শৈলেন ঘোষ
লোকটার নাম তাসানু। আর তার ছেলের নাম কুহা। পৃথিবীসুদ্ধ মানুষ তাসানুর নাম জানবে, এমন কোনো কথা নেই। কিন্তু ওই যে শহরটা, ওই যে পাহাড়ের পায়ে-পায়ে যে-শহরটা গড়ে উঠেছে, সেখানকার সব মানুষই চেনে তাসানুকে। চোখে না-দেখলেও অন্তত নামটা কারো অজানা নয়। অথচ অঢেল পয়সার মালিকও নয় তাসানু, অথবা দু-চারটে বাড়ির মালিকানাও নেই তার। তবুও তাসানুকে লোকে চেনে। চেনে, একজন জবরদস্ত লড়াকু মানুষ বলে। হ্যাঁ, তাসানু লড়াই করে। তবে সে-লড়াই বন্দুক-হাতে যুদ্ধ নয়। সে লড়াই করে পাঁচিল-ঘেরা রিঙের মধ্যে মত্ত বলদের সঙ্গে। হ্যাঁ, তাসানু একজন বুল-ফাইটার। টগবগে, তাজা ভয়ংকর হিংস্র বলদের সঙ্গে লড়াই করে সে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।
এ যেন প্রাণ নিয়ে এক মারাত্মক খেলা। এ-খেলায় আজ পর্যন্ত হার স্বীকার করেনি তাসানু। দুরন্ত দানবের মতো ওই জন্তুটা যেন তাসানুর কাছে নেহাতই একটা তুচ্ছ প্রাণী। জন্তুটা যখন তার খাঁচার ঘর থেকে ছাড়া পেয়ে তাসানুর দিকে খাড়া দুটো শিং উঁচিয়ে ধেয়ে আসে, তখন তাসানু অন্য মানুষ। তখন তাসানুর হাতে কোনো অস্ত্র নেই। শুধু একটা লালকাপড়ের টুকরো। নিমেষে নিজেকে সামলে নিয়ে, ওই লালকাপড়ের উড়ন্ত হাওয়ায়, তাকে করে তোলে আরও ভয়াবহ। জন্তুটার নিশ্বাসের শব্দে বুক কেঁপে ওঠে ওই রিঙের চারপাশে জমায়েত মানুষগুলোর। কিন্তু ভয় নেই তাসানুর। দেখলে মনে হবে, মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়ে দুর্দান্ত সাহসী এক মানুষ, দুর্ধর্ষ এক বোকা-শত্রুর সঙ্গে লড়াই-লড়াই খেলা করছে। তারপর সেই শত্রুর শিং দুটো আঁকড়ে ধরে তার ঘাড়টা মটকে দেয় সজোরে। শত্রুর বিরাট দেহটা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পড়ে-পড়ে হাঁসফাঁস করতে থাকে। আর তখন হাজার-হাজার দর্শক চিৎকার করে ওঠে আনন্দে। সেই দর্শকের দল পাগলের মতো হাত-পা ছুড়ে রিং ডিঙিয়ে ছুটে যেতে চায় তাসানুর কাছে। ইচ্ছে করে তাকে মাথায় নিয়ে নাচে। তখন রিঙের চারপাশে শুধু তাদের একটি আদরের নাম আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে তোলে, ‘তাসানু, তাসানু’। আর তাসানু তখন বুক ফুলিয়ে, হাত নেড়ে তাদের উল্লাসের সাড়া দিতে-দিতে রিং পেরিয়ে চোখের আড়ালে হারিয়ে যায়। কিন্তু তাসানুর নামটা হারায় না। সে-নাম ছড়িয়ে যায় ঘরে-ঘরে, সকলের মুখে-মুখে।

এমনি করে লড়াই করতে-করতে মানুষটাকে যেন রক্তের নেশা পেয়ে বসে। এখন সে জানে শুধু খুন করতে। তার চেয়ে যে শক্তিশালী, তাকে হত্যা না-করতে পারলে তার সুখ নেই। তার সবল আর পাথরের মতো শক্ত দেহটা দেখে ভয় পাবে না কোন মানুষ! কারণ সে-দেহে দয়া নেই, মায়া নেই, নেই একটুখানি স্নেহ। ছিল না কোনোদিনই। তাসানু যেন এক ভয়ংকর জন্তুর চেয়েও নৃশংস একটা হাত-পা-ওলা জীব। সে যখন তার মা-বাবার কাছে থাকতে থাকতে বড়ো হয়েছে, তখন থেকেই তার হাত-দুটো আঁকপাঁক করত কিংবা চোখ দুটো হিংসায় ঝলসে উঠে যেন বলতে চাইত, ‘এসো, আমি তোমার ঘাড়টা মটকে দিই।’
তাসানুর এখন আর কেউ নেই। আছে শুধু ওই ছেলেটি, কুহা। বউটারও মরে যাবার কথা নয়। মরে যাবার মতো তার বয়েসও হয়নি। কিন্তু অকালে চলে গেল। সে তো তাসানুরই জন্যে। একদিন তাসানু বউকে নিয়ে গেছল তার লড়াইয়ের খেলা দেখাতে। সেদিন ছিল খুব বড়ো খেলা। খুব ধুমধাম। অনেক উপহার। তার বউ যেতে চায়নি এ-খেলা দেখতে। কিন্তু তাকে যেতে হয়েছিল তাসানুরই চাপে। কিন্তু লড়াইয়ের সেই ভয়াবহ দৃশ্য সহ্য করতে পারেনি তার বউ। তাসানু যখন একটা মারমুখী বলদের ঘাড় ধরার জন্যে এগিয়ে গেছল, তখনই সেই ক্ষিপ্ত জন্তুটা তার শিং দুটো উঁচিয়ে তেড়ে গেছে তাসানুর দিকে। আর তখনই মূর্ছা গেছল তার বউ। আর জ্ঞান ফেরেনি।
মায়ের জন্যে ছেলেটা কেঁদেছিল অনেক। দুঃখ পেয়েছিল বটে তাসানুও। কিন্তু সে-দুঃখ তার কোনোদিনই বুকে চেপে বসতে পারেনি। সে শুধু ভাবত, যেদিন তার ক্ষমতা কমবে, সেদিন ছেলেকে সে দিয়ে যাবে তার সেই ক্ষমতা। সেদিন তারই মতো ছেলে কুহার নামও ছড়িয়ে পড়বে সবার মুখে-মুখে। বাপের মতো ছেলেও হবে এক সাহসী লড়াকু।
হ্যাঁ, সত্যিই যত দিন যায় ছেলেটার বুকখানাও যেন ততই চওড়া হয়ে ওঠে। তেমনি শক্তিসামর্থ্য। তাসানু ছেলের মুখের দিকে তাকায় আর মনে-মনে ভাবে, তার সময় এগিয়ে আসছে। তার শক্তি যেন লুকিয়ে লুকিয়ে ছেলের বুকেই উঁকি মারছে। ছেলের ওই পাট্টাই চেহারাটা দেখে আনন্দে শিউরে ওঠে তাসানু। কখনো বা ছেলের হাতটা নিজের হাতের মুঠি দিয়ে জাপটে ধরে জিজ্ঞেস করে, ‘পারবি না, আমার মতো লড়াই করতে?’
উত্তর দেয় না কুহা। শুধু তার বাবার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। আর নয়তো বাবার হাতে ফুলে-ওঠা ওই লোহার মতো শক্ত মাংসপেশির দিকে চমকে-চমকে দেখে। ওই হাতের দুরন্ত আঘাতে কতই-না বলদের ঘাড় মটকে দিয়েছে তার বাবা। মনে-মনে ভাবে, এই নিষ্ঠুর খেলাটা যদি মানুষের মগজে বাসা না-বাঁধত, তাহলে নিশ্চয়ই পৃথিবী রসাতলে যেত না। মানুষের মগজটা যেন অন্যায় আর অপকর্মের আখড়া!
খুব যখন ছোটো ছিল কুহা, তখন সে একেবারে কাছে-কাছে থাকত তার মায়ের। হয়তো-বা মা-ই তাকে কাছে-কাছে লুকিয়ে রাখত। হয়তো মা ভয় পেত কুহার বাবাকে। ভয় পেত, যদি তার বুক থেকে ছেলেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার বাবা! না, ছেলে তার বাপের মতো হোক, কুহার মা তা কোনোদিনই চাইত না। চাইত না, ছেলে হোক অমন নৃশংস কিংবা অমন ঘাতক। তাই কুহার বাবা ছিল তার কাছে একটা আতঙ্ক!
কিন্তু ভয় পেত না কুহা তার বাবাকে। সে তার বাবার মুখের দিকে যখনই তাকাত, দেখত, বাবার মুখের চোয়াল দুটো যেন হিংসায় ছটফট করছে। যখন চোখের দিকে তাকাত, দেখত বাবার লাল-টকটকে চোখ দুটো যেন এক্ষুনি ঠিকরে বেরিয়ে এসে কাউকে ভস্ম করে দেবে! ঠোঁটে হাসি নেই, কিংবা বুকে আদর। বাবাকে দেখতে-দেখতে যখনই সে মায়ের কাছে ছুটে যেত, মনে হত, একমুঠো জ্যোৎস্নার আলোয় যেন ডুব দিয়ে একঝাঁক ফুলের বুকে এসে সে লুটোপুটি খাচ্ছে!
হ্যাঁ, ফুলই ভালোবাসত কুহা। কিংবা ভালো লাগত দুই-পাহাড়ের মাঝখানে ওই যে কাচের মতো নিথর জলের হ্রদ, ওখানে ছুটে যেতে। ওই জলের ছায়ায় কত গাছের ছবি। সেই ছবির ফাঁকে-ফাঁকে কুহার মুখের ছায়াটাও ভেসে ওঠে। ঠিক সেই মুহূর্তে সেই জলের দোলনায় সে-ও যেন ছবির মতো দোল খায়। সেই হ্রদের ধারে-ধারে যত পাথরের টুকরো, কিংবা যত গাছ, সবার সঙ্গে জানা-চেনা কুহার। যখনই কুহা সেখানে যায়, যখনই পাহাড়ের গায়ে-গায়ে বাতাসের দোলা এসে গাছের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখনই যেন কুহার মনে হয়, সেই বাতাস হু-হু করে বইতে-বইতে তার নাম ধরে ডাকছে, ‘কুহা-হা, কুহা-হা।’ কুহা হা-হা করে হেসে ওঠে, আর নয়তো লাফিয়ে-লাফিয়ে, পাথরে পা ফেলে এ-পাহাড় থেকে ও-পাহাড়ে ছুটে যায়। এ ছিল কুহার খেলা। কুহা তখন জানতেও পারত না, তার বাবাও খেলা করছে। তার বাবাও এইমাত্র আর একটা বলদের দুটো শিং জড়িয়ে ধরে মাটির ওপর গড়াগড়ি খাচ্ছে। আর হাজার হাজার মানুষ সেই দৃশ্য দেখতে-দেখতে চিৎকার করে উল্লাস করছে।
এমনি করে দিন যায়। বড়ো হয়ে ওঠে কুহা।
এমনি করে দিন যায়। বয়স বাড়ে তাসানুর। কিন্তু না, তাসানু বয়স মানে না। সে তার দেহের মাংসপেশিগুলোকে নিজে-নিজেই দেখে আর খুশিতে ডগমগ করে। আর মনে-মনে ভাবে, বয়সকে থোড়াই কেয়ার! তার শক্তির সে কী দেমাক!
কিন্তু একদিন তার এই দেমাক লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। একদিন হঠাৎ তার মাথায় উঁকি দিল একটি পাকাচুল। তার ছেলে হেসে গড়িয়ে গেল তাই দেখে। তাসানু বুঝতে পারল না কেন ছেলে হাসে! ছেলের মুখের দিকে তাকায় তাসানু। তবু ছেলের হাসি থামে না। রেগে যায় তাসানু। ছেলে তবু থামে না। অবাক হয় তাসানু। যে-ছেলে তার মুখের দিকে চেয়ে কোনোদিন কথা বলতে সাহস করে না, সেই ছেলে হাসে! মেজাজ তার বিগড়ে যায়। থাকতে পারে না। ধমক মারে ছেলেকে, ‘আমি তোর বাপ, আমার সামনে হাসিস তুই!’
কুহা বলে, ‘এতদিন হাসি পায়নি, আজ পাচ্ছে।’
আরও জ্বলে ওঠে তাসানু, ‘আমি তোর ঠাট্টার পাত্তর! দুনিয়াসুদ্ধ লোক আমায় ভয় পায়; আর তুই হাসিস!’
‘আর ভয় পাবে না কেউ।’ ভারি হালকা স্বরে উত্তর দেয় কুহা।
ছেলের মুখে এইকথা শুনে উন্মাদের মতো শক্ত তার বাহুদুটো উঁচিয়ে ধরে তাসানু! বলে, ‘দেখছিস!’
কুহা বাবার বাহু দুটোর ওপর হাত বুলিয়ে বলে, ‘এমন শক্ত আর ক-দিন থাকবে?’
তাসানু চিৎকার করে ওঠে। বলে, ‘চিরদিন।’
‘কিন্তু তোমার দিন তো ফুরিয়ে আসছে বাবা। তোমার চুলে পাক ধরেছে।’
লাফিয়ে ওঠে যেন তাসানু। একটা ক্ষিপ্ত বাঘের মতো কুহার মাথার ঝুঁটিটা খামচে ধরে বলে, ‘আর একবার বল।’
কুহা ভয় পায় না। বাবার মুখের সামনে বুকখানা উঁচিয়ে বলে, ‘আমি তোমার লড়াইয়ের বলদ নই। আমি তোমার ছেলে। মনে কোরো না, আমার শক্তি কারো চেয়ে কম! আমি মনে করি, আমার গায়ে হাত তোলার আগে, আমার বয়সটা তোমার ভেবে দেখা উচিত ছিল। মনে কোরো না, আমি দুর্বল। মনে কোরো না, আমি আমার মায়ের চেয়ে নরম। তোমার নির্দয় বাহাদুরি দেখানোর জন্যে, আমার মাকে মরতে হয়েছে। একথা তুমি ভুলে থাকতে পারো, কিন্তু আমি ভুলিনি। ভুলব না কোনোদিনও। সুতরাং আশা করব, তুমি এখনই আমার মাথা থেকে তোমার হাত সরিয়ে নেবে।’
ছেলের কথা শুনে তাসানুর দেমাক এতটুকু কমে না। সে আরও উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘আমাকে ভয় দেখাস তুই।’
কুহা তেমনি ঠাণ্ডা-মেজাজে বলে, ‘তোমার এই দেমাক ভিতুর আস্ফালন। তোমার এ-আস্ফালন শেষ হতে আর দেরি নেই।’
কুহার মাথার চুল থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে রাগে কাঁপতে-কাঁপতে তাসানু ছেলেকে দু-হাত দিয়ে প্রচন্ড শক্তিতে জাপটে ধরল। তারপর চিৎকার করে বলে উঠল, ‘আমি শুধু বলদই মারতে পারি না, আমি মানুষেরও টুঁটি ছিড়ে ফেলতে পারি।’
কুহা নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। বাবার দুই বাহুর প্রচন্ড চাপে তার দম আটকে আসছে। মুহূর্তে তার মনে হল, এই নির্দয় মানুষটার হাতে দুর্বলের মতো মরলে, সেটা হবে কাপুরুষের মরণ। সুতরাং প্রচন্ড জোরে একটা ঝটকা মারল কুহা তার বাবার বুকে। তাসানু তার তাজা ছেলেটার আচমকা আঘাতে আর্তনাদ করে দু-হাত দূরে ছিটকে পড়ল। পড়ে হাঁফাতে লাগল। হাঁফাতে-হাঁফাতে ছেলের মুখের দিকে আহত বাঘের মতো জুলজুল করে তাকিয়ে থাকে তাসানু। বুকের ভেতরটা চমকে ওঠে কুহার! ছি:! ছি:! এ কী করল সে! সে কি সত্যি-সত্যি তার বাবাকে আঘাত করল। চোখের পলকে কুহা বাবার কাছে ছুটে যায়। দু-হাত দিয়ে বাবার শরীরটা জড়িয়ে ধরে মাটি থেকে তুলে নেয়। তারপর কাঁপা-কাঁপা স্বরে বলে, ‘আমি অন্যায় করে ফেলেছি বাবা, আমায় তুমি ক্ষমা করো।’
আজই প্রথম এবং বোধহয় কুহার জ্ঞানে প্রথম, সে বাবার ঠোঁটে হাসি দেখল। অবাক হয়ে যায় কুহা বাবাকে হাসতে দেখে! তাসানু দাঁড়িয়ে উঠে আনন্দে উদবেল হয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে, ‘শাবাশ।’
বাবার বুকের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে কুহা আরও অবাক হয়ে যায়! ভয়ে-ভয়েই জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কিছু মনে করোনি তো বাবা?’
তাসানু বলে, ‘মনে করব কীরে! আজ আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। আজ পর্যন্ত আমি কারও কাছে হারিনি। আজ পর্যন্ত কারও সাহস হয়নি আমার গা স্পর্শ করে। কিন্তু আজ আমি আমার ছেলের কাছে হেরে গেছি। এ আমার কম আনন্দ? আমি বুঝেছি, এবার আমার শক্তি, আমার ছেলেকে দিয়ে যাবার সময় হয়েছে। এবার সত্যিই আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার ছুটির সময় এগিয়ে আসছে।’
বাবার বুকের মধ্যে থরথর করে কাঁপতে লাগল কুহা। কান্নাটাকে শত চেষ্টা করেও লুকোতে পারল না। তাসানু ছেলের মাথায় হাত বুলোতে-বুলোতে বলল, ‘দুর বোকা, কাঁদছিস কেন? আমার দিন শেষ হলে তোকেই তো করতে হবে আমার মুখ উজ্জ্বল। তুই পারবি না?’
‘কী?’
‘আমার মুখ উজ্জ্বল করতে?’
‘পারব।’
‘শাবাশ।’ বলে আনন্দে চিৎকার করে ছেলেকে আবার জড়িয়ে ধরল। তারপর আবার বলল, ‘আমি দেখতে চাই, আমার চেয়েও বড়ো হয়েছিস তুই। আমার চেয়ে আরও শক্তিশালী বলদের সঙ্গে লড়াই করে চমক লাগিয়ে দিচ্ছিস সক্কলকে।’
চুপ করে রইল কুহা। বাবা জিজ্ঞেস করল, ‘কীরে, কিছু বলছিস না যে!’
হঠাৎই যেন বলে ফেলে কুহা, ‘এ-লড়াই আমার ভালো লাগে না বাবা!’
তাসানুর হাসিমুখখানা কুহার উত্তর শুনে ফ্যাকাসে হয়ে যায়। আবার জিজ্ঞেস করে, ‘কেন?’
‘কষ্ট হয়।’
তাসানু চেঁচিয়ে ওঠে, ‘ছি:! ছি:! তুই না জোয়ান ছেলে! কষ্টের কথা মুখে আনতে তোর আটকাল না! আমি যে কতদিন সেই স্বপ্ন দেখেছি কুহা! দেখেছি, তুই-ও আমার মতো লড়াইয়ের রিঙে একটা ভীষণ-মূর্তি বলদের সঙ্গে লড়াই করছিস। সবাই তোর লড়াই দেখে, আমার মতো তোরও নাম ধরে উল্লাস করছে। আমার মতো তোরও নাম ঘরে-ঘরে ছড়িয়ে পড়ছে। ছেলের গর্বে আমার বুকখানা ফুলে উঠছে। সে কী আনন্দ আমার।’
কুহা আদর করে বাবাকে। তারপর নরম গলায় বলে, ‘একটা নিরীহ জীবকে হত্যা করতে আমার ভালো লাগে না বাবা।’
তাসানু চুপসে যায়। গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে, ‘তবে কি আমি মনে করব, আমার ছেলে একটা নির্জীব হাড়গোড়-ভাঙা মাংসের ডেলা!’
‘বাবা, আমিও কি তবে মনে করব, আমার বাবা দয়াহীন, মায়াহীন একটা হিংস্র দানব!’
থতমত খেয়ে যায় তাসানু ছেলের কথা শুনে। এই একটু আগে যে-লোকটার মুখখানা হাসিতে ঝকঝক করছিল, সেই মুখ এখন রাগের আগুনে ঝলসে উঠছে। ছেলের মুখের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চেয়ে তাসানু গর্জে উঠল, ‘আমার ছেলে তুই। আমার জন্যে এই পৃথিবীতে তুই বেঁচে আছিস। আমার জন্যে ওই চোখ দুটো তোর আলো দেখছে। আমারই জন্যে তোর মুখে কথা ফুটেছে। আমি যা হুকুম করব, তোকে তা-ই করতে হবে। আমার হুকুম, আমারই মতো তোকে বলদের সঙ্গে লড়াই করতে হবে। তোকে আমার সঙ্গে যেতে হবে কাল। আমার নিজের হাতে তোকে আমি খেলা শেখাব। আর যদি আমায় অবজ্ঞা করিস, তবে আমারই হাতে মরতে হবে তোকে!’
বাবার একথা শুনে কুহা যেন আতঙ্কে থমকে যায়। মুখে তার কথা আসে না। কীই-বা বলবে সে! কাকেই বা বলবে। যে-মানুষটা বলতে পারে নিজের হাতে ছেলেকে মারবে, সে কি আর মানুষ আছে! শিউরে ওঠে কুহা! বুঝি-বা সত্যি সে বোবা হয়ে গেল। কেন-না, সারাদিনে একটি কথাও তার মুখ দিয়ে বেরোয়নি। কেমন যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেছে তার মনের ভেতরটা। এখন কুহা বুঝতে পেরেছে, এই মানুষটার হাত থেকে সে কিছুতেই নিস্তার পাবে না। বাঁচতে হলে হয় তাকে লড়াই করতে হয়, আর তা না-হলে তার বাবার হাতে তার নিশ্চিত মরণ।
সারাদিন ধরে কুহা যে কী ভাবল, কেউ জানে না। সারাদিন ধরে সে বাবার চোখের আড়ালে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। তারপর রাত নি:ঝুম গড়িয়ে এলে নিজের ঘরে শুয়ে পড়ল। ঘুমোল না কুহা। নিস্তব্ধ রাতে সে নিশ্চুপ হয়ে কীসের জন্যে যেন অপেক্ষা করতে লাগল। গভীর রাতের কালো ওড়নাটা যখন এই শহরের মুখখানা একেবারে ঢেকে ফেলল, তখন কুহা চুপিচুপি নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সতর্কপায়ে এগিয়ে গেল বাবার ঘরের দিকে। উঁকি মারল জানালা দিয়ে। ঘুমুচ্ছে। যে-মানুষটা দিনের আলোয় ঘাতক, এই রাতের অন্ধকারে ঘুমিয়ে-পড়া সেই মানুষটাই দ্যাখো যেন কত পালটে গেছে! ঘুমের কোলে লুটিয়ে পড়ে যেন একটি নিরীহ নিষ্পাপ মানুষ স্বপ্নের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।
একটু মুচকি হাসে কুহা। আবার একবার ভালো করে দেখে তার বাবাকে। তারপর অদৃশ্য হয়ে যায় রাতের অন্ধকারে। আর দেখা গেল না।
যেমন রোজ খুব সকালে সে ঘুম থেকে ওঠে, সেদিনও তাসানু তেমনি সকালেই জেগে উঠেছিল। কিন্তু যেমন রোজ সকালে কুহা তার বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়, আজ তেমন করে এসে দাঁড়াল না কুহা।
যেমন সে রোজ সকালে বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, ‘তোমার আজকের দিন সুখের হোক,’ আজ তেমনি করে বলতে এল না কুহা।
অবাক হল তাসানু। ভাবল, তবে কি কুহার ঘুম ভাঙেনি! ডাকল সে ছেলের নাম ধরে, ‘কুহা!’
কোনো সাড়া পেল না।
আবার ডাকল ‘কুহা-হা!’
এবারও কোনো সাড়া মিলল না।
কেমন যেন চমকে উঠল তাসানু। এবার বেশ চিৎকার করেই ডাক দিল, ‘কুহা-হা-হা।’
না, কুহা সাড়া দিয়ে বলল না, ‘যাই বাবা।’
ব্যস্ত হয়ে ঝটপট বিছানা ছেড়ে উঠে বসল তাসানু। ছুটে গেল ছেলের ঘরে। না তো! ঘরে তো ছেলে নেই। থমকে যায় তাসানু। গলার স্বরে যত চিৎকার ছিল সব একসঙ্গে ফেটে পড়ল, ‘কুহা-হা, কুহা-হা-হা।’
না, কোনো সাড়াও নেই, কোনো শব্দও নেই। মুহূর্তের মধ্যে তাসানুর কঠিন হাত-পাগুলো কেমন যেন অবশ হয়ে যায়! একটা অজানা আতঙ্ক হঠাৎ যেন কাঁপিয়ে দেয় তার বুকের ভেতরটা। ছেলে কি তবে তাকে ছেড়ে চলে গেল! সে পাগলের মতো চিৎকার করে ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। তাসানু জানে, ছেলে তার ওই পাহাড়-ঘেরা হ্রদের ধারে রোজ যায়। তাই সে-ও কুহার নাম ধরে চিৎকার করতে-করতে ছুটল সেইদিকেই। না, দেখা যায় না কুহাকে। ছেলের মতো সে-ও পাথরের গায়ে-গায়ে পা ফেলে ছোটে। আঁতিপাতি করে খোঁজে আর চিৎকার করে, ‘কুহা-হা, কুহা-হা-হা।’
নির্জন সেই হ্রদের তীরে, সবুজ সেই গাছে-গাছে, বিরাট সেই পাহাড়ের গায়ে-গায়ে প্রতিধ্বনিই শুধু শুনতে পায় তাসানু। কিন্তু ছেলের সাড়া সে শুনতে পায় না। পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করে দেয় তাসানু। ছুটতে-ছুটতে পাথরের গায়ে হোঁচট খায়। কখনো পড়ে যায়। ওঠে, আবার চিৎকার করে। যেন জেরবার হয়ে যায় তাসানু নামের দুর্ধর্ষ মানুষটা। দেখলে মনে হবে, যেন ঝড়ঝঞ্ঝায় ধ্বস্ত একটুকরো শুকনো-গাছের ডাল! ভেঙে-মচকে ছটফট করছে!
আর বেশিক্ষণ পারল না তাসানু। পারল না ছুটতে, চেঁচাতে। ভীষণ তেষ্টায় সে ক্লান্ত। লুটিয়ে পড়ল পাথরের ওপর। পড়ে-পড়ে হাঁফাতে লাগল।
অনেকক্ষণ পরে, অনেক কষ্টে উঠে দাঁড়াতে পারল তাসানু। টলতে-টলতে সে নেমে গেল হ্রদের তীরে। কাচের মতো স্বচ্ছ সেই জল নিজের চোখে-মুখে ছিটিয়ে নিয়ে চুমুক দিল। আঃ! যেন বাঁচে তাসানু। আর একবার চারদিকটা সে ভালো করে দেখল। কিন্তু হায়! সে কাউকে দেখতে পেল না। কোনো সাড়াও পেল না। শুধু নির্জন সেই হ্রদের তীরে বাতাসের ঝুমঝুমি ছাড়া আর কিছুই শোনা যায় না। ভারি শান্ত চারপাশ।
এখন কী করা উচিত, ভেবে পায় না তাসানু। ছেলে তাকে ছেড়ে চলে যাবে, একথা যেন সে বিশ্বাসই করতে পারে না। মনে-মনে ছেলের ওপর কখনো ভীষণ রাগে, আবার কখনো ভাবনায় থমকায়।
এমনই সময় হঠাৎ তাসানুর মনে হল, ছেলেটা এখানে না-এসে অন্য কোথাও তো যেতে পারে! কে জানে, সেখান থেকে এতক্ষণে হয়তো ঘরে ফিরে এসেছে! যেমনি একথা মনে হল, সঙ্গে-সঙ্গে সে ঘরের দিকে ছুটল। পারে না ছুটতে। ক্লান্ত পা-দুটো তার টলে-টলে হোঁচট খায়। অনেক কষ্টে ঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় সে। ঘরের ভেতর চোখ ফিরিয়ে সে চমকে যায়। এ কী! রাজপ্রাসাদের দূত যেন অপেক্ষা করছে তার জন্যে ঘরের ভেতর! নিজেকে সামলাবার চেষ্টা করে তাসানু। কোনো কথা না-বলে অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। দূত হাসে। তবু কিছু জিজ্ঞেস করে না তাসানু। বোবামূর্তির মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তার সামনে। দূত জিজ্ঞেস করে, ‘কী হয়েছে তাসানু? দেখে মনে হচ্ছে, তুমি খুবই ক্লান্ত।’
তাসানু তবুও নিশ্চুপ।
দূত আবার বলে, ‘তোমার জন্যে একটি সুসংবাদ এনেছি।’
তাসানু শুধু চেয়েই থাকে।
দূত থামল না। বলল, ‘তুমি নাকি আজ মস্ত লড়াইয়ের খেলায় নামছ? সম্রাট এ-খবর শুনে অত্যন্ত খুশি হয়েছেন। তিনি আজ নিজেই তোমার লড়াই দেখার জন্যে উপস্থিত থাকবেন। রাজপ্রাসাদ থেকে এ-সংবাদ তোমায় পৌঁছে দেবার জন্যে আমায় পাঠানো হয়েছে তোমার কাছে। সম্রাটের সামনে তুমি খেলা দেখাবে, কী ভাগ্যবান তুমি। তোমাকে আমার অভিনন্দন।’
এবার তাসানুর মুখে কথা ফোটে। সে শান্তস্বরে বলে, ‘আজ আমায় রেহাই দাও।’
‘মানে!’ প্রথমে চমকে যায়, তারপর হেসে ওঠে দূত। বলে, ‘তাসানুর মুখে এ-কী কথা!’
তাসানু বলে, ‘হ্যাঁ, আজ আমার ছুটি চাই।’
‘তুমি লড়াই করবে না?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে দূত। ‘না।’ দৃঢ় কন্ঠে উত্তর দেয় তাসানু।
‘তাসানু, এ-সুযোগ বারবার আসে না। সম্রাটের সামনে খেলা দেখাবে এ তোমার কত বড়ো ভাগ্য! এ সৌভাগ্য ক-জনের কপালে জোটে। তিনি খুশি হলে তোমার জয়জয়কার! চাই কী, তোমার কোনো অভাবই থাকবে না।’
‘থামো!’ দূতের কথা শেষ হবার আগেই আচমকা ধমক দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল তাসানু। ‘আমি আজ লড়াই করতে পারব না। আমার এ-সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিতে পারো সম্রাটকে।’
দূত আর কোনো কথা বলতে সাহস করল না। সে চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল তাসানু। ঘরের মধ্যে এখন সে একা। কিছু ভাবতে পারে না। কেমন যেন সব তার এলোমেলো হয়ে গেছে! কী সে করবে এখন? এখন সে ছেলের খোঁজে পথে বেরুবে, না, সম্রাটের আদেশমতো লড়াইয়ের রিঙে যাবে! একটা মত্ত বলদের সঙ্গে লড়াই করে সম্রাটকে খুশি করা এখন তার কাছে বড়ো, না, ছেলেকে খুঁজে বার করা! ভাবতে-ভাবতে এই কঠিন মানুষটা কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়ে। কখনো সে বিছানায় মুখ গুঁজে হাঁফায়। নয়তো জানালায় মুখ বাড়ায়। স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সামনের পথের দিকে। ওই পথে যদি তার ছেলে আসে! সে যদি দেখতে পায়! তাসানু নামের ভয়ংকর এই মানুষটা এখন নিজেই নিজের সঙ্গে লড়াই করছে। যে-মানুষটা হারেনি কোনোদিন কারো কাছে, সেই মানুষই আজ আধমরা মানুষের মতো ধুঁকতে-ধুঁকতে এই ঘরটার চারপাশে আকুল হয়ে কাকে যেন খুঁজে বেড়ায়! কিন্তু এ-ঘরে কেউ নেই। শূন্য। তাসানুর বুকের ভেতরটা হু-হু করে জ্বলে যায়। এইখানেই একদিন সে তার বউকে নিয়ে ঘর বেঁধেছিল। এই ঘরেই তার ছেলেটা প্রথম হামাগুড়ি দিতে শিখেছিল। এই ঘরেই সে তাসানুকে প্রথম ‘বাবা’ বলে ডেকেছে। মায়ের কোলে লুকোচুরি খেলেছে। কী সুখের সংসার ছিল তাদের। কী সুন্দর ছিল সেই মানুষটি, যে তাকে মৃত্যুর হাত থেকে ছিনিয়ে এনে এই ঘরে আশ্রয় দিয়েছিল। সেই মানুষটিও ছেড়ে চলে গেছে এই পৃথিবী তার বউয়ের মতো। আর আজ তার ছেলেটাও তাকে ফেলে চলে গেল! পারল না তাসানু আর চুপ করে থাকতে। শূন্য ঘরের ভেতর উন্মাদের মতো আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, ‘কুহা, কুহা-হা।’ দুমদাম করে ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল। ছুটে বেরিয়ে পড়ল ঘর থেকে। তারপর ওই শক্তিমান মানুষটা ছুটতে-ছুটতে চেঁচাতে লাগল, ‘কুহা, কুহা-হা।’
সে এখন জানে না, ছুটতে-ছুটতে কোথায় যাবে। এখন সে শুধু জানে, এই শহরটা ফেলে পালাতে হবে তাকে। এ-শহর শহর নয়! এ যেন এক কসাইখানা। নিরীহ প্রাণীকে হত্যা করতে না-দেখলে, এ-শহরের মানুষের চোখে ঘুম আসে না। এ-শহরের মানুষ রক্ত দেখলে উল্লাস করে। আজ সে বুঝতে পেরেছে, এ অন্যায়, এ মিথ্যা। সে বুঝতে পেরেছে আজ, এ-পৃথিবীটা শুধু মানুষের একার নয়। মানুষের মতো আর যে প্রাণীগুলো এই পৃথিবীর বাতাসে নিশ্বাস নেয়, এ-পৃথিবী তাদেরও। এখানে কি মানুষ আর সকলকে মেরে একাই বেঁচে থাকতে চায়! এত স্বার্থপর!
কিন্তু এ-শহর ছেড়ে পালাতে পারল না তাসানু। কেন-না, সম্রাটের সান্ত্রীর দল তাকে ধরার জন্যে ধাওয়া করল। তাসানু তাদের চোখকে ফাঁকি দিতে পারল না। সে ধরা পড়ে গেল। তাকে বন্দি করা হল। হাজির করা হল সম্রাটের সামনে।
এ তো নতুন কথা নয়, সম্রাটকে অগ্রাহ্য করে যে-মানুষ পালাবার চেষ্টা করে, তার জন্যে কেউ ফুলের শয্যা সাজিয়ে রাখে না। সুতরাং সম্রাট ক্ষিপ্ত হলেন ভয়ংকর রকম। তাসানুকে দেখে গর্জন করে উঠলেন, ‘এই লোকটাই তাসানু? এঁ:? এই লোকটাই ভয়ে কুকুরের মতো ল্যাজ গুটিয়ে পালাচ্ছিল?’
সম্রাটের পার্শ্বচররা বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ সম্রাট, এই সেই লোক।’
সম্রাট এবার রুক্ষস্বরে ধমকে উঠলেন, ‘তবে যে আমায় বলা হয়েছিল, লোকটা সাহসী!’
একজন পার্শ্বচর সম্রাটের এ-প্রশ্নে আমতা-আমতা করে ঘাড় চুলকিয়ে বললেন, ‘আজ্ঞে, লোকটা আগে সাহসী ছিল। এখন একটু ইয়ে—’
তার কথা শেষ হবার আগেই সম্রাট কড়কে উঠলেন, ‘মূর্খ।’ তারপর তাসানুর মুখের ওপর সম্রাট কঠোর দৃষ্টি হেনে বললেন, ‘তোমার নাকি এমন স্পর্ধা, আমার দূতকে তুমি অপমান করেছ? বলেছ, আমাকে তুমি খেলা দেখাতে পারবে না? জানো, আমি এ-দেশের সম্রাট!’
তাসানু এতটুকু ভয় না-পেয়ে উত্তর দিল, ‘সম্রাটের সামনে সেই কথা বলতে আমি এখনও ভয় পাই না।’
তাসানুর মুখে এমন দুঃসাহসিক উত্তর শোনার জন্যে সম্রাট আদৌ প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি হতচকিত। অপমানে তাঁর চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠল। যে-সম্রাটের সামনে কোনো মানুষের টুঁ শব্দ করার সাহস নেই, সেই সম্রাটের মুখের ওপর কথা বলে কে, না সামান্য বলদের সঙ্গে লড়াই করে এমন একটা লোক! সম্রাট ক্ষিপ্ত হয়ে গর্জে উঠলেন, ‘জানো, আমি এখনই তোমাকে হত্যা করতে পারি!’
তাসানু বলল, ‘হ্যাঁ, একথা আমার জানা আছে। আমি এও জানি, হত্যা শুধু আপনি একা করতে পারেন না, এ-শহরের সবাই হত্যা করতে পারে। এ-শহর একটা কসাইখানা।’
‘কী!’ ভীষণ চিৎকার করে উঠলেন সম্রাট। তিনি যেন সিংহাসনে বসতে পারছেন না! ভয়ংকর রকম বিচলিত তিনি! সাংঘাতিক অপমানবোধ করলেন সম্রাট। আর কিছু ভেবে না-পেয়ে বলে উঠলেন, ‘আমি তোমাকে নরখাদক বাঘের মুখে ফেলে দেব। তোমাকে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খাবে, আমি দেখব।’
তাসানু তেমনি ধীরভাবে বলল, ‘এ তো যথার্থ কসাইখানার সম্রাটেরই মতো কথা।’
সম্রাট সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি উত্তেজিত। তিনি কাঁপছেন। কাঁপতে-কাঁপতে নিজের হাত তাসানুর দিকে ছুড়ে বললেন, ‘আমি কোনো কথা শুনতে চাই না। আমি জানতে চাই, তুমি লড়াই করবে কিনা!’
‘আজ্ঞে না।’
তাসানুর এই উদ্ধত উত্তর শুনে সম্রাট উত্তেজনায় দ্বিগুণ জোরে কাঁপতে-কাঁপতে বললেন, ‘নির্বোধ আমায় অগ্রাহ্য করো তুমি! শেষবারের মতো ভেবে দ্যাখো। হয় আমায় খেলা দেখাও, নয় বাঘের মুখে জীবন দাও।’
তাসানু এতটুকু বিচলিত না-হয়ে আগের মতোই শান্তস্বরে বলল, ‘আমি আগেও বলেছি, আবার বলছি, লড়াই আমি করব না।’
সম্রাট এবার হাতের মুঠি পাকিয়ে বললেন, ‘আমিও তোমায় ছেড়ে দেব না।’ তারপর নিমেষে কী ভাবলেন যেন সম্রাট। ভেবেই বললেন, ‘তুমি আবার ভেবে দ্যাখো! সময় চাও, তোমাকে একদিন সময়ও দিলুম। একদিন তুমি আমার কারাগারে বন্দি থাকবে। একদিন ওই নির্জন কারাগারে তুমি ভাবতে পারবে, কোনটা তুমি চাও, লড়াই, না মৃত্যু।’ এই বলে তিনি সিংহাসন ছেড়ে চলে গেলেন।
সান্ত্রীরা তাসানুকে বন্দি করে রাখল কারাগারে।
অন্ধকার সেই কারাগারে বন্দি মানুষটা এখন বুঝতে পারল, এ-শহরের সেইসব মানুষ, যারা একদিন তাসানুকে মাথায় করে নেচেছে, তার জয়গান করেছে, এখন তারা কেউ তার পাশে নেই। তা যদি থাকত, তবে সম্রাটের আদেশ শুনে কেউ-না-কেউ তাকে বাঁচাতে আসত। কিন্তু কেউই তো এল না। কেউ তো বলল না, ‘সম্রাট, এই সাহসী মানুষটি সারাজীবন আমাদের মতো লক্ষ-লক্ষ মানুষকে আনন্দ দিয়েছে। আজ মানুষটা যখন ছুটি চাইছে, তখন তাকে ছুটি না-দিয়ে, কারাগারে বন্দি করাটা সম্রাটের সঠিক বিচার নয়।’ কে বলবে এমন কথা? এমন কথা যে বলতে পারে, তার বুকের পাটা থাকা চাই! সে-মানুষ কোথায় এখানে?
কিন্তু তাসানুও কি বোকার মতো মৃত্যুকে মেনে নেব! না-মেনে উপায়? তার তো কিছু করার নেই আর! এই কারারক্ষীদের সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে সে তো আর ফটক ভেঙে পালাতে পারবে না। কিন্তু তবুও কি তার ভাবা উচিত নয়? অকারণে মরাটা কি সত্যিই বোকামি নয়? কার ওপরে অভিমান করে মরতে চায় সে? ছেলের ওপর? ছেলে যদি ভুলই করে ফেলে, তবে বাবাই তো তাকে ভালোবেসে তার ভুল ভেঙে দেবে! কিংবা যদি কোনো দুঃখ থাকে তার, মন থেকে মুছিয়ে দেবে!
এমনই সময় সে যেন আলো দেখতে পেল। হঠাৎ যেন তার মনে হল মরা তার হবে না। সে লড়াই-ই করবে। লড়াই করলে সে মুক্তি পাবে। আর এখন সেই মুক্তিই সে চায়। কেন-না, মুক্তির পর সে ছেলেকে খুঁজে বার করবে। যেমন করেই হোক, ছেলেকে তার বার করা চাই। যতক্ষণ না ছেলের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে সে বলতে পারছে, কোনো জীবনকে সে আর হত্যা করবে না কোনোদিন, ততক্ষণ যেন শান্তি নেই তার। সুতরাং সে কারাগারের লৌহকপাট দু-হাত দিয়ে চেপে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওহে কারারক্ষী, সম্রাটকে খবর দাও, আমি মরতে চাই না। আমি একটি নিরীহ প্রাণীকে হত্যা করার কৌশল দেখিয়ে সম্রাটকে খুশিই করতে চাই। সুতরাং আমায় যেন এখনই মুক্তি দেওয়া হয়।’
খুশি হয়েই সম্রাট তাসানুকে মুক্তি দিলেন।
আজ বুঝি তাসানুর জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ খেলা। সম্রাটের নিজের ইচ্ছায় আজকের এ-খেলার আয়োজন। সুতরাং এ যেন একটা রাজকীয় উৎসব। সারা শহরজুড়ে সেই উৎসবের সাজ-সাজ রব। সমস্ত মানুষের মুখে-মুখে তাসানুর কথা। তাসানুর গায়ে আজ নতুন পোশাক। এ-পোশাককে ওরা বলে আলোর পোশাক। এ-পোশাকের থরে থরে সোনা আর চাঁদি ঝলমল করছে। যে-জ্যাকেটটা তাসানু গায়ে দিয়েছে, সেটি সম্রাটের নিজের হাতের উপহার। সুতরাং সেই জ্যাকেটটির যে কত দাম, তার হিসেব কে করবে!
তাসানু ঠিকই করেছিল, আজ রিঙের মধ্যে সে থাকবে একা। আর কেউ না। হাজার-হাজার দর্শকের মাঝখানে সম্রাটও উপস্থিত। ব্যাণ্ড বেজে উঠল। তাসানু বীরের মতো ছুটে ঢুকে পড়ল লড়াইয়ের রিঙের মধ্যে। সম্রাটকে সে অভিবাদন করল। সম্রাট খুশিতে হাত তুলে সে-অভিবাদন গ্রহণ করলেন। অভিবাদন করল সে দর্শকদের। উত্তেজিত দর্শকরা আনন্দে উথলে চিৎকার করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্ষিপ্ত বলদ তার বন্দিঘর থেকে ছাড়া পেল। সঙ্গে-সঙ্গে সেই বলদ তীক্ষ্ণ শিং দুটো উঁচিয়ে, ঝড়ের বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাসানুর ওপর। তড়িৎগতিতে তাসানু নিজেকে একটু সরিয়ে নিয়ে, তার হাতের সেই লালকাপড়টা উড়িয়ে দিল তার মুখের সামনে। মাথায় এমন এক ঝাঁকুনি দিল বলদটা, না-পিছিয়ে রক্ষে নেই তাসানুর। পিছিয়ে যেতেই বলদটা নিজের ভার নিজেই সামলাতে পারে না যেন। টালমাটাল করতে-করতে আবার ঘুরে দাঁড়ায়। আবার তেড়ে যায় তাসানুকে। এখন সে চিনে ফেলেছে তাসানুকে, চিনে ফেলেছে, এই লোকটাই তার শত্রু। এই শত্রু শুধু একদল নিষ্ঠুর মানুষকে আনন্দ দেওয়ার জন্য এইমাত্র তার পিঠের ওই কুঁজটার ওপর বর্শার ফলক ছুড়ে গেঁথে দিল। আর একটা ছুড়ল। ছুড়ল একটা, দুটো, তিনটে। গড়িয়ে পড়ছে তার গা দিয়ে টাটকা, ঘন রক্ত। অসহ্য যন্ত্রণা। সে-যন্ত্রণা মানার এখন সময় নেই। এখন তাকে বাঁচার জন্যে লড়াই করতে হবে। সে আক্রমণ করে ওই মানুষটাকে, যে-মানুষটা অকারণেই তাকে কুঁদে-কুঁদে মারছে হাতে অস্ত্র নিয়ে। ঠিক বটে, বলদের হাতে কোনো অস্ত্র নেই। কিন্তু সে দুর্বলের মতো মরতে জানে না। সে-ও তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে মরতে-মরতে বলে যাবে, ওই মানুষের মতো সে-ও এই পৃথিবীতে বাঁচতে এসেছিল।
সত্যিই সে লড়াই করতে-করতেই মরল। এখন লড়াইয়ের শেষধাপে যখন পৌঁছে গেল তাসানু, তখন তার হাতে তরোয়াল। মানুষের নিষ্ঠুর কৌশলের কাছে হেরে গিয়ে যখন বেদম হয়ে পড়ছিল সেই বলদ, তার নিশ্বাসটা যখন ধীরে ধীরে তার বুকের মধ্যে আটকে আসছিল, তখনই তাসানুর হাতের সেই তরোয়াল খুন করল সেই বলদকে।
কী চিৎকার! কী উল্লাস! সে কী আনন্দ!
অবাক কথা, সেই চিৎকার শুনে কিন্তু তাসানু আজ নিজে এতটুকু আনন্দ প্রকাশ করল না। সে ওই মৃত বলদটার সামনে বোবার মতো দাঁড়িয়ে পড়ে। দ্যাখে! তার চোখের কোণে ক-ফোঁটা অশ্রু যেন উছলে ওঠে। সে যেন শুনতে পায় দু-দিন আগে তার ছেলে যা বলে গেছে, ‘আমি কি তবে মনে করব, আমার বাবা দয়াহীন, মায়াহীন একটা হিংস্র দানব!’ হঠাৎ সেই রিঙের মধ্যে, বলদটার সামনে দাঁড়িয়ে সে চিৎকার করে ওঠে, ‘না।’ তারপর সে ছুড়ে ফেলে দেয় তার হাতের তরোয়াল। ছুড়ে ফেলে আকাশের দিকে তাকিয়ে, কঠিন স্বরে বলে ওঠে, ‘বিশ্বাস কর কুহা, এ-লড়াই আমার শেষ লড়াই। এ-লড়াই আমি করেছি ক-দিন বেঁচে থাকব বলে। বেঁচে থেকে তোকে শেষ দেখা দেখে যাব কুহা। আমি যে তোর বাবা!’
রিঙের চারপাশের সেই আনন্দমত্ত মানুষের ঢল ধেয়ে আসে তাসানুর দিকে। তারা যেন তাসানুকে মাথায় নিয়ে নাচতে চায়। তাসানু আর দাঁড়াল না সেখানে একমুহূর্তও। ছুটে আসা ওই মানুষগুলোর হাত থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্যে সে-ও ছুটল। রিঙের পাশে তার সাজগোজের ঘরে ঢুকে পড়ল। ঘরের দরজায় আগল লাগিয়ে লুকিয়ে বসে রইল।
অনেকক্ষণ পর, যখন সব মানুষের কন্ঠস্বর নিশ্চুপ হয়ে গেছল, যখন একটি মানুষও আর তাসানুর নাম ধরে চিৎকার করেনি, তখন তাসানু ফিরে গেছল তার নিজের ঘরে। একা, নি:সঙ্গ!
সারারাত ঘুমোতে পারেনি তাসানু। ক্লান্ত মানুষটার যদি-বা কখনো চোখের পাতায় ঘুম ছুঁই ছুঁই করে, তখনই তার মনে হয়, সেই হাজার হাজার মানুষের, পিশাচের মতো, চিৎকারধ্বনি যেন তার বুকে কাঁপন জাগায়। শিউরে উঠে কখনো সে বিছানায় বসে পড়ে। কখনো সে দু-হাত দিয়ে নিজের কানদুটো চেপে ধরে। সে পারে না, কিছুতেই পারে না সেই চিৎকার সহ্য করতে। বুঝি-বা তাসানু পাগল হয়ে যায়। তবে কি সে এখান থেকে ছুটে পালালে বাঁচবে! ছুটে পালালে বুঝি এ-শব্দ তার কানে আর কোনোদিন ভেসে আসবে না! হয়তো এই কথাটাই সত্যি মনে হল তাসানুর। তাই সে এই অন্ধকার রাতে ঘুমের বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ছুট দিল আচম্বিতে। ঘর ছেড়ে বাইরে সে বেরিয়ে এল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ওই চিৎকারও যেন তাকে পিছু তাড়া করেছে। দিগবিদিক ভুলে গিয়ে যেদিকে পারল সেইদিকেই পালায় সে। তবু তার নিস্তার নেই। যেন এ-চিৎকার সেইদিকেই ছোটে। অন্ধকারে দিশেহারা হয়ে যায় তাসানু। ছুটতে-ছুটতে এই সাহসী বলবান মানুষটা পৃথিবীর এই অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
কত যে দিন কেটে গেল তাসানুর ছেলেকে খুঁজতে-খুঁজতে, কত বছর, তার হিসাব করতে পারে না। হয়তো অনেক বছর। কেন-না, মানুষটাকে এখন আর চেনবার যো নেই। কী চেহারা হয়েছে! অমন দশাসই শরীরটা ভেঙে মুচকে গেছে। চোখদুটো কোটরে ঢুকেছে। চৌকো চোয়ালদুটো মুখের দু-পাশে যেন দুটো ঢিপি। সেই চওড়া বুকখানা চুপসে একেবারে হাড়-জিরজির করছে। মাথার যত চুলে পাক ধরেছে, তারও বেশি চুল পড়ে গেছে। অমন ঝলমলে তাজা মানুষটা এই ক-বছরে এমন বুড়িয়ে গেছে, না-দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না। যেন ধুঁকছে। এতদিন ধরে সে কুহাকে তন্ন-তন্ন করে খুঁজেছে। কিন্তু হায়রে! ছেলের খোঁজ সে এখনও পেল না। এমনিই হয়। তাসানু নামে এই মানুষটাও তো একদিন বাপ-মার মনে কষ্ট দিয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়ে এসেছে, আর ফেরেনি।
হ্যাঁ, পালিয়ে এসেছে তাসানু। আজ তার সেই পুরোনো দিনের সব কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে যায় তাসানুর বুড়ো মা-বাবার মুখদুটি। তার বাবা পেটের অন্ন জোটাতে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কী পরিশ্রমটাই না করেছে। আর তাসানু, ছি ছি, কী কষ্টই না দিয়েছে তাদের। ছোটোবেলায় সে ছিল যেন একটা দজ্জাল খুদে ডাকাত। মা-বাবার কথা শোনা তো দূরের কথা! সারাদিন মারামারি, নয়তো গুণ্ডাবাজি! স্কুলে পাঠাল বাবা, সেখানে পড়ার নামে অষ্টরম্ভা। বছর-বছর সেখান থেকে গোল্লা নিয়ে বাড়ি ফেরে তাসানু।
ছেলে যে তার মুখ্যু হয়েই থাকবে, একথাটা তাসানুর বাবার বুঝতে বেশি দেরি হয়নি। কী করলে যে ছেলেটি মানুষ হবে, এই ভাবনায় লোকটার চোখে ঘুম আসে না। নিজে সারাদিন পাহাড়ের মাথায় পাথর ভেঙে ঝুড়ি বোঝাই করে। এ-কাজে ক-টা পয়সাই বা পায় সে। নিজে আধপেটা খেয়ে থাকা যায়! কিন্তু ছেলেটা যেন কষ্ট না-পায়। কোন বাপ-মা আর চায়, ছেলে তার দুঃখ-কষ্টে থাকে! সে-কথা আর বোঝে কে!
তার কষ্ট ঘোচাতে বাবা যে কত কষ্ট করছে, তা নিয়ে মাথা ঘামাতে তাসানুর বয়েই গেছে। সকাল-সন্ধে দুটো জুটলেই হল। আর না-জুটলে, সে কী হম্বিতম্বি! যেন এখুনি পেলেই হাতে মাথা কাটে! মানুষেরও তো সহ্যের একটা সীমা আছে। এক-একদিন তাসানুর বাবা যখন আর ছেলের বেয়াদপি সহ্য করতে পারে না, তখন তার মনে হয় দু-চার ঘা দেয় বসিয়ে! কিন্তু না, ছেলে বড়ো হয়েছে! গায়ে হাত তোলাটা উচিত না।
কিন্তু একদিন পারল না তাসানুর বাবা। ছেলে এমন চোটপাট শুরু করে দিলে যে, ভীষণ রেগে তার ঘাড়টা খামচে ধরলে তাসানুর বাবা। রাগে ঠকঠক করে কাঁপতে-কাঁপতে বললে, ‘লজ্জা করে না। তোর মতো একটা জুয়ান ছেলে বসে-বসে বাপ-মার অন্ন ধ্বংসাচ্ছিস, আবার লম্বা-চওড়া কথাও বলছিস! আর যদি বেশি কথা বলিস, এই ঘাড়টা ভেঙে জঞ্জালে ফেলে দিয়ে আসব।’
তাসানু ঝটকা মেরে বাবার হাতটা নিজের ঘাড় থেকে সরিয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আমার গায়ে তুমি হাত তোলো! তুমি কি ভুলে গেছ, আমি জোয়ান। আমার গায়ের জোরটা তোমার চেয়ে নিশ্চয়ই কম নয়।’
তাসানু আরও যেন কী বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই বাবা চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘কেন, মারবি আমায়? অতই যদি টনটনে জ্ঞান, মনে ভেবে থাকিস জোয়ান হয়েছিস, তবে বাপের ঘাড়ে বসে আছিস কেন? যা না, নিজের ধান্দা নিজে করে নিগে যা না।’
তাসানু তেমনি গোঁয়ারের মতো চিল্লিয়ে উঠল, ‘হ্যাঁ, তা-ই যাব।’
কিন্তু সে তো তাসানুর মুখের কথা। যাবে কোথায়? কে তাকে বসিয়ে-বসিয়ে খাওয়াবে? মুরোদ যে কত, সে আর জানতে বাকি নেই। পেটে ঢুঁ মারলে তো ক অক্ষর বেরোবে না! তার আবার টেণ্ডাই-মেণ্ডাই দ্যাখো! আশ্চর্য!
কিন্তু বাপ-মাকে কষ্ট দিয়ে কি আর মানুষ পার পায়! পেলেও, ক-দিন? একদিন-না-একদিন ঠিক ধরা পড়বে! আর হলও তাই! এমন বিপদে পড়ল না তাসানু! অবিশ্যি তার আগে বেচারা বুড়ো বাপটাকে একটা পা খেসারত দিতে হল! হয়েছে কী, সেদিনও পাথর ভাঙতে পাহাড়ে উঠেছিল তার বাবা। পা ফসকাল। খাদে পড়ল। পা ভাঙল। রক্ষে, এমন কিছু গভীর ছিল না খাদটা। মানুষটা বেঁচে গেল। কিন্তু একে কি বাঁচা বলে! এখন সে খোঁড়া, অকেজো। এ-বাঁচা তো না-বাঁচারই সমান। ঘরে পড়ে-পড়ে এখন পেটের খিদে মেটানোর জন্যে সে ছেলের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে। তাসানুও এতদিনে বুঝতে পারে খিদের কী জ্বালা! না-খেতে পেয়ে এখন তার চোটপাট মায়ের ওপর। কিন্তু মা-ই বা কী করবে? ছেলের যদি এখনও আক্কেল না-হয়, ছেলে যদি এখনও চেষ্টা-চরিত্তির করে দু-চারটে পয়সা রোজগার করে না-আনতে পারে, তবে তাসানুর বুড়ি-মা কি এর ঘর, তার দোরে ঘুরে-ঘুরে ভিক্ষে করে আনবে? একা-একা চোখের জল ফেলে তাসানুর মা। আর ছেলেকে বলে, ‘কিছু না-পারিস, যা না পাহাড়ে। বাপের মতো পাথর কেটে দুটো পয়সা রোজগার করে নিয়ে আয় না!’
যায় না তাসানু। যায় অন্য কোথাও। সারাদিন ঘরে থাকে না। কোথা যায়, কেউ জানতেও পারে না। ঘরের খবর রাখার তার গরজ নেই। পা ভেঙে বাপটা কেমন আছে, তা জানার যেন তার দায়ই নেই। দিন পেরুলে রাতের অন্ধকারে সে ঘরে ঢোকে। একবারও জিজ্ঞেস করে না, ভালো-মন্দ কোনো কথা। নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়ে। কাকপক্ষী ডাকার আগেই আবার কেটে পড়ে!
একদিন সে ফিরল না। সারাদিন, সারারাত সে ফিরল না। ছেলের জন্যে ঘুম আসে না মার। একবার ঘর আর একবার বার করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেল সে তাসানুর বাবার কাছে। বাবা বিছানায় শুয়ে-শুয়েই জিজ্ঞেস করলে, ‘কী হয়েছে বউ, অমন বারবার ঘর আর বাইরে যাচ্ছ কেন? কী হয়েছে?’
বউ চুপ করে থাকে।
বাবা বলে, ‘তুমি চুপ করে থাকলে ভাবছ আমি কিছু বুঝতে পারি না!’
বউ আঁতকে ওঠে। জিজ্ঞেস করে, ‘কী বুঝেছ?’
‘তাসানু ঘরে ফেরেনি, তাই না?’
বউ ভয়ে-ভয়ে উত্তর দেয়, ‘হ্যাঁ, কী করব এখন আমি?’
‘কিচ্ছু করতে হবে না তোমায়। ও ঠিকই ফিরবে। সঙ্গে বিপদ মাথায় নিয়ে ফিরবে।’
একথা শুনে শিউরে ওঠে তাসানুর মা। বলে, ‘অমন কথা কেন বলছ?’
‘ঠিক কথাই বলছি বউ। আমাদের বিপদে না-ফেলে ছেলে তোমার ছাড়বে না। সে চায় না, আমরা বেঁচে থাকি। তা যদি চাইত, আমাদের মুখে দুটো অন্ন দেবার জন্যে সে পাথর কাটতেও পাহাড়ে উঠত।’ বলতে-বলতে দুঃখে যেন গলাটা ধরে আসে তাসানুর বাবার।
থাকতে পারে না মা। ডুকরে কেঁদে ওঠে।
বাবা আবার বলে, ‘কেঁদো না বউ। তুমি কিচ্ছু ভেবো না। আমি খোঁড়া, অথর্ব হয়ে গেলেও, তোমাকে উপোসি করে কোনোদিনই রাখব না। তুমি দেখো, আমি কালই আবার পাথর কাটতে পাহাড়ে উঠব। আমার পা ভাঙলে কী হয়েছে, হাত দুটো তো এখনও ঠুঁটো হয়ে যায়নি। আমি পারব, ঠিক পারব। মনে করো, আমাদের যদি ছেলে না-ই থাকত, তখন কী হত? আমরা কি পড়ে-পড়ে মার খেতুম?’
হঠাৎ সেই অন্ধকার রাতে বাইরের দরজায় কে যেন ধাক্কা দিল। তাসানুর বাবা-মা দুজনেই চমকে ওঠে। মা তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে উঠে বললে, ‘ওই এসেছে।’ হন্তদন্ত হয় এগিয়ে যাবার জন্যে যেই পা ফেলেছে, বাবা মায়ের হাতটা ধরে ফেললে। চুপিসাড়ে বললে, ‘এত রাত্রে অমন হুট করে দরজা খুলো না! আগে জিজ্ঞেস করো, কে ডাকে।’
কিন্তু এরই মধ্যে আরও ক-বার ধাক্কা পড়ল। মা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলে, ‘কে?’
‘আমরা।’
ধক করে শিউরে উঠল বুকের ভেতরটা। এ তো তার ছেলের গলা নয়! ভয়ে-ভয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তোমরা?’
‘আমরা পুলিশ। দরজা খোলো।’
মায়ের হাত-পাগুলো ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। গায়ে কাঁটা দিল। কাঁপাস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন বাবা?’
‘আগে দরজা খোলো, তারপর বলছি।’
বাবা গম্ভীয় গলায় শুয়ে-শুয়েই বললে, ‘খুলে দাও বউ! ওদের আসতে দাও!’
ঘরের দরজা খুলতেই পুলিশের বড়োকর্তা গলাটাকে বিচ্ছিরি করে জিজ্ঞেস করলে, ‘এটা তো তাসানুর বাড়ি?’
মা আতঙ্কে যেন কুঁকড়ে গেছে! বললে, ‘হ্যাঁ বাবা, কেন কী হয়েছে?’
‘সে কোথায়?’
‘সে তো নেই।’
‘বাড়ি ফেরেনি?’
‘না বাবা!’
‘আমরা তল্লাশি করে দেখব।’
‘আমি তো বলছি বাবা, সে ঘরে নেই।’
‘মুখের কথা আমরা শুনতে চাই না।’
‘আমি তার মা।’
‘তুমি মা হতে পারো, কিন্তু তোমার ছেলে একটা চোর। কাল সে কয়েক হাজার টাকার সোনা চুরি করে ভেগেছে। সে বাড়িতে লুকিয়ে আছে কিনা, কিংবা চোরাইমালগুলো বাড়িতে রেখেছে কিনা, আমরা তল্লাশি করে দেখতে চাই।’
এরপর মা আর কথা বলবে কী করে। গলা দিয়ে যেন স্বর আর বেরোয় না। তবু তাকে আর একবার বলতে হল, ‘বিশ্বাস করো বাবা, ছেলে আমার ঘরে নেই।’
পুলিশ অফিসার খেঁকিয়ে উঠে বললে, ‘পৃথিবীর সব মা-ই এই কথা বলে। আমাদের ভেতরে যেতে দাও।’
শুনতে পেয়েছিল তাসানুর বাবা পুলিশের হম্বিতম্বি। তাই ঘর থেকেই চিৎকার করে বলে উঠল, ‘ওদের আটকে রেখো না বউ। ওরা ভেতরে এসে দেখে যাক, পৃথিবীতে তোমার মতো মায়েরাও আছে, যারা কোনোদিন মিথ্যা বলে না।’
সুতরাং তাসানুর মা দরজা ছেড়ে ওদের ভেতরে আসার পথ করে দিল।
কিন্তু জানাই তো ছিল যে, শত চেষ্টা করলেও তাসানুকে তারা এখানে খুঁজে পাবে না। তবু তারা যখন পুলিশ, তখন তন্ন তন্ন করে না-খুঁজে ছাড়ছে না। তাসানুকে না-পাওয়া গেলেও তারা খুঁজবে চোরাই সেই সোনা। তাই পুলিশের বড়োকর্তা ঘরে যা দুটো আসবাব ছিল, ভেঙে ছড়িয়ে ছত্রাকার করে দিয়ে গেল। যাবার সময় শাসিয়ে গেল, ‘ছেলেকে না-পাওয়া গেলে, তোমাদেরও ছাড়ান নেই।’
পুলিশের বড়োকর্তার এই কথা শুনে তাসানুর বাবা মুচকি-মুচকি হেসেছিল। তারপর বলেছিল, ‘আমাদের ছেড়ো না দারোগাবাবু। তুমি আমাদের ধরে রাখলে আমরা এ-যাত্রা বেঁচে যাই।’
তাসানুর বাবার এই কথায় পুলিশের বড়োকর্তা তিরিক্ষি মেজাজে কড়কে উঠেছিল, ‘কে বাঁচে আর কে মরে পরে দেখা যাবে!’ বলে বড়োকর্তা সাঙ্গোপাঙ্গদের নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
সব কিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল যেন কিছুক্ষণের জন্যে। সেই ভয়ংকর রাতটা তাসানুর বাবা আর মার সামনে যেন রাক্ষুসীর মতো চোখ মটকে হাসতে লাগল। সারারাত ঘুমুতে পারেনি দুটো বুড়োমানুষ। রাতভোর দুটো মানুষ শুধু ভেবেছে, যারা কোনোদিন অন্যায় করেনি, যাদের মনে কোনোদিন পাপ বাসা বাঁধতে পারেনি, তাদের কপালেই কি যত দুঃখ দেখা দেয়। দুটো মানুষ সারারাত নিশ্চল হয়ে বসেছিল সেই ঘরের নির্জনতায়। তারপর শেষ রাতের হাওয়া গায়ে লাগতেই ক্লান্ত দুটো মানুষ ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ঘুম যখন ভেঙেছিল তাদের, তখন রোদ উঠে গেছে। ঘুম-ভাঙা চোখে দুজনেই দুজনের মুখের দিকে হতবাক হয়ে চেয়ে ছিল। কী করবে এখন জানে না। ভেতরে-ভেতরে রাগে গুমরে কাঁপতে থাকে তাসানুর বাবা। তারপর একসময় ফেটে পড়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘আমি এখন একটা চোরের বাপ!’
মায়ের চোখে জল, সে তো বাধা মানবে না। আপন মনেই বলে ফেলে, ‘ছেলেটা ধরা পড়লে?’
‘পড়ুক! অমন ছেলের বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ভালো।’
উঠে পড়ল মা। কাল রাতে পুলিশের তান্ডবে ঘরদোর লন্ডভন্ড হয়ে আছে। ঘরের শ্রী ফিরিয়ে আনার জন্যে মা যখন ভাবছে, কোনখানকার জিনিস কোথায় রাখবে, তখন আবার বাইরের দরজায় ঠেলা পড়ল, ‘দরজা খোলো!’
থতোমতো খেয়ে গেছে মা। এ যে তাসানুর গলা!
বাবা বলল, ‘তিনি এলেন।’
মা দরজাটা খুলে ফেলতেই তাসানু ঝড়ের মতো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। সে হাঁফাচ্ছে। তার হাতভর্তি খাবারের ঠোঙা। মাকে বললে, ‘এই নাও! এবার প্রাণভরে যত পারো খাও।’
ছেলেকে দেখে, বাবা বিছানায় উঠে বসল। ছেলের মুখের দিকে কটমট করে তাকাল। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কোথা ছিলি সারারাত?’
তাসানুর যেন লজ্জা নেই। বেহায়ার মতো উত্তর দিল, ‘তোমাদের পেটের জোগাড় করছিলুম।’
‘কোথায় পেলি এত খাবার?’ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল বাবা।
‘সে তোমাদের দেখতে হবে না।’ উত্তর দিল তাসানু।
‘মনে করছিস আমি জানি না!’
‘কী জানো তুমি? তোমার জানবার আছেই বা কী!’
‘কোথায় সেই সোনার বাণ্ডিল?’
থমকে গেছে তাসানু বাবার কথা শুনে, ‘মানে!’
‘মনে হচ্ছে আকাশ থেকে পড়লি? মানেটা এরপরও আরও খোলসা করে বলতে হবে?’ বলে চেঁচিয়ে উঠল তাসানুর বাবা, ‘তুই একটা চোর। তুই আমাদের মুখে চুন-কালি দিয়েছিস। তোর মুখ দেখাও পাপ!’
তর্জন করে উঠল তাসানু, ‘দেখো না আমার মুখ!’
বাবাও গলার স্বর আরও উঁচিয়ে বললে, ‘বার কর সেই সোনা!’
‘না, বার করব না।’
দাঁড়িয়ে পড়ল তাসানুর খোঁড়া বাবা। মা তাড়াতাড়ি গিয়ে ধরে ফেললে তাকে। বাবা বললে, ‘না ছেড়ে দাও আমায়।’ বলে একটা ঝটকা মেরে ছেলের চুলের ঝুঁটিটা নিজের মুঠোয় খামচে ধরে বললে, ‘বার কর সেই সোনা!’
‘তুমি আমার চুলের মুঠি ছাড়বে কি না?’
‘চোর কোথাকার! আমার ছেলে হয়ে তুই চুরি করিস! তোর জন্যে আমার ঘরে পুলিশ ঢোকে! দ্যাখ হতচ্ছাড়া, পুলিশ আমাদের ঘরদোর কী করে গেছে!’
‘পুলিশ!’ ভয়ে আঁতকে ওঠে তাসানু।
‘হ্যাঁ, পুলিশ!’
ছটফট করে চেঁচিয়ে উঠল তাসানু, ‘পুলিশ জানতে পারল কী করে? তাহলে তোমরাই বলেছ!’
বাবা তেমনি ধমক মেরে বললে, ‘বলতে পারলে বাঁচতুম। কিন্তু আমরা জানতুম নারে শয়তান, রাতের অন্ধকারে তুই নিজের ঘরে না-এসে, অন্যের ঘরে সিঁদ কাটছিস! তোর চুলের মুঠি আমি ছাড়ব না! পুলিশ এসে তোকে না-পেটালে, আমার শান্তি নেই।’ বলে ঘরের ভেতর থেকেই গলা চড়িয়ে হাঁকাহাঁকি শুরু করে দিলে, ‘কে কোথায় আছ, আমার ঘরে চোর, চোর!’
বাবার চিৎকার শুনে মরিয়া হয়ে তাসানু বাবার হাত থেকে মাথার চুল ছাড়াবার জন্যে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিলে। কিন্তু ওই হাতে তার বাবা এতদিন পাথর ভেঙে এসেছে। ওই হাত ছাড়াবে তাসানু, এমন তার সাধ্য আছে! যখন সে সত্যিই তার বাবার শক্তির কাছে হার মানল, যখন দেখল আর বেশিক্ষণ টানাহ্যাঁচড়া করলে সে ধরা পড়ে যাবে, তখন প্রাণের দায়ে সে কবুল করল, সে চুরি করেছে। সে নিজের জামার নীচে কোমরে হাত ঢুকিয়ে এক বাণ্ডিল সোনার গয়না বাবার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘এই নাও, এবার আমায় ছেড়ে দাও।’
থমকে গেছে তাসানুর বাবা। তার হাতের মুঠি যেন আপনা থেকেই আলগা হয়ে তাসানুর মাথা থেকে নেমে গেল। সোনার বাণ্ডিলটা তাসানুর হাত থেকে নিজের হাতে নিয়ে, ধিক্কার দিয়ে উঠল, ‘ছি:! ছি:! ছি:! তাসানু, এইটাই শেষে সত্য হল? তাসানু, তুই আমার ছেলে হয়ে, আজ চোর হলি।’ আর কিছু বলতে পারল না। ছেলের মুখের দিকে চাইতেই, পাথর ভেঙে শক্ত হয়ে গড়ে উঠেছে যে-মানুষটা, তার চোখ দুটো ছলছল করে উঠল।
তাসানু ছাড়া পেয়েই তিরের মতো ছুটে পালল ঘর থেকে। কেন-না, তার বাবার সেই ‘চোর-চোর’ চিৎকারের শব্দটা যে এতক্ষণ পাড়াপড়শির কানে পৌঁছে গেছে, এটা বুঝতে পারছিল তাসানু। সুতরাং সে দাঁড়াল না। সে প্রাণপণে ছুটে পালাল।
কিন্তু পড়শিরা যখন হইহই করে ছুটে এসে তাসানুদের ঘরে ঢুকে পড়েছিল, তখনও তাসানুরের বাবা বোবার মতো দাঁড়িয়ে।
‘কই চোর, কই চোর’ বলে যখন তারা ঘরের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারছিল, তখন তাসানুর মা আর থাকতে পারল না। হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল।
তার কান্না শুনে তাসানুর বাবা কথা বলল। বলল, ‘কেঁদো না বউ, চলো, আমরা পুলিশের কাছে যাই।’
পাড়াপড়শি জিজ্ঞেস করলে, ‘চোর কই?’
তাসানুর বাবা হাতের সোনার বাণ্ডিলটা তাদের দেখিয়ে বললে, ‘এই তো চোর, আমি আর আমার বউ।’
‘তোমরা?’ অবাক হয়ে গেল পাড়াপড়শিরা।
‘হ্যাঁ আমরা। তোমরা আমাকে আর আমার বউকে থানায় নিয়ে চলো। আমার পা-টা তো ভাঙা, তোমরা কেউ যদি সাহায্য করো, তাহলে আমি হাঁটতে পারি।’
পাড়াপড়শি সাহায্য করল। তাসানুর বাবা খোঁড়া পায়ে হাঁটতে-হাঁটতে বউকে নিয়ে থানায় পৌঁছে গেল।
‘দারোগাবাবু!’ থানার বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেল তাসানুর বাবা পুলিশের বড়োকর্তাকে।
বড়োকর্তা তাসানুর বাবার দিকে কটমট করে তাকাল। বললে, ‘ভেতরে এসো।’ তাসানুর মা আর বাবা কাছে আসতেই জিজ্ঞেস করলে, ‘তোমরাই তো তাসানুর বাবা আর মা?’
‘হ্যাঁ হুজুর।’
‘ছেলে ফিরেছে?’
‘ছেলে চুরি করেনি হুজুর। চুরি করেছি এই আমরা দুজনে, আমি আর আমার বউ।’
পুলিশের বড়োকর্তা থতোমতো খেয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, ‘মানে?’
হুজুর, ক-দিন ধরে ছেলেটাকে কিছু খেতে দিতে পারিনি। পাথর কাটতে গিয়ে আমার পা-টা জখম হবার পর থেকে উপোসে আমাদের দিন চলছিল। পেটের খিদে সহ্য করতে না-পেরে আমি আর আমার বউ এই কাজ করেছি। আমরাই দুজনে চোর হুজুর। কিন্তু হুজুর, চুরি করার পর থেকে দগ্ধে-দগ্ধে মরছি আমরা। এ-পাপকাজের জন্যে আমাদের ঘুম নেই। আমরা প্রায় পাগল হয়ে যেতে বসেছি। তাই হুজুর, থাকতে না-পেরে সেই চোরাইমাল আপনাকে ফেরত দেব বলে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি। এই দেখুন।’ বলে তাসানুর বাবা সেই সোনার বাণ্ডিলটা পুলিশের বড়োকর্তার সামনে রাখল। বড়োকর্তা অবাক হয়ে তাকাল, তাসানুর বাবা আর মার মুখের দিকে।
‘বিশ্বাস করুন হুজুর, ছেলেটা আমার কিচ্ছু জানে না। খিদের জ্বালায় ছেলেটা আমার কাল থেকে ঘরে ফেরেনি। আমি বাপ হয়ে তার মুখে দুটো অন্ন দিতে পারিনি বলে অভিমান করে, সে চলে গেছে হুজুর।’
পুলিশের বড়োকর্তা এবার তাসানুর বাবার মুখের ওপর একদৃষ্টে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ। তারপর একটু হাসল। তারপর বলল, ‘চোরাইমাল যখন তোমাদের কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে, আর তোমরা নিজেরাই যখন কবুল করছ, তোমরা চোর, তখন মনে রেখো, শাস্তি তোমাদের পেতেই হবে।’
‘সে তো জানিই হুজুর।’
পুলিশের বড়োকর্তা আবার বললে, ‘তোমরা বুড়োমানুষ। আরও ভালো করে ভেবে দ্যাখো! সত্যি কথাটা চেপে গেলে তোমাদের জেল হবে।’
তাসানুর বাবা ব্যস্ত হয়ে বললে, ‘আমাদের জেল হবে, এই কথাটাই সত্যি দারোগাবাবু! আমাদের তো জেলই হওয়া উচিত। আমরা তো চোর।’
পুলিশের বড়োকর্তা অগত্যা তাসানুর বাবা আর মাকে আর কিছুই জিজ্ঞেস করলে না। কয়েদের ফটক খুলে তখনকার মতো দুজনকে আটকে রাখা হল। তারপর বিচার।
আশ্চর্য! তাসানুর বাবা এতটুকু লজ্জা পেল না। দেখলে মনে হবে, মুখখানি তার হাসি-হাসি। অথচ বউ যেন তার লজ্জায় বোবা হয়ে আছে। তাই দেখে তাসানুর বাবা হাসতে-হাসতে বলল, ‘অমন চুপ করে আছ কেন বউ? আজ তো আনন্দ করবে। আজ থেকে আমরা খেতে পাব। জেলখানার খাবার। পেটটা তো ঠাণ্ডা হবে।’ হাসতে-হাসতেই বলছিল মানুষটা। তারপর যে কী হল, বলতে-বলতে যেন নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না। চোখের জল গড়িয়ে এল গাল বেয়ে। মাথাটা যেন মাটির সঙ্গে মিশিয়ে নিয়ে সে কাঁদতে লাগল।
এখানে তাসানুর বাবা-মা কয়েদে। আর ওদিকে তাসানু প্রাণের ভয়ে কোথায় যে পালাল, আর ধরা গেল না। সে জানত, এ-তল্লাটে থাকলে তার নির্ঘাত মরণ। সুতরাং সে পগাড়পার। একবারও ভাবল না বুড়ো মা-বাবার কথা।
পালাল বটে তাসানু, কিন্তু কোথায় যাবে সে? ক-দিন যদি লুকিয়ে না-থাকে, ধরা পড়ার ষোলো আনা ভয়। অথচ কোথায় যে লুকোবে, তাও জানে না সে! একটা গোপন আশ্রয় তো তার চাই। সুতরাং যদ্দিন না সে-ব্যবস্থা হচ্ছে, তদ্দিন কী করবে তাসানু!
বুদ্ধি তার ঠিক জুটে গেল। শয়তানি বুদ্ধি তো মাথায় ঠাসা। তাই ভাবল, যে-ক-টা দিন আশ্রয় না-মেলে, সে তার ভোল পালটে ফেলবে। করলও তাই। তাসানু সারা গায়ে ধুলোবালি মাখল। গায়ের জামাটা এদিক-ওদিক ছিঁড়ে-ফেড়ে কাদা লাগাল। পরনের প্যান্টটা পায়ের ওপর টেনে তুলে একটা কিম্ভূতকিমাকার ভূতের মতো চেহারা করে ভিখিরি সাজল। ভিখিরি সেজে পথে হাঁটে আর হাত পাতে। হাত পাতলে দু-চারটে দয়ালু মানুষের অভাব হয় না। সুতরাং পেটের অন্নও তার জুটে গেল। কী আশ্চর্য! ছেলের জন্য বাপ-মা কয়েদে ঢুকে খিদে মেটায়। আর চোর ছেলেটা ভিখিরি সেজে খাবার চায়। একেই বোধহয় বলে কপাল।
এ তো জানা কথাই, তাসানুর মা-বাবার বিচারে জেল হবে। এবং হলও। বুড়োমানুষ বলেই হয়তো বিচারকের দয়া হয়েছিল। তাই তাদের জেল হয়েছিল একবছরের। তাসানুর বাবা বউকে বলে, ‘বউ, এক বছরের জেল মানে জানো? একবছর উপোসি থাকতে হবে না। বাইরে থেকে কী করবে বউ! বাইরে এত ছদ্মবেশী চোর চারদিকে ছড়িয়ে আছে, তার চেয়ে কয়েদই ভালো। অন্তত, কয়েদের এই চোরগুলো মানুষ ঠকিয়ে ছদ্মবেশে এখানে আসেনি। এরা সাচ্চা চোর। এদের চিনতে কষ্ট নেই। সবাই না-হলেও, অধিকাংশ চোরই তো পেটের দায়ে চুরি করেছে।’
বউ তার উত্তর দিল, ‘তোমার ছেলেও তো পেটের দায়েই চুরি করেছিল।’

‘না, সে পেটের দায়ে চুরি করেনি। একটা জোয়ান ছেলে, যে গায়ে-গতরে খেটে দুটো পয়সা উপায় করতে ভয় পায়, যার আমার মতো পাথর ভেঙে পয়সা রোজগার করতে সম্মানে বাধে, সে যখন চুরি করে, তখন তার আর এক নাম শয়তান।’
কী আশ্চর্য! শয়তানই শয়তানকে চেনে। সেদিন যখন তাসানু পথে-পথে ভিখিরি সেজে হাঁটছিল আর ভিক্ষে করছিল, তখন তাসানুকে চিনতে পেরেছিল এমনই এক শয়তান। সেই শয়তানটিও একটি ভিখিরি। তাসানু যেমন ভিক্ষে করছিল, সেও তেমনি। তাসানুকে লক্ষ করতে-করতে, লোকটা তাসানুর কাছে এগিয়ে এসেছিল। তারপর মুখে হাসি টেনে, চোখটা মটকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘নতুন মনে হচ্ছে?’
‘মানে?’ অচেনা লোকের মুখে, আচমকা এমন একটা প্রশ্নে খুবই ঘাবড়ে গেছল তাসানু। সে প্রায় লাফিয়ে দৌড় দিতে গেছে। লোকটা ধাঁ করে তার হাত ধরে ফেলে বললে, ‘আরে করছ কী! এক্ষুনি দুজনেই ধরা পড়ে যাব! আমাকে ভয় নেই। তুমিও যা, আমিও তাই!’
তাসানু তেমনি আড়ষ্ট হয়েই বললে, ‘তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারলুম না তো!’
‘তুমি তো ছদ্মবেশী?’ সে জিজ্ঞেস করে তাসানুর মুখের দিকে চেয়ে রইল।
তাসানু ভেবার মতো জিজ্ঞেস করে বসল, ‘তুমি কেমন করে জানলে?’
অমনি লোকটা এমন একটা অদ্ভুত শব্দ করে ‘ইটটিমাস, ইটটিমাস’ বলে চেঁচিয়ে উঠল যে, তাই শুনে আরও ঘাবড়ে গেল তাসানু।
তাসানুর মুখের চেহারাটা দেখে লোকটাও বুঝেছে, তাসানু গোঁত খেয়েছে। এক্ষুনি উপড়ে যাবার ভয় আছে। তাই সঙ্গে সঙ্গে বললে, ‘আমার কথা শুনে তোমার ঘাবড়াবার কিছু নেই। ওটার মানেটা খুব সোজা। মানে তোমার চালচলন দেখেই বুঝেছি, তুমি একটি—’ সব কথাটা শেষ না-করে এই পর্যন্ত বলে থামল। তারপর আবার হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘কেসটা কী? চুরি না খুন?’
‘চুরি।’
‘টাকা? না গয়না?’
‘গয়না।’
‘সঙ্গে আছে। না গেছে?’
‘গেছে?’
‘কার খপ্পরে গেছে? পুলিশ না জনতার?’
‘বাবার।’
লোকটা যেন ভূত দেখলে, ‘এঃ, বাবার খপ্পরে! ইটটিমাস! কীরকম?’
‘বাবা কেড়ে নিল।’
‘আর তুমি লক্ষ্মীছেলের মতো দিয়ে দিলে?’
‘দিতুম না, এমন চুলের মুঠি ধরল, না-দিয়ে পারলুম না।’
‘দূর! একদম ফোকাস!’
‘মানে?’
‘ফোকাস মানে জানো না? ইটটিমাস! ফোকাস মানে বোকাদের জ্যাঠা! মানে তুমি বোকা-জ্যাঠা। নাম কী?’
‘তাসানু।’
‘নিজের? না ভাড়া-করা?’
‘নিজের।’
‘এঃ! লোকটা যেন গাছের মগডাল থেকে ডিগবাজি মারল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘বলো কী! এখনও নিজের আসল নামটা চালু রেখেছ? ফশ করে আমার কাছে বলে ফেললে? সব্বনাশ! এক্ষুনি পালটে ফেলো, নইলে এমন প্যাঁচে পড়ে যাবে, আর বেরিয়ে আসতে পারবে না! এই যে আমার আসল নামটা, তুমি শত চেষ্টা করলেও আমার পেট থেকে বার করতে পারছ না! আসল নামটা পালটে আমি এখন ঘষতে-ঘষতে হয়ে গেছি গুড্ডাবাবা! দ্যাখো বাপু, এইসব কাজে, এই জ্ঞানটুকু যদি না-থাকে, তবে ঝুলখান্ডা হয়ে যাবার খুব ভয় থাকে।’
তাসানু লোকটার কথা শুনে সত্যি ভয় পেল। তবে ঝুলখান্ডা কথাটার মানে জানে না বলে, জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়ে যাবে?’
‘ঝুলখান্ডা।’
তাসানু কথাটা শুনে ফ্যালফ্যাল করে লোকটার মুখের দিকে চেয়ে রইল। তাসানুর চাউনি দেখেই লোকটার মালুম হয়েছে, সে কিছুই বোঝেনি। তাই একটু মুচকি হাসি ঠোঁটে ছড়িয়ে বললে, ‘তোমার তো দেখছি এখনও হামাগুড়ি দেবার মতোও শক্তি হয়নি। ঠিক আছে! এক কাজ করো, আগে নামটা পালটাও। তারপর ওইসব কথার মানে-টানেগুলো শিখিয়ে দেব।’
লোকটার বকবকানি শুনে তাসানুর যেন কেমন সব গোলমাল হয়ে গেছে। তাই জিজ্ঞেস করলে, ‘নামটা কী নামে রাখব?’
লোকটা হাত নেড়ে বলল, ‘এটাও বলে দিতে হবে। তুমি তো দেখছি এখনও একটু ভজু টাইপের আছ! ঠিক আছে, তোমার নাম রাখো কালাভজু।’
তাসানুর মুখ দেখেই বোঝা গেল, নামটা তার পছন্দ হয়নি। তাই কোনো উত্তরই দিল না।
লোকটা জিজ্ঞেস করে, ‘কী, পছন্দ হল না?’
তাসানু বললে, ‘দুর! আমি শুধুমুধু ভজা হতে যাব কেন?’
‘তবে কী হবে তুমি?’
‘ভাবছি।’
‘ভাব, আমিও ভাবি।’ বলে দুজনেই একটু চুপ করে রইল।
হঠাৎ তাসানুই বলে উঠল, ‘আমার নামটা আমি ঠিক করে ফেলেছি।’
‘কী?’
‘কালা-ভজু নয়। কালা-জুজু।’
লোকটা যেন শুকনো মেরুতে ঠাণ্ডা পানির গন্ধ পেলে। তাসানুকে একেবারে দু-হাত দিয়ে দুমড়ে ধরে আদর করে চেঁচাল, ‘আকুরপাঞ্জা।’
তাসানু লোকটার দু-হাতের মধ্যে চ্যাপটা হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘এটার মানে আমি বুঝতে পেরেছি!’
‘কী?’
‘মানে, শাবাশ। এবার ছাড়ো, নইলে দম আটকে মরব।’
লোকটা তাসানুকে ছেড়ে দিয়ে পিঠে তারিফ করে একটা চড় মেরে বলল, ‘না, তুমি দেখছি শিখতে সময় নেবে না বেশি।’ তারপর জিজ্ঞেস করলে, ‘এখন কী করবে?’
তাসানু বলল, ‘এখন মনে হচ্ছে, এখানে আমাদের বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না।’
‘চলো, হাঁটি।’
‘কোথা যাবে?’
‘চলো, আমাদের গাড্ডায় চলো।’
‘সেটা কী জিনিস?’
‘সেখানেই তো আসল ব্যাপার। তুমি ভাবছ বুঝি আমরা শুধু ভিক্ষে করেই বেড়াই!’
‘তবে?’
‘আছে, আছে। চলো এখন, সেখানে তোমার নামটা সিল করে রিপিট করে রাখা হবে, যাতে ভোকাট্টা না-হয়ে যাও।’
তার এই কথা শুনে তাসানু বেশ ঘাবড়ে গেল। লোকটা সাংঘাতিক ধড়িবাজ। তাসানুর মুখের দিকে চেয়েই বুঝতে পেরেছে মনের কথাটা। সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠে বললে, ‘আরে ছ্যা, এমন একটা জোয়ান ছেলে রিপিটের নাম শুনে ভড়কে গেলে! আরে বাবা, সে-সব কিচ্ছু না। আমাদের গাড্ডায় তো আরও অনেকে আছে, তাদের সঙ্গে তোমার একটু জান-পয়ছান হবে। তুমি তো বাঁচতে চাও? নাকি, একা-একা রাস্তায় ঘুরে নিজের বিপদ ডেকে আনতে চাও? আমাদের গাড্ডায় চলো, দেখবে ভয়ও নেই, ডরও নেই। একসঙ্গে থাকবে, ভিখ মাঙবে, খানা খাবে, আর মজাসে নাক ডাকাবে। চলো!’
সুতরাং তাসানু চলল তার সঙ্গে। অবিশ্যি এটাও ঠিক, বাঁচতে গেলে এমনি একটা জায়গারই দরকার ছিল তাসানুর। অন্তত এখনকার মতো। একা-একা পথে ভিখিরি সেজে ঘুরে বেড়ানোটা যে মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়, তাসানু আগে না-বুঝলেও এখন বুঝতে পেরেছে। সুতরাং সে আর দোনোমোনো না-করে তার সঙ্গে তার গাড্ডার দিকে হাঁটা দিল।
বেশ অনেকটা পথ তারা হাঁটল। পাহাড়ি-পথ বলে বেশ কিছুটা ওঠানামা করতে-করতে সে লোকটার সঙ্গে যেখানে এসে পৌঁছোল, সেটা কাউকে বলবার মতো জায়গা নয়। কেন-না, সেখানে যারা আছে, সকলেই ভিখিরি। ছদ্মবেশী। যতটা আলো পড়ে সেখানে, তার চেয়ে অনেকখানি বেশি ছায়া। যেমন ঘিঞ্জি, তেমনি নোংরা।
দেখেশুনে তাসানুর গা-টা ঘিনঘিন করে উঠলেও, কাউকে বুঝতে দিল না। তবে সে বুঝতে পারল, আপাতত পুলিশের হাত থেকে রেহাই পেতে গেলে, এটা একটা চোস্ত জায়গা। এমন সময় হঠাৎ তাসানুর নজর পড়ল, অন্ততপক্ষে দশটা লোক ইদিক-উদিক থেকে দাঁত ছরকুট্টে তার দিকে দেখছে! তাসানুর তখন ‘কী করি, কী বলি’ অবস্থা। অবশ্য তাকে কিছু বলতে হল না, করতেও হল না। বলার আগেই লোকগুলো হো-হো করে হেসে উঠল। গুড্ডাবাবাও তাদের সঙ্গে বেহায়ার মতো হাসতে-হাসতে তাদেরই জিজ্ঞেস করলে, ‘চলবে?’
তখন সেই দশটা লোকের একটা লোক তেমনি হাসি-ফসকানো দাঁত বার করেই বললে, ‘চলবে মানে! একদম টগবগে জোয়ান ছেলে!’
‘আরে বাবা, এ আমার নজর! এড়িয়ে যাওয়া অত সহজ নয়!’ বলে গুড্ডাবাবা তাসানুর পিঠে একটু হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘এখানে কোনো অসুবিধা হবে না তো?’
তাসানুর এখন অসুবিধা হলেই বা কী, আর না-হলেই বা কী। বিপদ মাথায় নিয়ে পথে-পথে ঘুরঘুর করার চেয়ে, এ-ব্যবস্থাটা তার ভালো লাগবারই কথা। সুতরাং সে ঘাড় নেড়ে বললে, ‘না, অসুবিধা কেন হবে। বেশ তো ভালোই।’
অমনি সেই দশটা লোক আবার একসঙ্গে হেসে উঠল, কিন্তু কথা বলল একজন। ঠোঁটদুটো শালপাতার মতো চেটালো করে বলল, ‘দ্যাখো বাপু, তোমার মুখের বাক্যিগুলোকে একটু পালটাতে হবে। অমন রসিয়ে-রসিয়ে বললে চলবে না। গলার স্বরটিকে ভেঙে একেবারে কাঁসার ঘটি করে ফেলতে হবে। কখনো ঘ্যাং-ঘ্যাং করবে, আবার কখনো খ্যান-খ্যান করবে। দরকার হলে প্যান-প্যানও করতে হবে।’ তারপর গুড্ডাবাবার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললে, ‘এই যে ইনি, যার সঙ্গে তুমি এলে, ইনি যে আমাদের গোদাবাবা, সেটা বোধহয় তোমার আগেই জানা হয়ে গেছে। আসলে ইনি হচ্ছেন আমাদের সর্দার।’
এতক্ষণে তাসানু কথা বলল। বলল, ‘ইনি তো গোদাবাবা নন, ইনি তো গুড্ডাবাবা।’
লোকটা একেবারে ল্যাজ-কাটা ফেউয়ের মতো ফ্যা-অ্যা-অ্যা করে হেসে উঠে বললে, ‘একদম ধসকা-মারা বুদ্ধি। সোজা কথাটা বুঝতে এত দেরি করলে, বড়ো-বড়ো কাজে প্যাঁচ মারবে কী করে? আরে বাবা, গোদাবাবাকে কী আর আমরা আজ থেকে চিনি! সেই কোন কাল থেকে গোদা গোদা বলে গোঙাচ্ছি। গোঙাতে-গোঙাতে কখন যে আমাদের আদরের গোদাবাবা গুড্ডাবাবা হয়ে গেল, আমরা নিজেরাই জানি না।’ বলেই আবার ফ্যা-অ্যা-অ্যা করে হেসে উঠল। তার হাসির শব্দ শুনে তাসানুর মুখের চেহারাটাই কেমন হাঁদা-হাঁদা হয়ে গেছে! সেই হাঁদা-মুখ দেখে কে আর না-হেসে থাকতে পারে। সবাই হেসে ফেটে পড়ল। অতগুলো লোকের এত রকমের হাসি শুনে কানের পর্দাটা বুঝি দুম-ফট হয়ে যায় এখুনি।
হাসির দম ফুরিয়ে যেতেই, সেই লোকটাই গুড্ডাবাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে একে কী নামে ডাকা হবে?’
গুড্ডাবাবা বললে, ‘ওর নাম রেখেছি, কালা-জুজু।’
‘কালা-জুজু!’ হঠাৎ সবাই এমন চিৎকার করে উঠল, চিৎকার করে তাসানুর পিঠে এমন চাপড়া-চাপড়ি শুরু করে দিলে যে, তাসানুর প্রাণ প্রায় যায়-যায়!
চাপড়ানিটা থিতিয়ে আসতেই গুড্ডাবাবা বললে, ‘তাহলে ব্যাপারটা এই দাঁড়াচ্ছে, কালা-জুজু আজ থেকে আমাদের গাড্ডায় থাকছে। আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। খেতে পেলে খাচ্ছে। না-পেলে মুখে কুলুপ এঁটে পড়ে থাকছে। রাজি?’
সবাই একসঙ্গে গুড্ডাবাবার কথায় সায় দিয়ে বললে, ‘রাজি।’
কিন্তু তাসানু চুপ করে রইল।
তাকে চুপ থাকতে দেখে গুড্ডাবাবাই বলল, ‘তুমি কী ভাবছ?’
তাসানু বললে, ‘আসলে আমার তো ভিক্ষে করা অভ্যেস নেই।’
‘আরে বাবা, পেট থেকে পড়েই কি আর কেউ বলে, গুড মর্নিং স্যার।’ বলেই গুড্ডাবাবা আবার হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বললে, ‘ঘাবড়াবার কিছু নেই, সব শিখিয়ে দেব। এমনকি, তোমার চেহারার ভোল পালটে একটি খাসা ভিখিরি বানিয়ে ছেড়ে দেব তোমাকে। দ্যাখো বাপু, কেউ এই ব্যবসায় একদিনে পোক্ত হয়ে ওঠে না। আমরাও হইনি। আমাদের অনেক কাঠ-খড় পোড়াতে হচ্ছে। তোমাকেও হবে। তা ছাড়া, আর একটা কথা শুনে রাখো, আমরা শুধু ভিক্ষে করি না। তাল পেলেই তলে-তলে আমরা লুঠতরাজও করি। আমাদের সে-কাজটা তুমি কাল দেখতে পাবে। আমরা কাল মেলায় যাব। মেলার মতো ভিড়ভাট্টার জায়গাগুলো আমাদের স্বর্গরাজ্য। সুতরাং তোমার আজ বিশ্রাম। খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়তে পারো।’
শুয়ে পড়ার ইচ্ছে যদিও তাসানুর ছিল না, তবু এখন যখন রাত হয়ে আসছে, সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, তখন কি আর একলাটি কারো জেগে বসে থাকতে ভালো লাগে! সুতরাং তাসানু ওদের তৈরি শুকনো রুটি চিবিয়ে সত্যিই শুয়ে পড়ল। কিন্তু ঘুম এল না তাসানুর। অজানা জায়গায়, অচেনা মানুষের সঙ্গে এই নোংরা বিছানায় শুয়ে ঘুম পায় না কোনো মানুষেরই। সে শুয়ে শুয়ে উসখুস করতে লাগল, আর ভাবতে লাগল, শেষপর্যন্ত কি তাকে এখানেই ঘাঁটি গাড়তে হবে! কে জানে! এখন তো আর অন্য কিছু করার নেই। পেছনে পুলিশ! অবিশ্যি পুলিশের হাত থেকে বাঁচার জন্যে এই জায়গাটা যে কতটা নিরাপদ, এটা এখনও সে ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছে না। আর সেই কারণেই মনের মধ্যে আতঙ্কটাও বেশ চেপে বসেছে তার। কিন্তু এখনও সে জানে না, তার বাবা আর মা ছেলেকে বাঁচানোর জন্যে জেলে ঢুকেছে। ছেলের দোষ নিজের ঘাড়ে নিয়েছে তার মা আর বাবা।
হঠাৎ চমকে ওঠে তাসানু।
ফিসফিস করে কারা যেন কথা বলছে।
বিছানায় মটকা মেরে পড়ে থাকে তাসানু।
হ্যাঁ, এই গভীর রাতের অন্ধকারে এ মানুষেরই ফিসফিসানি।
কান খাড়া করে থাকে তাসানু। কিন্তু এতই অস্পষ্ট এই শব্দ যে, একটা কথাও সে বুঝতে পারছে না। তাসানুকে কেমন যেন ভয় পাইয়ে দেয়! তার বুকটা সন্দেহে কাঁপতে থাকে। সে চুপিসারে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। বুকের ওপর ভর দিয়েই তাসানু সেই শব্দের দিকে এগিয়ে চলল।
হ্যাঁ, খানিকটা গিয়েই তাসানু দেখতে পেয়েছে। ওই তো, সে স্পষ্ট দেখছে, একটা ঘুপচিমতো জায়গায় গুড্ডাবাবা যেন কার সঙ্গে কথা বলছে! তাসানু মাটির সঙ্গে একেবারে মিশে গেল। মিশে আরও একটু এগিয়ে যেতেই গুড্ডাবাবার কথা তার কানে এল, ‘প্রথমেই তুমি লোকটার ডান পা ভেঙে দেবে, তাহলে পালাতে পারবে না। তারপর তুমি ওর বাঁ-চোখটা গেলে দেবে। একচোখ কানা আর এক ঠ্যাং ভাঙা একটি ভিখিরি বানাতে হবে কালা-জুজুকে। লোকটা তাহলে জুজুর মতোই দেখতে হবে। আমাদের কাছ থেকে পালাতেও পারবে না, আমাদের ঠকাতেও পারবে না।’ বলে একটু থামল। তারপর দুজনে চোখাচোখি করে একটু মুচকি হাসল। একটা পাথর সরিয়ে একটা গর্তের মধ্যে হাত পুরে একটা বস্তামতো কী যেন রাখল। হয়তো কিছু গুপ্তধন। কিন্তু সেই গুপ্তধন যে কী, তাসানু এতদূর থেকে তা ঠাওর করতে পারল না। সে একদম চুপ! দৃষ্টি তার স্থির।
অবিশ্যি বেশিক্ষণ তাকে ওই অবস্থায় থাকতে হল না। একটু পরেই গুড্ডাবাবা আর সেই লোকটা একটা পাথর টেনে সেই গর্তের মুখটা ঢেকে দিল। তারপর গুড্ডাবাবা হয়তো ইশারায় কিছু বলল। বলে, নিজে নি:সাড়ে সেখান থেকে চলে গেল। কিন্তু সঙ্গের লোকটা সেখান থেকে নড়ল না। বসে রইল পাহারাদারের মতো সেইখানেই। আর তাসানু ভাবতে লাগল এখন সে কী করবে?
তাসানু সেই আড়ালে অনেকক্ষণ ঘাপটি মেরে পড়ে রইল। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করল। কিন্তু লোকটার সেখান থেকে চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখতে পেল না তাসানু।
আরে, লোকটা যেন ঢুলছে! চনমন করে লাফিয়ে ওঠে তাসানুর চোখের পাতা দুটো। আরও ভালো করে দেখল তাসানু। হ্যাঁ, ঘুমের ঘোরে লোকটা লটকাচ্ছে মাঝে-মাঝে। কী যেন ভাবল তাসানু। সেই ঘুটঘুটে জায়গাটার এদিক-ওদিক আর-একবার ভালো করে দেখে নিল তাসানু। উঠে দাঁড়াল। আলতো পায়ের ডিঙি মেরে এগিয়ে গেল। তারপর আচমকা ছুটে গিয়ে ঝট করে তার মুখটা জাপটে ধরলে। ধরেই এক ঘুসি। লোকটা লাফিয়ে উঠেছে। চিৎকার করার আগেই ওর মুখটা নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে তাসানু বেদম ঘুসি চালাতে লাগল। ধস্তাধস্তি করে লোকটা কোনোরকমে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে, যেই আবার চেঁচাতে গেছে, তাসানু চট করে তার গলাটা টিপে ধরেছে। মাটির ওপর চিত করে তার বুকের ওপর বসে পড়ল। লোকটা আরও কিছুক্ষণ হাত-পা ছোড়াছুড়ি করল। আরও কিছুক্ষণ ধস্তাধস্তি। তারপর নিজে-নিজেই নেতিয়ে গোঙাতে লাগল। আরও ক-বার তার মুন্ডুটা ধরে ঝাঁকানি দিল তাসানু। ঠাণ্ডা মেরে গেল লোকটা। তাড়াতাড়ি তার ঠ্যাং ধরে টান মারল। একটু তফাতে টেনে ফেলে রেখে, গর্তের পাথরটা সরাল। একটু শব্দ হল। শব্দটা খুব জোরে না-হলেও, বলা যায় না, কেউ শুনেও ফেলতে পারে তো! তাই চট করে আবার লুকিয়ে পড়ল তাসানু। হাঁপাচ্ছে তাসানু। দারুণ উত্তেজনা। নিশ্বাসের শব্দটাকে সে যেন কিছুতেই বাগ মানাতে পারছে না।
কিন্তু না, কেউ এল না। রক্ষে! তাহলেও বেশিক্ষণ এ-অবস্থায় থাকাটা নিরাপদ নয়। আর একবার চারদিক বেশ ভালো করে দেখে নিয়ে, তাসানু ছুটে গেল সেই গর্তের দিকেই। গর্তের মধ্যে সে হাত ঢোকাতেই স্পষ্ট বুঝল, একটা ছোট্টমতো বস্তা। সে টেনে তুলল। বস্তার মুখে জড়ানো দড়িটাকে তড়িঘড়ি টানতে গিয়ে গেল জট পাকিয়ে। খুলতে পারে না তাসানু। কিন্তু বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়িয়ে বস্তার জটটা টানাটানি করলে যে বিপদ নিশ্চিত, এ-কথাটা না-বললেও কি আর বোঝে না? সুতরাং তাসানু মুখ-বাঁধা বস্তাটা কাঁধে ফেলেই সেখান থেকে হাওয়া! অবিশ্যি বস্তাটা তেমন ভারি নয় বলে ছুটতে তার কষ্ট হচ্ছিল না। কিন্তু একটা সন্দেহ তাকে পেয়ে বসল, বস্তাটা এত হালকা কেন? তবে কি এর মধ্যে দামি কিছু নেই? যাই থাক, এখন তাকে ওই বস্তা কাঁধে ফেলে পালাতে হবে। সুতরাং সেই অন্ধকারে এই অচেনা জায়গার অজানা পথে সে পড়িমরি ছুটতে লাগল। এসব দেখলে, এখন একথা কাউকে বলার দরকার নেই যে, তাসানু সত্যিই এক ডাকু! তা না-হলে, এই নিশুতিরাতে বেমালুম একটা লোককে খুন করতে পারে! মানুষের লোভ যেন মানুষের প্রাণের চেয়েও বড়ো।
তাসানু যখন অনেকটা ছুটে, খানিকটা হেঁটে পাহাড়ি-পথের খানা-খন্দ ডিঙোচ্ছিল, তখন রাতও হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকেনি। ধীরে ধীরে ভোরের আলো আকাশে উপচে পড়ার জন্যে পুবদিকে উঁকিঝুঁকি মারছে। তাসানু বুঝতে পারল, সে পুবদিকেই যাচ্ছে। ভোরের আলো যতই তার গায়ে ছড়াচ্ছে, ভয়ও যেন তাকে ততই পেয়ে বসছে।
সত্যিই তো! এখন এই বস্তাটা কাঁধে নিয়ে সে কোথায় যাবে! ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পথেঘাটে মানুষের চলাফেরাও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু জায়গাটা তাসানুর একেবারেই চেনা লাগছে না। সে যে কতটা পথ এসেছে, সেটাও সে এখন খেয়াল করতে পারছে না। কিন্তু তাকে এখনই একটা আস্তানা খুঁজে বার করতে হবে। যেখানে সে অন্তত এখনকার মতো লুকিয়ে থাকতে পারে। কারণ এভাবে পথে-পথে ঘুরে বেড়ালে গুড্ডাবাবার দল যদি তাকে দেখতে পায়! আর সে-ভয়টা তো একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না!
যত ভোর কাটছে, ততই তার ভয়ও বাড়ছে। অবিশ্যি এটাও ঠিক, বস্তাটার মধ্যে কী আছে, সেটা জানার জন্যে তার মনটাও ভীষণ ছুক-ছুক করছে। এতক্ষণ ধরে যে-বস্তাটা কাঁধে ফেলে সে এতখানি পথ হেঁটে এল, কে জানে সেটা তাসানু ঝুটমুট বয়ে নিয়ে এল কিনা! সুতরাং এর ভেতরটা না-দেখে, এটা ঘাড়ে ফেলে হাঁটার কোনো মানে আছে? অবিশ্যি দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পথেঘাটে লোকজন যে-হারে বাড়ছে, তাতে তো আর মাঝপথে বসে বস্তা খুলে দেখতে পারে না! যাবেই বা কোথায়? চেনাজানা জায়গা হলেও কথা ছিল। এ তো তাসানুর কাছে একদম বিদেশ। এখানকার গোপন জায়গার হদিশটি তো তার জানা নেই। কিন্তু একটা হিল্লে এখনই হওয়া দরকার। এমনভাবে দিনের আলোয় হেঁটে চলাটা খুব একটা বুদ্ধিমানের মতো কাজ হচ্ছে না। গুড্ডাবাবা তো আছেই। তার ওপর আর একটা খাঁড়া মাথার ওপর ঝুলছে। সে-খাঁড়ার নাম পুলিশ!
সুতরাং হাঁটতে হাঁটতে তাসানু বেশ ক-বার বস্তাটার গায়ে হাত দিয়ে টেপাটেপি করল। তেমন শক্ত কিছু মালুম হল না। তবে বুঝতে পারল শক্ত করে বাঁধা যেন কাগজের প্যাকেট। অনেকগুলো। আরও ধাঁধা লেগে গেল তাসানুর। না, এখনই খুলে দেখতে হচ্ছে! অন্তত মুখটা খুলে টুপ করে একটু উঁকি মারার লোভটা সে কিছুতেই সামলাতে পারল না।
ভাগ্য বলতে হবে, একটা সুনসান জায়গা তার নজরে পড়ে গেল! কেউ দেখছে কি তাকে? না। চট করে সেই জায়গাটার মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। চটপট বস্তাটা কাঁধ থেকে নামিয়ে, বস্তার মুখের সেই জটপাকানো দড়িটায় দিলে এক টান, ফট! দড়িটা ছিঁড়ল। আরিব্বাস! এ কী কান্ড! বস্তাভর্তি যে টাকার বাণ্ডিল! তাসানুর বুকটা ধড়াস করে লাফিয়ে উঠল। রাখ! রাখ! ঢেকে রাখ! আর বলতে! তাসানু সঙ্গে সঙ্গে সেই টুকরো দড়িটা দিয়েই বস্তার বুখটা কোনোরকমে বেঁধে ফেলল। সেখান থেকে মার ছুট!
উফ! তাসানুর পা-দুটো যেন চলতে চাইছে না। এ-কী দেখল সে, একবস্তা টাকার বাণ্ডিল! গায়ে কাঁটা দেয় তাসানুর। থরথর করে কাঁপছে যেন সারা শরীর। বাসরে বাস, এত টাকা নিয়ে সে কী করবে? একদিনেই সে এত বড়োলোক হয়ে গেল। কখনো ভাবছে, এখুনি একটা বাড়ি কিনে ফেলে। আবার ভাবছে, ধরা পড়ে গেলে? ভাবছে, একটা হাতি হলে মন্দ হয় না। আবার ভাবছে, শুধুমুধু একটা হাতিই বা পুষতে যাবে কেন? তবে একটা জাহাজ কিনে ফেলাই ভালো! হ্যাঁ, এটা মন্দ না। মস্ত একটা জাহাজ। জাহাজে ভেসে সমুদ্রে পাড়ি। আঃ হা:! চারিদিকে শুধু অতল জলের হাতছানি। এগিয়ে চলো দুলতে-দুলতে। সমুদ্র পেরিয়ে তেরো নদীর দেশে। তখন আর পুলিশকেও আসতে হচ্ছে না, কিংবা গুড্ডাবাবার দলও জানতে পারছে না। দারুণ হবে কিন্তু! সে তো হবে। তা একটা জাহাজের দাম কত সেটা জানা আছে কী? সে দেখা যাবেখন। বস্তাভর্তি টাকা। এক বস্তায় একটা জাহাজ ঠিকই হয়ে যাবে। তবে বাপু, যদি টুপুস করে ডুবে যায়, তাহলেই সব কম্ম শেষ! আরে বাবা, ডুবব বললেই কী আর ডুবছে! জাহাজ বলে কথা! সে তো বুঝলুম জাহাজ। তাই বলে কি মাথা কিনে রেখেছে! একবার যদি মাঝদরিয়ায় ঝঞ্ঝা ওঠে, আর সমুদ্র উত্তাল হয়ে নাচনকোঁদন শুরু করে দেয়, তখন আর ট্যাঁ-ফুঁ করতে হবে না। এ তো আর ডাঙায় ঝড় নয় যে, উঠল আর ঘরের কোণে সেঁদিয়ে গেলুম। তার ওপর আছে আবার এখানে-ওখানে তুষারের চাঁই। ভেসে এসে জাহাজের গায়ে যদি মারে ধাক্কা, তাহলে আর দেখতে হবে না, ভু-সস—
আরে! আরে! সামনে একটা পান্থশালা নয়?
হ্যাঁ, তাই তো!
তাসানু যেন হাতে চাঁদ পেয়ে গেল। ভাবল, এখানে তো এখন সে দিব্যি ঢুকে পড়তে পারে! বস্তাঠাসা যখন টাকা আছে, তখন তো আর ভাবনা নেই। যা লাগে দেবে বস্তা। তার ওপর সারাটা পথ রাতভোর হেঁটে, এখন একটু জিরিয়ে না-নিলে শরীর যেন আর বইছে না। তা ছাড়া গুড্ডাবাবার গাড্ডাখানায় এখন যে কী হাড্ডাহাড্ডি কান্ড চলছে, সেটা না-বললেও কে-না-বোঝে! চাই কী, এতক্ষণে যে গুড্ডাবাবার চাঁইবাবারা লাঠিসোঁটা নিয়ে তাসানুর খোঁজে বেরিয়ে পড়েনি, একথা মূর্খেই ভাববে। সুতরাং এই পান্থশালায় এখন ঢুকে পড়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
ঢুকে সে পড়ল। পান্থশালায় যে লোকটার সঙ্গে তার প্রথম দেখা হল, তাসানু বুঝতে পারল, ইনিই পান্থশালার মালিক।
মালিক দেখল তাসানুকে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই তাসানুই তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে থাকার ব্যবস্থা হবে কী?’
সে বলল, ‘এটা তো থাকারই জায়গা।’
‘হ্যাঁ, তা জানি, কিন্তু জায়গা হবে কিনা তাই জিজ্ঞেস করছি।’ মোলায়েম সুরে তাসানু বলল।
লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘ক-জন?’
তাসানু বলল, ‘আমি, একজন।’
‘ক-দিন?’
‘আজকের দিন।’
‘শুধু থাকা, না খাওয়া?’
‘দুটোই।’
‘কী করা হয়?’
‘ব্যাবসা।’
‘বস্তায় কী আছে?’ বলে লোকটা যেন কেমন সন্দেহে তাকাল।
হকচকিয়ে গেছে তাসানু হঠাৎ তার এই প্রশ্নে। চট করে তার মুখে কোনো উত্তর এল না বলে আমতা-আমতা করতে লাগল। তারপর ফস করে মাথায় বুদ্ধিটা আসতেই সে বলল, ‘শস্তায় কিছু মাল পেয়েছি। সওদা করেছি।’
‘বিছানা?’
‘সঙ্গে নেই। লাগবেও না। একটা দিন তো থাকব।’
‘তবে সামনের ঘরটায় ঢুকে পড়ুন,’ বলে লোকটা ঘরের দিকে আঙুল দেখাল।
তাসানু ওইখানে দাঁড়িয়েই ঘরটা দেখে লোকটার দিকে মুখ ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘কত পড়বে?’
লোকটা যেন তাসানুকে একটা ছোট্ট ধমক মেরেই বলল, ‘দুর মশাই, ওসব নিয়ে এখন মাথা ঘামাচ্ছেন কেন বলুন তো! খরচের কথা পরে হবে। আগে ঠাণ্ডা হয়ে নিন, তারপর কথা হবে। আপনাকে দেখে তো মনে হচ্ছে, ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।’
‘তা একটু ক্লান্তি হয়েছি বটে। তাহলেও পাওনাগন্ডার ব্যাপারটা...’
তাসানুকে কথা শেষ করতে না-দিয়েই সে বলল, ‘কখন থেকে হাঁটছেন?’
‘তা অনেকক্ষণ থেকে।’
‘তবে! যান যান একটু বিশ্রাম করে নিন। পয়সার জন্যে কি আর কিছু আটকায়!’
তাসানু তবু বলল, ‘তাহলেও হিসেবপত্রের ঝামেলাটা মিটিয়ে রাখাই ভালো।’
‘আরে মশাই, আপনি তো দেখছি আচ্ছা মুশকিলে ফেলেছেন। বলছি তো, পরে কথা বলব। কিছুর জন্যে কি কিছু আটকায়? আপনি আমার আশ্রয়ে এসেছেন, আমি আপনার সঙ্গে পয়সা নিয়ে ঝুটঝামেলা করব, এটা আপনি ভাবলেন কী করে? পয়সাটাই বড়ো হল?’
তাসানুর ভালো লেগে গেল লোকটাকে।
লোকটা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু যদি মনে না-করেন, আপনার নামটা জিজ্ঞেস করতে পারি কি?’
হঠাৎ নাম জিজ্ঞেস করতেই তাসানু একেবারে থতোমতো খেয়ে গেছে। ভাববার আগেই মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে গেল, ‘কালা-জুজু।’
‘আরে মশাই, সাংঘাতিক রহস্য-রহস্য নাম তো আপনার!’
‘কী করব? গুরুজনরা রেখেছেন। ফেলে দিতে পারি না তো!’
‘ফেলবেন কেন? এমন একটা দুর্দান্ত নাম কি ফেলে দিয়ে নষ্ট করে কেউ! তা সঙ্গের টাকাপয়সাগুলো কোথায় রেখেছেন?’ বলে তিনি তাসানুর মুখের দিকে পিটপিট করে চেয়ে রইলেন।
আবার থমকে গেছে তাসানু। এবার বুঝতে না-দিয়ে সঙ্গে-সঙ্গে বলে উঠল, ‘সে রেখেছি।’
‘সাবধানে রাখবেন মশাই। যা দিনকাল পড়েছে। তা ছাড়া এটা পাঁচজনের জায়গা। পাঁচটা লোক যাচ্ছে-আসছে। কার পেটে কী আছে, কে জানছে বলুন! তবে একটা কাজ আপনি করতে পারেন। নিজের কাছে রাখতে না-চাইলে আমার কাছে রেখে দিতে পারেন। চাবির মধ্যে থাকবে। একেবারে নিরাপদ।’
তাসানু একটু হাসল। তারপর বলল, ‘না, খুব একটা বেশি কিছু নেই। থাক, আমার কাছেই থাক।’
‘আপনি যা ভালো বোঝেন।’
তাসানু জিজ্ঞেস করল, তাহলে ওই সামনের ঘরটায় যাব?’
‘হ্যাঁ, চলুন, আমি দেখিয়ে দিয়ে আসি।’
তাসানু তার সঙ্গে গিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।
পান্থশালার ঘর যেমন হওয়া উচিত, ঘরটা তেমনই। খুব একটা ভালোও না, আবার খুব যে একটা বাসের অযোগ্য, তেমনও না। তা, তাসানুর এখন যা অবস্থা, তাতে ঘর ভালো কি মন্দ তা নিয়ে বিচার করতে গেলে, নিজেরই বিপদ ঘনিয়ে আসবে। এখন যেন-তেন-প্রকারেণ একটা ফোকরে ঢুকে পড়া। সোজাকথায় লুকিয়ে থাকা। আপাতত গুড্ডাবাবার হাত থেকে তো বাঁচা যাক। তারপর দেখা যাবে। তবু ভালো যে, ঘরে একটা খাটিয়া আছে। দিব্যি শোয়া যাবে! কিন্তু এই বস্তাটা? এই বস্তাভর্তি টাকাগুলো সে রাখে কোথায়? সেও তো এক সমস্যা! কী আশ্চর্য কান্ড বাবা! টাকা থাকলেও জ্বালাতন, আবার না-থাকলেও জ্বালাতন! যাই হোক, এখন ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দেওয়া যাক। বন্ধই করে দিল সে। বস্তাটা মাথায় দিয়ে খাটিয়ার ওপর শুয়ে পড়ল। আঃ! আড়মোড়া ভেঙে একটা বেশ লম্বা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে ভাবল, ব্যাপারটা কি খুব ভুল হয়ে গেল?
কোন ব্যাপারটা?
মানে ফস করে কালা-জুজু নামটা বলে ফেলার ব্যাপারটা।
না, একপক্ষে ভালো। তার কালা-জজু নামটা তো আর পুলিশ জানছে না। পুলিশ তার আসল নামটাই জানে, তাসানু। কিন্তু এখন যেটা ভেবে পাচ্ছে না তাসানু, সেটা হল, এখন তার কাছে কে সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর, গুড্ডাবাবা, না পুলিশ? হয়তো দুজনেই। এই দুজনই তার সবচেয়ে বড়ো দুশমন। আর এ তো তার নিজেরই জন্যে হয়েছে। সোনা যদি সে চুরি না-করত, পুলিশ তার পিছু নিত না। আর পুলিশ পিছু না-নিলে গুড্ডাবাবার পাল্লাতেও তাকে পড়তে হত না। তা-ও না-হয় গুড্ডাবাবার পাল্লায় পড়ল, কিন্তু তারপর সেখানে যে-কান্ডটা করল, তাকে কী বলবে তুমি? খুব বুদ্ধিমানের কাজ? একটা লোককে খুন করে টাকার বস্তা নিয়ে ভেগে পড়ে এখন তাসানু নিজেই নিজের জালে জড়িয়ে পড়েছে। কেউ তো আর ওপর-পড়া হয়ে তাকে এইসব বুদ্ধি দেয়নি। নিজের যা মনে হচ্ছে, তাই করেছে!
শুয়ে-শুয়ে ঘুম আসছিল না তাসানুর। মনটা তার ভারি উশখুশ করছিল। বারবার মাথার বস্তাটা খামচে-খামচে ধরছে আর মনে-মনে ভাবছে, টাকাপয়সাগুলো যদি এক্ষুনি গুনে ফেলতে পারত। না, এখন দরকার নেই। দিনেরবেলা কে কোত্থেকে দেখে ফেলবে! রাত্তিরবেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, তখন। কিন্তু পান্থশালার লোকটার কীরকম আহ্লাদেপনা দেখেছ? বলে, সঙ্গে যদি টাকাপয়সা থাকে তো তার কাছে রেখে দিতে! খেপেছ! তারপর আর একটা কান্ড হোক আর কী!
দুপুরবেলা পেটে দুটো পড়তেই তাসানু নাক ডাকাতে শুরু করে দিলে। টেনে একটি ঘুম দিয়ে যখন বাছাধন উঠল, তখন সন্ধে গড়াচ্ছে! আজকের রাতটা সে না-হয় এখানে থাকল, কিন্তু কাল? রাত পোহালেই তো সকাল। তখন? কালকের কথা তাসানু আজকে এখনও ভাবেনি। তার এখন একটাই শুধু ভাবনা, সেটা হল ওই বস্তাটা। ওই বস্তাটার টাকাগুলো সে যতক্ষণ না গুনে ফেলছে, ততক্ষণ নিশ্চিন্ত হতে পারছে না যেন! সুতরাং ঘুমিয়ে পড়ার রাতটা যত তাড়াতাড়ি আসে ততই মঙ্গল।
ঘুমিয়ে পড়ায় রাত এল ঠিকই। ঠিক এই সময়েই হঠাৎ পান্থশালার সেই লোকটি একেবারে তাসানুর ঘরে হাজির। ‘কী মশাই, ঘুমিয়ে পড়লেন নাকি?’ বলে দরজা ঠেলে লোকটি ঘরে ঢুকে পড়ল।
তাসানু তার এভাবে আচমকা ঘরে ঢুকে পড়ায় থতোমতো খেয়ে গেছে। আমতা আমতা করে বললে, ‘না, এখনও জেগে আছি।’
লোকটি সারা ঘরে বেশ ভালো করে চোখ বুলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘বস্তাটাকে তো দেখছি মাথার বালিশ করে ফেলেছেন!’
চমকে ওঠে তাসানু। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে হাসতে-হাসতে বললে, ‘একটা কিছু মাথায় তো দিতে হয়।’
‘তা থাকছেন তো দু-একদিন?’
‘না, কাল সকালেই যাচ্ছি।’
‘সকালেই!’
‘হ্যাঁ, হাজারটা কাজ, বুঝলেন না! কিন্তু আপনি তো বললেন না, কত কী দিতে হবে?’
‘সে হবে’খন। এত ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? এখন যাই। আপনি আরাম করুন। পরে দেখা হবে।’
লোকটা বেরিয়ে গেল।
তাসানু ঘরের দরজাটা আবার বন্ধ করে দিল। বস্তার মুখটা খুলি-খুলি করেও খুলতে পারছে না। অথচ তরও সইছে না। কিন্তু না। এখনও সবাই ঘুমিয়ে পড়েনি। কে আবার কখন হুট করে দরজায় ঠেলা মেরে বসে! তার চেয়ে রাত গভীর হোক না। সবাই ঘুমিয়ে পড়ুক, তারপর দেখা যাবে। এত ব্যস্ত হবার কী আছে? কেউ তো আর কেড়ে নিচ্ছে না বস্তাটা। দুর, বস্তা নিয়ে কে অত মাথা ঘামায়!
সুতরাং তাসানু গভীর রাতের জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। সে কান পেতেছিল। শুনতে পাচ্ছিল, রাত যতই এগিয়ে আসছে, ধীরে-ধীরে সব নি:ঝুমও হয়ে আসছে। যখন তাসানুর মনে হল, আর কোনো শব্দ নেই, বাইরে কোনো কথাবার্তা নেই, তখন তার ইচ্ছে হল, বাইরে একবার উঁকি মারে! সে সত্যি-সত্যি দরজা খুলে ফেলল। উঁকিও মারল। কিন্তু কাউকে দেখা গেল না। যাক বাবা! এতক্ষণে একটু সুযোগ এল! সত্যি বলতে কী, এমন উত্তেজনা তাকে পেয়ে বসল, ঘরের দরজাটায় যে খিল দিতে হবে, সে-কথাটা তার খেয়ালই হল না। আনমনে তড়িঘড়ি দরজাটা ভেজিয়ে দিয়েই বস্তাটা নিয়ে বসে পড়ল তাসানু। খুলে ফেলল বস্তা। উপুড় করে নাড়া দিতেই থোকা থোকা টাকার বাণ্ডিল ছড়িয়ে পড়ল। উঃ! কত টাকা! এক রাত্তিরে এত টাকা সে গুনবে কী করে? গুনেই বা করবে কী! বুঝতেই তো পেরেছে। এ তো আর একশো-দুশো হবে না! হাজার-হাজার! তাসানু বুকের ভেতরে আনন্দে দাপাদাপি শুরু হয়ে গেছে! আনন্দে বস্তার ভেতরে টাকাগুলো আবার লুকিয়ে ফেলার কথা সে ভুলেই বসেছে! টাকাগুলো নিয়ে একবার এদিকে রাখে, একবার ওদিকে রাখে। কখনও ছড়ায়। কখনও দু-হাত দিয়ে খামচে ধরে লোফালুফি লাগিয়ে দেয়। আনন্দে সে হাসবে, না-কাঁদবে? সে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে হাসির শব্দটাকে গলার মধ্যে চেপে ধরে সে খিলখিল করতে লাগল। চেষ্টা করেও সে হাসিটাকে আটকে রাখতে পারল না। কিন্তু কেউ শুনে ফেললে! হাসিটাকে একবার সামলায় তো দশবার ফেটে পড়ে। শেষে হাসতে-হাসতে সে টাকাগুলোর ওপর গড়াগড়ি শুরু করে দিলে। উঃ! সে কী দারুণ উত্তেজনা!
খুট!
চমকে ওঠে তাসানু।
‘কে!’
ধড়ফড় করে উঠে পড়ে তাসানু।
এই সর্বনাশ! দরজাটা যেন আস্তে আস্তে খুলে যাচ্ছে!
পড়িমরি ছুটে গেল তাসানু। দরজাটা বন্ধ করার জন্যে হাত বাড়াতেই থমকে গেছে। এ-কী, এ যে সেই লোকটা! ঢুকে পড়ল সে! ‘হ্যাল্লো, কালা-জুজু!’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে তাসানু। মারল ছুট টাকাগুলোর কাছে। লুকিয়ে ফেলার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ল টাকাগুলোর ওপর।
লোকটা বলে উঠল, ‘কালা-জুজু, আর লুকিয়ে কী করবেন? আমি দেখে ফেলেছি। দেখে ফেলেছি এখন নয়, যখন আপনি পান্থশালায় এসেছেন, তখনই। বস্তার পিঠে যে একটা ফুটো, সেটা আপনার মতো একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তির চোখ এড়িয়ে গেছে, এতেই আমি অবাক হচ্ছি। ওই ফুটো দিয়ে টাকার বাণ্ডিল উঁকি মারছে দেখেই, আপনাকে আমি ধরে ফেলেছি।’
তাসানু যেন পাথর!
লোকটা এবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর মুচকি-মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করল, ‘এত টাকা পেলেন কোত্থেকে?’
তাসানু চুপ করেই রইল।
লোকটা জিজ্ঞেস করল, ‘কী চুপ কেন? বলুন এত টাকা পেলেন কোথায়?’
তাসানু যে চটপট বলে ফেলবে একটা কিছু, তেমন বুদ্ধি তার লোপ পেয়েছে তখন। যেমন চুপ করে ছিল, তেমনই চুপ থাকলে মিটে যেত। তা না, এমন তোতলাতে শুরু করে দিলে যে, লোকটা আরও পেয়ে বসল। আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি চুরি করেছেন?’
তাসানু এবার বেশ চিৎকার করেই বলে উঠল, ‘কে বলেছে, আমি চুরি করেছি! এ-টাকা আমার।’
‘তবে যে বললেন, শস্তার মাল সওদা করেছেন?’
তাসানু এবার যেন একটু রোষ দেখিয়েই বলল, ‘সে আপনাকে দেখতে হবে না।’
‘দেখতে হবে বইকী! একটা চোর যদি আমার পান্থশালায় ঢুকে বসে, তাকে তো পুলিশের হাতে আমাকেই দিতে হবে। কত টাকা আছে?’
তাসানু খেঁকিয়ে উঠল, ‘যত টাকাই থাক।’
এগিয়ে গেল লোকটা।
তাসানু রুখে দাঁড়াল, ‘কাছে আসবেন না বলছি।’
‘কেন, মারবেন?’
‘সরে যান বলছি।’
এবার কিন্তু লোকটি নিজের মূর্তি ধরল। ধাঁ করে ধরে ফেলল তাসানুর একটা হাত। তাসানু টেনে একঝটকা মারল লোকটিকে। লোকটি এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল তাসানুর ঘাড়ের ওপর। তাসানুও ছাড়বার পাত্তর নয়। দুজনের মধ্যে আচমকা লেগে গেল প্রচন্ড মারামারি।
লোকটির সত্যিই ভীষণ শক্তি। দেখলেই মনে হয়, তাসানুর মতো চারটে লোককে একাই ঘায়েল করতে পারে। সুতরাং তাসানু বারবার প্যাঁচ খেয়ে লটকে-লটকে মাটিতে পড়ছে। আবার উঠছে। জাপটে ধরছে। টানাহ্যাঁচড়া করছে। কিন্তু আবার কাত হয়ে ডিগবাজি খাচ্ছে। একফাঁকে তাসানু তার একটা হাত এমন জোরে কামড়ে ধরলে যে, লোকটির হাতটা বুঝি, দু-টুকরো হয়ে যায়! তাসানুর মুখ থেকে হাত ছাড়াবার জন্যে লোকটি মরিয়া হয়ে ঝাপটা-ঝাপটি শুরু করে দিল। তাসানু ছাড়েই না। শেষমেশ লোকটা আর সহ্য করতে না-পেরে, একহাত দিয়েই তার মাথায় এমন একটা ঘুসি মারল যে, মনে হল, তাসানুর ঘাড় থেকে বুঝি মুন্ডুটা ছিটকে বেরিয়ে গেল। আসলে, মুন্ডুটা ছিটকে বেরিয়ে না-গেলেও তাসানু ছিটকে পড়ল মাটিতে। পড়ল, আর উঠতে পারল না। এ-কী! তাসানু যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে! তবে কি একঘায়েই সে কুপোকাত! হতে পারে! কেন-না, মাথায় আঘাত তো! হয়তো মোক্ষম লেগেছে! তাহলে কী হবে এবার?
লোকটা কিন্তু একটুও ঘাবড়াল না। সঙ্গে সঙ্গে ছড়ানো-মড়ানো টাকাগুলোকে আবার বস্তার মধ্যে পুরে ফেলল। সেই বস্তাটা নিয়ে নি:শব্দে নিজের ঘরে রেখে আবার এল তাসানুর ঘরে। তাসানুকে ঘর থেকে টেনে বার করে, সেই অন্ধকার রাত্তিরে তাকে ঘাড়ে নিয়ে কোথায় যে ফেলে দিয়ে এল, কেউ জানতেও পারল না।
লোকটাও হয়তো ভেবেছিল, তাসানু খতম হয়ে গেছে। সুতরাং এখন তাকে পায় কে! না-বললেও কে আর বোঝে না, নিজে টাকাগুলোকে হাতাবে বলেই তো এমন একটা মতলব সে ফেঁদেছিল। এখন তার হাতে চাঁদ। কে এমন মূর্খ আছে, টাকার বস্তা হাতে পেয়ে, সেই টাকা মাঠে ছড়িয়ে দেয়!
তাসানু পড়ে ছিল একটা জঙ্গলে। সেই পান্থশালা থেকে বেশ অনেকটা দূরে। ভাগ্যি ভালো, তখনও তার প্রাণটি বুকের মধ্যে ধুকপুক করছিল। কতক্ষণ যে তাসানু সেইখানে পড়ে-পড়ে ধুঁকেছে, কেউ জানে না। যখন সকালে রোদ উঠে গেছল, তখনও সে মরেনি। তাকে আধমরা অবস্থায় দেখতে পেয়েছিল একটি দয়ালু মানুষ। সে তাসানুকে সেখান থেকে নিয়ে গেছল নিজের ঘরে। তখনও তাসানু চোখ খুলে দেখেনি। দেখেনি, যে-মানুষটি তাকে বাঁচানোর জন্যে আপ্রাণ লড়াই করছে, সে-মানুষটির বুক-ভর্তি দয়া আর স্নেহ জমে আছে। এই লোকটির অবিশ্যি সবই আছে, বউ, ছেলে, মেয়ে। কিন্তু এখন এইঘরে সে একা। কারণ তারা থাকে অনেক দূরে। তার দেশে। লোকটি এখানে কাজ করে জঙ্গলে। কাজ করে আরও পাঁচটা লোকের সঙ্গে। করাত দিয়ে গাছ কেটে কাঠ বার করে। বলতে পারো, চাকরি করে। মাসে-মাসে মাইনে পায়। একখানাই ঘর তার। এই জঙ্গলেরই ধারে। সেদিন যখন সে কাজে যাচ্ছিল, তখনই সে আচমকা দেখতে পেয়েছিল তাসানুকে। প্রথমটা হয়তো সে ভেবেছিল, তাসানু মরেই গেছে। কিন্তু না। একটা জীবন্ত মানুষকে এখানে, এভাবে পড়ে থাকতে দেখে সে ভীষণ ভয় পেয়ে গেছল। মানুষটাকে বাঁচানোর জন্যে সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এখানে এমন কেউ নেই যে, তাকে একটু সাহস দিতে পারে। একটু সাহায্য করতে পারে। কিন্তু দেরি তো করা যায় না! অগত্যা লোকটি নিজের কাঁধেই তাসানুকে তুলে নিল। নিয়ে চলল নিজের ঘরে। নিজের ঘরে নিজের বিছানায় সে শুইয়ে দিল তাসানুকে। তাসানুর চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিল। তারপর ওর মাথায় আলতো হাতের স্পর্শ দিল। তেমন একটা আঘাতের চিহ্ন তার শরীরে সে কোথাও দেখতে পেলে না। শুধু দেখতে পেল, তাসানুর নিশ্বাসটা যেন সহজ হয়ে আসছে। লোকটা স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইল সেইদিকে। শুনতে পেল, তাসানুর গলা দিয়ে যেন একটা ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে! ব্যস্ত হয়ে তাকাল লোকটি। তাসানুর মাথাটা এদিক থেকে ওদিকে হেলে পড়ল। জ্ঞান আসছে তাসানুর। হ্যাঁ চোখ চাইল তাসানু। তারপর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
লোকটি তাসানুর মাথায় হাত রাখল।
তাসানুর ফ্যাকাসে চোখে অবাক চাউনি।
লোকটির মুখে হাসি। জিজ্ঞেস করল, ‘কষ্ট হচ্ছে?’ ভারি স্নেহমাখা গলার স্বর।
তাসানুর গলায় কোনো উত্তর নেই। হয়তো উত্তর দেবার মতো তার এখন ক্ষমতাই নেই। তাই সে ফ্যালফ্যাল করে চেয়েই রইল।
লোকটি আবার বলল, ‘কিচ্ছু ভয় নেই। ভালো হয়ে যাবে।’
তাসানু চেয়েই রইল।
হ্যাঁ, তাসানু একদিন সত্যিই ভালো হয়ে উঠেছিল। সে উঠে বসেছিল। তারপর একদিন বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছিল। তারপর তাসানু একদিন লোকটিকে বলেছিল, ‘এবার আমি যেতে পারব।’
লোকটি জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কোথায় যাবে? বাড়ি?’
তাসানু বলেছিল, ‘বাড়ি থাকলে তবে তো যাব।’
‘কেন, তোমার মা, বাবা কেউ নেই?’
তাসানু একথার কোনো উত্তর না-দিয়ে একটু হাসল। সে হাসি ভারি কষ্টের।
লোকটি জিজ্ঞেস করল, ‘কী করো তুমি?’
তাসানু তাকাল লোকটির মুখের দিকে। হয়তো কিছু ভাবল। তারপর স্পষ্ট গলায় বলে উঠল, ‘চুরি।’
চমকে চাইল লোকটি।
তাকে চমকাতে দেখে তাসানু আবার বলল, ‘হ্যাঁ, আমি চোর।’
বেশ নির্ভয়েই সে বলল। কেন-না, তাসানুর মনে হয়েছিল, যে-মানুষটা তার প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছে, অন্তত তার কাছে সে কিছুতেই মিথ্যে বলবে না। মিথ্যে সে অনেক বলেছে। তাতে কী লাভ হয়েছে তার! এখন যদি এ-মানুষটা তাকে হাজারো শাস্তি দেয়, তবে সে-শাস্তি মাথা পেতে নিতে তাসানু একটুও পিছপা হবে না। কারণ, এই মানুষটার মুখখানা দেখে, তার যেন মন বারবার বলে উঠছে, এতদিন সে যা করেছে, সব ভুল, সব মিথ্যে!
লোকটি কিন্তু তাসানুকে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে হয়তো বুঝতে পেরেছিল, সে চোর বলেই বোধহয় কেউ তাকে মেরে জঙ্গলে ফেলে দিয়ে গেছে। অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিল তাসানুর নামটি।
তাসানু উত্তরে বলেছিল, ‘‘আমি যখন বাবা-মার সঙ্গে থাকতুম, তখন তারা আমায় তাসানু বলে ডাকত। তারপর পাকচক্রে আমি যখন চুরি করতে শিখলুম, তখন আমার নাম হল ‘কালা-জুজু’।’’
সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা মার কাছে এখন থাকো না কেন?’
‘চোর-ছেলের মুখ দেখতে চায় কোন মা-বাবা?’ উত্তর দিয়েছিল তাসানু।
লোকটি বলল, ‘না, না, ওকথা বলো না। বাবা-মার দুঃখ হলেও ছেলেটি তো তাদের দুঃখ ঘোচাবে। চলো, আমি তোমায় তাদের কাছে নিয়ে যাব।’
তাসানু লোকটির কথা শুনল। তারপর একটু চুপ থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি যাব। কিন্তু এখন নয়। এখন আমি কাজ খুঁজব। নিজের পায়ে দাঁড়াব। চোর হয়ে নয়, তাদের ছেলের মতোই তাদের সামনে দাঁড়াতে চাই আমি।’
‘বেশ, আমার সঙ্গে কাজ করবে তুমি?’
‘কী কাজ?’
‘আমি জঙ্গলে কাজ করি। করাত টেনে কাঠ কাটি।’
তাসানু বলল, ‘আমি তো করাত টানতে জানি না।’
‘আমি শিখিয়ে দেব।’
তাসানু বলল, ‘তাহলে পারব।’ তারপর একটু থেমে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিন্তু এখানে আমি থাকব কোথায়?’
লোকটি উত্তর দিল, ‘কেন, আমি তো আছি। আমার কাছে থাকবে।’
‘তুমি চোরকে আশ্রয় দেবে।’ জিজ্ঞেস করেছিল তাসানু।
লোকটি একটু হাসল। তাসানুর কাঁধে হাত রাখল। একটু মৃদু ঝাঁকানি দিয়ে বলল, ‘না, তুমি চোর নও। তুমি আমার আপনার জন। আমার ছেলের মতো।’
দুটি চোখ জলে ভরে গেল তাসানুর।
সুতরাং তাসানু সেই লোকটির কাছেই থেকে গেল।
লোকটির নাম তাকাজি। হাসি-ভরা মুখটি তার। দেখলেই এত ভালো লাগে। মাথার চুলে যদিও পাক ধরেছে, কিন্তু দেহে তার অসম্ভব ক্ষমতা। কিন্তু দেহে যত ক্ষমতা, তার চেয়ে বেশি ভালোবাসা তার মনে। সেই ভালোবাসার ছোঁয়া লেগে তাসানু যেন আস্তে-আস্তে কেমন এক অন্য মানুষ হয়ে ওঠে। সে এখন জানে না মানুষকে ঠকাতে, কিংবা মিথ্যা বলতে। এখন তার বুক-ভর্তি আনন্দ। কেন-না, সে এখন তাকাজির সঙ্গে জঙ্গলে যায়। তাকাজির সঙ্গে হাত মিলিয়ে করাত টেনে কাঠ কাটে। বাড়ন্ত দেহের মাংসপেশিগুলো তার ফুলে-ফুলে ওঠে। একটা শক্তসমর্থ মানুষ হয়ে ওঠে তাসানু।
এমনি করে দিন চলে যায়।
এমনি একটা দিনে তাসানু তাকাজিকে বলেছিল, ‘তাকা, তুমি আর না-ই বা এত খাটলে।’
তাকা বলেছিল, ‘আমার না-খাটলে চলবে কেমন করে? দেশে আমার ছেলে রয়েছে, মেয়ে রয়েছে। তারা পড়াশোনা করে। আমার বউ আছে। আমি না-খাটলে, তাদের কে দেখবে?’
তাসানু বলেছিল, ‘একদিন তো তুমি বুড়ো হয়ে যাবে, একদিন তো তোমার খাটবার ক্ষমতা থাকবে না। সেদিন?’
তাকাজি উত্তর দিয়েছিল, ‘সেদিন আমার মেয়ে যাবে শ্বশুরবাড়ি আর ছেলে দেখবে আমাদের, তার বুড়ো মা-বাপকে।’
তাসানুর বুকটা শিউরে উঠল। হঠাৎ যেন ঝাপসা হয়ে বুড়ো বাবা-মার মুখ দুটি তার চোখের ওপর ভেসে ওঠে। ছি:! সে তাদের ফেলে রেখে পালিয়ে এসেছে! এ কী করেছে সে! দুঃখে যেন বোবা হয়ে যায় তাসানু। ইশ! না-জানি তারা এখন কত কষ্ট পাচ্ছে!
তাসানু এখন করাত টানে গভীর জঙ্গলে। গাছের ফাঁকে-ফাঁকে করাতের শব্দ ওঠে। ওই শব্দ ছাড়া এখন আর সে কিছু জানে না। সে জানে, ওই শব্দ যত গর্জে উঠবে, ততই তার বুকের ঘাম মাটিতে ছড়িয়ে পড়বে। সেই তার সুখ। এখন তাকে কেউ বলবে না, সে চোর। সে জোয়ান ছেলে। মেহনত করতে জানে সে। আর ভয় কী তার!
তাসানু একদিন তাকাজির সঙ্গে মাটি কোপাতে লাগল। তাকাজির তো মাত্তর একখানি ঘর ছিল। মাটি কুপিয়ে দুজনে মিলে আর-একখানা ঘর তুলল। একটা তোরঙ্গ ছিল, দুটো হল। একটা তোরঙ্গে যত পোশাক ছিল, আরও তত পোশাক হল। য-খানা বাসন ছিল, আরও অনেক হল। ঘর ভরে গেল খুশিতে।

একদিন খুশিতে উছলে উঠেই তাসানু তার তাকাজিকে বলেছিল, ‘তাকা, তুমি তো অনেকদিন দেশে যাওনি। যাও না এবার। ক-দিন ঘুরে এসো। ছেলে-মেয়েকে দেখে এসো। আমি আছি।’
তাকাজি বলেছিল, ‘হ্যাঁ যাব। তাসানুর বিয়ে দিয়ে যাব।’
তাসানুর মুখখানা লাল হয়ে ওঠে।
একদিন সত্যিই তাসানুর বিয়ে হল। সেই জঙ্গলের নির্জন ছায়ায় একদিন বিয়ের বাদ্যি বেজে উঠল। সেই জঙ্গলের নির্জন ঘরে আরও অনেকদিন পর একটি ছেলে জন্মাল তাসানুর। ছেলের নাম রাখল কুহা। খুশিতে উছলে ওঠে তাকাজি বলে, ‘তাসানু, ঘরে আমার নাতি এল। নতুন দিনের নতুন মানুষ। এবার আমার ছুটি। এবার আমার ছেলে-মেয়ের কাছে ফিরে যাবার সময় হল। তাসানু, জঙ্গলের কাজ আমার শেষ হয়েছে। এবার আমি দেশে যাব।’
তাসানুর বুকের ভেতরটা কেমন যেন থমকে যায়।
একদিন সত্যিই খুব সকালে এই জঙ্গলের শেষ রাস্তায় জুড়ি-ঘোড়ার এক্কাগাড়ি ছুটে যায়। চেয়ে থাকে তাসানু। গাড়িতে তার তাকাজি। তেমনি হাসি-মাখা মুখ। ঘোড়া ছোটে। তার পায়ের শব্দ ভেসে আসে। সে-শব্দ মনে হয়, যেন তার তাকাজির বুক-ভর্তি ভালোবাসার শব্দ। বোবার মতো সেই শব্দ শুনতে থাকে তাসানু। আহারে! তাসানু হয়তো মানুষটাকে আর কোনোদিন কাছে পাবে না। কেন-না, এখান থেকে, এই জঙ্গল পেরিয়ে তাকাজি যাবে বন্দরে। সেই বন্দর থেকে তার জাহাজ সমুদ্রের জলে ঢেউ তুলে যাবে অনেকদূরে, আর এক বন্দরে। সেখানে থেকে তার দেশে।
তাকাজি চলে গেল। কেমন যেন নি:ঝুম হয়ে গেল বাড়িটা। আর যেন কিছুই ভালো লাগে না তাসানুর। জঙ্গলে যায়। কাঠ কাটে। কিন্তু যে করাতের শব্দে একদিন সে সুখ দেখেছিল, আজ যেন আর সে-সুখ নেই। তাকাজির জন্যে ব্যথায় ভরে যায় তার মন। এমনি করে ভাবতে-ভাবতে যে তার শরীরটাও ভেঙে পড়বে, এ-কথাটা বুঝতে পেরেছিল তার বউ। তাই একদিন বউ বলল, ‘এমনি করে তুমি মনখারাপ করে বসে থাকলে, আমাদেরও কি ভালো লাগে! তার চেয়ে ভালো, একদিন সবাই মিলে ঘুরে আসি তাকার দেশ থেকে!’
তার বউয়ের মুখে একথা শুনে খুব খুশি হয়েছিল তাসানু। বলল, ‘কিন্তু বউ, তাকার দেশে যাব যে, আমাদের অত পয়সা কই?’
বউ বলল, ‘একটু খরচ কমিয়ে, কিছু পয়সা জমিয়ে ক-দিন পরে যাব।’
বউয়ের বুদ্ধির তারিফ করেছিল তাসানু। আর সত্যি-সত্যি সেদিন থেকে পয়সাও বাঁচাতে শুরু করে দিল তারা।
যেদিন অনেক পয়সা জমে গেল, সেদিন জঙ্গল থেকে ক-দিনের ছুটি নিয়ে তারা রওনা দিল। রওনা দিল তাকাজির দেশে। এবারও সেই তেমনি জুড়ি-ঘোড়ার এক্কাগাড়ি। তবে তাকাজির মতো তাসানু কিন্তু একা নয়। সঙ্গে তার ছেলে আর বউ। এক্কাগাড়ি বন্দরে পৌঁছলে, দুরন্ত সমুদ্রে ওদেরও জাহাজ ভেসে চলল। ওরা চলল আর এক বন্দরে, তাকাজির দেশে। আঃ! কতদিন তাসানু তার তাকাজিকে দেখেনি। আবার দেখতে পাবে। তাকা বলে আনন্দে জড়িয়ে ধরবে। ভাবতেই তাসানুর সারা গায়ে যেন শিহরন লাগে। আর কতদূর, তাকাজির দেশের সেই বন্দর। ধৈর্য হারিয়ে ফেলে যেন তাসানু। কখন সে দেখা পাবে সেই বন্দরের।
দেখা পেয়েছিল তাসানু। দেখা পেয়েছিল সেই বন্দরের। কিন্তু পৌঁছোতে পারেনি তার তাকাজির কাছে। পৌঁছোবে কী করে? এ যে এক মস্ত শহর। এই শহরের কোন চত্বরে যে তার তাকার বাড়ি, সেটা খুঁজে বার করা কি সহজ কাজ! তাসানু ভেবেছিল, বন্দরে নামবে, কাউকে জিজ্ঞেস করবে, অমনি সে পৌঁছে যাবে সেই বাড়িতে। কিন্তু এ তো শহর। শহরে কে আর অন্যের খোঁজ রাখে! এখানে যেমন গিজগিজ করছে মানুষজন, তেমনি অগুনতি বাড়িঘর। রাস্তাঘাট, গাড়িঘোড়া, হইহল্লা, হট্টমালার শহর যেন!
তাসানু তার ছেলে-বউকে নিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ধাঁধায় পড়ে যায়! কোথায় যাবে, কাকে জিজ্ঞেস করবে? কেউ কথাও বলে না, চেয়েও দেখে না। কে তো কে! অথচ এমন করে বোকার মতো পথে-পথে কত ঘুরবে? শেষে তাসানু বউকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করা যায় বলো তো?’
বউ বলল, ‘ফিরে চলো।’
তাসানু বলল, ‘কিন্তু এত কষ্ট করে, এতটা পথ এসে তাকার সঙ্গে দেখা না-করে ফিরে যাব?’
‘তা ছাড়া আর কী উপায় বলো! আমরা তো তার ঠিকানাই জানি না।’
সত্যি কথাই। তাসানুর সব জানা আছে, কিন্তু মানুষটার ঠিকানাই সে জানে না। সুতরাং সে বলল, ‘আমরা তাকে যেমন করে হোক খুঁজে বার করে সে ভুলটা শুধরে নেব।’
অগত্যা বউ বলল, ‘তবে দ্যাখো চেষ্টা করে। কিন্তু সারাক্ষণ তো পথে পথে ঘোরা যায় না।’
তাসানু বলল, ‘চলো একটা আস্তানা খুঁজি।’
শহরের আস্তানা মানে তো হোটেল। সুতরাং তারা একটা ছোটখাটো হোটেলেই উঠল। এতখানি পথ এসেছে তারা, জঙ্গল থেকে শহরে। অন্তত পথের সেই ধকলটা তো এখানে সামলাতে পারবে।
একটু পরে হোটেল থেকে তাসানু এবার একাই পথে বার হল তাকাজিকে খুঁজতে। পথঘাট তার একেবারে অচেনা। ঘোঁতঘাঁত কিচ্ছু জানে না। তবু সে নাছোড়বান্দা। খুঁজে তাকে পেতেই হবে।
কিন্তু পেল না তাসানু তার তাকার খোঁজ। এবার সে সত্যিই বিপদে পড়ে গেল। একদিন-দু-দিন নয়, ক-দিন ধরেই তাসানু শহরের আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়াল। ঘুরতে-ঘুরতে তার পয়সাও ফুরিয়ে এল। এমনকি, তার সেই জঙ্গলের ঘরে ফিরে যাওয়ার পয়সাতেও টান পড়ল। কী করবে এখন তাসানু?
বউ জিজ্ঞেস করল, ‘ফিরবে কী করে? যে ক-টা পয়সা আছে, ক-দিন পরে ফুরিয়ে গেলে, তখন ছেলেটাকে কী খেতে দেব?’
তাসানু বলল, ‘বউ, ভয় পেয়ো না। গায়ে যতক্ষণ তাগদ আছে, ততক্ষণ তোমাদের না-খেয়ে থাকতে হবে না। কিছু না-পেলে মোট তো বইতে পারব।’
আজও পথে বার হল তাসানু। তবে আজ তাকার খোঁজে নয়, কাজের খোঁজে। সে বোধহয় বুঝতে পেরেছে তাকার সঙ্গে আর দেখা হবে না। সুতরাং সে একা-একাই পথে হাঁটছিল আর ভাবছিল, এত লোকের মধ্যে সে কাকে বলবে তাকে একটা কাজ দেবার কথা। অবিশ্যি করাত টানতে-টানতে তাসানুর চেহারাটা এখন যা হয়েছে, যে-কোনো কাজই সে করতে পারে। যেমন লম্বা-চওড়া, তেমনি লোহার মতো পেটা-পেটা চমৎকার স্বাস্থ্য। কিন্তু স্বাস্থ্য দেখে আর কার মন গলবে যে, এক্ষুনি ডেকে তাকে কাজ দেবে!
কিন্তু সত্যি ঠিক এমনই এক কান্ড ঘটে গেল সেদিন। পথচলতি অনেক মানুষের মধ্যে একজন মানুষের নজর কেড়েছিল তাসানু। সত্যি বলতে কী, তাসানুকে দেখে লোকটি চমকে উঠেছিল। এবং তাসানু তার দৃষ্টির বাইরে চলে যাবার আগেই সে তাসানুকে ডাক দিল, ‘ও ভাই, একটু দাঁড়াবে?’
তাসানু প্রথমে খেয়ালই করেনি। মুখ ফিরিয়ে চলেই যাচ্ছিল। লোকটি আবার ডাকল, ‘তোমাকে ডাকছি ভাই, তোমাকে!’
‘আমাকে?’ তাসানু উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘হ্যাঁ, তোমাকে।’
তাসানু এগিয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বলবেন?’
‘না, তোমাকে একটু ভালো করে দেখব। ভারি চমৎকার স্বাস্থ্যটি তোমার।’ বলে লোকটি তাসানুর কাঁধে হাত রাখল।
তাসানু কিছু না-বলে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে একটু হাসল।
‘কী করা হয়?’ লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল।
‘কিছু না।’ তাসানু উত্তর দিল, ‘একটা কাজ খুঁজছি।’
‘করবে একটা কাজ?’
কথাটা শুনে থতোমতো খেয়ে গেছে তাসানু। এতক্ষণ ধরে পথে-পথে সে তো কাজের জন্যেই ঘুরেছে। আর সেই কাজ এখন তার সামনে হাজির। যেন নিজের কান দুটোকে বিশ্বাসই করতে পারে না তাসানু। তাই খুব আগ্রহের সঙ্গেই সে বলল, ‘পেলে নিশ্চয়ই করব।’
লোকটি বলল, ‘আমি তোমায় কাজ দেব।’
‘আপনি?’ যেন স্বপ্ন দেখছে তাসানু।
‘কোথায় থাকো?’ জিজ্ঞেস করল লোকটি।
‘এখানে থাকি না। থাকি অনেক দূরে। এখানে এসেছি আমার তাকাজির খোঁজে। কিন্তু খোঁজ পেলুম না। তাই ফিরে যাব ভাবছি। আপাতত এই শহরেরই এক হোটেলে আছি। সঙ্গে আছে বউ আর ছেলে।’
‘আমি তোমায় যে-কাজটা দেব, সেটা কিন্তু খুব ভয়ংকর কাজ।’
শুনে একটু যেন মুষড়ে গেল তাসানু। তবে কি লোকটি তাকে আবার কোনো বদ কাজে লাগিয়ে দেবে? সুতরাং তাসানু খুব স্পষ্ট গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘চুরি-ডাকাতি নয় তো?’
ভদ্রলোক হো হো করে হেসে উঠল। হাসতে-হাসতে বলল, ‘না, না, সেসব কিছু নয়।’
‘তবে?’ তবু তার মন থেকে সন্দেহ গেল না।
লোকটি উত্তরে বলল, ‘কাজটাকে ঠিক কাজ না-বললেও ক্ষতি নেই। কাজের বদলে এটাকে খেলা বললে, মানায় ভালো।’
লোকটার কথাগুলো কেমন যেন হেঁয়ালির মতো শোনাল তাসানুর কানে। শেষকালে আবার আর এক ফাঁদে পড়বে নাকি। তাই নিজের ভয়টাকে সে ভদ্রলোককে জানতে না-দিয়ে বলল, ‘যদি বলেন কাজটা কী ধরনের?’
‘বুল-ফাইটিং জানো? মানে, বলদের সঙ্গে লড়াই করার কথা শুনেছ কখনো? কাজটা সেই বলদের সঙ্গে লড়াই। বলদের সঙ্গে লড়াই করে জিততে হবে তোমায়। আসলে এটা বলদ-মারার খেলা। খেলায় একবার যদি কোনোরকমে বীরত্ব দেখাতে পারো, তবে, নাম তো হবেই, সেইসঙ্গে হবে অনেক পয়সা।’
তাসানু বলল, ‘আজ্ঞে, এমন খেলা তো আমার জানা নেই।’
‘আমি তোমায় শিখিয়ে দেব। আমি বহুলোককে শিখিয়েছি এই খেলা। তারা এক-একজন তাবড়-তাবড় বুল-ফাইটার।’
তাসানু উত্তর দিল, ‘না-দেখলে আন্দাজে কেমন করে বলি?’
‘তোমার এখন সময় আছে?’ লোকটি জিজ্ঞেস করল।
তাসানু বলল, ‘হ্যাঁ, তা আছে।’
‘তবে তুমি আমার সঙ্গে যেতে পারো। আমি এখন এমনই এক খেলার রিঙে যাচ্ছি। আজ একটা খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই আছে। তুমি দেখলে বুঝতে পারবে।’
তাসানু ভদ্রলোকের সঙ্গে লড়াই দেখতে চলে গেল।
খেলা দেখে রাজি হয়ে গেল তাসানু। হ্যাঁ, সে বুল-ফাইটারই হবে। সেই লোকটির কাছে সে খেলা শিখতে শুরু করলে। তারপর? সে হয়ে উঠল এক ভয়ংকর হিংস্র মানুষ। অনেক তার পয়সা।
এইখানেই তার ছেলে কুহা ধীরে ধীরে বড়ো হয়ে উঠেছিল। এইখানেই কুহা লেখাপড়া শিখল একটি-একটি ক্লাসে উঠে। এখানেই তাসানু তার ছেলে কুহাকে বলেছিল, ‘তোকেও আমার মতো লড়াই করতে হবে বলদের সঙ্গে। আর তা যদি না-করিস, তবে তোকে মরতে হবে আমার হাতে।’
কুহা বলে, নিরীহ জীবকে সে হত্যা করতে পারবে না। এখানেই ছেলের কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে তাসানু। আর তখন এখান থেকেই তার ছেলে কুহা বাবাকে ছেড়ে চলে যায়। আর ফিরে আসে না। তাসানু বুঝি বুঝতে পারে তার ভুল। সে ছুটে পালায় এ-শহর ছেড়ে। খুঁজে বেড়ায় তার ছেলেকে। খুঁজতে-খুঁজতে বুড়ো হয়ে গেল লোকটা। কতদিন হয়ে গেল। কত বছর। কিন্তু এখনও সে তার ছেলেকে খুঁজে পেল না। এখনও না।
এখন দ্যাখো ওই মানুষটাকে। চিনতে পারছ? ওরই নাম তো তাসানু। যেন একটা পাগল। একমাথা ঝাঁকড়া চুল। গালভর্তি দাড়ি। কতদিন চান করেনি। হাতের নোখগুলো কী বিচ্ছিরি ময়লা। জামাটা শতচ্ছিন্ন। প্যান্টে তাপ্পিমারা। পায়ে জুতো নেই। ওই তো হেঁটে চলেছে। দ্যাখো, একদল কাক কেমন মাথায় উড়ে-উড়ে ওকে বিরক্ত করছে। ওকে দেখলেই যেন কাকগুলো পেয়ে বসে। কা-কা-কা। পালায় তাসানু।
কিন্তু পালাবে কোথায়? তার না-আছে ঘর, না-আছে দোর। পথে-পথেই সে পালিয়ে বেড়ায়। তারপর রাত যখন আসবে, কোনো পোড়োবাড়ির ভাঙা দেওয়ালের আড়ালে ঘুমিয়ে পড়বে। আঃ! রাত এলে নিশ্চিন্ত। অন্তত কাকের জ্বালাতন থেকে বাঁচে। কিন্তু তার বদলে আর এক বিপদ। রাতের অন্ধকারে শীতটা এমন কামড়ে ধরে যে, বেচারা ঘুমুতেই পারে না। তবু তাকে পড়ে থাকতেই হবে অন্ধকারে। আর হেঁটে চলতে হবে দিনের আলোয় এখানে-ওখানে।
একদিন এমনি করেই হাঁটছিল সে। এমনি করে কাকের তাড়া খাচ্ছিল। এমনই সময়ে হঠাৎ যেন সে শুনতে পেয়েছিল এক গভীর জলের ছলাতকার। হ্যাঁ, একটু এগিয়ে সে দেখতে পেয়েছিল একটা নদী। মস্ত-মস্ত পাথর ডিঙিয়ে ঠিক যেন ঝরনার মতো বয়ে যাচ্ছে ঢালু পথে। সে আরও দেখল, এই পাথরের ওপর পা রেখে অথবা নদীর জলে পা ডুবিয়ে এপারের মানুষ ওপারে যাচ্ছে। আরও একটু এগিয়ে যেতে তাসানু দেখল, ঝরনার মতো এই নদী লাফ দিয়ে নীচে, আরও নীচে অঝোর ধারায় ঝরে যায়। নীচে, দুই পাহাড়ের মাঝে, আর এক নদী। সে-নদীর জল আকাশভরা নীল। আর এ-নদীর জল কাচের মতো স্বচ্ছ। স্বচ্ছ জলের নদী নীল জলের বুকে পড়ে উথলে ওঠে। তার চারদিকে জলের বিন্দুগুলি যেন কুয়াশা। সেইদিকে অবাক হয়ে চেয়ে থাকে তাসানু। তারপর হঠাৎ চমকে ওঠে। দেখে কী, ফুলের কুঁড়ির মতো দুটি ছোট্ট ছেলে। ছুটে যায় এই স্বচ্ছ নদীর পাথর ডিঙিয়ে, কিংবা জলে পা ভিজিয়ে। ছুটতে-ছুটতে তারা হাসে। দুই নদীর জলের কলতানের মতো সেও যেন এক বাজনা। ভারি মিষ্টি। স্থির হয়ে যায় তাসানুর চোখ। ভয় পায়, যদি পিছলে পড়ে। এগিয়ে যায় তাসানু। কিন্তু ওদের নাগাল পায় না। ওরা এই জলের মতোই কলকল করতে-করতে এপার থেকে ওপারে হারিয়ে গেল। তাসানুও বুঝি ছুটতে চায়। ছুটে-ছুটে ওদের দেখতে চায়। কিন্তু পারে না। কখনো জল খরস্রোত। কখনো বালি, গভীর খাদ। তাসানু ছুটতে গিয়ে হোঁচট খায়। না-হয় থমকে দাঁড়ায়। আবার ছোটে। যেন মানতে চায় না কোনো বাধা। সে যাবেই ওপারে। ওপারে সেই সবুজ গাছের অরণ্যে সে ঢুকেও পড়ল। উঁচু-নিচু পাহাড়ি পাথরের গায়ে-গায়ে যে গাছ বেড়ে উঠেছে, সে তার ফাঁকে চোখ মেলে উঁকি দিল। দেখে কী, গাছের সঙ্গে দুটি ঘোড়া বাঁধা! সাদা ধবধব করছে গায়ের রং। ছোট্ট। কিন্তু কী তেজিয়ান। তাসানু চুপচাপ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল।
একটুখানি দাঁড়াতে-না-দাঁড়াতেই সে আবার চমকে উঠেছে। আবার সেই ছোট্ট ছেলেদুটির হাসির শব্দ সে শুনতে পেল। সে শব্দ দূর থেকে কাছে এগিয়ে আসছে। উত্তেজনায় দুরুদুরু বুক কাঁপছে তাসানুর। এখন কী করবে সে! ওই তো এসে পড়েছে ছেলেদুটি! তাদের দুজনেরই হাতে রাশরাশ সবুজ ঘাস। তাদের দেখে সে কী আনন্দ দুই ঘোড়ার। ছুটে গেল ছেলে দুটি। আদর করল ঘোড়া দুটিকে। মুখে ঘাস দিল।
একেবারে কাঠের মতো আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে দেখছিল তাসানু। কে ছেলেদুটি? ভেবে পাচ্ছিল না তাসানু। তাসানুর ছেলেটাও যখন ছোটো ছিল, সে-ও ছিল এমনি। হাসিখুশি, ছটফটে। সে-ও এমনি করে গাছের ফাঁকে ফাঁকে ছুটত, খেলা করত। হাসতে হাসতে তার মায়ের কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ত। সে-দৃশ্য যেন এখনও সে দেখতে পায়। সেই দৃশ্যের কথা ভাবতে ভাবতে এখন হঠাৎ এমন আচমকা হেসে ওঠে! এ-কী! তাসানু নিজের মনে পাগলের মতো হেসে ওঠে কেন? এখনই ওরা শুনতে পাবে যে!
শুনতেই পেয়েছিল ছেলেদুটি। হকচকিয়ে গেছে। ভয় পেল নাকি! হয়তো। কেন-না, তারা পেছন ফিরে তাকাল একবার! তারপর ঘোড়ার পিঠে লাফ দিয়ে মারল ছুট।
গাছের আড়াল থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছে তাসানু। ছি:, ছি:, এ-কী করল সে! সে কি চিৎকার করে ওদের ডাক দেবে!
ডাকবে কী, ডাকার আগেই তারা পগাড়পার। তবে কি তারা তাসানুর ভয়ে হারিয়ে গেল! বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে তাসানুর। না, এ হতে পারে না। এই অরণ্যের অন্ধকারে সে তাদের হারিয়ে যেতে দেবে না। কিছুতেই না।
কিন্তু কোথায় পাবে তাদের তাসানু। খুঁজতে-খুঁজতে তো সে নিজেই হারিয়ে যাবে। যাক না। তাসানু তো অনেকদিন আগেই হারিয়ে গেছে। সুতরাং নতুন করে আর কী হারাবে? তাই সে অরণ্যের গভীরে হাঁটতে লাগল।
কতক্ষণ আর পারবে সে হাঁটতে এই শরীরে? পারে না। বসে পড়ে। তারপর কেমন যেন ঝিমুতে লাগল! তবু ভালো, এখানে কাকের ঝামেলা নেই। অবিশ্যি পাখির ডাক সে শুনতে পাচ্ছে। অরণ্যের গাছে-গাছে পাখি। এসব পাখি তো আর কাকের মতো ছ্যাঁচড়া নয়। ওরা নিজের নিয়েই আছে। গান গাইছে, আর নয়তো পাতার ফাঁকে লুকোচুরি খেলছে। কে কোথায় বসে বসে ঝিমুচ্ছে, তা নিয়ে ওদের অত মাথাব্যথা নেই।
কিন্তু তাসানুর মাথাটা কেমন যেন হঠাৎ ঝনঝন করে ওঠে। অরণ্যের ঝরে-পড়া পাতার ওপর যেন খসখস শব্দ শুনতে পায় তাসানু! ভয় পায়। কোনো ভয়ংকর জন্তু নাকি! উঠে দাঁড়াল তাসানু। এমন শক্তি নেই যে, এক্ষুনি একটা গাছের ওপর উঠে পড়ে। ওকে বোধহয় দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই মরতে হবে। কেন-না, মনে হচ্ছে, জন্তুটা তার খুবই কাছে এগিয়ে আসছে। সুতরাং তাসানু একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে রইল।
একটু পরেই তার ভুল ভাঙল। সে দেখতে পেল, জন্তু নয়, একজন মানুষকে। দেখতে তারই মতো অথর্ব। হয়তো বা তার চেয়েও বুড়ো। তারই মতো ঠুকঠুক করে হাঁটছে, পিটপিট করে চাইছে। তারই মতো মুখভর্তি দাড়ি! নোংরা, ছেঁড়া চিরকুট জামা-প্যান্ট।
জন্তুর ভয়টা তাসানুর মন থেকে মুছে গেলেও, লোকটাকে দেখে কেমন যেন সন্দেহ হল। হওয়ারই কথা। এই নির্জন অরণ্যে হঠাৎ এ-সময়ে কেন ঘুরঘুর করছে লোকটা! লোকটাকে দেখে তার সন্দেহ হলেও তেমন ভয় পাবার মতো কিছু মনে হল না। সুতরাং সে গাছের আড়ালে লুকিয়ে না-থেকে তার সামনে এসে দাঁড়াল। এবং এখন তার মনে হল, লোকটার সঙ্গে দুটো কথা বলে দেখা যেতে পারে লোকটার মতলব কী। তাই তাসানু তাকে উদ্দেশ্য করে গলাখাঁকারি দিল। লোকটা থমকে দাঁড়াল।
‘এই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?’ জিজ্ঞেস করল তাসানু।
সে বলল, ‘আমি কোথায় যাই সেটা বলার আগে আমি কি জিজ্ঞেস করতে পারি, তুমিই বা এখানে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে কী কম্ম করছ?’
তাসানু উত্তর দিল, ‘আমি কী করছি, সেটা তোমায় দেখতে হবে না। এখানে আমি যা খুশি করব। এ-বন আমার। এখানে তুমি কার হুকুমে ঢুকেছ? জানো, আমি তোমায় এক্ষুনি গ্রেপ্তার করতে পারি!’
লোকটা তাসানুর কথা শুনে হ্যা-হ্যা করে হেসে উঠে বললে, ‘পাগল।’ বলে, তাসানুর মুখের কাছে আরও খানিকটা এগিয়ে এসে, তার কোমর থেকে ধাঁ করে একটা ছুরি বার করে বললে, ‘আমি কে দেখতে পাচ্ছ? আমি এই জঙ্গলের রাজা। এক্ষুনি তোমাকে ঘ্যাঁচ করে দেব।’
তাসানু থতোমতো খেয়ে গেছে। ছুরিটা দেখে নয়, লোকটার মুখ দেখে। দাড়িগোঁফের ভেতর দিয়ে লোকটার যেটুকু মুখ উঁকি মারছে, তাই দেখে ওর যেন লোকটাকে খুব চেনা-চেনা লাগছে! কোথায় দেখেছি, কোথায় দেখেছি ভাবতে-ভাবতে সে একেবারে লোকটার মুখের কাছাকাছি চলে গেল। মুখের শব্দটাকে জিবের ডগায় সামলে রেখে হঠাৎ ভেবে বসল, লোকটা কি সেই গুড্ডাবাবা।
ঠিক তাই, এই লোকটাই সেই গুড্ডাবাবা। তাসানুর মতো এই লোকটাও সব হারিয়ে, এখন বনের ভেতর লুকিয়ে-ছাপিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে!
কিন্তু আশ্চর্য, গুড্ডাবাবাও তাসানুকে চিনে ফেলেছে। সে আচমকা চিৎকার করে উঠেছে, ‘কালা-জুজু!’ বলেই তাসানুর গলাটা খচ করে খামচে ধরে বললে, ‘ব্যাটা শয়তান, আমার টাকার বস্তা নিয়ে পালিয়ে এসে এখানে লুকিয়ে আছিস? বার কর বস্তা।’
তাসানুও কি কমতি আছে? খ্যাঁচ করে গুড্ডাবাবার পাকা দাড়ির গোছা খামচে ধরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ছাড় ব্যাটা গুড্ডা, আমার গলা ছাড়। নইলে তোর দাড়ি উপড়ে ফেলব!’
কিন্তু কেউ ছাড়ে না। আঃ উঃ করতে-করতে দুজনেই খামচাখামচি লাগিয়ে দিলে। শেষে ফশ করে তাসানু তার হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে মার ছুট। কিন্তু ছুটতে পারলে তবে তো! তার আগেই গুড্ডাবাবা ছুরি উঁচিয়ে তার সামনে হাজির! হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে-হাঁপাতে বলল, ‘এখন আর পালাবি কোথায়? এতদিন তো পালিয়ে বেড়িয়েছিস। এবার বার কর বস্তা। নইলে এই ছুরি দিয়ে তোর কম্ম শেষ করে দেব।’
তাসানু ঢোক গিলতে শুরু করে দিলে। পালাবার ফন্দি খুঁজছে সে। কিন্তু কোথায় পালাবে? অবিশ্যি এই বনে-জঙ্গলে একটা সুবিধে এই, একবার যদি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে পড়তে পারো, তো ব্যস, কেল্লা ফতে! তখন আর খুঁজে বার করতে হচ্ছে না। কিন্তু তেমন কোনো ঝোপঝাড় নজরেই পড়ছে না তাসানুর। অথচ বিপদ ঘনিয়ে আসছে। সুতরাং সে ভাবল, মরতেই যখন হবে, তখন আর ভয় পেয়ে কী লাভ। চোখের পলকে সে গুড্ডার ঘাড়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধাঁই করে ধাক্কা খেতেই গুড্ডার হাত থেকে ছুরিটা গেছে ছিটকে! তারপর লেগে গেল কোস্তাকুস্তি দুজনের মধ্যে। কিন্তু দুই বুড়োই তো বেতোরুগি। দুজনেই বাতের ব্যথায় কাতরায়। তবু চালিয়ে যায়।
শেষে দুজনেই কাত। দুজনেরই হাঁপ ধরে গেল। দুজনেই দু-পাশে চিতপাত হয়ে ফোঁস-ফোঁস করতে লাগল।
হয়তো বয়সটা একটু কম বলে তাসানুই প্রথম হাত-পা ঝেড়ে ওঠবার চেষ্টা করে। কিন্তু উ-হু-হু-হু! ব্যথার চোটে প্রাণ যায়রে বাবা! তবু তাকে উঠতে হবে। অন্তত লোকটার পাল্লা থেকে শটকে পড়তে না-পারলে তার ঘোর বিপদ। তাই শত কষ্ট সহ্য করে সে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতেই তার নজরে পড়ে গেল, গুড্ডাবাবার হাত-ফসকানো সেই ছুরিটা। তুলে নিল। ছুড়ে ফেলে দিল গভীর জঙ্গলে। তারপর সেখান থেকে মার দৌড়!
গুড্ডাবাবাও উঠে পড়েছে। সে-ও তাড়া লাগাল। সে-ও চিৎকার শুরু করে দিল। কিন্তু তাসানুও লুকিয়ে-ছাপিয়ে খুঁজতে লাগল বাঁচার পথ।
একটা পথ সে পেল। বন থেকে পালাবার পথ। সেই পথে সে পা বাড়াল। সেখান থেকে সে জনপদে পড়ল। কিন্তু গুড্ডাবাবার নজর সে এড়াতে পারল না। সে-ও তার পিছু নিয়েছে। তবে কি তাসানু শেষপর্যন্ত ধরা পড়বে লোকটার হাতে?
না। তাসানুর চোখের সমানে একটা পাঁচিল-ঘেরা মস্ত বাগান। বাগানের মধ্যে একটা কী সুন্দর ছবির মতো ছোট্ট বাড়ি! বাঁচতে হলে তাসানুকে এখন এই বাগানেই ঢুকে পড়তে হয়! সে বাগানের ফটক ঠেলে সত্যিই ঢুকে পড়ল। তারপর ঝটপট ফটকটা আবার বন্ধ করে, আগলটা লাগিয়ে দিলে। কে জানে, গুড্ডাবাবা তাকে এই বাগানে ঢুকতে দেখেছে কি না। হয়তো দেখেছে। কিন্তু এখন তো তাসানু বেঁচে গেছে। একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে তাসানু। উঃ, কী ভয়ংকর বিপদের মধ্যেই না পড়েছিল। কিন্তু এখানেই বা সে কতক্ষণ থাকতে পারবে। এখনই তো সে ধরা পড়বে। তাই তাসানু আগুপিছু কিচ্ছু না-ভেবে বাগানের আরও ভেতরে ঢুকে পড়ল। মতলব একটা যদি তেমন ঘুপচিমতো জায়গা পায়, সেখানেই লুকিয়ে পড়বে। অন্তত কিছুক্ষণের জন্যে। তেমনই একটা জায়গা সে খুঁজতে লাগল।
তেমন জায়গা সে দেখতে পেল না। কিন্তু যা দেখতে পেল, তা দেখে থমকে যায় তাসানু। দেখতে পেল, বাগানভর্তি যত ফুল, তত পাখি। যত হরিণ, তত খরগোশ। যতগুলো বলদ দেখে, তার বেশি দেখে ঘোড়া। বাগানের মাঝখানে মস্ত পুকুরটায় যত মাছ, তত হাঁস। অবাক হয়ে দেখতে-দেখতে তাসানু নিজের কথা ভুলেই বসল। সে লোভ সামলাতে পারল না। একটা বলদের গায়ে সে হাত দিল। আহারে! এমন নিরীহ বলদ সে কত মেরেছে!
‘এই, ওখানে কে দাঁড়িয়ে আছো?’ কে যেন আচমকা ধমক মেরে হাঁক পাড়ল। সে বোধহয় বাগানের মালি।
বুকটা ধক করে ওঠে তাসানুর। তাড়াতাড়ি লুকিয়ে পড়ল সে একটা গাছের ফাঁকে। কিন্তু পারল না মালির চোখ এড়াতে। মালি দৌড়ে এসে ধরে ফেলল তাসানুকে। ভয়ে কাকুতিমিনতি করতে লাগল তাসানু, ‘আমায় মেরো না বাবা, আমি চোর নই।’
লোকটা আবার ধমকাল, ‘কেন ঢুকেছ এখানে?’
‘বুঝতে পারিনি বাবা।’
‘চোর কোথাকার, বুঝতে পারিনি!’ মালি তার ঘাড় ধরে মারলে এক হ্যাঁচকা।’
শুনতে পেয়েছিল বাগানের মালিক। বাড়ির দরজা ঠেলে সে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল। ওখান থেকেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘কী হয়েছে মালি?’
‘আজ্ঞে একটা চোর ঢুকেছে।’
‘চোর।’ অবাক হল মালিক। বলল, ‘মেরো না। দাঁড়াও আমি যাচ্ছি।’
তাসানু প্রায় কেঁদে উঠল, ‘আমায় ছেড়ে দাও। আমি চোর নই।’
বাড়ির মালিক তাসানুর সামনে এসে দাঁড়াল। থমকে চাইল। সে যেন হতচকিত। ব্যস্ত হয়ে মালিকে বলল, ‘তোমার হাতটা ওর ঘাড় থেকে সরিয়ে নাও মালি, সরিয়ে নাও।’
মালি হাত সরিয়ে নিল।
মালিক আরও কিছুক্ষণ চোখ সরাল না তাসানুর মুখের ওপর থেকে। দৃষ্টি তার স্থির। তারপর অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তুমি?’
তাসানু আবার বলল, ‘আমি চোর নই বাবা।’
‘কী তোমার নাম?’ ব্যস্ত হয়েই সে জিজ্ঞেস করল।
‘বাবা আমার আদর করে নাম রেখেছিল তাসানু। যেদিন আমি আমার বুড়ো বাপ-মাকে দুঃখ দিয়ে ঘর থেকে পালাই, সেদিন আমার নাম হল, কালা-জুজু।’
‘একসময় তুমি করাত দিয়ে কাঠ কেটে পয়সা উপায় করতে?’
‘হ্যাঁ বাবা।’ অবাক হয়ে উত্তর দিল তাসানু।
‘তুমি বলদের সঙ্গে লড়াই করতে?’
‘তুমি কেমন করে জানলে বাবা?’
‘তুমি ছেলের নাম রেখেছিলে কুহা?’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কুহা,’ ভারি ব্যস্ত হয়ে উঠল তাসানু, ‘তাকে আমি খুঁজছি, কতদিন ধরে খুঁজছি।’
‘আমায় তুমি চিনতে পারছ?’
‘তেমন করে তো চোখে দেখতে পাই না।’
‘আমার কাছে এগিয়ে এসো। ভালো করে দ্যাখো!’
‘কই, চিনতে পারছি না তো!’
‘আর একটু কাছে এসো।’
তাসানু এগিয়ে গেল আরও একটু কাছে। তারপর অপলকে চেয়ে-চেয়ে দেখতে লাগল। দেখতে-দেখতে হঠাৎ যেন তার ঠোঁটদুটি থরথর করে কেঁপে উঠল। উত্তেজনায় বুকটা তার ধড়ফড় করতে লাগল। সে হাঁপাতে লাগল। তারপর আচমকা চিৎকার করে তাকে জড়িয়ে ধরল, ‘আমার কুহা, আমার কুহা!’ তারপর হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল।
সেই বাগানের মালিক, সেই ফুল আর পাখির মালিক, সেই বলদ আর ঘোড়ার মালিক, সেই হাঁস আর হরিণের মালিক কুহা, তার চোখেও নি:শব্দে অশ্রু ঝরে যায়। কুহা ভালোবেসেছে পৃথিবীর সব প্রাণীকে। আর এতদিন তার বাবার বুকের মধ্যে যে-ভালোবাসা জমাট বেঁধেছিল, সেই ভালোবাসা আজ ভেঙে-ভেঙে ঝরে পড়ছে তারই বুকে। বাবা আর ছেলে দুজনেই কাঁদে। কাঁদে না শুধু পাখিরা, কিংবা হরিণ অথবা বলদ। হাঁস কিংবা খরগোশ। কারণ তারা জানে ওই বাবা আর ছেলের মতো এ-পৃথিবীটা তাদেরও।
এমনই সময় দুটি ছেলে ছুটে গেল বাগানের ভেতর দিয়ে খলখল করে হাসতে-হাসতে। তাসানু চমকে তাকায়। চিনতে পারে। এই তো সেই ছেলে দুটি। ঘোড়ায় চড়ে অরণ্যে ছুটে পালাল! তাসানু নিজের চোখের অশ্রু মুছে ফেলে, দেখতে দেখতে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল, ‘কে ওরা?’
‘আমার ছেলে,’ উত্তর দিল কুহা।
চিৎকার করে হেসে উঠল তাসানু। হাসতে হাসতে ছেলের বুকে মাথা রাখল। তাকিয়ে রইল ওইদিকে, ওই নতুন দুটি মানুষের দিকে। আর মনে মনে ভাবতে লাগল, ‘আহা! পৃথিবীটা আমাদের সকলের বলেই বুঝি এত সুন্দর।’ তারপর স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে ছেলেকে জড়িয়ে ধরল। কুহার ছেলেদুটিও তখনও হাসছে। শোনা যাচ্ছে সেই হাসির শব্দ। যেন বাতাসের মতো ফুরফুরে সেই হাসির কলতান। ভেসে যাচ্ছে দূরে, অনেক দূরে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন