প্রথম অধ্যায়

রাজাধিরাজ ভট্টাচার্য

এখন রাত সওয়া বারোটা৷ চোখের নজরে পিছলে-যাওয়া ঝিরঝিরে বৃষ্টি অনবরত বয়ে চলেছে৷ বাসের জানালার কাচ অর্ধেক নামিয়ে রেখেছি, বাকি অর্ধেক শূন্যস্থান দিয়ে ছিটেফোঁটা জল এসে পরম তৃপ্তির পরশ রেখে যাচ্ছে এই শরীরে৷ পাশে বসা ষণ্ডা চেহারার মানুষ অকাতরে ঘুমোচ্ছেন৷ সারা শরীর দিয়ে চোলাইয়ের গন্ধ ভুরভুর করছে, দেখে মনে হয় ভদ্রলোক চূড়ান্ত রকমের অসহায় অথবা নিপাট ভদ্র৷ সরকারি বাসের ছাদ থেকে চাতাল অবধি নেমে-আসা লোহার পাইপে মাথা রেখে তিনি পরম নিশ্চিন্তে আছেন, মাথায় গামছা, ঠোঁটের ফাঁক গলে লালা উপচে পড়ছে৷

মাখনের মতো রাস্তা, স্বপ্নের মতো জীবন৷ গরম ভাত, আলুসেদ্ধ, ভালো ঘিয়ের গন্ধ আর এক চিমটে নুন৷ ব্যাচেলর জীবনের সুখ-অসুখ, খাটের দু-পাশ থেকে নামার সুবিধা আর কর্মজীবন৷ আহা, মাঝেমধ্যে নিজেকেই হিংসে হয়৷ এই দেখুন, পরিচয় দিতেই ভুলে গিয়েছি৷

আমার নাম অভিজিৎ শাক্য ভট্টাচার্য৷ নামের বাহার দেখে চমকে লাভ নেই, বস্তির ছেলের ডাকনাম পটা৷ চেহারার দিক থেকে একটু ঢ্যাঙা গোছের৷ শুনেছি, ঠাকুরদা বেশ লম্বা মানুষ ছিলেন৷ বাবাকে আজন্ম দেখিনি, মা সজ্ঞানে শরীর ছেড়ে চলে গেছেন বছরকয়েক আগে৷ আমার এক দিদি ছিলেন, তিনিও মাত্র তিন বছর বয়সে নিউমোনিয়ায়...

নেবুতলা পার্কের পিছনদিকের বস্তিতে পৈতৃক ভাড়ায় থাকি৷ বয়স পৌনে তেইশ৷ লম্বায় পাঁচ ফুট সওয়া এগারো ইঞ্চি৷ চুল আর চোখের মণির রং খয়েরি৷ পেশায় জোগাড়ে, শখে ফ্রিলান্সার৷ পেট্রোল, ন্যাপথলিন, ডেনড্রাইট আর বোরোলিনের গন্ধ ভীষণ পছন্দ করি৷

রাজমিস্ত্রি, ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, কাঠের মিস্ত্রি, পাথরের মিস্ত্রি ছাড়াও তামাম দুনিয়ায় যত মিস্ত্রি আছেন, সকলের জোগাড়ের কাজ করি৷ কাজের জন্য আমার কোনও বাছবিচার নেই৷ সকাল সাড়ে আটটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত পরিশ্রম করি৷ দুপুরে এক ঘণ্টা টিফিন৷ বিকেলে কড়কড়ে চারশো পঞ্চাশ টাকা৷ রবিবার বিশ্রাম৷

হাজার টাকা ঘর ভাড়া, মাসিক দু-হাজার টাকা খাওয়ার খরচা দেওয়ার পরেও বিস্তর কাঁচা অর্থ জমে থাকে৷ মায়ের সঞ্চয় এবং আমার জমিয়ে-রাখা অর্থ দিয়ে বছর তিনেক হল, অর্ডার সাপ্লাইয়ের কাজে নেমেছি৷ সাপ্লায়ার হিসেবে নিজস্ব জিএসটি নাম্বার এবং বিজনেস কার্ড আছে; ‘সর্বজয়া সাপ্লাই এজেন্সি;সাপ্লাই অলমোস্ট এভরিথিং’৷

বলতে দ্বিধা নেই, মায়ের নামের ব্যবসায়, মা লক্ষ্মীর বিশেষ কৃপায় আমি আমার মতো প্রতিষ্ঠিত৷ এই কয় বছরে আর্থিক সম্পত্তি তিনগুণ বেড়েছে৷ একসময় আধপেটা খেতাম, সেই তুলনায় যথেষ্ট ভালো আছি৷ ব্যবসা ভাগ্য ফিরিয়ে এনেছে৷

যার যেমন চাহিদা, তেমন জোগান৷ জিনিস এবং চাহিদা অনুযায়ী তার দাম ধার্য হয়৷ ভালো জাতের অর্কিড থেকে শুরু করে চাইনিজ ছাতা, ডেকরেশনের জন্য শৌখিন ঝাড়বাতি, খাস লখনউয়ের আতর, ফুলশয্যার চাদর, বেনারসের জর্দা, বাহারি পরদা, রান্নার গ্যাসের রেগুলেটর, সিমেন্টের ভেন্টিলেটর, মোরাদাবাদে তৈরি ভালো ছুরি, কাচের চুড়ি, ঘুমের ওষুধ, টুকটাক নেশার সরঞ্জাম, উইপোকা মারার বিষ, বিহারের তামাঞ্চা, এমনকি পায়খানার পটি পর্যন্ত সাপ্লাই করেছি হালফিলে৷ দু-নম্বরি কাজে আমার কিঞ্চিৎ অনীহা আছে৷ মহিলাদের ব্যাপারে সাড়ে তিন হাত দূরে থাকি, ওটা চাহিদা-জোগানের বাইরে৷ স্কুলজীবনে একবার প্রেমপত্র লেখার দুঃসাহস করেছিলাম৷ সেই মেয়ে বাড়ি বয়ে এসে মায়ের কাছে চিঠি জমা দিয়ে বলেছিল, ‘আগে ঠিক করে আমার নামের বানান লিখতে শিখুক, তারপর না হয়..’

মা এমন ধুনে দিয়েছিলেন, এখনও সে কথা মনে পড়লে অন্তরাত্মা কাঁপে৷ সবাই বোন অথবা দিদি, বউদি পর্যন্ত বলতে ভুলে গিয়েছি৷

মাস তিনেক আগের কথা, বৈষ্ণবঘাটা থেকে পোকা সমেত মানুষের ইয়ে সাপ্লাই করেছি দক্ষিণ কলকাতার এক শপিং মলে৷ অতিরিক্ত অ্যাসিডের ব্যবহারে শপিং মলের চেম্বারের সমস্ত পোকা মরে গিয়েছিল, নতুন করে পোকা ভরে দিয়েছি৷ কাঞ্চনমূল্য তিন হাজার সাতশো টাকা গুনে নিয়েছি;এটাই ব্যবসা৷

বাইরে বৃষ্টির বেগ ক্রমশ বাড়ছে৷ উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরছি শহর কলকাতায়৷ এক বিখ্যাত তান্ত্রিক বাবাজিকে বাঘের নখ, দক্ষিণ হস্ত শঙ্খ, পলা, ভালো জাতের নীলা আর কুমারী মেয়ের গোটা কঙ্কাল সাপ্লাই করতে এসেছিলাম৷ এখন মোটা পেমেন্ট নিয়ে ফিরছি৷ ট্রেনের টিকিট পাইনি, বেসরকারি বাসের ভাড়া অনেক বেশি৷ খরচার ব্যাপারে আমি একটু ইয়ে, অগত্যা...

শহর কলকাতায় সবকিছু পাওয়া যায়৷ নির্দিষ্ট দ্রব্যের নির্দিষ্ট সাপ্লায়ার আছে, সেখানে গিয়ে পৌঁছনোই বড়ো কথা৷ আমাদের বস্তিতে ফটকাদা নামে একজন থাকে, পুলিশের খোঁচর হিসেবে কাজ করে সেই মানুষ৷ শহর কলকাতার বিভিন্ন গুপ্ত বাজারের খবর সে-ই আমাকে শিখিয়েছে৷ জীবনদা নামে একজন সিনিয়র মানুষ আছেন, যিনি নিয়ম করে রামায়ণ, মহাভারত, ভাগবত এবং শংকরাচার্যর গীতার ব্যাখ্যা শোনান নিজের ভাষায়৷

আধ্যাত্মিক বিষয়ে আমার বিশেষ আগ্রহ৷ এই বিষয় নিয়ে আমি রীতিমতো পড়াশোনা করি৷ শুনেছি, আমার ঠাকুরদা তন্ত্রসিদ্ধ কাপালিক ছিলেন বাংলাদেশের কোনও এক মহাশ্মশানে৷ রক্তবীজ সহজে ছাড়ে না, সেই ধারা হয়তো সংক্রমিত হয়েছে৷ জীবনবাবুর কাছে নিয়মিত আধ্যাত্মিক পড়াশোনা ছাড়াও কলেজ স্ট্রিট ঘেঁটে বহু পুরোনো বই কিনে আমি পড়াশোনা করি৷ মানে বুঝতে না পারলে জীবনদার কাছে পরিষ্কার করে নিই৷

আচার্য ছাড়া ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতা বোঝা অসম্ভব৷ এটা গুরুমুখী বিদ্যা৷ গুরুকৃপা ছাড়া অন্তর্নিহিত বোধ অসম্পূর্ণ৷ একটা গোটা জীবন হয়তো কেটে যাবে, বোধ হবে না এতটুকু৷

মাঝেমধ্যেই ইচ্ছা হয়, গৃহত্যাগী হয়ে যাই৷ ভাবনাচিন্তা মাটিতে টেনে নামানো সোজা কাজ নয়৷ সবকিছুরই একটা প্রস্তুতি, সময় এবং চেষ্টা লাগে৷ বৃষ্টির ছিটে এসে চিন্তাভাবনায় ছেদ টানল৷

বেগ ক্রমশ বাড়ছে৷ বাসের পিছনের চাকার ঠিক ওপরে বসে আছি৷ ঝাঁকুনির চোটে ঘুমের ষষ্ঠীপুজো৷ গবেষণা আর নিদ্রা অভিন্ন গোত্র, নির্ঝঞ্ঝাট এবং নিঃশব্দতা ভীষণ পছন্দ৷ কোমর ধরে গেছে, ঝাপসা চোখে নিজের জায়গায় ঘাড় নিচু করে কোনওরকমে একটু দাঁড়িয়েছি৷ অর্ধেক ভিজে গিয়েছি৷

এখান থেকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, বৃষ্টির ছাটে ড্রাইভার সাহেবের সামনের কাচ ঝাপসা৷ বাসের গতিবেগ ঝিমিয়ে এসেছে৷ নিরুপায় বাস রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে গেল৷ একটা মশা পোঁ শব্দে মালকোশ ধরেছে, এমন সময় বিকট এক শব্দের সঙ্গে ভয়ংকর ঝাঁকুনি মালুম পেলাম৷ সিট ছেড়ে হাওয়ায় ভেসে উঠল আমার এই পার্থিব শরীর৷ ইউটিউবে উড়ন্ত মা নুষের ভিডিয়ো দেখেছি, পিঠে গ্যাস চেম্বার নিয়ে মানুষ এইভাবে হাওয়ায় ভেসে থাকতে পারে, আমি বিনা গ্যাসে হাওয়ায় উড়ছি৷

একসঙ্গে অসংখ্য কাচ গুঁড়িয়ে যাওয়ার শব্দ কানে এল৷ চারপাশ থেকে প্রচুর মানুষের আর্তনাদ৷ সবকিছু ছাপিয়ে বন্ধ কারখানার সাইরেনের সমবেত সংগীতের মতো একাধিক শিশুর কান্না শুনতে পাচ্ছি৷

কোথাও একটা গিয়ে ধাক্কা খেলাম৷ কাঁধে আর মাথায় তীব্র চোটপাট৷ নিজের শরীরের হাড় ভাঙার শব্দ সর্বপ্রথম নিজের কানেই আসে৷ চারপাশ ঘন আঁধার৷ অন্ধকার আরও গভীর হয়ে আসছে৷ জিভ শুকিয়ে আসছে, ক্রমশ জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি৷ এই মাসে এখনও ব্যাঙ্কের পাসবই আপডেট করা হয়নি৷ প্যান্টের পকেটে আশি হাজার সাতশো আশি টাকা আছে৷ শিরদাঁড়ায় ভয়ানক চোট লেগেছে৷ কোথাও যেন তলিয়ে যাচ্ছি৷

বাসের সামনের চেয়ারে ভীষণ মিষ্টি এক মেয়ে বসেছিল৷ গ্রীবার সন্ধিলগ্নে ছোট্ট কালো তিল, হাওয়ায় এলোমেলো চুল, যামিনী রায়ের আঁকা চোখজোড়া, চিবুকের কাছে অদ্ভুত যতিচিহ্ন! এই ঘোর দুর্বিপাকে মেয়েটাকে বোধহয় আর কোনওদিন খুঁজে পাব না৷ ধুস!

কিছুক্ষণ পর বৃষ্টির শব্দ আর কানে এল না৷ দুনিয়ার সব আলো একসঙ্গে হঠাৎ নিভে গেলে যা হওয়ার তা-ই হল, অপার শান্তি৷

কতক্ষণ সময় পার হয়ে গেছে, কে জানে? কান্না আর জলের ফোঁটা বেয়ে বর্ষণের ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসছে৷ চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার! ছিটেফোঁটা জলের ঝাপটা বন্ধ চোখের পাতায় এসে পড়ছে৷

অসম্ভব ব্যথা গোটা শরীরে৷ কে যেন টেনেহিঁচড়ে বের করছে আমায়৷ খুব আবছা কথা কানে আসছে, ‘বেঁচে আছে, স্যার! নাক থেকে গরম হাওয়া বের হচ্ছে৷’

‘চালান করে দে হসপিটালে৷’

আবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছি৷ কার যেন একটা মোবাইলে খুব আবছা গানের সুর কানে আসছে... আহা! আমার মা সলিলবাবুর বড়ো ভক্ত ছিলেন,

‘দূর দূর দূর দূর, পানে আনমনে চাহিয়া

কী বিরাগের রাগিণী...’

শরীর নাড়াচাড়া করতে পারিনি গত কয়েকদিন৷ মস্তিষ্কের অবস্থা আরও খারাপ৷ পাঁজর আর মেরুদণ্ডে ভয়ংকর চোট৷ কথা বলার চেষ্টা থাকলেও চোয়াল খুলছে না৷ ক্রমশ চিন্তাভাবনা শুকিয়ে আসছে৷ পুকুর থেকে জ্যান্ত মাছকে ডাঙায় তুলে রেখে দিলে যেমন আস্তে আস্তে মরতে থাকে, ঠিক তেমনভাবেই স্লো মোশনে মরছি৷ আমার দু-কামরার টালির চালের ঘরের দেওয়ালে যেসব পূর্বপুরুষের ছবি টাঙানো আছে, একে একে তাঁরা এসে চোখের সামনে হাঁটাচলা শুরু করেছেন৷ অদ্ভুত ব্যাপার, কান ভীষণভাবে সক্রিয়!

এই কঠিন সময়ে একটা চরম উপলব্ধি;কান শুধুই শোনে এমন কিন্তু নয়, সে চিন্তাও করতে পারে৷ সে তখনই চিন্তা করে যখন, মাথা কাজ করে না৷

ডাক্তার এবং সহকারীদের মধ্যে আলোচনা শুনতে পাচ্ছি৷ সিনিয়র ডাক্তারবাবু বললেন, ‘চান্স খুব কম, মনে হচ্ছে, কোমায় চলে যাচ্ছে৷ ভেন্টিলেশন খুলে দিলেই...’

‘কী করব, স্যার?’

‘ওয়েট ফর সাম টাইম৷ হি ইজ টু ইয়াং!’

কিছুক্ষণ পর একটা সময় এল৷ ব্যথা, যন্ত্রণা, কষ্ট... গায়েব! চারপাশ ভীষণ অস্পষ্ট, ঝাপসা৷ চোখের সামনে থেকে পূর্বপুরুষরা একে একে সবাই বিদায় নিলেন৷ হালকা লাগছে, হাওয়ায় উড়ে যেতে পারি, শক্ত হাতে সরকারি বিছানার এক ইঞ্চি লোহার রড ধরে আছি৷ একটা কঠিন লড়াইয়ের সারাংশ গলার কাছে দলা পাকিয়ে এসে দাঁড়িয়ে গেছে৷ পাশের বিছানায় বোধহয় একজন সন্তান ভূমিষ্ঠ হল, উঠে বসলাম৷

শরীরের কোথাও ব্যান্ডেজ বাঁধা নেই, নাকে রাইল’স টিউব নেই, কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের মুখোশ নেই, এত সুস্থ কোনওদিন ছিলাম না৷

আরে! বিছানায় ওটা কে শুয়ে আছে! এ যে হুবহু আমারই মতো দেখতে! আমি কি নিজেকে ছাপিয়ে গিয়েছি?

হাজার চেষ্টা করেও ওর সঙ্গে নিজেকে মিশিয়ে দিতে পারছি না৷ মহা মুশকিল! অনুভূতিহীন আমার শরীর লেপটে আছে হসপিটালের বিছানায়৷ পাশের বিছানায় যিশুখ্রিস্টের মতো হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে সদ্য-জন্ম-নেওয়া মিনিয়েচার মানুষ৷ সেই মুখে মায়া, মমতা, দয়া, রাগ, হিংসা, লোভ;কিছুই নেই৷ পাশের বিছানায় মিটিমিটি হাসছেন মা লক্ষ্মী৷ আহা, কী রূপ! ওপাশে আমি, মায়ার বন্ধন কাটিয়ে লম্বা রেসের ঘোড়া৷

শেষ পর্যন্ত বুঝলাম, ফুরিয়ে গিয়েছি৷ চোখের সামনে নিজেকে মরতে দেখা এক চরম অনুভূতি৷ শরীর-বোধ হারিয়ে ফেলেছি, মাটিতে পা পড়ছে না৷ ছেলেবেলায় খুব ইচ্ছে ছিল, একবার অন্তত মহাকাশে যাব৷ ভগবান সকলের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করেন৷

বহু দূর থেকে সূক্ষ্ম আলো আসছে৷ আলোর পথযাত্রী দু’জন নিঃশব্দে এলেন৷ একজনের শরীর থেকে সুগন্ধ বেরোচ্ছে, অপরজনের শরীরে কর্পোরেশনের ময়লা ফেলার গাড়ির মতো পচা গন্ধ৷

দুর্গন্ধ স্তব্ধ হয়ে গেল৷ কিছুটা পর সুগন্ধকেও আর খুঁজে পেলাম না৷ ওদিকে, নার্স আর ডাক্তারবাবুরা ছোটাছুটি শুরু করেছেন৷ আমার বুকে পাম্প করা হচ্ছে৷ চামড়ার শরীরে কোনও উত্তেজনা নেই৷ মড়া মাছের মতো স্থির আমার দৃষ্টি৷ ডাক্তারবাবু এগিয়ে এসে চোখের পাতা দুটো নিভিয়ে দিলেন৷ বড্ড অসহায় লাগছে৷ হঠাৎ হাতে টান অনুভব করলাম৷ কে র‌্যা?

অদৃশ্য কেউ একজন আমায় নিয়ে চলেছে অদ্ভুত এক সুড়ঙ্গের মধ্যে দিয়ে৷ ভীষণ অন্ধকার অথচ সুগন্ধময় যাত্রাপথ৷ তেইশ বছরের জীবনে প্রচুর হেঁটেছি, তবে উড়ে যাওয়ার মজাই আলাদা৷ টের পেলাম, এত বড়ো সুড়ঙ্গে আমি একদম একা, গোটা জগৎসংসারে সকলেই একা, জড়িয়ে-থাকা কিছু চরিত্র বাকিটা অভিনয়৷

অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি৷ এটা বোধহয় কৃষ্ণগহ্বর৷ সৃষ্টির আগের অনাসৃষ্টি এখান থেকেই শুরু হয়েছে৷ কান ঘেঁষে বাইপাস ধরে এগিয়ে চলেছি অনন্তমার্গের দিকে৷

কিছুক্ষণ আগে দেখা পূর্বপুরুষগণ আবার ফিরে এসেছেন৷ মায়ের মুখ ঝাপসা দেখতে পাচ্ছি৷ কতদিন পর দেখা৷ মরেও সুখ৷

খোসা-ছাড়ানো কমলালেবু রঙের আলো এসে পড়ল মায়ের মুখে৷ অন্ধকার সুড়ঙ্গের মধ্যে অসংখ্য হারিয়ে-যাওয়া অস্পষ্ট মুখের মধ্যে একমাত্র স্পষ্ট আমার মায়ের মুখমণ্ডল৷ সেই মুখে তিনটে চোখ৷ দু-চোখে অশ্রু, তৃতীয় চোখে আগুন, ঠোঁটের কোণে অভিমানী হাসি৷ আমি এসে দাঁড়িয়েছি গর্ভধারিণীর সামনে৷

নিজের দুটো হাত দিয়ে আমার মাথা ধরে মা কপালে চুমু এঁকে দিলেন৷ কানে কিছু অযান্ত্রিক শব্দ এল৷ প্রচ্ছন্ন এক কালো পরদা ভেদ করে একগাল দাড়ি আর কৌপীন পরে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন৷ তাঁর চোখের দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে গেল৷

কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই ভদ্রলোক সটান প্রশ্ন করলেন, ‘তুই এখন, এখানে?’

‘আমার স্থূল শরীরের মৃত্যু হয়েছে অ্যাক্সিডেন্টে, থেঁতলে-যাওয়া ঠান্ডা শরীর পড়ে আছে মর্গে৷ আগামিকাল সকালে আমাকে কাটাছেঁড়া করা হবে৷ সরকারি নিয়মানুযায়ী বাড়ির লোককে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালানো হবে, খুঁজে না পেলে সময় অনুযায়ী গণদাহ করা হবে৷ আমার ছিন্নভিন্ন মুখের ছবি দেখে টেলিভিশনের পরদায় কেউ চিনতে পারেনি তাই বডি নিতে আসেনি এখনও পর্যন্ত৷ ভিড়ের মধ্যে মানিব্যাগ কেউ সটকে দিয়েছে৷ পকেটে প্রচুর টাকাপয়সা ছিল৷ সব গায়েব৷’

‘এখান থেকে তুই কোথায় যাবি?’

‘ঠিক জানি না, আমায় কোথায় নিয়ে যাওয়া হবে৷’

‘কে নিয়ে এল তোকে?’

‘কী জানি, চোখে দেখা যায়নি তাকে! বোধহয় পারফিউম মেখে এসেছিল, কী খোশবাই৷’

‘হাত দেখি?’

‘কার?’

‘তোর!’

‘দেখুন৷’

‘নিশ্চয়ই গন্ডগোল করেছে অপদার্থগুলো, তোর রেখা বেশ বলিষ্ঠ৷ কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, আমি আসছি৷’

অযান্ত্রিক শব্দ সমেত ভদ্রলোক পরদার অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন, আবার ফিরে এলেন কয়েক মুহৃর্ত পর৷ ইতিমধ্যে মা-কে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না৷ বড্ড ছেলেমানুষ৷

আরে! বাসের সেই মেয়েটা! যাক, দেখা হল শেষ পর্যন্ত৷ দু-পা এগিয়ে আলাপ করতে যাব, এমন সময় শব্দব্রহ্ম কানে এল৷

কৌপীনধারী ভদ্রলোকের গুরুগম্ভীর শব্দে চমকে উঠছি বারবার৷ উনি বললেন, ‘তোর এখনও সময় হয়নি৷ আগামী পঞ্চান্ন বছর সাড়ে তিন মাস পৌনে তিন ঘণ্টা চৌত্রিশ সেকেন্ড আরও তুই বাঁচবি৷ পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষের সাময়িক অপমৃত্যু হয়েছে, যারা পরবর্তীকালে আবার প্রাণ ফিরে পেয়েছে৷ তুই ফিরে যা৷ তোর শরীর দাহ হতে এখনও দেরি আছে৷ অনেক কিছু অদ্ভুত হওয়া বাকি আছে তোর জীবনে৷ শরীর ফিরে পেলে এটাকে তোর স্বপ্ন বলেই মনে হবে৷’

‘আমার মা কোথায় গেল?’

‘উনি মহামায়া, সকল মায়ের একই রূপ, একই জাত, একই বিদ্যা, একই স্বভাব৷’

‘আমার ওই শরীরে আর ফিরে লাভ নেই৷ মেরুদণ্ডে একবার ভালোমতো চোট লাগলে তার জীবন দফারফা৷ মুখ থেঁতলে গেছে, প্লাস্টিক সার্জারি করাতে গেলে প্রচুর খরচ৷ মেডিক্লেম নেই৷’

‘সেসব ব্যবস্থা হয়ে গেছে, পোস্টমর্টেম হবে কয়েক ঘণ্টা পর৷ তুই এক্ষুনি ফিরে যা৷ তোর শরীর, শোরুম কন্ডিশন করে দিয়েছি৷’

‘আর আপনি?’

ব্যারিটোন ভয়েসে হাসির শব্দ শুনতে পাচ্ছি, ভদ্রলোক চোখের সামনে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছেন৷ ফুরিয়ে যাওয়ার একদম শেষ মুহৃর্তে আমার দিকে তাকিয়ে বলে গেলেন, ‘তোর ঠাকুরদা যার আরাধনা করতেন, আমিই সে, অর্থাৎ মনু৷’

চেঁচিয়ে বললাম, ‘আপনার কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে৷’

ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল, ‘বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা, সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবি৷ তোর কপালে এখন অনেক ভোগান্তি আছে৷’

‘আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে কী করে?’

শব্দের বদলে যা অনুভব করলাম, সেটা এক ধরনের অস্তিত্বহীন স্পর্শ৷ সেই সুগন্ধ আবার নাকে আসছে৷ হারিয়ে-যাওয়া সেই সুড়ঙ্গের পথ আবার খুঁজে পেলাম৷ অদৃশ্য শক্তি আমাকে টেনে নিয়ে চলেছেন ফিরতি পথে৷ নিজের মর্জি বলে কিছুই আর রইল না৷ শালা মরেও শান্তি নেই!

এই ভ্যাপসা গরমকালে এত ঠান্ডা কেন মশাই! একটা কম্বল পর্যন্ত দেয় না৷ মরে গেলে কোনও সম্মান থাকে না, ধুস!

এখানে আর কিছুক্ষণ থাকলে ঠান্ডাতেই আবার মরে যাব৷ উফ কী গন্ধ! চল্লিশ ওয়াটের একটা ফিলামেন্টের আলো জ্বলছে৷ বিড়ালের থেকে বড়ো সাইজের একটা ইঁদুর মাংস খুবলে খাচ্ছে৷ সর্বাঙ্গ শিউরে উঠল!

নিজের হাত-পা, কপাল, চোখ, নাক, মুখ এবং সর্বত্র হাত বুলিয়ে দেখে নিলাম৷ নাহ, সব ঠিক হ্যায়! কোথাও কিছু কম-বেশি নেই৷ একেবারে নিখুঁত বলা চলে৷ কোনও ব্যথা-যন্ত্রণা নেই৷ বাসি মানুষের এত গন্ধ!

মর্গে দুটোমাত্র দরজা৷ দুটোই বাইরে থেকে বন্ধ৷ ধেড়ে ইঁদুরগুলো কোথা থেকে ঢুকছে? ওরা মহা সেয়ানা৷ নিজেদের পথ নিজেরা ঠিক করে নেয়৷ মানুষ ভীষণ বোকা৷ আঁতেল জাত একটা৷

বাইরে বেরোনোর রাস্তা অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি, পাচ্ছি না৷ দুর্গন্ধ আর তীব্র ঠান্ডায় আবার মরে যেতে পারি৷ দুটো বেহায়া ইঁদুরকে লাথি মেরে সাইড করে দরজায় টোকা দিলাম, বাইরে ধপাস করে একটা আওয়াজ হল৷ ফট শব্দ করে হলদে আলো নিভে গেল৷

দু-পেয়ে মানুষের পালিয়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে পেলাম মনে হল৷ কী মুশকিল! গড়পড়তা মানুষ জাতই ভীষণ ভিতু৷ ওয়াক! বমি হল কিছুটা৷ আপনারা বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর সব দুর্গন্ধ একদিকে, পচা মানুষের গন্ধ অন্যদিকে৷ দেওয়াল হাতড়ে সুইচ খুঁজেও লাভ হল না, আমার ভবিষ্যতের মতোই লোডশেডিং৷

কী করব, এসব ভাবছি৷ অন্ধকারে চোখ সয়ে গেছে৷ একপাশে ছোট্ট টেবিল৷ তার ওপর ছুরি-কাঁচি, রাবারের হ্যান্ডগ্লাভস৷ পাশের চেয়ারের ওপর ঝুলিয়ে-রাখা ডাক্তারের গাউন, গলিয়ে ফেললাম৷ যাক, তবু কিছুটা শান্তি৷

ঠান্ডায় হাত দুটো পকেটে ঢুকিয়ে ফেলেছি৷ কপালে একের পর এক প্রাপ্তিযোগ! ফিরে-পাওয়া জীবনের পর গোটা এক প্যাকেট সিগারেট এবং লাইটার৷ ফস করে একটা তামাক-কাঠি ধরিয়ে ফেললাম৷ ধোঁয়ায় বুদ্ধি খোলে৷ সেটা শেষ হতে নড়েচড়ে দরজায় আবার টোকা দিলাম৷ বাইরে থেকে জড়ানো গলায় মিনিমিনে আওয়াজ এল, ‘কৌন হ্যায়?’

কী উত্তর দেব? আমি মানুষ না বনমানুষ, মরা না জ্যান্ত, হুলো না মেনি?

এই না! সেসব ঠিক আছে৷ আমি হুলো৷ আবার বাইরে থেকে প্রশ্নবোধক জিজ্ঞাসা চিহ্ন ফিরে এল, ‘কৌন?’

ভাবলাম, একবার বলি, ‘দেবীওঁ অউর সজ্জনো, ম্যায় হুঁ অমিতাভ বচ্চন, আপ খেল রহে হ্যায় কউন বনেগা ক্রোড়পতি!’ পায়ের কাছে একটা ইঁদুর আবার জ্বালাচ্ছে৷

বাইরে থেকে তালা খোলার শব্দ পাচ্ছি৷ কাঁচা খিস্তি সমেত ভক করে একদলা দেশি মদ আর গুটখার গন্ধ নাকে এল৷

আলোছায়া সমেত টলতে-থাকা কোঁকড়ানো চুলের একজন মানুষ ঢুকে এল, সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছে না৷ কিছুটা এগিয়ে ডানদিকে সুইচবোর্ড৷ দেওয়াল হাতড়ে লোকটা সেইদিকেই এগোচ্ছে৷ এই সুযোগ! ফুডYত করে, একেবারে নিঃশব্দে বাইরে বেরিয়ে এলাম৷ একজোড়া হাওয়াই চটি পড়ে আছে৷ আজকাল এর কদর ভীষণ বেশি৷ সেই দুটো হাতে নিয়ে, দে-দৌড়!

টানা পৌনে ঘণ্টা ধরে দৌড়োচ্ছি৷ আকাশপথে আলো ফুটতেই অচেনা পথের কাঁচা রাস্তার ধারে বসে পড়েছি৷ গলা শুকিয়ে চৌচির, বেশ খিদে পাচ্ছে৷ পকেটে হাত দিতেই সিগারেট, লাইটার বেরিয়ে এল৷ ইস... আমার মোবাইল, এতগুলো টাকা, ব্যাগের জামাকাপড়, সদ্য কেনা পারফিউম;সব মায়ের ভোগে৷

সিমেন্টের বাঁধানো বেঞ্চির ওপর উঠে বসলাম৷ এটা হদ্দ গ্রাম৷ সুপুরি গাছের ফাঁকফোকর গলে সূয্যিমামা আকাশে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন৷ সিমেন্টের উন্নয়নমূলক রাস্তা এখানেই শেষ, এরপর মাটির রাস্তা শুরু হয়েছে৷

হাতের সিগারেট, হাওয়াই চটির তলায় পিষে মাটির রাস্তায় নেমে পড়েছি৷ কিছুটা যেতেই চোখে পড়ল, একটা পেয়ারা গাছের ডাল বেরিয়ে এসেছে পার্শ্ববর্তী জঙ্গলের ঝোপঝাড় থেকে৷ সেখানে জামাপ্যান্ট ঝুলছে৷ কতক্ষণ আর ডাক্তার সেজে থাকা যায়!

প্রকৃতি মায়ের মতো৷ তার সামনে উলঙ্গ হতে লজ্জা পাওয়ার কথা নয়, অবশ্য এই মুহৃর্তে আমি নিরুপায়৷ সিগারেট আর লাইটার স্থান পরিবর্তন করল৷

ফিটিংস একটু ঢিলে হয়েছে, অসুবিধা নেই, কলকাতায় গিয়ে অলটার করিয়ে নেব৷ এমন সময় জঙ্গলের ভিতর থেকে মানুষের গলার শব্দ শুনতে পেলাম, ‘ওই মাখন, কী কাণ্ড দেখ! আর ঝুলিয়ে বসে থাকিস না বাপ! তোর বাবার জামাকাপড় নিয়ে পালাচ্ছে ডাক্তারবাবু৷’

উফ! স্কুলে তিনশো মিটার দৌড়ে সেকেন্ড হয়েছিলাম৷ টানা চল্লিশ মিনিট দৌড়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে৷ এদিকের রাস্তা আমি চিনি না অথচ রাস্তা আমায় ঠিক চেনে৷ আবার একটা সরকারি বাস৷ হাওয়াই চটি ছিঁড়ে হ্যারিকেন হয়ে গেছে৷ টিকিটবাবু অত্যন্ত ভদ্রলোক৷ বললাম, ‘টাকাপয়সা, ফোন সমস্ত ছিনতাই হয়ে গেছে৷’

কিছু ভালোমানুষ এখনও আছেন, যাঁদের ভরসায় দুনিয়া চলছে৷ কন্ডাক্টর ভদ্রলোক কৃষ্ণনগরে এসে কচুরি, ছানাপোড়া খাওয়ালেন৷ এখনও অনেকটা রাস্তা, টুকটাক কথাবার্তা শুরু হল৷ ভদ্রলোক নিজের একমাত্র প্রতিবন্ধী সন্তানের কথা, স্ত্রী-র অবসাদের কথা বললেন৷ নিজের ধর্ম পালটানোর কারণ বললেন৷ ধর্মতলায় পৌঁছে দিলেন এবং বাড়ি অব্দি পৌঁছোনোর জন্য আরও পঞ্চাশটা টাকা হাতে গুঁজে দিলেন৷ নিজের জায়গায়, নিজেকে আবার খুঁজে পেলাম, ওম শান্তি৷

ফটকাদাকে ডেকে, তালা খুলিয়ে ঘরে ঢুকলাম৷ তামাম দুনিয়ার যেকোনও বন্ধ তালার চাবি তার কাছে আছে৷ টিকিটবাবুর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সাড়ে তিনশো টাকা ট্রান্সফার করলাম ফটকাদার মোবাইল থেকে৷

চেনা বাথরুম, বিছানা, গামছা, আর চেনা আসবাবপত্র; পাঁচতারা হোটেলের থেকেও দামি স্পর্শসুখ৷ সেই চেনা ঘরদোর, চেনা ধুলো, চেনা পাপোশ৷ অচেনা নিজের কাছে একমাত্র আমি, আমরা সবাই৷ যদি কোনওদিন কেউ অবান্তর প্রশ্ন করে, কী খুঁজছ?

একটাই উত্তর, নিজেকে খুঁজছি!

স্নান সেরে দুটো ভাতেভাত খেয়ে শুয়েছি৷ ক্লান্ত শরীর৷ একটা গভীর ঘুম এবং মিষ্টি স্বপ্ন৷

সরকারি বাসের সেই মেয়ে, আটচল্লিশ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে৷ চেনা পারফিউমের নাম অ্যান ইভনিং ইন প্যারিস৷ সুগন্ধ-মাখানো অচেনা সেই হাসি৷ এই চোখ মানুষের মনের কথা জেনে নেয়, নিজের মনের কথা কোনওদিনও জানতে দেয় না৷

মেয়েটার ছবি... হাসি সমেত মিলিয়ে গেল৷ প্রেমের স্বপ্নের হ্যাপি এন্ডিং৷ এবার নতুন শো টাইম৷ এই গরমে পাহাড়ি গ্রামের স্বপ্ন!

বরফের চাদরে মোড়া শীতকালীন পাহাড়৷ খুব সম্ভবত হিমালয়৷ একটা মন্দির৷ মন্দিরের চুড়োয় একটা অর্ধেক ভাঙা পাথর বিপজ্জনক অবস্থায় ঝুলছে৷ আকাশের রং ঝকঝকে নীল৷ চারপাশে দু-চারটে ঘরবাড়ি আর লম্বা গাছের ওপর ঝুরো বরফ লেপটে আছে৷ কোনও মানুষ যদি সেই গাছের নীচে এসে একটুখানি ধাক্কা দেয়, পেঁজা তুলোর মতো বরফ ঝরে পড়বে৷ খরস্রোতা নদীর শব্দ শোনা যাচ্ছে, মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ৷ সবকিছু ছাপিয়ে কানে আসছে একজন মানুষের পদচারণার শব্দ৷

এ কী! কে এই মানুষ? এটা তো...

ধড়ফড় করে উঠে বসলাম৷ হৃদযন্ত্র এলোপাথাড়ি ছাদে ওঠানামা করছে৷ গলা শুকিয়ে কাঠ৷ শরীর কাঁপছে৷ বিছানা থেকে উঠতে গিয়ে কিছুটা টাল খেয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়লাম৷ কোনওরকমে উঠে ফ্রিজ থেকে বের করে ঢকঢক করে জল খেলাম৷ বড্ড ঘাম দিচ্ছে৷ আবার এসে বিছানায় বসেছি৷

সাধারণত, স্বপ্ন দেখার কিছুক্ষণ পরেই তা মন থেকে মুছে যায়৷ এই স্বপ্ন গেঁথে রইল মনে৷ সন্ধে গড়িয়ে এল৷ এক কাপ চা, দুটো বিস্কুট নিয়ে টিভি খুলে বসলাম৷ শরীরময় একটা অস্বস্তি৷ কেমন যেন ভয় লাগছে৷ খেতে ইচ্ছা করছে না, শুয়ে পড়েছি আবার৷

রাতের অবস্থা আরও ভয়াবহ৷ যতবার ঘুমোতে যাই, ততবারই স্বপ্ন৷ সেই এক পাহাড়ের স্বপ্ন৷ সেই স্বপ্নে কোথাও যেন আমি স্বয়ং সেখানে আছি অথচ খুঁজে পাচ্ছি না৷ এখন রাত আড়াইটে, বাইরে বেরিয়ে এসেছি৷ মনের কথা বলার মানুষ নেই৷ চোখ চলে গেল পাশের বাড়ির খোলা জানালার দিকে৷

জীবনবাবু অত্যন্ত জ্ঞানী এবং পড়াশোনা-জানা মানুষ৷ কিছুটা খ্যাপাটে গোছের৷ আধ্যাত্মিক দর্শন এবং উটকো কিছু বিষয়ের ওপর বিস্তর চর্চা আছে ওঁর৷ একবার গেলে হয়! তার আগে বরং একবার বকুল ডাক্তারের কাছে যাই৷ মনে হয়, গ্যাস হয়েছে৷

বাকি রাত জেগে, পায়চারি করে কেটে গেল৷ ঘুমোনোর সাহস খুঁজে পাচ্ছি না৷ বলে বোঝানো যাবে না, এমন অস্বস্তি সারা শরীরময় ঘুরপাক খাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত সকাল হল৷

আয়নায় নিজেকে দেখছি, চোখের তলায় সুখের কালি৷ বয়সের তুলনায় একটু বেশি বুড়ো হয়ে গিয়েছি বোধহয়৷ এবার সাময়িক থামতেই হবে৷ একটু বিশ্রাম, তারপর আবার দৌড়৷ ভোরবেলা আধ ঘণ্টার জন্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম৷

বাড়ি থেকে স্নান সেরে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে, রাস্তায় জলখাবার খেয়ে বকুল ডাক্তারের চেম্বারে এসে বসেছি৷ যথাসময় হাঁক পড়ল৷

ডাক্তারের লোমশ কবজির সঙ্গে লেপটে-থাকা চেন-আঁটা ওমেগা ঘড়ি ঝলমল করছে চোখের সামনে৷ ওপাশে সিনিয়র কম্পাউন্ডার বাসুদা খাতা খুলে হিসাবপত্র মিলিয়ে নিচ্ছেন৷ চেম্বারে টুকটাক ভিড়৷ টিপটিপ বৃষ্টি ঝড়ছে৷ বাইরের জামরুল গাছে একটা টিয়া পাখি বসে, মনের সুখে ফল খাচ্ছে৷ বৃষ্টিতে ভেজার একটা আলাদা সুখ আছে৷ প্রকৃতি সবাইকে খুশি করে, অকৃতজ্ঞ মানুষ প্রকৃতি ধ্বংস করে চলেছে৷

গতকাল রাতের স্বপ্নের সবিস্তার বর্ণনা শুনে, বকুল ডাক্তার নাড়ি টিপে ধরলেন৷ চোখের তলা, আলজিভের ডগা, কানের ফুটো, ঘাড়ের মাঝখানে শক্ত করে টিপলেন৷ ঘড়ি মেপে প্রেশারের ওঠানামা দেখলেন৷

ভদ্রলোক নিজের মনে বিড়বিড় করছেন, ‘গড়বড় আছে...’

খানিকক্ষণ পর প্রেসক্রিপশন প্যাড টেনে নিয়ে বললেন, ‘প্রেশারের ওষুধ খাস?’

‘না৷’

‘নেশা করিস?’

‘হ্যাঁ৷’

‘রোজ?’

‘হ্যাঁ৷’

‘ক-বার?’

‘তিনবার কমপক্ষে হয়েই যায়৷’

‘এই বয়সে! চাবকে পিঠের ছাল তুলে নেব জানোয়ার৷’

‘কাজের সূত্রে সারাদিন দৌড়োতে হয়৷ চা আর সিগারেট দিনে তিন-চারবার তো হয়ই৷’

‘আর... মদ, গাঁজা?’

‘ধুস! সে তো বছরে কয়েকদিন৷’

‘তুই মাতাল নোস?’

‘একেবারেই না৷’

‘এই যে বললি, নেশা করিস!’

‘ওই তো... চা আর সিগারেট৷’

‘আর কিচ্ছু না?’

‘নাহ৷’

‘সত্যি বলছিস!’

‘তিন-সত্যি৷’

‘স্ট্রেইঞ্জ!’

ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ নিজের পার্কার কলম প্যাডের ওপর ঠুকতে ঠুকতে বললেন, ‘এর আগে কী কী স্বপ্ন দেখেছিস?’

নড়েচড়ে বসে বললাম, ‘এটা দু-দিন আগের ঘটনা, প্রথমে অ্যাক্সিডেন্টের স্বপ্ন৷ দেখলাম, কেউ আমায় এক অন্য পৃথিবীতে নিয়ে চলে গেল, সেখানে মায়ের সঙ্গে দেখা হল৷ আবার সেখান থেকে ফিরিয়ে দিল এই পৃথিবীতে৷ অবশ্য আমার মনে হয় এটা স্বপ্ন নয়৷ কারণ বাসটা সত্যিই অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল৷’

‘কোন বাস?’

‘উত্তরবঙ্গের যে সরকারি বাস অ্যাক্সিডেন্টের কথা টিভি-তে চলছে এখন, সেই বাস৷’

‘সেটায় শুনলাম, ড্রাইভার ছাড়া কেউ বেঁচে নেই!’

‘আরে! আমিও তো মরেই গিয়েছিলাম! ওপরওয়ালার দয়ায় বেঁচে ফিরে মর্গ থেকে পালিয়ে এসেছি৷’

বকুল ডাক্তার হাসছেন৷ হাসির কথাই বটে৷ আর বেশি চিন্তাভাবনা না করে ডাক্তারবাবু খসখস করে প্রেসক্রিপশন লিখতে শুরু করলেন৷ এক, দুই, তিন, চাররকম ওষুধ লিখে আমায় জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুই কি ইংরেজি অ্যাডভেঞ্চার মুভি একটু বেশি দেখিস, অথবা সাসপেন্স থ্রিলার?’

‘কই না তো!’

চারপাশে ঘাড় ঘুরিয়ে ওঁর মুখটা আমার কানের কাছে এনে বললেন, ‘বান্ধবীর সঙ্গে ঝামেলা করেছিস? যদি করে থাকিস, মানিয়ে নে৷ মেয়েদের সঙ্গে আমরা কোনওদিনই জিততে পারব না৷ ওদের অনেক শক্তি৷’

‘আমার কোনো বান্ধবী নেই৷’

‘কেন? নেই কেন? এই যুগের এই বয়সের রোজগেরে হ্যান্ডসাম ছেলের বান্ধবী নেই কেন?’

‘কী জানি? কলেজ সময়ের দু-একজন বান্ধবী আছে৷ তবে, সেই অর্থে...’

বকুল ডাক্তার হাসছেন৷ দুষ্টু হাসি৷ চোখে বদমাইশির ছাপ স্পষ্ট৷ আমার মাথার চুলগুলো ঘেঁটে দিয়ে বললেন, ‘হয় প্রেম কর, না হয় বিয়ে কর! স্বপ্নের চৌদ্দগুষ্টির ক্ষমতা হবে না তোর ধারেকাছে ঘেঁষতে৷ সব সুখ, অসুখ পাপোশের তলায় ঢুকে যাবে৷ এটাই ওষুধ৷ তুই বোধহয় একাকিত্বে ভুগছিস৷ তেমন হলে দিনকয়েক কোথাও বাইরে ঘুরে আয়৷’

‘কোথায়?’

‘হিমালয় বেস্ট অপশন, না হলে দিঘা, পুরী অথবা পুরুলিয়া৷ তাতেও যদি স্বপ্নের দাপট না কমে, তখন বাঙুরে দু-টাকার টিকিট কেটে নিউরো সাইকিয়াট্রিক দেখাতে হবে৷’

‘আচ্ছা আসি৷’

‘আয়৷’

ডাক্তারবাবু ভিজিট নেন না, আমিও দিই না৷ মা একসময় নিয়মিত ও বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন৷ দুপুরে আমরা দু-জনে বেশ কয়েক বছর ওখানেই খেয়েছি৷ সে অনেক আগের কথা৷ শীর্ষাদি অর্থাৎ বকুল ডাক্তারের মেয়ে তখন যাদবপুরে পড়তেন৷ এখন আমেরিকাতে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর৷ প্রতি ভাইফোঁটায় এখনও ওয়েব-ফোঁটা চলছে৷ ডাক্তার-গিন্নি অর্থাৎ জ্যাঠাইমা আমায় নিয়মিত পড়াতেন৷ মা-কে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা ডাক্তারবাবু করেছিলেন৷ কিন্তু, বিধাতার থেকে বড়ো মোক্তার কেউ নেই৷

শীর্ষাদিদি বিদেশে চলে যাওয়ার পর জেঠিমা চুপচাপ হয়ে গেছেন৷ আগে পিয়ানো বাজিয়ে গান গাইতেন, এখন বাংলা সিরিয়াল দেখেন৷ বকুল ডাক্তারের কোনো পরিবর্তন নেই৷ আগেও একই রকম ইয়ারকি মারতেন৷ পুরুষদের অনুভূতি বোধহয় কিছুটা হলেও কম৷

বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ আগে৷ এখন, মাথার ওপর দুপুরের কাঠফাটা রোদ্দুর৷ প্রায় সাড়ে তিনশো টাকার ওষুধ৷ বাকিটা ডাক্তারবাবু স্যাম্পল দিয়েছেন৷ পাড়ার নির্জন গলি, মানুষজন নেই৷ শম্ভুদের নিরীহ বেড়াল সাইকেলের ওপর বসে ভাতঘুম দিচ্ছে৷ হঠাৎ... কে যেন মোক্ষম ধাক্কা দিল! আমি ছিটকে পড়লাম মিত্তির বাড়ির সামনে জড়ো করা বালির স্তূপের ওপর৷ কার এত সাহস! শুয়োরের...

মাথা বেশ গরম হয়ে আছে৷ বালির স্তূপ থেকে কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে গা-হাত-পা ঝেড়ে সাইকেল টানতে টানতে নিয়ে এসে, দেওয়াল ধারে দাঁড় করিয়ে, গামছা পরে চৌবাচ্চা থেকে পরপর দশ বালতি জল মাথায় ঢেলেছি৷ এক খাবলা ঠান্ডা তেল মাথার মাঝখানে দিয়ে ভালো করে থেবড়ে আবার দশ বালতি জল৷

আনসারির দোকানে বসে খাসির মাংস আর পরোটা গোগ্রাসে গিলে, প্রেসক্রিপশন মিলিয়ে ওষুধ পরপর খেয়ে বিছানায় শরীর পেতে দিলাম৷ দৃষ্টি সোজা ওপরে৷

সিলিং-এর পাইপগুলোয় কিছু মরচে ধরেছে৷ ওপরের বাঁশগুলোর অবস্থাও সুবিধার নয়৷ বহুকাল রং হয়নি৷ মাথার দু-পাশের দেওয়ালে মা-বাবার ছবি টাঙানো আছে৷ দুটো ছবির মাঝখানে আরেকটা ছবি, উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর মা-কে পুরী নিয়ে গিয়েছিলাম, সেই ছবি৷ ছানার গজা, মদনমোহন, শিঙাড়া, পান্তুয়া; সবই আছে, সেই মুহৃর্তগুলো আর ফিরে আসবে না৷

মধ্যবিত্তের স্মৃতির সুখ আর অসুখ দুটোই অ্যালবামে আটকে থাকে৷ একে একে মানুষ চলে যায়, ছবি ঠিক থেকে যায়৷ বেশ কিছুকাল পর একটা সময় আসে, যখন সেই ছবিগুলো পোকায় কাটে৷ চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে কিছুই হয় না৷ জীবনের বেশির ভাগই আসলে ভালো থাকার অভিনয়৷ চিতা;একমাত্র সত্য৷ মিশরে সেটাকেও সংরক্ষণ করে রাখা হত, মরেও শান্তি নেই৷

আমি জানি, ডাক্তারবাবু কড়া দাগের ঘুমের ওষুধ দিয়েছেন৷ একটা খালি পেটে হজমের ওষুধ৷ একটা ছেলে-ভোলানো ভিটামিন ট্যাবলেট৷ একদম শেষে পেট পরিষ্কারের ওষুধ৷ ওষুধের কম্পোজিশনের খেলা আমি কিছুটা বুঝি৷ আমার এক স্কুলের বন্ধু মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়েছে হালফিলে৷ সে নিজেও শেখে, আমাদেরকেও শেখায়৷

আধ ঘণ্টা পর দৃষ্টি ঘনিয়ে এল৷ ক্রমশ যেন রসাতলে তলিয়ে যাচ্ছি৷ শরীর স্থির৷ মন নিয়ন্ত্রণের বাইরে৷ অনেক দূরে হারিয়ে যাচ্ছি৷ পালতোলা নৌকোয় হাওয়া ধরলে যেমন টান ধরে, তেমনভাবে কেউ যেন আমাকে হাত ধরে পাতাললোকে নিয়ে যাচ্ছে৷ মন শান্ত হল৷ আমি শান্তি পেলাম৷

আন্দাজ আধ ঘণ্টা হয়েছে সবে৷ এখনও ভালোমতো ঘুম পোক্ত হয়নি৷ সূক্ষ্ম আলোর রাস্তা ধরে স্বপ্ন এল, যেন আমার ঘুমিয়ে পড়ার অপেক্ষায় ছিল৷ খিদে, ঘুম, প্রেম, পরিস্থিতি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়;কিছু অবস্থাকে আটকানোর ক্ষমতা মানুষের নেই, স্বপ্ন তেমনই৷ যতই আওয়াজ দিক, মানুষ আসলে ভীষণ অসহায়৷

বাইরে বোধহয় টুকটাক বৃষ্টি শুরু হয়েছে৷ স্বপ্নের সুতো, লাটাই খুলে হড়হড় করে এগিয়ে চলেছে৷ আমি উপলক্ষমাত্র৷ মানসচক্ষে দেখতে পাচ্ছি ফেলে-আসা জীবন৷

পার্কের একপাশে পেল্লায় দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে, এপাশে একটা বাচ্চা ছেলে হাফপ্যান্ট আর বগল-ছেঁড়া গেঞ্জি পরে নেবুতলা পার্কের মাঠে প্লাস্টিকের ছেঁড়া ঘুড়ি নিয়ে দৌড়োচ্ছে৷ ঘুড়ির সেই ছেঁড়া জায়গা থেকে ফরফর শব্দ হচ্ছে, ওই বয়সে এটাই আনন্দ৷ চারপাশে ঘটে-যাওয়া ঘটনায় বাচ্চা ছেলেটার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই৷ দৌড় থামিয়ে ঘর্মাক্ত ছেলেটা এবারে হাঁটা শুরু করল৷ সূর্যের আলো না-ঢোকা সুড়ঙ্গের মতো গলিপথ বেয়ে সে এগিয়ে চলেছে৷ বো বারাকের ফিরিঙ্গি সাহেবের বাড়ি ছুঁয়ে রিপন স্ট্রিটের মাঞ্জা গলি, ছিপি গলি, বেলুন গলি৷ সেখান থেকে পদ্মপুকুর৷ ইতিমধ্যে সেই ছেলে অনেক বড়ো হয়ে গেছে৷ এখন সে ফুলপ্যান্ট৷ তবে, দৌড় থামেনি৷ দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার মতো এই স্বপ্ন ভীষণ গতিময়৷

হিন্দ সিনেমা ফেলে সেই ছেলে দৌড়োচ্ছে৷ আচমকা একটা কালো অ্যাম্বাসাডর মুখের সামনে চলে এসেছে৷ ছেলেটা হুমড়ি খেয়ে পড়ল উত্তপ্ত বনেটের ওপর৷ চোখের সামনে ঝিলিক দিয়ে উঠল একরাশ আলো! ঘুম ভেঙে গেল৷

বাইরে ভয়ানক বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে৷ তুমুল ঝড় উঠেছে৷ একে একে সব ক-টা জানলা বন্ধ করলাম৷ সিগারেট ধরিয়ে বাইরে এসে দরজার সামনে দাঁড়ালাম৷ ওপাশে ফটকাদার ঘর অন্ধকার৷ তার ওপাশে, জীবনদার ঘরে হলদে আলো জ্বলছে৷ সর্বশক্তি নিয়ে বৃষ্টি নামল৷ চোখ জড়িয়ে আসছে ঘুমে৷ ওষুধ বেশ কার্যকরী৷

বিছানায় মাথা দিতেই আবার ঘুম৷ এটা চেনা স্বপ্ন, যে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে যায় বারবার৷ তবে এবারের হিসাব অন্য৷ স্বপ্ন আরও নিখুঁত৷

দু-পাশে বিস্তৃত বরফের চাদর৷ মাঝে সরু পাথুরে পথ৷ বলিষ্ঠ চেহারার সুদর্শন পুরুষ চলেছেন সেই পথের ওপর দিয়ে হেঁটে৷ সে যুবক, আমার মতো শ্যামলা বরণ তার নয়, পাকা গমের মতো রং, মাথা ভরতি ঢেউ-খেলানো খয়েরি চুল, চওড়া পিঠে নয় সুতোর পইতে৷ ভয়ংকর একটা বাজ পড়ে ঘুমের বারোটা পাঁচ৷

ধুস! আবার উঠে বসেছি৷ সুইচ বোর্ড থেকে ফিউজ খুলে দিয়েছি৷ কোথা থেকে যেন একটা অদ্ভুত সুন্দর গন্ধ আসছে৷ বোধহয় ধুনো-ধূপের গন্ধ৷ স্বপ্ন ভাঙার পরেও স্বপ্নের প্রতিটা ডিটেলিং মনে থেকে যাচ্ছে, এটা সত্যিই অভাবনীয়৷ আমি গুগল করে জেনেছি, সাধারণত এমনটা হয় না৷

দু-দিন আরও কাটল, অবস্থার উন্নতি হওয়ার কোনও লক্ষণ নেই৷ ঘুমিয়ে পড়ামাত্র স্বপ্ন এসে হাজির হয়৷ প্রতিবার শরীরে কাঁপুনি দিয়ে ঘুম ভাঙছে৷ সেই কম্পন থামতে সময় নেয়, শরীর স্থির হওয়ার পর মনে অবসাদ নেমে আসে৷ কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছি প্রতিদিন৷

বুলবুল ডাক্তারের কথা অনুযায়ী, ভোরবেলা উঠে সরকারি হাসপাতালে লাইন দিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে এখন বাড়ি ফিরছি৷ গুচ্ছের পরীক্ষা লিখে দিয়েছেন৷ ওষুধ একই আছে, একটা প্রেশারের ওষুধ বেড়েছে৷ কোনওরকমে দু-টো মুখে গুঁজে আবার বিছানায় এসে পড়েছি৷

কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ ফিরে, ঘুম এল৷ যথারীতি স্বপ্নের সেই চওড়া পিঠের যুবক এগিয়ে চলেছে৷ চোখ-ধাঁধিয়ে-দেওয়া বরফ৷ বাঁদিকে কারুকার্য করা কাঠের খোলা দরজা৷ সেই যুবকের দৃষ্টি নেমে এল পথের দিকে, একটা বড়ো কালো পাথরের ওপর খুব সুন্দর আলপনা আঁকা আছে৷ নিঃসন্দেহে ভীষণ দক্ষ হাতের কাজ৷ সুদর্শন যুবক আলপনা দেখছে তন্ময় হয়ে৷ একজন মানুষের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার সবটুকু নিংড়ে দেওয়া আছে সেই কাজে৷ বজ্রবিদ্যুতের ঝলসানো আলোয়, রক্ত-মাখা শানিত তলোয়ার দেখলাম!

ধড়ফড়িয়ে বিছানায় উঠে বসেছি৷ সারা শরীর ঘামে ভিজে জবজবে৷ বিছানা থেকে নেমে পাখা পাঁচ নম্বরে চালিয়ে দিয়ে, ঠান্ডা জল খেয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট টেনে আবার ঘরে এসেছি৷ সেই অদ্ভুত স্বপ্ন আরও দু-বার দেখে, গোটা রাত কাবার!

সকালের খালি পেটে হজমের ওষুধ খেয়ে, ভেলোর চায়ের দোকানে চা-বিস্কুট, ঘুগনি-রুটি খেয়ে, ফ্রেশ হয়ে ঘরে ফিরে এসেছি৷ চোখে যথেষ্ট ঘুম বাকি আছে৷ গত রাতে তিন-চারবার ঘুম ভেঙেছে৷ কাজে বেরোনোর এতটুকু ইচ্ছা নেই৷ ফোন না থাকার জন্য কোনও অর্ডারপত্র নেই৷ একটা ফোন কিনলেই হয়৷ থানায় ডায়েরি করে, পুরনো সিমের নাম্বার আবার পাওয়া যাবে৷

তিল তিল করে গড়ে-তোলা স্বপ্নে, নিজেকে হারিয়ে ফেলার ভয় গলায় চেপে বসছে ক্রমশ৷ মনে হচ্ছে, কেউ যেন আমাকে সব সময় লুকিয়ে দেখছে৷ হঠাৎ হাসি পেল৷ কীসব আবোল-তাবোল ভাবছি! চোখ দুটো বড্ড জ্বলছে৷

ফটকাদার দরজায় কড়া নাড়লাম৷ হাতঘড়িতে সময় সকাল ন-টা৷ ঘুম চোখে বেরিয়ে এসে ফটকাদা বলল, ‘কী হয়েছে রে তোর?’

‘কই, কিছু না তো!’

‘কাল রাত আড়াইটার সময় বাড়ি ফিরেছি, তোকে তখন বাইরে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেতে দেখলাম৷ এখন দেখছি, তোর দু-চোখের তলায় কালি পড়ে গেছে৷’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘শরীর খুব একটা ভালো নেই, একটু দক্ষিণেশ্বর যাব ভাবছি৷ বিশালের বাইকের চাবি তোমার কাছে আছে? যদি একটু দাও৷’

ঘরের ভিতর থেকে চাবি নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলল, ‘আমি রাত এগারোটায় বের হব৷ তার আগে ফিরে আসিস প্লিজ৷’

‘আসব৷’

গঙ্গার হাওয়ায় অদ্ভুত মাদকতা আছে৷ ভবতারিণীর মন্দিরের স্নান ঘাটের কাছে আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি৷ বাঁ পাশে বালি ব্রিজ৷ ডান হাতের গঙ্গা কিছুটা দূরে গিয়ে বাঁক নিয়েছে৷ এখান থেকে শুরু করে খড়দহ পর্যন্ত কিছু প্রাচীন মন্দির আছে৷ প্রতিটি মন্দিরের নিজস্ব একটা করে উপন্যাস আছে৷

ইদানীং দক্ষিণেশ্বরে গঙ্গার ধারে বসতে দেয় না, রেলিং দিয়ে ঘিরে দিয়েছে৷

এক মা হনুমান, বাচ্চা পিঠে পঞ্চবটীর কাছে ঘোরাফেরা করছে৷ আগে অনেক হনুমান ছিল৷ তিনটে পেটমোটা বাচ্চা কুকুর, ঝোলা কান নিয়ে অবাক চোখে মানুষের স্নান দেখছে৷

এখানে পৌঁছেই ভোগের টিকিট কেটে নিয়েছি৷ গঙ্গায় তিনটে ডুব দিয়ে পেট ভরে প্রসাদ পেয়ে চুপচাপ নাটমন্দিরে বসে আছি৷ সামনে মা ভবতারিণীর মন্দিরের গেট বন্ধ৷ পাশের লম্বা দালানের মোটা থামের আড়ালে মানব-মানবী জোড়ায় বসে আছে, আমি একা৷ কোনও দায়বদ্ধতা নেই, কোনও জবাবদিহি নেই; এক ধরনের অপদার্থতা বলতে পারেন৷

আজ তুলনামূলকভাবে ফাঁকা৷ বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছি৷ মা ভবতারিণীর মতো চোখের চাহনি আর কারও হয় না৷ কাঠের দরজা বন্ধ করে সেই দৃষ্টিপথ আটকে রাখা যায় না৷ তামাম দুনিয়ার যাবতীয় অনুভূতি একদিকে, ওই চোখের মায়া অন্যদিকে৷ মা গো!

পকেট থেকে ওষুধ বের করে জল দিয়ে গিলে নিয়েছি৷ বেশ ঘুম পাচ্ছে৷ হাড়িকাঠের দিকে পা আর মন্দিরের দিকে মাথা করে শুয়ে পড়লাম৷ প্রায় আধ ঘণ্টার ওপর একটা নির্ঝঞ্ঝাট পাওয়ার ন্যাপ চলছে৷ সেই পাহাড়ের স্বপ্ন আসার তোড়জোড় শুরু হয়েছে৷ এমন সময় কে যেন ধাক্কা দিল!

কীর্তন পার্টির এক ছোকরা এসে তুলে দিল৷ মহা জ্বালাতন! দানপাত্রে এগারো টাকা গুঁজে দিয়ে কিছুটা হেঁটে সিঁড়ি ভেঙে শিব মন্দিরের চাতালে উঠে এসেছি, মাথায় যন্ত্রণা, চোখ জ্বলছে৷

ওপাশে ছয়টা, এপাশে ছয়টা, মোট বারোটা শিব মন্দির৷ ওপাশের মন্দির দর্শন এবং প্রদক্ষিণ করে এবারে এদিকে এসেছি৷ শিব মন্দিরের পিছনদিকের সরু ফালি অংশ একদম ফাঁকা৷

একজন মধ্যবয়স্কা ভদ্রমহিলা আগে থেকেই এখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন৷ টিভি-তে একজন খবর পড়েন, ভদ্রমহিলা অনেকটা তাঁর মতো দেখতে৷ জায়গাটা বড্ড সংকীর্ণ৷ উনি না এগোলে, আমি যেতে পারব না৷

কিছুটা এগোতেই, আপাদমস্তক আমায় দেখে ভ্রূ কুঁচকে উনি বললেন, ‘ভাই, তুমি কাঁচরাপাড়ার স্বপনের ছোটোছেলে না? একটু আগে নাটমন্দিরে শুয়ে ছিলে!’

থতমত খেয়ে সামলে বললাম, ‘নাটমন্দিরে শুয়ে ছিলাম ঠিকই, তবে আমার বাবার নাম স্বপন নয়৷’

ভদ্রমহিলা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছেন৷ দু-চোখে বিস্ময়! পরিবেশ হালকা করতে কোনওরকমে কেটে পড়ার মতলব করছিলাম, ভদ্রমহিলা পুরো আত্মবিশ্বাস নিয়ে আরেকবার বললেন, ‘তুমি দীপু নও?’

‘না৷’

‘সে কী বাবা, গত মাসে আমার হাতের আংটি তুমিই তো বাড়িতে দিয়ে এলে৷’

ভদ্রমহিলার তিন আঙুলে তিনটে আংটি৷ গোমেদ, নীলা আর পলা৷

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম৷ একই চেহারার সাদৃশ্যে একাধিক মানুষ থাকতেই পারে৷ কিছুটা সময় নিয়ে নিজের অনামিকার গোমেদ দেখিয়ে বললেন, ‘আমার প্রায়ই রাতে ঘুম ভেঙে যেত৷ যত রাজ্যের উলটোপালটা সব স্বপ্ন জুড়ে বসত৷ তোমার বাবার আংটিতে ভীষণ উপকার পেয়েছি৷ মা কালীর কাছে মানত করেছিলাম, পুজো দিতে এসেছি৷’

চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছি৷ বাল্যবন্ধু রতনের মামার বিয়েতে বরযাত্রী গিয়েছিলাম কল্যাণীতে৷ রাস্তায় কাঁচরাপাড়ার নাম শুনেছিলাম, কিন্তু নামিনি৷ জ্ঞানত কোনওদিনই সেখানে যাইনি৷ একমুখ প্রশ্নবোধক জিজ্ঞাসা নিয়ে ভদ্রমহিলা দাঁড়িয়ে আছেন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে৷

কিছু বলার আগেই তিনি বললেন, ‘স্বপন তোমার ব্যাপারে একটা কথা আমাকে বলেছিল৷’

‘কী কথা?’

‘তুমি নাকি অ্যাক্সিডেন্টের স্বপ্ন দেখো?’

আমার গলা শুকিয়ে আসছে৷ বুকে দম ভরে বললাম, ‘কই না তো!’

‘উহুঁ! না বললে হবে! স্বপন আমায় বলেছিল, তুমি নাকি স্বপ্নে অ্যাক্সিডেন্টে নিজের মৃত্যু দেখতে পাও? স্বপন অবশ্য বলেছিল, তুমি নাস্তিক৷ এসব মানো না৷ তুমি কি এখনও স্বপ্ন দেখো?’

‘আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে!’

‘পনেরো বছর সরকারি স্কুলে ভূগোল পড়াচ্ছি, ভুল আমার নয়, তোমার হচ্ছে, ভাই৷’

ভদ্রমহিলার গলার স্বর পালটে গেছে৷ চোখে তুখোড় কনফিডেন্স৷ চিন্তাভাবনার সমস্ত স্তর তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে৷ শরীর ঘামছে৷ অনেক চিন্তা করেও কাঁচরাপাড়ায় নিজেকে খুঁজে পেলাম না৷

গভীর চিন্তা নিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে আছি, বেশ বড়ো আকারের একটা মৌমাছি আধমরা হয়ে পড়ে আছে৷ লাখ লাখ লালপিঁপড়ে ছেঁকে ধরেছে৷ মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করার মতো ধৈর্য পিঁপড়েদের নেই৷ একে একে মৌমাছির হাত-পা খুলে নেওয়া হচ্ছে৷ দক্ষিণেশ্বরের মায়ের মন্দিরের চুড়োর ওপর থেকে একঝাঁক পায়রা একসঙ্গে উড়ে যাওয়ার শব্দে হুঁশ ফিরে পেলাম৷ মাথা তুলে দেখি, সামনে কেউ নেই! অদ্ভুত!

পাশেই পরমহংসর ঘর৷ নিশ্চুপ বসে আছি, দেওয়ালে পিঠ আগেই ঠেকে গেছে৷ চারপাশে ভালো করে তাকিয়ে ঠাকুরের মশারির ছদরির দিকে দৃষ্টি আটকে গেল, একজোড়া টিকটিকি সৃষ্টিসুখে মত্ত৷ বাইরে বেরিয়ে সেই ভদ্রমহিলাকে কোথাও খুঁজে পেলাম না৷ বড্ড কান্না পাচ্ছে৷ নিজেকে অর্ধোন্মাদ মনে হয় আজকাল৷ কেন এমন হল...

এখন বেলা তিনটে৷ মাথায় একটা মতলব এসেছে৷ পার্কিং থেকে বাইক নিয়ে সোজা কাঁচরাপাড়া৷ বারাকপুর থেকে কল্যাণী এক্সপ্রেস ধরে এক ঘণ্টা৷ ঘড়িতে সময় চারটে পঁচিশ, একটা বড়ো সোনার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি৷

হাতের সিগারেট শেষ করে, সোজা ঢুকে এলাম ভিতরে৷ শুরু হল খোঁজখবর নেওয়া৷

গত দেড় ঘণ্টায়, ছোটো-বড়ো মিলিয়ে সাতটা সোনার দোকানে হানা দিয়েছি৷ দু-জন স্বপন জ্যোতিষীকে খুঁজে পাওয়া গেছে৷ একজন অতিবৃদ্ধ, অপরজন ব্যাচেলর৷

অবিবাহিত ভদ্রলোককে খুঁজে পাওয়া গেল না, বৃদ্ধ ভদ্রলোকের একটিমাত্র মেয়ে, পানাগড়ে স্কুলে ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষিকা৷ বৃদ্ধের স্ত্রী গত হয়েছেন বছর তিনেক আগে৷ পরিচারক দেখাশোনা করেন৷ আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর উনি বললেন, ‘হালিশহরে স্বপন হালদার নামে একজন জ্যোতিষচর্চা করেন৷ যতদূর জানি, ওঁর একটা ছেলে আছে৷’

বৃদ্ধ স্বপনবাবুকে বিদায় জানিয়ে, হালিশহর শ্মশান ছাড়িয়ে বড়োরাস্তার উলটোদিকের সরু গলিতে স্বপন জ্যোতিষীকে খুঁজে পাওয়া গেল৷ ভদ্রলোকের একমাত্র ছেলের আজ পইতে, বয়স এগারো৷ এই ছেলের সঙ্গে আমার চেহারার কোনও মিল নেই৷

পাশেই রামপ্রসাদের ভিটে, শ্মশান, চৈতন্যডোবা এবং সাধক নিগমানন্দর আশ্রম দেখে, ফিরতি পথে ব্যারাকপুরে বিরিয়ানি খেয়ে যখন বাড়ি ঢুকছি, তখন রাত সওয়া দশটা৷

বাইকের আওয়াজ শুনে ফটকাদা বেরিয়ে এল৷ চাবি হ্যান্ডওভার করে আমি নিজের ঘরে এলাম৷

আলো জ্বেলে, স্নান সেরে ভগবানের সিংহাসনে একটা ধূপকাঠি ধরিয়ে এক কাপ চা নিয়ে টিভি খুলে বসেছি৷ সেই বাস অ্যাক্সিডেন্টের খবর আর দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না৷ তার জায়গায় নতুন গরম খবর৷

পাশের জানালা দিয়ে জীবনবাবুর ঘর দেখা যাচ্ছে৷ সেখানে এখন অন্ধকার৷ রাত এগারোটা থেকে ভোর ছ-টা পর্যন্ত মোটামুটি ভদ্রলোক জেগে থাকেন, দিনের বেলায় ঘুমোন! অদ্ভুত মানুষ৷

ঘুমের ওষুধ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি৷ খেলেও সিনেমা দেখব, না খেলেও দেখব৷ বকুল ডাক্তারের ওপর ভরসা রেখে খেয়ে নিলাম৷ সারাদিন যথেষ্ট ঘোরাঘুরি হয়েছে৷ শরীর ক্লান্ত৷ কাজকর্ম সব শিকেয় উঠেছে৷

মাস ছয়েক আগে একবার হিসাব কষেছিলাম:

ঘরভাড়া, খাওয়া আর টুকটাক হাতখরচা নিয়ে রোজ কমবেশি একশো আশি টাকা হলে আমার কাজ মিটে যায়৷ সেই হিসাবে আগামী দশ বছরের সঞ্চয় হাতে আছে৷ সংসারী হওয়ার ইচ্ছে নেই৷ বহুত ঝামেলা৷ তবে, বাসের সেই মেয়েটার কাছে মন জমা পড়ে আছে৷ এর আগে এমন কোনও অনুভূতি কখনও হয়নি৷ চোখ বন্ধ করলেই সেই নারী চোখের সামনে এসে হাজিরা দিচ্ছেন৷ গ্রীবার সন্ধিলগ্নে সেই তিল! বাঁ গালে টোল৷ সে নির্ঘাত বেঁচে নেই৷ সবার ভাগ্য আমার মতো নয়৷

চেনা বালিশ, বিছানা এবং চেনা স্বপ্ন৷ তুষারাবৃত সেই হিমালয়ের মন্দিরের চওড়া চাতাল এবং যুবক পুরোহিত৷ পাশ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে খরস্রোতা, সরু এক নদী৷ ওপাশে, অনেক দূর থেকে একটি মেয়ে এগিয়ে আসছে৷ তার হাতে পাথরের থালা৷ সেখানে দুটো ছোটো কাঁসার বাটিতে শ্বেতচন্দন ও লালচন্দন, ফুল-তুলসী-মালা আর একটি দক্ষিণাবর্তী শঙ্খ৷

মেয়েটার মুখ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে না, আবছা চেনা মনে হচ্ছে৷ হয়তো কোথাও দেখেছি৷ শঙ্খের শব্দে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠল৷ যুবক পুরোহিতের মুখ একবারও দেখতে পাওয়া যায়নি৷ আকাশ থেকে তুলোর মতো বরফবৃষ্টি শুরু হল, যেন পুষ্পবৃষ্টি হচ্ছে৷

তিনবার শঙ্খের ধ্বনি শেষ হতেই ঘুম ভেঙে বিছানায় উঠে বসেছি৷ শরীর ভিজে জবজবে পান্তুয়া৷ ঘাড়ের কাছে ব্যথা৷ থম মেরে কিছুক্ষণ বসে থেকে বিছানা থেকে নেমে এলাম৷

জানালার বাইরে চোখ গেল৷ দক্ষিণদিকের সুপুরি গাছ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক তার পাশেই কলা গাছের ওপরে একটা প্যাঁচা বসে আছে৷ আকাশে অর্ধেক চাঁদের আলো, জীবনদার ঘরে বাল্ব জ্বলছে৷ ভদ্রলোক এই সময় বই, খবরের কাগজ পড়েন৷ সময় রাত দেড়টা৷ স্বপ্নের কথা নিখুঁতভাবে মনে গেঁথে আছে৷ আশ্চর্য!

বাইরে এসে একটা সিগারেট৷ মা লক্ষ্মীর বাহন ফরফর করে আমার মাথার ওপর দিয়ে উড়ে চলে গেল৷ এই মুহৃর্তে আকাশ মেঘমুক্ত৷ হাঁ করে চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছি৷ আহা! চোখ আটকে আছে শশীর দিকে, হাতে মোক্ষম সিগারেটের ছ্যাঁকা খেলাম৷ ধ্যাত!

এভাবে বাঁচা যায় না৷ কাজকর্ম, খিদে, ঘুম সব ডকে উঠেছে৷ শরীর ঢুলছে অথচ ঘুম পরিণতি পাচ্ছে না৷ ক্রমশ মৃত্যুভয় চেপে বসছে৷

জীবনবাবুর জানলা দিয়ে ধোঁয়া দেখতে পাচ্ছি৷ নির্ঘাত ভদ্রলোক বিড়ি ফুঁকছেন৷ সত্যি বলতে কী, ওঁকে আমি একটু ভয় পাই৷ কখন কী করেন, কী বলেন, কোনও ঠিক নেই৷ তবে, এই মানুষের জ্ঞান অসীম৷ যাই একবার৷ তেইশ বছরের জীবনে, সব থেকে বিপদের সময় দাঁড়িয়ে আছি৷

মনের সব সাহস এক জায়গায় নিয়ে, চললাম জীবনদার ঘরে৷

একজনের শোয়ার মতো তক্তপোশ, বালিশ-কোলবালিশ৷ একজোড়া মলিন গামছা৷ পলেস্তারা-খসা ড্যাম্প দেওয়াল, গোটা দু-তিনেক জামাকাপড়, মাটির কলসি আর বই৷ এই পুরো ঘর আসলে বইদের আস্তানা, একজন মানুষ কোনওরকমে থাকেন, এই যা৷

সে মানুষ লম্বায় ছয় ফুট সওয়া ইঞ্চি৷ পরনে লুঙ্গি অথবা হাফপ্যান্ট৷ গরমকালে ফুলশার্ট এবং শীতকালে খালি গায়ে দিব্যি থাকেন৷ সারাদিনে একবার খাবার, অজস্রবার চা আর তিন বান্ডিল বিড়ি হলে ওঁর চলে যায়৷ রাতভর জেগে পড়াশোনা করা মানুষকে পাগল বলা যায় না কিছুতেই৷ রেগে গেলে পৃথিবীর সব ভাষায় খিস্তি দিতে পারেন উনি৷

রংচটা দরজায় হালকা ধাক্কা দিলাম৷ জানলার দিকে মুখ করে বহু প্রাচীন একটা বই পড়ছেন ভদ্রলোক, মুখে বিড়ি, চৌষট্টি বছর বয়সেও চশমার প্রয়োজন হয় না, গায়ের রং তামাটে৷ চোখ দুটো অব্যক্ত শব্দ শুনিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে৷ গলায় জড়ানো মোটা পইতে৷ ডান হাতের মধ্যমায় একটা লোহার আংটি৷ পরনে লুঙ্গি এবং ফুলহাতা গলাবন্ধ কোঁচকানো বুশশার্ট৷

খোলা দরজা দিয়ে কিছুটা ঢুকে এসে খুকখুক করে কাশলাম৷ বই থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন, ‘আমি জানতাম, তুই আসবি৷’

‘আ...আপনি জানতেন?’

‘বোস, এই পাতাটা শেষ করে আসছি৷’

তেপায়া একটা ভাঙা টুলে কোনওরকম বসেছি৷ আমার পাশে একটা আলনা, দু-একটা পুরোনো জামাকাপড় ছাড়াও এক পিস রেডিয়ো ঝুলছে৷ বাঁদিকের দেওয়ালে একটা অচল টাইমপিস, সময় নয়টা বেজে দশ৷ দিনরাত একাকার৷ জীবনবাবুর মাথার ঠিক ওপরে একটা পাঁজি ক্যালেন্ডার, সেই হিসাব অনুযায়ী এটা মাঘ মাস৷ ঘরের মেঝে, বিছানার বেশির ভাগ, তিনটে বিপর্যস্ত আলমারি... সব বইতে ঠাসা৷ ভদ্রলোক নিজে যে চেয়ার-টেবিলে বসে আছেন সেটা, যেকোনও সময় ভেঙে পড়তে পারে৷ বিছানায়, বালিশে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে ওঁর পোষা হুলো; সাবমেরিন৷

চেয়ার নিয়ে ভদ্রলোক সামনে এসে বসেছেন৷ ওঁর দৃষ্টি সোজাসুজি আমার মুখের ওপর৷ হঠাৎ কেন জানি না, মুখ ফসকে একটা বোকা প্রশ্ন করে ফেললাম, ‘আপনি ঘুমোননি?’

চোখের ইশারায় বেড়ালটাকে দেখিয়ে বললেন, ‘সাবমেরিন দিনের বেলায় জেগে থাকে, রাতের বেলায় ঘুমোয়, আমি উলটো৷ এ ঘরে অনেক দামি বই আছে, যেকোনও একজন পাহারায় সদাজাগ্রত না থাকলে, চুরি হয়ে যেতে পারে৷’

হাসি পেলেও হাসা যাবে না৷ ভদ্রলোক ভীষণ সিরিয়াস মুডে আছেন৷ ক-জন মানুষ বই পড়েন আজকাল? বইমেলা ছাড়া বই চুরি যাওয়ার দিন বোধহয় শেষ৷ বেশির ভাগ লাইব্রেরি ধুঁকছে৷

বিড়াল হিসেবে সাবমেরিন অত্যন্ত ভদ্র৷ কলাগাছ সংলগ্ন এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও বাথরুম করে না৷ কচি বয়সে দু-একটা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়েছিল, জীবনদা তখন অপারেশন করিয়ে নেয়৷ এখন সে বুদ্ধিজীবী এক মুক্তপুরুষ৷ বাকি সারাটা সময় জীবনবাবুর টেবিলে বসে থাকে আর রেডিয়োয় গান শোনে৷ ফিরোজা বেগমের নজরুলগীতি ওর বিশেষ পছন্দ৷ আখতারির ‘জোছনা করেছে আড়ি’ শুনে তবলার তালে ঘাড় নাড়ে এই মার্জার৷

পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরিয়ে জীবনদা বললেন, ‘তোর নিশ্চয়ই আমার মতো কোনও সমস্যা নেই, তাহলে রাতে ঘুমোস না কেন? তুই যখন উত্তরবঙ্গ গেলি, তখন তোর পিঠে একটা ব্যাগ ছিল৷ যখন ফিরে এলি, তখন ব্যাগ ছিল না৷ গিয়েছিলি জুতো পরে, ফিরলি হাওয়াই চটি নিয়ে;ব্যাপার কী?’

‘আপনি কী করে জানলেন? তখন তো আপনি ঘুমিয়ে ছিলেন৷’

‘সাবমেরিন আমায় সব খবর দেয়! ওর ভাষা আমি বুঝি, আমার প্রতিটা ভাষা ও বোঝে৷’

নিপাট ভালোমানুষের মতো পাশ ফিরে ঘুমিয়ে আছে জীবনবাবুর পোষা হুলো৷ ওর পেটে এত বুদ্ধি, সেটা দেখে বোঝা যায় না৷ ঘুমের ঘোরেই সে হাত-পা নাড়ছে৷

জীবনবাবু বললেন, ‘মানুষের মতো ওরাও স্বপ্ন দেখে৷ ইন ফ্যাক্ট, একটু বেশিই দেখে৷ চা খাবি?’

‘হ্যাঁ৷’

‘তোর ঘরে তো ইলেকট্রিক উনুন আছে, বানিয়ে নিয়ে আয় দেখি দু-কাপ৷ একটু বেশি করে দুধ, চিনি দিস৷ কিপটেমি করিস না সব জায়গায়৷ জিরে-দেওয়া বিস্কুট আনবি না, ক্রিমক্র্যাকার হলে সুবিধা হয়৷ একটা ফ্লাস্কে ভরে আনবি৷ রাতের বেলা খোলা খাবার খাওয়া যায় না৷ ততক্ষণে আমি বাকি দুটো পাতা শেষ করে নিই৷’

চা-টা নিয়ে এলাম৷ দু-জনে খাওয়া শেষ করে আবার মুখোমুখি৷ জীবনবাবু কথা শুরু করলেন, ‘উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরে অব্দি একটা রাতও তুই ঠিক করে ঘুমোসনি৷ হামেশাই ঘর থেকে বেরিয়ে ঘোরাফেরা করে আবার ঘরে ঢুকে গিয়েছিস৷ এখন স্পষ্ট দেখছি, চোখের তলায় মোটা কালির দাগ৷ সমস্যা কী?’

‘সেইজন্যেই এসেছি৷ বলতে ভরসা পাচ্ছি না৷ হয়তো আমারই ভুল৷ আজ বরং আসি, কাল আসব৷’

উঠতে যাওয়ার মুহৃর্তে ভদ্রলোক আমার হাত টেনে ধরলেন৷ বরফের মতো ঠান্ডা শরীর৷ ইশারায় বসতে বলে বিড়ি ধরিয়ে মোক্ষম একটা রিং ছেড়ে বললেন, ‘ঘুম হয়?’

‘আগে প্রচুর ঘুমোতাম৷ এখন হয় না৷’

‘একদমই হয় না?’

‘হয়, তবে আধ ঘণ্টা-চল্লিশ মিনিটের বেশি ঘুমোতে পারি না৷’

‘কেন?’

‘আপনি শুনলে হাসবেন, ভাবলে আমার নিজেরও হাসি পায়, তবুও বলি, নানারকম স্বপ্ন চোখের সামনে এসে জড়ো হয়৷ তাতে অবশ্য খুব একটা অসুবিধা হয় না৷ সমস্যা হয় একটা বিশেষ স্বপ্ন নিয়ে৷ সেটা এলেই ঘুমের ইয়ে হয়ে যায়৷ ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসি৷ ভীষণ কষ্ট হয়৷ সারা শরীর ঘামে ভিজে যায়, গলা শুকিয়ে আসে, মনে হয়, প্রাণ বেরিয়ে যাবে৷’

‘এই বিশেষ স্বপ্ন কবে থেকে আসছে?’

‘উত্তরবঙ্গ থেকে এখানে ফিরে আসার পর থেকেই... এর আগে এমন স্বপ্ন দেখিনি৷’

‘স্বপ্নে কি তুই নিজে আছিস?’

‘এই ব্যাপারই ভীষণ কনফিউজিং! মনে হচ্ছে যেন নিজে আছি সেখানে, কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না৷’

হাতের বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘নিজেকে খুঁজে পাওয়া অবশ্য ভীষণ কঠিন কাজ৷ যা-ই হোক, ডাক্তার দেখিয়েছিস নিশ্চয়ই? কী বললেন?’

‘ওষুধ দিয়েছেন৷ বললেন, প্রেম করতে... ঘুরে বেড়িয়ে আসতে৷’

‘বটে! টকের জ্বালায় তেঁতুলতলায় বাস৷ প্রেম বা বিয়ে কখনওই সমাধান নয়৷’

ভদ্রলোক পায়চারি করছেন, ওঁর চোখজোড়া আমার চোখের ওপর বন্দি৷ মাথা নিচু করে বসে আছি৷ চোখে ঘুম, মনে অবসাদ৷ আড়চোখে দেখলাম, সাবমেরিন পাশ পালটে শুল৷ ওর ঘুমে কোনও ব্যাঘাত নেই, যত সমস্যা আমার৷ জীবনদা সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন৷ গলা খাঁকরে বললেন, ‘জন্মের পর থেকে একটা শিশু যতক্ষণ না কথা শিখছে, ততক্ষণ সে তার চাহিদা কীভাবে জানায়?’

‘কেঁদে৷’

‘বেশ৷ একজন মানুষ, যিনি কথা বলতে পারেন না, তিনি তাঁর চাহিদা বা বক্তব্য কীভাবে পেশ করেন?’

‘ইশারায় বা লিখে৷’

‘সাধু সাধু! তোর বুদ্ধি আছে৷ একটু বেশিই বুদ্ধি আছে, এটাই সমস্যা৷’

চেয়ার টেনে নিয়ে বসে ভদ্রলোক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সমস্যা হচ্ছে, তুই ভাই পুরো ঘটনা আমায় খুলে বলছিস না৷ হঠাৎ করে এমন কোনও উৎপাত জীবনে আসতে পারে না৷ ক্যানসার ছাড়া সব রোগেরই একটা পটভূমিকা থাকে৷ একান্তই তোর ব্যক্তিগত কিছু থাকলে আমার কিছু করার থাকবে না৷ তবে জেনে রাখ, আমার এই যৎকিঞ্চিৎ বুদ্ধিতে যা বুঝতে পারছি, লক্ষণ মোটেই সুবিধার নয়৷ একটা স্বপ্ন, একটা মানুষকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট৷ যতই ঘুমের ওষুধ খা, কিছু স্বপ্ন আমৃত্যু ঘুমোতে দেবে না৷ নার্ভের ডাক্তার প্রথমে ঝুড়ি ঝুড়ি ঘুমের ওষুধ দেবে, তারপর কাউন্সেলিং করবে, তারপর তোমাকে রিহ্যাব সেন্টারে পাঠাবে৷ এসবের পরবর্তী এবং ফাইনাল স্টেজ হচ্ছে পাগলখানা৷ অবশ্য তার আগেই অনেকে নিজেকে পিষে ফেলে৷ তুই যদি সবকিছু খুলে না বলিস, আসতে পারিস৷ তোর এবং আমার দু-জনেরই সময় বাঁচে৷’

বিড়ি ধরিয়ে ভদ্রলোক আবার পায়চারি শুরু করেছেন৷ ঝরঝর করে সমস্ত কথা বলে গেলেন৷ আমি মাথা নিচু করে বসে আছি৷

সামনের জানালার ফাঁক গলে সেই কলা গাছ দেখতে পাচ্ছি৷ প্যাঁচাটা উড়ে এসে আবার সেখানেই বসেছে৷ জীবনবাবুকে ঠিক কোথা থেকে বলা শুরু করব, সেসব ভাবছি, এমন সময় ভদ্রলোক বললেন, ‘দুটো কথা মাথায় রাখিস৷ প্রথমত, তোর কথা বাইরের দুনিয়ায় কেউ জানবে না৷ দ্বিতীয়ত, আমার কথার কখনও নড়চড় হয় না৷’

টুল ছেড়ে উঠে দু-চার পা হেঁটে আমি আবার এসে বসলাম৷ একবুক নিশ্বাস আর সাহস নিয়ে শুরু করলাম কথা:

আমার জোগাড়ের কাজ, অর্ডার সাপ্লাইয়ের ব্যাবসা, মায়ের মৃত্যু থেকে শুরু করে উত্তরবঙ্গ থেকে ফেরার সময় বাসে বসে-থাকা সেই মেয়েটার কথা, অ্যাক্সিডেন্টের কথা, তাৎক্ষণিক মরে যাওয়া এবং আবার ফিরে এসে মর্গ থেকে পালিয়ে যাওয়া, কন্ডাক্টর ভদ্রলোকের কথা, প্রথম দিনের স্বপ্নে ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা, এমনকি গতকালের দক্ষিণেশ্বরের সেই ভদ্রমহিলা ও কাঁচরাপাড়ার ঘটনা পর্যন্ত বাদ দিইনি৷

যাবতীয় খুঁটিনাটি বলতে সময় লেগেছে প্রায় একটা গোটা ঘণ্টা৷ ইতিমধ্যে ভদ্রলোক প্রায় গোটা চারেক বিড়ি টেনেছেন৷ ফ্লাস্ক থেকে ঢেলে আরও এক কাপ চা খেয়েছেন এবং মাঝেমধ্যে অবাক হয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন৷

বক্তব্য শেষ করে পুনরায় সেই টুলে এসে বসেছি৷ জীবনদার চোখে জল, ঠোঁটের কোনায় একচিলতে হাসি৷ এতটা কথা একসঙ্গে বলতে পেরে হালকা লাগছে, একজোড়া ডানা থাকলে এক্ষুনি ছটফটিয়ে উড়ে যেতাম৷

আন্দাজ প্রায় মিনিট পনেরো চুপ থেকে জীবনবাবু বললেন, ‘এখন মনে হয়, ভোর চারটে বাজে৷ আমাকে দু-তিন ঘণ্টা সময় দে৷ স্বপ্ন নিয়ে আমার বিস্তর পড়াশোনা করা আছে৷ তবে এটুকু মাথায় রাখ, সামনে তোর কঠিন পরীক্ষা৷ বাড়ির বাইরে বের হবি না, যতক্ষণ না আমি বলছি৷’

ঘাবড়ে গিয়ে চুপচাপ বসে আছি৷ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কাঁধে হাত রেখে বললেন, ‘তুই যা, ঠিক ঘড়ি মিলিয়ে দু-ঘণ্টা পরে আয়৷ উপায় একটা হবেই৷’

গোটা মাথা ভার হয়ে আছে, মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছি ক্রমশ৷ নিজের কাছে নিজেই অসহ্য হয়ে উঠছি৷ বেশ বুঝতে পারছি, তলিয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে আমার৷

টুল থেকে উঠে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে হঠাৎ কেঁদে ফেললাম৷ শেষ চোখে জোয়ার এসেছিল মায়ের মুখাগ্নির সময়৷ তারপর আবার আজকে৷ বাঁচতে আমায় হবেই৷ জীবনে যেটা কোনওদিন করিনি, তা-ই হল আজ৷ জীবনদার পায়ের সামনে পড়ে হাপুসনয়নে কেঁদে ফেলেছি৷

অতি সাধারণ ছেলে আমি৷ নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম, সেখান থেকে লড়াই করে মধ্যবিত্ত হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা৷ এই লড়াকু জীবন যদি এমনভাবে ঘেঁটে যায়...

আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘কিছুক্ষণ পর আমি যাচ্ছি তোর ঘরে৷’

সকাল পাঁচটা৷ জীবনদার ঘর থেকে বেরিয়ে, পাড়ার দোকানে চা-বিস্কুট খেয়ে ঘরে ফিরে এসেছি৷ ঘুম না-হওয়ার জন্য মাথা টলছে৷ আকাশ মেঘলা৷ মন-কেমন-করা হাওয়া বইছে৷ বৃষ্টির তোড়জোড় শুরু হয়েছে৷

অনেকদিন পুরোনো ছবি দেখা হয়নি৷ মা-বাবার বিয়ের অ্যালবাম বের করে ওলটাতে শুরু করেছি৷ নাকের নীচ থেকে থুতনি পর্যন্ত আমার মুখের সঙ্গে মায়ের মুখের অদ্ভুত মিল আছে৷ চোখ আর কপাল বাবার মতো৷ আমার এক জ্যাঠা আর দুই পিসি আছেন বলে শুনেছি বাংলাদেশে৷ কেউ খোঁজখবর রাখেন না, আমার কাছে কারও ঠিকানা নেই৷ ঝামেলা শেষ৷

এর পরের অ্যালবাম আমার মুখেভাতের৷ সর্বসাকুল্যে গোটা দশেক ছবি৷ বাড়ির অমতে মা এক রিফিউজিকে বিয়ে করেছিলেন, মামার বাড়ির কেউ কোনও সম্পর্ক রাখেননি৷ শুনেছি ওরা সব বড়োলোক৷ হলদিয়ার দিকে কোথায় যেন সরকারি কন্ট্রাক্টর৷ মায়ের এক মামাতো ভাই বড়োবাজারে আসতেন মাঝে মাঝে, তখন দেখা করে যেতেন৷ আমি রাঙামামা বলে ডাকতাম৷ মা মারা যাওয়ার পর তিনিও সব পাট চুকিয়ে দিয়েছেন৷ ভালোই করেছেন৷ পয়সা থাকলেই আত্মীয়স্বজন জোটে৷ আমারও যদি কোনওদিন পয়সা হয়, নতুন করে সব রক্তের সম্পর্ক গজিয়ে উঠবে৷ না হলে;উলঙ্গ রাতে বিছানায় শুয়ে স্বপ্ন দেখে যাব পাগলের মতো৷ একদিন সত্যিই হয়তো উন্মাদ হয়ে যাব ঘুম খুঁজতে বেরিয়ে৷

ঘড়িতে সকাল সাতটার ঘণ্টা পড়তেই বাইরে জীবনবাবুর গলার আওয়াজ শুনতে পেলাম, ‘অভিজিৎ আছ?’

‘আসুন৷’

ভদ্রলোক একা আসেননি, বাহনকে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন৷ আমাকে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে একলাফে প্লাস্টিকের চেয়ার দখল করে বসল সাবমেরিন৷ জীবনবাবু এসে বসলেন খাটে৷ আমি দাঁড়িয়ে রইলাম৷ ভদ্রলোক ইশারায় আমাকে বসতে বললেন৷ যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো বসে পড়েছি৷

ঘরের চারপাশে চোখ বুলিয়ে জীবনবাবু বলতে শুরু করলেন, ‘তুমি ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, বিজ্ঞান ও ঈশ্বর, এর মধ্যে কোনটা বিশ্বাস করো?’

‘আমার বিশ্বাসে কী এসে যায়? আমি বিশ্বাস করলেও এগুলোর অস্তিত্ব আছে, না করলেও আছে৷’

‘পুনর্জন্মে বিশ্বাস করো?’

কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম, ‘সন্দেহ হয়, তবে এমন অনেক ঘটনা আছে, যেগুলো দেখলে অবিশ্বাস করার মতো যুক্তি খাড়া করা যায় না৷’

জীবনবাবু মাথা নাড়লেন৷ মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, ‘তোমার যে উপসর্গ দেখা দিয়েছে, সেটা সুবিধার নয় বাপু৷ এটাকে ঠিক ডিসঅর্ডার বলা যায় না৷ ‘নাইটমেয়ার ডিসঅর্ডার’ নামে একটা রোগ আছে বটে, এটা সেই ঘরানায় পড়ে না৷ তাহলে এটা কী?’

সাবমেরিন উঠে বসেছে৷ পিঠ উঁচু করে কিছুটা ব্যায়াম সেরে নিয়ে, সে মাটিতে নেমে দু-চার পা হেঁটে, একলাফে জীবনদার কোলে এসে বসেছে৷

ওর গায়ে হাত বুলিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ‘স্বপ্ন বিভ্রান্তির ফলে মানুষ নানারকম উলটো-সিধে কাজ করেছে; এমন কথা শোনা গিয়েছে আগে৷ এর চিকিৎসা আছে৷ অ্যান্টি ডিপ্রেশন, অ্যান্টি অ্যাংজাইটি বড়ি বহুকাল ধরে খেয়ে যেতে হয়৷ এগুলো সবই বকলমে ঘুমের ওষুধ৷ তোমার ক্রাইসিস আরও বড়ো৷ কারণ, ওষুধ খেয়েও তোমার ঘুম ভেঙে যাচ্ছে৷’

কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে বললাম, ‘তাহলে কী করণীয়?’

জীবনবাবুর মুখে মৃদু হাসি, উদাস দৃষ্টি৷ সাবমেরিন পরম নিশ্চিন্তে ওঁর কোলে মাথা দিয়ে বসে আছে৷ বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে, সঙ্গে আবেগি বাতাস, এলোমেলো চিন্তাভাবনা৷ গাছের পাতা, শহরের ধুলোমাটি ঘরের জানালা ভেদ করে ঢুকে আসছে মরমে৷ জীবনবাবু গলা খাঁকরে উঠলেন৷

ভদ্রলোক বললেন, ‘তামাম দুনিয়ায় অকারণে কিছু ঘটে না৷ সবকিছুর একটা হেতু আছে৷ তুমি পাহাড়ে যে মন্দিরের স্বপ্ন দেখছ, সেটা কোন জায়গায় বলতে পারবে?’

‘নাহ! আমি কখনও কোনোদিন কোনো পাহাড়ে যাইনি৷’

সাবমেরিনকে কাঁধে তুলে জীবনবাবু বিছানা থেকে নামলেন৷ ঘরের মধ্যে কিছুটা পায়চারি করলেন৷ তারপর আবার নিজের পুরোনো জায়গায় এসে বসলেন৷

বিছানা থেকে নেমে আমি চায়ের ব্যবস্থা করলাম৷ ঝাড়া আধ ঘণ্টা সবাই চুপ৷ চা খাওয়া হলে জীবনবাবু মুখ খুললেন, ‘ভাই অভিজিৎ, তোমার সঞ্চিত যাবতীয় অর্থ নিয়ে এই পৃথিবীর যত নামীদামি ডাক্তার-বৈদ্য দেখাও-না কেন, এই রোগের ওষুধ মাত্র একটাই এবং সেটা জানতে গেলে তোমাকে ঘর ছাড়তে হবে!’

ভদ্রলোক চুপ করে গেছেন৷ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে আমি ওঁর দিকে তাকিয়ে আছি৷ জীবনদার এমন মুখের ভাব আগে দেখিনি৷ এখানে পাগলামির কোনও লক্ষণ নেই৷ চোখের কোণ ভিজে৷ ভদ্রলোক বললেন, ‘এই ধরনের উদ্দেশ্যমূলক স্বপ্ন যখন মানুষের জীবনে বারবার আসে, তখন হয় তার উত্তর খুঁজে নিজেকে মুক্ত করতে হয় তা না হলে বাকি জীবন পাগলাগারদে পচতে হয়৷’

ঝাঁজালো কথায় কোনও মারপ্যাঁচ নেই৷ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘এক্ষেত্রে আমার পরামর্শ একটাই; তোমার স্বপ্নের উৎস, উদ্দেশ্য এবং বিধেয় এই তিনটে খুঁজে বার করে, তার প্রতিকার করে বাড়ি ফেরো, তবেই শান্তি৷ না হলে শেষ ঘুম পর্যন্ত তোমার জীবনে শান্তি নেই৷’

ভদ্রলোকের গলা কাঁপছে৷ শরীরে ঘাম৷ কপালে চিন্তার ভ্রূকুটি৷ আমার নিজের শরীরও অবশ্য কাঁপছে৷ গলা শুকিয়ে গেছে৷ বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে৷ জীবনবাবু আবার বলা শুরু করলেন, ‘খুব সম্ভবত গত জন্মে বা অন্য কোনো এক জন্মের কিছু দৈবিক হিসাব তোমার এখনও বাকি আছে৷ সেই হিসাব সম্ভবত সেই মন্দিরেই লুকিয়ে আছে৷ আমার মনে হয়, মন্দির খুঁজে পেলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে৷’

বিছানা থেকে হঠাৎ উঠে বেরিয়ে যাওয়ার আগের মুহৃর্তে ভদ্রলোক আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যদি তুমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের স্বপ্নসন্ধানের উদ্দেশে যাবে বলে ঠিক করো, সেক্ষেত্রে যাওয়ার আগে একবার আমার সঙ্গে দেখা করো৷ শুরুটা কোথা থেকে করবে, সেটা হয়তো আমি বলে দিতে পারব৷’

ভদ্রলোক আর দাঁড়ালেন না, সাবমেরিনকে নিয়ে বেরিয়ে চলে গেলেন৷ আমি ধপ করে মাটিতে বসে পড়লাম৷ চোখের সামনে বড়ো ড্রেসিং টেবিল৷ আয়নায় একজন হেরে-যাওয়া মানুষের বিধ্বস্ত চেহারা দেখতে পাচ্ছি৷ জীবন-প্রদীপের সলতে শেষ হয়ে আসছে ক্রমশ৷

প্রায় ঘণ্টাখানেক হল, অনুভূতিহীন অবস্থায় বসে আছি৷ ক্রমশ রাগের আগুন জ্বলে উঠল গোটা শরীরে, অসহায় মানুষ আর কী-ই বা করতে পারে৷ উঠে দাঁড়িয়ে সোজা জীবনবাবুর ঘরের ভেজানো দরজা এক ঝটকায় খুলে ফেলেছি৷ ভদ্রলোক অকাতরে বিছানায় ঘুমোচ্ছেন৷ সাবমেরিন টেবিলের ছড়ানো বইয়ের ওপর পরম নিশ্চিন্তে বসে আছে৷ অবাক চোখে সে আমাকে দেখছে৷ নির্ঘাত ভাবছে; এতটা স্পর্ধা হল কী করে!

জীবনদা ঘুম ভেঙে বিস্ময়কর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন৷ তোয়াক্কা না করে বেশ কড়া গলায় প্রশ্ন করলাম, ‘নিজের সিদ্ধান্ত সম্বন্ধে আপনি এতটা শিওর হচ্ছেন কী করে?’

অধ্যায় ১ / ৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%