মুক্তো-মণির রক্তে পুথি

বাণীব্রত গোস্বামী

প্রত্যুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ দেখে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কার ফোন?’

‘বড়ো চিন্তায় পড়ে গেলাম গো অপূর্ব! দুবরাজপুর থানা থেকে ফোন এসেছিল। একটা প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক পুথি লাইব্রেরি থেকে চুরি হয়ে গেছে।’

‘সে কী গো! কী পুথি?’

‘পুরোটা বলতে পারল না। ফোন করেছিল বড়োবাবু মি. পাকরাশি। পালিতের কাছ থেকে আমার নম্বর নিয়েছে।’

‘কী বলল?’

‘আসল কথা। এখন যেতে হবে। আমি বলেছি, আজ হবে না, কাল দেখছি। তখন জোর দিয়েই বলল যে, কাল একবার অবশ্যই আসতে হবে।’

‘তাহলে কি কাল যাবার সব ব্যবস্থা করব? সকালবেলা হাওড়া থেকে একটা ভালো গাড়ি ছাড়ে। হুল এক্সপ্রেস। তাহলে ওটাতেই টিকিট কাটি।’

‘যা ভালো বোঝো করো।’

শুরু হল তোড়জোড় কয়েকদিনের জন্য দুবরাজপুর যাবার। প্রত্যুষ ডুব দিল বইপত্র নিয়ে বীরভূমের প্রাচীন ইতিহাসের গভীরে। এটা ওর সিগনেচার পদ্ধতি। যে কোনো কাজে হাত দেওয়ার আগে, সেই বিষয়ে গভীর পড়াশোনা করে নেওয়া। এতে নাকি কাজের অনেক সুবিধে হয়। তবে আমার যন্ত্রণাটা অন্য জায়গায়। আমাকে নির্বোধ শ্রোতার মতো সেইসব গল্প মন দিয়ে শুনতে হয়। কোনো বিরক্তি প্রকাশ করা চলে না। মাঝেমধ্যে আবার দু’একটা প্রশ্ন-ও করে। যাই হোক এই কাজের দৌলতে বীরভূমের বীর রাজাদের কিছু ইতিহাস জানা হয়ে গেল। এই রাজ বংশের নামেই নাকি এই অঞ্চলের নাম বীরভূম। বল্লাল সেনের ছেলে লক্ষ্মণ সেনের প্রতিষ্ঠিত রাজনগরেই এই বীর বংশের রাজধানী ছিল। আপাতত আমাদের গন্তব্য দুবরাজপুর। কিন্তু প্রত্যুষের মুখে বারবার উঠে আসছে রাজনগরের কথা। এখন দেখা যাক, কোথাকার জল কোথায় গড়ায়!

পরদিন আমরা ব্যাগ গুছিয়ে সাত সকালেই বেরিয়ে পড়লাম। হাওড়া থেকে ঠিক ছ’টা চল্লিশেই ছেড়ে দিল হুল এক্সপ্রেস। মানুষের মনের সঙ্গে মাটির একটা সম্পর্ক আছে। বর্ধমানের পর থেকেই যেই না মাটিতে লালচে রং ধরতে লাগল, মনের কোণে একটা আনন্দ উঁকি দিল। যত এগোচ্ছি মাটিতে তত বালি আর নুড়ি পাথর মিশে যাচ্ছে। আমাদের মনেও একটা রহস্য ক্রমশ যেন দানা পাকিয়ে উঠছে। প্রত্যুষ জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে গভীর চিন্তামগ্ন। হঠাৎ বলে উঠল, ‘আচ্ছা অপূর্ব, একবার পাকরাশিকে ফোন করো তো। ঝাড়খন্ড এবং দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গের অন্যান্য জেলাগুলোর সঙ্গে বর্ডার সিল করে দিতে বলেছিলাম। দেখো তো কোনো খবর আছে কিনা!’

ফোন লাগালাম। তারপর উত্তরে হতাশ হয়ে ঘাড় নাড়লাম প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু প্রত্যুষের কথায় একটা খটকা লাগল। জানি ও যখন গভীর একাগ্ৰতা নিয়ে কিছু ভাবে তখন প্রশ্ন করা পছন্দ করে না। তবুও ভয়ে ভয়েই বললাম, ‘তুমি রাজনগরের কথা ভাবছ কেন? একটু বলবে ভাই।’

দেখলাম প্রত্যুষ এবার উত্তেজিত হল না। ঠান্ডা মাথায় উত্তর দিল, ‘দেখো পুথিটা সত্যিই অনেক প্রাচীন। তার একটা আকাশছোঁয়া ঐতিহাসিক মূল্য আছে বটে, তবে চুরির উদ্দেশ্য শুধু সেটা নাও তো হতে পারে। পুথিটা শুনেছি হিন্দু রাজা বীর রাজবংশের বীরগাঁথা সম্বলিত ইতিহাসের ওপর রচিত। তাই এই রাজবংশের প্রকৃত রাজধানী রাজনগরের সঙ্গে এই পুথি চুরির কোনো সম্পর্ক থাকতেই পারে।’

‘কীরকম সম্পর্কের কথা ভাবছ তুমি?’

‘দেখো, রাজনগরে এখন বীর রাজাদের রাজপ্রাসাদের ভগ্নদশা হলেও, তার ধ্বংসাবশেষ এখনও বর্তমান। অর্থাৎ সেই রাজবংশের অস্তিত্ব এখনও আছে। কেন জানি না, আমার মনে হচ্ছে যে এই রাজবংশের পুথির সঙ্গে রাজনগরের রাজবাড়ির একটা কোথাও যেন যোগাযোগ আছে। অবশ্য এটা আমার একমাত্র ব্যক্তিগত ধারণা। এখন দেখা যাক।’

আমি মনে মনে বুঝলাম, প্রত্যুষ ঘটনার অনেক গভীরে ঢুকে গেছে। আর ও যখন একটা যোগসূত্রের সন্ধান পেয়ে গেছে, তখন আমার পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে ঘটনার জল বোধহয় সেদিকেই গড়াবে। এখন দেখা যাক কপালে কী আছে! এইসব গল্পের কোন ফাঁকে ট্রেন চলে এল দুবরাজপুর। স্টেশনটি ভারী সুন্দর। স্টেশনের পাশেই একটি ছোটো ঢালু টিলা। তার গা বেয়ে একটি অগভীর জঙ্গল। আমরা বেশ কৌতূহল নিয়েই নামলাম। নামতেই দেখি এক ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন।

‘নমস্কার আমি জগদীশ কোলে। থানার ড্রাইভার। পাকরাশি বাবু আমাকে পাঠিয়েছেন। আপনাদের ছবি দেখিয়েছিল। দেখেই আমি চিনতে পেরেছি। চলুন, বাইরে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। হোটেল ঠিক করা আছে। আগে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন। তারপর থানায় নিয়ে যেতে বলেছেন উনি।’

দেখলাম ব্যবস্থাপনায় কোনো ত্রুটি নেই। আমরা জগদীশের গাড়িতে গিয়ে বসলাম। স্টেশনের পাশেই বাজার। বাজারের ভেতরটা ভীষণ ঘিঞ্জি। দোকানপাট লোকজন জমজমাট। প্রত্যুষের চোখে রোদ চশমা। তার ভেতর তীক্ষ্ম দৃষ্টি। আমরা মিনিট দশেকের মধ্যেই যে জায়গাটায় এলাম তার নাম মামা-ভাগ্নে পাহাড়। নামেই পাহাড়, আসলে অনেক বড়ো বড়ো বোল্ডার ছড়িয়ে আছে ইতস্তত। পাথরের ওপর পাথর। তাইতে বেশ কিছুটা উচ্চতা হয়েছে। তবে জায়গাটা পুরোটাই ঘন জঙ্গলে ঘেরা। ঠিক মামা-ভাগ্নে পাহাড়ের গেটের উলটোদিকেই আমাদের হোটেল। হোটেল হিল ভিউ।

আমরা একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়েই থানায় গেলাম জগদীশের গাড়িতে। থানায় গিয়ে দেখি পাকরাশি বাবু বেরিয়েছেন। টেবিলের ওপর রাখা খবরের কাগজটা প্রত্যুষ তুলে নিল। আমিও পাশ থেকে উঁকি মারলাম। দেখলাম পুথি চুরির খবরটা ভেতরের পাতায় ছোট্ট করে বেরিয়েছে। কিছুক্ষণ পরেই থানায় হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন মি. পাকরাশি। মাথার টুপিটা টেবিলের ওপর রেখে, জলের গ্লাসের ঢাকনাটা খুলে এক চুমুক দিয়েই রুমাল দিয়ে মুখ মুছে বলে উঠলেন, ‘আর বলবেন না, মি. সেন! একটার পর একটা ঝামেলা। ভাবলাম আমি নিজেই আপনাদের রিসিভ করতে যাব, কিন্তু তার কি আর উপায় আছে? বেরোতে যাবার সময় ফোন। বাজারের ওপারেই একটি মেয়ে কিডন্যাপ হয়েছে। অন্য কেউ হলে একটু পরেই যেতাম। কিন্তু স্যার নিজেই ফোন করলেন। শ্রদ্ধেয় মানুষ, কী আর বলব!’

এবার প্রত্যুষ মনে হল কাজ শুরু করে দিল। জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার মানে?’

‘লোকে সবাই স্যার বলে, আমিও বলি। নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য। সজ্জন ব্যক্তি। দুবরাজপুর কলেজে পড়ান।’

‘কোন সাবজেক্ট?’

‘এই রে! সেটা তো জানি না। আপনার দরকার! কোনো কাজে লাগবে?’

‘না… এমনিই!’

‘এক মিনিট দাঁড়ান। আমি জেনে দিচ্ছি।’

বলেই মোবাইলটা বার করলেন। তারপর কার সঙ্গে কথা বললেন। ফোনটা নামিয়ে বললেন, ‘আরে আমি তো জানতামই না, উনি সংস্কৃত’র প্রফেসর। আচ্ছা মশাই এসব ভাষা এখন কেউ পড়ে? আর পড়েই বা কী লাভ!’

‘ঠিকই বলেছেন। ভারতবর্ষে এই ভাষার চর্চা ক্রমশ কমছে, তবে বিদেশে এই নিয়ে গবেষণা কিন্তু উত্তরোত্তর বাড়ছে।’

‘সে কী মশাই! ওরা এখন সংস্কৃত পড়ছে?’

‘পড়ছে মানে, রীতিমতো উচ্চশিক্ষা অর্জন করছে। বেদ উপনিষদ পুরাণ, ইত্যাদি ভারতবর্ষ তথা হিন্দু ধর্মের প্রাচীন ইতিহাসকে জানতে চাইছে।’

‘তা…ই! তাহলে তো মশাই আমাদের বেশ গর্বের ব্যাপার!’

‘হ্যাঁ, তা তো বটেই। তবে ওই মেয়েটির অপহরণের ব্যাপারে স্যার ফোন করলেন কেন?’

‘আরে! মেয়েটি গ্ৰামের মেয়ে। রাজনগরের ওদিকে বাড়ি। ছোটোবেলা থেকেই স্যারের বাড়িতে থাকত। পড়াশোনাও করত, আবার ঘরের টুকটাক ফাই-ফরমাশ কাজেও হাত লাগাত। স্যার নিজের মেয়ের মতোই স্নেহ করতেন। গতকাল রাত্তিরে খেয়েদেয় নিজের ঘরে শুয়েছিল। গিয়ে দেখলাম একটা সিঙ্গল ডিভান। ওইখানেই ও নাকি রোজ শোয়। আজ হঠাৎ সকাল থেকে বেপাত্তা। ভোরবেলা উঠে দুধ আনতে গিয়েছিল। আর ফেরেনি।’

‘বয়স কত হবে?’

‘কার? বিমলা? মানে মেয়েটির? বছর কুড়ি। এইতো সবে কলেজে ভরতি হয়েছিল। স্যার খুব স্নেহ করতেন। বলতেন, ওকে শিক্ষিত করে, নিজের পায়ে দাঁড় করিয়ে ভালো বিয়ে দেব।’

‘স্যারের সঙ্গে একটু দেখা করা যাবে?’

‘হ্যাঁ, কেন যাবে না? নিশ্চই যাবে। কখন যাবেন বলুন।’

‘বিকেলে আগে একটু লাইব্রেরিতে যাব। পরে স্যারের কাছে, সন্ধেবেলা যাব।’

বুঝলাম, প্রত্যুষ ঘুঁটি সাজাতে শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, পুথি চুরির সঙ্গে মেয়ে চুরির কী সম্পর্ক। আদৌ কি কিছু আছে? নাকি এমনিই প্রত্যুষ বলল। তবুও মন বলছে, ও তো শুধু বলার লোক নয়। কোথাও একটা ক্ষীণ যোগসূত্র নিশ্চয়ই পেয়েছে। সেটাই এখন আমাকে জানতে হবে।

হোটেলে ফিরে এসে স্নান সেরে খেতে বসলাম। এখানকার আলুপোস্ত বেশ বিখ্যাত। খেতে খেতেই প্রত্যুষকে প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা ভাই, আমরা স্যারের বাড়ি যাব কেন? এমনি…ই, না কোনো কারণ আছে? মানে বলতে চাইছি, এই কেসের সঙ্গে কোনো যোগসাজশ আছে নাকি?’

‘আরে না না! পুথি চুরির গল্প তো শুনলে, লাইব্রেরি গিয়ে আরও শুনবে। তারপর অপহরণের গল্প! আরে! যত শুনবে, তত বেশি লিখতে পারবে। তোমার জন্যই তো যাওয়া ভায়া।’

বুঝলাম, পাশ কাটিয়ে গেল প্রত্যুষ। খেয়েদেয়ে উঠে দু’জনে বারান্দায় দাঁড়ালাম। সামনের প্রকৃতি মনোমুগ্ধকর। হাত বাড়ালেই সবুজের সমারোহ। ছোটো ছোটো টিলার পাশ দিয়ে হাঁটাপথ উঠে গেছে পাহাড়চূড়ায় কালী মন্দিরের দিকে। বেশ নয়নাভিরাম ট্যুরিস্ট স্পট। প্রত্যুষ একটা সিগারেট ধরাল। দেশলাই’র একটা কাঠি বার করে বারুদের দিকটা দিয়ে একটা ছক কাটছে বারান্দার ওপর। আমি বোঝার চেষ্টা করছি। শুধু দেখলাম একটা ত্রিভুজ এঁকেছে। তারপর তার প্রতিটা বাহুর ওপর উলটোদিকের শীর্ষবিন্দু থেকে তিনটে লম্ব আঁকল। তারপর তিনটে লম্ব এসে যে সাধারণ বিন্দুতে এসে মিশেছে, সেই বিন্দুটা দেখিয়ে আমাকে বলল, এইখানে আমাদের পৌঁছোতে হবে, বুঝেছ অপূর্ব।

আমি বোকার মতো প্রশ্ন করলাম, ‘এটা কোথায়?’

‘ওই যে তিনটে ঘটনা গিয়ে যেখানে এক জায়গায় মিলেছে।’

আমি আর থাকতে না পেরে, ঘরে এসে একটু বিশ্রাম নিতে লাগলাম। সকালে ট্রেন ধরার জন্য অনেক ভোরে উঠতে হয়েছে। প্রত্যুষ বারান্দায় পায়চারি করতে লাগল। কখন চোখটা লেগে এসেছিল, বুঝতে পারিনি। তখন বিকেল চারটে মতো হবে। হঠাৎ প্রত্যুষের ডাকে ঘুম ভাঙল।

‘চলো… জগদীশ এসে গেছে। লাইব্রেরি যেতে হবে।’

আমাদের হোটেল থেকে লাইব্রেরি গাড়িতে মিনিট পাঁচেকও লাগল না। প্রায় একশো বছরের পুরোনো লাইব্রেরি। বেশ ভগ্নদশা। শোনা গেল, সরকারি সাহায্য নাকি এসেছে, সংস্কার হবে। বেশ বনেদি গঠনের দোতলা বাড়ি। একতলায় অফিসঘর। দু’জন মাত্র কর্মী। একজন লাইব্রেরিয়ান, আর একজন দারোয়ান। সন্ধের পর লাইব্রেরিয়ান বাড়ি চলে যায়। দারোয়ান রাতে এখানেই থাকে। নাম জগন্নাথ দলুই। বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। নিজেদের পরিচয় দিয়ে প্রত্যুষ জগন্নাথের সঙ্গেই কথা বলতে শুরু করল। জানা গেল মি. পাকরাশি আগেই আমাদের কথা বলে রেখেছেন।

‘আচ্ছা জগন্নাথ, তুমি রাত্তিরে কোথায় শোও?’

‘এই বারান্দার ভেতর দিকটায় বাবু।’

‘লাইব্রেরি ঘরে কি তালা দেওয়া থাকে?’

‘হ্যাঁ বাবু। চাবি আমার বালিশের নীচে থাকে।’

‘যেদিন চুরি হল, কী ঘটেছিল?’

‘বাবু আমি এত গভীর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম যে কিছুই ঠাওর করতে পারিনি। মনে হয়, ওরা আমার নাকে কিছু শুঁকিয়েছিল। আমি সাধারণত ভোর পাঁচটায় উঠে পড়ি। সেদিন যখন উঠলাম, দেখি আটটা বেজে গেছে। রোদ বেশ কড়া। উঠে চোখ খুলতেই দেখি লাইব্রেরির দরজা হাট করে খোলা। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। ঘরের ভেতর ঢুকে দেখলাম সব কিছু ঠিকঠাক। সব জায়গার জিনিস জায়গায় আছে। বিন্দুমাত্র কিছু কোথাও নড়েনি। দৌড়ে গেলাম ওপরে। দোতলায় কিছু মূল্যবান বইপত্র থাকে। হঠাৎ দেখি পিছনের আসল আলমারির দরজাটাই খোলা। যেটার ভেতর ওই পুরোনো পুথিটি ছিল। পুথিটা নেই। দৌড়ে নীচে এলাম দেখি আমার বালিশের তলার চাবি উধাও। চাবি ঝুলছে দরজার তালার সঙ্গে।’

এবার প্রত্যুষ লাইব্রেরিয়ান বিশম্ভরবাবুর দিকে ঘুরল।

‘আচ্ছা বিশ্বম্ভরবাবু, পুথিটা আপনি দেখেছিলেন?’

‘হ্যাঁ, অনেকবার। প্রায় পাঁচশো বছর আগেকার। এখানকার বীর রাজবংশের ইতিহাস ও আরও অনেক তথ্য সম্বলিত ইতিহাসে সমৃদ্ধ। তবে সবই আমার শোনা কথা। পড়তে কিছুই পারিনি। কারণ পুরো পুথিটাই সংস্কৃতে লেখা। শোনা যায় রাজা হাম্ভিরের আমলেই নাকি তার সভাকবি এই পুথি রচনা শুরু করেছিলেন। তারপর পরবর্তী রাজারা সেই ধারা বহন করে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। বীর বংশের শেষ রাজা ‘বীররাজা’ নামে যিনি বিখ্যাত ছিলেন, তার আমল অবধি সমস্ত কিছুর বর্ণনাই নাকি ওই পুথিতে লিপিবদ্ধ।’

‘আচ্ছা চুরি যাওয়ার পর পুলিশ এসে কিছু নিয়ে গেছে?’

‘হ্যাঁ, ওই হাতের ছাপ টাপ সব সংগ্ৰহ করল, আর ভালো কথা, সিঁড়ির কাছে আর একটা বাইরে হাওয়াই চটি পাওয়া যায়। সেটাও পুলিশ নিয়ে গেছে। বোধহয় অন্ধকারে চোরের তাড়াহুড়োতে চটিটা ছিঁড়ে যায়।’

‘অনেক ধন্যবাদ বিশ্বম্ভরবাবু। প্রয়োজন পড়লে আবার আসব।’

‘অবশ্যই। নমস্কার।’

বাইরে বেরিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বুঝলে ভায়া?’

‘পুথিটা বিক্রি করলে অনেক দাম পাওয়া যাবে, না…?’

‘সে তো পরের প্রশ্ন। চোর এল রাত্তিরে, অন্ধকারে। আরও কিছু প্রাচীন পুথি রয়েছে দেখলাম, সেগুলো একটাও নিল না। অথচ ঠিক বেছে প্রাচীনতম বীর বংশের বীর-গাঁথা পুথিটাই নিয়ে চলে গেল। বেশ শিক্ষিত চোর বলতে হবে। তার মানে আমার হিসেব বলছে, এখন পড়াশোনার কাজ চলছে।’

‘তুমি কী বলছ, আমার তো মাথাতেই কিছু ঢুকছে না!’

‘সব ঢুকে যাবে, এখন চলো তো নকুলবাবুর বাড়ি।’

আমি আর কথা বাড়ালাম না। বুঝলাম, মনের ভেতরে অনেকটাই এগিয়ে গেছে প্রত্যুষ। গাড়িতে গিয়ে বসলাম। নকুলবাবুর বাড়ি স্টেশন থেকে সিউড়ি যাওয়ার পথে। মিনিট পনেরো যেতে হয়। বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়াতে দেখলাম, সদ্য রং করা দোতলা বাড়ি। বাড়ির বাইরে বেশ যত্নের ছাপ। বাড়ির ভেতরে ঢুকে বুঝলাম, শিক্ষার বাস। বসার ঘরে সোফার পিছনেই বিশাল বই’এর সেল্ফ। একজন মাঝবয়সি মহিলা দরজা খুললেন। বোধহয় ওঁর স্ত্রী। আমাদের বসতে বললেন। আমরা বসার মিনিট দু’য়েকের মধ্যেই নকুলবাবু সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমে এলেন। বহুদিন পর ধুতি পাঞ্জাবি পরা মানুষ দেখলাম। পুরো চেহারায় এক অদ্ভুত সৌম্যকান্তি। প্রকৃত সজ্জন ব্যক্তি বলতে যা বোঝায়। বয়স খুব সম্ভবত ষাটের আশেপাশে। মানে চাকরিতে অবসরের মুখে। ওঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনে হল, মি. পাকরাশি কিছু ভূমিকা ইতিমধ্যেই করে রেখেছেন। আমার অন্তত তাই মনে হল। আরে! গোয়েন্দা না হলেও, গোয়েন্দার সহকারী তো! সিঁড়ি দিয়ে নামতেই বলে উঠলেন,

‘নমস্কার, একটু চা বলি?’

প্রত্যুষ অভিবাদন জানিয়ে বেশ পেশাদারি ভঙ্গিতেই শুরু করল, ‘পুথি চুরির ব্যাপারটা শুনেছেন নিশ্চয়ই?’

‘অবশ্যই। ওটা একটা বাংলা তথা ভারতীয় ইতিহাসের সম্পদ ছিল। আমি বহুবার ওটা দেখেছি এবং যতটা পেরেছি উদ্ধার করার চেষ্টা করেছি। খুবই জীর্ণদশা হয়ে গেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, একটি অমূল্য সম্পদ আবারও আমাদের হাতছাড়া হল।’

‘আপনার কী ধারণা এই চুরির বিষয়ে? মানে যে বা যারা করল, তাদের প্রকৃত উদ্দেশ্যটা কী?’

‘আমার এ ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই। আপনারা গোয়েন্দা মানুষ, হয়তো আন্দাজ করতে পারবেন। আসলে আমি সকাল থেকে খুব দুশ্চিন্তায় আছি বিমলাকে নিয়ে।’

‘আচ্ছা, তাহলে বিমলার ব্যাপারটাই একটু খুলে বলুন।’

‘বিমলাকে আমি যখন আমার বাড়ি নিয়ে আসি, তখন ওর বয়স ছয়। আমাদের কলেজের বাগানের যে মালি ছিল দীনু, তার মেয়ে। একদিন দীনুর সঙ্গে কলেজে এসেছিল। ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে। আমার দেখে বেশ ভালো লাগল। এমনিতেই আমার একটি মাত্র মেয়ে। এখন অন্ডালে বিয়ে হয়ে গেছে। জামাই ওখানে ইঞ্জিনিয়ার। তখনই আমি দীনুকে বলি যে তোমার মেয়েকে যদি আমায় দাও, তাহলে ওকে আমি মানুষ করব। লেখাপড়া শেখাব। ওর সব দায়িত্ব আমার। সেই থেকেই ও আমার কাছে।’

‘আচ্ছা, তারপর কী হল?’

‘তারপর ওকে স্কুলে ভরতি করে দিলাম। নিজের মেয়ের চোখেই দেখতাম। বড়ো হতে লাগল। পড়াশোনাও বেশ মন দিয়ে করত। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক ভালোভাবেই পাশ করল। তারপর আমি আমার কলেজে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে ভরতি করে দিলাম।’

‘হঠাৎ আজকে সকালে কী হল?’

‘ও প্রতিদিন সকালেই খুব ভোরে উঠে খাটালে দুধ আনতে যেত। বরাবরই। প্রতিদিনের মতো আজকেও বেরিয়েছিল। প্রায় ঘণ্টাখানেক হয়ে যাওয়ার পর আমি ওর মোবাইলে ফোন করি। বলে সুইচড অফ। বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম। ঘণ্টাদুয়েক দেখে আমি থানায় ফোন করি।’

‘তারপর… জিনিসপত্র কিছু নিয়ে গেছে?’

‘না, কিছুই সেরকম নিয়ে যায়নি। ওই এক জামা কাপড়েই বেরিয়েছে। আর ওই নিজের হাতব্যাগে কিছু টাকা। তাও সেরকম বেশি নয়।’

‘ওর জিনিসপত্র সব কোথায়?’

‘আসুন না। ওর ঘরেই সব সাজানো।

নকুলবাবু আমাদের ভেতরের একটা ছোটো ঘরে নিয়ে গেলেন। প্রত্যুষের তীক্ষ্ম চোখ বাজপাখির মতো ঘুরছে। ঘরের ভেতর দেখলাম একটা সিঙ্গল খাট, একটা আলনা, আর একটা পড়ার টেবিল, টেবিলে পাশে একটা ছোটো আলমারি। আলমারির গায়ে একটা ডিম্বাকৃতি আয়না লাগানো। আয়নার ওপর নানা রঙের টিপ আটকানো। প্রত্যুষ একটা টিপ হাতে তুলে নিয়ে প্রশ্ন করল, ‘বিমলা কি খুব সাজতে ভালোবাসত?’

‘না, সেরকম কিছু নয়। আসলে এটা আগে আমার মেয়ের ঘর ছিল। মেয়ের বিয়ের পর ঘরটা ফাঁকা লাগত, তাই বিমলাকে এই ঘরটায় থাকতে বলি। প্রচুর সাজার জিনিস ছিল মেয়ের। ছুঁয়েও দেখত না এ সব বিমলা। ইদানীং কলেজে ভরতি হওয়ার পর একটু সাজগোজ করতে ভালোবাসত।’

‘কেন? হঠাৎ কারও প্রেমে পড়েছিল। এই বয়সে প্রেমে পড়লেই সাধারণত সাজ বাড়ে।’

‘না, সেরকম তো কিছু কোনোদিন বুঝিনি। তারপর গোপনে কিছু করলে জানি না।’

‘থানা থেকে কী বলল?’

‘মি. পাকরাশি তো বললেন, খোঁজখবর চালাচ্ছেন। আমি বিমলার বাড়িতে খবর দিয়ে দিয়েছি। আমি আর থানায় যোগাযোগ করব না।’

‘কেন? হঠাৎ একথা বলছেন!’

‘না, মানে ওই ইয়ে আর কী… বলছিলাম যে হয়তো দুম করে কোনো আত্মীয়’র বাড়ি চলে গেছে। হয়তো হঠাৎ রাস্তায় দেখা হয়ে গেছে, সে জোর করে নিয়ে গেছে। না বলতে পারেনি।’

‘হ্যাঁ, সে সবই না হয় বুঝলাম, কিন্তু সেটা তো ফোনে জানিয়ে দিলেই পারত। আর ফোনটাই বা সুইচড অফ কেন?’

এবার নকুলবাবু একটু যেন ঘাবড়ে গেলেন। থতোমতো খেয়ে বলে উঠলেন, ‘কী বলি বলুন তো আজকালকার ছেলেমেয়েদের বুদ্ধি!’

‘ঠিক আছে, ওর ফোন নম্বরটা আমায় লিখে দিন।’

ফোন নম্বরটা নিয়ে প্রত্যুষ নমস্কার জানিয়ে আবার আসতে হতে পারে জানিয়ে বিদায় নিল। আমি গাড়িতে উঠেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী বুঝলে ভায়া, কিছু আন্দাজ পেলে?’

‘শোনো অপু, এই দু’টো ঘটনা কিন্তু বিচ্ছিন্ন নয়, ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। আমার ধারণা।’

‘হঠাৎ এরকম ধারণার কারণ?’

‘সেরকম কোনো যোগসূত্র এখনও আমি পাইনি, তবে নকুলবাবু কিছু একটা লুকোচ্ছেন আমাদের কাছ থেকে। বিমলার অপহরণটা মনে হচ্ছে বেশ সন্দেহজনক। নকুলবাবুর পেটে কিছু কথা লুকিয়ে আছে। সেটা না জানলে পুরো অন্ধকারটা কাটছে না। একটা ঝাপসা নক্সা ফুটে উঠছে মনের মধ্যে, কিন্তু তারপরেই কিছু অজানা কুয়াশা এসে পুরো চিত্রটা ঢেকে দিচ্ছে।’

আমি বুঝলাম প্রত্যুষের মনের ভেতর ঘুঁটি সাজানো চলছে। শুধু উলটোদিকের মানুষ ঠিক চাল দিচ্ছে না বলে ওর পরবর্তী চাল আটকে যাচ্ছে। হঠাৎ সম্বিত ফিরল ড্রাইভারের কথায়, ‘স্যার এখন কি হোটেলে ফিরব?’

প্রত্যুষ সিগারেটে টান দিয়ে দু’টো রিং ছাড়ল, তারপর উত্তর দিল, ‘না আগে একবার থানায় চলো, তারপর হোটেল। মি. পাকরাশির সঙ্গে একটু দরকার আছে।’

থানায় ঢুকতেই মি. পাকরাশি চায়ের অর্ডার দিলেন। তারপর চায়ে চুমুক দিয়ে একটা চুক করে শব্দ করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী বুঝছেন প্রত্যুষবাবু?’

‘একটা সহজ কথা বুঝতে পারছি, যারা পুথিটা চুরি করেছে, তাদের প্রাচীন পুথি বিক্রি করাটা উদ্দেশ্য নয়। কারণ তাহলে অতটা প্রাচীন না হলেও আশপাশের পুথিগুলোও তারা নিয়ে যেত। ওটার থেকে একটু কম হলেও তো ভালোই দাম পেত।’

‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, পুথি বিক্রি হয়ে বেহাত হয়নি।’

‘এখন প্রশ্ন শুধু ওই বীর রাজবংশের যাবতীয় তথ্য সম্বলিত পুথিটাই কেন চুরি হল? সেটাই এখন বেশি ভাবাচ্ছে আমাকে।’

‘তাহলে পুথিটা উদ্ধার হবে কীভাবে? সে রাস্তা কিছু পাওয়া গেল?’

‘আসলে ওই সকালের অপহরণের কেসটা সমাধান হয়ে গেলেই, পুথির ব্যাপারটাও জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

‘কী বলছেন কী মশাই। ওই মেয়েটার অপহরণের সঙ্গে পুথি চুরির কী সম্পর্ক?’

‘আছে মশাই, আছে। আপনি অপহরণের ঘটনাটা কিছু এগোলেন?’

‘আরে! মোবাইলটা তো প্রথমে ট্র্যাক করলাম, সিউড়ি দেখাচ্ছিল। তারপর তো হাওয়া। আর কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। সিম বা হয়তো মোবাইলটাই ফেলে দিয়েছে। আমি সব থানাতেই মেয়েটার ছবি পাঠিয়ে দিয়েছি। সিউড়ির ওসিকেও বলেছি তল্লাশি চালাতে। এখনও তো কোনো খবর আসেনি।’

‘ঠিক আছে। অশেষ ধন্যবাদ। কিছু খবর পেলে জানাবেন। এখন তাহলে উঠি।’

আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। আমাদের হোটেলের নীচেই খাওয়ার জায়গা। তবে জায়গাটা বিকেল অবধি যেরকম জমজমাট লাগছিল, এখন একেবারেই নিঝুম। অথচ ন’টাও বাজেনি। সামনের টিলায় গভীর অন্ধকার এসে জমাট বেঁধেছে। পাহাড়ের ভেতর পূজারির ঘরে জঙ্গলের ফাঁকে টিমটিম আলো জ্বলছে। এদিকটায় লোকবসতি কম। দোকানপাট যা আছে, সবই পর্যটক নির্ভরশীল। পাহাড়ের পিছনে একটা ছোটো বসতি আছে। তাদের যাতায়াতের রাস্তা আলাদা। পাহাড়ের রাস্তা এখন পুরো সুনসান। এদিকে পুজোর পরেই বেশ রাতের দিকে ঠান্ডা পড়ে যায়। এখন জায়গাটার বেশ রহস্যময় পরিবেশ। কিন্তু তার থেকেও বড়ো কোনো রহস্যে আমরা ধীরে জড়িয়ে পড়ছি না তো! প্রত্যুষ একটা বই পড়ছে। বীরভূমের বীর বংশের ইতিহাস। প্রায় চারশো বছরের ওপর রাজত্বকাল। বোধহয় ১২০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে মোটামুটি ১৬০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি। ঘটনাবহুল রাজত্বকাল। প্রত্যুষের এটা চিরকালের ধর্ম, যে কোনো ঘটনার একদম গভীরে ঢুকে যাওয়া। যে কোনো তদন্তে হাত দিয়ে, সে বিষয়ের ইতিহাস, ভূগোল সব গুলে খাওয়া। হয়তো সেটা না হলে তদন্তে ফাঁকফোকর খুঁজে পাওয়াও মুশকিল! তবে একটা ব্যাপার আমার কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, ও কোনো প্রমাণ ছাড়া এতটা নিশ্চিত হচ্ছে কী করে যে এই পুথি চুরি আর অপহরণের ঘটনা একই যোগসূত্রে গাঁথা। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওর ষষ্ঠেন্দ্রিয় যখন একটা রহস্যের যোগসাজসের গন্ধ পেয়েছে এই দুই ঘটনার মধ্যে, তখন আমি নিশ্চিত কিছু একটা মিল আছে এই দুই ভিন্ন ঘটনার ভেতর। এখন দেখা যাক তদন্ত কোনদিকে গড়ায়।

পরদিন সকালে ঘুম ভাঙল মি. পাকরাশির ফোনে। ফোনটা আমিই ধরলাম। প্রত্যুষ শুয়েই শুনছিল। আমি ওকে কিছু বলার আগেই ও বলে উঠল, ‘গাড়িটা পাঠাতে বলেছ বড়োবাবুকে?’

‘কেন? গাড়ি কী হবে? তুমি জানো কী ঘটেছে?’

‘না, রাজনগর শব্দটা তো তোমার কথার ফাঁকেই শুনলাম। ওখানে কিছু একটা হয়েছে, সেটা আন্দাজ করলাম। আমাদের তো আজকে ওখানে এমনিতেই যাবার কথা।’

‘ওখানে গত রাতে একটা খুন হয়েছে। যদিও একটা পুলিশ চৌকি আছে ওখানে, তবুও সেটা এই প্রধান থানার অধীনে। তাই ওঁকে খুব সকালেই বেরিয়ে যেতে হচ্ছে বলে আমাদের জানিয়ে গেলেন। আচ্ছা, ভালো কথা, আমাদের ওখানে আজ যাওয়ার কথা কেন?’

‘দেখো অপূর্ব, বীর রাজবংশের বীরগাঁথা লেখা পুথি চুরি গেছে, অথচ তুমি বীর রাজবংশের যেখানে রাজধানী ছিল, সেখানে যাবে না!’

‘রাজধানী ছিল মানে?’

‘এই বীরভূমে যে বীর রাজবংশ রাজত্ব করত, তাদের রাজ্যের প্রসার এই শুধু আজকের বীরভূম নয়। সেই রাজ্য ছিল বর্তমান ঝাড়খন্ডের দেহঘর থেকে বিষ্ণুপুর অবধি। এই বিশাল সমগ্ৰ রাজ্যের রাজধানী ছিল এই রাজনগর। সেখানে এখনও ভগ্নদশা হলেও রাজপ্রাসাদের অস্তিত্ব বর্তমান। সেখানে না গেলে তো এই তদন্ত সম্পূর্ণ অধরা থেকে যাবে।’

‘ঠিক আছে, তাহলে আমি এখনই গাড়ি বলে দিচ্ছি।’

আমরা ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করার আগেই দেখি গাড়ি এসে হোটেলের দরজায় হাজির। আটটা নাগাদ গাড়ি ছাড়ল। শুনলাম কুড়ি কিলোমিটার প্রায় রাস্তা। আধঘণ্টা মতো লাগবে। দুবরাজপুর ছাড়াতেই রাস্তার পাশে লাল কাঁকুরে অসমান মাটি আর দূরে সবুজ ধানের ঢেউ খেলানো ক্ষেত। এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। বেশ চোখের আরাম হচ্ছিল।

রাজনগরকে ঠিক গ্ৰাম বলা যাবে না, আবার শহর বললেও বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। তার থেকে গঞ্জ বলা ভাল। তবে আমাদের গাড়ির সামনে যেহেতু পুলিশ লেখা আছে, থমথমে রাজনগর যেন আমাদের দেখে আরও ফাঁকা হয়ে গেল। মোড় ঘুরতেই একটা চায়ের দোকানে গোটা পাঁচ ছয়েক ছেলে বুড়ো বসেছিল। আমাদের দেখেই উঠে হাঁটা দিল। চায়ের দোকানিকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাজপ্রাসাদটা কোনদিকে পড়বে?’

আমতা আমতা করে কোনো উত্তর দিতে পারল না। হাত দিয়ে দেখিয়ে দিল পশ্চিমদিকে। আমাদের গাড়ি আবার স্টার্ট দিল। কিছুটা এগোতেই দেখলাম কয়েকটা বিক্ষিপ্ত জটলা। সেগুলো পাশ কাটিয়ে খানিকটা এগোতেই দেখা গেল দু’জন পুলিশকর্মী একটা বেঞ্চে বসে আছে। পুলিশের গাড়ি দেখেই একজন উঠে এল। হাতে লাঠি, মনে হল কনস্টেবল হতে পারে। একটা সেলাম ঠুকল। বুঝলাম পাকরাশি বাবুর বলা আছে মনে হয় আমাদের বিষয়ে। প্রত্যুষ গাড়ি থেকে নেমেই জিজ্ঞেস করল, ‘ঘটনাটা কী হয়েছে?’

‘স্যার ওই যে দূরে টালির চালের বাড়িটা দেখছেন, ওই খেজুর গাছটার পাশে ওখানেই থাকত নিধিরাম হেলা। গাইডের কাজ করত। কাল রাতে মার্ডার হয়েছে। এইখানটায় ওর বডি পড়েছিল। পিঠের ওপর ছুরি গাঁথা। ভোরবেলা কিছু লোক দেখতে পেয়ে থানায় খবর দেয়।’

‘গাইড মানে! কীসের গাইড্?’

‘ওই যে দূরে (বলে লোকটা একপাক ঘুরে গেল) রাজপ্রাসাদ দেখছেন। ওর কিছু ইতিহাস ও বাপ ঠাকুর্দার মুখে শুনে মুখস্থ করেছিল, পর্যটক এলে নিজের মনগড়া কিছু মিশিয়ে ওইসব গল্প বলে ও দু’পয়সা রোজগার করত। তবে ও স্যার দিনরাত ওর আশেপাশেই ঘুরঘুর করত। গ্ৰামের লোকে বলে, ওর কেমন যেন একটা নেশা ছিল ওই রাজপ্রাসাদ।’

আমি আর প্রত্যুষ দূরে তাকিয়ে দেখলাম রাজপ্রাসাদের দিকে। প্রাসাদ দেখে মনে একটু হাসিই পেল। আসলে দুটো বেশ উঁচু পাঁচিল দাঁড়িয়ে আছে। তার ওপর গাছপালার জঙ্গল। খুব সম্ভবত পাথরের গাঁথনি। পুলিশটা আমাদের পথ দেখিয়ে প্রাসাদের দিকে নিয়ে চলল। পথ বড়োই অসমান, মালভূমি যেমন হয় আর কী! পাথুরে আর উঁচু নীচু।

কাছে গিয়ে দেখলাম একটা কালো জলের বেশ বড়ো দিঘি। তার নাম শুনলাম স্থানীয়দের মুখে কালিদহ। তার মাঝখানে একটা জঙ্গলে ভরা দ্বীপ। তার মধ্যে বীর রাজাদের আরাম নিবাস বা হাওয়া মহল। যাই বলা যায় না কেন? তার পাশে প্রায় তিনতলা বাড়ি সমান উঁচু পাথরের পাঁচিল। আড়াআড়িভাবে। তার নীচে প্রচুর ধ্বসংস্তূপ। ইঁটের পাঁজা। ভাঙাচোরা অনেক দেওয়াল ঘাসের জঙ্গলে ঢাকা। আমরা সেই দু’টো বড়ো পাঁচিলের ফাঁক বরাবর ঢুকলাম। কিছুটা যেতেই দেখলাম একটা বেশ বড়ো কুয়ো। ইঁদারা বললেও চলে। প্রত্যুষ আমাদের থেকে একটু এগিয়ে গেল। কুয়োর একদম কাছাকাছি। কুয়োর পাড়ে জংলা গাছ ভরতি। কুয়োর ভেতরেও গাছপালা। একটা বেশ মোটা দড়ি, অনেকটা ওই ফ্ল্যাটবাড়ির রঙের মিস্ত্রিদের কাছে যেমন থাকে। পাতকুয়োর ভেতরে নেমে গেছে দড়িটা। অপরপ্রান্ত একটা মোটা গাছে বাঁধা। দড়িটার গা মসৃণ। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে দড়িটা দু’একদিনের মধ্যেই বাঁধা হয়েছে। প্রত্যুষ একটা সিগারেট ধরাল। আমি চুপ। বুঝলাম সূত্রের খুব কাছাকাছি হয়তো পৌঁছোতে পারছে প্রত্যুষ।

আচমকা প্রত্যুষ আমার দিকে ঘুরেই বলল, ‘মি. পাকরাশিকে একটা ফোন করো তো।’ বলেই পুলিশটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল, ‘আপনারা যেখানে খুন হয়েছে, ওখানে বসে না থেকে এই পাতকুয়োর সামনে এসে বসুন। আমি বড়োবাবুকে বলে দিচ্ছি। আর, ভালো করে খেয়াল রাখবেন যেন, এই দড়িটায় কেউ যেন হাত না দেয়।’

ঘাড় নেড়ে পুলিশটা চলে যেতেই আমি পাকরাশির ফোনটা লাগিয়ে স্পিকারে দিয়ে প্রত্যুষকে কথা বলতে দিলাম। আমি শুধু মন দিয়ে শুনতে লাগলাম ওদের কথোপকথন।

‘মি. পাকরাশি, সকালে আপনি যখন এলেন, তখন ভেতরে একটা বড়ো কুয়ো আর দড়ি দেখেছিলেন?’

‘হ্যাঁ, দেখলাম তো। ওই রাজপ্রাসাদেরই কুয়ো। এখন মনে হয়, নীচে জল নেই। শুকিয়ে গেছে। দড়ি তো সব কুয়োতেই থাকে! কেন বলুন তো?’

‘দড়িটা ফরেনসিকে পাঠাতে হবে। ওর ওপরে লেগে থাকা হাতের ছাপ থাকলে পরীক্ষা করতে হবে। এটাতো আর সেই বীররাজাদের লাগানো দড়ি নয়। কয়েকদিন আগে বাঁধা হয়েছে। আর একটা ভালো কথা, কুয়োর সামনের মাটিতে কিছু পায়ের ছাপ আছে। সেগুলো পরীক্ষা করেছেন?’

‘কই দেখিনি তো?’

আমি দেখলাম প্রত্যুষের কী তীক্ষ্ম দৃষ্টি। সত্যিই সেরকম কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কুয়োর চারপাশের বালিমাটি যেহেতু বেশ শক্ত, তাই ছাপ যথেষ্ট হালকা। আমি ঝুঁকে পড়ে ভালো করে দেখতে যাচ্ছিলাম। ঠিক তখনই প্রত্যুষ আমাকে ফোনে কথা বলার ফাঁকেই হাত দিয়ে আটকাল। আমি থমকে গেলাম। তাকিয়ে দেখলাম, একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে ছাপগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে ছাপ অনেকগুলো হলেও, দেখে মনে হচ্ছে একজনেরই। খুব সম্ভবত স্নিকার জুতো। প্রত্যুষ এবার নীচু হয়ে বসে ঝুঁকে পড়ল ছাপগুলোর ওপর। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে একটা গভীর নিশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘সাত নম্বর!’

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী? জুতোর নম্বর?’

এইবার ও রহস্য করে আমাকে উত্তর দিল, ‘ভায়া, এখন জানতে হবে যে লাইব্রেরিতে পাওয়া হাওয়াই চটির নম্বর কত?’

‘আরে! তুমি তো যা ঘটনাই ঘটছে, সব একই সূত্রে, এক মালায় গাঁথছ। প্রথমে অপহরণ, এখন এই খুনটাও তুমি পুথি চুরির কেসে জুড়বে নাকি?’

‘মনে তো হচ্ছে এটাও সেই বীরবংশের সেই বীরেরই কাজ। এখন প্রশ্ন হল, কে সেই বীরপুরুষ? সেটাই খুঁজে বার করতে হবে।’

আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত হলাম, প্রত্যুষ হেঁয়ালিতে উত্তর দিচ্ছে মানে ও তদন্ত মনে মনে প্রায় গুটিয়ে এনেছে। এখন শুধু সমাধানের অপেক্ষা। ছক ওর সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফাঁদে এখন শুধু পাখি পড়লেই হয়! আমাদের কাজ, শুধু অপেক্ষা!

পুলিশ দু’জনকে নির্দেশ দেওয়া হল, কোনোমতেই যেন পায়ের ছাপ নষ্ট না হয়। আমরা দূরে গিয়ে একটা চায়ের দোকানে বসলাম। মি.পাকরাশি না আসা অবধি অপেক্ষা করতেই হবে আমাদের। কথাবার্তায় বুঝলাম, প্রত্যুষের উদ্দেশ্য মৃত নিধিরাম হেলা সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য উদ্ধার করা। তাতে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট সুবিধে হবে।

লোকমুখে যেটা জানতে পারলাম, নিধিরামের বয়স হবে পঞ্চাশের কোটায়। চেহারা দোহারা। মাঝারি উচ্চতার গড়ন। সারাদিন এইখানেই ঘোরাঘুরি করত। দু’টো নতুন পর্যটকের আশায়। তাদের এই অজানা বীররাজাদের গল্পগাছা শুনিয়ে দু’পয়সা পেত। তবে এই কাজ করতে গিয়ে ওর নাকি এই ভাঙা ধ্বংসাবশেষের ওপর কেমন জানি একটা মায়া পড়ে গিয়েছিল। নিজে হাতেই মাঝেমধ্যে জঙ্গল পরিষ্কার করত ওই জায়গার। নিঝুম দুপুরে গিয়ে একা একা কুয়োর ধারে ভেতরে বসে থাকত। এমনকি এটাও জানা গেল, অনেক সময় গভীর রাতেও ওকে ওই ভাঙা রাজপ্রাসাদে দেখা গেছে। মানে ওকে ঠিক দেখা না গেলেও, ওর বিড়ির আগুন অন্ধকারে টিপটিপ করত। আবার কখনও গনগনে হয়ে উঠত। হয়তো তখন বিড়িতে টান দিত। এ’সব দৃশ্য নাকি এখানকার অনেক মানুষই দেখেছে।

মি. পাকরাশির আস্তে দেরি হচ্ছে দেখে আমরা পায়ে পায়ে নিধিরাম হেলা’র বাড়ির দিকে এগোতে থাকলাম। বাড়ির সামনে গিয়ে দেখি হতদরিদ্র অবস্থা। ঘর একদিকে বেঁকে গেছে, যে কোনোসময় ভেঙে পড়তে পারে। চালের টালি অর্ধেক ভাঙা। সামনে ছোটো একটা উঠোন। উঠোনের একধারে একটা পেয়ারা গাছের নীচে বসে সাদা শাড়ি পরে এক মহিলা খুব সম্ভবত চাল বাছছে। প্রত্যুষ সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বোঝা গেল এটা নিধিরামের বউ। ভদ্রমহিলার সঙ্গে প্রত্যুষ গল্প জুড়ল। ভদ্রমহিলার কথা আমি এক বর্ণও বুঝতে পারছি না। পুরো দেহাতি বীরভূমের গ্ৰাম্য মালভূমির ভাষা। তবে সারাংশ যেটুকু বুঝলাম, যে ভদ্রমহিলার স্বামী গতকাল রাতে ওই রাজপ্রাসাদের কাছে গিয়েছিলেন। তার ঘণ্টাখানেক পরেই উনি একটা আর্তনাদ শুনেছিলেন। ওঁর ঝিমুনির মধ্যেই যেন মনে হয়েছিল নিধিরামের গলা। ছুটে বেরিয়ে যান ঘর থেকে। তারপরেই দেখেন ওইখানে উপুড় হয়ে পড়ে আছে নিধিরাম। পিঠের বাঁদিকে একটা ছোরা গাঁথা। রক্তে ভেসে যাচ্ছে সবুজ ঘাস।

প্রশ্ন এখন একটাই, নিধিরাম যদি ভাঙা রাজপ্রাসাদেই গিয়েছিল, তাহলে তাকে মানে প্রায় পাঁচশো মিটার দূরে ফাঁকা মাঠে নিয়ে এসে খুন করল কে? সেটাই এখন‌ একমাত্র চিন্তার বিষয়। এইটুকু পড়ে পাঠকরা যা ভাবছে, আমিও সেই কথাই ভাবছি যে, পুথি চুরি, অপহরণ এবং এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কি একই লোকের হাত আছে, নাকি অপরাধী আলাদা?

আমার এই সাত-পাঁচ ভাবনার সম্বিত ভাঙল জিপ গাড়ির আওয়াজে। মি. পাকরাশি দলবল নিয়ে এসে হাজির। প্রত্যুষ আর আমি এগিয়ে গেলাম। সবাই মিলেই আবার হাজির হলাম রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষে। ফরেনসিকের লোকজন দড়িটা পরীক্ষার জন্য সংগ্ৰহ করল। আর পায়ের ছাপগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। এর ফাঁকেই টুকটাক কথা হল প্রত্যুষের সঙ্গে বড়োবাবু মি. পাকরাশির।

‘আসলে প্রত্যুষবাবু, আমি যেখানে খুনটা হয়েছে, সেই জায়গাটা আর তার আশপাশ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। এই ভাঙাচোরা রাজপ্রাসাদের দিকটা সেরকম নজর দিইনি। তবে একবার ঢুকেছিলাম বটে। নির্জন গোপন জায়াগা, বড়ো পাঁচিলের আড়াল, যদি কোনো দুষ্কর্মের আখড়ার সন্ধান পাওয়া যায়, মানে নেশার জিনিসপত্র বা বোমা বাঁধার সরঞ্জাম, এই সবের যদি সন্ধান পাওয়া যায় আর কী! কিন্তু খুনের সঙ্গে এই জায়গার সম্পর্ক কী? খুন তো হয়েছে এখান থেকে পাঁচশো মিটার দূরে। এই দড়ি পায়ের ছাপ, এসব কী কাজে লাগবে?’

‘লাগবে স্যার লাগবে। এখন বলুন তো লাইব্রেরিতে যে ছেঁড়া চটিটা পাওয়া গিয়েছিল, সেটা কত নম্বর?’

‘ওটা আমি সংগ্ৰহ করেছিলাম। তখন দেখেছিলাম, বোধহয় সাত। আমার রিপোর্টে লেখা আছে।’

‘এখানেও যে জুতোর ছাপগুলো দেখছেন, সেটাও সাত। তবে তার থেকে এটা নিশ্চিতভাবে এখনই বলা যায় না যে দু’জায়গাতেই একই অপরাধী কাজ করেছে। আবার নাও হতে পারে।’

‘আপনি তো সব গুলিয়ে দিচ্ছেন মশাই!’

‘মোটেই না, বরং গুলিয়ে আসল অমৃতটা তুলে আনার চেষ্টা করছি।’

এবার বেশ আওয়াজ করে হেসে উঠলেন মি. পাকরাশি। আমরা আবার চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। বড়োবাবু আবার দেখলাম প্রত্যুষকে একটু খোঁচাল, ‘তার মানে আপনি বলতে চাইছেন যে, ওই পুথি চুরির কেসের সঙ্গে এই খুনের একটা সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে?’ তবে গলায় ওঁর বেশ একটা তাচ্ছিল্যের সুর। পর মুহূর্তেই বড়োবাবুকে চমকে দিয়ে প্রত্যুষ উত্তর দিল, ‘শুধু তাই নয়, অপহরণটাও এর সঙ্গে জুড়ে নিতে পারেন!’

এবার বড়োবাবু যেন একটু নড়েচড়ে বসলেন।

‘কী বলছেন কী মশাই! এ তো সাংঘাতিক ব্যাপার। গত তিনদিনের তিনটে ঘটনাই একসঙ্গে জড়িয়ে আছে! আপনি তো সাংঘাতিক লোক মশাই। যদি সেটা হয়, তাহলে তো সেটা হবে একটা জটিলতম কেস। আপনি কি কোনো গন্ধ পেয়েছেন নাকি?

‘আরে না! গন্ধ পেলে তো শুঁকেই চলে যেতাম। এটা শুধুই আমার আন্দাজ। আচ্ছা অপহরণের তদন্তটা কিছু এগোল?’

‘কোনোভাবেই কোনো সূত্র পাচ্ছি না প্রত্যুষবাবু। তবে একটা খটকা আমার লাগছে।’

‘কী খটকা?’

‘দেখুন সাধারণত এই বয়সের মেয়ে অপহরণ হয় দু’টো কারণে, এক ধর্ষণ করল বা তার পরে মার্ডার করে দিল। আর তা না হলে তুলে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে নিল। পয়সার বিনিময়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার ফোন, এইসব বয়সের মেয়ে কিডন্যাপ করে আসতে দেখিনি কখনও। ও! এই আলোচনায় মনে পড়ল, একটা দরকারি কথা তো আপনাকে বলাই হয়নি।’

‘কী কথা?’

‘এলাকায় একটা কানাঘুষো খবর শুনলাম, বিমলা নাকি ইদানীং প্রেম করত। কলেজের সামনে একটা ছেলের বাইকে অনেকেই প্রায় উঠতে দেখেছে। তবে ছেলেটার নামধাম কেউ কিছু বলতে পারছে না। শুধু বলছে, ইমারতি দ্রব্যের ব্যবসা করে।’

‘বাহ, এতো দারুণ খবর। আপনি কালই কয়েকটাকে তুলে আনুন, যারা ছেলেটাকে দেখেছে। ওদের মুখের বর্ণনা শুনে অপূর্ব ছবি এঁকে দেবে।’

আমি বোকার মতো ঘাড় নাড়লাম। বুঝলাম, কালকের দিনটা আমার জলে গেল। আমরা ফেরার উদ্দেশ্যে গাড়িতে উঠলাম। এই সময়টাই সেরা সময় প্রত্যুষকে ঘাঁটাবার। গাড়িতে বসেই তাই বলে উঠলাম, ‘ভাই, তাহলে শেষমেশ কেসটা কী দাঁড়াল? তুমি কি নিশ্চিত যে তিনটি ঘটনার মধ্যে একটা যোগসূত্র আছে?’

‘মোটামুটি বলা যায়। তবে আরেকটু ভাবনা বাকি আছে এখনও। একটা বিষয় এখনও পুরোটা জানা হয়নি।’

‘কী বিষয়?’

‘মনে পড়ছে, গতকাল নকুলবাবু কী একটা লুকোচ্ছিল?’

‘হ্যাঁ, ঠিক। শেষের দিকে চোখমুখ আর কথায় জড়তা দেখে আমারও তাই মনে হয়েছিল যে নকুলবাবু একটা কিছু লুকোচ্ছেন। কিন্তু লোকটাকে দেখে তো খুব সজ্জন মনে হয়। যথেষ্ট শিক্ষিতও বটে। উনি কি কোনো অপরাধের মধ্যে জড়িয়ে পড়বেন?’

‘দেখো অপূর্ব, অপরাধী সবসময় অপরাধ একা করে না, বা করতে পারেও না। ইচ্ছাকৃত বা অজান্তে অনেকেই জড়িয়ে পড়ে সেই অপরাধ জগতে। কেউ অন্যায় লোভে, কেউ বা সাংঘাতিক ভয়ে। তবে অপরাধকে প্রশ্রয় দেওয়াও এক ধরনের অপরাধ। অনেক ভালো মানুষও অনেক সময় প্রশ্রয় দিতে বাধ্য হয়, বিপদের ফাঁদে পড়ে।’

‘তার মানে তুমি বলতে চাইছ যে, নকুল বাবু ভালো লোক হওয়া সত্ত্বেও এই অপরাধের জালে জড়িয়ে পড়েছেন?’

‘তুমি গোয়েন্দার সহকারী না হয়ে উকিল হলে, ভালো পসার জমবে। তুমি তো আমার মুখে কথা বসিয়ে দিচ্ছ ভাই! দেখো উনি একজন যথেষ্ট সজ্জন মানুষ। সমাজে একটা বেশ ভালো অবস্থান আছে ওঁর। ফলে একশোভাগ নিশ্চিত না হয়ে ওঁর বিরুদ্ধে এক চুলও এগোনো যাবে না। তারপর যদি কোনোভাবে আমাদের হিসাব নিকাশে একটু ভুল হয়ে যায়, তখন নিজেকে ক্ষমা করতে পারব না। মানুষের গায়ে বদনামের কালিমা লাগানো সহজ, কিন্তু তা মুছে দেওয়া অনেক কঠিন, এটা ভাবা উচিত।’

মনে মনে বুঝলাম, ছোটোখাটো গোয়েন্দা হয়তো অনেকে সাজতে পারে, কিন্তু প্রত্যুষ হওয়া কঠিন। তবে একটা জিনিস আমি আন্দাজ করলাম, যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে ওর মনের ভেতর উথালপাথাল চলছে। যেটা এতদিন পাশে থেকে আমি বুঝতে পারছি, কিন্তু কাউকেই প্রাণ খুলে ও ঠিক বলতে পারছে না। তাই আমি একটু ভরসা দিয়েই বললাম, ‘তুমি কোনো কাজ করতে ইতস্তত করছ? আমায় খোলাখুলি বলতে পারো!’

‘না, সঠিক সিদ্ধান্ত হবে কিনা সেটাই ভাবছি। নকুল বাবুর মোবাইলে আড়ি পাতা কি ঠিক হবে? ওঁর নম্বর তো বড়োবাবুর কাছে আছে। যে ফোন থেকে উনি অপহরণের নালিশ জানিয়েছিলেন।’

‘যদি সত্যিই প্রয়োজন পড়ে তবে আর দোনামোনা করে লাভ কী?’

‘ঠিক আছে, তাহলে কথাটা বলেই দাও বড়োবাবুকে। তারপর যা হবে দেখা যাবে।’

মনের দোটানার মধ্যেই ফোন করলাম বড়োবাবুকে।

‘হ্যালো? বলুন আবার কী হল?’

‘বলছি, একটা কথা ছিল আপনার সঙ্গে। ইয়ে মানে কীভাবে শুরু করব বুঝতে পারছি না!’

‘আরে! অত ইতস্তত করছেন কেন? বলেই ফেলুন না।’

‘আচ্ছা, ওই নকুলেশ্বর বাবু আছেন না! ওঁর ফোন নম্বর আছে তো আপনার কাছে?’

‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো? লাগবে?’

‘ওঁর নম্বরটা একটু ট্র্যাক করতে হবে প্লিজ।’

‘কী বলছেন কি আপনি? আপনি নিজে বুঝতে পারছেন, আপনি কী বলছেন!’

‘আমি জানি, উনি কোনো প্রকারেই অপরাধী নন, কিন্তু তদন্তের স্বার্থে ওঁর ফোনটা ট্র্যাক করাটা বিশেষ জরুরি।’

‘না, আসলে উনি এই সমাজের এক অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তি। রাজনৈতিক নেতা থেকে আরম্ভ করে সমাজের সব জ্ঞানী গুণী মানুষজন ওঁকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করেন। এবার বুঝতে পারছেন, ব্যাপারটা যদি কোনোভাবে জানাজানি হয়, আমার কী অবস্থা হবে! আপনি তো বলেই খালাস।’

এই দু’দিনে প্রথম মি. পাকরাশির গলায় দেখলাম ঝাঁঝ। উনি যেন সত্যিই একটু অসন্তুষ্ট হয়েছেন এই প্রস্তাবটা শুনে। আমার চোখমুখ দেখে প্রত্যুষ বোধহয় কথোপকথনটা কিছুটা আন্দাজ করে নিয়েছে। ফোনটা আমার হাত থেকে কেড়ে নিল।

‘হ্যালো পাকরাশিবাবু, আমি প্রত্যুষ বলছি, আমি দায়িত্ব নিয়ে জোর দিয়ে বলতে পারি যে আপনি এই ফোন ট্র্যাক করলে আপনার বিন্দুমাত্র কোনো ক্ষতি হবে না, উলটে আপনি লাভবান হবেন। আমার স্থির বিশ্বাস, আমি অবশ্যই প্রমাণ করে দিতে পারি যে নকুলেশ্বর বাবুর সঙ্গে এই তদন্তের সামান্য হলেও যোগসূত্র আছে। ফলে আপনার বিন্দুমাত্র অপরাধবোধের কোনো ব্যাপার নেই। বরং উলটে আপনি এই কাজ করার জন্য ভবিষ্যতে প্রশংসিত হবেন। এই আমি বলে দিলাম। আর এরপরও যদি আপনি করতে ভরসা না পান, তাহলে তো আমাকে বাধ্য হয়ে জেলা সুপারের সঙ্গে কথা বলতে হবে।’

‘মি. সেন, আপনি এতটাই নিশ্চিত, যে নকুলবাবু এইসব ঘটনায় যুক্ত! ঠি…ক আছে আপনি যখন বলছেন, আমি দেখছি।’

‘ধন্যবাদ। সব পরে বুঝে যাবেন।’

আমি বাকরুদ্ধ। প্রত্যুষ বিনা কোনো তথ্য প্রমাণে এত বড়ো কথাটা থানার বড়োবাবুকে দিয়ে দিল। এখন যদি নকুলবাবুর সত্যিই কোনো যোগাযোগ না থাকে এইসব অপরাধের সঙ্গে, তাহলে তখন কী হবে? আমার তো ভেবেই কীরকম ভয় আর অস্বস্তি হচ্ছে। থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম, ‘তুমি বড়োবাবুকে কথা দিয়ে দিলে? তারপর যদি প্রমাণ করতে না পারো!’

‘ঠিকই বলেছ অপূর্ব। তবে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, নকুলবাবুর ফোন ট্যাপ করলে একটা জবরদস্ত সূত্র পাওয়া যাবে।’

আমি মনে মনে নিশ্চিন্ত হলাম। কারণ এখনও অবধি আমি কোনোদিন প্রত্যুষের চিন্তা লক্ষ্যভেদ করতে ব্যর্থ হতে দেখিনি। ওকে সাহস আর উৎসাহ দেবার জন্য সমর্থন করলাম,

‘ঠিকই করেছ। আমারও ওঁর সঙ্গে কথা বলে তাই মনে হচ্ছিল।’

‘আরও কথা বলতে হবে ওঁর সঙ্গে। আজ বিকেলে ওঁর বাড়ি আর একবার যাব।’

‘তাহলে তো ভালোই হয়। ধাঁধা আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

দুপুরবেলা খাওয়া-দাওয়া করে আমরা অল্প বিশ্রাম নিলাম। বিকেল গুটিয়ে সন্ধে নামার একটু আগেই গাড়িকে বলে রেখেছি। নকুলেশ্বরবাবুর বাড়িতে যাব। তবে আজকে আমরা আগাম ফোন না করেই যাব ঠিক করলাম।

তবে এদিন বেল বাজাতেই দরজা খুললেন ওঁর স্ত্রী। আমাদের দেখেই উনি বেশ সন্ত্রস্ত। উনি ডাক দিলেন নকুলবাবুকে। নকুলবাবু সিঁড়ি দিয়ে নামতেই আমাদের দেখে মুখে একরাশ বিরক্তি। সিঁড়ি থেকেই বলে উঠলেন, ‘আজ একটু ব্যস্ত আছি।’

প্রত্যুষ তৎক্ষণাৎ বলে উঠল, ‘কিন্তু আমাদের তো একটু প্রয়োজন আছে আপনার সঙ্গে। আপনার সামান্য সহযোগিতা না পেলে তো খুব অসুবিধেয় পড়ে যাব!’

‘আমার আবার কী সহযোগিতা?’

‘আপনি পণ্ডিত মানুষ। আপনার কাছ থেকে একটু বীরভূমের হিন্দু রাজাদের সম্পর্কে কিছু জানতে চাই।’

‘ঠিক আছে। আসুন, বসুন। বলুন, কী জানতে চান?’

‘এই বীরভূমের বীর রাজাদের প্রাচীন ইতিহাস যদি কিছু বলেন।’

বুঝলাম প্রত্যুষ এখন চার ফেলে জলে খেলাচ্ছে। ভালো শিকারি যেভাবে জল থেকে বড়ো মাছ খেলিয়ে তোলে। নকুলবাবু শুরু করলেন।

‘মোটামুটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই বীর বংশের রাজারা খুব সম্ভবত উড়িষ্যা থেকে এখানে এসে তাদের রাজ্যপাট জমিয়েছিলেন। তিনি বীররাজা নামেই বিখ্যাত ছিলেন। সেই থেকেই ওই বংশের নাম হয়ে যায় বীর বংশ। বল্লাল সেনের ছেলে লক্ষ্মণ সেন বর্তমান এই রাজনগর প্রতিষ্ঠা করেন। তখন তার নাম ছিল শুধু ‘নগর'। পরবর্তীকালে এই নগরে বীর রাজারা তাদের রাজধানী প্রতিষ্ঠিত করলে এই নগরের নাম হয় রাজনগর। এই বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন বীর হাম্ভির। তারপর প্রায় সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি পাঠান সেনা জোনেদ খান বীর বংশের রাজার প্রধান রানির সহায়তায় তাঁকে হত্যা করে এই রাজনগরের সিংহাসনে বসেন। এইভাবেই এই রাজবংশের পতন হয়।’

‘মানে, অন্তর্বর্তী বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই কি এত বড়ো বংশের পতন হল?’

‘হ্যাঁ, অবশ্যই। ভারতবর্ষের পরাধীনতার ইতিহাসও তো সেই বিশ্বাসঘাতকতার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে।’

‘আর ওই পুথির ব্যাপারটা। ওটা তো আপনি প্রায় সবটাই পাঠোদ্ধার করেছেন!’

বুঝলাম অনেকক্ষণ ধরে লুজ বল দেবার ফাঁকে একটা গুগলি ছেড়েছে। নকুলবাবুর মুখটা বেশ দ্বিধাগ্ৰস্ত। উনি সামলে নিয়ে বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ পড়েছি বটে। ইদানীং আবার একটু বেশি যাতায়াত করতাম বিমলার জন্য। ওকে সব নানারকম ইতিহাসের গল্প বলতাম। ওর প্রিয় বিষয় হল ইতিহাস। ওই মাঝেমধ্যে চেপে ধরত, ‘চলো না লাইব্রেরিতে, সারা পৃথিবীর ইতিহাস পড়ছি, আর নিজের জেলার ইতিহাস জানব না! তুমি তো সংস্কৃত পড়তে পারো। একটু আমাকে পড়ে বুঝিয়ে দাও না সব বীর বংশের ইতিহাস’। তাই ওকে নিয়ে মাঝেমধ্যে সন্ধেবেলা লাইব্রেরিতে যেতাম।’

‘হ্যাঁ সেটা আপনি না বললেও আমি লাইব্রেরিয়ান বিশম্ভরবাবুর মুখে শুনেছি।’

দেখলাম কীভাবে প্রত্যুষের তৈরি ফাঁদে আস্তে আস্তে জালে জড়িয়ে যাচ্ছে নকুলবাবু। প্রত্যুষ আবার ব্যাপারটাকে পোক্ত করল। প্রত্যুষের চোখ এখন বাজপাখির মতো তীক্ষ্ম আর চারদিকে ঘুরছে। নকুলবাবুর কথা শেষ হতেই প্রত্যুষ বলে উঠল, ‘তার মানে আপনি পুথিটা অনেকবার দেখেছেন?’

‘হ্যাঁ, তা দেখেছি বটে। কেন বলুন তো?’

‘না, বলছিলাম রাজবংশের পুথি বলে কথা। এই ধরনের পুথিতে অনেক আবার গুপ্তধনের সন্ধান থাকে। সেসব কিছু পেয়েছিলেন নাকি, কোনোসময়?’

এইবার বেশ অস্বস্তি ফুটে উঠল নকুলবাবুর চোখে মুখে। কিন্তু বেশ জোর করে সেটাকে ঢাকবার চেষ্টা করলেন। তবুও মুখে কিছু উত্তর দিতে বিব্রত বোধ করলেন। শুধু মাথা দিয়ে ঘাড় নেড়ে ‘না’ বোঝালেন।

প্রত্যুষ আবার খোঁচাল নকুলবাবুকে, ‘আপনার কী ধারণা, ওই ভগ্নস্তূপের নীচে সত্যিই কোনো প্রাচীন গুপ্তধন আছে?’

‘পুথিতে লেখা থাকলেও তা আজ আর নেই, এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কারণ পরবর্তীকালের মুসলিম রাজারা বা ব্রিটিশ শাসক তা কি আর ওই ফাঁকা মাঠের মধ্যে ফেলে রেখে দেবে? কিন্তু আমি যতই তা নিয়ে চিৎকার করি, তা কে-ই বা শুনছে বা বুঝছে?’

এই শেষ কথাটা বলার সময় একটা অদ্ভুত আচরণ করলেন নকুলবাবু। পরিষ্কার বোঝা গেল, কেউ বা কারা ওঁর কথা শুনছে না এই বিষয়ে এবং কথা না শুনে ভুল পথে এগোচ্ছে। প্রত্যুষের যা বোঝার প্রায় সবটাই বোঝা হয়ে গেছে। তাই হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে উঠল। তারপরেই দু’হাত জোড় করে বেশ গম্ভীর গলায় বলে উঠল, ‘নমস্কার আজ উঠি। আবার দেখা হবে।’

নকুলবাবু থতোমতো খেয়ে বিদায় জানালেন। আমরা হোটেলের রাস্তা ধরলাম।

নীচ থেকে একেবারে খেয়েই হোটেলের ঘরে উঠে এলাম। দু’জনে দু’টো সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় গল্প করছি। কথাটা আমিই প্রথমে পাড়লাম, ‘আচ্ছা প্রত্যুষ, নকুলবাবুর আবভাব দেখে তো মনে হচ্ছে, তোমার আন্দাজ সম্পূর্ণ ঠিক। ওঁর মনে হয় সরাসরি যোগাযোগ আছে এই সব কাণ্ডে!’

‘না, একেবারেই না। পিছনে খেলছে অন্য লোক। এক বা একাধিক। উনি শুধু এই ষড়যন্ত্রের শিকার। ওঁর শুধু একটাই দোষ, উনি অসম্ভব চাপে পড়ে, কিছু একটা লুকোচ্ছেন আমাদের কাছে।’

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয়, ওঁর মতো লোক অপরাধী হবে?’

‘সেটা ঠিক। তবে কোনো সত্য গোপন করা বা তদন্তে সহযোগিতা না করাও তো একটা অপরাধ।’

‘তার মানে শুধু সেই চক্রটাকে খুঁজে বার করাই এখন আমাদের কাজ। আর যার প্রধান হাতিয়ার এখন আমাদের কাছে নকুলবাবু। তাহলে বাকি রইল শুধু খুনের ব্যাপারটা।’

‘লাইব্রেরি আর খুনের জায়গা থেকে পাওয়া জিনিসপত্র আর হাতের ছাপের ফরেনসিকটা আসুক। তাহলেই সব জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে।’

প্রত্যুষ একটা বই নিয়ে বসল। আমার শরীর আর সারাদিনের ধকলে নিচ্ছে না। আমি শুয়ে পড়লাম।

পরদিন ভোরবেলা উঠে দেখি প্রত্যুষ বিছানায় নেই। হাত বাড়িয়ে মোবাইলে দেখলাম সকাল সাতটা। এত সকালে কোথায় বেরোল? কিছু বলেও তো গেল না। মোবাইলে একটা ফোন করব? করা কি উচিত হবে? না, থাক। বলে যাওয়ার হলে তো আমাকে বলেই যেত। বলে যখন যায়নি, তার মানে নিশ্চয়ই কিছু কারণ আছে। ফোন করা উচিত হবে না। এইসব সাত-পাঁচ ভাবছি, তার মধ্যেই দেখি থানার বড়োবাবুর ফোন।

‘হ্যালো?’

‘প্রত্যুষবাবু আছেন?’

‘না, আমি অপূর্ব বলছি।’

‘আচ্ছা, উনি ফিরলে একটু থানায় আসবেন। দরকার আছে। তখন দু’জনকে একসঙ্গেই পুরোটা বলব। অনেক কথা আছে।’

আমি ফ্রেশ হয়ে রেডি হতে লাগলাম। আমার ঠিক রেডি হওয়ার মুখে দেখি প্রত্যুষ ঢুকল ঘরে। হাতে একটা বড়ো ব্যাগ। ওকে দেখেই প্রশ্ন করলাম, ‘এত সকালে কোথায় গিয়েছিলে?’

‘দুবরাজপুর মার্কেটে। সারাদিনে হয়তো আর সময় হবে না। তাই একটু কেনকাটা সেরে নিলাম। হয়তো একটু পরেই হোটেল ছেড়ে দিয়ে আমরা এখান থেকে চলে যাব।’

‘সে কী! আর বাকি তদন্ত!’

আমার কথার উত্তর না দিয়ে নিজের কালো চামড়ার ব্যাগ থেকে হার্ড বলার রিভলবারটা বার করে এক চোখ বন্ধ করে একবার মাছির ভেতর দিয়ে দৃষ্টিটা তীক্ষ্ম করে আমার দিকে তাকাল। তারপর এক ঝটকায় সিলিন্ডারটা খুলে দেখে নিল, যে ছ’টা বুলেটই ঠাসা আছে। এবার আমি একটু ঘাবড়ালাম। সাত সকালে বিনা কারণে আবার এ সব কেন ভাই! তবুও জড়তা কাটিয়ে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, ‘কী ব্যাপার হঠাৎ বন্দুক কেন? আর কীসব কিনলে?’

‘বীর রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধ হবে তার পোশাক।’

‘বড়োবাবু ফোন করেছিল। যেতে বলেছে।’

‘জানতাম করবে। ব্রেকফাস্ট খেয়ে বেরিয়ে যাব। একটু হেভি ব্রেকফাস্ট বলে দাও। তারপর কখন কী পেটে পড়বে জানি না।’

আমি ‘আচ্ছা' ছাড়া আর কোনো কথা বাড়ালাম না। প্রত্যুষ বাথরুমে ঢুকল স্নান সারতে। আমি সেই ফাঁকে ওর নিয়ে আসা ব্যাগটা তল্লাশি করতে গেলাম। ব্যাগ খুলে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ! ব্যাগের ভেতর রয়েছে দু’টো ধুতি, ফতুয়া দু’টো, আর গামছা। এ সব হঠাৎ কী হবে আমাদের! যুদ্ধ হবে বলল যে! সে কী ধুতি পরে করতে হবে নাকি। কী জানি বাবা! আবার ব্যাগের মুখ বন্ধ করে রেখে দিলাম। দেখাই যাক না কী হয়!

প্রত্যুষ বাথরুম থেকে বেরোবার একটু পরেই খাবার দিয়ে গেল। হঠাৎ হর্নের আওয়াজ। মানে থানা থেকে গাড়ি নিয়ে জগদীশ হাজির। আমরা তাড়াতাড়ি করে খেয়ে থানায় হাজির হলাম। আজ থানায় ঢুকতেই বড়োবাবু অন্যরকম খাতির যত্ন শুরু করলেন। গতকালের থেকে ব্যবহারে অনেকটাই তফাৎ। তারপর নিজেই প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে শুরু করলেন, ‘আপনি মশাই অন্তর্যামী!’

‘কেন…? আমি আবার কী করলাম!’

‘কোনো প্রমাণ সূত্র ছাড়াই কীভাবে আপনি সব মিলিয়ে দিলেন, একেবারে দুই’য়ে দুই’য়ে চার।’

‘তাই নাকি! তা কোন দুই মিলে চার হল?’

‘পুথি যারা চুরি কেরেছিল, তারাই রাজনগরের ওখানে নিধিরামকে মার্ডার করেছে। কিন্তু একটা জিনিস কিছুতেই মাথায় ঢুকছে না, নিধিরামের মতো একটা গরিবকে মেরে লাভ কী ওদের!

‘ফরেনসিক রিপোর্ট এসে গেছে। বাহ, তাহলে দুটো কেস এখন একটা। আর নিধিরামের মরার কারণটা পরে বলছি। এখন তাহলে অপহরণের কেসটা আপনিই সামলান। ওটার জন্য তো আর আপনি আমায় ডাকেননি!’

‘আরে না না, আমার কথায় কিছু মাইন্ড করবেন না। আমি কালকেই নকুলেশ্বরবাবুর ফোন পুরো ট্র্যাক করতে বলে দিয়েছি। শুধু তাই নয় গত সাতদিনের কলরেকর্ড যতটা সম্ভব উদ্ধার করতে বলে দিয়েছি। খুব তাড়াতাড়ি হাতে পেয়ে যাব।’

‘হ্যাঁ, ঠিক। ওটা না পেলে বাকি কেসটা অধরা থেকে যাবে।’

‘তার মানে এটা এখন নিশ্চিত করে বলা যায় যে, তিনটি ঘটনা আসলে একটিই কেস। তবুও একটা কথা কিছুতেই হজম হচ্ছে না যে নকুলবাবু কী করে এইসব অপরাধের মধ্যে জড়িয়ে পড়ল! ওঁকে তো আমি বহুদিন চিনি। আর শুধু আমি কেন! সারা দুবরাজপুর ওঁর সামাজিক অবস্থান সম্বন্ধে যথেষ্ট ভালোভাবেই জানে।’

‘ঠিকই বলেছেন। উনি তো নিজে থেকে কোনো অপরাধ করেননি। ওঁকে ভয় দেখিয়ে বা জোর করে অপরাধের মধ্যে ফাঁসিয়ে দেওয়া হয়েছে। উনি নিজের অজান্তেই অন্যায়ের জালে জড়িয়ে পড়েছেন।’

‘আমি আপনাকে দুপুরের মধ্যেই কলরেকর্ড সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জানিয়ে দিচ্ছি। আমাকে এযাবৎ যা খবর দিয়েছে কোম্পানি, তাতে আশা করি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমার হাতে পুরো লিস্ট চলে আসবে।’

‘আর ওই বিমলার নম্বরটা দিয়েছেন তো?’

‘এই রে… একদম ভুল হয়ে গেছে। ওটার কথা তো মাথা থেকেই বেরিয়েই গিয়েছিল। আসলে ওটার সেই সিউড়ির লোকেশনের পর আর কোনো হদিশ না পাওয়ায় খেয়ালই ছিল না। ওটা আমি এখনই আর্জেন্ট হিসেবে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

বিমলার প্রেমিককে চেনে এরকম কয়েকজন সাক্ষীকে থানায় ধরে নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের বর্ণনা শুনে আমি সেই মহাপুরুষের ছবি আঁকতে লাগলাম।‌ প্রতিটি মিনিটকে ঘণ্টা মনে হচ্ছে। বারবার ঘড়ির দিকে দেখছি। বড়োবাবু বলেছেন লাঞ্চের পর মোটামুটি দু’টো নাগাদ জানতে পারবেন। প্রত্যুষ হোটেলের ঘরে ফিরে কী করছে কে জানে! আমি শুধু ভাবছি, যদি কিছু অপরাধ জানা যায়, তাহলে কি নকুলবাবুকে গ্ৰেপ্তার করা হবে? যদি হয়, তাহলে তো আগুন জ্বলবে দুবরাজপুরে। ওঁর ছাত্রছাত্রী ভক্ত মিলে সংখ্যাটা নেহাৎ কম নয়। তারা তো এর প্রতিবাদে রাস্তায় নামবে। সেটা সামলানো কিন্তু বেশ কঠিন হবে। আর যদি সেরকম কিছু পাওয়া না যায়, তাহলে কিন্তু পুরো ফ্লপ। তখন আবার অন্য রাস্তা খোঁজা। সে বড়ো বিরক্তিকর। এতটা এগিয়ে এসে যদি তীরে তরী ডোবে! তাহলে বলতে হবে আমাদের চরম দুর্ভাগ্য। তবু এই মুহূর্তে প্রত্যুষের দূরদৃষ্টির ওপর ভরসা করা ছাড়া আর অন্য কোনো রাস্তা খোলা নেই।

হোটেলে ফিরে দুপুরবেলা লাঞ্চ করে উঠেই ফোন করলাম পাকরাশিকে। প্রত্যুষ বারণ করেছিল করতে। আমি তাও অধৈর্য হয়ে করে ফেললাম। তাতে বড়োবাবুর সুবিধেই হল। উনি কল করতে একটু ইতস্তত করছিলেন। আমার ফোন পেতেই বলে উঠলেন, ‘প্রত্যুষবাবুকে আমার তরফ থেকে ধন্যবাদ জানাবেন। মাস্টারমশাই মানে নকুলেশ্বর বাবুর ফোনে গত দু’দিন তিনটি নম্বর থেকে ফোন এসেছিল।’

আমি মাঝপথে কথা থামিয়ে বললাম, ‘ঠিক আছে, আমি প্রত্যুষকে দিচ্ছি।’

উনি আবার শুরু করলেন।

‘নমস্কার প্রত্যুষবাবু, নকুলবাবুর ফোনে তিনটি সন্দেহজনক নম্বর থেকে ফোন করা হয়েছে। তার মধ্যে শেষ দুটি নম্বরের একটি সিউড়ি লাস্ট লোকেশন দেখাচ্ছে। আর দ্বিতীয়টি রাজনগর দেখাচ্ছে। তবে প্রথম নম্বরটি সবচেয়ে সন্দেহজনক। ওটি থেকে যেমন নকুলবাবুকে ফোন করা হয়েছে একবার, তেমনি অপহরণের আগেরদিন বেশ কয়েকবার বিমলার ফোনে ফোন করা হয়েছে। তবে ওই ফোন ও বিমলার ফোনটির লাস্ট লোকেশন সিউড়ি দেখাচ্ছিল। এখন আর কোনো হদিশ নেই। তবে আপনার কথা কিন্তু হুবহু মিলে যাচ্ছে প্রত্যুষবাবু। অশেষ ধন্যবাদ।’

‘তাহলে কী বুঝলেন? যে অপহরণকারী সেই আসলে বিমলার প্রেমিক। তার মানে অপহরণের তদন্ত এখানেই ইতি। এখন তাহলে কেস তিনটে থেকে দু’টো। শুধু পুথি চুরি আর খুন।

‘আচ্ছা ওই পুথি চুরি আর খুন কি এরাই করেছে?’

‘সেটা নকুলবাবু বলতে পারবেন। এখন বাড়িতে বসে বলবেন না থানায়? সেটা আপনার বিষয়।’

‘না, চলুন আগে ওঁর বাড়ি যাই, না খাপ খুললে তখন থানায় নিয়ে আসব।’

‘তাহলে কখন যাবেন?’

‘হাতে একটা জরুরি কাজ আছে, ওটা সেরেই বিকেলের দিকে যাব। ওই ধরুন চারটে নাগাদ। আমি যাওয়ার সময় আপনাদের তুলে নেব।’

‘ঠিক আছে। তাহলে দেখা হচ্ছে।’

ফোন ছাড়ার পর আমি একটা প্রণামের ভঙ্গি করে বলে উঠলাম, ‘তাহলে কেস তো সাকসেস। মোটামুটি গুটিয়ে এনেছ।’

প্রত্যুষ হেঁয়ালি করে আবৃত্তি করে উঠল, ‘হায় ছায়াবৃতা, কালো ঘোমটার নীচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ। উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে'। এটি যিনি লিখেছিলেন, তার বাড়িও এখান থেকে বেশি দূর নয়।’

আমি চুপ করে গেলাম।

ঠিক বিকেল চারটে নাগাদ আমি প্রত্যুষ আর থানার বড়োবাবু তিনজনে মিলে গিয়ে হাজির হলাম নকুলেশ্বরবাবুর বাড়ি। আমাদের দেখে বেশ ঘাবড়েই গেলেন নকুলবাবু। তবুও উনি প্রথম ধাক্কাটা সামলে নিয়ে বসতে বললেন আমাদের। প্রথমে প্রত্যুষই শুরু করল। একদম সরাসরি।

‘আপনার ফোনে গত দু’দিনে যত ফোন এসেছে, তার মধ্যে তিনটি ফোনের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে না। সেই ফোনের নম্বরগুলো আমাদের কাছে আছে। নম্বরগুলি সন্দেহজনক। এখন আমাদের প্রশ্ন হল, তাদের সঙ্গে আপনার কী কথা হয়েছিল? নম্বরগুলো কি বলব আপনাকে?’

নকুলবাবুর মাথা নীচু হয়ে গেল। উনি হাত দেখিয়ে ইশারায় বললেন, ‘না থাক। আমি বুঝে গেছি কোন নম্বরগুলো।’

‘আপনি আরও আগে একটু সহযোগিতা করলে আমাদের আর এত দৌড়ঝাঁপ করতে হত না।’

‘প্রত্যুষবাবু আমার দিকটাও একটু বোঝার চেষ্টা করুন। বিমলা আমার মেয়ের মতো। ওদের কথামতো না চললে ওরা বিমলাকে ধর্ষণ করে খুন করে ফেলে রেখে যাবে বলেছিল। তাই আমি ভয়ে আপনাদের কাউকে কিছু বলিনি।’

‘তা ফোনে ওদের দাবি কী ছিল?’

‘আরে! একটা ভিত্তিহীন দাবি। ওই পুথিটা জানলাম ওরাই চুরি করেছে। তারপর অনেক কষ্ট করেছে পাঠোদ্ধার করার জন্য। পারেনি। তখন পাতার পর পাতা ছবি তুলে আমার মোবাইলে পাঠাত, অর্থ বলে দেওয়ার জন্য। আসলে ওদের‌ দৃঢ় বিশ্বাস, রাজনগরের ওই ধ্বংসপ্রাপ্ত রাজপ্রাসাদের আশেপাশে কোথাও প্রচুর মণি-মুক্তো গুপ্তধন আছে। সেটা বলে দেওয়ার জন্য আমাকে চাপ দিত। আর শাসাত, না বললে ওরা বিমলার সর্বনাশ করবে।’

‘তা, আপনি শেষে কী সমাধান সূত্র দিলেন?’

‘ওখানে একজায়গায় ছিল যে পাঠানদের কাছে পরাজয় অবশ্যম্ভাবী বুঝে গিয়ে বীর বংশের শেষ রাজা তার সর্বস্ব নিয়ে কুয়োর মধ্যে ঝাঁপ দিলেন। সেই জায়গাটা দেখিয়ে আমি বলি যে, ওখানে গুপ্তধন খুঁজলে পেলেও পেতে পারো। কিন্তু আমার বিমলাকে মুক্তি দাও।’

‘তার উত্তরে ওরা কী বলে?’

‘বলেছে তো আজকে বিমলাকে ছেড়ে দেবে। আমি তো তাই সেই থেকে বসে আছি মেয়েটার অপেক্ষায়।’

‘মাস্টারমশাই আপনাকে যে ফোন করত, মানে অপহরণকারী, সে আসলে বিমলারই প্রেমিক।’

‘মানে! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না!’

‘আপনার বিমলাও এর মধ্যে জড়িত। ও আর ওর প্রেমিক, দু’জনে মিলেই এই মতলব করেছিল।’

‘দাঁড়ান, এইবার আমার মাথায় ব্যাপারটা কিছুটা পরিষ্কার হচ্ছে। ইতিহাস নিয়ে বিমলাকে কলেজে ভরতি করে দেওয়ার পর আমি ওকে নিয়ে প্রায়ই লাইব্রেরিতে যেতাম। নানা রকম ঐতিহাসিক গল্প বলতাম ওকে। বিভিন্ন পুথি পড়ে পর্যালোচনা করতাম। যে পুথিটা চুরি গেছে সেটাও অনেকবার ওকে দেখিয়েছি। বলেছি, কত কী যে লুকিয়ে ওই ভগ্নস্তূপের তলায় কে জানে! শেষে সবসমেত বীর রাজা ঝাঁপ দিয়েছিল ওই কুয়োর ভেতর। এই বীরবাজাদের প্রধান সম্পদ ছিল তাদের বীরত্ব। একটা এত বছরের রাজত্বকাল তার কত অমূল্য সম্পদ সব তলিয়ে গেল ইতিহাসের গহ্বরে। এ’সবের অর্থ কী ও গুপ্তধন বুঝল!’

‘একদম ঠিকই ধরেছেন। সেই সব গল্পই ও মনে হয় ওর প্রেমিককে করে। আর এখানে ও যত স্নেহ আদরেই বড়ো হোক, সে তো হাজার হলেও করুণা। তাই এই দয়ার বন্ধন থেকে ছিটকে বেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত হতে চেয়েছিল। সহজে বড়োলোক হয়ে যাওয়ার লোভ ওকে বোধহয় পেয়ে বসেছিল। আর লোভ থেকেই যাবতীয় পাপ। আর যেখানেই পাপ, সেখানেই মৃত্যু।’

‘তার মানে রাজনগরের খুনটাও কি ওরাই করেছে?’

‘সেটা যদিও এখনও প্রমাণসাপেক্ষ। তবু আন্দাজ করা যায় যে সেটা ওর প্রেমিকেরই কাজ।’

‘ও প্রেম করত যে সেটা আপনারা জানলেন কী করে?’

‘আপনি আন্দাজ করতে পারেননি হয়তো, কিন্তু এলাকায় অনেকেই জানে। অপূর্ব, দেখাও না স্যারকে ওই প্রেমিকের আঁকা ছবিটা।’

ছবিটা বার করলাম। দেখানোর পর নকুলেশ্বর বাবু চিনতে পারলেন না। তবে খুব হতাশ হলেন। বলে উঠলেন, ‘এখন বুঝতে পারছি কেন বিমলার ইদানীং সংস্কৃত শেখার ঝোঁক বেড়েছিল?’ যতই হোক নিজের মেয়ের মতো স্নেহ করতেন তো! এবার প্রত্যুষ ইশারা করল পাকরাশি বাবুকে ওঠার জন্য। বড়োবাবু উঠে দাঁড়ালেন। প্রত্যুষ হাত ঘড়ির দিকে তাকাল। বাইরে বেরিয়ে বড়োবাবুকে প্রত্যুষ নির্দেশের ঢঙেই বলল, ‘আপনি একটা ক্রিমিনালকে গ্ৰেপ্তার করে চারদিকে রটিয়ে দিন যে রাজনগরের খুনি ধরা পড়ে গেছে। প্রেস মিডিয়া সবাইকে জানিয়ে দিন। আর রাজনগর থেকে পুলিশ পিকেট কালকে তুলে নিন।’

‘আর খুনি ধরা পড়ার ব্যাপারটা কী হবে! পুথিটাই বা কীভাবে উদ্ধার হবে?’

‘সেই জন্য আপনাকে আর একটা উপকার করতে হবে পাকরাশি বাবু। রাজনগরে একটা গোপন থাকার জায়গা ব্যবস্থা করে দিতে হবে। একদিনের জন্য। তবে আমরা কিন্তু গিয়ে উঠব ছদ্মবেশে।’

‘সে কী মশাই! এবার তো পুরো গোয়েন্দা গল্প!’

‘না, আমরা অপরাধীকে চিনি না। কিন্তু অপরাধী তো গোপনে আমাদের চিনে রাখতে পারে!’

‘আর ছদ্মবেশের সরঞ্জাম?’

‘সামান্য কিছু আমাদের ব্যাগেই থাকে। আর বাকিটা আমি জোগাড় করে নিয়েছি।’

‘ভালো। তা, আমি কি জানতে পারি কীসের ছদ্মবেশ?’

‘সেরকম কিছু নয়। ওই গ্ৰামের দেহাতি মানুষ। জমিজমা কেনা বেচার ব্যাপারে ওই এলাকায় কথা বলতে যাচ্ছি। চারদিকে ঘুরে ধানী জমি-টমি দেখব। গ্ৰামের মধ্যে ঘোরাঘুরি করব। ব্যস! এইটুকুই আপনি ব্যবস্থা করে দিন।’

প্রত্যুষের কথাগুলো শুনে মনের‍ মধ্যে বেশ শিহরন হচ্ছে। বুঝে গেলাম অপরাধীদের সঙ্গে একটা মুখোমুখি সংঘর্ষের সম্ভাবনা আছে। আমরা হোটেলে ফিরে সব মালপত্র গুছিয়ে নিলাম। এদিকে বড়োবাবু একটা পোড় খাওয়া সমাজবিরোধীকে তুলে এনেছে। দুবরাজপুর শহরেও মোটামুটি কানাঘুষো রটে গেছে যে রাজনগরের নিধিরামের খুনি ধরা পড়ে গেছে। স্থানীয় টিভি চ্যানেলেও দেখলাম, দেখাচ্ছে। প্রত্যুষের পরিকল্পনা, আমরা পরেরদিন ধুতি পাঞ্জাবি পরেই বেরোব। মুখে হালকা মেক-আপ। গ্ৰাম্য মানুষের মতো। টুকটাক সে’সব প্রসাধন আমাদের ব্যাগেই থাকে। ইতিমধ্যে পাকরাশি বাবুও জানিয়ে দিলেন যে আমরা কোথায় গিয়ে উঠব। রাজনগরেই ওঁর পরিচিত একজনের বাড়ির একতলায়। রাতে ঘুমের মধ্যেও মনের ভেতর উথালপাথাল কাজ করছে। ভোররাতের দিকে একটু চোখটা লেগে গিয়েছিল, ঘুম ভাঙল প্রত্যুষের মোবাইলের জোরালো অ্যালার্মে।

সকালে বেশ তাড়াতাড়িই আমরা বেরিয়ে গেলাম। পরনে ধুতি একটু খাটো করে পরা, একটা চলনসই পাঞ্জাবি। মাথায় গামছাটা পাগড়ির মতো বাঁধা। তবে গাড়িতে নয়। আমরা রাজনগরের বাসেই উঠলাম। বাসে সময় একটু বেশিই লাগে। প্রায় মিনিট পঁয়তাল্লিশ। বাস থেকে নেমে নিবারণ ঢালির বাড়ি খুঁজতে বেশি সময় লাগল না। ম্যাড়মেড়ে রঙের দোতলা পুরোনো বাড়ি। অনেক জায়গায় রং চটা, পলেস্তরা খসা। প্রত্যুষ বাড়ি দেখে খুব খুশি। যেমনটা চাইছিল। একেবারে মানানসই। আমাদের জন্য একতলার একটা ঘর খুলে দিল। চৌকি পাতা। চলনসই একটা বিছানা। বাথরুম বাইরে। উঠোনে। কলতলা লাগোয়া একটা টিউবওয়েল। মোটামুটি একদিন চালিয়ে নেওয়া যায়। আমরা একটু খাবারের সন্ধানে বেরোলাম। খাবার বলতে সেরকম কিছু পেলাম না। আসলে ছোটো গঞ্জ শহর তো! ওই চায়ের দোকানের ডিম-টোস্ট সম্বল। নিরুপায়! তাই খেলাম। দুপুরে খাওয়ার খোঁজও নিয়ে এলাম। পাশেই একটা টালির চালের দর্মার হোটেলে। আসলে সারাদিন খাওয়া আর ঘুমোনো ছাড়া তো অন্য কোনো কাজ নেই। দূর থেকে দেখে বুঝলাম পুলিশের ডিউটি উঠে গেছে। যাক! কথামতো পাকরাশি বাবু ভালোই কাজ সেরেছে। মঞ্চ একদম পুরো প্রস্তুত। এখন শুধু রাতের অপেক্ষা। যদি পাখি এসে ফাঁদে পড়ে। সারাদিন আমরা মোটামুটি ঘুমিয়েই কাটালাম। ঠিক সন্ধের পর কালিদহ দিঘির ধারে গিয়ে দু’জনে বসলাম। সামনেই সেই প্রায় পাঁচশো বছরের পুরোনো পাথরের পাঁচিল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে যেন অন্ধকারে বীর রাজাদের বীরত্ব ঘোষণা করছে। জমি এখানে অসমান। কোথাও ঢালু আবার কোথাও চড়াই। চাঁদ আজকে আধ-খাওয়া। জ্যোৎস্না ফেলছে দিঘির জলে, তবে তাতে ছটা কম। পড়েই জলে গুলে যাচ্ছে। একটা আলো আঁধারি পরিবেশ। বেশ গা ছমছম করছে। তবে এখন কিছু হবার সম্ভাবনা নেই। সেটাই স্বাভাবিক। যা হবে গভীর রাতে।

প্রত্যুষকে একটা প্রশ্ন করলাম, ‘আচ্ছা আজ রাতে যদি তোমার পাখি না আসে, তাহলে কতদিন আমরা এই ছোটো শহরে বসে থাকব?’

‘আমার ধারণা দু’একদিনের মধ্যেই আসবে। দেরি করবে না। কারণ বিমলা কোথাও একটা লুকিয়ে আছে। বেরোতে পারছে না। পুলিশ জোর তল্লাশি চালাচ্ছে। এলাকার লোকজনও কেউ চিনে ফেলতে পারে। আবার কাজ না মেটা অবধি এলাকাও ছাড়তে পারছে না। তাই ওরা চাইবে যত দ্রুত সম্ভব গুপ্তধন হাতিয়ে এলাকা থেকে কেটে পড়ার।’

‘তাহলে তো ভালোই হয়। আজই কেল্লা ফতে! আচ্ছা শুধু আমরাই কি রাজপ্রাসাদে থাকব?’

‘না, দূরে পুলিশ থাকবে লুকিয়ে। পাকরাশি বাবুকে আমার বলা আছে।’

‘বাহ, তার মানে পাকা বন্দোবস্ত। পুলিশ ক’টায় আসবে।’

‘বলেছি তো এগারোটা নাগাদ। দেখা যাক। তবে তার আগে নাটক শুরু হবে না।’

আমরা রাতের খাবার খেয়ে মোটামুটি এগারোটা নাগাদ চলে গেলাম স্পটে। ভাঙা রাজপ্রাসাদের পাঁচিল থেকে একটু দূরে কালিদহ লেকের পাশে একটা বড়ো পাকুড় গাছ আছে। তার পাশেই একটা বড়ো আগাছার ঝোপ। সেটার আড়ালেই দু’জনে আশ্রয় নিলাম। আলকাতরার মতো চটচটে অন্ধকার। মাথার ওপর একফালি চাঁদ দিক বদলাচ্ছে। গাছপালাগুলো যেন অশরীরী ছায়া শরীর। চুপচাপ বসে আছি। কারও কোনো দেখা নেই। মনে হচ্ছে আজকের প্ল্যান ভেস্তে যাবার উপক্রম।

হঠাৎ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে একটা গাড়ির শব্দ। শব্দটা অনেক দূরে। পিচ রাস্তার ওপর। যদিও এখান থেকে আবছা দেখা যায়। জোরালো হেড লাইটের আলোটা অন্ধকারের বুকে বর্শার মতো একবার বিঁধে গিয়েই নিভে গেল। এখন চাঁদের আলোয় মনে হচ্ছে গাড়ি নয় বাইক। বাইক থেকে নেমে এদিকেই হেঁটে আসছে দু’টো ছায়া শরীর। চারদিক জনমানবশূন্য। একটু কাছাকাছি আসতে বুঝতে পারলাম একজন পুরুষ আর একজন নারী। দু’জনের কাঁধেই দুটো বড়ো ব্যাগ। দুজনের পরনেই জিনস, হুডি আর পায়ে স্নিকার। সবই গাঢ় রঙের। অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে আমাদের। নিজেদের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি নিজেরাই। দম বন্ধ করে নিলে ভালো হয়। ছেলেটি আর মেয়েটি কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা দুই পাঁচিলের ফাঁক দিয়ে পাতকুয়োর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর ওদের ব্যাগ থেকে ছোটো কোদাল গাঁইতি সব বার করে ছেলেটি মাটিতে রাখল। আমি প্রত্যুষকে একটা ছোটো ঠেলা দিলাম। প্রত্যুষ ইশারায় জিজ্ঞেস করল, ‘কী…?’

আমি ফিসফিসিয়ে বললাম, ‘এবার পাকড়াও করো। এখনও দেরি কেন?’

ঠোঁটের ওপর আঙুল চেপে প্রত্যুষ বলল, ‘দাঁড়া…ও, গুপ্তধন সমেত ধরব।’

আমি এই ঘন অন্ধকার চেয়েও আরও গভীর অন্ধকারে তলিয়ে গেলাম। গুপ্তধন! সে কী সত্যিই আছে নাকি! এ’সবের ফাঁকেই আবার তাকিয়ে দেখি ছেলেটি একটি দড়ির একপ্রান্ত গাছে বেঁধে আগের দিনের মতো, ওই কোদাল আর গাঁইতি নিয়ে অপর প্রান্ত ধরে পাতকুয়োর ভেতরে নেমে যাচ্ছে। আর মেয়েটি কুয়োর মধ্যে মোবাইলের আলো ফেলছে। আমরা একদম মূর্তির মতো স্থির। খানিকক্ষণ পর চমকে উঠলাম একটা শব্দে। একটা ঠং করে আওয়াজ কুয়োর ভেতর থেকে। তারপর বেশ কয়েকবার। এবার মেয়েটি আস্তে করে প্রশ্ন করল, ‘পেয়েছ?

কুয়োর ভেতর থেকে একটা চাপা শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে ওপরে উঠে এল, ‘মনে হচ্ছে!’ আমি একটু বেখেয়ালি হয়ে পড়েছিলাম এসব মন দিয়ে দেখতে গিয়ে। হঠাৎ দেখলাম প্রত্যুষ মোবাইল বার করে কিছু একটা ম্যাসেজ করল। তার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দেখি দু’জন মহিলা পুলিশ হেঁটে আসছে। প্রত্যুষের ইশারায় তারা পিছন থেকে গিয়ে মেয়েটিকে জাপটে ধরল। মেয়েটি চিৎকার করতে যাচ্ছিল। মেয়েটির মুখ চেপে ধরল এক মহিলা কনস্টেবল। তারপর দেখলাম ঘাড়ের কাছে জামা মুঠো করে ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে রাখা জিপের দিকে। পাশ দিয়ে নিয়ে যাবার সময় মনে হল যেন বিমলা। যদিও অপহরণের দিন একবারই ছবিটা দেখেছিলাম থানায়। তাও পাসপোর্ট সাইজ। এবার আমি আর প্রত্যুষ একেবারে পাতকুয়োর সামনে। গাছের গায়ে বাঁধা দড়ি নীচে ঝুলছে। নীচে সেই অজানা পুরুষ! সে আসলে কে? এটাই কি বিমলার প্রেমিক? প্রত্যুষ হঠাৎ কুয়োর দিকে মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘নীচে যেই থাকেন ওপরে উঠে আসুন। বেকার খোঁড়াখুঁড়ি করে লাভ নেই। উঠে আসুন তাড়াতাড়ি।’

ভিতর থেকে ‘বিমলা’ বলে একটা চিৎকার ভেসে এল। প্রত্যুষ পালটা উত্তর দিল, ‘বিমলা এখন তার বাপের বাড়িতে আদর খাচ্ছে। আপনিও শ্বশুরবাড়ি যাবেন চলুন।’

এর একটু পরেই দেখি দড়ি বেয়ে ছেলেটি উঠে এল, মাথার হুডি সরাতেই দেখলাম আমার আঁকা ছবির সঙ্গে হুবহু মিল। নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ালাম। নিজেকে বেশ গর্বিত মনে হচ্ছে। ছেলেটির কোমরের কাছের বেল্ট সমেত প্যান্ট ধরে প্রত্যুষ হাঁটা শুরু করল। আমি পিছন ধরতে চাইলে প্রত্যুষ আমাকে বলল, ‘দাঁড়াও, গুপ্তধন নিয়ে তবে যাব। তুমি এখানে থাকো।’

আমি আবার অবাক! এ গোয়েন্দা আমাকে শুধু সাসপেন্স দিয়ে হৃদরোগী বানিয়ে দেবে। প্রত্যুষকে এগিয়ে যেতে দেখেই, দেখলাম পাকরাশি বাবু এগিয়ে আসছেন। বিমলার প্রেমিককে বড়োবাবুর হাতে তুলে দিয়েই আবার পিছন ঘুরল আমার দিকে। তারপর আমার কাছে এসে একেবারে চমকে দিয়ে দড়ি বেয়ে পাতকুয়োর ভেতর নামতে লাগল প্রত্যুষ। ধুতি পরেই। আমি স্বাভাবিক কারণেই মোবাইলের আলোটা কুয়োর ভেতরে ফেললাম। তারপর খানিকক্ষণ পরে নিজেই উঠে এল। একটু হাঁফ ছেড়েই বলল, ‘নাও, এবার গুপ্তধনটা টেনে তোলো দিকিনি!’ আমি আবার চমকালাম। কিন্তু কথার অমান্য করার অভ্যাস আমার নেই। যতই হোক সহকারী তো! তবুও টানতে গিয়ে দেখলাম বেশ ভারী। আমার অবস্থা বেগতিক দেখে প্রত্যুষও হাত লাগাল। দু’জনের চেষ্টায় অবশেষে গুপ্তধন উঠে এল মাটির ওপর। না গুপ্তধন নয়! এক বিশাল পাতকুয়োর কপিকল। লোহার। কম করে পাঁচ ছ’শো বছরের পুরোনো। সেটাই বা কম কীসের! যথেষ্ট পুরোনো প্রত্নতাত্তিক নিদর্শন। যদিও সেটা সরকারি সম্পত্তি। পাকরাশি বাবুকে বলা হল এই অমূল্য দ্রব্যটির যথাযথ ব্যবস্থা নিতে। বীর রাজ বংশের এটাও একটা ঐতিহাসিক নিদর্শন। আমরাও ওই রাজনগরের বাড়ি থেকে মালপত্র নিয়ে পুলিশের জিপেই উঠলাম। দু’টি জিপ অন্ধকার চিরে ছুটছে হাইওয়ে দিয়ে দুবরাজপুরের দিকে। পিছনের জিপে বিমলা আর তার প্রেমিক কয়েকজন কনস্টেবলের জিম্মায়। অত রাতেই বড়োবাবু আমাদের সেই পুরোনো হোটেলের দরজা ধাক্কিয়ে হোটেল খুলিয়ে আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিল। যাবার সময় বলে গেল, ‘এখন দেখি, মেয়ে জামাই’র কাছ থেকে কত তাড়াতাড়ি পুথিটা উদ্ধার করা যায়! কাল সকালে একটু বেলা করেই বিশ্রাম নিয়ে আসুন। অফিসিয়াল কাজগুলো সেরে নেব। তখন গল্পও হবে। পারলে নকুলেশ্বরবাবুকে ডেকে নেব।’

প্রত্যুষকে এবার সত্যিই ক্লান্ত লাগছে। আমি জানি ও বাস্তবেই কয়েক রাত ভালো করে ঘুমোয়নি। তাই শুধু ‘গুড নাইট' বলেই বিদায় জানাল সবাইকে। আজ আর কোনো কথা নয়। গা এলিয়ে দিলাম বিছানায়।

পরদিন একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠলাম। মনটা খুব আরামপ্রদ। একটা সাফল্যের শান্তির ছোঁয়া। আবার একটা পালক প্রত্যুষের মুকুটে। বেশ গড়িমসি করছি দু’জনে। অবশেষে ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট খেতে বসেছি। পাকরাশি বাবুর ফোন, ‘ক’টায় আসছেন? নকুলেশ্বরবাবুকে বলেছি। সেই সময় ডেকে নেব।’

‘আমরা ধরুন আধ ঘণ্টার মধ্যে আসছি। আপনি নকুলবাবুকে ফোন করে দিন।’

‘আচ্ছা ধন্যবাদ। চলে আসুন।’

আমরা থানায় ঢুকে তো অবাক। দু’একজন লোকাল টিভি চ্যানেল আর কাগজের সাংবাদিকও হাজির। পাকরাশি বাবুই শুরু করলেন, ‘আচ্ছা প্রত্যুষবাবু, যদি একটু বলেন, কীভাবে আপনি তদন্তটায় এগোলেন?’

প্রত্যুষ জানে সেটা বলতে হবে। সেই জন্যই এখানে অবশ্য ডাকা। তাই নির্লিপ্তভাবেই শুরু করল, ‘আমি প্রথম লাইব্রেরিতে গিয়ে বুঝি, পুথিটা চুরি হয়েছে বিক্রির উদ্দেশ্যে নয়। অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। কারণ তা না হলে বাকি পুরোনো পুথিগুলোও নিয়ে যেত। তারপর এল অপহরণের খবর। সেটা শুনে প্রথমে আমার কোনোরকম সন্দেহ হয়নি। তারপর যখন দেখলাম খুন, ধর্ষণ বা মুক্তিপণের কোনো খবর আসছে না। তখন সন্দেহটা দানা বাঁধতে লাগল। এরমধ্যেই খুন। খুন হল কে? সামান্য এক হতদরিদ্র গাইড। যে কিনা দিনরাত রাজপ্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের আশেপাশে ঘোরে। তাকে খুনের কারণ কী হতে পারে? একমাত্র কি কিছু দেখে ফেলা বা চিৎকার করে ফেলা। তারপর পালিয়ে যাওয়ার সময় পিছন থেকে তাড়া করে রাজপ্রাসাদের অনতিদূরে খুন। তখনই দেখলাম লাইব্রেরির হাওয়াই চটি আর রাজনগর রাজপ্রাসাদের স্নিকার জুতোর ছাপের একই মাপ। মনের ভেতর দুইয়ে-দুইয়ে চার হল। তারপর সেইদিনই সন্ধেবেলা‌ নকুলেশ্বরবাবুর কথাবার্তা রহস্যের কুয়াশা আরও কাটিয়ে দিল। উনি কিছু একটা গোপন করছেন। সেটা কি এইসব ঘটনার সঙ্গেই যুক্ত? বাকিটা আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। তারপর তো সবই আপনাদের জানা।

‘কিন্তু হঠাৎ ছদ্মবেশ কেন?’

‘দেখুন, বিমলার প্রেমিক স্থানীয় ছেলে। তার কোনো গুপ্তচর আশেপাশে থাকতেই পারে। তাই পুলিশ পাহারা সরলেও বা অপরাধী ধরা পড়ার খবর রটিয়ে দিলেও সাবধানের মার নেই। তাই ছদ্মবেশেই আমাদের রাজনগরে যাওয়া।’

‘আপনি নমস্য ব্যক্তি মশাই।’

‘তা আপনাদের কাজ কতদূর?’

‘গত কাল রাতেই ওদের জেরা করে সিউড়ির যে হোটেলে ওরা উঠেছিল, সেখান থেকেই পুথিটা উদ্ধার হয়। ইতিমধ্যেই লাইব্রেরিতে ফেরত দিয়ে দিয়েছি। লাইব্রেরি আর রাজনগর রাজপ্রাসাদে পাওয়া হাতের ছাপ সব মিলে গেছে। ওরা জেরায় স্বীকার করে নিয়েছে যে বিমলাই ওর প্রেমিককে বলে যে ওই রাজপ্রাসাদের কুয়োয় গুপ্তধন আছে। ওর কথাতেই ওর প্রেমিক প্রলুব্ধ হয়। তারপর অতিরিক্ত লোভের বশেই বুদ্ধিনাশ। আর সেই ভ্রমেই আপনার সাজানো টোপটা গেলে। প্রথমদিন রাতে নিধিরাম ওদের ক্রিয়াকর্ম দেখে চিৎকার চেঁচামেচি করায় ওকে মরতে হল। কিন্তু প্রথমদিন উদ্ধার করতে না পারলেও কুয়োর ভেতরে পাওয়া ধাতব আওয়াজে নিশ্চিত হয় ওরা যে গুপ্তধন আছে। আর নকুলবাবুর কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার ভুল অর্থ করে বিমলার ধারণা হয় ওখানে অবশ্যই কোনো গুপ্তধন আছে। প্রথমে ও নিজেই ওর স্বল্পজ্ঞানে পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকে। শেষে ব্যর্থ হয়ে নকুলেশ্বরবাবুকে ভয় দেখিয়ে অর্থ খোঁজার চেষ্টা করে।’

এবার নকুলবাবু সব শুনে আর থাকতে পারলেন না। বলেই ফেললেন, ‘বিমলাকে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসতাম, মানুষ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু এই বয়সে এসে একটা শিক্ষা পেলাম, যতই স্নেহ করো, নিজের না হলে মানুষ আপনার হয় না।’

প্রত্যুষ ঘড়ি দেখল। সাড়ে বারোটা বেজে গেছে। এইবার না উঠলে ফেরার হুল এক্সপ্রেসটা পাওয়া যাবে না। অবশেষে তাড়াহুড়ো করেই আমরা দুবরাজপুর স্টেশনে এলাম। ট্রেন ঢোকার সময়ের কাছাকাছি। অবশ্য পাকরাশি বাবু নিজে এসেছিলেন বিদায় জানাতে। ট্রেনে বসে ভাবতে লাগলাম, ট্রেন ছুটছে মালভূমির রুক্ষতা পেরিয়ে সমতলের সবুজের দিকে। পুথিটা আবার লাইব্রেরিতে নিজের স্থায়ী জায়গায়। শুধু বিমলার অবুঝ লোভের কারণে সেই প্রাচীন পুথির গায়ে লেগে গেল এক অযাচিত পাপ আর সেই ইতিহাসকে ভালোবাসত এমন এক নিরীহ মানুষের রক্ত।

সুখী গৃহকোণ, আগস্ট ২০২৩

___

অধ্যায় ৪ / ৪
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%