রাজাধিরাজ ভট্টাচার্য
‘কখনও ভেবে দেখেছিস... পতঞ্জলি যোগসূত্র কেন রচনা করেছিলেন?’
‘না৷’
‘যোগদর্শনের নিয়মিত অধ্যয়নে মানবদেহের কুণ্ডলিনীর শক্তি জাগ্রত হয়৷ দেহের প্রধান তিন নাড়ি ইড়া, পিঙ্গলা এবং সুষুম্নার মধ্যবর্তী পর্যায়ে যে শক্তিচক্র অবস্থান করে, তাকেই কুণ্ডলিনী বলে৷’
আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে আগুন ধরিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘এই মহাবিশ্বের যতজন সাধক যত রকমের সাধনা করে চলেছেন, সকলের উদ্দেশ্য নিজস্ব কুণ্ডলিনীকে জাগ্রত করা৷ কুণ্ডলিনী চক্র জাগ্রত হওয়া মানে জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হওয়া৷ যার জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হয়, তার ইহজন্ম বা পরজন্ম বলে কিছু থাকে না৷ সেখানে আত্মাই শেষকথা, শরীর কেবলমাত্র ধারক ও বাহকের কাজ করে, সে মৃত্যুভয়হীন৷’
হাতে ধরা সিগারেটে একটা মোক্ষম টান মেরে বাবাজি বললেন, ‘কদাচিৎ এমনও হয়, ঈশ্বর নির্দিষ্ট পাত্রকে কার্যনির্বাহের জন্য স্বপ্নাদেশ দেন৷ চট্টগ্রাম থেকে কলকাতায় কবিরাজি পড়তে-আসা অন্নদাঠাকুর নিয়মিত এক সন্ন্যাসীর স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন, পরবর্তীকালে ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসের স্বপ্নাদেশে আদ্যামাকে খুঁজে পান ইডেন গার্ডেনসে৷ মাতা বৈষ্ণোদেবী এইভাবেই প্রতিষ্ঠা পান৷ স্বপ্নে কুলদেবতাকে খুঁজে পেয়েছেন এমন প্রচুর নিদর্শন আছে৷’
মিনিটখানেকের বিরতি নিয়ে সন্ন্যাসী বললেন, ‘স্বপ্নাদেশে পূর্বজন্মের সাধনার আসন খুঁজে পান পরজন্মের মহাযোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী৷ এরকম উদাহরণ আরও অনেক আছে৷ এক জন্মের সাধনায় মহাযোগী, মহান গায়ক, মহান শিল্পী... হয়ে ওঠা অসম্ভব৷ কিশোরকুমার গান শেখেননি, কয়েক জন্মের সংস্কার লুকিয়ে ছিল ওঁর মধ্যে৷ অনেকেই আছেন সংসারে, যাঁরা ছবি আঁকা কোনওদিন শেখেননি অথচ তাঁরা আজন্ম দুর্দান্ত শিল্পী৷ যার প্রস্তুতি বা প্রারব্ধ আছে, সে অবশ্যই সফল হবে৷ কর্মপ্রচেষ্টা কখনও বিফলে যায় না৷ আচার্যের কাছে নিয়মিত মুণ্ডক উপনিষদ-এর ব্যাখ্যা শুনলে, নিয়মিত তার বিশ্লেষণ করলে, স্বপ্নের ভাষা অনেকটাই জানা যায়৷’
সিগারেটের ছাই হাওয়ায় উড়ে মিশে যাচ্ছে৷ আগুনের স্ফুলিঙ্গ কিছুটা বাড়িয়ে অঘোরীবাবা বললেন, ‘জন্মান্তরবাদ একটি ধ্রুবসত্য ধারণা৷ ফেলে-আসা কোনও এক জন্মের অসম্পূর্ণ কর্ম, আশীর্বাদ এবং অভিশাপ, অপর কোনও জন্মে ভোগ করতেই হয়; এটাই কর্মবাদ৷ আচার্য শংকরের সাংখ্যদর্শনে এটাই মীমাংসা অর্থাৎ কর্মের বিচারক৷ এর কারণেই মানুষ বারবার সংসারে ফিরে আসে এবং ঘুরঘুর করতে থাকে৷ তোর পূর্বজন্মের কর্ম তোকে কলকাতা থেকে নাকে দড়ি দিয়ে ঘুরপাক খাইয়ে বেনারসের এই ঘাটে এনে দাঁড় করিয়েছে৷ সামনের রাস্তা খোলা আছে৷ কর্ম সম্পন্ন করে নিজের বাড়ি ফিরে যা৷ তোর জীবনে যতরকম মানসিক অস্থিরতা আছে, সব কেটে যাবে৷ সেই বংশের তুই কেউ না হলেও, জন্মান্তরবাদ অনুযায়ী পঞ্চম পুরুষ বটে৷ মহর্ষির দেওয়া অভিশাপ ভোগ করতেই হবে৷ নিয়তির সিদ্ধান্তকে মেনে নিতেই হয়৷’
অঘোরীর ব্যাখ্যা ও দর্শন শুনে আমি অবাক হয়ে গিয়েছি৷ এমন মানুষের নাম না জানলে জীবন বৃথা৷ প্রশ্ন করে বসলাম, ‘সম্প্রদায় অনুযায়ী আপনার একটা নাম অবশ্যই আছে, সেটা যদি বলেন...’
আমার প্রশ্ন শুনে হেসে বললেন, ‘ধরে নে আমি নামহীন সাধক৷’
‘আচ্ছা! সাধু, সন্ত, সন্ন্যাসী, ঋষি, মুনি, সাধক; এসবই কি আলাদা, না একই?’
ভদ্রলোক কিছুক্ষণ ভাবলেন৷ হাসির রেশ মুখে নিয়ে বললেন, ‘ঋষি হলেন এমন এক জ্ঞানী সাধক, যার বিশেষ সাধনার অন্তর্নিহিত বিজ্ঞান সম্বন্ধে সম্যক ধারণা আছে৷ একজন ঋষির ক্ষমতা অনেক, এঁদের আশীর্বাদ এবং অভিশাপ একশো শতাংশ কার্যকরী৷ ঋষির সাধারণ তিনটে পদ আছে; মহর্ষি, দেবর্ষি এবং ব্রহ্মর্ষি৷ ব্যাসদেব প্রমুখ হলেন মহর্ষি, নারদ হলেন দেবর্ষি, বিশ্বামিত্র হলেন ব্রহ্মর্ষি৷ প্রত্যেকের সাধনার বিষয়বস্তুর আধার আলাদা৷ ব্রহ্মজ্ঞানী ঋষিদের ধ্যানযোগ অত্যন্ত সক্রিয়৷ মুনি কথার তাৎপর্য ভিন্ন৷ চিন্তাভাবনা এবং মনন যাঁর অত্যন্ত সক্রিয়, তিনিই মুনি৷ সাধু তিনি, যিনি সত্যের মার্গে চলেন৷ সাধনার বিভিন্ন জ্ঞান প্রাপ্ত করেন যে সাধু, তাঁকে সন্ত বলা হয় এবং যিনি জ্ঞানপ্রাপ্তির জন্য সৎ এবং অসৎ দুটোই নাশ করতে পারেন, তিনিই সন্ন্যাসী৷’
মিনিট দুয়েক থেমে ভদ্রলোক বললেন, ‘এবার আসি সাধনার কথায়৷ মূলত চার ধরনের সাধনা হয়; তন্ত্র, মন্ত্র, যন্ত্র এবং যোগসাধনা৷ তন্ত্রের মূল ঘরানা দুটি; বাম এবং দক্ষিণ বা ডান, মন্ত্র তিন ধরনের হয়; বৈদিক, তান্ত্রিক এবং সাবর৷ যন্ত্র বা কবচসাধনা দু-রকমের হয়; গণিত এবং মন্ত্র৷ যোগসাধনার পাঁচটি ধারা; য়ম, নিয়ম, আসন, প্রাণায়াম এবং প্রত্যাহার৷’
ভদ্রলোক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন এবং চুপ করে বসে রইলেন বেশ অনেকক্ষণ৷ আমার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘সাধনার এতসব বিভাজন ছাড়াও আরও অনেক মার্গ আছে৷ আধার অনুযায়ী সাধক নির্দিষ্ট পথে প্রতিষ্ঠিত৷ প্রত্যেকটি মার্গ স্বয়ংসম্পূর্ণ৷ নিজেদের মার্গ নিয়ে মূর্খরা লড়াই করে মরে৷ যার মার্গ ভক্তি, সে জ্ঞানমার্গীদের গালাগাল দেয়, উলটোটাও হয়৷ আখেরে ক্ষতি হয় সাধনার৷’
অঘোরীর ব্যাখ্যা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি৷ আমার কাছ থেকে একটা বিড়ি চেয়ে নিয়ে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়ে লম্বা টান মেরে বললেন, ‘এতসব জেনে তোর কী লাভ হল, জানি না, তুই বেরিয়ে পড়৷ তাড়াহুড়ায় রাস্তায় যাবি না৷ থেমে, বিশ্রাম নিয়ে যাবি৷’
ঠান্ডা মাথায় সমস্ত ঘটনা চিন্তা করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কবে, কখন বেরোব?’
‘আর কয়েক মুহৃর্ত পর সূর্যোদয় হবে, বাড়ি ফিরে গোটা দিন বিশ্রাম কর৷ আগামিকাল ভোরবেলা বেরিয়ে পড়, কীসে যাবি?’
‘মোটর সাইকেলে৷’
‘সেই ভালো, নিজের সিদ্ধান্ত নিজের হাতে৷’
টুকটাক কিছু কথা বলে চরণ স্পর্শ করামাত্র বৃদ্ধ অঘোরী মাথায় হাত দিয়ে আশীর্বাদ করলেন৷ ফিরতি পথে মুগ ডাল ভাজার গন্ধ নাকে এল৷ বাড়ির সকলের জন্য এক চাঙারি ভরতি মুগ ডালের পকোড়া নিয়ে ঢুকেছি৷ হাতঘড়িতে সময় সকাল ছয়টা৷ দোতলায় উঠে দেখলাম, মেসোমশাই ঘণ্টা নেড়ে পুজো করছেন, মাসিমা বিছানায় শুয়ে সেইদিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন৷ একটা বয়সের পর শরীরের মোহ কেটে যায়, তখন বিশ্বাস এবং ভরসা এই দুটোই ভালোবাসাকে বাঁচিয়ে রাখে৷
টানা ছয় ঘণ্টা ঘুমোনোর পর, দুপুরে খাবার খেয়ে সদ্য কেনা বাইকের সাজসরঞ্জাম ফিট করে, লম্বা ঘুমিয়ে ভোর চারটের সময় গঙ্গাপ্রণাম সেরে যখন বাইক নিয়ে বের হচ্ছি, তখন আকাশে চাঁদ এবং সূর্য একসঙ্গে উপস্থিত৷
বাতাসের আবহে ভেসে চলেছি ধাবমান যন্ত্রের পিঠে চেপে৷ লাল রঙের ছোট্ট সুইচ টিপলে গাড়ির ইঞ্জিন চালু হয়ে যায়, মোটরের শক্তিতে চাকা ঘুরতে থাকে, নতুন শহর এগিয়ে আসে বারে বারে, পথ একই রয়ে যায়, পথিক পালটে যায় সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে৷
উতরেটিয়া, রায়বেরেলি, বাছারবা, বারাবাংকি টপকে লখনউ পৌঁছোলাম বিকেলের দিকে৷ আজকের জন্য যথেষ্ট৷ এসে উঠেছি সেই ধর্মশালায়, সঙ্গে নিয়ে এসেছি ফলাহার৷ এর আগে এখানে থেকে যাওয়ার সূত্রে জানি, মঙ্গলবারে এঁরা নিরামিষ খান৷ রাত কাটিয়ে ভোরবেলা বিদায় নিলাম৷ কাঁধ এবং ঘাড় সংলগ্ন অংশ আড়ষ্ট হয়ে আছে৷ হাওয়ায় শীতের ভাব বোঝা যাচ্ছে৷ লখনউ থেকে কাঠগোদাম যেতে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টার মতো সময় লাগে৷
টানা চার-সাড়ে চার ঘণ্টা চালিয়ে বারেলি এসে পৌঁছেছি৷ ঘাড়ের কাছে ভীষণ ব্যথা৷ এত বাইক চালানোর অভ্যাস নেই৷ কিছুক্ষণ বিশ্রাম দরকার, এক জায়গায় নেমে দাঁড়ালাম৷ অসহ্য যন্ত্রণায় কিছুটা বমি হল খালি পেটে৷ চোখে-মুখে জল দিয়ে আরও কিছুটা চলে এসেছি, দাঁড়িয়ে পড়তে বাধ্য হলাম, ব্যথার চোটে আবার বমি আসছে৷
একজন সুঠাম যুবক এক বোতল জল এগিয়ে দিলেন৷ আলাপ হল কুলদীপ সিং রানার সঙ্গে৷ হাইওয়ের ওপর বিখ্যাত সুপ্রাচীন এক ধাবার বংশপরম্পরায় মালিক উনি৷ আশ্চর্যের ব্যাপার, এখানকার ধাবাগুলোয় টুকটাক ওষুধ পাওয়া যায়! জলখাবারে ছোলা-কুলচা এবং প্যারাসিটামল খেয়ে, দড়ি-বাঁধা খাটিয়ার ওপর শুয়ে পড়েছি৷ ঘুম ভাঙল প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর৷
ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে বুঝতে পারলাম, ঘাড়, কাঁধ, কনুই... সব শক্ত হয়ে গেছে৷ ব্যথা কিছুটা কমেছে, তবে কোনও নড়াচড়া নেই৷
কুলদীপ সিং মাঝবয়সি সিংহপুরুষ৷ কোমরে তলোয়ার এবং মাথায় পাগড়ি বিদ্যমান, রীতিমতো ব্যায়াম করা পালিশ চেহারা৷ আমার কাছে এসে কাঁধ এবং হাত টিপে দেখে বললেন, ‘অবিলম্বে ডাক্তার দেখানো দরকার, তবে তার থেকেও ভালো হয় যদি আপনি কর্তার সিং-এর সঙ্গে মোলাকাত করতে পারেন৷ সমস্যা হল, ভদ্রলোকের দেখা পাওয়া ভার৷’
ফোনে যোগাযোগ করে, পরিচিত একটা ছেলের গাড়িতে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন কর্তার সিং-এর কাছে৷ মারুতি ওমনি চালানো ছেলেটির নাম অশোক কুমার, বাড়ি মধ্যপ্রদেশের সাতনায়৷ হাই রোডের ধারে কুলদীপ সিং-এর লরির যন্ত্রাংশের দোকানের সে কর্মচারী৷
বেরিলির মতো ঘিঞ্জি শহর খুব কম আছে৷ শহরের রাস্তায় অজস্র ঘুড়ি, সুতো, মাঞ্জা এবং চুড়ির দোকান৷ বেশ প্রাচীন শহর৷ কলকা করা ডিজাইনের কিছু সুপ্রাচীন হাভেলি এখনও টিকে রয়েছে৷ প্রাচীন জনপদ এবং বিভিন্ন গলি পেরিয়ে সেই ছোকরা আমায় এনে দাঁড় করাল সুপ্রাচীন এক গুরুদোয়ারার সামনে৷ বেরিলি শহরের এটাই সব থেকে প্রাচীনতম গুরুদোয়ারা; ‘তেগ বাহাদুর সাহেব’৷
বাইক, ব্যাগ এবং চাবি ফেলে এসেছি সেই ধাবায়৷ ফোনে কুলদীপ সিংজি নিশ্চিন্ত করলেন৷ মাথায় সাদা রুমাল চাপা দিয়ে, গুরুদোয়ারার ভিতরে এসে খুঁজে পেলাম কর্তার সিং মহাশয়কে৷ আহা, যেন সাক্ষাৎ মহাভারতের ভীম দর্শন করছি৷ যেমন চেহারা, তেমনি মানানসই পাগড়ি৷
বিশাল সাইজের লোহার কড়াইতে সমপরিমাণ দেশি ঘি আর আটা দিয়ে মহাপ্রসাদ তৈরি করছেন কর্তার সিং, গন্ধে ভুবন ভরিয়ে দিয়েছেন৷ ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে প্রায় সত্তরের কাছাকাছি৷ খোঁজখবর নিয়ে জানলাম, ভারতীয় আর্মির একজন উচ্চপদস্থ অফিসার ছিলেন উনি৷ নিজের সময় কুস্তিগির হিসাবে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করতেন৷ কার্গিল যুদ্ধের সময় ওঁর সাহসিকতার জন্য সরকার বাহাদুর বিশেষভাবে পুরস্কৃত করেন৷
আমার পাশে বসে কথাগুলো বলছিলেন যোগীন্দর সিং সান্ধু৷ ‘লাঙ্গটিয়া ইয়ার’ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে এইদিকে, যার মানে ছেলেবেলার বন্ধু৷ যোগীন্দরজি এবং কর্তারজি একসঙ্গে বেড়ে উঠেছিলেন লাহোরে৷ একই স্কুল, মহল্লা এবং পরিস্থিতির তাড়নায় পরিবার ছেড়ে আসতে বাধ্য হন ওঁরা দু-জনে৷
যোগীন্দরজির পরিবার থাকলেও কর্তার সিং ব্যাচেলার৷ একই রাতে পাশাপাশি দুই পরিবারের ওপর আক্রমণ চালানো হয়েছিল লাহোরে৷ দুই কিশোর, বন্ধুর বাড়িতে দাওয়াত থাকায় রক্ষা পেয়ে যায়৷ এরপর পালিয়ে আসেন একসঙ্গে৷ জীবনী অনেকটা মিলখা সিং-এর সঙ্গে মেলে৷ সময়ের তফাত অবশ্য আছে৷ স্বাধীনতার বেশ কয়েক বছর পরের ঘটনা এটি৷
এখানকার ব্যাপারস্যাপার বেশ দেরি হয়ে যাবে আন্দাজ করে বাইরে বেরিয়ে, স্থানীয় লোকজনের কাছে খবরাখবর নিয়ে একজন অস্টিয়োপ্যাথ দেখিয়ে এসেছি৷ লম্বা প্রেসক্রিপশন করে ভদ্রলোক তিনদিন রেস্ট লিখে দিয়েছেন, সঙ্গে বরফ-সেঁক৷
ওষুধপত্র এবং একটা আইসব্যাগ কিনে আবার ফিরে এসেছি গুরুদোয়ারায়৷ ব্যথাযন্ত্রণা সবকিছুর ওপরে, বিকেলের দিকে অমৃত ভোগ পেলাম৷ এখানে এই ভোগকে ‘গুরু কা লঙ্গর’ বলে৷ সবশেষে পাতে এল হালুয়া, আহা! এহেন অন্ন প্রসাদ জঠরে গেলে জীবন ধন্য হতে বাধ্য৷
সবকিছু মিটে গেলে সন্ধে সাতটা নাগাদ ভদ্রলোকের হাত খালি হল৷ ডাক্তারবাবুর দেওয়া ওষুধ খেয়ে ব্যথা কিছুটা কম, তবে হাত নাড়ানোর উপায় নেই৷ শরীর ঠিক থাকলে এতক্ষণে কাঠগোদাম পৌঁছে যাবার কথা৷ সবই নিয়তি৷
নিজের হুড-খোলা জিপে আমাকে পাশে বসিয়ে, ভদ্রলোক নিয়ে এসেছেন নিজের বাড়িতে৷ শহর থেকে কিছুটা দূরে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত রিটায়ার্ড আর্মি অফিসার কর্তার সিং-এর বাংলো৷
রাত সাড়ে ন-টা, সুসজ্জিত খোলা বাগানে বড়ো ছাতার নীচে আসর বসেছে৷ হাতে গরম পোড়া মুরগি এবং কাচের গ্লাসে উত্তেজক তরল পানীয়৷ কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছে, তেমন চেনাশোনা নেই৷ ওদিকে বাইক এবং যাবতীয় মালপত্র পড়ে আছে সেই ধাবায়৷ কিছুক্ষণ আগেই ফোনে আরেকবার কথা বলেছিলাম কুলদীপ ভাইসাহেবের সঙ্গে, উনি আশ্বস্ত করেছেন৷
ফোনে আমার কথা শুনে, কর্তার সিংজি পিঠে হাত রেখে বললেন, ‘কুলদীপ খানদানি বংশের ছেলে, নিশ্চিন্ত রহো৷ ওদের বংশের বড়ো ছেলে এখনও আর্মিতে জয়েন করে৷ কয়েক পুরুষের খাবারের ব্যবসা ওদের৷’
ভদ্রলোকের কথায় নিশ্চিন্ত হলাম৷ পেট পুরে খাওয়ার পর একজন খানসামাকে ডেকে বললেন, ‘মালিশওয়ালা তেল গরম কিয়া জায়ে৷’
ঘানিতে পেষা সরষের তেল, কেশর, মুলতানি মাটি, জোয়ান গুঁড়ো, থেঁতলে-দেওয়া রসুন, কপূÅর, মৌরি গুঁড়ো এবং আরও কিছু আয়ুর্বেদিক ওষধি মিলিয়ে তৈরি হল তেল৷ ব্যথার ব্যাপ্তি কাঁধ থেকে ছাড়িয়ে পিঠ পর্যন্ত ধরে গেছে৷ জং-ধরা লোহার কবজার মতো শরীর শক্ত হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ৷
মালিশ করা যায় এমন একটা টেবিলের ওপর উলটে শুইয়ে ভদ্রলোক তেল দিয়ে রগড়াতে শুরু করলেন, ব্যথার উপশমে চোখ বন্ধ হয়ে এল৷ মেরুদণ্ডের দু-পাশে হাতের চাপ দিয়ে পাঁজরের হাড় ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম, অর্ধেক ব্যথা তৎক্ষণাৎ কমে গেল৷
টেবিলের ওপর উঠে বসেছি এখন৷ কাঁধ এবং ঘাড়ের সন্ধিক্ষণে গরম তেল মালিশ করে ভদ্রলোক চুলের মুঠি ধরে, একবার ডানদিকে, আরেকবার বাঁদিকে ঘুরিয়ে দিলেন৷ কড়মড় শব্দে ঘাড়ের হাড়গুলো কথা বলে উঠল৷ আবার আমাকে শুইয়ে দিয়ে, কনুই দিয়ে পিঠের ওপর ঘোরাতে শুরু করলেন৷ গোটা শরীরে রক্তসঞ্চালন শুরু হল, যেন নতুন জীবন ফিরে পেলাম৷
প্রায় একই কায়দায় হাত, কোমর, পা সমস্ত মালিশ হল টানা দেড় ঘণ্টা ধরে৷ টেবিল থেকে যখন মাটিতে নামলাম, নিজেকে মুক্তপুরুষ বলে মনে হচ্ছে, যেকোনও সময় হাওয়ায় উড়ে যেতে পারি৷
ভদ্রলোকের পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে যেতেই আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন৷ ওই চেহারায় আমায় খুঁজে পাওয়া গেলে ভাগ্য ভালো বলতে হবে৷ রাতের বেলা শোয়ার ভাগ্য হল একটা বিলাসবহুল খাটে৷ এক ঘুমে রাত কাবার, ভোরবেলা উঠে দেখলাম, ভদ্রলোক ওই ভারী চেহারা নিয়ে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে দৌড়োচ্ছেন, জলখাবার না খাইয়ে ছাড়লেন না৷
কিছু ব্যায়াম দেখিয়ে দিয়ে, কোথায় যাব; বিস্তারিত জেনে, নিজের ফোন নাম্বার আমাকে দিয়ে বললেন, ‘পথেঘাটে যদি বিপদে পড়ো, আমায় ফোন কোরো, ওই রাস্তা আমার মুখস্থ, প্রচুর জানাশোনা আছে সেখানে৷’
বিদায় লগ্নে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ইতস্তত করে একটা প্রশ্ন করলাম, ‘অচেনা কাউকে আপনি এইভাবে বাড়িতে থাকতে দিলেন কী ভেবে? যদি আমি চুরি করে পালাতাম!’
ভদ্রলোকের হাসির শব্দে পাশের আমগাছ থেকে গোটাকয়েক কাক উড়ে চলে গেল৷ ‘ডালখোলা’ নামে একটা জায়গা আছে জানি, আমার সামনের মানুষ ‘দিলখোলা’৷
হাসি থামার কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘প্রায় চল্লিশ বছর আর্মিতে সার্ভিস করেছি, মানুষের চোখ দেখে বিচার করতে আমার দু-মিনিট সময় লাগে৷ রাজস্থানের পোস্টিং-এর সময় একবার এক বাচ্চা ছেলে সীমানা টপকে এ দেশে ঢুকে এসেছিল৷ ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিলাম৷ এই ঘটনার মাসখানেক পরে একজোড়া যুবক-যুবতী একইভাবে এ দেশে ঢুকে পড়ে, দেখামাত্র ফায়ার করি৷ মৃত শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণে বিস্ফোরক বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়৷ করমর্দন করার সময় বা মালিশ করার সময় মানুষকে স্পর্শ করামাত্র অনুভূতি স্পষ্ট হয়ে যায়৷ মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা আমার আছে৷ ওয়াহেগুরুর আশীর্বাদে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে পারি৷’
এই দুনিয়ায় কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা ব্যতিক্রমী, কর্তার সিং তেমনই একজন৷ বাড়ির পরিচারক গাড়ি চালিয়ে সেই ধাবায় ছেড়ে এলেন৷ ঋণ জমা হচ্ছে এক-এক করে৷ সময়-সুযোগ বুঝে ফেরত দিতে হবে সামর্থ্য অনুযায়ী৷
কুলদীপ ভাইসাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে, কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার বেরিয়ে পড়েছি৷ যাত্রাপথ সোজা উত্তরমুখী৷ সূর্য পশ্চিম আকাশে, মাঝখানে একবার চায়ের বিরতি দিয়ে, রাস্তার ধারে টুকটাক ব্যায়াম সেরে যখন পন্থনগর পৌঁছোলাম, তখন সন্ধে সাতটা, চারপাশ অন্ধকার৷
কিছু বাইক আরোহী রাস্তার পাশ ঘেঁষে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷ আলোচনায় বুঝলাম, কিছুক্ষণ আগে জাতীয় সড়কে তেন্দুয়াদের একটা গ্যাং দেখা গেছে৷ লরি, বাস এবং গাড়ি হলে একরকম, বাইক নিয়ে যাওয়া...
অনেক কষ্টে একটা থাকার জায়গা জুটল৷ এটা হোটেল নয়, মধ্যবিত্ত বাড়ির একতলার সিঁড়ির নীচে ঘরের মেঝেতে কম্বল বিছানো আছে৷ ব্যাগে কিছু শুকনো খাবার ছিল, এক গ্লাস জল খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম৷
আন্দাজ রাত দেড়টা হবে, মানুষের চেঁচামেচির শব্দ এল৷ মালিক ভদ্রলোক এসে বলে গেলেন, বাইরে তেন্দুয়া ঘুরতে দেখা গেছে, কোনওভাবেই যেন না বের হই৷
পরদিন সকালবেলা বনদপ্তরের লোকজন এসে ছানবিন করে আশ্বস্ত করার পর দুগ্গা নাম নিয়ে বাইক স্টার্ট দিলাম৷ পন্থনগরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও একটি নামকরা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় আছে৷ জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কের দূরত্ব এখান থেকে ঘণ্টাখানেকের মাত্র৷ এই জঙ্গল তারই অংশবিশেষ৷
রাস্তায় জ্যাম না থাকলে এখান থেকে নৈনিতাল দু-ঘণ্টা, সওয়া দু-ঘণ্টায় পৌঁছে যাওয়া যায়, আমার লাগল সাড়ে চার ঘণ্টা৷
পাহাড়ের এক বাঁকে ডিমের অমলেট আর গরম কফি খাচ্ছি৷ জীবনে প্রথমবার হিমালয় দর্শনে শিহরিত হয়ে উঠেছি বারবার৷ মন বলে উঠল, এই পৃথিবীতে এমন জায়গাও আছে!
পাহাড়ি পথে বাইক চালানো বেশ কঠিন ব্যাপার৷ এই রাস্তার নিজস্ব কিছু নিয়ম আছে, সেগুলো সবসময় মেনে চলতে হয়৷ সমতলের মতো মর্জিমাফিক ওভারটেক করা যায় না৷
হিমালয়ে ওঠার আগে, দূর থেকে পাহাড়কে দেখা এবং বেশ কিছুটা ওপরে উঠে যাওয়ার পর পাহাড় থেকে নীচের দিকে তাকিয়ে থাকার অনুভূতিই আলাদা৷ যত ওপরে ওঠা যায়, ততই ক্রমশ ঠান্ডা বাড়ছে৷

বাইক বেশ ভালোই চলছে, এখনও পর্যন্ত নির্ঝঞ্ঝাট যাত্রা বলা যায়৷ বাস স্ট্যান্ড সংলগ্ন এলাকা টপকে পৌঁছে গেলাম নৈনিতাল৷ ডানদিকে রাস্তা ঘুরে পোস্ট অফিসের পাশে এক ভদ্রলোকের বাড়িতে পেয়িং গেস্টের বিজ্ঞাপন দেখে ঢুকে পড়েছি৷ থাকার মতো একটা ঘর জুটল, মোটামুটি ঠান্ডা আবহাওয়া৷
এসব এলাকায় থাকা-খাওয়া বেশ দুর্মূল্য ৷ জিনিসপত্র রেখে, ফুটপাথ থেকে কড়ি-চাওল নিলাম মাত্র পঁচিশ টাকায়৷ একটু ভালো হোটেলে এই খাবারের দাম দুশো টাকা, ভাবা যায়!
খাবার খেয়ে বাইক নিয়ে পৌঁছে গেলাম সার্ভিস সেন্টারে, মবিল এবং ফিলটার পালটে আবার ফিরে এসেছি৷ দরদাম করে এক হকারের কাছ থেকে একটা মোটা কম্বলের চাদর কিনেছি নগদ আড়াইশো টাকা দিয়ে৷ সূর্যাস্তের পর ঝপ করে ঠান্ডা নামে এদিকে৷ নৈনি লেকের অমন স্বচ্ছ নীল জল, তখন কুচকুচে কালো মনে হয়৷ রাতের অন্ধকারে কম্বল গায়ে, মল্লিতাল থেকে মল রোড ধরে তল্লিতাল পর্যন্ত হাঁটতে অসাধারণ লাগে৷ দু-দিন এখানে থেকে, বিশ্রাম নিয়ে, পরের দিন ভোরবেলা নয়নাদেবীর মন্দির দর্শন করে, পাশের গুরুদোয়ারায় ভোগ প্রসাদ গ্রহণ করে বাইক নিয়ে এসে পৌঁছেছি ভোয়ালি৷
যে বাড়িতে পেয়িং গেস্ট হিসেবে ভাড়া ছিলাম, সেখানের ভদ্রলোক জানিয়েছিলেন, এখানকার বিখ্যাত গোলু মহারাজের মন্দির বা ঘণ্টা মন্দির দেখা অবশ্যকর্তব্যের মধ্যে পড়ে৷
মন্দিরের বয়সের গাছপাথর নেই৷ ব্রিটিশরা পাকাপাকিভাবে এখানে বসবাস করার আগে, স্থানীয় মানুষজন এই ভগবানকে পূজা করতেন, আজও সেই শ্রদ্ধাস্রোত বয়ে চলেছে৷ ঘোড়ার পিঠে সওয়ারি মহাদেবমূর্তি, অনেক মতান্তরও আছে৷ অনেকে বলে থাকেন ইনিই কল্কি অবতার৷
মন্দিরের বিশেষত্ব হচ্ছে ‘ঘণ্টা’৷ মনস্কামনা পূর্ণ হলে ভক্তগণ এসে ঘণ্টা বেঁধে দিয়ে যান৷ লক্ষাধিক বিভিন্ন আকৃতির ঘণ্টা এবং সেগুলো ধরে ঝুলতে-থাকা অসংখ্য বাঁদর৷ বর্তমানের মন্দিরটি চারপাশে জাল দিয়ে ঘেরা, খুব সম্ভবত বাঁদরামো থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্য৷
ভোয়ালির আরেকটি অবশ্য দ্রষ্টব্য হচ্ছে এখানকার ফলের বাজার, মৌসুমি পাহাড়ি ফল এবং ফুলের এত বড়ো বাজার, সমগ্র কুমায়ুন অঞ্চলে নেই বোধহয়৷
বাজার সংলগ্ন এলাকা থেকে বেরিয়ে একটা পাইস হোটেলে খাবার খেতে গিয়ে এক সাধুবাবার সঙ্গে আলাপ হল৷ ভদ্রলোকের নাম অচ্যুতানন্দ গিরি, সুদূর নর্মদা থেকে পায়ে হেঁটে উনি যাচ্ছেন পাতাল ভুবনেশ্বর দর্শন করতে৷ পথে বিভিন্ন তীর্থস্থানে সপ্তাহখানেক থেকে, সময় কাটিয়ে মহানন্দে হেঁটে চলেছেন পরিব্রাজক সাধক৷ মধ্যবয়স্ক মানুষ, কাঁধে ঝোলা, বুকে গেরুয়া চাদর জড়ানো, যার ভিতর থেকে একটা বাঁদর উঁকি মারছে৷
বাঁদরের গলার সঙ্গে সাধুবাবার গলায় দড়ি বাঁধা আছে৷ ভদ্রলোককে আমি খাওয়ার আহ্বান জানালে, উনি হাতজোড় করে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, ‘ভাণ্ডারা এবং নিজের হাতের রান্না ছাড়া আমি খাই না৷’
টুকটাক আলোচনা সেরে বাঁদরটিকে হাফ ডজন কলা কিনে দিয়ে, আদর করে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আবার৷ সাধুবাবা জানালেন অদূরেই নিমকরলি বাবার বিখ্যাত কাঞ্চি আশ্রম অবস্থিত, সেটি যেন অবশ্যই দর্শন করি৷
নিমকরলিবাবা; গোটা কুমায়ুন, হিমালয় এবং গোটা বিশ্ব যাকে স্বয়ং হনুমানজির অবতার বলে মানেন৷ লোকমুখে ওঁর প্রচুর অলৌকিক ঘটনা ছড়িয়ে আছে৷ পৃথিবীর বিখ্যাত কিছু মানুষজন ওঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন৷ স্টিভ জোবস, মার্ক জুকারবার্গ থেকে শুরু করে আরও অনেকে আছেন এই তালিকায়৷
চোখ-জুড়োনো মন্দিরটি কোশী নদীর ধারে অবস্থিত৷ স্থানীয় একজন বৃদ্ধ মানুষ বললেন, ‘মন্দিরের পিছনে পাহাড়ের কোনও এক গুপ্ত স্থানে এক গুহা আছে বলে শোনা যায়৷ ওখানে স্বয়ং হনুমানজি আসেন তপস্যা করতে, বাবা নিমকরলি ওঁর দর্শন পান এবং দীর্ঘ সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন৷ এই মন্দির থেকে কোনওদিন কেউ অভুক্ত ফেরত যায় না৷’
মন্দিরে প্রবেশ করতেই শরীরে তরঙ্গ খেলে গেল৷ দর্শন অন্তে অনেক কষ্টে একটা থাকার জায়গা জুটল মন্দির সংলগ্ন ধর্মশালায়৷ গরম জলে স্নান সেরে, ব্যাগপত্র নির্দিষ্ট লকারে ঢুকিয়ে বিশ্রামের কিছুক্ষণ পর হাঁটতে বেরিয়েছি৷
সূর্য পশ্চিমে, আকাশে কিছু উড়ো মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে৷ মন্দির এলাকায় অনেক বৃদ্ধ সাধুসন্ন্যাসী হেঁটেচলে বেড়াচ্ছেন, একজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর সঙ্গে আলাপচারিতা চলল কিছুক্ষণ৷ নিমকরলিবাবার জীবনের অদ্ভুত সমস্ত ঘটনা একের পর এক বলে যাচ্ছেন উনি, স্বচক্ষে দেখেছেন সেই মহাপুরুষকে, স্পর্শ করেছেন একাধিকবার৷ ওঁর চরণ ছুঁয়ে স্পর্শ করলাম আমি, দু-হাত ভরে আশীর্বাদ করলেন ভদ্রলোক এবং একটি আখরোট দিলেন খেতে৷
এখন সময় রাত দশটা, চারদিক নিস্তব্ধ৷ কিছু আগে প্রসাদ পেয়ে নিজের জায়গায় ফিরে এসেছি৷ একই ঘরে পরপর দশখানা বিছানা পাতা আছে, সাত নম্বরে আমি৷ বালিশে মাথা দিতেই দু-চোখে ঘুম জড়িয়ে এল৷ ঘুম ভাঙল ঝটকা দিয়ে, স্বপ্নে উপস্থিত স্বয়ং পিণ্ডারিজি৷ আমায় ডাকছেন৷
ঘড়িতে সময় রাত দেড়টা, নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এসে, ধর্মশালার পিছনের পাহাড়ি জঙ্গলের রাস্তা ধরেছি; স্বপ্নে এমনই নির্দেশ৷
বেশ কিছুটা যাওয়ার পর জঙ্গল ঘন হয়ে এল, সামনে পথ ত্রিমুখী৷ মোবাইলের আলো জ্বেলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছি, ঝোপঝাড়, জঙ্গল ভেদ করে একজন এগিয়ে এলেন৷ জটাধারী সে মানুষের নিম্নাঙ্গ কালো কৌপীন দিয়ে ঢাকা, উচ্চতা আমার কোমরের কাছে, বামন বলা যেতে পারে৷ সময় নষ্ট না করে ইশারায় তিনি আমায় ডেকে নিলেন৷ মন্ত্রমুগ্ধের মতো এগিয়ে চললাম৷ আরও ত্রিশ মিনিট পরে গন্তব্যে পৌঁছোনো গেল৷ মধ্যরাতের গহন অরণ্যের ব্যাখ্যা করা খুব মুশকিল৷ কিছু নির্দিষ্ট চিহ্ন দেখে আন্দাজ করা গেল, এ ভূমি জাগ্রত৷
পঞ্চমুণ্ডির এক আসন, পাথরের খাঁজে আটকানো ত্রিশূল এবং সামনে রাখা জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড; আলাপ হল নাগা সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীর সঙ্গে৷ একটা পলিথিনের প্যাকেট আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এতে এক প্যাকেট নুন, গোলাপজল, ছোট্ট একটা প্রদীপ এবং আরও কিছু দ্রব্য আছে৷ পিণ্ডারিজির স্বপ্নাদেশমতো এগুলো অর্চনা করে রেখেছি৷ আগামী কর্তব্য এবং নির্দেশ উনি আপনাকে স্বপ্নে দিয়ে দেবেন৷ গত বিশ বছর আমি লোকালয়ে যাইনি, তাই আপনাকে এখানে টেনে আনতে বাধ্য হলাম৷ আগামী দিনে সাবধানে থাকবেন৷’
ভদ্রলোককে প্রণাম সেরে ফিরতি পথে আশ্রমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছি, পূর্ব আকাশে কিঞ্চিৎ লাল আভা দেখা যাচ্ছে৷ হাতের প্লাস্টিকের প্যাকেট নিয়ে কোশী নদীর ধারে নেমে এসেছি৷ একটা বড়ো পাথর দেখে বসলাম তার ওপর৷ কিছু দূরে দীর্ঘাকার একটা সাপ ফণা ডুবিয়ে কোশী নদীর জলপান করছে, সূর্যের প্রথম আলো তার শরীরে এসে পড়তেই সে পানীয় জল থেকে মাথা তুলে সূর্যের দিকে তাকিয়ে নিজেকে খরস্রোতা নদীতে ভাসিয়ে দিল, আমি উঠে পড়লাম৷
জীবনের স্রোত এবং নদীর স্রোতে কোনও তফাত নেই, ঠিকমতো ভাসতে পারলেই হল৷ ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নিয়ে, জারিকেন ভরতি পেট্রোল ভরে, রওনা দিলাম রানিখেত৷ রাস্তাঘাট অত্যন্ত সুন্দর এবং সুশৃঙ্খল৷ ‘চোখের সুখ’ বলে একটা ব্যাপার আছে, যা এখানে এলে বোঝা যায়৷ এতটা পথ পাহাড়ি রাস্তায় চালিয়ে, মোটামুটি পোক্ত হয়ে গিয়েছি৷
এখন যেখান থেকে বাইক নিয়ে চলেছি, সেখানে রাস্তাঘাট অনেকটা সমতলের মতো৷ পাহাড়ি বাঁক এখানে প্রায় নেই বললেই চলে৷ চারপাশে হরেকরকম চাষের জমি৷ পথে একটা ধাবা দেখে দাঁড়িয়েছি৷ রাজমা-চাওল খাবার পর কিছুটা ব্যায়াম সেরে নিয়ে আবার রওনা দিয়েছি৷
বাধ্য হয়ে পুনরায় দাঁড়িয়ে পড়েছি এখানে৷ এটা একটা ছোট্ট পাহাড়ি হ্যামলেট, নাম মঝখালি৷ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আমি আটকে গিয়েছি৷ তাক-লাগানো ব্যাপার৷ রামজীবন চৌহান নামে এক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ হল এখানে৷ স্থানীয় ফল থেকে উনি বিভিন্ন জ্যাম, জেলি ও আচার তৈরি করেন৷ ওঁর গিন্নি বাড়িতে বানানো কমলালেবুর পুডিং খাওয়ালেন৷ স্বাদের ব্যাখ্যা লিখে বোঝানো মুশকিল৷
এমন সময় কর্তার সিংজির ফোন এল৷ কুশল বিনিময়ে এবং টুকটাক আলোচনার পর আবার রওনা দিয়েছি, কৌশানি পৌঁছোতে সন্ধে হয়ে গেল৷ নগদ সাতশো টাকার বিনিময়ে একটা জ্যাকেট কিনতেই হল, প্রবল ঠান্ডা৷ স্কুল ছুটির মরশুম হওয়ার জন্য ভালোই ভিড় আছে৷ গান্ধী আশ্রমের ডান হাত ধরে কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে গলির ভিতরে একটা সস্তার হোটেল পাওয়া গেল৷ বাইরে থেকে দুটো রুটি কিনে জ্যাম দিয়ে খেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছি কম্বল চাপা দিয়ে৷
ঘুমিয়ে পড়ার মুহৃর্তে একটা কথা মনে বারবার ফিরে আসছে, শিলিগুড়িতে বাস অ্যাক্সিডেন্ট দিয়ে জীবনের যে উপন্যাস শুরু হয়েছিল, তার গতিপথ আমাকে কৌশানি পর্যন্ত এনে দাঁড় করিয়েছে৷ যেকোনও মুহৃর্তে, যেকোনও মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে, জীবনদর্শন না বদলালেই হল৷
কলকাতা, কাশী, লখনউ, কানপুর, বেরিলি; সকলের সঙ্গে কথা বলে, নোটবুকে দিনলিপি লিখে যখন ঘুমোতে যাচ্ছি, ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, সময় রাত দশটা৷ শুভরাত্রি৷
ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে গেল আজ৷ শীতের জড়তা কাটিয়ে কালো কফিতে চুমুক মেরে বেরিয়ে পড়েছি গান্ধী আশ্রমের উদ্দেশে৷ বাতাসে শীতের মিঠে আমেজ৷ আশ্রমে অবস্থিত গান্ধীজির তিনমূর্তি বাঁদরের সঙ্গে কথোপকথন সেরে পাড়ি জমিয়েছি বাগেশ্বরের উদ্দেশে৷ বেশির ভাগই ঢালু পথ, ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সওয়া ঘণ্টা পিচের রাস্তা৷ মাঝখানে এক জায়গায় হল্ট দিয়ে হ্যান্ডলুমের মাফলার কিনে, গলায় জড়িয়ে আবার দৌড়৷
অবশেষে পৌঁছোলাম বাগেশ্বর৷ একটা সময় তিব্বত এবং কুমায়ুনের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের মূলকেন্দ্র ছিল উত্তরাখণ্ডের কুমায়ুন ডিভিশনের এই ছোট্ট শহর৷ ১৯৬২ চিনের যুদ্ধের পর সেসব বন্ধ হয়ে যায়৷ এই রাস্তা ধরে আরও দু-তিন ঘণ্টা এগোলেই চকৌরি হয়ে ধনোল্টি, মুন্সিয়ারি, বিনসার; এসব জায়গায় যাওয়া যায়৷
ছুটির মরশুমে হোটেলের ভাড়া বড্ড বেশি, অনেকক্ষণ খোঁজাখুঁজি করে প্রায় ভেঙে-পড়া এক প্রাচীন বাড়ির ঠিকে ভাড়াটে হিসেবে আশ্রয় জুটল৷ দিনপ্রতি দুশো টাকা দিতে হবে৷ দিনে দু-কাপ চা-বিস্কুট, ঘরে মাত্র একটা টিউবলাইট জ্বলবে, একটামাত্র চার্জিং পয়েন্ট; আমার জন্য যথেষ্ট৷
আন্দাজ নব্বই-বিরানব্বই বছরের বৃদ্ধার আতিথেয়তা অতুলনীয়৷ মাটি-পাথরের উনুনে তৈরি গরম জলে স্নান সেরে এক কাপ চা খেয়ে, পায়ে হেঁটে দশ মিনিটের রাস্তায় পৌঁছে গেলাম বৈজনাথ মন্দির৷ এই রাস্তা অচেনা হলেও, মন্দিরে ঢুকে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছি!
চোখ আটকে আছে মন্দিরের চুড়োর দিকে৷ ওপরদিকের অর্ধগোলাকৃতি একটা পাথর ভাঙা অবস্থায় ঝুলছে৷ শরীর কেঁপে উঠল, সর্বাঙ্গে কাঁটা দিয়ে উঠল৷ পাশেই কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে গোমতী নদী৷ পাথর বাঁধানো স্নান ঘাটে বসতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেল হঠাৎ৷ একের পর এক পুরোনো ঘটনা চোখের সামনে এসে হাজির হতে শুরু করেছে৷ আমি কি জাতিস্মর! নাকি আমার গোটা জীবনটাই স্বপ্নময়৷ বাস্তব বোধ হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ৷ অতীত হাতছানি দিচ্ছে হারিয়ে যাওয়ার৷
বহু পুরোনো ফেলে-আসা জীবন যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি৷ খুব সম্ভবত মা পুজো দিতে আসতেন এই মন্দিরে৷ যে বছর আমি জন্মাই, সে বছর বাবা ইহলোক ত্যাগ করেন, এই জন্মেও আমি ঠিক ততটাই অপয়া৷ পরবর্তীকালে কিছুদিন বোধহয় এই মন্দিরে আমি পূজা শিখেছি৷ রত্নাবলির সঙ্গে খুব সম্ভবত আমার এখানেই দেখা হয়েছিল৷ ছবির মতো সব স্পষ্ট চোখের সামনে ভাসছে৷ বড্ড কান্না পাচ্ছে৷
চোখের জল বাঁধ মানল না শেষ পর্যন্ত৷ পকেট থেকে রুমাল বের করে চোখের ওপর চেপে ধরেছি৷ বাবা, রত্নাবলি, মা— কেউ কোথাও নেই৷ আমি ঠিক ফিরে এসেছি, কথা রেখেছি৷ ওঁরাও হয়তো স্বপ্নে খুঁজতে খুঁজতে কোনওদিন এখানে এসে ঠিক পৌঁছে যাবেন, আমি তখন হয়তো থাকব না৷ কোথায় থাকব তাও জানি না৷ আদৌ বেঁচে থাকব কি না তখন...
গোটা মন্দির চত্বর আরও দেড় ঘণ্টা সময় নিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম৷ ছেলেবেলায় এই উঠোনেই বন্ধুরা একসঙ্গে খেলে বড়ো হয়েছি৷ পণ্ডিতমহাশয়ের টোল ছিল ওই কোণে৷ মন্দির থেকে বেরিয়ে গোমতী নদীর ওপরে কাঠের পাটাতন ফেলা থাকত, এখন সেটা লোহার ব্রিজ হয়েছে৷ হালকা মনে পড়ছে, কোনও এক শীতের বিকেলে জোর তর্ক বসেছিল এই মন্দির প্রাঙ্গণে৷ তিব্বত থেকে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী এসেছিলেন প্রাচীন মহনির্বাণের পুঁথি নিয়ে, সেই তর্কে পণ্ডিতমশাই পরাস্ত হয়েছিলেন৷ কত কথা আর কথকতা; এই তো জীবন৷
হাঁটতে হাঁটতে নিজের ভাড়া ঘরে ফিরে এসেছি, বোবার মতো একবুক স্মৃতি নিয়ে বসে আছি চুপচাপ৷ বৃদ্ধা এসে বসলেন নিঃশব্দে৷
হঠাৎ ভদ্রমহিলাকে প্রশ্ন করলাম, ‘বৈজনাথ মন্দিরের প্রাচীন ইতিহাস আপনি জানেন?’
ভদ্রমহিলা আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘চার পুরুষ আগে ওই মন্দিরের বংশপরম্পরায় পুরোহিতের বংশ এইটা, মন্দির একই আছে, পুরোহিতের বংশ পালটে গেছে৷ কিছুটা তো অবশ্যই জানি৷ বহিরাগত শত্রুদের দ্বারা কতবার যে আক্রমণ করা হয়েছে এই মন্দিরের ওপর, তার ইয়ত্তা নেই৷ শেষ যেটুকু ছিল, ইংরেজরা সব নিয়ে চলে গেছে৷’
‘পূজারির বংশ পালটে গেল কেন?’
‘নির্দিষ্ট শাস্ত্রীয় প্রথা ভেঙে এই বংশের এক পূর্বপুরুষ এক অসুরবংশীয় মন্দিরে পুজো শুরু করেন৷ বৈজনাথ মন্দির থেকে তৎক্ষণাৎ ওঁকে বের করে দেওয়া হয়৷ কোনও এক ঋষি সেই সময় তাঁকে অভিশাপ দেন, পাঁচ পুরুষের অভিশাপ৷’
‘আপনার কোনও সন্তান নেই?’
‘ছিল একসময়, এখন আর নেই৷’
হতভম্বের মতো কিছুক্ষণ ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, ‘ঠিক বুঝতে পারলাম না৷’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘সত্তর বছর আগের ঘটনা, রাধাষ্টমীর রাত্রিবেলা আমার একমাত্র ছেলে স্বপ্ন দেখে বিছানা থেকে উঠে আমার ঘরে এসে বলল; মা ছিন্নমস্তা এখানে কোথাও চাপা পড়ে আছেন, তিনি পরিত্রাণ পেতে চাইছেন৷’
ভদ্রমহিলা চুপ করে আছেন, চোখে জল টইটম্বুর৷ এক ঢোঁক জল খেয়ে কান্না সামলে বললেন, ‘ছেলে পরবর্তী সময়ে আর ঘুমোতে পারল না৷ সামর্থ্য অনুযায়ী ডাক্তার, বৈদ্য, হাকিম... সব দেখানো হল, কোনও লাভ হল না৷ একটা জোয়ান ছেলে দুই মাসের মধ্যে ক্রমশ উন্মাদ হয়ে গেল একটা স্বপ্নের জন্য৷ তাও ওকে ঘরে বন্দি করে রেখেছিলাম কোনওরকমে, শেষরক্ষা হল না৷ কালীপুজোর আগের দিন সকাল থেকে ওকে আর খুঁজে পেলাম না, স্থানীয় সবাই খুঁজতে বেরোলেন৷ পরের দিন অর্থাৎ কালীপুজোর রাতের বেলায় ছেলের মৃতদেহ পাওয়া গেল কান্দার জঙ্গলের এক ধ্বংসস্তূপের পাশে৷ পায়ে সাপের দংশনের চিহ্ন পাওয়া গিয়েছিল৷ এই ধ্বংসস্তূপ সেই অসুরবংশীয় মন্দিরের আবর্জনা৷’
আমার শরীর এই ঠান্ডাতেও ঘামে ভিজে জবজবে, গলা শুকিয়ে কাঠ৷ খানিকক্ষণ পর প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার স্বামী?’
‘ছেলে যে বছর জন্মাল, সেই বছরই তিনি মারা যান৷ অনেক কষ্টে বুকে আগলে বড়ো করেছিলাম সন্তানকে, আমি পড়ে আছি এখনও, আমার মৃত্যু নেই৷’
ভদ্রমহিলা কাঁদছেন, চোখে ছানি, কানে কম শোনেন৷ হঠাৎ কী মনে হতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই বংশে আগেও কি এইভাবে কেউ মারা গেছেন?’
আমার হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে উনি বললেন, ‘শুনেছি, আমার স্বামীর ঠাকুরদাদা কান্দার জঙ্গলে প্রথম এই অসুরবংশীয় মন্দির রক্ষা করতে গিয়ে নিজের প্রাণ হারান৷ আমার স্বামীর বাবা, কান্দাতে এক বাড়িতে পুজো সেরে ফেরার সময় জঙ্গলে বাঘের আঘাতে নিহত হন৷ আমার স্বামী কান্দার রাজপরিবারের যজ্ঞ শেষ করে ফেরার সময়ে সেই জঙ্গলেই বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান৷ পরবর্তী সময়ে ছেলের মৃত্যু হয় এখানেই৷ একই বংশের চারজন পুরুষ ওই জঙ্গলেই শেষ হয়৷’
বৃদ্ধা এই সময় চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘ওই জঙ্গল অভিশপ্ত৷ ব্রিটিশরা পর্যন্ত ওখানে থাকতে পারেনি৷ অমন সুন্দর চায়ের বাগান, ভিটেমাটি সব ছেড়ে তারাও চলে গিয়েছিল কৌশানির দিকে৷’
শুকনো গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখন আপনার চলে কীভাবে?’
‘স্বাধীনতা সংগ্রামীর একটা পেনশন পাই আর টুকটাক ঘর ভাড়া, চলে যায় কোনওরকমে৷’
‘আপনার ছেলের কোনও ছবি আছে?’
মরচে-ধরা বহু পুরোনো একটা টিনের বাক্স, তার মধ্যে ভেলভেটের চাদর, তার মধ্যে অতি যত্নে রাখা আছে একটা ছোট্ট অ্যালবাম৷ সেখান থেকে বের হল সাদা-কালো ছবি৷ একগাদা ড্যাম্পের গন্ধ সমেত ছবিটা আমার হাতে এল, ছিটকে গেলাম!
দোতলার ঘরে এসে শুয়ে পড়েছি কিছু আগে৷ মাথার ওপর পেটাই ছাদের অবস্থা ভালো নয়৷ তার থেকেও খারাপ অবস্থা আমার শরীরের৷ গত জন্ম, এই জন্ম সব মিলেমিশে একাকার৷ হজমশক্তি তলানিতে৷ শরীর জুড়ে একটা কষ্ট৷
তাপমাত্রার শ্রীবৃদ্ধি ঘটছে ক্রমশ৷ ঠান্ডার প্রকোপে দাঁতের পাটি কাঁপছে, মোবাইলে তাপমাত্রা তেরো ডিগ্রি, পারদ যন্ত্র বলছে আমার তাপমাত্রা একশো দুইয়ের ওপর৷ একটা মোটা কম্বল কম পড়ে যাচ্ছে৷
কোনওরকমে উঠে গায়ে জ্যাকেট গলিয়ে আবার শুয়ে পড়েছি৷ বড্ড ক্লান্ত লাগছে৷ গত চার পুরুষ ধরে বয়ে-আসা অপমৃত্যুর অভিশাপ বয়ে চলেছে এই শরীর৷ নীচের তলায় বসে আছেন আমার গত জন্মের অভাগী মা! আর কত সহ্য করবে সে?
বৃদ্ধার সেই অ্যালবামের থেকে ছবি আমার মোবাইলে তুলে নিয়েছি৷ স্বপ্নে যে যুবকের চেহারা দেখে বারংবার উঠে বসতাম, আমিই সে! গণিতের ব্যস্তানুপাতে সে-ই আমি৷ ঠাকুরের ভাষায়; ‘আই অ্যাম হি৷’
গত জন্মের আমি, বাবা, ঠাকুরদা, পিতামহ; সবাই অপঘাতে মরেছি একই জঙ্গলে৷ কলকাতা থেকে যেচে আমি কি এখানে মরতে এসেছি! কক্ষনও নয়, কাল ভোরবেলায় উলটপুরাণ গাইব৷ প্রয়োজন নেই আমার অর্থের, ঐশ্বর্যের৷ ওই আশরফি এখনও পকেটে রয়ে গেছে, এই দুর্দান্ত জীবনচক্রের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে লকারে রেখে দেব আমৃত্যু৷ রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হয়ে বাকি জীবন ঠিক কাটিয়ে দিতে পারব৷
ফ্লাস্কে রাখা গরম কফির সঙ্গে একটা কেক খেয়ে প্যারাসিটামল খেলাম৷ হাতঘড়িতে সময় রাত পৌনে দশটা৷ আধ ঘণ্টা পর ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল, ঘুমিয়ে পড়েছি৷ নাকে উগ্র গন্ধ এসে ধরা দিল, ঘুম ভেঙে গেল৷ নিজের ঝুঁকে-যাওয়া শরীর আর একমুখ হাসি নিয়ে পিণ্ডারিজি এসে বসে আছেন সামনের বেতের চেয়ারে, দৃষ্টি অস্বচ্ছ৷
এটা বোধহয় স্বপ্ন নয়, হয়তো বাস্তব অথবা ব্যাখ্যাতীত অন্যকিছু! নুইয়ে-পড়া শরীর নিয়ে তিনি আমায় জিজ্ঞাসা করছেন, ‘কেমন আছ অভিজিৎ?’
‘ভালো নেই একদম, বড্ড কষ্টে আছি, গুরুদেব৷’
‘কীসের কষ্ট?’
‘মায়ের এমন অসহায়তা দেখে কোনও সন্তান ভালো থাকতে পারে?’
‘মা, সন্তান এবং অন্যান্য সকল সম্পর্কের আধার হল মায়া৷ নিষ্কাম হতে শেখো, আরও সংযমী হও৷ সকল পরিস্থিতিকে স্বাভাবিকভাবে মানতে শেখো৷ যে মানুষের সংস্কারসিদ্ধ, সে কখনও বিচলিত হয় না৷ একটা কথা মাথায় রেখো, সমস্ত সম্পর্ক আপেক্ষিক, পরিস্থিতির মতো সেগুলো পালটে যায়৷’
দু-জনেই চুপচাপ৷ বৃদ্ধ পণ্ডিত মৃদু হাসছেন৷ কিছুক্ষণ পর উনি বললেন, ‘তুমি জানো, আমি মনের কথা বুঝতে পারি, তাই এলাম৷ ভুলেও এখান থেকে পালিয়ে যেও না৷ বেশ কিছু কর্তব্য বাকি আছে তোমার৷ এই জন্মে তোমার সেই সুযোগ এসেছে৷’
‘সুযোগ! কীসের সুযোগ?’
‘পঞ্চাঙ্গ খণ্ডনের সুযোগ!’
‘পঞ্চাঙ্গ! সেটা কী?’
‘কর্মফলের দোষে কুলদেবতা অথবা কোনও মহান ঋষি কুপিত হলে বংশে পঞ্চাঙ্গের অভিশাপ লাগে৷ একই বংশের পরপর পাঁচজন পুরুষের মৃত্যু বা অপমৃত্যু হয়৷ এর আগে চারজনের মৃত্যু সেই সিদ্ধান্ত বজায় রেখেছে, তুমি সেই অভিশাপ খণ্ডন করবে, না হয় তোমারও অপঘাতে মৃত্যু হবে৷’
আমি থমকে গিয়েছি৷ সারা শরীর ভিজে ঘাম চুঁইয়ে পড়ছে, তবু জ্যাকেট খুলতে পারছি না, বোধশক্তি হারিয়েছি৷ হঠাৎ কেঁদে ফেললাম৷
বৃদ্ধ পিণ্ডারিজি মুখে হাসি নিয়ে চুপ করে বসে আছেন৷ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললেন, ‘শান্ত হও, নিজেকে নিয়ে ভাবো৷ যেমন বলছি, তেমন করো, মৃত্যু তোমায় স্পর্শ করতে পারবে না৷ আমায় বিশ্বাস করো, নিজের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনো৷ আত্মবিশ্বাস যার নেই, ঈশ্বর তাকে কখনও কৃপা করেন না৷’
‘কী করতে হবে আমায়?’
‘আগামী পরশু ভূতচতুর্দশী৷ তার পরের দিন কালীপুজো৷ পরশু দিন সন্ধ্যাবেলায় সূর্যাস্তের মুহৃর্তে তুমি এখান থেকে নিজের বাহন সমেত রওনা দেবে কান্দার জঙ্গলে৷ তোমার ওই প্লাস্টিকের ব্যাগে কী আছে, জানো?’
‘না, আমি খুলে দেখিনি এখনও৷’
‘মন্ত্রপূত লবণ, গোলাপজল, প্রদীপ, ঘৃত, সাপের খোলস৷’
‘এগুলো আমি কী করব?’
‘আগামিকাল স্থানীয় দোকান থেকে একটা কোদাল কিনবে৷ চা-বাগানের গুপ্ত ধ্বংসস্তূপের নির্দিষ্ট স্থানে এক হাত গভীর খননকার্য চালাবে, সেখান থেকে উদ্ধার হবে সুপ্রাচীন এক ছিন্নমস্তার বিগ্রহ৷ গোলাপজল দিয়ে তাকে স্নান করিয়ে, ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালিয়ে আরতি করবে৷ ব্যাগ থেকে বের করে লবণ এবং সাপের খোলস সেই গর্তে একসঙ্গে পুঁতে দিয়ে মাটি চাপা দেবে৷’
‘তারপর?’
‘ব্রাহ্মমুহৃর্তে সেই মূর্তি বিসর্জন করে দেবে সরযূ, গোমতী এবং গুপ্ত ভাগীরথী নদীর সংগমস্থলে৷ ব্যস, এখানেই তোমার আসল কাজ শেষ৷ মূর্তির সঙ্গে কোদাল ভাসিয়ে দেবে৷ ফিরতি পথে কালিকা মন্দির দর্শন করে হাতে তৈরি একটি নতুন কম্বল কিনে মা কালীর পায়ে স্পর্শ করিয়ে এখানে ফিরে এসে বৃদ্ধার শরীরে চাপিয়ে দেবে এবং তাঁকে তোমার এখানে আসার উদ্দেশ্য খুলে বলবে, উনি বিশ্বাস করবেন তোমার কথায়৷ তোমাকে আসতে হবে এর পরের বছর শিবরাত্রিতে, কারণ সেই দিন ওই ভদ্রমহিলার মৃত্যু ধার্য করা হয়েছে৷ সেইদিন ওঁর জন্মদিন, সেদিনই বৃদ্ধার মৃত্যু হবে৷ এই বাড়ি বিক্রি করে সমস্ত অর্থ দান করে দিও যেকোনও ভগ্ন মন্দিরের সংস্কারের কাজে৷’
ভদ্রলোক থেমে গেছেন৷ চিন্তাভাবনা করে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এতগুলো কাজ আমি একা পারব?’
দুষ্টুমি-মাখানো হাসিমুখে পিণ্ডারিজি বললেন, ‘একজন অনাহৃত অতিথি থাকবেন তোমার সঙ্গে৷ ছিন্নমস্তার মূর্তির পাদদেশে একান্নটি স্বর্ণমুদ্রার একটি বাক্স থাকবে, ওটি তোমার পারিশ্রমিক৷’
‘অত অর্থ আমি কী করব?’
‘সেটা তোমার ব্যক্তিগত ব্যাপার৷ জন্মান্তরের পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার তুমি৷ সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তোমার৷’
খানিকক্ষণ চুপ থেকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘অনাহৃত অতিথির নাম কী?’
‘গোটা ভারতবর্ষের বন্ধ মন্দিরে যিনি পুজো করেন, তেমনই একজন৷’
‘কে তিনি, কী নাম তাঁর?’
পিন্ডারীজি কোনও উত্তর দিচ্ছেন না৷ মাথায় আরও একটা প্রশ্ন এল, জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমার প্রতি আপনার অপত্যস্নেহের কারণ কী?’
মৃদু হেসে পিণ্ডারিজি বললেন, ‘বহু বছর ধরে ঈশ্বর যখন বন্দি থাকেন, নির্দিষ্ট সময়ের পর যখন তাঁর মুক্ত হওয়ার সংযোগ তৈরি হয়, তখন এক বিশেষ শুভমুহৃর্তে তাঁর বিসর্জনের আয়োজন করা হয়৷ এই বিশেষ কর্মকাণ্ডে যিনি বা যাঁরা সাহায্য করে থাকেন, তাঁদের কর্মবন্ধন থেকে মুক্তি মেলে৷ তোমাকে যিনি সাহায্য করতে আসবেন, তাঁর নাম দ্রোণি৷’
যেমন হঠাৎ এসেছিলেন, তেমনই মিলিয়ে গেলেন পিণ্ডারিজি৷ হতবাক অবস্থায় আমি বসে আছি৷ জ্বর আমার শরীর ছেড়ে চলে গেছে বহু দূরে৷ পুবের আকাশ লাল, জানালার লোহার ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখলাম, বৃদ্ধা এক ঘটি জল ঢেলে সূর্যপ্রণাম করছেন৷ শরীরের কুঁচকে-যাওয়া চামড়া, পশমের মতো একমাথা সাদা চুল, কাঁপতে-থাকা গলায় উনি বলে চলেছেন: ওঁ নমঃ বিবস্বতে ব্রহ্মণ ভাস্বতে বিষ্ণু তেজসে জগৎ সবিত্রে...
বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চা-জলখাবার খেতে৷ জ্বর উবে গিয়ে এই শরীর এখন ঝরঝরে৷ বেলার দিকে স্থানীয় হার্ডওয়্যারের দোকান থেকে একটা কোদাল কিনতে হবে৷ মানসিক প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে এসেছি, এবার হবে আসল লড়াই৷ নিজের মৃত্যুযোগ খণ্ডনের লড়াই৷
সূর্যের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গিয়ে উঠলাম:
‘খণ্ডন ভব বন্ধন জগ বন্দন বন্দি তোমায়৷
নিরঞ্জন নর-রূপ-ধর নির্গুণ গুণময়’
পাহাড়ি জনপদে দীপাবলির আয়োজন শুরু হয়েছে৷ মানুষ তার নিজের ঘরবাড়ি, উঠোন, মন্দির রাঙিয়ে তুলছেন রং এবং আলপনার বাহারে, এদিকে বলে রঙ্গোলি৷
মাথার কেশ, মেহেন্দির রঙে রাঙিয়ে তোলার চেষ্টা চলছে৷ বিহার, উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, গাড়োয়াল, কুমায়ুন; বিবাহিত মহিলাদের হাতে মেহেন্দির নকশা আর কাচের চুড়ির শোভা দেখার মতো৷
নগদ তিনশো কুড়ি টাকায়, হাতল সমেত কোদাল কিনে, দু-চারজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে আড্ডা মেরে, নিরামিষ খাবার প্যাক করিয়ে ঠিকে ভাড়াটের মতো ফিরেছি নিজেরই পূর্বজন্মের ভিটেয়৷ ইচ্ছা করছে, বৃদ্ধাকে গিয়ে সব কথা উগরে দিই, আমাকে জড়িয়ে সে মানুষ কিছুটা অন্তত আশ্বস্ত হবে৷
ফিরতি রাস্তায় অতিবৃদ্ধ এক মানুষের সঙ্গে দেখা পেলাম৷ মিঠে রোদ্দুর পিঠে মেখে তিনি অদ্ভুত দেখতে একরকম বাঁশি বাজাচ্ছেন৷ সুর ভীষণ চেনা মনে হতে বাইক থেকে নেমে দাঁড়িয়েছি, আরও কিছু পর্যটক দাঁড়িয়ে আছেন৷ কোথাও যেন এই সুর শুনেছি এর আগে, কিছুতেই মনে করতে পারছি না৷ ভদ্রলোকের আন্দাজ বয়স নব্বইয়ের কাছাকাছি৷
চোখ বন্ধ করে উনি একমনে সুর টেনে চলেছেন৷ পাহাড়ি সুরের অদ্ভুত ওঠা-পড়া এবং বিস্তার৷ সুরের স্রষ্টা এবং সৃষ্টি; দু-জনেই ভীষণ চেনা, কিছুতেই মনে পড়ছে না, স্মৃতি বিশ্বাসঘাতকতা করছে, কী যেন নাম...
খানিকক্ষণ পর ভদ্রলোক চোখ খুললেন, স্বতঃস্ফূর্ত হাততালি দিয়ে উঠলাম৷ চিনতে পেরেছি৷ যথেষ্ট বয়স হয়েছে এই মানুষের, শরীরের চামড়া কুঁচকে আছে৷ চোখ ছোটো করে ভিড় ঠেলে কিছুটা এগিয়ে এলেন আমার দিকে, আপাদমস্তক ভালো করে দেখে নিয়ে কাঁপা গলায় বললেন, ‘আপনি কি কখনও আমার ছাত্র ছিলেন?’
ঘোর কাটিয়ে চটপট জবাব দিলাম, ‘‘না তো! আমি টুরিস্ট, প্রথমবার এখানে বেড়াতে এসেছি৷’
বাইক নিয়ে ফিরছি, চোখের কোলে জল এসে ভিড়েছে৷ স্মৃতি ফিরে এসে ছিটকে যাচ্ছি নিজের কাছ থেকে৷ যে মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ দুটোই অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে, তার বর্তমান ভালো হয় কী করে?
আজকাল অল্পেই চোখে জল চলে আসে, আগে এমন হত না৷ এখন, এই মুহৃর্তে একটা কথা মাথায় ঘুরছে; কলকাতায় আমার গর্ভধারিণী মা যদি বেঁচে থাকতেন, এ সময় ভীষণ কষ্ট পেতেন৷ আমাকে এ অবস্থায় উনি দেখতে পারতেন না৷ ভগবান যা করেন, মঙ্গলের জন্যই করেন৷
ঘরে ফিরে বৃদ্ধার হাতে খাবার দিয়ে, নিজের অংশ নিয়ে দোতলায় উঠে এসেছি৷ দেওয়ালে প্রমাণ সাইজের রাধাকৃষ্ণর প্রাচীন ছবি, যেন একই শরীরের দুই অংশ৷ আমার মৃত্যুর পর রত্নাবলির কী হয়েছিল, কে জানে! সে কি এখনও বেঁচে আছে?
দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমিয়ে, বিকেলে উঠে সামনের চায়ের দোকানে বসে আছি৷ কী মনে হতে পাশের দোকান থেকে এক বান্ডিল নাইলনের মজবুত দড়ি কিনে ফেললাম৷ মন বলছে, হয়তো কাজে লাগবে৷ সময় বাড়ছে, উত্তেজনার পারদ ক্রমশ চড়ছে৷
রত্নাবলি নামে সামনের চায়ের দোকানের ভদ্রলোক কাউকে চেনেন না৷ অবশ্য ভদ্রলোক এই অঞ্চলে এসেছেন, কুড়ি বছর হল, ইতিহাস আরও আগের৷
রাতে খেয়ে, ঘুমিয়ে পরের দিন সকাল দশটায় ঘুম ভেঙেছে৷ চা-জলখাবার খেয়ে আবার শুয়ে পড়েছি, নাক থেকে জল ঝরছে৷ অ্যান্টি অ্যালার্জি একটা ওষুধ খেয়ে আবার ঝিমিয়ে পড়েছি৷ ঘুম ভাঙল বিকেল পাঁচটায়, শরীর ঝরঝরে৷ ঘরের দেওয়ালে ঝুলতে-থাকা রাধাকৃষ্ণর ছবিতে প্রণাম করে, প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিসপত্র এবং কোদাল বেঁধে নিয়ে বাইক স্টার্ট করে রওনা দিলাম এখান থেকে পঁচিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কান্দা, স্থানীয় লোকেরা একে কান্দিও বলে থাকেন৷
পঁচিশ কিলোমিটার রাস্তা যেতে প্রায় পঞ্চাশ মিনিট সময় লাগল৷ রাস্তার অবস্থা ভালো নয়, আলো প্রায় নেই বললেই চলে৷ গাড়ির হেডলাইট ভরসা৷ একটা মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে, কিছুক্ষণ ব্যায়াম সেরে নিয়েছি৷ গুগল ম্যাপ বলছে এটাই কান্দা চৌরাহা৷
স্থানীয় এক দোকানে বসে চা-বিস্কুট খাচ্ছি৷ ভারী মুখরোচক স্বাদ স্থানীয় বেকারি বিস্কুটের৷ ময়দা, নারকেলের কুচো এবং জোয়ান দিয়ে আগুনে সেঁকা ভীষণ খাস্তা এই বিস্কুট৷ মুখে দিলেই মিলিয়ে যায়, কামড় বসালেই কড়মড় শব্দ কানে আসে৷ আহা!
পাশের দোকানে দু-চারজন শিশু বাজি কিনছে দরদাম করে৷ তুবড়িকে এদিকে বলে ‘আনার’৷ চরকিকে বলে চকরগিন্নি৷ সময় সন্ধে সাতটা, কারও দেখা নেই৷ আরেক দফা চা-বিস্কুট খেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছি৷ অপেক্ষা করার মতো ফালতু কাজ আর হয় না৷ নাকে অদ্ভুত গন্ধ আসছে৷
খালি পায়ে, কম্বলের মোটা চাদর দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢেকে একজন মানুষ এসেছেন হনুমান-টুপি পরে৷ টুপির ওপরে জড়ানো কাপড়ে বাঁধা পাগড়ি৷ ভদ্রলোক কাছে এসে দাঁড়ানো ইস্তক একটা অস্বস্তিকর গন্ধ পাচ্ছি৷ ওঁর চেহারা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও চোখের জ্যোতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে৷ চওড়া কাঁধ, উন্নত নাসিকা এবং দৃঢ় চোয়াল৷
আমি উঠে দাঁড়াতে, হাতজোড় করে নমস্কার সেরে বললেন, ‘আমার নাম দ্রোণি৷ উত্তরের পাহাড়ে থাকি, আপনার বিশেষ প্রয়োজনে আমি আজ এখানে এসেছি৷’
কিছু বলার আগেই ভদ্রলোক বলতে শুরু করেছেন, ‘কিছুটা এগিয়ে গেলে বিস্তৃত চা-বাগান দেখতে পাবেন৷ ডান হাতের চা-বাগানের মাঝখানের সরু রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলে ঘন জঙ্গল শুরু হবে, আপনার মোটরবাইক সেখানে রেখে জঙ্গলের সরু পথে এগিয়ে যাবেন প্রায় তিন কিলোমিটার৷ রাস্তা মোটেই ভালো নয়, সাবধানে যাবেন৷ এক জায়গায় আমায় ঠিক খুঁজে পাবেন, বাকি কথা সেখানেই হবে, আমি আসি৷’
ফিরে যেতে গিয়ে দু-পা পিছিয়ে এসে ভদ্রলোক বললেন, ‘একটা কথা মাথায় রাখবেন, হিংস্র জন্তু বা অপর কোনও প্রতিক্রিয়ায় আপনি নিজেকে সংযত রাখবেন, পিছনে ফিরে তাকাবেন না, উত্তর দেবেন না৷ আপনার কাছে যা জিনিস আছে, কেউ ক্ষতি করতে পারবে না৷ সোজা এগিয়ে যাবেন গন্তব্যে৷’
‘গন্তব্য চিনব কেমন করে?’
‘পথ আপনাকে ঠিক চিনে নেবে, পথিক ঠিক থাকলেই হল৷’
প্রশ্ন করার দ্বিতীয় সুযোগ না দিয়ে ভদ্রলোক চলে গেলেন তীব্র গতিতে৷ বসে রইলাম চুপচাপ৷ মনে হল, কোনও প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে উনি এসেছেন নিজের কর্তব্য পালন করতে৷
আরেক রাউন্ড চা-সিগারেট টেনে বাইক সমেত এগিয়ে গেলাম৷ ঘোর অমাবস্যার অন্ধকার রাত্রি, পথেঘাটে অসংখ্য শেয়াল ও অন্যান্য হিংস্র প্রাণী ঘোরাফেরা করছে৷ পরিস্থিতির বিচারে আমি নির্ভীক অথবা নিরুপায়৷ গোটা হৃদয় জুড়ে শুধুই উৎকণ্ঠা৷ যে খোঁজে বেরিয়েছিলাম, সেই রঙ্গমঞ্চের অন্তিম দৃশ্য উপস্থিত৷ এগিয়ে চলেছি পাহাড়ি হাওয়া শরীরে মেখে৷ রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ৷ বেশ কয়েকবার পিছলে গিয়ে সামলে উঠেছি৷ পরিস্থিতির থেকে বড়ো শিক্ষক কেউ নেই৷ এক জায়গায় এসে থামতেই হল৷
পথ এখানে শেষ হয়ে গেছে, এরপর ছোটোবড়ো পাথরের স্তূপ এবং জঙ্গলের শুরু৷ বাইক থেকে নেমে, এক হাতে প্লাস্টিকের থলে, কাঁধে নাইলনের দড়ি আর কোদাল, পকেটের ভিতরে একটা কাপড়ের ব্যাগ মুড়ে এনেছি৷ একটা জলের বোতল আর মির্জা সাহেবের আশরফি নিয়ে, মোবাইলের টর্চ জ্বলে লটবহর সমেত হেঁটে চলেছি সরু পাথুরে রাস্তা ধরে, এ রাস্তায় একজন মানুষ কোনওক্রমে হাঁটতে পারে, দু-জন পাশাপাশি হাঁটা অসম্ভব৷
পিছলে যাওয়ার তাগিদ প্রতিমুহৃর্তে, পড়ে গিয়ে হাড় না ভাঙলেই হল৷ রাস্তা এবং পরিস্থিতির বিচারে আন্দাজ আড়াই কিলোমিটার পথ পৌঁছোতে লাগল প্রায় আড়াই ঘণ্টা৷ হাঁপিয়ে পড়েছি, সেই মানুষের এখনও দেখা পাইনি৷
হঠাৎ কান সজাগ হয়ে উঠেছে৷ এক জায়গায় বিশ্রাম নিতে কিছুক্ষণ বসেছিলাম, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মোবাইলের আলোয় দেখি, সামনে প্রমাণ আকারের তেন্দুয়া! চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম৷
সে এল, এক হাত তফাতে আমার ঘ্রাণ নিল এবং বিদায় নিল, এই মুহৃর্তে আমি অস্পৃশ্য৷ এ শরীরের মাংসের স্বাদ কি তেতো?
কিছুক্ষণের বিরতি নিয়ে পথের চিহ্ন দেখে পাহাড়ের ওপরদিকে উঠতে শুরু করেছি৷ মোবাইলের আলোয় দেখতে পাচ্ছি, পাথরের ধাপ কাটা আছে, কিছুটা এগোতেই বিকট হাসির শব্দ পেলাম৷ শুধু হাসি নয়, অশরীরী নিশ্বাস পড়ছে ঘাড়ের কাছে৷ দ্রোণির কথাগুলো মাথায় এল, সমস্ত ভয় চেপে রেখে এগিয়ে গেলাম অনেকটা ওপরের দিকে৷ পায়ের তলার মাটি হঠাৎ কেঁপে উঠল৷

মুহৃর্তের মধ্যে এক বিশালাকার পাথরের খণ্ড ওপরদিক থেকে নেমে এসে শরীর ঘেঁষে গড়িয়ে চলে গেল খাদের দিকে৷ আমি অবিচল, অনিত্য, অদম্য জেদ নিয়ে এগিয়ে চলেছি৷ পরিস্থিতি শক্তি দিয়েছে, হয় জিতে ফিরব, না হয় মরব, পালানোর পথ বন্ধ৷ কার্য সম্পন্ন না হলে, আগামী জন্মে আবার স্বপ্ন দেখতে হবে, পথ খুঁজে আসতে হবে এখানেই৷
বাঁচার অদম্য ইচ্ছে আমাকে এই অব্দি টেনে এনেছে৷ গত জন্মের চার পুরুষ যা পারেননি, এ জন্মের পঞ্চম পুরুষকে তা পারতেই হবে৷ এতজন মহান সাধকের আশীর্বাদ রয়েছে আমার সঙ্গে, সব হেরে যাবে? অসম্ভব! ঘাড়ের কাছে আরেকবার গরম হাওয়া ছুঁয়ে যেতেই, থমকে গিয়েছি৷ একবার প্রতিবাদ করা দরকার৷
চিৎকার করে গায়ত্রী মন্ত্রপাঠ শুরু করলাম৷ এই বিশ্বসংসারে এর থেকে শক্তিশালী মন্ত্র আর কিচ্ছু নেই৷ জীবনবাবু জানিয়েছিলেন, যে মন্ত্র শুরু হয় ওঁ দিয়ে এবং শেষ হয় ওঁ দিয়ে, তার শক্তি অসীম, সকল বীজমন্ত্রের আধার হল গায়ত্রী মন্ত্র৷
এই মুহৃর্তে পৃথিবীর সব থেকে শক্তিশালী এবং সাহসী পুরুষ আমি৷ রিচার্ড ফাইনম্যান, মার্ক টোয়েন, মার্কস, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে গীতা, ভাগবত এবং উপনিষদ-পড়া সনাতন শক্তির আকর আমার শিরদাঁড়া তৈরি করেছে, হেরে গেলে চলবে? এগিয়ে চলো৷ সমস্ত অভিশাপ খণ্ডিত হবে কর্মের দ্বারা৷
আরও দশ মিনিট পর চড়াই শেষ, এবার উতরাই৷ নীচের দিকে দশ কদম নামতেই স্বয়ং গন্ধমাদন আলো করে দাঁড়িয়ে আছেন৷ এই ভদ্রলোক হেঁটে আমার থেকে আগে পৌঁছোলেন কীভাবে? অন্য কোনও শর্টকাট রাস্তা নিশ্চয়ই আছে, আমাকে বলেননি৷ ওঁকে দেখে অপরিষ্কার মনেই হয় না, এই উৎকট গন্ধের রহস্য জানতে হবে৷
ওঁর কাছে পৌঁছোতে, একটি সমতল পাথর দেখিয়ে বসতে ইশারা করে ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি বিশ্রাম নিন এখানে৷’
পাথরের ওপর বসে চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে দেখছি৷ ভদ্রলোক একটা কাজ ভালো করেছেন; দুটো পেল্লায় জ্বলন্ত মশাল মাটিতে গুঁজে রেখেছেন৷ জন্মে এর আগে কোনওদিন মশাল দেখিনি৷ তেমন হাওয়া না-থাকায়, মশাল দুটো দাপটের সঙ্গে জ্বলে চারপাশ আলোয় মুড়ে রেখেছে৷ বেশ কিছু পোকা সেই আগুন ঘিরে বনবন করে ঘুরছে৷ শমা-পরওয়ানা, যুগযুগান্তরের পরিপূরক৷
পকেট থেকে বোতল বের করে এক ঢোঁক জল খেয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে সামনে দাঁড়ানো গন্ধমাদনকে একটা সিগারেট অফার করলাম৷ ভদ্রলোক হাত জোড় করলেন৷ কী যেন নাম বলেছিলেন নিজের? দ্রোণি;এই নাম আগে কোথাও যেন শুনেছি অথবা পড়েছি, যা-ই হোক, নামে আর কী-ই বা আসে-যায়!
চোখ তুলে একবার সেই মানুষের দিকে তাকালাম৷ একসময় কুস্তি শিখেছি, এখনও মাঝেমধ্যে প্যাকটিস করি, মুগুর ভাঁজি৷ চেহারার কাঠামো দেখে আন্দাজ করা যায়, পরম শক্তিশালী পুরুষ আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন৷ শুধু... ওই গন্ধটুকু... যাক গে৷
আমি উঠে দাঁড়াতে, ভদ্রলোক অঙ্গুলিনির্দেশ করলেন পাশের দুটো গাছের মাঝখানে৷ কিছুটা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, প্রায় সাত ফুট জায়গা জুড়ে ঝরে-যাওয়া গাছের পাতা এবং কিছু পাথরখণ্ড পড়ে আছে৷
জ্যাকেট খুলে কোমরে বেঁধে নিয়েছি৷ প্রতিটা পাথরের ওজন কম করে বিশ-পঁচিশ কিলো হবেই৷ আমার ওজন আটাত্তর কিলো, উচ্চতা ভালোই, ওজন সম্বন্ধে আমার আন্দাজ আছে৷ একটানা দশটা পাথর সরিয়ে হাঁপ ছেড়ে দাঁড়িয়েছি, এগারো নম্বর পাথর তুলতেই এক বিষধর সাপ সটান ছোবল মারলে, মশালের আলোয় ফোটো ফিনিশে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি৷ গন্ধমাদন চিল্লিয়ে উঠলেন, ‘ব্যাগ থেকে কুঞ্চক বের করুন এক্ষুনি৷’
‘কাঁচি তো আনিনি!’
বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ভদ্রলোক বললেন, ‘কুঞ্চক মানে সাপের খোলস৷’
সেই পরম বস্তু বের করতেই, সামনের দীর্ঘ চেহারার সাপবাবাজি শান্ত হয়ে গেছেন৷ এতটা কষ্ট করে এতদূর এসে সাপের কাছে হার মানার কোনও মানেই হয় না৷ কিছু বিশেষ লক্ষণ দেখে বোঝা যায় এ সাধারণ প্রাণী নয়৷ সরীসৃপের শরীরে অদ্ভুত কিছু যতিচিহ্ন লক্ষ করা যাচ্ছে৷ আমি অবাক হয়ে দেখেই চলেছি৷
চোখ-জুড়োনো রূপ এই প্রাণীর, সুদীর্ঘ অবয়ব, ফণার নীচের অংশ গাঢ় নীল রঙের ওপর সবুজের আভা স্পষ্টত দৃশ্যমান৷ চোখ দুটোয় অদ্ভুত অভিব্যক্তি৷ মোহাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে দেখেই চলেছি, সে-ও এক-সমুদ্র জিজ্ঞাসা নিয়ে আমার পানে তাকিয়ে আছে৷
আমি দাঁড়িয়ে আছি দেখে দ্রোণি বললেন, ‘আপনি এগিয়ে গিয়ে ওকে স্নেহ জানিয়ে দিন, ও মুক্ত হতে চায়৷’
‘আমি ছুঁলেই ও মুক্ত হবে, এত শক্তি আমার?’
‘হ্যাঁ, এই মুহৃর্তে আপনি বিশেষ আশীর্বাদধন্য৷ বহুকাল ধরে অপেক্ষারত এই সরীসৃপের কর্তব্য আর সাধনা দুটোই শেষ৷ কলিযুগে ওর দায়িত্ব-কর্তব্য থেকে রেহাই পেল শেষ পর্যন্ত৷’
এর আগে একাধিকবার সাপ ধরার অভিজ্ঞতা আছে৷ জোরাবরের সঙ্গে আলাপের পর ভয় কেটে গেছে অনেকটাই৷ ধীরপায়ে সেইদিকে এগিয়ে গেলাম৷ নিজের দ্বিখণ্ডিত জিভ বের করে সে জাগতিক সবকিছু বোঝার চেষ্টা করছে৷ প্রশ্রয় পেয়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম৷
অবাক কাণ্ড! কাছে যেতেই তিনি সোজা আমার পকেটে ঢোকার চেষ্টা করছে! মনে পড়ল, ওই পকেটে মির্জা সাহেবের দেওয়া আশরফি আছে৷ কোনওরকমে ওকে উদ্ধার করে পার্শ্ববর্তী গাছের ডালে তুলে দেওয়ামাত্র নিমেষের মধ্যে কোথায় চলে গেল! কিছুক্ষণ ওকে খোঁজাখুঁজি করে কাজে মন দিলাম৷
আরও তিনটে ভারী পাথরখণ্ড সরানোর পর মাটি ও পাথরের তৈরি এক যজ্ঞবেদি দেখতে পেলাম, তন্ত্রমতে সেখানে শ্রীযন্ত্র স্থাপন করা আছে৷ বহুকালের অবহেলায় ফাটল ধরেছে৷ দ্রোণি এগিয়ে এসে বেদি স্পর্শ করে প্রণাম করলেন, অনুমতি চাইলেন এবং করজোড়ে পিছিয়ে গেলেন৷
আরও কিছু সময় পর পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা মানুষের নির্দেশে, কোদাল তুলে সপাসপ চালাতে শুরু করেছি৷ এক ঘণ্টার মধ্যে এক হাত গভীর তিন হাত চওড়া গর্ত হয়ে গেল৷ ‘দ্রোণি’ বাবাজি এগিয়ে এলেন আমার কাছে, হাতের ইশারায় কাজ বন্ধ করতে বললেন৷ এই ঠান্ডাতেও আমার শরীর ঘেমে উঠে সপসপ করছে৷
পাশে দাঁড়িয়ে-থাকা ভদ্রলোকের কথা অনুযায়ী এবার হাত দিয়ে মাটি সরাতে শুরু করেছি৷ প্রকৃতির নিজস্ব একটা মিষ্টি গন্ধ আছে, সে সুবাস চাপা পড়ে গেছে পাশে দাঁড়ানো মানুষের শরীর থেকে আসা উৎকট গন্ধে৷ আমার গন্ধ-গ্রন্থি নিশ্চিত অবশ হয়ে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই৷ মাটির নীচে কীসের যেন স্পর্শ পেলাম৷
চামড়ার হাত, পাথরে স্পর্শ পাওয়ামাত্র শরীরে শিহরন জেগে গেছে৷ বৈদ্যুতিক শক-খাওয়া মানুষের মতো এক হাত দূরে ছিটকে পড়েছি৷ কে বলে, পাথরে প্রাণ নেই?
তামাম দুনিয়ার সব কিছুই প্রাণবন্ত৷ জড় আর জীবন; এক ও অভিন্ন, তফাত স্বল্প আছে অবশ্য৷ চামড়ার শরীরে যতক্ষণ আত্মা জুড়ে আছে, ততক্ষণ সে জীবন৷ আত্মা বেরিয়ে গেলেই শরীর জড় এবং পচনশীল৷ যে পাতা গাছে লেগে থাকে, তার প্রাণ আছে, ঝরে-যাওয়া পাতা নিষ্প্রাণ৷ যে পাথরে ঐশ্বরিক শক্তি আছে, মানুষের ভক্তি আছে, সে বিগ্রহ, না হলে সে অতি সাধারণ পাথর৷
দ্রোণি এগিয়ে এসেছেন৷ কম্বল খুলে পাশের মাটিতে রাখলেন৷ হাঁটু মুড়ে বসলেন দক্ষিণ অভিমুখে, আমার চক্ষু সার্থক হল৷
এ শরীর না ভাস্কর্য! মুগ্ধ হয়ে মশালের আলোয় কাঠামো দেখছি, বিভোর হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ৷ এমন সুন্দর চেহারায় এত বিদঘুটে গন্ধ! শরীরের প্রত্যেকটা পেশি ভরাট, উন্নত এবং সম্পূর্ণ৷
আচমকা ভদ্রলোক খোলা গলায় মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করলেন, গলার দাপট শুনে আমি চমকে উঠেছি; শব্দের প্রতিটি অনুরণন হিল্লোল তুলেছে হিমালয়ের এই বিশেষ স্থানে৷ অমন উচ্চারণ আমি এর আগে কোনওদিন শুনিনি! কে এই দ্রোণি! ব্যারিটোন ভয়েস এবং নিখুঁত উচ্চারণে বলে চলেছেন:
‘এনাংকাশুপরেশভাল ফলকাং বালার্ককোট প্রভাং,
জ্বালাবদ্ধমহার্ঘরত্ননিচয়াং কন্দপর্দপোজ্জ্বলাম৷
শূলাক্ষাং কুশপাশবেণুমুষলাংভোজাভয়ান,
বিভ্রতীং ভক্তেষ্টাং ছিন্নমস্তকাং ভগবতী
ধ্যায়েদ হৃদব্জে সদা৷৷’
আমাকে তিনবার প্রদক্ষিণ করে বজ্রাসনে বসে এই মন্ত্র বারবার জপে চলেছেন দ্রোণি৷ প্রায় আধ ঘণ্টা পর উনি থামলেন, আমাকে বললেন, ‘মা ছিন্নমস্তাকে এবার আপনি ধরিত্রী থেকে তুলে আনুন নিশ্চিন্তে, ওঁর অনুমতি পাওয়া গেছে!’
জামার হাতা গুটিয়ে আবার কাজে মন দিলাম৷
এই মুহৃর্তে ভদ্রলোক ভুজঙ্গাসনে বসে ছিন্নমস্তা গায়ত্রী পাঠ শুরু করলেন: ‘ওঁ বিরোচন্যৈ বিদ্মহে ছিন্নমস্তায়ৈ ধীমহি তন্নো দেবীঃ প্রচোদয়াৎ ওঁ’
আরও প্রায় কুড়ি মিনিটের চেষ্টায় মা বেরিয়ে এলেন, সুতির কাপড় দিয়ে পরিষ্কার এক পাথরের ওপরে তাঁকে আমি দাঁড় করালাম৷

দ্রোণির মন্ত্রের উচ্চারণ আবার পালটে গেছে: ‘ওঁ হ্লীং শ্রীং ছ্রং ছিন্নমস্তকে ফট স্বাহা৷ ওঁ শ্রীং হ্লীং হ্লীং ঐং বজ্রবৈরোচনীয়ৈ হ্লীং হ্লীং ফট স্বাহা৷’
গোলাপজলে স্নান করিয়ে ছিন্নমস্তা মা-কে পরিচ্ছন্ন করা হল৷ অদ্ভুত ব্যাপার! এই মাঝরাতে, মাথার ওপরের কোনও এক অদৃশ্য গাছ থেকে লাল রঙের ফুলের বর্ষা শুরু হয়েছে মূর্তির ওপর৷ এযাবৎ ‘পুষ্পবৃষ্টি’র কথা শুনেছি, আজ চাক্ষুষ উপলব্ধি করলাম৷
কুচকুচে কালো পাথরের ওপর খোদাই করে বানানো সুপ্রাচীন এই প্রতিমামূর্তি৷ সামুদ্রিক ক্রিয়া ও রাজযোগের প্রমাণ হিসাবে নিজের মস্তক ধরে আছেন নিজের হাতে, অপর হাতে খড়্গ৷ অস্ত্রের নাম চন্দ্রহাস৷
মহাদেব সন্তুষ্ট হয়ে মহাপণ্ডিত রাবণকে উপহার দিয়েছিলেন এই খড়্গ৷ রাবণের ব্যবহারে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি চন্দ্রহাস ফিরিয়ে নেন এবং মেঘনাদকে উপহার দেন৷ দৃষ্টি ফিরিয়ে নিতে পারছি না মূর্তির আকর্ষণ থেকে৷
প্রতিমার দুই চোখে ছোট্ট হিরে বসানো, যার ঔজ্জ্বল্য আজও অক্ষত৷ প্রায় আড়াই হাত লম্বা প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকলে শরীরের প্রতিটি রোমকূপ উত্তেজনায় সাড়া দেয়, চোখে জল আসে৷ পুরোনো একাধিক স্মৃতি এসে একে একে ভিড় জমাচ্ছে এই মননে৷ ভূতকাল, বর্তমানকাল মিলেমিশে একাকার৷
ইশারায় আমাকে বসতে বলে দ্রোণি বললেন, ‘একটু অপেক্ষা করুন, আমি আসছি মুহৃর্তের মধ্যেই৷’
চুপ করে বসে আছি, দূর আকাশে একটা প্যারাসুট উড়ে যাচ্ছে বুকে এক টুকরো আগুন নিয়ে৷ অদূরে শেয়াল দম্পতি অবাক চোখে আমায় দেখছে৷ হয়তো ভাবছে, এ ব্যাটা পাগল নাকি!
মিনিট তিনেকের মধ্যে দ্রোণি ফিরে এলেন, হাতে কিছু শুকনো কাঠ৷ সেই কাঠ সাজিয়ে, পদ্মাসনে বসে, নিজের দুই হাত শুকনো কাঠের ওপর রেখে মন্ত্র উচ্চারণ করতে শুরু করেছেন:
‘ওঁ সপ্তজিহভায়া বিদমহে অগ্নি দেবা ধীমহি তন্ন অগ্নিঃ প্রচোদয়াৎ৷
বৈশ্বনারায় বিদমহে লালিলয় ধীমাঃ তন অগ্নিয়্যা প্রচোদয়াৎ৷’
মন্ত্রপাঠ করার দশ মিনিট পরেই অদ্ভুত ঘটনা ঘটল৷ সাজানো সমিধ থেকে কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়া বেরিয়ে আসছে ক্রমশ৷ ভদ্রলোক বললেন, ‘অর্ধেক শিশি ঘৃত জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে সমর্পণ করো৷’
শিশির অর্ধেক ঘি ঢালতেই, আগুনের শ্রীবৃদ্ধি হল৷ চোখের সামনে যা দেখছি তা অবিশ্বাস্য! জীবনে এই প্রথমবার দেখলাম আগুন, ক্রমশ এক বিশালাকার দৈত্যের শরীর ধারণ করেছে৷ তাঁর মাথায় অদৃশ্য মুকুট৷
দ্রোণি ভদ্রলোক ঘন ঘন হাতের মুদ্রা বদলে ফেলছেন৷ মন্ত্র উচ্চারণের অন্তিম পর্বে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন, নিজের ডান হাতে একটা ছুরি আমার দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘নিজেকে নির্বস্ত্র করে, বুকের মাঝখানের এক টুকরো রক্ত, বাম হস্তের মধ্যমার রক্ত, দক্ষিণ ঊরুর রক্ত এবং ডান পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুলের এক ফোঁটা রক্ত এই অগ্নিকে সমর্পণ করুন, হাতে সময় খুব কম৷’
নিজেকে নির্বস্ত্র করে ফেললাম৷ সেই আগুন ভয়াবহ রূপ নিতে শুরু করেছে৷ অদ্ভুত ব্যাপার! শরীরের বিভিন্ন জায়গার রক্তের ছিটে আগুনে পড়তেই, তার উচ্চতা ক্রমশ কমতে শুরু করল৷ দ্রোণি আমার হাত থেকে ছুরি চেয়ে নিয়ে সোজা চালিয়ে দিলেন নিজের হাতের চেটোয়৷ গলগল করে রক্ত ঝরছে তার হাত থেকে, মিনিট পাঁচেকের মধ্যে আগুনের দর্পচূর্ণ হল৷ ভদ্রলোক যজ্ঞের কালো ছাই এনে তিলক কেটে দিলেন মা ছিন্নমস্তার ললাটে৷ মুহৃর্তের মধ্যে মূর্তির অবয়ব ঘাম দিয়ে উঠেছে, এতকাল ভূতলে থেকেও তিনি ভীষণভাবে জাগ্রতা৷
আমার পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোক ছিন্নমস্তার পায়ের কাছে করজোড়ে বসেছেন, তাঁর চোখে জল, মূর্তির চোখেও জল, আমি নির্বাক এবং স্তম্ভিত!
উঠে দাঁড়ানোর পর দ্রোণিকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘জীবনে এই প্রথমবার আমি কোনও প্রতিমার অশ্রু দেখলাম, তাঁকে ঘামতে দেখলাম, এ কীভাবে সম্ভব?’
আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘একনিষ্ঠ কোনও সাধকের সাধনারত অবস্থায় অপমৃত্যু হলে, তাঁর চৈতন্য আটকা পড়ে যায় নির্দিষ্ট প্রতিমার অঙ্গে৷ আজ, এই মুহৃর্তে, রাজা চন্দ্রোদয়ের আত্মা মুক্ত হল৷ মা ছিন্নমস্তার পিশাচসাধনায় তিনি মহাযোগী রাবণকে পুনরুজ্জীবিত করতে চেয়েছিলেন, পারেননি৷ শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের গলা কেটে রক্ত দিয়েছিলেন মা ছিন্নমস্তাকে৷ সন্তানের এহেন আত্মত্যাগ হেতু মা ছিন্নমস্তা ভূগর্ভে প্রবেশ করেন৷ এই স্থান অভিশপ্ত হয় এবং বহিঃশত্রুর আক্রমণে মন্দির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়৷’
ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘কয়েকশত বছর পর আপনার গত জন্মের পূর্বপুরুষ, এই মন্দিরের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে আবার পুজো শুরু করেন৷ অসুরকুলের অনার্য মন্দিরে পুজো করার জন্য মহর্ষির দ্বারা শাপিত হলেন৷ আপনি এই বংশের না হলেও অভিশাপের পঞ্চম পুরুষ বটে৷ নতুন জনমে মানুষের জাতি, ধর্ম, গোত্র ইত্যাদি পালটে গেলেও... কর্ম, সাধনা, আশীর্বাদ, অভিশাপ; এগুলো খণ্ডিত হয় না, হিসাব না মিটলে মুক্তি নেই, আমি নিজে ভুক্তভোগী৷’
দ্রোণি থেমে গেছেন, চোয়াল শক্ত হয়ে উঠেছে ওঁর৷ আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘মাত্র পাঁচ পুরুষের অভিশাপে আপনি মুক্ত হয়ে গেলেন৷ দ্বাপর যুগ থেকে আমি এখনও অভিশাপ বহন করে চলেছি৷’
ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ ওঁর কথার অর্থ বুঝতে না পেরে আমি কাজে মন দিলাম৷ জামাকাপড় পরে নিয়ে, আরও কিছুটা মাটি সরাতেই একটা বাক্স এবং পঞ্চপ্রদীপ বেরিয়ে এল৷ এ সেই প্রদীপ, যাকে এতকাল স্বপ্নে দেখে এসেছি৷ স্বপ্ন আর বাস্তব যখন এক হয়ে যায়, তখন মানুষ ভাষাহীন হয়ে পড়ে৷ কিছুক্ষণ পর হুঁশ ফিরে পেলাম দ্রোণির ডাকে৷
বাক্স খোলা হল, একান্নটি প্রমাণ আকারের স্বর্ণমুদ্রা সংরক্ষিত আছে৷ ছাব্বিশটি আলাদা করে নিয়ে দ্রোণির সামনে ধরে বললাম, ‘এটা আপনার প্রাপ্য, নিতেই হবে৷ আপনি ছাড়া এই অভিযান অসম্ভব ছিল৷’
ভদ্রলোক হেসে ফেললেন৷ বললেন, ‘অর্থের কোনও প্রয়োজনীয়তা আমার নেই৷ ওই অর্থ আপনার পূর্বপুরুষের৷ দরিদ্রনারায়ণ এবং ঈশ্বরসেবায় ওই অর্থ ব্যয় করে দেবেন, বাকি আপনার ইচ্ছা৷’
অদ্ভুত মানুষ এই দ্রোণি৷ ওঁর নির্দেশনায় বাকি ক্রিয়াচার সম্পন্ন করে, যজ্ঞের বেঁচে-থাকা কাঠ, নুন, মাটিতে পড়ে-থাকা সাপের খোলস দিয়ে সেই গর্ত বন্ধ করে ক্লান্ত শরীরে মা ছিন্নমস্তার পদযুগলের সামনের থেবড়ে বসে পড়েছি৷ মূর্তির শরীর থেকে ধোঁয়া নির্গত হচ্ছে এ সময়, চোখের অলিন্দে উপচে-পড়া বারিধারা এবং অপূর্ব গন্ধে মাতোয়ারা চারপাশ৷ আমার ক্লান্ত শরীর কেঁপে উঠছে ক্রমাগত৷
এ জীবনে জ্ঞানত কারও কোনও অপকার করিনি, সকলের মঙ্গলকামনা করে উঠে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ পর৷ রাতের পরিবেশ পালটে যাচ্ছে ক্রমশ, আয়োজন সম্পূর্ণ করার সময় এগিয়ে আসছে৷
যাবতীয় জিনিসপত্র এক জায়গায় বেঁধে, কোদাল এবং মূর্তি দুই কাঁধে নিয়ে এগিয়ে চলেছি সংগমস্থলে৷ দু-হাতে মশাল নিয়ে আমার পাঁচ হাত দূরে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলেছেন দ্রোণি৷
প্রায় দেড় কিলোমিটার হেঁটে পৌঁছে গিয়েছি তিনটি সুপ্রাচীন নদীর সংগমস্থলে৷ ভদ্রলোক জানালেন, হাতে সময় আছে এখনও পনেরো মিনিট৷
পাথরের খাঁজে বসে একটা সিগারেট বের করেছি, মা ছিন্নমস্তার মুখের দিকে তাকিয়ে সেটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছি, মায়ের সামনে সিগারেট খাওয়া যায় না৷ নদীর সংগমস্থলের জলস্রোতের শব্দে মাতোয়ারা চারপাশ, সেইদিকে দৃষ্টি রেখে, দ্রোণি কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷
নির্দিষ্ট সময় ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘নিজেকে বস্ত্রহীন করুন, এবং ওই কোদাল, হাঁটু-জলে গিয়ে ভাসিয়ে দিন৷’
কথামতো কাজ করে আবার ফিরে এসেছি নিজের জায়গায়৷ ভদ্রলোক বেঁচে-থাকা অর্ধেক শিশি ঘি আমার হাতে ধরিয়ে বললেন, ‘এই ঘৃত মায়ের শরীরে ভালো করে মাখিয়ে, প্রণাম করে, সোজা রাস্তা ধরে এগিয়ে কোমর-জলে দাঁড়িয়ে, আমার দিকে মুখ করে মা ছিন্নমস্তাকে পিছনদিকে ভাসিয়ে সোজা চলে আসবেন আমার কাছে, ভুলেও পিছু তাকাবেন না৷’
আমি বোধহয় এই মুহৃর্তে নিজের মধ্যে নেই৷ দ্রোণি যেমন বলছেন, মন্ত্রমুগ্ধের মতো তেমনি করছি৷ ভদ্রলোকের মধ্যে অদ্ভুত এক আকর্ষণশক্তি আছে, তেমনি আছে অগাধ পাণ্ডিত্য৷ কিছুক্ষণ আগে ওঁর মুখে স্পষ্ট মন্ত্র উচ্চারণ যেমন শুনেছি, অমন আমি আর কারও মুখে শুনিনি, যেন শাস্ত্র স্বয়ং কথা বলছে৷
ভীষণ খরস্রতা নদীসংগম৷ অনেক কষ্টে কোমর অব্দি চলে পৌঁছোনো গেল৷ জলের মতো ঠান্ডা বোধহয় এই পৃথিবীতে আর কিচ্ছু নেই৷ শরীরের নিম্নাংশ অবশ হয়ে গেছে৷ ঝপাং শব্দে বিসর্জন সম্পন্ন হল৷ অনুভূতিহীন মন নিয়ে ফিরতি পথ ধরলাম৷
কোনওরকমে উঠে এসে জামাকাপড় গলিয়ে নিজেকে গরম করার চেষ্টা করছি৷ নদী সংগমের ওপার থেকে লালচে রঙের গোলাকার সূর্য নিজের প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ করার তাগিদে উঠে-পড়ে লেগেছেন৷ গোটা আকাশ লাল হয়ে উঠেছে৷ ভীষণ ক্লান্ত মনে হচ্ছে নিজেকে৷
আমার দিকে ফিরে এলেন দ্রোণি৷ ওঁকে দণ্ডবৎ প্রণাম সেরে উঠে প্রশ্ন করলাম, ‘আপনার অদ্ভুত পাণ্ডিত্য দেখে আমি সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছি, আপনার পরিচয় জানতে বড্ড ইচ্ছা করছে৷’
‘প্রাচীন শাস্ত্র এবং ধর্মগ্রন্থ ঘাঁটলে আমার বংশ এবং ব্যক্তিগত পরিচয় পাওয়া যায়, নিজের মুখে পরিচয় দেওয়া খুব একটা গর্বের বিষয় নয়৷ মানুষের কর্মে তার পরিচয়৷’
মাথা নিচু করে ফেলেছি৷ মিনিটখানেক সময় নিয়ে বললাম, ‘একটা প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতেই হবে৷’
‘সময় ভীষণ কম, তাড়াতাড়ি বলুন৷’
‘আপনার মতো অমন সুঠাম শরীর আমি খুব কম মানুষের দেখেছি, তেমনি আপনার মতো শারীরিক দুর্গন্ধ কোনও জীবিত মানুষের শরীরে পাইনি৷ একটু যদি বুঝিয়ে বলেন৷’
আমার দিকে স্পষ্ট দৃষ্টি হেনে ভদ্রলোক বললেন, ‘এরপর কিন্তু আর কোনও প্রশ্ন নয়৷’
‘বেশ৷ কথা দিলাম৷’
শরীর থেকে কম্বলের চাদর সরিয়ে, মাথার পাগড়ি খুলতে শুরু করলেন ভদ্রলোক৷ এরপর তিনি নিজের হনুমান-টুপি খুলে ফেললেন৷ অদ্ভুত সুন্দর মুখশ্রী, তেমনি দগদগে ঘা মাথার মধ্যে থেকে কপাল ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে৷ উগ্র বিকট গন্ধ সেই ক্ষতের উৎপত্তিস্থল৷ অমন সুপুরুষ যার মুখমণ্ডল, পেশিবহুল পুরুষত্ব যার শরীর থেকে চুঁইয়ে ঝরছে, তাঁর মাথায় অমন ঘা কেন!
আগের কথামতো আর কোনও প্রশ্ন করার উপায় নেই আমার৷ মনের কথা বুঝতে পারলেন কি না ভদ্রলোক, আমি ঠিক জানি না৷ উনি বলে উঠলেন, ‘মহাভারত পড়া আছে?’
‘হ্যাঁ৷’
‘দ্রোণি নামে কাউকে চেনেন না? যার পিতার নাম মহর্ষি দ্রোণ এবং মাতার নাম কৃপী৷’
বড্ড শরীর খারাপ লাগছে, একটু জল পেলে ভালো হয়৷ গলার কাছে শুকিয়ে আসছে দলা-পাকানো উৎকণ্ঠা৷ ভদ্রলোক এখন ব্যাখ্যার মেজাজে আছেন বোধহয়৷ উনি বললেন, ‘এই উপমহাদেশের শতসহস্র এমন মন্দির আছে, যাতে প্রতিমা পুজো পান না৷ সেইসব বন্ধ, গুপ্ত এবং অবহেলিত মন্দিরে আমি পুজো করে বেড়াই৷ আমাকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল দ্বাপরযুগে৷ কলি যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে, আমার মুক্তি নেই৷ বেঁচে-থাকা চিরঞ্জীবীদের মধ্যে আমি একজন৷ নমস্কার, আমার পরিচিত নাম অশ্বত্থামা৷’
চোখের সামনে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো আলোকমণ্ডলী ছড়িয়ে পড়ছে৷ অসহায়ের মতো আমি ক্রমশ মাটিতে এলিয়ে পড়ছি৷ জ্ঞান হারানোর চরম মুহৃর্তে বুঝতে পারলাম, কেউ একজন আমায় কাঁধে তুলে নিলেন৷ মৃদু শব্দে মহাপণ্ডিত রাবণ রচিত শিবস্তোত্র শুনতে পাচ্ছি, এরপর শুরু হল মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র৷
জ্ঞান যখন ফিরল, চোখ খুলে দেখলাম, যাবতীয় জিনিসপত্র সমেত আমি পড়ে আছি বাইকের সামনে, একটা পাহাড়ি কুকুর আমায় চেটে পরিষ্কার করছে৷ আশপাশে কেউ কোথাও নেই, থাকার কথাও নয় অবশ্য৷ জীবনে আর কোনও ভয়, দুর্বলতা, বাধাবিপত্তি, অশান্তি, স্বপ্নভ্রম রইল না৷ বাইক চালিয়ে, কান্দি বাজারে এসে স্থানীয়দের হাতে বোনা একটা কম্বল কিনে মা কালীর মন্দিরে মায়ের চরণ স্পর্শ করে ফিরে এসে বৃদ্ধার গায়ে চাপিয়ে দিয়েছি৷ ধর্ম-অর্থ-কাম এই জন্মের মতো সম্পূর্ণতা পেল, মোক্ষ পেতে এখনও অনেক দেরি৷
প্রায় অন্ধ একজন মা-কে, তাঁর ছেলের সঙ্গে এবং নিজেকে তার পূর্বজন্মের মায়ের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে হল আমায়৷ এ এক ভীষণ গুরুদায়িত্ব৷ নিজের পূর্বজন্মের অস্তিত্বের প্রমাণ দিতে হচ্ছে, এই জন্মের আমি কে!
ভদ্রমহিলা প্রথমে বিশ্বাস করতেই চাইছিলেন না, একের পর এক প্রশ্ন করে চললেন আমায়৷ সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর উনি থামতে, আমি প্রশ্ন করে বসলাম, ‘রত্নাবলির কী খবর?’
বৃদ্ধা কাঁদছেন৷ চোখের জল মুছে বললেন, ‘তুই অসুস্থ হওয়ার পর, ওর বাবা ওকে এখান থেকে সমতলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে৷ কেউ বলে, ও নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিল, আবার কেউ বলে ও নাকি বিদেশিদের হাতে... আমি ঠিক জানি না৷’
বৃদ্ধা, অসহায় মানুষকে আমি ওইভাবে ফেলে চলে আসতে পারিনি৷ কোনও এক জন্মের হলেও ‘মা’ শব্দতত্ত্বের গভীরতা আমার সব থেকে দুর্বলতার জায়গা৷
দিন দুয়েকের মাথায় গাড়ি ঠিক করে কৌশানি নিয়ে গিয়ে ওঁর চোখের অপারেশন করানো হয়৷ চার দিনের মাথায় ফিরে এসে এই বসতভিটের মেরামতির কাজ শুরু করা হয়৷ স্থানীয় একজন পরিচারিকা ঠিক করে, মোবাইল ফোন কিনে দিয়ে প্রায় পনেরো দিন এখানে থাকার পর আজ ফিরব পুরোনো গন্তব্যের পথে৷ হাড়-হিম-করা ঠান্ডা এখনও পড়েনি, তবে ইঙ্গিত স্পষ্ট৷
অনেক কাজ বাকি রয়ে গেছে, ফিরতি পথে যতটা সম্ভব ঋণ পরিশোধ করে যেতে হবে৷ অগুনতি মানুষের আশ্রয় থেকেছি এই কদিন৷ পন্থনগর, বেরিলি, লখনউ, কানপুর, হাইওয়ের ধারে অভিশপ্ত ম্যাজিশিয়ান এবং সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসী হয়ে মা মুণ্ডেশ্বরী মন্দিরের খোলা প্রাঙ্গণে চিত হয়ে শুয়ে আছি এ সময়৷ সব জায়গায় ঠেক খেয়ে এখানে এসে পৌঁছোতে প্রায় একুশ দিন সময় লেগে গেছে৷
বেনারসের মাসিমা, কানপুরের লতাদিদি থেকে শুরু করে কলকাতার জীবনদা; সবার কাছে আমি ঋণী৷ লখনউয়ের মাসিমা, বেনারসের পুরোহিত, মির্জা সাহেবের আশরফি এবং অবশ্যই জামাল সাহেব ও জিতু পাঠকের মতো মানুষের কাছে গিয়ে একবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে৷
কঠিনতম পরীক্ষার চূড়ান্ত পর্যায়ে যখন মনে হয়, জীবন এখানেই শেষ হয়ে গেল, আসল লড়াই ঠিক তখন থেকেই শুরু হয়৷ কর্ম এবং প্রচেষ্টা;শেষ পর্যন্ত আপনাকে ঠিক জিতিয়ে দেবে, সময় লাগবে ঠিকই, কিন্তু আপনি জিতে যাবেন নিশ্চিত৷
সকলের সঙ্গে দেখা করে কলকাতায় ফিরেছি বাগেশ্বর থেকে রওনা দেওয়ার এক মাস পর৷ বেনারসের মাসিমা এবং বাগেশ্বরের বৃদ্ধাকে কথা দেওয়া আছে, শীঘ্রই আবার তাঁদের কাছে দেখা করতে যাব৷
লখনউয়ের মাসিমাকে ডাক্তারবাবুর পরামর্শে ইনহেলার মেশিন দেওয়া হয়েছে, দিদিকে বাইরের কাজে না-বের-হওয়ার অনুরোধ করেছি৷ মায়ের দেখভাল করাই এখন মূল কাজ৷ ফি-মাসে টাকা পাঠিয়ে দেব, কথা দিয়েছি৷
সময় চলে যায় হু হু করে, গত ছয় মাসের যাত্রাপথে প্রচুর মানুষের কাছে ঋণ জমা করে এসেছি৷ বেনারসের অঘোরীবাবা, মির্জা সাহেব এবং পিণ্ডারিজির সঙ্গে আর দেখা হয়নি৷ ওঁরা নিজেরা দেখা না দিলে মোলাকাত অসম্ভব৷
একটা নতুন লাল কাপড় এবং হাজার দশেক টাকা দিয়ে এসেছি সেই ভদ্রমহিলাকে, যিনি আমায় গঙ্গামাটি এবং পরনের টুকরো কাপড় দিয়ে সাহায্য করেছিলেন৷ তাঁর জীবনী ভারী অদ্ভুত৷ আপনাদের ভালোবাসা পেলে ভবিষ্যতে তাঁকে নিয়ে উপন্যাস লেখার ইচ্ছা রইল৷
কাশীর দরিদ্র ব্রাহ্মণ পূজারিকে নগদ এক লক্ষ টাকা দিতে গেলে উনি কেঁদে ফেলেন, হাতজোড় করে আমার কাছে পরিত্রাণ চেয়ে নেন৷ এই পৃথিবীতে খুব কমসংখ্যক মানুষ এমনও আছেন, যাঁরা অর্থকে জয় করে ফেলতে পারেন৷ অনেক কষ্টে তাঁকে সামান্য দক্ষিণা দেওয়া গেছে৷
কানপুরের লতাদিদি এখন আর সেই বস্তিতে থাকেন না৷ রিটায়ারমেন্টের মোটা টাকা পেয়ে একটা ফ্ল্যাট কিনে ওঁরা চলে গেছেন কলোনির দিকে৷ গত পরশু ফোনে কথা হচ্ছিল, সকলে মিলেমিশে বেশ আছেন৷
আমিও বেশ ভালোই আছি৷ ব্যবসার কাজে নতুন উদ্যোগে কাজ শুরু করেছি৷ ব্যাঙ্কের লকারে অমূল্য অর্থরাশি এবং আশরফি অতি যত্নে রেখে দিয়েছি৷ বেনারসের মাসিমা অনুরোধ করেছিলেন সেখানে থেকে যাওয়ার জন্য, আমি চলে এসেছি৷ দিনে একবার অন্তত কথা হয় দু-জনের সঙ্গে৷ একমাস অন্তর বেনারস এবং বাগেশ্বর ঘুরে আসতে হয়৷ ব্যক্তিগত উদ্যোগে বেনারসিমাসিমার ছেলের সঙ্গে কথা বলেছিলাম, তিনি সাফ জানিয়েছেন, এ দেশে উনি ফিরবেন না, কারও সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন না, কারও কোনও দায়িত্ব নেবেন না, তাঁর কাছে সবাই মৃত৷
সবাই নিজের মতো আছেন, আমিও দিব্যি আছি, বস্তির এই দুই কামরার ঘরে৷ নিজের জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেকটা বদলে গেছে৷ প্রচুর অর্থ হঠাৎ জীবনে এসে যদি আপনার স্বভাবচরিত্র বদলে দেয়, বুঝতে হবে, হজমের গোলমাল আছে৷ বস্তির এই ঘর আমার মা-বাবার মৃত্যুস্থান, এখানেই আমৃত্যু থাকতে চাই৷ দিব্যি আছি অতি সাধারণভাবেই৷ ব্যাবসার কাজে দু-জন সহকারী রাখা হয়েছে, একার দ্বারা সব সম্ভব হচ্ছে না৷ এভাবেই গোটা বছর কেটে গেল৷
আজ মহাশিবরাত্রি, বাগেশ্বরে বিশাল মেলা বসেছে৷ সেসব ছাপিয়ে মূল মফস্বল থেকে কিছুটা দূরে আমি আর জীবনদা স্থানীয় শ্মশানঘাটে দাঁড়িয়ে আছি৷ একটা জীবনে দু-বার মাতৃগর্ভে মুখাগ্নি করলাম, এ এক অদ্ভুত অনুভূতি৷ চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, জীবনদা আমায় বুকে জড়িয়ে নিলেন৷
কলকাতায় ফিরেছি, দিন পনেরো হল৷ নগদ তিন লক্ষ টাকা প্রাচীন মন্দিরের সংস্কারে দিতে হবে, দায়িত্ব অনেক৷ বাইক নিয়ে মন্দিরের খোঁজে বেরিয়েছি নর্মদার দিকে৷ মন ঘরে টিকতে চাইছে না৷ পথে নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় হলেই আবার উপন্যাস লিখতে শুরু করব৷ ভালো থাকুন সকলে৷ জয় মহাকাল৷

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন