শৈলেন ঘোষ
আর ক-দিন পরে শীত আসবে। আসবে, সাদা-ঝকঝকে তুষারের ওড়না গায়ে জড়িয়ে এইখানে, এই পাহাড়ের গায়ে। আসবে, ওই ছোট্ট নদীর জলে, জঙ্গলে, গাছে গাছে। আর আসবে, ওই বুড়ো-আপেলগাছটার শুকনো ডালে। সত্যি, শীত এলে কী ভীষণ কষ্ট হয় ওই বুড়ো-আপেলগাছটার। শীতের নখগুলো যেন বড্ড খোঁচা খোঁচা। আহা, বড্ড লাগে তার!
আপেলগাছের যখন বয়স ছিল, যখন অগুনতি সবুজপাতা ঝুমঝুমি বাজিয়ে তার ডালে-ডালে নাচত, তখন কি আর সে ভয় পেত শীতকে! তখন কনকনে ঠান্ডা হিমেল বাতাসই বয়ে যাক, কী ঝুরঝুরে তুষারই ঝরে পড়ুক, মাথা উঁচিয়ে আপেলগাছ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভেংচি কেটে দিত শীতটাকে। নয়তো মাথা ঝাঁকিয়ে শীতটাকে দিত রাগিয়ে।
হায় রে! এখন আপেলগাছের সেদিন কি আর আছে! এখন সে বুড়ো। না-আছে গা-ভর্তি সবুজপাতা, না ডালে ডালে টুকটুকে আপেল। যাও-বা দু-একটি ছিটেফোঁটা পাতা এডালে-ওডালে ফুরফুর করছে, সে থাকাও যা, না-থাকাও তা। এখন শুকনো ডালপালাগুলো হাড়-জিরজিরে ভূতের মতো, হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কী বিচ্ছিরি দেখতে লাগে!
বিচ্ছিরি বলে বিচ্ছিরি! কেউ ফিরেও তাকায় না। কী আর করবে! আপেলগাছ ওই বিচ্ছিরি চেহারা নিয়েই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে একলাটি। ভারি নিঃসঙ্গ। মনে মনে ভাবে, সে যেন পৃথিবীর একটা বোঝা, কেউ তাকে ভালোবাসে না, কেউ তার কাছে আসে না। অথচ আগে যখন ডালে ডালে ফুল ফুটত, ফুলের বুকের ভেতর থেকে যখন কাঁচা-সবুজ আপেলগুলি উঁকি মারত, তারপর সেই সবুজ আপেল যখন টুকটুকে লাল হয়ে গাছের গায়ে দুলে উঠত, তখন কিন্তু সবাই আসত। আসত কত পাখি, কত ভোমরা, কত কাঠবিড়ালি, নাম না-জানা আরও কত অতিথি। রঙিন-পাখিরা তখন সবুজপাতার ফাঁকে-ফাঁকে নাচত, গান গাইত, লুকোচুরি খেলত। কাঠবিড়ালি এডালে-ওডালে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে খেলা করত। কিংবা পাকা আপেলে টুক করে কামড় দিয়ে, তুড়ুক তুড়ুক ছুট দিত। উঃ! কী মজা, কী মজা! তখন কী ভালোই না লাগত আপেলগাছের। ভাবত, আহা! তার কত সুখ!
এখন আর কেউ আসে না। কোনও মানুষ আসে না তার কাছে, তার ডাল থেকে আপেল পাড়তে। কোনোও পাখি আসে না তার ডালে, তাকে গান শোনাতে। আসে না কোনও কাঠবিড়ালি, তার ডালে ডালে খেলা করতে। তাই ভারি দুঃখে একলাটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বুড়ো-আপেলগাছ ভাবে, আমার সুখ গেল কোথায়? তবে কী সুখ শুধু ক-দিনের?
শীত আসছে। হঠাৎ ঠিক শীতের আগে, আপেলগাছের শুকনো পাতা-ঝরা ডালে একদিন একটি পাখি এসে বসল। হয়তো বা অজান্তে, কিংবা আনমনে। পাখিটি এডালে-ওডালে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচতে লাগল। নাচতে নাচতে নরম সুরে গান জুড়ল। শিউরে উঠল বুড়ো-আপেলগাছ। আঃ! কতদিন পর পাখি এসেছে। তার ডালে বসে গান গাইছে! কী ভালো লাগছে তার! বুক যেন খুশিতে ভরে যায়! আনন্দে উপচে উঠল তার শুকনো ডালপালা। দুলে উঠল। কেঁদে ফেলল বুড়ো-আপেলগাছ।
পাখি যেন থতমত খেয়ে থমকে যায়! তাই তো, গাছের ডালপালাগুলো যেন থেকে থেকে দুলে উঠছে! চমকে থেমে জুল-জুল করে দেখতে লাগল পাখি এদিক-ওদিক। ভাবতে লাগল, কে দোলা দেয়! কেন দুলছি!
পাখিকে থামতে দেখে, হঠাৎ সেই বুড়ো-আপেলগাছের শুকনো খটখটে গলার ভেতর থেকে খসখসে শব্দ বেরিয়ে এল। ভাঙা ভাঙা, অস্পষ্ট সেই শব্দ, 'ভয় পাস না পাখি, ভয় পাস না। তোর গানের সুরে আমার বুকটা দুলে উঠেছে। তুই আবার গা, আমি শুনি! আমি কতদিন গান শুনিনি। শুনিনি তোর মতো ছোট্ট পাখির গান।'
গাছের কথা শুনে পাখির ধড়ে যেন প্রাণ এল। হেসে উঠল পাখি। হাসতে হাসতে বলল, 'তাই বলো, তুমি! আমি ভাবলুম, বুঝি আকাশ থেকে বাতাসে ঝাপটা দিল।'
পাখির এই কথায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সেই বুড়ো-আপেলগাছ। অনেক দুঃখ-জড়ানো গলায়, অনেক কষ্টে সে সয়ে সয়ে বলল, 'আমার কাছে বাতাস আসে না রে পাখি, আকাশ আমার দিকে চেয়ে দেখে না।'
'কেন?' অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল পাখি।
'আমি যে বুড়ো হয়ে গেছি। আমার ফুল নেই, ফল নেই। রূপ নেই, রং নেই। আছে শুধু ক-টা শুকনো ডাল। আমাকে কেউ ভালোবাসে না, কেউ না।'
বুড়ো-আপেলগাছের কথা শুনে কেমন যেন দুঃখে ভার হয়ে গেল পাখির মন। বলল, 'আপেল-বুড়ো, দুঃখ কোরো না! আমার সব খুশি দিয়ে তোমায় আমি সুখ দেব। কেউ না-থাক, আমি তোমার বন্ধু হব।'
'সত্যি,' গাছের সেই খসখসে ভাঙা গলাটা দুরন্ত আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারপর খুশিতে উদবেল হয়ে গাছ দুলতে লাগল। দুলতে দুলতে বলল, 'পাখি, আমার কাছে তুই রোজ আসবি তো?'
পাখি বলল, 'আসব, নিশ্চয়ই আসব।'
'গান শোনাবি তো পাখি?'
পাখি বলল, 'নিশ্চয়ই শোনাব। গান শোনাব, নাচ দেখাব।'
'কিন্তু তার বদলে তোকে যে আমি কিছুই দিতে পারব না। আমার যে সব ফুরিয়ে গেছে।' কথাটা বলতে ভারি কষ্ট হল আপেলগাছের।
পাখি বলল, 'না, আপেলগাছ, না, তোমার কিচ্ছু ফুরোয়নি। তোমার বয়স ফুরোলেও তোমার মনটা তো এখনও হারিয়ে যায়নি।'
পাখির এইকথা শুনে বুড়ো-আপেলগাছের বুকের ভেতরটা আনন্দে থরথর করে কেঁপে উঠল। মনে হল, বুঝি-বা এখনই পাখিটাকে জড়িয়ে ধরে সে আদর করে। কিন্তু না, তা সে করল না। শুধু জিজ্ঞেস করল, 'তোর নাম কী পাখি, তোর নাম?'
'আমি জয়,' পাখি উত্তর দিল।
'তুই এত রং কোথায় পেলি পাখি?'
পাখি উত্তর দিল, 'তা তো জানি না। আমি যখন বাতাসে ডানা মেলে উড়ে যাই, তখন নীল আকাশে আমার নীল পালকের রং ঢেউ তোলে। সবাই বলে সুন্দর।'
বুড়ো-আপেলগাছের ভাঙা গলা খুশিতে উছলে উঠল, 'সুন্দর! পাখি তুই সত্যিই সুন্দর! তুই গান গা পাখি, আবার গা। আমি শুনি।'
পাখি গান গাইল।
আবার গাইল।
রোজ গাইল।
হ্যাঁ, সেদিন থেকে পাখি রোজ বুড়ো-আপেলগাছের কাছে আসত। তার সঙ্গে কত গল্প করত। অনেক গান শোনাত, নাচত। খুশিতে দুলে উঠত আপেলগাছ। ভাবত, রূপ তার নাই থাক, খুশি তো ফিরে এসেছে। সে-খুশি তার ওই একটি পাখি। সেই পাখির নাম জয়।
দেখতে দেখতে শীত এসে গেল। দূরে পাহাড়ের মাথায় মাথায় বরফ জমতে শুরু করেছে। আর ক-দিন পরে বরফ পড়তে শুরু করবে। শিরশিরে হিমেল বাতাস সেই কথা জানান দিচ্ছে।
বুড়ো-আপেলগাছ একদিন জয়কে বলল, 'শীত এসে গেল।'
জয় বলল, 'হ্যাঁ, এবার ক-টা দিন তোমায় একলা থাকতে হবে।'
গাছ চমকে উঠল। বলল, 'কেন?'
জয় উত্তর দিল, 'ক-টা দিন এখানে থাকব না। দূরের দেশে চলে যাব।'
অবাক হল আপেলগাছ। জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় যাবি?'
'জানো না, শীত পড়লে, দলবেঁধে আমরা আর-এক দেশে উড়ে যাই? বরফের ঠান্ডা গায়ে লাগলে আমরা বাঁচব কেমন করে? আর, তা ছাড়া বরফ যখন পড়বে আমরা যে তখন খাবারও পাব না।' উত্তর দিল জয়।
পাখির কথা শুনে বুড়ো-আপেলগাছের বুকটা যেন শিউরে উঠল। বলল, 'তুই সত্যিই চলে যাবি পাখি? বরফ এত নির্দয়, তোকেও কষ্ট দেয়? তুই চলে গেলে আমি একা থাকব কেমন করে?'
'তুমি ভেবো না আপেল-বুড়ো। শীত গড়িয়ে বসন্ত এলেই আমি আবার আসব। আবার তোমায় গান শোনাব।' উত্তর দিল জয়।
'আহা! বসন্তের দিনগুলি কী সুন্দর। বসন্তের দিনগুলিতে আগে কত-না সাজে সেজেছি আমি। আমার ডালে সবুজে-সবুজে উছলে পড়ত নতুন পাতা। কত রং, কত আনন্দ। কিন্তু আজ? আজও বসন্ত আসে দিকে দিকে রং ছড়িয়ে, কিন্তু আমার জন্যে সে কিছুই আনে না। এমনকী, আমার দিকে ফিরেও তাকায় না। এত তাচ্ছিল্য কেন যে করে! এত অবহেলা! আমি কি বুড়ো, তাই?

আপেল-বুড়োর কথা শুনে জয়ের একটুখানি বুক, দুঃখের ভারে উপচে গেল। বলল, 'মন খারাপ কোরো না আপেল-বুড়ো। বসন্ত কিছু নাই আনুক, আমি আনব। আমি তোমার বন্ধু। অচেনা সেই দূর দেশ থেকে আমি নিয়ে আসব, তুমি যা চাইবে।'
বুড়ো-গাছ বলল, 'তুই তো ছোট্ট পাখি। তুই আর আমার জন্যে কী আনবি!'
'বলো না, কী চাও?' জিজ্ঞেস করল জয়।
'পারবি?'
'হ্যাঁ, পারব।'
বুড়ো-আপেলগাছ থামল। হয়তো কিছু ভাবল। তারপরে বলল, 'পাখি, যদি তোর কষ্ট হয়?'
'আমার কিচ্ছু কষ্ট হবে না। বলো না, তোমার কী চাই?'
'যদি তোর সত্যি কষ্ট না-হয় পাখি, তবে পারিস তো আমার জন্যে একটু ভালোবাসা নিয়ে আসিস!'
থমকে গেল পাখি। তার মুখের কথা যেন মুখেই হারিয়ে গেল। কেন-না, তার তো জানা নেই, কোথায় গেলে সে ভালোবাসা খুঁজে পাবে! একটু ভালোবাসা কোথায় পাওয়া যায়! চোখ দুটি তার ছলছলিয়ে উঠল বুড়ো-আপেলগাছের জন্যে। তারপর আনমনেই সে বলে ফেলল, 'হ্যাঁ আনব, তোমার জন্যে ভালোবাসাই আনব আপেল-বুড়ো।' বলা শেষ না-হতেই তার চোখের জলের ফোঁটাগুলি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে মাটিতে।
সময় হয়ে গেল। বাতাসে তুষার ভেসে আসার আগেই, জয় নামে ওই ছোট্ট পাখিটি, হাজার-হাজার পাখির সঙ্গে উড়ে চলল আর-এক দেশে। নীল আকাশে অগুনতি রঙের ঢেউ তুলে ওদের ডানাগুলি দুলে ওঠে। ওরা উড়ে চলে কখনও ধুধু মাঠের ওপর দিয়ে। কখনও গভীর বন ছাড়িয়ে। সবুজ খেত পেরিয়ে। কখনও উত্তাল নদী ছাড়িয়ে। ওরা যাবে, গভীর সমুদ্রের বুকে সেই বন-সবুজের দ্বীপে। সেখানের আকাশে বসন্ত। শুধুই বসন্ত। খুনখুনে শীত-বুড়িটার সাধ্য কী, সেখানে তার পাকা চুলের তুষার ছড়িয়ে দেয়! কিংবা হাত বাড়িয়ে খামচে দেয় ওই ছোট্ট ছোট্ট পাখিদের! সত্যি! পাখিদের এ যেন এক দুঃসাহসিক অভিযান। যত বিপদ, যত ভয় সব জয় করে ওরা এগিয়ে যাবে। এগিয়ে যাবে, সূর্যের নিশান লক্ষ রেখে, সেই দক্ষিণে। কত না অজানা পাখির সঙ্গে কত না অচেনা পাখির পরিচয় হবে। কত কথা, কত গল্প হবে। কত বন্ধুত্ব গড়ে উঠবে।
অথচ এবারের এই অভিযানে জয় যেন ওই হাজার হাজার পাখির আনন্দের দোসর হয়ে উঠতে পারে না। বন্ধু-আপেলগাছের কথা তার বারবার মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায়, তার সেই ছোট্ট কথাটা, 'পারিস তো আমার জন্যে একটু ভালোবাসা নিয়ে আসিস।' যতবার মনে পড়ে, ততবারই যেন বুকখানা তার শিউরে ওঠে। মন তার আকুল হয়ে বলে ওঠে, 'বলো, বলো, কোথায় গেলে আমি ভালোবাসা পাব, আপেল-বুড়োর জন্যে একটু ভালোবাসা?'
উত্তর পায় না জয়। তবু সে উড়ে যায় আর ভাবে, না-জানি শীতের বুড়ি নিঃসঙ্গ ওই আপেলগাছকে এখন কত কষ্ট দিচ্ছে। সে-কথা যত ভাবে, ততই তার কষ্ট হয়!
পাখি উড়ছে দলে দলে, সকাল থেকে দুপুর। সময় বয়ে যায়। হারিয়ে যায় একটি-একটি চেনা পথ, চেনা দেশ। উড়তে উড়তে সন্ধ্যা নামে। সূর্যের সোনা-রঙে আকাশ ছেয়ে যায়। একটু পরেই আঁধার নামবে। তারপরেই ঘুমের রাত নেমে আসবে ওই অসংখ্য পাখির চোখেও।
সত্যি রাত এল।
পাখিদের ক্লান্ত ডানাগুলি গাছে গাছে স্থির হয়ে থেমে যায়। সামনে শুধু গাছ। কত গাছ। তারই একটি ডালে বসে বসে জয় আকাশের দিকে চেয়ে থাকে। ঘুম আসে না চোখে। মন তার অস্থির হয়ে বারবার বলে ওঠে, 'রাতের আঁধার কী আজ একটু তাড়াতাড়ি আকাশ থেকে মুছে যাবে না?'
আর একটি পাখি, সে-ও ঘুমোয়নি। সে-ও বসে ছিল জয়েরই পাশে, আর-একটি ডালে। সেই পাখিটি অনেকক্ষণ ধরে দেখছিল জয়কে। কী জানি, কী মনে হয়েছিল তার, হঠাৎ জয়কে জিজ্ঞেস করল, 'এখনও জেগে আছ?'
জয় থতমত খেয়ে গিয়েছিল অচেনা পাখির গলা শুনে। চকিতে তার দিকে ফিরে তাকাল জয়। অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা না-গেলেও জয় বুঝতে পারল, পাখিটি তারই মতো ছোট্ট। পাখিটি বলল, 'আমার নাম টুটু। যদি আপত্তি না-থাকে তোমার নামটা জানতে পারি কি?'
'জয়।'
টুটু জিজ্ঞেস করল, 'অনেকক্ষণ থেকে জেগে আছ। ঘুমোবে না?'
জয় উত্তর দিল, 'ঘুম পাচ্ছে না।'
টুটু আশ্চর্য হল। বলল, 'আজ এতটা পথ এসেছ, ঘুম তো পাবারই কথা। আমি তো ঘুমিয়েই পড়েছিলুম। তোমার ডানার শব্দে আমার আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। কাল আরও অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। ঘুমিয়ে পড়ো। নইলে শরীর বইবে না।'
জয় কোনও উত্তরই দিতে পারল না।
টুটু নামে সেই পাখিটি আবার বলল, 'যদি কিছু মনে না-করো, একটা কথা জিজ্ঞেস করব?'
'কী কথা?'
'শরীরটা কি তোমার ভালো নেই?'
মুখটা নিচু করল জয়।
টুটু খুবই ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল জয়ের কাছে। বলল, 'আমি কি তোমায় সাহায্য করতে পারি?'
'অনেক ধন্যবাদ। আমার শরীর ঠিকই আছে,' উত্তর দিল জয়।
'কিন্তু তোমার যে একটা কিছু হয়েছে, এটা তুমি নিশ্চয়ই স্বীকার করবে?' টুটু যেন জয়ের খুব আপনজনের মতো কথাটা জিজ্ঞেস করল।
জয় আবার চুপ করে রইল।
'কী কষ্ট হচ্ছে তোমার, আমায় বলতে পারো না?' টুটু জিজ্ঞেস করল।
উত্তর দিতে দোনোমনো করল জয়।
টুটু বলল, 'অবিশ্যি অসুবিধে থাকলে বোলো না। তবে এটা ঠিক, আমাকে বিশ্বাস করে বললে, আমি তোমার ক্ষতি করব না। আমায় বন্ধু ভাবতে তুমি দ্বিধা করলে, আমি দুঃখ পাব।'
হঠাৎ যেন একঝলক খুশি জয়ের মুখে উছলে উঠল।
টুটু আবার বলল, 'এখন অনেকদিন একসঙ্গে থাকতে হবে আমাদের। প্রত্যেক বছর আমাদের এই অভিযানে কত বিপদ আসে, কত কষ্ট। আমরা যদি অন্যকে বন্ধুর মতো না-দেখি, বন্ধুর কষ্টে যদি এগিয়ে না-আসি, তবে আকাশের নীচে এই পৃথিবীতে একসঙ্গে বেঁচে থাকার মানে আছে?'
তার কথা শুনে কী যে ভালো লাগল। জয়ের সমস্ত মনটা যেন নিমেষে ভরে গেল। সে আর চুপ করে থাকতে পারল না। বলল, 'এ-সময়ে হঠাৎ তোমার মতো বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের কথা। আমার সব কথা তোমাকে আমি নিশ্চয়ই বলব। জানি না, সেসব কথা শুনে তুমি আমায় কী ভাববে!'
'কিচ্ছু ভাবব না। তুমি নিশ্চিন্তে বলতে পারো।'
'তবে শোনো,' জয় বলল, 'আমার এক বন্ধুর কথা ভেবে আমি বড়ো কষ্ট পাচ্ছি।'
আশ্চর্য হল টুটু। জিজ্ঞেস করল, 'বন্ধুর জন্য কষ্ট পাচ্ছ? কে তোমার সেই বন্ধু?'
'এক বুড়ো-আপেলগাছ।'
টুটু আরও অবাক হল, 'আপেলগাছ! কী হয়েছে তার?'
জয় বলল, 'আমার সেই বুড়ো-আপেলগাছ এখন বড়ো একা। তার কাছে কেউ যায় না, তাকে ভালোবাসে না। কেউ চেয়েও দ্যাখে না তার দিকে। কেন-না, তার না-আছে সবুজপাতার জৌলুস, না-যৌবনের খুশির ছোঁয়া। এখন শুধু তার দেহে শুকনো ডালপালাগুলো এধার-ওধার ছড়িয়ে-ছিটিয়ে লিকলিক করছে। দেখে আমার বড্ড কষ্ট হল। তাকে গান শোনালুম। তার ডালে-ডালে নেচে নেচে তাকে আনন্দ দিলুম। আর বললুম, কেউ না-থাক, আজ থেকে আমি তোমার বন্ধু। তারপর দেশ ছেড়ে যাবার আগে তার কাছে যখন বিদায় চাইলুম, দুঃখে তার বুক ভরে গেল। আমিও পারলুম না। আমারও চোখ ছলছলিয়ে উঠল।' বলতে বলতে জয় থামল। তার গলা কাঁপছে। অন্ধকারে দেখা গেল না, হয়তো তখন তার চোখেও জল গড়িয়ে পড়ছে।
সামলে নিল জয়। তারপর আবার বলল, 'এক কঠিন কাজ সে আমায় দিয়েছে।'
টুটু জিজ্ঞেস করল, 'কী কাজ?'
'দূর-দেশ থেকে ফেরার সময় তার জন্যে আমায় একটু ভালোবাসা নিয়ে যেতে বলেছে।'
'ভালোবাসা!' চমকে উঠল টুটু।
'আমি তাকে কথা দিয়েছি। কিন্তু আমি তো জানি না, কোথায় গেলে ভালোবাসা খুঁজে পাব?' বলে টুটুর দিকে চাইল জয়। জিজ্ঞেস করল, 'তুমি জানো?'
কিন্তু টুটুর মুখ দিয়ে ছোট্ট একটি শব্দ অস্ফুটস্বরে বেরিয়ে এল, 'না।'
'হায়!' হতাশায় দীর্ঘশ্বাস পড়ল জয়ের।
এবার টুটুর গলার স্বর স্পষ্ট হল। সে বলল, 'হতাশ হোয়ো না বন্ধু। আমি আছি তোমার সঙ্গে। আমরা দুজনে একসঙ্গে আপেল-বুড়োর জন্যে ভালোবাসা খুঁজে বেড়াব। এসো, এখন ঘুমিয়ে পড়ি।'
বন্ধুর আশ্বাস শুনে খুশিতে ভরে গেল জয়ের মন। এখন সে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে। অন্তত একটা কথা সে তো এখন জানে যে, এই মুহূর্তে সে আর একা নয়। তার মনের কথা বলার মতো একজন বন্ধু তো সে এখন পেয়েছে। সে-বন্ধু তারই মতো আর-এক পাখি। ছোট্ট, সুন্দর। সুতরাং ঘুমিয়ে পড়েছিল জয়। ভারি নিশ্চিন্ত, স্বস্তির ঘুম।
জয়ের যখন ঘুম ভাঙল, আকাশে তখনও তেমন আলো ফোটেনি। কিন্তু আলোর খবর পৌঁছে গেছে পুব দিকে। চোখ চাইতেই সে দেখল, অসংখ্য পাখির সকলেই জেগে উঠেছে। টুটুও জেগেছে। সে জয়ের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে আর হাসছে। চোখে চোখ পড়তেই সে জিজ্ঞেস করল, 'কী, ঘুম ভাঙল?'
'ঘুমিয়ে পড়েছিলুম,' জয় উত্তর দিল। যেন একটু একটু লজ্জা পেয়েছে সে।
টুটু বলল, 'আকাশে আর-একটু আলো ফুটলে মাটিতে নেমে পেট ভরে খেয়ে নিতে হবে। চেয়ে দ্যাখো, জায়গাটা বেশ ভালো। মনে হচ্ছে অনেক পোকামাকড় পাওয়া যাবে। আজই আমাদের দক্ষিণের সমুদ্র ধরার জন্য পাড়ি দিতে হবে।'
জয় বলল, 'ও, তাহলে আজই সেই তেপান্তরের মাঠ পেরোতে হবে আমাদের?'
'বলতে পারো তেপান্তর,' উত্তর দিল টুটু, 'তবে, এ-যুগে তো আর সেই তেপান্তর নেই, সেই রূপকথার রাজপুত্রের তেপান্তর।'
জয় বলল, 'হ্যাঁ, এ-তেপান্তরের হাল আমার জানা আছে। আমি তো আর এই প্রথম দক্ষিণে যচ্ছি না। ক-বছর আগে আমি মায়ের সঙ্গে প্রথম যাই দক্ষিণে বন-সবুজের দ্বীপে। সে-বার দক্ষিণে সেই দ্বীপে আমার দুটি ভাই হয়েছিল। আমারও জন্ম সেই দক্ষিণে।'
টুটু বলল, 'তুমি দেখছি আমারই মতো।'
কথা বলতে-বলতেই আলো ফুটে উঠল। পাখিরা খাবারের খোঁজে তল্লাশি শুরু করে দিল। উঃ! কী কিচির-মিচির হুল্লোড়। জায়গাটা একটা মস্ত জলার ধারে। তখনও সেই মস্ত জলার ঝকঝকে জলে দু-একটি শালুকফুল উঁকি মারছে।
টুটু বলল, 'জয়, খাবার খুঁজতে-খুঁজতে যেন অন্যমনস্ক হোয়ো না। একটু নজর রেখো চারদিকে। গতবছর এইখানেই আমাদের মারবার জন্যে বন্দুক ছুড়েছিল পাখি-শিকারির দল।'
আঁতকে উঠল জয়। বলল, 'হ্যাঁ, মনে আছে মনে আছে! বন্দুকের গুলিতে আমাদের দলের অনেক পাখি মারাও গিয়েছিল এইখানে।'
টুটু বলল, 'কে জানে, এবারও কেউ লুকিয়ে লুকিয়ে তাক কষছে কিনা!'
