সুমিত বর্ধন

নির্জন অরণ্যপথ
সূর্যের তির্যক রেখা
কলকে ফুলের সুবাস

পাহাড়ের নীচে
ঢলে পড়ে সূর্য
ভেসে আসে ঘণ্টাধ্বনি



“আগেই সন্দেহ হয়েছিল মানুষ মারছে উটিয়া বাঁদরে, আর আজ একেবারে হাতেনাতে প্রমাণ পেয়ে গেলাম।”
বাইরে অন্ধকার গাঢ় হয়ে এসেছে। এক সারি জানলার কাচের পেছনে একটু আগেও আকাশের গায়ে যেখানে লালচে আভা দেখা যাচ্ছিল, এখন সেখানে তারা-জ্বলা কালো।
দেওয়ালগিরির ম্লান নীলচে আলোয় ঘরের অন্ধকার সবটা যায়নি। ঘরের কোণে আর আসবাবের আনাচকানাচে ঘন ছায়া জমে আছে। ঘরের এক প্রান্তে পড়ার টেবিল। তার ওপরে রাখা লন্ঠন থেকে দেওয়ালের গায়ে ছবি পড়ে। টেবিলের একদিকে বসে হোমিগঞ্জের কাউন্সিলার অরূপরতন। দীর্ঘদেহী, মেদহীন ছিপছিপে গঠন, চওড়া কপাল। দু-হাত টেবিলে ছড়িয়ে ছবির দিকে তিনি ঝুঁকে তাকিয়ে থাকেন। ছবিতে একটা দ্বিপদ জীব। শীর্ণকায় লম্বাটে দেহ। ধূসর লোমে ঢাকা। গলা আর মাথার গড়ন অনেকটা মন্দিরচিত্রে দেখতে পাওয়া পৃথিবীর উটের মতন। দু-হাতের প্রান্তে কালো সরু আঙুল। হাঁটু পেছনদিকে বেঁকানো।
“কোথায় তোলা এটা?” কপালে ভাঁজ পড়ে অরূপরতনের।
টেবিলের উলটোদিকে বসা ইন্সপেক্টর বিকাশ ভারী শরীরটাকে চেয়ারের দুই হাতলের মধ্যে বাঁকিয়েচুরিয়ে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য খোঁজার চেষ্টা করেন, “হোমিগঞ্জের ঠিক বাইরেই। আয়সরেশম কুঠির কাছে।”
“কে তুলল?”
রুমালে মুখ আর মাথার টাক মোছেন বিকাশ, “পরেশ। কুঠির গোমস্তা। পরেশ একটা নতুন ফোটোস্কোপ কিনেছে। কুঠির বাইরে সেটা চেক করছিল। হঠাৎ এটাকে দেখতে পেয়ে—”
ঘরের অন্য প্রান্তে একটা র্যাকে সার দিয়ে খাড়া করা হাতিয়ার রাখা। বেশির ভাগই নানা সাইজের তলোয়ার, তবে দু-একটা লাঠি আর বল্লমও রয়েছে। দেওয়ালগিরির আলোয় তাদের লম্বা ছায়া পড়ে মেঝেয়।
র্যাকের সামনে একটা গদি-আঁটা কেদারায় বসে একটা বছর পনেরোর ছেলে। হাতে তার একটা শামুক বাঁশের বাঁশি। ঘরের উলটোদিকের দেওয়ালে ফেলা প্রাণীটার ছবির দিকে তাকিয়ে সে বড়দের কথা শোনে।
অরূপরতনের ধূসর চোখের তারায় উদ্বেগের ছায়া পড়ে, “লোকালয়ের এত কাছে! সাধারণত এদের কালভৈরব পাসের জঙ্গল ছাড়া দেখতে পাওয়া যায় না।’’
আবার মুখ মোছেন ইন্সপেক্টর বিকাশ, “হ্যাঁ, ছবিটা না দেখলে আমিও বিশ্বাস করতাম না।”
“কোনদিকে গেছে পরেশ দেখেনি?”
“না। ছবি তুলেই পরেশ পড়ি-মরি করে কুঠিতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। তারপর ঘণ্টাখানেক বাদে সাহস করে দু-চারজনকে সঙ্গে নিয়ে কোতোয়ালিতে খবর দেয়।”
টেবিলে ছড়ানো হাতের তালু দুটো মুঠো করেন অরূপরতন, “স্বাভাবিক। এর মতো হিংস্র প্রাণী আর এই গ্রহে নেই। কে শখ করে সামনে যাবে!”
“এই খুনিয়া জানোয়ার শহরের মধ্যে ঢুকে কী ফ্যাসাদ বাধাবে কে জানে?” ফের রুমালে মুখ মোছেন ইন্সপেক্টর বিকাশ, “এখন তো আর কিছু করা যাবে না, কোতোয়ালি থেকে সবাইকে খবর পাঠিয়েছি রাতটা সাবধানে থাকতে। সকাল হলেই খোঁজ শুরু করব।”
ওপর-নীচে মাথা নাড়েন অরূপরতন, “হ্যাঁ, এখন অন্ধকার হয়ে গেছে, ঝুঁকি না-নেওয়াই ভালো।”
“আপনার কাছে আমাকে কমিশনার সাহেব পাঠালেন আর-একটা কাজে। কাল সকালে এটাকে খুঁজতে লোকের দরকার। আপনার এস্টেটের কয়েকজনকে দিতে পারবেন কি?”
ঘরের অন্যদিকে বসা ছেলেটা বড়দের কথায় মনঃসংযোগ হারিয়ে ফেলে বাঁশিতে ফুঁ দেয়। দিনকয়েক আগে এক কালান্দরের বাঁশিতে শোনা সুর বাজাতে চেষ্টা করে আনাড়ি হাতে।
“আঃ রজত! শব্দ কোরো না।” মৃদু ধমক দিয়ে বিকাশের দিকে তাকান অরূপরতন, “অবশ্যই! কমিশনার সাহেবকে বলে দেবেন, শুধু আমার লোক কেন, আমিও সঙ্গে যাব।”
লন্ঠন থেকে ফোটো ক্রিস্টাল বের করে রোশনি ক্রিস্টাল ভরেন ইন্সপেক্টর। ছবি মিলিয়ে গিয়ে নীল আলো পড়ে দেওয়ালে।
“তাহলে তো খুব ভালো হয়। আপনার মতো নামজাদা তলোয়ারবাজ সঙ্গে থাকলে লোকেও সাহস পাবে।” স্বস্তির ছোঁয়া লাগে ইন্সপেক্টর বিকাশের কণ্ঠে।
“আরে দুর! ছাড়ুন তো,” মৃদু হাসেন অরূপরতন, “ওসব লোকে বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলে।”
লন্ঠন তুলে নেন বিকাশ, “সে বললে হবে? ওস্তাদ তলোয়ারবাজ বলে এ তল্লাটে আপনাকে লোকে একডাকে চেনে। যা-ই হোক, চলি, কোতোয়ালিতে ফিরে কমিশনার সাহেবকে রিপোর্ট দিতে হবে।”
ঘর থেকে বেরিয়ে যান ইন্সপেক্টর, পেছনে টেনে বন্ধ করে দেন দরজা। জানলার কাচ দিয়ে রজত দেখতে পায়, অন্ধকারের মধ্যে দুলতে দুলতে ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছে লন্ঠনের নীল আলো। যেন আকাশ থেকে নেমে-আসা একটা তারা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে অন্ধকারের বুক চিরে।
গলাখাঁকারি দেন অরূপরতন, “রজত!”
জানলার দিক থেকে চোখ ফেরায় রজত, “হ্যাঁ বাবা।”
“রজত, তোমাকে অনেকবার আগেও বলেছি, যখন দরকারি কথাবার্তা হবে, তখন অযথা শব্দ করবে না। কাজের মধ্যে তুমি বাঁশি বাজাচ্ছিলে কেন?’’
“আমি—’’
কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারে না রজত, হাত তুলে তাকে বাধা দেন অরূপরতন, “দ্যাখো, বাঁশি বাজানোটা দরবেশ কালান্দরদের মানায়। তারা পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। বড় হলে তোমাকে অনেক দায়িত্ব নিতে হবে। এবার থেকে একটু কাজে মন দাও।”
আরও হয়তো বকুনি খেত রজত, কিন্তু অরূপরতনের কথার মধ্যেই ভেতরের দরজা ঠেলে ঘরে ঢোকে শিবানী, এস্টেটের হাউসকিপার। রজতের মা-র মৃত্যুর পর থেকে এই বছর পঞ্চাশের মহিলাই এস্টেটের এক রকমের কর্ত্রী।
“ছোটেসাব, খেতে চলো।”
গোঁজ হয়ে বসে থাকে রজত, “খাব না, খিদে নেই।”
“খিদে না পেলেও রাত্রে খেতে হয়। চলো।”
রজত ফের কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বাইরে থেকে হঠাৎ ভেসে আসে কোনও মানুষের কাতর আর্তনাদ।
সচকিত হয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকান অরূপরতন, “একটা চিৎকার শোনা গেল না?”
মাথা নেড়ে সায় দেয় শিবানী, “হ্যাঁ বড়েসাব, কাছেই কোথাও।”
বাইরের দিকে তাকায় রজতও। কিন্তু সেখানে নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, কিছুই নজরে আসে না।
কয়েক মিনিট কেটে যায়, কিন্তু সেই প্রথম চিৎকারের পর আর কোনও আওয়াজ আসে না। শিবানীর দিকে ফেরেন অরূপরতন, শঙ্কাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “তাড়াতাড়ি লোক ডাকো, আলো নিয়ে আসতে বলো। বাইরে গিয়ে খুঁজতে হবে।’’
শশব্যস্তে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ায় শিবানী।
কিন্তু সে কয়েক পা এগোতে-না এগোতেই, যেন একটা বিস্ফোরণ ঘটে। একটা জানলার পাল্লা, কাচ, কাঠ সব সশব্দে টুকরো টুকরো হয়ে ছিটকে আসে ভেতরদিকে, আর তার পেছনে ঘরের মেঝেয় আছড়ে পড়ে একটা রক্তাক্ত দেহ।
দেওয়ালগিরির ঝাপসা আলোতেও রজতের মানুষটাকে চিনতে অসুবিধে হয় না।
ইন্সপেক্টর বিকাশ।
শিবানীর দুই চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে, নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ রজত যেন পরিষ্কার শুনতে পায়।
ভাঙা জানলা দিয়ে একঝলক ঠান্ডা হাওয়া বয়ে আনে নীল আপেলের মিষ্টি গন্ধ।
চোয়াল শক্ত করে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে ঝুঁকে দাঁড়ান অরূপরতন।
কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কোনওরকম প্রতিক্রিয়া আসার আগেই, ঠিক পরের মুহূর্তেই একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে ভাঙা জানলা দিয়ে ঘরে লাফ দিয়ে এসে পড়ে সেই প্রাণীটা, যার ছবি একটু আগেই রজত দেওয়ালের গায়ে দেখেছে। একটা বুনো দুর্গন্ধ ছড়িয়ে যায় ঘরে।
উটিয়া বাঁদর।
কিছুক্ষণের জন্যে সময়ের গতি যেন থেমে যায়। রজতের মনে হয় ঘরখানা যেন দাবার সাজানো ছক, আর সেই ছকের ওপর তারা সবাই নিশ্চল হয়ে আটকে গেছে। ঘরের একদিকে টেবিলের পেছনে তারা বাবা। ঠিক তার উলটোদিকে হাতিয়ার র্যাকের সামনে সে। ঘরের মাঝখানে ভাঙা জানলার সামনে লম্বা গলা বাড়িয়ে উটিয়া বাঁদর। আর তার বিপরীতে মুঠো-করা দু-হাত মুখের কাছে তুলে বিস্ফারিত নয়নে দাঁড়িয়ে হাউসকিপার শিবানী।
থেমে-থাকা সময় আবার গতি পায়। টেবিলের পেছনে থেকে চিৎকার করে ওঠেন অরূপরতন, “রজত, হাতিয়ার, হাতিয়ার দে আমাকে একটা।”
কিন্তু রজতের হাতিয়ার দেওয়ার মতন অবস্থা নেই, হাঁটু দুটো দু-হাতে জড়িয়ে সে তখন ঠকঠক করে কাঁপছে।
লম্বা ঘাড়টা ঘুরিয়ে উটিয়া বাঁদর এতক্ষণ ঘরটা জরিপ করছিল, অরূপরতনের গলার স্বরে আকৃষ্ট হয়ে সেটা এবার এক-পা এক-পা করে টেবিলের দিকে এগোতে থাকে।
আবার চিৎকার করেন অরূপরতন, “রজত, হাতিয়ার দে, হাতিয়ার!”
নড়তে পারে না রজত। তার মনে হয় যেন তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে গেছে।
হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয় উটিয়া বাঁদর।
শিবানীর যেন হঠাৎ সংবিৎ ফেরে, হাতিয়ার র্যাকের দিকে দৌড়োতে শুরু করে সে।
শিবানীর দৌড়োনোর আওয়াজে সচকিত হয়ে ওঠে উটিয়া বাঁদর, লম্বা ঘাড়টা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। চোখগুলো তার কেমন একটা শয়তানি বুদ্ধিতে চকচক করে ওঠে, অরূপরতনকে ছেড়ে শিবানীর দিকে দৌড়ে আসে সেটা।
হাতিয়ার র্যাকের ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে শিবানী। একটা তলোয়ার টেনে নিয়ে অরূপরতনের দিকে ফিরে দু-হাতে মাথার ওপর তুলে ছুড়ে দেয় সর্বশক্তিতে।
কিন্তু ততক্ষণে উটিয়া বাঁদর এসে পড়েছে প্রায় ঘাড়ের ওপর। শিবানীকে প্রায় ন্যাকড়ার পুতুলের মতোই তুলে নিয়ে দেওয়ালের গায়ে ছুড়ে দেয় পশুটা।
অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় অরূপরতন লাফিয়ে ওঠেন টেবিলে, তারপর টেবিল থেকে স্প্রিং-এর মতন লাফিয়ে যান শূন্যে।
দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শিবানী, উটিয়া বাঁদর লাফিয়ে পড়ে তার ওপর, মাথা বাড়িয়ে দাঁত বসিয়ে ছিঁড়ে নেয় তার টুঁটি।
রক্তের ফোয়ারা ছড়িয়ে যায় শিবানীর গলা থেকে, তার পা দুটো ছটফট করতে থাকে, গোড়ালি দুটো এক বীভৎস ছন্দে ঠকঠক আওয়াজ তোলে কাঠের মেঝেতে।
অসাড় শরীরে চেয়ারে হাঁটু দুটো জড়িয়ে বসে থাকে রজত। তার হাতের মুঠোয় তখনও বাঁশিটা শক্ত করে ধরা।
শূন্যেই শিবানীর ছুড়ে-দেওয়া তলোয়ার দু-হাতে ধরে ফেলেন অরূপরতন। বাঁ হাত খাপের ওপর, ডান হাত তলোয়ারের হাতলে। মাটিতে পড়ার আগেই তলোয়ার টেনে নিয়ে খাপ ছুড়ে ফেলেন দূরে।
লম্বা ঘাড়টা ঘুরিয়ে তাঁর দিকে তাকায় উটিয়া বাঁদর, তারপর শিবানীর শরীরের ওপর থেকে ধীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়ায়।
মাটিতে পড়েই সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ান অরূপরতনও। বাঁ পা সামনে, ডান পা পেছনে, বাঁ পায়ের গোড়ালি মাটি থেকে তোলা। তলোয়ারের লম্বা ফলা খাড়া করে উঁচুতে তুলে ধরা, জমির সঙ্গে নব্বই ডিগ্রিতে। দুই মুঠোয় ধরা তলোয়ারের হাতল ডানদিকের গালের কাছাকাছি, কনুই ছড়ানো শরীর থেকে দূরে।
তাঁকে লক্ষ্য করে দৌড়োতে শুরু করে উটিয়া বাঁদর।
চেয়ারে অবশ হয়ে বসে থাকে রজত।
সবেগে দৌড়ে-আসা উটিয়া বাঁদরের বিন্দুমাত্র পরোয়া না করে একই জায়গায় অটল, অচল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন অরূপরতন।

তাঁর কাছাকাছি এসে পড়ে উটিয়া বাঁদর, তার উটের মতো মাথাটা সামনের দিকে ছিটকে আসে তাঁর গলা লক্ষ্য করে। ঠোঁটের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসে রক্ত-মাখা দাঁত।
কোনও দক্ষ নর্তকের মতোই সমস্ত শরীর নিশ্চল রেখে কেবল ডান পায়ে ভর দিয়ে উটিয়া বাঁদরের সামনে থেকে ডানদিকে ঘুরে যান অরূপরতন, বাঁ পা নিয়ে আসেন ডান পায়ের পেছনে। উটিয়া বাঁদরের লম্বা গলাটা এখন তাঁর বুকের সামনে আড়াআড়ি ছড়ানো।
খাড়া করে ধরে-থাকা তলোয়ারের ফলাটা পেছনদিকে এবার বেঁকিয়ে দেন অরূপরতন, তারপর কাঁধের ওপর থেকে বিদ্যুৎবেগে নামিয়ে আনেন উটিয়া বাঁদরের ঘাড়ের ওপর।
ঘাড় থেকে লম্বাটে মাথাটা সঙ্গে সঙ্গে খসে পড়ে মাটিতে, আর তার একটু পরেই রক্ত ছড়িয়ে আছড়ে পড়ে উটিয়া বাঁদরের কবন্ধ লাশটাও।
মাটিতে তলোয়ার ফেলে দেন অরূপরতন। লম্বা পায়ে এগিয়ে এসে মাটিতে পড়ে-থাকা শিবানীর চোয়ালের তলায় হাত রেখে তার নাড়িটা একবার দেখেন। তারপর তার খুলে-থাকা চোখের পাতা দুটো বন্ধ করে দিয়ে সস্নেহে কপালে একবার হাত বুলিয়ে দেন।
রজত তখনও চেয়ারের ওপর হাঁটু দুটো দু-হাতে জড়িয়ে বসে। শিবানীর পাশ থেকে উঠে এসে তার গালে সপাটে একটা চড় কষিয়ে দেন অরূপরতন।
“নালায়েক, নামর্দ! একটা অপদার্থ তৈরি হয়েছিস! কাল থেকেই তুই চিরাগ আখড়ায় যাবি তলোয়ারবাজির তালিম নিতে।’’
রজতের মুঠো থেকে বাঁশিটা এক হ্যাঁচকায় টেনে নেন অরূপরতন। মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দেন মড়মড় শব্দে।
সকালের নরম রোদে আলোছায়া-মাখা পাথরের উঠোনে দিনের তালিম শুরু করেন ওস্তাদ উদয়ভান, চিরাগ আখড়ার ওস্তাদ। কাঠের তলোয়ার হাতে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে শোনে নবিশরা1।
উদয়ভানের বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে, চুলে আর দাড়িতে সাদার ছোঁয়া লেগেছে, কিন্তু চওড়া কাঁধ আর ছড়ানো বুক প্রমাণ দেয় তাঁর স্বাস্থ্য এখনও অটুট।
প্রতিদিনের মতো আজও তলোয়ারবাজির তরিকাগুলো দিনের প্রথমে একবার রপ্ত করান উদয়ভান। রোদ লেগে ঝকঝক করে তাঁর হাতের মুঠোয় ধরা তলোয়ারের ইস্পাত কাচের ফলা।
“ফটক। তলোয়ারবাজির এইটা প্রথম তরিকা।” আখড়ার চারপাশের ছায়া ফেলা গাছের পাতার মর্মরধ্বনির সঙ্গে মেশে উদয়ভানের উঁচু গলার আওয়াজ। “ডান পা বাঁ পায়ের এক কদম আগে। বাঁ পায়ের গোড়ালি মাটি থেকে এক আঙুল তোলা, ডান পায়ের গোড়ালি তোলা সামান্য। পা একটু বেঁকানো, শরীরের ওজন পায়ের মাঝামাঝি। লাফ দেওয়ার জন্যে তৈরি। তলোয়ারের হাতল বাঁ হাতের তালুতে, ডান তালু হাতলের কড়ার নীচে হালকা করে ধরা। তলোয়ারের ডগা দুশমনের বাঁদিকে চোখের দিকে। মাথা সোজা, চিবুক ভেতরে টেনে আনা। আর হাত? হাত কোথায় থাকবে? বিজন?”
নবিশদের দু-একজনের মুখে বাঁকা হাসি খেলে যায়। বিজন ওস্তাদের একেবারে পেয়ারের শাগির্দ। কারণে-অকারণে তাকে সবার সামনে তুলে ধরাটা আজকাল অনেকেরই গায়ে লাগে।
বিজন অবশ্য সেসবে ভ্রূক্ষেপ করে না, লাইন থেকে বেরিয়ে ওস্তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ফটক তরিকায় কাঠের তলোয়ার তুলে ধরে।
“হাত শরীর থেকে সামান্য দূরে আলগা করে ধরা, যেন বাহুমূল আর শরীরের মধ্যে দু-দিকে দুটো বল ধরা আছে।’’
বিজনের দিক হাত উঁচু করে দেখান উদয়ভান, “এই তরিকায় শরীর পুরোটাই তলোয়ারের আড়ালে থাকে। মাথাটা দেখা যায় বটে, কিন্তু মাথার ওপর কোপ চালালে পালটা দেওয়াটা শক্ত নয়।’’
মুখের কাঁচাপাকা দাড়িতে হাত রেখে নবিশদের লাইনের দিকে তাকান উদয়ভান, “ফটকের কাছাকাছি আর কোনও তরিকা আছে?’’
“বেওকুফ!” কেউ একজন উত্তর দেয়।
“হ্যাঁ। দুশমনকে বুদ্ধু বানিয়ে কাছে টেনে আনার তরিকা বলে এর নাম বেওকুফ। এটা প্রায় ফটক তরিকার মতোই, কেবল তলোয়ারের ডগা থাকবে নীচের দিকে, দুশমনের হাঁটুর দিকে তাক করা।” বিজনের দু-হাতে বাড়িয়ে-ধরা কাঠের তলোয়ারের মাথাটা একটা আঙুল দিয়ে নীচের দিকে নামিয়ে দেন উদয়ভান, “দুর্বল ভেবে দুশমন কাছে এলে তাকে পালটা দেওয়া এর উদ্দেশ্য। তবে এই তরিকা নতুনদের জন্যে নয়।”
খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে নবিশদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে ছিপছিপে লম্বাটে রজত। গত তিন বছর ধরে কথাগুলো শুনে শুনে তার মুখস্থ হয়ে গেছে, এক কথা শুনতে তার কিছুটা বিরক্তিই লাগে। সুরেলা আওয়াজ তুলে আকাশে উড়তে-থাকা রামধনু ফিঙের ঝাঁকের দিকে নিজের অজান্তেই চলে যায় তার বাদামি রঙের চোখজোড়া।
“রজত!’’ ওস্তাদের হুংকারে রজতের মন আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসে। ‘‘সামনে দুশমন থাকলে কি আকাশের পাখি দেখবি?’’
নবিশদের সারির মধ্যে থেকে দু-একটা খুকখুক হাসির শব্দ ওঠে।
“খামোশ!’’ ধমকে ওঠেন ওস্তাদ উদয়ভান, “রজত, সামনে আয়।”
মাথা নিচু করে নবিশদের লাইন পার করে সামনে বিজনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় রজত। আড়চোখে তাকিয়ে দ্যাখে বিজনের কান-এঁটো-করা হাসিটা।
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রজতের দিকে তাকান ওস্তাদ উদয়ভান, “ফটক যদি নিজে নিজেকে বাঁচানোর তরিকা হয়, তাহলে বেপরোয়া হামলার তরিকা কী?”
“চাঁদোয়া।” মাথা নিচু করে উত্তর দেয় রজত।
“করে দেখা।”
চাঁদোয়া তরিকায় পজিশন নেয় রজত। বাঁ পা সামনে, কাঠের তলোয়ার কোপ মারার মতো করে ধার ওপরদিকে রেখে দু-হাতে মাথার ওপর তোলা। ফলা পেছনদিকে আর ডানদিকে বেঁকানো। বাঁ হাত কপালের কাছে, কনুই কাছাকাছি টেনে আনা।
হাতের তলোয়ার তুলে রজতের দিকে ইঙ্গিত করেন, “এই তরিকা হামলা করার, দুশমনকে ভয় পাওয়ানোর। এতে একচোটে দুশমনকে মেরে ফেলা যায়, কিন্তু শরীর, গলা, কবজি আড়ালে থাকে না। এ তরিকায় কোনও ডিফেন্স নেই, সবটাই অফেন্স।”
বিজনের দিকে তাকান উদয়ভান, “বিজন!”
“ওস্তাদ!’’
“রজতের মুখোমুখি দাঁড়া!”
একটা বাঁকা হাসি খেলে যায় বিজনের ঠোঁটে, কাঠের তলোয়ার দু-হাতে ধরে রজতের মুখোমুখি দাঁড়ায় সে। ঢোঁক গেলে রজত। এই সামনে দাঁড়ানোর অর্থ সে ভালোই বোঝে।
“অফেন্স আর ডিফেন্স দুটোই যাতে আছে, সেই তরিকার নাম কি বিজন?’’
“খুঁটি! ওস্তাদ।”
“পজিশন নে।”
দেহের সঙ্গে তলোয়ারের ফলা প্রায় সমান্তরাল রেখে তলোয়ার উঁচু করে তুলে ধরে বিজন। তলোয়ারের হাতল চেপে-ধরা মুঠো দুটো ডানদিকের চিবুকের কাছে, তলোয়ারের ফলা আকাশের দিকে, বাঁ পা সামনে।
নিজের ইস্পাত কাচের তলোয়ারের ফলাটা কাঠের তলোয়ার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে-থাকা দুই নবিশের মাঝখানে বাড়িয়ে ধরেন ওস্তাদ উদয়ভান, “বিজন, খুঁটি। রজত, চাঁদোয়া। দুটো তরিকা মুখোমুখি। এবার, হামলা!”
বিদ্যুৎবেগে দুজনের মাঝখান থেকে নিজের তলোয়ার সরিয়ে নেন উদয়ভান।
মাথার ওপর তুলে-রাখা তলোয়ার দিয়ে বিজনের শরীরের ওপর কোপ চালায় রজত, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার নিজের সোজা করে তুলে-ধরা তলোয়ার বাঁদিকে মাথার সামনে আড়াআড়ি করে নামিয়ে আনে বিজন।
রজতের তলোয়ারের কোপ বিজনের শরীরের ওপর পড়ে না, আটকে যায় তার তলোয়ারের বাধায়। কাঠে কাঠে ঠোকাঠুকির ঠকাস শব্দটা আকাশের দিকে ছিটকে যায়, একটা যন্ত্রণার তরঙ্গ রজতের মুঠো থেকে শুরু হয়ে ছড়িয়ে পড়ে তার কাঁধের হাড় অবধি।
রজতকে সামলে নেওয়ার সুযোগ দেয় না বিজন। তার ডান হাতের কনুই ওপরদিকে ঘুরে আসে, কবজি মুচড়ে যায়, আর কাঠের তলোয়ারের ডগাটা ওপর থেকে কোনাকুনি নেমে এসে আঘাত করে রজতের বুকের মাঝখানে।
যন্ত্রণায় মুখটা কুঁকড়ে যায় রজতের। তার হাত থেকে তলোয়ার খসে পড়ে, দু-হাতে বুক চেপে ধরে মাটিতে বসে পড়ে সে।
একরকম ঘাড় ধরেই রজতকে টেনে দাঁড় করিয়ে দেন উদয়ভান, “চাঁদোয়া তরিকা ওস্তাদ তলোয়ারবাজদের জন্যে। বোঝাই যাচ্ছে, রজত তাদের মধ্যে পড়ে না।”
হাসির আওয়াজ ছড়িয়ে যায় সার দিয়ে দাঁড়ানো নবিশদের মধ্যে। বিজনের মুখের হাসিটা আরও চওড়া হয়।
তলোয়ার কুড়িয়ে নেওয়ার অছিলায় জামার হাতায় চোখের জলটা সবার অলক্ষে মুছে নেয় রজত।
আখড়া থেকে ফিরে হাত-মুখ ধুয়ে শরীরের কালশিটে-পড়া দাগগুলোতে মলম লাগায় রজত, পোশাক পালটে দু-একটা জিনিস ঢোকায় পকেটে। তারপর বাইরের ঘরের হাতিয়ার র্যাক থেকে একটা তলোয়ার বের করে কোমরবন্ধে গুঁজে নিয়েই তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসে বাইরে।
বাইরের ঘরে বেশিক্ষণ থাকতে পারে না রজত। সেই রাতের ঘটনার পর বছর তিনেক হয়ে গেছে, তবু ঘরে ঢুকলেই সেদিনের কয়েকটা গন্ধ যেন ফের তার নাকে ভেসে আসে। উটিয়া বাঁদরের গায়ের দুর্গন্ধ, শিবানীর রক্তের তামাটে গন্ধ, ভাঙা জানলা দিয়ে ভেসে-আসা নীল আপেলের মিষ্টি গন্ধ, আর তার ঘাড়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে-পড়া অরূপরতনের শরীর থেকে ভেসে-আসা সাবানে হালকা সুগন্ধ। সেই সঙ্গে কানে বাজতে থাকে সেদিন প্রথম শোনা দুটো কথা।
“নালায়েক! নামর্দ!”
হনহন করে পা চালিয়ে দেয় রজত, যেন স্মৃতিগুলো সব সে পেছনে ফেলে আসতে চায়। রাস্তা ধরে রজত হাঁটতে থাকে দক্ষিণদিকে, যেখানে আকাশের গায়ে দেখা যায় পাহাড়ের সারি।
হাঁটতে হাঁটতে হোমিগঞ্জের বাইরে এসে পড়ে রজত। আয়াসরেশমের কুঠি, চালকল, মালগুদাম পেরিয়ে কালভৈরব পাসের রাস্তা ধরে উঠতে থাকে পাহাড়ে।
প্রায় আধ ঘণ্টা ওঠার পর কালভৈরব পাসের একদম ওপর এসে দাঁড়ায় রজত। পাহাড়ি পথটা এখানে আরও দক্ষিণে নেমে গিয়ে পাহাড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছে। এই রাস্তা গিয়ে মিশেছে রুসোগঞ্জ আর হকিন্সাবাদের রাস্তায়। এদিকে তাকালে জঙ্গল ছাড়া কিছু দেখতে পাওয়া যায় না। যেদিক দিয়ে সে উঠে এসেছে, সেদিকে তাকালে অবশ্য হোমিগঞ্জকে পরিষ্কার দেখতে পাওয়া যায়।
কালভৈরব পাস থেকে নেমে-আসা রাস্তাটা হোমিগঞ্জের আগে তিন ভাগ হয়ে গেছে। একটা দক্ষিণদিকে বেঁকে চলে গেছে গোডেলগাঁও অবধি, একটা শেষ হয়েছে হোমিগঞ্জে, আর অন্যটা চলে গেছে আরও উত্তরদিকে এশারগাঁওয়ের দিকে। এখানে থেকে দেখা না গেলেও এই রাস্তাই এশারগাঁওয়ের পর পুবদিকে বাঁক নিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে চলে গেছে হকিন্সাবাদের দিকে।
হোমিগঞ্জের দিকে নেমে-যাওয়া কালভৈরব পাসের রাস্তা থেকে একটা সরু পথ পুবদিকের একটা পাহাড়ে উঠে গেছে। হোমিগঞ্জের দিকে আর-একবার তাকিয়ে এবার এই পথটা ধরে রজত। গাছের ছায়া-ঢাকা খাড়াই পথ ধরে একটু ওঠার পর এসে দাঁড়ায় পাহাড়ের মাথায়।
পাহাড়ের ওপরে একটা পাথরের মন্দির। বেশি বড় নয়। কয়েক ধাপ সিঁড়ি, একটা চাতাল, আর তার পেছনে কালভৈরবের বিগ্রহ। এই মন্দিরের নাম থেকেই পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার পথটার নাম কালভৈরব পাস হয়েছে।
কালভৈরবের মন্দিরের চেহারা অত্যন্ত সাদাসিধে, মন্দিরের গায়ে ছবি, খোদাই বা অন্য কোনওরকম অলংকরণ নেই। তবে মন্দিরের থামের গায়ে নানান নাম লেখা। এখানে যারা আসে, তারা থামের গায়ে নিজেদের নাম লিখে যায়। কয়েক শতাব্দী ধরে এই প্রথা পালন করার পর এখন থামগুলো আঁকাবাঁকা অক্ষরে ভরে গেছে।
থামে নাম লেখা ছাড়াও এখানে আর-একটা প্রথা আছে। যাত্রীরা এখানে চাতালে নানা জিনিস রেখে যায়, আবার চাতালে রেখে-যাওয়া জিনিসের মধ্যে থেকে নিজের যেটা প্রয়োজন, সেটা তুলে নিয়ে যায়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই মন্দিরে এই নীরব বিনিময় প্রথা চলে আসছে।
চাতালে উঠে কালভৈরবকে একটা প্রণাম করে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে রজত। উত্তর-পশ্চিমের উঁচু উঁচু পাহাড় এখান থেকে পরিষ্কার দেখা যায়। তাদের বরফ-ঢাকা চুড়োগুলো বিকেলের আলোয় ঝকঝক করে।
দূরের পাহাড়গুলোর দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটা বাঁশি বের করে তাতে ফুঁ দেয় তাতে রজত। বহুদিন আগে এক অচেনা কালান্দরের কাছে শোনা সুর বাজতে থাকে তার বাঁশিতে।
পাহাড়, গাছ, আকাশ তার বাঁশির সুর শোনে, কেউ তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে না, কেউ তাকে ব্যঙ্গ করে না।
সুর যখন শেষ হয় তখন হোমিগঞ্জ থেকে ভেসে আসছে ঘণ্টার হালকা শব্দ। সন্ধের প্রস্তুতিতে যেন দূরের পাহাড়ের সারি তাদের চূড়ায় লাল রং মেখে ধীরে ধীরে অঙ্গে জড়িয়ে নিচ্ছে কুয়াশার চাদর।
বাঁশিটা পকেটে পুরে নামতে আরম্ভ করে রজত, অন্ধকার হওয়ার আগে নীচে নেমে যেতে হবে, এ অঞ্চলে উটিয়া বাঁদরের উৎপাত আছে।
পাহাড় থেকে নেমে কালভৈরব পাস ধরে রজত কিছুটা এগিয়েছে, হঠাৎ রাস্তার পাশের জঙ্গলে একটা মড়মড় করে ডালপালা ভাঙার আওয়াজ ওঠে। রজতের হৃৎপিণ্ডটা গলার কাছে লাফিয়ে ওঠে, তলোয়ারের মুঠের ওপর তার আঙুলগুলো সজোরে চেপে বসে। উটিয়া বাঁদর, ডিমকি হায়েনা, শিঙেল চিতা, এই জঙ্গলে হিংস্র পশুর অভাব নেই।
কিন্তু না, কোনও পশুর আক্রমণ নয়, আওয়াজের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত হয় রজত। একটা গাছ কোনওভাবে উপড়ে গিয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ঝোপঝাড় ভাঙতে ভাঙতে নীচে গড়িয়ে পড়ছে।
জঙ্গলে এভাবে গাছ ভেঙে পড়াটা নতুন কিছু নয়, এর আগেও রজত এরকম দেখেছে। মেটে খরগোশ বা ডোরা ইঁদুর গাছের গোড়ায় বাস করে গাছের শেকড় কেটে দিলে গাছে ওইভাবে ভেঙে পড়ে।
পথে দাঁড়িয়ে গাছের গড়ানো দেখছে রজত, হঠাৎ পাহাড়ের ওপর থেকে একটা বড় পাথর ছিটকে এসে তার কয়েক ফুট সামনে এসে পড়ে।
চমকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে যায় রজত, পাথরটা হয়তো গড়ানো গাছের ধাক্কায় পাহাড়ের গা থেকে খসে পড়েছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা নিরাপদ নয়, পাথরটা তার মাথাতেও পড়তে পারত। যাওয়ার জন্যে ফের পা বাড়ায় সে।
কিন্তু পথের মাঝে পড়ে-থাকা পাথরটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তার ওপর চোখ পড়তে আর-একবার দাঁড়িয়ে পড়তে হয় তাকে।
চওড়া চ্যাটালো গোল পাথরের স্ল্যাবটা দেখে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে প্রকৃতির জল-হাওয়া তার রূপ গড়ে দেয়নি। উপরন্তু তার গায়ে খোদাই করা রয়েছে কোন এক অদ্ভুত লিপির আঁকিবুকি।
দ্বিতীয়বারের জন্যে রজতের হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ওঠে। তবে এবারে ভয়ে নয়, প্রত্যাশায়।
ভিন্নর বাঙ্কার! গাছের ধাক্কায় পাথরটা কোন ভিন্নর বাঙ্কারের মুখ থেকে খসে পড়েছে!
মানুষ অম্বালিকায় পা দেওয়ার বহু আগেই ভিন্নররা উধাও হয়ে গেছে এই গ্রহ থেকে। কোথায় গেছে, বা কেন গেছে, তার উত্তর কেউ জানে না। কিন্তু অম্বালিকায় রয়ে গেছে তাদের ফেলে-যাওয়া নানা প্রযুক্তি। কিছু মাটির ওপরে, আর কিছু ভূগর্ভে। তাদের ফেলে সে সমস্ত জিনিসের চাহিদা আকাশছোঁয়া।
নিজের ভয়গুলোকে দাবিয়ে রেখে কালভৈরব পাসের রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢোকে রজত, মাথা উঁচু করে পাহাড়ের গায়ে খোঁজার চেষ্টা করে ভিন্নর বাঙ্কারের প্রবেশদ্বার।
নীচ থেকে পাহাড়ের গায়ের গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের আলো-আঁধারির মধ্যে কোনও কিছু ঠাহর করা সহজ নয়। মাথা ঘুরিয়ে এদিক-সেদিক দেখেও কিছু নজরে না পড়তে রজত কিছুটা হতাশ হয়ে ভাবছে কী করবে, হঠাৎ পড়ন্ত আলো আর মেঘের কোন এক অদৃশ্য কারসাজিতে রোদের একটা তির্যক রেখা আকাশ থেকে যেন অদৃষ্টের আঙুলের মতোই পাহাড়ের গায়ে এসে পড়ে।
আর সে আলোয় রজত স্পষ্ট দেখতে পায় পাহাড়ের গায়ে গাছপালার সবুজের কোলে ভিন্নর বাঙ্কারের অন্ধকার গুহামুখ।
হাত-পায়ে ভর দিয়ে পাহাড়ের ওপর উঠে গুহার মুখের কাছে পৌঁছোয় রজত। গুহার মুখটা চার ফুটের বেশি চওড়া হবে না, তার চারপাশটা পাথর দিয়ে বাঁধানো। দেখলে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে নীচে যে পাথরটা গড়িয়ে পড়েছে, সেটা দিয়েই এই গুহামুখটা শক্ত করে বন্ধ করা ছিল।
বাঁ হাতে রোশনি প্রদীপ ধরে আর ডান হাত তলোয়ারের হাতলে রেখে, ঘাড়-মাথা গুঁজে গুহার মধ্যে পা রাখে রজত। সরু গুহাটা সুড়ঙ্গের মতো এঁকেবেঁকে পাহাড়ের ভেতরে চলে গেছে, রোশনি প্রদীপের নীল আলোয় বেশি দূর দেখা যায় না। এবড়োখেবড়ো স্যাঁতসেঁতে দেওয়ালে গা ঘষটে কিছুটা দেখে, কিছুটা আন্দাজে রজত গুহার ভেতরে ঢুকতে থাকে।
কিছুটা যাওয়ার পর রজত বুঝতে পারে, সুড়ঙ্গটা ঢালু হয়ে ওপরের দিকে উঠছে, আর একই সঙ্গে গুহার ব্যাস ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এবার আর ঘাড় গুঁজেও হয় না, একেবারে পিঠটা বেঁকিয়ে কোনওমতে এগোতে হয়। পায়ের নীচেটা পিচ্ছিল হয়ে আসে, জুতোর মধ্যে দিয়েও জলের স্পর্শ টের পাওয়া যায়।
মিনিট পাঁচেক এইভাবে যাওয়ার পর আচমকাই সুড়ঙ্গটা ফুরিয়ে যায়, আর রজত একটা খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ায়।
চারপাশে রোশনি প্রদীপের নীল আলো ফ্যালে রজত। নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে বেশি দূর দেখা যায় না বটে, কিন্তু বেশ বোঝা যায় যে সে একটা চওড়া গুহার ভেতর এসে দাঁড়িয়েছে। গুহাটার ছাদটা অনেক উঁচুতে, দেওয়ালগুলোও বেশ দূরে।
রোশনি প্রদীপের আলোতে মাটিতে পড়ে-থাকা কিছু একটা চকচক করে ওঠে। কাছে গিয়ে আলো ফেলে ভালো করে দ্যাখে রজত।
লন্ঠন। একটা লন্ঠন।
রজতের মনের ভিন্নর পুরাবস্তু পাওয়ার আশাটুকু আচমকাই নিভে যায়। গুহায় লন্ঠন পাওয়ার অর্থ তার আসার আগে এখানে মানুষের পা পড়েছে। অর্থাৎ এখানে যা ছিল, তার সবই হয়তো আগেই লুঠ হয়ে গেছে।
নিচু হয়ে লন্ঠনটা জ্বালায় রজত। লন্ঠনের জোরালো আলোয় এবার চারপাশটা ভালো করে দেখা যায়। গুহাটা দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশ ফুটের মতন হবে, ছাদটা প্রায় দু-মানুষ উঁচুতে। যেদিক থেকে সে গুহায় ঢুকেছে, তার উলটোদিকে পাথরের স্তূপ, হয়তো গুহাটা এককালে আরও বড় ছিল, ছাদ ধসে পড়ে বাকিটা বুজে গেছে। গুহার মাটিতে একটা জলের কুণ্ড, তার থেকে জল উপচে তিরতির করে বয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে তার আসা সুড়ঙ্গ দিয়ে। কুণ্ডের পাশ থেকে একটা প্যাঁচালো পাথরের সিঁড়ি উঠে গেছে গুহার ছাদ অবধি।
এবং রজতের আশঙ্কা অমূলক নয়, লন্ঠনটা ছাড়া গুহাটা একেবারেই ফাঁকা। মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে-থাকা ছোটবড় পাথরের টুকরো ছাড়া আর কিচ্ছু নেই সেখানে।
মুষড়ে পড়ে রজত। তার সমস্ত পরিশ্রমটাই বৃথা। সে আসার আগেই গুহা কেউ খালি করে দিয়েছে।
কিছুটা শেষ চেষ্টার মতো করেই প্যাঁচানো পাথরের সিঁড়িটা বেয়ে ওপরে ওঠে রজত। কিন্তু সেখানেও কিছু পায় না। সিঁড়িটা হঠাৎ করেই গুহার ছাদে শেষ হয়ে গেছে, আর ওপরে ওঠার জায়গা নেই।
সিঁড়িটা ছাদের যেখানে শেষ হয়েছে সে জায়গাটা লন্ঠন তুলে একবার ভালো করে দ্যাখে রজত। না, কোনও লুকোনো দরজা চোখে পড়ে না রজতের, তবে সিঁড়ির শেষাংশ ঘিরে ছাদের গায়ে একটা হালকা রেখা দেখতে পায় সে।
হাত দিয়ে জায়গাটা ছোঁয় রজত। রেখার দু-দিকের স্পর্শ হাতের ছোঁয়ায় দু-রকম লাগে তার। আর-একবার লন্ঠন তুলে ভালো করে দ্যাখে সে।
এবার বুঝতে অসুবিধে হয় না তার। যেখানে এখন ছাদ, সেখানে একটা ফোকর ছিল, যেখান দিয়ে ওপরে ওঠা যেত। কিন্তু কোনও কারণে সেই প্রবেশপথটা বুজিয়ে দেওয়া হয়েছে। যারা গুহা থেকে মালপত্র সরিয়েছে, তারাই হয়তো কাজটা করেছে।
কিন্তু কেন? কৌতূহল আরও জোরালো হয় রজতের, সিঁড়ি থেকে নেমে গুহার চারপাশ আর-একবার ভালো করে দেখতে আরম্ভ করে সে।
গুহার যেদিকটা পাথরের স্তূপ, সেখানটা খুঁটিয়ে দেখলে স্পষ্টই বোঝা যায় যে সেখানে একটা প্রবেশদ্বার ছিল। পাথরের স্তূপের চারপাশে সেই হারিয়ে যাওয়া প্রবেশদ্বারের খোদাই-করা ফ্রেমটা চিনতে অসুবিধে হয় না। রজতের প্রথমে বুঝতে ভুল হয়েছিল। গুহাটার ছাদ ধসে পড়েনি, পাথর দিয়ে সেটাকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু কেন? ভিন্নর বাঙ্কার লুঠ করার কাজটা মানুষ অম্বালিকায় পা দেওয়া অবধি হয়ে আসছে। কিন্ত বাঙ্কার লুঠ করে তারপর তার কিছু অংশ বুজিয়ে দেওয়ার কথা রজত কখনও শোনেনি। তার কৌতূহল প্রশমিত হওয়া দূরস্থান, আরও দ্বিগুণ হয়ে বেড়ে ওঠে।
লন্ঠনের আলোতে এবার গুহার অন্য দেওয়ালগুলো দ্যাখে রজত। চারটে দেওয়ালেরই মাঝের অংশে একটা টানা লম্বা পটির মতন ফ্রেস্কো আঁকা। আর সেই ফ্রেস্কোর প্যানেলের পর প্যানেল জুড়ে কেবল ভিন্নরদের নানা নারকীয় ছবি।
ভিন্নরদের ছবি রজত আগে যে দেখেনি তা নয়। অম্বালিকায় নানান জায়গায় তাদের ছবি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। ভিন্নরদের শরীরের আকারের সঙ্গে উটিয়া বাঁদরের চেহারার বেশ কিছুটা সাদৃশ্য আছে। অনেকেই মনে করে, জংলি উটিয়া বাঁদর থেকেই ভিন্নররা বিবর্তিত হয়েছে।
কিন্তু এই গুহার ফ্রেস্কোর মতো ভিন্নরদের এমন সব কুৎসিত, বীভৎস ছবি রজত আজ পর্যন্ত দেখেনি। ফ্রেস্কোর প্রতিটি প্যানেলে কেবল আঁকা বিকৃত যৌনাচার আর নৃশংস অত্যাচারের দৃশ্যপট।
ছবিগুলো দেখলে সর্বশরীর কেমন গুলিয়ে ওঠে। কিন্তু তার মনে ওঠা প্রশ্নের সূত্র খুঁজে পাওয়ার আশায় তা-ও প্রত্যেকটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দ্যাখে রজত।
প্রায় সব ক-টা ছবি যখন তার দেখা শেষ হয়ে এসেছে, একটা ছবিতে চোখ আটকে যায় তার। একটা পাহাড়ের চুড়োয় একদল ভিন্নর আর-একটি ভিন্নরের ওপর নির্যাতন করছে। তার চোখ খুবলে নিচ্ছে, তার হাত-পা কেটে নিচ্ছে।
ছবিতে আঁকা আকাশ আর তার প্রেক্ষাপটে আঁকা পাহাড়ের দিকে চোখ আটকে যায় রজতের। দৃশ্যটা তার কেমন পরিচিত লাগে।
হঠাৎ তার মনে পড়ে যায়, ঠিক এই দৃশ্যটাই সে খানিক আগে কালভৈরবের মন্দিরের কাছ থেকে দেখেছে। মন্দিরের সিঁড়িতে বসলে দূরের পাহাড়গুলোকে ওইরকমই দেখতে লাগে।
কপাল কুঁচকে আসে রজতের, সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ের কোনদিকে সে এসেছে, ঠাহর করতে চেষ্টা করে। গুহার মাঝখানে ছাদে গিয়ে ঠেকা সিঁড়িটায় আর-একবার চোখ যায় তার।
আর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকারে বিদ্যুৎ চমকানোর মতোই সে কোথায় আছে, তার কাছে সেটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়।
কালভৈরবের মন্দির! এই গুহাটা কালভৈরবের মন্দিরের ঠিক নীচে। মানুষ যখন অম্বালিকায় আসে তখন কেউ পাহাড়চুড়োয় বাঙ্কারে ঢোকার মূল প্রবেশপথটা বন্ধ করে দিয়ে ওপরে মন্দির তুলে দেয়। এবং তারাই হয়তো গুহার অর্ধেকটা পাথর দিয়ে বুজিয়ে দেয়। কিন্তু কেন? কী রহস্য লুকিয়ে আছে এই গুহায়?
পকেট থেকে টাইমস্কোপ বের করে দ্যাখে রজত। বেশ দেরি হয়ে গেছে, তাকে অনেকটা পথ যেতে হবে। তা ছাড়া এর রহস্যের জট এখানে বসে ছাড়ানো সম্ভব নয়, হোমিগঞ্জে লোককে জিজ্ঞেস করলে, কিংবা কাউন্সিল হাউসের পুরোনো রেকর্ড ঘাঁটলে হয়তো কিছু সূত্র পাওয়া যেতে পারে।
যাওয়ার আগে গুহাটার ভেতর আর-একবার চোখ বোলাতে গিয়ে রজতের নজর পড়ে সিঁড়ির পাশে জলকুণ্ডের দিকে। পাহাড়ের ভেতরে কোনও জলের স্রোত প্রস্রবণ হয়ে বেরিয়ে এসেছে গুহার মাটি থেকে, অল্প অল্প করে গুহার পাথুরে মেঝে হয়ে গড়িয়ে চলে যাচ্ছে তার আসা সুড়ঙ্গ দিয়ে।
মাথায় একটা চিন্তা খেলে যায় রজতের। গুহাটা মানুষে খালি করে দিয়েছে বটে, কিন্তু জলের তলায় যদি ছোটখাটো দু-একটা পুরাবস্তু লুকিয়ে থাকে?
হারিয়ে-যাওয়া আশাটা আবার নতুন করে জেগে ওঠে রজতের মনে। লন্ঠনটা সে তুলে ধরে জলকুণ্ডের ওপরে। কিন্তু লন্ঠনের নীল আলোয় জলের অন্ধকার কাটে না। মসিবর্ণ জলের তলায় কী আছে তা দেখতে পাওয়া যায় না।
জলটা একবার হাতড়ে দেখার ইচ্ছেটা মনে জাগে রজতের, কিন্তু জলে হাত দিতেও তার সাহস হয় না। অম্বালিকায় বিষাক্ত প্রাণীর অভাব নেই। জলের মধ্যে ঘাপটি মেরে কী লুকিয়ে আছে, বলা মুশকিল।
খাপ থেকে তলোয়ার টেনে বের করে রজত, হাত না দিয়ে বরঞ্চ এটা দিয়ে জল নেড়ে দেখাটা বেশি নিরাপদ।
ইস্পাত কাচের ফলাটা জলে খানিকটা ডোবায় রজত, কিন্তু তলোয়ারের ডগা জলের তলা স্পর্শ করে না। কিছুটা অবাকই হয় সে, কুণ্ডটা কি তাহলে খুব গভীর?
ফলার প্রায় অর্ধেকটা জলে ডুবিয়ে দেয় রজত, কিন্তু তা-ও তলোয়ারের প্রান্তভাগ কুণ্ডের জলের নীচে ঠ্যাকে না।
রজত তলোয়ারটা আরও কিছুটা ডোবাতেই ইতস্তত একটা মৃদু কাঁপুনি অনুভব করে শরীরে। যেন জল থেকে তলোয়ারের ফলা বেয়ে তার হাতে উঠে আসছে জুঁই বোলতার গুঞ্জনের মতো একটা কম্পন। হাতের হাড় চিনচিন করে ওঠে তার, গ্রন্থিগুলো অবশ হয়ে আসতে চায়।
চমকে উঠে রজত তলোয়ার টেনে নিতে চেষ্টা করে, কিন্তু তলোয়ার নড়ে না। কে যেন বজ্রমুষ্টিতে তলোয়ারের ফলা ধরে রেখেছে। সেটাকে ডাইনে-বামে, ওপরে-নীচে একচুলও নড়ানো যায় না। জল থেকে উঠে-আসা কম্পন এবার হাত থেকে রজতের শরীরে ছড়িয়ে যেতে আরম্ভ করে, তার শরীরের একটা চিনচিনে অবশতা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে যেতে থাকে।
আতঙ্কে তলোয়ারের হাতল থেকে হাত ছাড়িয়ে নিতে যায় রজত, কিন্তু তার হাতের আঙুলগুলো যেন অসাড় হয়ে গেছে, তার নির্দেশ মানে না, আগের মতোই তার মুঠো তলোয়ারের হাতল আঁকড়ে থাকে। জল থেকে এবার একটা কালো ধোঁয়ার সরু বিনুনি উঠতে আরম্ভ করে তলোয়ারের ফলা বেয়ে। কোথাও যেন দূর থেকে ভেসে আসে একই সুরে বিরামহীনভাবে বাজতে-থাকা ভেঁপুর তীক্ষ্ণ শব্দ, আর বেতালা বেয়াড়া ঢাকঢোলের আওয়াজ।
রজতের মনে হয়, গুহার ছাদ, মাটি, দেওয়াল সব যেন ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে, মিশে যাচ্ছে কোন এক অন্তহীন অন্ধকারে। সেই নিঃসীম অন্ধকারের কেন্দ্রে এক অদ্ভুত সত্তার উপস্থিতি যেন মর্মে অনুভব করে সে। মুহুর্মুহু স্পন্দিত হয়ে-চলা সেই নিরাবয়ব, অজানা, সীমাহীন চেতনার মন নেই, অহং নেই, অনন্ত বুভুক্ষা ছাড়া কোনও বোধ নেই। সেই ক্ষুধা যেন সৃষ্টির শৃঙ্খলায় অন্ধ আক্রোশে দাঁত ঘষে চলেছে চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলার জন্ম দেবার উন্মাদ প্রচেষ্টায়।
সেই সত্তার একটা ক্ষুদ্র অংশ স্পর্শ করে রজতের মন। কোথাও যেন একটা সংযোগ তৈরি হয়। রজতের মনে হয়, শূন্য কলসি যেমন ধীরে ধীরে জলে ভরে ওঠে, তার অন্তঃকরণও যেন কোন এক উপস্থিতিতে পূর্ণ হয়ে উঠছে, এই অনন্ত অন্ধকারে সে-ও যেন লীন হয়ে যাচ্ছে, হারিয়ে যাচ্ছে তার চেতনা।
যখন বোধ ফিরে আসে, রজত খেয়াল করে, সে হাঁটু গেড়ে বসে আছে জলের কুণ্ডের কাছে। তার দুই হাঁটুর সামনে আড়াআড়িভাবে পড়ে তার তলোয়ার।
ডান হাতের মুঠোয় তলোয়ারের হাতল চেপে ধরে রজত। তার মনের মধ্যে সে অনুভব করে যে কোথাও বহু দূর থেকে ভেসে আসা এক সীমাহীন ক্ষুধার হাহাকার।
দাঁড়িয়ে উঠে তলোয়ার খাপে ঢোকায় রজত, বন্ধ হয়ে যায় হাহাকার।
সুড়ঙ্গ দিয়ে বেরিয়ে যখন রজত ফের কালভৈরব পাসে পা রাখে তখন রাত হয়ে গেছে, অম্বালিকার আকাশের মাঝখানে উঠে এসেছে ভামিনীর দুধসাদা থালার চেহারা। তার আলোয় রজতের পথ চলতে অসুবিধে হয় না।
পাহাড়ি পথ বেয়ে কিছুটা নেমে এসেছে রজত, পাশের জঙ্গল থেকে পথের ওপর লাফিয়ে পড়ে একটা উটিয়া বাঁদর। লম্বা গলাটা রজতের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে তীক্ষ্ণ চিৎকার করে ওঠে প্রায় চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে।
মনে বিন্দুমাত্র আলোড়ন হয় না রজতের। প্রায় শিথিল ভঙ্গিতে খাপ থেকে তলোয়ার খুলে বাড়িয়ে ধরে সে। আগের মতোই তলোয়ারের স্পর্শে অনুভব করে সেই বুভুক্ষার হাহাকার।
নাক তুলে হাওয়ায় কিছুর গন্ধ শোঁকার চেষ্টা করে উটিয়া বাঁদর। তার চিৎকার মাঝপথেই বন্ধ হয়ে যায়, তার বদলে সেটার গলা দিয়ে যে আওয়াজটা বেরিয়ে আসে, তাকে অনায়াসে আর্তনাদ বলা চলে। রজতকে ফেলে হুড়মুড় করে ঝোপঝাড় মাড়িয়ে জঙ্গলের অন্ধকারে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যায় সেটা।
তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে হোমিগঞ্জের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনের ভেতরটা একবার হাতড়ায় রজত। কিন্তু সেখানে সে দ্বিধা, শঙ্কা বা ভয়ের কোনও চিহ্ন খুঁজে পায় না। সেগুলো যেন সে ভিন্নর বাঙ্কারের গুহাতেই ফেলে এসেছে।
সকালের নরম রোদে আলোছায়া-মাখা পাথরের উঠোনে আজকেও দিনের তালিম শুরু করেন ওস্তাদ উদয়ভান, চিরাগ আখড়ার ওস্তাদ। কাঠের তলোয়ার হাতে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে শোনে নবিশরা।
আজও নবিশদের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে রজত। তফাতের মধ্যে অন্যদিনের মতো তার মনে বিরক্তির জায়গায় একটা নিস্পৃহতার ভাব। এমনকী সুরেলা আওয়াজ তুলে আকাশে উড়তে-থাকা রামধনু ফিঙের ঝাঁকও আজ তাকে আকর্ষণ করে না।
আজও তলোয়ারবাজির তরিকাগুলো রপ্ত করান উদয়ভান। আখড়ার চারপাশে ছড়িয়ে যায় তাঁর উঁচু গলার আওয়াজ।
“পুচ্ছ্! এই তরিকায় দুশমন তলোয়ার দেখতে পাবে না, কতটা লম্বা তা-ও বুঝতে পারবে না, ধাঁধায় থাকবে। তলোয়ার ফেরানো শরীরের পেছনদিকে, তলোয়ারের হাতল-ধরা দু-হাতের মুঠি ডানদিকের কোমরের কাছাকাছি, তলোয়ারের ডগা মাটি থেকে সামান্য ওপরে, যেন জানোয়ারের ল্যাজ।’’
তরিকা দেখানো শেষ করে সোজা হয়ে দাঁড়ান উদয়ভান, “আজ তিন তরফা মোকাবিলা। বিজন, রজত, সুজয়!”
বিজন আর রজতের সঙ্গে তাদেরই বয়সি একটা ছেলে নবিশদের লাইন ছেড়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
“বিজন, সুজয় এদিকে। রজত এপাশে।’’
একটা বাঁকা হাসি খেলে যায় বিজনের ঠোঁটে। প্রতিদিনের মতো আজও উদয়ভানের উদ্দেশ্য রজতকে অপদস্থ করা। না হলে তার মতো আনাড়িকে কেউ দুজনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পাঠায় না।
উদয়ভানের উদ্দেশ্যটা বোঝে রজতও। কিন্তু অন্যদিনের মতো আজ আর তার রাগ, ক্ষোভ, অভিমান কিছুই বোধ হয় না। তার সমস্ত মন আজ কেমন একটা নিস্পৃহতাতে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
“রজত, বিজন, সুজয়। ফটক। তিনজনে একই তরিকা!’’ উদয়ভানের হুকুম ছড়িয়ে যায় আখড়ার উঠোনে।
তিনজনেই পজিশন নেয়। ডান পা-বাঁ পায়ের এক কদম আগে, বাঁ পায়ের গোড়ালি তোলা, দু-হাতে ধরা কাঠের তলোয়ারের প্রান্ত প্রতিপক্ষের চোখের দিকে তাক করা।
শরীরটা আলগা করে দেয় রজত। গত রাতের ভিন্নর বাঙ্কারের মতোই আজও তার মনের ভেতর জায়গা করে নেয় কোনও এক নামহীন উপস্থিতি।
তরিকার পোজ ঢিলে হয়ে যায় রজতের। কাঠের তলোয়ারের প্রান্ত দুলতে দুলতে, নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ে। যেন রজত তার হাতিয়ারের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে।
মুখের হাসিটা আরও চওড়া হয় বিজনের। তার কাঠের তলোয়ারের ফলা ডানদিকে বেঁকে গিয়েই ছুটে আসে রজতের গর্দান লক্ষ্য করে।
নিজেকে বাঁচানোর কোনও চেষ্টাই করে না রজত। বিজনের তলোয়ার তার শরীর স্পর্শ করার আগেই তার নিজের নীচে ঝুঁকে-পড়া তলোয়ার বিদ্যুৎবেগে সোজা ওপরে উঠে আসে। বিজনের তলোয়ার ধরে-থাকা দুই হাতের ছড়ানো কনুইয়ের ফাঁক দিয়ে উঠে তলোয়ারের কাঠের প্রান্তটা বর্শার মতো আঘাত করে বিজনের থুতনির ঠিক নীচে।
যন্ত্রণায় দু-চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে বিজনের। এক হাত তলোয়ার থেকে তুলে গলা চেপে ধরে সে পিছিয়ে যায় এক-পা।
সুজয় তখনও কাঠের তলোয়ার উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে। তার মুখের হতভম্ব চেহারা পরিষ্কার জানা দিচ্ছে যে এই পরিস্থিতিতে কী করতে হবে তা তার বুদ্ধির বাইরে।
বিজনকে আঘাত করে রজতের তলোয়ার থামে না। সুজয়ের উঁচিয়ে-থাকা তলোয়ারকে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে কোনাকুনি নীচে নেমে আঘাত করে তার হাঁটুর ঠিক তলায়। কাঠের তলোয়ার আর সুজয়ের পায়ের সংঘর্ষে যে বীভৎস আওয়াজটা হয়, তাতে বুঝতে অসবিধে হয় না যে সুজয়ের পায়ের হাড় সম্ভবত অক্ষত নেই।
একটা মর্মভেদী আর্তনাদ করে হাতের তলোয়ার ছুড়ে ফেলে দেয় সুজয়, দু-হাতে পা চেপে ধরে মাটিতে পড়ে চিৎকার করতে থাকে যন্ত্রণায়।
বিজনের দিকে কয়েক পা এগিয়ে যায় রজত। নীচ থেকে আবার কোনাকুনি উঠে আসে তার তলোয়ার, আছড়ে পড়ে বিজনের বাঁদিকের পাঁজরে। হাড় ভাঙার আওয়াজটা এবারেও স্পষ্ট শোনা যায়।
বিজনকে নিশ্বাস, দম নেওয়ার সুযোগ দেয় না রজত। পেছন থেকে ভেসে আসা উদয়ভানের, “খতম! খতম! ম্যাচ খতম” চিৎকারের তোয়াক্কা না করে বিজনের আরও কাছে পৌঁছে দু-হাতে ধরা তলোয়ারের বাঁটের প্রান্ত সজোরে হাতুড়ির মতো নামিয়ে আনে তার নাকের ওপর। নাক দিয়ে রক্ত ছিটকে যায় বিজনের, দেহটা তার কাটা গাছের মতন আছড়ে পড়ে মাটিতে।

মাত্র কয়েকটা মিনিটের মধ্যেই তালিম নিতে-আসা দুটো ছেলে গুরুতর জখম হয়ে ছটফট করে মাটিতে, আর ভাবলেশহীন মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকে রজত। বিস্ফারিত চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে অন্য নবিশেরা।
ক্রুদ্ধ শিঙেল চিতার মতো রজতের সামনে লাফিয়ে পড়েন উদয়ভান, “বেরিয়ে যা! আমার আখড়া থেকে এক্ষুনি বেরিয়ে যা!”
একটা তাচ্ছিল্যের ভাব ছড়িয়ে পড়ে রজতের চোখ-মুখে। কাঠের তলোয়ারের দু-প্রান্ত দু-হাতে ধরে সজোরে নামিয়ে আনে ঊরুর ওপরে।
কাঠ ভাঙার তীক্ষ্ণ শব্দটা ছড়িয়ে যায় আখড়ার প্রতিটি কোণে। চমকে উঠে গাছের আশ্রয় ছেড়ে আকাশের দিকে ছিটকে উড়ে যায় রামধনু ফিঙের ঝাঁক।
কাঠের তলোয়ারের ভাঙা টুকরো দুটো উদয়ভানের গায়ে ছুড়ে দিয়ে বিনা বাক্যব্যয়ে রজত বেরিয়ে যায় চিরাগ আখড়া ছেড়ে।
বিকেলবেলা বাইরের ঘর থেকে ওস্তাদ উদয়ভানের গলা পায় রজত। অরূপরতনের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তার টুকরোটাকরা তার কানে আসে।
“...জখম গুরুতর… শয্যাশায়ী…”
উত্তরে অরূপরতন কী বলেন, শোনা যায় না।
“হয়তো আমারই দোষ, ভেবেছিলাম, কোণঠাসা করলে, রাগিয়ে দিলে লড়াইয়ের ইচ্ছেটা... তাহলেও এরপর আর আখড়ায় ওকে…।”
আবার ভেসে আসে উদয়ভানের কণ্ঠস্বর।
কিছুক্ষণ পরে রজতের ঘরে ঢোকেন অরূপরতন। রাগত স্বরে বলেন, “ওস্তাদ উদয়ভান আর আখড়ায় তোকে রাখতে চান না।”
“কী করা যাবে!” নিরাসক্ত কণ্ঠে উত্তর দেয় রজত।
“তুই ছেলেগুলোকে ওভাবে জখম করলি কেন?”
“তলোয়ারবাজি লোক খুনজখম করার জন্যেই শেখে, মৌজমস্তি করার জন্যে নয়।” নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলে রজত, “জখম হওয়ার ভয় থাকলে ওদের তলোয়ারবাজি শিখতে আসাই উচিত হয়নি।”
উত্তর দিতে গিয়েও দিতে পারেন না অরূপরতন। রজতের দিকে তাকিয়ে তাঁর কথা মুখেই থেকে যায়। তাঁর কেমন মনে হয় যেন আদিম কোনও আক্রোশ আর ক্রূরতা পুঞ্জীভূত হয়ে রজতের দু-চোখের পেছন থেকে উঁকি দিচ্ছে, ছাড়া পেলেই তাঁকে মুহূর্তের মধ্যে ছিন্নভিন্ন করে দেবে।
তাঁর বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা ধাক্কা লাগে। মাথা নিচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে যান তিনি।
মাসখানেক কেটে যায়। রজত আর অরূপরতনের মধ্যে বহুদিন ধরেই যে ধীরে ধীরে একটা অদৃশ্য দেওয়াল গড়ে উঠেছিল, সেটা এ ক-দিনে আরও মজবুত, পাকাপোক্ত হয়ে ওঠে। একই ছাদের নীচে দুটো মানুষ পাশাপাশি থেকেও পরস্পরের থেকে আলাদা হয়ে যায়।
আখড়া যাওয়া বন্ধ হলেও তলোয়ারবাজি বন্ধ হয়নি রজতের। রোজ বাড়ির সামনের আঙিনায় ইস্পাত কাচের তলোয়ার হাতে টানা কসরত করে সে। তলোয়ারবাজির সমস্ত ধরনের প্রথা লঙ্ঘন করা নিয়ম-ভাঙা ছন্দে তার দেহের চারপাশে ঘোরে তার তলোয়ার। পথচলতি লোক অনেক সময়ে দাঁড়িয়ে তার সেই অদ্ভুত, অজানা তলোয়ারবাজি দেখে।
সেদিন বিকেলেও রজত তার কসরতে ব্যস্ত, মন্টু ছুটতে ছুটতে আসে।
মন্টু হোমিগঞ্জের বাইরের তাদের চালকল আর চালের গুদাম দেখাশোনা করে। গোলগাল চেহারা, কিছুটা স্থূলবুদ্ধি হলেও সর্বদা হাসিখুশি থাকে। বেশি খায় বলে সবাই তাকে খ্যাপায়, তবে সে নিয়ে তার বিশেষ মাথাব্যথা নেই।
“ছোটেসাব, বড়েসাব কোথায়?”
“বাগানে।”
সংক্ষিপ্ত উত্তরটা দিয়েই হয়তো রজত নিজের তলোয়ারবাজিতে মন দিত, কিন্তু মন্টুর মুখের দিকে নজর পড়তে তার কপাল কুঁচকে যায়।
মন্টুর একটা চোখ ফোলা, ঠোঁট ফেটে রক্ত পড়ছে। তার মুখের সেই চিরাচরিত হাসি আজ উধাও।
“কী হয়েছে তোর?”
“পিণ্ডারি!” হাঁপাতে হাঁপাতে উত্তর দেয় মন্টু।
“কোথায়?’’
“চালকলে। বলছে, আমাদের কাফিলা2 নাকি চুঙ্গিকর দেয়নি, তাই বাকি আদায় করতে এসেছে।”
পিণ্ডারি। একটা শব্দেই রজত বুঝে যায়, কী হয়েছে। আজকাল নানা সরকারি বিভাগ ভাড়াটে সিপাহি নিয়োগ করে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে এরা প্রায়ই খাজনা আদায়ের ছুতোয় নানা জোরজুলুম করে, বা লুঠতরাজ করে। এদের সাজা দিতে পারে এমন কোনও বিচারব্যবস্থা অম্বালিকায় নেই, কেবল তলোয়ারের জোরেই এদের তলোয়ার আটকাতে হয়।
তলোয়ার খাপে ঢুকিয়ে কোমরবন্ধে গোঁজে রজত, “আস্তাবল থেকে গ্রিবিন নিয়ে আয়।”
অবাক হয়ে রজতের মুখের দিকে তাকায় মন্টু, “বড়ে সাবকে—?”
“পরে খবর দিবি। তাড়াতাড়ি যা!’’
একটু বাদে লাগাম ধরে নীল রঙের লম্বা গলা পশুটাকে হাঁটিয়ে নিয়ে আসে মন্টু।
লাগামটা তার হাত থেকে নিয়ে রেকাবে পা রেখে গ্রিবিনের পিঠে লাফিয়ে ওঠে রজত, “এবার যা, বাবাকে খবর দে।”
হতভম্ব হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে মন্টু, “তুমি কোথায় চললে?”
“চালকলে।”
গোড়ালির ধাক্কায় গ্রিবিন ছুটিয়ে দেয় রজত। পেছন থেকে তার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মন্টু।
চালকলটা হোমিগঞ্জের কিছুটা বাইরে, পাহাড়ের গায়ে। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনায় তার টারবাইনের বিশাল চাকাটা ধীরে ধীরে ঘোরে।
টারবাইনের চাকার সামনে দাঁড়িয়ে একটা নীলকান্ত মোষে টানা গাড়িতে চালের বস্তা বোঝাই করে দু-তিনজন। আরও চার-পাঁচজন তলোয়ার হাতে গাড়ির সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাহারায় দাঁড়িয়ে। প্রত্যেকটা লোকেরই রুক্ষ চেহারা, চাহনিতে মায়ামমতার লেশমাত্র নেই।
গ্রিবিনের পিঠ থেকে নেমে তার লাগামটা একটা গাছের ডালে বাঁধে রজত। তারপর খাপ থেকে তলোয়ার বের করে পাহারা-দেওয়া দলটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুখ তার ভাবলেশহীন, দু-হাতে ধরা তলোয়ার শিথিলভাবে শরীরের সামনে ঝুলছে।
তার তলোয়ার ধরার ভঙ্গি দেখে এর-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হাসে পিণ্ডারিদের দলটা।
চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে রজত। তলোয়ার বয়ে যে ক্ষুধার হাহাকারের মতো বোধ তার হাতে উঠে আসে, তাতেই যেন তার শরীর আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
এক হাতে তলোয়ার নাচাতে নাচাতে একজন এগিয়ে আসে। উশকোখুশকো চুল, পোকা-লাগা দাঁত, ময়লা জামাকাপড়।
“খোকাবাবুর তো ভালো করে গোঁফ গজায়নি দেখছি। তোমাকেই লড়তে পাঠিয়ে দিল?”
কোনও উত্তর দেয় না রজত, তার শারীরিক ভঙ্গিরও কোনও পরিবর্তন হয় না, মুখের চেহারাও তার আগের মতনই নিরুত্তাপ থাকে। কেবল তার তলোয়ারটা নীচ থেকে বিদ্যুৎবেগে উঠে আসে। তার কবজির সামান্য মোচড়ে ফলার ধারালো দিকটা ওপরদিকে বেঁকে গিয়ে পিণ্ডারির বাঁদিকের চিবুক থেকে গাল এবং কান চেঁচে বাদ করে দেয়।
ইচ্ছে হলে রজত তলোয়ারের ওই টানটা লোকটার গলাতেও দিতে পারত, কিন্তু এই মুহূর্তে তার কোনও তাড়া নেই।
গাল বাদ গিয়ে লোকটার মুখের ভেতরের দাঁতের পাটি প্রকট হয়ে পড়ে। রক্ত-মাখা বীভৎস মুখ নিয়ে সে আর্তনাদ করে কয়েক পা পিছিয়ে যায়।
“শালা বাঞ্চোত।’’ আর-একজন পিণ্ডারি তলোয়ার তুলে ছুটে এসে রজতের মাথা লক্ষ্য করে কোপ চালায়।
রজতের তলোয়ার এবার ওপর থেকে নীচে নেমে আসে। তার মাথায় কোপ পড়ার আগেই তার তলোয়ারের ফলা পিণ্ডারির পেটের ওপরদিকে হালকাভাবে আড়াআড়ি বয়ে যায়। তলোয়ারের টানে লোকটার পেট চিরে যায়, হাতের তলোয়ার ফেলে আর্তনাদ করে সে মাটিতে বসে পড়ে। তার চেরা পেটের ভেতর থেকে নাড়িভুঁড়িগুলো পরিত্যক্ত আবর্জনার মতো ছড়িয়ে পড়ে মাটিতে।
তারপর চলতে থাকে এক অদ্ভুত, অসম যুদ্ধ। রক্ত ছলকায়, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিটকে পড়ে, আর্তনাদ আর রক্তের তামাটে গন্ধ ছড়িয়ে যায় বাতাসে।
আর প্রতিটি আঘাতের পর, প্রতিটি আর্তনাদের পর তার তলোয়ারের ধরা হাতে রজত কোনও সুদূর এক বুভুক্ষার পরিতৃপ্তির আভাস পায়।
বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন অরূপরতন লোকজন জুটিয়ে চালকলে এসে উপস্থিত হন ততক্ষণে লড়াই শেষ হয়ে গেছে। রক্ত-ভেজা মাটিতে পিণ্ডারির দল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আর্তনাদ করছে। তলোয়ারের আঘাত তাদের শরীর এমনভাবে খুবলে দিয়েছে যে তারা বাঁচবে না বটে, কিন্তু মারা যাবে অনেকক্ষণ বাদে, এবং অশেষ যন্ত্রণা ভোগ করে।
আর এদের থেকে কিছু দূরে, একটা গাছের তলায় বসে সম্পূর্ণ নির্লিপ্তভাবে রক্ত মুছে তলোয়ার পরিষ্কার করে রজত।
পড়ে-থাকা মানুষগুলোর আঘাতের চেহারা দেখে অরূপরতনের সঙ্গে আসা কয়েকজন ওয়াক তুলতে থাকে, কয়েকজন থরথর করে কাঁপতে থাকে।
রজতের কাছে পাংশু মুখে এসে দাঁড়ান অরূপরতন, “এ তুই কী করেছিস? এরপর লোক তোর সম্বন্ধে কী বলবে জানিস?”
বাবার দিকে তাকায় রজত। মুখে তার একটা তিক্ত হাসি, বসে-যাওয়া চোখে উন্মত্ততার ছাপ।
“যা-ই বলুক, নালায়েক-নামর্দ তো বলবে না।”
মাসকয়েক আগে বুকে অনুভব করা ধাক্কাটা আজ যেন আরও দ্বিগুণ জোরে আঘাত করে অরূপরতনকে। একটা অন্ধকার আচ্ছন্ন করে তাঁর চেতনাকে, জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান তিনি।
রাতের বেলা ডাক্তার এসে অরূপরতনকে পরীক্ষা করে গম্ভীর মুখে রজতকে জানিয়ে দিয়ে যায় যে স্ট্রোকে অরূপরতনের নিম্নাঙ্গ আড়ষ্ট হয়ে গেছে, সুস্থ না-হওয়া অবধি তিনি নিজের পায়ে চলতে পারবেন না।
ডাক্তার বিদায় নেওয়ার পর রজত নিজের ঘরে এসে পোশাক পালটাচ্ছে, তার তাক থেকে কী একটা মাটিতে গড়িয়ে পড়ে।
নীচের দিকে তাকিয়ে দ্যাখে রজত। তার শামুক বাঁশের বাঁশিটা।
গোড়ালি দিয়ে মাটিতে পড়ে-থাকা বাঁশিটাকে মড়মড় করে পিষে দেয় রজত।
আরও বছর পাঁচেক কেটে গেছে। অরূপরতন সুস্থ হয়ে উঠেছেন বটে, কিন্তু তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। ভগ্নস্বাস্থ্য অরূপরতনকে এখন লাঠি ঠুকে ঠুকে চলাফেরা করতে হয়, তলোয়ারবাজি করার প্রশ্নই নেই।
অন্যদিকে দুর্ধর্ষ তলোয়ারবাজ বলে রজতের নাম হোমিগঞ্জের চারপাশে রাষ্ট্র হয়ে গেছে। তলোয়ারবাজির যে-কোনও কম্পিটিশনে তাকে দেখা যায়, এবং সে থাকলে সেই প্রতিযোগিতা জেতা অন্য কারও পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে।
অবশ্য চিরাগ আখড়ার সেই ঘটনার পর প্রতিযোগিতার সময় রজত নিজেকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং নিয়মকানুন কঠোরভাবে মেনে চলে। এ বিষয়ে আজ পর্যন্ত তার কোনও অন্যথা হয়নি।
তবে লড়াইটা যখন কাঠের বদলে ইস্পাত কাচের তলোয়ার দিয়ে হয়, আর প্রতিযোগিতার বদলে জান দেওয়া-নেওয়ার হয়, সেখানে রজত সাক্ষাৎ মৃত্যুর মতোই নির্মম, নির্দয়। তার নাম শুনে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে এসে অনেকেই প্রাণ খুইয়ে তার মূল্য চুকিয়েছে। যারা কোনও কারণে বদলা নিতে এসেছে, তারাও ফিরে যেতে পারেনি।
তবে তার নাম শুনে কেবল তলোয়ারবাজরাই আসে না, আসে তলোয়ার সওদাগরেরাও। আজ সকালে যেমন এসেছে মন্মথ।
জানুর ওপর দু-হাত রেখে ফরাশে হাঁটু গেড়ে বসে থাকে রজত। টিকোলো নাকের নিচে চোখ দুটো আগের চাইতে ঈষৎ বসে গেছে, চোয়াল আরো শক্ত হয়ে উঠেছে। রজতের সামনে দু-হাতে যত্ন করে ধরে এক-এক করে তলোয়ার বিছিয়ে ধরে মন্মথ।
“এইটার হাতলে পাথর-বসানো মিনাকারির কাজ, কোমরবন্ধে লাগালে হুজুরকে মানাবে ভালো। এইটা দেখুন হুজুর, একেবারে বনেদি তলোয়ার। দৌলতনগরের প্রথম গভর্নরের এডিকং3-এর খাস হাতিয়ার। বংশের লোকজন যত্ন করে অনেকদিন রেখে দিয়েছিল। অবস্থা পড়ে গেছে বলে বাধ্য হয়ে বিক্রি করেছে। আর হুজুর, এইটা হকিন্সাবাদের সুখেন ওস্তাদের নিজের হাতে বানানো। ফলার ওপরে মহাকাল স্তোত্র খোদাই করা আছে।”
ডাইনে-বাঁয়ে হালকা মাথা নাড়ে রজত, “মন্মথ, তলোয়ার সাজগোজের জন্যেও নয়, আর বনেদিয়ানা দেখানোর জন্যেও নয়। তলোয়ারের কাজ হল মানুষের জান নেওয়া, মানুষকে জখম করা। আর তাতে মহাকাল স্তোত্রও কোনও কাজে আসে না। সহজে খুন ঝরানো যায় এমন কোনও হাতিয়ার থাকলে দেখাও।”
ইতস্তত করে ঝোলা থেকে একটা তলোয়ার বের করে মন্মথ। খাপ থেকে খুলে ফরাশের ওপর নামিয়ে রাখে সন্তর্পণে, “হুজুরের এটা ঠিক পছন্দ হবে কি না জানি না। পুরোনো জিনিস, অনেক হাত ঘুরে আমার কাছে এসেছে। দেখতে সাদামাটা, তবে শুনেছি, ইউলারগঞ্জে ব্যবহার হয়েছিল।”
কপাল কুঁচকোয় রজত, “ইউলারগঞ্জে? মানে ইউলারগঞ্জের গণহত্যায়?”
ঢোঁক গেলে মন্মথ, “জি হুজুর, তা-ই তো শুনেছি। যার কাছ থেকে কিনেছিলাম, সে বলেছিল, গণকবরে লাশের সঙ্গেই এটা পাওয়া গিয়েছিল। এটা দিয়েই হয়তো—!”
তলোয়ারটা হাতে তুলে দ্যাখে রজত। মন্মথ মিথ্যে বলেনি, তলোয়ারটা দেখতে অতি সাধারণ। বৈশিষ্ট্যের মধ্যে তার লম্বা সোজা হাতলের প্রান্তটা পেছনদিকে বাঁকানো, আর বাঁকানো অংশটা উটিয়া বাঁদরের মাথার আকারে খোদাই করা। ধার পরীক্ষা করার জন্যে ফলার ওপর আলতো করে দুটো আঙুল বোলায় রজত। এবং সঙ্গে সঙ্গে ঘোলাটে কাচের ফলা সূর্যোদয়ের মতো লাল হয়ে ওঠে। বিস্মিত রজত আঙুল দুটো তুলে ধরে দ্যাখে, দুটো আঙুলই আড়াআড়িভাবে চিরে গেছে।
“সাবধান হুজুর!” তাড়াতাড়ি একটা রুমাল বাড়িয়ে ধরে মন্মথ, “আমি দু-একজন ওস্তাদ কারিগরকে তলোয়ারটা দেখিয়েছিলাম, তারা সবাই একবাক্যে বলেছে এই তলোয়ারের কাচটা মানুষের তৈরি নয়। খাঁটি ভিন্নর কাচ।”
অম্বালিকায় লোহা অপ্রতুল। হাতিয়ার তাই এখানে তৈরি হয় ইস্পাতের বদলে ইস্পাত কাচে। আর ইস্পাত কাচ মানুষ তৈরি করা শেখে অম্বালিকায় পাওয়া ভিন্নরদের ফেলে-যাওয়া ইস্পাত কাচের নমুনা থেকে। কিন্তু ক্ষমতায় আর গুণে মানুষের বানানো ইস্পাত কাচ ভিন্নরদের তৈরি ইস্পাত কাচের ধারেকাছে আসে না।
রুমালে আঙুল মুছে তলোয়ার নামিয়ে রাখে রজত, “আমি এটাই নেব।”
একটা চওড়া হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মন্মথের মুখ, “হুজুর সমঝদার। কাজের জিনিস চেনেন।’’
দরজায় এসে দাঁড়ায় একজন গৃহভৃত্য, “ছোটেসাব, বড়েসাব আপনাকে ডাকছেন।’’
উঠে দাঁড়ায় রজত, “যাচ্ছি। মন্মথকে অফিসঘরে নিয়ে যাও। বলো এই তলোয়ারটার দাম চুকিয়ে দিতে। আর পয়সা মেটানো হয়ে গেলে এটাকে এখানেই রেখে যেয়ো।”
ঘর থেকে বেরিয়ে একটা ঢাকা বারান্দা পেরোয় রজত। অরূপরতনের ঘরের লাক্ষার কাজ করা দরজার পাল্লা দুটো ঠেলে ভেতরে পা রাখে। দরজার দু-পাশে বিশাল জালার মতো ফুলদানিতে রাখা মোহনচাঁপার গাঢ় মিষ্টি গন্ধে ভারী হয়ে আছে ঘরের বাতাস। তার সঙ্গে মেশে জানলা দিয়ে ভেসে-আসা নীল আপেলের হালকা সুবাস।
“ডাকছিলে?”
একটা কাউচে আধশোয়া হয়ে-বসা অরূপরতন জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, মাথা ঘোরান রজতের ডাকে।
“ওস্তাদ উদয়ভান এসেছিল।”
“কেন?”
“তুই চিরাগ আখড়ার কম্পিটিশনে নাম দিয়েছিস?”
রজতের কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ঝরে পড়ে, “হ্যাঁ দিয়েছি। এ তল্লাটে যে-কোনও কম্পিটিশনেই আমি নাম দিয়ে থাকি। এতে নতুন কী আছে? তার জন্যে ওস্তাদজিকে আসতে হল কেন, বুঝলাম না।’’
“তুই বিজনের বিপক্ষে নাম দিয়েছিস!”
চেষ্টা করেও কণ্ঠস্বরে ব্যঙ্গের ছোঁয়া চেপে রাখতে পারে না রজত, “সেটা দেওয়াটাই তো স্বাভাবিক। বিজন এখন চিরাগ আখড়ার এক নম্বর তলোয়ারবাজ, প্রায় ওস্তাদজির ডান হাত। বাকিরা তো নবিশ। নিজের তলোয়ারবাজির প্রমাণ দিতে গেলে তো বিজনের সঙ্গে লড়েই দিতে হবে। কেন, বিজন ভয় পেয়েছে নাকি?”
দু-পাশে মাথা নাড়ান অরূপরতন, “ভয় পায়নি, তবে—’’
“তবে কী?’’
জানলার বাইরের নীলচে-সবুজ আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা নিশ্বাস টানেন অরূপরতন।
“দেখ, চিরাগ আখড়ার কম্পিটিশন দেখতে হকিন্সাবাদ থেকে অনেক ফৌজি অফিসাররা আসে। বিজনের হকিন্সাবাদের ফৌজি স্কুলে ইন্সট্রাক্টরের চাকরিতে যোগ দেওয়া প্রায় পাকা। চাকরিটা পাওয়ার জন্যে বিজনের পরিবার প্রচুর পয়সা ঢেলেছে। এখন বিজন যদি তোর কাছে হকিন্সাবাদের অফিসারদের সামনে হেরে যায়, তাহলে এই চাকরিটা পাওয়া খুব মুশকিল হয়ে যাবে।”
“তো আমি কী করব?’’ বিরক্তি দ্বিগুণ হয় রজতের কণ্ঠস্বরে।
“উদয়ভান আমাকে বলতে এসেছিল তোকে একটা অনুরোধ করতে।”
কপাল কুঁচকে আসে রজতের, “কী অনুরোধ?”
“তুই যদি বিজনের কাছে হেরে যাস তো ভালো হয়।”
ঘরের মধ্যে একটা উটিয়া বাঁদর লাফ দিয়ে পড়লেও রজত হয়তো এতটা চমকে উঠত না, “মানে ইচ্ছে করে হেরে যাব? বিজনের কাছে? কী বলছ তুমি!”
রজতের চোখে চোখ রেখে কিছুটা অনুনয়ের স্বরেই অরূপরতন বলেন, “হ্যাঁ, ক্ষতি কী বল? তুই তো ওই আখড়া কবে ছেড়ে দিয়েছিস। হারলি কি জিতলি, তাতে কী যায় আসে? কিন্তু জিতলে বিজনের যদি চাকরিটা পেতে সুবিধা হয়—’’
একটা রক্তলাল ক্রোধ যেন লাভার মতো ছড়িয়ে যায় রজতের মাথার মধ্যে। অরূপরতন তাঁর কথা শেষ করার আগেই যেন বিস্ফোরণে ফেটে পড়ে সে, “এই বিজনটা পুরো জালি। হিজড়েটার মারদাঙ্গা করার ক্ষমতা নেই, যাচ্ছে মাস্টারি করতে। সেটাতেও দু-নম্বরি। নিজে জেতার দম নেই, অন্যকে বলছে হেরে যেতে।’’
দু-হাত শরীরের দু-পাশে মুঠো করে ধরে অরূপরতনের দিকে ঝুঁকে পড়ে রজত, “আর তুমিও বলিহারি। আমি কী চাই আর না চাই, সে কথা কোনওদিন জানতে চাইলে না। শুধু তোমার কী প্রয়োজন, সেটাই শুনে গেলাম।’’
ফুঁসতে ফুঁসতে অরূপরতনের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রজত। নিজের ঘর থেকে উঠিয়ে নেয় মন্মথর রেখে-যাওয়া নতুন তলোয়ারটা। তারপর বাড়ির বাইরে এসে গ্রিবিন ছুটিয়ে দেয় কালভৈরব পাসের উদ্দেশে।
ব্যবহারের আগে নতুন তলোয়ারটাকে ভিন্নর বাঙ্কারের কুণ্ডের জলে চুবিয়ে নিতে হবে।
রজত যখন অরূপরতনের কাছে বিজন সম্বন্ধে তার বিরূপ ধারণা ব্যক্ত করছে, সেই সময়ে হোমিগঞ্জের অন্য প্রান্তে আর একজনও বিজন সম্বন্ধে মনের মধ্যে একই রকমের বিরূপ ধারণা নিয়েও তাকে জেতানোর পথ খুঁজতে ব্যস্ত। সে অন্য আর কেউ নয়, বিজনের স্ত্রী রিমা।
রিমা বরাবরই উচ্চাকাঙ্ক্ষী। এশারগাঁওয়ের সামান্য রেশমচাষির মেয়ে থেকে হোমিগঞ্জের অন্যতম বনেদি পরিবারের বধূ হয়ে ওঠাটা উচ্চাকাঙ্ক্ষা না থাকলে হয় না। এর জন্যে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে।
কিন্তু উচ্চাকাঙ্ক্ষা বস্তুটা এমনই যে সেটা এক জায়গায় স্থিতু হতে চায় না। সিঁড়ির একটা ধাপে ওঠামাত্র পরের ধাপে কীভাবে উঠবে, সেই নিয়ে উতলা হয়ে পড়ে। হোমিগঞ্জ এশারগাঁওয়ের তুলনায় বড় জায়গা বটে, কিন্তু হকিন্সাবাদের কাছে মফস্সল। হোমিগঞ্জের সামাজিক সিঁড়িটা গোটাকতক বনেদি পরিবার অবধি উঠেই ফুরিয়ে গেছে। সে তুলনায় হকিন্সাবাদে সেই সিঁড়ি উঠে গেছে অনেক উঁচুতে, খোদ চ্যান্সেলরের দরবার অবধি।
রিমাই তাই অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে বিজনকে রাজি করিয়েছিল হকিন্সাবাদে একটা সরকারি চাকরি জোটাতে। রিমাই বহু কষ্টে তাকে বুঝিয়েছিল, চাকরি পেতে গেলে দু-হাতে পয়সা ঢালতে হয়। এখন তার পরিশ্রমের ফল যখন হাতে প্রায় এসে পড়েছে, তখন তলোয়ারবাজির কম্পিটিশনে মাঝখান থেকে রজত এসে পড়ে শেষ মুহূর্তে সব পণ্ডশ্রম করে দিতে চলেছে। যেদিন থেকে বিজন জানতে পেরেছে যে তাকে রজতের বিরুদ্ধে তাকে লড়তে হবে, হারার আতঙ্ক যেন তাকে গ্রাস করেছে। দুশ্চিন্তায় তার আহার-নিদ্রা বন্ধ হয়ে গেছে।
এইরকম মেরুদণ্ডহীন পুরুষমানুষের ভরসায় থাকলে রিমার উচ্চাকাঙ্ক্ষার স্বপ্নগুলোকে অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই জলাঞ্জলি দিতে হয়। অতএব রিমা বিজনকে জেতানোর দায়িত্বটা নিজের কাঁধেই তুলে নিয়েছে। চোখের জল ফেলে, নানা গল্প ফেঁদে উদয়ভানকে সে-ই অরূপরতনের কাছে পাঠিয়েছিল। আর উদয়ভানের অনুরোধে কাজ হয়েছে কি না জানার জন্যে নজর রাখতে বলেছিল সুবলকে। সুবল বিজনদের বাড়ির পুরোনো কাজের লোক।
বই পড়ার অছিলায় রিমা সকালে থেকেই বাড়ির সামনের আঙিনায় সুবলের জন্যে অপেক্ষা করে আছে।
বেলা যখন কিছুটা বেড়ে উঠেছে, সুবল এসে হাজির হয়।
“কিছু খবর পেলি? হারতে রাজি হয়েছে?’’ অধীর আগ্রহে প্রশ্ন করে রিমা।
মাথা নাড়ে সুবল, “না। বোধহয় রাজি হয়নি। ওদের বাড়ির লোক বলল নাকি বাবার সঙ্গে কথা কাটাকাটি করে বাড়ি থেকে গ্রিবিনে চড়ে বেরিয়ে গেছে।’’
কিছুটা দমে যায় রিমা কিন্তু হাল ছাড়ে না, “বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথায় গেছে?”
“কালভৈরব পাসের দিকে গেছে, যা শুনলাম। প্রায়ই নাকি ওদিকে যায়।’’
“কালভৈরব পাস? কালভৈরব পাসে কী করতে যায়?’’
“তা জানি না। কালভৈরবের মন্দিরে যায় হয়তো।”
কয়েক মুহূর্ত চিন্তা করে রিমা। উদয়ভানের অনুরোধে যদি কাজ না হয়ে থাকে তাহলে তাকেই রজতকে বুঝিয়েসুঝিয়ে রাজি করাতে হবে। রজতের মন ভেজাতে যদি কান্নাকাটি, চোখের জল, মনগড়া দুঃখের গল্প— এইসবের প্রয়োজন হয় তাহলে সেইসব নাটকের জন্যে কালভৈরবের মন্দিরের মতো নির্জন জনবিরল জায়গাই আদর্শ।
সুবলের হাতে বইটা ধরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় রিমা, “দেখি, আমি যদি রাজি করাতে পারি। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে, বলবি, আমি মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছি।”
“কালভৈরবের মন্দিরের কাছে উটিয়া বাঁদরের উপদ্রব আছে।” মৃদু প্রতিবাদ করে সুবল।
“এখন দিনের বেলা কিছু হবে না।” হাত নেড়ে প্রতিবাদ উড়িয়ে দিয়ে হাঁটা দেয় রিমা।
কালভৈরব পাসে ওঠার রাস্তার মুখের কাছটা এসে রিমা দ্যাখে, সুবল ভুল বলেনি, পাহাড়ে ওঠার পথের ধারে একটা গাছের সঙ্গে একটা গ্রিবিন বাঁধা।
গ্রিবিনটাকে ছাড়িয়ে কিছুটা এগিয়ে রিমা দেখতে পায়, বেশ কিছুটা দূরে একজন বৃদ্ধ ও একটি কিশোরী মেয়ে পাহাড়ি পথ দিয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে। দূর থেকে তাদের দুজনের কথাবার্তার অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসে। তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে রিমাও কালভৈরব পাস ধরে পাহাড়ে চড়তে থাকে।
প্রায় বেশ কিছুক্ষণ হাঁটার পর রিমা খেয়াল করে, সে প্রায় কালভৈরব পাসের ওপরদিকে উঠে এসেছে। বৃদ্ধ আর মেয়েটিও পথের বাঁকের আড়ালে হারিয়ে গেছে, তাদের আর দেখা যাচ্ছে না।
কিছুক্ষণ জিরিয়ে সে আবার হাঁটা শুরু করতে যাবে, রাস্তার ধারের পাহাড়ের ওপর থেকে তার গায়ে কয়েকটা পাথরকুচি ছিটকে এসে লাগে। চমকে উঠে রিমা ওপরদিকে তাকিয়ে দ্যাখে, পাহাড়ের গায়ে একটা ছোট গুহার মুখে কিছু নড়াচড়া করছে।
রিমার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ওঠে। এ অঞ্চলে উটিয়া বাঁদরের উৎপাতের কথা সুবিদিত। তাড়াতাড়ি রাস্তার ধারে একটা গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে গুহার মুখটা লক্ষ করতে থাকে সে।
কিন্তু কয়েক মুহূর্ত বাদেই রিমা আশ্চর্য হয়ে দেখতে পায়, গুহা থেকে বেরিয়ে আসছে কোনও উটিয়া বাঁদর নয়, যার সঙ্গে দেখা করবে বলে সে কালভৈরব পাসে উঠে এসেছে, সেই রজত স্বয়ং।
পাহাড় থেকে নেমে পথ ধরে রজত আরও ওপরে উঠে গেলেও রিমা চুপ করে লুকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, রজতের সঙ্গে কথা বলার আগে একবার তার রহস্যটা জেনে নেওয়া দরকার। সে ওই গুহার মধ্যে কী করছিল, তার প্রমাণ জোগাড় করতে পারলে তার ওপর হয়তো চাপ দেওয়া সম্ভব।
রজতের চেহারাটা বাঁকের আড়ালে মিলিয়ে গেলে রিমা পাহাড়ে উঠে গুহার মধ্যে ঢোকে।
দুর্গম, সরু সুড়ঙ্গটা দিয়ে ভেতরে ঢুকে রিমাকে অবশ্য হতাশই হতে হয়। একটা প্যাঁচানো সিঁড়ির ধাপে রাখা লন্ঠনের আলোয় দেখা বা বোঝা যায়, জায়গাটা একটা পরিত্যক্ত ভিন্নর বাঙ্কার ছাড়া কিছু নয়। এখানে রজত যে জন্যই এসে থাকুক, তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যেতে পারে এমন কোনও কিছুরই অস্তিত্ব নেই।
তবু যাওয়ার আগে কেবল কৌতূহলের বশবর্তী হয়ে লন্ঠন তুলে দেওয়ালের ছবিগুলো দেখতে থাকে রিমা।
কয়েকটা ছবি দেখার পরই রিমার শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে, সে খেয়াল করে, তার মনের ভেতর মাথাচাড়া দিচ্ছে এমন কিছু উদগ্র বাসনা, যার অস্তিত্বের কথা তার কয়েক মুহূর্ত আগেও জানা ছিল না। কোন এক দুর্নিবার আকর্ষণ তাকে যেন বাধ্য করে ভিন্নর বাঙ্কারের প্রতিটি ছবি খুঁটিয়ে দেখতে।
সব ছবি যখন দেখা শেষ হয় তখন রিমার সমস্ত শরীর ঘামে ভিজে গেছে, পাঁজরের খাঁচাটা প্রায় হাপরের মতন ওঠানামা করছে।
অস্থির শরীর আর মনের মধ্যে ঘুরপাক খেতে-থাকা উৎকট বাসনা নিয়ে সিঁড়ির পাশের জলকুণ্ডের দিকে তাকায় রিমা। চোখে-মুখে জলের ঝাপটা দিলে হয়তো কিছুটা স্বাভাবিক হওয়া যাবে। কৌতূহল মেটাতে গিয়ে এখানে এসে তার খামোখা সময় নষ্ট হল। রজতের সঙ্গে কথা বলা তার এখনও বাকি।
কুণ্ডের ধারে বসে আঁজলা করা হাত দুটো জলে ডোবায় রিমা। সঙ্গে সঙ্গে জল থেকে একটা অদ্ভুত শিরশিরানি তার হাত বেয়ে শরীরে উঠে আসে। কোনও আদিম বুভুক্ষা যেন হাহাকার করে তার সমস্ত শরীরকে ডাক দেয়।
দু-হাত জলে ডুবিয়ে কুণ্ডের ধারে হাঁটু গেড়ে আচ্ছন্নের মতো বসে থাকে রিমা।
রিমা যখন উটিয়া বাঁদরের ভয়ে গাছের পেছনে লুকোচ্ছে, তার আগে আগে হাঁটতে-থাকা বৃদ্ধ আর কিশোরীটি তখন পৌঁছে গেছে কালভৈরবের মন্দিরের কাছে।
মন্দিরের সিঁড়িতে বসে কাঁধের ঝোলা থেকে কয়েকটা ফল বের করে মেয়েটির দিকে বাড়িয়ে দেয় বৃদ্ধ, “মিতা, এগুলো মন্দিরের ভেতর রেখে আয় তো মা। আর দেখ যদি কাজে লাগার মতো কিছু পাস।”
মন্দিরের ফল রেখে বেরিয়ে আসে মিতা, হাতে একটা পাতার ঠোঙা, “চিঁড়ে আছে, দাদু। খাবে?”
“চিঁড়ে?’’ মিতার হাতের ঠোঙার দিকে তাকায় বৃদ্ধ, “চিঁড়ে তো ভেজাতে হবে। জল তো নেই। উঠতে উঠতে এত তেষ্টা পেল যে সব জল খেয়ে ফেলেছি।”
“ও তোমায় চিন্তা করতে হবে না, দাদু। পাহাড়ে ওঠার সময় আমি জলের শব্দ পেয়েছি। কাছেই কোথাও একটা ঝরনা আছে। তুমি এখানে বোসো, আমি চিঁড়ে ভিজিয়ে আনছি।’’
বৃদ্ধকে প্রতিবাদ করার সুযোগ না দিয়ে তরতর করে নীচে জঙ্গলের মধ্যে নেমে যায় মিতা।
মিতার যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে বৃদ্ধ। তারপর মন্দিরের দিকে ফিরে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে আরম্ভ করে, “হে বাবা কালভৈরব, আমার এই বাপ-মা-মরা নাতনিটার একটা ব্যবস্থা করে দাও বাবা, তাহলে আমি শান্তিতে চোখ বুজতে পারি। জয় বাবা কালভৈরব। হে বাবা কালভৈরব—’’
চোখ বুজে প্রার্থনা করতে-থাকা বৃদ্ধ টেরও পায় না কখন রজত মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষ কোনও কারণে রজত মন্দিরের কাছে আসেনি। ভিন্নর বাঙ্কারে এলে সে এখানটা একবার ঘুরে যায়। পাহাড়চুড়ো থেকে চারপাশের দৃশ্যটা কিছুক্ষণ দ্যাখে, তারপর চলে যায়। আজও সে একই কারণে এসেছিল। কিন্তু পাহাড়ের ওপর একলা বৃদ্ধকে পেয়ে তার মনে আদিম এক বুভুক্ষার বোধ হঠাৎই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যেন কোনও ভোজনবিলাসী অনাহারে কাতর হয়ে হাহাকার করছে।
একটা আঙুল দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে-থাকা বৃদ্ধের কাঁধে খোঁচা দেয় সে, “এই বুড়ো! কী করছ এখানে?”
থতোমতো খেয়ে উঠে দাঁড়ায় বৃদ্ধ। সামনে একজন তলোয়ারবাজকে দেখে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে কিছুটা।
“কিছু না, হুজুর। বুড়ো মানুষ হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে পড়েছি, তাই একটু জিরিয়ে নিচ্ছি।”
“কোথা থেকে আসছ?’’
“গোডেলগাঁও থেকে, হুজুর। দৌলতনগর যাব, মহাকালের মন্দির দর্শন করতে।”
“সঙ্গে কেউ নেই?’’
ইতস্তত করে না বৃদ্ধ। অম্বালিকায় কোনও তলোয়ারবাজকে কোনও সহায়হীন অল্পবয়সি মেয়ের সংবাদ দেওয়াটা যে আদৌ নিরাপদ নয়, তার দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সে কথা সে ভালোই জানে। তাই সত্যিটা গোপন করে বলে, “না, হুজুর। সবারই কাজকর্ম আছে। বুড়ো মানুষকে কে আর তীর্থযাত্রায় নিয়ে যাবে। একাই যাচ্ছি।”
“হুঁ।” নির্নিমেষ নয়নে বৃদ্ধের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে রজত। হাত নেমে আসে তার তলোয়ারের হাতলে, “তাহলে তোমার থাকা-না-থাকাতে কিছু যায়-আসে না, বলো? চোখ বন্ধ করো।”
রজত কী করতে চলেছে, বুঝতে এক মুহূর্তও লাগে না বৃদ্ধের। তার দু-চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাত দুটো সামনে তুলে পিছিয়ে যাবার চেষ্টা করে সে।
কিন্তু তার আগেই সাপের ছোবলের মতো খাপ থেকে লাফিয়ে ওঠে রজতের তলোয়ার, বৃদ্ধ সামান্য নড়াচড়াটুকু করার আগেই দু-ফাঁক করে দেয় তার গলার নলি।
পিচকিরির মতন রক্ত ছিটকে যায় বৃদ্ধের গলা থেকে, তার দেহটা আছড়ে পড়ে মাটিতে।
বৃদ্ধের জামায় তলোয়ারের রক্ত মুছে সেটাকে খাপে ঢোকায় রজত, তারপর কালভৈরব পাসের রাস্তা দিয়ে নীচে নামতে থাকে শিস দিতে দিতে।
অর্ধেকটা রাস্তা রজত নেমে এসেছে, হঠাৎ উলটোদিক থেকে ওপরে উঠতে-থাকা একজন তার মুখোমুখি এসে পড়ে। মাঝবয়সি লোকটার সাদামাটা চেহারা, পরনে অতি সাধারণ পোশাক, পিঠে ফেরিওয়ালাদের মতন একটা বাক্স বাঁধা। রজতকে দেখে সে যেন ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে, তাড়াতাড়ি পথ ছেড়ে দেয়।
লোকটার হাবভাব কেমন যেন সন্দেহজনক লাগে রজতের, হাত তুলে পথ আটকায় তার।
“দাঁড়াও। কোথায় যাচ্ছ?’’
“রুসোগঞ্জ যাব, হুজুর। মাল ফিরি করতে।”
“বাড়ি কোথায়?”
“এই হোমিগঞ্জেই হুজুর।”
“হোমিগঞ্জে? তোমাকে তো কোনওদিন হোমিগঞ্জে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না?”
লোকটা উত্তর দেওয়ার জন্যে দাঁড়ায় না। পথ থেকে লাফ দিয়ে পাশের জঙ্গলে পড়েই ঝোপঝাড় ভেঙে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় লাগায়।
খাপ থেকে তলোয়ার বের করে চালায় বটে রজত, কিন্তু লোকটা ততক্ষণে নাগালের বাইরে চলে গেছে। নিজের ওপর কিছুটা বিরক্ত হয়েই রজত ফের নামতে শুরু করে কালভৈরব পাস ধরে।
ঠিক সেই সময়ে মন্দিরের কাছে উঠে এসে বুকফাটা আর্তনাদ করে ওঠে মিতা। তার ঠাকুরদার দেহটা চিত হয়ে পড়ে মন্দিরের সামনের মাটি রক্তে লাল করে দিচ্ছে। খোলা চোখ দুটো যেন কোনও নীরব অনুযোগ নিয়ে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে।
অল্প বয়সেই মিতা তার মা-বাপকে হারিয়েছে। তার নিজের লোক বলতে ছিল একমাত্র এই ঠাকুরদা। তাকেও এই অচেনা বিজন জায়গায় হারিয়ে যেন মাথায় বাজ ভেঙে পড়ে তার। ঠাকুরদার পাশে বসে হাহাকার করে কাঁদতে থাকে সে।
পাণ্ডববর্জিত কালভৈরব পাসে মিতার কান্নার শব্দ কোনও মানুষের কানে যায় না। কিন্তু পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে সে শব্দের প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় মানুষের বৈরী একটি প্রাণীর কানে। লম্বাটে মাথায় বসানো দুটো কান সজাগ হয়ে সেই কান্নার উৎস খোঁজে, দুটো রক্তলাল চোখ পাহাড়চুড়োয় মৃতদেহের পাশে বসে কাঁদতে-থাকা মেয়েটার সন্ধান পায়, তারপর পেছনদিকে বেঁকানো হাঁটুর নীচে বসানো দুটো চ্যাটালো পা ঝোপঝাড় ভেঙে দৌড়োতে শুরু করে কালভৈরব মন্দির লক্ষ্য করে।
ঠাকুরদার শরীরের পাশে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে-থাকা মিতা হঠাৎ তার পেছনে কিছুর উপস্থিতি টের পায়। মাথা ঘুরিয়ে আর-একবার আর্তনাদ করে ওঠে সে। জঙ্গলের মধ্যে থেকে কালভৈরব মন্দিরের পাহাড়চুড়োয় উঠে এসেছে একটা উটিয়া বাঁদর।
কিন্তু আর্তনাদ করলেও ঠাকুরদার শরীর ছেড়ে পিছু হটে না সে। চিৎকার করতে করতেই দু-চারটে পাথর কুড়িয়ে ছুড়তে থাকে উটিয়া বাঁদরকে লক্ষ্য করে।
গায়ে এসে-পড়া পাথরগুলোকে গ্রাহ্য করে না উটিয়া বাঁদর। লম্বা গলাটা সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আর হাত দুটো দু-পাশে ছড়িয়ে সেটা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে ওঠে চ্যালেঞ্জের ভঙ্গিতে, আর তারপর এক-পা এক-পা করে এগোতে থাকে ঠাকুরদার শরীর আগলে দাঁড়িয়ে-থাকা মিতার দিকে।
চিৎকার করে পাথর ছুড়তে থাকে মিতা, আর তার দিকে ধীর কদমে এগিয়ে আসতে থাকে উটিয়া বাঁদর।
এই অসম লড়াইয়ের পরিণতি একটাই হওয়ার ছিল। কিন্তু মিতাও একটা টুঁটি-ছেঁড়া লাশে পরিণত হওয়ার আগেই ছুটতে ছুটতে মন্দিরের কাছে উঠে আসে সেই ফেরিওয়ালা, একটু আগেই যে রজতের হাত এড়িয়ে পালিয়েছে। সে-ও হয়তো মিতার চিৎকার শুনে থাকবে।
পাহাড়ের মাথায় উঠে পরিস্থিতি বুঝে উঠতে বেশিক্ষণ লাগে না ফেরিওয়ালার। বিন্দুমাত্র দেরি না করে সে পিঠে বাঁধা বাক্স থেকে একটা সলতে-পরানো মাটির বোতল বের করে, তারপর সলতেতে আগুন লাগিয়ে বোতলটা ছুড়ে দেয় উটিয়া বাঁদরের গায়ে।
উটিয়া বাঁদরের গায়ে লেগে বোতলটা টুকরো টুকরো হয়ে যায়, আর বোতলের মধ্যে ঠুসে-রাখা তেল, খড়ের কুচি আর কাঠের গুঁড়ো মাখামাখি হয়ে যায় তার শরীরে। এবং সঙ্গে সঙ্গে সলতের আগুনে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে দাহ্য পদার্থের সেই মিশ্রণ।
মুহূর্তের মধ্যে উটিয়া বাঁদরের সারা শরীরে আগুন লেগে যায়, তার চিৎকার পালটে যায় করুণ আর্তনাদে। কাতর স্বরে চিৎকার করতে করতে সেটা দৌড়ে পালায় জঙ্গলের মধ্যে।
নিচু হয়ে ঝুঁকে মাটিতে পড়ে-থাকা বৃদ্ধের চোখ দুটো বুজিয়ে দেয় ফেরিওয়ালা। তার গলার ক্ষতটা পরীক্ষা করে বলে, “ওস্তাদ তলোয়ারবাজের কাজ। কে মারল এভাবে?’’
দু-দিকে মাথা নাড়ে মিতা, “আমি জানি না, নীচে ঝরনায় গিয়েছিলাম। এসে দেখি—”
কান্নায় গলা বুজে আসে মিতার, বাকিটা আর বলতে পারে না।
কাজটা কার, আন্দাজ করতে অসুবিধে হয় না ফেরিওয়ালার। খুব সম্ভব তার হাত এড়িয়েই সে পালিয়েছে একটু আগেই। কিন্তু সন্দেহ হলেও সে কথা এই মুহূর্তে শোকে কাতর মেয়েটাকে শোনানোর সময় নয়। তার বদলে সে বলে, “যেতে দাও। সে কথা পরে ভাবা যাবে। বরঞ্চ এখান থেকে চলো তাড়াতাড়ি। আবার কোথা থেকে কোন বিপদ এসে হাজির হয়, বলা যায় না।”
পড়ে-থাকা বৃদ্ধের দেহের দিকে সজল নয়নে তাকায় মিতা, “কিন্তু দাদু—!”
“তোমার দাদু এখন সব সাহায্যের বাইরে চলে গেছেন। নাও, তাড়াতাড়ি চলো। না হলে আমাদেরও একই অবস্থা হবে। কোথায় যাচ্ছিলে তোমরা?’’
“হকিন্সাবাদ, আমার মাসির কাছে।’’ চোখ মুছে বলে মিতা।
“হকিন্সাবাদ? সে তো অনেক দূরে! তুমি বাচ্চা মেয়ে, একা অত দূর কী করে যাবে? আমি এখন রুসোগঞ্জ যাচ্ছি, তবে দিন পনেরো বাদে কাজ হয়ে গেলে আমি ওখান থেকে হকিন্সাবাদ যাব। এক কাজ করো, আমার সঙ্গে চলো, আমি তোমায় সঙ্গে করে তোমায় মাসির কাছে পৌঁছে দেব।”
যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়িয়ে যায় মিতা। সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলে, “কিন্তু তুমি কে?’’
“আমার নাম রবি। শহরে শহরে জিনিস ফেরি করে বেড়াই। চলো তাড়াতাড়ি। আর যা প্রশ্ন আছে, যেতে যেতে জিজ্ঞেস কোরো। এ জায়গাটা নিরাপদ নয়।”
আর কথা না বাড়িয়ে ফেরিওয়ালার সঙ্গে পাহাড়চুড়ো থেকে নেমে যায় মিতা।
ভিন্নর বাঙ্কারে হুঁশ ফিরে আসে রিমার। সে খেয়াল করে, জলে দু-হাত ডুবিয়ে কুণ্ডের পাশে বসে রয়েছে, শরীরে তার কেমন একটা ঘোর-লাগা ভাব।
টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় রিমা, কোনওমতে হাতড়ে হাতড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে সুড়ঙ্গ দিয়ে। বাইরের হাওয়ায় শ্বাস নেয় জোরে জোরে।
কিছুক্ষণ বাদে শরীরটা স্বাভাবিক হয়ে আসে রিমার, ঘোর-লাগা ভাবটা কেটে যায়। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারে, বেলা চলে গেছে, দিন এখন পড়ার দিকে। গুহার মধ্যে সে বেশ অনেকক্ষণই আটকে ছিল।
নিজের নির্বুদ্ধিতাকে দোষ দেয় রিমা। রজতের দেখাদেখি ওই গুহার মধ্যে তার না ঢুকলেও চলত। কোনও সন্দেহ নেই যে ভিন্নর বাঙ্কারের বদ্ধ হাওয়ায় সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। এবার হয়তো আর রজতকে পাওয়া যাবে না, তার নিজের বোকামিতে একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল।
নিজেকেই মনে মনে গাল দিতে দিতে কালভৈরব পাস বেয়ে ওপরে ওঠে রিমা। যদি কোনওভাবে রজতকে ধরতে পারা যায়, তাহলে তার এত দূর আসার উদ্দেশ্যটা পণ্ড হয় না।
কিন্তু কালভৈরবের মন্দিরের চুড়োয় উঠে আঁতকে ওঠে রিমা। মন্দিরের সামনে চিত হয়ে পড়ে আছে সেই বুড়োটার গলাকাটা লাশ, যাকে সকালে সে তার আগে আগে পাহাড়ে উঠতে দেখেছিল। মাটিতে জমাট বেঁধে রয়েছে কালচে রক্ত, তার ওপরে থিকথিক করে উড়ছে জুঁই বোলতার ঝাঁক। কিছু দূরে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে কোনও মাটির পাত্রের টুকরো আর পোড়া তেল।
মন্দিরের সামনে কী হয়েছিল তা দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টাও করে না। পেছন ফিরে দৌড় লাগায় পাহাড়ি পথ ধরে। জায়গাটা আর মোটেই নিরাপদ নয়।
তা ছাড়া তাকে রজতকে যে করে হোক বোঝাতে হবে। সে যদি বাড়ি ফিরে গিয়ে থাকে তাহলে রিমা সেখানেই তার সঙ্গে দেখা করবে।
তরতর করে কালভৈরব পাসের রাস্তা ধরে হোমিগঞ্জের দিকে নামতে থাকে রিমা।
কালভৈরব পাস থেকে নেমে দু-একটা কাজ সেরে যখন রজত বাড়ি ফেরে তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়েছে। বাড়ির আঙিনায় ঢুকতেই সে বুঝতে পারে, তার বাড়িতে না-থাকার সময় কিছু একটা ঘটে গেছে। বাড়ির লোকজন ব্যস্ত হয়ে এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করছে। সবাই কেমন উত্তেজিত।
গ্রিবিনের লাগামটা একজনের হাতে ধরিয়ে দিয়ে তাকে রজত প্রশ্ন করে, “কী হয়েছে? সবাই এমন দৌড়োদৌড়ি করছে কেন?”
মুখ কাঁচুমাচু হয়ে আসে কর্মচারীটির, “চুরি হয়ে গেছে, ছোটেসাব। আপনি যখন বাইরে ছিলেন, বাড়িতে চোর পড়েছিল।”
জ্বলন্ত চোখে তার দিকে তাকায় রজত, “দিনদুপুরে চোর পড়ল, আর তোরা এতগুলো লোক কী করছিলি?”
রজতের দৃষ্টির সামনে লোকটা কেমন কুঁকড়ে যায়, “একটা ফেরিওয়ালার মতো দেখতে লোক বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করছিল। আমরা ভেবেছিলাম, কিছু বিক্রি করতে এসেছে। এখন মনে হচ্ছে, সে-ই চুরি করেছে।”
ফেরিওয়ালা! কালভৈরব পাসে দেখা লোকটার কথা মনে পড়ে যায় রজতের। আর সঙ্গে সঙ্গে রাগটা নিজের ওপরেই গিয়ে পড়ে তার। তলোয়ার না চালিয়ে মুখ চালানোটাই তার ভুল হয়েছে। একটা লম্বা শ্বাস টেনে ভয়ে জড়সড়ো কর্মচারীকে প্রশ্ন করে, “কী চুরি হয়েছে?”
“রান্নাঘরের কিছু বাসনকোশন আর অফিসের রোজখরচের টাকা।”
“বেশি কিছু নয় তাহলে।”
“না, ছোটেসাব।”
“যা যাবার গেছে। হইচই বন্ধ করে সবাইকে নিজের কাজে যেতে বল।”
“জি, ছোটেসাব।” স্বস্তি পেয়ে লোকটা খবর দিতে ছোটে।
নিজের ঘরে এসে তলোয়ারটা পরম যত্নে ন্যাকড়া দিয়ে আস্তে আস্তে পরিষ্কার করে রজত। অনেকদিন বাদে তার মনোমতো একটা হাতিয়ার পেয়েছে সে। তলোয়ারে অলংকরণ নেই, অহেতুক সাজসজ্জা নেই। আছে কেবল মারণক্ষমতা।
হাতের পাঁচটা আঙুল তলোয়ারের হাতলে আলতো মুঠোয় জড়িয়ে দেয় রজত। হাতের তালুতে কেমন একটা উষ্ণ স্পর্শ লাগে তার, মুঠোয় টের পায় একটা ধীর মৃদু স্পন্দন। যেন তলোয়ারটা কোনও জড়বস্তু নয়, সাময়িক নিদ্রাচ্ছন্ন কোনও চেতন প্রাণী।
শ্বাসপ্রশ্বাসের লয় বাড়ে রজতের। তলোয়ারের স্পর্শ প্রেমিকার শরীরের স্পর্শের মতোই মনে হয় তার। তার হাতের আঙুল যেন জড়িয়ে রেখেছে তলোয়ারের হাতল নয়, প্রেমিকার স্তন।
“ছোটেসাব!”
রজতের আত্মরতিতে বাধা পড়ে। দরজায় একজন গৃহভৃত্য এসে দাঁড়িয়েছে।
তলোয়ারের আঘাতে লোকটার গলাটা দু-ফাঁক করে দেওয়ার অদম্য ইচ্ছেটাকে কোনওমতে বাগে আনে রজত। নিশ্বাস যত দূর সম্ভব স্বাভাবিক করে কর্কশ স্বরে প্রশ্ন করে, “কী হয়েছে?”
“আপনার সঙ্গে একজন ভদ্রমহিলা দেখা করতে এসেছেন, ছোটেসাব।”
আশ্চর্য হয় রজত, “ভদ্রমহিলা! কে ভদ্রমহিলা?’’
“বলছেন, বিজনের বাড়ি থেকে এসেছেন।”
বিজনের বাড়ি! ব্যঙ্গের হাসিতে বেঁকে যায় রজতের মুখ। শালা হিজড়ে বিজন। উদয়ভানকে দিয়ে বলে পাঠিয়ে হয়নি, আবার বাড়ির মেয়েছেলেকে পাঠিয়েছে।
রজত প্রথমে ভাবে, দেখা না করেই যে এসেছে, তাকে বিদায় করে দেবে। কিন্তু তারপর ঠিক করে, সে নিজেই গিয়ে মুখের ওপর না করে দেবে। বিজন তো হারবেই। কিন্তু তাকে হারানোর আনন্দটা যদি একবারের বেশি পাওয়া যায়, মন্দ কী!
তলোয়ারটা সযত্নে নামিয়ে রাখে রজত, “বসতে বল। আসছি।”
বহুকাল আগে যে ঘরটাতে উটিয়া বাঁদরের সঙ্গে অরূপরতনের মরণপণ লড়াই হয়েছিল, সেই ঘরে আর-এক নতুন নাটকের পর্দা ওঠে। অম্বালিকার তৃণপ্রান্তরে দুটো নকশি বাঘ যেমন দূর থেকে পরস্পরের ক্ষমতার পরিমাপ করে, ঘরের দুই প্রান্ত থেকে রজত আর রিমাও শিকারির দৃষ্টিতে পরস্পরকে জরিপ করে।
রজত দ্যাখে একজন সম্ভ্রান্ত ঘরের সুন্দরী তরুণী মহিলা। পরনে হালকা রঙের দামি রেশমের পোশাক, হাত দুটো একটা অসহায়তার ভঙ্গিতে হাঁটুর ওপর জড়ো করা। আবছা প্রসাধন করা মুখেও পড়েছে সেই অসহায়তার ছাপ। কিন্তু সেই আপাত অসহায় ভাবের পেছনে তার দুই চোখে ধূর্তামি আর উচ্চাকাঙ্ক্ষার ঝিলিক রজতের নজর এড়ায় না।
রিমা দ্যাখে একজন ছিপছিপে চেহারার তরুণ। পরনের পোশাক অতি সাধারণ। পরিষ্কার করে কামানো মুখের চেহারা নিরুত্তেজ, নিরুত্তাপ। অথচ সেই মুখের দিকে তাকিয়ে রিমা টের পায়, তার দু-চোখের পেছনে উঁকি দিচ্ছে এক আদিম উন্মত্ততা। রজতের আপাত নিস্পৃহতা যেন এক সর্বনাশা প্রলয়ের পথ আটকে-রাখা এক দুর্বল বাঁধ, যা ধসে পড়তে পারে সামান্য প্ররোচনাতেই।
শিউরে উঠে ভাবটাকে সামলে নিয়ে, গলায় অসহায়তার ভাবটাকে যথাসম্ভব ফুটিয়ে তুলে চোখ নামিয়ে রিমা বলে, “আমার নাম রিমা, আমি বিজনের— বিজনের বোন। আপনাকে একটা অনুরোধ করতে এসেছি।”
একটা বাঁকা হাসি খেলা করে রজতের মুখে, “বিজনের বোন আছে তো জানতাম না, স্ত্রী আছে জানি। তা যা-ই হোক, কী করতে পারি বলুন।’’
মাথা নিচু করে রিমা বলে, “দেখুন, আমাদের খেতখামার ভালো চলছে না। এই চাকরিটা আমাদের খুব দরকার। জমানো পুঁজি যা ছিল, সব এই চাকরির উমেদারিতে খরচ হয়ে গেছে। এখন বিজন যদি চাকরিটা না পায়—!’’
আরও বেঁকে যায় রজতের মুখের হাসিটা, “মানে আমাকে বিজনের কাছে হেরে যেতে হবে, এই তো?!’’
হাঁটুর ওপর রাখা আঙুলগুলো কচলায় রিমা, “হ্যাঁ। জানি এটা অন্যায় উপরোধ। কিন্তু কী করব! আমাদের মাথায় এত বড় বিপদ না থাকলে আপনার কাছে এভাবে আসতাম না।”
ব্যঙ্গের হাসিতে আরও কুৎসিত হয়ে ওঠে রজতের মুখের চেহারাটা, “দেখুন রিমা, তলোয়ারবাজকে ইচ্ছে করে হেরে যেতে বলা, আর কোনও মহিলার কাছে তার শরীর চাওয়া— দুটোই একরকম। আপনি যখন আমার কাছে এত বড় একটা স্বার্থত্যাগ চাইছেন, আমিও তাহলে তার প্রতিদানে একই মাপের কিছু চাইতে পারি?”
দু-চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে রিমার। তাকে যে রজত ফাঁদে ফেলতে চাইছে, বুঝতে তার অসুবিধে হয় না। কিন্তু তখন আর তার পেছোনোর উপায় নেই। অসহায়তার মুখোশটা যথাসম্ভব আটকে রেখে শুষ্ক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে, “বলুন, আমায় কী করতে হবে?”
কদর্য হাসি হাসে রজত, “ওই যা বললাম! আমি ইচ্ছে করে হেরে যেতে রাজি আছি। যদি আপনি আমার সঙ্গে শুতে রাজি থাকেন।”
মুখোশটা শেষ পর্যন্ত আর ধরে রাখতে পারে না রিমা। রক্তবর্ণ মুখে দু-হাত মুঠো করে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকায় রজতের দিকে, “আপনাকে আমি ভদ্রলোক ভেবেছিলাম, তাই বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছিলাম। কিন্তু আমার অসহায়তার সুযোগ নিয়ে আপনি—!’’
হাত তুলে থাকে থামিয়ে দেয় রজত, “দেখুন, এত কথার প্রয়োজন নেই। আপনাকে আমার শর্তের কথা বলে দিলাম। রাজি থাকলে ঝরনার ধারে আমাদের চালকলে গিয়ে অপেক্ষা করুন। আর রাজি না থাকলে বাড়ি চলে যান।”
ফুঁসতে ফুঁসতে বেরিয়ে আসে রিমা। কী ভেবেছে তাকে রজত? বাজারি মেয়েছেলে? বেশ্যা? প্রয়োজন আছে বলেই রজত কি ভেবেছে, তার বিনিময়ে সে শরীর বিলিয়ে দেবে? রাগে একরকম অন্ধ হয়েই পথ হাঁটে সে।
কিন্তু কিছুক্ষণ বাদে তার রাগের গনগনে প্রাচীরের পেছন থেকে কয়েকটা বিপরীত চিন্তা মাথা তোলে। মনের এককোণে কে যেন ফিশফিশ করে বলে ওঠে, ‘এত রাগার কী আছে? কয়েক ঘণ্টার তো ব্যাপার! আর জানতেই বা পারছে কে? বিজন চাকরিটা পেয়ে গেলে হোমিগঞ্জের পাটই তো উঠে যাবে। রজতের মুখও আর এ জীবনে দেখতে হবে না।’
চেষ্টা করেও চিন্তাগুলোকে দাবিয়ে রাখতে পারে না রিমা, উত্তরোত্তর আরও সরব হয়ে ওঠে তারা। যুক্তিগুলো ক্রমশ আরও ধারালো হয়ে উঠে রিমার মনের আপত্তিগুলো সব একে একে নস্যাৎ করে দিতে থাকে।
একসময়ে রিমা খেয়াল করে যে সে অন্যমনস্ক হয়ে পথ চলতে চলতে বাড়ির রাস্তা ছেড়ে রজতদের চালকলের কাছে এসে পড়েছে। তার রাগের আগুনের ছাইটুকু অবশিষ্ট আছে কেবল। আর স্বার্থসিদ্ধি আর চরিত্র রক্ষার মাঝের মানসিক দ্বন্দ্বের পাঁচিলটাও দুর্বল হয়ে এসেছে অনেকটাই।
চালকলটা হোমিগঞ্জের বাইরে, পাহাড়ের গায়ে। পাহাড় থেকে ঝরনার জল লাফিয়ে পড়ে একটা গভীর কূপের মতো ফাটলে। ফাটলের ওপর বসিয়ে দেওয়া টারবাইন ঘোরে জলের শক্তিতে। চালকল চলে টারবাইনের শক্তিতে।
কাঠের তক্তায় তৈরি বাড়ির দরজাটা বন্ধ। ঝরনার জল পড়ার শব্দ আর চালকল চলার যান্ত্রিক শব্দ ছাপিয়ে তার পেছন থেকে ভেসে আসে মোটা গলায় গাওয়া বেসুরো গানের আওয়াজ।
দ্বিধাগ্রস্ত কাঁপা-কাঁপা হাতে চালকলের দরজায় টোকা দেয় রিমা। বন্ধ হয়ে যায় গান। সশব্দে কাঠের পাল্লা খুলে মুখ বাড়ায় মন্টু।
“রজত—’’, কথাটা শুরু করে থেমে যায় রিমা।
মন্টুর অবশ্য বুঝতে অসুবিধে হয় না। একগাল হেসে সে বলে, “ছোটেসাব? তাঁরে তো বাড়িতে পাবেন। এখানে কোথায়?”
“না। উনি আমায় এখানে অপেক্ষা করতে বললেন।’’ কুণ্ঠিতভাবে উত্তর দেয় রিমা।
“এখানে?’’ বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে মন্টু, “আচ্ছা, আসুন।”
চালকলের ভেতরটা গরম, তুষের গুঁড়োর ওড়াউড়িতে হাওয়া ভারী হয়ে আছে। কাঠের তক্তার ফাঁক দিয়ে বিকেলের আলো বর্শার মতো তির্যক রেখায় মেঝেতে এসে পড়ে। ছাদে ঝোলানো লন্ঠনের নীলচে আলোয় দেখা যায়, ঘরের একদিকে সার-দেওয়া কাঠের ঢেঁকির মাথাগুলো একসঙ্গে শব্দ করে উঠছে-নামছে। ঘরের অন্যদিকে চালের বস্তার স্তূপ আর একটা বাঁকাচোরা বেঞ্চ। বেঞ্চের একপাশে মাটিতে একটা খড়ের বিছানা।
“বসুন!’’ বেঞ্চিটা দেখিয়ে দিয়ে নিজের কাজে মন দেয় মন্টু। চালকলের ঢেঁকির ওঠানামার শব্দ ফের ছাপিয়ে তার গলার বেসুরো গান। বেঞ্চিতে জড়সড়ো হয়ে বসে থাকে রিমা।
ঘন আঠা যেভাবে গড়ায়, সেইভাবে মন্থর গতিতে পেরিয়ে যায় কিছুটা সময়। চালকলের ভেতরে অন্ধকারটা আরও গাঢ় হয়, মাটিতে এসে-পড়া আলোর রেখাগুলোতে লালচে রং ধরে। তারপর একসময়ে চালকলের বন্ধ দরজায় ঠকঠক করে শব্দ হয়।
গান থামিয়ে দরজা খুলে দিয়ে হাসে মন্টু, “ওঃ, ছোটেসাব! আপনার জন্যে কেউ—”
কথাটা শেষ না করেই রিমার দিকে তাকায় মন্টু।
দরজা দিয়ে মাথা গলিয়ে একবার রিমাকে দেখে নেয় রজত। তারপর মন্টুর দিকে তাকায়, “এই! তুই এবার এখান থেকে যা।’’
রজতের মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকায় মন্টু। আবার তাড়া দেয় রজত, “বললাম না, যা! ঘণ্টাখানেকের আগে ফিরবি না। ফোট!’’
বিস্মিত দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে রজতের পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায় মন্টু।
দরজা বন্ধ করে রিমার সামনে এসে দাঁড়ায় রজত। মুঠো-করা দুই হাত শরীরের দু-পাশে চেপে ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ায় রিমা।
বাঁ হাতের আঙুলে রিমার চিবুকটা তুলে ধরে রজত, “আমি হেরে যেতে রাজি আছি। আমি যা চাই, তুমি দিতে রাজি তো?’’
কথা বলে না রিমা, তার শরীরের দু-দিকের হাতের মুঠো দুটো আরও শক্ত হয় আসে।
রজতের অন্য হাতটা রিমার জামার মধ্যে দিয়ে প্রবেশ করে স্পর্শ করে তার স্তন, “কী, রাজি তো?”
রজতের চোখের দিকে তাকায় রিমা। তার চাহনির পেছন থেকে যেন উঁকি মারে এক সীমাহীন বুভুক্ষা। সে ক্ষুধার সামনে রিমার সমস্ত সংযমের বাঁধন মুহূর্তের মধ্যে খসে পড়ে। কে যেন তার মাথার মধ্যে বলে ওঠে, ‘শহরের বাইরে এই আধা অন্ধকার ঘরে তুমি কার সঙ্গে কী করছ, কে জানতে যাচ্ছে? জানলেই বা কী যায় আসে?’
প্রতিবাদ করে না রিমা। সেই আগ্রাসী ক্ষুধার কাছে স্বেচ্ছায় সঁপে দেয় নিজেকে, দুই হাতে রজতের মুখ নামিয়ে আনে তার নিজের ঠোঁটের ওপর। তার মুখের ভেতর রজতের জিভের স্পর্শে আবার তার সর্বশরীরে ছড়িয়ে পড়ে ভিন্নর বাঙ্কারে অনুভব করা সেই অদ্ভুত শিরশিরানি। মন, বুদ্ধি, অহঙের অস্তিত্ববিহীন সেই নিখাদ ক্ষুধার হাহাকারে যেন বিলীন হয়ে যেতে চায় তার সমস্ত সত্তা। অজানা, অচেনা নানান শরীরী বাসনা যেন সর্বাঙ্গে অসংখ্য বীথি-উপবীথি বিস্তার করে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের তন্তুজালের কঠিন বাঁধনে বন্দি হয়ে পড়ে রমণেচ্ছা ছাড়া রিমার প্রতিটি অন্য বোধ।
কয়েক মুহূর্তের জন্যে একে অপরের থেকে ছিটকে সরে যায় রজত আর রিমা। অধীর ব্যস্ততায় পোশাক খুলে ছুড়ে ফ্যালে চারপাশে। তারপরে দুটো শরীর আবার পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যায় সর্পিল ভঙ্গিমায়।
রিমার শরীর হাতড়ায় রজতের দুই হাত। স্তন থেকে নেমে আসে নিতম্বে। নিতম্ব থেকে সরে আসে ঊরুসন্ধিতে। ঊরুসন্ধি থেকে উঠে আসে নাভিতে।
রজতের শরীর বেড় দিয়ে তার পিঠে উঠে আসে রিমার দুই হাত। তার দাঁত বসে যায় রজতের কাঁধে। তার মনে হয়, তার ধমনিতে বইছে ফুটন্ত লাভার স্রোত।
রিমাকে জড়িয়ে রজত গড়িয়ে পড়ে মেঝেয় পাতা খড়ের বিছানায়। চিত হয়ে তাকে তুলে নেয় নিজের শরীরের ওপর।
রজতকে নিজের শরীরে প্রবিষ্ট করিয়ে দুই ঊরুতে তার কোমর চেপে ধরে সোজা হয়ে বসে রিমা। তার মাথা হেলে যায় পিঠের পেছনে, বিস্ফারিত দুই চোখের দৃষ্টি হারিয়ে যায় শূন্যে। চালকলের ঢেঁকির ওঠাপড়ার সঙ্গে তাল রেখে তার শরীরটা ওঠানামা করতে থাকে রজতের দেহের ওপর।
একবার রিমার শরীর ভোগ করার বিনিময়েই রজত হেরে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তার কাছে দ্বিতীয়বার না এলেও হত। কিন্তু যা ছিল বিজনের জয়ের মূল্যমাত্র, তাই যেন রিমার কাছে আসক্তি হয়ে দাঁড়ায়। তাই সে এরপর থেকে প্রতিদিনই আসতে থাকে।
প্রাণ সৃষ্টির প্রারম্ভে আদিম জৈবিক দ্রবণে ভেসে থাকত যে সমস্ত মৃদু চেতন, শুধুমাত্র জননেচ্ছায় তাড়িত জীবেরা, তাদের মতোই সেই প্রায়ান্ধকার জঠরের মতো ঘরের উষ্ণ গাঢ় বাতাসে ডুব দিয়ে রোজই রিমার আর রজতের শরীর এক কালহীন, সীমাহীন বুভুক্ষার পরিতৃপ্তি খুঁজতে থাকে। ভিন্নর বাঙ্কারে আঁকা অম্বালিকার আদি বাসিন্দাদের বিকৃত কামনার ছবি তাদের দুজনের শরীরকে আশ্রয় করে লোকচক্ষুর অন্তরালে যেন নতুন জীবন ফিরে পায়।
প্রতিযোগিতার আগের দিনও আসে রিমা। বরং বলা যেতে পারে যে সে না এসে থাকতে পারে না। বুভুক্ষার তুফান পার হয়ে সে আর রজত ঘর্মাক্ত, ক্লেদাক্ত শরীরে চিত হয়ে শুয়ে থাকে খড়ের বিছানায়।
রিমার যোনিপথে আলতো করে আঙুল রাখে রজত, “তাহলে আজই আমাদের শেষ সন্ধে?’’
ছাদ থেকে ঝোলানো লন্ঠনের নীল আলোর দিকে তাকায় রিমা, “হোমিগঞ্জে শেষ। কালকে কম্পিটিশন শেষ হয়ে গেলেই আমাদের রুসোগঞ্জ যাওয়ার কথা। কিন্তু তোমাকে রুসোগঞ্জ আসতে আটকাচ্ছে কে?”
ভ্রূ কপালে তোলে রজত, “বিজন বুঝতে পারবে না?’’
“ফুঃ!’’ একটা ব্যঙ্গের আওয়াজ করে রিমা, “বিজনকে আমি যা বোঝাব তা-ই বুঝবে!”
রিমার শরীরের কিছুটা ভেতরে প্রবেশ করে রজতের আঙুল, “তাহলে আরও কিছুক্ষণ থেকে যাও। বিজনকে না হয় কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়ো।’’
চমকে শ্বাস নেয় রিমা, সরিয়ে দেয় রজতের হাত, “আজ নয়। কালকের কম্পিটিশন নিয়ে বিজন এমনিতেই চিন্তায় আছে, দেরি হলে খুঁজতে লোক পাঠাবে।”
বিছানা থেকে উঠে পোশাক পরে রজত, মুখে তার বাঁকা হাসি, “বিজনকে বলে দিয়ো অত চিন্তা না করতে। তার জেতার দাম অন্য কেউ চুকিয়ে দিয়েছে।”
পোশাক পরতে পরতে থমকে যায় রিমা। অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গ নিয়েই জ্বলন্ত চোখে তাকায় রজতের দিকে, “বিজনকে কী বলতে হবে, সে আমি বুঝে নেব। তুমি তোমায় কাল কী করতে হবে, সে কথা ভুলে যেয়ো না।”
“ভুলব না। নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।” উত্তর দিতে গিয়ে মুখ বিকৃত হয়ে যায় রজতের।
আর কোনও কথা না বলে না রিমা। পোশাক পরা শেষ করে রজতের দিকে দ্বিতীয়বার না তাকিয়েই বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
রিমাকে কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় রজত, তারপর কিছুক্ষণ বাদে তলোয়ারটা কোমরে গুঁজে নিয়ে সে-ও পা রাখে ঘরের বাইরে।
বাইরে অন্ধকার নেমে এসেছে। চালকলের দরজার দু-পাশে বসানো দেওয়ালগিরি দুটো জ্বলে উঠেছে, তাদের নীল আলো বৃত্তের আকারে ছড়িয়ে পড়েছে পাথর বাঁধানো পথের ওপর। বাতাসে ঝরনা থেকে উড়ে-আসা জলকণার সঙ্গে মিশেছে পাহাড়ি কলকে ফুলের মাদক গন্ধ।
ফেরার আগে রজত দরজাটা বন্ধ করছে, টারবাইনের দিক থেকে একটা মৃদু নড়াচড়ার আওয়াজ আসে। চিন্তা করার জন্যে দাঁড়ায় না রজত। তলোয়ারের হাতলে হাত রেখে লম্বা কয়েকটা কদমে পেরিয়ে যায় দরজা আর টারবাইনের মধ্যের দূরত্ব।
টারবাইনের কাছে একটা লোক রজতকে দেখে কলকবজার আড়ালে লুকোনোর চেষ্টা করে। আবছা আলোতেও তাকে চিনতে অসুবিধে হয় না রজতের। লোকটা বিজনদের এস্টেটের কর্মচারী, এর আগে দু-তিনবার রজত তাকে দেখেছে।
লোকটার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টাও করে না রজত। সে কী করছে, জানতেও চায় না। বিনা বাক্যে নিমেষের মধ্যে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে তার গলায় চালিয়ে দেয়।
লোকটা আর্তনাদ করার সুযোগও পায় না। তার টলতে-থাকা শরীরটাকে রজত ঘাড় ধরে টেনে নিয়ে এসে ঝরনার ফাটলে ফেলে দেয়।
প্রশ্ন করা মানে সময় নষ্ট। দিনকয়েক আগেই কালভৈরব পাসে রজতের সে অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে।
লম্বা আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখে গভীর আত্মপ্রসাদ অনুভব করে রিমা। লোকে তাকে সুন্দরী মনে করে। কিন্তু তার ওই সৌন্দর্য যে ক্ষুরধার বুদ্ধিকে আড়াল করে রেখেছে, তার খবর কেউ রাখে না। ওই বুদ্ধিই তাকে এশারগাঁও থেকে নিয়ে এসেছে হোমিগঞ্জ অবধি। এবার তার জোরেই সে পৌঁছে যাবে হকিন্সাবাদ, আর কিছু সময়ের অপেক্ষামাত্র। আর তারপর? তারপর অনন্ত ভবিষ্যৎ। যার রাস্তা হয়তো গিয়ে থেমেছে চ্যান্সেলরের দরবারে। অথবা প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে। সংসারে যতদিন পুরুষমানুষ আছে, তার গন্তব্যে পৌঁছোতে কোনও অসুবিধে হবে না।
মুখে প্রসাধনের একটা হালকা ছোঁয়া লাগিয়ে উপচে-পড়া আত্মবিশ্বাস নিয়ে বিজনের ঘরের দিকে পা বাড়ায় রিমা। লড়াইয়ের আগে বিজনের মনের জোর বাড়িয়ে তুলতে হবে। হোমিগঞ্জে এটাই তার শেষ কাজ।
পিঠ সোজা করে, ঘাড়টা পেছনদিকে সামান্য বেঁকিয়ে বিজনের অফিসঘরে পা রাখে, মুখে ফুটিয়ে রাখে একটা হালকা তাচ্ছিল্যের ভাব। চিরকাল এই শরীরী ভঙ্গিতেই বিজনকে দাবিয়ে রেখে এসেছে রিমা।
অফিসঘরের টেবিলে মাথা গুঁজে কী একটা কাগজে দ্যাখে বিজন, টেবিলের পাশের জানলা দিয়ে আসা আলোয় তার মুখের চেহারা কেমন ফ্যাক্যাশে দেখায়। সামান্য বিরক্ত হয় রিমা, পুরুষমানুষের এত আত্মবিশ্বাস কম হলে চলে? সব ঝামেলা কি তাকেই একাই ঘাড়ে নিতে হবে?
দরজার কপাটে আলতো টোকা দেয় রিমা, “‘চলো, দেরি হয়ে যাবে।”
রিমা কিছু বলার সঙ্গে সঙ্গেই অন্যসময় বিজন যেমন তার ইচ্ছেপূরণের জন্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, আজ তার মধ্যে সেই তাগাদা দেখা যায় না। কাগজটা পড়া শেষ করে তবেই উঠে দাঁড়ায় বিজন, তার ঈষৎ স্থূল মুখে চোখ দুটো যেন আজ একটু বেশিই ফোলা লাগে।
“থাক। তোমায় যেতে হবে না।” শীতল কণ্ঠে বলে বিজন।
“মানে?” যে লোকটাকে এতকাল সে নিজের অঙ্গুলিহেলনে চালিয়ে এসেছে, তার হঠাৎ এমন ব্যবহারে কিছুটা হকচকিয়ে যায় রিমা।
“আমার যে-কোনও মূল্যে জেতাটা কি এতই দরকারি ছিল? আজকে জিতলে লোকে কী বলবে জানো? এ লোকটা বউয়ের ভেড়ুয়া। জেতার জন্যে বউকে ব্যবহার করে। এর চাইতে হেরে যাওয়া অনেক সম্মানজনক হত।”
রিমার কেমন মনে হয়, যেসব অদৃশ্য সুতোয় সে এতকাল বিজনকে পুতুলের মতো নাচিয়ে এসেছে, সেগুলো একে একে পটপট করে ছিঁড়ে যাচ্ছে। তবুও মুখের অবজ্ঞার ভাবটা বজায় রেখে কঠিন স্বরে বলে, “তুমি কী বলছ, বুঝতে পারছি না!”
“তুমি রজতের কাছে যাওনি?’’
একটু আশ্চর্য হয় রিমা, বিজনের কানে খবরটা তুলল কে? কিন্তু কণ্ঠস্বরে তার আভাস লাগতে না দিয়ে স্বাভাবিক স্বরেই বলে, “হ্যাঁ, গিয়েছিলাম একবার রজতের বাড়ি। তাকে বোঝাতে। কিন্তু সে রাজি হয়নি।”
চোখ দুটো জ্বলে ওঠে বিজনের— “রজতের বাড়ি নয়। রজতদের চালকলে।’’
ক্রুদ্ধ কণ্ঠে প্রতিবাদ করে রিমা, “বাজে কথা! কে বলেছে এসব কথা? ডাকো তাকে!”
চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা জল মুছে টেবিলে রাখা একটা লন্ঠনে হাত রাখে বিজন, “রেশমকুঠির গোমস্তা পরেশের ছেলে ফোটোস্কোপ নিয়ে হোমিগঞ্জের বাইরের ঝরনার ছবি তুলছিল। তার ফোটো ক্রিস্টালে এই ছবিটা ধরা পড়ে।”
দেওয়ালের গায়ে একটা নীলচে ছবি ফুটে ওঠে। দূর থেকে তোলা ছবি, কিছুটা ঝাপসা। চালকল থেকে বেরিয়ে আসছে রিমা, তার পেছনে চালকলের দরজায় দাঁড়িয়ে রজত।
শূন্যদৃষ্টিতে রিমার দিকে তাকায় বিজন, “কাল সুবলকে তোমার খোঁজে পাঠিয়েছিলাম। তাকেও আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।”
পাংশু মুখে দাঁড়িয়ে থাকে রিমা। তার পিঠ বেয়ে ঘামের স্রোত নামে, গলা শুকনো লাগে, জিবটাও মনে হয় আটকে গেছে। নিজের ভেতরে হাতড়ায় রিমা, কিন্তু বহুকাল ধরে সযত্নে লালিত আত্মবিশ্বাসের প্রাচীরটাকে আর খুঁজে পায় না। এই বিপদের মুহূর্তেই সেটা যেন কোথায় মিলিয়ে গেছে।
একটু আগে যে কাগজটা সে দেখছিল, টেবিল থেকে সেটা তুলে নিয়ে রিমার দিকে বাড়িয়ে ধরে বিজন, “আমার হার বা জিতে আর কিছু আসে-যায় না। চিরকাল আমি উপহাসের পাত্র হয়েই থাকব। লোকে আমার দিকে আঙুল তুলে বলবে, ‘এই লোকটা নিজের স্ত্রী-র শরীরের বিনিময়ে জিততে চেয়েছিল।’ আমার সামনে এখন একটিমাত্র রাস্তাই খোলা আছে।”
কাঁপা-কাঁপা হাতে বিজনের বাড়ানো কাগজটা নেয় রিমা, “এটা কী?”
আর-একবার চোখের জল মোছে বিজন, “তালাকনামা4। আমি তোমাকে আমার থেকে মুক্তি দিলাম। এর এক কপি কাছারিতে জমা দেওয়া হয়ে গেছে। এখন তুমি সম্পূর্ণ স্বাধীন।”
রিমার মনে হয়, তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। তার মনের মধ্যে এতদিন ধরে সযত্নে উচ্চাকাঙ্ক্ষার রঙিন প্রাসাদগুলো একের পর ধসে পড়ছে। ভাঙা গলায় কোনওমতে সে বলার চেষ্টা করে, “তুমি আমাকে এভাবে—’’
হাত তুলে রিমাকে থামিয়ে দেয় বিজন, তার মুখে একটা ম্লান হাসি, “বিচ্ছেদ দিতে পারি না? হ্যাঁ পারি। বিয়ের আগে তুমিই করারনামার5জন্যে জোর করেছিলে, মনে নেই? চাইলেই যখন ইচ্ছে আমরা পরস্পরকে বিচ্ছেদ দিতে পারি।”
চোখে কেমন অন্ধকার দ্যাখে রিমা। বিজন ভুল বলেনি, প্রয়োজন পড়লে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করার একটা রাস্তা খোলা রাখার জন্যে বিয়ের আগে রিমাই চাপ দিয়েছিল করারনামায় সই করার। কিন্তু তার আঙুলের ইশারায় সর্বদা পুতুলনাচ নাচতে-থাকা বিজন যে তার অস্ত্র তারই বিরুদ্ধে প্রয়োগ করবে, সে কথা এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত সে কল্পনাতেও আনতে পারেনি।
রিমাকে আর কিছু বলাই সুযোগ দেয় না বিজন, তার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।
টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ে রিমা, মুঠোয় ধরা কাগজটার দিকে তাকিয়ে থাকে শূন্যদৃষ্টিতে। বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয়ের ঠিক আগেই তার সমস্ত জীবন যে তার চারপাশে এভাবে গুঁড়িয়ে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে, সে কথা সে কখনও অতি বড় দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি।
এখন কী করবে সে? ফিরে যাবে মা-বাপের কাছে এশারগাঁওয়ে? এই বৈভব ফেলে আবার ফেরত যাবে রেশমচাষির অনাড়ম্বর, কায়িক পরিশ্রমের জীবনে। না, মরে গেলেও রিমা তা পারবে না। অনেক পরিকল্পনা, অনেক কূটবুদ্ধি খাটিয়ে এত অবধি সে যা অর্জন করেছে, তাকে সে এত সহজে হাতছাড়া হতে দেবে না।
না। রিমা বিজনকে যা হোক করে রাজি করাবে এই তালাকনামা প্রত্যাহার করে নিতে। জেতার পর বিজনের রাগ নিশ্চয়ই ঠান্ডা হয়ে আসবে, তখন রিমা একবার অনুনয়-বিনয় করবে, দরকার হলে হাতে-পায়ে ধরে ক্ষমা চেয়ে নেবে। প্রয়োজন হলে সব দোষ রজতের ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে হোমিগঞ্জের স্টেডিয়ামের দিকে হাঁটা দেয় রিমা।
রজতও সেই সময়ে স্টেডিয়ামের পথ ধরেছে। কালভৈরব পাস দিয়ে কিছুটা উঠেই ডানদিকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটা সরু পায়ে-চলা পথ চলে গেছে। একটা-দুটো চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সেই পথে এসে থেমেছে একটা পাহাড়ের নীচে। পথের শেষে একটা পাথরে বাঁধানো তোরণ, তার স্থাপত্য দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় সেটা ভিন্নরদের হাতে গড়া। তোরণের একপাশে টেবিল পেতে বসে-থাকা চৌকিদারের কাছে তলোয়ার জমা দিয়ে তোরণ পার হয় রজত, ভেতরে হাতিয়ার নিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই।
তোরণের পর একটা আলো-আঁধারি লম্বা সুড়ঙ্গ ঢালু হয়ে উঠে গেছে ওপরের দিকে। তার দু-পাশের দেওয়ালে সারি দিয়ে বসানো ক্রিস্টালের বাতি নীলচে আলোর বৃত্ত ফেলে মেঝেতে।
সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে স্টেডিয়ামের ভেতরে পা রেখে মাথা তুলে চারপাশটা একবার দ্যাখে রজত। ভিন্নরদের ফেলে-দেওয়া এই অদ্ভুত স্থাপত্যকে মানুষ স্টেডিয়াম হিসেবে ব্যবহার করে বটে, কিন্তু এর আদত কাজ কী ছিল, তা কেউ জানে না।
স্টেডিয়ামটা অনেকটা ক্রেটারের মতন। যেন পাহাড়ের মাথাটা অনেকটা গর্ত করে তুলে বাদ দেওয়া হয়েছে। ক্রেটারের দেওয়াল বেয়ে উঠে গেছে অগুনতি সরু সরু র্যাম্প। ক্রেটারের তলদেশ থেকে শুরু হয়ে সেগুলো ক্রেটারটা বেড় দিয়ে ত্যারচাভাবে উঠে গেছে ওপরের দিকে। নীচ থেকে তাকালে মনে হয় যেন হঠাৎ জমে-যাওয়া কোনও সাইক্লোন। নীচের দিকে র্যাম্পগুলোর সামনের দিকে কাঠের বেড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে দর্শকরা সার দিয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিযোগিতা শুরুর অপেক্ষা করে।
স্টেডিয়ামের ঠিক মাঝখানে খাটো পাথরের থাম দিয়ে ঘেরা একটা চতুষ্কোণ বাঁধানো জায়গা, তাদের চারপাশে জড়ানো দড়ির বাঁধন। এইটা লড়াইয়ের রিং। রিং-এর একপাশে জড়ো করে রাখা কাঠের তলোয়ার।
স্টেডিয়ামের দেওয়াল ঘেঁষে মাটিতে বসে বিভিন্ন আখড়ার নবিশ, ওস্তাদ আর নামজাদা তলোয়ারবাজরা। একদিকের দেওয়ালে একটা স্কোরবোর্ড টাঙানো, তার নীচে বসে রেফারি আর জুরিরা।
চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজদের মধ্যে বিজনকে দেখতে পায় রজত। সে তার থেকে দূরত্ব বজায় রেখে আর-এক জায়গায় ভিড়ের আড়ালে গিয়ে বসে।
স্কোরবোর্ডের নীচ টাঙানো ঘণ্টা বেজে ওঠে। শুরু হয়ে যায় প্রতিযোগিতা, দড়ির বেড়া টপকে রিং-এর মধ্যে এসে দাঁড়ায় রেফারি।
জুরিদের সারি থেকে প্রথম দুই প্রতিযোগীর নাম ঘোষণা করা হয়। এবার ভিড় থেকে উঠে এসে দুই তলোয়ারবাজ স্তূপ থেকে কাঠের তলোয়ার বেছে নিয়ে পা রাখে রিং-এর মধ্যে।
রিং-এর একটা খাটো থামের মাথায় চাপ দেয় রেফারি। একটা মৃদু গুঞ্জন তুলে ভিন্নর প্রযুক্তিতে গড়া বাঁধানো জায়গাটা মাটি থেকে তিন-চার হাত ওপরে উঠে ভাসতে থাকে হাওয়ায়।
রিমাও এই সময়ে স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছোয়। কিন্তু সে স্টেডিয়ামের ভেতরে যাওয়ার ঝুঁকি নেয় না। বিজন যদি তাকে দেখে ফ্যালে তাহলে কী করে বসবে, বলা যায় না। স্টেডিয়ামে ঢোকার সুড়ঙ্গটা এড়িয়ে গিয়ে সে পাহাড়ের গা বেয়ে উঠে আসে ক্রেটারের কিনারায়। সেখানে একটা গাছের আড়াল থেকে মাথা বাড়িয়ে সে নীচের লড়াই দেখতে থাকে।
রিং-এর ভেতর লম্বা হাতে একটা ঝালর-বসানো হাতপাখা বাড়িয়ে ধরে রেফারি। পরস্পরকে মাথা ঝুঁকিয়ে সম্মান জানিয়ে তার দুইদিকে কাঠের তলোয়ার হাতে পজিশন নেয় দুই প্রতিযোগী।
“লড়ো!” চিৎকার করে হুকুমটা দিয়েই হাতপাখা সরিয়ে নেয় রেফারি। লড়াই শুরু হয়ে যায় দুই প্রতিপক্ষের, চিৎকার করে একে অপরকে আক্রমণ করতে থাকে তারা। স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে যায় কাঠের তলোয়ারের ঠোকাঠুকির আওয়াজ।
কিছুক্ষণ বাদে রেফারি লাফিয়ে উঠে তার পাখা-ধরা হাতটা বাড়িয়ে ধরে দুজনের মধ্যে, “মোহন, গেম!”
দুই প্রতিযোগী লড়াই থামিয়ে সরে যায় রিং-এর দুই কোণে, তাদের একজনের মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। স্টেডিয়ামের ভিড়ের মধ্যে হাততালি ছড়িয়ে যায়, জুরির সারির পেছনে কেউ একজন স্কোরবোর্ডে নম্বর লেখে।
থামের ওপর রেফারির হাতের চাপে রিং নেমে আসে স্টেডিয়ামের মাটিতে। দুই প্রতিপক্ষ ফের এক অপরকে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করে বিদায় নেয় রিং থেকে।
“মোহন জিতে গেল?’’ রজতের পাশ থেকে কেউ মন্তব্য করে, “আমি ভাবলাম, ড্র হবে!”
আড়চোখে তাকিয়ে দ্যাখে রজত। বক্তার পরনে দামি পোশাক, চুল পরিপাটি করে পেছনে টেনে আঁচড়ানো। টিকালো নাক, চওড়া কপাল। দেখলেই বোঝা যায় শহুরে মানুষ। হয়তো হকিন্সাবাদ বা দৌলতনগরের কোনও মিলিশিয়ার অফিসার।
“না, মোহনই জিতেছে। কোনও ভুল নেই।” প্রথম ব্যক্তির পেছনে বসা আর-একজন উত্তর দেয়, “শংকরের তলোয়ার মোহনের শরীরের দু-ইঞ্চি দূর দিয়ে বেরিয়ে গেছে, কিন্তু মোহনের তলোয়ার পৌঁছে গিয়েছিল শংকরের কাঁধের প্রায় আধ ইঞ্চি কাছাকাছি।”
দ্বিতীয় বক্তার পোশাক আটপৌরে হলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চওড়া চিবুক, ভারী নাক। পিঠ সোজা করে ধরে রাখার ভঙ্গিতে ফৌজি ছাপ সুস্পষ্ট।
হেসে কপালে ভ্রূ তোলে প্রথম বক্তা, “আপনার চোখের তো সাংঘাতিক জোর দেখছি! যাক, তলোয়ারবাজি দেখতে এসে আপনার মতো একজনের দেখা পাওয়া গেল। আমার নাম অতীন, এককালে প্রজাতন্ত্রী পার্টিতে ছিলাম।”
ভ্রূ কপালে তুলে তার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় দ্বিতীয় বক্তা।
আবার হেসে তাকে আশ্বস্ত করে অতীন, “তবে সেসব অনেককাল আগের কথা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চিন্তাধারাও পালটে যায়। এখন আমাদের মূলমন্ত্র হল চ্যান্সেলরের হাত শক্ত করা। এ কাজে আপনাদের মতো তলোয়ারবাজদের পাশে পেলে আমরা খুশি হব। ওহো, আপনার পরিচয়টা যে জানা হল না!”
“আমি সোমনাথ। ইউলারগঞ্জ থেকে আসছি।”
আবার একজোড়া প্রতিযোগীর নাম ঘোষণা করা হয়, দুই বক্তাকে ভুলে রিং-এর লড়াইয়ের দিকে মন দেয় রজত।
বেলা বাড়ে, রেফারির চিৎকার ছড়িয়ে যায় স্টেডিয়ামে, একের পর এক প্রতিযোগিতা শেষ হয়, প্রতিযোগীদের কেউ বিজয়ীর হাসি হেসে তার দলের মধ্যে গিয়ে বসে, কেউ মুখ চুন করে নেমে আসে রিং থেকে।
অবশেষে পালা আসে বিজন আর রজতের।
“বিজন! চিরাগ আখড়া!’’ জুরিদের সারি থেকে ভেসে আসে চিৎকার।
ভিড়ের মধ্যে থেকে উঠে রিং-এর দিকে ভারী পা ফেলে এগিয়ে আসে বিজন। তার চোয়াল শক্ত। দু-চোখ জ্বলে ক্রোধের আগুনে। কাঠের তলোয়ারের স্তূপ থেকে একটা বেছে নিয়ে রিং-এর ভেতরে এসে দাঁড়ায় সে।
“রজত! চিরাগ আখড়ার প্রাক্তনী!” আর-একবার ঘোষণা শোনা যায় জুরিদের সারি থেকে।
উঠে দাঁড়ায় রজত, তার মুখ ভাবলেশহীন, দৃষ্টি যেন হারিয়ে গেছে শূন্যে। পায়চারি করার মতো ধীর কদমে এগিয়ে যায় রিং-এর দিকে। স্তূপ থেকে কাঠের তলোয়ার তুলে নিয়ে সে-ও এসে দাঁড়ায় রিং-এর ভেতরে।
চোখে জিজ্ঞাসা নিয়ে তার সেই নিস্পৃহ শরীরভঙ্গির দিকে তাকায় অতীন আর সোমনাথ।
দড়ির বেড়া টপকে রিং-এর মধ্যে এসে দাঁড়ান রেফারি। তাঁর চিৎকার ছড়িয়ে যায় স্টেডিয়ামের চারপাশে।
“রজত! বিজন! এটা ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, লড়াই নয়। তাই আপনাদের জিজ্ঞাসা করছি। আপনাদের মধ্যে কোনও শত্রুতা নেই তো? পরস্পরের প্রতি কোনও আক্রোশ নেই তো?”
কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে দু-পাশে মাথা নাড়ে বিজন। তার চোয়াল আগের মতোই শক্ত।
ঈষৎ মাথা নাড়ে রজতও। তার মুখ আগের মতোই ভাবলেশহীন।
থামের ওপর রেফারির হাতের ছোঁয়ায় মাটি থেকে ভেসে ওঠে রিং।
ভিড়ের দিকে ফিরে মাথা ঝুঁকিয়ে কুর্নিশ করেন রেফারি। তাঁকে অনুসরণ করে রজত আর বিজনও।
একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরস্পরের দিকে মাথা ঝোঁকায় রজত আর বিজন।
এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নেমে আসে স্টেডিয়ামে। নীরব হয়ে যায় ভিড়ের গুঞ্জন, থেমে যায় টুকরো কথাবার্তা। এমনকী কিছুক্ষণ আগেও যে চিল-বেড়ালটা থেকে থেকে গাছের পেছন থেকে চিৎকার করছিল, সেটাও চুপ করে যায়। সমস্ত স্টেডিয়াম যেন রুদ্ধশ্বাসে এই লড়াইয়ের প্রতীক্ষা করে।
আর স্টেডিয়ামের বাইরে, ক্রেটারের কানায় একই রকম শ্বাসরুদ্ধ অবস্থায় প্রতীক্ষা করে রিমাও।
কাঠের তলোয়ার তুলে ধরে দুজনে। বিজনের নাকের পাটা দুটো উঁচু, শক্ত চোয়াল, চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরে। রজতের চাহনি নিরুত্তাপ, ঠোঁটের কোণে হালকা ব্যঙ্গের হাসি।
দুজনের মধ্যে ঝালর-দেওয়া পাখা বাড়িয়ে ধরেন রেফারি, “প্রতিযোগিতা হোক সুস্থ, সাবলীল। পূর্ণ হোক আপনাদের প্রয়াস।”
নিথর, নীরব ভিড় চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে রিং-এর দিকে।
এক ঝটকায় পাখা সরিয়ে নেন রেফারি, “লড়ো!”
ফটক পজিশন নেয় দুজনেই। ডান পা বাঁ পায়ের এক কদম আগে। পা একটু বেঁকানো, শরীরের ওজন রাখা পায়ের মাঝামাঝি জায়গায়। তলোয়ারের ডগা প্রতিপক্ষের বাঁদিকে চোখের দিকে তাক করা। মাথা সোজা, চিবুক ভেতরে টেনে আনা।
বেশ কিছুক্ষণ কেউ নড়ে না। যেন কোনও কারণে জমে পাথর হয়ে গেছে দুজনেই।
তারপর রজতের উঁচু-করা তলোয়ার ধীরে ধীরে নেমে আসতে থাকে নীচের দিকে।
বিজন তার দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু আক্রমণ করে না।
আস্তে আস্তে রজতের তলোয়ারের ডগা নেমে আসে মাটির কাছাকাছি। তারপর তার শরীরটা ঝুঁকতে শুরু করে সামনের দিকে।
ভিড়ের মধ্যে থেকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তার এই অদ্ভুত তলোয়ারবাজির দিকে তাকিয়ে থাকে অতীন আর সোমনাথ।
স্টেডিয়ামের আর-একদিক থেকে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকেন ওস্তাদ উদয়ভান। কী হচ্ছে, কিছুটা বোধহয় আন্দাজ করতে পারেন তিনি।
মন্থর গতিতে রজত ডান পা টেনে পেছনে নিয়ে আসে বাঁ পায়ের কাছে, তার কাঠের তলোয়ার সরে যায় শরীরের ডানদিকে। তার উন্মুক্ত শরীর যেন প্রতিপক্ষকে আহ্বান জানায় তাকে আক্রমণ করার। কিন্তু তবু বিজন আক্রমণ করে না।
আস্তে আস্তে পা ঘষে ঘষে বাঁদিকে অল্প অল্প করে সরে রজত। তার দিকে চোখ রেখে বিজন ধীরে ধীরে সরে বাঁদিকে। তার তলোয়ার আগের মতোই ফটক তরিকায় উঁচিয়ে ধরা।
দুই পা আরও কাছাকাছি টেনে আনে রজত, তার দুই হাঁটু আরও বেঁকে যায়, কোমর থেকে শরীর ঝুঁকে যায় সামনের দিকে। ডান হাঁটুর ওপর আড়াআড়ি করে ধরা তলোয়ারটা কেমন ঝুলতে থাকে শিথিলভাবে। তাকে দেখলে যে কেউ মনে করবে যে সে প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছে।
কিন্তু কেউ কাউকে তবু আক্রমণ করে না। ফের আগের মতোই পাথরের মতোই নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে দুজনে। কেবল বিজনের গলায় তার কণ্ঠমণির উৎকণ্ঠার ওঠানামা ছাড়া আর কোনও নড়াচড়া রেফারির চোখে পড়ে না।
ঘাড় সোজা করে চোখের কোণ দিয়ে পালা করে দুজনের দিকে তাকান রেফারি। ভাবলেশহীন মুখে, শিথিল শরীরে তাকিয়ে থাকে রজত। শব্দ তুলে শ্বাস নেয় বিজন। কিন্তু এ ছাড়া দুজনেই কেউ কোনওরকম নড়াচড়া করে না।
উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে দুই প্রতিযোগীর দিকে তাকিয়ে থাকেন উদয়ভান, লড়াইয়ের গতিপ্রকৃতি তাঁর অভিজ্ঞ দৃষ্টিতে ভালো ঠ্যাকে না।
আর সেই চিত্রপটের মতো নিশ্চল, অদ্ভুত লড়াইয়ের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত কণ্ঠে অতীন বলে, “এ তো সাধারণ কোনও ম্যাচ নয়! এ তো ডুয়েল!”
নিশ্চল, নিথর দুই প্রতিপক্ষের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে রেফারি আড়চোখে তাকান উদয়ভানের দিকে। মাথাটা সামনের দিকে ঈষৎ ঝোঁকান উদয়ভান।
“ড্র!” দুই প্রতিপক্ষের মাঝখানে পাখাটা বাড়িয়ে ধরে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করেন রেফারি।
আর সেই মুহূর্তেই হুংকার তুলে রজতকে লক্ষ্য করে লাফ দেয় বিজন।
রজত আর বিজনের সংঘর্ষে ঠিক কী ঘটে, দেখা যায় না। কেবল বিজনের শরীরটা রজতকে পার করে খাটো থামের রেলিং টপকে রিং-এর প্ল্যাটফর্ম থেকে নীচে ভিড়ের মধ্যে এসে পড়ে। দেখা যায়, তলোয়ার উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রজত।
আর-একবার শোনা যায় রেফারির গলা, “কেউ জেতেনি। ম্যাচ ড্র!”
তলোয়ার নামায় রজত। রেফারির দিকে ফিরে হিমশীতল কণ্ঠে বলে, “আপনি একে ড্র বলেন?”
থামে হাত রেখে রিং নামিয়ে আনেন রেফারি। ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, “হ্যাঁ, ঠিকই বলেছি। ড্র। দুজনের কেউ জেতেনি।”
“হুঁঃ!’’ তিক্ততা চুইয়ে পড়ে রজতের গলায়, “বুড়ো হয়ে গেছেন, তাই চোখে ভালো দেখতে পান না বোধহয়!’’
“কী বললে?’’ রজতের এমন অপমানজনক মন্তব্যে চমকে ওঠেন রেফারি।
“আপনি ড্র বলার সঙ্গে সঙ্গেই বিজন আমার দিকে পুরো বেআইনি একটা খোঁচা মেরেছিল। আমি আটকে দিয়ে ওর মাথায় পালটা দিয়েছি!’’ স্টেডিয়ামের ভিড়ের দিকে একবার তাকিয়ে রেফারির চোখে চোখ রাখে রজত, “যান, ভালো করে দেখে আসুন!”
তলোয়ারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিঃশব্দ, নিশ্চুপ স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যায় রজত। বিস্মিত চোখে সবাই তাকিয়ে থাকে তার দিকে, কেবল একটা হালকা, ধূর্ত হাসি ফুটে ওঠে অতীনের মুখে।
স্টেডিয়ামের ওপর থেকে হতভম্ব হয়ে দ্যাখে রিমাও। কী হল, সে ঠিক বুঝতে পারে না। ম্যাচ ড্র হল, সে দেখেছে। কিন্তু বিজন অমন হুমড়ি খেয়ে পড়ল কেন? আর পড়ে যাওয়ার পর উঠছে না কেন?”
হঠাৎ নীচের ভিড় থেকে কান্না-জড়ানো কয়েকটা আর্তনাদ ভেসে আসে, “বিজন মরে গেছে!”
“কানের ওপর খুলি ফাটিয়ে দিয়েছে ওই হারামজাদা রজত!’’
“ডাক্তার। ডাক্তার ডাক!’’
“ডাক্তার? ডাক্তার আর কী করবে? দেখছিস না, মাথার ঘিলু বেরিয়ে এসেছে?”
রিমার মনে হয়, তার চারপাশের দুনিয়াটা কোন অতল অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। বিজন মারা গেছে! সকালেই বিজন তাকে বিচ্ছেদ দিয়েছে, তার বিধবা স্ত্রী হিসেবেও আর তার কোনও স্বীকৃতি নেই! এবার সে কোথায় গিয়ে ওঠে?! তিলতিল করে গড়ে-তোলা তার জীবন, তার সামাজিক পরিচয়, তার বৈভব, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তার চারপাশে গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে গেছে।
নীচ থেকে আবার চিৎকার ভেসে আসে।
“এই হারামজাদা রজত ইচ্ছে করে খুন করেছে বিজনকে। মেরে ফেল শালাকে!”
“খুঁজে দেখ, কোথায় গেল খানকির ছেলেটা।”
কেউ একজন স্টেডিয়ামের বাইরে ছুটে গিয়ে খবর নিয়ে আসে।
“কালভৈরব পাস ধরে ওপরে গেছে!’’
“বাঞ্চোতকে ওখানেই কেটে ফেলে দেব। চল চল, তলোয়ার ওঠা।”
স্টেডিয়াম থেকে হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসে চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা আর বিজনের বন্ধুরা। তলোয়ার নিয়ে দৌড় লাগায় কালভৈরব পাসের দিকে।
প্রথমে কেমন একটা পৈশাচিক আনন্দ অনুভব করে রিমা। মরুক রজত, তার এই অবস্থার জন্যে সে-ই দায়ী। কিন্তু পরক্ষণেই তার বহুদিনের শান-দেওয়া বুদ্ধিটা যুক্তি দিয়ে দাবিয়ে দেয় আবেগকে।
রজত। রজতই এখন তার একমাত্র আশ্রয়। রজত মরে গেলে বিজনের বন্ধুরা তাকে হোমিগঞ্জের চৌরাস্তার মোড়ে ফাঁসিতে টাঙিয়ে দিতে দু-মিনিটও দেরি করবে না। তাকে বাঁচাতে পারে একমাত্র রজত। তাকে সাবধান করে দিতে হবে। বিজনের বন্ধুরা রজতকে ধরে ফেলার আগেই তাকে তার কাছে পৌঁছোতে হবে।
রাস্তা ধরলে দেরি হবে। বনবাদাড় ভেঙে পাহাড়ের ওপর দিয়েই রজতের উদ্দেশে দৌড়োতে থাকে রিমা।
ঠান্ডা পড়েছে, এত বেলাতেও কালভৈরব পাসের গাছের ফাঁকে ফাঁকে কুয়াশা জমে আছে। কোথাও গাছের পাতা থেকে টুপটাপ করে ঝরে পড়ে জল। গাছের আড়াল থেকে মাঝেমধ্যে ভেসে আসে চিল-বেড়ালের তীক্ষ্ণ চিৎকার আর কলকে ফুলের তীব্র গন্ধ।
আস্তে আস্তে ওপরে ওঠে রজত। তার মাথার মধ্যে গনগনে করে জ্বলে রাগের আগুন। এই হোমিগঞ্জের লোক সবাই সমান। যতই সে চেষ্টা করুক-না কেন, তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিতে এদের সবার গায়ে লাগে। সে তার নিজের বাপ হোক, কি আখড়ার ওস্তাদ, কি কম্পিটিশনের রেফারি। সবাই চেষ্টা করে তাকে ছোট করতে, নীচে টেনে নামাতে।
হঠাৎ পাতার ওপর দিয়ে দৌড়োনোর শব্দ হয়। কুয়াশা ভেদ করে গাছের পেছন থেকে হুড়মুড় করে রজতের সামনে এসে পড়ে রিমা। চমকে উঠে তলোয়ারের হাতলে হাত রাখে রজত।
এক হাত তুলে রজতকে নিরস্ত করে, অন্য হাতে যেখান দিয়ে রজত উঠে এসেছে, সেইদিকের রাস্তাটা দেখায় রিমা। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “রজত, ওরা তোমাকে মারতে আসছে।”
তলোয়ারের হাতল থেকে হাত সরিয়ে নেয় রজত, “কারা?”
“চিরাগ আখড়ার ছেলেরা। বিজনের বদলা নিতে।”
“বদলা! কেন?’’ কপাল কুঁচকোয় রজত।
“তুমি— তুমি বিজনকে মেরে ফেলেছ!’’ বিজনকে কোনওদিন সমাজে ওঠার সিঁড়ির বেশি কিছু ভাবেনি রিমা। কিন্তু তার মৃত্যুর কথাটা বলতে গিয়ে তার গলাটা কেমন ধরে আসে।
“বিজন! মারা গেছে? আচ্ছা!” পেছন ফিরে রজত হোমিগঞ্জের দিকে নামতে শুরু করে।
তার পেছনে ছুটে আসে রিমা, “কোথায় যাচ্ছ? বললাম না, তোমাকে ওরা মারতে আসছে? কম করে দশ-পনেরোজন আছে দলে।’’
পাহাড়ি পথ ধরে নামতে নামতে রজত বলে, “থাকুক। আমি ইচ্ছে করে বিজনকে মারিনি। মনে দুশমনি নিয়ে আমি বিজনের মুখোমুখি হইনি।”
“ওরা সেসব কথা মানতে চাইবে না। সংখ্যায় ওরা অনেক ভারী, রজত।”
রিমার দিকে ফেরে রজত, “বুঝলাম। কিন্তু তুমি আমায় এসব বলতে এলে কেন বলো তো?”
“রজত, বিজন মারা গেছে। আমাদের দুজনের কথা জানতে পেরে আজ সকালে কম্পিটিশনের আগে আমাকে ডিভোর্স দিয়েছে।’’
চুপ করে রিমার মুখের দিয়ে তাকিয়ে থাকে রজত। চোখ মুছে তার সামনে এসে দাঁড়ায় রিমা, তার জামাটা খামচে ধরে দু-হাতে, “তুমি ছাড়া আমার আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই, রজত। আমাকে তোমার সঙ্গে নিয়ে চলো। হোমিগঞ্জ নয়, অন্য কোথাও চলো পালিয়ে যাই! তাড়াতাড়ি! ওরা এসে পড়ার আগে!”
সামনে গাছের কুয়াশা-ঢাকা ছায়ায় পায়ের শব্দ ওঠে। রিমাকে সজোরে একপাশে ঠেলে দেয় রজত। পথের একধারে মাটির ওপর ছিটকে পড়ে রিমা।
রিমাকে ফেলে কয়েক কদম সামনের দিকে এগিয়ে যায় রজত। খাপের তলোয়ারে হাত রেখে গাছের আড়াল থেকে একের পর এক বেরিয়ে আসে চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা। ভ্রূক্ষেপ না করে তাদের দিকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে যায় রজত।
দুজন পথ আটকায় তার।
“এই বাঞ্চোত, যাচ্ছিস কোথায়?”
“ভেবেছিস, বিজনের মৃত্যুর বদলা না নিয়ে তোকে ছেড়ে দেব?”
হাঁটা বন্ধ করে না রজত, এগোতে থাকে পথ ধরে, “আমাকে মেরে বদলা নিতে চাস?”
চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ফ্যালে চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা।
“কেন মৃত্যু তোর প্রাপ্য নয়?’’ প্রশ্ন করে একজন।
“একদমই না।” হাঁটতে হাঁটতেই হিমশীতল কণ্ঠে উত্তর দেয় রজত।
“কী বললি?’’ একের পর এক খাপ থেকে বেরিয়ে আসে তলোয়ার।
তবুও দাঁড়ায় না রজত। হাঁটতে হাঁটতে চলে আসে তলোয়ারবাজদের আরও কাছে, “বিজন ন্যায়সংগত লড়াইতে মারা গেছে। তার জন্যে তোদের কোনও ক্ষোভ বা আক্রোশ থাকা উচিত নয়।”
কথা শেষ হতে-না হতেই রজতের খাপ থেকে লাফিয়ে ওঠে এক হাতে ধরা তলোয়ার। যে একদম কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, তলোয়ার আড়াআড়ি তার পেটের ওপর দিয়ে ছুটে গিয়ে উঠে যায় আকাশের দিকে। দু-হাতে পেট চেপে সে আর্তনাদ করে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে, তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে নেমে আসে রক্তের ধারা।
দু-হাতে মাথার ওপর তলোয়ার তুলে পেছন থেকে চিৎকার করে রজতের ঘাড়ের ওপর এসে পড়ে একজন। লাট্টুর মতো পাক খেয়ে ঘুরে যায় রজত। তার তলোয়ার-ধরা ডান হাতের মুঠো কানের কাছে। তলোয়ারের ফলা শরীরের সঙ্গে সমান্তরাল, ডগা ফেরানো মাটির দিকে, ধার বাইরের দিকে।
ছুটে-আসা তলোয়ারবাজের সামনে থেকে শরীরটা সরিয়ে নেয় রজত। তার নিজের তলোয়ারের ধার শত্রুর শরীরের নীচ থেকে কোনাকুনি উঠে যায় ওপরে। রজতের পাশ দিয়ে হুড়মুড় করে ছুটে গিয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে তলোয়ারবাজ।
তলোয়ারের হাতল বেয়ে কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি উঠে আসে রজতের শরীরে। যেন একটা তৃষ্ণার্ত পশু মহা আনন্দে তার পিপাসা মেটাচ্ছে।
নিস্তব্ধ অরণ্যে কেবল গাছের পাতা থেকে টুপটাপ জল পড়ার শব্দ হয়। মাটিতে লুটিয়ে-থাকা কুয়াশার চাদর আঙুল জড়িয়ে দেয় পায়ে। কয়েকটা রামধনু ফিঙে চিপচিপ আওয়াজ করে গাছের ডাল থেকে ডালে উড়ে যায়।
আর-একবার পাক খেয়ে ঘুরে যায় রজত। কয়েক পা এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এবার তার তলোয়ার ডান হাতে কোনাকুনি করে ধরা শরীরের ডানদিকে। হাতলের প্রান্ত কোমরের কাছে, ডগা ওপরদিকে।
তার চারপাশে তলোয়ার উঁচিয়ে-থাকা চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা পিছু হটে সরে যায় তার থেকে দূরে।
অরণ্যের কুয়াশা-ঢাকা গভীরতা থেকে ভেসে আসে ডিমকি হায়েনার বুক্কন। তাতে সাড়া দিয়ে চিৎকার করে ওঠে একটা চিল-বেড়াল।
রজতের ভেতরের বুভুক্ষাটা আরও যাতনা, আরও ক্লেশ, আরও মৃত্যু চেয়ে হাহাকার করে।
তলোয়ার নামিয়ে নেয় রজত। শিথিল ভঙ্গিতে তলোয়ার তার ডান হাত থেকে ঝোলে শরীরের একপাশে। তলোয়ার বাড়িয়ে তাকে লক্ষ্য করতে থাকে তলোয়ারবাজরা।
পায়ে কুয়াশা জড়িয়ে ধীর কদমে হাঁটে রজত, যেন বেড়াতে বেরিয়েছে, কোনও তাড়াহুড়ো নেই।
আলো-আঁধারির আলপনা-বোনা অরণ্যপথে মৃত্যুপথযাত্রীর কাতর আর্তনাদের সঙ্গে মিলে যায় দূর থেকে ভেসে-আসা ডিমকি হায়েনার চিৎকার।
এবার তিনদিক থেকে তিনজনে আক্রমণ করে তাকে একসঙ্গে। বাঁদিকে বিদ্যুৎবেগে ঘুরে যায় রজত, তার তলোয়ার-ধরা হাত উঠে আসে মাথার ওপর।
বাঁদিকের তলোয়ারবাজ তখন তাকে সর্বশক্তি দিয়ে আক্রমণ করতে আসছে। তার তলোয়ার-ধরা দুই মুঠো মাথার পেছনে, তলোয়ারের ফলা প্রায় পিঠের সঙ্গে সমান্তরাল।
কিন্তু সে তলোয়ার নামিয়ে আনার আগেই রজতের তলোয়ারের ডগা তার বাঁদিকের কাঁধ থেকে ডানদিকের কোমর অবধি একটিমাত্র মসৃণ টানে চিরে দেয়।
ঘোরা থামে না রজতের। তার হাঁটু ভাঁজ করা, শরীর কোমর থেকে সামনের দিকে সামান্য ঝুঁকে। তার বাঁ হাতও চলে আসে তলোয়ারের হাতলে, তলোয়ার উঠে আসে ওপরে। ডান হাতের কনুই মাথার কাছে, বাঁ হাতের কনুই পাঁজরের কাছে। তলোয়ার আকাশের দিকে তাক করে কোনাকুনি করে ধরা।
দ্বিতীয় আক্রমণকারীও তখন মাথার ওপর তলোয়ার তুলেছে। কিন্তু সে রজতকে আঘাত করা সুযোগ পায় না। রজতের তলোয়ার বাতাসে পাক খেয়ে ওপর থেকে নেমে আসে তার বাঁদিকের পাঁজরে। পাঁজর, পেট, মেরুদণ্ডের খানিকটা কেটে তার শরীরটাকে প্রায় দু-টুকরো করে দেয়। হাওয়ায় ছড়িয়ে যায় আর্তনাদ আর রক্তের ফোয়ারা।
প্রথম আক্রমণকারীর দেহটা তখনও মাটিতে পড়েনি।
দ্বিতীয় আক্রমণকারীর শরীরের সামনে থেকে সরে যায় রজত। তলোয়ারের হাতল থেকে তার বাঁ হাত উঠে আসে, তলোয়ারের ফলা সমান্তরাল হয়ে যায় মাটির সঙ্গে। তার ডান পা সামনের দিকে অনেকখানি বাড়ানো, বাঁ হাঁটু ভাঁজ করা, শরীরটা কিছুটা পেছনে হেলানো।
পেছন থেকে তৃতীয় আক্রমণকারী তখন মাথার ওপর তলোয়ার তুলে দৌড়ে আসছে।
বাঁ পায়ে ভর দিয়ে ডানদিকে ঘুরে সরে যায় রজত, তলোয়ার ধরে-রাখা ডান হাতটা উঠে আসে ওপরে। তৃতীয় আক্রমণকারী তার দৌড় থামাতে পারে না, রজতের শরীর পার করে চলে যায় সামনের দিকে।
তার পিঠে এবার ওপর থেকে নেমে আসে রজতের তলোয়ার, ডানদিকের কাঁধ থেকে আরম্ভ করে মেরুদণ্ড দু-ফাঁক করে দিয়ে থামে এসে বাঁদিকের কোমরে।
ঘোরা শেষ হয় রজতের। আর তার পরেই তিনটে দেহ কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে আছড়ে পড়ে মাটিতে।
কোনও অজানা শ্বাপদের পিপাসা মেটার তৃপ্তির অনুভূতি উঠে আসে তলোয়ার থেকে রজতের হাতে।
জঙ্গলের ভেতর থেকে আবার ভেসে-আসা চিল বেড়ালের চিৎকার মেশে জখমি মানুষের বেদনাতুর আর্তনাদে। রক্তের তামাটে গন্ধে হারিয়ে যায় পাহাড়ি পথের মাটির সোঁদা গন্ধ।
আর-একবার সামনের দিকে মন্থরগতিতে হাঁটে রজত। আবার তার ডান হাত থেকে শিথিলভাবে ঝোলে তলোয়ার। আবার তার ভেতরে এক চির অতৃপ্ত ক্ষুধা হাহাকার করে রক্তের নজরানা দাবি করে।
পায়ে পায়ে কুয়াশার বিনুনি জড়িয়ে আবার তিনজন একসঙ্গে আক্রমণ করে তাকে। চিল-বেড়ালের তীক্ষ্ণ চিৎকার যেন তাদের উৎসাহ জোগায়।
প্রথমজন চিৎকার করে মাথার ওপর তলোয়ার তুলে তেড়ে আসে। রজতের তলোয়ার বিদ্যুতের গতিতে ডানদিকে উঠেই নীচে নেমে আসে, তার পেট ফেঁড়ে দিয়ে ফের উঠে যায় বাঁদিকে। বাঁদিকে আবার নেমে আসে তলোয়ার, তার ঊরু চিরে দিয়েই উঠে যায় ওপরে।
রজতের রক্ত-মাখা তলোয়ার এখন মাথার ওপর ডানদিকে। তলোয়ারের ডগা আকাশের দিকে, ফলা মাটির সঙ্গে কোনাকুনি করে উঁচিয়ে ধরা। বাঁ পা পেছনে, মাটির সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল। ডান পা সামনে, হাঁটু ভাঁজ করা।
গাছের পাতা থেকে ঝরে-পড়া জলের বিন্দুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তলোয়ার থেকে ঝরে পড়ে রক্তের ফোঁটা।
দ্বিতীয় আক্রমণকারী রজতের ডানদিক থেকে ছুটে এসে তাকে লক্ষ্য করে দু-হাতে তলোয়ার চালায়। শরীরটা পেছনদিকে হেলিয়ে অনায়াসে তার তলোয়ারের কোপ এড়িয়ে যায় রজত। তারপর সে যখন টাল সামলাতে না পেরে রজতের সামনে দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছে, রজতের উঁচু করে ধরা তলোয়ার নেমে এসে আড়াআড়ি বয়ে যায় তার পিঠের মাঝখান দিয়ে।
রজতের তলোয়ার নীচ থেকে আবার উঠে যায় ওপরে। ডান হাতের মুঠো বাঁ কাঁধের কাছে, তলোয়ারের ডগা তাক করা আকাশের দিকে।
রজতের হাতের তালুতে তলোয়ার বেয়ে নেমে আসে রক্তের ধারা। যেন কোন এক অসীম হিংস্রতার অধীর পিপাসা মেটায়।
তৃতীয়জন তলোয়ার তুলে ছুটে আসে সামনে থেকে। রজতের ডান হাতের মুঠো চলে যায় বাঁ কাঁধের পেছনে, পিঠের পেছনে ধরা তলোয়ারের ডগা স্পর্শ করে ডানদিকের কোমর, ভাঁজ হয়ে যায় দুই হাঁটু। তারপর তৃতীয় আক্রমণকারী যখন তার নাগালে এসে পড়েছে, তার তলোয়ার পিঠের পেছন থেকে উঠে এসে চিরে দেয় তার পেট।
তিনটে দেহ একের পর এক আছড়ে পড়ে মাটিতে। একটা ক্রূর উল্লাস যেন তলোয়ার থেকে উঠে এসে রতিসুখের মতো টগবগিয়ে ছুটে যায় রজতের প্রতিটি শিরা আর ধমনি দিয়ে।
পেছন থেকে আর-একজন তলোয়ারবাজ লক্ষ্য করে রজতকে। সে তেড়ে আসে না, বাকিদের দেখে তার শিক্ষা হয়ে গেছে। তলোয়ার উঁচিয়ে কিছুটা দূরত্ব রেখে হাঁটে।
জামার আস্তিনে ঠোঁটে লেগে-থাকা রক্তের লবণাক্ত স্বাদ মোছে রজত। তলোয়ার নামিয়ে হাঁটতে থাকে কুয়াশায় গোড়ালি ডুবিয়ে।
পেছনের তলোয়ারবাজ আচমকাই দৌড়ে আসে মাথার ওপর তলোয়ার তুলে।
রজতের ভেতরে একটা অন্তহীন নির্বোধ ক্ষুধা অধীর প্রত্যাশা নিয়ে যেন রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করে।
দুটো হাঁটু ভাঁজ করে শরীর ঝুঁকিয়ে ঘুরে যায় রজত। তার তলোয়ার বাঁদিকে উঠেই নেমে আসে ঘূর্ণির মতো, পেট ফাঁক করে দেয় আক্রমণকারীর। ফের যেন একটা তৃপ্তির বোধ রজতের তলোয়ার থেকে ছড়িয়ে যায় তার শরীরের বিন্দুতে বিন্দুতে।
জীবন আর মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে কলরব তুলে আকাশের দিকে উঠে যায় কয়েকটা রামধনু ফিঙে। তাদের ডানার ঝাপটায় ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে পড়ে গাছের ডাল থেকে, রজতের আস্তিনে রেখে যায় তাদের বুনো সুগন্ধের স্মৃতি।
শেষ হয় লড়াই। নিস্তব্ধ বনপথে শোনা যায় কেবল পাতার মর্মরধ্বনি আর রামধনু ফিঙের ডাক। গাছের আড়াল চিল-বেড়ালটা তীক্ষ্ণস্বরে ডাকতে থাকে বিরামহীনভাবে।
কুয়াশার চাদর জড়িয়ে নির্জন অরণ্যের মাটিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে থাকে কয়েকটা বাতিল রক্তাক্ত লাশ।
একটা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে রিমা। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে সেই বধ্যভূমির দিকে তাকিয়ে তার সমস্ত শরীর কাঁপে থরথর করে। যেন পথ হারিয়ে কোনও অজানা এক ভয়ানক মৃত্যুপুরীতে এসে পড়েছে সে।
তলোয়ারের রক্ত একটা লাশের জামায় মুছে কালভৈরব পাসের রাস্তাটা দিয়ে হোমিগঞ্জের দিকে নামতে থাকে রজত।
ভয় ছাপিয়ে রিমার টিকে থাকার প্রবৃত্তি আবার প্রবল হয়ে ওঠে। দৌড়ে গিয়ে সে রজতের পথ রোধ করে দাঁড়ায়, “ওদিকে না, রজত। ওদিক থেকে আরও লোক আসছে।”
উল্লাসে ঝকঝক করে ওঠে রজতের চোখ, যেন সে ভোজসভার নিমন্ত্রণ পেয়েছে, “আসতে দাও! আসুক, আরও আসুক!”
দু-হাত রজতের বুকের ওপর রেখে রিমা অনুনয়ের সুরে বলে, “একবার ভেবে দ্যাখো রজত। বিজন ছাড়া আরও এতগুলো লোক মারা গেছে তোমার হাতে। আমার আর তোমার সম্পর্কের কথাও এতক্ষণে চাউর হয়ে গেছে। হোমিগঞ্জের লোক ভাববে, আমার জন্যেই তুমি এতগুলো মানুষ মেরেছ। আমাদের ধরতে পারলে দুজনকেই সঙ্গে সঙ্গে ফাঁসিতে লটকে দেবে। একটা পুরো শহরের সঙ্গে লড়াই করা তোমার পক্ষেও সম্ভব নয়।”
উত্তরদিকে রাস্তার দিকে তাকায় রজত। না, একা তার পক্ষে পুরো হোমিগঞ্জের সঙ্গে লড়া সম্ভব নয়। ও রাস্তা তার জন্যে আপাতত বন্ধ।
দক্ষিণদিকে তাকায় রজত। ওই রাস্তা রুসোগঞ্জ হয়ে হকিন্সাবাদ গেছে। রজত সেখানেই যাবে। স্টেডিয়ামে তার পেছনে হকিন্সাবাদের যে তলোয়ারবাজ বসে ছিল, অতীন না কী যেন নাম, সে বলছিল তাদের তলোয়ারবাজ দরকার। হকিন্সাবাদে গিয়ে তাকে খুঁজে বের করবে রজত।
একটা কথা মনে পড়তে রজতের মুখটা বিকৃত হয়ে যায় একটা কদর্য হাসিতে— রিমা হকিন্সাবাদ যেতে চেয়েছিল!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন