৫১. ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ

তসলিমা নাসরিন

ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ

তসলিমা নাসরিন মরে গিয়েছিল। হ্যাঁ, মরেই গিয়েছিল সে। এখন বেঁচে উঠেছে। এখন সে ফুসফুস পূর্ণ করে নিতে পারছে নির্মল বাতাস। এখন সে ঘ্ৰাণ নিতে পারছে সবুজের, এখন সে ভিজতে পারছে রোদে, জলে, পূর্ণিমায়। সে দেখেছে মৃত্যু কত ভয়ঙ্কর, কত কুৎসিত। সে দেখেছে মৃত্যু কত বীভৎস, কত কদাকার। যে মানুষ একবার মরণ থেকে উঠে আসে, সে জানে বেঁচে থাকা কী সুন্দর, বেঁচে থাকা কী ভীষণ আনন্দের।

আমি বেঁচে আছি। ফুটপাতে টায়ার জ্বালিয়ে ভাত ফুটোয় যে অর্ধনগ্ন নারী, তাকেও বলি বেঁচে থেক। মুখে ক্ষো পাউডার মেখে পার্কের বেঞ্চে বসে থাকা উৎসুক রমণীকে বলি বেঁচে থেক। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের অলস্কৃত দুঃখিতাকে বলি বেঁচে থেক। মধ্যরাতে ঘরে ফেরা পাড় মাতালের অনঙ্গ বধূকে বলি বেঁচে থেক। বেঁচে থাক নারী, নারী তুমি বেঁচে ওঠ। প্রচণ্ড বেঁচে ওঠ ।

ওদের কথা ভেব না। ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ। ওরা তোমার বিকেলের চায়ে গোপনে বিষ মিশিয়ে দেবে। ওরা কৃষ্ণপক্ষ রাতে তোমার গলায় দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে দেবে আমগাছের ডালে, ঘরের সিলিং ফ্যানে, কড়ি বরগা কাঠে, ওরা পাল বেঁধে তোমাকে ধর্ষণ করবে উপযুপরি, ওরা কাচপুর ব্রিজের কাছে তোমার বুকে ছুরি বসাবে, ওরা ধাবমান ট্রেনের নিচে তোমাকে ধাক্কা দেবে, ওরা তোমার কণ্ঠদেশ চিরে দেবে ধারালো রেডে, ওরা তোমার সারা গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বেলে দেবে। ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ।

ওরা জেরুজালেমে, হিমালয়ে, হেরা পর্বতে বসে ধর্ম রচনা করেছে। এই ধর্মকে ওরা পবিত্র ঘোষণা করেছে। এই পবিত্রতার দোহাই দিয়ে ওরা তোমাকে পাকে ফেলছে। ওরা তোমাকে পায়ের নিচে স্থান দিচ্ছে, ওরা তোমাকে রন্ধনশালায় পাঠাচ্ছে, ওরা তোমাকে সাজসজ্জা করাচ্ছে, ওরা তোমাকে শয্যায় ওঠাচ্ছে, শয্যা থেকে যখন ইচ্ছে নামাচ্ছে। ওরা তোমাকে আবৃত করছে, প্রয়োজনে অনাবৃত করছে। ওরা তোমাকে পদাঘাত করছে, পরিহার করছে। ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ।

নারী তুমি বেঁচে ওঠ। নিঃশ্বাসে নাও অমল হওয়া। এই আকাশ তোমার, আকাশের সব নক্ষত্র তোমার। এই ঝাউপাতা তোমার, এই নদী, কাশবন, অরণ্য তোমার, এই মেঘপুঞ্জ, এই জল-হাওয়া তোমার। এই মাটি, এই ঘাস, ঘাসফুল, পাখি, এই সমুদ্র তোমার। ওরা তোমার কেউ নয়, ওরা পুরুষ। ওরা তোমাকে গ্রাস করবে, ওরা তোমাকে শত টুকরোয় ছিড়বে। ওরা তোমাকে পিষে পিষে নিশ্চিহ্ন করবে। করবে, কারণ ওরা মানুষ নয়, পুরুষ।

যে তুমি মুখ থুবড়ে পড়ে আছ নারী, তোমার সারা শরীরে পুরুষের কামড়, তোমাকে শুকতে এসে একটি কুকুরও বেদনায় নীল হবে, তোমাকে দেখতে এসে কাক শকুনও লুকিয়ে রাখবে নখর, সেই তোমাকেই যদি কেউ পুনরায় কামড় বসায় সে কোনও শূকর নয়, সে কোনও কালকেউটে নয়, সে পুরুষ। তুমি উঠে দাঁড়াও নারী। মেরুদণ্ড সোজা করে একবার দাঁড়াও। তুমি হাঁটো। এই পথ তোমার। এই মাঠ তোমার। এই শস্যখেত তোমার, আলপথ তোমার। দিগন্ত অদি যতদূর দেখ তুমি, সব তোমার।

আমি মৃত্যু দেখেছি। আমি আগুন দেখেছি। সাপের ছোবল দেখেছি। আমি অন্ধকার দেখেছি। খাদ দেখেছি, ফাঁদ দেখেছি। আমি দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছি ক্রমশ সমৃদ্ধ জীবনের দিকে। আমি দেখতে দেখতে পার হচ্ছি রেলসেতু, পার হচ্ছি কাচপুর ব্রিজ, আমতলা, পার হচ্ছি ঘোর অন্ধকার। আমি নারী বলে আজ আমার অহঙ্কার হয়। আমি নারী বলে আমার রক্তের প্রতি কণাকে আমি শুদ্ধ বলে ভাবি, নারী বলে শরীরের প্রতি লোমকূপকে পবিত্র বলে ভাবি, নারী বলে আমার স্নায়ুতন্ত্রকে সৎ ও সরল বলে ভাবি।

তুমি যদি নারী হও, তুমি এইভাবে মৃত্যুকে অতিক্রম করে বেঁচে ওঠ। ওরা তোমাকে সতীত্ব শেখাবে, ওরা তোমাকে চিতায় ওঠাবে, ওরা তোমাকে নারীত্ব বোঝাবে, ওরা তোমাকে মাতৃত্বের মাহাত্ম্য বর্ণনা করবে। এইসব ভুল শিক্ষা, এইসব পাপ, এইসব পাতা ফাঁদে একবার পা দিলেই ওরা তোমাকে চুমু খাবে, ওরা তোমাকে পাজাকোলা করে ধী ধা নৃত্য করবে, ওরা তোমাকে চার দেয়াল দেবে, সোনার শেকল দেবে, ওরা তোমাকে পোষা টিয়ার খাচায় যেমন আহার দেওয়া হয়, তেমন আহার দেবে। তুমি যদি মানুষ হও শেকল ছিড়ে একবার দাঁড়াও। দুহাতে শেকল ছেড়, এই হাত তোমার। দুপায়ে দৌড়ে যাও, এই পা তোমার। দু’চোখে জীবন দেখ, এই চোখ তোমার। তুমি ঠা ঠা করে হাস, তোমার ঠোঁট, চোখ, গ্রীবা তোমার। তুমি আদ্যন্ত তোমার। তুমি আমূল তোমার।

ওই দেখ, ওরা তোমাকে খুবলে খেতে আসছে, ওরা তোমাকে চাখতে আসছে, ছিড়তে আসছে, ওরা মৃত্যুর আরেক নাম। ওরা বীভৎসতার আরেক নাম, ওরা তোমাকে পান করতে আসছে, লেহন করতে আসছে, ওরা তোমাকে দলিত করতে আসছে। ওরা পুরুষ। ওরা মানুষ নয়।

নারী তুমি সতর্ক হও । তোমার দিকে ধেয়ে আসা পুরুষেরা মূলত আসে অবাধ কাম ও অনিয়ন্ত্রিত ক্রোধের কারণে, কর্তৃত্বের ক্রোধ।

এই জগৎ তোমার নারী, এই জগতে তুমি যেমন ইচ্ছে বাঁচ। এই জগৎ যদি একটা নদী হয়, তুমি নদী জুড়ে সাতার কাটো। এই জগৎ যদি একটা আকাশ হয়, তুমি আকাশ জুড়ে ওড়। জীবন যদি তোমার হয়, যা আসলেই তোমার, তবে সেই জীবন তুমি যেমন ইচ্ছে যাপন কর। তোমার কর্তৃত্ব তুমি নাও নারী।

আমি মৃত্যু দেখেছি। আমি পাপ দেখেছি, পঙ্ক দেখেছি। আর যেন কোনও নারীকে এত কাটাতার পেরোতে না হয়, শত ছিন্ন হতে না হয়। আর যেন কোনও নারীকে কেবল গন্তব্যে পৌছোবার জন্য পেরোতে না হয় এমন দুর্গম অরণ্য। আর যেন কোনও নারীকে বুনো মোষ এমন না তাড়ায়, আর যেন পুরুষের গুহা থেকে রক্তাক্ত বেরোতে না হয় কোনও নারীকে।

পুষ্টিহীনতায় ভুগছে যে নারী, তাকে বলি বেঁচে থেক। রক্তশূন্যতায় ভুগছে যে নারী, তাকে বলি বেঁচে থেক। যে নারী বন্ধ্যাতে ভুগছে, প্রসব কষ্টে ভুগছে, তাকে বলি বেঁচে থেক। খুব ভোরে দল বেঁধে হেঁটে যাওয়া বস্ত্র বালিকাদের বলি বেঁচে থেক, ঘুটে কুড়োনো কিশোরীকে বলি বেঁচে থেকু, বেঁচে ওঠ নারী। চমৎকার বেঁচে ওঠ।

এই আমি সকল দুঃখ ঝেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছি। এই আমি কোনও অশ্লীলতা ও অসুস্থতার সঙ্গে আপস করিনি। নারী তুমি হাত ধর সুন্দরের, নারী তুমি হাত ধর স্বপ্নের।

সকল অধ্যায়
১.
০১. আমার যে অপরাধের জন্য আমি এতসব অত্যাচারের আশঙ্কা করছি, তা হচ্ছে, আমি ‘মেয়েমানুষ’
২.
৭৩. রুদ্র’র জন্য ভালোবাসা
৩.
০২. নারীর সমার্থক শব্দ হিসেবে ‘মানুষ’ লেখা নেই
৪.
০৩. পুরুষ ছাড়া মেয়েরা একজনও যা সাতজনও তা
৫.
০৪. চরিত্র সচেতন বুদ্ধিজীবি
৬.
০৫. সমাজের চোখে ভালো মেয়ের সংজ্ঞা
৭.
০৬. মেয়েদের ত্রুটি-বিচ্যুতি
৮.
০৭. নারী নিচ, নারী অধম, নারী মানুষ না
৯.
০৮. বিয়ের বয়স
১০.
১০. নিজ সংসারেও মেয়েদের অভিনয় করতে হয়
১১.
১১. প্রোসটেটনামা
১২.
১২. হাদিসের বাণী : স্ত্রীকে মারপিট কর
১৩.
১৩. নারীর শরীর
১৪.
৭৬. নীতিকথার কাহিনী লেখা সহজ
১৫.
১৪. ভয়ঙ্কর ধর্ষণ-খেলা ‘তাহারুশ’
১৬.
১৫. পর্দা প্রথায় ধর্ষণ রোধ হয়না
১৭.
১৬. বিয়ে : মেধার অপচয় এবং প্রতিভার পতন
১৮.
১৭. সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না
১৯.
১৮. পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির আছে ধর্ম এবং আইন
২০.
১৯. হুদুদ-কিয়াস সমাচার
২১.
২০. একা হলেও মেয়েরা অশ্বত্থের মত বেঁচে উঠতে পারে
২২.
২১. মেয়েদেরকে পাথর সরিয়ে-সরিয়ে হাঁটতে হয়
২৩.
০৯. আদিলা বকুলের ভালবাসা
২৪.
২২. আমার বন্ধু হাবিবুল্লাহ
২৫.
২৩. আজ না হোক, দুদিন পর
২৬.
২৪. মেয়েদের পরিচয়
২৭.
২৫. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত
২৮.
২৬. রামায়ন-মহাভারত
২৯.
২৭. মহাভারতে নারীর অবনমনের চিত্র
৩০.
২৮. মেয়েদের ‘বড়’ হওয়া
৩১.
২৯. নারী এবং খাদ্য-বস্তু
৩২.
৩০. মেয়েদের ‘চরিত্র’
৩৩.
৩১. ‘মেয়েটির চরিত্র ভাল নয়’
৩৪.
৩২. ওড়না
৩৫.
৩৩. সাতটি পয়েণ্ট
৩৬.
৩৪. শুধু নারীর জন্য কিছু শব্দ
৩৭.
৩৫. সংসার
৩৮.
৩৭. আসলেই কি নারীরাই নারীদের শত্রু
৩৯.
৩৮. বিবাহিত মেয়েরা যেমন হয়
৪০.
৩৯. নারীর শ্লীলতা
৪১.
৪০. চুড়ি আর সস্তার জিনিস
৪২.
৪১. নারীর শরীরই তার সবচেয়ে বড় বেড়ি
৪৩.
৪২. পৌরুষিক অত্যাচার
৪৪.
৪৩. উচ্চবিত্ত মিসেসদের জীবনযাপন
৪৫.
৪৪. ভিন্ন এক সমাজে নারীরা
৪৬.
৪৫. মিস্টার বনাম মিস এবং মিসেস
৪৭.
৪৬. বন্ধ্যা, ওর বাচ্চা হয় না
৪৮.
৪৭. কাটা দিয়েই আজকাল কাটা তুলতে হয়
৪৯.
৪৮. একটি গন্তব্যের দিকে
৫০.
৪৯. নারী সম্পূর্ণ মানুষ হোক
৫১.
৫০. কেবল একবার রুখে দাঁড়ালেই হয়
৫২.
৫১. ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ
৫৩.
৫২. পূর্বাভাস
৫৪.
৫৩. সূর্যদীঘল বাড়ির জয়গুন
৫৫.
৫৪. পক্ষপাত সকল সময় মঙ্গলময় নয়
৫৬.
৫৫. নারী দায়মুক্ত হোক
৫৭.
৫৬. নারী যখন রাজনৈতিক ক্ষমতায়
৫৮.
৫৭. যত যে রাণী হোক, সে তো নারীই
৫৯.
৫৮. শব্দের অপচয়
৬০.
৫৯. ভাগ্যবানের বউ মরে, আর অভাগার গরু মরে
৬১.
৬০. মকছুদোল মোমেনীন বা বেহেশতের কুঞ্জী
৬২.
৩৬. সাধারণ গৃহস্থ ঘরের দৈনন্দিন চিত্র
৬৩.
৬১. শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া
৬৪.
৬২. দর্জির স্পর্শ
৬৫.
৬৩. ময়মনসিংহ আমার গোপন ভালবাসার নাম
৬৬.
৬৪. সমরেশ বসুর প্রজাপতি
৬৭.
৬৫. নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু দ্বিধা এবং ভয়
৬৮.
৬৬. অবাধ যৌনতাকেই ওরা স্বাধীনতা বলে ভাবছে
৬৯.
৬৭. ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলা নেতৃত্ব
৭০.
৬৮. স্মৃতিতে লেনিন
৭১.
৬৯. ধর্মের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে না এলে নারীর মুক্তি অসম্ভব
৭২.
৭০. বহুবিবাহ
৭৩.
৭১. অনৈসলামিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি
৭৪.
৭২. ফুলের মত পবিত্র
৭৫.
৭৪. দাসী ছহবত
৭৬.
৭৫. মুক্তিযুদ্ধ নারীকে কী দিয়েছে
৭৭.
৭৭. কুমারীর ব্রত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%