অবশ্য এবার আর তেমন কিছু হল না।
খাবারের পালা চুকে গেলে, সেই জলার ধার ছেড়ে এবার পাখিরা আবার আকাশপথে পাড়ি দিল। চলল সেই তেপান্তরের মাঠের দিকে।
সত্যি, মাঠটা ভীষণ বড়ো। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে নজরই যায় না। ওরা জানে, এই মাঠটা পেরোতে অনেকটা সময় চলে যাবে। মাঠ তো মাঠ, সত্যিই খাঁখাঁ করছে। খাবারের কথা ছেড়ে দাও, মাথা খুঁড়লে একফোঁটা জল পর্যন্ত পাবে না। এমনকী, একটু যে জিরিয়ে নেবে, তেমন একটি গাছেরও টিকি দেখতে পাবে না। অবিশ্যি মাঠের সেই শেষপ্রান্তে একটা ছোট্ট পুকুরমতো আছে। সেখানেই যা একটু জল পাওয়া যায়। খুব তেষ্টা পেলে ওই পুকুরেই গলা ভিজিয়ে নিতে পারো। ইচ্ছে করলে চান করে গাটাও ঠান্ডা করে নিতে অসুবিধে নেই।
এখন আকাশ-ভর্তি আলো। আকাশের প্রায় মাঝ-বরাবর চলে এসেছে সূর্য। অসংখ্য উড়ন্ত পাখির গায়ে গায়ে আলোর ঝিলিমিলি। পাখিদের ছায়া পড়েছে মাঠের ওপর। সেই ছায়া দেখে মনে হচ্ছে, নকশা-কাটা একটা মস্ত কার্পেট মাটির ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। পাখিদের কোনও ক্লান্তি নেই। তাদের ডানাগুলি খুশিতে উঠছে-নামছে। কেউ কেউ হাওয়ায় ভাসছে, কিংবা দুলছে। একদল কলতান শুরু করলে, আর একদল আনন্দে গান শুরু করে দেয়।
টুটু বলল, 'সবাই কী খুশি দ্যাখো জয়!'
'দেখছি তাই।' জয় উত্তর দিল।
টুটু আবার বলল, 'তোমার ভালো লাগছে না?'
'খুব,' উত্তর দিল জয়, 'দলবেঁধে নতুন দেশে পাড়ি দিতে কার না ভালো লাগে বলো? তবে আমার বারবার সেই আপেল-বুড়োর কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। জানি না, এই শূন্য আকাশে উড়তে উড়তে কোথায় তার জন্যে ভালোবাসা খুঁজে পাব।'
'জয়,' হঠাৎ কেমন যেন এক আতঙ্ক-জড়ানো গলায় চিৎকার করে ডাক দিল টুটু।
চমকে উঠল জয়, 'কী হল?'
'দেখতে পাচ্ছ?' টুটুর গলায় ভীষণ উত্তেজনা।
'কী?'
টুটু যেন আর্তনাদ করে উঠল, 'একঝাঁক বাজপাখি। আমাদের আক্রমণ করতে আসছে!'
সত্যিই, কী ভয়ংকর দ্রুতগতিতে বাজপাখির ঝাঁক ছোঁ-মারার জন্যে গোঁত দিচ্ছে। আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল পাখির দলের ওপর। আশ্চর্য, এতক্ষণ কেউ খেয়ালও করেনি। এমন অতর্কিতে আক্রমণ করল যে, সবাই হতবাক হয়ে গেছে। তাদের সেই কলতান মুহূর্তে যেন আর্তনাদ হয়ে উঠল। হাজার-হাজার পাখি নিজেদের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে প্রাণপণ ছোটাছুটি লাগিয়ে দিল। সমস্ত দলটা চোখের নিমেষে ভেঙে ছত্রখান হয়ে গেল। যারা পারল পালাল। যারা, পারল না, ধরা পড়ল। বাজপাখির খোঁচা-খোঁচা নখ ততক্ষণে তাদের খামচে ধরেছে। খানিক চিৎকার করে, নিশ্চুপ হয়ে গেল তারা চিরদিনের মতো।
আকাশে তো আর লুকোবার জায়গা নেই! সুতরাং মরো, না-হয় মরার জন্যে চরকি খাও। জয় আর টুটুরও এই অবস্থা। কখনও মৃত্যুর নাগালের কাছাকাছি এসে পড়ছে, আবার কোনোও রকমে বাঁচছে। এমনি করতে করতে প্রাণপণে ছুট দিল তারা যেদিকে পারল। বাজপাখির হিংস্র দৃষ্টি এড়িয়ে তারা বাঁচল বটে, কিন্তু দলছুট হয়ে কোনদিকে যে হারিয়ে গেল, বোঝা গেল না। রক্ষে এই, জয় আর টুটু কেউ কারও কাছছাড়া হয়নি। দুজনেই বেঁচে আছে। কিন্তু কতক্ষণ আর এমনি করে বেঁচে থাকবে। এখনও তারা আকাশে ছুটছে। তারা জানে, যেকোনোও মুহূর্তে আবার ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে বাজপাখি। সুতরাং যত শক্তি আছে সব শক্তি দিয়ে উড়ে পালাও।
আর বোধহয় বেশিক্ষণ তারা উড়তে পারবে না। কেননা, ভয় যখন দু-হাত দিয়ে গলাটা টিপে ধরে তখন তো বুকের নিশ্বাস আপনাআপনি স্থির হয়ে যায়। সুতরাং, এখনই তাদের থামতে হবে। থামবার আগে চট করে একবার পিছু ফিরে দেখার চেষ্টা করল টুটু, শত্রু কত দূরে! কিন্তু পিছু ফিরে থমকে গেল টুটু। আঁতকে চিৎকার করে উঠল, 'জয়।'
জয়ও ফিরে তাকাল। দেখল, পেছনের আকাশ শূন্য। তাদের সেই হাজার হাজার সঙ্গীর একজনও দেখা গেল না। এমনকী, সেই নৃশংস বাজপাখির একটাও নজরে পড়ল না।
হাঁপাতে হাঁপাতে টুটু অতিকষ্টে বলল, 'আমরা দলছুট হয়ে অন্যদিকে ছিটকে এসেছি।'
বেদম হয়ে কথা বলতে জয়ের ভারি কষ্ট হচ্ছে। তবু কোনওরকমে ঢোক গিলতে গিলতে জিজ্ঞেস করল, 'বাজপাখি কি সকলকেই মেরে ফেলল?'
টুটু উত্তর দিল, 'কী জানি।'
'এখন কী হবে তাহলে?' জয়ের যেন দম আটকে আসছে।
'তাও জানি না।'
আর কোনও কথা বলার শক্তি নেই দুজনেরই। চুপচাপ।
কিন্তু উড়তে উড়তে জয়ের ডানা দুটো যেন হঠাৎ আড়ষ্ট হয়ে আসছে। যেন টলে পড়ছে জয়। বুঝি এক্ষুনি আকাশ থেকে ছিটকে পড়ে! তাই দেখে চেঁচিয়ে উঠল টুটু, 'কী হল জয়?'
'সমুদ্র আর কত দূর?' অতিকষ্টে প্রশ্ন করল জয়।
'এখনও অনেক দূর,' উত্তর দল টুটু। বলল, 'আজ আর বোধহয় পৌঁছোতে পারব না।'
টুটর কথাটা শেষ হতে না-হতেই আচমকা দেখা গেল, আকাশের ওই ওপর থেকে জয় একটা ঢেলার মতো মাটিতে গোঁত খেয়ে পড়ে যাচ্ছে। দেখার সঙ্গে সঙ্গে টুটু গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'জয…'
জয় ততক্ষণে মাটিতে পড়ে গেছে। অবশ্য শেষমুহূর্তে, আপ্রাণ চেষ্টা করে ডানাটা হাওয়ায় মেলে ধরেছিল জয়। তাই আঘাত তেমন লাগল না। কিন্তু নির্জীব হয়ে মাটিতে সে লুটিয়ে পড়ল। দম বুঝি এক্ষুনি ফেটে পড়ে।
চোখের পলকে টুটুও নেমে এসেছে। একেবারে জয়ের কাছে। ভীষণ ভয় পেয়ে গেল টুটু। কারণ, যেখানে জয় পড়েছে, সেখানে না-আছে গাছ, না-ঘাস। খটখটে শুকনো একটা ফাঁকা জায়গা। কেউ দেখে ফেললে, আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আর সত্যি সত্যি যদি কেউ দেখে ফেলে, তবে নির্ঘাত বিপদ। এই বিপদের কথা মনে হতেই সে যে কী করবে আর না-করবে, কিছুই ঠাওর করে উঠতে পারে না। একবার যদি জয়ের দিকে তাকায়, তো পাঁচবার সে এদিক-ওদিক ফিরে দেখে। না, কেউ নেই। উৎকণ্ঠায় মুখ তার এইটুকু হয়ে গেছে। অবশ্য সে ইচ্ছে করলে এক্ষুনি পালাতে পারে। এমনকী ইচ্ছে করলে নিজে লুকিয়ে থাকার মতো একটা জায়গাও খুঁজে বার করতে পারে। কিন্তু সে-কথা টুটু এখন ভাবতেই পারে না। জয় তার বন্ধু। এই বিপদের সময় যে বন্ধুকে ফেলে পালায়, তাকে শয়তান ছাড়া আর কী বলা যায়। হতে পারে টুটু একটা ছোট্ট পাখি। তাই বলে তার মনটা তো আর ছোট্ট নয়। সুতরাং ক্ষণেক দেরি না-করে, জয়কে তার দুটি ডানা দিয়ে আড়াল করে জড়িয়ে রাখল। জয় তখনও হাঁপাচ্ছে। হাঁপাচ্ছে টুটুও। তবু সব ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলে, টুটু জয়ের বুকটা নিজের শরীরের উত্তাপে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করতে লাগল। নিজের বন্ধুকে বাঁচানোর জন্যে, এখন টুটুকেই যদি কেউ মারে, ক্ষতি নেই। তার প্রাণের বদলে বন্ধু যদি বাঁচে, তার চেয়ে বেশি আর কী চাইবে, ওই ছোট্ট পাখি টুটু!
ভয়ে আর ভাবনায় অনেকক্ষণ কেটে গেল।
'টুটু!' হঠাৎ ডাকল জয়। নিস্তেজ গলার স্বর।
টুটু প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল জয়ের ডাক শুনে। অবাক চোখে তার দিকে খানিক চেয়ে জিজ্ঞেস করল, 'এখন ভালো বোধ করছ?'
'ভালো,' জয় উত্তর দিল।
হ্যাঁ, জয়ের বুকের ওপর থেকে ডানা দুটি সরিয়ে নিয়ে টুটু দেখল, সত্যি, জয় এখন আর হাঁপাচ্ছে না। একটু বিশ্রাম নিয়ে বেশ খানিকটা সামলে নিয়েছে নিজেকে। ব্যস্ত হয়ে টুটু জিজ্ঞেস করল, 'উড়তে পারবে?'
'আর একটু বসলে কোনও অসুবিধে আছে?' জয় প্রশ্ন করল।
'অসুবিধে নেই। তবে জায়গাটা একদম ফাঁকা। বলা যায় না কিছু,' টুটু উত্তর দিল।
'আমার জন্যে তুমি কেন বিপদ মাথায় নাও! তুমি বরং একটু আড়াল খুঁজে লুকিয়ে পড়ো। আমার যা হয় হবে।'
জয়ের একথা শুনে টুটু হয়তো একটু ব্যথা পেল। বলল, 'ছিঃ, ছিঃ! তুমি এ কী বলছ জয়? তোমার দুঃসময়ে, তোমাকে ফেলে রেখে আমি পালাব? তুমি না আমার বন্ধু! মরতে হয় তো দুজনেই মরব।'
বুঝি-বা জয়ের চোখের পাতা দুটি ছলছল করে উঠল টুটুর এই কথা শুনে। সে চুপ করে রইল। মনে মনে ভাবতে লাগল, এর নামই কী ভালোবাসা?
একটু পরেই জয় উঠতে পারল। একটু পরে সে হাঁটতেও পারল। ডানা ছড়িয়ে তুড়ুক-তুড়ুক সে লাফাতে পারল। তারপরে বলল, 'টুটু, এবার আমি উড়তে পারব।'
'পারবে?' খুশিতে উছলে গেল টুটুর মুখখানি।
'হ্যাঁ, পারব। কিন্তু আমরা যাব কোথায়? আমরা যে দল-ছাড়া হয়ে গেছি!' জিজ্ঞেস করল জয়।
'ভয় নেই জয়। আমাদের যেতে হবে দক্ষিণে। দক্ষিণের পথ তো আমরা চিনি। যেতে-যেতে আমরা নিশ্চয়ই আবার সবাইকে দেখতে পাব।' উত্তর দিল টুটু।
'কিন্তু আকাশটা দেখতে পাচ্ছ টুটু?' জিজ্ঞেস করল জয়।
টুটু আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে।'
'আঁধার নামলে তখন কী হবে?'
টুটু বলল, 'মনে হচ্ছে আজ আমাদের এখানেই কোথাও রাত কাটাতে হবে।'
'থাকার জায়গা তো কোথাও দেখছি না,' উত্তর দিল জয়।
'এসো, দেখি। কোথাও আশ্রয় দেখতে পাই কিনা! উড়তে পারবে তো?' টুটু জিজ্ঞেস করল।
'হ্যাঁ পারব,' বলে জয় ডানা মেলে দিল আকাশে।
টুটুও ফুড়ুত করে জয়ের পাশে উড়ে গেল। টুটু উড়তে উড়তে চেঁচিয়ে উঠল, 'ওদিকে নয়। এদিকে এসো। চলো, দক্ষিণ দিকেই এগিয়ে যাই।'
জয় দক্ষিণ দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল, 'ঠিক বলেছ। যতটা এগিয়ে থাকা যায়।'
তারপর দুজনেই নিশ্চুপ। ওদের উড়ন্ত ডানায় মৃদু হাওয়ার স্পর্শ লেগে শনশন শব্দ ভেসে আসছে শুধু। ওদের চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। কখনও শূন্য আকাশের এদিক-ওদিক চোখ ঘুরছে-ফিরছে, আবার কখনো আশ্রয়ের জন্য নীচে চোখ মেলে ধরছে।
হঠাৎ জয় কথা বলল, 'তোমাকে কষ্ট দিলুম।'
'কীসের কষ্ট?' জিজ্ঞেস করল টুটু।
'তুমি না-থাকলে আমি হয়তো বাঁচতুম না,' জয়ের উত্তর।
'আমিও তো বলতে পারি, তুমি ছিলে বলে ওই হিংস্র বাজপাখির কবল থেকে আমি বেঁচেছি।' জবাব দিল টুটু।
'বাজের যেন আমাদের দেখলেই যত খিদে পায়, তাই না টুটু?'
টুটু বলল, 'আর যে কত রকমের শত্রু আমাদের চারপাশে সবসময় ঘুরঘুর করছে। কেউ আমাদের রক্ত খেয়ে পেট ভরাতে চায়। কেউ আমাদের বন্দুক ছুড়ে খুন করতে চায়। কেউ অতর্কিতে জাল ছুড়ে আমাদের ধরে হাটে হাটে ব্যাবসা করে বেড়ায়। কেউ খাঁচায় বন্দি করে আমাদের পোষ মানায়।'
'এরা সব শয়তান, চোর,' জয়ের গলা ঝাঁঝিয়ে ওঠে।
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ,' উত্তর দিল টুটু, 'জানো আমি একবার এই রকম এক পাখি-চোরের হাতে প্রায় ধরা পড়েছিলুম!'
যেন আঁতকে উঠল জয়, 'এঁঃ, বলো কী!'
'ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছি,' বলে একটু থেমে টুটু আবার বলল, 'হ্যাঁ ভাগ্য তো বটেই, কিন্তু আমাদের সাহসের জোরটাও কম ছিল না।'
'কী রকম?' খুব উদগ্রীব হয়ে জয় জিজ্ঞেস করল।
'তবে শোনো,' উড়তে-উড়তেই বলতে শুরু করল টুটু, 'সেবার অন্য আর-একটা দলের সঙ্গে ঠিক এমনি করে আমি গরমের দেশে যাচ্ছিলুম। আমরা ঠিক করেছিলুম, প্রথম দিনই নদী পেরিয়ে সন্ধের আগেই বনে আশ্রয় নেব। বনের দূরত্ব ছিল অনেকটা, আর হাওয়া বইছিল আমাদের বিপরীত দিকে। কাজেই বেশ কষ্ট করে হাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের এগিয়ে যেতে হচ্ছিল। পথটা হবে প্রায় তিনশো মাইল। এ তো আর এমন কিছু নয়। ঘন্টায় ষাট-সত্তর মাইল বেগে উড়তে তো আমরা সহজেই পারি। সুতরাং পাঁচ-ছ-ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাবার কথা। মাঝে আবার পেটে কিছু দেবার জন্যে একটা জলা জায়গায় কিছুক্ষণ থামতে হল। খেয়েদেয়ে আবার পাড়ি। নদী পেরোলুম, বনেও ঢুকলুম। অবশ্য হাওয়ার জন্যে সময় একটু বেশিই লাগল। আমাদের দলের পাখিরা যদি এই পথটুকু আসতে কিছুটা কাহিল হয়ে থাকে, তবে সেটা এমন কিছু অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। তারা বিশ্রাম নেবার আশায় গাছে গাছে তড়িঘড়ি বসার জন্য এতই ব্যস্ত হয়ে উঠল যে, দেখল না পাখি-চোর আমাদের ধরবে বলে এধারে-ওধারে জাল পেতেছে। কিন্তু কী ভাগ্য, আমি দেখতে পেয়েছিলুম সেই জালের ফাঁদ। পাখির দল ফাঁদে পা দেবার আগেই আমি চিৎকার করে উঠলুম, 'বন্ধুরা সাবধান! গাছে ফাঁদ!'
'হাজার-হাজার পাখির দল আমার আচমকা চিৎকারে এমন ঘাবড়ে গেল যে, বসতে গিয়েও থমকে গেল তারা। চোখ মেলে দেখতেই তাদের হুঁশ হয়েছে। তাই তো, গাছে তো সত্যিই ফাঁদ! অমনি সঙ্গে-সঙ্গে তারাও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'সামনে ফাঁদ, সামনে ফাঁদ।' চিৎকার করতে করতে পালাবার পথ খুঁজতে লাগল। পাখি-চোরের দল ঘাপটি মেরে বসেছিল বনের আড়ালে। তাদের ফাঁদের ফাঁসটা যে আমরা নজর করে ফেলেছি, বুঝতে পেরেছিল তারা। অমনি একেবারে চোখের পলকে এধার-ওধার দিয়ে হইহই করে তারা বেরিয়ে এল। তাদের হাতে ছিল তির-ধনুক। তির ছুটল আকাশের দিকে। হাজার হাজার পাখি প্রাণের ভয়ে যে যেদিকে পারল, পালাল। যারা পালাতে পারল না, তাদের কারও বুকে, কারও চোখে, কারও মুখে তিরের ফলা আঘাত হানল। তারা লুটিয়ে পড়ছে আকাশ থেকে মাটিতে। ঠিক এই সময়ে আমার বুকখানা ভীষণ সাহসে ফুলে উঠল। আমি বুঝতে পারলুম, এখন যদি রুখে না-দাঁড়াই, তবে আরও অনেকে মরব আমরা। সুতরাং আমি চেঁচিয়ে উঠলুম, 'বন্ধুগণ, ভয় পেয়ে পালালে, আমাদের নিস্তার নেই। আমরা অনেকে এখনও বেঁচে আছি। এসো, শয়তান চোরগুলোর ওপর একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ি। পালালে মরব, শত্রুর সামনে রুখে দাঁড়ালে বাঁচব। আমরা ছোটো হতে পারি, কিন্তু আমরা সবাই এক। আমাদের শক্তি কম কীসে!'
'এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে জাদুমন্ত্রের মতো কাজ হল। সমস্ত পাখি দলে দলে সেই নচ্ছার চোরগুলোর ওপর লাফিয়ে পড়ে আঘাত হানতে লাগল। আমাদের ঠোঁটের ঠোক্করে ওদের মুখে-চোখে রক্ত ঝরে পড়ে। আমাদের নখের খোঁচায় ওদের শরীরে জ্বালা ধরে যায়। ডানার ঝাপটায় চারদিক অন্ধকার দ্যাখে। চোরের দল আমাদের এই আচমকা আক্রমণের জন্যে একদম তৈরি ছিল না। তারা তো হতভম্ব হয়ে গেছে। তারপর যখনই ব্যাপারটা তারা বুঝতে পারল, তখন লাগিয়ে দিলে প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি। জঙ্গলের মধ্যে হুলুস্থুলু কাণ্ড। আমাদের মতো ছোট্ট ছোট্ট পাখির কাছে নাস্তানাবুদ হয়ে সেই চোর-বাহাদুরের দল আর দাঁড়ায় সেখানে! যে যেদিকে পারল, মারল ছুট। 'ভাগ, ভাগ!' ওঃ! তারপর আমাদের সে কী আনন্দে চিৎকার শুরু হয়ে গেল। আমি নিজে এমন উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলুম যে, একটা চোরকে একা পেয়ে তার পেছনেই একাএকা লড়ে গেলুম। ব্যাস! একেবারে বোকার মতো কাজটা করে বসলুম। দল বেঁধে তাড়া করা এক। আর আমার মতো একটা ছোট্ট পাখির ওই জাঁদরেল চোরটার সঙ্গে লড়াই করা একেবারে অন্য ব্যাপার। চোরটা যেই দেখেছে, আমি একলা, অমনি সে দাঁড়িয়ে পড়েছে। তার হাতে যে একটা জাল, এটা আমি একদম লক্ষ করিনি। আমি যেই তার মাথায় ঝাপটা মারতে গেছি, ব্যাস, সে সঙ্গে সঙ্গে জালটা ছুড়ে দিয়েছে। যাঃ! আমি জালের ভেতর বন্দি! আমার আর পালাবার পথ নেই! ওই শক্ত জালটা ছেঁড়ার ক্ষমতা আমি আর কোথায় পাব! অগত্যা জালের ভেতর ছটফট করতে করতে আমি চিৎকার করে উঠলুম। কিন্তু বৃথাই গলা ফাটানো। লোকটা আমাকে সেই অবস্থায় জালে বন্দি করে, বনের গভীরে ঢুকে পড়ল। তারপর একটা বেশ নিরিবিলি জায়গা দেখে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে জালের ভেতর চোখ রেখে আমাকে এমন করে দেখতে লাগল, যেন এক্ষুনি গিলে খেয়ে ফেলবে। আমার ঠোক্কর খেয়ে বেচারার সারা শরীর রক্তে দগদগ করছে। তার ওই বেহাল অবস্থা দেখে, আমার এমন বিপদেও কী করে যে হাসি পাচ্ছিল, আমি এখন নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যাই। অবাক হবারই তো কথা! কেননা, তখন তো আমার প্রাণটি ওই চোরের হাতে ঝুলছে। ওই তো, দ্যাখো না, চোরবাবাজি আমাকে মারার জন্যে জালের মধ্যে হাত পুরল। আমার মনে হল, এক্ষুনি আমি দম আটকে মরে যাব। উফ! চোরের পাঁচটা আঙুল যেন জাঁতাকলের মতো আমাকে টিপে ধরেছে! আমার আর টুঁ শব্দটি করার মতো ক্ষমতা নেই। ডানা ঝাপটিয়ে, ঠোঁট উঁচিয়ে ছটফট করতে করতে ভাবতে লাগলুম, আঃ! এত কষ্ট আর সহ্য হয় না। মরতে আমার এখনও এত দেরি হচ্ছে কেন!
'এমন সময় হঠাৎ আমি যেন শুনতে পেলুম আমার সঙ্গীরা চিৎকার করছে। আমাকে বলছে, 'ভয় নেই টুটু, আমরা এসে পড়েছি।'
'আমি বুঝতে পারলুম, আমি ধরা পড়ার পর তারা চুপিচুপি ওই চোরের পিছু নিয়েছে। আমি দেখতে পেলুম, তারা চোখের পলকে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাখি-চোরের ওপর। আবার লেগে গেল ঝটাপটি। আমি তোমায় বলব কী, সেই চোরটা আর এক মুহূর্ত দেরি না-করে, আমাকে ছেড়ে দিয়ে মারল ছুট! উঃ! ঝোপঝাড়ের ভেতর দিয়ে লম্বা-লম্বা পা ফেলে দে হাওয়া।'
'আমি বেঁচে গেলুম। কিন্তু তখনও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, আমি বেঁচে আছি। আমার বুকের ভেতরটা তখন এমন তোলপাড় করছিল, মনে হচ্ছিল, তক্ষুনি বুঝি আমার বুকের নিশ্বাস থেমে যাবে।'
টুটুর কথা শুনতে শুনতে জয় যেন একেবারে বোবা হয়ে গেছে। কিছুই খেয়াল করেনি। খেয়াল করেনি, কতক্ষণ উড়েছে, কতটা এসেছে। সূর্য যে সন্ধ্যার রং ছড়িয়ে এক্ষুনি আকাশের আড়ালে মুখখানি লুকিয়ে ফেলবে, তাও নজর করার সময় ছিল না জয়ের।
গল্প শেষ করে টুটুই চেঁচিয়ে উঠল, 'এ কী, সন্ধে হয়ে গেল যে!'
জয়ের যেন তখন চমক ভাঙল, 'এঁ! তাই তো!'
টুটু বলল, 'ওই দ্যাখো, গাছ!'
'কই?'
'ওই যে, সামনে!'
'একে বলে বরাত। এক্ষুনি আকাশ আঁধারে ডুবে যাবে। যাক, একটা আশ্রয় পাওয়া গেল।' উত্তর দিল জয়।
টুটু সামনে চোখ স্থির রেখে বলল, 'মনে হচ্ছে অনেক গাছ।'
জয়ও ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। তার পর বলল, 'মনে তো হচ্ছে অনেক। তাড়াতাড়ি চলো।'
দেখতে দেখতে দুজনেই গাছের মাথার ওপর উড়ে এল। দুজনেই দেখতে পেল, চারদিকে অগুনতি গাছ। ডালে বসার আগে একটা গাছের পাতার ফাঁক-ফোকরগুলি দুজনেই একটু পরখ করে দেখে নিল। না, তেমন বিপজ্জনক কিছু নজরে পড়ছে না। দুজনেই বসে পড়ল। আঃ! কী আরাম!
জয়ই বলল, 'বেঁচে ওঠার পর এতক্ষণে বেশ একটা নিরাপদ জায়গা পাওয়া গেল। কী মনে হচ্ছে টুটু তোমার? বেশ ভালো না?'
জয়ের কথার কোনোও উত্তর না-দিয়ে টুটু জিজ্ঞেস করল, 'তোমার খিদে পাচ্ছে না জয়?'
'পেলেই-বা কী! তোমার বুঝি খুব খিদে পাচ্ছে?' বলে জয় টুটুর মুখের দিকে চাইল।
টুটু বলল, 'পাওয়াটা কিছু আশ্চর্যের নয়। সেই কখন খেয়েছি। তারপরে এই ধকল! বাববা!'
জয় জিজ্ঞেস করল, 'এখানে খাবার পাবে কোথায়?'
'আমার মনে হয়, গাছের আড়ালে আড়ালে খুঁজলে খাবার কিছু মিলে যেতে পারে। তোমার পিঁপড়ে ভালো লাগে?' টুটু প্রশ্ন করল।
'পিঁপড়ে মন্দ না। তবে আমার বেশি ভালো লাগে কেঁচো।' উত্তর দিল জয়।
টুটু হাসল। বলল, 'গাছে আর কেঁচো পাবে কোথায়? চেষ্টা করলে পিঁপড়ে পাওয়া যেতে পারে।'
'চলো তবে, তাই দেখা যাক,' বলে জয় তুড়ুক করে লাফ মেরে গাছের ওপরভাগের একটা ডাল ধরল।
দেখাদেখি টুটুও লাফাল। বলল, 'চটপট মিলে গেলে ভালো। বেশিক্ষণ খোঁজাখুঁজি করা যাবে না। দেখতে পাচ্ছ আকাশের অবস্থা? সন্ধ্যারাতের তারা ফুটতে আরম্ভ করেছে।'
'হ্যাঁ, এরপর অন্ধকারে অন্ধ হয়ে চুপটি করে ডালে বসে থাকো,' উত্তর দিল জয়।
তার পর জয় একবার এ-ডালে ওঠে, টুটু একবার ও-ডালে লাফায়। একটা দুটো পোকা দেখলেই টকাস করে কামড়ে ধরে, টুকুস করে গালে পোরে।
হঠাৎ জয় একটা অদ্ভুত প্রশ্ন করে বসল টুটুকে। বলল, 'টুটু, তুমি কোনোদিন চালভাজা খেয়েছ?'
'হ্যাঁ, একবার আমরা শখ করে চিনদেশে গিয়েছিলুম। তারপর সেখান থেকে উড়তে উড়তে বাংলাদেশ। তখন চালভাজা খেয়েছি।' উত্তর দিল টুটু।
'বেড়ে খেতে, কী বলো?'
'দারুণ।'
'তার সঙ্গে যদি আবার ছোলা, বাদাম মেখে দাও, রক্ষে নেই,' বলেই জয় ঝপ করে একটা ঝিঁঝিপোকা দুটি ঠোঁটের ফাঁকে কবজা করে ধরে গিলে ফেললে। ফেলেই আবার ওপরে উঠতে শুরু করল।
'এই, এই, সাপ!' টুটু একেবারে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছে।
টুটুর চিৎকার শুনে জয় আগুপিছু কিছু না-দেখে মেরেছে এক গোঁত গাছের ওপর থেকে নীচে। সঙ্গে সঙ্গে সাপও মেরেছে এক ছোবল। যাঃ! ফসকে গেছে! সাপের ছোবল জয়ের ঘাড়ে না-পড়ে, পড়ল গিয়ে গাছের ডালে, ঠকাস! উফ, কী বাঁচান বেঁচে গেল জয়। আর একটু হলেই জয়ের ঘাড়ে পড়েছিল সাপের ছোবল! সাপ তো শিকার ফসকে রেগে কাঁই। কী তার ফোঁসফোসানি! এই মারে তো সেই মারে! আর মারবে কাকে! দু-বন্ধু তখন গাছ ছেড়ে হাওয়া। এখন তুমি গাছের ডালে যত পারো তড়পাও! তাদের আর ধরতে হচ্ছে না।
কিন্তু এদিকে যে আর-এক কাণ্ড। আকাশের অন্ধকার যে চারদিক ঘিরে ফেলছে। কী তাড়াতাড়ি রাত নেমে আসছে পৃথিবীর কোণে কোণে! এই অন্ধকারে পাখি কতক্ষণ দেখতে পাবে! কী মুশকিল! জয় আকাশে উড়তে উড়তেই ব্যস্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, 'টুটু, তুমি আমার কাছে কাছে থাকো।'
টুটুর গলাতেও আতঙ্ক। বলল, 'এই তো, আমি তোমার কাছে কাছেই আছি। কিন্তু এরপর তো আর কিছুই দেখতে পাব না!'
জয় তেমনি ব্যস্ত হয়েই বলল, 'কিন্তু আমি সামনে একটা কী দেখতে পাচ্ছি।'
টুটু খুবই উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'কই?'
'ওই যে!'
একটু ভালো করে ঠাওর করে টুটু চেঁচিয়ে উঠল, 'জয়, মনে হচ্ছে একটা পোড়োবাড়ি।'
'তবে চলো, চলো, শিগগির চলো,' জয়ের যেন আর তর সইল না। বলল, 'আজ রাতটা কোনোরকমে ওই পোড়োবাড়িতেই কাটাতে হবে।'
'ঠিক বলেছ,' বলে টুটু জয়ের সঙ্গে তিরবেগে উড়ে এসে একটা পাঁচিলের ওপর নেমে পড়ল। নেমে, সুড়ুত সুড়ুত করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দুজনেই ভাঙা-কড়িকাঠের ফোকরে সেঁধিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল যেন! উফ!
ঘরে ঢুকে জয়ও কথা বলে না, টুটুও চুপ। দমটাকে সামলাতে কিছুক্ষণ অন্তত চুপচাপ থাকাই ঠিক। ঝামেলার যেন শেষ নেই। একটার পর একটা লেগেই আছে। যাক! এখন তো কিছুটা নিশ্চিন্তি!
অনেকক্ষণ পর জয়ের মুখেই প্রথম কথা ফুটল, 'টুটু, অন্ধকারে তোমাকে দেখা যাচ্ছে না।'
'আমি তোমার পাশে, এই তো!'
জয় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল, 'যাক বাবা! মনে হয় রাতটা বেশ ভালোই কাটবে, কী বলো?'
টুটু উত্তর দিল, 'বলা যায় না। যেভাবে একটার পর একটা অঘটন ঘটছে!'
'সত্যি! দলছাড়া হয়ে আমরা দুজনে এখন যে কোথায় যাব, কী করব, কিছুই জানি না। আবার সবাইকে খুঁজে পাব কিনা, তারও কিছু ঠিক নেই।' কেমন যেন হতাশার সুর জয়ের গলায়।
'যত নষ্টের গোড়া বাজপাখির দল।' উত্তর দিল টুটু।
'ঠিক বলেছ। কী ভয়ংকর হিংসুটে চেহারা!'
'শুধু হিংসুটে বলছ কেন, বলো খুনি, রক্তপিশাচের দল।' টুটুর কণ্ঠ যেন ক্ষিপ্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল।
'হুশশ। হুশশশ।' এই রে, ঘরের ভেতরে যেন মানুষের গলার স্বর! টুটু আর জয়ের গলা শুনে তাড়া দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
জয় আর টুটু দুজনেই থতমত খেয়ে গেছে। দুজনেই একদম চুপ। দেখা গেল, ঘরের মধ্যে হঠাৎ যেন একটা ছায়া নড়েচড়ে উঠল। মনে হল উঠে দাঁড়াল। ওপর দিকে তাকাল। আচমকা হাঁক পাড়ল, 'গণেশ।'
ব্যাস। এক হাঁকেই দুই পাখির আত্মারাম খাঁচাছাড়া! তাদের আর একচুল বুঝতে বাকি রইল না যে, ঘরের মধ্যে একজন মানুষ হাঁক পেড়েছে।
'এই গণেশ,' কোনোও সাড়া না-পেয়ে আবার চেঁচাল লোকটা।
'যাই বাবু।'
'লণ্ঠনটা নিয়ে আয়।'
'আসছি এক্ষুনি।' বলে দেখতে-দেখতে লণ্ঠন হাতে গণেশ ঢুকল। ঘরে আলো ছড়িয়ে পড়ল। দেখা গেল গণেশের বাবু বিছানায় শুয়ে শুয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। ঘরের ভেতর পাখির ক্যাঁচ-ক্যাঁচানিতে ঘুমের ব্যাঘাত হয়েছে। তাই ঘরে গণেশ ঢুকতেই তিনি বললেন, 'দ্যাখ তো, মনে হচ্ছে ঘরে পাখি ঢুকেছে।'
অমনি গণেশ নামে সেই লন্ঠন-হাতে লোকটা, লন্ঠনটা ওপরে তুলে ড্যাবড্যাব করে ঘরের আনাচেকানাচে লক্ষ করতে লাগল।

হঠাৎ সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক যা ভাবা, কড়িকাঠে তার নজর পড়ে গেছে। সে দেখতে পেয়েছে জয় আর টুটুকে। দুটিতে ঘাপটিমেরে বসে আছে। দেখতে পেয়েই গণেশ চেঁচাল, 'আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর, ঘরে দুটো রংচঙে পাখি ঢুকেছে। দারুণ দেখতে!'
লোকটা বলল, 'কই রে?'
'আজ্ঞে, ওই যে কড়িকাঠে।'
'তাই তো! কোত্থেকে এল বল তো?'
'মনে হয় তাড়া খেয়ে ঢুকে পড়েছে।'
'দ্যাখদিকিনি ধরতে পারিস কিনা।'
'হ্যাঁ-হ্যাঁ, খুব পারব,' বলে সেই গণেশ নামে লোকটা লন্ঠনটা মাটিতে রেখে, একটা অ্যায়সা লম্বা লাঠি নিয়ে কড়িকাঠে খোঁচা দিলে। বুঝতেই পারছ, জয় আর টুটুর অবস্থা! তখন তো গাঢ় অন্ধকার। সুতরাং তখন পাখির চোখেও আলো নেই। খোঁচা খেয়ে দুজনেই প্রাণ বাঁচাতে অন্ধকারেই চরকি খেতে লাগল। যে-পথ দিয়ে তারা সেই ঘুরে ঢুকেছিল, অন্ধকারে সে-পথের হদিস তারা কেমন করে খুঁজে পাবে? উড়তে উড়তে এ-দেওয়ালে, ও-দেওয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে, ঝাপটা মারছে. ছিটকে পড়ছে।
হু-ই-ই দ্যাখো, জয় পথটা দেখতে পেয়েছে। জয় চেঁচিয়ে উঠল, 'টুটু, এদিক দিয়ে পালিয়ে এসো!'
জয় পালাল। কিন্তু টুটু পারল না। বেচারা বেদম হয়ে দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পড়ল ঘরের কোণে। ধরা পড়ে গেল গণেশের হাতে।
গণেশ চেঁচিয়ে উঠল, 'ধরেছি বাবু।'
বাবু জিজ্ঞেস করল, 'আর একটা?'
'দেখতে পাচ্ছি না।'
'দ্যাখ, এখানেই আছে কোথাও।'
গণেশ তখন বাবুর কথামতো এক হাতে টুটুকে চিপটে ধরে হাঁপাহাঁপি করে জয়কে খুঁজতে লাগল। কিন্তু পাবে কোথায়? সে তখন বাইরে বেরিয়ে দে-চম্পট!
গণেশ যখন খুঁজতে খুঁজতে হালাক হয়ে গেছে, তখন গণেশের বাবু বলল, 'যাক গে, ছেড়ে দে। আর খুঁজতে হবে না। মনে হয় পালিয়েছে।'
তখন গণেশ বলল, 'তাহলে এখন এটাকে নিয়ে কী করি? কোথায় রাখব, খাঁচাটাচা তো নেই।'
'একটা কিছু চাপা দিয়ে রাখ!'
গণেশ বলল, 'চাপা দেবারই বা কী আছে। একটা টিনের ক্যানেস্তারা আছে, তা ফুটোফাটা। চাপা দিয়ে রাখলে পালাবে।'
লোকটা বলল, 'তাহলে এক কাজ কর, দড়ি দিয়ে ঠ্যাং বেঁধে ক্যানেস্তারার ভেতরে ফেলে রাখ। তারপর সকালে দেখা যাবে।'
'সেই ভালো,' গণেশ সায় দিল। তারপর সত্যি সত্যি টুটুর ঠ্যাং বেঁধে ক্যানেস্তারায় চাপা দিয়ে রাখল।
টুটু অবশ্য ঘাড়-ঠ্যাং ছুড়ে ডানা ঝাপটে গণেশের হাত ফসকে পালাবার অনেক চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। মানুষের মুঠির ভেতর থেকে পালানো অতই সহজ! অগত্যা টুটু অন্ধকার রাতে, পোড়োবাড়ির ভাঙাঘরে টিনের ভেতর পড়ে-পড়ে কোঁকাতে লাগল। জানতেও পারল না জয় কোথায় লুকিয়ে পড়েছে।
সারারাত ছটফট করেছে টুটু ক্যানেস্তারার ভেতর। আর ওদিকে গোটা রাতটা পোড়োবাড়ির বাইরের ঝোপে লুকিয়ে-লুকিয়ে জয় ভেবেছে, রাত কাটতে আর কত দেরি!
তারপর সত্যি যখন রাত গড়িয়ে ভোরের আলো আকাশে ছড়িয়ে পড়ব পড়ব করছে, তখন জয় ঝোপের ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল। সে জানে না টুটুর কী হয়েছে। সারারাত কী উৎকণ্ঠায় কেটেছে তার। তাই আবার সে ভাঙাঘরে ঢোকার জন্যে উঁকি দিল। না কোনো সাড়া নেই। তাহলে বোধহয় সবাই ঘুমোচ্ছে! টুক করে সে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। বাইরে যদিও তখন ধীরে ধীরে আঁধার কাটছে, একটু একটু আলো, কিন্তু ঘরের ভেতর তো আর তা নয়! তখনও অন্ধকার। নিস্তব্ধ। এমনকী, একটু আগে পর্যন্ত টুটুর ঝটপটানির শব্দটা শোনা যাচ্ছিল। এখন তাও স্থির। সুতরাং জয় ফুড়ুত করে ঘরে ঢুকেই যে চটজলদি টুটুর খোঁজ পেয়ে যাবে, তেমন কোনো উপায়ই নেই। তাই সে বাধ্য হয়েই খুব নিচু গলায় ডাক দিল, 'টুটু!'
হ্যাঁ, শুনতে পেয়েছে টুটু। জয়ের গলা শুনে সে ছটফট করে উঠেছে। টুটুও খুব নরম সুরে সাড়া দিল, 'জয়?'
'হ্যাঁ, আমি জয়। তুমি কোথায়?'
'আমি টিনের ভেতর বন্দি!'
'বন্দি!' জয় চমকে উঠল।
টুটু তেমনি নিচু স্বরেই বলল, 'আমায় দড়ি দিয়ে বেঁধে টিনের ভেতর চাপা দিয়ে রেখেছে।'
'কই টিন?' ব্যস্ত হয়ে জয় জিজ্ঞেস করল।
'দেখতে পাচ্ছ না?'
জয় বলল, 'দেখতে পাব কেমন করে! বাইরে যদিও ভোর হয়েছে. কিন্তু ঘরের ভেতরটা এখনও অন্ধকার।'
'তুমি তাহলে এক কাজ করো,' টুটু উত্তর দিল, 'আমার পা বাঁধা, কিন্তু ডানা খোলা। আমি টিনের গায়ে ডানার ঝাপটা মারি। তুমি শুনে-শুনে খুঁজে নাও।'
'ঠিক বলেছ!' জয় টুটুর বুদ্ধির তারিফ করেই উত্তরটা দিল।
সত্যি, টুটু অনেক কসরত করতে করতে টিনে ডানার ঝাপটা মারতে লাগল, ঝনাত, ঝনাত। আর জয়ও সেই শব্দ শুনতে শুনতে টিনটাকে খুঁজতে লাগল। অবশ্য তখন ভোরের আকাশ পোড়োবাড়ির ঘরের ভেতরেও আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। সুতরাং টিনটাকে ঠাওর করতে জয়কে খুব একটা মেহনত করতে হল না। টিনের ক্যানেস্তারাটা তার নজরে তো পড়লই, সেইসঙ্গে সে দেখতে পেল তার গায়ের ফুটোফাটাও। জয় আগুপিছু কিচ্ছু ভাবল না, নিমেষ দেরিও করল না। ঝটপট ফুটোর মধ্যে শরীরটা গলিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সত্যি, এমন কষে টুটুর ঠ্যাং-এ দড়ি বাঁধা হয়েছে যে, শত চেষ্টা করলেও বাছাধনের উড়ে পালাবার উপায় নেই।
জয় বলল, 'টুটু, কিচ্ছু ভেবো না। আমি ব্যবস্থা করছি।' বলে জয় নিজের ঠোঁট দিয়ে কখনো টেনে, কখনও ঠোক্কর মেরে সেই দড়ি কাটতে লাগল। একটু করে দড়ির বাঁধন খুলছে, জয়ের যেন ততই ভয় বাড়ছে! যদি লোকগুলোর ঘুম ভেঙে যায়!
উঃ! কী কষে বেঁধেছে রে বাবা! বেচারি টুটুর বাঁধনের চাপে পা বুঝি ছিঁড়ে যায়!
অবশ্য, আর ভয়ের কিছু নেই। শেষ বাঁধনটা খুলে যেতেই টুটু আনন্দে দিশেহারা হয়ে সেই ক্যানেস্তারার ভেতরেই জয়কে জড়িয়ে ধরল। জয় বলল, 'টুটু, আর দেরি নয়। চলো, চলো বেরিয়ে পড়ি! নইলে আবার বিপদ হতে পারে।'
টুটু সুট করে ফুটোর ভেতর থেকে মাথা গলিয়ে একবার বাইরেটা দেখে নিল। না, কেউ দ্যাখেনি। ওই তো ঘুমে সব অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে। টুটু ফিসফিস করে জয়ের কানের কাছে ঠোঁট এনে বলল, 'সব ঘুমোচ্ছে।'
জয় বলল, 'তবে শিগগির বেরিয়ে পড়ো!'
টুটু ফুটোর ওপর তুড়ুক করে লাফিয়ে উঠে চোখের পলকে ফুড়ুত করে দে-হাওয়া! সঙ্গে-সঙ্গে তার পেছনে জয়ও দিল লম্বাছুট, ফুড়ুত-ফুড়ুত-ফুড়ুত! উঃ! দুজনের পাখায় তখন কী দুরন্ত গতি! এখন তাদের ধরতে পারে, এমন কার সাধ্যি আছে!
অবশ্য উড়তে উড়তে বেশ খানিকটা কাহিল হয়ে পড়ছিল টুটু। হবেই তো, কাল সারারাত বেচারি একফোঁটা ঘুমোতে পারেনি। সারারাত টিনের ভেতর ছটফট করেছে। সুতরাং এখন উড়তে কষ্ট হলে তুমি তাকে দোষ দিতে পারো না। অথচ একটু থেমে যে জিরিয়ে নেবে, এমন সাহসও হচ্ছিল না। খিদেও পাচ্ছে। তাই বলে এমন নয় যে, এক্ষুনি পেটে কিছু না-পড়লে 'বাবা গো, মা গো, খেতে দাও গো' বলে, হাত-পা ছুড়ে পাড়া মাথায় করতে হবে!
চুপচাপ উড়তে উড়তে অনেকখানি আকাশপথ পেরিয়ে এল তারা। দেখতে দেখতে সূর্যও ঝলমল করে আকাশ উপচে উছলে পড়েছে। এ-সময়টা পাখিদের ভারি ভালো লাগার সময়। সকালে পাখিদের পালকে রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়লে, খুশি যেন গান হয়ে তাদের গলায় ঝরে যায়। কিন্তু এখন এই দুই পাখির তো আর খুশির সময় নয়। তাই ভোরের সূর্য ভালোবেসে যতই তাদের গায়ে গায়ে ছড়িয়ে পড়ুক, গলা তাদের গান গেয়ে আকাশের বুক আনন্দে ভরিয়ে দেবে না। এখন তারা কেমন করে বেঁচে থাকবে, এই ভাবনায় ছটফট করছে। দল ভেঙে ছিটকে পড়েছে তারা। যতই হোক, দলবেঁধে থাকলে সাহসও থাকে। কিন্তু এখন তারা দুজন মাত্র। কে জানে শেষ অবধি বন-সবুজের দ্বীপে পৌঁছোতে পারবে কিনা! কে জানে, এই দুঃসময়ে আপেল-বুড়োর জন্যে কোত্থেকে তারা ভালোবাসা খুঁজে পাবে!
হঠাৎ জয়ই কথা বলল, 'টুটু, হাওয়ার তেজ বেড়েছে, বুঝতে পারছ?'
টুটু বলল, 'হ্যাঁ, সমুদ্রের হাওয়া।'
জয় অবাক হল, 'সমুদ্র কী এসে গেল?'
'না, দেরি আছে,' উত্তর দিল টুটু।
'আরও কতটা?'
'বেশ খানিকটা।'
জয় উড়তে উড়তে টুটুর মুখের দিকে তাকাল। জিজ্ঞেস করল, 'এবার একটু থামলে হয় না?'
টুটু বলল, 'আরও একটু চলো। আমার মনে হচ্ছে, আর একটু গেলে, একটা গরমজলের ফোয়ারা পাব আমরা। সেখানে থেমে একটু চান করে নেব। গরমজলে পালক ভিজিয়ে চান করে নিলে, ক্লান্তি কেটে যাবে।'
'সেই ভালো,' উত্তর দিল জয়।
সুতরাং থামল না তারা। উড়ে চলল, আরও অনেকটা।
উড়তে উড়তে হঠাৎ জলের শব্দ শোনা গেল। ঠিক যেন নূপুরের রিমঝিম। হঠাৎ উঁচুনিচু কিছু পাথর, কিছু কিছু গাছের ঝোপ নজরে পড়ল।
টুটু জিজ্ঞেস করল, 'শুনতে পাচ্ছ?'
'পাচ্ছি, জলের শব্দ,' উত্তর দিল জয়।
'এখানেই সেই ফোয়ারা।'
জায়গাটা চোখে পড়তেই কী ভালো লেগে গেল জয়ের। চেঁচিয়ে উঠল, 'টুটু, কী চমৎকার জায়গা। আমি তো আগে কখনো এদিকে আসিনি।'
টুটু বলল, 'এবারেও আসতে না। আসলে এটা তো আমাদের দক্ষিণে যাওয়ার পথ নয়। বিপদই তো আমাদের এদিকে টেনে এনেছে।'
জয় খুব উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'এদিক দিয়ে আমরা দক্ষিণের সেই বন-সবুজের দ্বীপে যেতে পারব তো?'
'হ্যাঁ, আমরা তো দক্ষিণেই চলেছি,' উত্তর দিল টুটু, 'তবে পথটা একটু ঘুর হয়ে গেল, এই যা! আর যদি কোনও গণ্ডগোলে না-পড়ি তবে, সমুদ্রের সেই বন-সবুজের দ্বীপে ঠিক সময়েই পৌঁছে যাব।' একটু থেমে টুটু আবার বলল, 'এবার নামতে হবে। ওই দ্যাখো, গাছের ফাঁকে গরমজলের ফোয়ারা। কেমন পাথরের ফাঁক দিয়ে উপচে পড়ছে!'
'কী সুন্দর!' খুশিতে উছলে উঠল জয়ের চোখ দুটি। জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে নামি?'
'হ্যাঁ, এসো এই গাছটায়।'
দুজনেই হুস হুস করে গাছের ডালে নেমে পড়ল।
'আঃ! এখন একটু নিশ্চিন্ত হওয়া গেল,' জয় যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
'চান করবে তো?' জিজ্ঞেস করল টুটু।
'নিশ্চয়ই,' জয়ের গলায় খুশির আমেজ।
'তবে চলো।'
দুজনেই আবার ফুড়ুত করে উড়ে এসে জলের ধারে নামল। কী নির্জন, নিঝুম চারদিকটা। গাছগাছালি। প্রজাপতি। ফড়িং। এত বড়ো-বড়ো মথ। ফুলের রংবাহার। ভাঙা পাথরের চাঁই। তার ফাঁকে গরমজলের ফোয়ারা। উছলে এদিক-ওদিক পথ খুঁজতে-খুঁজতে বেয়ে চলেছে। এমনি একটা ছোট্ট সোঁতার জলে ডানা ঝাপটে দু-বন্ধুতে চান করে নিল। ভারি আরাম। ভিজে পালকের জল ঝেড়ে ফেলার জন্যে এমন গা-ঝাড়া দিল, মনে হল দুটি পাখি যেন দু-মুঠো রঙিন তুলো। গায়ে একটু রোদের তাপ ছুঁইয়ে দুজনে আবার উঠে পড়ল গাছে।
জয় বলল, 'দেখেছ, যতক্ষণ ভয় থাকে ততক্ষণ খিদে থাকলেও খেতে ইচ্ছে করে না। এখন একটু একটু ইচ্ছে করছে, না টুটু?'
টুটু বলল, 'ভয় যে কেটে গেছে, কী করে বুঝলে?'
জয় উত্তর দিল, 'এমন চমৎকার একটা জায়গায় যে আপদ থাকতে পারে, সেটা বিশ্বাস করতে মন চায় না।'
'হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, জায়গাটা খুবই চমৎকার। তবে ভয় যে কখন কোথা দিয়ে আসে কেউ বলতে পারে না।' জবাব দিল টুটু।
জয় বলল, 'তা ঠিক।'
টুটু বলল, 'আর বেশিক্ষণ গাছে বসে না-থাকাই ভালো। চলো কিছু খেয়ে নেওয়া যাক। এবার সমুদ্রের পথে পাড়ি দিতে হবে। সন্ধের আগেই বন-সবুজের দ্বীপে আমাদের পৌঁছোতেই হবে। তা না-হলে মুশকিল।'
খাওয়া সেরে বেশ কিছুটা উড়ে আসার পরই নজরে পড়ল সমুদ্র। দূর থেকে তার শব্দটা তখন মনে হচ্ছিল, কত ক্ষীণ। এখন গর্জন হয়ে যেন ধমক মারছে। পাখিরা তো আর সমুদ্রকে ভয় পায় না। আকাশের নীচে জলের ঢেউ তুলে সমুদ্র যতই গর্জন করুক, পাখিদের বয়ে গেছে। পাখিরা তখন সুদূর আকাশে ডানা মেলে উড়ে যায়। সমুদ্র নাগালই পায় না।
সমুদ্রের এই দেশে এর আগে জয় কোনোদিন আসেনি। তাই সে ভীষণ উৎসুক হয়ে চারদিকটা দেখতে দেখতে উড়ে আসছিল।
'তুমি এদিকে কতবার এসেছ টুটু?' হঠাৎ জয়ই জিজ্ঞেস করল।
টুটু উত্তর দিল, 'একবারই'।
'দেখছি, তোমার সব মনে আছে।'
টুটু হাসল।
'আমি এদিকে কোনোদিন আসিনি, তাই এত ভালো লাগছে,' খুব খুশি হয়ে জয় বলল।
টুটু বলল, 'হ্যাঁ, ভালো লাগার মতোই জায়গা। সমুদ্রের কোলে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ঝাউ-পাইনের বন। দু-একটি দেবদারু গাছ। তীর-ভর্তি সোনা-ছড়ানো বালি।
হাওয়ার তীব্রতা বাড়ছে। সমুদ্রের বুক থেকে ছেঁড়া-ছেঁড়া মেঘও ভেসে আসছে। মাঝে-মাঝে সূর্যের মুখ ঢাকা পড়ছে, আবার ঝলসে উঠছে। লুকোচুরি খেলা যেন। ওদের উড়ে চলার গতিও কিছুটা কমেছে। তাহলেও আর ভয় নেই। এসে পড়েছে ওরা। সামনে সমুদ্র।
জয় আর টুটু অনেক বাধা ভেঙে সমুদ্রের তীরে পৌঁছে গেল। এবার আরও খানিকটা উড়ে গেলে বন-সবুজের দ্বীপ।
টুটু নিশ্বাস ছেড়ে বলল, 'যাক বাঁচা গেল! সমুদ্রে পাড়ি দেবার আগে এসো জয়, একটু জিরিয়ে নিই।'
জয় বলল, 'ঠিকই বলেছ, একটু দম নিয়ে যাওয়াই ভালো।'
অন্য সময় হলে টুটুও হয়তো একথা বলত না, আর জয়ও হয়তো সায় দিত না। কিন্তু কালকের ধকলটা টুটুর গায়েগতরে তো এখনও মালুম দিচ্ছে। সুতরাং এতটা একটানা উড়ে আসার পর, একটু বিশ্রাম নিতে চাইলে সেটা কিছু অন্যায় নয়।
দুজনেই গাছে বসে পড়ল।
উরি ব্যাস! দ্যাখো, দ্যাখো, সমুদ্রের সঙ্গে পাহাড়ের কী সাংঘাতিক লড়াই হচ্ছে। সমুদ্রের কিনারে জলের ওপর পাহাড়টা দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ-ছোঁয়া ঢেউগুলো বারবার পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ে ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হার মানছে না। আবার গা-ঝাড়া দিয়ে লাফিয়ে পড়ছে প্রচণ্ড তেজ দেখিয়ে। আঘাতে আঘাতে জলের বিন্দুগুলি ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। মনে হচ্ছে সেই জলবিন্দু যেন আকাশ-ভর্তি ধোঁয়া।
সমুদ্র যতই আঘাত করুক, পাহাড় কিন্তু শান্ত। নড়েও না, চড়েও না। ঢেউয়ের দানবকে সে যেন থোড়াই কেয়ার করছে।
পাহাড় আর সমুদ্রের এই লড়াই দেখতে-দেখতে জয় বলল, 'দ্যাখো টুটু, যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই দেখছি আঘাত করার জন্যে সবাই একেবারে উঁচিয়ে আছে। তুমি সমুদ্র আর পাহাড়ের কথা ছেড়েই দাও না! আমাদের কথাই ধরো। কেউ আমাদের মারতে চায়। কেউ আমাদের ধরে খাঁচায় বন্দি করতে চায়। নয়তো রঙিন পালকগুলি আমাদের গা থেকে উপড়ে নিয়ে, বিকিকিনির পসরা করতে চায়।'
টুটু চুপ করে রইল।
'কী, চুপ করে আছ যে?' অবাক হল জয়, 'আমার কথা শুনছ না? তুমি কী অন্য কিছু ভাবছ?'
'হ্যাঁ, ভাবছি আজ এখানেই থেকে যাব।'
'কেন?' চমকে চাইল জয়।
'আকাশটা ভালো ঠেকছে না,' উত্তর দিল টুটু, 'মাঝপথে আবার যদি কোনোও বিপদ হয়!'
'ঠিক বলেছ,' জয় আকাশের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, আকাশের অবস্থা ভালো নয়। আজ এখানেই থেকে যাওয়া ভালো।'
ছোট্ট ওই দুটি পাখির মস্ত এই সমুদ্রের তীরে থাকার কোনো অসুবিধে ছিল না। পাহাড়ের গা ভেঙে ভেঙে ওই অত গাছ। তা ছাড়া অফুরন্ত খাবার। বেশ নিশ্চিন্তেই একটা রাত কাটিয়ে দেওয়া এমন কিছু ব্যাপার নয়। তা ছাড়া কালকের দিনটা আসতেও তো আর বেশি সময় নেই। একটু পরেই বিকেল হবে। তারপরেই বিকেল গড়িয়ে সন্ধে। টেনে ঘুম দাও। ঘুম ভাঙলেই সকাল। ব্যাস! আবার চলো। অবশ্য এখানে থাকার একটাই অসুবিধে। তা হল, জায়গাটা একটু উটকো। তার ওপর দমকা হাওয়া সমুদ্রের বুক থেকে যেমন ছুটে আসছে, তেমনি ভেসে আসছে গর্জন। তা হোক। তবু কী মজা! চারদিকে শুধু মজা! তুমি যদি একটু চোখ মেলে দ্যাখো, দেখবে বেলাভূমির ওপর কত কী! কখনো দেখবে বড়োবড়ো শামুক গুটিগুটি হেঁটে বেড়াচ্ছে। দেখবে কচ্ছপ চুপটি করে শুয়ে আছে। যদি বরাত খুব ভালো হয় তিমিমাছও নজরে পড়ে যেতে পারে! কত ঝিনুক, কাঁকড়া!
দুজনেই সমুদ্রের ধারে একটি গাছের একই ডালে বসেছিল। বসে বসে টুটুর চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছিল। মাঝে মাঝে ঢুলে পড়ছিল টুটু। আর জয়, ঠায় সমুদ্রের দিকে চোখ রেখে বসে বসে দেখছিল। দেখতে পাচ্ছ, কত গাঙচিল? ঢেউ-এর সঙ্গে কেমন খেলা করছে! গায়ে নীল-সাদা ছোপ ছোপ, টুকটুকে লাল ঠোঁটওলা ইয়া পেল্লাই হাঁসগুলির কাণ্ড দেখেছ! ওই অত উঁচু ঢেউগুলিকে ভয়ই পাচ্ছে না। ঢেউ যেখানে তীরের ওপর এসে লুটিয়ে পড়ছে সেখানে দিব্যি ঠোঁট ঠেকিয়ে খাবার খুঁজছে। হয় শামুক ধরে গালে পুরছে, না-হয় গেঁড়ি। কিংবা ছোট্ট-ছোট্ট মাছ।
দ্যাখো, দ্যাখো! দুটো অ্যায়সা বড়ো কাঁকড়া কেমন গর্তের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। দেখেছ, দাঁড়াগুলি কী মোটা মোটা! ও কী রে বাবা, দুজনেই যে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ও বাবা কেমন তালে তালে দাঁড়াগুলি ওঠাচ্ছে-নামাচ্ছে। নাচছে নাকি! হ্যাঁ তো রে! কী নাচ, কী নাচ!
জয় সেই নাচ দেখে আর থাকতে পারল না। চেঁচিয়ে টুটুকে ডাক দিল, 'টুটু, টুটু, নাচদ্যাখো!'
টুটু ধড়ফড় করে চোখের পাতা খুলে ফেলেছে। ঢুলতে ঢুলতে টুটু এখন সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছিল। জয়ের ডাক শুনে ঘুমচোখে সেইদিকে তাকাতে সে-ও দেখতে পেল, সত্যিই তো, দুটো খাড়া-খাড়া দাঁড়াওলা কাঁকড়া বেমালুম নাচানাচি করছে!
জয় টুটুর মুখের দিকে চেয়ে আনন্দে আটখানা হয়ে বলল, 'চলো টুটু, নাচ দেখে আসি!'
সত্যি বলতে কী, তাজ্জব নাচের সেই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে টুটু এতই অবাক হয়ে গিয়েছিল যে, তখন তার ঘুমটুম কোথায় হাওয়া! সে-ও তাই জয়ের কথায় সায় দিয়ে বলল, 'চলো! দেখেই আসি!'
'কোথায় যাবে?' কে যেন হঠাৎ বাধা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল।
থতমত খেয়ে গেছে টুটু আর জয় দুজনে সেই গলার স্বর শুনে। কারণ এ-ডাক তাদের একদম অপরিচিত। উড়তে গিয়েও ওড়া হল না। খুব অবাক-দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক চাইতে লাগল জয় আর টুটু।
তাকে দেখতে পেয়েছে টুটু। টুটু আর জয়কে সে দেখছে। জয়ের চোখও তার দিকে পড়তে একদম ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে জয়। সেই গাছে, ঠিক তাদের মাথার ওপরে আর একটা ডালে একটা শঙ্খচিল বসে আছে। আসলে তার মুখ দেখে বোঝা মুশকিল তার মেজাজটা খুশি-খুশি, না, রাগী-রাগী।
জয় আর টুটুকে তার দিকে অমন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকতে দেখে, সেই শঙ্খচিলটা আবার বলল, 'মনে হচ্ছে ভয় পেয়ে গেছ! ভয় পাবার কিছু নেই। তোমরা যা করতে যাচ্ছিলে, সেই করাটা ঠিক হচ্ছিল না বলেই আমি তোমাদের বাধা দিলুম। তোমরা ভেবেছ ওই কাঁকড়া দুটো নাচছে! না, না, ওটা নাচ নয়, লড়াই। ওই দুটো ধুমসো কাঁকড়া ফাঁক পেলেই লড়াই করে। দ্যাখো, এখন একবার ভালো করে চেয়ে দ্যাখো, লড়াইটা কেমন জমেছে। এর নাম হাড্ডাহাড্ডি লড়াই!'
জয় আর টুটু চকিতে শঙ্খচিলের মুখ থেকে চোখ ফিরিয়ে আবার সেই কাঁকড়া দুটোর দিকে চাইল। আরে, তাই তো কাঁকড়া দুটো দাঁড়া দিয়ে কী ভীষণ খটাখটি লাগিয়েছে!
'তোমরা এ-পাড়ায় কী মনে করে?' শঙ্খচিলটা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল।
'আমরা দক্ষিণে যাচ্ছিলুম,' উত্তর দিল জয়।
'ও, গরমের দেশে?'
'হ্যাঁ,' জয় আর টুটু দুজনেই একসঙ্গে বলে উঠল।
'তা দুটিতে কেন? দলের আর সবাই?'
'আমরা দলছুট হয়ে এদিকে চলে এসেছি।'
'কী রকম?' শঙ্খচিল একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।
জয় বলল, 'একদল বাজপাখি আমাদের দলকে আক্রমণ করেছিল। আমাদের দলের অনেককে তারা ছোঁ-মেরে ধরে নিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গোটা দলটা ছত্রাকার হয়ে যে যেদিকে পারল পালাল। আমরা দুজনে কোনোক্রমে এদিকে পালিয়ে এসেছি।'
'ওটি কে? তোমার ভাই নাকি?'
'ও আমার বন্ধু, টুটু। আমার নাম জয়।'
'তোমার বন্ধুটি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছে মনে হয়!'
'হ্যাঁ, বিপদে পড়লে যা হয়,' উত্তর দিল জয়।
শঙ্খচিল বলল, 'বিপদের এখন হয়েছে কী! আরও বিপদ আসছে।'
জয় আর টুটু দুজনেই থতমত খেয়ে তার মুখের দিকে চাইল।
শঙ্খচিল বলল, 'এ-বিপদ শুধু তোমাদের নয়, আমাদেরও।'
জয় আর টুটু আতঙ্কে কুঁচকে গেল।
শঙ্খচিল আবার জিজ্ঞেস করল, 'দক্ষিণের কোন দেশে যাবে?'
'সমুদ্রের বুকে, সেই বন-সবুজের দ্বীপে,' খুব ভয়ে-ভয়েই উত্তরটা দিল টুটু।
'তাহলে তো আর কথাই নেই,' শঙ্খচিল উত্তর দিল, 'এখনও খেয়াল করোনি, বাতাসে একটু-একটু ঝোড়ো-হাওয়ার গন্ধ ভেসে আসছে! আকাশে ছেঁড়া-মেঘ উড়ে যাচ্ছে! এই দুপুরের রোদেও কেমন একটা পাঁশুটে রং! সমুদ্রের দিকে তাকাও দ্যাখো, ঢেউগুলো কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে! মনে হচ্ছে ঝড় উঠবে।'
জয় আর টুটু দুজনেই বোবা হয়ে শঙ্খচিলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারা আকাশে মেঘও দেখেছে, বাতাসের তেজও বুঝেছে। কিন্তু ঝড় উঠতে পারে, এ-কথাটা তো তাদের মাথায় ঢোকেনি!
সেই শঙ্খচিল আবার বলল, 'অন্তত আরও দুটো দিন তোমরা এখান থেকে বেরোতে পারছ না। আমার মনে হচ্ছে, আজ রাতের মধ্যেই যা হোক একটা হেস্তনেস্ত হয়ে যাবে। আর বরাত যদি সহায় হয়, ঝড় এদিকে না-এসে অন্য দিকেও চলে যেতে পারে।'
টুটু আর জয় দুজনেরই মুখ শুকিয়ে আমচুর।
ওদের মুখের দিকে চেয়ে শঙ্খচিল হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, 'আরে বাবা, এ-সব কথা ভেবে ঘাবড়ালে চলে। এই নিয়েই তো বেঁচে আছি আমরা। আর যখন মরবার সময় হবে কেউ ঠেকাতে পারবে না!'
জয় আমতা-আমতা করে বলল, 'কিন্তু আমাকে তো বেঁচে থাকতেই হবে। বুড়ো-আপেলগাছ যে আমার পথের দিকে চেয়ে বসে থাকবে!'
শঙ্খচিল জয়ের কথা শুনে অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চাইল। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'আপেলগাছ?'
'হ্যাঁ, ভারি দুঃখী। তাকে কেউ ভালোবাসে না। তাই আমাকে তার জন্যে একটু ভালোবাসা নিয়ে যেতে বলেছে।'
শঙ্খচিল একটু গম্ভীর হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'তার ডালে বুঝি আর ফুল ফোটে না? ফল ধরে না?'
'না,' জয় উত্তর দিল, 'বুড়ো হয়ে গেছে যে!'
শঙ্খচিল মুখে কী একটা অস্পষ্ট শব্দ করল। তারপর বলল, 'বুড়োর জন্যে ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া ভারি শক্ত। যাকে ভালোবাসলে কোনও কাজে আসবে না, তাকে কেউ ভালোবাসা দিতে চায়? তবু যদি বুড়ো ডালে দু-একটা ফলও ফলত, তাহলেও কথা ছিল।'
শঙ্খচিলের কথা শুনে জয়ের মুখের কথা যেন হারিয়ে গেল। মুখখানা কাচুমাচু করে সে টুটুর মুখের দিকে চাইল।
শঙ্খচিল হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, 'দাঁড়াও, দাঁড়াও! ওই দ্যাখো, কাঁকড়া দুটোর কী দুর্দশা হয়েছে।'
জয় আর টুটু শঙ্খচিলের কথা শুনে চটপট ফিরে দ্যাখে, হ্যাঁ তো রে, দুটোই কাত হয়ে পড়ে-পড়ে কাতরাচ্ছে!
শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, 'কী বুঝছ?'
টুটু আর জয় দুজনেরই মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, 'বোকার মতো, নিজেদের মধ্যে যেমন মারামারি করা!' বলে কাঁকড়া দুটোর দিকেই তাকিয়ে রইল।
'তোমাদের খিদে পাচ্ছে না?' হঠাৎ যে শঙ্খচিল কাঁকড়া দুটোর ওই অবস্থা দেখতে-দেখতে এই কথাটা জিজ্ঞেস করবে, ভাবতে পারেনি জয়, টুটু, কেউই। সুতরাং দুজনেই একটু হকচকিয়ে গেল।
টুটু আর জয় দুজনকেই চুপ থাকতে দেখে আবার শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, 'কী? খাবে না কিছু?'
টুটু এবার চট করে উত্তর দিল, 'খেয়েছি তো!'
শঙ্খচিল বলল, 'সে তো অনেকক্ষণ আগে। দ্যাখো, ধীরে-ধীরে আকাশ কেমন আচ্ছন্ন হয়ে আসছে। এরপর যে কী হবে, তোমরাও জানো না, আমিও জানি না। দ্যাখো, স্বর্গের রাস্তা অনেক দূর। ঝড়ের কোপে পড়ে স্বর্গে যদি যেতেই হয় তো, অতটা রাস্তা খালি পেটে উড়ে যাওয়া খুবই শক্ত। সুতরাং চলো, কিছু খেয়ে তৈরি থাকি। ওই পাহাড়টার ডান দিকে একটা সরোবর আছে। সেখানে পোকামাকড় ভর্তি। এসো আমার সঙ্গে।' বলে শঙ্খচিল হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দিল। জয় আর টুটু তার পিছু নিল। আর মনে মনে যেন কেমন ভালো লেগে গেল তাকে।
সমুদ্রের গর্জন বাড়ছে। দমকা বাতাস গাছে গাছে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। পাঁশুটে আকাশ এখন মেঘে মেঘে ছেয়ে গেছে। বনের পাখি, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ এখন সবাই জানতে পেরেছে, বিপদ আসছে!
শঙ্খচিলের সঙ্গে উড়তে উড়তে জয় আর টুটু যে-জায়গাটায় এল, সেটা পাহাড়ের একদম ওপরে। কাচের মতো ঝকঝকে জলে টলমল করছে একটি সরোবর। চারদিকে গাছ আর গাছ। ঘন গাছের পাতার আড়ালে একবার যদি লুকিয়ে পড়া যায়, তবে হয়তো ঝড়ের ধাক্কাটা সামলে যেতে পারে। শঙ্খচিল সরোবরের ধারে একটি গাছ দেখে চেঁচাল, 'এসো, এখানে বসে পড়ি।'
জয় আর টুটু শঙ্খচিলের পাশে বসে পড়ল।
শঙ্খচিল বলল, 'দেখেছ, কত তাড়াতাড়ি ঝড় এসে পড়ল! খাওয়া হল না।'
জয় বলল, 'ভাগ্যিস তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তুমি বারণ করলে, তাই। নইলে সমুদ্রে পাড়ি দিলে আমাদের কী হত বলো তো?'
হঠাৎ টুটু চেঁচিয়ে উঠল, 'জয়, মজা দ্যাখো, মজা দ্যাখো!'
জয় টুটুর চেঁচামেচি শুনে চটপট ফিরে তাকিয়ে দ্যাখে, অন্তত দুশো, তিনশো, কী আরও বেশি হবে, গোদা-গোদা গোসাপ গাল ফুলিয়ে সামনের গাছে হুড়োহুড়ি করছে। সত্যি, কী বীভৎস দেখতে লাগছে! গায়ে কাঁটা দেয়! দেখতে-দেখতে জয় আর টুটুর মুখের চেহারাই পালটে গেছে। এমন নয় যে, তারা কখনও গোসাপ দ্যাখেনি। অনেকবার দেখেছে। কিন্তু একসঙ্গে এতগুলি গোসাপের গাছের ওপর এমন তাণ্ডব তাদের কখনও চোখে পড়েনি। ভাবো একবার, একদঙ্গল গোসাপ একবার এ-ডালে লাফাচ্ছে, ও-ডালে উঠছে। কখনও জিভ বার করছে। ল্যাজ নাড়ছে। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! মনে হচ্ছে, গোটাগাছটাই যেন গোসাপের পোশাক গায়ে দিয়ে ঝড়ের হাওয়ায় ঝটাপটি খাচ্ছে!
শঙ্খচিল জয় আর টুটুর মুখ দেখে হেসে উঠল, 'কী বুঝছ?'
টুটু জিজ্ঞেস করল, 'এত গোসাপ কেন?'
শঙ্খচিল বলল, 'কই এত! এ তো ক-টা। সমুদ্রের তীরে, গাছের ওপর গাদা-গাদা গেছো-গোসাপ বাস করে। তোমরা কখনো দ্যাখোনি বুঝি?'
জয় জিজ্ঞেস করল, 'ওরা অমন হুল্লোড় করছে কেন?'
শঙ্খচিল বলল, 'ঝড় আসছে যে! ভয় পেয়েছে। দ্যাখো না, এক্ষুনি সব কোথায় চম্পট দেয়!'
বলতে না-বলতেই সেই অগুনতি গোসাপ ওই গাছের ওপর থেকে তরতর করে নামাতে শুরু করে দিল। সে কী প্রাণের ভয় তাদের। এ-ওর ঘাড়ের ওপর দিয়ে, ও তার মাথা টপকে মারলে ছুট। কে আগে পালাতে পারে, সেই নিয়ে ধস্তাধস্তি। যেন আগে পালালেই প্রাণে বাঁচবে!
দেখতে-দেখতে গাছ ফাঁকা!
জয় আর টুটু হাঁদার মতো সেইদিকে তাকিয়ে রইল বটে, কিন্তু গোসাপগুলো যে কোথায় গা-ঢাকা দিল, দেখতে পেল না।
'নাচ দেখবে নাকি?' হঠাৎ শঙ্খচিলটা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।
জয় আর টুটু একমুখ আগ্রহ নিয়ে শঙ্খচিলের দিকে তাকাল।
'হ্যাঁ,' শঙ্খচিল বলল, 'একটু আগে তো সমুদ্রের তীরে কাঁকড়ার লড়াই দেখেছ। এতক্ষণ গাছের ওপর গোসাপের কাণ্ডকারখানা দেখলে। এখন যদি ব্যাঙের নাচ দেখতে চাও, আমার সঙ্গে এসো!' বলে শঙ্খচিল ডানা ঝাপটিয়ে ঠিক সরোবরের কাছ বরাবর আর একটা ঝাউগাছের ওপর এসে বসল। জয় আর টুটুও তার সঙ্গে গেল।
এতক্ষণ একটানা সমুদ্রের গর্জনটাই ওদের কানে বেজেছে। কিন্তু এখানে, এই সরোবরের তীরে যে হাজারখানেক ব্যাং আকাশে মেঘ দেখে চেঁচামেচি করে নাচানাচি করছে, এটা ওরা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি।
শঙ্খচিল বলল, 'ওই দ্যাখো!'
সত্যি, দেখতে-দেখতে জয় আর টুটু অবাক হয়ে গেল। সেই সরোবরের ধার ঘেঁষে ব্যাঙেদের সে কী লাগ-বঙা-বঙ নাচ আর গান। অবাক চোখে দেখতে-দেখতে শেষকালে হেসে কুটোকুটি হয়ে গেল জয় আর টুটু।
শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, 'কেমন লাগছে?'
টুটু বলল, 'অবাক দেশের আজব ব্যাং।'
জয় বলল, 'সত্যি আজবই বটে! সোনাব্যাং, কোলাব্যাং, গোদাব্যাং, খ্যাঁদাব্যাং, ব্যাং-ব্যাঙাচি কত দেখেছি, কিন্তু একসঙ্গে এতগুলো ব্যাঙের নাচা-গানা কখনো দেখিনি!'
শঙ্খচিল বলল, 'এই নাচা-গানা এখন চলল। বুঝতে পারছ তো, ঝড় তৈরি হচ্ছে। আকাশও সাজছে। এদিকে সন্ধেও এগিয়ে আসছে। এসো, জঙ্গলটার এইদিকে ঢুকে পড়ি। চলো, দেখবে চলো, এইদিকে কী গভীর জঙ্গল।'
শঙ্খচিলের সঙ্গে জয় আর টুটু সেই জঙ্গলেই ঢুকে পড়ল।
শঙ্খচিল বলল, 'জঙ্গলের ভেতরটা তবু অনেকটা নিরাপদ। গাছে গাছে ঠেসাঠেসি। ঠিক যেন গলা-জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে। যাই বলো, তাই বলো, গাছেদের মধ্যে বেশ একটা বন্ধুত্ব আছে। একেই বলি একতা। ঝড়ের বিপদ এলে একসঙ্গে রুখে দাঁড়ায়। জানো তো, সবাই এক হলে, বিপদ নিজেই ভয়ে পালায়। তাই গাছেদের আমার খুব ভালো লাগে।'
জয় আর টুটু শঙ্খচিলের কথা শুনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
ঝড় উঠছে। জঙ্গলের মধ্যে শোঁ-শোঁ শব্দ শুরু হয়ে গেছে। গাছের ডালে ডালে ঠোকাঠুকি লেগে গেছে। এদিকে আকাশের ঝোড়ো-মেঘের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আঁধার রাত ঘনিয়ে আসছে।
'এসো, এইখানেই বসি।' বলে শঙ্খচিল একটা বেশ ঘন-পাতাওলা পাইনগাছে বসে পড়ল। জয় আর টুটুও বসল। অন্ধকার ঘনিয়ে আসবার সঙ্গে-সঙ্গে ওদের চোখেও অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ল। এখন শুধু শুনতে পাবে সমুদ্রের গর্জন, ঝড়ের তাণ্ডব আর গাছে গাছে ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটা। স্থির হয়ে বসে কার সাধ্যি।
শঙ্খচিল বলল, 'দুর্যোগ শুরু হয়ে গেছে। তোমরা একটু সাবধানে থেকো। আমি অন্ধকারে তোমাদের ঠিক ঠাওর করতে পারছি না।'
জয় বলল, 'আমরা ঠিক আছি।'
বলতে-বলতেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।
টুটু বলল, 'বৃষ্টি পড়ছে।'
শঙ্খচিল উত্তর দিল, 'আজ ঘুমের দফারফা!'
বৃষ্টি দেখে, জয়ের মুখখানা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে। সে প্রায় কাঁদো-কাঁদো হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আপেল-বুড়োর কী হবে শঙ্খচিল?'
শঙ্খচিল বলল, 'এখন দ্যাখো, ঝড় কোন দিকে যায়! পুবে যেতে পারে, পশ্চিমে বাঁক নিতে পারে। উত্তরে না-গেলেই ভালো। তোমার আপেল-বুড়ো রক্ষা পেয়ে যাবে।'
'কে হে, শঙ্খ নাকি?' ঝড়ের ধাক্কায় হাঁপাতে-হাঁপাতেই কেউ যেন শঙ্খচিলকে ডাক দিল।
টুটু বা জয় বুঝতে পারল না, কে ডাক দিল। কিন্তু শঙ্খচিল বুঝতে পারল। বুঝতে পারল, যে-গাছের ডালে সে বসে আছে, সেই পাইনগাছই তাকে ডাকল। তাই সে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ পাইন-দাদা, আমি!'
পাইনগাছ বলল, 'কী বিপদ বলো দিকি! আবার ঝড় উঠল। এই ক-দিন আগেই তো একচোট হয়ে গেল! সমুদ্র যেন খেপেই আছে।'
'তা বটে,' শঙ্খচিল উত্তর দিল, 'সেবার কী সাংঘাতিক জলোচ্ছ্বাস হল বলো? সমুদ্রের একটা মস্ত ঢেউ ঝড়ের ধাক্কায় ডাঙায় আছড়ে পড়ে কত দূর পর্যন্ত ছুটে গিয়েছিল বলো? কত ঘরবাড়ি, গাছপালা, মানুষজন, পশুপাখি সেই জলের তোড়ে কোথায় যে ভেসে গেল, তার আর হদিশ পাওয়া গেল না।'
পাইনগাছ বলল, 'হ্যাঁ, আমার এই এত উঁচু মাথার চেয়ে আরও উঁচু ছিল সেই জলোচ্ছ্বাস। আমি তো কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেলুম। কিন্তু আমার বন্ধু ঝাউগাছ সেই ধাক্কা সামলাতে পারল না। বয়েস হয়েছিল তো! আহা! বেচারা জলের তোড়ে মাটি উপড়ে কোথায় যে ভেসে গেল আর খোঁজ পাওয়া গেল না। বন্ধুর জন্যে মনটা প্রায়ই খারাপ লাগে।'
ঝাউগাছের কথা শুনে জয়ের বুকটা ঢিপঢিপ করে কেঁপে উঠল।
পাইনগাছ বলল, 'এ-দুটি কি তোমার সঙ্গে?'
জয় আর টুটু দুজনেই বুঝতে পারল, পাইনগাছ তাদের কথাই জিজ্ঞেস করছে।
শঙ্খচিল উত্তর দিল, 'হ্যাঁ দাদা, আমার সঙ্গে।'
পাইনগাছ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আগে দেখিনি তো?'
শঙ্খচিল বলল, 'না, এ-দুটি এদেশের নয়। দক্ষিণে যাচ্ছিল।'
'ও গরমের দেশে?'
'হ্যাঁ, বন-সবুজের দ্বীপে।'
'তা এ-পথ দিয়ে কেন?'
'বাজপাখির তাড়া খেয়ে দলছুট হয়ে এদিকে চলে এসেছে।'
'রক্ষে,' একটা যেন নিশ্চিন্তির হাওয়া শোনা গেল পাইনগাছের গলায়। বলল, 'বাজপাখির দৃষ্টি এড়িয়ে প্রাণে বাঁচা মানে কপালের অনেক জোর। এখন আবার ঝড়ের পাল্লায় পড়তে হল। দেখা যাক কপাল রক্ষা করতে পারে কিনা!'
শঙ্খচিল বলল, 'ছেলে দুটি ভালো।'
পাইনগাছ উত্তর দিল, 'দেখে মনে হচ্ছে।'
শঙ্খচিল বলল, 'জানো পাইনদাদা, ছেলে দুটি ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে।'
'এঁঃ!' পাইনগাছ অবাক হয়ে চমকে উঠল। বলল, 'ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলুম না তো!'
শঙ্খচিল তখন সেই পাইনগাছকে জয়ের বন্ধু আপেল-গাছের কথা বলল। সব শুনে পাইনগাছ থমকে রইল কিছুক্ষণের জন্যে। তারপর জয়ের দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে তার গলা দিয়ে বেরিয়ে এল, 'বাঃ!'
আর কথা বলা গেল না। কেন-না, ঝড়ের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। শুরু হয়ে গেছে বৃষ্টি। রাতের আকাশে ঝড়ের মেঘ। চারদিকে ঝড়ের তাণ্ডব শুরু হয়ে গেছে। উত্তাল সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউগুলো যেন ক্ষিপ্ত দানবের মতো লাফিয়ে পড়ছে তীরে। মনে হয় সেই দানব, পাহাড়ের গায়ে সেই বনভূমির ছোটো-বড়ো সব গাছের ঝুঁটি ধরে নাড়ানাড়ি করে দিচ্ছে। শুধু গর্জন। জয় অথবা টুটু, পাইনগাছ কিংবা শঙ্খচিল সবাই আতঙ্কে স্তব্ধ। সবাই এখন বাঁচার জন্যে প্রাণপণে যুদ্ধ করছে সেই দুর্যোগের সঙ্গে! কিন্তু এ কী! গাছের ডালে হঠাৎ জয় আর টুটুকে দেখা যাচ্ছে না তো! তাই তো, কী হল তাদের!
অনেকক্ষণ পর, তখনও গভীর রাত, একটু যেন ঝড়ের দাপট কমল।
বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছে পাইনগাছ। ক্লান্ত স্বরেই ডাক দিল, 'ওহে শঙ্খ, ঠিক আছ তো?'
গাছের ডাল আঁকড়ে ধরে শঙ্খচিল তখনও হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে-হাঁপাতেই বলল, 'বেঁচে গেছি। বিপদ বোধ হয় কাটল।'
গাছ বলল, 'অনেকটা। ঝড় পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে।'
শঙ্খচিল বলল, 'পাইনদাদা, আমাদের সঙ্গী দুটি ঠিক আছে তো?'
গাছ বলল, 'কই, আমার ডালে তো দেখছি না তাদের!'
'এঁঃ,' চমকে উঠল শঙ্খচিল, 'গেল কোথায়?'
পাইনগাছ ব্যস্ত হয়ে বলল, 'ধাক্কা সামলাতে পারেনি হয়তো! দ্যাখো আবার, কোথাও মুখ থুবড়ে পড়ল কিনা। ছোট্ট তো!'
শঙ্খচিলও ঠিক ততটা ব্যস্ত হয়েই জিজ্ঞেস করল, 'এখন তাহলে কী করা যায়?'
পাইনগাছ বলল, 'এই অন্ধকারে কিছু তো করা যাবে না। ভোর হলে তখন খোঁজ করতে হবে।'
আসলে, পাইনগাছের কথাই ঠিক, জয় আর টুটু ঝড়ের ধাক্কা সামলাতে পারেনি। গাছের ডাল ফসকে গেছে ছিটকে। খানিকটা দূরে মুখ থুবড়ে কাদায় পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে! উঃ কী ভীষণ লেগেছে তাদের! তবু রক্ষে, দুজনে প্রায় একই জায়গায় পড়ে আছে। কাদায় এমন লেপটে গেছে যে, নড়াচড়া করারও ক্ষমতা নেই তাদের। এখন জঙ্গলের সাপখোপ ওদের খোঁজ পেয়ে গেলে, আর কিছু করার থাকবে না। সুতরাং কাদার ওপর বেশি লাফালাফি না-করে জয় আর টুটু চুপচাপ পড়ে রইল।
বাকি রাতটুকু কী দুশ্চিন্তায় না-কাটল শঙ্খচিলের। সত্যি, ওই ছোট্ট পাখি দুটোকে বড্ড ভালো লেগে গেছে তার। ওই ছোট্ট পাখির মন দুটি যেন টুকরো সোনার ঝিকিমিকি আলোর মতো ঝলমলে। তাই পাখি দুটির জন্যে গাছে বসে অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল শঙ্খচিল।
হঠাৎ পাইনগাছ কথা বলল, 'এখনও ছটফট করছ কেন হে, শঙ্খ, এবার নিশ্চিন্তে একটু ঘুমিয়ে নিতে পারো। আর ভয় নেই। দেখতে পাচ্ছ না, বৃষ্টি থেমেছে, হাওয়ার দাপট কত কমেছে, সমুদ্রেরও আর তেমন আস্ফালন নেই।'
শঙ্খচিল উত্তর দিল, 'সবই তো বুঝছি পাইনদাদা, কিন্তু ওই পাখি দুটির জন্যে মন যে বড়ো উতলা হয়ে আছে।'
'কী করবে বলো,' পাইনগাছ বলল, 'তোমারও কিছু করার নেই, আমিও কিছু করতে পারি না। তবু সকাল হওয়ার আগে কোনোও কিছু করার কথা ভাবাও তো যাচ্ছে না।'
শঙ্খচিল নিরাশ হয়ে উত্তর দিল, 'সেই তো মুশকিল।'
সুতরাং ভোরের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল শঙ্খচিল। একফোঁটা ঘুমও তার চোখ ছুঁতে পারল না। ঠায় জেগে বসে রইল আকাশের দিকে চেয়ে। কখন ছড়িয়ে পড়বে আকাশ থেকে একটু আলোর রোশনাই? আর কত দেরি?
ভোর হল। আকাশের আলো মাটির বুকে নেমে আসতেই মনে হল, বুঝিবা কাল রাতে এখানে এক ভয়ংকর যুদ্ধ হয়ে গেছে। চারিদিকে ধবংসের চিহ্ন। গাছপালা ভেঙেছে। সরোবরের জল উপচে পড়েছে। কেউ মরেছে, কেউ আহত হয়েছে। ঝড়ের ধাক্কায় সমুদ্রের বুক থেকে হাজার হাজার গেঁড়ি-শামুকের খোলা, ঝিনুক ছিটকে এসে বেলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গে শঙ্খচিল গাছের ডাল ছেড়ে আকাশে উড়ল। উড়তে উড়তে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, 'জয়, টুটু।' কিন্তু কোথায় তারা! খুঁজে খুঁজে ডেকে ডেকে জেরবার হয়ে গেল শঙ্খচিল, তবু জয় আর টুটুর সাড়া মিলল না।
পাইনগাছ দূর থেকে শঙ্খচিলকে বলল, 'খুঁজে পাওয়া মুশকিল মনে হচ্ছে। দ্যাখো, হয়তো এখান থেকে আরও কিছু দূরে ছিটকে পড়েছে।'
শঙ্খচিল তখন কাছ থেকে দূরে, আরও দূর উড়ে উড়ে ডাকতে লাগল। তার ডাক শুনে আরও অনেক অনেক পাখি হাজির হল সেখানে। 'কী হয়েছে? কী হয়েছে?' বলে তারাও জয় আর টুটুকে আতালিপাতালি খুঁজতে লাগল।
আচ্ছা, ওখানে কী ওটা। ওই যে টুকটুক করে নড়ছে! ওই কী টুটু? হ্যাঁ, ওই তো জয়! একজন হঠাৎ দেখতে পেয়ে চিল-চেঁচিয়ে ডাক পাড়ল, 'ওই তো সেই ছোট্ট পাখি! ওই তো সেই ছোট্ট পাখি!'
'কই? কই?' অনেক-অনেক পাখি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে এদিক-ওদিক উড়তে লাগল।
'ওই তো! ওই তো!'
হ্যাঁ, ঠিক তো! ওই তো! দেখতে পেয়েছে। সবাই দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েছে জয় আর টুটু দুটি পাখিকেই। একটা ঝোপের মধ্যে আড়ষ্ট হয়ে তিরতির করে কাঁপছে। না-পারছে উড়তে না-পারছে দাঁড়াতে।
তখন সেই বন্ধু শঙ্খচিল 'জয়, টুটু', বলে চেঁচিয়ে উঠে ঝপ করে নেমে পড়ল সেই ঝোপের মধ্যে। সঙ্গে-সঙ্গে বন্ধু শঙ্খচিল ঝট করে আলতো ঠোঁটে চেপে জয়কে তুলে নিল। অন্য আর একটি শঙ্খচিল টুটুকেও তুলে নিল। নিয়ে, উড়তে উড়তে আবার সেই পাইনগাছে এসে বসল।
খবরটা রটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেখানে যত শঙ্খচিল ছিল, সব সেখানে হাজির। সক্কলে সেই পাইনগাছের ওপর জড়ো হয়ে, জয় আর টুটুর ওই অবস্থা দেখে, কেউ আস্তে, কেউ ফিসফিস করে, কথা বলা শুরু করে দিল। অবশ্য এতজন একসঙ্গে কথা বললে, সে ফিসফিস করে বলো, আর জোরেই বলো, একটা হট্টগোল তো হবেই। তাই পাইনগাছ একটু ধমক দিয়েই সবাইকে বলল, 'ওহে, তোমরা সক্কলে মিলে এত হইহই করছ কেন? জানো না, অসুস্থ প্রাণীর কাছে বেশি হল্লা করলে সে আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে।'
সবাই চুপ করে গেল।
'তোমরা বরঞ্চ এক কাজ করো,' আবার গাছ বলল, 'পারো তো ক-টা পোকা ধরে আনো! কাল থেকে বেচারিদের খাওয়া নেই। আশা করা যায় পেটে কিছু পড়লে তাড়াতাড়ি সামলে উঠবে।'
পাইনগাছের কথা মুখ থেকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সব ক-টা পাখি পোকা আনতে হইহই করে এদিক-ওদিক উড়ে চলল। আর শঙ্খচিল ওদের শরীরে নিজের ডানা বিছিয়ে দুই পাখির বুকের রক্ত গরম করতে লাগল।
দ্যাখো, দ্যাখো, হালকা মেঘের ফাঁকে আকাশের ওই দূরে কেমন একটা সোনালি আলোর ছটা দেখা যাচ্ছে! মানে, আকাশ পরিষ্কার হতে আর দেরি নেই। মনে হয়, কিছুক্ষণ পরেই সূর্যের আলোয় উপচে যাবে চারদিক।
পাইনগাছ বলল, 'রোদ উঠতে আর দেরি নেই। যাক অল্পস্বল্পের মধ্যে দিয়ে দুর্যোগটা কেটে গেল।'
'আর কিছু না-পেয়ে নিষ্ঠুর ঝড় বাচ্চা পাখি দুটোকে শুধু আঘাত করে গেল।' উত্তর দিল শঙ্খচিল।
পাইনগাছ জিজ্ঞেস করল, 'এখন ভালোর দিকে মনে হয় কি?'
'এখন ওরা আমার বুকের নীচে,' জবাব দিল শঙ্খচিল।
'হাঁপাচ্ছে কি?'
'এখন অনেকটা স্থির হয়েছে।'
'বেঁচে গেল,' একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল পাইনগাছ।
শঙ্খচিল বলল, 'এই অবস্থায় এখন যে ওরা কেমন করে বন-সবুজের দ্বীপে যাবে, সেইটাই চিন্তার ব্যাপার। তার ওপরে, যেতে হবে সমুদ্রের বুকের ওপর দিয়ে।'
'দ্যাখো কী হয়,' উত্তর দিল পাইনগাছ।
'শঙ্খচিল!' হঠাৎ কে ডাকল? জয় না?
শঙ্খচিল তাড়াতাড়ি ডানা সরিয়ে নিল। দেখল, জয় আর টুটু দুজনেই উঠে বসার চেষ্টা করছে। দুজনেই জলে-কাদায় একাকার হয়ে আছে।
'শঙ্খচিল!' আবার ডাকল জয়, 'আমি একটু বসব।'
শঙ্খচিল ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'পারবে?'
'হ্যাঁ।'
টুটু বলল, 'আমিও পারব।'
'পড়ে যাবে না তো?'
জয় আর টুটু দুজনেই একসঙ্গে বলল, 'না, না, পড়ব না।'
পাইনগাছ বলল, 'ঠিক আছে, ওদের একটু বসতেই দাও!'
জয় আর টুটু দুজনেই উঠে বসল। শঙ্খচিল তার ঠোঁটের আলতো স্পর্শে জয় আর টুটুর গায়ের কাদাগুলি ধীরে-ধীরে মুছে দিতে লাগল। ধীরে-ধীরে জয় আর টুটুর পালকের রংগুলি কাদার আড়াল থেকে ফুটে বেরিয়ে আবার রঙিন হয়ে ঝলসে উঠল।
সূর্যের মুখ দেখা গেল এতক্ষণে। তাও একঝলকের জন্যে।
দেখতে দেখতে পাখির দল ঠোঁটে পোকা নিয়ে একে-একে হাজির। কারও ঠোঁটে কেঁচো, কারও ঠোঁটে ফড়িং, কারও-কারও পিঁপড়ে। জয় আর টুটু কি রাক্ষস নাকি! অত খাবে কী করে! তাই দেখে পাইনগাছ হাসতে-হাসতে বলল, 'এ যে একেবারে যজ্ঞি বসে গেল।'
শঙ্খচিল জিজ্ঞেস করল, 'তুমি কী খাবে, জয়?'
জয় বলল, 'একটা কেঁচো।'
টুটু বলল, 'দুটো ফড়িং।'
সত্যি কী ভীষণ খিদে পেয়েছিল দুজনের। একেবারে গপগপ করে গিলে খেয়ে ফেলল জয় আর টুটু একটা কেঁচো আর দুটো ফড়িং।
পাইনগাছ একটু হাসতে-হাসতেই বলল, 'বাকিগুলো আর রেখে কী হবে, সবাই মিলে খেয়ে শেষ করে ফেলো।'
'তা ঠিক, তা ঠিক,' বলে সবাই মিলে পোকামাকড়ের ভোজ বসাল সেই পাইনগাছের পাতার আড়ালে।
একটু পরেই জয় আর টুটুর রঙিন ডানা যেন আপনা থেকে নিশপিশ করতে লাগল। মনে হল, ডানাগুলি যেন আকাশে ছড়িয়ে পড়ার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে।
তাই দেখে পাইনগাছ বলল, 'ছটফট করার কোনও কারণ নেই। ডানা মেলে আকাশে ওড়ার এখনও সময় হয়নি। এখনও তোমাদের বিশ্রামের দরকার।'
জয় বলল, 'আকাশ তো পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমাদের যে দেরি হয়ে যাবে!'
পাইনগাছ বলল, 'জানি, সময়ের দাম খুবই বেশি। তবু, শরীরটা ঝরঝরে না-হলে সময়ের জন্যে একটু অপেক্ষা করতে হবে বই কী!'
শঙ্খচিল বলল, 'ঠিক বলেছ পাইনদাদা! আমরা রয়েছি। জয় আর টুটুর ভাবনার তো কিছু নেই।'
জয় বলল, 'জানি, তোমরা ছিলে বলেই আমরা প্রাণে বাঁচলুম। তোমরা ছিলে বলেই আবার আকাশ-ভরা রোদের আলো আমাদের চোখের ওপর ছড়িয়ে পড়ল।'
পাইনগাছ একটু হাসল। তারপর বোধহয় আকাশের দিকে চাইল। আকাশটাকে একটু দেখে অস্ফুট স্বরে বলল, 'এরই নাম ভালোবাসা।'
রোদে ভরে উঠেছে আকাশ। সমুদ্রের বুকে রোদের মণিমুক্তো ঝিকমিক করছে। পাহাড়ের গায়ে ঢেউয়ের উল্লাস লাফিয়ে পড়ছে। বৃষ্টির জলে চান করে সবুজ গাছগুলি এখন যেন রোদ পিঠে দিয়ে খুশিতে মাথা দোলাচ্ছে। গেছো-গোসাপের দল আবার দলবেঁধে পাহাড়ের পাথরে গা এলিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে। পাথরের ফাঁকে-ফাঁকে শামুকছানারা উঁকিঝুঁকি মারছে। কী আনন্দ শঙ্খচিলেদের, ডানা মেলে উড়ছে। গাঙচিলের দল ঢেউয়ের ওপর দোল খেতে খেতে মাছ খুঁজছে। আর নীল-সাদা হাঁসেরা সমুদ্রের বেলাভূমিতে গুগলি গেঁড়ি খুঁজছে। ধরছে, খাচ্ছে আর গান গাইছে।
হঠাৎ পাইনগাছ বলে উঠল, 'শঙ্খ, শঙ্খ, মেঘের পরে রোদ উঠলে মনে হয় না, গান গাই?'
শঙ্খচিল হইহই করে বলে উঠল, 'বেশ হয়, তুমি গান গাইলে খুব মজা করে আমরা নাচব।'
পাইনগাছ হেসে উঠল, 'দুর বোকা, আমার কী আর সে মুরোদ আছে! কেঠো-গলায় কী আর মিঠে-মিঠে গান হয়! বরঞ্চ তোমরা গাও, আমরা শুনি। তোমাদের সেই গানটা একবার শুনিয়ে দাও না, তোমাদের এই ছোট্ট দুটি অতিথিকে!'
'কোন গানটা?'
পাইনগাছ ভাবতে ভাবতে বলল, 'সেই যে, কী বলে যেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, মনে পড়েছে, সেই যে, সেই গানটা—ও পিসি গো…'
শঙ্খচিল আনন্দে হাসতে হাসতে বলল, 'ও তুমি কোন গানটার কথা বলছ বুঝতে পেরেছি,' বলে শঙ্খচিল যেই একটা লাইন গাইল অমনি সক্কলে একসঙ্গে গেয়ে উঠলঃ
ও পিসি গো, হায় গো পিসি, কত বড়ো মাছ,
ওই দ্যাখো না ডাঙায় উঠে লাগিয়ে দিল নাচ ,
ও খুড়ি গো, ফোকলা-বুড়ি, থুড়ি-থুড়ি-থুড়ি,
কানের ভেতর খড়কে গুঁজে দাও কেন সুড়সুড়ি!
ও বলি তাই আমার এত পাচ্ছে কেন হাঁচি,
এই দ্যাখোসে নাকের ভেতর ঢুকে গেছে মাছি!
চুলকে মরি পেটের ভেতর উই-উকুনের বাসা,
বলো এবার শুনলে কেমন, গানটি কেমন খাসা?
উঃ! সে কী মজা! কেউ গাছের ডালে নেচে নেচে গায়, কেউ আকাশে ডানা মেলে উড়ে-উড়ে, কেউ বা মাটিতে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে।
কী খুশি জয় আর টুটুর। তারাও যেন সব কষ্ট ভুলে, গান শুনে নিজেরাও নাচতে শুরু করে দিলে।
পাইনগাছ তাই না-দেখে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, 'বাঃ! বাঃ!'
নাচ-গানের জলসাটা চলল অনেকক্ষণ। অনেকক্ষণ ধরে হাসি আর খুশিতে সারা পাইনগাছের ডালপালা দুলতে থাকল। সেই খুশির গান শুনে আকাশও যেন আরও ঝলমল করছে। নীল আর নীল, শুধু নীল।
জয় টুটুর কানের কাছে মুখ এনে চুপিচুপি বলল, 'দ্যাখো টুটু, আকাশ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে!'
টুটু বলল, 'হ্যাঁ, আর দেরি করা ঠিক নয়। চলো এবার যাই!'
জয় বলল, 'এখান থেকে চলে যেতে মনটা ভীষণ খারাপ খারাপ লাগছে, তাই না?'
টুটু উত্তর দিল, 'খুব।'
হঠাৎ পাইনগাছ ওদের দেখে ফেলেছে। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, 'কী, দুটিতে চুপিচুপি কী কথা হচ্ছে?'
জয় আর টুটু দুজনেই থতমত খেয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে জয় বলল, 'না, তেমন কিছু নয়।'
পাইনগাছ আরও জোরে হেসে উঠল। যেই হাসল, মগডালের পাতাগুলি খিলখিল করে উঠল। খিলখিল করতে করতেই পাইনগাছ বলল, 'ভাবছ শুনতে পাইনি? আমার পাতায়-পাতায় কান। দ্যাখো বাপু, নীল আকাশ যতই হাতছানি দিক, কাল ভোরের আগে তোমাদের ছুটি হবে না।'
জয় আর টুটুর মুখ শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেল।
শঙ্খচিল পাইনগাছকে সায় দিয়ে বলল, 'তা তো বটেই! শরীর যদি ঠিক মতো চাঙ্গা হয়ে না-ওঠে, তো উড়তে উড়তে মাঝ-সমুদ্রে বিপদ হলে, তখন কী হবে?'
পাইনগাছ বলল, 'ঠিক কথাই তো। আমরা কী পাথর? আমাদের কী মন নেই? মনে দয়া-মায়া নেই? এভাবে তো দুটো ছোট্ট পাখিকে আমরা বিপদের মুখে ঠেলে দিতে পারি না!'
জয় আমতা-আমতা করল, 'কিন্তু…'
তার কথা শেষ হবার আগেই পাইনগাছ বলল, 'আমার কথা শোন রে পাখি। এই পৃথিবীতে আমার হয়ে গেল পঞ্চাশ বছর। ভালো-মন্দ কত কী দেখলুম। আমার ডালে কত পাখি এল কত পাখি গেল। কত পাখির কত সুখের কথা শুনলুম, কত দুঃখের কথা। কত পাখি গান গেয়ে গেল আমার ডালে, কত পাখি নাচল। কিন্তু কোনও পাখিকে তো বলতে শুনলুম না, একটি বুড়ো-গাছের জন্যে সে ভালোবাসা খুঁজতে বেরিয়েছে। ওরে পাখি, এইকথা শোনার পর থেকে তোদের জন্যে ভালোবাসায় আমারই মন উপচে পড়ছে। আমিও যেদিন বুড়ো হব, যেদিন আমারও সবুজপাতা ঝরে পড়বে, আমার শুকনো ডালপালাগুলো লিকলিক করবে, সেদিন হয়তো আর কেউ আসবে না আমার কাছে। সেদিন তোদেরই কথা শুধু মনে পড়বে আমার। তাই আজ যতক্ষণ পারি, আমার পাতার আড়ালে লুকিয়ে রেখে ভালোবাসি তোদের।'
গাছের কথা শুনে ভারি মন খারাপ হয়ে গেল জয় আর টুটুর। আজই চলে যাওয়ার জন্যে আর তারা কথা তুলল না। সুতরাং কালই ভোরে যাওয়া ঠিক হল। জয় আর টুটু পাইনগাছকে বলল, 'পাইনদাদা, আজ আমরা থাকলে তুমি যদি খুশি হও, আমরা নিশ্চয়ই যাব না।'
পাইনগাছ খুশিতে দুলে উঠল। দুলতে দুলতে বলল, 'আঃ, কী যে ভালো লাগছে তোদের কথা শুনে!'
আজ সারাদিন পাইনগাছের কাছে-কাছে থাকল জয় আর টুটু। কখনো এ-ডাল কখনো ও-ডালে। কখনো আবার গাছের ডাল ছেড়ে শঙ্খচিলের সঙ্গে উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগল। পাইনগাছ মাথা তুলে দ্যাখে আর চেঁচায়, 'ওহে শঙ্খ, বেশি দূরে যেয়ো না! হারিয়ে যাবে।'
শঙ্খ বলল, 'ভয় কোরো না, আমি সঙ্গে আছি।'
সারাদিন কত খেলা, কত হাসি আর কত খুশির কলতানে ভরে গেল সমুদ্রের তীরের সেই বন-পাহাড়। তারপর ধীরে-ধীরে যখন সূর্যের উত্তাপ কমতে লাগল, বিকেলের পড়ন্ত রোদের ঝাঁঝ কমল, তখন যেন জয় আর টুটুর মনটাও কেমন খারাপ খারাপ করতে লাগল
সন্ধ্যা নামার অনেক আগেই শঙ্খচিলের সঙ্গে জয় আর টুটু আবার পাইনগাছের ডালে এসে বসল। পাইনগাছ কী খুশি। বলল, 'এসো, এসো, অনেক খেলাধুলো হয়েছে। এবার একটু গল্পগুজব করা যাক। আমাদের তো গল্প ছাড়া করারও কিছু নেই। সেই যে মাটিতে গেঁথে বসে আছি ব্যাস, নট নড়ন-চড়ন, নট কিচ্ছু,' বলে নিজেই হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে আবার বলল, 'তোমাদের মতো যদি আমার ডানা থাকত, তবে যে কী মজা হত!'
টুটু বলল, 'পাইনদাদা, মজা হত ঠিকই, কিন্তু তোমার এই বিশাল দেহটা নিয়ে যখন তুমি আকাশে উড়তে, উফ যা দেখতে লাগত না, মনে হত হাওয়াই-দত্যি!'
পাইনগাছ বলল, 'আরে বাবা, সেইজন্যেই তো ভগবান হুড়কুষ্টি করে আমাদের মাটির সঙ্গে বেঁধে রেখেছে।'
শঙ্খচিল বলল, 'কিন্তু তোমাদের জন্যই তো পৃথিবী এত সুন্দর, এত সবুজ।'

পাইনগাছ শঙ্খচিলের কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, 'কিন্তু পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখতে পেলুম কই? যেখানে জন্মেছি সেখান থেকে তো এক-পা হাঁটতে পারি না আমি। শুনেছি, পৃথিবীর দিকে-দিকে কত না চোখ-জুড়ানো সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। শুনেছি, পৃথিবীর কোথাও আছে শুষ্ক মরুভূমি, কোথাও আছে শস্য-শ্যামলা সবুজ খেত। কোথাও আছে পাহাড়ের মাথায় তুষারের মুকুট। ঝরনা। কোথাও-বা শান্ত নদীর কুলুকুলু ধবনি। অবশ্য সমুদ্রের তীরে আমার জন্ম বলে, সমুদ্র আমার চোখে-চোখে। কিন্তু সমুদ্রের গভীরে যে কত অপূর্ব দৃশ্য আছে, সে আর আমি কোনোদিন দেখতে পাব না। শুনেছি সমুদ্রের নীচে অসংখ্য মাছ, অসংখ্য রঙিন গাছগাছালি। তেমনি কত না মণিমুক্তো। সবই শোনা রইল। দেখা আর কোনওদিন হবে না। শুনেছি, সমুদ্রের বুকে কোথাও কোথাও আছে প্রবালদ্বীপ। চোখ-ঝলসানো পাথর আর পাথর সেখানে। সেই প্রবালদ্বীপ নিয়ে কত গল্প শুনেছি, কত স্বপ্ন দেখেছি।'
'কী গল্প শুনেছ পাইনদাদা?' জিজ্ঞেস করল শঙ্খচিল।
'সে অনেক কথা।' উত্তর দিল পাইনগাছ।
'বলো না,' একই সঙ্গে আবদার করল জয় আর টুটু।
গাছ বলল, 'সে যে অনেক সময় লাগবে!'
জয় আর টুটু বলল, 'লাগুক না। আমরা তো আর চলে যাচ্ছি না এক্ষুনি।'
পাইনগাছ বলল, 'বেশ, তবে শোনো।' বলে পাইনগাছ গল্প বলতে শুরু করল। জয়, টুটু আর শঙ্খচিল শুনতে লাগল :
'অনেক, অ-নে-ক দিন আগে পৃথিবীর একেবারে দক্ষিণে এক সমুদ্রে নীল আর সবুজ, লাল আর হলুদ রঙের পাথর দিয়ে গড়ে উঠেছিল এক প্রবালদ্বীপ। আকাশ উপচে সূর্যের আলো যখন ছড়িয়ে পড়ত সেই রঙিন পাথরের গায়ে, তখন মনে হত, সে যেন এক স্বপ্নের দেশ। মনে হত, কোন এক সুখী রাজা সেখানে পৃথিবীর সব সেরা মণিমুক্তোগুলি সাজিয়ে সাজিয়ে এক সুখের রাজত্ব গড়েছে। আসলে কিন্তু তা নয়। এ-দ্বীপ গড়ে উঠেছিল আপনা-আপনি। এখানে কোনো রাজাও ছিল না, তার রাজত্বও ছিল না। এখানে উড়ে আসত নীল-ডানার হাঁস। কত রঙের পাখি। কত রঙিন মাছের ছোট্ট-ছোট্ট সরোবর ছিল এখানে। একসঙ্গে থাকত। কেউ কাউকে হিংসা করত না। কোনো ঝগড়া ছিল না। ছিল আনন্দ আর হাসি। পাখিরা যখন গান গাইত, সরোবরের মাছেরা তখন জলের নীচে আনন্দে লুটোপুটি খেত। আর নীল-ডানার হাঁসেরা আকাশে উড়ে-উড়ে দোল খেত। কী সুখ না ছিল সেখানে!
'একদিন হল কী, ভয়ংকর এক ঝড় উঠল সমুদ্রে। প্রবালদ্বীপের তীর ভাসিয়ে সমুদ্রের ঢেউ মাতামাতি শুরু করে দিল। সে যাই হোক, সমুদ্রের বুকে ঝড় তো হামেশাই ওঠে, আবার সময় হলে থেমেও যায়। কিন্তু একটা অদ্ভুত কাণ্ড হল। একজন লোভী জেলে সমুদ্রে মাছ ধরতে বেরিয়ে, সেই ঝড়ের মুখে পড়ল। কথা নয় তার বেঁচে থাকার। ঝড়ের ঘূর্ণিতে কখন তার জলের তলায় তলিয়ে যাবার কথা। কিন্তু আশ্চর্য, সে বেঁচে গেল। ঝড়ের ঝাপটায় তার নৌকো ঠেকল গিয়ে এই প্রবালদ্বীপে। ঝড়ে-জলে জেলে তো নাকানিচোবানি খেয়ে মরো-মরো। প্রাণটি কোনোরকমে তখনও তার বুকের মধ্যে ধিকিধিকি করছে। নৌকোর দাঁড় আঁকড়ে সে মুখ গুঁজে গোঙাচ্ছে!
'লোভী জেলে আরও অনেকক্ষণ নৌকোর ভেতর পড়ে পড়ে ধুঁকল। তারপর আস্তে আস্তে ঝড় কমল। সে যখন কোঁকাতে-কোঁকাতে উঠে বসল, তখন ঝড়ের মেঘ কেটে আকাশে রোদ উঠেছে। বুঝতেই পারছ, জেলের তখন কী মনের অবস্থা! কারণ সে যে এখন কোথায় এসে পড়েছে, বুঝতেই পারছে না। ভয় আর আতঙ্কে সে দূর-সমুদ্রের বুকের দিকে চেয়ে রইল ফ্যালফ্যাল করে। তারপরে হঠাৎ যখন তার সেই প্রবালদ্বীপের ওপর চোখ পড়ল, চমকে উঠল সে। তার চোখ ঝলসে গেল। চারদিকে রং আর রং। সূর্যের আলোয়, রঙের ছটায়, সমুদ্র-বুকের সেই ছোট্ট দ্বীপটা যেন ঝলমল করছে। সে হন্তদন্ত হয়ে নৌকো থেকে নেমে পড়ল। চারদিকে চোখ মেলে সে দিশেহারা হয়ে গেল। ভয়টা নিমেষে উবে গেল মন থেকে। লোভে চোখ দুটো তার ঠিকরে বেরিয়ে আসে যেন! লোভী জেলে এক-একটা রঙিন পাথরে হাত দেয়, আর চিৎকার করে বুকে জড়িয়ে ধরে, 'আমার, আমার।' সে ভাবল, এই পাথর নিশ্চয়ই খুব মূল্যবান রত্ন। সমুদ্রের এই নিরালা বক্ষের এই মূল্যবান রত্নের মালিক সে! সুতরাং সে আনন্দে চিৎকার আর লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিল।
'হঠাৎ এই দ্বীপে এক অপরিচিত মানুষকে দেখে সেই দ্বীপের পাখিরা, সেই দ্বীপের প্রাণীরা অবাক হয়ে গেল। ভাবল, তাদের সুখের রাজ্যে কোথা থেকে এল এই মানুষ!
'সেই মানুষ কিন্তু তখন এই রং-ঝলমল পাথরের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে, আর ভাবছে, সে এখন এই পাথর নিয়ে যাবে বন্দরে-বন্দরে। এই পাথরের বেসাতি করে না-জানি তার কত পয়সা হবে! উফ! এইকথা ভাবতে-ভাবতে তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। সে আর স্থির থাকতে পারে না। পাথর তুলে সে পাথরের গায়ে আঘাত করতে লাগল। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ পাথরগুলি টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ছে। সেই পাথর সে দু-হাত ভরে কুড়িয়ে নেয়, উত্তেজনায় হাঁপায় আর পাগলের মতো হোহো করে হেসে ওঠে। তার কোমরে জড়ানে ছিল একটা কাপড়ের ফেট্টি। সে তাড়াতাড়ি সেটা খুলে ফেলল। তারপর সেই ভাঙা পাথরের চাঁইগুলো সেই কাপড়ে বেঁধে ভাবল, 'আগে এগুলো নৌকোয় রেখে আসি। আবার এসে নিয়ে যাব।' এই ভেবে সে পাথরের বোঝাটা কাঁধে ফেলে, তার নৌকোর দিকে হাঁটা দিল।
'কিছুটা গিয়েই সে থামকে গেল। দেখল, অসংখ্য নীল-ডানার হাঁস তার পথের মাঝে দাঁড়িয়ে ডানা দোলাচ্ছে। জেলে প্রথমটা ওদের দেখে থমকে গেলেও, পরে গ্রাহ্যই করল না। হাত নেড়ে 'হুশ, হুশ' করে তাড়া মারল। তাড়া খেয়ে হাঁসগুলো কোথায় ছুটে পালাবে, তা নয়, তারা জেলের দিকে এগিয়ে চলল। জেলে ঘাবড়ে গেল! ভাবল, হাঁসের দল তাকে ভয় না-পেয়ে তার দিকেই কেন এগিয়ে আসে! জেলে তখন একটা পাথর ছুড়ে দিল হাঁসের দিকে। আর দেখতে! চোখের পাতা পড়তেও দিল না। সেই হাঁসের দল ডানা ঝাপটে লাফিয়ে পড়ল জেলের ঘাড়ে। জেলে একা। হাঁসেরা তার তুলনায় ছোট্ট হলেও, দলে ভারি। এমনিতেই কথা আছে, একতাই বল। হাঁসের দল সেই একতার বলে জেলেকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ল। করবেই তো! তাদের এই সুন্দর রঙে রঙে সাজানো আনন্দের রাজ্যকে একজন লোভী মানুষ ভেঙে তছনছ করে দেবে, এ তারা কখনও সহ্য করতে পারে! সুতরাং হাঁসের দল ডানার ঝাপটা মেরে, পায়ের নখ ফুটিয়ে, ঠোঁটের ঠোক্কর দিয়ে সেই লোভী জেলেকে আধমরা করে ছাড়ল। অগত্যা সে যন্ত্রণায় হাত-পা ছুড়ে চিৎকার করতে লাগল, 'বাঁচাও, বাঁচাও!' কিন্তু তখন কে তাকে বাঁচাবে! তার কাঁধে ঝোলানো সেই পাথরের বোঝা মাটিতে ছিটকে ছড়িয়ে পড়ল। আর সে নিজে হাঁসের আক্রমণে পাথরের ওপর গড়াগড়ি খেতে খেতে মাথা কুটতে লাগল। আঘাত যখন সে আর সহ্য করতে পারল না, তখন তার সারাশরীর রক্তে-রক্তে রাঙা হয়ে উঠেছে। সে জ্ঞান হারাল।
'জেলের যখন জ্ঞান ফিরল, তখন রাত। আকাশে চাঁদ। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে চারদিক। সমুদ্রের তরঙ্গের ওপর লক্ষ-লক্ষ চাঁদের কণা দোলা খাচ্ছে। রেশমের মতো নরম আলোর ওড়নাখানি লুটিয়ে পড়েছে সেই প্রবালদ্বীপের রঙিন পাথরের ওপর। আঃ! দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। সেই লোভী জেলে অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াল। সে বুঝতে পারল, তার সারাশরীরে ক্ষত, ব্যাথা। কিন্তু মুহূর্তেই সে ভুলে গেল সব কিছু। চাঁদের আলোয় ঝলসে-ওঠায় সেই পাথরের দিকে তাকিয়ে চোখ দুটো তার আবার লোভে জ্বলজ্বল করতে লাগল। মনে মনে ভাবল, আর তাকে পায় কে! সেই হাঁসের দল এই গভীর রাতে আর তো এখানে আসতে পারছে না! সুতরাং সে চাঁদের আলোয় আবার পাথর ভাঙতে লাগল।
'হঠাৎ চমকে যায় জেলে! এ কী, কে যেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে! থমকে অবাক-দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে তার দিকে। একটি অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে। তার গায়ে জ্যোৎস্নার ফিনফিনে আলোর পোশাক। মাথায় রঙিন রত্নের মুকুট। অঙ্গে রত্নখচিত কত না অলংকার। তাকে দেখে জেলে নিজেই যেন পাথরের মতো স্থির।
'মেয়েটি কথা বলল, 'কে তুমি?'
আঃ! কী মধুর কণ্ঠস্বর তার। পৃথিবীর আকাশে-বাতাসে যত সুর আছে, সব যেন একসঙ্গে ঝরে পড়ল তার কণ্ঠ দিয়ে।
কথা বলতে পারল না জেলে। হতভম্বের মতো চেয়ে আছে তার দিকে।
মেয়েটি আবার বলল, 'আমি প্রকৃতি মায়ের মেয়ে। ওই যে দেখছ, আকাশে জ্যোৎস্নায় ভরে আছে চাঁদ, ওই জ্যোৎস্নায় আমার তরী ভাসিয়ে. আমি পৃথিবীর দিকে দিকে ঘুরে বেড়াই। যারা পৃথিবীর সৌন্দর্য নষ্ট করে, আমি তাদের জন্য নিয়ে আসি মৃত্যু! তুমি জেনে রাখো, পৃথিবীর যেখানে যত সবুজবনের ছায়া ছড়িয়ে আছে, সে আমার মায়ের সৃষ্টি। পাহাড়ের মাথায় যে তুষারের মুকুট, সে আমারই মায়ের। পৃথিবীর দুই প্রান্তে শুভ্র তুষারের যে নদী বয়ে চলে, সে আমারই মায়ের দান। পৃথিবীর যেখানে যত নদী আছে, যত ঝরনা আছে কিংবা সমুদ্র আছে, সবই আমার মায়ের অধিকারে। তুমি লোভের বশে আমার প্রকৃতি-মায়ের এই চমৎকার প্রবাল-দ্বীপের রত্নভাণ্ডার লুঠ করছ। সুতরাং তোমার জন্যে আমিও এনেছি মৃত্যু!'
'না-আ-আ!' হঠাৎ এক আহত পশুর মতো প্রচণ্ড চিৎকার করে উঠল সেই জেলে।
'সঙ্গে-সঙ্গে প্রকৃতি-মায়ের মেয়েও হেসে উঠল খিলখিল করে। তার হাসির সুরে জ্যোৎস্নার আলোয় সেই রঙিন দ্বীপ ঝলমল করে কেঁপে উঠল। হাসতে হাসতে সে বলল, 'মৃত্যুর নাম শুনে ভয় পেয়ে গেলে?'
'জেলে এবার কথা বলল। উত্তেজনায় গলা তার থরথর করে কাঁপছে। সে বলল, 'তুমি মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাও। এ-দ্বীপ আমার। তোমার শক্তি থাকে, আমাকে বাধা দাও! দেখি, তোমার কত ক্ষমতা! জেনে রাখো মেয়ে, আমি মানুষ। তোমার ওই প্রকৃতি-মা-কে আমি থোড়াই কেয়ার করি।'
'আবার হেসে উঠল সেই মেয়ে। বলল, 'ওহে মানুষ, অত দম্ভ ভালো নয়। তুমি তো জন্মেছ আমারই মায়ের দয়ায়।'
'মিথ্যে কথা!'
'আমারই মায়ের শক্তিতে তুমি আজ বড়ো হয়েছ।'
'কে বলে সে-কথা? আমারই নিজের শক্তিতে আমি বড়ো হয়েছি।'
'মেয়েটি আবার হাসল। এক বোকা মানুষের আস্ফালন দেখে, তার মুখে এ যেন করুণার হাসি। হাসতে হাসতে সে বলল, 'ভারি বোকা তো তুমি। বোকারাই নিজের শক্তির বড়াই করে! তোমার শক্তি দিয়ে তুমি কি পারবে, সবুজ গাছের জন্ম দিতে? গাছে গাছে ফুল ফোটাতে? পারবে কি রঙিন পাখির মতো কারো কণ্ঠে গান দিতে? অথবা প্রজাপতির মতো পাখার রঙে কাউকে রাঙিয়ে তুলতে? তোমার শক্তির জোরে তুমি কি পারবে ভূমিকম্পের সঙ্গে লড়াই করতে কিংবা অগ্ন্যুৎপাতের সামনে দাঁড়াতে?'
'জেলে চিৎকার করে উঠল, 'পারি, পারি, সব পারি। একদিন সব পারব।'
'মেয়েটি এবার হাসল না। বলল, 'সবই যদি পারো তাহলে তোমার জন্যে এই যে আমি মৃত্যু এনেছি, এও তুমি নিশ্চয়ই জয় করতে পরবে?'
'জেলের গলায় দম্ভ ফেটে পড়ল। সে বলল 'দেখি, কে আমাকে মারে! তুমি? তার আগে আমিই তোমাকে শেষ করে ফেলব।' বলে সেই লোভী জেলে, ক্ষিপ্ত হয়ে তুলে নিল একটা মস্ত পাথর। তারপর চোখের পলকে সেই পাথর ছুড়ে দিল মেয়েটির দিকে। মুহূর্তও লাগল না। পাথর তার গায়ে আঘাত করার আগেই, সে অদৃশ্য হয়ে গেল। সেই অদৃশ্য মেয়ের কণ্ঠে গর্জে উঠল এক ভয়ংকর হাসি। সেই হাসির শব্দে সেই সমুদ্র, সেই দ্বীপ, সেই জ্যোৎস্নার আলো সবই যেন আর্তনাদ করে কাঁপিয়ে তুলল দিগবিদিক। প্রথমটা ভয় পেল সেই জেলে। কিন্তু তারপরেই সে আবার সেই পাথরের টুকরোগুলো বোঝাই করতে লাগল তার কাপড়ের থলিতে।
'এখন চারদিক শান্ত। শুধু সমুদ্রের শব্দ। ঢেউয়ের পর ঢেউ আছড়ে পড়ে গর্জে উঠছে। জেলে ভাবল, এই সুযোগ। আর দেরি ঠিক নয়। সঙ্গে সঙ্গে সেই বোঝা আবার পিঠে ফেলে, সে তার নৌকোর দিকে হাঁটা দিল।
'সে থমকে দাঁড়ায়। তাই তো! তীরে এসে সে তো নৌকো দেখতে পাচ্ছে না! তবে কী সমুদ্রের এই কিনারে সে নৌকো বাঁধেনি।
'সুতরাং সে ছুটল এই কিনার থেকে আর এক কিনারে। সেখানেও তো নৌকো নেই! আতঙ্কে কেঁপে ওঠে তার সারা শরীর। তারপর সে এ-কূল থেকে ও-কূলে পাগলের মতো ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। কিন্তু কোথায় পাবে তার নৌকো! নৌকো তো ভেসে গেছে সমুদ্রের জলে জলে কোথায়। সে কী আর দেখা যায়! হায় রে লোভী জেলে, প্রবালদ্বীপের সৌন্দর্য দেখে তখন তুমি এমনই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলে, নৌকোটা যে তীরে বেঁধে রাখা দরকার, এ তুমি খেয়াল করলে না!
'জেলের মাথায় যেন বাজ পড়ল। চিৎকার করে উঠল জেলে। উন্মাদের মতো দিগবিদিক জ্ঞান হারিয়ে সে আর্তনাদ করতে লাগল, 'বাঁচাও বাঁচাও!' কিন্তু কে তাকে বাঁচাবে! এই নির্জন প্রবালদ্বীপে তার চোখের সামনে এখন এই কঠিন পাথরগুলি ছাড়া আর কিচ্ছু নেই। মরণ-ভয়ে ভীত এই মানুষটার চোখে এই পাথরগুলো এখন আর মূল্যবান রত্ন নয়! যেন এক-একটা ভয়ংকর দৈত্য। তার গলাটা টিপে ধরার জন্যে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসছে। জেলে প্রাণের ভয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট দিল। কিন্তু কোথায় পালাবে? যেদিকে ছোটে, সেই দিকেই যেন সেই পাথরের দৈত্য মুখ বেঁকিয়ে দাঁড়িয়ে তাকে ভয় দেখাচ্ছে। চিৎকার করে কান্না জুড়ে দেয় জেলে। কিন্তু এখন তার কান্না শোনার মতো একটি প্রাণীও নেই এই পাথরের রাজত্বে। ছুটতে ছুটতে কাঁদতে কাঁদতে জেরবার হয়ে গেল সেই জেলে। শেষে যখন তার বুকের রক্ত ঠান্ডা হয়ে এল ধীরে-ধীরে, যখন তার ক্লান্ত পা আর উঠছে না, তখন সে ছিটকে পড়ল ওই পাথরের ওপর মুখ থুবড়ে। তারপর আর কিছু জানা গেল না। জানা গেল না, সেইখানেই পড়ে পড়ে সেই জেলের মৃত্যু হল, অথবা জানা গেল না, কোনোও একদিন সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস সেই দ্বীপে আছড়ে পড়ে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল কিনা!'
গল্প শেষ হল। গল্প শুনতে শুনতে কেমন যেন থমথম করছে সক্কলের মুখ। কথা নেই। শুধু চোখের ওপর ভাসছে, সেই দ্বীপ, সেই জেলে, সেই পাথর আর জ্যোৎস্নার তরী বেয়ে নেমে আসা সেই মেয়ের মুখখানি।
পাইনগাছ কথা বলল, 'শুনলে তো গল্প?'
টুটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, 'আশ্চর্য গল্প।'
শঙ্খচিল বলল, 'লোভ করলে মরণ ছাড়া আর পথ নেই।'
সবার কথা শেষ হলে, খুব যেন হতাশ গলায় জয় বলল, 'এমন যেখানে লোভ, দম্ভ, সেখানে কোথায় খুঁজে পাব ভালোবাসা?'
পাইনগাছ জয়ের কথা শুনে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, 'কেন, আমাদের ভালোবাসা কী ভালোবাসা নয়? এই যে শঙ্খচিল তোমাদের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ভালোবাসল, সে কী ভালোবাসা নয়?'
লজ্জা পেল জয়। বলল, 'না পাইনদাদা, তোমাদের এ-ভালোবাসার কথা ভুলতে পারি না আমরা। আমাদের ভুল বুঝো না! তোমাদের ভালোবাসা না-পলে আমরা কী বাঁচতে পারতুম! আমার ভাবনা যে আপেলগাছের জন্যে।'
বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। আর একটু পরেই সন্ধ্যা নামবে। পাইনগাছ বলল, 'আজ তোমরা আমার কাছেই থাকো। আমার ভালো লাগবে। রাত কাটলেই তো তোমরা চলে যাবে। বেশ লাগল তোমাদের। আবার কবে দেখা হবে জানি না। কে জানে কোনদিন কী বিপদ আসে! যেদিন ওই সমুদ্র মনে করবে আমার কাজ শেষ হয়েছে, সেইদিনই সে ঝড়ের ধাক্কায় আমায় মাটিতে ঠেলে ফেল দেবে। জানি না সেদিন আসতে কত দেরি।' বলে পাইনগাছ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
শঙ্খচিল বলল, 'ও-কথা কেন বলছ পাইনদাদা?'
পাইনগাছ বলল, 'না, জানো, হঠাৎ ওই ছোট্ট দুটো পাখিকে বিদায় দেবার কথা মনে আসতেই মনটা কেমন করে উঠল।' বলে হঠাৎ পাইনগাছের চোখ পড়ল জয় আর টুটুর চোখের ওপর। হো-হো করে হেসে উঠল পাইনগাছ। হাসতে হাসতে বলল, 'আরে, আরে, জয় আর টুটুর চোখে জল কেন? দুর বোকা, আমার কথা শুনে কাঁদে! ছিঃ, ছিঃ! কেউ দেখে ফেললে কী বলবে বল তো? আয়, আমার কাছে আয়!' তারপর আদর করে বলল, 'একটা গান শোনাবি না আমাকে? নে, একটা গান শোনা! পাখির গান শুনতে আমার এত ভালো লাগে!'
জয় আর টুটুর চোখে তখনও জল টলটল করছে। তাড়াতাড়ি মুখ ঘুরিয়ে দুজনেই ওই দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দুজনেই একই সুরে গেয়ে উঠল :
একটু কথার, একটু সুরে একটুখানি গান,
এই তো জানি ছোট্ট প্রাণের খুশির কলতান।
খানিক আলোয়, খানিক ছায়ায় বাতাসে ঢেউ তুলে,
মোদের গানে উঠুক সবার হৃদয়খানি দুলে।
ছোট্ট হাসির, ছোট্ট খুশির বাজিয়ে যাব বাঁশি,
আলোর মতো মুক্তো দেব ছড়িয়ে রাশি-রাশি।
সন্ধ্যা নেমে এল। দূর সমুদ্রে সূর্যের শেষ চিহ্নটি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। পাইনগাছ বলল, 'সত্যিই, কী চমৎকার! যেমন চমৎকার তোমাদের গান, তেমনি চমৎকার এই সন্ধ্যা। তোমাদের ঘুমের সময় এল। এই রাত তোমাদের শুভ হোক! তোমরা সুখী হও!'
ঘুমিয়ে পড়ল জয় আর টুটু। ঘুমিয়ে পড়ল তাদের পাশে শঙ্খচিল।
খুব ভোরেই ঘুম ভেঙেছিল জয় আর টুটুর। চোখ খুলেই অবাক হয়ে গেল তারা। দ্যাখে কী, অমন, শয়ে-শয়ে শঙ্খচিল পাইনগাছের ডালে এসে জমায়েত হয়েছে। সবার চোখ জয় আর টুটুর দিকে।
'ঘুম ভাঙল?' পাইনগাছ জিজ্ঞেস করল।
জয় বলল, 'ঘুমিয়ে পড়েছিলুম।'
পাইনগাছ, বলল, 'এবার তোমাদের যাবার সময় হয়েছে। ওরা তোমাদের জন্যে খাবার এনেছে। কিছু খেয়ে নাও।'
জয় আর টুটু পেটভরে খেয়ে নিল।
শঙ্খচিল বলল, 'তোমাদের বিদায় জানাবার জন্যে সবাই এসে পড়েছে। আর দেরি কোরো না।'
পাইনগাছ বলল, 'ছোট্ট পাখি, তোমরা সুন্দর! তোমাদের কথা ভুলব না কোনোদিন। আবার যদি কখনো আসো, খুব ভালো লাগবে আমাদের।'
টুটু আর জয় একসঙ্গে বলে উঠল, 'তোমাদের কথা আমরা কোনোদিন ভুলব না। কক্ষনো না,' তারপর একটু থেমে আবার বলল, 'এবার তাহলে বিদায় দাও পাইনদাদা!'
'বিদায়!' পাইনগাছের গলা কেঁপে উঠল।
'বিদায়!' শঙ্খচিল বুঝি চোখের জল সামলাতে পারে না।
তারপর যত পাখি সেখানে জড়ো হয়েছিল, সবাই একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, 'বিদায়!'
সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য পাখি বাতাসে ডানা ছড়িয়ে আকাশে ভেসে উঠল। জয় আর টুটুও আকাশে উড়ল। দক্ষিণে মুখ ঘোরাবার আগে আবার ডাক দিল, 'বিদায়।' তারপর সমুদ্রের আকাশে ডানা মেলে ভেসে গেল।
ওই পাখির দল তাদের অনুসরণ করল। সমুদ্রের বেশ কিছুটা পথ দুই পাখির সঙ্গী হল তারা। তারপর বিদায় জানিয়ে মাঝ-সমুদ্রের বুক থেকে তীরের দিকে ফিরতে লাগল। তখন জয় আর টুটু সমুদ্রের শূন্য আকাশে দুটি বিন্দুর মতো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
উড়তে উড়তে হঠাৎই চিৎকার করে উঠেছিল টুটু, 'জয়, ওই দ্যাখো, আগে আগে আমাদের দল উড়ে যাচ্ছে!'
'কই?'
'ওই তো সামনে!'
'তাই তো' জয় আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারপর ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'আমাদের না-হয় দেরির কারণ আছে। ওরা এত দেরি করে কোত্থেকে আসছে?'
টুটু বলল, 'দ্যাখো, ওদেরও হয়তো ঝড়ে পড়তে হয়েছিল।'
জয় বলল, 'চলো, আর একটু তাড়াতাড়ি গেলে হয়তো ওদের ধরে ফেলতে পারব।'
সত্যি, জয় আর টুটু কী দ্রুত উড়ে এল। দেখতে দেখতে দলের মধ্যে মিশে গেল। আঃ! তারপর কী আনন্দ! এ জিজ্ঞেস করে, 'কোথা ছিলে?' ও বলে, 'দেরি কেন?' এ এক গল্প বলে, ও এক গান শোনায়। সে কী হাসিখুশি, মজা।
সমুদ্রের বুকে সেই খুশির কলতান ছড়িয়ে ছড়িয়ে আরও খানিকটা উড়ে আসার পর, ওই তারা দেখতে পেয়েছে সেই বন-সবুজের দ্বীপ। তখন আবার আর একরাশ আনন্দের ঢেউয়ে দুলে উঠল পাখিদের রঙিন ডানাগুলি।
বিকেলেই ওরা পৌঁছে গেল বন-সবুজের দ্বীপে। সবুজ তো সত্যিই সবুজ। এক গভীর অরণ্য। ঘন গাছের দুর্গ দিয়ে ঘেরা যেন সেই দ্বীপ। পাখির দল অরণ্যের বুকের ওপর যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর আকাশে উড়তে উড়তে আরও গভীরে পৌঁছে গেল। সমুদ্রের বাতাস এখানে আসে, কিন্তু তার সে ভয়ংকর মূর্তি দেখা যায় না। শোনাও যায় না তার হম্বিতম্বি। এখানে শুধু গাছের পাতায় বাতাসের শব্দ। ভারি গম্ভীর। অদ্ভুত রহস্যে ভরা।
এই নিয়ে বোধহয় এখানে জয় পাঁচবার এল। টুটুও তাই। মায়েরা শীতের দেশ থেকে উড়ে এসে এখানে ডিম পাড়ে। জয়ের মতো এবারও কত পাখির জন্ম হবে এই বনের গাছে গাছে। অবশ্য টুটুর জন্ম আরও একটু দক্ষিণে। তা হোক, কিন্তু এখন দুজনের ভারি বন্ধুত্ব। কেউ কাউকে কাছছাড়া করতে চায় না। একই সঙ্গে একই গাছে বাসা বাঁধল টুটু আর জয়। এখন বেশ ক-টা দিন এখানে থাকতে হবে। বেশ ক-টা দিন এই বন-সবুজের দ্বীপে তাদের আস্তানা গড়ে উঠবে। কী ভালো বলো? এই বনের অন্য পাখিরা, কিংবা অন্য কোনও পশু প্রাণী ঝগড়া করে ওদের বলবে না, 'এ-দেশ আমাদের। আমাদের দেশে তোমরা কার হুকুমে প্রবেশ করেছ? তোমরা এখনই এখান থেকে ভাগো, নইলে ডান্ডা মেরে তোমাদের ঠান্ডা করে দেব!'
কিন্তু উলটে দ্যাখো, বনের অন্য পাখিরা ওদের দেখে কত খুশি। ওরা উড়ে আসার সঙ্গে-সঙ্গে কেমন আদর করে এ-দেশের পাখিরা ওদের আশ্রয় দিল! এমনকী, গাছে গাছে ওই যে অত বাঁদর, তারাও দ্যাখো, নতুন অতিথিকে দেখে কত খুশি! ডালে ডালে তারা কেমন হুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে। সত্যি, বাঁদরের ছানাগুলোকে দেখলে কী দারুণ মজা লাগে। মায়ের পেটের মধ্যে ঠ্যাং জড়িয়ে কেমন জুলজুল করে দেখছে জয় আর টুটুকে।
হ্যাঁ, এই বনে বাঁদর কেন, বাঘও আছে। বাঘ আছে, হরিণ আছে, সাপ আছে। এমনকী হাতিও আছে। ফেউ কী খ্যাঁকশেয়ালের কথা ছেড়ে দাও। তারা তো থাকবেই। সববার সঙ্গে আবার দেখা হবে। দেখা হবে, সেই ছোট্ট হরিণটার সঙ্গে। গত বছর সেই ছোট্ট হরিণটার সঙ্গে জয়ের ভাব হয়েছে। কে জানে এই একবছর বাদে সে জয়কে চিনতে পারবে কিনা! যাই হোক আজ তো আর খোঁজ করা যাবে না তার। আজ সবাই খুব ক্লান্ত। খেয়ে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেই হয়। তারপর কাল সকাল থেকে বন-সবুজের দ্বীপে নতুন সংসার পাতবে পাখিরা। সামনে ঝিল। ওই ঝিলে বাঘ জল খেতে আসে। আসে হরিণ, হাতি সক্কলে। ওই ঝিলে পাখিরাও চান করবে। আর ঝিলের ধারে পোকা খুঁজে-খুঁজে পেট ভরাবে। ঝিলের জল ভারি পরিষ্কার। আয়নার মতো ঝকঝক করছে।
ক্লান্ত পাখিরা ঘুমিয়ে পড়ল। রাতও গভীর হল। রাতের বনে ঝিঁঝির ডাক। অসংখ্য জোনাকি। গাছের ফাঁকে ফাঁকে তাদের আলোর চুমকিগুলি ঝিলমিল করে ভেসে বেড়াচ্ছে। অনেক অনেক দূরে কখনো-বা বাঘের গর্জনে হঠাৎ হঠাৎ চমকে ওঠে বনের নির্জনতা। কোথাও বা গাছের ডালে একটি-দুটি পাখির ডানার ঝটপটানি। কিংবা গিরগিটির টকটকানি।
জয়ের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল খুব ভোরেই। ঘুম ভাঙতেই জয় ডাক দিয়েছিল টুটুকে। তারপর দুজনেই এ-গাছ থেকে ও-গাছে উড়ে-উড়ে ভারি আনন্দে ছোটাছুটি করতে লাগল।
ছুটতে-ছুটতে জয়ই বলল, 'এই বনে বেশ একটা মজা আছে।'
টুটু উত্তর দিল, 'আমারও এখানে এলে এত ভালো লাগে!'
'কিন্তু জানো টুটু, এত ভালো লাগার মধ্যেও বুড়ো-আপেলগাছের কথা আমার বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে। আমি তো এখনও জানি না কোত্থেকে তার জন্যে আমি ভালোবাসা নিয়ে যাব।'
হঠাৎ টুটু চেঁচিয়ে উঠল, 'জয়, জয়, হাতি!'
হ্যাঁ তো রে! ও বাবা, মায়ের সঙ্গে আবার একটা বাচ্চা! কেমন টুক-টুক করে হেঁটে চলেছে। বাচ্চাটাকে দেখে কী হাসিই না পাচ্ছে! হাসি পাবারই কথা। মায়ের ওই দশাসই চেহারার পাশে বাচ্চাটাকে মনে হচ্ছে যেন খেলনা-হাতি। কেমন শুঁড় নাড়ছে, আর কুতকুত করে এদিক-ওদিক চাইছে।
বাচ্চাটাকে দেখে জয় আর টুটুর এত মজা লেগে গেল যে, তারাও চলল সঙ্গে সঙ্গে ফুড়ুত-ফুড়ুত এগাছে-ওগাছে লাফ দিয়ে। একটু যেতে দুজনেই বুঝতে পেরেছে, হাতি-মা ছেলেকে নিয়ে ঝিলে চলেছে। আর, দেখতে দেখতে হাতি যখন সত্যি ঝিলে চলে এল, তখন আকাশের আলো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে ঝিলের জলে ঝিলিমিলি খেলছে। জলের সামনে মা এসে দাঁড়াল। খুব সতর্ক চোখে চারপাশটা দেখে নিল। না, কাউকে দেখতে পেল না। ভাবল, যাক, কেউ দ্যাখেনি। সত্যি কেউ দ্যাখেনি। কিন্তু দুটো যে ছোট্ট পাখি তার পিছু নিয়েছে সেটা আর হাতি-মা টের পাবে কী করে! গাছে অমন কত পাখি ডাকাডাকি করছে! ভয় তো শুধু ব্যাঘ্রমহাশয়কে। তিনিও তো তেষ্টা পেলে হুট করে চলে আসেন এই ঝিলের ধারে জল খেতে। অবশ্য এখন যে তিনি আসবেন না, এ-কথাটা না-জেনে কী আর হাতি-মা ছানাকে নিয়ে এসেছে এখানে! বনের বাসিন্দারা ভারি সতর্ক। কে যে কখন কোথায় থাকে, তারা সব জানে। তবু সাবধানের মার নেই। তাই হাতি-মা আশপাশটা আবার ভালো করে দেখে তারপর ঝিলে নামল। ওই দ্যাখো, মায়ের দেখাদেখি বাচ্চাটাও কেমন গুটগুট করে নামছে! কী সাবধানী-মা দেখেছ! ছেলেকে কেমন আগলে আছে! ব্যাস, তারপরেই শুরু হয়ে গেল জল নিয়ে হাতি-মায়ের ফোয়ারার খেলা। হাতি-মা শুঁড়ে জল টানে আর ছেলের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। আবার কখনো শুঁড়ের জল আকাশের দিকে ছুড়ে দিয়ে নিজের গা ভিজিয়ে নেয়। ই-ই-ই! আচমকা ফোয়ারার জল একবার লেগে গেছে জয় আর টুটুর গায়ে। ঠিক হয়েছে! যেমন এগিয়ে যাওয়া। দুজনেই জলের তোড়ে নাকানিচোবানি খেয়ে হাঁপানি শুরু করে দিল।
আরে, আরে! ও কী, ও কী! ওই দ্যাখো, একদল হরিণ এসেছে ঝিলে জল খেতে। অবশ্য হাতি-মা ছেলেকে নিয়ে যেখানে চান করছে, তার থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে হরিণের দল জল খায় আর হাতির চান দেখে।
ইশ-শ-শ! কী হল দ্যাখো! মা-হাতিটা কী দুষ্টু দেখেছ! শুঁড়ে জল নিয়ে আচমকা হরিণের দিকে ছুড়ে দিয়েছে। হরিণের দল একদম হকচকিয়ে গেছে। মারল ছুট। এখন আর ছুটলে কী হবে! জলে নেয়ে-ভিজে একশা! একটু দূরে দাঁড়িয়ে, মাথা-গা ঝাড়া দিয়ে জুলজুল করে দেখতে লাগল। আর এ-ওর গায়ে গা ঘষতে লাগল। দেখে, কী মজা লেগে গেছে জয় আর টুটুর। দুজনেই গাছের ওপর থেকে গলা ফাটিয়ে হেসে উঠেছে।
আচ্ছা, জয় হাসতে-হাসতে থমকে গেল কেন? কী দেখল জয়? মনে হচ্ছে, দলের ভেতর তার বন্ধু হরিণছানাও আছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ। জয় ঠিক চিনতে পেরেছে। ওই তো! দ্যাখো, দ্যাখো, একবছরে কত বড়ো হয়ে গেছে!
জয় গাছ থেকে ফুড়ুত করে উড়ে ডাক দিল, 'টুটু, এসো, এসো, দেখবে এসো, আমার বন্ধু হরিণছানা!'
'কই?' টুটুও জয়ের পিছু পিছু উড়ে চলল।
জয় হরিণ-বন্ধুর মাথার ওপর উড়ে আসতে, হরিণও তাকে চিনতে পেরেছে। অমনি সেই হরিণছানাও আকাশবাগে মাথা তুলে জয়কে দেখে লাফিয়ে উঠল। লাফাতে-লাফাতে আনন্দে ছুট দিল বনের ভেতরে। জয় আর টুটুও ডাক দেয় আর হাওয়ায় নাচতে নাচতে হরিণের পিছু নেয়।
অনেকখানি ছুটে এসে হরিণ আনন্দে চার পা তুলে নাচে। জয় আর টুটুও আকাশ থেকে প্রায় তার গায়ের কাছে উড়ে এসে ডানা ছড়িয়ে দোল খায়। সে কী আনন্দ! শেষে জয় আর টুটু দুজনেই হঠাৎ তার পিঠের ওপর বসে পড়ে চিৎকার শুরু করে দিল। হরিণও তাদের পিঠে নিয়ে সে কী ছুট। গাছের বাঁদরগুলো তাই না-দেখে খুশিতে গাছের এডালে-ওডালে নাচানাচি শুরু করে দিল। সত্যি, সে কী অদ্ভুত দৃশ্য!
কী হল? ছুটতে ছুটতে হরিণটা আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল কেন? চোখের সামনে ওই ঝোপটার মধ্যে স্থিরচোখে কী দেখছে? ঝোপের ভেতরটা যেন একটু একটু নড়ছে। হ্যাঁ, ঠিক যা ভাবা, ঝোপের মধ্যে ডোরাকাটা একটা বাঘ। কেমন ঘাপটি মেরে বসে আছে। হরিণটাকে দেখে লোভে ল্যাজ নাড়ছে। দেখে ফেলেছে টুটু। সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে উঠে চেঁচিয়ে উঠেছে, 'বাঘ!'
আর বলব কী, চোখের পাতা পড়ার আগেই হরিণছানাটা মেরেছে এক লাফ। মেরেই ছুট। জয় আর টুটু শূন্যে মারল এক ডিগবাজি। মেরেই দেখতে পেল, বাঘই হালুম করে একটা হাঁক পাড়ল। বুক তো কাঁপলই, বন পর্যন্ত কেঁপে উঠল। তারপর ঝোপ ডিঙিয়ে মারল এক লাফ! মেরেই হরিণের পেছনে ধাওয়া করল।
হরিণ তখন ছুট-ছুট! বাঘও নাছোড়বান্দা। তখন সেই বনের ভেতর বাঘ আর হরিণের কী সাংঘাতিক ছুটন্ত লড়াই শুরু হয়ে গেল।
জয় আর টুটুর মুখ তো শুকিয়ে এইটুকু! উড়তে উড়তে জয় আর টুটু কখনো বাঘের মাথার ওপর আসে, কখনো আসে হরিণের মাথার ওপর। তাদের বন্ধুকে এখন বাঘের হাত থেকে কেমন করে যে বাঁচাবে, দুজনের কেউই জানে না।
বলো, ওই ছোট্ট হরিণটা, এই ধুমসো রাক্ষসটার সঙ্গে কতক্ষণ পারবে? শেষে টুটুই চেঁচিয়ে উঠল। বলল, 'জয়, আমাদের যদি মরতে হয় তো মরব। এসো, উড়তে উড়তে বাঘের চোখে নখ ফুটিয়ে দিই!'
জয় উত্তেজনায় ছটফট করতে করতে বলল, 'হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমাদের প্রাণ দিয়ে যদি বন্ধুর প্রাণ বাঁচে তার চেয়ে সুখ আর কী আছে।' বলে জয় আর টুটু এবার বাঘের সঙ্গে লড়াই শুরু করল। বাঘ যেদিকে ছোটে, ঠিক তার উলটো দিক থেকে জয় আর টুটু তার দিকে উড়ে আসে। টুটুই প্রথম ছোঁ-মারার মতো ছুটন্ত বাঘের দিকে তার পায়ের নখ উঁচিয়ে নেমে এল। দিল খুঁচিয়ে! যাঃ! ফসকে গেছে। তার নখের খোঁচা বাঘের চোখে না-লেগে, লাগল মাথায়। উরি বাবা! বাঘের তখন সে কী মূর্তি। টুটুকে ধরার জন্য থাবা উঁচিয়ে শূন্যে মারল এক ডিগবাজি। কিন্তু ততক্ষণে টুটু হুশ। আকাশে হাওয়া খাচ্ছে। এই তালে হরিণও ছুট ছুট। বাঘের নাগালের অনেকটা দূরে ভোঁ-কাট্টা! কিন্তু এর নাম বাঘ। অত সহজে ছাড়বার পাত্তর ইনি নন। আবার হরিণের পেছনে মারল তাড়া। এবার জয়ের পালা। চোখের নিমেষে জয় সোজা গোঁত মেরে বাঘের সামনে। মেরেছে ঠোঁটের ঠোক্কর একেবারে চোখের ভেতর। মেরেই ফুড়ুত! সিধে, আকাশে!
এক ঠোক্করেই বাঘের চোখ ফুটো। বুঝতেই পারছ, তখন বাঘের কী বেহাল অবস্থা। আর হরিণকে ধরবে কী, কানা চোখের জ্বালা নিয়ে ব্যাঘ্রমশাই সেইখানেই হুমড়ি খেয়ে হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিল। কার আর ঘাড়ে ভূত চেপেছে যে, বাঘের হাঁক শুনে তার কাছে ছুটে যায়! সুতরাং এখন যত পারো চিৎকার করো, বয়ে গেছে কারও শুনতে!
হরিণ তো পালালই, জয় আর টুটুও হাওয়া। অবশ্য জয় আর টুটু হরিণের পিছু আর ছুটল না। দুজন নিজেদের গাছেই ফিরে এসেছে। উফ! ভীষণ হাঁপাচ্ছে দুজনেই। হবেই তো! বাঘের সঙ্গে লড়াই করা কী এই ছোট্ট পাখির কম্ম! কিন্তু দ্যাখো, হতে পারি ছোট্ট, গায়ে জোর না-ই থাক, কিন্তু সাহস আর বুদ্ধি থাকলে যে, শক্তিশালী শত্রুকে ঘায়েল করা যায়, এই দুটি ছোট্ট পাখি সেইটাই কেমন দেখিয়ে দিল। তবে বাপু, হরিণের সঙ্গে খেলা করতে গিয়ে অমন অসাবধানী হওয়া উচিত হয়নি। একটা কিছু অঘটন ঘটে গেলে, তখন কী হত?
জয় আর টুটু অনেকক্ষণ গাছের ফাঁকে চুপটি করে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর কানা-বাঘের আর হম্বিতম্বি শোনা গেল না। হয়তো বাঘটা চোখের যন্ত্রণা নিয়ে ঘরের ছেলে ঘরে পালিয়েছে। এই গভীর বনে কোথায় যে বাঘের ঘর, সে তো জয় আর টুটু কেউ-ই জানে না। জানলেই বা কী! ভাবছ, তারা যাবে সেখানে? খেপেছ, আর ও-পথ মাড়াতে আছে!
কিন্তু মনটা বড়ো ছুক-ছুক করছিল জয়ের। তাই তো, হরিণটা গেল কোথায়! চুপটি করে সেই কথাটাই সে ভাবছিল। হঠাৎ টুটু কথা বলল। জিজ্ঞেস করল, 'কী জয়, চুপ করে আছ কেন?'
'ভাবছি।'
'কী?'
'বাঘটাই বা কোথায় গেল, হরিণটারই বা কী হল?'
টুটু বলল, 'বাঘের কথা ছেড়ে দাও। যা মার খেয়েছে, পালাতে পথ পায়নি। এখন বাছাধনকে একটি চোখ সম্বল করে বেঁচে থাকতে হবে। তবে হরিণটা যে কোথায় গেল, সেইটাই চিন্তার। চলো, খুঁজে আসি!'
জয় বলল, 'হ্যাঁ, আমিও সেই কথাই ভাবছিলুম। চলো।'
দুটিতে আবার উড়ল বনের গাছে গাছে। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগল হরিণছানাকে। কোথায় পাবে তাকে? প্রাণের ভয়ে সে যে কোথায় লুকিয়ে আছে, খুঁজে পাওয়া খুবই শক্ত। তার ওপর দ্বীপটাও তো আর একটুখানি নয় যে, বললেই একটা চক্কর দিয়ে আসবে। অনেকটা উড়লে তবে এই দ্বীপে সেই যেখানে মানুষ বাস করে, সেখানে পৌঁছোতে পারবে। তা সে একেবারে বনের শেষ প্রান্তে। তা বলে এ-মানুষরা শহরের মানুষের মতো অমন নয়। এরা কাপড়ও পরে না, জামাও গায়ে দেয় না। ভাবছ, দেখলে লজ্জা করবে? মোটেই না। কী সুন্দর গাছের ছাল আর গাছের পাতার বাহারি-পোশাক তাদের গায়। তার ওপর ছেলেদের মাথায় বনফুলের মুকুট। আর মেয়েদের গায়ে কত রকমের রঙিন পাথরের অলংকার। ঝকমকে রং মেখে তারা যখন হাতে বর্শা নিয়ে গান গেয়ে নাচে, কী বলব তোমাদের, দারুণ লাগে। এই বর্শাটাকেই ভয়। বনের বাঘ যদি কখনো-সখনো খাবারের খোঁজে মানুষের আস্তানায় ঢুকে পড়ে, তবে ওই বর্শাই তাদের রক্ষা করে। ওই বর্শা দিয়ে বাঘের বংশ নাশ করে ছেড়ে দেবে।
জয় আর টুটু উড়তে উড়তে একেবারে মানুষের সেই আস্তানার কাছাকাছি পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু তবু সেই হরিণের দেখা মিলল না। অগত্যা ফিরে আসতে হল। কী আর করা! খুব মন খারাপ হয়ে গেল দুজনেরই।
এমনি করে তিন দিন কাটল তাদের বন-সবুজের দ্বীপে। এমনি করে আর কতদিন তাদের থাকতে হবে এখানে। বন-সবুজের দ্বীপে যেন সবসময় বসন্ত। অথচ উত্তরে এখন শীত। সেখানে এখন হিমেল বাতাস আর তুষারের ঝঞ্ঝা। বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে জয়ের। আবার মনে পড়ে যায় বুড়ো-আপেলগাছের কথা। তার জন্য এখনও একটু ভালোবাসা খুঁজে পেল না জয়। ভালোবাসা না-পেলে সে কেমন করে দাঁড়াবে আপেলগাছের সামনে! কোন মুখে সে বলবে, 'তোমার জন্য ভালোবাসা আনতে পারিনি আপেল-বুড়ো!'
যতই দিন যাচ্ছে, ততই যেন জয়ের মনটা মুষড়ে পড়ছে। তবে কী সে আর কোনোদিন বুড়ো-আপেলগাছের কাছে যাবে না!
না, সে যাবে। নিশ্চয়ই যাবে। তাকে যেতেই হবে। এখন জয় সব ছেড়ে এই ভালোবাসার খোঁজেই ঘুরে বেড়াবে। খুঁজবে এই বন-সবুজের কোণে-কোণে!
কিন্তু হায়! তা আর হল না।
কেন?
এই বন-সবুজের দ্বীপে সেদিনের রাত এসেছিল এক ভয়ংকর মূর্তি ধরে। শান্ত রাতের নিস্তব্ধতা এই বনে সেদিনও ছিল তেমনই। রাতের ছায়ায় সেদিন তেমনই ঘুমিয়ে পড়েছিল পাখিরা, ঘুমিয়ে পড়েছিল পশুরা, গাছপালা, লতাপাতা সবাই। শুধু জেগে ছিল জয় আর টুটু। গল্প করেছিল দুটিতে একটু বেশি রাত অবধি। তারপর ওরাও ঘুমিয়ে পড়েছিল।
কিন্তু হঠাৎ গভীর রাতে ওদের ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। চমকে জেগে উঠেছিল জয় আর টুটু পাখিদের মরণ-কান্নায় আর পশুদের আর্তনাদে। জেগে দ্যাখে কী, বাতাস কাঁপিয়ে হুহু শব্দে আগুনের শিখা ছুটে আসছে এক গাছের মাথা ছুঁয়ে আর এক গাছে। এ কী সর্বনাশ! এ যে বনে আগুন লেগে গেছে। যেদিকে তাকাও, আগুন আর আগুন। বিশাল বিশাল গাছ দাউদাউ করে জ্বলছে, আর কী প্রচণ্ড আওয়াজ করে ডালপালাগুলো ফেটে পড়ছে। গাছে গাছে ঘষে ঘষে একী দাবাগ্নি ছুটে আসছে! পশুপাখি যে যেখানে ছিল প্রাণের ভয়ে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। কিন্তু বন ছেড়ে তারা কোথায় পালাবে? আগুন আর আগুন। আকাশ যেন রক্তে রাঙা হয়ে ঝলসে উঠেছে। গাছের পাখিরা সেই রক্তরাঙা আকাশে কানামাছির মতো ঘুরপাক খেয়ে চিৎকার করছে। জয় আর টুটুও চরকি খেতে-খেতে কে যে কোথায় হারিয়ে গেল, জানা গেল না। পশুরাই বা কতক্ষণ আগুনের হাত থেকে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবে! আগুনে বন্দি হয়ে কেউ মরে, কেউ দগ্ধে-দগ্ধে চিৎকার করে। কেউ বাঁচাবার নেই। বলা যায়, যারা বেঁচে আছে তারা তখন অসহায়ের মতো বাঁচার জন্যে আগুনের সঙ্গে লড়াই করছে।
সেই রাক্ষুসে আগুনের দাপটে যখন বন-সবুজ দ্বীপের সব সবুজই শেষ হয়ে গেল, তখন ভোর হয়ে গেছে। এখানে-ওখানে তখনও আগুন ধিকধিক করছে। এখানে-ওখানে আগুনে দগ্ধ মৃত পশুদের দেহ ছড়িয়ে আছে। পাশেপাশে লুটিয়ে আছে আগুনের শিকার কত পাখি! তবে কী জয় আর টুটুও এই আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেল!
এ কী! হঠাৎ এই ধবংসের রাজ্যে একটি ছোট্ট ছেলে কোত্থেকে এল। হ্যাঁ, ওই তো! তবে কী বনের শেষে সেই যে জংলি মানুষেরা বাস করে, এই ছোট্ট ছেলেটি সেখান থেকে ছুটে এসেছে! কেমন হতাশ চোখে দেখছে চারদিক! ভীষণ দুঃখে ভার হয়ে আছে তার চোখ দুটি। হয়তো-বা জলের কণা চিকচিক করছে তার চোখের কোণে। ও কি কাঁদছে? হয়তো তাই। কেননা, যে সবুজ-বনের আলো-আঁধারে সে ছুটে-ছুটে খেলা করেছে এতদিন, গাছের ডালে-ডালে লাফালাফি করেছে, গান গেয়েছে, সে-বন আর সে দেখতে পাবে না কোনোদিন। এখন আকাশটা যেন বড্ড একলা। আকাশের সব আলো যেন একসঙ্গে ভেঙে পড়েছে বন-সবুজের আগুনে পোড়া ছাইয়ের ওপর। বনের কপালে একটি ছোট্ট রুপোলি ফোঁটার মতো সেই যে জল-তকতকে ঝিল, তারও বুক-ভর্তি আজ কালো ছাইয়ের স্তূপ। ইচ্ছে করলে জঙ্গলের সেই ছেলেটি আর ঝিলের জলে লাফিয়ে পড়ে এপার-ওপার তোলপাড় করতে পারবে না। আজ যেন তার সব হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে তার বন্ধু এই সবুজ বন।
দেখতে দেখতে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে তার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। তারপর সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ওই ছাইগাদার ওপর কী যেন একটা নড়ছে। ছুটে গেল সেইখানে। তুলে নিল। এ যে একটা পাখি! আহা রে, আগুনে দগ্ধ হয়ে এখনও বেঁচে থাকার জন্যে ছটফট করছে। এ কী! এ যে জয়! ছেলেটি আর জানবে কী করে যে, এর নাম জয়। তার কাছে জয় শুধু একটি পাখি। ছেলেটি দু-হাতের আলতো মুঠি দিয়ে জয়কে তুলে নিল বুকে। তারপর ছুটল। ছুটল ঘরের দিকে। আর জয় ছেলেটির বুকের ভেতর নিশ্বাস ফেলতে-ফেলতে ভাবতে লাগল, আর কতক্ষণ! তার সময় বোধ হয় শেষ হয়ে এসেছে। বুড়ো-আপেলগাছ তো কোনোদিন জানতে পারবে না একথা। হয়তো সে ভাববে, জয় তাকে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে পালিয়ে গেছে অন্য কোথাও। কিন্তু কে তাকে বলবে, জয় তাকে ভোলেনি। ভুলবে না কোনোদিন। সে যে তার বন্ধু।
ছেলেটি ছুটতে ছুটতে পাতায়-ছাওয়া একটি ছোট্ট কুটিরের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর ডাক দিল, 'মা, মা!'
'কী হয়েছে?' ভেতর থেকে মা সাড়া দিল।
'দেখবে এসো!'
মা বেরিয়ে এল।
'একটা পাখি,' মায়ের দিকে হাত বাড়িয়ে জয়কে দেখাল।
'ইশ! ছিঃ ছিঃ, পুড়ে গেছে।' মা যেন শিউরে উঠল, 'আয়, আয়, ঘরে নিয়ে আয়।' মা ব্যস্ত হয়ে ছেলেকে ঘরের মধ্যে টেনে নিয়ে গেল।
জয়ের কী কষ্টই না-হচ্ছে। যতই হোক, সে তো ছোট্ট একটা পাখি। আগুনের জ্বালা সে কখনো সহ্য করতে পারে!
'পাখিটাকে নিয়ে কী করব মা?' ছেলে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল।
মা ছুটে, ঘরের পেছন দিক থেকে একটা কী-যেন বুনোগাছ ছিঁড়ে নিয়ে এল। তারপর ছেলেকে বলল, 'গাছের পাতা নিঙড়ে ওর গায়ে রস ছড়িয়ে দে।'
ছেলে মায়ের কথা শুনে জয়কে নিজের কোলে রেখে পাতার রস ছড়িয়ে দিল জয়ের আগুনে আহত বুকে, ডানায়, পিঠে আঃ! কী আরাম লাগছে জয়ের। জ্বালার যন্ত্রণা যেন নিমেষে মিলিয়ে যাচ্ছে। আহা। সারাক্ষণ যদি এই রস তার সারা গায়ে ছড়িয়ে দেয়!

অনেকক্ষণ ধরে মা আর ছেলে এমনি করে জয়কে নিয়ে পড়ে রইল। অনেকক্ষণ পর জয়ের চোখে যেন একটু-একটু ঘুম জড়িয়ে আসছে। যখনই তন্দ্রায় চোখের পাতা একটু বোজে, তখনই যেন চমকে ওঠে। তারপর কখন যেন ঘুমিয়ে পড়ে অজান্তে। সারাক্ষণ ঘুমিয়ে থাকে ওই ছোট্ট ছেলেটির কোলে মাথা রেখে।
ছেলেটি ডাকল। বলল, 'দ্যাখো মা, পাখি ঘুমোচ্ছে।'
মা ক-টা নরম কচিপাতা ঘরের মেঝেয় বিছিয়ে দিয়ে বলল, 'আস্তে-আস্তে এখানে শুইয়ে দে!'
ছেলেটি জয়কে পাতার বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও তার পাশে বসল। বসে-বসে দেখতে লাগল, পাখির ছোট্ট বুকখানা থিরথির করে কাঁপছে। কখনো-কখনো তার আহত ডানা দুটি হঠাৎ-হঠাৎ চমকে ওঠে, আবার স্থির হয়ে লুটিয়ে পড়ে।
সেই সকাল থেকে অনেকক্ষণ ঘুমোল জয়। যখন তার ঘুম ভাঙল, তখনও সে দেখল, ছেলেটি বসে আছে তার পাশে, তার মুখের দিকে চেয়ে। হঠাৎ কী মনে হল, ওঠার চেষ্টা করল জয়। ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে তাকে ধরে ফেলল। মুখে শব্দ করল, 'না-ন-না, চ্ছু-চ্ছু।' বলে আবার শুইয়ে দিল? শুয়ে পড়ে জয় মিটমিট করে দেখতে লাগল ছেলেটিকে।
কী আশ্চর্য, এখন তো জয়ের জ্বালা-যন্ত্রণা কিছুই নেই! সে কী তবে ভালো হয়ে গেল। তা কী করে হবে? ওই দ্যাখো না, তার ডানার পালকগুলি কেমন পুড়ে ঝলসে গেছে! কে জানে, সে আর উড়তে পারবে কী না! সত্যি, জয় যদি আর উড়তে না-পারে!
ছেলেটি আলতো হাতের ছোঁয়া দিয়ে জয়ের ডানায় হাত বুলিয়ে দিল। তারপর আদর করে বলল, 'পাখি, চুপটি করে শুয়ে থাকো। নইলে ডানায় লেগে যাবে!'
জয় কী বুঝল কে জানে! কিন্তু ছেলেটির নরম গলার ওই মিষ্টি শব্দগুলি এত ভালো লেগে গেল, জয় আর একটুও ছটফট করল না। তখন ছেলেটি ছুটে গিয়ে একটা পাতার বাটিতে করে একটু জল নিয়ে এল। তারপর সেই জল ফোঁটা-ফোঁটা জয়ের ঠোঁটে দিতেই, আঃ জয়ের বুকটা যেন ভরে গেল। মনে হল, নতুন করে তার জীবনটা বুকের ভেতর দুলে উঠছে। সে হয়তো পারবে, নিশ্চয়ই পারবে ওই আকাশে ডানা মেলে আবার উড়ে যেতে। কিন্তু সে আবার কবে? কত দিন পরে? সে-কথা কে বলবে! আর সত্যিই যদি ভালো হয়ে ওঠে জয়, সত্যিই যদি তার ডানা দুটি আবার হাওয়ায় ভেসে ওঠার জন্য আকুলিবিকুলি করে, তখন এই ছোট্ট ছেলেটি তাকে বন্দি করে রাখবে না তো!
হ্যাঁ, জয় বন্দি হয়েই রইল। ক-দিন পরে জয় যখন সত্যিই ডানায় ভর দিয়ে তুড়ুক-তুড়ুক করে মাটির ওপর নাচতে লাগল, তখন ছেলেটিও খুশিতে নেচে উঠল। মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে, মাকে জড়িয়ে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, 'মা, পাখি নাচছে!' তারপর গাছের ডালপালা দিয়ে তার জন্যে খাঁচা তৈরি হল। সেই খাঁচায় বন্দি হল জয়।
খাঁচায় বন্দি পাখিকে কত গান শোনায় ছেলেটি। তার সঙ্গে কত কথা বলে। কত আদর করে। হায় রে! এ-আদর কেমন করে ভালো লাগবে জয়ের। সে যে বন্দি! ওই আকাশ যে তাকে বারবার হাতছানি দেয়। হাতছানি দেয় বুড়ো-আপেলগাছ। মনে পড়ে যায় টুটুর মুখখানি। আহা! টুটু কী বেঁচে আছে? না, আগুনের জ্বালায় সেও ঝলসে শেষ হয়ে গেছে? জয় কাঁদে আর ভারি মনমরা হয়ে বসে থাকে খাঁচার ভেতর বন্দি হয়ে। আর হয়তো মনে-মনে ছেলেটিকে বলে, 'ছোট্ট ভাইটি আমার, তুমি আমার জীবন ফিরিয়ে দিয়েছ। এ-কথা তো আমি কোনওদিনই ভুলতে পারব না। এবার আমার এই খাঁচার দরজা খুলে আমার আকাশ আমাকে ফিরিয়ে দাও!'
একদিন সকালে জয়ের খাঁচাটি বাইরে একটি গাছের ডালে ঝুলছিল। আকাশের দিকে চেয়ে হঠাৎ যেন জয় থতমত খেয়ে যায়। ও কে আকাশে উড়ে যায়! উড়ে-উড়ে কী যেন সে খুঁজে বেড়াচ্ছে! আনন্দে চিৎকার করে ওঠে জয়! উড়ে যায় একটি পাখি। চিনতে পেরেছে জয়! ও যে টুটু! গলা ফাটিয়ে ডাক দিল জয়, 'টুটু-উ-উ!'
টুটু শুনতে পায়নি। তাই সে ফিরেও তাকাল না।
ভারি ব্যস্ত সুরে আবার চেঁচিয়ে উঠল জয়, 'টুটু, টুটু-উ-উ!'
এবার টুটু চমকে থামে। এদিক-ওদিক চাইতে চাইতে হঠাৎ তার নজর পড়ে যায় খাঁচার দিকে। তিরবেগে সে নেমে আসে ওই আকাশ থেকে খাঁচার ওপর। সেও চিৎকার করে ওঠে, 'জয়....!'
জয় খাঁচার ভেতর লাফিয়ে উঠে ওর মুখের কাছে মুখ এনে উত্তেজনায় হাঁপাতে-হাঁপাতে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি ভালো আছো টুটু?'
টুটুও তেমনি খুশিতে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, 'তুমি। তুমি কেমন আছো জয়?'
জয় বল, 'আমি বন্দি।'
'আমি তোমায় খুঁজে বেড়াচ্ছি কতদিন ধরে।' টুটু উত্তর দিল।
জয় জিজ্ঞেস করল, 'এখন কী হবে টুটু?'
টুটু বলল, 'আমি তোমায় মুক্ত করে নিয়ে যাব!'
'কেমন করে?'
'যেমন করে একদিন তুমি আমাকে মুক্ত করেছিলে। আমিও তেমনি আমার সব শক্তি দিয়ে তোমার খাঁচার বাঁধন ভেঙে ফেলব,' উত্তর দিল টুটু। উত্তর দিয়েই, ডালপালা দিয়ে তৈরি সেই খাঁচায় ঠোঁট দিয়ে আঘাত করতে লাগল টুটু। উফ! কী শক্ত!
দেখে ফেলেছিল সেই ছেলেটি। আশ্চর্য, সে ছুটে গেল না খাঁচার দিকে। তাড়া দিল না টুটুকে। সে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। অবাক হয়ে দেখতে থাকে। তারপর কী জানি, কী ভাবল সে, চিৎকার করে ডাকল, 'মা-আ-আ।'
ছেলের চিৎকার শুনে ছুটে আসে মা, 'কী রে?'
ছেলেটি খাঁচার দিকে আঙুল তুলল, 'দ্যাখো, খাঁচার ওপর আর একটা পাখি।'
মা-ও দেখল। মা অবাক হয়ে গেল। তারপর বলল, 'ওর বন্ধু বোধ হয়।'
ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, 'মা, বন্ধুকে বুঝি আর এক বন্ধু খাঁচার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসার জন্যে ডাক দিচ্ছে?'
মা বলল, 'হ্যাঁ বাবা! খাঁচা তো ওদের ঘর নয়। খাঁচার ভেতর পাখিকে আমরা বন্দি করে রেখেছি। হয়তো পাখি কষ্ট পাচ্ছে। তাই বন্ধু ওকে খাঁচা ভেঙে নিয়ে যেতে এসেছে।'
ছেলে বলল, 'তাহলে তো এতদিন পাখিকে আমরা খুব কষ্ট দিয়েছি।'
মা উত্তর দিল, 'কাউকে বন্দি করে রাখলে তার তো কষ্ট হয় বাবা।'
মায়ের কথা শুনে ছেলেটির মুখখানি যেন দুঃখে ভার হয়ে গেল। একটু কিছু ভাবল ছেলেটি। তারপর বলল, 'তাহলে মা, আমি পাখিকে ছেড়ে দিই। এখন তো পাখি ভালো হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই আকাশে উড়তে পারবে।'
মা এ-কথার কোনোও উত্তর দিল না। কেমন যেন স্নেহমাখা চোখে চেয়ে রইল ছেলের দিকে।
ছেলেটি খাঁচার কাছে এগিয়ে গেল। টুটু এতক্ষণ খাঁচার ওপর ঠোঁটের আঘাত করছিল। ছেলেটিকে এগিয়ে আসতে দেখে ভয় পেল টুটু। উড়ে গেল। ছেলেটির মাথার ওপর উড়তে-উড়তে চেঁচাতে লাগল, 'ভয় পেয়ো না জয়, আমি আছি।'
ছেলেটি খাঁচার দরজা খুলে ফেলল। হাত বাড়িয়ে দিল জয়ের দিকে। জয় ঝটপটানি শুরু করে দিল খাঁচার ভেতর। সে এখন সত্যি ভয় পেয়েছে! জয় ভাবল, তবে কী ছেলেটি তাকে মারবে!
কিন্তু না। নরম হাতের মুঠির ভেতর আলতো করে ধরে সে জয়কে বাইরে নিয়ে এল। জয়ের মুখের কাছে নিজের মুখটি এনে স্থিরচোখে তাকাল খানিক। তারপর বলল, 'ওরে পাখি, তোর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে আমি এতদিন তোকে কত ভালোবেসেছি। কত যত্ন করেছি। বিশ্বাস কর, আমি কিন্তু একটুও জানতুম না, এই খাঁচার ভেতর বন্দি থেকে আমার এত যত্নেও তুই কষ্ট পেয়েছিস। আজ বুঝতে পেরেছি, তোকে বন্দি করে আমি ভুল করেছি। আমি তোর কেউ নই। তোর বন্ধু ওই বনের পাখি। তোর বন্ধু ওই আকাশ। তোর জন্যে আমার মনে যত কষ্টই হোক, তোকে আর আমি দুঃখ দেব না। তুই উড়ে যা পাখি, তোর বন্ধুর সঙ্গে ডানা মেলে আকাশে উড়ে যা। সঙ্গে নিয়ে যা আমার এই ছোট্ট ভালোবাসা।' বলে ছেলেটি জয়ের কপালে একটি ছোট্ট চুমু খেয়ে তার হাতের মুঠি খুলে দিল।
জয় চোখের পলকে বাতাসে ডানা মেলে দিল। সেই ছোট্ট ছেলের মাথার ওপর ডানা মেলে উড়তে উড়তে সে যেন বাতাসে কান্না ছড়িয়ে ককিয়ে উঠল, 'ও আমার ছোট্ট বন্ধু, এতদিন আমি আমার আপেল-বুড়োর জন্যে দিকে-দিকে ভালোবাসা খুঁজে বেড়িয়েছি। পাইনি। আজ আমি পেয়েছি। আমার কপালে এই যে তুমি ঠোঁটের স্পর্শ এঁকে দিলে, এই আমার ভালোবাসা। এই ভালোবাসাই আমি নিয়ে যাব আপেল-বুড়োর কাছে। ও আমার ছোট্ট বন্ধু, তোমার দয়ার কথা আমি ভুলব না, কোনোদিনও না। তুমি আমার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছ। তুমি সুন্দর। ফুলের চেয়েও সুন্দর। হে বন্ধু, বিদায়! বিদায়!' বলতে-বলতে অঝোর ধারায় জয়ের চোখের জল আকাশ থেকে মাটিতে ঝরতে লাগল।
ছেলেটি অবাক হয়ে চেয়ে থাকে আকাশে। তার যেন মনে হল, আকাশের ওই ছোট্ট পাখির কণ্ঠ দিয়ে অনেক কান্নার গান একসঙ্গে বাতাসে লুটোপুটি খাচ্ছে।
উড়তে উড়তে জয় আনন্দে উত্তাল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, 'টুটু-উ-উ।'
টুটু ছুটে এল জয়ের কাছে।
জয় উত্তেজনায় হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, 'টুটু, আমি পেয়েছি, আপেল-বুড়োর জন্যে ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি। ওই আমার ছোট্ট বন্ধু, তার ওই ছোট্ট দুটি ঠোঁট দিয়ে আমার কপালে ভালোবাস এঁকে দিয়েছে। এই ভালোবাসাই আমি আপেল-বুড়োর জন্যে নিয়ে যাব। চলো টুটু, এক্ষুনি চলো। দেশে ফিরে যাই!' বলতে-বলতে জয় তীব্র গতিতে উড়ে চলল। টুটুও থামল না।
সেই ছোট্ট ছেলেটি অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। দেখল, বন্ধুর সঙ্গে বন্ধু শূন্যে উড়তে উড়তে হারিয়ে যাচ্ছে, দূরে, অনেক দূরে। তারপর আকাশের সঙ্গে আকাশ হয়ে যেন হারিয়ে গেল। ঠিক তক্ষুনি ছেলেটি গেল মায়ের কাছে। মাকে জড়িয়ে শূন্য খাঁচাটার দিকে তাকিয়ে রইল ছলছল চোখে।
কতদিন পর আবার দেশে ফিরে এল জয় আর টুটু। শীত চলে গেছে। এখন এখানে বসন্ত। গাছে গাছে নতুন পাতা। রঙিন ফুল। যত পাখি দেশ ছেড়ে দক্ষিণে গিয়েছিল, তারা সবাই ফিরতে পারেনি। যারা ফিরে এসেছে, তারা আবার গাছে গাছে গান শুরু করে দিয়েছে।
ফিরে এসেছিল জয় আর টুটুও। জয় হাসিখুশিতে আকাশে লুটোপুটি খেতে খেতে চিৎকার করছিল, 'আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো, আমি তোমার জয়। আমি তোমার জন্যে ভালোবাসা নিয়ে এসেছি।'
হঠাৎ জয় থমকে যায়। ঠিক যেখানে সেই বুড়ো-আপেলগাছ দাঁড়িয়ে ছিল, মনে হচ্ছে, সেখানেই তো সে এসেছে। আপেল-বুড়োকে তো দেখতে পাচ্ছে না! তবে কী আমরা অন্য কোথাও চলে এলুম?' বলেই জয় আবার ডাকল, 'আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো, আমি জয়। তোমার জন্যে ভালোবাসা নিয়ে এসেছি। এই দ্যাখো, আমার কপালে আঁকা!'
সাড়া পেল না জয়। দেখতে পেল না আপেল-বুড়োকে। তখন সে এখানে-ওখানে, আকাশে-বাতাসে আকুল হয়ে চিৎকার করতে লাগল, 'আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো, আপেল-বুড়ো!'
বাতাস ভেসে যায়। কিন্তু আপেল-বুড়োর সাড়া পাওয়া যায় না।
অনেক, অনেকক্ষণ সে ডাকল। জয়কে অমন আকুল হয়ে চিৎকার করতে শুনে একটি পাখি ওর কাছে উড়ে এল। জিজ্ঞেস করল, 'কাকে, ডাকছ তুমি?'
'এইখানে যে বুড়ো-আপেলগাছ ছিল, তাকে খুঁজছি আমি,' উত্তর দিল জয়।
'আর তো তাকে খুঁজে পাবে না,' পাখি বলল।
'কেন?' জয় ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
পাখি বলল, 'সেই বুড়ো-আপেলগাছকে তো কেটে ফেলেছে! জানো না, যেখানে সে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ধুঁকছিল, সেখান দিয়ে নতুন রাস্তা হবে?'
'না-আ-আ-আ!' আকাশ কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল জয়।
শূন্য আকাশে প্রতিধবনি উঠল, 'না-আ-আ-আ।' তারপর সেই প্রতিধবনি হাওয়ায় ভাসতে-ভাসতে হারিয়ে গেল দূরে, অনেক দূরে।
হারিয়ে গেল দূরে, আরও অনেক দূরে জয়ও। হারিয়ে গেল আকাশে। তার আকাশ-বন্ধু টুটুর সঙ্গে। আর তারা ফিরল না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন