দ্বিতীয় অধ্যায়

রাজাধিরাজ ভট্টাচার্য

অদ্ভুত নিরুত্তাপ মানুষ! আমার কথায় পাত্তা না দিয়ে চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘বোসো, বলছি৷’

নিজের লুঙ্গি সামলে ভদ্রলোক উঠে দাঁড়িয়ে, সাবমেরিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘নিলুকে বল তো, ঘরে দু-কাপ চা-বিস্কুট দিয়ে যেতে৷’

বাঘের মেসোমশাই কী বুঝল, কে জানে? ঘড়ঘড় শব্দ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে গেল৷ ভদ্রলোকের দৃষ্টি আমার চোখের দিকে গেঁথে আছে৷ কাছে এগিয়ে এসে সটান জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভৌতবিজ্ঞান বা ফিজিক্স বলে একটা বিষয় আছে, সেটা তুমি জানো?’

‘আপনি ভুলে যাচ্ছেন আমি আর্টস গ্যাজুয়েট৷’

‘ওহঃ! রিয়েলি!’

ভদ্রলোক পাগলের মতো হাসছেন৷ এই সময় নিলুদি ও সাবমেরিন একত্রে ঘরে এলেন৷ দু-কাপ চা-বিস্কুট নড়বড়ে টুলে নামিয়ে রেখে, দু-পিস নোনতা বিস্কুট সাবমেরিনের মুখের সামনে দিয়ে, বেরিয়ে গেলেন৷ ভদ্রলোকের হাসির কোনও বিরতি নেই৷ সেটা থামল বেশ কিছুক্ষণ পরে৷ নিজের হাতে চায়ের কাপ তুলে তাতে একটা চুমুক মেরে বললেন, ‘ঘটনা খুব সম্ভবত উনিশশো সাতাত্তর বা তার আশপাশের কোনও একটা সময়৷ মানবসভ্যতায় তৈরি একটি উপগ্রহ ‘ভয়জার’ অতি সফলভাবে প্রথমবারের মতো এই সৌরজগৎ টপকে গেল৷ এর শরীরে একটি বাক্য খোদাই করা ছিল: ‘‘Greetings to the inhabitants of the universe from the third planet Earth of the star Sun’’

চোখের ইশারায় আমাকে চা নিতে বলে, জীবনবাবু নিজের কাপে চুমুক দিলেন৷ বিস্কুটের একটা অংশ কামড়ে আমায় বললেন, ‘এই ইংরেজির বাংলা মানে তুই জানিস নিশ্চয়ই?’

‘হ্যাঁ৷’

‘এই কথাগুলো কে লিখেছিলেন, জানিস?’

চায়ের কাপে চুমুক দিলাম৷ বিস্কুটের বেশ কিছুটা অংশ খেয়ে ফেললাম, মাথায় কোনও নাম আসছে না৷

জীবনবাবু বললেন, ‘কার্ল এডওয়ার্ড সেগান৷ ভদ্রলোক বিখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী, লেখক এবং মার্কিন মহাকাশ প্রকল্পসমূহের এক মহান ব্যক্তিত্ব৷ লেখাটা ওঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত৷’

এসব বিষয়ে আমার পড়াশোনা কিছুটা কম৷ জীবনবাবু অবশ্য অন্য মানুষ৷ কোন বিষয় তার পড়াশোনা নেই, সেটাই ভেবে দেখার বিষয়৷

হাতের বিস্কুটের পুরো অংশ শেষ করে বললেন, ‘সেগান সাহেব ভারতবর্ষের সনাতন এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ভীষণভাবে মানতেন৷ আমাদের প্রাচীন শাস্ত্র অনুযায়ী এই ব্রহ্মাণ্ডের নিরন্তর ধ্বংস, বিনাশ এবং পুনর্জন্ম এক অনন্ত প্রক্রিয়া৷ বর্তমান বিজ্ঞান এই সৌরজগৎ সম্বন্ধে যা ধারণা করে, আমাদের সুপ্রাচীন শাস্ত্রে সেসব কথা অনেক আগে থেকেই লেখা আছে৷ পৃথিবীর মহাজ্ঞানীদের একাংশ মনে করেন পুনর্জন্ম; এক বলিষ্ঠ দর্শন৷ সনাতন ধর্ম বারবার বলছে আত্মার রং, রূপ, গন্ধ, আকার কিছুই নেই, জন্মমৃত্যুর পারে৷ সেই আত্মা যখন চামড়ার শরীর ধারণ করে, তখন মৃত্যু এসে আদৌ কি পুরোটা ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিতে পারে? কিছু অধরা থেকেই যায়৷ মানুষ বারংবার তাই ফিরে ফিরে আসে৷ যে কারণে অতৃপ্ত চৈতন্য বারবার ফিরে আসে, সেটাই মায়া৷ এ এক অমোঘ টান৷ বিজ্ঞানের ভাষায় এই টানের নাম, মাধ্যাকর্ষণ৷ গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড মায়ায় জড়িয়ে৷’

হাতের বাকি চা শেষ করে ভদ্রলোক বিড়ি ধরিয়েছেন৷ ঘরের ভিতর পায়চারি করে ধূমপান শেষ করে বললেন, ‘মানুষের রিপু এবং কর্ম সম্পূর্ণতা না পেলে তাকে আবার আসতে হয়, বারংবার আসতে হয়৷ এটাই কামনা, এটাই মায়া, এটাই মাধ্যাকর্ষণ, জীবাত্মার সৃষ্টির কারণ এবং উৎস এখান থেকেই৷ বিসর্জনের পর গঙ্গার মাটি গঙ্গায় মিশে যায়, সেই মাটি দিয়ে আবার ঠাকুর তৈরি হয়৷ কাঠামো থেকে যায় শেষ পর্যন্ত৷ যতক্ষণ না কাঠামোসুদ্ধু মুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ নিস্তার নেই৷ প্রতিটা বিসর্জন আসলে সৃষ্টির নেপথ্য৷’

আমি চুপ করে বসে আছি৷ বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না৷ সাবমেরিন টেবিল থেকে নেমে গুটিগুটি পায়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে৷ হঠাৎ, একলাফে সে কোলে উঠে বসল৷ ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে, পরম নিশ্চিন্তে শুয়ে পড়ল৷ এ এক অদ্ভুত অনুভূতি, মায়ের কথা মনে পড়ছে৷ সারাদিন কাজ সেরে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে মা আমায় পড়াতে বসাতেন৷ তারপর ওঁর হাতে শুয়ে রাজপুত্র-রাজকন্যার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম৷ এখন আমি একা৷ মা ছাড়া সব সন্তানই একা৷

জীবনবাবুর কথায় হুঁশ ফিরে পেলাম;‘তোর কিছু একটা সম্পর্ক, বস্তু, কর্ম বা সাধনা অসম্পূর্ণতায় ভুগছে৷ সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ না-হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই৷ তোর স্বপ্ন তোকে বারবার সেই কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে৷ শ্যামাচরণ লাহিড়ী ছাড়াও আরও অনেকের জীবনে এই ঘটনা ঘটেছে৷ এই মুহৃর্তে দাঁড়িয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত হল, বাড়ি থেকে নিজেকে বের করে নিয়ে গিয়ে যেকোনও উপায়ে সেই বৃত্ত সম্পূর্ণ করে আসা৷’

জীবনবাবু থেমেছেন, এই সময় আমি ফস করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘যদি আমি এখানে, নিজের ঘরে থাকি?’

‘হয় তুই বদ্ধ উন্মাদ হয়ে যাবি শিগগিরই, না হয় নিজেকে শেষ করে দিতে বাধ্য হবি৷ ঘুম ছাড়া মানুষ বাঁচে না৷’

নিরুপায় হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘কোথায় যাব আমি প্রথমে?’

‘জামাকাপড় গুছিয়ে নে, তোকে আমি সব বলে দিচ্ছি৷’

‘আমি বাঁচতে চাই, জীবনদা৷’

‘জানি, বেঁচে থাকার এই ইচ্ছাটাই হয়তো তোকে জিতিয়ে দেবে৷’

দাঁত মাজার ব্রাশ, মাজন, তেল, সাবান, জামাকাপড়৷ পাড়ার দোকান থেকে স্মার্টফোন, থানায় ডায়েরি করিয়ে হারিয়ে-যাওয়া সিম পুনরুদ্ধার করা হল৷ নতুন জুতো আর মানিব্যাগ কিনতে হবে৷ সমস্ত কিছু গোছগাছ করতে রাত আটটা বাজল৷ শরীর ভীষণভাবে ক্লান্ত৷ চোখ জড়িয়ে আসছে অথচ আধ ঘণ্টার বেশি ঘুম অসম্ভব৷

জীবনবাবু ঠিকই বলেছিলেন, এইভাবে চলতে থাকলে আমি পাগল হবই৷ বড়োরাস্তার দোকান থেকে জুতো, মানিব্যাগ কিনে, ঘরের সমস্ত ফিউজ খুলে, দরজা-জানলা বন্ধ করে, পিঠে ব্যাগ চাপিয়ে সাবমেরিনের দোরগোড়ায় এসে হাজির হয়েছি৷ সময় রাত সাড়ে এগারোটা৷

বালিশে মাথা পেতে বাঘের মেসোমশাই ঘুমোচ্ছে৷ জীবনবাবু পায়চারি করছিলেন৷ দরজায় উঁকি মারতেই, আমায় ডেকে এনে চেয়ারে বসালেন৷ কোনও ভূমিকা না করে আমার হাতে খান দুয়েক বিস্কুট ধরিয়ে নিজের মতো বলতে শুরু করলেন, ‘সনাতন প্রাচীন শাস্ত্রে আমাদের জীবন এবং মৃত্যু নিয়ে অনেক কিছু ব্যাখ্যা করা আছে৷ সেসব পড়া, গবেষণা করা বা জেনে ওঠা একটা জীবনে কখনওই পুরোটা সম্ভব নয়৷ তোর পাল্লায় পড়ে পুরোনো বই খুঁজে স্বপ্ন নিয়ে আমি বেশ কিছু পড়াশোনা করেছি৷’

ভদ্রলোক থামলেন৷ কিছুটা হেঁটে বিছানায় উঠে বসে বললেন, ‘এই বিশ্বসংসারে মানুষের ব্যাখ্যার বাইরে অনেক কিছুই এখনও আছে৷ স্বপ্ন তেমনই এক জটিল বিষয়৷ প্রাচীন শাস্ত্রমতে, ভগবান বিষ্ণু হলেন স্বপ্নের দেবতা৷ যে স্বপ্ন বারবার দেখে তোর ঘুম ভেঙে যাচ্ছে, ওঁরই সৃষ্টি৷ এক্ষেত্রে চন্দ্রের প্রভাব লক্ষণীয়৷ একই স্বপ্ন লাগাতার দেখা মানে, কোনও ঘটনার পূর্বাভাস হতে পারে বা ফেলে-আসা কোনও এক জীবনের অসম্পূর্ণ ঘটনার ইঙ্গিত হতে পারে, আবার কিছু না-ও হতে পারে৷ সেই ঘটনা বিচার করা সাধারণ মানুষের কম্ম নয়৷ প্রকৃত জ্ঞানী, পণ্ডিত এবং যোগী ছাড়া এই সমস্যার সঠিক সমাধান অসম্ভব৷ প্রাচীন বইগুলোয় স্বপ্নের অনেকরকম অর্থ ব্যাখ্যা করা আছে৷ ভিন্ন লেখক, ভিন্ন বই, ভিন্ন প্রকাশনী এবং সময়ের তারতম্যে ব্যাখ্যাও ভিন্ন প্রকৃতির৷ সেসব ঘেঁটে বুঝলাম, কোনো সিদ্ধান্তবাক্য দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নেই৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে কার আছে সেই যোগ্যতা?’

বিছানা থেকে নেমে এসে ভদ্রলোক সরাসরি আমার মুখের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ আমার কাছে এর কোনও উত্তর নেই, সেটা উনি জানেন বিলক্ষণ৷ মা-বাবা এবং শিক্ষাগুরু, ছাত্রকে সব থেকে ভালো চেনেন৷

বেশিক্ষণ অপেক্ষা না করে ভদ্রলোক বললেন, ‘যে প্রশ্নের উত্তর সাধারণ মানুষ জানে না, সেই প্রশ্নের উত্তর দেন স্বয়ং ভগবান৷ যেহেতু ভগবানের কোনও ফোন নাম্বার আমার বা তোর কাছে নেই, সেহেতু তোর এই শরীরটাকে নিয়ে স্বয়ং তাঁর মন্দিরে গিয়ে দাঁড়াতে হবে৷ প্রশ্ন হচ্ছে, কোন মন্দিরে এবং কেন?’

আমি নির্বাক শ্রোতা৷ গলার কাছে কলারের বোতাম আটকে দিয়ে জীবনবাবু বললেন, ‘সনাতন সংস্কৃতির প্রাচীনতম শেকড়গুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভারতবর্ষ সমেত বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে৷ এক্ষেত্রে বিদেশ যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই৷ পাশের রাজ্য বিহারের শোন নদীর তীরে অবস্থিত কৈমুর পাহাড়৷ মাত্র ছয়শো ফুট উঁচু সেই পাহাড়ে মা মুণ্ডেশ্বরীদেবীর মন্দির অবস্থিত৷ জায়গার নাম ভভুয়া৷ অনেকে বলে থাকেন ইনি দেবী দুর্গার অহিংসার প্রতিরূপ৷ কিছু মানুষ ভিন্নমত পোষণ করেন৷ যতদূর আমার স্মৃতি বলছে, বহু প্রাচীন এক পঞ্চমুখী শিব-শিলা সেখানে আছে, আর আছেন মা স্বয়ং৷ এ ছাড়া লক্ষ্মী, গণেশ, সরস্বতী সবাই উপস্থিত৷ সমগ্র অঞ্চলটি ভীষণভাবে জাগ্রত এবং ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ৷ এখানে প্রাচীন প্রত্নতত্ত্বের নিদর্শন প্রায়ই পাওয়া যায়৷ এসব ছাড়াও এই মন্দিরের একটা অন্যরকম ব্যাপার আছে৷’

জীবনবাবু থামলেন৷ আমার হাতঘড়িতে সময় রাত বারোটা৷ অসময়ের চায়ের ফরমাইশে ফটকাদাকে ঘুম থেকে তুলে ইন্ডাকশন মেশিনে চা বানিয়ে আনতে হয়েছে, সঙ্গে বিস্কুট৷ সাবমেরিন অকাতরে ঘুমোচ্ছে৷ কোথায় যেন একটা পড়েছিলাম, বিড়াল দিনে বারো থেকে চোদ্দো ঘণ্টা ঘুমোয়৷ চোখের সামনে কাউকে নির্ঝঞ্ঝাট এইভাবে ঘুমোতে দেখলে আজকাল হিংসে হয়৷

চা-পর্ব শেষ হবার পর জীবনদা একটা বিড়ি ধরিয়েছেন৷ সেটায় পরপর চারবার টান দিয়ে বললেন, ‘মা মুণ্ডেশ্বরীর অদ্ভুত এক শক্তি এই মহাক্ষেত্রে বিরাজ করছে৷ সেটাই মূল বিষয়৷’

ভদ্রলোকের মুখের এক্সপ্রেশন পালটে গেছে৷ চোখ দুটো জানালার বাইরের আঁধারে আটকে আছে, হয়তো স্মৃতি হাতড়ে চলেছেন উনি৷

বেশ অনেকক্ষণ পর আস্তে আস্তে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলেন৷ বাইরে এই সময় বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ টালির চালে বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ অদ্ভুত এক ছন্দের সৃষ্টি করে৷

বিছানার পাশে রাখা একটা ছোট্ট চাদর সাবমেরিনের গায়ে চাপিয়ে দিয়ে বললেন, ‘বলির জন্য নিয়ে-আসা ছাগশিশুর শরীরে মা মুণ্ডেশ্বরীর মন্ত্রপূত ফুল ছিটিয়ে দিলে তারা সাময়িক শান্ত হয়ে যায়৷ মৃত প্রাণী যেমন শান্ত হয়ে থাকে, হুবহু তেমনই৷ দেখে মনে হয়, সেই প্রাণীর চৈতন্য এবং প্রাণীসত্তা লোপ পেয়েছে৷ আসলে সে মরেনি, সাময়িক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে৷ ঈশ্বরের মন্ত্রপূত চাল আর ফুল-মালা ছুঁয়ে দিলে একটা গোটা ছাগল অজ্ঞান হয়ে যায়, ভাবা যায়! এখানে ভেবে দেখার বিষয়, ছাগল মানুষের মতো অভিনয় বা ভণ্ডামি কোনওটাই করতে জানে না!’

