পীতাম্বরী পদ্মাবতী

বাণীব্রত গোস্বামী

মুহূর্তের জন্য বোধহয় প্রত্যুষ একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিল। না হলে দাবায় এরকম ভুল চাল ও সচরাচর দেয় না। আমার ঘোড়ার ঠিক আড়াই পা’র মুখেই ওর মন্ত্রী খোয়া যাবে। আমি সবে ঘোড়াটা তুলে একটা আলতো টোকা দিতে যাব ওর মন্ত্রীটাকে, এমন সময় দরজায় দু’বার টোকা। আমি চৌকি থেকে সবে এক পা নামিয়েছি দরজাটা খুলব বলে, প্রত্যুষ মুচকি হেসে বলে উঠল, ‘যাও শাঁসালো মক্কেল, বেশ ভারী চেহারা, হাতে লাঠি আছে, হয়তো পেতলে বাঁধানো সেটাই এতক্ষণ খেয়াল করছিলাম, নাও দেখো গিয়ে, আগে তো দরজাটা খোলো।’

এবার কিছুটা আন্দাজ করলাম ওর চালে ভুল হওয়ার কারণ। মেসবাড়ির সিঁড়ি দিয়ে মক্কেলের ওঠার সময়েই ও সজাগ হয়ে খেয়াল করছিল শব্দটা। মনটা ছিল ওইদিকে। দরজা খুলে আমার মুখ দিয়ে কোনো কথা সরছে না। ‘আ…সুন’ বলতে গিয়ে নিজের মুখের হাঁ-ই বন্ধ হচ্ছে না। কারণ ঘরের ভেতরে বসেই প্রত্যুষ এক মুহূর্ত আগে যা বলল, তা হুবহু মিলে যাচ্ছে। ভদ্রলোক বেশ ভারী চেহারার। বয়স বছর ষাট হবে। শরীরে সচ্ছলতার ছাপ সুস্পষ্ট। পরনে গিলে করা পাঞ্জাবি, ফিনফিনে চুড়িপাড় ধুতি। হাতের কোনো আঙুল মোটামুটি আংটি ছাড়া নেই। ডান হাতে ধরা বেশ একটি বনেদি লাঠি। যার মাথায় পিতলের একটা সাপের মুখ। সাপের চোখে মনে হল খুব সম্ভবত দু’টি ছোটো পান্না বসানো। ভদ্রলোক এসে চেয়ারে বসলেন। কলকাতায় এখন এরকম সাজপোশাকের মানুষ দেখতে পাওয়া দুষ্কর। উনি চেয়ারে বসেই প্রথমে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনাদের মধ্যে প্রত্যুষবাবু কে?’ কথাবার্তায় বেশ একটা জমিদারি মেজাজ।

আমি ইশারায় প্রত্যুষের দিকে দেখালাম। উনি আমার দিকে তাকিয়ে বেশ বুদ্ধিমান চোখের দৃষ্টি ছুড়ে দিয়ে বললেন, ‘তার মানে, আপনি তো অপূর্ববাবু?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনি?’

‘নমস্কার, আমি চন্দ্রমাধব গোস্বামী। আমি একটি বিশেষ দরকারে প্রত্যুষবাবুর কাছে এসেছি।’

এবার প্রত্যুষ মুখ খুলল, ‘হ্যাঁ, দরকার ছাড়া তো কেউ এখানে বড়ো একটা আসে না। আপনি নির্দ্বিধায় আপনার সমস্যাটা বলতে পারেন।’

‘আসলে আমাকে কেউ যেন খুন করতে চায়।’

প্রত্যুষ এবার চেয়ারে গা এলিয়ে বসা থেকে একদম হেলান ছেড়ে সোজা হয়ে বসল। তারপর চন্দ্রমাধববাবুর চোখে চোখ রেখে ভ্রূযুগল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘মানে? কে খুন করতে চায়, আর কেনই বা চায়? হঠাৎ আপনার এসব মনে হওয়ার কারণ কী?’

‘সেটা বোঝাতে গেলে একটু গোড়া থেকে শুরু করতে হবে।’

আমি ওঁকে হাত তুলে থামিয়ে বললাম, ‘একটু চা বলি?’ উনি চোখের ইশারায় ‘হ্যাঁ’ বললেন। হাজার হোক মক্কেল তো। এটুকু ভদ্রতা করতেই হয়। এর ফাঁকেই উনি শুরু করলেন।

‘আপনাদের খবর আমি পাই চন্দননগর থেকে। আমাদের বংশের একটি শাখা চন্দননগর গোস্বামীঘাটে স্থায়ীভাবে চলে যায়। ফোনে হালকা যোগাযোগ আছে। ওদের মুখেই আমি প্রথম ‘ননীচোরের মোহনবাঁশি’ গল্পটা শুনি। তারপর গতকাল আপনাদের ঠিকানা আর ফোন নম্বরটা ওদের কাছ থেকে নিই। কিন্তু ফোন করছি কেউ তুলছে না।’

‘হ্যাঁ, ক’দিন হল ফোনটা খারাপ। আপনি এখন আসছেন কোত্থেকে?’

‘আমি আসছি গোস্বামী-মালিপাড়া থেকে। নাম শুনেছেন?’

প্রত্যুষ নেতিবাচক ঘাড় নাড়ল।

‘আপনি যদি দিল্লি রোড ধরে সোজা বর্ধমানের দিকে যেতে থাকেন, ঠিক ব্যান্ডেলের কাছেই সুগন্ধা মোড় পড়বে। সেখান থেকে বাঁদিক নিলেই পুঁইনান বলে একটি এলাকা আছে। তার মাঝেই একটি ছোটো গ্ৰাম গোস্বামী মালিপাড়া। তবে এখন রাস্তা পাকা হয়ে গেছে। আমি তো টানা গাড়িতেই এলাম।’

কথার ফাঁকেই আমাদের মেসের চাকর সুখময় চা দিয়ে গেল। উনি চায়ে একটা চুমুক দিয়ে আবার শুরু করলেন।

‘আমাদের পূর্বপুরুষ প্রায় পাঁচশো বছর আগে নবদ্বীপ ছেড়ে এখানে চলে আসে। এই পুঁইনানের বেশিরভাগ জমিই তখন আমাদের ছিল। সেই সময় বাংলায় বারো ভুঁইয়াদের রাজত্ব। আমার ঠাকুরদার মুখে এসব গল্প শোনা। তখন মোগল সম্রাট আকবরের নির্দেশে মানসিংহ বাংলা দখল করতে উদ্যত হয়েছিল। তার বাহিনীর আক্রমণে বাংলা জর্জরিত। ঠিক সেসময় পোর্তুগিজ জলদস্যুরা ব্যান্ডেলের কাছে কুন্তিঘাটে জাহাজ ভিড়িয়েছে। উদ্দেশ্য দাসপ্রথা। গরিবদের মধ্যে বাচ্চা চুরি বা কম পয়সায় কিনে ইউরোপে পাচার করা তাদের প্রধান ব্যবসা ছিল। তাছাড়া জলপথে লুটপাট তো ছিলই। এছাড়া কিছু আমদানি রপ্তানির ব্যবসাও তারা করত। তৎকালীন সেই পোর্তুগিজ দস্যুদলের নেতা ছিলেন দাভি ডি ক্রুজ্। এনার সঙ্গে তখন ওই মোগলদের হাত থেকে বাঁচার জন্য বিশেষ সখ্যতা হয় আমাদের পূর্বপুরুষ প্রতাপনারায়ণ গোস্বামীর। মানে যিনি নবদ্বীপ থেকে এসে এখানে জমিদারির পত্তন করেন। আমি এখন যে বাড়িতে থাকি, সেই বাড়ি তৈরি করার সময়েই ঘটে মহা বিপত্তি।’

আমি আর থাকতে না পেরে মাঝখানেই কথা বলে ফেললাম, ‘কীসের বিপত্তি?’

‘মানে, ঘটনাটা হল এই বাড়ির পাশের সরোবর খোঁড়ার সময়ে মাটির নীচে থেকে একটি পাথরের বিরাট মা মনসার মূর্তি পাওয়া যায়। তবে মূর্তির ডানদিকে মানে আসলে মা মনসার যেদিকের চোখটি অন্ধ, সেখান শুধু একটি গর্ত ছিল। যেন কিছু একটা বসানো ছিল। সরোবর যেখানে খোঁড়া হচ্ছিল, সেখানে ছিল জলপদ্মের এক বিশাল জলাভূমি। তাই আমাদের বাড়িতে মা মনসা দেবী পদ্মাবতী হিসেবেই অধিষ্ঠিত। মনসা মন্দির এবং দেবী প্রতিষ্ঠা করেন প্রতাপনারায়ণ স্বয়ং। আপনি ব্যান্ডেল সুগন্ধা মোড়েই গোস্বামী মালিপাড়ার ‘পদ্মাবতী ভবন’ বললেই সবাই রাস্তা দেখিয়ে দেবে।’

প্রত্যুষ গোয়েন্দা মানুষ। গম্ভীর হয়ে শুনছে ওঁর কথা। আমার তো ইতিহাসের ক্লাস মনে হচ্ছে। অধৈর্য হয়ে বলেই ফেললাম, ‘ওই খুনের সম্ভাবনার গল্পটা যদি বলেন।’

উনি হয়তো আমার অধৈর্যটা কিছুটা মনে মনে আন্দাজ করলেন। আলতো হেসেই একেবারে সোজা ঘটনার কেন্দ্রে ঢুকলেন, ‘পরশুদিন আমি রাতে শুয়ে আছি। দোতালার দক্ষিণের ঘরে আমি একাই শুই। বাইরে সেদিন হালকা বৃষ্টি পড়ছে। একটা জানলার একদিকের পাল্লা শুধু খোলা। না খুললে আমার একটু শ্বাসকষ্ট হয়। ঘর ঘুটঘুটে অন্ধকার। হঠাৎ একটা হিসহিস শব্দ। মাথার কাছে মোবাইলটা রাখা থাকে। মোবাইলের টর্চটা জ্বালালাম। বিশ্বাস করুন প্রত্যুষবাবু, নিজে চোখে যা দেখলাম, আমার আত্মারাম খাঁচা। খাটের পায়া জড়িয়ে একটা বিরাট চন্দ্রবোড়া সাপ উঠে আসছে। উজ্জ্বল কাঁচা হলুদের ওপর কালো ছোপ। ছোবল মারলে বড়োজোর আধ ঘণ্টা। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় দেবে না।’

অনেকক্ষণ পর প্রত্যুষ একটা প্রশ্ন করল, ‘আপনাদের ওই দিকে কি খুব সাপের উৎপাত?’

‘দেখুন, আমাদের অঞ্চলটা মূলত আম বাগান আর বাঁশ বনে ঘেরা। কলা বাগানও আছে। সাপখোপ থাকাটাই স্বাভাবিক। ধানজমিতেও মাঝেমধ্যে কেউটে, গোখরো দেখা যায়। কিন্তু তা বলে একেবারে আমার দোতালার ঘরে! নীচে একতলায় বাড়ি ভরতি লোক। সবাইকে ছেড়ে আমার ঘরেই সাপটা এসে ঢুকল। বলুন, এটা বিশ্বাসযোগ্য? তা-ও কাকতালীয় বলে মেনে নিতাম, যদি না গতকাল রাতে আমার ঘরের সিন্দুকটা কেউ শাবল দিয়ে খোলার চেষ্টা করত। তার চেয়েও বড়ো কথা, এই কাজ করার আগে আমাকে অচেতন করা হয়েছিল। রাতে খাবারের মধ্যে বা জলে ঘুমের ওষুধ কেউ হয়তো মিশিয়ে দিয়েছিল। কারণ অত গাঢ় ঘুম আমার জীবনে হয় না। ঘরের মধ্যে শাবল দিয়ে সিন্দুক ভাঙার চেষ্টা করছে, অথচ আমি তার বিন্দুমাত্র টের পেলাম না।’

এবার প্রত্যুষ বেশ রহস্যের গন্ধ পেয়ে গেছে। সেটা ওর চোখেমুখে পরিষ্কার। খুব গম্ভীরভাবে জিজ্ঞেস করল, ‘সিন্দুকটা কেন ভাঙতে চাইছিল? কী আছে ওটার ভেতরে?’

ভদ্রলোক প্রত্যুষের প্রশ্নে একটু থতোমতো খেয়ে গেলেন। মনের মধ্যে কথাটা বলে ফেলার একটা আপশোশ চোখের ভাষায় ফুটে উঠল। আমার যেটা মনে হল, উনি ওঁর একটা প্রাণসংশয়ের শুধু নিরাপত্তা চাইছিলেন আমাদের কাছে, কিন্তু পারিবারিক পুরো ব্যাপারটা বা সিন্দুকের ভেতরের কোনো গোপন মূল্যবান সামগ্ৰীর কথা খোলসা করতে চাইছিলেন না। এখন আবেগের বশে পুরোটা বলে ফেলে বেশ বেকায়দায় পড়ে গেছেন। কিন্তু প্রত্যুষও ছাড়বার পাত্র নয়। বেশ পাকা গোয়েন্দার মতো মক্কেলকে চাঁচাছোলা ভাষায় সতর্ক করল, ‘দেখুন আপনি যদি আমাদের খুলে পুরোটা না বলেন, আপনার কেসটা আমাদের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। তারপরেই আমার দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল, একটা খাতা পেন বার করো।’ বুঝলাম ওর দূরদর্শিতা বলছে এবার চন্দ্রমাধববাবু গল্পের গোপন বাক্স খুলবে। আমাকে সহকারী হিসাবে সব লিপিবদ্ধ করতে বলছে, হয়তো যেটা হবে আমার পরের রহস্য উপন্যাসের রসদ। বুঝলাম না, প্রত্যুষ আগে থেকেই সব বুঝে যায় কী করে? ঠিক তখনই চন্দ্রমাধববাবু ঢোঁক গিলে স্বীকার করলেন, ‘আসলে প্রত্যুষবাবু আমার আপনাকে বলতে কোনো দ্বিধা নেই, কিন্তু অপূর্ববাবু যেহেতু সাহিত্যিক মানুষ, সেই কারণেই আমার ভয়। উনি যদি ওই জিনিসটার কথা কোনো প্রখ্যাত পত্র পত্রিকায় প্রকাশিত করে দেন, তখন আমার বিপদ আরও বাড়তে পারে।’

এবার প্রত্যুষ আরও কড়া স্বরেই ঘোষণা করল, ‘অপূর্বকে না জানিয়ে আমি জীবনে কোনো কাজ করিনি। আপনার যদি অসুবিধে থাকে তো, আপনি না-ই বলতে পারেন। তবু আপনাকে আবারও বলি, পুরোটা না জেনে কেসটা আমার পক্ষে নেওয়া অসম্ভব। তবে একটা প্রতিশ্রুতি আপনাকে আমি দিতে পারি ওর তরফ থেকে, যদি আপনি অনুমতি না দেন বা যদি আমরা বুঝি যে আপনার সেই দ্রব্যটির কথা সত্যিই গোপনীয় রাখা উচিত, আমরা কখনই তা জনসমক্ষে প্রকাশ করব না। আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন।’ এবার অনেকটা নিশ্চিন্ত হয়েই উনি শুরু করলেন,

‘একটু পিছন থেকেই শুরু করি। শ্রীলঙ্কায় তখন ‘অনুরাধাপুর’ যুগের শেষদিক। সিংহল কোট্টে রাজ্যে তখন ভীষণ রাজনৈতিক সংকট। সেই সময় পোর্তুগিজ জলদস্যুদের জাহাজ দিগ্‌ভ্রান্ত হয়েই সিংহলে মানে আজকের শ্রীলঙ্কায় এসে ভেড়ে। স্বভাবতই সুযোগ বুঝে ক্যান্ডি এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের দখল নেয়। শ্রীলঙ্কার তৎকালীন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও নিজেদের করায়ত্ত করে। তখন শ্রীলঙ্কা ছিল পৃথিবীতে বিভিন্ন মশলা আর প্রাকৃতিক মূল্যবান রত্নের ভাণ্ডার। প্রচুর মণিমানিক্য তখন পোর্তুগিজরা শ্রীলঙ্কা থেকে হাতায়। এদিকে প্রতাপনারায়ণের সরোবর খুঁড়তে গিয়ে মনসা দেবীর মূর্তি উদ্ধারের কথাও আলোর গতিতে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে চাঁদ বণিকের সেই লৌহবাসর অধুনা বাংলাদেশের বগুড়া রংপুরের এক কিলোমিটার দূরে গোকুলমেধ গ্ৰামে প্রত্নতত্ত্ববিদরা দাবি করলেও মনসামঙ্গলে কিন্তু আমরা পাই যে চাঁদ সওদাগরের জমিদারি ছিল চম্পকনগরীতে। যে অঞ্চলটি এখন পূর্ব বর্ধমানে। আর একটি ব্যাপারে সব ঐতিহাসিক নিশ্চিত যে ওঁর বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল ব্যান্ডেলের কাছেই আদিসপ্তগ্ৰামে। যার স্পষ্ট উল্লেখ আছে আদি মনসামঙ্গলে। শুধু তাই নয়, তার বাণিজ্যের প্রধান বন্দরই ছিল এই ব্যান্ডেলের কাছে ত্রিবেণীতে। এই ত্রিবেণী ঘাট থেকেই ছাড়ত তার বাণিজ্য-তরী। যা পাড়ি দিত সাগর থেকে মহাসাগরে। সেই ময়ূরপঙ্ক্ষী নৌবহরের গল্প আজও ত্রিবেণীর ইতিহাসে শুধু নয়, প্রাচীন মানুষদেরও মুখে মুখে ঘোরে। ঠিক সেই কারণেই রটে গেল এই মনসা মূর্তি নাকি চাঁদ সওদাগরের। ব্যস! আর যায় কোথায়। হাজার মানুষের ভিড় ভেঙে পড়তে লাগল সে মূর্তি দেখতে। কথাটা আর চাপা থাকল না। স্বভাবতই গিয়ে পৌঁছোল পোর্তুগিজ শাসক বা নেতা দাভি ডি ক্রুজের কানে। প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে ব্যবসার খাতিরে সম্পর্ক তখন তার খুবই ঘনিষ্ঠ। তিনিও এলেন মূর্তিটি দেখতে। চোখের গর্তের ব্যাপারটাও প্রতাপনারায়ণের কাছ থেকে বোঝার চেষ্টা করলেন। শেষে খুশি হয়ে সুদূর শ্রীলঙ্কা দেশের সম্পদ হাতানো রত্নভান্ডারের মধ্য থেকে একটি প্রায় একশো ক্যারেটের ওপর পীতাম্বরী নীলা প্রতাপনারায়ণকে উপহার দিলেন। যেটি মা মনসার ডান চোখে বসানো হল। আমার ধারণা শুধু ভারত কেন, সমগ্ৰ পৃথিবীতে এত বড়ো পীতাম্বরী নীলা নেই, যা আমাদের পদ্মাবতীর চোখে বসানো।’

‘তাহলে সেটা সিন্দুকে এল কী করে?’

‘সে গল্প আলাদা। সপ্তদশ শতাব্দীর (প্রায় ১৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) শুরুর দিকে আরাকান মানে এখন যেটা বার্মা বা মায়ানমার থেকে মগেরা আমাদের দক্ষিণবঙ্গ আক্রমণ করল। জলপথে যুদ্ধবিদ্যায় তারা খুবই পটু ছিল। পিছু হটতে লাগল পোর্তুগিজরা। এবার আমাদের পূর্বপুরুষদের সঙ্গে পোর্তুগিজদের সম্পর্কটা ছিল খুব বন্ধুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই মগেদের উৎপাতে, মানে যেটাকে ‘মগের মুল্লুক’ বলে আর কী! সেই ভয়ে তারপর থেকে দেবী পদ্মাবতীর দক্ষিণ আঁখিতে, মানে যে চোখটি ওঁর অন্ধ সেখানে শুধু মনসা পুজোর দিন ওই পীতাম্বরী নীলা লাগানো হত, তারপর সারাবছর এমনি সাধারণ নীল পাথর পরিয়ে রাখা হত। সেইভাবেই মূর্তির মধ্যে ব্যবস্থা আছে। তারপর থেকেই বছরের বাকি সময় ওই পীতাম্বরী নীলা থাকে সিন্দুকে।’

গল্প একদম জমে ক্ষীর। বুঝতেই পারছি প্রত্যুষ পুরো ঢুকে গেছে কাহিনিতে। ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘তা সিন্দুকের চাবি কোথায় থাকে?’

এবার বেশ ঘাবড়ে গেলেন চন্দ্রমাধববাবু। হাতজোড় করে আমাদের দিকে তাকিয়ে অনুরোধ করলেন, ‘এই ব্যাপারে দয়া করে আর কিছু প্রশ্ন করবেন না। এর বেশি আর কিছু আমি বলতে পারব না। তবে একটা সূত্র আপনাকে দিতে পারি যে এই সিন্দুকের কোনো চাবি নেই।’

এবার যেন সত্যি সত্যিই প্রত্যুষের একটু দয়া হল। সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে আশ্বস্ত করল, ‘তাহলে বলুন আমাদের কী করতে হবে?’

‘আসলে আগামী শুক্রবার আমাদের বাড়িতে দেবী পদ্মাবতীর পুজো। আমাদের বাড়ি কিন্তু মনসা পুজো মানে দুর্গাপুজো। তিনদিন ধরে চলে উৎসব। গাঁ ভরতি লোক দু’বেলা পাত পেড়ে খায়। আপনারা যদি দয়া করে ওই তিন দিন আমার বাড়িতে পায়ের ধুলো দেন তাহলে আমি একটু নিশ্চিন্ত বোধ করব। আর ওই মূল্যবান জিনিসটিও সংরক্ষিত থাকবে। আপনার যা পারিশ্রমিক হয়, আমি দিয়ে দেব। কিন্তু ওই কয়েক কোটি টাকা মূল্যের দ্রব্যটি চুরি হয়ে গেলে আমাদের সব বাড়ি জমি জায়গা বেচেও ওই পীতাম্বরী নীলা আবার জোগাড় করতে পারব না।’

কথার ফাঁকেই তিনি ঘড়ি দেখলেন। তারপরই দাঁড়িয়ে উঠে বললেন, ‘অনেক রাত হয়ে গেল, এবার উঠি। তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি, আপনারা আসছেন। আমি ম্যানেজারকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দেব।’

প্রত্যুষ আস্তে করেই বলল, ‘ঠিক আছে, কথা দিলাম।’ আমি ভদ্রলোকের সঙ্গে এগিয়ে দিতে সিঁড়ি অবধি পা বাড়ালাম।

ভদ্রলোককে বিদায় জানিয়ে ঘরে ঢুকতেই, প্রত্যুষ শুরু করল, ‘তুমি মা মনসা সম্বন্ধে কতটুকু জানো?’

‘কিছুই জানি না বললেই ভালো হয়।’

‘মা মনসাকে ভালো করে না জানলে, এই কেসে ঢোকাটাই বৃথা হয়ে যাবে। সারা জীবন শুধু বানিয়ে গল্পই লিখে গেলে, কিছু তথ্যও তো জানা দরকার। ইনি হলেন এক অনার্য দেবী। প্রথমে এনার পুজো পাওয়ার কোনো অধিকার ছিল না। শাস্ত্রে আছে, ইনি নাকি কাশ্যপ মুনির কন্যা। পদ্মপাতার ওপর এনার নাকি জন্ম হয়েছিল, তাই আর এক নাম পদ্মাবতী। স্বয়ং ভগবান শিব যখন এনাকে কন্যারূপে বরণ করেন, তখন একটাই শর্ত দেন, যে তার একনিষ্ঠ ভক্ত চাঁদ সওদাগর নিজে হাতে মনসা পুজো করলে তবেই সে দেবীত্ব অর্জন করতে পারবে। এ গল্প আমাদের সকলেরই জানা। তবে দেবী চন্ডী বা পার্বতী পরবর্তীকালে মনসার মাতৃত্ব স্বীকার করলেও একবার রুষ্ট হয়ে মনসার ডানদিকের চোখটি পুড়িয়ে দেন। সেই থেকেই পদ্মবতীর এক চোখ অন্ধ। শাস্ত্রে জানা যায় তিনি নাকি ঋষি জরুৎকারকে বিবাহ করেছিলেন। তাঁদের নাকি একটি পুত্র সন্তানও ছিল, নাম আস্তিক। তবে আসল কথা যেটা হল, এনার বাহন রাজহংস আর অস্ত্র হল সর্প।’

প্রত্যুষের কথা শেষ হতেই আমার প্রশ্ন, ‘কিন্তু এর সঙ্গে এই কেসের সম্পর্ক কী?’

‘সম্পর্ক কী, সেটা জানি না। তবে গোড়াটা সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে দুম করে আগায় গিয়ে সাফল্য আসে কি?’

‘না তা নয়, তবে তোমার কী মনে হয়, পীতাম্বরী নীলাটা কে চুরি করতে চাইছে?’

‘শোনো, এটুকু বোঝাই যায় যে একটা জমিদার বাড়িতে বাইরে থেকে চোর ঢুকে রাত্তিরবেলা সিন্দুক ভেঙে নীলা চুরি করবে না। চোর আছে বাড়ির ভেতরেই। এখন ওখানে গিয়ে সবার সঙ্গে আলাপ পরিচয় না করে বলা খুব মুশকিল। তবে চোর যে ওঁর পরিচিত, সেটা আগেই বলে দেওয়া যায়।’

‘তার মানে আমরা যাচ্ছি, তাই তো। স্কুলে একটা দুজনের ছুটির দরখাস্ত ফেলে দিই। আমার তো ভাবলেই কীরকম শিহরন হচ্ছে, যে আমরা যে বাড়িতে যাচ্ছি, সেখানেই বাড়ির লোকজনের মধ্যেই অপরাধী লুকিয়ে আছে। বেশ মজা হবে।’

‘তুমি তো ভায়া আনন্দেই আছ। নতুন গল্পের মশলা পাবে। এদিকে আমার যে খুব খিদে পেয়ে গেছে। সুখময়কে বলো খাবারটা দিয়ে যেতে।’

বলেই ও গুনগুন করে গেয়ে উঠল, ‘কী বিষের ছোবল দিবি কালনাগিনী তুই…’

বুঝলাম প্রত্যুষ গান ধরেছে মানে, ও গভীর চিন্তামগ্ন। যে কোনো বিষয়ে এতটা গভীরে যাওয়ার ক্ষমতা ও রাখে, তা অকল্পনীয়। আমি সুখময়কে চিৎকার করে খাবার দিতে বললাম। আমাদের যাওয়া আগামী বৃহস্পতিবার। মানে হাতে আর এক সপ্তাহও নেই।

এসব লেখার ফাঁকেই খাবার এসে গেল। প্রত্যুষ খেতে খেতেই আমাকে একটা কাজ দিল, ‘অপূর্ব তোমার একটা জরুরি কাজ আছে। প্রথমে জানবে ওঁর ওই গোস্বামী মালিপাড়া কোন থানার অধীনে। আর সেই থানার বড়োবাবু কে? যদি তিনি আমাদের পরিচিত হন তো মিটে গেল। তা না হলে পরিচয় পর্বটা আগেই সেরে ফেলতে হবে। ওটা লাগবেই।’

বুঝলাম ও ঘুঁটি সাজাতে শুরু করে দিয়েছে। পরদিন সকালে উঠেই আমাকে মনে করিয়ে দিল, ‘আচ্ছা অপূর্ব মনে আছে তো, যন্তরটা( হার্ড বলার রিভলবার) সার্ভিসিং-এ দেওয়া আছে। কবে দেবে বলেছে?’

‘সে তো মঙ্গলবার। আর আমাদের যাওয়া তো বৃহস্পতিবার।’

‘একবার ফোন করে দিও, যেন ঝোলায় না।’

‘ঠিক আছে, সে না হয় করে দেব। কিন্তু ওখানে কি ওটা আমাদের লাগবেই?’

‘লাগবে কিনা জানি না। তবে যে বা যারা একটা ষাট বছরের বৃদ্ধকে মারতে ঘরে ভয়ংকর বিষাক্ত চন্দ্রবোড়া ছেড়ে দিতে পারে, সেখানে নিরস্ত্র যাওয়া কি উচিত হবে?’

‘তাহলে তো বেশ জমে যাবে, বলো!’

‘তুমি ভাবছ তোমার গল্পের কথা, আমি ভাবছি প্রাণ সংশয়ের কথা। ওহ! ভালো কথা একটা অ্যান্টিভেনামের ফাইল নিয়ে নেবে, আর কয়েকটা সিরিঞ্জ।’

‘অ্যান্টিভেনাম কী হবে?’

‘আরে! মনসা পুজোর নিমন্ত্রণ, আর সাপের বিষ ঝাড়ার ওষুধ সঙ্গে নেবে না!’

‘তা কোন সাপের নেব?’

‘এখন চন্দ্রবোড়া মানে যেটা সবচেয়ে বিষাক্ত অর্থাৎ রাসেল্ ভাইপার, এছাড়া কেউটে, শঙ্খচূড়, শাঁখামুটি সব সাপের মিলিয়ে একটা ককটেল অ্যান্টিভেনাম পাওয়া যায়। ওটাই নেবে।’

‘আর গোখরো?’

