হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

রাজর্ষি পেল্লায় বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল। কলকাতার গায়ের এই উপনগরীর বহু বাড়িই তার মালিকের অভিজাত্য ও আর্থিক সচ্ছলতার নিদর্শন বহন করে থাকে, কিন্তু রাজর্ষি যে বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল সে বাড়িটা শুধু কলেবরের দিক থেকে নয়, নান্দনিক দিক থেকেও মনমুগ্ধকর। ফুলের টব শোভিত দোতলার ব্যালকনি, গ্রিল, দরজা-জানালার কাঠের পাল্লার নকশা, সবকিছুতেই একটা আলাদা নান্দনিক ভাবনার ছাপ আছে যা আশেপাশের বাড়িগুলোর থেকে আলাদা করে রেখেছে এ-বাড়িকে।
সব থেকে আকর্ষণীয় হল, এ-বাড়ির কম্পাউন্ডের প্রবেশ মুখে অর্থাৎ গেটের দু-পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পূর্ণাবয়ব নারী মূর্তি। যারা করজোড়ে স্বাগত জানাচ্ছে অতিথিকে। পূর্ণাঙ্গ মানুষের আকৃতির এই নারী মূর্তি দুটোকে হঠাৎ দেখলে জীবন্ত বলে ভ্রম হওয়া স্বাভাবিক।
রাজর্ষির প্রথম দিন তেমনটাই মনে হয়েছিল। আর তা হবে নাই-বা কেন? এই মূর্তি দুটো যে ভার্গব চৌধুরীর নিজের হাতে গড়া। পাথর, ধাতু, কাঠ বা ফাইবার মাধ্যম যাই হোক না কেন, ভাস্কর ভার্গব চৌধুরীর হাতে সব কিছুই জীবন্ত হয়ে ওঠে। তাইতো দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও তাঁর নাম শিল্প মহলে সমাদৃত।
রাজর্ষি ওই নারীমূর্তিদ্বয়ের মাঝখানে অর্থাৎ গেটের সামনে এসে দাঁড়াতেই, বাড়ির ভিতর থেকে ভার্গব স্যারের পোষ্য রটওয়েলারটা বার কয়েক ডেকে উঠল। প্রশিক্ষিত সারমেয়, বাড়ির সামনে রাজর্ষির উপস্থিতি টের পেয়েছে। ঘড়ি দেখল রাজর্ষি। চারটে বাজতে তখনও পাঁচ মিনিট বাকি। স্যার তাকে ঠিক চারটেতেই আসতে বলেছেন।
স্যারের মতো মানুষের পাঁচ মিনিট সময়েরও অনেক দাম। তাই রাজর্ষি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রইল চারটে বাজার প্রত্যাশাতে। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল কাঠের তৈরি মূর্তি দুটোকে। কী বিস্ময়কর হাতের কাজ স্যারের! মূর্তি দুটোর চোখ বা নাকের পাটা দেখে মনে হচ্ছে এখনই হয়তো তারা পলক ফেলবে বা শ্বাস নেবার জন্য মৃদু কেঁপে উঠবে! এমন নিখুঁত শিল্পকর্ম এই দুটো। রাজর্ষি শুনেছে যে ভার্গব চৌধুরী দুজন মডেলকে সামনে দাঁড় করিয়ে তাঁর এই নারী মূর্তি দুটো নিৰ্মাণ করেছিলেন।
কুকুরটা আবার ডেকে উঠল। আর তার সঙ্গে সঙ্গে একটা কণ্ঠস্বর কানে গেল রাজর্ষির, ‘বাবু ভিতরে আসুন।’
নারী মূর্তির থেকে চোখ সরিয়ে রাজর্ষি তাকিয়ে দেখল, ধুতি আর ফতুয়া পরা এক প্রৌঢ় বাড়ির ভেতর থেকে গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। এ-বাড়িতে ইতিপূর্বে বার কয়েক আসার সুবাদে রাজর্ষি লোকটাকে চেনে। ওঁর নাম সনাতন। ভার্গব চৌধুরীর বাড়িতে পরিচারক হিসাবে কাজ করেন।
এ-বাড়িতে মানুষ বলতে থাকেন, অকৃতদার ভার্গব চৌধুরী আর এই লোকটা। রাজর্ষি রিস্টওয়াচ দেখল, ঠিক চারটে বাজে। স্যার সম্ভবত তাঁর পরিচারককে বলে রেখেছেন রাজর্ষির কথা। প্রৌঢ় পরিচারককে দেখে রাজর্ষি তার স্বভাবজাত সৌজন্যবশত তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘কাকা, ভালো আছেন তো?’
রাজর্ষির কথা শুনে যেন খুশি হল লোকটা। মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল, ‘হ্যাঁ বাবু, ভালো আছি।’ গেট খুলে গেল, রাজর্ষি বাড়ির কম্পাউন্ডে প্রবেশ করে পরিচারকের পিছন পিছন ভিতরে ঢুকল।
বাড়ির ভিতরেও নন্দনতত্ত্বর ছাপ সর্বত্র। কোথাও দেয়াল থেকে ঝুলছে ওয়াল পেন্টিং, আবার কোথাও বসানো আছে নানা আকৃতির মূর্তি। এসবই ভার্গব স্যারের সৃষ্টি।
লোকটা তাকে পৌঁছে দিল ভার্গব চৌধুরীর কাজের ঘর বা স্টুডিও-র সামনে। ভারী পর্দা ঝুলছে ঘরের দরজাতে। ভিতর থেকে আসা পাখার বাতাসে তবুও মাঝে মাঝে ফাঁক হয়ে যাচ্ছে পর্দাটা।
রাজর্ষি তার ফাঁক দিয়ে দেখল, স্টুডিওর মাঝখানে ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছেন প্রখ্যাত ভাস্কর মধ্যবয়সি ভার্গব চৌধুরী। কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য, বা যখন তিনি অতিথি অভ্যাগতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তখন তিনি ওই চেয়ারেই বসে থাকেন। তাঁর যেসব ছবি পত্র-পত্রিকাতে ছাপা হয়, তাতে তাঁকে ওই চেয়ারেই বসে থাকতে দেখা যায়।
রাজর্ষি তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘আসব স্যার?’
ভেতর থেকে জবাব এল, ‘হ্যাঁ এসো।’
ভার্গব চৌধুরীর স্টুডিওতে পা রাখল রাজর্ষি। বেশ বড় একটা ঘর। তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নানান আকৃতির নানান ধরনের মূর্তি বা শিল্প কার্য ৷ তাদের কোনওটার কাজ সম্পূর্ণ আবার কোনওটার কাজ অসম্পূর্ণ। আর এইসব শিল্পকর্মের একটা বড় অংশই নারী বা পুরুষের নগ্ন মূর্তি, যা নির্মাণের জন্য খ্যাতিমান ভার্গব চৌধুরী। এছাড়া শিল্পকর্মের নানা সরঞ্জামও রাখা আছে এখানে ওখানে।
রাজর্ষি স্টুডিওতে ঢুকতেই সোজা হয়ে বসলেন ভার্গব চৌধুরী। তার পরনে একটা ফতুয়া আর পায়জামা, পায়ে দামি স্লিপার। ঠিক যেন সিনেমার নায়কের মতো দেখতে। অনেকেই সেজন্য আড়ালে ভার্গব চৌধুরীকে ‘উত্তমকুমার’ বলেও ডাকেন। আর্ট কলেজের মেয়েরা এখনও ক্রাশ খায় মধ্যবয়সি ভার্গব চৌধুরীকে দেখে।
তিনি চোখের ইশারাতে রাজর্ষিকে তার কাছেই একটা টুলে বসতে বললেন। রাজর্ষি তার নির্দেশ পালন করার পর তাকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে ভার্গব বললেন, ‘তোমাকে একটা কাজ দেব বলে ডেকেছি, তাই না? টেলিফোনে মনে হয় এটুকু বলেছি তোমাকে?’
রাজর্ষি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার।’
ভার্গব কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে এবার প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি, অতিথি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিসের নাম শুনেছ?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘হ্যাঁ স্যার। ওরা তো হোটেল ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। কদিন আগেই সম্ভবত খবরের কাগজে দেখেছিলাম যে ওরা নিউ টাউনে একটা পাঁচতারা হোটেল খুলতে চলেছে।’
রাজর্ষির জবাব শুনে ভার্গব বললেন, ‘ইউ আর রাইট মাই বয়। আর সে জন্যই তোমাকে ডাকা।’
পাঁচতারা হোটেলের সঙ্গে রাজর্ষির কাজের কী সম্পর্ক এরপর তা ভার্গব স্যার বললেন তাকে। একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘ওই কোম্পানির প্রধান মাথা হলেন সুন্দরাইয়া। দক্ষিণের মানুষ তিনি। তবে কাজের স্বার্থে দীর্ঘদিন ধরে মুম্বাইতে আছেন। আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে তিনি প্রথমে একটা মাঝারি মানের হোটেল খোলেন তৎকালীন বোম্বে নগরীতে। আর তারপর এই পঁচিশ বছরের মধ্যে তিনি বিজনেস টাইকুনে পরিণত হয়েছেন। সারাদেশে বেশ কয়েক গণ্ডা, ফাইভ স্টার হোটেল ওঁর।
‘উনি যখন প্রথম হোটেল খুলেছিলেন তখন ও যেমন ব্যবসায় নতুন ছিল, তেমনি আমিও ছিলাম সদ্য আর্ট কলেজ থেকে পাশ করা উঠতি শিল্পী। বোম্বেতে একটা আর্ট এক্সজিবিশনে আমার কাজ দেখে সুন্দরাইয়ার ভালো লেগেছিল। যদিও শিল্পের বিষয়ে সেদিনও কিছু তেমন বুঝত না, আর আজও বোঝে বলে মনে হয় না।
‘আসলে উনি আমার প্রথম যে কাজটা দেখেছিলেন সেটাও ছিল নগ্নিকা মূর্তি। সেজন্যই হয়তো আমার কাজ আকর্ষণ করেছিল তাঁকে। যাই হোক আমার কাজ দেখে তিনি আমাকে একটা পূর্ণাবয়ব কাঠের নগ্নিকা মূর্তি ও বানাতে দেন। যেটা তিনি তার হোটেলের পানশালার দরজাতে রাখবেন। আমি তার কথা মতো বানিয়েও দিয়েছিলাম সে মূর্তি। সুন্দরাইয়ার সেদিনের সেই মাঝারি মানের হোটেল আজ সেভেন স্টার হোটেলে পরিণত। কিন্তু আজও সেখানকার হোটেলের লবিতে আমার ওই মূর্তিটা দাঁড় করানো আছে।’
এ কথাগুলো একটানা বলার পর একটু থেমে সিগারেটে বেশ কয়েকটা লম্বা টান দিয়ে ভার্গব চৌধুরী বললেন, ‘কয়েকদিন আগে সুন্দরাইয়া তার এক স্থানীয় প্রতিনিধিকে আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। লোকটার নাম বিজন গুহ। নিউটাউনে যে হোটেলটা ওরা খুলতে চলেছে তার তত্ত্বাবধান করছেন ওই বিজন গুহ নামের ভদ্রলোক। ওঁরা চাইছে নতুন হোটেলের রিসেপশনেও একটা অমন নগ্নিকা মূর্তি থাকবে। যেটা তৈরি করবার জন্যই ওঁরা আমার কাছে এসেছিলেন। আমি চাই কাজটা তুমি করো। তাতে তোমার নাম হবে, আর যে পয়সাটা ওরা দিতে চাইছে তা আমার তুলনায় কম হলেও তোমার তুলনায় যথেষ্ট বলেই আমার বিশ্বাস...’
ভার্গব স্যারের কথা এ পর্যন্ত শুনে রাজর্ষি বলে উঠল, ‘আপনার কাজ আমি করব স্যার!’
তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, করবে। আসলে মূর্তিটা কে তৈরি করবে তা নিয়ে ওদের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। মূর্তিটা শুধু ওদের দরকার। তবে শর্ত একটাই। কাজটা ভালো হওয়া চাই। আমি নিজে কাজটা করব না দুটো কারণে। প্রথমত, ওদের বাজেট দু-লাখ, আমি পাঁচ লাখ ছাড়া কোনও কাজ করি না। আর দ্বিতীয় কারণ হল সামনেই স্টকহোমে আমার একটা এক্সিবিশন হবে। যে কাজ নিয়ে আমি ব্যস্ত আছি। হোটেলের কাজটা আবার এক মাসের মধ্যে করতে হবে। ওদের ইনোগরেশনের দিন নাকি ফিক্সাপ হয়ে গেছে। নইলে হয়তো-বা সুন্দরাইয়ার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্কের খাতিরে কাজটা আমি করে দিতাম।’
দু-লাখ টাকা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ভাস্করের কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে কম হলেও আর্ট কলেজ থেকে মাত্র তিন বছর আগে পাশ করা রাজর্ষির কাছে সে অনেক টাকা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাছাড়া এই কাজের মাধ্যমে তাঁর পরিচিতি বৃদ্ধি ও ভবিষ্যতে আরও বড় বড় কাজ পাবার নিশ্চিত সম্ভাবনা রয়েছে। তার কথা এ পর্যন্ত শেষ করতেই রাজর্ষি জানতে চাইল, ‘নগ্নিকা মূর্তি তো নানান ধরনের হয়। ওঁরা ঠিক কী ধরনের মূর্তি চাইছেন স্যার?’
বিখ্যাত ভাস্কর ভার্গব চৌধুরী সিগারেটে বেশ কয়েকটা লম্বা টান দিয়ে সেটা হাতের টোকায় কায়দা করে জানালার বাইরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে বললেন, ‘মানুষের আকৃতির, পূর্ণাবয়ব, দণ্ডায়মান কাঠের নারী মূর্তি। তবে তাতে ভারতীয় শিল্পরীতি অর্থাৎ ছন্দ, মূর্তির মনের ভাব প্রকাশ, এসব কোনও ব্যাপার থাকবে না। নন্দলাল বসু নয়, ওরা চাইছেন পাশ্চাত্য ভাবনার ‘পিওর রিয়েলিস্টিক আর্ট’। ধরা যাক গ্রিসে যেমন নগ্ন মূর্তি হতো। মাইকেল এঞ্জেলোও যেমন কিছু মূর্তি রচনা করেছিলেন। তুমি যা দেখবে সেই শরীরই ফুটিয়ে তুলবে তোমার কাজে। সোজা ভাষায় বলতে গেলে ফুল ন্যুড একটা নারীর মূর্তি। একই সঙ্গে যার মধ্যে শিল্প সুষমাও থাকবে আবার যাকে দেখে যৌনতার উদ্রেকও ঘটবে। কাঠের তৈরি রক্ত মাংসের নারী।’
স্যারের কথা শুনে রাজর্ষি বলল, ‘স্যার, আমি কি কাজটা ঠিকমতো করতে পারব? এত বড় একটা কাজ। তাছাড়া এই কাজের সঙ্গে আপনার সম্মান জড়িয়ে আছে। তা ছাড়াও একজন মডেলও তো...’
রাজর্ষি তার কথার শেষ করার আগেই ভার্গব বললেন, ‘নিজের ওপর কনফিডেন্স রাখো, নিশ্চয়ই পারবে। আর্ট কলেজের গত বছর পাঁচেকের মধ্যে সেরা ছাত্র তুমি। আমিও নিজের হাতে কিছু কাজ শিখিয়েছি তোমাকে। আমি তো রইলামই। কোনও প্রয়োজন হলে পরামর্শ নেবে আমার থেকে। প্রয়োজন হলে, আমি নিজে গিয়ে তোমাকে কাজ দেখিয়ে আসব। কাজটা তুমি করলেও তা ঠিকভাবে করার দায়িত্ব তো আসলে আমারই। আর তুমি কি ডালিমের বাড়ি চেনো?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘বেচারাম মল্লিক লেনের দোতলা বাড়িতে একবার গিয়েছিলাম স্যার।’
ভার্গব বললেন, ‘হ্যাঁ, ওটাই ওর বাড়ি। বিকালে ও-বাড়িতে প্রাইভেট মিটিং দেয় ছাত্রছাত্রীদের। ওকে গিয়ে তুমি আমার কথা বলো। যদিও ওর শরীর কিছুটা শিথিল হতে শুরু করেছে তবুও ওকে দিয়ে তোমার কাজ চলে যাবে বলে আমার ধারণা। ওর শরীরের মৃদু শিথিলতা ভাস্কর্যে ঢেকে দেওয়া যাবে। সব থেকে ভালো হয় যদি ও অল্পবয়সি কোনও মেয়েকে মডেল হিসেবে জোগাড় করে দিতে পারে। ডালিমকে সে কথাও বলবে তুমি।’
রাজর্ষি বলল, ‘আমি কালই ওর সঙ্গে কথা বলতে যাব স্যার।’
ভার্গব বললেন, ‘এবার বাকি রইল টাকা-পয়সার ব্যাপারটা। ওই বিজন গুহকে ফোন করে বলে দিচ্ছি তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করে নিতে আর অ্যাডভান্স হিসেবে আপাতত থার্টি পার্সেন্ট টাকা তোমাকে দিয়ে দিতে। আর আমার গোডাউনে একটা কাঠের ব্লক পড়ে আছে। ওটায় তোমার কাজ চলে যাবে। ফুল পেমেন্ট পেলে ওর দাম মিটিয়ে দিও। আমি সনাতনকে বলে রাখব। আমি বাড়িতে থাকি বা না থাকি তুমি এসে নিয়ে যেও। তোমার আর কিছু বলার বা জানার আছে?’
রাজর্ষি বলল, ‘না স্যার। আপাতত কোনও প্রশ্ন নেই৷ আপনাকে যে কী বলে...’
ভার্গব চৌধুরী হেসে বললেন, ‘না, ওসব ধন্যবাদ জানানোর ব্যাপার নেই। অনুজ শিল্পীদের জন্য, ছাত্রদের জন্য কিছুটা, কিছু করাটা আমার কর্তব্যর মধ্যে পড়ে। কাজটা শুধু মন দিয়ে করার চেষ্টা করো।’
রাজর্ষি বলল, ‘অবশ্যই স্যার।’
ভার্গব চৌধুরী এরপর চেয়ারে উঠে দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দিলেন রাজর্ষির সঙ্গে তাঁর কথা বলা শেষ। তিনি এবার তার শিল্পকর্মে নিমগ্ন হবেন। রাজর্ষিও এরপর আর তার সময় নষ্ট না করে স্টুডিও থেকে বেরিয়ে এল।
শোভাবাজার মেট্রো স্টেশনের কাছে যে অঞ্চলে মেস বাড়িতে রাজর্ষি থাকে, সে জায়গার থেকে বেচারাম মল্লিক লেনের দূরত্ব আধঘণ্টার। গতকাল ভার্গব চৌধুরীর বাড়ি থেকে ফেরার পর থেকেই কাজটার ব্যাপারে রাজর্ষি বেশ উত্তেজনা বোধ করছে।
এদিন রবিবার সকালবেলা ওই বিজন গুহ নামক ভদ্রলোক ফোন করেছিলেন। তাকে যা বলার তা ভার্গব স্যার বলে দিয়েছিলেন—কাজেই রাজর্ষিকে আর বেশি কথা বলতে হয়নি তাঁকে। ভদ্রলোক, রাজর্ষির কাছ থেকে তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ডিটেল নিয়ে নিয়েছেন আর বলেছেন, রাজর্ষি কাজ শুরু করার পর ব্যাপারটা তাকে জানাতে। তিনি এসে কাজ দেখে যাবেন।
রাজর্ষি যখন বেচারাম মল্লিক লেনের মুখে এসে উপস্থিত হল, তখন বিকেল পাঁচটা বাজে। শীতের ছোট বেলা। ইতিমধ্যে সূর্য ঢলে পড়েছে। রবিবার দুপুরে কয়েকজন ছোট ছেলেমেয়েকে আঁকা শেখায় রাজর্ষি। তারা আজ আসতে দেরি করল বলে রাজর্ষিরও এ জায়গায় আসতে কিছুটা দেরি হল।
রাজর্ষি গলিটাতে ঢুকে পড়ল। পুরোনো কলকাতা। চারপাশের বাড়িগুলো পুরোনো, ঘিঞ্জি, বিবর্ণ। একে অপরের গায়ে ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে। বাড়িগুলোর নীচে পায়রার খোপের মতো সব দোকান। রবিবার বলে অবশ্য অধিকাংশ দোকান বন্ধ। দু-একটা বই-বাইন্ডিং, কাটিং-এর দোকান ঘটাং ঘটাং করে মেশিনে কাজ চলছে।
সৰ্পিল গলি ধরে কিছুটা এগিয়ে একটা ছোট মোড়ে পৌঁছে গেল রাজর্ষি। একটা ছোট চায়ের দোকানের সামনে বেঞ্চে চুপচাপ বসে আছে কয়েকজন বৃদ্ধ। বেলা শেষের আলোয় আলোতে ফুটে উঠেছে তাদের মুখের বলিরেখা। রাস্তার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন তাঁরা। যেন অনন্তকাল ধরেই তাঁরা ওভাবে ওখানে বসে আছেন। রাজর্ষির তাঁদের দেখে মনে হল, বেশ ভালো একটা ছবি করা যায় এদের নিয়ে।
চায়ের দোকানের ঠিক উল্টো দিকে পুরোনো আমলের দোতলা বাড়িটাকে চিনতে অসুবিধা হল না রাজর্ষির। পলেস্তারা খসা বাড়িটার মাথায় একটা পা ভাঙা সিংহ মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। রাজর্ষিকে ওটাই বাড়িটাকে চিনিয়ে দিল। ইতিপূর্বে এক বন্ধুর সঙ্গে সে এই বাড়িতে এসেছিল।
রাজর্ষি ঢুকে পড়ল বাড়ির ভিতর। আধো অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে সে দোতলায় উঠতেই, সিঁড়ির মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বেশ শক্তপোক্ত চেহারার জিন্স শার্ট পরা মহিলা একটু কঠিন স্বরে জানতে চাইল, ‘কাকে চাই? কোথা থেকে আসছেন?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘ডালিমদির সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। আমাকে ভার্গব চৌধুরী স্যার পাঠিয়েছেন। ওঁর সঙ্গে কথা বলব আমি।’
মহিলাটি একবার আপাদমস্ত ভালো করে দেখল রাজর্ষিকে। তারপর বলল, ‘আসুন আমার সঙ্গে।’
তার পিছন পিছন রাজর্ষি এগোল বাড়ির পেছনের বারান্দার দিকে। রাজর্ষি ইতিপূর্বে যখন এ-বাড়িতে এসেছিল তখন এমন কোনও মহিলাকে দেখেনি। তাকে অনুসরণ করার সময় রাজর্ষির মনে হল যে উটকো লোকের প্রবেশ আটকাতেই সম্ভবত ডালিমদি এই মহিলাকে তার সহকারী হিসাবে অথবা নিরাপত্তার জন্য নিয়োগ করেছে।
আসলে এ-দেশে যারা ন্যুড মডেল হিসাবে কাজ করেন তাদের সবাইকে অনেকে নিছকই বারবণিতা বা বেশ্যা বলে ভাবেন। একথা ঠিকই একসময় যারা এ পেশায় আসতেন তাদের অনেকেই সংগ্রহ করা হতো কলকাতা বা কলকাতার উপকণ্ঠের গণিকা পল্লী থেকে।
এখনও হয়তো কেউ কেউ আসেন সে সব জায়গা থেকে। তবে তা বলে সব মডেলই বেশ্যা নয়। বিদেশে তো এদেরও শিল্পীর মর্যাদা দেওয়া হয়, সম্মান দেওয়া হয়। আর তারা যে টাকা রোজগার করেন তাতে কর্পোরেট সংস্থার বড় মাপের কর্মীদেরও মাথা ঘুরে যাবে।
যাই হোক এ দেশের লোকেরা ন্যুড মডেল মানেই বেশ্যা ভাবে। তাই পথেঘাটে অনেক সময় নানা ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয় এদের। যদিও ডালিমদির অতীত সম্পর্কে রাজর্ষির কিছু জানা নেই তবে সে তাঁর সম্পর্কে এটুকু জানে যে আর্ট কলেজে ও অন্যত্র প্রায় কুড়ি বছর মডেল হিসেবে কাজ করছেন তিনি। বহু শিল্পী ভাস্কর তাঁকে নিয়ে কাজ করেছেন। ভার্গব স্যারও করেছেন।
মহিলা তাকে এনে দাঁড় করাল ডালিমদির ঘরের সামনে। বন্ধ কাঠের দরজার একটা পাল্লা নিঃশব্দে বেশ কিছুটা ফাঁক করল মহিলা। রাজর্ষির চোখে পড়ল ঘরের ভিতরটা। উজ্জ্বল আলো জ্বলছে ঘরে। ঘরটার ঠিক মাঝখানে ঘাড়টা একপাশে মৃদু হেলিয়ে হাফন্যুড অবস্থায় বসে আছেন ডালিমদি। তার ঊর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত, কোমরের নীচে একটা সায়া মতো পোশাক পরা। তার ফাঁক দিয়ে কায়দা করে একটা উরু বাইরে বের করে রেখেছেন তিনি।
ডালিমদির বয়স আনুমানিক চল্লিশের কাছাকাছি হবে। কিন্তু এ বয়সেও শরীরটাকে যত্ন করে ধরে রেখেছেন তিনি। ক্ষীণ কটিদেশ, ডালিমের মতো বর্তুলাকার স্তন যুগল। তবে ভালো করে খেয়াল করলে বোঝা যায় বয়স তার শরীরে থাবা বসাবার কাজ শুরু করেছে। কিছুটা শিথিল হয়ে এসেছে তার ডালিমের মতো স্তনগুলো। তবে দক্ষ ভাস্কর-শিল্পী হলে এটুকু ব্যাপার তাঁদের কাজ থেকে মুছে ফেলতে পারেন।
ডালিমদিকে অর্ধ-বৃত্তাকারে ঘিরে মেঝেতে কাগজ-পেন্সিল নিয়ে বসে আছে সাত-আটজন ছেলেমেয়ে। তাদের দৃষ্টি ডালিমদি বা সামনের আর্ট পেপারে নিবদ্ধ। সম্ভবত তারা আর্ট ও কলেজের ছেলেমেয়েই হবে। ডালিমদি প্রাইভেট মিটিং দিচ্ছেন তাদের জন্য।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে অবশ্য ওই অবস্থাতেই ডালিমদির চোখ পড়ল দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা তাদের দুজনের দিকে। তার চোখের ভাব বুঝিয়ে দিল রাজর্ষিকে তিনি দেখেছেন। ডালিমদি আর ছাত্র-ছাত্রীদের যাতে কাজের ব্যাঘাত না ঘটে, সেজন্য আবার নিঃশব্দে পাল্লাটা বন্ধ করে দিল সেই মহিলা। এরপর সে তার নিজের জায়গায় ফিরে যাবার আগে রাজর্ষিকে বলে গেল, ‘এখনও আরও আধঘণ্টা সময় লাগবে। আপনি এখানে অপেক্ষা করুন। ছেলেমেয়েরা বাইরে বেরোলে তখন কথা বলবেন।’
মহিলাটি চলে গেল। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল রাজর্ষি। বাড়ির পিছন দিকে একটা বস্তি মতো আছে। বারান্দার ওপর থেকে সেটা দেখা যাচ্ছে। বেশ কিছু লোকজন সেখানে। পোশাক দেখেই বোঝা যায় তারা গরিব মানুষ। টিন বা অ্যাসবেস্টাসের চালের কয়েকটা ঘর রয়েছে সেখানে। কোনও ঘরের সামনে রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা শিশি বোতল, কাগজের স্তূপ। তারই মাঝে কোনও ঘরের সামনে কয়লার উনুন জ্বালানো হয়েছে। কুণ্ডলি পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছে। কেউ বা ছেঁড়া চাদর মুড়ি দিয়ে ঘরের দরজায় বসে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলছে।
ঝাঁ চকচকে কলকাতা শহরের ভিতর এরকম অনেক খণ্ড খণ্ড অন্য কলকাতা আছে যার উপস্থিতি বাইরে থেকে ঠিক টের পাওয়া যায় না। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রাজর্ষি দেখতে লাগল সেই কলকাতাকে। শীতকাল, আলো ক্রমশ মরে আসছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারও নামতে শুরু করবে।
ঠিক সাড়ে পাঁচটা নাগাদই ঘরের দরজাটা খুলে গেল। এতক্ষণ যারা ঘরে বসে আঁকছিল তারা এবার তাদের জিনিসপত্র নিয়ে একে একে বেরোতে শুরু করল। শেষ ছেলেটা বাইরে বেরিয়ে থামতেই ঘরের ভিতর থেকে ডাক এল, ‘বাইরে যিনি আছেন, তিনি ভিতরে আসুন।’
সেই ডাক শুনে ঘরের ভিতর পা রাখল রাজর্ষি। ডালিমদি তখন তার গায়ে একটা সিল্কের ড্রেসিং গাউন জড়িয়ে নিয়ে তার ফিতে বাঁধছিলেন। রাজর্ষি যখন আর্ট কলেজের ছাত্র ছিল তখন অন্য ছাত্রদের সঙ্গে সে-ও ডালিমদির ন্যুড ছবি করেছিল। একবার সে তার কাছে এসেছিল অন্য জনের সঙ্গী হয়ে। তবে এত ছাত্র, লোকজন ডালিমদির কাছে আসা-যাওয়া করে যে তাকে মনে রাখার কথা নয়, ডালিমদির। তবুও তিনি তাকে দেখে বললেন, ‘ভাই, আপনাকে যেন চেনা মনে হচ্ছে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘আমি আর্ট কলেজের ছাত্র ছিলাম। আমি আপনার ছবি-মূর্তি করেছি। অন্য একজনের সঙ্গে একবার এখানে এসেওছিলাম। আমার নাম রাজর্ষি বসু। ভার্গব স্যার, আমাকে আপনার সঙ্গে কথা বলার জন্য এখানে পাঠিয়েছেন।’
‘ভার্গব স্যার’-এর নাম শোনামাত্রই ডালিমদি বললেন, ‘সরি ভাই, উনি আপনাকে পাঠিয়েছেন জানা ছিল না। আপনাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হল। আপনি বসুন।’
ডালিমদি একটা টুলে আর একটা মোড়াতে রাজর্ষি তার মুখোমুখি বসল। গাউনের পকেট থেকে লাইটার, সিগারেট বার করে একটা সিগারেট ধরিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে ডালিমদি বললেন, ‘বলুন ভাই, স্যার আমার কাছে আপনাকে কেন পাঠিয়েছেন?’
রাজর্ষি এবার যথাসম্ভব বিস্তৃতভাবে বলল, ডালিমদির কাছে তার আসার কারণটা। সিগারেট টানতে টানতে ডালিমদি মন দিয়ে শুনলেন রাজর্ষির কথাগুলো। ভালো করে তার কথা শোনার পর তিনি বললেন, ‘ভার্গব স্যার আজ পর্যন্ত যাদের আমার কাছে পাঠিয়েছেন তাদের কাউকেই আমি ফেরাইনি। কিন্তু সমস্যা হল আমার শরীর তো একটাই। আগামী সপ্তাহে আমি চেন্নাই চলে যাচ্ছি ওখানকার একটা আর্ট কলেজের কাজে। ফিরতে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগবে। কথাবার্তা সব পাকা হয়ে গেছে আর টিকিটও কাটা হয়ে গেছে ট্রেনের। আপনার তো আবার এক মাসের মধ্যে কাজটা শেষ করতে হবে। অন্তত দশটা মিটিংয়ের ব্যাপার। যদি একটু সময় পেতাম তবে আমি কাজটা করতে পারতাম। কিন্তু আপনার হাতে তো বেশি সময় নেই।’
রাজর্ষি বলল, ‘হ্যাঁ, ওরা হোটেল ইনোগরেশনের ডেট ফিক্স আপ করে ফেলেছে। তার আগেই মূর্তিটার ডেলিভারি দিতে হবে। স্যার বলেছেন, আপনি যদি নিতে না পারেন তবে অন্য কাউকে যদি ব্যবস্থা করে দেন তাহলেও হবে।’
ডালিমদি সে কথা শুনে হেসে বললেন, ‘কাকে ব্যবস্থা করে দিই বলুন তো ভাই? তবে আপনার সঙ্গে বিছানায় যাবার জন্য অনেক মেয়ে পাবেন, কিন্তু মডেল হবার জন্য মেয়ে পাওয়া মুশকিল। বিছানায় গেলেই যদি কিছু সময়ের জন্য দু-পাঁচ হাজার টাকা এক ঘণ্টায় অনায়াসে রোজগার ও করা যায় তবে কে আর শরীর খুলে মুখ গুজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে চায়। বিছানায় শোবার চেয়ে ন্যুড মডেল হবার কষ্ট অনেক বেশি। তাছাড়া এই ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের যুগে তারা নিজেদের শরীর নানা ভাবে বাইরে ছড়িয়ে রোজগার করে। অনেক গৃহবধূও আছে তাদের মধ্যে। শুধু মডেল হতেই তাদের লজ্জা। আসলে শিল্প-টিল্প কোনও ব্যাপার নেই। সবার কাছে টাকা রোজগারই শেষ কথা।’
এ কথাগুলো একটানা বলে থামলেন ডালিমদি। যেন কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গেই শেষে কথাগুলো বললেন। নগ্ন মডেল হিসেবে কাজ করার জন্য বিখ্যাত ডালিমদি। হয়তো-বা বহু বছর ধরে শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করার জন্য শিল্পের প্রতি একটা মমত্ববোধ সৃষ্টি হয়েছে তার মনে।
কথাগুলো বলার পর ডালিমদি একটু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘আমার সমবয়সি যে-ক’জন মডেলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ আছে তাদের দিয়ে ছাত্রছাত্রীদের শেখার কাজ চললেও আপনার কাজ চলবে না। ও কাজের জন্য অল্পবয়সি মেয়ের দরকার আপনার, যে দেখতে সুন্দরী হবে। যার দেহ টাইট থাকবে এখনও। আপনার কথা শুনে বুঝতে পারছি ওরা কেমন মূর্তি চান। রিয়েলিস্টিক মূর্তি তৈরির জন্য মডেলের শরীরটা ভালো হতে হবে। আপনি বরং আমাকে আপনার ফোন নম্বর দিয়ে যান। চেষ্টা করে দেখব ভাই আপনার জন্য কিছু করতে পারি কিনা। কিন্তু ওই যে বললাম ভাই আজকাল টাকাটাই শেষ কথা। আপনাকে দুটো মিটিং দেওয়ার পরেই হয়তো সে টাকা রোজগারের জন্য কাউকে নিয়ে ক’দিনের জন্য দীঘা বা দার্জিলিং চলে গেল। এদিকে আপনি তার অপেক্ষায় বসেই রইলেন। সে আর ফেরে না! এসব কারণেই আজকাল কোনও মেয়েকে জোগাড় করে দিতে ভয় করে। তবু দেখি কী করতে পারি।’
যে মহিলা এ-বাড়িতে ঢোকার পর রাজর্ষিকে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল এবার সে এসে দুজনকেই কাচের গ্লাসে চা দিয়ে গেল। চা পান করতে করতে সামান্য কিছু কথাবার্তা হল, তাদের দুজনের মধ্যে। রাজর্ষি কোথায় থাকে, বর্তমানে কোনও চাকরি করে কিনা, ভার্গব স্যারের সঙ্গে তার কতটা সখ্য তা জানার চেষ্টা করলেন ডালিমদি। চা খাওয়ার পর তাকে নিজের ফোন নম্বর দিয়ে আরও একবার তাকে ব্যাপারটা দেখার জন্য অনুরোধ জানিয়ে সেই ঘর ছাড়ল রাজর্ষি।
সে যখন বাড়ি ছেড়ে রাস্তায় নামল তখন সন্ধ্যার অন্ধকার নামতে শুরু করেছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। চায়ের দোকানের বুড়োগুলো আর নেই। শূন্য রাস্তা। পেছনের সেই বস্তির উনুনের ধোঁয়াগুলো যেন কোন পথে এদিকে এসে জমা হয়ে রাস্তায় সন্ধ্যার অন্ধকারের সঙ্গে মিলেমিশে একটা ধোঁয়াশার সৃষ্টি করেছে।
বাস রাস্তার দিকে এগোবার জন্য গলি দিয়ে হাঁটতে শুরু করল রাজর্ষি। হঠাৎই পিছন থেকে ভেসে এল একটা কণ্ঠস্বর, ‘এক্সকিউজ মি, আপনি একটু দাঁড়াবেন?’ গলাটা শুনে রাজর্ষি থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাল। একটা মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে জিন্স-টপ, তার উপরে একটা জ্যাকেট। পিঠে একটা ব্যাগ, কাজের জন্য বাইরে বেরোলে যে ধরনের ব্যাগ লোকে আজকাল পিঠে নেয়, তেমনই একটা ব্যাগ। একটা স্কার্ফ আলগোছে মেয়েটার মুখে জড়ানো। তার আড়াল থেকে দুটো চোখ রাজর্ষির দিকে চেয়ে আছে।
রাজর্ষি তার উদ্দেশে বলল, ‘আমাকে কিছু বলবেন?’
মেয়েটা বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। আপনি কি কোনও মডেলের খোঁজ করছেন?’
প্রশ্নটা শুনে রাজর্ষি অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, কিন্তু আপনি জানলেন কীভাবে?’
স্কার্ফের আড়ালে মেয়েটা যেন হাসল বলে মনে হয়৷ সে বলল, ‘আপনি যখন ডালিমদির সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন আমি ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে শুনেছি।’
মেয়েটার কথা শুনে রাজর্ষি বলল, ‘আপনি কি আর্ট কলেজের ছাত্রী?’
সে জবাব দিল, ‘এককালে ছিলাম, এখন আর নই।’
একথা বলে মেয়েটা স্কার্ফটা মুখ থেকে সরিয়ে বলল, ‘আমাকে দিয়ে কাজ চলবে আপনার?’
রাজর্ষি ভালো করে তাকাল মেয়েটার দিকে। নাক, চোখ, মুখ বেশ সুন্দর মেয়েটার। এক কথায় তাকে সুন্দরীই বলা যায়। বেশ লম্বা, শরীরের গঠনও বেশ আকর্ষণীয়। রাজর্ষি জানতে চাইল, ‘আপনি মডেলের কাজ করেন? আগে করেছেন?’
মেয়েটা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, তবে একবারই মাত্র। কিন্তু কয়েকঘণ্টা একটানা বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে আমার কোনও অসুবিধে হবে না। কাজের ধরনটা আমার জানা।’
রাজর্ষি আবারও একবার ভালো করে তাকাল মেয়েটার দিকে। সে অনুমান করল মেয়েটা তারই বয়সি, অর্থাৎ মেয়েটার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে।
একটা গাড়ি আসছে। তাদের দুজনকে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে গাড়িটা হর্ন দিল। রাস্তা ছেড়ে সামনের একটা ল্যাম্পপোস্টের নীচে গিয়ে দাঁড়াল দুজন, গাড়িটা তাদের পাশ দিয়ে চলে যাবার পর রাজর্ষি মুহূর্তখানেক চুপ করে থেকে ভাবতে লাগল মেয়েটাকে কী বলা উচিত। মেয়েটার শরীরের যা গঠন তাতে মডেল হিসাবে মেয়েটা মন্দ হবে না। ভার্গব স্যার তাকে ডালিমদির কাছে পাঠালেও রাজর্ষি মডেল হিসাবে মনে মনে এমন কোনও মেয়েকেই কল্পনা করে রেখেছে, যে একজন সুন্দরী তন্বী যুবতী হবে।
রাজর্ষিকে চুপ করে থাকতে দেখে যুবতী বলল, ‘কী ভাবছেন? আমার শরীরে কোনও খুঁত আছে কিনা? না, নেই। তবে তার প্রমাণ তো রাস্তায় দাঁড়িয়ে দেওয়া যাবে না। আমাকে আপনি কোথাও নিয়ে যেতে পারেন তা দেখার জন্য। তারপর না-হয় সিদ্ধান্ত নেবেন।’
এ কথা বলে, সে বলল, ‘তবে একটা কথা আপনাকে জানিয়ে দিই। আমি কিন্তু প্রস্টিটিউট নই, আর কোনও অবস্থাতেই সে কাজ করি না। আসলে বাড়িতে বৃদ্ধা ঠাকুমা আছেন। তাঁর চিকিৎসার জন্য আমার বাড়তি কিছু টাকার দরকার। আর তাই আপনাকে প্রস্তাবটা দিচ্ছি। শর্ত শুধু একটাই, আমার ব্যাপারটা কাউকে আপনি জানাবেন না। আসলে টাকার দরকার বলেই কাজটা করব আমি। ভবিষ্যতে আর হয়তো কোনওদিন করব না। একটা সরকারি চাকরির জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি। হয়তো-বা সেটা হয়ে যাবে। ব্যাপারটা জানাজানি হলে সমস্যা হবে। আশাকরি আমার ব্যাপারটা আপনি বুঝতে পারছেন?’ একটানা কথাগুলো বলে থামল মেয়েটা।
রাজর্ষি বলল, ‘আপনার কথা আমি বুঝলাম। আপনি থাকেন কোথায়?’
মেয়েটা বলল, ‘কলকাতা শহরের শেষ প্রান্ত হলেও খুব বেশি দূরে নয়। বিরাটিতে। ওদিকে বিরাটির মোড়ে একটা মাঠের গায়ে সার্কাস বসে। হয়তো-বা জায়গাটা চেনা আছে আপনার। তার ঠিক পাশ দিয়ে গঙ্গার দিকে এগোলে আমাদের পুরোনো বাড়ি।’
রাজর্ষির জায়গাটা চেনা। কয়েকজন পরিচিত লোকও আছে ওদিকে। সে এবার জানতে চাইল, ‘আপনি এ কাজের প্রতি সিটিং-এর জন্য ঘণ্টা পিছু কত টাকা নেবেন? আর অন্য কোনও স্টুডিও বা বাড়িতে গিয়ে কাজ করতে আপনার অসুবিধা নেই তো?’
মেয়েটা এরপর একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘এ কাজের জন্য বর্তমানে ঘণ্টা পিছু কত রেট তা তো জানা নেই আমার। আপনি শিল্পী মানুষ, ভদ্রলোক। আপনি নিশ্চয়ই একজন গরিব মেয়েকে ঠকাবেন না। অন্যদের যা দিতেন বা দেন আমাকেও তাই দেবেন।’ তারপর সে বলল, ‘বাইরে কোথাও যেতে হলে যাব। তবে আমার বাড়িটাও একবার আপনি দেখতে পারেন, আপনার কাজের জন্য উপযুক্ত কিনা। আমি আর ঠাকুমা ছাড়া সে-বাড়িতে অন্য কেউ থাকে না। আর আমার দিক থেকেও সে ক্ষেত্রে একটা সুবিধা হবে। কমফোর্ট বোধ করব আমি। হাজার হোক অন্য কোথাও গিয়ে পোশাক খুলতে আমার একটু শঙ্কা তো লাগবেই। আগে একবার কাজটা করলেও এটা তো আমার পেশা নয়। তাই ডালিমদির মতো আমি মানসিকভাবে অতটা সড়গড় হয়ে উঠিনি। তবে আমার বাড়িতে আপনার কাজের ব্যাঘাত ঘটবে না।’ কথা শেষ করে হাসল মেয়েটা।
রাজর্ষি এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি কোথায় সে কাজটা করবে। তার নিজের ভাড়া ঘর একাজের জন্য উপযুক্ত নয়, বহু লোকের বাস সেখানে। কেউ ভাবতেই পারে রাজর্ষি ঘরের দরজা বন্ধ করে আসলে অন্য কোনও কাজ করছে।
রাজর্ষিকে কাজটা করতে হলে তো কোনও স্টুডিও ভাড়া নিয়ে করতে হবে। আগামী কালই সে তার পরিচিত কয়েকটা স্টুডিওতে খোঁজখবর করতে যাবে বলে ভেবে রেখেছে। মেয়েটার বাড়ি যদি স্টুডিও হিসাবে ব্যবহার করা যায় তাবে সেটা মন্দ হবে না।
এ কথা ভাবার পর হঠাৎই এরপর রাজর্ষির মনে মুহূর্তের জন্য অন্য একটা কথা এল। মেয়েটাকে সে একদমই চেনে না। আজকাল দিনকাল ভালো নয়। নানা ধরনের খারাপ ঘটনার কথা চারপাশে শোনা যায়। মেয়েটার অন্য কোনও মতলব নেই তো?
কাকতালীয় ভাবেই মেয়েটা যেন রাজর্ষির মনের কথা পাঠ করতে পারল। সে বলল, ‘আপনি কী ভাবছেন? আমার মনে কোনও দুরভিসন্ধি আছে কিনা? আপনি আমার প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারেন। যদিও সে সম্পর্কে প্রমাণ দেওয়ার কোনও সার্টিফিকেট আমার কাছে নেই। আপনাকে এখনই কোনও সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। কাল আপনি আমার বাড়ি আসুন। আরও কিছু কথা হোক, তারপর নাহয় আপনি আপনার সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু এখনই আপনি আমাকে ‘না’ বলে দেবেন না। আমার টাকার দরকার।’
মেয়েটার শেষ কথাগুলোর মধ্যে যেন একটা ব্যাকুল আর্তি ফুটে উঠল। রাজর্ষির এবার মনে হল মেয়েটা সম্ভবত মিথ্যা কথা বলছে না। সে বলল, ‘ঠিক আছে আপনার প্রস্তাব আমি ভেবে দেখব। কাল কখন আপনার বাড়ি যাওয়া যেতে পারে?’
সে জবাব দিল, ‘কাল এই সময় যদি আপনি বিরাটির সার্কাস মোড়ে উপস্থিত হন, তবে আমি সেখান থেকে আপনাকে আমাদের বাড়ি নিয়ে যেতে পারি। আসলে, দুপুর থেকে বিকাল পর্যন্ত আমি ওখানকার এক বাইন্ডিং-এর দোকানে পার্টটাইম কাজ করছি। ওই সময়টাই সুবিধা হবে। তবে আপনি যদি বলেন তবে আমি নয় কাজ কামাই করে দুপুরবেলা বাড়ি থাকব।’
পরদিন সকাল-দুপুরটা রাজর্ষির স্টুডিও খুঁজতে বেরোবার কথা। বিকাল বা সন্ধ্যা হলে রাজর্ষির সুবিধা হয়। এবার সে হেসে বলল, ‘ঠিক আছে আমি কাল পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার মধ্যে পৌঁছে যাব বিরাটির সার্কাস মোড়ে। তারপর আমাদের মধ্যে কাজের ব্যাপারে ফাইনাল কথাবার্তা হবে। আপনার সঙ্গে এতক্ষণ কথা বলছি, কিন্তু এখনও পর্যন্ত আপনার নামটাই জানা হল না।’
মেয়েটা হেসে জবাব দিল, ‘আমার নাম মরিয়ম বিশ্বাস।’
তার নাম শুনে রাজর্ষি অনুমান করল মেয়েটা খ্রিস্টান। রাজর্ষি নিজের আত্মপরিচয় দিয়ে বলল, ‘আমার নাম রাজর্ষি। শোভাবাজারের কাছে থাকি।’ এ কথা বলে সে তার পার্স থেকে নিজের নামাঙ্কিত কার্ডটা বের করে মরিয়ম নামের মেয়েটার হাতে দিয়ে বলল, ‘এতে আমার নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর সব লেখা আছে। আপনার কার্ড বা ফোন নম্বর থাকলে দিন।’
মেয়েটা বলল, ‘কার্ড তো আমার নেই। ফোন নম্বর একটা আছে। যদিও টাকার অভাবে সেটা রিচার্জ করা হয়নি বলে কদিন হল বন্ধ আছে৷ তবু সেই নম্বরটাই আপাতত নিয়ে নিন।’ একথা বলে সে নম্বরটা বলল, রাজর্ষি সেটা তুলে নিল নিজের সেলফোনে।
দুজনের মধ্যে প্রাথমিক কথাবার্তা শেষ। ইতিমধ্যে সন্ধ্যার অন্ধকার আরও গাঢ় হয়েছে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে ধোঁয়াটাও যেন গ্রাস করতে শুরু করেছে রাস্তাটাকে। হয়তো-বা কোথাও আরও কেউ কয়লার উনুন জ্বালিয়েছে।
মেয়েটা এবার বলল, ‘তাহলে স্যার আমি এবার যাই? আমার ওদিককার কাজ এখনও একটু বাকি আছে। আমি কাল ওই সময় ওখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।’
রাজর্ষি বলল, ‘হ্যাঁ আসুন। আমাকেও এবার ফিরতে হবে। আমি কাল পৌঁছে যাব।’
মেয়েটা হাতজোড় করে রাজর্ষিকে নমস্কার করে পা ফেলতে গিয়েও একবারের জন্য থেমে গেল। তারপর বলল, ‘স্যার আর একবার আমার রিকোয়েস্টটা মনে করিয়ে দিই। দয়া করে আমার কথা কাউকে বলবেন না।’
রাজর্ষি মরিয়মের কথা শুনে তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন, আপনার সঙ্গে আমি কাজ করি বা না করি আপনার পরিচয় আমি কাউকে জানাব না।’
রাজর্ষির কথা শুনে হাসি ফুটে উঠল মরিয়মের মুখে। স্কার্ফ দিয়ে আগের মতো মুখটা ঢেকে নিল। তারপর সে হারিয়ে গেল গলির ধোঁয়াশার মধ্যে।
রাজর্ষি এগোল বাস রাস্তার দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সে পৌঁছে গেল রাস্তার মোড়ে। নিয়নের আলোতে উদ্ভাসিত রাস্তা। বাসের জন্য অপেক্ষা করতে করতে সদ্যপরিচিত মেয়েটার সঙ্গে কথোপকথন ভাবতে লাগল সে। বড় অদ্ভুতভাবে মেয়েটার সঙ্গে পরিচয় হল তার। এমনি তার খারাপ লাগেনি মেয়েটাকে। সে যেমন চাইছে মেয়েটা ঠিক তেমনই। পরদিন মেয়েটার বাড়ি গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সে।
এ কথাগুলোই ভাবছিল রাজর্ষি। হঠাৎ তার সেল ফোনে ‘টুং’ করে একটা শব্দ হল। মেসেজ পাঠিয়েছে কেউ। মোবাইলের মেসেজটা খুলতেই সে দেখল সেটা ব্যাঙ্কের মেসেজ। ষাট হাজার টাকা ক্রেডিট হয়েছে তার নামে। ভার্গব স্যারের বলে দেওয়া কথা মতো হোটেল কোম্পানি বিজন গুহ কাজের জন্য থার্টি পার্সেন্ট অগ্রিম ভরে দিয়েছেন তার অ্যাকাউন্টে।
মেসেজটা দেখে স্বাভাবিক ভাবেই খুশি হল রাজর্ষি। তার মনে হল, কি অদ্ভুত সমাপতন! মেয়েটার সঙ্গে কথা হল আর টাকাটাও তার কাছে চলে এল! আর এর সঙ্গে সঙ্গে রাজর্ষির একথাও মনে হল যে টাকাটা তার কাছে চলে আসার পর কাজটা আর শুধু কথাবার্তার পর্যায়ে রইল না। কাজটা এবার সত্যিই তাকে করতে হবে ও মন দিয়েই করতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরে ফেরার বাসে উঠে পড়ল রাজর্ষি।
একটা স্টুডিও। তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানান ধরনের সম্পূর্ণ বা অর্ধসমাপ্ত নারী মূর্তি। যার অধিকাংশই নগ্ন বা অর্ধনগ্ন। হাঁ, এই ন্যুড স্কালপচারের জন্যই তো বিখ্যাত ভার্গব স্যার। এ স্টুডিও রাজর্ষির পরিচিত।
কাঠের ব্লকটার সামনে দাঁড়িয়েছিল রাজর্ষি। একজন মেয়ে ঘরে ঢুকল। মরিয়ম। তার জন্যই প্রতীক্ষা করছিল রাজর্ষি। কাজ শুরু করতে হবে তাকে। পারস্পরিক কুশল বিনিময়ের পরে কোথায় ঠিক কী ভঙ্গিমায় দাঁড়াতে হবে তাকে তা বুঝিয়ে দিল রাজর্ষি। মরিয়ম গিয়ে দাঁড়াল নির্দিষ্ট স্থানে আর রাজর্ষি কাঠের ব্লকটার সামনে দাঁড়িয়ে পেন্সিল হাতে নিল। মেয়েটার মাথা থেকে পায়ের পরিমাণ প্রথমে হিসাব করে চিহ্নিত করতে হবে কাঠের ব্লকের গায়ে।
প্রথম দিনের কাজ বলতে এটুকুই। কিন্তু কাজটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর ওপরেই নির্ভর করছে মেয়েটার শরীরের প্রতিটা অংশ কত নিখুঁত ভাবে নির্মাণ করতে পারবে রাজর্ষি। এই পরিমাপেই কাঠের ব্লকটার মধ্যে রক্তমাংসের সঞ্চার ঘটাবে, অর্থাৎ তাকে পরিণত করবে ঠিক যেন এক জীবন্ত মূর্তিতে।
পেন্সিল হাতে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে রইল রাজর্ষি। এবার পোশাক খুলতে হবে মরিয়ম নামের মেয়েটাকে, সম্পূর্ণ নগ্ন হতে হবে তাকে। তবে এ কাজ একজন শিল্পীর কাছে, শিল্পের স্বার্থে পারস্পরিক কোনও যৌনতা নেই তাদের দুজনের মধ্যে। কিন্তু একটার পর একটা মুহূর্ত পেরিয়ে যেতে লাগল মেয়েটা তার পোশাক না খুলে নিশ্চুপ ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
রাজর্ষি তাকে বলল, ‘আপনার কি আমার সামনে পোশাক ছাড়তে অস্বস্তি হচ্ছে? তাহলে আমরা একটা কাজ করি? আমি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছি। আপনি পোশাক খুলে টেবিলের ওপর যে চাদরটা আছে তা গায়ে জড়িয়ে নিন। তারপর আমি আবার ঘরে ঢুকলে তখন ধীরে ধীরে চাদরটা সরিয়ে নেবেন।’
মডেলদের অস্বস্তি দূর করার জন্য বেশ কয়েকটা চালু কৌশল আছে। তাদের লজ্জা দূর করার জন্য সেই পদ্ধতিগুলোর মধ্যে একটা তাকে বলল রাজর্ষি। মেয়েটা তা শুনে বলল, ‘না, ওসবের দরকার নেই, আমি খুলছি।’
মরিয়মের জ্যাকেটের ভিতর একটা টি-শার্ট পরা। সে জ্যাকেটের বোতামগুলো খুলতেই তার টি-শার্টের আড়াল থেকে সুডৌল স্তনের গঠন ধরা দিল রাজর্ষির চোখে। জ্যাকেটটা খুলে পাশের টেবিলে রাখার পর মরিয়ম দুই হাত দিয়ে টি-শার্টটা মাথার উপর দিয়ে খুলতে গিয়েও হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর হঠাৎই এই ঘরের কোণে রাখা অর্ধ সমাপ্ত, অসম্পূর্ণ একটা নারী মূর্তির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ওটা কার মূর্তি ছিল? কাজটা শেষ হয়নি কেন?’
ভার্গব স্যারের এই স্টুডিওতে ইতিপূর্বে আসার সুবাদে ওই নারী মূর্তিকে দেখেছে রাজর্ষি। সে যেমন কাঠের ব্লকের সামনে মূর্তি বানাবে বলে দাঁড়িয়ে, ঠিক তেমনই একটা কাঠের ব্লক খোদাই করে নারী মূর্তিটা বানানো হচ্ছিল। মূর্তিটার একমাত্র স্তনের গঠনই নিখুঁতভাবে পরিস্ফুট। অন্য অংশগুলো তেমন স্পষ্ট নয়। রাজর্ষি কোনওদিন মূর্তিটা সম্পর্কে ভার্গব স্যারকে জিগ্যেস করেনি।
মরিয়মের প্রশ্ন শুনে রাজর্ষি বলল, ‘ওটা কার মূর্তি আমার জানা নেই। যিনি মূর্তিটা বানাচ্ছিলেন তিনি কোনও কারণে কাজটা থামিয়ে দেন। হয়তো তিনি ভবিষ্যতে কাজটা আবার ধরবেন, অথবা ধরবেন না। বহু স্টুডিওতেই এমন অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য পড়ে থাকে।’ এ কথা বলে একটু থেমে রাজর্ষি বলল, ‘তবে অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য হলেও ওই মূর্তিটা অনেক দামে বিক্রি হতে পারে।’
কথাটা শুনে মেয়েটা জানতে চাইল, ‘কেন অনেক দামে বিক্রি হতে পারে কেন?’
রাজর্ষি মৃদু হেসে বলল, ‘কারণ এই মূর্তিতে বর্তমানে ভারত বিখ্যাত শিল্পীর হাতের ছোঁয়া আছে। দেখেছেন মূর্তি অসম্পূর্ণ হলেও ওর স্তন দুটো কি নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করা! তিনি আমাকে তাঁর এই স্টুডিও ব্যবহার করতে দিয়েছেন। আর আমি কাজটা ওঁরই পাইয়ে দেওয়া।’
রাজর্ষির জবাব শুনে মরিয়ম প্রশ্ন করল, ‘তিনি কে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘তিনি বিখ্যাত শিল্পী ভার্গব চৌধুরী। তার নাম শুনেছেন আপনি?’
সে কথাটা শেষ করা সঙ্গে-সঙ্গেই মুহূর্তের জন্য যেন অদ্ভুত এক দৃষ্টি ফুটে উঠল মেয়েটার চোখে। এরপর সে টেবিল থেকে জ্যাকেটটা উঠিয়ে নিয়ে সেটা আবারও পরতে শুরু করল! রাজর্ষি তাকে প্রশ্ন করল, ‘কী হল আপনার?’
জ্যাকেটের বোতামগুলো আটকাতে আটকাতে মরিয়ম জবাব দিল, ‘আমি এখানে পোশাক খুলব না।’
রাজর্ষি মৃদু বিস্মিতভাবে বলল, ‘কেন? কী অসুবিধা হচ্ছে আপনার?’
মরিয়ম নামের মেয়েটা বেশ রুক্ষ সুরে বলল, ‘আমি কিছুতেই পোশাক খুলব না।’ বলে সে আর কোনও বাক্যালাপ না করে রাজর্ষিকে হতভম্ব করে দরজার দিকে এগোল। দরজা দিয়ে বেরোবার পরমুহূর্তে সে বেশ জোরে দরজার পাল্লাটা বন্ধ করে দিল। ঠক করে বেশ শব্দ হল তাতে! কিন্তু সেই ঠক্-ঠক্ শব্দটা যেন হয়েই চলেছে!
এ পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখে চোখ মেলল রাজর্ষি। হ্যাঁ, স্বপ্ন দেখছিল! সকাল হয়ে গেছে। বাসা বাড়ির কাজের লোকটা চা নিয়ে এসেছে। দরজায় সেই শব্দ করছে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বিছানা ছেড়ে উঠল রাজর্ষি। আজ তার অনেক কাজ, দিন শুরু হয়ে গেল রাজর্ষির।
চা খাবার সময় সে ভাবল অদ্ভুত স্বপ্নটার কথা। গতরাতে রাজর্ষি তার এই কাজের কথা ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সে বুঝতে পারল কাজটার সম্পর্কে তার নানা ভাবনা। গতকাল মেয়েটার সঙ্গে পরিচিত হওয়া এসব কিছু মিলেমিশে জট পাকিয়ে ধরা দিয়েছে তার স্বপ্নে।
দৈনন্দিন নানা টুকিটাকি কাজ ছেড়ে স্নান-খাওয়া মিটিয়ে বেলা দশটা নাগাদ বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল রাজর্ষি। তার গন্তব্য হল কয়েকটা আর্ট স্টুডিও। যেগুলো ভাড়া নিয়ে মূর্তি, ছবি বা এ ধরনের কাজ করা হয়।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে সে গেল কলেজ স্ট্রিটের কাছাকাছি একটা স্টুডিও-তে। কয়েকবার সেখানে গ্রুপের সঙ্গে কাজ করেছে রাজর্ষি। স্টুডিও-র মালিক বলাইদা তার পরিচিত। তিনি জানালেন স্টুডিও ফাঁকা নেই। তবে তিনি একটা বাড়ির ঠিকানা দিলেন। সে ঠিকানাটা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের কাছের একটা গলি।
রাজর্ষি সেখানে গিয়ে বুঝতে পারল তার কাছাকাছি একটা বেশ্যালয় আছে। বাড়ির মালকিন স্টুডিও বলে যে ঘরটা ভাড়া দেয় সেখানে আসলে বেশ্যালয়ের মেয়েদের এনে ন্যুড ছবি তোলানো হয়, হয়তো-বা পর্নোগ্রাফিও তোলা হয়। রাজর্ষির কাজের জন্য সে জায়গা চলবে না।
এরপর সে সেখান থেকে মেট্রো ধরে গেল দক্ষিণের একটা জায়গায়। সেখানে সে একটা স্টুডিও পেল ঠিকই কিন্তু তার মালিক মওকা বুঝে প্রায় দ্বিগুণ ভাড়া হেঁকে বসল। তারপর আরও কয়েকটা জায়গা ঘুরে কলকাতার উত্তর-দক্ষিণ চক্কর দিয়ে রাজর্ষি যখন তার ঘরে ফিরে এল তখন দুপুর দুটো বাজে।
এভাবেই দিনের অর্ধেকটা অতিবাহিত করে দিল সে। তারপর ঘণ্টাখানেক সময় বিশ্রাম নিয়ে আবার বিকেল সাড়ে চারটে নাগাদ বেরিয়ে পড়ল বরানগর যাবার জন্য। বাসে করে সে জায়গায় পৌঁছোতে চল্লিশ মিনিট মতো লাগার কথা। কলকাতায় মফসসল থেকে ঢোকা-বেরোবার জন্য বিটি রোড একটা গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। অফিস ছুটির সময় হয়ে যাওয়াতে ট্রাফিকও রাস্তায় প্রচুর।
রাজর্ষি যে বাসে উঠল সে বাসটা ধুঁকতে ধুঁকতে এগোতে লাগল জ্যামের মধ্যে দিয়ে। অবশেষে বাস যখন তাকে নির্দিষ্ট স্থানে নামিয়ে দিল তখন দিনের আলো প্রায় মরে এসেছে। ধাবমান গাড়িগুলোর হেডলাইট, রাস্তার দোকানে নিয়নের আলোগুলো সব জ্বলে উঠেছে। রাস্তার মোড়টা লোকজনের ভিড়ে বেশ জমজমাট।
বাস থেকে নেমে রাজর্ষি প্রথমে এমন একটা জায়গাতে গিয়ে দাঁড়াল যেখান থেকে তার সামনের সবকিছু দৃষ্টিগোচর হয়, আর সে-ও সহজেই মেয়েটার নজরে পড়ে। জায়গাটায় দাঁড়িয়ে রাজর্ষি চারপাশে তাকিয়ে মেয়েটাকে খুঁজতে লাগল।
এভাবে মিনিট পাঁচেক সময় কেটে গেল। আর এই সময়টুকুর মধ্যেই ঝুপ করে যেন অন্ধকার নেমে এল। রাজর্ষি মৃদু উৎকণ্ঠিতভাবে ঘড়ি দেখল। সাড়ে পাঁচটা তো বেজে গেছে! ঠিক এই সময় পিছন থেকে কণ্ঠস্বরটা কানে এল, ‘স্যার আমি এসে গেছি।’
রাজর্ষি পিছনে তাকিয়ে দেখল মেয়েটা এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে তার গতদিনের মতোই পোশাক। স্কার্ফ না দিয়ে একই ভাবে মুখটা আচ্ছাদিত। রাজর্ষি তার দিকে তাকাতেই সে বলল, ‘কাজে গিয়েছিলাম। তাই একটু দেরি হয়ে গেল। এই বাস থেকে নামলাম। আপনি কি অনেকক্ষণ ধরে এখানে দাঁড়িয়ে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘মিনিট পাঁচের মতো হল এসেছি।’
মরিয়ম নামের মেয়েটা এরপর বড় রাস্তা সংলগ্ন গঙ্গার দিকে রাস্তাটা দেখিয়ে বলল, ‘এটাই আমার বাড়ি যাবার পথ। হেঁটে যেতে দশ মিনিট মতো সময় লাগবে। আপনি হাঁটতে পারবেন?’
শীতকালে হাঁটতে ভালোই লাগে।’ রাজর্ষি বলল, ‘হেঁটে যাব, চলুন।’
মরিয়ম বড় রাস্তা ছেড়ে ঢুকে পড়ল সে রাস্তায়। রাজর্ষি তাকে অনুসরণ করল। ফুটপাথ ধরে এগিয়ে চলল মেয়েটা। আর তার কয়েক পা পিছনে রাজর্ষি। রাস্তার দু-পাশের ফ্ল্যাট বাড়িগুলোকে একসময় পেরিয়ে এল তারা। পুরোনো দিনের ঘর বাড়ি শুরু হল এরপর।
এখনও এই অঞ্চলে প্রমোটারদের হাত পড়েনি। অনেক বাড়ি বেশ জীর্ণ। তাদের গঠনগুলো দেখে বোঝা যায় যে বাড়িগুলো বেশ পুরোনো। রাস্তার লোকজনও ধীরে ধীরে কমে এল। মেয়েটা একবার থমকে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে বলল, ‘আপনার কোনও অসুবিধা হচ্ছে না তো?’
রাজর্ষি হেসে বলল, ‘না অসুবিধা হচ্ছে না।’ তার জবাব শুনে মেয়েটা এরপর ঢুকে পড়ল একটা সরু গলির মধ্যে। ক্ষয়াটে বাতি জ্বলছে গলির মধ্যে। দু-পাশে নোনা এটা ধরা বাড়ির দেওয়াল। শীতের সন্ধ্যা বলেই হয়তো লোকজন নেই রাস্তায়। কোথাও হয়তো কোনও বাড়ির রোয়াকে চাদর জড়িয়ে বসে আছে কেউ, অথবা কোনও মুদি দোকানে কেউ সন্ধ্যাবাতি দিচ্ছে। লোকজন বলতে এটুকুই চোখে পড়ল রাজর্ষির।
গলিটা সাপের মতো এঁকে-বেঁকে এগিয়েছে পশ্চিম দিকে অর্থাৎ গঙ্গার দিকে। বেশ অনেকক্ষণ সে গলি দিয়ে চলার পর আর একটা গলিতে ঢুকে সে গলির শেষ মাথায় একটা জীর্ণ দোতলা বাড়ির সামনে এসে থামল মেয়েটা। তারপর বাড়িটা দেখিয়ে বলল, ‘এটাই আমাদের বাড়ি। ভিতরে আসুন।’
মরিয়মের পিছন পিছন বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল রাজর্ষি। বাড়ির ভিতরে ঢুকতেই প্রথমে কড়ি বরগার ছাদওয়ালা একটা বারান্দা। তার গায়ে বেশ কয়েকটা ঘর। বারান্দার এক কোনা দিয়ে দোতলায় ওঠার জন্য সিঁড়ি। একটা ফ্যাকাশে আলো জ্বলছিল বারান্দাতে। রাজর্ষি খেয়াল করল একটা ঘরের দরজার মাথার ওপর যিশুখ্রিস্টের একটা পুরোনো ছবি ঝুলছে। অর্থাৎ রাজর্ষির অনুমানই ঠিক। মরিয়ম নামের মেয়েটা ধর্মে খ্রিস্টান। মরিয়ম তাকে নিয়ে এগোল সিঁড়ির দিকে। মরিয়মের পিছন পিছন রাজর্ষি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যাচ্ছিল, ঠিক সেই সময় একটা কণ্ঠস্বর শোনা গেল, ‘সোনালি, ফিরলি নাকি?’
রাজর্ষি দেখল একজন বৃদ্ধা বেরিয়ে এসেছেন একটা ঘর থেকে। তার মাথার চুল সব শনের মতো সাদা, লোলচর্মাবৃত দেহ। পরনে একটা হাউস কোট। মরিয়ম তার কথার জবাবে বলল, ‘হ্যাঁ ডার্লিং, এলাম।’
বৃদ্ধা একবার তার ডান হাতটা চোখের কাছে তুলে ভালো করে ঠাহর করার চেষ্টা করে বললেন, ‘তোর সঙ্গে একজন লোক আছে মনে হচ্ছে। কে ও?’
মরিয়ম উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ, একজন আছেন। তুমি ঘরে যাও, আমি কিছুক্ষণ পর যাচ্ছি তোমার কাছে।’
মরিয়মের কথা শুনে বৃদ্ধা ঘরে ঢুকে গেলেন আর রাজর্ষিও সিঁড়ি বেয়ে উঠতে শুরু করল। মেয়েটা ওপরে উঠতে উঠতে বৃদ্ধার পরিচয় দান করল, ‘আমার ঠাকুমা। ছোটবেলায় বাবা-মা মারা যান, আমি ওঁর কাছেই মানুষ। বেশ কয়েক বছর হল চোখে দেখতে পান না। বিশেষত রাত্রিবেলাতে দেখেনই না বললে চলে। তার ওপর বয়সজনিত নানা সমস্যা। ইদানীং মাথাটাও একটু গন্ডগোল করছে মনে হয়। টাকাটা হাতে এলে ভালো একজন ডাক্তার দেখাব।’
একথা বলতে বলতে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে রাজর্ষিকে নিয়ে উপরে উঠে এল মরিয়ম। দোতলার বারান্দাটা কাঠের জাফরি দিয়ে ঢাকা। তার ফাঁক গলে বাইরের ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলো এসে প্রবেশ করছে ভিতরে। আলো-আঁধারি খেলা করছে চারপাশে।
বারান্দার গায়েও এক তলার মতো কয়েকটা ঘর আছে। তাদের দরজা বন্ধ। হঠাৎ মাথার ওপর মৃদু ফট ফট শব্দ হল। মৃদু চমকে উঠল রাজর্ষি। মেয়েটা হেসে বলল, ‘আপনার ভূতের ভয় নেই তো? ওরা বাদুড়। এত বড় বাড়ি দোতলাটা কোনও কাজে লাগে না বললেই চলে। তাই ওরা বাসা বেঁধেছে। আছে থাক, আমাদের তো কোনও ক্ষতি করে না ওরা।’
রাজর্ষি বলল, ‘বাড়িটার বয়স কত হবে?’
বারান্দার শেষ মাথার একটা ঘরের হুড়কো খুলতে খুলতে মরিয়ম বলল, ‘প্রায় দেড়শো বছর হবে। আমার ঠাকুরদার বাবা ছিলেন বিলাতি সাহেব। স্ত্রী অবশ্য বাঙালি ছিলেন। আমার সেই সাহেব গ্রেট গ্র্যান্ড ফাদার কাঁচরাপাড়া রেলের ওয়ার্কশপে চাকরি করতেন। তিনি এবাড়ি বানিয়েছিলেন।’
মরিয়ম দরজাটা খুলে ফেলল। তারপর ঘরে ঢুকে খুট করে শব্দ করে আলো জ্বালল। রাজর্ষি পা রাখল ঘরের ভিতর। উজ্জ্বল আলো। রাজর্ষির মনে হল বাতিটা নতুন লাগানো হয়েছে। বেশ বড় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন একটা ঘর। ঘরের এক কোণে একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার রাখা রয়েছে।
মেয়েটা এগিয়ে গিয়ে ঘরের জানালাটা খুলতেই এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস ঢুকল ঘরে। সেই জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রাজর্ষি দেখল গঙ্গার একদম কিনারে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। দূরে ওপারে বিন্দু বিন্দু আলো চোখে পড়ছে এপার থেকে।
জানলাটা খোলার পর মরিয়ম মুখে মাথায় জড়ানো স্কার্ফটা খুলে ফেলল। রাজর্ষি দেখল তার মসৃণ চুলের রং লালচে। হয় ব্লিচ করা, অথবা তার পূর্বপুরুষের রক্তের স্বাক্ষর সেটা। লাল চামড়ার সাহেবের রক্ত তখনও যার প্রবাহিত হচ্ছে তার শরীরে। মরিয়ম এরপর ঘরের কোণে গিয়ে টেবিলের ওপর পিঠ থেকে ব্যাগটা খুলে রাখল। তারপর রাজর্ষির উদ্দেশ্যে বলল, ‘এবার তাহলে কাজের কথা শুরু হোক স্যার?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, করা যেতে পারে।’
মেয়েটা তার কিছুটা তফাতে ঘরের মধ্যে রাখা একটা চেয়ার দেখিয়ে বলল, ‘আপনি ওখানে বসুন।’
রাজর্ষি এগিয়ে গিয়ে চেয়ারটাতে বসল। মেয়েটা এরপর কোনও ভনিতা না করে বলল, ‘আপনার কাজের জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ আমার শরীরটা তাই তো? তবে সেটা আগে দেখাই আপনাকে। তবে আবারও একটা কথা বলি আপনাকে, আমি কিন্তু প্রস্টিটিউট নই।’
মরিয়ম যেন তার শেষ বাক্যটার মাধ্যমে মৃদু সতর্ক করল রাজর্ষিকে। রাজর্ষি শুধু বলল, ‘জানলা খোলা। শীতকাল, ঠান্ডা বাতাস ঢুকছে ঘরে।’
মেয়েটা হেসে বলল, ‘এতে আমার কোনও অসুবিধা হবে না।’
রাজর্ষি আর কোনও কথা না বলে চেয়ে রইল মরিয়মের দিকে। পোশাক খুলতে শুরু করল মেয়েটা। ধীরে ধীরে জ্যাকেট, পরনের লেগিন্স আর টি-শার্টটা উঠিয়ে ফেলল সে। শুধু গোলাপি রঙের অন্তর্বাস রইল তার পরনে।
তার শরীরে গঠনটা এবার মোটামুটি স্পষ্ট হয়ে গেল রাজর্ষির কাছে। উজ্জ্বল আলোতে ক্ষীণ কটিদেশ সম্পন্ন যুবতীর গিরি খাদের মতো বক্ষ বিভাজিকা, গভীর নাভিকূপ, মসৃণ উরু সবই ধরা দিল রাজর্ষির চোখে। মরিয়ম এরপর স্থির দৃষ্টিতে কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল রাজর্ষির দিকে। হয়তো-বা সে বোঝার চেষ্টা করল রাজর্ষির চোখে কোনও লোলুপতা ফুটে উঠছে কিনা?
রাজর্ষি একজন সুস্থ সবল রক্ত মাংসের মানুষ। তার সামনে কোনও যুবতী পোশাক খুললে সে উত্তেজনা বোধ করবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই উত্তেজনাকে অবদমিত করে সে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করতে লাগল মেয়েটার শরীরের নান্দনিক সৌন্দর্য, যা তার কাজের জন্য, শিল্প সৃষ্টির জন্য প্রয়োজন।
মরিয়াম এরপর তার অন্তর্বাস দুটোও খুলে ফেলল। উন্মুক্ত হয়ে গেল তার বর্তুলাকার স্তন যুগল, তার অগ্রভাগে ঘন কৃষ্ণবর্ণের তীক্ষ্ণ ছুরির ফলার মতো স্তনবৃন্ত, নাভির নীচে নির্মেদ তলপেট, বক্ষদেশ।
মেয়েটা রাজর্ষিকে জানিয়েছে সে ইতিপূর্বে একবার মডেল হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই সে এরপর একবার পাশ ফিরে তারপর পিছন ফিরে দাঁড়াল যাতে বিভিন্ন কোণ থেকে রাজর্ষির চোখে দৃশ্যমান হয় শরীরের সব অংশ। রাজর্ষি দেখতে পেল তার গ্রীবা। তারপর মেয়েটার শরীরটা ‘ভি’ আকৃতির হয়ে নীচে নেমে এসে মিলিত হয়েছে ঈষৎ ভারী নিতম্বের সঙ্গে।
রাজর্ষি চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে এগোল মেয়েটার কাছে। তারপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মেয়েটার শরীরটাকে দেখতে দেখতে কয়েকবার ধীর ভাবে প্রদক্ষিণ করল তাকে। অচঞ্চলভাবে দাঁড়িয়ে রইল মেয়েটা।
রাজর্ষি এরপর মরিয়মকে বেশ কয়েকবার নির্দিষ্ট বিভিন্ন ভঙ্গিমায় দাঁড়াতে বলল। সেই নির্দেশই পালন করল মরিয়ম। রাজর্ষি কোনও সময় তার একদম সামনে গিয়ে, কখনও-বা কিছুটা দূরে সরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল মরিয়মের দেহ।
মনে মনে মেয়েটার শরীর নিয়ে আঁক কষে রাজর্ষি একটা ব্যাপার বুঝতে পারল যে তার কল্পিত মডেল বা ডালিমদির থেকে অনেক আকর্ষণীয় এই নারীদেহ। কোনও খুঁত বা মেদের, পেশীর বাহুল্য অথবা অভাব কোনওটাই নেই তার শরীরে। ওপরওয়ালা যেন নিখুঁত অঙ্ক করে বানিয়েছে তার শরীর।
রাজর্ষির যা দেখার ছিল তা দেখা হয়ে যাওয়ার পর সে মরিয়মকে বলল, ‘এবার পোশাক পরে নিন।’ এ কথা বলে রাজর্ষি ফিরে গিয়ে তার চেয়ারে বসল। অন্তর্বাস পোশাক পরতে পরতে মেয়েটা জিগ্যেস করল, ‘কী দেখলেন? চলবে তো?’
অন্তত মডেলের সমস্যার দূর হল বলে মনে হল রাজর্ষির। সে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, চলবে।’
মেয়েটার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল রাজর্ষির জবাব শুনে। পোশাক পরে একটা চেয়ার টেনে এনে রাজর্ষির মুখোমুখি বসল মরিয়ম। তারপর বলল, ‘তবে কাজটা আমি পাচ্ছি তো?’
রাজর্ষি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ।’
মরিয়ম বলল, ‘তবে কবে থেকে কাজ শুরু করবেন আপনি? আর কোথায় করবেন?’
রাজর্ষি বলল, ‘কাজ তো কাল থেকেই শুরু করলে ভালো হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে স্টুডিও পাওয়া নিয়ে। আজ বেশ কয়েকটা স্টুডিওতে গেছিলাম। হয় খালি নেই, নইলে আমার কাজের জন্য উপযুক্ত নয়। দেখি কাল আবার খোঁজে বেরোতে হবে।’
মরিয়ম বললেন, ‘আপনি এ-ঘরটাকে স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন না? দিনের বেলা জানলা দিয়ে কিন্তু প্রচুর আলো ঢোকে। আপনি আপনার কাজের জন্য সাজিয়ে নিতে পারেন।’
মরিয়মের কথা শুনে রাজর্ষি ভালো করে তাকাল চারপাশে। বেশ কয়েক মুহূর্ত ঘরটা দেখার পর তার মনে হল এই ঘরটাকে স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করলে মন্দ হবে না। হয়তো আরও কতকগুলো বাতির ব্যবস্থা করতে হবে। আর নিজের বাড়িতে হলে মেয়েটাও নিঃসংকোচে কাজ করতে পারবে। তার মুখমণ্ডলে কোনও শঙ্কা বা অস্বস্তির দাগ থাকার সম্ভাবনা থাকবে না।
সব দিক বিচার বিবেচনা করার পর রাজর্ষি বলল, ‘হ্যাঁ এখানেও কাজটা করা যেতে পারে। তবে এবার আসল কথায় আসা যাক। আপনার আর্থিক দাবির ব্যাপারে ভেবে থাকলে সেটা স্পষ্ট করে বলুন। আর কোনও শর্ত থাকলে সেটাও বলুন?’
রাজর্ষির কথা শুনে সে হেসে বলল, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি টাকা-পয়সার ব্যাপারটা আপনিই ঠিক করবেন। আর শর্ত বলতে ওই একটাই, আপনি কারো কাছে আমার নাম প্রকাশ করবেন না।’
মেয়েটার কথা শুনে রাজর্ষি মনে মনে হিসাব করে বলল, ‘আপনাকে আমি পঁচিশ দেব। আর ঘর ভাড়ার জন্য দশ। সব মিলিয়ে পঁয়ত্রিশ হাজার টাকা। আপনাকে হয়তো দশ-বারো দিন দাঁড়াতে হবে। তবে আপনার অবর্তমানে কাজের জন্য আমাকে ঘরটা ব্যবহার করতে দিতে হবে কিন্তু।’
মরিয়ম বলল, ‘ঠিক আছে, ওতেই হবে। সত্যি কথা বলতে কি এতটাকা আশা করিনি। অবশ্য শুনেছিলাম যে মোটামুটি ভালোই রোজগার করেন অনেক মডেল। হ্যাঁ, আমি না থাকলেও যে-কোনও সময় এসে আপনি ঘর ব্যবহার করতে পারবেন। আমি ঠাকুমাকে বলে রাখব। আর একটা কথা, আমার প্রতিবেশীরা ভালো, সবাই নিজের মতো থাকেন। অন্যের ব্যাপারে বিশেষ নাক গলান না। তবুও যদি কেউ আপনাকে কিছু জিগ্যেস করে, তবে আপনি জানাবেন যে, আপনি আর্টিস্ট। কাজের জন্য এখানে ঘর ভাড়া নিয়েছেন।’
রাজর্ষি বলল, ‘ঠিক আছে তাই বলব। তবে কাজ শুরু করতে দেরি করা যাবে না। আমি কালই কাজের জিনিসপত্র সব এখানে এনে ফেলব। আপনার সমস্যা না হলে আমি পরশু থেকেই কাজ শুরু করে দেব।’
মরিয়াম বলল, ‘আমার আপত্তি নেই। কাল আপনি আপনার জিনিসপত্র নিয়ে চলে আসুন। আমি ঠাকুমাকে বলে রাখব। সপ্তাহে আমি একটা দিন ছুটি নিতে পারি। সেটা নয় তবে পরশুদিনই নেব। আপনি কখন আসবেন বলুন?’
রাজর্ষি বলল, ‘তবে তো ভালোই হয়। প্রথম দিনটা দিনের আলোতে কাজ করলে ভালো হবে। আর আপনার পারিশ্রমিকের অগ্রিম আমি কালই দিয়ে দিতে পারি। ওটা কবে দেব?’
মরিয়ম বলল, ‘ওটা আপনি যখন কাল আসবেন তখন ঠাকুমার হাতে দিয়ে দেবেন। আমি কাল না থাকলেও সব কিছু বুঝিয়ে বলে যাব তাকে।’
রাজর্ষি এরপর মরিয়মের সঙ্গে আরও কিছু কথাবার্তা বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বাড়ি ফেরার জন্য। মরিয়াম তাকে পৌঁছে দিল গলির মোড় পর্যন্ত। সেখান থেকে রাজর্ষি একটা রিক্সা পেয়ে গেল বড় রাস্তায় পৌঁছোনোর জন্য।
নিজের বাসা বাড়ির মোড়ে সে যখন বাস থেকে নামল তখন রাত আটটা বাজে। ঘরে ফিরে সে মনে মনে পরদিনের কাজের পরিকল্পনা ছকে নিল। প্রথমে সে ফোন করল ভার্গব স্যারকে তার বাড়ি থেকে কাঠের ব্লকটা পরদিন আনতে যাবে বলে। কথাটা শুনে ভার্গব স্যার জানতে চাইলেন, ‘মডেল কোথায় পেলে? কাজ করবে কোথায়? কোন স্টুডিওতে?’
রাজর্ষি, মরিয়মকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে কায়দা করে তাঁর প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘আপনার কথা মতো ডালিমদির কাছে গেছিলাম। তিনি তেমন কারো সন্ধান দিতে না পেরে অপেক্ষা করতে বললেন। তবে আমার এক পরিচিতের মাধ্যমে একটা মেয়েকে পেয়েছি। তার মডেল হবার অভিজ্ঞতা আছে। মেয়েটাকে দেখে কাজের জন্য উপযুক্ত মনে হয়েছে। ওকে নিয়েই কাজ করবার জন্য এক জায়গায় একটা ঘর ভাড়া নিয়েছি। আমার বাড়ি থেকে খুব বেশি দূর নয়।’
ভার্গব চৌধুরী ব্যস্ত মানুষ। তিনি আর এ ব্যাপারে বিশেষ কিছু জানতে চাইলেন না। রাজর্ষিকে তিনি বললেন, ‘আমি কাল বাড়ি থাকব না। সনাতনকে বলে রাখব। তুমি দিনের বেলাতে তোমার সুবিধামতো এসে কাঠের ব্লকটা নিয়ে যেও। মন দিয়ে কাজ শুরু করো।’ এই বলে লাইনটা কেটে দিলেন তিনি।
রাজর্ষি পরদিন তার পরিকল্পনা মতোই কাজ করল। কাঠের ব্লকটা তার একার পক্ষে ওঠানো-নামানো সম্ভব নয়। তাই দুজন মজুর জোগাড় করতে হল তাকে। তাদের জোগাড় করার পর একটা ছোট ভারবাহী ভাড়া করে নিজের সাজ-সরঞ্জাম ও লোক দু-জনকে নিয়ে সে প্রথম রওনা হল ভার্গব স্যারের বাড়ির উদ্দেশে। তিনি বাড়িতে ছিলেন না। তাঁর পরিচারককে ব্যাপারটা জানিয়ে গেছিলেন। মজুরদের সহায়তায় ভার্গব স্যারের গোডাউন থেকে কাঠের ব্লকটা গাড়িতে তুলে রাজর্ষি এরপর রওনা হল তার কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশে।
তাদের গাড়ি যখন মরিয়মের বাড়ির গলির মুখে পৌঁছোল তখন বেলাটা বারোটা বাজে। গাড়ি থেকে মজুরটা লগটা কাঁধে নিয়ে উপস্থিত হল মরিয়মের বাড়িতে। গলির ভেতর দু-চারজন লোক তাদের ঘরের দরজা বা জানলা দিয়ে ব্যাপারটা দেখল। তাদের চোখে মৃদু কৌতুহল ফুটে উঠলেও তারা রাজর্ষিকে কিছু জিগ্যেস করল না।
রাজর্ষি যখন মরিয়মের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হল, তখন বারান্দার সামনে একটা চেয়ারে চাদর মুড়ি দিয়ে বসে মরিয়মের ঠাকুমা রোদ পোহাছিলেন। রাজর্ষি তাঁর সামনে গিয়ে তাকে নমস্কার করে বলল, ‘আমি কাল সন্ধ্যায় মরিয়মের সঙ্গে এখানে এসেছিলাম। কিছু জিনিস এনেছি, দোতলার ঘরে রাখব।’
কথাটা শুনে তিনি বিড় বিড় করে বললেন, ‘যাও। সে বলে গেছে তুমি আসবে।’
রাজর্ষি একটা খামে করে মরিয়মের জন্য অগ্রিম পাঁচ হাজার টাকা এনেছিল। এরপর সে খামটা বার করে সেটা বৃদ্ধার হাতে দিয়ে বললেন, ‘এতে পাঁচ হাজার টাকা আছে। মরিয়মকে দিয়ে দেবেন।’
বৃদ্ধা খামটা নিলেও টাকা গুনলেন না। তবে সেটা রেখে আসার জন্যই হয়তো চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দা সংলগ্ন তার ঘরের ভিতর চলে গেলেন।
রাজর্ষিও এরপর মজুরদের সাহায্যে কাঠের লগটা নিয়ে দোতলায় উঠে এল। বারান্দায় উঠে কড়ি কাঠের দিকে চোখ যেতেই রাজর্ষি দেখল সার সার বাদুড় ঝুলছে কড়ি বরগা থেকে। অবশ্য রাজর্ষির এসবে ভয় নেই। দরজা খুলে সে গত দিনের ঘরটাতে ঢুকল।
জানলা খুলতেই তার চোখে পড়ল গঙ্গা। সে যেন ছুঁয়ে যাচ্ছে বাড়িটাকে। আর জানলা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই একরাশ দিনের আলো এসে ভরিয়ে দিল ঘরটা। গতকাল একটা জিনিস যা রাজর্ষি খেয়াল করেনি এবার সেটা সে দেখল। ঘরের দেয়ালের একপাশে আর একটা দরজা আছে। সেটা অবশ্য ভিতর থেকে বন্ধ।
মজুরদের দিয়ে ঘরের মধ্যে একটা নির্দিষ্ট জায়গাতে দাঁড় করানো হল কাঠের গুঁড়িটাকে। কাজের জন্য ঘরটাকে গুছিয়ে, অন্য সব কাজ মিটিয়ে সেই বাড়ি থেকে রাজর্ষি যখন বাড়ি ফিরল তখন বিকাল হতে চলেছে।
আজ থেকে রাজর্ষির আসল কাজ শুরু। সকালের দিকটা নিজের ঘরেই কাটাল সে। ভাস্কর্য হোক বা ছবি অথবা লেখালিখি। এসব কাজ শুরু করার আগে মনটাকে শান্ত রাখতে হয়, মনে মনে একটা প্রস্তুতি নিতে হয়। রাজর্ষি সে কাজই করল। শান্তমনে কাজটা কীভাবে শুরু করবে তা নিয়ে ভাবল সে। এরপর স্নান খাওয়া সেরে বেলা বারোটা নাগাদ সে রওনা হল গন্তব্যে।
রাজর্ষি যখন মরিয়মের বাড়ি পৌঁছাল তখন একটা বাজে। গত দিনের মতো এদিনও বৃদ্ধা বারান্দার সামনে একটা চেয়ারে র্যা পার গায়ে দিয়ে বসেছিলেন। কেমন যেন অন্য দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। রাজর্ষি তার সামনে গিয়ে সৌজন্যবশত বলল, ‘কেমন আছেন ঠাকুমা? মরিয়ম কই?’
বৃদ্ধা মাটির থেকে মুখ না তুলেই কাঁপা কাঁপা হাতে তর্জনী ওপরে তুলে বললেন, ‘সে ওপরে।’ রাজর্ষি তারপর বারান্দা হয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এল। বারান্দার গায়ের দরজাগুলো সব বন্ধ। সে হাঁক দিল, ‘মরিয়ম? আমি এসেছি।’
কোনও উত্তর এল না কোথাও থেকে। এরপর সে তার কাজের ঘরের সামনে গিয়ে দেখল দরজার হুড়কোটা খুলে রাখা আছে। সে প্রবেশ করল ঘরের ভিতর। আধো অন্ধকার ঘর। তবে সে গিয়ে জানলার পাল্লাটা খুলতেই উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। বাইরে গঙ্গা বয়ে দুপুরের রোদের ঝিলিমিলি। কয়েকটা জেলে ডিঙি ভেসে যাচ্ছে। ভারি সুন্দর দৃশ্য।
শিল্পীর চোখ আটকে গেল সেই নিসর্গর দিকে। আর এরপরই একটা শব্দ শুনে রাজর্ষি পিছনে ফিরে দেখল, ঘরে যে অন্য দরজাটা আছে সেটা খুলে প্রবেশ করেছে মরিয়ম। তার পরনে একটা হাউস কোট। মরিয়মের চোখ-মুখে মৃদু ফোলা ভাব। তা দেখে রাজর্ষির মনে হল সদ্য ঘুম থেকে উঠে এল সে।
হাসল মরিয়ম। সুন্দর ঝকঝকে দাঁতের পাটি। জানলা দিয়ে আসা সূর্যের আলোতে আগুন রঙা দেখাচ্ছে তার লালচে-সোনালি চুল। যেন আজ কিছুটা লাস্যময়ী দেখাচ্ছে তাকে। রাজর্ষি তাকে বলল, ‘গুড আফটারনুন।’
মরিয়ম বলল, ‘গুড আফটারনুন। কাল কোনও সমস্যা হয়নি তো? যে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলেন তা পেয়েছি।’
রাজর্ষি বলল, ‘না, কোনও অসুবিধা হয়নি। কাজের জন্য ঘরটা মোটামুটি গুছিয়ে ফেলতে পেরেছি।’
কালচে রঙের কাঠের ব্লকটার দিকে তাকিয়ে মরিয়ম বলল, ‘ওতেই তো আপনি আমার রক্ত মাংস ফুটিয়ে তুলবেন। কী কাঠ ওটা?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘আবলুশ কাঠ। ও কাঠের বৈশিষ্ট হল সহজে সামান্য আঘাতে টুকরো হয়ে যায় না। তাই এর গায়ে ছেনি বা বাটালি চালাবার সময় অবাঞ্ছিত ক্ষতির সম্ভাবনা কম থাকে। নিখুঁত শিল্পকর্ম করা যায় এ দিয়ে।’
মরিয়ম বলল, ‘ও আচ্ছা। তাহলে এবার আপনি আপনার কাজ শুরু করতে পারেন।’
রাজর্ষি কাজ শুরু করেছিল। মরিয়মকে কোন ভঙ্গিমাতে দাঁড় করাবে সে ঠিক করে রেখেছিল। ভঙ্গিটা সে বুঝিয়ে দিল। মাথার ওপর হাত তুলে দাঁড়াবে মরিয়ম। যাতে তার দেহের সম্মুখ ভাগের প্রতিটা অঙ্গ, বাঁক ধরা দেয় শিল্পীর চোখে।
মরিয়াম দাঁড়াল নিজের নির্দিষ্ট মন জায়গাতে আর রাজর্ষি দাঁড়াল কাঠের ব্লকটার সামনে। কাঠের যে কাজ শুরুর আগে মুহূর্তের জন্য একবার দৃষ্টি বিনিময় হল তাদের দু’জনের মধ্যে। মরিয়ম এরপর তার হাউস কোটের মতো পোশাকটা গা থেকে খসিয়ে ফেলল। ভিতরে কোনও অন্তর্বাস ছিল না তার। বাইরে থেকে সূর্যালোকে স্পষ্ট তাঁর শরীরের প্রতিটা রেখা, খাঁজ, মাংস পেশী। কোনও মানুষের ছবি আঁকতে হলে বা সেই মডেলের ভাস্কর্য বানাতে হলে নির্দিষ্ট কিছু কৌশলগত নিয়ম মেনে চলতে হয়।
মরিয়াম নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে দাঁড়াবার পর পেনসিল দিয়ে কাঠের ব্লকের গায়ে দাগ দিতে শুরু করল সে। জ্যামিতিক দাগ। মেয়েটার মাথার আকৃতিটাকে একটা বর্গাকার ইউনিট ধরে নিয়ে সেই ইউনিট অনুসারে তাই তার শরীরের বিস্তার ঘটিয়ে রাজর্ষি কাঠের ব্লকের গায়ে আঁক কাটতে লাগল।
সময় এগিয়ে চলল তার সঙ্গে সঙ্গে। সে একই ভাবে দাঁড়িলে রইল মরিয়ম। মিনিট পঁয়তাল্লিশ সময় যেন দেখতে দেখতেই কেটে গেল। রাজর্ষি মেয়েটার উদ্দেশ্যে বলল, ‘এবার আপনি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারেন।’
তার কথা শুনে মরিয়ম কয়েক মুহূর্তের জন্য তার হাত দুটো মাথার ওপর থেকে নামিয়ে আবার নির্দিষ্ট জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে বলল, ‘অসুবিধা না হলে কাজ চালিয়ে যান। আমার বিশ্রামের দরকার হলে বলব।’
রাজর্ষি তাই আবার তার কাজ শুরু করল। কাঠের ব্লকের গায়ে হিসাব করে আঁক কষে যেতে লাগল সে। বলা যেতে পারে কাঠের ব্লকে মেয়েটার জ্যামিতিক অবয়ব রচনা করতে লাগল সে। ঘণ্টা দুই পর যখন তার কাজ তা শেষ হল তখন বাইরে বিকাল হতে চলেছে।
আশ্চর্যের ব্যাপার এই সময়ের মধ্যে মরিয়ম বিশ্রাম দূরে নেওয়া দূরে থাক, এক মুহূর্তের জন্য নড়েনি। ব্যাপারটা খানিকটা বিস্মিত করল তাকে। এক সময় সে মেয়েটাকে বলল, ‘এবার পোশাক পরে নিন।’
এ কথা বলার পর রাজর্ষি বলল, ‘একটা ব্যাপারে আমার ভয় লাগছে আপনার জন্য।’
হাউস কোটে গা ঢেকে মরিয়াম বিস্মিত ভাবে জানতে চাইল, কীসের ভয়?’ রাজর্ষি জবাব দিল, ‘শীতের মধ্যে জামা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে আপনাকে। রাতে তো আরও ঠান্ডা নামবে। আপনি না অসুস্থ হয়ে পড়েন!’
কথাটা শুনে মরিয়াম কয়েক মুহূর্ত চেয়ে রইল রাজর্ষির দিকে। হয়তো সে বোঝার চেষ্টা করল রাজর্ষির উৎকণ্ঠা সত্যি, নাকি কৃত্রিম? তারপর মৃদু হেসে সে বলল, ‘ও নিয়ে আপনাকে চিন্তা করতে হবে না। আপনি আপনার কাজ করে যাবেন। আর আমাকে যা করতে হবে সে নির্দেশ দেবেন।’
এদিনের মতো কাজ শেষ হলেও এখনও একটা কাজ বাকি ছিল রাজর্ষির। বলা যেতে পারে এটা তার সংস্কার। প্রথম দিন আঁক কষার পর একবার অন্তত সে বাটালির ঘা দেবে কাঠের গায়ে। সে কাজের জন্য রাজর্ষি বাটালি আর হাতুড়ি তুলে নিল, তারপর কাঠের গায়ে এক জায়গায় বাটালি বসিয়ে তাতে হাতুড়ির ঘা দিল। উক্ করে একটা শব্দ হল। কাঠের গা থেকে একটুকরো আঁক উঠে ছিটকে পড়ল মাটিতে। কিন্তু অন্য ঘরের দেওয়ালে শব্দটা প্রতিধ্বনিত হয়ে খোলা দরজা দিয়ে বাইরের বারান্দায় পৌঁছে গেল।
একটা ঝটপট শব্দ হল। সম্ভবত শব্দটাতে ভয় পেয়েই একটা বাদুড় কড়িকাঠ থেকে নেমে ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে উদ্ভ্রান্তের মতো ওড়াউড়ি শুরু করল। এ দেওয়াল ও দেওয়ালে অন্ধের মতো ধাক্কা খেয়ে প্রাণীটা এত নিচু দিয়ে উড়ছে যে রাজর্ষির মাথায় সে ধাক্কা খেতে পারে। সেজন্য দু-হাত দিয়ে নিজের মাথাটা বাঁচাবার চেষ্টা করতে লাগল রাজর্ষি।
মরিয়ম কিন্তু ঘাবড়াল না ব্যাপারটাতে। মনে হয় এমন ব্যাপারে সে অভ্যস্ত। বরং সে হেসে ফেলল রাজর্ষির ভঙ্গিমা দেখে। তবে শেষ পর্যন্ত বাদুড়টা যে দরজা দিয়ে মরিয়মের ঘরে প্রবেশ করেছিল তার ফাঁক গলে সে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল।
অস্বস্তি মুক্ত হল রাজর্ষি। যে এবার মরিয়মকে বলল, ‘আজকের মতো আমার কাজ এটুকুই। আমি কাল দিনের বেলা আবার আসব। কাঠের গা থেকে অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো ছেঁটে ফেলতে হবে। আপনি কাল না থাকলেও চলবে। এরপর কবে থাকতে পারবেন?’
মরিয়াম বলল, ‘পরশু সন্ধ্যায়।’
রাজর্ষি বলল, ‘বেশ, তবে আসি কাল একজন ইলেকট্রিশিয়ান এনে এ-ঘরে আরও ক’টা বাতি লাগিয়ে নেব।’
রাজর্ষি এরপর বলল, ‘একটা কথা আপনাকে জিগ্যেস করব করব করে করা হয়নি। আপনি সেদিন বলেছিলেন আপনি আর্ট কলেজের ছাত্রী ছিলেন। কোন কলেজ? কোন বিভাগ?’
মরিয়াম বলল, ‘একটা বেসরকারি আর্ট কলেজ। ও তেমন কিছু নয়। ভর্তি হয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু সামান্য কিছু দিন ক্লাস করার পরই ছেড়ে দিয়েছিলাম। তখনই ডালিমদির সঙ্গে একটা পরিচয় তৈরি হয়েছিল। ওঁর বাড়ির কাছেই তো আমার বর্তমান কাজের জায়গা। তাই কখনও কখনও ওঁর সঙ্গে দেখা করতে যাই। যেমন, সেদিন ওখানে গেছিলাম।’
রাজর্ষির একবার মনে হল যে সে প্রশ্ন করে, ‘আর্ট কলেজে ভর্তি হবার পর ছেড়ে দেবার কারণটা কী?’ কিন্তু এরপর তার মনে হল প্রশ্নটা হয়তো একান্ত ব্যক্তিগত হতে পারে। তাই সে এই প্রশ্ন করা থেকে বিরত থাকল।
মরিয়ম এরপর বলল, ‘যদি আপনার আপত্তি না থাকে তবে বলবেন এ মূর্তিটা কেন বানানো হচ্ছে?’
রাজর্ষি হেসে বলল, ‘আপত্তির কিছু নেই। আপনি, অতিথি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির নাম হয়তো শুনেছেন যারা হোটেল ব্যবসার জন্য বিখ্যাত। ওঁরা একটা হোটেল বানাচ্ছেন নিউটাউনে। সেই হোটেলের লবিতে মূর্তিটা বসার কথা।’
মরিয়াম কথাটা শুনে বলল, ‘আপনার তো দেখছি অনেক বড় বড় কানেকশন!’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘না। আমি সাধারণ একজন লোক। কানেশনটা আসলে ভার্গব স্যারের, তিনিই কাজটা আমাকে পাইয়ে দিয়েছেন।’
এ কথা বলার পর রাজর্ষি আরও কিছু একটা কথা বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই মরিয়ম বলল, ‘ভার্গব স্যার মানে, ভার্গব চৌধুরী?’
মরিয়মের প্রশ্ন শুনে রাজর্ষি মৃদু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘হ্যাঁ, আপনি তাকে চেনেন নাকি?’
মরিয়ম মৃদু হেসে বলল, ‘উনি বিখ্যাত মানুষ। মাঝে মাঝেই তো ওঁকে টিভির পর্দাতে দেখা যায়। তাছাড়া আমি যখন আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিলাম তখন উনি ফ্রেশার্সদের অনুষ্ঠানে চিফ গেস্ট হয়ে এসেছিলেন। তখন সামনে থেকে দেখেছি। খুব সুন্দর দেখতে ওঁকে।’
মরিয়মের জবাব শুনে রাজর্ষি হেসে বলল, ‘হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন, একদম রাজপুত্রের মতো দেখতে!’
এ কথা বলার পর রাজর্ষি বলল, ‘উনি বলেছেন, প্রয়োজনে তিনি এসে আমাকে কাজ দেখিয়ে যাবেন। যদিও উনি অত্যন্ত ব্যস্ত মানুষ। আসতে পারবেন বলে মনে হয় না।’
রাজর্ষির এ কথার সঙ্গে সঙ্গে মরিয়ম একটু উত্তেজিত ভাবে বলে উঠল, ‘আমার নাম-ঠিকানা আপনি তাকে বলে দিয়েছেন নাকি?’
রাজর্ষি বলল, ‘না, না, আপনার শঙ্কিত হবার কোনও কারণ নেই। আমি একজন মডেল পেয়েছি কাজের জন্য, এটুকুই শুধু আমি তাঁকে বলেছি।’
মরিয়াম হেসে বলল, ‘আমি আশা রাখি, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন।’
আরও সামান্য কিছু কথা বলল তারা দুজন। রাজর্ষি এক সময় খেয়াল করল ঘরের আলো কমে আসছে, সূর্য ডুবতে শুরু করেছে গঙ্গার বুকে। এদিনের মতো তার কাজ, কথাবার্তা, মরিয়মের সঙ্গে আগামী কয়েক দিনের কাজের পরিকল্পনা সাঙ্গ করে ঘর থেকে রাজর্ষি বেরিয়ে পড়ল।
মরিয়াম তাকে নীচের বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিল। বারান্দায় নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃদ্ধা। তিনি তাদের খেয়াল করলেন কিনা তা বুঝতে পারল না রাজর্ষি। মরিয়মের বাড়ি ছেড়ে সন্ধ্যা নামার আগে রাজর্ষি ঘরে ফেরার জন্য রওনা হয়ে গেল।
মরিয়মের বাড়ির দোতলার ঘরটাতে রোজ যাওয়া-আসা শুরু হয়ে গেল রাজর্ষির। তবে মরিয়ম সব দিন থাকে না। তারা দুজন নিজেরা আলোচনা করে ঠিক করে কবে মরিয়ম থাকতে পারবে। সাধারণত তিন-চার দিন পরপর একদিন রাজর্ষির সামনে এসে সে নগ্ন হয়ে দাঁড়ায়। বেশির ভাগ সময়েই রাজর্ষি তার সঙ্গে কাজ করে অন্ধকার নামার পর। বাকি দিনগুলোয় সে সকাল বা দুপুরে এসে মূর্তিটাকে নিয়ে একলা কাজ করে সন্ধ্যা নামার আগে আবার বাড়ি ফিরে যায়।
কোনও কাজ মনোযোগ দিয়ে শুরু করার পর দিনের হিসাব মাথায় থাকে না। হঠাৎ একদিন বিজন গুহ-র ফোন পেয়ে রাজর্ষির খেয়াল হল, সে কাজ শুরু করার পর প্রায় দু-সপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। তিনি তাকে বললেন, ‘আপনার যদি আপত্তি না থাকে তবে আমি একদিন কাজটা দেখে আসতে চাই।’
সময় যেমন এগিয়েছে তেমনই রাজর্ষির কাজও তার সঙ্গে সঙ্গে বেশ খানিকটা এগিয়েছে। কাঠের লগ বা গুঁড়িটা এখন আর নিছক একটা কাঠের টুকরো নেই। সেটা একটা নারী মূর্তির আকৃতি ধারণ করেছে। মূর্তির মুখমণ্ডল স্পষ্ট না হলেও সেটা যে একটা নারী মূর্তি তা অনায়াসেই বোঝা যায়।
বিজন গুহর প্রস্তাবে রাজর্ষি আপত্তি করল না। ঠিক হল, দু-দিন পরই তিনি আসবেন। রাজর্ষি সেদিনই ব্যাপারটা মরিয়মকে জানাতে সে বলল, ‘তিনি আসতে পারেন, আমার আপত্তি নেই, কিন্তু আমি তার সামনে হাজির হব না। বলা যায় না, হয়তো ভবিষ্যতে কোনওদিন পথে-ঘাটে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তিনি চিনে ফেললেন। তখন আমার পক্ষে সেটা বিড়ম্বনার হবে। তাছাড়া নিরাপত্তার স্বার্থেও আমার দ্বিতীয় কোনও ব্যক্তির সামনে আত্মপ্রকাশ করা উচিত হবে না।’
রাজর্ষি বলল, ‘আপনার থাকার প্রয়োজন নেই। শুধু ব্যাপারটা আপনাকে জানিয়ে রাখলাম।’
মরিয়ম এরপর জানতে চাইল, ‘আপনার ভার্গব স্যার কোনও খোঁজ খবর নিয়েছেন কাজের ব্যাপারে? এখানে আমার ব্যাপারে তিনি কিছু জানিয়েছেন আপনাকে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘না, এর মধ্যে আর তাঁর সঙ্গে কোনও কথা হয়নি। তিনি ব্যস্ত মানুষ। এ কারণে তাঁকে বিরক্ত করতে মন চায় না। তবে আমি ভেবে রেখেছি, কাজটা শেষের দিকে পৌঁছলে তখন একবার তাকে এসে দেখে যাবার অনুরোধ জানাব।’
কথাটা শুনে মরিয়ম বলল, ‘আপনার নিজের কাজের ওপর কোনও ভরসা নেই? আমি তো বেশ বুঝতে পারছি যে আমি প্রবেশ করছি ওই মূর্তির মধ্যে।’
রাজর্ষি হেসে জবাব দিল, ‘ব্যাপারটা আসলে তা নয়। আসলে উনি তো অনেক বড় শিল্পী, কোনও খুঁত যেটা আমার চোখে ধরা পড়ছে না অথবা কোনও একটা কিছু করলে হয়তো মূর্তিটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে সেটা উনি বলে দিতে পারেন। শিল্পকর্ম যথাসম্ভব নিঁখুত আর সুন্দর হওয়াই তো কাম্য।’
রাজর্ষির জবাব শুনে মরিয়ম আর কিছু বলল না। সে শুধু হাসল। তারপর কাজের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে পোশাক খুলতে শুরু করল। কাজের জন্য হাতে বাটালি তুলে নিতে গিয়ে রাজর্ষির মনে হল, ভার্গব স্যার যদি মূর্তিটা দেখতে আসতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন, তখন তিনি বলতেই পারেন যে মডেলকে তিনি দেখতে চান, তাকে রাজর্ষি তার কাজে কতটা সার্থক ভাবে ফুটিয়ে তুলতে চান তা বোঝার জন্য। তখন কী হবে?
মরিয়মকে কি রাজি করানো যাবে একবার ভার্গব স্যারের সামনে হাজির হবার জন্য? এ নিয়ে দু-তরফে কোনও সমস্যার সৃষ্টি হবে না তো? অবশ্য এর পরক্ষণেই রাজর্ষির মনে হল, সে সময় দেখা যাবে কী করা যাবে? এখন এসব নিয়ে ভাবলে তার মনসংযোগ নষ্ট হতে পারে, অতএব এসব কথা না ভেবে কাজ শুরু করল সে।
এরপর মাঝের একটা দিন যথারীতি কেটে গেল। এ দিনটাও যথা নিয়মে রাজর্ষি কাজ করল। মরিয়ম অবশ্য ছিল না। তার পরদিন দুপুরের দিকে মরিয়মের বাড়িতে এসে উপস্থিত হল রাজর্ষি। মরিয়মের ঠাকুমা বারান্দায় কালো শাল মুড়ি দিয়ে বসে মৃদুমৃদু দুলছিলেন। দিন পনেরো হতে চলল রাজর্ষি এ-বাড়িতে রোজ যাওয়া-আসা করছে। কিন্তু বৃদ্ধা কোনওদিনই রাজর্ষির প্রতি কোনও আগ্রহ দেখান না, কথাও বলেন না। তবে এদিন তিনি রাজর্ষি যখন সিঁড়ির দিকে এগোচ্ছে তখন তার উদ্দেশ্যে বলল, ‘আমার নাতনি কোথায়? তুমি তাকে দেখেছ?’
রাজর্ষি তাঁর প্রশ্ন শুনে জবাব দিল, ‘আমি তো এই এখনই বাড়ি ঢুকছি। আমি তো তাকে দেখিনি। তার তো কাজে বেরোবার কথা। কেন? আপনার কোনও দরকার হলে প্রয়োজনে আমাকে বলতে পারেন।’
রাজর্ষির কথা শুনে বৃদ্ধা কেমন যেন অসংলগ্ন ভাবে বললেন, ‘কত দিন দেখিনি তাকে! কতদিন আসেনি সে! ওর সঙ্গে দেখা হলে বোলো একবার আসতে।’
মরিয়ম, রাজর্ষিকে বলেছিল বটে তার ঠাকুমার মাথাটাও আজকাল নাকি একটু গন্ডগোল করছে। বৃদ্ধার কথাগুলো তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে হল রাজর্ষির। সে শুধু বলল, ‘আমি তাকে বলে দেব আপনার সঙ্গে দেখা করতে।’
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে এসে তার কাজের ঘরে প্রবেশ করল রাজর্ষি। জানলাটা সে খুলল। দুপুরের রোদ প্রবেশ করল ঘরে। ঘড়ি দেখল রাজর্ষি। বেলা দুটো বাজে। বিজন গুহ নামের ভদ্রলোকের বিকাল সাড়ে চারটে নাগাদ আসার কথা। তিনি ফোন করলেন। তারপর তাঁকে রাস্তার মোড় থেকে নিয়ে আসার কথা রাজর্ষির। মাঝের কয়েক ঘণ্টা সময় কাজ করেই কাটাবে রাজর্ষি।
প্রতিদিন সে কাজ সেরে যাবার আগে মূর্তিটা একটা কাপড় দিয়ে ঢেকে থেকে যায়। ঠিক তেমন অবস্থাতেই রাখা ছিল মূর্তিটা। রাজর্ষি কাজ শুরুর জন্য কাপড়টা সরিয়ে নিল। তারপর প্রতিদিন কাজ আরম্ভ করার আগে সেটাকে একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নেয়, তেমনই দেখার জন্য মূর্তিটার দিকে চাইল সে।
ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত দেখতে দেখতে হঠাৎই তার যেন মনে হল মূর্তির তলপেটের দিকটা যেন একটু স্ফিত মনে হচ্ছে। মনে মনে সে মরিয়মের শরীরটা একবার কল্পনা করে নিল। মরিয়মের শরীর তো মেদহীন। তলপেটে তার সামান্য চর্বি নেই। রাজর্ষি ভালো করে দেখে বুঝতে পারল, ব্যাপারটা তার চোখের ভুল নয়। মূর্তির অবয়ব সঠিক করার জন্য সেই স্ফিত অংশটা চেঁছে বাদ দেয়ার জন্য রাজর্ষি বাটালিটা হাতে তুলে নিল। সেটা মূর্তির তলপেটে ঘষতে যাবে ঠিক সেই সময় মাথার ওপর মৃদু শব্দ শুনে সে ছাদের দিকে তাকাল।
রাজর্ষির বাটালি মূর্তিটাকে স্পর্শ করতে গিয়েও থেমে গেল। যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে কড়ি-বরগার ছাদের একটা কাঠের বিম আঁকড়ে ধরে ঝুলছে একটা বাদুড়৷ সে যেন তাকিয়ে আছে রাজর্ষির দিকেই! ওটা কি প্রথম দিনের সেই বাদুড়টাই নাকি অন্য কোনও একটা আবার কোনও ফাঁকে বাইরের বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকে পড়েছে।
প্রাণীটাকে দেখে বেশ অস্বস্তি বোধ করল রাজর্ষি। কিন্তু সে বাদুড়টাকে শব্দ করে বা অন্য কোনওভাবে তাড়াতে সাহস করল না। কারণ, প্রাণীটা তাড়া খেয়ে দরজা বা জানলা দিয়ে বাইরে না বেরিয়ে যদি ঘরের মধ্যেই ওড়াউড়ি শুরু করে তবে বিপত্তি শুরু হবে। রাজর্ষি বেশ খানিকক্ষণ বাদুড়টার দিকে চেয়ে থাকার পর ধীরে ধীরে তার কাজ শুরু করল।
বাটালিতে হাতুড়ির ঘা পড়ার শব্দ হল ঠিকই। কিন্তু সেই শব্দ শুনে প্রাণীটা উড়ল না। মূর্তির শরীরের যে বাড়তি অংশটা রাজর্ষির চোখে ধরা দিয়েছে, সে সেটাকে ধীরে ধীরে যত্ন করে চেঁছে ফেলল। তারপর মূর্তির দেহের অন্য অংশ নিয়ে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু করল।
কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে নিজের অজান্তেই যেন তার চোখ চলে যেতে লাগল ছাদের দিকে। রাজর্ষির বাদুড়টার দিকে তাকিয়ে মনে হতে লাগল সে যেন তাকিয়ে তার মূর্তি বানানো দেখছে।
সময় এগিয়ে চলল। রাজর্ষির মোবাইল ফোন বেজে উঠল এক সময়। বিজন গুহ-র ফোন কল। সাড়ে চারটে বাজে। কাজে নিমগ্ন রাজর্ষি খেয়ালই করেনি কখন আড়াই ঘণ্টা সময় কেটে গেছে। তিনি জানালেন আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই রাস্তার মোড়ে এসে পৌঁছোবেন। তার এস.ইউ.ভি গাড়িটা কালো রঙের। নম্বরটাও তিনি বলে দিলেন। রাজর্ষি তাকে বলল, সে-ও ওই জায়গায় পৌঁছচ্ছে তাকে রিসিভ করার জন্য।
কাজ থামিয়ে দিল রাজর্ষি, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে বাড়ি ছেড়ে রওনা হল রাস্তার দিকে। রাজর্ষি রাস্তার মোড় পৌঁছাবার মিনিটখানেকের মধ্যে বিজন গুহর গাড়ি পৌঁছে গেল সেখানে। রাজর্ষি এগিয়ে গেল গাড়ির দরজার সামনে। ইতিমধ্যেই টেলিফোনেই তাদের মধ্যে বাক্যালাপ হয়েছে। সাক্ষাৎ হয়নি। তবে তারা দুজন দুজনকে চিনতে ভুল করল না।
গাড়ি থেকে নামলেন মাঝবয়সি বিজন গুহ। হাসিখুশি চেহারা তাঁর। পরনে কর্পোরেট পোশাক—কোট, টাই, পায়ে জুতো। তিনি গাড়ি থেকে নামতেই দামি সুগন্ধীর মৃদু সুবাস রাজর্ষির নাকে এসে লাগল। গাড়ি থেকে নেমেই বিজন গুহ রাজর্ষির দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘আপনার গলা শুনে, ইয়ং ম্যান বলেই মনে হয়েছিল, কিন্তু এত ইয়ং ম্যান তা ভাবিনি!’ এরপর টুকটাক সৌজন্যসূচক কিছু কথাবার্তার পর রাজর্ষি ভদ্রলোককে নিয়ে এগোল তার ‘স্টুডিও’তে যাবার জন্য।
বাড়িটার কাছে পৌঁছে গেল তারা দুজন। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে বারান্দার কড়ি কাঠের দিকে তাকিয়ে মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালেন ভদ্রলোক। বাদুড়গুলো তার দৃষ্টি এড়াল না। তিনি বললেন, ‘এ তো দেখি গল্পের বইতে পড়া হন্টেড হাউসের মতো লাগছে। বাদুড়গুলো ভ্যাম্পায়ার নয়তো?’ এরপর তিনি নিজেদের সম্পর্কে রসিকতা করে বললেন, ‘অবশ্য আমরা যারা কর্পোরেট জগৎ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত, আমাদেরও অনেকে আড়ালে ভ্যাম্পায়ার বলে থাকে।’
রাজর্ষি হেসে বলল, ‘বাড়িটা পুরোনো আর ভূতুড়ে মনে হলেও আমার কাজের জন্য একেবারে আদর্শ। হট্টগোলের কারণে মনঃসংযোগ নষ্ট হবার ব্যাপার নেই।’
বিজন গুহকে নিয়ে দরজা খুলে রাজর্ষি ঘরে প্রবেশ করল। রাজর্ষি তাকে এনে দাঁড় করাল মূর্তিটার সামনে। তিনি মূর্তিটাকে দেখতে দেখতে প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ওটা মন থেকে তৈরি করছেন, নাকি কাউকে সামনে রেখে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘মডেল হিসেবে একজন থাকছেন। তাঁকে সামনে রেখেই বানাচ্ছি।’
‘অবিকল তাঁর মতো হবেও?’
‘হ্যাঁ, তেমনটাই হবে।’
তার জবাব শুনে বিজন গুহ বললেন, ‘আপনাকে সত্যি কথা বলি, এইসব শিল্প-ভাস্কর্য-মূর্তির ব্যাপারে আমি কিছু বুঝি না। আমাদের কাজের সিস্টেম অনুসারে কাজ এগিয়েছে কিনা সেটা রিপোর্ট করতে হবে বলে দেখতে এসেছি। স্বয়ং মিস্টার ভার্গবের মতো মানুষ যখন আপনার কাজের ওপর ভরসা রাখেন, তখন আমাদের ভরসা না রাখার কোনও কারণ নেই। কাজ শেষ হতে আপনার আর কতদিন সময় লাগবে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘আর সপ্তাহ দুই। আমি আপনাকে দেওয়া কথা অনুসারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করে দেব।’
বিজন গুহ বললেন, ‘ধন্যবাদ, ওটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ, হোটেল ইনোগরেশন ডেট ফিক্স আপ হয়ে গেছে।’
এরপর আর মূর্তি সংক্রান্ত বিষয় কোনও কথা বললেন না তিনি। খোলা জানলা দেখে এগিয়ে গিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখে বললেন, ‘বিউটিফুল!’ বাইরে তো গঙ্গাবক্ষে সুর্যদেব অবগাহন শুরু করেছেন। কিছুক্ষণ সে দৃশ্য দেখার পর তিনি বললেন, ‘আপনাকে আমার এই মুহূর্তে আর কিছু বলার নেই। প্রয়োজন হলে ফোনে কথা বলে নেব। এবার আমাকে ফিরতে হবে।’
বিজন গুহকে তাঁর গাড়িতে তুলে দিয়ে এসে রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে চা খেয়ে রাজর্ষি যখন আবার সে ঘরে ফিরে এল তখন পাঁচটা বেজে গেছে। বাইরের আলো সরে গেছে। আর আধ ঘণ্টার মধ্যেই অন্ধকার নামতে শুরু করবে। সবকিছু গুছিয়ে রাজর্ষি এবার বাড়ি যাবার জন্য রওনা হবে। মূর্তিটার পাশে একটা ছোট টেবিলে সে তার যন্ত্রপাতি সাজিয়ে রাখে। মরিয়মই অন্য কোনও ঘর থেকে রাজর্ষির কাজের সুবিধার জন্য টেবিলটা দিয়েছে।
সেই টেবিলে কাঠ খোদাইয়ের জিনিসগুলো প্রথমে গুছিয়ে রাখল রাজর্ষি। মূর্তির পায়ের তলায় পড়ে থাকা কাঠের পাতলা ছিলকা বা আঁশগুলোকে কুড়িয়ে সে ঘরের এক কোণে রাখল। রোজই রাখে, কাঠের একটা ছোটখাটো স্তূপ ইতিমধ্যেই ঘরের কোণে তৈরি হয়ে গেছে। ঘরের ভিতরের আলো ক্রমশ কমে আসছে। এরপর রাজর্ষি মূর্তিটাকে ঢেকে দিল। কাজ শেষ তার। এরপর জানলা-দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে পড়বে সে।
জানলার দিকে এগোতে গিয়ে সে তাকাল কড়ি কাঠের দিকে। বাদুড়টা আর সেখানে নেই। রাজর্ষি অনুমান করল সে যখন ঘরে ছিল না তখন বাইরে বেরিয়ে গেছে বাদুড়টা। ব্যাপারটা দেখে রাজর্ষি নিশ্চিন্ত বোধ করল। জানলার দিকে এগোতে এগোতে সে স্বগতোক্তির স্বরে বলল, ‘বাঁচা গেছে!’
ঠিক একই সময় লাগোয়া পাশের ঘরের দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল মরিয়াম। রাজর্ষির বলা কথাটা শুনে সে প্রশ্ন করল, ‘বাঁচা গেছে মানে?’
রাজর্ষি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে তার উদ্দেশে বলল, ‘বাদুড়! আজ ঘরে ঢুকে দেখি মূর্তির ঠিক মাথার ওপর সেটা ঝুলছে। আমি যতক্ষণ কাজ করছিলাম ততক্ষণ সেটা ছিল। এখন দেখছি না। মনে হচ্ছে জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে। জানি না সেটা আগের দিনের বাদুড়টাই কিনা? প্রাণীটা চলে গেছে দেখে বললাম, ‘বাঁচা গেছে।’
রাজর্ষির কথা শুনে মরিয়াম হেসে বলল, ‘ওরা অমন মাঝে মাঝে ঘরে ঢুকে পড়ে। তবে ওরা আপনার কোনও ক্ষতি করবে না। ভয়ের কারণ নেই। বাদুড় ঘরে ঢুকলে সে তার মতো ঝুলবে, আর আপনি আপনার মতো কাজ করবেন।’
রাজর্ষি এরপর মরিয়ামের উদ্দেশে বলল, ‘একটু আগেই বিজন গুহ এসেছিলেন। আমি তাঁকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এখনই ফিরলাম।’
মরিয়াম বলল, ‘হ্যাঁ আমি তাকে দেখেছি। বাড়িতেই তো ছিলাম।’
রাজর্ষি মৃদু বিস্মিত ভাবে বলল, ‘বাড়িতে ছিলেন! কাজে যাননি?’
মরিয়াম জবাব দিল, ‘গেছিলাম। চারটে নাগাদ ফিরেছি। ঠাকুমার শরীরটা একটু খারাপ। মাথাটা গন্ডগোল করছে। তাই আগে ফিরেছি।’
রাজর্ষি বলল, ‘আমারও তাই মনে হল। বলছিলেন, আপনি নাকি অনেকদিন এ-বাড়িতে আসেননি। আমার সঙ্গে দেখা হলে আপনাকে আসতে বলতে।’
ওদিন মরিয়মের তার সামনে দাঁড়াবার কথা নয়। আবার দু-দিন বাদে সন্ধ্যায় তার নগ্ন হয়ে দাঁড়াবার কথা। মরিয়াম তাই রাজর্ষির উদ্দেশ্যে বলল, ‘আপনি যান। দরজা-জানলা আমি বন্ধ করে দেব।’
সময়ের নিয়মে আরও বেশ কয়েকটা দিন কেটে গেল। আরও বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছে মূর্তি তৈরির কাজ। মরিয়াম এর মধ্যে দু-দিন নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজর্ষির সামনে। আবলুশ কাঠের বুকে তাকে, তার শরীরের রক্ত-মাংসকে ফুটিয়ে তুলে চলেছে রাজর্ষি। তার হাতে আর দিন দশেক মাত্র সময় আছে। তাই অতি দ্রুত কাজ করে চলেছে সে।
প্রতিদিন বেলা দশটা নাগাদ রাজর্ষি বাড়িটাতে চলে আসছে। দুপুরের খাবার সঙ্গেই আনছে সে। প্রথম দফাতে বেলা একটা পর্যন্ত কাজ করছে রাজর্ষি। তারপর খাওয়া সেরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে টানা বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত কাজ। যতক্ষণ না বাইরের গঙ্গার বুকে সূর্য ডোবে আর বাদুড়টা অন্ধকার নামার আভাস পেয়ে বাইরে বেরিয়ে যায়। হ্যাঁ, একটা অদ্ভুত ব্যাপার। রাজর্ষি রোজ কাজ সেরে ফেরার সময় দরজা জানলা বন্ধ করে দিয়ে যায়। কিন্তু পরদিন দরজা খুলে সিলিং-এর দিকে তাকালেই দেখতে পায় বাদুড়টা মূর্তিটার মাথার ওপর কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে!
এতদিন রাজর্ষি বুঝতে পেরে গেছে, যে বাদুড়টা ঝুলে থাকে সেটা একই বাদুড়৷ তবে সম্ভবত এটা একদম প্রথম দিনের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে পাশের ঘরে ঢুকে যাওয়া বাদুড়টা নয়। কারণ এ যে প্রাণীটা সূর্য ডোবার পর সম্ভবত রাত্রিকে স্বাগত জানাতে খুব সাবলিল ভাবে বাইরে উড়ে যায় জানলার বরাবর ফাঁক গলে। একদিনও তাকে গরাদে ধাক্কা খেতে দেখেনি।
রাজর্ষি যখন একলা এ-ঘরে কাজ করে তখন মাঝে মাঝে কোনও কোনও সময় তার চোখ চলে যায় ছাদের দিকে। তখন বাদুড়টাকে দেখে তার মনে হয় প্রাণীটা যেন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার কাজ দেখে। রাজর্ষির কাজ দেখার জন্যই যেন কড়িকাঠে ঝোলে সে। মরিয়মকে কোনওদিন বাদুড়টাকে দেখাতে পারেনি রাজর্ষি। কারণ এই বাদুড়টা এ ঘরে উপস্থিত হবার পর মরিয়ম রাজর্ষির সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য অথবা তার সামনে নগ্ন ভাবে দাঁড়াবার জন্য যে কয়দিন উপস্থিত হয়েছে, তার আগেই উড়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে বাদুড়টা। যদিও প্রাণীটার কথা শুনে মরিয়ম রাজর্ষিকে আশ্বস্ত করে বলেছে যে প্রাণীটাকে নিয়ে চিন্তার কোনও কারণ নেই তবুও বাদুড়টাকে দেখে রাজর্ষির মাঝে মাঝে কেমন অস্বস্তি হয়। কেমন যেন অদ্ভুত ভাবে তাকে দেখে ওই বাদুড়টা।
বেশ কিছুদিন ধরে মূর্তিটা নিয়ে কাজে ব্যস্ত থাকায় রাজর্ষির বেশ কিছু অন্য কাজ জমা হয়ে গেছিল। কাজগুলো আর না করলেই চলছিল না তার। এর মধ্যে ছিল তার দৈনন্দিন ব্যবহারের কিছু জিনিস কেনা, ব্যাঙ্কের কাজ এসব ব্যাপার। তাই এদিন আর অন্যদিনের মতো সকাল দশটাতে মরিয়মের বাড়িতে যাওয়া হল না রাজর্ষির।
সারা সকাল থেকে বেশ বেলা পর্যন্ত সময় লাগল তার জমে থাকা কাজ মিটতে। তারপর দুপুর বেলা বাড়ি ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে যখন সেই পুরোনো বাড়িতে কাজের ঘরের দরজার সামনে উপস্থিত হল তখন দুপুর তিনটে বাজে। মরিয়মের সঙ্গে রাজর্ষির কথা হয়েছে, আজ সন্ধ্যায় সে তার সামনে এসে দাঁড়াবে। আর তিনদিন পোশাক খুলে দাঁড়ালেই তার সে কাজ মিটে যাবে।
মরিয়মকে নিয়ে কাজের ব্যাপারে রাজর্ষির তেমনই হিসাব করা আছে। প্রতিদিনের মতোই এদিনও দরজা খুলল রাজর্ষি। তারপর ঘরে ঢুকে জানলা খুলতেই আলোকময় হয়ে উঠল ঘরটা। জানলাটা পশ্চিমমুখী, কাজেই এসময় সূর্যের পুরো আলোটাই এ-ঘরে ঢোকে।
মূর্তিটা একই রকম ঢাকা দেওয়া আছে। রাজর্ষি এগিয়ে গিয়ে মূর্তির গা থেকে কাপড়টা সরিয়ে ফেলল। মুখ বাদে মূর্তির দেহের অন্য অংশগুলো অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কাঠের গায়ে ফুটে উঠেছে তীক্ষ্ণ বৃন্ত সমৃদ্ধ বর্তুলাকার স্তন যুগল, আত্মপ্রকাশ করেছে গভীর নাভি, সৃষ্টি হয়েছে ঊর্ধ্বে ওঠানো মৃণালের মতো বাহুদ্বয়, মসৃণ উরু দুটো আর উরু সন্ধি। জেগে উঠেছে মানবী শরীরের নানা বাঁক, খাঁজ যা যৌনভাবে উদ্দীপ্ত করে পুরুষকে।
মরিয়মের শরীরটা যেমন ঠিক তেমনই একটা শরীর ফুটে উঠেছে কাঠের গায়ে রাজর্ষির শৈল্পিক ছোঁয়ায়। বলা যেতে পারে রাজর্ষির সামনে যেটা দাঁড়িয়ে রয়েছে সেটা আর এখন কাঠের লগ বা গুঁড়ি নয়। রক্ত, মাংস-পেলব পেশী সমৃদ্ধ জীবন্ত কাঠের মানবী শরীর।
রাজর্ষির কাজ হিসাব মতো চললে আর দু-তিন দিনের মধ্যে মূর্তির শরীরের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে বলে রাজর্ষির ধারণা। বাকি একটা সপ্তাহ ধরে রাজর্ষি নির্মাণ করবে মরিয়মের মুখটা। সেরকমই পরিকল্পনা করে রেখেছে সে। ছেনি, বাটালি হাতে তুলে নিয়ে কাজ শুরু করার আগে প্রতিদিনের মতোই সে দেখে নিয়ে শুরু করল মুখ বিহীন সেই নগ্নিকাকে।
রাজর্ষির দৃষ্টি ক্রমশ মূর্তির বুক থেকে নামতে শুরু করল শরীরের নীচের দিকে। মূর্তির স্তনবৃন্ত, গভীর নাভি ছুঁয়ে রাজর্ষির চোখ হঠাৎ এসে থেমে গেল মূর্তির তলপেটে। আবার কেমন যেন ফোলা মনে হচ্ছে ও জায়গাটা। কয়েক মুহূর্ত স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে তারপর সে জায়গায় হাত বুলিয়ে রাজর্ষি বুঝতে পারল ব্যাপারটা তার দৃষ্টি বিভ্রম নয়, সত্যি সে জায়গাটা ফোলা আগের দিনের মতোই!
রাজর্ষি বোঝার চেষ্টা করল এর কারণ কী। এমন অসঙ্গতি তো দুবার হবার কথা নয়। তবে কি রাজর্ষির মূর্তির অঙ্গ পরিমাপের ক্ষেত্রে গাণিতিক হিসাবে কিছু ভুল হচ্ছে? মূর্তির দেহের তলপেট সংলগ্ন অন্য অংশ তৈরি করতে গিয়ে হিসাবের ভুলে সে তলপেটের অংশটা স্ফিত করে ফেলছে?
নিজের কাজের ত্রুটিটা ধরার জন্য সে একটা স্কেল নিয়ে মূর্তির সর্বাঙ্গ গাণিতিক ভাবে জরিপ করতে লাগল। কিন্তু হিসাব করে সে দেখল তার গাণিতিক হিসাব ঠিকই আছে। নারী দেহের হাতের আঙুলের ডগা থেকে পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুল পর্যন্ত এক ইঞ্চির ফারাক নেই কোথাও ওই তলপেটের জায়গাটুকু ছাড়া! যাই হোক, এই ব্যাপারটার সমাধান করতে হবে রাজর্ষিকে। অর্থাৎ আগের দিনের মতোই মূর্তির তলপেট থেকে চেঁছে বাদ দিতে হবে ফোলা অংশটা।
ঘরে বেশ আলো ঢুকছে তবুও আরও আলোতে নিখুঁতভাবে চাঁছার কাজটা করার জন্য আরও দুটো বাতি জ্বালিয়ে নিল রাজর্ষি। এরপর সে বাটালি তুলে নিয়ে তার ফলাটা তলপেটে বসিয়ে কাঠের হাতুড়ি দিয়ে বাটালিতে ঘা দিল। প্রত্যাশিত ভাবেই ঠক করে একটা শব্দ হল, একটা কাঠের ছিলকাও খসে পড়ল মাটিতে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই মাথার ওপর একটা শব্দ হল।
রাজর্ষি দ্বিতীয় বার মূর্তির গায়ে আঘাত করতে গিয়েও থমকে গেল সেই শব্দ শুনে। ওপর দিকে তাকিয়ে রাজর্ষি দেখল ঝুলন্ত অবস্থায় বাদুড়টা তার কালো ডানা দুটো দু’পাশে বিস্তার করেছে। বেশ বড় দুটো ডানা। সে স্থির দৃষ্টিতে তার লাল চুল্লির মতো চোখ নিয়ে ওপর থেকে তাকিয়ে থাকে রাজর্ষির দিকে!
প্রাণীটা ওপর থেকে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়বে নাকি? ওড়াউড়ি শুরু করবে নাকি? মুহূর্তের জন্য একটা শঙ্কা জেগে উঠল তার মনে। সে তাকিয়ে রইল বাদুড়টার দিকে। তবে শেষ পর্যন্ত তেমন কিছু ভয়ের ব্যাপার ঘটল না। ধীরে ধীরে তার ডানা দুটো গুটিয়ে নিল প্রাণীটা। আর রাজর্ষি আবার তার কাজে মনোনিবেশ করল। সাবধানে, ধীরে ধীরে সে চেঁছে উঠিয়ে ফেলল সেই ফোলা অংশটাকে, তারপর সেই নারী মূর্তির অন্য স্থানগুলো মসৃণ করার কাজে মন দিল।
নিজের মনে কাজ করছিল রাজর্ষি। ঘরে দুটো জোরালো বাতি জ্বলছিল বলে রাজর্ষি খেয়াল করেনি সময় কতটা কেটে গেছে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হয়েছে আর বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যাও নামবে একটু পর। তার হুঁশ ফিরল মাথার ওপর বাদুড়টা যখন তার ডানা ঝাপটাল বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। প্রতিদিনের মতোই সে নিখুঁত ভাবে গরাদের ফাঁক গলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
রাজর্ষি জানলার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল বাইরে নদী বয়ে সূর্য ডুবে গেছে। তবে সে এখন বাড়ি ফিরবে না। মরিয়ম আজ এসে দাঁড়াবে। তাকে নিয়ে ঘণ্টাখানেক কাজ করার পর তবেই রাজর্ষি বাড়ি ফিরবে।
মরিয়ম আসার আগে, তাকে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় কাজ শুরু করার আগে মৃদু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য চেয়ারে বসল রাজর্ষি। সে বোঝার চেষ্টা করতে লাগল পরপর দু’বার কী ভুলের জন্য মূর্তির তলপেটের অংশটা সে স্ফিত করে ফেলেছিল। ব্যাপারটা তার বোঝা দরকার যাতে অন্য কোনও মূর্তি নির্মাণের সময় তাকে একই ভুলের সম্মুখীন না হতে হয়।
মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে ব্যাপারটা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেছিল রাজর্ষি। এক সময় মনে হল বেশ ঠান্ডা লাগছে তার। শীত আরও বেড়েছে কদিন ধরে। সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস ঢুকতে শুরু করেছে ঘরে। আর এরপরই দরজা খোলার শব্দ হল। পাশের ঘর থেকে মরিয়ম প্রবেশ করল সে ঘরে। রাজর্ষি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল তাকে দেখে। মরিয়ম তার উদ্দেশে মিষ্টি হাসি ছুড়ে দিয়ে বলল, ‘গুড ইভিনিং স্যার।’ রাজর্ষিও প্রীতি সম্ভাষণ জানাল তাকে।
মরিয়ম এরপর মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে রাজর্ষিকে প্রশ্ন করল, ‘আপনার কাজ কেমন এগোচ্ছে?’
রাজর্ষি বলল, ‘মন্দ নয়। তাছাড়া কাজ শেষ করার সময়ওতো হয়ে এল। মুখের কাজটা ধরে ফেলব দু-তিনদিনের মধ্যে।’
রাজর্ষি ও-ঘরে থাকাকালীন এর আগে যে মরিয়মকে কোনওদিন মূর্তিটার ঘনিষ্ঠ হতে দেখেনি। এদিন কিন্তু সে এগিয়ে এসে দাঁড়াল মূর্তিটার সামনে, তারপর মূর্তির গায়ে হাত বোলাতে লাগল। ওপর থেকে মূর্তির নানা জায়গা স্পর্শ করতে করতে মরিয়মের হাতটা এসে থেমে গেল মূর্তির নাভির নীচে তলপেটে। রাজর্ষির মনে হল মরিয়ম যেন বেশ কয়েকবার হাত বুলিয়ে দেখল সে জায়গাটা। তারপর মূর্তির থেকে কিছুটা তফাতে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুটা তফাত থেকে এরপর সে দেখতে লাগল নিজের মূর্তিটাকে।
রাজর্ষি এবার তাকে প্রশ্ন করল, ‘কেমন দেখছেন মূর্তিটাকে? শরীরটা ঠিক আপনার মতোই তো? যদিও মুখটা এখনও তৈরি হয়নি।’
মরিয়ম জবাব দিল, ‘শরীরটা একদম হুবহু আমার মতোই লাগছে। আর শরীরটাই তো মেয়েদের আসল ব্যাপার তাই না?’
রাজর্ষি তার এ কথার সরাসরি কোনও জবাব না দিয়ে মৃদু হেসে বলল, ‘মূর্তিটা যাতে হুবহু আপনার মতোই হয় সেই চেষ্টাই করছি। এবার তবে কাজ শুরু করা যাক? তার আগে জানলাটা বন্ধ করে দিই। আপনার ঠান্ডা লাগতে পারে।’
রাজর্ষির কথার জবাবে মরিয়ম বলল, ‘আপনাকে তো আগেই একদিন বলেছি আমার ঠান্ডা লাগবে না। জানলা বন্ধ থাকলে বরং আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে মনে হয়। হ্যাঁ, এবার তাহলে কাজ শুরু করা যাক।’
মরিয়ম গিয়ে দাঁড়াল তার নির্দিষ্ট জায়গাতে। রাজর্ষিও মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে প্রস্তুত হল তার কাজ শুরু করার জন্য। মরিয়ম একটা একটা করে পোশাক খুলে নগ্ন হয় তার নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে। বিস্তৃত বাতির উজ্জ্বল আলো যেন চুইয়ে পড়তে লাগল মরিয়মের শরীরের স্তনবৃন্ত আর কৌণিক বিন্দুগুলো দিয়ে। বাটালি হাতুড়ি নিয়ে মূর্তির গায়ে ঘা দেওয়ার আগে রাজর্ষি দেখে নিতে লাগল মরিয়মের পুরো শরীরটা।
রাজর্ষির চোখ তার শরীর বেয়ে নামতে নামতে থেমে গেল মরিয়মের তলপেটে। রাজর্ষি ভালো করে দেখার চেষ্টা করতে লাগল মরিয়মের তলপেট স্ফিত নয়তো? আর সেটাই রাজর্ষি তুলে ধরেনি তো তার মূর্তির মধ্যে?
রাজর্ষির চোখের দৃষ্টি দেখে মরিয়াম অনুমান করল কী দেখছে। অন্য দিন যে নিজের ভঙ্গিতে দাঁড়াবার পর কোনও কথা বলে না যতক্ষণ না রাজর্ষির কাজ শেষ হয়। আজ কিন্তু মরিয়ম রাজর্ষিকে এমন ভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রশ্ন করে বলল, ‘এমন ভাবে কী দেখছেন?’
সত্যি কথাই বেরিয়ে এল রাজর্ষির মুখ দিয়ে। সে জবাব দিল, ‘আপনার তলপেট।’
কথাটা শুনে মরিয়ম প্রশ্ন করল, ‘কী দেখছেন তলপেটে? দেখতে কোনও অসুবিধা হচ্ছে? আমি কি একটু ঘুরে দাঁড়াব?’
যা দেখার তা দেখা হয়ে গেছে রাজর্ষির। কোনওরকম স্ফিত ভাব নেই মরিয়মের নগ্ন তলপেটে। তাই সে বলল, ‘না, থাক, দরকার নেই।’ এ কথা বলে সে মূর্তির গায়ে তার কাজ শুরু করল।
এইদিনের মতো যখন রাজর্ষির কাজ শেষ হল তখন প্রায় সাতটা বাজে। রাজর্ষিকে বাটালি হাতুড়ি নামিয়ে রাখতে দেখে কাজ শেষ হয়েছে বুঝতে পেরে মরিয়ম পোশাক পরতে লাগল। সবকিছু গুছিয়ে রাজর্ষি যখন মূর্তিটাকে কাপড় ঢাকা দিয়ে দিল তখন মরিয়ামেরও শরীর ঢাকা হয়ে গেছে। মরিয়ম, রাজর্ষিকে বলল, ‘আজ আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই। আশা করি আপনি সঠিক উত্তর দেবেন। অবশ্য নাও দিতে পারেন, যেটা আপনার মর্জি।’
রাজর্ষি বলল, ‘কী প্রশ্ন বলুন? চেষ্টা করব উত্তর দিতে।’
মরিয়ম বলল, ‘এই যে আমি একজন যুবতী মেয়ে নির্জন একলা ঘরে নগ্ন হয়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকি, আপনার কখনও ইচ্ছা হয় না আমাকে আলিঙ্গন করার? সম্ভোগ করার?’
মরিয়মের এ প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল না রাজর্ষি। সে বলল, ‘আসলে আপনি আমার কাজের একটা অঙ্গ হিসাবে থাকেন। আমার কাছে হয়তো আপনি একটা ‘বস্তুর’ মতো। তাই আমার আপনার ক্ষেত্রে এমন ইচ্ছা জাগে না।’
জবাব শুনে মরিয়ম বলল, ‘আপনি আমাকে তবে জড় বস্তু বলছেন? প্রাণহীন একটা শরীর? আমি তো শুনেছি। অনেক ভাস্কর, চিত্রকর তাদের মডেলদের সঙ্গে যে শুধু দেহের মিলন ঘটিয়েছিলেন তাই-ই নয়, কেউ কেউ নাকি তাদের নিজেদের ঘরণীও বানিয়েছিলেন?’
রাজর্ষি হেসে বলল, ‘আমার বক্তব্যটা আমি হয়তো ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছি না। আপনি অবশ্যই একজন রক্তমাংসের নারী। কিন্তু আমি যখন কাজের জন্য হাতে বাটালি-ছেনি তুলে নিই আর আপনি আমার সামনে পোশাক খুলে দাঁড়ান, ঠিক তখন আপনি আমার কাছে একটা ‘অবজেক্ট’ হয়ে ওঠেন। বলা যেতে পারে তখন আপনি পরোক্ষভাবে একটা শিল্পবস্তু। তবে হ্যাঁ, আপনি একথা ঠিকই বলেছেন। অনেক মডেলের সঙ্গে অনেক শিল্পী-ভাস্করেরই সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। কেউ কেউ মডেলদের ঘরণী বা স্থায়ী সঙ্গিনীও করেছেন। এ ব্যাপারে বাংলার তথা ভারতবর্ষের কিংবদন্তী ভাস্করের নামও বলা যেতে পারে।’
রাজর্ষি জবাব শুনে মরিয়ম মৃদু হাসল। তারপর বলল, ‘কিংবদন্তি ভাস্কর’ কথাটা শুনে একজনের কথা মনে পড়ে গেল। আপনার ভার্গব স্যারের সঙ্গে কোনও কথা হয়েছে মূর্তি দেখতে আসার ব্যাপারে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘না হয়নি। আর কয়েকদিন বাদেই তাকে ফোন করব মূর্তিটা দেখে যাবার জন্য৷ চূড়ান্ত কাজ শেষ করার আগে মূর্তিটা তাকে একবার দেখিয়ে নেওয়া জরুরি বলেই মনে হয়। তবে ওই যে আপনাকে আগের দিন বললাম, তিনি সময় দিতে পারবেন কিনা কে জানে।’
মরিয়ম কিন্তু আজও এ কথাটা শুনে রাজর্ষিকে বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। একবার আপনি তাকে দেখিয়ে নিন। উনি ব্যস্ত মানুষ। আজকালের মধ্যেই ওঁকে ফোন করে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখুন।’
এ কথা বলার পরই মরিয়ম একটু যেন সতর্ক হয়ে প্রশ্ন গিয়ে বলল, ‘তবে আমার নাম-পরিচয় কিন্তু আপনি তাঁর কাছে যথারীতি গোপন রাখবেন।’
রাজর্ষি এসে বলল, ‘সে ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। আপনি যে আমি ছাড়া অন্য ব্যক্তিদেরও এ বাড়িতে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন, তার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।’
মরিয়ম এরপর জানতে চাইল, ‘আমাকে আবার কবে দাঁড়াতে হবে আপনার সামনে?’
রাজর্ষি বলল, ‘পরশু দুপুরের মধ্যে আমি মূর্তির শরীরের বাকি অংশের কাজটা শেষ করে ফেলব, তারপর মুখটা ধরব। ওই কাজটা খুব মনোযোগ দিয়ে নিখুঁতভাবে করতে হবে। আপনাকে পরশু সন্ধ্যায় দাঁড়াতে হবে আমার সামনে।’
মরিয়ম বলল, ‘আচ্ছা সে কথাই রইল তবে। আপনি যান, জানলা-দরজা আমি বন্ধ করে দেব।’ তার এই কথার পর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল রাজর্ষি।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাজর্ষির মনে পড়ল মরিয়মের পরামর্শের কথা। ভার্গব স্যারকে ফোন করে তাঁকে আসার জন্য আগাম অনুরোধ জানিয়ে রাখা উচিত। কথাটা মনে হতেই রাজর্ষি আর দেরি না করে ফোন করল তাঁর নাম্বারে।
ফোনটা রিসিভ করেই ভার্গব স্যার বললেন, ‘তোমার কাজ কেমন চলছে বলো? বেশ কয়েকদিন মনে হয়েছে যে ফোন করে খোঁজ নিই। কিন্তু বিদেশের ওই প্রদর্শনীতে যাবার জন্য আমার কাজের এত চাপ যে সামান্য ফোন করার সময়টুকু পর্যন্ত পাচ্ছি না।’
রাজর্ষি বলল, ‘আপনি যে ব্যস্ত মানুষ সে তো জানিই স্যার।’
ও পাশ থেকে প্রশ্ন এল, ‘তোমার কাজ তো এখন শেষের পথে, তাই না?’
কথাটা শুনে রাজর্ষি বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, প্রায় শেষের পথে। মুখটাই শুধু বাকি, সেটা কাল থেকে ধরে ফেলব। আশাকরি আর সাতদিনের মধ্যে কাজটা সম্পূর্ণ হয়ে যাবে।’
ভার্গব স্যার শুনে বললেন, ‘ভেরি গুড মাই বয়। আমি জানতাম তুমি কাজটা করতে পারবে। আর সেজন্যই কাজটা তোমাকে দিয়েছিলাম।’
রাজর্ষি এবার তার আসল কথাটা পাড়ল। সে বলল, ‘কাজটা শেষ করার আগে যদি আপনি যে কোনওদিন কাজটা একবার এসে দেখে নেন তবে আমি একটু ভরসা পাই।’
রাজর্ষির আশঙ্কা কিছুটা সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে ভার্গব চৌধুরী বললেন, ‘আমার এখন যা কাজের চাপ তাতে স্টুডিও ছেড়ে বাইরে বেরোনোই মুশকিল। আমি না গেলেও তুমি যে কাজটা ঠিকঠাক করবে সে ভরসা আমার আছে। তেমন হলে তুমি মূর্তির কয়েকটা ছবি হোয়াটস্অ্যাপ করে দিতে পারো।’
রাজর্ষি তবুও অনুনয় করে বলল, ‘তা নিশ্চয়ই পাঠাতে পারি স্যার। কিন্তু আপনি নিজের চোখে এসে যদি একবার দেখে যান তবে কোনও ছোটখাটো ত্রুটি থাকলেও সেটা আমি সংশোধন করতে পারি। যদি পাঁচ মিনিটের জন্য আসেন...’
ভার্গব স্যার বললেন, ‘সাধারণ মানুষের চোখ তো আর শিল্পীর চোখ নয় যে তারা ত্রুটি ধরতে পারবে! তারা তোমার ওই মূর্তির দিকে তাকিয়ে থাকবে যৌনতা খোঁজার জন্য। তোমার প্রস্তাব আমার মনে থাকবে। কিন্তু এখনই তোমাকে যাবার ব্যাপারে নিশ্চিত কোনও কথা দিতে পারছি না। মুখের কাজটা মন দিয়ে কোরো। পরে কথা হবে।’ এই কথা বলে ফোন কলটা কেটে দিলেন ব্যস্ত মানুষ, বিখ্যাত ভাস্কর ভার্গব চৌধুরী।
রাজর্ষির আর কিছু করার নেই। তবে যে তিনি একেবারে ‘যাব না’ বলে দেননি, রাজর্ষির প্রস্তাবটা মনে রাখবেন বলেছেন সেটাই একটা ক্ষীণ আশা জাগিয়ে রাখল রাজর্ষির মনে। স্নান সেরে টিফিন করে রাজর্ষি সকাল ন’টা নাগাদ বেরিয়ে পড়ল বিরাটির উদ্দেশে। সে বাড়িতে পৌঁছে রাজর্ষি দেখল একটা কালো চাদর গায়ে নিজের ঘরের বাইরে বসে ছিলেন সেই বৃদ্ধা। ওকে দেখেই উঠে দাঁড়ালেন সেই লোলচর্মসার বৃদ্ধা। তাঁর উঠে দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে রাজর্ষির মনে হল যেন তিনি ওকে কিছু বলবেন।
রাজর্ষি তাঁকে জিগ্যেস করল, ‘আপনি কিছু বলবেন?’
বৃদ্ধা বললেন, ‘তুমি তো ওপরে যাচ্ছ, আমার নাতনিটাকে দেখলে বোলো সে যেন আমার সঙ্গে একবার দেখা করে।’ এ কথা বলে, একটু হেসে বৃদ্ধা বললেন, ‘সে তো জানে, আমি হাঁটুর ব্যথায় ওপরে উঠতে পারি না। রোজ রাতে ওর হিল পরা জুতোর ঠক ঠক শব্দ শুনি। মাঝরাতে সে যে কী করে সেই জানে! আমি নীচ থেকে ডাকি, কিন্তু সে সাড়া দেয় না। কতদিন তাকে দেখিনি...’
বৃদ্ধার কথা শুনে রাজর্ষি অনুমান করল, বয়সজনিত কারণে বৃদ্ধার মাথায় সত্যিই একটু গন্ডগোল শুরু হয়েছে। কিন্তু আগের দিনের মতোই সে বৃদ্ধাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘ঠিক আছে। দেখা হলে আমি তাকে কথাটা বলে দিচ্ছি।’
ওপরে উঠে এল রাজর্ষি। কোনার ঘরের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সে ভালো করে খেয়াল করল বারান্দার গায়ের ঘরগুলোকে। তাদের জানলা ভিতর থেকে আর দরজাগুলো বাইরে থেকে বন্ধ। ঘরগুলোর ভিতর কেউ আছে বলে মনে হয় না তার। এরপর দরজা খুলে রাজর্ষি নিজের ঘরে প্রবেশ করল প্রতিদিনের মতো প্রথমে জানলা খুলল সে।
রাজর্ষি চোখ গেল সিলিংয়ের দিকে। প্রতিদিনের মতোই মূর্তির ঠিক মাথার ওপর কড়িকাঠ থেকে ঝুলছে বাদুড়টা। যে একবার নড়ে ওঠে তাকাল রাজর্ষির দিকে। যেন সে এতক্ষণ ধরে রাজর্ষির অপেক্ষাতেই ছিল।
এই কয়দিন আর কোনও সময় নষ্ট করা যাবে না। পরিকল্পনামতো দ্রুত কাজ শেষ করতে হবে রাজর্ষিকে। সে অন্য কিছু আর না ভেবে মূর্তিটার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। উঠিয়ে ফেলল মূর্তির গায়ের চাদরটা। প্রতিদিনের মতোই কাজ শুরু করার আগে মূর্তিটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। না কোনও অসঙ্গতি ধরা পড়ল না তার চোখে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজ শুরু করে দিল রাজর্ষি। যথাসম্ভব মনোযোগ দিয়েই কাজ করতে লাগল সে। মাঝে দুপুরে খাওয়া আর বিশ্রামের জন্য কিছুটা সময় বিরতি নিল সে, তারপর আবার কাজ।
তারই মধ্যে রাজর্ষির যে কবার মাথার ওপর দিকে দৃষ্টি গেল, সে কবারই তার মনে হল বাদুড়টা যেন তাকিয়ে তার কাজ দেখছে! তবে বাদুড়ের ব্যাপারে মনসংযোগ করার মতো সময় তার হাতে নেই। তাই সারাদিন নিজের কাজেই মগ্ন রইল সে।
দিন শেষে ওই বাদুড়টার ডানা ঝাপটানোর শব্দেই হুঁশ ফিরল তার। জানলা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল প্রাণীটা, আর ঠিক সেই সময় রাজর্ষির কাজও শেষ হয়ে গেল। এদিন শেষ বিকালে কাজ শেষ হবার পর রাজর্ষি বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মূর্তিটার দিকে।
মূর্তির মুখমণ্ডল বাদে তার শরীরের সর্বাঙ্গের কাজ নিখুঁত ভাবে সম্পন্ন করেছে রাজর্ষি। সত্যি সে রক্ত-মাংস, শিরা, উপশিরা সবই ফুটিয়ে তুলেছে কাঠের মূর্তিটার মধ্যে বাটালির সূক্ষ্ম আঘাতে। ফুটিয়ে তুলেছে নারী দেহের সামান্য ভাঁজ পর্যন্ত। যা পুরুষকে হাতছানি দেবে, মনে মনে কামার্ত করে তুলবে!
নিজের কাজ দেখে মনে মনে খুশিই হল রাজর্ষি। তার মনে হল হয়তো সত্যিই ভার্গব স্যারের এ মূর্তি দেখার কোনও প্রয়োজন নেই, এমনই নিখুঁত হয়েছে তার শিল্পকর্ম। এখন শুধু শেষ কাজটা অর্থাৎ মুখমণ্ডলের কাজটা করে ফেলতে পারলেই তার কাজ শেষ হয়ে যাবে। এই ভাবনা নিয়েই এইদিন সন্ধ্যায় ঘর ছাড়ল সে।
সারাদিন ধরে এক নাগাড়ে দাঁড়িয়ে কাজ করা কম পরিশ্রমের বিষয় নয়। বাড়ি ফিরে রাত ন’টার মধ্যে খাওয়া সেরে রাজর্ষি পরদিনের কাজের কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ে। পরিশ্রান্ত থাকার কারণে গাঢ় ঘুম নেমে আসে তার চোখে।
কাজের আশি শতাংশ সম্পন্ন হয়ে গেছে বলে বেশ একটু আনন্দ মন নিয়েই, পরদিনের পরিকল্পনার কথা ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল রাজর্ষি। সাধারণত এক টানা ঘুমেই তার ভোর হয়ে যায়। কিন্তু এ রাতটা তেমন কাটল না রাজর্ষির। নানান রকম অদ্ভুত, অবাস্তব স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যেতে লাগল তার। কখনও সে স্বপ্ন দেখল যে মূর্তির গায়ে বাটালির আঘাত করতেই তার গা থেকে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল! জীবন্ত হয়ে ওঠে মূর্তিটা আর্তনাদ করে উঠল, ‘একী! তুমি আমাকে খুন করবে নাকি?’ মূর্তির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল সেটা তো আসলে মূর্তি নয়, সে আঘাত করছে মরিয়মকে!
কখনও সে স্বপ্নের মধ্যে দেখল মরিয়মের বৃদ্ধা ঠাকুমা তাঁর গায়ের কালো চাদরটা দেহের দু’পাশে বাদুড়ের ডানার মতো মেলে ধরে ওড়াউড়ি করছে ঘরের মধ্যে রাজর্ষির মাথার ওপর। আর তাকে জিগ্যেস করছে, ‘আমার নাতনি কোথায়? নাতনি কোথায়?’
কোন একবার সে স্বপ্ন দেখল, ভার্গব স্যার মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে কী কারণে যেন ভয়ংকর তিরস্কার করছেন। রাজর্ষি তাকে বারবার করে বলছে, ‘আমি তো যেমন দেখেছি ঠিক তেমনই বানিয়েছি মূর্তিটা।’ কিন্তু তার কোনও কথাই শুনছেন না ভার্গব স্যার!
এমন আরও নানা অদ্ভুত টুকরো টুকরো স্বপ্ন দেখে সারা রাতে বেশ কয়েকবার ঘুম ভেঙে গেল রাজর্ষির। তবে শেষ রাতের দিকে তার চোখে গাঢ় ঘুম নেমে এল। কাজেই এদিন সকালে ঘুম ভাঙতে খানিকটা দেরি হল তার। সে যখন ঘুম থেকে উঠল তখন প্রায় ন’টা বাজে। রাজর্ষি তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল তার কাজের জায়গাতে পৌঁছোনোর জন্য।
বৃদ্ধা যেন আজ রাজর্ষি কখন আসবে সে জন্যই অপেক্ষা করে বারান্দায় ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর গায়ে গতদিনের সেই কালো চাদরটা। তাকে দেখে গত রাতের দেখা স্বপ্নগুলোর মধ্যে একটা স্বপ্নর কথা মনে পড়ে গেল রাজর্ষির। ওই সেই বৃদ্ধার উড়ে বেড়ানো স্বপ্নটা। যা দেখে ভয় পেয়ে ঘুম ভেঙে গেছিল রাজর্ষির। এখন অবশ্য সে সেই স্বপ্নের কথা ভেবে মনে মনে হাসল, বাস্তবের নানা জিনিস, দৃশ্য মিলেমিশে স্বপ্নের ভিতর কেমন সব অদ্ভুত রূপ নেয় সে কথা ভেবে।
রাজর্ষি বারান্দায় উঠতেই তিনি বললেন, ‘কাল তুমি ওকে বলেছিলে আমার সঙ্গে ওকে দেখা করার কথা? কই সে তো এল না?’
রাজর্ষি এ প্রশ্নের জবাবে বলল, ‘কাল আমার সঙ্গে তার দেখা হয়নি। সে কাজে বেরিয়ে গেছিল মনে হয়। আজ দেখা হলে আমি তাকে জানাব আপনার কথা।’
বৃদ্ধা বলল, ‘হ্যাঁ, বোলো। সে মনে হয় উপরেই আছে। সারারাত তার হেঁটে-চলার ঠক ঠক শব্দ শুনেছি হল আমি। ভোর বেলা থেকেই তাকে ধরব বলে বারান্দাতে বসে আছি। কিন্তু তাকে নামতে দেখিনি।’
মরিয়মের আজ সন্ধ্যায় রাজর্ষি সামনে দাঁড়ানোর কথা। তবে কি সে কাজে যায়নি? বাড়িতেই আছে? ঠাকুমার কথাটা সত্যি না প্রলাপ সে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না। রাজর্ষি বৃদ্ধাকে বলল, ‘সে যদি উপরে থাকে তবে আমি তাকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
রাজর্ষির কথা শুনে বৃদ্ধা সম্ভবত কিছুটা আশ্বস্ত হলেন, সে বারান্দা থেকে তিনি পা বাড়ালেন তার ঘরে যাবার জন্য। রাজর্ষি সিঁড়ি বেয়ে উঠে পড়ল দোতলায়। দেখল ওপরের ঘরগুলো আগের মতোই বাইরে থেকে বন্ধ। সেখানে কেউ আছে বলে মনে হয় না। রাজর্ষির কাজের ঘরে লাগোয়া যে ঘর থেকে মরিয়ম ভিতর দিকে দরজা দিয়ে কাজের ঘরে প্রবেশ করে তার দরজাও বাইরে থেকে বন্ধ। সম্ভবত মরিয়ম ফিরে এসে এ-ঘরে ঢোকে তারপর দুটো ঘরের মাঝের দরজা দিয়ে কাজের সময় রাজর্ষির সামনে আবির্ভূত হয়।
ততদিনে এমনই ধারণা হয়েছে রাজর্ষির। তবে পাশের ঘরটাই মরিয়মের বেডরুম কিনা তা জানা নেই রাজর্ষির। কাজের ঘরে ঢোকার আগে রাজর্ষি ভেবে নিল, যে আজ ঠাকুমার ব্যাপারটা বলবে মরিয়মকে। বৃদ্ধার চিকিৎসার জন্য যদি আরও টাকার প্রয়োজন থাকে তবে তার বকেয়া টাকাটা রাজর্ষি এক-দুদিনের মধ্যেই দিয়ে দিতে পারে মরিয়মকে।
ঘরে ঢুকল রাজর্ষি। মাথার উপর বাদুড়টাকেও রোজকার মতো দেখল। যেমন ঝুলন্ত অবস্থায় রাজর্ষির দিকে তাকিয়ে থাকে প্রাণীটা। অন্তত রাজর্ষির তেমনই মনে হয়। মূর্তিটা আগের মতোই ঢাকা দেওয়া রয়েছে। দুটো ঘরের মাঝের দরজা আগের মতোই পাশের ঘরের দিক থেকে বন্ধ। চারপাশে তাকিয়ে তার ও-ঘরের সবকিছু অন্য দিনের মতোই স্বাভাবিক বলেই মনে হল। রাজর্ষি এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মূর্তিটার কাছে৷ সরিয়ে ফেলল মূর্তির গায়ের আবরণটা। আজ থেকে তার মূর্তির মুখমণ্ডলের কাজ শুরু করার কথা। কিন্তু রোজকার মতো প্রথমে মূর্তিটাকে দেখতে গিয়ে হতভম্ব হয়ে গেল রাজর্ষি। আবারও মূর্তির তলপেটটা স্ফিত লাগছে দেখতে। শুধু তলপেট নয়, মূর্তির পুরো পেটটাকে নিয়েই একটা ফোলা ফোলা ভাব! পর পর তিনবার একই কাণ্ড কী ভাবে ঘটা সম্ভব!
অবাক হয়ে মূর্তিটার পেটের দিকে তাকিয়ে থাকার পর সে জায়গায় হাত বুলিয়ে বুঝতে পারল ব্যাপারটা তার দৃষ্টি বিভ্রম নয়, সত্যি জায়গাটা ফুলে গেছে!
রাজর্ষি এরপর মূর্তির কাছ থেকে সরে এসে কিছুটা তফাতে রাখা আছে চেয়ারটার উপর ধপ্ করে বসে পড়ল। হ্যাঁ, সে জায়গাতে বসেও সে দেখতে পাচ্ছে মূর্তির পেটটা ফোলা! সেদিকে তাকিয়ে রাজর্ষি ব্যাপারটার কারণ খোঁজার চেষ্টা করতে লাগল এবং এই ঘটনার সমাধান কী ভাবে করা যায় তা ভাবতে লাগল। সময় এগিয়ে চলল।
ঘণ্টাখানেক পর রাজর্ষির একটা কারণ মনে হল মূর্তিটার পেট ফুলে যাওয়া সম্বন্ধে। যদিও সে ভাবনার বাস্তবতা কতটা তা জানা নেই রাজর্ষির। তবু তার মনে হল এমন হতে পারে যে কাঠের লগটা দীর্ঘদিন হয়তো ভার্গব স্যারের গুদামে পড়ে ছিল। আর সেই কারণে হয়তো সেখানে থাকার সময় কোনও ভাবে জলের স্পর্শ পেয়েছিল গুঁড়ির ওই অংশটা। আর সে কারণেই জায়গাটা মাঝে মাঝে ফেঁপে উঠছে!
কিন্তু এই সমস্যার সমাধান কী? এখন তো আর নতুন করে মূর্তি তৈরি করার সময় নেই। এরপরই রাজর্ষির খেয়াল হল এই সমস্যা রোধ করার জন্য এক ধরনের কেমিক্যাল বা রাসায়নিক পাওয়া যায়, যা কাঠের ভেজা ভাব দূর করে তার ফুলে ওঠা রোধ করে। অনেক ভাস্কর ওই রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারও করেন।
এ সমস্যা দূর করার জন্য এবং তা কোন দোকানে পাওয়া যাবে সেটাও তারা জানা। তবে সেটা কাঠের গায়ে মাখাবার আগে ওই ফোলা ভাবটা চেঁছে ফেলতে হবে রাজর্ষিকে। তারপর ও জায়গাতে প্রলেপ দিলে একই রকম থেকে যাবে জায়গাটা।
রাজর্ষি পরদিন সকালেই সেই রাসায়নিকটা নিয়ে হাজির হবে বলে ঠিক করে নিল। এরপর সে চেয়ার ছেড়ে এগিয়ে গেল মূর্তির ফুলে ওঠা পেটটা চেঁছে ফেলার জন্য।
কাজ শুরু করল রাজর্ষি। ধীরে ধীরে সাবধানে চেঁছে ফেলে দিল ফুলে থাকা বাড়তি অংশ। তার পর কাছ থেকে দূর থেকে ভালো করে দেখল মূর্তিটাকে। সে কিছুটা আশ্বস্ত হল এই ভেবে যে মূর্তিটাকে আবার আগের মতোই লাগছে। তবে মূর্তিটার পেট ফুলে যাবার কারণটার ব্যাপারে সে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হতে পারল না।
সে এ-ঘরে ঢোকার পর ঘণ্টা তিনেক সময় কেটে গেছে। সঙ্গে আনা দুপুরের খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য তার চেয়ারটায় বসল। অবশ্য এখন আর রাজর্ষির কোনও কাজ নেই। তার কাজ শুরু হবে মরিয়ম আসার পর।
মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে তার পেট ফুলে যাবার অন্য কোনও কারণ থাকতে পারে কিনা তা ভাবতে লাগল রাজর্ষি। হয়তো রাতে ঘুম না আসার কারণেই অথবা পরিশ্রমের ক্লান্তিতে কেমন যেন ঘুম পেতে লাগল তার। চেয়ারটাকে টেবিলের কাছে টেনে নিয়ে গিয়ে টেবিলের উপর একটু মাথা গুঁজতেই রাজর্ষির চোখে ঘুম নেমে এল।
মাথার ওপর একটা ঝটপট শব্দে রাজর্ষির ঘুম ভাঙল। চোখ মেলেই সে দেখতে পেল আধো অন্ধকার ঘর ছেড়ে বাদুড়টা বাইরে বেরিয়ে গেল। জানলার ওপাশে সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। রাজর্ষি তাড়াতাড়ি চোখ মেলে উঠে দাঁড়াল। এতটা সময় যে কেটে গেছে তা সে বুঝতেই পারেনি।
ঘড়িতে প্রায় সাড়ে পাঁচটা বাজে! মরিয়ম নিশ্চয়ই এসে পড়বে। রাজর্ষি এগিয়ে গিয়ে ঘরের বাতি জ্বালিয়ে দিল। উজ্জ্বল আলোতে ভরে উঠল ঘর। রাজর্ষি তার চেয়ারটা আবার নিজের জায়গায় আনল। আর ঠিক তার পরই পাশের ঘরের দরজা খুলে মরিয়ম ঘরে প্রবেশ করল।
যথারীতি পরস্পরকে তারা শুভ সন্ধ্যা বিনিময় করল। তাকে দেখে রাজর্ষির হঠাৎ বৃদ্ধার কথা মনে পড়ে গেল। কাজ শুরু আগে তাই সে তাকে বলল, ‘ইদানীং আপনার ঠাকুমার মাথাটা কি একটু বেশি গন্ডগোল করছে? দু-দিন ধরে ওঁর সঙ্গে দেখা হলেই উনি বলছেন আমি যেন আপনাকে বলি যে ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য! তাঁর নাকি আপনার সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি!’
মরিয়ম, রাজর্ষির কথার জবাব দিতে গিয়েও যেন মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে থেমে গেল। তারপর মূর্তিটার কাছে এগিয়ে আঁতকে ওঠার ঢঙে বলল, ‘এ বাবা! আপনি এ কী করেছেন?’
রাজর্ষি তার কথা শুনে মূর্তিটার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, ‘কী করেছি?’ মরিয়ম মূর্তি পেটের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘ওর পেটটা অমন সরু করে ফেলেছেন কেন? এটা কি কোনও বিশেষ ধরনের আর্টের ব্যাপার?’
রাজর্ষি মূর্তিটার কাছে এসে তার পেটের দিকে তাকাল। হ্যাঁ, হঠাৎই তার নিজের চোখেও বেশ সরু মনে হচ্ছে মূর্তির পেটটা। চোখ কচলে রাজর্ষি ভালো করে তাকাল মূর্তির পেটের দিকে। সে বুঝতে পারল মরিয়ম মিথ্যা বলছে না। মাহেঞ্জোদারোর বিখ্যাত ড্যান্সিং গার্ল-এর মূর্তির মতোই সরু লাগছে মরিয়মের মূর্তির পেটটা!
রাজর্ষি হতবাক হয়ে গেল। তবে কি সে ফোলা অংশটা বারবার চাঁছতে গিয়ে এ কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলল। নিশ্চয়ই তাই হবে। এ কথাই মনে হল রাজর্ষির। সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভুলের জন্য রাজর্ষির বুকটা ধক্ করে উঠল। এবার কী করবে সে? যারা মূর্তি বানাতে দিয়েছেন তারা তো ‘পিওর রিয়েলেস্টিক’ মূর্তি চেয়েছেন তার কাছে। হুবহু নারী শরীরের সে মূর্তি দেখে তাদের হোটেল-পানশালায় ফুর্তি করতে আসা কাস্টমারদের মধ্যে যৌন উন্মাদনার সৃষ্টি হবে। কিন্তু এ ঘটনার পর মূর্তিটা তো আর রিয়েলেস্টিক রইল না। সেমি রিয়েলেস্টিক হয়ে গেল।
ভার্গব স্যারের বলা নির্দেশ মনে পড়ে গেল রাজর্ষির। লোকগুলো ওসব শিল্পটিল্প বোঝে না। মূর্তিটা বড় সুন্দর হতে হবে, অর্থাৎ যা দেখে তাদের মনে যৌন উন্মাদনা জাগবে। কিন্তু পেট সরু এই নারী মূর্তি তো সে উন্মাদনা জাগাতে সক্ষম হবে না!
মরিয়মের কথার জবাবে রাজর্ষি উদ্বিগ্ন স্বরে বলল, ‘কাজ করতে গিয়ে আমার সম্ভবত ভুল হয়ে গেছে! আসলে পেটের কাছটা মাঝে মাঝেই ফুলে উঠছিল। সম্ভবত কাঠের ওই অংশটাতে ড্যাম্প ধরেছে। আমি ফুলে ওঠা জায়গাটা চেঁছে ফেলতে গিয়ে এই কাণ্ডটা করে ফেললাম। ভাবছি আমি এখন কী করি? মূর্তিটা তো এভাবে ওদের দেওয়া যাবে না। টাকাটা না-হয় আমি ওদের ফেরত দিলাম, কিন্তু আমার এই কাজের সঙ্গে তো ভার্গব স্যারের মান-সম্মান জড়িত।’
রাজর্ষির কথা শুনে মরিয়ম বলল, ‘একটা কাজ করুন না। আপনি ভার্গব স্যারকেই বলুন না। তিনি এসে দেখে যান মূর্তিটা। তিনি বড় ভাস্কর-শিল্পী। তিনি হয়তো কোনও পন্থা দিতে পারবেন জায়গাটা মেরামত করার?’
মরিয়মের কথাটা মনে ধরল রাজর্ষির। সে বলল, ‘হ্যাঁ, সেটাই সম্ভবত একমাত্র পথ। আমি এখনই ফোন করছি তাঁকে।’ এই বলে পকেট থেকে মোবাইল ফোনটা বার করল রাজর্ষি।
সে ভার্গব স্যারকে কল করতে যাচ্ছিল তার আগেই মরিয়াম তার উদ্দেশ্যে বলল, ‘এক মিনিট দাঁড়ান, একটা কথা বলার আছে।’
‘কী কথা?’ প্রশ্ন করলে রাজর্ষি।
মরিয়ম একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘ওঁকে রাতে আসার কথা বলবেন। আমি থাকার চেষ্টা করব।’
মরিয়মের মুখে এই উল্টো কথা শুনে রাজর্ষি বিস্মিত ভাবে বলে উঠল, ‘আপনি থাকবেন!’ মরিয়ম বলল, ‘থাকতাম না। কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি তাতে আমার মনে হচ্ছে যে ঝুঁকি নিয়ে হলেও আমার এখানে থাকা দরকার। মূর্তিটা তো আমাকে দেখেই তৈরি করা। আমি থাকলে হয়তো ভার্গব স্যারের ত্রুটি সংশোধনের কাজে সুবিধা হতে পারে।’ এ কথা বলে একটু থেমে সে বলল, ‘মূর্তিটা তো আমারই। আমিই তো রয়েছি ওর মধ্যে। তাছাড়া আপনার এত দিনের পরিশ্রম, ভার্গব স্যারের সম্মান, এসব কিছু ভেবেই আমি আমার মত পরিবর্তন করলাম।’
`রাজর্ষি তার কথা শুনে কৃতজ্ঞতার স্বরে বলল, ‘আপনি উপস্থিত থাকলে অবশ্যই কাজের সুবিধা হবে আমার। যদি কোনও ভাবে পেটের ওই অংশটা ভরাট করতে হয় তবে সেটাও তো আপনাকে দেখেই করতে হবে।’
কথা বলতে বলতে ভার্গব স্যারের নাম্বারে ডায়াল করল রাজর্ষি। বার কয়েক রিং হবার পর ভার্গব স্যার কলটা রিসিভ করে বলল, ‘হ্যাঁ, বলো খবর কী? কাজ শেষ তোমার?’
রাজর্ষি বলল, ‘কাল বা পরশু আপনাকে একবার আমার কাজের জায়গাতে আসতেই হবে স্যার...’
রাজর্ষির গলায় উত্তেজনার আঁচ পেয়ে ভার্গব স্যার জানতে চাইলেন, ‘কী হয়েছে?’
রাজর্ষি বলল, ‘বড় ভুল করে ফেলেছি। মূর্তির পেটের অংশের কাঠটা বারবার ফুলে ফুলে উঠছিল। আমি চাঁছতে গিয়ে ও জায়গাটা সরু করে ফেলেছি। এখন আপনিই ভরসা স্যার।’
ভার্গব চৌধুরী সত্যিই অভিজ্ঞ ভাস্কর। এসব ত্রুটি ঢাকার কৌশল তার জানা। একটু ভেবে নিয়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘মূর্তিটা তৈরি করতে গিয়ে যে কাঠের টুকরোগুলো বেরিয়েছিল সেগুলো নিশ্চয়ই তুমি ফেলে দাওনি?’
রাজর্ষি বলল, ‘না স্যার। ঘরের কোনাতেই সব রাখা আছে।’
ভার্গব স্যার বললেন, ‘ওগুলোই কাজে লাগবে। আগে ওগুলো দিয়ে ডাস্ট বা গুঁড়ো বানাতে হবে। তারপর ওর সঙ্গে অ্যাডেসিভ বা আঠা আর একটা কেমিক্যাল মিশিয়ে মণ্ড তৈরি করে ও জায়গায় লেপে দিতে হবে। তারপর সেটা শুকিয়ে গেলে তখন তুমি জায়গাটাকে আবার বাটালি দিয়ে যে আকৃতি চাও সেই আকৃতিতে ফিরিয়ে আনতে পারবে। কাল সকালে আমাকে ফোন করো। আমি খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেব তোমাকে। তুমিই কাজটা করতে পারবে। আমি তো সারাদিন ব্যস্ত থাকি নইলে...’
তাঁকে কথা শেষ করতে না দিয়ে রাজর্ষি মরিয়া হয়ে বলল, ‘আপনাকে কিন্তু আসতেই হবে স্যার। কাল বা পরশু সন্ধ্যার পর। মডেলও থাকবে ওসময়। আমি সব জোগাড় করে রাখব। কিন্তু আপনি একবার না এলে আমি কিছুতেই কাজটা করতে পারব না। তাহলে ওদের জানিয়ে দিতে হবে কাজটা আমি করতে পারিনি। টাকা আমি ওদের ফেরত দিয়ে দেব। আর এ পেশাতেও আমি থাকব না।’ একটানা কথাগুলো বলে থামল রাজর্ষি।
তার কথা শুনে ভার্গব স্যার সম্ভবত পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারলেন। তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, কাল সন্ধ্যাতে আমি যাব। তুমি হোয়াটসঅ্যাপে লোকেশন পাঠিয়ে রাখো। আর তোমাকে কী কী ব্যবস্থা করতে হবে সেটা আমি ওখানেই লিখে দিচ্ছি। বাকি কথা ফোনে বলে নেব ও জায়গাতে যাবার আগে।’ কথা বলে ফোনের লাইন কেটে দিলেন তিনি।
তিনি ফোন ছেড়ে দেওয়ার পর রাজর্ষি তার কথাগুলো জানিয়ে দিল মরিয়মকে। সে বলল, ‘আমি থাকব।’
মরিয়মকে নিয়ে এদিন আর কাজ করার মতো পরিস্থিতি ছিল না রাজর্ষির। সেটা বুঝতে পেরেই এরপর রাজর্ষির থেকে বিদায় নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল মরিয়ম। রাজর্ষি প্রথম দিন এ-বাড়িতে আসার সময় তার বাটালি, হাতুড়ি ইত্যাদি যন্ত্রপাতি যে চটের থলেতে ভরে এনেছিল, সেই থলেতে ঘরের কোণে রাখা কাঠের গুঁড়ি থেকে খসিয়ে ফেলা টুকরোগুলো ভরতে লাগল।
এই কাজ করতে করতে সে আবার মাথার উপর ঝটপট্ শব্দ শুনতে পেল। সে দেখল বাদুড়টা আবার ঘরে ঢুকে মূর্তির মাথার ওপর নিজের জায়গাতে ঝুলে পড়ল। সে জায়গা থেকে সে যেন লক্ষ করতে লাগল রাজর্ষিকে।
কাঠের টুকরোগুলো সংগ্রহ করার পর রাজর্ষি মূর্তিটাকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দিল। তারপর জানলা বন্ধ করে বাতি নিভিয়ে কাঠের টুকরো ভর্তি বস্তাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বাড়ি ফেরার জন্য। এদিন ট্যাক্সি নিয়েই বাড়ি ফিরতে হল তাকে। ভার্গব স্যারের নির্দেশ মতো সে লোকেশন পাঠিয়ে দিল। উত্তেজনায় এ রাতেও ভালো ঘুম হল না রাজর্ষির।
ভার্গব চৌধুরী দায়িত্ববান মানুষ। রাজর্ষি ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই সকাল সাতটা নাগাদ হোয়াটসঅ্যাপে তার মেসেজ চলে এল। কোথায় গিয়ে কী করতে হবে সেই নির্দেশ তিনি দিয়ে দিলেন রাজর্ষিকে। এর সঙ্গে তিনি এটাও জানিয়ে দিলেন যে আজ তিনি যাচ্ছেন মূর্তিটাকে মেরামত করার জন্য। তবে নিজের কাজ সেরে সেখানে পৌঁছতে সন্ধ্যা উতরে যাবে। রাজর্ষি যেন তাঁকে বাড়িটাতে তাকে নিয়ে যাবার জন্য রাত আটটা নাগাদ বিরাটির মোড়ে উপস্থিত থাকে।
রাজর্ষির দুপুর পর্যন্ত সময় ব্যস্ততার মধ্যেই কেটে গেল৷ ভার্গব স্যারের নির্দেশ মতো তাকে প্রথমে যেতে হলে উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার এক মিল বা করাত কলে। যন্ত্রের সাহায্যে সেখানে কাঠের টুকরোগুলোকে গুঁড়ো করা হল। পাঁচ কেজি মতো কাঠের গুঁড়ো।
কাজটা করাতে তার বেশ কয়েক ঘণ্টা সময় লাগল। তারপর সেই কাজ সেরে তাকে যেতে হল শিয়ালদার কাছে কোলে মার্কেটের এক দোকানে আঠা বা অ্যাডেসিভ ও মণ্ড বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সংগ্রহের জন্য। এসব কাজ যখন মিটল তখন বেলা প্রায় একটা বাজে। রাজর্ষি তাই সিদ্ধান্ত নিল যে আর জিনিসগুলো রাখার জন্য এত বেলাতে মরিয়মের বাড়ি যাবে না। ভার্গব স্যারকে নিয়ে একেবারেই সে ওই বাড়িতে উপস্থিত হবে।
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সংগ্রহ করে প্রথমে নিজের বাসাতেই ফিরে এল। খাওয়া সেরে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সে বিছানাতে শুল ঠিকই, কিন্তু প্রচণ্ড উৎকণ্ঠা উত্তেজনা বোধ করতে লাগল সে। রাজর্ষি ভাবতে লাগল ভার্গব স্যার মূর্তিটা দেখে তাকে কেমন তিরস্কার করবেন কে জানে। সবথেকে বড় কথা শেষ পর্যন্ত মূর্তিটা মেরামত করা যাবে তো? নইলে কী হবে?
এই ভয়টা সময় যত এগোতে লাগল তত যেন চেপে বসতে লাগল রাজর্ষির মনে। দুপুর গড়িয়ে বিকাল হল এক সময় তারপর সন্ধ্যাও নামল। উত্তেজনায় যেন খই ফুটছে রাজর্ষির মনে। সন্ধ্যা ছ’টা বাজতেই বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল রাজর্ষি। আধ ঘণ্টার মধ্যে সে তার ব্যাগপত্তর নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল।
ট্যাক্সি নিয়ে যখন সে বিরাটির মোড়ে উপস্থিত হল তখন সবে সাতটা বেজেছে। সেখানে পৌঁছেই সে ভার্গব স্যারের হোয়াটসঅ্যাপে খবরটা পাঠিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে জবাব এল, তিনি বাড়ি থেকে বেরোচ্ছেন। মোড়ের এক পাশে দাঁড়িয়ে সে প্রতীক্ষা করতে শুরু করল তাঁর অপমানের জন্য। নানা ভাবনা দুর্ভাবনার কারণে বেশ উত্তেজিত বোধ করতে লাগল সে।
সময় এগিয়ে চলল তার সঙ্গে সঙ্গে জাঁকিয়ে ঠান্ডা নামতে শুরু করল চারপাশে। এক ঘণ্টা সময় কেটে গেল একসময়। ওই আটটা নাগাদই রাজর্ষির সামনে দাঁড়াল ভার্গব স্যারের গাড়ি। নিজেই ড্রাইভ করে এসেছেন তিনি। জানলার কাচটা নামিয়ে তিনি রাজর্ষিকে নির্দেশ দিলেন গাড়ির পিছনের সিটে উঠে পড়ার জন্য। রাজর্ষি তাই করল।
বিরাটির মোড় থেকে মরিয়মের বাড়ি যাওয়ার গলির সামনে পৌঁছোতে পাঁচ মিনিট সময় লাগল। ও অঞ্চলের রাস্তা-ঘাট এর মধ্যেই ফাঁকা হতে শুরু করেছে। হয়তো বেশি ঠান্ডা পড়ার জন্যই। রাস্তার একপাশে গাড়ি পার্ক করার পর তারা দুজন গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ভার্গব স্যার শুধু একবার তাকে প্রশ্ন করলেন, ‘যে জিনিসগুলোর কথা বলেছিলাম তা সব জোগাড় করেছ তো?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘হ্যাঁ স্যার সব।’
রাজর্ষি এরপর তাকে নিয়ে প্রবেশ করল গলির ভিতরে। রাত আটটা বাজে। কিন্তু এর মধ্যেই সারা পাড়া যেন ঘুমিয়ে পড়েছে। জাঁকিয়ে শীত পড়েছে বলেই হয়তো বা দরজা-জানালা সব বন্ধ। কোথাও কোনও লোক নেই। কুয়াশাও নামতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। আলোগুলো আরও ফ্যাকাসে লাগছে তার জন্য। সেই পথ ধরে ভার্গব স্যারকে সঙ্গে নিয়ে রাজর্ষি একসময় পৌঁছে গেল গলির শেষ প্রান্তে তার গন্তব্যে। পাতলা কুয়াশার চাদর গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে বাড়িটা। একতলার বারান্দাতে একটা ক্ষয়াটে বাতি জ্বলছে যেমন জ্বলে। রাজর্ষি তাঁকে বলল, ‘স্যার ওই বাড়িটা আমার স্টুডিও।’
কথাটা শুনে ভার্গব স্যার বললেন, ‘তুমি আর অন্য কোথাও ঘর খুঁজে পাওনি! এ তো মনে হয় শহরের শেষ সীমানায় গঙ্গার ধারে পৌছে গেছি!’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘হ্যাঁ স্যার বাড়ির ঠিক পিছনেই গঙ্গা।’
ভার্গব স্যারকে নিয়ে বারান্দায় প্রবেশ করতে রাজর্ষি দেখল মরিয়মের ঠাকুমা সেখানে দাঁড়িয়ে আছেন। রাজর্ষিদের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি তার হাতটা চোখের সামনে তুলে ওদের দেখার চেষ্টা করে বলেন, ‘কে কে?’
রাজর্ষি জবাব দিল, ‘আমি ঠাকুমা। কাজ করতে এসেছি।’
চোখে দেখতে না পারলেও তার কণ্ঠস্বর চিনতে পারলেন বৃদ্ধা। তিনি বললেন, ‘ও তুমি! একবার সোনালিকে উপর থেকে নীচে আসতে বলো তো। সন্ধ্যা থেকে এসে হিল জুতো পরে খট্ খট্ শব্দে উপরের বারান্দায় হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি ডাকছি কিন্তু সে সাড়া দিচ্ছে না। বৃদ্ধার কথা শুনে রাজর্ষি বলল, ‘আমি তাকে বলে দিচ্ছি। আজ খুব ঠান্ডা পড়েছে। আপনি ঘরে যান।’
তার কথা শোনার পর ঘরে ঢোকার জন্য পিছু ফিরলেন বৃদ্ধা, আর রাজর্ষি ভার্গব চৌধুরীকে নিয়ে এগোল সিঁড়ির সে দিকে। ব্যাগ হাতে নিয়ে কাঠের সিঁড়িতে বেশ জোরে জোরে পা ফেলে শব্দ তুলে উপরে উঠতে শুরু করল রাজর্ষি যাতে তাদের আগমন বার্তা পৌঁছে যায় মরিয়মের কাছে।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় ভার্গব স্যার জানতে চাইলেন, ‘এই বৃদ্ধা কে? সোনালি কে?’ রাজর্ষি জবাব দিল, ‘সোনালি হল আমার মডেল আর বৃদ্ধা হলেন ল্যান্ড লেডি, আমার মডেলের গ্র্যান্ড মাদার।’
রাজর্ষি মনে মনে খুশি হল বৃদ্ধা ‘মরিয়ম’ বলেনি বলে। যদিও মরিয়ম আজ থাকবে বলেছে কিন্তু যে নামে সবাই তাকে চেনে সেই নাম সে ভার্গব স্যারের কাছে প্রকাশ করবে কিনা তা রাজর্ষির জানা নেই।
দোতলায় উঠে এল তারা দুজন। আলো জ্বলছে না সেখানে, তবে বাড়ির ঠিক সামনের ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে বারান্দায়। দোতলায় ওঠার পর ভার্গব স্যার আবার মন্তব্য করলেন, ‘এ তো একেবারে হন্টেড হাউস মনে হচ্ছে! সাপখোপের উপদ্রব নেই তো!’
রাজর্ষি তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘না স্যার, ওসবের উপদ্রব নেই।’
ভার্গব স্যারকে ঘরের বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে প্রথমে দরজা খুলল রাজর্ষি। ব্যাগ রেখে ঘরের আলো জ্বালিয়ে দিল সে। তারপর জানলাটা খুলে দিল ঘরের গুমোট ভাবটা কাটিয়ে ফেলার জন্য। এরপর মূর্তিটার দিকে এক ঝলক তাকাল সে।
মূর্তিটা একই রকম ঢাকা দেওয়া। ঠিক যেমন গত রাতে ঢাকা দিয়ে গেছিল সে। এরপর তাকাল মাথার উপর কড়িকাঠের দিকে। বাদুড়টা সেখানে নেই। তাকে মাথার উপর থেকে ঝুলতে দেখলে ভার্গব স্যারের কী প্রতিক্রিয়া হবে তা রাজর্ষির জানা নেই। কাজেই সে খুশিই হল বাদুড়টাকে না দেখে। এরপর সে ভার্গব সারের উদ্দেশ্যে বলল, ‘স্যার, ভিতরে আসুন।’
ভার্গব চৌধুরী ঘরের ভেতর পা রাখলেন। চারপাশ ভালো করে একবার তাকালেন তিনি। কাপড় ঢাকা দেওয়া মূর্তিটার দিকেও তাকালেন তারপর জানলার দিকে তাকালেন। রাজর্ষি তাঁর উদ্দেশ্যে বলল, ‘মডেল মেয়েটাকে ডাকি স্যার?’
ভার্গব চৌধুরী এগিয়ে গিয়ে জানলার ধারে গিয়ে গঙ্গা বক্ষের দিকে উঁকি দিলেন। তারপর সম্মতি প্রকাশ করলেন তার কথায়। রাজর্ষি গিয়ে দাঁড়াল পাশের ঘরে যাওয়া-আসার দরজার সামনে। তারপর দরজায় মৃদু ধাক্কা নাড়া দিয়ে বলল, ‘ম্যাডাম শুনছেন? স্যার এসেছেন।’
দরজায় ধাক্কা দিয়ে রাজর্ষি বেশ কয়েকবার তাকে ডাকল। যদিও তার নাম উচ্চারণ করল না সে। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। এরপর সে একটু জোরে ধাক্কা দিতেই দরজাটা যেন কীভাবে খুলে গেল। এঘর থেকে এক ফালি আলো গিয়ে পড়ল পাশের ঘরটাতে। সেই আলোতে রাজর্ষি দেখল এতদিন যে পাশের ঘরটাকে মরিয়মের বেডরুম অথবা বিশ্রামের রুম ভেবেছিল সেটা আসলে সিঁড়ি ঘর। কাঠের সিঁড়ি সে ঘর থেকে উপরে উঠে গেছে অপর দিকে অর্থাৎ বাড়িটার তিনতলায় কোনও ঘর আছে কিনা আর মরিয়ম সেখানেই থাকে কিনা তা জানা নেই রাজর্ষির।
সিঁড়িটা ওপর দিকে উঠে অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছে। ব্যাপারটা দেখে বেশ খানিকটা অবাক হল রাজর্ষি। তার সঙ্গে সঙ্গে মরিয়ামের কোনও সাড়া না পাওয়ায় ভার্গব স্যারের সামনে মৃদু অপ্রস্তুত বোধ করল সে। ভার্গব স্যারের উদ্দেশ্যে সে বলল, ‘আমার মনে হয় ও এখনই চলে আসবে।’
ভার্গব চৌধুরী বললেন, ‘হ্যাঁ, তার থাকা দরকার। তুমি এবার কাপড়টা সরিয়ে ফেলো। মূর্তিটা দেখি।’
মূর্তিটার কাছে এগোবার জন্য ঘরের দু-দিক থেকে একসঙ্গে পা বাড়াতে যাচ্ছিল তারা। ঠিক সেই সময় খোলা জানালা দিয়ে হঠাৎই যেন এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস প্রবেশ করল ঘরে। আর সেই বাতাসে মূর্তির গা থেকে খসে পড়ল তার গায়ের কাপড়টা। আর সঙ্গে সঙ্গে রাজর্ষি আর ভার্গব স্যার থেমে গেলেন। কাঠের মূর্তি কোথায়? কাপড়ের আড়ালে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল একজন রক্তমাংসের নারী শরীর! সম্পূর্ণ নগ্ন তার দেহ, শুধু একটা ওড়নার মতো কাপড় দিয়ে তার মুখটা আচ্ছাদিত।
তারা দুজনেই বিস্মিত হল তাকে দেখে। ভার্গব স্যার তা দেখে রাজর্ষির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল, ‘মূর্তি কই? যে দাঁড়িয়ে আছে সে তোমার মডেল নাকি?’
নগ্নিকার মুখ ঢাকা থাকলেও রাজর্ষির এ শরীর চেনা। কারণ, এই শরীরই তো সে এতদিন ফুটিয়ে তুলেছে কাঠের মধ্যে৷ তাই সে ভার্গব স্যারের প্রশ্নের জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তা বলতে গিয়েও তাকে থেমে যেতে হল মেয়েটার পেটের দিকে চোখ পড়তেই। তার পেট-তলপেট অত্যন্ত ফোলা লাগছে। গর্ভবতী মহিলাদের যেমন দেখতে লাগে ঠিক তেমনই। কিন্তু মরিয়মের ক্ষেত্রে তা কীভাবে সম্ভব? দু-দিনের মধ্যে তার শরীর এমন হয়ে যাতে পারে নাকি? তবে কি যে দাঁড়িয়ে আছে সে মরিয়ম নয়?
রাজর্ষি ধন্দে পড়ে গিয়ে চেয়ে রইল সেই নগ্নিকার দিকে। রাজর্ষি তার পরিচয় বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। তাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে ভার্গব স্যার আবারও বললেন, ‘কে ও? মূর্তিটা কোথায়?’
রাজর্ষি কিছু জবাব দেওয়ার আগে সেই নগ্নিকা ভাৰ্গব স্যারের উদ্দেশে বলল, ‘আমাকে চিনতে পারছেন না। স্যার?’
কণ্ঠস্বরটা যে মরিয়মের তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু তার এই স্ফিত পেট কী ভাবে হল? এ ব্যাপারটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারল না রাজর্ষি।
ভার্গব চৌধুরী এবার মেয়েটাকে প্রশ্ন করল, ‘কে তুমি? মুখ না দেখালে চিনব কী করে?’
নগ্নিকা যেন হাসল, তারপর ভার্গব স্যারের উদ্দেশে বলল, ‘আমার শরীরটা দেখেও আপনি চিনতে পারছেন না? এই শরীর নিয়ে এক সময় কত খেলেছেন আপনি।’ ভার্গব স্যার বললেন, ‘তার মানে? কে তুমি? কী আবোল তাবোল বকছ? আমি তো কিছুই বুঝতে পাচ্ছি না!’
মেয়েটা আবারও জবাব দিল, ‘ভালো করে আমার শরীরটা দেখুন। নিশ্চয়ই চিনতে পারবেন।’
ভার্গব চৌধুরী এবার রাজর্ষির উদ্দেশে রুষ্ট স্বরে বললেন, ‘তুমি কি এই পাগল মহিলাকে দেখাবার জন্য আমাকে এখানে এনেছ?’
এ প্রশ্নের জবাব দিল মরিয়মের কণ্ঠ। সে বলল, ‘না, উনি নন। আপনাকে এখানে টেনে এনেছে আপনার ভবিতব্য। এখানে টেনে এনেছি আমি। যার জন্য আমার এত প্রচেষ্টা। আমি জানতাম, যে ভাবেই হোক একদিন আমি তোমাকে এখানে টেনে আনবই।’ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এল মেয়েটার সম্বোধন।
নগ্নিকার একথা শুনে ভার্গব চৌধুরী বললেন, ‘তুমি কী বলছ তা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।’
নগ্নিকা এবার জবাব দিল, ‘আমার শরীরটা দেখে যখন চিনতে পারলে না তখন আমিই তোমাকে আমার কথা মনে করিয়ে দিই। আমি সেই মেয়ে যে একদিন আর্ট কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তোমার গুণ আর রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছিল। তুমি আমাকে প্রস্তাব দিলে আমাকে তোমার কাজের মডেল হবার জন্য। ব্যাপারটা শুধু তুমি আমি জানতাম, আর জানত না কেউ। আমি পোশাক খুলে দাঁড়াতাম তোমার সামনে। তারপর তোমার-আমার সম্পর্ক আরও গাঢ় হল। আমি আমার শরীরটা সম্পূর্ণই দিয়ে দিলাম তোমাকে...’
নগ্নিকা এ পর্যন্ত বলার পরই ভার্গব চৌধুরী বলে উঠলেন, ‘কে? কে তুমি?’
রাজর্ষির মনে হল ভার্গব চৌধুরীর গলাটা যেন এবার কেঁপে উঠল।
মুহূর্তের জন্য থেমে সেই নগ্ন নারী এরপর আবার বলতে শুরু করল, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, ভালোবেসে-ছিলাম, কিন্তু তার ফল যে এমন ভয়ংকর হবে তো আমার জানা ছিল না। একদিন আমি বুঝতে পারলাম আমি “তোমার সন্তানের মা” হতে চলেছি। আমার পেটটা ফুলতে শুরু করল। কিন্তু ফোলা পেটের মেয়ে কি তোমার কাজের মডেল হতে পারে? তুমি বুঝতে পারলে আমি আর তোমার মডেল হতে পারব না। সবথেকে বড় কথা, তুমি বুঝতে পারলে আমার এই স্ফিত উদরের দায় নিতে হবে তোমাকে। আর তোমার এই বোঝাটাই আমার জীবনের কাল হল। আমাকে তুমি একদিন বেড়াতে নিয়ে গেলে কলকাতা থেকে অনেক দূরে গঙ্গার পাড়ে এক জায়গায়। আর তারপর চির জীবনের জন্য পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেল সেই মেয়েটা। এই পেটটা, এই ফোলা পেটটাই আমাকে তারপর টেনে নিয়ে গেল মৃত্যুর দিকে।’
এই শেষ কথাটা বলার সময় একটা আর্তনাদ যেন বেরিয়ে এল তার কণ্ঠ থেকে আর তারপরেই সে খুলে ফেলল তার মুখের অবগুণ্ঠন।
রাজর্ষির মুখ থেকে তার নিজের অজান্তেই যেন বেরিয়ে এল, ‘মরিয়ম, এ তো দেখছি তুমিই!’
ভার্গব স্যারের চোখে যেন আতঙ্ক মাখা বিস্ময় ফুটে উঠল এবার। তিনি কাঁপাকাঁপা স্বরে বলে উঠলেন, ‘মরিয়ম তুমি! কিন্তু এ কী ভাবে সম্ভব? আমি যে তোমাকে নিজের হাতে...’
ভার্গব চৌধুরীকে তার কথা শেষ করতে না দিয়ে মরিয়াম বলল, ‘নিজের হাতে খুন করে গঙ্গায় ফেলে দিয়েছিলে তাই তো? ধরে নাও আমি আবার সেখান থেকে উঠে এসেছি তোমারই টানে। আমার ভালোবাসা আর তোমার প্রতি বিশ্বাস তো মিথ্যা ছিল না।’ এই কথা বলে খিলখিল করে হেসে উঠল মরিয়ম।
বিস্মিত হতভম্ব রাজর্ষি দেখল ভার্গব চৌধুরী এবার মৃদু মৃদু কাঁপতে শুরু করেছেন। তাঁর চোখ বিস্ফারিত। তিনি যেন মরিয়মের উদ্দেশে কিছু বলতে চাইছেন কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনও স্বর বেরোল না। মরিয়াম এরপর তার স্ফিত উদর নিয়ে দু-হাত বাড়িয়ে ধীর পায়ে ভার্গব চৌধুরীর দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘এসো আমার কাছে এসো। আমাকে ভালোবাসো। আমার পেটে হাত বুলিয়ে দেখো। এখানে তো তোমারই ভালোবাসা রাখা আছে। বাটালি দিয়ে কি এ চিহ্ন মুছে ফেলতে পারে কোনও ভাস্কর? এসো, এসো, কাছে এসো...’
মরিয়ম কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছতে পারল না। তার আগেই প্রবল আতঙ্কে মাটিতে পড়ে স্থির হয়ে গেলেন বিখ্যাত ভাস্কর ভার্গব চৌধুরী!
মরিয়ম দাঁড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ সে মাটিতে পড়ে থাকা ভার্গব চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে থাকার পর রাজর্ষির উদ্দেশে বলল, ‘কেমন পড়ে আছে দেখছেন? ঠিক যেন একটা কাঠের মূর্তি। যাকে কেউ না নাড়ালে কোনওদিন নড়বে না। আমার কাজ শেষ, এবার আমি চলি।’ এ কথা বলে সে এগোল পাশের ঘরে যাবার জন্য।
রাজর্ষির চোখের সামনে দিয়ে অন্তর্হিত হল পাশের সিঁড়ি ঘরের অন্ধকারে। আর তারপরেই রাজর্ষি শুনতে পেল একটা ঠক্ ঠক্ শব্দ। যে শব্দের কথা মরিয়মের ঠাকুমা বলেন। সেটা কি জুতোর হিলের শব্দ? নাকি কাঠের পায়ের? দ্বিতীয়টার সম্ভাবনাই বেশি। কারণ মরিয়মের পায়ে তো কোনও জুতো ছিল না। রাজর্ষির মনে হল কাঠের কোনও মূর্তি যেন পা ফেলে ঠক্ ঠক্ শব্দ করতে করতে উপরের দিকে উঠে যাচ্ছে। মরিয়মের কাঠের মূর্তি!
শব্দটা একসময় থেমে গেল। আর তার মুহূর্তখানিকের মধ্যে আরও একটা শব্দ রাজর্ষির কানে এল। তবে সেটা ওপর থেকে নয়, নীচ থেকে। মৃদু জলোচ্ছ্বাসের শব্দ। যেন ওপর থেকে নদী বক্ষে আছড়ে পড়ল কিছু। আর তারপরই বাইরের অন্ধকার থেকে ঘরে প্রবেশ করল সেই বাদুড়টা। কড়িকাঠে গিয়ে আশ্রয় নিল সে। ওপর থেকে সে তাকিয়ে দেখতে লাগল মাটিতে পড়ে থাকা ভার্গব চৌধুরীকে। নিষ্পন্দ কাঠের মূর্তির মতো পড়ে আছেন তিনি।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন