হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

পদাতিক এক্সপ্রেস দু-ঘণ্টারও বেশি সময় লেট করল। সৃজনবাবু যখন নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনে ট্রেন থেকে যখন নামলেন, তখন বেলা প্রায় তিনটে বাজে। আসলে মাত্র তিনদিন আগে সৃজন ট্রেনের টিকিটের খোঁজ করেছিলেন। আর একমাত্র এই ট্রেনই মিলেছিল। নইলে তিনি সকালের দিকেই এখানে পৌঁছোনোর চেষ্টা করতেন। যদিও নিউ আলিপুরদুয়ার থেকে জয়ন্তী মাত্র ঘণ্টাখানেকের পথ বলেই জেনেছেন সৃজন। বিকেলবেলায় তাঁর জয়ন্তী পৌঁছে যাওয়ার কথা।
জয়ন্তীর সৌন্দর্য আর নির্জনতা নাকি অপরূপ। ভাগ্য ভালো থাকলে ওয়াইল্ড লাইফ, বিশেষত হাতির দেখা মেলে। এসবের খোঁজেই কলকাতা থেকে রওনা হয়েছেন সৃজন।
প্ল্যাটফর্মের বাইরে লাগেজ নিয়ে পৌঁছতেই তিনি দেখলেন একটা লোক হাতে প্ল্যাকার্ড ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তাতে সৃজনবাবুর নাম লেখা। ট্রেনের টিকিট আর ট্রাভেলিং এজেন্সির গাড়িটাই শুধু কলকাতা থেকে বুকিং করে আসতে পেরেছেন সৃজন। এ গাড়ি তাঁকে জয়ন্তী পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।
সৃজন লোকটার কাছে গিয়ে নিজের পরিচয় দিতেই লোকটা বলল, ‘আসুন স্যার। আমার নাম শীতল বর্মন। আমাকে পাঠানো হয়েছে আপনাকে জয়ন্তীতে পৌঁছে দিতে।’ কাছেই একটা বড় আকারের জিপের মতো গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। লোকটা এরপর সৃজনকে নিয়ে এগোল সেদিকে। লাগেজ নিয়ে ড্রাইভারের পিছনের সিটে উঠে বসলেন তিনি। গাড়ি রওনা হল জয়ন্তীর দিকে।
শহরে প্রবেশ করল গাড়ি। দক্ষিণবঙ্গের মফস্সল শহরের সঙ্গে উত্তরবঙ্গের এ-শহরের বর্তমানে খুব একটা পার্থক্য নেই। ছোটখাটো শপিং মল থেকে শুরু করে প্রাইভেট নার্সিংহোম। বহুজাতিক সংস্থার খাবারের দোকান সবই আছে।
শীতল নামের চালক সৃজনকে বলল, ‘জয়ন্তী, বক্সা টাইগার রিজার্ভের মধ্যে পড়ে। ওখানে ঢুকতে গাড়ির আর আপনার পারমিট করাতে হবে ফরেস্ট থেকে। তা ওখানে কোথায় উঠবেন স্যার? কোনও সরকারি লজ নাকি নদীর ওপারে কোনও হোম স্টেতে?’
সৃজন বললেন, ‘কোথায় থাকব সেটা এখনও ঠিক হয়নি। তোমার কোনও থাকার জায়গা চেনা থাকলে নিয়ে যেতে পারো। আসলে দোল-হোলি আর রবিবার এবার একসঙ্গে পড়ল তো। পরপর তিনদিন ছুটি। তার সঙ্গে আরও দুটো ছুটি যোগ করে হঠাৎই বেড়াতে বেরিয়ে পড়েছি। ইন্টারনেট থেকে চেষ্টা করেছিলাম থাকার জায়গা বুক করার জন্য। কিন্তু যে কয়েকটা সরকারি-বেসরকারি জায়গার খোঁজ পেলাম, তারা কেউ বুকিং নিতে রাজি হল না। আমি একলা মানুষ, একটা ঘর কোথাও নিশ্চয়ই মিলে যাবে তাই না?
গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে ড্রাইভার বলল, ‘করোনার বিধিনিষেধের জন্য তো সবকিছুই বন্ধ ছিল, বাইরে বেড়াতে যেতে পারছিল না লোকে। মাস দুই আগে নিষেধ উঠতে এখন একটু ছুটি পেলেই সবাই বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। ডুয়ার্সেও আসছে। তাই জয়ন্তীতেও টুরিস্টের বেশ চাপ আছে। তবে একটা ঘর পেতে অসুবিধা হবে না বলেই মনে হয়। জয়ন্তীর ওপারে পাহাড়ের নীচে বেশ কয়েকটা হোম স্টে আছে ভুটিয়া বস্তিতে। সেখানে আমার চেনা কয়েকজনও আছে। নদীর এপারে থাকার জায়গা না মিললে ওপারের ভুটিয়া বস্তিতে নিয়ে যাব আপনাকে। ওপারটা বরং অনেক বেশি নিরিবিলি।’
সৃজন বললেন, ‘হ্যাঁ, নিরিবিলি জায়গাই আমার বেশি পছন্দ।’
সত্যি একটা নিরিবিলি জায়গাই খুঁজছেন সৃজন। যেখানে দু’-তিন দিন প্রকৃতির ভিতর একলা কাটিয়ে নিজের দেহ-মনকে চাঙ্গা করে নিতে পারবেন তিনি। সম্প্রতি একটা নতুন উপসর্গ যোগ হয়েছে সৃজনের জীবনে। বলা ভালো খ্যাতির বিড়ম্বনা। সরকারি অফিসে চাকরির পাশাপাশি বেশ কয়েকটা ওয়েব সিরিজে পরপর তিনি অভিনয় করেছেন বাংলা ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রির নামী অভিনেতাদের সঙ্গে। সিরিজগুলো বেশ হিট হয়েছে। সবার হাতেই তো এখন অ্যান্ড্রয়েড ফোন আর ঘরে ল্যাপটপ।
ওয়েব সিরিজে অভিনয়ের সুবাদে সৃজনের মুখ এখন অনেকের কাছেই পরিচিত। এই তো ট্রেনে আসার সময় গত রাতে সৃজন যখন সবে খাবারের প্যাকেটটা খুলেছেন ঠিক তখনই বেশ কয়েকজন অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে সৃজনকে চিনে ফেলে তার পাশে এসে বসল। সৃজনের সঙ্গে সেলফি তোলার পর তারা এমন কথা শুরু করল যে আর উঠতেই চায় না! কত প্রশ্ন, কত কৌতূহল তাদের! এদিকে সৃজনের পেট খিদেয় চুঁই-ছুঁই করছে। শেষ পর্যন্ত একসময় তাদের বলতে বাধ্য হলেন যে, ‘তোমরা এখন যাও৷ অনেক রাত হল, অন্য প্যাসেঞ্জাররা ডিস্টার্বড ফিল করতে পারেন।’ ভাগ্য ভালো ছেলেমেয়েগুলো শেষ রাতে মালদা নেমে গেল, নইলে হয়তো এখানেও তারা তাঁর পিছু ধাওয়া করত।
খ্যাতি ব্যাপারটা সবার মতো সৃজনেরও ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু এ ক’টা দিন তিনি একদম নিরুপদ্রবে কাটাতে চান। অফিস আর শ্যুটিংয়ের চাপে একদম হাঁফিয়ে উঠেছেন সৃজন। তাই এক বন্ধুর পরামর্শ মতো জয়ন্তীতে যাবেন বলে বেরিয়ে পড়েছেন।
আলিপুরদুয়ার শহর ছেড়ে এক সময় বাইরে বেরিয়ে পড়ল গাড়ি। পথের দুপাশে মাঝে মাঝে ছোট-বড় ঘরবাড়ি। টিনের ঢালু ছাদ তাদের মাথায়। বাড়ির হাতায় দাঁড়িয়ে থাকা সুপারি গাছ। এই টিনের ছাদওয়ালা বাড়ি আর সুপারি গাছ উত্তরবঙ্গের গ্রামীণ এলাকার সিগনেচার স্টাইল বলা যেতে পারে।
সৃজন এর আগে কোনওদিন জয়ন্তীতে না গেলেও বেশ কয়েকবার উত্তরবঙ্গের নানা জায়গায় বেড়াতে এসেছেন। তখনও তিনি এমন রাস্তা দেখেছেন।
একটা নদীর ওপর ছোট ব্রিজ অতিক্রম করে সোজা বক্সা টাইগার রিজার্ভ বা জয়ন্তী নদীর পথ ধরল গাড়ি। কোথাও চা-বাগান, আবার কোথাও বড় বড় গাছ। তার মধ্যে দিয়ে এগিয়েছে মসৃণ রাস্তা। দুপাশের জঙ্গল ক্রমশ ঘন হয়ে উঠতে লাগল সময়ের সঙ্গে সঙ্গে।
সৃজন দেখতে পেলেন রাস্তার এক জায়গায় হাতির ছবি দেওয়া সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘এলিফ্যান্ট করিডোর’। অর্থাৎ হাতি এই জায়গা দিয়ে রাস্তা পার হয়। সৃজন ড্রাইভারকে প্রশ্ন করলেন ‘এখানে আপনি হাতি দেখেছেন?’
ড্রাইভার বর্মন জবাব দিল, ‘একবার নয়, বহুবার। একবার তো একদল হাতি এই রাস্তায় উঠে নিজেদের খেয়ালে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ছিল। আর যতক্ষণ না ওরা উল্টোদিকের জঙ্গলে নেমে গেল সেই এক ঘণ্টা রাস্তার দুপাশে কিছুটা তফাতে সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়েছিল। হাতির দল তেড়ে এলে গাড়ি ঘুরিয়ে সেদিন পালানো যেত না। শুধু গাড়ির পিছনে গাড়ি। তবে সাধারণত ওরা অমন করে না। মানুষকে কমবেশি সবাই ভয় পায়। জয়ন্তীতে, বিশেষত নদীর ওপারের জঙ্গলে প্রচুর হাতি আছে। বলা যেতে পারে হাতি নিয়েই ঘর করে মানুষ। ইস্কুলের বাচ্চাদের ব্যাগেও হাতি তাড়ানোর জন্য ক্র্যাকার অর্থাৎ চকোলেট বোম থাকে। আপনি আর কিছু না দেখতে পেলেও হাতি নিশ্চয়ই দেখতে পাবেন জয়ন্তীতে।’
সৃজন জানতে চাইলেন, ‘আপনারা কি টুরিস্টদের জঙ্গল সাফারিতে নিয়ে যান?’
ড্রাইভার জবাব দিল, ‘বাইরের গাড়িকে টাইগার রিজার্ভ অঞ্চলের ভিতর নদীর ওপারে ভুটিয়া বস্তি বা মহাকাল পাহাড়ের নীচে পর্যন্ত যেতে দিলেও জঙ্গলের ভিতর ঢুকতে দেয় না। জঙ্গল সাফারির জন্য ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়ি আছে। আর স্থানীয় কিছু মানুষের জিপসি গাড়ির পারমিটও আছে। ওরাও টুরিস্টদের জঙ্গল সাফারিতে নিয়ে
যায়।’
সৃজন বললেন, ‘জায়গাটায় যখন যাচ্ছি তখন একবার জঙ্গল সাফারিতে যাওয়ার ইচ্ছা আছে।’
ড্রাইভার বলল, ‘সম্ভব হলে মহাকালের মন্দির দেখে নেবেন। ট্রেক করে ওখানে যেতে হয়।’
জঙ্গলের পথ ধরে ড্রাইভারের সঙ্গে নানা কথা বলতে বলতে সৃজন ঘণ্টাখানেক বাদে বিকেলবেলা পৌঁছে গেলেন বক্সা রিজার্ভ ফরেস্টের প্রবেশ মুখে। রাস্তার ডানপাশে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের পারমিট কাউন্টার। বেশ কয়েকটা টুরিস্ট পার্টির গাড়ি সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
ড্রাইভার গাড়ি থেকে নামল সেখানে। সৃজনও নামলেন। সিগারেট খেতে ইচ্ছা হল তাঁর। ড্রাইভার সৃজনের থেকে টাকা আর আধার কার্ড নিয়ে রাস্তার অন্যপাশে চলে গেল পারমিট বানানোর জন্য। সৃজন একটা সিগারেট ধরালেন। রাস্তার পাশের জঙ্গলের ভিতর থেকে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শোনা গেল। এ ডাক সৃজন এই উত্তরবঙ্গেই একবার মাদারিহাটের জঙ্গলে শুনেছেন, ময়ূরের ডাক।
কিছুটা তফাতেই রাস্তার পাশে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি দেওয়া ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা হোর্ডিং আছে। সেটা দেখার জন্য সৃজন কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালেন তার সামনে। বক্সা ফরেস্ট অঞ্চলে যে সব বিশেষ প্রাণীর খোঁজ মেলে তারই কিছু নামের তালিকা ছবি সমেত দেওয়া আছে সেখানে।
সৃজন সিগারেট টানতে টানতে দেখতে লাগলেন হোর্ডিংটা। স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে হাতি, বাঘ, লেপার্ড, ভল্লুক, কয়েক প্রজাতির হরিণ আর বন্য বরাহর ছবি। রয়েছে ময়ূর, প্যাঁচা, নীলকণ্ঠ, বুলবুলি, বাজ-সহ বেশকিছু পাখির ছবি। আর সরীসৃপের মধ্যে আছে ময়াল, কিং কোবরা আর গিরগিটির মতো দেখতে টোকে গেকো বা তক্ষক।
ড্রাইভার শীতল বর্মন যখন ফিরে এল তখন সৃজনের সিগারেট শেষ হয়ে গিয়েছে। সৃজনের হাতে সে কার্ড আর পারমিট ধরিয়ে দিয়ে চালকের আসনে উঠে বসল। গাড়ি স্টার্ট করে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে একটু অসন্তোষের ভঙ্গিতে বলল, ‘শুধু আপনার কার্ডের কপি নয়, আমার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জেরক্স, এমনকী গাড়ির ব্লু-বুকের কপিও জমা নিল ওরা। আগে কিন্তু এত কড়াকড়ি ছিল না। শুধু টুরিস্টদের আইডেন্টিটি কার্ডের কপি দিলেই চলত। আমরা মৌখিক পারমিশন নিয়েই টুরিস্টদের জয়ন্তীতে পৌঁছে দিতাম।’
সৃজন প্রশ্ন করল, ‘এখন এত কড়াকড়ি কেন?’
এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আগে ড্রাইভার তাঁকে প্রশ্ন করল, ‘বলুন তো এই জঙ্গলের সব থেকে দামি প্রাণী কী? ওই হোর্ডিংয়ে তার ছবি দেওয়া ছিল।’
সৃজন বললেন, ‘নিশ্চয়ই বাঘ বা হাতি হবে।’
ড্রাইভার বলল, ‘না স্যার। ওই হোর্ডিংয়ের সবথেকে আকারে ছোট প্রাণী। মাত্র দশ-বারো ইঞ্চি লম্বা। তক্ষক। ওর এক-একটার দাম কত জানেন? পঞ্চাশ লাখ থেকে এক কোটি টাকা। এর থেকে নাকি ক্যান্সার, এডস, হাঁপানির ওষুধ তৈরি হয়। তাই চোরবাজারে ওদের এত দাম। তক্ষকের চোরাচালান রুখতেই বর্তমানে এত কড়াকড়ি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কড়াকড়ির মধ্যেও তক্ষক পাচার হয়। দু-একজন কখনও-সখনও ধরাও পড়ে।’
সৃজন শুনে বললেন, ‘হ্যাঁ, তক্ষক চোরাচালানের ব্যাপারটা কাগজে পড়েছিলাম বটে, কিন্তু এ প্রাণীর এমন অবিশ্বাস্য দাম তা জানা ছিল না!’
কিছু সময়ের মধ্যেই এরপর দুপাশে জঙ্গলের পথ ধরে সৃজন শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন তাঁর গন্তব্য জয়ন্তীতে। ছোটখাটো বেশ কয়েকটা দোকান আছে সে জায়গায়। বেশ কিছু গাড়িও দাঁড়িয়ে আছে। সৃজনের চোখে পড়ল সামনেই পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত প্রায় আধ কিলোমিটার চওড়া নদীখাত। তবে তাতে জল নেই। বিকেলের আলোয় ধবধবে সাদা নুড়ি-পাথর ছড়িয়ে আছে বিস্তীর্ণ নদীখাতে। আর তার পাড় বরাবর বড় বড় গাছের ঘন জঙ্গল। আর ওপারের জঙ্গলের মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে নয়নাভিরাম সবুজ পাহাড়।
গাড়ি প্রথমে এপারেই থামল। ড্রাইভারের সঙ্গে নীচে নামলেন সৃজন। শীতল বর্মন বলল, ‘যদি ওপারে থাকতে হয় তবে যা কিছু কেনার তা এখান থেকেই কিনতে হবে। ওপারে কিন্তু কোনও দোকান নেই। তবে আগে দেখি এখানে কোনও থাকার জায়গা মেলে কি না?’
এ পারে নদীখাতের গায়ে বেশ কয়েকটা গেস্ট হাউস পরপর দাঁড়িয়ে আছে। সরকারি জায়গায় অগ্রিম বুকিং ছাড়া থাকা যায় না। তাই সৃজনকে নিয়ে ড্রাইভার গেল কয়েকটা বেসরকারি গেস্ট হাউসে। তাদের মধ্যে একটা গেস্ট হাউসে ঘর ফাঁকা আছে ঠিকই, কিন্তু সেখানে বাসে করে বেশ বড় একটা টুরিস্ট পার্টি এসে উঠেছে। বাচ্চাকাচ্চা, লোকজন, চিৎকার-চেঁচামেচিতে সে জায়গা সরগরম।
সৃজন বুঝতে পারলেন, আর যাই হোক এখানে থাকলে জয়ন্তীর নির্জনতা উপভোগ করা যাবে না। তার উপর তিনি খেয়াল করলেন একজন মহিলা তাঁর সঙ্গীকে ডেকে সৃজনকে দেখিয়ে কী যেন বলল! সম্ভবত সৃজনকে চিনতে পেরেছেন সেই মহিলা। এসব দেখে সৃজন বললেন, ‘চলুন, ওপারে কোনও নিরিবিলি হোম স্টে পাওয়া যায় কি না দেখুন। ওপারে যদি থাকার জায়গা না মেলে তখন না হয় এখানে এসে থাকব।’
সৃজনের কথামতো তাকে নিয়ে ড্রাইভার আবার গাড়ির কাছে ফিরে এল। একটা দোকান থেকে সৃজন কয়েকটা সিগারেটের প্যাকেট, বিস্কুট, জলের বোতল কিনে উঠে বসল গাড়িতে। গাড়ি এবার নদীখাত পেরোনোর জন্য নেমে পড়ল। পাথরের উপর দিয়ে দুলতে দুলতে চলল।
ড্রাইভার বলল, ‘বর্ষাকালে এ জায়গা দেখলে স্যার চিনতে পারবেন না। জলে ভরে ওঠে নদী। ওপার-এপার তখন তিন-চার মাসের জন্য প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক ঘুরে ওপারে যেতে হয়।’
জল না থাকলেও বিকেলের আলোয় চওড়া শুভ্র নদীখাত বেশ সুন্দর লাগল। নদীখাতে নামার পরই যেন মুছে গেল এ-পারের সব শব্দ। সৃজনের মনে হল পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা ওপারের জঙ্গল যেন তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেদিকে এগোতে এগোতে ড্রাইভার তাঁকে সতর্ক করে বলল, ‘ওপারে কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই মোবাইলে টাওয়ার পাওয়া যায় না। কাউকে ফোন করার থাকলে করে নিন।’
সৃজনের কাউকে ফোন করার ছিল না। তবে ড্রাইভারের কথা শুনে তিনি মনে মনে খুশিই হলেন ওপারে কেউ তাঁকে ফোনেও ধরতে পারবে না বলে। একদম নিরবচ্ছিন্ন শান্তি উপভোগ করতে পারবেন তিনি। যে কারণে তাঁর ওখানে যাওয়া।
দেখতে দেখতে ক্রমশ এগিয়ে এল ওপারের জঙ্গল। নদীখাত ছেড়ে ওপারে ওঠার মুখে ড্রাইভার বলল, ‘বাঁদিকে নদীর পাড় বরাবর মহাকাল মন্দিরে যাওয়ার পথ, আর আমরা যাব সামনের ভুটিয়া বস্তিতে। ওই যে পাহাড় দেখছেন ওর কিছুটা ভুটানের অংশ। আর ওর নীচেই ভুটিয়া বস্তি। ওখানে স্থানীয় মানুষদের কিছু জিপসি গাড়ি আছে। সেসব গাড়ি ওপার থেকে এপারে লোকজনকে মহাকাল পাহাড়, ভুটানঘাট দেখাতে নিয়ে যায়, জঙ্গল সাফারিও করায়। ওপারে থাকলেও আপনার কোনও অসুবিধা হবে না। আর আমরা যেখানে এসে থেমেছিলাম সেখানকার গাড়িগুলো আপনাকে শিলিগুড়ি পর্যন্তও পৌঁছে দেবে দিনে রাতে যে-কোনও সময়।’
সৃজন কথাটা শুনে বেশ নিশ্চিন্ত বোধ করলেন।
গাড়ি নদীখাত ছেড়ে উঠে পড়ল ওপারে। সামনেই নদীর পাড় বরাবর বড় বড় গাছের গভীর জঙ্গল। এপারে উঠে আসতেই ময়ূরের তীব্র ডাক ভেসে এল জঙ্গলের ভিতর থেকে। সে ডাক যেন স্বাগত জানাল সৃজনকে। জঙ্গল আর নদীখাতের মধ্যবর্তী রাস্তা দিয়ে এগোল গাড়ি। দিন শেষে আরও নানা পাখির ডাক ভেসে আসছে জঙ্গলের ভিতর থেকে।
গাড়ির জানালা দিয়ে রাস্তার পাশে একটা জায়গা দেখিয়ে ড্রাইভার বলল, ‘ওই দেখুন স্যার, হাতির নাদ পড়ে আছে। আপনাকে বলেছিলাম না এদিকে প্রচুর হাতি আছে। এত বড় প্রাণী, কিন্তু ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধে চলাচল করতে পারে, আর গা ঢাকা দিয়েও থাকতে পারে। কখন যে আপনার পিছনে এসে দাঁড়াবে তা আপনি বুঝতেও পারবেন না।’
কথা বলতে বলতে সৃজনরা মিনিট দশেকের মধ্যেই পৌঁছে গেল ভুটিয়া বস্তিতে। রাস্তা, নদী আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরও এগিয়েছে সামনের দিকে। সেদিকটা দেখিয়ে ড্রাইভার বলল, ‘ওদিকে দূরে হাতিপোতা বলে একটা গ্রাম আছে জঙ্গলের মধ্যে।’
পাহাড়ের ঢালের নীচে দুপাশের জঙ্গলের মধ্যে টিনের ছাদওয়ালা, কাঠের তৈরি কয়েকটা বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এটাই ভুটিয়া বস্তি। কয়েকটা হুডখোলা সাফারি জিপ আর লোকজনও আছে সেখানে। তবে কোনও চিৎকার, চেঁচামেচি নেই। শান্ত পরিবেশ চারপাশে।
শীতল বর্মন বলল, ‘স্যার আপনি গাড়িতে বসুন। এ বাড়িগুলোই, ‘হোম স্টে।’ আমি আগে দেখি কোনও ঘর পাওয়া যায় কি না। তারপর আপনাকে সেখানে নিয়ে যাব।’
রাস্তার একধারে গাড়িতে বসে রইলেন সৃজন, আর ড্রাইভার শীতল বর্মন এগোল ভুটিয়া বস্তিতে ঘর খোঁজার জন্য। ঘড়ি দেখলেন সৃজন। কখন যেন পাঁচটা বেজে গিয়েছে। সূর্য যেন এবার দ্রুত চলতে শুরু করেছে পিছনে। আর তার সঙ্গে সঙ্গে যেন পাখির ডাক থেমে গিয়ে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা নেমে আসতে শুরু করেছে জয়ন্তী নদীর খাত আর তার পাড়ের জঙ্গলের বুকে। সৃজন গাড়িতে বসে সেই নির্জনতা উপভোগ করতে লাগলেন।
ড্রাইভার মিনিট দশেকের মধ্যে ফিরে এসে বলল, ‘ব্যাড লাক স্যার। এখানেও কোথাও একটাও ঘর আজ খালি নেই। কাল অবশ্য দুটো হোম স্টে-তে ঘর খালি হবে।’
সৃজন কথাটা শুনে আশঙ্কিত ভাবে বললেন, ‘তবে কি আমাকে ওপারের সেই গেস্ট হাউসেই থাকতে হবে?’
একটু ভেবে নিয়ে ড্রাইভার বলল, ‘হাতিপোতার রাস্তায় এখান থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে একটা হোম স্টে আছে। দু-বছর, লকডাউনের আগে আমি এক টুরিস্ট পার্টিকে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিলাম সেখানে। যদিও হোম স্টে-র মালিকের সঙ্গে আমার চেনা নেই। তবুও একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি ওখানে জায়গা মেলে কি না। তবে যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। আর আধ ঘণ্টার মধ্যে অন্ধকার নেমে যাবে। তারপর ও পথে চলা খুব রিস্কের ব্যাপার। হাতি বেরোতে পারে, তাছাড়া অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে নুড়ি-পাথরের নদীখাত পেরোনো খুব অসুবিধার,’—এ কথা বলে সে গাড়িতে উঠে বসল, তারপর গাড়ি নিয়ে এগোল সামনের দিকে। আশা-নিরাশার দোলচলে সৃজন চেয়ে রইলেন জঙ্গলের দিকে। আলো ফুরিয়ে আসছে জঙ্গলের ভিতর।
মিনিট পাঁচেক এগোনোর পর গাড়ি এসে থামল একটা বাড়ির সামনে। শাল কাঠের খুঁটির উপর একলা দাঁড়িয়ে আছে ঢালু টিনের ছাদওয়ালা বাড়িটা। কাঠের রেলিং দেওয়া একটা ছোট বারান্দাও আছে। গাছের ডালের তৈরি বেড়া দিয়ে ঘেরা বাড়িটা। তার তিন দিকে কিছুটা তফাতেই শুরু হয়েছে জঙ্গল। আর সামনে সরু রাস্তা পেরিয়ে ঢাল বেয়ে সামান্য নীচে নামতেই নদীখাত। ডালপালাহীন বিশাল একটা গাছের গুঁড়ি স্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। সূর্য তখন ডুবে গিয়ে দ্রুত আবছা হতে শুরু করেছে। ড্রাইভার শীতল বর্মন বলল, ‘এটাই সেই হোম স্টে। চলুন দেখি আমাদের ভাগ্যে কী আছে?’
গাড়ি থেকে চটপট নেমে সৃজন ড্রাইভারের সঙ্গে এগোলেন বাড়িটার দিকে। বেড়ার গেট ঠেলে বাড়ির চৌহদ্দিতে প্রবেশ করতেই কোথা থেকে যেন একটা ‘টক্ টক্’ শব্দ হল। ভিতরে ঢুকে সৃজনের নজরে পড়ল বাড়িটাকে ধরে রাখা শাল কাঠের গুঁড়িগুলোর ওপাশে দুটো ছোট কাঠের ঘর রয়েছে। তার গায়ে একটা বেশ বড় ঝাঁকড়া জবা ফুলের গাছ। আর তার পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সবুজ রঙের হুড খোলা একটা পুরোনো জিপসি গাড়ি। যে ধরনের গাড়ি জঙ্গল সাফারিতে ব্যবহার করা হয়।
ভিতরে ঢুকে একটু এগিয়ে সৃজন আর ড্রাইভার দাঁড়াল কাঠের গুঁড়িগুলোর মাঝে। মাথার ওপর বাড়িটা থাকায় চারপাশটা বেশ ছায়া ঘন, তার উপর আবার অন্ধকার নামতে চলেছে। সৃজন বুঝতে পারলেন আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হোম স্টে-র নীচের এই অংশটা ডুবে যাবে ঘন অন্ধকারে।
সামনের কাঠের ঘর দুটোর দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার বলল, ‘কোই হ্যায়? কোই হ্যায়?’ কাছেই কোথা থেকে যেন আবার সেই টক্ টক্ শব্দটা হল, আর তারপরই কাঠের ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল একজন লোক।
দোহারা গড়ন। দেখে মনে হয় মাঝবয়সি। পরনে একটা খাকি প্যান্ট আর বগল কাটা ঢিলে শার্টের মতো পোশাক, পাহাড়ি লোকজন যেমন পরে। মাঝারি লোকটির দাঁড়ানোর ভঙ্গি একটু ঝুঁকে পড়া। তাকে দেখেই বোঝা যায়, সে অথবা তার পূর্বপুরুষ পাহাড়ি অঞ্চলেরই মানুষ।
সৃজন আর বর্মনের দিকে কয়েক মুহূর্ত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকার পর লোকটি প্রশ্ন করল, ‘কী চাই?’
ড্রাইভার শীতল বর্মন জিগ্যেস করল, ‘এই হোম-স্টে তোমার তো?’
আলো-আঁধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, হোম স্টে তারই।
ড্রাইভার বলল, ‘তোমার হোম স্টে-তে ঘর খালি আছে? এই সাহেব কলকাতা থেকে এসেছেন।’ হোম স্টে-র মালিক জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, খালি আছে। কিন্তু লকডাউনের পর আমি আর কাউকে ঘর ভাড়া দিইনি।’
দ্রুত অন্ধকার নেমে আসছে চারপাশে। এখানে ব্যর্থ হলে নদীর ওপারে হই-হট্টগোল ভরা সেই গেস্ট হাউসে ফিরে যেতে হবে সৃজনকে। তাই তিনি লোকটার উদ্দেশে বললেন, ‘দেখো না একটা ঘর দিতে পারো কি না? ভুটিয়া বস্তিতে একটা হোম-স্টেতেও থাকার জায়গা পেলাম না।’
ড্রাইভার বলল, ‘হ্যাঁ, আজকের রাতটা যদি তুমি অন্তত থাকার ব্যবস্থা করে দাও তবে বড় ভালো হয়। কাল না হয় স্যার ভুটিয়া বস্তিতে কোনও হোম স্টে-তে উঠে যাবেন।’
সৃজন এরপর লোকটিকে বললেন, ‘হ্যাঁ, অন্তত আজকের রাতটা। টাকাপয়সা নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। যা বলবে তাই দেব।’
লোকটা এরপর কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘না টাকাপয়সার কোনও ব্যাপার নয়। আসলে এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই, লণ্ঠনের আলোয় কাজ চালাতে হয়। তাছাড়া লকডাউনের পর টুরিস্ট রাখিনি বলে ঘরে মুরগি নেই বা অন্য খাবারও খুব একটা নেই। এমনকী চারপাশে কথা বলারও লোক নেই। স্যারের অসুবিধা হবে না?’
সৃজন বললেন, ‘খাবার নিয়ে আমার তেমন অসুবিধা হবে না। চা আর ডাল-ভাত হলেই চলবে। আর আমি নিরিবিলি জায়গাতেই থাকতে এসেছি। লণ্ঠনের আলোতেও বেশ চলে যাবে। তেমন অসুবিধা হলে নয় কাল ভুটিয়া বস্তিতে গিয়ে ঘর খুঁজে নেব।’
লোকটা আবারও কয়েক মুহূর্ত ভেবে নিয়ে প্রথমে সৃজনকে বলল, ‘আচ্ছা স্যার, থাকুন তবে। কাল বাজারে গিয়ে মুরগি আর অন্য জিনিস না কিনে আনা পর্যন্ত আজ রাতে আপনাকে শুধু ডাল, রুটি দিতে পারব।’
এ কথা বলে সে ড্রাইভারকে বলল, ‘তবে তুমি যে আমার এখানে টুরিস্ট পৌঁছে দিয়ে গেছ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে বোলো না। আসলে লকডাউনের পর আর টুরিস্ট রাখার লাইসেন্স রিনিউ করা হয়নি। ফরেস্টের লোকেরা জানতে পারলে পয়সা চাইতে আসতে পারে।’
ড্রাইভার শীতল বর্মন বলল, ‘তুমি নিশ্চিন্তে থাকো। স্যারকে নামিয়ে দিয়ে আমি এখন সোজা আলিপুরদুয়ার রওনা হয়ে যাব।’
হোম স্টে-র মালিক বলল, ‘ঠিক আছে স্যার। আপনার লাগেজ থাকলে নিয়ে আসুন। আমি ঘর খোলার ব্যবস্থা করি।’
ড্রাইভারের সঙ্গে সৃজন আবার গাড়ির সামনে ফিরে এলেন। অন লাইনে গাড়ি বুকিংয়ের সময় কিছু অ্যাডভান্স পেমেন্ট করা ছিল ট্রাভেল এজেন্সিকে। হিসাব করে বাকি টাকাটা ড্রাইভারকে বুঝিয়ে দিলেন সৃজন। তার সঙ্গে দুশো টাকা টিপসও দিলেন।
সৃজনের লাগেজ বলতে চাকা লাগানো একটা ছোট ট্রলি ব্যাগ, আর চেন লাগানো মোটা চটের তৈরি একটা শপিং ব্যাগ, যার মধ্যে টুকিটাকি জিনিস রাখা আছে। এছাড়া অবশ্য একটা ক্যারি ব্যাগে সদ্য কেনা জলের বোতলগুলো আছে।
টাকা মেটানোর পর ড্রাইভার গাড়ি থেকে সেগুলো নামিয়ে সৃজনের সঙ্গে বাড়ির গেটের ভিতর পৌঁছে দিয়ে গেল। যাওয়ার সময় সে বলে গেল, ‘গুড লাক স্যার। এখানে ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল, বিশেষত হাতি দেখার সম্ভাবনা প্রচুর। সকালে সামনের রাস্তায় ফাঁকা গাড়ি পেয়ে যাবেন মহাকাল বা ভুটানঘাট দেখার জন্য।’
ড্রাইভারকে বিদায় জানিয়ে সামনে তাকিয়েই সৃজন দেখলেন একটা লণ্ঠন জ্বালিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে হোম স্টে-র মালিক। আর ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক মহিলা। তার পরনে পাহাড়ি রমণীদের মতো হাঁটুর নীচ পর্যন্ত একটা স্কার্টের উপর হাতাওয়ালা জামা। সে-ও তাকিয়ে আছে সৃজনের দিকে। দুটো শালখুঁটির উপর ভর করে কাঠের সিঁড়ি উঠে গিয়েছে উপরের বারান্দার দিকে। লোকটা সৃজনের কাছে এগিয়ে এসে এক হাতে ট্রলি ব্যাগটা তুলে নিয়ে বলল, ‘উপরে চলুন স্যার।’
লোকটার পেছন পেছন সিঁড়ির দিকে এগোতে এগোতে সৃজন শুনতে পেলেন, শীতল বর্মনের গাড়ি ফেরার জন্য যাত্রা শুরু করল।
সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় সৃজন জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার নাম কী? কে কে থাকো এখানে?’
সে জবাব দিল, ‘নকুল ভুটিয়া স্যার। আমার সঙ্গে বউ লক্ষ্মী থাকে। ওই যাকে দেখলেন। ছেলেমেয়ে নেই আমাদের।’
নকুলের সঙ্গে ওপরের বারান্দায় উঠে আসতেই বাইরে ঝুপ করে অন্ধকার নামল। সৃজন দেখলেন জঙ্গলের আড়ালে রাস্তায় হারিয়ে যাচ্ছে তাঁকে রেখে যাওয়া গাড়ির হেডলাইটের আলো। বারান্দার
গায়ে একটা ঘর অতিক্রম করে পরের ঘরটার দরজা খুলল নকুল। সে ঘরের তিন দিকেই বারান্দা। টেবিল-চেয়ার পাতা আছে বারান্দায়। সামনের রাস্তার ওপাশে জয়ন্তীর নদীতট আর একপাশের জঙ্গল দেখা যায় সেখান থেকে। যদিও এখন অন্ধকারে নদী-জঙ্গল সব মিলেমিশে গিয়েছে।
দরজা খুলে সৃজনকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল নকুল। মাঝারি আকৃতির ছিমছাম ঘর। একটা কাঠের খাটে পরিপাটি করে বিছানা সাজানো আছে। একটা কাঠের আলমারি আর টেবিল-চেয়ারও আছে ঘরে। ঘরের সঙ্গেই বাথরুম। হোম স্টে-র মালিক দরজা খুলে বাথরুমটা দেখিয়ে বলল, ‘দুটো বালতিতেই জল রাখা আছে স্যার। শেষ হলে বলবেন, এনে দেব।’
সৃজন উঁকি দিয়ে দেখল বাথরুমটা বেশ ঝকঝকে, টয়লেট প্যানটাও বেশ পরিষ্কার। লাগেজ নামিয়ে রাখার পর নকুল ভুটিয়া বলল, ‘গরম লাগার কথা নয়। বাড়িটা তো পাহাড়ের ঠিক নীচেই। তবে অসুবিধা হলে দরজা খুলে শোবেন। নদীর দিক থেকে বাতাস আসে। দরজা খুলে ঘুমালেও এখানে চোর-ডাকাতের কোনও ভয় নেই।’
লণ্ঠনটা রেখে চলে গেল নকুল। সে চলে যেতেই ব্যাগ খুলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে গুছিয়ে রেখে সৃজন টয়লেটে গিয়ে ঢুকলেন। স্নান সেরে সেখান থেকে পায়জামা, পাঞ্জাবি পরে তিনি বেরোতে না বেরোতেই নকুল ফিরে এল ধূমায়িত চায়ের কাপ হাতে নিয়ে। ঘরের টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে সে জানতে চাইল, ‘ডিনার কখন দেব স্যার?’
সৃজন বললেন, ‘ন’টা নাগাদ দিলেই হবে।’
ঘর ছেড়ে বাইরে বেরোনোর আগে নকুল বলে গেল, ‘একটু পর বাইরে গিয়ে বসবেন স্যার। দেখবেন চারপাশটা কেমন সুন্দর লাগে!’
নকুল এই কথা বলে দরজার পাল্লা ভেজিয়ে চলে গেল। বিস্কুট দিয়ে বেশ আয়েশ করে চা পান করে বিছানায় বেশ কিছুক্ষণ গড়িয়ে নিলেন সৃজন। স্নান করে বিছানায় শুয়ে থাকার পর পথশ্রমের ক্লান্তি অনেকটাই কেটে গেল। তাঁর ঘড়িতে যখন সাতটা বাজল তখন সৃজন খাট থেকে নেমে বাইরের বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। চারপাশে তাকিয়ে সত্যি অবাক হয়ে গেলেন তিনি। জঙ্গলের মাথার উপর বেশ বড় চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। গোল চাঁদ, পরদিন দোল পূর্ণিমা। জ্যোৎস্নাবিধৌত চরাচর।
বারান্দা থেকে সামনে কিছুটা তফাতে জয়ন্তী নদীর বিস্তৃত শুষ্ক নদীতট। চাঁদের আলোয় নদীর বুকের সাদা পাথরগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ যেন দুধ ঢেলে দিয়েছে নদীর বুকে। এমন অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য এর আগে কোনও দিন দেখেননি সৃজন। বেশ কিছুক্ষণ সেই অপার্থিব সৌন্দর্যের দিকে চেয়ে রইলেন সৃজন। মনে হল কলকাতা থেকে এত দূরে এই নির্জন পরিবেশে ছুটে আসা সার্থক হয়েছে তাঁর।
সৃজন এরপর খেয়াল করলেন বারান্দার টেবিলে নকুল পরিপাটি করে দুটো গ্লাস আর কাচের জগ সাজিয়ে রেখে গিয়েছে। ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। হোম স্টে-র মালিক জানে যে এখানে যাঁরা আসেন তাঁরা নির্জন প্রকৃতির কোলে একটু আমোদ-আহ্লাদও করতে আসেন। তাই গ্লাসের ব্যবস্থা।
সৃজনের নিয়মিত মদ্যপানের অভ্যাস না থাকলেও এক বন্ধুর গিফট করা একটা হুইস্কির বোতল সঙ্গে এনেছেন। ঘরে ঢুকে হুইস্কির বোতলটা বের করে এনে টেবিলে বসলেন তিনি। তারপর একটা পেগ বানিয়ে ধীরে ধীরে তিনি গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে তাকিয়ে রইলেন নদী আর জঙ্গলের দিকে। চাঁদের আলো স্বাভাবিক কারণেই জঙ্গলের সর্বত্র প্রবেশ করছে না। এক অদ্ভুত আলো-আঁধারি খেলা করছে জঙ্গলের ভিতর। যেন এক অপার রহস্য লুকিয়ে আছে গভীরে।
বারান্দার ঠিক নীচে কিছুটা তফাতে হঠাৎ-ই একটা জায়গায় সৃজন এরপর একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন। বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে উজ্জ্বল অগুনতি আলোকবিন্দু সেখানে জ্বলছে নিভছে! ভালো করে তাকিয়ে সৃজন বুঝতে পারলেন সেগুলো আসলে জোনাকির আলো। আর এরপর সেই একই রকম আলোকবিন্দুর গালিচা দেখতে পেলেন সৃজন। তাঁর মনে হল প্রাকৃতিক এই আলোক গালিচা কৃত্রিমভাবে নির্মাণ করার ক্ষমতা পৃথিবীর সেরা ইলেকট্রিক ইঞ্জিনিয়ারেরও নেই। অরণ্যপ্রকৃতিই একমাত্র সৃষ্টি করতে পারে এই আশ্চর্য সুন্দর দৃশ্য।
জঙ্গলের ভিতর কোনও গাছের মাথা থেকে একটা পাখি এরপর মাঝে মাঝে ডাকতে শুরু করল। নিশ্চয়ই কোনও রাতচরা পাখি হবে। আর তার সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গলের ভিতর থেকে ভেসে আসতে লাগল নানা অদ্ভুত শব্দ।
সৃজন বুঝতে পারলেন রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই জঙ্গলের রাত জাগা প্রাণীরা জেগে উঠেছে। ও তাদেরই শব্দ। তিনি শুনেছেন জঙ্গলের রাতচরা প্রাণীরা অন্ধকারেও অনেক দূরের জিনিস দেখতে পায়। সৃজনের মনে হল তিনি তাদের দেখতে না পেলেও হয়তো জঙ্গলের আড়াল থেকে তারা লক্ষ করছে চাঁদের আলোয় কাঠের বারান্দায় বসে থাকা তাঁকে। ব্যাপারটা ভেবে বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করলেন সৃজন। হুইস্কিতে চুমুক দিতে দিতে, নানা শব্দ শুনতে শুনতে অন্ধকার জঙ্গল আর জ্যোৎস্নাময় জয়ন্তী নদীর শুষ্ক খাতের শোভা উপভোগ করতে লাগলেন তিনি।
কখন কীভাবে যে দু-ঘণ্টা সময় কেটে গেল বুঝতে পারলেন না। ইতিমধ্যে সৃজন তিন পেগ হুইস্কি পান করে ফেলেছেন। মাথাটাও একটু ঝিমঝিম করতে শুরু করেছে জয়ন্তীর বুক থেকে ভেসে আসা ঠান্ডা বাতাসে। হুঁশ ফিরল নকুল ভুটিয়া তাঁর সামনে খাবারের থালা-বাটি নিয়ে এসে দাঁড়াতে। ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় রাত ন’টা। সময় জ্ঞান আছে হোম স্টে-র মালিকের।
সৃজন হুইস্কির বোতলটা টেবিলের এক পাশে সরিয়ে রাখতেই থালা আর বাটি টেবিলে নামিয়ে রাখল নকুল। রুটি, ডাল আর একটা বাটিতে সব্জিও আছে।
থালাটা টেনে নিয়ে সৃজন বললেন, ‘তোমার হোম স্টে-র চারপাশটা সত্যিই খুব সুন্দর। একেবারে জঙ্গলের মধ্যে বসে আছি।’
নকুল বলল, ‘পুরোনো ভুটিয়া বস্তি কিন্তু এখানেই প্রথমে ছিল। তারপর হাতির উপদ্রব আর অন্য কয়েকটা কারণে এখন অন্য জায়গায় সরে গেছে। আমিই শুধু রয়ে গেছি।’
ঠিক সেই সময় সেই রাতচরা পাখিটা আবার ডেকে উঠল। সৃজন জানতে চাইলেন, ‘ওটা কোন পাখির ডাক?’
নকুল ভুটিয়া টেবিলের ধার থেকে একটু সরে গিয়ে বারান্দার রেলিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘নাইটজার। বাংলায় বলে ‘দিনকানা’ পাখি। আলো সহ্য করতে পারে না, রাতে বেরোয়।’ রুটি ছিঁড়ে তা দিয়ে শাক জাতীয় তরকারিটা প্রথম মুখে তুললেন সৃজন। শাকের স্বাদটা বেশ নতুন ধরনের। এর আগে তা কোনওদিন খাননি তিনি। সৃজন বললেন, ‘কী শাক এটা? বেশ ভালো খেতে তো!’
নকুল যেন খুশি হল ব্যাপারটা শুনে। সে জবাব দিল, ‘শুটকি শাক স্যার। আমাদের নিজস্ব খাবার। শাক প্রথমে কিছুদিন মাটির হাঁড়িতে মাটির তলায় রাখা হয়। তারপর তা তুলে রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করে রান্না করা হয়।’
এ কথা বলে সে জানতে চাইল, ‘স্যার আপনি জয়ন্তীতে কদিন থাকবেন?’
খেতে খেতে সৃজন বললেন, ‘কাল আর পরশু। তার পরদিন মাঝরাতে আলিপুরদুয়ার থেকে ফেরার ট্রেন। তবে তোমার এই জায়গাটা আমার বেশ লেগেছে। তুমি থাকতে দিলে বাকি দু-রাত এখানেই থাকব।’
নকুল ভুটিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘এ জায়গা পছন্দ হলে থাকবেন স্যার। তাহলে কাল খুব ভোরে চা দিয়ে আমি বাজারে চলে যাব। বউ তো লকড়ি আনতে জঙ্গলে ঢুকবে। সকালের দিকে হোম স্টে-তে আপনি ছাড়া কেউ থাকবে না স্যার।’
সৃজন বলল, ‘আমার কোনও সমস্যা নেই তাতে। ভাবছি সকালবেলা একটা গাড়ি নিয়ে মহাকালের দিকে ঘুরে আসব।’
নকুল বলল, ‘সামনের রাস্তা ধরে ভুটিয়া বস্তির দিকে এগোলে ফ্লাইং গাড়ি পেয়ে যাবেন। টুরিস্টের সন্ধানে ওরা ঘুরে বেড়ায়।’
এরপর সৃজন যতক্ষণ না খাওয়া শেষ করলেন ততক্ষণ হোম স্টে-র আতিথিয়তার নিয়ম মেনে সেখানে দাঁড়িয়ে রইল সে। তারপর এঁটো থালা গ্লাস নিয়ে নীচে নেমে গেল নকুল।
বাথরুমে ঢুকে বেসিনে হাত-মুখ ধুয়ে আবার বারান্দায় এসে বসলেন সৃজন। চাঁদ ঠিক জঙ্গলের মাথার উপর উঠে গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকার পর সৃজনের হঠাৎ মনে হল চাঁদের আলোয় সামনের রাস্তা ধরে মিনিট দশেক হেঁটে আসা যাক।
প্রতি রাতে খাওয়ার পর হাঁটার অভ্যাস সৃজনের। তাতে হজম আর ঘুম ভালো হয়, শরীর ভালো থাকে। সিনেমায় নামার পর নিজের শরীর ঠিক রাখা সম্পর্কে বেশ একটু সচেতন হয়েছেন সৃজন।
রাত দশটা বাজে। বারান্দা ছেড়ে সিঁড়ি বেয়ে তিনি নীচে নেমে পড়লেন। জায়গাটায় খেলা করছে জমাট বাঁধা অন্ধকার। এসব অঞ্চলের লোকদের তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ার অভ্যাস। সৃজনের মনে হল নকুল আর তার বউ নিশ্চয়ই ইতিমধ্যে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়েছে।
সেই অন্ধকার হাতড়ে বাড়ির নীচ থেকে বেড়ার ঝাঁপ টেনে সামনের চন্দ্রালোকিত রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন সৃজন। জঙ্গলের ভিতর থেকে আসা শব্দগুলো যেন এখন থেমে গিয়েছে। জঙ্গলকে এক পাশে রেখে সোজা সামনের জয়ন্তীর নদীখাতের দিকে তিনি ধীর পায়ে হাঁটতে শুরু করলেন।
হোম স্টে ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে নিস্তব্ধ পথ ধরে আনুমানিক তিনি একশো গজ এগিয়েছেন, হঠাৎ-ই যেন একটা তীব্র শব্দ হল টক্ টক্ করে! শব্দটা শুনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন সৃজন। কীসের শব্দ এটা? কয়েক মুহূর্তর নিস্তব্ধতা। তারপর আবারও সেই অদ্ভুত শব্দ শোনা গেল—টক্ টক্ তোয়াখ!’
হোম স্টে-তে পা রাখার সময় সৃজন এমন একটা মৃদু শব্দ শুনেছিলেন ঠিকই, কিন্তু দ্বিতীয় বারের এই শব্দের প্রাবল্য এত বেশি, তা যেন চন্দ্রালোকিত আকাশে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল। সৃজন চারপাশে তাকিয়ে শব্দটার উৎস বোঝার চেষ্টা করতে লাগলেন। এটা কি কোনও রাতজাগা প্রাণীর ডাক? নাকি কোনও যান্ত্রিক শব্দ?
জোনাকির আলোগুলো এখন নিভে গিয়েছে। জঙ্গলের ভিতর খেলা করছে গভীর অন্ধকার। চাঁদের আলোয় জেগে আছে জয়ন্তীর নদীতটটাই। সেই নিঃসঙ্গ নদীখাতে কোনও প্রাণী বা কেউ নেই।
বেশ কয়েক মুহূর্তর নিস্তব্ধতা। তারপর তৃতীয়বারের জন্য শব্দটা শোনা গেল—‘টক্ টক্ টক্ তোয়াখ!’ জঙ্গল আর নদীতটের নিস্তব্ধতাকে যেন ছিন্নভিন্ন করে দিল শব্দটা। সৃজনের এবার যেন মনে হল শব্দটা কোনও উঁচু জায়গা থেকে হচ্ছে। তাই উন্মুক্ত আকাশে তার তীব্রতা বা বিস্তার এত বেশি। আর এরপরই তিনি নকুল ভুটিয়ার গলা শুনতে পেলেন, ‘স্যার কোথায় যাচ্ছেন? চলে আসুন, চলে আসুন।’
সৃজন দেখলেন হোম স্টে-র বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে নকুল ভুটিয়া। তার হাতে একটা লাঠি। সৃজন তার ডাক শুনে পিছু ফিরে এগোলেন তার দিকে। সৃজন নকুলের কাছে পৌঁছোতেই সে বলল, ‘এত রাতে বাইরে বেরিয়েছিলেন কেন স্যার?’
সৃজন বললেন, ‘ভাবলাম, ঘুমানোর আগে একটু হেঁটে আসি, তাই। টক্ টক্ করে একটা আওয়াজ হচ্ছে, শুনেছ নিশ্চয়ই? ও কীসের শব্দ?
নকুল বলল, ‘ওই শব্দ শুনেই তো তাড়াতাড়ি ঘরের বাইরে বেরিয়ে রাস্তায় এলাম। এটা তক্ষকের ডাক। আমরা জঙ্গলের, তাই ওদের ভাষা বুঝি। ডাক শুনে বুঝতে পারলাম ও কাউকে দেখেছে। রাতে মানুষের থেকে অন্ধকারের মধ্যে তিনশো গুণ বেশি দেখতে পায় ওরা। আমি প্রথমে ভাবলাম বুঝি হাতি এসেছে। তারপর বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি আপনি। ওই ডালপালা ছাড়া লম্বা গাছের গুঁড়ির মাথা থেকেও ডাকছে। রাতে বাড়ির কাছে বন্য জন্তু বা কেউ এলে এমন ডাকে।’
সৃজন জানতে চাইল, ‘ও কি তোমার পোষা নাকি?’
নকুল ভুটিয়া বলল, ‘ও এখানেই থাকে। অনেক সময় আমার ঘরেও ঢোকে। আমরা তাড়াই না। এখানকার লোকেরা তক্ষককে ঘরের লক্ষ্মী বলে মনে করে।’
এরপর নকুল বলল, ‘আপনার ওভাবে বাইরে বেরোনোও ঠিক হয়নি। আর বেরোবেন না। যে কোনও সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। হাতির পাল মাঝে মাঝেই এখানে চলে আসে। তার উপর আবার কদিন হল একটা দলছুট বুনো দাঁতাল কাছেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুদিন আগেই এক বাইকআরোহী অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছে ওর হাত
থেকে। সন্ধ্যার পর আপনি আর কখনও হোম স্টে-র বাইরে বেরোবেন না।’
নকুলের কথার গুরুত্ব অনুভব করে সৃজন ঢুকে পড়লেন হোম স্টে-তে। বেড়ার গেটটা বন্ধ করে নকুল অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেল তার ঘরের দিকে। আর সৃজন সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরে ফিরে শুয়ে পড়লেন। ঘুম নেমে এল তাঁর চোখে।
রাতে বেশ ভালো ঘুম হল সৃজনের। ভোরবেলা বাইরে থেকে ভেসে আসা মোরগের ডাকে তাঁর ঘুম ভাঙল। বিছানা ছেড়ে উঠে তিনি বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে আসতেই দেখতে পেলেন মোরগটাকে। হোম স্টে-র কিছুটা তফাতে যেখান থেকে জঙ্গল শুরু হয়েছে, সেখানেই একটা গাছের গুঁড়ির নীচে পোকা খুঁটে খাচ্ছে সে। সকালের আলোয় ঝলমল করছে তার পালকগুলো।
নতুন সূর্য প্রাণ সঞ্চার করেছে এই জঙ্গলময় পৃথিবীর বুকে। ঝলমলে আলোয় বহুদূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে জয়ন্তী নদীর বিস্তৃত তট রেখা। এমনকী ওপারে নদীর গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কয়েকটা বাংলোও চোখে পড়ছে। একটা গাড়িকেও নদীখাত পেরিয়ে ওপারে আসতে দেখলেন তিনি। এর পরই তাঁর চোখ পড়ল, হোম স্টে-র কাছে দাঁড়িয়ে থাকা স্তম্ভর মতো গাছের গুঁড়িটার মাথার দিকে। একটা পাখি তার মাথায় বসে আছে। পাখিটা উড়তেই তার ডানার নীল রং ঝলমল করে উঠল।
সেই নেড়া গুঁড়িটার দিকে তাকাতেই সৃজনের মনে পড়ে গেল গত রাতের তক্ষকের সেই অদ্ভুত ডাকের কথা। নকুল বলেছিল, ওর মাথা থেকেই নাকি ডাকছিল প্রাণীটা। পাখিটা নদীর উপর চক্কর কেটে আবারও হাজির হল গুঁড়িটার মাথায়। আর ঠিক সেই সময় নকুলও বারান্দায় উঠে এল চায়ের ট্রে হাতে নিয়ে। তার পরনে বুশ শার্ট, প্যান্ট আর জুতো। চোখে কালো সানগ্লাস। তাকে দেখে সৃজন বুঝতে পারলেন বাজারে যাবার জন্য একদম তৈরি হয়ে আছে সে।
নকুল চায়ের ট্রে টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, ‘গুড মর্নিং স্যার। তাহলে এখানে থাকবেন তো?’ সৃজন হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’
গাছের গুঁড়ির মাথা থেকে পাখিটা আবার উড়ল নদীর দিকে। তাকে দেখিয়ে সুজন জানতে চাইলেন, ‘ওটা কী পাখি?’
নকুল বলল, ‘নীলকণ্ঠ পাখি স্যার। এ জঙ্গলে অনেক আছে।’
এরপর সে বলল, ‘আমি এবার বাজারে যাই স্যার? নাস্তাটা আজ আপনাকে বাইরে করতে হবে। কাল অসুবিধা হবে না। মহাকাল মন্দির দেখে আসুন স্যার, ভালো লাগবে।’
সৃজন বলল, ‘হ্যাঁ, ভাবছি দেখে আসব। দাঁড়াও, তুমি কিছু টাকা নিয়ে যাও।’
এই বলে তিনি ঘরে ঢুকে পার্স থেকে দু-হাজার টাকা নিয়ে ফিরে এসে তা তুলে দিলেন নকুলের হাতে। নকুল টাকা নিয়ে যাওয়ার সময় বলে গেল, আমি দুপুরেই ফিরে আসব।’
নকুল চলে যাওয়ার পর প্রথমে প্রভাতী সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে চা খেলেন সৃজন। তারপর ধীরে সুস্থে স্নান সেরে বাইরে যাওয়ার পোশাক পরে যখন ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলেন তখন সকাল আটটা। ঘরে তালা লাগিয়ে নীচে নেমে তিনি কাউকে দেখতে পেলেন না। নকুলের ঘরের দরজা বন্ধ। নিশ্চয়ই বাজারের দিকে রওনা হয়েছে, আর তার বউ কাঠ আনতে।
হোম স্টে ছেড়ে সৃজন এরপর বাইরে বেরিয়ে পড়লেন। তারপর যে পথ ধরে তিনি নকুলের হোম স্টে-তে এসে উঠেছেন সেই পথ ধরে ভুটিয়া বস্তির দিকে হাঁটতে শুরু করলেন। এক দিকে সূর্যালোকে ঝলমলে নদীতট, অন্যদিকে বড় বড় গাছের জঙ্গল। পাখির ডাক ভেসে আসছে জঙ্গল থেকে। কয়েকটা গাছ চিনতেও পারলেন তিনি। শিমূল, আমলকী, হরীতকী, সেগুন।
এসব দেখতে দেখতে সৃজনের হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল। নকুল আর সৃজনকে পৌঁছে দিয়ে যাওয়া সেই ড্রাইভারের কথা মিলে গেল, তিনি মিনিট দশেক হাঁটার পরই সামনের দিক থেকে হুড খোলা সবুজ রঙের একটা জিপসি গাড়ি এসে তাঁর সামনে দাঁড়াল। চালকের আসনে বসা অল্পবয়সি ড্রাইভার তাঁকে বলল, ‘মহাকাল মন্দির যাবেন স্যার? ভালো করে ঘুরিয়ে আনব। ওয়াইল্ড লাইফও দেখতে পাবেন। একদল হাতি আজ নদীর বেডে নেমেছে।’
ছেলেটার সঙ্গে সামান্য কিছু কথাবার্তার পর সৃজন উঠে পড়লেন তার গাড়ির পিছনে। ছেলেটা গাড়ির মুখ ঘুরিয়ে রওনা হল মহাকাল মন্দিরে যাওয়ার জন্য। ভুটিয়া বস্তি অতিক্রম করে জয়ন্তীর বুকে নেমে পড়ল গাড়ি। বেশ কিছুটা এগিয়ে এপারের সঙ্গে বেশ কিছুটা দূরত্ব রেখে বাঁক নিয়ে পাড় বরাবর চলতে লাগল গাড়ি। ড্রাইভার ছেলেটা বলল, ‘জঙ্গলের দিকটা ভালো করে খেয়াল রাখবেন স্যার। ওয়াইল্ড লাইফের দেখা মিলতে পারে।’
নদীখাতের মধ্যে দিয়ে দুলতে দুলতে গাড়ি এগিয়ে চলল আর ছেলেটার নির্দেশ মতো সৃজন চেয়ে রইলেন জঙ্গলের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি একটা ময়ূর আর কয়েকটা ময়ূরী দেখতে পেলেন। জঙ্গলের গা ঘেঁষে নদীর বুকে নেমে ঘুরে বেড়াচ্ছে তারা।
আরও কিছুক্ষণ এগোনোর পর ছেলেটা বলল, ‘আপনাকে হাতি দেখাব বললাম না স্যার? ওই দেখুন হাতি। চিৎকার করবেন না। ওরা তেড়ে এলে বিপদ হবে।’
ড্রাইভার ছেলেটার দৃষ্টি অনুসরণ করে সৃজন দেখতে পেলেন সেই হাতির দলটাকে। নদীর বুকে বেশ খানিকটা এগিয়ে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে তারা। গাড়ি একসময় সেদিকে অনেকটাই এগিয়ে গেল। তাদের পাশ কাটিয়েই এগোতে হবে গাড়িকে।
সৃজন বেশ কাছ থেকে এবার দেখতে পেলেন হাতিগুলোকে। একটা বড় দাঁতাল। তার সঙ্গে আরও সাতটা মাকনা আর মেয়ে হাতি। এদের সঙ্গে আরও নানা আকৃতির তিনটে বাচ্চা হাতি। তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সে জায়গাটা একটু ডোবার মতো।সেখান থেকে জল নিয়ে পা ভিজাচ্ছে।
সৃজন মোবাইল বার করে বেশ কয়েকটা ছবি তুলল তাদের। ড্রাইভার ছেলেটা অতি ধীরে হাতির পালের থেকে নিরাপদ দূরত্ব রেখে জায়গাটা পেরিয়ে গেল। হাতির পাল খুব একটা ভ্রূক্ষেপ করল না জিপসি গাড়িটাকে। হাতিগুলোকে পিছনে রেখে কিছুটা এগোনোর পর সৃজন ছেলেটাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি জঙ্গল সাফারিতে নিয়ে যাও?’
ছেলেটা বলল, ‘হ্যাঁ, নিয়ে যাই। কিন্তু কাল ফরেস্ট দপ্তর নোটিস দিয়েছে আজ থেকে কয়েক দিনের জন্য জঙ্গল সাফারি বন্ধ থাকবে।’
সৃজন জানতে চাইলেন, ‘বন্ধ থাকবে কেন?’
ড্রাইভার ছেলেটা বলল, ‘ভুটান পাহাড় থেকে একটা দলছুট দাঁতাল এখানে নেমে এসেছে। সম্ভবত অন্য কোনও দাঁতালের সঙ্গে লড়াই হয়েছিল তার। কারণ, নীচে নেমে আসা দাঁতালটার একটা কান ছেঁড়া। খেপে আছে আহত দাঁতালটা। ভুটিয়া বস্তির একজনকেও আক্রমণ করেছিল। যতদিন না ওকে আবার নিজের জায়গায় ফেরত পাঠানো হচ্ছে ততদিন নিরাপত্তার কারণে সাফারি বন্ধ থাকবে। মনে হয় পাঁচ-সাতদিন লেগে যাবে সাফারি চালু হতে।’
গাড়ি এগিয়ে চলল। ক্রমশ সামনের পাহাড়শ্রেণি কাছে এগিয়ে আসতে লাগল আর যাত্রাপথে চোখে পড়তে লাগল জলপূর্ণ ছোট ছোট নালা। একসময় তেমনই একটা নালা বা ছোট নদীর গা ঘেঁষে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে উঠতে শুরু করল জিপসি গাড়িটা। কিছু সময়ের মধ্যেই চারপাশে পাহাড় ঘেরা একটা উন্মুক্ত জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পড়ল জিপসি গাড়িটা। আরও বেশ কিছু গাড়ি, লোকজন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, কিছু অস্থায়ী দোকানপাটও আছে।
গাড়ি যেখানে দাঁড়াল তার এক পাশে কিছুটা নীচে একটা সরু নদী, কুলকুল করে জল বইছে তাতে। বাঁশের একটা সাঁকো পেরিয়ে নদীর ওপারে যেতে হয়। তারপর ওপাশ থেকে পাহাড়ের গা বেয়ে উপরে দিকে উঠতে হয়। কিছু লোক সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে।
নীচ থেকে কিছুটা উপর দিকে পাহাড়ের মধ্যে একটা তোরণের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। সেটা দেখিয়ে ড্রাইভার ছেলেটা বলল, ‘যে তোরণটা দেখা যাচ্ছে, ওটা হল “ছোট মহাকাল” মন্দির। আর “বড় মহাকাল” হল পাহাড়ের মাথায়। আমি এখানেই থাকব। যান, ছোট মহাকাল, বড় মহাকাল দেখে আসুন।’
সৃজন গাড়ি থেকে নেমে ধীরে ধীরে পৌঁছে গেলেন নীচের সাঁকোর সামনে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্বচ্ছ ঠান্ডা জল ছোট-বড় পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে প্রবাহিত হচ্ছে। কোনও কোনও টুরিস্ট জলে পা ডুবিয়ে বসে। অথবা জলের মধ্যে জেগে থাকা বড় বড় পাথরের উপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলছে। পঁচিশ ফুট মতো চওড়া হবে নদীটা। মাথার উপর নীল আকাশে ঝলমল করছে রোদ। তবে চারদিকে পাহাড় ঘেরা বলে জায়গাটা একটু ঠান্ডা।
অন্য কিছু টুরিস্টদের সঙ্গে পাকদণ্ডী বেয়ে কিছুটা উপরে উঠে সৃজন পৌঁছে গেলেন ছোট মহাকাল মন্দিরে। পাহাড়ের গায়ে একটা প্রাকৃতিক গুহাই হল ছোট মহাকাল মন্দির। পাহাড়ের উপর থেকে নেমে আসা জলস্রোত চুঁইয়ে পাথর ক্ষয়ে গিয়ে গুহার মধ্যে নানা অবয়ব সৃষ্টি করেছে। শিব বা মহাকালের প্রতীক একটা ত্রিশূল পোঁতা সেখানে। পুণ্যার্থী কেউ কেউ পুজো দিচ্ছেন মহাকালকে।
একটা সাইনবোর্ড দেখে সৃজন বুঝতে পারলেন, এই পাহাড় আসলে ভুটানের ভূখণ্ডে অবস্থিত। ভুটান সরকারই মহাকাল মন্দিরের দেখভাল করেন। বড় মহাকাল মন্দির দেখে আসা একজন টুরিস্টের সঙ্গে কথা বলে সৃজন জানতে পারলেন, ওই মন্দিরে উঠতে একঘণ্টা সময় লাগবে এবং পথটা খুব ভালো নয়। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বড় মহাকাল যাবেন না।
সৃজন ছোট মহাকাল মন্দির থেকে নীচে নেমে এসে সাঁকোটা থেকে কিছুটা এগিয়ে জুতো খুলে নদীর ঠান্ডা জলে পা ডুবিয়ে একটা পাথরের উপর বসলেন। তাঁর বেশ লাগছিল জায়গাটা। নদীর ঠান্ডা জল, চারপাশের সবুজ পাহাড়, মাথার উপর নীল আকাশ, মহাকাল মন্দিরে তীর্থ যাত্রীদের যাওয়া-আসা, সব মিলিয়ে বসে থাকতে খুব ভালো লাগছিল সৃজনের। বসে থাকতে থাকতে কখন যে এক ঘণ্টা সময় কেটে গেল তা বুঝতেই পারলেন না তিনি।
হঠাৎ কাছ থেকে একটা শব্দ কানে এল তাঁর, ‘আরে! সৃজনবাবু না?’
সৃজন পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, যে পাথরটার উপর তিনি বসে আছেন সেই পাথরটার উপর এসে দাঁড়িয়েছেন দুজন। তাঁদের একজন মাঝবয়সি, আর অপরজন মধ্য তিরিশের যুবক। দুজনের পরনেই দামি পোশাক, পায়ে স্নিকার্স। মাঝবয়সি লোকটির আঙুলগুলোয় ঝলমল করছে অনেক ক’টা সোনার আংটি। দেখেই বোঝা যাচ্ছে পয়সাওয়ালা।
হাসিখুশি চেহারার মাঝবয়সি লোকটি আবারও সৃজনের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আপনি সৃজনবাবু তো? ঠিক বলছি কি না?’
লোকটার বাচনভঙ্গি দেখে সৃজনের মনে হল তিনি যেন সৃজনের পরিচয় সম্পর্কে একপ্রকার নিশ্চিত হয়েই প্রশ্নটা করলেন।
সৃজন জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি সৃজন। কিন্তু আপনাদের তো ঠিক চিনতে পারলাম না?’
তাঁর কথা শুনে মধ্যবয়সি ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘চিনবেন কী করে? আমরা তো আপনার মতো সেলিব্রিটি নই, সাধারণ মানুষ। তবে আপনাকে আমি একবার দেখেই চিনেছি। ওয়েব সিরিজগুলোতে দারুণ অভিনয় করেন আপনি। বলতে গেলে আমি আপনার একজন ফ্যান। একটু বসে কথা বলতে পারি? এ সৌভাগ্য তো আমার সচরাচর হবে না।’
কলকাতা থেকে এত দূরে এই ভুটান পাহাড়েও তাঁকে কেউ চিনে ফেলবে সৃজন তা ভাবতে পারেননি। এ ব্যাপারটাতেও তিনি যেমন একটু খুশি হলেন, তেমন একটু অস্বস্তিও বোধ করলেন বিব্রত হওয়ার আশঙ্কায়। মুখে অবশ্য তাঁকে বলতেই হল, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বসুন।’
ভদ্রলোক আর তাঁর সঙ্গী বসলেন পাথরের উপর। তারপর মাঝবয়সি সেই ভদ্রলোক বললেন, ‘আমাদের পরিচয়টা প্রথমে আপনাকে বলি। আমার নাম নির্মল রায়। এই উত্তরবঙ্গেরই শিলিগুড়ির বাসিন্দা। টিম্বার মার্চেন্ট। তিন পুরুষের কাঠের ব্যবসা। ডুয়ার্সে একটা চা-বাগানও আছে। আর আমার সঙ্গী পশুপতি হল আমার শ্যালক। মালদায় থাকে।একটা স্কুলে বিজ্ঞান পড়ায়।’ এ কথা বলে নির্মল রায় প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি কি এখানে শ্যুটিংয়ের কাজে এসেছেন? আর কে এসেছেন আপনার সঙ্গে?’
সৃজন জবাব দিলেন, ‘না, শ্যুটিং নয়, বেড়াতেই এসেছি। একলাই এসেছি।’
নির্মল বললেন, ‘আমরাও বেড়াতে এসেছি। ভুটিয়া বস্তির একটা ঘরে উঠেছি। আপনি নিশ্চয়ই ওপারে কোনও সরকারি গেস্ট হাউসে উঠেছেন? আপনারা সেলিব্রিটি মানুষ, আপনাদের জন্য সুযোগ-সুবিধাই আলাদা হয়।’
সৃজন মিথ্যা কথা বলতে পারেন না। কথাটা শুনে হেসে বললেন, ‘ওসব সুযোগ-সুবিধা বড় বড় অভিনেতা পান। আমি অত বড় নই। আমিও এপারেই উঠেছি। ভুটিয়া বস্তি থেকে কিছুটা এগিয়ে হাতিপোতার রাস্তায় একটা বাড়িতে।’
কথাটা শুনে নির্মল বললেন, ‘কী বলছেন মশাই! আপনিও কম বড় সেলিব্রিটি নাকি? এত সাবলীল অভিনয় করেন কীভাবে? ছোট থেকে অভিনয় শিখেছেন নাকি?’
সৃজন জবাব দিলেন, ‘মোটেও না। চাকরিতে ঢোকার পর শখে অফিস ক্লাবের একটা নাটকে অভিনয় করেছিলাম। ঘটনাচক্রে ডিরেক্টর সৌমেন্দু গুপ্ত নাটক দেখতে এসেছিলেন। ওয়েব সিরিজ করার জন্য তিনি নতুন মুখ খুঁজছিলেন। আমাকে পছন্দ হয়। আমিও রাজি হয়ে যাই। তিনিই আমাকে শিখিয়ে পড়িয়ে নেন। তারপর দর্শকের আমার অভিনয় পছন্দ হওয়াতে পরপর কয়েকটা সিনেমা করে ফেললাম। এই আর কী...।’
পশুপতি মাস্টারমশাই এরপর বললেন, ‘আমি ওয়েব সিরিজ দেখি না ঠিকই কিন্তু আমার স্ত্রী দেখেন। উনিও আপনার খুব ভক্ত। আপনার সঙ্গে দেখা হলে খুব খুশি হতেন।’
নির্মল বললেন, ‘আমার শ্যালক আসলে সর্বক্ষণ ওর স্কুল আর নিজের পড়াশোনা নিয়ে থাকে। ওর সাবজেক্ট বটানি। বলা যেতে পারে ও গাছপালা দেখবে বলেই জঙ্গলে বেড়াতে আসা।’
সৃজন বললেন, ‘এই বক্সা-জয়ন্তী জায়গাটা কিন্তু আমারও বেশ লাগছে। মনে হচ্ছে এখানেই থেকে যেতে পারলে ভালো হতো।’
নির্মলও বললেন, ‘আমাদেরও তাই মনে হচ্ছে। কিন্তু ফিরে তো যেতেই হয় সবাইকে। আপনি কবে ফিরছেন?’
সৃজন জবাব দিলেন ‘পরশু আলিপুরদুয়ার থেকে মাঝরাতে ট্রেন। পরশুই রওনা হব এখান থেকে।’
নির্মল বললেন, ‘আপনার মতো মানুষের সঙ্গে দেখা হবে জানলে কিছু উপহার আনতাম। আমাদেরও এখানে আরও দু-দিন থাকার কথা। হয়তো আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে। আপনার কোনও কাজে লাগতে পারলে আমাদেরও খুব ভালো লাগবে।’
কথাটা শুনে সৃজন বললেন, ‘ধন্যবাদ আপনাকে।’
আর এর পরই তিনি রিস্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করলেন এ জায়গাতে আসার পর প্রায় দু-ঘণ্টা সময় কাটতে চলেছে। ড্রাইভারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে তার এখানে দু-ঘণ্টাই থাকার কথা। সৃজন তাই এরপর তাঁদের দুজনের উদ্দেশে বললেন, ‘মাফ করবেন। আমাকে এবার ফিরতে হবে। আপনাদের সঙ্গে পরিচয় হয়ে ভালো লাগল।’
নির্মল বললেন, ‘হ্যাঁ, আমাদেরও এবার ফিরতে হবে। আমার নিজের গাড়িটা ওপারে রাখা আছে। বাইরের গাড়ি নিয়ে এখানে অনেক জায়গাতে ঘোরা সমস্যা বলে এ-পারে আমরা ভাড়ার জিপসিতে
ঘুরছি।’
তিনজন এরপর উঠে পড়লেন সে জায়গা ছেড়ে। টুকটাক কথা বলতে বলতে সাঁকো পেরিয়ে উপরে উঠে কার পার্কিংয়ের জায়গায় তারা ফিরে এলেন। সৃজনকে নমস্কার জানিয়ে একটা জিপসিতে উঠে নির্মল রায় আর তাঁর শ্যালক রওনা হলেন ভুটিয়া বস্তিতে ফিরবেন বলে। সৃজনের গাড়ির ড্রাইভারকে খুঁজে পেতে পাঁচ মিনিট সময় লাগল। তারপর তিনিও রওনা হলেন হোম স্টে-তে ফেরার জন্য।
একই পথ ধরে জয়ন্তীর খাত ধরে ফিরতে শুরু করল সৃজনের গাড়ি। ফেরার পথে অবশ্য হস্তীকুলের দেখা মিলল না। কখন যেন তারা জঙ্গলে ফিরে গিয়েছে। নদীখাত থেকে একসময় সৃজনের জিপসি গাড়িটা উপরে উঠে ভুটিয়া বস্তির দিকের রাস্তা ধরল।
ভুটিয়া বস্তির কাছাকাছি পৌঁছোতেই হঠাৎ সৃজন দেখতে পেলেন রাস্তার পাশে পরপর দুটো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা টুরিস্ট জিপসি আর একটা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়ি। কয়েকজন উর্দি পরা বন্দুকধারী বনরক্ষীকে প্রথমে দেখতে পেলেন সৃজন। তারপর টুরিস্ট গাড়িটার সামনে দেখতে পেলেন নির্মল রায় আর তার শ্যালককে।
বনদপ্তর গাড়ি চেক করছে। সৃজনের গাড়িটাকেও হাত দেখিয়ে থামাল একজন বনরক্ষী। গাড়ি দুটোর কাছেই দাঁড়িয়ে পড়ল সৃজনের গাড়িটা। একজন ফরেস্ট অফিসার এগিয়ে এসে প্রথমে ভালো করে দেখলেন সৃজনকে। তারপর তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘কোথা থেকে আসছেন?’
সৃজন জবাব দিলেন, ‘কলকাতা থেকে এখানে ঘুরতে এসেছি। মহাকাল দেখতে গিয়েছিলাম।’ অফিসার একটু কড়া গলায় বললেন, ‘গাড়ি থেকে নামুন। চেক করব।’
তার কথা শুনে গাড়ি থেকে নেমে পড়লেন সৃজন।
ফরেস্ট অফিসার সৃজনকে বলল, ‘আপনার কোনও পরিচয়পত্র দেখান।’
নির্মল রায়ের গাড়িটা মনে হয় চেক করা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সৃজনকে দেখতে পেয়েই তিনি কাছে এগিয়ে এলেন। সৃজন পার্স থেকে আধার কার্ড বের করে অফিসারকে দেখাতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় নির্মল রায় ফরেস্ট অফিসারের উদ্দেশে বললেন, ‘কাকে হ্যারাস করছেন? ওঁকেও কি আপনি আমাদের মতো সাধারণ পাবলিক ভেবেছেন নাকি?’
কথাটা শুনে ফরেস্ট অফিসার তাঁকে বললেন, ‘কে উনি?’
নির্মল বেশ কড়াভাবে বললেন, ‘ওঁকে সারা পৃথিবী চেনে আর আপনি চেনেন না? আশ্চর্য ব্যাপার! উনি বিখ্যাত অভিনেতা সৃজন। তাঁর গাড়ি আটকাচ্ছেন আপনি? যদি উনি কলকাতা ফিরে আপনার নামে কমপ্লেন করেন বা মিডিয়াতে রিপোর্ট করেন তাহলে কী হবে বুঝতে পারছেন?’
সৃজনের পরিচয় জেনে এবার যেন মিইয়ে গেলেন ফরেস্ট অফিসার। তিনি সৃজনকে বললেন, ‘সরি স্যার, আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। আর কার্ড দেখাতে হবে না। গাড়িতে উঠে পড়ুন। আমি বিট অফিসার রমানাথ মদন। কাছেই বিট অফিসে আমাকে পাবেন। রুটিন চেক করছিলাম। কোনও প্রয়োজন হলে আমাকে জানাবেন স্যার।’
সৃজন এরপর আর তার সঙ্গে কোনও কথা না বাড়িয়ে গাড়িতে উঠে পড়লেন। নির্মল রায়ও তাঁর গাড়িতে গিয়ে উঠলেন। দুটো গাড়িই চলতে শুরু করল। ভুটিয়া বস্তির কাছে পৌঁছে নির্মল রায় সৃজনের উদ্দেশে হাত নেড়ে সেখানে ঢুকে পড়লেন। আর এরপর সৃজনও কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলেন তাঁর গন্তব্যে।
গাড়ি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে তিনি বেড়ার গেট খুলে হোম স্টে-তে পা রাখতেই নিচু স্বরে সেই টক্ টক্ শব্দটা হল। তিনি তাকালেন নকুলের ঘরের দিকে। সেদিক থেকেই যেন শব্দটা এল। ঘরের দরজা খোলা। তবে নকুল বা তার স্ত্রীকে দেখতে পেলেন না তিনি। কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে তালা খুলে সৃজন ঢুকে পড়লেন নিজের ঘরে।
ঘরে ফিরে বাইরের পোশাক পাল্টে বিছানায় শুয়ে ছিলেন সৃজন। বন্ধ দরজায় টোকা দেওয়ার শব্দ শুনে দরজা খুলে দেখলেন দুপুরের খাবারের ট্রে নিয়ে হাজির হয়েছে নকুল। পোশাক পাল্টায়নি সে। এমনকী চোখে সানগ্লাসটাও আছে। বেলা একটা বাজে। বারান্দায় রোদ এসে পড়েছে বলে সৃজন বললেন, ‘তুমি ঘরেই খাবার দাও।’
ঘরে ঢুকে টেবিলে ট্রে থেকে খাবার নামাতে শুরু করল নকুল। ভাত, ডাল, তরকারি আর ধোঁয়া ওঠা মুরগির ঝোল।
চেয়ার ঠেলে নিয়ে সৃজন খেতে বসলেন। নকুল যথারীতি একটু তফাতে দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল, যদি সৃজনের কোনও কিছুর প্রয়োজন হয় সেজন্য।
খাবার মুখে তুলে সৃজন জানতে চাইলেন, ‘কখন ফিরলে তুমি?’
নকুল জবাব দিল, ‘এগারোটায় ফিরলাম। হাতিপোতার হাট থেকে সবকিছু কিনে এনেছি। আমার গাড়িতে তেল কম ছিল, জারে করে পেট্রলও কিনে এনেছি। আপনি চাইলে ফেরার দিন সন্ধ্যায় আপনাকে আমার গাড়িতে পৌঁছে দেব।’
সৃজন বললেন, ‘বাহ্, তাহলে তো বেশ ভালোই হয়।’
সৃজন এরপর বললেন, ‘রান্নাটা বেশ ভালোই হয়েছে। কে করল? তুমি, না বউ?’
নকুল জবাব দিল, ‘বউ। লকড়ি নিয়ে ও জঙ্গল থেকে ফিরে এসেছে।’
এ কথা বলে সে জানতে চাইল, ‘কেমন বেড়ালেন স্যার?’
সৃজন জবাব দিলেন, ‘ভালো। জয়ন্তীর বেড়ে একদল হাতিও দেখলাম।’
হাতির কথা শুনে নকুল বলল, ‘কাল রাতে আপনাকে দাঁতালটার ব্যাপারে সাবধান করেছিলাম। সে কিন্তু রাতে পাশের জঙ্গলে এসেছিল। বউ জঙ্গলে ঢুকে লকড়ি আনতে গিয়ে তার নাদ দেখেছে।’
নকুল গত রাতের প্রসঙ্গ উত্থাপন করাতে সৃজনের অবশ্যম্ভাবীভাবে মনে পড়ে গেল তক্ষকের ডাকের কথা। কিছুক্ষণ আগে হোম স্টে-তে ঢোকার সময়ও মৃদু সুরে সে ডাক শুনেছেন। সৃজন তাই বললেন, ‘গত রাতের তক্ষকটা তোমার বাড়িতে এসে ঢুকেছে নাকি? একটু আগে তার ডাক শুনলাম।’
নকুল বলল, ‘হ্যাঁ স্যার। ও আমার ঘরে এসে ঢুকেছে।’
সৃজন বললেন, ‘আমাকে একটু দেখাতে পারবে? আমি কোনও দিন তক্ষক দেখিনি। কাল রাতে ওর ওই শব্দ শোনার পর থেকে প্রাণীটিকে দেখার জন্য কৌতূহল হচ্ছে।’
কথাটা শুনে নকুল ভুটিয়া একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘আমি চেষ্টা করছি ওকে দেখানো যায় যদি।’ সৃজনের খাওয়া শেষ হওয়ার পর থালা বাটি নিয়ে চলে গেল নকুল। সৃজনও দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন।
তখন প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে। দরজায় নক করার শব্দ। শুনে ঘুম ভেঙে উঠে দরজা খুলে দেখলেন নকুল এসে দাঁড়িয়েছে। সে বলল, ‘চলুন স্যার, তক্ষক দেখবেন।’
সৃজন এরপর ঘর থেকে বেরিয়ে নকুলের সঙ্গে নীচে নেমে এলেন। নকুল তাঁকে নিয়ে এগোল তার ঘরের দিকে। পাশাপাশি দুটো ঘর হলেও বাইরে থেকে ভিতরে ঢোকার জন্য দরজা একটাই। সে দরজা দিয়ে প্রথম ঘরে প্রবেশ করলেন সৃজন। আধো অন্ধকার ঘর। কাঠের খাট, চেয়ার ইত্যাদি কিছু সস্তা আসবাব রয়েছে সেখানে।
ঘরের মধ্যে দিয়ে নকুলের পিছন পিছন এরপর দ্বিতীয় ঘরে প্রবেশ করলেন সৃজন। সে ঘরের পিছনদিকের একটা জানলা খোলা। তা দিয়ে আলো ঢুকছে ঘরে। জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নকুলের জিপসি গাড়িটা। সৃজন ঘরটায় ঢুকেই বুঝতে পারলেন সেটা রান্নাঘর। মাটির উনুন, কেরোসিন স্টোভ থেকে শুরু করে নানা ধরনের বাসনপত্র ছড়িয়ে আছে মাঝারি আকৃতির ঘরটায়। এক কোণে বন থেকে সংগ্রহ করে আনা লকড়ির স্তূপ আছে। সেদিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে নকুল বলল, ‘ওই দেখুন স্যার।’
খোলা জানলা দিয়ে আলো সোজা এসে পড়েছে সেই জ্বালানি কাঠের স্তূপের উপর। সেই আলোয় পাঁচ হাত তফাত থেকে স্তূপের উপর বসে থাকা প্রাণীটাকে স্পষ্ট দেখতে পেলেন সৃজন। গিরগিটির মতো প্রাণী। এক ফুট মতো লম্বা হবে মাথা থেকে লেজ পর্যন্ত। পিঠের দিকটা নীলচে-বেগুনি, সারা শরীরে লাল-সাদা ফোঁটা। ঘাড়টা একটু উঠিয়ে প্রাণীটা বড় বড় চোখে তাকিয়ে আছে সৃজনের দিকে। ফালি চোখ, অর্থাৎ, চোখের মধ্যে আড়াআড়ি একটা দাগ আছে।
অনেক প্রজাতির সরীসৃপের যেমন থাকে। প্রাণীটা ত্রিকোণ আকৃতির, মুখের দিকটা গিরগিটির মতো অতটা ছুঁচলো নয়। মাথাটা বড় ও মুখের দিকটা কিছুটা ভোঁতা। প্রাণীটাকে ভালো করে দেখার পর সৃজন বললেন, ‘বেশ সুন্দর তো। এইটুকু প্রাণীর গলায় এত জোর!’
জোরে না হলেও সৃজনের কথা সমর্থন করেই যেন প্রাণীটা এরপর ডেকে উঠল, ‘টক্ টক্-টক্ক্ষ!’
নকুল বলল, ‘এ প্রাণীকে আমরা জঙ্গলের লোকরা খুবই পয়মন্ত বলে মনে করি। আপনি হয়তো জানেন যে অষ্টনাগের এক নাগ বলা হয় তক্ষককে। মহাকাল মানে শিবের অলঙ্কারও এই তক্ষক। মহাভারতেও তক্ষকের কথা লেখা আছে। কাশ্যপ মুনির সন্তান তক্ষক। খাণ্ডব বনে তক্ষককুল বাস করত। এখানকার লোকদের বিশ্বাস, ভালো মানুষরা মারা যাওয়ার পর তাদের আত্মারা তক্ষকের রূপ ধরে জঙ্গল পাহারা দেয়। সব তক্ষকের গায়ে ফোঁটা থাকে। তা দিয়েই তক্ষককে অন্য গিরগিটির থেকে আলাদা করা যায়। ফোঁটার রং যাই হোক না কেন গায়ে ফোঁটা থাকবেই।’
সৃজন বললেন, ‘এখানে আসার পথে ড্রাইভার বলছিল চোরবাজারে নাকি ওর দাম কোটি টাকা!’ সৃজনের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তক্ষকটা কাঠের স্তূপের উপর থেকে জানলার দিকের মেঝেতে লাফিয়ে নামল। তারপর দ্বিতীয় লাফে জানলার গরাদের ফাঁক গলে বাইরে অদৃশ্য হয়ে গেল!
সৃজনের কথা শুনে নকুল বলল, ‘হ্যাঁ, স্যার, কথাটা মিথ্যা নয়। কিছু লোভী, নিষ্ঠুর মানুষ তক্ষক ধরছে, মারছে, কোটি টাকা দামে বিক্রি করছে চোরবাজারে। আমি তো এসব কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারি না। জঙ্গলের মানুষ আমি, ছোটবেলা থেকে তক্ষকের সঙ্গে বসবাস। এদের ধরে বিক্রি করার কথা কোনওদিন ভাবতে পারিনি। পারলে বড়লোক হয়ে যেতাম। তক্ষকরা হল মৃত মানুষের আত্মা, জঙ্গলের রক্ষাকর্তা ওরা।’
নকুলের ঘর থেকে বেরিয়ে উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকলেন সৃজন। বিছানায় শুতেই আবারও ঘুম নেমে এল তার চোখে। শহুরে জীবনের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ক্লান্তি লুকিয়ে আছে সৃজনের মন ও শরীরে। তাই বিছানায় শুয়ে পড়লেই ঘুম নেমে আসছে সৃজনের চোখে।আর সৃজনও ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করছেন। কলকাতায় ফেরার পর তো আর এ সুযোগ মিলবে না।
সৃজনের যখন ঘুম ভাঙল তখন সন্ধ্যা সাতটা বেজে গিয়েছে। ঘর অন্ধকার দেখে তিনি বুঝলেন বাইরেও অন্ধকার নেমে গিয়েছে। লণ্ঠনটা জ্বালানোর পর হুইস্কির বোতল নিয়ে বাইরের বারান্দায় বেরোলেন তিনি। নকুল আগের দিনের মতোই টেবিলে গ্লাস জলের জাগ সব সাজিয়ে রেখে গিয়েছে।
জঙ্গলের মাথায় সোনার থালার মতো বিরাট চাঁদ উঠেছে। দোল পূর্ণিমার চাঁদ। যদিও এই অরণ্যাবাসে দোল উৎসবের কোনও চিহ্ন চোখে পড়েনি। সৃজন হুইস্কি খেতে খেতে দেখতে লাগলেন জ্যোৎস্না উদ্ভাসিত জয়ন্তীতট আর অরণ্য প্রদেশের রাত্রির সৌন্দর্য। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছিল সেই দিনকানা পাখি বা নাইটজারের চিৎকার। যেন রাত্রির উৎসবে সেজেছে সে। আর গাছের গুঁড়ির নীচে জোনাকিরা যেন নাচতে নাচতে সঙ্গ দিচ্ছে তাকে। বেড়ে চলল রাত।
সৃজনের পানপর্ব যখন শেষ হল তখন রাত প্রায় ন’টা বাজে। একটা সিগারেট ধরিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে বারান্দার রেলিং ধরে ঝুঁকে দাঁড়ালেন তিনি। ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন একজন মহিলা হোম স্টে থেকে বেরিয়ে হেঁটে যাচ্ছে জঙ্গলের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে সে জঙ্গলের দিকে একটা গাছের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার পরনের পোশাক আর অবয়ব দেখে সৃজনের তাকে নকুলের বউ বলেই মনে হল। নইলে এত রাতে অন্য কোনও মহিলা এখানে কীভাবে আসবে?
সৃজন সিগারেটটা এরপর শেষ করতে না করতেই নকুল ডিনার এনে টেবিলে সাজাতে লাগল। সৃজন খেতে বসে নকুলকে বললেন, ‘তোমার স্ত্রীকে জঙ্গলের দিকে যেতে দেখলাম মনে হল! এত রাতে ও কী করতে জঙ্গলে ঢুকল?’
নকুল একটু ইতস্তত করে জবাব দিল, ‘নীচে কোনও বাথরুম নেই, তাই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে জঙ্গলে যেতে হয়।’
সৃজন বললেন, ‘আমাকে তো অন্ধকার নামার পর বাইরে যেতে বারণ করলে, তোমাদের রাতে বাইরে যেতে ভয় করে না?’
নকুল বলল, ‘তা কিছুটা করে। তবে বাইরের লোকের থেকে অন্ধকারে জঙ্গলের ভিতর আমরা অনেক ভালো দেখতে পাই। তা ছাড়া জঙ্গলের বিভিন্ন শব্দ চিনি। এটাই আমাদের ভরসা।’ সৃজন এরপর খেতে খেতে কৌতূহলবশত বললেন, ‘তোমার হোম স্টে এত সুন্দর জায়গায়, তোমাদের এত ভালো ব্যবহার আপ্যায়ন, কিন্তু করোনার পর হোম স্টে-র লাইসেন্স রিনিউ করলে না কেন? টুরিস্ট তোলো না কেন?’
নকুল একটু চুপ করে থেকে বলল, ‘বলতে পারেন মানুষের প্রতি দুঃখে। কত মানুষকে আমার ঘরে আশ্রয় দিয়েছি, কত মানুষকে সাহায্য করেছি, কিন্তু করোনার সময় যখন লকডাউন হল তখন কেউ আমার একবারও খোঁজ নিল না। লকডাউনের পরপর বর্ষা নামল, নদীতে জল এল। ওপারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। রিলিফের রেশন কিছুটা শুধু এসেছিল ওই ভুটিয়া বস্তির জন্যই। আমাদের দুজনেরও কীভাবে যেন করোনা ধরেছিল! কী ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে যে সে সময় কাটিয়েছি তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না। তাই ভেবেছিলাম আর কোনওদিন কোনও মানুষের উপকারে লাগব না। স্বামী-স্ত্রী দুজনে নিজেদের মতো আলাদা থাকব। কিন্তু আপনি বিপদে পড়েছেন দেখে শেষপর্যন্ত আপনাকে থাকতে দিতে রাজি হয়ে গেলাম।’ কথা বলার পর নকুল জানতে চাইল, ‘কাল কী করবেন স্যার?’
সৃজন বলল, ‘ফরেস্টে তো শুনলাম দাঁতাল হাতিটার জন্য সাফারি বন্ধ। কী আর করব? পরশু বিকেল পর্যন্ত শুধু খাব আর ঘুমাব। কলকাতায় ফিরে যাওয়ার পর তো আর এ সুযোগ হবে না। তবে এ-যাত্রায় জঙ্গল সাফারিটা হল না।’
নকুল কথাটা শুনে বলল, ‘পরশু সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ আপনাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য রওনা হব। তখন হাতিপোতার রাস্তা দিয়ে গিয়ে নদী পেরোব। ও-পথে বেশ কিছুটা জঙ্গল আছে, কয়েকটা নালাও আছে। বন্যপ্রাণীরা অনেক সময় জল খেতে আসে নালায়। ও পথে গেলে আপনার কিছুটা নাইট সাফারি হয়ে যাবে।’
সৃজন ব্যাপারটা শুনে বললেন, ‘বাহ্! তবে তো ভালোই হয়। তুমি সেভাবেই আমাকে নিয়ে যেও।’ সৃজনের খাওয়া শেষ হওয়ার পর নকুল বাসন নিয়ে চলে গেল। তিনিও এরপর ঘরে ঢুকে লণ্ঠন নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন।
সৃজন পরদিন বিকেল পর্যন্ত সত্যিই খেয়ে আর ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিলেন নকুল ভুটিয়ার হোম স্টে-তে। বিকেলে যখন তাঁর ঘুম ভাঙল তখন পাঁচটা বাজে। সৃজনের দুটো দিন কেটে যেতে চলেছে বক্সা-জয়ন্তীতে। ঘুম ভাঙার পর তাঁর মনে হল এক কাপ চা পেলে মন্দ হয় না।
নকুলকে চা দিতে বলার জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নামলেন তিনি। নকুলকে নীচে নেমে দেখতে না পেলেও তিনি দেখলেন তার ঘরের দরজার সামনে সৃজনের দিকে এক পাশ ফিরে উবু হয়ে বসে কী যেন করছে নকুলের বউ। পরনে তার ববি প্রিন্টের চুড়িদার-কামিজ। নীল রঙের একটা ওড়না গলা থেকে পিঠে ফেলা। সৃজন তার উদ্দেশে বললেন, ‘এক কাপ চা পাওয়া যাবে?’
কথাটা শুনে সৃজনের দিকে মুহূর্তর জন্য ফিরে তাকাল নকুলের বউ লক্ষ্মী। এই প্রথম তার মুখমণ্ডল কাছ থেকে দেখলেন সৃজন। ফর্সা-মুখমণ্ডলে বড় বড় চোখ, ভুটিয়াদের মতো ভোঁতা নাক। তার তাকানোর মধ্যে কী যেন একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে বলে মুহূর্তের জন্য মনে হল সৃজনের। তাঁর কথার জবাবে নকুলের বউ লক্ষ্মী ‘হ্যাঁ, স্যার পাঠিয়ে দিচ্ছি,’ বলে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। সৃজনও উপরে ফিরে গিয়ে বারান্দায় বসলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই নকুল এসে চা দিয়ে গেল তাঁকে।
সৃজন বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে প্রকৃতি উপভোগ করতে লাগলেন। সূর্য পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। বিদায়ী সূর্যের আলোতে নদীখাতের পাথরগুলোকে এখন সোনালি মনে হচ্ছে।
চা শেষ করে কাপটা টেবিলে নামিয়ে রেখে তিনি ভাবছিলেন, এই সুন্দর জায়গায় কী দ্রুত দুটো দিন ফুরিয়ে গেল! কালই তো কলকাতার দিকে রওনা হতে হবে। আর ফেরা মানেই তো সেই কর্মব্যস্ত জীবন। দম ফেলার ফুরসত থাকবে না।
ভাবতে ভাবতেই বারান্দায় বসে সৃজন দেখতে পেলেন দুজনকে। ভুটিয়া বস্তির দিক থেকে হেঁটে আসছে তারা। কিছুটা এগিয়ে আসার পর সৃজন তাদের চিনতে পারলেন। সেই নির্মল রায় আর তাঁর শ্যালক শিক্ষক ভদ্রলোক। গতকাল তাঁদের ব্যবহার সৃজনের বেশ ভালোই লেগেছে। বিশেষত ফরেস্ট অফিসার যখন সৃজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে শুরু করেছিলেন, তখন নির্মল এমনভাবে সৃজনের সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছিলেন যে তা সত্যি প্রশংসনীয়।
তাদের দেখতে পেয়ে সৃজন চেয়ার ছেড়ে উঠে রেলিং ধরে দাঁড়ালেন। তাঁরাও এবার সৃজনকে দেখতে পেলেন। নির্মল হাত নাড়লেন সৃজনের উদ্দেশে, তারপর এগিয়ে আসতে লাগল হোম স্টে-র দিকে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলার জন্য বারান্দা ছেড়ে নীচে নামলেন তিনি। তারপর গেট খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তারা দুজন হোম স্টে-র গেটের মুখে সৃজনের সামনে এসে দাঁড়ালেন।
নির্মল একগাল হেসে সৃজনকে প্রশ্ন করলেন, ‘সারাদিন কোথায় কোথায় বেড়ালেন?’
সৃজন বললেন, ‘কোথাও না। সাফারি তো বন্ধ, তাই যাওয়া হল না। সারাদিন ঘরেই কাটালাম। আপনারা?’
মাস্টারমশাই বললেন, ‘আমাদেরও একই অবস্থা। সারাদিন ঘরেই কাটিয়ে বিকেলে হাঁটতে বেরিয়েছিলাম। আপনার কথা মনে পড়ল। বলেছিলেন, এদিকেই উঠেছেন। যদি আপনার সঙ্গে দেখা মেলে তাই হাঁটতে হাঁটতে এদিকে চলে এলাম। আমাদের সৌভাগ্য আপনার দেখা পেলাম।’ ঠিক এই সময় হঠাৎই সেই শব্দটা কানে এল ‘টক্ টক্ টক্ক্ষ!’
সৃজনের মনে হল আশপাশে কাছাকাছি জায়গা থেকেই যেন ডেকে উঠল প্রাণীটা। আর শব্দটা কানে যেতেই তারা দুজন চারপাশে তাকাতে লাগলেন।
তা দেখে সৃজন মৃদু হেসে বললেন, ‘ও তেমন কিছু নয়, তক্ষকের ডাক। এখানে একটা তক্ষক আছে। কাছেপিঠে ঘুরে বেড়ায়। রাতে গাছের মাথায় উঠে প্রচণ্ড শব্দ করে ডাকে। কথাটা শুনে নির্মল বললেন, ‘তাই নাকি! তক্ষকের ডাক? জঙ্গলের পথে এ শব্দ আমি একবার শুনেছি। তবে কীসের শব্দ তা জানতাম না।’
সৃজন বললেন, ‘আমার হোম স্টে-র মালিক বলছিল যে এখানে ভালো মানুষরা মারা গেলে নাকি তক্ষকের রূপ নিয়ে জঙ্গল পাহারা দেয়।’
নির্মল বললেন, ‘তার মানে বলতে চাইছেন যে তক্ষকরা আসলে মৃত মানুষের প্রেতাত্মা?’
সৃজন হেসে বললেন, ‘আমি কিছু বলতে চাইনি। হোম স্টে-র মালিক বলেছে। তার কথার অর্থ এমনটাই দাঁড়ায়।’
একথার পর সৃজন ভদ্রতাবশত তাঁদের বললেন, ‘আসুন, উপরে বারান্দায় বসে কথা বলি?’
নির্মল বললেন, ‘না, উপরে উঠব না। তাহলে ভুটিয়া বস্তিতে ফেরার আগেই অন্ধকার নেমে যাবে। এখানে আবার একটা খ্যাপা হাতি ঘুরছে! এখানে দাঁড়িয়ে আর দুটো কথা বলেই চলে যাব।’
এ কথা বলার পর নির্মল বললেন, ‘আমরা কাল ফিরব। আপনিও তো কাল ফিরবেন। আমার গাড়িটা তো ওপারেই আছে। আমাদের খুব ইচ্ছা আপনাকে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশন পর্যন্ত লিফট দিয়ে তারপর শিলিগুড়ি ফেরার। আপনার সঙ্গলাভের সুযোগ তো বারবার ঘটবে না। আপনার মতো সিনেমা আর্টিস্টকে আমরা শুধু দূর থেকেই দেখে এসেছি।’ নির্মলের কথা শেষ হতেই মাস্টারমশাই বললেন, ‘আপনার সেবা করার এই সুযোগ থেকে প্লিজ আমাদের বঞ্চিত করবেন না।’
প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এতে সৃজনের কিছুটা হলেও খরচ বাঁচে। কিন্তু ফেরার ব্যাপারে ইতিমধ্যে নকুলের সঙ্গে কথা হয়ে গিয়েছে সৃজনের। তাই তিনি প্রস্তাবটা শুনে একটু চুপ করে থেকে বললেন, ‘হোম
স্টে-র মালিকের জিপসিতে কাল সন্ধ্যা সাতটায় আমার রওনা হওয়ার কথা। হাতিপোতার রাস্তা দিয়ে সে আমাকে নিয়ে যাবে। ও পথে নাকি ওয়াইল্ড লাইফ দেখার সম্ভাবনা। ফেরার পথে একটা ছোটখাটো নাইট সাফারির মতো ব্যাপার হবে আর কী!’
কথাটা শুনেই নির্মল বললেন, ‘দারুণ ব্যাপার তো। আমরা যদি এই নাইট সাফারিতে আপনার সঙ্গী হই তাহলে আপত্তি আছে? আপনার গাড়ি হাতিপোতার রাস্তা ধরে প্রথমে নদীর ওপারে যেখানে আমাদের গাড়ি রাখা, সে পর্যন্ত পৌঁছে দেবে। তারপর সেখান থেকে আমরা আপনাকে নিউ আলিপুরদুয়ার পৌঁছে দেব।’
পশুপতি বললেন, ‘হ্যাঁ, আমরা কি আপনার সঙ্গী হতে পারি? আসলে ওই নাইট সাফারির মতো একটা ব্যাপার হবে বলছেন তো। তাই সঙ্গী হওয়ার লোভ সামলাতে পারছি না।’
সৃজন বললেন, ‘ঠিক আছে তবে তাই হবে। কাল সন্ধ্যা সাতটায় চলে আসবেন এখানে।’ নির্মল এরপর বললেন, ‘কাল আপনার পরিচয় পেয়ে ফরেস্ট অফিসার কেমন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল দেখলেন। আসলে আপনারা হলেন ভিআইপি। আপনাদের সঙ্গ লাভ করাটা বিরাট ব্যাপার।’
সূর্য পুরো ডুবে গিয়েছে। কমতে শুরু করেছে আলো। বনের দিকে তাকিয়ে নির্মল বললেন, ‘এবার আসি। তাহলে ওই কথাই রইল। কাল সন্ধ্যা সাতটায় হাজির হয়ে যাব আমরা।’
একথা বলে নমস্কার বিনিময় করে তাঁরা হাঁটতে শুরু করলেন ভুটিয়া বস্তির দিকে।
তারা এগোনোর পর সৃজন বেড়ার ঝাঁপ সরিয়ে হোম স্টে-তে পা রাখতেই সামনেই দেখতে পেল নকুলকে। সে তাকে প্রশ্ন করল, ‘স্যার, আপনি সিনেমা করেন?’
এ প্রশ্ন শুনে সৃজন বুঝতে পারলেন, এখানে দাঁড়িয়ে নকুল তাঁদের কথাবার্তা শুনেছে। সৃজন হেসে জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ।’
নকুল এরপর জানতে চাইল, ‘লোক দুজন কে স্যার?’
সৃজন বললেন, ‘ওঁরা শিলিগুড়ি থেকে এসেছেন। একজনের কাঠের ব্যবসা, চা-বাগান আছে। অন্য জন স্কুলমাস্টার। কাল সন্ধ্যায় ওঁরাও আমার সঙ্গে তোমার গাড়িতে যাবেন। আপত্তি নেই তো?’
নকুল বলল, ‘আপনি যেমন বলবেন, তেমনই হবে।’
সৃজন এরপর উপরে উঠে নিজের ঘরে ফিরে এলেন। আগের দুই সন্ধ্যার মতো তিনি যখন হুইস্কির বোতল নিয়ে বারান্দাতে এসে বসলেন তখন জঙ্গলের মাথার উপর চাঁদ উঠে গিয়েছে। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে জয়ন্তী নদীর বুকে। প্রতি সন্ধ্যার মতো নাইটজার পাখিটাও ডাকতে শুরু করেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে গাছের গুঁড়িগুলোর নীচে ঝোপেঝাড়ে জোনাকির নাচনও শুরু হল। শেষবারের মতো রাতের অরণ্যের সৌন্দর্য দেখতে দেখতে হুইস্কি খেতে লাগলেন সৃজন। সময়ও এগিয়ে চলল।
বোতলের অবশিষ্ট অংশটা শেষ করতে গিয়ে অন্য দু-রাতের চেয়ে একটু বেশি পান করে ফেললেন তিনি। সৃজন যেন একসময় দেখতে পেলেন হোম স্টে-র থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের দিকে হেঁটে যাচ্ছে এক মহিলা, নকুলের বউ।
এরপরই নকুল রাতের খাবার নিয়ে উপস্থিত হল। সৃজন বুঝতে পারলেন রাত ন’টা বাজে। বেশি মদ্যপান করার জন্য সৃজনের নেশা বেশ চড়েছে। তাই আর তিনি বেশি কথা বললেন না নকুলের সঙ্গে। চুপচাপ খাওয়া সেরে ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লেন।
মাঝরাতে হঠাৎই একবার ঘুম ভেঙে গেল বাইরে থেকে ভেসে আসা সেই শব্দে—‘টক্ টক্ টকক্ষ!’
এত তীব্র সেই ডাক যে বাইরে থেকে দরজা-জানলা বন্ধ ঘরেও সে ডাক প্রবেশ করছে! তবে বাড়ির ভিতর থেকে নয়, সৃজনের মনে হল সে ডাক বাইরে থেকেই আসছে। হয়তো-বা সেই নেড়া গাছের গুঁড়ির মাথায় বসেই ডাকছে প্রাণীটা। আকাশ বিদীর্ণ যেন এরপর উত্তেজিতভাবে আরও বেশ কয়েকবার প্রাণীটা ডাকল ‘টক্ টক্ টক্ক্ষ!’
তারপর সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সৃজনের চোখে আবারও ঘুম নেমে এল।
হয়তো-বা গত রাতে একটু বেশি পরিমাণ হুইস্কি খাওয়ার কারণেই অন্য দু-দিনের থেকে একটু বেশি দেরি করে ঘুম ভাঙল সৃজনের। প্রায় আটটা বাজে। বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে বাইরে বেরোতেই নকুল চা নিয়ে দরজায় ঠোকা দিল।
দরজা খুললেন সৃজন। নকুলের পরনে খাকি পোশাক, পায়ে জুতো, চোখে সানগ্লাস। তাকে দেখে সৃজনের মনে হল সম্ভবত সে বাইরে বেরোবে। ঘরে ঢুকে সে টেবিলে চায়ের কাপ নামিয়ে ফিরে যাচ্ছিল। সৃজন বললেন, ‘আজ তো ফিরে যাব। দাঁড়াও তোমার পাওনাটা এখন মিটিয়ে ফেলি।’
সৃজন পার্স থেকে দশটা পাঁচশো টাকার নোট নিয়ে এগিয়ে দিলেন নকুলের হাতে। আগে দিয়েছিলেন দুই, এখন পাঁচ। সব মিলিয়ে সাত হাজার। বেশ খানিকটা বেশি টাকাই তিনি খুশি হয়ে দিলেন নকুল ভুটিয়াকে। নকুল টাকাটা নিল ঠিকই। কিন্তু তার মুখে হাসি ফুটল না। তা দেখে সৃজন বললেন, ‘টাকাটা কম হল নাকি?’
নকুল সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘না, না বরং অনেক বেশি টাকাই আপনি দিলেন। আমি এখন একটু বাইরে যাচ্ছি।’ একথা বলে একটু গম্ভীরভাবে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল নকুল।
চায়ের কাপ হাতে বাইরের বারান্দায় এসে সৃজন বসলেন। অনেকক্ষণ আগে সূর্যোদয় হয়েছে। তার আলো ছড়িয়ে পড়েছে জয়ন্তীর নদীখাতে। জঙ্গলের ভিতর। তবু যেন এদিন সকালে চারপাশের পরিবেশটা কেমন থমথমে মনে হল। অন্য দিন পাখির ডাক, ময়ূরের চিৎকার ভেসে আসে জঙ্গলের ভিতর থেকে, কিন্তু আজ কোনও শব্দ নেই। চা পান করতে করতেই সৃজন দেখলেন হোম স্টে থেকে বাইরে বেরিয়ে নকুল হাঁটতে শুরু করেছে জঙ্গলের দিকে। তার হাতে একটা লাঠি। এরপর সে অদৃশ্য হয়ে গেল জঙ্গলের ভিতর।
নকুল জঙ্গলের ভিতর প্রবেশ করার পরও সৃজন বেশ কিছুক্ষণ বারান্দায় বসে রইলেন। শূন্য নদীতটের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে তার মনে একটা অদ্ভুত বিষণ্ণতা জেগে উঠল। এই নির্জন প্রকৃতি ছেড়ে আজই তো তাকে ফিরে যেতে হবে। কত তাড়াতাড়ি যেন ফুরিয়ে গেল সময়! এ ভাবনায় তার মনেও বিষণ্ণতা।
রোদ বাড়ছে। বেশ গায়ে লাগছে রোদটা। সৃজন তাই এরপর ঘরে ঢুকে গেলেন। বেলা এগারোটা নাগাদ সৃজন স্নান সেরে তাঁর কাজের জিনিসপত্র গুছিয়ে ফেললেন ফেরার জন্য।
দুপুর একটায় খাবার নিয়ে ঘরে ঢুকল নকুল। পরনে তাঁর একই পোশাক। চোখে চশমা। সৃজন তার মুখের দিকে তাকাতেই বুঝতে পারলেন নকুলের মুখটা সকালের থেকেও যেন বেশি গম্ভীর! নিঃশব্দে টেবিলে খাবার সাজাল। ভাত আর মুরগির ঝোল।
সৃজন খেতে বসলেন। কিছুটা তফাতে গম্ভীর মুখে নকুল দাঁড়িয়ে। সৃজন খেতে শুরু করে একসময় নকুলকে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘তোমাকে এত গম্ভীর দেখাচ্ছে কেন?’
একটু চুপ করে থেকে নকুল তাঁকে প্রশ্ন করে, ‘স্যার, আপনি আমার বউ লক্ষ্মীকে দেখেছেন?’
সৃজন বললেন, ‘কাল রাতে তুমি যখন আমার খাবার আনলে তার ঠিক আগে ওকে জঙ্গলে ঢুকতে দেখেছিলাম মনে হয়।’
নকুল বলল, ‘হ্যাঁ, তখন ও বাইরে বেরিয়েছিল। কিন্তু ওকে তারপর থেকে পাওয়া যাচ্ছে না!’
কথাটা শুনে খাওয়া থামিয়ে সৃজন জিজ্ঞাসা করলেন, ‘পাওয়া যাচ্ছে না মানে?’
নকুল বলল, ‘হ্যাঁ, ওকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই যে সে আপনার খাবার তৈরি করে হোম স্টে-র বাইরে গেছিল, তারপর আর ঘরে ফেরেনি।
সৃজন বললেন, ‘চিন্তার ব্যাপার তো। কোথায় যেতে পারে? আগে কখনও এমন হয়েছে? তোমাদের ঝগড়াঝাঁটি হয়েছে নাকি?’
নকুল বলল, ‘না, না, সেসব কিছু হয়নি। জঙ্গলে অনেক খুঁজলাম কিন্তু ওকে কোথাও পেলাম না!’
‘কোনও আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যায়নি তো? ভুটিয়া বস্তিতে?’
নকুল বলল, ‘না, আমাদের কোনও আত্মীয়স্বজন নেই এখানে। থাকলে কি লকডাউনের সময় আমাদের এমন অবস্থা হতো? জঙ্গলেই গেছিল। সে জন্যই চিন্তা হচ্ছে আমার।’
সৃজন বললেন, ‘এখন তবে কী করবে তুমি? পুলিস বা ফরেস্ট গার্ডদের জানাবে?’
নকুল বলল, ‘দেখি ও রাতের মধ্যে ফিরে আসে কি না। তারপর ভাবব কী করা যায়।’
একথা বলার পর নকুল বলল, ‘তবে আপনি ফেরার ব্যাপারে চিন্তা করবেন না স্যার। যেমন বলেছি তেমনই ঠিক আপনাকে পৌঁছে দেব। আমি এখন একবার বাইরে যাচ্ছি, দেখি লক্ষ্মীর কোনও খোঁজ পাওয়া যায় কি না।’
সৃজনের খাওয়া শেষ হলে চলে গেল নকুল। সৃজনও নকুলের বউয়ের বাড়ি না ফেরার খবরটা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন।
সৃজনের ঘুম ভাঙল বিকেল পাঁচটা নাগাদ। ঘুম ভাঙার পর সৃজনের আবার মনে হল নকুলের বউয়ের কি খোঁজ মিলেছে? নকুল কি ফিরে এসেছে?
খোঁজ নেওয়ার জন্য উঠে পড়লেন তিনি। বাইরে বারান্দায় বেরিয়ে একবার চারপাশে ভালো করে তাকালেন। না, কেউ কোথাও নেই। সূর্য ঢলে পড়তে শুরু করেছে পশ্চিমে। আর এক ঘণ্টার মধ্যেই অন্ধকার নামবে। তারপর সন্ধ্যা সাতটার সময় সৃজনকে রওনা হতে হবে ফেরার জন্য। বারান্দা থেকে নীচে নেমে তিনি দেখলেন নকুল তাঁর ঘরের চৌকাঠে বসে আছে। তাঁকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। সৃজন জানতে চাইলেন, ‘তোমার বউ ঘরে ফিরেছে?’
নকুল জবাব দিল, ‘না ফেরেনি। জঙ্গল, নদীর চর, হাতিপোতার দিক থেকে ভুটিয়া বস্তি সব জায়গাতে খুঁজে এলাম।’
এ কথা বলার পর নকুল জানতে চাইল, ‘আপনার সঙ্গে যাঁরা যাবেন, তাঁরা কখন আসবেন?’ সৃজন বললেন, ‘সাতটার আগেই এসে যাবেন নিশ্চয়ই। তুমি আমাদের হাতিপোতা হয়ে ওপারে যেখানে ওঁদের গাড়ি রাখা আছে সে পর্যন্ত পৌঁছে দেবে।’
নকুল বলল, ‘আচ্ছা স্যার।’
সৃজন এরপর নীচ থেকে উপরে ফিরে গিয়ে বারান্দায় বসলেন। ধীরে ধীরে নিঃশব্দে কিছু সময়ের মধ্যেই অন্ধকার নামতে শুরু করল চারপাশে। চাঁদ ওঠার আগে যখন অন্ধকারে জঙ্গল আর জয়ন্তীর চর তার চোখে হারিয়ে গেল তখন ঘরে ঢুকে লণ্ঠন জ্বালালেন তিনি। দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল তাঁর রওনা হওয়ার সময়। সাড়ে ছ’টা বাজতেই বাইরে যাওয়ার জন্য পোশাক পরে তৈরি হতে লাগলেন সৃজন।
সৃজনের ঘড়ির কাঁটা যখন প্রায় সাতটার কাছে তখন তিনি রওনা হওয়ার জন্য একেবারে তৈরি হয়ে তার লাগেজ নিয়ে বারান্দায় বেরোলেন। বাইরে ততক্ষণে চাঁদ উঠতে শুরু করেছে। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে অরণ্য। জয়ন্তীর পাথর বিছানো শুভ্রতট। তিনি বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই হোম স্টে-র সামনের রাস্তা থেকে নির্মল রায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এল ‘সৃজনবাবু, আমরা এসে গেছি।’
সৃজন জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, আসছি আমি।’
তিনি লাগেজ নিয়ে নীচে নামতেই দেখতে পেলেন নকুলকে। সে বলল, ‘আপনারা রাস্তায় দাঁড়ান, আমি গাড়ি নিয়ে বেরোচ্ছি।’ বলে সে এগোল তার রান্নাঘরের পাশে রাখা গাড়িটার দিকে।
সৃজন রাস্তায় বেরিয়ে এলেন। সামনেই দাঁড়িয়ে নির্মল আর পশুপতি। নির্মল এক গাল হেসে বললেন, ‘গুড ইভনিং। আপনার সঙ্গে এভাবে যেতে পারছি, এ ব্যাপারটা ভাবতেই কেমন যেন থ্রিল ফিল করছি।’
গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করার মৃদু শব্দ কানে এল সৃজনের। নকুল গাড়ি বের করছে।
নির্মলের কথার জবাবে সৃজন বললেন, ‘হাতিপোতার রাস্তায় তো নাকি ওয়াইল্ড লাইফ দেখার সম্ভাবনা থাকে। দেখা যাক আমাদের ভাগ্যে কী আছে!’
তাদের দুজনের সঙ্গে টুকটাক দু-একটা কথা বলতে না বলতেই হোম স্টে-র পিছন দিক দিয়ে গাড়ি বের করে তাদের সামনে হাজির হল নকুল। জিপসি গাড়ি। পিছনটা ছাদহীন, উন্মুক্ত। মালপত্র গাড়িতে তোলার জন্য নকুল গাড়ি থেকে নামল। মালপত্র অবশ্য তেমন বেশি কিছু নেই। সৃজনের কাছে একটা ট্রলি ব্যাগ আর চেনওয়ালা চটের শপিং ব্যাগ। নির্মল রায়ের হাতে একটা ছোট সুটকেস আর পশুপতি মাস্টারের পিঠে একটা।
নকুল গাড়ি থেকে নামার পর কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল নির্মল আর মাস্টারমশাইয়ের দিকে। তারপর সে দুবার বড় বড় শ্বাস টেনে সৃজনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিন, লাগেজ পিছনে রাখি। আপনি আমার পাশে বসবেন আর ওঁরা গাড়ির পিছনে বসে বা দাঁড়িয়ে যাবেন জঙ্গল দেখতে দেখতে।’
নির্মল সঙ্গে সঙ্গে সৃজনকে বললেন, ‘হ্যাঁ আপনি সামনে বসুন, আমরা পিছনে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে দেখতে যাব লোকে যেমন জঙ্গল সাফারিতে যায়।’
সৃজনের লাগেজ প্রথমে গাড়ির পিছনে তুলে ফেলল নকুল। নির্মল রায়ের সুটকেসটাও সে তুলল। তারপর পশুপতির দিকে তাঁর ব্যাগের জন্য হাত বাড়াতেই তিনি বললেন, ‘এটা আমার কাঁধেই থাক।’
‘জিপসি’-র পিছনে উঠে হ্যান্ডেল ধরে দাঁড়ালেন নির্মল আর পশুপতি। সৃজনও উঠে বসলেন ড্রাইভারের পাশের আসনে। তিনি খেয়াল করলেন চালকের সামনে উঠে বসার আগে আবারও নকুল বাতাসে শ্বাস টানল।
হেডলাইট জ্বলে উঠল। গাড়ি রওনা হয়ে গেল জঙ্গলের পথ বেয়ে। একটু এগোতেই সৃজন চাপা স্বরে তার পাশে বসা নকুলকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার বউয়ের খোঁজ পেলে?’
নকুলও চাপা স্বরে জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, পেয়েছি। কোথায় পরে বলব। এখন কোনও কথা বলবেন না। আপনার ওয়াইল্ড লাইফ দেখার শখ পূরণ করব আমি।’
নকুলের বউয়ের খোঁজ পাওয়া আর বন্য জন্তু দেখার সম্ভাবনা, এ দুটো কথা শুনে সৃজনের ভালো লাগল। তিনি চেয়ে রইলেন সামনের দিকে।
হেডলাইট জ্বেলে ধীর গতিতে এগোতে লাগল নকুলের গাড়ি। হোম স্টে থেকে রওনা হয়ে গাড়িটা প্রথমে একপাশে জঙ্গল আর অন্য পাশে নদী চরের মাঝে রাস্তা ধরে চললেও একসময় জয়ন্তীর নদীখাতটা পাশ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল। পথের দুপাশে শুরু হল জঙ্গল। বিরাট বিরাট গাছ আর ঝোপজঙ্গল। চাঁদ মাথার উপর উঠতে শুরু করেছে, তবে তার আলো জঙ্গলের গভীরে না পৌঁছোলেও সামনের রাস্তা অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। মাঝে মাঝে রাস্তা সামান্য বাঁক নিয়েছে। সে সময় গাড়ির হেডলাইটের আলো পিছলে পড়ছে পথের পাশের জঙ্গলের গায়ে। সবাই নিশ্চুপ। সবার দৃষ্টিই জঙ্গলের উপর নিবদ্ধ। যদি কোনও বন্যপ্রাণীর দেখা মেলে সেই আশায়। সৃজন তাকিয়ে সামনের দিকে। বেশ রোমাঞ্চ অনুভব হচ্ছে তাঁর।
মিনিট পনেরো চলার পর এক জায়গায় এসে নকুল গাড়ি থামাল। তারপর হেডলাইট নিভিয়ে দিল। সামনে চাঁদের আলোয় একটা সরু নদীখাত প্রবাহিত হচ্ছে জঙ্গলের বুকে। সামান্য জলও আছে তাতে। নকুল সেখানে গাড়ি দাঁড় করাল সৃজনদের বন্যপ্রাণী দেখানোর আশায়।
মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আশাপূরণ করে একদল প্রাণী রাস্তার একপাশের ঝোপের আড়াল থেকে বাইরে এসে শীর্ণ নদীতে জল খেতে নামল।চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে প্রাণীগুলোকে। একপাল হরিণ। বিরাট বড় সিং আছে একটা হরিণের। সম্ভবত সে-ই দলপতি। নদীতে নেমে জল খেয়ে আবার জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল তারা। সৃজন বললেন, ‘দারুণ ব্যাপার দেখলাম।’
নকুল চাপা স্বরে বলল, ‘এর থেকে অনেক বড় ওয়াইল্ড লাইফ দেখতে পাবেন আপনি।’ আবার হেডলাইট জ্বলে উঠল, চলতে শুরু করল গাড়ি। নদীখাতটা পার হয়ে জঙ্গলের রাস্তার আরও গভীরে প্রবেশ করল নকুলের জিপসি।
আরও মিনিট পনেরো চলার পর আবারও দাঁড়িয়ে পড়ল নকুলের গাড়ি। জায়গাটার দুপাশে দশ-বারো ফুট করে ঝোপঝাড় আর প্রাচীন গাছের জঙ্গল। সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নকুল বলল, ‘আমি বাথরুম করে আসি। আপনি কিন্তু নীচে নামবেন না।’ হেডলাইট জ্বালানো অবস্থাতেই নকুল নীচে নেমে রাস্তার একপাশে একটা ঝোপের আড়ালে চলে গেল।
মিনিট তিনেক কেটে যাওয়ার পরও যখন নকুল ফিরল না, তখন গাড়ির পিছনে দাঁড়ানো নির্মল বললেন, ‘আমাদের মাঝ রাস্তায় দাঁড় করিয়ে ড্রাইভার কোথায় গেল?’
সৃজন বললেন, ‘বলে গেল বাথরুম করতে যাচ্ছে। বড় কাজ হয়তো। সেজন্য ফিরতে দেরি হচ্ছে।’
নকুলের ফেরার প্রত্যাশায় সবাই তাকিয়ে রইল, যে ঝোপের আড়ালে গিয়েছে সেদিকে। আর এরপরই সেদিক থেকে একটা শব্দ শোনা গেল—টক্ টক্ টক্! তক্ষকের ডাক। আর তারপরই হেডলাইটের আলোয় সবাই দেখতে পেল একটা তক্ষক বেরিয়ে এসে রাস্তার মাঝখানে এসে দাঁড়াল। আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে গায়ে ফোঁটা আঁকা শরীর। তবে তার চলা-ফেরা দেখে মনে হল সম্ভবত সে আহত বা অসুস্থ, ভালো করে চলতে পারছে না। রাস্তার মাঝখানে এসে সে একবার ঘাড় উঁচিয়ে গাড়িটার দিকে তাকিয়ে সোজা রাস্তা বরাবর ধীরগতিতে হাঁটতে লাগল।
সৃজন শুনলেন, চাপা স্বরে কী যেন কথা হল গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা নির্মল আর তাঁর শ্যালকের মধ্যে। আর তারপরই গাড়ি থেকে লাফ দিয়ে তাঁরা নীচে নেমে পড়লেন। নির্মলের উদ্দেশে সৃজন বললেন, ‘নামলেন কেন আপনারা?’
প্রশ্নের জবাবে সৃজনকে অবাক করে দিয়ে নির্মল কোমর থেকে একটা পিস্তল টেনে বের করে সেটা গাড়ির ভিতর বসে থাকা তাঁর দিকে তাক করে বললেন, ‘চুপ করে বসে থাকুন। এবার আমরা যেভাবে বলব সেভাবে আপনি আর আপনার ড্রাইভার চলবেন। নইলে বিপদ হবে।’ এ কথা বলার পর তিনি আর পশুপতি এগোলেন ধীর পায়ে এগোতে থাকা তক্ষকটার দিকে। হেডলাইটের আলোয় সৃজন দেখলেন পশুপতির হাতে একটা জাল রয়েছে। তা দেখে তাঁরা কী করতে চলেছেন তা বুঝতে অসুবিধা হল না সৃজনের। হতভম্বর মতো সামনের দিকে তাকিয়ে রইলেন তিনি।
হেডলাইটের আলো যে পর্যন্ত পৌঁছেছে, আনুমানিক সেই পঞ্চাশ-ষাট ফুট দূর পর্যন্ত তক্ষকের পিছু ধাওয়া করে এগিয়ে গেলেন তাঁরা দুজন। এরপর তক্ষকটা হঠাৎই দাঁড়িয়ে পড়ল।
পশুপতি তাঁর হাতের জালটা ফেলতে যাচ্ছিলেন ওটার গায়ে। ঠিক সেই সময় তক্ষকটা ‘টক টক’ শব্দে চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল পাশের একটা বিরাট ঝোপের গায়ে। আর তার পরমুহূর্তেই সৃজনকে প্রচণ্ড অবাক করে দিয়ে সেই ঝোপটা যেন উঠে দাঁড়াল! ঝোপ কোথায়! এ তো একটা বিরাট দাঁতাল হাতি! এরপর যে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল তা প্রায় স্তব্ধ করেছিল সৃজনের হৃৎপিণ্ড। হাতিটা প্রথমে শুঁড়ের নাগালের মধ্যে পেয়ে গেল পশুপতিকে। নিমেষের মধ্যে পশুপতিকে শুঁড়ে তুলে আছাড় মারল মাটিতে। চূর্ণ হয়ে গেল তাঁর শরীর।
নির্মল রায়ের মনে হয় আর গুলি চালানোর কথা মাথায় এল না। হলেও অবশ্য তাতে কাজ হতো না একেবারেই। পশুপতির অবস্থা দেখে নির্মল পালাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এবার তাঁর উপর এসে পড়ল হাতিটা। মাটিতে ফেলে উন্মত্ত দাঁতালটা পায়ের নীচে দলতে থাকল নির্মলের শরীরটা। সে এক বীভৎস দৃশ্য।
নির্মলের শরীরটা যখন মাংসপিণ্ডে পরিণত হল তখন হাতিটা থামল। তারপর খুনে দাঁতালটা সোজা তাকাল গাড়িটার দিকে। হেডলাইটের আলোয় জ্বলছে তার হিংস্র চোখ দুটো! গাড়ির দিকে ছুটে আসার আগে হাতিটা যেন একবার জরিপ করে নিচ্ছে। সাক্ষাৎ মৃত্যুকে দেখতে পেয়ে সৃজনের শরীর অসাড় হয়ে গেল! বিস্ফারিত চোখে তিনি চেয়ে রইলেন হাতিটার দিকে। প্রতি মুহূর্তে তার মনে হতে লাগল এই বুঝি হাতিটা ছুটে এল!
কিন্তু এরপরই তাঁর একসময় মনে হতে লাগল হাতিটা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও তার বিশাল শরীরটা ক্রমশ যেন ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে!
সৃজনের কানের কাছে ফিসফিস করে কে যেন বলল, ‘শব্দ করবেন না।’
সৃজন এবার খেয়াল করলেন, কখন যেন চালকের সামনে উঠে বসেছে নকুল। ধীরে ধীরে গাড়িটাকে সে পিছোচ্ছে! একসময় হাতিটার থেকে বেশ অনেকটাই দূরে সরে এল গাড়ি। নকুল এরপর ক্ষিপ্র হাতে গাড়িটাকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, ‘আর আপনার ভয় নেই।’
সৃজন যে ভয়ঙ্কর দৃশ্যর সাক্ষী হয়েছেন তার আতঙ্ক থেকে তিনি এখনও মুক্ত হতে পারেননি। নিশ্চুপ হয়ে বসে রইলেন তিনি। গাড়ি চালাতে লাগল নকুল।
সে এসে থামল সেই শীর্ণ নদীর সামনে। যেখানে হরিণরা জল খেতে এসেছিল। চাঁদের আলোয় ফটফট করছে জায়গাটা। গাড়ি থেকে নেমে নকুল বলল, ‘স্যার, একটু নামুন। আপনাকে একটা জিনিস দেখাব।’
সৃজন তার কথা শুনে নীচে নামলেন। নকুল এরপর গাড়ির পিছনে পড়ে থাকা পশুপতির ব্যাগটা খুলল। তার ভিতর থেকে বেরিয়ে এল গায়ে ফুটো করা একফুট মতো লম্বা একটা স্টিলের বাক্স। নকুল সেই বাক্সটা খুলতেই অবাক হয়ে গেলেন সৃজন। তার মধ্যে রয়েছে একটা তক্ষক! চাঁদের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে তার নীল পিঠ, আর গায়ের ফোঁটাগুলো! প্রাণীটা নড়ছে! তবে প্রাণীটার মুখে একটা স্টিকিং প্লাস্টার আটকানো আছে যাতে সে চিৎকার করতে না পারে।
প্রাণীটাকে হাতে তুলে নিয়ে তার মুখে লাগানো স্টিকিং প্লাস্টারটা খুলতে খুলতে নকুল বলল, ‘একটা তক্ষক ধরেও ওদের লোভ মিটবে না বুঝতে পেরেছিলাম। তাই তো দাঁতালটার কাছে নিয়ে গিয়ে ওদের শাস্তির ব্যবস্থা করলাম। নইলে ওরা আবারও জঙ্গলে হানা দিত তক্ষক ধরতে। লোক দুটো আসলে তক্ষক পাচারকারী ছিল। ওরা আপনার সঙ্গী হতে চেয়েছিল, আপনার পরিচয় পেলে লোকেরা গাড়ি সার্চ করবে না বলে।’
একটি ধাতস্থ হয়ে সৃজন জানতে চাইলেন, ‘তুমি কী করে বুঝলে ব্যাগের মধ্যে তক্ষক আছে?’ নকুল বলল, ‘গন্ধে। আমরা বনের মানুষ, তক্ষকের গন্ধ পাই। ও গন্ধ আপনারা পাবেন না।’
প্রাণীটার মুখ থেকে স্টিকিং প্লাস্টারটা খুলে তাকে নকুল নামিয়ে রাখল সিটের এক কোণে। তক্ষকটা ঘাড় তুলে দেখতে লাগল সৃজনকে। তক্ষক শিকারিদের জিনিসপত্রগুলো নকুল ছুড়ে ফেলল জঙ্গলের মধ্যে। সৃজনের ট্রলিব্যাগ আর চটের ব্যাগটা তুলে নিয়ে রাখল ড্রাইভারের আসনের পাশে। তারপর সে সৃজনকে বলল, ‘চলুন স্যার, আপনাকে নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে আসি। তবে যা দেখলেন, কাউকে বলবেন না।’
নকুল গাড়িতে উঠে বসল। উঠে বসলেন সৃজনও। গাড়ি সেই নদীর পাড় ধরে চলতে চলতে একসময় পৌঁছে গেল চাঁদের আলোয় জেগে থাকা জয়ন্তী নদীর খাতে। তারপর নদী পেরিয়ে ওপারে পৌঁছে সোজা রওনা হল গন্তব্যের দিকে। সারা রাস্তা সৃজন বা নকুল কেউ কোনও কথা বললেন না।
সৃজনরা যখন নিউ আলিপুরদুয়ার স্টেশনে এসে পৌঁছোলেন তখন রাত প্রায় দশটা। আলোকোজ্জ্বল প্রধান প্রবেশ পথে নয়, নকুল তার গাড়িটা এনে দাঁড় করাল স্টেশনের মূল প্রবেশ তোরণের বিপরীতে। সেখান থেকে কয়েকটা লাইন পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে উঠতে হয়। জায়গাটা নির্জন, কোনও লোকজন নেই। শুধু রাস্তার পাশে কয়েকটা ল্যাম্প পোস্ট সেখানে ম্যাটমেটে আলো ছড়াচ্ছে। তেমনই একটা ল্যাম্পপোস্টের নীচে তার জিপসি গাড়িটা থামল।
দরজা খুলে লাগেজ নিয়ে সৃজন নামলেন। ড্রাইভারের আসনে বসা নকুল তাঁর উদ্দেশে বলল, ‘আপনি ভালো মানুষ, তাই আপনাকে হোম স্টে-তে আশ্রয় দিয়েছিলাম। দুঃখ কী জানেন, কত মানুষকে এর আগে থাকতে দিয়েছিলাম আমার বাড়িতে, কিন্তু লকডাউনের সময় কেউ খোঁজ নিল না আমরা বাঁচলাম, নাকি মরলাম।’
আর একথা বলার পর সে একটু থেমে বলল, ‘না, আমরা মরিনি। ভালো মানুষরা মরে না। আমরা মরলে জঙ্গল পাহারা দেবে কে? আমরা আর জঙ্গল তো আলাদা নয়।’
বিদায় নেওয়ার আগের মুহূর্তে সৃজন হাত নেড়ে টা টা করে তাকালেন নকুল ভুটিয়ার মুখের দিকে। ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে নকুলের মুখে। সৃজন দেখলেন নকুলের চোখের মণি দুটো কেমন যেন বড় বড় দেখাচ্ছে, আর তার মধ্যে রয়েছে একটা ফালি দাগ। তক্ষকের চোখে যেমন থাকে। ঠোঁটের কোণে জেগে আছে একটা অদ্ভুত হাসি!
নকুল এগোল গাড়িটা নিয়ে। ঠিক তখন আরও একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেলেন সৃজন। গাড়ির পিছনের আসনে নকুল তক্ষকটাকে যেখানে রেখেছিল সেখানে বসে আছে লক্ষ্মী! গায়ে তার ফোঁটা ছাপের পোশাক, তক্ষকের গায়ে যেমন ফোঁটা থাকে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে গাড়িটা মিলিয়ে গেল অন্ধকারে। রেললাইন টপকে ঝলমলে প্ল্যাটফর্মের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সৃজনের মনে পড়ে গেল নকুল ভুটিয়ার মুখে শোনা কথাটা—
‘জঙ্গলে ভালো মানুষরা মারা গেলে তাদের আত্মারা তক্ষকের রূপ ধরে জঙ্গল পাহারা দেয়!’
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন