চতুর্থ অধ্যায়

রাজাধিরাজ ভট্টাচার্য

ভদ্রলোক চুপ করে সমস্ত কথা শুনলেন৷ কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়িয়ে পায়চারি করে আবার নিজের চেয়ারে এসে বসলেন৷ খানিকক্ষণ পর বললেন, ‘আমার স্ত্রী এবং ছেলে আমাকে ছেড়ে বিদেশে আছে, আপনার অস্বাভাবিক মনে হয় না?’

‘অপরের ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা ঘামাই না৷ নিজের ব্যক্তিগত জীবনে অনধিকার প্রবেশ পছন্দ করি না৷’

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক আবার বললেন, ‘জানি না, আমি কেন এত কথা বলছি, আসল সত্যিটা আপনাকে বলতে গেলে যতটা শক্তির প্রয়োজন, ততটা আমার মধ্যে এই মুহৃর্তে নেই৷’

ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ পাশে রাখা গ্লাসে বরফ এবং সুরা মিশিয়ে পরপর দু-বার গলাধঃকরণ করে বললেন, ‘বিখ্যাত চিত্রাভিনেতা সলমন খানকে তো নিশ্চয়ই চেনেন?’

‘চিনি না... তবে জানি৷ দারুণ কাজ করেন ভদ্রলোক, বেশ কয়েকটা ছবি দেখেছি৷’

মাথা নেড়ে গ্লাসের বাকি তরল উদরীকরণ করে জিতুবাবু বললেন, ‘ওঁর ডান হাতে একটা ব্রেসলেট আছে, যেটায় আসল ফিরোজি পাথর বসানো আছে৷ ওই পাথরের অসীম গুণ, উলটোদিক থেকে আসা বিভিন্ন ক্ষতিকারক এনার্জি ওই পাথর হজম করে নিতে পারে৷ যখন সেই এনার্জির আক্রমণ বড্ড বেশি হয়, তখন ফিরোজি পাথর ভেঙে টুকরো হয়ে যায়৷ আমি যদি খুব ভুল না হই তাহলে এটা সলমন খানের সাত অথবা আট নম্বর ফিরোজি৷’

চুপ করে বসে শুনছি৷ ভদ্রলোক পরপর বটম মেরে যাচ্ছেন, আমি গুনছি৷ এটা নিয়ে পাঁচ নম্বর, উনি থামলেন৷ কিছু একটা কথা হয়তো বলতে চাইছেন, পারছেন না৷ তাই এত ভূমিকা৷

একমনে শামি-কাবাবের প্লেট শেষ করে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাচ্ছি, এমন সময় দেখি ভদ্রলোক পায়ের সামনে বসে৷ ভীষণ বিচলিত অবস্থায় উনি বললেন, ‘গতকাল খুব বাজে কাজ করে ফেলেছি, রাতারাতি তার শাস্তি বিদেশে থাকা আমার ছেলে পেয়েছে৷ প্লিজ ক্ষমা করে দিন৷’

‘আরে উঠুন মশাই, হয়েছেটা কী?’

বেশ কিছু সময় নিয়ে বললেন, ‘আপনার আশরফি আমি চুরি করেছিলাম, বদলে আমার বন্ধুর অনুকরণে তৈরি নকল আশরফি আপনার হাতে দিয়েছিলাম৷ তফাত আপনি বুঝতেই পারেননি, অবশ্য বোঝার কথাও নয়৷ আপনি চলে যাওয়ার পর আমি যখন ঘুমিয়ে পড়ি, তার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা লাল রঙের ক্রুদ্ধ সাপের স্বপ্ন দেখি৷ আধ ঘণ্টার মধ্যে গিন্নির ফোন আসে, ছেলের ভয়ানক গাড়ি অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, সে মরণাপন্ন৷ এই পাপ আমার, আজ সকালে গিয়ে শ্মশানে প্রায়শ্চিত্ত এবং হোমযজ্ঞ করে এসেছি৷ কিন্তু, আপনি ক্ষমা না করলে কিছুই হবে না৷ জানি আমি অযোগ্য, তবু আমায় ক্ষমা করুন, প্লিজ ছেলেকে বাঁচান৷’

লখনউ শহরে রাত সাড়ে এগারোটা এমন কিছু বড়ো ব্যাপার নয়৷ নিজের আশরফি নিজের হাতে নিয়ে রগড়ে যাচাই করে পকেটস্থ করেছি৷ ভদ্রলোক নিজের ছেলের বাইকের চাবি এবং সেল-লেটার আমায় জোর করে দিতে চেয়েছিলেন; নিইনি, নেব না৷

জেনেশুনে চোরের সম্পত্তির মালিক হওয়ার কোনও মানে হয় না৷ এক সময়ের আধপেটা খেয়ে-থাকা মানুষ আমি, চৌর্যবৃত্তি বিলকুল না-পসন্দ৷ গরিব হতে পারি, ভিখারি নই৷ ভিখারি হলেও নিতাম না৷ জীবনবাবু শিখিয়েছিলেন, জেনেশুনে যে মানুষ চুরির পয়সা ভোগ করে, তার কর্মনাশ হয়৷

একটা উবার বুক করে ধর্মশালায় ফিরে এসে, ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নিয়েছি৷ যাদের আশ্রয়ে ছিলাম, তাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে, জবরদস্তি হাতে হাজার পাঁচেক গুঁজে দিয়ে রেল স্টেশনে এসে বসে আছি৷ রক্ত, আগুন আর প্রেমের ঋণ রাখতে নেই৷

অনলাইন বা অফলাইন কোথাও ট্রেনের টিকিট নেই৷ আর ভালো লাগছে না, এবার বাড়ি ফিরব, মাথার ঠিক নেই আমার৷ যে মানুষের জন্য মনে শ্রদ্ধা জন্ম নেয়, সেই মানুষ যখন ঠকিয়ে দেন, তখন নিজের গালে ঠাসিয়ে চড় মারতে ইচ্ছা করে৷ আরও শিক্ষার প্রয়োজন আছে এই জীবনে৷

স্টেশনের বাইরে একজন ট্রাভেল এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে কানপুর পর্যন্ত একটা গাড়ি জোগাড় হয়েছে৷ সেই চারচাকা, কানপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে একজন রাজধানীর প্যাসেঞ্জার নিয়ে ফিরবে লখনউতে, প্রায় অর্ধেক ভাড়ায় আমার কাজ মিটে গেল৷ কানপুর থেকে হাওড়া এবং শিয়ালদার প্রচুর ট্রেন আছে, যেকোনও একটা ট্রেনে ঠিক ব্যবস্থা হয়ে যাবে৷

লখনউ থেকে কানপুরের দূরত্ব গাড়িতে সওয়া ঘণ্টার মতো৷ এখন সময় সকাল সওয়া আটটা৷ রাতভর রাগের মাথায় স্টেশনে কাটিয়ে শরীর ক্লান্ত৷

শহর ছাড়িয়ে হু হু প্রান্তরের মধ্য দিয়ে মারুতি ছুটে চলেছে৷ মধ্যম লয়ের বৃষ্টিপাত, সঙ্গে মিউজিক সিস্টেমে সারেঙ্গি, রাগ বাহার৷ মাথার মধ্যে জমে-থাকা গত কয়েকদিনের যাবতীয় স্মৃতি সরিয়ে ফেলতে হবে৷ স্বপ্নের প্রতিকার হয়েছে, ব্যস যথেষ্ট৷ একজন মহান সুফি সন্ন্যাসী একটা উপহার দিয়েছেন, সেটাকে যত্ন করে কাছে রাখলেই হবে৷ এবারে গিয়ে কাজে ফিরতে হবে৷ নতুন করে কাজ খুঁজতে হবে, উপার্জন করতে হবে৷ অনেক খরচা হয়ে গেছে, আবার নতুন সঞ্চয় শুরু করতে হবে৷ ফাঁকা মাথায় নানান চিন্তার মহাসমাবেশ৷

হাজার চিন্তাভাবনা করলেও ভবিতব্যকে ঠেকানো সোজা নয়৷ যা হওয়ার তা হবেই, হতেই হবে, মানুষ আসলেই ভীষণ অসহায়৷

উলটোদিক থেকে আসা ষোলো চাকার পাঞ্জাব লরিকে জায়গা দিতে গিয়ে গাড়ি চলে গেল রাস্তার একদম সাইডে৷ সেখানে একটা মাইলস্টোনে ধাক্কা খেয়ে পরপর দু-বার পালটি খেয়ে গাড়ি উলটে পড়ে রইল পাশের আখের খেতে৷ রাগ শিবরঞ্জনী, ঠাট কাফি, তিনতাল৷

মরিনি, বেঁচে আছি৷ কপাল ফেটে রক্তাক্ত অবস্থা৷ চোখে ঝাপসা দেখছি৷ দু-মাসের মধ্যে পরপর দু-বার বড়ো অ্যাক্সিডেন্ট! পড়ে রইলাম নির্জীবের মতো৷ কতগুলো হাড় ভেঙেছে; কে জানে!

গাড়ির বাইরে বের হতে পারছি না৷ দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি, কয়েকজন কৃষক এদিকে দৌড়ে আসছেন৷ দরজা ভেঙে আমাকে বের করা হল৷ পরপর দু-বার বমি হল৷ চৌক থেকে সদ্য কেনা সাদা কুর্তা রক্তে ভিজে গেছে, দাঁড়াতে পারছি না৷ সামনে বসে গাড়ি-চালানো ছেলেটার নাম রমেশ, বেচারা সদ্য বিয়ে করেছে৷

ঈশ্বরের পরম কৃপা, রমেশ বেঁচে গেছে৷ ওর কলার-বোনে চোট পেয়েছে, সময় লাগবে, তবে ঠিক হয়ে যাবে৷ আমার কপাল ফেটেছে, পিঠে প্রায় দশ ইঞ্চিমতো একটা লম্বা মাংস খুবলে-যাওয়া দাগ হয়ে গেছে৷ পাঁজরে ভয়ংকর চোট, কাশলেই মুখ থেকে রক্ত বেরোচ্ছে৷ অ্যাম্বুলেন্স এল আরও আধ ঘণ্টা পর৷

কানপুর স্টেট জেনারেল হসপিটালের মেল সার্জিক্যাল ওয়ার্ডে পড়ে আছি, আজ প্রায় চোদ্দো দিন হল৷ এইভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো৷ মির্জা সাহেবের কথা কানে বাজছে, উনি বারবার সাবধান করেছিলেন, শুনিনি৷ ইতিমধ্যে পুলিশ এসে বার তিনেক বয়ান নিয়ে গেছে৷ একে যন্ত্রণার শেষ নেই, তার ওপর আবার পুলিশের ঝামেলা৷ জীবন আর নরক একাকার৷ এত কিছুর পরেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস, ঠিক বেঁচে যাব এবারেও৷ দু-হাত তুলে চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে; আমি মৃত্যুঞ্জয়ী বলে, আপাতত দু-হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা৷ লড়াই ছাড়িনি আমি৷

অদম্য জেদ চেপেছে মনে৷ দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিজ্ঞা করেছি, বাড়ি এখন ফিরব না৷ স্বপ্নে দেখা ওই মন্দির আমায় খুঁজে বের করতে হবেই৷ হয় ওই মন্দির অব্দি বেঁচে থেকে পৌঁছোব, না হয় মরে পড়ে থাকব পথে-ঘাটে-প্রান্তরে৷ তার আগে একটা উইপোকার ঢিপি খুঁজতে হবে৷ বারবার কেন ঈশ্বর আমায় বাঁচিয়ে দিচ্ছেন, সেটাও বুঝতে পারছি না৷ ভগবান কি পাষাণ! না মরতে দেয়, না বাঁচতে দেয়৷

পাঁজর থেকে শুরু করে বুকের ছাতির ওপর জড়ানো সিন্থেটিক ব্যান্ডেজ৷ দু-দিন ছাড়া একটু একটু করে আরও টান দেওয়া হচ্ছে৷ ব্যথায়, যন্ত্রণায় আমি মুষড়ে পড়ছি৷ ড্রাইভার রমেশভাই বাড়ি ফিরে গেছে পরশু দিন, আমার এখনও সময় লাগবে৷ ওঁর পরিবারে আছে আমার চালচুলো-পরিবার... বাড়ন্ত৷ ছেলেবেলায় মা শিখিয়েছিলেন ‘নেই’ বলতে নেই৷

এখানে সরকারি হসপিটালে খাওয়াদাওয়া; নিরামিষ, আমিষ দু-রকম ব্যবস্থাই আছে৷ অড়হর ডালে মাঝেমধ্যে দেশি ঘিয়ের গন্ধ পাই৷

বৃদ্ধা একজন ক্রিশ্চান নার্সদিদির সঙ্গে বেশ আলাপ জমেছে৷ ‘হেনরি লতা’ নামের ভদ্রমহিলার বাপের বাড়ি কেরলের দিকে কোনও একটা গ্রামে৷ শ্রদ্ধেয়া লতা মঙ্গেশকরের মতো উনি দুটো বিনুনি করেন৷ গলায় ক্রস চিহ্নমার্কা লকেট সব সময় দেখতে পেলেও, কদাচিৎ হাতে জপের মালাও দেখতে পাই৷

পরবর্তীকালে জেনেছিলাম, উনি ভগবান যিশুর নামজপ করেন৷ কথাবার্তা শুনে মনে হয় বেশ পড়াশোনা-জানা মহিলা৷ মাঝেমধ্যে ইংরেজিতে আমায় কড়া ভাষায় শাসন করেন, পুরোটা স্পষ্ট বুঝতে পারি না, তবে আন্দাজ ঠিক করে নিই৷ আদর আর গালাগালের ভাষা সবাই বোঝে৷

ইতিমধ্যে আরও দশ দিন কেটেছে৷ মাথার ব্যান্ডেজ খুলে দেওয়া হয়েছে, সেখানে কাটা দাগ রয়ে গেছে, মুখ থেকে রক্তপাত বন্ধ হয়েছে অবশেষে৷ পাঁজরের ব্যান্ডেজ এবার টাইট করার বদলে ক্রমশ হালকা করা শুরু হয়েছে৷ ব্যথার উপশম কমাতে পেইনকিলারের জায়গায় এক ধরনের স্টিকার লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে৷ এগুলোর বেশ ভালো দাম, নিজের পয়সায় কিনতে হচ্ছে৷ সরকার আর কতই বা দেবেন!

আরও তিন দিন কেটেছে, অনেকদিন পর আজ উঠে দাঁড়িয়েছি৷ শরীর টলছে, মাথা ঘুরছে, ঘেঁটে-যাওয়া মানবজমিন সামলে উঠতে সময় লাগবে৷ লাগুক সময়, গোটা একটা জীবন পড়ে আছে৷ অবশ্য ব্যালান্স-শিটের কতটুকু ফাঁকা পড়ে আছে, কে-ই বা জানে!

লতাদিদির নিজস্ব জীবনদর্শন আছে, আর আছে একচিলতে সংসার৷ নিরুদ্দেশ হয়ে-যাওয়া স্বামী এবং বখাটে পুত্র; এই হল ওঁর চাষের জমি৷

আগামী দিন দুয়েকের মধ্যে আমাকে হয়তো এখান থেকে ছেড়ে দেবে, তারপর আরও কমপক্ষে দেড় মাসের বিশ্রাম প্রয়োজন৷ লতাদিদিকে জিজ্ঞেস করায় উনি বললেন, ‘কম পয়সায় বেশ কিছু থাকার জায়গা আছে এই কানপুর শহরে৷ আমার ঘরের লাগোয়া একটা এক কামরার ঘর খালি হয়েছে হালফিলে৷ সেখানে রান্নার ব্যবস্থাও আছে৷ যদি বলো, তাহলে কথা বলে দেখতে পারি৷’

‘কত ভাড়া?’

‘খাট-বিছানা সমেত হাজার তিনেক৷’

‘রাজি৷’

মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট হসপিটালের পিছনদিকের বস্তিতে থাকার জায়গা জুটেছে৷ মাথাপিছু পাঁচজনপ্রতি একটা করে বাথরুম৷ দিনপ্রতি একশো আশি টাকা দিলে তিন বেলার সাদামাটা খাবার পাওয়া যায়৷ জীবন আর তালশাস একই পরম বস্তু, বেখেয়ালে কামড়ালেই রস গড়িয়ে কাপড়েচোপড়ে করে দেবে৷ ভাবছি, মির্জা সাহেবের আশরফি শেষ পর্যন্ত বিক্রি না করতে হয়৷ যদিও ব্যাঙ্কের অবস্থা এখনও বেশ পোক্ত৷

দিন সাতেকের মাথায় লাঠি হাতে বাইরে ঘোরাফেরা শুরু করলাম৷ ভাগ্যিস বয়স কম, হাড়ের জোর বেশি৷ আরও দিন পনেরোর মধ্যে লাঠি ছাড়া হাঁটতে শুরু করেছি৷ মনের জোরের প্রধান উপকরণ হচ্ছে গীতা৷ আধ্যাত্মিক শক্তিকে মানসিক শক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারে এই ধর্মগ্রন্থ৷ প্রকৃত অর্থ বুঝে পড়লে আপনারা বুঝতে পারবেন, আমি মিথ্যে বলছি না৷

আজ লতাদিদির একমাত্র সন্তান লরেন্সের ত্রিশতম জন্মদিন৷ ছোটখাটো একটা আয়োজন করা হয়েছে, আমি আমন্ত্রিত৷ প্রাথমিক অনুষ্ঠান এবং কেক কাটা পর্ব শেষ হলে, লরেন্স তার বন্ধুদের নিয়ে পাশের ঘরে মচ্ছব লাগিয়েছে৷ খাওয়াদাওয়া সেরে বাকি লোকজন প্রায় সবাই চলে গেছেন৷ এখন রাত পৌনে বারোটা৷ আমি লতাদিদির গল্প শুনছি৷

কেরলের এক আদিবাসী হিন্দু মহিলা, এক খ্রিস্টান সাদা চামড়ার সাহেবের প্রেমে পড়েন৷ সেই প্রেম জানাজানি হয়ে গেলে তুমুল অশান্তি শুরু হয়, ভালোবাসাকে বাঁচাতে দু-জনে মিলে পালিয়ে আসেন দিল্লিতে৷

ততদিনে অবশ্য লতা মুন্ডালা ধর্ম পালটে হেনরি লতা নামে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন৷ ঘটনা এখান থেকে শুরু হতে পারত, তার জায়গায় যেটা ঘটল, সেটা ভীষণ মর্মান্তিক৷

দিল্লি স্টেশনে নেমেই লতাদিদি অচৈতন্য হয়ে পড়েন৷ প্রায় ছয় ঘণ্টা পর নিজেকে খুঁজে পান ডাস্টবিনের পাশে৷ বুঝতে পারেন, দুশো বছরের সাদা চামড়ার ভোগের উপাদানমাত্র তিনি৷

চোখের জল মুছে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘যে মানুষের ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে পরিবার ছেড়েছিলাম, সেই মানুষকে কুকুর বললে, ব্রহ্মার স্ত্রী-কে অপমান করা হয়৷ আমার ভালোবাসা তার চোখে ধরা পড়েনি৷ আমি তখন অন্তঃসত্ত্বা, কেরলে ফিরে যাওয়ার মতো মুখ নেই৷ একবার ভেবেছিলাম, শেষ করে দেব নিজেকে৷ আরেকবার ভেবেছিলাম, বিক্রি করব নিজেকে৷ বাকি সব মেয়ের মতো, ‘আয়না’ নামে আমার খুব কাছের একজন বন্ধু আছে... বুঝেছিলাম, এই কালো কুৎসিত চেহারা সহজে বিক্রি হবার নয়৷’

কিছু মানুষ নিঃশব্দে কাঁদতে পারেন, হেনরি-লতা এমনই একজন৷ প্লাস্টিকের জগ থেকে কিছুটা জল গলায় ঢেলে উনি বললেন, ‘নার্সিং-এর কাজ শিখেছিলাম, সেটাই কাজে লাগল৷ লরেন্স ওর বাবার গায়ের রং পেয়েছে৷ ওকে আমি ঠিকমতো মানুষ করে তুলতে পারিনি৷ তাতে আমার এতটুকু কোনও আক্ষেপ নেই, আমার কাজ আমি করেছি৷ সন্তান হিসেবে ও ব্যর্থ৷ রক্ত যাবে কোথায়?’

চোখের জল মুছে ভদ্রমহিলা চুপ করে বসে আছেন৷ কিছুটা সময়ের পর প্রসঙ্গ পালটাতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘সনাতন ধর্ম এবং খ্রিস্টধর্ম;দুটোই আপনি নিজের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করেছেন৷ যতদূর এই ক-দিনে আপনাকে চিনেছি, আধ্যাত্মিক বিষয়ে আপনার পড়াশোনা বেশ গভীর৷ কী মনে হয় আপনার, কোন ধর্ম বেশি উদার? কোন ধর্মের সামাজিক মূল্যবোধ বেশি? কোন ধর্ম প্রকৃত ভালোবাসার আধার?’

প্রশ্ন শুনে লতাদিদি চুপচাপ বসে আছেন৷ জপের মালা পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন৷ এদিক-ওদিক দেখে, গাউনের পকেট থেকে চাবি বের করে আলমারি খুলে দুটো পোস্টকার্ড সাইজের ল্যামিনেটেড ছবি বের করলেন৷ একটা ভগবান শ্রীকৃষ্ণর, অপরটি যিশুখ্রিস্টের৷ দুটো ছবিতেই চন্দনের ফোঁটা দেওয়া আছে৷ খুব যত্ন করে সাজানো প্রাণের দুই ঠাকুর৷ চরম বৈষম্যের মধ্যে একমাত্র ভালোবাসাই যেখানে শেষ ধর্ম৷

নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরে এসে লতাদিদি বলতে শুরু করলেন, ‘আমার বাবা নিজের হাতে ভগবান শ্রীকৃষ্ণর মূর্তি গড়তেন, আমরা সবাই পুষ্পাঞ্জলি দিতাম৷ আজও জন্মাষ্টমীর দিন এবং বড়োদিনের দিন আমি দু-জনকে একসঙ্গে পুষ্পাঞ্জলি দিই, মন্ত্র আমার নিজের৷ পৃথিবীর কোনও শক্তি আমার কাছ থেকে এই ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবে না৷ আমি দু-জনকেই ভালোবাসি৷ স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে এটুকু আমার অধিকার৷’

ভদ্রমহিলার গলা কাঁপছে৷ কিছুক্ষণ থেমে তিনি বললেন, ‘একশো কোটির গণতান্ত্রিক দেশে যদি নিজের মতো করে নিজের ধর্ম বেছে নিই তাহলে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়, থাকলেও আই ডোন্ট কেয়ার৷ কার্ল মার্কস থেকে শুরু করে স্বামী বিবেকানন্দ, সবাই আমার ভীষণ পছন্দের মানুষ৷’

চুপচাপ বসে আমি অবাক হয়ে শুনছি ওঁর কথা৷ ভদ্রমহিলা থেমে নেই, উনি বলে চলেছেন, ‘ভক্তিমার্গের প্রায় সব ধরনের দর্শনের বই আমি পড়ি৷ গীতা পড়ে আমার মনে হয়েছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন মহাজাগতিক শক্তির আকর, একই সঙ্গে তিনি মহাপ্রেমিক৷ ওঁর মতো অবতারের পক্ষেই সম্ভব রাসলীলা সম্পন্ন করা৷ শরীর ছাপিয়ে মন এবং মন ছাপিয়ে নিষ্কাম প্রেমে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই হল ভালোবাসা৷ ঠিক একই ভালোবাসার সন্ধান পেয়েছি প্রভু যিশুর জীবনে৷’

এই সময় ওঁর মোবাইলে একটা ফোন এল, কথাবার্তা শেষ করে উনি আবার বলতে শুরু করেছেন, ‘ধর্মান্ধ মানুষদের আত্মজ্ঞান উপলব্ধি করাতে আসা অবতারকে, কাঠের ফ্রেমে পেরেক দিয়ে গেঁথে ঝুলিয়ে রাখে অপদার্থ ভোগী মানুষ৷ ক্রুশবিদ্ধ রক্তাক্ত সাধক ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন, তাঁকে যারা বিদ্ধ করেছে, তাদের ক্ষমা করে দেওয়া হোক৷ কারণ, তাদেরও তিনি ভালোবাসেন৷’

সামনে বসা মানুষের চোখে জল৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘নিজের ব্যথা-যন্ত্রণা-লাঞ্ছনা সবকিছু ছাপিয়ে অপরকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই হল আধ্যাত্মিক শক্তি৷ অবতার ছাড়া ওইভাবে ক্ষমা করা সম্ভব নয়৷ মানুষের ভালোবাসা ভীষণ ঠুনকো, নিজের জীবন দিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি৷ নিষ্কাম ভালোবাসার অপর নাম শক্তি, তার থেকেও বেশি ক্ষমতার প্রয়োজন হয় বেইমানদের ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য৷’

চুপচাপ বসে আমি ভাবছি, ভেবেই চলেছি৷ গ্লুকোজের মতো জলে গুলে চামচে করে কাউকে ধর্ম খাইয়ে দেওয়া যায় না৷ যে মানুষের যেমন আধার, সে ঠিক তার নিজের মতো করে ধর্ম বেছে নেয়৷ এই স্বাধীনতাটুকু বোধহয় থাকা উচিত৷

একই মানুষ একই সঙ্গে একাধিক ধর্মপরায়ণ হতেই পারেন৷ যে মানুষ পয়গম্বর হজরত মহম্মদ, যিশুখ্রিস্ট, ভগবান শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ, গুরু নানককে একই সঙ্গে ভালোবাসতে পারেন; তিনিই বোধহয় প্রকৃত ধার্মিক৷

জীবনবাবু বলেন, ‘এই পৃথিবীর প্রতিটা ধর্ম শেষ পর্যন্ত আত্মজ্ঞান উপলব্ধির কথাই বলেছে৷ আত্মজ্ঞান আর ঈশ্বরদর্শনের মধ্যে কোনো তফাত নেই৷’

আমার চোখের দিকে তাকিয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘বর্তমান সময়ে আমার একটা কথা প্রায়ই মনে হয়, জিসাসকে ক্রুশিফায়েড না করা হলে, ধর্ম হিসেবে ক্রিশ্চিয়ানিটি এতটা ব্যাপ্তির জায়গায় আসতে পারত না৷ সবই তাঁর লীলা৷’

ঊনষাট বছরের মহিলা যে জ্ঞান দিলেন, তা আজীবন মনে থাকবে৷ একজন মানুষ হাজার প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও যদি নিজের ধর্মবিচার নিয়ে আনন্দে থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে, উনি ঠিক পথেই আছেন৷

আলোচনা এখন শেষ পর্বে, আক্ষেপের গলায় দিদি বললেন, ‘দুঃখ খালি একটাই, ছেলেটা মানুষ হল না৷’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘ছেলে কী করে?’

উত্তরে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘একটা গ্যারেজে কাজ করে, মোটামুটি ভালোই উপার্জন করে৷ ত্রিশ বছর বয়সে কমপক্ষে তিনজন মেয়ের প্রায় সর্বনাশ করে ফেলেছিল, আন্দাজ পেয়ে বাঁচিয়ে দিয়েছি৷ স্কাউন্ড্রেল বাপের চরিত্র পেয়েছে বোধহয়৷ ক্ষমা করতে করতে আমিও হাঁপিয়ে উঠেছি, একজন মা হয়ে অন্য মেয়েদের ওপর অত্যাচার সহ্য করব না৷ ওকে চূড়ান্ত সাবধান করা আছে, এরপর কোনও বেলেল্লাপনা করলে, জাস্ট কেটে দেব৷’

ভদ্রমহিলার চোখ দুটো জ্বলছে৷ মায়া, মমতা, ক্ষমা; সবকিছু ছাপিয়ে সেই চোখজোড়ায় এখন আগুনের প্রতিচ্ছবি৷ মিনিট দশেক চুপ থাকার পর উনি বললেন, ‘যদি কোনওদিন আমি আমার সন্তানকে মেরে দিই, বুঝবে সহ্যশক্তির ওটাই শেষ সীমানা৷ এ আমার পূর্বজন্মের কর্মফল, এ জন্মে তেমন কোনও পাপ কাজ করিনি৷ ভালোবাসার প্রতি আস্থা রেখে মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা যদি পাপ হয়, তাহলে আমি অবশ্যই পাপী৷’

গায়ের রং বা শারীরিক আকৃতি দিয়ে একজন মানুষের সৌন্দর্য কখনও মাপা যাবে না৷ আমার সামনে বসা প্রায় ষাট বছরের মানুষ ঘোর কৃষ্ণবর্ণা৷ অথচ, ওঁর দৃষ্টিভঙ্গি দধীচির হাড়ের মতো সাদা৷

নিজের ঘরে ফিরে এসে আজকের রাতে আর ঘুমোনো গেল না৷ দশ দিন হয়ে গেল আরও... লাঠি ছাড়া এখন দিব্যি হাঁটতে পারছি৷ নিয়মিত ফিজিয়োথেরাপি আর ব্যায়াম চলছে৷

সামনের সপ্তাহে মহালয়া৷ ওই দিনে মা ফলাহার খেতেন, আমিও তা-ই খেতাম৷ স্নান করে পেতে চুল আঁচড়ে মায়ের সামনে বাবু হয়ে বসতাম৷ একই বাটিতে ফলাহার মেখে মা নিজেও এক গ্রাস করে খেতেন, এক গ্রাস আমার মুখে ঠেসে দিতেন৷ এমনও দিন গেছে, মা নিজের খাবার আধপেটা খেয়ে বাকিটা আমায়...

সেইসব সোনায় বাঁধানো মুহৃর্ত আর ফিরে আসবে না৷ সমুদ্র ছাড়া কেউ কখনও কিছু ফিরিয়ে দিতে পারে না৷ মা আর সমুদ্রের মধ্যে তফাত নেই৷ দু-জনেরই সুবিশাল ব্যাপ্তি৷

দেখতে দেখতে আরও দিন দশেক কেটে গেল৷ আজ চতুর্থী, ভোর চারটের সময় উঠে হাঁটতে বেরিয়েছি৷ এই জায়গায় আরও অনেকে হাঁটতে আসেন৷ কানপুর ভীষণ ঘিঞ্জি শহর, তুলনামূলকভাবে এখানে বেশ কিছুটা ফাঁকা৷ লতাদিদির মাতৃস্নেহ আর নিজের শরীরের যত্নে আমি এখন প্রায় সুস্থ৷ সময় কাটছে, স্বপ্নে দেখা খরস্রোতা নদীর মতো৷

আজ ষষ্ঠী, প্রায় আধ কিলোমিটার একনাগাড়ে দৌড়েছি৷ এখন আমি পুরোটাই সুস্থ৷ এবার আমায় এখান থেকে পাততাড়ি গুটোতে হবে৷ ইতিমধ্যে আরও দিন দুয়েক লতাদিদির সঙ্গে আলোচনা হয়েছে৷ ভদ্রমহিলা চে সাহেবের ভীষণ ভক্ত৷ একজন মানুষের মধ্যে সর্বধর্ম এবং সর্বদর্শনের সমন্বয় খুব কম দেখা যায়৷

এদিকে বেশ কিছু দুর্গাপুজো হয়৷ গ্রামবাংলা থেকে ঢাকি এবং পুরোহিতের সমাগম ঘটে৷ ‘বারোয়ারি দুর্গাপূজা অনুষ্ঠান সমিতি’ নামে একটা ভালো পুজো হয়৷ সকালবেলা প্রতিমা দর্শন করে, বোধন দেখে, কলাবউ স্নান দেখে, প্যান্ডেলে বসে লুচি-আলুর দম খাচ্ছি৷ মাইকে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ চলছে৷ তবিয়ত খুশ৷

বছরে তিনদিন আমি গর্ভধারিণী মা-কে প্রণাম করতাম৷ আমার জন্মদিনের দিন, মায়ের জন্মদিনের দিন আর বিজয়াদশমীর দিন৷ আজ মায়ের জন্মদিন, বাইক কেনার জন্য এর থেকে ভালো দিন আর হয় না৷ নিজের মেহনতের জমানো পয়সায় লাল টুকটুকে একটা ইয়ামাহা কেনা হল আপনাদের সকলের আশীর্বাদে৷

দেড়শো সিসি মাখনের মতো ইঞ্জিন৷ বাইক কিনে সন্ধ্যা আরতির সময় ফিরে এসেছি মা দুর্গার কাছে৷ পুজো শেষে ঠাকুরমশাই বাইকপুজো করে দিলেন৷ ভদ্রলোকের নাম কল্যাণ চক্রবর্তী, থাকেন মেদিনীপুরের মহিষাদলের কাছে৷ অদ্ভুত এক সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি, নিজেকে মৃত্যুঞ্জয়ী মনে হয় মাঝেমধ্যে৷

একবুক আনন্দ নিয়ে ফিরে এসেছি নিজের বস্তিতে৷ লতাদিদি কিছুটা আগেই বাইরে থেকে ফিরেছেন৷ ওঁকে বসিয়ে এক লম্বা চক্কর কেটে দুর্গাপ্রতিমা দর্শন করিয়ে এনেছি৷ ভদ্রমহিলা ভীষণ খুশি হয়েছেন৷ রাতে খাওয়ার নেমন্তন্ন করলেন৷

নিজের ঘরে ফিরে এসে ব্যাগপত্র গোছানো শুরু করেছি৷ প্রায় আট সপ্তাহ হয়ে গেল, এখানে আছি৷ এবার আমায় এখান থেকে বেরোতে হবে৷ বিকেলের দিকে একবার ফটকাদাকে কলকাতায় ফোন করেছিলাম, জীবনবাবুর সঙ্গে কথা বলার দরকার ছিল৷ গত কয়েক মাসের সমস্ত ঘটনা শুনে ফোনের ওপার থেকে উত্তেজিত হয়ে উনি বললেন, ‘জ্জিও বেটা, এই না হলে জীবন! এবার তোর বেনারস যাওয়া উচিত৷ এই দেশের, পৃথিবীর এবং সনাতন ধর্মের প্রাচীনতম উপনিবেশে একবার অন্তত ঢুঁ মেরে আয়৷ তোর যা ঘটনার ঘনঘটা শুনলাম, তাতে মনে হচ্ছে, কাশি তোকে খালি হাতে ফেরাবে না৷ স্বপ্নের মন্দির দেখে, তবেই ফিরিস৷’

কর্তার ইচ্ছায় কর্ম৷ ঠিক করেছি, আগামিকাল ভোরবেলা এখান থেকে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়ব৷ শরীর ফিট, মন চাঙ্গা৷ গাড়ির ব্লু-বুক এলেই কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট ঠিকানায় কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দেবেন৷ হালফিলে একটা সরকারি অ্যাপ হয়েছে৷ সেটায় সবকিছু আপলোড থাকলে আর কোনও চিন্তা নেই৷

এখন রাত সাড়ে ন-টা, লতাদিদির ঘরে বাঁধাকপির তরকারি, তিনটে রুটি আর এক কাপ চা খেয়ে নিজের ঘরে ফিরে শোয়ার তোড়জোড় শুরু করেছি৷ কোথা থেকে যেন ঝগড়ার আওয়াজ আসছে! এমন সময় পাশের ঘর থেকে চিল চিৎকার শুনতে পেলাম৷ বেরিয়ে দেখি, প্রায় এক-দেড়শো মানুষ সেখানে ভিড় করে দাঁড়িয়ে আছে৷

একজন বৃদ্ধ মানুষ তাঁর মেয়েকে নিয়ে এসেছেন৷ মেয়েটির কোলে এক ফুটফুটে শিশু৷

বৃদ্ধের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই একরত্তি শিশু লতাদিদির ছেলের সন্তান৷ লরেন্স গোপনে বিয়ে করেছে বছর দুয়েক আগে ওই যুবতীকে৷ গত সাত দিন সে বেপাত্তা! খোঁজখবর করে তারা এই ঠিকানায় এসে উপস্থিত হয়েছে৷ যাকে নিয়ে এত ঘটনা, সেই লরেন্স, নেশা করে টিনের চালের ওপর হাফপ্যান্ট পরে দিব্যি ঘুমোচ্ছে৷

সবাই মিলে তাকে ধরে বেঁধে নামাল৷ লতাদিদি নিজের চটি খুলে তিন থাপ্পড় মারতেই ছেলে জ্ঞানে ফিরেছে৷ সে স্বীকার করে নিল, ওই সন্তানের জাগতিক পিতা স্বয়ং নিজে৷ ক্রমশ নাইট শো-এর সিনেমা শেষ, ভিড় পাতলা হল৷

লতাদিদির দু-কামরার ছোট্ট ঘরে ঠাঁই হল আরও আড়াইজনের৷ ঝামেলা মিটিয়ে নিজের বিছানায় এসে যখন শুয়েছি, তখন ঘড়িতে রাত সাড়ে বারোটা৷ ঘুম ভাঙল পরের দিন সকাল সাড়ে ন-টায়৷

বিদায় নেওয়ার জন্য এসে দাঁড়িয়েছি দিদির ঘরের দরজার সামনে৷ দরজা খুলতেই লতাদিদি মুখে আঙুল দিয়ে ইশারায় বোঝালেন, রাজকন্যা ঘুমিয়ে আছে৷ অবাক চোখে তাকিয়ে দেখছি, লতাদিদির মুখের সঙ্গে অনেকটা মিল৷ ঠাম্মার কোলে পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে একজন মিনিয়েচার নাতনি৷

বাচ্চাটিকে তার মায়ের কাছে জমা রেখে লতাদিদি বাইরে বেরিয়ে এলেন৷ ভদ্রমহিলার চোখে-মুখে পরম তৃপ্তির আভা দেখে মন খুশিতে ভরে উঠল৷ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করার পর, আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, হাতে তিনশো টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘বাবা বিশ্বনাথের কাছে আমার নাতনির নামে পুজো দিয়ে দিও৷’

বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক শেষ মুহৃর্তে আমি বললাম, ‘আজ আপনাকে দেখে সত্যিই খুব ভালো লাগছে৷’

একগাল হেসে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘দুটো কারণে আমি ভীষণ খুশি, প্রথমত; সন্তানকে উপযুক্তভাবে মানুষ করার জন্য ভগবান আমাকে দ্বিতীয়বার সুযোগ দিয়েছেন৷ দ্বিতীয়ত; বাচ্চাটার গায়ের রং আমার মতো৷ এ দেশের মানুষের চামড়ার রং কৃষ্ণবর্ণ, মনের রং ধবধবে ফরসা৷ ছেলের ওই ফ্যাটফেটে সাদা রং আমি ঘৃণা করি, কৃষ্ণকলিই আমার পছন্দ৷’

ঠাকুর বেড়াল পুষিয়ে সংসার করিয়ে নেয়, এ তো সাক্ষাৎ মা জননী৷ লতাদিদির দুঃখ এইবার ঘুচবে নিশ্চিত৷ জীবন তাকে সুযোগ দিয়েছে৷ মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম আবার৷

নতুন ইঞ্জিন, পুরাতন সওয়ারি, খেলা জমে গেছে৷ কলকাতার নেবুতলার বস্তির অভিজিৎ ওরফে পটা এখন বোহেমিয়ান৷ নিজের স্বপ্নের হিসাব মিটিয়ে তবেই সে ফিরবে, না হলে ফিরবে না, এতটুকু জেদ মনে পুষে না রাখতে পারলে... যাক গে৷

বাইক ছুটছে ন্যাশনাল হাইওয়ে দিয়ে৷ মাখনের মতো রাস্তা৷ রোদ, জল, ঝড়, বৃষ্টি সব মাথায় নিয়ে আমি এগিয়ে চলেছি এই পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন শহর বেনারসের দিকে৷ গুগল ম্যাপের ওপর ভরসা আর উড়নচণ্ডীর হাতে বাইক পড়লে যা হয় আর কী৷ অচেনা হাওয়া যখন বুকে ধাক্কা মারে, তখন মনে হয় আমিই আরব বেদুইন৷ জীবনে দু-তিনবার যখন মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছি, তখন মরার চিন্তা ছেড়ে দেওয়াই ভালো৷

রাস্তায় ধারে একটা হোটেলে দাঁড়িয়ে চা আর নানখাটাই খেতে খেতে ভাবছি, কার নামে পুজো দেব! লতাদিদির উপাধি হেনরি, লরেন্স যাকে বিয়ে করেছে, তার নাম শমা হামিদ৷

চা-বিস্কুট খেয়ে, সিগারেট ফুঁকে আমি আবার দৌড় শুরু করেছি৷ মনে মনে লতাদিদির নাতনির একটা নাম ঠিক করে ফেলেছি৷

নাম সর্বজয়া৷ গোত্র ভরদ্বাজ৷

আমার উপাধি আর গোত্র দুটোই ওকে উপহার দিলাম৷

১৪

এখন মাঝরাত, এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে রাস্তার একদম বামদিক ঘেঁষে খুব সাবধানে বাইক চালাচ্ছি৷ দুপুরে যেখানে ভাত, ডাল, ছোলার তরকারি খেয়েছিলাম, সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷ বৃষ্টির ঝাপটায় ঘুম ভাঙল রাত ন-টায়৷ বাইকের সঙ্গে একটা রেইনকোট আর হেলমেট ফ্রি দিয়েছিল৷

কতদূর এসেছি, ঠিক জানি না, মোবাইলের ম্যাপে রাস্তা দেখাচ্ছে এখনও ঘণ্টা তিনেক৷ এই বৃষ্টিতে চালানো অসম্ভব, রাস্তাঘাট প্রায় শুনশান৷ লরি ছাড়া অন্য কোনও যানবাহন তেমন চলছে না৷ এই আবহাওয়ায় বাইকের গতি বাড়ানো যায় না৷ প্লাস্টিক প্যাকেটের ভিতর থেকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, মোবাইল ঘড়িতে সময় রাত সাড়ে বারোটা৷ বৃষ্টির প্রকোপ বাড়ছে৷

টিনের ছাউনি-দেওয়া একটা শেডের নীচে এসে কোনওরকমে আশ্রয় নিয়েছি৷ খুব সম্ভবত এটা চায়ের দোকান৷ পাশে থাকা মাটির উনুন এখনও তেতে আছে৷ রেইনকোট খুলে মাটির দাওয়ায় আরামসে বসেছি৷

এই সময় এক কাপ চা হলে মন্দ হত না৷ চা জুটল না, পরিবর্তে বৃষ্টি কিছুটা কমল৷ ক্রমশ কমতে-থাকা বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে আরও একটা শব্দ কানে আসছে৷ অমন শব্দ এর আগে শুনিনি৷ মোবাইলের আলো জ্বেলে শব্দের উৎস খুঁজে পাশের বট গাছের পিছনের দিকে চোখ আটকে গেল৷

দুটো বিষধর সাপের মধ্যে জোড় লেগেছে৷ একে অপরকে পেঁচিয়ে ধরেছে ভালোবাসার তাড়নায়৷ চরম কামনায় নাগপাশে বন্দি দুই প্রাণী৷ মোবাইলের টর্চের আলো বন্ধ করে চোখ সরিয়ে নিলাম৷ রতিক্রিয়া অবস্থায় কোনও প্রাণীকেই বিরক্ত করা উচিত নয়৷

বৃষ্টি বন্ধ হয়েছে৷ হাতের সিগারেট শেষ করে রেইনকোট গুটিয়ে আবার দৌড় শুরু, তিনটে ঘণ্টা নষ্ট হল৷

আরও টানা ঘণ্টাখানেক বাইক চালানোর পর এক প্রকাণ্ড বট গাছ দেখতে পাচ্ছি৷ মানুষের ভিড় বাড়ছে ক্রমশ, ভোরের আলো ফুটছে৷ একজন দোকানি জ্বলন্ত স্টোভ সমেত ফুটন্ত চা নিয়ে ছাতা মাথায় হাঁটছেন৷ টিপটিপ বৃষ্টি এবং পরপর দু-কাপ চা খেয়ে আবার দৌড় শুরু৷

সকালের আলো ফুটছে, সময় ভোর পাঁচটা৷ হাইওয়ের ধারের এক গ্রাম্য রাস্তার মুখে বেশ ভিড় জমেছে৷ বাঁদিকে ক্রমশ সরু হয়ে-যাওয়া মেঠোরাস্তা ধরে লম্বা এক হাট বসেছে৷ বাইক দাঁড় করে নেমে পড়লাম হাট দেখতে৷ খুশির ঠিকানা নেই৷ গতীয়মান জীবনের একটা আলাদা স্রোত আছে, ক্রমশ সেটা রক্তে মিশে মানুষের স্বভাবচরিত্র পালটে দেয়৷ এদিকে বৃষ্টি হয়নি! ছেলেপুলেরা দিব্যি খোলা মাঠে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে৷

কী নেই এই হাটে! পশমের চাদর, রেশমি চুড়ি, মাথার পাগড়ি, পুজোর সামগ্রী, শাকসবজি, ফার্নিচার, সাইকেল, বই, গবাদি পশু, মেহেন্দির হরেকরকম ছাপ, পাঁপড়, চা-পাতা, চাদর, মশারি, পায়জামার দড়ি, নানান ধরনের ভাজাভুজি ও মিষ্টান্ন এবং হাটের একদম শেষে একদল মাদারি খেলা দেখানোর তোড়জোড় শুরু করেছে৷ যেন মেলা বসে গেছে৷

সরু মেঠোরাস্তার দু-পাশে দু-জন মানুষ মিষ্টি বিক্রি করছেন, ভিড় জমে আছে৷ একজন তৈরি করছেন ‘জলেবি’, অপরজন হাতের তালুর সাইজের ‘জলেবা’ বিক্রি করছেন, সঙ্গে দই৷

মেঠোরাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছি৷ একজন দোকানির ডালায় লেখা আছে, ‘মার ডালা!’ খোঁজখবর করে বুঝলাম, ইঁদুর মারার বিষ বিক্রি হচ্ছে৷

একটা ফাঁকা মাঠে মানুষজন গোল করে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন৷ শহরে যে সাধারণ ‘মাদারি কা খেল’ দেখা যায়, এটা তার থেকে অনেক উন্নত৷ কুকুর, বাঁদর, ভল্লুক, সাপ;সবাই পারফর্মার৷ অপর প্রান্তে এক মধ্যবয়স্ক মানুষ হাতসাফাইয়ের খেলা দেখাচ্ছেন! নিখুঁত কারিগরি৷ বড়ো স্টেজ নেই, চোখ-ধাঁধানো আলো নেই, বাদ্যযন্ত্র নেই৷ যেটা দেখছি, সেটাকে পরিষ্কার ইন্দ্রজাল বলে৷ ভদ্রলোক চ্যালেঞ্জ করে যেকোনও মানুষকে চোখের সামনে ডেকে বশ করে ফেলছেন৷

প্রায় ঘণ্টাখানেক সেখানে দাঁড়ানোর পর খেলা শেষ হলে, আলাপ হল সুরাজ কুমারের সঙ্গে৷ আসল নাম জন্মেজয় ত্রিপাঠী৷ নিবাস অযোধ্যায়, বয়স সাতান্ন, একমাত্র কন্যা ব্যাঙ্গালোরে চাকরিরতা৷ মাস তিনেক হল, স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে৷

চায়ের পর সিগারেট অফার করে ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এই যে আপনি ম্যাজিকের খেলা দেখান, এতেই সংসার চলে? নাকি এটা স্রেফ শখ?’

ভদ্রলোক হাসলেন কিছুক্ষণ, তারপর বললেন, ‘ধনসম্পত্তি আমাদের পূর্বপুরুষ যা গচ্ছিত রেখে গেছেন, তাতে কাজ না করলেও চলে যায়৷ রাস্তায় দাঁড়িয়ে ম্যাজিকের দেখাই কয়েক পুরুষের একটা অভিশাপ খণ্ডন করতে৷’

‘কীরকম?’

আধ ঘণ্টার মধ্যে আলাপ জমে ক্ষীর৷ পাতার তৈরি থালায় বাড়ি থেকে বয়ে-আনা রুটি, ঢ্যাঁড়শের শুকনো ভাজি, আমলকীর চাটনি আর ছোট্ট একটা বাটিতে একটু রাবড়ি দিলেন ভদ্রলোক৷ খাবারের ব্যাপারে বেশি বিনয় করতে নেই, সবকিছু সাবড়ে দিতে মিনিট দশেকের বেশি লাগল না৷ অমন রাবড়ি আমি কোনওদিনও খাইনি, আজীবন মুখে লেগে থাকবে৷

ভোজন পর্বের শেষে ভদ্রলোক বললেন, ‘ঘটনা আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগের৷ ‘ম্যাজিক’ শব্দটা তখনও এ দেশে প্রচলিত হয়নি৷ একজন জাদুকরকে সম্পূর্ণরূপে নিজের বিদ্যা এবং সাধনার ওপর ভরসা রাখতে হত৷ সেই বিদ্যা অর্জনের গোটাকয়েক ঘাঁটি ছিল, প্রচ্ছন্নভাবে এখনও কিছু টিকে আছে৷ পূর্ব ভারতের তারাপীঠ, কামাখ্যার মায়ং এবং উত্তর ভারতের নৈমিষারণ্য৷ ওইদিকে বালুচিস্তান, গান্ধার, মুলতান এবং হিমালয়ের বিভিন্ন জায়গায় বশীকরণ, সম্মোহন, ইন্দ্রজাল এবং আরও কিছু বিদ্যা শেখানো হত৷ একজন ম্যাজিশিয়ানকে যোগ, প্রেতবিদ্যা এবং হাত সাফাইয়ের কাজ একসঙ্গে শিখতে হত, তন্ত্রের কিছু শ্বাসক্রিয়া এবং সামুদ্রিক ক্রিয়া নিয়মিত অভ্যাস করতে হত৷ এখনকার ম্যাজিক বেশির ভাগই যন্ত্রনির্ভর, তখন সে উপায় ছিল না৷’

সাময়িক বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক আবার বলতে শুরু করেছেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষরা থাকতেন মুলতানে৷ প্রাচীন যে সূর্য মন্দির ছিল, সেখানে বংশানুক্রমে পূজারি ছিলেন পূর্বপুরুষগণ৷ সম্রাট আলেকজান্ডার মুলতান জয় করেছিলেন৷ তিনি ফিরে গেলেও বেশির ভাগ সৈন্য থেকে যান বলেই শুনেছি৷ পাঁচ-সাতশো বছর আগে মুলতান ছিল তন্ত্র ও প্রেতবিদ্যার অন্যতম ঘাঁটি৷ পূর্বপুরুষগণ প্রেতবিদ্যায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন৷’

অবাক হয়ে যাওয়ার মতো কথা বলছেন ভদ্রলোক! সবকিছু শুনে আমি প্রশ্ন করলাম, ‘প্রেতবিদ্যা শেখার প্রয়োজন হত কেন?’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘সেই সময় ভারতবর্ষের সেই প্রান্তরে ম্যাজিশিয়ানরা ভূত ছাড়ানোর কাজও করতেন৷ পরে অবশ্য এই ডিপার্টমেন্ট সম্পূর্ণ অন্য একদল মানুষের হাতে চলে যায়, তাঁরা এটাকে নিয়ে ব্যবসা এবং কুসংস্কার শুরু করেন৷ কিছু অপদার্থ ভ্রষ্ট তান্ত্রিক দু-পয়সা আয়ের রাস্তা করে নেন৷ এই বিদ্যা অত সোজা নয়, পিতৃদোষ কাটানো মুখের ব্যাপার নয়৷ আমাদের এক পূর্বপুরুষ এই কাজ করে দু-নম্বরি অর্থ উপার্জন করতে যান এবং এক বিধবার অভিশাপ গ্রহণ করেন৷ বংশপরম্পরায় অভিশাপবহনকারী আমিই শেষ পুরুষ৷ বাধ্য হয়ে এই পেশায় আছি৷ আপনাদের বাংলায় ‘শাপমোচন’ বলে একটা বিখ্যাত সিনেমা আছে, অনেকটা তেমনই আমাদের বংশের ইতিহাস৷ আমার মা বাঙালি ছিলেন, বীরভূমের মামার বাড়িতে আমি বেশ কয়েকবার গিয়েছি৷’

ভদ্রলোক থেমে গেছেন৷ এক কাপ চা ওঁর হাতে এগিয়ে দিয়ে আমি বললাম, ‘অভিশাপের ঘটনা কীরকম?’

‘কী হবে এসব শুনে?’

‘ধরে নিন, উপন্যাস লিখব৷’

একগাল হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘নামধাম পালটে দেবেন অবশ্যই৷’

ঘাড় নেড়ে ওঁর কথায় সায় দিতেই ত্রিপাঠীজি বললেন, ‘আগেই বলেছি, আমরা প্রধানত গান্ধার এবং মুলতান হয়ে এ দেশে এসেছি৷ পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতানে সুফি দরবেশদের রমরমার আগে, প্রথমদিকে সনাতন রাজা এবং পরবর্তী সময়ে শিখদের দাপট ছিল৷ ওদের রাজসভায় বাজিকর খেলা দেখাতেন৷ তান্ত্রিকদের একটা সম্প্রদায় এই সময় বিভিন্ন অলৌকিক ক্রিয়া মানুষের সামনে দেখিয়ে মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করলেন৷ তন্ত্রবিদ্যা শুধুমাত্র ভারতবর্ষেই অবস্থিত ছিল না, সনাতন এই বিদ্যার শেকড় ভারতবর্ষে থাকলেও... আজও সারা বিশ্বে কম-বেশি এর প্রভাব বিস্তৃত৷ আপনি হয়তো শুনলে অবাক হবেন ভাই, স্বয়ং চেঙ্গিস খান ভগবান শিবকে মানতেন!’

চমকে উঠেছি৷ এসব তথ্য কতটা সত্যি, মা গঙ্গাই জানেন৷ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘মঙ্গোলিয়ায় যতগুলো প্রাচীন মকবরা আছে, বেশির ভাগ মকবরার মাথায় এবং বাইরের দিকে ত্রিশূল পোঁতা আছে৷ আমাদের সগোত্রীয় একজন মহারাষ্ট্রের জাদুকর স্বচক্ষে নিজের পয়সা খরচা করে মঙ্গোলিয়ায় গিয়ে সেসব দেখে এসেছে৷ পরবর্তীকালে খোঁজখবর করে জেনেছিলাম, মঙ্গোলিয়ায় সেই সময় তেন্দ্রিং ধর্মের প্রচলন ছিল৷ তেন্দ্রিং আর কিছুই নয়, তন্ত্রের আদিরূপ৷ এর উপাস্য দেবতা স্বয়ং মহাদেব, তাই ত্রিশূলের পূজা করা হত৷ যদিও এসব ব্যাখ্যা আমার বাপ-ঠাকুরদার কাছ থেকে শোনা, সত্যতা বিচার করতে পারব না৷ তবে, ওঁরা দু-জনে ভুল বলার মানুষ নন৷’

ভদ্রলোক থেমেছেন৷ হাতে জমে-থাকা সিগারেটের ছাই ফেলে একটা লম্বা টান দিয়ে বললেন, ‘বাবা পণ্ডিত মানুষ ছিলেন৷ ছেলেবেলায় কামাখ্যা দর্শন করতে গিয়ে উনি মায়ং জেলায় নিজের গুরুমা খুঁজে পান এবং তন্ত্রবিদ্যা শেখেন৷ বাবার মুখে আরও একটা খবর শুনেছি, বাংলার বিখ্যাত জাদুকর মিস্টার সরকার জাদুবিদ্যা শিখেছেন মায়ং থেকেই৷ উনি নিজেও নিয়মিত হঠযোগ প্যাকটিস করতেন৷ সবই বাবার মুখে শোনা, সত্যতা বিচার করার প্রশ্নই ওঠে না৷’

কিছুটা বিরতি নিয়ে হাতের বাকি সিগারেট শেষ করে ভদ্রলোক বললেন, ‘কামাখ্যা সমেত আশপাশের বেশ কিছু জায়গা তন্ত্রসাধক-সাধিকাদের উর্বর জমি৷ মারণ, উচাটন, বশীকরণ... এসবের তীর্থক্ষেত্র মায়ং৷ কঠিন রোগ নিরাময় এবং বশীকরণে এদের জুড়ি মেলা ভার৷ প্রকৃত গুণী মানুষের দেখা পাওয়াই দুষ্কর, সহজে ওঁরা জনসমক্ষে আসেন না৷ এলেও অতি সাধারণ অবস্থাতেই থাকেন৷’

মিনিট পাঁচেকের একটা বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক আবার বললেন, ‘বহু প্রাচীন এক কুম্ভমেলায় আমাদের পূর্বপুরুষ জাদুবিদ্যার প্রদর্শনী করছিলেন৷ বলতে দ্বিধা নেই, ভদ্রলোক কিছুটা লোভী প্রকৃতির ছিলেন নিশ্চয়ই৷ এক বিধবা তীর্থযাত্রীকে তিনি সম্মোহন করেন এবং পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরপ্রদেশের যাবতীয় সম্পত্তি হস্তগত করেন৷ মৃত্যুকালীন অবস্থায় সেই বিধবা মণিকর্ণিকা ঘাটের মাটি স্পর্শ করে অভিশাপ দেন, যতদিন এই বংশে পরবর্তী প্রজন্ম পুরুষ জন্মাবে, তাদের সবাইকে রাস্তায় খেলা দেখিয়ে একপ্রকার ভিক্ষা করে খেতে হবে৷ যে এই নিয়ম মানবে না, তার অকালমৃত্যু হবে৷’

হাতের জ্বলন্ত সিগারেট ফেলে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘নিয়ম না-মানার জন্য আমার বড়োদাদু, দুই কাকা এবং আমার এক ভাই অল্প বয়সে অপঘাতে মারা যান৷ আমাকে জোর করে, ধরে-বেঁধে, পিটিয়ে জাদুবিদ্যা শেখানো হয়েছে৷ এই কাজ করার আমার এতটুক ইচ্ছা ছিল না৷ এখন খারাপ লাগে, এই বিদ্যার এখানেই শেষ; এই ভেবে৷’

‘অপর কাউকে এটা শেখানো যায় না?’

‘না, মানুষের ক্ষতি করে দিতে পারে সে৷ কিছু বিদ্যা নষ্ট হয়ে যাওয়াই ভালো৷’

ভদ্রলোক মাথা নিচু করে মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন৷ কিছুক্ষণ পর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমার একটিমাত্র কন্যাসন্তান৷ কয়েকশো বছর আগে পাওয়া অভিশাপ এবং এই জাদুবিদ্যার এখানেই ইতি ঘটবে৷ এই ঘটনা বাইরের লোক খুব একটা কেউ জানেন না৷ অবুঝের মতো আপনাকে সব কথা খুলে কেন বললাম, সেটাও বুঝতে পারছি না৷’

দু-পা পিছিয়ে আমাকে ভালো করে আপাদমস্তক জরিপ করে কিছুক্ষণ সময় নিয়ে ম্যাজিশিয়ান ভদ্রলোক বললেন, ‘এমন কোনও বস্তু আপনার সঙ্গে আছে, যা আমায় ভীষণভাবে আকৃষ্ট করছে৷ আমি যদি খুব ভুল না হই, আপনার রাশি কুম্ভ এবং পিতৃপুরুষের দোষে ভুগছেন৷ এর সমস্যার সমাধান আমার কাছে নেই, কিছুটা দূরে এগিয়ে গেলে একজন প্রায় অন্ধ ভিক্ষু সন্ন্যাসী দেখতে পাবেন৷ তিনি ভীষণ গুণী মানুষ৷ যাওয়ার আগে একবার দর্শন করে যান৷’

আমার সঙ্গে কথা বলা হয়ে গেলে ভদ্রলোক নির্দিষ্ট জায়গায় এগিয়ে গেলেন৷ সাময়িক বিরতির পর আবার শুরু হল অদ্ভুত ধরনের জাদু খেলা৷

এ দেশের কোনও এক প্রত্যন্ত গ্রামের হাটে অদূর ভবিষ্যতে হয়তো এই খেলা আরও কিছুদিন দেখা যাবে, তারপর আর দেখা যাবে না৷ একটা প্রজন্ম শেষ, একটা বিদ্যার সমাপ্তি এবং একটা অভিশাপের খণ্ডন৷ জীবনের ইতিহাস এইভাবেই সৃষ্টি হয়, এইভাবেই বিলুপ্ত হয়৷ সাধারণ মানুষের কোনও ইতিহাস লেখা হয় না, সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার ইতিহাস অবশ্যই লিপিবদ্ধ করা উচিত৷

আরও আধ ঘণ্টামতো খেলা দেখে হাতে সিগারেট নিয়ে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে গেলাম হাটের একদম শেষ প্রান্তে৷ একজন অতিবৃদ্ধ মানুষ ঝিম মেরে বসে আছেন৷ ভদ্রলোকের পায়ের নখ বেশ বড়ো৷ নাভি অবধি দাড়ি, সাদা চোখ, মাথায় পাগড়ির আড়ালে লুকিয়ে-থাকা জটাধারী কেশ এবং শরীর ভরতি কুঁচকে-যাওয়া তামাটে চামড়া৷ পরনে কালো কৌপীন৷ শরীর জুড়ে উলকি আঁকা রয়েছে৷

খোঁজখবর নিয়ে জানলাম ভদ্রলোকের নাম কালীনাথবাবা৷ ওঁর কথাই বলেছিলেন জাদুকর সাহেব৷

স্থানীয় মানুষজন জানালেন ওই মানুষের বয়সের গাছপাথর নেই৷ চোখে প্রায় দেখতেই পান না৷ নিজের হাত, সামনে বসা মানুষের কপালে এবং হাতে বুলিয়ে নির্ভুল গণনা এবং ভাগ্য বাতলে দিতে পারতেন একসময়৷ এখন সেই বোধ এবং বুদ্ধি দুটোই হারিয়েছেন বয়সের দোষে৷ শ্রবণশক্তি ভীষণ আবছা হলেও এখনও টিকে আছে কোনওরকম৷ কানে না-শোনার কারণেই হয়তো কথা খুব কম বলেন আজকাল৷

মাসে একদিনের এই রবিবারের হাটে, পুরোনো অভ্যাসমতো উনি ঠিক এসে হাজিরা দেন রাস্তা চিনে৷ সারাদিন ধরে চা-বিস্কুট খান এবং বিকেল পাঁচটায় উঠে উলটোদিকের জঙ্গলে মিলিয়ে যান৷ ভদ্রলোকের আসল বাস কোথায়, কেউ জানে না৷

আখের রস তৈরি করা একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক জানালেন, ওই বৃদ্ধ সাধুবাবাকে মাঝেমধ্যে নৈমিষারণ্যের শ্মশানের আশপাশে এবং হনুমানগড়ি এলাকায় ঘুরঘুর করতে দেখা যায়৷ এতটা রাস্তা কীভাবে উনি যান, সেটা গবেষণার বিষয়৷

হাতের সিগারেট ফেলে কিছুটা কাছে গিয়ে ওঁর সামনে মাটিতে ধপ করে বসে পড়েছি৷ ভদ্রলোকের কোনও হেলদোল নেই৷ আমি খুঁটিয়ে লক্ষ করছিলাম ওই মানুষকে৷ দক্ষিণ কানে পরপর তিনটে ফুটো, তাতে সোনা, রুপো এবং লোহা ধারণ করা আছে৷ বসে-থাকা অবস্থায় নিজের শরীর আরও খানিকটা ঝুঁকিয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছি ওঁকে৷

কিছু সময়ের পর বৃদ্ধ সন্ন্যাসী নিজের নাক সমেত মুখমণ্ডল আমার কাছে এগিয়ে এলেন, কিছুক্ষণ শুঁকে কয়েক সেকেন্ডের বিরতিতে পুনরায় নিজের জায়গায় ফিরে হেসে বললেন, ‘সবাই মির্জা সাহেবের দেখা পায় না৷ যারা পায়, তারা ভাগ্যবান৷ উনি নিজে দেখা না দিলে দেখা পাওয়া অসম্ভব৷’

হাতের ইশারায় আমায় কাছে ডাকলেন উনি৷ কিছুটা এগিয়ে গেলাম৷ নিজের শুকনো আঙুলগুলো একে একে আমার কপালে এবং ডান হাতের চেটোয় চালনা করতে থাকলেন অনবরত৷

প্রায় মিনিট পাঁচেক পর বললেন, ‘অধরা স্বপ্ন একবার নিশ্চিত ধরা দেবে, তখন তুমি রাজা হবে৷ শরীর থেকে যে চন্দনের গন্ধ বের হচ্ছে, সেটা মির্জা সাহেবের আশীর্বাদ ছাড়া অন্য কিছু নয়৷ আমার বেদম খিদে পেয়েছে, কিছু টাকা দেবে?’

কাঁপতে-থাকা দুটো হাত আমার সামনে সাহায্য চাইছে৷ ভদ্রলোক কাঁপা গলায় বললেন, ‘একসময় মানুষের নির্ভুল ভাগ্য বাতলে দিতাম, বদলে মানুষ দুটো পয়সা বা খাবার দিত৷ এখন বয়সের ভারে আর চোখে দেখি না, তাই মানুষ অবিশ্বাস করে৷ মূর্খ মানুষ এটা বোঝে না, কপাল এবং হাতের রেখা না দেখে স্রেফ স্পর্শ করেই বোঝা যায়৷ আমার গুরুর আদেশ ছিল, আজীবন মাধুকরী করে খেতে হবে, সেটাই মেনে চলেছি আজও৷ জ্যোতিষচর্চার একটা দোকান খুলে বসলে যা অর্থ আয় হত, একটা রাজপ্রাসাদ বানাতে পারতাম৷ গুরুর কথা খণ্ডন করার মতো ক্ষমতা আমার নেই৷ আমি জানি, খুব সম্ভবত আগামী তিন বছর পর মাঘী পূর্ণিমার দিন আমার মৃত্যু হবে, নৈমিষারণ্যের অদূরে দধীচি কুণ্ডের কাছে৷’

কালীনাথবাবার বক্তব্য বুঝতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে৷ ভীষণ জড়ানো কথা৷ আমার সামনে পেতে-রাখা কম্পনরত হাত দুটো স্থান পরিবর্তন করেছে, সেগুলো আবার আমার কপাল ছুঁয়েছে৷ ভীষণ খড়খড়ে হাত৷ কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ‘কপাল আর হাতের রেখা স্পর্শ করে আমি মানুষের মনের ভাষা বুঝতে পারি, তাদের দেখা স্বপ্নের ভাষা বুঝতে পারি৷ যে স্বপ্ন বারে বারে এসে মানুষের ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, সেই স্বপ্ন বাস্তবিক জীবনে ঘটে থাকে৷’

ভদ্রলোকের ঘনঘন দীর্ঘশ্বাস পড়ছে৷ পাশে পড়ে-থাকা ধুলো-মাখা প্লাস্টিকের বোতল থেকে এক ঢোঁক জল খেয়ে বললেন, ‘কোনও অবিবাহিত যুবতী যদি স্বপ্নে দ্যাখে তার প্রেমিক জেলখানায় বন্দি, তখন সেই প্রেমিকের দূরে কোথাও চলে যাওয়ার ইঙ্গিত বহন করে৷ স্বপ্নে যদি কোনও যুবক বা যুবতী বড়ো কোনও ছুরি বা চাকু দেখে থাকেন তাহলে বুঝতে হবে, তাঁদের প্রেমের সম্পর্ক আগামী দিনে কাটতে চলেছে৷ স্বপ্নে যদি কোনও মানুষ নিজের কবর দেখেন, তাহলে তাঁর জীবন নিরাশাময় হবে৷ যদি কোনও বিবাহিত স্ত্রী স্বপ্নে কালো রঙের ঘোড়া দেখে থাকেন, তখন বুঝতে হবে ওঁর স্বামী অপর কোনও স্ত্রী-র প্রতি আসক্ত৷ এবারে আসি তোমার পালায়, হিমালয়ের বরফের দেশে কোনও প্রাচীন মন্দিরে পুরোহিতের পিঠের অংশ দেখলে বুঝতে হবে সেই পুরোহিত তুমি স্বয়ং৷ সেই মন্দিরে তোমার নিশ্চয়ই কিছু বাকি রয়ে গেছে৷ কিছু বস্তু, ধাতু, মানুষ অথবা অপার্থিব কিছু প্রাপ্তি কপালে আছেই৷ সেই মন্দির অব্দি ভাই তোমাকে পৌঁছোতে হবে৷ রাস্তা তুমি ঠিক পেয়ে যাবে, এখান থেকে সোজা বেনারস যাচ্ছ তো?’

‘হ্যাঁ৷’

‘এই বছর দুর্গা একাদশী পড়েছে শনিবার৷ ওই দিন রাত বারোটায় রাজা হরিশ্চন্দ্র ঘাটে এবং একই অঘোরী রবিবার সন্ধ্যায় মণিকর্ণিকা ঘাটে উপস্থিত থাকবেন৷ অতিবৃদ্ধ এবং জ্ঞানী অঘোরী তিনি৷ ওঁর মতো স্বপ্ন বিশ্লেষণ কারও পক্ষে সম্ভব নয়৷ ওই মানুষের ডান হাতের কড়ে আঙুল নেই৷ তিনি মহাপণ্ডিত এবং সিদ্ধান্তী৷ ওঁর কোনও নির্দিষ্ট নাম নেই, তোমার স্বপ্নের উদ্ধার উনিই করবেন বলে আশা রাখি৷’

‘আপনি আমার কপাল স্পর্শ করে এতগুলো কথা বললেন কীভাবে৷’

আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ভদ্রলোক নিজের মর্জিমতো বলতে শুরু করলেন, ‘কিছু কিছু মানুষের জীবনে অদ্ভুত পরিবর্তন আসে, তুমি সেরকম একজন৷ কপালের মধ্যভাগে চক্র রয়েছে, কপালের ওপরের দিকে ঢাল রয়েছে, সচ্চরিত্রের ইঙ্গিত সুস্পষ্ট৷ আমি হলফ করে বলতে পারি, ভীষণ পরিশ্রমের জীবন তোমার৷ চোখে না দেখেও বলতে পারি তুমি মাতৃমুখী, পিতৃবংশে গুরুমুখী তন্ত্রবিদ্যার চল আছে৷ এই অল্প বয়সে হয়তো তোমার ক্ষণিকের জন্য হলেও মৃত্যু অভিজ্ঞতা হয়েছে৷ আমি ভুল বললে শুধরে দিও৷’

চমকে উঠেছি৷ ভদ্রলোকের কাঁপতে-থাকা হাত দুটো আবার সামনে এগিয়ে এসেছে৷ পরিষ্কার কানে শুনতে পাচ্ছি, ‘দুটো পয়সা দিয়ে যাও, আমি ক্ষুধার্ত৷’

পকেট থেকে পাঁচশো টাকা বের করে ওঁর হাতে দিলাম, নোটের ওপর হাত বুলিয়ে বললেন, ‘আমার জন্য পঞ্চাশ টাকাই যথেষ্ট, একটা দিন খুব আনন্দের সঙ্গে কেটে যায়৷ গুরুজি বলে গিয়েছিলেন রোজ ভিক্ষা করতে৷ যে মানুষ অর্থ সঞ্চয় করে সে আর যা-ই হোক, সন্ন্যাসী হতে পারেন না৷ এই শরীর থাকতে গুরুজির কথার নড়চড় হবে না৷ আগামী জন্মে আমি সন্ন্যাসী রাজা হব৷ তুমি এ জন্মেই মহারাজা হবে৷ জয় অঘোরনাথ৷’

পাঁচশো টাকা পকেটে ফিরিয়ে নিয়ে, পাঁচটা দশ টাকা দিলাম৷ একটা গোটা দিন চলে গেল৷ ক্রমশ একটা জিনিস বুঝতে পারছি, সংসারধর্ম হয়তো আমার জন্য নয়৷ সন্ন্যাসী হওয়ার মতো শক্তি আমার নেই৷ বাকিটা জীবন বোহেমিয়ানের মতো ঘুরে বেড়াব৷ সাধুসঙ্গ করে এত তৃপ্তি, আগে জানতাম না৷ ভাগ্যিস বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম৷

বৃষ্টিতে ভিজে বাইকটা ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে গেছে৷ অদ্ভুত কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে গাড়ি স্টার্ট করে আবার দৌড় শুরু করেছি৷ বৃষ্টিস্নাত হাওয়া বুকে এসে ধাক্কা মারছে৷ ঘণ্টাখানেক হল, টানা বাইক চালিয়ে অনেকটা চলে এসেছি৷ আরও আধ ঘণ্টা চালিয়ে... ওই দূরে গঙ্গা দেখতে পাচ্ছি৷ সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশ একত্রিত হয়ে একটা শহর তৈরি করেছে, তারই নাম বারাণসী৷ জয় বাবা বিশ্বনাথ৷

এই জনপদ এক অদ্ভুত জায়গা৷ শংকরাচার্য প্রবর্তিত দশনামী সম্প্রদায় ছাড়াও যতগুলি সনাতন গুপ্ততন্ত্র সম্প্রদায় এবং তাদেরও যত উপসম্প্রদায় আছে, সবার ঠেক হল কাশী৷ স্থানীয় মানুষেরা বলে থাকেন মহাদেবের ত্রিশূলের ডগার ওপর এই শহরের অধিষ্ঠান৷ বাবা বিশ্বনাথ স্থানীয় মানুষের ঘরের সন্তানের মতো ভালোবাসা পান৷

এখন রাত দশটা৷ স্থানীয় এক কচুরির দোকান থেকে খাবার নিয়ে এসে গঙ্গার ধারে বসে আছি৷ এটা দশাশ্বমেধ ঘাটের সিঁড়ি, কিছুটা দূরেই মণিকর্ণিকা ঘাটের জ্বলন্ত চিতা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে৷ খিদে পেয়েছিল খুব, পেট পুরে খেয়ে একটা থাকার জায়গা খুঁজতে হবে৷

সরকারি উদ্যোগে বেনারস শহরের নবনির্মাণ হচ্ছে৷ ভাঙার কাজ মোটামুটি শেষ, পাথর বসানো কাজ চলছে এখন৷ আজকের রাতের জন্য একটা সস্তার হোটেল পাওয়া গেল মূল শহরের কিছুটা বাইরের দিকে৷ দুশো টাকায় ডর্মিটরি৷ ব্যবস্থা ঠিকঠাক৷

রাত দুটোয় উঠে বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরে লাইন দিয়েছি৷ দর্শন হল ভোর পাঁচটার সময়৷ দিনের প্রথম আরতি দেখে ফিরে এসেছি নিজের জায়গায়৷ ঘুম যখন ভাঙল, তখন দুপুর সাড়ে বারোটা৷

বাইক নিয়ে বেরিয়ে, বিভিন্ন অচেনা গলিপথ ঘুরে হাজির হয়েছি রাজা হরিশ্চন্দ্র ঘাটে৷ ঘণ্টাখানেকের মতো বসে কিছু দাহকার্য দেখে চলে এসেছি অসি ঘাটে৷ কিছু মানুষজন এখানে স্নান সারছেন, আজ দুর্গা-নবমী, কোথা থেকে যেন ঢাকের আওয়াজ কানে ভেসে আসছে৷

গঙ্গাস্নানের সময় মানুষ ইষ্টমন্ত্র জপ করে নিজের আরাধ্য দেব-দেবীর পূজা অর্চনা করে থাকেন৷ একজন বৃদ্ধা লালপেড়ে শাড়ি পরে, একমাথা সিঁদুর নিয়ে গঙ্গায় পা ডুবিয়ে বাচ্চাদের মতো জলকেলি করছেন৷ বয়স যতই হোক, শিশুসুলভ কিছু প্রবৃত্তি আমাদের সকলের মধ্যেই থাকে৷

বয়স্কা মানুষ গঙ্গায় স্নান সেরে উঠে ফেরার সময় সদ্য লাগানো পাথরে পিছলে গেলেন এবং পড়লেন৷ সিঁড়ির কোনা ওঁর কপালে লেগে তুমুল রক্তপাত শুরু হয়েছে৷ ভদ্রমহিলা কিছুতেই নিজে থেকে উঠতে পারছেন না, মনে হয়, কোমরে চোট পেয়েছেন বিস্তর৷ অনেকেই ভিড় করেছেন, তোলার চেষ্টা করছেন কোনওরকমে, কিন্তু ওঠানো যাচ্ছে না৷ বাইকের চাবি পকেটে পুরে কয়েক ধাপ নেমে গিয়ে শুনলাম, ভদ্রমহিলা কাঁদছেন পরিষ্কার বাংলায়, ‘মইরা গেলাম রে, অহন আর বাঁচুম না৷ বাত্তি দিওনের কেউ নেই গা... এ আমার হইল কিডা! ও গো শ্যামলের বাপ, তুমি আইসো৷’

ভদ্রমহিলার কান্না শুনে শ্যামল বা শ্যামলের বাবা কেউ এলেন না৷ অনেকেই তুলতে চাইছেন ওঁকে, ভদ্রমহিলা ভীষণ ভয় পেয়ে গেছেন৷

আরও কিছুটা এগিয়ে গিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করে ওঁর কপালে চেপে ধরে বললাম, ‘আপনার বাড়ি কোথায় বলুন, আমি পৌঁছে দিচ্ছি৷’

‘তুই কেডা?’

একবার ভাবলাম, বলে দিই ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্টাইলে ‘আমি কেদার’, তার বদলে বললাম, ‘আমার নাম অভিজিৎ... ডাকনাম পটা, কলকাতায় থাকি৷’

নিজের হাতে রুমাল মাথায় চেপে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমার কোমর ভাইঙ্গা গেছে রে বাপ৷ আমি মইরা যাইমু এবার৷’

‘বালাই ষাট! মরতে যাবেন কোন দুঃখে! গত চার মাসে আমার তিনবার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে, মরা অত সোজা নয়, মাসিমা!’

ভদ্রমহিলা বোধহয় আমার কথায় ভরসা পেলেন৷ কান্না থামিয়ে বললেন, ‘থাইলে তুইলা ফেল৷’

সারা রাস্তায় বৃদ্ধা চিল চিৎকার করতে করতে এসেছেন৷ প্রায় গঙ্গার কাছাকাছি একটা দোতলা পুরোনো বাড়ি৷ বহুদিন রং বা পলেস্তারা পড়েনি৷ এই বাড়ির একতলার মেঝে সাবেকি লাল রঙের জার্মান লাল অক্সাইড দিয়ে তৈরি৷

রিকশা থেকে নেমে কোনওরকমে পাঁজাকোলা করে বুড়িকে নিয়ে ঢুকেছি একতলার বারান্দায়৷ একজন মধ্যবয়স্কা পরিচারিকা এসে হাউমাউ করে প্রথমে অনেকটা কেঁদে নিলেন, তারপর একটা গদি বিছিয়ে দিলেন৷

মানুষ যখন শরীর ছেড়ে দেয়, তখন ওজন দ্বিগুণ হয়ে যায়৷ হইহল্লা শুনে ওপর থেকে একজন বৃদ্ধ নামছেন সিঁড়ি বেয়ে৷ শারীরিক অবস্থা তাঁরও ভালো নয়৷ কাঁপতে-থাকা শরীর নিয়ে ভদ্রলোক বসে পড়লেন বৃদ্ধার পাশে৷ আলাপ হল জ্যোতিপ্রকাশ কাঞ্জিলালের সঙ্গে৷

ভদ্রলোকের ভাষায় ওপার বাংলার টান নেই৷ আমাকে চেয়ারে বসতে বলে, বাড়ির ল্যান্ডফোন থেকে ডাক্তারবাবুকে ফোন করলেন৷ মিনিট বিশেকের তফাতে চিকিৎসক এলেন, বেশ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বললেন, ‘কোমরের বল ভেঙেছে নির্ঘাত! অপারেশন ছাড়া সহজে ঠিক হওয়ার নয়৷’

আরও কিছুক্ষণ পরীক্ষার পর, একটা পোর্টেবল এক্স রে মেশিন এবং দু-চারজন লোকজন এলেন৷ বৃদ্ধার কপালে সেলাই পড়ল৷ বুঝতে পারলাম বাঙালি ডাক্তারবাবু এদের বন্ধু মানুষ৷ ভদ্রলোক খানিক ধমক মেরে বললেন, ‘রোজ গঙ্গাস্নানের প্রয়োজন কী?’

অবুঝ বাচ্চা মেয়ের মতো অভিমান-মাখা মুখে ভদ্রমহিলা চুপ করে শুয়ে আছেন৷ মাথার রক্ত আর সিঁদুর এক হয়ে গেছে৷ আমি বসে আছি, এই অবস্থায় ছেড়ে যাওয়া যায় না৷ বৃদ্ধ এসে আমার হাত দুটো ধরে বললেন, ‘এই উপকার আমি জীবনে ভুলব না৷’

কোথায় উঠেছি, কোথায় থাকি, কাজকর্ম কী করি... যাবতীয় প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষ হলে আমার হাতে গরম চায়ের কাপ তুলে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘বাবা বিশ্বনাথ নিশ্চয়ই তোমাকে পাঠিয়েছেন৷’

ইতিমধ্যে প্যাথলজি থেকে এক্স রে প্লেট চলে এসেছে৷ ডাক্তারবাবুর আন্দাজ সঠিক৷ এবার অ্যাম্বুলেন্স কল করা হল৷ ডাক্তারবাবু নিজের গাড়িতে উঠলেন, বৃদ্ধ ভদ্রলোক উঠলেন অ্যাম্বুলেন্সে৷ অসি ঘাটের পার্কিং থেকে বাইক বের করে আমি চললাম অ্যাম্বুলেন্সের পিছনে পিছনে৷

রাস্তায় এক জায়গায় মা দুর্গার আরতি হচ্ছে৷ বেশ কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে মায়ের মুখের মায়া-জড়ানো অভিমান লক্ষ করলাম৷ নিশি ফুরোলেই বিদায়৷ মাসিমা চলেছেন যুদ্ধে৷

১৫

হাসপাতালে রাত জাগা নতুন কিছু নয়৷ এই বয়সে কতবার জেগেছি, তারই ইয়ত্তা নেই৷ বছর পাঁচেক আগে পয়সার জন্য রাত জাগতাম৷ পেটের খিদে সব কাজ করিয়ে নেয়৷

সুসজ্জিত আধুনিক নার্সিং হোম৷ পেশেন্ট পার্টির থাকার ব্যবস্থা আছে নীচের ঠান্ডা হলঘরে৷ ভদ্রলোক বসে আছেন চেয়ারে৷ মাসিমার অ্যাডমিশন হয়ে গেলে আমি ফিরে যাচ্ছিলাম, মেসোমশাই হাত দুটো ধরে থাকতে অনুরোধ করলেন৷ সব ক্ষেত্রে ‘না’ শব্দটা ব্যবহার করা যায় না৷

ডর্মিটরি থেকে আমার একমাত্র সম্বল পিঠের ব্যাগ নিয়ে এসেছি৷ বেফালতু রোজ টাকা গোনার কোনও মানেই হয় না৷ ভাঁড়ে মা ভবানী৷ ব্যাঙ্কের সেভিংস অনেকটাই উড়ে গেছে৷ দেখা যাক, আর কতদিন এইভাবে চলে৷ ক্লান্ত শরীরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি, খেয়াল নেই৷

সকালবেলা অপারেশন হল৷ টানা দেড় ঘণ্টার অস্ত্রোপচার, কিছুক্ষণ আগে জ্ঞানে ফিরেছেন মাসিমা৷ ভিজিটিং আওয়ারসে দেখা করতে গিয়েছি আমরা দু-জনে৷ অস্পষ্ট কথাবার্তা বলছেন৷ আমার হাত দুটো ধরে বললেন, ‘যতক্ষণ না বাড়ি ফিরতাসি, তুমি যাইয়ো না, বাবা৷’

ভদ্রমহিলার মুখে মৃত্যুভয় স্পষ্ট ছাপ ফেলেছে; এটাই স্বাভাবিক৷ জীবনচক্রের কঠিনতম সত্য হল মৃত্যু৷ তবু মানুষ সংসার গড়ে, মায়ার বাঁধন জিইয়ে রাখে৷ মন্দিরে ষোলোআনার পুজো দিয়ে ভাবে, ভগবানকে দত্তক নিয়ে ফেলেছে৷ অবশ্য, মানুষ আর কী-ই বা করতে পারে? জীবন আর রাজ্য লটারি; একই পরম বস্তু৷ লাগে তুক, না লাগে তাক৷

বাইরে বেরিয়ে এসে একটা সিগারেট ধরিয়েছি৷ হসপিটালের লবিতে ফিরে দেখি, মাথা নিচু করে বৃদ্ধ জ্যোতিপ্রকাশ কাঁদছেন নীরবে৷ পাশে বসে, একটা লেবু-লজেন্স দিলাম ওঁর হাতে৷

কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘শ্যামল আমাদের একমাত্র জীবিত সন্তান, মেয়ে মারা গেছে সাত বছর আগে ক্যান্সারে৷ ছেলেটা বিদেশে গিয়েছিল চাকরি নিয়ে৷ বিয়ে করেছিল স্থানীয় এক ফ্রেঞ্চ মেয়েকে৷ গত দু-বছর কোনও ফোন পাইনি, আমরা ফোন করলেও উত্তর দেয় না৷ অথচ ওর বন্ধুদের কাছ থেকে খবর পাই, আমার নাতনি হয়েছে৷ আমাদের কী দোষ জানি না৷ এই বুড়ো বয়সে বড্ড একাকিত্বে ভুগি৷’

কান্নার শব্দ থেমে গেছে, চোখের জল থামেনি৷ এসবের মাঝখানে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে লাভ নেই৷ আমার কর্তব্য এই পর্যন্তই থাকার কথা, কিন্তু তেমন আর হল কই৷ জীবন সত্যি ভারী অদ্ভুত! বিকেলের দিকে আবার ভিজিটিং আওয়ারস৷

মাসিমার অশ্রুভরা অনুরোধ শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারলাম না৷ নানান চিন্তা মাথায় বাইক নিয়ে ফিরছি নতুন থাকার জায়গায়৷ সন্ধে গড়িয়ে রাত হতে চলেছে৷ আজ বিজয়াদশমী৷

বিশাল ব্যান্ড-পার্টির সমারোহে মা দুর্গা চলেছেন গঙ্গায়৷ কাশীর দশমীতে প্রতিমা বিসর্জন যাঁরা দেখেননি তাঁদের বলে বোঝানো মুশকিল৷ মানুষজন নাচছেন মাঝরাস্তায়, বাইক সাইড করে জনসাধারণের ভিড়ে মিশে তুমুল নাচ শুরু করেছি আমিও... আরও হাজার অ্যাক্সিডেন্ট হতে পারে, শতচ্ছিন্ন হয়ে গঙ্গার ধারে অথবা ন্যাশনাল হাইওয়েতে টুকরো টুকরো অবস্থায় পড়ে থাকতে পারি, জিতু পাঠক বা ওঁর মতো মানুষ বারুদে ছিন্নভিন্ন করতে পারে আমার মাথার খুলি; তবুও উইপোকার ঢিবি থেকে ঠিক ফিরে আসব, কর্তব্য শেষ না-হওয়া পর্যন্ত বারবার আমায় ফিরে আসতে হবে৷ এই বোহেমিয়ান শরীরের স্বপ্নপূরণ না হলে আমার মুক্তি নেই৷ নাচছি আমি... ‘জিমি জিমি... আজা আজা৷’

চিনি না, জানি না, আলাপ নেই, তবুও নাচছি৷ বিসর্জন বলে কথা৷ প্রতিটা বিসর্জন বকলমে আগামীর নবসূচনা৷ চামড়া পুড়ে যায়, মাটি জলে মিশে গলে যায়, কাঠামো ঠিক থেকে যায়৷ পুরাতনী সেই কাঠামোর ওপর নতুন মাটির প্রলেপ পড়ে৷ বছরের দশটা দিন মৃন্ময়ী মা আবার জেগে ওঠেন৷ কলকাতায় থাকলে আজকের দিনে সিদ্ধি খেয়ে থাকি৷ এ বছর নিরামিষ৷

ঘণ্টা দুয়েক নাচার পর আমি ক্লান্ত৷ মন ফুরফুরে৷ বৃদ্ধ দম্পতির অনুরোধে নিজেকে নিয়ে ফিরে এসেছি মাসিমার বাড়ি৷ স্নান সেরে, খাবার খেয়ে মরা মানুষের মতো ঘুমিয়ে পড়েছি দক্ষিণ-খোলা জানালার দিকে মাথা রেখে৷ আহা মিষ্টি দখিনা বাতাস৷ আগামিকাল মাসিমার ছুটি৷ আপাতত টানা দুই মাস বিশ্রাম, তারপর ফিজিয়োথেরাপি৷

ভদ্রমহিলা ফিরে এলেন দুপুরের দিকে৷ গত দু-দিন নিয়ম করে দিনে দু-বার হসপিটালে গিয়েছি৷ এ বাড়ির বাজার করে দিয়েছি৷ নোটবইতে নিয়ম করে সব হিসাব লিখে রেখেছি৷ কলকাতায়, লখনউয় এবং কানপুরে মানুষজনের খবর নিয়েছি৷ এখানকার ঠিকানায় আজ সকালবেলা বাইকের কাগজপত্র এবং নাম্বার প্লেট এসেছে৷ বেলার দিকে গিয়ে ফিট করে এনেছি৷ এই শহর বোধহয় ঘুমোয় না, কোনও এক ছোট্ট মন্দিরে এই মুহৃর্তে কেউ নিশ্চয়ই পুজো করছেন৷

এখন রাত দশটা৷ দরজায় টোকা মেরে, অনুমতি নিয়ে ওঁদের ঘরে ঢুকে এসেছি৷ এই মুহৃর্তে জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য সেই মন্দির খুঁজে পাওয়া৷ যার জন্য মাসের পর মাস ঘর ছেড়ে ঘুরছি যাযাবরের মতো, সেই লক্ষ্যপূরণ না-হওয়া পর্যন্ত নিস্তার নেই৷

টানা এক ঘণ্টা আমি ওঁদের বোঝালাম৷ মেসোমশাই বুঝলেন, মাসিমা অবুঝ৷ শিশুর মতো কাঁদছেন৷ এ কান্নায় মায়ার বন্ধন বড্ড বেশি, নিজেকে একবার জড়িয়ে ফেললে আর ছাড়ানো যাবে না, ভীষণ দুর্বলতার জায়গা৷ এঁদের ছেলে হারিয়েছে, আমি মা-বাবা৷ মায়া কাটিয়ে উঠতেই হবে৷

শেষ পর্যন্ত আমায় সবকিছু বলতেই হল৷ কেন আমি নিজের ঘর ছেড়ে আজ দিশাহারা৷ মা মুণ্ডেশ্বরী থেকে শুরু করে হালফিলের লতাদিদি কেউ বাদ গেলেন না৷ ভদ্রমহিলার চোখ কপালে উঠে গেছে৷

আমার জীবনবৃত্তান্ত শুনে উনি চুপ মেরে গেছেন৷ অনুমতি আদায় করে পাশের ঘরে ফিরে এসেছি৷ হঠাৎ মনে এল আজ একাদশী এবং শনিবার৷

পরিচারিকা ভদ্রমহিলাকে দরজা ভেজিয়ে রাখতে বলে আমি বেরিয়ে গেলাম রাজা হরিশ্চন্দ্র ঘাটের উদ্দেশে৷ হিসাবমতো আজ, এই একাদশীর রাতে, এই ঘাটেই সেই অঘোরীর দেখা পাওয়ার কথা, বাকিটা কপাল৷

অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে গলিপথ ধরে চলেছি একা৷ মা বলতেন জীবনে কোনওদিন অকারণে ভয় পেতে নেই৷ যেটুকু ভয় ছিল, চোখের সামনে মায়ের মৃতদেহ পুড়তে দেখার পর কেটে গিয়েছে৷ গঙ্গার হাওয়া গলির দেওয়ালে ধাক্কা লেগে অদ্ভুত আওয়াজ সৃষ্টি করছে৷ প্রায় মিনিট বিশেক হাঁটার পর নিজেকে খুঁজে পেলাম রাজা হরিশ্চন্দ্র ঘাটে৷ তিনটের মধ্যে দুটো চিতা তখনও জ্বলছে কোনওরকমে, একটা থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে কিন্তু আগুন নেই৷

হাতঘড়িতে সময় রাত সাড়ে এগারোটা৷ ধূপের গন্ধের সঙ্গে পোড়া মানুষের শরীরের গন্ধ মিশে অদ্ভুত এক মিশ্রণ তৈরি হয়েছে৷ গঙ্গার হাওয়ায় একটা শীতল ভাব এসেছে৷ এতটা হেঁটে আসার পর কিছুক্ষণ বসতেই শরীরের ঘাম শুকিয়ে গেছে৷ সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ঘাটে বাঁধা একটা নৌকার মধ্যে উঠে বসেছি৷ নৌকার গায়ে স্পষ্ট হিন্দিতে লেখা আছে: ‘মর্দ কো ভি দর্দ হোতা হ্যায়৷’

দূর থেকে ঢাকের বাদ্যির মিঠে বোল ভেসে আসছে৷ গঙ্গার জলে আলোর প্রতিফলন খেলা করছে৷ ঘড়ির কাঁটায় রাত বারোটা পাঁচ৷ সরকারি হ্যালোজেনের আলোয় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সম্পূর্ণ নগ্ন এক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী লোহার রেলিং-এর অন্ধকার ধার ঘেঁষে ক্রমশ নেমে আসছেন গঙ্গার দিকে৷ নিজেকে আমি চুপচাপ নৌকার খোলের মধ্যে গুটিয়ে নিলাম৷

সন্ন্যাসী থামলেন, নব্বই ডিগ্রি ঘুরে একবার হ্যালোজেনের দিকে তাকালেন, আলো বন্ধ হয়ে গেল, তাজ্জব কি বাত! কাজ চলে যাওয়ার মতো আলো অবশ্য আছে৷

জনা তিনেক মাতাল, সিঁড়ির একদম ধারে শুয়ে রয়েছে, তাদের পাশ কাটিয়ে ভদ্রলোক একবুক গঙ্গাজলে নেমে পড়লেন৷ আকাশের দিকে তাকিয়ে, যোনি মুদ্রায় আঙুল সাজিয়ে পরপর তিনটে ডুব মারলেন৷

গঙ্গাস্নান সেরে, ভেজা শরীরে প্রায় নিভে-যাওয়া চিতার সামনে দাঁড়ালেন৷ এক নির্দিষ্ট কক্ষপথে নিজেকে পরিক্রমা করলেন তিনবার৷ ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে রয়েছেন নির্বিকারভাবে৷ পিছনদিকে থাকায় ওঁর মুখের অভিব্যক্তি বোঝা যাচ্ছে না৷

নিঃশব্দে এই সময় নৌকা থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি, অনেকটা দেখা যাচ্ছে এইবারে৷ কারা যেন গঙ্গার সিঁড়িতে পর পর প্রদীপ জ্বালিয়ে রেখে গেছেন৷ গঙ্গার হাওয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে সেগুলো জ্বলছে৷ সাহসে ভরসা রেখে আরও কিছুটা এগিয়ে গেলাম৷

কান পেতে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি, সাড়ে ছয় ফুট উচ্চতার বৃদ্ধ অঘোরী নিভে-যাওয়া সেই চিতার সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করেছেন;

‘ওঁ হ্রিং ক্লিইং... মহাযোনি... পৃএপ্রয়োজন৷ ভার্ধ্যা পুত্রঃ পিগুপ্রয়োজনঃ৷

পিশুপ্রয়োজন৷ মুক্তিরেতন্মিনান্তি সংশয়ঃ’

কেউ কোথাও নেই৷ গোটা তিনেক অচৈতন্য মাতাল, একজন অঘোরী, আমি... আর... প্রায় নিভে-যাওয়া এক চিতা৷ টানা আধ ঘণ্টা মন্ত্র উচ্চারণ করে চলেছেন একজন মানুষ৷ এই সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল৷

চিতার বামদিকে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ অঘোরী প্রস্রাব করা শুরু করলেন৷ প্রস্রাবের কিছুটা অংশ নিজের হাতে নিয়ে ছিটিয়ে দিলেন চিতার ওপর৷ নিভে-যাওয়া চিতা হঠাৎ দাউদাউ করে জ্বলে উঠল৷ ভদ্রলোক হাত দুটি মহাশূন্যে তুলে... ইহ তিষ্ঠতি... ইহ তিষ্ঠতি... ইহ তিষ্ঠতি... পর পর তিনবার বলে চুপ করে গেলেন৷

নিজের চোখের সামনে অমন ক্রিয়া দেখে আমি স্থির হয়ে গিয়েছি৷ দাঁড়ানো অবস্থায় বৃদ্ধ অঘোরী কিঞ্চিৎ দুলতে শুরু করেছেন৷ বাইরে থেকে রামনাম ভেসে আসছে৷ সেই কোলাহলে নৌকার চালে ঘুমিয়ে-থাকা একটা কুকুর, আমাকে এতটুকু পাত্তা না দিয়ে বৃদ্ধ অঘোরীর কাছে গিয়ে লেজ নাড়তে শুরু করেছে৷ দেখামাত্র ভদ্রলোক ওকে কোলে তুলে নিয়েছেন৷

একটা টাটকা মড়া এল৷ কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে আমি অন্ধকারে মিশে গেলাম৷ মৃতের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলে বৃদ্ধ অঘোরী সদ্য আসা মৃত ব্যক্তির সামনে গিয়ে বসলেন৷

কিছু মানুষের ধারণা আছে, যে মৃতদেহের ওপর শবসাধনা করা হয়, তাঁর স্বর্গপ্রাপ্তি হয়৷ এর সত্যতা আমার জানা নেই৷

মৃতের পরিবার, মৃতদেহ শ্মশানে রেখে বেরিয়ে গেলেন বাইরের দিকে৷ খুব সম্ভবত ওঁরা অপেক্ষা করবেন সূর্যোদয় পর্যন্ত৷

সিঁড়ির ধাপে ছড়িয়ে-থাকা কিছু কালো তিল কুড়িয়ে নিয়ে ভদ্রলোক আবার মন্ত্র উচ্চারণ শুরু করেছেন;

‘যদি তুষ্টাস্ত মে দেবা ব্রহ্মাবিষ্ণুমহেশ

সর্ববদেবদিজ্বাতিভ্যে! যজ্জতীর্থশিলোচ্চয়াৎ

দেবেঙ্যোহতিপবিভ্রোহস্বষিভ্যোহপি শিবাব্যয়ীৎ

গন্ত্রেভ্যো দেবদেবী, যোগিভ্যমচাপি সর্ববশঃ৷

ন্যাসিভ্যশ্চপি কর্থিত্যে ধর্থিভাশ্চ তথ! পুনঃ

জ্ঞাতিভ্যোহডিপবিত্রোহং পবিভ্রং স্তা সদ লুব

পবিব্রমস্ত তং দেবাঃ সঙ্যমুক্ত দ্রিবং যযুঃ৷

দুষ্ট দৈত্যং ততঃ স্পৃষ্ট৷ সর্ব হরিপুবং যষুঃ৷৷’

গঙ্গার সিঁড়ির শেষ ধাপে বসে, চোখের সামনে যা দেখছি তা অবিশ্বাস্য৷ যেহেতু চোখ নিজের, বিশ্বাস হারানোর জায়গা নেই৷

আরও আধ ঘণ্টা মন্ত্র উচ্চারণের পর, বৃদ্ধ অঘোরী চিতার ওপর উঠে বসেছেন, হাতে বোতলবন্দি পানীয়৷ হঠাৎ করে একটা গোটা দারুর বোতল কোথা থেকে এসে জুটল, তা-ই ভাবছি৷

আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বৃদ্ধ অঘোরী চিৎকার করছেন, ‘জাগো পিশাচ, জাগো প্রেত, জাগো সুপ্ত সত্তা৷’

এই দৃশ্য চোখে না দেখলে অবিশ্বাস্য বলেই মনে হত৷ আরও মিনিট পনেরোর ব্যবধানে, মৃত মানুষ কিছুটা উঠে বসেছে! বৃদ্ধ অঘোরী তাঁকে সুরা সেবন করালেন নিজের হাতে৷ মৃত মানুষ ক্ষণিকের জন্য জীবন ফিরে পেলেন, আবার শুয়ে পড়লেন৷ বোতলে বেঁচে-থাকা বাকি সুরা নিজের গলায় ঢকঢক করে চালান করে দিলেন অঘোরী৷ চিতা থেকে নেমে মৃতদেহকে স্পর্শ করে প্রণাম সেরে তিনি বেরিয়ে গেলেন বাইরের দিকে৷ সরকারি হ্যালোজেন ধুম করে আবার জ্বলে উঠল৷ আমি ওঁর পিছু নিলাম৷

আলো-আঁধারির গলিপথে একজন বৃদ্ধ নগ্ন মানুষ হাঁটছেন নিজের মর্জিমতো৷ প্রায় দশ মিনিট পর একটা বন্ধ গুমটি দোকানের সামনে এসে তিনবার কাঠের পাল্লায় টোকা দিলেন৷ একচিলতে পাল্লা ফাঁক হয়ে একজন রমণীর হাত বেরিয়ে এল, সেই হাতে ধরা আছে গাঁজাভরা মাটির কলকে৷ সেখানে দাঁড়িয়েই কলকেতে আগুন লাগিয়ে ডানদিকের সরু গলি ধরে এসে উপস্থিত হয়েছেন গঙ্গার ধারে৷ এটা কোন ঘাট জানি না৷

ছিলিমে পরপর তিনটে লম্বা টান দিয়ে বৃদ্ধ মানুষটি ধপ করে মাটিতে বসে পড়েছেন৷ পাশেই হাতখানেক লম্বা ছোট্ট এক শিবের মন্দির৷ সেই মন্দিরে পিঠ দিয়ে আয়েশ করে বসে নিজের মনে কথা বলে চলেছেন বৃদ্ধ অঘোরী৷

মুখে একগাল হাসি, চোখ ঢুলুঢুলু, লম্বা টান মেরে বাবাজি বললেন, ‘কাল রাতে রান্না ঠিক হয়েছিল?’

বৃদ্ধ অঘোরী কাকে প্রশ্ন করছেন, কে জানে! অপর প্রান্ত থেকে আমার কানে কোনও উত্তর এল না, অথচ ওঁকে দেখে মনে হচ্ছে, উনি উত্তর পেয়ে গেছেন৷ ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘এই বুড়ো বয়সে বেশি গিলিস না, তবে শালা তোর যা হজমশক্তি... হি হি হি৷ বহুকাল পর আজ রাতে এক মড়া চণ্ডালকে জাগিয়েছিলাম৷ সেই ব্যাটা অপদার্থ, চোখ খুলে আমাকে দেখে ভয়ে আবার মরে গেল... হ্যা হ্যা হ্যা... কাল রতন এসেছিল, বলছিল, বাবা, টাকা চাই৷ আমি পরিষ্কার বলে দিয়েছি, খেটে খাও... এমন একটা জোয়ান শরীর থাকতে হারামজাদা ভিক্ষা করে কেন, কে জানে! ওর জীবনে সিদ্ধিলাভ হবে না৷ কুঁড়ে মানুষ সংসারে চলে যায়, সন্ন্যাসী যদি কুঁড়ে হয় তাহলে সে শালা পঙ্গু ভিখারি হয়ে মরবে৷ সন্ন্যাস মানেই সনাতন শক্তির আকর৷’

চার-পাঁচ হাত পেছিয়ে গিয়েছি আমি, পকেট থেকে দেশলাই বের করে সিগারেট সবে ধরাতে যাব, এমন সময় বজ্রের মতো এক থাবা এসে আমার ঘাড়ে পড়েছে৷ অসীম শক্তিধর মানুষ৷ লম্বা একটা ছুরি গলার কাছে ধরে, ঘাড় ধরে টানতে টানতে বৃদ্ধ অঘোরী আমায় নিয়ে এলেন সেই ছোট্ট শিব মন্দিরের সামনে৷ আমার শরীরের সমস্ত শক্তি অবশ হয়ে গেছে৷ এক নিমেষে মাটিতে ফেলে গলার সামনে ছুরি ধরে ওঁর নিজের মুখ আমার মুখের কাছে নামিয়ে এনে হঠাৎ ছিটকে সরে গেলেন৷

গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসলেন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, মনের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় করে আমি উঠে বসে সিগারেট ধরিয়েছি, আরেকটা সিগারেট ওঁর হতে দিয়েছি৷ আমার শরীর স্পর্শ করে কারেন্ট লাগার কথা নয়, তাহলে!

সিগারেট হাতে ধরে অঘোরী অবাক চোখে আমায় দেখে চলেছেন৷ আমি আগুন জ্বেলে ওঁর মুখের সামনে ধরলাম, উনি সিগারেট ধরালেন, আমি স্পষ্ট দেখলাম ওই মানুষের ডান হাতের কড়ে আঙুল নেই৷ যাক, ঠিক মানুষের সংস্পর্শে এসেছি৷ ভদ্রলোক হঠাৎ আমাকে ছেড়ে দিলেন কেন, বুঝতে পারছি না৷

সিগারেটে মস্ত এক টান মেরে আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বললেন, ‘তোর শরীরে অদ্ভুত একটা চেনা গন্ধ আছে৷ বহুকাল পর এই গন্ধ আবার পেলাম৷ এটা বোধহয় একটা সাপের গন্ধ৷ সাপটার নাম খুব সম্ভবত সর্পগন্ধা৷ নৈমিষারণ্যের জঙ্গলে এই সাপের এবং ওঁর মালিকের একসময় খুব চর্চা হত৷ সে সুফি ছিল, সর্পগন্ধা ছিল ওর বন্ধু৷ তোর শরীরে ওই গন্ধ এল কোথা থেকে?’

পকেট হাতড়ে আশরফি বের করেছি৷ সেটা ওঁর হাতে দিলাম, ভদ্রলোক কেঁপে উঠেছেন৷ আমার হাতে আশরফি ফেরত দিয়ে বললেন, ‘এখানে কী মতলবে? টিকটিকির মতো আমাকে ফলো করছিস কেন?

হাতের সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে বললাম, ‘আমার জীবনে মস্ত এক বিপদ চলছে, বাবাজি৷ এই বিপদ থেকে একমাত্র আপনি উদ্ধার করতে পারেন৷’

বৃদ্ধ অঘোরী আমার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে বললেন, ‘ওই পয়সা সঙ্গে থাকলে কোনও বিপদে পড়ার কথা নয়, তবুও শুনি তোর কীসের বিপদ!’

মুখোমুখি আমি, বৃদ্ধ অঘোরী আর ছোট্ট এক শিবলিঙ্গ৷ প্রায় এক ঘণ্টা ধরে সমস্ত কথা খুলে বললাম ওঁকে৷ সব শুনে উনি মুচকি হাসছেন৷ আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললেন, ‘পিণ্ডারিজি একজন মহাসাধক৷ উনি আমারই সম্প্রদায়৷ তোর চৌদ্দগুষ্টির ভাগ্য ভালো, ওই মানুষকে চোখে দেখেছিস৷ অমন পরোপকারী প্রকৃত জ্ঞানী সিদ্ধান্তী খুব বেশি আর নেই এই দেশে৷’

ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ সিগারেটে শেষ টান মেরে বললেন, ‘তোর ওই মির্জা সাহেবের এক পরিচিত গুমনামীবাবার পরম ভক্ত ছিলেন৷ ফৈজাবাদে ওঁকে দেখেছি৷ আমার সঙ্গে গুমনামীর আলাপ ছিল, উনি নৈমিষারণ্যে প্রায়ই যেতেন, তপস্যা করতেন৷ ভদ্রলোকের অগাধ জ্ঞান এবং পড়াশোনা ছিল৷ ওই মানুষ যদি দেশ শাসন করতেন, আজকে ছবি অন্যরকম হত৷ জিন্না সাহেব হয়তো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ওঁকে মেনে নিতেন! নেতাজি রাজনীতিতে থাকলে দেশভাগ হত না৷ ওঁর মানসিক এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতা ছিল চূড়ান্ত৷ আমাদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় ছিল৷ ওঁর সাধনমার্গ ছিল অদ্বৈত৷ প্রচুর বই পড়ত আর চিঠি লিখত৷ উনিশশো বাষট্টির চিনের যুদ্ধের সময়... নাহ থাক৷ কিছু কথা গোপন থাকাই ভালো৷’

ভদ্রলোক থামতেই আমি প্রশ্ন করলাম, ‘উনি কলকাতায় না ফিরে উত্তরপ্রদেশে এলেন কেন, যদিও বা এলেন, ফিরলেন না কেন?’

বৃদ্ধ সন্ন্যাসী হাসছেন৷ কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বললেন, ‘অর্থই অনর্থের মূল৷ আইএনএ-র বিপুল অর্থ, দেশবাসীর সোনাদানা... সব থেকে শব পর্যন্ত বাঁটোয়ারা হলে যা হয় আর কী! তবে, ওঁর মৃত্যু নেই৷ মহাপণ্ডিত চাণক্যর মতো উনিও অমর হয়েই থাকবেন৷’

বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে অঘোরী বললেন, ‘ভগওয়ানজি কলকাতায় গিয়ে কোথায় উঠতেন?’

‘কেন! ওঁর ভিটে এখনও আছে সেখানে!’

বিকট শব্দে অঘোরী হাসতে শুরু করেছেন৷ হেসেই চলেছেন লাগাতার৷ কিছুক্ষণ পর ভদ্রলোক গড়গড় করে কিছু কথা বলে গেলেন, যেগুলো লেখার শক্তি আমার নেই এখানে৷ অবাক হয়ে শুনছি, সবটুকু শোনার পর হতভম্বের মতো বসে আছি৷ কিছু কথা না-জানাই ভালো৷ যার প্রতি যে শ্রদ্ধা আছে, সেটুকু বজায় থাকবে না৷

বেশ কিছুক্ষণ দু-জনেই চুপচাপ বসে আছি৷ মাথায় হঠাৎ একটা প্রশ্ন আসতে জিজ্ঞাসা করলাম,

‘জীবনের সবথেকে বড় অভিশাপ কী?

বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বললেন, ‘পরম বন্ধু বা যে মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করে তাকে কখনও পেছন থেকে ছুরি মারতে নেই৷ মিত্রদ্রোহ,এই সংসারের নিকৃষ্টতম পাপকার্য, কয়েক জন্মজুড়ে কর্মফলের অভিশাপ বহন করে যেতে হবে৷ এর থেকে উদ্ধার নেই৷’

কথা শেষে আচমকা আমার কপালে নিজের হাত স্পর্শ করেছেন বৃদ্ধ৷ চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর হাত নামিয়ে বললেন, ‘এখন রাতের তৃতীয় প্রহর, আর কিছুক্ষণ পরেই মহাকাল মন্দিরের বাবাকে সেবা করা হবে ভস্ম দিয়ে, তারপর ওঁকে স্নান করানো হবে কারন দিয়ে৷ সেই মহাপ্রসাদ যেকোনও মূল্যে তুমি সংগ্রহ করবে কাচের শিশিতে৷ এক্ষেত্রে যদি কিছু পয়সা খরচা হয়, করবে৷ এরপর রাস্তার উলটোদিকে চলে আসবে৷ এই রাস্তা দিয়ে সোজা পাঁচ মিনিট হাঁটলে পাবে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্দির৷ ওখানে পৌঁছে বাবাকে দর্শন করে, মন্দিরের কুয়ো থেকে বড়ো তামার গামলায় ভরতি করে জল নিয়ে আসবে৷ এতসব কিছু জোগাড় হলে, আজ মধ্যরাতে মণিকর্ণিকা ঘাটে আমাকে খুঁজে পাবে৷ তার আগে আরও একটা কাজ করতে হবে৷’

‘কী কাজ?’

‘একটু মাটি লাগবে যে৷’

‘গঙ্গায় নেমে মাটি তুললেই হবে!’

‘ঠিকানা বলছি, লিখে নে৷’

‘কাগজ, কলম, মোবাইল কিচ্ছু নেই৷’

‘এগিয়ে আয় হতভাগা৷’

নাম, ঠিকানা বলে ভদ্রলোক আমার কপালে নিজের আঙুল দিয়ে সেটা লিখে দিলেন৷ শরীর কেঁপে উঠল৷

চুপচাপ বসে আছি৷ মনে একের পর এক প্রশ্নের ওঠানামা চলছে৷ কিছুটা দ্বrদ্ব কাটিয়ে বললাম, ‘আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে খুব ইচ্ছা হচ্ছে, যদি অনুমতি দেন৷’

‘অবাস্তব কোনও প্রশ্ন করবি না৷’

বেশ খানিকটা সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে একটা প্রশ্ন করে বসলাম, ‘এই যে... আমার স্বপ্নে দেখা মন্দির, পিণ্ডারিজি এবং মির্জা সাহেবের সংস্কার, আপনার বিভিন্ন ক্রিয়া... মাঝেমধ্যে মনে হয় এগুলো সব মিথ্যা৷ হয়তো আমি কোনও কঠিন এক রোগে ভুগছি, হয়তো এটা মানসিক বিকার, এই সকল তন্ত্র-মন্ত্র-যন্ত্র সংস্কার... সবকিছুই মিথ্যা৷ জ্যোতিষ বলে আসলে কোনও বিদ্যা নেই, পুরোটাই আন্দাজ আর গণিতের সিদ্ধান্ত৷ কেন মাঝেমধ্যে মনে হয়, আমি ভুল পথে চলেছি?’

‘তুই কি নাস্তিক?’

এরকম প্রশ্ন শুনে চমকে যাই, সামলে বললাম, ‘বোধহয় না, ঈশ্বরে বিশ্বাস আছে৷ কিছু ক্ষেত্রে মনে হয় বিজ্ঞানই শেষকথা৷ হয়তো আমি ভুল, মাঝেমধ্যে স্বধর্মের ওপরেও বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি৷ যাকে চোখে দেখা যায় না, তার ওপর বিশ্বাস কীভাবে রাখব?’

প্রশ্ন শুনে বৃদ্ধ অঘোরী নড়েচড়ে বসেছেন৷ আমার কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে নিয়ে লম্বা টান মেরে বললেন, ‘বিজ্ঞানের কথা বলছিস তুই! আমার ভীষণ হাসি পাচ্ছে৷ তবে তোর বয়সে, এইসব আধ্যাত্মিক কথা এবং ঘটনা হজম করা চাট্টিখানি ব্যাপার নয়৷ খাবার খেলেই হল না, হজম করতে প্রচুর শক্তি লাগে৷ এর জন্য উপযুক্ত আচার্যের ছত্রছায়ায় প্রচুর সংস্কার দরকার৷’

সিগারেটের জমে-থাকা ছাই ফেলে বজ্রাসনে বসে ভদ্রলোক বললেন, ‘ঘটনা উনিশশো ষাট সালের৷ প্রথমবারের জন্য তখন আফগানিস্তান গিয়েছিলাম গুরুজির সঙ্গে৷ আমার চোখ বেঁধে গুরুজি নিয়ে গিয়েছিলেন ভীষণ রুক্ষ এক পার্বত্য প্রদেশে৷ খুব সম্ভবত সেটা ছিল কারাকোরাম পর্বতশ্রেণির অংশ৷ গুরুজি কেন আমাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিলেন, জানিস?’

প্রশ্নের উত্তরের জন্য কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে, আমার কাছে উত্তর না পেয়ে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, ‘গান্ধার ডামরতন্ত্রের প্রাচীন বিদ্যা সংগ্রহের জন্য আমাকে পরবর্তীকালে আরও তিনবার যেতে হয়েছিল আফগানিস্তানের দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে৷ সুপ্রাচীন বটবৃক্ষের মতো তিনজন অঘোরী থাকতেন সেখানে৷ তাদের বিদ্যা, শক্তি এবং সাধনা ছিল অপরিসীম৷ গুরুজির মুখে শুনেছিলাম, ওঁরা জ্ঞানগঞ্জ থেকে এসেছিলেন বিশেষ বিমানে চড়ে৷’

হাতের সিগারেটের ছাই ঝেড়ে ভদ্রলোক বলতে শুরু করলেন, ‘গুরুজির কাছে শুনেছি, ওই তিনজন সন্ন্যাসী মহাভারতের যুগ থেকে এখনও পর্যন্ত বেঁচে আছেন৷ আড়াই-তিনশো বছর পর জীর্ণ শরীর পালটাতে হয় ওঁদের৷ সিদ্ধি, সাধনা এবং প্রারব্ধ একই থাকে৷’

ফুরিয়ে-যাওয়া হাতের সিগারেট ফেলে ভদ্রলোক চোখ বন্ধ করে স্মৃতি হাতড়ে চলেছেন৷ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে বললেন, ‘সেটা ১৯৯০ সাল, শেষবার আমি গুরুজির সঙ্গে গিয়েছি গান্ধার প্রদেশে৷ ফিরে আসার সাত দিন আগে যথারীতি চোখ বন্ধ করে আমাকে নিয়ে গেলেন সেই দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে৷ তিনজন অতিবৃদ্ধ সন্ন্যাসীর একজন আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন৷ ওঁর সঙ্গে কথা বলার সময় আমি এক অবুঝ কাজ করে ফেলেছিলাম৷ সামনে বসা বৃদ্ধ সন্ন্যাসীকে প্রশ্ন করেছিলাম, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ এবং ঋগ্বেদে বহুবার ‘বিমান’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে৷ মহর্ষি ভরদ্বাজের লেখা একটা আস্ত সংহিতা আছে এর ওপরে৷ ‘যন্ত্র-সর্বস্ব’ নামক পুস্তকের ‘বৃহৎ বিমানশাস্ত্র’ নামক অধ্যায়ে মহর্ষি ভরদ্বাজ আট ধরনের বিমান তৈরির উপায় এবং উপকরণ দিয়ে গেছেন৷ যদিও প্রাচীন পুঁথি এবং বেদের চারটি অধ্যায় পড়ে আমি একশো ত্রিশের কাছাকাছি বিমানের প্রকারভেদ পেয়েছি৷ আচ্ছা, এগুলো কি সব সত্যি না গল্পকথা? যদি রাম সেতু থাকে, যদি রাবণের রাজপ্রাসাদ থাকে, কুরুক্ষেত্র নামক জায়গা এখনও থেকে থাকে, তবে প্রাচীন বিমানের কোনও ভগ্নাংশ কি এখনও থাকবে না?’

‘দাঁড়া, তেষ্টা পেয়েছে’; এই বলে আমার সামনে বসা বৃদ্ধ অঘোরী একছুটে গঙ্গা থেকে আঁজলা করে কিছুটা জল খেয়ে নিয়ে আবার নিজের জায়গায় এসে বসেছেন৷

খানিকক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করলেন, ‘আমার প্রশ্নের উত্তরে আফগানিস্তানের বৃদ্ধ সন্ন্যাসী আমার চোখ বেঁধে নিয়ে চললেন আরও ভয়ংকর গিরিখাতের দিকে৷ আন্দাজ আধ ঘণ্টা পর উনি আমার চোখের বাঁধন খুলেছিলেন৷ চোখের সামনে দিনের উজ্জ্বল আলোয় এক বন্ধ গুহার মুখ দেখতে পেয়েছিলাম৷ সেই বৃদ্ধ সন্ন্যাসীর তিনবার হাততালিতে গুহামুখের পাথর নিজে থেকেই সরে গিয়েছিল৷ গুহার ভিতরে কী ছিল, জানিস?’

‘কী ছিল?’

‘আন্দাজ পাঁচ থেকে ছয় হাজার বছর পুরোনো একটা গোটা বিমান! মন্ত্রপূত সেই বিমানের কবচ ধারণ করার নিজস্ব ক্ষমতা ছিল৷ উচ্চতায় আন্দাজ ফুট দশেক হবে৷ তিনজন মানুষ সেখানে অনায়াসে বসতে পারবে৷ সোনা, রুপো এবং লোহা দিয়ে তৈরি সেই বিমান হয়তো মহাভারতের সময় বা তার আরও আগের তৈরি৷ আমি একবর্ণও মিথ্যা কথা বলছি না৷’

আমি অবাক হয়ে ওঁর কথা শুনছি, বৃদ্ধ অঘোরী বললেন, ‘এখানেই শেষ নয়, আরও আছে৷ এবার আসি ফেলে-আসা কয়েক বছর আগের ঘটনায়৷’

ভদ্রলোক একটা বিড়ি ধরিয়ে বললেন, ‘এই বছরকয়েক আগে অর্থাৎ ২০১২ সালে আমেরিকার আটজন সৈন্য খুব সম্ভবত দুষ্কৃতীদের খোঁজে ওই গুহার মুখ পর্যন্ত পৌঁছে যায়৷ লুকিয়ে-থাকা দুষ্কৃতীদের খুঁজতে গুহার মুখ খুলে ওরা অমন উদ্ভট প্রাচীন যন্ত্র দেখে ভীষণ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়৷ সেই বিমান স্পর্শ করতে গেলেই আটজন আমেরিকান সৈন্য একসঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়ে যায়, যাদের আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি৷ ‘কবচ’ হারিয়ে বিমানটি বিকল হয়ে পড়ে৷’

কয়েক মুহৃর্তের জন্য থেমে একটা সুখটান দিয়ে ভদ্রলোক আবার বলা শুরু করলেন, ‘ঝড়ের গতিতে সেই খবর ছড়িয়ে পড়ে৷ তামাম দুনিয়ার তথাকথিত সভ্য দেশের দেশনায়করা সেই বিমান দর্শনের লোভে ভিড় জমাতে শুরু করেন আফগানিস্তানের দুর্গম পার্বত্য এলাকায়৷ খুব সম্ভবত শেষ পর্যন্ত রাশিয়া বিমানটি সঙ্গে করে নিয়ে যায়৷’

আবার একটা বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক থামলেন৷ কিছুক্ষণ পর বললেন, ‘জার্মান দেশের সংস্কৃতের পণ্ডিতরা এবং হিটলারের অনুগামীরা সনাতন শাস্ত্র ঘেঁটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাচীন বিমান তৈরির জন্য বহু চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি৷ ২০১২ সাল থেকে আজ অব্দি আফগানিস্তানের সেই বিমানের ফোটোকপি এখনও তৈরি হল না৷ সেই আটজন সৈন্য এখনও বেপাত্তা!’

দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘তোর হয়তো মনে হতে পারে এটা গাঁজাখুরি গল্প৷ খবর নিয়ে দেখ, আমি ভুল বলছি কি না৷’

ভদ্রলোক চুপ করে বসে আছেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে৷ কিছুক্ষণ পরে বললেন, ‘বিজ্ঞানের ক্ষমতা নেই নতুন করে কিছু আবিষ্কার করবে৷ প্রাচীন সত্যকে বিজ্ঞানীরা খুঁজে বের করতে পারে মাত্র৷ ১৬৮০ সালে নিউটন সাহেব যখন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি খুঁজে পেলেন, তখন সারা বিশ্বের মানুষ তাঁকে মাথায় করে নাচতে শুরু করেছেন৷ সেই ধারা আজও অব্যাহত৷ স্কুলে আমাদের পড়ানো হচ্ছে গাছ থেকে আপেল পড়ার গল্প৷ অথচ, এই ঘটনার আরও এগারোশো বছর আগে ‘ভাস্করাচার্য দ্বিতীয়’ নামে এক মহান পণ্ডিত ‘গুরুত্ব আকর্ষণশক্তি’ ব্যাখ্যা করে যান৷ যা মাধ্যাকর্ষণেরই ব্যাখ্যা করে থাকে৷ এইসব ইতিহাস আমাদের দেশের স্কুলে কেন পড়ানো হয় না?’

অঘোরী ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ এসবের কোনও ব্যাখ্যা নেই৷ প্রশ্ন করে আমি নিজেই এখন লজ্জিত৷ তবে অনেক কিছু জানা গেল৷ কিছু ক্ষেত্রে জ্ঞানী মানুষদের একটু খুঁচিয়ে দিতে হয়৷ তবে মাত্রাজ্ঞান বজায় রাখতে হয়৷

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘এটা গেল বিজ্ঞানের বিষয়৷ এবারে আসি সাধনার কথায়৷ তুই পিণ্ডারিজি এবং মির্জা সাহেব, দু-জনকেই দেখলি৷ যদি ওঁরা স্বেচ্ছায় না দেখা দিতেন, তুই কি আদৌ ওঁদের দেখতে পারতিস?’

মাথা নিচু করে বসে আছি আমি৷ ভদ্রলোক বলে চলেছেন, ‘মির্জা সাহেবকে একবার দেখার জন্য কত মানুষ সারাজীবন অপেক্ষা করে আছে, জানিস? সকলের চোখের সামনে উনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন অথচ কেউ ওঁকে দেখতে পাচ্ছে না৷ পিণ্ডারিজির একই বিদ্যা আছে৷ মুহৃর্তের মধ্যে উনি সূক্ষ্ম শরীরে যেকোনও জায়গায় পৌঁছে যেতে পারেন৷ বিশিষ্ট হঠযোগী স্বর্গীয় শ্যামাচরণ লাহিড়ী এবং মহাত্মা ত্রৈলঙ্গস্বামীর একই বিদ্যা এবং সিদ্ধিলাভ ছিল৷ এর কোনও ব্যাখ্যা আছে তোর বিজ্ঞানে? তবু সনাতন এমন এক শাস্ত্র যে, বিজ্ঞানকে সম্মান দেয়৷ চাঁদ বা মঙ্গলে মানুষের স্পর্শকে আমরা সাধুবাদ জানাই৷ ব্যক্তিগতভাবে আমার কোনও দ্বrদ্ব নেই এ বিষয়ে, ঈশ্বরের ইচ্ছাই শেষকথা৷’

মিনিটখানেকের বিরতি নিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘মিশরের পিরামিডের কাছে গেলে সময়ের গতি কমে যায়, কৈলাস পর্বতে চড়তে গেলে সময়ের গতি বেড়ে যায়, বিজ্ঞান যে প্রাচীন সময়কে ধরার চেষ্টা করছে... মহর্ষি কাকভূশণ্ডি সেই কাজ অনেক আগে প্রমাণ রেখে গেছেন৷’

বজ্রাসন থেকে উঠে একদৌড়ে কিছুটা গঙ্গাজল খেয়ে এসে বৃদ্ধ অঘোরী বললেন, ‘পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব, মাধ্যাকর্ষণ শক্তি, বিমান তৈরির প্রাচীনতম বিদ্যা, ব্রহ্মাস্ত্রের মতো পারমাণবিক বিদ্যা; এসবেরই সৃষ্টিকর্তা আমরা৷ অথচ নিজেদের গুরুত্ব দিই না এতটুকু, ফল যা হওয়ার তা-ই হয়েছে৷ আমরা এক-একটা অপদার্থ তৈরি হয়েছি৷ নিজেদের আবিষ্কৃত বিজ্ঞানকে আমরা নিজেরাই বিশ্বাস করি না৷ সকল বিজ্ঞান ও বিদ্যার আধার স্বয়ং ঈশ্বরকে বিশ্বাস করি না, এর থেকে বড়ো অবিদ্যা আর কী হতে পারে?’

সন্ন্যাসীবাবা ছিলিমে আগুন ধরিয়েছেন৷ আমি মাথা নিচু করে বসে আছি, যথেষ্ট শিক্ষা হয়েছে৷

এইসময় মনে আরেকটা প্রশ্ন এল, জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আদি যোগী,—কথার মানে কী?’

‘নিজের হাতের মুঠোয় ধরা কল্কেতে একটা মোক্ষম টান মেরে, আমাকে আপাদমস্তক একবার মেপে নিয়ে বললেন, ‘সৃষ্টি হওয়ার আগেও অনাসৃষ্টি ছিল৷ তারও আগে ছিল মহাশূন্য যা, অজ্ঞান বা অবিদ্যা নামে পরিচিত৷ সেই অজ্ঞানের পর্দা সরিয়ে সৃষ্টি স্বয়ং এসে প্রতিষ্ঠা করলেন মহাজাগতিক বোধ এবং ঐশ্বর্যের—যা বিদ্যা বা জ্ঞান নামে পরিচিত৷ সৃষ্টি—নিজেই হলেন আদিযোগী মহেশ্বর৷ উনিই সৃষ্টিকর্তা এবং উনিই সংহারক অর্থাৎ যম, যিনি য়মন করেন৷’

ভদ্রলোক থেমে গেছেন৷ নিজের হাতের কল্কে, ওষ্ঠের উপর চেপে ধরে, শান দিয়ে নিলেন বারকয়েক৷

কিছুক্ষণ সময় নিয়ে বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘সমুদ্র-মন্থনে ওঠা গরল বা বিষ (মতান্তরে ঔষধ বা অমৃত) পান করে ভগবান শিবের বাহ্যিক শরীর উত্তপ্ত হয়ে ওঠে৷ এই অবস্থায় ওঁর নাম—নীলকণ্ঠ৷ উত্তপ্ত শিবলিঙ্গকে শান্ত রাখার জন্য আদিমানব থেকে শুরু করে আজপর্যন্ত সকলেই ওঁকে তৃপ্ত করার চেষ্টা করছেন৷’

হাতের সিগারেটে শেষ টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে আরেকটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলাম, ‘শিবরাত্রির বিশেষত্ব কী বাবাজি?’

অবশিষ্ট হাতের আগুনকে স্পর্ধা জানিয়ে টান মেরে বাবাজি বললেন, ‘যদি মহাসতী’র অপমানের পৌরাণিক কথাকে অস্বীকার করিস, তাহলেও জেনে রাখ, আজকের দিনেই প্রলয় এসেছিল৷ তিনটি প্রধান গুণ—সত্ত্ব, রজ ও তম শিবরাত্রির বিশেষ দিনেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল৷ তন্ত্রের প্রধান চারটি শাখার উৎপত্তি এই দিনেই হয়েছিল যা, পঞ্চম-বেদ নামে পরিচিত৷’

হাতের সিগারেট মাটিতে নামিয়ে আমার কাছ থেকে একটা বিড়ি চেয়ে নিয়ে তাতে সুখটান মেরে বৃদ্ধ মানুষটি বললেন, ‘যদি মহবিশ্বকে ‘একশো’ হিসাবে ধরিস তাহলে— সত্ত্ব, রজ ও তম’র যোগফল ‘তিন’ সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে উত্তর দাঁড়াবে ৩৩.৩৩৩৩৩.. ঠিক তো?’

আমি ঘাড় নেড়ে জবাব দিলাম, ‘একদম ঠিক’৷

খানিকক্ষণ চুপ মেরে বসে থেকে, দাড়ি গোঁফের মাঝে লুকিয়ে রাখা এক-গাল হাসি দিয়ে অমায়িক বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘জেনে রাখিস, দশমিকের পর যে ভগ্নাংশের উত্তর মেলে না বা হিসাব খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটাই সৃষ্টি৷ মানুষ নিজের চামড়ার চোখ দিয়ে ওইটুকুই দেখতে বা বুঝতে পারবে৷ যে তার বেশি বোঝার চেষ্টা করবে সে সংসার ছাড়বে৷’

কথা শেষ হওয়া মাত্র বৃদ্ধ অঘোরী উঠে চলে যাচ্ছিলেন, ফিরে এসে বললেন, ‘কাল সারাদিনে একবারমাত্র খাবার খাবি! সেটা নিরামিষ এবং কোনও মন্দিরের প্রসাদ হলেই ভালো হয়৷ সূর্য ডুবে গেলে অবশ্যই সিদ্ধি খাবি৷ মাথায় রাখিস, এটা কেবল কালকের জন্যই৷’

এই বয়সে ওই মানুষের হেঁটে চলার গতি অসাধারণ! চোখের নিমেষে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন৷

ফিরতি পথে টানা পনেরো মিনিট দৌড়ে আমি ঢুকে পড়েছি মাসিমার বাড়ির সদর দরজা দিয়ে৷ হাজার দুয়েক টাকা, মোটরবাইকের চাবি নিয়ে, সোজা এসে উপস্থিত হয়েছি কালভৈরব মন্দিরের সামনে৷

এই শহরের পথঘাট আমার কাছে একদম নতুন৷ মোবাইলের ম্যাপ না থাকলে ভীষণ অসুবিধায় পড়তাম৷ মন থেকে সমস্ত সংশয় মুছে গেছে৷ সনাতন আধ্যাত্মিকতা কখনও বিজ্ঞান-বিরোধী নয়৷ এ দেশের প্রাচীন পণ্ডিতগণ জাগতিক এবং মহাজগতিক সত্যকে উপলব্ধি করে গেছেন৷ বর্তমান বিজ্ঞান সেই সত্য আবার খুঁজে পাচ্ছে৷ আমাদের মন এবং বিদ্যা আমাদের বশে নেই; কারণ একটাই, নিজেদের বিদ্যা, সংস্কৃতি এবং শক্তিকে আমরা গুরুত্ব দিই না৷ ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস থাকা আর নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখা;একই পরম বস্তু৷

১৬

রবিবারের ভোরবেলা৷ লাইন দিয়ে মহাকাল দর্শন করতে গেলে গোটা একটা দিন কম পড়ে যাবে৷ ঈশ্বর যখন টানেন, তখন উপায় ঠিক নাগালে আসে৷ সম্মিলিত একঝাঁক পূজারির সঙ্গে ভিড়ে মিশে মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশ করেছি৷ বিহারের নামজাদা এক মন্ত্রী এসেছেন, সঙ্গে বিখ্যাত অভিনেতা৷

অপেক্ষারত জনসমুদ্রের মিলিত জয়ধ্বনি এবং তন্ত্রের স্পষ্ট উচ্চারণে আমার শরীর-মন শিহরিত৷ শৃঙ্গাররত মহাকাল পুজো নিচ্ছেন সকলের কাছ থেকে৷ বর্ণবৈষম্যের অনেক ঊর্ধ্বে সনাতন ব্যবস্থা৷ যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, মানুষ নিজের ক্ষতি নিজে করেছে৷

কর্মফলের দোষে যে ক্ষত্রিয় মরা কুকুরের পাছার মাংস ডোমের বাড়ি থেকে চুরি করে খায়, সে ধ্যানের গভীরে গিয়ে গায়ত্রী মন্ত্র খুঁজে পায়, তিনিই স্বয়ং মহর্ষি বিশ্বামিত্র; এই হল সনাতনের ঠিকঠাক ব্যাখ্যা৷ যে মানুষ মগজে ব্রহ্মসূত্র ধারণ করেন, তিনিই ব্রাহ্মণ৷ এর সঙ্গে উপাধির কোনও সম্পর্ক নেই৷ হালফিলে স্বামী বিবেকানন্দর থেকে বড়ো ব্রাহ্মণ কেউ আছে নাকি? পর পর তিন-চারবার শরীর কেঁপে উঠল৷

কাচের শিশিতে প্রসাদ নিয়ে, পেন্নাম ঠুকে বেরিয়ে এসেছি ভিড় ঠেলে৷ অগুনতি মানুষের সমষ্টিগত কোলাহলের শব্দে মুখরিত চারপাশ; জয় মহাকাল৷

বাইক নিয়ে চলে এসেছি রাস্তার উলটোদিকে, মহামৃত্যুঞ্জয় মন্দিরে৷ শিবলিঙ্গ দর্শন এবং পূজা অর্পণের পর মন্দির প্রাঙ্গণে অবস্থিত কূপেশ্বর মহারাজের দরবারে চলে এসেছি৷ পুরোহিতমহাশয়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, এই মন্দিরে শিবলিঙ্গ সাত দিন সাতরকমভাবে সাজানো হয়৷ মন্দিরের পাশেই মহর্ষি ধন্বন্তরির বিখ্যাত কুয়ো থেকে এই জাগ্রত শিবলিঙ্গ উঠেছেন বলে ওঁর নাম কূপেশ্বর মহারাজ৷

এই কুয়ো নিয়ে রহস্যের শেষ নেই৷ স্থানীয় মানুষজন বলেন এই ঘটনা মহাভারত যুগের৷ সর্পরাজ তক্ষক মহর্ষি ধন্বন্তরির পিঠে যখন দংশন করেন, তখন পঞ্চভূতে মিশে যাওয়ার আগে নিজের যাবতীয় বিদ্যা এবং ঔষধাবলি এই কুয়োর মধ্যে নিক্ষেপ করেন৷ সেই থেকে এখনও পর্যন্ত এই জল অমৃতসমান৷ যদিও এই কাহিনির অন্যরকম ব্যাখ্যাও আছে৷

কথিত আছে, নিয়মিত এই জলসেবনে দুরারোগ্য ব্যাধির প্রশমন হয়৷ যৎকিঞ্চিৎ দক্ষিণায় এক গামলা জল নিয়ে চলে এসেছি মাসিমার বাড়ি৷ রিকশাচালক অত্যন্ত ভদ্র এবং বিনয়ী মানুষ৷ ওঁর বাড়ি রামনগর এলাকায়৷ একটিমাত্র কন্যা এখন কলেজে পড়ছে৷

রিকশার ধীর গতির সঙ্গে পাল্লা রেখে বাইক চালিয়ে ফিরে এসে হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছি লাল মেঝেতে৷ কোথায় নেবুতলার বস্তি, আর কোথায় বেনারসের এই বাড়ি৷ মানবজীবনের চাষের জমি সর্বত্র প্রসারিত৷ জানালার বাইরে দক্ষিণমুখী জাহ্নবী৷

এই গঙ্গা ধরে একদিকে হাঁটলে কলকাতা, উলটোদিকে গঙ্গোত্রী হিমবাহ৷ জীবনে একটা সময় আসে, যখন দুটো রাস্তার মধ্যে যেকোনও একটা বেছে নিতে হয়৷ খুব কম সংখ্যক মানুষ আছেন, যাঁরা দু-দিকেই বজায় রাখতে পারেন, তাঁরাই গৃহীযোগী৷

আকাশ মেঘলা৷ স্নান সেরে হাঁটতে বেরিয়েছি, খিদে পেয়েছে বেশ৷ গঙ্গার ধার ধরে সোজা হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ চলে এসেছি৷ ক্লান্তির তাড়নায় বসে পড়েছি৷ ঘণ্টার শব্দ শুনে দৃষ্টি খুলে গেল৷

চোখের সামনে বৃদ্ধ পূজারি প্রাণ ভরে পূজা করছেন মহাদেবের৷ কাঁসর-ঘণ্টা-ঢাকঢোল... কোনও শব্দ বা মানুষের ভিড় নেই এখানে৷ শিবলিঙ্গ এবং পুরোহিত, ভক্তিরসের টানে দু-জনেই মিলেমিশে একাকার৷ পূজারি ঠাকুরমশাই বোধহয় বাহ্যিক জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন৷ চোখ বন্ধ করে আরতি করে চলেছেন, অশ্রুধারা গাল ছাপিয়ে মাটিতে এসে ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে৷ পায়ের গোড়ালি ফেটে রক্ত চুঁইয়ে আলপনা সৃষ্টি করছে৷ তীব্র ভালোবাসায় ব্যথা, যন্ত্রণা থাকে বই কী৷ ব্যথা হল ভালোবাসার অলংকার৷

এই সময় আপনারা যদি আমায় প্রশ্ন করেন, ঈশ্বর কী বা কে? তাহলে উত্তর হবে; ভক্ত যেমন, ঈশ্বর ঠিক তেমন৷ ঈশ্বরের নিজস্ব কোনও আকৃতি নেই, ভক্তের ধারণায় ঈশ্বর শরীর খুঁজে পান৷

যে মানুষ ডাকাতি করে, তার ভগবান ডাকাতকালী নামে পুজো পান৷ যিনি সকল স্ত্রীজাতিকে মাতৃরূপে পূজা করেন, তাঁর ভগবান ভবতারিণী নামে পূজিতা হন৷ সতীপীঠে যিনি শক্তিপূজা করেন, তাঁর ভগবান তারা, হিংলাজ, নলাটেশ্বরী; ইত্যাদি নামে পূজিতা হন৷ আপনি যেমন, আপনার জগৎ এবং ভগবান একই রকম৷ ভিন্ন কোটি মানুষের ভিন্ন কোটি ভগবান, এই সংখ্যা তেত্রিশ কোটি অর্থাৎ তেত্রিশ ধরনের৷ বিভিন্ন প্রকারভেদে আসলে সবাই শক্তিপুজো করে চলেছেন৷

শক্তির বিনাশ নেই৷ সেই এক আদি ও অকৃত্রিম শক্তি৷ ভক্তের আধার ও শক্তি অনুযায়ী ঈশ্বরের নাম পালটে যায়৷ সেই একই যোগ, যোগীর আধার অনুযায়ী যোগশাস্ত্রের নাম পালটে যায়৷ তামাম দুনিয়ায় শক্তি মাত্র একটি৷ সব শক্তি ঈশ্বরের শক্তি৷ আমরা নিমিত্তমাত্র৷

একান্ন সতীপীঠ ছাড়াও ছাব্বিশটি উপপীঠ রয়েছে৷ সিংহবাহিনীর দশমহাবিদ্যা এবং তন্ত্রের প্রধান চারটি শাখা; সব পুজোই শক্তিপুজো৷ জলের ছিটেফোঁটা গায়ে পড়তেই সংবিৎ ফিরে পেলাম৷ কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, খেয়াল নেই৷ পুজোর শান্তিজলের ছিটে এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছে৷ উঠে বসলাম, ভদ্রলোক এখনও পূজা চালিয়ে যাচ্ছেন৷

অমন ভক্তিরসের পুজো আমি এর আগে দেখিনি৷ আরও দশ মিনিট পর বাম হাতের ঘণ্টা থামল৷ পুরোহিতমশাই ভোগের থালা তুলে ধরেছেন ভগবানের সামনে, আকুল মিনতি নিয়ে সাময়িক বিরতি হল৷

পাশে রাখা ঝোলা থেকে প্রভু শ্রীকৃষ্ণ ও শ্রীরাধিকার যুগলমূর্তি বের করলেন তিনি৷ এক টুকরো কাপড়ের আসন পেতে সেই যুগলমূর্তিকে বসালেন অতি নিষ্ঠাভরে৷ আপেল এবং গোটাকয়েক মিছরির দানা ছোট্ট থালায় সাজিয়ে শুরু হল কৃষ্ণভজনা৷ কোথায় যেন শুনেছিলাম, কলিযুগে নামসংকীর্তনের মাহাত্ম্য সব থেকে বেশি৷

অবশেষে পুজো শেষ হল৷ যুগলমূর্তি স্থান পরিবর্তন করে আবার ঝোলার মধ্যে ঢুকে গেল৷ এতক্ষণ আড়ালে দাঁড়িয়ে পুজো দেখছিলাম, এবার সামনে এসে বললাম, ‘ভগবান শিবের জন্য খিচুড়ি আর প্রভু শ্রীকৃষ্ণর জন্য ফল কেন?’

ভদ্রলোক আমায় দেখে চমকে উঠেছেন৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, ‘ভগবান শিবের একজন পাকাপোক্ত যজমান আছেন, যিনি মাস গেলে আমাকে দু-হাজার টাকা করে দেন এই নিত্যপূজার জন্য৷ মহাদেবের ভোগ তাঁরই দেওয়া৷ ব্যাগের মধ্যে যে যুগলমূর্তি দেখলেন, ওই মূর্তি আমার বাবার দেওয়া৷ আমি দীনদরিদ্র ব্রাহ্মণসন্তান৷ অভাবের জন্য বিয়ে করিনি, মাসে দু-হাজার টাকায় আমার চলে যায়৷ থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা প্রভু জুটিয়ে দিয়েছেন৷ ওই টাকায় টুকরো ফল ব্যতীত আর কিছু জোগাড় হয় না৷’

পুরোহিত মহাশয়ের পাশে মাটিতে বসে দু-হাত পেতে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমার ভীষণ খিদে পেয়েছে, বিশ্বাস করুন, সকাল থেকে কিছু খাইনি৷ এই প্রসাদ আমি পেতে পারি?’

‘অবশ্যই৷ দাঁড়ান, আমার কাছে ব্যাগে শালপাতা রাখা আছে৷ খিচুড়ি, তরকারি, পায়েস সবকিছু খেয়ে পেট ভরে গেল৷ আমার খাওয়া শেষ হওয়া পর্যন্ত ঠাকুরমশাই ঠায় বসে রইলেন৷ গঙ্গায় হাত ধুয়ে দক্ষিণা দিতে গেলে ভদ্রলোক লম্বা জিভ বের করে বললেন, ‘করছেন কী মশাই! দুটো অন্নভোগ খাইয়ে পয়সা নেব? অতগুলো টাকা নিয়ে আমি করব কী? আমায় একটা টাকা দিন, তাহলেই যথেষ্ট৷’

ভদ্রলোকের নাম-ঠিকানা নিয়েছি, সত্যিই যদি কোনওদিন আমার হাতে অর্থ আসে, এই মানুষের অভাব আমি ঘুচিয়ে দেব৷ জীবপুজো আর ঈশ্বরপুজো; একই পরম বিদ্যা৷ ঈশ্বরপূজা করতে গেলে মন অহংকারহীন হতে হয়৷ কর্ম, নিষ্ঠা, সাধনা, দান এবং সম্প্রদানের মাধ্যমে মানুষের অহংকার নাশ হয়৷

শবদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় পয়সা এবং খাওয়ার জিনিস ছড়ানো হয়, বিভিন্ন পূজা এবং সামাজিক সংস্কারের পর দরিদ্রনারায়ণ সেবা বা বালকভোজন করানো হয় একই কারণে৷ পরিশ্রম দ্বারা অর্জিত পয়সা যখন মানুষ দান করেন, তখন অহংকার খর্ব হয়৷ তীর্থে বা মন্দিরে দান এবং কন্যাসম্প্রদান; এক জিনিস নয়৷ দানের প্রকারভেদ আছে৷ অহংকারের মোটা পরদা যত পাতলা হবে, ততই মানুষ নিজের কাছে স্বচ্ছ হয়ে উঠবে, আত্মজ্ঞান লাভ করবে৷

কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কী ভেবে আমি আবার ফিরে এসে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ঠাকুরমশাই, আমি আপনার দুপুরের খাবার খেয়ে ফেললাম না তো?’

ভদ্রলোক হাসছেন৷ অমায়িক হাসি৷ এই হাসির অর্থ আমি জানি৷ একসময় আধপেটা খেয়ে জীবন আমিও কাটিয়েছি৷ পৃথিবীর সমস্ত হতভাগ্যের হাসি একই রকম দেখতে হয়, কেন কে জানে! নিজের ঝোলা থেকে একটা আপেল আর কলা বের করে দেখিয়ে বললেন, ‘ভগবান শিবের প্রসাদ আপনি পেলেন, আমি রাধাকৃষ্ণর প্রসাদ গ্রহণ করব৷’

এখন সময় বেলা দেড়টা৷ গতকালের আলাপ-হওয়া বৃদ্ধ অঘোরীর দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছোতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগল৷ জায়গা মোটেই সুবিধার নয়৷ অলিগলি-পাকস্থলী ছাপিয়ে পৌঁছে গিয়েছি মাঝবয়সি এক মহিলার আস্তানায়৷ এই বাড়ির ভগ্নপ্রায় দশা, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে হয়তো এর সাবেকিয়ানা বজায় ছিল৷ অত বড়ো বাড়িতে মা আর মেয়ে থাকেন, পুরুষের চিহ্নমাত্র নেই৷ ভদ্রমহিলার বয়স আন্দাজ পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন হবে, কন্যার বয়স ত্রিশের কাছাকাছি৷

এক গ্লাস জল খেয়ে বললাম, ‘নমস্কার৷ আমার নাম অভিজিৎ শাক্য ভট্টাচার্য, নিবাস কলকাতা৷ গতকাল রাত্রে হরিশ্চন্দ্র ঘাটে এক বৃদ্ধ অঘোরীর সঙ্গে আলাপ হয়৷ ওঁর পরামর্শ অনুযায়ী আমার স্বপ্ন এবং পিতৃদোষ কাটাতে আপনার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি৷’

বিচলিত অবস্থায় ভদ্রমহিলা বললেন, ‘আমি কী-ই বা করতে পারি? বাড়ির অবস্থা দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আর্থিক দিক থেকে আমি ভালো নেই৷’

‘অর্থ চাইছি না, একটু মাটি আর এক টুকরো কাপড় চাই৷’

ভদ্রমহিলা তাজ্জব বনে গেছেন৷ সত্যি বলতে কী, এই বিষয়ে আমার নিজেরও কোনও আন্দাজ নেই৷ কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, ‘আমি যা কাজ করি, তাতে বছরে একদিন একটু গঙ্গামাটির প্রয়োজন হয় বটে৷’

এক মুহৃর্ত থেমে এক ঢোঁক জল খেয়ে ভদ্রমহিলা বললেন, ‘বছরে দু-একটা দিন নতুন কাপড় আমাকে পরতে হয়৷ পরের বছর সেই দিনগুলো সকালবেলায় গত বছরের কাপড় গঙ্গায় বিসর্জন দিতে হয়৷ আপনি আমার ঠিকানা কী করে পেলেন, সত্যি বলুন তো?’

থিতু হয়ে বসে বললাম, ‘যে বৃদ্ধ অঘোরী আপনার ঠিকানা আমায় দিয়েছেন, তাঁর ডান হাতের কড়ে আঙুল নেই৷ উচ্চতায় ছয় ফুটের বেশি, বয়স আন্দাজ করা সত্যিই ভীষণ মুশকিল৷ ওঁর নাম আমি জানি না, খুব সম্ভবত ওঁর কোনও নাম নেই৷’

ভদ্রমহিলা উঠে দাঁড়িয়েছেন, প্রায় দৌড়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেলেন৷ একটা কাঁসার বাটিতে কিছুটা মাটি আর লাল কাপড়ের টুকরো নিয়ে ফিরলেন মিনিট দশকের মধ্যেই৷

‘চা খাবেন?’

‘অন্য কোনওদিন৷’

একটা কাপড়ের ব্যাগে সবকিছু ভরে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ‘আপনার পরম সৌভাগ্য, ওঁর দর্শন পেয়েছেন৷ ঘোর বিপদের দিনে উনি বাঁচিয়েছিলেন আমায়৷ দীক্ষা নিতে চেয়েছিলাম ওঁর কাছে, দেননি৷ বলেছিলেন, এখনও সময় হয়নি৷’

ভদ্রমহিলার চোখে জল৷ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে আমি বললাম, ‘যদি একান্তই কিছু মনে না করেন, আপনার পরিচয় জানতে পারি?’

‘আমি উর্বশী৷ আমার মাতৃবংশের পনেরোতম নারী আমি যে, দেবসেবার কাজ করে চলেছি গোপনে৷ মা, দিদিমা সবাই এই কাজ করেছেন৷ ভারতীয় ইতিহাস, আমাদের দেবদাসী আখ্যা দিয়েছে৷ বেনারসের বাইরে এখনও তিনটে প্রাচীন গুপ্ত মন্দির এমন আছে, যেখানে বছরে চার দিন দেবদাসী সম্প্রদায় স্বেচ্ছায় পরমেশ্বরের মনোরঞ্জন করে থাকেন৷ আমি নিজের ইচ্ছায় এই কাজ করি, কোনও বাধ্যবাধকতা নেই৷ আমার মেয়ের ইচ্ছা নয় এই কাজ করার; ও বেসরকারি হাসপাতালে নার্সের চাকরি করে৷ আমার বংশে খুব সম্ভবত আমিই শেষ প্রজন্ম৷ বছরের বাকি সময় আমি নাচ শেখাই বাচ্চাদের, চলে যায় মোটামুটি৷ এই শহরের কয়েকজন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী ছাড়া আমার এই পরিচয় কেউ জানে না৷ আশা রাখি, এই সত্যতার গোপনীয়তা আপনি বজায় রাখবেন৷’

ঘাড় নেড়ে বললাম, ‘আচ্ছা, চলি৷ পরে আসব আবার৷ কিছু প্রশ্ন রয়ে গেল৷ আজ সময় নেই৷’

‘সাবধানে যাবেন৷ ওই মাটি যেন আপনি ছাড়া অপর কাররও শরীর স্পর্শ না করে৷ কাজ হয়ে গেলে বাকি অংশ গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন৷ হর হর মহাদেব৷’

‘জয় ভোলেনাথ৷’

বিচিত্র মানুষ এবং বৈচিত্র্যময় মানুষের জীবন৷ একটা গোটা দিনে আর কত অভিজ্ঞতা হওয়া বাকি আছে, কে জানে৷ ভদ্রমহিলার ঠিকানা আমার কপালে লেখা থাকবে আমৃত্যু৷ সমস্ত কাজকর্ম ভালোভাবে মিটে যাক, আবার আসব আমি ওঁর বাড়ি৷ মনের কোণে গচ্ছিত একগাদা প্রশ্ন আমৃত্যু শান্তিতে থাকতে দেবে না৷

দুপুর পেরিয়ে বিকেল, সূর্য পশ্চিম আকাশে৷ নক্ষত্রখচিত সপ্তর্ষিমণ্ডল এবং ধ্রুবতারা যথাস্থানে বিচরণ করছে৷ বহুকাল নেশা করিনি, আজ নিজেকে নেশায় মিশিয়ে দেওয়ার দিন৷

বেনারসে নেশার সবরকম উপকরণ পাবেন৷ পরপর দু-গ্লাস সিদ্ধি, নেশা জেগে ওঠার আগে বাইক সমেত মাসিমার গৃহে প্রত্যাবর্তন৷

বাইক রেখে সরু গলি পথ বেয়ে আমি হাঁটছি, উদ্দেশ্য মণিকর্ণিকা ঘাটের দিকে৷ দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে, হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়েছি, এটা সেই গাঁজার ঠেক৷ আঙুল-কাটা বাবাজির মতো পরপর তিনবার টোকা মারলাম৷ কাচের চুড়ি সমেত এক মহিলার হাত বেরিয়ে এল কলকে সমেত৷

‘কিতনা?’

‘বিস রুপয়৷’

উড়োজাহাজ মাটি ছেড়েছে, অনেকক্ষণ হল৷ আকাশপথে নিজের আস্তানা খুঁজে বেড়াচ্ছে সে, দিগভ্রান্ত এরোপ্লেনের মতো কোন রাস্তা ধরে কোথায় চলেছি, ভগবান জানেন৷

সমস্ত জ্বালাযন্ত্রণা, স্বপ্ন সবকিছু ছাপিয়ে আমি এখন তুরীয় অবস্থায় ভেসে বেড়াচ্ছি৷ একটা কথাই মনে আছে, ডান পকেটে বাবা মহাকালের কারণ আর গঙ্গামাটি৷ বাম পকেটে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্দিরের কুয়োর পানি এবং লাল কাপড়৷ কতক্ষণ ধরে হাঁটছি, তার ইয়ত্তা নেই৷ অনেক কষ্টে কোনওরকমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একজন ট্রাফিক পুলিশকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘হমকো মণিকর্ণিকা জানা হ্যায়, ক্যায়সে জায়ে?’

ভদ্রলোক আপ্রাণ চেষ্টা করলেন বোঝানোর, বৃথা চেষ্টা৷ সজ্ঞানে নেই, এখন বিজ্ঞানে আছি৷ কিছুক্ষণ পর ব্যস্ত চৌমাথা খুঁজে পেলাম৷ বলা ভালো, চৌমাথা আমায় খুঁজে পেল৷

হুঁ বুঝেছি! এটা গোধূলিয়া মোড়৷ এখনও কিছুটা হাওয়ায় উড়তে হবে৷ জিলিপির প্যাঁচের মতো অসংখ্য গলিপথ ছড়িয়ে আছে এখানে৷ অর্ধেক চোখ খোলা অবস্থায় কোথায় যাচ্ছি, জানি না৷ বহু প্রাচীন একটা ছোট্ট মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়েছি৷ অদ্ভুত শান্ত লোকালয়, বন্ধ মন্দিরের লোহার গ্রিল গেটের বাইরে হাঁটু মুড়ে বসে এক ভদ্রলোক দু-হাত জড়ো করে কাঁদছেন৷ দেওয়ালে ভর দিয়ে অনেকক্ষণ সেই মানুষের কান্না দেখলাম৷ মৃতপ্রায় সন্তানের প্রাণভিক্ষা করছেন একজন বাবা, নেশাগ্রস্ত হৃদয়ে প্রশ্ন উঠল, ভগবান কি আদৌ কোনও প্রার্থনা শুনতে পান?

সমস্ত মোহমায়া সরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নামই হল জীবন৷ কোন রাস্তা দিয়ে জানি না, শেষ পর্যন্ত পৌঁছোলাম মণিকর্ণিকায়৷ চোখের সামনে নরম বিছানায় পরপর শুয়ে আছে, আপনার—আমার সবার অবশ্যম্ভাবী ভবিষ্যৎ;জ্বলন্ত চিতা৷

দু-জন মুখ-ঢাকা মানুষ দু-হাতে বাঁশ নিয়ে একটা অর্ধজ্বলন্ত চিতাকে গুছিয়ে মারছে৷ সে হয়তো ভুলে উঠে বসেছিল৷ মেরে আবার শুইয়ে দেওয়ার তোড়জোড়৷

হাতের ঘড়িতে কিছুতেই সময় দেখতে পারছি না, সব ঝাপসা! পাশেই এক জায়গায় চিতার থেকে এক টুকরো আগুন ধার করে রান্নার আয়োজন করা হয়েছে৷ ছাঁকা তেলে মাছ ভাজা হচ্ছে সেখানে৷ গনগনে আগুন, তার ওপর বসানো লোহার কড়াই৷ পাপপুণ্যের সমস্ত হিসাব এখানেই হবে, মাছ থেকে শুরু করে মানুষ, কেউ বাদ যাবে না৷ বড্ড নেশা হয়ে গেছে৷

এমন সময় কানে ডমরুর শব্দ এল৷ শ্মশান মহাদেবের অর্থাৎ ডোম রাজার অঘোরতন্ত্রের পুজো শুরু হয়েছে৷

প্রথমে একটি, তারপর দুটি, তারপর চারটি, ছয়টি, আটটি, বারোটি এবং ক্রমশ অসংখ্য ডমরুর শব্দনাদ আমার কানের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে৷ শরীর নাচতে শুরু করল৷ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ এবং শ্মশানের সবাই নাচছে আমার সঙ্গে৷

ঘর্মাক্ত অবস্থায় ক্লান্ত হয়ে পড়ছি অথচ নাচের বিরাম নেই৷ অজস্র ভিড় ঠেলে মন্দিরের গর্ভগৃহের কাছাকাছি পৌঁছোতে পেরেছি৷ ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি, একসঙ্গে প্রায় পনেরো-ষোলোজন অঘোরী চিতাভস্ম মেখে একসঙ্গে নাচছেন৷ একজন বৃদ্ধ অঘোরী আরতি করছেন৷ আমার এই শরীর আরও নেশা চাইছে৷

হাত পেতে দিলাম সামনে দাঁড়ানো নির্বস্ত্র সন্ন্যাসীর কাছে, উনি নিজের জ্বলন্ত কলকে আমার হাতে দিলেন, পরপর তিন টান দিলাম, যতটুকু যা কিছু ঝাপসা ছিল, চোখের সামনে সব পরিষ্কার হয়ে গেল৷ সম্পূর্ণ জাগ্রত অবস্থায় স্বপ্নের সেই মন্দিরের অবয়ব দেখলাম৷ যে মন্দির বারংবার এসে স্বপ্নে বিব্রত করে, সেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের শারীরিক কাঠামো আলাদা হতে পারে, তবে নয় সুতোর পইতের ধারক আমিই বটে৷

প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার চরম মুহৃর্তে কেউ একজন চুলের মুঠি ধরে টেনে নিয়ে এলেন৷ ঘুরিয়ে এক ঘুসি মারতে যাব এমন সময় দেখি স্বয়ং সেই অঘোরী৷

চুলের মুঠি ছেড়ে আমার হাত ধরে টানতে শুরু করেছেন গত রাতের হরিশ্চন্দ্র ঘাটের চার আঙুলের সন্ন্যাসী৷ কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, কিচ্ছু বুঝতে পারছি না৷ এটা খুব সম্ভবত মণিকর্ণিকা শ্মশানের পিছনদিকের অন্ধকার অংশ৷ অঘোরীর টানাটানিতে কিছুটা নেশা ছুটেছে৷

মড়া পোড়ানোর একটা ফাঁকা খাট দেখিয়ে বললেন, ‘এতে চুপচাপ বসে থাক৷ মহাকাল এবং মহামৃত্যুঞ্জয় মন্দিরের পানীয় গলায় ঢেলে দে একসঙ্গে৷ সঙ্গে গাঁজা আছে?’

কথা বলার শক্তি নেই, মাথা নেড়ে জবাব দিলাম৷

আমার হাতে একটা ছিলিম ধরিয়ে বললেন, ‘এখন সময় রাত সওয়া এগারোটা৷ বারোটার সময় আমি আসছি৷ ততক্ষণ তুই এখানেই থাকবি৷’

ভদ্রলোক না বললেও আমি এখানেই বসে থাকতাম৷ উঠে যাওয়ার মতো শক্তি নেই৷ বহমান গঙ্গা আর ফুরিয়ে-যাওয়া সময়ের হিসাব রাখতে কেউ কোনওদিন পারেনি৷ দূরে কোথা থেকে যেন বৃদ্ধ মানুষের ভাঙা সুরের গান ভেসে আসছে৷

রাত বারোটার পর মণিকর্ণিকার চরিত্র পালটে যায়৷ ঝাপসা চোখে তেমন কিছুই দেখতে পাচ্ছি না, অনুভব করছি, কিছু অশরীরী আমার আশপাশে ঘুরঘুর করছেন৷ শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শিহরনের ঢেউ, সঙ্গে উৎকট গন্ধ৷ এক ঝটকায় সবকিছু সাফ হয়ে গেল;বুঝলাম, অঘোরী এসেছেন৷ হাতে সাদা কাগজ৷

আমার মাথায় হাত বুলিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘চোখে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে?’

‘না৷’

‘এইবার দেখ তো!’... ভদ্রলোক জল ঢেলে চলেছেন অনবরত আমার মাথায়, কর্পূরের গন্ধ পাচ্ছি! অবাক কাণ্ড! দৃষ্টি স্বচ্ছ হয়ে এল ক্রমশ৷ গোটা শরীর ভিজে জবজবে৷

এ সময় উনি আদেশ করলেন, ‘হাতের ঘড়ি আর পইতে খুলে ফেলে দে৷’

‘ওই টাইমপিস মায়ের স্মৃতি, ফেলা যাবে না৷’

‘এত ঠুনকো তোর ভালোবাসা! স্মৃতি নিয়ে বাঁচতে হবে? সমস্ত বিত্তবাসনা থেকে নিজেকে মুক্ত কর হারামজাদা৷’

টান মেরে ঘড়ি, পইতে ছুড়ে ফেলে দিলাম৷ বন্ধনমুক্ত মনে হচ্ছে নিজেকে৷

এদিকে লোকজন নেই৷ আমার মুখের সামনে এসে বসলেন বৃদ্ধ সন্ন্যাসী৷ চোখের দিকে সোজা তাকিয়ে বললেন, ‘এখন যে ক্রিয়া করব, সচরাচর সেটা কেউ করে না, এক্ষেত্রে নিরুপায়৷ তোর নাকে হয়তো উৎকট বাজে গন্ধ ধাক্কা দেবে, চোখের সামনে বীভৎস কিছু হয়তো আসবে, অদৃশ্য কেউ হয়তো তোকে মৃদু ধাক্কা দেবে; ভয় পাবি না একদম, জায়গা ছেড়ে নড়ার কোনও প্রশ্নই নেই৷ আসন থেকে উঠে গেলে ক্ষতি হতে পারে৷ গঙ্গামাটি মেখে নে, লাল কাপড়ের টুকরো ডান কানে গুঁজে দে, শরীরের নিম্নভাগে কোনও তাবিজ থাকলে গঙ্গায় ভাসিয়ে দে৷’

গলার বিপত্তারিণীর মাদুলি খুলে কোনওরকমে হামাগুড়ি দিয়ে গঙ্গা অব্দি পৌঁছে স্নান সেরে নিম্নাঙ্গে মরা মানুষের সাদা কাপড় জড়িয়ে এসে বসলাম৷ দেবদাসীর দেওয়া গঙ্গামাটি নাভি আর কপালে মেখে নিয়েছি৷ অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে আছি৷ জগৎময় শ্মশান অথবা শ্মশানময় জগৎ, নিত্য-অনিত্য... সত্য-অসত্য... এই পৃথিবীর শেষ নির্যাসটুকু অবগাহন করতে হলে, এই শরীর বাঁচিয়ে রাখতে হবে৷

জীবন এবং জীবনদর্শন একসঙ্গে চলে৷ উচ্চকোটির কিছু মানুষের কাছে, জীবনের থেকেও জীবনদর্শনের অনেক বেশি গুরুত্ব৷ হুঁশ ফিরে পেলাম ভারী গলার হাত ধরে৷

অঘোরী জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্রস্তুত?’

ঘাড় নাড়িয়ে সম্মতি জানাতে, বৃদ্ধ অঘোরী হাতের ইশারায় অদৃশ্য কাউকে আমন্ত্রণ জানালেন৷ হাতের কাগজ নামিয়ে রাখলেন পাশের ফাঁকা জায়গায়৷ আমার দিকে বক্রদৃষ্টিতে দেখে বললেন, ‘চোখ বন্ধ রাখবি, যতক্ষণ না আমি বলছি, চোখ খুললেই অকালমৃত্যু৷’

মৃত্যুর ভয় অনেকটাই কেটে গেছে৷ রাজ্য লটারি টিকিটের মতো আমার জীবন, যেকোনও মুহৃর্তে আবার হয়তো কর্পূরের মতো উবে যাবে৷ চারপাশ ভালো করে দেখে নিয়ে চোখ বন্ধ করলাম, যদি আর কোনওদিন চোখ না খোলে?

একঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে বুকে ধাক্কা মারল৷ প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ অঘোরীর মন্ত্র উচ্চারণ কানে এল;

‘শিবসি শ্রাদ্ধকুদ্যস্ত কুলানাং শতমুদ্ধরেৎ৷

গয়াশিরমসি যঃ পিগান যেষাং নান৷ তু নির্বপেৎ৷

নরকন্থঊ দিবং যান্তি স্বর্স্থা মোক্ষমাগুয়াৎ৷৷

গত্থা বণি>যাশীর্ষে প্রেতরাঁজন্য পিগুকং৷

গ্রদদেগ্ধ মনুজৈঃ সার্দং স্বপিতৃভাত্ততে৷ দদৌ৷

পেঙাঃ প্রেতত্বনিমুর্ণ বণিক চ গৃহমাগতঃ৷

পপ্রতবাজঃ সহ প্রেতৈর্গয়াশ্রাদ্ধাদ্দিবং গতঃ৷

গযাযং সর্ধবকালেষু পিং দদ্যাবিচক্ষণঃ

অধিগাসে জন্মদিনে চাতহুেপি গুরুতুক্রয়োঃ৷

ন ত্যক্তব্যং গয়াশ্রাদ্ধং সিংসেস্থহপি বৃহস্পতো৷

৩থা দৈবগ্রমোদন প্রবহহ বৃণেষুচ৷

পুতঃ কর্মাধিকারী চ শ্রাদ্বকৃদ্বক্ষলৌকভাক৷

মীমে মেষে স্থিতে স্থৃষ্যে কমা৷য়াং কার্শা কে ঘটে৷ ৷৷’

শরীরের প্রতিটা রোমকূপে কাঁপুনি ধরেছে৷ কানের একদম কাছে এসে কেউ একজন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে৷ বহু মাস পর সেই পুরোনো গন্ধ আবার নাকে এসেছে, যে গন্ধ আমি মর্গে পেয়েছিলাম; পচা মানুষের গন্ধ৷

শরীর ক্রমশ এলিয়ে পড়ছে বিছানায়৷ আমি জানি, এই বিছানায় হয়তো কিছুক্ষণ আগেই কোনও মৃত শরীর এসেছে৷ একের পর এক গতীয়মান স্বপ্ন আসছে৷ জীবনবাবু, পিণ্ডারিজি, মির্জা সাহেব, লতাদিদি, দেবদাসী এবং সামনে ক্রিয়ারত স্বয়ং তিনি৷

বহমান জাহ্নবী, এক নগ্ন সাধু এবং আমি৷ বরফে ঢাকা সেই রাস্তা এবং অর্ধভগ্ন সেই সুপ্রাচীন মন্দির৷ এতকাল পর পুরোহিতকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে, জীবনবাবু ঠিকই বলতেন, নিজেকে চিনতে সব থেকে বেশি সময় লাগে৷

স্বপ্নের মধ্যে বৃদ্ধ অঘোরীর ভারী গলার শব্দ শুনতে পাচ্ছি; ‘মন্দির দেখতে পাচ্ছিস?’

‘হুঁ৷’

‘যেমনটা দেখছিস, ঠিক তেমনটা বল৷’

‘ছোটো ছোটো তিনটি মন্দির৷ বেশির ভাগই অর্ধভগ্ন৷ পাথরের ওপর পাথর বসিয়ে মন্দির তৈরি করা হয়েছে৷ যে মন্দিরে দাঁড়িয়ে আমি এই সময় পুজো করছি, তার গম্বুজাকৃতির চুড়ো যেকোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে৷ মন্দিরের ভিতর উগ্রকালীমূর্তি, লম্বায় প্রায় সাত ফুট৷ কালী মন্দিরের ডানদিকে মহাদেবের মন্দির, বামদিকে আরও একটা মন্দির, এখানে অনেক ছোটো ছোটো মূর্তি রাখা আছে৷ গণেশ, সরস্বতী, লক্ষ্মী এবং... আরও একটা মূর্তি৷ এই মন্দিরের গেট বন্ধ, বাইরে থেকে দেখতে পাচ্ছি এক দেবীমূর্তি অথচ মুণ্ডহীন৷ আমার বড্ড শরীর খারাপ লাগছে... পাশ দিয়ে একটা নদী বয়ে যাচ্ছে... সেই নদীর জলের রং লাল... আমি আর পারছি না... প্লিজ ছেড়ে দিন... মুণ্ডহীন অবস্থায় পড়ে আছি নদীর ধারে... হাতের মুঠোয় ধরা একটি পঞ্চপ্রদীপ...’

খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠেছি, ‘ছেড়ে দে আমায়৷ নিম্নাঙ্গে জড়ানো কাপড় খুলে গেছে, শরীর জুড়ে কাঁপুনি৷ গোটা দেহে কেউ যেন আলপিন ফুটিয়ে দিচ্ছে৷’

বৃদ্ধ অঘোরী বললেন, ‘চোখ খোল হতভাগা৷’

শরীর ঘেমে গেছে, মরা মানুষের বিছানার বালিশে মাথা দিয়ে নিজেকে জ্যান্ত অবস্থায় আবিষ্কার করলাম৷ কোনওরকমে মাথা তুলে দেখলাম, পুবের আকাশ রাঙিয়ে তিনি ঘুম ভেঙে উঠছেন৷ বৃদ্ধ অঘোরী হাতে কাগজ নিয়ে গঙ্গার দিকে দু-হাত তুলে বদ্ধ উন্মাদের মতো হাহা শব্দে হাসছেন৷

আমার হাতে সেই কাগজ ধরিয়ে দিয়ে, লম্বা দৌড়ে সিঁড়ির ধাপ অতিক্রম করে এক ঝাঁপে গঙ্গায় গিয়ে মিলিয়ে গেলেন৷

গঙ্গার থেকে চোখ ফিরিয়ে আমার দৃষ্টি আটকে গেছে গত রাতের সেই সাদা কাগজে৷ কাগজ আর সাদা নেই অবশ্য, দক্ষ হাতে কেউ একজন একটা ভাঙা মন্দিরের ছবি এঁকেছেন, স্বপ্নে এই মন্দিরের ছবি দেখেই আমি ঘর ছেড়েছিলাম৷

নগ্ন শরীর ভরতি কালো তিল আর গঙ্গামাটি৷ একদৌড়ে, নৌকার ওপর ভল্ট খেয়ে গঙ্গায় ঝাঁপ দিলাম আমিও৷ অনেকটা জলের তলা থেকে যখন নিজেকে ওপরে টেনে তুলছি, তখন ছেলেবেলার সেই বন্ধুর কথা মনে পড়ল, জলে ডুবে যাওয়ার মুহৃর্তে বাঁচাতে পারিনি৷ সাঁতার না জেনে জলে নামা কখনওই উচিত নয়, দোষ তার, সব জায়গায় নিজেকে দায়ী করার কোনও মানেই হয় না৷

অনেকক্ষণ সাঁতার কেটে, গঙ্গায় ভেসে-যাওয়া মড়ার বিছানার রঙিন চাদর জড়িয়ে খালি গায়ে হেঁটে ফিরছি গন্তব্যে৷ জামা-প্যান্ট, জুতো, বেল্ট, পইতে সব গেছে৷ অক্ষত অবস্থায় বেঁচে আছে দুটো জিনিস৷ এই শরীর এবং হাতে ধরা সেই একফালি কাগজ৷ ঠিকে প্রজার মতো বাড়ি ফিরছি, যার মালিক অন্য কেউ৷

১৭

মাসিমার বাড়ির ছাদে মুখ গুঁজে বসে আছি অনেকক্ষণ৷ ঘোলাটে আকাশে ধোঁয়ার গন্ধ৷ নেশার ঘোর এখনও ছিটেফোঁটা বেঁচে আছে৷

সামনে পেতে-রাখা সাদা কাগজের ওপর সেই মন্দিরের ছবি৷ নিখুঁত স্কেচ, স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে কিছুমাত্র তফাত নেই৷

মানুষ স্বপ্নে ঈশ্বরের নির্দেশ পান, কিছু মানুষ স্বপ্নে অর্শ, হাঁপানি ইত্যাদির ওষুধ পেয়ে থাকেন, বিশ্ববরেণ্য গণিতজ্ঞ রামানুজন স্বপ্নে গণিতের ফর্মুলা পর্যন্ত পেয়েছিলেন, আমি পেয়েছি একটা গোটা ছবি৷ মাথায় দুর্দান্ত আইডিয়া এসেছে!

সামনে পড়ে-থাকা ছবিটি স্ক্যান করে গুগলে সার্চ অপশনে দিয়েছি৷ নিমেষের মধ্যে একের পর এক ছবি স্ক্রিনে ভেসে উঠছে৷ অতগুলো মন্দির একসঙ্গে দেখে গুলিয়ে গেছে৷ একই ধাঁচের মন্দির বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত, আমার স্বপ্নের সঙ্গে মেলে এমন মন্দির অনেক আছে এই দেশে৷ এমতাবস্থায় বাইক নিয়ে গোটা দেশ ঘুরে বেড়ানো অসম্ভব৷

ছবি হাতে নিয়ে শুরু হল খোঁজ৷ যুবা, বৃদ্ধ, অতিবৃদ্ধ সন্ন্যাসীদের কাছে ঘুরে চলেছি, আজ কয়েকদিন হল৷ উত্তরকাশী, গঙ্গোত্রী, নর্মদা, বাগেশ্বর... এমন বেশ কিছু নাম সাধুসমাজে ঘোরাফেরা করছে৷

ছবি অনুযায়ী মন্দিরটি অবস্থিত ঘন পাহাড়ি জঙ্গলের মাঝখানে৷ ইতিমধ্যে সময় কেটে গেছে জলের মতো৷ শ্মশানের ওই ঘটনার পর মন বিক্ষিপ্ত৷

আজ লক্ষ্মীপুজো৷ এই কদিন রোজ একবার করে মণিকর্ণিকা ঘাটে গিয়েছি৷ অনামী সেই বৃদ্ধ অঘোরীকে আর খুঁজে পাইনি তারপর থেকে৷ এখন রাত পৌনে বারোটা, সিগারেট হাতে বসে আছি রাজা হরিশ্চন্দ্র ঘাটে৷ শান্ত শ্মশান, অশান্ত মন, ক্লান্ত শরীর৷

দীর্ঘ কয়েক মাস অনবরত সাধুসঙ্গ করে মন্দ লাগছে না৷ অন্যরকমভাবে বেঁচে থাকার মধ্যে কষ্ট কম, সংসারের ঝামেলা নেই, যাহোক একটা খেলেই হল, চাহিদা কম থাকায় জীবন ঠিক কেটে যায় নিজের মতো করে, আমরা হেদিয়ে মরি৷

মানুষ একটা গোটা জীবনের সত্তর শতাংশ সময় উপার্জনের জন্য দৌড়ে মরে৷ অতঃপর, সেই সঞ্চিত অর্থ রেখে দিয়ে কেটে পড়ে৷ ভোগ করে অপর কেউ৷ আমরা সবাই ভাড়াটে, জমির মালিক একজনই৷

রাত বারোটা, হাতের সিগারেট ফেলে চুপচাপ বসে আছি৷ পকেট থেকে আশরফি বের করে হাতে ঘষে নিয়ে আবার ঢুকিয়ে রেখেছি৷ অদ্ভুত মন-কেমন-করা চন্দনের গন্ধ৷

মৃত মানুষের চামড়া পোড়ার গন্ধ, বাতাসে মিশে-থাকা ধূপধুনোর গন্ধ, নিঃশব্দে বয়ে-যাওয়া গঙ্গাজলের শব্দ এবং গন্ধ... সব মিলেমিশে একাকার৷

উঠতে যাব, পিঠে স্পর্শ পেয়ে আবার বসে পড়েছি৷ হন্যে হয়ে যাকে খুঁজছি, তাঁর দেখা পেলাম শেষ পর্যন্ত৷ অনেক কিছু বলার আছে, ভাষা হারিয়ে ফেলেছি৷

বৃদ্ধ সন্ন্যাসী বললেন, ‘শুনলাম, তুই আমায় খুঁজছিস! ছবি হাতে পাওয়ার পরে মন্দির খুঁজে পেলি?’

‘উহুঁ, পাইনি৷’

‘হুঁ... যে মন্দির সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে, তার খোঁজ পাওয়া মুশকিল৷ সেই মন্দির ছিল, এখন আর নেই৷’

‘তাহলে উপায়?’

‘আছে, উপায় আছে৷ গত কয়েকদিন সেই উত্তরের খোঁজেই ছিলাম৷ সরেজমিনে ছানবিন করে তবেই এসেছি৷’

বৃদ্ধ অঘোরীর হাতের ইশারায় উঠে ওঁর পিছু নিয়েছি৷ বেশ অনেকক্ষণ হাঁটার পর এল রানি অহল্যাবাই ঘাট৷ চারপাশ নিস্তব্ধ, টুকটাক কথাবার্তার পর অঘোরী বক্তব্য শুরু করলেন, ‘রামায়ণ ঠিক কত বছর আগের ঘটনা, তার নিশ্চিত কোনও দলিল নেই৷ অনেকেই মনে করেন, রামায়ণের গোটা ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে এই পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে, বিভিন্ন সময়ে৷ কিছু ইসলামিক দেশেও রামচন্দ্রকে সম্মান জানানো হয়৷ থাইল্যান্ডের রাজার নাম বংশপরম্পরায় আজও রামচন্দ্রর নামে রাখা হয়৷ ইন্দোনেশিয়ায় নিয়ম মেনে প্রত্যহ রামায়ণ পাঠ হয়৷ এ দেশের থেকেও বেশি রামলীলা মঞ্চস্থ হয় সেখানে, অংশগ্রহণকারী সবাই ইসলামধর্মাবলম্বী৷ জর্ডন নদীর পশ্চিম উপকূলে সুবিশাল বসতির নাম রামাল্লাহ৷ ফারাওদের সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস খুঁজলে প্রথম রাজার নাম পাওয়া যাবে রামাসেস৷ এই মহাবিশ্বের এমন কোনও দেশ হয়তো নেই, যেখানে সনাতন স্পর্শ করেনি৷’

ভদ্রলোক উদাস দৃষ্টিতে ঘাটে বাঁধা নৌকার দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ কিছুটা সময়ের পর বললেন, ‘ধরা যাক, ঘটনার সূত্রপাত কমপক্ষে আজ থেকে চার-পাঁচ হাজার বছর আগে, রামায়ণের সময়৷ রাবণের মৃত্যুর পর ওঁর পার্থিব শরীর দাহ এবং পারলৌকিক ক্রিয়ার জন্য বিভীষণের ওপর দায়িত্ব দিয়ে রামচন্দ্র প্রায়শ্চিত্তের উদ্দেশ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়েন৷ রাজ্যলাভে মত্ত বিভীষণ রাবণের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া এড়িয়ে যান৷ এই সময় নাগলোকের মানুষজন রাবণের শরীরকে সংরক্ষিত করেন কেশর, চন্দন এবং বিভিন্ন ওষুধপত্র দিয়ে৷ ওঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, দশানন যেকোনও মুহৃর্তে আবার বেঁচে উঠবেন৷ আজও শ্রীলঙ্কার কিছু মানুষ বিশ্বাস রাখেন, রাবণ যেকোনওদিন ফিরে এসে পুনরায় সোনার লঙ্কা তৈরি করবেন৷’

বৃদ্ধ অঘোরী আমার দেওয়া সিগারেট ধরিয়ে বললেন, ‘রাবণের মৃত্যুর আন্দাজ হাজার বছর পর ওঁকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে এক অসুরবংশীয় রাজা কঠিন তপস্যায় বসেন হিমালয়ের গহন অরণ্যে৷ খুব সম্ভবত তাঁর নাম ছিল চন্দ্রোদয়, রাবণের মতো তিনিও ভগবান শিবের উপাসক ছিলেন৷ যে জায়গায় উনি তপস্যা করেছিলেন, সেটা সরযূ, গোমতী এবং সুপ্ত ভাগীরথী নদীর সংগমস্থল৷ বর্তমানে সেই জায়গার নাম কান্দা, জেলা বাগেশ্বর, রাজ্যের নাম উত্তরাখণ্ড৷’

অঘোরীবাবা থেমেছেন, হাতের সিগারেটে একটা টান দিয়ে বললেন, ‘বাগেশ্বর জায়গাটি বহু পুরোনো, প্রাচীন শাস্ত্রে এর নাম উল্লেখ করা আছে ‘দানপুর’ হিসাবে৷ রাজা চন্দ্রোদয়ের মৃত্যুর আনুমানিক তিন-সাড়ে তিন হাজার বছর পর ওই জায়গার খোঁজ পেয়ে একজন স্থানীয় ব্রাহ্মণ যুবক প্রাচীন মূর্তি পুনরুদ্ধার করে সেখানে একটি ছোট্ট মন্দির তৈরি করেন, যার ধ্বংসস্তূপের মরীচিকা এখনও ছিটেফোঁটা রয়ে গেছে লোকচক্ষুর আড়ালে৷’

হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘আজ থেকে কিছু বছর আগে পর্যন্ত সেই মন্দির ছিল৷ ১৭৯০ সাল নাগাদ নেপালের গোরখা জনজাতি এই অঞ্চল আক্রমণ এবং দখল করে৷ যা খবর পেলাম, ওই সময় সেই মন্দির ধ্বংস হয় এবং যাবতীয় প্রাচীন মূর্তি ও খাজানা লুঠ হয়৷ গোরখারা ওই অঞ্চলে পঁচিশ বছর রাজত্ব করেছিল৷ কী কারণে জানি না, ওই মন্দিরটির বেঁচে-থাকা ধ্বংসাবশেষ পর্যন্ত পরবর্তীকালে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়৷ কয়েক বছর পরে ব্রিটিশরা এসে অঞ্চলটি দখল করে, সম্মুখসমরে গোরখারা পরাজিত হয়৷ ১৮১৬ সালে ‘সুগৌলি চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয় উভয়ের মধ্যে৷ সেই মন্দির আজ প্রায় নিশ্চিহ্ন, কিছুই নেই, তবে ছিন্নমস্তা মা কালীর এক মূর্তি সেখানে অনাদরে পড়ে রয়েছে মাটির নীচে৷’

বৃদ্ধ অঘোরী চুপ করে গেছেন৷ পাশে পড়ে-থাকা একটা শুকনো গাঁদা ফুল নিজের হাতে তুলে নিয়ে আপনমনে গঙ্গার দিকে ছুড়ে বললেন, ‘ব্রিটিশরা এই জায়গায় চা-বাগান তৈরি করে৷ কোনও এক অজ্ঞাত কারণে বর্তমানে এই জায়গা পরিত্যক্ত৷ তেন্দুয়া আর অন্যান্য বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণক্ষেত্র হিসাবে মানুষ ওই জায়গা এড়িয়ে চলে৷ স্থানীয় বৃদ্ধ মানুষজন নির্দিষ্ট ওই স্থানকে অভিশপ্ত বলে থাকেন৷’

গঙ্গার দিক থেকে নিজের চোখ সরিয়ে আমার দৃষ্টির ওপর নজর ফেলে অঘোরী বললেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তুই ছিলিস সেই অভিশপ্ত মন্দিরের সর্বশেষ পূজারি৷ অগ্নিহোত্রী কুলের শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ বংশে তোর জন্ম হয়েছিল কর্মগুণে৷ পরম্পরাগত আভিজাত্যের বিরুদ্ধে গিয়ে সেই অভিশপ্ত অনার্য মন্দিরে পূজারি ছিলেন তোর পূর্বপুরুষ৷ অসুর স্থাপিত মন্দিরে পূজা করার জন্য অভিশপ্ত হয়েছিলেন কোনও এক মহর্ষির দ্বারা৷’

কথা বলতে গিয়ে উত্তেজিত বৃদ্ধ অঘোরী দাঁড়িয়ে পড়েছেন৷ বাকশূন্য অবস্থায় বসে আছি৷ বিচারশক্তি এবং চিন্তাভাবনা কোমায় চলে গেছে৷

বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাচলা করে আমার পাশে এসে বসে কাঁধে হাত রেখে অঘোরী বললেন, ‘ওই মন্দিরের মা ছিন্নমস্তাকে মাটি খুঁড়ে বের করে, ব্রাহ্মমুহৃর্তে গুপ্ত ভাগীরথীর সংগমস্থলে বিসর্জন করতে হবে তোকে৷ স্বপ্নে এমনই ইঙ্গিত দর্শন করছে, হয়তো এটাই মায়ের ইচ্ছা৷’

আমি উঠে দাঁড়িয়েছি, মাথা ধরে গেছে৷ শরীর কাঁপছে, মন এবং দৃষ্টি উদ্ভ্রান্ত৷ মাথা ঘুরে আবার বসে পড়েছি৷ একের পর এক প্রশ্নের ঢেউ আছড়ে পড়ছে৷

কিছুক্ষণ পর ওঁকে প্রশ্ন করলাম, ‘এই তথ্য এবং ইতিহাস আপনি জানলেন কী করে?’

‘প্রথমত, পড়াশোনা৷ ইতিহাসের পাতায় গোরখাদের সঙ্গে ইংরেজদের যুদ্ধের কথা স্পষ্টভাবে এখনও লেখা আছে৷ দ্বিতীয়ত, জ্ঞানগঞ্জ থেকে একজন জ্ঞানবৃদ্ধ যোগী এসেছিলেন নৈমিষারণ্যে৷ তাঁর সঙ্গে দেখা করে বাকি তথ্য নিয়েছি৷’

‘জ্ঞানগঞ্জ কোথায়?’

বেশ খানিকক্ষণ হেসে ভদ্রলোক বললেন, ‘অবান্তর প্রশ্ন করে লাভ নেই৷ এই বিষয়ে আলোচনা করা ঠিক নয়৷ এক্তিয়ারের বাইরের কোনও প্রশ্নের উত্তর আমি দেব না৷’

অনেকবার অনুরোধ সত্ত্বেও ভদ্রলোক মুখ বন্ধ করে রেখেছেন৷ নিরুপায় হয়ে হাতজোড় করে ওঁর পায়ের সামনে বসে পড়েছি৷ বললাম, ‘দয়া করে বলুন, যদি বেঁচে থাকি, সব এবং শবটুকু নিয়ে উপন্যাস লিখতে চাই৷ নিশ্চিন্তে থাকুন, আপনার নাম কোথাও উল্লেখ করব না৷’

চিন্তাভাবনা করে আমার পাশে বসে ভদ্রলোক বললেন, ‘কৈলাস পর্বতে এক অদৃশ্য বসতি আছে৷ সাতজন চিরঞ্জীবী ছাড়াও উচ্চকোটির প্রচুর মহাযোগী এবং সন্ন্যাসী সেখানে বসবাস করেন৷ মহাপণ্ডিত চাণক্য, মহর্ষি ভৃগু, ঋষি পরাশর এবং আরও অনেকে এখানেই থাকেন সূক্ষ্ম দেহে৷ এই জায়গাটিকেই অনেকে সাংগ্রিলা ভ্যালি বা জ্ঞানগঞ্জ বলে থাকেন৷ কেউ আবার দুটো জায়গা পৃথকভাবে দেখেন৷ কৈলাস তীর্থযাত্রী কখনও এঁদের আংশিক দর্শন পান ক্ষণিকের জন্য৷ অনেকেই মনে করেন পৃথিবীতে এটিই স্বর্গলোক৷ বিষ্ণুপুরাণ অনুযায়ী চৌদ্দটি লোকের সন্ধান পাওয়া যায়৷ মহাপুরুষগণ এই চৌদ্দ স্তরেই বিরাজমান৷ সবার ওপরে বিরাজ করেন ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ৷’

‘আপনি সেখানে গেছেন?’

‘গুরুদেবের দয়ায় কৈলাস দর্শন করেছি অবশ্যই, জ্ঞানগঞ্জের হদিশ পাইনি৷ সেখানে পৌঁছোতে আমার আরও কয়েকটা জন্ম লাগবে৷ ভারতবর্ষের মানচিত্রে তিব্বত, নেপাল, গান্ধার, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কা;এই পাঁচটি অংশ যুক্ত থাকলে ভীষণ খুশি হতাম৷’

‘এই বিষয়ে কিছু প্রশ্ন আছে৷’

‘বল৷’

‘এই ইতিহাসের বর্ণনা দেওয়ার জন্য রাজা হরিশ্চন্দ্র ঘাট থেকে উঠে, রানি অহল্যাবাই ঘাটে আসতে হল কেন?’

‘শ্মশানে সব আলোচনা করা যায় না৷ রাবণ, মহিষাসুর, নারদ, অশ্বথামা, পরশুরাম এবং আরও কয়েকজনের ব্যাপারে শ্মশানে বসে আলোচনা করা অনুচিত, আলোচনারত সাধারণ মানুষের ক্ষতি হয়৷’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘কয়েকশো বছরের আগের ঘটনা, বংশপরম্পরার হাত ধরে এই ঘোর কলিযুগে আমার জীবনে আবার অভিশাপ হয়ে ফিরে এসেছে; সত্যিই অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে৷ যদি এই ঘটনা বাস্তব হয়, কেন এমন হয়? স্বপ্নে আসা মন্দির এবং আমার জীবনপথের পরিবর্তনের কারণ কী? বর্তমানে আমি তো সেই বংশের কেউ নই, তাহলে?’

বৃদ্ধ অঘোরী হাসছেন৷ কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘প্রশ্নের ব্যাখ্যা হয়তো আমি করব, তুই কতটা বুঝবি, ভৈরব জানেন৷ প্রশ্ন করতে গেলে যেমন পাত্রতা লাগে, উত্তর শুনে হজম করার মতো অতটুকু শক্তিরও প্রয়োজন হয়৷’

মিনিট দুয়েক পরে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, ‘মহর্ষি পতঞ্জলির যোগসূত্র পড়া আছে?’

‘সবে শুরু করেছি৷’

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%