‘গোখরো বা পদ্মগোখরো বলে আলাদা কিছু নেই, ওটাই কেউটে বা কোবরা। কেউটে কথাটা আছে বৈজ্ঞানিক নামে, আর কোবরা আছে ইংরেজি নামে। আদতে সবই এক। ঠিক বুঝে আনতে পারবে তো?’

‘ও কে বস। মনে রেখো, সাপের হাঁচি বেদেয় চেনে।’

প্রত্যুষ আওয়াজ করে হাসতে লাগল। খোঁজ নিয়ে জানলাম গোস্বামী মালিপাড়া রাজহাট থানার অন্তর্গত। রাজহাট থানার ওসি মিঃ তালুকদার। উনি আবার মিস্টার মিত্তিরের ব্যাচ মেট। মিস্টার মিত্তিরের সঙ্গে আলাপ হয়েছিল কাঁথিতে। কপালকুণ্ডলার খাঁড়া উদ্ধার কেসে। বড়ো মিশুকে মানুষ আর পরোপকারী। বলতেই নিশ্চিন্ত করলেন যে তালুকদারকে সব বলে দেবেন। পারলে ফোনেও আলাপ করিয়ে দেবেন। বাকি গোছগাছ সব আমাকেই সারতে হল। প্রত্যুষ শুধু সাপ নিয়ে পড়াশোনা করে যাচ্ছে। যেন আমাদের খুব শীঘ্রই সাপে কামড়াবে।

কথামতো ঠিক বৃহস্পতিবার সকালেই চন্দ্রমাধববাবুর গাড়ি নিয়ে হাজির। তবে এবারে উনি নিজে আসেননি। পাঠিয়ে দিয়েছেন ম্যানেজার দিবাকরবাবুকে। বয়স বছর চল্লিশেক। দোহারা গড়ন। গায়ের রং মাঝারি। উচ্চতা স্বাভাবিক। গালের ওপর গুটিবসন্তের দাগ ভরতি। কথাবার্তায় অমায়িক। বালি ব্রিজ পেরিয়েই দিল্লি রোড ধরা হল। যেতে যেতে অনেক গল্পই হল ওঁর সঙ্গে। প্রসঙ্গটা প্রত্যুষই প্রথম তুলল, ‘আপনি কতদিন আছেন ওই বাড়িতে?’

‘তা প্রায় বছর দশেক।’

‘আর কে কে আছে বাড়িতে?’

‘বাড়ির লোক বলতে কাকাবাবু মানে আমাদের স্যার চন্দ্রমাধববাবু। কাকিমা গীতা দেবী। ওঁর এক ছেলে চন্দ্ররূপবাবু, ওঁর স্ত্রী সুলেখা দেবী। আর মেয়ে আছে, ছেলের বড়ো। তার আগেই বিয়ে হয়ে গেছে আমেরিকায়। জামাই ওখানে একটা কলেজে পড়ায়?’

‘কী সাবজেক্ট?’

‘সেটা তো বলতে পারব না।’

‘আর কে আছেন?’

‘আর তো কেউ ছিল না। তবে মাস দু’য়েক হল ওঁর ভাইপো রুডি মানে রুদ্র এসেছে লন্ডন থেকে।’

‘ওঁর দাদা কী লন্ডনে থাকেন?’

‘না, থাকতেন। মারা গেছেন কিছুদিন হল।’

‘ভাইপো ক’দিনের জন্য এসেছেন?’

‘সেটা আমি জানি না। স্যার বলতে পারবেন।’

‘আচ্ছা আর কে আছে বাড়িতে?’

‘আর সবই কাজের লোক। মানে কাজের মাসি, মালি, দারোয়ান, রান্নার ঠাকুর, চাকর এইসব আর কী। গেলেই সবার সঙ্গে আলাপ হবে।’

‘আর আপনার বাড়িতে কে আছে?’

‘ইয়ে… মানে আপাতত আমার বাড়িতে কেউ নেই। মগরার ওইদিকে অজ গাঁয়ে আমাদের বাড়ি। আমার বাবা মা দু’জনেই মারা গেছেন। আমার একটি অনেক ছোটো বোন আছে। নাম শিউলি। ওকে আমি বরাবরই ব্যান্ডেলে হোস্টেলে রেখে ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়িয়েছি। তারপর এখন হুগলি মহসিন কলেজে পড়ে। থার্ড ইয়ার। স্যার বললেন, আর হোস্টেলে থাকবে কেন! সোমত্থ মেয়ে। কাকিমাও রাজি হয়ে গেলেন। ওদেরও মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল। ঘরটা ফাঁকা লাগে। নিজের মেয়ের মতো শিউলি এখন এই বাড়িতেই থাকে।’

‘বোনের এ’বাড়িতে থাকার কথাটা কিন্তু আপনি প্রথমে বলেননি দিবাকরবাবু।’

‘হ্যাঁ, একদম মাথা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।’

‘আরে! না না এমনি মজা করছিলাম।’

এই বলে প্রত্যুষ দিবাকরবাবুর কাঁধে হাত দিল। আমি সামনের সিটে বসে দুধারের বৃষ্টিভেজা সবুজ দেখছি। আকাশের মুখ আজ ভার। যখন তখন ঢালতে পারে। কলকাতার দিকে এবছর জল কম হলেও এদিকে মাঠ দেখে মনে হচ্ছে বৃষ্টি ভালোই হয়েছে। প্রকৃতির কী খেলা! এই একদিকে রোদ, তো অন্যদিকে বাদলা। হঠাৎ প্রত্যুষ বলে উঠল, ‘আচ্ছা ওই আপনার স্যারের ওপর আক্রমণের ব্যাপারটা সম্বন্ধে কিছু জানেন?’

‘কোনটা? ওই সাপের ব্যাপারটা বলছেন? না, ওটা নিয়ে আমার কিছু বলার নেই। কী বলব বলুন তো। দোতালার ঘরে সাপ গেল কী করে!’

‘আচ্ছা, সিন্দুকটাও তো কেউ ভাঙতে চেয়েছিল। তবে কী কেউ…’

মুখের কথা কেড়ে নিয়ে দিবাকর বাবু অনুরোধ করলেন, ‘দেখুন, এসব ব্যাপার আপনাকে স্যারই বলবেন। আমার মুখে এসব বলাটা উচিত হবে না।’

কথার ফাঁকে প্রায় ঘণ্টাদুয়েক কেটে গেল। আমরা মনে হল কাছাকাছি এসে গেছি। পথে অবশ্য এক জায়গায় মিনিট দশেক চা খেতে দাঁড়িয়েছিলাম। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছি, দূরে ফাঁকা জমি পেরিয়ে গাছের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ‘পদ্মাবতী ভবন’। অজ পাড়াগাঁয়ে প্রায় পাঁচশো বছরের ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। যার প্রতিটি পরতে লেগে আছে অনেক অজানা ইতিহাস আর রহস্যের গন্ধ।

দু’মহলা বাড়ি। সামনের গাড়ি বারান্দার নীচে এসে আমরা নামলাম। পাশেই থামগুলো ডালহৌসি পাড়ার জিপিও’র মতো। গেটের পাশে একটা ‘রট উইলার’ কুকুর বাঁধা। ঢুকতেই বসার ঘর। চকমিলান মেঝে। ভেবেছিলাম চারদিকের দেওয়ালে বাঘ সিংহের মাথা তাকিয়ে থাকবে। মানে যেমন এসব জমিদার বাড়িতে থাকে আর কী! কিন্তু না! এ’বাড়িতে বৈঠকখানা সাজানো হরেকরকম ঠাকুরের ফটো দিয়ে। আমরা নামতেই চন্দ্রমাধববাবু নিজে এসে আমাদের স্বাগত জানালেন। চাকর জনার্দনকে বললেন, দোতালায় ঠিক ওঁর পাশের ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করতে। দোতালার দক্ষিণ পশ্চিম দিকের ঘরে চন্দ্রমাধববাবু স্ত্রীকে নিয়ে থাকেন। ঠিক তার পাশেই দক্ষিণমুখো ঘরটা আমাদের খুলে দেওয়া হল। বিছানায় দুধসাদা চাদর পাতা। সবই ভালো। শুধু চড়াই পাখি সাইজের মশা উড়ছে চারদিকে। মানে মশারি ছাড়া কোনোমতেই শোওয়া যাবে না। শুনলাম আমাদের পাশের ঘরটাই ওঁর দাদার। অর্থাৎ যেখানে এখন বড়দার ছেলে রুদ্র এসে উঠেছে। হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতেই ঠাকুর নিকুঞ্জ লুচি তরকারি, মিষ্টি দিয়ে গেল। প্রত্যুষ মিষ্টিটা হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘জনাই’র মনোহরা, জানি না আগামী ক’দিনে কোনো প্রাণ-হরা না হলেই ভালো হয়।’

খেয়েদেয়ে আমরা একটু আশপাশটা দেখব বলে বেরোলাম। দারোয়ান সুখীরাম পেন্নাম ঠুকল। আগ বাড়িয়েই বলল, ‘কুছু জরুরৎ হলে হামাকে বলবেন।’ চারদিকে শুধু নানা জাতের ফলের বাগান। একটু এগোলেই দিঘির মতো বিশাল সরোবর। চারপাশ গভীর বাঁশবনে ঘেরা। তার আগে বাঁদিকেই দেবী পদ্মাবতীর মন্দির। মন্দিরের গায়ে বিষ্ণুপুরের পোড়ামাটির কাজ। এই টেরাকোটার কাজ প্রাচীন ঐতিহ্য বহন করছে। মন্দিরের চূড়ায় একটি পিতলের সাপ। সিঁড়িতে প্রণাম করে শ্বেতপাথরের চাতালে উঠলাম। ভিতরে একটি ছোটো বাসুদেবের মূর্তি দেখলাম। ঠিক তার পিছনেই মা মনসা। দেবী পদ্মাবতী এখানে পীতাম্বরী। গায়ের রং হলুদ। উচ্চতায় প্রায় ছ’ফুট। এক হাতে পদ্ম, আর এক হাতে সর্প। সাপটা দেখে মনে হল পদ্মগোখরো। মূর্তির ডানদিকের চোখটা অন্ধ। একটি নীল কাচ বসানো। বুঝলাম এখানেই খুলে পরানো হয় সেই মহামূল্যবান পীতাম্বরী নীলা।

দুপুরবেলা খাওয়ার টেবিলে সবার সঙ্গে গুছিয়ে আলাপ হল। এলাহি আয়োজন। চন্দ্রমাধববাবুকে দেখলাম ভাতের সঙ্গে রুটি খেতে। জানতে পারলাম দু’বেলা নাকি ইনসুলিন নেন। মধুমেহ খুবই বাড়তি। বাড়ির সব মহিলাদের সঙ্গে আলাপ হল। সবাই পরিবেশনে ব্যস্ত। স্বয়ং গীতা দেবী, মানে এ’বাড়ির মালকিন। ওঁর সহযোগী আদরের শিউলি। এছাড়াও কাজের মঞ্জুমাসি ও সব সময়ের লোক যশোদা। ছেলে চন্দ্ররূপবাবু আমার পাশেই বসেছেন। রুদ্ররূপের কথা জিজ্ঞেস করায় শুনলাম, কী একটা কাজে কলকাতায় গেছে, বিকেলে ফিরবেন। গল্পের ফাঁকে জানতে পারলাম, মেয়ে জামাই নাকি আজকেই ফিরছে আমেরিকা থেকে। গাড়ি তাদের আনতে এয়ারপোর্ট গেছে। এনাদের বর্তমান রোজগার বলতে তেলকল, চিনিকল আর গোটা দুই চালকল। বাপ ছেলে মিলেই দেখাশোনা করে। ছেলের ইচ্ছে ব্যান্ডেলে একটা মল করবে। বাপের তাতে সায় নেই। কলের থেকে নাকি মলে আয় কম। শুধু পয়সার শ্রাদ্ধ আর দেখনদারি। ছেলের বউ তার বাপের বাড়িতে। সন্তানসম্ভবা। তাই তার সঙ্গে আর আলাপ হল না। খেয়েদেয়ে উঠেই প্রত্যুষ চন্দ্রমাধববাবুকে বললেন, ‘চলুন একবার সিন্দুকটা দেখব।’

বুঝলাম প্রত্যুষ পুরোপুরি ঢুকে পড়তে চাইছে রহস্যের মধ্যে। ওঁর ঘরে গেলাম সিন্দুকটা দেখতে। দেখলেই বোঝা যায় প্রাচীন বিদেশি বনেদি জিনিস। খুব সম্ভবত ফরাসি দেশের। তবে কম্বিনেশন নম্বর লক লাগানো হয়েছে পরে। অন্তত প্রত্যুষের মত তাই। কারণ পাঁচশো বছর আগে নম্বর লক আসেনি। কাছে গিয়ে দেখা গেল, অনুমান সঠিক। কোণে ছোট্ট করে এনগ্ৰেভ করা ‘ক্লাবসেফ্’। আড়াইশো বছর আগে পৃথিবীর প্রথম বিখ্যাত ফরাসি কম্বিনেশন লক কোম্পানি এরাই। আর তাদের উপনিবেশ ছিল কাছেই চন্দননগরে। ফলে দুইয়ে দুইয়ে চার। কিন্তু একটা অবাক করা জিনিস, সিন্দুকের ওপরদিকে ঠিক যেমন শিল-নোড়া কাটানো হয়, সেরকম ছেনি দিয়ে কেটে লেখা, ‘শূন্য নয়নের এক নয়ন’। লেখাটা পড়ে প্রত্যুষ চন্দ্রমাধববাবুর দিকে তাকাল। উনি হেসে বললেন, ‘ঠাকুরদার মুখে শোনা, উনি লোক ডেকে এটা করিয়েছিলেন। মানেটা বুঝলেন তো। মা পদ্মাবতীর শূন্য নয়নের একটা নয়ন এর ভেতরে রাখা। সেটাই উনি লিখতে চেয়েছেন।’ প্রত্যুষ গম্ভীর হয়ে ঘাড় নাড়ল, ‘বুঝলাম।’

তারপর ঘরে এসেই একটা সিগারেট ধরিয়ে বারান্দায় গিয়ে দু’টো রিং ছাড়ল। ঘুরেই আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সিন্দুকটা দেখলে?’

‘হ্যাঁ, দেখলাম তো।’

‘আর পীতাম্বরী নীলা দেখতে ইচ্ছে করে না!’

‘সে তো উনি দেখালেন না। কাল তো দেখতে পাবই, যখন পুজোর সময় মায়ের চোখে পরানো হবে।’

‘না, তার আগে চাইলেও দেখতে পারো।’

‘কী করে?’

‘সিন্দুক খুলে।’

‘সে তো পাসওয়ার্ড লাগবে!’

‘টুকেও তো পাস করা যায়। যদি বলে দিই পাসওয়ার্ড।’

‘তুমি জানো?’

‘গায়ে তো লেখাই আছে, ‘শূন্য নয়নের এক নয়ন’। মানে জিরো নাইন ওয়ান নাইন।’

‘কী সাংঘাতিক! আমার ধারণা তুমি ব্যোমকেশকেও ছাড়িয়ে যাবে। একটু পায়ের ধুলো দাও।’

‘ধীরে বৎস। সবে তো কলির সন্ধে।’

দুপুরবেলা একটু গড়িয়ে নিলাম। উঠে দেখি সারা বাড়ি আলো দিয়ে সাজানো। বুঝলাম, কাল তো উৎসব। নীচে হৈ হৈ শুনে বুঝলাম, মেয়ে জামাই এসে গেছে। নেমে দেখলাম, একটি ফুটফুটে বাচ্চা। ছেলে। নাম নীল। ভালো বাংলা বলতে পারে না। ভারি মিষ্টি সুরে আমাকে প্রশ্ন করল, ‘আর ইউ ডিকেকটিভ আঙ্কেল?’

আমি ঘাড় নেড়ে প্রত্যুষকে দেখালাম। ওদিকে একবার তাকিয়ে আমাকে বলল, ‘দেন ইউ আর কুট্টুস অফ টিনটিন?’

বুঝলাম খুব টিনটিন পড়ে। মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, ‘ডু ইউ নো, উই আর ডিটেকটিভ?’

‘ইয়েস। ডাডুর ওপর স্নেক অ্যাটাক হয়েছিল। টোমরা টাকে অ্যারেস্ট করবে টো। আমি জানি।’

‘নিশ্চয়ই করব।’

‘ডাডুর ঘরে কিং-কোবরা ঢুকেছিল। এখানে অ্যানাকোন্ডা আছে?’

আমি হাসছি। তার ফাঁকেই ওর বাবা ঢুকলেন।

‘আপনাদের বিরক্ত করছে খুব?’

আলাপ হল। জামাই বেশ ভদ্র, অমায়িক ভালো মানুষ। নাম সীতাংশু মুখার্জী। আমেরিকায় নিউ জার্সিতে থাকেন। টুকটাক গল্প হল। বলতে বলতেই রুদ্ররূপবাবু এসে পড়লেন। চেহারায় চালচলনে একটা প্রবাসে থাকার ছাপ। চন্দ্রমাধববাবু আমাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিলেন। দেখলাম সীতাংশুবাবুও ওঁকে চেনেন না। তার মানে ফোনেও কোনো পারিবারিক যোগাযোগ নেই রুদ্ররূপের সঙ্গে সীতাংশুদের। এমনকি ওঁর স্ত্রী মানে এই বাড়ির মেয়ে চন্দ্রিমার সঙ্গেও নিজের জ্যেঠতুতো দাদার কোনো চেনাশোনা নেই! ব্যাপারটা খটকা লাগল। প্রত্যুষ ফিসফিস করল, ‘রুদ্ররূপের সঙ্গে একটু আলাপ জমাতে হবে।’ আমি বললাম, ‘সবে তো ঢুকল, একটু ধাতস্থ হতে দাও।’

একটু পরে দেখলাম, রুদ্ররূপবাবু ফ্রেশ হয়ে বাড়ির ঘরোয়া পোশাকে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। প্রত্যুষ এগিয়ে গেল। করমর্দন করে বলল, ‘আমি প্রত্যুষ সেন। আপনার কাকাবাবুর নিয়োজিত ডিটেকটিভ।’

বুঝলাম, ও স্ট্রেট ফরোয়ার্ড খেলছে। প্রথমেই সোজাসুজি আক্রমণ। রুদ্ররূপ বিন্দুমাত্র ঘাবড়াল না। হেসেই বলল, ‘জানি, কাকাবাবু বলেছেন আমাকে। ওই সাপ ধরতে আর সিন্দুক ভেঙে চুরির কিনারা করতে এসেছেন।’

প্রত্যুষ সাপের মতো হঠাৎ ছোবল দিল।

‘আপনি তো ছোটোবেলা থেকে লন্ডনে থেকেও বাংলাটা বেশ ভালো বলেন।’

‘হ্যাঁ, আমি বাবার সঙ্গে বরাবরই বাংলায় কথা বলতাম।’

‘বলতাম কেন? এখন বলেন না?’

‘না, বাবা তো মাস তিনেক হল মারা গেছেন।’

‘আর মা?’

‘মা বহুদিনই আমাদের সঙ্গে থাকতেন না। অনেক বছর আগেই বাবার সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গিয়েছিল।’

‘আচ্ছা, আপনারা লন্ডনে কোথায় থাকতেন?’

‘ব্রিক লেনে।’

‘আচ্ছা, ওখানেই তো সাধারণত ভারতীয়রা থাকেন। তা আপনি ওখানে কী করতেন?’

‘এটা কি জেরা?’

‘আরে না না, এমনিই কৌতূহল। আসলে বিদেশের গল্প তো, তাই জানতে ইচ্ছে করে।’

‘মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পাশ করেছি।’

‘তারপর এখানে কি ছুটিতে না বেড়াতে?’

‘না… নিজেদের বাড়ি। এত সম্পত্তি। যতই হোক পৈতৃক অধিকার। বাবার মুখে অনেক গল্প শুনে একটু নস্টালজিক হয়ে পড়েছিলাম। তারপর ভাবলাম রক্তের টানে, দেশের মাটির আকর্ষণে ফিরে যাই। এখানেই সেটল করি। যেমন ভাবা, তেমন সিদ্ধান্ত। চলে এলাম। থেকে গেলাম নিজের অধিকারে।’

‘বাহ, শুনে দারুণ লাগল। সবাই যদি এভাবে ভাবত, তাহলে পৃথিবীটা হয়তো অন্যরকম হত।’

এবার রুদ্ররূপ পালটা বাউন্সার ছাড়ল।

‘আপনার কী মনে হয়? সাপটা কি বাইরে থেকে এসেছিল? নাকি কেউ…? আর সিন্দুকটাই বা কে ভাঙতে গেল? এত উঁচু পাঁচিল! কীভাবে সম্ভব! আর তাছাড়া রাতে নীচে কুকুর ছাড়া থাকে। চোর কি তাহলে বাড়ির কেউ?’

‘আপনার কি কাউকে সন্দেহ হয়?’

‘দেখুন, আমি তো আর গোয়েন্দা নয়। তবে বাইরের লোককে মাথায় তুললে এরকম হবেই। আমি কাকাবাবুকে অনেকবার সাবধান করেছি। এরপর না শুনলে প্রাণ সংশয়ও হতে পারে। আগেরবার যদি সাপটা কামড়ে দিত, তাহলেই তো সব শেষ হয়ে যেত সেদিন! আমি আর এর বেশি কী করতে পারি?’

‘আচ্ছা নমস্কার। খুব ভালো লাগল আপনার সঙ্গে আলাপ করে। অনেক ধন্যবাদ।’

‘যেটা বললাম, সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি। আপনি বুদ্ধিমান, নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন। চলি, নমস্কার। ও হ্যাঁ, ভালো কথা, একটু নজরে রাখবেন।’

কেসটা বেশ জমে গেল। আগ্ৰহ আর চাপতে পারলাম না। প্রত্যুষকে বললাম, ‘কী বুঝছ ভায়া?’

‘শালা ভগ্নীপতি সমস্যা।’

‘মানে! আমি তো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘যে মানুষটা দু’মাস আগে লন্ডন থেকে এসেছে তার পা টা খেয়াল করেছ। সচরাচর সারা বছর চটি না পরলে এরকম হয় না। অথচ মানুষটা দু’মাস আগেও লন্ডনের হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় ছিল। সেটা দেখেই আমার প্রথমে সন্দেহ হয়, আমি একটু নজরে রাখি। রুদ্র ঘরে ঢুকে ফ্রেশ হবার পর, দেখলাম চা দিতে এল শিউলি। তারপর…’

‘তারপর কী?’

‘এই তো লেখক! রাসলীলার গন্ধ পেয়ে গেছ যেই, অমনি উঠে বসেছ।’

‘প্লিজ বল না কী কেস!’

‘আরে! রুদ্র হাত ধরে টান দিয়েছিল, শিউলি হাত ছাড়িয়ে পালাল।’

‘ব্যস! এইটুকু।’

‘তিষ্ঠ বৎস। ধৈর্য ধরো। নজরে রাখো। ফাতনা যখন নড়েছে, বঁড়শিতে মাছ উঠবেই। চার খাবার সময়টা দেবে তো!’

‘তুমি গুরুদেব।’

মনটা ছটফট করছে প্রত্যুষের চন্দ্ররূপবাবুর দাদার কথা জানার জন্য। উনি একটু বেরিয়েছেন। কালকে পুজোর অনুষ্ঠানে কিছু বিশেষ অতিথিদের নিমন্ত্রণ করার জন্য। শুনলাম তার মধ্যে রাজহাট থানার ওসি-ও আছেন। ভালোই হল, কালকেই সামনাসামনি আলাপ হয়ে যাবে। একেবারে দেখা হল রাতে খাওয়ার টেবিলে। কিন্তু তখন প্রসঙ্গটা তোলা গেল না, কারণ রুদ্ররূপও পাশে বসে রয়েছে।

খেয়ে উঠেই চন্দ্ররূপবাবু নিজের ঘরের দিকে হাঁটা লাগালেন। পিছন থেকে ডাক দিল প্রত্যুষ, ‘একটু দরকারি কথা ছিল, আপনি কি এখনই শুয়ে পড়েন?’

‘না, কিছুক্ষণ গল্পের বই পড়ি, গান শুনি। তারপর শুই। বলুন না, কী দরকার?’

‘আপনার দাদার ব্যাপারে একটু বলুন। আপনার ঘরে গিয়ে বসলে কোনো আপত্তি নেই তো?’

‘আরে! না, আপত্তির কী আছে। আপনারা হলেন আমার প্রধান অতিথি। আসুন।’

প্রত্যুষ ঘরে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর শুরু হল ওঁর দাদার গল্প। উনি যা বললেন, সেটাই হুবহু তুলে ধরি।

‘আমার দাদা ইন্দ্রমাধব, ছোটোবেলা থেকেই পড়াশোনায় খুব ভালো। বিলেতে গেল ব্যারিস্টারি পড়তে। তারপর পড়াশোনা শেষ করে এখানে এল বটে, কিন্তু মন বসল না। আবার লন্ডনে ফিরে গেল। ওখানেই ওকালতি শুরু করল, এই অবধি ঠিকই ছিল। এরপরেই ঘটল সেই সমস্যা। ওখানে একটি স্থানীয় মেয়ে, মানে ব্রিটিশ লেডির সঙ্গে দাদার ভালোবাসা হয়। বাড়িতে জানাল। বাবা তখনও বেঁচে। কোনোমতেই মেনে নিলেন না। বললেন, বাড়িতে নারায়ণ আছে, মেমসাহেব পুত্রবধূ হিসাবে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। দাদা বাধ্য হয়ে বাবার অমতেই বিয়ে করলেন ওই মহিলাকে। আমি তখন মাঝেমধ্যে দাদাকে ফোন করতাম। কিছুদিন পরে তখনই জানতে পারি, দাদার ছেলে হল। তারপরেও বেশ কয়েক বছর যোগাযোগ ছিল। দাদার খুব ইচ্ছে ছিল একবার বাড়িতে আসার। আমি বাবাকে রাজি করাতে পারলাম না। বাবা কিছুতেই অনুমতি দিলেন না। তখনই শুনেছিলাম ছেলের নাম রেখেছে রুদ্ররূপ। সবাই আদর করে রুডি ডাকে। তখন ওদের খুব দেখবার ইচ্ছে হত। যতই হোক নিজের রক্ত। বাড়িতে না ফিরতে পারার জন্য বোধহয় দাদার খুব অভিমান হয়েছিল। একদিন হঠাৎ ফোন করলাম, কিন্তু পেলাম না। বলছে রং নম্বর। সেদিনের পর আর কোনোদিন দাদার সঙ্গে কথা হয়নি। দাদা ফোন করে নিজের নতুন কোনো ফোন নম্বর আর দিল না। বোধহয় অভিমানে। মাঝে মাঝে খুব মন খারাপ হত। তারপর যা হয়। জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম। সময় সব কিছু ভুলিয়ে দেয়। সময়ের ধুলোয় মলিন হতে লাগল দাদার স্মৃতি। চোখের বাইরে থেকে মনের বাইরে চলে গেল। সেবছর নিজেও বিবাহ করলাম। বাবারই নির্বাচন করা মেয়ে। নিজের সংসার হয়ে গেল। ক্রমশ চারদিক থেকে জড়িয়ে পড়লাম। একদিন সন্ধেবেলা বসে আছি, শিউলি হঠাৎ এসে বলল, লন্ডন থেকে আমার ফোন এসেছে। বুকটা ধড়াস করে উঠল। প্রায় পঁচিশ বছর পর। গলা কাঁপছিল আমার। শুনি ফোনের ওপারে রুদ্ররূপের গলা। সেই প্রথম দাদার মৃত্যুসংবাদ দিল। ভেঙে পড়লাম খুব। যোগাযোগ না থাকলেও এতদিন জানতাম মানুষটা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তে হলেও আছে। ছোটোবেলার সব স্মৃতি মনে পড়তে লাগল। দুই ভাইতে আমরা পিঠোপিঠি। বন্ধুর মতো বড়ো হয়েছি। রুদ্ররূপ অনুমতি চাইল এই বাড়িতে আসার। বাড়ির বড়ো ছেলে বাড়িতে আসবে, আমি বাধা দেবার কে! তার এক সপ্তাহ পরেই রুদ্ররূপ এসে পৌঁছোল। বংশের ছেলে পৈতৃক ভিটেতে ফিরল। এর থেকে আনন্দের আর কী আছে প্রত্যুষবাবু। আমি আজ আছি, হয়তো কাল নেই। আমার ছেলে চন্দ্রকে তো আমি সবসময় বলি, দুই ভাইতে সম্পত্তি, কারবার সব ভালো করে বুঝে নে। আমাকে এবার ধীরে ধীরে মুক্তি দে। আমি যেন নিশ্চিন্তে চোখ বুজতে পারি।’

এতক্ষণ প্রত্যুষ নিষ্পলক দৃষ্টি দিয়ে সব কথা শুনছিল। হঠাৎ বলে উঠল, ‘আজকের রাতটা কিন্তু খুব নিশ্চিন্তে চোখ বুজবেন না। একটু সজাগ থাকবেন। তবে ভয়ের কিছু নেই, আমি পাশের ঘরে জেগেই থাকব।’

এই কথা শুনে বেশ ঘাবড়ে গেলেন চন্দ্রমাধববাবু। আমতা করে বলে উঠলেন, ‘কে…ন? আজ আবার কী হবে?’

‘কিচ্ছু না, কোনো ভয় নেই। আমি তো আছি।’

বেশ চিন্তান্বিত হয়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেলেন চন্দ্রমাধববাবু। আমরা ওঁর ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই ওঁর স্ত্রী গীতা দেবী ঘরে ঢুকলেন। মনে হল, আমরা এতক্ষণ ঘরে কথা বলছিলাম বলে উনি বোধহয় বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। আমরা আমাদের ঘরে চলে এলাম। দেখলাম সারা বাড়ির আলো নেভানো। পুরো পদ্মাবতী ভবন ডুব দিয়েছে অন্ধকারে।

ঘরে ঢুকেই প্রত্যুষকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি খামোকা ওঁকে ভয় দেখাতে গেলে কেন?’

‘রুগিকে একটু ভয় না দেখালে, ডাক্তারের কাছে আসবে কেন? ভয় না পেলে মক্কেল তো ভাবতে পারে, শুধু শুধু গোয়েন্দা ভাড়া করে নিয়ে এলাম।’

‘দূ…র তুমি আমাকে ভুল বোঝাচ্ছ। তুমি সেই গোত্রের গোয়েন্দা নও।’

‘তবে শোনো। সত্যিই ওঁর বেশ বিপদ হতে পারে। এমনকি খুনের গন্ধও আমি পেয়েছি। কাল সঠিক বলতে পারব। এখন লন্ডনে একটা ফোন করতে হবে।’

এই বলে প্রত্যুষ ওর সায়েন্স কলেজের সহপাঠী শংকরকে ফোন করল। শংকর দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকে। কেমব্রিজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে গবেষণা করছে। শংকরকে ফোন করে রুদ্ররূপের মুখে শোনা লন্ডনের পুরো গল্পটাই বলল। উদ্দেশ্য গল্পের সত্যতা যাচাই করা। প্রত্যুষের অনুরোধে শংকর কথা দিল, পরদিন সকালেই সব খোঁজ নিয়ে জানাবে। আমরা শুয়ে পড়লাম। প্রত্যুষ মোবাইল ঘাঁটছে। আমি একটা ভূতের গল্প পড়ছি। হঠাৎ একটা খুট করে দরজা খোলার আওয়াজ। প্রত্যুষ মোবাইলের আলোটা আমার চোখে ফেলল, দেখছে ঘুমিয়েছি কিনা। তারপর ফিসফিস করল, ‘শুনলে?’

‘হ্যাঁ, চন্দ্রমাধববাবুর বাবুর ঘরের দিকে?’

‘না, রুদ্ররূপের ঘরের দরজা। তুমি আস্তে করে যাও।’

‘তুমি?’

‘আমাকে চন্দ্রমাধববাবুর ঘরের দিকে নজর রাখতে হবে। অপু তুমি যাও, মনে হচ্ছে, তোমার গল্পের গরম মশলা পাবে।’

নিঃশব্দে আমাদের ঘরের দরজা খুললাম। পা টিপে টিপে হেঁটে গেলাম রুদ্ররূপের দরজার দিকে। চোখ রাখলাম খড়খড়ি জানলায়। ঘরের ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। চোখ সইতে সময় নিচ্ছে। দরজার ওপরের শার্সি কাচ দিয়ে শ্রাবণের মেঘে ঢাকা সামান্য জ্যোৎস্না ঘরের ভেতর সেঁধিয়েছে। তাতে সব অস্পষ্ট। তবে দুটো ঝাপসা অবয়ব দেখা যাচ্ছে। একজন পুরুষ, অপরজন নারী। শরীরে বস্ত্র নেই বললেই চলে। বিছানায় শরীর দুটো কম্পমান। নিজের ভেতর একটা পাপবোধ কাজ করছে। কিন্তু তদন্তের স্বার্থে চোখ সরাতে পারলাম না। হঠাৎ কথা বলে উঠল নারী শরীরটা, ‘আমি কিন্তু আর তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারছি না।’

‘আর ক’টা দিন ধৈর্য ধরো সোনা। হাতে পাঁজি মঙ্গলবার।’ পুরুষ সঙ্গীটি সান্ত্বনা দিল।

‘আমার দাদা কিন্তু তোমাকে সন্দেহ করে।’

‘শোনো, আমি এই বাড়ির ভবিষ্যত মালিক। বড়ো কর্তা। ম্যানেজারের আপত্তিতে আমার বিয়ে আটকাবে?’

‘না, দাদা মনে হয় আমাদের ব্যাপারটা কিছুটা আন্দাজ করেছে। তোমার চালচলনেই বুঝতে পেরেছে।’

‘বাড়ির মালিকের সঙ্গে ম্যানেজারের বোনের প্রেম করা কি অন্যায়?’

‘না, তা নয়। তবুও দাদা আমায় তোমার সঙ্গে মিশতে বারণ করেছে। বলেছে অজানা অচেনা ছেলে, সাবধানে থাকতে।’

এতক্ষণের কথায় বুঝতে পারলাম, মেয়েটি শিউলি। রুদ্ররূপ গাল ধরে আদর করল শিউলির। তারপর গালের ওপর নাক ঘষে বলে উঠল, ‘আর বড়োজোর দুটো দিন অপেক্ষা করো। সব পরিকল্পনা বলে দেব। তার পরেই কেল্লা ফতে!’

‘তুমি যেমন বলবে, তেমন হবে।’

‘একটু ধৈর্য ধরো, তুমি হবে এই বাড়ির বড়ো বউ।’

‘দাদা যেন কোনোদিন ঘুণাক্ষরেও কিছু টের না পায়।’

‘আরে তোমার দাদা আমার বাঁ হাতের খেল।’

এই কথার ফাঁকেই শিউলি বিছানার পাশে মাটিতে লুটিয়ে থাকা পোশাক তুলে পরতে উদ্যত হল। আমি পা টিপে আবার নিজের ঘরের দিকে হাঁটা লাগালাম। দূরে বারান্দার কোণে প্রত্যুষ দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। নজর চন্দ্রমাধববাবুর ঘরের দিকে। আমি গিয়ে পাশে দাঁড়ালাম। প্রত্যুষ ইশারায় নীচে দেখাল। দেখলাম আকাশের মেঘ যেন একটু কেটেছে। মেঘের গরাদ ভেঙে আধখাওয়া চাঁদের আলো ভাসিয়ে দিয়েছে নীচের বাগান। চারদিক ঘন অন্ধকারের মধ্যে ফটকের পাশে দুটি নগ্ন শ্বেতপাথরের নারী মূর্তি তাদের মঙ্গলঘট থেকে যেন অনর্গল জ্যোৎস্না ঢেলে দিচ্ছে। জীবন্ত মনে হচ্ছে তাদের। সেই জ্যোৎস্নায় যেন ধীরে ধীরে কাটছে রহস্যের অন্ধকার।

সূর্য তখনও ওঠেনি। তবে একটা লাল আলোর হালকা পোঁচ পুব আকাশে দেখা গেল। আমাদের চোখ লেগে আসছে। আমরা ঘুমোতে গেলাম। সকালে উঠতে একটু দেরি হয়ে গেল আমাদের। উঠে দেখি সারাবাড়িতে সাজো-সাজো রব। সবাই বেশ নতুন জামাকাপড় পরেছে। আমরা উঠতেই দিবাকরবাবু চলে এলেন। হাতে দুটো পায়জামা পাঞ্জাবির প্যাকেট। স্নান করে পরে নিতে বললেন। প্রত্যুষ জিজ্ঞেস করল, ‘খুব ব্যস্ত?’

‘সেরকম কিছু নয়। বলুন কী দরকার?’

‘কয়েকটা কথা জিজ্ঞেস করতাম আপনাকে।’

‘কী ব্যাপারে?’

‘রুদ্ররূপবাবুর প্রসঙ্গে।’

‘আমি কী বলব! মালিকদের ব্যাপার। কর্তার ইচ্ছে কর্ম।’

‘আপনার কি কোনো সমস্যা আছে ওঁকে নিয়ে?’

‘আমার আবার কী সমস্যা থাকবে?’

এবার একটু খোঁচা দিল প্রত্যুষ।

‘ওঁর কিন্তু আপনাকে নিয়ে সমস্যা আছে। উনি সন্দেহ করেন ক’দিন আগে ঘটে যাওয়া যাবতীয় অঘটনের জন্য নাকি আপনিই দায়ী।’

‘তা তো বলবেই। আমার হয়েছে যত জ্বালা। ঘি আর আগুন পাশাপাশি। আমার চিন্তা আমার ছোটো বোনটাকে নিয়ে। বাপ-মা মরা ছোটো মেয়ে। আমার হাতে পুরো দায়িত্ব সঁপে দিয়ে তাঁরা তো দিব্যি চলে গেলেন। আমি নিজে সংসার অবধি না করে শিউলিকে মানুষ করলাম। পাছে দাদা বউদির সংসারে ওর কষ্ট হয়, তাই ঘর সংসার পাতলাম না। অথচ আমার চোখ কিছুই এড়ায় না। রুদ্র আড়ালে আবডালে ফষ্টিনষ্টি করে। তবে পরের ছেলেকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। নিজের বোন হলেও বলছি, শিউলিরও প্রশ্রয় আছে যথেষ্ট। ওদের মেলামেশায় আমি বাধা দিই বলে, আমি ওদের কাছে এখন খারাপ। বড়োবাবু বা গিন্নিমা জানতে পারলে আমার মান ইজ্জত কোথায় যাবে বুঝতে পারছেন!’

‘এত বড়ো বংশের ছেলে, আসলে তো এই বাড়ির বড়ো অংশীদার। পাত্র হিসেবে তো বেশ ভালোই। তাতেও আপনার আপত্তি কেন?’

‘শুনুন, ওর চালচুলো আমাদের কিছু জানা আছে কি? হঠাৎ করে এসে বলল, আমি রুদ্ররূপ। অমনি বড়োবাবু অন্ধ বিশ্বাসে আর ভালোবাসায় একেবারে বড়ো ছেলের মর্যাদা দিয়ে দিলেন। কোনো যাচাই করলেন না।’

‘কেন? কোনো প্রমাণপত্র দেখতে চাননি।’

‘শুনেছি পাসপোর্ট বার করে বড়োবাবুকে দেখিয়েছিল। বড়োবাবু তার আগেই বলে দিলেন, তুমি যে আমার দাদার ছেলে, আমার চিনতে ভুল হয়নি। ওসবের কোনো প্রয়োজন নেই।’

‘তার মানে তো পাসপোর্ট আছে।’

‘দেখুন, আমি অনেক ঘাটের জল খেয়ে এখানে এসেছি। জালিয়াতদের কাছে ওসব জাল পাসপোর্ট ভিসার কাগজ বানানো কোনো কঠিন কাজ নয়।’

‘তার মানে আমি বলতে চান, রুদ্ররূপ জালিয়াত!’

‘আমি কিছুই বলতে চাই না, আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই যে, আর একটু বাজিয়ে নেওয়া উচিত ছিল। আমার কথা কে শুনবে? আমি তো এ’বাড়ির চাকর। তবে প্রত্যুষবাবু মিলিয়ে নেবেন আপনি, গরিবের কথা বাসি হলেও মিষ্টি।’

‘আপনি ওদিকে যান এবার। না হলে আবার পুজোর জোগাড়ে দেরি হয়ে যাবে।’

দিবাকর চলে যেতে, আমি হাসলাম, শালা ভগ্নীপতিতে তো হেব্বি ঝামেলা!

প্রত্যুষ গেয়ে উঠল, ‘ডুবিয়া মরিলাম, মরিয়া ডুবিলাম, তোমারি প্রেমে পড়িয়া…’

বুঝলাম জাল গুটিয়ে আনছে। আমার জানা আছে, ও তখনই গলা ছেড়ে গান গায়।

হঠাৎ গান থামিয়ে প্রত্যুষ আমাকে ইশারা করল। আমি দরজার কাছে যেতেই দেখলাম, চাকর জনার্দন দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখেই বলল, ‘বাবু ডাকছেন।’

আমি আর প্রত্যুষ গেলাম চন্দ্রমাধববাবুর ঘরে। গিয়ে দেখি সিন্দুকটা খোলা। আমাদের দেখে উনি দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। তারপর সিন্দুকের ভেতর থেকে একটা মিনে করা চন্দন কাঠের বাক্স বার করলেন। তারপর আস্তে করে বললেন, ‘দাঁড়ান আপনাদের জিনিসটা দেখাই। একটু পরেই তো মায়ের চোখে বসানো হবে।’ বলেই বাক্সটা খুলতেই আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সারা ঘরে একটা আলো ছড়িয়ে পড়ল। উনি পাথরটা তুলে আমার হাতে দিলেন। আকারে শঙ্কু আকৃতি। ছাড়ানো লিচুর মতো অনেকটা। সমুদ্র-নীল রঙের। যেন একটা উজ্জ্বল হলুদ রোদ্দুর ঠিকরে বেরোচ্ছে মণিটার ভেতর থেকে। লুকোনো হলুদ আলোটা যেন মণিটার নীলচে আভাকে আরও টলটলে করে তুলেছে। পাঁচশো বছরেরও বেশি ইতিহাস লুকিয়ে আছে এর ভেতর। প্রত্যুষ অবাক চোখে প্রশ্ন করল, ‘এ জিনিস আপনি বাড়িতে রেখেছেন কেন?’

‘আসলে আমাদের বাপ ঠাকুরদা বিশ্বাস করতেন এই নীলা বাড়িতে থাকলে কোনো দুষ্ট গ্ৰহ মানে বিশেষ করে বড়োঠাকুরের কোনো কু-দৃষ্টি আমাদের বংশে পড়বে না। সব কিছুই মঙ্গলময় হবে। আপনি হয়তো কুসংস্কার বলতে পারেন। কিন্তু আমার মন চায়নি, এটা ব্যাংকের লকারে রাখতে।’

‘তা ভালো করেছেন। শনি আটকাতে ঘরে মণি রেখেছেন। এদিকে আবার মণি সরাতে তো ফণি ঢুকে পড়ল। ঠিক আছে, এবার বলুন তো এই সিন্দুক খোলার গোপন সংখ্যার গুপ্তমন্ত্র আর কে জানে?’

‘আমি ছাড়া একমাত্র আমাদের কুলপুরোহিত। আমাদের মধ্যে যিনি আগে মারা যাবেন, তিনি তার পরবর্তী একমাত্র জ্যেষ্ঠ উত্তরাধিকার বা বংশধরকে বলে যাবেন। কেন বলুন তো?’

‘না, কোনো কারণ নেই। এখন দেখা যাক কী হয়! চলুন।’

এই বলে নীলা নিয়ে আমরা মন্দিরের দিকে পা বাড়ালাম। ঠাকুরমশাই পরিয়ে দেবেন মা পদ্মাবতীর চোখে। পুজো শুরু হল।

হঠাৎ প্রত্যুষের ফোন বেজে উঠল। কাঁসর ঘণ্টার আওয়াজ থেকে প্রত্যুষ একটু দূরে উঠে গেল। খানিকক্ষণ পর আমার পাশের চেয়ারে এসে বসে আমার কানে ফিসফিস করে যেটা বলল, আমি শুনে চেয়ার থেকে লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠছিলাম। প্রত্যুষ চেপে বসিয়ে দিল। কথাটা হল, শংকর ফোন করেছিল। ব্রিক লেনে বা মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির ম্যানেজমেন্ট বিভাগে রুদ্ররূপ বলে কেউ নেই। কোনোকালে ছিলও না, অর্থাৎ বাকিটা বুঝে নাও।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘একটা জাল মানুষ বাড়ির মধ্যে মিশে রয়েছে। সে কি! এক্ষুণি ওকে অ্যারেস্ট করাও। তালুকদারকে ফোন করব?’

‘ধীরে বৎস। এই জালিয়াতির শাস্তি ক’মাস! আর ঘরে সাপ ঢুকিয়ে খুনের চেষ্টা আর সিন্দুক ভাঙতে চাওয়ার সমাধান কী হবে। আর একটু সুতো ছেড়ে খেলতে হবে বুঝেছ। বড়ো মাছ খেলিয়ে না তুললে, ঘাই মেরে পালাবে।’

আমি আড়চোখে রুদ্ররূপের দিকে তাকালাম। বেশ খোশমেজাজেই রয়েছে। একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। আজ দুপুরবেলা মধ্যাহ্নভোজের বিপুল আয়োজন। একটা অদ্ভুত ঘটনা লক্ষ করলাম, মন্দিরের পাশে কিছু হাঁস বাঁধা রয়েছে। জিজ্ঞেস করায় জানতে পারলাম, ওগুলো দেবীর পদতলে নিবেদিত। বলি হবে। হাঁস বলি! এরকম কথা জীবনে শুনিনি। চন্দ্রমাধববাবুর কাছ থেকে জানা গেল, এই বলিপ্রথা তাদের বংশের পুরোনো রীতি। প্রত্যুষ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু হাঁস তো দেবীর বাহন?’

‘ঠিকই বলেছেন প্রত্যুষবাবু। তবে সে তো শ্বেত রাজহংস। তাই খেয়াল করে দেখুন বলি দেওয়া হচ্ছে সাধারণ পাতি হাঁস বা বেলে হাঁস। তবে একটাও সাদা নেই, সেটা খেয়াল করেছেন! কোনো জাতেরই সাদা হাঁস বলি মায়ের পুজোয় অনুমতি নেই।’

‘কিছু মনে করবেন না, আমার কিন্তু কোনো প্রকার বলিতেই সায় নেই।’

‘ধর্ম মশাই, ধর্ম। এ বড়ো সাংঘাতিক নেশা। এর থেকে বড়ো আসক্তি আর কিছুতে নেই। আমি বন্ধ করতে চাইলেও বন্ধ হবে না। গ্ৰামের মানুষ বিদ্রোহ করবে। এরপর একজন সাপে কেটে মারা গেলেই তার জন্য আমাকে দায়ী করবে। বলবে পুজোয় নাকি খুঁত হয়েছে। আপনি ভাবতে পারেন, এই একবিংশ শতাব্দীতেও ওরা এখনও বিশ্বাস করে মায়ের চোখের নীলা আসলে স্বয়ং সর্পরাজের মাথার মণি।’

গল্পের ফাঁকেই মিঃ তালুকদার এসে গেলেন। এসেই করমর্দন করলেন প্রত্যুষের সঙ্গে। টুকটাক পুরোনো কেসগুলোর গল্প হচ্ছিল। পুজো শেষ হয়ে এল। পুরোহিত মশাই মা পদ্মাবতীর ডান চোখের পীতাম্বরী নীলাটি চন্দ্রমাধববাবুর হাতে এনে দিলেন। উনি আমাদের কাছ থেকে একটু সময় চেয়ে নিলেন, ‘আমি সিন্দুকে মণিটা রেখে ইনসুলিনটা নিয়ে আসি। এসে খেতে বসব আপনাদের সঙ্গেই।’

আমি তালুকদারের সঙ্গে গল্পে মশগুল। মিনিট দশেক হয়ে গেছে প্রায়। হঠাৎ আমি চমকে উঠলাম একটা আওয়াজে, ‘অপু… কুইক!’

বলেই প্রত্যুষ দৌড় লাগাল দোতলার সিঁড়ির দিকে। আমি ওর পিছনে অনুসরণ করলাম। খেয়াল করিনি মিঃ তালুকদারও দৌড় লাগিয়েছেন। গিয়ে যা দেখলাম, আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা বরফের স্রোত বয়ে গেল।

দেখি বিছানার ওপর পড়ে আছেন চন্দ্রমাধববাবু। চোখ বোজা। প্রায় অচৈতন্য। প্রত্যুষ ধাক্কা দিয়ে ওঁকে ডাকতেই, উনি চোখটা আধবোজা অবস্থায় তাকালেন। কথা জড়িয়ে গেছে ওঁর। চোখ মেলতে পারছেন না। প্রত্যুষ আমাকে নির্দেশ দিল, ‘যাও তাড়াতাড়ি অ্যান্টিভেনাম আর সিরিঞ্জটা নিয়ে এসো।’

আমি নিয়ে আসার পর, প্রত্যুষ অ্যান্টিভেনামটা চন্দ্রমাধববাবুকে ফুঁড়ে দিল। মিঃ তালুকদার একটু উসখুশ করছেন। কিছু একটা বলবেন মনে হচ্ছে। আসলে তখন ঘরভরতি লোক। বাড়িসুদ্ধু সবাই চলে এসেছে। প্রত্যুষ ঘাড় ঘুরিয়ে দ্রুত একজন ডাক্তারকে খবর দিতে বলল। মিঃ তালুকদার বোধহয় ইঞ্জেকশনটা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ইতস্তত করছিলেন। প্রত্যুষ আন্দাজ করেছিল সেটা। ও নিজেই বিষয়টা পরিষ্কার করে দিল।

‘মিঃ তালুকদার, আমি নিশ্চিত কোনোভাবে সাপের কোনো সাংঘাতিক বিষ ওঁর শরীরে প্রবেশ করেছে। খুব সম্ভবত ইনসুলিনের অ্যাম্পুলের ভেতর দিয়ে। ওটা পরীক্ষা করতে পাঠাতে হবে। ওঁর ছাড়া আর কারও হাতের ছাপ পাওয়া যায় কিনা!’

মিঃ তালুকদার অবাক, একইসঙ্গে মুগ্ধ। বলতে বলতেই ডাক্তার এসে হাজির। তালুকদার পরিচয় করিয়ে দিল আমাদের ডাক্তারের সঙ্গে, ‘উনি হলেন স্বনামধন্য গোয়েন্দা প্রত্যুষ সেন আর ইনি সুলেখক অপূর্ব কর।’ তারপর পুরো ঘটনাটির বর্ণনা করলেন।

ডাক্তারবাবু বললেন, ‘হ্যাঁ আমি আপনাদের অনেক গল্প শুনেছি। সরাসরি আলাপ ছিল না। আজ ভালো লাগল সামনে থেকে দেখে। একদমই সঠিক কাজটাই করেছন। ঠিকই ধরেছেন, সাপের বিষক্রিয়াতেই ওঁর এই অবস্থা। মোটামুটি বিপদ কেটে গেছে। আমি কিছু সাধারণ ওষুধ দিয়ে যাচ্ছি। জ্বর আসতে পারে অল্প। তবে খেয়াল রাখবেন যেন ঘুমিয়ে না পড়েন।’

বাড়ির পরিবেশটা একটু থমথমে হয়ে গেল। চন্দ্রমাধববাবু দিবাকরকে ইশারায় সব সামলাতে বললেন। প্রত্যুষ নীলাটার কথা জিজ্ঞেস করায় চন্দ্রমাধববাবু হাত দিয়ে দেখালেন যে পীতাম্বরী নীলা সযত্নেই সিন্দুকে সুরক্ষিত আছে। গীতা দেবী কান্নাকাটি করছেন। তাকে সামলাচ্ছেন শিউলি। চন্দ্ররূপ এসে প্রত্যুষের হাত ধরে অনেক ধন্যবাদ দিল। রুদ্ররূপ প্রত্যুষকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা প্রত্যুষবাবু কাকাবাবুর ইনসুলিনের শিশিতে সাপের বিষ মেশাল কে?’

‘আমি আপনি যে কেউ হতে পারে! এখন হাতের ছাপ মিলিয়ে দেখা যাক। কার সঙ্গে মেলে!’

খেয়াল করলাম এই উত্তরে রুদ্ররূপের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মিঃ তালুকদার হুকুমের সুরেই বলে উঠলেন, ‘এখন কোনো বাড়ির লোকই বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে যাবেন না। আর যারা বাইরের অভ্যাগত আছেন, একটু খেয়াল রাখবেন, তারা যেন কেউ ওপরে না আসে।’

হঠাৎ ফোন বেজে উঠল চন্দ্ররূপবাবুর। ও ব্যস্ত হয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কথা বলতে লাগল। প্রত্যুষের ইশারায় আমি চন্দ্ররূপের পিছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। চন্দ্ররূপ ফোন নামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সমস্যা হয়ে গেল তো!’

‘কী সমস্যা?’

‘শালাবাবু ফোন করেছিল। সুলেখা মানে, আমার স্ত্রীর হঠাৎ লেবার পেন উঠেছে। ওরা এখনই ওকে নিয়ে ব্যান্ডেলের নার্সিংহোমে যাচ্ছে। আমাকে আসতে বলল, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। এদিকে এই বিপদ। কী করি বলুন তো?’

আমি প্রত্যুষকে ব্যাপারটা বলায় ও তালুকদারবাবুকে বলল, ‘চন্দ্ররূপ একটু গাড়ি নিয়ে এখনই বাইরে যাবে। আমি দায়িত্ব নিলাম।’

‘আপনি দায়িত্ব নিলে, আমার আর কিছু বলার নেই।’

চন্দ্ররূপ ছুটে বেরিয়ে গেল। দিবাকর আমাদের খেতে ডাকল। আমরা সিঁড়ি দিয়ে নামছি। প্রত্যুষ একটা প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘দেখলেন তো দিবাকরবাবু, সাপের কামড় ছাড়াই বিষ ঢুকে গেল শরীরে।’

‘দেখুন, উনি মারা গেলে তো আমার নতুন করে কোনো লাভ হবে না? যার লাভ হবে সেই করেছে। জলের মতো পরিষ্কার। বাড়ির বড়ো ছেলে।’

‘তাতেও কি আপনার কোনো লাভই নেই?’

এবার বেশ ঘাবড়ে গেল দিবাকর। হাতজোড় করে অনুরোধ করল, ‘আমার বোনকে বাঁচান ওর হাত থেকে।’

‘দেখুন দিবাকরবাবু, কাউকে বাঁচানো বা মারা আমার কাজ নয়। আমার দুটো কাজ, প্রথমত আমার মক্কেলকে রক্ষা করা, আর অপরাধীকে সনাক্ত করা। শাস্তির বিধান বিচারব্যবস্থার হাতে। আমার সেখানে কোনো হাত নেই।’

এবার আমার বেশ ভয় করছে। সব কিছুর ভেতরেই মনে হচ্ছে সাপের বিষ দেখছি। প্রত্যুষ হেসে বলল, ‘মা মনসার প্রসাদ, ভয় নেই। গুছিয়ে মেরে দাও। তারপর বিশ্রাম। ঘুমিয়ে নিতে হবে ভালো করে। রাতে আবার চাঁদ সওদাগর আসবে।’

পুরো কথাটাই আমার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। আমি ভয়ে ভয়ে পঞ্চব্যঞ্জন খেতে থাকলাম। একটা মিষ্টি পাতে পড়ল। মিষ্টিটার নামটা অদ্ভুত। ‘ফলিডল’। সবুজ রঙের দেখতে। রসের। অনেকটা রসকদমের মতো। কিন্তু কী সাংঘাতিক নাম রে বাবা! এতো সাপ আর বিষাক্ত পোকামাকড় মারার পাউডারের নাম।

সন্ধেবেলা খবর এল, ছেলে হয়েছে চন্দ্ররূপের। বাড়িতে এতো অস্থিরতার মধ্যেও আনন্দের ঢেউ খেলে গেল। চন্দ্রমাধববাবু একটু সুস্থ বোধ করছেন। বংশের প্রদীপ, নাতি আসার খবরে ওঁর মুখে একটা সন্তুষ্টির আলোর রেখা ফুটে উঠল। দিবাকরকে ডেকে বললেন, চন্দননগর থেকে জলভরা নিয়ে আসতে। মা মনসার সন্ধ্যারতি শুরু হয়েছে। আবার সারা বাড়িতে আলো জ্বলে উঠেছে। আমার অস্বস্তি যাচ্ছে না। রুদ্ররূপ চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জানি ও অপরাধী। অথচ কিছু করার নেই। সাপের ছুঁচো গেলার মতো অবস্থা। বিপদকে পাশে নিয়ে এইভাবে কতক্ষণ চলা যায়! সারাদিনের ধকলে বাড়ির সবাই ক্লান্ত। রাতের খাওয়া পর্ব তাড়াতাড়িই শুরু হল। প্রত্যুষ জানাল, অবেলায় খেয়েছে বলে আর রাতে খাবে না। আমাকে আস্তে করে বলল, ‘রাতে না ঘুমিয়ে যেটুকু হজম করতে পারবে, সেটুকু খাও।’

‘কেন? ঘুমব না কেন?’

‘কোনো কোনো সাপ শেষ কামড় দেয় গভীর রাতে।’

আমি ভয়ে আর কিছু খেতেই পারলাম না। আমার মাথায় একটা প্রশ্ন খেলে গেল, ‘আচ্ছা প্রত্যুষ, ধরো চন্দ্রমাধববাবু যদি মারা যেতেন, তাহলে তুমি না থাকলে সবাই কী ভাবত?’

‘সাধারণভাবে হার্টঅ্যাটাক। আরও তলিয়ে দেখলে, মানে যদি পোস্টমর্টেম হত, তাহলে সাপের কামড়।’

‘কিন্তু কামড়ের তো দাগ নেই!’

‘কালকেউটে কামড়ালে সাধারণত দাগ থাকে না। এতই সূক্ষ্ম তার দাঁত। সবাই ভাবত কালকেউটেই কামড়েছে।’

‘আর অপরাধী বেকসুর খালাস!’

‘সঙ্গে সম্পত্তির আর ব্যবসার অর্ধেক অধিকার। তার সঙ্গে পীতাম্বরী নীলা হাতের মুঠোয়।’

রাত দশটার পর বাড়ির সমস্ত আলো নিভে গেল। আশেপাশের গ্ৰাম আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। দু’একটা কুকুর কান্নার সুর তুলে ডাকছে। মনে হচ্ছে যেন শেয়াল। তবে শেয়ালও এদিকটায় আছে। আগেরদিন ডাক শোনা গিয়েছিল। রাতের অন্ধকার চিরে একটা রাতচরা ডেকে চলে গেল। আমরা মশারির মধ্যে মড়ার মতো ঘাপটি মেরে পড়ে আছি। তবে কান খাড়া। মন সজাগ। কখন চোখ লেগে গেছে খেয়াল করিনি। হঠাৎ একটা গলার আওয়াজ। ঘুমের ঘোরে মন হল প্রত্যুষ। ধড়মড় করে উঠলাম। চোখ খুলে দেখি, পাশের বিছানায় প্রত্যুষ নেই। হুড়োহুড়ি করে নামলাম। নেমেই আওয়াজটা অনুসরণ করে ছুটলাম পাশের ঘরে। সিঁড়ি দিয়ে অনেকের উঠে আসার ধুপধাপ শব্দ। দেখি চন্দ্রমাধববাবুর ঘরের দরজা খোলা। ভেতরে থকথকে অন্ধকার। কিছু ঠাহর হচ্ছে না। অন্ধকারের গর্ভ থেকে একটা শব্দ বেরিয়ে এল, ‘অপু আলোটা জ্বালাও।’

দরজার পাশে সুইচ বোর্ড হাতড়ে সবকটা সুইচ মেরে দিলাম। আলো জ্বলে উঠল। যা দেখলাম, তাতে আমি আকস্মিক তড়িতাহত। রুদ্ররূপের হাতে গ্লাভস পরা। ডান হাতে শাবল ধরা। প্রত্যুষের মাথার দিকে তাক করা। মাথার ঠিক ইঞ্চি দুয়েক আগে বাঁ হাত দিয়ে প্রত্যুষের শাবলের একটা প্রান্ত ধরা। আর ডান হাতের রিভলবারটা রুদ্ররূপের মাথায় সাঁটানো। বিছানার ওপর চন্দ্রমাধববাবু আর গীতা দেবী বসে ঠকঠক করে কাঁপছেন। পরস্পরের হাত ধরা। সিন্দুকটা পুরো হাঁ করে খোলা। ভেতরের চন্দন কাঠের বাক্সের ডালাটা খোলা। গোপন বাক্স ফাঁকা। কোনো মণি নেই। হঠাৎ প্রত্যুষ বলে উঠল, ‘কোনো চালাকি করার চেষ্টা করবেন না, আপনার বুদ্ধি যতই প্রখর হোক না কেন! আমার হাতে যেটি ধরা আছে, আপনার ওই বুদ্ধি ফুটো করে দিতে শুধু ঘোড়ায় একটা হালকা চাপ দিতে লাগবে। অতএব ভালোয় ভালোয় শাবলটা ফেলে দিয়ে চুপ করে চেয়ারে বসুন।’

পোষমানা হিংস্র কুকুরের মতো চোখ নিয়ে সামনের চেয়ারে বসল রুদ্ররূপ। ততক্ষণে ঘরে বাড়ির বাকি সবাই চলে এসেছে। প্রত্যুষ আমাকে তাড়াতাড়ি তালুকদারকে খবর দিতে বলল। আমি ফোনটা আনতে ঘরে এসেছি। একটা হাঁউমাউ শব্দ। ফোন করতে করতেই আবার ও ঘরের পা বাড়ালাম। চন্দ্রমাধববাবু আর ওঁর স্ত্রী হাত পা ছড়িয়ে কাঁদছেন পীতাম্বরী নীলার শোকে। প্রত্যুষ সান্ত্বনা দিচ্ছে, ‘নীলা নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। আপনাদের মহামূল্যবান পাথর সুরক্ষিত আছে। সব বলছি, একটু স্থির হয়ে বসুন।’ ভিড়ের ভেতর থেকে হঠাৎ শিউলি বলে উঠল, ‘নীলা সিন্দুকে নেই, অথচ আপনার জিম্মায় গেল কী করে! ওটা তো এ’বাড়ির গোপন সম্পত্তি।’

প্রত্যুষ হেসে উত্তর দিল, ‘শুধু সম্পত্তি নয় শিউলি দেবী। এই বাড়ির প্রাণভোমরা। দেবী পদ্মবতীর দিব্য আঁখি। বেহুলা লখিন্দরের প্রাণ-পাখি।’

শেষ লাইনটার অর্থ আমি বুঝলাম না। দিবাকরবাবু শিউলিকে ধমক দিয়ে চুপ করতে বললেন। বাড়ির লোক, গুরুজনদের টপকে শিউলির কথা বলাটা উনি পছন্দ করলেন না। আবার সমস্ত ঘরে পিনপতন নীরবতা। বাইরে কয়েকটা বাদুড়ের ঝটপট করার শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। নীরবতা ভঙ্গ করে তালুকদার বাবু ঢুকলেন। ওঁকে দেখেই প্রত্যুষ রুদ্ররূপকে দেখিয়ে বলে উঠল, ‘এই নিন জামাই লখিন্দরকে। বেহুলাকে দু’দিন পরে পাবেন।’

তালুকদার বাবু হাতকড়া বার করে রুদ্ররূপকে পরাবার সময় জিজ্ঞেস করল, ‘কী চার্জ দেব?’

‘চুরি ও খুনের চেষ্টা। চুরির ব্যাপারটা আমার হাতেনাতে ধরা পড়েছে। খুনের প্রচেষ্টাটা যদি স্বীকার না করে, প্রমাণ করতে বেগ পেতে হবে না।’

‘কিন্তু আপনার ওই ইনসুলিনের শিশিতে তো চন্দ্রমাধববাবুর হাতের ছাপ ছাড়া অন্য কারও ছাপ পাওয়া যায়নি।’ ---’তার মানে তখনও গ্লাভস পরা ছিল। তবে জেনে রাখুন এই ঘরে সাপ ছেড়ে দেওয়াটাও এই মূর্তিমানের কাজ। ওঁর আসল নামটা খুব সম্ভবত ‘সি’ দিয়ে, শিউলি দেবী সঠিকটা বলতে পারবেন।’

দিবাকরবাবু ফোঁস করে উঠলেন, ‘আবার শিউলিকে এর মধ্যে জড়াচ্ছেন কেন?’

‘আপনি কিছুই জানেন না দিবাকরবাবু। আপনি শুধু ওপর থেকে ওদের প্রেমটা আন্দাজ করেছিলেন। বাকি ষড়যন্ত্রের কিছুই খবর রাখেন না।’

‘ষড়যন্ত্র! মানে! আপনি কী বলছেন, আমি তো এর এক বর্ণও বুঝতে পারছি না।’

‘সবটা ধৈর্য ধরে ‌শুনুন। নিজেই সব বুঝতে পারবেন।’

সবাই বিস্ফারিত চোখে প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে আছে। প্রত্যুষ শুরু করল।

‘আচ্ছা দিবাকর বাবু শিউলি দেবীর ডান হাতে ওই যে ট্যাটুটা করা, এস + সি। ‘এস’ যদি শিউলি ধরি তাহলে ‘সি’ কে? আপনিই জিজ্ঞেস করুন।’

শিউলি ডান হাতের উলকি করা জায়গাটা শাড়ির আঁচল দিয়ে ঢাকতে চাইল। দিবাকরবাবু কাপড়টা সরিয়ে শিউলিকে ধমকাল, ‘বল, এটা কার নামের আদ্যক্ষর হাতে লিখেছিস?’

‘চন্দন। চন্দনকে আমি ভালোবাসি।’

‘কোথায় থাকে?’

‘চুঁচুড়া, খাদনে মোড়ের কাছে। নিজেদের বাড়ি।’

তালুকদার বাবু ইতিমধ্যেই নোটবুক বার করে ফেলেছেন। সব টুকে রাখছেন। টোকার ফাঁকেই প্রশ্ন করলেন, ‘চন্দন কী? পুরো নাম বলুন।’

শিউলি মাথা নীচু করে জানাল, ‘চন্দন বণিক।’

প্রত্যুষ হেসে বলে উঠল, ‘আরে বাবা! একদম চাঁদ বণিকের পালা!’

গীতা দেবী আর চন্দ্রমাধববাবু বসে বসেই ঢুলে পড়ছেন। ঘুমে ওঁদের চোখ জড়িয়ে আসছে। দেখে প্রত্যুষ বলল, ‘টেবিলের ওপর পিতলের জলের জগটা বোধহয় আপনাকে নিয়ে যেতে হবে তালুকদার বাবু।’ তারপরেই বিছানার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনারা দু’জন শোবার আগে এই জগ থেকেই তো জল খান?’

গীতা দেবী ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ রোজ রাতে শোবার আগে শিউলি এক জগ খাবার জল রেখে যায়।’

এবার চন্দ্রমাধববাবু জড়ানো গলায় একটা কৌতূহলী প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা প্রত্যুষবাবু, আমরা তো দরজা ভালো করে বন্ধ করে শুলাম। তা সত্ত্বেও রুদ্ররূপ ঘরের ভেতরে ঢুকল কী করে?’

এই কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রত্যুষ খাটের নীচের দিকে তাকাল। তারপর মোবাইলের টর্চটা জ্বালিয়ে খাটের তলার অন্ধকারে ফেলল। মিঃ তালুকদারের দিকে তাকিয়ে ওঁকেও নীচু হতে ইশারা করায়, উনি অবাক হলেন। খাটের তলা তো ফাঁকা! আমি জানি আর পাঁচজনের থেকে প্রত্যুষের চোখ আলাদা। প্রত্যুষ তীক্ষ্ণ চোখে বলে উঠল, ‘কিছু দেখতে পাচ্ছেন মিঃ তালুকদার?’

উনি ঘাড় নাড়লেন। আমি হঠাৎ দর্শক থেকে খেলোয়াড় হয়ে উঠলাম। সহকারীর মতো বলে উঠলাম, ‘কয়েকটা মরা মশা ছাড়া তো আর কিছু নেই।’

‘শাবাশ! আরও ভালো করে দেখো।’

মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে দেখাতে দেখতে পেলাম বেশ কয়েক জায়গায় আঙুল দিয়ে মেঝেতে রক্ত মোছার দাগ। মিঃ তালুকদার-ও অবাক! প্রত্যুষ নির্দেশ দিল, ‘এই মশার মৃত লাশগুলোর ফরেনসিক সেরোলজি করতে হবে। রক্তের দাগটা কার আঙুলের ছাপ সেটাও জানা দরকার।’

‘ঠিক আছে। কিচ্ছু চিন্তা করবেন না। সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন বলুন বাড়ির কাদের রক্তের স্যাম্পেল নেব। আমি লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

‘অন্য কারও নিতে হবে না, শুধু শিউলি দেবীর নিলেই হবে।’

এবার দিবাকর প্রতিবাদ করলেন, ‘দেখুন আমরা কর্মচারী বলে কি বিনা প্রমাণেই আমাদের দোষী সাব্যস্ত করবেন? এটা ওঁদের পারিবারিক সমস্যা। এর মধ্যে আমাদের জড়াচ্ছেন কেন?’

‘আপনি খামোকা কিছু না জেনেই মন্তব্য করছেন। আপনার বোধহয় জানা নেই, আমি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ হয়েই তদন্ত করি। এমনকি মক্কেল নিজে অপরাধী হলেও আমি রেয়াদ করি না। আপনার বোন যদি দোষী না হন, তাহলে চিন্তা কী? কোনো কিছুই প্রমাণ হবে না। বেকসুর খালাস হয়ে যাবে।’

শিউলি কিন্তু বেশ ঘাবড়ে গিয়েছে। দিবাকরবাবু শাসনের সুরে আপশোশ করলেন, ‘তখন বারবার বলেছিলাম, ছেলেটির সঙ্গে না মিশতে। এখন ঠেলা সামলা। পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা।’

মিঃ তালুকদার নিজের কাজ শুরু করে দিলেন। আনুষঙ্গিক কাজকর্ম সারতে আকাশে আলো ফুটে গেল। বিছানার ওপর চন্দ্রমাধববাবু আর গীতা দেবী নিজেদের অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছেন আধশোয়া অবস্থায়। মিঃ তালুকদারের যাবার সময় গলার আওয়াজে ধড়মড় করে উঠে বসলেন চন্দ্রমাধববাবু।

প্রত্যুষ বলল, ‘আপনারা এবার একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোন। খুব সম্ভবত আপনাদের জলের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল।’

‘সে কী! কে মেশাল?’

‘বোধহয় শিউলি।’

‘কী বলছেন আপনি। ওকে আমরা নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসতাম।’

‘খুব সম্ভবত জলে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ও খাটের তলায় লুকিয়ে ছিল, আপনাদের চোখ লাগতেই দরজা খুলে দেয়। তারপরেই ছদ্মবেশী রুদ্ররূপ ঘরে ঢোকে পীতাম্বরী নীলা চুরি করার উদ্দেশ্যে। তারপর চুরি হয়ে গেলে দুজনেই পালাত।’

‘এখন মণিটা কোথায়?’

প্রত্যুষ পকেটে হাত দিয়ে বৃদ্ধাঙুল আর তর্জনীর ফাঁকে নীলাটা ধরে দেখাল।

‘ওটা সিন্দুকের ভেতর থেকে আপনার হাতে গেল কী করে?’

‘আপনারা যখন রাত্রে খেতে গেলেন, আমি গেলাম না। আমার মনে হল মণিটা ওখানে রাখাটা আর নিরাপদ নয়। যেহেতু রুদ্ররূপের সকালবেলা আপনাকে খুনের চক্রান্তটা ব্যর্থ হয়ে যায়, তাই বেপরোয়া হয়ে উঠবে সেটাই স্বাভাবিক। আপনি যখন পুজোর পরে নীলাটা সিন্দুকে রাখতে আসেন, তার আগেই শিউলি বা রুদ্র যে কেউ একজন আপনার সিন্দুকের নম্বর প্লেটের ওপর পাউডার লাগিয়ে দেয়। সেটা আপনি নীচে নামার পর আপনার আঙুলের মাথায় দেখতে পাই। তারপরেই ওপরে এসে দেখি যে সিন্দুকের নম্বর প্লেটের ওপর পাউডার লাগানো। কিন্তু তখন মুছে দিলেও আর লাভ হত না। কারণ সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময়েই আমার সঙ্গে শিউলির দেখা হয়। বুঝলাম যে নম্বরগুলোয় আপনি আঙুল ছুঁইয়েছেন, সেখানে পাউডার উঠে গেছে। আর শিউলি সহজেই জেনে গেছে সিন্দুকের পাসওয়ার্ড। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই, নীলাটা সরিয়ে ফেলতে হবে।’

‘ঠিকই ধরেছেন, আমারও তখন কেমন একটা সন্দেহ হয়েছিল। ভাবলাম সিন্দুকের লাগোয়া ড্রেসিংটেবিল। তাই হয়তো গীতা পাউডার মাখতে গিয়ে উড়ে এসে লেগেছে। কিন্তু আপনি মণিটা সরালেন কীভাবে? নির্দিষ্ট নম্বর না টিপলে তো সিন্দুক কোনোমতেই খুলবে না।’

‘পাসওয়ার্ড তো আপনার সিন্দুকের ওপরেই খোদাই করা। ‘শূন্য নয়নের এক নয়ন’। মানে জিরো নাইন ওয়ান নাইন।’

‘আমি আপনাকে যত দেখছি মুগ্ধ হচ্ছি। মানুষকে বিশ্বাস করে এত ঠকলাম। রুদ্ররূপকে আমি নিজের ছেলের মতো ভালোবাসতাম। আর শিউলিকে মেয়ের মতো।’

‘এই রুদ্ররূপ আসলে চূঁচুড়ার চন্দন বণিক। শিউলির প্রেমিক। রুদ্ররূপের যাবতীয় তথ্য ও শিউলি মারফৎ সংগ্ৰহ করে। তারপর আপনাকে বার দুয়েক ফোন করে। শেষে জাল পাসপোর্ট বানিয়ে পাকাপাকিভাবে এই বাড়িতে সেঁধিয়ে যায়। ওর প্রথমে লক্ষ্য ঘরে সাপ ঢুকিয়ে বা ইনসুলিনে সাপের বিষ মিশিয়ে আপনাকে হত্যা করা। তারপর সম্পত্তি ব্যবসা সব কিছুর অংশীদার হওয়া। আর বাড়ির জ্যেষ্ঠ বংশধর হিসাবে পীতাম্বরী নীলা আর সিন্দুকের পাসওয়ার্ড স্বাভাবিক নিয়মে করায়ত্ত করা। সেটা সফল না হওয়ায়, অন্তত নীলাটা চুরি করে কেটে পড়ার তালে ছিল দু’জনে।’

‘আমার মাথা গুলিয়ে যাচ্ছে প্রত্যুষবাবু। আমি তো আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি শুনে।’

‘ঠিক আছে, আপনি এখন বিশ্রাম নিন। দু’একদিনের মধ্যেই আশা করি সব প্রমাণ হয়ে যাবে।’

আমরা আমাদের নিজেদের ঘরে এসে ঢুকতেই আমি অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা কথাটা পাড়লাম, ‘আচ্ছা প্রত্যুষ ওই খাটের নীচের মশা আর রক্তের দাগটা ঠিক খোলসা হল না।’

‘শোনো, শিউলি আগে থেকেই খাটের তলায় ঘাপটি মেরে ছিল। এখানে তো মশার সাংঘাতিক উৎপাত। তারা তো আর শিউলিকে ছেড়ে দেবে না। যথারীতি গায়ে বসছে, রক্ত খাচ্ছে। শিউলি কিন্তু চাপড় মেরে মারতে পারছে না, আওয়াজ হবে। তাই মশা রক্ত খেয়ে পেট মোটা হলে আঙুল দিয়ে টিপে মারছিল। তাই ওই রক্ত শিউলি ছাড়া আর কার হবে? কারণ চন্দ্রমাধববাবু আর গীতা দেবী তো মশারির ভেতর।’

‘এবারের উপন্যাসটা জমে যাবে, বলো…?’

‘দাঁড়া…ও, আগে উনি লেখার অনুমতি দিক।’

আমরাও একটু বিছানায় গড়িয়ে নিলাম। সারারাত যা গেল! সন্ধেবেলা মিঃ তালুকদার ফোন করলেন, ‘প্রত্যুষবাবু শিউলির সঙ্গে তো ওই রক্তের স্যাম্পেল ম্যাচ করে গেছে। আমি তাহলে লেডিস পুলিশ নিয়ে আসছি।’

‘ঠিক আছে আসুন। আমি ততক্ষণ নজর রাখছি।’

দিবাকরবাবুকে আমি ডেকে বললাম ঘটনাটা। উনি ভেঙে পড়লেন। যতই হোক বাপ-মা মরা একমাত্র ছোটো বোন। হয়তো বোনকে কিছু বলতে শিউলির ঘরে ঢুকলেন। বেরিয়েও এলেন কিছুক্ষণ পর। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মিঃ তালুকদার দলবল নিয়ে চলে এলেন। এসেই বললেন, ‘আপনার রুদ্ররূপই যে চন্দন, সেটার প্রমাণ হাতে এসে গেছে। পাসপোর্টটাও জাল। ও ভালো কথা, সেই সূত্র ধরে আমরা একটা জাল পাসপোর্ট চক্রের হদিশ পেয়েছি। তবে ওই ঘরে সাপ ছাড়া আর ইনসুলিনে বিষ মেশানোটা ব্যাটা কিছুতেই স্বীকার করছে না। তবে ইনসুলিনের শিশির রাবারের ক্যাপে দুটি ছিদ্র পাওয়া গেছে। মানে একটি চন্দ্রমাধববাবুর ইনসুলিন বার করার, অপরটি সিরিঞ্জ দিয়ে বিষ ঢোকানোর। এখন শুধু প্রমাণের অপেক্ষা। ঠিক আছে চলুন।’

আমরা শিউলির ঘরের দিকে এগোতে লাগলাম। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। দরজায় টোকা দেওয়া হল। কোনো সাড়াশব্দ নেই। তারপর জোরে ধাক্কা দেওয়াতেও ভেতর থেকে দরজা খুলল না। অবশেষে সিদ্ধান্ত হল দরজা ভেঙে ফেলার। দরজা ভেঙে যা দেখলাম, তাতে আমরা আঁতকে উঠলাম। শিউলি যেন বিছানায় ঘুমিয়ে আছে। শুধু ডান হাতে একটা ঘুমের বড়ির শিশি। প্রত্যুষ ছুটে গিয়ে গলার পাশে হাত দিয়ে স্পন্দন দেখল। তারপরেই ব্যস্ত চোখে বলে উঠল, ‘এখনও বেঁচে আছে। দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।’

মিঃ তালুকদার পুলিশের জিপেই একজন কনস্টেবল ও মহিলা পুলিশকে দিয়ে শিউলিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন। হৈ চৈ মিটে যাওয়ার পর আমরা খেয়াল করলাম, টেবিলের ওপর একটা ভাঁজ করা চিঠি। তাতে লেখা…

‘আমি চন্দনকে ভালোবাসি। আমার কথাতেই ও রুদ্ররূপ হয়ে এই বাড়িতে আসে। তারপর ও আমাকে শিশি করে সাপ ভরে দেয়, আমি চন্দ্রকাকুর ঘরে ছেড়ে দিই। তারপর আমিই ওর এনে দেওয়া সাপের বিষ ইনসুলিনের শিশিতে মেশাই। রাতেও খাটের তলায় ঘরে লুকিয়ে থেকে রাতে দরজা খুলে দিই। কাকাবাবু কাকিমার যাতে ঘুম না ভাঙে তার জন্য চন্দন আমাকে ঘুমের বড়ি এনে দিয়েছিল। আমিই ওদের জলে মিশিয়ে দিই। কিন্তু তবুও শেষ রক্ষা হল না। ধরে পড়ে গেলাম। তাই বাকি ঘুমের বড়িগুলো খেয়ে আমি চললাম। শেষে বুঝলাম, লোভে পড়ে আমি অনেক ভুল করেছি। তাই লজ্জায় ঘৃণায় আমার আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। নিজেকেই নিজে শেষ করে দিলাম। পারলে আমাকে তোমরা ক্ষমা করে দিও।

—শিউলি।

আমরা বাকরুদ্ধ। দিবাকরবাবু কেঁদে ফেললেন। প্রত্যুষ পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিচ্ছে। জানি না তাতে কতটা দুঃখের উপশম হচ্ছে। মিঃ তালুকদার আবার করমর্দন করলেন প্রত্যুষের সঙ্গে, ‘ইউ আর জাস্ট জিনিয়াস।’ চন্দ্রমাধববাবু সায় দিলেন, ‘আমার মানুষ চিনতে ভুল হয় না। আমি ঠিক লোকের ওপরেই ভরসা করেছিলাম। শুধু স্নেহে অন্ধ হয়ে রুদ্ররূপকেই বুঝতে পারিনি।’

প্রত্যুষ গম্ভীরভাবে বলে উঠল, ‘মিঃ তালুকদার আপনার এখনও একটা কাজ বাকি আছে। চন্দন সাপের বিষটা বা সাপটা পেল কোত্থেকে? সেটা জানা দরকার।’

‘ওটা নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না, আজ বাবাজিকে একটু জামাই আদর করতে হবে। তাহলেই সব বেরিয়ে যাবে।’

‘দয়া করে সেটা করুন, কারণ এগুলো তো বনদপ্তরের অমূল্য সম্পদ।’

‘ঠিক আছে, দেখছি।’

এই বলে মিঃ তালুকদার বেরিয়ে গেলেন। শ্রাবণের আকাশের ঘন মেঘ যেন বাড়ির ভেতরে ঘনিয়ে এসেছে। গুমোট বেঁধে রয়েছে চাপা কান্না। পরদিন সকালেই আমাদের বিদায় নেওয়ার পালা। আমরা সকালবেলা তৈরি হতেই চন্দ্রমাধববাবু ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা সই করা চেকের পাতা। কিছু লেখা নেই। প্রত্যুষের দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘এটা কিন্তু আপনাকে রাখতে হবে, যেটা ন্যায্য মনে করবেন বসিয়ে নেবেন।’

প্রত্যুষ মুচকি হেসে বলে উঠল, ‘এটার কোনো প্রয়োজন নেই। আমার পারিশ্রমিক আমি প্রথম দিনেই ঠিক করে রেখেছি। আপনার হাতের ওই ছড়িটা।’

‘এটা তো আমার প্রপিতামহের স্মৃতি। তবে আপনি চাইলে…’

‘ওটা আপনার প্রপিতামহের বলে আমি চাইছি না। হাতলের নীচের দিকে দেখুন, উর্দুতে লেখা আছে, মহম্মদ মহসিন, ১৮৫০. মানে লোকহিতৈষী ও জনদরদি এক মহামানব, যিনি হুগলি ইমামবাড়া ও মহসিন কলেজ তৈরি করেছিলেন। সেই কারণেই ওটা আমার চাই।’

এবার চন্দ্রমাধববাবু হাতজোড় করে প্রত্যুষকে প্রণাম করলেন। তারপর হাতের ছড়িটা প্রত্যুষের হাতে তুলে দিলেন। আমি দেখলাম, উনি ভালো মুডেই আছেন। আমিও ফস করে উপন্যাসটা লেখার অনুমতিটা চেয়ে নিলাম। উনি আমার পিঠে হাত দিয়ে আদরের সুরে বললেন, ‘নিশ্চয়ই লিখবেন। মানুষ জানুক আমাদের বংশের কথা, মা পদ্মাবতীর কথা, তার পীতাম্বরী নীলার কথা, আর তার গায়ে জড়িয়ে থাকা রহস্যের গল্প। আর ভয় কী! আপনারা তো আপদে বিপদে পাশেই থাকলেন।’

আমরা গাড়িতে উঠতে যাব, হঠাৎ পিছন থেকে ডাক চন্দ্ররূপবাবুর, ‘প্রত্যুষদা আমার একটা অনুরোধ ছিল।’

‘বলুন, কী করতে পারি?’

‘আমার ছেলের যদি একটা নামকরণ আপনি করে দেন, তাহলে আপনার একটা অমলিন স্মৃতি এই বাড়িতে, বংশে থেকে যাবে।’

‘আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি ওর নাম রাখবেন ‘আস্তিক’। মা মনসার একমাত্র পুত্র। নমস্কার আসছি।’

গাড়ি ছেড়ে দিল। একটু এগোতেই ধানের ক্ষেত ঢেউ খেলছে। মেঘের জাল কেটে রোদের লুটোপুটি। আমি জানলার দিকে তাকিয়ে ভাবছি, যদি কোনোদিন আসল রুদ্ররূপ ফিরে আসে। শিউলি যদি বেঁচে যায়। চন্দন বা শিউলি তো আর খুন করতে পারেনি। চুরি বা খুনের চেষ্টা করেছিল মাত্র। তার শাস্তি বড়োজোর কতদিন! দু’চারবছর। তারপর হয়তো ওরা ঘর বাঁধবে। ওদেরও হয়তো সন্তান হবে। দুই অপরাধীর সন্তান। এদিকে আস্তিকও বড়ো হয়ে উঠবে। হয়তো ভবিষ্যতের গর্ভে বোনা হবে রহস্যের কোনো নতুন জাল, যার জট ছাড়াতে আসবে হয়তো কোনো নতুন প্রত্যুষ। হঠাৎ সংবিত ফিরল, প্রত্যুষের গলায়, ‘আচ্ছা অপু এই ছড়িটা কি মহম্মদ মহসিন চন্দ্রমাধববাবুদের কোনো পূর্বপুরুষকে নিজে হাতে উপহার দিয়েছিলেন, নাকি কোনো ঘুরপথে গোস্বামীরা জোগাড় করেছিল?’

‘এই ব্যাপারটা তোমার জেনে লাভ কি? এটা তদন্ত করার জন্য তোমায় মহম্মদ মহসিন তো কোনো পারিশ্রমিক দেবে না। ওসব ভুলে যাও। এই ছড়ি এখন তোমার। তবে এটুকু বলতে পারি, এখন বেশ কিছুদিন তুমি রহস্য তদন্তে ভালোই ছড়ি ঘোরাবে।’

গাড়ির ভেতর একটা হাসির রোল ছাপিয়ে উঠল। গাড়ি উঠল ছোটো রাস্তা থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে। কলকাতার পথে। সবে দু’জনে দু’টো সিগারেট ধরিয়েছি, ফোনটা বেজে উঠল প্রত্যুষের। প্রত্যুষ ফোনটা স্পিকারে দিল।

‘আমি দুবরাজপুর থেকে বসন্ত অধিকারী বলছি। এখানে একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটে গেছে।’

প্রত্যুষ আমার দিকে তাকাল। আমি ইশারায় বললাম, পরে…। প্রত্যুষ বলে দিল, ‘আপনি ঘণ্টাদুয়েক পরে ফোন করুন।’ ফোন কেটে দিল। জানি না কী সংবাদ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

বইচই পূজাবার্ষিকী, ১৪৩০

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%