ক্লেদাক্ত ক্লোরেল্লা

কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

জার্নালিস্ট অহিন দত্ত তাঁর বিশাল ড্রয়িংরুমে সোফায় গা ডুবিয়ে একটা রিপোর্টের ক্লিপিংস দেখছিল৷ আমায় দেখে ভুরু নাচাল৷

উত্তেজিত হয়েই ছিলাম৷ বললাম, 'খবর শুনেছিস? গতকাল তেরো-শো৷ পরশুদিন এই সংখ্যা ছিল হাজার৷ আজ এরই মধ্যে—'

আমায় হাত তুলে থামিয়ে ক্লিপিংসটা বন্ধ করল ও৷ বলল, 'সেটাই দেখছিলাম৷ এরই মধ্যে সাত-শো জন মারা পড়েছে৷ দিনের শেষে কতয় দাঁড়াবে বোঝা যাচ্ছে না৷ কিন্তু এই বিরাট সংকটের সময় স্যার যে কোথায় বেপাত্তা হয়ে গেলেন৷'

আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম৷ বললাম, 'তার মানে? আমি তো তোকে নিয়ে স্যারের কাছেই যাব ভেবেছিলাম৷'

ও বলল, 'আজ্ঞে না৷ সে চান্স আর স্যার দিলেন না৷ ভাবছিলাম এ ঘটনার কারণটা জানিয়ে স্যারকে একটা সারপ্রাইজ দেব—'

'তুই কারণটা জানতে পেরে গেছিস?'

'ইয়েস ইয়োর অনার'—মাথাটা সামান্য ঝুঁকিয়ে ও বলল, 'অবশ্য সবটাই আমার অনুমান, তবু যতদূর মনে হয় অনুমানটা অভ্রান্তই৷ আর সেইজন্যেই কিছুক্ষণ আগে 'টেলিওয়াচ'-এ স্যারের ল্যাবরেটরিতে কানেকশন করেছিলুম৷ সাড়া পেলুম না৷ তখন ওনার সেক্রেটারি মিস হেনরিয়েটাকে ধরতে উনি জানালেন, স্যার নাকি রাত দুটোর সময় একটা অ্যাটাচি নিয়ে কোথায় বেরিয়ে যান কাউকে কোনো ইনফরমেশন না দিয়ে৷ এখন আমি পড়েছি অথৈ জলে৷'

এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, টেলিওয়াচ জিনিসটি হল হাতঘড়িতে ফিট করা ওয়্যারলেসের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ৷ যা হোক, এদিকে ব্যাপার তো বেশ ঘোলাটে মনে হচ্ছে৷ সাধারণত স্যারের না বলে-কয়ে কোথাও উধাও হওয়া অভ্যেস নেই৷ আর ঠিক এই সময়ে স্যার চলে গেলেন, যখন মাত্র তিন দিনের মধ্যে হাজার তিনেক লোক মারা পড়েছে খাদ্যে অদ্ভুত এক বিষের প্রাদুর্ভাবে৷

এই খাদ্য আবার যে-সে খাদ্য নয়, আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যের বিকল্প হিসাবে যে খাদ্যের প্রচলন হয়েছে কয়েক বছর হল, সেই মহামূল্যবান ক্লোরেল্লা!

এখনও এই খাদ্যের মূল্য জনসাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে, তাই মুষ্টিমেয় ধনীলোক ছাড়া ক্লোরেল্লা কেউ খান না৷ সেই শ্রেণিরই হাজার তিনেক লোক ইতিমধ্যে মারা পড়েছেন এবং এই বিষের কথাটা জানা গেছে সবে আজ সকালে; তখন থেকেই সাবধানবাণী প্রচারিত হচ্ছে৷ সব মিলিয়ে একটা সসেমিরা অবস্থা৷

অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সময়েই স্যার বেপাত্তা!

এইসব কারণেই মাঝে মাঝে স্যারের ওপর খুব রাগ ধরে৷ যদিও সে রাগ বেশিক্ষণ থাকে না৷ কারণ ওনার অগাধ পাণ্ডিত্য আর তার সঙ্গে সুবিশাল প্রতিভার মিশ্রণ দেখে আমরা সর্বদাই তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা করে চলি৷ অথচ এই মানুষকেই কিছু কিছু লোক কেন যে সহ্য করতে পারেন না কে জানে! হয়তো বা গোপন ঈর্ষাবশতই৷ যে কারণেই হোক, ওনার এই মহৎ বৈজ্ঞানিক প্রতিভার দাম যে কেন উনি পেলেন না, সেটা ভেবে প্রায়সময়েই আমি আর অহিন দুঃখবোধ করি, আর সেইজন্যেই ওনার নিঃসঙ্গ সংগ্রামে একটু সঙ্গ দিতে চেষ্টা করি৷

এই মুহূর্তেও সেই কথাই আমরা বলাবলি করছিলাম৷ স্যার সুশোভন সেনচৌধুরীর আজকের এই খামখেয়াল সম্বন্ধে৷ এমন সময় অহিনের টেলিওয়াচটা সংকেত দিতে শুরু করল৷

অহিন সাড়া দিতেই ভেসে এল স্যারের গলা, 'ওখানে কি কিংশুকও আছ?'

সাড়া দিলাম৷

স্যার বললেন, 'ভালোই হল৷ শোনো তোমরা৷ অহিনের গাড়িতে তোমরা দু-জন চটপট নামখানায় চলে এসো৷ এক বিরাট বিস্ময় তোমাদের জন্য এখানে অপেক্ষা করে আছে৷ যত তাড়াতাড়ি পারো এসো কিন্তু৷'

প্রত্যুত্তরে কিছু জিজ্ঞেস করার সময় পেলাম না৷ একটা ওভার দিয়ে স্যার সুইচ বন্ধ করলেন৷ নামখানা জায়গাটা আমি চিনি না, নাম শুনেছি মাত্র, কিন্তু অহিনও কি চেনে না?

অহিন বলল, 'ওটা কাকদ্বীপ পেরিয়ে যেতে হয়, একেবারে সুন্দরবন এলাকায়৷ কাকদ্বীপ থেকে লোককে জিজ্ঞেস করে চলে যাওয়া যাবে৷ চল বেরিয়ে পড়ি৷'

ঠিক চার মিনিট পরে আমরা গাড়ি স্টার্ট করলাম৷

আমি ঘটনাটা জানতে পারি সবে গতকাল সকালে৷ পরশুদিন নাকি হাজারখানেক লোক মারা পড়েছে এক রকমের উগ্র অদ্ভুত বিষে, কিন্তু এর উৎস কী তা জানা যায়নি; তবে তখন থেকেই চারদিকে বিরাট তোলপাড় চলছিল৷

অনেকেই একে বিরাট এক ষড়যন্ত্রমূলক কাজ বলে মনে করছিলেন, কারণ শুধু ধনীলোকরাই মারা পড়ছিলেন; এঁদের মধ্যে খবরের কাগজের হেডলাইন হয় প্রায়ই এমন লোকও ছিলেন কয়েকজন, তাই কারণটা খুঁজে বের করার ব্যস্ততা ছিল প্রচণ্ড, আর তার থেকেও বেশি ছিল সরকারি চাপ৷

স্যার বেশ কিছুদিন ধরে অন্য গ্রহের বাসিন্দাদের সঙ্গে, যারা পৃথিবীকে উপনিবেশ রূপে ব্যবহার করতে চায়, তাদের সঙ্গে বেতারে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, তাই স্যারকে আর বিরক্ত করিনি৷ আমি আর অহিন দু-জনেই কারণটা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম৷ জানি স্যার ঘটনাটা নিশ্চয়ই শুনেছেন, তাই সে নিয়ে একটা বিশ্লেষণ খাড়া করে তবেই স্যারের কাছে গিয়ে আলোচনা করা যাবে, আমি আর অহিন এরকমই ভেবে রেখেছিলাম৷ কিন্তু এ আবার কী হল? দাবার সব চালই যে পুরো উলটে গেল!

রাস্তায় যেতে যেতে অহিন আমায় খুলে বলল ওর বিশ্লেষণ৷ ইতিমধ্যে আমি একটা যুক্তি খাড়া করার চেষ্টা করেছিলাম মনে মনে৷ কিন্তু ঠিক জোর পাচ্ছিলাম না সেটার সম্ভাবনা নিয়ে৷ ভাবছিলাম, হয়তো ক্লোরেল্লায় কোনোরকম একটা ঘাটতি আছে, যেটা এতদিন বিজ্ঞানীদের নজরে পড়েনি, আর সেই থেকেই এই অজানা বিষের উৎপত্তি৷

কিন্তু অহিনের চমৎকার বিশ্লেষণ শুনে আমার মনের ধোঁয়াশা দূর হয়ে গেল৷ ওর ধারণা, এটা কোনো একটা উগ্রপন্থী দলের কাজ৷ নির্ঘাত কোনো বিজ্ঞানীকে হাত করে এই দুর্ঘটনা ঘটানো হয়েছে৷ নাহলে খাবারে বিষ কীভাবে আসবে আর এমন সুন্দর প্রক্রিয়ায় তা মেশানোই বা হবে কীভাবে? তবে সেখানেও একটাই খটকা, এমন ধরনের বিষ কীভাবে পেল তারা, যার স্বরূপ বিজ্ঞানীরাও নির্ধারণ করতে পারছেন না? তবে কি ল্যাবরেটরিতে উদ্ভাবন করা হয়েছে এই বিষ?

আমাদের দুই মাথা মিলেও কোনো নির্ভরযোগ্য সমাধান বেরোল না৷ নামখানা পৌঁছে গেলাম৷ কিন্তু পৌঁছেই হল আসল মুশকিল৷ স্যারকে খুঁজব কোথায়? উনি তো কিছুই বলেননি?

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না৷ আমরা নামখানার প্রধান কেন্দ্রস্থল ফেলে রেখে একেবারে জঙ্গলের গায়ে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ভাবছিলাম এরপর কী করা উচিত৷

ঠিক সতেরো মিনিটের মাথায় টেলিওয়াচে স্যারের গলা, 'অহিন, কিংশুক, তোমাদের বাঁ-দিকে একটা গরান গাছের নীচে একটা বিরাট পাথর পড়ে আছে দেখো৷ ওখান দিয়ে সোজা এগিয়ে এসো৷ মিনিট পাঁচেক হাঁটলে একটা গাড়ি দেখতে পাবে, ওতে চড়ে বোসো৷'

আবার ওভার, আবার সুইচ বন্ধ, এবং কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই৷ আমরা স্যার সুশোভন নামক কম্যান্ডারের অলিখিত সৈনিক৷ তাই বিনা দ্বিধায় স্যার যা বললেন করলাম৷

সেই কিম্ভূতকিমাকার গাড়িটাতে উঠে বসার পরেই গাড়িটা আপনা থেকেই চলতে শুরু করল দেখে মোটেই অবাক হলাম না, যতটা অবাক হলাম এই ভেবে যে স্যার এই জঙ্গলে রিমোট কন্ট্রোলার কোথায় পেলেন, যা দিয়ে গাড়িটাকে চালাচ্ছেন?

সেই মুহূর্তে কিছু ভেবে স্থির করতে পারিনি, পরে শুনেছিলাম৷ শুনেছিলাম আরও কিছু অবাক করা তথ্য৷ দেখেছিলাম অভাবনীয় কিছু দৃশ্য, যা আমাদের নিয়ে গিয়েছিল এক আপাত অবিশ্বাস্য জগতে, ভরে দিয়েছিল আমাদের অভিজ্ঞতার ঝুলি৷

একসময় গাড়িটা গিয়ে পৌঁছোল একটা বিরাট বাড়ির সামনে৷ বাড়িটা আর কিছুই নয়, একটা ল্যাবরেটরি৷ স্যার সুশোভনের নিখুঁত নির্দেশে এর প্রতিটি যান্ত্রিক অঙ্গসজ্জা অত্যাধুনিক৷ স্যার গোপনে এখানে এমন একটি ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন জানতাম না৷ জায়ান্ট কম্পিউটার, কন্ট্রোল প্যানেল, ডিসপ্লে বোর্ড এবং আরও অজস্র অদ্ভুত সব যন্ত্র ছড়িয়ে রয়েছে চারপাশে৷ এমনকী একটা যান্ত্রিক রোবটও আছে৷ তবে বেশির ভাগ যন্ত্রই দেখলাম শব্দগ্রাহক ধরনের৷

কিন্তু বুঝছিলাম না এত জায়গা থাকতে এই বনবাসে ল্যাবরেটরি বসাবার যুক্তি কোথায়? আধ ঘণ্টার মধ্যেই উত্তর পেলাম৷

স্যার আমাদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছিলেন বটে, কিন্তু একটা কথাও বলেননি৷ কী যেন এক চাপা উত্তেজনায় অস্থির হয়ে ছিলেন৷ হঠাৎ এক সময় থেমে গেলেন ঘড়ির দিকে তাকিয়ে৷ বিড়বিড় করে বললেন, 'যাক এতক্ষণে সময় হল৷ এর মধ্যে কত কী যে ঘটল কে জানে৷'

তাকিয়ে দেখি স্যারের ঘড়িতে রামধনুর খেলা আর জলতরঙ্গের শব্দ৷

স্যার তাড়াতাড়ি কম্পিউটার বোর্ডের দিকে যেতে যেতে বললেন, 'অহিন, কিংশুক তোমরা এসো৷ পৃথিবীর দুর্দিনে আমার পাশে দাঁড়াও৷'

ব্যাপার কিছুই বুঝছিলাম না৷ হতভম্বের মতো উনি যা বলছিলেন, করছিলাম৷ আমরা এখানে আসার পর থেকে স্যার এই ল্যাবরেটরি বা কাল হঠাৎ নিখোঁজ হওয়া সম্বন্ধে কিছুই বলেননি৷ উপরন্তু বিড়বিড় করে এমন সব কথা বলেছেন, যার কোনো অর্থই হয় না৷ স্যারকে চিন্তান্বিত দেখে আমাদের যে জন্য এখানে আসা, সেই কথা তোলারই আর সাহস বা সময় পাইনি৷ এখন এই ব্যাপার৷

স্যার কম্পিউটার বোর্ডের গায়ে তিনটে সুইচ অন করে দিয়ে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে বসলেন৷ বিড়বিড় করে বললেন, 'সাদা আলোর পরে তিনবার লাল আলো৷ তারপর গোলাপি দু-বার৷ চেকিং, রিভিউ, আউট৷'

বলার সঙ্গে সঙ্গে স্যারের হাত কাজ করে যাচ্ছিল৷ কম্পিউটার বোর্ডে স্যারের কথামতো আলোর খেলা দেখা যাচ্ছিল৷ এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের হতচকিত করে দিয়ে কম্পিউটার বোর্ডে যেন একটা দূরাগত শব্দ শোনা যাচ্ছিল৷

বড়োজোর মিনিট দুয়েক, তারপরই একটা বিপ বিপ শব্দ শোনার সঙ্গেসঙ্গে দেখি স্যার উল্লাসে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠেছেন৷ এবার এগিয়ে গেলেন কম্পিউটার বোর্ডের দিকে৷ ততক্ষণে বোর্ডে অনবরত নানা রঙের আলোর খেলা দেখা যাচ্ছে৷ স্যার ওই আলোর সংকেত অনুযায়ী কী সব নোট করতে লাগলেন এবং সুইচ টিপে যতদূর মনে হয় তার উত্তর দিতে লাগলেন৷

এতক্ষণে আমাদের মোটামুটি ধারণা হয়ে গেছে, স্যারের নিজস্ব কাজ অর্থাৎ ভিনগ্রহবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগই উনি করছেন৷ কিন্তু আমাদের বিন্দুমাত্র ধারণাই ছিল না এরপর কী কাণ্ড ঘটতে পারে৷

অহিন সাংবাদিক৷ চুপ করে বসে থাকা ধাতে নেই৷ ওর সঙ্গে আমিও ঘুরতে বেরিয়েছিলাম আশপাশ৷ ঠিক আধঘণ্টা পরে একটা বিকট চিৎকার শোনা গেল৷ শব্দটা বেরিয়েছে বোধ হয় স্যারের ল্যাবরেটরি থেকেই৷

দৌড়োলাম৷ পৌঁছেই দেখি স্যারের হাত পাগলের মতো রিমোট কন্ট্রোলারের বোতামগুলোর ওপর ঘুরে চলেছে৷ স্যারের সামনে রোবটটা দাঁড়িয়ে আর ওর দেহের ওপর যেন একটা অস্বচ্ছ প্লাস্টিকের মতো আবরণ তৈরি হয়ে চলেছে৷ মিনিটখানেকের মধ্যেই পুরো আবরণ তৈরি হয়ে যেতে আমরা ভয়ংকর চমকে উঠলাম৷ আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে দু-জন স্যার সুশোভন৷

মুহ্যমান অবস্থাটা কেটে গেল স্যারের বকুনির চোটে, 'হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছ কী? এক্ষুনি বেরোও৷'

বলেই স্যার প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে আমাদের দু-জনকে বাইরে বের করে দিলেন এবং জানলা দিয়ে দেখলাম রোবটটাকে ঠেলেঠুলে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে দাঁড় করিয়ে তার হাতদুটো ঠিক নিজের মতো ভঙ্গিতে রাখলেন তার ওপর এবং আরও কয়েকটা সুইচ অন করে কয়েকটা খাতাপত্র বগলদাবা করে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এসে আমাদের দু-জনকে সঙ্গে নিয়ে একটা ঝোপের মধ্যে বসে পড়লেন৷

স্যারের ওই অদ্ভুত কাজকর্মের তাৎপর্য কী সে প্রশ্নটা মনের মধ্যে জেগে ওঠার আগেই উত্তর পেয়ে গেলাম৷ একটা কান-ফাটানো বিস্ফোরণের শব্দে গোটা ল্যাবরেটরিটা ধ্বংস হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ সাইরেনের মতো শব্দ করে একটা গোটা পিরামিডকে আকাশের দিকে উড়ে গিয়ে মহাশূন্যে মিলিয়ে যেতে দেখলাম৷

পরের দিন সকাল৷ স্যারের ড্রয়িংরুমে বসেছিলাম সামনে কফির কাপ নিয়ে৷ আমাদের আশঙ্কা বা টেনশান কিছুই আর নেই৷ কারণ গতকাল রাত থেকে আর নতুন করে কোনো মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি৷ সে আশঙ্কা দূর করে দিয়েছেন স্যার সুশোভন সেনচৌধুরী৷ কিন্তু কীভাবে? সেটাই বসে বসে তাঁর মুখে শুনছিলাম মুগ্ধ বিস্ময়ে৷

স্যার সুশোভন অনেকদিন আগেই অনুমান করেছিলেন এবং পরে প্রমাণ করেছিলেন যে ভাষার চেয়ে আলোর সংকেতে অনেক সহজে ভাবের আদানপ্রদান ঘটানো যায়৷ এইভাবেই নানা ভিনগ্রহীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে করতে এদের সঙ্গে স্যারের আলাপ হয়৷ সুদূর সাইমন গ্যালাক্সি থেকে আগত এদের উদ্দেশ্য বুঝে ফেলতে স্যারের দু-দিনও লাগেনি৷

ওদের কথা থেকেই স্যার জানতে পেরেছিলেন যে খাদ্যের অভাবই ওদের এখানে আসতে বাধ্য করেছে৷ এবং এটা শুনে, তারপর ক্লোরেল্লার ঘটনা শুনে দুয়ে দুয়ে চার করে ফেলতে স্যারের মতো উন্নত মস্তিষ্কের পক্ষে মোটেই অসুবিধা হয়নি৷ তাই তড়িঘড়ি স্যার কাউকে না বলে-কয়ে বেরিয়ে পড়েন পরিস্থিতি সামাল দিতে৷

অনেকদিন আগেই ল্যাবরেটরিটা স্যার তৈরি করে রেখেছিলেন যোগাযোগ করার সুবিধার জন্য৷ এখানে এসে ওদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে ওরা ক্লোরেল্লার মধ্যে ওদের জীবনধারণের উপযোগী খাদ্য খুঁজে পেয়ে গেছে৷ তাই সে খাদ্য ওদের যেকোনো মূল্যে সংগ্রহ করা দরকার৷ আর সেজন্যেই মানুষ যাতে ওই খাদ্য বিষ মনে করে তাকে পরিত্যাগ করে, সেই কারণেই এখন যে ক্লোরেল্লা মানুষের নাগালের মধ্যে জন্মাচ্ছে, তাতেই ওরা আমাদের অজানা এক বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে, ফলে তা হয়ে যাচ্ছে মানুষের পক্ষে প্রাণঘাতী৷

আর যেহেতু সেই সংগৃহীত ক্লোরেল্লা এখনও দুর্মূল্য বলে ধনী মানুষরা ছাড়া অন্যদের নাগালের বাইরে, তাই এর ফলে তাঁরাই মারা যাচ্ছেন৷ এর মধ্যে অন্য কোনো ষড়যন্ত্রের নামগন্ধও নেই৷ এবং এইভাবেই ভিনগ্রহীরা একদিন পৃথিবীর ভবিষ্যতের বিপুল খাদ্যভাণ্ডারকে নিজেদের কবজাগত করার চেষ্টায় ছিল৷

কিন্তু স্যার সুশোভন এবং তাঁর অসাধারণ দূরদৃষ্টি তা হতে দিল না৷

স্যার প্রথম থেকেই ওদের সঙ্গে বন্ধুর মতো ব্যবহার করছিলেন, তাই ধীরে ধীরে ওদের নেতৃস্থানীয় একজনের কাছ থেকে এসব কথা বের করে নেন৷ এবং এই ভয়ংকর পরিকল্পনা জানার পর উনি বন্ধুত্বের ভান করেই পরামর্শ দেন ওদের সংগৃহীত ক্লোরেল্লায় একটি বিশেষ জিনিস মিশিয়ে নিতে, যা নাকি এই গ্রহে ওদের বেঁচে থাকার পক্ষে উপযোগী হয়ে উঠবে৷

কিন্তু ওই মিশ্রণই হল ওদের পক্ষে মরণ-মিশ্রণ, কারণ ওই বিশেষ জিনিসটি ছিল অত্যধিক মাত্রায় 'মালাচাইট গ্রিন'৷ মানবদেহের পক্ষে একটি ভীষণ ক্ষতিকর বিষাক্ত ভেজাল৷ স্যার এটা বুঝেছিলেন যে, যেহেতু ওরা ক্লোরেল্লায় খুঁজে পেয়েছে ওদেরও জীবনদায়ী খাদ্যগুণ, সুতরাং ওদেরও দেহের কোষ, শিরা, স্নায়ু ইত্যাদি মানুষের মতোই গুণাবলীসমৃদ্ধ, আর তাই এই বিষ নিশ্চয়ই ওদেরও পক্ষে ভয়ংকর৷

এটা জেনে নিয়েই স্যার ওদের খাদ্যে ওদেরই হাত দিয়ে নিক্ষেপ করলেন মরণবাণ, যার ফলে একদিনের মধ্যে ওদের ২২ জনের মধ্যে মারা গেল ১৭ জন, বাকি ৫ জন গুরুতর অসুস্থ৷ আর সেই ৫টি অর্ধমৃত জীবই সেদিন উড়ে গিয়েছিল প্রাণভয়ে, আমাদের চোখের সামনে৷

কিন্তু স্যার যা ভয় করছিলেন তাই হল, ওরা এর কারণটা অনুমান করতে পেরে গেল এবং তার জন্যেই যাবার আগে তারা গোটা ল্যাবরেটরিটা ধ্বংস করে দিয়ে গেল৷

স্যার বলে যাচ্ছিলেন আর আমাদের ধাঁধা ক্রমশ দূর হয়ে যাচ্ছিল—'রক্ষে এই যে আমার ছদ্মবেশের ফাঁকিটা ওরা ধরতে পারেনি৷ ওটাকে 'আমি' মনে করেই শেষ করে দিল৷ কিন্তু হে মহাকাশবাসীরা', স্যার সেই দূর মহশূন্যে উধাও জীবদের উদ্দেশ্যে বললেন, 'পৃথিবীর মানুষও যে কিছুটা বুদ্ধিমান জীব, সেটা তোমরা ভুলে যাও কেন৷'

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%