছি। তারপর কলকাতায় পড়তে চলে গেলাম। সেই থেকে কলকাতাতেই, আর চাকরিসূত্রে সারা ভারত ঘুরে বেড়ানো। এদিকে আসাই সাধারণত হয় না। ওই যেটুকু ফোনে যোগাযোগ। তবে হঠাৎ একটা খবরে আর বিশেষ কিছু দরকারে এই প্রায় পাঁচ বছর পরে আবার যাচ্ছি।’
প্রত্যুষের এতক্ষণ চোখের পলক পড়ছিল না। মনোজিৎবাবুর দীর্ঘ গল্প বলার শেষে প্রত্যুষ সিগারেটের ছাইটা গাড়ির জানলা দিয়ে ছোট্ট টোকায় খানিকটা ফেলে জিজ্ঞেস করল, ‘তা কী এমন কারণ ঘটল?’
‘না… ওই ক’দিন আগে অর্চনা ফোন করে বলল যে ওই বাড়িটা ওরা বিক্রি করে দিতে চায়। একবিঘে জমির ওপর এই এতবড়ো বাড়ি আর সামলানো যাচ্ছে না। একটা রিসর্ট ব্যবসায়ী খুব চাপ দিচ্ছে। তোমার তো কলকাতায় বাড়িঘর সবই আছে, তুমি যদি একটা সই দিয়ে দাও তাহলে তোমার এই বিধবা ভাইঝিটার খুব উপকার হয়। ভালো কথা। আমিও সাত-পাঁচ কিছু ভাবিনি। ঠিক আছে, যতই হোক নিজের ভাইঝি, বিধবা; যদি কিছু ওর টাকাপয়সার সুরাহা হয়, আমি সই দিয়ে দেব। এইরকমই মোটামুটি একটা মনস্থ করেছিলাম। সেইকথা মতো খদ্দেররাও দেখতে আসতে শুরু করে। বাবার ঘরটা এতদিন বন্ধই ছিল। এখন পরিষ্কার করতে গিয়ে দীনুকাকা বাবার আলমারিতে একটা সিল করা খাম পায়। তার ওপর আমার নাম লেখা। দীনুকাকা আমাকে সেইদিনই ফোন করে। ওর কথা থেকেই জানতে পারি, সরকারি চিঠির খামের মতো খামটা। কাগজের নীচে পাতলা সুতোর জাল। দীনুকাকার ধারণা কোনো প্রয়োজনীয় চিঠি। এদিকে অর্চনাও চিঠিটার কথা জানতে পেরে যায়। ও দীনুকাকাকে চাপ দিতে থাকে চিঠিটা দেখাবার জন্য, শুধু তাই নয় ‘চাকর’ বলে অপমানও করে। বাধ্য হয়ে দীনুকাকা পরেরদিন আমার কাছে ফোনে কান্নাকাটি করতে থাকে। তখন আমিও অর্চনাকে মানা করি। ওকে বোঝাই ঠিক আছে, চিঠিটা সবার সামনেই খোলা হবে, এখন তুই শান্ত হয়ে যা… ওর একটাই বক্তব্য, আমাদের পারিবারিক ব্যাপারে চাকরবাকর ঢুকবে কেন? আরে দীনুকাকা কী শুধু চাকর নাকি? তিন পুরুষ ধরে এ’বাড়িতে আছে বাড়ির লোক হয়ে। বয়স্ক মানুষ, তাকে এভাবে অপমান করাটা আমি একেবারেই ভালোভাবে নিইনি। তবে তার মধ্যে আমি একটা মারাত্মক ভুলও করে ফেলেছি। আসলে প্রত্যুষবাবু, কৌতূহলটা চাপতে পারিনি।’
‘তা কী ভুল করলেন?’
‘আমার এক স্কুলের সহপাঠী আছে শিশির। কাছাকাছিই থাকে। ওখানকার এক প্রাইমারি স্কুলে পড়ায়। আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ফোনে প্রায়ই কথা হয়। দীনুকাকাকে বললাম, খামটা লুকিয়ে নিয়ে গিয়ে শিশিরকে একবার দেখাতে। তারপর শিশির যেটা বলল, সেটা বেশ রহস্যময়। চিঠিতে নাকি একটা চার লাইনের কবিতা লেখা আছে। আচ্ছা, বাবা একটা সিল করা খামে আমার জন্য কবিতা লিখে রেখে যাবে কেন? বলতে পারেন?’
‘তাহলে খামের সুতোর জাল তো এখন চিঠির ভেতর রহস্যের জাল বিস্তার করে ফেলল।’
‘হ্যাঁ, ঠিক সেই কারণেই আপনাকে ডাকা। ছেলের মুখে আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। সেইজন্যই আপনাদের নিয়ে ওখানে যাওয়া। তবে আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিক আমি দিয়ে দেব।’
এবার প্রত্যুষ আমার দিকে তাকাল। আমি দুটো হাত জোড়া করে ঘষতে লাগলাম। সবাই ভাবছে, আমি হয়তো গাড়ির জানলা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়ার জন্য হাত গরম করছি। না, আসলে আমি এবারের মতো প্রত্যুষের কাছে ক্ষমা চাইছি। আসলে এই গোয়েন্দা কাহিনিতে জড়িয়ে পড়ার নেশা ড্রাগের মতো। দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়। তবে প্রত্যুষ এই ঘটনায় যে বেশ মজে গেছে, ওর চোখেমুখে সেটা পরিষ্কার। তাতে আমি নিশ্চিন্ত যে আমার মুকুটে খুব শিগগিরই আর একটা পালক লাগতে চলেছে।
কথার ফাঁকে কখন যে পৌঁছে গেলাম, বুঝতেই পারলাম না। মনে মনে যেরকম ছবিটা এঁকেছিলাম, তার থেকে অনেক এলাহি ব্যাপার। বিশাল বাগান, বাগান না-বলে একটা ছোটো অরণ্য বলাই ভালো। তার মধ্যে বেশ বনেদি গড়নের দোতলা বড়ো বাড়ি। বাড়িতে ঢুকতে ডানদিকে কালীমন্দির। নিত্যপুজো হয়। বাড়ির পিছনে একটা টলটলে জলের পুকুর। পুকুর ধারে হাঁসের ঘর। তবে মূল আকর্ষণ হল দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিস্তীর্ণ ইছামতী। তার ওপারে বাংলাদেশ। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। একটা অদ্ভুত শিহরন হচ্ছে, ভারতের শেষ ভূখন্ডে দাঁড়িয়ে। দীনুকাকা আমাদের ঘর দেখিয়ে দিল। একজন কাজের মহিলাকেও দেখলাম। সবসময় থাকে। রাধামাসি। জানলাম কাছেই গ্ৰামে থাকে। অর্চনার সঙ্গে আলাপ হল। বয়স মনে হল পঁয়ত্রিশের আশেপাশে হবে। তবে হঠাৎ দেখলে একটু কম বলে মনে হয়। বিধবার চিহ্ন বলতে শুধু মাথায় সিঁদুরটাই যা নেই, বাকিটা সবই বিবাহিতের মতো। নিজেই বলছি, সাহিত্যিকের চোখ তো ভালো হয় না, তার ওপর আবার গোয়েন্দার সহকারী। অর্চনার শরীরে বৈধব্যের ভাঙনের থেকে যৌবনের জোয়ারটাই বেশি প্রকট। বেশ একটা আঁটোসাঁটো গড়ন। সবই টই-টুম্বুর। যাকগে, সেসব ভেবে আমার লাভ নেই, মনটা ছটফট করছে ওই খামটা দেখার জন্য। প্রত্যুষ চুপচাপ। চারদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে। বোঝা যাচ্ছে, মাঠে নেমে গেছে। এখন মাঠ পরীক্ষা করছে। তারপর সুযোগ বুঝে খেলতে নামবে। বলতে বলতেই অর্চনার মামাতো দেওর এসে উপস্থিত। বাজারে গিয়েছিল। আলাপ হল। ওঁর নাম বিপুল। ইমারতি দ্রব্যের সাপ্লাইয়ের ব্যবসা করেন। বয়স চল্লিশের কোঠায়। চেহারা ছবি এই ব্যবসার লোকেদের যেমন হয় আর কী। ওঃ, ভালো কথা, ছোটো বলে একজনের পরিচয় দেওয়া হয়নি। সে হল অর্চনার ছেলে অভিজিৎ। বছর পাঁচ ছয়েকের হবে। হাত-পা ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে বসতেই এক থালা মিষ্টি নিয়ে রাধামাসি হাজির। প্রত্যুষকে বললাম, ‘এখানের মাখা সন্দেশটা কিন্তু দারুণ।’
প্রত্যুষ স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বলে উঠল, ‘দেখো আগে কী সন্দেশ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, তারপর তো মাখবে।’
আমাদের পরিচয় হল যে আমরা প্রসেনজিতের স্কুলের টিচার। টিকটিকি পরিচয়টা গোপনই থাকল। বসার ঘরে সবাই গোল হয়ে বসে আছি। সুযোগ বুঝে মনোজিৎবাবু দীনুকাকাকে বললেন, ওই খামটা নিয়ে আসতে। কিছুক্ষণ পরেই দীনুকাকা খামটা নিয়ে হাজির। দীনুকাকা মানুষটার প্রায় আশি বছর বয়স। শহরের মানুষ হলে সাধারণত শয্যাশায়ী হত। কিন্তু গ্ৰামের মানুষ তো, এখনও কী কর্মঠ! খামটা মনোজিৎবাবু প্রত্যুষের হাতেই দিল। প্রত্যুষ হেসে বলে উঠল, ‘আপনার বাবা আপনার নাম লিখে আপনাকে দিয়ে গেছে, আপনিই খুলুন।’
খামের ভেতর থেকে একটি লালচে কাগজ বেরিয়ে এল। তাতে কালির কলম দিয়ে কিছু লেখা। মনোজিৎবাবু আগেই জানতেন একটি কবিতা লেখা আছে, এ’বার স্বচক্ষে দেখলেন। তারপর বোকার মতো প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। প্রত্যুষ ঝাঁকুনি দিয়ে বলে উঠল, ‘কী হল? পড়ুন!’ ওঁর সংবিত ফিরে এল উনি পড়লেন,
‘রক্ত আমার রক্ত নয়,
পোষ্য কি প্রভুভক্ত হয়?
অধিকার নেই কাগজে কলমে,
‘প্রণাম কুঠার দমনে’র মরমে।’
আমরা সবাই পরষ্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম। বিপুল হঠাৎ বলে উঠল, ‘এইটা নিয়ে এ ক’দিন ধরে এতো আলোচনা। একদম বেকার। এতো একটা নিছক মজার ছড়া।’
তাল দিল অর্চনা, ‘ঠিক বলেছ। বাবার মুখে শুনেছি দাদু খুব গোয়েন্দা গল্প পড়তে ভালোবাসত। আমারও ছোটোবেলায় মনে আছে, দাদু শব্দছক আর ধাঁধা নিয়েই সারাদিন সময় কাটাত। তাই কাকামণির সঙ্গেও মজা করেছে।’
এবার মনোজিৎবাবু গম্ভীরভাবে বললেন, ‘কথাটা তুই ঠিকই বলেছিস অর্চনা। তবে বাবা একটা বন্ধ খামে আলমারির মধ্যে আমার নাম লিখে ভেতরে শুধুমাত্র মজা করার জন্য একটা ছড়া লিখে রেখে যাবে? আপনি কী বলেন প্রত্যুষবাবু?’
আমি দেখলাম প্রত্যুষের মুখটা অন্যরকম হয়ে গেছে। শিকারের গন্ধ পেলে শিকারির যেমন হয়। কঠিন, একাগ্ৰ, নিষ্পলক। মোবাইলটা বার করে কাগজটার একটা ছবি তুলে নিল। তারপর যেটা বলল, তাতে নিস্তব্ধ ঘরে আকাশ ভেঙে পড়ল।
‘এটা কোনো সাধারণ ছড়া নয়, এটা একটা সংকেত। খুব সম্ভবত আপনাদের সম্পত্তির বিষয় নিয়ে।’
আমিও নির্বাক। ওরা সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। মনে মনে ভাবছি, হয়ে গেল সব ঘোরাঘুরি। ভাবলাম ক’দিন খুব আনন্দে ফাঁকা মাথায় কাটানো যাবে। হয়তো সহজ কোনো ছড়া মনোজিৎবাবু দেখাবে। প্রত্যুষও দুম করে সমাধান করে দেবে। মিটে যাবে। এতো চক্ষু চড়কগাছ করা ছড়া। তার আগা মাথা, কিছুই বুঝতে পারছি না। কোনদিক থেকে এগোব তাইতো মাথায় ঢুকছে না। আর প্রত্যুষের এক বদ স্বভাব আছে, কোনোকিছু মাথায় একবার ঢুকলে, যতক্ষণ না তার একটা পরিষ্কার উত্তর বের হচ্ছে, ওর নাওয়া খাওয়া সব বন্ধ। তার মানে আজ মনে হচ্ছে রাতের ঘুম গেল। আমরা ঘরে ফিরে এলাম। ভয়ে ভয়ে প্রত্যুষকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কোনো হদিশ পেলে?’
‘একজন অপরাধী ।তো ইতিমধ্যেই ধরা পড়ে গেছে।’
‘মানে…? সেটা আবার কে?’
‘তার নাম অপূর্ব কর।’
‘মানে?’
‘ঘুরতে যাওয়ার নাম করে তুমি আমায় রহস্যের মধ্যে ডুবিয়ে দিলে। তাও আবার ইছামতীতে। যেখানে ইচ্ছের বিরুদ্ধে মতি খাটাতে হচ্ছে।’
‘না, আমিও বুঝিনি এতটা কঠিন খেলা হয়ে যাবে। ছাড়ো! তুমি কী কিছু উদ্ধার করতে পারলে?’
‘আমি কী উদ্ধার করতে পারলাম সেটা বড়ো কথা নয়, তবে একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছি।’
‘সে কী! কী ভুল?’
‘আগ বাড়িয়ে বলে দিলাম, এটা সম্পত্তি সংক্রান্ত সংকেত। দেখো গোয়েন্দাগিরির প্রথম শর্ত হল, কাউকে বিশ্বাস না করা। সবাইকেই মনে মনে অপরাধী ভাবা। তাই সঠিকভাবে না জেনে, আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে এইরকম উক্তি করা ঠিক নয়। এতে অপরাধী আগে থেকে সতর্ক হয়ে যায়।’
‘এখানে তো কোনো অপরাধ ঘটেনি। সেক্ষেত্রে অপরাধীর প্রশ্ন উঠছে কেন?’
‘শোনো, কারও বাড়ির সম্পত্তির গোপন কথা কেউ ধাঁধা করে লিখে রেখে যায় না। এটা কি স্বাভাবিক? সেটাই একটা রহস্য নয় কি? আর যেখানেই রহস্যের জাল, সেখানেই সেই জালে অজান্তেই জড়িয়ে যায় কিছু অপরাধ।’
আমি হতবাক। কত গভীর দূরদৃষ্টি প্রত্যুষের। খেয়েদেয়ে উঠে আমরা ইছামতীর ধারে বাঁধানো জায়গাটায় গিয়ে বসলাম। প্রত্যুষ সিগারেট নিয়ে পায়চারি করছে। এবারে পর্যটকদের ভালো ভিড় রয়েছে টাকিতে। সরকারি, বেসরকারি বেশ কিছু ভালো হোটেলও হয়েছে এখন এখানে। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় করেছে পুরসভা, এই ইছামতীর ধার বাঁধিয়ে। ভারী সুন্দর সাজিয়েছে এই নদীপাড়। দু-একদিনের মনের পরিবর্তনের ভারী সুন্দর জায়গা। হঠাৎ প্রত্যুষ আমার দিকে ঘুরে বলল, ‘আচ্ছা অপু, তুমি তো লেখক। রক্তের সমার্থক শব্দগুলো একটু বলো তো।’
‘সবকটা জানি না। কয়েকটা জানি। রক্তিম, শোণিত, রঞ্জিত, রুধির।’
‘তাহলে প্রথম লাইনটা কী দাঁড়াল! ‘রঞ্জিত আমার রক্ত নয়’ কী বুঝলে?’
‘কী বলছ! মনোজিৎ বাবুর দাদা রঞ্জিতবাবু ওঁর বাবার নিজের ছেলে নয়?’
‘ধীরে বৎস ধীরে। এখনও তিন লাইন বাকি আছে।’
রহস্য জট পাকাতে লাগল। সন্ধেবেলা চায়ের আসরে আড্ডা জমে গেল। প্রত্যুষ বলছে কম, শুনছে বেশি। দীনুকাকা চা পকোড়া জোগান দিচ্ছে। এর মধ্যেই এক ফাঁকে উঠে গেল প্রত্যুষ। দীনুকাকার পিছন পিছন। ও কী জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিল। নাকি সিগারেট খেতে। খানিকক্ষণ পরে গম্ভীর হয়ে ফিরে এল। এসে মনোজিৎবাবুর পাশে বসল। বসেই বলে উঠল, ‘ধাঁধার মধ্যে যে সূত্রটা দেওয়া আছে, সেটার সমাধান করতে গেলে আপনার বাবার সম্বন্ধে আমাকে বিশদভাবে জানতে হবে।’
‘বলুন কী জানতে চান। আমার কুড়ি বছর বয়সে বাবা মারা যান। বাবার শেষ পনেরো বছর, আমার ভালো মনে আছে। তবে তার থেকেও বেশি জানে দীনুকাকা। মোটামুটি বাবার সমসাময়িক।’
‘আপনি যেটুকু জানেন, সেটুকুই বলুন।’
‘আমার বাবা সর্বজিৎ ভট্টাচার্য ছিলেন ভারী অদ্ভুত মানুষ। তিনি পুরসভায় কাজ করলেও রহস্য গল্পের ছিলেন মারাত্মক ভক্ত। আমি ছোটোবেলায় বাবাকে সারাদিন গোয়েন্দা বই পড়তেই দেখতাম। আর কথা বলতে পছন্দ করতেন একটু ঘুরিয়ে ছন্দ মিলিয়ে। ছোটোবেলায় আমাকে মাঝে মাঝে ধাঁধা বলতেন। আবার উত্তর দিতে না পারলে সমাধানটা বুঝিয়ে দিতেন। আর একটা কথা খুব বলতেন যে ধাঁধা একটা শিল্প। রামায়ণ মহাভারত সব নাকি ধাঁধা। এ দুটো মহাকাব্য শুধু নিছক একটা গল্প নয়, এর মধ্য দিয়ে অন্য কিছু বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যে সংকেত ভাঙতে পারে সে নিজেই গড়তে পারে নিজের ভাগ্য। বাবা একটা কথা প্রায়ই বলতেন, যে সূত্র করতে পারে সমাধান, সে পুত্র হয় ভাগ্যবান। এ কথার অর্থ এখন অল্প বুঝতে পারছি। আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে এটা সত্যিই কোনো সম্পত্তি-ঘটিত সংকেত।’
হঠাৎ অর্চনা বলে উঠল, ‘ছাড়ো তো ওইসব ধাঁধার চচ্চড়ি। ক’দিন ঘুরতে এসেছ। হৈ-হৈ করে আনন্দ করে ক’দিন কাটিয়ে যাও। শুধু শুধু মাথা খারাপ করে লাভ কী!’
ঘাড় নেড়ে সমর্থন করল বিপুল। তারপর হাত নেড়ে বলল, ‘সিনেমায় এ সব হয়। কোত্থেকে একটা গুপ্তধন বেরিয়ে গেল।’ আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, আপনারা আবার টিকটিকি টিচার নয় তো। তাহলে কিন্তু গল্প জমে ক্ষীর। যাক ভালোই হবে গুপ্তধন বেরোলে অর্চনারও কপাল ফাটবে। তারপর জমিয়ে রিসর্টটা হবে। এই উপলক্ষে একটু সেলিব্রেট হলে ভালো হয়।’ বলে আমার দিকে বুড়ো আঙুল দিয়ে ইশারা করল গলায় জল ঢালার ভঙ্গিতে, ‘চলে তো?’ আমি আলতো করে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বোঝালাম।
এবার প্রত্যুষ মুখ খুলল, ‘সংকেত মানে শুধু গুপ্তধন ভাবছেন কেন? গুপ্ত ইতিহাসও তো হতে পারে।’
এবার বিপুল একটু অসন্তুষ্ট। বেশ ঝেঁঝিয়েই বলে উঠল।
‘এ কি কোনো রাজবংশ যে এর আবার ইতিহাস হবে!’
‘সব বংশেরই তো একটা ইতিহাস থাকে। অজানা, না-বলা বা অপ্রিয় কোনো সত্য।’
‘মানে কেঁচো খুঁড়তে কেউটে। তবে দীনু মালটা কিন্তু অনেক কিছু জানে।’
এবার মনোজিৎবাবু প্রতিবাদ করলেন, ‘শোনো বিপুল, তুমি জানো না দীনু আমাদের বাড়ির কাজের লোক হলেও ও কিন্তু আমার নিজের কাকার মতো। আর আমার বাবাও ওঁকে খুব বিশ্বাস করতেন।’
‘আপনি তো এখানে থাকেন না। পায়ের জুতো মাথায় তুললে সংসার চালানো যায় না। সে আপনি বললে সম্মান করব। ওসব ছেড়ে এ’বার বাড়ি বেচা নিয়ে মিটিংটা শুরু করুন।’
মনোজিৎবাবু প্রত্যুষের মুখের দিকে তাকাল। প্রত্যুষের চোখে ‘না’ লেখা রয়েছে। তীক্ষ্ণ চোখের চাহনির অর্থ মনোজিৎবাবুর বুঝতে অসুবিধে হল না। উনি নরম করে বললেন, ‘না… মানে, আগে দেখাই যাক না সংকেতটার কী মানে, আমরা তো আছি কয়েকদিন। দু-একদিন পরেই না হয় মিটিং হবে।’
এবার বিপুল বেশ বিরক্ত। সে বেশ জোরেই বলল, ‘না, অর্চনার দিকটাও তো আমাকে ভাবতে হবে।’
‘সে তো শুধু তোমার বউদি নয়, আমার-ও তো ভাইঝি।’
এ’বার বিপুল বেশ অপমান করার সুরেই বলল, ‘দেখুন এই শরিকি সম্পত্তি বড়ো নোংরা জিনিস। আপনি বহুদিন বাড়িছাড়া, অর্চনাই সব দেখভাল করত, এত বড়ো বাড়ি মেনটেন করা বহুত ঝামেলা। তারপর নানারকম ক্যাচাল আছে, অনেক লাফড়া আছে, প্রমোটারের প্রেশার আছে, আপনি আপনার ডিমান্ড বলবেন, প্রবলেম সলভ। এসেছেন, ঘুরুন, খাওয়াদাওয়া করুন, আনন্দ করুন বিনা কারণে কেস জন্ডিস করবেন না। এটা আমার রিকোয়েস্ট।’
‘শোনো বিপুল, তুমি একটা কথা পরিষ্কার করে শুনে নাও, আমার যা আলোচনা করার আমি অর্চনার সঙ্গেই করব।’
এ’বার অর্চনা আগ বাড়িয়ে বলে উঠল, ‘না কাকামণি, এখন বিপুলই আমার একমাত্র ভরসা। আমার হয়ে ওই কথা বলবে।’
এ’বার মনোজিৎবাবু বেশ রেগে গেলেন। কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ দীনুকাকার প্রবেশ।
‘আজ রাতে মুরগির ঝোল আর রুটি। কারও কোনো অসুবিধে নেই তো।’
প্রত্যুষ এতক্ষণ চুপ করেই ছিল। দীনুকাকার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার রান্না হয়ে গেলে একটু আমার ঘরে এস তো, দরকার আছে।’
‘আচ্ছা দাদাবাবু।’ বলে চলে গেল দীনু।
আমরা ঘরে ফিরে এলাম। প্রত্যুষ বলল, ‘অপু একটা জিনিস খেয়াল করেছ, ঠাকুরঘরে মা কালীর মূর্তির পাশে আর একটা ঠাকুরের মূর্তি। ওটা কীসের জানো?’
‘হ্যাঁ, আমিও খেয়াল করলাম, কেমন অদ্ভুত মূর্তিটা। কুঞ্চিত কেশ, নীলাভ। চোখ, মুখ, পা, নখ রক্তাভ। হাতে ধনুর্বাণ। তবে বাহনটা কী অদ্ভুত! না কুমির, না শুশুক, অনেকটা মাছের মতো। কিন্তু মাছ নয়। কোন ঠাকুর বলো তো ওটা?’
‘ওটা কামদেব মদন। ব্রহ্মা আর দেবী ‘শ্রী’র পুত্র। ইনি যৌনশক্তির দেবতা। এনার স্ত্রী হলেন রতি। এনার বাণ হল কামময় পুষ্পবাণ। এই দেবতার মূল পুজোর দিন দোল। বসন্তের সঙ্গে মদনের খুব সখ্যতা। ওই ঋতুতেই উনি খুব প্রকট।’
‘বাব্বাঃ এতো সাংঘাতিক তথ্য।’
‘নিজে জানো, ব্যস! ওইটুকুই। ক্লাসে আবার যেন লেকচার দিও না। অল্পবয়েসে এই ঠাকুরের গল্প বেশি জানলে তাকে কী বলে জানো তো, ‘পাকা মদন’।’ এই বলে প্রত্যুষ হাসতে লাগল।
‘আচ্ছা এর পুজো লোকে করে কেন?’
‘এই মদন তোমার মিত্র হলে ক্ষতি নেই, শত্রু হলে সমূহ বিপদ। যাদের সঙ্গে শত্রুতা হয়, তারা এর পুজো করে।’
‘মানে? এই ঠাকুর আবার কী শত্রুতা করবে?’
‘কী আবার! তোমার বংশতালিকায় ফুলস্টপ।’
এই কথার মাঝেই রাত ন’টা নাগাদ দীনু ঘরে এল।
প্রত্যুষ পিঠে হাত বুলিয়ে বলল, ‘বোসো, তোমাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করবো।’
‘হ্যাঁ বলুন।’
‘বড়োবাবু মানে সর্বজিৎ বাবুর বড়োছেলে রঞ্জিত সম্বন্ধে কিছু বল। মানে বাবুর সঙ্গে সম্পর্ক কেমন ছিল?’
‘বাবু আমি এ’বাড়ির কাজের লোক। আমার কী এ’সব বলা উচিত হবে?’
‘তোমার কোনো ভয় নেই। তুমি নির্ভয়ে যা জানো বল।’
‘বড়োবাবুর বিয়ের পরে ছেলেপুলে হচ্ছিল না। মা ঠাকুরনকে ডাক্তার দেখানো হল। কোনো ফল হল না। তারপর একদিন বড়োবাবু অনাথ-আশ্রম থেকে ওই রঞ্জিতবাবুকে নিয়ে এলেন। তখন রঞ্জিতের বয়স কত হবে, বছর পাঁচেক। আমারই বয়স তখন দশ বছর। আমাকেও খুব ভালোবাসতেন। আমার বাড়ি দূরের গ্ৰামে। আমার বাবা এদের জমিতে মুনিশ খাটত। আমরা নীচু জাত। জেলে। আমাকে তো আর ছেলের জায়গায় বসানো যায় না। আশেপাশের কিছু লোকজন এ সব জানত, তারা বেশিরভাগই মরে গেছে। আর বাকিরা সবাই জানে উনিই বাবুর বড়ো ছেলে।’
‘আর ছোটোবাবু! মানে মনোজিৎবাবু।’
‘সে এক বিরাট গল্প। মায়ের গুরুদেব পরামর্শ দিলেন বাড়িতে মদন ঠাকুরের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে। বাড়িতে মদন এল। প্রতিষ্ঠা হল। নিত্যপুজো শুরু হল। বিয়ের কুড়ি বছর পর মদনের কৃপায় আর গুরুদেবের আশীর্বাদে, মায়ের পেটে ছোটোখোকা এল। সবাই তাই বিশ্বাস করে, আমিও তাই করি। সারা বাড়ি আনন্দে ভরে উঠল। ছোটোবাবু এসবের কিছুই জানে না।’
‘আর বড়ো ছেলে রঞ্জিত আনন্দ পেল।’
‘রঞ্জিতবাবু তো ওইসব পুরসভার কীসব কন্টাকটারি করত। বাবুই সুযোগ করে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিল। তবে প্রায়ই বাবুর সঙ্গে টাকা পয়সা নিয়ে ঝামেলা হত। বাবুকে কীসব লেখাপড়া করে দিতে বলত। আসলে ছোটোবাবু মানে আপনাদের মনোজিৎবাবু তো একটু বড়ো হতেই কলকাতায় পড়তে চলে গেল। মা ঠাকুরনও মারা গেলেন। কত্তাবাবুর বয়স হয়ে গেল। হাঁপানিতে ধরল। রঞ্জিতবাবুর ওপর খুব নির্ভরশীল হয়ে পড়লেন।’
‘যাক তাহলে মদনের কৃপা আছে বলো এই বংশে।’
কপালে হাত ঠেকিয়ে দীনুকাকা বলল, ‘হ্যাঁ, সেইজন্যই তো মদনের পুরোনো ছোটো মূর্তি বিসর্জন দিয়ে এই বড়ো মূর্তি এনে কত্তাবাবু বসালেন।’
‘আর এই অর্চনা বিপুল এরা কেমন? এরা জানে এসব কথা?’
‘আমি চাকর হয়ে আর কী বলব? নিশ্চয়ই জানে। বাবা কী আর মেয়েকে ভেতরের গল্প বলেনি। তবে আমাকে কিছু বুঝতে দেয় না। অর্চনা দিদিমণি কেমন যেন? বিধবা মানুষ হয়ে সারাক্ষণ দেওরের সঙ্গে, জিনিসটা ভালো দেখায়? আশেপাশে সবাই কানাঘুষো করে।’
‘আচ্ছা এই বিপুলবাবু কি বরাবরই এখানে আসত?’
‘না, অর্চনা দিদিমণির বিয়ে হল মেঘনাদবাবুর সঙ্গে। এই বিপুলবাবু নাকি ওঁর কীরকম মামাতো ভাই, বন্ধুর মতো। ওই তারপর থেকে মাঝেমধ্যে যাতায়াত ছিল। মেঘনাদবাবু মারা যাওয়ার পর তো এখানে একেবারে গেঁড়েই বসলেন। অর্চনা দিদিমণির সব ভালোমন্দের ভার নাকি উনিই নিলেন।’
‘আচ্ছা তোমাদের ওই মেঘনাদবাবু কীভাবে মারা গেলেন?’
‘সেদিনের কথা কি ভোলা যায়? এবছর দোলের দিন ছিল। মেঘনাদবাবু, বিপুলবাবু আর অর্চনাদিদি সবাই আনন্দ করে নৌকো করে ঘুরতে গেল। ছোটোখোকা মানে অভিজিৎবাবু আমার কাছেই ছিল। আমি সব খাবার-দাবার করে দিলাম। সন্ধেবেলা দুজনে কান্নাকাটি করতে করতে ফিরল। মেঘনাদবাবু নাকি জলে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছে।’
‘থানা পুলিশ হল না? বডি পাওয়া গেল?
‘হ্যাঁ, অর্চনা দিদিমণি-ই তো পুলিশে জানাল। পুলিশ এল। কত জেরা করল। অনেক খুঁজেছিল। কোথাও বডি পাওয়া গেল না। জলে কুমির, হাঙর, কামোট, শুশুক কত কী আছে! তাদের পেটে চলে গেছে। ও আর পাওয়া যায়?’
‘আচ্ছা, তোমার কী মনে হয়? মেঘনাদবাবু আত্মহত্যা করল কেন?’
‘আমি জানি না বাবু।’
‘দিদিমণির সঙ্গে কি ঝগড়া হত?’
‘সে তো সব সংসারেই হয়।’
‘না, বিপুলবাবুকে নিয়ে।’
‘দেখুন বাবুরা, কোন স্বামী মেনে নেবে পরপুরুষের সঙ্গে মাখামাখি। হয়তো কোনো অশান্তি ছিল, আমি বুঝতে পারিনি। নাহলে কেউ শুধু শুধু মরে।’
‘আত্মহত্যাই বা বলছ কেন? খুনও তো হতে পারে।’
‘আমি কী বলব বাবু, পুলিশই কিছু বলতে পারল না। তবে ওদের সব ব্যাপারটাই কেমন যেন ধোঁয়াশা! বাড়ি কেনার খদ্দের গভীর রাতে আসবে কেন? আমি, ছোটো খোকাবাবু ঘুমিয়ে পড়লে একটা লোক আসে। প্রায়ই। সে নাকি খদ্দের। বাইক নিয়ে আসে। হেলমেট পরা থাকে। হেলমেট খোলে না। আমার বয়স হয়েছে। অন্ধকারে ঠাহর করতে পারি না। মুখটা কোনোদিন দেখিনি। তবে চেহারাটা খুব চেনা-চেনা। তিনজনে ওপরের ঘরে বসে, অনেক রাত অবধি খাওয়া-দাওয়া, গল্পগুজব করে। সকালে উঠে দেখতে পাই না। বোধহয় ভোররাতে চলে যায়। বুঝি না কিছু, বড়োকত্তাবাবু ঠিকই বলতেন।’
‘কী বলতেন?’
‘আমাকে সবসময় বলতেন, ‘দেখ আমার যা শরীরের অবস্থা, আজ আছি, কাল নেই। তুই থাকিস, দেখবি সংসার যেন ঠিক থাকে। আমি আর কী করব! বাবা মদনদেব যদি চান থাকবে, নাহলে সব ভাঙবে। ভাঙলে বুঝবে ঠ্যালা’। বাবু আমি এ’সব কথার কোনো মানে বুঝতাম না। তবে মারা যাবার আগে আমাকে একটা দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আজ মুক্তি।’
‘কী দায়িত্ব?’
‘নিজের ঘরের ওই কাঠের দেরাজের চাবি। ওর ভেতর নাকি খুব দরকারি কী একটা জিনিস আছে, যেটা ছোটোবাবু ছাড়া কাউকে দেওয়া যাবে না। আমারও তো বয়স হচ্ছে, চিন্তা বাড়তে লাগল। ঘর পরিষ্কারের ছুতোয় আলমারিটা খুললাম। খুলে দেখি, কিছু নেই। শুধু একটা খাম। সেটাই ছোটোবাবুকে (মনোজিৎবাবুকে) জানালাম। তারপর বাবুর বন্ধুর কাছে গিয়ে তো জানলাম, কী একটা ছড়া! এ’সবের মানে কী বাবু?’
‘কিছু না। ধৈর্য ধরো, সব জানতে পারবে। ঠিক আছে এ’বার তুমি এসো। সাবধানে থেকো। তুমি অনেক কিছু জানো, আর বোঝো তো বেশি জানা মানেই বেশি বিপদ। সাবধান!’
রাতে খাওয়া ভালোই হল। নিজেদের ঘরে চলে এলাম। আমাদের পাশেই বিপুলবাবুর ঘর। নীচে থাকে অর্চনা। তার পাশের ঘরেই মনোজিৎবাবুদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আমি শুয়ে পড়লাম। প্রত্যুষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ইছামতীর দিকে তাকিয়ে সিগারেট খাচ্ছে। বেশ ঠান্ডা হাওয়া আসছে। দরজার পর্দাটা হালকা উড়ছে। দূরে টিমটিম করছে বাংলাদেশের আলো। আকাশের তারার মতো। আকাশও আজ পরিষ্কার। কামড় খাওয়া পাঁপড়ের মতো চাঁদ। জ্যোৎস্নায় বুঁদ ইছামতী। মনে মনে ভাবছি, আচ্ছা এই যে আকাশে এতো তারা, এরা তো দিনের বেলাতেও থাকে, আমরা দেখতে পাই না। অথচ রাতে কী পরিষ্কার! সবই আলো আঁধারের খেলা। ছায়ার ভেতরে মায়া। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না। হঠাৎ ঘুম ভাঙল, প্রত্যুষের একটা ধাক্কায়। ধড়মড় করে উঠে বসলাম। দেখি প্রত্যুষ।
‘কী হল? এতো রাতে!’
‘সংকেতটা পরিষ্কার।’
‘কী বলছ কি? সত্যিই…!’
‘হ্যাঁ শোনো। প্রথম লাইনের মানে তো আগেই বলেছি, মানে রঞ্জিতবাবু সর্বজিৎবাবুর ছেলে নয়। দ্বিতীয় লাইনে, পোষ্য প্রভুভক্ত নয়, মানে এখানে পোষ্য রঞ্জিতবাবু এবং সর্বজিৎবাবুর বাধ্য নয়। ওদের দু’জনের খারাপ সম্পর্কের আভাস দেওয়া হয়েছে। তৃতীয় লাইনে, মানে অধিকার নেই কাগজে-কলমে, মানে কোথাও একটা উইল আছে, সেটাই আমাদের খুঁজে বার করতে হবে। আমি নিশ্চিত সেই উইলে রঞ্জিতবাবুর নাম নেই। তবে আসল খেলাটা উনি খেলেছেন শেষ লাইনে। শেষ লাইনটা মারাত্মক! আচ্ছা অপু, তুমি এ্যনাগ্ৰাম জানো?’
‘কোথায় যেন একটা পড়েছিলাম কথাটা, ঠিক মনে নেই।’
‘আগেকার দিনের বৈজ্ঞানিকরা নিজের বিশ্বাস এই এ্যনাগ্ৰামে গোপনে লিখে রাখতেন। তারপর সেটা প্রমাণ করার চেষ্টা করতেন। জীবদ্দশায় না পারলে, মারা যাওয়ার পর সেই এ্যনাগ্ৰাম উদ্ধার করে তার প্রিয় ছাত্ররা গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতেন। অন্য কেউ যাতে সেই কর্মকাণ্ডের কথা জানতে না পারে, গোপন থাকে, তাই রহস্য করে নিজের আবিষ্কার কথার জাদু দিয়ে লুকিয়ে রাখতেন। কোপারনিকাস, গ্যালিলিও এনারাও এই এ্যনাগ্ৰামের আশ্রয় নিয়েছিলেন।’
‘কীভাবে?’
‘একই শব্দের বিভিন্ন অক্ষরের সমন্বয় আর বিন্যাসের মাধ্যমে। সিম্পল পারমুটেশন, কম্বিনেশন। যেমন এখানে, বিশেষ শব্দ-বন্ধনীর মধ্যে আছে, ‘প্রণাম কুঠার দমনে’ আসলে এটা, প্রমাণ ঠাকুর মদনে। এবার আসি শেষ শব্দটায়, মানে ‘মরমে’। এক্ষেত্রে তিনি কি সবটাই ঠাকুরের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন? মানে ওই সবই তাঁর ইচ্ছা। নাকি ঠাকুরের বুকের ভেতরই সব লুকিয়ে রেখেছেন। এখন শুয়ে পড়ো, কাল মদনের ফুল-বডি চেক-আপ।’
‘তোমার পায়ের ধুলো দাও। তুমি গুরু অন্য জিনিস!’
ভোরবেলা একটা চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল। মনোজিৎবাবুর গলা। প্রত্যুষের বিছানা ফাঁকা। দৌড়ে নীচে গেলাম। নীচের বারান্দায় প্রসেনজিতের মা ভারতীদেবীর সঙ্গে দেখা। বললেন, ‘সব্বোনাশ হয়ে গেছে, দীনুকাকা আর নেই!’ বলে পিছনের বাগানের দিকে দেখালেন। ছুটে গেলাম বাগানে। দেখলাম পুকুর ঘাটের দিকে জটলা। প্রত্যুষ, বিপুল, অর্চনা, মনোজিৎবাবু, প্রসেনজিৎ সবাই রয়েছে। দূরে দাঁড়িয়ে শুধু কাঁদছে অভিজিৎ। আমি গিয়ে সান্ত্বনা দিলাম অভিজিৎকে। ও আমাকে জড়িয়ে কেঁদে বলল, ‘দাদুন মরে গেছে, আমাকে ভূতের গল্প বলবে কে?’
‘দাদুন তোমাকে রোজ ভূতের গল্প শোনাত?’
‘হ্যাঁ, ভূত তো আমাদের বাড়িতে রোজ রাত্তিরে আসে। আমাকে দাদুন ভূতের পায়ের শব্দ শোনাত।’
দেখি প্রত্যুষ এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে। অভিজিতের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর গেলাম মৃতদেহের কাছে। পুকুরের ধারে অশোক ফুলের গাছ। তার ঠিক নীচেই উপুড় হয়ে পড়ে আছে দীনুকাকা। গায়ের ওপর দু-চারটে অশোক ফুল। বাঁদিকে পুকুর-ঘাট। গাছের গুঁড়ির সিঁড়ি, গজাল দিয়ে আটকানো। ধাপে ধাপে নেমে গেছে পুকুরে। শরীরে কোথাও কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। শুধু পিঠের ওপর একটা ছোটো ফুটো। সেখান থেকে একটু রক্ত চুঁইয়ে পড়েছে কুয়াশা ভেজা নরম মাটিতে। সামান্য। প্রত্যুষ বলল, ‘পুলিশকে খবর দেওয়া হয়েছে?’ মনোজিৎবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ, বিপুল ফোন করে দিয়েছে।’ প্রত্যুষ চারিদিকে ছবি তুলতে লাগল।
বলতে বলতেই পুলিশ এসে গেল। আগে এসেই মৃতদেহের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। তারপর খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফোন কে করেছিলেন?’
ভিড়ের মধ্যে থেকে বিপুল এগিয়ে এসে বলল, ‘আমি।’
‘আর বাকিরা…’
বিপুল একে একে পরিচয় করাতে লাগল। প্রত্যুষের দিকে দেখিয়ে বলল, ‘ইনি প্রসেনজিতের স্কুলের মানে হিন্দু স্কুলের বিজ্ঞানের টিচার, প্রত্যুষবাবু।’
‘দাঁড়ান দাঁড়ান, মানে প্রত্যুষ সেন। চন্দননগরের বাঁশি কেস। বলেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি অপূর্ব কর। আঁকার টিচার, হিন্দুস্কুল। পড়েছি, ননীচোরের মোহনবাঁশি, দারুণ লিখেছেন। আসলে চন্দননগরের ইন্সপেক্টর পালিত আমার পুলিশ ট্রেনিংয়ের ব্যাচমেট। আমাকে পুরো গল্পটা বলেছে। ব্যস! আপনি এসে গেছেন, আমার আর কোনো চিন্তা নেই। বলুন কী বুঝছেন?’
‘আপনি তো দেখলেন। কী বুঝলেন?’
‘দেখুন, বয়স্ক মানুষ। ঘাটে পা স্লিপ করে পড়ে গেছে। কুয়াশায় আর শ্যাওলায় ঘাট পিছল। এইসব গজাল বেরিয়ে আছে। হয়তো পিঠে ঢুকে গেছে। তারপর ছটফট করতে করতে বাড়ির দিকে যেতে গেছে, পারেনি। এখানে পড়ে ফিনিশ। তবে পুলিশ কেস হবে। অ্যাক্সিডেন্ট হলেও পোস্টমর্টেম তো করতেই হবে।’
‘হ্যাঁ সেটাই করুন। তবে আমার ধারণা এটা মার্ডার। আমার যেটা সন্দেহ হচ্ছে, উনি স্নান করেননি তখনও, তবুও পিঠের কাছটা অত ভিজে কেন? সেটাই বেশি ভাবাচ্ছে। মার্ডার ওয়েপানটা এক্ষেত্রে অদ্ভুত মনে হচ্ছে। দেখা যাক।’
এ’বার ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলিবাবু একটু নড়েচড়ে দাঁড়ালেন, ‘আচ্ছা বডি প্রথম কে দেখে?’
বিপুল এগিয়ে এসে বলল, ‘আমি ভোরবেলা উঠে রোজই বাগানে ঘুরি। দেখি রোজই দীনুকাকা চান করে ঠাকুর প্রণাম করে। আমি কালকেও বললাম, কীগো, এই ঠান্ডায় এতো ভোরবেলা তোমার শীত করে না? আমাকে আবার বলল, বহুদিনের অভ্যাস। অসুবিধে হয় না। আজকে তো এসে দেখি এই অবস্থা। আমি চমকে গেলাম। দীনু নেই! লাশ!’
পুলিশ চলে যাওয়ার পর, আমি আর প্রত্যুষ ইছামতীর ধারে বাঁধানো জায়গায় একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম। দু’টো চা নিলাম। প্রত্যুষের মুখে কুলুপ। আমার আর ধৈর্য ধরছে না। বলেই ফেললাম, ‘তুমি যাই বলো খুনি কিন্তু বিপুল।’
‘না, বিপুল আর যাই করুক খুন করেনি। আমি সারারাত ওকে নজর রেখেছিলাম। কিছু একটা তোমার মতো আমিও আন্দাজ করেছিলাম। কিন্তু না। তবে খুনে সাহায্য করতে পারে। তবে খুনি ধরা না পড়লেও, আমরা কিন্তু ধরা পড়ে গেলাম। মানে পুলিশের বড়োবাবুর কথায় সবই জানাজানি হয়ে গেল। খুনি যেই হোক, সে আরও সতর্ক হয়ে যাবে। পরিচয় বেরিয়ে লাভের লাভ কিছুই হল না, বরং ক্ষতিই হল।’
‘হ্যাঁ, গাঙ্গুলিবাবু পুরো হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিল। কিন্তু তাহলে খুনটা করল কে?’
‘সব গুলিয়ে যাচ্ছে অপু। একটা অঙ্ক সাজাচ্ছি। সিঁড়িভাঙা সরলের মতো। ক্রমশ উত্তরের দিকে যাচ্ছি। লাইনগুলো ছোটো হয়ে আসছে, আবার সব ভেঙেচুরে বড়ো হয়ে যাচ্ছে। জটিল হয়ে যাচ্ছে। প্রথম থেকে সাজাও। একটা জলজ্যান্ত মানুষ উধাও হয়ে গেল। কেউ তার কোনো খবর পেল না। বডি অবধি পাওয়া গেল না। পুলিশের খাতায় নিখোঁজ। বাড়ির লোকের কাছে মৃত। তারপর একটা রহস্যময় ধাঁধা। সম্পত্তির প্রাণভোমরা। একটা বৃদ্ধ নিরীহ মানুষ খুন। যে কিনা বাড়ির অনেক কিছু জানে। আর সবচেয়ে যেটা আমাকে ভাবাচ্ছে অপু, সেটা হল সেই ছায়াময় অজানা মানুষ। যে নিজের মুখ দেখাতে চায় না। অথচ রোজ আসে গভীর রাতে, আবার চলে যায় ভোররাতে। সে কী খদ্দের! নাকি অন্য কেউ। কোনো ছদ্মবেশী? কী চায়? সম্পত্তি! নাকি অন্য কিছু? অভিজিতের দাদুনের কাছে শোনা ভূতের পায়ের শব্দ কার? সে কী সত্যিই কল্পনার ভূত না সেই রাতের মুখোশ পরা অতিথি। না অপু এ শুধু রহস্যের জাল নয়, একেবারে ইন্দ্রজাল। ম্যাজিক অফ মদন।’
‘ওফ্ দুর্ধর্ষ! গপ্পের নামটা কী দেওয়া যায় বলো তো? এই নামটা কিন্তু জমে যাবে!’
‘তুমি এখন গল্প ভাবছ, আমি ভাবছি মদনের কথা। এই রহস্যে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে মদন। শেষে হয়তো নিজে ভেঙে গিয়ে ভেঙে দেবে সব রহস্যের বেড়াজাল। হয়তো টুকরো টুকরো হয়ে যাবে কামদেব মদন, খুলে যাবে সব রহস্যের জট, হয়ে যাবে সব ধোঁয়াশার পর্দা উন্মোচন। তবে একটা কথা জানো তো অপু, আমরা মানুষেরা যতই বুদ্ধির বড়াই করি, উপরে বসে শেষ খেলাটা কিন্তু উনিই খেলেন। শুধু দেখতে পাওয়ার চোখ সবার থাকে না। আমরা তার নগণ্য সৃষ্টিমাত্র। আমরা যেসব পুতুল তৈরি করেছি, এখন নিজেরাই তাদের হাতের পুতুল।’
‘সূত্রের মধ্যে মদন আছে ঠিকই, কিন্তু বাকি ব্যাপারে মদন কীভাবে ঢুকল?’
‘পুরোটাই তো মদনময়। মেঘনাদবাবুর বডি পাওয়া গেল না, কীসে খেল? হয়তো মদনের বাহন মকরে। আবার দোলের দিন। যেদিন কামদেব মহাজাগ্ৰত। কী অদ্ভুত! দীনুকাকা মারা গেল অশোক-ফুল গাছের নীচে। গায়েও দু-চারটে অশোক ফুল পড়েছিল। জানো অপু, মদনদেবের ধনুর্বাণের সব বাণই হল পুষ্পবাণ। তবে তার মধ্যে সেরা পুষ্প হল অশোক ফুল। সেই অশোক ফুলের নীচেই দীনুকাকার মৃত্যু। এর পরেও বলবে মদনের কোনো ভূমিকা নেই। চলো, আজ স্নান করে আমি মদনকে প্রণাম করব। তারপর শ্বশুরবাড়ি।’
‘কার শ্বশুরবাড়ি?’
‘অর্চনার।’
আমরা নদীর ধার থেকে বাড়ি ফিরে এলাম। প্রত্যুষ স্নান করে ঠাকুরঘরে ঢুকল। স্পর্শ করে প্রণাম করল মদনকে। তারপর হাসিমুখে বেরিয়ে এল। এরপর অর্চনার শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা নিল মনোজিৎবাবুর কাছে থেকে। আমরা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেলাম। বসিরহাট, উকিলপাড়া। সেখানে গিয়ে অল্প খোঁজ করতেই মেঘনাদবাবুদের বাড়ি পাওয়া গেল। মোটামুটি স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত পরিবার। একান্নবর্তী পরিবার। পুলিশের পরিচয় দিয়েই ঢুকতে বাধ্য হলাম। কারণ অর্চনা এবং ওই বাড়ির প্রতি, ওর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা খুবই বীতশ্রদ্ধ। মেঘনাদের মারা যাওয়ার যে গল্পটা অর্চনারা ফেঁদেছিল, সেটা ওঁরা বিশ্বাস করেন না। ওরা এটা খুন বলেই মনে করে। যেহেতু বডি পাওয়া যায়নি, ফলে কোনো তদন্তও হয়নি। কিছু করার নেই, অগত্যা মেনে নিয়েছেন। তবে বিপুল নামে ওঁদের কোনো মামাতো ভাই নেই। বিপুল হল মেঘনাদের বন্ধু, ব্যবসার পার্টনার। প্রত্যুষকে বললাম, ‘দেখলে তো, তুমি কিন্তু বিপুলকে অ্যারেস্ট করাতে পারতে।’
‘কীসস্যু প্রমাণ হত না। ফসকা গেরো হয়ে যেত।’
‘তবে একটা বিষয় তো পরিষ্কার হল, যে ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।’
‘সে তো একশোবার। কেসটা আর জলবৎ তরলং থাকল না। ভুয়ো পরিচয়, মানে আমি নিশ্চিত অপরাধের গন্ধটা এখানেই লুকিয়ে আছে। তা না হলে, ও মামাতো ভাই সেজে ওখানে ঢুকবে কেন?’
‘না, বন্ধু হিসেবে অনেকে আপত্তি তুলতে পারে, দেওর হলে একটা সামাজিক সুবিধে আছে।’
‘সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছ অপু। তবে এই বিপুল কিন্তু নাটের গুরু নয়, মানে যাকে বলে মাস্টার-মাইন্ড। পিছনে অন্য মাথা আছে। তা না হলে ওর অতটা সাহস হবে না, যে পরপর খুন করে পুলিশ বা সবার চোখের সামনে ধুলো দিয়ে ঘুরে বেড়াবে।’
‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ, যে মেঘনাদবাবুকে বিপুল মারেনি। আর আজকের দীনুকাকার খুনটাতেও ওর কোনো হাত নেই!’
‘দেখো হাত আছে কিনা জানি না, আর থাকলেও কতটা আছে, সেটা তদন্তসাপেক্ষে। তবে, মেঘনাদবাবুর খুন বা আত্মহত্যাটা নিয়ে আমার খটকা বাড়ছে।’
‘কেন?’
‘দাদুনের কাছে শোনা অভিজিতের ভূতের পায়ের শব্দ। শিশুদের কথা কখনও অবহেলা করতে নেই। ওদের পর্যবেক্ষণ সবসময় নিরপেক্ষ হয়। কারণ ওরা কোনো দলের হয় না। ওদের মুখ আর মুখোশ এক হয়।’
‘তাহলে এখন কী করণীয়?’
‘সবার আগে মেঘনাদবাবুকে মেঘের আড়াল থেকে বার করে আনা।’
‘তুমি কি একশোভাগ নিশ্চিত, উনি বেঁচে আছেন।’
‘দেখো, আন্দাজের ওপর তো আর কাউকে দোষী করা যায় না। আর সবার আগে প্রমাণ করতে হবে যে উনি বেঁচে আছেন। তারপর যেখান থেকেই হোক, ওঁকে খুঁজে বার করতে হবে। তারপরের প্রশ্ন হল, ওঁকে অপরাধী প্রমাণ করা।’
‘তাহলে তদন্ত এগোবে এই পথেই।’
‘হ্যাঁ, দেখো মনে মনে একটা নকশা এঁকে না নিলে, তুমি তো এগোতে পারবে না। এখন আমাদের প্রথম কাজ, মেঘনাদবাবু সম্বন্ধে যত বেশি সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করা। লোকটার সম্পর্কে তুমি যত বেশি জানবে, তোমার কাজ তত সহজ হয়ে যাবে। এখন চল।’
সারাদিন আমরা বসিরহাটের নানা অঞ্চলে ঘুরতে লাগলাম। বিভিন্ন পাড়ায়, চায়ের দোকানে, ক্লাবে জিজ্ঞাসাবাদ চলতে লাগল। অনেকে মেঘনাদবাবুকে চিনতে পারল, অনেকে পারল না। তবে টুকরো টুকরো অনেক যা খবর জোগাড় হল, তাতে তো উনি মোটামুটি বিখ্যাত মহাপুরুষ। সেই টুকরো খবরের মালা গেঁথে একদম গলায় পরিয়ে দিলেই হল। খুবই কর্মময় জীবন। এখন আমি সেই মেঘনাদ রচনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
কলেজে পড়তে পড়তেই পাড়াঘর, আশপাশে, আত্মীয়স্বজনদের মধ্যে মেঘনাদের ফেরেববাজি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বহু লোকের কাছেই টাকা-পয়সা ধার নিত। কখনই ঠিক সময়ে শোধ দিত না। একটা ধার করে আর একটা ধারের টাকা ধামাচাপা দিত। সেই সময়েই আলাপ হয় এই বিপুলের সঙ্গে। দু’জনে মিলে বসিরহাটে চিটফান্ডের ব্যবসা ফাঁদে। সবাই জানত আসল মালিক মেঘনাদ। বিপুল ম্যানেজার মাত্র। কিন্তু ভেতরে আসলে দু’জনে পার্টনার। বহু লোকের টাকা ওরা আত্মসাৎ করেছে। বিপুল পালিয়ে বেড়ায়, এদিকে বড়ো একটা মাড়ায় না। আর তাছাড়া, ওকে ধরলেই বা কী! ও তো টাকা-পয়সা সংক্রান্ত সব দোষ মেঘনাদের ঘাড়ে দিয়ে খালাস। আর মেঘনাদ তো মৃত বা বেপাত্তা। একবারে মাস্টারস্ট্রোক! তবে তারপরেই ওরা ফেঁদেছিল আসল ব্যবসা। যেটার জন্য এই অজানায় হারিয়ে যাওয়ার নাটক করা ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা মেঘনাদের সামনে খোলা ছিল না।
সেটা হল এই প্রোমোটারি ব্যবসা। এমনিই তো মেঘনাদ ছোটোবেলা থেকেই একদম সততার প্রতীক। তাই একই ফ্ল্যাট একাধিক লোকের কাছে জাল কাগজ তৈরি করে বেচতে লাগল। একই ফ্ল্যাটের বিনিময়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে জালিয়াতি করে লোন নিতে বা ক্রেতাদের লোন পাইয়ে দেওয়াতে সাহায্য করতে লাগল। ক্রমশ নিজে যত ফাঁসতে লাগল, তত ডুবতে লাগল ধারের গভীরে। কিন্তু তবুও মেঘনাদ ছিল ধূর্ত। এত কিছুর পরেও যাতে বাইরের লোক, কেউ কিছুই বুঝতে না পারে তাই চাল-চলনে বড়োলোকির কমতি ছিল না। ঠিক এই জায়গাতেই ফেঁসেছিল অর্চনা। আসলে রতনে রতন চেনে। অর্চনার রক্তেও তো ভেজাল। তাই মেঘনাদের ওই ফাঁপা বড়োলোকি, ফাঁকা আওয়াজ বেশ ভালোই লাগত। জানা গেল, বিয়ের আগে বেশ চুটিয়েই প্রেম করত ওরা। দু’জনেই ভাবছে দু’জনেই খুব লাভ করছে। কিন্তু আসলে একমাত্র ঈশ্বরই জানেন, যে দু’জনেই দু’জনকে ঠকাচ্ছে। প্রত্যুষ মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই ‘মেঘনাদ-বধ কাব্য’ একটি সাজানো ঘটনা। তবে পুরো পরিকল্পনাটাকে উন্মুক্ত না করতে পারলে শান্তি নেই। তবে ওর চারিত্রিক যা বর্ণনা পাওয়া গেল, তাতে ও-ই যে নাটের গুরু, সেটা সন্দেহাতীত। আর ওই আত্মহত্যার আষাঢ়ে গল্প, যেটা ওরা কেঁদেকেটে এসে বলেছিল, সেটা সম্পূর্ণই ভুয়ো। আর বিপুল অর্চনা নিজেদের মধ্যে একটা অবৈধ সম্পর্কের জাল বিস্তার করে, শুধুমাত্র সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে তাদের মনে একটা খুনের সম্ভাবনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। অনেকেই মনে মনে ভাবতে শুরু করল যে, বিপুল অর্চনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার জন্যই বোধহয় পথের কাঁটা মেঘনাদকে সরিয়ে দিয়েছে। তবে সেটা ভাবলে আদতে ওদের ক্ষতি নেই। কারণ সাধারণ মানুষ ভাবা ছাড়া তো আর কিছু করতে পারবে না। আর প্রমাণ! পুলিশেরও বাবারও সাধ্যি নেই যে বিপুলকে খুনি প্রমাণ করে। কারণ প্রকৃতপক্ষে বিপুল তো খুন করেইনি। প্রত্যুষ মোটামুটি নিশ্চিত একটা ছবি এঁকে ফেলল মনের ভেতর, যে মেঘনাদ খুন বা আত্মহত্যা যা-ই রটাক, ও বহাল তবিয়তেই কোথাও ঘাপটি মেরে গা-ঢাকা দিয়ে রয়েছে। আর বউকে বিধবা সাজিয়ে সহানুভূতি নেওয়ার তাল। তার মানে যেটা শেষপর্যন্ত দাঁড়াল যে খুন করেছে, পুলিশের খাতায় বডি না পাওয়া গেলেও সে মৃত বা নিখোঁজ। একবারে মাস্টার প্ল্যান। এই মাছকে জালে তোলা সহজ হবে না। দেখা যাক, এখন কতটা বেগ দেয়।
ফিরতে ফিরতে আমাদের বিকেল হল। বাড়িতে এসে দেখি অর্চনা নেই। বোধহয় কোথাও বেরিয়েছে। বিপুলও নেই। আলো পড়ে এসেছে। শীতের বেলা। ইছামতীর জলে সূর্যাস্তের শেষ আলোর আবিরের আলতা, কেউ যেন গুলে দিয়েছে। আমরা নদীর ধারে বাঁধানো বেঞ্চের ওপর এসে বসলাম। অনেক পর্যটকই বসে আছে। চারদিকে হরেক পসরা সাজিয়ে নানারকমের দোকান লাগানো। বেশ জমজমাট। নদী হলেও স্থানীয় লোকেরা এ জায়গাটাকে সৈকত বলতেই বেশি ভালোবাসে। অনেক হোটেলের নামের সঙ্গে ‘সৈকত’ কথাটা জোড়া রয়েছে। বসে এইসব সাত-পাঁচ ভাবছি। অনেক ছোটো ছোটো লাল নীল নৌকো ভাসছে জলে। কোনোটার মাথায় পতপত করছে বাংলাদেশের পতাকা আবার কোনোটাতে ভারতের। এখানে বসে থাকলে কোথা দিয়ে সময় কেটে যায়, বোঝা যায় না। বড়ো মনোমুগ্ধকর সে দৃশ্য! তবে প্রত্যুষ তো আর সাধারণ পাঁচ জনের মতো মনোরম দৃশ্যে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে না। ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় সদা সজাগ। চোখ বাজপাখির মতো। তীক্ষ্ম। আচমকা আমাকে বলে উঠল, ‘ঘর থেকে দৌড়ে, দূরবিনটা নিয়ে এসো তো। ব্যাগের বাইরের খাপে আছে।’
‘দূরবিন? হ্যাঁ যাই, বাংলাদেশটা পরিষ্কার দেখা যাবে।’
‘শুধু বাংলাদেশ কেন? বাংলাদেশের সরষে ফুলও অবধি দেখাব। তাড়াতাড়ি যাও।’
বিনা বাক্যব্যয়ে দৌড়ে গিয়ে দূরবিনটা নিয়ে এলাম। পাশে বসতেই প্রত্যুষ ঘাড়ে হাত দিয়ে দূরবিনটা একঝলক চোখে লাগিয়েই, তারপর সরিয়ে যন্তরটা আমার চোখে ঠেসে ধরল, নির্দেশ দিল, ‘ভারতের পতাকা লাগানো ওই নীল নৌকাটার দিকে এবার দূরবিনটা তাক করো, চোখটা লাগাও। কী দেখছ?’
‘আরে! এবার সত্যিই আমার চোখে সরষেফুল। এটা তো অর্চনা। তবে সঙ্গের লোকটা বিপুল নয়। অন্য একজন?’
ইছামতীর টলটলে ঢেউতে প্রেম যেন টলমল। তারা যে-ই হোক, এই স্লেট রঙা মেঘের আড়ালে কনে দেখা আলোয় বড়ো মধুর সে দৃশ্য। এসব প্রত্যুষের ঘটে ঢুকবে না। সব ইচ্ছে মরে গেছে ওর মতির চাপে। ওই জন্যেই বলে, অতি চালাকের গলায় দড়ি, রজনীগন্ধার মালা আর কোনোদিন জুটবে না! আর ওর পাল্লায় পড়ে, আমার কপালটাও পুড়েছে। পোড়াকপাল নিয়ে চোখে দূরবিন লাগিয়ে লোকের প্রেম দেখো। আর নিজের বেলায় ঘণ্টা। হঠাৎ দূরে ঘাটের পাশের সীমান্ত প্রতিরক্ষা বাহিনীর অফিস থেকে একটা ঘণ্টাধ্বনি বেজে উঠল। বোধহয় সূর্যাস্তের আগাম ঘোষণা। রোজই সকাল সন্ধে বাজানো হয়। মনে মনে এইসব আবোলতাবোল ভাবছি। আবার এটাও ভাবছি, কে এই অচেনা পুরুষ? সে কি কোনো তৃতীয় পুরুষ? অর্চনা কি বহুগামী? আবার দূরবিনটা চোখে লাগালাম। ভালোবাসাবাসির দৃশ্য এবার দূষণমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, বিপদসীমার ওপর দিয়ে বইছে, আর দেখা বোধহয় উচিত নয়। মনুষ্যত্বে বাধছে। ভাবছি চোখ সরিয়ে নেব। দেখলাম, ওরা প্রেমে মাখামাখি হয়ে ঢুকে গেল ছই’র ভেতর।
প্রত্যুষকে পুরো গল্পটা বললাম। তারপর আস্তে করে বললাম, ‘কী বুঝলে?’
‘এখন আমি ভাবছি, এই লোকটি কোনো তৃতীয় পুরুষ? নাকি আত্মগোপন করে থাকা, সাধারণ লোকচক্ষুর আড়ালে সবার চোখে ধুলো দিয়ে, আত্মহত্যার গল্প রটিয়ে দেওয়া মেঘনাদ নিজেই? হয়তো খুনের উদ্যাপন করছে আজ! আর খবর নিচ্ছে, খুনের পরে বাড়ির বা পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির।’
‘নৌকো থেকে নামলে ওদের দু’জনকে গ্ৰেপ্তার করলেই তো হয়! তাহলেই তো সমাধান।’
‘গ্ৰেপ্তার করলেই কি আর সব সমাধান মিটে যায়?’
‘না, এটা যদি মেঘনাদ হয়, তাহলে তো, পরে আমাদের হাত কামড়াতে হবে।’
‘সে তুমি এখনই কামড়াতে পার। আমার টেলিপ্যাথি বলছে ওটা মেঘনাদ।’
‘যদিও আমি তোমার সহকারী, তবুও বলছি একটা কথা, যদি শোনো, এ সুযোগ হাতছাড়া কোরো না, হাতের লক্ষ্মী পায়ে ঠেলো না।’
‘ঘরের লক্ষ্মী ঘরে ফিরলেও, নারায়ণ অত সহজে ধরা দেবে বলে মনে হয় না। অর্চনা যখন জেনে গেছে, আমরা গোয়েন্দা, তখন তোমার মনে হয়, ওটা যদি সত্যিই মেঘনাদ হয়, তাহলে এই ঘাটে নামবে! কখনই না। ও অনেক বেশি ধূর্ত। তুমি শুধু দেখে যাও, কী হচ্ছে!’
‘না, আমি বলছিলাম, যদি দু’জনে ঘাটে নামে। তাহলে যদি পাকড়াও করা যেত। সবটা জানা যেত।’
‘তাতে কী লাভ? জালিয়াতি, আত্মগোপন, পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা, এ সব জামিনযোগ্য অপরাধ। তারপর বহুবছর কেস চলার পর, যদিও বা দোষী প্রমাণিত হয়, তাহলেও শাস্তি মেরেকেটে বছরখানেক। আর তোমার খুনি, যে কে সেই অধরা।’
‘ঠিক। বুঝলাম। তাহলে উপায়।’
‘তোমার এখন একটাই কাজ, লোকটার মুখটা ভালো করে দেখে নেওয়া, যাতে বাড়ি গিয়ে হুবহু ছবিটা আঁকতে পারো।’
‘তখন যদি দেখা যায় এটাই মেঘনাদ। তখন তো আর কিছু করার থাকবে না, পাখি ফুড়ুৎ।’
‘তবুও আমারও মন বলছে, এটা মেঘনাদ, ওকে হাতেনাতে ধরি, কিন্তু আমার বুদ্ধি বলছে এখন ধরা উচিত নয়।’
‘মনের কথা তো জীবনে কোনোদিন শুনলে না, চিরকাল বুদ্ধির কথায় চললে। উলটে একটা ছবি আঁকার কাজ দিলে আবার।’
‘একটা কল্কা মনের মধ্যে আবছা আঁকা হচ্ছে, তবে স্পষ্ট নয়। তাও চোখের সামনে ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি। বড়ো অদ্ভুত কেস অপূর্ব, মনে হচ্ছে যতদূর খুনি আগেই নিজেকেই মৃত ঘোষণা করেছে। কী অসম্ভব ধূর্ত!’
হঠাৎ প্রত্যুষ আবার সতর্ক করল আমায়, দূরবিন থেকে চোখ সরি…ইও না। হ্যাঁ ঠিকই, আমি একটু অসতর্ক হয়ে পড়েছিলাম। কাঁহাতক আর চোখ লাগিয়ে অন্যের প্রেম দেখা যায়। প্রত্যুষের কথায় আবার যন্তরটা চোখে লাগালাম। তবে এবারে যা দেখলাম, তাতে আমার চোখ বিস্ফারিত। মুখ দিয়ে কথা সরছে না। প্রত্যুষ জিজ্ঞেস করল, ‘বলো নতুন কিছু দেখতে পেলে?’ আমার পুরো কথা বেরোল না, শুধু দু’টো শব্দ বেরিয়ে এল, ‘জোড়া… তো…’
‘জোড়া তো আগেই জানি! বিশেষ কিছু দেখলে কী?’
‘জোড়া মানুষ নয় গো, নৌকো।’
‘মিলে যাচ্ছে।’
‘কী মিলে যাচ্ছে? আমি তো দেখছি, দু’টো নৌকো মিলে যাচ্ছে।’
‘ধারাবিবরণীটা ঠিকমতো করো। আমি গাঙ্গুলিকে একটা ফোন করি। ঘাটে আসতে বলি, জামাই বরণ করার জন্য।’
‘জামাই আবার কে?’
‘ধীরে বৎস, সব জানতে পারবে। তারপর বল, কী দেখতে পাচ্ছ?’
‘অন্য একটা ছোটো নৌকো এসে, অর্চনাদের নৌকোর সঙ্গে লেগেছে। মাঝনদীতে একসঙ্গে ভাসছে। হঠাৎ নৌকো দু’টো জুড়ল কেন?’
‘দেখে যাও, নিজেই সব বুঝে যাবে। ইধার কা মাল উধার হবে। মন দিয়ে দেখো।’
‘তুমি কি জ্যোতিষী?’
‘না, সবই অঙ্ক। মিলতেই হবে।’
‘ঠিক বলেছ, একটা লোক টলমল করে এই নৌকো থেকে ওই নৌকোয় যাচ্ছে।’
‘লোকটার মুখটা ভালো করে দেখো। যতটা স্পষ্ট দেখা যায়।’
‘হ্যাঁ দেখে নিয়েছি। তবে লোকটা ওই নৌকোয় চলে গেল, অর্চনা নয়, শুধু লোকটা।’
‘তারপর?’
‘দু’টো নৌকো ফাঁক হয়ে যাচ্ছে। লোকটাকে নিয়ে ওই নৌকোটা দক্ষিণ দিকে চলে যাচ্ছে। এই নৌকোটা অর্চনাকে নিয়ে ঘাটের দিকে আসছে।’
‘গাঙ্গুলিবাবু আসতে দেরি করছে কেন?’
‘তুমি কি অর্চনাকে গ্ৰেপ্তার করবে?’
‘কেন? অবৈধ প্রেম করার অপরাধে? নাকি নিজেরই আত্মগোপন করা ছদ্মবেশী স্বামীর সঙ্গে মদনপুজো করার ধারায়? আনন্দধারায় গ্ৰেপ্তার করব।’
‘তাহলে পুলিশ?’
‘ভরসা করি… এ ভব কান্ডারি, হালটি ছাড়িয়া তারে, দাও দাও রে… নদী ভরা ঢে…উ, বোঝো না তু…মি।’
‘আবার ফাজলামি আর হেঁয়ালি।’
‘হেঁয়ালি নয়, যা বলার গানেই বুঝিয়ে দিয়েছি। এবার শুধু দেখে যাও।’
অর্চনাদের নৌকো ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে। ইন্সপেক্টর গাঙ্গুলি অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। ঘাটের আশেপাশে কিছু সাদা পোশাকের পুলিশ। প্রত্যুষ ফোনে কথা বলছে। বোধহয় গাঙ্গুলির সঙ্গে। আমি আর প্রত্যুষ, ঘাট থেকে অনেকটা দূরে। ওখান থেকে আমাদের এদিকটায় সচরাচর দেখতে পাবার কথা নয়।
অর্চনার নৌকো ঘাটে এসে লাগল। নৌকোয় আর কেউ নেই। কাঠের পাটাতন দিয়ে অর্চনা নেমে চারদিকে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। হঠাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখি চার পাঁচটা সাদা পোশাকের পুলিশ দৌড়ে গিয়ে নৌকোয় উঠে মাঝিটাকে ধরল। তারপর জামার কলার ধরে জিপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। প্রত্যুষ এগিয়ে যাচ্ছে। আমি পিছন পিছন। গাড়িতে তোলার সময় প্রত্যুষ গাঙ্গুলিকে বলল, ‘ডিম ভরা ইলিশ আছে, পেটে অনেক কথা ভরা, আপনি এখন নিয়ে গিয়ে আঁশ ছাড়ান, আমি কাল সকালে আসছি।’
আমরাও এবার বাড়ির পথ ধরলাম। প্রত্যুষ হঠাৎ কাঁধে হাত দিয়ে বলে উঠল, ‘দেখলে আবার ভুলে গেলাম। গাঙ্গুলিকে আর একবার ফোন করো তো, কালকে যেন পোস্টমর্টেম রিপোর্টটা হাতে পাই।’
‘আচ্ছা, দেখছি।’
বাড়ি ফিরে এসে আবার ব্যাগ থেকে আঁকার সরঞ্জাম বার করলাম। ওটা আমার প্রাণ-ভোমরা। ওইটা ছাড়া আমি কোথাও যাই না। যতদূর সম্ভব সেই অচেনা পুরুষের ছবিটা আঁকতে লাগলাম। প্রত্যুষ বেরিয়ে গেল। খানিকক্ষণ পরে ঘরে ফিরল, হাতে একটা ক্যাডবেরি নিয়ে। আমার আঁকা ততক্ষণে প্রায় শেষ। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘ক্যাডবেরি কেন?’
‘তোমার জন্য নয়, মেঘনাদের ছেলের জন্য।’
‘মানে, রাবণের নাতি?’
‘হ্যাঁ, তবে মেয়ের ঘরের। অভিজিৎকে একবার ডাকো।’
আমি অভিজিৎকে ডাকতে ঘরের বাইরে গেলাম। বারান্দায় অর্চনার সঙ্গে দেখা হল। আমাকে দেখে ফ্রেমে বাঁধানো ফটোর মতো হাসল। আমি একটু গলে যাবার ভঙ্গিতে বলে উঠলাম, ‘সকাল থেকে দেখাই হয়নি।’
‘হ্যাঁ, সকালে তো আপনারা বেরিয়ে গেলেন, বিকেলে আবার আমি একটু বেরিয়েছিলাম সংসারের টুকিটাকি জিনিস কিনতে।’
‘ভালো, একটু আধটু না বেরোলেও তো আর হয় না। বাইরে বেরোলে একটু ঘোরাও হয়, আবার কাজও সারা হয়। মানে ওই কলা কেনা বা বেচার সঙ্গে, রথ দেখা।
একটু পরে অভিজিৎকে নিয়ে ঘরে ঢুকতেই প্রত্যুষ বলল, ‘হেলে ধরতে গিয়ে, কেউটের সঙ্গে গল্প করছিলে?’
আমি হাসলাম। তার ফাঁকেই হঠাৎ অভিজিৎ ছবিটা হাতে তুলে নিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘আমার বাবার ছবি তোমরা কোত্থেকে পেলে?’
এবার প্রত্যুষ ক্যাডবেরিটা হাতে দিয়ে অভিজিতের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ‘এখন এই ছবির কথা কাউকে কিচ্ছুটি বলবে না, তাহলে তোমার বাবাকে আমরা আর খুঁজে বার করতে পারব না। কেমন, মনে থাকবে তো?’
ঘাড় নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বলল অভিজিৎ।
আমরা নিশ্চিত হয়ে গেলাম মেঘনাদ মরেনি। পুরো খেলাটাই ও পর্দার আড়াল থেকে খেলছে।
পরদিন সকালে দশটা নাগাদ গাঙ্গুলিবাবুর ফোন এল। দৌড়ে ফোনটা নিয়ে প্রত্যুষের হাতে দিলাম। প্রত্যুষের মুখে একটা সাফল্যের শান্তি ফুটে উঠছে। ফোনটা ছেড়ে বলল, ‘যা ভেবেছিলাম তাই, এটা খুন। তবে অদ্ভুতভাবে। কোনো মার্ডার ওয়েপন কোনোদিনই পাওয়া যাবে না। পোস্টমর্টেমে বলছে যেটা ঢুকেছে, সেটা বার করা হয়নি। অথচ সেটা ভ্যানিস। কী সাংঘাতিক চালাক অপরাধী!’
‘মানে?’
‘মানে, কাল যখন নিজের বুকে ঢুকবে, তখন নিজেই দেখে নিও। ঢুকবে কিন্তু বার করতে হবে না, ওখানেই ভ্যানিশ।’
‘এবার কিন্তু তুমি সব গুলিয়ে দিচ্ছ।’
‘এবার চলো থানায় যাব।’
‘আবার কেন?’
‘বাঃ, কান্ডারির সঙ্গে মোলাকাত করবে না। শুধু যাত্রীদের নিয়ে ভাবলেই হবে?’
আমরা বেরোলাম থানার উদ্দেশে। থানায় গিয়ে শুনলাম গাঙ্গুলিবাবু একটু কাজে বেরিয়েছেন, বসিরহাটের দিকে। মনে হয়, মাঝিকে জেরা করার পর, গেছেন মেঘ সরিয়ে মেঘনাদকে খুঁজতে। যাইহোক মেজবাবুর কাছ থেকে যা জানা গেল, সেটাই বলছি।
মাঝির নাম সহিদুল। গত দোলের দিন এই মাঝির নৌকাতেই ওরা তিনজন মানে, বিপুল, অর্চনা আর মেঘনাদ ওঠে। তারপর যথেষ্ট মদ্যপান করে তিনজনেই। নানারকম গল্পগুজব আর প্ল্যান করতে থাকে। অনেকক্ষণ পর একটা নৌকো এসে এই নৌকোর গায়ে লাগে। খুব সম্ভবত, ওটা ঝড়খালির ওদিককার নৌকো। মেঘনাদবাবু লাফ দিয়ে ওই নৌকোয় উঠে অন্যদিকে চলে যায়। তারপর ওরা সহিদুলকে কিছু অতিরিক্ত টাকা দেয়। ফিরে এসে রটিয়ে দিতে বলে, যে মেঘনাদবাবু মাঝনদীতে হঠাৎ ঝাঁপ দেয় বা পড়ে যায় বেসামাল হয়ে। মানে আত্মহত্যা অথবা দুর্ঘটনা। তবে ও জেরায় স্বীকার করেছে, গতকাল মেঘনাদবাবু যখন বউদিমনির সঙ্গে দেখা করতে আসে, অন্য নৌকোতেই আসে, আবার সেই নৌকোতেই ফিরে চলে যায়। দিনের বেলা কখনই টাকিতে নামে না।
আমরা আবার বাড়ি ফিরে এলাম। প্রত্যুষ ঘরে ঢুকে হাসল। আমি বুঝি ও কখন খোশমেজাজে থাকে। তাহলে কি তদন্ত শেষ! তবে ও যে বেশ হালকা হয়ে গেছে সেটা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না। গুনগুন করে গান ধরেছে, আমাকেও ইশারা করছে ধরার জন্য, ‘করি মানা কাম ছাড়ে না মদনে… আমি, প্রেম রসিকা হব কেমনে’।
তারপর মনোজিৎবাবুকে বলল সবাইকে বসার ঘরে ডাকার জন্য। সবার চোখমুখই বেশ ভীত সন্ত্রস্ত। যেন খুনি ধরা পড়ে গেছে। প্রত্যুষ প্রথমেই সবাইকে হালকা করে দিল, ‘দেখুন খুনের তদন্ত করতে আমি এখানে আসিনি। ওটা পুলিশের কাজ। আমাকে মনোজিৎবাবু যে কাজের জন্য এখানে ডেকেছিলেন সেই কাজ আমি মোটামুটি করে ফেলেছি। ওঁর স্থাবর অস্থাবর যাবতীয় সম্পত্তির ভবিষ্যত মালিকানার হদিশ আছে এই সংকেতে। আর সামান্য একটু সমাধান করতে আমার বাকি আছে। এখন কোনো আভাস আমি কাউকে দেব না। এমনকি অপূর্বকেও আমি বলিনি। কাল সকালে আমি সবাইকে জানিয়ে দেব। আপনারা তার মানসিক প্রস্তুতি নিন।’
আমি প্রত্যুষের কথায় অবাক হয়ে গেলাম। ‘ও তো আমায় সংকেতের সমাধানটা বলেছে। তাহলে ওরকম বলল কেন? মতলবটা কী? এটা কি ওর নতুন কোনো চাল!’
আসলে তখনও বুঝিনি, এটাই ছিল ওর মোক্ষম ও শেষ ফাঁদ। কারণ মেঘনাদ জেনে গেছে, আমরা গোয়েন্দা। ফলে ভালো টোপ না দিলে, শিকার জালে পড়বে না।
আজ সন্ধেবেলাও বাড়ির পরিবেশটা থমথমে। মনোজিৎবাবুর মনটা বেশি খারাপ। যতই হোক ছোটোবেলায় কোলেপিঠে করে মানুষ করেছিল লোকটা। মৃত্যুটা যদি স্বাভাবিক হত, হয়তো বা কষ্ট হলেও মেনে নেওয়া যেত। কিন্তু একটা মানুষ দীর্ঘ সত্তর বছর মানে প্রায় সারাটা জীবন একটা বাড়িতে দিয়ে অবশেষে খুন হলেন। এটা মেনে নেওয়া খুব কঠিন। বাকিদেরও মন খারাপ। সবার মুখই গম্ভীর। কোনটা আসল মুখ আর কোনটা মুখোশ, বোঝা কঠিন। রাতের খাবার সেদিন বাইরে থেকেই এল।
রাতে খাওয়ার পর প্রত্যুষ একটা অদ্ভুত পরামর্শ দিল। হ্যাঁ, এটা ঠিক, আমি সবসময়ই বলি যে এই কেসটাতে আমার কোনো সরাসরি অংশগ্রহণ নেই। আমি কি শুধু লেখক হয়েই থাকব। তাহলে আমি কীসের সহকারী? কিন্তু তা’বলে এইরকম মৃত্যুমুখে ঠেলে দেওয়া। যেখানে খুনি সাধারণের থেকে অনেক চালাক। ও আমাকে ওর বিছানায় শুতে বলল। পুরো চাপা দিয়ে। আর প্রতিদিনের মতো এই ঠান্ডাতেও দরজা খোলা থাকবে। মানে আমি শিকার আর শিকারির মাঝখানে শুধুমাত্র টোপ! প্রথমে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে প্রত্যুষ স্মরণ করিয়ে দিল, যে আমার অনুরোধেই ও এখানে এসেছে আর এই কেসটা নিয়েছে। অগত্যা রাজি হতে হল। শুয়ে পড়লাম চাপা দিয়ে প্রত্যুষের খাটে। চোখের পাতা বুজে আছি, কিন্তু ঘুম নেই। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছু দেখতে পাচ্ছি না। আমার খাটে প্রত্যুষ শুয়ে আছে না উঠে গেছে, কিছুই বুঝতে পারছি না। কারণ প্রত্যুষের কথামতো মাথা চাপা। শুধু হালকা একটা ঝিঁ-ঝিঁ পোকার আওয়াজ আসছে। ঘরের ঘড়িটার টিকটিক শব্দটা মনে হচ্ছে হাতুড়ি পিটছে। ক্রমশ জোর হচ্ছে শব্দের তীক্ষ্ণতা। একটা পাখির ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ পেলাম। পেঁচা বা বাদুড় হবে। চুপ করে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা। পারা যায়! ধৈর্যচ্যুতি ঘটছে। আর পারছি না। ফিসফিস করে উঠলাম, ‘রাত তো প্রায় কাবার হয়ে গেল, তোমার খুনি কখন আসবে?’ খাদের গভীর থেকে একটা গম্ভীর গলা হিসহিস করে উঠল, ‘চুপ একদম চুপ, এখনও দেরি আছে। তোমার বডির মেটাবলিজম আর ইমিউন সিস্টেম নর্মাল হয় ভোররাতে। ঘুম সেসময় গভীরতম। মস্তিষ্ক তখন গুছিয়ে নেয় নিজের কাজ। চাঙ্গা করে স্মৃতিশক্তি। চুপ করে শুয়ে থাকো। কোনো চিন্তা নেই, আমি জেগে আছি। বরফ জমুক, তারপর তো আইসক্রিম খাবে।’
প্রত্যুষের কথার কিছু মানে বুঝলাম না। ভয়ও লাগছে। তাও একটু নিশ্চিন্ত হলাম। কখন চোখ লেগে গেছে, মনে নেই। নিজেই বুঝতে পারিনি। একটা ধস্তাধস্তির আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকারে কিছুই ঠাহর করতে পারছি না। শুধু প্রত্যুষের চিৎকার শুনলাম, ‘অপু লাইটটা জ্বালাও।’
ধড়মড় করে লাইটটা জ্বালিয়ে দিলাম। ঠিক তখনই কানে এল, ‘হ্যান্ডস আপ’। তাকিয়ে যেটা দেখলাম, নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। আমি তথৈবচ, মোটামুটি ভাবসমাধিস্থ। শরীর স্পন্দনহীন। প্রত্যুষের হার্ড বলার রিভলবারটা একটা লোকের মাথায় তাক করা। লোকটার সুঠাম চেহারা। মাথায় একটা হনুমান-টুপি। ডানহাতে একটা তীক্ষ্ণ বরফের ছুরি। আওয়াজ পেয়ে মনোজিৎবাবু ছুটে এসেছেন। প্রত্যুষ বামহাত দিয়ে লোকটার টুপিটা খুলে দিল। তারপরেই হেসে বলল, ‘কি, চিনতে পারছেন মনোজিৎবাবু? আপনাদের বাড়ির জামাই। মেঘনাদবাবু আপনার খেলা শেষ। এবার বড়ো শ্বশুরবাড়িতে যেতে হবে। অপু, গাঙ্গুলিকে একটা ফোন করো। আর বিপুলবাবু তো নিশ্চয় পালিয়ে গেছে। মনোজিৎবাবু মেন গেটটায় তালা লাগান। অর্চনা বোধহয় এখনও পালাতে পারেনি। দেখো, আমার মোবাইলে বিপুলের ফটো আছে, এখনি গাঙ্গুলিবাবুকে পাঠিয়ে দাও, বলো এখনও বেশিদূর পালাতে পারেনি। আমি ততক্ষণ জামাইয়ের একটু সেবাযত্ন করি।’
মিনিট দশেকের মধ্যে পুলিশ এসে গেল। আমরা সবাই গোল হয়ে বসে। মাঝখানে মাথা নীচু করে মেঘনাদ আর অর্চনা বসে আছে। গাঙ্গুলিবাবু ঢুকতেই প্রত্যুষ বলে উঠল, ‘গুড মর্নিং। এই হল আপনার দু’জন অপরাধী। আর একজন পালিয়েছে।’
‘কোথাও পালাতে পারবে না। বাস রাস্তা, হাসনাবাদ প্ল্যাটফর্ম সব জায়গায় ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি। পুলিশ পোস্টিং রয়েছে। বি.এস.এফ. কেও জানিয়ে দিয়েছি। যাতে বাংলাদেশ না পালায়। এখন কেসটা একটু খুলে বলুন তো। কীভাবে সমাধান করলেন?’
প্রত্যুষ প্রথমে সংকেত আর তার সমাধান বিশদভাবে বলল। তারপর শুরু করল খুনের গল্প। এটা আমি আমার নিজের ভাষায় লিখব না। ঠিক প্রত্যুষ যেমন বলেছে, তেমনই তুলে ধরব। হুবহু।
‘সংকেতটা পড়ার পরেই আমার সন্দেহ হতে শুরু করে যে এই বাড়িতে সম্পত্তি নিয়ে একটা বড়ো গন্ডগোল আছে। তারপর অর্চনা দেবীর স্বামীর মৃত্যুটায় আমার খটকা লাগে। ওঁর স্বামী যদি আত্মহত্যা করেন, তাহলে উনি কিছুটা মনমরা হয়ে থাকবেন, স্বামীর বন্ধু বা ভাই যদিও সেটা মিথ্যে, তার সঙ্গে বহাল তবিয়তে থাকবেন না। আর যদি খুন করে থাকেন, তাহলে পালিয়ে যেতেন বা ভয়ে-ভয়ে থাকতেন। এর কোনোটাই কিন্তু হয়নি। বডিটা বেমালুম লোপাট হয়ে গেল, তার কোনো আপশোশও ওঁর মধ্যে দেখিনি। তাতেও আমার হালকা সন্দেহ হয়। সন্দেহটা প্রকট হয় দীনুকাকার কথায়। রোজ গভীর রাতে যে অজানা অতিথি লুকিয়ে আসে সেটা অর্চনা দেবীর স্বামী নয় তো! হতে পারে। তবে সেদিন যখন দীনুকাকা এই বংশের যাবতীয় গোপন তথ্য আমাকে জানাচ্ছিল, তখন আমি ধরতে পারি বিপুল দরজার পাশে আড়ি পাতছে। আমি তাই সারারাত বিপুলকে নজরে রাখি। দীনুকাকাকেও সাবধান করি। তবু আমার একটু অসাবধানতায় দীনুকাকার প্রাণটা চলে গেল। দীনুকাকাকে মারার ওদের উদ্দেশ্য হল, পুরোনো সব ঘটনা জানা সাক্ষী লোপাট করা। তবে মারার প্ল্যানটা মাস্টার প্ল্যান। সবার সন্দেহ গিয়ে পড়বে বিপুলের ওপর। কিন্তু কোনোভাবেই তা প্রমাণ করা যাবে না। কারণ ও বলছে প্রথম দেখেছে দীনুকাকাকে, তারপর নিজেই প্রথম পুলিশকে ফোন করে। কোনো খুনি নিশ্চয় খুন করার পর এ সব করবে না। আর মেঘনাদবাবুর এই লুকিয়ে যাওয়ায়, দুটো সুবিধের দিক আছে। প্রথম হল অর্চনার বিধবা সেজে মনোজিৎবাবুর করুণা আদায় করে বাপের বাড়ির সম্পত্তি হাতানো। যতটা বেশি অংশীদার হওয়া যায়। দ্বিতীয়ত কোনোরকম অপরাধ করলে, তা থাকবে যাবতীয় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর দীনুকাকাকে মারার পদ্ধতিটা তো ইউনিক। কোনো রক্ত মোটামুটি বেরোবে না। হাজার খুঁজলেও মার্ডার ওয়েপন্ পাওয়া যাবে না। আসলে ওটা তো একটা বরফের ছুরি। ছুরির ফাঁকা খাপে জল ভরে ডিপ ফ্রিজে রাখা। অবিকল তীক্ষ্ম, শুধু বরফের। ঢুকিয়ে দেওয়ার পর আর বার করতে হবে না। নিজে থেকেই ধীরে ধীরে গলে যাবে। মেঘনাদবাবু আমি ভুল বললে, আমাকে শুধরে দেবেন। তারপর আমি আরও নিশ্চিত হলাম নৌকায় অর্চনা দেবীকে একজন পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে দেখে। মানুষের স্বামী মারা গেলে বা বেঁচে থাকতেও পরকীয়া হতে পারে। সেটা তো ওঁর ইতিমধ্যেই সাজানো আছে বিপুলবাবুর সঙ্গে। মানে উনি সেরকমই অভিনয় করতেন। আসলে যদিও ওঁর কোনো সম্পর্কই ছিল না বিপুলবাবুর সঙ্গে। যেটুকু ছিল সবটাই ব্যবসায়িক। তাহলে ওই পুরুষটি ওঁর মৃত বা হারানো স্বামী হতে পারে। কারণ পরকীয়ার তো আর পরকীয়া হয় না। অর্চনা দেবী সেদিন আমাদের দেখতে না পেয়ে একটু বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন বা ভেবেছিলেন আমাদের ফিরতে আরও দেরি হবে। এদিকে মেঘনাদবাবুও সকালে দীনুকাকাকে সরিয়ে কাজ হাসিল করে একটু সেলিব্রেট করতে চাইলেন। ভাবলেন গরিব মানুষ, তার ওপর বৃদ্ধ, এ আর কী তদন্ত হবে! আর হলেই বা কী! তাকে ছোঁয়ার ক্ষমতা তো কারোরই নেই। তিনি তো মৃত। তাছাড়া বাড়ির পুরো পরিস্থিতির খবরটাও নেওয়া যাবে। আচ্ছা, আমি যদি ভুল না বলে থাকি আপনি তো গা-ঢাকা দেবার পর কিছুদিন বাংলাদেশে পালিয়েছিলেন। অন্তত আপনার জুতোটা তো সেই কথাই বলছে। ‘রায়বর্মন’ কোম্পানির জুতো। এটা ভারতে পাওয়া যায় না। তারপর আপনার সব গল্পই আমার কাছে ফাঁস হয়ে যায়। সে যাকগে, এখন আপনাকে ফাঁদে ফেলার গল্পটা বলি। আমি ফলাও করে গতকাল বিকালে বললাম, যে কাল আমি সংকেতটার সমাধান সবাইকে বলব। আজ কাউকে বলব না। এমনকি অপূর্বকেও না। ব্যস! এইকথা শোনামাত্রই বিপুল আর অর্চনা মেঘনাদের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করে। কারণ, ওরা খুব ভালো করেই জানে যে সংকেত উদ্ধার হলে সব গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে। সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়ে যাবে। সংকেত নিয়ে একটা ভয় অর্চনার সবসময়েই ছিল। সেই মুহূর্তেই ওরা আমাকে সরিয়ে দেবার কৌশল ঠিক করে নেয়। সেই একই পদ্ধতি। বরফের ছুরি আবার ডিপ ফ্রিজে তৈরি করল অর্চনা। আর বিপুল থাকল তদন্ত অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য। বিপুল যে অপরাধী সেটা কিছুতেই প্রমাণ করা যাবে না। তার ওপর যত সন্দেহই হোক, আসলে তো সে অপরাধী নয়। সে শুধু এই প্ল্যানে সঙ্গ দিচ্ছে, ফাঁকতালে কিছু ক্ষীর খাওয়ার লোভে। আর মেঘনাদবাবু আর অর্চনার উদ্দেশ্য মনোজিৎবাবুকে জপিয়ে সম্পত্তি পুরোটা গ্ৰাস করা। আমি যথারীতি অপুকে শোয়ালাম আমার খাটে। আর আমি ওত পেতে থাকলাম বাবাজীবনকে ধরব বলে। তবে সব চেষ্টাই বৃথা গেল। মিথ্যে এতো বুদ্ধি খাটালেন মেঘনাদবাবু। এই সম্পত্তি কার সে একমাত্র মদন জানে। আচ্ছা মনোজিৎবাবু, ঠাকুর কিন্তু এবার ভাঙতে হবে। ওটা প্লাস্টার অফ্ প্যারিসের।’
এবার মুখ খুললেন মনোজিৎবাবু, ‘সে কী! এতো আমাদের বংশের জাগ্ৰত তিনপুরুষের ঠাকুর। সেটা ভাঙবেন?’
‘আরে মদনের ভেতরেই তো সব গল্প লুকিয়ে আছে। ভাঙলে দেখবেন সব পরিষ্কার। তখন আর মন খারাপ হবে না।’
অনেকক্ষণ পর আমি এ’বার বলতে বাধ্য হলাম, ‘মূর্তির মধ্যে গোপন তথ্য! এতো পুরো ব্যোমকেশ।’
‘ঠিক বলেছ। এ’টা উনি গোয়েন্দা গল্প থেকেই পড়ে বুদ্ধি খাটিয়েছেন। আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই, গাঙ্গুলিবাবু থাকতে থাকতেই মূর্তিটা ভাঙা হোক।’
আমরা সবাই মিলে গেলাম ঠাকুরঘরে। কাঁসর ঘণ্টার লাঠিটা দিয়ে প্রত্যুষ দু’বার মারতেই মদন দু’টুকরো। ঠাকুরের ভেতরটা ফাঁপা। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট। তার ভেতর একটা উইল। আর একটা ভেলভেটের বটুয়াতে পঞ্চাশটা সোনার মোহর। আমরা হতবাক। মোহরগুলো মনোজিৎবাবুর হাতে তুলে দিল প্রত্যুষ। উইলটা আমাকে পড়তে বলল। পুরো উইলটা এখানে লিখে গল্প দীর্ঘায়িত করতে চাই না। শুধু সারমর্মটা তুলে ধরছি।
‘আমি শ্রী সর্বজিৎ ভট্টাচার্য্য সজ্ঞানে স্ব-ইচ্ছায় এই উইল করছি। আমার জেষ্ঠ পুত্র হিসাবে পরিচিত রঞ্জিত ভট্টাচার্য্য আমার নিজের পুত্র নয়। তাকে আমি শুধু মানুষ করেছি এবং আশ্রয় দিয়েছি মাত্র। যদিও তার ওপর আমি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট, কারণ সে শেষ বয়সে ব্যবসায়িক বিষয়ে আমার সঙ্গে তঞ্চকতা করে। তবুও আমি সব কিছু সহ্য করেছি, যেহেতু আমার কনিষ্ঠ পুত্র বাইরে থাকায় আমি বৃদ্ধ বয়সে রঞ্জিতের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। তবে আমার যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তির ওপর রঞ্জিতের কোনো অধিকার নেই। তবু আমি মনোজিৎকে অনুরোধ করব সে যেন দয়াপরবশ হয়ে রঞ্জিত বা তার কোনো বংশধরকে এই বাড়িতে শুধুমাত্র আশ্রয় দেয়। আর আমার দ্বিতীয় অনুরোধ, মনোজিৎ এই সম্পত্তির সম্পূর্ণ একক মালিক হওয়ার পর, যেন এই ভাঙা মদন ঠাকুরের পরিবর্তে পাথরের একটি সুন্দর মদন মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে এবং নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করে। তোমরা সবাই আমার আশীর্বাদ নিও। আশাকরি ঈশ্বরের কৃপায় সকলে ভালো থাকবে’।
—ইতি
শ্রী সর্বজিৎ ভট্টাচার্য্য
বিকেলবেলা খবর এল বিপুল বসিরহাট থেকে ধরা পড়েছে। ছুরির খাপটাও ফ্রিজ থেকে পাওয়া গেল। যেটাতে জল জমিয়ে ওরা ছুরি বানাত। সবচেয়ে খারাপ লাগছে অভিজিতের জন্য। বাবা মা, দু’জনেরই জেল হয়ে গেল। অল্প বয়েসে একদম একা হয়ে পড়ল বেচারা। ওর তো কোনো দোষ নেই। নিষ্পাপ একটা বাচ্চা। ওকে দেখে দয়া হল মনোজিৎবাবুর। মনোজিৎবাবু সিদ্ধান্ত নিলেন ওকে কলকাতায় নিয়ে আসার। প্রসেনজিতের সঙ্গে পড়াশোনা করবে, একসঙ্গে থাকবে ছোটো ভাইয়ের মতো। এইখানে ও তো আর একা থাকতে পারবে না। অনাথ আশ্রমে দিতেও মায়া হল মনোজিৎবাবুর। বাড়ি বিক্রি হওয়ার সিদ্ধান্ত নাকচ করলেন। এতো সুন্দর জায়গা। পৈতৃক ভিটে। রিটায়ার্ডের পর এসে থাকা যাবে। রাধামাসির হাতে বাড়ির চাবি দিয়ে আমরা অভিজিৎকে নিয়ে বিকেলবেলা রওনা হলাম। কলকাতায় ফিরে বড়োবাজারে পাথরের দোকানে মনোজিৎবাবু এক সুন্দর মদন মূর্তির অর্ডার দিলেন। মূর্তি প্রতিষ্ঠা হবে দোলের দিন। মদনদেবের পুজোর উপযুক্ত দিন। আমাকে আর প্রত্যুষকে যেতেই হবে। কোনোভাবেই কাটানো যাবে না।
দোলের আগেরদিনই আমরা চলে গেলাম। সারা বাড়ি জুড়ে আনন্দের পরিবেশ। ওঁদের কিছু আত্মীয়-স্বজন এসেছে। বসন্ত এখানে জাগ্ৰত। কলকাতার মতো নয়। কোনো ঋতুর যাওয়া আসাই কল্লোলিনীতে বোঝা যায় না। পরদিন সকালে দেখি নীল আকাশের বুকে সোনালি রোদ খেলছে। জলের ওপর আলোর লুকোচুরি। চারিদিক প্রেমময়। খুশি যেন গড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। নানা ফুলে সেজে উঠেছে মদন। ভারি সুন্দর মূর্তিটা। একটা কামুক সৌন্দর্য। উগ্ৰতা নেই, অথচ একটা শান্ত উত্তেজনা মদনের লাল চোখে। প্রত্যুষের সঙ্গে মজা করলাম, ‘ভালো করে ঠাকুরের কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও। দু’মাস আগে তুমি কিন্তু ওঁর মূর্তি ভেঙেছিলে।’
প্রত্যুষ বুদ্ধিমান। উত্তর দিল, ‘কামদেব অনেক আগেই আমাকে রামদেব বানিয়ে দিয়েছে। নাহলে নিজে সংসার না করে আমি লোকের সংসারের জট ছাড়াই। আর কী অভিশাপ দেবে আমায়?’
পুরোহিত মশাই এসে গেছেন। উনিই নিত্যপুজো করবেন। আজকের পুজো শুরু হল। উচ্চারিত হচ্ছে পুজোর মন্ত্র। ‘ক্লীং কামদেবায় বিদ্ময়ে পুষ্পবাণায় ধীমহী তন্নোহনঙ্গ প্রচোদয়াৎ’। ভক্তিভাব চারদিকে থৈ থৈ করছে। প্রাণপ্রতিষ্ঠা হল নতুন মদনের। একটা ইতিহাসের যবনিকা পতন ঘটল। মনোজিৎ বাবুর ছেলে প্রসেনজিতের সঙ্গে খেলা করছে এ’বাড়ির পরোক্ষ বংশধর অভিজিৎ। প্রত্যুষ তাকিয়ে আছে সেইদিকে। হয়তো ভাবছে, কী গল্প আবার লেখা হবে ভবিষ্যতের গর্ভে আগামী দিনের অজানা পাতায়।
সুখী গৃহকোণ, সেপ্টেম্বর ২০২২
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন