হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ঝাড়খণ্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গ্রামটার সামনে ট্রেকারটা যখন হোমাগ্নিকে নামিয়ে দিল তখন বেলা প্রায় দশটা বাজে। গরমকাল, ইতিমধ্যে রোদের তেজ বাড়তে শুরু করেছে। গ্রাম বলতে গোটা দশ-বারো মাটির বাড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে। তাদের দেওয়ালগুলোতে রং-বেরঙের ছবি আঁকা—আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে যেমন দেখতে পাওয়া যায়।
এই গ্রাম বা যে জায়গাতে হোমাগ্নি যাবে বলে এসেছে তার খোঁজ সে পেয়েছে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফির একটা ম্যাগাজিন থেকে। ওয়াইল্ড লাইফ বা বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার শখ আছে হোমাগ্নির। তাই সে কলকাতা থেকে চলে এসেছে এখানে।
গ্রামের ঠিক পিছন থেকেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। আর তা কিছুটা এগিয়েই ধীরে ধীরে উঠে গেছে উপর দিকে। হোমাগ্নির চোখের সামনে জেগে আছে সবুজ জঙ্গলে ছাওয়া দলমা পাহাড়ের সারি। হাতিদের স্বর্গভূমি। পাকা ধানের মরশুমে খাবারের আশাতে ফি-বছরই যারা পাহাড় ছেড়ে হানা দেয় পার্শ্ববর্তী রাজ্য বাংলার বাঁকুড়া-সহ নানান জায়গাতে। তাদের ছবি তোলার জন্যই হোমাগ্নি এসেছে।
যে লোকটার তোলা ছবি ও লেখা ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল সে গতবছর ঠিক এ-সময়তেই এসেছিল এখানে। এ গ্রামে কার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে অর্থাৎ যে লোকটা তাকে গন্তব্যে নিয়ে যাবে তার নামও লেখা ছিল সেখানে। তার নাম যুধিষ্ঠির মাহাতো।
রুকস্যাক আর ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে হোমাগ্নি গাড়ি থেকে নেমে গ্রামের ভিতর পা রাখতেই একদল বাচ্চা ছেলে এসে ঘিরে ধরল তাকে। তাদের খালি গা, খালি পা, পরনে নামমাত্র একটা প্যান্ট। একটু ছোট বাচ্চাদের পরনে সেটুকুও নেই। সম্পূর্ণ উলঙ্গ তারা। তাদের দেখেই বোঝা যায় তারা খুব গরিব। হোমাগ্নি তাদেরকে জিগ্যেস করল, ‘যুধিষ্ঠির মাহাতোর ঘর কোনটা?’
বাচ্চাগুলোও মনে হয় অনুমান করল যে কার সন্ধানে সে এখানে এসেছে। কারণ, সে প্রশ্ন শেষ করতে না করতেই আট-দশ বছরের দুটো ছেলে ছুটল কাছেই একটা ঘরের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল এক বৃদ্ধ। তারপর এগিয়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে।
লোকটারও দেহের ঊর্ধ্বাঙ্গ উন্মুক্ত, খালি পা। কোমরে একটা আধময়লা সাদা ধুতি হাঁটুর উপরে গুটিয়ে পরা। মাথায় একটা জীর্ণ গামছা। বৃদ্ধর ভ্রু-যুগল বয়সের ভারে সাদা হয়ে গেছে, মুখে অসংখ্য বলিরেখা। একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে হোমাগ্নির উদ্দেশে হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে বৃদ্ধ বলল, ‘বাবু কোথা থেকে এয়েছেন?’
হোমাগ্নি বলল, ‘কলকাতা থেকে এসেছি হাতির ছবি তুলতে। গতবছর একজন এসে জঙ্গলের মধ্যে যে বাড়িটা আছে, সেখানে থেকে ছিল, হাতির ছবি তুলে নিয়ে গেছিল। তুমি তাকে সেখানে নিয়ে গেছিলে। একটা বইতে সে ছবি ছাপা হয়েছিল। তোমার কথাও লেখা হয়েছিল সেখানে। তাই আমি তোমার কাছে এসেছি, তুমি আমাকে নিয়ে যাবে ওখানে?’ একটানা কথাগুলো বলে থামল হোমাগ্নি।
তার কথা শুনে বেশ কয়েক মুহূর্ত ভালো করে তাকাল লোকটা। হোমাগ্নিকে দেখে, বিশেষত তার ক্যামেরার ব্যাগটা দেখে তাকে সে জায়গাতে নিয়ে যাবার পক্ষে সম্ভবত উপযুক্ত লোক বলেই মনে হল যুধিষ্ঠির মাহাতোর। সে বলল, ‘হ্যাঁ, সেই ছবি-তোলা বাবু এসেছিল বটে। এখন মাঝেমধ্যেই কিছু লোক আসে। আমি ওখানে তাদের নিয়ে যাই। তবে সে বাড়িতে কিন্তু আলো-পাখার কোনও ব্যবস্থা নেই। রান্না বা খাবারেরও কোনও ব্যবস্থা নেই। আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে পায়ে হেঁটে সেখানে যেতে হবে। সে বাড়িটা একদম ওই পাহাড়ের নীচেই। আপনি পারবেন তো?’
হোমাগ্নি হেসে বলল, ‘ওসবে আমার কোনও অসুবিধা হবে না। তুমি নিয়ে গেলেই পারব।’
যুধিষ্ঠির বলল, ‘আপনি দাঁড়ান, আমি লাঠিটা নিয়ে আসছি। বুড়ো হয়েছি তো, এখন এতটা পথ চলতে হাঁফ ধরে।’ এই বলে সে হোমাগ্নিকে দাঁড় করিয়ে রেখে এগোল তার ঘরের দিকে।
বাচ্চা ছেলেগুলো হোমাগ্নিকে ঘিরে দাঁড়িয়ে। তাদের চাহনি দেখে হোমাগ্নির মনে হল তারা যেন কিছু প্রত্যাশা করছে তার কাছ থেকে। হোমাগ্নির খেয়াল হল তার সঙ্গে একটা লজেন্সের প্যাকেট আছে। ব্যাগ থেকে প্যাকেটটা বার করে সে তুলে দিল ছেলেটার হাতে। অতি সামান্য জিনিস, পঞ্চাশ পয়সা করে দাম হবে হয়তো। কিন্তু সে জিনিস হাতে পেয়েই বাচ্চাগুলোর চোখ-মুখ এত উজ্জ্বল হয়ে উঠল যে হাতে যেন চাঁদ পেয়েছে তারা।
যুধিষ্ঠির ফিরে এল তার লাঠি নিয়ে। বাচ্চাগুলোর হাতে লজেন্সগুলো দেখে খুশি হয়ে যুধিষ্ঠির বলল, ‘খুব ভালো করলেন বাবু, ওরা তো এটুকুও পায় না। পুরো গ্রামটাই হয়তো না খেতে পেয়ে উজার হয়ে যেত যদি না কয়েক বছর আগে বেবি দিদিমণি এখানে এসে উপস্থিত হতো। তারই দয়ায় আমরা অন্তত একবেলা চাল-ডাল খেতে পারি।’
হোমাগ্নি জানতে চাইল, ‘কোনও সরকারি সাহায্য পাও না?’
বৃদ্ধ জবাব দিল, ‘কখনও কখনও। তবে, তাতে সাত দিনও চলে না। শহর থেকে অনেক দূরে থাকি আমরা। আমাদের খোঁজে তেমন কেউ আসে না। ভোটের সময় নেতারা এসে আমাদের খাওয়া-পরা, কাজের কথা বলে যায়, কিন্তু তারপর আর তাদের দেখাও মেলে না।’ একথা সে ক্ষোভের সঙ্গে বলে বলল, ‘চলুন, এবার রওনা হওয়া যাক। যেতে যেতে কথা বলি?’
গ্রামের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গিয়েই হোমাগ্নিরা প্রবেশ করল জঙ্গলের মধ্যে। চারপাশে শাল-পিয়াল গাছের জঙ্গল। বড় বড় সব গাছ। কোনও কোনও গাছের ডাল-পালা মাথার উপর গিয়ে মিলিত হয়ে আকাশের বুকে চাঁদোয়ার সৃষ্টি করেছে। কোথাও কোথাও গত পাতা-ঝরার মরশুমের শুকনো পাতা বাতাস তাড়িত হয়ে এক জায়গাতে জমা হয়ে আছে। আর তার মধ্যে দিয়েই পায়ে চলার পথ। জঙ্গলে প্রবেশ করার পর সে-পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে হোমাগ্নি জানতে চাইল, ‘তুমি যে বেবি দিদিমণির কথা বললে, তিনি কে?’
যুধিষ্ঠির লাঠি ভর দিয়ে চলতে চলতে বলল, ‘আপনি যে বাড়িতে থাকতে যাচ্ছেন সেটা তারই বাড়ি, সে-ই সেখানে থাকে। বড়বাবু যখন ছোটবেলায় তাকে এখানে নিয়ে থাকতেন তখন কী সুন্দর দেখতে ছিল সে। আমি তাকে কাঁধে নিয়ে জঙ্গলে ঘোরাতাম। সে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা হবে। আমি তখন ওই বাড়ির কেয়ারটেকারের কাজ করতাম।’
হোমাগ্নি যে বাড়িতে থাকার জন্য যাচ্ছে সে বাড়ির মালকিন বা লোকজনের সম্পর্কে লেখা ছিল না ওই ফটোগ্রাফির বইতে। হোমাগ্নি তাই কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘বেবি দিদিমণি কী করেন? আর কে কে থাকে ওই বাড়িতে?’
বৃদ্ধ বলল, ‘সে একলাই থাকে বাড়িতে। কিছু করে না। করার দরকারও নেই। বড়বাবুর কোলিয়ারির ব্যবসা ছিল। বাড়িটা বড়বাবুই তো বানিয়েছিলেন। বড় ভালো ছিলেন মানুষটা...’ এ কথা শুনে হোমাগ্নি বলল, ‘তিনি এখন নেই?
যুধিষ্ঠির মাহাতো বলল, ‘না, নেই। তিনি বছর দশ আগে মারা গেছেন। তবে খবরটা আমার জানা ছিল না। শেষ ওই দশ-পনেরো বছর ধরে তাদের কোনও খোঁজ ছিল না আমার কাছে। তারা এখানে আসা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। বাড়িটা তালাবন্ধই ছিলও। তবে আমি কখনও সখনও ওখানে গিয়ে বাইরে থেকে দেখে আসতাম বাড়িটা। একসময় অনেকদিন কাজ করেছি তো, তাই ওবাড়ির প্রতি আমার মায়া আছে।
দু-বছর আগে হঠাৎই একদিন ও বাড়ির কাছে গিয়ে দেখি বেবি দিদিমণি দাঁড়িয়ে আছে বারান্দাতে। আমি তাকে প্রথমে দেখে চিনতে পারিনি। সে আমাকে ঠিক চিনতে পেরে ডাকল। বহুদিন পর কথাবার্তা হল আমাদের মধ্যে। সে বলল, শহর আর তার ভালো লাগে না, তাই সে এবার থেকে এখানেই থাকবে। তারপর থেকে আছে। আমি তার সঙ্গে মাঝে মাঝে গিয়ে দেখা করে আসি। তারই কথামতো লোকে এলে তার কাছে নিয়ে যাই। ঘর ভাড়ার জন্য, হাতি দেখাবার জন্য। কোন এক খবরের কাগজেও বেরিয়েছিল বাড়িটার কথা। তারপর থেকে কিছু লোক আসে। ও বাড়িতে থাকে, হাতি দেখে, তাদের ছবি তোলে তারপর ফিরে যায়।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল বৃদ্ধ।
হোমাগ্নি চলতে চলতে প্রশ্ন করল, ‘ওখানে আর কোনও ঘরবাড়ি আছে?’
যুধিষ্ঠির বলল, ‘না নেই। হাতির ভয়ে কেউই ওদিকে যায় না। এমনকী ওজন্যই কেউ কোনোদিন বাড়িটার দখল নিতে যায়নি।’
হোমাগ্নি একথা শুনে বলল, ‘আচ্ছা, হাতিরা ওবাড়িটার কোনও ক্ষতি করে না কেন?’
বৃদ্ধ বলল, ‘বাড়ির সামনে যে পুকুরটাতে হাতিরা জল খেতে আসে, স্নান করতে আসে, সে পুকুরটাতো বড়বাবুই তৈরি করে দিয়েছিলেন গ্রামের লোকেদের দিয়ে মাটি কাটিয়ে। হাতিরাও কিন্তু মানুষের মতোই সবকিছু বুঝতে পারে। ওই বাড়ির মালিকই যে তাদের পিপাসা মেটাবার ব্যবস্থা করেছিলেন সেটা ওরা জানে, বোঝে। তাই ওরা বাড়িটার কোনও ক্ষতি করে না। পাহাড় থেকে নেমে আসে, জল খায়, খেলা করে তারপর আবার ফিরে যায়।’
হাতিদের মনোবিজ্ঞান নিয়ে ততটা জানা নেই হোমাগ্নির। হয়তো-বা তবে তাই হবে। হোমাগ্নি জানতে চাইল, ‘তুমি শেষ কবে লোক নিয়ে গেছিলে ও বাড়িতে?’
যুধিষ্ঠির জবাব দিল, ‘মাসখানেক আগে। তারাও হাতি দেখতে পেয়েছিল। ওখানে যারা যায় তারা হাতি দেখতে পাবেই। তবে এই সময়টাই হাতি দেখার সব থেকে ভালো সময়। বড় বড় হাতির দল পাহাড় থেকে নেমে আসে জল খাবার জন্য।’
ও কথা বলার পর সে বলল, ‘আমি তিনরাত পর আবার আপনাকে সকালবেলা গিয়ে ফিরিয়ে আনব। তার মধ্যে নিশ্চয়ই আপনার কাজ শেষ হয়ে যাবে। তবে ওখানে বাড়ির বাইরে বেরোলে একটু সাবধানে চলা-ফেরা করবেন। হাতি এত বড় প্রাণী হলেও একদম নিঃশব্দে চলা-ফেরা করে। কখন যে আপনার পিছনে এসে দাঁড়াবে আপনি তা বুঝতেও পারবেন না। অবশ্য এখনও কোনোদিন ওখানে কোনও খারাপ ঘটনা ঘটেনি। বেবি দিদিমণি আছে, সে আপনাকে সব বুঝিয়ে দেবে।’
তারপর টুকটাক আরও নানান কথা বলতে বলতে এগিয়ে চলল তারা। সময় এগিয়ে চলল তার সঙ্গে সঙ্গে। মাঝে মাঝে বনের ভিতর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাক আর নিজেদের পায়ের নীচে পাতা মাড়ানোর শব্দ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। একসময় বুড়ো যুধিষ্ঠির পথের পাশে এক জায়গায় আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওই দেখুন, হাতির চিহ্ন। আমরা প্রায় কাছে চলে এসেছি।’ তার দৃষ্টি অনুসরণ করে হোমাগ্নি দেখতে পেল সেখানে পড়ে আছে হাতির নাদ বা মল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সামনের জঙ্গলটা যেন মৃদু ফিকে হয়ে আসতে লাগল। গাছের ফাঁক গলে একটা উন্মুক্ত স্থান যেন চোখে পড়তে লাগল। পথ প্রদর্শক যেন একটু সতর্কভাবে এগোতে শুরু করল সেদিকে। তাকে অনুসরণ করে হোমাগ্নি কিছুক্ষণের মধ্যে উপস্থিত হল উন্মুক্ত জায়গাতে।
ফাঁকা জমিটার তিনদিকে অবস্থান করছে জঙ্গল। আর একদিকে অবস্থান করছে পাহাড়ের ঢাল। বড় বড় গাছে ছাওয়া সেই পাহাড়ের ঢাল উঠে গেছে উপরদিকে। তার মধ্যে দিয়ে পায়ে চলা পথের মতো একটা রেখাও যেন দেখা যাচ্ছে। জমিটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে শাল কাঠের গুঁড়ির উপর বাংলো ধরনের একটা পুরোনো বাড়ি।
কাঠের বাড়িটার ঢালু ছাদ, বারান্দাতে কাঠের রেলিং। সিঁড়ি বেয়ে বাড়িটাতে উঠতে হয়। আর বাড়ি ও পাহাড়ের ঢালের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে পুকুরের মতো একটা ছোট জলাশয়। সেই পুকুরটা দেখে চিনতে পারল হোমাগ্নি। ওরই ছবি ছাপা হয়েছিল ম্যাগাজিনে। চাঁদনি রাতে সার বেঁধে পুকুরে জলপান করছে, জলকেলি করছে বুনোহাতির দল। অপূর্ব সেই ছবিগুলো। যা হোমাগ্নিকে টেনে এনেছে এই জায়গাতে।
হোমাগ্নিকে নিয়ে যুধিষ্ঠির এগোল সেই বাড়িটার দিকে। যদিও বাড়িটার দরজা, জানলা সব বন্ধ। বারান্দাতেও কেউ চোখে পড়ছে না।
বাড়িটার কাছে গিয়ে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে যুধিষ্ঠির হোমাগ্নিকে নিয়ে উঠে পড়ল বারান্দাতে। বেশ অনেকগুলো ছোট-বড় ঘর আছে উপরে। আর তাকে ঘিরে বৃত্তাকারে ঘেরা বারান্দা। বারান্দায় উঠে হোমাগ্নি বুঝতে পারল পুকুরটা এখন তার কাছে চলে এসেছে। তার পাড়ের দূরত্ব বাড়িটা থেকে খুব বেশি হলে পঞ্চাশ মিটার হবে।
বারান্দাতে উঠে আসার পর যুধিষ্ঠির হাঁক দিল, ‘দিদিমণি? দিদিমণি? লোক এসেছে।’
সে বারকয়েক হাঁক দেবার পর বারান্দার পিছনের দিকের ঘরগুলোর দিক থেকে হোমাগ্নিরা যেদিকে দাঁড়িয়ে আছে সেদিকে আত্মপ্রকাশ করলেন এক মহিলা। মৃদু হেলতে-দুলতে তিনি এসে দাঁড়ালেন ওদের সামনে।
হোমাগ্নি আর সেই মহিলা তাকাল পরস্পরের দিকে। তাকে দেখে মৃদু অবাকই হল হোমাগ্নি। ভদ্রমহিলার বয়স আনুমানিক পঞ্চাশ হবে। কিন্তু তার চেহারাটা অত্যন্ত মোটা। সত্যি কথা বলতে কী অমন মোটা চেহারার মহিলা ইতিপূর্বে খুব একটা দেখেনি হোমাগ্নি। ঠিক যেন সুমো কুস্তিগিরের মতো তার দেহ। যদিও কোনও মানুষের শরীর নিয়ে কোনও প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা ঠিক নয়, তবে চলতি কথায় যে চেহারাকে হাতির মতো বলা হয়ে থাকে ভদ্রমহিলার শরীর ঠিক তেমনই।
তার পরনে একটা হাউস কোটের মতো সিল্কের পোশাক, গলায় লকেট সমেত একটা বেশ মোটা চেন ঝুলছে। তার শরীরের গঠন যাই হোক না কেন, স্ফীত মুখমণ্ডলে একটা আভিজাত্য যেন লুকিয়ে আছে। হাত জোড় করে পরস্পরকে নমস্কার জানাবার পর তিনি বললেন, ‘আমি মিস তটিনী সেন। আপনার পরিচয়?’
ভদ্রমহিলার নামটা জানার পর হোমাগ্নিও নিজের নাম, পরিচয়, আসার কারণ ব্যক্ত করল তাঁকে। তটিনী সেন ওরফে বেবি দিদিমণি বললেন, ‘আশাকরি এখানকার সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে যুধিষ্ঠির কাকা জানিয়েছে আপনাকে। তিন রাত থাকার জন্য পাঁচ হাজার টাকা দিতে হবে আপনাকে। তবে নিশ্চিত হাতি দেখতে পাবেন। রাজি তো?’
হোমাগ্নি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, রাজি।’ একথা বলে সে টাকাটা বার করে বাড়িয়ে দিল বেবি দিদিমণির দিকে। তিনি বললেন, ‘টাকাটা যুধিষ্ঠির কাকাকে দিন। ওদের জন্যই আমি ঘর ভাড়া দিই, টাকা নিই।’
যুধিষ্ঠির টাকা নেবার পর তার বেবি দিদিমণি তাকে বললেন, ‘বুলচিকির বউয়ের বাচ্চা হবার আগে ওকে একবার ডাক্তার দেখিয়ে আনবে, নেপাল দাদুর পরনের কাপড়টা একদম ছিঁড়ে গেছে। ওর জন্য কাপড়ের ব্যবস্থা করবে। বাকি টাকাটা গ্রামের যে কাজে লাগে, সে কাজে ব্যবহার করবে। আর একটা কথা, এবার থেকে যে বা যারা এখানে আসতে চায় তাদের নিয়ে আসবে। তোমাদের গ্রামে একটা ডিপ টিউবওয়েল বসানো খুব দরকার।’
ভদ্রমহিলার ও-কথা শুনে হোমাগ্নি বুঝতে পারল গ্রামের সব খবর সম্পর্কেই তিনি বেশ ওয়াকিবহাল। তাঁর কথা শুনে যুধিষ্ঠির বলল, ‘মাঝে মাঝে অনেকেই তো আমার কাছে আসে এখানে আসার জন্য। কিন্তু সবাইকে আনতে ঠিক ভরসা পাই না। তুমি একলা থাকো, কার মনে কী আছে তা বলা যায় না।’
যুধিষ্ঠির কাকার কথায় তার বেবি দিদিমণি বললেন, ‘ও নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। নিয়ে আসবে। এবার তুমি যাও। নইলে ফিরতে দেরি হয়ে যাবে।’
যুধিষ্ঠির এরপর আর দাঁড়ালেন না। সে এগোল সিঁড়ির দিকে। সে চলে যাবার পর মিস সেন বললেন, ‘আসুন, আপনাকে ঘর খুলে দিই।’
কয়েকটা ঘর অতিক্রম করে দরজা খুলে তাকে নিয়ে একটা ঘরে ঢুকলেন তিনি। একটা খাটে পরিপাটি করে বিছানা পাতা আছে সেখানে। সঙ্গে বাথরুমে বিরাট একটা ড্রামে জল ভরা। তিনি বললেন, ‘এটা পুকুর থেকে আনা স্নানের জল। পানীয় জলের প্রয়োজন হলে বলবেন, দিয়ে দেব।’
হোমাগ্নি বলল, ‘আপাতত তা সঙ্গে আছে। দরকার হলে বলব।’
তাকে ঘরে ঢুকিয়ে সবকিছু দেখিয়ে দেবার পর তিনি বললেন, ‘এবার আমি যাই। আপনি বিশ্রাম নিন। আমি বারান্দার অন্য পাশটাতে থাকি। কোনও প্রয়োজন হলে ডাকবেন।’
হোমাগ্নির ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন মিস সেন, বেবি দিদিমণি। তিনি চলে যাবার পর হোমাগ্নি ব্যাগ থেকে সবকিছু বার করে ঘরে গুছিয়ে রেখে পোশাক পরিবর্তন করে বাইরে এসে দাঁড়াল। বাড়িটার চারপাশ একদম নিস্তব্ধ।
পুকুরটার দিকে তাকিয়ে হোমাগ্নি ভাবতে লাগল কোথায় ক্যামেরা বসালে বা কোন অ্যাঙ্গেলে ক্যামেরা বসালে হাতিরা জল খেতে এলে তাদের ভালো ছবি তোলা যেতে পারে? কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড গরম অনুভূত হতে লাগল তার। গ্রীষ্মের সূর্য যেন মাথার উপর থেকে আগুন ছড়াতে শুরু করেছে! বাতাস গরম হয়ে উঠেছে। কাজেই হোমাগ্নি আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ঘরে ঢুকে সঙ্গে আনা শুকনো খাবার দিয়ে দুপুরের জলখাবার সাঙ্গ করে বিছানাতে শুয়ে পড়ল সে।
পথশ্রমের ক্লান্তিতে কিছুক্ষণের মধ্যেই তার চোখে ঘুম নেমে এল।
হোমাগ্নির যখন ঘুম ভাঙল তখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। মুখ-হাত ধুয়ে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল সে। রোদের তেজ এখন বেশ অনেকটাই কমে এসেছে। পাহাড়ের আড়ালে ঢলতে শুরু করেছে সূর্য। তিনদিকের জঙ্গল থেকে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছে। সম্ভবত, দিনের শেষে বাসায় ফেরার প্রস্তুতি শুরু করেছে তারা।
পাহাড়ের ঢালের জঙ্গল থেকে একঝাঁক টিয়া আকাশের দিকে উড়ে গেল। বেশ মনোরম পরিবেশ চারপাশে। কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করার পর হোমাগ্নি বাড়িটা একবার ঘুরে দেখার জন্য বারান্দা দিয়ে হাঁটতে শুরু করল। সে পৌঁছে গেল বারান্দার বিপরীত দিকে। ওদিকেও সার সার বেশ কয়েকটা বন্ধ ঘর। বাংলো বাড়িটা এমনভাবে বানানো হয়েছে যে দু-দিকের বারান্দা থেকেই জলাশয়টা দেখা যায়।
কয়েকটা ঘর পেরিয়ে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল হোমাগ্নি। সে ঘরের দরজার মাথার উপর দুটো ছবি টাঙানো। তার একটা একজন মাঝবয়সি পুরুষের। তার চেহারার মধ্যে বেশ একটা আভিজাত্য আছে। আর অপরটি একজন তন্বী তরুণীর।
বেশ সুন্দরী বলা যায় তাকে। কাদের ছবি? হোমাগ্নি তাকিয়ে ছিল ছবি দুটোর দিকে। ঠিক সেই সময় দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন বাড়ির মালকিন। তাঁর সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় হতেই হোমাগ্নি হেসে বলল, ‘গুড ইভিনিং ম্যাডাম। ছবি দুটো দেখছিলাম। কাদের ছবি?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘গুড ইভিনিং। প্রথম ছবিটা আমার স্বর্গত পিতার। যিনি এই বাড়িটি তৈরি করেছিলেন।’
তারপর তিনি একটু থেমে বললেন, ‘আর দ্বিতীয়টা আমার বোনের।’
তাঁর কথা শুনে হোমাগ্নি এবার খেয়াল করল বেবি দিদিমণির সঙ্গে ছবির যুবতীর মুখের আদলের একটা সাদৃশ্য আছে।
হোমাগ্নি তারপর তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘আপনাদের এই বাড়ি আর জায়গাটা বেশ সুন্দর। কিন্তু একলা থাকতে ভয় লাগে না?’
বেবি দিদিমণি হেসে বললেন, ‘না, করে না। আমাকে কে আর এমন কী করবে? যদিও এ ব্যাপারটা নিয়ে যুধিষ্ঠির কাকা বেশ চিন্তায় থাকে।’
‘মানুষ না হোক হাতির ভয়?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘না, ওরা এ-বাড়ির লোকজনকে কোনোদিনও কিছু বলেনি। করবেও না। ওই যে পাহাড়ের গায়ে রাস্তাটা দেখেছেন, ওটা বেয়ে ওরা নেমে আসে, জল খায়। খেলা করে জলে তারপর আবার নিজেদের মতো ফিরে যায়।’
হোমাগ্নি বলল, ‘শুনলাম ওই পুকুরটা নাকি আপনার পিতৃদেবই খনন করিয়েছিলেন। তিনি বেশ প্রকৃতিপ্রেমী মানুষ ছিলেন বুঝি?’
বেবি দিদিমণি বললেন, ‘তা বলতে পারেন। ওই পুকুরটা খনন করার ব্যাপারে একটা গল্প আছে। পাহাড়ে তো বর্ষা ছাড়া জল পাওয়া যায় না। একবার একটা হাতির বাচ্চা জলের সন্ধানে গ্রীষ্মকালে নীচে ওখানে এসে উপস্থিত হয়েছিল। জল না পেয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে বাচ্চাটা শেষ পর্যন্ত মারা যায়। এরপর হাতির দল যখন পাহাড় থেকে নেমে এসে বাচ্চার মরদেহটা খুঁজে পায় তখন তাদের কী আর্তনাদ!
ব্যাপারটা বড় কাহিল করেছিল বাবাকে। তিনি পয়সাওয়ালা মানুষ ছিলেন। এরপর তিনি গ্রামের মানুষদের দিয়ে হাতিদের জন্য পুকুরটা খনন করান। কষ্ট দূর হয় হাতিদের। হাতি খুব বুদ্ধিমান প্রাণী। ব্যাপারটা ওরাও বুঝতে পেরেছিল। বাবাকে ওরা এতটাই চিনে গিয়েছিল যে, ওরা এলে বাবা কখনও নীচে নেমে পুকুরের কাছে গিয়ে দাঁড়াত ওদের কাছ থেকে দেখার জন্য। ওরা কিছু বলত না বাবাকে।’
একথা বলে একটু থেমে তিনি বললেন, ‘তবে আপনি কিন্তু ওদের কাছে যাবেন না। বিপদ হতে পারে, যারা হাতি দেখতে আসেন তারা এই বারান্দাতে দাঁড়িয়েই হাতির ছবি তোলেন।’
হোমাগ্নি বলল, ‘হ্যাঁ, আমিও তাই তুলব। আমার ক্যামেরাতে টেলিফটো লেন্সও আছে। সমস্যা হবে না। তা কখন ওদের দেখা মিলতে পারে?’
সূর্য এবার যেন দ্রুত মুখ লুকোতে শুরু করেছে পাহাড়ের আড়ালে সেদিকে তাকিয়ে মিস যেন বললেন, ‘বেশ গরম পড়েছে। তার ওপর আবার পরশু পূর্ণিমা। এ সময়ই ওরা আসে। চাঁদ ওঠার পর যে-কোনও সময় ওরা ওই পথ বেয়ে নেমে আসতে পারে। সাধারণত ওরা দিনের আলো ফোটার আগেই আবার যেমন এসেছিল, তেমনই দল বেঁধে ফিরে যায়। জানেন আমি যখন এখানে ছোটবেলায় প্রথম এসেছিলাম তখন একটা বাচ্চা হাতি দেখেছিলাম। সে হাতিটাই এখন ওদের দলপতি। পাহাড়ের মতো বড়। কী বিশাল দাঁত দুটো ওর। এলে আপনি দেখতে পাবেন।’
হোমাগ্নি বলল, ‘হ্যাঁ, ওর ছবি আমি বইতে দেখেছি।’
তিনি এরপর বললেন, ‘আপনি একটু দাঁড়ান। আমি মোমবাতি আনি।’ এ কথা বলে ঘরে ঢুকে বেশ কয়েকটা মোমবাতি আর একটা দেশলাই বাক্স এনে হোমাগ্নির হাতে ধরিয়ে দিল।
হোমাগ্নির মনে হল দিনের আলো থাকতে থাকতেই বারান্দায় ক্যামেরাটা ভালো করে বসিয়ে ফেলা দরকার। তাই সে এরপর বেবি দিদিমণি থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল।
বারান্দাতে একটি ট্রাইপডে ক্যামেরাটাকে ঠিকঠাক করে বসিয়ে ফেলল হোমাগ্নি। তারপর ঘর থেকে একটা চেয়ার এনে তার পাশে বসল। আর তারপরই সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল। কিছুক্ষণের মধ্যে গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেল চারপাশ। তারপর আবার চাঁদ উঠতে শুরু করল। জঙ্গল, পাহাড় সবকিছু বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল আসন্ন পূর্ণিমার চাঁদের আলোতে। পাহাড়ের ঢালের গায়ের পথটাও স্পষ্ট দেখা যেতে লাগল।
যে পথ বেয়ে হাতি নামে সে পথের দিকে আর পুকুরটার দিকে চেয়ে বসে রইল হোমাগ্নি। বয়ে চলল সময়, বেড়ে চলল রাত। বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় সেখানে অতিবাহিত করার পর তারই মাঝে একফাঁকে নৈশাহার সাঙ্গ করে আবার বারান্দায় এসে বসল সে। আবারও শুরু হল তার প্রতীক্ষা। ছবি তোলার জন্য এমন প্রতীক্ষা ফটোগ্রাফারদের করতেই হয়।
রাত আরও গভীর হতে হতে একসময় পৌঁছোল বারোটার ঘরে। তারপর মশার উৎপাত শুরু হল চারপাশে। হোমাগ্নি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না আর কতক্ষণ তাকে বসে থাকতে হবে। হঠাৎ কয়েক হাত তফাত থেকে মিস সেনের গলা কানে এল তার, ‘আপনি আজকের মতো ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ুন।’
কখন যেন তিনি নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছেন এদিকের বারান্দাতে। হোমাগ্নি তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘আজ আর সম্ভবত ওরা আসবে না। আপনি শুয়ে পড়ুন। আর যদি ওরা আসে তবে আমি আপনাকে ডেকে দেব। রাতে আমার ঘুম আসে না, জেগে থাকি। ওরা এলে আমি ঠিক টের পাব।’
কথাটা শুনে উঠে দাঁড়াল হোমাগ্নি। তারপর স্ট্যান্ড থেকে ক্যামেরাটা খুলে নিয়ে ভদ্রমহিলাকে গুড নাইট জানিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল।
রাতে আর হাতি দেখার জন্য ডাক এল না হোমাগ্নির। পরদিন সকাল সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙার পর সে হাত-মুখ ধোয়া ইত্যাদি কাজ সেরে ক্যামেরা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এল। বাইরে সুন্দর সকাল। সকালের আলোতে পুকুরের জল চিকচিক করছে। জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে নানান ধরনের পাখির ডাক। চারপাশে তাকিয়ে বেশ ভালো লাগল তার। প্রথমে সে বাড়ির দু’পাশের বারান্দাতে একবার ঘুরে নিল।
মিস সেন, মানে বেবি দিদিমণির ঘরের দরজা বন্ধ দেখে হোমাগ্নি অনুমান করল, যথাসম্ভব তিনি ঘরেই আছেন। এরপর সে নেমে পড়ল বারান্দা ছেড়ে, সে অনুমান করল এসময় হাতির ভয় নিশ্চয়ই নেই। নীচে নেমে সে প্রথমে কিছুটা তফাত থেকে বাড়িটার বেশ কয়েকটা ছবি তুলল। তারপর সামনের ফাঁকা জমি পেরিয়ে জঙ্গলের গায়ে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখতে পেল কিছুটা তফাতেই একটা গাছের মাথায় একটা বিশাল ধনেশ পাখি বসে আছে। গাছের ডালপালার ফাঁক গলে আসা সূর্যের আলোতে তার পিঠের হলদে পালক আর লেজ ঝলমল করছে। অপূর্ব দৃশ্য। অভ্যস্ত হাতে দ্রুত ক্যামেরা বার করে হোমাগ্নি পাখিটার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে নিল। এরপর জঙ্গলের গভীরে উড়ে গেল পাখিটা আর হোমাগ্নিও জঙ্গলের ধার ঘেঁষে এগোল পুকুরটার দিকে।
পুকুরের পাড়ে এসে সে দাঁড়াল। পুকুরের ঠিক ওপাড়েই কিছুটা তফাতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমেছে হাতি চলাচলের পথটা। পুকুরপাড়ের চারপাশে তাকাতেই সে সর্বত্রই দেখতে পেল অগভীর গোল গোল চিহ্ন। হাতির পায়ের ছাপ। তবে তা নতুন নয় পুরানো। পুকুর পাড়ের ভেজা কাদা-মাটি গ্রীষ্মের প্রখর সূর্যতাপে জমাট বেঁধে গেছে ঠিকই, কিন্তু জলাশয়ের পাড়ে হাতিদের পদচিহ্নগুলো এখনও জেগে আছে।
বেশ কিছু সময় পুকুরপাড়ে সে দাঁড়িয়ে রইল। বেশ কিছু ছবিও তুলল সে ওই পুকুর আর পদচিহ্নগুলোর। তারপর সেখান থেকে ফিরে বাড়ির চারপাশের ফাঁকা জমির মধ্যে ঘুরে বেড়াতে লাগল, যদি অন্য কিছুর ছবি তোলা যায় তার সন্ধানে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গরম অনুভূত হতে শুরু করল। সকাল ন’টা এখনও বাজেনি। কিন্তু এর মধ্যেই সূর্যদেব যেন তাঁর অগ্নিবর্ষণ শুরু করে দিয়েছেন! অগত্যা হোমাগ্নি আবার ঘরে ফিরে এল। ঘরে একটা জানালাও আছে। কিছু সময়ের জন্য জানলাটা সে খুলল ঠিকই, কিন্তু বাইরে থেকে গরম বাতাস ঘরে ঢুকতে শুরু করল। কাজেই সে দরজা-জানলা সব বন্ধ করে দিল।
বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ ঘরের দরজাতে ঠোকা পড়ল। হোমাগ্নি দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই দেখতে পেল মিস সেন দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বললেন, ‘গুড মর্নিং। রাতে ঘুম কেমন হল? আসলে রাতে আমার ঘুম আসে না। ভোরের দিকে ঘুম আসে। তাই উঠতে দেরি হয়ে যায়।’
হোমাগ্নি বলল, ‘ভালোই, আপনি ডাকতে আসবেন, এ প্রতীক্ষায় কিছুক্ষণ থাকার পর আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে উঠে বাইরে চারপাশে একবার ঘুরেও এলাম।’
মিস সেন, ওরফে বেবি দিদিমণি বললেন, ‘কাল রাতে ওরা আসেনি। তবে আজ আসবে মনে হয়। দেখছেন সকাল থেকে কেমন গরম পড়েছে! যত্ত গরম বাড়বে তত তৃষ্ণার্ত হয়ে উঠবে প্রাণীগুলো।’
হোমাগ্নি বলল, ‘হ্যাঁ, ওদের ছবি তোলার জন্যই বড় আশা নিয়ে এখানে এসেছি।’
তার কথার জবাবে কিছু বলতে গিয়েও জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে থেমে গেলেন তিনি। তার দৃষ্টি অনুধাবন করে হোমাগ্নি দেখল জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেছে যুধিষ্ঠির মাহাতো আর তার পিছন পিছন তিনজন যুবক। তাদেরকে দেখে হোমাগ্নি বলল, ‘আপনার নতুন অতিথি নাকি? দেখে তো তাই মনে হচ্ছে।’
মিস সেন বললেন, ‘সম্ভবত তাই। শহরের লোক। তবে আপনার কোনও অসুবিধা হবে না। সব ঘরই তো খালি পড়ে আছে।’
তাদের দুজনের অনুমানই সত্যি প্রমাণিত হল। তাদের তিনজনকে নিয়ে উপরে উঠে এল যুধিষ্ঠির। তারপর মিস সেনের উদ্দেশে বলল, ‘দিদিমণি, ওরা জামশেদপুর থেকে এসেছেন এখানে থাকার জন্য।’ বেবি দিদিমণি তাকালেন লোকগুলোর দিকে। তার দিকেও তাকাল লোকগুলো। তাদের হোমাগ্নির মতো যুবকই বলা যায়। অর্থাৎ তাদের বয়স তিরিশের আশপাশে হবে।
গৃহকর্তীকে দেখে তাদের চোখে যেন মৃদু বিস্ময় ফুটে উঠল। হয়তো সেটা মিস সেনের চেহারার জন্য। তাদের তিনজনের মধ্যে দলপতিগোছের ছেলেটা বারান্দা থেকে নীচের দিকে গুটখার পিক ছুড়ে দেবার পর হিন্দিতে মিস সেনকে প্রশ্ন করল, ‘এখানে হাতি দেখা যায়?’
তিনি জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, কদিন থাকবেন আপনারা?’
সে জবাব দিল, ‘দু-রাত।’
মিস সেন বললেন, ‘একটা বড় ঘর আছে তিন-চারজনের থাকার মতো। সেটা আপনাদের দিতে পারি। কিন্তু দশ হাজার টাকা লাগবে।’
যুবকদের মধ্যে অপর একজন তার কথা শুনে বলল, ‘হ্যাঁ, তা দিতে আপত্তি নেই। কিন্তু হাতি দেখা যাবে তো ঠিক?’
এ যুবকও হিন্দিতেই কথা বলল। তা দেখে হোমাগ্নি বুঝতে পারল, এরা সবাই অবাঙালি।
মিস সেন বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গেই বললেন, ‘হ্যাঁ, দেখা যাবে।’
যুবকদের মধ্যে প্রথম যে কথা শুরু করেছিল সে তার নিজেদের পরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমার নাম ওম প্রকাশ, আর ওরা দুজন হল রাকেশ আর পরমেশ্বর।’—এ কথা বলার পর সে পকেট থেকে একটা চকচকে পাঁচশো টাকার বান্ডিল বার করে তার থেকে কুড়িটা নোট গুনে নিয়ে টাকাটা মিস সেনের দিকে বাড়িয়ে দিল। তিনি টাকাটা নিয়ে যুধিষ্ঠিরের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা রেখে দিও। টিউবয়েলের খরচ অনেকটাই জোগাড় হল।’
তাঁর কথাতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে ঘাড় নাড়ল বৃদ্ধ। তারপর পিছু ফেরার আগে হোমাগ্নির দিকে তাকিয়ে বৃদ্ধ মৃদু হেসে বলল, ‘পরশু সকালে এসে আপনাদের সবাইকে একসঙ্গে ফিরিয়ে নিয়ে যাব।’
বৃদ্ধ এগোল ফেরার জন্য আর মিস সেন তার নতুন অতিথিদের নিয়ে এগোলেন তাদের ঘরের দিকে। দুটো ঘর পর তাদের নিয়ে একটা ঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি। আর হোমাগ্নি তার ঘরে ঢুকে পড়ল।
ঘুম ভাঙার পর আগের দিনের মতোই বিকেল পাঁচটার পর ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল।
নতুন অতিথিদের ঘরের দরজা বন্ধ। হোমাগ্নি অনুমান করল তারা ঘুমাচ্ছে। বারান্দা থেকে নীচে নেমে সামনের ফাঁকা জমিতে কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে আবার গিয়ে দাঁড়াল পুকুরটার ধারে।
সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যাচ্ছে পাহাড়ের আড়ালে। ভারি মনোরম দৃশ্য। তবে বাতাসে এখনও বেশ খানিকটা গরম ভাব আছে। পাহাড় থেকে হাতিদের নামার পথটার দিকে তাকিয়ে হোমাগ্নি ভাবল, আজ যা গরম পড়েছিল, তাতে নিশ্চয়ই মিস সেনের কথা মতো হাতি দেখা যাবে।
বেশ অনেকক্ষণ জলাশয়টার পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের শোভা উপভোগ করল সে। সূর্য পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে পড়ার পর সেখান থেকে ফিরে আবার বাড়িতে উঠে এল সে।
গতকাল শেষ বিকালের মতোই আলো থাকতে থাকতেই তার ক্যামেরাটা নির্দিষ্ট স্থানে স্ট্যান্ডের উপর বসিয়ে ফেলল সে। তারপর তার পাশে চেয়ার নিয়ে পুকুর আর পাহাড়ের দিকে মুখ করে বারান্দাতে বসল সে।
অন্ধকার নামল পাহাড় আর তার পাদদেশের জঙ্গলে। নতুন লোকগুলোর ঘরের ভিতর থেকে এবার কথাবার্তার অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতে শুনে হোমাগ্নি বুঝতে পারল তাদের ঘুম ভেঙেছে।
অন্ধকারে সবকিছু ঢেকে যাওয়ার পর আবার একসময় চাঁদ উঠতে শুরু করল। তারপরই দরজা খোলার শব্দ শুনে হোমাগ্নি দেখল, ওমপ্রকাশ নামের সেই যুবক বাইরে বেরিয়ে এল। ঘরের ভিতর একবার তাকিয়ে সে তার সঙ্গীদের উদ্দেশে নির্দেশ দিল, ‘চেয়ার-টেবিল সব বাইরে আন।’—এ কথা বলার পর সে সোজা এগিয়ে এসে দাঁড়াল হোমাগ্নির কাছে। তারপর তার ক্যামেরাটা দেখে প্রশ্ন করল, ‘ছবি তুলতে এসেছেন? কোথা থেকে এসেছেন?
হোমাগ্নি বলল, ‘হ্যাঁ, ছবি তুলতে এসেছি৷ কলকাতা থেকে এসেছি।’
তার জবাব শুনে ওম নামের যুবক বলল, ‘ও আপনি ‘বাঙালিবাবু’! কবে এসেছেন?’
হোমাগ্নি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, বাঙালি। কালই এসেছি এখানে।’
‘ছবি তোলা ছাড়া আর কী করেন?’ জানতে চাইল ছেলেটা।
‘একটা ছোটখাটো অফিসে চাকরি করি’—জবাব দিল হোমাগ্নি।
তার জবাব শুনে সেই যুবক যেন মৃদু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, ‘ও চাকরি! আমরা সব বিজনেসম্যান। জামশেদপুরে আমাদের সবার বড় বিজনেস আছে। বাঙ্গালি কর্মচারীও আছে।’
তার বলার ভঙ্গী গায়ে না মেখে হোমাগ্নি শুধু তার কথা শুনে মৃদু হাসল। কৌতূহলী হিন্দিভাষী যুবক এরপর তাকে প্রশ্ন করল, ‘হাতি দেখেছেন এখানে?’
হোমাগ্নি বলল, ‘না, দেখিনি। তবে বাড়ির মালকিন বলেছেন, আজ রাতে হাতি দেখার খুব সম্ভাবনা। তাই ক্যামেরা নিয়ে বসেছি।’
ঠিক এই সময়ে, ওম নামের যুবকের এক সঙ্গী তার উদ্দেশে বলল, ‘বস, সব রেডি করে ফেলেছি।’
কথাটা শুনে ওম আর হোমাগ্নি তাকাল সেদিকে। তাদের কিছুটা তফাতেই একটা টেবিল আর তাকে ঘিরে তিনটে চেয়ার পেতে ফেলা হয়েছে। টেবিলের উপর সাজানো হয়েছে একটা বড় মদের বোতল, জলের বোতল, গ্লাস ইত্যাদিও সাজানো হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ মদ্যপান করতে বসবে লোকগুলো। সেদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে ওম, হোমাগ্নিকে বলল, ‘চলুন, আপনিও কয়েক পেগ খাবেন। একদম খাঁটি স্কচ হুইস্কি, ইম্পোর্টেড মাল।’
হোমাগ্নি মদ্যপান করে না এমনটা নয়, কিন্তু সে কোনও অপরিচিত বা সদ্য পরিচিত লোকের সঙ্গে মদ্যপান করে না। তাছাড়া এসময় মদ্যপান করলে হাতিগুলো এলে তার ছবি তোলার কাজ ব্যাহত হতে পারে। তাই সে ওম নামের যুবকের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করে বলল, ‘ধন্যবাদ আপনাকে। কিন্তু আমি এখন মদ্যপান করব না। আপনারা করুন।’
তার জবাব শুনে ওম আর তাকে জোর করল না। সে গিয়ে বসল তার সঙ্গীদের সঙ্গে। গ্লাসের টুংটাং শব্দ আর কথাবার্তা শুরু হল তাদের নিজেদের মধ্যে। মদ্যপান শুরু করল তারা তিন যুবক আর সে সব কথা শুনতে শুনতে, হোমাগ্নি চেয়ে রইল পাহাড় আর পুকুরটার দিকে হাতি নামার প্রতীক্ষাতে।
বেড়ে চলল রাত। তার সঙ্গে বেড়ে চলল সেই তিন যুবকের মদ্যপান। তাদের কথাবার্তা শুনে হোমাগ্নি এখানে আসার কারণটা একসময় বুঝতে পারল। ওম নামের যুবকের দৃষ্টি পড়েছে কোনও একটা মেয়ের উপর। সেই মেয়ের উপর আর এক যুবকেরও দৃষ্টি আছে। সেই মেয়েটাকে কে বেশি আকৃষ্ট করতে পারবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে ওম আর সেই যুবকের মধ্যে।
সেই যুবক কিছুদিন আগে কোন এক জঙ্গলে গিয়েছিল বেড়াতে। মেয়েটার মুখ থেকে কথাটা জানতে পেরেছে ওম। তাই সেই ছেলেটার সঙ্গে কম্পিটিশান করে ওম তার সঙ্গীদের নিয়ে এখানে চলে এসেছে। তার ইচ্ছা আইফোন দিয়ে বুনো হাতির ছবি তুলে সে চমকে দেবে তার প্রেয়সীকে; তাকে বুঝিয়ে দেবে যে ও কোনও ব্যসতি আদমি নয়।
রাত যত বাড়তে লাগল, যত তাদের নেশা চড়তে লাগল, তত নিজেদের মধ্যে চটুল কথা বলতে শুরু করল তারা। তিনজন কবে কোথায়, কীভাবে নারীসঙ্গ করেছে, বেশ্যালয়ে গেছে—ও নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করল তারা। মাঝে মাঝে অশ্লীল গালি-গালাজও করতে লাগল। ইচ্ছা না থাকলেও তাদের বাক্যালাপ শুনে বেশ অস্বস্তিবোধ হতে লাগল হোমাগ্নির। কিন্তু তার কিছু করার নেই। তাদের কথাবার্তা শুনতে শুনতে পাহাড় আর পুকুরের দিকে চেয়ে রইল সে। সময় এগিয়ে চলল।
রাত দশটা নাগাদ ওমের রাকেশ নামের সঙ্গী বলল, ‘কই হাতি-টাতি তো কিছুই এল না। সব ফালতু বকওয়াস নয়তো?’
ও কথা শুনে ওমের অন্য সঙ্গী পরমেশ্বর বলল, ‘হাতি তো একটা দেখেই নিয়েছ।’
‘কোথায়?’ প্রশ্ন করল ওম।
এ কথার জবাবে পরমেশ্বর বলল, ‘কেন এ বাড়ির মালকিন? সে তো হাতির মতোই দেখতে।’
তার এ কথা শোনার পর অশ্লীলভাবে হাসতে শুরু করল সবাই। কিন্তু তারপরই তাদের সবার হাসি, কথাবার্তা যেন হঠাৎই একসঙ্গে থেমে গেল। নিস্তব্ধ হয়ে গেল বারান্দা। তারপর ওমের কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘হ্যালো?’
ওম কথাটা তার উদ্দেশে বলেছে বলে হোমাগ্নি তাকাল তাদের দিকে। কিন্তু সে দেখতে পেল তাদের তিনজনের দৃষ্টি অন্যদিকে নিবদ্ধ। বারান্দার কোনায় বাড়ির পিছনের অংশে যাবার মুখটাতে চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবতী। ওম আর তার সঙ্গীদের দৃষ্টি তার দিকেই নিবদ্ধ। হোমাগ্নি বুঝতে পারল, ওই মেয়েটার উদ্দেশেই ‘হ্যালো’ বলেছে ওম।
মেয়েটা তাকিয়ে আছে জঙ্গলের দিকে। কয়েক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপর মেয়েটার উদ্দেশে আবারও ‘হ্যালো!’ বলল ওম। এবার মেয়েটা ফিরে তাকাল তাদের দিকে। চাঁদের আলো এসে পড়েছে মেয়েটার মুখে, শরীরে। ছিপছিপে চেহারার এক সুন্দরী যুবতী সে। তার মুখ দেখে হোমাগ্নির যেন মনে হল কোথায় যেন তাকে দেখেছে!
মেয়েটা তাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আমাকে কিছু বলছেন?’
তাকে আপনি না বলে তুমি সম্বোধন করে ওম বলল, ‘হ্যাঁ, তোমাকেই। তুমি কোথা থেকে এলে? এ বাড়িতেই থাকো?
যুবতী মৃদু হেসে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, এ বাড়িতেই থাকি!’ ওমের সঙ্গী জড়ানো গলায় প্রশ্ন করল, ‘কী নাম তোমার? কী করো?’
যুবতী আবারও হেসে জবাব দিল, ‘আমার নাম হরিণী। তেমন কিছুই করি না।’
এবার হোমাগ্নি মেয়েটার নাম শুনে আর মুখমণ্ডল দেখে চিনে ফেলল তাকে। ও যে ছবির সেই মেয়েটা। মিস সেনের বোন! সে যে এ বাড়িতেই থাকে মিস সেন তাকে বলেননি। যুধিষ্ঠির বলেছিল, তার বেবি দিদিমণি একাই থাকেন এখানে। হয়তো বা এই ভদ্রমহিলার এখানে আসার খবর জানা নেই তারও। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মৃদু বিস্মিত হল হোমাগ্নি।
ওম হরিণীর উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ‘এখানে হাতি সত্যিই আসে?’
সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আসে।’
‘তুমি আমাদের এই বস্কে হাতি দেখাতে পারবে?’ তার উদ্দেশে প্রশ্ন করল, ওমের একজন সঙ্গী।
কথাটা শুনে হরিণী বলল, ‘একটু আগেই আপনারা বলছিলেন না একটা হাতি দেখেছেন?’
তার পালটা প্রশ্ন শুনে একটু থমকে গেল ওম আর তার সঙ্গীরা। অর্থাৎ তাদের আলোচনা মেয়েটার কানে গেছে। ওম সম্ভবত এবার প্রসঙ্গটা পালটে ফেলার জন্য বলল, ‘তোমাকে দেখতে কিন্তু খুব সুন্দর!’
তার কথা শুনে মেয়েটা কোনও জবাব দিল না। একটু হেসে সে নিজের জায়গা ছেড়ে বারান্দার অন্যদিকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
সে চলে যাবার পর ওম তার সঙ্গীদের উদ্দেশে বলল, ‘মেয়েটা কিন্তু বেশ সুন্দর দেখতে। বেশ সেক্সি! কে হতে পারে বলতো মেয়েটা?
পরমেশ্বর বলল, ‘বাড়ির মালকিনের কেউ হবে বলে মনে হয় না। সে হস্তিনীর মতো, আর এ হরিণীর মতো দেখতে। শহর থেকে আসা কাজের লোক বা অন্য কেউ হতে পারে। অনেক রাত হল। হাতি আর আসবে না। মশা কামড়াচ্ছে। এবার ঘরে ঢুকি?’
এরপর নিজেদের মধ্যে কয়েকটা কথা বলে চেয়ার থেকে উঠে টলতে টলতে ঘরে ঢুকে তারা দরজা বন্ধ করে দিল। তারা চলে যাওয়াতে হোমাগ্নি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। তাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ কিছুই ভালো লাগছিল না হোমাগ্নির। আবারও নিস্তব্ধতা নেমে এল বারান্দাতে। হোমাগ্নি চেয়ে রইল নির্দিষ্ট দিকে। ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, শুধু হাতির দেখা নেই।
রাত বারোটা নাগাদ মশার প্রচণ্ড উৎপাত শুরু হল। তারপর সে মিস সেনের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল, ‘আজও মনে হয় ওরা আসবে না।’
আগের দিনের মতোই কখন যেন তার কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন বেবি দিদিমণি। হোমাগ্নি তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি বললেন, ‘ভেবেছিলাম ওরা আসবে, কিন্তু এল না! কালতো পূর্ণিমা। দেখা যাক কী হয়? আর মশার কামড় খাবেন না। ঘরে ঢুকে পড়ুন। আমি জেগে আছি। হাতি এলে ডেকে দেব।’
দ্বিতীয় রাতেও হাতি দেখতে না পেয়ে একটু হতাশভাবে উঠে দাঁড়াল হোমাগ্নি। তারপর স্ট্যান্ড থেকে ক্যামেরাটা খুলে নিয়ে মিস সেনের থেকে বিদায় নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তবে এ রাতেও হাতি দেখার জন্য ডাক এল না তার।
রাত কেটে গিয়ে প্রকৃতির নিয়মেই ভোরের আলো ফুটল। গত রাতে মিস সেনের কথামতো হোমাগ্নি তার পরেও অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিল, যদি তিনি তার ঘরের দরজাতে টোকা দেন, সেজন্য। তাছাড়া ঘুমও আসতে চাইছিল না তার। দেরিতে ঘুম আসাতে এদিন সকালে ঘুম ভাঙতে বেশ দেরি হয়ে গেল তার। ঘুম ভাঙতেই তার মনে হল—আজই তো এই বন-গৃহে তার শেষ দিন-রাত। হাতির দেখা মিলবে তো? নইলে এত পরিশ্রম করে এই গরমে কষ্ট করে এখানে আসা, নিরর্থক হয়ে যাবে।
সকালবেলা হোমাগ্নি যখন প্রাতরাশ ইত্যাদি সেরে বারান্দার বাইরে বেরিয়ে এল তখন ন’টা বেজে গেছে। বারান্দায় চেয়ার-টেবিলগুলো একই অবস্থায় রয়েছে। টেবিলের উপর পড়ে আছে এঁটো গ্লাস, শূন্য মদের বোতল ইত্যাদি গতরাতে লোকগুলোর মদ্যপানের চিহ্ন। তবে তাদের ঘরের দরজা বন্ধ। ঘুমাচ্ছে তারা।
সে জিনিসগুলো দেখার পরই হোমাগ্নির মনে পড়ে গেল, গতরাতে হরিণী নামের সেই যুবতীর কথা। বারান্দা বেয়ে হাঁটতে শুরু করল সে। পৌঁছে গেল পিছনের দিকের বারান্দাতে। মিস সেনের ঘরের কাছে এসে কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। হোমাগ্নি ভালো করে তাকাল দরজার মাথার উপর টাঙানো মেয়েটার ছবির দিকে। ভালো করে ছবিটার দিকে তাকিয়ে সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে এই সেই যুবতী যে গত রাতে চাঁদের আলোতে বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নিশ্চয়ই মিস সেনের ঘরে অথবা এদিকের কোনও একটা ঘরেই থাকে সে।
এ কথা ভাবতে ভাবতে বারান্দা থেকে নীচে নেমে পুকুরটার দিকে এগোল সে। আর ফাঁকা জমিতে নামার পরই সে বুঝতে পারল, আজও সূর্যদেব অগ্নিবর্ষণ শুরু করেছেন। তারই মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে পুকুর-পাড়ে গিয়ে পৌঁছল সে। আগের দিনের মতোই রয়েছে সে জায়গা।
পুকুরের চারপাশে জমাট বাঁধা কাদা-মাটিতে জেগে আছে হাতির পায়ের পুরোনো ছাপ, দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হাতিদের জলাশয়ে আসার পথটা। সেই পথের দিকে তাকিয়ে হোমাগ্নি মনে মনে বলল, আজ যেন ভাগ্য সহায় হয়। বড় দল না হলেও, কয়েকটা হাতি অন্তত যেন জল খেতে নামে। অন্তত কয়েকটা ছবি যেন তুলতে পারি ওদের। কিন্তু রোদের তেজ এত প্রচণ্ড হয়ে উঠতে শুরু করল যে, এরপর আর খোলা আকাশের নীচে বেশিক্ষণ তার পক্ষে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হল না। আরও কিছুক্ষণ বাড়িটার আশপাশে ঘুরে বেড়াবার ইচ্ছা থাকলেও বাধ্য হয়ে বাড়িতে ফিরে আসতে হল তাকে।
ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেও ঘরের ভিতরটাও যেন গরম হয়ে উঠতে লাগল। বাইরে সত্যিই আগুন ঝরাতে শুরু করেছে গ্রীষ্মের সূর্য, বাতাস গরম হয়ে উঠেছে। আর দরজা-জানলা, ভেন্টিলেটারের ফাঁক গলে সেই বাতাস ঢুকে ঘরের ভিতরটাকেও গরম করে তুলেছে।
শরীরে প্রচণ্ড অস্বস্তি হতে লাগল হোমাগ্নির। তবে তারই মধ্যে আবারও তার একটা কথা মনে হল—মিস সেন বলেছেন যে, গরম যত বাড়বে ততই হাতি দেখার সম্ভাবনা প্রবল। কষ্ট করে হোমাগ্নি গরমটা মানিয়ে নিতে পারবে, কিন্তু হাতির যেন দেখা মেলে।
নিজের ঘরে শুয়ে অন্য সেই তিনজনের ঘরের দরজা খোলার শব্দ শুনতে পেল হোমাগ্নি। বারান্দায় সামান্য কিছুক্ষণ তাদের দু-চারটে কথাবার্তার শব্দ শোনার পর আবার দরজা বন্ধ হবার শব্দও কানে এল। হোমাগ্নি অনুমান করল, বাইরে বেরিয়ে গরম দেখে আবার ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল তারা। বার কয়েক স্নান করে শরীরটা ঠান্ডা করার চেষ্টা করে, শুয়ে বসে, হাতি দেখার সম্ভাবনার কথা চিন্তা করতে করতে শেষ পর্যন্ত ভয়ংকর গরমের দুপুরটা আর বিকালের প্রথম অংশটা কাটিয়ে দিল হোমাগ্নি।
ক্যামেরা নিয়ে বিকাল বেলা যখন সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল, তখন সূর্য পাহাড়ের গায়ে ঢলতে শুরু করলেও বাতাস বেশ গরম। পুকুরের দিকে তাকিয়ে সে দেখতে পেল মিস সেনকে। তিনি পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে দেখে হোমাগ্নি বারান্দা ছেড়ে নেমে এগোল সেদিকে। পৌঁছে গেল পুকুরের কাছে।
হোমাগ্নির দিকে একপাশ ফিরে পাহাড়ের হাতি নামার পথটার দিকে চেয়ে আছেন তিনি। বেলা শেষের রাঙা আলো এসে পড়েছে তাঁর মুখে। তাঁর শরীরের আকৃতি যেমনই হোক না কেন, সেই আলোতে এক আশ্চর্য স্নিগ্ধ কোমল ভাব জেগে উঠেছে তাঁর মুখমণ্ডলে। তা দেখে হোমাগ্নির মনে হল, বেশ ভালো ছবি হবে।
একটা ছবি তুলি ভদ্রমহিলার। তাছাড়া ছবিটা এ জায়গার স্মৃতি হয়েও থাকবে। এ কথা ভেবে ভদ্রমহিলার হাত দশেক তফাতে দাঁড়িয়ে ক্যামেরা বার করে ভদ্রমহিলার বেশ কয়েকটা ছবি তুলে ফেলল।
হোমাগ্নির ক্যামেরার শাটারের মৃদু শব্দেই মনে হয় ফিরে তাকালেন মিস সেন। তারপর সম্ভবত ছবি তোলার ব্যাপারটা অনুমান করে প্রশ্ন করলেন, ‘কীসের ছবি তুললেন?’
একটু ইতস্তত করে হোমাগ্নি মৃদু হেসে জবাব দিল, ‘আপনার।’ তার জবাব শুনে বেবি দিদিমণি মৃদু বিস্মিতভাবে বললেন, ‘আমার ছবি তো আজকাল আর কেউ তোলে না। অনেক লোকই তো ছবি তুলতে আসে এখানে। আপনি তুললেন কেন?’
হোমাগ্নি সত্যি কথাই বলল, ‘আমার মনে হল এ সময় তুললে ছবিটা বেশ সুন্দর হবে, তাই।’
মিস সেন বললেন, ‘আমার ছবি সুন্দর হবে! এই হাতির মতো চেহারাতে ছবি সুন্দর হয় কখনও?’
হোমাগ্নি তার এ কথার কী জবাব দেবে তা বুঝতে না পেরে চুপ করে রইল।
ভদ্রমহিলা আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘আমাকে দেখলেই সবার হাতির কথা মনে হয় তাই না? যাঁরা এসেছে তারাও তো এ কথাই আলোচনা করছিল তাই না? আপনাদেরও তাই মনে হয় তাই না?’
মিস সেনের এ কথাগুলোর মধ্যে কোথায় যেন একটা বিষণ্ণতা লুকিয়ে আছে বলে মনে হল হোমাগ্নির। তার এ কথাও মনে হল যে গতরাতে ওম আর তার সঙ্গীদের কথোপকথন শুনে, সেটা তাঁর বোন মিস সেনকে জানিয়েছে, অথবা তিনি নিজেই আড়াল থেকে কথাটা শুনে মনে মনে আহত হয়েছেন।
হোমাগ্নি এবার তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘মানুষের শরীরের গঠনের ওপর তো তার নিজের সব সময় হাত থাকে না। তাই এক-একজনের চেহারা এক-এক রকম। তবে শরীর নয়, মানুষের মনের গঠনের মধ্যেই তার আসল সৌন্দর্য, পরিচয় থাকে। আমি অন্তত তেমনটাই মনে করি। তবে আপনার আপত্তি থাকলে আমি এখনই ছবিগুলো মুছে দিতে পারি।’
বেবি দিদিমণি মনে হয় খুশি হলেন হোমাগ্নির কথা শুনে। একটু চুপ করে থেকে তিনি বললেন, ‘যাক যখন তুলেই ফেলেছেন, তখন আর মোছার দরকার নেই।’
ভদ্রমহিলার চেহারা নিয়ে অস্বস্তিকর আলোচনা থেকে মুক্ত হবার জন্য হোমাগ্নি এরপর তাঁকে তার বোন হরিণীর কথা জিগ্যেস করতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় একটা গলার শব্দ ভেসে এল, ‘হাতি কি আজ আসবে?’
কিছুটা তফাতে জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে ওম আর তার দুই সঙ্গী। বিকাল হবার পর তারা জঙ্গলে ঢুকেছিল। ওমই তাকে প্রশ্নটা করল।
মিস সেন মৃদু চিৎকারের সঙ্গে তাদের উদ্দেশে বললেন, ‘দেখা পাবারই তো কথা।’
পরমেশ্বর ছেলেটা বলল, ‘এত দূর থেকে যখন এসেছি, আর এত টাকা যখন দিয়েছি তখন হাতি দেখাতেই হবে আমাদের।’
মিস সেন তার কথার কোনও জবাব দিলেন না।
ওম তারপর মিস সেনের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বলল, ‘আমাদের খাবার জল শেষ হয়ে গেছে। জল দিয়ে যান।’ একথা বলে সে সঙ্গীদের নিয়ে রওনা হল বাড়িটার দিকে।
মিস সেন স্বগোতক্তির সুরে বললেন, ‘আমার মন বলছে হাতিরা আজ আসবে। যাই জল দিয়ে আসি।’ একথা বলে তিনিও হাঁটতে শুরু করলেন বাড়িটার দিকে। হোমাগ্নির আর কোনও কথা হল না তাঁর সঙ্গে। তবে মিস সেনের শেষ কথাগুলো শুনে যেন আশ্বস্ত বোধ করল সে।
হোমাগ্নি পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তর শোভা উপভোগ করতে লাগল। পাহাড়ের বুকে সূর্যদেব মুখ লুকালেন একসময়। সন্ধ্যা নামবে এবার। তার আগেই হোমাগ্নিকে ক্যামেরাটা বসিয়ে ফেলতে হবে বারান্দাতে। তাই সে-ও এবার রওনা হল বাড়িটার দিকে।
বারান্দাতে ওঠার পর প্রথমে সে ক্যামেরাটা ঠিক জায়গায় বসাল। তারপর ঘরে ঢুকে সামান্য কিছু খেয়ে নিয়ে ফিরে এসে ক্যামেরার পাশে বসল। অন্ধকার নামতে শুরু করেছে এখন। হোমাগ্নি মনে মনে বলল, ‘এই শেষ রাতে ভাগ্য যেন সহায় হয়। হাতির দল যেন জল খেতে আসে।’
চাঁদ ওঠার খানিক বাদে মদের বোতল ইত্যাদি সঙ্গে করে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল ওম প্রকাশ, রাকেশ ও পরমেশ্বর। ওমের সঙ্গীরা বোতল, গ্লাস আর জলের বোতল টেবিলে সাজাতে লাগল। আর সে এগিয়ে এসে দাঁড়াল হোমাগ্নির সামনে। তারপর প্রশ্ন করল, ‘এ ক্যামেরাতে রাতেও ছবি তোলা যায়?’
হোমাগ্নি জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, যায়। সেজন্যই তো এই ক্যামেরা নিয়ে বসে আছি। নাইট ভিশন আছে এতে।’
ওম এরপর প্রশ্ন করল, ‘হাতির ছবি কেমন উঠল?’ হোমাগ্নি এ প্রশ্ন শুনে বলল, ‘কোথায় হাতি? তাদের দেখা এখনও পেলাম না তো।’
ওম বলল, ‘কেন, বিকালে যে পুকুর-পাড়ে, হাতির ছবি তুললেন? আমরা দেখলাম তো।’—এ কথা বলে হাসল সে।
এবার তার কথাটা বুঝতে পারল হোমাগ্নি। ওম তাকে মিস সেনের ছবি তোলার কথা বলছে! এ হেন রসিকতা ঠিক ভালো লাগল না হোমাগ্নির। ওমের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সে আবার পুকুর, পাহাড়টার দিকে তাকাল।
অবাঙালি যুবক মনে হয় বুঝতে পারল যে হোমাগ্নির তার সঙ্গে বাক্যালাপের খুব একটা আগ্রহ নেই। সে বলল, ‘শালি, সত্যি কথা বলল কিনা কে জানে? দেখি আজ হাতি দেখা যায় কি না?’
মিস সেন সম্পর্কে তাচ্ছিল্য করে ওম যে শব্দ প্রয়োগ করল তাতে তার এ কথাতেও কোনও মন্তব্য করার ইচ্ছা হল না হোমাগ্নির। ওম এরপর তার পাশ থেকে সরে গিয়ে সঙ্গীদের সঙ্গে যোগ দিল। শুরু হল তাদের মদ্যপান, কথাবার্তা।
রাত যত বাড়তে লাগল, সময় যত এগিয়ে চলল তত এগিয়ে চলতে লাগল মদ্যপানের সঙ্গে চটুল আলাপ-আলোচনা, অশ্লীল খিস্তি-খেউড়। বাধ্য হয়েই হোমাগ্নিকে শুনে যেতে হচ্ছে তাদের কথাবার্তা। তবে রাত যত বাড়তে লাগল হোমাগ্নির মনের মধ্যে এই ভেবে উত্তেজনা কাজ করতে লাগল—হাতির দেখা মিলবে তো?
আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলতে দুলতে নির্দিষ্ট দিকে চেয়ে রইল সে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। পুকুর, পাহাড়ের ঢালের সেই হাতি নামার পথ সব কিছুই একেবারে স্পষ্ট। তবে কেমন যেন একটা গুমোট ভাব চারপাশে। বাতাস নেই, একটা গাছের পাতাও নড়ছে না।
দেখতে দেখতে কীভাবে যেন ঘণ্টা তিনেক সময় কেটে গেল। রাত দশটা বেজে গেল। হোমাগ্নির কানে এল, ওমের সঙ্গী রাকেশ বলল, ‘বোতলটা তো খালি হয়ে গেল! ঘরে আর একটা আছে, সেটা নিয়ে আসি?’
ওম, তার উদ্দেশে বলল, ‘হ্যাঁ, যা। আর আরও কিছুক্ষণ বসে দেখি হাতি আসে কি না? যদিও আমার মনে হচ্ছে সব ফালতু বকোয়াস!’
রাকেশ নামের ছেলেটা ঘরে ঢুকে নতুন বোতল নিয়ে এল, শুরু হল তাদের দ্বিতীয় দফার মদ্যপান। তার সঙ্গে বেড়ে চলল নেশার ঘোরে অশ্লীল কথাবার্তা। হোমাগ্নি আগের মতোই চেয়ে রইল পুকুরের দিকে। ক্রমশই মনের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে তার। সময় তো এগিয়ে চলেছে, হাতিগুলো ঠিক আসবে তো?
হোমাগ্নি একসময় দেখল তার ঘড়িতে রাত বারোটা বাজে। এবার তার নিজের মধ্যেও হাতির দেখা না পেয়ে, কেমন যেন হতাশা কাজ করতে শুরু করল। সময় যে পেরিয়ে যাচ্ছে। তবে সে সিদ্ধান্ত নিল সারারাত বারান্দায় বসে থাকবে সে। বলা তো যায় না, হয়তো আরও গভীর রাতে হাতিরা জল খেতে এল? এদিকে তখন তিন বন্ধুর নেশা তুঙ্গে। নিজেদের মধ্যে খিস্তির ফোয়ারা ছুটছে! হোমাগ্নির এক সময় কানে এল পরমেশ্বর বলল, ‘চল, এবার শুয়ে পড়ি? হাতি-টাতি কিছু নেই এখানে। সব পয়সা খেঁচার ধান্দা।’
রাকেশ তাকে সমর্থন করে বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। ওই হাতির মতো মেয়ে-ছেলেটা আমাদের ধোঁকা দিচ্ছে। ও যদি ল্যাংটো হয়ে আমাদের সামনে দাঁড়ায় তবে মোবাইলে ওরই ছবি হাতির ছবি বলে নেওয়া যেতে পারে।’
তিন যুবকের আলোচনা যেন এবার হোমাগ্নির সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যেতে লাগল। কান-মাথা গরম হয়ে উঠতে লাগল তার। সে বুঝে উঠতে পারল না, তার পক্ষে এই মদ্যপ যুবকদের থামানোর চেষ্টা করা ঠিক হবে কিনা?
সঙ্গীদের কথাবার্তার জবাবে তাদের দলপতি একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ওই বুড়ি মাগির ছবি তুললে সে ছবি আর কে দেখতে চাইবে? তবে কাল যে ছুকরিটা এসে দাঁড়িয়ে ছিল সেটাকে পেলে বেশ হতো। তার হরিণীর মতোই ফিগার। বড়িয়া সেক্সি!’
রাকেশ জড়ানো গলায় বলল, ‘কিন্তু সেই হরিণীকে তো আজ সারাদিন দেখতেই পেলাম না। মনে হয় সকালবেলা সে ভেগে গেছে। চল, এবার ঘরে ঢুকি?’
আর তারপরই তাদের কথাবার্তা যেন হঠাৎই একসঙ্গে কয়েক মুহূর্তর জন্য থেমে গেল। তারপরই ওম যেন কার উদ্দেশে বলল, ‘হাই! হ্যালো!’
হোমাগ্নি সঙ্গে সঙ্গে ফিরে তাকিয়ে দেখল তারা তিনজন এই মুহূর্তে যার সম্পর্কে কথা বলছিল, কাকতালীয়ভাবে এই মুহূর্তে সে এসে দাঁড়িয়েছে বারান্দাতে। সে তাকিয়ে আছে ওম আর তার সঙ্গীদের দিকে! হরিণী, মিস সেনের বোন!
সে ওমের কথার জবাবে মৃদু সুর টেনে বলল, ‘হ্যা-লো-ও!’
ওম তাকে বলল, ‘সারাদিন তোমার দেখা পেলাম না। কোথায় ছিলে?’
হরিণী জবাব দিল, ‘আজ বাইরে খুব গরম ছিল তাই ঘরের বাইরে বেরোইনি।’
রাকেশ তার কথা শুনে বলল, ‘এতক্ষণ বসে বসে হাতির দেখা তো পেলাম না। তবে তোমার দেখা পেয়ে ভালো লাগল।’
মদ্যপ যুবকের কথা শুনে যুবতীর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। কিছুটা যেন চপলতা মেশানো প্রশ্রয়ের হাসি। এরপর সেই যুবতী তাদের উদ্দেশে বলল, ‘হাতি দেখতে পাননি তো কী হয়েছে? প্রকৃতি তো দেখতে পাচ্ছেন? দেখুন কত সুন্দর চাঁদ উঠেছে! তার আলোতে ওই পুকুর, পাহাড়, জঙ্গল কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে। আমার তো ওই পুকুরের ধারে, চাঁদের আলোতে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছা হচ্ছে।’
যুবতীর বলা কথাটা যেন সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিয়ে ওম বলল, ‘চলো তবে ওই পুকুরের পাড়ে গিয়ে আমরা কিছুক্ষণ প্রকৃতি দেখি? তাতে হাতি না দেখতে পাবার দুঃখ কিছুটা কাটবে।’
মেয়েটা কিন্তু ওমের এ প্রস্তাবে আপত্তি করল না। সে বলল, ‘ঠিক আছে চলুন।’
হোমাগ্নি বেশ অবাক হয়ে গেল মেয়েটা এই মদ্যপ যুবকদের প্রস্তাবে সাড়া দেওয়াতে। এত রাতে এই ছেলেগুলোর সঙ্গে বাড়ি থেকে নামলে মেয়েটার বিপদের সম্ভাবনা আছে। বিশেষত, বর্তমানে এই তিন যুবকের আচার-আচরণ যখন স্বাভাবিক নয়। ব্যাপারটা তার খারাপ লাগলেও মেয়েটা আর যুবকদের মধ্যে কথাবার্তা বলা উচিত বোধ করল না সে। চেয়ার থেকে উঠে পড়ল ওম আর তার সঙ্গীরা।
মেয়েটাও এগিয়ে এল। তাকে সঙ্গে করে তারা তিনজন হোমাগ্নির গা ঘেঁষে এগোল নীচে নামার জন্য। তার পাশ দিয়ে যাবার সময় ওম তার উদ্দেশে হেসে ঈষৎ জড়ানো গলায় বলল, ‘হাতি আর আসবে না। আপনি ক্যামেরা গুটিয়ে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ুন। আমরা একটু ঘুরে আসি।’
হোমাগ্নি তার কথাতে কোনও মন্তব্য করল না। মেয়েটা, ছেলেগুলোর সঙ্গে বারান্দা ছেড়ে নীচে নেমে রওনা হল পুকুরটার দিকে। আর হোমাগ্নি আগের মতোই পাহাড় আর পুকুরটার দিকে চেয়ে বসে রইল। তারা চারজন পৌঁছে গেল জলাশয়ের পাড়ে। চাঁদের আলোতে হোমাগ্নি দেখতে পাচ্ছে তাদের। পুকুর-পাড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েটার সঙ্গে তারা তিনজন কথাবার্তা বলতে শুরু করল মনে হল হোমাগ্নির।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হোমাগ্নির যেন মনে হল মেয়েটার সঙ্গে যেন কিছু ঘটতে শুরু করেছে! তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে পড়েছে ওমেরা। নাইট ভিশন ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখতেই হোমাগ্নির চোখে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল। মদ্যপ যুবকরা হরিণীর হাত ধরে টানাটানি করা শুরু করেছে। সম্ভবত তারা মেয়েটাকে পুকুরের কাছের জঙ্গলের দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। আর মেয়েটা তাদের বাধা দেবার চেষ্টা করছে। কী ঘটতে চলেছে তা বুঝতে অসুবিধা হল না হোমাগ্নির। সে ওই দৃশ্য দেখে নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে।
হোমাগ্নি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। প্রথমে একবার তার মনে হল মিস সেনকে ডেকে নিয়ে যায় ওই জায়গাটাতে। কিন্তু এর পরক্ষণেই তার মনে হল তাতে দেরি হয়ে যেতে পারে। এখনই মেয়েটার কাছে না পৌঁছোতে পারলে মেয়েটার ক্ষতি হয়ে যাবার প্রভূত সম্ভাবনা। হোমাগ্নি আর তাই মিস সেনের ঘরের দিকে না গিয়ে আর কালবিলম্ব না করে বারান্দা থেকে নেমে ছুটতে শুরু করল পুকুরের দিকে।
ইতিমধ্যে ওম আর তার সঙ্গীরা পুকুরের দিক থেকে জঙ্গলের দিক থেকে বেশ কিছুটা সড়িয়ে এনেছে মেয়েটাকে। সে আপ্রাণ চেষ্টা করছে ওমদের বাধা দেবার, কিন্তু পারছে না। তবে তারা কেউই খেয়াল করেনি হোমাগ্নি যে এগোচ্ছে তাদের দিকে।
হোমাগ্নি তখন তাদের বেশ কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, ঠিক সেই সময় একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। হঠাৎই সেই যুবতী এক ঝটকায় ওদের হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল। তারপর একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করে উঠল।
তার সেই চিৎকারের মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত কিছু ছিল যা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হোমাগ্নি। ওম আর তার সঙ্গীরাও যেন কেমন একটা থতমত খেয়ে গেল সেই চিৎকার শুনে। এক মুহূর্তের নিস্তব্ধতা। তারপরই আবারও একইভাবে চিৎকার করে উঠল হরিণী। আর এর পরমুহূর্তেই পুকুরের ওপাড়ের গা থেকে তার চিৎকারের প্রত্যুত্তর ভেসে এল একইরকমভাবে—‘ট্রি-য়া-য়া-ঙ্ক!’
হরিণীর কণ্ঠ থেকে আর পাহাড়ের গা থেকে যে শব্দ জেগে উঠল সে শব্দ হরিণীর ডাক নয়। এ শব্দ অন্যত্র শুনেছে হোমাগ্নি। হাতির ক্রুদ্ধ চিৎকার! আর এরপরই হোমাগ্নি দেখতে পেল চাঁদের আলোতে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝড়ের গতিতে নীচে নামতে শুরু করেছে দলমা পাহাড়ের হাতিরা। নীচে নামতে নামতে ট্রি-য়া-ঙ্ক, ট্রিয়াঙ্ক শব্দে চিৎকার করতে লাগল তারা।
তাদের সেই ডাক চাঁদের আলোতে প্রতিধ্বনিত হতে শুরু করল দলমা পাহাড় শ্রেণিতে। আর সেই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে পড়ল ওম আর তার সঙ্গীরা। তারা আর মেয়েটাকে টানার চেষ্টা করল না। আর এই সুযোগটাই কাজে লাগাল যুবতী।
হোমাগ্নি দেখল যুবকদের কাছ থেকে তিরের মতো ছুটে গিয়ে সে ঝাঁপ দিল পুকুরের দিকে। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই নীচে নেমে পড়ল সেই মাতঙ্গীরা। প্রথমে একটা বিরাট দাঁতাল আর পিছনে তার সঙ্গীরা। তাদের প্রত্যেকের আকৃতিই যেন পাহাড়ের মতো! ডাক ছাড়তে ছাড়তে পুকুরটাকে বেড় দিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল তারা।
হোমাগ্নি বুঝতে পারল বিপদ ঘনিয়ে আসছে। দ্রুত এগিয়ে আসছে ক্রুদ্ধ হস্তিবাহিনী। হোমাগ্নি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখান থেকে বাড়িটা অপেক্ষা জঙ্গলটা কাছে। তাই সে ছুটল জঙ্গলের দিকে। জঙ্গলের ভিতর একটা গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে সে ফিরে তাকাল বাড়ি আর পুকুরটার দিকে।
মদের নেশা কাটিয়ে ওম আর তার সঙ্গীরাও এবার তাদের বিপদটা বুঝতে পারল। প্রাণ বাঁচাবার জন্য তারা ছুটল বাড়িটার দিকে। কিন্তু হাতির পাল তখন এপাশে চলে এসেছে। দাঁতালটার নেতৃত্বে তারাও ছুটল ওম আর তার সঙ্গীদের পিছনে।
তিনজনের শেষ পর্যন্ত কেউই বাড়িটার কাছে পৌঁছোতে পারল না। তার আগেই তাদের ঘিরে ধরল হস্তিবাহিনী। আর এরপরই চাঁদের আলোতে নারকীয় দৃশ্যের সূচনা হল হোমাগ্নির চোখের সামনে। দাঁতাল হাতিটা প্রথমে ওমকে শুঁড়ে জড়িয়ে শূন্যে ছুড়ে দিল। সে ছিটকে পড়ল বেশ কিছুটা তফাতে।
অন্য হাতিগুলোও তাদের শুঁড়ের আঘাতে অন্য দুজন যুবককে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর সবাই মিলে পদদলিত করতে লাগল তাদের তিনজনের দেহ! আবার কখনও-বা সেই দেহগুলোকে শুঁড়ে তুলে নিয়ে, ছিন্ন হাত-পাগুলো নিয়ে বীভৎস চিৎকার করতে করতে লোফালুফি শুরু করল। জঙ্গলের আড়াল থেকে হোমাগ্নি দেখতে লাগল সেই ভয়ংকর দৃশ্য। তখন আর তার জঙ্গলের গভীরে পালিয়ে যাবার ক্ষমতা নেই। হাত-পা সব অবশ হয়ে গেছে তার।
সব প্রলয়েরই যেমন শেষ আছে, তেমনই ওই মহামাতঙ্গীর দলও একসময় ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে গেল। থেমে গেল তাদের আকাশ কাঁপানো তীব্র চিৎকার। ওম আর তার সঙ্গীদের মৃতদেহগুলো, বলা ভালো দলা পাকানো মাংসপিণ্ডগুলো ফেলে রেখে তারা এগোল পুকুরের দিকে। ওই পুকুরেইতো মেয়েটা আছে! এবার কি তবে তার পালা? ব্যাপারটা কল্পনা করতেই একটা হিমেল রক্তের স্রোত নেমে গেল হোমাগ্নির শিরদাঁড়া বেয়ে।
পুকুরের ধারে গিয়ে সাড় বেঁধে দাঁড়াল সেই হস্তীবাহিনী। চাঁদের আলোতে দাঁড়িয়ে আছে তারা। যে দৃশ্য প্রত্যক্ষ করার জন্য হোমাগ্নি এখানে ছুটে এসেছে তা এখন তার চোখের সামনে। তবে এ দৃশ্য দেখার আগে তাকে যে এমন ভয়ংকর অভিজ্ঞতা প্রত্যক্ষ করতে হবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। হোমাগ্নি গুনে দেখল সেই দাঁতালটা আর তার সঙ্গের মাতলা পুরুষ-নারী মিলিয়ে মোট সাতটা হাতি।
দাঁতালটা এরপর জলে নেমে পড়ল আর তাকে অনুসরণ করল তার সঙ্গীরা। হোমাগ্নির মনে হল এই বুঝি নারী কণ্ঠর আর্ত চিৎকার ভেসে আসবে জল থেকে। কিন্তু তেমন কিছু ঘটল না। জল পান করে তাদের রক্তাক্ত শরীরগুলো ধুয়ে নেবার পর তারা মেতে উঠল জলকেলিতে। আকাশের দিকে চাঁদের আলোতে ছিটকে উঠতে লাগল জল। আর হোমাগ্নি যেন সম্মোহিতভাবে চেয়ে রইল সেই দৃশ্যর দিকে। সময় এগিয়ে চলল।
কতক্ষণ যে এভাবে সেদিকে তাকিয়ে ছিল তা ঠিক বুঝে উঠতে পারল না হোমাগ্নি। এক সময় শরীর ঠান্ডা হল সেই হস্তিকূল জল থেকে উঠে পড়ল তারা। বিশাল দাঁতালটার নেতৃত্বে এবার হাতির দল পা বাড়াল দলমা পাহাড়ে ফিরে যাবার জন্য।
পুকুর ছেড়ে তারা সবেমাত্র কিছুটা এগিয়েছে ঠিক তখনই আবার শব্দ শোনা গেল—‘ট্রি- য়া-য়া-ঙ্ক!’ তবে এবারের শব্দটা ঠিক ক্রুদ্ধ গর্জন বা আর্তনাদের মতো নয়, কিছুটা যেন কোমলতা মিশে আছে সে ডাকের সঙ্গে।
সে ডাক শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল হাতিগুলো। দাঁতালটা পিছনে ফিরে ওই একই ধরনের শব্দ করল। আর এর পরই একটা হাতি পুকুর থেকে ধীরে ধীরে উপরে উঠে এল। হোমাগ্নির তাকে দেখে মনে হল সেটা স্ত্রী হাতি। তাহলে একটা হাতি পুকুরের মধ্যে রয়ে গিয়েছিল?
মাদি হাতিটা জল থেকে উঠে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল অন্য হাতিগুলোর কাছে। দাঁতালটা একবার শুঁড় বোলাল তার গায়ে। তারপর তাকে সঙ্গে করে রওনা হল ফেরার জন্য। ঠিক সেই সময় হোমাগ্নি খেয়াল করল, হাতির সংখ্যা সাত নয় আট!
পাহাড়ের ঢালের কাছে পৌঁছে ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে শুরু করল হাতিটা। সব শেষে জল থেকে উঠে আসা হস্তিনীটা মুহূর্তের জন্য যেন একবার ফিরে তাকাল বাড়িটার দিকে। প্রণামের ভঙ্গিতে শুঁড়টা মাথার উপর ওঠাল সে। তারপর আবার অনুসরণ করল হাতিগুলোকে।
দলমা পাহাড়ের মাথার উপর আকাশ লাল হতে শুরু করল। পাহাড় আর তার পাদদেশের জঙ্গলের পাখির দল ভোরের প্রথম আলোকে স্বাগত জানিয়ে কিচির-মিচির শব্দে ডাকতে শুরু করল। অন্ধকার কেটে গিয়ে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। আর কোথাও কোনও অন্ধকার নেই। জঙ্গল আর বাড়িটার মাঝখানে ফাঁকা জমিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে সেই মৃত দেহগুলো।
হোমাগ্নির বিস্ময় আর আতঙ্ক এখনও কাটেনি। সে বুঝে উঠতে পারছিল না তার এখন কী করা উচিত, সে কি বাড়িটার দিকে যাবে? নাকি চেষ্টা করবে বনের পথ ধরে গ্রামে ফেরার? এক সময় তার মনে হল, গত রাতের এত ঘটনা, আকাশ কাঁপানো হাতিদের চিৎকার, লোকগুলোর মৃত্যু আর্তনাদ, এসব জেনেও মিস সেন ঘরের বাইরে বের হলেন না কেন? আর ভোরের আলো ফোটার পরও তাকে দেখা যাচ্ছে না কেন?—এসব কথা ভাবতে ভাবতেই কিছুক্ষণ পর একজনকে দেখতে পেল হোমাগ্নি।
জঙ্গলের এক দিক থেকে প্রথমে বেরিয়ে এল বুড়ো যুধিষ্ঠির আর তার পিছন পিছন ইউনিফর্ম গায়ে বন্দুক-সহ বনরক্ষী বাহিনীর কিছু লোক। জঙ্গলের বাইরে বেরিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে ফাঁকা জমিটাতে পড়ে থাকা মরদেহগুলোর দিকে বিস্মিতভাবে তাকাল তারা। তাদের দেখে হোমাগ্নি মনে বল ফিরে এল, ‘এই যে আমি’ বলে চিৎকার করে জঙ্গল থেকে ছুটে বেরিয়ে এল।
হোমাগ্নি তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যুধিষ্ঠির একজন ফরেস্ট অফিসারকে হোমাগ্নিকে দেখিয়ে বলল, ‘এই সেই ফটোতোলাবাবু যাকে আমি প্রথমদিন এখানে এনেছিলাম।’
ফরেস্ট অফিসার হোমাগ্নিকে বলল, ‘সারারাত হাতিদের বন কাঁপানো ডাক শুনে আমরা বুঝতে পারছিলাম এখানে কিছু একটা ঘটছে। আমরা এখানে আসার জন্য ভোরের আলো ফোটার অপেক্ষা করছিলাম। ঘটনাটা ঠিক কী হয়েছে বলুন তো?’
তাঁর প্রশ্নের জবাবে যথাসম্ভব দ্রুত তাদেরকে গত রাতের ঘটনাটা খুলে বলল হোমাগ্নি।
হোমাগ্নির কথা শুনে যুধিষ্ঠির মাহাতো মৃদু বিঘ্নিতভাবে বলল, ‘বেবি দিদিমণির তো কোনও বোন নেই। ও মেয়ে নিশ্চয়ই তবে অন্য কেউ হবে। কিন্তু বেবি দিদিমণি কোথায়?’
হোমাগ্নি জবাব দিল, ‘গতকাল বিকেলের পর আর আমি তাকে দেখিনি। ঘরের মধ্যেও হতে পারেন।’
ফরেস্ট অফিসার বললেন, ‘চলুন, আগে তার খোঁজ করে দেখি? তাকে পেলে তিনি কী বলেন তা শুনি। তারপর পুলিশে খবর দিতে হবে। মৃত দেহগুলো সরাবার ব্যবস্থা করতে হবে।’
অফিসারের নির্দেশমতো সবাই তারপর এগোল বাড়িটার দিকে। বাড়ির বারান্দায় উঠেই হোমাগ্নি প্রথমে তার দামি ক্যামেরাটা স্ট্যান্ড থেকে খুলে নিল। জিনিসটা আস্ত আছে এই তার ভাগ্যি!
বারান্দাটা বেড় দিয়ে এরপর সবাই এসে দাঁড়াল মিস সেনের ঘরের সামনে। দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। দরজার মাথার উপরে মেয়েটার ছবিটা দেখেই হোমাগ্নি বলল, ‘এই তো সেই মেয়েটার ছবিটা! মিস সেন যাকে তার বোন বলেছিলেন।’
কথাটা শুনে তাকে অবাক করে দিয়ে যুধিষ্ঠির বলল, ‘আপনি মনে হয় ভুল শুনেছিলেন। এটা তো বেবি দিদিমণির অল্প বয়সের ছবি! ও চেহারাতে আমি তাকে দেখেছি। তারপর দিদিমণি কী একটা কঠিন অসুখে পড়েছিল। সে সেই অসুখ থেকে সুস্থ হয়েছিল ঠিকই। তারপর সেই ওষুধের ফলে মোটা হয়ে গেছিল। সে জন্যই বহুদিন পর তাকে প্রথম দেখে আমি চিনতে পারিনি। বেবি দিদিমণিই আমাকে বলেছিল তার মোটা হবার কারণটা।’
ফরেস্ট অফিসার বললেন, ‘দেখা যাক উনি কী বলেন?’
বেশ কিছুক্ষণ ধরে মিস সেনকে ডাকার পরও যখন ভিতর থেকে কোনও সাড়া এল না তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল দরজা ভেঙে ফেলার। বন্দুকের কুঁদোর আঘাতে দরজা ভেঙে ফেলা হল।
ঘরে প্রবেশ করতেই প্রথমে একটা পচা গন্ধ এসে লাগল সবার নাকে। খোলা দরজা দিয়ে ঢোকা সূর্যের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল ঘর। তারপর সবাই চমকে উঠল।
দরজার কাছেই খাটের উপর শুয়ে আছে একটা মরদেহ। তবে তার দেহ হাতির মতো প্রকাণ্ড নয়। পরনের পোশাক দেখে বোঝা যাচ্ছে সেটা কোনও মহিলার দেহ। বেশ কিছুদিন আগে সম্ভবত মৃত্যু হয়েছে তার। শরীরটা পচে শুকিয়ে কঙ্কাল হয়ে গেছে।!
ফরেস্ট অফিসার প্রশ্ন করলেন, ‘এ কার দেহ?’
মৃতদেহের দিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখার পর বৃদ্ধ যুধিষ্ঠির বিস্মিতভাবে আর্তনাদ করে বলল, ‘এ যে বেবি দিদিমণি! ওই তো ওর গলার সোনার লকেটটা!’
হতভম্ব হোমাগ্নিও বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, ওই লকেটটা আমিও মিস সেনের গলাতে দেখেছি!’
যুধিষ্ঠির এরপর কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল, ‘বেবি দিদিমণিকে আমি কত ছোটবেলা থেকে কোলে-পিঠে মানুষ করেছিলাম। ওর শরীরটা অসুখের পর মোটা হয়ে গেছিল। বড়বাবু মারা যাবার পর ও আর বাড়ির বাইরে বেরোতে পারল না। রাস্তায় বেরোলেই ওকে সবাই ‘হাতি’, ‘হাতি’ বলে খ্যাপাতো! এ ব্যাপারটা একদিন আর সহ্য করতে না পেরে শহর ছেড়ে দিদিমণি এখানে চলে এসেছিল। বেবি দিদিমণিই আমাকে বলেছিল তার সে দুঃখের কাহিনি। ও যে এখানে এসে এভাবে চলে যাবে আমি তা ভাবতেও পারছি না।’
ফরেস্ট অফিসার এবার হোমাগ্নিকে বলল, ‘আপনারা আর যুধিষ্ঠির মাহাতোর কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই মৃতদেহটা দেখে বোঝা যাচ্ছে বেশ কিছুদিনের পুরোনো। আপনাদের কথামতো ওটা যদি মিস সেনের দেহ হয়ে থাকে, তবে কালও আপনি তাকে দেখলেন কীভাবে?’
এ প্রশ্ন শুনে হোমাগ্নি বলল, ‘আমারও মাথার মধ্যে কেমন যেন সবকিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে! হ্যাঁ, উনি কালকেও ছিলেন। আমি ওর ছবি তুলেছি।’
কথাটা শুনে ফরেস্ট অফিসার অবিশ্বাসের সুরে বললেন, ‘ছবিটা আছে? কই দেখি?’
হোমাগ্নি বলল, ‘হ্যাঁ আছে, দেখাচ্ছি।’
ক্যামেরার ফটো গ্যালারি খুলল হোমাগ্নি। গতকাল মিস সেনের ছবিগুলোই তার তোলা শেষ ছবি। তবে ছবিগুলো অফিসারকে দেখাতে গিয়েই বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সে। ছবিতে পুকুর, পাহাড় সবকিছু একই আছে। শুধু মিস সেন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখানে তিনি নেই। তার পরিবর্তে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে একটা হস্তিনী! যে চেয়ে আছে দলমা পাহাড়ের দিকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন