গ্যাঁড়া

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

আজ রাত্রে আমার কন্যার বিবাহ।

সকালবেলা দার্শনিক মনোভাব লইয়া বাহিরের বারান্দায় বসিয়া আছি। একটা নূতন সম্বন্ধের সূত্রপাত হইতে চলিয়াছে। মানুষের জীবনে নূতন নূতন সম্পর্কের বন্ধন ক্রমাগত বাড়িয়াই চলিতে থাকে। ...

বাড়ি আত্মীয়-কুটুম্বে ভরিয়া গিয়াছে। অসংখ্য ছোট ছোট ছেলে মেয়ে পিপীলিকার মতো চারিদিকে ছুটাছুটি করিয়া বেড়াইতেছে; কলহ করিতেছে, হাসিতেছে, কাঁদিতেছে, আছাড় খাইতেছে। ইহাদের সকলকে ভাল করিয়া চিনি না।

আকাশে কাক-চিল আমার বাড়িটাকেই লক্ষ্য করিয়া চারিদিকে উড়িয়া বেড়াইতেছে; কারণ তেতলার ছাদে রান্নার আয়োজন ও ভিয়ান বসিয়াছে। কলিকাতায় কাক-চিলের সংখ্যা বড় কম নয়।

সকলের সহিত তাল রাখিয়া উঠানের এক কোণে শানাই বাজিতেছে। বাড়ি সরগরম।

এখনও দু’ একজন আত্মীয়-বন্ধু আসিয়া পৌঁছিতে বাকি আছে। ভাগলপুর হইতে ছোট শ্যালকের আসিবার কথা—

বাড়ির সম্মুখে গাড়ি আসিয়া থামিল; ছোট শ্যালক গাড়ি হইতে নামিল। সঙ্গে একটি অপরিচিত যুবক; আদ্দির পাঞ্জাবি-পরা হৃষ্টপুষ্ট বলিষ্ঠ চেহারা, পায়ে বার্নিশ পাম্প্‌-সু, হাতে সোনার রিস্ট-ওয়াচ—বেশ—ভব্যিযুক্ত মানুষ—

শ্যালককে সম্ভাষণ করিলাম, ‘এসো হে সমর—’

সমর আসিয়া আমাকে একটা প্রণাম ঠুকিল। অত্যন্ত চট্‌পটে কর্মপটু আমার এই শ্যালকটি! একদণ্ড চুপ করিয়া বসিয়া থাকিবার পাত্র নয়। সর্বদাই ব্যস্ত।

প্রণাম করিতে করিতেই বলিল, ‘এসে পড়লাম। আবার কালই ফিরতে হবে। গ্যাঁড়াকেও নিয়ে এলাম।...গ্যাঁড়া, তুমি বসো, আমি চট্‌ করে দিদির সঙ্গে দেখা করে আসি।’

সঙ্গীকে আমার কাছে বসাইয়া সমর বাড়ির ভিতর অন্তর্হিত হইল। বড়ই বিব্রত হইয়া পড়িলাম। এই ভদ্র যুবকটির নাম গ্যাঁড়া তাহাতে সন্দেহ নাই। সম্ভবত ভাল নাম একটা আছে, কিন্তু আমি তাহা জানি না। ইনি সমরের বন্ধু, সম্ভবত ধনী। ইঁহাকে কি বলিয়া সম্বোধন করিব?

যাহোক, শ্যালকের বন্ধু, আমার কন্যার বিবাহে আসিয়াছেন, আপ্যায়িত করিতে হইবে। বলিলাম, ‘বড় খুশি হলাম, হেঁ হেঁ—ভাগলপুরেই থাকা হয় বুঝি।’

‘আজ্ঞে, বাঙালীটোলায়।’

গ্যাঁড়ার গলার আওয়াজ ঘষা-ঘষা, যেন ধোঁয়ায় বদ্ধ হইয়া গিয়াছে; কিন্তু তাহার কথার ভঙ্গির মধ্যে বেশ একটা তেজস্বিতা আছে। অস্বস্তি আরও বাড়িয়া গেল। যুবককে ঠিক কিভাবে গ্রহণ করিব স্থির করিতে পারিতেছি না। সমকক্ষের মতো ব্যবহার করিব, না সম্মানিত ব্যক্তির মতো? অথবা স্নেহভাজন কনিষ্ঠের মতো? আপনি না তুমি? অবশ্য আমি তাহার চেয়ে বয়সে বড়, কিন্তু কেবলমাত্র বয়োজ্যেষ্ঠতার জোরে কাহাকেও ‘তুমি’ বলা নিরাপদ নয়। তাহার পায়ের পাম্প্ ও হাতের রিস্ট-ওয়াচ বেশ দামী বলিয়াই মনে হইতেছে।

গ্যাঁড়া! নামটা এমন বেয়াড়া যে উহাকে মোলায়েম করিয়া আনাও এক রকম অসম্ভব। অথচ গ্যাঁড়া বলিতেও বাধিতেছে। মনে মনে কয়েকবার ‘গেঁড়ুবাবু, গেঁড়ুবাবু’ উচ্চারণ করিলাম, কিন্তু খুব শ্রুতিমধুর মনে হইল না।

যুবক নাসিকার প্রান্তভাগ কয়েকবার কুঞ্চিত করিয়া হঠাৎ বলিল, ‘ঘি পুড়ছে—ঘি পুড়ছে—’ কণ্ঠস্বরে একটু অসন্তোষ প্রকাশ পাইল।

আমি বলিলাম, ‘ছাদে ভিয়েন বসেছে কিনা। আপনার নাক তো খুব তীক্ষ্ণ, গেঁড়ুবাবু...’

‘গ্যাঁড়া—গ্যাঁড়া। বাবু-টাবু নয়। আমাকে সবাই গ্যাঁড়া বলে ডাকে।’

বিশেষ বিচলিত হইয়া পড়িলাম। কি করা যায়? শেষ পর্যন্ত কি ভদ্রলোককে গ্যাঁড়া বলিয়াই ডাকিতে হইবে? কিন্তু মনের ভিতর সায় পাইতেছি না যে!

সমস্যা যখন এইরূপ সঙ্গীন হইয়া উঠিয়াছে, এমন সময় সমর ফিরিয়া আসিল—

‘নাও নাও, গ্যাঁড়া, আর দেরি কোরো না—কাজ আরম্ভ করে দাও। তেতলার ছাদে ভিয়েন বসেছে, তুমি সটান সেখানে চলে যাও। দিদি সব ব্যবস্থা করে দেবেন।’

গ্যাঁড়া চক্ষের নিমেষে পাঞ্জাবি, পাম্প্ ও রিস্ট-ওয়াচ খুলিয়া তৈয়ার হইয়া দাঁড়াইল। সমর আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিল, ‘খাজা তৈরি করবার জন্যে গ্যাঁড়াকে নিয়ে এসেছি। ও হল ভাগলপুরের সেরা কারিগর।’

মুহূর্ত মধ্যে গ্যাঁড়ার সহিত আমার সম্পর্ক সহজ ও সরল হইয়া গেল; তাহাকে গ্যাঁড়া এবং তুমি বলিতে মনের মধ্যে আর কোনও দ্বিধা রহিল না।

হাসিয়া বলিলাম, ‘বেশ, বেশ, তাহলে আর দেরি নয়, গ্যাঁড়া, তুমি কাজে লেগে যাও। বিকেল থেকেই বড় বড় অতিথিরা আসতে আরম্ভ করবেন—চিংড়িদহের কুমার বাহাদুর, স্যার ফজলু—দেখো, যেন ভাগলপুরের নিন্দে না হয়।’

৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৫১

সকল অধ্যায়
১.
প্রেতপুরী
২.
বিজ্ঞাপন বিভ্রাট
৩.
উড়ো মেঘ
৪.
বেড়ালের ডাক
৫.
প্লেগ
৬.
রূপসী
৭.
কবি-প্রিয়া
৮.
রক্ত-খদ্যোত
৯.
টিকটিকির ডিম
১০.
দৈবাৎ
১১.
অন্ধকারে
১২.
বিজয়ী
১৩.
করুণাময়ী
১৪.
দুই দিক্
১৫.
শীলা-সোমেশ
১৬.
কুলপ্রদীপ
১৭.
মরণ-ভোমরা
১৮.
ইতর-ভদ্র
১৯.
রূপকথা
২০.
কর্তার কীর্তি
২১.
কালকূট
২২.
অশরীরী
২৩.
ব্রজলাট
২৪.
সন্ধি-বিগ্রহ
২৫.
উল্কার আলো
২৬.
অরণ্যে
২৭.
মেথুশীলা
২৮.
মনে মনে
২৯.
সবুজ চশমা
৩০.
নারীর মূল্য
৩১.
আলোর নেশা
৩২.
বহুবিঘ্নানি
৩৩.
ট্রেনে আধঘণ্টা
৩৪.
গ্রন্থকার
৩৫.
কুবের ও কন্দর্প 
৩৬.
মরণ দোল
৩৭.
অমরবৃন্দ 
৩৮.
আঙটি 
৩৯.
তিমিঙ্গিল
৪০.
ভেন্‌ডেটা
৪১.
ভল্লু সর্দার
৪২.
বিদ্রোহী
৪৩.
স্বখাত সলিল
৪৪.
অভিজ্ঞান
৪৫.
জটিল ব্যাপার
৪৬.
আদিম নৃত্য
৪৭.
একূল ওকূল
৪৮.
প্রতিদ্বন্দ্বী
৪৯.
কেতুর পুচ্ছ
৫০.
শালীবাহন
৫১.
বরলাভ
৫২.
প্রেমের কথা
৫৩.
ভালবাসা লিমিটেড
৫৪.
মায়ামৃগ
৫৫.
সন্দেহজনক ব্যাপার
৫৬.
তন্দ্রাহরণ
৫৭.
বহুরূপী
৫৮.
হাসি-কান্না
৫৯.
প্রণয়-কলহ
৬০.
ধীরে রজনি!
৬১.
ন্যুডিস্‌ম-এর গোড়ার কথা
৬২.
শুক্লা একাদশী
৬৩.
মন্দ লোক
৬৪.
দন্তরুচি
৬৫.
প্রেমিক
৬৬.
স্বর্গের বিচার
৬৭.
মায়া কানন
৬৮.
প্রতিধ্বনি
৬৯.
অযাত্রা
৭০.
কুতুব শীর্ষে
৭১.
টুথ-ব্রাশ
৭২.
নাইট ক্লাব
৭৩.
নিশীথে
৭৪.
রোমান্স
৭৫.
যস্মিন্ দেশে
৭৬.
পিছু ডাক
৭৭.
গোপন কথা
৭৮.
অপরিচিতা
৭৯.
ঘড়ি
৮০.
গ্যাঁড়া
৮১.
মাৎসন্যায়
৮২.
লম্পট
৮৩.
আরব সাগরের রসিকতা
৮৪.
এপিঠ ওপিঠ
৮৫.
ঝি
৮৬.
অসমাপ্ত
৮৭.
শাপে বর
৮৮.
ইচ্ছাশক্তি
৮৯.
পঞ্চভূত
৯০.
ভাল বাসা
৯১.
আধিদৈবিক
৯২.
বাঘিনী
৯৩.
ভূতোর চন্দ্রবিন্দু
৯৪.
সেকালিনী
৯৫.
দিগ্‌দর্শন
৯৬.
মুখোস
৯৭.
আণবিক বোমা
৯৮.
স্মর-গরল
৯৯.
ছুরি
১০০.
আকাশবাণী
১০১.
নিষ্পত্তি
১০২.
শাদা পৃথিবী
১০৩.
ভাগ্যবন্ত
১০৪.
মেঘদূত
১০৫.
পরীক্ষা
১০৬.
বালখিল্য
১০৭.
পূর্ণিমা
১০৮.
নূতন মানুষ
১০৯.
স্বাধীনতার রস
১১০.
ও কুমারী
১১১.
যুধিষ্ঠিরের স্বর্গ
১১২.
ধীরেন ঘোষের বিবাহ
১১৩.
দেহান্তর
১১৪.
ভূত-ভবিষ্যৎ
১১৫.
ভক্তিভাজন
১১৬.
গ্রন্থি-রহস্য
১১৭.
জোড় বিজোড়
১১৮.
নিরুত্তর
১১৯.
অলৌকিক
১২০.
সন্ন্যাস
১২১.
তা তা থৈ থৈ
১২২.
আদায় কাঁচকলায়
১২৩.
বনমানুষ
১২৪.
বড় ঘরের কথা
১২৫.
শ্রেষ্ঠ বিসর্জন
১২৬.
অষ্টমে মঙ্গল
১২৭.
কল্পনা
১২৮.
তাই নে রে মন তাই নে
১২৯.
কানু কহে রাই
১৩০.
অপদার্থ
১৩১.
চরিত্র
১৩২.
দেখা হবে
১৩৩.
গীতা
১৩৪.
গুহা
১৩৫.
শরণার্থী
১৩৬.
শূন্য শুধু শূন্য নয়
১৩৭.
মধু-মালতী
১৩৮.
চিরঞ্জীব
১৩৯.
মায়া করঙ্গী
১৪০.
ঘড়িদাসের গুপ্তকথা
১৪১.
সতী
১৪২.
নীলকর
১৪৩.
এমন দিনে
১৪৪.
কালো মোরগ
১৪৫.
নখদর্পণ
১৪৬.
সাক্ষী
১৪৭.
হেমনলিনী
১৪৮.
পতিতার পত্র
১৪৯.
সেই আমি
১৫০.
মানবী
১৫১.
প্রিয় চরিত্র
১৫২.
স্ত্রী-ভাগ্য
১৫৩.
সুত-মিত-রমণী
১৫৪.
কা তব কান্তা
১৫৫.
প্রত্নকেতকী
১৫৬.
সুন্দরী ঝর্ণা
১৫৭.
চিড়িক্‌দাস
১৫৮.
চিন্ময়ের চাকরি
১৫৯.
ডিক্‌টেটর
১৬০.
মুষ্টিযোগ
১৬১.
ছোট কর্তা
১৬২.
মালকোষ
১৬৩.
গোদাবরী
১৬৪.
ফকির-বাবা
১৬৫.
অবিকল
১৬৬.
কিসের লজ্জা
১৬৭.
বোম্বাইকা ডাকু
১৬৮.
চলচ্চিত্র প্রবেশিকা
১৬৯.
আর একটু হলেই
১৭০.
কিষ্টোলাল
১৭১.
পিছু পিছু চলে
১৭২.
কামিনী
১৭৩.
জননান্তর সৌহৃদানি
১৭৪.
হৃৎকম্প
১৭৫.
পলাতক
১৭৬.
ভাই ভাই
১৭৭.
প্রেম
১৭৮.
রমণীর মন
১৭৯.
মটর মাস্টারের কৃতজ্ঞতা
১৮০.
বুড়ো বুড়ি দু’জনাতে
১৮১.
কালস্রোত
১৮২.
অমাবস্যা
১৮৩.
বক্কেশ্বরী
১৮৪.
গল্প-পরিচয়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%