মানুষবলির জঙ্গলে

শৈলেন ঘোষ

একদিকে পাহাড়। পাহাড় ঘিরে ঘন জঙ্গল। আর এই জঙ্গলের গায়ে, কিছুটা দূরে, এক ভয়াল সমুদ্র। এই জঙ্গলের দেশে থাকত টুহো নামে একটি ছোট্ট ছেলে। এখন টুহোদের এই জঙ্গলে দুর্ভিক্ষের বিপদ। বৃষ্টি নেই। পাহাড়ের ঢালুতে অথবা এধার-ওধার ফসলের জমিতে ছিটেফোঁটা যেটুকু চাষাবাদ হয়, সেসব এখন জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে গেছে। কত মানুষের প্রাণ গেছে।

টুহোরা অবশ্য এখনও বেঁচে আছে। বেঁচে আছে, টুহোর মা আর বাবা। আর বেঁচে আছে টুহোর বন্ধু লুলাম। লুলাম থাকে টুহোদেরই কাছে। কারণ, ক-বছর আগে সমুদ্রে ঢেউ তুলে সেই যে জলদস্যুর দল লুঠপাট করতে এসেছিল, তারা ধরে নিয়ে গেছে লুলামের মা-বাবাকে। শুধু লুলামের মা-বাবা কেন, আরও কতজনকে যে জাহাজে বন্দী করে নিয়ে গেছে, তারও হিসেব কেউ জানে না। কী ভয়ংকর এই বিদেশি জলদস্যুরা। মাথার চুলগুলো যেমন লালচে, গায়ের রংও তেমনি টকটকে লাল। হাতে বর্শা, সঙ্গে কামান আর নয় তো চকচকে তরোয়াল। আরও আছে, ভয়ংকর হিংস্র কুকুর। ওই দস্যুদের তুমি আঘাত করতে যাও, ওই কুকুর তোমার টুঁটি কামড়ে ধরে তোমায় শেষ করে ফেলবে। কত মানুষের যে শুধু কুকুরের কামড়েই প্রাণ গেছে, সে-কথা শুনলেও তোমার হাত-পা থরথর করে কাঁপবে!

টুহোরা জঙ্গলের মানুষ। সুতরাং তাদের পোশাক, চালচলন তো আর আমাদের মতো নয়। তুমি ওদের দেখলে ভাবতেই পারো, কী অসভ্যরে বাবা! ওই জলদস্যুদের মতো তাদের না-আছে অস্ত্র, না-আছে কুকুর। ওদের সম্বল শুধু তির আর ধনুক। তিরের ফলায় বিষ মাখিয়ে ওরা শিকার করে, নয় তো, শত্রুকে ঘায়েল করে। কিন্তু জলদস্যুর ওই কামানের পাশে এই তিরধনুক তুচ্ছ খেলনা। তাই সামান্য ক-জন দস্যু হঠাৎ চড়াও হয়ে সহজেই একদল মানুষকে কুপোকাত করে তাদের সম্বল নিয়ে চম্পট দিতে পারে। সম্পদ নিয়ে চম্পট দিক, তবু তার একটা মানে আছে। কিন্তু কেন যে তারা মানুষ ধরে নিয়ে যায়, এর মানে বুঝতে পারে না টুহো। কেন-না, সেই বোঝার বুদ্ধি তার এখনও হয়নি। কারণ, এখন তার বয়স মাত্র নয়। পরে অবশ্য টুহো শুনেছে, এই জলদস্যুরা মানুষ ধরে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেয় অন্যের কাছে। তাদের নাম হয় ক্রীতদাস। অন্য দেশে, অন্যের হুকুমে খেটে মরে তারা, তার বদলে তাদের জোটে দু-বেলা দুটি অন্ন। কে জানে, হয়তো লুলামের মা-বাবাকেও এমনই দাসত্ব করে দিন কাটাতে হচ্ছে।

সত্যি বলতে কী, এই জঙ্গলের মানুষের বিপদের শেষ নেই। যেমন বিপদ জলদস্যুদের জন্যে, তেমনি বিপদ বৃষ্টি না-হলে। আবার আর এক বিপদ ঝড়। যখন দিগবিদিক কাঁপিয়ে ঝড়ের তান্ডব শুরু হয়, তখন সে যে কী সাংঘাতিক ঘটনা! সমুদ্রের কাছাকাছি বলে, এই জঙ্গলে ঘূর্ণিঝড়ের দানবটা যখন ধেয়ে আসে, তখন আর রক্ষে থাকে না। নীল আকাশের বুকে ধুলোর জাল ছড়িয়ে আর কালো মেঘের গুরুগুরু গর্জনে ঝড়ের সে কী প্রচন্ড দাপাদাপি। ঝড়ের সামনে যা পড়বে নির্ঘাত নিশ্চিহ্ন। ঘরবাড়ি, গাছপালা খেলনা-পুতুলের মতো মাটির ওপর লুটিয়ে পড়ে। তার ওপর যদি সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস উছলে ডাঙার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আর কথা নেই! অসংখ্য মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায় জলের তলায়। সে যে কী ভয়ংকর দৃশ্য, না-দেখলে কে বোঝাবে!

টুহোরা শিখেছে, এ বিপদ হল মানুষের পাপের ফল। এই পাপের ফলে দেবতা ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষকে দেন এইসব শাস্তি। সুতরাং দেবতাদের তুষ্ট করতে না-পারলে ধ্বংস নিশ্চিত। দেবতা থাকলে পুজোআর্চা করার জন্য পুরোহিতও থাকবেন, থাকবেন জ্ঞানী-পন্ডিতজন। তাই, না-বললেও তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, এসব কথা তাঁরাই শিখিয়েছেন। তাঁরা এ-ও শিখিয়েছেন, এ-পাপ থেকে নিস্তার পেতে হলে কী করতে হবে এই জঙ্গলের মানুষকে। তাঁদেরই আদেশে, প্রতি বছর কত মানুষকে যে দেবতার সামনে বলি দেওয়া হয়, সেকথা শুনলে আতঙ্কে শিউরে উঠবে। ওরা বিশ্বাস করতে শিখিয়েছেন, মানুষের রক্ত পেলেই তুষ্ট হবেন দেবতা, আর জঙ্গলের মানুষজন বিপদ থেকে মুক্তি পাবে। এ বিশ্বাস কার সাধ্য ওদের মন থেকে মুছে দেয়! তাই টুহোদের জঙ্গলে মানুষের প্রাণ, সে তো চাইলেই পাওয়া যায়। যেন কোনো দামই নেই।

কিন্তু এই ছোট্ট টুহোর মন যেন মানতে চায় না এ বিশ্বাস। তাই যখনই কোনো মানুষের মৃত্যুর আগে কান্নার শব্দটা ওর কানে পৌঁছোয়, তখন ওর মন বলে, এ কী অন্যায়, নিষ্ঠুর অত্যাচার মানুষের ওপর! কিন্তু একথা তো মুখ ফুটে বলা যায় না। মরতে কে চায় টুহো জানে, একথা যে বলে, তার প্রাণটিকে কেড়ে নিতে ওদের হাতের ধারালো অস্ত্র মুহূর্ত দেরি করবে না। ওদের বিশ্বাস এমনই অন্ধ! সুতরাং টুহো চুপচাপ দেখে যায়, আর শোনে।

কিন্তু একদিন টুহো পারল না নিশ্চুপ থাকতে। একদিন মরণের ভয়টা টুহোর মন থেকে উবে গেল। সে যেন রুখে দাঁড়াতে চায়। কেন-না, তার বন্ধু লুলামকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ওরা। হ্যাঁ, এই দুর্ভিক্ষ, এই অনাবৃষ্টির হাত থেকে বাঁচার জন্যে লুলামকে বলি দেবে ওরা কাল সকালে বৃষ্টির দেবতার কাছে।

আজ তাই এই অন্ধকার ঘুমের রাতে টুহোর চোখে ঘুম নেই। সে বিছানা ছেড়ে কখনো উঠছে, কখনো ছটফট করছে, কখনো ভাবছে তার বন্ধু লুলামের কথা। ভাবছে, কেন এমন হয়। তার ওই ছোট্ট বন্ধুটিকে হত্যা করতে কারও কি হাত কাঁপবে না! কেউ কি বলবে না, ও নিষ্পাপ। পাপ বলে কথাটার যদি কোনো মানে থাকে, তবে, সে পাপ তো সবাই করেছে, তবেই না এ-দুর্ভিক্ষ! লুলামের একা কী দোষ যে, বেছে বেছে তাকেই হত্যা করা হবে! লুলামের মিষ্টি মুখখানা টুহোর ঘুম-ভাঙা চোখের ওপর ভেসে ওঠে। স্থির থাকতে পারে না টুহো। ছুটে যায় টুহো এই মাটির ঘরের ছোট্ট জানালাটার সামনে। আকাশের দিকে ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে থাকে। আকাশের ওই তারাগুলো দেখতে দেখতে টুহোর চোখদুটিও যেন অজান্তে দেখতে পেয়েছিল তার বন্ধুরও সেই চোখদুটো। দেখতে পেয়েছিল, সে-চোখে লুলামের অশ্রুর ফোঁটাগুলো টলমল করছে যেন! থাকতে পারেনি টুহো। ওই আকাশের দিকে দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল এই জানালার ফাঁক দিয়ে। টুহোর ওই দুটি হাত ওই আকাশের কাছে একটুকরো মেঘ আর ক-ফোঁটা বৃষ্টি ছাড়া আর কিছু চায় না। কারণ এ বৃষ্টি যে তার বন্ধুর প্রাণ। বৃষ্টি হলে হয়তো বা ওদের অস্ত্রের আঘাতে লুলামের রক্ত ঝরবে না। ও বেঁচে যাবে।

কিন্তু কই মেঘ? আকাশভর্তি ওই অসংখ্য তারা যেন চোখ মটকে ঠাট্টা করছে টুহোকে। যেন বলতে চাইছে, ‘আজকের রাতটুকুই তোমার বন্ধুর শেষ রাত। কাল ভোরেই আলো দেখতে ভুলবে তোমার বন্ধুর চোখদুটি। সে তোমার নাম ধরে আর ডাকবে না। কিংবা এই জঙ্গলের গা বেয়ে পাহাড়ের পাথর ডিঙিয়ে সে ছুটে যাবে না খেলা করতে।’

হ্যাঁ, এই পাহাড়েই ছুটে ছুটে খেলা করত টুহো আর লুলাম। এই গা-ছমছম গভীর জঙ্গলেই লুকিয়ে সাপ ধরে ওরা, কিংবা গিরগিটি অথবা বুনো খরগোশ। মাঝে মাঝে চিতাবাঘের মতো দেখতে জাগুয়ারের মুখোমুখি যে হয়নি ওরা, তেমন নয়। একবার তো প্রায় মরতেই বসেছিল। সেবার ওরা দুজনেই যাচ্ছিল একটা আনন্দ-উৎসব দেখতে। সেটা ছিল জংলি-নাচের উৎসব। এমন উৎসব তো প্রায় লেগেই থাকে এই জঙ্গলে। সে-নাচে বড়োরা যেমন মেতে ওঠে, তেমনি ছোটোরাও। এ নাচ দেখতে অনেকখানি পথ যেতে হবে বন পেরিয়ে। ওদের সঙ্গে বড়ো কেউ না-থাকলেও, দুজনের কাঁধেই ছিল তির-ধনুক। ওরা জানে, বনের গভীরে ওদের পা যতই এগিয়ে যাবে, ততই বন হয়ে উঠবে ভয়ংকর। কী অদ্ভুত সেই গহন বনের রূপ! সে রূপ দেখলে, বনের যারা বাসিন্দা তাদেরও কাঁটা দেয় গায়ে! সুতরাং টুহো আর লুলামের গা এখানে এলে যদি ছমছমিয়ে ওঠে, তবে ওদের দোষ দেওয়া যায় না।

অবিশ্যি এই ঘন জঙ্গলের মধ্যেই আবার এমন এমন দৃশ্য নজরে পড়বে যে, দেখলে, চোখ জুড়িয়ে যাবে। সে দৃশ্য দেখলে মনে হবে, এখানেই যদি একটা ছোটো ঘর বেঁধে চিরকাল থাকা যেত! বনের গায়ে পাহাড়ের ঢালু পথ। ঢালুর নীচে একটা মস্ত সরোবর। চারদিকে গাছের গায়ে গাছ ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড়ছে,নয় তো খেলা করছে। থমকে থমকে হাওয়ার শব্দ। পাতার হাততালি। দেখতে দেখতে বিভোর হয়ে যাবে। তোমার মুখের শব্দগুলো যেন হারিয়ে যায়। তুমি নিশ্চুপ হয়ে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকবে খালি। না, কোনো শব্দ নয়, কোনো কথা নয়! কথার শব্দে যদি ওই পাখিরা উড়ে পালায়, কিংবা গাছেরা যদি পাতায় পাতায় তালি না-বাজায়! অথবা সরোবরের জলে বাতাসের যে মৃদু মৃদু হিল্লোল ঝিলমিল করছে তা যদি থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে! না, থাক, কথা না-বলাই ভালো।

সেইদিন টুহো আর লুলাম এই পথ দিয়েই নাচ দেখতে যাচ্ছিল। যদিও দুজনের মুখে হাজারো গল্প, তবু তাদের চোখ কিন্তু সজাগ। এই জঙ্গলে কোথাও কী বিপদ ওত পেতে আছে, কে বলতে পারে! জাগুয়ারকে তো আর বিশ্বাস নেই। উরিব্বাস! যেমন বাছাধন সড়সড় করে গাছে উঠতে পারে, তেমনি পারে তরতর করে সাঁতার কাটতে। তার ওপর গায়ে এমন ছোপ, পাতা-ঝোপের আড়ালে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকলে কাকপক্ষীও টের পাবে না। জাগুয়ার খেপে গেলে রক্ষে নেই। সামনে পড়লেই হয়, নির্ঘাত মরণ। কিন্তু আশ্চর্য, মানুষকে মারলেও মানুষের মাংস ওরা মুখেও তোলে না।

সেদিন হাঁটতে হাঁটতে একটা মজার দৃশ্য দেখে দুজনেই থমকে দাঁড়ায়। দেখে কী, কটা ‘হাউ-হাউ’ বাঁদর গাছের ডালে ল্যাজ জড়িয়ে আর একটা ডালে হাত পাকিয়ে দোল খাচ্ছে। সত্যি, এই ‘হাউ-হাউ’ বাঁদর দেখলে তুমি না-হেসে থাকতেই পারবে না। এমন উদ্ভট দেখতে বাঁদরগুলোকে! ল্যাজটা তো ইয়া পেল্লায় বটেই, তার ওপর গলার নীচে এইস্যা ঢ্যাপসা মাংসের একটা ফাঁপা ঢিপি! দেখলে, হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যাবে। এরা উঠবে সেই সাতসকালে, যখন কারো ঘুম ভাঙবে না। উঠেই ‘হাউ-হাউ’ করে এমন চেঁচামেচি শুরু করে দেবে যে, ঘুমোয় কার সাধ্যি। আবার মা-বাঁদরগুলো তো প্রায় কুকুরের মতোই ঘেউ-ঘেউ করে চেঁচাবে। ওই ‘হাউ-হাউ’ করে চেঁচায় বলেই ওদের নামও হয়ে গেছে ‘হাউ-হাউ’।

বাঁদরগুলো গাছের ডালে অমন করে দুলতে দুলতে যেই না টুহো আর লুলামকে দেখতে পেয়েছে, আর দোলা! ব্যস! সটাসট মার ছুট! এমনিতেই বাঁদরগুলো একটু গদাইলশকর! কিন্তু অচেনা কাউকে দেখলেই হয়, টপাটপ মারবে লাফ! মেরেই ভোঁ কাট!

বাঁদর দেখলে আর লুলামকে পায় কে! কী চেঁচান চেঁচাবে আর তাড়া করবে। যতই হাত ধরে টানো আর থামতে বলো, মানবেই না। তবু বন বলে কথা! বিপদে পড়তে কতক্ষণ! কিন্তু বাঁদর দেখে লুলামের সে-সব এখন কিচ্ছু মনে নেই। সুতরাং সে কখনো হাততালি দিচ্ছে, কখনো বাঁদরের মতো হাউ-হাউ করছে আর টুহো যতই তাকে সামলাবার চেষ্টা করছে ততই সে—

বলতে বলতেই চমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে লুলাম। টুহো থতোমতো খেয়ে গেছে! কী ব্যাপার! ব্যাপার আর কী, সামনে সাক্ষাৎ যম! একটু দূরে বনের গায়ে পাহাড়টা যে-দিকে বাঁক খেয়েছে, সেখানে একটা জল-চিকচিক সরোবর। সরোবরের জলের ওপর একটা গাছের ডাল নেমে এসে প্রায় জল ছুঁই ছুঁই করছে। ডালটা দেখলেই বুঝবে বেশ শক্ত। সেই ডালের ওপর বসে বসে এক বাছাধন জাগুয়ার দিব্যি মাছ ধরছে। বাছাধন করছে কী, জলের ভেতর লেজ ডুবিয়ে লেজের ডগা টুকটুক করে নাচাচ্ছে। মতলবটা কী জানো? ওরা জানে এমনি করে টুকটুকিয়ে লেজ নাড়লে জলের মাছ ধাঁধায় পড়ে যাবে। ভাববে বুঝি পোকামাকড়, খাবার-দাবার। ভেবে, লোভে লোভে যেই লেজের চারপাশে এসে ছুক ছুক করবে, অমনি সেই রামচালাক জাগুয়ার জলের মধ্যে মারবে লাফ! মেরেই খপাৎ করে কামড়ে ধরে মাছের মুন্ডু চিবুতে শুরু করে দেবে। উঃ! কী শয়তান-রে বাবা!

কিন্তু এখন? মাছধরা তার হল না! কেন? ওই ‘হাউ-হাউ’ বাঁদরের লাফালাফি আর লুলামের চেঁচামেচি শুনে তার পিলে শুকিয়ে গেছে! জলের থেকে লেজ না-তুলেই, গাছের ডালে ঝটপট দাঁড়িয়ে পড়েছে। পড়তেই চোখাচোখি! আর দেখতে, বনের সেই জাগুয়ারের লালচক্ষু কটমটিয়ে উঠল! ওদের দিকে তাকিয়ে লেজ দোলাতে লাগল। উরিব্বাস, সে কী মূর্তি! তাই না-দেখে, টুহো লুলামের হাত ধরে দে ছুট! পালা, পালা! কিন্তু পালাবে কোথায়! জাগুয়ারটা মেরেছে লাফ! এই সেরেছে! আর কিছু না-পেয়ে টুহো লুলামকে নিয়ে সামনের ঝোপটার মধ্যেই দুড়দাড়িয়ে ঢুকে পড়েছে। বনের মধ্যে এ কি আর যে-সে ঝোপ! কী ঘন দেখেছ! জাগুয়ারটা তো তেমনি ধূর্ত। জানে ঝোপের মধ্যে ঢুকলে যদি ঝোপের জালে জড়িয়ে যায়, তাই ঝোপের মধ্যে না-ঢুকে গাছের ডালে মারল লাফ! লাফ মেরে ওপর থেকে টুহোদের দেখতে লাগল। উফ! গোঁফ দুটো দেখো, যেন রাগে ফুলে ফুলে উঠছে!

কী বিপদেই না-পড়ল টুহো আর লুলাম। না-পারে এগোতে, না-পেছুতে। অথচ ঝোপের মধ্যে বেশিক্ষণ থাকাও তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু এখন যে কী করা উচিত, দুজনে ভেবেও পাচ্ছে না। ভয়ে দুজনেই কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু জাগুয়ারটা হঠাৎ করল কী, এই ডাল থেকে মারল ওই ডালে এক লাফ! মানে, টুহো আর লুলামের একেবারে মাথার ওপর। এই বুঝি ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ঘাড়ে! চোখের পলকে টুহো লুলামের হাতটা ধরে মেরেছে এক টান। মারতেই, দুজনেই ঝোপের মধ্যে হুড়মুড় করে হুমড়ি খেয়ে চিৎপটাং! কিন্তু জাগুয়ারটাও তো সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়েছে! কিন্তু দিলে কী হবে! তার টিপ গেছে ফসকে! সে ওদের ঘাড়ে না-পড়ে, পড়ল গিয়ে কাঁটাঝোপে। পড়েই লতাপাতায় এমন জড়ান জড়াল যে, বাছাধনের কম্ম শেষ! না-পারে ছাড়াতে, না-পারে গড়াতে। ঝটাপটি আর সে কী হম্বিতম্বি! যতই করছে হম্বিতম্বি ততই মরছে ঝোপের জটে জড়িয়ে! এই দৃশ্যের কথা ভাবো তো একবার! একটা ঘন ঝোপের একদিকে দুটি ছেলে প্রাণের দায়ে আঁকপাক করছে, আর সেই ঝোপেরই দু-হাত দূরে একটা জাগুয়ার তাদের মারবে বলে হাঁকডাক করছে! উঃ! শিউরে উঠতে হয়!

কিন্তু অবাক করে দিল লুলাম। টুহো যা ভাবতে পারেনি লুলাম তাই করে বসল। করল কী, ফস করে ধনুকটা কাঁধ থেকে টেনে নিয়ে দিল ছুড়ে একটা বিষমাখা তির! ব্যস! সেটা প্যাঁট করে জাগুয়ারের পেটে গেল বিঁধে! তারপর সে-যে কী দক্ষযজ্ঞ কান্ড! এমন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল বাছাধন জাগুয়ার, মনে হল, এই বুঝি ঝোপের প্যাঁচ ছাড়িয়ে টুহো আর লুলামের ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে! কিন্তু এমন মোক্ষম প্যাঁচে জড়িয়েছে সেই জাগুয়ার যে, যতই সে ধামসাচ্ছে, ততই ফাঁদের ফাঁপরে আটকা পড়ছে। কিন্তু ওই তিরের বিষ তো সাংঘাতিক। কতক্ষণ আর লম্ফঝম্ফ করবে সে। দেখতে দেখতে কেমন যেন থিতিয়ে আসছে তার শক্তি। একটু পরেই ভবলীলা তার শেষ হবে!

জাগুয়ারটার সময় ঘনিয়ে এসেছে দেখেও কিন্তু টুহো আর লুলাম সেখানে দাঁড়াল না। ওরা জানে, এক্ষুনি না-পালালে আরও বিপদ ঘটতে পারে! সুতরাং সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই জাগুয়ারের মরণের শেষ দৃশ্য দেখার জন্য অপেক্ষা করল না তারা। ঝোপের কাঁটাকাঠি আর লতাপাতার জট ছাড়াবার জন্য দুজনেই টানাটানি লাগিয়ে দিলে। শেষমেশ রক্ষে পেল বটে, কিন্তু ভয় গেল না। সেখান থেকে দুজনে মারল ছুট একেবারে চোখ-কান বুজে! অবশ্যি গহন বনে চোখ-কান বুজে ছুটব বললেই তো ছোটা যায় না! পদে পদে বাধা। পাহাড়ের ঢালুর ওপর চাঁই চাঁই পাথর তো তোমার মস্ত শত্রু! তোমায় যেমন গাছের এফাঁক-ওফাঁক দিয়ে ছুটতে ছুটতে হোঁচট খেতে হবে, তেমনি গাছের এপাশে-ওপাশে ছড়ানো পাথরে ঠোক্করও সামলাতে হবে। এ ছাড়াও কে বলতে পারে, কোথায় সাপখোপটা ঝাপটা মারার জন্য ফণা তুলে ফুঁসছে! সুতরাং বললেই চোখ-কান বুজে ছোটা যায় না বনের ভেতর। একথা কে-না জানে, পালাতে পারেনি বলেই না লুলামের মা আর বাবা ধরা পড়েছিল জলদস্যুদের হাতে এই বনেরই ভেতর! সে-ও তো এক ভয়ংকর ঘটনা! কী সে ঘটনা?

সেদিন লুলামের মা আর বাবা বনে গিয়েছিল শিকারের খোঁজে। ওই থমকে থেমে থাকা বনের ভেতর ওরা চুপিসারে খুঁজে বেড়াচ্ছিল হরিণ। ওরা খেয়ালই করেনি, ওদের পেছনেও নি:শব্দে এগিয়ে আসছে জলদস্যুর ভয়ংকর হাতের থাবা! কে জানে, কখন ওই দস্যুরা এখানে ঢুকে গা-ঢাকা দিয়ে বসেছিল। লুলামের মা হঠাৎ দেখতে পেয়েছিল একটা বুনো শুয়োর। নাই-বা হল হরিণ, বুনো শুয়োরেরই পেছনে তাড়া লাগালে। লুলামের বাবার হাত থেকে পলকে তির ছুটল। একেবারে শুয়োরের গায়ে। আনন্দে চিৎকার করে উঠল লুলামের মা আর বাবা। কিন্তু অতর্কিতে তাদের সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ল জলদস্যুর দল। লুলামের বাবার হাতের তির শত্রুর দিকে ছিটকে আসার আগেই, ওরা জাপটে ধরল। ওদের হাতে-পায়ে শিকল বাঁধল। এই জঙ্গল আর ওই পাহাড়ের পাথর পেরিয়ে নিয়ে গেল তাদের জাহাজে। কেউ জানতেও পারল না।

সেই থেকে লুলাম মা-বাবাকে হারিয়ে টুহোদেরই কাছে, তাদের আপনজন হয়ে আছে। টুহোর সে বন্ধু, কিন্তু টুহোর মা আর বাবার কাছ সে-ও যেন টুহোর মতোই তাদের ছেলে। অথচ লুলামকে বলি দেবার জন্য যখন টুহোদের বাড়ি থেকে নিয়ে গেল ওরা, তখন? তখন সবাই চুপ! শুধু কেঁদে উঠেছিল টুহো। সে-কান্না তার বুকের মধ্যে ফুঁপিয়ে উঠেছিল। তাই সে এই রাতের অন্ধকারে জানালায় মুখ রেখে আকাশের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে ক-ফোঁটা বৃষ্টির জন্যে।

কিন্তু হঠাৎ যেন টুহোর বুকটা কান্না ভুলে কেঁপে ওঠে। কেমন যেন ছটফটিয়ে উঠল পায়ের পাতা দুটো। এই বন্ধ ঘরের অন্ধকারে ওর আচমকা মনে হল, বন্ধুর জন্য এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হা-হুতাশ করলে তো তার প্রাণ কেউ ফিরিয়ে দেবে না! টুহো ভাবল, সে কি পারে না লুলামকে বাঁচাতে! গায়ে কাঁটা দেয় টুহোর। বুকখানা শক্ত করে সে মনে মনে বলে উঠল, হ্যাঁ সে পারে! আর যদি না-পারে, তবে বন্ধুর জন্য মরতে তার ভয় নেই।

টুহো বুক ফুলিয়ে টান-টান হয়ে দাঁড়াল এবার। বাইরের অন্ধকার থেকে ঘরের নিস্তব্ধতায় মুখ ফিরিয়ে দেখল মা আর বাবা অঘোরে ঘুমুচ্ছে। নি:সাড়ে তির-ধনুকটা পিঠে বাঁধল। খুব সাবধানে দরজাটা খুলে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে বাইরে। কোথায়, কোনখানে লুলাম যে এখন মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছে, সেটা তার জানা। জায়গাটা এখান থেকে খানিকটা দূরে। বনের এই ঘন জঙ্গলের কোল বেয়ে তাকে উঠতে হবে পাহাড়ের ওপর। সেখান থেকে আরও ওপরে দেবতার মন্দির। সেইখানে আছে লুলাম। সেই মন্দিরের পূজারি সারারাত যে লুলামের দিকে নজর রেখে জেগে থাকবে, এ কি আর টুহোর জানা নেই! হায়রে, কে জানে এই গভীর রাতে লুলাম এখন কী করছে! সে কি ঘুমিয়ে পড়েছে নিশ্চিন্তে! নাকি, জেগে জেগে কাঁদছে! এই যে বন, এই যে পাহাড় বেয়ে ঝরনার শব্দ, কিংবা সকালের আকাশ-ভাঙা রোদের ছটা, পাখির নাচ, ঝিরিঝিরি বাতাসের ঢেউ-লাগা শিহরন, লুলাম তো আর কোনোদিনই তা দেখতে পাবে না। আজকের রাত যখন ফুরিয়ে যাবে, ডেকে আনবে কালকের ভোর, যখন হাজার হাজার মানুষ এই পাহাড়ের ওপরে জমায়েত হয়ে ওর মৃত্যুর মুহূর্তে চিৎকার করে ডেকে বলবে, ‘বৃষ্টির দেবতা, তুমি আমাদের পাপ ক্ষমা করো, আকাশ-ভেঙে জল দাও’। যখন বেজে উঠবে কাড়ানাকাড়া, তখন বোধ হয় আর্তনাদ করে কেঁদে উঠবে লুলাম। বলবে, ‘এই সুন্দর পৃথিবীতে আমি তো কোনো পাপ করিনি। তোমরা করেছ পাপ, আমার কেন রক্ত নেবে? আমি বাঁচতে চাই।’

হ্যাঁ টুহো ওকে মরতে দেবে না। টুহো লুলামকে বাঁচাবেই। তাই এই অন্ধকার রাতে সে একা বেরিয়ে পড়েছে ঘর থেকে। এই নিস্তব্ধ, নিশুতি রাতে বনের গভীরে কত যে ভয়ংকর বিপদ ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে, সে তার অজানা নয়। তবু সে-ভয় এখন তার কাছেও ঘেঁষতে পারবে না। এখন টুহোর বুকখানা সাহসে যেন ফুলে উঠছে। সে একা একা যতই বনের গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে, ততই যেন দুঃসাহসে তার চোখ-মুখ ঝলসে উঠছে। ঝিঁঝির শব্দ, অথবা ক্ষুধার্ত সাপের নিশ্বাস, কিংবা কোনো শিকারি পশুর আর্তনাদ টুহোকে মাঝে মাঝে চমকে দিলেও, তার বুকের সাহস কেউ কেড়ে নিতে পারবে না আর। অবিশ্যি সাপ নামক শয়তানটাকেই ভয়। কেন-না, কোন ফোকরে যে থাকেন তিনি, বোঝা দায়। তাই টুহোও এই জ্যোৎস্না-ঝরা আলো-আঁধারে বনের পাতার ওপর পায়ের শব্দটাকে, শত্রুকে খেদিয়ে দেবার জন্য, জোরে-জোরে ঠুকে যাচ্ছে! অবিশ্যি তাকে তেমন কোনো হিংস্র বন্যপ্রাণীর মুখোমুখি হতে হয়নি এখনও পর্যন্ত। এখন ও পৌঁছে গেছে বনের ধার ঘেঁষে পাহাড়ের পায়ের কাছে। এই পাহাড়ের ওপরেই তাকে উঠতে হবে। ওপরেই সেই মন্দির। সেই মন্দিরেই আছে লুলাম। কিন্তু এই রাতের ছায়ায় পাথর ডিঙিয়ে পাহাড়ে ওঠা, সেও তো এক ভয়াবহ অভিযান। শুধু পাথর নয়। পাথরের গায়ে গায়ে গাছ। গাছের আড়ালে আবার লুকিয়ে আছে খাদের ফাঁদ! সে ফাঁদ তো মরণফাঁদ। পিছলে পড়লে, লুলামের আগেই টুহোর সব শেষ। সুতরাং চোখের দৃষ্টিটাকে সজাগ রেখে তাকে এগিয়ে যেতে হবে পাহাড়ের ওপর। টুহো মরতে চায় না। মরতে যদি হয় তাকে, সে মরতে রাজি আছে, কিন্তু তার আগে সে লুলামকে বাঁচাবেই। কিন্তু কেমন করে? বুঝি-বা টুহো এর উত্তর নিজেও জানে না।

বলতে বলতেই এরই মধ্যে অগুনতি পাথর টপকে টপকে পাহাড়ের অনেকটা ওপরে উঠে এসেছে সে। এখানে থমকে দাঁড়াল সে! চমকে চাইল। ঝাপসা অন্ধকারে এখান থেকে টুহো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে মন্দিরটা। বুকটা শিউরে উঠল। হ্যাঁ, এবার তাকে আরও সতর্ক হয়ে এগোতে হবে। আরও সাবধানে। কখনো গাছের ফাঁকে উঁকি দিয়ে, কখনো পাথরের আড়ালে লুকিয়ে-ছাপিয়ে শত্রুর সন্ধানী নজরটা তাকে এড়িয়ে যেতে হবে। কারণ শত্রু যদি জানতে পারে, তবে তার সব চেষ্টা ব্যর্থ। এমনকী, হয়তো তারও নিস্তার পাওয়ার কোনো পথই খোলা থাকবে না। এখন তাই টুহো কাঁধ থেকে তির-ধনুকটা নামিয়ে হাতে নিয়েছে। এখন সে পায়ের শব্দটাকে সামলে রাখার জন্য, আলতো পায়ের ডিঙি মেরে হেঁটে চলেছে। পা যদি ফসকায়, তার ফল যে কী হবে, সে না-বললেও কে-না বুঝতে পারে!

ধরো, এমনি করতে করতে টুহো না-হয় মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছোল, কিন্তু তারপর? তারপর ঢুকবে কেমন করে মন্দিরের ভেতরে? ঢোকার পথে, মন্দিরের ফটকে, পাহারা তো কেউ দেবে নিশ্চয়! তখন? অথচ লুলামকে উদ্ধার করতে তাকে যেমন করে হোক মন্দিরের ভেতরে তো যেতেই হবে!

এরই ফাঁকে আরও বেশ খানিকটা চড়াই ডিঙিয়ে উঠে এসেছে টুহো। এখন সে সত্যিই মন্দিরের প্রায় সামনাসামনি এসে পড়েছে। মন্দিরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে টুহো। এখানে এই ঘুপচি-মতো জায়গাটায় লুকিয়ে টুহো দাঁড়িয়ে পড়ল, আর কাউকে দেখতে হচ্ছে না! কিন্তু আশ্চর্য! মন্দিরের আশেপাশেও তো কাউকে দেখা যাচ্ছে না। ভারি নির্জন চারদিক। খুব সন্তর্পণে ওই ঘুপচি জায়গা থেকে একছুটে বেরিয়ে এসে একটা পাথরের আড়ালে ঝুপ করে লুকিয়ে পড়ল টুহো। সেখানে থেকে উঁকি মারল। ভোঁ-ভাঁ! জনমনিষ্যির নামগন্ধ নেই! কেমন একটা সন্দেহ চেপে ধরল টুহোকে। ভাবল, তবে কি লুলাম এখানে নেই! একটা না-জানা ভয়ে সে শিউরে ওঠে। না, এখানে তো ভীতুর মতো দাঁড়িয়ে থাকা চলে না তার! তবু হুট করে এগিয়ে যাওয়া, সেটাও খুব বুদ্ধিমানের কাজ নয়! তাই, সে নি:সাড়ে এগিয়ে চলল মন্দিরের ফটকটাকে লক্ষ রেখে। হ্যাঁ, এগিয়ে এসেছে সে মন্দিরের একেবারে কাছাকাছি। তারপর পৌঁছে গেল ফটকটার সামনে! কিন্তু এ কী! ফটক বন্ধ কেন? সত্যিই তো কেউ নেই! না-কোনো পাহারাদার, বা মন্দিরের অন্য কোনো মানুষ। চারিদিক নিঝুম, জনমানবশূন্য। কিন্তু মুষড়ে পড়লে তো চলবে না। এখানে যদি লুলাম না-থাকে, তবে অন্য আর কোথায় সে থাকতে পারে! যেখানেই থাক, খুঁজে সে বার করবেই। তার আগে এই মন্দিরটা তাকে দেখতেই হয়। কিন্তু মন্দিরের ভেতরে টুহো ঢুকবে কেমন করে? ফটক তো বন্ধ! তাই বলে হাল ছাড়লেও তো চলবে না! প্রতিজ্ঞা তার, যেমন করে হোক মন্দিরের চত্বরে তাকে ঢুকতেই হবে। কিন্তু মন্দিরের এই উঁচু পাঁচিল সে কেমন করে টপকাবে?

ভাবতে ভাবতে মন্দিরের বাইরে সে চোখ মেলে ঘুরতে লাগল।

হঠাৎ সে দাঁড়ায় কেন? যেন থমকে চায়! সামনে ওটা কী?

একটা মস্ত উঁচু পাথর। মন্দিরের পাঁচিলের লাগোয়া পড়ে আছে।

এবার ছুটে গেল টুহো পাথরটার সামনে। হ্যাঁ, সে রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। এখন সে সহজেই ওই পাথরের ওপরে উঠে, পাঁচিলে লাফ মারতে পারে। সত্যি সত্যিই সে পাথরটার গা বেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তার মাথায়। উত্তেজনায় টুহোর যেন বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে। সে যেন পাঁচিলে লাফ দিতে ভয় পাচ্ছে! কিন্তু এখানে তো এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়ানোও ঠিক নয়! যেকোনো মুহূর্তে মারাত্মক বিপদ ঘটে যেতে পারে! সুতরাং আর তিলেক অপেক্ষা না-করে, পাঁচিল লক্ষ রেখে টুহো মেরেছে লাফ! ধাঁই করে পাঁচিলের গায়ে টুহো মারল এক ধাক্কা। হাত ফসকাল। মুখ থুবড়ে মেরেছে ডিগবাজি! পাথরের ওপর মুখটা প্রচন্ড ঘা খেয়ে ঘষটে গেল তার! কে জানে রক্ত ঝরছে কিনা! রক্ত দেখবে কে? ভয়ে মুহূর্তের জন্য যেন তার বুকের শব্দটা স্তব্ধ হয়ে গেল! কেন-না, ওর ডিগবাজি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের ভেতর থেকে চিৎকার শোনা গেল, ‘কে?’

টুহো যেমন করে পড়েছিল, ঠিক তেমনি করে পলকের মধ্যে উঠে দাঁড়াল। অপেক্ষা না-করে নিমেষের মধ্যে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। হাত-পা তার কাঁপছে উত্তেজনায়। যা:! তার সব চেষ্টা বুঝি ব্যর্থ হয়ে যায়! ছি: ছি:! আর একটু ধৈর্য ধরলে এমন দুর্ঘটনা না-ও তো ঘটতে পারত! কিন্তু সেকথা এখন ভাবা আর না-ভাবা দুই-ই সমান! কেন-না, টুহো এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, সেই চিৎকার আরও ব্যস্ত স্বরে ফুঁসে উঠছে, ‘কে? কে?’

টুহো যেন এই গাছের আড়ালে এখন একটি পাথরের মূর্তি। নিশ্চল, নিশ্চুপ!

হঠাৎ মন্দিরের ফটকটা খুলে গেল। ছ্যাঁত করে উঠল টুহোর বুকটা। এখান থেকে টুহো স্পষ্ট দেখতে পেল, ফটক পেরিয়ে কে একজন বেরিয়ে এল। তার এক হাতে লণ্ঠন আর এক হাতে ধনুক। সে বিস্ফারিত চোখে এধার-ওধার দেখছে। চিৎকার করছে, ‘কে এখানে?’

কী প্রচন্ড উৎকন্ঠা। ভয়ে যেন কাঠ হয়ে গেছে টুহো! বুকের শ্বাস যেন তার রুদ্ধ হয়ে আসছে! আসবেই তো! লোকটা যদি হঠাৎ টুহোকে দেখে ফেলে! দেখে ফেললে যে মৃত্যু, এ-কথাটা টুহো ভালো করে জানে! অবিশ্যি টুহোর হাতেও তির-ধনুক আছে। সে ইচ্ছে করলে এই আড়ালে দাঁড়িয়েই এখনই লোকটাকে শেষ করে ফেলতে পারে। ওই তো লোকটা লণ্ঠনটা ওপর দিকে তুলে চোখ ঘোরাচ্ছে এদিক-ওদিক, সবদিকই। এ কী! লোকটা এবার মন্দিরের ফটক ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল যে! ওই তো মন্দিরের পেছনদিকটা দেখার জন্য লোকটা ঝোপঝাড় সরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে! এগিয়ে যাচ্ছে টুহোর চোখের আড়ালে। রোমাঞ্চিত হচ্ছে টুহোর সারা শরীর! লোকটা দেখতে দেখতে মন্দিরের ফটকটা খোলা রেখেই একেবারে আড়ালে চলে গেল! এখান থেকে টুহো যদি এই মুহূর্তে একছুটে ওই ফটক ডিঙিয়ে মন্দিরে ঢুকে পড়ে, কেউ জানতেও পারবে না। হ্যাঁ, ওই তো! টুহো সত্যি সত্যিই ছুট দিয়েছে! ওই তো, সে ছুটতে ছুটতে মন্দিরে ঢুকে পড়ল। ওই তো ভেতর থেকে মন্দিরের ফটক বন্ধ করে দিল। তারপর হাঁকপাঁক করে খুঁজতে লাগল লুলামকে।

না, এই অন্ধকারে সে তো দেখতে পাচ্ছে না লুলামকে। অগত্যা সে খুবই ব্যস্ত হয়ে অস্ফুট স্বরে ডাক দিল, ‘লুলাম!’

সে সাড়া পেল না। আবার ডাকল, ‘লুলাম, লুলাম!’

ঠিক তক্ষুনি বাইরের ফটকে ঘা পড়ল। হ্যাঁ, নিশ্চয়ই সেই লোকটা!

আঁতকে উঠেছে টুহো! গলার স্বর তার আপনা থেকেই যেন তীব্র হয়ে ডেকে উঠল, ‘লুলাম!’

অমনি সঙ্গে সঙ্গে ফটকের বাইরে সেই লোকটাও চিৎকার শুরু করে দিলে, ‘কে ফটক বন্ধ করেছে! ফটক খোলো, ফটক খোলো!’

টুহো অন্ধকারে দু-হাত বাড়িয়ে ডাকতে লাগল, ‘লুলাম, লুলাম!’

লোকটাও ধাক্কা দিচ্ছে ফটকে, যত শক্তি আছে তার সব শক্তি দিয়ে। যেন ফটক ভেঙে ফেলতে চায়! তেমনি গলা ফাটিয়ে যতই চিৎকার করছে, ততই যেন চমকে উঠছে টুহোর বুকটা! টুহো যেন হাঁপাচ্ছে।

হঠাৎ অন্ধকারে কোথায় এসে থমকে গেল টুহো! কে যেন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে! কে ও! ওই তো লুলাম! ভোর হলেই ওকে হত্যা করা হবে, অথচ এখন এমন নিশ্চিন্তে কেমন করে ও ঘুমিয়ে আছে! হয়তো কেঁদে কেঁদে যখন আর পারেনি, পারেনি জেগে থাকতে, ওর ক্লান্ত চোখে তখনই বুঝি ঘুম নেমে এসেছে! টুহো মুহূর্ত দেরি করল না। লুলামের গায়ে হাত রাখল। ডাক দিল। তার হাতের স্পর্শে জেগে উঠেছে লুলাম! যেন ভয় পেয়েছে। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, ‘কে!’

‘আমি, টুহো।’

ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছে লুলাম। অবাক চোখে অন্ধকারে টুহোকে দেখতে দেখতে সে যেন বোবা হয়ে গেল।

টুহো বলল, ‘তোকে আমার সঙ্গে যেতে হবে। এক্ষুনি।’

লুলামের বোবা মুখে ভয়ের স্বর, ‘কোথায়?’

টুহো ব্যস্ত হয়ে উত্তর দিল, ‘তোকে বাঁচতে হবে।’

লুলাম ভয়ে ভয়েই উত্তর দিল, ‘আমি তো এখানে বন্দি হয়ে আছি। বাঁচব কেমন করে?’

টুহো লুলামের দিকে হাতটা বাড়িয়ে দিল। বলল, ‘আমি আছি। আমি তোকে বাঁচাব। আমার হাতটা ধর তাড়াতাড়ি। পালাতে হবে। শুনতে পাচ্ছিস না বাইরে, ফটকে ধাক্কার শব্দ!’

লুলাম টুহোর হাতটা জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কোন রাস্তা দিয়ে পালাবে?’

টুহো তেমনি উত্তেজিত হয়েই উত্তর দিল, ‘জানি না। এখন আমাদের মন্দিরের ছাতে যেতে হবে। আয়।’ বলে টুহো লুলামের হাত ধরে, অন্ধকারে হাতড়ে-হাতড়ে ছাতের সিঁড়ি খুঁজতে লাগল।

শেষমেশ তারা যখন সিঁড়ি খুঁজে পেল, তখনও কিন্তু লোকটা চেল্লাচিল্লি চালিয়ে যাচ্ছে। ছাতে উঠে পড়েছে দুজনেই। লোকটার হাতে লণ্ঠন। সুতরাং এই ছাতের আড়াল থেকে তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে টুহো আর লুলাম। লুলাম তাকে দেখে চাপা গলায় টুহোর প্রায় কানের কাছে মুখ এনে বলল, ‘পুরোহিত!’

টুহো একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উত্তর দিল, ‘ও, ইনিই সেই পুরোহিত! ইনিই অকম্মের পান্ডা।’

লুলাম তেমনই চাপাস্বরেই বলল, ‘ছাতের ওপর থেকে আমাদের তো পালাবার উপায় নেই।’

টুহো গলার শব্দটাকে এবার রুক্ষ করে উত্তর দিল, ‘আমাদের পালাবার রাস্তা পরিষ্কার করে নেবার উপায় আমার হাতেই আছে। দ্যাখ কী করি।’ বলে টুহো কাঁধ থেকে ধনুকটা নামিয়ে তির জুতে নিশান করল পুরোহিতের কপালটা। তারপর চোখের পলকে সেই তির ছুড়ে দিল। কে জানে লাগল কিনা। কিন্তু লোকটা আর্তস্বরে চিৎকার করে উঠল। দেখা গেল, তার হাতের লণ্ঠনটা ছিটকে দপ করে নিবে গেল। তারপর সেই পুরেহিত বোধ হয় পাহাড়ের উঁচু-নিচু পাথরের বাধা তুচ্ছ করে, প্রাণের দায়ে ছুটতে লাগল। কিন্তু কোথায় যে লুকিয়ে পড়ল, দেখতে পেল না টুহো। নিমেষে সেই পাহাড়চূড়ায় আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল। সেই নিস্তব্ধতা কী ভয়ংকর রহস্যময়!

টুহো যেন তবুও নিশ্চিন্ত হতে পারে না। মন বলে, যদি পুরোহিতের গায়ে তির না-লেগে থাকে! যদি লোকটা কাছেপিঠে লুকিয়ে থাকে তাকে পাকড়াও করবার জন্য! তাই সে লুলামকে নিয়ে আরও কিছুক্ষণ ছাতের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে রইল। কান খাড়া করে রইল সে! হাতের তির ধনুকে জুতে তৈরি থাকল।

না, কোনো কিছুরই হদিশ সে পেল না। না-কোনো মানুষের কন্ঠস্বর, না-কোনো ভয়ের লক্ষণ। হন্তদন্ত হয়ে, লুলামকে সঙ্গে নিয়ে টুহো ছাত থেকে নেমে এল নীচে। আশ্চর্য কথা, মন্দিরে আর কিন্তু একটিও প্রাণী ছিল না। কেন ছিল না, সে নিয়ে ভাববার সময় তো এখন নয়! এখন টুহো মন্দিরের ফটকটা চটপট খুলে ফেলল। ফটক পেরিয়ে টুহো লুলামকে নিয়ে পাহাড়ের ঘন জঙ্গলে গা ঢাকা দিয়ে পালিয়ে গেল।

আর একটু পরেই শেষ রাতের অন্ধকার ভোরের আলোয় ঝলসে উঠবে। সুতরাং আলো ফোটার আগেই যেমন করে হোক পাহাড় ডিঙিয়ে নীচে নেমে আসতে হবে টুহো আর লুলামকে। তারপর পাহাড়ের জঙ্গল থেকে, নীচের জঙ্গলে লুকিয়ে পড়তে হবে। কারণটা তো স্পষ্ট করে না-বললেও সবাই জানে। একটু পরেই তুলকালাম কান্ড শুরু হয়ে যাবে। একটু পরেই ‘ধর ধর’ রব তুলে জঙ্গলের মানুষ যে তাদের খোঁজে জঙ্গল তোলপাড় শুরু করে দেবে সেটা একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। আর তখনও যদি পাহাড় থেকে তারা নেমে আসতে না-পারে, তবে ধরা তারা পড়বেই। ব্যর্থ হবে টুহোর এত চেষ্টা সব। তখন তাদের কে রক্ষা করবে!

অবিশ্যি এখনও এই পাহাড় থেকে নামবার সময়েও তারা অত্যন্ত সতর্ক। কেন-না, পুরোহিতের সেই হিংস্র চোখদুটোকে, কিংবা তার সেই ভয়ংকর চিৎকার এখনও তুচ্ছ করার সময় হয়নি। তাই সাবধান, খুব সাবধান।

হ্যাঁ, ওই পাহাড়ের কঠিন পাথর ওদের যতই বাধা দিচ্ছে, ওরা যেন ততই দুরন্ত সাহসে সেই পাথর টপকে টপকে এগিয়ে চলেছে। আর ওদের সজাগ দৃষ্টিটা চমকে চমকে এপাশ-ওপাশ উঁকি মারছে। কখনো দুজনে গভীর খাদে লাফিয়ে নামছে, হাঁচড়-পাঁচড় করে আবার উঠছে। হোঁচট খাচ্ছে, পড়ছে, এগিয়ে চলছে।

এমনি করতে করতে কখন যে সকাল হয়ে গেল, দুজনেরই খেয়াল নেই। এই সকালের আলোকে ফাঁকি দিয়ে, পাহাড়ের শেষ ধাপ ডিঙিয়ে দুজনেই গহন বনে ঢুকে পড়ল। আঃ! এখন অনেকটা নিশ্চিন্ত। বিপদ না-কাটলেও ভাবতে পারা যায়, এখনকার মতো ওরা বেঁচে গেছে। গাছের ডালে, বন উপচে-পড়া পাখির ডাক, ডানার শব্দ আর সেই পাতায়-পাতায় এই সকালের উজ্জ্বল আলোর উঁকিঝুঁকি যেন জানান দিচ্ছে, বনেরও ঘুম ভেঙেছে! বনও কি ঘুমোয়? ক্লান্তিতে বনের চোখদুটোও কি ঘুমের আবেশে জড়িয়ে আসে? কে জানে!

কিন্তু এখন এই যে ছোট্ট দুটি বন্ধু শত্রুর ধারালো অস্ত্রের আঘাত থেকে বাঁচবার জন্যে বনের বুকের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে, তারা যেন পারছে না আর! ক্লান্তি যেন জড়িয়ে ধরেছে। বেচারা লুলামের পা দুটি যেন আর ছুটতে চাইছে না। তবু এখানে ক্ষণিক দাঁড়িয়ে বুক-ভর্তি দম নিতে সাহসও হল না তাদের। আরও একটু গভীরে না-যাওয়া পর্যন্ত যেন নিশ্চিন্ত হতে পারছে না তারা। তাই যত কষ্টই হোক, ছুটবে তারা। ছুটবে আরও, আ-র-ও গভীরে।

ছুটতে ছুটতে হঠাৎ কেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল লুলাম। কেন তার চোখদুটো অমন ভয়ে বিহ্বল। টুহোর হাতটা সে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। অমন আড়ষ্ট হয়ে কী দেখে সে হাঁপাচ্ছে! টুহো ওর মুখের দিকে চেয়ে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী?’

লুলাম সামনের ঝোপের দিকে আঙুল দেখাল।

টুহো সেদিকে চোখ ফিরিয়ে আতঙ্কে থমকে গেল। দেখল, এখানের এই ঝোপটার ওপাশে খানিকটা খোলা জায়গা। জায়গাটা ঘিরে চারদিকে আবার জঙ্গল। টুহো দেখল, এখানে একদল জলদস্যু ঘাঁটি গেড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে টুহোর যেন সব কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। ওর যেন বুদ্ধি লোপ পেয়েছে! এখনই যে একটা নিরাপদ জায়গায় লুকিয়ে পড়া উচিত, সে-কথা না-ভেবে হাঁদার মতো ফ্যালফ্যাল করে সেইদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। কী আশ্চর্য! ওর কি কোনো হুঁশ নেই! এক্ষুনি ওই দস্যুর দল দেখতে পেলে যে ওদের কম্ম শেষ করে দেবে!

জলদস্যুদের দেখে হয়তো বেহুঁশ হয়েই দাঁড়িয়ে থাকত টুহো। খুব বরাতজোর, হঠাৎ লুলামই ওর হাতটা ধরে টান দিল। ধক করে কেঁপে উঠেছে টুহোর বুকের ভেতরটা। হাতটা টান দিয়ে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লুলাম বলে উঠল, ‘একটা দস্যু এদিকেই আসছে!’

আর দেখতে হয়! একেবারে লুলামকে প্রায় টানতে টানতে টুহো ছুটল। ছুটতে ছুটতে বলল, ‘লুলাম, লুকিয়ে না-পড়লে ধরা পড়ব।’

সে-সময়ে এর বেশি দুজনের মুখে আর কোনো কথাই সরল না। অবিশ্যি তখন তো কথা বলার সময় নয়, তখন পালাবার সময়। কেন-না, লুলামকে আপাতত একটা মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে, এখন দুজনেই আর এক ভয়ংকর বিপদের মুখে পড়ে গেছে? কেউ জানে না, এখন ওরা বেঁচে যাবে কিনা। যদিও-বা বাঁচে, আর তখন যদি ধরা পড়ে ওদের যে কিছুই করার থাকবে না। হয়তো ওদের দুজনকেই জাহাজে বন্দি করে লুলামের বাবা আর মার মতো কোনো অজানা দেশে নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেবে ওই জলদস্যুর দল! তখন? সুতরাং এখন, ওই যে একটা দস্যু এগিয়ে আসছে, তার চোখকে ফাঁকি দেবার জন্য একটা ঝোপের আড়ালে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ল ওরা।

আশ্চর্য! লোকটা কিন্তু এদিকে এলই না। এমনকী, তাকে দেখে মনে হল, টুহো আর লুলাম যে এখানে লুকিয়ে বসে আছে, সেটিও সে টের পায়নি। যেমন করে সে আসছিল, তেমনি করেই সে ঝোপের ওইপাশ দিয়ে চলে গেল! কে জানে হয়তো বা টহল দিচ্ছে। কিন্তু, তাহলে টুহো আর লুলাম এখন কী করে! ওরা তো দস্যুদের প্রায় নাগালের মধ্যে। ওদের সতর্ক দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়ে যে পালাবে, সে মিথ্যে আশা। অথচ এভাবে এখানে এই ঝোপের মধ্যে বেশিক্ষণ গা-ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে থাকাও তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এ-কথাটা তো ভুললে চলবে না, টুহো আর লুলামের সামনে যেমন জলদস্যুদের হিংস্র থাবা উঁচিয়ে আছে, তেমনি পেছনেও তো শত্রু এতক্ষণে তাদের খোঁজে বনের ভেতর লঙ্কাকান্ড শুরু করে দিয়েছে! তাহলে কী করবে এখন টুহো আর লুলাম? সামনেও যেতে পারে না, পেছনেও ফিরতে পারে না! এখনই এই মুহূর্তে যদি কোনো বাঁচার পথ খুঁজে না-পায়, তবে একটা ভয়াবহ কান্ড ঘটবেই।

এমনি সময় লুলাম ফিসফিস করে উঠল, ‘লোকটা তো চলে গেল!’

টুহো উত্তর দিল, ‘এখান থেকে বেরুলেই সামনের ওই দস্যুদল দেখতে পাবে।’

লুলাম বলল, ‘কিন্তু এখানে এভাবে কতক্ষণ থাকবে?’

টুহো উত্তর দিল, ‘কী করব ভেবে পাচ্ছি না।’

লুলাম জবাব দিল, ‘অন্তত, এখনকার মতো গাছের ওপর উঠে তো লুকিয়ে থাকতে পারি।’

মতলবটা টুহো যেন লুফে নিল। লুলামের মুখে এই চমৎকার কথাটা শুনে টুহোর মনে হল, পৃথিবীতে এই মুহূর্তে যত বুদ্ধিমান মানুষ আছে, লুলাম যেন তাদের সবার সেরা বুদ্ধিমান। অন্য সময় হলে টুহো নিশ্চয়ই আনন্দে লুলামকে কাঁধে তুলে নিত। কিন্তু এখন সে নিজেকে সামলে নিয়ে শুধু ওর কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘শাবাশ লুলাম! ঠিক বলেছিস। আয় তবে, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ি।’

সামনের ঝাঁকড়া গাছটা আঁকড়ে ধরে দুজনেই তরতর করে গাছে উঠে পড়ল। টুহোরা বনের মানুষ। সুতরাং গাছে ওঠা ওদের কাছে টুসকি। আর, এই গাছটাও কী বিরাট দ্যাখো। এদিক-ওদিক ডালপালা ছড়িয়ে আকাশে মাথা তুলে আছে। ঝড় উঠলে যখন ঝটাপটি লাগিয়ে দেয়, তখন দেখলে মনে হবে, যেন একটা দানব। রেগে তাল ঠুকছে! পর পর এমনি যদি কয়েকটা গাছ গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তখন তো বোঝাই দায়, কার মাথা কোনটি! তার ওপর কোনো গাছের ডালে যদি কেউ ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে, কার সাধ্যি তাকে খুঁজে বার করে।

সুতরাং এখন টুহো আর লুলামকেও খুঁজে পেতে হচ্ছে না। এই ডালটায় পা দিয়ে, ওই ডালটায় লাফ মেরে দুটিতে একেবারে সটান মগডালে! সুবিধামতো একঝাঁক পাতার আড়ালে চুপচাপ বসে রইল। এখানে অবিশ্যি ওদের কেউ দেখতে না-পেলেও, ভয় যে একেবারেই নেই তা যেন মনে কোরো না। একজনের চোখে ধুলো দেওয়া ভারি শক্ত! তোমরা নিশ্চয়ই ভাবছ সে কে? তার কথা কিন্তু তোমরা আগেই শুনেছ। তার নাম জাগুয়ার। বলো, কী ধূর্ত শয়তান এই জন্তুটা!

বসে থাকতে থাকতে দুজনেই আড়ষ্ট চোখে এদিক-ওদিক দেখছিল। হঠাৎ লুলাম টুহোর গায়ে আলতো হাতে ঠেলা মারল। টুহো চমকে গেছে! ফিরে তাকাতেই ইশারা করল লুলাম। যেদিকে ইশারা করল সেদিকে তাকিয়ে টুহো দেখতে পেল, গাছের এই মগডাল থেকে জলদস্যুদের আস্তানাটা স্পষ্ট নজরে আসছে। অন্তত কুড়ি-পঁচিশ জন দস্যু তাঁবু ফেলে এখানে আড্ডা গেড়েছে। হ্যাঁ, সত্যিই জায়গাটা ওরা ভালোই খুঁজে বার করেছে। যেমন নিরিবিলি, তেমনি নির্জন। এক তস্কর ছাড়া এমন ভয়াবহ জায়গা আর কার পছন্দ হবে! সুতরাং টুহো আর লুলাম নামে দুটো ছেলে যে ওদের দেখে ফেলেছে, ছেলে দুটো যে গাছের ডালে লুকিয়ে আছে, এ কথাটা ওরা জানতে পারলে, উফ! কী যে কান্ড হবে, ভাবলেই গা শিউরে ওঠে।

তাহলে টুহো আর লুলাম এখন করবে কী! ওরা কি এমনি করে গাছের ওপরই বসে থাকবে। সে তো আর সম্ভব নয়। ঠিক কথা, সম্ভব নয়। তবু এখন তাদের গাছ থেকে নামাও চলবে না, ভেগে পড়ার রাস্তাও ধরা যাবে না। সুতরাং অপেক্ষা তাদের করতেই হবে। অপেক্ষা করতে হবে রাতের জন্য। রাতের অন্ধকারে গা-ঢাকা দেওয়া ছাড়া আর গত্যন্তর নেই তাদের। অগত্যা গাছেই থাকো। গাছের ডাল জাপটে সময় কাটাও। এ তো আচ্ছা ফ্যাসাদ!

এখন একটু চোখ মেলে দ্যাখো, কী ভয়ংকর এক দুর্গম জায়গায় টুহো আর লুলাম এসে পড়েছে! অতিসাহসী মানুষেরও এদিকে আসতে গা ছমছম করবে। অথচ টুহো আর লুলাম এল কী করে! ভিনদেশি ওই জলদস্যুরা কি সাধ করে এখানে আস্তানা গেড়েছে! ওরা জানে এদিকে কেউ আসে না, আসতে পারে না। এমন নিরাপদ জায়গা তুমি আর দুটি পাবে না। ওরা এসেছে এখানে প্রাণ নিতে। টুহো আর লুলাম এসেছে প্রাণ বাঁচাতে। কী আশ্চর্য দেখো, আমরা তো সবাই মানুষ! অথচ নিজেরা বেঁচে থাকবে বলে একদল মানুষের আর একদল মানুষকে খুন করতে হাত কাঁপে না। তারা অন্যের সম্পদ লুঠ করে নিজেদের ভাঁড়ার ভর্তি করার জন্য। দুনিয়ায় সবাই বড়ো হতে চায়। দুনিয়ায় সবাই অন্যের ধনসম্পদ লুঠ করে সুখী হতে চায়। কিন্তু অন্যের সুখ তারা সহ্য করতে পারে না। চোখ টাটায়।

এইরে, এই গন্ডগোলের কোন ফাঁকে টুহো তার তির-ধনুকটা খুইয়ে বসেছে। এখন, কেউ যদি ওদের আক্রমণ করে, ঠেকা দেবার মতো যে কিছুই নেই ওদের হাতে! কী হবে!

বলতে বলতেই হঠাৎ যেন কানে এল দূর থেকে অনেক মানুষের চিৎকারের শব্দ। টুহো আর লুলাম দুজনেই আঁতকে উঠেছে! দুজনের চোখ একই সঙ্গে ওই জলদস্যুর আস্তানার দিকে ঠিকরে পড়ল। কিন্তু না, এ চিৎকার তো তাদের আস্তানা থেকে আসছে না। বরঞ্চ মনে হল, ওই দস্যুদল নিজেরাই যেন সতর্ক হয়ে নিজেদের অস্ত্র ঝটপট হাতে নিচ্ছে। হয়তো তারা আতঙ্কিত, কিন্তু যেকোনো বিপদের জন্য হুঁশিয়ার! দস্যুর দল সঙ্গে সঙ্গে তাঁবু ছেড়ে ঝুপঝাপ লুকিয়ে পড়ল এদিক-ওদিক। হ্যাঁ, চিৎকার এদিকেই ভেসে আসছে। কারা চিৎকার করে এগিয়ে আসছে! ওরা কি তবে টুহো আর লুলামকে খুঁজতে বেরিয়েছে! নাকি ওই জলদস্যুদের আক্রমণ করতে আসছে! ভাবতে ভাবতে টুহো আর লুলামের গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে। কী প্রচন্ড উদবেগ নিয়ে এই গাছের ডালে তারা অপেক্ষা করছে!

হ্যাঁ, হঠাৎ দেখা গেল সেই মানুষের দলটাকে। হ্যাঁ, এরা বনেরই মানুষ। সবারই হাতে তির-ধনুক। সবার মুখেই যেন আতঙ্কের ছায়া। চেঁচাচ্ছে আর সেই দুর্গম বনের আনাচেকানাচে তন্নতন্ন করে ঢুঁড়ে বেড়াচ্ছে।

এমনি সময় লুলাম আতঙ্কে ফিসফিসিয়ে উঠল, ‘টুহো!’

পলকে টুহো নিজের ঠোঁটে আঙুল চেপে ‘স-স-স’ করে শব্দ করে ওকে কথা বলতে বারণ করল।

কিন্তু লুলাম থামল না। সে ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘পুরোহিত!’

টুহো আঁতকে উঠেছে, ‘কই?’

ভয়ে লুলামের গলার স্বর আটকে আসছে। শুধু আঙুল তুলল পুরোহিতের দিকে।

আর কারও সন্দেহ নেই, টুহো আর লুলামকে ধরার জন্যেই ওরা বেরিয়ে পড়েছে। টুহো যেন কথা বলতে পারে না। অনেক কষ্টে সে শুধু বলতে পারল, ‘গাছের সঙ্গে সেঁটে থাক। কেউ যেন না-দেখতে পায়।’

অবিশ্যি ওরা যেখানে উঠেছে, সেখান থেকে ওদের কেউ দেখতে পাবে না ঠিকই, তবু সাবধানের মার নেই। কিন্তু বেশি সাবধান হতে গিয়ে টুহো যে নিজেই অমন অসাবধানের মতো কাজ করে ফেলবে, এ যেন ভাবা যায় না। হয়েছে কী, পুরোহিতের ওই দলবলকে দেখতে দেখতে টুহো হঠাৎ যেন কেমন বেসামাল হয়ে গেছে! মগডাল থেকে হাত ফসকে মেরেছে ডিগবাজি। এই যা:! পড়ল বুঝি হাত-পা ভেঙে মাটিতে! ঘাড়-মুন্ডু গোঁত্তা মেরে প্রাণটি বুঝি গেল তার! না, না, ওই দ্যাখো, কী দারুণ বাহাদুর টুহো! পড়তে পড়তে ধরে ফেলেছে আর একটা ডাল! ঝুলে পড়েছে! বেঁচে গেছে টুহো। কিন্তু বাঁচলে কী হবে! বিপদ যখন আসে, সে তো একা আসে না। ঝুলতে গিয়ে এইসা ঝাঁকুনি লাগল গাছের ডালে যে, ডালপালা সব ঝমাঝম করে কেঁপে উঠেছে। আর বলতে হয় না! পড়বি তো পড় সকলের নজর পড়েছে গাছের ওপর!

সত্যি! রাখে হরি তো মারে কে! এমন একটা জায়গায় টুহো ঝুলছে, যেখানে কারও দৃষ্টিই গেল না। কী বরাত বলো! উলটে, ওই ঝাঁকুনির শব্দে লোকগুলো নিজেরাই ভড়কে গেছে। ভাবল, গাছের ওপর নিশ্চয়ই ভয়ংকর সেই জন্তু জাগুয়ার ঘুর-ঘুর করছে। সেই ভয়েই দলসুদ্ধু প্রায় সবক-টা লোকই একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘জাগুয়ার, জাগুয়ার!’ বলে, ধনুকের ছিলায় তির উঁচিয়ে এক-পা, এক-পা করে পিছু হটতে লাগল! টুহো আর লুলাম জুল জুল করে দেখছে। ভাবছে, এই বুঝি সবাই তির ছুড়ল। দিল বুঝি উড়িয়ে!

এমন সময়, একেবারে আচমকা, কোথায় ছিল জলদস্যুর দল, ঝুপঝাপ সেই ঝোপ থেকে বেরিয়ে পড়েছে। বন কাঁপিয়ে হল্লা তুলে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাদের ঘাড়ে! অতর্কিতে! হকচকিয়ে গেছে সবাই। পালাতেও পারে না, ধনুকে তির নাড়াতেও পারে না। ইস! যেন মনে হল, আকাশ থেকে বিনা মেঘে বাজ পড়ল! তাল বুঝে যে-ক-টা লোক পালাতে গেল, তাদের সঙ্গে লেগে গেল ধুন্ধুমার লড়াই। সে কী রক্তারক্তি কান্ড! টুহো আর লুলাম ভয়ে একেবারে কাঠ। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল সেই মারদাঙ্গার ভয়াবহ দৃশ্যের দিকে। এখন যদি টুহোকে কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘এই যে লড়াই হচ্ছে, তুমি কার জয় চাও? এই জলদস্যুর? নাকি, ওই পুরোহিত যে মানুষগুলোকে ডেকে এনেছে তোমাদের ধরার জন্য, তাদের?’ কী উত্তর দেবে টুহো? তোমরা বোধ হয় ভাবছ, টুহো এই প্রশ্নটা শুনে নিশ্চয়ই ঘাবড়ে যাবে। কিন্তু না। ওর কাছে এই প্রশ্নটা জলের মতো সোজা। টুহো চায়, এই দুটো দলই মারদাঙ্গা করতে করতে মরুক। সে যেমন চায় না, বিদেশি জলদস্যুরা তস্করের মতো তার দেশের মানুষের রক্ত ঝরাক, রক্ত ঝরিয়ে সব লুঠ করে নিয়ে যাক, তেমনি সে এ-ও চায় না, তার দেশেরই মানুষ, পুরোহিতের মিথ্যা কথায় বিশ্বাস করে, তার বন্ধু লুলামকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তবে কি টুহোর মন বলতে চায়, যারা অন্যায় করে, যারা নিষ্ঠুর হত্যাকারী তাদের বাঁচার কোনো অধিকার নেই এই পৃথিবীতে! তারা মরুক, নিজেরাই লড়তে লড়তে! নিশ্চিহ্ন হয়ে যাক যত পাপ, যত হিংসা, সব!

হ্যাঁ, ওরা স্পষ্ট দেখছে, কী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই না চলছে দু-দলে! দু-দলই গাছের ফাঁকে লুকিয়ে-ছাপিয়ে তাদের হাতের অস্ত্র ছুড়ে চলেছে। গাছের পাতায় রক্তের ছাপ ছড়িয়ে পড়েছে। যে পারছে, রণে ভঙ্গ দিয়ে পালাচ্ছে। আর যে পারছে না, সেইখানেই মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে।

হঠাৎ টুহোর চমক ভাঙল। লুলাম একটু গলার স্বর উঁচিয়েই বলল, ‘টুহো, ওই দ্যাখো পুরোহিত পালাচ্ছে!’

টুহো লুলামের কথা শুনে চোখ ফিরিয়ে দেখে সত্যিই পুরোহিত ভাগছে। পুরোহিতকে পালাতে দেখে টুহো লুলামকে বলল, ‘লুলাম, এই তাল। ওরা লড়াই করুক। আমরা ওদের চোখে ধুলো দিয়ে ওই পুরোহিতের মতো এই সুযোগে পালাতে পারি।’

লুলাম বলল, ‘কিন্তু পুরোহিত দেখতে পেলে!’

টুহো উত্তর দিল, ‘পুরোহিত নিজের প্রাণ নিয়েই এখন পালাতে পারে কিনা তার ঠিক নেই! আয়, আমরা গাছ থেকে নেমে পড়ি। লড়াই শেষ হয়ে গেলে হয়তো ফাঁক পাব না’— বলে টুহো গাছের ডালে ডালে পা ফেলে টুপটাপ ওই ওপর থেকে নীচে নামতে লাগল। টুহোকে দেখে লুলামও ডাল থেকে ডালে লাফ মেরে মেরে ঝুপঝাপ নেমে এল। তারপর দে ছুট!

এই এক ভারি অদ্ভুত জায়গা গহন বন। একবার লুকিয়ে পড়তে পারলেই হয়, চট করে কেউ ঠাওর করতে পারবে না। ধরতেও পারবে না। কিন্তু ওরা যাবে কোথায়? ছুটলেই যে বাঁচা যায়, এমন কথা তো আর ভাবা যায় না! সুতরাং বাঁচার ইচ্ছা যতই পেয়ে বসছে ওদের, দুর্গম বনের ঝোপঝাড়ের বাধাটা যেন ততই তুচ্ছ মনে হচ্ছে!

অবশেষে সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ল দুজনেই। দুজনেরই পা যেন আর উঠতে-নামতে চাইছিল না। এখানে ওরা কি একটু বসবে? এই নির্জন নিস্তব্ধ জায়গাটায়?

হ্যাঁ, ওরা থামল। সামনে বোধহয় একটা ছোট্ট ঝরনা ছুটে যাচ্ছে বনের ভেতর দিয়ে। জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। বসে পড়ল দুজনেই। ক্লান্তির নিশ্বাসটাকে ধীরে ধীরে সামলাবার চেষ্টা করল। একটু ধাতস্থ হয়ে চারপাশটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরীক্ষা করল। আপাতত কোনো বিপদ আছে বলে মনে হল না। তবু এখানে তো এভাবে বসে থাকা যায় না! তাই লুলামই কথা বলল প্রথমে। জিজ্ঞেস করল, ‘এরপর?’

টুহো লুলামের মুখের দিকে চাইল।

লুলাম আবার বলল, ‘তুমি এত কান্ড না-করলে, তোমার এত বিপদ হত না। সকাল যখনই হত, তখনই দেবতার সামনে ওদের খড়্গ আমাকে আঘাত করত। আমি মরলে আর তো কোনো অশান্তি থাকত না। আমার প্রাণ কেন বাঁচাতে গেলে? আমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের বিপদ তুমি নিজে ডেকে আনলে কেন টুহো?’

টুহো লুলামের এই কথার কোনো উত্তর না-দিয়ে, উলটে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর খিদে পাচ্ছে না লুলাম?’

লুলাম উত্তর দিল, ‘এটা বোধহয় ঠিক খিদে পাওয়ার সময় নয়!’

ঠিক বটে, এই সাংঘাতিক উত্তেজনায়, এই সময়ে খিদের কথা কার আর মনে হয়। বরঞ্চ এই সময়ে বারবার যে কথাটা মনের ভেতর তোলপাড় করছে, সে-কথাটা হল, এরপর কী করবে তারা? কোথায় যাবে?

সত্যিই তো, একটা মাথা গোঁজার মতো জায়গা না-মিললে, এভাবে কতক্ষণ তারা লুকিয়ে-ছাপিয়ে নিজেদের বাঁচিয়ে রাখবে! এখানে বেশিক্ষণ বসে থাকাটাও বোধহয় খুব বিবেচনার কাজ নয়। সুতরাং উঠতেই হবে। তারপর যে কী হবে দুজনার কেউই জানে না!

‘টুহো!’ যেন খুব উদগ্রীব হয়ে হঠাৎ লুলাম ডেকে উঠল।

‘কী?’ ভয়ার্ত কন্ঠে সাড়া দিল টুহো।

লুলাম তেমনি ব্যস্ত হয়েই বলল, ‘ওই দ্যাখো, কী একটা যেন ঝোপের মধ্যে ঝটপট করছে।’

টুহো তাড়াতাড়ি চোখ ফিরিয়ে দেখে, সত্যিই তো! আরও একটু স্থির হয়ে দেখতে দেখতে টুহো বলল, ‘একটা পাখি মনে হচ্ছে।’

লুলাম উত্তর দিল, ‘আমারও তাই মনে হচ্ছে। দেখছ, গায়ের রংটা কেমন জলপাই-এর মতো সবুজ?’

টুহো বলল, ‘মাথার দু-পাশে কালো কালো ছাপও দেখা যাচ্ছে।’

লুলাম বলল, ‘দেখতে পাচ্ছ, ঠোঁটের দু-পাশটা কেমন এবড়োখেবড়ো।’

টুহো লুলামের হাতটা ধরে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর বলল, ‘চ, দেখি।’ বলে দুজনেই সেই ঝোপের দিকে ছুটল।

কাছে এসে লুলাম বলল, ‘দেখলে, আমি ঠিক বলেছি, পাখি।’

টুহো আরও একটু ভালো করে দেখল। তারপর ঝোপের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে পাখিটাকে টেনে বার করে আনল। এনে লুলামের চোখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘জানিস, এ পাখিটার নাম কী?’

লুলাম বলল, ‘মটমট না?’

‘হ্যাঁ, কিন্তু দেখছিস গাছের কাঁটা ফুটে পাখিটার ডানার পালক খসেছে?’

‘কী করে এমন হল বলো তো?’

‘বুঝতে পারছি না!’

‘আর বোধহয় উড়তে পারবে না।’—বলে লুলাম পাখিটার গায়ে আলতো ছোঁয়ায় হাত বোলাল।

টুহো বললে, ‘দেখি, উড়তে পারে কিনা।’—বলে পাখিটাকে ধীরে ধীরে মাটির ওপর বসিয়ে দিল।

কিন্তু উড়তে সে পারল না। একটা ডানা গুটিয়ে আর একটা ডানা মেলে ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটতে লাগল।

লুলাম বলল, ‘কই, পারছে না তো?’

একটু যেন ব্যস্ত হয়েই টুহো এগিয়ে গেল। পাখিটাকে তুলে নিল মাটি থেকে। তারপর বলল, ‘ডানাটা ভাঙল নাকি!’—বলে ডানাটায় আস্তে একটা টান দিল। বুঝতে পারল টুহো, ভাঙেনি। কিন্তু জখম হয়েছে মোক্ষম।

লুলাম জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কি পাখিটা উড়তে পারবে না?’

টুহো বলল, ‘আয় দেখি। ওর ওই ব্যথার জায়গায় একটু জল ছিটিয়ে দিলে হয়তো চাঙ্গা হতে পারে।’

‘ঠিক বলেছ।’ বলে লুলাম আর টুহো ঝরনার শব্দ শুনতে শুনতে তার জলের কাছে পৌঁছে গেল। ছোট্ট ঝরনার ঝকঝকে জল, যেন ঝলক ঝলক রুপো। গড়িয়ে নামছে ওপর থেকে নীচে টলটল করে। পাথরের গায়ে নাচতে নাচতে নদীর গান গেয়ে ছুটে চলেছে। পাখিটাকে বুকে নিয়ে লুলামের সঙ্গে টুহো একটা পাথরে লাফ দিল। জলের কাছে হেঁট হয়ে হাত ডোবাল লুলাম। আঁজলা ভরে জল নিয়ে পাখিটার গায়ে ছড়িয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে পাখিটা হাঁ করল। পাখিটার তেষ্টা পেয়েছে। ওর ঠোঁটে একটু একটু করে জলের ফোঁটা গড়িয়ে-গড়িয়ে ঢেলে দিল লুলাম। পাখিটা যেন গা-ঝাড়া দিচ্ছে! কেমন চনমন করে চেয়ে দেখছে এধার-ওধার! এ কী, টুহো আর লুলামের মুখের দিকেও অমন জুলুক-জুলুক তাকায় কেন? তবে কি পাখি বলতে চায়, ‘এবার আমায় ছেড়ে দাও!’

হয়তো তাই হবে। হয়তো টুহো আর লুলাম ওর মনের কথা বুঝতে পারে। তাই টুহো বলল, ‘এবার বোধহয় উড়তে পারবে। দেখছিস লুলাম, এখন যেন ডানাটা নাড়াবার চেষ্টা করছে?’

লুলাম বলল, ‘দ্যাখো না ছেড়ে দিয়ে!’

‘যদি উড়তে গিয়ে থুবড়ে পড়ে!’ যেন ভয় পেল টুহো।

‘কিন্তু চেষ্টা তো করতে হবে। বাঁচলে ও তো আকাশেই বাঁচবে। আর আকাশে যদি উড়তে না-চায়, আমরা সঙ্গে নিয়ে যাব।’ উত্তর দিল লুলাম।

‘বেশ, তবে তাই দেখি।’—বলে টুহো পাখিকে ছেড়েই দিল। উড়ল সে, কিন্তু হাওয়ায় সে ভাসতে পারল না। টাল খেয়ে পড়ে গেল।

ইস! খুব বরাত! জলের ওপর পড়ে যে নাকানি-চোবানি খায়নি এই রক্ষে। পড়ল আর একটা মস্ত পাথরের ওপর। পড়েই কিন্তু উঠে পড়ল। পাথরটার ওপরেই ক-বার তুড়ুক-তুড়ুক লাফাল। তারপরে দ্যাখো, ওই তো সোঁ করে উড়ে গেল! ওই তো একটা গাছের ডালে গিয়ে বসেছে! লেজটা আর ঘাড়টা কেমন দোলাচ্ছে, ঘোরাচ্ছে, টুহো আর লুলামকে কেমন দেখছে। এই দ্যাখো, ডানা ছড়িয়ে লাফ দিল আকাশে। উড়ছে পাখিটা উড়তে উড়তে ক-বার ঘুরপাক খেয়ে কোথায় যে হারিয়ে গেল, আর দেখা গেল না।

কী খুশি লুলাম। হেসে উঠল লুলাম। লুলামের হাসি দেখে টুহোও হেসে উঠেছে। হাতে হাতে তালি দিয়ে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছে দুজনেই। তারপর থতোমতো খেয়ে গেছে। মুখের হাসি তাদের মুখেই হারিয়ে গেছে! ওদের সামনে কে যেন একজন দাঁড়িয়ে! তার হাতে তির-ধনুক। তাদের দিকে নিশান করে উঁচিয়ে আছে! কী দশাসই চেহারা লোকটার! যেন গুণ্ডা।

‘হা-হা-হা।’ লোকটা বাজখাঁই গলায় হেসে উঠল।

টুহো আর লুলামের বুকটা দুরু-দুরু করে কেঁপে উঠল। না-পারে নড়তে, না-কিছু করতে!

লোকটা হাসতে হাসতেই বললে, ‘খুব যে ফাঁকি দিয়ে পালাচ্ছিলি। ভেবেছিস, পার পেয়ে যাবি। আমি কি মরে গেছি। আমাকে চিনিস?’

টুহো আর লুলাম লোকটার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইল।

সে তিরটা তেমনি উঁচিয়ে বলে চলল, ‘আমায় যদি চিনতে না-পারিস তো শুনে রাখ, আমার নাম টিংকুমাংগো।’—বলেই আবার হা-হা-হা করে হেসে উঠল।

নামটা শুনতেই ছ্যাঁত করে চমকে উঠেছে ওদের দুজনারই বুক। কারণ টিংকুমাংগোকে ওরা আগে দেখেনি ঠিকই, কিন্তু নাম শুনেছে। এই টিংকুমাংগোই হচ্ছে সেই ভয়ংকর ঘাতক। এই টিংকুমাংগোই দেবতার সামনে মানুষকে বলি দেয়। লুলামকেও বলি দেবে।

এবার টিংকুমাংগো হাতের ধনুকটাকে আরও একটু শক্ত করে ধরে বলল, ‘যেখানে দাঁড়িয়ে আছিস, সেইখানেই থাকবি। এক পা নড়লেই তিরের ঘায়ে শেষ করে ফেলব।’—বলে টিংকুমাংগো ওদের দিকে এগিয়ে গেল।

যেমন দাঁড়িয়ে ছিল তেমনই দাঁড়িয়ে রইল টুহো আর লুলাম। এমনকী, কেউ কারও দিকে চাইবারও সাহস পেল না। আর সন্দেহ নেই, দুজনেই ধরা পড়ে গেছে। পালাতে গেলেই নির্ঘাত মরণ। অথচ টুহোর মনের ভেতরটা যেন জ্বলে উঠছে। মনে হচ্ছে, এখনই ওই ঘাতকের ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে! কিন্তু না। সে তা করল না। কারণ ওর ঘাড়ে পড়তে গেলেই, ও তিরটা ছুড়ে দিতে পারে। তখন যে তার এত চেষ্টা সব ব্যর্থ হয়ে যাবে! এভাবে না-মরে, মরণের সঙ্গে লড়াইটা তাকে করতে হবে বুদ্ধিমানের মতো। সুতরাং পুতুলের মতো তারা দাঁড়িয়েই রইল।

এখন একেবারে সামনে এসে গেছে টিংকুমাংগো। সামনে এসে ঘ্যাঁচ করে টুহোর গলায় একটা রদ্দা মারল। তারপর টুহোর হাতটা ধরে এমন মোচড় দিল, ওর যেন প্রাণটা বেরিয়ে যায়। ধনুকটাকে ঝটপট কাঁধে ফেলে আর এক হাত দিয়ে লুলামের চুলের মুঠিটা খামচে হিড়হিড় করে টানতে টানতে নিয়ে চলল। যেতে যেতে এমন হুংকার ছাড়তে লাগল, যেন মনে হল এখনই কেটে ফেলবে!

লোকটা যে তাদের কাটবেই, এখন একথাটা টুহো আর লুলাম স্পষ্ট বুঝে গেছে। ওরা প্রায় যন্ত্রের মতো এই টিংকুমাংগোর গোঁত্তা খেতে খেতে এখন যে কোথায় চলেছে, বুঝতে পারে না। অবিশ্যি যে-কথাটা বুঝতে পারছে, তা হল রেহাই তাদের নেই। হত্যা তাদের করা হবে ঠিকই। কিন্তু কখন?

এতক্ষণ পরে হুংকার ছাড়ার পর টিংকুমাংগো এবার মুখ খুলল। গাঁক গাঁক করে ধমকে উঠল, ‘দেবতাকে ফাঁকি দিয়ে যে পালায়, সে কোনোদিন রেহাই পায় না। এবার কে তোদের বাঁচাবেরে নচ্ছার? সামনে চেয়ে দ্যাখ, কোথায় নিয়ে এসেছি তোদের!’

সামনে চেয়ে দেখল টুহো আর লুলাম। শিউরে উঠল। কারণ সামনেই হত্যামঞ্চ!

টিংকুমাংগো টুহো আর লুলামের কাঁচুমাচু মুখ দেখে ভীষণ চিৎকার করে হেসে উঠল, ‘হো-হো-হো।’ হাসতেই হাসতেই বলল, ‘ওইখানেই তোদের ভবলীলা সাঙ্গ হবে। হা-হা-হা!’

হ্যাঁ, হত্যা-মঞ্চের চারিদিকে পাথর দিয়ে ঘেরা খুব উঁচু পাঁচিল। মধ্যিখানে একটা উঁচুমতো বেদী দেখা যাচ্ছে। ওইটাই বোধ হয়, হত্যা-মঞ্চ। ওই পাথর-ঘেরা পাঁচিলের গায়ে একটা মস্ত ফটক। গাছের মোটা মোটা গুঁড়ি দিয়ে সেই ফটক তৈরি হয়েছে। একটা ঢাপ্পুস তালা ঝুলছে ফটকের গায়ে। অবিশ্যি ফটকের গুঁড়িগুলো ফাঁক ফাঁক। ওই ফাঁকে চোখ রেখে ভেতর থেকে ফটকের বাইরেটা, কিংবা বাইরে থেকে ভেতরটা স্পষ্ট দেখা যায়।

টিংকুমাংগো টুহো আর লুলামকে টানতে-টানতে সেই ফটকের সামনে নিয়ে এল। দুজনকে টিংকুমাংগো একটা হাত দিয়ে জাপটে ধরল। বাপরে বাপ! কী ক্ষমতা! টুহো আর লুলামের ট্যাঁ-ফুঁ করারও শক্তি নেই। আর একটা হাত দিয়ে কোমর থেকে ফটকের চাবি বার করলে। তালায় লাগিয়ে ফটকটা খুলে ফেলল। লাথি মেরে ফটকের পাল্লা দুটো ফাঁক করে টুহো আর লুলামকে তার মধ্যে ঠেলে দিল। পাথর-ঘেরা সেই হত্যা-মঞ্চের মধ্যে ছিটকে পড়ল টুহো আর লুলাম। ধড়ফড় করে উঠতে-না-উঠতেই টিংকুমাংগো বাইরে থেকে ফটকটা বন্ধ করে দিয়েছে। টুহো আর লুলাম নির্বাক, হতভম্ব! চিৎকার করা তো দূরের কথা, মুখ দিয়ে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত বেরুল না তাদের। শুধু নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগল, এরপর?

কিন্তু হঠাৎ যে কী হল কে জানে, টিংকুমাংগো চিৎকার করে উঠেছে! উরিব্বাস! তার সেই বাজখাঁই গলায় সে কী বোম-ফট চিৎকার! আচমকা অমন চিৎকার শুনলে বুকের ভেতরটা কার না ভয়ে লম্ফঝম্প লাগায়! টুহো আর লুলাম তো নেহাতই বাচ্চা! কিন্তু আশ্চর্য, টুহো একটু দোনোমনো করলেও, লুলাম ছুট দিল। ফটকের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারল। তারপর প্রায় গলা ফাটিয়ে ডাক দিল, ‘টুহো!’

ডাক শুনে টুহোও ছুটে এসেছে। লুলামের পাশে দাঁড়াতেই সে ব্যস্ত হয়ে বললে, ‘দ্যাখো, দ্যাখো!’

টুহো চোখ মেলেই হকচকিয়ে গেছে! দেখে, একটা পাখি। কেমন যেন সন্দেহ হয় টুহোর। মনে হয়, যেন সেই মটমট পাখিটা। সেই পাখিটা টিংকুমাংগোর মাথার ওপর চরকি খাচ্ছে, আর যেই না সুযোগ পাচ্ছে মাথার ওপর ঠোঁটের ঠোক্কর ঝাড়ছে। টিংকুমাংগো যতবার তালায় চাবি আঁটতে যায়, ততবারই এই কান্ড। টিংকুমাংগো না-পারে তালায় চাবি দিতে, না-পারে পাখিটাকে কবজা করতে। শুধু চেল্লায়, আর লাফ মারে!

লুলামই বলল, ‘টুহো, টুহো, এটা কি সেই পাখিটা, মটমট?’ কথাগুলো বলতে বলতে লুলাম উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে।

‘হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হচ্ছে।’ উত্তর দিল টুহো, ‘এই পাখিটাকেই আমরা বাঁচিয়েছি। আমরা আকাশে উড়িয়ে দিয়েছি।’

এই অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখতে দেখতে এবার দুজনেই যেন ভীষণ উত্তেজিত। টিংকুমাংগোকে কিছুতেই ছাড়বে না পাখি! ঝাপটা মেরে মেরে পাখি যেন টিংকুমাংগোকে পাগল করে ছাড়বে।

এরই ফাঁকে এমন একটা কান্ড ঘটে গেল যে, দেখে টুহো লুলাম দুজনেই থ। হল কী, টিংকুমাংগো নিজের মাথা বাঁচাতে গিয়ে যেই আঁকপাঁক করে দুটি হাতই মাথায় তুলেছে, অমনি পাখি ছোঁ মেরেছে। হাত থেকে ফটকের চাবিটা নিয়ে হু-স-স। পাখি হাওয়া। টিংকুমাংগোর যেন মাথায় বাজ পড়ল। আঁতকে উঠে তার সে কী চিৎকার! ‘চাবি, চাবি! চাবি নিয়ে পাখি পালাল।’ বলতে বলতে পাখির পেছনে ছুট দিল টিংকুমাংগো। কিন্তু পাখি তো আকাশে। ঠোঁটে চাবি লেপটে ওর মাথার ওপর চরকি খাচ্ছে! আর কি ধরা যায়!

টুহো বুঝতে পেরেছে। বুঝতে পেরেছে লোকটা ফটকে তালা আঁটতে পারেনি। তাই, আনন্দে প্রায় লাফিয়ে উঠে ডাক দিল, ‘লুলাম, টিংকুমাংগো ফটকে তালা লাগাতে পারেনি নিশ্চয়ই। নিশ্চয়ই ফটক খোলা। আয় দেখি।’

লুলামও সঙ্গে সঙ্গে ওরই মতো খুশি হয়ে বলে উঠল, ‘ঠিক বলেছ। ফটক ঠেললেই খুলে যাবে।’

এরপর দুজনেই ফটকে ঠেলা মারলে। না, ফটক খুলল না। দারুণ ভারি। যেন খুলতেই চায় না। ওরাও কি ছাড়বার পাত্তর। এমন সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে, মরণ ছাড়া গত্যন্তর নেই। তাই প্রাণপণে হ্যাঁচড়া-হেঁচড়ি করে একটুখানি নড়াতে পারল ফটকটা। ওই একটুখানি ফাঁকের ভেতরেই অনেক কষ্টে মাথা গলিয়ে, সুড়ুৎ করে বাইরে বেরিয়ে এল দুজনে। টিংকুমাংগো দেখতেই পেল না। আসলে দেখবে কী, সে তো তখনও পাখির সঙ্গে পাঁয়তারা কষছে। এই পালাবার তাল।

কিন্তু পালাতে গিয়ে টুহোর কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল। এইরে, দু-চারটে লোক যে জড়ো হয়ে গেছে! হয়তো টিংকুমাংগোর চেঁচামেচি শুনে! দেখতে পেল টুহো আর লুলামকে? না। ওরা তো পাখির সঙ্গে টিংকুমাংগোর নাচন-কোঁদন দেখতেই মত্ত। আর কোনো কথা আছে! টুহো লুলামের হাত ধরে ভোঁ-কাট্টা! একটা বেশ ঝাঁকড়া গাছের আড়ালে গিয়ে দুজনে লুকিয়ে, নি:সাড়ে পাখির সঙ্গে টিংকুমাংগোর আস্ফালন দেখতে লাগল।

দেখতে দেখতে টুহো আর লুলামের চক্ষুস্থির! ও কী, ও কী! পাখিটার গায়ের সবুজ রং হঠাৎ কখন যেন হলদে হয়ে গেছে! ভেলকি দেখছে না তো! দুজনেই হাঁদারামের মতো পাখির দিকে চেয়ে চেয়ে ঢোক গিলতে লাগল! গিলতে গিলতে লুলামই কথা বলল, ‘সবুজ পাখিটা হলদে হয়ে গেল কী করে, টুহো?’

টুহো উত্তর দিল, ‘বুঝতে পারছি না।’

দ্যাখো, দ্যাখো, টিংকুমাংগোর নজর এখন আর চাবির দিকে নেই। তার নজর পড়েছে, পাখির রঙের দিকে! টিংকুমাংগোর লম্ফঝম্ফ এখন একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেল যে! কী ব্যাপার! সে-ও যেন ভীষণ অবাক হয়ে গেছে! অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে পাখিটার দিকে!

কিন্তু টিংকুমাংগো থমকে দাঁড়ালে কী হবে? এতক্ষণ যে লোকগুলো জড়ো হয়ে টিংকুমাংগোর কান্ডকারখানা দেখছিল, তারাই এবার পাখির পেছনে ছোটাছুটি আর হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিল। এ তো আচ্ছা ভেলকি! পাখির যেন ভয়ও নেই, ডরও নেই। অতগুলো মানুষকে ভড়কি দিয়ে হাওয়ায় চরকি খেয়ে আকাশে ডানা ঝাপটাচ্ছে!

উরিব্বাস! হঠাৎ আবার এ কী তাজ্জব ব্যাপার। পাখির গায়ের হলদে রং হঠাৎ যেন সোনার রঙে ঝলসে ওঠে! মনে হল, যেন একতাল কাঁচা সোনার জ্যান্ত পাখি আকাশে বিদ্যুতের ঝিলিক মেরে উড়ে বেড়াচ্ছে! আর দেখতে! কোথায় চাবি আর কোথায় কী। টিংকুমাংগোর চোখদুটো লোভে জ্বলজ্বল করে উঠল। সে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘সোনা, সোনা...।’— বলেই পাখিটাকে ধরার জন্যে তুর্কিনাচন শুরু করে দিল টিংকুমাংগো।

এমন খবর কি আর চাপা থাকে! এ যে সোনার খবর! তার ওপরে জ্যান্ত সোনা। খবর পৌঁছে গেল বনের সর্দারের কানে। সরেজমিনে তদারক করতে তিনিও হাজির। লোকটাকে দেখতে যেমন ঢ্যাপ্পুস-ঢপঢপ, তেমনি গম্ভীর-গমগম। তিনি কোনোদিন যে হাত-পা তুলে পাখি ধরার জন্য নাচানাচি শুরু করবেন, একথা কেউ ভাবতেই পারে না। কিন্তু সেই তিনিও থাকতে পারলেন না। সোনা দেখে, কানা হলেন। লাগিয়ে দিলেন টিংকুমাংগোর সঙ্গে লাফালাফি! কিন্তু পাখির বয়েই গেছে! সে যেমন উড়ছিল, তেমনিই উড়ে চলল।

এমন সময় হল কী, পাখিটা উড়তে উড়তে একটা গাছের ডালে গিয়ে বসে পড়ল। অমনি সেই মস্ত বড়ো গাছটা সোনার আলোয় ঝলমল করে উঠল। যত লোক ছিল সঙ্গে সঙ্গে গাছের দিকে ছুট মারল। তাদের সঙ্গে ছুটে গেল টিংকুমাংগো। ছুট দিল বনের সর্দার। সবার আগে গাছে উঠে পাখি ধরার জন্য লেগে গেল হুড়োহুড়ি। আগে যদি যায় টিংকুমাংগো, অমনি তার ঠ্যাংটা ধরে টেনে নামায় অন্য সবাই। ফাঁকতালে সর্দার যেই উঠতে যাবে, অমনি তাকে জাপটে ধরে আর একদল লোক টান মারে। টান মেরে আর একদল লোক যেই না গাছের ওপর লাফ দিতে যায়, অমনি আর এক কান্ড! কোথায় ছিল পুরোহিত, ছুটে এসেছে। বনের সর্দারকে ঝাপটা মেরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘আমি পুরোহিত। ওই জ্যান্ত সোনা আমার।’

অমনি সঙ্গে সঙ্গে পুরোহিতের কথার ওপর কথা চড়িয়ে সর্দার চেঁচাল, ‘এ পাখি বনের। আমি বনের সর্দার। এ সোনা আমার।’

সর্দার থামতে-না-থামতেই টিংকুমাংগো চেঁচাল, ‘আমি আছি, তাই দেবতা আছেন। মানুষ কাটি তাই, সবাই বাঁচেন। ও সোনা আমার।’

তারপর ‘আমার সোনা, আমার সোনা’ বলে নানান জনে নানান সুরে চিল্লিয়ে এমন গলাবাজি করতে লাগল যে, সেখানে টেঁকে কে? পাখির ঠোঁটের সেই চাবির কথা তো ছেড়েই দাও, অমন যে টুহো আর লুলাম, তাদের কথা কারও খেয়াল নেই তখন! এখন সবার চোখ ওই জ্যান্ত সোনার দিকে। অবিশ্যি বুড়োদের এই কান্ডকারখানা দেখে টুহো আর লুলামের তো মজা লাগারই কথা। ওরা ভাবছে, সোনা নিয়ে এই ধামসা-ধামসিটা আরও চলুক অনেকক্ষণ। তা বটে, এখনও ঘুঁসোঘুঁসি শুরু হয়নি ঠিকই, কিন্তু টানাটানিটা বেশ জমেছে!

হঠাৎ টুহো আর লুলাম দেখে কী, গাছে উঠতে না-পেরে, একদল লোক গোটা গাছটাই উপড়ে ফেলার জন্য হুমড়ি খেয়ে নাড়ানাড়ি লাগিয়ে দিল। এই বুঝি ঘাড়ে পড়ল গাছটা। পাখি বুঝি ধরা পড়ল!

হুঁ! পাখির বয়েই গেছে। অত ঠেলাঠেলি, অত ধাক্কাধাক্কি, অত চিৎকার চেঁচামেচি, যেন পাখি কেয়ারই করে না। যেমন বসেছিল তেমনি বসে রইল ঠোঁটে চাবিকাঠিটি নিয়ে।

এদিকে খবরটা যত ছড়াতে লাগল, মানুষজনের ভিড়ও তত বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে লোকে লোকারণ্য। জ্যান্ত সোনা ধরার জন্য তুলকালাম কান্ড শুরু হয়ে গেল। অত লোকের ভিড়ের ঠেলায় কোথায় গেল টিংকুমাংগো, কোথায় বনের সর্দার, আর কোথায় বা পুরোহিত! তারা ভিড়ের মধ্যে দিশেহারা হয়ে ‘সোনা, সোনা’ করে গলা ফাটাতে লাগল।

এমন সময় আচমকা গুরু-গুরু করে যেন মাটি কেঁপে উঠল। ওই দ্যাখো, ঠেলামেলির ঠোক্করে মাটি উপড়ে গাছটা লটকে পড়ছে। এই সব্বনাশ। দ্যাখো, দ্যাখো, মানুষের ঘাড়ের ওপর হুড়মুড়িয়ে পড়ল যে গাছটা। তাই না-দেখে ভয়ে আর্তনাদ করে পালাতে গিয়ে পড়বি তো পড় গাছের নীচে। কেউ মরল, কারও ঘাড় ভাঙল, কেউ পালাল।

আর, এদিকে পাখিটা কিন্তু ভয়ও পায় না, কারও তোয়াক্কাও রাখে না। ফুড়ুত করে উড়ে গাছের ডাল থেকে নীল আকাশে ঘুরতে লাগল। সত্যি! নীল আকাশের নীচে সেই সোনায় গড়া পাখির দিকে তাকালে লোভ সামলায় কার সাধ্যি! যে-মানুষগুলো গাছের নীচে পড়ল না, বা মরল না, তারা ভাবল, সোনা বুঝি ওই উড়ে পালায়। মানুষগুলো সব খ্যাপার মতো আকাশে হাত তুলে লাফাতে লাগল। আর ‘আয়, আয়’ করে হাঁপাতে লাগল।

দেখে তো টুহোর চক্ষু কপালে। কথা বলবে কী, যেন সে স্বপ্ন দেখছে! ঠোঁটের ফাঁকে কথা এলে তবে তো! তবু বলতে হবে লুলামকে। এই আশ্চর্য কান্ড দেখে, সে একটুও ভড়কাল না। উলটে বলে উঠল, ‘টুহো, এবার আমরা বেঁচে গেছি।’

লুলামের আচমকা কথা শুনে টুহো চমকে উঠল। তার যেন স্বপ্ন ভাঙল। লুলামের কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলল, ‘এখনও কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না।’

লুলামও তেমনি নিচু গলায় স্বর নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন ও-কথা বলছ? দেখতে পাচ্ছ না, সোনার লোভে লোকগুলোর চেহারা কেমন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। আমাদের কথা ওদের আর মনেই নেই।’

এবার টুহো পাখিটার দিকে একদৃষ্টে দেখতে দেখতে বলল, ‘কিন্তু লুলাম, পাখিটা কি সত্যি সোনার?’

‘দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।’ উত্তর দিল লুলাম।

‘ভাবতে অবাক লাগে, সবুজ পাখি সোনার পাখি হয়ে গেল কেমন করে!’

লুলাম বলল, ‘পাখিটা বোধ হয় জাদু জানে। আমরা যে ওকে বাঁচিয়েছি এ-কথা সে ভোলেনি। তাই আমাদের বাঁচানোর জন্যই বোধহয় তার এই জাদুর খেলা। মানুষগুলোকে লোভে একেবারে অন্ধ করে দিয়েছে। লোকগুলোও আমাদের কথা একদম ভুলে গেছে।’

এমন সময় টুহো, লুলাম দুজনেই চমকে উঠেছে। কে যেন পাখিটাকে তাক করে শূন্যে একটা পাথর ছুড়ল। অবিশ্যি পাখির গায়ে লাগল না। কিন্তু তার দেখাদেখি অমনি সঙ্গে সঙ্গে যত লোক ছিল সবাই মাটি থেকে পাথর তুলে পাখির দিকে ছুড়তে লাগল। পাখির লাগেই না। কখনো গোত্তা মারে, কখনো ভড়কি দিয়ে পাখি এপাশ-ওপাশ উড়ে পালায়। ততই যেন খেপে ওঠে মানুষগুলো। পাথর তোলে আর শূন্যে ছোড়ে। অথচ দ্যাখো, পাখি কিন্তু ভয়ে পালাচ্ছে না সেখান থেকে। ঠিক তাদের মাথার ওপর চরকি খাচ্ছে।

কিন্তু হঠাৎ কী হল, পাখিটা উড়তে উড়তে এগিয়ে চলল! মানুষগুলোও চোখ কপালে তুলে পাখির পিছু ছুটল। কোথায় ঝোপ, কোথায় কাঁটা, কোথায় ঢিপি আর কোথায় খানাখন্দ, সেসব তাদের খেয়ালই নেই। উড়তে উড়তে পাখিটা যেই পাহাড়ের আড়ালে ঢাকা পড়েছে, লোকগুলোও পাহাড় টপকে ওপরে উঠেছে। আবার যেই পাহাড়ের আড়াল থেকে পাখিটা গাছের ফাঁকে হারিয়ে যাচ্ছে, অমনি দুড়দাড়িয়ে মানুষগুলো পাহাড় থেকে নীচে নামছে। কী হুল্লোড়বাজিরে বাবা! পাখিটা মানুষগুলোকে একেবারে চোখের জলে, নাকের জলে করে ছাড়ছে!

হঠাৎ দেখা গেল, পাখিটা উড়তে উড়তে তিন পাহাড়ের মধ্যিখানে একটা সরোবরের ওপর এসে পড়েছে। পাখির সেই সোনার দেহের ছায়াটা জলের ওপর পড়ে যেই ঝলমল করে উঠল, অমনি লোকগুলো পাখিকে তাক করে আবার পাথর ছুড়তে লাগল। পাথরগুলো টপাটপ জলের ওপর পড়ে আর সরোবরের জল ঝিলিক ঝিলিক করে।

এমন সময় হল কী, একটা পাথর বেটপকা পাখির গায়ে লেগে গেছে! ইস, যেই না-লাগা, পাখি কাত! তার সোনার দেহটা জলের ওপর ছিটকে পড়ে টুপ করে তলিয়ে গেল। আর দেখতে হয় তখন! ওই অতগুলো মানুষ একসঙ্গে জলের ওপর লাফিয়ে পড়ে সোনার পাখি হাতাবার জন্য হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিল! এ আগে লাফায়, তো ও তাকে টেনে ধরে। উনি যেই নামতে যাবেন, ইনি তাঁকে লেঙ্গি মারেন! সে এক ভয়ংকর টানাটানি। তারপর হাতাহাতি। শেষে, হাত থেকে লাঠালাঠি। লেগে গেল দাঙ্গা।

লুলাম চেঁচায়, ‘টুহো, দ্যাখো, টিংকুমাংগো পুরোহিতের গলা টিপে ধরেছে!’

টুহো দেখতে দেখতে লাফিয়ে উঠল। বলল, ‘লুলাম, এই আমাদের পালাবার সুযোগ!’

লুলাম কিন্তু পালাবার পথ না-খুঁজে চেঁচাল, ‘এখনও সময় হয়নি। আর একটু দাঁড়াতেই হবে। অন্তত কে আগে মরে, সেটা তো দেখতে হবে।’

হ্যাঁ, টিংকুমাংগোর সঙ্গে পুরোহিতের লেগে গেছে ঝটাপটি। আর ঠিক তখনই তাল বুঝে বনের সর্দার জলের ভেতর মেরেছে লাফ। আর যেই না লাফ-মারা সবাই একেবারে তারস্বরে চিৎকার করে উঠল, ‘ধর, ধর!’

বলতে-না-বলতেই, যত লোক ছিল সবাই জলের ওপর লাফিয়ে পড়ল। তাদের সঙ্গে টিংকুমাংগোও লাফ দিল, পুরোহিতও ঝাঁপ দিল। কিন্তু কেউ তো জানে না, সরোবরটা কত গভীর, কোনখানটায় ঘূর্ণিটান, জলের নীচে খরস্রোত! ব্যস! জলে পড়তেই, ওই দ্যাখো পুরোহিত জলের ভেতর খাবি খাচ্ছে! সর্দার জলের তলায় টাল খাচ্ছে! হোঁতকা-হোঁদল টিংকুমাংগো স্রোতের টানে পাক খাচ্ছে। আর তাদের সঙ্গে সেই অগুনতি মানুষ জলে পড়ে বেসামাল। অথই জলে হাবুডুবু খাচ্ছে, আর খেতে খেতে তলিয়ে যাচ্ছে।

হায়! হায়! মানুষগুলো যে জলের নীচে ডুবেই গেল! অত চিৎকার, এত লোভ, এত হল্লা সব যে থিতিয়ে গেল নিমেষের মধ্যে। কী ভয়ংকর নিস্তব্ধতা! সরোবরের নিথর জলের ওপর কেমন যেন একটা ভয়াল রহস্য উঁকিঝুঁকি মারছে!

আড়াল থেকে চুপিসারে বেরিয়ে এল টুহো আর লুলাম। মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। চোখে তাদের যত ভয়, তার চেয়ে বিস্ময় বেশি। খুব সন্তর্পণে এগিয়ে গেল সরোবরের কাছাকাছি। বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইল স্থির জলের দিকে। একটি মানুষেরও চিহ্ন নেই। তবে কি মানুষগুলো জলের গভীরে ডুবে ডুবে সেই সোনার পাখির খোঁজ করছে। কিংবা সোনার জন্য লড়াই করছে। মানুষ মরে গেলেও কি তার লোভ মরে না? এর উত্তর জানে না টুহো, জানে না লুলাম। ওরা শুধু ভাবে সেই পাখিটার কথা। সেই সবুজ রঙের পাখি, যার গায়ে সোনা ছিল না, ছিল শুধু নরম তুলতুলে পালকের ওপর রং আর রং! যে রং দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়, ভালোবাসায় বুক ভরে ওঠে!

হ্যাঁ, টুহো আর লুলামের ভালোবাসায় ভুলেই বোধ হয়, সেই সবুজ পাখি সোনা হয়েছে। সেই সোনার পাখি নিজে জলে ডুবে টুহো আর লুলামের প্রাণ বাঁচিয়েছে। সরোবরের জলের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ভার হয়ে আসে টুহো আর লুলামের দুটি মন। টুহো লুলামের হাতটি ধরে। সেই স্বচ্ছ জলে দুজনায় দুটি হাত নামিয়ে মনে মনে বলে উঠল, ‘পাখি, তোমাকে ভুলব না, কোনোদিনও না।’ তারপর তাদের দুজনারই গাল বেয়ে অশ্রুর ফোঁটাগুলি উপচে পড়ে। একটি একটি ফোঁটা সেই সরোবরের জলের ওপর গড়িয়ে যায়। ওমা! সঙ্গে সঙ্গে এ কী দেখা যায়। সেই সরোবরের জলে যেন মেঘের ছায়া নেমেছে। চকিতে টুহো আর লুলাম আকাশের দিকে তাকাল। তারা লাফিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। হ্যাঁ, আকাশে মেঘ। বৃষ্টির মেঘ। হ্যাঁ, বাতাসে গন্ধ! বাদলের গন্ধ। মেঘে মেঘে আকাশ ছেয়ে গেল! বিদ্যুৎ চমকে উঠল। গুরুগুরু গর্জনে মাটি কেঁপে উঠল। ওই তো গাছের পাতায় বাতাসের ঢেউ লেগেছে। ওই তো সরোবরের জলে, মেঘের বুক থেকে বৃষ্টির ফোঁটাগুলি টুপটাপ ছড়িয়ে পড়ছে। ওই তো, অঝোর ধারায় ঝরছে তারা। দেখছ না, যেন রাশি-রাশি মুক্তা মুঠো-মুঠো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে।

একেবারে আনন্দে আত্মহারা হয়ে চিৎকার করে উঠল টুহো আর লুলাম। তারা নেচে উঠল। বৃষ্টির জলে ভিজে-নেয়ে তারা তোলপাড় শুরু করে দিল। তারপর তারা ছুট দিল। ছুট দিল বন পেরিয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে। তাদের পেছনে পেছনে হাওয়া ছোটে, হাওয়ার সঙ্গে মেঘ ছোটে, মেঘের সঙ্গে বৃষ্টি। ওরা বুঝি আর ঘরে ফিরবে না। ওরা বুঝি এমনি করে হারিয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে সেখানে, যেখানে প্রাণ আছে। যেখানে মানুষ মানুষকে কাটে না। মানুষ মানুষকে হিংসা করে না!

সে দেশ কোথায়, কোন অজানা রাজ্যে, জানে না তারা। তবু সেই দেশই খুঁজে বেড়াবে তারা এখন। তারপর খুঁজে পেলে অনেক খুশির মধ্যে সেখানে নিশ্চিন্তে ভাববে একজনের কথা। সে আর কেউ নয়, একটি জলপাই-সবুজ পাখি!

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%