৭৫. মুক্তিযুদ্ধ নারীকে কী দিয়েছে

তসলিমা নাসরিন

মুক্তিযুদ্ধ নারীকে কী দিয়েছে

আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম। গা হাত পা ঢিলে করে ঘুমের মত পড়ে ছিলাম বিছানায়। একটি টর্চের আলো আমার মুখের ওপর পড়ল প্রথম, আলো ও মুখের ওপর রেখেই ওরা নিজেদের মধ্যে কথা বলল—কী কথা বলল আমি বুঝতে পারিনি, ওদের ভাষা ছিল উর্দু।

আমি তখন জানি না ওরা বাড়ির সদর দরজার কাছে একটি নারকেল গাছের সঙ্গে আমার বাবাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে রেখেছে। আমি তখনও জানি না আমার মা বাড়ির উঠোন পেরিয়ে চলে গেছেন অন্য আশ্রয়ে। ওরা এসেছে এই দুঃসংবাদ আমার কাছে আগে পৌঁছেনি। আমি কেবল বারান্দা ধরে হেঁটে আসা চার জোড়া বুটের শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম এবং ভিন্ন ভাষার কথোপকথন আমাকে—যদিও আমার বয়স অল্প, এইটুকু বুঝিয়ে দিল—ভীষণ এক দুর্ঘটনা ঘটছে আজ। আজ আমাদের বড় দুঃসময়। আমার বয়স অল্প বলেই আমাকে উঠোনের অন্ধকার পেরিয়ে পাড়া-পড়শির ঘরে উঠতে হয়নি। অচেতন পড়ে থাকতে হয়েছে দক্ষিণের ঘরের একটি পুরনো পালঙ্কে। বুটের শব্দ এক সময় আমার ঘরে এসে থামল। পাশে আমার ছোট বোন ঘুমোচ্ছিল। শব্দগুলো ঘরের মধ্যে পুরো চক্কর দিয়ে আমার শিয়রের কাছে এল। আমি সেই প্রথম অভিনয় করলাম ঘুমের, যেন ঘুমিয়ে আছি, আমি কিছু শুনছি না, আমি কিছু দেখছি না, আপনারা যা ইচ্ছে তাই করুন, ঘুমের মানুষকে জাগাবেন না। ওরা আমার মুখে টর্চ ফেলল, আলো পড়লে চোখ কেঁপে ওঠে, আমার কেপেছিল কি না জানি না।

ওরা আলোর নিচে কী দেখছিল—আমার বয়স? বয়স পছন্দ হয়নি বলে ওরা ঘুরিয়ে নিল আলো, পাশের বিছানায় ছিল রেহেলে রাখা খোলা কোরান শরীফ, কোরান শরীফের ওপর মা’র হাতের দুটো অনন্ত বালা। ওরা মা’র অনন্ত বালা নিল, ঘরের আলমারি খুলে আমাদের সোনা রুপা যা পেল, নিল। ওরা কথা বলছিল, হাসছিল, আমার মাঝে মধ্যে মনে হয় ওরা আমার বয়সের জন্য নিশ্চয় দুঃখ করছিল। বয়স কেন আমার আরও খানিকটা বেশি হল না!

আমি স্থবির পড়ে ছিলাম বিছানায়। ওদের ক্রুর হাসি, ওদের বিদঘুটে ভাষা, ওদের ভয়ঙ্কর বুট আমাকে আশ্চর্য স্থবিরতা দিয়েছিল, আমি এখনও শীতল এক সাপ দেখি আমার শরীর বেয়ে উঠছে। আমার যদি আরও খানিকটা বয়স বেশি হত ! ওই একটি অন্ধকার ঘরে, ওই একটি ভয়ার্ত শ্বাস স্তব্ধ করা রাতে আমার যদি বয়স হত পনেরো ষোল সতেরো আঠারো উনিশ ।

ওরকম বয়স ছিল না-কি কারও? ছিল। ওরকম বয়সের কারও বাড়িতে মধ্যরাতে অতর্কিতে আক্রমণ কি হয়নি? তা-ও হয়েছে। তুলে নিয়ে গেছে ওরা অগণন তরুণীকে। ওদের বিকৃত লালসার শিকার আমার খালা, আমার পড়শি বোন, আমার চেনা, অল্পচেনা, অচেনা আত্মীয় অনাত্মীয়। এ কথা নতুন নয়। সকলেই জানে। জানে একাত্তরে এদেশের নারীর উপর পাকিস্তানি বর্বর সৈন্যদের অবাধ ধর্ষণের খবর। জানে, কেবল জানেই, আর কিছু নয়।

এত বড় একটি যুদ্ধ ঘটে গেল দেশে। এত হত্যা, গণহত্যা, এত লুঠ, ধর্ষণ ঘটল—তবু ধর্ষণের সংজ্ঞা বদলাল না। একটি ধ্বংসস্তুপের ওপর দাঁড়িয়ে মানুষ যখন নিঃস্ব, পঙ্গু, সর্বস্বাস্ত, স্বজন হারানোর বেদনায় নীল—সেই মানুষই তখন ধর্ষিতার দিকে পুরনো চোখে তাকাল, পুরনো আঙুলই তুলল। হায়, মুখ বাঙালি! হায় দুর্ভাগা, দুশ্চরিত্র, দুর্গত বাঙালি!

যে দেশে এমন এক মুক্তিযুদ্ধ ঘটে, যে মুক্তিযুদ্ধে এমন অবাধ নরহত্যা হয়, অবাধ নারী-ধর্ষণ হয়—সে দেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা কেন নতুন কিছু হয় না? সে দেশে ধর্ষণ কেন বুট ও বেয়নেটের অত্যাচারের মত এক ধরনের অত্যাচার বলে বিবেচিত হয় না? কেন ধর্ষিতাদের জন্য সামাজিক স্বীকৃতির অভাব হয়? কেন ধর্ষণ গ্রহণীয় হয় না আর দশটা অত্যাচার যেমন সমাজে গ্রহণীয়?

মুক্তিযুদ্ধ যদি আমাদের নতুন একটি বোধের জন্ম না দিতে পারে, তবে কী পেরেছে দিতে—যা নিয়ে আমরা বিজয় দিবসের উৎসব করি, স্বাধীনতা দিবসের আনন্দে আলোকসজ্জায় মেতে উঠি, চেতনার ভেতরে গাঢ় এক অন্ধকার রেখে এই আলোকসজ্জা আমাদের সামান্যও কি আলোকিত করে?

একটি যুদ্ধই পারে যুদ্ধের সকল ক্ষতি মেনে নেবার সাহস ও শক্তি জোগাতে। একটি যুদ্ধই পারে যুদ্ধের সকল ভাঙন জয় করে জয়ের পতাকা ওড়াতে। আমরা পতাকা উড়িয়েছি ঠিকই, আমরা দেশ থেকে উটকে বর্বরদের দূর করেছি ঠিকই কিন্তু সমাজের নষ্ট ও নোংরা সংস্কার দূর করতে পারিনি—যে সংস্কার একাত্তরের কোনও অত্যাচারিত তরুণীকে ক্ষমা করেনি এবং দীর্ঘ কুড়ি বছর পর এখনও তাদের ক্ষমা করবার ক্ষমতা অর্জন করেনি।

আবার একটি মুক্তিযুদ্ধের অপেক্ষা করতে হবে—আবার অপেক্ষা করতে হবে দেশজোড়া তুমুল তাণ্ডবের–আবার আমাদের অপেক্ষা করতে হবে অগণন মৃত্যুর। আর কত মৃত্যু, কত ভাঙন, কত ধর্ষণ এদেশে ঘটলে ধর্ষিতারা মুখ তুলে দাঁড়াতে পারবে সমাজের কাঠগড়ায় এবং ঘৃণায় উচ্চারণ করতে পারবে অসভ্য পুরুষের নাম! এক যুদ্ধে আমরা মন ও মানসিকতার উত্তরণ ঘটাতে পারিনি, এক যুদ্ধে আমরা অর্জন করতে পারিনি সত্য ও সুন্দরের পক্ষে যাবার সামান্যও দুঃসাহস। আর কত যুদ্ধের দরকার এদেশে? আর কত মৃত্যুর?

বছর ঘুরে এদেশে বিজয়ের উৎসব হয়। আনন্দে নেচে ওঠে পুরো দেশ, দুঃসহ দুঃশাসনে ক্লিষ্ট তৃতীয় বিশ্বের এক হতভাগ্য দেশ। ডিসেম্বরের ষোল তারিখের প্রতিটি শীতার্ত সকালে খোলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি নগরীর উৎসব দেখি আর আমার সারা শরীরে হেঁটে যায় শীতল একটি সাপ। চোখ বুজলেই টের পাই শরীরে টর্চের আলো। ওরা আমার বয়স মাপছে। নগরীর এই অশ্লীল উৎসবের প্রতি ঘৃণায় আমার দুচোখ ফেটে কান্না নামে। কে আছে আমার এবং আমার মত অগণন নারীর কান্না থামায়? আছে কোনও আইন এবং সংস্কার এদেশে? মুক্তিযুদ্ধ অনেককে অনেক কিছু দিয়েছে, নারীকে দিয়েছে কী?

সকল অধ্যায়
১.
০১. আমার যে অপরাধের জন্য আমি এতসব অত্যাচারের আশঙ্কা করছি, তা হচ্ছে, আমি ‘মেয়েমানুষ’
২.
৭৩. রুদ্র’র জন্য ভালোবাসা
৩.
০২. নারীর সমার্থক শব্দ হিসেবে ‘মানুষ’ লেখা নেই
৪.
০৩. পুরুষ ছাড়া মেয়েরা একজনও যা সাতজনও তা
৫.
০৪. চরিত্র সচেতন বুদ্ধিজীবি
৬.
০৫. সমাজের চোখে ভালো মেয়ের সংজ্ঞা
৭.
০৬. মেয়েদের ত্রুটি-বিচ্যুতি
৮.
০৭. নারী নিচ, নারী অধম, নারী মানুষ না
৯.
০৮. বিয়ের বয়স
১০.
১০. নিজ সংসারেও মেয়েদের অভিনয় করতে হয়
১১.
১১. প্রোসটেটনামা
১২.
১২. হাদিসের বাণী : স্ত্রীকে মারপিট কর
১৩.
১৩. নারীর শরীর
১৪.
৭৬. নীতিকথার কাহিনী লেখা সহজ
১৫.
১৪. ভয়ঙ্কর ধর্ষণ-খেলা ‘তাহারুশ’
১৬.
১৫. পর্দা প্রথায় ধর্ষণ রোধ হয়না
১৭.
১৬. বিয়ে : মেধার অপচয় এবং প্রতিভার পতন
১৮.
১৭. সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না
১৯.
১৮. পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির আছে ধর্ম এবং আইন
২০.
১৯. হুদুদ-কিয়াস সমাচার
২১.
২০. একা হলেও মেয়েরা অশ্বত্থের মত বেঁচে উঠতে পারে
২২.
২১. মেয়েদেরকে পাথর সরিয়ে-সরিয়ে হাঁটতে হয়
২৩.
০৯. আদিলা বকুলের ভালবাসা
২৪.
২২. আমার বন্ধু হাবিবুল্লাহ
২৫.
২৩. আজ না হোক, দুদিন পর
২৬.
২৪. মেয়েদের পরিচয়
২৭.
২৫. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত
২৮.
২৬. রামায়ন-মহাভারত
২৯.
২৭. মহাভারতে নারীর অবনমনের চিত্র
৩০.
২৮. মেয়েদের ‘বড়’ হওয়া
৩১.
২৯. নারী এবং খাদ্য-বস্তু
৩২.
৩০. মেয়েদের ‘চরিত্র’
৩৩.
৩১. ‘মেয়েটির চরিত্র ভাল নয়’
৩৪.
৩২. ওড়না
৩৫.
৩৩. সাতটি পয়েণ্ট
৩৬.
৩৪. শুধু নারীর জন্য কিছু শব্দ
৩৭.
৩৫. সংসার
৩৮.
৩৭. আসলেই কি নারীরাই নারীদের শত্রু
৩৯.
৩৮. বিবাহিত মেয়েরা যেমন হয়
৪০.
৩৯. নারীর শ্লীলতা
৪১.
৪০. চুড়ি আর সস্তার জিনিস
৪২.
৪১. নারীর শরীরই তার সবচেয়ে বড় বেড়ি
৪৩.
৪২. পৌরুষিক অত্যাচার
৪৪.
৪৩. উচ্চবিত্ত মিসেসদের জীবনযাপন
৪৫.
৪৪. ভিন্ন এক সমাজে নারীরা
৪৬.
৪৫. মিস্টার বনাম মিস এবং মিসেস
৪৭.
৪৬. বন্ধ্যা, ওর বাচ্চা হয় না
৪৮.
৪৭. কাটা দিয়েই আজকাল কাটা তুলতে হয়
৪৯.
৪৮. একটি গন্তব্যের দিকে
৫০.
৪৯. নারী সম্পূর্ণ মানুষ হোক
৫১.
৫০. কেবল একবার রুখে দাঁড়ালেই হয়
৫২.
৫১. ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ
৫৩.
৫২. পূর্বাভাস
৫৪.
৫৩. সূর্যদীঘল বাড়ির জয়গুন
৫৫.
৫৪. পক্ষপাত সকল সময় মঙ্গলময় নয়
৫৬.
৫৫. নারী দায়মুক্ত হোক
৫৭.
৫৬. নারী যখন রাজনৈতিক ক্ষমতায়
৫৮.
৫৭. যত যে রাণী হোক, সে তো নারীই
৫৯.
৫৮. শব্দের অপচয়
৬০.
৫৯. ভাগ্যবানের বউ মরে, আর অভাগার গরু মরে
৬১.
৬০. মকছুদোল মোমেনীন বা বেহেশতের কুঞ্জী
৬২.
৩৬. সাধারণ গৃহস্থ ঘরের দৈনন্দিন চিত্র
৬৩.
৬১. শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া
৬৪.
৬২. দর্জির স্পর্শ
৬৫.
৬৩. ময়মনসিংহ আমার গোপন ভালবাসার নাম
৬৬.
৬৪. সমরেশ বসুর প্রজাপতি
৬৭.
৬৫. নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু দ্বিধা এবং ভয়
৬৮.
৬৬. অবাধ যৌনতাকেই ওরা স্বাধীনতা বলে ভাবছে
৬৯.
৬৭. ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলা নেতৃত্ব
৭০.
৬৮. স্মৃতিতে লেনিন
৭১.
৬৯. ধর্মের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে না এলে নারীর মুক্তি অসম্ভব
৭২.
৭০. বহুবিবাহ
৭৩.
৭১. অনৈসলামিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি
৭৪.
৭২. ফুলের মত পবিত্র
৭৫.
৭৪. দাসী ছহবত
৭৬.
৭৫. মুক্তিযুদ্ধ নারীকে কী দিয়েছে
৭৭.
৭৭. কুমারীর ব্রত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%