সুমিত বর্ধন

হিমশীতল রাতের পর
ঘণ্টার নিষ্কলুষ শব্দ
নশ্বর জগতে ভোর আসে

আজ,
আমাদের জীবনে প্রতিবিম্ব
ঘাসের শিশিরে



আখড়ার ঘরে কিষেনপ্রতাপের সামনে বসে রবি, মিতা আর হিমু। একটু আগেই মিতা তার অভিজ্ঞতার কথা শোনানো শেষ করেছে তাঁকে।
গম্ভীরভাবে মাথা নাড়েন কিষেনপ্রতাপ, “মিতার ইতিহাস জানার পরই রজতের পাগলামি আরম্ভ হয়। গম্বুজ ঘরের যন্ত্র খুব সম্ভব ওর ভেতরের অপরাধবোধকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে থাকবে।”
“তাহলে কি ভিন্নররা ওই কাজের জন্যেই গম্বুজ ঘরগুলো বানিয়েছিল, ওস্তাদ?” প্রশ্ন করে হিমু।
“খুব সম্ভব।”
“কিন্তু তা-ও তো তারা টিকে থাকতে পারেনি!”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেন কিষেনপ্রতাপ, “হয়তো তাদের বিপদ বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। কিংবা হয়তো ওই কয়েকটামাত্র যন্ত্র লড়ার জন্যে যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু তা হলেও, এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ার একটা সূত্র তো পাওয়া গেল!”
“আমি তাহলে এখন কী করব, ওস্তাদ?”
“অম্বালিকা ফের এখন গৃহযুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। হকিন্সাবাদ আর নিরাপদ জায়গা নয়। আমি আখড়া বন্ধ করে দিয়ে অসিমঠ চলে যাব। তুমি মিতাকে হোমিগঞ্জে রেখে অসিমঠে চলে এসো। তোমার তালিম এখনও বাকি আছে।”
রবির দিকে তাকান কিষেনপ্রতাপ, “তুমি কী করবে? কিছু ভেবেছ?”
“হ্যাঁ হুজুর, ঠিক করে নিয়েছি। আমি মিতার সঙ্গে হোমিগঞ্জেই থাকব। এই হিমু সাহেব না-ফেরা অবধি একটু সব দিকে নজরে রাখব।’’
প্রশ্নের ভঙ্গিতে কপালে ভুরু তোলেন কিষেনপ্রতাপ।
ঠোঁট উলটে মাথা ঝাঁকায় রবি, “হ্যাঁ, হুজুর! চতুর্দিকে চোরছ্যাঁচড়ে একেবারে ভরে গেছে, হুজুর। সব চোখে চোখে না রাখলে আবার কোথায় কী ঘটে, বলা যায় না।”
কিষেনপ্রতাপের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসিটা কারও নজরে পড়ে না।
কালভৈরব পাসের ছায়া-মাখা রাস্তা ধরে হোমিগঞ্জের দিকে হাঁটে তিনজন— হিমু, মিতা আর রবি। নির্জন রাস্তায় মাঝেমধ্যে চিল-বেড়ালের চিৎকার ছাড়া আর কিছু শোনা যায় না।
হাঁটতে হাঁটতে আঙুল তোলে হিমু, “ওই তো, কালভৈরবের মন্দিরের রাস্তা।”
পিঠে বাঁধা ব্যাগটা ঝাঁকিয়ে ঠিক করে মিতা, “চলো, যাওয়ার আগে একবার প্রণাম করে যাই।”
মন্দিরের ঢালু রাস্তাটা দিয়ে কিছুটা উঠেছে হিমু আর মিতা, একটা ‘উঃ’ আওয়াজ করে রবি দাঁড়িয়ে পড়ে।
“কী হল, কাকা?’’ উদ্বিগ্ন স্বরে বলে মিতা।
“কিছু না! এই একটা শেকড়ে পা আটকে আঙুলটা মচকে গেল। তোমরা যাও, আমি আসছি।”
“তুমি ঠিক থাকবে তো কাকা?”
“আরে হ্যাঁ হ্যাঁ,’’ আশ্বস্ত করে রবি, “তেমন কিছু হয়নি। একটু বসলেই ঠিক হয়ে যাবে।’’
হিমু আর মিতার চেহারা দুটো গাছের আড়ালে মিলিয়ে যেতেই একটা কান-এঁটো-করা হাসি হেসে পাইপ ধরায় রবি। তার মুখ দেখে বোঝা যায় না যে তার শরীরে কোনও ব্যথা আছে।
পাহাড়চুড়োয় উঠে মন্দিরের সামনেটা দেখায় মিতা, “দাদু ওখানেই—,’’ গলা ধরে আসে তার।
চুপ করে থাকে হিমু, মিতাকে সান্ত্বনা জানানোর ভাষা খুঁজে পায় না সে।
এক হাতে চোখের জল মুছে মিতা মন্দিরের দিকে তাকায়, “এখানে এলে তো কিছু দিতে হয়। কী দিই?”
মৃদু হেসে দু-হাত ওলটায় হিমু, “আমাকে জিজ্ঞেস কোরো না। আমার কাছে কিচ্ছু নেই।”
পিঠের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে হাতড়ায় মিতা। তারপর একটা জরির নকশা-তোলা কাপড়ের টুকরো বের করে আনে, “এইটা দিয়ে দিই?”
কাপড়টার দিকে তাকায় হিমু, “এত দামি জিনিস দিয়ে দেবে?”
“এটা ওই বাইজি কোঠায় আমায় দিয়েছিল। নাচের কাঁচুলি বানানোর জন্যে।” মিতার কান কেমন লাল হয়ে ওঠে, “এ রেখে আর কী করব। যাই, দিয়ে আসি।”
মন্দিরে কাপড় রেখে বেরিয়ে এসে মিতা একটা কী তুলে ধরে। তার দু-চোখে কৌতুক, “দ্যাখো, কী পেলাম।”
“কী?”
“একটা শামুক বাঁশের বাঁশি। বাজাবে?”
“দুর, আমি বাঁশি বাজাতে জানি নাকি?” হেসে ফ্যালে হিমু।
“চেষ্টা করে দ্যাখো-না। এমন কী আর শক্ত জিনিস!” কৌতুকে ঝকঝক করে মিতার চোখ।
মন্দিরের সিঁড়িতে বসে বাঁশিতে ফুঁ দেয় হিমু। বাঁশি থেকে কয়েকটা বেসুরো আওয়াজ ছাড়া কিছু বেরোয় না।
হিমুর পাশে বসে হেসে ঢলে পড়ে মিতা, “ধুস, কিচ্ছু হচ্ছে না।”
বাঁশি নামিয়ে হিমু বলে, “বললাম তো পারি না। তুমিই তো বললে বাজাতে।’’
পাশ থেকে রবির আওয়াজ আসে, “আমি বাজাব?”
রবি কখন উঠে এসেছে, হিমু আর মিতা কেউ খেয়াল করেনি।
হিমুর হাত থেকে বাঁশিটা নিয়ে রবির দিকে বাড়িয়ে ধরে মিতা, “তুমি বাঁশি বাজাতে পারো কাকা?”
“রাস্তায়-ঘাটে ঘুরে বেড়াই, ওই একটু-আধটু শিখেছি।’’ হেসে বলে রবি।
মাটিতে বসে বাঁশিতে ফুঁ দেয় রবি, একটা আনন্দের সুর ভেসে যায় তার বাঁশি থেকে। বাতাস সে সুর ছড়িয়ে দেয় আকাশে, আকাশ থেকে বয়ে নিয়ে যায় মেঘের কোলে মাথা তুলে রাখা পশ্চিমের বরফ-মাখা পাহাড়ে, পাহাড় থেকে বিছিয়ে দেয় নীচের ঘন বনানীর চাদর মুড়ি-দেওয়া গভীর উপত্যকায়।
কালভৈরব পাসের চুড়োয় বসে তিনটি মানুষ বিশৃঙ্খলার অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করার একটি শৃঙ্খল নির্মাণের সূচনা করে।
অদৃশ্য সে শৃঙ্খলের নাম ভালোবাসা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন