সুমিত বর্ধন

হে জীবন, কীসের সাথে তুলনা করি তোমার?
যেন দিনান্তে বিদ্যুতের ম্লান আলোয় দেখা
হেমন্তের শূন্য খেত

রামধনু ফিঙে,
চলো যাওয়া যাক
দ্যাখো কেমন আলোর ছটা
পুবের আকাশে



অম্বালিকায় হকিন্সাবাদ যদি রাজনীতির কেন্দ্র হয়, তাহলে দৌলতনগর তার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। এখানে ক্ষমতার উৎস ভূসম্পত্তি নয়, বাণিজ্যলব্ধ অর্থ।
দৌলতনগরের বর্তমান গভর্নরটি উচ্চতায় কিঞ্চিৎ খাটো হলেও উচ্চাভিলাষটি তাঁর আকাশচুম্বী। পিতামহ-প্রপিতামহের আমলের গৌরব ফিরিয়ে আনতে তিনি বদ্ধপরিকর। তিনি ভেঙে-পড়া মঙ্গলদেউড়ি পুনর্নির্মাণ করিয়েছেন, রাস্তাঘাট মেরামত করিয়েছেন, এবং তার চাইতে বড় কথা, দৌলতনগরের বাইরে নানা কারখানা বসিয়েছেন। নিউটন অ্যাকাডেমির কয়েকজন শিক্ষক পুরোনো ভিন্নর ইঞ্জিনকে যন্ত্র চালানোর কাজে ব্যবহার করার পন্থা আবিষ্কার করার পর এইসব কারখানায় আজকাল অনেক সস্তায় উৎপাদন হয়। যোধবণিকের কাফিলা আবার দৌলতনগর আসতে আরম্ভ করেছে। নীলকান্ত মহিষ জোতা তাদের গাড়িতে তারা কাঁচামাল নিয়ে আসে এবং দৌলতনগরের কারখানায় তৈরি পণ্য নিয়ে ফেরত যায়।
দৌলতনগরের কোষাগারে অর্থের জোগান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গভর্নরের দৃষ্টিও বাইরের দিকে প্রসারিত হয়েছে, কেবল দৌলতনগরেই তিনি আর নিজেকে সীমিত রাখতে চান না। সেনেট নির্বীর্য হওয়ার অর্থ সমস্ত ক্ষমতা চ্যান্সেলরের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া। চ্যান্সেলরের ক্ষমতার উৎস কওমি পলটন। এবং কওমি পলটনের ক্ষমতার উৎস দৌলতনগরের কোশাগার। এইরকম একটা সরল গাণিতিক হিসেব দাঁড় করানো গেলে প্রশাসনিক দায়িত্বের অনর্থক ঝঞ্ঝাট ঘাড়ে না নিয়েই দৌলতনগরের গভর্নর বকলমে অম্বালিকার প্রভু হয়ে ওঠেন।
অতএব গভর্নর কওমি পলটনকে দৌলতনগরে ডেকে এনেছেন, এবং শাঁসে-জলে পুষ্ট করছেন। তাদের থাকার জন্যে পরিত্যক্ত কাইজারি মহামৃগের পিলখানা9 ভেঙে একটা নতুন মহল্লা বসানো হয়েছে, এবং কার্যত এটাই আজকাল কওমি পলটনের হেডকোয়ার্টার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে তাদের সঙ্গে এসে যোগ দিয়েছে আরও নানান ভাগ্যসন্ধানী। প্লেটোগড়ের বরখাস্ত সিপাহি, ইউলারগঞ্জের গুন্ডা, কাজ-হারানো যোধবণিক, ভাগ্যসন্ধানী পিণ্ডারি, কয়েদ-খাটা আসামি, কাউকেই অতীন ফেরায়নি। গভর্নরের বদান্যতায় এবং অতীনের দিলখোলা নিয়োগপদ্ধতিতে কওমি পলটনের সদস্যসংখ্যা ফুলেফেঁপে উঠেছে, পিলখানা আজকাল দিবারাত্র সরগরম থাকে।
শীতকাল কেটে গিয়ে বসন্ত এসেছে। আবহাওয়া পরিষ্কার, রোদের তেমন তাপ নেই। পিলখানার নতুন বাঁধানো রাস্তার মোড়ে একটা নীল আপেল খেতে খেতে চারপাশের ভিড়ের ওপর নজর রাখে হিমু। আজ দিন সাতেক হল সে দৌলতনগর এসেছে। টানা সাত দিন ধরে সে এই পিলখানার আনাচকানাচে সকাল-সন্ধে নজর রাখছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত রজতকে দেখতে পায়নি। সাবধানে পিলখানার আশপাশের দোকানে রজতের খোঁজও করেছিল, কিন্তু সেখানেও কেউ সন্ধান দিতে পারেনি। আজকেও সকাল থেকে সে এই পিলখানায় চক্কর কাটছে, কিন্তু এ পর্যন্ত তার ঘোরাফেরা বৃথাই গেছে, রজত তার নজরে পড়েনি।
হঠাৎ বড়রাস্তার দিক থেকে একটা হইহই ওঠে, বাজনার আওয়াজ আর লোকের উল্লাসধ্বনি শোনা যায়। চারপাশের লোকজন মাথা তুলে আওয়াজটা শোনে, তারপরে দৌড় দেয় বড়রাস্তা লক্ষ্য করে।
একজনকে দাঁড় করিয়ে হিমু জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে ভাই, এত আওয়াজ কীসের?”
“বসন্তপূজার শোভাযাত্রা বেরিয়েছে!” বলেই সে দৌড় লাগায়।
বসন্তপূজার শোভাযাত্রা বসন্তকালের শুরুতেই বেরোয়। দৌলতনগরের আমোদ-প্রমোদের ব্যাবসার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা সব এই দিনে মিছিল করে শহর পরিক্রমা করে, তারপর মহাকাল মন্দিরে পুজো দিয়ে ফেরত যায়।
কয়েক মিনিটের মধ্যে পিলখানার রাস্তা ফাঁকা হয়ে যায়।
প্রথমে হিমু ভাবে, ফেরত চলে যাবে। পিলখানার ফাঁকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটা বিপজ্জনক। কেউ যদি সন্দেহের বশে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে তাহলে সে ফাঁদে পড়ে যাবে।
তারপরে তার মনে হয়, পিলখানায় কয়েকদিন তল্লাশি করেও সে রজতের খোঁজ পায়নি। বসন্তপূজার শোভাযাত্রা দেখতে সাধারণত ভিড় ভেঙে পড়ে। সেখানে একবার চোখ রাখলে হয়, যদি রজতকে দেখতে পাওয়া যায়।
বড়রাস্তার দু-পাশে মানুষের ভিড়। তারই মধ্যে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চারদিকে নজর রাখে হিমু। ভিড়ের সামনে দিয়ে একের পর এক চলে যায় শহরের প্রমোদ পসারিরা।
প্রথমে আসে একদল বাজিগর। কেউ ডিগবাজি খেতে খেতে, কেউ হাওয়ায় একসঙ্গে অনেকগুলো বল বা মুগুর ছুড়তে ছুড়তে, কেউ শরীরের চারপাশে একটা বিশাল রিং ঘোরাতে ঘোরাতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়। ভিড়ের মধ্যে থেকে হাততালি, টীকাটিপ্পনী ভেসে আসে।
তারপরে রঙিন সাজ-পরানো গ্রিবিনে চড়ে আসে শুঁড়িখানার মালিকরা, তাদের পেছনে তাদের সহকারীরা ফুলেল মদের খুদে খুদে বোতল ছুড়তে থাকে ভিড়ের মধ্যে, সেগুলো নেওয়ার জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।
শুঁড়িদের পর মুখে রং মেখে, মুখোশ পরে অদ্ভুত সাজপোশাক গায়ে হেলতেদুলতে হেঁটে চলে যায় নটুয়ারা। ভিড়ের মধ্যে থেকে উড়ে আসে হাসির হররা, টীকাটিপ্পনী, হাততালি।
তারপর দু-পায়ে হেঁটে আসে একসার ফুলে সাজানো পালকি। পালকির মধ্যে বসে হাত নাড়ে রূপমঞ্জিলের বাইজি কুঠির মালিক-মালকিনরা। ভিড় থেকে এবার ভেসে আসে শিস, অশালীন উক্তি।
পালকির পর অজস্র ছোট ছোট পায়ে হেঁটে আসে একটা লম্বাটে মাল কন্টেনার। তার দু-দিক নামানো। কন্টেনারের ভেতরে সাজসজ্জা করে দাঁড়িয়ে থাকে রূপমঞ্জিলের সদ্য যোগ-দেওয়া রূপবতীরা।

কন্টেনারের দিকে চোখ পড়তে হঠাৎ চমকে ওঠে হিমু। তার বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ডটা হাতুড়ির মতো পড়তে থাকে। তার সামনে আচমকা রজত, পুরো কৌমি পলটন, দুটো উটিয়া বাঁদর, একটা কাইজারি মহামৃগ সব একসঙ্গে এসে পড়লেও তার হয়তো এইরকম অবস্থা হত না।
কন্টেনারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে একটা গালে টোল-পড়া মেয়ে। যাকে সে শেষ দেখেছিল হকিন্সাবাদের এক বৃষ্টি-ভেজা বিকেলে।
হিমুর মাথা থেকে রজত, তলোয়ারবাজি, শস্ত্রবিদ্যার পাঁচ স্তম্ভ, সব বেমালুম উবে যায়। সে কন্টেনারটাকে নজরে রেখে তার পেছনে পেছনে হাঁটতে শুরু করে।
রাস্তার ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকেই গাল দেয় রবি। মিতার খোঁজ পেতে গিয়ে তার অত বাড়াবাড়ি না করলেও চলত। হকিন্সাবাদের বড় মানুষদের নিজেদের মধ্যে যতই ঝগড়া থাকুক, সমাজের নীচের তলার কেউ তাদের কারও গায়ে হাত দিলে তাকে শিক্ষা দেবার জন্যে তারা শ্বাপদের মতো হিংস্র হয়ে ওঠে।
রাস্তার মোড়ে ঠান্ডায় অর্ধমৃত শুভাকে উলঙ্গ অবস্থায় পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাই তার মাথার দাম ঘোষণা হয়ে যায়, তার ছবি পড়তে থাকে হকিন্সাবাদের বড়রাস্তার ছাতার মতো প্রোজেক্টরের তলায়, আর তার নাগাল পেতে শিকারি শিঙেল চিতার মতো হন্যে হয়ে সারা হকিন্সাবাদে চষে ফেলতে থাকে হকিন্সাবাদের পুলিশ আর সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর নিজস্ব লশকরের তলোয়ারবাজরা।
প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক মাস গা-ঢাকা দিয়ে থাকতে হয় রবিকে। তারপর এক কাফিলা-সালারকে10 ঘুস দিয়ে তার কাফিলায় মালের বস্তার নীচে লুকিয়ে হকিন্সাবাদ ছেড়েছে সে।
রবি অবশ্য জানে যে দৌলতনগরের রূপমঞ্জিলেরও নিজস্ব নিয়ম আছে, বাইজি কুঠিতে মাস ছয়েকের ট্রেনিং-এর আগে কোনও মেয়েকে খদ্দেরের কাছে পাঠানো হয় না। ততদিন তারা প্রতিষ্ঠিত বাইজিদের ফাইফরমাশ খাটে আর মজলিশে পরিচারিকার কাজ করে। সুতরাং ততদিন মিতার তেমন কোনও বিপদ হয়তো হবে না। কিন্তু মেয়েটা হয়তো ভাববে যে রবি তাকে বিপদের মুখে ফেলে পালিয়ে গেছে, এইটা মনে করলেই তার বুকের ভেতরটা কেমন টনটন করে ওঠে।
দৌলতনগরের হালহকিকত সব রবির সব জানা। সুতরাং তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সে শোভাযাত্রা দেখতে থাকে। মিতাকে খুঁজে বের করার এটাই শ্রেষ্ঠ পন্থা।
শোভাযাত্রায় মাল কন্টেনারটা আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার মধ্যে সে মিতাকে দেখতে পায়। মনের আনন্দটা ভেতরেই চেপে রেখে সে ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে যায়। ভিড়ের সামনের দিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোমরে তলোয়ার বাঁধা কুঠির পাহারাদাররা দাঁড়িয়ে। শোভাযাত্রার দিন এরাই কুঠির মালকিন আর মেয়েদের নিরাপত্তা দেয়। এদের একজনের কাছে এগিয়ে গিয়ে রবি যতটা সম্ভব নিরুত্তাপ কণ্ঠে প্রশ্ন করে, “বাবা! এবারে অনেকগুলো নতুন মেয়ে দেখছি! কোন কুঠির ভাই?”
“মোহিনী, শ্যামলী আর উর্বশী।” রাস্তা থেকে চোখ না সরিয়েই উত্তর দেয় পাহারাদার।
কোনও তাড়াহুড়ো না দেখিয়ে ভিড় ঠেলে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসে রবি। তারপর বড়রাস্তা ছেড়ে একটা গলিতে ঢুকে দৌড় দেয় প্রাণপণে।
অম্বালিকায় পা রাখার পর মানুষ যখন প্রথম দৌলতনগর অঞ্চলে আসে, এখানে সে হকিন্সাবাদের মতো কোনও ভিন্নর সভ্যতার পুরাকীর্তি পায়নি। এই অঞ্চলটা প্রায় পুরোটাই ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে ভরতি ছিল।
কেবল একটি ব্যতিক্রম বাদে।
হকিন্সাবাদের একটি অঞ্চলে বুদ্বুদের মতো কয়েকটি সৌধ মানুষ আবিষ্কার করে। যেন কতকগুলো গম্বুজ মাটির ওপর গড়ে উঠেছে। এই বাড়িগুলোর ভেতরে দেওয়ালের গায়ে একটা চৌকোনা পাথরে চাপ দিলে গম্বুজের মাথার কাছে অগুনতি কুলুঙ্গিতে নীল আলো জ্বলে ওঠে, মেঝের নীচে কোনও যন্ত্রের মৃদু গুঞ্জন পাওয়া যায়।
প্রথমদিকে এই গম্বুজগুলোর উদ্দেশ্য না বুঝতে পারা গেলেও, কিছুদিনের মধ্যেই এদের রহস্য মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। এদের ভেতরের যন্ত্রটা চালু হলে মানুষের অনুভূতিগুলো বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
গম্বুজের এই শক্তি হয়তো অনেক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানিরীক্ষার কাজে লাগানো যেত, কিন্তু তার বদলে মানুষ এই গম্বুজগুলোকে ঘিরে বানিয়ে ফেলল বাগান, হলঘর, বারান্দা, বড় বড় জানলা-বসানো এক খোলামেলা কাঠের বাড়ি, এবং তার সরল নির্দোষ নাম রাখল পার্টি হাউস।
পার্টি হাউস হয়ে উঠল বড় মানুষদের আমোদ-প্রমোদের আর হুল্লোড়ের ঠিকানা। আর সেই সমস্ত প্রমোদের অন্তিম অধ্যায়ের যৌনক্রীড়া অনুষ্ঠিত হতে থাকল ওই গম্বুজের নীচে, বহুগুণে বর্ধিত রতিসুখ উপভোগ করার জন্যে।
আর পার্টি হাউসে রূপের জোগান দিতে তার চারপাশে ধীরে ধীরে গড়ে উঠল রূপমঞ্জিল। একের পর এক বাইজি কোঠা, শুঁড়িখানা, বড় মানুষদের প্রমোদ ভবন, এবং দোকানপাটে সাজানো এক বৃহৎ মহল্লা।
তিনটে কোঠার মধ্যে কোনটা মিতার, সেটা খুঁজে পেতে বেশি বেগ পেতে হয়নি রবিকে। এখন সে এই রূপমঞ্জিলের একটা পানশালার বারান্দায় ঠররার গ্লাস হাতে রাস্তার উলটোদিকে মোহিনী কোঠার ওপর নজর রাখে।
ধীরে ধীরে বেলা বাড়ে, মহাকাল মন্দিরের পুজো সাঙ্গ করে কোঠায় এক-এক করে ফিরে আসে বাইজির দল।
ঠররার দাম চুকিয়ে বারান্দা থেকে নেমে আসে রবি, ধীরেসুস্থে মোহিনী কোঠার সামনে এসে দরোয়ানকে বলে, “মিতার সঙ্গে দেখা করব।”
চোখ তুলে আকাশের দিকে ইঙ্গিত করে লোকটা, “এখনও সময় হয়নি। সন্ধেবেলা ঘুরে এসো।”
মৃদু হাসে রবি, “আরে না না। আমি এমনি দেখা করতে এসেছি। আমি ওর কাকা, অনেক দূরে থাকি।”
ব্যঙ্গে বেঁকে যায় দরোয়ানের ঠোঁট, “ওইসব বাবা-কাকা এখানে অনেকে খেলতে আসে। যাও, ফোটো তো, বললাম না, এখনও সময় হয়নি।”
পকেট থেকে কতকগুলো নোট বের করে লোকটার হাতে গুঁজে দেয় রবি, “মাইরি বলছি। আমি ওর কাকা। তুমি একবার খবর দিয়ে দ্যাখো-না। বলো, রুসোগঞ্জের কাকা এসেছে। যদি দেখা করতে না চায়, চলে যাব।”
ভেতরে ঢুকে গিয়ে ব্যাজার মুখে ফেরত আসে দরোয়ান, “যাও, ডাকছে।’’
কুঠির ভেতরে একটা ছোট ঘরে বসে মিতা। বেশভূষা বাইজিদের মতো। রবিকে দেখে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, “ওঃ কাকা। আমি ভেবেছিলাম, আর তোমার সঙ্গে কোনওদিন দেখাই হবে না।”
“কেন হবে না! আমি একটা কাজে আটকে পড়েছিলাম। কিন্তু তুমি দৌলতনগরে এসেছ শুনেই আমি ছুটতে ছুটতে চলে এসেছি। কেমন আছ তুমি?”
রবি ভেবেছিল, মিতা হয়তো কাঁদবে, অনুযোগ করবে, তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে বলবে। কিন্তু মিতা সেসব কিছুই করে না। শুধু ম্লান হেসে বলে, “ভালোই আছি, কাকা। এখানেই তো আমাকে থাকতে হবে, তাই মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। রুমাদির টুকটাক কাজ করছি, আদবকায়দা শিখছি।”
কেমন একটা যন্ত্রণার ছাপ লাগে রবির মুখে, “তুমি থাকতে না চাইলে—”
আবার সেই ম্লান হাসি হাসে মিতা, “কোথায় আর যাব, কাকা? সংসারে আপন বলতে কেউ নেই। কার কাছে যাব? এই হয়তো আমার ভবিতব্য! আর তা ছাড়া এরাই বা আমায় ছেড়ে দেবে কেন? শুনেছি, হুজরাইনের থেকে এরা আমাকে অনেক টাকায় কিনেছে।”
বুকের ভেতরটা মুচড়ে ওঠে রবির। মিতাকে আশ্বস্ত করার জন্যে সে কিছু বলতে যাচ্ছে, কুঠির দরোয়ান আবার ব্যাজার মুখে এসে হাজির হয়, “একজন তলোয়ারবাজ তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাইছে। বলছে, তুমি চেনো। হকিন্সাবাদে বৃষ্টির দিন দেখা হয়েছিল।”
ফের মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মিতার, “হকিন্সাবাদ? বৃষ্টি? ও হ্যাঁ হ্যাঁ, চিনি। নিয়ে এসো।”
“কে মিতা?’’ প্রশ্ন করে রবি।
“নাম জানি না, কাকা, হকিন্সাবাদে দেখা হয়েছিল।’’ একটু ইতস্তত করে বলে মিতা।
“চেনো, অথচ নাম জানো না?” বিস্ময়ের ছোঁয়া লাগে রবির কণ্ঠস্বরে।
চুপ করে থাকে মিতা।
একটু বাদেই ঘরে ঢোকে হিমু। রবি অবাক হয়ে দ্যাখে, তাকে দেখামাত্র মিতার মুখে একটা অদ্ভুত খুশির হাসি খেলে যায়।
মাথা ঝোঁকায় হিমু, “কিছু মনে করবেন না, আমার নাম হিমু। অনির্বাণ আখড়ার তলোয়ারবাজ। আপনার মনে আছে কি না জানি না, তবে হকিন্সাবাদে একদিন বৃষ্টির দিন আপনি আমাকে আশ্রয় দিয়েছিলেন।’’
“খুব মনে আছে।” হেসে বলে মিতা, “বসুন-না! বসুন।”
রবির দিকে চোখ যায় হিমুর, সে কিছুটা ইতস্তত করে।
“বসুন-না।’’ আবার বলে মিতা, “ইনি আমার কাকা। আমার বাবার মতো।”
রবিও যোগ দেয়, “হ্যাঁ সাহেব, বসুন-না।’’
আড়ষ্টতা কাটিয়ে একটা টুল টেনে নিয়ে বসে হিমু।
“মিতা, এঁর সঙ্গে তোমার হকিন্সাবাদে আলাপ হয়েছিল?’’ কে জানে কেন, রবির মুখে একটা চওড়া হাসি লটকানো।
“হ্যাঁ। একবারই দেখা হয়েছিল।” চোখ নামিয়ে বলে মিতা।
“ওঃ! খালি একবার!” রবির হাসিটা প্রায় তার কান ছোঁয়।
“আমি দৌলতনগর একটা কাজে এসেছিলাম। আপনাকে শোভাযাত্রায় দেখলাম, তাই ভাবলাম, একবার দেখা করি।” প্রসঙ্গ পালটানোর চেষ্টা করে হিমু, রবির চওড়া হাসিটা তার নজর এড়ায়নি।
“দৌলতনগর কাজে এসেছিলেন?” মিতার মুখ দেখে মনে হয়, সে-ও প্রসঙ্গ পালটাতে পেরে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে।
“হ্যাঁ। একজনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলাম।”
চেয়ার ছেড়ে ওঠার উপক্রম করে রবি, “আচ্ছা মিতা, তোমরা কথা বলো, আমি এবার উঠি।” তার মুখের হাসিটা ছোট হওয়ার কোনও লক্ষণ দেখা যায় না।
“না, না, কাকা, তুমি বসো।” কেমন যেন তাড়াহুড়ো করে বলে মিতা।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আপনি বসুন।” হিমুও যেন কেমন তাড়াহুড়ো করে মিতার কথার পুনরাবৃত্তি করে, “আমি বেশিক্ষণ থাকতে পারব না।”
উঠতে গিয়েও বসে পড়ে রবি। তবে তার কান-এঁটো-করা হাসিটা যথাস্থানেই লটকানো থাকে।
“আপনি কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, বলছিলেন। আপনি কি কয়েকদিন থাকবেন দৌলতনগরে?’’ আবার প্রশ্ন করে মিতা।
“ঠিক বলতে পারছি না।” একটু ইতস্তত করে উত্তর দেয় হিমু।
তার ঈষৎ দ্বিধা রবির চোখ এড়ায় না, “কিছু মনে করবেন না সাহেব, আপনি কি কারও সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন? না কাউকে খুঁজতে এসেছেন?”
“হ্যাঁ, ওই আর কী। খুঁজতে।” আবার ইতস্তত করে উত্তর দেয় হিমু।
কপাল কোঁচকায় রবি, “এত বড় শহরে কাউকে খুঁজে পাওয়া তো খুব মুশকিল। কোথায় থাকে, সে ব্যাপারে কিছু জানেন?”
ঘাড় নাড়ে হিমু, “না। সে কোথায় থাকে, জানাটা সহজ নয়।’’
“মাপ করবেন সাহেব, তবে যাকে খুঁজছেন, সে কি তলোয়ারবাজ? নাকি অন্য কেউ?” আবার প্রশ্ন করে রবি।
আবার ঘাড় নাড়ে হিমু, “সেটা এই মুহূর্তে আপনাদের ঠিক বুঝিয়ে বলা মুশকিল।”
কুঠির একজন কর্মচারী ঘরে এসে ঢোকে। মিতাকে উদ্দেশ করে বলে, “রুমাদি বলে পাঠাল, সন্ধেবেলা পার্টি হাউসে পার্টি আছে, তৈরি থাকতে।”
“কওমি পলটনের পার্টি তো?” উত্তর দেয় মিতা।
“হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওই পিলখানার বজ্জাতগুলো।” মুখ বেঁকিয়ে উত্তর দিয়ে বিদায় নেয় লোকটা।
চমকে ওঠে হিমু, ‘‘আপনি এই কওমি পলটনের লোকেদের চেনেন?’’ মিতার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে সে।
“হ্যাঁ, চিনি। ওদের একজন বড় মাপের নেতা আছে, অতীন, সে নীরাদির কাছে আসে।”
কপাল কুঁচকোয় রবি, “আপনি যাকে খুঁজছেন, সে কি এই কওমি পলটনের কেউ? বা কওমি পলটনের সঙ্গে কোনওভাবে জড়িত?’’
উত্তর দেয় না হিমু। কপাল কুঁচকে কী যেন চিন্তা করে।
“আমাকে বিশ্বাস করে খুলে বলতে পারেন।’’ অনুরোধের স্বরে বলে মিতা, “যদি কোনওভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি।”
মিতার অনুরোধে যোগ দেয় রবিও, “হ্যাঁ, মিতা আর আমি যতটা পারি আপনাকে সাহায্য করার চেষ্টা করব। আমাদের আপনার বন্ধু বলেই জানবেন। আপনি নিঃসংকোচে আমাদের সব বলতে পারেন।”
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা লম্বা নিশ্বাস নেয় হিমু। ‘‘আমি যাকে খুঁজছি, তার নাম রাজেন। কওমি পলটনের হয়ে খুনখারাপি করে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে পিলখানা চষে বেড়িয়েও আমি তার খোঁজ পাইনি।”
“আচ্ছা! রাজেন!” কী চিন্তা করে মিতা।
“হ্যাঁ। ওর আসল নাম রজত। বাড়ি হোমিগঞ্জে।”
“রজত! হোমিগঞ্জ!” কেমন চিন্তিত লাগে রবিকেও।
মাথা ঝাঁকায় মিতা, “না, মনে পড়ছে না। কিন্তু কওমি পলটনের কেউ হলে সন্ধেবেলা পার্টি হাউসে হয়তো আসবে। আপনি এই কুঠির কাছাকাছি কোথাও থাকবেন, আমি পার্টি হাউসে খোঁজ নিয়ে জানাব, এসেছে কি না।”
কুঠির কর্মচারী এসে আবার মিতাকে তাড়া দেয়, “রুমাদি তৈরি হতে বলল।”
উঠে পড়ে রবি, “চলুন সাহেব, আমরা বাইরে যাই।”
রাস্তায় বেরিয়েই আবার দাঁড়িয়ে পড়ে রবি, “ওঃ! দেখেছেন, মিতাকে একটা দরকারি কথা বলতে ভুলে গেলাম।”
রাস্তার ওপারে পানশালাটা হিমুকে দেখায় রবি, “সাহেব, আপনি ওখানে অপেক্ষা করুন, আমি মিতাকে একটা কথা বলেই চট করে চলে আসছি।”
কুঠির দরোয়ান রবিকে দেখে বিরক্ত হয়, “এই তো একটু আগেই গেলে। আবার কী চাই?”
মুচকি হাসে রবি, “কুঠির মালকিনের সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
নাক দিয়ে একটা ব্যঙ্গের শব্দ করে দরোয়ান, “নতুন লোক নাকি তুমি? আকাশ থেকে পড়েছ? জানো না, কুঠির মালকিন কারও সঙ্গে দেখা করে না।”
আবার মুচকি হেসে বাঁ হাতের তর্জনী আর মধ্যমা ফাঁক করে দরোয়ানের দিকে বাড়িয়ে ধরে রবি, “আমার সঙ্গে দেখা করবে।”
ঝুঁকে দুটো আঙুলের মাঝের চামড়াটা দ্যাখে দরোয়ান। ঝাপসা নীল কালিতে একটা দু-টুকরো হয়ে-যাওয়া তালার ছবি উলকি করা।
মাথা দোলায় রবি, ‘সিন্ডিকেট। যাও, খবর দাও।”
হতভম্বের মতো রবির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ভেতরে দৌড়োয় দরোয়ান।
একটু পরে লাক্ষার নকশা-করা আসবাব আর ফুলের তোড়ায় সাজানো কুঠির মালকিনের ঘরে পা রাখে রবি।
মালকিনের নাম মোহিনী। রূপমঞ্জিলে মালকিনের নাম থেকেই কুঠির নাম হয়। তবে মোহিনীর নাম হয়তো এককালে মোহন ছিল, চড়া প্রসাধনের নীচ থেকে উঁকি-মারা গালের সবুজাভ আভায়, মুগুরের মতো লোমশ দুই হাতে আর কর্কশ গলার স্বরে তার কিছুটা আভাস রয়ে গেছে।
মোহিনীর জানলাহীন ঘরে বাসি খাবারের গন্ধ, টেবিলে একটা প্লেটে জড়ো করে রাখা একগাদা হাড়গোড়। খড়কে দিয়ে দাঁত খুঁটতে খুঁটতে মোহিনী বলে, “যা বলার, পাঁচ মিনিটে বলে ফুটে যাও। ব্যাবসার সময়, বেশি হেজিয়ো না।”
“তোমার যে নতুন মেয়েটা, মিতা, তাকে ছাড়াতে চাই।”
চুপ করে কিছুক্ষণ রবির দিকে তাকিয়ে থাকে মোহিনী, তারপর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে, “খোয়াব দেখছ নাকি বুড়ো? সিন্ডিকেট বলে ঘরে ঢুকতে দিয়েছি, নইলে লাথ মেরে তাড়িয়ে দিতাম। তা-ই বলে একেবারে মেয়েছেলে কেনার আবদার? বুড়ো বয়সে খুব রস দেখছি যে! ফোটো এখান থেকে।”
মোহিনীর চোখে চোখ রেখে রবি বলে, “তুমি সিন্ডিকেটের নিয়ম জানো। জলশকুন জলশকুনের মাংস খায় না। আমি মেয়েটার কাকা। যার জিম্মায় রেখেছিলাম, সে তোমাকে বেচে দিয়েছে।”
আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে মোহিনী, “এ লাইনে বাবা-কাকা অনেক দেখা হয়ে গেছে, বুড়ো। সত্যি কাকা, না মেয়েছেলে কিনে কাকা-কাকা খেলতে চাও? ওঃ! শালা রস একেবারে গড়িয়ে পড়ছে যে! যাবে, না পেছনে ক্যাঁত করে একটা লাথি মারব?’’
পকেট থেকে একটা ফোটোক্রিস্টাল বের করে টেবিলের ওপর ছুড়ে দেয় রবি, “দেখে নাও।’’
কপাল কুঁচকে কয়েক সেকেন্ড রবির দিকে তাকিয়ে থাকে মোহিনী, তারপর ক্রিস্টালটা একটা লন্ঠনে পুরে দেয়।
ঘরের দেওয়ালে আলোর ছবি পড়ে। হকিন্সাবাদে শুভাকে নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় পাওয়ার খবর, পুলিশ কমিশনারের বক্তব্য, রবির একটা আন্দাজি ছবি-আঁকা ইনামের পোস্টার।
পোস্টারের ছবিটার দিকে তাকিয়ে রবির মুখের দিকে তাকায় মোহিনী, তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে একটা শিসের শব্দ, “উরি শ্লা! তুমি বুড়ো তো দেখছি একেবারে রসের কলশি।” আওয়াজ করে হাওয়ায় একটা চুমু খায় মোহিনী, “আজ রাতে থাকো-না বুড়ো আমার কাছে! হাওয়ায় আগুন লাগিয়ে দেব।”
একটা চওড়া হাসি হাসে রবি, “দুর হারামি! কাজের কথা বল!”
বুকে হাত রেখে ঠোঁট ফোলায় মোহিনী, “বুক ভেঙে দিলে গো বুড়ো তুমি আমার।’’
ভুরু কপালে তুলে রবি প্রশ্ন করে, “কত দিয়ে কিনেছিলে?”
ড্রয়ার থেকে একটা খাতা বের করে রবির সামনে একটা পাতা মেলে ধরে মোহিনী, “কেনা দাম। তবে আরও খরচা হয়ে গেছে। দুনো লাগবে।”
মাথা নাড়ায় রবি, “না, দেড়া। অত খরচা তোমার হয়নি। জলশকুন হয়ে জলশকুনের মাংস খেতে চেয়ো না।”
জামার ভেতর থেকে একটা বটুয়া বের করে রবি। বটুয়া থেকে আঙুলের আকারের কয়েকটা সোনার কাঠি বের করে গুনে গুনে নামিয়ে রাখে টেবিলের ওপর।
“দেড়ার একটু বেশি আছে। আজকের রেট।”
সোনার টুকরোগুলো টেবিল থেকে কুড়িয়ে নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে মোহিনী, “লোকসান হয়ে গেল গো বুড়ো।’’
“সে তোমার ব্যাপার। ব্যাবসা করার আগে তোমার যাচাই করা উচিত ছিল।”
ধূর্ত চোখে বটুয়াটার দিকে তাকায় মোহিনী, “অবশ্য তোমার বটুয়াটা কেড়ে নিয়ে মেয়েটাকে রেখে দিলে আমার লাভ ভালোই থাকে।”
“তা থাকে,’’ নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলে রবি, “কিন্তু তারপর থেকে যদি রোজ তোমার মক্কেলেদের বাড়িতে চুরি হয় তাহলে তোমার ব্যাবসা থাকে না।”
আবার ঠোঁট ফোলায় মোহিনী, “তুমি বারবার কেন এমন করে আমার বুক ভেঙে দাও গো বুড়ো।”
“তাহলে পাক্কা?’’ প্রশ্ন করে রবি।
ড্রয়ার থেকে একটা নম্বর-লেখা কাঠের চাকতি বের করে রবির দিকে ছুড়ে দেয়, “এই নাও। তবে এখন না। পার্টি হাউসে মেহফিল আছে। তার পর নিয়ে যেয়ো।”
সন্ধে নেমেছে। অন্ধকারে সেজে উঠছে রূপমঞ্জিল। রাস্তায়, বারান্দায়, বাড়ির ছাদে জলে নানা রঙের কাগজের লন্ঠন। রাস্তায় সুসজ্জিত নারী-পুরুষের ভিড়, হাওয়ায় ভাসে হাসির আওয়াজ আর আতরের সুগন্ধ, পানশালায় উপচে পড়ে লোক।
একটা পানশালা থেকে একটু দূরে একটা গাছের নীচে অন্ধকারে বসে অপেক্ষা করে রবি আর হিমু। রবির পায়ের কাছে দুটো গ্লাস আর একটা মদের বোতল রাখা, যেন দুজনে মিলে নেশা করতে বসেছে।
রাস্তার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে রবি, “যত শুনছি, সাহেব, তত আশ্চর্য হচ্ছি। ওফ, এ তো ভয়ানক মানুষ! একেবারে যেন সাক্ষাৎ নরকের দানব!”
“তা একরকম বলতে পারেন। এ যেখানে যায়, সেখানটাই নরক হয়ে ওঠে।” উত্তর দেয় হিমু।
“আমি জীবনে খুনে, বদমাইশ কম দেখিনি, সাহেব। কিন্তু এ তাদের সবাইকে ছাপিয়ে যায়।”
উত্তর না দিয়ে হিমু উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে রাস্তার শেষ প্রান্তের দিকে তাকায়। যেখানে পার্টি হাউসের রোশনাই ঝলমল করছে। এক ঘণ্টা ধরে এই করে আসছে হিমু— ঘনঘন পার্টি হাউসের দিকে তাকানো।
সহানুভূতির স্বরে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে রবি, “চিন্তা করবেন না সাহেব। মিতার স্বভাবটা নরম হলে কী হবে, মাথায় খুব বুদ্ধি। দেখবেন না, ও এমন করে খবর বের করে নেবে, যে কেউ টেরই পাবে না।’’
হিমুর মুখ দেখে মনে হল না, সে রবির কথায় খুব একটা স্বস্তি পেয়েছে। চুপ করে আবার পার্টি হাউসের দিকে তাকায় সে।
সেই মুহূর্তে পার্টি হাউসের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসে বিকেলে দেখা মোহিনী কুঠির সেই কর্মচারী, “আরে এসো, এসো,’’ একগাল হেসে বলে রবি, “মিতা কিছু খবর পাঠিয়েছে বুঝি?”
“হ্যাঁ।’’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে লোকটা।
“বেশ, বেশ। বোসো। এক গ্লাস খাবে নাকি আমদের সঙ্গে?” গ্লাসে মদ ঢালে রবি।
“না, না,’’ ব্যস্ত হয় লোকটা— “আমার তাড়া আছে। পান থেকে চুন খসলেই পিলখানার বদমাশগুলো হুজ্জত করবে।’’
“কী বলল মিতা?’’ উদ্গ্রীব কণ্ঠে প্রশ্ন করে হিমু।
“মিতাদি বলে পাঠাল যে পার্টিতে রাজেন বলে কেউ একজন এসেছে।”
“আচ্ছা, আচ্ছা!’’ একগাল হেসে উঠে দাঁড়ায় রবি, “অনেক ধন্যবাদ ভাই তোমাকে এই খবরটা দেওয়ার জন্যে। এটা রাখো।”
লোকটার হাতে কয়েকটা টাকার নোট গুঁজে দেয় রবি, “পার্টি কখন শেষ হবে, বলতে পারো?”
“এই তো সবে শুরু হল। শেষ হতে হতে রাত দশটা তো হবেই।”
“দশটা?’’
“হ্যাঁ। তার পরে তো আগে নয়।” রবির দেওয়া টাকাগুলো পকেটে ঢুকিয়ে বিদায় নেয় লোকটা।
“কী করবেন এখন সাহেব?’’ হিমুকে প্রশ্ন করে রবি, “আপনি যাকে খুঁজছিলেন, সে তো আছে ওখানে।”
চোয়াল শক্ত হয়ে আসে হিমুর, “আজ রাতের মধ্যেই মারব ওকে।”
“আজ রাতের মধ্যেই?” বিস্ময়ের ছোঁয়া রবির কণ্ঠে।
“হ্যাঁ। এই সুযোগ হাতছাড়া হতে দেওয়া উচিত হবে না। পার্টি হাউসের সামনে অপেক্ষা করব। পার্টি থেকে বেরোলে ওর পিছু নেব, তারপর একটা নির্জন জায়গা দেখে হামলা করব।”
পার্টি হাউসে হুল্লোড় চলে। ঘরে আলো, ছাদে টাঙানো মহার্ঘ রঙিন ক্রিস্টালের ঝাড়বাতি আর ঘরের আনাচকানাচে বসানো সুগন্ধি মোমবাতি।
লম্বা হলঘরের একদিকে একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মে বসে থাকে অতীন, তার দু-পাশে বিপুল আর সোমনাথ। কওমি পলটনের তিন নেতা। তাদের পরনে দামি পরিচ্ছদ, চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো, মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ। বুঝতে অসুবিধে হয় না যে তারা হকিন্সাবাদের প্রতিকূলতার দিনগুলো পেছনে ফেলে এসেছে।
ঘরের উলটোদিকে আর-একটা উঁচু প্ল্যাটফর্মে বসে সংগীত পরিবেশন করে কুঠির বাইজিরা, তাদের রূপের সঙ্গে পাল্লা দেয় তাদের সুরেলা কণ্ঠ আর বাদ্যযন্ত্রের জাদু।
ঘরের মাঝখানে পাতা ফরাশের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে থাকে কওমি পলটনের সদস্যরা, তাদের মাঝে ঘুরে ঘুরে খাদ্য-পানীয় পরিবেশন করে সদ্য কুঠিতে যোগ-দেওয়া অল্পবয়সি মেয়েরা। তাদের সঙ্গে সঙ্গে মিতাও অতিথিদের গ্লাসে মদ ঢালে।
মূল দলটা থেকে একটু দূরে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে থাকে রজত। তার সামনে দামি মদ নয়, একটা ঠররার বোতল। এই কয়েক মাসে তার স্বাস্থ্য ভেঙে গেছে। চোখ দুটো কোটরাগত, চোয়ালের হাড় ঠেলে বেরিয়ে এসেছে। কারও সঙ্গে কথা না বলে সে আপন মনে ঠররার গ্লাসে চুমুক দেয়।
অতীনের হঠাৎ চোখ যায় মিতার দিকে, “এই মেয়েটা! এদিকে এসো।’’
ফুলেল মদের বোতল হাতে এগিয়ে আসে মিতা।
তাকে দু-চোখ দিয়ে মাপে অতীন, “মাঝেমধ্যে দেখি তোমাকে এখানে। কী নাম তোমার?’’
“মিতা, হুজুর।’’ মদ ঢালে মিতা অতীনের গ্লাসে।
“কত বয়স তোমার?’’
“আপনিই বলুন হুজুর।” মাথা নামিয়ে উত্তর দেয় মিতা।
“আঠেরো-উনিশ হবে, না?” গ্লাসে চুমুক দেয় অতীন।
“প্রায়, ওইরকম হবে হুজুর।” অল্প হেসে আবার অতীনের গ্লাসে মদ ঢালে মিতা।
“বাড়ি কোথায়?’’
“পশ্চিমে হুজুর, গোডেলগাঁওয়ে।”
“গোডেলগাঁও! ওঃ, অত দূর থেকে এখানে চলে এসেছ?’’ গ্লাসে চুমুক দেয় অতীন, “তুমি মোহিনী কুঠিতে কাজ করো?’’
“হ্যাঁ হুজুর, রুমাদির কাছে কাজ শিখছি।’’
“বাইজি হওয়ার জন্যে?” কেমন একটা অদ্ভুত হাসি খেলা করে অতীনের মুখে, “তাহলে তো তোমাকে সাহায্য করতেই হয়।”
চুপ করে থাকে মিতা।
“তুমি হয়তো আমাকে চেনো না। কিন্তু আমি কওমি পলটনের নেতা।” অহংকারে ঘাড় পেছনে হেলে যায় অতীনের, “রুমাকে বলবে, আমি তোমাকে নারী হয়ে উঠতে সাহায্য করব।” মুখের হাসিটা কেমন কদর্য হয়ে ওঠে অতীনের, “বুঝতে পারলে, না কী?’’
মুখ শুকিয়ে যায় মিতার, ঢোঁক গিলে মাথা নিচু করে নেয় সে।
“যাও।’’ হাত নেড়ে মিতাকে বিদায় দেয় অতীন। মদের বোতল তুলে নিয়ে অন্যদিকে সরে যায় মিতা।
পাশে বসা বিপুলের দিকে ফেরে অতীন, “আমি একটু আসছি। রাজেনের সঙ্গে কথা বলার আছে।”
বিপুলের চোয়াল কেমন শক্ত হয়ে আসে, “অতীন, তোমায় একটা কথা বলার ছিল। এই রাজেন আমাদের সঙ্গে পিলখানায় থাকে না। বাইরে অন্য কোথাও থাকে। দলের ছেলেদের মধ্যে এই নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে।”
বিপুলের কথাকে পাত্তা দেয় না অতীন, “রাজেনের ব্যাপার একটু আলাদা। ও আমাদের দলের হলেও, কিছুটা স্বতন্ত্র। ও অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে না। ওকে আমার ওপরেই ছেড়ে দাও।”
উঠে চলে যায় অতীন, নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বিপুল আর সোমনাথ।
সুবেশা নর-নারীর ভিড়ের মধ্যে দিয়ে রূপমঞ্জিলের আলোয় সাজানো পথ দিয়ে হাঁটে রবি আর হিমু। তাদের হাতে এখনও অনেক সময় আছে, রাত দশটার আগে পার্টি শেষ হবে না।
“দেখুন, একটু বাদেই আপনি লড়াইতে আটকে পড়বেন, আমি হয়তো আর বলার সুযোগ পাব না,’’ কিছুটা ইতস্তত করে বলে রবি, “মিতার ব্যাপারে আপনাকে কয়েকটা কথা বলার ছিল।”
“হ্যাঁ, বলুন।”
“মিতার মা-বাপ কেউ নেই। ছিল এক বুড়ো দাদু, সে-ও খুন হয়ে যায়।”
“সে কী!’’
“হ্যাঁ। কালভৈরব পাসে।”
“কালভৈরব পাসে!’’ বিস্মিত কণ্ঠে বলে হিমু।
“হ্যাঁ। সেসব কথা পরে আপনাকে একদিন বিশদে বলব। তবে আপনাকে একটা অন্য কথা বলার ছিল।”
“হ্যাঁ, বলুন।’’ দাঁড়িয়ে পড়ে হিমু।
আবার ইতস্তত করে রবি, “কীভাবে আপনাকে কথাটা বলি, ঠিক বুঝতে পারছি না। মিতা মেয়েটা খুব ভালো। কিন্তু ওর তিন কুলে কেউ নেই, পুরো একা। কোথায় কখন আবার কী বিপদে পড়ে, আপনার কাজ মিটে গেলে ওকে একটু দেখবেন।”
একটা ম্লান হাসি হাসে হিমু, “আজ রাতের পর যদি বেঁচে থাকি, তাহলে নিশ্চয়ই দেখব।”
“ও কথা বলবেন না, ও কথা বলবেন না,” ব্যস্ত হয়ে বলে ওঠে রবি, “আপনি অবশ্যই জিতবেন।”
মাথা নাড়ে হিমু, “এই কওমি পলটনের লোকজন তলোয়ারবাজির নিয়ম কত মানবে, আমার সন্দেহ আছে। রজতকে চ্যালেঞ্জ করলে এরা যে সবাই মিলে আমাকে আক্রমণ করবে না, সে কথা কেউ বলতে পারে না। সবার সঙ্গে একা আমি হয়তো পেরে উঠব না।”
“আরে, চিন্তা করছেন কেন, রবি আপনার সঙ্গে আছে। এই দেখুন।’’ কাঁধে ঝোলানো একটা ব্যাগের মুখ খুলে ধরে রবি।
ঝুঁকে দ্যাখে হিমু। ব্যাগের ভেতর শোয়ানো সারি সারি সলতে-পরানো মাটির বোতল।
“রাস্তায়-ঘাটে মাল ফিরি করতে ঘুরে বেড়াতে হয় কি না, তাই কাছে রাখি। কোথায় কখন চোর-ডাকাতের খপ্পরে পড়ি,’’ লাজুক হাসি হাসে রবি, “আমি তো আর আপনার মতো তলোয়ার চালাতে জানি না।”
পার্টি হাউসের গম্বুজের ঘরে ওপরদিকে নানা গোপন খাঁজে নীল আলো জ্বলে, পায়ের নীচে টের পাওয়া যায় যান্ত্রিক গুঞ্জন। পার্টির শেষ অঙ্কে এখানে যেসব অভ্যাগত তাদের সঙ্গিনীদের নিয়ে আসবে, তাদের জন্যে বিশাল ঘরটার ভেতর চিক দিয়ে ঘেরা এক সারি ছোট ছোট কামরা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। ভেতরে মেঝেতে পেতে দেওয়া হয়েছে বিছানা।
এখানে লোক আসতে অবশ্য এখনও অনেক দেরি আছে। গম্বুজের ঘর আপাতত ফাঁকা। কেবল একটা ছাউনির ভেতরে বসে রজত আর অতীন, তাদের সামনে ঠররার বোতল।
হাতে ধরা ঠররার গ্লাসের দিকে তাকিয়ে থাকে রজত, “সোমনাথকে মারতে হবে?”
“হ্যাঁ!” উত্তর দেয় অতীন, “ওই চাষার বাচ্চা আমার সব কাজে আজকাল বাগড়া দেয়। মুখে মুখে তর্ক করে। ওকে নিয়ে দল চালানো মুশকিল হয়ে পড়ছে। সোমনাথ না থাকলে বিপুল চুপচাপ আমার কথা মেনে নেবে।”
রজতের দিকে ঝুঁকে পড়ে অতীন, “যত তাড়াতাড়ি পারো। পারলে আজকালের মধ্যেই।”
নীরবে ঠররার গ্লাসে চুমুক দেয় রজত।
একটা হাসি খ্যালে অতীনের মুখে, “তুমি আমার জন্যে আজ পর্যন্ত যা করেছ, তার ঋণ শোধ করা সম্ভব নয়। কিন্তু তা-ও, তুমি আমার এই কাজটা করে দিলে আমি নিজের হাতে তোমাকে একটা উপহার দেব।”
জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায় রজত, কিন্তু কোনও প্রশ্ন করে না।
হাসিটা চওড়া হয় অতীনের, “তোমাকে আমি নিজের হাতে হিমুর মাথাটা উপহার দেব।”
“হিমু?’’ চমকে ওঠে রজত।
“হ্যাঁ। বিজনের ভাই। যাকে তুমি মেরেছিলে। হারামির বাচ্চাটা কয়েকদিন হল পিলখানায় তোমার খোঁজে চক্কর লাগাচ্ছে। কাজটা হয়ে গেলেই দলের ছেলেদের বলব ওর মাথাটা নামিয়ে দিতে।’’
উঠে পড়ে অতীন, “আমি বেরিয়ে যাচ্ছি। তুমি সোমনাথের ওপর নজর রেখো। সুযোগ পেলে হাতছাড়া কোরো না।”
চিক ঠেলে বেরিয়ে আসে অতীন, এগিয়ে যায় গম্বুজের দরজার দিকে।
কয়েক পা গিয়ে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে অতীন। অন্য আর-একটা চিকের কামরার ভেতর থেকে তার কানে একটা কিছু আওয়াজ এসেছে।
বিদ্যুৎবেগে পেছনে ফের অতীন, আর দৌড়ে গিয়ে কামরাটার ভেতর থেকে হিড়হিড় করে টেনে বের করে আনে মিতাকে।
“মিতা না, তোর নাম? আমাদের কথা শুনছিলি?”
“না, না,’’ প্রতিবাদ করে মিতা, “শরীর খারাপ করছিল, তাই বিশ্রাম নিচ্ছিলাম, হুজুর। আপনাদের কোনও কথা শুনিনি।”
টানতে টানতে মিতাকে নিয়ে আসে অতীন। চোখ দিয়ে জল পড়ে মিতার, “যেতে দিন হুজুর। পার্টিতে কাজ আছে।”
“চুপ। কোত্থাও যাবি না।’’ ধমক দেয় অতীন।
চিকের পেছন থেকে রজতের গলা ভেসে আসে আসে, “কী করছ অতীন?”
“কী করছি মানে?’’ বিরক্তির সুরে উত্তর দেয় অতীন, “এ মেয়েটা আড়ি পাতছিল। একে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। কার হয়ে কাজ করে, আর কী শুনেছে!”
“জিজ্ঞাসাবাদ আবার কী করবে,’’ ভাবলেশহীন গলায় বলে রজত, “গলায় তলোয়ারটা চালিয়ে দাও, কাজ মিটে যাবে।”
এমন নিরুত্তাপ কণ্ঠে মানুষ মারার নির্দেশ শুনে অতীনের মতো পোড়খাওয়া তলোয়ারবাজও যেন চমকে ওঠে। ইতস্তত করে বলে, “এইসব চুনোপুঁটির জন্যে অত ঝামেলা করে লাভ নেই।”
“ঠিক আছে। তাহলে আমার কাছে রেখে দিয়ে নিজের কাজে যাও।” আবার সেই ভাবলেশহীন গলায় বলে রজত, “আমায় যা কাজ দিয়েছ, আজকের মধ্যেই শেষ করার চেষ্টা করব।”
“ঠিক আছে তাহলে।’’ মিতাকে রজতের চিকের কামরায় ঢুকিয়ে দিয়ে অতীন বিদায় নেয়।
পার্টি হাউসের সামনের হলঘরে ফুর্তির তুফান বইছে। মাটিতে গড়াগড়ি যাচ্ছে মানুষ আর মদের বোতল, বেসুরো গানের সঙ্গে মিশছে হাসির হররা, মোমবাতির সুগন্ধে মিশছে নানান মদের ঝাঁজালো গন্ধ।
হলঘরের একদিকে বসে চোয়াল শক্ত করে সেদিকে তাকায় সোমনাথ, “এরা পলটনের ফৌজি, না রান্ডিখানার দালাল? এদের নিয়ে আমাদের একদিন হকিন্সাবাদ কুচ11 করতে হবে? লোকে তো আমাদের গায়ে থুতু দেবে।”
মাথা নেড়ে সায় দেয় বিপুল, “হ্যাঁ। সব অতীনের দোষ। যাকে পেরেছে, পলটনে ঢুকিয়েছে।’’
“অতীনের মাথায় আজকাল মেয়েছেলে ছাড়া কিছু নেই। ওর হাবভাবে মনে হয় যেন দৌলতনগরে ও ফুর্তি করতে এসেছে। লড়াইয়ের তৈয়ারি করতে নয়।” সোমনাথের গলায় বিতৃষ্ণা ঝরে পড়ে।
“হ্যাঁ, দেখলে না, বাচ্চা মেয়েটাকে কী বলল? নির্লজ্জ মাগিবাজ একটা।”
জ্বলন্ত দৃষ্টিতে বিপুলের দিকে তাকায় সোমনাথ, “আর বাড়তে দেওয়া যায় না। অতীনকে আজকের মধ্যেই সরিয়ে দিতে হবে।’’
“এখানে?’’
একটা মদের বোতল গড়িয়ে আসে সোমনাথের কাছে। ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকায় সোমনাথ, “না, এখানে না। এখানে ঝামেলা হতে পারে, অনেক লোক আছে। একটু বাদে ও মোহিনী কুঠিতে যাবে, নিজের বাঁধা মেয়েছেলের কাছে। সেখানে।”
কপালে ভ্রূ তোলে বিপুল, “তুমি আর আমি?’’
“হ্যাঁ।” উত্তর দেয় সোমনাথ, “আর আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ো।”
“আর রাজেন?’’
“অতীনকে খতম করে ফেরার পর আমাদের ছেলেদের কোনও একটা ছুতোয় ওর ওপর লেলিয়ে দিলেই হবে।” নিচু স্বরে উত্তর দেয় সোমনাথ।
বাইরের দরজার দিকে চোখ তুলে ইঙ্গিত করে বিপুল, “অতীন বেরিয়ে যাচ্ছে!”
“যেতে দাও। ওর দিকে তাকিয়ো না। আধ ঘণ্টা বাদে আমরা বেরোব, যাতে কারও সন্দেহ না হয়।”
“ঠিক আছে। ততক্ষণে আমি আরও দুজনকে বলে রাখছি।”
পার্টি হাউসের বাইরে দাঁড়িয়ে-থাকা রবি কপাল কুঁচকোয়, “সাহেব, কিছু একটা গণ্ডগোল হচ্ছে।”
“কেন?’’ হাউসের জানলা দিয়ে ভেসে-আসা আলো আর হুল্লোড়ের শব্দের দিকে তাকিয়ে বলে হিমু।
“একজন বেরিয়ে খুব সম্ভব মোহিনী কুঠির দিকে গেল। তার আধ ঘণ্টা বাদে আরও চারজন বেরিয়ে হন্তদন্ত হয়ে তার পেছনে পেছনে গেল। আমার খুব একটা ভালো ঠেকছে না।”
“তাহলে কী করব আমরা?”
“না! আমাদের কিছু করার নেই। আমাদের দরকার তো রজতকে। আমাদের এখানেই অপেক্ষা করতে হবে।”
চিকের কামরার ভেতরে গ্লাসে ঠররা ঢালে রজত। সামনে বসা মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বলে, “চুপচাপ বসে থাকো। যদি আওয়াজ করো কিংবা পালাতে চেষ্টা করো, গলায় তলোয়ার চালিয়ে দেব।”
“না হুজুর, আওয়াজ করব না।’’ এককোণে জড়সড়ো হয়ে বসে থাকে মিতা।
ঠররার গ্লাসটা এক চুমুকে খালি করে দেয় রজত। আজকাল ঠররা ছাড়া সে এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। নেশা কেটে গেলেই তার মনের মধ্যে অনেক মুখ ভিড় করে আসে। বিজন, রিমা, চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা, আরও অনেক নাম-না-জানা মুখ। আগে মানুষ মারলে তার ভেতরের বুভুক্ষাটা যেমন তৃপ্তি পেত, আজকাল সেটাও যেন সে অনুভব করতে পারে না। মনে হয়, তার ভেতরটা কেমন অসাড় হয়ে গেছে।
ভয়ার্ত মুখে বসে-থাকা মেয়েটাকে কেমন আবছা লাগে রজতের। শুধু মেয়েটা নয়, আজকাল সবাইকে কেমন আবছা লাগে রজতের। যেন সব ছায়া দিয়ে তৈরি।
একটা আওয়াজ হয়, যেন কে যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে। মিতার দিকে তাকিয়ে ধমক দেয় রজত, “বললাম না কোনও আওয়াজ না করতে।”
“আমি আওয়াজ করিনি, হুজুর।’’ ভয়ে ভয়ে বলে মিতা, “তবে লোকে বলে, এই গম্বুজের নীচে নানা আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়।”
“লোকে বলে।” ভাবলেশহীন গলায় বলে রজত।
“হ্যাঁ, হুজুর। নানা আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়, নানা দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়।’’
“দৃশ্য।” গলায় ঠররা ঢেলে দিয়ে চোখ বোজে রজত, “হ্যাঁ, আমিও একটা দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। উত্তর-পশ্চিমের উঁচু পাহাড়গুলো যেন মিশে গেছে মেঘের মধ্যে। পাহাড়ি হাওয়ার শব্দ হচ্ছে। উপত্যকা থেকে মাঝেমধ্যে ভেসে আসছে কাইজারী মহামৃগের ডাক। কচি সবুজ পাতাগুলো কাঁপতে কাঁপতে ছড়িয়ে দিচ্ছে কলকে ফুলের বুনো গন্ধ।”
“আমিও এইরকম একটা দৃশ্য দেখেছিলাম।” মিতা বলে।
“তুমি দেখেছিলে?’’ চোখ খোলে রজত, “কোথায়?”
“কালভৈরব পাসে।”
“কালভৈরব পাস!” বিস্মিত কণ্ঠে বলে রজত।
“হ্যাঁ, হুজুর! আপনি চেনেন জায়গাটা?”
“হ্যাঁ, চিনি! ভালো করে চিনি।” গলায় ঠররা ঢালে রজত, “তুমি চেনো?”
“হ্যাঁ, হুজুর। একবার গিয়েছিলাম।”
“আশ্চর্য! দৌলতনগরের মেয়ে কালভৈরব পাস যাবে কেন?” তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে মিতার দিকে তাকায় রজত।
“আমরা গোডেলগাঁও থেকে আসছিলাম, হুজুর। আমি আর আমার দাদু। বছর দুয়েক আগে।’’ মাটির দিকে চোখ নামিয়ে বলে মিতা।
রজতের দু-চোখ বিস্ফারিত হয়ে ওঠে। বেড়ে যায় তার শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি।
মিতা লক্ষ করে না, তার মুখ নিচু করা।
“আমি জল আনতে গিয়েছিলাম, তার মধ্যে কেউ এসে দাদুর ওপর তলোয়ার চালিয়ে দেয়।” ফুঁপিয়ে ওঠে মিতা।
ছিটকে লাফিয়ে ওঠে রজত। সে কোথাও দূর থেকে শুনতে পায় একটা বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর, ‘হে বাবা কালভৈরব! হে বাবা কালভৈরব!’
ভয়ার্ত চোখে চারপাশে তাকায় রজত। ওই যে, ওই চিকের গায়ে ও কীসের ছায়া? কোনও বৃদ্ধ হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করছে?
চিৎকার করে তলোয়ার টেনে নেয় রজত, চিকটাকে কোপাতে শুরু করে পাগলের মতো। আর্তনাদ করে দূরে সরে যায় মিতা।
আবার একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পায় রজত। অনুনয়ের সুরে কে বলছে, ‘আমাকে এখানেই মেরে ফ্যালো রজত।’ কে ও? কার ছায়া ওই চিকের গায়ে, ওই ছায়াটাই কি বলছে, ‘তুমি না থাকলে আমার জীবনটা এমন নরক হয়ে উঠত না?’
পাগলের মতো আবার একটা চিক কোপায় রজত। দৌড়ে গম্বুজ ঘর থেকে পালিয়ে যায় মিতা।
আবার কি আর-একটা চিকের ওপর ছায়া পড়েছে? ওই ছায়াই কি তলোয়ার হাতে বলছে, ‘ভেবেছিস, বিজনের মৃত্যুর বদলা না নিয়ে তোকে ছেড়ে দেব?’
গম্বুজ ঘরের সব ক-টা চিক কুপিয়ে মাটিতে ফেলে দেয় রজত। কিন্তু তা-ও তো ছায়াগুলো তার চারপাশে ভিড় করে আসে। তা-ও তো কণ্ঠস্বরগুলো থামে না।
‘নালায়েক, নামর্দ!’
‘বুড়ো মানুষ হাঁটতে হাঁটতে হাঁপিয়ে পড়েছি।’
‘মানুষ মারা ছাড়া তুমি জানোই বা কী?’
‘মৃত্যু তোর প্রাপ্য নয়?’
দু-হাতে নিজের চারপাশে এলোপাথাড়ি তলোয়ার চালায় রজত। তার ডান হাঁটু ভাঁজ করা, ডান ঊরু মাটির সঙ্গে সমান্তরাল। বন্য শ্বাপদের মতো তার খোলা মুখের দু-পাশ দিয়ে ঝরে পড়ে লালা।
আর-একটা নতুন কণ্ঠস্বর শুনতে পায় রজত।
“এই রাজেন, কী করছ?”
কে ও ছায়া? না মানুষ? পার্থক্য করতে চেষ্টা করে না রজত। তলোয়ার চালিয়ে দেয় কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে। একটা আর্তনাদের আওয়াজ হয়। আরও কণ্ঠস্বর শোনা যায়।
“পাগল হয়ে গেছে।”
‘নালায়েক, নামর্দ!’
“মাথায় খুন সওয়ার হয়েছে। দূরে থাক!”
‘হে বাবা কালভৈরব! হে বাবা কালভৈরব!’
প্রতিটি কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে পাগলের মতো তলোয়ার চালায় রজত। ছায়া-কায়ার তফাত সে বুঝতে পারে না। প্রতিটি চেহারাই ঝাপসা দেখায় তার চোখে।
“অতীনকে ডাক! সোমনাথকে!” কেউ চ্যাঁচায়।
“অতীন মোহিনী কুঠিতে।”
অতীন! সোমনাথ! রজতের একটা কথা মনে পড়ে যায়। অতীন তাকে একটা কাজ দিয়েছিল।
“বিপুল! সোমনাথ!” চিৎকার করতে করতে গম্বুজ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে রজত।
বিপুল, সোমনাথ আর তাদের দুই সহকারী তলোয়ার হাতে মোহিনী কুঠির ভেতর এসে দাঁড়ায়। তাদের পেছনে শরীরের রক্তে চৌকাঠ ভেজায় কুঠির দরোয়ান। মোহিনী কুঠির বাইজি আর তাদের সহকারীরা সব পার্টি হাউসে, কুঠি এখন তাই ফাঁকা। কেবল মালকিনের ঘরের তলায় দেখা যায় নীল আলোর রেখা। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে সোমনাথ, পেছনে বাকিরা।
লাক্ষার নকশা-তোলা টেবিলের পেছনে খাতাপত্র দেখতে-থাকা মোহিনীর চোখ চারজন তলোয়ারবাজকে একসঙ্গে দেখে আতঙ্কে বিস্ফারিত হয়ে ওঠে।
ভণিতা না করে শান্ত গলায় প্রশ্ন করে সোমনাথ, “অতীন কোথায়?”
আঙুল তুলে ওপরের দিকে দেখায় মোহিনী, “দোতলায়। দশ নম্বর ঘর।”
আর দ্বিতীয় বাক্যটি খরচ না করে তার গলায় তলোয়ার চালিয়ে দেয় সোমনাথ। মোহিনীর গলা থেকে ছিটকে-আসা রক্ত টেবিলের খাতাপত্রের সাদা কাগজে লাল কালিতে জীবন-মৃত্যুর হিসেব লিখতে থাকে।
পা টিপে টিপে দোতলায় ওঠে চারজনে। সিঁড়ির পর একটা লম্বা করিডর। তার দু-পাশে বন্ধ দরজা, তাদের মাথায় নম্বর লেখা।
নম্বর মিলিয়ে মিলিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে তার দরজায় কান পাতে বিপুল। তারপরে মাথা নাড়ে।
সহকারী দুজনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে সোমনাথ বলে, “একটা তোশক নিয়ে আয়।’’
পাশের একটা খালি ঘরের বিছানা থেকে তোশক তুলে আনে দুজনে।
বন্ধ ঘরের দরজায় লাথি মারে বিপুল। ছিটকিনি ভেঙে সজোরে ভেতরদিকে ছিটকে খুলে যায় দরজা। ভেতরে নজরে আসে বিছানায় শোয়া নীরার শরীরের ওপর উপুড় হয়ে ওঠানামা করতে-থাকা অতীনের উলঙ্গ দেহটা।
দৌড়ে গিয়ে তাদের অতীনের ওপর তোশকটা ফেলে দেয় সোমনাথের দুই সহকারী। তারপর চারজনে মিলে তোশকের ভেতর দিয়ে তার শরীরের ওপর তলোয়ারের খোঁচা মারতে আরম্ভ করে।
অতীনের তলা থেকে নগ্ন দেহে বেরিয়ে এসে দরজার দিকে পালাতে চেষ্টা করে নীরা। কিন্তু তার আগেই তার ঘাড়ে সোমনাথের তলোয়ারের কোপ পড়ে। মাটিতে আছড়ে পড়ে নীরা, তার মাথাটা দেহ থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
তোশকটা টেনে ফেলে দেয় বিপুল। বিছানার ওপর রক্তাক্ত শরীরে পড়ে হাঁপায় অতীন।
“খতম করে দাও।” হুকুম দেয় সোমনাথ।
অতীনকে বিছানা থেকে টেনে নামিয়ে একটা দেওয়ালের গায়ে ঠেসে ধরে দুই তলোয়ারবাজ। তার গলার সামনে বাঁ হাতের কবজিটা ধরে বিপুল, তারপর কবজির ওপর তলোয়ারের ফলাটা শুইয়ে রেখে ডান হাতের চাপে তার ডগাটা গেঁথে দেয় অতীনের গলায়।
অতীনকে খতম করে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে চারজন, পার্টি হাউসের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসে কওমি পলটনের একজন সদস্য।
“অতীন কোথায়?’’ হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞাসা করে সে।
“কেন? কী হয়েছে?” পালটা প্রশ্ন করে সোমনাথ।
“রাজেন পাগল হয়ে গেছে। যাকে পারছে, মারছে।”
বিনা বাক্যব্যয়ে তলোয়ারের আঘাতে লোকটার পেট চিরে দেয় সোমনাথ। তারপর দৌড় দেয় পার্টি হাউসের দিকে।
পার্টি হাউসের বাইরে দাঁড়িয়ে-থাকা রবি ঘনঘন মাথা ঝাঁকায়, “নাঃ! কিছু একটা সমস্যা তো হয়েছেই। প্রথমে একজন বেরিয়ে গেল, তারপর তার পেছনে পেছনে চারজন গেল। তারপরে আবার একটু আগে একজন দৌড়োতে দৌড়োতে গেল!’’
“ভেতর থেকে চ্যাঁচামেচির আওয়াজও আসছে।” পার্টি হাউসের জানলার দিকে তাকিয়ে বলে হিমু।
“হ্যাঁ, এদের নিজেদের মধ্যে কিছু ঝামেলা লেগেছে মনে হচ্ছে।’’
রাস্তার দিকে তাকায় হিমু, “যে চারজন গিয়েছিল, তারা আবার ফিরে আসছে।”
ছুটতে ছুটতে চারজন পার্টি হাউসে ঢুকে পড়ে। ভেতরে গোলমালের শব্দ বেড়ে যায়।
উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে পার্টি হাউসের দিকে তাকায় হিমু, “এদের নিজেদের মধ্যে মারামারি লেগে গেল নাকি? মিতা—’’
হিমুর কথা শেষ হয় না, আর্তনাদ করতে করতে পার্টি হাউস থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে কোঠার সমস্ত বাইজি, বাজনদার আর অন্য সব কর্মচারী। সেই ভিড়ে হিমু দেখতে পায় মিতাকেও। হাত নাড়ে সে, “মিতা!”
ছুটতে ছুটতে হিমুর কাছে এসে দাঁড়ায় মিতা, “যাকে আপনি খুঁজছিলেন, রজত না রাজেন, সে পাগল হয়ে গেছে।”
“পাগল হয়ে গেছে?” বিস্মিত কণ্ঠে বলে হিমু।
“হ্যাঁ! যাকে সামনে পাচ্ছে, মারছে! পাগলের মতো চিৎকার করছে!’’ হাঁপাতে হাঁপাতে বলে মিতা।
চিৎকার করতে করতে এলোপাথাড়ি তলোয়ার চালায় রজত। আজ তার তলোয়ারবাজিতে কোনও নৈপুণ্য নেই, কায়দা নেই, তরিকা নেই। উদ্ভ্রান্তের মতো সে যেদিকে পারে, তলোয়ারের কোপ মারে। তাকে ঘিরে-ধরা কওমি পলটনের তলোয়ারবাজদের তলোয়ারের খোঁচায় তার শরীরের নানা জায়গা থেকে রক্ত ঝরে, কিন্তু তা-ও তার ভ্রূক্ষেপ নেই। তার তলোয়ারের কোপ কখনও হাওয়ায় পড়ে, কখনও দেওয়ালে, কখনও তার ধাক্কায় তাক থেকে উলটে পড়ে মোমবাতি, ভেঙে টুকরো হয়ে যায় ঠররার বোতল। মোমবাতির আগুন আর ঠররার কোহলের মিশ্রণে আগুন লেগে যায় দু-এক জায়গায়। তবু তারই মধ্যে উন্মাদের মতো তলোয়ার চালায় রজত।
একজন পেছন থেকে দৌড়ে আসে মাথার ওপর তলোয়ার তুলে। সে কাছে আসতেই দু-হাতে তলোয়ার কাঁধের ওপর তুলে তার পেটে আড়াআড়ি আঘাত করে রজত। তারপর সে ছিটকে গড়িয়ে পড়ে যেতেই আবার এলোপাথাড়ি তলোয়ার চালাতে আরম্ভ করে।
একটা স্বল্প পরিসর জায়গায় রজতকে ঘিরে ধরে চার-পাঁচজন। রজতের তলোয়ার নীচ থেকে লম্বালম্বি উঠে যায়, পেট থেকে বুক অবধি চিরে দেয় একজনের। আর-একজনের সামনে থেকে সরে গিয়ে সে কোপ মারে তার কোমরের ডানদিকে।
রজতের তলোয়ার কখনও ওপরে উঠে নীচে নামে, কখনও নীচ থেকে ওপরে ওঠে। আর প্রত্যেকবার তার পায়ের কাছে গড়িয়ে পড়ে লাশ।
আর প্রত্যেকবারই তাকে ঘিরে-থাকা ছায়ামূর্তির দলে যোগ দেয় আর-একজন।
চিৎকার করে রজত, মাথা ঝাঁকায়, তার মাথা থেকে ছিটকে যায় স্বেদবিন্দু, শরীর থেকে ছিটকে যায় রক্তের ফোঁটা।
ছড়িয়ে-পড়া আগুন এবার উঠতে থাকে দেওয়াল বেয়ে। রজতের ভেতরের বুভুক্ষাটাও যেন আগুন হয়ে হাহাকার করে তার চারপাশে।
“পাগল হয়ে গেছে, একদম পাগল হয়ে গেছে! মার! মেরে ফেল শালাকে!”
চেনা-চেনা লাগে গলাটা। কে? কে ও? ধোঁয়ার মধ্যে দিয়ে দেখার চেষ্টা করে রজত।
হ্যাঁ। সোমনাথ! কী যেন কাজ ছিল একটা সোমনাথের সঙ্গে?
‘যত তাড়াতাড়ি পারো। পারলে আজকালের মধ্যেই।’
কে বলল? সোমনাথের পাশে কে ও? অতীন? হ্যাঁ অতীন।
হ্যাঁ, মনে পড়েছে। অতীন বলেছিল, সোমনাথকে মারতে হবে।
টলতে টলতে এগোয় রজত।
দেওয়ালের কোণ থেকে বেরিয়ে এসে কেউ তার কাঁধে তলোয়ারের কোপ মারে। তাকে একদিকে ঠেলে দিয়ে তার পেটে তলোয়ার পুরো গুঁজে দেয় রজত।
সামনে দুজন মাথার ওপর তলোয়ার তোলে। রজতের এক হাতে ধরা তলোয়ার ডানদিক থেকে বাঁদিকে গিয়ে তাদের দুজনের পেট একটানে একই সঙ্গে চিরে দেয়। পেছন থেকে কেউ এই সুযোগে তার পিঠে তলোয়ারের কোপ মারে। পেছন ফিরে রজত তার থুতনির নীচে তলোয়ার লম্বালম্বিভাবে ঢুকিয়ে দেয়।
ছায়ামূর্তির দল ভারী হয়।
আগুন এবার ছাদ স্পর্শ করে। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আসে চারপাশ।
সামনে দুজন তার পথ আটকায়। তাদের পেছন থেকে সোমনাথ চ্যাঁচায়, “মার, মার শালাকে, মেরে ফেল।”
ডান কানের কাছের তলোয়ার-ধরা হাতের দুই মুঠি তুলে তাকে একজন আক্রমণ করে। রজতের তলোয়ার নেমে আসে তার বাঁ পাঁজরে। দ্বিতীয়জন এবার মাথার ওপর তলোয়ার তোলে। তার ডান হাত আর পাঁজরের মধ্যে তলোয়ার একবার ঢুকিয়ে দিয়েই সোমনাথকে লক্ষ্য করে ঝাঁপ দেয় রজত।
তলোয়ার চালানোর সুযোগ পায় না সোমনাথ, রজতের শরীরের ধাক্কায় পড়ে যায় মাটিতে। তার বুকের ওপর হাঁটু দিয়ে চেপে ধরে রজত। নিজের তলোয়ার দিয়ে রজতের শরীরে বারংবার কোপ মারে সোমনাথ। পেছন থেকেও তার পিঠে পড়ে আরও তলোয়ারের কোপ। কিন্তু সব অগ্রাহ্য করে তলোয়ারের ধার সোমনাথের গলায় রেখে করাতের মতো ঘষতে থাকে রজত।
হাহাকার করে জ্বলে আগুন, ছিটকোয় রক্ত, জান্তব চিৎকার করে রজত। শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সোমনাথের মাথা।
সোমনাথের কাটা মাথা এক হাতে ধরে তলোয়ারে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায় রজত। তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে-থাকা তলোয়ারবাজরা তলোয়ার ওঠায়, কিন্তু তাকে আক্রমণ করে না।
সোমনাথের মাথাটা নিজের মুখের কাছে ধরে কিছুক্ষণ ঘাড় বেঁকিয়ে দ্যাখে রজত, তারপর ছুড়ে ফেলে দেয় আগুনের মধ্যে।
তার সামনে দাঁড়ানো তলোয়ারবাজদের দিকে চোখ যায় রজতের। কে ওই লোকটা? বিপুল? হ্যাঁ, বিপুল। বিপুলের পাশে কে ও, সোমনাথ? সোমনাথ মরেনি? না, না, সোমনাথকে মারতে হবে, অতীনের নির্দেশ।
তলোয়ার তুলে বিপুলের দিকে তেড়ে আসে রজত।
রজতের সঙ্গে লড়াই করার আগ্রহ দেখায় না কেউ। চতুর্দিকে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ছত্রভঙ্গ হয়ে যে যেদিকে পারে পালায়।
অবসন্ন শরীরে টলতে টলতে এগোয় রজত। সোমনাথ? সোমনাথ কোথায় গেল? ওই যে, ওখানে একটা দরজা। সোমনাথ নিশ্চয়ই ওদিকেই গেছে।
দরজা দিয়ে টলতে টলতে জ্বলন্ত পার্টি হাউসের বাইরে এসে পড়ে রজত। বাইরে লোকের ভিড়। কিন্তু সবাই কেন ওভাবে তাকিয়ে আছে তার দিকে?
ভিড়ের সামনে কে? হিমু? হিমুর পেছনে কে? বিজন? আর তার পাশে ওটা কে দাঁড়িয়ে? রিমা? ওই তো গালে টোল-পড়া মেয়েটা। তার পেছনে কালভৈরব পাসের বুড়োটা। ওই তো অতীন আর সোমনাথ। তাদের পেছনে চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা। তাদের পেছনে আরও লোক। কে ওরা? আর মানুষের পেছনে ওরা কারা? পোশাক-পরা উটিয়া বাঁদর? আর তাদের পেছনে দাউদাউ করে কী জ্বলে? শহর? গ্রাম? আর জ্বলন্ত শহরের পেছনে ওই যে নিকষকালো আকাশ, কোথা থেকে এল ওটা?
না। এসব সে বুঝতে চায় না। তার পেছনের জ্বলন্ত বাড়িতে আগুনের মধ্যে থেকে হাহাকার করে কে যেন তাকে ডাকে। ওই বুভুক্ষার হাহাকার সে চেনে। ওই বুভুক্ষার কাছে নিজেকে সঁপে দেবে সে।
তলোয়ার তুলে উন্মাদের মতো চিৎকার করতে করতে আগুনের মধ্যে ঝাঁপ দেয় রজত।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন