হকিন্সাবাদ

সুমিত বর্ধন

রিক্ত হস্তে দুনিয়াতে আসা

বিদায় নগ্নপদে

দুটি সাধারণ ঘটনার ব্যবধানে সমাধি অগুনতি স্বপ্নের

যাওয়ার আগে পরিষ্কার করেছি আয়না

আমার হৃদয়ের। এতে এখন প্রতিফলিত

অম্বালিকার আকাশ


রুসোগঞ্জ আর হোমিগঞ্জের মধ্যে দূরত্ব খুব একটা বেশি না হলেও, দুটো শহরের চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। হোমিগঞ্জ কৃষিপণ্যনির্ভর। শহরের আদি বাসিন্দাদের কারও চালকল আছে, কারও রেশমকুঠি, কারও ফলের আড়ত। এই শহরে রাস্তাঘাট চওড়া, বাড়িগুলো খোলামেলা, উঠোন দালানে ঘেরা।

রুসোগঞ্জ যোধবণিকদের প্রধান কেন্দ্র। ঘিঞ্জি রাস্তার ওপরে এদের দুর্গের মতো দোতলা পাথরের বাড়িগুলোর একতলায় গুদোম আর আস্তাবল, দোতলায় বাসস্থান। বাড়ির জানলাগুলো ছোট ছোট, ভারী কাঠের তৈরি সদর দরজাগুলো পেছনে হেলানো, তাদের ওপর ইস্পাত কাচের ধারালো গজাল বসানো। গ্রিবিন আর নীলকান্ত মহিষের শরীর আর বিষ্ঠার গন্ধে এখানে বাতাস প্রায় সবসময়েই ভারী হয়ে থাকে, রাস্তায় জড়ো-করা মালের বস্তা আর মহিষ গাড়ির পাশ দিয়ে সাবধানে হাঁটতে হয়।

বণিকদের মহল্লার পাশে বাজার। এখানে ঘিঞ্জি রাস্তার ওপর বাড়িগুলো পাথরের বদলে কাঠ আর মাটিতে তৈরি। বাড়িগুলোর একতলায় নানা সামগ্রীর দোকান, দোতলায় ছোট ছোট খুপরি ঘরে মানুষের বাস।

এমনই একটা খুপরি ঘরে কাঠের আগুনে একটা কালি-পড়া হাঁড়িতে রান্না করে মিতা। ঘরের এককোণে মেঝেয় চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে রবি। ঘরের একটিমাত্র জানলা দিয়ে সকালের রোদ এসে পড়ে তার গায়ে।

“কাল রাতে কোথায় গিয়েছিলে কাকা?” হাঁড়িতে খুন্তি নাড়তে নাড়তে প্রশ্ন করে রিমা।

কাকা, অর্থাৎ রবি, মাথাটা সামান্য তোলে বিছানা থেকে, “কাল রাতে? কই, কোথাও যাইনি তো!”

উনুনের একটা কাঠ সামান্য নেড়ে দেয় মিতা, “সে কী! কাল মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যে দেখলাম তোমার বিছানা খালি!”

চোখ ওপরে তুলে কী যেন মনে করার চেষ্টা করে রবি, “ওহো! হ্যাঁ! কাল রাতে মনে হল, বৃষ্টি আসবে। তাই জঙ্গল থেকে শুকনো কাঠ কুড়িয়ে আনতে গিয়েছিলাম। কাঠ ভিজে গেলে তো আবার তোমার রান্না হবে না।”

“ওঃ, আচ্ছা!” রবির নিশাকালীন অন্তর্ধান নিয়ে মিতার মনে আর কোনও প্রশ্ন আছে বলে মনে হল না। সে অন্য প্রসঙ্গ উত্থাপন করে, “আচ্ছা কাকা, আমরা হকিন্সাবাদ কবে যাচ্ছি?”

উত্তর দেয় না রবি, অন্যমনস্ক হয়ে কী চিন্তা করে। তাকে ঘাঁটায় না মিতা। এই অজানা বিদেশে সে একা, অসহায়। প্রায় সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন লোকের ওপর নির্ভরশীল। কয়েকদিন হল, হকিন্সাবাদের কথা জিজ্ঞেস করলেই রবি কেমন এড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তা-ও মিতা তাকে চটাতে চায় না। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া তার আর কোনও উপায় নেই।

ঘরের কোণের দিকে চোখ যায় মিতার। সেখানে একটা থালার ওপর তার দাদুর ছবি কয়েকটা ফুল দিয়ে সাজিয়ে রেখেছে সে। তার সামনে সকালে যে ধূপ জ্বালিয়ে দিয়েছিল সে, তার থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া ওঠে। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সে যে দাদুর সৎকার পর্যন্ত করতে পারেনি, দাদুর দেহটা জঙ্গলের মধ্যে রেখেই পালিয়ে এসেছে, সে দুঃখ মিতা এখনও ভুলতে পারেনি।

ছবিটার দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে, “তুমি যেখানেই থাকো, ভালো থেকো দাদু। জয় মহাকাল, আমার দাদুকে ভালো রেখো তুমি। আর চিন্তা কোরো না দাদু, একদিন না একদিন আমি ঠিক তোমার মৃত্যুর বদলা নেব।’’

“মিতা, শোনো।” বিছানায় উঠে বসে ডাক দেয় রবি, তার গলায় কেমন একটা অসন্তুষ্টির ছাপ।

চোখ মুছে রবির সামনে গিয়ে বসে মিতা।

“দ্যাখো মিতা, তুমি যে এই রোজ বলো, ‘বদলা নেব, বদলা নেব’, এটা বলা ঠিক না। বদলা, প্রতিশোধ— এসব কথা বড় মানুষ, তলোয়ারবাজ— এদের মানায়। তুমি মহাকালের কাছে দাদুর জন্যে প্রার্থনা করো, তাহলেই হবে।”

“বদলার কথা না বললে আমি শান্তি পাই না যে!” মুখ ফিরিয়ে আবার চোখের জল মোছে মিতা।

একটা ভারী শ্বাস নেয় রবি, “কিন্তু তোমার এইসব কথায় তোমার দাদুর আত্মার মুক্তি পেতে অসুবিধে হবে যে, মিতা। যাক গে, শোনো। তুমি আমাকে হকিন্সাবাদ যাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করছিলে না? আমি তোমায় নিয়ে আজকালের মধ্যেই হকিন্সাবাদের জন্যে রওনা দিতাম। কিন্তু আমার একটু চোট লেগেছে।’’

“চোট লেগেছে? সে কী গো! কী করে? ডাক্তার দেখিয়েছ?” উদ্‌বিগ্ন কণ্ঠে প্রশ্ন করে মিতা।

“আরে না না, তেমন কিছু নয়।” আশ্বস্ত করে রবি, “কাল রাতে কাঠ আনতে গিয়ে একটা গাছের শেকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম। কোমরে একটু লেগেছে। দু-একদিনের মধ্যে ঠিক হয়ে গেলেই বাঁধাছাঁদা করে হকিন্সাবাদের রাস্তা ধরব।”

“তুমি ব্যস্ত হোয়ো না কাকা। সেরে ওঠো আগে। দু-চার দিন দেরি হলে তেমন কিছু ক্ষতি হবে না।” তাড়াতাড়ি বলে ওঠে মিতা।

“তোমার মনটা খুব নরম। আমার সেরকম কিছু হয়নি গো। সত্যি! দু-একদিন একটু জিরোলেই ঠিক হয়ে যাবে। ওহো, ভুলেই গিয়েছিলাম, তোমায় একটা জিনিস দেওয়ার ছিল। দাঁড়াও।”

বিছানার তলা হাতড়ে একটা খাপে ঢোকানো ছোরা বের করে আনে রবি, “এইটা তোমার কাছে রেখে দাও। পোশাকের মধ্যে লুকিয়ে রেখো, কেউ টের না পায়। দিনকাল ভালো নয়, সঙ্গে একটা হাতিয়ার থাকা ভালো।”

মাথা নাড়ে মিতা, “আচ্ছা। একটা রশিতে বেঁধে গলায় ঝুলিয়ে রাখব। রান্না হয়ে গেছে, খাবে কাকা?”

তাক থেকে দুটো থালা নামিয়ে আনে রবি, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, দাও। খুব খিদে পেয়ে গেছে।”

ভাত, সামান্য দু-একটা সবজি, উনুনের সামনে বসে মিতার সঙ্গে তা-ই পরিতৃপ্তি করে খায় রবি।

“ওঃ, দারুণ রেঁধেছ মিতা! তুমি দেখছি, আমার অভ্যেস খারাপ করে দিচ্ছ। দু-দিন বাদে তুমি চলে যাবে, তখন এইরকম রান্না আর কোথায় পাব বলো তো?”

হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে মিতার মুখটা। সে কিছু একটা বলতে যাবে, নীচ থেকে কে ডাক দেয়, “ও রবি! রবি আছ?”

দরজার দিকে মাথা বাড়ায় রবি, “আছি? কে?”

“আমি বিষ্টু। একবার শুনে যাও!”

সরু সিঁড়ি দিয়ে একতলায় নেমে আসে রবি। সাদামাটা পোশাকে তারই বয়সি একজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে।

“কী হয়েছে, বিষ্টু?’’

“রবি, আমরা দশ-পনেরোজন মিলে কোতোয়ালি যাচ্ছি, তুমি আমাদের সঙ্গে আসতে পারবে?”

“কোতোয়ালি! কেন?” আশ্চর্য কণ্ঠে প্রশ্ন করে রবি।

“আর বোলো না। অনর্থক ঝুটঝামেলা। নির্মলকে চেনো তো, যার ওই মোড়ের মাথায় যন্ত্রপাতির দোকান? তাকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে।”

“সে কী গো? কী হয়েছিল?”

“কিচ্ছু হয়নি।” বিরক্ত গলায় বলে বিষ্টু, “বণিক মহল্লায় একজনের বাড়িতে চোর পড়েছিল। বেশি কিছু নিতে পারেনি, পাহারাদার দেখে ফেলাতে, ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালায়। আজ সকালে পুলিশ এসে তল্লাশি করার সময়ে ছাদে নির্মলের দোকানের একটা রসিদ কুড়িয়ে পায়। তারপর আর কী! সোজা ওর দোকানে এসে ওকে ধরে নিয়ে গেছে।”

“রসিদ!’’ কেমন যেন চমকে ওঠে রবি। অন্যমনস্কভাবে হাত ঢোকায় পকেটে।

“হ্যাঁ, রসিদ।” গলার স্বরে বিরক্তি কাটে না বিষ্টুর, “কোথায় যে চুরি করেছে, তাকে খুঁজে বের করবে, না নির্মলের দোকানের রসিদ পাওয়া গেছে বলে তাকেই তুলে নিয়ে গেল। আমরা তাই সবাই দল বেঁধে যাচ্ছি, দরকার হলে মুচলেকা দিয়ে কি জামিন দিয়ে ছাড়িয়ে আনব। তুমি আসবে আমাদের সঙ্গে?”

“যেতাম গো। ইশ্‌শ, খামোখা নিরীহ লোকটাকে ধরে নিয়ে গেছে গো!” সহানুভূতির সুরে বলে রবি, “কিন্তু একদম হাঁটতে পারছি না, কাল রাতে নামতে গিয়ে সিঁড়ি থেকে খুব জোর পড়ে গিয়েছি। তোমরা এবার যাও। পরের বার দরকার হলে আমি অবশ্যই যাব।”

বিরসবদনে বিষ্টু বিদায় নিতেই রবি ছটফটিয়ে চারপাশে চায়, যেন কী করবে, মনস্থির করতে পারছে না।

হঠাৎ তার চোখ যায় আকাশের দিকে। সেখানে একটা ব্লিম্প মন্থরগতিতে ভেসে যাচ্ছে রুসোগঞ্জের মাঝখানে উঁচু ব্লিম্প টাওয়ারটার দিকে।

এক মুহূর্ত কী চিন্তা করে রবি লম্বা পায়ে দৌড় লাগায় সেইদিকে। রাস্তার লোক অবাক হয়ে তাকে তাকিয়ে দ্যাখে। মাঝবয়সি একটা লোকে যে অত জোরে দৌড়োতে পারে, তাকে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করত না।

আধ ঘণ্টা বাদেই যেমন গিয়েছিল, তেমনি ছুটতে ছুটতে ফেরত আসে রবি। তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে উঠে ঘরে মাথা গলিয়েই বলে, “মিতা, তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নাও। এখনই হকিন্সাবাদের জন্যে বেরিয়ে পড়তে হবে।”

“এখনই!’’ অবাক হয় মিতা, “তুমি যে বললে, চোট লেগেছে, দু-তিন দিন বাদে বেরোবে?”

“হ্যাঁ, তা বলেছিলাম,’’ ওপর-নীচে মাথা দোলায় রবি, “কিন্তু আমাদের আর রাস্তা দিয়ে যেতে হবে না। আরাম করে বসে বসে যাব।”

রবির কথা বুঝতে না পেরে তার মুখের দিকে নীরবে তাকিয়ে থাকে মিতা।

“বুঝতে পারলে না?” একটু অধৈর্য হয়ে হাতের মুঠো খোলে রবি— “এই দ্যাখো!”

ঝুঁকে পড়ে দ্যাখে মিতা, কিন্তু বুঝতে পারে না, ‘‘কী এটা?”

“ব্লিম্পের টিকিট!” বিজয়ীর ভঙ্গিতে বলে রবি, “এক ঘণ্টার মধ্যে একটা ব্লিম্প ছাড়বে, আমরা তাতে চড়ে যাব।”

“ব্লিম্প!” বিস্ফারিত হয়ে ওঠে মিতার দু-চোখ— “মানে হাওয়া জাহাজ! তাতে তো বড়লোকরা চড়ে। আমরা ওতে করে যাব কী করে?”

“আরে, এটা সেরকম ব্লিম্প নয়, যাতে বড়লোকরা চড়ে বেড়াতে বেরোয়।’’ মিতাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে রবি, ‘‘এতে করে মাল যায়, যাত্রীদের জন্যে পাঁচ-দশটা সিট থাকে।”

তবু সংশয় কাটে না মিতার, “তা-ও, এর টিকিটের নিশ্চয়ই অনেক টাকা দাম হবে! তুমি এত খরচা করবে?”

“আরে দুর! আমি টাকা দিয়ে টিকিট কেটেছি নাকি! যারা মাল পাঠায়, তাদেরই একজন দুটো টিকিট আমাকে জোগাড় করে দিয়েছে। নাও, নাও, চলো। দেরি হয়ে যাবে।”

মিনিট দশেকের মধ্যেই রবি পিঠে ফেরিওয়ালার বাক্স বেঁধে মিতাকে নিয়ে হাঁটা দেয় ব্লিম্প টাওয়ারের দিকে।

রবি বানিয়ে বলেনি, পাশবালিশের মতো বিশাল বেলুনের নীচে ঝোলানো কেবিনটা সত্যিই মালে ঠাসা। মালের পেটির মাঝখানে এদিকে-ওদিকে কয়েকটা তক্তা-মারা চেয়ার, তাতে পা গুটিয়ে কোনওমতে বসা যায়।

ব্লিম্প ছাড়া অবধি রবি কেমন একটু চঞ্চল ছিল, যেন কিছু একটা দুশ্চিন্তার মধ্যে রয়েছে, কিন্তু ব্লিম্প টাওয়ারের বাঁধন খুলে হাওয়ায় উঠতেই সে সেই অস্বাচ্ছন্দ্যকর চেয়ারেই বেশ আয়েশ করে ঠেস দিয়ে বসে।

“মিতা, হকিন্সাবাদ খুব বড় শহর। তুমি যার কাছে যাচ্ছ, তার ঠিকানা জানো তো?”

একটু ইতস্তত করে মিতা, “ঠিকানা তো সেরকম কিছু জানি না, তবে দাদু বলেছিল পলটনবাজারে দর্জির দোকান।”

“পলটনবাজারে তো অনেক দোকান আছে। ঠিক কোথায় জানো?”

“দাদু বলেছিল বাজারের বড়রাস্তায়। মুসাফিরখানার কাছাকাছি। খুঁজে পেতে অসুবিধে হবে?” উৎকণ্ঠার ছোঁয়া লাগে মিতার কণ্ঠস্বরে।

“আরে না না। তুমি চিন্তা কোরো না। ও আমি ঠিক খুঁজে বের করে নেব। দোকানে কার কাছে যাবে তুমি?”

“ওই দোকানেই যাব। ওটা আমার মাসির দোকান।” বেশ গর্বের সঙ্গে বলে মিতা।

“মাসি? মানে তোমার মায়ের বোন?’’

“না, বোন নয়,’’ একটু থতোমতো খায় মিতা, “আমাদের গ্রামের মেয়ে তো, আমি তাই মাসি বলি।’’

“ওঃ আচ্ছা।” কেমন একটু চিন্তিত দেখায় রবিকে— “তোমার সঙ্গে যোগাযোগ আছে?”

আবার একটু ইতস্তত করে মিতা, “হ্যাঁ, ওই বছরখানেক আগে গ্রামে এসেছিল। তখনই তো দাদুকে বলেছিল, ‘হকিন্সাবাদে পলটনবাজারে দর্জির দোকান দিয়েছি। মেয়েটা একটু বড় হলে নিয়ে যেয়ো, কাজে লাগিয়ে দেব’।”

“বাঃ, তাহলে তো ভালোই। মাসির দোকানে দর্জির কাজ শিখে নিলে তোমার আর চিন্তা থাকে না।’’

এরপর আর বিশেষ কথা হয় না, কেবিনের একচিলতে জানলা দিয়ে মিতা নীচের শোভা দেখতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রবিও কোনও গভীর চিন্তায় ডুবে যায়।

হকিন্সাবাদ এককালে ভিন্নরদের ফেলে-যাওয়া শহর। মানুষ অম্বালিকায় আসার পর শহরের ঝোপজঙ্গল সাফ করে, জন্তুজানোয়ার তাড়িয়ে এখানে বসবাস শুরু করে। শুধু মাথা গোঁজার আস্তানা নয়, ভিন্নরদের ফেলে-যাওয়া নানা প্রযুক্তিও তারা নিজের মতো করে কাজে লাগাতে শুরু করে।

যেমন প্রয়োজন, যন্ত্রকে তেমন রূপ দেয় মানুষ, তাতে সংযোজন করে কুড়িয়ে-পাওয়া প্রযুক্তির ক্রিয়া। নতুন প্রযুক্তির ব্যবহারের অসম্পূর্ণ জ্ঞান আর অচেনা গ্রহে জীবন শুরু করতে চাওয়া মরিয়া তাগিদ— এই দুইয়ের সংমিশ্রণ হকিন্সাবাদে জন্ম দেয় নানা অদ্ভুত যন্ত্রের, যাদের মধ্যে অতি আধুনিক আর অতি প্রাচীন পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে যায় আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে-ফেলা জরাসন্ধর দুই টুকরোর মতো।

ব্লিম্প টাওয়ার থেকে নেমে বিস্ফারিত নেত্রে সেইসব বিচিত্র যন্ত্র দেখতে থাকে মিতা।

পাখির পায়ের আদলে গড়া ধাতব দুই পায়ে হেঁটে যায় পালকি। পালকির আগে আগে তার রশি ধরে হাঁটে বেহারা, ভেতরে তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে বসে থাকে সুবেশ নারী-পুরুষরা। মাথার ওপরের ট্রামলাইন দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ তুলে ক্রিস্টালের নীল দ্যুতি-মাখা কাচের তালের মতো ইঞ্জিন টেনে নিয়ে যায় ট্রামের কাঠের কামরা। রাস্তার ধারে বসানো ধাতুর ছাতা তাদের খুঁটির চারপাশে মাটিতে ফোটোক্রিস্টালের আলো ফেলে দেখায় নানা পণ্যের বিজ্ঞাপন। তাদের সামনে দিয়ে কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে অজস্র ছোট ছোট পায়ে হেঁটে যায় মালের কন্টেনার। কন্টেনারের মাথায় বসানো ছোটবড় লিভারে হাত রেখে তাদের চালিয়ে নিয়ে যায় চালকরা।

আজন্ম পাড়াগাঁয়ে লালিত মিতা অবাক দৃষ্টিতে চারপাশে তাকাতে তাকাতে রবির সঙ্গে পথ হাঁটে।

মানুষ যখন হকিন্সাবাদে আসে, তখন শহরের একদম কেন্দ্রে ভিন্নরদের ফেলে-যাওয়া মহল, অলিন্দ, সোপান, রাজপথ, তোরণ, ফোয়ারা প্রায় অক্ষতই ছিল। ব্যবহারের আগে এই এলাকাটা যৎসামান্যই পরিবর্তন করে প্রায় আগের মতোই রেখে দেওয়া হয়। প্রধান পথের দু-পাশে কাঁসরপাতা গাছের সারির জন্যে এ অঞ্চলের নাম কাঁসরপাড়া। এখানেই প্রেসিডেন্টের প্রাসাদ, চ্যান্সেলরের দরবার, সেনেট আর আদালত। এখানে কেবল তারাই বাস করে, যারা হকিন্সাবাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার শীর্ষে। কাঁসরপাড়া ঘিরেই গড়ে উঠেছে হকিন্সাবাদের বাকি সব অঞ্চল, যার একটি অংশের নাম পলটনবাজার। জনশ্রুতি, পৃথিবীর প্রথম অভিযাত্রীদলের সঙ্গে যে পলটন এসেছিল, তাদের প্রয়োজনেই গড়ে ওঠে এই বাজার।

হকিন্সাবাদে রবি এর আগেও এসেছে, রাস্তাঘাট তার চেনা, পলটনবাজার চিনে আসতে তার অসুবিধে হয় না, বড়রাস্তায় মুসাফিরখানার কাছে দর্জির দোকান খুঁজে পেতেও বড় একটা বেগ পেতে হয় না। ব্লিম্প থেকে নামার আধ ঘণ্টার মধ্যেই সে দর্জির দোকানে পৌঁছে যায় মিতাকে নিয়ে।

দর্জির দোকানে জানলা নেই। বদ্ধ ঘরটার বাতাস কাপড়, মাড় আর ঘামের গন্ধে কেমন থমথমে হয়ে আছে। আলো-আঁধারি এককোণে ক্রিস্টাল লন্ঠনের নীলচে আলোয় তিন-চারজন মেয়ে কাপড়ে নকশা তোলে, বোতাম বসায়। আর একদিকে ধবধবে ফরাশের ওপর কাপড়ের বান্ডিল আর প্যাকেটের মধ্যে বসে একজন মাঝবয়সি লোক জামাকাপড় ভাঁজ করে।

দোকানে পা রেখে রবি ফরাশে বসা লোকটাকে উদ্দেশ করে কিছু বলতে যাবে, আর-একজন দোকানে এসে ঢোকে। রবির পেছন থেকে জোরালো নারীকণ্ঠ ভেসে আসে, “বিশু, আমার জামাটা হল?”

ফরাশে বসা লোকটা ব্যস্ত হয়ে ওঠে, “শুভা হুজরাইন! আপনি নিজে এলেন! আপনার কাজের মেয়েটাকে পাঠিয়ে দিলেই তো হত!”

“সে দিনকতক হল কাজ ছেড়ে চলে গেছে!” রবির পাশ কাটিয়ে এগিয়ে আসেন শুভা।

আড়চোখে তাকিয়ে দ্যাখে রবি। মহিলার বয়স চল্লিশ ছাড়িয়েছে, দামি পোশাক, পরিপাটি চুল, মুখে হালকা প্রসাধন। ব্যক্তিত্বে আভিজাত্যের ছাপ স্পষ্ট।

“আপনি খবর দিলেন না কেন? আমি কারও হাত দিয়ে পাঠিয়ে দিতাম। আপনি শুধু কষ্ট করে এত দূর এলেন।” বিশুর কণ্ঠে বিনয় ঝরে পড়ে।

“তোমার ভণিতা রাখো তো!” ধমক দেন শুভা। স্পষ্টই বোঝা যায়, বিশুর মিষ্টি কথায় চিঁড়ে ভেজেনি। ‘‘জামাটা হয়েছে কি না বলো।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, হয়ে গেছে, খালি কয়েকটা বোতাম বসানো বাকি।” ঢোঁক গিলে বোতাম বসাতে-থাকা মেয়েটাকে তাগাদা দেয় বিশু, “নে নে, তাড়াতাড়ি হাত চালা, দেখছিস না, হুজরাইন দাঁড়িয়ে আছেন।”

“উফফ!” একটা বিরক্তি ছড়িয়ে পড়ে শুভার মুখে, “কোনও একটা জামা আজ পর্যন্ত তুমি সময়মতো দিলে না বিশু। আমি ফুল কিনতে যাচ্ছি, তার মধ্যে কাজটা শেষ করো।”

শুভা বেরিয়ে যেতে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে বিশু, রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মোছে।

“কে ভাই ইনি?” সহানুভূতির স্বরে জিজ্ঞাসা করে রবি, “কোনও বড় ঘরের কেউ?”

“তা বলতে পারেন। সেনেটর সুখেন্দুর নাম শুনেছেন তো? বছরখানেক আগে মারা গেছেন। জীবদ্দশায় চ্যান্সেলরের ডান হাত ছিলেন। একেবারে গলায় গলায় বন্ধু। এই শুভা হুজরাইন তাঁর হাউসকিপার ছিলেন।”

“হাউসকিপার?” ভ্রূ কপালে তোলে রবি।

একটা অর্থবহ হাসি খেলে যায় বিশুর মুখে, “ওই আর কী! বড় মানুষের ব্যাপার, বুঝতেই পারছেন। যাক, কী চাই বলুন।”

গলাখাঁকারি দেয় রবি, “আপনাদের মালকিনের সঙ্গে একটু দরকার ছিল।”

বিশুর মুখের হাসি মিলিয়ে যায়, “মালকিন? মানে দিদি? কেন, কী দরকার বলুন তো?”

মিতাকে এগিয়ে দেয় রবি, “গোডেলগাঁও থেকে ওঁর এই বোনঝি এসেছে। ওঁর সঙ্গে দেখা করবে।”

বিরক্তিতে ঢেকে যায় বিশুর মুখ, “দেখুন ভাই, এটা হকিন্সাবাদ। ওইসব বোনপো-বোনঝির গপ্প অনেকবার শুনেছি। আমাকে উজবুক ভেবেছেন নাকি? যান, যান, বেরোন দোকান থেকে!”

মিতার দিকে আড়চোখে তাকায় রবি। বিশুর এই অপ্রত্যাশিত অভদ্র ব্যবহারে তার মুখ পাংশু হয়ে গেছে, চোখের কোণে জল চিকচিক করছে।

পকেট থেকে কয়েকটা টাকার নোট বের করে বিশুর হাতের মুঠোয় গুঁজে দেয় রবি, “আরে ভাই, রাগ করছেন কেন? একটু গিয়ে খবর দিন-না। যদি দেখা না করতে চান, চলে যাব।”

হাতের মুঠোর দিকে তাকিয়ে রাগ পড়ে আসে বিশুর, সেলাই করতে থাকা একটা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, “যা, দিদিকে খবর দিয়ে আয়। বল, গোডেলগাঁও থেকে কে বোনঝি দেখা করতে এসেছে।”

সেলাই ফেলে মেয়েটা দোকানের পেছনের একটা দরজা দিয়ে ভেতরে কোথাও চলে যায়। রবি আর মিতা দাঁড়িয়ে থাকে, বিশু তাদের বসতে বলার প্রয়োজন মনে করে না।

মেয়েটা যাওয়ার কয়েক মিনিট বাদেই দোকানে ফেরত আসেন শুভা, “বিশু, হল?”

পাশে বসা মেয়েটার থেকে একটা জামা নিয়ে প্যাক করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বিশু, “হ্যাঁ, ম্যাডাম, হয়ে গেছে। বসুন, দিয়ে দিচ্ছি।’’

ফরাশে বসে শুভা দাম মেটাচ্ছেন, এমন সময়ে ভেতরে যে মেয়েটা গিয়েছিল, সে ফেরত আসে। নিরাসক্ত গলায় বলে, “দিদি বলল, দিদির কোনও বোনঝি নেই। গোডেলগাঁওয়ে দিদি কাউকে চেনে না।”

মিতার চোখের কোণে যে জলটা এতক্ষণ জমা ছিল, সেটা এবার তার গাল বেয়ে নেমে আসে। কান্না-জড়ানো গলায় সে বলে, “কেন মাসি এমন কথা বলল? মাসি বোধহয় ঠিক বুঝতে পারেনি। একবার মাসিকে নিজে আসতে বলো-না! আমাকে দেখলে মাসি ঠিক চিনতে পারবে!”

অন্য সময় হলে হয়তো বিশু দুজনকেই ঘাড়ধাক্কা দিত। কিন্তু শুভার মতো দামি খদ্দেরের সামনে এমন অহেতুক ঝামেলায় সে বিব্রত হয়ে পড়ে। সেলাই-করা মেয়েটাকে বলে, “আর-একবার যা। দিদিকে আসতে বল। আমি সামলাতে পারছি না।”

আবার ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যায় মেয়েটা। মিতার মুখের দিকে একটা তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে জামার প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে যান শুভাও।

কিছুক্ষণ বাদে দোকানের পেছন থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে আসেন। কাঁচাপাকা চুল, চোখে মোটা কাচের চশমা।

“কে গো তোমরা? কাজের সময় অশান্তি করছ?’’

মিতার দিকে আড়চোখে তাকায় রবি। তার মুখের হতভম্ব চেহারা থেকেই পরিষ্কার, সে এই মহিলাকে আগে কখনও দেখেনি।

“এই দোকানটা কি আপনার?” আমতা আমতা করে প্রশ্ন করে রবি।

“হ্যাঁ! কেন বলো তো?” কপাল কুঁচকে উত্তর দেন বৃদ্ধা।

“আমরা তাহলে বোধহয় ভুল দোকানে এসে পড়েছি।” মিতার দিকে চোখ তুলে ইঙ্গিত করে রবি, “আমরা ভেবেছিলাম এটা ওর মাসির দোকান।”

“তোমার মাসি!” চশমার ফাঁক দিয়ে মিতার দিকে তাকান বৃদ্ধা, “কী নাম বলো তো তোমার মাসির?”

“মলি!’’ ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয় মিতা।

“ওঃ মলি! মলি আমার কাছে কাজ করত। কিন্তু সে তো বছরখানেক হল, কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে।”

অদ্ভুত দৃষ্টিতে বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে থাকে মিতা। যেন সে নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

“কোথায় গেছে, বলতে পারবেন?” মিতার কান্না-ভেজা মুখের দিকে একবার তাকিয়ে প্রশ্ন করে রবি।

“না গো! খবর রাখিনি। তবে শুনেছি, বেশি রোজগারের আশায় দর্জির কাজ ছেড়ে দিয়েছে। ছেলেমানুষের সামনে এর বেশি আর কী বলি বলো!”

বৃদ্ধার কথাগুলো শুনে কেমন যেন পাথরের মূর্তির মতো হয়ে যায় মিতা। তাকে কোনওমতে হাত ধরে দোকানের বাইরের নিয়ে আসে রবি।

রাস্তায় এসে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ে মিতা, “কাকা, আমি কোথায় যাব এবার? আমার তো কেউ নেই! কী হবে আমার?’’

তার পিঠে একটা হাত রেখে তাকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে রবি, “কেঁদো না, কেঁদো না। কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে।”

সান্ত্বনা দেয় বটে রবি মিতাকে, কিন্তু তার নিজের মুখের চেহারা দেখেই বোঝা যায় যে সে এবার কী করবে, সে ব্যাপারে তার নিজেরও কোনও সুস্পষ্ট ধারণা নেই।

“ফেরিওয়ালা, ও ফেরিওয়ালা! এই যে এদিকে!”

একটা চেনা গলার আওয়াজে মাথা ঘোরায় রবি। রাস্তার ধারে দাঁড় করানো একটা পালকিতে বসে হাতছানি দিয়ে তাকে ডাকেন শুভা।

কাছে গিয়ে মাথা ঝোঁকায় রবি, “ডাকছেন হুজরাইন?’’

মিতার দিকে চোখ তুলে ইঙ্গিত করেন শুভা, “কে হয় তোমার?”

“দূর সম্পর্কের ভাইঝি, হুজরাইন।”

মাথা নাড়েন শুভা, “শহরে বোধহয় কাজ খুঁজতে এসেছিলে, না?’’

“হ্যাঁ, হুজরাইন। কিন্তু—’’

হাত তুলে বাধা দেন শুভা, “বলতে হবে না। বুঝতে পেরেছি। আমার একটা ফুলের দোকান আছে। দোকানে যে মেয়েটা কাজ করত, সে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে গেছে। চাও তো তোমার ভাইঝিকে আমি তার জায়গায় রাখতে পারি।”

ইতস্তত করে রবি। হকিন্সাবাদে কোনও অজানা লোকের কাছে একটা বাচ্চা মেয়েকে সঁপে দেওয়ার মধ্যে যে কী বিপদ আছে, তার চাইতে ভালো কেউ জানে না।

রবির মুখের চেহারা দেখে তার মনের কথাটা বোধহয় বুঝতে পারেন শুভা, “তোমাকে এখনই হ্যাঁ-না কিছু বলতে হবে না। আমার সঙ্গে এসো, আমার বাড়ি দেখে যাও, তারপর না হয় ঠিক কোরো।’’

নিরুপায় হয়ে তা-ই করে রবি। রশি ধরে পালকি হাঁটিয়ে নিয়ে যায় বেহারা, আর তার পেছনে হাঁটে রবি আর মিতা। পলটনবাজারের পর আরও দু-একটা অঞ্চল পার হয়ে পালকি এসে পড়ে কাঁসরপাড়ার কাছাকাছি একটা অভিজাত পল্লিতে। তার রাস্তার দু-পাশের বাড়িগুলো দেখলেই বোঝা যায় সেটা পয়সাওয়ালা মানুষের এলাকা।

বড় একটা ফটক-দেওয়া বাড়ির সামনে পালকি থেকে নামেন শুভা। বাড়ির একতলায় একটা ফুলের দোকান, দোকানের জানলায় সাজানো নানা বর্ণের আর আকারের ফুলের তোড়া।

দোকানটা দেখে আশ্বস্ত হয় রবি। দর্জির দোকান না হলেও ফুলের দোকান। মিতার গ্রাসাচ্ছাদনের একটা বন্দোবস্ত হয়ে যাবে।

মিতার দিকে তাকান শুভা, “আমার কাছে ফুল সাজানো শিখবে আর এই দোকান সামলাবে। কী? করবে কাজ?”

নীরবে ঘাড় নেড়ে সায় দেয় মিতা।

ব্যবস্থা পাকা করে মিতার কাছে বিদায় নেয় রবি, “যাক, এইবার আমি নিশ্চিন্ত! তোমার একটা কাজের বন্দোবস্ত হল। একবার এই হুজরাইনের কাছে কাজ শিখে নিলে তুমিও একদিন একটা দোকান দিয়ে ফেলবে।”

“তোমার সঙ্গে আর দেখা হবে না, কাকা?’’ ব্যথিত কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে মিতা।

“সে কী! অবশ্যই হবে। আমি কাজের ফাঁকে ফাঁকে তোমাকে এসে দেখে যাব?’’

“তুমি কি এখন রুসোগঞ্জ ফেরত যাবে?’’

“রুসোগঞ্জ!’’ কেমন আঁতকে ওঠে রবি, “না, না, রুসোগঞ্জ যাব না। হকিন্সাবাদ, দৌলতনগর, এর কাছাকাছি কোথাও থাকব। না হলে তোমাকে দেখতে আসব কী করে?”

ফটকের একটা কপাট ধরে দাঁড়িয়ে থাকে মিতা। বিকেলের পড়ন্ত রোদ পড়ে তার মুখে। তাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় রবি।

কিছুটা যাওয়ার পর তার চোখটা কেমন জ্বালা করে ওঠে। নিশ্চয়ই বালি পড়ে থাকবে, মনে মনে ভাবে সে।

জামার হাতায় চোখ মুছে আবার পথ চলে রবি।

সময় থেমে থাকে না। দিন গড়িয়ে সপ্তাহ, সপ্তাহ গড়িয়ে মাস, মাস গড়িয়ে বছর হয়। বছরের পর আরও একটা বছর চলে যায়। হকিন্সাবাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে ওঠে। সেনেটর সুখেন্দুর পর আরও দু-তিনজন বয়স্ক সেনেটর দেহ রাখার পর সেনেটের দখল পুরোপুরি চলে যায় চ্যান্সেলর-বিরোধীদের হাতে। সেনেট আর চ্যান্সেলরপন্থীদের মধ্যের বিরোধ ক্রমে কথা কাটাকাটি থেকে গালাগালি, গালাগালি থেকে হাতাহাতি, এবং হাতাহাতি থেকে খুনোখুনিতে এসে দাঁড়ায়।

এরপর শুরু হয় যথেচ্ছাচার। ক্ষমতা দখলের জন্য মরিয়া দু-পক্ষই তাদের লড়াই রাজপথে নামিয়ে আনে। চ্যান্সেলরের কওমি পলটন আর সেনেটের আজাদ মিলিশিয়ার মধ্যে মারামারি, দাঙ্গাহাঙ্গামা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে যোগ হয় রাজনৈতিক খুন আর গুপ্তহত্যা। দুই পক্ষই পরস্পরের সমর্থকদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র কসুর করে না। হকিন্সাবাদের রাস্তায় তাজা রক্তে ভেজা নরমুণ্ড গড়াগড়ি যেতে দেখাটা মানুষের গা-সওয়া হয়ে দাঁড়ায়। ঘোলা জলে মাছ ধরতে দৌলতাবাদের গভর্নর থেকে পিণ্ডারির দল অবধি অনেকেই নেমে পড়ে।

এই অরাজকতার মধ্যেই একদিন অম্বালিকা দিবস আসে। মানুষ বছরের এই দিনটাতেই অম্বালিকায় প্রথম পা রেখেছিল। বাড়িতে বাড়িতে পতাকা ওড়ে, রাস্তা পতাকার মালায় সেজে ওঠে, ছোট ছোট ছেলেমেয়ে পতাকা হাতে দৌড়ে বেড়ায়। বাজারে, দোকানে খদ্দেরের ভিড়, চারপাশে উৎসবের আমেজ। এর দু-দিন আগেই কামানিয়া ফটকের কাছে চার-পাঁচজন সেনেটপন্থী আমলা খুন হয়েছে, কিন্তু মানুষের হুল্লোড় দেখে সে নিয়ে কারও বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা আছে বলে বোঝা যায় না।

হকিন্সাবাদের পশ্চিম প্রান্তের একটা অঞ্চল খুঁটিপাড়া। এখানে এলে দেখতে পাওয়া যায় ছ-সাতটা পঁচিশ-তিরিশ ফুট উঁচু কোনও অজানা ধাতুর খুঁটি মাটি থেকে স্ক্রুয়ের প্যাঁচের মতো আকাশের দিকে উঁচিয়ে আছে বল্লমের মতো। এগুলোর ব্যবহার কী, আজ অবধি জানা যায়নি, তবে এদের থেকেই এই এলাকার নাম খুঁটিপাড়া হয়ে গেছে।

এই খুঁটির সারির পেছনে এককালে একটা বিস্তৃত ভিন্নর ইমারতের ধ্বংসস্তূপ ছিল। এটারই ধসে-পড়া ছাদ আর দেওয়াল সরিয়ে ফেলে তারপর অবশিষ্ট থাম আর বরগাগুলোর ওপর কাঠের তক্তা বসিয়ে মানুষ অম্বালিকায় পৌঁছে তাদের প্রথম বাসস্থান নির্মাণ করে।

তবে সে অনেককাল আগের কথা। এই হতশ্রী অঞ্চলের কুৎসিত আস্তানাগুলোতে আজকাল বাস শুধু দরিদ্র আর হতভাগাদের। আর তাদের, যারা কোনও কারণে সমাজের দৃষ্টির বাইরে থাকতে চায়।

এখানেই ঠররার গ্লাস হাতে এমনই একটা আস্তানার দরজায় বসে থাকে তলোয়ারবাজ অতীন। মুখে তার খুশির ছাপ।

খুঁটিপাড়ার খুঁটির মাথায় উড়তে-থাকা রংবেরঙের পতাকার দিকে তাকিয়ে গ্লাসে চুমুক দেয় অতীন, “মাত্র দু-বছর হয়েছে। কিন্তু তার মধ্যেই এত ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি যে মনে হচ্ছে একটা যুগ কেটে গেছে। তবে এত দিনের আশা-নিরাশা, হার-জিত পার হয়ে এইবারে মনে হচ্ছে, একটা শক্ত জমিতে এসে দাঁড়িয়েছি।”

ঘরের ভেতরে মাথাটা বাড়িয়ে দেয় অতীন, “তবে রাজেন, তুমি না থাকলে এতটা দূর আসা সম্ভব হত না। তোমার কাছে আমি আজীবন ঋণী থাকব।”

রাজেন, যাকে উদ্দেশ করে অতীনের কথাগুলো বলা, সে আর অন্য কেউ নয়, হোমিগঞ্জের রজত।

কাঠের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে থাকে রজত। তার হাতেও ঠররার গ্লাস। ছড়ানো পায়ের পাশে একটা ঠররার বোতল।

একটা মৃদু হাসি খেলে যায় রজতের ঠোঁটে। কিন্তু সে কিছু বলে না।

কোথা থেকে একঝলক গানবাজনার শব্দ ভেসে আসে। গলার স্বর নামিয়ে আনে অতীন, “তোমায় একটা কথা জানিয়ে রাখি, রাজেন। আজ রাতে যদি সব প্ল্যানমাফিক ঠিকঠাক যায়, তাহলে আরও ক্ষমতা আমার হাতের মুঠোয়। ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বলের সঙ্গে আমার কথা হয়ে আছে।”

শব্দ করে ঠররার গ্লাসে চুমুক দেয় রজত। কোটরাগত, কালি-পড়া চোখ তুলে তাকায় অতীনের দিকে, “কাকে খুন করতে হবে?”

মাথা নিচু করে রজতের দিকে সরে আসে অতীন, “বিভূতি। হারামিটা কালকে কামানিয়া ফটকে আমাদের হাত ফসকে পালিয়েছে। আর পারলে অম্বরিষ। খানকির ছেলে পেছন থেকে আমাদের বিরুদ্ধে কলকাঠি নাড়ছে।”

ঠোঁটে ঠররার গ্লাস ঠেকিয়ে ওপর-নীচে মৃদু মাথা নাড়ে রজত। আরও নিচু হয়ে আসে অতীনের গলা, “অম্বরিষ কলম-পেষা আমলা। যত প্যাঁচপয়জার মাথায়, হাতিয়ার চালাতে জানে না। ওর জান নেওয়াটা খুব একটা কঠিন হবে না। কিন্তু বিভূতি পুরোনো ফৌজি, তলোয়ারবাজ বলে নাম আছে। ওকে মারাটা সহজ হবে না।’’

জ্বলন্ত চোখে অতীনের দিকে তাকায় রজত। কিন্তু কিছু বলে না।

রজতের চোখের আগুন অতীনের নজরে পড়ে না, সে নিজের কথা বলে যায়, “ভেবেছিলাম, সোমনাথ আর বিপুলকে সঙ্গে নেব। তারপর ভেবে দেখলাম, তুমি থাকলে আর ওই গাঁওয়ার দুটোর দরকার পড়বে না।’’

দরজার সামনের গলিটা দিয়ে নোংরা জামাকাপড়-পরা চার-পাঁচটা বাচ্চা পতাকা হাতে নিয়ে হইহই করতে করতে দৌড়ে যায়।

রজতের একেবারে কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে অতীন, “সন্ধে ছ-টা, জলুষচকের ট্রাম টার্মিনাসে। দেরি কোরো না।”

আস্তানার পেছনদিকে আর-একটা ঘর। অন্ধকার, ঘুপচি। সেখানে মেঝেয় বসে একটা ছেঁড়া জামা সেলাই করে রিমা। তার পরনের পোশাক অপরিচ্ছন্ন, চোখ-মুখ বসে গেছে, কপালে দুশ্চিন্তার রেখা। তার সামনে কাঁথায় শুয়ে হাত-পা ছোড়ে একটা বাচ্চা ছেলে, তার সরু হাতে-পায়ে অপুষ্টির ছাপ স্পষ্ট বোঝা যায়।

ঘরের পাতলা কাঠের দেওয়ালে অন্যদিকের শব্দ আটকায় না। সুতরাং অতীন যত আস্তেই বলুক, তার সব কথাই রিমার কানে যায়।

খানিক বাদে অতীন চলে যাওয়ার শব্দ পায় রিমা। ঠররার গ্লাস আর বোতল হাতে ঘরে এসে ঢোকে রজত, মাটিতে বসে গ্লাসে চুমুক দেয়।

অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকায় রিমা, “সামান্য ক-টা পয়সার জন্যে তুমি একের পর এক মানুষ মেরে চলেছ।”

উত্তর দেয় না রজত। শব্দ করে গ্লাসে চুমুক দেয় কেবল।

হাতের কাপড়টা নামিয়ে রাখে রিমা, “প্রতিদিন তুমি কেমন আরও নির্দয়, আরও নির্মম হয়ে উঠছ।”

তা-ও কোনও উত্তর আসে না রজতের কাছ থেকে।

ঘরের একমাত্র জানলাটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় রিমা, “ভেবেছিলাম, তোমার নিজের একটা আখড়া হবে। তলোয়ারবাজি শিখিয়ে যা আয় হবে, তাতে অন্তত সচ্ছলভাবে থাকা যাবে।’’

উত্তর না দিয়ে গ্লাসে ঠররা ঢেলে খালি বোতলটা একদিকে ছুড়ে ফ্যালে রজত। বোতলের আওয়াজে চমকে উঠে ছেলেটা কাঁদতে শুরু করে।

নিচু হয়ে ছেলেটাকে কোলে তুলে নেয় রিমা, “আমরা না হয় সমাজের আবর্জনা, কিন্তু এই বাচ্চাটা কী দোষ করেছে? আমার যা হয় হোক, কিন্তু এর কষ্ট দেখতে পারব না।”

ভাবলেশহীন কণ্ঠে রজত বলে, “তোমার কি আমার সঙ্গে থাকা পোষাচ্ছে না?”

“কী?” জ্বলন্ত দৃষ্টিতে রিমা তাকায় রজতের দিকে।

“আমাকে আবর্জনা বলছ যে!”

রজতের হিমশীতল কণ্ঠস্বরে রিমার শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়। তার মনে পড়ে যায় যে তার থেকে দু-ফুট দূরে যে বসে আছে, সে একজন মায়ামমতাহীন খুনি। মানুষের প্রাণ নেওয়া আর একটা গাছের পাতা ছেঁড়ার মধ্যে তার কাছে বিশেষ পার্থক্য নেই। কয়েক বছর আগে কালভৈরব পাসের ছবিটা মনে পড়ে যায় রিমার। ছড়ানো-ছেটানো লাশের মাঝখানে রক্ত-ঝরা তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে আছে রজত, মুখ তার বিকৃত এক অদ্ভুত হাসিতে।

সেদিন রিমা কালভৈরব পাসে কেবল নিজের পুরোনো জীবনই ফেলে আসেনি। মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার, তাকে ব্যবহার করার তার যে স্বাভাবিক ক্ষমতা, সেটাও যেন সেইদিন সে কালভৈরব পাসেই রেখে এসেছে।

অথবা সে তার ক্ষমতা হারায়নি। মানুষের যেসব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর সে নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ করত— ভালোবাসা, দয়া, করুণা, মানবতা— রজতের মধ্যে তার সব ক-টাই অনুপস্থিত। একসময়ে এগুলোকে সে বিজনের দুর্বলতা ভাবত। আজ রজতের চোখের পেছনের উন্মত্ত শূন্যতার সামনে সেগুলোকেই বিজনের গুণ বলে মনে হয় তার।

ছেলেটাকে বুকে চেপে ধরে রিমা। মাঝেমধ্যে তার মনে হয়, সে রজতকে ছেড়ে চলে যাবে। হোমিগঞ্জ এড়িয়ে এশারগাঁওয়ে ফেরত যাবে তার মা-বাপের কাছে। কিন্তু রিমা জানে, সে যেতে পারবে না। বিজন আর চিরাগ আখড়ার ছেলেদের মৃত্যুর বদলা যারা নিতে চাইবে, তাদের প্রতিহিংসার আগুন থেকে তাকে আর তার ছেলেকে রক্ষা করতে পারে একমাত্র রজতই।

ছেলেটা তখনও কেঁদে চলেছে। পিঠ চাপড়ে তাকে ভোলাতে চেষ্টা করে, “কাঁদিস না বাবু। আজ বচ্ছরকার দিন, কিন্তু আমার এমন অবস্থা যে তোকে একটা জামা পর্যন্ত কিনে দিতে পারিনি।”

ছেলেকে কোলে নিয়ে ঘরের কোণে একটা দেরাজ খোলে রিমা, “চল, মহাকালের নামে ধূপ দিই। কী করবি বাবু বল, কোন অশুভ লগ্নে তোর জন্ম কে জানে, তুই-আমি দুজনেই কষ্ট পাচ্ছি।”

কিন্তু দেরাজ হাতড়ে ধূপ পায় না রিমা। ছেলেকে আবার শুইয়ে দিয়ে হাতের শূন্যের দিকে তাকিয়ে আপশোশের স্বরে বলে, “মাঝেমধ্যে মনে হয়, এসব যদি কিছুই না হত! যেমন বিজনের সঙ্গে ছিলাম, তেমনি যদি থাকতে পারতাম!”

হাতের গ্লাসটা ছুড়ে ফেলে দেয় রজত, আবার একটা আওয়াজ হয়।

হাতের উলটো পিঠ দিয়ে চোখের কোণ থেকে এক বিন্দু জল মোছে রিমা, “বিজনের ঘর করলে এই দারিদ্র্য, এই মনের কষ্ট সহ্য করতে হত না।”

“হুঁঃ!” একটা ব্যঙ্গের আওয়াজ করে মেঝেতে শুয়ে পড়ে রজত, “সাধে কি আর বলে, মেয়েরা সব স্বার্থপর!”

“কথাটা বলতে লজ্জা করল না?” জ্বলে ওঠে রিমা, “আজকের এই অবস্থার জন্যে তুমিই দায়ী। তোমার মতো একটা বদ লোক না থাকলে বিজন আজ বেঁচে থাকত। আমিও সুখে থাকতাম!”

“ভুল, ভুল!” নেশা-জড়ানো গলায় উত্তর দেয় রজত, “এ সব কিছুর মূলে তুমিই!”

“কী বললে?” বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে রিমা।

কনুইয়ে ভর দিয়ে মাথা তোলে রজত, “বিজনের মৃত্যুর জন্যে তুমিই দায়ী। তোমার জন্যে বিজনও মরল, আর আমারও সর্বনাশ হয়ে গেল।”

বিস্ফারিত চোখে রিমা তাকিয়ে থাকে রজতের দিকে। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

একটা কদাকার ব্যঙ্গের হাসি খেলে যায় রজতের মুখে, “রিমা বলে একটা মেয়ের জন্যে সাদামাটা খেলার ম্যাচ পালটে গেল জীবন-মরণের ডুয়েলে।”

কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারে না রিমা, পাংশু মুখে তাকিয়ে থাকে রজতের দিকে।

কুৎসিত হাসিটা আরও ছড়িয়ে পড়ে রজতের মুখে, “সেদিন প্রতিশোধস্পৃহায় বিজনের তলোয়ার যেন প্রাণ পেয়েছিল। আর আমার তলোয়ারেও যেন ভর করেছিল একটা স্বার্থপর মেয়ের অশুভ শক্তি।”

রজতের গলা থেকে বেরিয়ে আসে একটা ভয়ানক হাসি, “এ সব কিছুর মূলে রিমা বলে একটি বজ্জাত মেয়েছেলে!”

রজতের হাসিতে যেন কণ্ঠস্বর ফিরে পায় রিমা, দু-হাত মুঠো করে চেঁচিয়ে ওঠে, “কথাগুলো মুখে আটকাচ্ছে না?’’

হাসি বন্ধ হয় না রজতের। ব্যঙ্গের স্বরে সে বলে, “তুমি একটা অপয়া, দুশ্চরিত্র মেয়েছেলে! একটা ডাইনি!”

ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে যেন রিমার। হাতিয়ার র‍্যাক থেকে রজতের তলোয়ারটা তুলে নিয়ে সে দৌড়ে যায় শুয়ে-থাকা ছেলের দিকে, “ডাইনি! বেশ তা-ই সই! চল বাবু, তোকে মারি, মেরে নিজের গলায় ছুরি দিই। এই রোজের যন্ত্রণা আর সহ্য হয় না।”

লাফিয়ে উঠে রিমাকে এক হাত দিয়ে জাপটে ধরে রজত। অন্য হাতে তলোয়ার কেড়ে নিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় দূরে, “তোমার এইসব ফালতু নৌটঙ্কি বন্ধ করো।”

তলোয়ার কোমরবন্ধে গোঁজে রজত। কর্কশ স্বরে বলে, “তুমি মরো কি বাঁচো, আমার কিছু যায় আসে না! বুঝলে?”

দুজনের ঝগড়ার শব্দে জেগে উঠে কাঁদতে আরম্ভ করে ছেলেটা।

সেদিকে না তাকিয়ে হনহন করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় রজত।

ঝগড়া করে বেরিয়ে এলেও রিমার কয়েকটা কথা রজতের মনের মধ্যে বিঁধতে থাকে। গত দু-বছরে অতীনের কথায় সে হেন খুনখারাপি নেই, যা করেনি। মূলত তার ক্ষমতার ওপর ভর করেই কওমি পলটনে অতীনের উত্থান। কিন্তু তার বিনিময়ে তার আর্থিক লাভ হয়েছে যৎসামান্য। হোমিগঞ্জ ছাড়ার পর থেকে দারিদ্র্য আর অনটন তার নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। রিমা ভুল বলেনি, একটা আখড়া খুলতে পারলে অন্তত সচ্ছল অবস্থায় তার দিন কাটতে পারে।

এলোমেলো ভাবতে ভাবতে পথ হাঁটতে হাঁটতে রজত খেয়াল করে, সে একটা অচেনা পাড়ার গলিতে এসে পড়েছে। এবার কোনদিকে যেতে হবে, সে ভাবছে, হঠাৎ তার কানে আসে একটা অতি পরিচিত শব্দ। কাঠের তলোয়ারের ঠোকাঠুকির আওয়াজ।

হৃৎপিণ্ডটা লাফিয়ে ওঠে রজতের। কাঠের তলোয়ার! তার মানে এখানে কোনও আখড়া আছে। আখড়ার ওস্তাদের সঙ্গে দু-হাত মহড়া নিলে যদি তার পছন্দ হয় তাহলে হয়তো তলোয়ারবাজি শিখিয়ে কিছু বাড়তি আয় হতে পারে।

গলি থেকে বেরোনোর কথা ভুলে গিয়ে আওয়াজ লক্ষ্য করে খুঁজে খুঁজে রজত অবশেষে একটা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। বাড়ির ফটকে ছোট ছোট অক্ষরে লেখা ‘অনির্বাণ আখড়া’।

দরজার সামনে মোতায়েন দরোয়ানকে রজত বলে, “আমি একজন তলোয়ারবাজ। তোমাদের ওস্তাদকে বলো, আমি একটা ম্যাচ খেলতে চাই।”

বাড়ির ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ বাদে ফেরত আসে লোকটা, “আপনাকে ভেতরে ডাকছে।”

আখড়ার ভেতরে এসে দাঁড়ায় রজত। একটা বড় হলঘর, দেওয়ালের মাথায় বসানো জানলা দিয়ে আলো এসে পড়ে কাঠের মেঝেতে। ঘরে সার দিয়ে বসে নবিশের দল। এক প্রান্তে একটা ছোট উঁচু প্ল্যাটফর্ম, তার ওপর হাঁটু মুড়ে বসে আখড়ার ওস্তাদে। তাঁর কামানো মাথা, হাতের মালা আর বসার ভঙ্গি দেখে তাঁকে তলোয়ারবাজের বদলে ভিক্ষু মনে হয়।

ঘরের কোণে জালার মতন বিশাল ফুলদানি। তার ফুলের মিষ্টি সুগন্ধের সঙ্গে মেশে ধূপের হালকা সুবাস। দেওয়ালের গায়ে বসানো একটা জলের গামলায় শামুক বাঁশের নল থেকে শব্দ করে জল পড়ে।

রজতের মনে হয়, আখড়ার বদলে সে ভুল করে কোনও মঠে ঢুকে পড়েছে।

জানুর ওপর দুই হাত রেখে মাথা নিচু করে সম্ভ্রম জানান আখড়ার ওস্তাদ, “আমি কিষেনপ্রতাপ। বলুন কী চান!”

মাথা ঝোঁকায় রজতও। ‘‘আমার নাম রাজেন, ছোটখাটো তলোয়ারবাজের কাজ করি। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, আপনার আখড়াটা চোখে পড়ল। অনেকদিন কোনও আখড়ায় যাই না, ভাবলাম, যদি আপনার সঙ্গে দু-একটা ম্যাচ খেলা যায়।”

সামান্য হাসেন কিষেনপ্রতাপ, “দেখুন, কিছু মনে করবেন না। আমাদের এখানে নিয়মকানুন একটু কড়া। আমার সঙ্গে লড়ার আগে আপনাকে আমার কোনও শাগির্দের সঙ্গে একবার লড়তে হবে।”

মাথা ঝোঁকায় রজত, “অবশ্যই! বলুন, কার সঙ্গে লড়তে হবে।”

বসে-থাকা নবিশদের সারির দিকে তাকান কিষেনপ্রতাপ, “বৈজু!”

একজন উঠে আসে। বছর উনিশ-কুড়ি বয়স, একটু খাটো গড়ন, মুখে একটা সরল ছেলেমানুষি ভাব।

অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে রজত তার দিকে তাকায়।

রজতের মুখের চেহারাটা কিষেনপ্রতাপের নজর এড়ায় না। মৃদু হেসে তিনি বলেন, “বয়স হয়তো কম, কিন্তু বৈজু আখড়ার পহেলা শাগির্দ। আমার ডান হাত বলতে পারেন।’’

মাথা ঝোঁকায় রজত, তার মুখে একটা হালকা ব্যঙ্গের হাসি, “আমার সৌভাগ্য!”

কাঠের তলোয়ার হাতে মুখোমুখি দাঁড়ায় বৈজু আর রজত। মাথা ঝুঁকিয়ে পরস্পরকে সম্মান জানিয়েই ফটক তরিকায় পজিশন নেয় দুজনেই। ডান পা সামনে, বাঁ পা পেছনে, তলোয়ার দু-হাতে বাড়ানো, তলোয়ারের ডগা প্রতিপক্ষের চোখের দিকে তাক করা।

বৈজু প্রথমে কিছুটা ইতস্তত করে। তার তলোয়ারের ডগাটা এদিক-ওদিক নড়ে, যেন সে মনস্থির করতে পারছে না, ঠিক কীভাবে আক্রমণ করবে।

তার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে দ্যাখে রজত। তারপর সে তার শরীর ঢিলে করে দেয়। তার তলোয়ারের ডগা মেঝের কাছে নেমে আসে, কাঁধ দুটো ঝুঁকে পড়ে, মাথাটা সামনের দিকে নুয়ে পড়ে।

ওস্তাদ কিষেনপ্রসাদের মুখে একটা বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায়। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রজতের দিকে তাকিয়ে তলোয়ার তুলে ধীরে ধীরে এগোয় বৈজু। রজত তাকে আক্রমণ করার চেষ্টাও করে না, সে-ও ধীরে ধীরে পেছোতে থাকে।

কয়েক কদম এগিয়ে পেছোতে আরম্ভ করে বৈজু, তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে বুঝতে চেষ্টা করে রজতের কায়দাটা। কয়েক পা এগিয়ে আবার দাঁড়িয়ে পড়ে রজত। তার শরীরটা আরও শিথিল হয়, কাঁধ দুটো আরও ঝুঁকে পড়ে। তার তলোয়ারের হাতল-ধরা বাঁ হাতের মুঠোটা উঠে আসে বাঁদিকে পাঁজরের কাছে, তলোয়ারের ফলা ডানদিকের হাঁটুর ওপর দিয়ে বেঁকে থাকে ডানদিকে।

কপালের ভাঁজগুলো আরও গভীর হয় কিষেনপ্রসাদের।

নিস্তব্ধ ঘরে শোনা যায় কেবল জল পড়ার আওয়াজ। চোখ সরু করে রজতের তলোয়ারবাজির কায়দাটা বোঝার চেষ্টা করে বৈজু। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে ওঠে।

কয়েক পা এগোয় বৈজু। তার সঙ্গে তাল রেখে পেছোয় রজত। কাঠের মেঝেতে পা ঘষার শব্দ শোনা যায় জলের আওয়াজ ছাপিয়ে।

আবার এগোয় বৈজু। পিছিয়ে যায় রজত।

তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকেন কিষেনপ্রতাপ।

প্রায় মিনিট দুয়েক পিছু হটা অব্যাহত থাকে রজতের। কিন্তু অবশেষে তার পিঠ ঠেকে যায় ঘরের একটা থামে। তার তলোয়ার-ধরা দুই মুঠো উঠে আসে বুকের কাছে। তলোয়ারের কাঠের ফলা ডানদিকে ফেরানো, মেঝের সঙ্গে সমান্তরাল করে ধরা।

সুযোগ পেয়ে আক্রমণ করে বৈজু। তার তলোয়ার কিছুটা ডানদিকে বেঁকে ছুটে আসে রজতের বাঁ কাঁধ লক্ষ্য করে।

মুহূর্তের মধ্যে রজতের তলোয়ারের ফলা হাতের মোচড়ে তার শরীরের ডানদিক থেকে উঠে আসে বাঁ কানের কাছে।

রজতের তলোয়ারে ধাক্কা খেয়ে প্রতিহত হয় বৈজুর তলোয়ারের গতি। কাঠে কাঠে টক্করের আওয়াজটা নিস্তব্ধ ঘরে বাজ পড়ার মতো ছড়িয়ে যায়।

বৈজুর তলোয়ারের মার আটকেই রজতের তলোয়ার নেমে আসে তার ডানদিকের পাঁজর লক্ষ্য করে। হাত বেঁকিয়ে কোনওমতে মারটা আটকায় বৈজু। আরও একবার কাঠের তলোয়ার ঠোকার আওয়াজ ওঠে।

“ম্যাচ! রাজেন জিতে গেছে!’’ তলোয়ার ঠোকার আওয়াজ মেলাতে-না মেলাতেই ওস্তাদ কিষেনপ্রতাপের গলার আওয়াজ ছড়িয়ে যায় ঘরে।

রজতকে ফেলে লম্বা পায়ে বৈজু এগিয়ে আসে কিষেনপ্রতাপের দিকে। মুখে তার অপ্রসন্নতার ছাপ— “ওস্তাদ, আর-একবার সুযোগ দিন।”

“না!’’ কঠিন দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বলেন কিষেনপ্রতাপ, “কোনও প্রয়োজন নেই। ম্যাচ শেষ।”

চোয়াল শক্ত করে একপাশে বসে পড়ে বৈজু।

মৃদু হেসে রজতের দিকে তাকান কিষেনপ্রতাপ, “রাজেন, আপনার তলোয়ারবাজির কায়দা দেখছি একদম স্বতন্ত্র। কোথায় শিখেছেন?”

“আমার বাবার কাছে। এইটুকুই শিখেছি। এর চাইতে বেশি জানি না।” বেশি কথা না বাড়িয়ে কিষেনপ্রতাপের সামনে এসে দাঁড়ায় রজত, “আপনি যদি আমাকে শেখান তো ভালো হয়।”

উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকেন কিষেনপ্রতাপ। যেন কথাটা তিনি শুনতেই পাননি।

রজতের ঠোঁট বেঁকে যায়, “আপনার আখড়ার নিয়ম অনুযায়ী আপনার শাগির্দের সঙ্গে একহাত মহড়া নেওয়া হয়ে গেছে। এবার আপনার সঙ্গে একটা ম্যাচ খেলতে চাই।”

“তার কোনও প্রয়োজন নেই। তলোয়ারবাজিতে আমি আপনার সঙ্গে পেরে উঠব না।” সামান্য হেসে উত্তর দেন কিষেনপ্রতাপ, “তা ছাড়া আমার বয়স হয়েছে, ছেলেদের শেখানোর বাইরে তলোয়ারবাজি করা অনেকদিন ছেড়ে দিয়েছি।”

কিষেনপ্রতাপের চোখে চোখ রাখে রজত। তার কালি-পড়া চোখের পেছন থেকে এক ক্ষুধিত তুফান যেন প্রলয়ের শাসানি দেয়।

চোখ সরান না কিষেনপ্রতাপ। ইস্পাতশীতল দৃষ্টিতে তিনিও তাকিয়ে থাকেন রজতের চোখের দিকে।

সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। পরস্পরের দিকে চোখ রেখে পাথরের মূর্তির মতো জমে যায় দুটি মানুষ। যেন ইন্দ্রিয়ের অগোচর কোনও দুনিয়ায় এক অজানা দ্বৈরথে লিপ্ত দুজনেই। সাধারণের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই।

বিস্মিত চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে থাকে বৈজু।

কিছুক্ষণ বাদে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙে রজতের। ব্যঙ্গে মুখ বিকৃত করে কাঠের তলোয়ারটা ছুড়ে ফেলে দিয়ে সে বেরিয়ে যায় আখড়া থেকে।

“আমি এক-পা এগোলাম, ও এক-পা পেছোল। আমি আবার এগোলাম, ও তলোয়ার নামিয়ে নিল। এটা কী ধরনের তলোয়ারবাজি?” কাপড়-মোড়া কাঠের তলোয়ার ঘাড়ে ফেলে আখড়া থেকে বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে নিজের মনেই বিড়বিড় করে বৈজু। গান গাইতে গাইতে পাশ দিয়ে একটা বিজয় উৎসবের মিছিল যায়, কিন্তু বৈজুর নজর সেদিকে যায় না। যে মাথা নিচু করে দুপুরের ম্যাচের কথা ভাবতে ভাবতে পতাকা আর ফুলে সাজানো পথ দিয়ে হাঁটে।

মাথার ওপর কড়কড় আওয়াজ করে মেঘ ডাকে। আর সঙ্গে সঙ্গেই অম্বালিকার নীলচে-সবুজ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমে আসে। মুশলধার বৃষ্টির মধ্যে মিছিলটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, যে যেদিকে পারে, দৌড়ে পালায়।

বৃষ্টি থেকে বাঁচতে ছুট লাগায় বৈজুও, কিন্তু রাস্তায় বিজয় উৎসবের ভিড়। বড়রাস্তার কোনও বাড়ির নীচেই দাঁড়ানোর জায়গা নেই। ছুটতে ছুটতে একটা গলির মধ্যে ঢুকে একটা বাড়ির ফটকের ছাউনির নীচে কোনওমতে গুটিশুটি হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। বাড়ির নীচে একটা ফুলের দোকান। তার জানলায় বসানো রংবেরঙের ফুলের টব আর সাজিগুলো বৃষ্টির জলে ভেজে। ফটকের পেছনের বাড়িটার দোতলার বারান্দায় বসে একটা রামধনু ফিঙে অনবরত ডেকে চলে।

ওপরে একটা শব্দ হয়। মাথা তুলে বৈজু দ্যাখে, একটা মেয়ে বারান্দাটার কাঠের কপাটগুলো বন্ধ করছে। আশ্রয়হারা হয়ে প্রতিবাদের কয়েকটা স্বর তুলে উড়ে গিয়ে ধোঁয়াটে বৃষ্টির মধ্যে হারিয়ে যায় রামধনু ফিঙেটা।

বৃষ্টি হঠাৎ আরও বেড়ে যায়। ফটকের ওপর ছাউনিতে আর বৃষ্টি আটকায় না, বৃষ্টির ছাট লেগে ভিজতে থাকে বৈজু।

ফটকটা হঠাৎ ফাঁক হয়ে যায়। একটা মেয়েলি গলায় কে বলে, “বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজছেন কেন? আসুন, ভেতরে এসে বসুন।”

তাকিয়ে বৈজু দ্যাখে, একটু আগে সে যাকে বারান্দায় দেখেছিল, সেই মেয়েটা। টানা টানা চোখ, টোল-পড়া গাল, মিষ্টি মুখটাতে মাখানো একটা ততোধিক মিষ্টি হাসি। বয়সে তার চাইতে কয়েক বছরের ছোটই হবে।

সকালেই যে বৈজু তার ওস্তাদের একডাকে একজন অচেনা তলোয়ারবাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়েছিল, সে হঠাৎ তার সমবয়সি একটা মেয়েকে দেখে এমন ঘাবড়ে যাবে, কে জানত! কুণ্ঠিত স্বরে সে বলে, “না, না, আমি ঠিক আছি। অসুবিধে হচ্ছে না।”

ফটকটা আরও খুলে দেয় মেয়েটা, “কোথায় ঠিক আছেন? ভিজে চান করে গেছেন, ঠান্ডা লাগবে তো। আসুন, ভেতরে আসুন।”

কী বলবে, বুঝতে পারে না বৈজু, সে যেন হঠাৎ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। চুপচাপ মেয়েটার পেছন পেছন ভেতরে পা রাখে।

ফটকের পর একটা ছোট উঠোন পেরিয়ে বাড়িতে ঢোকে মেয়েটা। একটা কাঠের বেঞ্চি দেখিয়ে বলে, “বসুন।”

ইতস্তত করে বৈজু, “আমার জামাকাপড় সব ভিজে, আপনাদের ঘর নোংরা হয়ে যাবে।’’

“ও কিছু হবে না। আমি মুছে দেব।” একটা তোয়ালে বাড়িয়ে ধরে মেয়েটা, “নিন, মাথা মুছে নিন।’’

তলোয়ার ধরতে যার হাত কাঁপে না, তার তোয়ালেটা নিতে কেমন হাত কেঁপে যায়।

মেয়েটার নজর এড়ায় না। ‘‘আপনার বেশ ঠান্ডা লেগেছে দেখছি। দাঁড়ান, একটু চা দিই আপনাকে।”

একটা টেবিলে রাখা পট থেকে কাপে চা ঢালে মেয়েটা। তাকে আড়চোখে তাকিয়ে দ্যাখে বৈজু। তার নিজের ব্যবহারে সে নিজেই আশ্চর্য হয়। আজ পর্যন্ত কোনও তলোয়ারবাজের সামনে দাঁড়াতে তাকে দুবার ভাবতে হয়নি, কিন্তু আজ এই মেয়েটার কাছে এসে তার হৃৎপিণ্ডটা এমন জোরে কেন ধুকপুক করছে, সে নিজেই বুঝতে পারে না।

চায়ে চুমুক দিচ্ছে বৈজু, বাড়ির দোতলা থেকে নারীকণ্ঠ ভেসে আসে, “কার সঙ্গে কথা বলছ মিতা?”

“কেউ না, হুজরাইন,’’ মাথা তুলে উত্তর দেয় মিতা, “একজন বৃষ্টিতে আটকে পড়েছিল, তার সঙ্গে।”

“একবার ওপরে শুনে যেয়ো।”

“আসছি, হুজরাইন।’’ উত্তর দিয়ে বৈজুর দিকে তাকায় মিতা। তার দৃষ্টিতে কিছুটা ভয় আর উদ্‌বেগ নজর এড়ায় না বৈজুর। চায়ের কাপটা মিতাকে ফেরত দেয় সে, “আমি আসি। বৃষ্টি ধরে এসেছে।”

বৃষ্টির মধ্যেই ভিজতে ভিজতে পথ হাঁটে বৈজু। তার মাথা থেকে তখন তলোয়ারবাজির প্যাঁচের সব চিন্তা বেমালুম উধাও হয়ে গেছে।

একটা টেবিলের পেছনে একটা খাতায় কী লেখেন শুভা। টেবিলে অ্যাশট্রেতে রাখা একটা পাইপ থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে নীলচে ধোঁয়া ওঠে। তার কটু গন্ধ মেশে বাইরে থেকে আসা বৃষ্টির ভিজে গন্ধে।

মিতা এসে দাঁড়ায় সামনে, “হুজরাইন!”

“কার সঙ্গে কথা বলছিলে মিতা?” টেবিলে থেকে চোখ তুলে প্রশ্ন করেন শুভা।

ঢোঁক গেলে মিতা “চেনা কেউ না, হুজরাইন। বৃষ্টিতে ভিজছিল তাই ভেতরে আসতে বলেছিলাম।”

“জানলা দিয়ে দেখে মনে হল কোনও আখড়ার নবিশ।” গম্ভীর কণ্ঠে বলেন শুভা, “এবার থেকে এইসব নিম্নশ্রেণির লোকজনের সঙ্গে আর মিশো না। তোমার জন্যে আমি বড় ঘরে কাজের ব্যবস্থা করেছি।”

“আচ্ছা হুজরাইন!” মাথা নিচু করে বলে মিতা।

টেবিলে থেকে পাইপটা তুলে মুখে দেন শুভা, “হ্যাঁ। সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর মহলে তোমার জন্যে একটা কাজ জোগাড় করেছি। এবার থেকে তুমি ওখানেই কাজ করবে। একবার যদি সেনেটরের নজরে পড়ে যাও তাহলে আর সারাজীবন কোনও দুঃখকষ্ট থাকবে না।”

“কিন্তু হুজরাইন, আমি এখানেই ভালো আছি। ওখানে যেতে মন চাইছে না।” ভয়ে ভয়ে বলে মিতা।

“মিতা!’’ মুখ থেকে পাইপ নামিয়ে বার দুয়েক সজোরে অ্যাশট্রেতে ঠোকেন শুভা, “মুখে মুখে তর্ক কোরো না। আজ দু-বছর হল তোমাকে কাজ শেখাচ্ছি। তুমি কি এখনও ছেলেমানুষ আছ? এবার তোমার নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।”

ভয়ে কুঁকড়ে যায় মিতা। মুখ নামিয়ে তাকিয়ে থাকে মেঝের দিকে। তার চোখের কোণে জল চিকচিক করে।

মিতা হয়তো আর-একবার ধমক খেত, কিন্তু তার আগে বাড়ির এক বুড়ি কর্মচারী ঘরে এসে হাজির হয়।

“হুজরাইন, রবি এসেছে।’’

“রবি!” বিরক্তি ঝরে পড়ে শুভার কণ্ঠে, “এ লোকটা ছ-মাসে, ন-মাসে একবার করে মুখ দেখাতে আসে কেন কে জানে! যাও, পাঠিয়ে দাও।”

“হুজরাইন, রবি নীচে রান্নাঘরে বসে আছে। বলল যে বৃষ্টিতে ভিজে গেছে, ওপরে এলে হুজরাইনের ঘর নোংরা হবে, তাই যদি মিতাকে নীচে পাঠিয়ে দেন, ভালো হয়। আর আপনার জন্যে এটা পাঠিয়ে দিল।’’

একটা ছোট ভেলভেটের বটুয়া শুভার দিকে বাড়িয়ে ধরে বুড়ি কর্মচারী।

বটুয়াটা খোলেন শুভা। ভেতরে একটা রুপোর ফুল-তোলা ব্রোচ, দামি পাথর বসানো।

মুহূর্তের মধ্যে শুভার ব্যবহার পালটে যায়। একটা চওড়া হাসি খেলে যায় তাঁর মুখে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, সেই ভালো কথা। অবেলায় ঘর ভিজলে আবার কাজ বাড়বে। মিতা, যাও। তোমার কাকা অনেকদিন বাদে এসেছে।”

শুভার কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি নীচে নেমে আসে মিতা।

রান্নাঘরে উনুনের পাশে বসে হাত স্যাঁকে রবি। একটা আংটায় ঝোলানো তার ভিজে জোব্বাটা থেকে টপটপ করে জল পড়ে।

আনন্দে মিতার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, “ওঃ কাকা, তুমি একেবারে ভিজে গেছ!”

চওড়া একটা হাসি খেলে যায় রবির মুখেও, “ও কিছু না। আমি ফেরিওয়ালা মানুষ, রোদে পোড়া, জলে ভেজা, ও আমার খুব অভ্যেস আছে। বোসো বোসো মিতা।”

মিতা অবশ্য সঙ্গে সঙ্গে বসে না, একটা তোয়ালে এনে রবির হাতে ধরিয়ে দেয়, “আগে মাথাটা মুছে নাও কাকা। ঠান্ডা লেগে যাবে।”

মাথা মুছতে মুছতে মিতার দিকে হাসিমুখে তাকায় রবি, “ওঃ! সেই আট মাস আগে তোমায় দেখেছি। তার মধ্যেই মনে হচ্ছে, তুমি কত বড় হয়ে গেছ। মাঝেমধ্যে ভাবি, তোমাকে আমার কাছে রাখি, কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় মাল ফেরি করে বেড়াই, কী করে তোমার দেখাশোনা করব। সেইজন্যে—’’

কথা শেষ না করেই উনুনের আগুনে একটা পাইপ ধরায় রবি, “তবে মিতা, যেখানেই থাকি-না কেন, তোমার চিন্তা সবসময়ে মাথায় থাকে।”

এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলার স্বর নামিয়ে মিতা বলে, “কাকা, তোমায় একটা কথা বলার ছিল।”

পাইপ থেকে ধোঁয়া টানে রবি। কড়া তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে যায় রান্নাঘরে, “হ্যাঁ, হ্যাঁ বলো। কী, কোনও সুন্দর দেখতে ছেলেকে মনে ধরেছে বুঝি?”

“না, না কাকা!’’ কেমন যেন চমকে ওঠে মিতা, “ওসব কিছু না! বলছি কাকা, হুজরাইন আমাকে সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর মহলে কাজে পাঠাচ্ছেন।”

“সেনেটর কৃষ্ণেন্দু!’’ কী যেন চিন্তা করে রবি, “ওঃ আচ্ছা! সেনেটর সুখেন্দুর ছেলে! ওঃ, তিনি তো মস্ত বড় মানুষ। মহলে অনেক কাজের লোক। কাজ দেখাতে পারলে তো অনেক উন্নতি করতে পারবে।”

একটা হাসি খেলে যায় রবির মুখে, “আর এই হুজুরাইনের কাছে কে আর আসে? সেনেটরের মহলে কত লোকের যাওয়া-আসা। সেখানে হয়তো কোনও ছেলেকে তোমার ভালো লেগে গেল! বিয়েশাদিও তো একদিন করতে হবে, না কী?”

মুখ শুকিয়ে যায় মিতার। সে হয়তো রবির এইরকম প্রতিক্রিয়া আশা করেনি। মাথা নিচু করে বলে, “কিন্তু কাকা—’’

হাসিমুখে রবি বলে, “কিন্তু কী, মিতা?”

মাথা নাড়ে মিতা, “না কাকা, কিছু না।”

বাড়ির অন্য কাজের লোকেদের মুখে সে বড় মানুষ সেনেটরদের সম্বন্ধে কানাঘুষো কিছু শুনেছে, কিন্তু সে কথা সে রবিকে মুখ ফুটে বলতে পারবে না।

রাত হয়ে গেছে। কিন্তু প্রবল গর্জন করে ঝরে চলে বৃষ্টি। ট্রাম টার্মিনাসের সামনের রাস্তা দিয়ে নদীর মতো বয়ে যায় জলস্রোত। মাথার ওপরে ট্রামলাইনের ওপর কাচের তালের মতো ইঞ্জিনটা গুঞ্জন তুলে কাঁপে। বৃষ্টির ধারায় তার নীল দ্যুতি দেখায় জ্যোতির্বলয়ের মতো। ইঞ্জিনের পেছনের অন্ধকার ফাঁকা কামরা দুটোর ছাদ থেকে জলপ্রপাতের মতো জল গড়িয়ে পড়ে।

ট্রামলাইনের ওঠার সিঁড়ির নীচে একটা ছোট গুমটিতে অপেক্ষা করে রজত। তার পায়ের কাছে ম্লান নীল আলো ফ্যালে একটা ক্রিস্টাল লন্ঠন।

জলের ওপর দিয়ে দৌড়োনোর ছপছপ শব্দ ওঠে। একটু বাদেই ছাতা বন্ধ করতে করতে গুমটিতে এসে ঢোকে অতীন, “তৈরি থাকো। দুজনেই এদিকে আসছে। অম্বরিষ আর বিভূতি দুজনেই একসঙ্গে সেরেস্তা থেকে বেরিয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে পড়বে।”

উঠে দাঁড়ায় রজত।

“কোথায় যাচ্ছ?’’ প্রশ্ন করে অতীন।

“আমি ওপরে প্ল্যাটফর্মে যাচ্ছি। তুমি নীচে একজনকে আটকে রেখো। ওপরের জন আমার।”

অন্ধকার জনহীন প্ল্যাটফর্মের একটা বেঞ্চে বসে খাপ থেকে তলোয়ার বের করে রজত। তলোয়ারের ডগা মাটিতে ঠেকিয়ে হাতল ধরে রাখে এক হাতের মুঠোয়। বিরামহীনভাবে বৃষ্টি পড়তে থাকে, ভিজতে থাকে রজত।

খানিক বাদে আবার জলের ওপর দিয়ে হাঁটার শব্দ হয়। বৃষ্টির ধারার মধ্যে দিয়ে দুজন হেঁটে আসে। লন্ঠন নিভিয়ে দিয়ে গুমটির অন্ধকার থেকে লক্ষ রাখে অতীন।

বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে ট্রামের ইঞ্জিন হুইস্‌ল শোনা যায়। ট্রাম ছাড়ার সময়ে হয়ে এসেছে। লোক দুজন হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেয়, তবে তার মধ্যে একজন কিছুটা পিছিয়ে পড়ে।

হনহন করে হেঁটে একজন যখন সিঁড়ি দিয়ে উঠছে, অন্যজন তখনও গুমটির কাছে। গুমটির ভেতর থেকে মাথা বাড়িয়ে অতীন ডাক দেয়, “হুজুর! অম্বরিষ, হুজুর!”

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে লোকটা, “কে?”

উত্তর দেয় না অতীন, গুমটি থেকে বেরিয়ে এসে দু-হাতে তার জামা ধরে হিড়হিড় করে তাকে টেনে ফেলে দেয় গুমটির ভেতরে মেঝেতে। তারপর অন্ধকারের মধ্যেই তার ওপর তলোয়ারের কোপ মারতে থাকে এলোপাথাড়ি। অবিশ্রান্ত বৃষ্টির শব্দে তার আর্তনাদ দ্বিতীয় ব্যক্তির কানে পৌঁছোয় না।

দ্বিতীয়জন প্ল্যাটফর্মে উঠে ট্রামের কামরার দিকে যাচ্ছে, বেঞ্চে বসা রজত প্রশ্ন করে, “বিভূতি সাব, আপনি নাকি ফৌজে নামকরা তলোয়ারবাজ ছিলেন?’’

উত্তর দেওয়ার বদলে রজতের দিকে ঘুরে খাপ থেকে তলোয়ার টেনে বের করার চেষ্টা করে দ্বিতীয় ব্যক্তি। কিন্তু তার আগেই লাফিয়ে ওঠে রজতের তলোয়ার, তার তলপেট থেকে বুক অবধি চিরে দেয়। প্ল্যাটফর্মে আছড়ে পড়ে বিভূতির দেহ, বৃষ্টির জলে মিশতে থাকে তার রক্ত।

নীচে নেমে আসে রজত। গুমটির ভেতর লন্ঠনের নীল আলো জ্বলে। মেঝেয় জল, কাদা আর রক্তে মাখামাখি হয়ে পড়ে অম্বরিষের কোপানো দেহ, তার একদিকে দাঁড়িয়ে হাঁপায় অতীন। রজতকে দেখে জিজ্ঞাসার ভঙ্গিতে চোখ তোলে সে, “হয়ে গেছে?”

নীরবে ওপর-নীচে মাথা নাড়ে রজত।

লন্ঠনটা তুলে ধরে অতীন, “চলো!”

লন্ঠনের আলোতে হঠাৎ কিছু চোখে পড়ে রজতের। হাত তুলে অতীনকে নিরস্ত করে সে অম্বরিষের লাশের পায়ের দিকে ঝুঁকে দ্যাখে।

অতীনের তলোয়ারের কোপে অম্বরিষের একটা পায়ের পাতা প্রায় দু-টুকরো হয়ে গেছে। সেখান জুতো আর পায়ের পাতার ফাঁকে আঙুল ঢুকিয়ে কিছু একটা টেনে বের করে তুলে ধরে রজত।

কপালে ভাঁজ পড়ে অতীনের, “ফোটোক্রিস্টাল! জুতোর মধ্যে লুকোনো ছিল!”

লন্ঠনের ক্রিস্টাল বের করে তার মধ্যে ফোটোক্রিস্টালটা ভরে দেয় অতীন। গুমটির দোয়ালের গায়ে একটা চতুষ্কোণ আলোর ছবি পড়ে। কয়েকটা চিঠির ছবি।

চিঠিগুলো পড়তে থাকে অতীন। বিস্ফারিত হয়ে ওঠে তার চোখ, মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে গালাগালি, “হারামির বাচ্চা উজ্জ্বল দু-দিকেই খেলছে!”

উত্তর না দিয়ে কপাল কোঁচকায় রজত, বৃষ্টির আওয়াজের মধ্যেও তার কানে অন্য একটা শব্দ এসেছে।

শব্দের কারণটা বুঝতে রজতের কয়েক সেকেন্ড লাগে। আচমকা সে অতীনের জামাটা মুঠো করে ধরে একটানে নিয়ে আসে গুমটির বাইরে, তারপর তাকে নিয়ে ঝাঁপ দেয় জলকাদার মধ্যে।

পরের মুহূর্তে তার পেছনে গুমটিটা সশব্দে উড়ে যায় এক নীল বিস্ফোরণে।

“মিসাইল!” অতীনের কানের কাছে মুখ এনে রজত বলে।

মাথা নাড়ে অতীন, “কোথায়?”

আঙুল তোলে রজত। বেশ অনেকটা দূরে, যেখানে মাথার ওপর ট্রামলাইনটা বাঁক নিয়েছে, সেখানে ট্রামলাইনের একটা থামের কাছে বৃষ্টির ঝাপসা চাদরের পেছনে একটা ছায়ামূর্তি নজরে পড়ে।

কী করবে, বোঝার চেষ্টা করে রজত। মাথার ওপর আবার ইঞ্জিনের হুইস্‌ল শোনা যায়, সঙ্গে চাকার শব্দ। ট্রাম প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে যাচ্ছে।

মনস্থির করে নেয় রজত। মিসাইল খুব একটা নির্ভুল হাতিয়ার নয়। একটা ফাঁপা শামুক বাঁশের নলের ডগায় কিছুটা ক্রিস্টালের গুঁড়ো ভরা থাকে, আর তার পেছনে ঠাসা থাকে বারুদ। লঞ্চারের ট্রিগার টিপলে বারুদে আগুন ধরে কাঠিটা হাউইয়ের মতো ছুটে আসে। ধাক্কা খেলে তার মাথার ক্রিস্টালের গুঁড়োয় বিস্ফোরণ হয়। ওই অস্ত্র দিয়ে কোনও ছুটন্ত মানুষকে নিশানা করা মুশকিল। সেই সুযোগ নিতে হবে।

গুমটির উলটোদিকে একটা পাথরের স্থাপত্য। মানুষের অম্বালিকায় আসার পর কোনও ঘটনার স্মারক। আঙুল তুলে তার দিকে অতীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে রজত।

মাথা নাড়ে অতীন। লাফ দিয়ে উঠে দৌড় দেয় তার দিকে।

কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করে রজত, তারপর সে-ও লাফিয়ে উঠে দৌড় দেয় উলটোদিকে, প্ল্যাটফর্মে ওঠার সিঁড়ির দিকে।

দূর থেকে অতীনকে লক্ষ্য করে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে ছুটে আসে একটা লালচে-হলুদ শিখা।

কয়েক লাফে সিঁড়ি পেরিয়ে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে দৌড়োয় রজত, ট্রাম তখন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে।

পাথরের স্থাপত্যের পেছনে ঝাঁপ দেয় অতীন। পরের মুহূর্তে ছুটে আসা শিখাটা স্পর্শ করে সেটাকে।

প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্ত থেকে লাফ দেয় রজত। আঁকড়ে ধরে ট্রামের দরজার হাতল।

একট নীল বিস্ফোরণে উড়ে যায় স্থাপত্য, বৃষ্টির সঙ্গে এবার নেমে আসে পাথরের টুকরো আর ধুলো।

শরীরটাকে টেনে ট্রামের পাদানিতে নিয়ে আসে রজত। তলোয়ার বের করে তার ডগা নীচের দিকে করে ধরে। হাতলে বাঁ হাত রাখে ডান হাতের নীচে।

পাথরের স্তূপের নীচে মাথা গুঁজে শুয়ে থাকে অতীন, সে জানে, আততায়ী তার একটু নড়াচড়া দেখলেই ছুটে আসবে মিসাইল।

দুলতে দুলতে ঘড়ঘড় আওয়াজে ট্রাম পৌঁছোয় লাইনের বাঁকে। তলোয়ারের মুখ নীচের দিকে করে লাফ দেয় রজত।

নীচে আততায়ী তখন মিসাইল লঞ্চার তুলে বৃষ্টির পেছনে অতীনের সন্ধান করছে। মাথার ওপরে রজতের উপস্থিতি সে টের পাওয়ার আগেই রজতের তলোয়ার বর্শার মতো তার ঘাড় ফুঁড়ে মাটি স্পর্শ করে। এক মুহূর্ত বাদেই তার মুখ থুবড়ে-পড়া দেহের দু-পাশের মাটি স্পর্শ করে রজতের দুই পা। ছিটকে যায় জল আর রক্ত।

জলকাদা মাখামাখি হয়ে একটু বাদে অতীন এসে হাজির হয়। তার মাথা থেকে বৃষ্টির জলের সঙ্গে গড়িয়ে পড়ে রক্তের ধারা।

মাটিতে পড়ে-থাকা লাশটাকে একটা লাথি কষায় সে, “ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল, শালা বেইমান, রেন্ডির বাচ্চা!”

রাত আরও গভীর হয়েছে। খুঁটিপাড়ার আস্তানায় দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঠররার গ্লাস হাতে বসে থাকে রজত। তার মুখে একটা অদ্ভুত হাসি, দৃষ্টি হারিয়ে গেছে কোন দূরে। তার থেকে একটু দূরে মেঝেয় বসে রিমা কাপড়ে রিফু করে। বাইরে থেকে ভেসে আসে বৃষ্টির আওয়াজ।

“রিমা, ঠররা আর আছে?’’ নেশা-জড়ানো গলায় প্রশ্ন করে রজত।

“আছে অল্প।”

“দাও!”

একটা দেরাজ থেকে ঠররার বোতল বের করে রিমা। আর ঠিক তখনই বাইরে থেকে ভেসে আসে বাঁশিতে আওয়াজ। কোনও কালান্দর এই বর্ষাতেও বাঁশি বাজিয়ে হেঁটে যাচ্ছে পথ ধরে।

বাঁশির সুরটা রজতের চেনা। তার শব্দে তার মনে পড়ে যায় বহুকাল আগের আগের এক সন্ধের কথা। একটা ছোট ছেলে তার ছোট ছোট আঙুলে বাঁশিতে সুর তোলার ব্যর্থ চেষ্টা করছে।

নিজের অজান্তেই সুরটা গুনগুন করে বেরিয়ে আসে তার গলা দিয়ে।

কিছুক্ষণ বাদে রিমাও গেয়ে ওঠে সুরটা।

আশ্চর্য হয়ে রিমার দিকে তাকায় রজত, “তুমি সুরটা জানো?”

মাথা দোলায় রিমা, “হ্যাঁ, আমাদের গ্রামে এক বুড়ো কালান্দরকে এই সুরটা বাজাতে শুনেছি।”

বাঁশির সুরটা আবার বাইরে কেঁদে কেঁদে ওঠে। রজতের মুখের কঠিন ভাবটা কেমন নমনীয় হয়ে আসে, “ছোটবেলায় আমার বাঁশি বাজাতে খুব ভালো লাগত। কিন্তু আমার বাবার পছন্দ ছিল না। বনেদি পরিবারের বিষয়ী মানুষ, পুরুষের ধর্ম বলতে বুঝত তলোয়ারের জোরে সম্পত্তি রক্ষা। আমার জন্মের সময় মা মারা যায়, তার জন্যে বাবা হয়তো মনে মনে আমাকেই দোষ দিত, আমার কোনও কাজই বোধহয় তাই বাবার পছন্দ হত না।”

হাতের খালি ঠররার গ্লাসটার দিকে তাকায় রজত, “যখন হোমিগঞ্জ থেকে চলে আসি, তখনই খুব অসুস্থ ছিল। এখনও বেঁচে আছে কি না কে জানে!”

একটা বোতল থেকে রজতের গ্লাসে ঠররা ঢেলে দেয় রিমা। গ্লাসে চুমুক দিয়ে রিমার মুখের দিকে তাকায় রজত। তার চোখের পেছনের সেই উন্মত্ততা যেন আজ ঘুমিয়ে পড়েছে, “রিমা, বাড়ি ফিরে যাবে?”

বিস্মিত দৃষ্টিতে রিমা রজতের দিকে তাকায়। যেন সে নতুন কাউকে দেখছে, “বাড়ি?”

“হ্যাঁ। তোমাদের গ্রামে। এশারগাঁও। হোমিগঞ্জ না। কালভৈরব পাস দিয়ে না, কাফিলা যাওয়ার পথ ধরে সোজা যদি তোমাদের গ্রামে চলে যাই?”

“পারলে তো আমি এখনই যাই। এই নোংরা, ভয়ানক শহরে আমি আর থাকতে চাই না। কিন্তু ভয় করে। ফের যদি কিছু হয়?”

ম্লান হাসি হেসে দু-দিকে মাথা নাড়ে রজত, “কী আর হবে। একটা তলোয়ারবাজির ম্যাচে দৈবাৎ একটা দুর্ঘটনা ঘটেছিল। তার থেকে মারামারি। তলোয়ারবাজদের মৃত্যু নিয়ে কেউ বেশি দিন ভাবে না।”

“কিন্তু বিজনের ভাই? সে যদি আমাদের খোঁজ পায়? বদলা নিতে আসে?” ইতস্তত করে বলে রিমা।

“বিজনের ভাই! হিমু? কোথায় আছে জানো সে?’’ রজতের কণ্ঠস্বর আবার কর্কশ হয়ে ওঠে।

দু-দিকে মাথা ঝাঁকায় রিমা, “না! এখন কোথায় আছে, কী করে জানব? যখন হোমিগঞ্জ ছেড়ে আসি তখন দৌলতনগরের নিউটন অ্যাকাডেমিতে পড়ত।”

“দৌলতনগরের নিউটন অ্যাকাডেমিতে কোনও হিমু পড়ে না।” ঠোঁট বেঁকে যায় রজতের, “লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েছি!”

“হিমুর খোঁজ নিয়েছ? কেন?” বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে রিমা।

গ্লাসে চুমুক দেয় রজত, মুখে তার বাঁকা হাসি, “এখানে আসার পর কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল, তাই খোঁজ নিয়ে রেখেছি!”

রজতের গ্লাসে ঠররা ঢালে রিমা, “তাহলে বোধহয় বাড়ি চলে গেছে।” একটা লম্বা শ্বাস নেয় রিমা, “অন্য সবাই হয়তো পুরোনো কথা ভুলে গেছে। কিন্তু হিমু—’’

মাথা নাড়ে রজত, “হিমু? আসতে দাও আমাদের খোঁজে, কিছু করার আগেই খতম করে দেব।”

“বেচারা!’’ রিমার মুখ দিয়ে তার অজান্তেই কথাটা বেরিয়ে যায়।

রজতের ঠোঁট ফের বেঁকে যায়, “কেন? হিমুকে আমি মারলে তোমার খুব কষ্ট হবে?”

“না, না!” ব্যস্ত হয়ে উত্তর দেয় রিমা, “তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে? কিন্তু বাচ্চা হিমু, যে কিছু করেনি, তাকে মারা—’’ চোখের কোণে চিকচিক-করা জলটা হাত দিয়ে মুছে নেয় রিমা, “এমন নিষ্ঠুর কাজ, মহাকাল করুন, সেদিন যেন না আসে।’’

উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে ঠররার গ্লাসে চুমুক দেয় রজত।

রজত মাথাটা নিচু না করলে রিমা দেখতে পেত, তার কালি-পড়া চোখের পেছনে আবার জেগে উঠেছে অল্প কিছুক্ষণের জন্যে ঘুমিয়ে-পড়া সেই উন্মত্ততা।

১০

নিমুর বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। তার বংশপরিচয় কারও জানা নেই, কিন্তু পোশাকের পারিপাট্য দেখলে তাকে বড় ঘরের কেউ বলে ভুল হয়। সেনেটর সুখেন্দু যখন জীবিত ছিলেন তখন নিমু তাঁর ব্যক্তিগত মাসাজার ছিল। তিনি মারা যাওয়ার পর নিমু চাকরিটি হারায় বটে, কিন্তু ততদিনে তার এত সুনাম রটে গেছে যে তার অন্নসংস্থানের অভাব হয়নি। যারাই তাকে দিয়ে মাসাজ করিয়েছে, তারা সবাই একবাক্যে বলে যে নিমুর আঙুলে জাদু আছে।

তবে মাসাজ করা ছাড়াও নিমু অর্থ রোজগারের জন্যে আরও নানারকম ফন্দিফিকির করে থাকে এবং সেই উপলক্ষ্যে শুভার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে।

বেশ কয়েকদিন হল বৃষ্টি থেমে গেছে, আকাশ পরিষ্কার। হাওয়ার স্যাঁতসেঁতে ভাবটাও আর তেমন নেই।

এইরকম এক সকালে হাই তুলতে তুলতে নিমু শুভার বাড়ির দিকে আসছে, তার সঙ্গে একটা ছেলের আর-একটু হলেই ধাক্কা লেগে যাচ্ছিল। ছেলেটা শুভার বাড়ির দোতলার বারান্দার দিকে তাকাতে তাকাতে যাচ্ছিল, নিমুকে দেখতে পায়নি।

কটমট করে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকে নিমু। এ বাড়িতে তার অবাধ যাতায়াত, কেউ তাকে বারণ করে না।

দোতলার একটা ঘরে আলগা পোশাকে আরামকেদারায় আধশোয়া হয়ে বসে ছিলেন শুভা, মুখে তাঁর একটা পাইপ।

মুখ থেকে ধোঁয়া ছাড়েন শুভা, তামাকের গন্ধ ছড়িয়ে যায় ঘরে, “একেবারে সকালে যে? রাতে এলে না, ছিলে কোথায়?”

হাই তুলতে তুলতে শুভার পায়ের কাছে বসে পড়ে নিমু, “জুয়ো খেলছিলাম!”

মুচকি হাসেন শুভা, “জিতলে?”

আবার হাই তোলে নিমু, “না, হেরেছি। বড় মানুষের ছেলে, খেলিয়ে তুলতে হবে। এখন দিনকতক হারব।”

নিমুর একটা কান আলতো করে টেনে দেন শুভা, “তুমি একটা পাক্কা জোচ্চোর!”

একটা চোখ টেপে নিমু। শুভার একটা পা কোলের ওপর টেনে নিয়ে হাঁটুর আর গোড়ালির মাঝখানটা মাসাজ করতে থাকে দু-হাতে।

“সে যা বলবে। কিন্তু তোমার বাড়িতে ঢোকার সময়ে দেখলাম, একটা ছেলে তোমার বারান্দার দিকে তাকাতে তাকাতে গেল।”

পাইপে টান দেন শুভা, আরামে তাঁর চোখ বুজে আসে। নিমুর আঙুলে সত্যিই জাদু আছে।

“বছর উনিশ-কুড়ি বয়স তো? ছোট ছোট চুল, তলোয়ারবাজির নবিশের মতো পোশাক-আশাক? ও রোজ দিনে দুবার এখানে চক্কর মেরে যায়।”

হাত থেমে যায় নিমুর, কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ে তার, “তোমার প্রেমে পড়েছে নাকি?”

হাত বাড়িয়ে নিমুর একটা গাল টিপে দেন শুভা, “দুর বোকা! আমার কি সে বয়স আছে নাকি? ও মিতার জন্যে এখানে ঘুরঘুর করে।”

“ওঃ!’’ একটা হাসি ফোটে নিমুর মুখে, তার হাত আবার চলতে আরম্ভ করে, “কিন্তু মিতা তো সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর মহলে।”

“উঁঃ!” একটা আচমকা নিশ্বাস টানেন শুভা। নিমুর হাত উঠে এসেছে তাঁর হাঁটুর ওপরে। তার হাতে সত্যিই জাদু আছে।

“সে কথা ছেলেটা জানে ভেবেছ?’’

হাসি খেলে যায় নিমুর মুখে, “ও হ্যাঁ, তা-ই তো। কিন্তু সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর মহলে মিতাকে যে কাজ করতে পাঠালে, সে তো পাক্কা মাগিবাজ। মেয়েছেলে দেখলেই তো মুখে নাল ঝরে!”

কপট ক্রোধে চোখ পাকিয়ে নিমুর দিকে তাকান শুভা, “ন্যাকা! বোঝো না নাকি? সেইজন্যেই তো পাঠিয়েছি। একবার যদি মিতাকে মনে ধরে তো আমারও কিছু হয়।’’

কেমন কুৎসিত দেখায় নিমুর মুখের হাসি, “হ্যাঁ, তা ঠিক! তারপর আবার নথখোলনির পাব্বনি উপরি!”

নিমুর হাতের ঠেলায় শুভার জামা উঠে এসেছে প্রায় তাঁর কোমরের কাছে। নিমুর মতোই একটা কুৎসিত হাসি হেসে দু-হাতে চুলের মুঠি ধরে তার মাথাটা গুঁজে দেন তিনি দুই ঊরুর মাঝে।

নিমুর আঙুলে কেবল নয়, জিবেও জাদু আছে।

সে কথা অবশ্য কম লোকেই জানে।

১১

সামাজিক পরিমাপে কাঁসরপাড়ার অবস্থান খুঁটিপাড়ার ঠিক বিপরীত মেরুতে। অম্বালিকায় পৌঁছে সবচাইতে অক্ষত অবস্থায় আবিষ্কার করা এই অঞ্চলের বিভিন্ন ইমারতে, মহলে, সৌধে বাস করে হকিন্সাবাদের ক্ষমতাবান আর মাতব্বররা। এর মধ্যে ভিন্নর স্থাপত্যের অন্যতম উদাহরণ যে মহলটি, সেটি একসময় ছিল সেনেটর সুখেন্দুর। তিনি গত হওয়ার পর ইদানীং এটির মালিক তাঁর পুত্র সেনেটর কৃষ্ণেন্দু।

সেনেটর সুখেন্দুর সম্বন্ধে হকিন্সাবাদের শাসকশ্রেণির মধ্যে দুটি বিপরীত মতবাদ আছে। যারা তাঁর গুণমুগ্ধ, তাদের বিশ্বাস, সেনেট আর চ্যান্সেলরের মধ্যে সেনেটর সুখেন্দু একটা গুরুত্বপূর্ণ সেতুর কাজ করতেন। তাঁর হস্তক্ষেপের জন্যেই ক্ষমতার দাঁড়িপাল্লার দুইটি পাল্লা এক সরলরেখায় বিরাজ করত। অপরদিকে তাঁর সমালোচকদের মত, তিনি আজীবন ক্ষমতার দুটি বিন্দুকে পরস্পরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে নিজের আখেরটি ভালো করে গুছিয়ে নিয়েছেন। সেনেট আর চ্যান্সেলরের মধ্যে যে সংঘাতের আবহাওয়া বর্তমানে তৈরি হয়েছে, তার বীজটি তিনিই রোপণ করে গেছেন।

তবে রাজনীতিতে সেনেটর সুখেন্দুর অবদান সম্বন্ধে নানা মত থাকলেও, তাঁর মহলটি যে ভিন্নর স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন, সে বিষয়ে কারও দ্বিমত নেই। এখানে প্যাঁচানো স্ক্রুয়ের মতো থামের গায়ের খাঁজে খাঁজে ফুটে থাকে নানা রঙের বাহারি ফুল, দেওয়ালের গা বেয়ে নেমে আসে সর্পিল, কুটিল জলরেখা, ঘোলাটে কাচের স্তম্ভ হাতের ছোঁয়ায় বেজে ওঠে অদ্ভুত, অচেনা সুরে, ছত্রাকের মতো ইমারতের ছাদ থেকে দোল খায় রঙিন অর্কিড।

সেনেটর সুখেন্দুর মতো তাঁর পুত্রের অবশ্য রাজনীতির মারপ্যাঁচে বিশেষ অংশগ্রহণ করেন না। উত্তরাধিকারসূত্রে পিতার মহল এবং পদটি লাভ করলেও পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করতে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ আছে বলে মনে হয় না। জীবনের নানা রসাস্বাদনেই তিনি সাধারণত তাঁর প্রয়াস নিয়োজিত করে থাকেন।

শীতের মরশুম এসে গেছে অম্বালিকায়, সন্ধে নামার সঙ্গে সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে নেমে আসে তাপমাত্রা। সুখেন্দুর মহলের দরবার হলের মাঝখানে একটা বিশাল আতশদানে6 জ্বলা আগুন তাই উষ্ণতা ছড়ায়।

আতশদানের একদিকে সেনেটর কৃষ্ণেন্দু। তাঁর দু-পাশে বসে তাঁর ব্যক্তিগত লশকরের তলোয়ারবাজরা। সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর বয়স বেশি না হলেও মাথার চুল পাতলা হয়ে গেছে। উঁচু খাড়া নাকের দু-পাশের চোখ দুটো কোটরাগত। গালে হাত দিয়ে তিনি কী চিন্তা করেন।

আতশদানের অন্যদিকে বসে অতীন আর কওমি পলটনের কিছু লোকজন। তাদের মধ্যে প্রধান সোমনাথ আর বিপুল। সোমনাথ চেহারায় কিছুটা স্থূলকায়, চওড়া কাঁধ আর খাটো ঘাড়ের ওপর বসানো মাথাটা গোলাকার। চামড়ার ভাঁজে প্রায় হারিয়ে যাওয়া দুই সরু চোখে ধূর্ত চাহনি। লম্বা ছিপছিপে চেহারার বিপুলের পাশে তাকে কিছুটা বেমানান লাগলেও, তাদের দুজনের শরীর ভঙ্গি থেকে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে তারা পরস্পরের ঘনিষ্ঠ।

এদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে পেছনদিকে বসে থাকে রজত। সে কওমি পলটনের পদাধিকারী নয়, কেবল পেশাদার খুনি। তা ছাড়া রাজনীতির মারপ্যাঁচে তার কোনও আগ্রহ নেই।

পরিচারিকারা এসে কওমি পলটনের তলোয়ারবাজদের চা আর খাবার পরিবেশন করে। গালে টোল-পড়া একটা মেয়ে এসে রজতের পাশে চায়ের পাত্র আর খাবারের প্লেট নামিয়ে রাখে। আড়চোখে সেদিকে দেখে সামনে তাকায় রজত। আতশদানের অন্য পাশে মাথা নিচু করে বসে-থাকা সেনেটর কৃষ্ণেন্দুকে তার কেমন শিকারি জলশকুনের মতো লাগে।

গাল থেকে হাত নামিয়ে অতীনের দিকে তাকান সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “তাহলে আপনি বলছেন, আমাকে সেনেটের সদস্যদের বোঝাতে হবে যে চ্যান্সেলর সেনেটের সামনে যা প্রস্তাব আনবেন, সেসব বিনা প্রতিবাদে পাস করিয়ে দেওয়াটা সময়ের প্রয়োজন।”

“হ্যাঁ। অম্বালিকার স্বার্থে।” উত্তর দেয় অতীন, “অম্বালিকার যে অরাজক অবস্থা, তাতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করে সুখসমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে সুশাসন দরকার। আর—”

“আর সুশাসনের জন্যে প্রয়োজন ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। অনেকবার শুনেছি যুক্তিটা!’’ একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “কিন্তু সবাই আপনাদের এ যুক্তি মানে না। কেউ কেউ বলে যে ক্ষমতা এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত হলে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়। তার চাইতে বিভিন্ন ভরকেন্দ্রে ক্ষমতাকে বণ্টন করে দিলে সবার স্বার্থই বজায় থাকে।”

“ভুল কথা বলে!’’ জোর গলায় উত্তর দেয় অতীন।

ভ্রূ কপালে তোলেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “তা-ই কি? সেদিন তো আপনাদের নেতা ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বলের মুখেও একই কথা শুনলাম মনে হচ্ছে!”

“ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বলের সঙ্গে আমাদের আর কোনও সংস্রব নেই। আমরা তাঁকে আর নেতা বলে মানি না।” উষ্মার সঙ্গে উত্তর দেয় অতীন।

দু-পাশে হাত ছড়িয়ে দেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “সে আপনাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। আমার জানার দরকার নেই। কিন্তু আমার অবস্থান স্পষ্ট করে দিই। এইসব রাজনীতির কূটতর্কে আমার কোনও আগ্রহ নেই। যে প্রথা যেমন চলছে, তাকে তেমনি চলতে দেওয়া উচিত বলেই আমি মনে করি।”

“তাহলে অম্বালিকার সমৃদ্ধির প্রতি আপনার কোনও দায়বদ্ধতা নেই?’’ কিছুটা রূঢ়ভাবেই প্রশ্ন করে অতীন।

একটা হাসি খেলে যায় সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর মুখে, “আমি মুক্ত বিহঙ্গ। দায়বদ্ধতাতে বিশ্বাস করি না। অম্বালিকা আমাদের আসার আগে থেকেই ছিল, আমাদের পরেও থাকবে। তাকে নিয়ে অযথা দুশ্চিন্তার প্রয়োজন দেখি না।”

আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ান সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “যা হবার তা হবে। সে নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করার চাইতে আনন্দ করা ভালো। আমার খাসমহলে আজ আমার বন্ধুদের জন্যে কিছু আমোদ-প্রমোদের বন্দোবস্ত করেছি। আপনাদেরও সাদরে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।”

উঠে দাঁড়িয়ে মাথা ঝোঁকায় অতীন, “মাফ করবেন, আজ আপনাকে সঙ্গ দিতে পারলাম না। অন্যত্র কিছু কাজ আছে।”

“যেমন আপনার অভিরুচি।” মাথা ঝুঁকিয়ে তলোয়ারবাজদের সঙ্গে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যান সেনেটর কৃষ্ণেন্দু।

সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে অতীনও। বাগানের অদ্ভুতদর্শন স্থাপত্যের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিরক্তির স্বরে বলে, “যা শুনেছিলাম তা-ই। এই সেনেটর কৃষ্ণেন্দু একেবারে অপদার্থ। ফুর্তি করা ছাড়া এর জীবনে আর কোনও উদ্দেশ্য আছে বলে মনে হয় না।”

সবাই মিলে মহল ছেড়ে বেরিয়ে আসছে, একটা চেনা সুর ভেসে আসে রজতের কানে। চেনা সুর, চেনা কণ্ঠস্বর।

হোমিগঞ্জের চালকলের কাছে এই গলায় এই গানই অনেকদিন আগে একবার শুনেছিল সে। অনেক অনেকদিন আগে।

এই ঠান্ডাতেও বিন্দু বিন্দু ঘাম দেয় রজতের কপালে। অনেক পুরোনো স্মৃতি ঠেলে ঠেলে উঠে আসতে চেষ্টা করে ওপরে।

জামার হাতায় ঘাম মুছে সে অতীনকে বলে, “তোমরা এগোও, আমি একটু পরে আসছি।”

কপালে ভুরু তোলে অতীন, কিন্তু কিছু বলে না।

১২

সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর মহলের বিচিত্র বাগানের মধ্যে দিয়ে গানের আওয়াজ লক্ষ করে হাঁটতে হাঁটতে বাগানের শেষ প্রান্তে এসে পড়ে রজত।

খানিকটা ফাঁকা জায়গায় পেছন ফিরে একটা উনুনে শুকনো গাছ-পাতা জ্বালায় একটা লোক। কাজ করতে করতে নিজের মনেই গান করে সে।

নিচু গলায় রজত ডাক দেয়, “মন্টু!”

পেছন ফিরে তাকিয়ে পাথরের মতো জমে যায় মন্টু। হতভম্ব দৃষ্টিতে সে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে রজতের দিকে। যেন ভূত দেখছে।

আবার ডাকে রজত, “মন্টু!”

ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ায় মন্টু, “ছোটেসাব! তুমি!”

মন্টুর কাছে এগিয়ে আসে রজত, “তুই এখানে কী করছিস, মন্টু?”

মন্টুর গলাটা কেমন চড়ে যায়, “জানতে চাইছ, এখানে এসেছি কেন?”

“হ্যাঁ। তা-ই তো জিজ্ঞেস করছি।’’

উনুন থেকে কয়েকটা স্ফুলিঙ্গ হাওয়ায় উড়ে এসে মন্টুর গায়ে পড়ে। সে দিকে দৃক্‌পাত না করে কান্না-জড়ানো গলায় চেঁচিয়ে ওঠে মন্টু, “বড়েসাব তো মারা গেছে। আমি আর হোমিগঞ্জে থেকে কী করতাম?”

“বাবা মারা গেছে!” অস্ফুট কণ্ঠে বলে রজত। অসুস্থ বৃদ্ধ মানুষটার চলে যাওয়া অপ্রত্যাশিত নয়, তবুও তার বুকের কোন এক গোপন কোণে একটা ব্যথা চিনচিন করে ওঠে।

মাথা নাড়ায় মন্টু, “আমি অনাথ। জন্মের পর পথের ধারে কে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছিল। বড়েসাব আমায় কুড়িয়ে পেয়ে মানুষ করে। বড় হলে চালকলটা চালাতে দেয়।”

চোখের জল মোছে মন্টু, “দুনিয়ায় আমার কেউ নেই। এক বড়েসাব ছিল। বাপের মতো। সে-ই যখন চলে গেল—’’ কথা শেষ করার আগেই কান্নায় গলা বুজে আসে মন্টুর।

শূন্যদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা শ্বাস নেয় রজত, “কবে মারা গেল বাবা?”

আবার কাঁদতে শুরু করে মন্টু, “সব তোমার দোষ। তোমার যাওয়ার পরপরই শয্যা নিয়েছিল বড়েসাব। তার দিনকতক বাদে বিজনের ভাই হিমু হোমিগঞ্জ এসেছে শুনে তাকে ডেকে পাঠাল।’’

“কী!’’ নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারে না রজত।

“হ্যাঁ। হিমুকে ডেকে পাঠিয়ে বলল, ‘রজতের ঘাড়ে অম্বালিকার অশুভ আত্মা ভর করেছে। ও আর মানুষ নেই। তোমাকে রজতকে মারতে হবে। তুমি হকিন্সাবাদ গিয়ে কিষেনপ্রতাপের আখড়ায় তলোয়ারবাজি শেখো। আমি চিঠি লিখে দিচ্ছি। নিজের নাম বলবে না। বৈজু নামে আমার এক পুরোনো কর্মচারী ছিল, মারা গেছে বহুদিন। তার নাম বসিয়ে তোমার জন্যে একটা জাল পরিচয়পত্র বানিয়ে রেখেছি। কেউ তোমার পরিচয় জানতে চাইলে সেইটা দেখিয়ে বলবে তোমার নাম বৈজু।’ হিমুকে এইসব বলার দু-দিনের মাথাতেই বড়েসাব মারা গেল।”

রজতের মনে হয়, তার চারপাশের দুনিয়াটা কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরে থেকে উঠে আসতে-চাওয়া ক্রোধের চিৎকার, আর মন্টুর গলায় তলোয়ার চালিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে, দুটোকেই কোনওরকমে দাবিয়ে রাখে সে। সমস্ত দুনিয়া তার দুশমন। কেউ তার বন্ধু নয়, সবাই তার বিপক্ষে। কারও তোয়াক্কা করার তার দরকার নেই।

একটা বিকৃত হাসিতে বেঁকে যায় রজতের মুখ, “আচ্ছা! এইবার বুঝতে পেরেছি!”

উনুনের আগুনের শিখার দিকে তাকায় রজত, “মন্টু, তোকে একটা কাজ করতে হবে। কিষেনপ্রতাপের আখড়ায় গিয়ে হিমুকে বলে আসবি যে রজত খুঁটিপাড়ায় থাকে। সে এখন নিজের পরিচয় দেয় রাজেন বলে, আর কওমি পলটনের হয়ে পয়সার বিনিময়ে মানুষ মারে।’’

বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মন্টু, “কী বলছ কী তুমি?”

নিরুত্তাপ কণ্ঠে রজত বলে, “বলবি, হিমু যখনই চাইবে, আমি লড়তে রাজি আছি। ওর সমস্ত দুঃখকষ্ট আমি এক তলোয়ারের কোপে ঘুচিয়ে দেব।”

“না, আমি ওসব বলতে পারব না! আমি কোনও খুনখারাপির মধ্যে নেই!” কান্না-ভেজা গলায় চিৎকার করে ওঠে মন্টু।

উত্তর দেয় না রজত। মন্টুকে পেছনে ফেলে বেরিয়ে যায় বাগান থেকে।

১৩

নিজের খাসমহলের মেঝেতে বিছানো ফরাশে তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু। ধীরে ধীরে তাঁর পার্ষদ আর ঘনিষ্ঠরা এসেও জোটে। পরিচারিকারা এসে গ্লাসে সুগন্ধি ফুলেল মদ ঢালে।

“তাহলে আমরা মধ্যপন্থা নিচ্ছি! মানে সেনেট বা চ্যান্সেলর কোনওদিকেই আমরা ঢলব না?’’ গ্লাস হাতে নিয়ে প্রশ্ন করে একজন।

মদের গ্লাস-ধরা হাতটা একবার বাঁদিক থেকে ডানদিকে ঘোরান সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “এই যে তোমরা সব এখানে আজ হাজির হয়েছ, আমি জানি, তোমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করে, আমার বাবা খুব কাজের মানুষ ছিলেন। আর সে তুলনায় আমি একটা অপদার্থ। আইয়াশ।’’

সমস্বরে অভ্যাগতদের মধ্যে থেকে অনেকগুলো ‘না, না’ উঠে আসে।

হাতের গ্লাসে চুমুক দেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু। মুখে একটা মৃদু হাসি খেলে তাঁর, “আমার আর আমার বাবার মধ্যে কাজেকর্মে অনেক তফাত। কিন্তু আমার বাবার কাছ থেকে পাওয়া একটা শিক্ষা আমি অক্ষরে অক্ষরে মানি। কী জানো?”

আবার সমস্বরে অভ্যাগতদের মধ্যে থেকে অনেকগুলো ‘কী? কী?’ উঠে আসে।

“রাজনীতিতে আদর্শ জিনিসটা একটা বোঝা। পেছনে টেনে রাখে, এগোতে দেয় না। রাজনীতির একটাই উদ্দেশ্য, ক্ষমতা দখল করা, আর ক্ষমতার জোরে দুনিয়াটাকে ভোগ করা। চ্যান্সেলর আর সেনেট দু-পক্ষই বিশ্বাস করে, তারা একটা আদর্শের জন্যে লড়াই করছে। আমি ওই আদর্শের বোঝা থেকে মুক্ত।”

“তাহলে আমরা এখন কী করব?’’ কেউ প্রশ্ন করে।

খালি গ্লাস বাড়িয়ে ধরেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু। গ্লাসে মদ ঢালে পরিচারিকা।

“কিছুই করব না। সেনেট আর চ্যান্সেলর, পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করে নিঃশেষ হয়ে যাক, তারপর হয়তো তৃতীয় কোনও শক্তির উত্থান হবে। ততক্ষণ আমরা অপেক্ষা করব!”

“কিন্তু অম্বালিকার মানুষ—!’’ দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে মন্তব্য করতে গিয়েও থেমে যায় প্রশ্নকর্তা।

“অম্বালিকার মানুষ!” সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর হাসিটা ছড়িয়ে যায় সারা ঘরে, “মানুষ হল শামুক বাঁশের ঝাড়ের মতো। না কাটলে জঙ্গল হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে ছেঁটে দিলে মজবুত হয়। একবার কেটে ফেললে আবার গজায়। মানুষ আর শামুক বাঁশ দুটোই ব্যবহারের বস্তু। আমাদের ব্যবহারে লাগা ছাড়া এ দুনিয়ায় তাদের আর কোনও উদ্দেশ্য নেই। বুঝলে?”

গ্লাসের মদটা এক চুমুকে শেষ করে ফেলেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “যা-ই হোক, অনেক গুরুগম্ভীর আলোচনা হল। এবার মেহফিল শুরু করা যাক। কী গেম খেলা হবে আজ? কেউ কিছু ঠিক করেছে?’’

“শামুক বাঁশের কথা যখন উঠল তখন শামুক বাঁশের খেলাটাই খেলা যেতে পারে!” কেউ একজন বলে।

“বাঃ! তা-ই হোক তাহলে!’’ খালি গ্লাসটা নামিয়ে রাখেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “গোল করে বোসো তাহলে! যে যার পার্টনার নিয়ে নাও!’’

অতিথিরা সব পুরুষ। প্রত্যেকে তাদের পছন্দের পরিচারিকাকে পাশে টেনে নিয়ে বসে পড়ে।

“আরম্ভ করা যাক?’’ সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর হাসিটা কেমন কুৎসিত দেখায়।

“আমার পার্টনার নেই!’’ পুরুষদের মধ্যে থেকে একজন মৃদু অনুযোগ করে।

“ওহো, তা-ই তো!’’ একজন পরিচারিকার দিকে তাকান সেনেটর সুখেন্দু, “বিনু, একে একজন পার্টনার জোগাড় করে দেওয়া যাবে?’’

মাথা ঝোঁকায় বিনু, “একটা মেয়ে আছে, হুজুর। তবে একেবারে নতুন। সবে মাসকয়েক আগে কাজে লেগেছে।’’

“নিয়ে এসো, নিয়ে এসো!” হাসিটা চওড়া হয় সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর, “এই সুযোগে তোমরাও শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে পারবে!”

মহলের ভাঁড়ারঘরের তাকে মিতা বাসন গুছিয়ে রাখছে, বিনু এসে তাকে ডাক দেয়, “আরে, তুমি এখানে! আর আমি সারা মহল চষে বেড়াচ্ছি। চলো, চলো, হুজুর ডাকছেন!’’

“কিন্তু কেন?’’ উদ্‌বিগ্ন দৃষ্টিতে বিনুর দিকে তাকায় মিতা।

“শামুক বাঁশ খেলতে! চলো!”

“সে কী খেলা? আমি তো খেলতে জানি না!’’ ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে মিতা।

“গেলেই দেখতে পাবে। কী করে খেলতে হয়, শিখিয়ে দেব। আরে, চলো-না।’’ একরকম টানতে টানতেই মিতাকে খাসমহলে টেনে নিয়ে আসে বিনু।

“হুজুর, মিতাকে নিয়ে এসেছি!”

“বেশ। বেশ। এসো মিতা। বিনু, ওকে বসিয়ে দাও!” দুই চোখ ডিমকি হায়েনার মতো চকচক করে ওঠে সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর।

নারী-পুরুষের বৃত্তের মধ্যে মিতাকে একটা খালি জায়গায় জোর করে বসিয়ে দেয় বিনু।

মিতার দিকে তাকান সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, মুখে তাঁর একটা কামুক হাসি, “এই খেলাটার নাম শামুক বাঁশ। শামুক বাঁশ ব্যবহার করার আগে যেমন তার খোলস ছাড়াতে হয়, এই খেলাতেও তেমন পয়েন্ট হারালে খোলস ছাড়তে হয়। যে হারবে, তার পার্টনার খোলস ছাড়বে।’’

“হুজুর, ঠিক বুঝতে পারলাম না।’’ ভয়ার্ত চোখে সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর দিকে তাকায় মিতা।

সামনে রাখা গ্লাস থেকে এক চুমুক মদ খান সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “খেলা শুরু হলেই বুঝতে পেরে যাবে। তোমার কাজ শুধু দান দেওয়া।’’

মিতা দ্যাখে, বৃত্তে বসা সবার মতোই তার সামনেও একজোড়া ছক্কা পড়ে আছে। কোনও এক অনাগত বিপদের আশঙ্কায় তার কপালে ঘামের বিন্দু ফুটে ওঠে।

হাতের মুঠোয় ছক্কা দুটো তুলে ফরাশের ওপর দান চালেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু, “নয়!’’

আঙুল তুলে নিজের ডানদিক থেকে এবার গুনতে শুরু করেন তিনি, “এক, দুই, তিন, চার...।”

গুনতে গুনতে তাঁর আঙুল থামে একজন পরিচারিকার ওপর। তার সামনে রাখা ছক্কা তুলে সে এবার দান দেয়। দুটো ছক্কা মিলিয়ে পাঁচ পড়ে।

‘খোলস! খোলস!’ নারী-পুরুষের বৃত্তটা সমস্বরে চিৎকার করে।

পরিচারিকার পাশে বসা পুরুষটি তার গায়ের জামা খুলে ছুড়ে ফেলে দেয়।

উল্লাসে চিৎকার করে ওঠে সবাই।

শামুক বাঁশ খেলার উদ্দেশ্য পরিস্ফুট হয়ে ওঠে মিতার কাছে। ক্ষুধার্ত ডিমকি হায়েনার ব্যূহে পড়া কস্তা7 হরিণের মতো থরথর করে কাঁপতে থাকে সে।

আবার দান চালেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু। এবার তাঁর গুনতি গিয়ে থামে পরিচারিকা বিনুর পাশে বসা পুরুষটিতে এসে। সে-ও পালটা দান দেয়। দানে সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর চাইতে ফোঁটা কম পড়ে।

একটা মাদক হাসি হেসে বিনু তার ঊর্ধ্বাঙ্গের পোশাক খুলে ফ্যালে। উল্লাসের চিৎকার ছড়িয়ে যায় ঘরে।

আর-একবার দান চালেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু। এবারও তাঁর গোনা গিয়ে থামে পরিচারিকা বিনুর পাশে বসা পুরুষটিতে এসে। এবারেও তার দানে সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর চাইতে ফোঁটা কম পড়ে।

‘খোলস! খোলস!’ সমস্বরে চিৎকার করে সবাই।

একটা বিলোল চাহনি মেলে বিনু তার ঊর্ধ্বাঙ্গের অন্তর্বাস খুলে ফ্যালে। দু-হাতে স্তনভার ধরে শরীর ঘুরিয়ে প্রদর্শন করে।

উল্লাসের চিৎকারে মনে হয়, ছাদ ভেঙে পড়বে।

অবশ, আড়ষ্ট শরীরে মিতা বসে মহাকালের কাছে প্রার্থনা করে।

দান পড়ে, পোশাক উড়ে পড়ে দূরে, উল্লাসের চিৎকারে কাঁপে ঘর, নারী-পুরুষ নগ্ন হয়, মহাকালের কাছে প্রার্থনা করে মিতা।

মহাকাল প্রার্থনা শোনেন না। মিতার পাশের পুরুষটি দান হারে।

সমস্বরে ‘খোলস, খোলস’ চিৎকার ওঠে। মিতার দু-চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে আসে, কেউ পাশ থেকে তার পোশাকের বোতাম খুলতে শুরু করে।

হঠাৎ তখনই বাইরে কোথা থেকে একটা কাচ ভাঙার আওয়াজ হয়, কারা ‘ধর, ধর। মার, মার’ চিৎকার করে ওঠে, একসঙ্গে অনেকজনের দৌড়োনোর শব্দ পাওয়া যায়।

মুহূর্তের মধ্যে ঘরে নিস্তব্ধতা নেমে আসে। অরাজক, অশান্ত হকিন্সাবাদে এইসব শব্দ কোনও শুভসংবাদ বহন করে আনে না।

বৃত্তে বসা নগ্ন আর অর্ধনগ্ন নারী-পুরুষ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে পরস্পরের মুখের দিকে চাইতে থাকে। ঘরের শৃঙ্গাররসের আমেজ যেন এক নিমেষেই বদলে গেছে ভয়ে।

গলাখাঁকারি দিয়ে শুকনো গলায় সেনেটর কৃষ্ণেন্দু বলেন, “কেউ একবার উঠে দ্যাখো কী হয়েছে।”

একজন উঠে ঘরের একটা জানলা খোলে। বাইরে থেকে একঝলক শীতের হাওয়ার সঙ্গে ভেসে আসে বাগানের ফুলের গন্ধ। ঘরের অনাবৃত শরীরগুলো ঠান্ডায় কেঁপে ওঠে।

যে জানলা খুলেছিল, সে বাইরে তাকিয়ে বলে, “কিছু দেখতে পাচ্ছি না। তবে মহলের পাহারাদাররা আর বরকন্দাজরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে।”

একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন সেনেটর কৃষ্ণেন্দু।

আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই খোলা জানলা দিয়ে মুখের সলতেয় আগুন ধরানো একটা মাটির বোতল ঘরের মধ্যে উড়ে আসে। মেঝেতে আছাড় খেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যায় বোতল, তার মধ্যে ভরা তেল আর দাহ্য পদার্থ ফরাশের ওপর ছড়িয়ে পড়ে, দাউদাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে ফরাশে।

আতঙ্কে চিৎকার করে অনাবৃত শরীরগুলো ঘর থেকে বেরিয়ে বাগানের হিমশীতল ঠান্ডায় প্রাণভয়ে এদিক-সেদিক দৌড়োয়। জামার বুকের কাছটা এক হাতে চেপে ধরে তাদের সঙ্গে দৌড়োয় মিতাও।

দৌড়োতে দৌড়োতে মিতা খেয়াল করে, সে গোলযোগ থেকে বেশ দূরে বাগানের একটা নির্জন অংশে এসে পড়েছে। চারপাশে আর কেউ নেই দেখে একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে থাকে মিতা।

আচমকা গাছের পেছন থেকে একটা হাত তাকে টেনে নিয়ে যায় গাছের পেছনে। কালো মুখোশ পরা একটা মুখ নেমে আসে তার মাথার দিকে। চিৎকার করে উঠতে গিয়েও করতে পারে না মিতা, আক্রমণকারীর অন্য হাতটা তার মুখ চেপে ধরেছে।

কালো মুখোশের পেছন থেকে একটা চেনা কণ্ঠস্বর অত্যন্ত নিচু স্বরে মিতার কানের কাছে বলে, “আমার ভুল হয়েছিল, মিতা। এ জায়গা তোমার জন্যে নয়। পালিয়ে যাও এখান থেকে।’’

কণ্ঠস্বর চিনতে বিন্দুমাত্র ভুল হয় না মিতার। বিস্মিত কণ্ঠে সে বলে, “কাকা!”

কিন্তু সে কথা শোনার আগেই মুখোশ-পরা আগন্তুক ছুট দিয়েছে বাগানের অন্যদিকে। তাকে দেখতে পেয়ে হইহই করে তাড়া করে আসে মহলের পাহারাদাররা।

১৪

রজতের বলা কথাগুলো বলে মুখ চুন করে দাঁড়িয়ে থাকে মন্টু।

সস্নেহে তার কাঁধে একটা হাত রাখেন কিষেনপ্রতাপ, “তোমার চিন্তা করার কারণ নেই। হিমুর দায়িত্ব আমার। এখন থেকে হিমু আর বাড়ি যাবে না, আমার এখানেই থাকবে। তুমি কেবল রজতের ওপর দূর থেকে একটু নজর রেখো। কিছু ঘটলে আমাকে খবর দিয়ো।”

মন্টুর মুখ দেখে মনে হয় না, কিষেনপ্রতাপের কথায় সে খুব একটা আশ্বস্ত হয়েছে, তবুও ঘাড় নেড়ে সে বিদায় নেয়।

আখড়া এখন খালি। মন্টুর আসার সঙ্গে সঙ্গেই কিষেনপ্রতাপ সবাইকে বিদায় দিয়েছেন। ধূপ আর ফুলের সুবাস-ভাসা শূন্য ঘরে হিমু মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে কিষেনপ্রতাপের।

“তাহলে আমি কি এখন রজতকে চ্যালেঞ্জ জানাব? তাকে লড়তে ডাকব?”

“না!’’ জোর গলায় বলেন কিষেনপ্রতাপ, “রজত বৃথা গর্ব করেনি। তুমি ওর সামনে কয়েক সেকেন্ডও টিকবে না।”

“কিন্তু কেন ওস্তাদ?’’ মৃদু প্রতিবাদ করে হিমু, “সেদিন হয়তো আমি রজতের সঙ্গে পেরে উঠিনি। কিন্তু তলোয়ারবাজিতে হার-জিত তো থাকেই। আরও কিছুদিন অভ্যাস করলে—’’

হাত তুলে বাধা দেন কিষেনপ্রতাপ, “তলোয়ারবাজি? রজত নিজেও জানে না, কিন্তু সে তলোয়ারবাজির সীমানা অতিক্রম করে গেছে বহুদিন আগেই। রজত যা করে, তার নাম তলোয়ারবাজি নয়।”

বিস্মিত কণ্ঠে হিমু বলে, “বুঝলাম না, ওস্তাদ!”

“তলোয়ারবাজি কাকে বলে বৈজু? কায়দা, তরিকা, প্যাঁচ, হরকত— এইসব তো? তলোয়ার নিয়ন্ত্রণ করার নানা কৌশল রপ্ত করা। কিন্তু রজত তলোয়ারকে নিয়ন্ত্রণ করে না, তার তলোয়ারই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।”

ঘরের একপাশের হাতিয়ার র‍্যাক থেকে একটা ইস্পাত কাচের তলোয়ার তুলে হাতের মোচড়ে দুবার ঘোরান কিষেনপ্রতাপ। তলোয়ার হাওয়া কাটে শনশন আওয়াজ করে।

“কোনও সাধারণ তলোয়ারবাজ রজতের বিরুদ্ধে জিততে পারবে না। রজতের বিরুদ্ধে জিততে গেলে তোমাকে তলোয়ারবাজ নয়, যোদ্ধা হতে হবে।”

তলোয়ারটা হিমুর হাতে ধরিয়ে দেন কিষেনপ্রতাপ, “যোদ্ধার জন্য তলোয়ারই তার মন। মনই তার তলোয়ার।”

“তলোয়ারবাজ আর যোদ্ধা আলাদা?” বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে হিমু। যোদ্ধা শব্দটা তার অজানা।

র‍্যাক থেকে আর-একটা তলোয়ার তুলে নেন কিষেনপ্রতাপ, “তলোয়ারবাজের কাছে তলোয়ার অর্থ, যশ আর জাগতিক সুখ উপার্জনের যন্ত্র। যোদ্ধার কাছে তলোয়ার অস্ত্র নয়। তলোয়ার জীবনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার পথ।”

কোনওরকম সতর্কবাণী ছাড়াই হিমুর গলা লক্ষ্য করে তলোয়ার চালিয়ে দেন কিষেনপ্রতাপ, “যোদ্ধা কায়মনোবাক্যে মৃত্যুকে জীবনের চরম ও একমাত্র সত্য বলে গ্রহণ করবে।”

কিষেনপ্রতাপের তলোয়ার আটকানোর জন্যে নিজের তলোয়ার তোলার সুযোগটুকু পায় না হিমু। তলোয়ারের ডগা তার কণ্ঠনালির মাত্র একচুল দূর দিয়ে বাতাসের হালকা স্পর্শ দিয়ে চলে যায়।

বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে ওঠে হিমুর কপালে। তার মনে হয়, সাক্ষাৎ মৃত্যু তার গলায় চুম্বনরেখা এঁকে দিয়ে গেল।

হিমুকে ভাববার সুযোগ দেন না কিষেনপ্রতাপ। পরের পর আঘাতে তাঁর তলোয়ার বিরামহীনভাবে ধেয়ে আসে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ লক্ষ্য করে। অতি কষ্টে নিজের তলোয়ার দিয়ে সেগুলোকে আটকায় হিমু।

“ফসল বোনা আর ফসল কেটে ঘরে তোলার যে অবিরাম চক্র, কৃষক জীবনের পথ চলে তাকে ঘিরে। বণিকের জীবন আবর্তিত হয় লাভ-লোকসানের হিসেবের চারপাশে। কারিগর নিজের হাতে যা সৃষ্টি করে, নিজের জীবনের মূল্যায়ন করে তা-ই দিয়ে। আর যোদ্ধা? যোদ্ধা জীবনকে দ্যাখে তার অস্ত্রের মধ্যে দিয়ে।”

তলোয়ার নামিয়ে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন কিষেনপ্রতাপ। তাঁর শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক, শরীর শিথিল, মুখে হালকা হাসি। দেখে বোঝার উপায় নেই যে একটু আগেই তিনি দ্রুতগতিতে ঝড়ের মতো আক্রমণ করছিলেন।

তাঁর উলটোদিকে দাঁড়িয়ে হাঁপায় হিমু। কিষেনপ্রতাপকে আটকাতে তার যেন সমস্ত শক্তি ক্ষয় হয়ে গেছে।

মাথা ডানদিকে ফেরান কিষেনপ্রতাপ, বাঁ হাঁটু ভাঁজ করে ডান পা ছড়িয়ে দেন ডানদিকে। তলোয়ার তুলে আনেন ওপরে। মুঠো বাঁ গালের কাছে, ফলা মাটির সঙ্গে সমান্তরাল, ধার ওপরদিকে।

“এই ব্রহ্মাণ্ড যেমন পঞ্চভূতে গড়া, অস্ত্রবিদ্যাও তেমনি পাঁচটি স্তম্ভকে আশ্রয় করে দাঁড়িয়ে। ক্ষিতি, জল, অগ্নি, বায়ু ও শূন্যতা।’’

শরীরের ভঙ্গি পালটান কিষেনপ্রতাপ। দুই পা দু-পাশে ছড়ানো। হাঁটু সামান্য ভাঁজ করা, কোমর নিচুতে। তলোয়ারের মুঠো নাভির কাছে, ফলা ডানদিকে ফেরানো, মাটির সঙ্গে সমান্তরাল।

“ক্ষিতি হল শস্ত্রবিদ্যার শাস্ত্র, তার সঞ্চিত জ্ঞান, তার নানান খুঁটিনাটি। দাঁড়াতে হলে মানুষের যেমন শক্ত জমির প্রয়োজন হয়, যোদ্ধাও তেমনি দাঁড়িয়ে থাকে শস্ত্রবিদ্যার তত্ত্বজ্ঞানকে আশ্রয় করে।”

আবার কোনওরকম সতর্কবাণী ছাড়াই হিমুকে আক্রমণ করেন কিষেনপ্রতাপ। একের পর এক তাঁর তলোয়ারের আঘাত সন্ধান খোঁজে হিমুর শরীরের অসুরক্ষিত অংশের। তার সমস্ত শক্তি আর দক্ষতা ব্যয় করে কোনওমতে আঘাত আটকায় হিমু।

“কিন্তু জিততে হলে কেবল অস্ত্রের তত্ত্বজ্ঞান যথেষ্ট নয়, অস্ত্রের পেছনে যে মন, তার ওপরেও যোদ্ধার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা প্রয়োজন। যোদ্ধার মন হবে জলের মতন। জলের যেমন কোনও নির্দিষ্ট আকার নেই, আধারের আকারই যেমন জলের আকার, যোদ্ধাও সেইভাবে লড়াইয়ের প্রয়োজনমতো রূপ দেবে মনকে। স্বচ্ছ, নিস্তরঙ্গ জলে যেমন অনেক দূর দৃষ্টি চলে, যোদ্ধাও তেমনি নিজের রণদৃষ্টিকে প্রসারিত করতে চিন্তার তরঙ্গকে শান্ত করে মনকে স্বচ্ছ রাখবে।”

অতি কষ্টে একবার পালটা আক্রমণ করতে সক্ষম হয় হিমু। অনায়াসে আঘাত এড়িয়ে যান কিষেনপ্রতাপ।

“যুদ্ধও এক ধরনের কলা। এই কলার মূল বৈশিষ্ট্য প্রচণ্ডতা। আগুন যেমন দাবানল হয়ে বিধ্বংসী রুদ্ররূপ ধারণ করে, যোদ্ধাকেও তেমনি যুদ্ধের সময় সংহারমূর্তি ধারণ করতে হয়ে। যোদ্ধা তাই নিরবচ্ছিন্ন অভ্যাসের মধ্যে দিয়ে নিজের মধ্যে ক্রমাগত রৌদ্ররসের সঞ্চার করবে।’’

হাঁপাতে থাকে হিমু। ঘামে তার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে, বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। অথচ কিষেনপ্রতাপের মধ্যে কোনও পরিবর্তন নেই। শান্ত, নিরাসক্ত ভঙ্গিতে আবার তলোয়ার তোলেন তিনি।

“তবে এ-ও জেনে রাখো যে আত্মকেন্দ্রিকতা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের জনক। বায়ু যেমন বয়ে আনে দূরের শব্দ, দূরের গন্ধ, যোদ্ধাও তেমনি নানা প্রান্তের যোদ্ধাদের রণকৌশল, শস্ত্রবিদ্যার সংবাদ রাখবে। অন্যকে জানলে তবেই নিজেকে পরিমাপ করা সম্ভব।”

কথা শেষ হতে-না হতেই আবার ঝড়ের বেগে হিমুর ওপর এসে পড়েন কিষেনপ্রতাপ। আঘাতের পর আঘাত নেমে তার আসে শরীর লক্ষ্য করে। তলোয়ারের ঠোকাঠুকিতে লেগে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে যায়, হিমুর মনে হয়, কেবল তলোয়ারের ঘূর্ণিঝড় ছাড়া সমস্ত জগতের অস্তিত্ব যেন লোপ পেয়েছে। তার মধ্যেই কোথাও দূর থেকে ভেসে আসে কিষেনপ্রতাপের কণ্ঠস্বর।

“কিন্তু এসবের ওপরেও আছে শূন্যতা। শূন্যতাকে বলে বোঝানো যায় না। তাকে অনুভব করতে হয়। এই ব্রহ্মাণ্ডের সমস্তই শূন্যতা থেকে শুরু হয়ে শূন্যতাতেই সমাপ্ত হয়। প্রকৃতির এই ছন্দে একবার নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত করতে পারলে যোদ্ধা অবচেতনভাবে তখন প্রকৃতির ছন্দে যুদ্ধ করে, শরীরী কৌশল ব্যবহার করে নয়।”

কিষেনপ্রতাপের আক্রমণের তীব্রতা আর প্রতিহত করতে পারে না হিমু, মাটিতে গড়িয়ে পড়ে যায়।

তলোয়ার নামিয়ে তাকে হাত ধরে ওঠান কিষেনপ্রতাপ, “রজতকে হারাতে গেলে তোমাকে শূন্যতাকে করায়ত্ত করতে হবে।’’

১৫

শীত পুরোদস্তুর জাঁকিয়ে পড়েছে। হাড়-কাঁপানো ঠান্ডায় ঝোড়ো হাওয়া শুকনো পাতা উড়িয়ে শনশন আওয়াজ তুলে ছুটে যায় গলি দিয়ে। তার ধাক্কায় ফটক-দেওয়া বাড়িটার জানলা-দরজা ঠকঠক করে কেঁপে ওঠে।

বাড়ির ভেতরে কাগজপত্র-ছড়ানো টেবিলের পেছনে বসে থাকেন শুভা। ঘরের কোণে তেপায়া আতশদানে আগুন জ্বলে, তার আঁচের উষ্ণতা যেন প্রতিফলিত হয় তাঁর মুখে।

তাঁর সামনে অসহায় মুখে দাঁড়িয়ে থাকে রবি, সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না।

“চলে গেছে! মিতা চলে গেছে?”

বিরক্তির স্বরে শুভা বলেন, “হ্যাঁ, তা-ই তো বললাম, দিন দশেক আগে চলে গেছে।’’

“কিন্তু কী এমন হল, হুজরাইন, যে চলে গেল?” বেদনা-মাখা কণ্ঠস্বরে প্রশ্ন করে রবি।

টেবিলে রাখা একটা কাগজ ছুরি দিয়ে কাটেন শুভা, “সে আমি আর কী করে জানব বলো? আমায় বলে কি আর গেছে? সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর বাড়ি থেকে এক মাস আগে চলে এল। শুনলাম, ওঁর মহলে কী সব দাঙ্গাহাঙ্গামা হয়েছে। ভাবলাম, বাচ্চা মেয়ে, হয়তো ভয় পেয়েছে, একটা দোকানে কাজ জোগাড় করে দিলাম। দিন সাতেক আগে সে কাজও ছেড়ে দিয়ে চলে এল। এবার একটু বকাবকি করলাম, তার পরের দিন সকালে উঠে দেখি ঘরে নেই।’’

কাগজের ওপর কর্কশ আওয়াজ করে শুভার ছুরি চলে। সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফ্যালে রবি, “কোথায় গেল, কিছু আন্দাজ করতে পারেন, হুজরাইন?”

হাতের ছুরিটা নামিয়ে রাগত স্বরে শুভা বলেন, “এক কথা আর কতবার বলব? জানলে তো তোমায় বলেই দিতাম। দ্যাখো, কোনও একটা ছোঁড়াকে পটিয়ে তার সঙ্গে ভেগে পড়েছে হয়তো।”

চোখের কোণটা হাতের উলটো পিঠ দিয়ে মুছে নেয় রবি, “হ্যাঁ, তা তো ঠিক, আপনিই বা কী করে জানবেন! হুজরাইন, যদি আপনার আপত্তি না থাকে তাহলে মিতার জিনিসপত্রগুলো দেখতে পারি? যদি কিছু আন্দাজ পাই, কোথায় গেছে।”

“আচ্ছা যাও।” নিমরাজি হয়ে গম্ভীর মুখে বলেন শুভা।

একটা বুড়ি কাজের লোক রবিকে মিতার বিছানার কাছে নিয়ে যায়। বিছানা উলটে-পালটে দ্যাখে রবি, কিন্তু কোথায় গেছে, কেন গেছে, তার কোনও হদিশ পাওয়া যায় না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায় রবি, “যাক গে, আর কী করা যাবে। যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক।’’

নিজের বাক্স থেকে একটা বোতল বের করে বুড়ির দিকে এগিয়ে ধরে রবি, “মিতার জন্যেই আমার আসা-যাওয়া ছিল, তোমাদের সঙ্গেও দেখা হত। আর হয়তো কোনওদিন আসা হবে না। এইটা রেখে দাও, ভালো ফুলেল মদ, রাতে সবাই ভাগ করে খেয়ো।”

কান-এঁটো-করা হাসি হেসে বোতলটা হাত বাড়িয়ে নেয় বুড়ি।

আর-একবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় রবি।

১৬

রাত বেশি হয়নি, কিন্তু তুষার পড়ে অবিশ্রান্তভাবে। জনমানবহীন রাস্তা ডুব দিয়েছে বরফের নীচে। বরফের চাদর মুড়ি দিয়েছে হকিন্সাবাদের বাড়িঘরও, কেবল তাদের জানলার ফাঁক দিয়ে নীলচে আলো চুইয়ে আসে।

কাঁসরপাড়া থেকে একটু দূরে একটা কন্টেনার ডিপোয় একসঙ্গে বসে কওমি পলটনের নেতারা কারও প্রতীক্ষা করে। অগুনতি খাটো পায়ে নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সারি সারি কন্টেনার, ক্রিস্টাল লন্ঠনের আলোয় তাদের ছায়া পড়ে দেওয়ালে।

বোতল থেকে গ্লাসে ঠররা ঢেলে হাতে হাতে এগিয়ে দেয় একজন। হাত বাড়িয়ে গ্লাস নেয় অতীন, “আপাতত এটা পরিষ্কার যে হকিন্সাবাদ থেকে আমরা আর কোনও সাহায্য পাব না। দৌলতনগরের গভর্নর আমাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমাদের অন্তত একবার তার কথাটা শোনা দরকার।”

ঘাড় নেড়ে সায় দেয় সবাই। গ্লাসে চুমুক দেয় অতীন, “কিন্তু পেছনে শত্রু ফেলে যাওয়াটা বোকামি। ব্রিগেডিয়ার উজ্জ্বল এককালে আমাদের নেতা ছিল, আমাদের অনেক খবর জানে, আমরা না থাকলে আমাদের অনেক ক্ষতি করে দিতে পারে। সুতরাং দৌলতনগর যাওয়ার আগে উজ্জ্বলকে খতম করাটা দরকার।”

এবারেও ঘাড় নেড়ে সায় দেয় সকলে।

সবার মুখের দিকে তাকায় অতীন, “উজ্জ্বল সেনেটের ব্রজেশের ছেলেয় বিয়ের মজলিশে গেছে। মজলিশ থেকে সেরে ফেরার সময়ে এই ডিপোর কাছ দিয়েই যাবে। আমাদের তখনই যা করার করতে হবে।”

“তাহলে এখন কী করব?’’ দলের মধ্যে থেকে কেউ প্রশ্ন করে।

“অপেক্ষা!” ছোট্ট জবাব দেয় অতীন।

বাইরে বিরামহীনভাবে তুষার পড়ে চলে, ডিপোর মধ্যে কওমি পলটনের লোকজন অপেক্ষা করে।

ঘণ্টাখানেক বাদে বরফের ওপর দিয়ে হাঁটার আওয়াজ হয়, আধা-অন্ধকার ডিপোয় একজন তলোয়ারবাজ এসে ঢোকে।

অধীর আগ্রহে উঠে দাঁড়ায় অতীন, “বলো মিলন? আসছে?”

নাথা নাড়ায় মিলন, “হ্যাঁ, সেনেটর ব্রজেশের মহল থেকে দুখানা পালকি একসঙ্গে রওনা দিয়েছে। ঠান্ডার জন্যে পালকি কাপড়ে ঢাকা, তবে একটা পালকিতে সেনেটর কৃষ্ণেন্দুর খানদানের নিশান লাগানো, আর অন্যটাতে উজ্জ্বলের।”

“কৃষ্ণেন্দু! কৃষ্ণেন্দু আর উজ্জ্বল দুজনে একসঙ্গে! এবার কী করব আমরা?” প্রশ্ন করে সোমনাথ।

“কী আর করব! দুজনকেই মারব।’’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উত্তর দেয় অতীন, “সেদিনকেও এই কৃষ্ণেন্দু উজ্জ্বলের কথা বলছিল। বোঝাই যাচ্ছে, দুজনে হাত মিলিয়েছে।”

“না!” হাত তুলে বাধা দেয় বিপুল, ‘‘কৃষ্ণেন্দু সরাসরি আমাদের বিপক্ষে যায়নি। তাকে মেরে শত্রুবৃদ্ধি করার দরকার নেই।”

“তাহলে উজ্জ্বলকে মারব কীভাবে? দুজনে তো একসঙ্গে রয়েছে।” জানতে চায় সোমনাথ।

“এক কাজ করা যাক,’’ উত্তর দেয় বিপুল, “আমরা এখানে আক্রমণ করব না। আমরা পালকি দুটোর পেছন পেছন যাব। তারপর কৃষ্ণেন্দুর পালকিটা উজ্জ্বলের থেকে আলাদা হয়ে গেলে উজ্জ্বলকে আক্রমণ করব।”

“আর যদি দুটো পালকি আলাদা না হয়?’’ প্রশ্ন করে অতীন।

দু-পাশে হাত ছড়িয়ে দেয় বিপুল, “তখন তাহলে দুজনকেই মারতে হবে।”

বিপুলের দিকে তাকায় সোমনাথ, “ফাঁকা রাস্তায় এতজন মিলে পালকির পিছু নেওয়া যাবে না, টের পেয়ে যাবে।’’

মাথা নাড়ে বিপুল, “ঠিক আছে, সবার আসার দরকার নেই। আট-দশজনকে নিয়ে আমি যাচ্ছি। উজ্জ্বলকে মারতে তার চাইতে বেশি লোক দরকার নেই। বাকিরা এখানেই থাক।’’

“আর রাজেন?” রজতের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে অতীন।

“রাজেন আসুক। তবে একটু পেছনে থাকুক। দরকার পড়লে আমরা ডেকে নেব।” উত্তর দেয় বিপুল।

১৭

রাত আরও গভীর হয়েছে, তুষারপাত হয়ে চলেছে বিরামহীনভাবে। ফুলের দোকানের বাড়িটা জানলা-দরজা আঁটা, লোকজনের সাড়াশব্দ নেই। দোতলার একটা ঘরে দুটো তেপায়া আতশদানে আগুন জ্বলে। তাদের উষ্ণতা আটকে রাখে বাইরের হাড়-জমানো ঠান্ডাকে। আগুনে ফেলা কাঠফুলের সুগন্ধে মেশে একটা ছিপি-খোলা বোতল থেকে উঠে-আসা ফুলেল মদের মাদক গন্ধ।

ঘরের একটিমাত্র বিছানায় কম্বলমুড়ি দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে থাকেন শুভা। তাঁর ঢুলুঢুলু চোখ দেখলে বুঝতে অসুবিধে হয় না যে ওই বোতলের কিছুটা তরল তাঁর মধ্যে ইতিমধ্যেই স্থানান্তরিত হয়েছে।

শুভার পায়ের কাছে কম্বলের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে নিমু তার আঙুলের জাদু দেখায়। সে জাদুতে মাঝে মাঝেই শুভা চমকে উঠে জোরে শ্বাস টানেন এবং কম্বলের নীচে নড়তে-থাকা নিমুর মাথাটা দু-হাতে চেপে ধরেন।

হঠাৎ নিমুর জাদু বন্ধ হয়ে যায়, আর তার দেহটা কম্বলের তলা থেকে হড়কে বেরিয়ে এসে দড়াম করে মাটিতে আছাড় খায়। ভয়ে আর ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে নিমু।

ফুলেল মদ আর নিমুর আঙুলের জাদুর ঘোর একই সঙ্গে কেটে যায় শুভার। তিনি আতঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন, ঘরের মেঝেয় নিমু মুখ থুবড়ে পড়ে রয়েছে, আর দু-পা দু-হাতে ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা কালো মুখোশ-পরা লোক।

নিমুর পা দুটো লোকটা আচমকা ছেড়ে দিয়ে কোমর থেকে একটা ছোরা বের করে। পা মাটিতে ঠোকায় নিমু, আর একবার ককিয়ে ওঠে, আর শুভা আতঙ্কে চমকে উঠে চেঁচিয়ে ওঠেন, ‘চোর, চোর’ বলে।

মুখোশ-পরা লোকটা শুভার চিৎকার গ্রাহ্য করে না। একটা চেয়ারে আয়েশ করে বসে বলে, “চ্যাঁচামেচি করে লাভ নেই। মদে যা ডোজ ছিল, কাজের লোকজন কেউ কাল দুপুরের আগে উঠবে না। সব নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছে!”

লোকটার কথার অর্থ বুঝতে না পেরে তাকিয়ে থাকেন শুভা।

“চিনতে অসুবিধে হচ্ছে?” মুখ থেকে মুখোশটা খুলে ফ্যালে লোকটা।

বিস্ময়ে আর ভয়ে চেঁচিয়ে ওঠেন শুভা, “রবি! ডাকাত!”

একটা হাসি খেলে যায় রবির মুখে, “হ্যাঁ, আমি ডাকাত। এবার—’’

রবির কথা শেষ হয় না, মাটিতে পড়ে-থাকা নিমু রবিকে লক্ষ্য করে লাফ দেয়।

চেয়ার ছেড়ে নড়ে না রবি। কেবল একটা পা বাড়িয়ে নিমুর পায়ে জড়িয়ে তাকে ফের ফেলে দেয়।

নিমু আর-একবার মুখ থুবড়ে পড়তেই রবি নিচু হয়ে তার হাতের একটা আঙুল একেবারে পেছনদিকে উলটে দেয়।

মট করে হাড় ভাঙার আওয়াজ ওঠে, নিমু তারস্বরে চিৎকার করতে আরম্ভ করে। কিছুটা যন্ত্রণায় আর কিছুটা তার জাদুর আঙুল খোয়ানোর দুঃখে।

একটা বালিশের ওয়াড় তার মুখে ঠুসে দিয়ে তার ঘাড়ে একটা পা রেখে চেয়ারে আয়েশ করে বসে রবি।

ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকেন শুভা, “ওই ঘরের আলমারিতে একটা টাকার থলে আছে, নিয়ে চলে যাও। কিন্তু প্রাণে মেরো না।”

মাথা নাড়ে রবি, “না! টাকাপয়সা চুরি করতে আমি আসিনি।”

কাঁপুনি কিছুটা কমে শুভার। বিস্মিত কণ্ঠে তিনি প্রশ্ন করেন, “তবে?”

শুভার চোখে চোখ রেখে রবি পালটা প্রশ্ন করে, “মিতা কোথায়?”

“মিতা? মিতা তো চলে গেছে!” কেমন তাড়াহুড়ো করে বলেন শুভা।

হাতের ছোরাটা শুভার দিকে ছুড়ে দেয় রবি। তাঁর কান ঘেঁষে ছুটে গিয়ে ছোরাটা দেওয়ালে বিঁধে কাঁপতে থাকে তিরতির করে। আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন শুভা।

আবার মাথা নাড়ে রবি। আঙুল তুলে দেখায় দেওয়ালে বেঁধা ছোরাটাকে, “না, যায়নি। ওই ছোরাটা দিয়ে সেদিনকে তুই কাগজ কাটছিলি। ওটা আমিই মিতাকে রুসোগঞ্জে দিয়েছিলাম। মিতা নিজে থেকে চলে গেলে ওটা ফেলে যেত না।’’

মাটিতে পড়ে-থাকা নিমু আবার ওঠার চেষ্টা করে। তার পেটে একটা লাথি কষিয়ে দেয় রবি, “এই বাঞ্চোত। চুপচাপ পড়ে থাক। নইলে বাকি আঙুলগুলোও ভেঙে দেব।”

চেয়ার থেকে উঠে দেওয়াল থেকে ছোরাটা খুলে নেয় রবি। শুভার চুলের মুঠি ধরে ছোরার ডগাটা চেপে ধরে তাঁর চোখের নীচে, “বলবি? না চোখটা তুলে নেব?”

ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকেন শুভা, “না! না! বলছি! বলছি! নিমু ভালো খদ্দের পেয়েছিল, বেচে দিয়েছি!”

ছোরাটা কোমরে গুঁজে শুভার গালে একটা থাপ্পড় লাগিয়ে দেয় রবি, “ভালো খদ্দের!’’ তার কণ্ঠস্বর শুনে মনে হয় সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না, “কোথায় বেচেছিস?’’

“বাইজি কোঠায়।” ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলেন শুভা।

শুভার চুলের মুঠিটা ধরে আবার নাড়ায় রবি, “কোন বাইজি কোঠায়?’’

“দৌলতনগরে।”

“দৌলতনগরে!” রবির কণ্ঠস্বরে বিস্ময় ঝরে পড়ে!

“হকিন্সাবাদে বেচলে জানাজানি হয়ে যেতে পারে, তাই—!”

শুভার চুলের মুঠি টানে রবি, “বাঃ! ব্যাবসা বুদ্ধি তো টনটনে দেখছি! দৌলতনগরের কোথায়?”

“রূপমঞ্জিলে।” কান্না-ভেজা গলায় উত্তর দেন শুভা।

“রূপমঞ্জিলে!” আর্তনাদ করে উঠে শুভাকে চড়ের পর চড় মারতে থাকে রবি, “রূপমঞ্জিলে! হারামজাদি মাগি, তুই বাচ্চা মেয়েটাকে ওই নরকে পাঠিয়ে দিয়েছিস!”

কয়েক মিনিট বাদে রবির মেজাজ ঠান্ডা হয়। ফোঁপাতে-থাকা শুভাকে ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে বসে একটা ভারী নিশ্বাস ফ্যালে।

“বাপ-মায়ের ঠিক নেই, জ্ঞান হয়ে থেকে চুরি করছি। কখনও টাকাপয়সা, কখনও গয়নাগাটি, কখনও কোনও দামি জিনিস, সারাজীবন ধরে লোকের থেকে নিয়েই গিয়েছি কেবল। এই মেয়েটাকে পেয়ে এই প্রথম মনে হল, না নিয়ে বরং তাকে কিছু দিই। নেওয়ার চাইতে দেওয়াতে যে এত আনন্দ, এর আগে জানতাম না। ভেবেছিলাম, ধুমধাম করে মেয়েটার বিয়ে দেব, তার বাচ্চাগুলো আমার কোলেপিঠে চড়ে খেলবে। তুই খানকি মাগি সেসব ইচ্ছেয় জল ঢেলে দিলি।”

কোমর থেকে ছোরাটা টেনে বের করে করে রবি। শিউরে ওঠেন শুভা, “মেরো না, আমাকে মেরো না। টাকাপয়সা যা আছে, সব নিয়ে যাও, কিন্তু মেরো না।”

মাথা ঝাঁকায় রবি, “আমি চোর, টাকাপয়সা কি দামি জিনিস চুরি করি। কিন্তু তোরা বড় মানুষেরা তো দেখছি আমার চাইতেও বড় চোর রে! মানুষের জীবনটাই চুরি করে নিস।”

ছোরাটা শুভার দিকে তুলে ধরে রবি, “না, তোকে মারব না। মানুষ মারা আমার দ্বারা হবে না। কিন্তু তোর নাক-উঁচু-করা বড়মানুষি জীবনের মতো ঘুচিয়ে দেব। তোকে আর তোর এই নাগরকে ল্যাংটো করে একসঙ্গে দড়ি দিয়ে রাস্তার মোড়ে বেঁধে রেখে যাব। কাল থেকে সারা হকিন্সাবাদের খোরাক হবি তুই।”

একলাফে শুভার কাছে পৌঁছে গিয়ে ছোরা দিয়ে চড়চড় করে তাঁর পোশাক কাটতে আরম্ভ করে রবি। তাঁর কান্নাকাটি, কাকুতিমিনতি সব বৃথা যায়।

বাইরে তখনও একনাগাড়ে বরফ পড়ে চলেছে।

১৮

হাওয়ার শনশন শব্দের সঙ্গে বিরামহীনভাবে তুষারপাত হয়ে চলে। রাস্তার গোড়ালি-ডোবা বরফের আস্তরণের ওপর বাতিস্তম্ভের নীলচে আলো পড়ে। তার মধ্যে দিয়ে ঘসঘস শব্দ তুলে দুটো পর্দা-ফেলা পালকি হাঁটে। পালকির সামনে পালকিবরদার পালকির রশি ধরে হাঁটে, পালকির পেছনে হাঁটে বরকন্দাজরা।

বাড়ির আনাচকানাচ থেকে দুটো পালকির ওপর নজর রাখে কওমি পলটনের আট-দশজন লোক। তাদের সর্বাঙ্গ মোড়া গরম পোশাকের ওপর তুষারের সাদা আস্তরণ।

কন্টেনার ডিপো ছাড়িয়ে এগিয়ে যায় পালকি দুটো। তাদের পেছনে তুষার মাথায় নিঃশব্দে হাঁটে কওমি পলটনের লোকেরা। আর তাদের কিছুটা পেছনে হাঁটে রজত।

দু-এক কিলোমিটার যাওয়ার পর একটা মোড়ে এসে একটা পালকি অন্য একটা রাস্তা নেয়, বরকন্দাজরা সেটাকেই অনুসরণ করে। অন্য পালকিটা পালকিবরদারের পেছনে হাঁটতে থাকে আগের রাস্তা ধরে।

তুষারকণার মধ্যে দিয়ে পালকিটাকে ভালো করে একবার ভালো করে দেখে নেয় বিপুল, “উজ্জ্বলের নিশান। এই পালকিটাই।”

একজন মিসাইল লঞ্চারে মিসাইল কাঠি বসায়। হাত নেড়ে বাধা দেয় বিপুল, “মিসাইল না। দু-দিকে অনেক বাড়ি আছে। আওয়াজ হবে।’’

আস্তে আস্তে পালকির কাছে এগিয়ে যায় দলটা। ছুটে গিয়ে একজন অতর্কিতে পালকিবরদারের ঘাড়ে তলোয়ারের কোপ মারে। লুটিয়ে পড়ে পালকিবরদার, দড়িতে তার হাতের টানে থেমে যায় পালকি। আর-একজন ছুটে গিয়ে পালকির পাশে ফেলা পর্দায় তলোয়ারের খোঁচা মারে, “বেরিয়ে আয় হারামজাদা!”

উত্তরে পর্দার পেছন থেকে একটা তলোয়ারের ডগা বেরিয়ে এসে হামলাকারীর বুকে আমূল বিঁধে যায়। আর সে রক্তাক্ত দেহে মাটিতে লুটিয়ে পড়ার আগেই পালকি থেকে যে লোকটা লাফিয়ে নামে, তুষারপাত আর ঝাপসা নীলচে অন্ধকারের মধ্যেও তাকে দূর থেকে চিনতে অসুবিধে হয় না রজতের।

কিষেনপ্রতাপ।

খুব সম্ভব বিপদ আন্দাজ করে উজ্জ্বল নিজের পালকিতে কিষেনপ্রতাপকে তুলে দিয়েছে।

“এই, তোমরা কারা? আমার সঙ্গে তোমাদের কীসের দুশমনি?” তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করে কিষেনপ্রতাপ।

“তুমি কে?’’ পালটা প্রশ্ন করে বিপুল, “উজ্জ্বল কোথায়?’’

“আমি অনির্বাণ আখড়ার কিষেনপ্রতাপ। নিজের পালকি ছিল না, তাই উজ্জ্বলের পালকিতে বাড়ি ফিরছি।” উত্তর দেন কিষেনপ্রতাপ, “কিন্তু তোমরা কে? খামোখা আমার ওপর হামলা করলে কেন?”

“উজ্জ্বলের পালকিতে এসেছে যখন, তখন উজ্জ্বলের বন্ধুই হবে। মার শালাকে!” বিপুলের একজন সহকারী চিৎকার করে বলে।

তলোয়ার বাড়িয়ে ধরেন কিষেনপ্রতাপ, “দ্যাখো, তোমাদের সঙ্গে আমার কোনও শত্রুতা নেই। হয়তো তোমাদের বুঝতে কিছু ভুল হয়েছে। বৃথা রক্তপাত করে লাভ নেই। আমাকে যেতে দাও।”

উত্তরে চিৎকার করে বিপুল সমেত পুরো দলটা তলোয়ার তুলে তাঁকে চারদিক থেকে আক্রমণ করে।

পলটনের তলোয়ারবাজদের পায়ের ধাক্কায় বরফের গুঁড়ো ছিটকে ওঠে, হাহাকার-করা বাতাসে সেই বরফ গুঁড়ো পাক খেয়ে ওঠে ওপরের দিকে। বাতিস্তম্ভের নীলচে আলোয় মনে হয়, কিষেনপ্রতাপকে ঘিরে ধরেছে বরফের তুফান।

বাঁদিক থেকে মাথার ওপর তলোয়ার তুলে ছুটে-আসা একজনের পথ থেকে শরীরটাকে সামান্য হেলিয়ে সরিয়ে নেন কিষেনপ্রতাপ। সে যখন পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, তার পিঠের ওপর আছড়ে পড়ে তাঁর তলোয়ার। সঙ্গে সঙ্গে ডানদিকে লাট্টুর মতো ঘুরে যান তিনি, এক কদম হটে যান পেছনে। তাঁর মাথা লক্ষ্য করে নেমে-আসা একটা তলোয়ার তাঁর শরীরকে আঘাত না করেই নেমে যায় নীচে। মুহূর্তের মধ্যে কিষেনপ্রতাপ মাথার ওপর তলোয়ার তুলে আঘাত করেন তলোয়ার ধরে থাকা হাতটায়। কবজি থেকে হাতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে তলোয়ার সমেত ছিটকে পড়ে মাটিতে। কাটা হাত থেকে ছড়িয়ে-পড়া রক্ত বাতিস্তম্ভের নীল আলোয় কালো দেখায়। মনে হয়, সাদা বরফের ওপর বুঝি কিছুটা কালি ছিটকে পড়ল।

আর-একজন পেছন থেকে দৌড়ে আসে। কিষেনপ্রতাপ পেছনে ফেরার প্রয়োজনও বোধ করেন না। ডান হাতে ধরা তলোয়ারের ফলাটা শরীরের পেছনে ফিরিয়ে নীচ থেকে ওপরে তুলে দেন। আক্রমণকারীর পেট থেকে বুক অবধি লম্বালম্বি চিরে যায়। তুষার-ওড়ানো বাতাসের কান্নার সঙ্গে মেশে মানুষের আর্তনাদ।

দূর থেকে তুষারের ঝাপসা পর্দার পেছন থেকে লড়াই দ্যাখে। আজ যে-কোনও কারণেই হোক, তার ভেতরের বুভুক্ষাটা অন্যদিনের মতো লড়াইয়ে যোগ দেওয়ার উৎসাহ দেখায় না।

মাথার ওপর তলোয়ার তুলে আবার একজন আক্রমণ করে কিষেনপ্রতাপকে। কয়েক পা পেছনে হটে তিনি তার রাস্তা থেকে সরে যান, তারপর আঘাত করেন তার কোমরে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে একজন তলোয়ার পিঠের পেছনে রেখে তাঁকে আক্রমণ করে বাঁদিক থেকে। সামনে কয়েক পা হেঁটে সরে যান কিষেনপ্রতাপ, তারপর পেছনে ঘুরে লোকটা তলোয়ার পিঠের পেছন থেকে তুলে আনার আগেই চিরে দেন তার পেট।

কওমি পলটনের সবাই এবার একসঙ্গে আক্রমণ করে কিষেনপ্রতাপকে। তাদের পা থেকে ছিটকে-ওঠা তুষারের ঘূর্ণিতে আড়াল পড়ে যান তিনি। কেবল বাতিস্তম্ভের নীল আলোর প্রতিফলনে তাঁর তলোয়ারটা আঁচ করা যায়। দূর থেকে ভালো করে বুঝতে পারে না রজত কী হচ্ছে। শুধু তার মনে হয়, একটা সাদা ঝড়ের কেন্দ্রে যেন নীল বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর প্রতিবার তার সঙ্গে তাল রেখে সাদা বরফের ওপর ছিটকে যাচ্ছে নীল আলোয় কালো দেখানো রক্ত। যেন কোনও রণদেবতা সাদা কাগজের ওপর কালো কালিতে লিখে চলেছেন এক ভয়ানক জঙ্গনামা8

দূর থেকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্যাখে রজত, কিন্তু সেই সমরতুফানে পা রাখতে এগোয় না। তার ভেতরে যে ক্ষুধাটা উদ্দাম হিংস্রতার সন্ধানে সদাই উদ্‌গ্রীব হয়ে থাকে, সেটা যেন আজ কোথায় লুকিয়ে পড়েছে।

কিষেনপ্রতাপের চারপাশের তুষারের ঘূর্ণির তীব্রতা কমে আসে। তাঁকে ঘিরে-ধরা তলোয়ারবাজরা দূরে সরে যায় তাঁর থেকে। একটা উঁচু পাঁচিলের দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে পড়েন কিষেনপ্রতাপ। তাঁর দু-হাতে ধরা তলোয়ার সামনের দিকে উঁচু করে ধরা।

দু-পাশ থেকে সাবধানে দুজনে তলোয়ার উঁচিয়ে এগিয়ে আসে। কিষেনপ্রতাপ আস্তে আস্তে ডানদিকে ফেরেন, ডানদিকের আক্রমণকারী তাঁর ঘোরার সঙ্গে তাল রেখে কয়েক কদম পেছনে হটে যায়। কিষেনপ্রতাপের হাঁটু দুটো ভাঁজ হয়ে আসে, তাঁর তলোয়ারের ফলা ঘুরে যায় ডানদিকের হাঁটুর কাছে, তলোয়ারের হাতল-ধরা দুই মুঠো উঠে আসে বাঁদিকের কোমরের কাছে। সেই অবস্থা থেকে আচমকাই বাঁদিকে ঘুরে যান তিনি। ঘোরার সময়ে তাঁর হাঁটু দুটো সোজা হয়ে যায়, তলোয়ার ডানদিকের হাঁটুর কাছে থেকে কোনাকুনি উঠে যায় ওপরে বাঁদিকে। অতর্কিতে আক্রমণে নড়ার সুযোগ পায় না বাঁদিকের তলোয়ারবাজ, কিষেনপ্রতাপের তলোয়ার তার কণ্ঠনালি দু-ফাঁক করে দেয়।

ডানদিকের তলোয়ারবাজ তখন চলে এসেছে কিষেনপ্রতাপের পেছনে। বাঁ কাঁধের ওপর থেকে সে তলোয়ার চালায় তাঁর গলা লক্ষ্য করে। কিন্তু ততক্ষণে আবার হাঁটু ভাঁজ করে ফেলেছেন কিষেনপ্রতাপ, তলোয়ারের কোপ চলে যায় তাঁর মাথার ওপর দিয়ে।

ডানদিকে ঘুরে যান কিষেনপ্রতাপ। তাঁর দুই মুঠি বাঁ কানের কাছে, তলোয়ারের ডগা ফেরানো আকাশের দিকে। সোজা হয়ে তলোয়ার সেখান থেকে নেমে যায় তলোয়ারবাজের বাঁ কাঁধ থেকে ডানদিকের কোমর অবধি।

আবার ডানদিকে ঘুরে যান কিষেনপ্রতাপ, কেবল ডান হাতে তলোয়ার তুলে আঘাত করেন বাঁদিক থেকে ছুটে-আসা একজনের গলায়।

তবু লড়াইতে যোগ দেয় না রজত। তার স্বাভাবিক রণোন্মত্ততা আজ যেন তাকে পরিত্যাগ করে গেছে। বাতাসের হাহাকারের মাঝে দাঁড়িয়ে পাথরের মূর্তির মতো সে তুষারপাতের ঝরোখার মধ্যে দিয়ে লড়াই দ্যাখে। তার মাথা, কাঁধ, পোশাক তুষারকণা জমে সাদা হয়ে ওঠে।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিষেনপ্রতাপের চারপাশে ভিড়টা খালি হয়ে যায়। বাতাসের হাহাকার আর ইতস্তত ছড়ানো লাশের মাঝখানে কিষেনপ্রতাপের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকে কেবল বিপুল।

লড়াইতে যোগ দিতে চেষ্টা করেও পেরে ওঠে না রজত। বহুকাল আগের এক রাত্রিতে, সেই উটিয়া বাঁদরের সামনে তার শরীর যেমন তার মনের আদেশ অমান্য করেছিল, আজও সে ঠিক সেইরকম অবস্থায় তুষারপাত আর বাতাসের আকুল কান্নার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকে।

বিপুলের দিকে ফেরেন কিষেনপ্রতাপ, তাঁর ডান হাতে ধরা তলোয়ার নীচে নামানো। ফটক তরিকায় তলোয়ার তুলে তাঁর দিকে এক-পা এক-পা করে এগিয়ে আসে বটে বিপুল, কিন্তু কী করবে, মনস্থির করতে পারে না। সে একবার কিষেনপ্রতাপকে বেড় দিয়ে ঘোরার চেষ্টা করে। একবার তলোয়ার তোলে। একবার নামায়।

তলোয়ার নামিয়ে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন কিষেনপ্রতাপ।

আবার তলোয়ার তোলে বিপুল।

কিষেনপ্রতাপের ডান হাতে ধরা তলোয়ারটা সাপের ছোবলের মতো উঠে আসে তার মাথা লক্ষ্য করে। কোনওমতে আঘাতটা নিজের তলোয়ার দিয়ে আটকায় বিপুল। দুটো তলোয়ার ঠোকার আওয়াজ ছড়িয়ে যায় বাতাসে। তুষারকণায় মেশে আগুনের স্ফুলিঙ্গ।

কিষেনপ্রতাপের তলোয়ার-ধরা ডান হাতের মুঠোটা উঠে যায় তাঁর বাঁ কাঁধ অবধি। সেখান থেকে দু-হাতে হাতল ধরে আবার তিনি তলোয়ার নামিয়ে আনেন বিপুলের শরীরের দিকে।

এ আঘাতটাও কোনওমতে ঠেকায় বটে বিপুল, কিন্তু একটা বিকট আওয়াজ তুলে তার তলোয়ারের ফলা ভেঙে খানখান হয়ে যায়।

ছুটে পালাতে-যাওয়া বিপুলকে ঘাড় ধরে ছুড়ে ফেলেন কিষেনপ্রতাপ, পিঠে হাঁটু দিয়ে তাকে চেপে ধরেন বরফের মধ্যে।

“কে তুই? নাম কী তোর? কেন হামলা করলি আমার ওপর?’’

উত্তর দেয় না বিপুল, শুধু অন্ধ আক্রোশে চিৎকার করে।

“তুই তো এদের নেতা মনে হচ্ছে।” গর্জন করেন কিষেনপ্রতাপ, “বোধবুদ্ধি নেই তোর? তোর জন্যে এতগুলো লোক অকারণে মারা গেল।”

উত্তর না দিয়ে চিৎকার করে চলে বিপুল। দূর থেকে নিশ্চেষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে দ্যাখে রজত।

হাতের তলোয়ারটা চারপাশে ঘুরিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে-থাকা লাশগুলো ইঙ্গিত করেন কিষেনপ্রতাপ, “উজবুক কোথাকার! দেখ তোর চারপাশে। এতগুলো লোক জানোয়ারের মতো মরে পড়ে আছে। এদের মৃত্যুর জন্যে তুই দায়ী। লজ্জা করে না তোর?”

উত্তর না দিয়ে ফাঁদে পড়া পশুর মতো কেবল চিৎকার করে চলে বিপুল। তলোয়ারের হাতলের প্রান্ত দিয়ে তার মাথায় সজোরে আঘাত করেন কিষেনপ্রতাপ।

চিৎকার বন্ধ হয়ে যায় বিপুলের। জ্ঞান হারিয়ে তার মাথাটা ঢলে পড়ে বরফে।

উঠে দাঁড়ান কিষেনপ্রতাপ। দূর থেকেই তলোয়ার উঁচিয়ে ধরেন রজতের দিকে। বাতাসের গর্জন সত্ত্বেও তাঁর কথাগুলো স্পষ্ট শুনতে পায় রজত।

“তলোয়ারই মন। মনই তলোয়ার। তলোয়ারকে জানলে মনকেও জানা যায়। অশুভ তলোয়ার, অশুভ মন।”

ক্রোধে জ্বলে ওঠে রজত, তলোয়ার টেনে বের করার চেষ্টা করে খাপ থেকে। কিন্তু অন্য সময় হাতলে হাত রাখলেই যে হাতিয়ার হিংস্র শ্বাপদের মতো রজতের মনের ভেতর জিঘাংসু রক্তপিপাসার আর্তি জানান দিতে দ্বিধা করে না, সেটা যেন আজ নির্বীর্য হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

মনের ভেতরে কয়েক বছর ধরে সযত্নে লালিত বুভুক্ষু উন্মত্ততাকে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করে রজত। কিন্তু এই প্রথম সে তার সন্ধান পায় না। কিষেনপ্রতাপের উঁচিয়ে-ধরা তলোয়ার থেকে তার দিকে যেন ভেসে আসে এক অসীম শূন্যতার আভাস, যেখানে অস্তিত্ব আর অনস্তিত্ব দুই অনুপস্থিত। সেখানে মৃত্যু নেই, অমরত্ব নেই, দিনরাত্রির প্রভেদ নেই। আছে শুধু অন্ধকারে নিমজ্জিত আরও অন্ধকার। সেখানে রজত, তার ক্রোধ, তার রক্তলোভী উন্মত্ততা মুহূর্তের মধ্যে বিলীন, নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

রজতের শিরদাঁড়া দিয়ে এমন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায়, যার সঙ্গে বাইরের তুষারের কোনও সম্পর্ক নেই।

তলোয়ারের হাতল থেকে হাত তুলে নিয়ে কিষেনপ্রতাপের সামনে থেকে দৌড়ে পালিয়ে যায় সে।

জনহীন রাস্তায় লাশের ওপর বরফ পড়তে থাকে।

১৯

সকালের নরম রোদ এসে পড়ে আখড়ার কাঠের মেঝেয়। জানলায় বসা দুটো রামধনু ফিঙে চিপ চিপ আওয়াজ করে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে। কাঠের গামলায় জল পড়ার আওয়াজ আর তাদের ডাক ছাড়া ফাঁকা আখড়ায় কোনও শব্দ নেই।

“তাহলে কওমি পলটনের নেতারা সব একসঙ্গে দৌলতনগর যাচ্ছে?’’ সামনে বসে-থাকা হিমুর দিকে তাকিয়ে বলেন কিষেনপ্রতাপ।

“হ্যাঁ ওস্তাদ। মন্টু একটু আগে তা-ই বলে গেল। ও কৃষ্ণেন্দুর মহলে কানাঘুষো শুনেছে যে কাল বা পরশুই ওরা একটা ব্লিম্প ভাড়া করে যাত্রা করবে।’’

“হুঁ।’’ কয়েকটা চিন্তার রেখা পড়ে কিষেনপ্রতাপের কপালে, “রজত যদি দৌলতনগর থেকে আর না ফেরে, বা অন্য কোথাও চলে যায়, তাহলে তার সন্ধান পাওয়া মুশকিল হবে। এই দুশমনি আর জিইয়ে রাখতে দেওয়া যায় না।”

“তাহলে কী করব, ওস্তাদ?’’

“তুমি রজতকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়ে দাও।’’

“মন্টুর হাত দিয়ে?”

মাথা নাড়েন কিষেনপ্রতাপ, “না। মন্টুকে পাঠিয়ো না। রজত কী করবে, বলা যায় না। তুমি পোস্ট অফিস থেকে চিঠি পাঠিয়ে দাও।’’

“কখন ডাকব রজতকে লড়তে, ওস্তাদ?”

“কাল সকালে। দপ্তরখানার সামনের মাঠে।”

“কালকেই! কিন্তু আমি কি রজতের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে তৈরি, ওস্তাদ?” বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে হিমু।

“না।” শান্তভাবে উত্তর দেন কিষেনপ্রতাপ। ‘‘রজতের সমকক্ষ হয়ে উঠতে গেলে তোমাকে এখনও অনেক অভ্যাস করতে হবে। কিন্তু তার সময় নেই। বহুদিন বাদে এই প্রথম রজতের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরেছে। এই তোমার সুযোগ। রজত তার আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার আগেই তোমাকে আক্রমণ করতে হবে।”

“কিন্তু তা-ও কি আমি রজতের বিরুদ্ধে জিততে পারব?’’ ভয় নয়, সামান্য উদ্‌বেগের ছোঁয়া হিমুর কণ্ঠে।

“খুব সম্ভব না। তোমার মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই তোমাকে রজতের সম্মুখীন হতে হবে।”

ঝগড়া বন্ধ করে উড়ে যায় জানলার পাখি দুটো।

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার প্রশ্ন করে হিমু, “কিন্তু মৃত্যু অবধারিত জেনেও লড়তে যাওয়াটা কি একভাবে আত্মহত্যা নয়?”

“না,” হিমুর চোখে চোখ রেখে উত্তর দেন কিষেনপ্রতাপ, “জীবনের কাছে পরাস্ত হয়ে পালিয়ে যাওয়ার নাম আত্মহত্যা। যোদ্ধা পালানোর পথ খোঁজে না। যোদ্ধার কাছে জীবন শিশিরের বিন্দু কিংবা বিদ্যুতের ক্ষণপ্রভার মতোই। মৃত্যু তার স্বাভাবিক পরিণতি। যুদ্ধের ফলাফল সম্বন্ধে সম্পূর্ণ নিরাসক্ত হয়ে যোদ্ধা যুদ্ধে লিপ্ত হয়।’’

শরীরের দু-পাশে দু-হাত ছড়িয়ে একটা কবিতা আবৃত্তি করেন কিষেনপ্রতাপ, “হে যোদ্ধা, তোমার মৃত্যুর সময় যদি এসে থাকে নিকটে, আর তুমি মারা যাও, তাহলে ভালোই তো। আর মৃত্যুর সময় যদি এসে থাকে, তবু তুমি মারা না যাও, হে যোদ্ধা, সে তো আরও ভালো।”

“গুস্তাকি মাফ করবেন ওস্তাদ, কিন্তু এ কথাগুলো মহাকাল মন্দিরের ভিক্ষুদের মতো শোনাচ্ছে।’’

“অসম্ভব নয়।” মৃদু হাসি ফোটে কিষেনপ্রতাপের ঠোঁটের কোণে, “মহাকালের দর্শন আর তলোয়ারের মধ্যে মিল কোথায় জানো? দুটোরই উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের ‘আমি’ বোধটাকে নাশ করা। এইটা বুঝতে পারলে তলোয়ারই তখন এই জীবন নামক প্রহেলিকার তালা খোলার চাবি হয়ে ওঠে।”

২০

খুঁটিপাড়ার আস্তানায় দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সারারাত বসে থাকে রজত। যে ক্ষমতার ভিতের ওপর এতকাল তার জীবনটা দাঁড়িয়ে ছিল, কিষেনপ্রতাপের সঙ্গে একটিমাত্র মোলাকাতে সেই ভিত টলে গেছে। এতদিন নিজেকে অপ্রতিরোধ্য তলোয়ারবাজ মনে করা রজত এই প্রথম লড়াই থেকে পালিয়ে এসেছে।

পেরিয়ে-আসা জীবনের সবটাই রজতের আজ হঠাৎ কেমন মূল্যহীন, ফাঁপা লাগে। বহুকাল আগে হোমিগঞ্জের জঙ্গলে দেখা একটা কাঠের গুঁড়ির কথা মনে পড়ে তার। আজ তার নিজেকে সেই নিষ্পত্র, পচে-যাওয়া, পোকা-ধরা, মাটিতে অর্ধেক পোঁতা গুঁড়িটার মতো মনে হয়। যার কুসুমিত হওয়ার, পল্লবিত হওয়ার সমস্ত সম্ভাবনাই ফুরিয়ে গেছে। রয়ে গেছে কেবল যে-কোনও মূল্যে টিকে থাকার ইচ্ছেটুকু।

পুরোনো স্মৃতিগুলো ভিড় করে আসে রজতের মনে। অভিযোগের দৃষ্টি নিয়ে কতকগুলো মুখ যেন চেয়ে থাকে তার দিকে। বিজন। কালভৈরবের মন্দিরের এক অচেনা বৃদ্ধ। চিরাগ আখড়ার তলোয়ারবাজরা। বিভূতি। সবাই যেন নীরবে তাদের মৃত্যুর কৈফিয়ত দাবি করে তার কাছে।

একটা গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে। একটু দূরে বসে থাকা রিমা অবাক চোখে তাকায় তার দিকে।

“কী হয়েছে তোমার? কাল সারারাত ধরে এখানে বসে রইলে? ছেলেটার ধুম জ্বর, বারণ করলাম, তা-ও রাতের বেলা বেরিয়ে গেলে! কী করছিলে অত রাত অবধি অত ঠান্ডার মধ্যে?’’

উত্তর দেয় না রজত। নিজের তলোয়ারটা তুলে নিয়ে ন্যাকড়া দিয়ে পালিশ করতে করতে নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে, “আমি কাল দৌলতনগর যাচ্ছি।’’

“দৌলতনগর!” বিস্মিত কণ্ঠে বলে রিমা।

“হ্যাঁ, অতীন আর কওমি পলটনের বাকি লোকজনের সঙ্গে।’’

“আমাদের এই অবস্থায় ফেলে রেখে?” অসহায়ভাবে বলে রিমা, “ছেলেটার জ্বর, হাতে একটা পয়সা নেই, আমাদের কী হবে?”

উত্তর দেয় না রজত। পালিশ করা শেষ করে সে ছোট একটা কাপড়ে মোড়া হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে তলোয়ারটা পরখ করে।

হাত দিয়ে চোখের কোণ থেকে জল মোছে রিমা, “আমাদের কী হবে, তাতে তোমার কিছু যায়-আসে না, না? দৌলতনগর যাওয়ার অছিলায় এবার আমাদের বরাবরের মতো ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চাও, না?”

উত্তর দেয় না রজত, ভাবলেশহীন মুখে নিজের মনে তলোয়ারের যত্ন করতে থাকে।

একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফ্যালে রিমা, “তুমি যখন ঠিকই করে নিয়েছ আমাদের আর তোমার প্রয়োজন নেই, তাহলে আমি চলে যাই। জানতাম, একদিন না একদিন এই সেই দিন আসবে।”

আবার চোখের জল মুছে দেরাজ থেকে জামাকাপড় বের করে ব্যাগ গোছাতে আরম্ভ করে রিমা, “একটা মানুষ এত দয়ামায়াহীন হয় কী করে?”

আস্তানার দরজায় একটা শব্দ হয়। কেউ একটা কাগজ দরজার তলা দিয়ে গুঁজে দিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে চলে যায়।

“সে তোমার খুশি, তুমি থাকবে কি যাবে।” কাগজটা তুলে নিয়ে চোখ বোলায় রজত, “কিন্তু যাবে কোথায়?’’

“তাতে তোমার কী?” রাগতস্বরে উত্তর দেয় রিমা, “আমি তোমাকে কোনও কৈফিয়ত দিতে বাধ্য নই।”

“তা ঠিক।” ব্যঙ্গে বেঁকে যায় রজতের মুখ, “পারলে যাওয়ার আগে তোমাকে কিছু উপহার দিতাম। কিন্তু কী করব, দেওয়ার মতো আমার কাছে কিছু নেই। তবে যাওয়ার আগে তোমাকে একটা ভালো খবর দিই।”

কাগজটা কোলে রেখে শব্দ করে খাপে তলোয়ার ঢোকায় রজত। ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে রিমা।

“কাল সক্কালবেলা, দপ্তরখানার মাঠে হিমুর সমস্ত দুঃখকষ্ট আমি বরাবরের মতো ঘুচিয়ে দেব।”

কোলের কাগজটা রিমার দিকে ছুড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় রজত, “হিমু হারামজাদা আমাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। প্রথমে বিজন, তারপরে এই শালা হিমু। দুটোরই কপালে আমার হাতে খতম হওয়া লেখা ছিল।”

দু-হাতে কাগজটা ধরে বিস্ফারিত চোখে রজতের দিকে তাকিয়ে থাকে রিমা। তার সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে থরথর করে। তার মনে হয়, দু-বছর আগের এক বিয়োগান্ত নাটকের প্রারম্ভে আবার এসে দাঁড়িয়েছে সে।

“হ্যাঁ, হিমুকেও মেরে ফ্যালো!” একটা বুকফাটা চিৎকার বেরিয়ে আসে তার গলা থেকে, “মানুষ মারা ছাড়া তুমি জানোই বা কী? মেরে ফ্যালো, দুনিয়াসুদ্ধ সবাইকে মেরে ফ্যালো!”

একটা বিকৃত হাসি খ্যালে রজতের মুখে, “না, সবাইকে না। সবাইকে মারার দরকার নেই। হিমুর পর কেবল ওই ওস্তাদ কিষেনপ্রতাপ একদিন না একদিন আমার তলোয়ারের ডগায় তার জান খোয়াবে।”

বন্য শ্বাপদের মতো একটা বিশ্রী হাসি বেরিয়ে আসে রজতের গলা থেকে, “তবে চিন্তা কোরো না। হিমুকে তাড়াতাড়ি মারব না। খেলিয়ে খেলিয়ে, ধীরেসুস্থে ওর প্রাণ নেব।”

২১

ফাঁকা আখড়ায় নিজের মনে একাই তলোয়ার নিয়ে অভ্যেস করে হিমু, তার কপাল থেকে ঘাম ছিটকে পড়ে, বিকেলের পড়ন্ত আলো ইস্পাত কাচের ফলায় প্রতিফলিত হয়ে বিন্দু বিন্দু আলোর নকশা আঁকে দেওয়ালে।

ঘরে এসে ঢোকেন কিষেনপ্রতাপ, “তুমি মন্টুকে খবর দিয়েছ?’’

তলোয়ার থামিয়ে মাথা নিচু করে হিমু, “হ্যাঁ ওস্তাদ, কাল একদম সকালে সোজা চলে আসতে বলেছি।”

হিমুর হাতের তলোয়ারের দিকে তাকান কিষেনপ্রতাপ, “আজ আর তোমার এত অভ্যাস করার প্রয়োজন নেই। বিশ্রাম নাও। তুমি যদি জেতার জন্যে ব্যাকুল হয়ে পড়ো, তাহলে হেরে যাবে।’’

চুপ করে থাকে হিমু। আখড়ার গামলায় জল পড়া ছাড়া আর কোনও শব্দ হয় না।

হিমুর চোখে চোখ রাখেন কিষেনপ্রতাপ, “জিতে বাঁচার চেষ্টা কোরো না। বরং মৃত্যুর জন্যে মনকে প্রস্তুত করো। জেনে রাখো, সৃষ্টির বাইরে থেকে দেখলে মাথার ওপরের আকাশ আর তোমার পায়ের নীচে জমি— এই দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে, তার সব কিছুর মূল্য এক পাঁজা কাঠের সমানও নয়। সেসব হারানোর জন্যে তৈরি থাকলে তবু বিজয়ী হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকবে।”

ইতস্তত করে হিমু বলে, “ওস্তাদ, কাল লড়াইয়ের পর আমি আর না-ও ফিরতে পারি। তা-ও একটা কথা জানতে চাইছি। রজতের বাবা আমায় মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন যে রজতের ওপর অম্বালিকার অশুভ আত্মা ভর করেছে। আর আপনি সেদিন বললেন যে রজত যা করে তা তলোয়ারবাজি নয়। এই দুটো কথার মধ্যে কি কোনও যোগসূত্র আছে?”

মাথা নাড়ান কিষেনপ্রতাপ, “আছে। রজত তলোয়ার চালায় না। রজতের তলোয়ারই রজতকে চালায়। কিন্তু এর বেশি আমি আর এখন কিছু বলব না। রজত যদি কাল তোমার কাছে হারে তাহলে তোমার এই প্রশ্নের উত্তর আমি দেব।”

২২

রাত গভীর, তবু পাথরের মূর্তির মতো জেগে বসে থাকে রিমা।

রাতটুকু পোয়ালেই হিমু আর রজত মুখোমুখি হবে দ্বৈরথে। আর সে লড়াইয়ের পরিণাম নিয়ে রিমার মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। বিজনের মতো হিমুও প্রাণ দেবে রজতের হাতে। অকালে ফুরিয়ে যাবে আরও একটা নিরপরাধ প্রাণ।

রিমার মনের ভেতর দিয়ে তার অতীতের স্মৃতিগুলো সার বেঁধে একের পর এক ফোটোস্কেপের ছবির মতো চলে যায়। এশারগাঁওতে কাটানো শৈশব, বিজনের সঙ্গে ঘর বাঁধা, প্রথমবার হকিন্সাবাদ বেড়াতে এসে চোখে ধাঁধা লাগা, আরও পাওয়ার আশায় রজতের কাছে গিয়ে সব খোয়ানো।

একপাশে মেঝেতে শুয়ে-থাকা রজতের দিকে তাকায় রিমা। ঘুমোতে ঘুমোতে চমকে উঠে হাত-পা ছোড়ে রজত, তার হাতের আঙুল বেঁকে যায়, পিঠ ধনুকের মতো হয়ে যায়, গলা থেকে বেরিয়ে আসে গোঙানির মতো শব্দ। যেন সে কোনও ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখছে।

তার বিকৃত চোখ-মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে হঠাৎ একটা ব্যাপার উপলব্ধি করে রিমা। রজতকে নৃশংস খুনি করে তোলার পেছনে তারও অবদান আছে। অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে যদি সেদিন সে রজতের কাছে না যেত, তাহলে শুধু বিজন নয়, আরও অনেক লোকের প্রাণ যেত না। রজত যাদের নির্বিচারে হত্যা করেছে, তাদের রক্ত তার হাতেও লেগে আছে। নিজের আর নিজের সন্তানের প্রাণের ভয়ে সে রজতকে আশ্রয় করে আছে বটে, কিন্তু রজতের সাহচর্যে কাটানো প্রতিটি দিন তাকে আরও নিবিড়ভাবে রজতের পাপের ভাগীদার করে তুলছে।

নিজের কর্তব্য স্থির করে নেয় রিমা। এই নরকের মতো জীবন থাকার চাইতে না-থাকা ভালো। তার প্রাণ যায় যাক, তবু প্রায়শ্চিত্ত করার অন্তত একবার চেষ্টা করে সে দেখবে।

কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে-রাখা একটা ছোরা বের করে সন্তর্পণে হাঁটু ঘষে ঘষে রজতের ঘুমন্ত শরীরের কাছে সরে আসে রিমা। তারপরে এক মুহূর্তও ইতস্তত না করে ছোরা মাথার ওপর তুলে নামিয়ে আনে তার কণ্ঠনালি লক্ষ্য করে।

ছোরা রজতের শরীর স্পর্শ করে না। আচমকাই ঘুম ভেঙে যায় রজতের, এক হাতে চেপে ধরে সে রিমার ছোরা ধরা হাতের কবজি। যেন এই আক্রমণের জন্যেই অপেক্ষা করছিল সে। একটা জান্তব গর্জন বেরিয়ে আসে তার মুখ থেকে, “কী করছিস তুই হারামাজাদি?”

উত্তর দেয় না রিমা, রজতের মুঠো থেকে হাত ছাড়িয়ে সে চেষ্টা করে তাকে আঘাত করতে।

কিন্তু রজতের শক্তির সঙ্গে পেরে ওঠা রিমার পক্ষে সম্ভব নয়। সজোরে তার হাত মুচড়ে দেয় রজত, তার মুঠো থেকে খসে পড়ে ছোরা। তাকে দু-হাতে ঠেলে ফেলে দিয়ে গর্জন করে ওঠে রজত, “শালা পাগলা মেয়েছেলে!”

উঠে দৌড়ে আস্তানার বাইরে পালিয়ে যায় রিমা। হুংকার করে তলোয়ার তুলে তার পেছনে ধাওয়া করে রজত।

বরফের আস্তরণে বাইরেটা সাদা হয়ে আছে। বাতাস কাচের মতো পরিষ্কার। আকাশে ঝকঝক করে অগুনতি তারা। নিস্তব্ধ, নিথর রাত্রে বরফের মধ্যে দিয়ে খালি পায়ে রজতের কাছ থেকে ছুটে পালাতে চেষ্টা করে রিমা।

প্রাণভয়ে মরিয়া হয়ে দৌড়োয় রিমা, আর তার পেছনে তলোয়ার নিয়ে তাড়া করে করে আসে রজত, মুখে তার ক্রূর হাসি।

ঘিঞ্জি খুঁটিপাড়ায় দৌড়োনোর জায়গা বিশেষ নেই। একটা চারদিক ঘেরা মাঠের মতো জায়গায় আটকে পড়ে রিমা, আর পালানোর পথ খুঁজে পায় না। মাঠের একপাশে একটা রাস্তা ঢালু হয়ে ওপরের দিকে উঠে গেছে। সেটা দিয়ে ওপরে উঠতে চেষ্টা করে রিমা, কিন্তু পা পিছলে গড়িয়ে পড়ে নীচে।

তলোয়ার হাতে তার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে রজত। রজতকে এড়াতে গিয়ে ছুটতে ছুটতে একটা নোংরা জলের ডোবার মধ্যে পা পিছলে পড়ে যায় রিমা। সঙ্গে সঙ্গেই সে টের পায়, ঠান্ডায় তার শরীর অবশ হয়ে আসছে, তার আর পালানোর ক্ষমতা নেই।

তলোয়ার হাতে জলের মধ্যে নেমে আসে রজত, তাকে দেখে মনে হয় না, ঠান্ডা তার শরীরকে কোনওভাবে কাবু করতে পেরেছে। আগুনের মতো জ্বলে তার দু-চোখ, “তুই... তুই হিমুর জন্যে... আমাকে…”

রজতের ঠোঁট কাঁপে থরথর করে। তার কথাগুলো কেমন অসংলগ্ন শোনায়।

“না, হিমুর জন্যে নয়! হিমুর জন্যে নয়! তোমার জন্যে!’’ সক্রোধে চেঁচিয়ে ওঠে রিমা।

“কী?’’ থমকে যায় রজত। যেন সে বুঝতে পারছে না।

“তুমি না থাকলে আমার জীবনটা এমন নরক হয়ে উঠত না। এতগুলো লোকেরও হয়তো প্রাণ যেত না।” দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে তার চোখ থেকে। “আমার আর কিছু যায়-আসে না।” দু-হাত জোড় করে রিমা, “আমাকে এখানেই মেরে ফ্যালো রজত। কিন্তু হাত জোড় করছি, কাল তুমি স্বেচ্ছায় হিমুর হাতে প্রাণ দিয়ো। তাহলে হয়তো আমাদের দুজনেরই পাপের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত হবে।”

রিমার কথাগুলো রজতের কানে গেছে বলে মনে হয় না। একটা ক্রোধান্ধ চিৎকার করে সে রিমার বুকে তলোয়ারটা সজোরে বিঁধিয়ে দেয়।

আস্তানার ভেতরে বিছানায় শুয়ে-থাকা রিমার ছেলেটা হঠাৎ জেগে উঠে তারস্বরে কাঁদতে শুরু করে।

২৩

গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকেন কিষেনপ্রতাপ, “আসেনি?”

মাথা নাড়ে হিমু, “না ওস্তাদ। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে যখন এল না তখন মন্টুকে ব্লিম্প টাওয়ারে খোঁজ নিতে পাঠালাম। কিন্তু ততক্ষণে ব্লিম্প চলে গেছে।”

ছলোছলো চোখে বসে-থাকা মন্টুর দিকে তাকায় হিমু, “তারপর খুঁটিপাড়ায় গিয়ে মন্টু দ্যাখে, গলির মধ্যে রিমার লাশ পড়ে আছে, আর আস্তানার ভেতর—”

হিমুর কথা শেষ হওয়ার আগেই মন্টুর পাশে কাঁথায় শোয়ানো বাচ্চাটা কাঁদতে শুরু করে। কোলে তুলে তাকে দোল দিতে শুরু করে মন্টু।

উদ্‌বিগ্ন দৃষ্টিতে কিষেনপ্রতাপের দিকে তাকায় হিমু, “এখন আমরা কী করব, ওস্তাদ?”

মন্টুর দিকে তাকিয়ে কিষেনপ্রতাপ বলেন, “তার চাইতে বড় প্রশ্ন, এই বাচ্চাটার কী হবে?”

“আমি মানুষ করব, হুজুর!” হাউমাউ করে চেঁচিয়ে ওঠে মন্টু, “বড়েসাবও তো আমাকে এমনি করে তুলে এনে মানুষ করেছিল।”

মাথা নাড়েন কিষেনপ্রতাপ, “বেশ। তাহলে তো ভালোই হল।”

মন্টুর দিকে তাকায় হিমু, “তুমি তাহলে কাল একে নিয়ে হোমিগঞ্জ চলে যাও, মন্টু। আমি চিঠি লিখে দেব, আমাদের বাড়িতে গিয়ে উঠো।”

ঘাড় নেড়ে বাচ্চাটাকে কোলে করে বিদায় নেয় মন্টু।

“আমিও কি তাহলে দৌলতনগর যাব, রজতকে ধরতে?’’ প্রশ্ন করে হিমু।

আখড়ার জানলা দিয়ে পরিষ্কার নীলচে-সবুজ আকাশটা দেখা যায়। তার দিকে তাকান কিষেনপ্রতাপ।

“না। রজত তোমার জন্যে অপেক্ষা করে থাকবে। তলোয়ারবাজদের নিয়মকানুন, আদবকায়দার এখন সে আর পরোয়া করে না। তুমি গেলে নিজে না লড়ে কওমি পলটনের দলটাকে তোমার ওপর লেলিয়ে দেবে।”

“তাহলে কী করব?”

“তলোয়ারবাজির সময় যা করো। দুশমনের অসতর্ক মুহূর্তের অপেক্ষা করো। এখন দু-এক মাস চুপচাপ থাকো, রজতকে ভাবতে দাও যে তুমি হাল ছেড়ে দিয়েছ। তারপর দৌলতনগর গিয়ে তাকে খুঁজে বের কোরো।”

“ভাবতে পারিনি যে রজত পালিয়ে যাবে।” হতাশার সুর ফুটে ওঠে হিমুর কণ্ঠে, “দৌলতনগরের ভিড়ে রজতকে খুঁজে বের করা মুশকিল হবে।”

মাথা নাড়েন কিষেনপ্রতাপ, “হ্যাঁ, রজতের দৌলতনগর পালিয়ে যাওয়াটা আমাদের সমস্যা বাড়িয়ে দিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এরও একটা ভালো দিক আছে। এতেই স্পষ্ট যে আমাদের শত্রু অপ্রতিরোধ্য নয়, সে-ও ভয় পায়।’’

“শত্রু? মানে রজত?’’

“না। রজত, রিমা এরা দাবার বোড়ে মাত্র। আমাদের প্রধান শত্রু অন্য কেউ। বা অন্য কিছু।’’

সেদিনকার মতো রামধনু ফিঙে দুটো জানলায় এসে বসে ফের চিপ চিপ আওয়াজে ঝগড়া শুরু করে। চুপ করে কিছুক্ষণ তাদের ডাক শোনেন কিষেনপ্রতাপ।

“তুমি দু-দিন আগে আমাকে কিছু প্রশ্ন করেছিলে। তার উত্তরটা আজ দিই। মানুষ এই অম্বালিকায় এসে ভুল করেছিল। এখানে এসে মানুষ এক অশুভ শক্তির কবলে পড়েছে।’’

“অশুভ শক্তি! বুঝলাম না, ওস্তাদ।”

“এই ব্রহ্মাণ্ডে শৃঙ্খলা আর বিশৃঙ্খলার মধ্যে হামেশা একটা টানাপোড়েন চলে। তোমার শরীর একটা শৃঙ্খলার অধীন। একে টিকিয়ে রাখতে তোমাকে শরীরের যত্ন নিতে হয়, তাকে পুষ্টি দিতে হয়। যদি না করো, তোমার শরীর প্রথমে রোগব্যাধির কবলে পড়বে, তারপর ভেঙে পড়বে। শৃঙ্খলার থেকে বিশৃঙ্খলার অধীনে চলে যাবে। যেমন তোমার শরীর, তেমনি এই সমাজের শরীর। এর নিয়মিত যত্ন না করলে এ-ও শৃঙ্খলার থেকে ক্রমশ বিশৃঙ্খলার দিকে চলে যায়।”

ঝগড়া থামিয়ে জানলা দিয়ে ভেতরে উড়ে এসে গামলার জলে ঝাঁপ দেয় পাখি দুটো। তাদের ডানা থেকে ছিটকে যায় মুক্তোর মতো জলের বিন্দু।

হাত তুলে হাতিয়ার র‍্যাকের দিকে ইঙ্গিত করেন কিষেনপ্রতাপ, “তোমাকে একটা প্রশ্ন করি, বৈজু। অম্বালিকায় আগ্নেয়াস্ত্র নেই কেন? কেন আমরা পৃথিবীর মধ্যযুগের মতো তলোয়ারের ব্যবহারে ফিরে গিয়েছি?”

একটু ইতস্তত করে জবাব দেয় হিমু, “অম্বালিকায় লোহা আর অন্য ধাতু অপ্রতুল বলে। ইস্পাত কাচ বিস্ফোরণের ধাক্কা সামলাতে পারে না।”

“মানলাম। কিন্তু তার বিকল্প কি কিছুই খুঁজে বের করা যেত না? ফোটোক্রিস্টালকে কি হাতিয়ারের রূপ দেওয়া যেত না?”

চুপ করে থাকে হিমু।

সামনে হাতটা ঘোরান কিষেনপ্রতাপ, “তোমার চারপাশে তাকিয়ে দ্যাখো বৈজু। সভ্যতার যে শিখরে পৌঁছে মানুষ পৃথিবী থেকে নক্ষত্রলোক পাড়ি দিয়ে অম্বালিকার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল, অম্বালিকায় পৌঁছে মাত্র কয়েকশো বছরের মধ্যে সেই অবস্থা থেকে তার চূড়ান্ত অবনতি হয়েছে। পৃথিবীর মানুষ প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করত। আর অম্বালিকায় মানুষ প্রতিকূলতার মধ্যে নিজেকে কোনওমতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। নিজের উদ্ভাবনী শক্তি, সৃজনশীলতা হারিয়ে ভিন্নরদের ফেলে-যাওয়া আস্তাকুঁড় থেকে প্রযুক্তি কুড়িয়ে বাঁচে। অম্বালিকায় পা রেখে মানুষ যেন ক্রমাগত পেছনের দিকে হাঁটছে। জ্ঞান, শিল্প, মনুষ্যত্ব প্রতিদিন অল্প অল্প করে হারিয়ে ফেলছে।’’

“কিন্তু কেন ওস্তাদ?’’

“সৃষ্টির আদিতে, যখন গ্রহ-নক্ষত্র দূরের কথা, কাল আর দিক পর্যন্ত জন্ম নেয়নি, তখন শৃঙ্খলা বলে কিছু ছিল না। কেবল ছিল অনন্ত বিশৃঙ্খলা। খুব সম্ভব ভিন্নররা সেই বিশৃঙ্খলার অন্তহীন শক্তিকে করায়ত্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কোনও ভুলের দরুন স্থান আর কালের পর্দার পেছন থেকে সেই বিশৃঙ্খলার একটা চৈতন্যসূত্র এই শৃঙ্খলার জগতে ঢুকে পড়ে। এর প্রভাবে ভিন্নর সভ্যতা নষ্ট হয়ে যায়।”

“গুস্তাকি মাফ করবেন ওস্তাদ। কিন্তু এই সমস্ত কথা আপনি জানলেন কোথা থেকে?” অবিশ্বাসের সুর হিমুর কণ্ঠে।

“অসিমঠে।’’

“অসিমঠ! সে কোথায়, ওস্তাদ? তার কথা তো কখনও শুনিনি।” বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করে হিমু।

“অসিমঠ উত্তর-পূর্বের পাহাড়ে। খুব কম লোকেই তার কথা জানে হিমু। এই অশুভ শক্তিকে পরাস্ত করার জন্যেই বহুকাল আগে অসিতপ বিভাস এর প্রতিষ্ঠা করেন।”

“ভিন্নররা কি এই শক্তিকে বাধা দেবার কোনও চেষ্টা করেনি?”

স্নানপর্ব সমাধা করে জানলা দিয়ে পাখি দুটো উড়ে চলে যায়। তাদের চিপ চিপ আওয়াজ মিলিয়ে যায় দূরে।

“কেউ কেউ হয়তো করেছিল। সে কথা জানার আর এখন কোনও উপায় নেই। কিন্তু ক্ষমতার লোভে ভিন্নরদের একটা গোষ্ঠী এই বিশৃঙ্খলার উপাসক হয়ে ওঠে। অম্বালিকার নানা জায়গায় ভূগর্ভে এদের উপাসনার কেন্দ্র ছিল। অম্বালিকায় আসার পর যখন আমাদের জ্ঞানের চর্চায় ভাটা পড়েনি, যারা এর বিপদ বুঝেছিল, তারা এসবের অনেকগুলো বুজিয়ে দেয়। কিন্তু সব নষ্ট করা যায়নি। রজত হয়তো এইরকমই কোনও উপাসনা গুহার সন্ধান পেয়ে থাকবে। এর সংস্পর্শে আসার পর এই শক্তি রজতকে আশ্রয় করে, তাকে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টির হাতিয়ার করে ফ্যালে।”

আখড়ায় অনেকদিন আগে রজতের চোখের পেছন থেকে উঁকি মারা উন্মত্ততার ছবিটা মনে পড়ে যায় হিমুর। নিজের অজান্তেই যেন শিউরে ওঠে সে।

“এর প্রভাবেই রজত মানুষ মারায় সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে?”

একটা লম্বা শ্বাস টানেন কিষেনপ্রতাপ, “হ্যাঁ। কিন্তু রজত যে শুধু নিজের হাতে মানুষ মারে তা-ই নয়। সে যেখানে যায়, তাকে কেন্দ্র করে বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে। হকিন্সাবাদে রাজনৈতিক সমস্যা ছিল। কিন্তু রজত আসার আগে পর্যন্ত সেটা এমন গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়নি। রজত যেখানে যাবে, সেখানেই হানাহানি, অরাজকতা চরমে উঠবে। সেইজন্যে পিতা হয়েও অরূপ তোমাকে রজতকে প্রাণ নেবার অনুরোধ করেছিলেন। সেইজন্যেই আমি বলেছিলাম রজত যা করে তা তলোয়ারবাজি নয়। বিশৃঙ্খলার শক্তি তার মধ্যে দিয়ে লড়াইয়ের সময় নিজেকে ব্যক্ত করে।”

“কিন্তু ভিন্নরদের কী হল, ওস্তাদ? তারা কি সব নিজেদের মধ্যে মারামারি করে মরে গেছে?’’

কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দেন কিষেনপ্রতাপ, “আমি একটা পালটা প্রশ্ন করি, হিমু। তুমি উটিয়া বাঁদর সম্বন্ধে কী জানো?”

“বন্য পশু। অত্যন্ত হিংস্র। লোকে বলে, ভিন্নররা একসময়ে এদের থেকেই বিবর্তিত হয়ে ধীমান প্রাণীতে পরিণত হয়।”

ধীরে ধীরে দু-পাশে মাথা নাড়ান কিষেনপ্রতাপ, “না, ভুল কথা। উটিয়া বাঁদররা বিবর্তনের ফলে ভিন্নরে পরিণত হয়নি। ক্রমশ অবনতি হতে হতে ভিন্নররাই উটিয়া বাঁদরে পরিণত হয়েছে। ভিন্নররা কোথাও যায়নি হিমু, বিশৃঙ্খলার অশুভ শক্তি তাদের সভ্যতার শিখর থেকে নামিয়ে জঙ্গলের পশু করে তুলেছে।’’

অনেকক্ষণ চুপ করে থাকেন কিষেনপ্রতাপ। তাঁর দৃষ্টি যেন হারিয়ে গেছে কোথাও।

তারপর হিমুর চোখে চোখ রাখেন।

“আর আমরাও যদি সময় থাকতে সাবধান না হই, তাহলে আর কয়েকশো বছরের মধ্যে মানুষও এই অম্বালিকার জঙ্গলে উটিয়া বাঁদরের পাশাপাশি হিংস্র জানোয়ারের মতো ঘুরে বেড়াবে।”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%