হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

গল্প-উপন্যাস লেখার জন্য মাথায় কোনও ভাবনা জমাট বাঁধে না, বা প্লট আসে না। যদি-বা কখনও তা এল, মনে হয় এ ভাবনা নিয়ে লেখা তো আগেই লিখে ফেলেছি। অথবা ভাবনাটা কাগজ-কলমে কীভাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরা যাবে তা বোঝা যায় না। মাথার ভিতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়।
এ ধরনের পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে লেখকদের অনেক সময়ই যেতে হয়। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘রাইটার্স ব্লক’। কিন্তু তা বলে প্রকাশক-সম্পাদকরা লেখককে ছাড়বেন কেন? বিশেষত যদি লেখকের একটু নাম-ডাক থাকে। মাথায় কিছুই আসছে না অথচ লেখার জন্য ঘন ঘন তাগাদা দিয়ে চলেন সম্পাদকরা।
তুহিনেরও কিছুদিন ধরে এ অবস্থা চলছে। ঘন ঘন ফোন আসছে প্রকাশকদের, ‘ও মশাই, পুজো তো আসতে চলল, লেখাটা কবে পাব বলুন?’ অথচ তুহিনের মাথায় কোনও প্লট আসছে না। আর এই বিড়ম্বনা থেকে মুক্তি পেতেই তুহিন বেরিয়ে পড়েছে বাড়ি থেকে। কয়েকটা দিন নিরিবিলিতে কাটালে যদি মাথাটা একটু খোলে, অথবা নতুন পরিবেশ থেকে যদি লেখার কোনও উপাদান মেলে সেই আশাতে।
তুহিন শুনেছে বিদেশের অনেক জায়গায় প্রকাশকরা নাকি লেখকদের তাদের লেখার রসদ সংগ্রহ করার জন্য নিজেদের খরচে বিদেশে পর্যন্ত দীর্ঘদিন থাকার ব্যবস্থা করেন। বাংলা বইয়ের বাজারে অবশ্য এখনও এ ব্যাপারটা আকাশকুসুম কল্পনার মতোই। লেখার প্রয়োজনে লেখককে কাঁকুড়গাছি থেকে যদি কাকদ্বীপও যেতে হয় তবে তা নিজের খরচেই যেতে হয়। আর অনেক সময়ই দেখা যায় যে লেখা শেষ হবার পর তা ছাপার বিনিময়ে যা অর্থ মেলে তাতে লেখকের রসদ সংগ্রহের জন্য ভ্রমণ খরচের অর্ধেকও ওঠে না।
তাই তুহিনও এ অবস্থায় কলকাতা থেকে অনেক দূরে কোথাও যেতে পারেনি। সে এসে উপস্থিত হয়েছে কলকাতা থেকে ঘণ্টা পাঁচেকের দূরত্বের এই সমুদ্র সৈকতে। তবে এ জায়গা ঠিক দীঘার মতো জনস্রোতপূর্ণ নয়। তুলনামূলক বেশ কিছুটা ফাঁকা ফাঁকা।
কাগজ-কলমে ভাদ্র মাস হলেও বর্ষার রেশ এখনও কাটেনি। তুহিন যখন বাস থেকে নামল, তার আগেই এ জায়গাতে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। রাস্তা-ঘাট হয়তো-বা সেজন্য কিছুটা ফাঁকা-ফাঁকা। বছর পাঁচেক আগে একবার এখানে এসেছিল বন্ধুদের সঙ্গে। যে কারণে এ জায়গা সামান্য কিছুটা চেনা।
এখানকার অধিকাংশ হোটেলগুলো বাস স্ট্যান্ডের চারপাশেই অবস্থিত। আর কিছু হোটেল, রিসর্ট আছে দূরে সমুদ্রের বালুতটের গা ঘেঁষে। এর আগেরবার বেড়াতে এসে সমুদ্র পাড়ের ওই হোটেল-রিসর্টগুলো দেখেছিল তুহিন। বাস থেকে নামতেই কয়েকজন লোক এসে তাকে ঘিরে ধরল। হোটেলের দালাল তারা।
তুহিন ওখানে আসার আগে মনে মনে ভেবে রেখেছে যে, প্রথমে সে চেষ্টা করবে সমুদ্র ধারের কোনও হোটেল বা রিসর্টে থাকার। কারণ যথাসম্ভব শান্ত নিরিবিলি পরিবেশে থাকতে চায় সে। আর ও-জায়গাতে একান্তই যদি ঘর না পাওয়া যায় তবে তখন বাস স্ট্যান্ডের কাছের কোনও একটা হোটেলে ঘর নেবে। কাজেই হোটেলের লোকেরা যখন তাকে ঘিরে দাঁড়াল তখন তাদের পাশ কাটাবার জন্য তুহিনকে ছোট্ট মিথ্যার আশ্রয় নিতে হল। সে তাদের জানাল তার ঘর বুক করা আছে। এ কথা শুনে তারা আর তুহিনকে বিরক্ত করল না। খদ্দের ধরার জন্য অন্যদিকে চলে গেল।
ঘড়ি দেখল তুহিন। দুপুর সাড়ে তিনটে বাজে। বেশ খিদে পেয়েছে তার। বাস স্ট্যান্ডের আশপাশে এখানে বেশ কয়েকটা খাবার হোটেল আছে। সে সিদ্ধান্ত নিল, খাওয়া সেরে তারপর সে সমুদ্রের ধারে রিসর্ট বা হোটেলের সন্ধানে যাবে।
সেই মতোই কাজ করল তুহিন। কাছেই একটা হোটেলে ঢুকে মাছ-ভাত দিয়ে খাওয়া সেরে নিল। তারপর পিঠের ব্যাগটা নিয়ে রওনা হল সমুদ্র পাড়ের দিকে। সোজা রাস্তা। মিনিট পাঁচেক হাঁটার পর প্রথমে সমুদ্রের গর্জন কানে এল তার। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই তুহিনের চোখে পড়ল সমুদ্রের অনন্ত জলরাশি।
তুহিন পৌঁছে গেল বালুতটে। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে আবার। সূর্য বেশ ম্রিয়মাণ। মেঘের ছায়াতে কালো দেখাচ্ছে সমুদ্রের জলরাশি। সে মৃদু উত্তালও বটে। মুহুর্মুহু তার ঢেউ এসে ভাঙছে বালুতটে। ছড়িয়ে পড়ছে সাদা ফেনা। তবু তারই মধ্যে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ভাবে সমুদ্রে স্নান করছে বেশ কিছু লোকজন। কোথাও আলিঙ্গনবদ্ধ কপোত-কপোতী, আবার কোথাও বা বাচ্চা-কাচ্চা সমেত কোনও পরিবার। সমুদ্র স্নানের অনাবিল মজা উপভোগ করছে সবাই।
তুহিন আগেরবার বেড়াতে এসে যেদিকে সেই রিসর্টগুলো দেখেছিল, সেদিকে তাকাল। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে সেগুলো। তবে সেদিকে যাবার আগে বেশ কিছুক্ষণ ধরে চেয়ে রইল সমুদ্রের দিকে। তুহিন যতবারই কোনও সমুদ্রের সামনে এসে দাঁড়ায় ততবারই তার নিজেকে কত ক্ষুদ্র মনে হয়।
কত বিশাল এই সমুদ্র, তার তুলনায় মানুষের জীবন আর কতটুকু? কত হাজার হাজার বছর ধরে সে বিরামহীন ভাবে ঢেউ ভেঙে চলেছে বালুতটে! হাজার হাজার বছর ধরে কত মানুষ জন্মাল, মরল, কত ঘটনা ঘটল মানুষের ইতিহাসে। কিন্তু সমুদ্র আগেও যেমন ছিল, এখনও তেমনি আছে, শত সহস্র বছর পরও থাকবে তার অসীম বিপুলতা নিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে তুহিন উপভোগ করল সমুদ্রের জলরাশির অন্তহীন সৌন্দর্য। তারপর সে বালুতট বেয়ে হাঁটতে শুরু করল রিসর্টগুলো যেদিকে আছে সেদিকে।
তুহিন যে জায়গা থেকে হাঁটা শুরু করল সেখান থেকে রিসর্টগুলোর অবস্থান বেশ খানিকটা দূর। যেখানে লোকজন স্নান করছিল সে জায়গা ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল তুহিনের পিছন থেকে। যেদিকে সে এগোচ্ছে সেদিকে কোনও লোকজন চোখে পড়ল না তুহিনের।
বিকাল হতে চলেছে। হয়তো-বা সেদিকে যারা স্নান করছিল তারা জল থেকে উঠে রিসর্ট বা হোটেলে ফিরে গেছে। এ কথাই মনে হল তার। তুহিন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল রিসর্টগুলোর কাছে। বেশ তফাতে তফাতে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় রিসর্টগুলো। সংখ্যায় তারা পাঁচ-ছ’টা হবে। কিন্তু সে-জায়গায় পৌঁছেও রিসর্ট-হোটেলগুলোর দরজায় বা ব্যালকনিতে কোনও লোককে দেখতে পেল না সে।
মেঘ জমা হচ্ছে আকাশে, তার নীচে কেমন যেন অদ্ভুত চুপচাপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বড় বড় বাড়িগুলো। একটা রিসর্টের দোতলার অংশ ভাঙা। না, ঝড়-বৃষ্টিতে ভাঙা নয়। মানুষই বাড়িটাকে ভেঙেছে ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে। এত সুন্দর রিসর্টটা কেন এভাবে ভাঙা হল তুহিনের তা বোধগম্য হল না।
বালুতট থেকে মৃদু ঢাল বেয়ে উঠতে হয় রিসর্টগুলোতে। তুহিন প্রথমে একটা রিসর্টের গেটের কাছে পৌঁছোল। বার কয়েক সে হাঁক দিল গেট কিপারের উদ্দেশে। কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। তুহিন তারপর খেয়াল করল তালা ঝুলছে রিসর্টের গেটে। অর্থাৎ ভিতরে কোনও লোক নেই।
আবারও কিছুটা হেঁটে সে এরপর পরের হোটেলের দরজায় উপস্থিত হয়ে একই জিনিস দেখতে পেল। তার দরজাতেও তালা ঝুলছে! তবে কি টুরিস্ট সিজন নয় বলে রিসর্টগুলো এখন আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে? এ প্রশ্নের উদয় হল তুহিনের মনে। কোনও রিসর্ট খোলা আছে কি না দেখার জন্য তুহিন আবারও এগোল।
আকাশ আরও কালো হতে শুরু করেছে। বৃষ্টি নামার পূর্বাভাস। এরপর আরও দুটো রিসর্ট ঘুরেও তুহিন সেখানে কারও দেখা পেল না। শেষ যে রিসর্টটা চোখে পড়ল সেটা তুলনায় অন্য রিসর্টগুলোর থেকে বেশ খানিকটা দূরে। সমুদ্রের দিকে মুখ করে একলা দাঁড়িয়ে আছে দোতলা রিসর্টটা। তার সামনে বালুতটে নিঃসঙ্গ ভাবে পড়ে আছে কালো একটা নৌকা। তুহিন ভাবল, এত রিসর্ট যখন দেখাই হল তখন শেষ রিসর্টটাও একবার দেখে যাওয়া যাক। এই ভেবে সে এগোল সেদিকে।
তুহিন রিসর্টটার কাছে পৌঁছোবার আগেই মাঝামাঝি জায়গাতে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। তুহিনকে যদি বৃষ্টি থেকে বাঁচতে হয় তবে তাকে রিসর্টগুলোর প্রাচীর বা শেডের আড়ালে কোথাও আশ্রয় নিতে হবে। কাজেই সামনের রিসর্টে কোনও লোক পাওয়া যাক বা না যাক, রিসর্টের প্রবেশ তোরণের মাথায় যে শেডটা দেখা যাচ্ছে, তার নীচে আশ্রয় নেবার জন্য সোজা ছুটল সেদিকে। কিন্তু গেটের কাছে পৌঁছোতে পৌঁছোতেই কাকভেজা হয়ে গেল তুহিন। তবে এই প্রথম সে দেখতে পেল রিসর্টের গেটটা খোলা। গেটের মাথায় রিসর্টের নাম লেখা ‘ঢেউপরী’।
তুহিন দরজা খোলা পেয়ে আর কালবিলম্ব না করে প্রবেশ করল রিসর্টের চৌহদ্দিতে। একপাশে একটা ছোট সুইমিংপুল আর অন্যপাশে ফুলের টব সাজানো জায়গা। আর তার মাঝখান দিয়ে টাইলস বসানো পথ বাড়িটার ভিতরে ঢোকার জন্য। একতলার যে জায়গাটা কাচে ঘেরা, মাথার উপর লেখা আছে ‘রিসেপশন’। কাচের দরজাটা খোলা দেখতে পেল তুহিন।
প্রবল বৃষ্টি থেকে বাঁচার জন্য এক ছুটে গিয়ে ঢুকে পড়ল রিসেপশনের ভিতর। ছিমছাম একটা রিসেপশন রুম। কাঠ আর প্লাইউডের ডেকরেশন করা কাউন্টার, গেস্টদের বসার জন্য সোফা সেট, দেওয়ালের গা থেকে ঝুলছে বেশ বড় আকৃতির ফ্রেমে বাঁধানো সূর্যাস্তের ছবি। একটা অ্যাকোয়ারিয়ামও আছে, তবে তাতে আর মাছ নেই। রিসেপশনের একপাশ থেকে প্যাসেজ এগিয়েছে বাড়িটার একতলার ঘরগুলোর দিকে আর অন্যপাশ থেকে সুদৃশ্য রেলিং দেওয়া সিঁড়ি উঠেছে দোতলাতে যাবার জন্য। রিসেপশনের ভিতর ছড়িয়ে আছে রুম ফ্রেশনারের তীব্র গন্ধ। তবে রিসেপশনে কাউকে দেখতে পেল না তুহিন।
চারপাশে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখার পর সে হাঁক দিল, ‘কেউ আছেন? রিসেপশনে আছেন কেউ?’
বার কয়েক ডাকার পর অর্ধবৃত্তাকার রিসেপশন কাউন্টারের দেওয়ালের গায়ে যে দরজাটা আছে সেটা খুলে গেল। ওপাশের ঘর থেকে কাউন্টারে এসে দাঁড়াল এক তরুণী। তার বয়স তুহিনের মতোই তিরিশের আশপাশে হবে। ফর্সা, ছিপছিপে চেহারা, পরনে জিন্স আর কুর্তি। নাক চোখ মুখের গড়ন দেখে তাকে নির্দ্বিধায় সুন্দরী বলা যেতে পারে। সে কাউন্টারে এসে দাঁড়াতেই ঘরের রুম ফ্রেশনারের গন্ধ ছাপিয়ে মেয়েটার গায়ের পারফিউমের গন্ধ টের পেল তুহিন। মৃদু বিস্মিতভাবে মেয়েটা কয়েক মুহূর্ত তুহিনের ভেজা চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকার পর প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি সমুদ্র থেকে উঠে এলেন?’
তুহিন এগিয়ে গিয়ে কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘না, না, আমি স্নানে নামিনি। আমি এদিকের রিসর্টগুলোতে থাকার জন্য ঘর খুঁজতে এসেছি। সবই তো তালা বন্ধ দেখলাম। এখানে আসতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম।’
জবাব শুনে মেয়েটা জানতে চাইল, ‘কোথা থেকে এসেছেন আপনি? কী করেন?’
তুহিন জবাব দিল, ‘আমার নাম তুহিন রায়। বিভিন্ন বই, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্রে গল্প-উপন্যাস লিখি৷ লেখাটাই আমার পেশা। কলকাতা থেকে বাসে করে একঘণ্টা আগে এখানে নেমেছি। কলকাতায় থাকি।’
মেয়েটা বলল, ‘ও আপনি সাহিত্যিক! লেখালেখির জন্য এখানে এসেছেন?
তুহিন মৃদু হেসে বলল, ‘অনেকটা তেমনই বলতে পারেন। নিরিবিলিতে লেখা নিয়ে একটু ভাবার জন্য এসেছি। তিন-চারদিন থাকার ইচ্ছা। যে জন্য বাস স্ট্যান্ডের হই-হট্টগোল ছেড়ে এদিকে এলাম। কিন্তু এদিকে তো সব বন্ধ দেখছি। কেন তা ঠিক বুঝতে পারছি না!’
মেয়েটা তুহিনের কথা শুনে বলল, ‘আসলে দূষণ নিয়ন্ত্রণ আর পর্ষদের সরকারি নির্দেশে রিসর্ট মালিকরা সব রিসর্ট তিন মাস হতে চলল বন্ধ করে দিয়েছে। আর আগামী তিন মাসের মধ্যে সব রিসর্ট এখান থেকে ভেঙে সরিয়ে দেবার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এখানে আর কোনও রিসর্ট থাকবে না।’
মেয়েটার কথা শুনে তুহিন বলল, ‘খবরের কাগজে এমন একটা খবর পড়েছিলাম মনে হয়। তা আপনাদের রিসর্টে কি লোক আছে? নাকি লোক থাকা বন্ধ হয়ে গেছে? ঘর পাওয়া যাবে এখানে?’
মেয়েটা আর তুহিনের কথার মাঝে কোথা থেকে এবার একটা বেশ বড় আকারের মাছি এসে ভন ভন করে উড়তে শুরু করল। কাউন্টারে একটা ইলেকট্রিক ব্যাট রাখা ছিল। মেয়েটা মাছিটাকে মারার জন্য সেই ব্যাটটা তুলে নিয়ে তুহিনের প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘আমার এখানে এখন বেশ কয়েকজন লোক আছেন। হঠাৎ তাঁরা এসে পড়েছেন। তাই আমি তাঁদের থাকতে দিয়েছি। যেহেতু আমি নিজে এখানে এখনও আছি তাই। এই রিসর্টের মালিক আমি নিজে। রিসর্টটা ভেঙে ফেলার আগে পর্যন্ত অর্থাৎ আরও তিন মাস আমার হাতে সময় আছে এখানে থাকার জন্য।’
রিসেপশনের ভিতরটাতে ধীরে ধীরে আলো কমে আসছে। বাইরে মেঘ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। বৃষ্টি আরও বাড়ছে।
ভন ভন করে উড়তে থাকা মাছিটার দিকে চোখ রেখে মেয়েটা এরপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, দোতলায় একটা ঘর খালি আছে। আপনি থাকতে পারেন। তবে দুটো সমস্যা আছে। সরকার থেকে ইলেকট্রিক লাইন কেটে দিয়ে গেছে। একটা ছোট জেনারেটর আছে। তাতে শুধু রাত্রিবেলা একটা করে বাতি আর ফ্যান চলে প্রতি ঘরে। অবশ্য জানলা খুললে সমুদ্রের বাতাসের জন্য ফ্যানের দরকার পড়ে না। আর দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল আমার এখানে রান্নার কোনও ব্যবস্থা নেই। কাজেই আপনাকে বাস স্ট্যান্ডের ওদিকের হোটেলে গিয়ে খাবার খেয়ে আসতে হবে অথবা খাবার নিয়ে আসতে হবে।’
মাছিটা ভনভন শব্দ করতে করতে বেশ বিরক্তিকর ভাবে উড়ছে। কখনও-বা তুহিনের মুখের সামনেও চলে আসছে। রিসর্টের মালকিনের কথা শুনে তুহিন ভাবতে লাগল তার এখন কী করা উচিত?
বাইরে আকাশ আর সমুদ্রের বুকে কেউ যেন কালি ঢেলে দিয়েছে। তার সঙ্গে প্রবল বৃষ্টির চোটে বাইরে তো এখনই যেন সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। দুর্যোগ কখন থামবে তুহিনের জানা নেই। তবে এ দুর্যোগ না কাটলে যে তার বাইরে বেরোবার উপায় নেই তুহিন তা বুঝতে পারল।
মাছিটাকে শেষ পর্যন্ত মেয়েটা তার ব্যাটের নাগালের মধ্যে পেয়ে গেল৷ ইলেকট্রিক ব্যাটের এক চাপড়ে সে ঘরের এক কোণে মাছিটাকে ছিটকে ফেলল। তারপর সে তুহিনকে বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলি? এই ঝড়-বৃষ্টি দু-তিন ঘণ্টার আগে থামবে বলে মনে হয় না। এমনকী মাঝরাত পর্যন্তও চলতে পারে। আপনি বরং আজকের রাতটা এখানে থেকে যান, অথবা বৃষ্টি থামলে অন্য কোথাও যাবার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু এভাবে ভেজা গায়ে দাঁড়িয়ে থাকলে আপনার কিন্তু জ্বরে পড়ার সম্ভাবনা আছে। মাত্র একশো টাকা দিলেই হবে একরাতের জন্য।’
কথাটা শুনে তুহিন বেশ অবাক হল। রিসর্টের পরিস্থিতি যতই অসুবিধাজনক হোক, তা বলে মাত্র একশো টাকা ভাড়া! যে-কোনও নিম্নমানের হোটেল ভাড়াই তো এখানে অন্তত পাঁচশো টাকা।
তুহিনের মনের ভাব সম্ভবত পাঠ করতে পেরে সেই যুবতী বলল, ‘আসলে ঘর ছাড়া সার্ভিস তো কিছুই দিতে পারব না আপনাকে। আসলে কী জানেন, বোর্ডার-গেস্টদের সঙ্গে থাকতে থাকতে সেটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। একলা থাকতে ভালোলাগে না, তাই অন্যদের এখানে থাকতে দিচ্ছি, আমি যে কদিন এখানে আছি সে ক’দিন। ওই একশো টাকাটা আমি আপনার থেকে নেব, যাতে আপনি বিনা ভাড়ায় এখানে থাকতে অস্বস্তিবোধ না করেন তার জন্য।’
বাইরে দুর্যোগ আরও বেড়ে চলেছে। সেদিকে তাকিয়ে নিয়ে তুহিন কোনও উপায় না দেখে এরপর মেয়েটার উদ্দেশে বলল, ‘ঠিক আছে, আজকের রাতটা আমি থাকব এখানে। দিন, কোন খাতায় সই-সাবুদ করতে হবে দেখি?’ এই বলে পিঠের ব্যাগটা হাতে নিল, তার ভিতর থেকে নিজের পরিচয়পত্র বার করে নিয়মমাফিক মেয়েটাকে দেবার জন্য।
কিন্তু রিসর্টের মালকিন হিসাবে নিজেকে পরিচয় দেওয়া মেয়েটি বলল, ‘এসব ফর্মালিটির ব্যাপার পরে হবেখন। ভিজে আছেন, আগে ঘরে চলুন।’
রিসেপশন কাউন্টারের দেওয়ালের পাশের বোর্ড থেকে একটা চাবি খুলে নিয়ে মেয়েটা কাউন্টার ছেড়ে এগোল সিঁড়ির দিকে। তুহিন তাকে অনুসরণ করল। সিঁড়ি বেয়ে তার পিছনে উঠতে উঠতে তুহিন জিজ্ঞাসা করল, ‘ম্যাডামের নামটা জানতে পারি?’
যুবতী উত্তর দিল, ‘আমার নাম ঝিনুক মিত্র।’
তুহিন তার নাম শুনে মনে মনে ভাবল, ‘ঢেউপরী, ঝিনুক, সমুদ্রের সঙ্গে দুটো নামই বেশ সম্পর্ক যুক্ত।’ দোতলায় উঠে এল তারা দুজন। একটা বারান্দা বা প্যাসেজের দু-পাশে বেশ কয়েকটা ঘর। বন্ধ ঘরগুলোর একটার দরজায় তালা খুলল। ঘরের ভিতরটা বাইরে থেকে অন্ধকার দেখাচ্ছে। তুহিনকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে ঝিনুকই আগে ঘরে ঢুকল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই বেশ খানিকটা আলো ঢুকল ঘরে। তারপর সে তুহিনকে বলল, ‘ভিতরে আসুন।’
তুহিন ঘরে পা রাখল। ঘরটার একটা দেওয়ালের গায়ে বিরাট বড় কাচের জানলা বসানো আছে। তার পাশের পর্দাটা টেনে সরিয়ে দিয়েছে ঝিনুক। তা দিয়েই বাইরের বর্ষণ সিক্ত বিকালের ম্রিয়মাণ আলোর কিছুটা অংশ ভিতরে ঢুকছে। তবুও তার মধ্যে দিয়ে যতটুকু দেখা যায় তাতেই তুহিন বুঝতে পারল সামনেই সমুদ্র। বাইরে একটা একচিলতে উন্মুক্ত বারান্দাও আছে। জানলার পাশের দরজাটা খুললেই সেই বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়ানো যায়।
রিসর্টের মালকিন বলল, ‘বৃষ্টি না থাকলে ওই জানলার সামনে বা বাইরের ব্যালকনিতে বসে কীভাবে যে সময় কেটে যায় তা আপনি বুঝতে পারবেন না।’
তুহিন এরপর তাকাল ঘরের চারদিকে। ছিমছাম ভাবে সাজানো ঘর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন বিছানা, ওয়ারড্রোব, ড্রেসিং টেবিল, চেয়ার, যা যা সাধারণত ঘরে থাকার কথা তার সবকিছুই আছে। ঘরের সঙ্গে অ্যাটাচড বাথও রয়েছে। সব মিলিয়ে ঘরটা মন্দ নয়।
ঝিনুক শুনে বলল, ‘সত্যি কথা বলতে কী, আগে যারা আসার রিসর্টে এসেছেন, তার বাইরে নতুন কোনও লোককে আর এখানে রাখার ইচ্ছা ছিল না আমার। গত দু-দিন আমি বেশ কয়েকজন লোককে ফিরিয়ে দিয়েছি। কিন্তু আপনি দুর্যোগের মধ্যে এসে উপস্থিত হয়েছেন, আর তার চাইতেও বড় কথা আপনি একজন লেখক। তাই আমি আপনাকে থাকার অনুরোধ জানালাম।’
রিসর্টের মালকিনের শেষ কথাটা শুনে নিজের লেখক পরিচিতির জন্য তুহিন এবার বেশ আত্মশ্লাঘা অনুভব করল। মেয়েটা এরপর বলল, ‘আমি এখন নীচে যাই। আপনি ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নিন। তবে আকাশের যা অবস্থা দেখছি তাতে আজ আর আপনি বাইরে বেরোতে পারবেন বলে মনে হয় না। সন্ধ্যা ছ’টায় জেনারেটর চালু হবে। তখন বাতি আসবে। টেবিলের ড্রয়ারে মোম আর দেশলাই রাখা আছে প্রয়োজনে কাজে লাগাতে পারেন। আমি রিসেপশন কাউন্টারের ঘরটাতেই থাকি। ইন্টারকম সিস্টেম বা বেল এখন আর কাজ করে না। কাজেই দরকার হলে একটু কষ্ট করে নীচে নেমে আমাকে ডাক দেবেন।’
একথাগুলো বলে এরপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ঝিনুক।
সে চলে যাবার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে, ওয়াশরুমে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে পোশাক পালটে তুহিন বিছানাতে বসে পড়ল। বাইরে তখনও একইভাবে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। বাইরের সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ভিতরের আলো ক্রমশ আরও কমে আসতে লেগেছে। ঘড়ি দেখল তুহিন। পাঁচটা অনেকক্ষণ বেজে গিয়েছে। ঘণ্টাখানেক পর সাধারণ নিয়মেই অন্ধকার নামবে।
কলকাতা থেকে বেশ অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছে তুহিন। তার ওপর রিসর্টের সন্ধানে বেশ কিছু পথ হাঁটতে হয়েছে তাকে। আর তার সঙ্গে ভিজেওছে সে। কাজেই কাচের জানলার বাইরের আলো-আঁধারির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মৃদু ক্লান্তিতে একসময় ঘুম নেমে এল তার চোখে।
তুহিনের এরপর যখন ঘুম ভাঙল তখন রাত প্রায় দশটা বাজে। একটানা অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল সে। ঘুম ভাঙতেই সে দেখতে পেল আলোয় ভরে গেছে তার ঘর। নরম এক মায়াবী আলো। না ডিম লাইটের আলো নয়, বাইরে বৃষ্টি কখন যেন থেমে গেছে! মেঘ কেটে গিয়ে আকাশে চাঁদ উঠেছে, বিরাট কাচের জানলা দিয়ে সে আলোই ঘরে ঢুকছে। ব্যাপারটা দেখেই বিছানা থেকে উঠে পড়ল তুহিন। এগিয়ে গিয়ে জানলার পাশের দরজাটা খুলে বাইরের ছোট্ট ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াল।
নীচে রিসর্টের বাইরে কিছুটা এগোলেই সমুদ্র। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে সমুদ্রের বুকে। তবে দুর্যোগ শেষে সমুদ্র এখন অনেক ঠান্ডা, সমাহিত। ঢেউয়ের মাথায় খেলা করছে চাঁদের আলো। দুধের ফেনার মতো ছোট ছোট ঢেউ এসে পাড়ে ভাঙছে। সমুদ্রের পাড় বরাবর দু’পাশের অনেকটা অংশও দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে রিসর্টের কিছুটা তফাতে বালির মধ্যে মৃদু হেলে দাঁড়িয়ে থাকা নৌকাটাও। সব মিলিয়ে মন-মুগ্ধকর দৃশ্য।
যেদৃশ্য বাস স্ট্যান্ডের কাছে কোনও হোটেলে থাকলে তুহিনের দেখার সৌভাগ্য হতো না। আর এরপরই সে ব্যালকনির রেলিং ধরে ঝুঁকে নীচে তাকিয়ে দেখতে পেল কয়েকজন নারী-পুরুষ চেয়ার পেতে বসে আছে সুইমিং পুলটার ধারে। তুহিন অনুমান করল তারা রিসর্টের অন্য বাসিন্দা হবে। বেশ কিছুক্ষণ বাইরে দাঁড়িয়ে জ্যোৎস্নাস্নাত সমুদ্রের শোভা উপভোগ করার পর আবার ঘরে ঢুকল তুহিন।
সুইচগুলো টিপতেই বাতি জ্বলে উঠল আর ফ্যানটাও ঘুরতে শুরু করল। তবে তার কোনওটারই তেমন কোনও জোর নেই। খানিকক্ষণ বিছানায় বসে নিজের লেখা নিয়ে নানা কথা ভাবার পর কেন জানি আবারও ঘুম পেতে লাগল তার। প্রায় বিকালে ভরপেট খাবার জন্য আর কিছু খেতেও ইচ্ছা করল না। যদিও একটা বিস্কুটের প্যাকেট ছিল তার ব্যাগে। বোতল থেকে কয়েক ঢোক জল পান করে বাতি নিভিয়ে আবারও তুহিন বিছানায় শুতেই ঘুম নেমে এল তার চোখে।
তুহিনের বরাবরই ভোরবেলা ঘুম ভাঙে। এদিন তার যখন ঘুম ভাঙল তখন সূর্যদেব সবে উদিত হবার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। আবছা আলো ফুটে উঠেছে বাইরে। ঘুম থেকে উঠে বসে তুহিনের মনে হল সূর্যোদয়ের দৃশ্য মিস করা ঠিক হবে না। সুযোগ তো বারবার আসে না। এ কথা ভেবে মুখে-চোখে জল দিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়ল।
সিঁড়ি দিয়ে প্রথমে রিসেপশনে নেমে এল তুহিন। ঘড়িতে সবে পাঁচটা বাজে। তার মনে হল সম্ভবত এখনও কেউ বিছানা ছেড়ে ওঠেনি। রুম ফ্রেশনারের তীব্র গন্ধ শুধু ছড়িয়ে আছে শূন্য রিসেপশনে। কাচের দরজার ছিটকানি খুলে সে বাইরে বেরিয়ে পড়ল। তারপর রিসর্টের গেট অতিক্রম করে এগোল সমুদ্রের দিকে।
সমুদ্রের একদম কিনারে গিয়ে দাঁড়াল তুহিন। শান্ত সমুদ্র। ছোট ছোট ঢেউ মৃদু শব্দে এসে পাড়ে ভাঙছে। তার জল-তরঙ্গ এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে তুহিনের পায়ের পাতা। আর সমুদ্রের বুকে আবির গুলে দিয়ে ডিমের লাল কুসুমের মতো সূর্যদেব উদয় হতে শুরু করেছেন। অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য! ভোরের বাতাসে সারা শরীর জুড়িয়ে যাচ্ছে।
দেখতে দেখতেই সূর্যদেব একসময় সমুদ্রের বুক থেকে তুহিনের চোখের সামনে উদয় হলেন। সেই দৃশ্য উপভোগ করে তুহিনের মনে হল, কিছু সমস্যা থাকলেও রিসর্টের অবস্থান বা পরিবেশটা মন্দ নয়। এমন নির্জন পরিবেশ হল ভাবনা-চিন্তার পক্ষে আদর্শ। যার সন্ধানে সে কলকাতা থেকে এখানে এসেছে।
সূর্য ওঠার পর আরও বেশ কিছুক্ষণ সময় সে দাঁড়িয়ে রইল সমুদ্রতটে। তারপর রিসর্টে ফেরার জন্য এগোল। সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে এই প্রথম ভোরের সমুদ্রতটে একটা লোক চোখে পড়ল তুহিনের। ধুতি-পাঞ্জাবি পরা একটা লোক। দূরে সমুদ্রের কিনারে দাঁড়িয়ে সে যেন তাকিয়ে আছে রিসর্টটার দিকেই।
তুহিন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে তাকাল লোকটার দিকে। তুহিন যে লোকটার দিকে তাকাল তা লোকটা বুঝতে পারল কি না কে জানে? সে লোকটা এরপর ধীরে ধীরে বালুতট বেয়ে হাঁটতে শুরু করল অন্য দিকে। লোকটাকে দেখে তুহিনের টুরিস্ট বা প্রাতঃভ্রমণকারী বলেই মনে হল।
রিসর্টের ভিতর ফিরে এল তুহিন। সকাল ছ’টা প্রায় বাজে। কিন্তু তখনও রিসেপশনে কাউকে দেখা গেল না। উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল তুহিন। তারপর খাটে আধ-শোয়া অবস্থায় বসে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তার লেখার প্লেট নিয়ে ভাবার চেষ্টা করতে লাগল।
ঘণ্টা তিনেক সময় তার এভাবেই কেটে গেল। বেলা ন’টা নাগাদ খিদে পেতে লাগল তুহিনের। তাছাড়া এত বেলা পর্যন্ত চা-ও খাওয়া হয়নি তার। তাই সে বাস স্ট্যান্ড থেকে ঘুরে আসার সিদ্ধান্ত নিল। তুহিন তৈরি হয়ে দ্বিতীয় বারের জন্য নীচে নামতেই সম্ভবত তার পায়ের শব্দ শুনে রিসেপশন কাউন্টারের গায়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এল ঝিনুক। তুহিনকে গুড মর্নিং জানিয়ে সে প্রশ্ন করল, ‘কি রাতে তেমন অসুবিধা হয়নি তো?’
তুহিনও তাকে গুড মর্নিং জানিয়ে বলল, ‘না, তেমন কিছু সমস্যা হয়নি।’
মেয়েটা এরপর জানতে চাইল, ‘কী ঠিক করলেন? থাকবেন, নাকি চলে যাবেন?’
তুহিন জবাব দিল, ‘আমি এখন বাস স্ট্যান্ডে যাচ্ছি। ফিরে এসে আপনাকে আমার সিদ্ধান্ত জানাব।’
ঠিক এই সময় গতকালের মতোই একটা মাছি কোথা থেকে এল! বোঁ-বোঁ করে পাক খেতে লাগল তাদের দুজনের মাঝে। ঝিনুক বিরক্তি ভরে হাত নাড়িয়ে মাছিটাকে তাড়াবার চেষ্টা করে বলল, ‘যান, ঘুরে আসুন তবে। আমি রিসর্টে আছি।’
তুহিন রিসর্ট ছেড়ে বেরিয়ে বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশে যাবার জন্য হাঁটতে শুরু করল। একের পর এক ফাঁকা রিসর্টগুলো পেরিয়ে আরও কিছুটা এগিয়েই সে দূর থেকেই দেখতে পেল বাস স্ট্যান্ডের কাছের সমুদ্রতটে ইতিমধ্যেই নেমে পড়েছে বহু মানুষ। সে জায়গায় পৌঁছে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়াল সে। হ্যাঁ, অনেক মানুষই জড়ো হয়েছে সেখানে। কেউ সকালবেলায় স্নানে নেমে পড়েছে, আবার কেউ বা হুল্লোড় করছে বালুতটে। স্থানীয় কয়েকজন লোক বেলাভূমিতে চেয়ার, ছাতা ইত্যাদি বসাতে শুরু করেছে ভাড়া দেবার জন্য।
গতকাল বিকালের আগে তুহিন যখন বাস স্ট্যান্ডে এসে নেমেছিল তখন জায়গাটা বেশ ফাঁকা-ফাঁকাই ছিল। কিন্তু তুহিন সমুদ্রতট থেকে বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছোতেই দেখতে পেল প্রচুর লোকজনের ভিড় চারপাশে। শুধু বাস নয়, আরও অনেক ধরনের গাড়িও জমা হয়েছে সেখানে। আর লোকজনদের চোখে-মুখে বেশ উত্তেজনার ভাবও সে লক্ষ্য করল। একটা চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে চা-বিস্কুট নিয়ে দোকানদারের কাছে হঠাৎ এত লোকজন জড়ো হবার কারণ জিজ্ঞাসা করতেই লোকটা বলল, ‘কলকাতা থেকে বেশ বড় একটা শ্যুটিং পার্টি এসেছে এখানে। ভালো হোটেলগুলো সব বুক করে নিয়েছে তারা। দু-দিন এখানে নায়ক-নায়িকারা সবাই থাকবে। তাদের দেখতে লোকজন সব জড়ো হয়েছে। দেখুন না এরপর কী হয়। আশপাশের গ্রামগুলো থেকে পিল পিল করে লোকজন আসা শুরু হল বলে!’
চা খাবার পর একটা পরোটার দোকান ফাঁকা দেখে সেখানে তুহিন গিয়ে ঢুকল পরোটা খাবার জন্য। একটা কাঠের বেঞ্চে বসে সে সবে পরোটা ছিঁড়ে মুখে দিয়েছে। ঠিক সে সময় দোকানের ভিতর ঢুকে পরোটা দিতে বলে তুহিনের সামনের বেঞ্চে বসলেন মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক। দোকানদার তাঁকেও পরোটা দিয়ে গেল। লোকটা পরোটা মুখে দিয়ে তুহিনকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি ফিল্ম পার্টির সঙ্গে এসেছেন নাকি টুরিস্ট? কোথা থেকে আসছেন?’
তুহিন পরোটা চিবোতে চিবোতে জবাব দিল, ‘কলকাতা থেকে আসছি ঠিকই, তবে টুরিস্ট।’
অনেক সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে ভাব জমালে তাদের কথার মধ্যে থেকে গল্পের প্লট উঠে আসে। তাই লোকটার সঙ্গে ভাব জমাবার উদ্দেশ্যে তুহিন তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘আপনার পরিচয়টা? আপনিও কি টুরিস্ট নাকি?’
ভদ্রলোক জবাব দিলেন, ‘আমার নাম নিশিনাথ মাইতি। স্থানীয় মানুষ। একটা স্কুলে শিক্ষকতা করি।’
একথা বলে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কী করেন? কোথায় উঠেছেন? একাই এসেছেন?
তুহিন বলল, ‘আমি গল্প-উপন্যাস লিখি। ওটাই আমার একমাত্র পেশা। তুহিন রায় আমার নাম। হয়তো কোনও সময় আপনি খবরের কাগজ বা বইয়ের পাতাতে আমার নাম দেখে থাকতে পারেন। আমি উঠেছি এখান থেকে কিছুটা দূরে যেখানে সমুদ্রের ধারে রিসর্টগুলো আছে সেখানে।’
তুহিনের জবাব শুনে নিশিনাথ বললেন, ‘নামটা চেনাচেনা লাগছে। হয়তো আপনার লেখা পড়ে থাকব। কিন্তু সমুদ্র পাড়ের রিসর্টগুলোতো সব বন্ধ হয়ে গেছে।’
তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ, বন্ধ হয়ে গেছে ঠিকই। কিন্তু ঢেউপরী নামের এক রিসর্টের মালকিন এখনও সেখানে আছেন। কাল বিকালে ঝড়-বাদলের মধ্যে আমি সেখানে উপস্থিত হয়েছিলাম। তিনি আমাকে সেখানে থাকতে দিয়েছেন। ব্যাপারটাকে ঠিক ভাড়া নিয়ে থাকতে দেওয়া বলা যায় না।’
ভদ্রলোক আবারও প্রশ্ন করলেন, ‘বাস স্ট্যান্ডে এত হোটেল থাকতে আপনি অতদূর গেলেন কেন?’
তুহিন বলল, ‘আমি একটু ফাঁকা জায়গায় থাকার জন্য এসেছি। যেখানে খুব একটা লোকজন নেই, সেখানে থাকলে লেখার জন্য আমার ভাবতে সুবিধা হবে। তাই ওদিকটাতে গিয়েছিলাম।’
একথা বলে একটু থেমে তুহিন বলল, ‘রিসর্টটা নির্জন জায়গাতে হলেও ওখানে খাবারের কোনও ব্যবস্থা নেই। খেতে হলে এই বাস স্ট্যান্ডেই আসতে হবে। তাই এই সমস্যা দূর করার জন্য একবার ভাবছিলাম যে এখানেই অন্য কোনও হোটেলে এসে উঠব আজ থেকে। কিন্তু আজ এখানে যা হট্টগোল দেখছি তাতে মনে হচ্ছে একটু কষ্ট হলেও যেখানে আছি সেখানে থাকাই ভালো।’
নিশিনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ, বাইরে থেকে অনেক লোক এসেছে। শুনলাম বড় হোটেলগুলো নাকি ওই সিনেমা পার্টির লোকজনই দখল করে নিয়েছে।’
একথা বলে তুহিন ভদ্রলোককে প্রশ্ন করল, ‘আপনাদের এ জায়গায় পরিবেশ পরিস্থিতি কেমন? মানে, আমি জানতে চাইছি শান্তি-শৃঙ্খলার কথা...’
এ প্রশ্ন শুনে একটু চুপ করে থেকে ভদ্রলোক বললেন, ‘সাত দিন আগে হলেও আমি বলতাম যে এখানকার পরিবেশ খুব ভালো, ভয়ের কোনও কারণ নেই। কিন্তু এখন সেটা বলা যাবে কি না তা বুঝতে পারছি না।’
তুহিন জানতে চাইল, ‘বুঝতে পারছেন না কেন?’
ভদ্রলোক আবারও একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘ছ’দিন আগে এখানে একটা রোমহর্ষক কাণ্ড ঘটেছে। সাগর বলাকা বলে যে বড় হোটেলটা আছে সেখানে এসে উঠেছিল ছ’জন নারী-পুরুষের একটা দল। আসলে তারা ছিল ডাকাত। মাঝ রাতে তারা হোটেলের যাবতীয় ক্যাশ আর বেশ কয়েকটা টুরিস্ট পার্টির টাকা-পয়সা, সোনা-দানা সব লুঠ করে পালিয়েছে। নগদ আর সোনা সব মিলিয়ে অন্তত দশ-পনেরো লাখ টাকা তারা লুঠ করেছে। পুলিশ অনেক খুঁজেও তাদের সন্ধান পাচ্ছে না। কেউ কেউ বলছে তারা নাকি নৌকা নিয়ে সমুদ্রে পালিয়ে অন্য কোনও জায়গায় গিয়ে উঠেছে। কী ভয়ংকর কাজ বলুন তো মশাই!’ একটানা কথাগুলো বলে থামলেন তিনি। তুহিন বলল, ‘সত্যিই ভয়ংকর ঘটনা। এমন ঘটনা আমি কল্পনাও করিনি...’
নিশিনাথ মাইতি এরপর পরোটার শেষ টুকরোটা মুখে ফেলে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার আসি আমি। স্কুল যেতে হবে। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।’
তুহিন জবাব দিল, ‘আমারও ভালো লাগল।’
ভদ্রলোক পয়সা মিটিয়ে দোকান ছেড়ে বেরিয়ে যেতেই একটা ভাবনা তুহিনের মনে বিদ্যুৎ চমকের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল—হোটেলে টুরিস্ট সেজে ঢুকে ডাকাতি, এ নিয়েই তো একটা গল্প লেখা হয়ে যেতে পারে। এমনকী একটা ছোটখাটো উপন্যাসও!
তুহিনেরও খাওয়া শেষ হয়ে গিয়েছিল। সে-ও এরপর পয়সা মিটিয়ে দোকানের বাইরে বেরিয়ে পড়ল। বাইরে ভিড় আর চিৎকার-চেঁচামেচি আরও বেড়েছে। তা দেখে তুহিন বুঝতে পারল, এ জায়গায় সে নিরুপদ্রবে থাকতে পারবে না। তার চেয়ে ওই রিসর্টটাই অনেক ভালো।
তুহিন মনে মনে ঠিক করে নিল সে কী করবে। সেই মতো সে বিচে ফিরে গিয়ে একটা ছাতা আর চেয়ার ভাড়া নিয়ে বসল। হোটেল ডাকাতির প্লটটা ইতিমধ্যে তার মাথায় খেলা করতে শুরু করেছে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘণ্টা তিনেক সময় কাটিয়ে দিল। তারপর বাস স্ট্যান্ডের একটা হোটেলে খাওয়া সেরে, কিছু শুকনো খাবারও কিনে নিয়ে তুহিন অবশেষে রিসর্টে ফেরার জন্য রওনা দিল।
আকাশে আজ মেঘ নেই। রোদের তেজও বেশ। বেলা একটা বেজে গেছে। সমুদ্রের পাড় বরাবর হেঁটে একটু ঘেমেই তুহিন রিসর্টে ফিরল। রিসেপশনে পা রাখতেই তুহিনের প্রতিবারের মতোই রুম ফ্রেশনারের কড়া গন্ধ নাকে লাগল। সে দেখল, ঝিনুক দাঁড়িয়ে আছে রিসেপশনের একপাশে ভিতরে যাবার প্যাসেজটার মুখে। তার হাতে সেই মসকিউটো ব্যাটটা। বেশ কয়েকটা মাছি উড়ে বেড়াচ্ছে সেখানে। আর সে ব্যাটটা দিয়ে মাছিগুলোকে মারার চেষ্টা করছে।
তুহিন তাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, ‘বাইরে গিয়ে খেয়ে আসতে আমার একটু কষ্ট হবে ঠিকই। কিন্তু ভাবছি এখানেই থেকে যাই। বাস স্ট্যান্ডের ওদিকে যা হই-হট্টগোল তাতে ওখানে থাকাটা আমার পক্ষে আরও অসুবিধার হবে।’
তুহিনের কথা শুনে রিসর্টের মালকিন ব্যাট চালানো থামিয়ে হেসে বলল, ‘ঠিক আছে থাকুন। আমার কোনও অসুবিধা নেই।’
তার দিক থেকে দুটো মাছি এবার উড়ে এল তুহিনের দিকে।
তুহিন বলল, ‘আপনার এখানে বেশ মাছি হয়েছে দেখছি!’
ঝিনুক বলল, ‘আর বলবেন না! ক’দিন ধরে কোথা থেকে যেন উড়ে আসছে ওরা। এত রুম ফ্রেশনার দিচ্ছি তবু কোনও কাজ হচ্ছে না। খুব বিরক্তিকর ব্যাপার!’
তুহিন এরপর আর রিসেপশনে দাঁড়াল না। সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরে ফিরে গেল।
দুপুরটা সে ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিল। ঘুম থেকে যখন সে উঠল তখন বিকাল পাঁচটা। রোদের তেজ নরম হয়ে এসেছে। তুহিন দরজা খুলে একটা চেয়ার নিয়ে গিয়ে বসল ব্যালকনিতে। মুখে শোনা ঘটনাকে কেন্দ্র করে গল্প বা উপন্যাস কীভাবে সাজানো যায় সে কথা ভাবতে থাকল।
অন্তত একটা গল্প তার মাথার মধ্যে রূপ পেতে চলেছে বলেই তুহিনের মনে হল। সময় এগিয়ে চলল। আর তার সঙ্গে তুহিনও ভেবে চলল। একসময় সূর্য ডুবতে শুরু করল সমুদ্রের বুকে। ঠিক এই সময় সে দেখতে পেল একজনকে। বেশ খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে একজন লোক। আর সে যেন তাকিয়ে আছে রিসর্টটার দিকেই। ভালো করে লোকটাকে খেয়াল করতেই তুহিন তাকে চিনে ফেলল। লোকটা সেই নিশিনাথ মাইতি! তাকে দেখেই তুহিনের মনে হল, লোকটার সঙ্গে আরও কথা বললে আরও কোনও গল্পের প্লট হয়তো তার মাথায় আসতে পারে। চেয়ার ছেড়ে উঠে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হাঁক দিল, ‘মাইতিবাবু? ও মাইতিবাবু?’
তুহিন হাঁক দিল ঠিকই। কিন্তু ভদ্রলোক এরপর পিছন ফিরে সেই হাঁটতে শুরু করলেন। তুহিন বুঝতে পারল না ভদ্রলোকের কানে তার ডাক পৌঁছেছিল কি না?
সূর্য ডোবার পর ঘরের ভিতর শুয়ে সে গল্পের প্লট নিয়েই ভাবতে লাগল। ধীরে ধীরে তার মাথার মধ্যে দানা বাঁধছে গল্পটা।
কোনও লেখক যখন তার লেখা নিয়ে এক মনে ভাবেন, তখন সময় কীভাবে কেটে যায়, তা বোঝা-ই যায় না। রাত ন’টা যখন বাজল তখন তুহিন বিছানা ছেড়ে উঠে দুপুরে কিনে আনা শুকনো খাবার দিয়ে রাতের খাওয়া সেরে নিল। তারপর আবার সে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সামনে তাকাতেই সে দেখতে পেল রিসর্টের বাইরে বালুতটে দাঁড়িয়ে আছে পাঁচ-ছয় জন। তুহিন বুঝতে পারল তারা রিসর্টেরই অন্য বাসিন্দারা। গতকাল রাতে সে যাদের রিসর্টের কম্পাউন্ডে ঘুরে বেড়াতে দেখেছিল।
তাদের দেখে তুহিনের মনে হল, লোকগুলোর কাছে একবার ঘুরে আসা যাক। তাদের সঙ্গে পরিচয়ও করা যেতে পারে। লোকগুলোর সঙ্গে কথা বললে লেখার জন্য আরও কোনও প্লটও মাথায় আসতে পারে। একথা ভেবে নীচে নেমে এল তুহিন, তারপর রিসর্ট ছেড়ে বেরিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করল লোকগুলো সমুদ্রের পাড়ে যে জায়গাতে দাঁড়িয়ে আছে সেই দিকে।
সে কিছুটা এগোতেই পিছন থেকে ঝিনুকের হাঁক শুনতে পেল, ‘কোথায় চললেন?’ তুহিন থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঝিনুক এসে দাঁড়াল তার সামনে। তুহিন বলল, ‘ওই যে ওনারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন সেখানে।’ ঝিনুক বলল, ‘আচ্ছা চলুন, আমিও যাই।’
ঝিনুকের সঙ্গে হাঁটা শুরু করল তুহিন। হাঁটতে হাঁটতে ঝিনুক তাকে প্রশ্ন করল, ‘বিকালবেলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে যাঁকে ডাকছিলেন তিনি কে?’
তুহিন জবাব দিল, ‘স্থানীয় এক স্কুল মাস্টার। আজ সকালেই বাস স্ট্যান্ডে পরিচয় হয়েছে। গল্প করার জন্য হাঁক দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার ডাক মনে হয় ওনার কানে পৌঁছোয়নি।’
তুহিনের জবাব শুনে ঝিনুক বলল, ‘আপনাকে একটা কথা বলছি কিছু মনে করবেন না। স্থানীয় লোকদের আজকাল আমি রিসর্টে অ্যালাও করি না। আমি একা থাকি। অনেক রকম সাবধানতা অবলম্বন করতে হয় আমাকে।’
তুহিন বলল, ‘ঠিক আছে ব্যাপারটা মাথায় রাখলাম। আমি আর দু-রাত এখানে থাকব।’
একথা বলার পর তুহিন জানতে চাইল, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হচ্ছে আপনি এখানকার বাসিন্দা নন। আপনি কোথা থেকে এসে রিসর্ট খুলেছিলেন এখানে?’
ঝিনুক জবাব দিল, ‘আমার বাড়ি সালকিয়া, হাওড়াতে। বাবা রিসর্টটা বানিয়েছিলেন। কিন্তু ওটা চালু হবার আগেই তিনি হৃদরোগে মারা যান। আমার ছেলেবেলাতেই মা-ও মারা গিয়েছিলেন। অন্য ভাইবোনও নেই। কাজেই বাবার স্বপ্ন পূরণ করার জন্য আমি এখানে চলে এসে রিসর্টটা চালু করেছিলাম। ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ-ই সরকারি নির্দেশে সব শেষ হয়ে গেল।’
তুহিন খেয়াল করল, শেষ কথাগুলো বলার সময় স্পষ্ট বিষণ্ণতা ধরা দিল মেয়েটার গলাতে।
সমুদ্রের দিক থেকে বাতাস ভেসে আসছে। সেই বাতাসে হঠাৎই একটা পচা গন্ধ ভেসে এল তুহিনের নাকে। সে যত এগোতে লাগল সেই দুর্গন্ধ যেন আরও স্পষ্ট হতে লাগল। তুহিন বলেই ফেলল, ‘কীসের গন্ধ এটা?’
ঝিনুক বলল, ‘মাঝে মাঝে ঢেউয়ের সঙ্গে মরা মাছ, কচ্ছপ এসব সমুদ্রতটে ভেসে আসে। সারাদিন সে সব রোদে পড়ে থেকে ফুলে পচে রাতের বেলা এমন বাজে গন্ধ ছড়ায়। তেমনই কিছু হবে সম্ভবত।’ কথাগুলো বলতে বলতেই ঝিনুক, তুহিনকে নিয়ে পৌছে গেল লোকগুলো যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। চারজন পুরুষ আর দুজন মহিলা।
তুহিন আর ঝিনুককে দেখে তাদের দিকে ফিরে দাঁড়াল সবাই। পুরুষ মানুষগুলোর বয়স পঁচিশ থেকে চল্লিশের মধ্যে হবে। আর মহিলা দুজনের মধ্যে একজন মাঝবয়সি, আর একজন যুবতী। তুহিনকে যেন জরিপ করার ভঙ্গিতে তারা তাকাল তার দিকে।
লোকগুলো এমনভাবে তাকাতে কেমন যেন অস্বস্তিবোধ করল তুহিন। নিশ্চুপভাবে স্থির দৃষ্টিতে তারা তাকিয়ে আছে তার দিকে। ঝিনুক অবশ্য এরপর তার বোর্ডারদের সঙ্গে তুহিনকে পরিচয় করিয়ে দেবার জন্য বলল, ‘ইনি হলেন তুহিনবাবু। আমার রিসর্টের নতুন অতিথি।’
তুহিন হাত জোড় করে নমস্কার জানাল সবাইকে। ঝিনুক এরপর এক-একজনকে দেখিয়ে তাদের নাম পরপর বলে যেতে লাগল, ‘ইনি হলেন পরিতোষবাবু। ইনি সঞ্জীব, ইনি নৃসিংহ, উনি করিম, এই ম্যাডামের নাম শেফালী আর ওই ম্যাডাম হলেন অবন্তিকা।’
পরিচয়-পর্ব মেটার পর মধ্য তিরিশের নৃসিংহ নামের লোকটা জানতে চাইল, তুহিন কী করে, কোথায় থাকে? লোকটার প্রশ্নের জবাব দিল তুহিন। সে তারপর নৃসিংহকে প্রশ্ন করল, ‘আপনারা কি সবাই একসঙ্গে বেড়াতে এসেছেন?’
‘না, আলাদা, আলাদা।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল লোকটা। তারপর পা বাড়াল অন্যদিকে। অন্য নারী-পুরুষরাও এরপর তুহিনের প্রতি তেমন কোনও আগ্রহ দেখাল না। যে যার মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল চারদিকে। এমনও হতে পারে হয়তো সেই পচা গন্ধের জন্যই তারা সরে গেল। লোকগুলো এদিক ওদিক ছিটকে যাবার পর তুহিন বলল, ‘সত্যিই এখানে এত দুর্গন্ধ যে আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না! রিসর্টেই ঢুকে পড়ি।’
ঝিনুক বলল, ‘চলুন আমিও যাই। একদম ফাঁকা ফেলে এসেছি বাড়িটা। অন্ধকারে সবার নজর এড়িয়ে বাড়ির ভিতর অন্য কেউ ঢুকে পড়লেই মুশকিল।’
তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ। দিন কাল কোথাও আর ভালো নেই। বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে আজ ওই স্কুল মাস্টারের মুখে শুনলাম এক সপ্তাহ আগে নাকি নারী-পুরুষের একটা দল টুরিস্ট সেজে হোটেলে উঠে রাত্রি বেলা হোটেল আর অন্য টুরিস্ট পার্টিদের সর্বস্ব লুঠ করে পালিয়েছে।’
ঝিনুক কথাটা শুনে বলল, ‘তাই নাকি! আমি বেশ কিছুদিন রিসর্ট ছেড়ে ওদিকে যাইনি, তাই খবরটা পাইনি। যে কদিন এখানে আছি, তবে তো সে কদিন আরও সাবধানে থাকতে হবে এখন থেকে।’ এ কথা বলার পর সে তুহিনকে বলল, ‘আপনি তো নির্জনে থাকতে এসেছেন আপনার লেখার ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য তাই না?’
রিসর্টের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তুহিন জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই। বেশ কিছুদিন ধরে কিছুতেই কোনও গল্পের প্লট আসছে না। বলতে পারেন ওই প্লট নিয়ে ভাবার জন্যই এখানে এসেছি।’
‘পেলেন কিছু? জানতে চাইল ঝিনুক।’
তুহিন বলল, ‘ওই ডাকাতির ঘটনাটা নিয়ে একটা গল্প লিখব। তবে লেখা শেষ না হলে বোঝা যাবে না গল্পটা দাঁড়াল কি না? তবে আরও ভালো কোনও প্লটের সন্ধানে আছি।’
কথাটা শুনে ঝিনুক একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনি ফিরে যাবার আগে আমি আপনাকে একটা গল্পের প্লট দেব।’
তুহিন হেসে বলল, ‘তাহলে তো ভালোই হয়।’ এরপর রিসর্টে ঢুকে যে যার ঘরে ঢুকে গেল তারা।
পরদিন তুহিনের যখন ঘুম ভাঙল, তার আগেই সূর্যোদয় হয়ে গেছে। কাচের জানলা দিয়ে আলো ঢুকছে ঘরে। বিছানা ছেড়ে উঠে তুহিন ফ্রেশ হয়ে নিল। তারপর খাতা পেন নিয়ে লিখতে বসল। গল্পটা তার মাথার মধ্যে মোটামুটি একটা রূপ নিয়েছে। লেখা শুরু করলে ধীরে ধীরে গল্প বা কাহিনিটা মনের ভিতর আরও স্পষ্ট হতে শুরু করে। এটাই লেখার নিয়ম। তুহিন লিখতে শুরু করল তার গল্প। বলা যেতে পারে সাবলীল গতিতেই লেখা চলতে লাগল। সময় এগিয়ে চলল তার সঙ্গেই।
ঘণ্টা খানেক লেখার পর হঠাৎই কোথা থেকে যেন একটা মাছি উড়ে এসে বসল তার খাতার পাতায়। তারপর মাছিটা তুহিনের মুখের আশপাশে ভনভন করে উড়ে বেড়াতে লাগল। তুহিন হাত দিয়ে তাকে বেশ কয়েকবার তাড়াবার চেষ্টা করল। কিন্তু মাছিটা দূরে উড়ে গিয়েও আবার ফিরে আসতে লাগল। অত্যন্ত বিরক্তিকর ব্যাপার।
তুহিন একসময় বাধ্য হয়েই লেখার খাতা বন্ধ করে দিল। ঘড়ি দেখল। বেলা প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। এতক্ষণ সে লেখায় মগ্ন ছিল বলে খিদেটা ঠিক অনুভূত হয়নি। লেখা বন্ধ করার পর বেশ খিদেও পেতে লাগল তার। বিছানা থেকে নেমে পোশাক পালটে বাস স্ট্যান্ডে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নিল।
ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই সে দেখতে পেল দু-তিনটে মাছি এবার একতলা ছেড়ে দোতলাতেও উঠে এসেছে! সিঁড়ি দিয়ে নীচে নেমেই তুহিন দেখল রিসেপশনে উড়ে বেড়াচ্ছে মাছির দল, বিশেষত এক তলার ভিতরে যাবার প্যাসেজের মুখটাতে তারা একদম ভনভন করছে।
তুহিনের পায়ের শব্দ শুনেই সম্ভবত রিসেপশন কাউন্টার সংলগ্ন দরজাটা খুলে গেল। বাইরে বেরিয়ে এল ঝিনুক। সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু মাছি ধেয়ে গেল তার দিকে। কাউন্টারে রাখা ইলেকট্রিক ব্যাটটা দিয়ে তাদের তাড়াবার চেষ্টা করতে করতে ঝিনুক বলল, ‘অবস্থাটা একবার দেখছেন! কেন যে এমন ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি বাড়িতে থাকতে শুরু করেছে তা কিছুই বুঝতে পারছি না! রুম ফ্রেশনার দিয়ে কোনও কাজ হচ্ছে না। আপনি তো বাস স্ট্যান্ডের ওদিকে যাচ্ছেন, যদি মাছি তাড়ানোর জন্য কোনও স্প্রে বা ওই ধরনের কোনও কিছু জিনিস একটু কিনে আনেন তবে বড় ভালো হয়। আমি আপনাকে টাকা দিয়ে দিচ্ছি। এই অনুরোধটাই জানাতে এলাম আপনাকে।’
ঝিনুকের কথা শুনে তুহিন বলল, ‘এখন টাকা দেবার দরকার নেই। আমি যদি ও ধরনের কোনও জিনিস পাই, তবে আগে কিনে আনি তারপর পয়সা দেবেন।’
তুহিনের কথা শুনে মেয়েটা আবার ঘরে ঢুকে দরজা দিয়ে দিল আর তুহিনও রিসর্ট ছেড়ে সমুদ্রের পাড় বরাবর রওনা হল বাস স্ট্যান্ডের উদ্দেশে।
বাস স্ট্যান্ডের কাছাকাছি সমুদ্রতটে লোকজনের ভিড় আজ আগের দিনের চেয়েও বেশি। হয়তো-বা শ্যুটিং দেখতে আসা লোকজনের এক অংশ রয়েছে এখানে। তারাই ভিড়টাকে বাড়িয়েছে।
সমুদ্রতট থেকে বাস স্ট্যান্ডে উঠে এল তুহিন। প্রথমে সে গতদিনের মতোই একটা দোকানে চা খাবার পর সেই পরোটার দোকানে ঢুকল। সেখানে ঢুকেই তুহিন দেখতে পেল নিশিনাথবাবু বসে আছেন। তাঁর সামনে খালি প্লেট। অর্থাৎ তাঁর খাওয়া হয়ে গেছে। একটা সংবাদপত্র হাতে নিয়ে তিনি তাতে চোখ বোলাচ্ছিলেন।
তুহিন দোকানে ঢুকে পরোটার অর্ডার দিতেই সম্ভবত তুহিনের গলা শুনে নিশিনাথ মাইতি কাগজ থেকে মুখ তুলে তার দিকে তাকালেন। তুহিনও এগিয়ে গিয়ে তাঁর টেবিলেই মুখোমুখি বসল। তারপর সে তাঁকে বলল, ‘গতকাল বিকালে তো সূর্য ডোবার আগে আপনি আমাদের রিসর্টের ওদিকে গিয়েছিলেন। আমি রিসর্টের বারান্দা থেকে আপনাকে ডেকেছিলাম। আপনি শুনতে পেলেন না।’
নিশিনাথবাবু তার কথার জবাবে প্রথমে বললেন, ‘ও তাই নাকি! সমুদ্রের বাতাসের কারণে আপনার গলা আমার কাছে পৌঁছোয়নি। এদিকের বিচে যা ভিড়, তাই সময় সুযোগ পেলে আমি ওদিকটা ফাঁকা বলে ওদিকে হাঁটতে যাই।’
এ কথা বলে তিনি হাতের খবরের কাগজে একটা খবর দেখিয়ে বললেন, ‘এই দেখুন কাগজে কী লিখেছে!’
দৈনিক সংবাদপত্রের প্রথম পাতার এক পাশে যে ছোট ছোট খবর ছাপা হয় তেমনই একটা খবর। তুহিন যে জায়গাতে এসেছে সেখানকার নাম উল্লেখ করে সংবাদপত্রের নিজস্ব সংবাদদাতা লিখেছেন, ‘সাতদিন অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও সৈকত শহরের সাগর বলাকা হোটেলের ভয়ংকর ডাকাতির কোনও কিনারা করতে পারল না স্থানীয় থানার পুলিশ বা জেলা পুলিশ। গত পঁচিশে জুন একদল পুরুষ-নারী ওই হোটেলে পর্যটক সেজে ঘর ভাড়া নেয়। তারপর মধ্যরাতে আগ্নেয়াস্ত্র-সহ অন্য অস্ত্র দেখিয়ে হোটেল ও ওই হোটেলের অন্য পর্যটকদের সর্বস্ব লুট করে নিয়ে পালায়। কিন্তু অপরাধীদের একজনকেও এখনও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত চলছে বলে জানানো হলেও এখনও অপরাধীরা ধরা না পড়ায় স্থানীয় হোটেল মালিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ জানানো হয়েছে। অবিলম্বে তারা দোষীদের গ্রেপ্তার এবং এই সৈকত শহরের হোটেলগুলি ও পর্যটকদের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের কাছে দাবি জানিয়েছেন।’
তুহিন কাগজটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, ‘ঘটনাটা যে ভয়ংকর তাতে সন্দেহ নেই। তবে ওই ঘটনা থেকে আমি কিন্তু আমার গল্পের জন্য প্লট পেয়ে গেছি। লিখতেও শুরু করেছি আজ সকাল থেকে।’
দোকানদার পরোটার প্লেট টেবিলে নামিয়ে রেখে গেল। নিশিনাথ জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি আপনার গল্পতে ডাকাতির স্থান হিসাবে এমনই সৈকত শহরই নির্বাচন করেছেন?’
পরোটার টুকরো ছিঁড়ে মুখে দেবার পর তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ, ঘটনার স্থান হিসেবে এ জায়গাকেই নির্বাচন করেছি, শুধু জায়গার একটা কল্পিত নাম দিয়েছি।’
তুহিনের কথা শুনে নিশিনাথবাবু বললেন, ‘গল্পের শেষে ডাকাতরা কি ধরা পড়বে?’
তুহিন জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, নইলে তো গল্পটা জমবে না।’ নিশিনাথ বললেন, ‘ডাকাতরা কোথায় লুকিয়েছিল বা না পালিয়েছিল, সে সম্পর্কে কী ভেবেছেন?’
পরোটা খেতে খেতে তুহিন বলল, ‘ঠিক এই জায়গাটাতেই তো গল্পের আসল রহস্য লুকিয়ে থাকবে। না, সেটা ভাবা হয়নি।’
এ কথা বলার পর তুহিন জানতে চাইল, ‘এখানে মশা-মাছি তাড়াবার স্প্রে বা ওষুধ কোথায় পাওয়া যায় বলতে পারবেন?’
নিশিনাথ বললেন, ‘ও জিনিস আমার কোনওদিন দরকার হয়নি বলে কিনিনি। তবে টিভিতে ওসবের বিজ্ঞাপন দেখেছি। রাস্তার ওপারে বেশ কয়েকটা স্টেশনারি দোকান আছে। সেখানে পেয়ে যাবেন বলেই আমার ধারণা। কিন্তু বেড়াতে এসে আপনি ও জিনিস দিয়ে কী করবেন?’
তুহিন বলল, ‘আর বলবেন না মশাই, আমাদের রিসর্টটায় কোথা থেকে যেন ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি উড়ে আসছে, বিরাট বিরাট সব নীলরঙা মাছি! তাই রিসর্টের মালকিন আমাকে অনুরোধ জানিয়েছেন মাছি তাড়াবার স্প্রে বা ওষুধ কিনে নিয়ে যেতে।’
নিশিনাথ প্রশ্ন করলেন, ‘রিসর্টে মালকিন আর আপনি ছাড়া আর কোনও লোকজন নেই?’
তুহিন বলল, ‘কর্মচারী কেউ নেই। তবে আমার মতো আরও ছয়জন নারী-পুরুষ আছেন সেখানে। চারজন পুরুষ, দুজন মহিলা। কাল রাতে রিসর্টের সামনের বিচে ঝিনুক, মানে ওই রিসর্টের মালকিন তাঁদের সঙ্গে আমার আলাপ করিয়ে দিলেন।’
‘ওঁরা কি সবাই একই সঙ্গে ওই রিসর্টে এসে উঠেছেন?’ আবারও প্রশ্ন করলেন নিশিনাথবাবু।
তুহিন জবাব দিল, ‘ওঁরা একসঙ্গে এসেছে কি না আমার জানা নেই। তবে তাঁদের দেখে আমার একই পরিবারের সদস্য বলে মনে হয়নি।’
নিশিনাথ মাইতি বললেন, ‘এতগুলো লোক খাওয়া-দাওয়া করছেন কোথায়? এখানে এসে?’
তুহিন বলল, ‘এটাও ঠিক আমি বলতে পারব না। এ দু-দিনে তাঁদের কাউকে আমার দিনের বেলা চোখে পড়েনি।’
নিশিনাথবাবু এরপর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার আমি যাই। আবার হয়তো আপনার সঙ্গে আমার দেখা হয়ে যাবে।’
তিনি চলে যাবার পর খাওয়া সেরে দোকান থেকে বেরিয়ে পড়ল তুহিন। নিশিনাথের কথামতোই রাস্তার ওপাশে একটা বড় স্টেশনারি দোকানে খোঁজ করতেই মশা-মাছি-আরশোলা তাড়াবার স্প্রে পাওয়া গেল। তা কেনার পর গতদিনের মতোই সে বাস স্ট্যান্ডের কাছের সি-বিচে বসে ঘণ্টা তিনেক সময় কাটিয়ে খাওয়া সেরে আর রাতের জন্য কিছু শুকনো খাবার কিনে রিসর্টে ফেরার পথ ধরল।
তুহিন রিসেপশনে পা দিতেই দেখল চারপাশে মাছি ভোঁ-ভোঁ করছে। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে তুহিন হাঁক দিল, ‘ম্যাডাম আছেন?’ দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল ঝিনুক। সঙ্গে সঙ্গে একদল মাছি ঘিরে ধরল তাকে। তুহিন তার দিকে কিনে আনা মাছি তাড়াবার স্প্রেটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখুন তো কাজ হয় কি না?’
ঝিনুক সেটা হাতে নিয়ে সিল খুলে আর কোনও কথা না বলে চারপাশে স্প্রে করল কয়েকবার। রিসেপশনের রুম ফ্রেশনারের গন্ধকে ছাপিয়ে অন্য একটা ঝাঁঝালো গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারপাশে। স্প্রেটাতে কিন্তু কাজ হল। মাছিগুলো ছিটকে সরে গেল ঝিনুক আর তুহিনের চারপাশ থেকে, তারপর কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই কোথায় যেন উড়ে চলে গেল।
ঝিনুকের মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে বলল, ‘অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। কত দাম নিল বলুন? আমি দিচ্ছি।’
কথাটা শুনে তুহিন বলল, ‘দাম, দিতে হবে না। খুব বেশি দামও নয় জিনিসটার। আমি তো বলতে গেলে আপনার এখানে বিনা ভাড়াতেই আছি। ধরে নিন আমি আপনাকে জিনিসটা উপহার দিলাম।’
ঝিনুক কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে এরপর প্রশ্ন করল, ‘আপনি কি কাল ফিরে যাবেন?’
তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ, কাল অথবা পরশু। আজ এখানে থাকলে তিন রাত তো হয়েই যাবে।’
তার কথা শুনে একটু চুপ করে থেকে ঝিনুক বলল, ‘আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে রাতে আমি আপনাকে ডাক দেব। সমুদ্রের পাড়ে ঘুরতে ঘুরতে একটু গল্প-গুজব করা যাবে।’
তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, কোনও সমস্যা নেই। ডাক দেবেন।’
ঝিনুক বলল, ‘আচ্ছা।’
তুহিন এরপর নিজের ঘরে ফিরে এল। তারপর স্নান সেরে লেখাটার কথা ভাবতে ভাবতে বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
একটানা প্রায় চার ঘণ্টা ঘুমাবার পর তুহিন যখন উঠে বসল তখন সমুদ্রর বুকে সূর্য ডুবতে বসেছে। বারান্দায় বেরিয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্য বেশ কিছুক্ষণ প্রত্যক্ষ করল তুহিন। লেখকদের সমস্যা হল একবার যদি কোনও লেখা শুরু করা হয়, তখন সেই লেখার কথাই সব সময় মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। মনে হয় লেখাটাকে আরও খানিকটা এগিয়ে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হয়। তুহিনের ক্ষেত্রেও এ ভাবনার ব্যতিক্রম ঘটে না। তাই সূর্য ডুবে যাবার পর যখন ঘরে বাতি জ্বলে উঠল তখন সে আলোর জোড় কম হলেও তারই মধ্যে লেখার খাতা নিয়ে বসে পড়ল তুহিন।
মন দিয়ে লিখতে বসলে কখন যে সময় পেরিয়ে যায় তা বোঝা যায় না। তুহিন যখন লেখা শেষ করল তখন রাত প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। দুপুরে কিনে আনা চিঁড়ে-দই-মিষ্টি দিয়ে তুহিন রাতের খাওয়া সেরে নিল। তারপর ভাবতে লাগল পরদিন দুপুরের বাসে নাকি একটা দিন পর সকালের বাসে কলকাতায় সে ফেরার জন্য রওনা হবে?
ঠিক এই সময় দরজাতে টোকা দেবার শব্দ শুনল সে। তুহিনের এবার মনে পড়ল ঝিনুক তাকে ডাকবে বলেছিল। দরজা খুলে সে দেখতে পেল ঝিনুক এসে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, ‘চলুন তবে যাওয়া যাক?’
নীচে নেমে ঝিনুকের সঙ্গে রিসর্টের বাইরে বেরিয়ে পড়ল তুহিন। আকাশে বেশ বড় চাঁদ উঠেছে। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে বেলাভূমিতে। মৃদু গর্জন করে দুধের ফেনার মতো ছোট ছোট ঢেউ এসে ভাঙছে বালুতটে। আর দূরে বড় ঢেউগুলোর মাথায় ফসফরাসের ঝিকিমিকি। কেউ কোথাও নেই। সমুদ্রের পাড় বরাবর হাঁটতে শুরু করল তারা। ঠান্ডা বাতাস গায়ে এসে লাগছে। হাঁটতে হাঁটতে ঝিনুক প্রশ্ন করল, ‘কে-কে আছে আপনার বাড়িতে?’
তুহিন উত্তর দিল, ‘কেউ নেই আমি একলা। বাবা-মা অনেকদিন আগেই গত হয়েছেন। আর বিয়ে-থাও করে ওঠা হয়নি।’
একথা বলার পর তুহিন বলল, ‘আপনাদের এ জায়গাটা দারুণ লাগছে। সমুদ্র, খোলা বাতাস, কোনও পলিউশন নেই, মনে হয় যেন এখানেই থেকে যাই।’
ঝিনুক হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘থাকুন না, কে আপত্তি করছে? তবে কী জানেন, এ সব জায়গাতে দু-চার দিনই ভালোলাগে। তারপর আর ভালো লাগে না। বিশেষত যদি আমার মতো একলা থাকতে হয়।’ মৃদু বিষণ্ণতা যেন ধরা দিল তার গলায়।
তুহিন বলল, ‘কিছু মনে করবেন না ম্যাডাম, একটা কথা বলছি। আপনি একজন জীবনসঙ্গী জোগাড় করছেন না কেন? তাহলেই তো আর আপনাকে একলা থাকতে হয় না।’
কথাটা শুনে একটু চুপ করে থেকে ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ, তা করলে হতো। কিন্তু এখন আর হবে না। দেরি হয়ে গেছে।’
তুহিন বলল, ‘দেরি হয়ে গেছে বলে তো মনে হয় না। আর বিয়ে করার কোনও বয়স হয় না।’
ঝিনুক যেন তুহিনের কথা শুনে হাসল। তারপর একটু চুপ করে থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে গিয়ে বলল, ‘আপনার লেখালেখির খবর কী?’
তুহিন জবাব দিল, ‘চলছে। শুরু করে দিয়েছি। বেশ খানিকটা লিখে ফেলেছি এর মধ্যে।’ একথা বলার পর তুহিন বলল, ‘আপনি কিন্তু আমাকে গল্পের একটা প্লট দেবেন বলেছিলেন।’
ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ, দেব। কাল দেব। কালকের দিনটা থেকে যান আপনি। আর একটা দিন থাকলে আপনার নিশ্চয়ই খুব একটা অসুবিধা হবে না।’
তুহিন একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘তা হবে না। ঠিক আছে আপনি যখন বলছেন, তখন না-হয় আরও একটা রাত থেকে যাব আপনার এখানে।’
সমুদ্রের কিনারে তারপর তারা দুজন দাঁড়িয়ে পড়ল। ঝিনুক তাকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আপনার সমুদ্রে স্নান করতে ভালো লাগে না?’
তুহিন বলল, ‘লাগে। বন্ধুদের সঙ্গে যতবার সমুদ্রে এসেছি, স্নান করেছি। তবে...’ এই বলে থেমে গেল তুহিন।
ঝিনুক হেসে বলল, ‘তবে কী? একলা স্নান করতে ভালো লাগে না তাই তো? আমারও লাগে না।’
তুহিন বলল, ‘ঠিক তাই। তাছাড়া আমি এবার এখানে লেখার চিন্তা মাথায় নিয়ে এসেছিলাম। তাই স্নান করার ভাবনাটা মাথায় আসেনি।’
ঝিনুক বলল, ‘এখন তো সে চিন্তা অনেকটা কেটে গেছে তাই তো?’
তুহিন জবাব দিল, ‘তা গেছে। সত্যি কথা বলতে কী, এই মুহূর্তে আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে সমুদ্রে নামতে পারলে মন্দ হতো না।’ তারা দুজনই এরপর আর কোনও কথা বলল না। ভেজা বাতাসে দাঁড়িয়ে বেশ খানিকটা সময় ধরে চন্দ্রালোকিত সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করল তারা। ঝিনুক তারপর বলল, ‘চলুন, এবার ফেরা যাক।’ কথা বলতে বলতে রিসর্টের থেকে বেশ খানিকটা দূরে চলে গিয়েছিল দুজনে। এবার তারা ফেরার পথ ধরল।
ফেরার সময় গতকালের মতোই সেই একটা পচা গন্ধ যেন তুহিনের নাকে আসতে লাগল। রিসর্টের কাছাকাছি পৌঁছোতেই তুহিন দেখল চাঁদের আলোতে বালুতটে ঘুরে বেড়াচ্ছে রিসর্টের অন্য বোর্ডাররা। তুহিনদের দেখতে পেয়ে প্রথমে থমকে দাঁড়াল তারা। তারপর তাদের চিনতে পেরে আবার নিজেদের মতো ঘুরতে শুরু করল। তুহিন, ঝিনুককে প্রশ্ন করল, ‘ওনারা কোথায় খান? দিনের বেলাতে ওনাদের বাইরে বেরোতে দেখি না তো?’
ঝিনুক বলল, ‘ওনারা সবাই এ জায়গাতে রেস্ট নিতে এসেছেন। তাই দিনের বেলা খুব একটা বাইরে বেরোন না। সবাই মিলে চাঁদা তুলে চাল-ডাল-সবজি কিনে এনেছেন। একসঙ্গে রান্না করে খান। রাতে খাবার পর ওঁরা হাঁটতে বেরোন।’
ঝিনুকের সঙ্গে রিসর্টের দরজার কাছে পৌঁছে গেল তুহিন। তারা রিসর্টের ভিতর ঢুকতে যাবে ঠিক সেই সময় হঠাৎই বেশ কয়েকটা জোরালো আলো চোখে পড়ল তাদের। সি-বিচের দু-দিক থেকেই বেশ কয়েকটা গাড়ি ছুটে আসছে। তা দেখে তুহিনরা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত পরেই চার-পাঁচটা গাড়ি এসে পৌঁছে গেল রিসর্টের সামনের বালুতটে।
গাড়িগুলোর হেডলাইট তো ছিলই, তার সঙ্গে সঙ্গে একটা গাড়ির মাথা থেকে জ্বলে উঠল সার্চ লাইট। যেটা চারপাশে দ্রুতগতিতে ঘুরতে লাগল। সেই আলো এত তীব্র যে তা চোখে পড়ামাত্রই চোখ ধাঁধিয়ে যেতে লাগল। এরপর লাউড স্পিকারে ঘোষণা শোনা গেল, ‘যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন হাত তুলে দাঁড়ান। আপনাদের চারপাশ থেকে পুলিশ ঘিরে রেখেছে। কেউ পালাবার চেষ্টা করলে গুলি চালাতে বাধ্য হব।’
বিস্মিত হতচকিত তুহিন ঘোষণাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে হাত উপরে তুলে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই পুলিশের লোকেরা গাড়ি থেকে নেমে চারপাশ ঘিরে ফেলল। দু-তিনজন পুলিশকর্মী এসে তুহিন আর ঝিনুককেও ঘিরে ধরল। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র।
ঝিনুক তাদের উদ্দেশে বলল, ‘এসব কী হচ্ছে? আপনারা আমাদের ঘিরে ধরেছেন কেন?’
তারা প্রথমে কোনও জবাব দিল না। কিন্তু এরপরই তাদের সামনে এসে উপস্থিত হল একজন। তাকে দেখেই তুহিন বুঝতে পারল লোকটা একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার। তার হাতেই লাউড স্পিকারটা ধরা। অফিসার সরাসরি ঝিনুককে প্রশ্ন করলেন, ‘এটা আপনার রিসর্ট? কী নাম আপনার?’
ঝিনুক জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, আমারই। আমার নাম ঝিনুক মিত্র।’
অফিসার এরপর জানতে চাইলেন, ‘এই লোকেরা আপনার রিসর্টের বোর্ডার?’
ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ ওনারা আমার এখানেই থাকেন। তবে ভাড়া নয়। আমি ওঁদের কদিনের জন্য থাকতে দিয়েছি।’
অফিসার বললেন, ‘আমরা একটা গুরুত্বপূর্ণ তদন্তের জন্য এখানে এসেছি। আপনি আশাকরি আমাদের সহযোগিতা করবেন। আপনার রিসর্টের লোকেদের উদ্দেশে বলুন আমাদের পুলিশকর্মীদের সহযোগিতা করতে, রিসর্টে ঢুকতে।’ এই বলে অফিসার হ্যান্ড মাইকটা বাড়িয়ে দিলেন ঝিনুকের দিকে।
ঝিনুক মাইকটা হাতে নিয়ে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে মাইকে মুখ দিয়ে বলল, ‘আমি ঝিনুক বলছি। আপনারা সবাই রিসর্টে ফিরে আসুন।’
পরপর বেশ কয়েকবার কথাটা বলল ঝিনুক। এরপর পুলিশের ঘেরাটোপের মধ্যে রিসর্টের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল রিসর্টের আবাসিকরা।
রিসেপশনে প্রবেশ করল সবাই। আবাসিকদের প্রত্যেকের মুখমণ্ডলেই উৎকণ্ঠার ভাব। ঝিনুক পুলিশ অফিসারকে জিগ্যেস করল, ‘এবার বলুন তো ব্যাপারটা কী? কীসের এনকোয়ারিতে এসেছেন আপনারা? আমার এখানে এঁরা যারা আছেন সবাই ভদ্র পরিবারের সন্তান।’
সবাই রিসেপশনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পচা গন্ধটাও যেন ভিতরে প্রবেশ করেছে। তাই যেন পুলিশ অফিসার নাকটা একটু কুঁচকে উপস্থিত আবাসিকদের উদ্দেশে বললেন, ‘আপনারা এক এক করে আপনাদের ঠিকানা বলুন?’
একজন পুলিশকর্মী মোবাইল ফোনের ক্যামেরা চালু করে ভিডিও রেকর্ডিং শুরু করল। আর প্রত্যেকে তাদের নাম-ঠিকানা বলে যেতে লাগলেন। তুহিন অন্যদের থেকে কিছুটা তফাতে ঝিনুকের সঙ্গে একপাশে দাঁড়িয়েছিল। রিসর্টের অন্য ছয়জন নারী-পুরুষ নিজেদের নাম-পরিচয় জানানোর পরই যে পুলিশকর্মী ভিডিও করছিল অফিসার ইঙ্গিতে আসতে বললেন। যে-কোনও কারণেই হোক তুহিনের নাম-পরিচয় জানতে চাইলেন না তিনি।
একজন পুলিশকর্মী এরপর অফিসারকে এক তাড়া কাগজ এগিয়ে দিল। তুহিনের মনে হল সেগুলো হল সিসিটিভি ক্যামেরায় তোলা কিছু মানুষের ছবির প্রিন্ট আউট।
অফিসার এক-একটা করে ছবি নিয়ে সার বেঁধে দাঁড়ানো আবাসিকদের মুখের সঙ্গে ছবির মুখ মেলাবার চেষ্টা করতে লাগলেন। তুহিন খেয়াল করল ধীরে ধীরে অফিসারের মুখে যেন চাপা হতাশা ঘিরে ফুটে উঠতে লাগল। তাঁর হাতে ধরা ছবির সঙ্গে রিসর্টের কারোরই যেন মিল পেলেন না তিনি।
অফিসার এরপর নরম স্বরে আবাসিকদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি দুঃখিত আপনাদের এত রাতে এভাবে বিরক্ত করলাম বলে। আসলে তদন্তের প্রয়োজনে আমাদের অনেক সময় এমন সব অপ্রিয় কাজ করতে হয়। আমার আর কিছু বলার নেই আপনাদের। আপনারা যেখানে খুশি যেতে পারেন।’
ঝিনুক অফিসারের উদ্দেশে বলল, ‘আপনারা এখানে কাদের সন্ধানে এসেছিলেন জানতে পারি কি?’
অফিসার যেন মৃদু লজ্জিতভাবে বললেন, ‘এখানে একটা হোটেলে ছ’জন ডাকাতের একটা গ্যাং ক’দিন আগে ডাকাতি করেছে। তাদের খোঁজেই এসেছিলাম।’
পুলিশ অফিসার তারপর তার দলবল নিয়ে রিসেপশন ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন।
আর তারা চলে যাবার পর তুহিনের হঠাৎই যেন মনে হল ঘরের সবাই তার দিকেই তাকিয়ে আছে! অবশ্য তারা কেউই কোনও কথা বলল না তুহিনকে। ঝিনুক সবার উদ্দেশে বলল, ‘কী আর করা যাবে! পুলিশের লোকেরা এমনই হয়। আসল অপরাধীকে ধরতে পারে না, সাধারণ মানুষকে হ্যারাস করে। অনেক রাত হল। যান এবার সবাই শুয়ে পড়ুন।’
ঝিনুকের কথা শুনে অন্যরা পা বাড়াল ভিতরে যাবার প্যাসেজের দিকে। আর তুহিনও সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল।
পরদিন বেলা সাতটা নাগাদ ঘুম ভাঙল তুহিনের। ঘুম থেকে ওঠার পর গত রাতের ঘটনাটা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর ফ্রেশ হয়ে লিখতে বসে গেল। একটানা প্রায় তিন ঘণ্টা লেখার পর বাইরে বেরোনোর জন্য তৈরি হয়ে ঘর ছেড়ে নীচে নামল। রিসেপশন জুড়ে মাছি তাড়াবার স্প্রের গন্ধ। তবে অন্যদিনের মতো এদিন সকালে নীচে নেমে সে ঝিনুককে আর দেখতে পেল না।
তুহিন বাইরে বেরিয়ে পড়ল রিসেপশন ছেড়ে। তারপর প্রতিদিনের মতোই রওনা হল বাস স্ট্যান্ডের দিকে। এদিন তাকে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে পরদিনের ফেরার টিকিটও কাটতে হবে।
বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছে সে যথারীতি চা খেয়ে পরোটার দোকানে ঢুকতেই দেখতে পেল নিশিনাথ মাইতিকে। টেবিলে কাগজ হাতে করে বসেছিলেন তিনি। তুহিন দোকানদারকে পরোটা দিতে বলে স্কুল মাস্টারের সামনে গিয়ে বসল। নিশিনাথ তাকে জিগ্যেস করল, ‘কবে ফিরছেন?’
তুহিন বলল, ‘আগামীকালই ফিরব।’
এ কথা বলার পর তুহিন তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘কাল রাতে একটা ঘটনা ঘটেছে মশাই।’
নিশিনাথ প্রশ্ন করলেন, ‘কী ঘটনা?’
তুহিন গতরাতে ডাকাতদের খোঁজে পুলিশের রিসর্ট অভিযানের কথা ব্যক্ত করল ভদ্রলোকের কাছে। তিনি বললেন, ‘পুলিশ তবে সত্যিই নড়েচড়ে বসেছে দেখছি।’
এ কথা বলার পর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘একটা কথা বলুন তো? আপনি না-হয় লেখালেখির জন্য নির্জন পরিবেশ খুঁজতে ঘটনাচক্রে এই রিসর্টে গিয়ে উঠেছেন। কিন্তু বাকি অতজন নারী-পুরুষ এখানে এত হোটেল থাকতে ঠিক ওখানে গিয়েই ঠাঁই নিল কেন?’
তুহিন বলল, ‘তা জানি না। তবে ওঁরা সারাদিন ঘরেই থাকেন। দিনের বেলা রিসর্টের বাইরে আসেন না। রিসর্টের মালকিনের মুখে শুনলাম ওঁরা নাকি একসঙ্গে রান্না করে খান।’
‘রিসর্টের মালকিনও তো বোধহয় দিনের বেলা রিসর্টের বাইরে বেরোন না তাই না?’
তুহিন জবাব দিল, ‘তাকেও আমি রিসেপশন ছেড়ে দিনেরবেলা বাইরে বেরোতে দেখিনি। তবে মেয়েটা ভালো, কথাবার্তা খুব সুন্দর। একা মেয়ে, বাবা-মা নেই। অনেক আশা নিয়ে রিসর্টটা চালু করেছিল। এখন সেটা সরকারের নির্দেশে বন্ধ হয়ে যাওয়াতে খুব মনঃকষ্টে আছে।’
তুহিন লোকটাকে একথা বলার পরই বুঝতে পারল, কোথায় যেন ঝিনুকের প্রতি তার মনের মধ্যে একটা দুর্বলতা জন্মেছে।
নিশিনাথ আর ও প্রসঙ্গে কোনও কথা না বলে তুহিনকে জিগ্যেস করল, ‘কাল কখন ফেরার বাস ধরার ইচ্ছা আপনার?’
তুহিন জবাব দিল, ‘একদম এখান থেকে খাওয়া সেরে বেলা বারোটা-একটা নাগাদ বাস ধরে সন্ধের মধ্যে কলকাতায় ফিরব।’
দোকানদার টেবিলে পরোটার থালা রেখে গেল। নিশিনাথবাবু উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার আমি চলি। কাল যদি ফেরার আগে আপনার সঙ্গে দেখা না হয়, তবে হয়তো আবার আপনি কোনও সময় এখানে এলে দেখা হয়ে যেতে পারে। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে বেশ লেগেছে আমার।’ তুহিন বলল, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলে আমারও বেশ লেগেছে। ভালো থাকবেন আপনি।’
নিশিনাথবাবু এরপর বেরিয়ে গেলেন দোকান ছেড়ে।
তুহিনও কিছুক্ষণের মধ্যেই খাওয়া সেরে বাইরে বেড়িয়ে এল। তারপর এগোল বাসের টিকিট কাউন্টারগুলোর দিকে। টিকিট পেতে কোনও সমস্যা হল না। পরিকল্পনা মতো পরদিন দুপুরের বাসে একটা টিকিট কেটে সে প্রতিদিনের মতো উপস্থিত হল সি-বিচে।
এদিনের আবহাওয়াটা বড় সুন্দর। আকাশটা যেন অনেকটা শরৎকালের মতো। ঝলমলে রোদ। তবে গরম খুব একটা নেই। বহু মানুষ স্নান করতে নেমেছে সমুদ্রে। হই-হুল্লোড় করে সমুদ্রে স্নান করছে সবাই। তুহিনের তা দেখে মনে হল সে-ও যদি যাবার আগে একবার সমুদ্রে স্নান করতে পারত তবে মন্দ হতো না। কিন্তু তুহিন সঙ্গে প্রয়োজনীয় পোশাক আনেনি। তাই তার সমুদ্রে নামা সম্ভব নয়। বেশ কয়েক ঘণ্টা সমুদ্রের পাড়ে অন্যদিনগুলোর মতোই বসে রইল তুহিন। তারপর দুপুরের খাওয়া সেরে রওনা হল রিসর্টের দিকে।
রিসর্টে প্রবেশ করে রিসেপশনের দরজার কাছে যেতেই একটা জিনিস চোখে পড়ল তুহিনের। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি উড়ছে বাইরে। যেন রিসেপশনের ভিতর প্রবেশ করতে গিয়েও করতে পারছে না তারা। কারণটা সম্ভবত ভিতরে মাছি তাড়ানোর রাসায়নিক ছড়ানো আছে বলে।
রিসেপশনে প্রবেশ করল তুহিন। মাছি তাড়াবার রাসায়নিকের গন্ধ সর্বত্র। কয়েকটা মাছি তার পিছন পিছন সেখানে প্রবেশ করল ঠিকই। কিন্তু তারপরই আবার তারা স্প্রের গন্ধ সহ্য করতে না পেরে ছিটকে বাইরে বেরিয়ে গেল।
তুহিন এরপর সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে যাচ্ছিল কিন্তু হঠাৎই তার মনে হল, পরদিন তো সে চলেই যাবে, তার আগে একবার রিসর্টের একতলাটা ঘুরে দেখে নিলে হয়। তাই সিঁড়ির দিকে না এগিয়ে সে এগোল করিডোরটার দিকে।
সেই প্যাসেজ বা করিডরটার ভিতর মাছি তাড়াবার রাসায়নিকের গন্ধ আরও বেশি তীব্র।
একপাশে দোতলার মতোই সার সার ঘর। তবে ঘরগুলোর দরজা-জানলা ভিতর থেকে বন্ধ। তুহিন অনুমান করল, এই সব ঘরগুলোর মধ্যেই আছেন রিসর্টের অন্য অতিথিরা।
তুহিন করিডোরের শেষ মাথা পর্যন্ত এগিয়ে গিয়ে আবার পিছু ফিরল। হঠাৎই একটা ঘরের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘরের ভিতর থেকে আসা একটা কথা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। কোনও লোকের কথাবার্তা আড়াল থেকে শোনা উচিত নয়, কিন্তু সে দাঁড়িয়ে পড়ল তার নামটা কানে এল বলে। সে শুনল কে একজন বলল, ‘তুহিন লোকটাই কি পুলিশকে খবর দিয়েছিল?’
এ কথা শুনে অপর একজন বলল, ‘কেন বলুন তো?’
প্রথম জন বলল, ‘দেখলে না, পুলিশ সবাইকে নাম-ঠিকানা জিগ্যেস করল। কিন্তু ওকে করল না।’
তৃতীয় একটা কণ্ঠস্বর বলল, ‘এখন আমারও তাই মনে হচ্ছে। ঝিনুক যে কেন ওকে এখানে থাকতে দিল কে জানে? তাছাড়া মাছিগুলো দেখেও তো লোকটার মনে অন্য কোনও সন্দেহ জাগতে পারে। আমাদের ভাগ্য ভালো পুলিশের লোকেরা দিনে না এসে রাতে এসেছিল।’
এরপর একটা নারীকণ্ঠ শোনা গেল। সে বলল, ‘আসলে ঝিনুকের তো একজন সঙ্গীর দরকার। আমার মনে হয় ওই তুহিন ছেলেটাকে ঝিনুকের পছন্দ হয়েছে। নিজের একাকীত্ব দূর করার জন্যই তো আমাদের ঝিনুক এখানে থাকতে দিয়েছে। আমরা না থাকলে তো ওর সঙ্গী লাগবে।’ আর একজন মহিলা কথা বলে উঠল, ‘কিন্তু তাহলে তো লোকটাকেও ঝিনুকের মতোই হতে হবে।’
মহিলা বলল, ‘হয়তো ঝিনুক সে ব্যবস্থা করে নেবে।’
কে যেন একজন জানতে চাইল, ‘কীভাবে করবে?’
কিন্তু এরপর তাকে নিয়ে ওই অদ্ভুত কথোপকথন তুহিনের আর শোনা হল না। কারণ সে রিসেপশনের দিকে একটা শব্দ শুনে, সম্ভবত ঝিনুক বাইরে বেরিয়েছে বুঝতে পেরে দ্রুত সেদিকে পা বাড়াল। কারণ, ঝিনুক যদি এদিকে উঁকি দিয়ে দেখে যে তুহিন দরজাতে আড়ি পেতে আছে তবে সেটা বড় বাজে ব্যাপার হবে।
করিডোর থেকে বাইরে বেরোতেই তুহিন ঝিনুকের মুখোমুখি হয়ে গেল। স্প্রে মেশিনটা নিয়ে স্প্রে করার চেষ্টা করছিল সে। তুহিনকে দেখে মৃদু বিস্মিতভাবে সে বলল, ‘আপনি কখন ফিরলেন?’
তুহিন বলল, ‘এই তো এক মিনিট। রিসর্টের ভিতরটা দেখে এলাম। সব ঘরেরই তো দরজা-জানলা বন্ধ দেখলাম।’
কথাটা শুনে ঝিনুক যেন একটু নিশ্চিতভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, সারাদিন ওরা রেস্ট নেয়।’ একথা বলে সে স্প্রে মেশিনটা দিয়ে স্প্রে-করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল, ‘ওষুধটা দেখছি শেষ হয়ে গেল। আগে বুঝতে পারলে আপনাকে দিয়ে আর একটা আনিয়ে নিতাম। আমি একদম সহ্য করতে পারছি না ওই মাছিগুলোকে। অনেকে যেমন আরশোলা দেখলে ঘেন্না বা ভয় পায়, মাছি দেখলে আমারও তেমন অনুভূতি হয়।’
একথা বলে ঝিনুক বলল, ‘আজ রাতে কিন্তু আবার আপনাকে নিয়ে বেরোব সমুদ্রের পাড়ে। আপনি যাবেন তো?’
তুহিন বলল, ‘হ্যাঁ যাব। আপনি কিন্তু আমাকে একটা প্লট দেবেন বলেছেন।’
ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
তুহিন এরপর রিসেপশন ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল নিজের ঘরে ফেরার জন্য।
ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পরেছিল তুহিন। তার ঘুম ভাঙল বিকাল পাঁচটা নাগাদ। আলো তখন নরম হয়ে এসেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে তুহিন বারান্দাতে গিয়ে দাঁড়াল। সূর্য ডোবার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে সোনালি রং ধরতে শুরু করেছে সমুদ্রের বুকে। অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য।
সেদিকে তাকিয়ে তুহিনের মনে পড়ে গেল রিসর্টে ফেরার পর বন্ধ দরজার আড়াল থেকে শোনা আবাসিকদের বাক্যালাপগুলো। তারা দুটো ব্যাপার সন্দেহ করছে। প্রথমত, তুহিনের সঙ্গে কোনওভাবে পুলিশের যোগসাজশ আছে। আর দ্বিতীয় সন্দেহটা হল তুহিনের প্রতি রিসর্টের মালকিন ঝিনুকের একটা দুর্বলতা আছে। কিন্তু তাদের বাকি কথাগুলোর মানে ঠিক স্পষ্ট নয় তুহিনের কাছে। তবে যতটুকু কথা সে বুঝেছে সেটুকু কথা তার পক্ষে বেশ অস্বস্তিজনক।
বেশ কিছুক্ষণ লোকগুলোর কথোপকথন নিয়ে চিন্তা করার পর একসময় তুহিন ভাবল, কে কী তার সম্পর্কে ভাবছে তা নিয়ে চিন্তা করে লাভ কী? পরদিনই তো রিসর্ট ছেড়ে সে চলে যাবে, তারপর আর হয়তো কোনওদিন তার দেখাই হবে না তাদের কারও সঙ্গে। কাজেই ওসব না ভেবে লেখাটা এগিয়ে রাখা যাক।
সূর্য ডুবে গেল কিছু সময়ের মধ্যে। তারপর ঘরের বাতিও জ্বলে গেল। কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে গেল তুহিন। অন্য সব ভাবনা মুছে গেল তার মন থেকে। একটানা সাড়ে ন’টা পর্যন্ত লিখল সে। তারপর বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। রাতে ঝিনুকের ডাকার কথা। শুকনো খাবার দিয়ে তুহিন খাওয়া সেরে নিল। তারপর প্রতীক্ষা করতে লাগল ঝিনুকের জন্য। ঠিক রাত দশটায় তার ঘরের দরজায় টোকা পড়ল।
তুহিন দরজা খুলতেই দেখতে পেল ঝিনুককে। একই সঙ্গে তার নাকে এল ঝিনুকের গায়ের পারফিউমের তীব্র গন্ধ। ঝিনুক বলল, ‘চলুন এবার তবে বেরোনো যাক?’
কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা দুজন রিসর্টের বাইরে বেড়িয়ে পড়ল। সমুদ্র আর জনমানবহীন বেলাভূমির মাথায় বেশ বড় সোনার থালার মতো চাঁদ উঠেছে। শব্দ করে ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তটে। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে তুহিন বলল, ‘আজ যেন ঢেউটা একটু বেশি মনে হচ্ছে!’
ঝিনুক বলল, ‘আজ তো পূর্ণিমা। অমাবস্যা-পূর্ণিমার রাতে ঢেউ একটু বাড়ে। তবে ভয়ের কিছু নেই। আপনি সাঁতার জানেন?’
তুহিন বলল, ‘আমি শহরের মানুষ। আমার বাড়ির কাছে কোনও পুকুর নেই। একবার ভেবেছিলাম সুইমিং ক্লাসে ভর্তি হব। শেষ পর্যন্ত আর তা হয়নি।’
তুহিনকে নিয়ে সোজা সমুদ্রের দিকে হাঁটতে হাঁটতে ঝিনুক বলল, ‘আমি জানি। আমি আমার বাড়ির পাশে একটা পুকুরে সাঁতার শিখেছিলাম। ও ব্যাপারটা অনেকটা সাইকেলের ব্যালেন্সের মতো, একবার কেউ শিখে নিলে আর ভোলে না।’
তারা দুজন হাঁটতে হাঁটতে সমুদ্রের একদম পাড়ে উপস্থিত হল। এক জায়গাতে চটি ছাড়ল ঝিনুক। তুহিন চটি ছাড়ার সময় বলল, ‘জল, এ পর্যন্ত এসে চটি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে না তো?’
ঝিনুক হেসে বলল, ‘নিয়ে গেলেও কাল সকালেই আবার ফেরত পেয়ে যাবেন। আমার অমন বহুবার হয়েছে। সমুদ্রের একটা বড় গুণ হল, সে কোনও কিছুই নিজের কাছে রাখে না। খড়কুটো হোক বা মানুষ, যাকেই নিজের বুকে টেনে নিয়ে যাক না কেন আবার তাকে ঠিক পাড়ে ফেরত দিয়ে যায়।’
এ কথা বলে ঝিনুক জলে নেমে পড়ল। গোড়ালি সমান জলে গিয়ে প্রথমে দাঁড়াল তারা। ছোট ছোট ঢেউ এসে ভাঙছে তাদের সামনে। আর দূরে বিশাল বিশাল ঢেউগুলো আকাশের দিকে উঠে আবার বিলীন হয়ে যাচ্ছে সমুদ্রগর্ভে।
সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ হয়ে ঝিনুক দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে তার চুল উড়ছে। চাঁদের আলোতে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে ঝিনুককে। তুহিনও তার সঙ্গে কিছুক্ষণ নিশ্চুপভাবে দাঁড়িয়ে থাকার পর বলল, ‘আপনি কিন্তু আমাকে আজ একটা গল্পের প্লট দেবেন বলেছিলেন?’
ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ, দেব।’ একথা বলে সে আরও কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল। তা দেখে তুহিনও তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। জল এবার তাদের হাঁটু ছুঁয়ে যাচ্ছে। আবারও সেখানে গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তুহিনের মনে হতে লাগল ঢেউ আর জল যেন ক্রমশ বাড়ছে। হাঁটুর উপর উঠতে শুরু করেছে জল। সে ঝিনুককে বলল, ‘কই বলুন?’
ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ, বলব তো। তবে আমার এখন আরও একটু এগোবার ইচ্ছা হচ্ছে। চলুন এগোই?’
তুহিন বলল, ‘আর এগোলে তো পুরো ভিজে যাব আমরা। ঢেউগুলো তো ক্রমশ বড় হচ্ছে দেখছি।’
ঝিনুক বলল, ‘হ্যাঁ, তবে ভয়ের কিছু নেই। আমার আজ স্নান করতে ইচ্ছা হচ্ছে। চলুন জলে নামি।’
তার এই কথা শুনে অবাক হয়ে গেল তুহিন। সে কী করবে বা বলবে তা বুঝে উঠতে পারল না। তাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ঝিনুক বলে উঠল, ‘কি, আপনার ভয় লাগছে? আমি তো আছি। ভয় লাগলে আমার হাত ধরুন।’
এই বলে সে আরও কিছুটা এগোল সামনের দিকে। তারপর বুক জলে পৌঁছে হাত দিয়ে জল ছিটকাতে শুরু করে তুহিনের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল চলে আসুন, চলে আসুন। আপনি যে এত ভিতু জানতাম না!’
এবার তুহিনের আঁতে ঘা লাগল, সে গিয়ে দাঁড়াল ঝিনুকের পাশে। ঢেউ ক্রমশ বাড়ছে। আর ঝিনুক ঢেউ এলেই মাথা জলের তলায় ডুবিয়ে দিচ্ছে। তারপর আবার ভুস করে জলের উপর মাথা তুলছে। তুহিনও একইভাবে ঢেউ আসার সঙ্গে সঙ্গে ওঠা-নামা করতে লাগল।
এভাবে যে তাকে রাতের সমুদ্রে স্নান করতে নামতে হবে সে ভাবেনি। জল ক্রমশ বাড়ছে। সে অবস্থাতেই একবার পিছনে তাকিয়ে তুহিন দেখতে গেল সমুদ্রের জল বেলাভূমির বেশ অনেকটা দূর পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, আর বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে বালুতটে। রিসর্টের আবাসিকরা। তারা যেন দেখার চেষ্টা করছে তুহিনদের স্নানের দৃশ্য।
তুহিন এবার বেশ অস্বস্তি বোধ করতে লাগল। তাছাড়া জল ক্রমশ বাড়ছে। সে জায়গাতে আর দাঁড়ানো ঠিক হবে না বুঝতে পেরে তুহিন ঝিনুককে বলল, ‘চলুন এবার ফেরা যাক?’
ঝিনুক কোনও উত্তর দিল না। কয়েক মুহূর্ত কেটে যাবার পর তুহিন আবার তাকে তারা দিয়ে বলল, ‘চলুন, চলুন, দেখছেন না কত বড় বড় ঢেউ আসছে!’
ঝিনুক কেমন যেন অদ্ভুতভাবে হেসে উঠল তুহিনের কথা শুনে। তারপর সে বলল, ‘চলুন আমরা ওই ঢেউগুলোর কাছে যাই।’
একথা বলে সে চেপে ধরল তুহিনের হাতটা। তারপর তাকে নিয়ে সামনে এগোতে লাগল। তুহিনের পায়ের নীচ থেকে সর সর করে বালি সরে যাচ্ছে। জল নাক পর্যন্ত উঠে এসেছে। ঢেউ এলে তার শরীরটা হারিয়ে যাচ্ছে জলের তলাতে।
তুহিনের এবার যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল। সে বলল, ‘আর নয়, আর নয়, এবারে ফিরে চলুন। আমি আর এগোব না।’ কিন্তু তার কথায় যেন ভ্রুক্ষেপই করল না ঝিনুক। তুহিন দেখল ঝিনুকের পুরো শরীরটাই জলের নীচে অদৃশ্য হয়ে গেছে, তবুও কীভাবে যেন কোন অদ্ভুত কৌশলে তুহিনকে সামনে টেনে নিয়ে চলেছে।
বিরাট বিরাট ঢেউ এগিয়ে আসছে সামনে থেকে৷ ওই ঢেউগুলোর কোনও একটা তুহিন আর ঝিনুককে নিমেষে টেনে নিয়ে যেতে পারে সমুদ্রের গভীরে। কিন্তু ঝিনুকের যেন তাতে কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। একসময় তুহিন বুঝতে পারল তার পক্ষে আর কিছুতেই এগোনো সম্ভব নয়। ঢেউয়ের দাপটে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার।
সে এবার হাতটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করল ঝিনুকের হাত থেকে৷ কিন্তু পারল না। ঝিনুক যেন লোহার মতো শক্ত করে ধরে আছে তার কব্জি। তাকে সমুদ্রের আরও গভীরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সে। সামনে পরপর বিশাল বিশাল কতগুলো ঢেউ আসছে। তা দেখে আতঙ্কে তুহিন চিৎকার করে উঠল। কিন্তু তার চিৎকার হারিয়ে গেল জলোচ্ছ্বাসের মধ্যে।
এক এক করে সেই বিশাল বিশাল ঢেউগুলো এসে পড়তে লাগল, আর তার মধ্যে হারিয়ে যেতে লাগল তুহিন। মাটি থেকে তার পা উঠে গেল জলের ধাক্কায়। তুহিনের শরীরটা পাক খেতে লাগল জলের মধ্যে।
তুহিন শেষবারের মতো জলতলের উপর ছিটকে উঠে দেখতে পেল কয়েক তলা বাড়ির সমান একটা বিরাট ঢেউ এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। আর সেটা কাছে আসতেই জলের নীচে অদৃশ্য হয়ে থাকা ঝিনুকের হাতটা যেন প্রচণ্ড শক্তিতে তাকে ছুড়ে দিল সেই ঢেউয়ের মধ্যে।
তুহিনের সারা শরীর ঘুরপাক খেতে লাগল সেই ঢেউয়ের মধ্যে। তুহিন বুঝতে পারল ঢেউটা তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে সমুদ্রের গভীরে। শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তার।
আর দু-এক মুহূর্তের মধ্যেই হয়তো তুহিন সংজ্ঞা হারিয়ে চিরদিনের মতো হারিয়ে যেত সমুদ্রের বুকে। ঠিক সেই সময় আবারও একটা হাত তার কব্জি চেপে ধরল। সে হাত যেন পিছন দিকে টেনে ধরল তুহিনকে, তাকে আটকে দিল স্রোতের টানে হারিয়ে যাওয়া থেকে। এবার নিজের শরীরেও কিছু জোর ফিরে পেল তুহিন।
যেদিকে পাড় সেদিকে হাতটা তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। আর তুহিনও চলতে লাগল সেই টানে। একসময় তুহিন কিছুটা ধাতস্থ হল, জলতলের উপর সে মাথাটা বার করতে পারল। কিন্তু কে তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে হাত ধরে উদ্ধার করে নিয়ে চলেছে? ঝিনুকই কি?
আর তার পরই তুহিনের পাশে জলের মধ্যে ভুস করে জেগে উঠল একটা মাথা। চাঁদের আলোতে তাকে তুহিন চিনে ফেলল। এ যে সেই স্কুল মাস্টার নিশিনাথ মাইতি! তিনি কীভাবে এখানে এলেন।
নিশিনাথ তাকে বললেন, ‘আর ভয় নেই, ফাঁড়া কেটে গেছে আপনার। তবে যথাসম্ভব জলের মধ্যে লুকিয়ে চলুন, ওরা যেন আপনাকে দেখতে না পায়।’
তুহিন বলল, ‘কারা?’
তিনি বললেন, ‘ওই যারা আপনাকে মারতে চেয়েছিল। ঝিনুক আর রিসর্টের বাসিন্দারা। ওই দেখুন ঝিনুককে নিয়ে ওরা ফিরে যাচ্ছে।’
তুহিন রিসর্টের দিকে তাকিয়ে দেখল ঝিনুক ও অন্যরা এগোচ্ছে রিসর্টের দিকে। অর্থাৎ, তুহিন যে জলে ভেসে যাবে ওটা তাদের কাছে প্রত্যাশিতই ছিল।
নিশিনাথের সঙ্গে তুহিন সেই রিসর্টের থেকে বেশ খানিকটা দূরে এমন জায়গাতে পাড়ে গিয়ে উঠল যে জায়গা রিসর্ট থেকে চোখে ও পরবে না। দুজনেই বসল বালুতটে। তুহিন বেশ কিছুক্ষণ হাঁপিয়ে নেবার পর তাকে প্রশ্ন করল, ‘আপনি কে বলুন তো?’
নিশিনাথ হেসে বললেন, ‘আমি সরকারি ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের একজন অফিসার। ওই ডাকাতির ব্যাপারটা নিয়ে তদন্ত করতে এখানে এসেছিলাম।’
একথা বলার পর তিনি বললেন, ‘আমি অনুমান করেছিলাম, আজ রাতে আপনার কোনও বিপদ আসতে পারে। তাই আমি এখানেই ছিলাম। আপনারা যখন জলে নামলেন তখন আপনাদের অলক্ষ্যে আমিও জলে নেমে পড়েছিলাম।’
তুহিন বলল, ‘ভাগ্যিস নেমেছিলেন। নইলে আমি বাঁচতাম না। কেন যে মেয়েটা আমাকে জলে ডুবিয়ে মারতে চাইল, আমি তা কিছুই বুঝতে পারছি না।’
নিশিনাথ বললেন, ‘এবার আপনি ওই রিসর্টে প্রবেশ করার মুহূর্ত থেকে আজ সমুদ্রের জলে নামা পর্যন্ত প্রতিটা ঘটনা খুলে বলুন আমাকে। দেখি আমি আপনার কথা শুনে তার থেকে কিছু উদ্ধার করতে পারি কি না?’
তুহিন এরপর বলে যেতে লাগল সব কথা।
সব কথা শেষ হবার পর নিশিনাথ বললেন, ‘আমার অনুমান যদি ঠিক হয় তবে একটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার জড়িয়ে আছে এ ঘটনার সঙ্গে।’
তুহিন জানতে চাইল, ‘সেটা কী?’
নিশিনাথ বললেন, ‘কাল সকালে আমরা রিসর্টে ঢুকব, তখন ব্যাপারটা বোঝা যাবে।’
একথা বলার পর তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘এবার উঠুন। কাছেই আর একটা রিসর্টের পিছনের দরজা ওর মালিককে দিয়ে খুলিয়ে ওখানেই আজ রাতে আমি ডেরা বেঁধেছি। বাকি রাতটা ওখানেই কাটাবেন। আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন। আমার কিছু লোকজনও ওখানে আছে।’
তুহিন এরপর উঠে তার সঙ্গে রওনা হল সেই রিসর্টের দিকে। সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে তিনি বললেন, ‘পুলিশের যে অফিসার আপনাদের রিসর্টে গেছিল তিনি আপনার পরিচয় আমার মাধ্যমে জানতেন। ওঁর উচিত ছিল আপনাকেও জিগ্যেস করা। ভিডিওতে যখন দেখলাম তখনই আমার মনে হল আপনাকে রিসর্টের অন্যরা সন্দেহ করতে পারে, আপনার উপর বিপদ আসতে পারে। আমার এ ধারণা আরও তীব্র হল লোকগুলোর পরিচয় আজ সকালে অনুসন্ধান করে...’
তুহিন বলল, ‘ওরা কারা?’
নিশিনাথ বললেন, ‘কাল বলব।’
তুহিন এরপর তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘আপনার পরিচয়টা তো ছদ্মবেশ ছিল। আপনার নামটাও কি ছদ্মনাম?’
তিনি হেসে বললেন, ‘কেন, নিশিনাথ নামটা কি খুব খারাপ?’ তুহিন বুঝতে পারল, এ ব্যাপারটা তিনি খোলসা করতে চাইছেন না।
তুহিন এরপর কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেল সেই রিসর্টে।
পরদিন বেলা দশটা নাগাদ নিশিনাথবাবুর সঙ্গে রাত্রিবাসের জায়গা ছেড়ে বেরিয়ে রওনা হল ঢেউপরীর দিকে। তুহিনকে তার কর্তব্য বুঝিয়ে দিয়েছেন গোয়েন্দা অফিসার। ঝলমলে রৌদ্রোজ্জ্বল আকাশ। ছোট ছোট ঢেউ এসে ভাঙছে বালুতটে। খুব সুন্দর পরিবেশ। তুহিনের মনে হচ্ছে, গতরাতের ঘটনাটা যেন নিছকই দুঃস্বপ্ন! তবে রাতে লম্বা ঘুম আর নিরাপত্তার আশ্বাসে তার মন বেশ চাঙ্গা হয়ে গেছে। এখন মনে মনে তীব্র উত্তেজনা বোধ করছে সে। সেটাই স্বাভাবিক।
রিসর্টের কাছে পৌঁছে গেল তারা দুজন। নিশিনাথ রিসর্টে প্রবেশ করার আগে তুহিনকে বললেন, ‘ভয় পাবেন না। যে-কোনও দৃশ্যর জন্য প্রস্তুত থাকবেন। আমার কাছে সার্ভিস রিভলভার আছে, তাছাড়া মোবাইলে মেসেজ করলেই দু-মিনিটের মধ্যে ফোর্স ছুটে আসবে।’
রিসর্টে ঢুকে রিসেপশনের গেটের সামনে এসে উপস্থিত হল তারা। গেটের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে মাছির ঝাঁক। কাচের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে রিসেপশনের ভিতরেও মাছির ঝাঁক ঘুরে বেড়াচ্ছে। মৃদু ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেল। ভিতরে প্রবেশ করল তারা। আর তার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের মাছিগুলোও ঢুকল ভিতরে।
রিসেপশনে ঢুকতেই একটা উৎকট পচা গন্ধ এসে লাগল নাকে। দুজনে গিয়ে দাঁড়াল কাউন্টার সংলগ্ন ঝিনুকের ঘরের দরজার সামনে। নিশিনাথ তুহিনকে ইশারা করে একপাশে সরে দাঁড়ালেন যাতে দরজা খুলে ঝিনুক তাঁকে না দেখতে পায় সে জন্য।
তুহিন ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে বলল, ‘ঝিনুক, আমি এসেছি।’
কয়েকবার সে কথাটা বলার পর ঘরের ভিতর থেকে একটা পদশব্দ দরজার দিকে এগিয়ে এল। তারপর দরজা খুলে উঁকি দিল! ঝিনুক। তুহিনকে দেখে মৃদু বিস্ময় ফুটে উঠল তার মুখে। তারপর সে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ভিতরে এসো। নইলে মাছি ঢুকে পড়বে।’
তুহিন তার কথা মতো ভিতরে ঢুকল। ঝিনুক দ্রুত দরজা বন্ধ করে দিল। ঘরের ভিতরও পচা গন্ধ ছড়িয়ে আছে চারপাশে। তীব্র গন্ধ, এবং তুহিনের মনে হল সেটার উৎস যেন ঝিনুকের শরীর!
ঘরের দেয়ালগুলোর মাথার দিকে দুটো ভেন্টিলেটর আছে। মাছি যাতে সেগুলো দিয়ে ঘরে ঢুকতে না পারে সম্ভবত সেজন্য তাদের গায়ে প্লেট লাগানো। ভেন্টিলেটর দুটো দিয়ে সামান্য আলো ঢুকছে ঘরে। আলো-আঁধারি পরিবেশ ঘরের মধ্যে। ঘরটাতে একটা বড় জানলা আছে ঠিকই তবে সেটা বন্ধ।
তুহিনের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকার পর ঝিনুক বলল, ‘আমি জানতাম তুমি আসবে। সমুদ্র সব কিছুই ফিরিয়ে দেয়। তবে আমি ভেবেছিলাম সূর্য ডোবার পর আসবে তুমি। কিন্তু তুমি দিনের বেলা উঠে এলে কীভাবে?’
ঝিনুকের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে তুহিন তাকে প্রশ্ন করল, ‘তোমার এখানে যারা আছে তারা কারা?’
ঝিনুক জবাব দিল, ‘তারাও তোমার-আমার মতোই।’
‘আমার-তোমার মতো মানে?’ প্রশ্ন করল তুহিন।
‘লঞ্চ ডুবি হয়েছিল ওদের। একদিন রাতে ওরা ভেসে এসেছিল এখানে। আমি ওদের আশ্রয় দিয়েছি।’
একথা বলার পর ঝিনুক বলল, ‘জানো বড় একা লাগত আমার। তুমি এসে গেছ আর চিন্তা নেই। এখানেই হোক বা অন্য কোথাও এক সঙ্গে থাকব আমরা। শেষ মুহূর্তে কি খুব কষ্ট হয়েছিল তোমার? এছাড়া যে আমার অন্য কোনও পথ ছিল না।’
ঝিনুকই যে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল তা ঝিনুকের কথা শুনে তুহিনের বুঝতে অসুবিধা হল না। এবং এখন পর্যন্ত ঝিনুকের সঙ্গে তার যা কথা হয়েছে তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা ইঙ্গিত অনুমান করে ভয় মেশানো বিস্ময়ে তুহিনের বুক কেঁপে উঠল। যদিও সে নিশিনাথের কথা মতোই তা ঝিনুকের সামনে প্রকাশ করল না। নিজের অনুমান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে তুহিন তাকে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি জলে ডুবেই...।’
তার কথা শেষ হবার আগেই ঝিনুক বলল, ‘না, জলে ডুবে নয়। রিসর্টের কর্মচারীদের বিদায় দেবার পর একদিন দারুণ হতাশায় আর একাকীত্ব সহ্য করতে না পেরে বিষ খেয়েছিলাম। কেউ জানতে পারেনি। শুধু ওই মাছিগুলো গন্ধ পেয়ে ছুটে আসে। ওরাই শুধু জানে।’
তুহিন বুঝতে পারল তার পা এবার টলতে শুরু করেছে।
ঝিনুক এরপর বলল, ‘কিন্তু পরে আমি বুঝতে পারলাম মরলেও একাকীত্ব ঘোচে না। তবে এখন আর আমার চিন্তা নেই। এসো আমার হাত ধরো তুহিন।’ একথা বলে সে এগিয়ে আসতে লাগল তুহিনের দিকে। ঠিক এই মুহূর্তে ছিটকে সরে এসে দরজাটা খুলে ফেলল। ঝিনুক সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, ‘দরজা বন্ধ করো, দরজা বন্ধ করো।’
আর তারপরই ঘরের ভিতর প্রবেশ করলেন নিশিনাথ। তাকে দেখে ঝিনুক চমকে উঠে বলল, ‘আপনি কে? কোথা থেকে এলেন?’
নিশিনাথ বললেন, ‘আমি তুহিনবাবুর সঙ্গেই এসেছি। কাল আপনি যখন ওনাকে জলে ডুবিয়ে মারতে চেয়েছিলেন তখন আমিই ওনাকে উদ্ধার করি।’
কথাটা শুনে মুহূর্তের মধ্যে যেন ঝিনুকের মুখ থেকে উধাও হয়ে গেল যাবতীয় কোমলতা। একটা হিংস্র ভাব ফুটে উঠল ঝিনুকের মুখে। প্রচণ্ড ঘৃণাভরে ঝিনুক, নিশিনাথ আর তুহিনের উদ্দেশে বলল, ‘তোমাদের কাউকেই আর আমি এখান থেকে ফিরতে দেব না।’ একথা বলে সে গলা টেপার জন্য হাত দুটো বাড়িয়ে এগোতে লাগল নিশিনাথের দিকে।
নিশিনাথ তার কোমর থেকে রিভলভারটা বার করে ঝিনুককে বলল, ‘আপনি যেই হোন না কেন, এগোবেন না।’
ঝিনুক সে কথা শুনে ব্যঙ্গভরে হেসে উঠে বলল, ‘আপনার ওই হাতের যন্ত্রটা আমার কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।’
এই বলে সে এগিয়ে আসতে থাকল নিশিনাথের দিকে। নিশিনাথ অস্ত্র উঁচিয়ে ধরলেন। কিন্তু ঝিনুক থামল না। আরও দু-পা এগিয়ে এসে ঝিনুক নিশিনাথের উপর ঝাঁপ দিল। নিশিনাথের হাতের রিভলভার থেকে এবার সত্যিই গুলি বেরিয়ে গেল। প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল ঘরটা।
ঝিনুকের শরীরটাও একবার ঝাঁকুনি খেল সম্ভবত গুলির আঘাতে। কিন্তু গুলি তাকে থামাতে পারল না। বাঘিনীর মতো সে নিশিনাথের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে টিপে ধরল তার গলা।
নিশিনাথ চেষ্টা করতে লাগলেন ঝিনুকের হাত থেকে নিজেকে মুক্ত করার, কিন্তু পারলেন না। ঝিনুকের দেহে যেন দানবের শক্তি। ঝিনুকের হাতের প্রচণ্ড নিষ্পেষণে নিশিনাথের চোখ যেন কোটর থেকে ছিটকে বাইরে বেরোবার উপক্রম হল। হাত থেকে খসে পড়ল তাঁর রিভলভার। তুহিন এতটাই বিস্মিত হয়ে গেছে যে সে বুঝে উঠতে পারল না তার কী করা উচিত।
ঠিক এই মুহূর্তে একটা ঘটনা ঘটল। পচা গন্ধ পেয়ে খোলা দরজা দিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি প্রবেশ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল ঝিনুকের উপর। ঝিনুক সঙ্গে সঙ্গে নিশিনাথবাবুর গলা ছেড়ে দিল। তারপর হাত দিয়ে তাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল মাছিদের। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি প্রবেশ করছে ঘরের ভিতর।
ঝিনুকের হাত থেকে মুক্ত হয়ে একছুটে গিয়ে জানলাটা খুলে দিলেন নিশিনাথ। বাইরের সূর্যালোক এবার সরাসরি প্রবেশ করল ঘরে। ঘর আলোকিত হতেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল ঝিনুকের গলা থেকে। ঝাঁকে ঝাঁকে মাছি ততক্ষণে তার সর্বাঙ্গে বসতে শুরু করেছে। চিৎকার করে উঠে এরপর ধীরে ধীরে মাটিতে পড়ে গেল ঝিনুক। আর সূর্যের আলোতে মুহূর্তের মধ্যে গলতে পচতে লাগল তার শরীর। তীব্র দুর্গন্ধে ভরে উঠল ঘর। শেষ একবার দুমড়ে মুচড়ে উঠে স্থির হয়ে গেল। মাছির দল তার শরীর ছেয়ে ফেলল পচা মাংসের লোভে।
নিশিনাথের সঙ্গে তুহিন বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ হতভম্বর মতো দাঁড়িয়ে রইল। নিশিনাথ বললেন, ‘এবার ফোর্স ডাকতে হবে। অন্য ঘরগুলোতে ঢুকতে হবে।’
এই বলে তিনি মোবাইলে মেসেজ পাঠালেন ফোর্সকে।
হতভম্ব তুহিনকে এরপর তিনি বললেন, ‘আমার কেন সন্দেহ হয়েছিল যে এর মধ্যে একটা আশ্চর্য ব্যাপার আছে তা আপনাকে বলি। কিছুদিন আগে কাছেই একটা সমুদ্র সৈকত থেকে সমুদ্রের ভিতর ঘুরতে যাওয়া একটা টুরিস্ট নৌকা ডুবে যায়। বেশ কিছু মানুষের জীবনহানি হয় তাতে। কিছু মানুষের দেহও আর পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ সেই ব্যক্তিদের নাম নথিভুক্ত করা হয় স্থানীয় থানাতে।
‘ডাকাতদের অনুসন্ধানে এসে তাদের সম্পর্কে কোনও ক্লু পাওয়া যায় কি না তার সন্ধানে পুরোনো ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ওই দুর্ঘটনায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের নামগুলো চোখে পড়ে আমার। তারপর আমি যখন ভিডিওতে রিসর্টের লোকগুলোর নাম শুনি তখন আমি অবাক হয়ে যাই। কারণ ওই যারা নিখোঁজ তাদেরই নাম বলছে লোকগুলো। পুরোনো ফাইলে তাদের ছবি ছিল। দেখলাম সেই ছবি মিলে যাচ্ছে ওই রিসর্টে থাকা নারী-পুরুষদের চেহারার সঙ্গে। ইতিমধ্যে কাল বেলার দিকে খবর এল শেষ পর্যন্ত পুরো ডাকাত দলটাকেই পাকড়াও করা গেছে। স্থানীয় এক গ্রামে ছদ্মবেশে আত্মগোপন করে ছিল তারা।
‘যাই হোক এরপর আমার মনে প্রশ্ন এল, ওই সব নিখোঁজ ব্যক্তিরা কেন ওই রিসর্টে এসে আত্মগোপন করে আছে? তাদের কি কোনও দুরভিসন্ধি আছে? কিন্তু এরপর আরও একটা ব্যাপার মাথায় এল আমার। রিসর্টের ভিতরে এমনভাবে মাছির দল হানা দিচ্ছে কেন? তবে কি রিসর্টের ভিতরে এমন কোনও জিনিস আছে যা মাছিকে আকৃষ্ট করে? পচা বা মরা কোনও জিনিস?
‘পুলিশ অফিসার আমাকে কথা প্রসঙ্গে জানিয়ে ছিলেন যে তাঁরা যখন রিসর্টে হানা দেন তখন সমুদ্রতটে আর রিসর্টের ভিতর তীব্র পচা গন্ধ ছড়িয়ে ছিল। আমার মনে পড়ল আপনি আমাকে বলেছেন যে ওই নারী-পুরুষরা দিনের বেলাতে রিসর্টের বাইরে বেরোতে না! এ সব ঘটনা বিশ্লেষণ করে শেষ পর্যন্ত আমি এই অবিশ্বাস্য ঘটনার ইঙ্গিত পেয়েছিলাম যা সত্যি প্রমাণিত হতে চলেছে। জানি এ ঘটনা কেউ কোনওদিন বিশ্বাস করবে না, তবু আমরা এ ঘটনার সাক্ষী রইলাম।’
একটানা কথাগুলো বলে থামলেন তিনি।
আর তারপরই রিসর্টের ভিতর প্রবেশ করল পুলিশকর্মীরা। নিশিনাথবাবু তাদের সব বন্ধ ঘরগুলোর দরজা ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিলেন। কাজ শুরু করল তাঁর লোকজন। একতলার প্যাসেজের ঘরগুলোর একটার পর একটা দরজা ভাঙতেই আবিষ্কৃত হতে থাকল একটার পর একটা মৃতদেহ। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে তাদের গা থেকে। আর তার টানে, পচা মাংসের লোভে ঝাঁকে ঝাঁকে মাছির দল উড়ে এসে উন্মত্তের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগল দেহগুলোর উপর!
নিশিনাথ, তুহিনকে বললেন, ‘আপনি এদের পরিচয় বুঝতে না পারলেও মাছিরা ঠিক চিনতে পেরেছিল এদের পরিচয়—এরা মৃত!’
মুহূর্তের জন্য তুহিনের চোখে ফুটে উঠল গতরাতের সেই দৃশ্য। চাঁদনী রাতে ঝিনুক তার হাত ধরে সমুদ্রের অতল জলরাশির মধ্যে টেনে নিয়ে চলেছে তার সঙ্গী করার জন্য! আর তারপরই তুহিনের মনে হল, ঝিনুক তাকে গল্পের প্লট না বললেও বিরাট এক কাহিনির পল্ট পেয়ে গেছে সে। এই ঘটনাটাই তো এক অবিশ্বাস্য কাহিনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন