তৃতীয় অধ্যায়

রাজাধিরাজ ভট্টাচার্য

রেললাইন ছাপিয়ে ডানদিকের একটা পথ ধরে সোজা দৌড় দিয়েছি৷ পথে এক মাতাল অটোওয়ালা জুটল৷ কড়কড়ে পাঁচশো টাকার বিনিময়ে সে আমায় পৌঁছে দিল ন্যাশনাল হাইওয়ে৷ পাশেই ‘চৌধুরী ধাবা’৷ কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে বসে, চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে, জুতো খুলে ডেটল দিয়ে পরিষ্কার করে, কষে সুতির কাপড় বেঁধে দিয়েছি৷ আপাতত রক্তপাত বন্ধ হয়েছে৷

এক প্লেট ডাল, দুটো রুটি, এক টুকরো কাঁচা পেঁয়াজ, খাবার মুখে তুলতে পারলাম না৷ শরীর ঘেমে বমি হল৷ রক্তাক্ত শিশুদের মুখ বারবার চোখের সামনে ভেসে আসছে৷ খণ্ডিত শরীর, অসহায় প্রযুক্তি৷ তবু অহংকারের শেষ নেই৷

কিছুক্ষণ বিরতি নিয়ে, পিণ্ডারিজিকে স্মরণ করে জোর করে খাবার মুখে গুঁজে দিলাম৷ পৃথিবীর শেষ বেঁচে-থাকা মানুষদের মধ্যে থাকতে চাই আমি৷ যে বাচ্চাটাকে রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করতে দেখলাম, তার মায়ের কী খবর?

বিগড়ে-যাওয়া মেজাজ ক্রমশ ঠিক হয়ে এল আমার সামনে বসা মানুষের খাওয়া দেখে৷ আলাপ হল সুখবিন্দর সিং ধিলো ওরফে সুখীপাজির সঙ্গে৷ বিশাল চেহারার মানুষ, তেমনই তাঁর খোরাকি৷ ডজনখানেক প্রমাণ মাপের আলুর পরোটা, এক খাবলা মাখন, এক গ্লাস দই এবং পোয়াখানেক রাবড়ি খেয়ে ভদ্রলোক আমাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন৷ পেশায় ট্রাক ড্রাইভার এই মানুষ লখনউয়ের আতর আর পারভিন সুলতানার গান শুনতে ভীষণ ভালোবাসেন৷ ওঁর চ্যালার নাম জগমোহন ওরফে জগু৷ তারও চেহারা বেশ খোলতাই৷ পাটনা থেকে একটা কনসাইনমেন্ট নিয়ে ওঁরা যাবেন প্রথমে লখনউ, তারপর সেখান থেকে কানপুর হয়ে দিল্লি৷

পথ আর পথিক যখন এক হয়ে যায়, তখন এই ভ্যাপসা গরমেও মানুষ ভালো থাকে৷ পিণ্ডারিজির কাছ থেকে বিদায়বেলায় একটা কথা শুনেছিলাম, যেটার বাংলা মানে করলে দাঁড়ায়, ‘যতক্ষণ না জীবনে মৃত্যু আসছে, ততক্ষণ রাজার মতো বাঁচতে শেখো৷ জীবন যদি একদিনেরও হয় কোনও অসুবিধা নেই, সেই একদিনের মেজাজ যেন বাকি একশো বছরে ছাপ ফেলে যায়৷ তন্ত্র এক শক্তি, তার থেকেও শক্তিশালী মানুষের মন এবং ভালোবাসা৷ যে নির্ভীক, সৎ, বিচক্ষণ এবং যার নিজের ওপর বিশ্বাস আছে; কোনও ক্রিয়া তার কোনও ক্ষতি করতে পারে না৷’

ড্রাইভার কেবিনের পিছনের লম্বা চেয়ারে ঝাড়া ছয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে আছি৷ মা মুণ্ডেশ্বরীর দয়ায় বাস্তবে বেঁচে আছি৷ এক্ষুনি এই মুহৃর্তে মাঝরাস্তায় নেমে ফিরতি পথে কলকাতায় ফিরে গেলেও হয়, তবে ফিরতে আর ইচ্ছা করছে না৷ বেশ বুঝতে পারছি, সারা শরীর এবং মন জুড়ে এক গতীয়মান শক্তি কাজ করছে৷ অতগুলো মৃত মানুষের মধ্যে আমার নাম নেই; আপাতত এইটুকুই সান্ত্বনা পুরস্কার৷ চোখের নজরে খোলা ওষুধের দোকান পেয়ে ইঞ্জেকশন নিয়েছি৷

উত্তরবঙ্গ থেকে ফেরার পথে বাস অ্যাক্সিডেন্টের সেই প্রথম ঘটনা থেকে শুরু করে গতকাল রাত্রে মুহৃর্তের জন্যে ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট থেকে নিজের জীবন ফিরে পাওয়া.... সব ক-টা সূত্রকে একটা মালায় গাঁথলে স্পষ্ট বোঝা যায়, কেউ একজন আমায় মরতে দিচ্ছে না! কিন্তু কেন! আমাকে বাঁচিয়ে রেখে কী লাভ! হঠাৎ চিন্তায় ছেদ পড়ল৷

ঝাঁকুনি দিয়ে চোদ্দো চাকার লরি দাঁড়িয়ে পড়েছে৷ আমার হাতঘড়ি অনুযায়ী সময় সকাল সাতটা৷ ঘুম-চোখে উঠে তন্ময় হয়ে গিয়েছি৷ শহর কলকাতায় এত সবুজ একসঙ্গে দেখা যায় না৷ প্রকৃতির স্থানভেদে গন্ধ পালটে যায়৷ গতকাল রাত্রে ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে যাঁরা মারা গেলেন, তাঁরা কি মুক্ত হবেন কোনওদিনও? এই মৃত্যুতে তাঁদের নিজেদের কোনও হাত নেই, এটা অ্যাক্সিডেন্ট, আত্মহত্যা নয়৷ আচমকা মরে যাওয়ার অনুভূতি কেমন হতে পারে?

যে মানুষ মৃত, সে সবরকম অনুভূতির বাইরে৷

একটা দেশি হোটেল৷ ছোলা পুরি হালুয়া এবং চা খেয়ে, হোটেলের পিছনের পুকুরে স্নান সেরে আবার তিনজনে লরিতে এসে উঠেছি৷ পাশে রাখা এক ছোট্ট মিউজিক সিস্টেমে পারভিন সুলতানাজি গাইছেন ‘সাঁই রাম সুমিরন করো...’

সুখীপাজি চুপচাপ গান শুনছেন, সামনে পথ অন্তহীন৷ গান শেষ হওয়ার পর একটা প্রশ্ন করলাম ওঁকে, ‘এই লরিতে কী মাল বোঝাই আছে?’

‘স্প্রিং৷’

‘এত স্প্রিং কার কাজে লাগে?’

বেশ খানিকক্ষণ হো হো শব্দে হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমার বাবা বলতেন, মানুষের শরীরের মাথা, কোমর, হাঁটু, মেরুদণ্ড; সবই হল স্প্রিং-এর খেলা৷ আমাদের মনেও একটা ভীষণ মজবুত স্প্রিং থাকে, যেটা বাইরে থেকে আসা ধাক্কাগুলো সামলে দেয়৷’

কথাগুলো হাসির হলেও ভাবার মতো৷ আমাদের শরীর এবং মনের স্থিতিস্থাপকতা না থাকলে প্রতিমুহৃর্তে ভেঙে গুঁড়িয়ে যেত৷ জীবনের আঁকেবাঁকে লুকিয়ে থাকা ঘাত-অন্তর্ঘাত মানুষের ক্ষমতার পরীক্ষা নেয়৷ নিরুপায় মানুষ সেই পরীক্ষা দিতে বাধ্য থাকে৷ কিছু মানুষ অসহায় হয়ে পড়েন শেষ পর্যন্ত এবং পরিস্থিতির চাপে অকালেই নিজেকে হারিয়ে দেন বাধ্য হয়ে৷ কিছু মানুষের বেঁচে থাকার খিদে অসীম৷ দাঁতে দাঁত চেপে সে লড়াইটা চালিয়ে যায়৷ এটাই জীবন৷ নিজের অস্তিত্ব এবং সত্তা টিকিয়ে রাখাই সংসারের ধর্ম৷

টানা সাড়ে ছয় ঘণ্টা পর গাড়ি থামল একটা জায়গায়৷ সূর্য মধ্যগগনে, তবে ঈশানকোণে মেঘের সঞ্চার হয়েছে৷ বেনারস ছেড়ে এসেছি আগেই৷

রাস্তার দু-দিকে দু-খানা একই রকম দেখতে ধাবা৷ পরবর্তীকালে জেনেছিলাম, দুটি ধাবার মালিক একই মানুষ৷ দুপুরে কবজি ডুবিয়ে খাওয়া হল পরোটা এবং দেশি ঘিয়ে বানানো পাঁঠার মাংস৷ হ্যান্ডপাম্প থেকে নিজে পাম্প করে জল খাওয়ার মজাই আলাদা৷ কিছুক্ষণ খাটিয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছি৷

চোখের নজরে এল; ধাবার একদম শেষের দিকে একটা ছোট্ট টেবিলের ওপর উঠে বসে পেল্লায় চেহারার এক হনুমান মনের সুখে মাখন-রুটি খাচ্ছে৷ সঙ্গে এক ভাঁড় চা এবং সবশেষে পাশে বসা এক ভদ্রলোকের দেওয়া এক পিস সিগারেট৷ খোঁজ নিয়ে জানলাম, উনি বিড়ি খান না, সিগারেট ধরিয়ে দিতে হয়৷

সবকিছু মিটে গেলে, পাশের পুকুরে তিনখানা ডুব মেরে হনুমান কোথায় যেন পালিয়ে গেল৷ জীবনে এই প্রথমবার হনুমানকে স্নান করতে দেখলাম৷ মিনিট দশেকের ব্যবধানে সে ফিরে এল তার বান্ধবীকে নিয়ে৷ ক্ষণিকের মায়ার বাঁধন কেটে আমরা আবার বেরিয়ে পড়েছি৷

গাড়ি চলছে হু হু শব্দে৷ ঠিক এই মুহৃর্তে পরমেশ্বর যদি অকারণে বরদান করেন, আমি মনেপ্রাণে চাইব ড্রাইভার হতে৷ পৃথিবীর সব থেকে সৌভাগ্যবান মানুষ বোধহয় একজন ড্রাইভার, যার নিজের জীবনের স্টিয়ারিং নিজের হাতে আছে৷

জীবনে যা চাই, ঠিক তার উলটোটাই হয়৷ শুধু আমার নয়, সবারই এক কেস৷ খুব কম মানুষই আছেন এই পৃথিবীতে, নিজের মতো করে যাঁরা বাঁচতে পারেন, তাঁরাই স্থিতপ্রজ্ঞ৷

লখনউয়ের মূল শহরের বাইরের হাইওয়ের ধারের এক গুদামে মাল খালাসের কাজ চলছে এই সময়৷ জায়গাটির নাম ‘উৎরেটিয়া’!

কাজকর্ম মিটে গেলে সুখীপাজির সঙ্গে কোলাকুলি করে জগুদার দেওয়া একটা ঠিকানার উদ্দেশে রওনা দিয়েছি ওঁদের চেনাশোনা টেম্পোর মাথায় চড়ে৷ সময় এখন রাত দেড়টা৷

এই জীবনে সুখীপাজি আর জগুভাইয়ের সঙ্গে হয়তো কোনওদিন দেখা হবে না, হয়তো হবে৷ মৃত্যুর আগের মুহৃর্তে হসপিটালে পড়ে-থাকা অবস্থায় পাশের বিছানায় হয়তো দেখা হবে, জানি না, জীবন কোথায় নিয়ে গিয়ে থামাবে৷ পিণ্ডারিজি একটা জিনিস খুব ভালো শিখিয়েছেন, ‘অন্তিম শ্বাস নেওয়ার আগের মুহৃর্ত পর্যন্ত মানুষের মৃত্যু নেই৷ শেষনিশ্বাস থেমে গেলেও মানুষের মৃত্যু নেই৷ শরীর হল চামড়াসর্বস্ব সাবেকিয়ানা, আত্মা অবিনশ্বর৷ যার মৃত্যুভয় কেটে গেছে, সে-ই মুক্ত, সে-ই মহাপ্রাণ মৃত্যুঞ্জয়ী৷’

হাতঘড়ি অনুযায়ী সময় রাত তিনটে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ ঘন জমাটি অন্ধকার৷ গত দশ মিনিট ধরে দরজার কড়া নেড়ে চলেছি৷ কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বাধ্য হয়ে ফিরতি পথ ধরতেই পিছন থেকে একজন মহিলা ধরা গলায় আওয়াজ দিলেন, ‘কাকে চাই?’

ঘরবাড়ির অবস্থা মোটেও ভালো নয়৷ কোনও এককালের পরিত্যক্ত ধর্মশালা৷ বাকি অংশ হোটেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়, দুটো ঘর এখনও ধর্মশলার আওতায় রয়ে গেছে৷ একটা ঘরে বৃদ্ধা মা থাকেন তাঁর মেয়েকে নিয়ে, পাশের ঘর ফাঁকা৷ একটা খাট, বহু পুরোনো একটা আলনা এবং হাতল-ভাঙা একখানা চেয়ার; যেটায় বসলেই শব্দ করে তীব্র প্রতিবাদ জানায়৷ বাথরুম বেশ পরিষ্কার৷ এক কাপ চা, একটা সিগারেট এবং মোবাইলে বাজানো রবীন্দ্রসংগীত... মেজাজ পালটে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট৷

অনেকবার ফোনে চেষ্টা করেও না পেয়ে বাধ্য হয়ে দু-কলম চিঠি লিখে দিয়েছিলেন জগুদাদা৷ অমৃতসরের এক সময়ের নামকরা ধনী মানুষ, সুরজিৎ সিং একটা গোটা ধর্মশালা বানিয়েছিলেন এই জায়গায়৷ কালের নিয়মে, তিন পুরুষের ব্যবসার দৌড় শেষ হয়৷ বিষয়সম্পত্তি, জমিজমা সব বিক্রি হয়ে পুঁজিপাটা বেলেঘাটা, কোনওরকমে টিকে গেছে দু-কামরায় এই নাম-কা-ওয়াস্তে ধর্মশালা৷ মাসপ্রতি আটশো টাকা অনুদানে মা-মেয়ের চলে না৷

ভদ্রমহিলা টুকটাক কাজকর্ম করে দু-পয়সা উপার্জন করেন৷ অভাবের জীবন বড্ড কষ্টের৷

আমার মা আমাকে এইভাবেই বড়ো করেছেন, মানুষ এইভাবেই বড়ো হয়, কঠিন পরিশ্রমের ফসল হিসেবে জীবন অন্য খাতে বইতে শুরু করে৷

দিনের বেলায় ঘণ্টা চারেক ঘুমিয়ে, স্নান সেরে দরজা খুলে বাইরে পা রাখতে যাব এমন সময় পিছন থেকে রমণীকণ্ঠ, ‘ভাইসাব, দোপহর মে য়হি খানা৷’

কত বয়স হবে ভদ্রমহিলার? আমার যদি কোনও বড়োদিদি থাকতেন, হয়তো এমনই বয়স হত৷ বৃদ্ধার হাঁপানির টান ওঠে ভোরের দিকে৷ রোজই কষ্ট পান বোধহয়৷ আমার মায়েরও একই রোগ ছিল৷

টুকটাক বাইরে ঘোরাফেরা করে একটা ইনহেলার কিনে ফিরছি৷ মায়ের কষ্টের দিনে ডাক্তারবাবু এটা দিয়েছিলেন৷ ওষুধের সব ক-টা নাম এখনও স্পষ্ট মাথায় গেঁথে রয়েছে৷ মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক সম্পর্ক গড়ে আর ভাঙে, মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক রক্তবীজের মতো জড়িয়ে থাকে৷ দূরত্ব থাকে, মতপার্থক্য থাকে, অনেক সময় মুখ দেখাদেখিও থাকে না, তবে লুনি নদীর মতো একটা চোরাস্রোত ঠিকই থাকে;এর কোনও বিনাশ নেই, শরীর থাকলেও নেই, না থাকলেও নেই৷

দু-কামরার ধর্মশালায় ফিরে তিনটে রুটি এবং এক বাটি ডাল জুটল৷ একটা লম্বা ঘুমের পর সন্ধেবেলায় চা খেতে বাইরে বেরিয়েছি৷ এই জায়গার নাম;পানদাড়িবা৷ লখনউ রেলওয়ে স্টেশন এখান থেকে মাত্র পাঁচ মিনিটের রাস্তা৷ প্রতি রবিবার ভোরবেলায় এখানে পানের হাট বসে, তাই অমন নাম৷ আজ শনিবার, আগামিকাল ভোরবেলা অবশ্যই এটা দেখব৷

রাতে একই রুটি এবং একই ডাল, উপরি পাওনা এক খিলি পান৷ দুঃস্বপ্নবিহীন একটা ঘুম এবং মোবাইলে ফিট করা ভোর চারটের অ্যালার্ম৷ পিণ্ডারিজি যে চরম উপকার করেছেন, আমৃত্যু তা ভোলা যাবে না৷ প্রতিকার সম্পূর্ণ হলে, তবেই বিপন্মুক্ত হওয়া সম্ভব, দেখা যাক৷

ভোররাতে বিছানায় শুয়ে ট্রেনের অ্যানাউন্সমেন্ট শুনতে পেয়েছি, জেগে-ওঠা শহরের ব্যস্ততার আঁচ পেয়েছি৷ সব প্রাচীন শহর বোধহয় একইভাবে জেগে ওঠে৷

পানের পাতা সম্বন্ধে আপনাদের নিশ্চয়ই কিছু জানকারি আছে৷ এযাবৎ আমার ধারণা ছিল না, তবে এখন হচ্ছে৷

ভারী অদ্ভুত এই পান-বাজার! আমাদের পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক মানুষ এখানে পান বেচাকেনা করতে আসেন৷ মূলত বাংলা পাতা এবং বাংলাদেশি ছাঁছিপাতার পান এখানে আসে৷ স্থানীয় মগহই বা মঘইপাতা সর্বাধিক প্রচলিত তবে, সব থেকে সুস্বাদু পানের পাতা হল দিশাবরী৷ যেমন খাস্তা, তেমনই অদ্ভুত এক খুশবু-মাখানো কোমলতা আছে৷ কানপুর, মেরাঠ, কংখল, হিমাচল; প্রায় সব জায়গা থেকে এখানে পান-বিক্রেতারা আসেন৷ সেদিক ঘোরাঘুরি করে, বাইরে নাস্তা সেরে, পাশের ঘরে থাকা দু-জন মানুষের জন্য জলখাবার নিয়ে এসেছি৷ ভীষণ খুশি ওঁরা দু-জন৷ এই খুশি আর ঈশ্বরীয় আনন্দের মধ্যে কোনও তফাত নেই৷

দুপুরবেলা স্নানাহার সেরে, একজন ফিরতি পানওয়ালার গাড়ির সঙ্গে অল্প পয়সায় সেটিং করে আবার পথ চলেছি নির্দিষ্ট গন্তব্যে৷ সড়কপথে দেড় ঘণ্টার দূরত্বে পৌঁছে গেলাম দেবা-শরিফ৷ লখনউ থেকে ট্রেনে বারাবাংকি রেলওয়ে স্টেশনে এসে অটো ধরে তেরো কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই বিখ্যাত দরগা৷ পরিচিতি না থাকলে এখানে থাকার জায়গা পাওয়া একটু চাপের ব্যাপার৷

খোঁজাখুঁজির পর মনের মতো একটা খাবারের হোটেল পেলাম৷ স্থানীয়রা এটাকে জামাল সাহেবের হোটেল বলেন৷ হোটেলের মালিক নিজের হাতে রান্নার ব্যবস্থা করেন৷ টেবিলে গিয়ে বসার পর একটা বাচ্চা ছেলে এল৷ সটান প্রশ্ন, ‘কী খাবেন?’

গরম চা এবং শিঙাড়া খেয়ে হোটেলের চেয়ারে চুপচাপ বসে আছি৷ আকাশের রং ক্রমশ পালটাতে শুরু করেছে৷ সন্ধে নামছে কালো মেঘের ওপর ভর করে৷ একটা বৃষ্টি ভীষণ দরকার৷

হোটেলে অন্য কোনও গ্রাহক না-থাকায় চুপচাপ বসে রইলাম৷ পরপর আরও দু-কাপ চা, এক পিস সিগারেট৷ আকাশ ফুটো হয়ে বৃষ্টি নেমে এল অঝোর ধারায়৷ চারপাশের ফেটে-যাওয়া মাটিতে বৃষ্টির জল ভরছে৷ ভিজে-যাওয়া সোঁদা মাটির গন্ধে চারদিক মাতোয়ারা৷ অনেকক্ষণ হল, আমি ছাড়া রেস্তরাঁয় কোনও খদ্দের নেই৷ পাশের চেয়ার টেনে নিয়ে জামাল সাহেব এসে বসলেন৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর বাইরের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক ভারী গলায় বললেন, ‘বারিশ কে বুঁদে খিড়কি সে আচ্ছা লাগতা হ্যায়, সিলিং সে নহি’৷

অর্থাৎ, বৃষ্টির জল জানলা দিয়ে দেখতে ভালো লাগে, ছাদ থেকে মোটেই নয়; কথাটার গভীরতা আছে৷ বেশ অনেকক্ষণ চুপচাপ থেকে আমি বললাম, ‘আপনি শায়েরি করেন?’

‘আমি শায়েরি ছাড়াও আরও অনেক কিছু করি৷’

‘যেমন?’

‘বিহারের এক ব্যাঙ্ক ডাকাতিতে আমার নাম জড়িয়ে গিয়েছিল, সেই সূত্রে বেশ কিছুদিন জেল খেটেছি৷ ছেলেবেলা থেকেই ঘুড়ি ওড়ানোর ভীষণ শখ ছিল, এখনও নিয়মিত ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় পতঙ্গবাজির কম্পিটিশনে যাই৷ পনেরো বছর বয়সে একটা মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম, একুশ বছর বয়সে তাকেই বিয়ে করলাম, চব্বিশ বছর বয়সে ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেল সে৷ এখনও পর্যন্ত তার মায়া কাটিয়ে উঠতে পারিনি, এখন আমার বয়স বিয়াল্লিশ৷ অপর কোনও মহিলার দিকে তাকালে মনে হয় যেন তাঁকে ঠকাচ্ছি৷ আপনি কী করেন?’

মোক্ষম প্রশ্ন করেছেন জামাল সাহেব৷ সত্যিই তো! বর্তমানে আমি কী করি?

কিছু মানুষ ভীষণ কথা বলতে ভালোবাসেন, ইনি সেই গোত্রীয়৷ টপিকের কোনও অভাব নেই৷

ধোঁয়া-ওঠা কাপে চুমুক দিয়ে বললাম, ‘অসহায় পরিস্থিতি আর ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম৷ অর্ধেক সমাধান হয়েছে, অর্ধেক বাকি৷ ফিরতে মন চাইছে না৷ ইচ্ছা হচ্ছে, অধরা মাধুরীর মতো অসম্পূর্ণ জীবন নিয়ে গোটা ভারতবর্ষ ঘুরে বেড়াই৷ কিছু কষ্ট জীবনে অনেক কিছু দিয়ে যায়৷’

মাথা নিচু করে হেসে জামাল সাহেব বললেন, ‘সেটা আপনাকে দেখলে বোঝা যায়! আমি রান্নাঘর থেকে আপনার ওপর নজর রাখছিলাম৷ আপনার দৃষ্টি উদভ্রান্ত এবং উৎসুক৷ জীবনে এমন অবস্থা সবারই আসে, আমার বেশ কয়েকবার এমন হয়েছে৷ বিনা দোষে সাড়ে তিন বছর জেল খাটতে হয়েছে৷ এখনও ফি-বছরে তিনবার করে সেখানে গিয়ে হাজিরা দিতে হয়, দেশের বাইরে যাওয়া বারণ৷ অথচ আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ৷ জীবনে একবারও পর্যন্ত বিহারে না-যাওয়া আমি, জেল খেটে এলাম বিহারে ব্যাঙ্ক ডাকাতির জন্য৷ আসলে আমার দু-জন বন্ধু সরাসরিভাবে জড়িত ছিল সেখানে, আমার নামও জড়িয়ে যায়৷ তবে, জেলে গিয়ে আমার ভীষণ উপকার হয়েছে৷ ‘শাবানা’র ইন্তেকালের পর আমি ভেবেছিলাম এই পৃথিবীতে সব থেকে দুঃখী মানুষ আমি, সেই ভুল আমার ভেঙে গেছে৷ আপনার কষ্টটা কী?’

নির্লজ্জের মতো নিজের দুর্বলতার কথা বলা যায় কি আদৌ? তবে, মানুষকে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়৷ একাধিকবার ঠকেছি, যাঁরা ঠকিয়েছেন, তারাও অবশ্য ভালো নেই৷ কিছুক্ষণ ভাবনাচিন্তা করে বলতে শুরু করলাম আমার জীবনগাথা৷ হাজি আলি মির্জা সাহেবের কথা শুনে জামাল সাহেব অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন৷

বৃষ্টি অবিরাম ঝরেই চলেছে৷ পথঘাট শুনশান৷ কথায় কথায় বেশ রাত হয়েছে৷ হাতঘড়িতে সময় রাত সাড়ে ন-টা৷ দু-জনে অনেকক্ষণ হল, চুপচাপ বসে আছি৷ এবারে উঠতেই হবে, একটা থাকার ব্যবস্থা খুঁজতে হবে৷

কিছুক্ষণ উসখুস করে জামাল সাহেব কথা শুরু করলেন, ‘হাজি আলি মির্জা সাহেবের কথা আমি শুনেছি আববা হুজুরের কাছে৷ কিন্তু...’

‘কিন্তু কী?’

‘উনি কি জীবিত আছেন?’

‘মানে?’

‘অনেক মানুষই ওঁকে খুঁজছেন, হঠাৎ কেউ কখনও দাবি করেন ওঁকে দেখেছেন, বেশির ভাগই খুঁজে পান না৷ গত বছরের শীতে একজন কয়েক মুহৃর্তের জন্য ওঁর দেখা পেয়েছিলেন৷ যদি এখনও বেঁচে থাকেন, তাহলে মানতেই হবে জীবিত পির সাধকদের মধ্যে উনি অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক৷ আমার খুব ইচ্ছা ছিল একবার দেখা করার, খুঁজে পাইনি৷’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি বললাম, ‘দু-তিন রাত এখানে থাকার সস্তায় হোটেলের ব্যবস্থা করে দেবেন প্লিজ, ভাড়া যা লাগে তা না হয়...’

‘বেশ তো, রাতের বেলা আমি বাড়ি চলে যাই৷ তারপর আপনার যদি সাহসে কুলোয়, এখানে থাকুন৷ আমি বালিশ, তোশকের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি৷ ওপরে বাথরুম আছে৷’

‘কত ভাড়া দিতে হবে?’

কথার উত্তর না দিয়ে, জামাল সাহেব হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন৷ ভদ্রলোকের মাজা গায়ের রং, মিষ্টি মুখ এবং বেশ হৃষ্টপুষ্ট শরীর৷ উচ্চতা প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট৷ প্রথম দর্শনে বেশ সাদামাটা মানুষ বলেই মনে হল৷ বাকিটা সময় বলবে৷

সদ্য কেনা একটা ডায়েরিতে দিনলিপি লিখতে শুরু করেছি৷ বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে৷ আকাশে একটাও তারা নেই৷ রাতভর জ্বালাবে মনে হয়৷ মিনিট পনেরো পরে জামাল সাহেব ফিরে এলেন রিকশায় চেপে, সঙ্গে একটা মোটা শতরঞ্চি, একটা গদি, দুটো বালিশ, গায়ে দেওয়ার একটা চাদর ছাড়াও মশা তাড়ানোর ধূপ এল৷ দু-জনে হাতাহাতি করে বিছানা তৈরি হল৷ বৃষ্টির বেগ কিছুটা হলেও কমেছে৷ স্থানীয় কবরস্থানের লোকেশন বুঝে, জামাল সাহেবের প্রস্থানের পর, বেরিয়ে পড়লাম৷

পিণ্ডারিজি কিছু কথা বলে দিয়েছিলেন, উচ্চকোটির কিছু সাধককে চোখে দেখা যায় না, গন্ধ এবং পারিপার্শ্বিক কিছু অবস্থা দেখে বুঝে নিতে হয় তিনি সেখানে উপস্থিত৷ কোনওরকম কথাবার্তা না বলে সেই স্থানে চুপচাপ অপেক্ষা করতে হয় এবং মনে মনে উপস্থিত হওয়ার প্রার্থনা জানাতে হয়৷ যদি দেখা দেওয়ার হয় উনি নিজেই আসেন, এক্ষেত্রে জোর করে কিছুই হয় না৷

মূল মসজিদ ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা গেলে তবেই কবরস্থান এবং তার পাশেই লাগোয়া একটা পুকুর৷ কাদামাটি মাখামাখি অবস্থায় গোরস্থানের মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি৷ সারিবদ্ধ কবর এবং ফুলের গাছ৷ কোনও এক অচেনা ফুলের মোহময়ী গন্ধ নাকে আসছে৷ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে এখন আকাশে গোটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে৷ আধভাঙা একটা কাঠের দরজা কোনওরকমে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা আছে, এটাই মূল ফটক৷ হাতঘড়িতে সময় রাত সওয়া বারোটা৷ জনমানবের চিহ্নমাত্র কোথাও নেই৷ একটা কুকুর এগিয়ে এল, অনেকক্ষণ ধরে আমায় শুঁকল, দু-চারবার লেজ নেড়ে আবার নিজের গন্তব্যে চলে গেল, আমি ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম৷

পায়ের পাশের মাটিতে খসখস শব্দ হতেই টর্চ জ্বেলে দেখলাম, সাপ চলে গেল৷ জায়গাটা বোধহয় খুব একটা সুবিধার নয়৷ কবরস্থানের মূল গেট ছেড়ে দু-কদম এগোতেই গোটা একটা পুকুর৷ হাতের মুঠোয় ধরা আলো চারপাশে ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে এক জায়গায় চোখ আটকে গেল৷ পলেস্তারা-খসা প্রাচীন সিমেন্টের বাঁধানো বসার জায়গা৷ পাশেই দাঁড়িয়ে কামিনী ফুলের গাছ৷ আহা! গন্ধে পাগল ত্রিভুবন৷

একশো আশি ডিগ্রি পরিক্রমা করে পুকুরের অপর প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি৷ মেঘ কেটে গিয়ে শশীকলা পুকুরের জলে লুকোচুরি খেলছে৷ টর্চ নিয়ে ভালো করে চারপাশ দেখে সিমেন্টের বেঞ্চিতে এসে বসলাম৷ ততক্ষণাৎ একটা প্যাঁচা ডানা ঝাপটিয়ে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল৷ কামিনী ফুলের পাগল-করা উগ্র গন্ধ, মহাশূন্যে আজ চাঁদ মধ্যগগনে৷

সেই সারমেয়, সঙ্গিনী সমেত আবার এসে জুটেছে বোধহয়৷ হয়তো সে ক্ষুধার্ত৷ অপেক্ষা করে মনে মনে গালাগালি করে চলে গেল৷ ভালো করে চারপাশ একবার দেখে নিয়ে, মানসিক দৃঢ়তা এক জায়গায় জড়ো করে টর্চের আলো বন্ধ করে দিলাম৷ হাত দুটো বুকের সামনে মুঠো করে মনে মনে বলতে শুরু করলাম, ‘মির্জা সাহেব, অনেক দূর থেকে আপনার কাছে এসেছি৷ পিণ্ডারিজি বলেছেন, আপনিই পারেন আমার জীবনের চরমতম ভুল সংশোধন করে দিতে৷ দয়া করে সাহায্য করুন৷’

একবার, পাঁচবার, দশবার... একই আর্তি বারবার জানাচ্ছি৷ সাপেদের আসা-যাওয়া শুনতে পাচ্ছি৷ আরও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর, এবারে উঠে যাব ভাবছি৷

কামিনী ফুলের সুবাস ছাপিয়ে অদ্ভুত সুন্দর একটা ভিনগোত্রীয় গন্ধ নাকে এল৷ কেউ একজন এসে পাশে বসার আন্দাজ টের পাচ্ছি, ভয়ে চোখ খোলার সাহস নেই৷ দূরত্ব কমছে, তাঁর নিশ্বাসের বাতাস আমার শরীর স্পর্শ করছে৷ হাতে ধরে থাকা মোবাইল টর্চ বারবার জ্বালানোর চেষ্টা করছি, জ্বলছে না, চোখ খুলে ফেললাম৷ আশপাশে কেউ কোথাও নেই৷ চোখের জায়গায় কান সক্রিয় হয়ে উঠল৷ পুরুষমানুষের ভরাট গলায় ভীষণ সুরেলা স্বর শুনতে পাচ্ছি৷ ভারী অদ্ভুত সুর, ক্রমশ ভাষা স্পষ্ট হল;‘ইবাদত হ্যায় তুঝসে, মিলা দে ইয়া... খুদ মিলজা তু মুঝসে৷’

রাগ মালকোশ, ঠাট; কাফি৷ সারেঙ্গি, হারমোনিয়াম, বীণা, সেতার, তবলা; কোনও কিছুর প্রয়োজন নেই৷ খালি গলার মূর্ছনা এবং প্রকৃতি, একে অপরের সঙ্গে মিশে গেছে নিষ্পাপ ভালোবাসায়৷ তন্ত্রের বীজমন্ত্রে পুরুষ আর প্রকৃতি যেমন অবিভক্ত হয়ে যায়, অনেকটা তেমনই৷ গানের কথা আরও স্পষ্ট হচ্ছে ক্রমশ৷

মিনিট পাঁচেক পর দেখতে পেলাম, অতিবৃদ্ধ এক ফকির পুকুরের জলে ভেসে বেড়াচ্ছেন৷ চাঁদ এবং অন্যান্য গ্রহনক্ষত্র থেকে আসা মহাজাগতিক আলোকরশ্মি তাঁর শরীরের ওপর ঠিকরে পড়ছে৷ সিমেন্টের বেঞ্চি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে, জুতো খুলে, কাদা মাটির ওপর হাঁটু মুড়ে বসে দু-হাতে প্রণাম জানালাম ভাসমান চৈতন্যকে৷ ভাসতে ভাসতে ভদ্রলোক আমার অনেকটা কাছে চলে এসেছেন৷ ওঁর বুকের ওপর হাত জড়ো করা৷ গলায় অদ্ভুত মাদকতার সুর এবং স্বরসাধনা৷ গান থামল আরও পাঁচ মিনিট পর৷ কান ছাপিয়ে মননে সেই গানের রেশ জড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ৷

বেশ লম্বা মানুষ৷ ঝুলে-যাওয়া চোয়াল, সর্বাঙ্গে ভাঁজ-খাওয়া চামড়ার উপপাদ্য৷ বয়সের ভারে সামনের দিকে ঝুঁকে আছেন৷ পরনে কালো জোব্বা, গলায় নীল পাথরের মালা, হাতের জপমালা কবজির সঙ্গে জড়ানো৷ ভেজা কাপড়ে ভাঙা সিমেন্টের বেঞ্চিটায় এসে চোখ বন্ধ করে বসলেন৷ এই মানুষের বয়স আন্দাজ করা সত্যিই অসম্ভব৷

কীভাবে কথা শুরু করব, সেই চিন্তা করছি৷ এমন সময় নাকে সেই গন্ধ এল, একটু আগে কবরস্থানের সামনে নাকে এসেছিল৷ আরও কিছুক্ষণ পরে নানান চিন্তাভাবনার মাঝখানে ভদ্রলোক চোখ খুললেন৷ আমি কিছু বলার আগে উনি নিজেই বলতে শুরু করলেন, ‘আপনি পাটনা থেকে আসছেন?’

‘জি৷’

‘আপনি হিন্দু?’

‘হ্যাঁ৷’

‘গান গাইতে পারেন?’

‘না, শুধুই শুনি৷ সুর আমার ভীষণ পছন্দের বিষয়৷ রবি ঠাকুরের গান আর শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতে খুব পছন্দ করি৷ আপনার গান শোনার সময় চোখের পাতা ফেলতে পারিনি, নড়তে পারিনি, এমনকি ঢোঁক পর্যন্ত গিলতে পারিনি৷ আপনি যে গান গাইলেন, সেটা আগে কোথাও শুনিনি৷ ভীষণ অদ্ভুত সুর, তেমনই গায়কি৷

মৃদু হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘এই গান আমার রচনা৷ দিনরাত সংগীত নিয়েই থাকি, আমার সাধনার মূল আধারই হল সংগীত৷ গায়ক আমি, শ্রোতা তিনি৷ তোমার কান আমার সুর স্পর্শ করেছে, এটা সত্যিই অবাক হওয়ার মতো বিষয়৷ আমায় সাধারণত কেউ দেখতে, শুনতে বা স্পর্শ করতে পারে না৷’

মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ভদ্রলোক বেশ খুশি হয়েছেন৷ প্রশ্রয় পেয়ে একটা প্রশ্ন করে বসলাম, ‘আপনার শরীর থেকে অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ বেরোচ্ছে, এটা কি কোনও পারফিউম?’

‘কৃত্রিম গন্ধ আমি ব্যবহার করি না৷ এটা আমার এক বন্ধুর শরীরের গন্ধ৷ ও আমার থেকেও বেশি লাজুক, একদমই লোকসমাজে আসতে চায় না৷ সারাদিন গাছে বসে থাকে, রাতের শেষ প্রহরে একবারমাত্র আমার কাছে আসে কয়েক মিনিটের জন্য৷’

পরিবেশ আবার শান্ত৷ দু-জনেই চুপচাপ বসে আছি৷ ভদ্রলোক যখন কথা বলেন, তখন চোখ বন্ধ রাখেন৷ ওঁর গলায় রবীন্দ্রসংগীত শুনতে ভীষণ ইচ্ছা করছে৷ কিছুক্ষণ সময়ের ব্যবধানে নির্লজ্জের মতো আবদার করে ফেললাম৷

অনুরোধ রাখলেন৷ আমাদের সবার পরিচিত একটা গান ধরলেন অন্তরা থেকে;

‘ভুলবে সে গান যদি না হয় যেয়ো ভুলে

উঠবে যখন তারা সন্ধ্যাসাগরকূলে,

তোমার সভায় যবে করব অবসান

এই ক’দিনের শুধু এই ক’টি মোর তান৷

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান

তার বদলে আমি চাই নে কোনো দান৷’

যে গানের এমন দর্শন, সেই গান গাওয়ার জন্য এমনই গলার প্রয়োজন৷ গান শেষ, অজান্তেই নিজের হাত চোখে চলে এল৷ আমি কাঁদছি, সত্যিই কাঁদছি, বিশ্বাস হচ্ছে না এ আমারই চোখের জল৷ আগেও এই গান কয়েকশোবার শুনেছি, কোনওদিন কাঁদিনি৷ আজ অন্যরকম অনুভূতি৷ সামনে দাঁড়ানো বৃদ্ধ ফকিরের অসীম ক্ষমতা৷ উনি মৃদু হাসছেন৷ ওঁর পায়ের কাছে গিয়ে ধপ করে বসলাম, পা গুটিয়ে নিলেন৷

বললেন, ‘ভুলেও আমাকে এক মুহৃর্তের জন্য স্পর্শ করবেন না, বড্ড কষ্ট পাব৷’

‘আপনাকে একটু প্রণাম করতে চাই৷’

‘দূর থেকে করুন৷’

‘আপনি সুফি সাধক?’

আকাশের চাঁদের দিকে একবার উঁকি মেরে ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে সটান প্রশ্ন ছুড়লেন, ‘সুফি সাধনা সম্বন্ধে কিছু জানা আছে আপনার?’

‘না, জানতে চাই৷’

‘দশ মিনিটে বা আধ ঘণ্টায় এই দর্শন বোঝানো সম্ভব নয়, তবে একটু আলোকপাত করতে পারি৷ তার আগে অবশ্য আপনাকে একটা কথা বলে রাখি৷ আমার সঙ্গে কথাবার্তা হয়ে গেলে এখান থেকে বেরিয়ে আপনি বাসে, ট্রেনে বা অন্য কোনও যানবাহনে উঠবেন না৷’

‘কেন! ইয়ে... মানে বাড়ি ফিরব কীভাবে?’

‘একটা নিজস্ব গাড়ি কিনে ফেলুন অথবা নিজের বাইক৷’

‘সে তো অনেক দাম!’

‘টাকা জোগাড় করুন, প্রয়োজন হয় পুরোনো কিনুন৷ নিজে চালাতে সক্ষম এমন গাড়ি ছাড়া অন্য কোনও যানবাহনে চাপলে আপনার দুর্ঘটনায় মৃত্যু নিশ্চিত৷ অঘটন ঘটেনি এখনও পর্যন্ত?’

‘ঘটেছে৷’

‘আরও একটা কথা, এই জীবনে কোনওদিন বিদেশ যাবেন না৷ বেঁচে ফিরতে পারবেন না৷’

‘কিন্তু... আমি যে ভেবেছিলাম, বাঁকুড়ায় তৈরি মাটির খেলনা বিদেশে বিক্রি করতে যাব৷’

‘আমি যা বলার, বলে দিয়েছি, বাকিটা আপনার সিদ্ধান্ত৷ এককথা দু-বার বলার মানুষ আমি নই, আমার কথা মিথ্যা হয় না৷’

ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ আমিও শান্ত হয়ে বসে আছি৷ জীবন এক অদ্ভুত খাতে বইছে৷ নাকের ভিতর দিয়ে ঢুকে সেই অচেনা গন্ধ মাতাল করে দিচ্ছে৷ দম ভরে সুবাস টেনে দু-চোখ বুজে বসে আছি৷ নীরবতা ছিন্ন করে ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় কাউকে যেন হাততালি দিয়ে ডাকলেন, ‘জোরাবর, ইধর আও৷’

কেউ এলেন না৷ বৃদ্ধ মানুষ কারও উদ্দেশে করে বললেন, ‘ডরো মত, ইধর আও৷’

কোথা থেকে যেন একটা অদ্ভুত শব্দ এল৷ চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ভদ্রলোক মুচকি হাসছেন৷ আমার দিকে তাকিয়ে ডানদিকের জঙ্গলে ইশারা করে বললেন, ‘ওই জঙ্গলে সোজা ঢুকে সামনে গেলেই তিন নম্বর গাছে লাল রঙের সাপ দেখতে পাবেন৷ ওকে শ্রদ্ধাভরে, সযত্নে এখানে নিয়ে আসুন৷ ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমার অনুমতি ছাড়া ও কাউকে দংশন করে না৷ ভয়ংকর বিষাক্ত হলেও নির্ভেজাল এক সৎ প্রাণী, মানুষের মতো বুদ্ধি নেই তাই নিষ্পাপ বলা যেতে পারে৷’

আমাদের কলকাতার বস্তিতে হারুকাকা থাকেন৷ উনি পেশাদার সাপুড়ে, আদি বাড়ি পুরুলিয়ায়৷ দু-একবার ওঁর পাল্লায় পড়ে সাপ ধরার অভিজ্ঞতা হয়েছে৷ তবে লাল রঙের সাপের কথা আমি জীবনে শুনিনি৷

চাঁদের আলোয় চারপাশ বেশ স্পষ্ট৷ মোবাইলের আলো জ্বেলে নির্দিষ্ট নিশানায় কিছু দূর এগোতেই অচেনা সুবাসের তীব্রতা ভীষণভাবে বাড়তে লাগল৷ কাদামাটি টপকে আরও কিছুটা এগোতেই চোখের সামনে একটা দশ ফুট উচ্চতার চন্দন গাছ৷ তার মাঝবরাবর একটা ডালে জড়িয়ে আছে আন্দাজ পাঁচ-ছয় ফুটের লাল রঙের জাতসাপ৷ তার চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত সম্মোহন৷ আমার গলা শুকিয়ে গেছে৷

কিছুটা সামলে নিয়ে, হাঁটু মুড়ে, মাটির ওপর বসে দু-চোখ বুজে দু-হাত বাড়িয়ে তাকে আহ্বান জানালাম৷ কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় তিনি নেমে এলেন আমার দু-হাতের ওপর৷ গোটা শরীর শিরশির করে উঠল৷ কিছু অনুভূতির অভিব্যক্তি হয় না৷ ভালোমন্দ একসঙ্গে চলতে থাকে৷

অদ্ভুত শীতল এই সরীসৃপের দেহ৷ চারপাশে পাগল-করা গন্ধের আকর স্বয়ং ইনি৷ অতি যত্নে নিয়ে হাজির হলাম বৃদ্ধ সাধকের সামনে৷ ততোধিক যত্নে তিনি জোরাবরকে নিজের কাছে টেনে নিলেন৷ সন্তানস্নেহে সরীসৃপের ফণায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকলেন বৃদ্ধ মির্জা সাহেব৷ আমি হাঁ করে অপলক দৃষ্টি নিয়ে সেইদিকে তাকিয়ে আছি, তাকিয়েই আছি৷

আদর পর্ব মিটতে আমাকে উদ্দেশ করে মির্জা সাহেব বললেন, ‘পিণ্ডারিজি গতকাল সূক্ষ্ম শরীরে এসেছিলেন৷ আপনার ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন, অমন একজন নিষ্কাম সাধকের স্নেহ পাওয়া চাট্টিখানি ব্যাপার নয়৷ আমাকে কী করতে হবে, সেটা উনি সাক্ষাতে বলে দিয়ে গেছেন৷ আপনাকে একটা চিঠি লিখে দিয়েছিলেন তো?’

চিঠির কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম, পকেট থেকে বের করে বৃদ্ধ মির্জা সাহেবের পাশে রেখে দিয়ে বললাম, ‘পিণ্ডারিজি এসেছিলেন আপনার কাছে! অবাক কাণ্ড! ভদ্রলোক বলেছিলেন, উনি কামাখ্যা যাবেন৷’

‘উনি সেখানেই আছেন, আসা-যাওয়ার জন্য কয়েক মুহৃর্ত সময় লাগে ওঁর৷ বর্তমান সময়ে অমন উচ্চকোটির যোগী খুব কম আছেন৷ আমি নিজে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অদৃশ্য থাকতে পারি, তবে সূক্ষ্ম শরীরে স্থান পরিবর্তন করতে পারি না৷ সে বিদ্যে আমার নেই৷ উনি সত্যিই ভীষণ ক্ষমতাবান এবং করুণাময় সাধক৷ আপনার ভুলের প্রায়শ্চিত্তটুকু না করে দিলে জীবনসংশয় থেকেই যাবে৷ এই চেয়ারে এসে চুপচাপ চোখ বন্ধ করে বসুন৷’

ভদ্রলোক নিজে উঠে দাঁড়িয়েছেন, আমি এখন সেই জায়গায় বসে আছি৷ আকাশের পূর্বদিক ক্রমশ ফরসা হতে শুরু করেছে৷ এটাই ব্রাহ্মমুহৃর্ত৷ চোখ-বন্ধ অবস্থায় মির্জা সাহেবের গলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ‘ইয়া খুদা, রহম কর বচেচ পর৷’

দু-চোখ এর ঠিক ওপরে, কপালের মাঝখানে জোরাবরের উপস্থিতি টের পাচ্ছি৷ ক্রমশ সে আমার বন্ধ চোখের ওপরে এসে উপস্থিত হয়েছে৷ ধীরে ধীরে তার দীর্ঘ শরীর নিয়ে পুরো মুখটা পেঁচিয়ে ধরল৷ স্পষ্ট উচ্চারণে মির্জা সাহেবের মন্ত্রপাঠ শুনছি৷ এটা খুব সম্ভবত আরবি ভাষা৷

শরীর জুড়ে একটা ভয়ংকর কাঁপুনি দেওয়ার কিছুক্ষণ পরেই ঘুম এল ভীষণ৷ জোরাবর ক্রমশ তার রাশ আলগা করতে শুরু করেছে৷ ঘুমিয়ে পড়ার চরম মুহৃর্তে টের পেলাম, সে আমার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে গেল৷ এত গভীর ঘুম আমার জীবনে কোনওদিন আসেনি৷

একটা স্বপ্ন আসছে ক্রমশ৷ আরে... এ তো আমার... মানে... সেই ছেলেবেলা.... উফফফ! ধড়ফড় করে উঠে বসেছি৷ চোখ খুলে সামনে দেখলাম, সূয্যিমামা নিজের জায়গায় জাঁকিয়ে বসার চেষ্টা করছেন৷ বিশালাকার এক কালো মেঘ আসুরিক প্রবৃত্তি নিয়ে তাকে আচ্ছন্ন করার জন্য ধেয়ে আসছে৷ ঘাড় ঘোরাতেই মাথার সামনে মির্জা সাহেব৷ বললেন, ‘দিনের আলোয় আমার বড্ড কষ্ট হয়, আপনি আমার সঙ্গে জঙ্গলে আসুন৷’

গত রাতের সেই চন্দন কাঠের গাছ৷ জোরাবরের গায়ে হাত বুলিয়ে মির্জা সাহেব ওকে ছেড়ে দিলেন৷ নিমেষের মধ্যে সে কোথাও একটা ভ্যানিশ হয়ে গেল৷ দিনের আলোয় চোখের সামনে লাল রঙের সাপ দেখলাম৷ গতকাল রাতে আমার মুখের সবটুকু জড়িয়ে ছিল এই মূর্তিমান, অথচ কখনও একবারও মনে হয়নি নিজের ক্ষতির কথা৷ তুলনামূলক একটা পরিচ্ছন্ন জায়গা দেখে বসেছি দু-জনে৷

টুকটাক কথাবার্তার পর মির্জা সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, ‘স্বপ্নে কী দেখলেন?’

‘বহু পুরোনো একটা ঘটনা ঘটেছিল একবার৷ তখন আমার বয়স দশ৷ কোথাও একটা গ্রামে বিয়েবাড়িতে গিয়েছিলাম মায়ের সঙ্গে৷ সেখানে আমি আর একটা বাচ্চা ছেলে পুকুরপাড়ে দৌড়োচ্ছিলাম৷ তার নাম খুব সম্ভবত অনন্ত৷ পা পিছলে সে পুকুরে পড়ে গেল৷ আমি হাত বাড়িয়ে ওকে ধরার চেষ্টা করেছিলাম, পারিনি তাকে বাঁচাতে৷ ভোররাত্রে উলটো স্বপ্ন দেখলাম৷ আমি পুকুরে ডুবে যাচ্ছি, অনন্ত হাত বাড়িয়ে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে৷’

‘আর কিছু দেখেননি?’

‘হ্যাঁ, দেখেছি৷’

‘কী?’

‘প্রায় দশ-বারো ইঞ্চি লম্বা একটা পঞ্চপ্রদীপ ভাঙা অবস্থায় পড়ে আছে মন্দিরের এককোণে, একজোড়া সাপ সেই প্রদীপের পাহারায় অপেক্ষমাণ৷ এটা সেই মন্দির, যে মন্দিরের স্বপ্ন বারংবার আমায় বিরক্ত করত৷ আশপাশে বেশ কিছু বরফ জমে আছে সেখানে৷ একটা মেয়েকে দেখলাম, এই মেয়েটাকে আগে আমি শিলিগুড়ি ফেরতের সময় বাসে দেখেছিলাম৷ স্পষ্ট দেখলাম, মেয়েটা সেই মন্দিরের বাইরে অপেক্ষা করছে৷’

‘পূজারিকে দেখতে পেলেন না?’

‘না৷’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে মির্জা সাহেব চুপ করে গেলেন৷ কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘বাসের সেই মেয়ে, মন্দিরের সেই মেয়ে এবং আপনি যার কঙ্কাল বিক্রি করে এসেছেন; তিনজন এক এবং অভিন্ন৷ সে বারবার আপনাকে খুঁজছে৷ এক কাজ করুন, আজ রাত্রে বেশ কিছু ধুনো, সুগন্ধি আতর এবং জমজম কুয়োর পানি নিয়ে আবার পুকুরপাড়ে ফিরে আসুন৷ ধুনো গুঁড়ো করে মাজারে স্পর্শ করিয়ে আনবেন, সময় রাত বারোটা৷ এই সূর্যের আলোয় শরীর ধরে রাখতে বড্ড কষ্ট হচ্ছে আমার৷ আপনি এখন আসুন৷ আমার সঙ্গে সাক্ষাতের কথা কাউকে বলবেন না৷ রাতে দেখা হবে৷’

ভদ্রলোক জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেলেন৷ আমি চুপচাপ বসে রইলাম৷ হাতঘড়িতে সময় সকাল সাড়ে আটটা৷ রাতের রাস্তা, দিনের আলোয় চেনা মুশকিল৷ ফিরতি পথে ধুনো কিনে মাথায় রুমাল চাপা দিয়ে মাজারে এসে উপস্থিত হয়েছি৷ সামনের চবুতরায় একঝাঁক পায়রা দানাশস্য খুঁটে খাচ্ছে৷ মূল দরগার চারদিকে বেশ কিছু এক কামরার ঘর আছে৷ নানা দেশ থেকে সেখানে এসে ভক্তবৃন্দ থাকেন সপরিবারে৷ জীবনের যাবতীয় অশান্তি অঞ্জলি দেন পিরের শ্রীচরণে৷

চবুতরায় ফরাশ পেতে ছয়জন মানুষ হারমোনিয়াম, তবলা নিয়ে পয়গম্বরের নামসংকীর্তন করছেন৷ গানের ছন্দ কাওয়ালি গোত্রের৷ ফজরের নামাজের পরবর্তী নামাজপাঠের আয়োজন চলছে৷ প্রণাম ঠুকে ফিরে এলাম খাবারের দোকানে৷

চূড়ান্ত ব্যস্ততা চারপাশে৷ দোকানে প্রচণ্ড ভিড়৷ জামাল সাহেব পরোটা ভাজছেন, দুটো ছেলে সার্ভিস দিয়ে শেষ করতে পারছে না৷ আমিও হাত লাগিয়ে দিলাম৷ টানা দেড় ঘণ্টা পর একটু ভিড় হালকা হল৷ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে ধন্যবাদ দিয়ে জামাল সাহেব বললেন, ‘বিছানাপত্তর ওপরে পেতে দিয়েছি৷ স্নান সেরে, জলখাবার খেয়ে, সেখানে বিশ্রাম করো৷ দেখা পেলে?’

‘রাতভর খুঁজেছি, গোটাকতক সাপ আর কুকুর ছাড়া কোনো মানুষের খোঁজ পাইনি৷’

‘জানতাম৷’

স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ার মুহৃর্তে জীবনবাবুর একটা কথা বারবার মনে পড়ছে, ‘যে মানুষ সমতল থেকে উঁচুতে ওঠেন, সে মাথা ঝুঁকিয়ে রাখে৷ যে মানুষ পাহাড় থেকে সমতলে নামেন, তাঁর মাথা সোজা হয়ে থাকে৷ মাথা ঝোঁকানো অবশ্যই ভালো, তবে নিজের তীক্ষ্ণতা বজায় রাখতে হবে৷ বিচক্ষণতার সঙ্গে সবকিছু বিবেচনা করতে হবে৷’

চোখ-কান খুলেই রেখেছি৷ গতকাল রাতে এখান থেকে বেরোনোর আগে ব্যাগ রেখে গিয়েছিলাম৷ কেউ সেটা ঘেঁটে, আবার অতি যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছে৷ জিনিসপত্র সবকিছু ঠিকঠাক তবে জামাকাপড়গুলো যে অর্ডারে সাজানো ছিল, তেমনভাবে নেই৷ মানিব্যাগ সমেত আইডি কার্ড ভাগ্যিস পকেটে ছিল! বিছানায় নিজেকে মিশিয়ে দিলাম৷ ক্লান্ত শরীর৷

প্রয়োজনমতো সমস্ত জিনিস সংগ্রহ করে হাতে কিছু সময় নিয়ে বেরিয়েছি, হাতঘড়িতে রাত এগারোটা৷ কবরস্থানের ভাঙা কাঠের দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি৷ গতকালের সেই উগ্র গন্ধ এখন আর নেই৷ সামনে পরপর স্মৃতিসৌধ৷ কিছু জায়গায় মার্বেল পাথরের সূক্ষ্ম কাজ করা আছে, কোনওটা আবার একদম সাদামাটা৷ পূর্ণিমার পরের দিন হিসাবে যথেষ্ট চাঁদের আলো পাওয়া গেছে৷ মানুষের গলার শব্দ পেয়ে গাছের অন্ধকারে মিশে গেলাম৷

মুখ-ঢাকা দু-জন মানুষ বেরিয়ে গেলেন৷ চেনা পারফিউমের গন্ধ এল৷ কিছুতেই মনে করতে পারছি না, এই গন্ধ আগে কোথায় পেয়েছি!

আরও দু-জন মানুষ এদিকে এলেন, নিচু গলায় তাঁরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলছেন, ‘বন্দা মিলা?’

‘নহি ইয়ার, অভি থা... অচানক কহিঁ গায়েব হো গয়া!’

এরা কি আমায় খুঁজছে? কিন্তু কেন?

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এদিক-সেদিক খোঁজাখুঁজি করে মানুষ দু-জন চলে গেল৷ কিছুটা সময় কাটিয়ে পুকুরপাড়ের সেই ভাঙা সিমেন্টের চেয়ারে এসে বসেছি৷

মনে সেই একই প্রশ্ন; আমাকে কেন কেউ খুঁজবে? উদ্দেশ্য কী?

হাতঘড়িতে সময় রাত বারোটা দশ৷ জোরাবরের গন্ধ নাকে আসছে৷ দূর থেকে কোনো এক মানুষের আসার পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি৷ সিমেন্টের চেয়ারের পিছনে লুকিয়ে পড়লাম৷ চাঁদের স্পষ্ট আলোয় মুখোশহীন যে মানুষকে দেখলাম, তিনি স্বয়ং জামালভাই৷ জোরাবরের গন্ধ, হয়তো তিনি পেয়েছেন৷ এই মানুষ আমাকে অনুসরণ করছে কেন!

আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ভদ্রলোক চলে গেলেন৷ সোজা উঠে না দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছে গেলাম চন্দন গাছতলায়৷ তুলনামূলকভাবে আজকে মাটি কিছুটা শক্ত৷ কারও কোথাও পাত্তা নেই৷

প্রায় আধ ঘণ্টা পর নাকে সুবাস এল৷ সশরীরে হাজির জোরাবর৷ সে আমায় ভালোই চিনেছে৷ কাঁধ বেয়ে নেমে এসে সামনে পড়ে-থাকা এক পদ্মপাতার ওপর গুছিয়ে কুণ্ডলী পাকিয়ে বসল, দৃষ্টি সটান আমার চোখের ওপর৷ মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে রেখেছি৷ আজ ওর গায়ের রং ঈষৎ খয়েরি, চোখে অদ্ভুত এক সম্মোহনী দৃষ্টি, ওই চোখ থেকে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই৷ ভিজে পাতা এবং কাদার ওপর পায়ের শব্দ পেলাম, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম মির্জা সাহেব স্বয়ং উপস্থিত৷

মুখে মৃদু হাসি নিয়ে উনি বসলেন আমার পাশেই৷ পদ্মপাতার আশ্রয় ছেড়ে জোরাবর নিজের মালিকের কোলে গিয়ে উঠল৷ ভাঙা চাঁদের আলোয় মির্জা সাহেবের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন চোখ-মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ গভীর দুটো চোখের নীচে লম্বা টিকালো নাক, বুক অব্দি লম্বা দাড়ি৷ নিঃসন্দেহে একসময় অসম্ভব সুপুরুষ ছিলেন৷

হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলাম, ‘আপনার বয়স কত হল?’

কিছুক্ষণ ভেবে উত্তর দিলেন, ‘বোধহয় একশো আশির ওপর, এ জীবনে অভিজ্ঞতা প্রচুর হয়েছে৷ এই দেশের স্বাধীনতা, বিশ্বযুদ্ধ এবং বেঁচে-থাকা শেষ মোগল সম্রাটকেও দেখেছি স্বচক্ষে৷ তবে আমার থেকেও বৃদ্ধ এক হিন্দু সন্ন্যাসী এখনও দেহ ধরে রেখেছেন৷ কখনও বেনারসের মণিকর্ণিকায় অথবা হরিশ্চন্দ্র ঘাটে ওঁকে দেখা যায়৷ কৈলাস পর্বতের পাদদেশে কিছু অতিবৃদ্ধ সন্ন্যাসী গুপ্ত অবস্থায় এখনও আছেন বলে শুনেছি৷ তাঁদের বয়স নাকি তিনশোর ওপরে৷’

কিছুক্ষণ চুপ করে বললাম, ‘সুফি মার্গ এবং সুফি সংগীত সম্বন্ধে যদি কিছু ধারণা দেন, খুব ভালো হয়! আমি নিজে যৎসামান্য পড়াশোনা করেছি, তবে আপনার মুখ থেকে শোনার লোভ সামলানো মুশকিল৷’

বৃদ্ধ মানুষ বেশ কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে নিজের দাড়িতে হাত বোলাতে শুরু করেছেন৷ খানিকক্ষণ পরে বললেন, ‘ইসলামধর্মের মূলতত্ত্ব হল নিষ্কাম এবং ত্যাগ, যেটাকে ইংরেজি ভাষায় ডিটাচমেন্ট এবং স্যাক্রিফাইস বলে৷ সুলতানি সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই ধর্মের মানুষের মধ্যে ভোগবাদ এবং অধঃপতন শুরু হয়৷ পরবর্তীকালে এসব লক্ষ করে কিছু ধর্মপ্রাণ মানুষ আশাহত হয়ে পড়েন এবং নিজেদের দর্শন নিয়ে একজন পির শাহজাদার অধীনে নির্দিষ্ট মতবাদের সংগঠন করে তোলেন, যা সম্পূর্ণরূপে নিষ্কাম সাধনার আধ্যাত্মিক সংগঠন হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়৷ সুফিদের সাধনমার্গ হল প্রেম এবং ভক্তি, এখান থেকেই সুফিবাদ, সুফিয়ানা এবং সুফি সংগীতের উৎস৷’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘তৎকালীন গোঁড়া মুসলিমরা সুফি সাধক বা ফকিরদের খুব একটা ভালো চোখে দেখেননি৷ ক্রমশ সুফি সাধকরা নিজেদের সমাজ থেকে আলাদা করে নিলেন৷ ত্যাগ, বৈরাগ্য, প্রেম ও সম্প্রীতি;এই চারটি হল সুফিবাদের মূলস্তম্ভ৷ সুফিরা তখনও এবং আজও কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা চিন্তা করেন না৷ আমাদের মতো সুফি সাধকদের একান্তই বিশ্বাস, একদিন আল্লাহ স্বয়ং প্রকট হবেন এবং ইসলামের আদর্শকে পুনরায় সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন৷’

জোরাবরকে চন্দন গাছের ডালে তুলে দিয়ে নিজের আসনে বসে বৃদ্ধ মির্জা সাহেব বললেন, ‘খ্রিস্টীয় নবম শতকে যে ইসলাম সাধকরা ‘সুফ’ অর্থাৎ পশমের বস্ত্র পরিধান করতেন মূলত তাঁদেরকেই সুফি বলা হত৷ পরবর্তীকালে দেখা গেছে, সুফির দর্শনতত্ত্বের ওপর উপনিষদ, যোগ এবং বৌদ্ধধর্মের প্রভাব আছে; অবশ্য, এই মতবাদের চরম বিরোধিতাও আছে৷ সুফি সাধকদের নিষ্কাম সাধনা এবং আল্লাহর উপলব্ধি নিয়ে যে ভক্তিমূলক এবং প্রার্থনাসংগীত রচনা করা হয়েছিল, তা সুফি সংগীত নামে পরিচিত৷ জনাব হাফিজ সাহেব, বুল্লেহ শাহ, আমির খসরু... এঁরা সকলে বিখ্যাত সুফি কবি৷ বাঙালি কবি লালন ফকিরও বেশ কিছু সুফি মার্গের গান রচনা করেছিলেন৷ তোদের প্রাণের কবি রবি ঠাকুরের বেশ কিছু গানে উপনিষদের ছোঁয়া পাওয়া যায়, সেগুলো অনেকটাই সুফিবাদের সঙ্গে মেলে৷ ভারতবর্ষে প্রধানত তিনটি সুফি সম্প্রদায় আছে;ফিরদৌসি, চিশতি এবং সুরাবর্দি৷ আমি যাঁর কাছে সুফি মতবাদের শিক্ষা পেয়েছি, তিনি মক্কায় থাকতেন, তাঁর নাম উচ্চারণ বারণ, কারণ তিনি প্রচারবিমুখ৷ উচ্চকোটির এক দরবেশ ছিলেন তিনি৷ এখানে বলে রাখি সুফি সাধকদের ফকির এবং দরবেশ; এই দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়৷ যদিও অনেকে মনে করেন দুটো শ্রেণিই এক৷’

আমি চুপচাপ বসে রয়েছি, অনেকক্ষণ হল৷ আরও অনেক কিছু জানতে ইচ্ছে করছে, তবে বোঝার সামর্থ্য সীমিত৷ আধ্যাত্মিক দর্শন বুঝতে গেলে প্রচুর পড়াশোনা এবং জাগ্রত চেতনার প্রয়োজন হয়, যা তৈরি হতে প্রচুর সময় লাগে, হয়তো একটা জন্ম কম পড়ে যায়৷

নীরবতা ভঙ্গ করে বৃদ্ধ মির্জা সাহেব বললেন, ‘আমার অত্যন্ত পছন্দের বিখ্যাত সুফি কবি এবং সংগীতজ্ঞ আমির খসরু সাহাবকে ‘তুতই-ই-হিন্দ’ অর্থাৎ তোতাপাখি, ‘ভারতের কণ্ঠস্বর’ এবং ‘কাওয়ালির জনক’;এই তিনটে ভিন্ন পরিচয়ে সম্মান জানানো হয়ে থাকে৷ অনেকেই মনে করেন, এই দেশের পাটিয়ালায় জন্ম নেওয়া এই সংগীতসাধক সেতারের আবিষ্কার করেন৷ ভারতীয় বীণা অর্থাৎ সরস্বতী বীণাকে খোলনলচে বদলে সেতার এবং পরবর্তীকালে ডমরু থেকে তবলার সৃষ্টি ওঁর হাত ধরেই হয়৷ যদিও এসব নিয়ে অনেক মতান্তর আছে৷ কাওয়ালি গানের প্রথম মার্গদর্শক ইনিই৷ রাগ ইমন, কাফি, বাহার এবং আরও বেশ কিছু বিখ্যাত রাগরাগিণীর জন্মদাতা স্বয়ং উনি৷ মহাজ্ঞানী এবং মহাপণ্ডিত এই সংগীতসাধককে ‘উর্দু সাহিত্যের জনক’ বলে থাকেন অনেকেই৷’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রলোক চুপ মেরে গেছেন৷ আরও কিছুক্ষণ চুপ থেকে তিনি গুনগুন করে সুর ভেঁজে একটা বহুলপ্রচলিত গান ধরলেন, ‘যে-হাল-এ-মিসকিন মাকুন তাগহাফুল দুরায়ে নয়না বানায়ে বাতিয়া৷’

গানের ভাষা হয়তো ততটা বুঝতে পারছি না, কিন্তু অনুভূতি! যেটা বোঝার জন্য কোনও ভাষার প্রয়োজন হয় না৷ আধ্যাত্মিক সাধনা আর সংগীত দুটো ভিন্ন খাতে বওয়া নদী যেন এক কণ্ঠস্বরে মিশে যেতে চাইছে৷

প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে চলল গজল, সত্যি বলছি, চোখের সামনে যা দেখছি তা অবিশ্বাস্য! বৃদ্ধ মির্জা সাহেব চোখ বন্ধ করে একমনে গেয়ে চলেছেন, হাওয়ায় ভাসছে ওঁর পার্থিব শরীর! মাটি থেকে প্রায় ছয় ইঞ্চি ওপরে মহাশূন্যে অবস্থিত উনি! আমি কেঁপে উঠছি বারবার৷ গান শেষ হতে, শরীর নিজে থেকেই নেমে এল৷

সাধনমার্গের ভিন্ন ভিন্ন ঘরানা আছে৷ যার যা সাধনার আকর, সে সেই ঘরানার সাধক৷ দেহ ও মন যখন সংগীততত্ত্বে প্রতিষ্ঠা পায়, তখন মানুষ মাধ্যাকর্ষণের বিরুদ্ধে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন৷ তানসেন প্রকৃতি পালটে দিতেন, সংগীতের মাধ্যমে আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারতেন৷ হনুমানজির মতন সাধক যোগমুদ্রায় সহজেই সমুদ্র পার করে ফেলতে পারেন, শ্যামাচরণ লাহিড়ীর মতো জ্ঞানী যোগী কলকাতায় বসে সুদূর ইংল্যান্ডের খবরে এনে দিতে পারেন৷ সবটুকুই সাধনা৷ ধর্ম আলাদা, আধ্যাত্মিক বোধ আলাদা, তবে উচ্চকোটি সাধকদের জাত একটাই; তারা সকলেই আত্মজ্ঞানী৷

যিনি আত্মজ্ঞানী, তিনি পঞ্চতত্ত্বে প্রতিষ্ঠিত৷ নিজের আয়ুর হ্রাস-বৃদ্ধি থেকে শুরু করে যাবতীয় ক্রিয়া তার নখদর্পণে৷ আমরা সাধারণ মানুষ, এগুলোকে অলৌকিক ভাবি আসলে, এসবই কঠিন সাধনার ফলাফল৷

মির্জা সাহেব চোখ খুলেছেন৷ দু-চোখ বয়ে অশ্রুধারা৷ প্রায় অনুভূতিশূন্য অবস্থায় মাটি স্পর্শ করে বসে আছি আমিও৷ সাময়িক ভুলে গিয়েছিলাম জীবনের দুঃখকষ্ট, স্বপ্নের গ্যাঁড়াকল আর এক সময়ের অভাবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কথা৷

পাশে পড়ে-থাকা মাটির হাঁড়ির টুকরো নিয়ে, বৃদ্ধ ভদ্রলোক কিছুটা কাদামাটি খুঁড়ে তালগোল পাকিয়ে একটা ছোট্ট ঢিপি তৈরি করলেন, আমার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট বললেন, ‘যদিও আমি আকারে বিশ্বাস করি না, তবুও আপনার বিশ্বাসের শক্তি বাড়াতে আমাকে এর সাহায্য নিতেই হল৷ ওঁকে কবর থেকে তোলা হয়েছিল, এইবার যেন কবরে শান্তিতে শুয়ে পড়তে পারে৷’

ভদ্রলোক থামলেন, ধূপবাতি এবং দরগায় স্পর্শ করিয়ে-আনা ধুনো ধরিয়ে পবিত্র জমজম কুয়োর জল কিছুটা সেই ঢিবির ওপর ঢেলে বললেন, ‘আমি যেমন বলছি, এই ঢিবিকে উদ্দেশ করে তেমনি বলুন৷’

ভদ্রলোক কিছু বক্তব্য রাখলেন, যেগুলো না বুঝেই আমি বললাম৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি যা বললাম, তার বাংলা মানে দাঁড়ায়; হে আল্লাহ, আমার কৃতকর্মের জন্য আমি লজ্জিত, আমি ক্ষমাপ্রার্থী সেই মানুষের কাছে, যার মৃত শরীর নিয়ে আমি ব্যবসা করেছি৷ দয়া করে আমায় ক্ষমাভিক্ষা করুন৷ মৃতের আত্মার জন্নত কামনা করছি৷’

প্রার্থনা শেষে, পাশে পড়ে-থাকা শক্ত মাটির হাঁড়ির টুকরো নিয়ে, মির্জা সাহেব সেই ঢিবিকে ঘেঁটে দিলেন৷ নিজের পকেট থেকে বের করে ছোট্ট একটি কালো কাপড় প্রথমে সেই ঢিবির ওপর স্পর্শ করে তৎক্ষণাৎ আমার মাথা থেকে বুক পর্যন্ত বুলিয়ে দিয়ে আবার নিজের পকেটে ঢুকিয়ে নিলেন৷ শরীর কেঁপে উঠল, ওঁর হাতের ছোঁয়া পেলাম৷ কয়েক ফোঁটা গোলাপজল আমার মুখে ছিটিয়ে দিয়ে তিনবার ফুঁ দিলেন আমার মাথায়৷ সম্মোহিত অবস্থায় আমি চুপচাপ বসে রইলাম৷

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনার দেখা স্বপ্ন নিয়ে আমি দুটো কথা বলব, যার একটা অক্ষরও আমার নিজের নয়৷ যে মন্দিরের স্বপ্ন আপনি বারবার দেখছেন, তার পাশ থেকে বয়ে-যাওয়া নদীতীরে আপনার মৃত্যু হয়েছিল৷ পিণ্ডারিজির মতে, শেষ মুহৃর্তে হাতে ধরে-থাকা আপনার অত্যন্ত প্রিয় একটি পঞ্চপ্রদীপ আপনার হাতেই রয়ে যায় মৃত্যুকালীন অবস্থায়৷ আপনি মারা যাওয়ার পর সেই নির্দিষ্ট হিন্দু মন্দিরের পুজো বন্ধ হয়ে যায়৷ আপনার শ্রাদ্ধশান্তি এবং পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন হয় বেশ কিছু সময় পর৷ কেন এত দেরি হয়, সে বিষয়ে আমি জানি না, পিণ্ডারিজি পরিষ্কার করে কিছু বলেননি৷ স্বপ্ন বিষয়ে আমার তেমন কোনও পড়াশোনা নেই৷ আজ কিছুটা আগে উনি এসে আমাকে এগুলো আপনাকে বলতে নির্দেশ করেছেন, আমি শুধু ওঁর নির্দেশ পালন করে চলেছি৷’

কয়েক মুহৃর্ত থেমে ভদ্রলোক বললেন, ‘এবারে আমি আমার একটা ব্যক্তিগত উপদেশ আপনাকে দিচ্ছি, আগেও বলেছি, আবারও বলছি, নিজে চালনা করতে পারেন এমন ছাড়া অন্য কোনও যানবাহন চাপবেন না৷ এখানে এসে আপনি কোথায়, কার বাড়িতে উঠেছেন, আমি জানি না, তবে বিপদের সংকেত দেখা দিচ্ছে৷ প্রেতযোনির খপ্পর থেকে আপাতত আপনি মুক্ত, তবে সামনে প্রাণঘাতী বিপদের আশঙ্কা আছে৷ এটাও ঠিক শেষ মুহৃর্তে আপনি ঠিক বেঁচে যাবেন, কোনও এক শুভ শক্তি আপনাকে বারবার বাঁচিয়ে দিচ্ছে৷ এখানে এসে আপনি কোথায় উঠেছেন?’

আচমকা প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে গিয়েছি৷ উত্তর দিলাম, ‘দরগার বাইরে অনেকগুলো দোকান আছে, তার মধ্যে জামাল সাহেবের পরোটার দোকান বিখ্যাত৷ সেখানেই ঠিকে আশ্রয় নিয়েছি৷’

‘ইয়া আল্লাহ! আমার মন এইজন্যই এত চিন্তায় পড়েছিল, আপনি ওই ইবলিসের কাছে উঠেছেন? সম্পত্তির জন্য নিজের বাপকে মেরেছে, সন্দেহের বশে নিজের বউকে মেরেছে, অর্থের লোভে ভিন রাজ্যে গিয়ে ব্যাঙ্ক ডাকাতি পর্যন্ত করেছে৷ মাত্র কয়েক হাজার টাকার জন্য আপনাকে খুন করতে ওর হাত একবারও কাঁপবে না৷ ওই অপদার্থ জামাল হন্যে হয়ে আমাকে খুঁজে চলেছে বহু বছর ধরে৷ আপনি এক কাজ করুন, এখান থেকে ডানদিকে জঙ্গল ধরে সোজা বেরিয়ে চলে যান৷ এক ঘণ্টার পথ পেরোলেই জাতীয় সড়ক পড়বে৷ ওখানে ফিরে আর লাভ নেই৷’

মির্জা সাহেবের বক্তব্য শুনে আমার চক্ষু চড়কগাছ৷ কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে বললাম, ‘নিজের পরিচয়পত্র, ব্যাঙ্কের কার্ড আর খুচরো কিছু টাকাপয়সা আমার সঙ্গেই আছে৷ যাবতীয় জামাকাপড় আর হাজার পাঁচেক টাকা ওই ব্যাগেই পড়ে রয়েছে৷ বর্তমানে এই বেকারত্বের জীবনে ওই টাকার মূল্য অসীম৷ একবার অন্তত যেতে না পারলে...’

আমার কথার উত্তরে কোনও উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোক নিজের বাঁ পকেটে হাত ঢোকালেন৷ একটি আশরফি আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘বাহাদুর শাহ জাফরের ‘তুঙ্গভদ্র’ নামে এক খাস হিন্দু গায়ক দোস্ত ছিলেন৷ একবার বার্মায় মুখোমুখি সংগীতচর্চায় এই আশরফি আমি উপহারস্বরূপ পাই, তখন আমি সদ্যযুবক৷ বাহাদুর শাহ এটি আমায় উপহার দিয়েছিলেন৷ এই মুদ্রার বিশেষ গুণ রয়েছে৷ কথিত আছে, বাদশাহ শাহজাহান তিনটি মুদ্রা পেয়েছিলেন আগ্রার সুপ্রাচীন শিব মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে, এটিই অন্তিম৷ আমার সঙ্গে এত বছর থেকে এই মুদ্রার বেশ কিছু শক্তি জন্মেছে৷ আসন্ন মৃত্যুযোগ থেকে এ আপনাকে বাঁচাবে৷ আমার এই সুফি শরীরে এক টাকারও খাবার প্রয়োজন হয় না৷ অর্থের কোনো মূল্য আমার কাছে নেই৷ এই জীবন আর বড়োজোর ছয় থেকে সাত মাস টিকিয়ে রাখতে হবে৷ আমার গুরুজির কাছ থেকে নির্দেশ এলেই, খোলস ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হবে৷’

আশরফি স্পর্শ করতেই শরীরে শিহরন খেলে উঠল৷ সুগন্ধিযুক্ত এই মহামূল্যবান মোহরের ওপর কিছু সাংকেতিক হরফ খোদাই করা আছে৷

উলটে-পালটে বারকয়েক আশরফি দেখে বললাম, ‘এটার দাম অনেক! আমি নিতে পারব না৷’

খানিক চিন্তাভাবনা করে ভদ্রলোক বললেন, ‘লখনউয়ের নকখাস বাজারে এটার বর্তমান মূল্য কমপক্ষে কোটি টাকার কাছাকাছি৷ এটা আমার তরফ থেকে আপনাকে উপহার দিলাম৷ বিয়ের পর নিজের বেগমের জন্য একটা ভালো হীরের আংটি বানিয়ে নেবেন৷ এ জীবনে আপনার অর্থযোগ প্রচুর৷ আজ থেকে দেড়-দুই বছর পর যখন প্রতিষ্ঠিত হবেন, তখন ছয় লক্ষ টাকা এই সুফি দরগার সেবায় এসে দিয়ে যাবেন; তাহলেই হবে৷ আপনার আর কোনও দ্বিধাবোধ থাকা উচিত নয়৷’

পয়সা হাতে নিয়ে বসে আছি৷ একজন মানুষ একদিনের আলাপে অমন উপহার কেন দেবেন? আমিই বা গ্রহণ করব কেন? উপহার ফেরত দিতে উদ্যোগী হলে, ভদ্রলোক গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন৷ মাথা নিচু করে ধর্মসংকটে বসে আছি৷

ভদ্রলোক মুচকি হাসলেন, তারপর বললেন, ‘সংগীতের সমঝদার বর্তমানে খুব কম মানুষ আছেন৷ সবাই গাইছেন, শ্রোতা কম৷ সকলেই লিখছেন, পাঠক কম৷ স্থির হয়ে এক জায়গায় বসে গান শোনার অসীম ক্ষমতা আপনার কাছে, ধরে নিন এটা তারই পুরস্কার৷ কথা বলার থেকে শোনায় আগ্রহ বেশি, আধ্যাত্মিক চেতনা যার সক্রিয়, খুদা যাকে স্বপ্ন নির্দেশ দিচ্ছেন, এই উপহার তাকে নিশ্চয়ই দেওয়া যায়৷ এ ছাড়া এটা আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, আপনার মনে কোনো দ্বিধাবোধ রাখবেন না৷ আমার একান্ত অনুরোধ, আপনি জামালের কাছে আর ফিরে যাবেন না৷ রাতের তৃতীয় প্রহর শেষ, এতক্ষণ শরীর ধরে রাখা আমার পক্ষে বড্ড কষ্টের৷ এবার আমায় যেতে হবেই৷’

নমস্কার জানিয়ে উঠে পড়েছি৷ উপহার এখন আমার ডান পকেটে৷ জামাকাপড় ঝেড়ে, পায়ে চটি গলাতে গিয়ে চমকে উঠেছি, মির্জা সাহেব সেখানে নেই৷ বসার জায়গাটি এখনও আছে, উনি নেই৷ যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় দেখা দেন, তিনি নিজের ইচ্ছাতেই অদৃশ্য হন৷ দূর থেকে বেশ কিছু পায়ের শব্দ কানে আসছে৷ লুকিয়ে পড়লাম গাছের আড়ালে৷

একাধিক টর্চের আলোয় জঙ্গলের পবিত্রতা নষ্ট হচ্ছে৷ জামাল সাহেবের গলা স্পষ্ট শুনতে পেলাম৷ বলছেন, ‘মির্জা সাহেবের কাছে থাকা ধনসম্পত্তি আমার চাই, ওই বাঙালি ছেলেটা কোথায় গেল? ও কি মির্জা সাহেবের দেখা পেয়ে গেল? গত আড়াই ঘণ্টা ধরে আমি ওকে খুঁজছি৷’

এই সময় একটা অন্য গলা শুনতে পেলাম, ‘জামালভাই, ছেলেটা ফিরে যায়নি তো!’

‘হতে পারে, এত রাতে এই গভীর জঙ্গলে কোন বুরবক পড়ে থাকে! ওর ব্যাঙ্কের এটিএম পিন কোড জেনে নিয়ে জোরজবরদস্তি...’

পায়ের আওয়াজ মিলিয়ে যেতেই, মির্জা সাহেবের উদ্দেশে একটা পেন্নাম ঠুকে আমি হাঁটতে শুরু করেছি৷ চাঁদের আলো পথ দেখাচ্ছে৷ বিশ্বাস করুন, আমার আর কোনও ভয়ডর নেই৷ আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে৷ মির্জা সাহেবের গাওয়া গানের সুর কানে বসে আছে৷ সেটা গুনগুন করে গাইতে গাইতে জঙ্গলের রাস্তায় চলে এলাম জাতীয় সড়কে৷

প্রায় খান দশেক লরি ছাড়ার পর একটা সাজানো বাস দেখতে পেলাম৷ অর্ধেকের বেশি সিট খালি৷ কর্তৃপক্ষের লোকজন বেশ ভদ্র, দু’একবার অনুরোধ করতেই আমাকে তুলে নিলেন৷ ড্রাইভারের পিছনদিকে একফালি সিটে আমি বসলাম৷ বাস চলছে ঝড়ের গতিতে, রাস্তা ফাঁকা৷ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ বিকট শব্দ হয়ে কোনওরকমে ওলটাতে গিয়ে আবার সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে এই যান৷ পাশে বসা ড্রাইভার সাহেব এবং খালাসির ঘুম ছুটে গেছে৷

মাত্র পনেরো দিনের পুরোনো টায়ার, মাঝখান থেকে ফেটে চৌচির৷ প্রায় চল্লিশ মিনিট লাগল টায়ার বদল করতে৷ আবার যাত্রা শুরু৷ উড়ো মেঘ কিছু জুটেছে বোধহয়, টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ মির্জা সাহেবের অনুরোধ বারবার কানে বাজছে৷ নিজের জীবনের সঙ্গে আরও অনেক মানুষের জীবনে ঝুঁকি জড়িয়ে নেওয়া চরম মূর্খতার পরিচয়৷ আপাতত আমি নিরুপায়৷ হে মা মুণ্ডেশ্বরী, বাকি এতটুকু পথ উতরে দাও মা গো!

স্টেশনের কাছে এসে যখন বাস থামল, তখন ভোর সওয়া পাঁচটা৷ এক ঘণ্টার রাস্তায় আর নতুন করে কোনও বিপদ হয়নি৷ বাসযাত্রী সকলে নেমে গেলেন, ওঁরা ফিরবেন এখান থেকে দিল্লি হয়ে রাজস্থান, আগামী পরশু সেখানে বউভাত৷

ভোরের আকাশ রাঙিয়ে, শত মেঘের কালো পরদা সরিয়ে ক্রমশ দৃশ্যমান এই জাগতিক পৃথিবীর মূল জীবনীশক্তি; বরুণকুমার৷

১২

ছেড়ে-যাওয়া আস্তানায় উঠে এসেছি৷ সকাল থেকে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে, মাঝে মাঝে থামছে, তেড়েফুঁড়ে আবার আসছে৷

স্নান সেরে এক কাপ চা খেয়ে বিছানায় মাথা দিতেই নির্ঝঞ্ঝাট লম্বা ঘুম৷ বৃষ্টি হলে উত্তরপ্রদেশের এই অঞ্চলে গরমের প্রভাব অনেকটাই কমে যায়৷ কলকাতার মতো ভ্যাপসা গরম এখানে নেই, ঘাম কম৷ স্থানীয় মানুষের উপদেশ অনুযায়ী পকেটে পিঁয়াজ নিয়ে ঘুরতে হয়৷ সেক্ষেত্রে নাকি গরমের হলকা লেগে শরীর খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে৷ এয়ারকুলার এখানে দারুণ কাজে দেয়৷ যিনি ফুটপাথের বাসিন্দা, তাঁর কাছেও ভাঙা কুলার দেখেছি, আমি যেখানে আছি, সেখানে অবশ্য নেই৷

কলকাতার তুলনায় এদিকে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ অনেকটাই কম৷ ভাষায় আর ব্যবহারে আদ্রতা মিশে আছে বটে৷ বেশির ভাগ মানুষ একে অপরের সঙ্গে ‘আপ’ অর্থাৎ আপনি সম্বোধন করে কথা বলেন৷ কলকাতার মানুষ হিসেবে প্রথম প্রথম কানে খটকা লাগলেও, সয়ে যায় সবকিছুই৷

ঘুম ভাঙল দুপুরের দিকে৷ আরেকবার স্নান সেরে বাইরে বেরিয়ে এসেছি৷ উদ্দেশ্যহীনভাবে কিছুটা হাঁটাহাঁটির পর বৃষ্টি এল৷ ফুটপাথের ওপর দু-জন মানুষ পাশাপাশি বসে আছেন৷ একজনের কাছ থেকে ভুট্টাভাজা কিনে অপরজনের কাছ থেকে ছাতা কিনলাম৷ নানান চিন্তার রেশ বুকে নিয়ে হেঁটে বেড়াচ্ছি শহরের রূপকথায়৷

আবহাওয়ার প্রকারভেদে এবং আরও নানা কারণে মানুষের পোশাক এবং খাদ্যাভ্যাস পালটে যায়৷ ব্যবহার পালটায় কি?

কিছু প্রশ্নের উত্তর হয়তো অজানা থেকে যাবে৷ অনেকটা হেঁটে চলে এসেছি৷ বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ছাতা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছি৷ সরকারি বোর্ড অনুযায়ী এই জায়গাটার নাম হুসেনগঞ্জ চৌরাহা৷

একজন ভিখারি এসে দুটো পয়সা চাইছেন, পকেট হাতড়ে কোনো খুচরো না পেয়ে বললাম, ‘ভুট্টা খাবেন?’

‘একটা ছাতা হলে ভালো হয়৷’

দান এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য আছে৷ জীবনবাবু একবার বুঝিয়েছিলেন, এখন আর মনে নেই৷ বড্ড হালকা লাগছে৷ এই যে তাৎক্ষণিক ভালো লাগা, এটাও এক ধরনের অহংকার৷ মন যখন আরও ওপরে উঠতে শুরু করবে, তখন ধর্ম-অর্থ-কামের পথে চলা শুরু হবে৷

রাস্তার ডানদিকে পরপর কতকগুলো থাকবার হোটেল৷ পাশেই কয়লার দোকান৷ ওপরে ব্যানারে লেখা আছে;‘হাজি সাহেব কোয়লেবালে৷’ হরেকরকম ঘুড়ি, মাঞ্জা সুতো এবং কাঠকয়লা বিক্রি হচ্ছে৷ ঘুড়ি বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য অদ্ভুত আকৃতির প্লাস্টিকের ব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে এখানে৷ রাস্তার বাঁদিকে একটা বড়ো টায়ার এবং বিদেশি মদের দোকান৷ তার পাশেই বাঁ হাতে একটা চওড়া গলি ঢুকে গেছে৷ সেই গলির মুখে এসে দাঁড়িয়েছি৷

একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ অতি যত্ন সহকারে পান তৈরি করছেন৷ নাকে অদ্ভুত সুন্দর খাবারের গন্ধ এল৷

খেয়েছি, পেট পুরে জমিয়ে খেয়েছি৷ দেশি ঘি দিয়ে তাওয়ার ওপর ফ্রাই করে চিকেন মশালা৷ পোড়া মুরগি, আদা-পিঁয়াজ-রসুবাটা, পোস্ত- কাজুবাদাম-কাঠবাদাম-খোয়া-নারকেল গুঁড়ো-গোলাপের পাপড়িবাটা দিয়ে তৈরি অসাধারণ এই রান্না৷ সঙ্গে যোগ্য সংগত দিয়েছে খামিড়ি রোটি৷

হুসেনগঞ্জের মোগল সম্রাট হোটেল থেকে বেরিয়ে এক খিলি দিশাবরী পাতার পান মুখে দিয়ে, হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি অনেকটা এইদিকে৷ আকাশের অবস্থা দেখে মনে হয়, সারাবছর এখানে এমনভাবেই ঘুড়ি ওড়ে৷ গোটা আশমান ছেয়ে আছে রংবেরঙের কাগজ-কাঠির হলফনামায়৷ সকলেই একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রত্যেকের সুতো বাঁধা আছে৷

এই জায়গার নাম বার্লিংটন চৌরাহা৷ বাঁদিকের চওড়া রাস্তা ধরে চলে গেলে পৌঁছে যাওয়া যাবে কেশরবাগ, জায়গাটার আসল নাম কাইজারবাগ৷ গান্ধীজি এবং গুমনামীবাবা ওখানে একটি নির্দিষ্ট দোকান থেকে চশমা বানাতেন, সেই দোকান আজও আছে৷ লোকমুখে শোনা যায়, গুমনামীবাবা সর্বপ্রথম উত্তরপ্রদেশে এসে এখানেই কোথাও লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজেকে৷ তৎকালীন উত্তরপ্রদেশ সরকার, ওঁকে আশ্রয় দিয়েছিলেন৷ স্মৃতি হিসেবে একটা সানগ্লাস কিনে ফেলেছি সেই দোকান থেকে৷ আবার ফিরে এসেছি বার্লিংটন চৌরাস্তার মোড়ে৷

এখান থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে আকাশবাণী ভবনের পাশ দিয়ে হাঁটলেই উড়ালপুল টপকে পৌঁছে যাওয়া যাবে লখনউ ক্যান্ট অর্থাৎ আর্মি রেসিডেনসিয়াল এলাকায়৷ সামনেই বিশালাকৃতির উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা৷ চোখের সামনে বেশ বড়ো আকারের সরকারি ম্যাপ-বোর্ড দেখতে পাচ্ছি৷ পরিষ্কার হরফে সব লেখা আছে৷ টুকটাক দেবনাগরী ও হিন্দি পড়তে পারি, জীবনদা শিখিয়েছিলেন৷

হাতে একটা সিগারেট নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করেছি, চোখ আটকে গেল৷ এক বৃদ্ধ মেকানিক এবং তাঁর ছেলে মিলে পুরোনো বুলেট বাইক রিপেয়ারিং করছেন৷ পরপর গোটা পনেরো বাইক দাঁড় করানো আছে, সব ক-টি সাবেকি রয়াল এনফিল্ড৷ এতগুলো পুরোনো গাড়ি একসঙ্গে দেখে, দাঁড়িয়ে পড়েছি৷ পুরুষদের গাড়ি আর মহিলাদের শাড়ি, দুর্বলতম চাষের জায়গা৷

হাতঘড়িতে সময় বিকেল পাঁচটা৷ বৃদ্ধ মেকানিক ময়লা হাতে চা-শিঙাড়া খাচ্ছেন৷ যেচে আলাপ করে বৃদ্ধ মানুষের সঙ্গে দু-দণ্ড কথা কয়ে বেশ পছন্দ হল৷ কলকাতায় কোথায় থাকি, কী করি... নানান প্রশ্নের পর জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনি কলকাতায় গেছেন কখনও?’

আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবুক দৃষ্টিতে বললেন, ‘সাতের দশকের প্রথমদিকে কলকাতায় গিয়েছিলাম লখনউ ইউনিভার্সিটির হয়ে ক্রিকেট ম্যাচ খেলতে৷ পরবর্তীকালে সেখান থেকে দার্জিলিং গিয়েছিলাম৷ আর কখনও যাওয়া হয়নি৷ তখন কলকাতায় ভীষণ অস্থির অবস্থা চলছে৷ নামজাদা বামপন্থী নেতাদের দেখেছি রাস্তায় টিনের ড্রামের ওপর উঠে বক্তৃতা দিতে৷ বিভিন্ন রাজ্য-রাজনীতির প্রতি আমার ইন্টারেস্ট আছে, বুদ্ধবাবু এবং দিদি দু-জনেই প্রিয় মানুষ৷ আমার নিজের মনে হয় বাঙালিরা জাতি হিসেবে ভীষণ কুঁড়ে, তবে মারাত্মক ট্যালেন্টেড৷’

‘আপনার জন্ম-কর্ম এখানেই?’

‘মির্জাপুরে আমার জন্ম, বাবা নর্দার্ন রেলওয়ের চাকরিসূত্রে এখানে বদলি হয়ে আসেন, ক্লাস ফাইভ থেকে লখনউতে, লালবাগ স্কুলে পড়াশোনা করেছি৷’

দু-চারটি এদিক-সেদিকের কথাবার্তার আদানপ্রদানের পর, পরবর্তী প্রশ্ন করে ফেলেছি, ‘নকখাস বাজার কোথায় বসে? পুরোনো জিনিসপত্র কেনা-বেচার মার্কেট কি ওটাই?’

আমাকে আপাদমস্তকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘চৌক এলাকায় শনিবার মাঝরাতের পর থেকে খোলা আকাশের নীচে একটা বাজার বসে, যার নাম নাকখাস৷ এই বাজারে মূলত সেকেন্ড হ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স আর জামাকাপড় পাওয়া যায়৷ তবে...’

বৃদ্ধ মেকানিক চুপ করে গেছেন৷ কিছুক্ষণ থেমে গলা খাঁকরে দু-হাত এগিয়ে এসে বললেন, ‘একটা জায়গা আছে এই বাজারে, যেখানে সাধারণ মানুষ পৌঁছোতে পারে না৷ তামাম উত্তরপ্রদেশের খানদানি লোকজন নিজের বাড়ির ঐতিহ্যশালী জিনিসপত্র এখানে বিক্রি করতে আসেন, সারা দুনিয়া থেকে মানুষজন সেই জিনিসপত্র নিলামে কিনতে আসে৷ সঠিক লোক ছাড়া এই গুপ্ত বাজার খুঁজে পাওয়া যায় না৷ আমিও ঠিকঠাক জানি না আসল জায়গা কোথায়৷ তবে জিতু পাঠক জানেন!’

‘উনি কে?’

‘বিখ্যাত বকিল সাহাব এবং অ্যান্টিক জিনিসের সমঝদার৷ ওঁর সংগ্রহে দুর্ম)ল্য জিনিসপত্র আছে বলে শুনেছি৷ আখতারির বসার চেয়ার, সাজের আয়না থেকে শুরু করে সম্রাট আকবরের আমলের পয়সা, অনেক কিছুই আছে৷ যদি প্রয়োজন হয়, আপনি একবার কথা বলে দেখতে পারেন৷ তবে একটু সমঝে, ভদ্রলোক ভীষণ খামখেয়ালি৷ একবার খেপে গেলে সামলানো মুশকিল হয়ে যায়৷ ওঁর একটা পুরোনো ট্রাম্প বাইক আছে, যেটার দেখাশোনা আমি করি৷ গিন্নি আর ছেলে বিদেশে থাকে, বছর দুয়েক আগের কেনা ছেলের ইয়ামাহা বাইকটা পড়েই আছে৷ ভদ্রলোক একসময় শখের জ্যোতিষচর্চা করতেন, নৈমিষারণ্যের শ্মশানেও মাঝরাতে দেখা গেছে কয়েকবার৷ ফি-বছরে একবার করে উত্তরকাশীতে ভাণ্ডারা দেন৷ এই বাজারেও একখানা ফিটন গাড়ি আছে ওঁর নিজের৷ অনেক অপবাদ আছে ওঁর সম্বন্ধে বাজারে৷ ওই মানুষের বন্ধুত্ব আর শত্রুতা; দুটোই ভীষণ তীব্র, অনেকটা মজে-যাওয়া কাঁঠালের মতো৷’

‘কোথায় থাকেন ভদ্রলোক?’

‘বাড়ি কাছেই, তবে দেখা করবেন কি না বলতে পারব না৷ সাধারণত অকারণে উনি কারও সঙ্গে দেখা করেন না৷’

‘কেন?’

‘কারণ জানা নেই৷ উনি আপন মর্জির মালিক!’

আরও দু-চারটে কথাবার্তার পর সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি, ভদ্রলোক গুনগুন করে গাইছেন, ‘ক্যা কারু সজনি... আয়ে না বলমওয়া৷’ আহা, খাসা গলা, বেশ মজলিশি মানুষ৷

হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছি কবীর মার্গ৷ যোজনা ভবনের পাশে বাম হাতের চওড়া গলির ভিতরে এক সুন্দর অট্টালিকা৷ খোঁজ নিয়ে জানা গেল, ভদ্রলোক বেশ জনপ্রিয় মানুষ৷ এই বাড়িটার ঠিক পিছনের বাংলোই হল, বিখ্যাত ঠুংরি গায়িকা বেগম আখতারের বাড়ি৷ একসময় উনি এখানে থাকতেন, বর্তমানে হাতবদলি হয়ে গেছে৷

গত পনেরো মিনিট ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করে, সেক্রেটারি সাহেব সময় দিলেন সাত দিন পরে৷ অনেক সাধ্যসাধনার ফলে তিনদিন পর একটা সময় জুটল৷

আমি বেরিয়ে আসছি, এমন সময় সেক্রেটারি ভদ্রলোক দৌড়ে এসে আমাকে আটকালেন৷ বললেন, ‘বাবু ক্যামেরায় আপনাকে দেখেছেন, আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান, প্লিজ বসুন৷’ ভদ্রলোক ভিতরে চলে গেলেন৷ ঘটনার আকস্মিকতায় আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি৷ কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হয়ে বসলাম৷ সংযোগ হয়তো একেই বলে৷

পাশাপাশি আরও গোটা আষ্টেক চেয়ার রাখা আছে৷ সবকটি ভরতি৷ বাঁদিকে প্রকাণ্ড সাইজের একটা টেবিল৷ চারপাশের দেওয়াল আলমারিতে পরপর বছরের হিসাব অনুযায়ী সারিবদ্ধভাবে সাজানো আইনের জার্নাল৷ দেওয়াল থেকে ঝুলে-পড়া প্রমাণ সাইজের আবক্ষ সব তৈলচিত্র৷ সকলের দৃষ্টি মনে হয় আমার দিকেই৷

একজন মধ্যবয়সি ভদ্রলোক, কাচের গ্লাসে ঠান্ডা জল দিয়ে গেলেন, সঙ্গে কালাকাঁদ৷ পরিবেশ বাতানুকূল, নাকে মিঠে আতরের খুশবু ভেসে আসছে৷ সামনের দেওয়ালে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা গ্র্যান্ডফাদার ক্লক-এ সময় সন্ধে ছ-টা৷ ব্যারিটোন শব্দে পরপর ছয়খানা ঘণ্টা বাজল৷

ঘড়ির কাঁটায় ছ-টা বেজে দুই মিনিট, মাঝারি উচ্চতায় মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্রলোক ঘরে ঢুকলেন৷ মাঝারি গড়ন, সাদা কুর্তা-পায়জামা৷ গলায় স্ফটিকের মালা, পায়ে কম্বলের চটি, চোখে সোনার ফ্রেমের চশমা, কুর্তার ফাঁক থেকে পইতে দেখা যাচ্ছে৷ চুলের কৃত্রিম রং কালো৷ ডান হাতের মধ্যমায় একটা সিঙ্গল-কাট অকৃত্রিম হীরের আংটি, যার জৌলুস নিজের জাত চিনিয়ে দিচ্ছে, ভদ্রলোকের চালচলনে অদ্ভুত এক আভিজাত্য ঝরে পড়ছে৷ ওঁর পিছনে আরও দু-জন ফাইল হাতে এসে উপস্থিত হয়েছেন এই ঘরে৷

ঝাড়া আড়াই ঘণ্টা ধরে আটজনের সঙ্গে আইনি জটিলতার কথাবার্তা চলছে একে একে৷ মাঝখানে একবার বেরিয়েছিলাম বাইরে, সিগারেট টেনে আবার ফিরে এসে বসেছি৷ এই ধরনের কথাবার্তা, আইনের মারপ্যাঁচ শুনতে ভালোই লাগছে৷ সবার শেষে এল আমার পালা৷

ভদ্রলোকের মুখোমুখি চেয়ারে এসে বসলাম৷ চোখের ইশারায় উনি, পাশে বসা সেক্রেটারি সাহেবকে কিছু একটা নির্দেশ দিলেন৷ কয়েক মিনিটের মধ্যেই সুসজ্জিত ট্রে-তে উর্দিধারী একজন বেয়ারা পানীয় এবং শুকনো মুখরোচক নিয়ে হাজির হলেন৷ আমার কাছে এক মিনিটের বিরতি চেয়ে, কাচের গ্লাসে অর্ধেক দারু এবং বাকিটা ঠান্ডা জল মিশিয়ে একনিশ্বাসে পুরোটা গলাধঃকরণ করলেন৷ মশলা-মাখানো ঘিয়ে ভাজা কাজু এক খাবলা মুখে পুড়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘আপনি ড্রিঙ্কস নেন?’

মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানানোর পর ভদ্রলোক বললেন, ‘ক্রিমিনাল কেস করা ছেড়ে দিয়েছি, বছরখানেক হল৷ সিভিল বা রেন্ট কন্ট্রোলের কোনও সমস্যা থাকলে বলুন৷ তবে আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, সমস্যা অন্য জায়গায়৷ আই মে বি রং...’

কিছুটা আমতা আমতা করে বললাম, ‘আপনি ঠিকই ধরেছেন, আমি আপনার সুনাম এবং পুরোনো জিনিসের সংগ্রহের কথা শুনে দেখা করতে এসেছি৷’

প্রায় আধ ঘণ্টা হয়ে গেল, ভদ্রলোক থম মেরে বসে আছেন৷ একের পর একটানা চার পাত্তর তরল নিজের পেটে চালান করে দিয়েছেন৷ মুখের ভূগোলে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে৷ আমি চুপচাপ বসে আছি৷ উঠে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে কিছুটা জড়ানো গলায় বললেন, ‘কী জানতে চান আপনি?’

কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে বললাম, ‘লোকমুখে শুনেছি, আপনার কাছে প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য জিনিসের বেশ কিছু সংগ্রহ আছে৷ সেসব আপনার ব্যক্তিগত সম্পত্তি, তা নিয়ে আমার কোনও বক্তব্য নেই৷ আমার কাছে একটি প্রাচীন আশরফি আছে, যেটা আমি নকখাস বাজারে বিক্রি করতে চাই৷ সমস্যা হচ্ছে, সেই বাজারের সঠিক জায়গায় গিয়ে পৌঁছোনোর মতো ক্ষমতা আমার নেই৷ এক্ষেত্রে আপনিই সহায়৷’

ভদ্রলোক চেয়ারে এলিয়ে পড়েছিলেন, সোজা হয়ে বসে চোখ খুলে আমার মুখের ওপর তাকিয়ে বললেন, ‘আপনাকে সাহায্য করে আমার লাভ?’

‘আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিক হিসেবে বিক্রির একটা অংশ আপনাকে অবশ্যই দেওয়া হবে৷ আসলে এই শহরে আমি কাউকেই তেমন চিনি না৷ কেউ যদি সাহায্য না করে, কাজটা হবে কী করে? অর্থের ভীষণ প্রয়োজন, একটা বাইক কিনতেই হবে আমাকে৷ এখানে আসার সময় খোঁজখবর নিয়েই এসেছি, বাজারে আপনার নাম আছে, যদি আমাকে একটু নকখাস বাজারে নিয়ে যান, আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব৷’

বাঁকা হাসি দিয়ে ভদ্রলোক উঠে দাঁড়াতে গিয়ে কিছুটা টাল খেয়ে, তৎক্ষণাৎ সামলে নিলেন৷ হাতের ইশারায় চাকরবাকর এবং বাকি সবাইকে সরে যেতে বললেন৷

একে একে সবাই চলে গেলে, আমার হাতে তালাচাবির গোছা ধরিয়ে কাঠের দরজা দেখিয়ে তালা মেরে ভিতরে আসতে বললেন৷ তালার অবয়ব প্রায় আমার হাতের তালুর সাইজের৷

একটু ভয়, কিছুটা সন্দেহ, বাকিটা রোমাঞ্চ... মন শান্ত রেখে নির্দেশমতো কাজ করলাম৷ এতদিনে এইটুকু অন্তত বুঝতে পেরেছি, বিপদ থেকে বাঁচানোর মতো কেউ একজন আছেন এই পৃথিবীতে৷

চেম্বারের পিছনদিকে একটা ঘর আছে, সেটা দেখার মতো৷ বার্মাটিক সেগুন কাঠের আলমারি৷ হাতির দাঁতের কারুকার্য করা নৌকা থেকে শুরু করে হরেকরকম পাথর, দলিল-দস্তাবেজ, হাতে আঁকা তৈলচিত্র, সারিবদ্ধভাবে দাঁড়-করানো প্রাচীন মুদ্রা এবং সারা পৃথিবীর বিখ্যাত সব গাড়ির যন্ত্রাংশ৷

একটা টেবিলের মুখোমুখি দুটো চেয়ার, পাশে একটা খাট এবং সোফা-কাম-বেড৷ টেবিলের ওপর রাখা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস৷ সুতির কাপড় দিয়ে ভালো করে মুছে নিয়ে বললেন, ‘কই দেখি, কী আশরফি?’

ভদ্রলোক বেশ ভালো রকমের নেশাগ্রস্ত, তবে জ্ঞান টনটনে৷ উঠে দাঁড়িয়ে পকেটের ভিতর থেকে উক্ত পয়সাটি ওঁর হাতে দিলাম৷ কাঠের দরজা বন্ধ করে চাবিটা আমার কাছেই রয়ে গেছে৷ ভদ্রলোক সেটা নিজের কাছে চেয়ে নেননি, হয়তো ভুলে গেছেন৷

প্রায় মিনিট দশেক হল দু-জনেই চুপচাপ৷ বাইরে এই সময় বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ ঘরের চারপাশ ঘুরে আমার দৃষ্টি আটকে গেল ভদ্রলোকের মুখের ওপর৷ আশরফি নিজের কাছে রেখে, অবাক চোখে আমাকে একটা প্রশ্ন করলেন, ‘সত্যি কথা বলুন, এই জিনিস আপনি কোথায় পেলেন?’

চরম মিথ্যা কথা বললাম, ‘আমার ঠাকুরদা, বাবাকে দিয়ে গিয়েছিলেন৷ সেই হিসাবে পৈতৃক সম্পত্তি৷’

খুব মন দিয়ে আমার কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে বললেন, ‘উহুঁ, খটকা লাগছে৷ বাই দ্য ওয়ে, আপনি কি পূজারি বা তান্ত্রিক?’

‘না! কেন বলুন তো!’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘তাহলে পরিষ্কার আপনি মিথ্যা কথা বলছেন! এই আশরফি আপনার নয়, হতে পারে না৷ কোনও সংগ্রহশালা বা কোনো মানুষের কাছ থেকে নির্ঘাত চুরি করেছেন৷’

ধরা-পড়ে-যাওয়া এথিক্যাল চোরের মতো আমি চুপচাপ বসে আছি৷ নিজের বাম পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করলেন ভদ্রলোক৷ কাকে যেন একটা ফোন করলেন৷ মেজাজ সুবিধার নয়, ভিন রাজ্যে এসে ধোলাই খেতে হবে নাকি!

ঘরের পিছনের দরজা খুলে লম্বাচওড়া চেহারার একজন মানুষ বেরিয়ে এসেছেন৷ জিতু পাঠকের ইশারায় আমাকে আপাদমস্তক সার্চ করা হল৷ নাক মোছার রুমাল, মোবাইল, কিছু টাকাপয়সা ছাড়া তেমন কিছুই বেরোল না৷ ভদ্রলোক যেমন এসেছিলেন, তেমনি চলে গেলেন৷ আমাকে ইশারায় সামনের চেয়ারে বসতে বলে পাঠক মহাশয় এক ঢোকে হাতের সুরাপাত্র শেষ করলেন৷

ফরসা মানুষ রেগে গেলে চোখ-মুখ লাল হয়ে যায়৷ চশমা খুলে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এসে আমার সামনে দাঁড়িয়ে দু-কাঁধে হাত দিয়ে বললেন, ‘আমার বাবা মারা যান একশত তিন বছর বয়সে, তিনি বিখ্যাত কোটলার রাজপরিবারের রাজজ্যোতিষী ছিলেন৷ একই পরিবারের রাজবৈদ্য ছিলেন আমার ঠাকুরদা৷ জ্যোতিষবিদ্যা সম্বন্ধে পড়াশোনা আমারও বেশ আছে৷’

হঠাৎ দু-পা পিছিয়ে গিয়ে ভদ্রলোক হাতজোড় করে নমস্কার করে বললেন, ‘নমস্কার৷ আমার নাম জিতেন্দ্রকুমার পাঠক, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে ভালো লাগল৷’

অদ্ভুত আচরণ! ভদ্রলোক নিজের ডান হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আমার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করার জন্য, ভদ্রতার খাতিরে আমিও নিজের ডান হাতে এগিয়ে দিলাম৷ প্রায় দু-আড়াই মিনিট হল, উনি আমার হাতটা চেপে ধরে রয়েছেন৷

আরও কিছুক্ষণ পর হঠাৎ হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললেন, ‘পাশের ঘরে টেবিলের ওপর প্যাড আর পেন রাখা আছে, নিয়ে আসুন’৷ ভদ্রলোকের কথায় কিছু একটা আছে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেটা এনে ওঁর সামনে দিলাম৷ কাটাকুটি খেলার মতো পেন দিয়ে উনি সাদা কাগজের ওপর জন্মছক আঁকতে শুরু করলেন৷ জন্মতারিখ এবং সময় নিয়ে প্রশ্ন করলেন, উত্তর দিয়ে আমি দাঁড়িয়ে রইলাম৷

আমার দিকে চোখ তুলে বললেন, ‘পিছনের ঘরে অনেক কিছু দেখার মতো আছে, ঘুরে দেখুন৷ আধ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে ডিস্টার্ব করবেন না৷ আপনি না বললেও আমি আপনাকে বলে দিচ্ছি, আসলে আপনি কে!’

ঘরটা আসলে একটা ছোটোখাটো মিউজিয়াম৷ মানতেই হবে ভদ্রলোকের সংগ্রহের বাতিক মারাত্মক৷ তালাবন্ধ কাচের আলমারির ওইপাশে একটা রুপোর মুকুট রাখা আছে৷ সেই মুকুটের মধ্যমণি একটা রাজবংশীয় পান্না৷ কত বছরের পুরোনো পাথর কে জানে! তবে জৌলুস হারায়নি এতটুকু৷ নিজের কর্মসূত্রে পাথর চিনতে শুরু করেছিলাম বছর তিনেক আগে থেকে, এখানে এসে চোখ ধাঁধিয়ে গেছে৷

ঠিক পঁয়ত্রিশ মিনিট পর জিতুবাবুর গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘বাঙালিবাবু, আসুন৷’

গুটিগুটি পায়ে সেখানে গিয়ে বসেছি৷

উনি বলতে শুরু করেছেন, ‘আর্থিক অনটনের জেরে জীবনে বেশ কিছু স্যাক্রিফাইস করতে হয়েছে, আজন্ম পিতৃহারা, বর্তমানে মা-ও বেঁচে নেই, একজন দিদি হয়তো ছিলেন৷ হালফিলে কঠিন কোনও এক সমস্যায় ঘর ছেড়েছেন৷ জীবনে অদ্ভুত সব অভিজ্ঞতা হওয়ার তুমুল সম্ভাবনা আছে৷ বয়স তেইশ বছরের কাছাকাছি, চরিত্র ভালো, মৃত্যুর মুখ থেকে ঘুরে আসার অভিজ্ঞতা হবে কয়েকবার৷ কোমরের বামদিক ঘেঁষে একটা জড়ুল আছে, আগামী দিনে রাজযোগ আছে, জাতকের পড়াশোনা মধ্যম, ভবিষ্যতে ভবঘুরে হওয়ার পুরো সুযোগ আছে, বর্তমানে বেকার... আর কিছু?’

লে হালুয়া৷ আমি অবাক! পাশে রাখা বোতল থেকে কিছুটা পানীয় কাচের গ্লাসে ঢেলে নিয়ে জল ছাড়াই নিজের গলায় চালান করে দিলেন ভদ্রলোক৷

চোখ-মুখ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এবার আসি এই পয়সার কথায়৷’

তাল সামলে উঠে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে ফস করে কিছুটা ধোঁয়া আমার মুখের ওপর ছেড়ে বললেন, ‘এই পয়সা হাতে নিয়ে ভালো করে রগড়ে দেখো, কোনও গন্ধ পাচ্ছ কি না!’

দুই হাতের মাঝখানে আশরফি রেখে ভালো করে ঘষতেই দিন দুয়েকের পুরোনো চেনা গন্ধ নাকে এসে ঠেকল৷ এই গন্ধ জোরাবরের৷ চন্দন কাঠের উগ্র গন্ধ-মাখানো এই আশরফির আসল মালিক কি সে?

মনে একের পর এক প্রশ্নের খেলা চলছে৷ দেওয়ালঘড়িতে সময় রাত সওয়া দশটা৷ সামনে বসা পাঠক সাহেব নিজের গ্লাসে আবার তরল ভরে নিয়েছেন৷ হাত পালটে পয়সা আবার ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের নীচে চলে গেল৷ আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটল, শেষ পর্যন্ত ভদ্রলোক চোখ তুললেন৷

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে জড়ানো গলায় বলতে শুরু করলেন, ‘লাল রঙের জাতসাপ খুব একটা নেই এই দেশে৷ একজন সুফি সন্ত ছিলেন মির্জা সাহেব নামে৷ অনেকে বলে থাকেন, উনি নাকি আজও জীবিত আছেন৷ ওই ভদ্রলোকের একটা লাল রঙের পোষা সাপ ছিল, ওর গোটা শরীর দিয়ে এমন গন্ধ বের হত বলে শুনেছি৷ গুমনামীবাবা ওরফে ভগবানজির ঘনিষ্ঠ নৈমিষারণ্যের এক সন্ন্যাসী ওই সাপের নাম দিয়েছিলেন সর্পগন্ধা৷ ছেলেবেলায় বাবার কাছে শুনেছি, মির্জা সাহেব নিজের পোষা সাপকে জোরাবর বলে ডাকতেন৷ এই আশরফি নির্ঘাত মির্জা সাহেবের সম্পত্তি৷ এমন আরেকটা আশরফি আমার এক বিখ্যাত ব্যবসাদার বন্ধুর কাছে আছে বম্বেতে, যেটা ঘষলে আজও হুবহু একই গন্ধ বেরোয়৷ বাবার কাছে শুনেছি, বিখ্যাত সুফি ফকির মির্জা সাহেবের কাছে এমন তিনটে পয়সা ছিল৷ একটা আছে আমার বন্ধুর কাছে, একটা আছে মধ্যপ্রাচ্যের এক আঞ্চলিক রাজার কাছে, আজ তিন নম্বর পয়সা আপনার হাতে দেখলাম, কীভাবে পেলেন?’

কথার প্রসঙ্গ পালটাতে বললাম, ‘গুমনামীবাবা সম্বন্ধে যদি দু-চার কথা বলেন, খুব ভালো হয়৷ বাঙালি হিসেবে ভীষণ স্পর্শকাতর জায়গা, নেতাজি এবং গুমনামীবাবা; এই দুটো নাম অনেকে একসঙ্গে উচ্চারণ করেন অথচ দু-জন মানুষের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা৷ আপনি দেখছেন ওঁকে?’

বাঁ হাতে ধরে-থাকা কাচের গ্লাস পাশে নামিয়ে রেখে ভদ্রলোক বললেন, ‘প্রণববাবু মাঝেমধ্যে আসতেন৷ তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আরও কিছু মানুষজন আসতেন৷ ভদ্রলোক নিজেকে লোকচক্ষুর আড়ালে গুটিয়ে রাখতে পছন্দ করতেন৷ ব্রাহ্মমুহৃর্তে অনেকেই ওঁর গলায় গীতাপাঠ শুনেছেন, যদিও এটা শোনা কথা, আমি নিজের কানে শুনিনি৷ হনুমানগড়ির জঙ্গলে এবং নৈমিষারণ্যের বিভিন্ন গুপ্ত ডেরায় ওঁকে নিজের চোখে আমি দেখেছি বার তিনেক৷ ভদ্রলোক জ্ঞানমার্গে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, ক্রিয়াযোগ অভ্যাস করতেন এবং খুব সম্ভবত অদ্বৈতচর্চা করতেন৷’

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিতু পাঠক আবার বলতে শুরু করেছেন, ‘একটা সময় ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু খোঁজখবর চালিয়েছিলাম৷ ওঁর লেখা একাধিক চিঠি আমার হাতে এসেছিল৷ আজাদ হিন্দ ফৌজের সমৃদ্ধিশালী তহবিল ছিল, পরবর্তীকালে সেটা তছরুপ হয়৷ ব্যক্তিগতভাবে ঘোর বিশ্বাস করি উনিই নেতাজি৷ একটা কথা ওঁর সম্বন্ধে শোনা যায়!’

‘কী কথা?’

‘কিছু মানুষ ওঁকে একই সময়ে একাধিক জায়গায় দেখেছেন, যদিও এটা শোনা কথা৷’

ভদ্রলোক থেমে গেছেন৷ কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন, ‘শাস্ত্রীজির সময়ের একটা ছবিতে ওঁকে বিদেশে দেখা যায় অথচ সেই সময় উনি এখানেই... তবে এটা জেনে রেখো ভাই, প্রসঙ্গ পালটে তুমি আমাকে ভোলাতে পারবে না৷’

আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি৷ মির্জা সাহেব তাঁর নিজের কথা বলতে বারণ করেছেন, ওই মানুষের সঙ্গে কথার খেলাপ কখনওই সম্ভব নয়৷ আমি মুখ বন্ধ করে আছি, বেশ বুঝতে পারছি, দুঁদে উকিল মানুষের সঙ্গে চালাকি সম্ভব নয়৷

ভদ্রলোক আগের প্রশ্ন আর-একবার বললেন, আবার গুছিয়ে মিথ্যা কথা বলব কি না ভাবছি৷ হঠাৎ জিতু পাঠক ছিটকে সরে গেলেন আমার কাছ থেকে, টলতে-থাকা অবস্থায় ডান পকেট থেকে একটি রিভলভার বের করে সেটা আমার মাথায় ঠেকিয়ে দিলেন৷ চোখ বন্ধ করে ফেলেছি৷ জীবনের কোনো মূল্য নেই৷ সেই বাস অ্যাক্সিডেন্টের পর মৃত্যুমুখ থেকে ফিরে আসা থেকে শুরু করে পিণ্ডারিজি, মির্জা সাহেব হয়ে আজ জিতু পাঠকের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে৷ আমার পুরো বিশ্বাস, এই বিপদ কেটে যাবে৷

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুকনো গলায় বললাম, ‘আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ একজনের কাছে, এই পয়সা সম্বন্ধে আপনাকে কিছু বলতে পারব না৷’

‘যদি আমি এক গুলিতে খুলি ফাটিয়ে দিই?’

‘আই ডোন্ট কেয়ার, প্লিজ প্রসিড৷’

রিভলভার টান মেরে ছুড়ে দিয়ে ভদ্রলোক ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন৷ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর উনি চেষ্টা করছেন উঠে দাঁড়ানোর, পারছেন না৷ মধ্যবয়স্ক মানুষকে আমি টেনে তুললাম৷ থরথর করে কাঁপছেন ভদ্রলোক৷

আমাকে বসতে বলে বাথরুমে চলে গেলেন৷ মেন গেটের চাবি আমার কাছে, ইচ্ছা করলেই পালাতে পারি৷ ইচ্ছায় আপাতত ভাটা চলছে৷ রিভলভার আমার পায়ের সামনে পড়ে আছে৷ ভদ্রলোক ফিরলেন মুখে-চোখে জল দিয়ে৷

নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরে এসে বসে আমায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই?’

উত্তর দিলাম, ‘আপনি আজকের মতো আমায় ছেড়ে দিন৷ আমি ফিরে যাব৷’

‘প্লিজ খেয়ে যাবেন৷’

ভদ্রলোক পকেট থেকে ফোন বের করে খাবারের অর্ডার দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন৷ নেশার ঘোর এখনও স্পষ্ট, তবে ব্যবহার সংযত৷

কিছুক্ষণ চুপ থেকে উনি কথা বলা শুরু করলেন, ‘ওই আশরফি যে আপনার নয়, সেটা আমি কী করে বুঝলাম, বলতে পারবেন?’

‘না৷’

‘ওই মোহর যার কাছে থাকবে সে, জীবনে কোনওদিন অর্থাভাবে ভুগবে না৷ বংশপরম্পরায় ওই সম্পদ আপনার হাতে থাকলে আপনার অর্থের অভাব থাকত না৷ আপনি মিথ্যা কথা বলেছেন আমায়, সত্যিটা যদি বলেন, আপনার উপকারই হবে৷ ওই পয়সার ওপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই৷ আমি জানি ওই পয়সা মির্জা সাহেবের, তবে আপনার কাছে কী করে এল, সেটাই বুঝতে পারছি না৷’

বেশ হতাশ লাগছে৷ নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে আমি ওঁর পাশে বসলাম৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘লোকের বাড়িতে কাজ করে মা আমায় বড়ো করেছেন৷ রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে হিসেবে এখনও কাজ করে চলেছি৷ আমার জীবনের গল্প শুনে কী পাবেন, আমি জানি না৷ তবে আমি বলছি, আপনি শুনুন৷ পরিস্থিতি বিচার করে মির্জা সাহেব নিশ্চয়ই আমায় ক্ষমা করে দেবেন৷’

রাত সওয়া বারোটা বাজে৷ অড়হর ডাল আর ঘি-মাখানো রুটি পড়ে আছে সামনের টেবিলে৷ অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন জিতু পাঠক৷ ভদ্রলোকের প্রায় নেশা ছুটে গেছে!

আমার হাত দুটো ধরে অবিশ্বাস্য কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘মির্জা সাহেবকে আপনি নিজের চোখে দেখেছেন তাহলে!’

‘হ্যাঁ, দু-দিন আগেই দেখেছি৷ জোরাবরকেও দেখেছি, হাতেও নিয়েছি৷ আপনি ঠিকই বলেছেন, ওই আশরফিতে ওই সাপের শরীরের গন্ধই লেগে আছে৷ নেহাত একখানা বাইক আমায় কিনতেই হবে, না হলে এই পয়সা কাছছাড়া করার কোনও ইচ্ছা আমার নেই৷’

ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে ওঁর নিজের হাত দুটো জড়ো করে, আমার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ক্ষমা করে দেবেন ভাই, আপনার দিকে বন্দুক তাক করা একদম ঠিক হয়নি৷ ওই আশরফি আপনি আপনার কাছেই রেখে দিন৷ পয়সা যা লাগে, আমি দিচ্ছি, কলকাতায় ফিরে আপনি না হয় আমায় ফেরত দিয়ে দেবেন৷’

‘সেটা অসম্ভব! অচেনা কারও কাছ থেকে আমি পয়সা ধার নেব না৷’

‘তাহলে ছেলের বাইকটা নিয়ে যান!’

‘মানে?’

‘আমার একমাত্র বংশধর আর গিন্নি বিদেশে আছে, আজ দু-বছর হয়ে গেল৷ ওর নতুন-কেনা ইয়ামাহা পড়ে আছে, নিয়ে যান৷ প্লিজ ওই আশরফি হাতছাড়া করবেন না৷ জীবনে যখন প্রচুর পয়সা আসবে, তখন ওই আশরফি আর কিনতে পারবেন না৷ ওটা অমূল্য! আমার ঘোর বিশ্বাস, আপনার ভাগ্য যেকোনও মুহৃর্তে বদলে দেবে ওই পয়সা!’

একটা জিনিস আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না৷ সবাই বলছে, আমার নাকি ভবিষ্যতে প্রচুর টাকাপয়সা হবে, কিন্তু কীভাবে?

মনের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে৷ চূড়ান্ত নেশাগ্রস্ত অবস্থায় উনি ভূত-ভবিষ্যৎ বাতলে দিলেন নিখুঁতভাবে৷ অদ্ভুত ক্ষমতা!

এই বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলে ভদ্রলোক বললেন, ‘জ্যোতিষবিদ্যায় যে পারদর্শী, সে মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েই তার হাতের রেখা বুঝে নিতে পারে৷ আমি সেই ব্যবস্থাই করেছি৷ হাতের রেখা স্পর্শ করে কুষ্ঠি বানানো ভীষণ কঠিন কাজ, তবে এই বিদ্যা আমার বাবা শিখিয়ে গেছেন৷ বর্তমান ভারতবর্ষে গুটিকয়েক লোক ছাড়া আর কেউ জানেন না এই মহাবিদ্যা৷ বাংলা, কাঞ্চি এবং আসামে এখনও দুই-একজন জানেন বটে৷’

ভদ্রলোকের নেশা অনেকটা কেটে গেছে৷ আমার খিদে মরে গেছে৷ সময় রাত্তির সাড়ে বারোটা৷ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পকেট থেকে চাবি বের করে ঝিম-মেরে-থাকা জিতু পাঠকের হাতে ধরিয়ে বললাম, ‘এবার আমি যাব৷’

একটু বিরতি নিয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য ভদ্রলোক বাথরুমে গিয়েছিলেন৷ ফিরে এসে আশরফি আমার হাতে দিয়ে ঘরের দরজা অবধি এসে বললেন, ‘আপনাকে একটা কথা বলা হয়নি৷ জ্যোতিষ বিচারে আপনার স্বপ্নলাভের কথা জানতে পারা যাচ্ছে৷ বেনারসের কোনও বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আপনার স্বপ্নের সঠিক মানে উদ্ধার করতে পারবেন বলে মনে হয়৷ এই স্বপ্নের অর্থ উদ্ধারের জন্য বিশেষ পূজারও প্রয়োজন আছে৷ যে উদ্দেশ্যে আপনি বাড়ি ছেড়েছেন, সেটা পুরো হলে বাড়ি ফিরে যান৷ এখানে থেকে খুব একটা লাভ কিছু হবে না৷ আগামিকাল এসে আমার ছেলের বাইকটা নিয়ে যাবেন অবশ্যই৷ আজকের মতো এইটুকুই, আমার কৃতকর্মের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী৷’

খিদের চোটে নাড়িভুঁড়ি সেদ্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়৷ একটা ফাঁকা অটো পেয়ে ধর্মশালায় ফিরে এসেছি৷ ঘরে ঢুকে জামাকাপড় পালটে দুটো রুটি খেয়ে যখন ঘুমিয়েছি, তখন হাতঘড়িতে সময় রাত সওয়া একটা৷

১৩

ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে আছি৷ শরীরময় অদ্ভুত অস্বস্তি৷ গত রাতের কথা বারবার স্মরণে আসছে৷

একটা অ্যাক্সিডেন্ট, জীবন-মৃত্যুকে স্পর্শ করে আবার ফিরে আসা এবং অতিষ্ঠ করে তোলা এক স্বপ্ন; এতগুলো কারণের জন্য আমি আজ ঘরছাড়া, বাউন্ডুলে৷ ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টের আগে এমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল শরীরে, সেটা আবার ফিরে এসেছে এই মুহৃর্তে৷

এতসব দুর্ঘটনার মধ্যে অনেক আগেই আমার ফুরিয়ে যাওয়ার কথা, অথচ দিব্যি এখনও বেঁচে আছি, প্রাণবায়ু ঠিকমতো কাজ করছে৷

ক্রমশ ব্যক্তিগত একটা ধারণা স্পষ্ট হচ্ছে; মানুষের ফুরিয়ে যাওয়া বোধহয় ঠিক ততটা সোজা নয়৷ আত্মহত্যা ছাড়া, নিজের ইচ্ছায় মানুষ মরতে পারেন না৷ ভীষ্ম পিতামহর মতো শক্তি সকলের নেই৷ নিজেকে শেষ করতে গিয়ে বেঁচে গেলে লজ্জার শেষ থাকে না৷ মানুষ এই অবস্থা থেকেও ঘুরে দাঁড়ায়, জীবন সকলকে শিক্ষা এবং সুযোগ দুটোই দেয়৷

মির্জা সাহেবের দেওয়া পয়সা কাছে থাকলে, নিজেকে রাজা-বাদশাহ বলে মনে হয়৷ গতকাল রাতে জিতু পাঠক আমার জীবন সম্বন্ধে যা বলেছেন তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সত্যি৷ ভদ্রলোক সত্যিই অদ্ভুত, খামখেয়ালি এবং অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী৷

ঈশ্বরে বিশ্বাস থাকলেও এযাবৎ জ্যোতিষশাস্ত্রকে ভণ্ড বলেই ভাবতাম৷ জিতু পাঠক নামক ব্যক্তিকে বিশ্লেষণ করার পর সেই ধারণা পালটে গেছে৷

মির্জা সাহেব সবার চোখের সামনে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে পারেন, ভদ্রলোকের সাধনমার্গ; সংগীত৷ জোরাবর; অত্যন্ত বিষধর এক সরীসৃপ অথচ সে মির্জা সাহেবের অনুগত৷ পুরো জঙ্গলে খুব সম্ভবত আর কোথাও চন্দন গাছ নেই, জোরাবরের শরীরের অমন গন্ধ পৃথিবীর আর কোনও সাপের গায়ে আছে কি?

পিণ্ডারিজি নিজের সূক্ষ্ম শরীরে মুহৃর্তের মধ্যে ভিন রাজ্যে পৌঁছে যেতে পারেন, তিনি স্বপ্নে অন্য মানুষকে নির্দেশনা দিতে পারেন৷ আমার মতো একটা সাধারণ ছেলের জন্য তিনি কেন এতটা কষ্ট করলেন? সবকিছুই কি কাকতালীয়!

মনের মধ্যে ঘুরতে-থাকা নানান চিন্তাভাবনায় ঘুম ভেঙে গেছে, এখন সময় ভোর চারটে৷ পাশের ঘরের বৃদ্ধা মাসিমা রাতভর কাশাকাশি করে একটু আগে ঘুমিয়েছেন৷ শারীরিক অস্বস্তি নিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে হাঁটতে শুরু করেছি৷

এই ভোরবেলায় বিয়েবাড়ি ফেরত একটা টাঙাগাড়ি আস্তানায় ফিরছে৷ মাথায় কী এল, একশো টাকায় রফা করে কেশরবাগ চৌরাস্তার মুখে এসে নেমেছি৷ ঘোড়াগাড়ির একটা অদ্ভুত দুলুনি আছে৷ আপনি যদি সেই গাড়ির মধ্যে শক্ত হয়ে বসে থাকেন তাহলে মজা পাবেন না, আপনাকেও দুলতে হবে গাড়ির ছন্দের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে;অনেকটাই আমাদের জীবনের মতো৷ চারপাশে একবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ডানদিকে রাস্তায় হাঁটা শুরু করেছি৷

একই শরীরে সত্ত্ব-তম-রজোগুণ বাস করে৷ মানুষের প্রবৃত্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সেই গুণ প্রকাশ পায়৷ প্রবৃত্তি আর নিবৃত্তি;এই নিয়েই জগৎসংসারের ওঠা-পড়া৷ জন্ম থেকে যে অভাগা ছেলেটা দৌড় শুরু করেছিল, তার ছায়া এখন হাঁটছে, একসঙ্গে আমিও হাঁটছি৷ ছায়ার থেকে কায়া যখন বড়ো হতে চায়, মানুষ তখন মুখ থুবড়ে পড়ে৷

সামনের বড়ো পার্কের মধ্যে এক অদ্ভুত সাদা বাড়ি দেখা যাচ্ছে, ওটার নাম বারাদুয়ারি৷ শোনা যায়, কোনও একসময় নাকি ওখানে বিচারসভা বসত, এখন বিয়েবাড়ি এবং বিভিন্ন প্রদর্শনী উপলক্ষে ভাড়া দেওয়া হয়৷ আমি এগিয়ে চলেছি লখনউ ইউনিভার্সিটির দিকে৷ চারপাশ নিস্তব্ধ শুনশান৷ এই ভোরে কে যেন গানের রেওয়াজ করছে, ভারী মিঠে গলা, বোধহয় আহির-ভৈরব৷

পণ্ডিত বিষ্ণুনারায়ণ ভাতখণ্ডে মিউজিক কলেজ টপকে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলে এসেছি অনেকটা৷ একটা ঠ্যালা ভ্যানে চা বিক্রি হচ্ছে৷ দু-কাপ চা আর একটা সিগারেট নিয়ে আবার হাঁটছি৷ মাঝেমধ্যে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে হাঁটতে ভালো লাগে৷ আরও কিছুটা এগিয়ে বাঁ হাতে শ্মশানঘাট৷

হাতঘড়িতে সময় পাঁচটা৷ পুবের আকাশ কমলা৷ পরপর দু-খানা মৃতদেহ চিতায় তোলার ব্যবস্থা হচ্ছে৷ একজন অতিবৃদ্ধ পুরুষ, আরেকজন অল্পবয়স্কা৷ মৃত্যুর কোনও বয়স নেই, মরলেই হল৷ আসা আর যাওয়ার মাঝে দিনকয়েকের অনিশ্চিত যাত্রাপালা; এটাই জীবন৷ মানুষ চলে যায়, তার ব্যবহৃত ঘরবাড়ি, আসবাবপত্র, এমনকি জপের মালা পর্যন্ত রয়ে যায়৷ কর্ম-সংস্কার ছাড়া কিছুই সঙ্গে যায় না৷

মৃত সধবা মহিলাকে স্নান করিয়ে নববধূর সাজে সাজানো হয়েছে৷ মাথায় ঘোমটা দেওয়ার জন্য জরদৌসি চূর্ণী, কপালে শ্বেতচন্দনের ফোঁটা, মাথা ভরতি কমলা সিঁদুর, হাতজোড়া মেহেন্দি... আমি অবাক হয়ে সব দেখছি৷ মড়া পোড়ানো এবং মড়া পুড়তে দেখা, আমার বিশেষ শখ, ভীষণ একটা টান অনুভব করি৷ জীবনে প্রথমবার সিগারেট ধরাতে গিয়ে খুব জোর আগুনের ছ্যাঁকা খেয়েছিলাম, বুঝেছিলাম, চুপচাপ চিতায় শুয়ে যে পুড়ছে, তার কত সুখ!

একটা সময় ছিল, ভীষণ মড়া পোড়াতাম, বিনা পয়সার নেমন্তন্ন পেতাম৷ অল্প বয়সের একটা ছেলের খাওয়ার লোভ এবং শূন্য পকেট, চিৎপুরের একদিকে সোনাগাছি, অন্যদিকে রয়াল হোটেল৷ যার খিদে, সে বোঝে, পেটভরা মানুষেরা খালি জ্ঞান দেয়৷

উত্তর কলকাতার মায়া-ধরা রাস্তাগুলো বড্ড কষ্ট দেয়৷ কখনও মনে হয়, এই হয়তো স্কটিশ চার্চ কলেজের দর্শন বিভাগ থেকে স্বামীজি বেরিয়ে চলে গেলেন৷ মানুষের জীবনে চাওয়া আর পাওয়া, কোনওদিনও সম্পূর্ণতা পাবে না৷

মড়া পোড়ানোর নেশা, অন্য বাকি সব নেশার থেকে ভীষণরকম তীব্র৷ হাতে যখন সময় আছে, তখন এখানেই বসি না হয়৷

চিতার কাঠ সাজানোর বিশেষ কিছু নিয়ম আছে, সিঁদুর-পরিহিতা মহিলার অঙ্গে এক টুকরো সোনা দেওয়ার রীতি আছে এদিকে৷ একের পর এক যাবতীয় নিয়মনিষ্ঠা পালিত হচ্ছে বিধি অনুযায়ী৷ বেশ জমিয়ে আমি একখানা সিগারেট ধরিয়েছি, আরও এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না৷

একদম ফাঁকা রাস্তায়, প্রায় নিঃশব্দে পালিশ করা কালো রঙের পুরোনো ফোর্ড গাড়ি এসে দাঁড়াল৷ হালফিলে এই গাড়িটা যেন কোথায় দেখেছি!

মোটা থামের আড়ালে নিজের পাতলা শরীরটাকে লুকিয়ে ফেললাম, চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি, জিতু পাঠক গাড়ি থেকে নেমে সেই সধবা মৃতার দিকে এগিয়ে চলেছেন৷

আমার মনে নানান প্রশ্নের ওঠানামা চলছে৷ যাবতীয় কৌতূহলকে স্তব্ধ করে ভদ্রলোক এগিয়ে চললেন গোমতী নদীর স্নানঘাটের দিকে৷ শ্মশানঘাটের এই স্নানঘাটকে ভৈসাকুণ্ড বলে, শ্মশানের নাম বৈকুণ্ঠধাম৷ কিছুটা এগিয়ে নিজেকে আড়াল করে ভদ্রলোককে লক্ষ করে চলেছি৷ গোমতী নদীর জলের অবস্থা ভীষণ সঙ্গিন, স্নানের উপযোগ্য নয় কোনওভাবেই৷ ভদ্রলোক ওই নোংরা জলেই স্নান সারলেন৷

একটা অদ্ভুত কাণ্ড দেখলাম চোখের সামনে৷ পরপর তিনবার গোমতী নদীতে ডুব দেওয়ার পর ভদ্রলোক পইতে বাম কাঁধে নিলেন৷ পূর্বদিক ছেড়ে এবার তিনি দক্ষিণ মুখে ডুব দিলেন তিনবার৷ স্নানঘাট থেকে উঠে আসার পর একজন স্থানীয় শ্মশানকর্মী কুড়ি লিটারের জলের বোতল খুলে ওঁর মাথায় ঢালতে লাগলেন৷ গোমতীর নোংরা জলকে ধোয়ার প্রক্রিয়া সমাপ্ত হল৷ উদীয়মান সূর্যকে প্রণাম করে ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন জ্বলন্ত চিতার দিকে, পোশাকের কিছুটা পরিবর্তন হল এই সময়৷

সাদা বস্ত্র ছেড়ে ভদ্রলোক রক্তবস্ত্র পরলেন৷ গলার স্ফটিক নামিয়ে, পাশে দাঁড়ানো ড্রাইভারের হাতে দিলেন৷ জ্বলন্ত চিতার সামনে এসে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা প্রণাম ঠুকে, ঘড়ির কাঁটার উলটোদিকে তিনবার পরিক্রমা করে, মৃতার বাড়ির লোকেদের সঙ্গে দু-একটা কথাবার্তা বলে, সেই চিতা থেকে জ্বলন্ত একটি কাঠ নিয়ে এগিয়ে গেলেন অন্যদিকে৷ দূরত্ব বজায় রেখে আমিও এগিয়ে চললাম৷ সামনে উন্মুক্ত আগাছা, অদূরে গোমতী নদী৷ দুটো জায়গার মাঝখানে দুই হাত চওড়া সিমেন্টের বাঁধানো যজ্ঞবেদি করা আছে৷ চিতার সেই জ্বলন্ত কাঠকে মাঝখানে রেখে সাজানো হল আরও অনেকগুলো কাঠ৷ জিতু পাঠক দক্ষিণমুখী আসনে বসে, বাম কাঁধে নয় সুতোর পইতে রেখে মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে অগ্নিকুণ্ডে ঘি ঢালছেন৷ আকাশ আংশিক মেঘলা করে ছিল অনেকক্ষণ, এবার বৃষ্টি শুরু হল৷

চোখের সামনে একটা তুমুল লড়াই দেখতে পাচ্ছি৷ বৃষ্টির জলে যজ্ঞের আগুন নিভে যাওয়াটাই স্বাভাবিক, কিন্তু আদৌ তা হচ্ছে না৷ টিনের পর টিন ঘি ঢেলে চলেছেন জিতু পাঠক৷

কিছুক্ষণ পর এক অস্বাভাবিক ব্যাপার ঘটল... বৃষ্টি হচ্ছে মাঝ-আকাশে, শ্মশানের অর্ধেক বৃষ্টিহীন, ক্রমশ সম্পূর্ণরূপে বৃষ্টিপাত বন্ধ হল৷

যজ্ঞবেদি এক-পায়ে স্পর্শ করে উঠে দাঁড়িয়েছেন ভদ্রলোক, মন্ত্র আওড়ে চলেছেন অনেকক্ষণ ধরে৷ দূরত্ব এতটাই যে কিছুই শোনা যাচ্ছে না৷ ক্রমশ সেই আগুন ভয়ংকর রূপ ধারণ করল৷ আগুন যখন দাঁড়িয়ে-থাকা জিতু পাঠককে ছাপিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে চাইছে, তখন ভদ্রলোক ঘি ঢালা বন্ধ করে দিলেন৷ আরও প্রায় দুই ঘণ্টা পর দুটো আগুন একসঙ্গে নিভল৷ চিতা এবং যজ্ঞের অগ্নিকুণ্ড দুটোই শান্ত হল৷

তামাম দুনিয়ার যেখানে যত আগুন আছে, সব নিভে গেলেও ক্ষুধার্ত পেটের আগুন আর কামনার আগুন বোধহয় কোনওদিন নিভবে না৷ ষড়রিপু এবং জন্মজন্মান্তরের সংস্কার মানুষের চরিত্র গঠন করে৷ আপনি, আমি, জিতু পাঠক; কেউ এর বাইরে নই৷ যে মানুষ ঘরসংসার ছেড়েছে, সে এই বাঁধন কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করে৷ সৎ-অসৎ উভয়েরই যে নাশ করে, জীবিত অবস্থায় যিনি নিজের পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করেন, তিনিই সন্ন্যাসী৷

চোখের সামনে যে মানুষকে দেখছি, তিনি সন্ন্যাসী নন মোটেই, গৃহী৷ আমার এই অল্প জীবনের অভিজ্ঞতা বলছে, জিতুবাবু সবেমাত্র একটা প্রায়শ্চিত্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেন৷ খুব সম্ভবত কোনও এক পাপকার্য খণ্ডনের উদ্দেশ্যে, প্রেতযোনির ক্রিয়া সম্পন্ন করলেন৷ সুপ্রাচীন শ্মশানের মাটি ছাড়া এই ক্রিয়া অসম্ভব৷

ভস্মের ছাই নিয়ে নিজের কপালে তিলক কেটে, ভদ্রলোক আবার নেমে গেলেন গোমতী নদীতে৷ এবার তিনি পূর্বদিকে মুখ করে পরপর তিনবার ডুব মারলেন, উঠে এলেন ডাঙায়, কুড়ি লিটার বিশুদ্ধ জলে স্নান সারলেন, কাপড় পরিত্যাগ করে সাদা কাপড় পরলেন, স্ফটিকের মালা গলিয়ে নিলেন গলায় এবং পইতে নিলেন ডান কাঁধে৷ গাড়িতে ওঠার আগে, প্রায় নিভে-যাওয়া চিতার সামনে হাঁটু মুড়ে বসে নিজের দু-কান ধরে, মাটিতে নাকখত দিলেন এবং সোজা বেরিয়ে গেলেন৷

একটা অটো ধরে ওঁর পিছু নিলাম৷ আমার বয়স কম, সাহস তুলনায় যথেষ্ট বেশি৷ হালফিলে মনে একটাই কথা গেঁথে গেছে; কেউ একজন অহরহ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আমাকে বাঁচানোর জন্য৷ হয়তো আপাতত আমি বিপদমুক্ত৷

এখন সময় দশটা, এটা লখনউ হাইকোর্ট৷ উলটোদিকে রেসিডেন্সি৷ বেশ বোঝা যায়, ভদ্রলোকের নামডাক আছে, আদালতে পৌঁছোনোমাত্র বেশ কিছু নেতা-মন্ত্রী এবং সাধারণ মানুষ ওঁর পাশে ঘুরঘুর করছেন৷ একজন জুনিয়র উকিলবাবু এসে কিছু কাগজপত্র দিয়ে গেলেন ভদ্রলোকের হাতে৷ নিজের পকেট থেকে মোবাইল বের করে কাউকে একটা ফোন করছেন৷ আশ্চর্য ব্যাপার, ফোনটা আমার কাছেই এল;

‘গুড মর্নিং ভাই, সন্ধে সাতটা নাগাদ একবার অবশ্যই আসবেন আমার গোমতীনগরের বাড়িতে, কাজ আছে৷ ঠিকানা মেসেজ করে দিচ্ছি, জায়গা চিনতে অসুবিধে হলে আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব?’

‘চিনতে কোনও অসুবিধা হবে না, আসব নিশ্চয়ই৷’

‘অবশ্যই আসবেন ভাই, বাইকের কাগজপত্র আমি সমস্ত রেডি করে রেখেছি৷ নিয়ে যাবেন৷’

আদালত থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রেসিডেন্সির মূল ফটকের সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি৷ দেখে বুঝলাম, হালফিলে মানুষজন এখানে প্রেম করতে আসেন৷ একসময় ভারতের স্বাধীনতার বীজ, কলকাতার ব্যারাকপুর থেকে শুরু হয়ে এখানেই বিস্তার লাভ করেছিল৷

সুবিশাল ঐতিহাসিক ঐতিহ্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছি৷ অতিবৃদ্ধ একজন ফকির সাহেব এইদিকে এগিয়ে আসছেন৷ নতজানু হয়ে প্রণাম করে ওঁকে রাস্তা দিলাম, উনি সামনে এসে দাঁড়ালেন৷

ভদ্রলোকের বয়স হয়েছে অনেক৷ আমার কপালের দিকে তীক্ষ্ণদৃষ্টি রেখে বললেন, ‘সামনে সমূহ বিপদ৷ আল্লাহতালার কাছে দোয়া চেয়ে নিন৷’

আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি কি এখানেই থাকেন?’

ভদ্রলোক অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন, ‘ওইদিকে, একদম শেষ প্রান্তে একটা ছোট্ট মাজার আছে, পুরো রেসিডেন্সি গোলাবারুদে ঝাঁজরা হয়ে গেলেও, ওই মাজারটি বেঁচে যায়৷ আমি পর্যটক, একান্নটি ইসলামিক দেশ পর্যায়ক্রমে ঘুরতে থাকি৷ জন্ম এ দেশে, এখানে থাকলে, ওই মাজারেই রোজ নামাজ পড়তে আসি৷’

আর অপেক্ষা না করে ভদ্রলোক চুপচাপ চলে গেলেন৷ ওঁর চলে যাওয়ার শেষ মুহৃর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করে আবার হাঁটতে শুরু করলাম৷ বিপদের আর কী-ই বা বাকি আছে! কাইজারবাগ চৌরাহার সামনে এসে দাঁড়িয়ে ডানদিকে সোজা হাঁটলে প্রচুর পুরোনো ঘরবাড়ি চোখে পড়ে৷

টানা চল্লিশ মিনিট ধরে হেঁটে এসে পৌঁছেছি একটা কাপড়ের মার্কেটে৷ চিকন, সাচ্চাজরি এবং কলকা-আঁকা কুর্তা ও পাঞ্জাবি ঝুলছে সরু রাস্তার দু-পাশে৷ কিছুটা ঘোরাঘুরি করে, ঢোলা পায়জামা কিনে, সরু গলি ধরে আবার প্রধান সড়কে এসে পৌঁছেছি৷ তুখোড় খিদে পেয়েছে৷

এখন যেখানে বসে বিরিয়ানি খাচ্ছি, সেই জায়গাটা যেমন ভিড়, তেমনি অগোছালো৷ মাছি ভনভনে অপরিষ্কার জায়গা৷ তবে, সব দুর্বলতা ছাপিয়ে গেছে খাবারের স্বাদ৷ এই জায়গা লখনউয়ের চক এবং ভারতবিখ্যাত এই দোকানের নাম ইদ্রিস৷ এদের বিরিয়ানি, কোর্মার জবাব নেই৷ মালিক ভদ্রলোকের সঙ্গে আলাপ করে জানলাম, এঁরা বিরিয়ানির মাংসে জল ব্যবহার করেন না, পুরো মাংসই তৈরি হয় মোষের দুধ দিয়ে৷

যেখানে খাচ্ছি, রাস্তার অন্য ফুটে, উড়ালপুলের নীচে একদল ছেলে ঘুড়ির সুতোয় মাঞ্জা দিচ্ছে৷

একেকটা বয়স থাকে, যখন জীবন নিজের মতো বাঁচা যায়, ক্রমশ বয়সের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের গতিমুখ পালটে যায়৷ পরিস্থিতি সিদ্ধান্ত নেয় আগামী জীবনের৷ বড়ো-হতে-থাকা মানুষ ক্রমশ বাধ্যতায় বাঁচতে শিখে যায়, এই বাঁচায় বেঁচে থাকার আনন্দ হয়তো পাওয়া যায় না, তবুও মানুষ বাঁচে, বাঁচতেই হয়৷ মহাপ্রভু জগন্নাথ বারো বছর পর শরীর পালটে ফেলেন, মানুষের সময় অনির্দিষ্ট৷

এই সময় জিতু পাঠকের আরেকবার ফোন এল৷ ভদ্রলোক আমার ঠিকানা জেনে নিলেন৷

সূর্য মধ্যগগনে৷ পেট ভরতি করে অটোয় বসে ধর্মশালায় ফিরছি৷ একটা নামী হোটেল থেকে ডালফ্রাই, মাংস আর পরোটা প্যাক করিয়ে নিয়েছি৷ মাথায় একটা অন্য চিন্তা খেলা করছে৷

যে মধ্যবয়স্ক মানুষ গতকাল রাতে আমার মাথায় বন্দুক ধরেছিলেন, আজ সেই মানুষই নেমন্তন্ন করছেন৷ ভদ্রলোক বিত্তবান, খামখেয়ালি, শৌখিন এবং অবশ্যই অসাধারণ, আজ সকালের শ্মশানের ঘটনা... কেমন যেন সব গুলিয়ে দিচ্ছে৷

একটা গোটা জীবনে অনেকরকম মানুষ আসেন৷ কেউ আসেন দুঃখ দিতে, কেউ আসেন আনন্দ দিতে, আবার কিছু মানুষ আসেন, ভাটার জলের মতো সমস্ত কিছু নিয়ে যান৷

কিছু মানুষ খুব অল্প সময়ের জন্য জীবনে আসেন, কিন্তু স্পষ্ট ছাপ ফেলে যান৷ মানুষ চেনা কঠিন, ভীষণ কঠিন! শুরু করতে হয় নিজেকে দিয়ে৷

মুশকিল কোথায় হয়, জানেন? যখন আগন্তুকদের সঙ্গে আমরা নিজেদের জড়িয়ে ফেলি৷ মানুষ সব থেকে বেশি দুঃখ পায় সেখানেই, যেখানে সে নিজেকে সব থেকে বেশি জড়িয়ে ফেলেছে৷ জীবনের ওই তিক্ত অভিজ্ঞতা কম-বেশি সবার হয়েছে, ভাগ্যিস হয়েছে৷

খুব ছেলেবেলার এক স্কুলের বন্ধুর মা-কে দু-বছর আগে রক্ত দিয়েছিলাম, লোকমুখে শুনতে পাই, সে আমার নামে উলটোপালটা কথা রটিয়ে বেড়ায়৷

একদিন তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম এই বিষয়ে, সে মাথা নিচু করে ফেলেছিল৷ সেই মুহৃর্তে ঠিক করে ফেলেছিলাম, জীবনে আর কোনওদিন তার সঙ্গে সম্পর্ক রাখব না৷ সে যদি ফিরে আসতেও চায়, তাও না৷ কিছু ক্ষেত্রে নিজেকে শাসন করা প্রয়োজন৷

অটো থেকে নেমে, গরম খাবার পাশের ঘরে পৌঁছে দিয়ে, স্নান সেরে নিজের ঘরে এসে বসেছি৷ বাথরুমের অবস্থা খুব খারাপ৷ এমনিতে বেশ পরিচ্ছন্ন হলেও, যেকোনও মুহৃর্তে ছাদ ভেঙে পড়তে পারে৷ তবুও আমার বিশ্বাস, ঠিক বেঁচে থাকব৷

পকেট থেকে আশরফি বের করে দুই হাতের তালুতে ভালো করে ঘষে, হাতের তেলো নাকের কাছে ধরে লম্বা শ্বাস টেনে বিরিয়ানির গন্ধ ছাড়া অন্য কিছু পেলাম না৷ গতকাল চন্দনের একটা মিষ্টি গন্ধ ছিল, আজ সেটা নেই৷ মনে একটা খটকা লাগছে!

জিতু পাঠক আবার ফোন করেছেন৷ যে মানুষের সঙ্গে একবার কথা বলার জন্য মানুষ দৌড়োচ্ছে, সেই মানুষ বারবার আমায় ফোন করছেন;অদ্ভুত!

কথাবার্তা বলে, হাতের চেটোয় আরও বেশ কিছুক্ষণ আশরফি ঘষাঘষি করে গন্ধ না পেয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়েছি৷ কোন মন্ত্রবলে সেই অমোঘ গন্ধ হারিয়ে গেল, কে জানে!

মোবাইলে নচিকেতা চক্রবর্তী মহাশয়ের একটা পুরোনো গান শুনতে পাচ্ছি; ‘শুধু বিষ, বিষ দাও, অমৃত চাই না৷’

গান শেষ হয়ে যাওয়ার মধ্যেই চোখ ঘোলা হয়ে ঘুম আসছে, কিশোরকুমারের গান ভেসে আসছে; ‘আকাশপথে প্রেম করেছি, বিশ্বনাথ৷’ ঘুম আসছে দু-চোখ বুজে, তৃপ্তির ঘুম৷

ঘুমের একদম গভীরে মির্জা সাহেবের মুখ স্বপ্নে ভেসে এল৷ ভদ্রলোক ভয়ংকর রেগে আছেন, আমাকে কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছেন৷ স্বপ্ন ক্রমশ আবছা হয়ে যাওয়ার শেষ মুহৃর্তে জোরাবরের শরীরের গন্ধ নাকে ধাক্কা দিয়ে গেল৷ ভারী অদ্ভুত স্বপ্ন!

দরজায় কে যেন টোকা দিচ্ছে, ঘেমে নেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসেছি৷ মন বলছে, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে৷

যে স্বপ্ন ঘর থেকে বের করে একটা ধর্মশালায় এনে দাঁড় করিয়েছে, তার বক্তব্যকে গুরুত্ব দিতে হয় বই কী৷ আমার জীবনে স্বপ্ন আর যা-ই হোক, হেলাফেলার বিষয় নয় একদমই৷

দরজা খুলতেই অবাক, জিতু পাঠকের সেক্রেটারি ভদ্রলোক নিতে এসেছেন গাড়ি নিয়ে৷ বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছে৷ পিণ্ডারিজি বলেছিলেন, স্বপ্নে যদি গন্ধ নাকে আসে, বুঝতে হবে, কিছু একটা ঘটতে চলেছে৷

সেক্রেটারি মহাশয়কে বাইরে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে বলে, তৈরি হয়ে বেরিয়ে এলাম৷ গত আধ ঘণ্টার ওপর মূল শহর ছাড়িয়ে গাড়ি চলেছে গোমতীনগরের দিকে৷

এটা নতুন শহর৷ সাবেকিয়ানার প্রাচীনত্ব এখানে নেই, ঝাঁ-চকচকে হোটেল, বাড়ি, বাংলো এবং আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বিপণনব্যবস্থা শপিং মল৷ মা বলতেন, খালি হাতে অচেনা মানুষের বাড়ি যেতে নেই৷ কিছু কেক কিনে নিয়েছি বিখ্যাত জে জে বেকারস থেকে৷ আরও আধ ঘণ্টা পর গাড়ি এসে থামল এক অট্টালিকার সামনে৷ চোখ-ধাঁধানো ব্যবস্থা!

মুখোমুখি আমি আর জিতু পাঠক৷ আপ্যায়নে কোনও খামতি নেই৷ সামনের টেবিলে বিভিন্ন স্ন্যাক্স এবং পানীয়ের ব্যবস্থা৷ মাথার ওপর কারুকার্যখচিত ঝাড়বাতি৷ মিঠা আতরের সুবাসে মুখরিত গোটা প্রাসাদ৷ সত্যিই অবাক হচ্ছি, গতকাল ওঁর ব্যবহারে এবং মুখের অভিব্যক্তিতে অহংকারের ভাব ফুটে উঠেছিল, আজ উলটপুরাণ৷ হাতঘড়িতে সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা৷

সুদৃশ্য কাচের প্লেটে মাছের কাবাব, টুন্ডে কাবাব, গলৌটি কাবাব, শিক কাবাব সাজানো আছে৷

নিজের হাতে গোলাপের শরবত আমার সামনে সাজিয়ে ভদ্রলোক এক অপ্রাসঙ্গিক কথা বললেন, ‘কখনও নিজের চোখের সামনে কোনো বাঁদরের স্বাভাবিক মৃত্যু দেখেছেন?’

কথার প্রসঙ্গে কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে, চিন্তা করে ভেবে বললাম, ‘না৷ কলকাতা শহরে বাঁদর খুব একটা দেখা যায় না, যদিও বাঁদরামির কোনও কমি নেই৷’

মুখে এক টুকরো কাবাব ফেলে ভদ্রলোক বললেন, ‘বাঁদর নিজের মৃত্যুর খবর দিনকয়েক আগে থেকে টের পায়৷ তখন সে নিভৃতে চলে যায়, মৃত্যুর পর উইপোকা ওর শরীরকে ধীরে ধীরে খেয়ে নেয়৷ যেসব বাঁদরের অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়, মানুষ গতি না করলে, অন্যান্য বাঁদর তাকে নিয়ে গিয়ে উইপোকার ঢিবির কাছে রেখে আসে৷’

ভদ্রলোক থামতে আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি হঠাৎ বাঁদরের মৃত্যু নিয়ে পড়লেন কেন?’

আমার কথার সরাসরি কোনও উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোক আবার বলতে শুরু করেছেন, ‘ধরুন, জঙ্গলে অথবা মাঠেঘাটে আমি মরে পড়ে আছি, হয়তো আপনি খবর পেলেন আমার মৃত্যুর; তখন আসবেন তো?’

এই প্রশ্নের কী উত্তর হয়, আমার জানা নেই৷ তবে, ভদ্রতা বলে একটা ব্যাপার আছে৷ আমি বললাম, ‘শারীরিক দিক থেকে আপনি এখনও যথেষ্ট পোক্ত৷ বিপদের দিনে বন্ধুর মতো আপনি আমায় পাবেন৷ আমার ফোন নাম্বার দেওয়া আছে, ডেকে নেবেন৷ আমার মতো সাধারণ মানুষের প্রয়োজন আপনার জীবনে পড়বে না৷ তবুও আমি আছি৷’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%