অনেকক্ষণ আগে নিভে-যাওয়া হাতের বিড়ি ফেলে ভদ্রলোক বললেন, ‘কিছুক্ষণ পর সেই মন্ত্রপূত চাল আবার ছাগলের শরীরে ছিটিয়ে দিলে সে প্রাণ ফিরে পায়৷ কয়েক মুহৃর্তের মধ্যেই ক্রমশ সে জ্ঞানে ফিরে আসে এবং মহানন্দে নাচতে থাকে৷ ভেবে দেখ, একটা ছাগলকে বলি ছাড়াই সাময়িক প্রাণহীন করে দেওয়া সম্ভব! এক ফোঁটা রক্তপাত হয় না সেখানে৷ তোর বাস অ্যাক্সিডেন্টের ঘটনা, আংশিক মৃত্যু অথবা দুঃস্বপ্ন যেটাই বলিস, কিছুটা হলেও এই ঘটনার সঙ্গে মিলে যায়৷’

আমি অবাক হয়ে বসে সব শুনছি৷ এর আগেও বহুবার লক্ষ করেছি, জীবনদা কথা বলার সময় তুমি-তুই গুলিয়ে ফেলেন৷

একটা নিভে-যাওয়া বিড়ি ধরিয়ে গোটা তিনেক টান দিয়ে জীবনবাবু বললেন, ‘বহুকাল আগে আমি একবার এই মন্দিরে গিয়েছিলাম৷ মা মুণ্ডেশ্বরীর প্রাচীন বিগ্রহ ছাড়াও পঞ্চমুখী শিবের প্রতি ভীষণভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলাম৷ মন্দিরের স্থাপত্যশিল্পে চোখ জুড়িয়ে যায়৷ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সঙ্গে যখন সনাতন শব্দ মিশে যায়, তখন অন্যরকম অনুভূতির জন্ম দেয়৷ অষ্টবাহুবিশিষ্ট অদ্ভুত এই মন্দিরের কিছু লৌকিক কথা আছে৷ শোনা যায়, তৎকালীন ‘মুণ্ড’ নামে এক অত্যাচারী রাজা ছিলেন৷ কেউ বলে থাকেন, ‘চণ্ড-মুণ্ড’ নামে দু-জন অসুর ছিলেন৷ তাঁদের শায়েস্তা করেন বলেই মা দুর্গার নাম মুণ্ডেশ্বরী৷ ভারতবর্ষের প্রাচীনতম মন্দিরগুলোর এটা একটা৷’

নিজের মাথায় দুবার টোকা মেরে জীবনবাবু বললেন, ‘যতদূর মনে পড়ছে, রাজা হর্ষবর্ধনের সময় হিউয়েন সাং ওই মন্দিরে এসেছিলেন৷ নিজের বই ‘সি-ইউ-কি’র এক জায়গায় উল্লেখ করেছেন, তৎকালীন পাটলিপুত্র, যা বর্তমানে পাটনা নামে পরিচিত, সেই শহর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে পৌঁছোলে বহু প্রাচীন এক মন্দিরের দর্শন পাওয়া যায়৷ এই মন্দির কে কবে তৈরি করেছে তা নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নেই৷ তবে লালমুখো সাহেবদের এই মন্দির নিয়ে বিশেষ আগ্রহ ছিল৷ ভারতবর্ষে এমন অষ্টবাহু মন্দির কম আছে৷ এই মন্দিরের পুনরুদ্ধারের খননকার্যের সময় আশপাশ থেকে দু-খানা পাথরখণ্ড পাওয়া যায়৷ তাতে দেবনাগরী ও ব্রাহ্মী লিপিতে আঠারোটি পঙক্তি খোদাই করা আছে৷ সেই পাথরখণ্ড দুটি তখন কলকাতা মিউজিয়ামে পাঠানো হয়৷ খুব সম্ভবত উনিশশো আট সালে ব্যানার্জি সাহেব নামে এক ভদ্রলোক সেই লিপি দুটির পাঠোদ্ধার করেন৷ তাতে ‘উদয় সেন’ নামে এক রাজার খোঁজ পাওয়া যায়৷ দু-হাজার তিন সালে মন্দিরের গর্ভগৃহ সংলগ্ন এলাকা থেকে একটি শ্রীলঙ্কান শাহি মোহর পাওয়া যায়৷ মন্দিরের গর্ভগৃহের দেওয়ালে তামিল ভাষায় কিছু বাক্য খোদাই করা আছে বটে! অনেকেই মনে করেন মহাপণ্ডিত রাবণ এখানে এসেছিলেন৷’

চট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাতের ধোঁয়ায় টান দিয়ে জীবনবাবু বললেন, ‘দুই হাজার আট সালে বিহার সরকার এই মন্দিরের প্রাচীনত্ব নিয়ে একটি সেমিনার করেন৷ তাতে জানা যায়, বহু বছর আগে শ্রীলঙ্কা থেকে যাঁরা বুদ্ধগয়া দর্শন করে সারনাথ যেতেন, তাঁরা এই মন্দির অবশ্যই দর্শন করতেন৷ ভারতবর্ষের প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত তন্ত্রের বিভিন্ন দর্শনের সঙ্গে এই মন্দিরের সরাসরি যোগাযোগ ছিল বা হয়তো ছিটেফোঁটা এখনও কিছুটা আছে৷ সংলগ্ন জঙ্গল এলাকায় ক্কচিৎ কখনও গুপ্ততান্ত্রিক বা উচ্চকোটির তন্ত্রসাধকদের দেখা মেলে এখনও৷ ভগবান শিবের সুপ্রাচীন শিলাখণ্ডের মূর্তির পাঁচটি মুখের একটি মুখ আমার ভগবান বিষ্ণুর বলে মনে হয়েছিল৷ পরবর্তীকালে দু-একটা কথা আরও জেনেছিলাম এই মন্দির সম্বন্ধে৷’

সাময়িক বিরতি নিয়ে জীবনবাবু থেমেছেন৷ কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করে, আমার সামনে এসে ঝুঁকে বললেন, ‘এই সুপ্রাচীন মন্দিরে আমি যখন গিয়েছিলাম, তখন আমার বয়স চৌত্রিশ৷ স্থানীয় একজন অতিবৃদ্ধ মানুষের কাছে একটা কথা শুনেছিলাম৷ স্বয়ং অবতার বুদ্ধ এই মন্দিরে এসেছিলেন নিজের স্বপ্ন তাড়নায়৷ হয়তো এমনই কিছু ইঙ্গিতবাহী স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, যার খোঁজে উনি সেখানে পৌঁছেছিলেন৷ যদিও এই ঘটনার কোনও ঐতিহাসিক সত্যতা নেই, তবে উনি যে এই মন্দিরে এসেছিলেন তা নিয়ে কোনও দ্বিমত নেই৷ এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ভগবান বুদ্ধ কি তাঁর নিজের স্বপ্নসন্ধান সম্পূর্ণ করেছিলেন?’

কিছুটা পিছিয়ে পিছনদিকে হাত দুটো মুড়ে হাঁটাচলা শুরু করলেন জীবনবাবু৷ আগের কথার রেশ ধরে বললেন, ‘বুদ্ধ স্বয়ং অবতার৷ ওই মন্দিরে এমন কিছু শক্তি নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে, যা ভ্রান্ত মানুষকে পথ দেখায়৷ তোর স্বপ্নের সন্ধান সেখান থেকে শুরু হলেই সব থেকে ভালো হয় বলে আমার ধারণা৷ তারপর সামনের পথ উনি নিজেই ঠিক করে দেবেন৷ তুই এগিয়ে যা৷’

‘যাব?’

‘যা৷’

তিরকাঠি এতক্ষণ ধনুর্বাণের সুতোয় জড়িয়ে ছিল৷ এবার তাতে টান পড়েছে৷ অনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে সে এগিয়ে চলেছে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের আশায়৷ লক্ষ্যভেদ হলে তবেই বাড়ি ফেরা, নচেৎ নয়৷ একটা কঠিন জেদ চেপে বসেছে৷ জিততে আমায় হবেই৷

এখন ভোর চারটে৷ সময়ের বেড়াজাল টপকে ঘুম-চোখে আমি ঢুলছি৷ ড্রাইভার সাহেবের পাশের জানালা থেকে মিঠে হাওয়া ঢুকছে৷ আমার বাঁদিকে বসে আছেন জামিলভাই৷ দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়ি চলেছে বর্ধমান হয়ে পাটনা সাহেবের দিকে৷

জামিলভাই, রিপন স্ট্রিটের বেলুন গলির একজন মাতববর৷ একসময় কাচের গুলির ব্যবসা করতেন৷ সেই ব্যবসা এখন ওঁর ভাই দেখে৷ বর্তমানে এই লরির অর্ধেক মালিক তিনি, বাকি অর্ধেক মালিক এই যন্ত্রের চালক রফিক সাহেব৷ শালা-ভগ্নীপতি দু’জনেই আমার থেকে বয়সে অনেকটা বড়ো৷ আপাতত এই লরি কাশীপুরের গুদাম থেকে ট্যালকম এবং অন্যান্য কেমিক্যাল নিয়ে চলেছে পাটনা অভিমুখে৷ সময়-সুযোগ বুঝে আমি এদের সঙ্গে ঝুলে পড়েছি৷

আমাদের বস্তির ফটকাদার কাছে খবর থাকে৷ কার লরি কোথায়, কীভাবে, কী মাল নিয়ে যায়;পুলিশের ফেউদের খবরাখবর রাখতে হয়৷

ইঞ্জিনের ঘড়ঘড়ে শব্দ, অসংলগ্ন ঝাঁকুনি এবং সামনের এত বড়ো কাচের পরদা উপেক্ষা করে আমার চোখে ঘুম জড়িয়ে আসছে৷ জামাল সাহেব বললেন, ‘তুই পিছনে গিয়ে শুয়ে পড়৷’

বসার জায়গার ঠিক পিছনেই এক হাত চওড়া, সাড়ে পাঁচ-ছয় ফুটের গদি-সাঁটা বেঞ্চ রাখা আছে৷ বুঝলাম সেটা ঘুমোনোর জায়গা৷ অবিশ্বাস্য একটা ঘটনা ঘটল৷

প্রায় অনেকদিন পর টানা দু-আড়াই ঘণ্টা স্বপ্ন ছাড়া ঘুমোলাম৷ হুঁশ ফিরল সেই চেনা পাহাড়ের স্বপ্ন নিয়ে৷ ঘামে ভিজে উঠে এসেছি আবার নিজের পুরোনো জায়গায়৷ চারপাশের চালচিত্র তুলনামূলকভাবে কিছুটা রুক্ষ৷ বাংলার মাটি, জল, আকাশের রং, রস, রূপ, সৌন্দর্যের মহিমা অন্যরকম৷ শরীর কিছুটা হলেও ভালো লাগছে৷ সকালে জলখাবারের জন্য গাড়ি দাঁড়াল এক সাদামাটা ধাবায়৷ দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে আকাশে কৃষ্ণকলির রং ধরেছে৷

খাটিয়ায় মাথা পেতে শুয়ে আছি৷ অবুঝ চোখ বারবার ঝিমিয়ে পড়ছে৷ মাটির রং এখানে ধূসর, সবুজ প্রান্তর৷ চোখের দৃষ্টি ঝাপসা৷ কোথাকার মানুষ কোথায় গিয়ে পৌঁছোবে, কেউ জানে না৷ মানুষ আসলে কিছুই জানে না, সবকিছুই আন্দাজ করে মাত্র৷ ‘ভবিষ্যৎ’ আপেক্ষিক, যেকোনও মুহৃর্তে পালটে যেতে পারে৷ কেন পালটে যায়?

— কোনো উত্তর নেই৷ গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো সবাই ‘কর্মফল’ টেনে আনবে!

ইদানীংকালে মনে একটা প্রশ্ন উঁকি দেয়, আমার গত জন্মের কর্ম কি সত্যিই এত খারাপ ছিল? এ জীবনে জ্ঞানত কোনওদিন কারও ক্ষতি করিনি৷

মাথার ওপরে ধীর লয়ে মেঘের রং ক্রমশ পালটে যাচ্ছে৷ অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম হল৷ পিঠের ব্যাগে প্রয়োজনীয় সবকিছু রেখে, জামাকাপড় খুলে, অন্তর্বাসের ওপর গামছা বেঁধে আবার শুয়ে পড়লাম দড়ির বিছানায়৷

গোটা জীবনে পুরুষ হওয়ার ফায়দা এটাই৷ যখন-তখন, যেখানে-সেখানে অর্ধনগ্ন শরীরে ভেজা যায়, বৃষ্টির জলে নিজেকে লুকিয়ে ফেলে কাঁদা যায়৷ সর্বসমক্ষে কাঁদতে নেই; অদ্ভুত এক ভ্রান্ত অথচ প্রতিষ্ঠিত মানসিকতা৷

কতকাল এমন বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি৷ দিনকয়েক আগে দেখা সেই মাতৃমুখী মহামায়ার কথা বারবার মনে পড়ছে৷ ত্রিনয়নীর সঙ্গে আমার মায়ের মুখের কতটা মিল! সেই যে বৃদ্ধ মানুষ, যাকে আমি ঠাকুরদা ভেবে ভুল করেছিলাম, তিনি ‘মনু’৷ আমাদের আদিপুরুষ৷

আহঃ! শরীর জুড়ে শান্তির বর্ষা৷ একেই বোধহয় শাহি স্নান বলে, যে স্নানে মনের ময়লা সাফ হয়ে যায়৷ শরীরে একটু মাটি লেগে থাকা ভালো, অহংকারের নাশ হয়৷ বেশির ভাগ ধর্মের মানুষ মাটিতে মিশে যায়, না হয় ছাই হয়ে মেশে৷ চিল-শকুনে ঠুকরে খায় যে মানুষদের, সেই পাখিদের বিষ্ঠা মাটিতে এসে মেশে৷

মাটি থেকেই সৃষ্টি, মাটির রাজত্বে শক্তির বিস্তার এবং বিনাশের পর ঘুরেফিরে সেই পঞ্চভূতে বিলীন হওয়া... সম্রাট আলেকজান্ডার থেকে শুরু করে আওরঙ্গজেব অবধি হিসাবের কোনও গরমিল নেই৷ জামিলভাইয়ের ডাকে মোহভঙ্গ হল৷

রাস্তায় আরও দু-জায়গায় ঠেক খেয়ে পাটনা পৌঁছেছি রাত সাড়ে আটটায়৷ শহরের কাছাকাছি পরিচিত এক সস্তা হোটেলে নামিয়ে দিয়ে দু-জনে বিদায় নিলেন৷ নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছোনোর আগে পর্যন্ত আমরা সবাই সঙ্গী৷ মড়া একবার চুল্লির ভিতর ঢুকে গেলেই হাতঘড়ি দেখি৷ যে শরীর ছেড়ে আত্মা পালিয়েছে, সেই দেহ পচনশীল৷ অনেকটা আমাদের সভ্য সমাজের মেকি সম্পর্কের মতো৷

এরকম ছারপোকা-বিছানায় ঘুমোনো অসম্ভব৷ অথচ পাশের বিছানার দৈত্যাকার মানুষ অকাতরে ঘুমোচ্ছেন৷ ছারপোকা, মশা, আরশোলা, টিকটিকি কোনো কিছুই তার নিদ্রাভঙ্গ করতে পারবে না৷ ঘুম আসলে এক সাধনা, পাশের অচেনা মানুষ নিদ্রাযোগী৷ একটা সিগারেট ধরিয়ে বাইরে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে আছি৷ নিস্তব্ধতারও একটা শব্দ হয়৷ কখনও সে এসে ধরা দেয়, উলটোভাবে হয়তো আমরা তার কাছে গিয়ে ধরা দিই৷

একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত অসভ্য উলঙ্গ লোক অকারণে এই মাঝরাতে আমায় দেখে হাসছে৷ অসহ্য! নিজেকে সেইদিক থেকে সরিয়ে এনে অনেকটা এগিয়ে এসেছি৷ আশপাশে বোধহয় রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম আছে৷ হাতে সিগারেট নিয়ে ভিন রাজ্যে হাঁটছি, নানান চিন্তার মহাসমাবেশ৷ গোটা ফুটপাথ ফাঁকা;ভাবা যায়!

রাস্তার উলটোদিকে ফ্লাইওভার৷ নিয়ন আলোয় স্পষ্ট অপরিচ্ছন্ন রাস্তা৷ উড়ালপুলের পাশে তিনজন কমবয়সি মেয়ে একে অপরের থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে আলো মেখে দাঁড়িয়ে আছে৷ ওদের চোখ-মুখের ভাষা অন্য কথা বলে৷ লোহা আর চুম্বকের সম্পর্ক৷ হঠাৎ মাথায় কী চাপল! একটা অমোঘ আকর্ষণ অনুভব করলাম৷ মন চাইছে উপেক্ষা করতে, শরীর নাছোড়বান্দা৷ অদ্ভুত এক দ্বন্দ্ব সমাস কাজ করে চলেছে৷ কামনা, বাসনা, যাতনা এবং যন্ত্রণা;সবকিছু ভোগ করতে হবে এই শরীর দিয়ে৷ যত দোষ বয়সের৷

রাস্তা টপকে একজনের কাছে পৌঁছে গিয়েছি৷ সে আমায় হাত ধরে নিয়ে চলল৷ কিছুটা এগিয়ে বাঁদিকের তিন নম্বর গলি, দু-নম্বর বাড়ি, একতলায় চার নম্বর খুপরি ঘর৷ টিউবলাইটের শরীরে সবুজ প্লাস্টিক মুড়ে ঘরের রং পালটানোর চেষ্টা করা হয়েছে৷ আমি বসে আছি নিরুপায় অবস্থায়৷ কাজটা আদৌ ঠিক হল?

বিছানার উলটোদিকের দেওয়ালে মা দুর্গার ছবি৷ পাশের দেওয়ালে ভোজপুরি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির গোটাকতক নায়িকার ছবি সাঁটা আছে৷ সব থেকে মজার বিষয়, মেয়েটা বাঙালি, বাংলাদেশি হলেও হতে পারে৷ চৌকস হিন্দি বলে৷ কথার ভাঁজ জানে৷ কিছুক্ষণ গপ্প করলাম৷ কড়কড়ে অগ্রিম পাঁচশো টাকা, আমার আগামী বেকারত্বের প্রায় আড়াই দিন বেঁচে থাকা কমে গেল৷

চোখের সামনে জলজ্যান্ত একটা আস্ত মেয়ে৷ তাঁর চোখের সামনে একটা প্রমাণ সাইজের আয়না৷ নায়িকার মতো আলগা চটক আছে শরীরে৷ মেয়েটির পেশাগত নাম ভানুমতী৷ লোকে আদর করে ভানু বলে ডাকে৷ আমি অবাক হয়ে তাকে দেখছি৷ আহা! অহংকার করতে হলে এমন রূপের করাই ভালো৷

নিজের কপালের টিপ খুলে সে আয়নায় আটকে রাখছে৷ ক্রমশ আমি এগিয়ে যাচ্ছি ভানুমতীর কাছে৷ শরীর কাঁপছে৷ অন্তরমহলে কেউ একজন আপ্রাণ চেষ্টা করছে আমাকে থামিয়ে দেওয়ার৷ উহুঁ, অত সোজা নয় বাওয়া৷ নিজেকে নষ্ট করে দেওয়ার একটা অন্যরকম মজা আছে৷ জীবনে কোনওদিন কখনও কোনো মেয়েকে এতটা কাছ থেকে দেখিনি৷ আয়নার সামনে সবাই বিশ্বসুন্দরী৷ কিন্তু এ কী! এক ঝটকায় বিছানায় এসে ছিটকে পড়েছি৷

প্রতিবিম্বের ছায়াপথে, এ আমি কাকে দেখলাম? এ তো... উত্তরবঙ্গের বাসের সেই মেয়ে! গ্রীবার সন্ধিক্ষণে যার এক ফোঁটা কালো তিল আমায় ঘুমোতে দেয় না৷ একলাফে দরজার ছিটকিনি খুলে চটি হাতে নিয়ে দৌড়েছি৷ খুব অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছি আজ৷ মা একটা কথা বারবার বলতেন, ‘চরিত্র যার ঠিক, সেই মানুষ৷ বাকি পশুদের সঙ্গে মানুষের এখানেই তফাত৷’

পথ গুলিয়ে হোটেল খুঁজে নিজের ঘরে ঢুকতে রাত কাবার হয়ে গেছে৷ চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে, কিছুটা জিরিয়ে নিয়ে, ভোরবেলা ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে এসেছি৷ ছায়া আর কায়া; আলাদা হওয়া অসম্ভব৷ আমি নিশ্চিতভাবেই পাগল হয়ে যাচ্ছি ক্রমশ৷

এখান থেকে তিন ঘণ্টা গেলে সেই মন্দির৷ কিছুটা এদিক-সেদিক হাঁটার পর কপালে ফাঁকা বাস জুটল৷ জীবন হ্যারিকেন, আমি আধপোড়া সলতে, আরেকটু হলেই গত রাত্রে আগুন ধরে যাচ্ছিল৷ যিনি বাঁচানোর, ঠিক বাঁচিয়ে দিয়েছেন৷ যখন মারবেন, কোনো শালা বাঁচাতে পারবে না৷

ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিকে সঙ্গী করে পৌঁছে গেলাম ‘ভভুয়া রোড’ রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন বাস স্ট্যান্ড অঞ্চলে৷ এখান থেকে গাড়ি ভাড়া পাওয়া যায়৷ শেয়ার ট্যাক্সি, সঙ্গে একজোড়া সদ্যবিবাহিত দম্পতি, রসিক বৃদ্ধ আর ছয়ের দশকের অ্যাম্বাসাডার৷ বাইরে তুমুল বৃষ্টি৷ মাঝবয়সি ড্রাইভার ভদ্রলোক মজলিশি মানুষ৷ ভোজপুরি ভাষায় একটা চটুল গান ধরেছেন৷ গান অনুযায়ী খাসা গলা৷

রাস্তার অবস্থা ভীষণ খারাপ, সরকারি কাজ চলছে৷ সদ্যবিবাহিতার হাতে মেহেন্দির রং বেশ গাঢ়৷ কাচের চুড়ির ছনছন আওয়াজে কানের সুখ ও অতৃপ্তির অসুখ৷ আমি বসে আছি ড্রাইভার সাহেবের পাশে৷ প্রায় ঘণ্টাখানেকের রাস্তার পর সবুজে ঘেরা বেশ উঁচু ঢিপির সামনে এসে দাঁড়ালাম৷ এটা বোধহয় মালভূমি অঞ্চলের অংশ৷ পাহাড় বলা যায় না৷ সামনে পথ দুটো৷

একটা গাড়ি রাস্তা এঁকেবেঁকে ওপরের মন্দিরের দিকে চলে গেছে৷ অন্যদিকে, সাদা-রং-করা সিঁড়ি একই অভিমুখে সোজা ওপরের দিকে উঠে গেছে৷

গাড়ির পিছন সিটের সেই বৃদ্ধ সহযাত্রী বেশ মজার মানুষ৷ ওঁর নাম রঘুবীর মিশ্রা, বাড়ি জৌনপুর৷ পরপর দুটো নাতির পর একটি ফুটফুটে নাতনির মনস্কামনা পুরো হওয়ার জন্য ভদ্রলোক পুজো দিতে এসেছেন৷ আমাকে বললেন, ‘বাড়িতে একটা মেয়ে না হলে মানায়? আমরা তিন ভাই, একটাও বোন নেই৷ আমাদের তিনজনের প্রত্যেকের দুটো করে ছেলে৷ তাদের আবার সব ক-টাই ছেলে৷ বংশের একমাত্র মেয়ে আমার নাতনি৷ চাট্টিখানি কথা!’

কিছুক্ষণ কথা বলার পর জানতে পারলাম, ভদ্রলোক নিজের সুদীর্ঘ জীবনে প্রায় বার পঞ্চাশেক এই মন্দিরে এসেছেন৷ মা মুণ্ডেশ্বরীদেবীর ওপর ওঁর অগাধ বিশ্বাস৷ আলাপ জমে গেল৷ বৃদ্ধ মানুষ নিজে দায়িত্ব নিয়ে মন্দিরের খুঁটিনাটি বোঝাতে শুরু করেছেন৷ লম্বা লাইন ম্যানেজ করে, আমাকে হাত ধরে টেনে নিয়ে ঢুকে গেলেন গর্ভগৃহে৷ জীবনবাবুর বক্তব্যে এতটুকু কোনও ভুল নেই৷ সবকিছু ছবির মতো স্পষ্ট মিলে যাচ্ছে৷

এই মন্দিরে অন্যরকম ছাগবলির প্রথা আছে৷ এটা বোধহয় পৃথিবীর একমাত্র নিষ্পাপ বলি৷ এই পুণ্যতীর্থে রক্তপাত নিষেধ৷ বলিপ্রদত্ত পশুর সাময়িক চেতনা চলে যায়৷ পুজো সম্পন্ন হলে ঠাকুরের মন্ত্রপূত ফুল গায়ে পড়তেই ছাগশিশু আবার উঠে দাঁড়ায়৷ অদ্ভুত শক্তি৷ নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা অসম্ভব৷

পরপর পাঁচবার একই ঘটনা চোখের সামনে দেখলাম৷ বৃদ্ধ ঠাকুরমশাই শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণের পর হাতের মধ্যে থাকা চাল আর গাঁদার মালা, বলির জন্য শুইয়ে-রাখা ছাগশিশুর শরীরে ছুড়ে দিলেন৷ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল সেই অবলা৷ নড়াচড়ার বিন্দুমাত্র উপায় নেই তার৷ সে যেন নিজের বশে নেই৷ তামাম দুনিয়ায় আমরা কেউ কি নিজের বশে আছি?

আমাদের সকলের রাশ অন্য কারও হাতে৷ ‘ফ্রি উইল’;কথাটা ভীষণভাবে আপেক্ষিক৷ আমাদের যাবতীয় কাজকর্মের সিদ্ধান্ত নেয় আমাদের মন৷ মনকে সিদ্ধান্তের জোগান দেয় কে?

পুজো দিয়ে বাইরে এসে মন্দিরের চাতালে বসে আছি চুপচাপ৷ মন বিষণ্ণ হয়ে আছে৷ আমার পাশে মিশ্রাজি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছেন মন্দিরের দেওয়ালে মাথা রেখে৷ আহা কী সুখ! আমার দু-চোখেও ঘুম জড়িয়ে আসছে৷ গত বেশ কয়েকরাত ঘুমহীন৷

আকাশ মেঘলা৷ বৃষ্টির ছিটেফোঁটার সঙ্গে মৃদুমন্দ হাওয়া৷ ক্লান্ত শরীরে চোখ বুজে এল, একবুক সাহস নিয়ে ভরবিকেলে ঘুমিয়ে পড়লাম৷ শরীরে অথবা মনের কোথাও চাপা কষ্ট হচ্ছে, নির্দিষ্ট জায়গা খুঁজে পাচ্ছি না৷

আশ্চর্যের ব্যাপার! ঘুম ভাঙল সোজা তিন ঘণ্টা পর৷ স্বপ্নের মন্দিরের সুঠাম যুবক পুরোহিতের মুখ দেখার মুহৃর্তে ঘুমটা ভেঙে গেল৷

মিশ্রাজি এক ভাঁড় চা এগিয়ে দিলেন আমার জন্য৷ সঙ্গে পরিষ্কার সাদা ধবধবে রুমাল৷

খানিকটা অবাক হয়ে রুমাল নিজের হাতে ধরে ওঁকে প্রশ্ন করলাম, ‘এটা কী কাজে লাগবে?’

‘আপনি কাঁদছিলেন! ঘুমের মধ্যে মানুষ এইভাবে কাঁদতে পারে, আমি এই প্রথম দেখলাম৷’

‘আমি কাঁদছিলাম? শিওর?’

‘গত এক ঘণ্টার ওপর ধরে আপনি কাঁদছেন৷ একবার ভাবলাম, ঘুম থেকে তুলে বসিয়ে দিই৷ তারপর ভাবলাম, না থাক, কাঁদলে মন হালকা হবে৷ বাই দ্য ওয়ে, কেন কাঁদছিলেন?’

এই প্রশ্নের কোনও যথাযথ উত্তর আমার কাছে নেই৷ বৃদ্ধ মানুষ পিতৃস্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন৷ আমার হাতে ধরা ওঁর রুমাল, চোখে সত্যিই জল৷ এক চুমুকে চা শেষ করে বললাম, ‘বিগত দশ-পনেরো দিন ধরে আমি খুব কষ্টে আছি, মিশ্রাজি৷ হয় আমি ক্রমশ পাগল হয়ে যাব, না হয় ধীরে ধীরে মরতে হবে৷’

অবাক দু-চোখে একমুঠো বিস্ময় নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘কিউঁ?’

অঝোর ধারায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ অশীতিপর এক বৃদ্ধ আমার হাতের কবজি মুঠো করে ধরে আছেন৷ বয়স একটা সংখ্যামাত্র৷ আসল শব্দ হল জেদ৷ বৃদ্ধের চোয়াল শক্ত৷ বৃষ্টির ছিটেফোঁটা তাঁর চশমার কাচ ঝাপসা করে দেওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা করছে৷ একটা লড়াই এবং জেদকে দমিয়ে রাখার শক্তি বোধহয় কারও নেই৷ মৃত্যু ক্ষণস্থায়ী৷ জেদ পুরো না-হওয়া পর্যন্ত মানুষ আবার জন্মায়৷ সম্রাট পুরুকে বারবার জন্মাতে হয় এই দেশে৷ কখনও তিনি ক্ষুদিরাম বসু, ভগত সিং, আবার কখনও বা স্বয়ং সুভাষচন্দ্র বোস৷ শক্তির কোনওদিন বিনাশ হয় না, সে কেবল রূপান্তরিত হয়৷

পণ্ডিত রঘুবীর মিশ্রা দাঁড়িয়েছেন৷ সাতের দশকের পাঁচ টাকা সাইজের রাজভোগের মতো চোখ করে বললেন, ‘চলুন, আপনাকে নিয়ে যাই পিণ্ডারিবাবার কাছে৷ যদি উনি দয়া করেন তাহলে কোনও চিন্তা নেই৷’

কিছুক্ষণ বৃষ্টির পর সন্ধ্যা নেমে এসেছে৷ ফিরতি পথে আরেকবার গর্ভগৃহ দর্শন করে আমরা এখন ফিরছি৷ ওঁর চেনা একজনের বাড়িতে থাকার জায়গা হয়েছে, ব্যবস্থা ভালোই৷

পিণ্ডারিজি সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বৃদ্ধ মিশ্রাজি বললেন, ‘বর্তমান সময়ে সমতল ভারতবর্ষে অন্যতম শ্রেষ্ঠ যোগী পুরুষ ইনি! বাবাজি টানা কুড়ি বছর গুরুর সংস্পর্শে পিণ্ডারি হিমবাহে সাধনা করে কাটিয়েছেন৷ গুরু বেঁচে না থাকলেও উপযুক্ত চ্যালা রেখে দিয়ে গেছেন৷ সমস্যা হচ্ছে, এই মানুষ গত পাঁচ বছর ধরে নিজেকে গৃহবন্দি করে ফেলেছেন৷ অচেনা, বাইরের মানুষের সঙ্গে আর সাক্ষাৎ করেন না৷’

দুশ্চিন্তা নিয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘তাহলে আমার কী হবে?’

ইশারায় আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, ‘পিণ্ডারিজি আমাকে হয়তো ফিরিয়ে দেবেন না৷ ভীষণ স্নেহ করেন৷ দেখা যাক, আপনার ভাগ্যে কী আছে৷’

চোখের সামনে বসে-থাকা রঘুবীর মিশ্রা ভারী অদ্ভুত মানুষ, এই যুগেও মোবাইল ফোন রাখেন না! নিজের পকেট ঘেঁটে একটা ছোট্ট ডায়েরি বের করে বললেন, ‘ছুটকি কো দেখনা হ্যায়৷ জরা নম্বর মিলা দিজিয়ে৷’

মিশ্রাজির হাতে ভিডিয়ো কল ধরিয়ে দিয়ে আমি কিছুটা এপাশে সরে এসেছি৷ এখন সন্ধ্যা সাড়ে ছ-টা৷ ফোনের নেটওয়ার্ক এবং আকাশের অবস্থা ভীষণ খারাপ৷ তার থেকেও খারাপ আমার সামনে দাঁড়ানো বৃদ্ধ মানুষের মুখের অবস্থা৷

মোবাইল ফেরত দিয়ে ভদ্রলোক জানালেন, যেকোনও উপায়ে এই মুহৃর্তে ওঁকে বেরিয়ে যেতে হবে৷ সাড়ে তিন মাসের প্রিয়দর্শিনীর ঠান্ডা-গরম লেগে জ্বর হয়েছে৷ কিছুটা অবাক হয়ে আমি বললাম, ‘বাচ্চাদের জ্বর-সর্দি-কাশি লেগেই থাকে৷ আপনার গোটা পরিবার সেখানে আছে৷ যদি ফিরতেই হয়, আগামিকাল সকালে ফিরুন, আজ নয়৷ আকাশের অবস্থা খারাপ, ভীষণ খারাপ৷’

দু-কদম এগিয়ে এসে মিশ্রাজি আমার হাত দুটো ধরে বললেন, ‘কাগজ-কলম হ্যায় আপকে পাস?’

ভদ্রলোককে আটকে রাখা গেল না৷ দু-কলম চিঠি লিখে আমার হাতে ধরিয়ে, ছাতা মাথায় বেরিয়ে গেলেন, অমোঘ টান৷ দেখে ভালো লাগল, এই পোড়া দেশে একজন কন্যাসন্তান এতটা স্নেহ, ভালোবাসা, আদরযত্ন পাচ্ছে৷ যুগ বদলাচ্ছে৷ সবকিছুই যে খারাপ হচ্ছে এমন কিন্তু নয়৷

এখন যেখানে বসে আছি, সেটা বিভূতিনারায়ণ পান্ডের বাড়ি৷ মিশ্রাজি প্রতিবার মায়ের দরবারে এসে এখানেই থাকেন৷ পান্ডেজি, লতায়-পাতায় মিশ্রাজির আত্মীয় হন৷

একশো স্কোয়ার ফিটের ঘর, সঙ্গে পরিচ্ছন্ন বাথরুম৷ একটা গদিওয়ালা চৌকি সঙ্গে একজোড়া বালিশ, পাশবালিশ এবং মশারি৷ রান্না করার চার-হাত বাই তিন-হাত ছোট্ট কিচেন৷ নিজে রান্না করতে না চাইলে, দুশো চল্লিশ টাকার বিনিময়ে দু-বেলা নিরামিষ খাবার আর চা-বিস্কুট পাওয়া যায়৷ ব্যবস্থাপনা ভালোই৷

কাল কোথায় ছিলাম, আজ কোথায় এসে পড়লাম৷

স্বপ্নের ক্ষমতা অসীম, এ কথা মানতেই হবে৷ সিকন্দর সাহেব থেকে শুরু করে হিটলার হয়ে বর্তমানে কালাম সাহেব পর্যন্ত স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার জন্য জীবন সঁপে দিয়েছিলেন৷ প্রত্যেকের স্বপ্ন আলাদা, তার বাস্তবিক প্রয়োগও আলাদা৷ কেউ সাম্রাজ্য বিস্তারের স্বপ্ন দেখেন, কেউ আবার মানুষ বাঁচানোর স্বপ্ন দেখেন৷ স্বপ্নের ওপর সাধারণ মানুষের জোর খাটে না৷ অসাধারণ মানুষ নিজের স্বপ্ন সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেন;তফাত সুস্পষ্ট৷

মিশ্রাজি সবকিছু বুঝিয়ে গেছেন, তারপরেও খবর নিয়ে জেনেছি, পিণ্ডারিবাবার অস্থায়ী ঠেক হল মুণ্ডেশ্বরী পাহাড়ের পিছনের শ্মশানে৷ ভদ্রলোকের বয়স একশোর ওপর৷ তন্ত্রসাধনা অভ্যাস করছেন আজ আশি বছরের ওপর৷ ঘর ছেড়ে গুরুগৃহে এসেছেন তারও পনেরো বছর আগে৷ সাধারণত উনি অচেনা কারও সঙ্গে দেখা করেন না৷ মিশ্রাজির মতো দু-একজন পুরোনো চ্যালা রয়ে গেছেন, যাঁদের সঙ্গে কদাচিৎ সাক্ষাৎ করেন, কথাবার্তা বলেন৷ খবর নিয়ে জানলাম, আগামী তরশু সূর্যোদয়ের আগে ভদ্রলোক এখান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন কামাখ্যার উদ্দেশে৷ সুযোগ আজ রাতেই৷ কারণ, ভদ্রলোক দিনের বেলা দর্শন দেন না৷ খুব চেনা মানুষ হলে, রাতে দেখা হলেও হতে পারে৷ নব্বই শতাংশ মানুষ রাত্রিবেলা গিয়ে দেখা না পেয়ে ফিরে আসেন৷ সবই তাঁর মর্জি৷

যতটা মেঘ হয়েছিল, তার তিনগুণ জোরে হাওয়া দিয়ে আকাশ পরিষ্কার হয়ে দিব্যি তারা ফুটে গেছে৷

এখন রাত এগারোটা দশ৷ দুটো রুটি খেয়ে কিছু টাকাপয়সা পকেটে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছি৷ রাস্তাঘাট ভয়ানক শুনশান৷ দশ-বারো মিনিট হাঁটার পর আলো খুঁজে পাওয়া গেল না৷ মোবাইলের টর্চ জিন্দাবাদ৷

বাড়িওয়ালা পান্ডেজি নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছেন৷ মন্দিরের সিঁড়ি ওঠার রাস্তা ফেলে বাঁদিকে পিচ রাস্তা ধরে কুড়ি মিনিট হাঁটার পর একফালি মেঠোরাস্তা ডানদিকে নেমে গেছে৷ এই পথ ধরে মিনিট পনেরো হাঁটা-পথে ঘন জঙ্গলে ঘেরা গ্রামের ছোট্ট শ্মশান৷ গা-ছমছমে পরিবেশে একা হাঁটতে যথেষ্ট সাহসের প্রয়োজন হয়৷ যাক, পৌঁছে গিয়েছি শেষ পর্যন্ত৷

এদিকের নিয়মে সূর্য ডুবে গেলে আর সৎকারকার্য করা যায় না৷ খানকয়েক শেয়াল ছাড়া গোটা চত্বর খাঁ খাঁ করছে৷ দুটো চিতা থেকে কুণ্ডলীকৃত ধোঁয়া ধীর লয়ে মহাশূন্যে বিলীন হয়ে যাচ্ছে৷ মাথার ওপর মহাজাগতিক গ্রহনক্ষত্র সুস্পষ্ট৷ একা এইভাবে এখানে আসাটা বোধহয় ঠিক হয়নি৷ বেঠিক হলে কী হত, সেটাও জানি না অবশ্য৷ আমি নিরুপায়৷ তবে, শ্মশান আমার পছন্দের জায়গা৷

শ্মশানের দক্ষিণ কোণে মাটির একচালা ঘর থেকে ধূপের গন্ধ নাকে আসছে৷ জনমানবহীন মহাশূন্যতাময় পরিবেশে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে এগিয়ে গেলাম সেই ঘরের দিকে৷ বেশ জমাটি অন্ধকার৷ ভাগ্যিস মোবাইলের আলোটুকু ছিল৷ পায়ের কাছে খুটখাট শব্দ হতে আলোর স্থান পরিবর্তন করে দেখতে পেলাম, দুটো চোখ জ্বলজ্বল করছে৷ শেয়ালদের স্পর্ধা বড্ড বেশি৷

ভুল বললাম, এটা শেয়াল নয়, আস্ত একটা কুকুর! মিশমিশে কালো গায়ের রং৷ এই গুমোট অন্ধকারে শুধু চোখ বোঝা যাচ্ছে৷ আমাকে তিন-চারবার শোঁকাশুঁকি করে সে, একচালা ঘরের দাওয়ায় গিয়ে মেজাজে বসল৷ আমি আরও এগিয়ে গেলাম৷ পিছনদিক থেকে পচা গন্ধ নাকে এল, সঙ্গে খসখসে শব্দ৷ ঘুরতেই সপাটে মাটিতে ছিটকে গিয়েছি৷ বুক বাজিয়ে বলতে পারি, আমার সাহস কিছুটা বেশি, আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে নির্ঘাত অজ্ঞান হয়ে যেত!

প্রায় সাড়ে ছ-ফুটের কাছাকাছি লম্বা এক অদ্ভুত জীব৷ শরীরময় অস্বস্তিকর গন্ধ৷ নাভি থেকে গলার কণ্ঠি পর্যন্ত ভুসোকালির উলকি! পাঁজর-বের-করা নগ্ন শরীর! একে, প্রথম দর্শনে মানুষ বলা যাবে না কিছুতেই৷ মোবাইলের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ভদ্রলোক দাঁত বের করে আমায় দেখছেন৷ দাঁতের রং, জন্ডিস রোগীর প্রস্রাবের থেকেও গাঢ় হলুদ৷ চোখজোড়া কোটরাগত৷ মুখের আকৃতি পরোটার মতো৷ আমি মাটিতে পড়ে আছি অথচ সে মানুষের কোনও হেলদোল নেই৷ কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে শুকনো গলায় বললাম, ‘মিশ্রাজি নে ভেজা হ্যায়, পিণ্ডারিবাবাজি সে মিলনা হ্যায়৷’

বলা-কওয়া নেই, আচমকা বৃষ্টি শুরু হল৷ ভাগ্যিস একটা ছাতা ছিল! অত্যাশ্চর্য এক ঘটনা আমাকে অবাক করে দিল, বৃষ্টির জলের ফোঁটা আমার সামনে দাঁড়ানো অদ্ভুত মানুষের শরীর স্পর্শ করতে পারছে না৷ তিনি শুকনো খটখটে৷ কায়াহীন ছায়া অর্থাৎ যার শরীর নেই অথচ সে দাঁড়িয়ে আছে চোখের সামনে৷ শরীর খারাপ লাগছে৷ চোখ সরিয়ে নিলাম৷

জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি আসবে, যেখানে আপনি ভয় পেতে বাধ্য৷ তবে, চেষ্টা করবেন হজম করে নেওয়ার৷ সুযোগসন্ধানী মানুষ, পরিস্থিতি, অপদেবতা, পুলিশ, রাজনৈতিক দালাল, ভূতপ্রেত... সকলেই যদি একবার বুঝে নেয়, আপনি ভয় পেয়েছেন তাহলে সবাই মিলে ষষ্ঠীপুজো করে ছাড়বে৷ বিশ্বাস করুন, অহেতুক ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই৷ ভয় স্রেফ একটা দুর্বলতা৷ হিন্দি সিনেমার একটা ফেভারিট ডায়ালগ;‘জো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া!’

দাঁত-বের-করা ছায়া হয় পাগল না হয় বোবা৷ কোনও কথা না বলে চোখের ইশারায় সামনের ঘরটা দেখিয়ে দিলেন৷ অর্থাৎ পিণ্ডারিবাবা এখানেই থাকেন৷ যাক, এই মাঝরাতে ঠিকানা অন্তত ঠিক আছে৷ মাটি থেকে উঠে গা-হাত-পা ঝেড়ে সামনের দিকে তাকাতেই আবার চমক; সেই ব্যক্তি আর নেই!

নিজেকে বোঝাচ্ছি; নেই মানে নেই৷ অত চিন্তা করার কিছু হয়নি৷ একজন মানুষ অত সহজে হাওয়ায় মিলিয়ে যেতে পারে না৷ আমার পড়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে হয়তো কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে৷ মোবাইলের আলো জ্বেলে ওকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না৷ ছায়া, কায়া আর মায়া; এই তো জগৎ৷

একবার ভাবলাম, গলা ছেড়ে হাঁক পাড়ি৷ আরেকবার ভাবলাম, পালাই এখান থেকে৷ প্রস্তুতি নেওয়ার আগেই মাটির ঘরের কাঠের দরজা খুলে গেল৷ বাইরে বেরিয়ে এলেন ঈষৎ ঝুঁকে-পড়া অতিবৃদ্ধ মানুষ৷ ধীর লয়ে এক-পা, দু-পা এগিয়ে এসে মৃদু শব্দে বললেন, ‘নমস্কার, বেটাজি, আপ কৌন?’

প্রতিনমস্কার জানিয়ে বললাম, ‘মেরা নাম অভিজিৎ ভট্টাচার্য৷ কলকাত্তা সে আয়া হুঁ৷ হামকো মিশ্রাজি নে ভেজা৷’

‘কৌন মিশ্রা?’

‘পণ্ডিত রঘুবীর মিশ্রা৷’

‘কিস লিয়ে ভেজা?’

‘মেরা নিন্দ গায়েব হো গয়া জিন্দেগি সে, হরবখত সপনা আতি হ্যায়!’

‘কৌনসা স্বপ্না?’

‘উঁচে পাহাড়োঁ কে উপর পুরানে মন্দির কা সপনা৷’

কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে ভদ্রলোক ভাঙা বাংলায় বললেন, ‘কিন্তু আমি যে আর দেখা করি না কারও সঙ্গে৷ বড্ড কষ্ট হয় এই শরীরে৷ এই বয়সে কোনওরকম ক্রিয়া করা আমার পক্ষে প্রায় অসম্ভব৷ নিজের ধ্যান-জপ নিয়েই থাকি৷ সময় হয়ে এসেছে আমার৷ মিশ্রাজির মতো দু-একজন পুরোনো আলাপী এখনও টিকে আছেন, তাঁরাই আসেন মাঝেমধ্যে৷’

আকুল প্রার্থনা নিয়ে আমি ভিজে মাটিতে বসে পড়লাম৷ কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ভদ্রলোক বললেন, ‘অন্দর আও৷’

পঞ্চাশ ওয়াটের একটা হলদে বাল্ব জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই সমবেত সংগীতের মতো শব্দ কানে এল!

এটা ঘর! হা ভগবান! কমপক্ষে গোটা বিশেক বিড়াল হবেই! আমাকে একটা ছোট্ট টুলের ওপর বসতে বলে ভদ্রলোক কোথায় যেন বেরিয়ে গেলেন৷

বিড়ালগুলো বেশির ভাগই প্রতিবন্ধী৷ কারও একটা চোখ অথবা হাত নেই৷ কিছু বিড়াল আবার সম্পূর্ণভাবে সুস্থ৷ ঘরের মেঝেতে একটা চাটাই পাতা আছে, তার ওপর কাঠের টুল৷ সেইটুকু জায়গা ছেড়ে বেড়ালগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছে৷ আমি সংখ্যা গুনতে শুরু করলাম৷ তিনবার গুনলাম, তিনরকম পরিণাম এল৷

একজন মা-বিড়াল তার তিনটে ছানাকে এতক্ষণ লুকিয়ে রেখেছিল৷ কিছুটা ভরসা পেয়ে এবার তাদের ছেড়ে দিয়েছে৷ তার মধ্যে একটা সাদা-কালো বেড়াল অতি কৌতূহলবশত আমার দিকে এগিয়ে আসছে৷ মা এসে সেটাকে ঘাড় ধরে নিয়ে গেল৷ বুঝলাম, মানুষ জাত হিসাবে খুব একটা সুবিধার নয়, অন্তত এদের কাছে তো নয়ই৷ ওপাশের দরজা খুলে এই সময় অতিবৃদ্ধ মানুষ প্রবেশ করলেন৷ বললেন, ‘ইধার আও বাঙালিবাবু৷’

ওদিকে যে আর-একটা ঘর আছে, সেটা এখানে বসে ঠাওর করা যায় না৷ টুল থেকে উঠে চললাম ভদ্রলোকের পিছু পিছু৷ নির্ঘাত সব ক-টা বিড়াল আমার চলে যাওয়া দেখছে৷ এতক্ষণ ওদের মাঝখানে বসেছিলাম, গোপনীয়তা নষ্ট করলাম৷ মানুষ হলে প্রচুর গালাগাল দিত৷

পাশের ঘরে ঢুকতেই চক্ষু চড়কগাছ!

বয়স হিসেবে আমার জীবনে অভিজ্ঞতার ঝুলি অনেকটাই বেশি৷ এযাবৎ এটা নিয়ে কিছুটা অহংকারও ছিল মনে, আজ সেসব ছাপিয়ে গেছে৷ ইচ্ছা হয় এইসব ঘটনা নিয়ে উপন্যাস লেখার, দেখা যাক৷

এখন এই মুহৃর্তে যা চোখের সামনে দেখছি, তাতে মনে হচ্ছে, জীবনে এখনও কিছুই দেখা হয়নি৷ যদি বেঁচে থাকি, আগামী দিনে লিখব নিশ্চয়ই৷

আন্দাজ আশি স্কোয়্যার ফুটের একটা মাটির ঘর৷ দেওয়ালে অসংখ্য ফাটল৷ লাল-রং-করা মেঝের ওপর দক্ষিণমুখী একটা ব্যাঘ্রমুণ্ডের আসন৷ পাথরের একটা বড়ো থালা, তিনটে ছোটো বাটি৷ একটা তামার হোমকুণ্ড৷ সামনের তিনটে দেওয়ালে দাঁড়-করানো তিনটি নরকঙ্কাল৷ পাথরের থালার বামদিকে তিনটি বিভিন্ন মাপের করোটি এবং ডানদিকে রুপোর সিংহাসনে একটি প্রমাণ আকারের নারায়ণ শিলা সযত্নে বসানো রয়েছে৷ নারায়ণ শিলার ভিতরে বিষ্ণুচক্র এবং শরীরে রুপোর পইতে স্পষ্টত দৃশ্যমান৷

এত কিছু একসঙ্গে দেখে দৃষ্টিভ্রম হয়ে গিয়েছিল৷ ক্রমশ আরও অনেক কিছু নজরে এল এবং বুঝলাম, এ জীবনে দেখার এখনও অনেক কিছুই বাকি আছে৷ সবে কলি সন্ধে৷

গোটা দশেক কঙ্কাল ঘরের মেঝেতে সাজানো আছে, খুব সম্ভবত বেড়ালের৷ এসবের মাঝখানে একটা কুশের আসন দেখতে পাচ্ছি৷ সেদিকে ইশারা করে সেই আসনে বসতে বলে ভদ্রলোক নিজে গিয়ে বসলেন বাঘমুন্ডির আসনের ওপর৷ ধূপের গন্ধ পাচ্ছি, তবে উৎস খুঁজে পাচ্ছি না৷

সামনাসামনি এইবার মুখটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ভদ্রলোকের৷ অজস্র বলিরেখা ও অনুভূতিসমৃদ্ধ পোড়-খাওয়া কাঁচাপাকা দাড়িওয়ালা একটা মুখ৷ মাথার জটা কোমর পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছে৷ গলায় রুদ্রাক্ষের মালা৷ হাত ও পায়ের নখ, পরিষ্কার করে কাটা৷ শরীরের রং ঘন বাদামি৷ এক টুকরো সাদা কাপড় লজ্জাবস্ত্র হিসেবে কোনওরকমে টিকে আছে৷ ভদ্রলোকের হাত, পা, পিঠে অজস্র ফুটো ফুটো দাগ৷ চোখের চাহনি অতলস্পর্শী এবং ঘোলাটে৷ পাঁজর ও গোটা শরীরের হাড় গোনা যায়৷ নিঃন্দেহে এটা ত্যাগের চেহারা৷

কথাবার্তা হিন্দি আর বাংলা মিশিয়েই চলছে৷ কিছুক্ষণ হল, উনি চুপ করে গেছেন একদম৷ চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে একগাল হাসলেন৷

প্রথম প্রশ্ন এল, ‘এখানে এসে পৌঁছোনো পর্যন্ত শরীরে কোনও কষ্ট হয়নি তো?’

‘মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলাম আপনার ঘরের দরজায় মুখে৷’

‘সেটাই স্বাভাবিক৷ আশপাশে কারও সঙ্গে দেখা হয়নি?’

‘আপনার ঘরের ঠিক সামনেই একজনের সঙ্গে দেখা হয়েছিল৷ আচমকা তাকে দেখেই পড়ে গিয়েছিলাম৷ মাটি থেকে উঠে দেখি সে নেই৷ ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম৷ অদ্ভুত প্রাণী৷’

ভদ্রলোক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলেন৷ অবজ্ঞা-মেশানো সেই হাসি দেখে রাগ হল৷ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কড়া ভাষায় উনি বললেন, ‘আমি মানুষের মনের ভাষা বুঝতে পারি৷ আপনার মনে, এই সময়ে... ঠিক এই মুহৃর্তে কী কথা চলছে, আমি সব বুঝতে পারছি! রাগ করে লাভ নেই, আমি এমনই৷ আমার কাছে যদি একজন সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের ব্যবহার আশা করেন, ভুল করবেন৷’

যাঃ শালা! এ তো ভারী অবাক কাণ্ড! মানুষ অন্য মানুষের মনের ভাষা কী করে বুঝবে! গতকাল রাতের মেয়েটার কথা ইনি জানবেন কী করে, যতক্ষণ না আমি বলছি? অন্য মানুষের চিন্তাভাবনার পূর্বাভাস জেনে যাওয়া কারও সম্ভব? যত্তসব গাঁজাখুরি৷

সামনের বৃদ্ধ বলে উঠলেন, ‘গতকাল রাতে কোন মেয়ের সঙ্গে আপনার কী হয়েছিল, তাতে আমি বিন্দুমাত্র আগ্রহী নই৷ আপনার বয়স কম, একা মানুষ৷ চেষ্টা করবেন, চরিত্রহীনতা যেন আপনাকে প্রশ্রয় না দেয়৷ একবার আছড়ে পড়লে খুব কম মানুষই উঠে দাঁড়াতে পারেন৷ হিন্দুধর্মে পাপের ধারণা খুব কাঁচা৷ স্বামীজি ঠিক কথাই বলে গেছেন, দুর্বলতাই পাপ৷ আমি মানসিক দুর্বলতার কথা বলছি, যা মানুষের নিজেরই কর্ম৷ সেখানে নিস্তার নেই৷’

মাথা নিচু করে ফেলেছি৷ গতকাল কাজটা ঠিক হয়নি৷ যদিও কিছুই হয়নি, তবুও এমন একটা পদক্ষেপ নেওয়ার আগে আমার আরও হাজারবার ভাবা উচিত ছিল৷ মা মারা যাবার পর জীবন কেমন যেন তছনছ হয়ে গেল৷ হাজার অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নিজেকে গুছিয়ে নিতে এখনও পারিনি৷

ভাবনাচিন্তা এলোমেলো করে দিয়ে উলটোদিক থেকে প্রশ্ন ধেয়ে এল, ‘মিশ্রা হারামজাদার সঙ্গে তোর আলাপ হল কী করে?’

জীবনবাবুর মতো পিণ্ডারিজিরও বোধহয় আপনি, তুমি আর তুই গুলিয়ে ফেলার রোগ আছে৷ মিশ্রাজির সঙ্গে আলাপের ঘটনা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করলাম৷

আবার প্রশ্ন, ‘পাহাড়ের পাগলিকে জানিয়ে এসেছিস নিজের সমস্যার কথা?’

‘পাগলি!! উনি স্বয়ং মা মুণ্ডেশ্বরী!’

ভদ্রলোক হাসছেন৷ ওই একরত্তি চেহারায় এত ভারী আওয়াজ কোথায় লুকিয়ে রেখেছেন, ভগবান জানেন৷ পরমা জাগ্রতা মা মুণ্ডেশ্বরীকে পাগলি বলছেন! লোকটা নিজেই হয়তো পাগল না হয় গাঁজাখোর!

উলটোদিকে হাসি থেমে গেছে৷ তার জায়গায় কথা ভেসে আসছে, ‘হ্যাঁ আমি গাঁজা খাই, আলবাত খাই৷ তাতে তোর বাপের কী?’

মনে মনে ভাবলুম, নিজের বাপকে চোখেই দেখিনি৷ তার আবার... যাক গে৷ বেশ কিছুক্ষণ সব চুপচাপ৷

ভদ্রলোক এখন গম্ভীর মেজাজে আছেন বলে মনে হয়৷ আমায় বললেন, ‘দেখি, তোর মিশ্রাজি কী চিঠি লিখেছে?’

পকেট থেকে বের করে চিঠি দিলাম৷ উনি পড়লেন এবং কুচিয়ে ছিঁড়ে সামনের পাথরের থালায় ফেলে রাখলেন৷ আমার মনে কিছুটা অপমানসূচক রাগ এল৷ ভদ্রলোক আবার হাসছেন৷ গা-জ্বালানো হাসি৷

হাসি থামিয়ে হঠাৎ বললেন, ‘তোর রাগের গুষ্টির...’

আমি চুপ করে বসে আছি৷ মনের মধ্যে কোনও অনুভূতি রাখা যাবে না৷ ভদ্রলোক সত্যিই মনের সমস্ত কথা পড়ে নিচ্ছেন, অদ্ভুত ক্ষমতা৷

আমি কিছু বলার আগেই উনি বললেন, ‘তোর সমস্যা কী?’

‘প্রতিবার ঘুমোনোর সময় কিছু স্বপ্ন এসে আমার ঘুম ভেঙে দিয়ে যায়!’

‘চেনা স্বপ্ন?’

‘হ্যাঁ৷ রোজ একই স্বপ্ন দেখলে চেনা হয়ে যায় বই কী৷’

‘কখন আসে স্বপ্নগুলো? দিনে না রাতে?’

‘আসা-যাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নেই, ঘুমোলেই আসে৷’

‘ঘুমোনোর কতক্ষণ পর আসে?’

‘আধ ঘণ্টা, এক ঘণ্টা, বড়োজোর দু-ঘণ্টা... তার বেশি নয়৷’

‘কবে থেকে শুরু হয়েছে এই উপদ্রব?’

‘প্রায় দিন দশ-বারো৷’

‘কীভাবে শুরু হল?’

শিলিগুড়িতে যাওয়ার এবং ফেরার পথের দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে গতকাল রাত পর্যন্ত সমস্ত ঘটনার খুঁটিনাটি বললাম৷ কথা বলার মাঝখানে উনি একবার মাত্র থামিয়েছিলেন৷ গাঁজার কলকের ছিলিমে আগুন ধরিয়ে বলেছিলেন, ‘শুরু কর৷’

ঝাড়া সওয়া ঘণ্টা ধরে গত কয়েকদিনের কাহিনি সবিস্তারে বললাম৷ এখন থেমে গিয়েছি৷ বড্ড ক্লান্ত লাগছে৷ চোখ দুটো জ্বলছে৷ শরীর ঘুমোতে চায়, স্বপ্ন ঘুমোতে দেয় না৷ এক অদ্ভুত অস্বস্তি-মাখানো জীবন বয়ে চলেছি৷ হঠাৎ পালটে-যাওয়া এই জীবনে নিজেকে বড্ড অচেনা লাগে৷

কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে দেখি, ভদ্রলোকের দৃষ্টি আমার মুখের ওপর আটকে আছে৷ কী ভাবছেন, কে জানে?

ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক দেখার চেষ্টা করছি৷ বেশ কিছু বিড়ালের কঙ্কালের সঙ্গে একটা কুকুরের কঙ্কালও আছে, ওটা শেয়ালেরও হতে পারে৷ দুটো প্রাণীর হাড়ের কাঠামো প্রায় একই৷ ওপরের দেওয়ালে কিছু ময়ূরের পালক সুন্দর করে সাজানো আছে৷ এত অনাসৃষ্টির মাঝে এটাই সব থেকে দৃষ্টিনন্দন৷

দীর্ঘমেয়াদি নিস্তব্ধতার চাদর সরিয়ে ভদ্রলোকের গলার শব্দ ভেসে এল, ‘তার মানে গত আট-দশ দিন তুই ঠিকঠাক ঘুমোসনি, তা-ই তো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘বেশ, এখন আমি একটা ক্রিয়া করব৷ এটা এক ধরনের তন্ত্র চিকিৎসা৷ এতে একটা জিনিস স্পষ্ট হয়ে যাবে, তুই আদৌ বাকি জীবন ঘুমোতে পারবি কি না!’

ঢোঁক গিলে প্রশ্ন করলাম, ‘যদি ঘুমোতে না পারি?’

‘সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হবে মৃত্যু অনিবার্য৷ কোনো এক জন্ম অথবা এই জন্মের কোনো কর্মফল তোকে শেষ করে দেবে৷ সেটা খণ্ডানোর ক্ষমতা আমার নেই, আমি তো বাচ্চা ছেলে, কোনো অবতারেরও নেই, এমনকি পাহাড়ের ওপরে যে পাগলি বসে আছে, তারও নেই৷’

বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলাম৷ মনে প্রশ্ন এল, অবতার বা ঈশ্বরের ক্ষমতার বাইরেও কিছু আছে?

মনের কথা পড়ে নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘মায়ার জগতে শক্তি আর কর্ম ছাড়া অন্য কিছু কাজ করে না৷ কামনা-বাসনা, স্নেহ-মায়া এসবই মায়ার পৃথিবীর শক্তির আকর৷ মহামায়ার এই জগতে কর্মই শেষ কথা বলে৷ এখানে অবতারও পার পায় না৷ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে সামান্য ব্যাধের হাতে মরতে হয়, ঠাকুর রামকৃষ্ণর মতো অবতারকে ক্যানসারে মরতে হয়, শংকরাচার্য ও স্বামী বিবেকানন্দর মতো মহান পণ্ডিতকে অল্প আয়ু নিয়ে চলে যেতে হয়৷ রাবণের মতো মহান শিবভক্ত শক্তিশালী ব্রাহ্মণকে রামচন্দ্রর হাতে মরতে হয়৷ একজন মায়ের অভিশাপে যদুবংশ ধ্বংস হয়ে যায়৷ কর্ম থেকে নিস্তার নেই, কারও নেই৷’

ভদ্রলোক থেমেছেন৷ আমি কাঁপছি, দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা বইছে৷ হয়তো আর বেশি দিন বাঁচব না৷ জ্ঞানত কোনও খারাপ কর্ম করিনি৷

সামনের বৃদ্ধ মানুষ আদেশ করলেন, ‘মাথার পিছনে যে কয়টা কঙ্কাল আছে, হাত দিয়ে সরিয়ে লম্বা শুয়ে পড়৷ যে আসনের ওপর বসে আছিস, সেটা মাথার নীচে দে৷’

মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি শুয়ে পড়লাম৷ সারা শরীর জুড়ে কুকুর-বিড়ালের হাড়ের স্পর্শ টের পাচ্ছি৷ বাইরে এ সময় বৃষ্টি শুরু হল৷ মাথার ওপর টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা শ্রুতি-ছন্দের সৃষ্টি করেছে৷ শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারিধারার গতি পালটাচ্ছে প্রতিমুহৃর্তে৷

মিনিট পাঁচেকের মধ্যে, পিণ্ডারিজি বাম হস্তে একটা কমণ্ডলু নিয়ে আমার মাথার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ ডান হাতে একটা অচেনা গাছের পাতা৷ জানালার বাইরের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন, ‘এখন রাতের তৃতীয় প্রহর৷ মিনিট দশেক পর থেকে যখন আমি বলব, তখন চোখ বন্ধ করে ঘুমোনোর চেষ্টা করবে, ভয় পাবে না৷ যতক্ষণ না তোমার ঘুম ভাঙে, আমি এখানেই থাকব৷ কথাগুলো মাথায় রাখবে৷’

জীবনবাবু একটা পুরোনো কবিতা প্রায়ই আওড়ে থাকেন, এই মুহৃর্তে সেই ছন্দ হঠাৎ মনে এল;

‘প্রথম প্রহরে সবাই জাগে, দ্বিতীয় প্রহরে ভোগী৷

তৃতীয় প্রহরে তস্কর জাগে, চতুর্থ প্রহরে যোগী৷’

কথা শেষ করে ভদ্রলোক কাজ শুরু করলেন৷ মাথার ডান পাশে কমণ্ডলু আর বাঁ পাশে গাছের পাতা নামিয়ে রেখে গম্ভীর স্বরে, মুক্তকণ্ঠে, স্পষ্ট উচ্চারণে বিষ্ণু মন্ত্র শুরু করলেন:

‘‘ওঁ বিষ্ণুং শারদচন্দ্র কোটি সদৃশং শঙ্খং,

রথাঙ্গং গদাম্ভোজং দধতং সিতাব্জ৷

নিলয়ং কান্ত্যা জগন্মোহনম,

আবদ্ধাঙ্গদহার কুণ্ডল মহামৌলিং,

স্ফুরৎ কঙ্কণম৷৷

শ্রীবৎসাঙ্কমুদারং কৌস্তভধরং

বন্দে মুনীদৈঃ স্তুতম৷৷’

এরপর পনেরো মিনিট সব চুপচাপ৷ দুই হাত জড়ো করে যতটা সম্ভব সোজা দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে ভদ্রলোক নিঃশব্দে বীজমন্ত্র আওড়ে চলেছেন৷ আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, ঠোঁট দুটো নড়ছে অল্পবিস্তর৷

একটা জিনিস নজরে এল৷ ওই ঝুঁকে-যাওয়া শরীর নিয়ে ভদ্রলোক টানা পনেরো মিনিট বাঁ পা তুলে রেখেছিলেন৷ জপ শেষ করে আস্তে আস্তে সেই পা মাটি স্পর্শ করল৷ উনি চোখ খুললেন৷ আমার মাথার ঠিক সামনে পদ্মাসনে বসলেন৷ নাকের ডগায় পড়ে-থাকা সেই পাতা মাটি থেকে তুলে কমণ্ডলুর জলে চুবিয়ে নিয়ে, সেটি আমার কপালের মাঝখানে স্পর্শ করে রইলেন৷ বাইরে বৃষ্টির শব্দ তুমুল গতিতে বাড়ছে৷ এক-দেড় মিনিট অন্তর সেই পাতা কমণ্ডলুর জলে চুবিয়ে আবার উনি আমার কপালের মাঝখানে ধরছেন৷ কোথা থেকে যেন একরাশ ঠান্ডা হাওয়া গোটা শরীর জুড়িয়ে দিচ্ছে৷

আমার মাথার সামনে বসা বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আদেশ করলেন, ‘চোখ বন্ধ করো৷’

বাইরের বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে আমার কানে আবার মন্ত্রের ছন্দ ভেসে আসছে:

ওঁ হ্রিং ওঁ ফট ওঁ কালী ওঁ মুণ্ডেশ্বরী ওঁ চামুণ্ডেশ্বরী করালবদনা বিনিষ্ক্রান্তাসিপাশিনী৷ বিচিত্র খট্বাঙ্গধরা নরমালাবিভূষণাগ্ধ৷

দ্বীপিচর্মপরিধানা শুষ্কমাংসাতিভৈরবা৷ অতিবিস্তারবদনা জিহ্বাললনভীষণা৷ নিমগ্না রক্তনয়না নাদাপুরিতদিন্মুখা৷’

ক্রমশ বৃষ্টির শব্দ বন্ধ হয়ে গেল৷ মন্ত্রের উচ্চারণের শব্দও কানে আসছে না৷ পিণ্ডারিজির হাতে ধরে-থাকা সেই পাতা, আমার কপালের ঠিক মাঝখানে সুড়সুড়ি দিচ্ছে৷ কিছুক্ষণ পর সুড়সুড়ি বন্ধ হল৷ ওঁর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে আমার দুই ভ্রূ-র মাঝখানে চেপে ধরেছেন ভদ্রলোক৷ বড্ড ঘুম পাচ্ছে৷

ক্লান্ত আমি, স্থান-কাল-পাত্র সব ভুলে যাচ্ছি৷ ঘুমিয়ে পড়ছি ক্রমশ... বড্ড ঘুম... বাঁচতে চাই আমি... হে মা মুণ্ডেশ্বরী... রক্ষা করো... মা... মা গো..

১০

বহু দূরের অজ্ঞাত সুড়ঙ্গ থেকে একরাশ আলো এসে মুখের ওপর আছড়ে ঘুম ভাঙল৷ সারা শরীর জুড়ে মিঠে আমেজ৷ আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসেছি অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে৷ শেষ কবে এমন ঘুমিয়েছি, মনে করতে পারলাম না৷

জানালার বাইরে মেঘলা আকাশ৷ মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষ, নেটওয়ার্ক সীমানার বাইরে৷ হাতের ঘড়িতে সময় দুপুর দুটো৷ বড্ড খিদে পেয়েছে৷ অনন্ত এক বিশ্রামের পর যেন চোখ খুলল৷ কোথায় আছি, কীভাবে এখানে এলাম সব মনে পড়ল ধীরে ধীরে৷ বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছি৷ বহুকাল এমন ঘুম হয়নি৷ মাথা টলছে৷

দু-কদম এগিয়ে এসে পাশের ঘরে উপস্থিত হয়েছি৷ হাতলওয়ালা একটা কাঠের পুরোনো চেয়ার দেখতে পাচ্ছি, এটা খুব সম্ভবত গতকাল রাত্রে ছিল না৷ অতগুলো বেড়াল এবং সেই সরমা-সন্তানই বা কোথায় গেল?

বন্ধ দরজার ফাঁকফোকর দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম৷ বাইরে, শ্মশানে বেশ কিছু মানুষ একত্রিত হয়ে মড়া পোড়াচ্ছেন৷ একজন কমবয়সি ভদ্রমহিলা বুক চাপড়ে চিৎকার করছেন, ‘হায় ম্যায় লুট গয়ি!’ ওঁর পাশে দু-জন বয়স্কার একই অবস্থা৷ একজন বৃদ্ধ পুরুষের চোখে জল দেখতে পাচ্ছি৷ বাকি সবাই নির্লিপ্ত৷

পরপর তিনটে চিতায় অগ্নিপিণ্ড৷ কিছুটা দূরে একটা পুকুর৷ মাথার ওপর একচিলতে মেঘলা আকাশ, তেমনি মানানসই গুমোট গরম৷ কাঁধের কাছে উষ্ণ বাতাস অনুভব করে, মুখ ঘুরিয়ে দেখি স্বয়ং তিনি৷ হাতে মাটির গ্লাসে জল, অন্য হাতে ধরা পাথুরে বাটিতে কিছু গোটা ফল৷ কোথা থেকে যেন অদ্ভুত সুন্দর ধূপ অথবা আতরের গন্ধ আসছে৷ একই গন্ধ গত রাতেও পেয়েছি অথচ উৎস খুঁজে পাইনি৷

চোখের ইশারায় চেয়ারে বসতে বলে বাটি আর জল আমার হাতে ধরিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘প্রথমে ফল খাবে, তারপর মিষ্টি, তারপর জল৷ এখানে মিষ্টি নেই, আমি নিয়ে আসছি৷ খাওয়া হয়ে গেলে চুপচাপ বসে থাকবে চেয়ারে৷ তোমার সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে৷’

কোনও প্রশ্ন করার আগেই ভদ্রলোক চোখের নিমেষে ভ্যানিশ হয়ে গেলেন৷ ওই ভাঙা শরীরে তাক-লাগানো গতি! কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার ফিরে এলেন৷

শসা, কলা... ইত্যাদি শেষ করে আম খাওয়া শুরু করেছি৷ যেমন গন্ধ, তেমন তার স্বাদ৷ সাক্ষাৎ অমৃত৷ মিনিটকয়েকের মধ্যেই গোটাকয়েক তিলের নাড়ু নিয়ে এসে হাজির হলেন৷ সেগুলো খেয়ে, ঠান্ডা জল এক ঢোঁকে গিলে খিদে মিটল৷ মন শান্ত৷ যতদূর মনে পড়ছে, গতকাল রাত্রে স্বপ্ন দেখিনি৷ দেখলেও এখন মনে নেই৷

ভদ্রলোক মাটিতে বসে আছেন৷ মুখে দুষ্টুমি-মাখানো নিশ্চিন্তের হাসি৷ কিছু মানুষ খাওয়াতে ভালোবাসেন, ইনি হয়তো সেই গোত্রের৷ হাত-মুখ ধুয়ে আমি চেয়ারে এসে বসেছি৷ লম্বা ঘুমের পর এক বাটি খাবার, আর কী চাই?

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধ সন্ন্যাসী কথা বলা শুরু করলেন, ‘মহর্ষি পরাশর একটি সংহিতা রচনা করেছিলেন, যার নাম ‘পরাশর-সংহিতা’৷ সেখানে স্বপ্নসম্বন্ধীয় ব্যাখ্যা আছে৷ তবে, তুই আপাতত ঝামেলার বাইরে এবং তোর কোনও মাথার ব্যামো নেই৷ সংসারের কর্মের বন্ধনে তুই একই স্বপ্ন দেখছিস বারবার, তবে এসবের বাইরেও একটা ব্যাপার আছে, তোর বিপদ খুব সম্ভবত সেই জায়গায়৷’

জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে আছি৷ মিনিট দুয়েকের বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘দিনের বেলার স্বপ্নের বেশির ভাগই অনির্দিষ্ট৷ মানুষের স্বপ্ন, চাঁদ এবং ভগবান বিষ্ণু; একই মুখ্য বিষয়ের উদ্দেশ্য, বিস্তার এবং বিধেয়৷ জ্যোতিষ বিচারে, চন্দ্রিমার সঙ্গে স্বপ্নের প্রভাব অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে৷ রাতের স্বপ্নের গুরুত্বই আলাদা৷ তবে, দিনের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ব্রাহ্মমুহৃর্তে স্বপ্নের বিশেষ বক্তব্য থাকে৷ সেই স্বপ্নে গৌরবর্ণ পুরুষের ঊর্ধ্বাংশ নগ্ন অবস্থায় দেখা মানে, সৌভাগ্যের আগাম সূচনা৷’

কয়েক মুহৃর্তের বিরতি নিয়ে পিণ্ডারিজি বলতে শুরু করেছেন আবার, ‘বারবার একই স্বপ্ন দেখা এবং ঘুম ভাঙার পরেও দীর্ঘ সময় ধরে মনে গেঁথে থাকা মানে, অবশ্যম্ভাবী কোনও ঘটনা এবং তার জন্য প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত করা হচ্ছে৷ ভোরবেলার স্বপ্নে, নিজের মাথার তিন, পাঁচ বা সাত টুকরো দেখা, মানুষ এবং হরিণের বন্ধুত্ব দেখা, সিংহাসনপ্রাপ্তি দেখা, মন্দিরের মধ্যে থাকা ফুল-মালা, ঘণ্টা, পঞ্চপ্রদীপ ইত্যাদি দেখা, দামি গ্রহরত্ন, রুপো এবং প্রস্ফুটিত পদ্ম ফুলের স্বপ্ন দেখলে শুভসংকেত হিসাবে ধরা হয়৷ ক্কচিৎ কখনও এই স্বপ্নের সঙ্গে যদি সুগন্ধ ভেসে আসে, বুঝতে হবে প্রাপ্তিযোগ নিকটস্থ৷ তোমার স্বপ্নের মধ্যে মন্দিরের যে বিবরণ আমায় দিয়েছ, তা শুভসংকেত বহন করছে বলেই মনে হয়৷ তবে, স্থান-কাল-পাত্র এবং সময় অনুযায়ী স্বপ্নের অর্থ পরিবর্তনশীল৷’

ভদ্রলোক কথা থামিয়ে দিয়েছেন৷ মুখের অভিব্যক্তি বলছে, এখনও বক্তব্য বাকি আছে৷ স্বপ্নের এহেন ব্যাখ্যা শুনে অবাক হয়ে গিয়েছি৷ কমণ্ডলু থেকে এক ঢোঁক জল মুখে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তবে...’

কথা শুরু হওয়ার আগেই থেমে গেলেন৷ কিছুক্ষণ আমার চোখের ওপর দৃষ্টিপাত করে, মিনিট পাঁচেকের বিরতি চেয়ে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে উলটোদিকে বসলেন৷ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, আমার সামনে বসা বৃদ্ধের শরীর ক্রমশ স্তব্ধ হয়ে আসছে৷ বয়সের ভারে বেঁকে-যাওয়া এক মানুষের পাঁজরের হাড় গোনা যাচ্ছে৷ খুঁটিয়ে লক্ষ করলে দেখা যায়, দক্ষিণ কানের ওপরের দিকে পরপর দুটো সরু কাঠের টুকরো ঢোকানো আছে৷ ক্ষয়াটে চেহারায় বহু বছরের ত্যাগ ও নিষ্কামতার ছাপ সুস্পষ্ট৷

ঘরের ভিতরের পরিবেশের নিস্তব্ধতা খণ্ডন করে, কিছুক্ষণের মধ্যেই মৃদুস্বরে মন্ত্রোচ্চারণের শব্দ শুনতে পেলাম, ভদ্রলোক রীতিমতো কাঁপছেন৷ চেয়ার থেকে উঠে ওঁর কাছাকাছি এসে বসেছি৷ এক হাত দূরত্বে নুইয়ে-থাকা বৃদ্ধ মানুষ ভীষণভাবে ঘামছেন৷ কিছুক্ষণ পর উনি নিঃসাড় অবস্থায় এলিয়ে পড়লেন, ওঁকে ধরতে গিয়ে ভয়ংকররকম ছ্যাঁকা খেয়ে তৎক্ষণাৎ ছেড়ে দিলাম৷ মানুষের শরীর, অথচ তপ্ত লোহার মতো গরম৷

পাশে পড়ে-থাকা পাথরের বাটি থেকে জলের ছিটে দিলাম ওঁর মুখে৷ গরম কড়াইতে জলের ফোঁটা যেমন উবে যায়, প্রায় সেই অবস্থা৷ পিণ্ডারিজি বেহুঁশ হয়ে আছেন৷

আধ ঘণ্টা পর কোনওরকম অল্প একটু চোখ খুলে হাতের ইশারায় আমাকে সরে যেতে বললেন৷ দু-পা পিছিয়ে এসে আবার চেয়ারে এসে বসেছি৷ আরও পনেরো মিনিট বিরতিতে উনি নিজে থেকেই উঠে বসলেন, একগাল হাসি নিয়ে আমার দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘এক পিস বাংলা বিড়ি আছে?’

হাসব না কাঁদব; বুঝতে পারছি না৷

দু-চার ঢোঁক জল এবং বিড়ি টেনে বললেন, ‘হালফিলে কোন তান্ত্রিকের সঙ্গে তোর মোলাকাত হয়েছিল অথবা এমন কিছু কাজ করেছিস, যেটা করা উচিত নয়৷ এই যেমন ধর মরা মানুষের কাজ... অথবা এই ধরনের কিছু?’

শিলিগুড়িতে তান্ত্রিকের সাক্ষাৎ এবং অর্ডার সাপ্লাইয়ের যাবতীয় বিবরণ ওঁকে আবার জানালাম৷ খুব মন দিয়ে সব কথা শুনে ভদ্রলোকের মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে৷

কিছুক্ষণ থেমে বললেন, ‘কাজটা মোটেই ভালো হয়নি৷ যে মেয়ের কঙ্কাল তুই বিক্রি করেছিস, সে আত্মঘাতী হয়েছিল৷ তুই খবর জানিস না, উত্তরবঙ্গের সেই তান্ত্রিক আজ ভোরে স্বয়ং আত্মঘাতী হয়েছেন৷ এবারে তোর পালা৷ এই অবস্থা থেকে বাঁচবার একটাই উপায়৷’

ভদ্রলোকের কাঁপুনি কমে গেছে৷ আমার সারা শরীর এখন ঘর্মাক্ত, রীতিমতো কাঁপছি৷ এই মানুষের কথা মিথ্যা হওয়ার নয়৷

আমার দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে জানলার বাইরে দৃষ্টি মেলে নির্লিপ্ত মুখে ভদ্রলোক বলে চলেছেন, ‘ঘটনা বেশ কয়েক বছর আগের৷ একজন অপদার্থ চামড়াসর্বস্ব লম্পট গ্রামের মাস্টারমশাই পাশের গ্রামের এক নিষ্পাপ কিশোরীকে ধর্ষণ করল৷ লজ্জায় সেই মেয়ে আত্মঘাতী হল৷ কিশোরীর বাবা রাতের অন্ধকারে সামাজিক লজ্জার ভয়ে মেয়েটিকে মাটিচাপা দিয়ে দিলেন৷ পরবর্তীকালে, মাটি থেকে তুলে নিয়ে সেই কঙ্কাল হাত বদলে এল তোর কাছে এবং শেষবারের মতো হাত বদলে চলে গেল তান্ত্রিকের কাছে৷ সেই হতভাগা অর্ধশিক্ষিত তান্ত্রিক একবারও টের পেল না, নিজের ক্ষতি সে নিজে করছে৷ আত্মহত্যার ক্ষেত্রে একটা কথা মাথায় রাখিস, কিছু মানুষ ভাবে, হয়তো সে পালিয়ে গেল, আসলে সে নিজেকে ওই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করল৷ যদিও মুক্তি অত সহজে মেলে না৷’

একচিলতে বাঁকা হাসি উপহার দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুই হয়তো অবিশ্বাস করবি, তোর যেখানে বাস অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল, সেটা ওই কিশোরীর কবরস্থান এবং এর কিছুটা দূরে সেই ধর্ষণের জায়গা৷ পুলিশের খাতায় ওই মেয়েটি নিখোঁজ৷ সেই শিক্ষক আজও বহাল তবিয়তে ঘোরাফেরা করছে৷ ওই কিশোরীর অতৃপ্ত আত্মা তখনই মুক্ত হবে, যখন সেই মাস্টার শাস্তি পাবে৷ পুরো ঘটনা কাকতালীয় মনে হলেও, যাচাই করে নিতে পারিস৷ আমার গণনা ভুল হবে না৷’

প্রশ্ন করলাম, ‘এতসব আপনি জানলেন কী করে?’

মৃদু হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘বহু প্রাচীন এক ডামরতন্ত্র আছে, যার নাম বিষ্ণু ডামরতন্ত্র৷ এই বিদ্যার রচয়িতা স্বয়ং ভগবান শিব, এর মান্যতা দিয়েছেন ভগবান বিষ্ণু এবং লিপিবদ্ধ করেছেন ভগবান গণেশ৷ এই শাস্ত্রের নিয়মিত অভ্যাস ও অধ্যয়নের ফলে সাধকের মনের সকল জিজ্ঞাসা স্বপ্নের মাধ্যমে উত্তর দেয়৷ এর কোনও পুঁথি আমার কাছে নেই, তবে আমার গুরুজি এই বিদ্যা আমায় শিখিয়েছিলেন৷ তামাম দুনিয়ায় যত মানুষ যত ধরনের স্বপ্ন দেখেন, সবই ভগবান বিষ্ণুর ক্যারিশমা৷ পৃথিবীকে প্রদক্ষিণের সময় চন্দ্রের গতিপথ, জলস্ফীতি এবং স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করে৷ যে মানুষ বিষ্ণুডামরতন্ত্র জানে, সে সামনের মানুষের মনের ভাষা সহজেই পড়ে নিতে পারে৷ তার নিজের প্রশ্নের উত্তর সে পায় স্বপ্নের মাধ্যমে;এটাই রীতি, এটাই বাস্তব এবং এটাই সাধনা৷ উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরে এক মহাসাধক এবং অধুনা পাকিস্তানের করাচির রত্নেশ্বর মহাদেব মন্দিরের এক তন্ত্র উপাসক এই বিশেষ ডামরতন্ত্রের শ্রেষ্ঠতম উপাসক ছিলেন৷ দু-জনেই অবশ্য দেহ রেখেছেন প্রায় দেড়শো বছর আগে৷ আমার গুরুজি ওঁদের দু-জনের কাছেই দীক্ষা নিয়েছিলেন৷’

ভদ্রলোক কিছুক্ষণ থামলেন৷ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘মনের একগাদা প্রশ্ন নিয়ে আমি ডামরক্রিয়া শুরু করলাম, ক্রমশ শরীর তপ্ত হল এবং দু-চোখ জুড়ে ঘুম এল৷ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর একে একে চোখের সামনে এসে ধরা দিল৷ তোকে এখানে যিনি পাঠিয়েছেন, সেই মিশ্রাজির নাতনি গত জন্মে স্বয়ং ওঁর স্ত্রী ছিলেন৷ ওই সন্তানের প্রতি মিশ্রাজির অপত্যস্নেহ থাকা অস্বাভাবিক নয়৷ বিভিন্ন সম্পর্কে নিকটস্থ আত্মীয়রা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নাম, সম্পর্ক এবং আকৃতি পালটে সংসারের মধ্যেই ঘুরঘুর করেন৷ যাওয়ার আর জায়গা কই?’

‘কেন এমন হয়, পিণ্ডারিজি?’

‘মৃত্যুকালীন ইচ্ছায় এই কার্মিক বন্ধন প্রাপ্ত হয়৷ সেই কারণেই মৃত্যুর অন্তিম মুহৃর্তে নিকটাত্মীয়দের ডেকে নেওয়া হয়৷ মায়া বড়ো কঠিন বস্তু, একবার জড়িয়ে পড়লে সহজে নিস্তার নেই, এই নিয়মের ব্যতিক্রম সিদ্ধান্তও আছে৷’

চুপ করে বসে ভদ্রলোকের বক্তব্যের বিশ্লেষণ করছি মনে মনে৷ শাস্ত্রের সিদ্ধান্তবাক্যের ব্যাখ্যা করে চলেছেন একের পর এক৷

কিছুটা বিরতি নিয়ে বৃদ্ধ পিণ্ডারিজি বললেন, ‘না জেনেশুনে মৃত মানুষের শরীর নিয়ে কোনওদিন ব্যাবসা করা উচিত নয়৷ যে দেহ সৎকার হয়নি, যে দেহ সৎকারের পর শাস্ত্র অনুযায়ী ক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি, সেই চেতনা প্রেতযোনিতে ঠাঁই পায়৷ সেই অতৃপ্ত চেতনা যতক্ষণ না নিজের কর্ম অনুযায়ী প্রাণী শরীর নিয়ে আবার জন্মাতে পারে, ততক্ষণ সে বদ্ধ৷ এই অতৃপ্ত চৈতন্যকেই প্রেত বলা হয়৷ এদের আংশিক কামনা-বাসনা থাকে তবে, ভোগবিলাসের সামর্থ্য থাকে না৷ কামনা তীব্র হলে কোনও কোনো ক্ষেত্রে এরা অন্য শরীরে ভর অথবা নির্ভর করে৷ বিভিন্ন ধর্মের প্রেতযোনি সম্পর্কে ধ্যানধারণা কম-বেশি একই৷ এক্ষেত্রে, ওই কিশোরীটি ভিন্ন ধর্মের মানুষ হওয়ায়, আমার পক্ষে ওকে মুক্ত করা সম্ভব নয়৷ সেই শাস্ত্র, মন্ত্র, যন্ত্র বা সংস্কার আমার জানা নেই৷ তবে, এমন মানুষকে চিনি, যে তাকে মুক্ত করবে৷ তুমি বরং এক কাজ করো, একবার দেবা-শরিফ চলে যাও৷’

‘সেটা কী বা কোথায়?’

চোখ দুটো রাজভোগের সাইজ করে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি দেবা-শরিফ চেনো না?’

‘পুরীর আশপাশে কোথাও?’

‘না, উত্তরপ্রদেশে৷’

কিছুক্ষণ চিন্তাভাবনা করে পিণ্ডারিজি বললেন, ‘এক কাজ করো, এখান থেকে বেরিয়ে প্রথমে পাটনা পৌঁছে যাও৷ সেখান থেকে মেল ট্রেন ধরে লখনউ যাও৷ তারপর ওখান থেকে আন্দাজ ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ওয়ারিশ আলি শাহর জন্মস্থান; দেবা-শরিফ৷ ওয়ারিশ আলি শাহ;বিখ্যাত মানুষ ছিলেন৷ সুফি সম্প্রদায়ের অমন সুবিশাল এবং জাগ্রত দরগা তামাম দুনিয়ায় খুব কম আছে৷ দর্শনের দিক থেকে সুফি এবং অদ্বৈত-বেদান্ত খুব কাছাকাছি৷ ওখানেই কাছেপিঠে কোথাও গুপ্ত অবস্থায় থাকেন হাজি আলি মির্জা সাহেব৷ ওঁর বয়স আমার থেকেও অনেকটা বেশি৷ সাচ্চা ফকির এবং সুফি ও সহজিয়াতন্ত্রের অমন পণ্ডিত চট করে এই যুগে পাওয়া যাবে না৷ আমি আমার মতন করে দু-কলম লিখে দিচ্ছি, বাকি কথা তুমি বুঝিয়ে বলবে৷’

‘ওই দরগায় খোঁজ করলে ওঁকে পাওয়া যাবে?’

‘না, নিকটবর্তী কবরস্থানে বা আশপাশের জলাশয় সংলগ্ন এলাকায়, উনি রাতের দ্বিতীয় প্রহরে সুফি সংগীত সাধনা করেন৷ দিনের বেলায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব৷ সংগীত ওঁর সাধনমার্গ৷ ভদ্রলোক ভালো বাংলা জানেন৷ অপূর্ব গানের গলা৷ ওঁকে একমাত্র ওখানেই পাবে৷ একসময় আমাদের মধ্যে শাস্ত্র নিয়ে প্রচুর আলোচনা হয়েছে৷ পিরসিদ্ধ মহান পণ্ডিত মানুষ৷ সমস্যা একটাই, উনি নিজে দর্শন না দিলে দেখা মেলা দুষ্কর৷’

পিণ্ডারিজি থেমে গেছেন৷ বৃদ্ধ মানুষ অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে এখন হাঁপাচ্ছেন৷ আরও কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘বয়স হয়েছে আমার, এই শরীর আর ধরে রাখা যায় না৷ আগামিকাল ভোরবেলা শেষবারের মতো এখান থেকে বেরিয়ে যাব, তারপর পরবর্তী অম্বুবাচি অব্দি অপেক্ষা করতে হবে৷ অম্বুবাচি শেষ হওয়ামাত্র আমি এই শরীর ত্যাগ করব৷ শেষ সাত দিন কোনও কথা বলা যাবে না, এ এক কঠিন তপস্যা৷ শবসাধনায় বসে মহাকাল তন্ত্রসাধনা করব৷ এই মানবজীবনের এখানেই ইতি ঘটবে৷ শরীর পড়ে থাকবে পথেঘাটে, কোনও মানুষের চোখে না পড়লে মাটিতে মিশে পোকামাকড়ের খাদ্য হয়ে যাবে, ভালোই হবে৷ আবার আসতে হবে, কমপক্ষে এখনও দুটো জন্ম বাকি আছে৷ তারপর ছুটি৷’

‘এখানে আর ফিরবেন না?’

‘নাহঃ৷’

‘মা মুণ্ডেশ্বরীর জন্য মন খারাপ করবে না?’

‘ধুর পাগল! মা আমায় ছেড়ে থাকতে পারবেন নাকি! মা কামাখ্যায় যাবেন আমার সঙ্গে, আলবাত যাবেন৷’

‘এখানে?’

‘উনি সর্বত্রই বিরাজমান৷ স্থান, কাল, সীমানায় বেঁধে রাখা যায় না৷ ভক্ত যেখানে, ভগবানও সেখানে৷ ভক্তের হৃদয় আর ভগবানের মন্দির;দুটোর ভাবার্থ একই৷ এ ছাড়া, সন্ন্যাসী বা সাধকদের শারীরিক মায়ায় জড়াতে নেই৷ তন্ত্রের প্রতিটা ক্রিয়ার প্রকৃত অর্থ হল নিষ্কাম অব্যয়কে প্রতিষ্ঠা করা৷’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভদ্রলোক আবার বললেন, ‘কলিযুগে একটা সময় এমন আসবে, রাবণ আবার ফিরে আসবেন নতুন নামে, নতুন চেহারায়৷ মহর্ষি মার্কণ্ডেয় জ্ঞানগঞ্জ থেকে এসে মহামৃত্যুঞ্জয় জপ করে রাবণকে পুনরুজ্জীবিত করবেন৷ আমার যতদূর ধারণা, মহাপণ্ডিত রাবণ মা মুণ্ডেশ্বরীর দরবারে একবার অন্তত আসবেন৷ এই ঘটনার কিছু বছর পরেই কল্কি আসবেন ধর্মকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য৷’

কথাগুলো বলে ভদ্রলোক চুপ মেরে বসে আছেন৷ সেই সুযোগে বললাম, ‘আপনার মৃতদেহের যদি সংস্কার না হয়, তখন আপনিও...?’

একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘প্রায় সত্তর বছর আগে আমি নিজের শ্রাদ্ধ নিজেই করে ফেলেছি৷ একজন সন্ন্যাসী, সংসারের সাধারণ নিয়মের আওতার বাইরে, সমাজের লেনদেন বা দেনাপাওনার হিসাবের বাইরে৷ বিভিন্ন মঠ-মিশনের সন্ন্যাসীরা বিপদের সময় ঝাঁপিয়ে পড়ে যেটুকু কাজ করেন, তার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই৷ সেবা ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করতেই ওঁরা এটুকু করেন৷ ঈশ্বরচিন্তাই সন্ন্যাসীর একমাত্র কাজ৷’

নিজের গলায় কিছুটা জল ঢেলে নিয়ে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘মানুষের মৃত শরীর দাহ হওয়ার পর যতসব বিধি ও সংস্কার পালন করা হয়, সবই বিদেহী আত্মার শান্তির জন্যই করা হয়৷ মানুষ ভাবে, পরলোকগত জীব এতে মুক্ত হবে; আসলে তা নয়৷ তাকে কর্মফল ভোগ করতেই হবে৷ বর্তমান সময়ে নিয়ম এবং সংস্কারের নামে প্রচুর কুসংস্কার ঢুকেছে৷ সেগুলো থেকে মুক্ত হলেই মানুষ শান্তি পাবে৷ সমস্যা হচ্ছে, আজকাল এইসব নিয়ে কেউ নিজে পড়াশোনা করে না৷ ফলে, যে যা বিধান দেয়, সেটাকেই মেনে নিতে হয়৷’

ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন দেখে আমি প্রশ্ন করলাম, ‘আপনি যে দেহ রাখবেন, এ কথা মিশ্রাজি জানেন?’

‘চলে গেলেই জানতে পারবেন৷ মায়া বাড়িয়ে, কষ্ট দিয়ে কী লাভ? মায়া যত কাটে, ততই মঙ্গল৷ সংসারী মানুষ, প্রথম দু-চারদিন হয়তো কান্নাকাটি করবেন৷ পরবর্তীকালে নাতি-নাতনি নিয়ে সব ভুলে যাবেন৷ এই মহাবিশ্বের যেকোনও মহাশোক প্রাথমিক সাত ঘণ্টা থেকে শুরু করে একুশ দিনের বেশি টিকে থাকে না, একান্তই যদি সে মানুষ দুঃখবিলাসী না হয়৷’

এতক্ষণ ধরে কথা বলে হাঁপিয়ে উঠেছি৷ বিড়ির পুরো প্যাকেট ওঁর হাতে দিলাম৷ তার থেকে একটা বের করে ফস করে আগুন ধরিয়ে চোখ মুদে মহানন্দে টান দিচ্ছেন বৃদ্ধ সাধক৷

প্রকৃত জ্ঞানী বোধহয় এমনই হন৷ অতি সাধারণ জীবনযাত্রা অথচ অসাধারণ চিন্তাভাবনা৷ যে মানুষ মাটিতে ভাঙা পাত্রে ভাত খায়, পাথরের ভাঙা বাটিতে জল খায়, তাঁর কাছে আমার একটা গোটা জীবন ভিক্ষা চাইছি! সত্যিই অবাক কাণ্ড!

এই দেশের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে সম্পূর্ণরূপে ধারণা করা অসম্ভব৷ চোখের সামনে যে মানুষকে দেখছি, তিনি সামনের মানুষের মনের কথা পড়ে ফেলেন, স্বপ্নের মাধ্যমে মানুষের সমস্যার সমাধান খুঁজে পান৷ অমন বিদ্যা ক-জনের আছে?

সামনে বসা জ্ঞানী মানুষের অনুমতি নিয়ে এক পিস বিড়ি ধরিয়েছি৷ দু-চারবার টেনে হঠাৎ প্রশ্ন করে বসলাম, ‘স্বপ্নে কি সত্যিই আগামীর কোনো ইঙ্গিত থাকে?’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে, আমার মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন, ‘তোমার সব প্রশ্নের উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই, তবে তুমি ছেলে ভালো৷ শেখার আগ্রহ আছে৷ মন পরিষ্কার এবং আমার যেটা সব থেকে ভালো লেগেছে, তুমি পরিশ্রমী এবং এখনও পর্যন্ত সচ্চরিত্র৷ চরিত্রবান এবং কর্মঠ মানুষদের আমি ভীষণ পছন্দ করি৷ যে জিনিসটা খুব সহজে নষ্ট করে ফেলা যায়, সেটা যখন কেউ খুব যত্ন নিয়ে বাঁচিয়ে রাখে, তাকে শ্রদ্ধা জানাতে মন চায়৷ একটা কথা সারাজীবন মাথায় রেখো, বিশেষ কোনও ক্ষেত্র ছাড়া এবং নিজের বিবাহিত স্ত্রী ছাড়া অপর যেকোনও নারীর শরীরের মাথা ছাড়া অন্য কোথাও স্পর্শ করবে না৷’

হাতের বিড়ি শেষ করে, দু-দণ্ড জিরিয়ে নিয়ে ভদ্রলোক আবার বলা শুরু করলেন, ‘স্বপ্ন হল যোগ-নিদ্রা-শয়নব্যবস্থার একটি বিচারক্রিয়া৷ চেতন এবং অবচেতনের সন্ধি অথবা সংঘাতে স্বপ্নের সৃষ্টি হয়৷ প্রাচীন সময়ের কিছু ঋষিদের ধারণা, আমাদের বিশ্রামের সময় সূক্ষ্ম মন অন্তরীক্ষ এবং নক্ষত্রপথ পরিক্রম করে, যা স্থান-কাল-পাত্র ছাপিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে৷ অর্থাৎ, পূর্ব এবং ভবিষ্যৎ দুটোই যেখানে আপেক্ষিক অথচ সত্য৷ অনেকটা মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো৷ সরাসরি খেলা দেখা যাচ্ছে দূরদর্শনের পরদায় অথচ খেলা হচ্ছে বিদেশের মাটিতে৷ স্বপ্নের অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝতে পারলে, আগামীর ইঙ্গিত অবশ্যই পাওয়া যায়৷ বহু ক্ষেত্রে স্বপ্নের ভাষা উলটো হয়!’

আমি বেশ কিছুটা অবাক হয়ে গিয়েছি৷ আরও খানিকক্ষণ চুপ থেকে হাতজোড় থেকে বললাম, ‘যদি একটু ব্যাখ্যা-সহ বুঝিয়ে দেন, ভালো হয়৷’

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে পিণ্ডারিজি বললেন, ‘বহু বছর আগে মাথায় ঝোঁক চেপে স্বপ্ন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেছিলাম৷ বেশ কিছুটা এগোনোর পর বাধ্য হয়ে থেমে যেতে হয়েছিল৷’

কয়েক মুহৃর্তের বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘কোনও যুবক অথবা যুবতি যদি স্বপ্নে নিজেকে আলিঙ্গনরত অবস্থায় দেখেন তাহলে তাঁর প্রেমযোগ আসন্ন৷ স্বামী-স্ত্রী উভয়েই যদি স্বপ্নে দেখেন তাঁরা ক্ষুধার্ত, তাঁদের সন্তানধারণের সমস্যা হবে৷ স্বপ্নে যদি কেউ নিজেকে বাঁ হাতে কাজ করতে দেখেন, তখন বুঝবেন সুনাম আসন্ন৷ যদি কোনও পুরুষ স্বপ্নে দেখেন, তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করছেন, তাঁর ক্ষতি হওয়ার এবং কঠিন অসুস্থতার সম্ভাবনা থাকে৷ যদি কেউ স্বপ্নে দেখে, ধুলোয় দৃষ্টিভ্রম হচ্ছে, ব্যবসার ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে৷ স্বপ্নে ধূমকেতু দেখা অতি অশোভনীয় জিনিস৷ স্বপ্নে ময়ূরের পালক দেখতে পেলে সে মানুষের শ্রীবৃদ্ধি হয়৷ স্বপ্নে যদি কেউ নিজেকে মাঝসমুদ্রে ঝড়ের মধ্যে আটকে থাকতে দেখেন, তাঁর দুর্ভাগ্যের শুরু হয়৷ স্বপ্নে যদি কোনও মানুষ পাহাড়ের শৃঙ্গ দেখেন, তাঁকে পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলতার ইঙ্গিত বোঝানো হয়৷ কোনও রোগী ব্যক্তি যদি স্বপ্নে নিজের কবর দেখতে পান, তাঁর রোগভোগ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকবে৷ স্বপ্নে নিজেকে ঘুড়ি ওড়াতে দেখলে অর্থলাভ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল৷ বিবাহযোগ্য কোনও মানুষ স্বপ্নে যদি সারস বা নীলকণ্ঠ পাখি দেখে থাকেন, তাঁর সত্বর বিবাহযোগ উপস্থিত হয়৷ এরকম আরও শতাধিক সিদ্ধান্ত আছে৷ স্বপ্নের সময়, স্থান এবং পাত্রভেদে যার ফলাফল পরিবর্তনশীল৷’

আমার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে, কিছুটা জল নিজের গলায় ঢেলে ভদ্রলোক বললেন, ‘তুমি হয়তো ভাই বললে বিশ্বাস করবে না;স্বপ্নের যে বিভিন্ন দিক নিয়ে আমি গবেষণা করা শুরু করেছিলাম, সেগুলোই ব্যক্তিগত জীবনে বারবার স্বপ্নে এসে ব্যতিব্যস্ত করে তুলেছিল৷ ওখানেই থেমে গিয়েছিলাম৷ স্বপ্নের বিষয়ে আর এগোতে পারিনি, যে নির্দিষ্ট মার্গ নিয়ে আমি সাধনা করছিলাম, তার থেকে অপর কোনও বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া ঠিক নয়৷ শুধু আমার ক্ষেত্রে নয়, সংসারী মানুষেরও উচিত লোভ সংযত করা, নির্দিষ্ট একটিমাত্র পথেই এগিয়ে যাওয়া৷ আয়ের কমপক্ষে দশ শতাংশ সঞ্চয় করা এবং দশ শতাংশ নিষ্কাম দান করা উচিত, তীর্থক্ষেত্রে দানের মাহাত্ম্য সর্বাধিক৷’

চুপচাপ অনেকক্ষণ বসে রইলেন ভদ্রলোক৷ আরও কিছুক্ষণ থেমে বললেন, ‘বিষ্ণুতন্ত্রের শক্তি ভীষণ প্রবল৷ সে নিজের সাধককে অপর কোনও বিষয়ের সঙ্গে ভাগ করে নেয় না৷ এই সাধনায় তন্ত্রশক্তি এবং তন্ত্রসাধক;উভয়ই একই ধারণা, যেমন উপযুক্ত ভক্ত আর ভক্তের ভগবান এক৷ তবে এখানে বলার মতো একটা বিষয় আছে;শুধু ভক্ত হলে হবে না, প্রকৃতপক্ষে জ্ঞানী ভক্ত হতে হবে৷ বিজ্ঞান অর্থাৎ বিশেষ জ্ঞান দিয়ে আধ্যাত্মিকতাকে যাচাই করে তবে সাধনায় বসতে পারবে এমন ভক্তের প্রয়োজন৷ তা না হলে সারাজীবন ঢোল-করতাল বাজিয়েই যেতে হবে, আখেরে লাভ কিছুই হবে না৷ সাধনায় যদি জ্ঞানবৃদ্ধি না হয়, অনুভূতি সূক্ষ্ম না হয়, তার থেকে সংসারী হওয়া অনেক ভালো৷ সনাতন সাধনায় যদি সাধকের শক্তি এবং শ্রীবৃদ্ধি না হয়, বুঝতে হবে, গোলমাল আছে৷’

অনেকক্ষণ পর বন্ধ চোখ খুলে ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন৷ দুষ্টুমি-মাখানো হাসি৷ মুখের অজস্র বলিরেখা আরও কুঁচকে গেছে৷ বাইরে বোধহয় নতুন কোনও মড়া এল৷ নামকীর্তনে চারপাশ মুখরিত৷

বৃদ্ধ মানুষ মিষ্টি হেসে বন্ধ দরজার বাইরের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘এটাই হল জীবনের সারসত্যি৷ যতক্ষণ জীবন আছে, ঘুরে বেড়িয়ে আনন্দ করে জ্ঞান অর্জন করে নে৷ সম্ভব হলে কিছু ভালো কর্ম করিস, মন যদি সেগুলো করতে না চায় তাহলেও চলবে, তবে মানুষের ক্ষতি হয় এমন কোনও কুকর্ম কোনওদিন করিস না৷ তোর কপাল স্পর্শ করে আমি বেশ কিছু নির্দেশ পেয়েছি, তোর ভাগ্যে রাজযোগ আছে৷ যে ক্রিয়া আমি তোকে করে দিয়েছি, তাতে তোর স্বপ্নের দোষ এবং ওই জাতীয় ঝঞ্ঝাট এ জীবনে কেটে যাবে৷ আগামী দিনে তুই আবার সাধারণ জীবনযাপন করতে পারবি৷ তবে তোর একটা পাওনা বাকি আছে!’

‘পাওনা?’

‘জি হ্যাঁ, আগের জন্মের পাওনা৷ সেই হিসাব এখনও বাকি আছে৷ পথদুর্ঘটনায় মরে গিয়েও তোকে আবার ফিরে আসতে হয়েছে, তার কারণ একটাই, এই স্থূল জীবনে তোর সেই সূক্ষ্ম হিসাব মেলার কথা৷ সেটা না-হওয়া পর্যন্ত তোর শান্তি নেই৷ আমি নিশ্চিত, শীঘ্রই তোর জীবনে আবার নতুন কোনও উপদ্রব আসবে৷ তার থেকে বরং তুই নিজের হিসাব নিজেই মিটিয়ে নে৷ বিধাতা হয়তো এমনই চান৷’

‘পূর্বজন্মের হিসাব! তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, জন্মান্তরবাদ সত্যিই হয়?’

‘আলবাত হয়৷ এই বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই৷ পৃথিবীর বেশির ভাগ ধর্মই কম-বেশি পুনর্জন্মকে মান্যতা দিয়েছে৷ তোকে একটা উদাহরণ দিই—’

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে একটা বিড়ি ধরিয়ে লম্বা এক সুখটান মেরে পিণ্ডারিজি বললেন, ‘পথচলতি কিছু অচেনা মানুষকে কখনও তোর চেনা মনে হয়? অনেকক্ষণ ধরে ভেবেও তুই কূলকিনারা খুঁজে পেলি না... কবে, কোথায় এই মানুষের সঙ্গে তোর দেখা হয়েছিল, অথচ চেনা মনে হচ্ছে৷ আবার ধর, পথ চলতে কিছু মানুষকে দেখে তোর ভালো লাগে, আবার কিছু মানুষকে দেখলেই মাথা গরম হয়ে যায়, যদিও এই মানুষের সঙ্গে তোর আলাপ নেই... তুই তাকে আগে কোনওদিন দেখিসনি... ইত্যাদি ইত্যাদি৷’

অল্প কিছুক্ষণ থেমে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘অবাক করার মতো ঘটনা হল, তোর বাহ্যিক চেতনা সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে না চিনতে পারলেও, তোর অবচেতন সেই মানুষকে ঠিকই চিনেছেন৷ আত্মা এক এবং সর্বব্যাপী৷ চেহারা পালটালেও চেতনা, সংস্কার, প্রবৃত্তি এসব চট করে পালটে ফেলা যায় না৷ সংস্কার পালটাতে গেলে স্বচ্ছ চিন্তাভাবনা ও সাধনার প্রয়োজন হয়৷’

কয়েক মুহৃর্তের বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক আবার বললেন, ‘পথচলতি এই জন্মের সেই অচেনা মানুষ কয়েক জন্ম আগে থেকেই মনের মণিকোঠায় কোথাও একটা রয়ে গেছেন৷ এটা কম-বেশি সবার সঙ্গেই হয়৷ চোখের সামনে হঠাৎ ঘটে-যাওয়া কোনও মুহৃর্ত দেখে আমাদের মনে হয়, এই ঘটনা আগেও হয়তো কোথাও ঘটেছে৷ চেতনা, সদাজাগ্রত এক বিবেচনা এবং সম্পূর্ণরূপে ব্যাখ্যার বাইরে৷ এই বিষয়ে আধুনিক বিজ্ঞান প্রতিমুহৃর্তে নিজেদের মতো পালটে ফেলে৷ স্নায়ুবিদ্যা কঠিনতম এক বিষয়৷ বিজ্ঞান এই বিষয়ে কোনও চিরস্থায়ী সিদ্ধান্তবাক্য দিতে পারে না৷ বিভিন্ন মানুষের মন এবং শরীর অনুযায়ী এটি পরিবর্তনশীল৷ যার যেমন আধার, যেমন সংস্কার... তার চেতনা ঠিক তেমনই৷ তোর সংস্কার ভালো, এই স্বপ্ন এই জন্মে তোকে কিছু দিতে এসেছে৷ স্বপ্নের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ না হলে একই স্বপ্ন আবার ঘুরে আসবে৷ স্বপ্নসন্ধান করে, নির্দিষ্ট কক্ষপথের বাকি থাকা অসম্পূর্ণ কর্ম বিহিত করে তবেই পাকাপাকিভাবে মুক্ত হওয়া সম্ভব৷’

কিছুক্ষণ থেমে একটু জল খেয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথি এবং বই ঘেঁটে বাহাত্তর ধরনের স্বপ্নের একটা তালিকা তৈরি করা গেছে, যার মধ্যে ত্রিশরকম স্বপ্ন শুভফলদায়ক এবং বিয়াল্লিশ রকমের ফল অশুভ৷ এর বাইরেও আরও অনেক কিছু সিদ্ধান্ত আছে, যা সাধারণের চিন্তাভাবনার বাইরে৷ যদিও এটি অতি সাধারণ ধারণা বলেই আমার মনে হয়েছে৷ প্রাচীন বই থেকে এই তথ্য আমি পেয়েছিলাম৷’

অবাক হয়ে এতক্ষণ শুনছিলাম৷ আরও কিছুটা এগিয়ে ওঁর পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই বাহাত্তর ধরনের স্বপ্ন কী কী, যদি একটু বলেন, প্লিজ!’

‘কী হবে তোর জেনে? এ ছাড়া, এর বাইরেও আরও প্রচুর স্বপ্ন দেখে মানুষ৷ স্থান, কাল, পাত্র অনুযায়ী স্বপ্নের ব্যাখ্যা বদলে যায়৷’

‘যদি আপনি অনুমতি দেন, পরবর্তীকালে এই নিয়ে বই লিখব৷’

‘তা লিখিস, তবে আমার নাম যেন না আসে৷ আরও যদি কিছু নির্দেশ পাই, তোকে নিশ্চয়ই জানিয়ে দেব৷’

‘কথা দিলাম, আপনার নাম ব্যবহার করব না৷ কিন্তু, স্বপ্নের নির্দেশ পরবর্তীকালে কীভাবে জানাবেন? আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে?’

মুচকি হেসে বৃদ্ধ বললেন, ‘সব জানতে পারবি৷ এসব কথা চিন্তা না করে তুই এখন গন্তব্যে বেরিয়ে পড়৷ ওই মেয়ের পারলৌকিক কার্য যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন হওয়া দরকার৷ ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আমি সাক্ষাৎ করে নেব৷ এই স্বপ্নযাত্রার শেষটুকু দেখার জন্য মুখিয়ে থাকব৷ বাধাবিপত্তি কাটিয়ে শেষ পর্যন্ত মনে হয়, বহু যুগের প্রাচীন অভিশাপ খণ্ডিত হতে যাচ্ছে তোর হাত দিয়ে, আমি আছি তোর সঙ্গে৷’

শুভ স্বপ্ন:

১) ভগবান বুদ্ধ ২) বিষ্ণু ৩) শিব ৪) জৈন তীর্থংকর ৫) ব্রহ্মা ৬) কার্তিকেয় ৭ ) লক্ষ্মী ৮) গণেশ ৯) গৌরী ১০) রাজা ১১) হাতি ১২) গরু ১৩) গাভী ১৪) চন্দ্র ১৫) সূর্য ১৬) বিমান ১৭) প্রাসাদ ১৮) ধোঁয়াহীন আগুন ১৯) ফুলের মালা ২০) ক্ষীরসাগর ২১) সরোবর ২২) সিংহ ২৩) ধনরত্নভাণ্ডার ২৪) পাহাড় ২৫) ধ্বজা ২৬) ভরা কলস ২৭) মল ২৮) মাংস ২৯) মাছ ৩০) কল্পবৃক্ষ৷

অশুভ স্বপ্ন:

১) গন্ধর্ব ২) রাক্ষস ৩) ভূত ৪) পিশাচ ৫) কুশ ৬) মহিষ ৭) বাঁদর ৮) ক্যাকটাস ৯) আহত সর্প ১০) নর্দমা ১১) বিছে ১২) ক্ষতিগ্রস্ত শ্মশান ১৩) উট ১৪) গাধা ১৫) আহত বেড়াল ১৬) আহত কুকুর ১৭) অভাব ১৮) কুয়ো ১৯) বেসুরো সংগীত ২০) কপট ব্রাহ্মণ ২১) ছাই ২২) মৃতের হাড় ২৩) পিঠে কুঁজ আছে এমন বামন ২৪) আঁধার ২৫) দুশ্চরিত্র পুরুষ/নারী ২৬) মৃত পশুর চামড়া ২৭) লাল পাথর ২৮) ঝগড়া ২৯) ঠগি ৩০) কুদৃষ্টি ৩১) শুকিয়ে-যাওয়া পুকুর, নদী, সাগর ৩২) ভূমিকম্প ৩৩) গ্রহের প্রকোপ ৩৪) অপকর্মের জন্য বহিষ্কৃত ব্যক্তি ৩৫) সাজাপ্রাপ্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তি ৩৬) পৃথিবীর টুকরো হয়ে যাওয়া ৩৭) তারাখসা ৩৮) উল্কাপাত এবং চাঁদের টুকরো হয়ে যাওয়া ৩৯) সূর্যের বিস্ফোরণ এবং টুকরো হয়ে যাওয়া ৪০) অসহনীয় গরম বা ঠান্ডা ৪১) ভয়ংকর ঝড় ৪২) নোংরা ভাষা শুনতে পাওয়া৷

১১

আরও কিছু আলাপচারিতার পর, বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর চরণ ছুঁয়ে, আরেকবার মন্দির দর্শন করে সকালের বাস ধরে পাটনায় ফিরে এসে টুকটাক কেনাকাটা করে, রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে বসে আছি৷ অদ্ভুত এক আবেশ শরীরময় ছড়িয়ে আছে৷ প্রকৃত জ্ঞানী মানুষের সান্নিধ্য করলে মন শান্ত হয়৷ নিজেকে এতকাল অভাগা ভাবতাম, গত রাতের ঘটনা সমস্ত হিসাব পালটে দিয়েছে৷

অনেক খুঁজে প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চির একটা কোণে সেঁটে বসলাম অবশেষে৷ মনের মধ্যে নানান প্রশ্নোত্তরের তোলপাড় চলছে৷ স্বপ্নের অত্যাচার থেকে আপাতত মুক্ত, এটাই খুশির খবর৷

রেলওয়ে স্টেশনের সিমেন্টে-বাঁধানো এই প্ল্যাটফর্ম;এক অদ্ভুত জায়গা৷ জন-জামাই-সাধু-সন্ন্যাসী-কুমার-চিরকুমারী-চোর-চি টিংবাজ সবাই এখানে নির্দিষ্ট গন্তব্যের জন্য অপেক্ষারত৷ কিছু মানুষ হয়তো হজ করতে যাবেন, কিছু মানুষ গোয়া যাবেন ফুর্তি করতে, আবার কিছু মানুষ হয়তো বৃন্দাবন যাবেন; সবাই স্টেশনের ইতিউতি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন৷

‘পথ’ একটাই, মতপার্থক্য থাকতেই পারে৷ যে পথে বিশ্বাস আছে, নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সেই পথে এগিয়ে যাওয়ার নামই ধর্ম৷ যার কোনও পথ নেই, সে বিপথে এবং ভীষণ বিপদে আছে৷ নিজের ধর্ম যদি একজন মানুষ সত্যিই নিজে ঠিক করে নিতে পারেন, তাঁর থেকে বিচক্ষণ আর কেউ নেই৷ বিবর্তনের হাত ধরে চারপেয়ে জীব আজ দু-পায়ে মেরুদণ্ড সোজা করে হেঁটেচলে বেড়াচ্ছে৷ পৃথিবী ছাড়িয়ে চাঁদ, মঙ্গল এবং বৃহস্পতির দিকে এগিয়ে চলেছেন এই বিশ্বের সব থেকে বুদ্ধিমান প্রাণী; এই মহান শক্তিশালী কার্মিক বিবর্তনের নামই ধর্ম অর্থাৎ ওয়ে অফ লাইফ৷

নানান চিন্তাভাবনায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই, ঘুম ভেঙে দেখি, আশপাশের মানুষজন পালটে গেছে৷ প্ল্যাটফর্মের বেঞ্চিতে সবাই ক্ষণিকের অতিথি৷ আসা-যাওয়া লেগেই থাকে৷

এখন রাত এগারোটা, রিজার্ভেশনের টিকিট নেই, অগত্যা জেনারেল টিকিট কেটে লখনউগামী একটা ট্রেনে উঠে বসে আছি৷ ভ্যাপসা গরম৷ ট্রেন লেট করে এসেছে কয়েক ঘণ্টা পর৷ বাথরুমের অবস্থা অবর্ণনীয়৷ এই দেশের মানুষ কবে যে সবকিছুর যত্ন নিতে শিখবে, কে জানে! একটা লম্বা হুইসল বাজিয়ে যাত্রা শুরু হল৷ অনেক রাত হয়েছে৷

প্রায় দু-ঘণ্টা পর মাঝরাস্তায় গোঁত্তা খেয়ে ট্রেন হঠাৎ থেমে গেল৷ সময় রাত একটা৷ পিঠের ব্যাগ নিয়ে চেয়ার থেকে উঠে ট্রেনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছোতে পাক্কা পনেরো মিনিট লাগল৷ মশা-মাছির থেকে মানুষের সংখ্যা বেশি এ দেশে, আমিও তাঁদেরই একজন৷ মা ষষ্ঠীর অসীম কৃপা৷ দূরপাল্লার ট্রেনের জেনারেল বগি হল ভারতবর্ষের সংহতি এবং সহিষ্ণুতার ক্ষুদ্রতম দৃষ্টান্ত৷ ভ্যাপসা গরমে প্রাণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে৷ ট্রেন চললে একরকম, দাঁড়িয়ে গেলে বড্ড অসহায় লাগে৷

পিঠের ব্যাগ সমেত একলাফে মাটিতে এসে নেমেছি, আরও অনেকে নেমেছেন৷ প্রাকৃতিক কর্মের ক্ষেত্রে পুরুষদের অনেক সুবিধা৷ গাছের পাতায় কোনও হেলদোল নেই৷ বৃষ্টি নামলে তবেই শান্তি৷ চারপাশে ঝোপঝাড়ে লুকিয়ে-থাকা কোটি কোটি জোনাকি পোকা আর আকাশের তারা এক হয়ে গেছে৷ দূরে টিমটিম করে জ্বলতে-থাকা এক বাল্বের আলোর প্রতিফলন চোখে এসে পড়ছে৷ শাশ্বত পরিবেশের নিস্তব্ধতাকে ছিন্নভিন্ন করে হঠাৎ হুইসল বেজে উঠল, ট্রেন আবার চলতে শুরু করেছে৷

কোনও অজ্ঞাত ঘটনা ঘটার আগে হয়তো কিছুটা সময় আমরা পাই, অনেক ক্ষেত্রে সেই সময়টা ধরতে পারি না; আজীবন সেই অধরা সময় আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয়!

বগি পালটে উঠে এসেছি সংরক্ষিত স্লিপার কামরায়৷ এখানেও যাচ্ছেতাই অবস্থা৷ চাদর এবং খবরের কাগজ পেতে মানুষ শুয়ে আছেন চলার পথে৷ আরেকবার ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেন থেমে গেল৷ একটা আনকোরা অনামী স্টেশন৷ ট্রেনে এত্তটুকু জায়গা নেই৷ ওই তো জায়গা!

অদ্ভুত এক মায়াবী প্ল্যাটফর্ম! হলদেটে আলো, গোটা দুয়েক কুকুর, একটা বিড়াল আর গোটাকয়েক ঘুমন্ত মানুষ, নিজের মর্জিমাফিক ঘুরতে-থাকা সিলিং ফ্যান হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷ বড্ড ঘুম পাচ্ছে৷ শরীর ক্লান্ত৷ নিপাট ভালোমানুষের মতো একটা ফাঁকা বেঞ্চ পড়ে আছে৷ অদৃশ্য কেউ যেন ধাক্কা দিয়ে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিতে চাইছে৷ পিছন ফিরে তাকিয়ে রইলাম, কেউ নেই৷ আবার যেন কেউ...

মনের কথায় সায় দিয়ে ট্রেন ছেড়ে নেমে এলাম প্ল্যাটফর্মে৷ তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন খালি বেঞ্চি, মাথার ওপর সরকারি পাখা৷ পিঠের বোঝা মাথার বালিশ হল৷ শরীর জুড়ে একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, ট্রেন থেকে নেমে এখানে এসে শুয়ে পড়তেই সেটা থেমে গেল; অদ্ভুত কাণ্ড! লম্বা একটা বাঁশি দিয়ে বেশ গতি নিয়ে রেলগাড়ি চলে গেল৷ যে যাবার, সে যাবে, কে কবে কাকে আটকে রাখতে পেরেছে! বড়ো নিশ্চিন্তের ঘুম! গোটা দুনিয়ায় মানুষের ঘরসংসার ছড়িয়ে রয়েছে৷ যেখানে শান্তি, সেখানে নিবৃত্তি৷ আমরা সবাই বোহেমিয়ান, বেদুইন, যাযাবর শ্রেণিভুক্ত৷ যে গৃহবন্দি, তার মন বিচরণ করে সর্বত্র৷ প্রতিমুহৃর্তে নতুন স্বপ্ন তৈরি হয়৷

এত আওয়াজ আসছে কোথা থেকে! শয়ে শয়ে মানুষের আর্তনাদ! কলকাতার ব্রিগেডের মতো জনসাধারণের পদধ্বনি, কুকুরের চিৎকার, পুলিশের হুইসলের শব্দ, একটা জেনারেটর ভ্যান কোথা থেকে এসে গেছে এর মধ্যে, সবকিছু ছাপিয়ে কানে আসছে মানুষের কান্না!

বেঞ্চি থেকে নামতে গিয়ে দেখি জুতো হাওয়া৷ ব্যাগ পিঠে তুলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছি, রেললাইন ধরে প্রচুর মানুষ দৌড়োচ্ছে! উলটোদিক থেকে দু-একজন রক্তাক্ত শরীরে ফিরেও আসছে৷ কিছু মানুষ দৌড়োচ্ছে প্রচুর জিনিসপত্র হাতে৷ কারও হাতে ধরা একাধিক সোনার চেন, নগদ টাকা, ব্যাগ, ক্যামেরা, জামাকাপড়, সুটকেস... একজনের হাতে দেখলাম রক্তাক্ত শিশু!

অ্যাক্সিডেন্ট! ভয়ংকর ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট! যে ট্রেনে আমি কিছুক্ষণ আগে ছিলাম, সেই ট্রেন প্রায় আড়াই কিলোমিটার দূরে দাঁড়ানো একটা মালগাড়িতে গিয়ে সজোরে ধাক্কা মেরে উলটে গেছে৷ যান্ত্রিক লোহার দেওয়ালের সঙ্গে অপর যান্ত্রিক লোহার দেওয়ালের টক্করে পিষে গেছেন সাধারণ মানুষ৷ আমি বোধহয় মানুষ নই! এর আগে একবার বাস অ্যাক্সিডেন্টে মরে বেঁচেছি, এবার মরতে মরতে বেঁচেছি৷ কেউ একজন বারবার বাঁচিয়ে দিচ্ছে৷

আরও একজন রক্তাক্ত মিনিয়েচার মানুষ! অসহায় কান্না৷ স্থানীয় প্রচুর মানুষ সেইদিকেই দৌড়োচ্ছেন৷ প্ল্যাটফর্ম থেকে লাফ মেরে নেমে পড়লাম রেললাইনে৷ খোয়া পাথরের ওপর দৌড় শুরু করেছি পাগলের মতো৷ হঠাৎ খেয়াল করলাম, পা থেকে রক্ত ঝরে মিশে যাচ্ছে কালো পাথরে৷

চারপাশে প্রচুর সরকারি আলো এসে জড়ো হয়েছে, হলদে আলোয় ছোপ ছোপ লাল রক্ত পড়ে আছে কালো পাথরের ওপর৷ উলটে-যাওয়া বিশাল আকৃতির মেইল ট্রেন দেখতে অনেকটা অন্তিম পর্যায়ের মোগল সাম্রাজ্যের মতো৷ আশপাশের জীবিত মানুষ স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে৷ হঠাৎ আঁতকে উঠলাম, পায়ে একটা পেরেক অর্ধেক ঢুকে গেছে৷ শরীর ঘেমে উঠে বমি হল৷ নিরুপায় অবস্থায় বসে রইলাম মাটির ওপর৷ চোখের সামনে লীলাখেলা দেখে যাচ্ছি৷ মানুষের রিপু, গোটা মানবজাতির থেকেও বেশি শক্তিধর৷

কিছু মানুষ মনুষ্যত্বকে উদ্ধার করছেন৷ মানুষের মতো দেখতে কিছু জীব এই সময় অবাধ লুটপাট চালাচ্ছে৷ আরও একাধিক রক্তাক্ত শিশু! শরীর খারাপ লাগছে আমার৷ কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে উদ্ধারকার্যে হাত লাগিয়েছি৷ বাতানুকূল কামরার কাচ ভেঙে অল্পবয়সি একজনকে বের করে আনা হল৷ আরও একজন, তারপর আরও একজন৷ এইবার আমি দু-হাত বাড়িয়ে দিয়েছি, রক্তাক্ত এক মানুষ, মুখের দিকে তাকাতেই প্রায় হুঁশ হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ৷ এ সেই মেয়ে, গ্রীবার সন্ধিক্ষণে যার যতিচিহ্ন আঁকা আছে৷ একজন মানুষ কতবার মরবে?

কাপুরুষের মতো ভিড়ের উলটোদিকে দৌড় লাগালাম৷ হড়হড় করে বমি হল৷ যত শক্তি, যত আওয়াজ সব মুখে৷ বুঝলাম, আমার শিরদাঁড়া এখনও মজবুত হয়নি৷ সে আছে এখানেই, হয়তো খুঁজছে আমায়৷

পথে একজোড়া ব্যবহারযোগ্য জুতো পেলাম৷ সেটা গলিয়ে আবার দৌড়৷ জুতো, তুমি কার? পায়ে যার, তার৷

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%