৫৫. নারী দায়মুক্ত হোক

তসলিমা নাসরিন

নারী দায়মুক্ত হোক

আমি একবার এক লোকের কাছ টাকা ধার করেছিলাম। টাকা ধার করবার অভ্যেস আমার একেবারেই নেই। এরকম দিন গেছে দুবেলা না খেয়ে কাটিয়েছি, দারিদ্র্যের একেবারে তল অবধি পৌঁছেও নিজেকে আমি অনড় রেখেছি—এ আমার এক ধরনের অহঙ্কার। তবু নিতান্ত বাধ্য হয়ে একবার আমি টাকা ধার করেছিলাম। লোকটি আমাকে বোন বলে ডাকতেন। সম্পর্কটি, আমি মনে করি যথাসম্ভব মার্জিত ও নির্বিঘ্ন।

শর্ত ছিল সাতদিন পর টাকা ক’টি আমি ফেরত দেব। অথচ আশ্চর্য সেই লোকটি পরদিনই আমাকে ফোন করলেন। ফোন কিন্তু টাকার জন্য করেননি। জিজ্ঞেস করলাম টাকা কি আপনার আজই দরকার? আমার পক্ষে আজ দেওয়া কিন্তু সম্ভব নয়। আমি যে তারিখের কথা বলেছি, অবশ্যই সেই তারিখে দেব। এর পরদিন লোকটি আমার অফিসে এলেন। অফিসে তাকে দেখে আমি অবাক হলাম। বললাম টাকা কিন্তু ওই তারিখের আগে আমি দিতে পারছি না ভাই। লোকটি হেসে বললেন–না, না তাতে কোনও অসুবিধে নেই। এরও পরদিন লোকটি আমার বাড়ি এলেন। জিজ্ঞেস করলাম কী ব্যাপার। লোকটি হাসলেন–না তিনি টাকার জন্যে আসেননি। এই পথ দিয়েই যাচ্ছিলেন, তো ভাবলেন যে দেখে যাই। এই দেখে যাওয়ার ব্যাপারটি পরদিনও ঘটল এবং এর পরদিনও ।

এদিকে সাতদিনের আগে টাকা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এবং লোকটির এই যাতায়াতও আমার পক্ষে ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠল। আমি একটি ব্যাপার তখন স্পষ্ট করে বুঝলাম—দায়বদ্ধতা আমার কণ্ঠস্বরকে এত স্নান করে রেখেছে যে লোকটিকে আমি ইচ্ছে করলেও ঘর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা স্পষ্ট করে বলতে পারছি না। দায়বদ্ধতা আমার মেরুদণ্ডকে এত দুর্বল করে রেখেছে যে আমি ইচ্ছে করলেই ঘাড় শক্ত করে দাঁড়াতে পারছি না। এই সাতদিন, যে সাতদিন আমি টাকা ক’টি লোকটিকে ফেরত দিতে না পেরেছি—ঘরে বাইরে এক অসুস্থ আবহাওয়ায় আমাকে নিঃশ্বাস নিতে হয়েছে, অনিচ্ছার সঙ্গে আমাকে আপস করতে হয়েছে। লোকটি ঘন ঘন আমার বাড়ি এসেছেন। না, টাকা নিতে নয়, লোকটি অযথাই এসেছেন। এসেছেন, চা খেয়েছেন, দু-চারটে সাদাসিধে কথা বলে চলেও গিয়েছেন। লোকটি সম্ভবত এরকমই চেয়েছিলেন যে এই দায় থেকে যেন আমি সহসা মুক্ত না হই এবং কখনোই যদি এই মুক্তিটি আমার না ঘটত আমি এখন স্পষ্ট বুঝি যে লোকটি তাতে মোটেও অসন্তুষ্ট হতেন না।

যে কোনও দায় মানুষকে শেষ অবধি কতদূর নিয়ে যায় বা যেতে পারে সে আমি কেবল অনুভব করতে পারি। কিছু টাকার জন্যে আমি দায়বদ্ধ ছিলাম, তাও মাত্র সাতদিন। এই সাতদিনে আমি হাড়েমজ্জায় টের পেয়েছি দায় জিনিসটি কী মারাত্মক পরিণতির দিকে মানুষকে ক্রমশ এগিয়ে নেয়। আর যারা জীবনের দায়বদ্ধতায় ভোগে? আমি জানি, আমি খুব গভীর করে জানি, অনেকেই এই দায়বদ্ধতায় ভোগে, বিশেষ করে মেয়েরা। খাদ্যের দায়, বস্ত্রের দায়, বাসস্থানের দায় নেই এমন মেয়ে ক’জন আছে। এ সংসারে? সম্পর্ক যত ঘনিষ্ঠই হোক, দায় তাতে কিছুমাত্র তরল হয় না। দায় দায়ই। যেহেতু অর্থনৈতিক ও সামাজিক কোনও স্বাধীনতা মেয়েদের নেই–তাই জীবনযাপনের তুচ্ছাতিতুচ্ছ উপকরণের জন্যও তারা দায়বদ্ধ হয়, কেউ পিতার কাছে, কেউ স্বামীর কাছে, কেউ পুত্রের কাছে। এই পিতা, স্বামী ও পুত্রকে মেয়েদের বিভিন্ন বয়সে মেয়েরা সহায় বলে জানে।

যদি দায় না থাকে কিছুর? যদি যাবতীয় দায় থেকে নারী একবার মুক্ত হতে পারে? যে মুক্তি নারীর জন্য অবশ্য প্রয়োজন। তবে কি শক্তি হবে কারও, নারীর পথ রোধ করে কখনও দাঁড়ায়, তবে কি শক্তি হবে কারও নারীকে সোনার শেকলে বাঁধে?

নারী সকল দায় থেকে মুক্ত হোক। এই দায়ই নারীর মানুষ হবার একমাত্র অন্তরায়। নানা দায়ে নারীকে জড়িয়ে অমানুষ করে রাখা সমাজের দীর্ঘকালের সংঘবদ্ধ চক্রান্ত। নারী দায়মুক্ত হোক।

নারী একবার নিজেকেই নিজের সহায় বলে জানুক। যদি জাল ছিঁড়তে হয়, নারী জাল ছিঁছুক। যদি বদ্ধঘরের খিল ভেঙে টুকরো করতে হয়, নারী তাই করুক। লোকে তাকে থুতু দেবে, লোকে তাকে চরিত্রহীন বলে গাল দেবে। তাতে কী? লোকের কথায় কী এসে যায়। এই লোকের মুখেই থুতু দেবার অভ্যেস করুক নারী। এই লোকের মুখেই চুনকালি মাখবার অভ্যেস করুক নারী।

আমরা অভ্যেস করি না বলেই পারি না। শিশুকে দাঁড়াবার, দৌড়েবার অভ্যেস করানো হয় বলেই শিশু দাঁড়ায়, দৌড়োয়। নারী তো একপ্রকার শিশুই, যাকে কেবল গায়ে-গতরে ছাড়া আর কিছুতেই বাড়তে দেওয়া হয় না। এই প্রতবন্ধি নারীরা পরিপূর্ণ হয়ে উঠুক বোধ ও প্রজ্ঞার পুরুষ্ট্র বিকাশে। নারী একবার নিজেকেই নিজের সহায় বলে মানুক।

সকল অধ্যায়
১.
০১. আমার যে অপরাধের জন্য আমি এতসব অত্যাচারের আশঙ্কা করছি, তা হচ্ছে, আমি ‘মেয়েমানুষ’
২.
৭৩. রুদ্র’র জন্য ভালোবাসা
৩.
০২. নারীর সমার্থক শব্দ হিসেবে ‘মানুষ’ লেখা নেই
৪.
০৩. পুরুষ ছাড়া মেয়েরা একজনও যা সাতজনও তা
৫.
০৪. চরিত্র সচেতন বুদ্ধিজীবি
৬.
০৫. সমাজের চোখে ভালো মেয়ের সংজ্ঞা
৭.
০৬. মেয়েদের ত্রুটি-বিচ্যুতি
৮.
০৭. নারী নিচ, নারী অধম, নারী মানুষ না
৯.
০৮. বিয়ের বয়স
১০.
১০. নিজ সংসারেও মেয়েদের অভিনয় করতে হয়
১১.
১১. প্রোসটেটনামা
১২.
১২. হাদিসের বাণী : স্ত্রীকে মারপিট কর
১৩.
১৩. নারীর শরীর
১৪.
৭৬. নীতিকথার কাহিনী লেখা সহজ
১৫.
১৪. ভয়ঙ্কর ধর্ষণ-খেলা ‘তাহারুশ’
১৬.
১৫. পর্দা প্রথায় ধর্ষণ রোধ হয়না
১৭.
১৬. বিয়ে : মেধার অপচয় এবং প্রতিভার পতন
১৮.
১৭. সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না
১৯.
১৮. পুরুষের স্বার্থসিদ্ধির আছে ধর্ম এবং আইন
২০.
১৯. হুদুদ-কিয়াস সমাচার
২১.
২০. একা হলেও মেয়েরা অশ্বত্থের মত বেঁচে উঠতে পারে
২২.
২১. মেয়েদেরকে পাথর সরিয়ে-সরিয়ে হাঁটতে হয়
২৩.
০৯. আদিলা বকুলের ভালবাসা
২৪.
২২. আমার বন্ধু হাবিবুল্লাহ
২৫.
২৩. আজ না হোক, দুদিন পর
২৬.
২৪. মেয়েদের পরিচয়
২৭.
২৫. স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত
২৮.
২৬. রামায়ন-মহাভারত
২৯.
২৭. মহাভারতে নারীর অবনমনের চিত্র
৩০.
২৮. মেয়েদের ‘বড়’ হওয়া
৩১.
২৯. নারী এবং খাদ্য-বস্তু
৩২.
৩০. মেয়েদের ‘চরিত্র’
৩৩.
৩১. ‘মেয়েটির চরিত্র ভাল নয়’
৩৪.
৩২. ওড়না
৩৫.
৩৩. সাতটি পয়েণ্ট
৩৬.
৩৪. শুধু নারীর জন্য কিছু শব্দ
৩৭.
৩৫. সংসার
৩৮.
৩৭. আসলেই কি নারীরাই নারীদের শত্রু
৩৯.
৩৮. বিবাহিত মেয়েরা যেমন হয়
৪০.
৩৯. নারীর শ্লীলতা
৪১.
৪০. চুড়ি আর সস্তার জিনিস
৪২.
৪১. নারীর শরীরই তার সবচেয়ে বড় বেড়ি
৪৩.
৪২. পৌরুষিক অত্যাচার
৪৪.
৪৩. উচ্চবিত্ত মিসেসদের জীবনযাপন
৪৫.
৪৪. ভিন্ন এক সমাজে নারীরা
৪৬.
৪৫. মিস্টার বনাম মিস এবং মিসেস
৪৭.
৪৬. বন্ধ্যা, ওর বাচ্চা হয় না
৪৮.
৪৭. কাটা দিয়েই আজকাল কাটা তুলতে হয়
৪৯.
৪৮. একটি গন্তব্যের দিকে
৫০.
৪৯. নারী সম্পূর্ণ মানুষ হোক
৫১.
৫০. কেবল একবার রুখে দাঁড়ালেই হয়
৫২.
৫১. ওরা তো মানুষ নয়, ওরা পুরুষ
৫৩.
৫২. পূর্বাভাস
৫৪.
৫৩. সূর্যদীঘল বাড়ির জয়গুন
৫৫.
৫৪. পক্ষপাত সকল সময় মঙ্গলময় নয়
৫৬.
৫৫. নারী দায়মুক্ত হোক
৫৭.
৫৬. নারী যখন রাজনৈতিক ক্ষমতায়
৫৮.
৫৭. যত যে রাণী হোক, সে তো নারীই
৫৯.
৫৮. শব্দের অপচয়
৬০.
৫৯. ভাগ্যবানের বউ মরে, আর অভাগার গরু মরে
৬১.
৬০. মকছুদোল মোমেনীন বা বেহেশতের কুঞ্জী
৬২.
৩৬. সাধারণ গৃহস্থ ঘরের দৈনন্দিন চিত্র
৬৩.
৬১. শত্রুর হাতে অস্ত্র তুলে দেয়া
৬৪.
৬২. দর্জির স্পর্শ
৬৫.
৬৩. ময়মনসিংহ আমার গোপন ভালবাসার নাম
৬৬.
৬৪. সমরেশ বসুর প্রজাপতি
৬৭.
৬৫. নারীর সবচেয়ে বড় শত্রু দ্বিধা এবং ভয়
৬৮.
৬৬. অবাধ যৌনতাকেই ওরা স্বাধীনতা বলে ভাবছে
৬৯.
৬৭. ইসলামের দৃষ্টিতে মহিলা নেতৃত্ব
৭০.
৬৮. স্মৃতিতে লেনিন
৭১.
৬৯. ধর্মের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে না এলে নারীর মুক্তি অসম্ভব
৭২.
৭০. বহুবিবাহ
৭৩.
৭১. অনৈসলামিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি
৭৪.
৭২. ফুলের মত পবিত্র
৭৫.
৭৪. দাসী ছহবত
৭৬.
৭৫. মুক্তিযুদ্ধ নারীকে কী দিয়েছে
৭৭.
৭৭. কুমারীর ব্রত

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%