দুঃসাহসী দুই বুড়ো

শৈলেন ঘোষ

এখন, এই রাজপ্রাসাদের উলটো দিকে ওই যে বুড়োমানুষটি নিজের মুখখানা লুকিয়ে রেখে ঘাপটি মেরে বসে আছে, তার নাম লোতিসাবা। সে রোজই এমনি করে বসে থাকে। বসে থাকে, রাজপ্রাসাদের দিকে দৃষ্টিটাকে স্থির রেখে। সে-দৃষ্টিতে এক ভয়ঙ্কর প্রতিহিংসা জড়ানো। সে অপেক্ষায় আছে, যদি কোনোদিন এই রাজপ্রাসাদের রাজাকে দেখতে পায়, তবে তার এই হাড়-জিরজিরে হাত দুটো দিয়ে তার গলাটা টিপে ধরবে। তারপর তাকে শেষ করে ফেলবে!

মানুষটিকে দেখলে কোন মানুষ না অবাক হয়! কত বয়স, অথচ হাঁটতে-ছুটতে তার কষ্ট নেই। অবিশ্যি বয়সের ভারে শরীরটা একটু ঝুঁকে যে পড়েনি, তেমন না। মুখের চামড়াও আর তেমন টান-টান হয়ে জৌলুস ছড়িয়ে দিচ্ছে না। চোখের দৃষ্টিতেও নেই তেমন তেজ। কিংবা গাল দুটো নেই তেমন নিটোল। তবুও তুমি আন্দাজ করতে পারবে না, মানুষটার কত বয়স। আমি যদি বলি, লোকটি আশি বছরের বৃদ্ধ, তবে তুমি নির্ঘাত চমকে উঠে বলে বসবে, ধ্যাত!

আমি জানি, বিশ্বাস করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। কেননা, আমিও যে ঠিক বলছি, এ-কথাটা আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছি না। কারণ, তার বয়স আশি তো হবেই, এমনকী বেশি হলেও আশ্চর্যের কিছু নেই।

এই বয়সে হাজারটা কাজ করতে হয় মানুষটাকে একা-একা। কারণ সে যে নিজেই একা। সে জানে আর তো কটা দিন। সময় এগিয়ে আসছে। একদিন কষ্টের শেষ হবেই। স্বর্গ অথবা নরক কোথা থেকে যে ডাক আসবে, তা সে নিজেও জানে না। মাঝে মাঝে মৃত্যুর ভাবনাটা আচমকা বুকের মধ্যে শিউরে উঠলে, মনটা ভীষণ ছটফট করে ওঠে। মনে হয়, শেষ কাজটা বুঝি সে করে যেতে পারল না। হ্যাঁ, শেষ কাজ। এই বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিজ্ঞা করেছিল, তার জোয়ান টগবগে ছেলেটার রক্তে যারা ওই পাহাড়টাকে শান্ত করতে চেয়েছিল, তাদেরও রক্ত দেখবে সে। তাই রাজপ্রাসাদের দিকে চেয়ে-চেয়ে বসে আছে সে। কিন্তু সেই দিন এখনও এল না তার।

হ্যাঁ, শহর থেকে একটু দূরেই ওই পাহাড়টা। এই শহরের সব মানুষই জানে, ওই পাহাড়ের বুকের মধ্যে আগুন জ্বলছে। ওই পাহাড় একটা আগ্নেয়গিরি। মাঝে মাঝে মাটি কাঁপিয়ে গর্জে ওঠে ওই আগ্নেয়গিরি। একবার সেই ভয়ঙ্কর গর্জনে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল এই শহরের বুকে। অনেক প্রাণ গেছল তখন। অনেক বাড়ি ধ্বংস হয়েছিল। অনেক পথ-ঘাট ধসে পড়েছিল। বৃদ্ধ মানুষ লোতিসাবারও ছোট্ট বাড়িটা বাঁচেনি এই ধ্বংসের হাত থেকে। তাসের ঘরের মতো সেটা উলটে পড়ে চুরমার হয়ে গেছল। লোতিসাবার বউ আর মেয়ে এই ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়েছিল। বাঁচেনি তারা। বেঁচে গেছল এই মানুষটা আর তার ছেলেটি। কিন্তু তারপরেই ওই রাজপ্রাসাদের সিংহদরজা পেরিয়ে সেই নিষ্ঠুর রাজার হুকুম ছড়িয়ে পড়েছিল। হুকুম হল, যেসব বাড়ি ধসেছে সেই সব বাড়িতে ঢুকেছে পাপ। সেই সব বাড়ির যেসব জোয়ান ছেলে এখনও বেঁচে আছে, তাদের ধরে আনতে হবে। তাদের হত্যা করতে হবে। হত্যার রক্ত ওই পাহাড়ে ছড়িয়ে না-দিলে পাহাড় শান্ত হবে না। সুতরাং লোতিসাবার ছেলেকে ওরা ধরে নিয়ে গেছল!

তারপর থেকেই মানুষটা কেমন যেন হয়ে গেল। তার একা-একা দুঃখের রাত্তিরগুলো কেটেছে ভীষণ আতঙ্কে। কাটতে-কাটতে মানুষটা আজ বৃদ্ধ, অথর্ব হয়ে গেছে।

কিন্তু এর আগে দুঃখ তার কোনোদিনই ছিল না। লোতিসাবা নিজে ছিল এক ক্লাউন। সার্কাসের হাজার-হাজার দর্শকের মুখে তাদের প্রিয় ক্লাউনের মিষ্টি নামটি ছোট্ট হয়ে যখন ডেকে উঠত ‘লোতি, লোতি’, তখন লোতিসাবা হয়তো হাতির কানটি ধরে বাদুড়ের মতো ঝুলে আছে, নয়তো বাঁদরের সঙ্গে খুনসুটি করছে। অথবা ট্রাপিজের দড়ি ঝুলে, প্রজাপতির মতো উড়ন্ত মেয়েদের সঙ্গে উড়তে গিয়ে চিতপটাং হয়ে ডিগবাজি খাচ্ছে। ছোট্ট-ছোট্ট বন্ধুদের কাছে সে এমনই প্রিয় হয়ে উঠেছিল যে, ওই কিম্ভূতকিমাকার সাজে সার্কাস এরেনায় তাকে কোনোদিন দেখা না গেলে, ছোটোদের যেন সার্কাস দেখাই হল না। বাঘ নয়, ভাল্লুকও নয়, লোতিসাবাকেই তারা দেখতে চায়।

ভূমিকম্পের আঘাতে লোতিসাবার বাড়িটা যখন ধসে গেল, বউটা, মেয়েটা চাপা পড়ল, সবশেষে যখন ছেলেটাকে ওরা ধরে নিয়ে গেল, তখন যন্ত্রণায় কামড়ে-কামড়ে তার বুকের ভেতরে কে যেন জ্বালা ধরিয়ে দিল। সে-জ্বালায় ছটফট করতে-করতে সে ওই রাজপ্রাসাদের সিংহদুয়ারের দিকে চোখ রেখে বসে থাকত। কিন্তু একটা জীবন্ত মানুষকে কেমন করে যে মারতে হয়, সে-কথা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারত না। মানুষকে মারবার কথা মনে হলেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠত সেই কচি-কচি মুখগুলি। সেই মুখগুলি, তাকে দেখে সার্কাসের গ্যালারিতে যে-মুখগুলি হেসে উঠত খলখল করে। কিংবা যাদের সেই ছোট্ট-ছোট্ট হাতগুলি আনন্দে বেজে উঠত তালি দিয়ে। ছোটো থেকেই তো মানুষ বড়ো হয়। যে-মানুষ ছোটোবেলায় এত সুন্দর, বড়ো হলে সে এত নিষ্ঠুর হয় কেমন করে! কিংবা এত বোকা! কিছুতেই ভেবে পেত না লোতিসাবা।

‘কী হে, এখানে এমন ঘাপটি মেরে বসে আছ কেন?’ কে যেন হঠাৎ তার পেছনে এসে দাঁড়াল। কাঁপা-কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল।

রোজ যেমন বসে থাকে, আজও তেমনি বসেছিল লোতিসাবা রাজপ্রাসাদের দিকে আড়ে-আড়ে চোখ রেখে। ডাক শুনে চমকে উঠেছে লোতিসাবা। ঝট করে মুখ ফিরিয়ে দেখে তারই মতো আর-এক বুড়োমানুষ। হয়তো বয়সেও তারই মতো। ঝুঁকে পড়েছে শরীরটা। চোখ দুটো তারই মতো নিস্তেজ।

বুকখানা ধক করে শিউরে উঠল লোতিসাবার। ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। কী রে বাবা, লোকটা তার মনের কথা বুঝতে পেরেছে নাকি! চট করে দাঁড়িয়ে পড়ল লোতিসাবা। লোকটার কথার কোনো উত্তর না-দিয়ে ধড়ফড় করে হাঁটতে শুরু করলে।

লোতিসাবাকে এমন করে হাঁটতে দেখে অচেনা লোকটা প্রথমটা থতমত খেয়ে গেছে। তারপর বিচ্ছিরি সুরে হো-হো করে হেসে উঠেছে। হাসতে-হাসতেই বললে, ‘আরে মশাই, পালাচ্ছ কেন? আমি কি ভূত, না, ভূতের ছা?’ বলতে-বলতে লোকটাও লোতিসাবার পিছু নিলে।

লোতিসাবা দাঁড়াল না।

লোতিসাবাকে দাঁড়াতে না-দেখে লোকটা আবার চেঁচাল, ‘আরে, চোরের মতো ভাগছ কেন? শোনো, শোনো!’

চোর বলতেই লোতিসাবার মাথার রক্ত গরম হয়ে গেছে। ঝট করে দাঁড়িয়ে পড়ল। মুখখানা বিচ্ছিরিরকম বেঁকিয়ে ফিরে চাইল লোকটার দিকে। তারপর হাতের মুঠো দুটো শক্ত করে পাকিয়ে অনেকটা ধমক মেরে বলে উঠল, ‘মুখ সামলে কথা বলবে!’

‘কী হল?’ লোকটা হাসতে-হাসতেই জিজ্ঞেস করলে।

‘চোর বললে কেন?’

‘কোনো ভদ্রলোকের ডাক শুনে অমন করে পালালে আর কী বলতে পারি?’ লোকটা উত্তর দিলে।

লোতিসাবা আরও রেগে গেল। বললে, ‘থাক, থাক! অনেক ভদ্রলোক দেখেছি! অচেনা কোনো মানুষকে চোর বলতে যার মুখে আটকায় না, সে কেমন ভদ্রলোক আমার জানা আছে!’

সে বলল, ‘আরে বাবা, চটছ কেন?’

‘বা:! বেশ চমৎকার কথা! কেউ আমায় চোর বললে, আমি দু-হাত তুলে নাচব নাকি!’

লোকটা লোতিসাবার কথা শুনে এবার বেশ প্রাণ খুলেই হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বললে, ‘না, না, নেচো না, নেচো না। এটা কি আর নাচের বয়স! এই বয়সে নাচানাচি করলে লোক হাসাহাসি করবে!’

লোতিসাবা তার হাসি শুনে আরও তিরিক্ষি মেজাজে চেঁচিয়ে উঠল, ‘পাগলামি করার জায়গা পাওনি!’

লোকটা হাসিটাকে একটু সামলিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘পাগলামিটা দেখলে কোথায়?’

‘তবে কী এটা? নির্লজ্জের মতো দাঁত ছিরিয়ে হাসলে তাকে পাগলামি ছাড়া কী বলা যায়! মরার তো সময় হয়ে এল। আর কেন!’

লোকটা এবার একটু গম্ভীর হয়েই উত্তর দিলে, ‘তোমারও তো তিনকাল সাফ হয়ে গেছে। এখন তো ঠ্যাং ধরে টান মারলেই হয়!’

লোতিসাবা যেন রাগে ফেটে পড়ল, ‘অভদ্র কোথাকার!’

‘তুমি তো আচ্ছা ভদ্রলোক হে, ঠাট্টা-তামাশা বোঝ না।’

লোতিসাবা রাগে তেমনি গজগজ করে বলে উঠল, ‘একজন অচেনা মানুষকে পথে-ঘাটে চোর বলে সম্বোধন করাটা কী ধরনের ঠাট্টা।’

এবার লোকটাও রেগেমেগে উত্তর দিলে, ‘পাগল বলাটাই বা কোনদিশি আদব-কায়দা?’

লোতিসাবা গলার স্বরটা আরও তুলে বললে, ‘তুমি আমাকে চোর বললে, আমিও তোমাকে পাগল বলতে পারি।’

তখন সেই লোকটাও বললে, ‘তুমি আমাকে পাগল বললে, আমিও তোমাকে চোর বলতে পারি!’

লোতিসাবা তেড়েফুঁড়ে বলে উঠল, ‘কক্ষনো পার না। তুমি আমাকে আগে চোর বলেছ!’

লোকটা লোতিসাবাকে অমন বে-দম হয়ে চেঁচাতে দেখে বেশ একটু বিরক্ত হয়েই বললে, ‘তুমি নেহাতই ছেলেমানুষ দেখছি!’

লোতিসাবা ঘুসি পাকালে। নিজের রাগটাকে আর বাগে রাখতে না পেরে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল। কাঁপতে কাঁপতে বললে, ‘আর একবার বলো, আমি ছেলেমানুষ! এক ঘুসিতে তোমার ফাঁকা নাকের গর্তটা আমি ভরাট করে দেব।’

লোকটা কেমন তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উঠল। বলল, ‘আরে রাখো রাখো। আমার নাম জোরুতসি। আমার ঘুসিটা কি তোমার চেয়েও কমতি আছে? এমন একখানি ঝাড়ব, তোমার ফোকলা দাঁতের মাড়ি দুটো উপড়ে যাবে!’

থাকতে পারল না লোতিসাবা। ঝাঁপিয়ে পড়ল জোরুতসির ওপর। তারপর সত্যিই দুই বুড়োতে লেগে গেল ঝটাপটি। অবিশ্যি মারামারি যত হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে গলাবাজি। কতরকমের যে শব্দ দু-জনের মুখ দিয়ে ছিটকে ছিটকে বেরুচ্ছে, কী বলব। এ যদি বলে ধুত, তো ও বলে ধ্যাত! এ যদি বলে হুঃ, তো ও বলে হা:! এ যদি বলে জলহস্তী, তো ও বলে ওরাংওটাং!

এমন সময় হঠাৎ যেন শহরের মাটি কেঁপে উঠল। হঠাৎ যেন একটা গুড়গুড় গর্জন শোনা গেল মাটির নীচে। হ্যাঁ, ক-দিন ধরে আগ্নেয়গিরির চূড়ার ভেতর থেকে ধিকিধিকি ধোঁয়া বেরুচ্ছিল। কিন্তু সে এমনই নগণ্য যে, সেদিকে বিশেষ কেউ নজরই দেয়নি। এ তো আর এমন কিছু নতুন নয়। ধোঁয়া তো প্রায়ই দেখা যায়। কিন্তু সেই ধোঁয়া আজ আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছে পাহাড়ের চূড়ায়। আচমকা পাহাড়ের চূড়াটা বিকট শব্দ করে ফেটে পড়ল। পাথরের টুকরোগুলো শূন্যে লাফাতে-লাফাতে মাটিতে ছিটকে পড়তে লাগল। অমনি চারিদিকে মানুষের আর্তনাদ, হুড়োহুড়ি, ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেছে। ঝগড়া করতে-করতে থতমত খেয়ে গেছল দুই বুড়ো। থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। জোরুতসি পাথরের আঘাত থেকে বাঁচার জন্যে এধার-ওধার ছুটতে-ছুটতে কোন ধারে যে হারিয়ে গেল, দেখা গেল না।

কিন্তু ছুটল না লোতিসাবা। সে সেইখানেই দাঁড়িয়ে রইল। দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, চাঁই-চাঁই পাথরগুলো কান-ফাটা শব্দ করে ছিটকে-ছিটকে পড়ছে রাজপ্রাসাদের মাথার ওপর। লোতিসাবা জানে এক্ষুনি ওই পাথরের ঘায়ে রাজপ্রাসাদ টুকরো-টুকরো হয়ে ভেঙে পড়বে। সে এও জানে এক্ষুনি পাথরের টুকরো উড়ে এসে তাকেও ধরাশায়ী করে ফেলবে। তবু সে ভয় পেল না। আনন্দে সে চিৎকার করে উঠল, ‘মরবে, রাজপ্রাসাদের রাজা এবার মরবে।’

ভেঙে পড়ল রাজপ্রাসাদের একটা দিক। প্রায় লাফিয়ে উঠল লোতিসাবা। ঠিক তক্ষুনি পাহাড়ের চূড়ার গহ্বর থেকে ঝলসে উঠল বিদ্যুতের ঝলকানি। চমকে-চমকে ঢেউ তুলল আগুনের হলকা। বেরিয়ে এল ওই গহ্বর থেকে রাশি রাশি ছাই। দিগবিদিক আঁধার হয়ে গেল। তারপর আর দেখা গেল না লোতিসাবাকে। যেটা দেখা গেল, তা হচ্ছে, পাহাড়ের ফেটে-পড়া চূড়াটার গর্ত দিয়ে গলগল করে বেরিয়ে আসছে তরল ফুটন্ত লাভা। যেন প্রচন্ড আক্রোশে উপচে পড়ছে। গড়িয়ে-গড়িয়ে এগিয়ে আসছে এই শহরেরই ওপরে। আতঙ্কে চিৎকার করে পালাতে গিয়ে যে তার সামনে পড়ে, সে মরে। যে এখনও মরেনি, তারও কি নিস্তার আছে! কিন্তু এই দুর্যোগে কোথা গেল সেই বুড়োমানুষ লোতিসাবা? কোথা গেল জোরুতসি?

এমনি করে তিন দিন চলল সেই ধ্বংসের তান্ডব। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সেই শহর। অনেক মন আর প্রাণ দিয়ে যে-শহরকে গড়ে তুলেছিল এ-দেশের মানুষ, এখন সে-শহর এক ধ্বংসস্তূপ। ক্ষতবিক্ষত হয়ে পড়ে আছে মুখ থুবড়ে।

তিন দিন পর সেই নিশ্চিহ্ন শহরের দিকে ছুটে গেছল উদ্ধারকারীর দল। মৃত মানুষের দেহগুলো তারা টেনে-টেনে বার করেছিল ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে। কিন্তু ওটা কার দেহ। ওই যে বুড়ো মানুষটি! এ যে লোতিসাবা! না, না, মানুষটি তো মৃত নয়! বুকের ভেতরে শেষনিশ্বাসটুকু তখনও তার ধুকধুক করছিল। দেহটা পাথরের টুকরোয় থেঁতলে গেছে। গায়ের চামড়া ঝলসে গেছে। বুঝি তার শেষ সময় ঘনিয়ে এসেছে!

আরও ক-জন জীবন্ত মানুষকে উদ্ধার করল তারা। মৃত্যুর কাছাকাছি যারা পৌঁছে গেছল, তড়িদগতিতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আশ্রয়-শিবিরে। দিন আর রাত্রির সঙ্গে যুঝতে-যুঝতে একদল মানুষ লড়াই করেছিল ওদের জীবন ফিরিয়ে আনার জন্যে। অনেকে বাঁচল, অনেকে মরল। অনেকে আশ্রয়-শিবির ছেড়ে চলে গেল। অনেকে গেল না। যারা গেল না, তখনও তারা মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা কষছে। পাঞ্জা কষছিল লোতিসাবাও। সে কী! ওই বৃদ্ধ এখনও বেঁচে আছে!

বেঁচে গেল লোতিসাবা। যদিও আঘাতের ক্ষতচিহ্নগুলো এখনও তার একেবারে মুছে যায়নি, তবু সে আজই প্রথমে উঠে বসতে পেরেছে। উঠে বসে ঘাড় ফিরিয়ে ও দেখে তারই মতো আরও কত মানুষ আশ্রয় পেয়েছে এই শিবিরে। কত শিশু, কত জোয়ান ছেলে। কারো হাত ভেঙেছে। কারো চোখ গেছে। কিন্তু কোনো ক্ষতি হয়নি লোতিসাবার। এ যেন এক জাদুমন্ত্র! আঘাতে আহত হয়ে, অথবা তপ্ত লাভায় দগ্ধে-দগ্ধে মানুষটা যদি শেষ হয়ে যেত, তাতে তো কোনো লোকসান ছিল না। বুড়ো মানুষের মরণ হলে, তার জন্যে কে আর হা-হুতাশ করে! সে তো এমনিতেই বাতিল। কিন্তু একটা তাজা ছেলের যদি হাতটা বাদ চলে যায়, সেটা যে অনেক বেশি দুঃখজনক। দেখেশুনে ভেতরে-ভেতরে কেমন যেন একটা অস্বস্তি ভোগ করছিল লোতিসাবা। ভাবতে-ভাবতে কেমন যেন সিঁটিয়ে যাচ্ছিল।

হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গেল লোতিসাবার। কী দেখল সে? কার মুখের দিকে চেয়ে তার চোখের দৃষ্টি থমকে গেল? দেখল, সেই লোকটা, যার সঙ্গে তার সেই দুর্যোগের আগে মারামারি লেগে গেছল। হ্যাঁ, মনে আছে, লোকটার নাম জোরুতসি। এ কী! এই বুড়োটাও বেঁচে আছে! আশ্চর্য!

হ্যাঁ, বেঁচে গেছে জোরুতসিও। আঘাত বোধহয় তেমন পায়নি। কারণ, লোকটা বিছানায় বসেছিল। লোতিসাবা স্পষ্ট দেখল, বসে আছে, তারই দিকে চেয়ে। কিন্তু তার চোখে যেন জল!

চট করে নিজেকে সামলে নিল জোরুতসি। চোখের জলটা চোখ থেকে মুছে ফেলার অছিলায় মুখটা একটু ঘুরিয়ে নিয়ে হাত দিল চোখের পাতায়। তারপর নিমেষে আবার চাইল লোতিসাবার চোখের দিকে। একটু চেষ্টা করে যেন হাসল। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। খোঁড়াচ্ছে। এগিয়ে এল লোতিসাবার কাছে। লোতিসাবার গায়ে হাত দিল। জিজ্ঞেস করলে, ‘ভালো আছ?’

অনেক কষ্টে লোতিসাবা শুধু ঘাড়টা নেড়ে জানাতে পারল, ভালো।

জোরুতসি বলল, ‘এরা ভয় পাচ্ছিল, তুমি বোধহয় বাঁচবে না।’

লোতিসাবা এবারও মুখে কোনো কথা না-বলে চুপচাপ তার মুখের দিকে চেয়ে রইল।

‘আমিও বেঁচে গেছি। এই দ্যাখো, আমার শুধু পা-টাই চোট খেয়েছে।’ বলে জোরুতসি নিজের পা-টা দেখাল লোতিসাবাকে।

লোতিসাবা দেখল।

‘তোমার আঘাতটা আরও সাংঘাতিক হয়েছিল।’ বলে জোরুতসি একটু থেমে হঠাৎ এমন ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল যে, তাই দেখে লোতিসাবা অবাক! লোতিসাবার বিছানার ওপর বসে মুখে দু-হাত চেপে লোকটা চাপাস্বরে কাঁদতে-কাঁদতে বললে, ‘আমার সব শেষ হয়ে গেছে ভাই।’

লোতিসাবা চমকে গেল।

‘আমার ছেলে, মেয়ে, বউ, সবাইকে ছিনিয়ে নিয়েছে ওই আগ্নেয়গিরি। শুধু বেঁচে রয়েছি আমি!’ বলে, কান্নাটা যেন জোরুতসি আর চাপতে পারছিল না।

জোরুতসিকে অমন একটি ছোট্ট ছেলের মতো কাঁদতে দেখে কেমন একটা মায়ায় বুকটা ভার হয়ে গেল লোতিসাবার। সেদিনের সেই ছেলেমানুষের মতো ঝগড়া করার দৃশ্যটা কেমন যেন লজ্জা পাইয়ে দিচ্ছিল তাকে।

তেমনি করে ফোঁপাতে-ফোঁপাতে জোরুতসি এবার বলল, ‘আমার আর বেঁচে থেকে কী লাভ!’

লোতিসাবা এতক্ষণে কথা বলল। যদিও কথা বলতে তার কষ্ট হচ্ছিল, তবু সে বলল, ‘কেঁদো না ভাই। আমিও যে তোমারই মতো হতভাগ্য। এর আগেরবার যখন ভূমিকম্প হল, তখন আমারও সব গেছে। বউ, ছেলে-মেয়ে, ঘর-দোর সব।’

জোরুতসি একটু থতমত খেয়ে লোতিসাবার মুখের দিকে তাকাল।

‘হ্যাঁ!’ বলে লোতিসাবা স্থির দৃষ্টিতে ক্ষণেক চেয়ে রইল জোরুতসির মুখের দিকে। তারপর বললে, ‘আরও শুনবে? রাজ-আদেশে আমার জোয়ান-ছেলেটাকে হত্যা করেছে ওরা। তার রক্ত ছড়িয়ে দিয়েছে ওই আগ্নেয়গিরির পাথরে।’ বলতে-বলতে লোতিসাবার চোখদুটো ছলছল করে উঠল।

‘অ্যাঁ!’ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন গর্জে উঠল জোরুতসি। চিৎকার করে বলে উঠল, ‘শয়তান, শয়তান!’

প্রতিহিংসায় জ্বলে ওঠা লোতিসাবার চোখদুটো ছটফটিয়ে নেচে উঠল, সে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ! শয়তান! এবার শয়তানটা মরেছে! আমি দেখেছি—’

‘কী দেখেছ?’ অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

‘তার রাজপ্রাসাদ ভেঙে ধসে মাটির সঙ্গে মিছে গেছে।’

জোরুতসি যেন উত্তেজনায় কাঁপতে-কাঁপতে তাকাল লোতিসাবার দিকে। প্রায় চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি দেখেছ? ঠিক দেখেছ?’

‘হ্যাঁ, দেখেছি! আমি নিজের চোখে দেখেছি। এমনকী, বাড়িটা হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি দু-হাত তুলে নেচেছি। আমি জানি, সেই শয়তান রাজাটা ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চাপা পড়ে মরেছে। সে এতদিন মরেনি বলে, আমারও মরা হয়নি। আমি এতদিন শুধু ব্যর্থ চেষ্টা করেছি তাকে মারবার।’

‘রাজাকে তুমি মারবার চেষ্টা করেছ?’ খুবই অবাক হয়ে গেল জোরুতসি।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, রাজাকে!’

‘এ-কথা ভাবতে তোমার সাহস হল কী করে?’

‘ভয়টাই বা কীসের?’

‘তোমার মতলবটা ওরা জানতে পারলে, তোমাকেই তো শেষ করে ফেলত।’

‘যার সব শেষ হয়ে গেছে, তার আর শেষ করবে কী!’ বলে একটু থামল লোতিসাবা। তারপর বলল, ‘ভয় যে আমি পাইনি, তা বলি না। পেয়েছিলুম একবার। তোমাকে।’

‘আমাকে?’

‘হ্যাঁ। আমি যখন রাজপ্রাসাদের দিকে চেয়ে বসেছিলুম, তুমি হঠাৎ আমায় ডাকলে। আমি চমকে গেলুম। ভাবলুম, তুমি নিশ্চয়ই রাজার গুপ্তচর। আমার মতলবটা বোধহয় তুমি টের পেয়ে গেছ! তাই আগুপিছু কিছু না-ভেবেই তোমাকে দেখে আমি পালাচ্ছিলুম!’

জোরুতসির মুখে একটু হাসি দেখা গেল। বললে, ‘তারপরেই তো তুমি আমার সঙ্গে লাগিয়ে দিলে।’

‘লাগত না। তুমি যে আমায় চোর বললে!’

লোতিসাবার এই কথাটা শুনেই যেন জোরুতসির মুখখানা নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে গুমরে-গুমরে বলে উঠল, ‘আমি নিজেই চোর তো! তাই সবাইকে ভাবি চোর!’

লোতিসাবা অবাক চোখে তাকাল তার মুখের দিকে। জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি চোর?’

জোরুতসি বলল, ‘হ্যাঁ, বিচারে আমার দশ বছরের জেল হয়েছিল।’

‘কবে ছাড়া পেয়েছ?’ উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘ছাড়া পাব কেন?’

‘মানে?’

‘পালিয়ে এসেছি।’

লোতিসাবা জোরুতসির মুখের ওপর থেকে নিজের চোখটা সরিয়ে নিয়ে বলে ফেলল, ‘চোরকে আমি ঘৃণা করি।’

‘নতুন কথা কিছুই নয়। সবাই করে।’ দুঃখে-ভরা শব্দগুলো মুখ থেকে আছড়ে পড়ল জোরুতসির।

তারপর দু-জনেই চুপ করে গেল।

আগ্নেয়গিরির ভগ্নস্তূপ থেকে উঠে আসা আরও কত মানুষ এখানে আশ্রয় পেয়েছে, এই শিবিরে। একটা চাপা কান্নায় ভরে আছে এই শিবির। আহত মানুষগুলো ধীরে ধীরে উঠতে পারছে, চলতে পারছে। জানতে পারছে কী গেছে, কে আছে। ওরা জানতে পারছে, এই শিবির থেকে যেদিন তাদের ছুটি হবে, সেদিন ওই খোলা আকাশটাই হবে তাদের সম্বল। কেননা যার কিছুই নেই, আকাশ ছাড়া তার আর কিছুই থাকে না। রক্ষে এই, আকাশের নীচে যে-মানুষগুলো ছেঁড়া জামা পরে, খালি পায়ে ঘুরে বেড়ায়, অথবা ঘুমিয়ে পড়ে, তাদের কেউ কোনোদিন বলে না, ‘ওহে, আকাশের ভাড়া দাও!’

দুটো মানুষ কাছাকাছি কতক্ষণ আর মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতে পারে। লোতিসাবা থাকতে পারল না। চোখ ফেরালে। কিছু বলতে যাচ্ছিল জোরুতসিকে, থমকে গেল। দেখল, জোরুতসির চোখ দুটো আবার ছলছল করছে। ঘৃণায় যে-মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল লোতিসাবা, সেই মুখের ঠোঁট দুটি তার ভারী ব্যস্ত হয়ে কিছু বলতে চাইল জোরুতসিকে। সে বলে ফেলল, ‘জোরুতসি, জোরুতসি, তুমি কাঁদছ কেন?’

থতমত খেয়ে গেছে জোরুতসি। নিজেকে সামলে নিলে। ধরা-ধরা গলায় উত্তর দিলে, ‘কই? না।’

‘তোমার চোখের পাতায় জল?’

‘ও কিছু নয়।’

‘আমার কথায় তুমি দুঃখ পেয়েছ?’

‘কোন কথায়?’

‘ঘৃণা?’

‘তুমি যদি চুরি করতে, আমিও তোমাকে ওই কথাই বলতুম, ‘চোরকে আমি ঘৃণা করি।’ তাতে তুমিও কি দুঃখ পেতে?’

লজ্জা পেল লোতিসাবা। জোরুতসির হাত দু-টি চেপে ধরল। বলল, ‘আমায় মাপ করো ভাই!’

লোতিসাবার হাতের স্পর্শে কী অদ্ভুত এক মমতা জড়ানো। সেই স্পর্শে বুড়োমানুষ জোরুতসি যেন নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। তার মনের সব কথা সে বলে ফেলল। সে বলল, ‘তুমি বিশ্বাস করো ভাই, একটা মিথ্যে অপবাদ নিয়ে এতদিন আমি বেঁচে আছি। বেঁচে আছি প্রমাণ করার জন্যে, আমি চোর নই। বিশ্বাস করো, আমি চোর নই! কিন্তু কাউকে সে-কথা বলার সুযোগ পেলুম না। একবার বিচারে যা সত্যি বলে প্রমাণ হয়, একবার কয়েদখানায় যাকে যেতে হয়, সে যতবারই বলুক সে অপরাধী নয়, তার কথা কি কেউ শোনে? কেউ না, কেউ না।’

লোতিসাবা ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘তুমি আমায় বলো, আমি বিশ্বাস করব। আমি এখন বুঝতে পেরেছি, তুমি মিথ্যে বলার মানুষ নও। আমি যদিও তোমার মতো বয়সে বৃদ্ধ তবু যতক্ষণ বেঁচে আছি, মনে করতে পার, আমি তোমার বন্ধু। অন্তত তোমার কোনো ক্ষতি আমি করব না।’

জোরুতসি চুপ করে রইল।

তাকে নিশ্চুপ দেখে, লোতিসাবা তার দু-টি হাতই চেপে ধরল। বলল, ‘আমায় বিশ্বাস করতে পারছ না?’

‘পারছি।’

‘তবে?’

‘ভাবছি।’

‘কী?’

‘সময় কত তাড়াতাড়ি চলে গেল।’ বলে আবার একটু থামল জোরুতসি। তার চোখের দৃষ্টিটা যেন দূরে, কতদূরে স্থির হয়ে থমকে আছে। ‘হ্যাঁ’, আবার সে বলল, ‘সময়টা কত তাড়াতাড়ি হারিয়ে গেল। আমার যখন কয়েদ হয়, তখন আমি ছিলুম মাঝবয়সি তরতাজা এক মানুষ। বুকে আমার অদম্য তেজ আর সাহস। তার মানে এই নয়, সেই সাহস আর শক্তির বড়াই করে সবার সঙ্গে আমি গা-জোয়ারি করে বেড়াই। আমি ছিলুম অত্যন্ত ঠাণ্ডা-মেজাজের এক মানুষ। তাই সবার সঙ্গে ছিল আমার বন্ধুত্ব, ভালোবাসা। আমি আমার ছেলে-মেয়ে নিয়ে ছোট্ট একটি সংসারে সুখে-শান্তিতে বাস করতুম। কারো সাতে-পাঁচে ছিলুম না। সবার সঙ্গে মিলেমিশে, যা জোটে তাতেই তুষ্ট থেকে আমার দিন চলত। শখ করে এটা-ওটা কিনে অনেক পয়সা খরচ করার মতো আমার সাধ্য ছিল না ঠিকই, তবে দিন এনে দিন খাওয়ার মতো আমার হাতে ছিল এক অদ্ভুত ক্ষমতা। আমি ছিলুম এক পুতুল-বানিয়ে। মাটি দিয়ে কিংবা কাঠ কুঁদে আমি খুব ভালো পুতুল বানাতে পারতুম। হরেকরকমের পুতুল, হাতি-ঘোড়া, উট-বাঘ, হাজার-মজা। যেটি যেমন, সেটি তেমন ঝকমকে রঙে সাজিয়ে আমি বেচে বেড়াতুম। এতে আমার যা দুটো পয়সা হত তাতে বেশ চলে যেত।

‘একবার এক মেলায় গেলুম পুতুল বেচতে। মেলায় বিকিকিনির কি শেষ আছে! এই মেলায় বিক্রির জন্যে আমি এক মেমসাহেব পুতুল গড়েছিলুম। তার মাথায় ছাতা। ছাতার বাহারি রং আর মেমসাহেবের রাঙা-টুকটুক মুখখানি দেখে কী যে খুশি সবাই! অনেকগুলো বিকে গেল সেই পুতুল। দু-একটা যা পড়ে ছিল, তার জন্যে আমার কোনো ভাবনা ছিল না। আমি জানতুম, যে-কটা পড়ে আছে, সে-কটাও থাকবে না।

‘বিক্রি শেষ করে, পুতুলের ঝুলিটা কাঁধে ফেলে যখন বাড়ি ফিরছি, তখনই ঘটল একটা অদ্ভুত ঘটনা। তখনও তেমন অন্ধকার হয়নি। সন্ধ্যে অবিশ্যি সবে যাই-যাই করছে। আমি নিজের মনেই হেঁটে চলেছি। হঠাৎ হল কী, কে যেন আমায় পিছন থেকে ডাকল, ‘ও পুতুলওলা!’

‘আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছি। গলা শুনেই বুঝতে পেরেছি, এ-ডাক একটি ছোট্ট ছেলের। পিছু ফিরে দেখি, যা আন্দাজ করেছি, ঠিক তাই। তার চেহারা দেখে বুঝতে কষ্ট হল না, ছেলেটির যদি বয়স হয় চার বছর, তো অনেক।

‘আমি তার দিকে ফিরে তাকাতেই সে বললে, ‘আমায় একটা পুতুল দেবে?’ এ তো জানা কথা, বয়স যেমন কচি-কচি, গলার স্বরটিও তেমনি আধো-আধো।

‘ওইটুকু ছেলেকে পথে একা দেখে আমি সত্যিই হকচকিয়ে গেছি। আমি তার কাছে এগিয়ে এসে ব্যাস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি একা-একা কোথা যাচ্ছ? কার সঙ্গে এসেছ?’

‘ছেলেটি আমার কথার কোনো উত্তর না-দিয়ে আবার বলল, ‘আমায় একটা পুতুল দেবে?’

‘আমি বললুম, ‘দেব। কিন্তু তুমি আগে বলো তোমার সঙ্গে কে আছেন?’

‘সে উত্তর দিল, ‘কেউ না!’

‘আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘তোমার বাড়ি কোথা?’

‘সে আমার কথার উত্তর না-দিয়ে আবার বলল, ‘একটা পুতুল দাও না?’

‘আমি ভাবলুম সেই ভালো। ওর হাতে একটা পুতুলই দিই। পুতুল দিলে নিশ্চয়ই বলবে। তাই তাড়াতাড়ি ঝুলির ভেতর হাত গলিয়ে দু-একটা পুতুল যা পড়ে ছিল তাই একটা বার করে ওর হাতে দিলুম। বললুম, ‘এই নাও।’

সে হাত বাড়াল। হাসল।

‘আমি তাকে হাসতে দেখে, নিজেও হাসতে-হাসতে জিজ্ঞেস করলুম, ‘এবার বলো, তোমার বাড়ি কোথা?’

‘যা:চ্চলে! কোথায় আমার প্রশ্নের উত্তর দেবে তা নয়, আমাকেই প্রশ্ন করে বসল, ‘তুমি নিজে তৈরি করেছ?’

‘আম বললুম, ‘হ্যাঁ।’

‘তোমার বাড়িতে আরও অনেক পুতুল আছে?’

‘আমি বললুম, ‘আছে।’

‘কী পুতুল আছে?’

‘বাঘ, ভাল্লুক, গন্ডার!’

‘সে যেন একটু অবাক হয়ে চোখ দুটো বড়ো-বড়ো করে তাকাল আমার দিকে। জিজ্ঞেস করল, ‘বাঘও আছে? হাঁ করতে পারে?’

‘আমি বললুম, ‘পারে বই কী! মস্ত বড়ো হাঁ করতে পারে।’

‘মস্ত বড়ো! তোমাকে গিলে খেয়ে ফেলতে পারে?’

‘নিশ্চয়ই পারে।’

‘তাহলে এখনও খায়নি কেন? তুমি কী করে বেঁচে আছ?’

‘আমার পোষমানা বাঘ।’

‘গায়ে ডোরা-কাটা?’

‘নিশ্চয়ই। তা না হলে বাঘ হবে কেমন করে?’

‘আমায় দেবে?’

‘দেব, আগে বলো, তুমি কার সঙ্গে এসেছ?’

‘আমার কথা এড়িয়ে সে আবার বলল, ‘আমি তোমার সঙ্গে যাব।’

‘আমি জিজ্ঞেস করলুম, ‘কোথায়?’

‘সে বলল, ‘তোমাদের বাড়িতে।’

‘আমি বললুম, ‘ঠিক আছে, আমি তোমায় নিয়ে যাব। তোমায় আমি বাঘ দেব, ভাল্লুক দেব, বাঁদর দেব, সব দেব। আগে বলো, তোমার সঙ্গে কে এসেছেন?’

‘তোমার কাছে বাঁদরও আছে?’ আমার কথার উত্তর না-দিয়ে এবার সে বাঁদরের কথা জিজ্ঞেস করল। এ তো দেখছি আচ্ছা বিপদে পড়া গেল। তবে কি ছেলেটির কেউ নেই! কী করি এখন! অথচ রাত গড়িয়ে আসছে! আমায় বাড়িও ফিরতে হবে এখুনি। দু-একটা টুকিটাকি বাজারও করে নিয়ে যেতে হবে। নইলে রান্নাও চড়বে না। কী মুশকিলে পড়লুম। তার ওপর আর এক চিন্তা, ছেলেটিকে পথে একা ফেলে যদি পালাই, সেটা কি ঠিক হবে! নেহাতই বাচ্চা! বিপদ হতে কতক্ষণ! সুতরাং তাকে কাছে টেনে নিলুম। বললুম, ‘চলো তোমায় বাড়ি পৌঁছে দিই।’

‘সে ঝট করে আমার হাতটা ছাড়িয়ে বলল, ‘আমি বাড়ি যাব না। আমি তোমার সঙ্গে যাব।’

‘সুতরাং বিপদটা বেশ ভয় পাইয়ে দিল আমায়। এই মুহূর্তে আর যে কী করা উচিত, আমার মাথায় আসছিল না। সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে। অগত্যা তাকে কোলে তুলে নিলুম। মনে-মনে ভাবলুম, রান্না একদিন না-ই চড়ল। না খেয়ে একটা রাত থাকা যায়, কিন্তু ছেলেটিকে না-পেয়ে তার বাপ-মায়েরই বা কী করে মুখে অন্ন রুচবে? সুতরাং ছেলেটির ঠিকানা আমায় খুঁজে বার করতেই হবে।

‘কিন্তু সে আমার কোলে উঠে তার হাতের সেই ছাতা-মাথায় মেমসাহেব পুতুলটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, পুতুলগুলো জ্যান্ত হয় না কেন?’

‘আমি বললুম, ‘কে বলল, জ্যান্ত নয়?’

‘সে ঠোঁট উলটিয়ে বলল, ‘হুঃ! জ্যান্ত বই কী! তোমার বাঁদরটা লাফাতে পারে?’

‘তা পারে না অবিশ্যি!’

‘তবে?’

‘আমি তখন তাকে বললুম, ‘তুমি যদি বল কার সঙ্গে এসেছ, তাহলে তোমাকে একটা জ্যান্ত বাঁদর দেব।’

‘সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল প্রায়, ‘সত্যি?’

‘আমি বললুম, ‘খুব লাফাবে।’

‘সে জিজ্ঞেস করল, ‘কলা খাবে?’

‘কলা খাবে, ছোলা খাবে।’

‘সে এবার জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, হনুমান বড়ো, না বাঁদর?’

‘আমি ভাবলুম, এ তো আচ্ছা ফ্যাসাদে পড়া গেল!

‘আমায় চুপ থাকতে দেখে সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘বলো না, হনুমান বড়ো, না বাঁদর?’

‘আমি আর কোনো উত্তর খুঁজে না-পেয়ে বললুম, ‘দুটোই বড়ো। হনুমান হনুমানের মতো বড়ো, বাঁদর বাঁদরের মতো।’

‘যে কোনো মানুষই বুঝতে পারে তখন আমার কী অবস্থা। পাছে আবার কিছু জিজ্ঞেস করে বসে, তাই তার জিজ্ঞেস করার আগেই আমি তাকে বললুম, ‘চলো, তুমি নিজেই দেখবে চলো, কে বড়ো বাঁদর না হনুমান।’

‘সে জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় যাব?’

‘আমি বললুম, ‘তুমি চুপটি করে আমার কোলে বসে থাকো, আমি তোমায় নিয়ে যাচ্ছি।’

‘সে খুশিতে লাফিয়ে উঠল, ‘খুব মজা।’

‘তাকে কোলে নিয়েই আমি পথে-পথে ঘুরতে লাগলুম। একবার সেই যেখানে মেলা বসেছিল, সেখানে যাই। একবার সিধে রাস্তা ধরে হাঁটি। একবার দাঁড়াই। এধার, ওধার দেখি। যদি কেউ এগিয়ে আসে। কিন্তু এল না। আমি ব্যস্ত হয়ে উঠলুম। এবং চট করে একটা বুদ্ধি আমার মাথায় এসে গেল। আমি থানার দিকে পা বাড়ালুম।

‘ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়েছে। হ্যাঁ, এতক্ষণ খেয়াল করিনি। আমার বুকে মাথাটি রেখে সে নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। আমি থানার দিকে ছুটছি। আর মাঝে মাঝে ওর ঢুলে-পড়া মাথাটা বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরছি। একটু-একটু হাওয়া বইছে। উত্তুরে। ঠাণ্ডা। বুঝতে পারছি, সেই হাওয়ায় আমারই শরীর শিরশির করছে। সুতরাং বাচ্চাটারও নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে। আপাতত ওর গায়ে একটা কিছু জড়ানো দরকার। গায়ে দেবার মতো আছেই বা কী, আমার সঙ্গে এই ঝুলিটা ছাড়া! যাই হোক, এখনকার মতো সেইটাই গায়ে জড়িয়ে দিলুম তার। অন্তত খানিকক্ষণের জন্যেও তো ঠাণ্ডার হাত থেকে রেহাই পাবে! কে জানে কখন খেয়েছে সে। যখনই খাক, কতক্ষণ ধরে আমার সঙ্গে ঘুরছে সে। এখনও কি আর পেটে আছে কিছু! মনটা আমার কেমন করে উঠল। থানায় তো যাচ্ছি। সেখানে দেখবে কে বাচ্চাটাকে? কে খেতে দেবে? কোথায়-বা শোবে, কোনখানে থাকবে? পুলিশ দেখে যদি ভয় পায়?

‘যেতে-যেতে আমি থামলুম। ভাবলুম, না, কাজ নেই থানায় গিয়ে। তারচেয়ে বরং আমার বাড়িতেই নিয়ে যাই। রাতটা তো ভালোয়-ভালোয় কাটুক। তারপর কাল সকালে উঠে যা হোক করা যাবে।

‘কিন্তু ভালোয়-ভালোয় কাটল না সেই রাত। কোন বাপ-মা আর ছেলেকে হারিয়ে হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকে! সুতরাং এতক্ষণ তারা ছেলের জন্যে পথে-পথে পাগলের মতো হন্যে হয়ে ছুটোছুটি করেছে। ছুটতে-ছুটতে হঠাৎ তারা আমায় দেখতে পেয়েছিল। আমায় দেখে হঠাৎ তারা চিৎকার করে উঠেছিল, ‘ছেলেধরা, ছেলেধরা! আমাদের ছেলে নিয়ে পালাচ্ছে।’

‘উচিত ছিল তাদের আমার কাছে আসা। কী ঘটেছে আর কী হয়েছে আমার মুখে শোনা। তা না-শুনে, তারা চিলের মতো চিৎকার করে এক মারমুখী মানুষের সামনে আমায় ফেলে দিলে।

‘নিমেষে একদল মানুষ আমার ওপর চড়াও হল। আমার বুক থেকে ছেলেটাকে ছিনিয়ে নিলে। লাগিয়ে দিলে দমাদ্দম কিল চড় ঘুসি। আমি যতবারই কথা বলবার চেষ্টা করছি, ‘আমাকে মারবেন না, আমাকে মারবেন না, দয়া করে আমার কথা শুনুন,’ ততই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছে। আমার মুখে-চোখে, পেটে-পিঠে ততই পড়ছে, লাথি ঘুসি। আর আমি সহ্য করতে পারছিলুম না। রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলুম। তখনও নিস্তার নেই। হট্টগোলে অসংখ্য লোক জমা হয়ে গেছে এরই মধ্যে। একটা চোর যখন ধরা পড়েছে আর সে-চোর যখন ছেলেধরা তখন হাতের সুখ মেটাবার জন্যে লোকের তো আর অভাব হয় না। তাই যে পারছে, সে-ই দিচ্ছে এক-ঘা, দু-ঘা। আমি ঘা খেতে-খেতে এলিয়ে পড়লুম। আমার নাকে-মুখে রক্ত। আর কথা বলতে পারছিলুম না। যে-কথা বলতে চাইছিলুম, সে-কথা আমার মুখেই জড়িয়ে যাচ্ছিল। সুতরাং যেটুকু জ্ঞান তখন আমার ছিল, আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল না, আমার সময় হয়ে এসেছে।

‘আমার যে সময় হয়ে এসেছে, এ-কথা বোধহয় মারমুখী জনতাও বুঝেছিল। সম্ভবত তারা এ-কথাও বুঝতে পারল, চোরকে যথেষ্ট শিক্ষা দেওয়া গেছে। আর দরকার নেই। এবার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া যেতে পারে। শেষ শিক্ষাটা পুলিশের দেওয়াই ভালো।

‘পুলিশও এসে পড়ল যথাসময়ে। আমার মুমূর্ষু অবস্থা দেখে পুলিশও বুঝতে পারল, আর একে পেটানোর দরকার হবে না। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোরের ভবলীলা সাঙ্গ হবে। সুতরাং তারা আমায় চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে চলে গেল। আমি জানি না, তারা আমায় কোথায় নিয়ে গেল। সম্ভবত দাওয়াখানায়। প্রাণ যখন এখনও ধুকধুক করছে তখন বোধহয় ঠ্যাং ধরে টেনে-টেনে ভাগাড়ে ফেলে দিতে তাদের আঁতে বাধল।

‘নিশ্চয়ই বুঝতে পারছে, আমি মরিনি। কী যে ভাগ্য, প্রাণ ফিরে পেলুম। তাই রাজ-আদেশে আমার বিচারের তোড়জোড় শুরু হল। এদেশে রাজা নিজেই যে বিচারক, এ-কথাটা বোধহয় অনেক দেশের মানুষই জানে না। আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে, কোমরে দড়ি বেঁধে বিচারশালায় নিয়ে এল পুলিশ। কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই রাজার দিকে নজর পড়ল আমার। তিনি এখন এসে বসে আছেন বিচারকের আসনে। হ্যাঁ, এই প্রথম আমি রাজাকে দেখলুম। দেখলুম, আমাদের দন্ডমুন্ডের কর্তাকে। উনি যদি বলেন, আকাশ উঁচু, তো উঁচু! নিচু তো নিচু!

‘সত্যি বলছি, যেদিন থেকে চোর হয়ে গেছি, সেদিন থেকে আমার ছেলে-মেয়ের কথা মনে হলেই, আমি লজ্জায় কুঁচকে যেতুম। ভাবলেই মনে হত তাদের চোখের সামনে দাঁড়াবার আগে আমার যেন মরণ হয়। তারা কি বিশ্বাস করবে, তাদের বাবা চোর নয়! বিশ্বাস করবে কি পথে-হারানো একটি বাচ্চা ছেলেকে বুকে তুলে নিতেই সে চোর হয়ে গেছে! এ-কথা বিশ্বাস করা যায় না। কেননা, চোর যখন ধরা পড়ে কাঠগড়ায় দাঁড়ায়, তখন গলা ফাটিয়ে যতই বলুক সে নির্দোষ, তার কথা কেউ শুনবে না। সে শুধু কুড়িয়ে বেড়াবে সকলের ঘৃণা!

‘বাবা!’

‘আমি চমকে উঠেছিলুম! আমার ছেলের কন্ঠস্বর! একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে আমার ছেলে আর মেয়ে! চোখে চোখ পড়তেই দেখি, দু-জনেরই গাল বেয়ে জল গড়াচ্ছে। কোনো কথা বলার হুকুম নেই আমার। হতবাক হয়ে চেয়ে রইলুম তাদের মুখের দিকে। এমনই সময়ে পুলিশের বড়ো-কর্তা রাজার সামনে দাঁড়িয়ে মাথা হেঁট করল। তারপর তারস্বরে চিৎকার করে নালিশ জানাল, ‘মহামান্য মহারাজাধিরাজ, যে-লোকটি এখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে আছে, সে একজন কুখ্যাত ছেলেধরা। লোকটি বাচ্চা-বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের পুতুল দেখিয়ে মন ভোলায়। তারপর ধরে নিয়ে যায়। এই লোকটি এমনই একটি বাচ্চা ছেলেকে চুরি করে পালাচ্ছিল যখন, তখন ধরা পড়ে। বিচারের জন্য লোকটিকে মহারাজের সামনে হাজির করা হয়েছে।’

‘মহারাজ কটমট করে চেয়ে দেখলেন আমার মুখের দিকে। তারপর নিজে একটি হুঁ: করে বাজখাঁই শব্দ করলেন মুখে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘এমনি করে ছেলে ধরে লোকটা কত পয়সা উপায় করেছে?’

‘পুলিশ-কর্তা বলল, ‘আজ্ঞে বলতে পারব না।’

‘লোকটার ক-খানা জামা আছে?’

‘আজ্ঞে বলতে পারব না।’

‘লোকটা তেলেভাজা বেগুনি খায়, না ঘিয়ে-ভাজা লুচি খায়?’

‘আজ্ঞে বলতে পারব না।’

‘অমনি রাজা কড়কে বলে উঠলেন, ‘তাহলে পারবেটা কী! বসে-বসে শুধু গিলবে!’

‘রাজার কড়কানি খেয়ে পুলিশের কর্তা ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলেন। আর সেই তক্কে হাত জোড় করে বলে উঠলুম, ‘আজ্ঞে আমি—’

‘আমার কথা শেষ করতে হল না। কথার মাঝখানেই রাজা হুকুম দিলেন, ‘এক-ঘা।’

‘আমি কথাটার মানে না-বুঝেই আবার বলে উঠলুম, ‘আজ্ঞে আমি চুরি—’

‘রাজা আবার হুকুম করলেন, ‘দু’-ঘা’।

‘আমি এবার সত্যিই ঘাবড়ে গিয়ে বলে উঠলুম, ‘আজ্ঞে আমি চুরি করিনি।’

‘রাজা এবার কড়া গলায় ধমক মেরে বলে উঠলেন, ‘দশ-ঘা চাবুক লাগাও। দশ বছর জেল খাটাও।’ এই রায় দিয়ে রাজা উঠে গেলেন গটমট করে।

‘রাজার রায় শুনে আমার পা থেকে মাটি যেন খসে পড়ল। আমি ভীষণ ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলুম, ‘হুজুর আমি চুরি করিনি।’

‘আমার কথা আর শুনছে কে! তুমি চুরি কর আর না-ই কর, রাজা যখন একবার শাস্তির হুকুম দিয়েছেন, তখন তুমি চোর। সুতরাং পুলিশের লোকেরা সেখান থেকে আমায় টানতে-টানতে নিয়ে চলল জেলখানায়। যত লোক ছিল এধারে-ওধারে সবাই ধিক ধিক করে ধিক্কার দিয়ে উঠল। কেঁদে উঠল আমার ছেলে, আমার মেয়ে, আমার বউ।

‘কিছু দোষ না-করেও মার খেয়েছিলুম রাস্তার লোকের কাছে। রাজার বিচারে এবার চাবুক খেলাম পুলিশের হাতে। তারপর পচতে লাগলুম জেলখানায়। আমি এখন একজন ছেলেচোর কয়েদি।’

এতক্ষণ জোরুতসির কথা শুনছিল লোতিসাবা চুপচাপ। এতক্ষণ জোরুতসির দুর্ভাগ্যের কথা শুনতে-শুনতে তার মুখে কখনো রাগ কখনো ঘৃণা ঝলসে উঠছিল। এবার সে কথা বলল, ‘তোমার গালে ওই যে দাগটা, ওটা বোধহয় চাবুকের আঘাত!’

ঘাড় নাড়ল জোরুতসি।

লোতিসাবার চোখ দুটো রাগে জ্বলে উঠল। বলল, ‘অন্যায়, অন্যায়, ভয়ঙ্কর অন্যায়! জানি না, অন্যায় কোনোদিন শেষ হবে কিনা!’ তারপর লোতিসাবা ধীরে ধীরে নিজের হাতটা জোরুতসির আঘাতে আহত গালের ওপর রেখে জিজ্ঞেস করল, ‘জেল ভেঙে পালালে কেমন করে?’

‘সে আর এক কাহিনী’, বলল জোরুতসি, ‘কয়েদের অন্দরমহল যেন এক নরক। সেই নরকের মধ্যে একবোঝা জঞ্জালের মতো আমি পড়ে থাকতুম। কী অমানুষিক অত্যাচার চলল, তোমায় কী বলব! আমার কাঁধে যেন জোয়াল জুতে সারাদিন খাটাত কয়েদের কোতোয়াল। হাড় আমার গুঁড়িয়ে যায়। কোনোদিন খেতে দিত, কোনোদিন পেট কোলে করে বসে থাকতুম। পরার জন্য পোশাকও ছিল তেমনি! চিরকুট একটা জামা, ছোট্ট একটা প্যান্ট। কি শীত, কি গ্রীষ্ম—এই পরে বাঁচো-মরো কেউ দেখতে আসছে না।

‘মানুষের কষ্ট সহ্য করারও তো একটা সীমা আছে! শরীরটা ভেঙে পড়ল। একদিন আর উঠতে পারলুম না। আমার জ্বর হয়েছে। গা পুড়ে যাচ্ছে। পড়ে রইলুম মুখ বুজে। কিন্তু কয়েদের লোক ছাড়বে কেন! জ্বর-জ্বালা ওসব মিথ্যে তাদের কাছে। তারা আমায় টেনে তুলল। জেলখাটতে এলে মানুষের জ্বর-জ্বালা হবে, এটা আবার কোন দেশি নিয়ম! সুতরাং তারা আমার নড়া ধরে ইঁদারার কাছে নিয়ে এসে বলল, ‘জল তোল।’

‘আমি ইঁদারায় বালতি ডুবিয়ে জল তুলতে লাগলুম। আমি জল তুললে তবে সারা কয়েদখানা ধোয়া-মোছা হবে। সবাই চান করবে। বাসন মাজা হবে। কাপড়-চোপড় কাচা হবে। অনেক কাজ। কিন্তু এই শরীরে আমি পারব কেন! মস্ত ওই জলভর্তি বালতিটা ইঁদারার নীচ থেকে ওপরে তুলে আনতে একটা সুস্থ মানুষেরই জান বেরিয়ে যায়, তো আমি কোন ছার। বালতি টানতে-টানতে আমার মাথা ঘুরে গেল। টাল সামলাতে পারলুম না। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলুম মুখ থুবড়ে। পড়ে-পড়ে অসহ্য কষ্টে ছটফট করতে লাগলুম। এরই মধ্যে কার দয়া-মায়া হল কে জানে! আমায় ধরাধরি করে তুলে নিল। চাতালে শুইয়ে দিল। তারপর যে কী হল, আমি জানি না। কিন্তু এটুকু জানি, আমার মরণ হল না।

‘ক-দিন পরে আমি আবার উঠে বসলুম। হিসেব করতে লাগলুম, আমার এই কারাবাসে ক-টা রাত পোহাল, আর ক-টা দিন বাকি!’

‘কী, কেমন আছ?’

‘হঠাৎ কে ডাকল আমায় নরম-গলায়। পিছন ফিরে দেখি, আমাদের এক কারারক্ষী। তোমায় বলতে ভুলে গেছি, এই লোকটিকে আমার খুব ভালো লাগে। বলতে পারব না, কেন। দু-একটা কথা যদি কখনো বলতে ইচ্ছে করে, তবে এই লোকটির সঙ্গে বললে, সে যে খেঁকিয়ে উঠবে না, তা আমি জানি। সুতরাং তার কথার উত্তরে আমি বললুম, ‘আজ তো ভালোই আছি।’

‘সে আমার কপালে হাত ছুঁয়ে বলল, ‘না, জ্বর নেই।’

‘আমার বুক বেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। বললুম, ‘মরে গেলেই তো আপদ চুকে যেত।’

‘সে আমার মুখের দিকে ক্ষণেক চাইল। স্থির হয়ে রইল। তারপর আচমকা জিজ্ঞেস করল, ‘চুরি করলে কেন?’

‘আমি তার দিকে তাকাতে পারলুম না। মাথাটা হেঁট হয়ে গেল আমার। মুখের কথাও হারিয়ে গেল। কিন্তু চোখ সে তো মানবে না। ছলছলিয়ে উঠল।

‘সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি তো একটি ছেলেকে চুরি করেছিলে?’

‘আমি এবার কথা বলতে পারলুম। আমার গলার স্বরটা তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বললুম, ‘ওরা তাই বলে!’

‘সে বলল, ‘তুমি চুরি করেছ বলেই তো ওরা বলেছে!’

‘হ্যাঁ, ওরাই বলেছে। বলেছে বলেই আমার জেল হয়েছে।’

‘তোমার ভাগ্য ভালো, শুধু জেলই হয়েছে। প্রাণদন্ড হয়নি।’

‘এবার আমি রাগটাকে চেপে রাখতে পারলুম না। ফুঁসে উঠলুম, ‘মিথ্যার ভয়ঙ্কর শক্তি! মিথ্যা অজুহাতে আমার প্রাণ গেলেও সেটা মিথ্যাই!’

‘সে যেন একটু থমকে গেল। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘মিথ্যা?’

‘ঠিক সেই সময় একটা অসম্ভব উত্তেজনা আমাকে যেন ধাক্কা মারল। আমি নিজেকে সামলাতে পারছি না। আমার হাতের আঙুলগুলো থরথর করে কাঁপছে। কথা বলতে যাচ্ছি, গলার স্বরও অস্থির হয়ে উঠেছে। সেই অস্থির গলায় তাকে আমি বলে উঠলুম, ‘হ্যাঁ, মিথ্যা’। তারপর কী হল, আচমকা তার হাতটা চেপে ধরলুম। বলে ফেললুম, ‘তুমি বিশ্বাস করো, আমি চুরি করিনি। বিশ্বাস করো, আমি চুরিকে ঘৃণা করি। আমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে জেলে পোরা হয়েছে।’

‘তুমি যে চুরি করোনি, এ-কথা প্রমাণ করতে পারনি কেন?’

‘আমার কথা কেউ শোনেনি। যতবারই সত্যি কথা বলতে গেছি, ততবারই এক-ঘা, দু-ঘা করে চাবুক মারার হুকুম হয়েছে। আমি তোমাকে আবার বলছি, আমি চোর নই। আমার এই যে হাত দুটো দেখছ, এই হাত দিয়ে আমি চুরি করতে পারি না। এ হাত দিয়ে আমি পুতুল বানাই। এই হাত দিয়ে আমি আমার ছেলে-মেয়েদের আদর করে বুকে জড়িয়ে ধরি। তুমি বিশ্বাস করো, এই হাত দিয়ে আমি সেই ছোট্ট ছেলেটিকেও বুকে তুলে নিয়েছিলুম। কেননা, সে পথে হারিয়ে গেছল। পথে তাকে একা ফেলে চলে যেতে পারিনি আমি। তার কোনো ঠিকানাই সে বলতে পারছিল না বলে, তাকে আমার বাড়িতেই নিয়ে যাচ্ছিলুম। তারপরেই আমি চোর হয়ে গেলুম।’

‘এ-ব্যাপারে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না কারারক্ষী। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ কী ভাবল। তারপর মুখ ফিরিয়ে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু খেয়েছ?’

‘আমি বললুম, ‘ভালো লাগছে না।’

‘কারারক্ষী এধার-ওধার একটু দেখে নিল কাছেপিঠে কেউ আছে কিনা। তারপর ঝট করে পকেটে হাত পুরে একটা কী বার করল। আমার মুখের কাছে হাতটা ধরে বলল, ‘এই নাও, চটপট খেয়ে নাও।’

‘আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখলুম, একটা মিষ্টি।

‘আমায় অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে বলল, ‘দেরি করছ কেন? কেউ দেখে ফেলবে! আমি বিপদে পড়ব।’

‘আমি ঠিক এই মুহূর্তে বোবা হয়ে গেছি। শুধু অবাক হয়ে ভাবছি, যেখানে এত অবিশ্বাস, এত নিষ্ঠুরতা সেখানে এমন মানুষেরও দেখা পাওয়া যায়? এমন বুক উপচে-পড়া ভালোবাসার মানুষ?

‘সে আবার বলল, ‘কী হল?’

‘আমি হাত বাড়ালুম।’

‘সে বলল, ‘আমি যাচ্ছি। এখানে আমার বেশিক্ষণ দাঁড়ানো ঠিক হবে না। আমি এখন যাই। আবার দেখা হবে।’

‘সে চলে গেল। আমি নিশ্চুপ হয়ে তাকিয়ে রইলুম তার পথের দিকে।’

‘এই কয়েদখানার চত্বরটা মস্ত বড়ো। চত্বর ঘিরে মস্ত পাঁচিল। খুব উঁচু। ছোট্ট-ছোট্ট ঘর। আলোবাতাসের বালাই নেই ঘরে। যেন অন্ধকূপ। সেই অন্ধকূপে হয় বসে থাকো, না হয় শুয়ে থাকো।

‘কারাগারে তখন গভীর রাত্রি। অন্ধকার ঘরে আরও অন্ধকার। আমি শুয়ে আছি। চোখে ঘুম নেই। ঘুম আসছে না। হাজারো চিন্তা আমার মাথার ভেতর পাক খাচ্ছে। দিনেরবেলা তবু সে একরকম। পাঁচটা মানুষের মুখ দেখে সময় কেটে যায়। এখন? রাত্রি যতই গভীর হয়, ততই যেন একটা হিংসুটে দানবের মতো আমারই নিশ্বাস হাঁসফাঁস করে ওঠে। দম আটকে আসছে যেন! এমনই সময় খুট করে একটা শব্দ ভেসে এল আমার কানে। ধক করে উঠল বুকের ভেতরটা। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে অন্ধকারে কটমট করে চেয়ে রইলুম। একটা যেন ছায়া এগিয়ে আসছে। তার নিশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছি আমি। আমি আতঙ্কে চিৎকার করতে গেলুম, গলার স্বর গলাতেই আটকে গেল।

‘সে এগিয়ে এল আমার আরও কাছে। অন্ধকারে আমার হাতটা ধরে ফেলল। চাপা স্বরে বলল, ‘কথা বোলো না। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসো আমার সঙ্গে।’

‘আমার শরীরে যেন বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল। কেননা, আমি বুঝতে পেরেছি, এ সেই দয়ালু কারারক্ষী। আমি যেন কেমন দিশেহারা হয়ে গেলুম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার হাত ধরে অন্ধকার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে এলুম নি:শব্দে। সে আমায় ছায়ার মতো আগলে-আগলে নিয়ে এল একটা গোপন জায়গায়। দেখলুম, এখান থেকে মাটির নীচে একটা সিঁড়ি নেমে গেছে। সে সিঁড়িতে পা রেখে বললে, ‘নেমে এসো।’

‘আমি এখনও কোনো কথা বলতে পারলুম না। তার পিছুপিছু সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলুম। আমি বুঝতে পারলুম, এটা কয়েদখানার একটা গুপ্ত পথ! তবে কি লোকটা সবার চোখে ধুলো দিয়ে আমাকে কয়েদ থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে?

‘ঠিক তাই। সিঁড়িটা যেখানে শেষ হয়েছে, লোকটি সেখানে এসে দাঁড়াল। কোমর থেকে একটা চাবি বার করল। সিঁড়ির সঙ্গে লাগোয়া একটা লোহার কপাটে চাবিটা লাগিয়ে খুলে ফেলল। তারপর আমার হাতে একটা কাপড়ের বাণ্ডিল দিয়ে বলল, ‘এতে পোশাক আছে। এটা নিয়ে তুমি এক্ষুনি বেরিয়ে যাও। তুমি এখন জেলখানার যে পোশাক পরে আছ, বাইরে গিয়ে বাণ্ডিলের পোশাক পরে, এই জেলখানার পোশাক ফেলে দিও। নইলে লোকে ভাববে, তুমি কয়েদি, জেল ভেঙে পালাচ্ছ! বাইরে ক-দিন খুব সতর্ক থাকবে। তোমার পালাবার খবরটা যখনই জানাজানি হবে, তখনই তোমাকে ধরবার জন্যে চলবে জোর তল্লাসি। সুতরাং সাবধান।’

‘আমি এবার কথা বললুম। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলুম, ‘পালাব কেন আমি?’

‘সে বলল, ‘তুমি পালাচ্ছ না। আমি বুঝেছি, মিথ্যে অভিযোগ করে তোমাকে বন্দি করে রাখা হয়েছে। আমি সেই নির্দোষ মানুষটাকে কষ্টের হাত থেকে রক্ষা করছি।’ সে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে আবার বলল, ‘আর সময় নেই। তুমি চলে যাও!’

‘আমি যেতে-যেতেও যেতে পারলুম না। থমকে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলুম, ‘তুমি আমায় পালাবার পথ বলে দিয়েছ, এ-কথা কেউ জানতে পারলে?’

‘কেউ জানবে না। তা ছাড়া সে নিয়ে তোমায় কিছু ভাবতেও হবে না। তুমি আর দেরি করলে বিপদ হবে! বিপদ তোমার আমার দু-জনেরই!’

‘আমি প্রায় কেঁদে ফেললুম। তার হাতটা জড়িয়ে ধরে বললুম, ‘তুমি এত মহৎ!’ বলে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লুম।

‘খানিকটা আসতেই একটা নিরিবিলি জায়গা নজরে পড়ে গেল। সেই নিরিবিলি জায়গায় কয়েদের পোশাকগুলো খুলে ফেলে, তার দেওয়া ঝকঝকে প্যান্ট শার্ট পরে ফেললুম। এখন আমি একেবারে আর এক নতুন মানুষ। সেই অন্ধকার নির্জন রাত্রে আমি হেঁটে চলেছি। হাঁটতে-হাঁটতে উত্তেজনায় কাঁপছি আমি।’

কথা শেষ হল জোরুতসির। জোরুতসির কথা শুনে লোতিসাবার মুখ যেন কথা বলতে পারছিল না। কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল তার। অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল দু-জনে। লোতিসাবা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, ‘জোরুতসি, তোমার এই দুঃখের কাহিনি শুনে আমার একটা কথা বিশ্বাস করতে এত ভালো লাগছে যে, এই পৃথিবীতে শয়তান যেমন থাকবে, যেমন থাকবে অত্যাচার অবিচার, তেমনি থাকবে ওই কারারক্ষীর মতো মানুষ। এইসব মানুষ আছে বলেই তো শয়তানের হাতের খড়্গ ছিটকে পড়ে চুরমার হয়ে যায়। জয় হয় তোমার মতো সাধু মানুষের।’

লোতিসাবার কথা শুনে কী বলবে জোরুতসি ভেবে পেল না। হেঁট হয়ে বসে রইল চুপচাপ কিছুক্ষণ। তারপর অস্ফুটস্বরে বলল, ‘আর ভালো লাগছে না এই আশ্রয়-শিবির।’

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘তোমার কি মনে হয় না, এখানকার সব মানুষের চোখে আমরা দুই বুড়ো, যেন দুই আপদ!’

লোতিসাবা বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ। আমারও তাই মনে হয়। অথর্ব হয়ে গেলে অন্যের কাছে দয়া ছাড়া আর তো কিছু পাবার থাকে না আমাদের।’

‘বুড়ো হয়ে বেঁচে থাকাটাই পাপ।’ বলল জোরুতসি।

লোতিসাবা দৃঢ় কন্ঠে চেঁচিয়ে উঠে বলল, ‘না, আমি মানি না এ-কথা। তুমি দেখো, যেদিন আমি উঠে দাঁড়াতে পারব, সেইদিনই এখান থেকে চলে যাব।’

‘কোথায়?’

‘যেদিকে দু-চোখ যায়।’

‘আমাকে সঙ্গে নেবে না?’

‘তোমাকে ফেলে যাব না।’

‘কিন্তু কে আমাদের থাকতে দেবে? কে আমাদের খেতে দেবে?’

লোতিসাবার চোখ দুটো ঝলসে উঠল। বলল, ‘জোরুতসি, আমার যখন যৌবন ছিল, আমি ছিলুম সার্কাসের ক্লাউন। ক্লাউনের সে-সব খেলা এখনও ভুলে যাইনি আমি। আমি পারব, আবার পারব খেলা দেখাতে। তুমি ছিলে পুতুল-বানিয়ে। পারবে না আবার পুতুল বানাতে?’

‘হ্যাঁ, পারব। আমিও নিশ্চয়ই পারব পুতুল বানাতে।’ দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দিল জোরুতসি।

লোতিসাবা আবার বলল, ‘আমি পথে-পথে ক্লাউনের খেলা দেখিয়ে পয়সা রোজগার করব, আর তুমি হাটে-হাটে পুতুল বেচে পয়সা আনবে। দুটো পেট তাতেই চলে যাবে।’

জোরুতসির মুখখানা উছলে উঠল সকালের রোদের মতো। তারপর লোতিসাবার মুখের দিকে চেয়ে বলল, ‘তুমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে ওঠো লোতিসাবা। তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, আমি এখনই ছুটে বেরিয়ে যাই এই আশ্রয়-শিবির থেকে।’

‘কে জানে, নতুন দিন হয়তো অপেক্ষা করছে আমাদের জন্যে।’ খুশিতে মুখখানি ভরে গেল লোতিসাবার।

ক-দিন পরে লোতিসাবা সত্যিই উঠে দাঁড়াল। ক-দিন পরে লোতিসাবা আর জোরুতসি সত্যিই আশ্রয়-শিবির থেকে বেরিয়ে পড়ল পথে। এই আশ্রয়-শিবির থেকে সেই ধ্বংসের শহর যদিও অনেক দূরে, তবুও আগ্নেয়গিরির চূড়াটা স্পষ্ট দেখা যায় এখান থেকে। লোতিসাবা আর জোরুতসি দুজনেই এখন জানে যে-শহর ধ্বংস হয়েছে, সেখানে ফিরে যাওয়ার আর কোনো মানে নেই। সুতরাং তাদের যেতে হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনোখানে। তারা হাঁটা দিল। দুই বুড়োমানুষ হেঁটে চলেছে সামনে। ওরা জানে, পথ যত দীর্ঘই হোক থামলে চলবে না। হাঁটতে হবে ওদের দৃঢ় পায়ে, হাসিমুখে।

হাঁটতে-হাঁটতে লোতিসাবাই প্রথম কথা বলল, ‘জোরুতসি, এই খোলা আকাশের নীচে হাঁটতে আজ এত ভালো লাগছে!’

‘সত্যি, কী ভালোই না লাগছে!’ উত্তর দিল জোরুতসি। তারপর আবার বলল, ‘দেখো, কষ্ট হলে থেমে পোড়ো!’

লোতিসাবা হেসে উঠল। মাথাটা আকাশের দিকে একটু উঁচু করে বলল, ‘আরে, আমার কী কষ্ট হবে! দেখছ, মাথা আমার কত উঁচুতে। যদি তোমার কষ্ট হয় আমায় বোলো। তোমার আঘাতটা তো পায়েই লেগেছিল!’

জোরুতসি বললে, ‘ও বাবা! তুমি এখনও আমার পায়ের কথা মনে রেখেছ! আমি তো সে-ব্যথা কবেই হজম করে বসে আছি।’ বলে, চলতে-চলতে আনন্দে একটা লাফ মেরে পায়ের ক্ষমতাটা জোরুতসিকে দেখিয়ে বলল, ‘দেখছ, একটি বাচ্চার মতো আমি এখনও লাফাতে পারি!’

লোতিসাবা জোরুতসির লাফ দেখে ভয়ে আঁতকে উঠল, ‘আরে, আরে, করছ কী, করছ কী? এখনই বিপদ ঘটবে! ভুলে যাচ্ছ কেন, এখন আর আমরা বাচ্চা নই।’

জোরুতসি বললে, ‘না, আমার ক্ষমতাটা তোমায় একটু দেখিয়ে দিলুম।’

লোতিসাবা ভয়ে-ভয়ে বললে, ‘আর ক্ষমতা দেখিয়ে কাজ নেই বাবা। শেষে হিতে বিপরীত হলে সে আর এক বিপদ!’

সুতরাং লোতিসাবার কথা শুনে জোরুতসি আর লাফালাফি করল না। শান্তশিষ্টের মতো হাঁটতে-হাঁটতে পৌঁছে গেল একটা নদীর কিনারে। নদীর কিনারে এসে পথ শেষ হয়েছে। পথ শেষ হলে যে এখানে এই নদী তাদের পথ আগলে দাঁড়াবে, সেটা এই দুই বুড়োমানুষের আদপেই জানা ছিল না। এখন তাদের এই নদী পেরোতে হবে। নদীর প্রচন্ড স্রোতে আর উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে জোরুতসি কেমন যেন মুষড়ে পড়ল। এবং অনেকটা হতাশ স্বরেই জিজ্ঞেস করল, ‘তবে কি আমাদের ফিরে যেতে হবে?’

‘ভয় পাচ্ছ?’ উলটে জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘না, ভয় পাচ্ছি না। ভাবছি, এ নদী তো পার হওয়া যাবে না।’ উত্তর দিল জোরুতসি।

‘কেন?’ প্রশ্ন করল লোতিসাবা।

‘কেমন করে পার হব? নৌকো-টৌকো তো দেখছি না।’

‘সাঁতার কেটে পার হব।’

‘নদীর জলে স্রোত দেখতে পাচ্ছ?’

‘স্রোত কাটিয়ে পার হব।’

‘তুমি সাঁতার জান?’ ভয়ে-ভয়েই জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

‘নিশ্চয়ই। তুমি?’

‘অনেকদিন জলে নামিনি। এককালে জানতুম।’

‘তবে আর কী। ভয় পাবার কিছু নেই। একবার শিখলে সাঁতার কেউ ভোলে না।’

বলে লোতিসাবা জোরুতসির হাত ধরে একটা গাছের নীচে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘এসো, পেটে কিছু দিয়ে নিই। যদিও লড়াইটা করতে হবে জলের সঙ্গে, তবু খালি পেটে সেটা জমবে না। তা ছাড়া বেরিয়েছিও তো অনেকক্ষণ। খিদেটা বেশ জাঁকিয়ে বসেছে পেটের মধ্যে।’

‘তা বসেছে!’ বলে জরুতসি লোতিসাবার সঙ্গে একটা গাছের নীচে বসে পড়ল।

হ্যাঁ, তারা আগেই কিছু খাবার সঙ্গে নিয়েছিল। দু-জনে গাছের নীচে বসে খেয়ে নিল পেট ভরে। তারপর নিজেদের পরা প্যান্ট-শার্টগুলো আঁটোসাঁটো করে গুটিয়ে নিয়ে, নদীর তীরে এগিয়ে গেল। ‘এসো’, বলে লোতিসারা আগুপিছু কিছু না ভেবে সটান নেমে যাচ্ছিল জলে। কিন্তু নামতে-নামতেও জোরুতসি দাঁড়িয়ে পড়ল।

‘কী হল? থামলে কেন?’ ফিরে দেখল লোতিসাবা।

‘লোতিসাবা।’ ডাক দিল জোরুতসি। তার গলা কাঁপছে।

‘কী বলছ?’

‘তোমার হাতটা একটু ধরতে দাও!’

‘ভয় পাচ্ছ নাকি?’

‘না।’

‘তবে?’

‘কে জানে, আর যদি আমাদের কোনোদিন দেখা না হয়! আমরা দু-জনেই যদি জলের স্রোতে হারিয়ে যাই চিরদিনের মতো!’

লোতিসাবা হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, ‘ও, তাই শেষবারের মতো হাত মিলিয়ে বিদায় জানাতে চাও! তুমি আশ্চর্য মানুষ!’ বলে লোতিসাবা নিজের হাত বাড়িয়ে জোরুতসির হাতে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললে, ‘আরে ভয় পাবার কী আছে! আমরা তো মরেই আছি। জলে ডুবলে কেউ কাঁদতেও আসবে না। এসো, এসো!’ বলে লোতিসাবা জলের ওপর লাফিয়ে পড়ল। সঙ্গেসঙ্গে জোরুতসিও লাফ দিল। জলের ওপর আওয়াজ উঠল, ঝপাং, ঝপাং! দুই বৃদ্ধ শুরু করে দিল হাত টানতে। টানতে-টানতে ভেসে চলল।

নদীতে সত্যিই ভয়ঙ্কর স্রোত। পাহাড়-ভাঙা পাথর ডিঙিয়ে এই নদী নেমে এসেছে এখানে। সুতরাং সেই স্রোতের সঙ্গে যে পাল্লা দেওয়া খুব সহজ কাজ নয়, এটা বোধহয় লোতিসাবা প্রথমটা বুঝতে পারেনি। তাই, দুই বৃদ্ধ নদীর মাঝ-বরাবর পৌঁছোতেই স্রোতের বেগ আর সামাল দিতে পারে না। একেবারে সোঁ-সোঁ শব্দে ভেসে চলে যায়। কী সাহস তাদের! তবু তারা লড়ে যাচ্ছে। তাদের হাত উঠছে, নামছে! জলের সঙ্গে হাবুডুবু খেতে-খেতে এগিয়ে চলেছে।

হঠাৎ জোরুতসি চিৎকার করে উঠল, ‘লোতিসাবা, বাঁচাও।’

লোতিসাবা ফিরে দেখার আগেই জোরুতসির হয়তো দম ফুরিয়ে গেল! কিংবা হয়তো তার হাত দু-টি ক্ষমতা হারাল। ওই তো সে তিরবেগে জলের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে!

‘জোরুতসি!’ চিৎকার করে উঠল লোতিসাবা। জোরুতসিকে দেখতে পেয়েছে লোতিসাবা। আতঙ্কে আড়ষ্ট হয়ে গেল সে তাকে দেখে। সে নিজেও যেন নিজেকে সামলাতে পারল না। হাত-পা ছেড়ে নিজেও ভেসে চলল ওই স্রোতের সঙ্গে হাবুডুবু খেতে-খেতে।

দু-জনকে তো আর দেখা যায় না! তবে কি দু-জনেই তলিয়ে গেল জলের নীচে। সবার অজান্তে, সকলের অলক্ষ্যে এমনভাবে দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল যে, এ-নিয়ে কেউ হায়-হায় করবারও ফুরসত পেল না। কেউ চিৎকার করে জলের ওপর লাফ দিয়ে ওদের বাঁচাবারও সুযোগ পেল না। অবিশ্যি এখানে ওদের দেখতে পাবেই বা কে? একেবারে মাঝদরিয়ায় কে আর নজর রেখে ওদের হালচাল লক্ষ করার জন্যে বসে আছে! সকালে যখন আকাশ-ছোঁয়া সূর্যের আলো মাথায় নিয়ে ওরা পথে বেরিয়েছিল, তখন ওদের বুকে ছিল অফুরন্ত উৎসাহ। আর এখন সূর্য ডুবে গেছে। আকাশ থেকে সন্ধ্যার ছায়া নেমেছে নদীর জলে। সুতরাং সেই ছায়াতে নদীর বুকে তাদের যে আবার খুঁজে পাওয়া যাবে, এমন আশা মিথ্যে।

কিন্তু খুঁজে পাওয়া গেছল। ভাগ্যের জোরে রক্ষা পেয়েছিল দু-জনেই। নদীর স্রোতে উথালপাথাল করতে-করতে দু-জনেই আছড়ে পড়েছিল এক পাথরের ওপর। স্রোতের সঙ্গে আপ্রাণ যুঝতে-যুঝতে লোতিসাবা যখন ভেসে যাওয়া জোরুতসির শরীরটাকে কোনোরকমে আঁকড়ে ধরেছিল, তখনই জোরুতসি জ্ঞান হারায়। তারপর তাকে টেনে রাখার চেষ্টা করতে না করতেই ওই পাথরের ওপর ধাক্কা খেল দু-জনেই। তবু ভালো, লোতিসাবা আঘাত পেলেও, তেমন একটা লাগল না তার। ভীষণ হাঁপাচ্ছে সে। হাঁপাতে-হাঁপাতেই সে জোরুতসির অচৈতন্য দেহটা টেনে তুলে ফেলল সেই পাথরটার ওপর। আর পলক দেরি হলে জোরুতসির দেহটা ঠিক জলের তলায় তলিয়ে যেত। খুব ভাগ্য বলতে হয়। লোতিসাবা এখন একা। এখন সে ভয়ঙ্কর বিপদের মুখোমুখি। জোরুতসিকে এখন সে কেমন করে বাঁচাবে, ভেবে পাচ্ছে না! এই জনমানবশূন্য জলের রাজ্যে কাকে ডাকবে সে! ইস! এখন মনে হচ্ছে, এমন গোঁয়ার্তুমি না-করলেই ছিল ভালো! তার সাধ্যও তো নেই যে, জোরুতসির এই নিশ্চল দেহটা সে অন্য কোথাও বয়ে নিয়ে যায়। চেষ্টা করে তো কোনো লাভ নেই। সে জোরুতসির কানের কাছে মুখটা এনে ডাক দিল, ‘জোরুতসি জোরুতসি!’ না, সে সাড়া দিল না। জোরুতসির বুকের ওপর নিজের হাতটা রেখে সে বুঝতে পারল, বুকের ভেতরটা তার ভীষণ ছটফট করছে। লোতিসাবা তার বুকে হাত বোলাতে-বোলাতে ভাবতে লাগল, এই পাথরটার ওপর এখনই যদি জোরুতসির শেষ নিশ্বাস বেরিয়ে যায়, তখন সে কী করবে, কোথায় যাবে!

না, অনেকক্ষণ পর হঠাৎ জোরুতসির দেহটা একটু নড়ে উঠেছিল। অনেকক্ষণ পর আচম্বিতে জোরুতসির মুখ দিয়ে ছোট্ট একটি শব্দ বেরিয়ে এসেছিল, ‘লোতিসাবা।’ লোতিসাবা চমকে উঠল। তবে কি জোরুতসির জ্ঞান ফিরে এসেছে! হুমড়ি খেয়ে জোরুতসির মুখের কাছে নিজের মুখখানা নামিয়ে এনে ব্যস্তস্বরে লোতিসাবাও ডাক দিল, ‘জোরুতসি, এই তো, আমি তোমার কাছেই।’

ধীরে-ধীরে চোখ মেলল জোরুতসি। চোখে-মুখে কষ্টের চিহ্ন।

লোতিসাবা আরও ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমার কষ্ট হচ্ছে, জোরুতসি?’

জোরুতসি ঘাড় নাড়ল।

এতক্ষণ অন্ধকার ছিল। এখন ধীরে-ধীরে ভোরের আলো ফুটছে। সারাটা রাত কেটে গেল লোতিসাবার জোরুতসির মুখের সামনে বসে-বসে। অন্ধকারে যেটা তার ঠাওর হয়নি, আলো ফুটতেই সে স্পষ্ট দেখতে পেল, যে-পাথরটার ওপর তারা আশ্রয় নিয়েছে, তার গায়ে-গায়ে আরও কত ছোটো-বড়ো পাথর ছড়িয়ে আছে। এটা নদীর কিনারা। সেই পাথরের ওপর নদীর জল ছলাত-ছলাত শব্দ তুলে বয়ে যাচ্ছে। আরও একটু আলো ফুটতেই লোতিসাবার নজরে পড়ল, নদীর গায়ে একটা মস্ত উঁচু পাহাড়। এই পাথরগুলোই পাহাড়ের গা ভেঙে ছিটকে ছড়িয়ে আছে নদীর জলে। একটির সঙ্গে একটি এমনভাবে লেগে আছে যে, লোতিসাবা ইচ্ছে করলেই সেই পাথর ডিঙিয়ে একেবারে পাহাড়ের কোলে পৌঁছে যেতে পারে।

‘আমরা কোথায়?’ হঠাৎ অস্ফুষ্টস্বরে কথা বলল জোরুতসি।

লোতিসাবা চমকে উঠল। চকিতে তার মুখের দিকে চাইল। তারপর বলল, ‘ভয় নেই, আমরা ডাঙার কাছাকাছিই আছি।’

‘আমাকে একটু ধরো। আমি বসব।’ বলল জোরুতসি।

‘বসতে পারবে?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘চেষ্টা করি।’

‘কষ্ট হবে। বরঞ্চ আর একটু শুয়ে থাকো।’

‘এই পাথরের ওপর শুয়ে থাকতেই আমার কষ্ট হচ্ছে। তুমি আমায় ধরো!’

লোতিসাবা জোরুতসিকে ধরল। উঠে বসল জোরুতসি। এধার-ওধার দেখতে লাগল। তারপর বলল, ‘আর একটু হলেই শেষ হয়ে যেতুম।’

লোতিসাবা দেখল জোরুতসি এখন সিধে হয়েই বসতে পারছে। বুকে অনেকটা সাহস হল এখন। বলল, ‘হ্যাঁ, এই বয়সে, এভাবে ঝুঁকি নেওয়াটা ঠিক হয়নি আমার। কে জানে এর পর ভাগ্যে কী আছে!’

‘চলো পাথর ডিঙিয়ে ওই পাহাড়টার কাছে যাই!’

জোরুতসির কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে গেল লোতিসাবা। বলল, কী বলছ তুমি?’

‘আমি পারব। আমার এখন ততটা কষ্ট লাগছে না!’

‘তুমি দাঁড়াতে পারবে?’ আশ্চর্য হয়েই জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘মনে হচ্ছে পারব। তুমি আমার হাতটা ধরো।’

লোতিসাবা জোরুতসির হাতটা ধরল। সত্যিই জোরুতসি উঠে দাঁড়াল টলতে-টলতে। তারপর জলের ওপর ছড়ানো পাথরে একটি-একটি পা ফেলে সেই পাহাড়টার কাছে এগিয়ে চলল। দূর থেকে দূরের জিনিস দেখতে একরকম। পাহাড়ের মাথাটা পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। কিন্তু যতই তারা কাছে এগিয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল, পাহাড়টা যেন একটা মস্ত উঁচু দেওয়াল। নদীর জল তার গায়ে ছোট্ট-ছোট্ট ঢেউ তুলে লুটিয়ে পড়ছে।

আরও একটু কাছে এগিয়ে লোতিসাবা বলল, ‘এবারেই মুশকিল।’

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

‘পাহাড় ডিঙিয়ে ওপারে যেতে হবে!’

‘সে কী! পাহাড় ডিঙুতে হবে কেন? তুমি দেখতে পাচ্ছ না?’

‘কী?’

‘পাহাড়ের গায়ে গুহা!’

‘কই?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা। ‘ওই তো!’ জোরুতসি দাঁড়াল। গুহার দিকে আঙুল বাড়াল।

লোতিসাবা দেখতে পেয়েছে! উত্তেজনায় প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, ‘গুহা! গুহা!’

জোরুতসিও লোতিসাবার দেখাদেখি উত্তেজনায় প্রায় লাফিয়ে উঠেছিল। আনন্দে সে হাত তুলে বলে উঠল, ‘আমার মনে হয়, ওই গুহার ভিতর দিয়ে ওপাশে যাওয়ার পথ আছে।’

লোতিসাবা বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়।’

‘সুতরাং চলো, আমাদের ওই পথেই যেতে হবে।’ বলে জোরুতসির হাতটা বেশ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বেশ সাহস করে এবার সে পা ফেলল। ফেলতে-ফেলতে সেই গুহার মুখোমুখি চলে এল প্রায়। দাঁড়াল।

লোতিসাবা বলল, ‘দেখতে পাচ্ছ, গুহার ভেতরে কী ভীষণ অন্ধকার?’

জোরুতসি বলল, ‘মনে হচ্ছে তুমি ভয় পাচ্ছ!’

‘ভয় না-পেলেও সাহস পাচ্ছি না। বলে লোতিসাবার ঠোঁট দু-টিতে একটুখানি হাসির রেখা ঝলসে উঠল।

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

লোতিসাবা বলল, ‘দেখলে তো, নদীর জলে দুঃসাহস দেখাতে গিয়ে একটু আগে কী সাংঘাতিক বিপদে পড়েছিলুম!’

‘হ্যাঁ, তার জন্যেই আমার মনে হয়েছে, তুমি ভয় পাওয়ার মানুষ নও। ভিতু মানুষ হলে তো তুমি আমায় ফেলে, নিজের প্রাণ বাঁচাতে চম্পট দিতে! আমি কখন মরে ভূত হয়ে যেতুম!’

জোরুতসির কথা শুনে এবার একটু জোরেই হেসে উঠল লোতিসাবা। হাসতে-হাসতেই বলল, ‘আমার জন্য কি আর বেঁচে আছ তুমি? সময় হলে সবাইকেই চলে যেতে হবে। তোমার এখনও সময় হয়নি তাই বেঁচে গেলে।’

জোরুতসি বলল, ‘তোমার কথাটাই যদি হক কথা হয়, তবে গুহার অন্ধকারই বা আমাদের কী করবে। এসো, এবার অন্ধকারেই এগিয়ে চলি।’

‘তুমি যখন বলছ, তখন আর আপত্তি করছি না। বেশ, তাই চলো।’ বলে দুই বৃদ্ধ এবার গুহার ভেতরে পা বাড়াল।

পাহাড়ের পেটের মধ্যে এক জমাট অন্ধকারের রাজত্ব যেন এই গুহাটা! যতই ভেতরে ঢুকছে ওরা ধীরে-ধীরে ওদের দৃষ্টি যেন ঝাপসা হয়ে আসছে। এখানে ছায়া নেই যে পাশের মানুষকে দেখা যাবে। নিশ্বাসের শব্দটুকু ছাড়া আর কিছু কানে আসে না। ওই পাহাড়ের পাথর যেমন নিষ্প্রাণ, তেমনি চারিদিক নিথর আর নিস্তব্ধ। হাঁটতে-হাঁটতে ওরা যখন গুহার আরও ভেতরে ঢুকে গেল, যখন মনে হল, অন্ধকারে ওরা হারিয়ে যাচ্ছে, তখন লোতিসাবাই ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, ‘জোরুতসি, ভীষণ অন্ধকার!’

‘ভয় করছে নাকি তোমার?’ জোরুতসি উত্তরটা এমনভাবে দিল মনে হল একটু আগে যে সে মরতে বসেছিল, সেটা ভুলেই গেছে।

লোতিসাবা জোরুতসির উত্তর শুনে বলল, ‘না, দু-জনে দিক ভুলে হারিয়ে না যাই।’

জোরুতসি বলল, ‘গুহার ওপারে যখন পৌঁছে যাব, তখন আলো দেখা যাবে। তুমি বরঞ্চ আমার হাতটা ধরো।’

লোতিসাবা জোরুতসির হাতটা চেপে ধরল।

জোরুতসি বলল, ‘হ্যাঁ, আরও একটু শক্ত করে ধরো। ফসকে না যায়! তাহলেই কিন্তু বিপদ!’

এখন দু-জনে হাত ধরাধরি করে হাঁটছে। আলতো-আলতো পা ফেলছে অন্ধকারে, আন্দাজে। অন্ধকার আরও অন্ধকার হচ্ছে। কখনো হোঁচট খাচ্ছে পাথরের গায়ে। পড়তে-পড়তেও পড়ছে না। সামলে গিয়ে টাল খাচ্ছে। যদিও তারা ভাবছে, ঠিক পথে তারা হাঁটছে, তবু তারা জানতে পারছে না, ঠিক পথ তাদের অনেক আগেই হারিয়ে গেছে!

অন্ধকারে হাঁটতে-হাঁটতে যখন সত্যিই তারা আলোর হদিস পেল না, তখন লোতিসাবাই প্রথম কথা বলল, ‘জোরুতসি, আমরা অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছি না তো?’

‘বুঝতে পারছি না!’ জোরুতসিও কেমন যেন ভয় পেয়ে গেল।

লোতিসাবা আবার বলল, ‘আমরা এগোচ্ছি, না অন্ধকারে ঘুরপাক খাচ্ছি! কিছুই তো দেখতে পাচ্ছি না!’

জোরুতসি মুখে কোনো কথা না-বলে দাঁড়িয়ে পড়ল।

লোতিসাবাও দাঁড়াল। বলল, ‘চলো, আবার নদীর তীরে ফিরে যাই!’

‘তারপর?’ কেমন যেন ভয় পেয়ে জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

লোতিসাবা বলল, ‘এখন তো অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচি, তারপর দেখা যাবে। জমাট অন্ধকারে যেন দম আটকে আসছে!’

একটু আগে যে উৎসাহ ছিল জোরুতসির মনে, এখন যেন তা চুপসে গেছে। সে-ও ভাবছে, অন্ধকারের হাত থেকে রেহাই পেলে সে-ও বাঁচে। তাই লোতিসাবার কথাতেই সায় দিল সে। বলল, ‘তাই চলো।’

তারা পিছু ফিরল। কিন্তু কানামাছির মতো পাথরে-পাথরে শুধু ঠোক্কর খাচ্ছে। তারা কোথায় এসেছে, কতখানি এসেছে, কোনদিকে এসেছে, এসব কিছুই তাদের খেয়াল থাকার কথা নয়। তা ছাড়া গুহার ভেতরেও আরও কত ছোটো-বড়ো গুহা! অন্ধকারে কোনটার ভেতর ঢুকে পড়েছে তারা, তা জানেই না। সুতরাং তারা একবার এদিকে আসে তো, একবার ওদিকে হাঁটে। একবার ওপাশে যায় তো, এপাশে ছোটে। এমনি করতে-করতে হাঁপিয়ে ওঠে তারা। অন্ধকারের খাঁচার মধ্যে ঘুরপাক খেতে-খেতে তারা উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল। চিৎকার করতে-করতে ছিটকে পড়ল লোতিসাবা জোরুতসির হাত ফসকে!

এতক্ষণ তবু দু-জনে দুজনকে ছুঁয়ে ছিল। তবু দু-জনে একসঙ্গে অন্ধকারের ভয়টাকে সামাল দিচ্ছিল। কিন্তু এখন দু-জনেই ছাড়াছাড়ি। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। দেখতে পাচ্ছে না বলে, দু-জনেই আঁকপাঁক করে দু-জনকে খুঁজতে গিয়ে আরও ধাঁধায় পড়ে যাচ্ছে। লোতিসাবা চিৎকার করছে, ‘জোরুতসি, জোরুতসি!’

জোরুতসি উত্তর দিচ্ছে, ‘আমি এদিকে, এদিকে।’

‘কোন দিকে? কোন দিকে?’

‘সামনে, সামনে!’

শূন্য এই গুহায় দু-জনের চিৎকারের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে গমগম করে উঠল। অন্ধকার হাতড়াতে-হাতড়াতে কখনো তারা কাছাকাছি এগিয়ে আসছে। এত কাছে, এই বুঝি তারা নিজেদের ছুঁয়ে ফেলল। না পারল না। আবার তাদের গলার শব্দ দূরে তলিয়ে যাচ্ছে।

আর যেন চিৎকার করার শক্তি নেই তাদের। গলার স্বর গলাতেই শুকিয়ে যাচ্ছে। ধীরে-ধীরে সত্যিই আর তারা কথা বলতে পারল না। নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারিদিক। কী হল যে দু-জনের কেউ জানতে পারল না। ওরা কি তবে এই অন্ধকূপে আটকা পড়ে শেষ হয়ে গেল!

হঠাৎ যেন দেখা একঝাঁক আলো একটি-একটি ফোঁটার মতো উড়তে-উড়তে জ্বলছে আবার নিবছে। এগিয়ে আসছে! কিন্তু সে আলোতে কি আর এই রাশ-রাশ অন্ধকার ঘুচে যায়!

কিন্তু অন্ধকার না-ঘুচলেও লোতিসাবা আর জোরুতসি দু-জনেই দেখতে পেয়েছে সেই আলো। ওরা সেই আলো দেখতে-দেখতে দু-জনেই হাত তুলে লাফিয়ে চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আলো, আলো!’

দু-জনে দু-জনকে সেই আলোতে দেখতে না-পেলেও, দু-জনেই দু-জনের গলা শুনতে পেল। দু-জনেই জানে এ-আলোতে দেখা যায় না। এ যে জোনাকির আলো! এই উড়ন্ত জোনাকি দেখে খুশিতে চিৎকার করে উঠল লোতিসাবা, ‘জোরুতসি, জোনাকির আলো দেখতে পাচ্ছ?’

জোরুতসিও চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি!’

‘আমায় দেখতে পাচ্ছ না?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘না, এখনও দেখতে পাচ্ছি না।’

লোতিসাবা বলল, ‘জোরুতসি তাহলে এক কাজ করা যায় না।’

‘কী কাজ?’

‘ওই আলো যেদিকে যায়, সেদিকে আমরাও তো যেতে পারি।’

‘কী লাভ?’

‘আমার মনে হয় গুহা ছেড়ে ওই জোনাকির ঝাঁক বাইরে যাচ্ছে।’

‘তোমার কি মনে হয়, এখন বাইরে আঁধার নেমেছে?’ জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

‘হতে পারে। আমরা তো অনেকক্ষণ গুহায় বন্দি হয়ে আছি।’ উত্তর দিলে লোতিসাবা।

জোরুতসি বলল, ‘তবে ওদের অনুসরণ করো। আমরা দু-জনে ওদের দেখে-দেখে বাইরে পৌঁছোতে পারলে, আমরা নিজেরাও নিজেদের খুঁজে পাব।’

কিন্তু হায় রে! জোনাকির ঝাঁক কোথাও না গিয়ে সেইখানেই, সেই অন্ধকার গুহার ভেতরই চক্কর মারতে লাগল। আর লোতিসাবা, জোরুতসিও তাদের দেখে দেখে সেইখানে ঘুরপাক খেতে লাগল।

শেষে যখন সত্যিই সেই অন্ধকার ছেড়ে তারা নড়ল না, তখন লোতিসাবা নিজের পায়ের তলা থেকে একমুঠো পাথর কুড়িয়ে নিলে। ধাঁ করে সেই জোনাক-ঝাঁকের গায়ের ওপর ছুড়ে দিলে। পাথরের টুকরোগুলো অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ল সেই গুহার গায়ে-মাথায়। আর দেখতে হয়! গুহার গায়ে ঝুলে-ঝুলে ঘুমুচ্ছিল ঝাঁক-ঝাঁক বাদুড়। সেই পাথর লাগল গিয়ে তাদের গায়ে। সঙ্গেসঙ্গে বাদুড়ের ঝাঁক চিড়িক-চিড়িক ডাক ছেড়ে সেই অন্ধকারে উড়নবাজি শুরু করে দিলে। কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই জোনাকগুলোর ওপর। কখনো ঠোক্কর মারে লোতিসাবা আর জোরুতসির গায়ে-মাথায়। চিৎকার করে ওঠে দুই বুড়ো। চিৎকার করে অন্ধকারে আঁকপাঁক করতে লাগল। কিন্তু ছাড়ে না বাদুড়। তাদের ডানায় তীক্ষ্ণ নোখ। ঝাঁকে-ঝাঁকে নোখ ফুটিয়ে জ্বালা ধরিয়ে দেয় দুই বুড়োর মুখে-চোখে। অন্ধকারে এ এক ভীষণ অবস্থা! তারা ছুট দেয় সামনের দিকে, ধাক্কা খেল গুহার দেওয়ালে। পেছনে ছুটল—আবার ধাক্কা। ডাইনে-বাঁয়ে যেদিক যায়, বাদুড়ের চিমটি খায়, নয়তো ধাক্কা খেয়ে উলটে পড়ে।

এবার তারা আর উলটে পড়ল না। এবার তাদের আর ধাক্কা খেতে হল না। বাদুড়ের খোঁচার তাড়ায় এবার তারা যেদিকে ছুটল, সেদিকটা এক্কেবারে ফাঁকা। তবে কি তারা খোলা পথটা দেখতে পেয়েছে?

হ্যাঁ, সেই পথে ছুটতে-ছুটতে তারা আলো দেখতে পেল। গুহার ওই মস্ত উঁচু গর্তটা দিয়ে আকাশের আলো এসে পড়েছে গুহার অন্ধকারে। চিৎকার করে উঠল, লোতিসাবা, জোরুতসি দু-জনেই আনন্দে। দু-জনেই ওই আলোর দিকে ছুটতে থাকল।

আলো আরও একটু স্পষ্ট হতে, জোরুতসি লোতিসাবাকে দেখতে পেয়েছে। দু-হাত তুলে ডেকে উঠেছে, ‘লোতিসাবা—’

লোতিসাবার মুখে-চোখে বিন্দু-বিন্দু রক্ত! বাদুড়ের নোখ লেগে ছড়ে-ছিঁড়ে গেছে। জোরুতসিরও কেটেছে, কিন্তু অতটা নয়। সেই আলোয় স্পষ্ট দেখা গেল লোতিসাবা যেন টলছে! আর পারছে না!

জোরুতসি ছুটে এল লোতিসাবার কাছে। তাকে ধরে ফেলল। বলল, ‘আমরা পথ দেখতে পেয়েছি লোতিসাবা!’

লোতিসাবার মুখে কোনো উত্তর বেরুল না।

কোনো উত্তর না শুনে জোরুতসি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে, লোতিসাবা?’

লোতিসাবা বলল, ‘চলো, কোথাও একটু বসি!’

অবিশ্যি দু-জনেই তখন ক্লান্ত। দু-জনেরই মুখে-চোখে ভয়ের ছায়া ছড়িয়ে আছে। দু-জনেই এখন একটু বসতে চায়। তাই গুহার সেই অন্ধকার গর্তটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে, ওরা একটা বসার মতো জায়গা খুঁজতে লাগল। বুঝতে পারল, এখন তারা নদীর অপর পারেই উঠেছে। কিন্তু এ-পারটা পাহাড়ের পাথর আর জঙ্গলের ঝোপে এমন ঢেকে আছে যে কিছুই ঠাওর হয় না। সুতরাং এই দুর্গম পথ ভেঙে কোনদিকে গেলে যে তারা সহজ পথটা দেখতে পাবে, সেটা নিয়ে এখন তারা মাথা ঘামাচ্ছে না। এখন ওরা একটু বসতে চায়। শরীরের ওপর দিয়ে যে সাংঘাতিক ধকলটা গেল, সেটা একটু সামাল দিতে চায়।

সুতরাং একটা মস্ত উঁচু গাছের নীচে, একটা পাথরে হেলান দিয়ে দুই বৃদ্ধমানুষ বসে পড়ল। তখনও তাদের মুখে-চোখে আতঙ্কের ঘোর কাটেনি। এই নির্জন বনে দুই বুড়োমানুষকে ওই অবস্থায় দেখলে কার না মায়া হয়! অবিশ্যি তারিফও করতে হয়। এই বয়সেও এই অমানুষিক কষ্ট সহ্য করার শক্তি তারা রাখে! তারা যে এখনও বেঁচে আছে, এ যেন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা।

আর কথা বলতে পারল না দু-জনেই। ক্লান্তিতে ঢুলতে লাগল। তারপর সেই পাথরের ওপর মাথা রেখে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল।

প্রথমে জেগে উঠেছিল লোতিসাবা। ঘুম ভাঙতেই সে দেখল সকাল হয়ে গেছে। সকালের স্পষ্ট আলোয় তার নজরে পড়ল, পাহাড়ের গা ঘেঁষে এ এক বন। সেই বনের গভীরে এক গাছের নীচে তারা ঘুমে অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল সারা রাত। অবিশ্যি জোরুতসির এখনও ঘুম ভাঙেনি। সে এখনও বেশ নাক ডাকাচ্ছে। বেচারি! লোতিসাবার ঘুমটা গভীর হওয়ায় এখন বেশ ঝরঝরে লাগছে তার শরীরটা। যদিও বাদুড়ের নোখ-খোঁচানির দরদটা এখনও বেশ জানান দিচ্ছে। জোরুতসিকে ও ডাকল না। মনে হচ্ছে, এখনও বেশ খানিকটা ঘুমুবে সে। ঘুমিয়েই থাক। আবার তো একটু পরেই দু-জনকে হাঁটতে হবে। তার আগে এমনি করে ঠেসে একটু ঘুমিয়ে নেওয়াই ভালো। অবিশ্যি লোতিসাবার ঘুমটা যে কম হয়েছে, তেমন না। শুরু থেকে শেষ অবধি নি:সাড়ে ঘুমিয়েছে সে। সুতরাং বেশ লাগছে এখন!

উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল লোতিসাবা। চোখ মেলে দেখল। প্রথমটা যেমন ভেবেছিল বনটা তেমন ঘন নয়। গাছপালার ফাঁক দিয়ে আকাশটা দেখা যাচ্ছে। পাহাড়টাও স্পষ্ট নজরে পড়ছে। এখান থেকে গুহার সেই গর্তটা দেখা যায় কিনা, লোতিসাবা চোখ মেলে সেটা পরখ করল। কই? সেই গুহার চিহ্নটি পর্যন্ত নেই! তাই তো! কোথায় গুলিয়ে গেল সেই মরণগুহার মস্ত ফাঁদটা!

এমন সময় থতমত খেয়ে গেছে লোতিসাবা। তার চোখে যেন ধাঁধা লেগে গেল নিমেষে! সে স্পষ্ট দেখতে পেল, তার সামনে একজন লোক। তাদের এই গাছটার একেবারে কাছাকাছি বসে আছে! বিশ্বাস করতে পারছিল না লোতিসাবা। তার ওপর ঘুমের রেশটা তখনও তার চোখে জড়িয়েছিল। তাই, ভালো করে দু-হাত দিয়ে চোখ দুটো মুছে, আবার দেখল। হ্যাঁ সত্যি! লোকটি তার দিকে চেয়ে মুচকি-মুচকি হাসছে। লোতিসাবা আরও অবাক হয়ে গেল দেখে যে, এই লোকটিও তাদের মতো বৃদ্ধ! বয়সে যেন একেবারে সমান-সমান। তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে লোতিসাবা যখন ভাবছিল, কথা বলবে কি বলবে না, তখন লোকটিই জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুম ভাঙল?’

লোকটাকে দেখে ভড়কে যাওয়ার রেশটা চট করে সামলে নিল লোতিসাবা। আমতা-আমতা করে বলল, ‘হ্যাঁ, আমার ভাঙল। আমার বন্ধুটির এখনও ভাঙেনি!’

সে বলল, ‘সে তো দেখতে পাচ্ছি। এখনও দিব্যি নাক ডাকাচ্ছে। মনে হচ্ছে, তোমাদের ওপর দিয়ে বেশ এখটা ঝড়ঝাপটা বয়ে গেছে!’

লোতিসাবা ছোট্ট একটা উত্তর দিল, ‘তা একটু।’

সে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে কোথায়?’

‘হঠাৎ এসে পড়েছি।’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

‘হঠাৎ!’ সে যেন অবাক হল। আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কোথা থেকে?’

লোতিসাবা বলল, ‘আমাদের ঠাঁই-ঠিকানা কি আর আছে যে, বলব কোথা থেকে আসছি!’

‘কী-রকম’ সে অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।

‘পাহাড়, পাহাড়, আগুনে-পাহাড় আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে!’

‘তোমরা কি তবে শহরে বাস করতে?’ ভীষণ কৌতূহলে জিজ্ঞেস করল লোকটি।

লোতিসাবা নিজের চেহারাটা দেখিয়ে বলল, ‘দুর্দশা দেখে বুঝতে পারছ না!’

লোকটি যেন নিজেকে নিজের মধ্যে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে বলল, ‘আমি কিন্তু এই জঙ্গলে বাস করি।’

‘একা?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘একাই তো!’

‘তোমার নাম?’

একটু থমকে গেল লোকটি। তারপর ঝট করে বলে উঠল, ‘চাচাচিনি।’

যদিও তার থমকে যাওয়ার দৃশ্যটা লোতিসাবার চোখ এড়িয়ে গেল না, তবু সেটা নিয়ে সন্দেহ করার মতো ভাবনা সেই মুহূর্তে তার মনে এল না। সে বলল, ‘আমি লোতিসাবা। আমার বন্ধুটির নাম জোরুতসি।’

‘আশ্চর্য! কী যোগাযোগ! আমরা তিনজনেই বয়সে বৃদ্ধ।’ সে হাসতে-হাসতে বলল।

তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘চললে কোথা?’

লোতিসাবা বলল, ‘যাব আর কোথায়! যে কটাদিন বেঁচে থাকব, শরীরে রসদ যোগাতে হবে তো! এখন চলেছি রসদ যোগাড়ের ধান্দায়।’

সে জিজ্ঞেস করল, ‘এই বয়সে তোমাদের কপালে তো চাকরি জুটবে না!’

‘না, চাকরি কেন! আমার বন্ধুটি খুব ভালো পুতুল বানাতে পারে। আর আমিও আমার যৌবনকালে ছিলুম সার্কাসের ক্লাউন। ও পুতুল বানিয়ে বিক্রি করবে, আর আমি খেলা দেখিয়ে পয়সা আনব। মনে হয়, এতেই দু-জনে, দু-বেলা, দু-মুঠো যোগাড় করতে পারব।’ বলে থামল লোতিসাবা। তারপর লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমার চলে কী করে?’’

লোকটি লোতিসাবার প্রশ্ন এড়িয়ে উত্তর দিল, ‘চলে যাচ্ছে।’

‘তুমিও চলো না আমাদের সঙ্গে? তিন বুড়োতে জমবে ভালো।’

সে বলল, ‘তোমাদের মতো তো আমি ওস্তাদ নই! তা ছাড়া এ-বন ছেড়ে আমি আর কোথাও যেতেও চাই না। এখানে মাথা গুঁজে থাকার মতো একটা ঝুপড়িও আছে আমার।’

‘তাই নাকি!’

‘চলো না। এখান থেকে একটুখানি। ক-পা হাঁটলেই। ভাঁড়ারে যা দুটো আছে, ভাগ করে খাওয়া যাবে। ডাকো, ডাকো, তোমার বন্ধুকে ডাকো!’

লোতিসাবা বলল, ‘তোমার ঝুপড়িতে যেতে বলছ যাচ্ছি, কিন্তু তোমার খাবারে ভাগ বসাতে বলছ, ওতেই আপত্তি।’

সে হাসতে-হাসতেই উত্তর দিল, ‘আরে বাবা, কিচ্ছু অসুবিধা হবে না। চলো, চলো! ডাকো তোমার বন্ধুকে!’

অগত্যা লোতিসাবা ডাকল, ‘জোরুতসি, জোরুতসি!’

বাবা! লোকটা কী ঘুমই না দিচ্ছিল!

ধড়ফড় করে উঠে পড়ল জোরুতসি।

‘এই দ্যাখো, আর একজন বন্ধু!’ লোতিসাবা বলল। জোরুতসি ঝটপট চোখটা মুছে ফেলল। দেখল। এবং বেশ খানিকটা অবাক হয়েই চেয়ে রইল লোকটির মুখের দিকে।

বৃদ্ধ লোকটিও যেন জোরুতসির চোখে চোখ পড়তে কী ভাবল!

অমন করে দু-জনকে দু-জনের মুখের দিকে চেয়ে থাকতে দেখে, লোতিসাবা জিজ্ঞেস করলে, ‘কী হলো, অমন থ হয়ে কী দেখছ? জান-পয়ছান আছে নাকি?’

হয়তো লোতিসাবার কথাটা চাপা দেবার জন্যেই জোরুতসি গম্ভীর গলায় বললে, ‘আমার নাম জোরুতসি।’

সে বলল, ‘আমি চাচাচিনি।’

‘বা:! তোমার নামটা তো ভারী অদ্ভুত! চাচাচিনি। তোমাকেও মনে হচ্ছে, চিনি-চিনি।’ বলে জোরুতসি লোকটার মুখের দিকে আগের মতোই চেয়ে রইল।

জোরুতসির কথা শুনে লোকটা হয়তো একটু বেসামাল হয়ে গেছল। চোখের পলকে নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিল, ‘হতে পারে। তোমার আমার বয়স তো প্রায় একই। অনেকদিন ধরে পৃথিবীতে বাস করছি। দেখা হওয়াটা এমন কিছু আশ্চর্যের নয়!’

তার কথার আর কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে পড়ল জোরুতসি। তারপর লোকটির পিছনে-পিছনে কয়েক পা হেঁটেই গেল তার আস্তানায়। ঝুপড়িই বটে। ঝোপঝাড়ের আড়ালে এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, চট করে চোখে পড়বে না। ছোট্ট একটা মাথাগোঁজার ঠাঁই।

‘এসো।’

লোতিসাবা আগেভাগে হাসতে-হাসতেই পা বাড়াল। জোরুতসি কিন্তু ভদ্রতা করেও মুখে হাসিও আনল না, কথাও বলল না।

সে বলল, ‘দেখো, মাথা না ঠোকে!’

লোতিসাবা হাসতে-হাসতেই বলল, ‘আর ঠুকবে কী! অন্ধকার গুহার মধ্যে মাথা ঠুকে-ঠুকে ঠোকার জায়গাগুলো সব ভরাট হয়ে গেছে!’’

লোকটা লোতিসাবার কথা শুনে হো-হো করে হেসে উঠল। অমনি সঙ্গে সঙ্গে একটা ঘোড়ার ডাক শোনা গেল। চমকে চাইল লোতিসাবা। অবাক হয়ে বলল, ‘ঘোড়া?’

জোরুতসিও চমকে গেল সেই ডাক শুনে।

লোকটা বলল, ‘হ্যাঁ, ঘোড়া। আমার।’

‘পুষেছ?’

‘না, জঙ্গল থেকে ধরে এনে পোষ মানিয়েছি।’

‘বা:!’ বলতে-বলতে লোতিসাবা মাথা নুইয়ে ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল।

জোরুতসির মুখখানা বেশ গম্ভীর এখন। ঝুপড়ির মধ্যে ঢুকে লোতিসাবা চারপাশটা একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর বলল, ‘খুব কষ্ট করেই আছ দেখছি!’

লোকটা একটা খাবারের বাণ্ডিল থেকে ক-খানা শুকনো রুটি বার করতে-করতে বললে, ‘কষ্ট আর কী! মরবার জন্যে অপেক্ষা করার এটা বেশ চমৎকার জায়গা।’ তারপর রুটিগুলো ওদের হাতে তুলে দিতে-দিতে জোরুতসিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি চুপচাপ কেন? কিছু বলো!’

অন্য কথা ভাবতে-ভাবতে অন্যমনস্ক মানুষ চমক ভাঙলে যেমন ‘উঁ’ করে ওঠে, তেমনি মুখে শব্দ করে জোরুতসি বলল, ‘না, কী আর বলব! কথার চেয়ে আমি কাজটাই বেশি পছন্দ করি।’

‘ওহো!’ বলে লোকটা হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, ‘তাহলে জলদি-জলদি ডান হাতের কাজটা সেরে নাও!’

‘অ্যাঁ! হ্যাঁ!’ কেমন যেন থমকে-থমকে উত্তর দিয়ে রুটির ভাগটা গপগপ করে গিলতে লাগল জোরুতসি। তার খাবার ধরন দেখে মনে হচ্ছে, যেন কোনো হিংসুটে বাঘ শিকার ধরে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাচ্ছে!

‘দাঁড়াও, তোমাদের জন্যে একটু জল এনে দিই!’ বলে লোকটা একটা মাটির পাত্র হাতে নিল। তারপর ঘরের একটা কোণ থেকে ঝট করে একটা বাণ্ডিল নিয়ে কোমরে ঝুলিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল। সেই বাণ্ডিলটার দিকে চোখ পড়ে গেল দু-জনেরই।

লোতিসাবা জিজ্ঞেস করল, ‘কতদূরে, জল?’

‘কাছেই।’ বলে লোকটা বেরিয়ে গেল।

জোরুতসির চোখ দুটো সন্দেহে ছটফট করতে লাগল। কী নিয়ে গেল লোকটা বাণ্ডিলের ভেতরে! জোরুতসি তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখতে লাগল এদিক-ওদিক ঘরের চারদিক।

হঠাৎ লোতিসাবা বলল, ‘তোমার কী হয়েছে বলো তো? অমন বোবা হয়ে আছ কেন?’

জোরুতসির সেই তীক্ষ্ণচোখের দৃষ্টিটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। বলল, ‘আমার কেমন মনে হচ্ছে!’

‘কী মনে হচ্ছে?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘পরে বলব। অপেক্ষা করো।’

‘লোকটা কি ডাকাত?’

‘হতে পারে। হয়তো ডাকাতদের চেয়েও হিংস্র!’ বলে নিজের চোয়ালটা কামড়ে ধরল জোরুতসি দাঁতে-দাঁত চেপে।

অনেকক্ষণ হয়ে গেল, লোকটা কিন্তু এখনও পর্যন্ত এল না। জল আনতে গেল তো, আজও গেল, কালও গেল! লোতিসাবা আর জোরুতসি দু-জনেই মুখ বুজে অপেক্ষা করছিল।

যে-লোতিসাবা এতক্ষণ লোকটার সঙ্গে প্রাণ খুলে গল্প জুড়ে দিয়েছিল, সেই লোতিসাবাও এখন কেমন কুঁচকে গেল!

জোরুতসি হঠাৎ কথা বলল, ‘জল আনতে কোথায় গেল লোকটা, এখনও আসছে না?’

‘দ্যাখো আবার, জল আনবার নাম করে অন্যকিছু মতলব আঁটছে কিনা!’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

‘এসো তো, বাইরেটা একটু দেখি!’ বলে জোরুতসি সেই ঝুপড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।

লোতিসাবা ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করলে, ‘আসছে?’

‘দেখছি না।’

লোতিসাবাও বেরিয়ে এল। হঠাৎ প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ঘোড়াটাকেও তো দেখছি না!’

‘তবে কি লোকটা পালাল!’ যেন অনেকটা নিজের মনেই বলে উঠল জোরুতসি।

‘পালাবে কেন?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘আমি যা ভেবেছি, তা যদি সত্যি হয়, তবে লোকটাকে পালাতেই হবে।’ উত্তর দিল জোরুতসি।

‘কী ভেবেছ তুমি?’

‘বললে ভয় পাবে না তো!’

‘তুমি যদি ভয় না পাও, আমারও ভয় পাবার কিছু নেই।’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

এবার জোরুতসি গলার স্বরটাকে অনেকটা নামিয়ে লোতিসাবার প্রায় কানের কাছে মুখটা এনে বললে, ‘তুমি কোনোদিন আমাদের সেই অত্যাচারী রাজাকে দেখেছ?’

‘না, দেখিনি। তবে আমার ছেলেকে হত্যা করার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি।’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

‘কিন্তু এখন যদি বলি, তারই আশ্রয়ে আমরা অপেক্ষা করছি!’

‘কী বলছ তুমি?’ হতচকিত হয়ে জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি, এই লোকটাই সেই রাজা!’

‘অ্যাঁ!’ লোতিসাবার মাথায় যেন বাজ পড়ল।

‘লোকটা জীবনে অনেক অত্যাচার করেছে। অনেক মানুষ হত্যা করেছে। আগ্নেয়গিরির জ্বলন্ত লাভায় তার সব কিছু ধ্বংস হয়েছে। আমাদের মতো সব খুইয়ে এই রাজাও প্রাণে বেঁচে গেছে! পাছে তাকে কেউ হত্যা করে, তাই এই জঙ্গলে গোপনে লুকিয়ে আছে সে।’

লোতিসাবার মুখখানা লাল হয়ে উঠল। বলল, ‘তাহলে বোধহয় সেও তোমায় চিনতে পেরেছে। তাই, জল আনবার নাম করে পালাল। আমি দেখলুম, সঙ্গে একটা বাণ্ডিল নিয়ে গেল। নিশ্চয়ই ওই বাণ্ডিলের মধ্যে গোপন কিছু আছে। ছি:! ছি:! এত কাছে পেয়েও প্রতিশোধ নিতে পারলুম না।’

জোরুতসি বলল, ‘এত নিরাশ হলে চলবে না। এসো, লোকটাকে খুঁজে বার করি।’

লোতিসাবা ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘বড্ড দেরি হয়ে গেল। দ্যাখো, হয়তো এতক্ষণে ঘোড়ায় চেপে জঙ্গল পেরিয়ে অন্য কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে।’

জোরুতসি গলায় বেশ জোর দিয়েই বলল, ‘আমার তা মনে হয় না। আমার স্থির বিশ্বাস, এই জঙ্গলেই সে কোথাও লুকিয়ে পড়েছে। চলো, আর দেরি করা ঠিক হবে না!’

হন্তদন্ত হয়ে দু-জনেই বেরিয়ে এল সেই ঝুপড়ির ভেতর থেকে।

‘কী হে, যাচ্ছ কোথা?’

লোতিসাবা, জোরুতসি দু-জনেই চমকে থমমত খেয়ে গেছে। আরে! লোকটা তো তাদের সামনে! এসে পড়েছে! ঘোড়ার পিঠ থেকে নামছে! এল কোন পথ দিয়ে!

নিজেকে সামলে নিয়ে লোতিসাবা বলল, ‘যাইনি কোথাও। তোমার দেরি হচ্ছে দেখে—’

‘খুঁজতে যাচ্ছিলে?’ লোতিসাবার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে লোকটা হেসে উঠল।

লোকটাকে সামনাসামনি দেখতে পেয়ে লেতিসাবার সব কেমন যেন গোলমাল হয়ে গেল। সে উত্তেজনায় কাঁপতে লাগল। এক্ষুনি বুঝি সে শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গলার টুঁটিটা টিপে ধরে। না, তার আগেই জোরুতসি কথা বলল। কথা বলল খুব সহজ সুরে, ‘এত কষ্ট করার কী দরকার ছিল! অনেক দূর থেকে জল আনতে হল বোধহয়!’

‘তেমন দূর না। তা ঘরে অতিথি এলে এটুকু কষ্ট তো করতেই হয়!’ সেও সহজভাবে উত্তর দিল।

লোতিসাবা ভেতরে-ভেতরে ফুঁসতে লাগল।

‘নাও, একেবারে ঠাণ্ডা জল। খুব তৃপ্তি পাবে।’

লোতিসাবা কথা না বলে লোকটার মুখের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে হাত বাড়াল।

জোরুতসি কিন্তু এক ঢোক গিলে লোকটাকে বললে, ‘ঠিকই বলেছ, বেশ ঠাণ্ডা! স্বাদও আছে দেখছি! ঝরনার জল বোধহয়!’

সে বলল, ‘হ্যাঁ।’ তারপর মুহূর্ত চুপ করে জিজ্ঞেস করল, ‘ঝরনায় যাবে নাকি?’

‘গেলে হয়।’ সঙ্গেসঙ্গে উত্তর দিল জোরুতসি।

মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে গেল লোতিসাবার।

‘হাঁটতে হবে।’

‘কতটা?’ লোতিসাবাই জিজ্ঞেস করল।

‘তা খানিকটা।’

‘হাঁটা আমাদের অভ্যেস আছে।’ গম্ভীর স্বরেই এবার উত্তর দিল লোতিসাবা।

সে বলল, ‘অনেকটা পাহাড় ডিঙিয়ে ওপরে উঠতে হবে।’

‘তা ওঠা যাবে।’ আরও কর্কশ স্বরে উত্তর দিল লোতিসাবা।

‘তবে চলো।’ লোকটাও রাজি হয়ে গেল।

তা ঠিক, বেশ খানিকটা জঙ্গলের পথ ভাঙতে হল তাদের। বেশ খানিকটা চড়াই-উতরাইও করতে হল। কষ্ট হচ্ছে না, এমন কথা বলা যায় না। পথ চলতে-চলতে তেমন কথাবার্তাও বড়ো একটা নিজেদের মধ্যে হল না।

আঃ! অনেকটা ওপরে উঠতেই চোখ জুড়িয়ে যায় যেন! হাঁপিয়ে হাঁসফাঁস করতে-করতেই জোরুতসি তারিফ করে বলে উঠল, ‘দারুণ।’

কিছুই বলল না লোতিসাবা। সে শুধু এদিক-ওদিক দেখার ভান করে লোকটাকেই দেখতে লাগল।

জোরুতসি আবার বলে উঠল, ‘ভারী চমৎকার জায়গায় আছ তুমি।’

‘ইচ্ছে করলে তোমরাও এই চমৎকার জায়গায় থাকতে পার।’ সে মুচকি হেসে উত্তর দিল।

লোতিসাবা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘না, আমরা খুনি নই! আমরা খুন করে এখানে লুকিয়ে থাকতে আসিনি!’

লোকটা থতমত খেয়ে গেল। দাঁড়িয়ে পড়ল।

জোরুতসি সঙ্গেসঙ্গে লোকটার পাশ থেকে পিছনে চলে যেতেই সে জিজ্ঞেস করলে, ‘খুনি? মানে?’

লোতিসাবা তেমনি কঠিন গলায় বললে, ‘মানে বুঝতে তো তোমার দেরি হওয়া উচিত নয়! তোমার নামটা যেন কী বললে?’

‘কেন? চাচাচিনি।’

লোতিসাবা কড়কে উঠল, ‘ভাঁওতা দেবার জায়গা পাওনি।’

লোকটা হাসিটাকে জোর করে মুখে এনে বললে, ‘ঠাট্টা করছ নাকি?’

‘না,’ এবার জোরুতসি পিছন থেকে চেঁচিয়ে উঠল, ‘না, ঠাট্টা আমরা করছি না, করছ তুমি। ওটা তোমার মিথ্যে নাম। তুমি চাচাও নও, চিনিও নও!’

লোকটা পিছু ফিরে জোরুতসির মুখের দিকে কটমট করে তাকাল।

আবার চিৎকার করে উঠল লোতিসাবা, ‘তুমি আমার ছেলেকে হত্যা করেছ।’

জোরুতসি গর্জে উঠল, ‘তুমি আমাকে মিথ্যে অভিযোগে জেলে পুরেছিলে।’

লোকটা চোখের পলকে তার কোমর থেকে একটা ছোরা বার করে ফেলল। তারপর সেই ছোরাটা উঁচিয়ে বলল, ‘আমিও বুঝতে পেরেছি, তোমরা আমায় চিনে ফেলেছ। সুতরাং সাবধান! আমার গায়ে যেন একটি আঁচড় না লাগে! তাহলে আমি তোমাদের শেষ করে ফেলব।’

আচমকা ছোরা দেখে লোতিসাবা আর জোরুতসি দু-জনেই হতচকিত! নির্জন এই পাহাড়ের গায়ে দুই বৃদ্ধকে হত্যা করার জন্যে আর এক বৃদ্ধের হাতে ছোরা! ভয়ঙ্কর সেই দৃশ্য দেখলে কার না গায়ে কাঁটা দেয়! কার না ভয়ে হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়! কিন্তু লোতিসাবা আর জোরুতসি চক্ষের নিমেষে নিজেদের সামলে নিল। অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকটার ঘাড়ে। লোকটা ভাবতে পারেনি তার হাতে ছোরা দেখেও এই দুই বৃদ্ধ তাকে আক্রমণ করবে। দুই বৃদ্ধের ধাক্কা সামলাতে পারল না লোকটা। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল পাথরের ওপর। সঙ্গেসঙ্গে জাপটে ধরল জোরুতসি। তার হাত থেকে ছোরাটা কেড়ে নেওয়ার জন্যে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিলে লোতিসাবা।

বৃদ্ধ হলে কী হবে! লোকটার গায়ে এখনও অসম্ভব শক্তি। লোতিসাবা আর জোরুতসির সঙ্গে একাই লড়তে-লড়তে সেই ঢালু পাহাড়টার ওপর সে গড়াগড়ি খেতে লাগল। হাতের ছোরাটা মুঠিতে চেপে ধরে সে কখনো পা ছুড়ছে, কখনো মাথা হেলাচ্ছে, নয়তো ঠেলা মারছে। এই বুঝি গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের ওপর থেকে নীচে! না, এই আবার সামলে গেল!

কিন্তু এভাবে একা-একা একটা মানুষ কতক্ষণ লড়াই করতে পারে দু-জনের সঙ্গে! সে একটু কাহিল হয়ে পড়তেই, তাল বুঝে জোরুতসি লোকটার মুখের ওপর জোরসে এক ঘুসি চালিয়ে দিলে। লোকটার নাক ফেটে রক্ত গড়িয়ে পড়ল। রক্ত দেখে একটুও ঘাবড়ে গেল না লোকটা। সে ঝট করে জোরুতসির গলাটা খামচে ধরলে। লোতিসাবার ঘাড়ে একটা ধাক্কা মেরে ছিটকে ফেলে দিল। তারপর জোরুতসির বুকের ওপর ছোরাটা চালিয়ে দিলে! ইস! জোরুতসির বুঝি শেষ সময় ঘনিয়ে এল। খুব বরাতজোর, ছোরাটা তার বুকে লাগল না। প্রাণপণ চেষ্টা করে, ছোরাটা তার বুকে আঘাত না করে, আহত করল তার হাত। কতটা লাগল, এ দেখার এখন ফুরসত নেই। কেননা, লোকটা আবার চালিয়ে দিতে পারে। তাই জোরুতসি ছোরার আঘাতে ভয় না পেয়ে, আবার লড়ে গেল লোকটার সঙ্গে। লোতিসাবাও ঠিক এই সুযোগে একটা বেশ বড়োসড়ো পাথর চট করে তুলে নিল। লোকটার মাথায় মারতে গেল। কিন্তু তাড়াতাড়িতে একটা পা বেমক্কা বেটাল হয়ে যেতেই, পাথরটা লোকটার মাথায় না লেগে, পড়ল গিয়ে তার ঘাড়ে। তাতেই যা কাজ হবার হয়েছে। লোকটার হাত থেকে ছোরাটা ছিটকে গেল। ওইখানেই পড়ে-পড়ে যন্ত্রণায় কোঁতাতে-কোঁতাতে অজ্ঞান হয়ে গেল সে।

লোতিসাবা আর জোরুতসি দু-জনেই হাঁপাচ্ছে। তার ওপর জোরুতসির হাত দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। মনে হয় না, জোরুতসির ক্ষমতা খুব বেশি। কারণ সেই ক্ষতের দিকে এখন জোরুতসির নজর নেই। তার নজর এখন সেই লোকটার দিকে।

লোকটা কি মরল? এগিয়ে গেল দু-জনেই।

না মরেনি। আঘাতের চোটে এখন লোকটা আধমরা। একটি ঘায়েই কুপোকাত! এখন কোনো সন্দেহই নেই, খানিকপরে লোকটা খাবি খাবে। আঃ! বাঁচা গেল! একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল জোরুতসি। এবার লোতিসাবা জোরুতসির আহত হাতটা ধরে ফেলল। দেখতে-দেখতে বললে, ‘ক্ষতটা খুব বেশি নয়। তবে রক্তটা এখনই বন্ধ হওয়া দরকার। তুমি এখানেই একটু দাঁড়াও, আমি একটু ঝরনার জল নিয়ে আসি।

জোরুতসি বাধা দিল। বলল, ‘না, একা নয়। আমিও যাব।’

‘তুমি আমার সঙ্গে গেলে লোকটাকে দেখবে কে? এখনও তো মরেনি।

জোরুতসি বলল, ‘মরতে দেরি নেই। শ্বাস উঠছে।’ তারপর লোকটার কোমরের দিকে তাকাল। দেখল, কোমরের কাছে একটা উঁচুমতো কী যেন রয়েছে। জোরুতসি তাই আবার বলল, ‘ওর কোমরে ওটা কী দ্যাখো তো।’

লোতিসাবা লোকটার কোমরে হাত দিয়ে একটা থলি টেনে বার করল।

জোরুতসি বলল, ‘দ্যাখো, কী আছে?’

‘স্বর্ণমুদ্রা!’ প্রায় চিৎকার করে উঠল লোতিসাবা।

‘তাড়াতাড়ি তোমার কোমরে লুকিয়ে ফেলো।’ জোরুতসি ব্যস্ত হয়ে বলল লোতিসাবাকে।

লোতিসাবা ঝটপট মুদ্রার থলিটা নিজের কোমরে লুকিয়ে ফেলে জোরুতসির হাত ধরে ঝরনার দিকে চলে গেল। ঝরনার জলে জোরুতসির হাতের রক্তটা ধুয়ে ফেলে একটা গাছের পাতা জড়িয়ে দিল লোতিসাবা। জড়াতে-জড়াতে বলল, ‘ছোরাটা যে অমন চট করে তোমার গায়ে বসিয়ে দেবে, আমি কল্পনাও করতে পারিনি।’

জোরুতসি রাগে গর্জে উঠল, ‘শয়তান, শয়তান! শয়তানের মাথাতেই সৃষ্টি হয় খুনের কারখানা!’

লোতিসাবা বলল, ‘লোকটা বোধহয় তোমাকে আগেই চিনতে পেরেছিল।’

‘হয়তো।’

‘সেই কারণেই এত খাতির করছিল।’

‘শিরায়-শিরায় পাপ তো!’

হঠাৎ জোরুতসির আহত হাতের দিকে আর একবার নজর করল লোতিসাবা। বলল, ‘এখনও রক্ত গড়াচ্ছে যে!’

‘গড়াতে দাও।’ দৃঢ়কন্ঠে উত্তর দিল জোরুতসি। তারপর বলল, ‘এখান থেকে আমাদের এখনই সরে পড়তে হবে। বলা যায় না, কোত্থেকে বিপদ আসে!’

‘কিন্তু লোকটাকে একবার শেষ দেখা দেখে গেলে হয় না? যতই হোক আমাদেরই তো রাজা!’ বলল লোতিসাবা।

‘তোমার দয়া যে উথলে উঠছে!’ ঠাট্টার সুরে উত্তর দিল জোরুতসি। ‘তোমার ইচ্ছে হয়, যেতে পার। কিন্তু এই মুহূর্তে এটা কোনো জরুরি কাজ নয়। এখন জরুরি হচ্ছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এই জায়াগাটা আমাদের ছেড়ে যাওয়া।’ বলে জোরুতসি লোতিসাবার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করে দিল। এখন অন্তত একটা ব্যাপারে তারা নিশ্চিন্ত যে না-খেয়ে তাদের মরতে হবে না। থলিভর্তি স্বর্ণমুদ্রা তাদের সঙ্গে। সুতরাং চলো সামনে। পাহাড় ডিঙিয়ে, বন পেরিয়ে আর এক নতুন দেশে।

অনেকখানি হেঁটে তারা অনেকটা পথ পেরিয়ে এল।

এতক্ষণ দু-জনেই নি:শব্দে চলে এসেছে। অনেকক্ষণ পর লোতিসাবাই প্রথম কথা বলল, ‘এত স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে কী করব আমরা?’

জোরুতসি বলল, ‘কথাটা একজন জ্ঞানী ব্যক্তির মতো বলা হল কি? এই মুদ্রা লাগবে আমাদের চলতে-ফিরতে না-খেয়ে তো থাকতে হবে না। চাইকি, ওই স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে একটা ছোটোখাটো বাড়িও তো বানাতে পারি।’

‘জোরুতসি, আমরা যখন আশ্রয়-শিবির থেকে বেরিয়ে আসি তখন আমাদের হাতে একটা খাবারের বাণ্ডিল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এ স্বর্ণমুদ্রা আমরা যদি না পেতুম?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

জোরুতসি বলল, ‘কথা ছিল, আমি পুতুল তৈরি করব, তুমি ক্লাউনের খেলা দেখাবে।’

‘হ্যাঁ, আমরা বলেছিলুম, বৃদ্ধ হলেও আমরা দেখিয়ে দেব, নিজেদের পায়ে আমরা দাঁড়াতে পারি। কিন্তু এখন তো তা বলতে পারব না!’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

‘কেন?’

‘এ তো অন্যের ধন আমরা লুঠ করেছি।’

জোরুতসি বলল, ‘লোতিসাবা, তুমি এরই মধ্যে ভুলে গেলে, সে তোমার ছেলের প্রাণ নিয়েছিল।’

‘এ-কথা কেউ ভোলে না জোরুতসি।’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

‘সে আমায় জেলে পুরেছিল। কিছুক্ষণ আগেও তো সে আমাকে হত্যা করার জন্যে ছোরা মারে। এখন সেই খুনি রাজাকে শায়েস্তা করে আমরা স্বর্ণমুদ্রা জয় করেছি। একে লুঠ বলে না, বলে, বীরত্বের পুরস্কার।’

লোতিসাবা মুচকি হাসল। হেসে বলল, ‘কেউ কিন্তু কোনোদিন জানতেও পারবে না আমরা বীর।’

‘কেন?’

‘কাউকে তো আর বলতে পারব না এ-কথা!’

‘চুপ!’ হঠাৎ জোরুতসি চাপাস্বরে থামতে বলল লোতিসাবাকে।

থতমত খেয়ে গেল লোতিসাবা। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল?’

জোরুতসির চোখে অবাক চাউনি। লোতিসাবাকে বললে, ‘সামনে দেখতে পাচ্ছ?’

‘হ্যাঁ, একটি মেয়ে।’ লোতিসাবাও অবাক চোখে সেইদিকেই চাইল।

এতক্ষণ তারা গল্পে এমনই মশগুল ছিল, কখন যে বনের পথ শেষ হয়েছে, তা তাদের খেয়ালই নেই। এখন, এই মুহূর্তে তারা এক নগরের পথে পা দিয়েছে। সেই পথেই তাদের সামনে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখছে এই দুই বুড়োকে। মেয়েটি যে খুব ছোটো, তা নয়। খুব বেশি হলে, বয়স দশ কি এগারো বছর। চেহারাটা ঝকঝকে না হলেও মুখখানি মিষ্টি। যত্ন নেই। ফ্রকটা পরেছে, তাও ময়লা। পায়ে একটা জুতো না দিলেই নয়! কোনো ছিরিছাঁদ নেই।

মেয়েটি দুই বুড়োকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে এল। লোতিসাবা আর জোরুতসির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল।

লোতিসাবা জোরুতসির কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বললে, ‘দুই বুড়োকে দেখে মেয়েটির বোধহয় মজা লেগেছে।’

জোরুতসিও তেমনি গলা নিচু করে উত্তর দিলে, ‘ঠিকই বলেছ। বুড়োমানুষ দেখতে ছোটোদের এমনিতেই মজা লাগে।’

হঠাৎ মেয়েটি কথা কইল, ‘তোমরা কোথা থেকে আসছ?’

মেয়েটির কথা শুনে লোতিসাবা আর জোরুতসি প্রায় একই সঙ্গে বলে উঠল, ‘অনেকদূর থেকে। আমরা মুসাফির।’

সে একবার লোতিসাবার মুখের দিকে চেয়ে, আর একবার জোরুতসিকে দেখে বললে, ‘কী দশা হয়েছে তোমাদের!’ জোরুতসির আর একটু কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমার হাতে আবার কী হয়েছে?’

জোরুতসিকে কোনো কথা বলতে না দিয়ে, লোতিসাবাই তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘উঃ! সে ভীষণ কান্ড! ওকে কামড় দিয়েছে!’

মেয়েটি তার চোখদুটো বড়ো বড়ো করে তাকিয়ে লোতিসাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে কামড়াল?’

এবার জোরুতসি নিজেই উত্তর দিল, ‘শেয়াল, শেয়াল!’ বলে লোতিসাবার দিকে আড়চোখে চেয়ে মুচকি হাসল।

মেয়েটি অবশ্য মুচকি হাসিটা দেখতে পেল না। পেল না বলেই শেয়ালের নাম শুনে ভয়ে-ভয়েই জিজ্ঞেস করলে, ‘অনেকটা কামড়ে দিয়েছে?’

জোরুতসি উত্তর দিল, ‘শেয়ালের কামড় তো!’

সে জিজ্ঞেস করল, ‘খ্যাঁক করে লাফিয়ে উঠে কামড়ে দিল?’

লোতিসাবা বলল, ‘না, খ্যাঁক করে লাফাল না। খ্যাঁক করে ঝাঁপিয়ে পড়ে কামড়ে দিয়ে পালিয়ে গেল।’

‘ছুটে পালাল?’

‘তবে আর বলছি কী!’ উত্তর দিল লোতিসাবা।

মেয়েটির গলার স্বরটা যেন কেঁপে উঠল। বলল, ‘শেয়ালগুলো তো ভীষণ ধূর্ত! দেখেছে তোমরা বুড়োমানুষ। ছুটতেও পারবে না, ধরতেও পারবে না। তাই কামড়ে দিয়েই ছুট মেরেছে।’

লোতিসাবা দেখল, শেয়ালের গল্পটা বেশ টানতে-টানতে লম্বা হয়ে যাচ্ছে। আর একটু বেশি টানাটানি করলে, ধরা পড়ার ভয়। সুতরাং শেয়ালের গল্পটাকে আর না-টেনে সে অন্য কথা বলল। মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’

মেয়েটি বলল, ‘আমি যাব আর কোথা? আমি কি মুসাফির? আমি তো এইখানেই থাকি।’

‘এইখানে?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল লোতিবাবা।

‘এইখান মানে কি আর রাস্তায়?’

‘তবে?’

মেয়েটি বলল, ‘এসো আমার সঙ্গে!’

লোতিসাবা হয়তো বলে বসত ‘চলো’, কিন্তু জোরুতসি চট করে লোতিসাবার হাতটা ধরে ফেলল। সে তো আর ভুলে যায়নি, এমনি করে সেই আর একটি বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে সে কেমন নাকাল হয়েছিল। এখন, এই একজন অচেনা মেয়েকে নিয়ে যদি আবার ফ্যাসাদ হয়! সুতরাং লোতিসাবাকে সে বাধা দিল। জোরুতসির হাতের টানে চমকে ওর মুখের দিকে কেমন ফ্যালফ্যালিয়ে তাকাল লোতিসাবা। জোরুতসি চোখ মটকাল। ইশারায় বলতে চাইল, ‘না, যেও না।’

অগত্যা যাওয়া হল না।

সে জিজ্ঞেস করল, ‘যাবে না?’

জোরুতসি ঝটপট উত্তর দিল, ‘আরে, যেতে কী আছে, গেলেই হয়। কিন্তু অকারণে আমাদের জন্যে তোমার বাড়ির লোকজন ঝামেলায় পড়বেন! বরঞ্চ পরে দেখা যাবে।’

মেয়েটি জোরুতসির কথা শুনে, দুই বৃদ্ধের চোখের দিকে তাকাল খানিক। কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘না, ঠিক বলেছ। তোমাদের সেখানে না যাওয়াই ভালো।’

মেয়েটির এই কথা শুনে কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল দুই বৃদ্ধের মনে। লোতিসাবা আর থাকতে পারল না। জোরুতসির আগেই জিজ্ঞেস করে বসল, ‘কেন?’

‘জায়গাটা ভালো নয়!’ মেয়েটি উত্তর দিল।

লোতিসাবা আর জোরুতসি মেয়েটির কথা শুনে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। লোতিসাবাই আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ভালো নয়? এ-কথা কেন বলছ?’

মেয়েটি শান্তগলায় বলল, ‘আমার নিজের বাড়ি তো নেই। আমার নিজের কেউ-ই নেই। আমি থাকি একটা ভাঙা পোড়োবাড়িতে।

‘একা?’

সে হেসে উঠল। তারপর বললে, ‘না, থাক সেসব কথা। আমি যাই।’

চলেই যাচ্ছিল। জোরুতসি জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমার নামটা বললে না?’

‘সুনি-ই-ই-ই।’ দূর থেকে হঠাৎ একটা কর্কশ গলার চিৎকার শোনা গেল। কে যেন ডাকতে-ডাকতে এগিয়ে আসছে এই দিকেই। মনে হল, সেই ডাক শুনে মেয়েটি ভয় পেয়েছে। জুজুর মতো তাকাল লোতিসাবা আর জোরুতসির মুখের দিকে। লোতিসাবা আর জোরুতসি দু-জনেই বুঝতে পারল, মেয়েটির নাম সুনি। লোতিসাবাই জিজ্ঞেস করল, ‘তোমাকে কেউ ডাকছে?’

‘হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি।’ ভীষণ ভয় পেয়ে সে বলল।

‘কে ডাকছে? ভয় পাচ্ছ কেন?’

‘না, কিছু না।’ বলে সে নিমেষের মধ্যে ছুটে পালাল।

হতভম্বের মতো চেয়ে রইল লোতিসাবা সেইদিকে। জোরুতসি বললে, ‘আমার মনে হচ্ছে, এখানে আর না-দাঁড়ানোই ভালো।’

‘কেন?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘ব্যাপারটা খুব সুবিধের বলে মনে হচ্ছে না।’ উত্তর দিল জোরুতসি।

‘একটু দাঁড়াও! ওই তো একটা লোক মেয়েটাকে ডাকতে-ডাকতে এদিকেই আসছে।’ বলল লোতিসাবা।

সত্যিই একটা লোক তাদের সামনে এসে দাঁড়াল। মুখ ভর্তি খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফ। গায়ের জামাটা বা পরনের প্যান্টটা, চাইকি পায়ের জুতোটি পর্যন্ত টুটা-ফাটা। মাথায় টুপি নেই বলে আধপাকা চুলগুলোতেও যে অনেকদিন চিরুনির আঁচড় পড়েনি, বেশ বোঝা যায়। দাঁতে কালচে-কালচে ছোপ। হয়তো লোকটার বয়স হবে লোতিসাবা বা জোরুতসির অর্ধেক, কিন্তু দেখলে মনে হয় যেন এইমাত্তর ভাগাড় থেকে উঠে এল। যেমন ল্যাকপেকে চেহারা, তেমনি খ্যানখ্যানে গলার স্বর।

এতক্ষণ বেদম চিৎকার করে কতবার যে ‘সুনি, সুনি’ বলে ডাকল তার হিসেব পাওয়া ভার। ডাকতে-ডাকতেই সে এগিয়ে আসছিল। দেখতে পেল লোতিসাবা আর জোরুতসিকে। অচেনা দুই বুড়োমানুষকে দেখে লোকটা ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল কিনা জানি না, কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সাড়াশব্দ না করে তাকিয়ে রইল ওদের মুখের দিকে। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘মহাশয়রা?’

‘আমি লোতিসাবা।’

‘আমি জোরুতসি।’

‘এদেশে এই প্রথম?’

‘হ্যাঁ, তা বটে।’

‘উদ্দেশ্য?’

‘আমরা মুসাফির।’

‘ও। তা এ-পথ দিয়ে একটি মেয়েকে যেতে দেখেছেন কি?’ সে জিজ্ঞেস করল।

‘তার নাম যদি সুনি হয়, তবে দেখেছি।’ বলল লোতিসাবা।

‘হ্যাঁ, সুনি, সুনি।’ লোকটা ভীষণ ক্ষিপ্তস্বরে হাতের আঙুল বাড়িয়ে ঘাড় নাড়ল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কোনদিকে গেল?’

‘এইপথেই গেল।’

মেজাজটা যে তার সাংঘাতিকরকম বিগড়ে গেছে, এই মুহূর্তে তার মুখের চেহারাটা দেখলেই বোঝা যায়। একেবারে অগ্নিশর্মা হয়ে সে চিল্লিয়ে উঠল, ‘আবার গেছে। আমাকে অচ্ছেদ্দা! পড়েছিলি রাস্তায়। তুলে এনে খাইয়ে-পরিয়ে মানুষ করলুম, তা আমাকেই তুই তাচ্ছিল্য করিস! দাঁড়া, আজ ঠেঙিয়ে তোর হাড় একদিকে আর মাস একদিকে করে ছাড়ব।’ বলে লোকটা ফোঁস ফাঁস করতে-করতে চলে গেল।

জোরুতসি বলল, ‘লোতিসাবা, আমাদের এখানে আর একদন্ড দাঁড়ানো ঠিক নয়।’

‘ভয় পেয়ে গেলে নাকি?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘ভয় না-পেলেও , ঝামেলায় পড়তে রাজি নই।’ উত্তর দিল জোরুতসি।

‘আমার কিন্তু মনে হয় লোকটা এক নম্বরের শয়তান। এই শয়তানটার খপ্পরে পড়েছে মেয়েটা।’ বলল লোতিসাবা।

জোরুতসি একটু গলা উঁচিয়েই বললে, ‘কে কার খপ্পরে পড়ল, এখন সে নিয়ে আমরা মাথা ঘামাতে যাই কেন! আমাদেরই কে দেখে!’

‘অত নির্দয় হোয়ো না জোরুতসি,’ বলল লোতিসাবা, ‘একটি শিশুকে ভালোবেসে তুমি একদিন জেল খেটেছ, তার মানে এই নয়, আর একটি শিশুর প্রতি অবিচার দেখলে আমরা মুখ বুজে সহ্য করে যাব। তুমি এসো আমার সঙ্গে।’

‘লোতিসাবা, তুমি ভুল পথে পা বাড়াচ্ছ।’

‘না’, লোতিসাবা চিৎকার করে উঠল, ‘আমি মনে করি তুমিই আমাকে ভুল পরামর্শ দিচ্ছ।’

কিন্তু ওই একটা কথাতেই জোরুতসি ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিবাদ করে উঠল, ‘লোতিসাবা, তুমি আমাকে বোকা ভাবতে পার, ভাবো। কিন্তু তবু আমি বলছি, অন্যের ব্যাপারে নাক গলিয়ে আমাদের বিপদ ডেকে আনা উচিত নয়। তুমি যদি বিপদ ডাকতে চাও, আমি আপত্তি করবই।’

লোতিসাবাও ছাড়বার পাত্তর নয়। সে তেমনি চিৎকার করেই বললে, ‘জোরুতসি, আমি তোমাকে কখনোই বোকা ভাবিনি। আমি তোমাকে বোকা না-ভেবে যদি গাধাও ভাবতুম, তুমি কি সেটা আমার মনের ভেতর ঢুকে জেনে আসতে পারতে? আমি মনে করি, এই মেয়েটির ব্যাপারে আমাদের একটা কর্তব্য আছে। অন্তত জানা দরকার মেয়েটি সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে কিনা। জোরুতসি, একসময়ে আমরাও তো ছেলে-মেয়ের বাপ ছিলুম। আমরাও তো মনে করতে পারি—’

হঠাৎ থমকে চুপ করে গেল লোতিসাবা। চমকে উঠল জোরুতসি। স্পষ্ট শুনতে পেল সেই লোকটার গাঁকগাকানি। যেদিক থেকে তার গলার শব্দ ভেসে আসছিল, সেদিকে চটপট চোখ ফেরাতেই তারা দেখতে পেল, সেই সুনি নামে মেয়েটির নড়া টানতে-টানতে লোকটা তাকে এদিকেই নিয়ে আসছে। লোতিসাবা থাকতে পারল না। ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ওহে ভাই, মেয়েটাকে মারছ কেন?’

‘বেশ করব মশাই।’ সে চিৎকার করে উত্তর দিল, ‘বজ্জাতি করে বেড়ালে তাকে কোলে নিয়ে আদর করতে হবে?’ সে উত্তেজনায় হাঁপাচ্ছে।

লোতিসাবা আর জোরুতসি এখন দু-জনেই দেখতে পেল, সেই ছোট্ট মেয়েটির দু-গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে।

লোতিসাবা সেই মেয়েটির চোখের জল দেখে যেন আর থাকতে পারল না। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে সে জিজ্ঞেস করে বসল, ‘এই বাচ্চাটিকে মারার অধিকার তোমায় কে দিয়েছে?’

আর দেখতে! লোকটা একেবারে ফেটে পড়ল। গলার স্বরটা ক্যারকেরিয়ে সে উত্তর দিল, ‘তুমি কে হে, আমার কৈফিয়ত তলব করার?’

‘মেয়েটিকে তুমি মারতে পারবে না।’ বেশ চড়া গলায় বলল লোতিসাবা।

সে তেমনি বিচ্ছিরি মেজাজে খেঁকিয়ে উঠল, ‘হুকুম করতে এসো না আমায়। আমি মারব। বেশ করব মারব। এক-শো বার মারব। এই দ্যাখো আমি মারছি। ক্ষমতা থাকে বাঁচাও!’ বলে লোকটা সুনির গালে, মাথায় বেধড়ক চড়চাপড় ঘুসি মারতে লাগল।

ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে এল লোতিসাবা। লোকটার হাতটা চেপে ধরল। তারপর ধমক মেরে বলে উঠল, ‘মেয়েটাকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনে দুটো খেতে-পরতে দাও বলে মেয়েটাকে অমন নির্দয়ভাবে মারবে! গা-জোয়ারি করার জায়গা পাওনি!’

ব্যস! এতেই হয়ে গলে উলটো কান্ড! লোতিসাবা লোকটার হাতটা ধরতেই সে চেঁচাল, ‘তুমি আমার গায়ে হাত দিলে কেন?’

‘তুমি মেয়েটার গায়ে হাত তুলছ কেন?’ চড়া গলাতেই লোতিসাবা বলল।

সে একটা ঝটকা মেরে, লোতিসাবার হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে রাগে দিগবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বলল, ‘ব্যাটা বুড়ো, থুত্থুড়ো, আমার গায়ে হাত দিস!’ বলে প্রায় চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠে পাড়া মাথায় করলে।

দেখতে-দেখতে লোকটার সাঙ্গোপাঙ্গরা হাজির। মেয়েটা তো ভয়ে তটস্থ। সাঙ্গোপাঙ্গদের চেহারা কী! চেহারা দেখলে কী দরের লোক তা বুঝতে বাকি থাকে না! সুতরাং তাদের যা স্বভাব! কোনো কিছু না শুনেই লাগিয়ে দিলে হম্বিতম্বি। চিৎকার-চেঁচামেচি। লোতিসাবা যতই গলা ফাটিয়ে বলবার চেষ্টা করুক সে নির্দোষ, কার কানে ঢুকছে সে-কথা। লোতিসাবাকে একেবারে নাজেহাল করে ছাড়ল। বেচারা লোতিসাবা! তাও এমনি চেঁচামেচি করেই যদি ব্যাপারটা শেষ হয়ে যেত তাহলেও কথা ছিল। মাঝে মাঝে ওই সাঙ্গোপাঙ্গরা এমন হাত-টাত গুটিয়ে লোতিসাবার দিকে তেড়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল, এই বুঝি ঝাড়ল বুড়োর মুখে একখানা ঘুসি!

হট্টগোলটা যখন একটু থিতিয়ে এল, তখন দলের পান্ডাটা লোতিসাবার সামনে দাঁড়িয়ে শাসিয়ে গেল, ‘বুড়োমানুষ, বুড়োর মতো থাকবে। বেশি বাড়াবাড়ি করলে, একটা ঠ্যাং খুলে নিয়ে জন্মের মতো ল্যাংড়া করে ছেড়ে দেব। আজ বাদে কাল পটল তুলবে, তবু তেজের বহর দ্যাখো!’ বলে লোকটা দলের আর সবাইকে ডেকে নিলে, ‘চলে আয় সব।’ তারপর মেয়েটার কাছে গেল। তার মাথার চুলের ঝুঁটিটা খামচে ধরে বললে, ‘এই সুনি, ফের যদি জানতে পারি তুই বেয়াদপি করছিস, কথা শুনছিস না, গলা টিপে মেরে ফেলব। বজ্জাত কোথাকার!’ তারপর গজগজ করতে করতে চলে গেল।

সঙ্গেসঙ্গে চলে গেল সেই লোকটাও, সুনিকে টানতে টানতে।

অপমানে ঘেন্নায় নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল বুড়ো লোতিসাবা সেইখানে। তবে কি জোরুতসির পরামর্শ না শুনে সে ভুল করল!

আশ্চর্য! এত যে কান্ড হয়ে গেল, এতক্ষণ পর্যন্ত জোরুতসি মুখ ফুটে একটি টুঁ শব্দ পর্যন্ত করেনি। চুপটি করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল। না কোনো উত্তেজনা, না কোনো উদ্বেগ। একবারও সে এগিয়ে আসেনি ওই অভদ্র লোকগুলোর হাত থেকে লোতিসাবাকে বাঁচাতে। যখন সব ঝামেলা কেটে গেল তখন হঠাৎ সে ডাক দিল, ‘লোতিসাবা!’

লোতিসাবা কটমট করে চাইল তার দিকে।

জোরুতসি তার চোখের দিকে চেয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘এবার কী করবে?’

লোতিসাবার যেন রাগে গা রি-রি করে উঠল। কোনো উত্তরই দিল না।

জোরুতসি আবার বলল, ‘আশা করি যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে তোমার?’

যেন ফেটে পড়ল লোতিসাবা। বলল, ‘তুমি যথেষ্ট খুশি হয়েছ?’

জোরুতসি এবার লোতিসাবার হাতে হাত রাখল। বলল, ‘আমাকে তোমার শত্রু ভেব না লোতিসাবা। তোমার এই অপমান আমাকে খুশি করবে, এটা তুমি কেমন করে ভাবলে? আমি খুশি হব তখন, যখন ওই মেয়েটিকে ওই দূর্বৃত্ত্তদের হাত থেকে রক্ষা করতে পারব।’

চকিতে লোতিসাবার মুখখানা খুশিতে ঝলসে উঠল। প্রায় লাফিয়ে উঠে সে জোরুতসিকে জড়িয়ে ধরল। বলল, ‘তুমি আমার সত্যিকারের বন্ধুর মতো কথা বলেছ জোরুতসি। আমিও ঠিক এই কথাই ভাবছিলুম, মেয়েটিকে আমাদের রক্ষা করতে হবে।’

‘কিন্তু লোতিসাবা, ভাবা এক জিনিস আর কাজে করা আর এক জিনিস। কিন্তু ভেবেছ কি, কেমন করে রক্ষা করবে? ওর চারপাশেই তো যমদূতরা নজর রেখে ঘুরঘুর করছে।’

লোতিসাবা বলল, ‘তাই বলে আমাদেরও ভয় পেলে চলবে না। চলো, দেখি মেয়েটিকে ওরা কোথায় নিয়ে গেল।’

জোরুতসি ঘাড় নেড়ে বলল, ‘না, এখন না। আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে।’

‘কতক্ষণ?’ জিজ্ঞেস করল লোতিসাবা।

‘যতক্ষণ না রাত আসে।’ উত্তর দিল জোরুতসি।

‘‘ততক্ষণ কী করব আমরা?’

‘আমাদের কিছু খেয়ে নেওয়া দরকার,’ বলল জোরুতসি, ‘চলো এখানে কোনো পান্থনিবাস আছে কিনা দেখি! তোমার কোমরে স্বর্ণমুদ্রার থলিটা ঠিক আছে তো?’

থতমত খেয়ে গেল লোতিসাবা। তাই তো, এতক্ষণ সেটার কথা তো মনেই ছিল না। তাড়াতাড়ি কোমরে হাত দিল লোতিসাবা। উফ খুব বাঁচোয়া! আছে, আছে! নিশ্চিন্তে একটা নিশ্বাস ফেলল লোতিসাবা। তারপর বলল, ‘থলির কথাটা একদম ভুলে বসেছিলুম।’

জোরুতসি বলল, ‘একটু আড়ালে চলো। একটা মুদ্রা বার করতে হবে। একটাতেই চলে যাবে। সোনা তো অনেক দাম। থলিতে কটা আছে বলে তোমার মনে হয়?’

লোতিসাবা খুব উৎসাহের সঙ্গেই বলল, ‘অনেক—অনেক। থলিভর্তি সোনা।’

জোরুতসি মৃদু হাসল। তারপর বলল, ‘আমরা দু-জন যে কটা দিন বাঁচব, মনে হয় ভালোভাবেই চলে যাবে।’

লোতিসাবা বলল, ‘ভালোভাবে কী বলছ, বলো রাজার হালে কেটে যাবে।’ বলতে-বলতে আড়ালে চলে গেল লোতিসাবা। থলি থেকে একটা সোনার মুদ্রা বার করে আনল।

এই সময়টায় এই নগরে বহু তীর্থযাত্রী আসেন। কারণ এখানে আছে বহু প্রাচীন এক গির্জা। এই গির্জার যিনি প্রতিষ্ঠাতা তাঁর জন্মদিনের উৎসব হয় অনেক ধুমধামের সঙ্গে। তাই জায়াগাটা ছোটো হলেও এই সময়ে খুব জমজমাট। লোতিসাবা আর জোরুতসি প্রথমটা পান্থনিবাস খুঁজে-খুঁজে হয়রান হলেও, জুটে একটা গেল। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাটা ভালোই। আরামে থাকার চিন্তা তো তারা করছে না। এখন কেমন করে মেয়েটাকে রক্ষা করবে এই চিন্তাই তাদের পেয়ে বসেছে। সুতরাং একটুও সময় নষ্ট না-করে তারা পান্থনিবাস থেকে পেটে দুটো কিছু দিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

পথে-ঘাটে বেশ ভিড়। দুই বুড়ো সেই ভিড়ের মধ্যে এদিক-ওদিক দেখতে-দেখতে হাঁটতে লাগল। তারা জানে না, কোনদিকে গেলে সেই পোড়ো-বাড়িটার খোঁজ পাবে। তা ছাড়া খোঁজ পেলেই যে মেয়েটাকে তারা সঙ্গেসঙ্গে উদ্ধার করে ফেলবে, এ-কথাটা মনে করাই তো ভুল। হাঁটতে-হাঁটতে লোতিসাবাই কথাটা তুলল। বলল, ‘মনে হয় না, কাজটা খুব সহজ হবে।’

জোরুতসি সায় দিল। বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। তবু হাল ছাড়লে চলবে না।’

‘হাল ছাড়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু অন্য একটা কথা ভাববার আছে।’ বলল লোতিসাবা।

‘কী বলো তো?’ জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

‘মেয়েটা নিজেই যদি বেঁকে বসে! আমাদের সঙ্গে যেতে না চায়!’

‘সে-কথাটাও ভাববার, ‘বলল জোরুতসি। একটু চুপ করে রইল। তারপরেই বলল, ‘অবশ্য সেটা পরের কথা। আগের কথা হল, তার সেই পোড়ো-বাড়িটা খুঁজে বার করা।’

নগরের পথে হাঁটতে-হাঁটতে ওদের বুঝতে দেরি হল না, পথের মানুষজন তাদের দিকে বেশ কৌতূহল নিয়েই তাকিয়ে-তাকিয়ে দেখছে। খুবই স্বাভাবিক। যতই হোক দু-জনেই তো বুড়ো। হতে পারে, একসঙ্গে হেঁটে-চলা ঠুকঠুক করে অথবা সাজপোশাকের বেহাল দেখে মজা লাগছে। এ আবার আর এক ফ্যাসাদ। নির্ঝঞ্ঝাটে পথ চলারও উপায় নেই। লোতিসাবা, জোরুতসি দু-জনেই কখনো মুখ ঘুরিয়ে, কখনো মুখ নামিয়ে নিজেদের লুকিয়ে রাখবার চেষ্টা করল।

হঠাৎ যেন থমকে যায় লোতিসাবা আর জোরুতসি। কোথায় যেন হারমোনিয়ামের বাজনা বাজে! একটা ট্যামবুরিনের শব্দ শোনা যায়! সেই বাজনার দিকে কান পেতে ওরা একটু এগিয়ে যেতেই দেখতে পেল, একদল লোক বেশ জমিয়ে ভিড় করে কী যেন দেখছে। দেখছে আর সেই বাজনার তালে-তালে ‘আহা, ওহো’ করে চেঁচিয়ে উঠছে। এগিয়ে গেল লোতিসাবা, জোরুতসি সেই দিকেই। বৃদ্ধমানুষ দু-জন ভিড়ের মধ্যে মাথা গলিয়ে চমকে ওঠে। এবং তারা স্পষ্ট দেখতে পায়, সেই মেয়েটিকে। দেখতে পায় সেই লোকটাকে! মেয়েটি ট্যামবুরিন বাজিয়ে নাচছে আর লোকটা হারমোনিয়ামে নাচের সুর বাজাচ্ছে। চোখের পাতা পড়ে না দুই বুড়োর। এত চমৎকার নাচের বহর, দেখতে দেখতে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য আর কিছু খেয়ালই রইল না তাদের। নিজেদের অজান্তে সেই মুহূর্তে তারা যেন এক খুশির রাজ্যে পৌঁছে গেছে। এখন আর এটা অজানা নয় যে, এভাবে মেয়েটা নাচে আর লোকটা পয়সা উপায় করে। সুতরাং এ-মেয়েকে উদ্ধার করা যে কী দুঃসাধ্য সে না বললেও বুঝতে বাকি থাকে না।

হঠাৎ নাচ দেখতে-দেখতে জোরুতসি লোতিসাবার জামাটা ধরে টান দিল।

লোতিসাবা চমকে তাকাল।

ইশারা করল জোরুতসি।

ভিড় ঠেলে বেরিয়ে এল লোতিসাবা।

‘এসো।’ চুপিসাড়ে ডাকল জোরুতসি।

লোতিসাবা তাকে অনুসরণ করল।

একটু আড়ালে এসে দাঁড়াল দু-জনে। জোরুতসি একটু গম্ভীর হয়ে বললে, ‘মেয়েটিকে আমরা খুঁজে পেয়েছি। নাচ শেষ না-হওয়া পর্যন্ত আমাদের এখানে অপেক্ষা করতে হবে।’

লোতিসাবা বললে, ‘নাচ শেষ হলে তখন কী করবে?’

‘ওদের গতিবিধি লক্ষ রাখব।’

‘আমাদের যদি কেউ সন্দেহ করে?’

‘যতটা সম্ভব নিজেদের লুকিয়ে রাখতে হবে।’

‘গোয়েন্দাদের মতো?’

‘অনেকটা তাই।’

মৃদু হাসল লোতিসাবা। তারপর বলল, ‘শেষ বয়সে আমাদের গোয়েন্দাও হতে হল।’

জোরুতসিও মুচকি হাসল। বলল, ‘হতে পারলে ভালোই। আজকাল গোয়েন্দাদের বাজারটা বেশ চড়া।’

তারপর দু-জনেই একসঙ্গে হেসে উঠল।

অবশ্য খানিক পরেই নাচ থেমে গেল। সুতরাং বেশিক্ষণ উৎকন্ঠা নিয়ে ওদের বসে থাকতে হল না। নাচ-দেখার ভিড়টা আস্তে-আস্তে হালকা হতেই জোরুতসিই মুখ খুলল। বলল, ‘এবার লোকটা আমাদের দেখে ফেলবে।’

লোতিসাবা বলল, ‘চলো, আর একটু আড়ালে চলো।’

‘কেন?’

‘এসো, বলছি।’ লোতিসাবা জোরুতসির হাত ধরে আর একটু আড়ালে এসে বলল, ‘আমার মাথায় একটা মতলব এসেছে।’

‘কী?’ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল জোরুতসি।

‘তুমি যদি বল, তাহলে লোকটাকে একটা স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে আসি।’

আঁতকে উঠল জোরুতসি। বলল, ‘এ তোমার কী আজগুবি মতলব!’

‘আজগুবি নয় জোরুতসি। মেয়েটাকে উদ্ধার করতে গেলে আমার মনে হয়েছে, লোকটাকেই আগে হাত করা দরকার।’ জবাব দিল লোতিসাবা। ‘তুমি এসো আমার সঙ্গে। দ্যাখো, আমি কী করি!’

‘বলছ যাচ্ছি। কিন্তু দেখো, আবার ঝঞ্ঝাটে না পড়ে যাই।’ বলে জোরুতসি লোতিসাবার কথায় সায় দিয়ে ওর সঙ্গ নিল।

লোকটা মেয়েটিকে নিয়ে প্রায় হাঁটতে যাচ্ছিল। কারণ নাচ শেষ, লোকজনও প্রায় সাফ। ঠিক সেই সময় একটু দূর থেকেই হাঁক দিল, ‘আরে ভাই ওস্তাদজি, একটু দাঁড়াবে?’

তাই তো! ওস্তাদজি বলে তাকে আবার কে ডাকে! হাঁটা তার হল না। যেখানে দাঁড়াল সেখান থেকেই মুখ উঁচিয়ে দেখল। ততক্ষণে লোতিসাবা, জোরুতসি দু-জনেই তার সামনে চলে এসেছে। এই দুই বুড়োকে চিনতে তো তার দেরি হল না। চিনতে পেরেই সে গম্ভীর হয়ে গেল। খ্যাঁকখ্যাঁকে গলায় জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমরা সেই বুড়ো দুটো না?’

লোকটা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে কথা বললে কী হবে! লোতিসাবা মুখের হাসিটি কিন্তু মুখ থেকে মুছে ফেললে না। হাসি-হাসি মুখে গদগদ হয়ে বললে, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ বুড়ো। তুমি তো ভাই এই বুড়ো দুটোকে একেবারে কামাল করে দিয়েছ! তুমি যে এত বড়ো ওস্তাদ লোক, আমাদের জানাই ছিল না।’

লোকটা লোতিসাবার হাসি দেখে অথবা কথা শুনে এতটুকু টসকাল না। তেমনি খেঁকুরের মতো খিটখিটিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘ওস্তাদির কী দেখলে?’

‘ওস্তাদি নয়? আরে ভাই কী বলছ তুমি? যেমন তোমার এই মেয়ের নাচ, তেমনি তোমার বাজনার হাত! ক্যায়া বাত! ক্যায়া বাত! আমি আর আমার এই বন্ধু তোমাদের এই কেরামতি দেখে তো একেবারে মাত হয়ে গেছি! তোমার মতো এমন একজন ওস্তাদ লোককে রাস্তায় ঘুরে-ঘুরে পয়সা রোজগার করতে হচ্ছে দেখে, আমাদের লজ্জায় মাথা হেঁট হয়ে গেছে। গুণীর গুণের তারিফ করার মতো সেই লোক তো দেশ থেকে ক্রমেই কমছে। হায়! হায়! কী মানুষের কী দশা! তা ভাই একটু যদি সাহস দাও তো একটা কথা বলি!’

‘কী কথা?’

‘তোমার এই ওস্তাদির দাম দেবার মতো আমাদের কাছ আপাতত একটি সোনার মুদ্রা আছে। তুমি যদি সেটি গ্রহণ কর, আমরা ধন্য হই।’ বলে লোতিসাবা হাতের মুঠো খুলে সোনার মুদ্রাটা ওর চোখের সামনে ধরলে।

আর দেখতে! লোকটার তো চক্ষু ছানাবড়া। কী রে বাবা! সে স্বপ্ন দেখছে না, গপ্প শুনছে! তার চোখের সামনে একটা স্বর্ণমুদ্রা! হঠাৎ তার খিটমিটে মেজাজটা কেমন যেন হাসি-পায়, হাসি-পায় করে খুশিতে ঝলসে উঠল। দু-টি হাত প্রায় আকাশে তুলে নৃত্য করতে-করতে লোকটা বলে উঠল, ‘একেই বলে সমঝদার! আমি অনেক দেখেছি, অনেক ঘুরেছি কিন্তু আপনাদের মতো এমন সমঝদার আদমি কোথাও দেখিনি।’ তারপর সোনার মুদ্রাটা প্রায় খামচে লোতিসাবার হাত থেকে নিজের হাতে নিয়ে প্যাট-প্যাট করে দেখতে লাগল। যখন সে বুঝতে পারল, মুদ্রাটা সত্যিই সোনার, তখন লোভে তার চোখ ঠিকরে পড়ে আর কী! কী করবে, কোথায় রাখবে কিচ্ছু ভেবে না পেয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘মাপ করুন দাদারা, আমি তখন বুঝতে পারিনি, আপনাদের এত বড়ো দিল!’

লোতিসাবা এই ফাঁকে একবার আড়চোখে দেখে নিল জোরুতসির দিকে। কেননা, লোকটা এতক্ষণ যাচ্ছেতাই ভাবে ‘তুমি-তুমি’ করে ডাকছিল। এখন ‘আপনি-আপনি’ করতে শুরু করেছে। মানে, ওষুধ কাজে লেগেছে! জোরুতসিও ব্যাপারটা বুঝেছে। তাই চোখ মটকে মুচকি হাসল।

সঙ্গেসঙ্গে লোতিসাবা লোকটাকে জিজ্ঞেস করলে, ‘তুমি কখন আমাদের বুঝতে পারনি ভাই?’

‘সেই যে তখন, সুনিটা খেলতে পালিয়েছিল। আমি ধরে আনলুম। মারলুম। আপনারা আপত্তি করলেন!’

‘ও হো-হো-হো।’ যেন ব্যাপারটা তেমন কিছু নয়, এরকম একটা ভাব দেখিয়ে লোতিসাবা হেসে উঠল। হাসতে-হাসতেই বলল, ‘ওটা কি আর মনে রাখবার মতো একটা ব্যাপার!’

এবারে একেবারে কাঁচুমাচু হয়ে লোকটা বলল, ‘আমার অপরাধ মাপ করে দিন বাবু।’

‘আরে না, না। তুমি কোনোই অপরাধ করনি। আমরাও কিছু মনে করিনি। তোমার মতো এমন একজন এলেমদার লোকের দেখা পাওয়াই তো ভাগ্যের কথা!’

লোকটা লোতিসাবার কথায় একেবারে শেয়ালের ল্যাজের মতো নেতিয়ে পড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বাবুরা আসছেন কোত্থেকে?’

‘অনেকদূর থেকে।’ বলেই লোতিসাবা লোকটাকে আর কিছু বলতে না-দিয়ে নিজেই বললে, ‘তোমার ওস্তাদির খেলাটা ভিড়ের মধ্যে দেখে মনটা ঠিক ভরল না।’

সে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘কেন বাবু? আবার বলেন তো দেখাতে পারি।’

‘কোথায় দেখাবে? এখানে? আবার লোক জমে যাবে।’ লোতিসাবা উত্তর দিল।

লোকটা বলল, ‘আরে ছ্যা: ছ্যা:! এখানে কেন! আমার ডেরায় চলুন না বাবু?’

‘কতদূর তোমার ডেরা?’

‘কাছেই।’

‘তোমার কোনো অসুবিধা নেই তো?’

‘কী বলছেন বাবু! আমার ডেরায় আপনাদের পায়ের ধুলো পড়বে, এর চেয়ে আর আনন্দের কী আছে!’

‘তবে চলো।’ বলে লোতিসাবা জোরুতসিকে ইশারা করল। জোরুতসি পা বাড়াল।

এতক্ষণ পর্যন্ত সেই মেয়ে সুনি মুখ ফুটে একটি কথাও বলেনি। শুধু শুনে গেছে লোকটার সঙ্গে লোতিসাবার কথাবার্তা। কথা বলেনি হয়তো ভয়ে। কিন্তু তার মুখে হাসি ফুটল যখনই সে দেখল, লোতিসাবা আর জোরুতসি দু-জনেই তাদের ডেরায় যাচ্ছে। ভয়ের ছায়াটা তার মুখ থেকে নিমেষে সরে গেছে।

লোকটা, লোতিসাবা আর জোরুতসিকে একটা পোড়োবাড়ির ভাঙা ঘরে নিয়ে এল। লোকটার যেমন ছিরি, ডেরাটাও যে তেমনই হবে, এ তো জানা কথা। ছোট্ট ঘর, চুন-বালি খসে গিয়ে যেন দাঁত ছরকুটে দাঁড়িয়ে আছে। দেওয়ালের ইটের ফাঁকে-ফাঁকে বড়ো-বড়ো গর্ত। সাপ-খোপ সেখানে ছানাপোনা নিয়ে সহজেই ঘরসংসার পাততে পারে! যত রাজ্যের নোংরা। একটা তেল-চিটচিটে শতচ্ছিন্ন শতরঞ্চি এবড়ো-খেবড়ো ঘরের মেঝেয় বিছিয়ে দিলে। বললে, ‘বসুন,। আমি গরিব-লোক বাবু। কষ্ট হলে ক্ষমা করে নেবেন।’

লোতিসাবা বলল, ‘না, না। তাতে কী হয়েছে। আমাদেরই কি রাজার বাপের মতো হাল!’ বলে দুই বৃদ্ধই বসে পড়ল।

সে বলল, ‘না বাবু, তা হলেও—’

কথা শেষ হবার আগেই লোতিসাবা বলল, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, এখন শুরু করে দাও।’

বলতে-বলতেই লোকটা হারমোনিয়ামের রিড টিপলে। মেয়েটি পায়ে ঘুঙুর বাঁধল। হাতে ট্যামবুরিন নিলে। তারপর শুরু হয়ে গেল নাচ আর বাজনা। অবিশ্যি ঘরটা ছোটো বলে তেমন খেলিয়ে-ছড়িয়ে নাচটা করতে পারছিল না মেয়েটি। কিন্তু তাহলেও তার নাচ দেখে দুই বুড়ো থ মেরে গেল।

নাচ শেষ হলে দুই বুড়োর সে কী তারিফ করার ধুম। লোতিসাবা তো এমন বিভোর হয়ে গেছল যে, ফস করে তার কোমরের থলিটা টেনে আর একটা সোনা বের করে ফেলেছিল প্রায়। জোরুতসির ভাগ্যিস নজরে পড়ে গেল! কটাস করে একটা চিমটি কেটে দিল লোতিসাবার হাতে। লোতিসাবা সঙ্গেসঙ্গে নিজের ভুলটা বুঝতে পেরে কোমর থেকে হাতটা সরিয়ে নিল বটে, কিন্তু সেই লোকটার দৃষ্টি এড়াল না। লোকটা দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেয়েই ঝট করে চোখটা ঘুরিয়ে নিলে। লোতিসাবার কোমরে যে কী আছে সেটা বুঝতে তার সময় লাগল না। মনে-মনে সে যে একটা ফন্দিও এঁটে ফেলেছে, লোতিসাবা আর জোরুতসি তা জানতেও পারল না। এই রে! লোকটা বুঝি লোতিসাবার কোমর থেকে এক্ষুনি সোনার মুদ্রা কেড়ে নেয়!

না, সঙ্গেসঙ্গে সে কিছু করল না। মাথায় বদ মতলবটা এসেছিল বলেই বোধহয় এখন সেটা মনের ভেতর চেপে রেখে, সে লোক-দেখানোর অছিলায় খুশিতে ডগমগ করতে লাগল। তারপর বললে, ‘বাবুরা যখন গরিবের ঘরে দয়া করে এলেন, তখন খানাপিনা না-করিয়ে ছাড়ছি না।’

লোতিসাবার ভেতরে-ভেতরে ষোলোআনা ইচ্ছে থাকলেও ভনিতা করতে ছাড়ল না। বলল, ‘আরে না, না। ওসব করতে হবে না।’

সে বলল, ‘তাই কি হয় বাবু, আপনারা আমার অতিথি।’

‘না রে ভাই, ওসব কিচ্ছু করতে হবে না। আমরা এক্ষুনি চলে যাব। আমরা মুসাফির।’

লোকটাও তেমনি নাছোড়বান্দা। বললে, ‘এক্ষুনি কোথায় যাবেন বাবু। আজ আপনাদের যাওয়াই হবে না। কাল এখানে খুব বড়ো উৎসব হবে। ওই যে গির্জাটা দেখলেন না বাবু, ওই গির্জা যিনি স্থাপন করেছেন, তাঁর কাল জন্মোৎসব। বহুত ধুমধাম হবে। দেখলে অবাক হয়ে যাবেন। আজ রাতটা আমার এখানে থেকে, কাল উৎসব-টুতসব দেখে তারপর যাবেন বাবু।’

মুখে ‘না, না’ বললেও লোতিসাবা আর জোরুতসি তো এই সুযোগটাই খুঁজছিল। সুযোগটা যে এত সহজে এসে যাবে, তারা ভাবতেই পারেনি। সুতরাং তারা রাজি হয়ে গেল। কিন্তু তারা জানতেও পারল না, লোকটা বুঝতে পেরেছে তাদের কাছে আরও স্বর্ণমুদ্রা আছে। সে ভেবেছে, এই বুড়ো দুটোকে যদি ভড়কে দিয়ে আজ রাতে তার ডেরায় আটকে রাখতে পারে, তাহলে এই মুদ্রাগুলো সে সহজেই কেড়ে নিতে পারবে। ব্যাপারটা কিন্তু আঁচ করতে পেরেছিল ওই ছোট্ট মেয়ে সুনি। লোকটার মতিগতি তো তার সবই জানা। সুতরাং সে বুঝেছে এই বুড়ো দুটোর এবার মরণ। শয়তানের খপ্পরে যখন পড়েছে, তখন আর রক্ষে নেই!

লোতিসাবা আর জোরুতসি আজ রাতটা যখন এখানে থাকতে রাজি হয়ে গেল, তখন লোকটা বলল, ‘বাবু, আমি তাহলে বাজার-হাটটা করে আনি। আপনারা বরঞ্চ এইফাঁকে শহরটা একটু ঘুরে-ফিরে দেখে আসুন। অনেক কিছু দেখার আছে বাবু এই শহরে।’

‘আমরা তো ভাই কিছুই চিনি না।’

‘ওই তো মেয়েটা আছে, আপনাদের নিয়ে যাবে।’ বলে সে সুনিকে ডাকল, ‘এই সুনি, বাবুদের একটু এই এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে আন। আমিও চটপট খানাপিনার ব্যবস্থা করে ফেলি।’

সুনি বলল, ‘চলুন।’

লোতিসাবা আর জোরুতসির তখন আনন্দে বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে উঠল। লোতিসাবা আর জোরুতসির চোখে-চোখে ইশারা হল। তারপর দু-জনে সুনির সঙ্গে বেরিয়ে গেল।

এখন লোতিসাবা আর জোরুতসির সঙ্গে একা-একা সেই মেয়ে সুনি হাঁটছে। কখনো চুপচাপ, কখনো দু-একটি কথা। লোতিসাবা আর জোরুতসি জানে, এখন ইচ্ছে করলেই মেয়েটিকে তারা উদ্ধার করতে পারে। কিন্তু মেয়েটির মনের কথা তো তাদের জানা নেই। উদ্ধার করার কথাটা ফস করে মেয়েটিকে বলাও যায় না। উলটো বিপত্তি হলে তখন? লোকটা যদিও তাকে মারধোর করে, হতে পারে মেয়েটা তাকেই আপনজন মনে করে। আপনজনের কাছ থেকে কে আর অচেনা অজানা অন্যজনের কাছে যেতে চায়! সুতরাং কথাটা তারা বলতে পারছিল না বলেই হাঁটতে-হাঁটতেও অস্বস্তিতে ছটফট করছিল। সত্যি কথাই, এমন সুযোগ তো আর না-ও আসতে পারে! কিন্তু নিজেদের কথা ভাবছিল বলে, একটা জিনিস তারা একেবারেই লক্ষ করেনি। আচ্ছা, মেয়েটাও যেন কিছু বলার জন্যে উসখুস করছে না? মাঝে মাঝে লোতিসাবা, জোরুতসির মুখের দিকে চাইছে। গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। তারা কিছু দেখেও না, কিছু জিজ্ঞেসও করে না। কিন্তু শেষমেষ আর থাকতে পারল না সুনি। সত্যিই তো, কতক্ষণ আর চুপ করে থাকতে পারে একটি ছোট্ট মেয়ে! অগত্যা কথা বলে ফেলল সুনি। বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব তোমাদের?’

লোতিসাবা আর জোরুতসির যেন চমক ভাঙল। সুনির মুখের দিকে চকিতে চাইল দু-জনে। দু-জনে একইসঙ্গে বলে উঠল, ‘কী কথা?’

সুনি জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা তো মুসাফির?’

প্রশ্নটা শুনে প্রথমটা হকচকিয়ে গেলেও, পরে সামলে নিয়ে দু-জনেই বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, মুসাফির।’

‘অনেক দেশ তোমরা দেখছে না?’

‘অনেক।’

‘এই বয়সে এখনও পথে-পথে হাঁটতে তোমাদের কষ্ট হয় না?’

‘অভ্যেস হয়ে গেছে।’

একটু চুপ করে রইল সুনি। তারপর আবার বলল, ‘আমারও খুব ঘুরে-ঘুরে দেশ দেখতে ইচ্ছে করে।’

লোতিসাবা প্রায় চিৎকার করে উঠল, ‘সত্যি নাকি?’

সুনি বলল, ‘সত্যি।’ তারপর সুনি লোতিসাবা আর জোরুতসির মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে দু-হাত দিয়ে দু-জনের হাত ধরে জিজ্ঞেস করলে, ‘সোনার মুদ্রাগুলো কোথায় রাখলে?’

ব্যস! আর দেখতে! দু-জনেই যেন এইমাত্তর আকাশ থেকে পড়ল। অবাক চোখে তাকাল সুনির দিকে।

সে তেমনি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কোথায় রেখেছ?’

জোরুতসি সামলাতে পারল না নিজেকে। আমতা-আমতা করে বললে, ‘কই সোনা?’

সুনি বললে, ‘আমার কাছে লুকোলেও, ও কিন্তু জানে।’

ভয়ে চুপ করে লোতিসাবা আর জোরুতসি এ ওর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে ভাবতে লাগল, মেয়েটা জানল কী করে!

সুনি আবার বলল, ‘অত খাতির করে সোনার মুদ্রাটা ওকে দিতে গেলে কেন? এবার কিন্তু তোমাদের খুব বিপদ!’

‘কীসের বিপদ?’ ভয়ে মুখ শুকিয়ে গেল জোরুতসি আর লোতিসাবার।

‘লোকটা মুদ্রাগুলো তোমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেবে! রাত্তিরে তোমাদের যে থাকতে বলছে, তার মানে বুঝছ না?’

সুনির কথা শুনে গয়ে কাঁটা দিল দুই বুড়োর।

সুনি আরও বলল, ‘ওর সাঙ্গোপাঙ্গগুলো সবকটা খুনি।’

এমন সময় জোরুতসি খানিকটা সামলে নিয়ে ধরা-ধরা গলায় জিজ্ঞেস করলে, ‘তুই কে?’

সুনি চুপ করে রইল।

‘বল, তুই কে?’

কান্নায় যেন সুনির গলাটা ভার হয়ে এল। সে বলল, ‘আমি কিছুই জানি না, আমি কে!

ও বলে আমাকে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছে।’

রাগে গর্জে উঠল লোতিসাবা। বলল, ‘আমি বলি সে তোকে চুরি করে এনেছে।’

মুখখানা ফ্যাকাশে হয়ে গেল সুনির।

জোরুতসি জিজ্ঞেস করল, ‘নাচ শিখলি কোথায়?’

‘নিজে-নিজে।’

‘গান?’

‘শুনে-শুনে।’

লোতিসাবা তেমনি তিরিক্ষি হয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘লোকটা তোকে রোজই মারে?’

কোনো উত্তর দিল না সুনি।

জোরুতসি জিজ্ঞেস করল, ‘এত মার খাস, তবু এখানে পড়ে আছিস কেন?’

‘কোথা যাব? আমার তো কেউ নেই। কে খেতে দেবে?’

‘আমাদের সঙ্গে যাবি? দেশ বেড়াবি?’

সে-কথা শুনে খুশিতে বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল সুনির মুখখানা। ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আমাকে নিয়ে চলো-না!’

লোতিসাবা আর জোরুতসি থমকে গেল। আনন্দে তাদের বুকের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। নিজেদের যেন তারা আর সামলে রাখতে পারছে না। কেননা, তাদের মতলবটা প্রায় সফল হতে চলেছে। কোনোরকমে উত্তেজনাটাকে সামাল দিয়ে লোতিসাবাই জিজ্ঞেস করলে, ‘লোকটা আমাদের সঙ্গে তোকে যেতে দেবে কেন?’

‘জানতে পারবে না। এখান থেকেই লুকিয়ে পালাব। আর ডেরায় ফিরব না।’ বলল সুনি।

‘আমাদের সঙ্গে থাকতে পারবি?’

‘পারব।’

‘কষ্ট হলে কাঁদবি না তো?’

‘তোমরা বুড়োমানুষ। তোমাদের কষ্ট হয় না, আর আমার হবে?’

‘তবে চ।’ বলে লোতিসাবা আর জোরুতসি তার দু-টি হাত ধরে এগিয়ে গেল।

সুনি বলল, ‘পা চালিয়ে হাঁটতে হবে। ও জানতে পারার আগেই ওর নাগালের বাইরে আমাদের হারিয়ে যেতে হবে।’

হ্যাঁ, সত্যিই তারা চলে এসেছিল অনেক, অ-নে-ক দূরে। সেই লোকটার নাগালের অনেক বাইরে। তারা এসেছিল আর এক নগরে। অনেক মানুষের কোলাহলের আর এক রাজ্যে। এখানে আসার পথে অনেক গান গেয়েছে সুনি। অনেক নাচ দেখিয়েছে। এই দুই বুড়োমানুষের অত্যন্ত কাছের আপন মেয়ের মতো হয়ে গেল সুনি। তাই এখন সুনি ভাবে, আর কষ্ট নয়, এই অথর্ব মানুষ দুটোর জন্যে সে আনবে সুখ, আনবে আনন্দ। সুনি এখন লোতিসাবাকে আদর করে ডাকে ‘লোতি’। জোরুতসিকে বলে ‘জো’। একদিন সে তার লোতি আর জোকে ডেকে বলেছিল, ‘এতদিন তো পথে-পথে ঘুরে-ঘুরে অনেক পথ পেরিয়ে এলুম। অনেক কষ্ট করে আমার জন্যে তো তোমরা সবই উজাড় করে দিয়েছ! আর কষ্ট নয়। আর নাই-বা মুসাফির সেজে ঘুরে বেড়ালে! এবার একটা ছোট্ট আস্তানা করো। সেই ছোট্ট আস্তানায় তোমাদের জন্যে সব সুখ, সব খুশি ছড়িয়ে দিয়ে আমি তোমাদের যত্ন করব।’

সে-কথা শুনে আনন্দে উছলে উঠেছিল লোতিসাবা আর জোরুতসি। অনেক দুঃখের রাত পেরিয়ে এসে আজ যেন আলোর সকাল তারা দেখতে পেয়েছে। এ মেয়ে সত্যিই বুঝি তাদের মেয়ে! এ মেয়ের মুখখানি দেখে তারাও আজ হাসতে পারে কিংবা তার মিষ্টি গলার ডাক শুনে অনেক দুঃখ ভুলতে পারে। হ্যাঁ, সুনি সবই শুনেছে। শুনেছে, লোতিসাবার দুর্ভাগ্যের কথা। শুনেছে জোরুতসির দুঃসময়ের কথা। সুনি যেন তাই সব মমতা ঢেলে দিয়ে তাদের মন ভোলাতে চায়। লোতিসাবা আর জোরুতসি নামের দু-টি মানুষ, তার চোখে যেন দু-টি তারা!

লোতিসাবা আর জোরুতসি একদিন সত্যিই ভাবল, সুনির সেই কথাটা! একটা ছোট্ট আস্তানার কথা। সোনার থলিটা এখনও সোনায় ভরতি। ক-টাই-বা খরচ হয়েছে। এই সোনার মুদ্রা দিয়ে একটা ছোট্ট আস্তানা কেন, একটা আকাশ-ছোঁয়া প্রাসাদ বানালেও সবটা খরচ হবে না। কিন্তু যেদিন সত্যি-সত্যি সোনার মুদ্রা ফুরিয়ে যাবে? সেদিন?

সুনি বলেছিল, ‘ভয় কেন লোতি, ভাবনা কীসের জো? আমি তোমাদের মেয়ে। আমার পায়ে যতদিন নূপুর বাজবে, আমার গলায় যতদিন গান শুনবে, ততদিন আমি তোমাদের দেখব।’

এই কথা শুনে ওই দুই বুড়ো নিশ্চিন্তে দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল। তারপর সুনির মাথার ওপর হাত রেখে আদর করে বলেছিল, ‘তুই আমাদের মেয়ের মতো মেয়ে।’

সত্যি-সত্যি একটা চমৎকার বাড়ি করল তারা। অপরূপ সেই রূপকথার মতো বাড়ির সামনে সুন্দর একটি বাগান করল। অনেক রঙের ফুল গাছে-গাছে ফুটে উঠল। অনেক ভোরে পাখিগুলি যখন গেয়ে উঠত, তখন সুনি তার লোতি আর জোর হাত ধরে বাগানে আসত। ভোরের হাওয়ায় নিশ্বাস নিতে-নিতে দুই বৃদ্ধ ফুলের গন্ধ বুকের মধ্যে ভরে নিত। নয়তো আধফোটা ফুলের মতো সুনির গলায় গান শুনতে-শুনতে ভাবত, এবার আমাদের সত্যিই সুখ ফিরে এসেছে! চোখজুড়ানো অপরূপ সেই বাড়ির একটি ঘর ছিল লোতিসাবার, একটি ঘর জোরুতসির আর একটি সেই ছোট্ট মেয়ে সুনির। মখমল-বিছানো খাটের ওপর শুয়ে থাকত দুই বুড়ো। কিংবা গদি-আঁটা আরাম-কেদারায় বসে-বসে দুই ঘরের জানালায় চোখ রেখে দুই বুড়ো দেখত, আকাশ অথবা আলো। মেঘ কিংবা বৃষ্টি। গাছ নয়তো পাখি। আর সুনি একবার এর ঘর, ওর ঘরে ঘুরে-ঘুরে গান গাইত। কিংবা মাথায় হাত রেখে তার ছোট্ট হাতের আঙুলগুলি দুই বুড়োর সাদা ধবধবে চুলের রাশিতে ছড়িয়ে দিয়ে বিলি কাটত আর জিজ্ঞেস করত, ‘কেমন লাগছে জো?’

তার জো বলত, ‘যেমন ভালো লাগলে খুব ভালো লাগে, তেমন ভালো লাগছে।’

যখন জিজ্ঞেস করত, ‘ভালো লাগছে লোতি?’

তখন লোতি বলত, ‘ভালো লাগছে বলেই তো এত ভালোবাসছিস আমায়।’

দু-জনেরই কথা শুনে হেসে উঠত সুনি। নয়তো দু-জনেরই বুকের ওপর তার মাথাটা রেখে আদর করে বলত, ‘তোমরা সোনার চেয়েও সুন্দর।’

এমনি করে তাদের দিন কাটছিল। এমনি করে খুশির রাজ্যে নাচের নূপুর বাজিয়ে সুনি একটু-একটু করে বড়ো হয়ে উঠল। তার জীবনে একটি-একটি দিন যোগ হয় আর লোতিসাবা, জোরুতসির জীবন থেকে একটি-একটি দিন হারিয়ে যায়। একটু-একটু করে বয়সের ভার এসে জড়িয়ে ধরছে তাদের। যে মানুষ দুটো অনেক পথ, অনেক নদী, অনেক বন, অনেক পাহাড় পার হয়েছে শক্ত পায়ে, সে-পা যেন আর চলতে চায় না। নিজের ঘরে একা-একা বসে থাকে দুই বুড়ো। আগে তবু যেতে পারত লোতির ঘরে জোরুতসি কিংবা জোর কাছে লোতিসাবা। এখন তা-ও যেন ইচ্ছে করে না। সুখের মুখ যখন ওরা দেখতে পেল, তখন দুই বন্ধুর দু-টি মুখ আর দুই বন্ধু দেখতে পায় না। এত কাছে থেকেও যেন কত দূরে চলে গেছে তারা। আগে তবু দু-দন্ড একসঙ্গে বসত। একসঙ্গে ফেলে আসা দিনগুলির সুখ-দুঃখের কথা বলত। এখন তারা জবুথবু হয়ে নিজের ঘরে, নিজের কথা নিজের মনেই ভাবে। সুনি না-হলে আর যেন চলে না তাদের। তার মুখ চেয়েই বসে থাকবে তারা। কখন আসবে সে! কখন এসে আদর করবে। কখন চানের জল গরম করে দেবে। হাতের কাছে জামা-পোশাক এনে দেবে। কখন খেতে দেবে। কখন এর ঘরে গুন-গুন করে গান গাইতে-গাইতে ওর ঘরে চলে যাবে। গানে-গানে ঘুম আসবে। ঘুমচোখে এক বুড়ো সুনিয়াকে জিজ্ঞেস করবে আর-এক বুড়ো লোতিসাবার কথা। আর এক বুড়ো লোতিসাবা জিজ্ঞেস করবে, জোরুতসির কথা। সুনির মুখে দুই বন্ধু দু-জনের কথা শুনতে-শুনতে ভাবে, একই ঘরে একই সঙ্গে থাকলেই তো ভালো হত। একসঙ্গে কথা বলত। একসঙ্গে সুনির গান শুনত। একসঙ্গে উঠত-বসত। ঘুমিয়ে পড়ত। আর এখন? ওই ছোট্ট মেয়েটার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে তারা। ওই মুখেই শোনে একজন আর একজনের কথা! ওর চোখেই দেখে একজন আর একজনের মুখ!

সত্যিই, বয়স তাদের যতই চেপে ধরছে, সুনি ছাড়া তাদের যেন আর একদন্ড চলছে না। ধীরে-ধীরে দুই বুড়ো বড়োই অসহায় হয়ে পড়ল। তখন জোরুতসি ভাবে, সুনি আমার কাছে থাকুক সারাদিন। আর লোতিসাবা ভাবে, সুনি তার কাছে থাকুক সারাক্ষণ। আর সুনি দুই বুড়োর সুখের জন্যে হাসিমুখে খেয়ে-খেটে দিন কাটায়।

কিন্তু এমনই সময়ে হঠাৎ একদিন অসহায় জোরুতসির যেন মনে হয়েছিল, সুনি তার ঘরে আসতেই চায় না। এত কেন দেরি করে?

এমনই সময়ে একদিন আচমকা লোতিসাবা ভেবেছিল, সুনির যেন তার কাছে আসতে সময় হয় না। সব সময় আসে না কেন?

এইটাই বুঝি সত্যি, বুড়ো হলে মানুষ যেন এমনি করেই ভুল বোঝে! কিন্তু কে না জানে সুনি তার লোতিসাবা আর জোরুতসির জন্যে সব ভালোবাসা, সব যত্ন উজাড় করে ঢেলে দিয়েছে। ওর চোখে যেমন তার লোতি, তেমনি তার জো। মানুষ দুটোর যেন কষ্ট না হয়, এই তো তার ভাবনা সবসময়ে। তবু কেন ভুলের বোঝা তাদের মাথায় বাসা বাঁধে?

সুনি যেমন রোজ আনন্দে হাসতে-হাসতে জোরুতসির ঘরে আসে, তেমনি সেদিনও এসেছিল। অন্যদিন সুনিকে দু-চোখ ভরে দেখে জোরুতসির মুখখানা যেমন ঝকঝক করে ওঠে, আজ তেমন হল না। কেমন যেন ভার-ভার জোরুতসির মুখখানা। সুনি হাসতে-হাসতে থমকে গেল। ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেল জোরুতসির কাছে। জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে তোমার জো?’

জোরুতসি সুনির মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকাল। তারপর বলল, ‘এখন এত দেরি করে আসিস কেন আমার ঘরে?’

সুনি হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, ‘কই দেরি করে আসি। রোজ যেমন আসি, তেমনই তো আসছি।’

‘না, তুই আরও তাড়াতাড়ি আসবি। অনেকক্ষণ থাকবি।’

সুনি বলল, ‘তোমার ঘরে অনেকক্ষণ থাকলে, লোতির ঘরে কতক্ষণ থাকব!’

জোরুতসির যে-রাগটা এতদিন মনের ভেতর গুমরে-গুমরে ফুঁসছিল, সেটা যেন দুম করে ফেটে পড়ল। জোরুতসি চেঁচিয়ে বললে, ‘কেন, লোতি কি আমার চেয়ে তোকে বেশি ভালোবাসে।’

থতমত খেয়ে গেল সুনি। কেমন অবাক চোখে জোরুতসির মুখের দিকে তাকাল একবার। কেননা, এমন কথা তো সে কোনোদিনই শোনেনি তার মুখে! তারপর অবাক স্বরেই জিজ্ঞেস করল, ‘অমন কথা কেন বলছ জো! তোমরা দু-জনেই আমায় সমান ভালোবাস! আমার কাছে তোমরা দু-জনেই তো সমান।’

জোরুতসি যেন খেপে উঠল। বলল, ‘না, আমি তোকে বেশি ভালোবাসি!’

সুনি থ হয়ে গেল।

আজ লোতির ঘরে যখন ঢুকল সুনি, তখন অন্যদিনের মতো মুখখানা তার হাসিতে ঝলমল করে উঠল না। জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেল, ‘কেমন আছ লোতি?’ মুখের ওপর যেন মেঘের ছায়া ছড়িয়ে পড়েছে তার। তাকে দেখে লোতিসাবাও কেমন যেন অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে সুনি? আজ মুখে হাসি নেই কেন?’

লোতির কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে চোখের পলকে সামলে নিল সুনি। মুখের হাসিটাকে জোর করে টেনে এনে বলে উঠল, ‘এই তো হাসছি।’

‘হাসছিস কই? তেমন করে হাসছিস না তো?’

‘এমন করেই তো আমি হাসি।’ সুনি উত্তর দিল।

‘এতক্ষণ কোথা ছিলি?’

‘জোর কাছে।’

‘সে বুঝি তোকে কিছু বলেছে?’

‘না, না, তেমন কিছু নয়।’

‘আমি বুঝতে পেরেছি, তুই লুকোচ্ছিস। কী বলেছে বল?’

‘বলছি তো কিচ্ছু না।’

‘মনে করছিস আমি কিছু জানি না!’

‘কী জান?’

‘সে তোকে বকেছে। আমি জানি লোকটা অমনি। আমি জানি লোকটা তোকে একদম দেখতে পারে না। আমার মতো তোকে ভালোবাসে না।’

চমকে উঠল সুনি। সে যেন বিশ্বাস করতে পারে না, যে দু-টি মানুষের মধ্যে এতদিন এত বন্ধুত্ব, আজ যেন কেমন করে সে-বন্ধুত্ব ভেঙে যাচ্ছে। দু-জনেই যেন একসুরে কথা কয়! দু-জনেই যেন তাকে অবিশ্বাস করে। তাদের চোখে সন্দেহ!

হ্যাঁ, ঠিক তাই। লোতিসাবাও জোরুতসির মতো বলে উঠল, ‘তুই তো জানিস, আমি তোকে কতটা ভালোবাসি।’

সুনি বলল, ‘হ্যাঁ জানি। কিন্তু তুমি যা মনে করছ, তা নয়। তুমি আমাকে যতটা ভালোবাস ঠিক ততটাই ভালোবাসে জোরুতসি।’

রাগে গর্জে উঠল লোতিসাবা, ‘মিথ্যে কথা! আমি তোকে বেশি ভালোবাসি।’

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সুনি লোতিসাবার মুখের দিকে কিছুক্ষণ। কেমন যেন তার সব গোলমাল হয়ে গেল। ও যতবারই ভাববার চেষ্টা করছে, লোতি আর জো তার কাছে এক, কেউ তাকে কম ভালোবাসে না, ততবারই তার মনের ভেতরে যেন দুটো মানুষ বার-বার চেঁচিয়ে উঠছে, ‘আমি বেশি ভালোবাসি, আমি বেশি ভালোবাসি’। সুনির সব আনন্দ যেন হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেল। যে-দুটো মানুষের সুখের জন্য সে এতদিন কোনো দুঃখকেই দুঃখ মনে করেনি, আজ যেন তাদের কথা ভেবে সে ভয় পায়! তবে কি সে নিজেই কোনো দোষ করে ফেলেছে! সাত-পাঁচ কিছুই ভেবে না-পেয়ে সে আবার ছুটে গেল জোরুতসির কাছে। বৃদ্ধমানুষটার বুকে হাত রাখল। জোরুতসি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইল সুনির মুখের দিকে। কথা বলল সুনি, জিজ্ঞেস করল, ‘আমার ওপর অমন রাগ করলে কেন জো?’

জোরুতসির বুকটা একটু কেঁপে উঠল।

সুনি আবার জিজ্ঞেস করলে, ‘আমি কি কোনো দোষ করেছি?’

জোরুতসির শীর্ণ হাতটা সুনির মাথা ছুঁয়ে একটু আদর করল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘একটা সত্যিকথা বলবি?’

‘কী?’

‘তুই কাকে বেশি ভালোবাসিস, আমাকে না লোতিকে?’

সুনি বলল, ‘জো, আমরা তো সবাই এক। আমরা তিনজনেই তো সুখী। আমরা তিনজনেই তিনজনকে সমান ভালোবাসি। কেউ কম না, কেউ বেশি না।’

‘কেন, তুই আমাকে বেশি ভালোবাসতে পারিস না?’

‘লোতিসাবা তো কোনো দোষ করেনি যে, ওকে কম ভালোবাসব।’

জোরুতসি চিৎকার করে উঠল, ‘লোতিসাবা, লোতিসাবা, লোতিসাবা! ও-নামটা আমার কাছে করবি না। আমি জানি ও তোকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে।’

সুনি বলল, ‘ভুল বুঝো না জো। আমি তোমাদের দু-জনেরই মেয়ে।’

‘আমার মেয়ে সে-ই, যে শুধু আমাকেই ভালোবাসে। তা যে পারে না, তাকে আমি মেয়ে বলি না।’

আঁতকে উঠল সুনি। বলল, ‘না জো, না, অমন কথা বোলো না। আমি যেমন তোমার মেয়ে, তেমনি আমি লোতিরও।’ বলে সুনি ছুটতে ছুটতে জোর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল লোতির ঘরে। সে লোতির বিছানার ওপর বসে পড়ল। তারপর হাঁপাতে-হাঁপাতে বললে, ‘আমি তোমাদের দু-জনেরই মেয়ে। আমি কারো একার নই। বিশ্বাস করো, তোমরা দু-জনেই আমার চোখে এক। তোমরা দুজনেই যে আমাকে রক্ষা করেছ।’

লোতি যেন গর্জন করে উঠল, ‘জোরুতসি কী করেছে? তোকে তো রক্ষা করেছি আমি।’

‘তোমরা দু-জনেই তো তোমাদের সব আদর দিয়ে আমাকে বড়ো করেছ।’

‘ভুল! ভুল! আমার একার সব আদর শেষ করে দিয়েছি তোর ভালোর জন্যে।’

সুনি থাকতে পারল না। আকুল হয়ে বলে উঠল, ‘তোমাদের এ কী হল লোতি! তোমাদের এত বন্ধুত্ব কোথায় গেল? কে তোমাদের এমন সর্বনাশ করল! এমন সুন্দর দুই মানুষের মনে এমন হিংসা ঢুকল কী করে! এমন পাপ!’ বলে হাউ-হাউ করে কেঁদে ফেলল সুনি। তারপর ছুটে সেখান থেকে পালাল।

এখন কী করবে সুনি ভেবে পাচ্ছে না। সে এখন বড়ো হয়েছে, সুতরাং বুঝতে পারছে, তারই জন্যে দুটো মানুষ এমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ-কথা কে না জানে, জ্ঞানে সুনি দু-জনের কাউকে কোনোদিন আলাদা করে ভাবেনি। দু-জনকেই সুনি তাদের নিজের মেয়ের মতো ভালবেসেছে, যত্ন করেছে। অথচ আজ তাকেই তারা অবিশ্বাস করছে। অন্যসময় হলে সুনি কী করত কে জানে! কিন্তু এই বুড়োমানুষ দুটোর জন্যে তার ভাবনার শেষ নেই। আজ সুনি যদি না-থাকে কে তাদের দেখবে? এই বুড়োমানুষ দুটোর কষ্ট হলে যখন ডাকবে ‘সুনি, সুনি’ বলে কে সাড়া দেবে? এমনি হাজারো কথা ভাবতে-ভাবতে সুনি একলাটি চলে যায় বাইরে। বসে থাকে পপলার গাছটার নীচে। নয়তো কখনো সে চলে যায় নদীর কিনারায়। নদীর জলের মতো তার চোখের জলেও ঢেউ ওঠে। তারপর নদীর তীর-ঘেঁষা দূর থেকে দূরে হারিয়ে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। যে-আনন্দে একদিন সুনির মন উছলে উঠেছিল, সেই আনন্দ তার আজ দুঃখের ছায়ায় অন্ধকার হয়ে গেছে। সে যেন গান ভুলেছে। নাচ ভুলেছে। তার ফুটফুটে সেই মুখখানি অভিমানে ভার হয়ে গেছে।

এমনই সময়ে হঠাৎ একদিন সুনি নদীর তীরে বসে-বসে চমকে উঠেছিল একটি শব্দ শুনে। কোথা থেকে ভেসে আসে নদীর জলে ছলাত-ছলাত শব্দ! এদিক-ওদিক চোখ ফেরায় সুনি ছটফটিয়ে। হঠাৎ দেখে কী, একটা ঘোড়া। কালো মিশমিশে তার গায়ের রং। নদীর তীরে মুখ ডুবিয়ে জল খাচ্ছে! অবাক হয়ে গেল সুনি। তাই তো। এ-সময়ে এখানে কার ঘোড়া!

জল খাওয়া শেষ করে সেই কালো ঘোড়া নদীর তীর ছেড়ে উঠে এল। সবুজ ঘাসে মুখ ঠেকিয়ে খেতে শুরু করে দিলে। সুনি একবার ঘোড়াটা দেখে, আবার একবার পেছন-সামনে চোখ ফিরিয়ে ঘোড়ার মালিককে খোঁজে। কিন্তু দেখতেই পায় না কাউকে। সুনি উঠে দাঁড়াল। ভয়ে-ভয়ে পা ফেলে এগিয়ে গেল। ঘোড়াটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঝট করে মুখ উঁচিয়ে একবারটি সুনির মুখের দিকে তাকাল ঘোড়া। আবার ঘাসে মুখ দিলে। নিজের মনে খেতে লাগল। কই, এখনও তো ঘোড়ার মালিককে দেখতে পেল না সুনি? তাই সে ভীরু পায়ে আরও একটু এগিয়ে গেল ঘোড়াটার কাছে। ঘোড়াটা সরেও না, নড়েও না। যেমন ছিল, সেখানেই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘাস চিবুতে লাগল। ঘোড়াটাকে কাছ থেকে দেখতে-দেখতে এত ভালো লেগে গেল সুনির! কিছু না-ভেবেই সে একেবারে ঘোড়াটার পাশে দাঁড়িয়ে ওর গায়ে হাত দিল। কিচ্ছু না-বলে ঘোড়া সুনির মুখের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়া দিলে। তারপর আচমকা চার-পা তুলে এমন ছুট দিলে যে, সুনির বুকের ভেতরটা আঁতকে উঠেছে। কিন্তু আশ্চর্য! ঘোড়াটা ছুটে পালিয়ে গেল না! একটু দূরে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে লাফাতে লাগল! সুনির চোখে একরাশ অবাক চাউনি! সুনি আরও এগোয় সেদিকে! অবিশ্যি ঘোড়াটার অমন লাফ-ঝাঁপ দেখতে কী মজাই না লাগছে তার! কিন্তু হঠাৎ হল কী, ঘোড়াটা লাফাতে-লাফাতে আবার সুনির দিকে ছুটে আসছে। এই রে! কী করবে সুনি। ঘোড়ার সঙ্গে কি আর ছুটতে পারে সে? তবু বেঘোরে কে আর প্রাণ দেয়! সুনিও মারল ছুট। কিন্তু চার-কদমেই ঘোড়া সুনির সামনে হাজির। সুনিকে ঘিরে ধরে লাফিয়ে-লাফিয়ে চক্কর খেতে লাগল। সুনি ভয়ে মরে আর কী! কী রে বাবা, সে কি একটা পাগলা ঘোড়ার পাল্লায় পড়ল! কিন্তু না তো! ঘোড়াটা তো সুনিকে কিচ্ছুটি বলল না। উলটে লাফ থামিয়ে, সুনির মুখের কাছে মুখটি এনে দেখতে লাগল। তারপর যেন ভাব করবার জন্যে ঘোড়াটা সুনির গায়ে গা ঠেকাল। সুনি ভয়ে কাঠ! একটু-একটু করে সরে যাবার চেষ্টা করে সুনি। কিন্তু পারল না। সরতে গিয়ে মাথায় ঠং করে এমন একটা ঠোক্কর লাগল! সুনি চকিতে চোখ তুলে দেখে, ঘোড়ার গলায় বাঁধা ছোট্ট একটা কৌটো, দুলতে-দুলতে তার মাথায় লেগেছে। আশ্চর্য! এতক্ষণ সুনি কৌটোটা দেখতেই পায়নি। কিন্তু আরও আশ্চর্য ব্যাপার হল, কৌটোটা ঠোক্কর খাওয়ার সঙ্গেসঙ্গে ফস করে খুলে গেল। সুনির চোখের সামনে সেই কৌটোর ভেতর থেকে বেরিয়ে পড়ল মণি-মুক্তো সাজানো একটি সোনার হার আর একটা নীল কাগজের টুকরো। অমনি সঙ্গেসঙ্গে ঘোড়াটা সেখান থেকে আবার মারলে ছুট। সুনি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে! কী করবে আর না-করবে ভাবতে-ভাবতেই ঘোড়া ভো-কাট্টা! নদীর ঢেউ-ছোঁয়া এলোমেলো হাওয়ায় যেমন সুনির মাথার চুলগুলি উড়ে-উড়ে মুখে ছড়িয়ে পড়ছিল, তেমনি সেই হাওয়ার ঝাপটা লেগে নীল কাগজটাও উড়ে-উড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। দেখতে পেয়েছে সুনি। ছুটে গিয়ে কাগজটাকে মুঠির মধ্যে ধরে ফেলল। মাটি থেকে মণি-মুক্তোর সোনার হারটা তাড়াতাড়ি তুলে নিলে। অবাক হয়ে দেখতে লাগল। মণির জেল্লা যতই তার মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, চোখের পাতা দু-টি ততই যেন ঝলমলিয়ে নেচে ওঠে। তারপর সে নীল কাগজটি খুলে-খুলে চোখ বুলাল। এ যে দেখি একটা চিঠি। পড়ে ফেলল সুনি সেই চিঠি। তাতে লেখা:

আমি যখন এই চিঠি লিখি, তখন আমি এক দুর্গম অরণ্যের গভীরে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা করছি। এ চিঠি যখন কেউ পাবে, তখন হয়তো আমি আর বেঁচে থাকব না। আমি ছিলাম এক অত্যাচারী রাজা। আমার রাজত্ব ছিল এক আগ্নেয়গিরির পায়ের কাছে। নিষ্ঠুর আঘাতে আমি অনেক মানুষের প্রাণ নিয়েছি। অনেক শিশুকে হত্যা করেছি। আমি ছিলাম এক জঘন্য পাপী মানুষ। আমার রাজ্যের মানুষ তাই আমাকে ঘৃণার চোখে দেখত। কিন্তু আমি যদি বলি মানুষই আমাকে এমন ঘাতক হতে শিখিয়েছিল, কে বিশ্বাস করবে সে-কথা। হ্যাঁ মানুষই। কারণ, তারা আমার একমাত্র মেয়েকে আমার প্রাসাদের অন্দরমহল থেকে চুরি করে নিয়ে পালিয়েছিল। আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় সেই মেয়েকে হারিয়ে আমি যেন দিশেহারা হয়ে পড়লাম। খুনের শয়তানটা তখনই আমার বুকের মধ্যে বাসা বাঁধল। কিন্তু পাপ তো আর বেশিদিন মাথা উঁচিয়ে থাকতে পারে না। একদিন তার ধ্বংস হবেই। আমারও হল। ওই আগ্নেয়গিরির আগুনে গ্রাস করল আমার রাজধানী। ধ্বংস করল রাজপ্রাসাদ। প্রাণ গেল অনেক মানুষের। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেলাম আমি। রক্ষা করতে পারলাম বেশ কিছু স্বর্ণমুদ্রা। আর আমার এই কালো ঘোড়াটিকে। আমি জানতাম, আমার শত্রু চারিদিকে। আমি তাই শত্রুর ভয়ে আশ্রয় নিলাম এই বনে। এমনই সময়ে হঠাৎ একটা কান্ড ঘটে গেল। একদিন সেই গভীর অরণ্যে দুই বৃদ্ধ উপস্থিত হল। তাদের একজন চিনে ফেলল আমায়। তাকে আমার রাজত্বে মিথ্যা অভিযোগে কয়েদ করেছিলাম। আর এক বৃদ্ধ আমাকে হত্যা করার জন্যে বহুদিন, বহুবার আমার রাজপ্রাসাদের বাইরে গোপনে অপেক্ষা করেছে। কারণ, বিনা অপরাধে তার ছেলের আমি প্রাণ নিয়েছিলাম। তারা যে আমায় চিনে ফেলেছে। এটা আমি যখনই টের পেয়েছি, তখন আমি বুঝতে পারলাম, এবার ওই দুই বৃদ্ধ নিশ্চয়ই আমাকে খতম করে ফেলবে। সুতরাং তাদের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হওয়ার আগে, আমি ঠিক করলাম, ওদেরই আমি শেষ করে ফেলব। কিন্তু পারলাম না। ওরাই আমাকে আহত করল। আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। বৃদ্ধ দু-জন ভেবেছিল, আমি আর বাঁচব না। তাই সোনার মুদ্রা ভরতি আমার কোমরে বাঁধা থলিটা নিয়ে পালাল তারা। আমার জ্ঞান হবার পর আমি কোনোরকমে আমার আশ্রয়ে ফিরে এসে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। আমি যখনই বুঝতে পারলাম আমার দিন শেষ হয়ে এসেছে, তখনই আমি এই চিঠিটি লেখা মনস্থ করি। যে আমার চিঠি পাবে এবং চিঠির সঙ্গে এই মণিমুক্তোখচিত সোনার হারটি, সে যদি বিশ্বাস করে আমাকে, তবে এই কালো ঘোড়া আবার যাবে তার কাছে। সে যদি এই কালো ঘোড়ার পিঠে চাপে তবে সে এই অরণ্যে তাকে নিয়ে আসবে। আমি যে-আশ্রয়ে ছিলাম, সেই আশ্রয়ের মাটির নীচে অসংখ্য স্বর্ণমুদ্রা আমি লুকিয়ে রেখেছি। সেগুলির মালিক হবে সে। আমার মেয়ে এখনও বেঁচে আছে কিনা জানি না। তাকে খুঁজে বার করাও যে খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার এও আমি জানি। কারণ, তাকে যখন হরণ করা হয়, তখন সে নেহাতই শিশু। এখন তার বয়স পনেরো বছর। তার গায়ের একটি চিহ্নই শুধু প্রমাণ করতে পারে সে আমার মেয়ে। সে চিহ্নটি আছে, তার ডান হাতের মধ্য আঙুলের মাথায়। সেটি একটি আশ্চর্য চিহ্ন। মধ্যে একটি বড়ো তিল এবং বড়ো তিলটিকে ঘিরে আরও ছোটো-ছোটো দশটি তিল। আমার নিজের ধারণা, এমন আশ্চর্য চিহ্ন আর কারো হাতেই দেখা যাবে না। সুতরাং যার হাতে এমন চিহ্ন দেখা যাবে, তাকে রাজকন্যা বলে বিশ্বাস করতে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না।

চিঠিটা পড়তে-পড়তে গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল সুনির। কেননা, সে জানে তার নিজের আঙুলে এমনি একটা চিহ্ন আছে। চিঠি শেষ করে সে চকিতে হাতের আঙুলটি একবার দেখল। তিলগুলি গুনে ফেলল। হ্যাঁ, আগের মতোই সে দেখল, একটাও বেশি নয়, একটাও কম নয়। মধ্যের বড়ো তিলটি ঘিরে দশটা তিলই আছে। ভীষণ ছটফটিয়ে উঠল দেখতে-দেখতে। সে নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে চিৎকার করতে পারছে না। সে হাসতে পারছে না। সে কাঁদতে পারছে না। সে মনে করতে পারছে না কিছুই। সে যেন বোবা হয়ে গেল। কিংবা হতভম্ব। সে ছুট দিল। ছুটল জোরুতসি লোতিসাবার কাছে। প্রাণপণে ছুটল। থামল না একটুও।

অনেকক্ষণ সুনি তাদের ঘরে আসেনি বলে লোতিসাবা যেমন ভেতরে-ভেতরে রাগে ফুঁসছিল, তেমন ভাবছিল, সুনি নিশ্চয়ই জোরুতসির ঘরে এখনও গল্প করছে। তেমনি জোরুতসিও ভাবছিল, সুনি নিশ্চয়ই এখনও লোতিসাবার ঘরেই গান গাইছে। ভাবতে-ভাবতে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল দুটো মানুষ। দুটো ভয়ঙ্কর হিংসুটে শয়তান। শয়তান দুটো টলতে-টলতে উঠে দাঁড়িয়েছিল। দু-জনেই ভেবেছিল, এ যাবে ওর ঘরে। ও যাবে তার ঘরে। সুনিকে ছিনিয়ে আনবে একজন আর একজনের কাছ থেকে। আর তা যদি না-পারে, একজন আর একজনের গলাটা টিপে ধরবে। শেষ করে ফেলবে। সুতরাং তারা বেরিয়ে পড়েছিল নিজের নিজের ঘর থেকে।

কিন্তু বেশিদূর যেতে হয়নি তাদের। হঠাৎই যেন পৌঁছে গেছল দু-জনে দু-জনের মুখোমুখি। বয়েসের ভারে ধসে-পড়া দুটো মানুষ! থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। অবাক হয়ে লোতিকে দেখছে জো। জোকে দেখছে লোতি। কতদিন পরে দেখা। যেন কত বছর। কেউ যেন চিনতে পারে না কাউকে। কেমন করে চিনবে! কত পালটে গেছে দু-জনে। ভাঙা বাঁশের মতো দু-জনেই নুয়ে পড়েছে। হিংসায় পুড়তে-পুড়তে মুখ দু-টি কালচে হয়ে গেছে। জরাজীর্ণ চোখগুলি কোটরে ঢুকে গেছে। মুখ দু-টি যেন এখন রঙ-চটা ভাঙা-ফাটা দুটো পাথরের মূর্তি। দুই বন্ধু দু-জনকে দেখতে পেয়ে উত্তেজনায় কাঁপছে। মুখে তাদের কথা নেই। বুকের ভেতর শিহরন। থিরথির করছে তাদের শুকনো ঠোঁটগুলি। দু-জনেই ভাবছে, এই কি সেই জো! এই কি সেই লোতি! কত সুখ-দুঃখের বন্ধু দু-জন! কত ঝগড়া করেছে! কত হেসেছে! শত্রুর সঙ্গে একসঙ্গে লড়াই করেছে! নয়তো হাতে হাত ধরে কত বিপদকে তুচ্ছ করেছে! পারল না তারা নিজেদের সামলে রাখতে। হিংসা নয়, হিংসা নয়। আজ দু-জনের বুক থেকে উছলে উঠছে শুধু ভালোবাসা আর ভালোবাসা! বাড়িয়ে দিল তাদের হাত দু-জন দু-জনের দিকে। শীর্ণ হাতগুলি উঠতে চায় না কাঁপে। তবু বন্ধুর হাতে বন্ধু আজ হাত মেলাবেই। ধীর-পায়ে এগিয়ে যায় এক বন্ধু আর-এক বন্ধুর কাছে। ছুঁয়ে যায় তাদের হাত দু-টি। সঙ্গেসঙ্গে অশ্রুর ফোঁটাগুলি ঝরে পড়ল তাদের চোখে-চোখে। কিছু বলতে পারল না তারা। শুধু বুকভর্তি বিশ্বাসের শব্দটা তীব্র হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। না, হাতে হাত ছুঁয়ে তারা যেন আর দাঁড়াতেও পারছে না। অবশ হয়ে আসে কেন হাত-পাগুলো! চোখের ওপর থেকে আলোর রেখাগুলি যেন দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আবছা হয়ে আসছে যেন দু-জনের দু-টি মুখ। দু-জনের চোখে অন্ধকার কোথা থেকে নেমে আসে! থেমে যায় যেন নিশ্বাস! বসে পড়ল সেখানেই। ঢলে পড়ল মাটিতে লোতিসাবা জোরুতসি নামে দু-টি বুড়োমানুষ।

মণি-মুক্তোর জৌলুস-ছড়ানো সেই সোনার হারটি ছুটতে-ছুটতে গলায় পরে নিয়েছিল সুনি। মুখে তার সাত-রাজ্যের হাসি, হাতে তার রাজার চিঠি। সে তার জো আর লোতিকে আজ অবাক করে দেবে এই চিঠি দেখিয়ে। এতদিন তারা যাকে মেয়ে বলে আদর করেছে, ভালোবেসেছে—সে শুধু তাদেরই মেয়ে নয়, সে রাজকন্যা!

ছুটছে আর আনন্দে চিৎকার করে ডাকছে সুনি, ‘লোতি-ই-ই!’ ‘জো-ও-ও!’ যেন থামে না সে ডাক। তারপর ঝড়ের মুখে একটি উড়ন্ত পাখির মতো সুনি ডানা মেলে দূরন্ত বেগে তাদের অপরূপ সেই বাড়ির ফটক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। তার পায়ের শব্দে-শব্দে প্রতিধ্বনি চারদিকে। সেই শব্দ ছাপিয়ে তার মিষ্টি হাসির কলতান যেন উপচে পড়ছে। সে হাসছে, ডাকছে। তারপরেই—

এ কী! তার জো আর লোতি এখানে কেন? এই ঘরের বাইরে দালানের এই মেঝেয় তারা এমন করে শুয়ে কেন? ব্যস্ত হয়ে এগিয়ে গেল সুনি। হাঁটু গেড়ে বসে তার জো আর লোতির নাম ধরে ডাক দিল। সাড়া পেল না। কপালে হাত দিল। চমকে উঠেছে সুনি। এত ঠাণ্ডা কেন তাদের কপাল দু-টি! অস্থির হয়ে বুকের ওপর হাত দিল। প্রাণভর্তি বুকের শব্দটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে! চোখের পাতাগুলি যেন চিরদিনের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে! আবার ডাকল সুনি। আবার, আবার! যখন সত্যিই সাড়া পেল না, তখন হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল। কাঁদতে-কাঁদতে বলল, ‘দ্যাখো দ্যাখো লোতি, দ্যাখো দ্যাখো জো, এই মালা আমার বাবা পাঠিয়েছে। চোখ মেলো জো, লোতি, চোখ খোলো। না, না, আমি রাজার মেয়ে নই। আমি সুনি। তোমাদেরই সুনি। তোমরা শুধু একটিবার চেয়ে দ্যাখো।’ তারপর কেঁদে গড়িয়ে পড়ল।

না, তার লোতি আর জো সাড়া দেবে না। কোনোদিনই না। কেননা, তারা এখন স্বর্গের পথে পাড়ি দিয়েছে। যতক্ষণ না সেখানে পৌঁছোতে পারে, থামবে না। তারা যে মুসাফির।

নিজের গলা থেকে সেই মণি-মুক্তোর হারটি খুলে ফেলেছিল সুনি। তারপর সেই হার আর রাজার লেখা সেই চিঠিটি তার লোতি আর জোর বুকে রেখে দিয়ে বলেছিল, ‘বিদায়!’

এমনই সময় কে যেন কর্কশ গলায় ডেকে উঠল, ‘সুনি-ই-ই।’

চমকে গেছে সুনি। এ সময়ে তাকে এখানে কে ডাকে! চকিতে পিছন ফিরে তাকিয়েছে। আঁতকে উঠেছে। এ যে সেই লোকটা! যে-লোকটা হারমোনিয়াম বাজাত আর সুনি ট্যামবুরিন বাজিয়ে নাচত! এখানে কোথা থেকে এল!

‘আমি তোকে বছরের পর বছর খুঁজে বেড়াচ্ছি। আমার চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে এসেছিস তুই! আজ তোকে ধরতে পেরেছি। নদীর ধারে একটা কালো ঘোড়ার সঙ্গে যখন খেলা করছিলি, তখন আমি তোকে হঠাৎ দেখতে পাই! এবার তোকে কে বাঁচাবে?’ বলতে-বলতে সেই লোকটা এগিয়ে আসছিল সুনির দিকে।

ভয়ে চিৎকার করে উঠল সুনি, ‘না-আ-আ!’ তারপর ছুটে পালাতে গেল।

পারল না। লোকটা তার পথ আগলে হেসে উঠল, ‘হা-হা-হা।’ তারপর বলল, ‘আর পালাবার পথ নেই তোর। ভালোয়-ভালোয় আমার সঙ্গে ফিরে না গেলে, তোকে শেষ করে ফেলব।’

সুনি চিৎকার করে বলল, ‘তুমি আমার পথ ছেড়ে দাও।’

সে বলল, ‘ভয় দেখাস কাকে?’

সুনি বলল, ‘যে শয়তান তাকে।’

‘তোর এত বড়ো আস্পর্ধা! আমি তোকে পথ থেকে কুড়িয়ে এনে প্রাণে বাঁচিয়েছি। তুই আমার নিমক খেয়েছিস!’

‘তুমি আমাকে রাজপ্রাসাদ থেকে চুরি করে এনে পথে-পথে ভিক্ষা করতে শিখিয়েছ। তুমি আমাকে ভিক্ষুক করেছ।’

সুনির এ-কথা শুনে লোকটা কেমন যেন থমকে গেল। অবাক চোখে তাকাল সুনির মুখের দিকে। তারপর চোখের নিমেষে একটা ক্ষিপ্ত নেকড়ের মতো দাঁতে-দাঁত চেপে গজরাতে লাগল। তার চোখের দৃষ্টি দুটো যেন আগুনের ভাঁটা! হাতের আঙুলগুলো এক-একটা শানিত ছুরি। তীক্ষ্ণ। উঁচিয়ে আছে সুনির গলায় আঘাত করার জন্যে। তার নিশ্বাসে নিশ্বাসে প্রতিহিংসা। সুনিকে ধরবার জন্যে পায়ে-পায়ে ডিঙি মেরে এগিয়ে আসছে! এখন কী ভীষণ মূর্তি তার!

সুনি যেন এই মুহূর্তে সেই নেকড়ের মুখে একটা হরিণ। লোকটার এই হিংস্র চেহারা দেখে সে আতঙ্কে আবার চিৎকার করে উঠল, ‘না-আ-আ।’ তারপর কোথা থেকে ও সাহস পেল কে জানে, একেবারে অতর্কিতে লোকটার ওপর লাফিয়ে পড়ে, দু-হাতের মুঠি দিয়ে ওর বুকের ওপর একটা প্রচন্ড ধাক্কা মারল। লোকটা সামলাতে পারল না সে ধাক্কা। শান-বাঁধানো দালানটার ওপর পড়ল মুখ থুবড়ে! সঙ্গেসঙ্গে সুনি মারল ছুট। একেবারে বাড়ির বাইরে।

এই আচমকা ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলেও, নিজেকে সামলে নিতে সময় লাগল না লোকটার। আবার উঠে দাঁড়াল। যে পথ দিয়ে সুনি পালাল, সেই পথেই সে তাড়া করল। সে চিৎকার করে উঠল, ‘সুনি অমন করে ছুটে পালালে মরবি তুই! তোকে আমি শেষ করে ফেলব!’

কিন্তু কে কাকে শেষ করে! তার নিজের যমই যে কাছে দাঁড়িয়ে, সেটা তো জানে না সে! কোথায় ছিল সেই কালো ঘোড়া! আচম্বিতে লাফিয়ে পড়ল লোকটার ঘাড়ে! লাফিয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘চিঁ-হিঁ-হিঁ।’

লোকটা ‘ওরে বাবা রে’ বলে মারল এক গোঁত্তা। একেবারে মাটির ওপর। পড়েই আবার ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছে। মেরেছে দৌড়! কিন্তু ঘোড়ার সঙ্গে পারে কখনও! ঘোড়া টেনে ঝাড়ল এক চাঁট। এক চাঁটেই বাছাধন দশ হাত দূরে ডিগবাজি খায়। আর উঠতেও পারে না, নড়তেও পারে না। কোমরটা গেছে বোধহয় ভেঙেচুরে টুকরো হয়ে। অগত্যা পড়ে-পড়েই গোঙাতে লাগল।

কালো-ঘোড়া এবার ছুট দিল সামনে। ওই যে সুনি ছুটে পালাচ্ছে। হ্যাঁ, ছুটতে-ছুটতে ঘোড়া সুনির সামনেই হাজির হল। তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে পড়ল। থমকে গেছে সুনি ঘোড়াকে দেখে। হাঁপাতে-হাঁপাতে ঘোড়ার চোখের দিকে অস্থির হয়ে তাকাল সুনি। ঘোড়া চিৎকার করে আবার ডেকে উঠল, ‘চিঁ-হিঁ-হিঁ!’ তারপর সুনির চারপাশে গোল হয়ে ঘুরে-ঘুরে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিলে। সে যেন ব্যস্ত হয়ে বলতে চাইছে, ‘এখনই আমার পিঠের ওপর উঠে পড়ো সুনি, নইলে বিপদ!’

সুনি কি আর ঘোড়ার মনের কথা বুঝতে পারে! কিন্তু বুঝতে পারে, এখন এই বিপদের সময় এই কালো-ঘোড়া ছাড়া আর কোনো বন্ধু নেই। সেই শয়তান লোকটাকে এখন সবচেয়ে ভয় সুনির। যদি সে এসে পড়ে! সুতরাং আগুপিছু কিছু না-ভেবে, দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল ঘোড়ার গলাটা। তারপর ভর দিয়ে উঠে পড়ল তার পিঠে। আঁকড়ে ধরল ঘোড়ার ঘাড়ের কেশরগুলো। ঘোড়া তিরবেগে দৌড় মারল। দৌড় মারল সামনে। নদীটা যেখানে বেঁকে গেছে, কালো ঘোড়াও সেদিকে বেঁকে গেল। যেদিকে নদীর পাড়ে-পাড়ে অসংখ্য গাছের পাতায়-পাতায় হাওয়া বইছে, সেইদিকে হাওয়ার মতো ধেয়ে গেল কালো ঘোড়া। তারপর অসংখ্য গাছের আড়ালে লুকোচুরি খেলতে-খেলতে কোথায় যে চলে গেল, কোন দেশে, কেউ আর দেখতেও পেল না।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%