মায়ামৃগের মৃগয়া

হেমেন্দ্রকুমার রায়

প্রথম পরিচ্ছেদ

রাতের অতিথি

ঢং ঢং ঢং!

রাত তিনটে! কলমদানিতে কলম রেখে অরুণ চেয়ার-টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, বিখ্যাত লেখক অরুণকুমার চৌধুরী।

আজ একটা জরুরি রচনা শেষ করার কথা। কিন্তু লেখা শেষ হল না। যত রাত বাড়ে, লেখাও যেন তত পুরুভুজের মতন বহু বাহুবিস্তার করতে থাকে। রাত তিনটের পর রচনাকে আর এমন অতিবৃদ্ধির সুযোগ দেওয়া চলল না। ক্ষান্ত হতে বাধ্য হল অরুণ।

ঊর্ধ্বমুখে হাঁ করে অরুণ মস্ত-বড়ো একটি জৃম্ভণ ত্যাগ করলে। তারপর গেঞ্জিটা খুলে রেখে ঘরের আলো নিবিয়ে দিলে।

পায়ে পায়ে শয্যার দিকে এগিয়ে গেল— সঙ্গে সঙ্গে স্তব্ধ রাত্রির বুক চিরে শব্দ হল— ধ্রুম ধ্রুম ধ্রুম!

রিভলবারের আওয়াজ! এত রাত্রে কলকাতার রাস্তায় রিভলবার ছোড়ে কে?

মুহূর্তে ভেঙে গেল অরুণের তন্দ্রাজড়তা। সে এক দৌড়ে জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

কিন্তু বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখা গেল কেবল নিরেট অন্ধকার। এ আর সেই আগেকার আলোকময়ী নগরী নয়— এ হচ্ছে, ব্ল্যাক-আউটের অপরিচিত কলকাতা, রাত সাড়ে নয়টা বাজলেই তিমির-ঘোমটায় মুখ ঢেকে এখন ঘুমিয়ে পড়বার জন্য ব্যস্ত হয়।

অন্ধকারকে যেন সশব্দে পদাঘাত করতে করতে দ্রুতবেগে কে ছুটে এল। তারপর পায়ের শব্দ থেমে গেল ঠিক অরুণের বাড়ির সামনে এসেই।

হঠাৎ কোথায় বেজে উঠল একটা তীব্র বাঁশি! সঙ্গে সঙ্গে নানাদিকে জাগল কত লোকের স্পষ্ট-অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর এবং দ্রুত পদশব্দ!

তারপরেই তার ঘরের দরজায় করাঘাত— একবার, দুইবার, তিনবার!

অরুণ চমকে উঠে বললে— 'কে?'

চাপা গলায় শোনা গেল, 'চুপ! আমি বরুণ। আলো জ্বেলো না। শীগগির দরজা খোলো!'

দরজা খুলতেই বরুণ ঘরের ভিতর এসে ঢুকল— শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনেই বোঝা গেল, সে ভয়ানক হাঁপাচ্ছে।

অরুণ সবিস্ময়ে বললে, 'তুমি বাড়ির ভিতরে এলে কেমন করে?'

বরুণ বললে, 'তোমার ট্যাঙ্কের জলের পাইপ ধরে।'

—কিন্তু—

—আর কিন্তু নয়, আমি এসেছি তোমাকে জানিয়ে গেলুম। ওই শোনো—

কড়াকড়, কড়াকড়, কড়াকড়! অরুণের বাড়ির সদর দরজার কড়া ক্রমাগত বাজতে লাগল!

—ব্যাপার কী বরুণ?

—বলবার সময় নেই। পুলিশ এসে পড়েছে— নিশ্চয়ই আমাকে দেখতে পেয়েছে! ডিটেকটিভ প্রশান্তের চোখ বিড়ালের মতন—অন্ধকারেও দেখতে পায়! অদৃশ্য হলুম!

—কোথায়?

—আমি নিজেই এখন জানি না। ফস করে একটা টর্চ জ্বেলে বরুণ একলাফে ঘরের বাইরে গিয়ে পড়ল।

কড়াকড়, কড়াকড়, কড়াকড়!

তারপরেই ডাকাডাকি —'বাড়িতে কে আছেন? দরজা খুলুন!'

অরুণ কিংকর্তব্যবিমূঢ়ের মতন মিনিট-খানেক চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

—দরজা খুলুন, দরজা খুলুন!

—কে আপনারা?

—পুলিশ!

—এখানে কী দরকার?

—আপনার বাড়িতে আসামি ঢুকেছে।

—অসম্ভব। আমার—

—ওসব কথা পরে হবে। আগে দরজা খুলে দিন। শেষ কথাগুলো কর্কশ হুকুমের মতন শোনাল।

অরুণ আগে সুইচ টিপে আলো জ্বাললে। তারপর নীচে নেমে এসে সদর দরজা খুলে দিলে।

এত অন্ধকারেও বোঝা গেল, রাস্তা পুলিশের লোকে ভরে গিয়েছে। দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল এক দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রকাণ্ড ব্যক্তি— অরুণ দেখেই চিনলে, সে হচ্ছে বাংলার গোয়েন্দা পুলিশের প্রসিদ্ধ কর্মচারী প্রশান্ত মজুমদার। তার পিছনে ও আশেপাশে কয়েকজন সাধারণ পুলিশ অফিসার ও সার্জেন্ট।

আঁধার রাতের ভিতরে প্রশান্তের দুই ক্ষুদ্র কিন্তু তীক্ষ্ন চক্ষু যেন তীব্র অগ্নিকণা বৃষ্টি করছে। প্রথমেই সে জিজ্ঞাসা করলে, 'আপনার নাম কী?'

—অরুণ চৌধুরী।

—পেশা?

—সাহিত্যচর্চা।

—ও, আপনি হচ্ছেন লেখক অরুণ চৌধুরী? বেশ, বেশ! এতক্ষণ আপনি কী করছিলেন?

—রাতটা ঘুমোবার জন্যে সৃষ্টি হয়েছে। আমি ঘুমোচ্ছিলুম।

—কিন্তু আপনার এ নিদ্রা এখন কাল-নিদ্রায় পরিণত হতে পারে তা জানেন?

—না, অতটা আমি জানি না।

—দস্যু দীনবন্ধু আপনার বাড়ির ভিতরে ঢুকেছে।

—আপনার এ-কথা আমি মানতে রাজি নই। কারণ সদর দরজা ভিতর থেকে বন্ধ ছিল।

—দীনবন্ধু দশজন সাধুর মতন সদর দরজা দিয়ে কারুর বাড়িতে ঢোকে না। সে আপনার বাড়িতে ঢুকেছে ওই জলের পাইপ বেয়ে।

—এ কথা সত্য হলেও বলব, আমার নিদ্রা কালনিদ্রায় পরিণত হবার ভয় নেই। কারণ কে না জানে, দীনবন্ধু ডাকাত হলেও নরহত্যা করে না?

প্রশান্ত বিরক্ত স্বরে বললে, 'তাহলে আপনি কি দীনবন্ধুকে আশ্রয় দিতে চান?'

—না।

—তাহলে আপনার বাড়িটা আমার একবার খুঁজে দেখতে পারি কি?

—মিছেই খুঁজবেন। দীনবন্ধু আমার বাড়িতে যদি ঢুকেও থাকে, তাহলে এখনও সে ধরা পড়বার জন্যে অপেক্ষা করছে না।

প্রশান্ত দৃঢ় কণ্ঠে বললে, 'অপেক্ষা করতে সে বাধ্য। আর তার পালাবার পথ নেই। আপনার বাড়ির দুদিকে রাস্তা আর দুদিকে খোলা জমি। চারিদিকেই পুলিশের পাহারা। দীনবন্ধু পাখি নয় যে উড়ে পালাবে।'

অগত্যা অরুণকে বলতে হল, 'বেশ, তাহলে খুঁজে দেখুন।'

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

গড়গড়ার নল

একতলা, দোতলা ও তেতলার সব জায়গায় তন্নতন্ন করে খুঁজে পুলিশের লোকেরা শেষটায় প্রবেশ করল অরুণের শয়নগৃহে।

প্রশান্ত জিজ্ঞাসা করলে, 'এই ঘরেই শুয়ে আপনি ঘুমোচ্ছিলেন?'

—আজ্ঞে হ্যাঁ।

—বাড়ির সব জায়গা—এমনকি ইঁদুরের গর্ত পর্যন্ত খুঁজতে বাকি রাখিনি। দীনবন্ধু নিশ্চয়ই এই ঘরেই লুকিয়ে আছে।

দুজন সার্জেন্ট উপরে এসেছিল। প্রশান্তের কথা শুনে তারা কোমরের রিভলবারে হাত দিলে।

প্রশান্ত বললে, 'অরুণবাবু, আপনাকে এমন দুশ্চিন্তাগ্রস্তের মতন দেখাচ্ছে কেন?'

অরুণ তাড়াতাড়ি শুকনো হাসি হেসে বললে, 'রাত সাড়ে-তিনটের সময়ে পুলিশের হাঙ্গামা কার ভালো লাগে মশাই?'

প্রশান্ত আর কিছু না বলে খাটের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পুলিশের লোকেরা চারিদিকে খোঁজাখুঁজি করতে লাগল।

তীক্ষ্ন চোখে বিছানার দিকে চেয়ে প্রশান্ত বললে, 'অরুণবাবু, আপনি আমাদের সঙ্গে ছলনা করছেন। সত্যিই কি আপনি ঘুমোচ্ছিলেন?'

—আপনার এই অন্যায় প্রশ্নের অর্থ বুঝলুম না।

—মাপ করবেন অরুণবাবু, আমি আপনাকে অপমান করতে চাই না। কিন্তু বিছানার চাদর আর বালিশের দিকে চেয়ে দেখুন। কোথাও একটুও ভাঁজ নেই, দেহের ভার পড়েছে এমন কোনো চিহ্নই নেই। আমি বাজি রেখে বলতে পারি, আজ রাত্রে এ বিছানায় শুয়ে কেউ ঘুমোয়নি।

অরুণ বেশ সপ্রতিভ ভাবেই বললে, 'আমিও আপনার কথা সমর্থন করি।'

—তার মানে?

—লিখতে লিখতে ক্লান্ত হয়ে আমি শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম ওই ইজিচেয়ারখানার উপরে।

—ও, তাই নাকি?

পুলিশের খোঁজাখুঁজি ব্যর্থ হল। ঘরের মধ্যে কারুকে পাওয়া গেল না।

অরুণ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। মনে মনে ভগবানকে ধন্যবাদ দিয়ে বললে, 'প্রশান্তবাবু, দেখলেন আমার কথা ঠিক কি না? দীনবন্ধু এখানে নেই। আপনারা অকারণেই আমার শান্তিভঙ্গ করলেন!'

প্রশান্ত হতাশ ভাবে বললে, 'আশ্চর্য! দীনবন্ধু কি ভেলকি জানে? হাতের মুঠোয় এসেও কর্পূরের মতন উড়ে গেল!'

ঢং ঢং ঢং ঢং! রাত চারটে।

অরুণ বললে, 'এইবারে আপনারা আমাকে একটু ঘুমোবার ছুটি দিলে সুখী হব।'

প্রশান্ত বললে, 'নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই! এইবারে আমরাও বিদায় হচ্ছি। আপনাকে অনেক কষ্ট দিলুম, ক্ষমা করবেন। কী করব বলুন, মানুষকে কষ্ট দেওয়াও আমাদের কর্তব্যের মধ্যে! আচ্ছা, আসি মশাই— নমস্কার!'

—নমস্কার।

পুলিশরা অদৃশ্য হল। অরুণ ধপাস করে একখানা চেয়ারের উপর বসে পড়ল। আজ মস্ত একটা ফাঁড়া কেটে গেল। তার বাড়ির ভিতরে বরুণকে পাওয়া গেলে সেও হয়তো ফাঁকি দিতে পারত না আইনের নাগপাশকে।

আইনের নাগপাশ! হ্যাঁ, বরুণকে বাঁচাবার জন্যে তার ভিতরেও সে ধরা দিতে রাজি আছে,—কিন্তু আজ যে বরুণ সত্যসত্যই বাঁচল, সেইটেই হচ্ছে বড়ো কথা।

বরুণ—তার শৈশববন্ধু বরুণ! এক গ্রামে তাদের জন্ম, একসঙ্গে তারা ছেলেবেলায় খেলা করেছে, বাল্যে ইস্কুলে পড়েছে, যৌবনে বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হয়েছে।

বরুণ ধনীর সন্তান হলেও চিরদিনই গরিবের দুঃখে কাতর। সে মেলামেশা করত গরিবদের সঙ্গেই এবং বরাবরই তার মূলমন্ত্র ছিল—'দরিদ্র-নারায়ণের সেবা'। যেখানে অভাবের হাহাকার, সেইখানেই তার আবির্ভাব। যেখানে বন্যা বা ঝড় বা ভূমিকম্পের দৈবদুর্বিপাক হয়েছে, চুম্বকের টানে আকৃষ্ট লোহার মতন বরুণ সেখানে ছুটে যাবেই। কত যে তার গোপন দান ছিল, অরুণ পর্যন্ত জানে না।

এই বরুণ হঠাৎ একদিন কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। একে একে বছরের পর বছর কাটতে লাগল, তবু তার সন্ধান নেই। সকলে স্থির করলে, বরুণ সন্ন্যাসী হয়েছে। কিন্তু অরুণ এ-কথা বিশ্বাস করেনি। সে জানত, বরুণ হচ্ছে জনতার সাধক— লোকালয়ের বাইরে গিয়ে সাধনা করা তার পক্ষে অসম্ভব। এবং যাবার সময়ে বরুণও তাকে চিঠিতে জানিয়ে গিয়েছিল— 'আমি অদৃশ্য হচ্ছি আরও ভালো করে দৃশ্যমান হবার জন্যে।'...

সুদীর্ঘ আট বৎসর অজ্ঞাতবাস করবার পর বরুণ আবার যখন দৃশ্যমান হল, লোকের কাছে সে তখন 'দস্যু দীনবন্ধু' নামে বিখ্যাত!

মনে আছে তার, বরুণের মুখে প্রথম যেদিন এই সত্য জানতে পারলে, সেদিন সে কতখানি আহত হয়েছিল! বরুণ আজ ডাকাত দীনবন্ধু!

তারপর বরুণ যখন তার দস্যুবৃত্তি গ্রহণ করার উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দিলে, তখনও সে মত-পরিবর্তন করলে না বটে, কিন্তু মানতে বাধ্য হল যে, ডাকাত বলতে সব সময়েই অসাধু বোঝায় না!

খাঁটি বন্ধুত্ব ভোলা অসম্ভব। দস্যু হলেও বরুণকে সে ত্যাগ করতে পারবে না!

এই আজকেই বরুণকে রক্ষা করবার জন্যে তাকে মিছে কথা কইতে হল। এক্ষেত্রে উপায় কী?

অরুণ বসে বসে এইসব কথা ভাবছে, এমন সময়ে ঘরে এসে ঢুকল শ্রীধর।

শ্রীধরও আগে ছিল ডাকাত এবং বার-দুয়েক জেলও খেটেছিল। কিন্তু তারপর প্রথমে বরুণের অধীনে চাকরি নেয়। এবং বরুণ অজ্ঞাতবাসে যাত্রা করবার পর অরুণ তাকে দেয় নিজের ভৃত্যের পদ।

শ্রীধরের বয়স এখন আটচল্লিশ বৎসর। কিন্তু এখনও তাকে দেখলে মনে হয় দুর্গা-প্রতিমার অসুরের মতন বলবান। চেহারাও প্রায় সেই রকম—ইয়া গালপাট্টা ঝাঁটা-গোঁফ, পাকানো চোখ, চওড়া বুকের পাটা। মিশমিশে কালো রং।

শ্রীধরকে দেখে অরুণ বললে, 'আপদরা বিদেয় হয়েছে?'

শ্রীধর বড়ো-বড়ো দাঁত বার করে একগাল হেসে বললে, 'কারা, বড়দার স্যাঙাতরা? হ্যাঁ, বিদেয় হয়েছে।'

শ্রীধর বরুণকে 'বড়দা' ও অরুণকে 'ছোটদা' বলে ডাকত।

—সদর বন্ধ হয়েছে তো?

—হ্যাঁ।

—তাহলে আজকের কাণ্ডটা তুমিও দেখেছ?

—হ্যাঁ, গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত— সব।

—তার মানে, বরুণকেও তুমি দেখেছ?

—খালি কি দেখেছি? বড়দাকে একটা গড়গড়ার নল বকশিশও দিয়েছি! অরুণ সবিস্ময়ে বললে, 'গড়গড়ার নল?'

—হ্যাঁ গো ছোটদা, হ্যাঁ। কর্তাবাবু (অরুণের পিতা) মারা যাবার পর তাঁর গড়গড়ার রবারের নলটা দালানে একটা হুকে টাঙানো ছিল। সেইটে বড়দাকে দিয়েছি।

—হঠাৎ তোমার এ খেয়াল হল কেন? বরুণ তো তামাক খায় না!

— অত শত জানিনে বাবু! হঠাৎ বড়দা এসে শুধোলেন, 'আমাকে তাড়াতাড়ি একটা গড়গড়ার নল দিতে পারিস শ্রীধর? আমিও চট করে নলটা এনে দিলুম আর কী?

—বরুণের সবই অদ্ভুত! পুলিশ যখন যখন হানা দিয়েছে— ধরতে পারলে একেবারে দ্বীপান্তর, তখন সে খুঁজছে গড়গড়ার নল! শ্রীধর, নল নিয়ে বরুণ কোথায় গেল?

—সোজা ছাদের দিকে।

—কিন্তু ছাদে সে নেই। যাক, বরুণ যে পালাতে পেরেছে এইটেই ভাগ্যের কথা!

—কে বলে বরুণ পালিয়েছে? আমি হাজির!

অরুণ চমকে ফিরে দেখে, দরজার সামনে হাস্যমুখে দাঁড়িয়ে আছে বরুণ!

অরুণ এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বললে, 'তুমি এই বাড়িতেই ছিলে?'

—নিশ্চয়ই!

—এ কী, তোমার সর্বাঙ্গ যে ভিজে, জামা-কাপড় দিয়ে টপ-টপ করে জল পড়ছে!

—আমার নাম বরুণ, আমি হচ্ছি জল-দেবতা! এতক্ষণ তাই জলের তলায় বাস করছিলুম।

অরুণ হতভম্বের মতন বললে, 'তোমার ব্যাপার আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!'

—ভীমের চোখে ধুলো দেবার জন্যে দুর্যোধন যেমন দ্বৈপায়ন হ্রদে প্রবেশ করেছিলেন, প্রশান্তকে ফাঁকি দেবার জন্যে আমিও তেমনি ঢুকেছিলুম তোমার ছাদের জলের সিস্টার্নের ভিতরে।

—অসম্ভব! আমার সামনে প্রশান্ত সিস্টার্নের ডালা খুলে ভিতরে উঁকি মেরে দেখেছিল।

—খালি উঁকি মারেনি অরুণ, জলের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে নাড়াচাড়াও করেছিল।

—তবে?

—কিন্তু আমি তখন সিস্টার্নের তলার সঙ্গে মিশিয়ে চিৎপাত হয়ে শুয়ে আছি। তোমার ওই জলাধারটি প্রকাণ্ড। তার তলদেশ ছিল পুলিশের নাগালের বাইরে।

—কিন্তু প্রশান্ত যে সিস্টার্নের পাশে সন্দিগ্ধভাবে পাঁচ-ছ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে ছিল! তুমি নিঃশ্বাস ফেলেছিলে কেমন করে?

—একটি গড়গড়ার রবারের নলের সাহায্যে।

—কী বললে?

—ভায়া, সিস্টার্নের অতিরিক্ত জল-নিকাশের জন্যে উপরে পাশের দিকে একটা পাইপ থাকে তা জানো? গড়গড়ার রবারের নলের একদিকটা ঢুকিয়ে দিয়েছিলুম সেই পাইপের মধ্যে, আর নলের অন্য-দিকটা ছিল আমার মুখবিবরে। জলের তলায় শুয়ে নল-পথে আমি মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ছিলুম। ব্যাপারটা কঠিন আর অভ্যাসসাপেক্ষ বটে, কিন্তু পরীক্ষিত। পুকুরে ডুবে খড়ের সাহায্যে এইভাবে নিঃশ্বাস ফেলে আগেও কেউ কেউ শত্রুকে ফাঁকি দিয়েছে!

—কিন্তু প্রশান্ত যদি লাঠি দিয়ে সিস্টার্নের তলাটা পরীক্ষা করত?

—আমি ধরা পড়তুম। কিন্তু সে যখন তা করেনি আর আমিও ধরা পড়িনি, তখন তোমার এত বেশি মাথা না ঘামালেও চলবে! এখন বাবা শ্রীধর, তুমি জাগ্রত হও— বিস্মিত হয়ে অতবড়ো হাঁ করে আমার দিকে আর তাকিয়ে থেকো না, কারণ চেষ্টা করলেও তুমি আমাকে গিলে ফেলতে পারবে না! তোমার মুখ বন্ধ কর—দৌড়ে আমার জন্যে তোয়ালে আর শুকনো জামা-কাপড় এনে দাও!

শ্রীধরের দুই চোখ তখন নাচছে! গদগদ কণ্ঠে সে বললে, 'বড়দা গো! দুটো পায়ের ধুলো দাও! তোমার মতন সর্দার পেলে, আমার আমি ডাকাতি করতে রাজি আছি! শাবাশ বুদ্ধি, শাবাশ বুদ্ধি!'

বরুণ ভ্রূভঙ্গি করে বললে, 'থামো থামো! আমার আর শিষ্যের দরকার নেই—এখান থেকে দূর হও!'

শ্রীধর মাথা নাড়তে নাড়তে আপন মনে বলতে বলতে বেরিয়ে গেল—'শাবাশ বুদ্ধি, শাবাশ বুদ্ধি! এমন সর্দার পেলে দুনিয়া জয় করতে পারি!'

বরুণ তখন পকেটের ভিতর থেকে একে একে বার করলে গোটাকয় হীরার আংটি, একছড়া মুক্তার মালা, একছড়া রত্নহার এবং আরও খান-কয়েক জড়োয়া গহনা!

অরুণ বিস্ফারিত চক্ষে অলংকারগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

বরুণ মৃদু মৃদু হাসতে হাসতে বললে, 'এগুলোর দাম কত হবে জানো?'

অরুণ বিরক্ত স্বরে বললে, 'না। জানতেও চাই না।'

—অন্তত দেড় লক্ষ টাকা। এগুলো হচ্ছে বংশীবদন সাহার সম্পত্তি। এবারের যুদ্ধে বংশীবদন কোটিপতি হবার চেষ্টা করছে। বাংলদেশে দুর্ভিক্ষের হাহাকার, শহর-গ্রামের পথে পথে অনাহারে হাজার হাজার মানুষ মারা পড়ছে, খেতে দিতে পারছে না বলে মা সন্তান বিলিয়ে দিচ্ছে, বাপ পুত্রহত্যা করছে, কিন্তু বংশীবদনদের মতন লোকের বিরাট সব গুপ্তভাণ্ডারে গিয়ে দেখো, মজুত করা রয়েছে চাল আর ডাল আর আটা-ময়দা আর অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের পাহাড়! এইসব মাল আটগুণ, দশগুণ কী আরও বেশি দামে বিক্রি করে পাষণ্ড বংশীবদনের দল দেশবাসীদের অস্থি-কঙ্কালের উপরে বসে ধনকুবের হতে চায়! তাই আমি নিয়েছি এদের শাস্তি দেবার ভার!

অরুণ বললে, 'শাস্তি দেবার তুমি কে?'

বরুণের দুই চক্ষু জ্বলে উঠল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠে পূর্ণকণ্ঠে সে বললে, 'আমি হচ্ছি ঈশ্বরের লাঠি! যারা দরিদ্রের রক্তশোষণ করে, তাদের পিঠ ভাঙব বলে আমি হয়েছি তৈরি! রাজার আইনের জাল হচ্ছে ছেঁড়া— ধরা পড়লেও এই বংশীবদনের দল নানা ফাঁক দিয়ে সুকৌশলে বেরিয়ে আসে। তাই আমি দাঁড়াতে চাই এদের বিরুদ্ধে। আইনের জালের ফাঁক দিয়ে এক-একজন বেরিয়ে আসবে, আর আমিও চালাব একে একে তাদের ওপরে লাঠি!'

—আইনের ত্রুটি শোধরাবার জন্যে তুমিও তো চাইছ আইনকে অমান্য করতে!

—ধরো, তাই।

—আরও অনেকে যদি তোমার মত অবলম্বন করে, তাহলে রাজার শাসনকার্য যে অচল হয়ে পড়বে।

—বিষ ভালো জিনিস নয়। কিন্তু বিষপানের পর যাঁর বেঁচে থাকবার শক্তি আছে, তিনিই পূজা পান নীলকণ্ঠ মহাদেব নামে। আমার মত অবলম্বনের শক্তি হবে ক-জনের? চোর-ডাকাত না হয়েও চোর-ডাকাতের অভিশপ্ত জীবনযাপন করবার সাধ্য আর সাহস হবে কার?

—তুমি পরস্ব হরণ কর। তুমিও চোর-ডাকাতের মতো!

—'ভাই অরুণ, তোমার মুখেও এ-কথা শুনে দুঃখিত হলুম। আমি কি চুরি-ডাকাতি করি, স্বার্থের জন্যে? তুমি কি জানো না, বংশীবদনের গহনাগুলো বেচে যদি দেড়লাখ টাকা পাই, তাহলে তার সমস্তটাই লাভ করবে তারা— যাদের জীবনে আশা নেই, দেহে বস্ত্র নেই, উদরে অন্ন নেই? আমি যে দরিদ্রনারায়ণদের প্রতিনিধি! দেশের জন্যে মানুষ নয়— মানুষের জন্যেই দেশ! দেশের চেয়ে মানুষ বড়ো আর আমি হচ্ছি সেই মানুষের সেবক।

আচমকা বিষম জোরে অরুণের সদর-দরজার কড়া নেড়ে কে চিৎকার করে বললে, 'দরজা খুলুন—দরজা খুলুন—শিগগির দরজা খুলুন!'

বরুণের মুখ ম্লান হয়ে গেল—একমুহূর্তের জন্যে। তারপরেই সে বললে, 'বন্ধুবর প্রশান্ত আবার এসেছেন তাঁর ভ্রম-সংশোধন করতে। আমিও আবার অদৃশ্য হলুম— তুমি অনায়াসে দরজা খুলে দিতে পারো!' সে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

প্রকাশ্যের গোপনতা

দরজা খুলে দিয়ে অরুণ এবারে ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'কী মশাই, শেষ রাতে বারবার আমাকে জ্বালাতন করবার অধিকার কি আপনাদের আছে?'

প্রশান্ত বিনয়ে একেবারে নুয়ে পড়ে বললে, 'নিশ্চয়ই নেই— নিশ্চয়ই নেই! কিন্তু আপনিও তো এখনও ঘুমোননি দেখছি। আর উপর থেকে আপনাদের কথাবার্তার আওয়াজও তো নীচে দাঁড়িয়ে শুনতে পাচ্ছিলুম। কার সঙ্গে এত কথা কইছিলেন?'

—শ্রীধরের সঙ্গে।

—শ্রীধর কে?

—আমার চাকর।

—চাকরের সঙ্গে এত কথা?

—আপনাদের উপদ্রবের কথাই হচ্ছিল।

—হ্যাঁ, আমরা যে উপদ্রব করছি, এটা স্বীকার না করলে পাপ হবে। কিন্তু আমাদের আর একবার উপদ্রব করবার অনুমতি দেবেন কি?

—আবার!

—একটু সন্দেহ থেকে গিয়েছে, সেটা দূর করবার সুযোগ চাই।

—আপনি কি মনে করছেন, দীনবন্ধু এখনও আমার বাড়িতে লুকিয়ে আছে?

—সেইরকমই তো সন্দেহ হচ্ছে! বাড়ির চতুর্দিকব্যাপী পুলিশের এই বেড়াজাল ভেদ করে একটা টিকটিকিরও যে পালাবার উপায় নেই!

—বেশ, আসুন। কিন্তু জানবেন, এই শেষ বার! এর পরেও আপনারা যদি অত্যাচার করতে চান, তাহলে খানাতল্লাশির পরওয়ানা আনতে হবে।

—বেশ, রাজি!

প্রশান্তের সঙ্গে সঙ্গে এ-অঞ্চলের থানার ইনস্পেকটর, দুজন সার্জেন্ট ও আরও কয়েকজন পুলিশের লোক পদশব্দে বাড়ি মুখরিত করে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে লাগল। পিছনে পিছনে চলল অরুণ।

প্রশান্ত আর কোনোদিকে চাইলে না, সোজা উঠে গিয়ে দাঁড়াল ছাদে। তারপর অগ্রসর হল জলের সিস্টার্নের দিকে।

অরুণের বুক দুপ-দুপ করতে লাগল! এইবারেই সর্বনাশ! বরুণ ঠিক আন্দাজ করেছে, প্রশান্ত এসেছে তার ভ্রম-সংশোধন করতে!

প্রশান্ত ইনস্পেকটরের কাছ থেকে তার লাঠিটা চেয়ে নিলে। তারপর সিস্টার্নের ডালা খুলে লাঠিগাছা জলের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে চারিদিকে নাড়াচাড়া করতে লাগল।

অরুণের মাথা ঘুরে গেল। সে দেয়ালে ঠেস দিয়ে নিজেকে সামলে নিলে।

প্রশান্ত লাঠিগাছা আবার জল থেকে বার করে আনলে। তার মুখ দেখে বোঝা গেল, পরীক্ষার ফল সন্তাোষজনক নয়।

অরুণ আস্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললে।

প্রশান্ত তবু দমবার পাত্র নয়। টর্চ নিয়ে সিস্টার্নের ফাঁকের ভিতরে মাথা গলিয়ে ভিতরটা ভালো করে পরীক্ষা করতে লাগল।

হঠাৎ সে অস্ফুট ধ্বনি করে উঠল।

ইনস্পেকটর বললে, 'ব্যাপার কী?'

অরুণের বুকে আবার লাগল চমক!

প্রশান্ত সিস্টার্নের ভিতর থেকে গড়গড়ার রবারের নলটা টেনে বার করে আনলে।

ইনস্পেকটর বললে, 'ও আবার কী?'

—তামাক খাবার নল। সিস্টার্নের জল-নিকাশের পাইপের সঙ্গে লাগানো ছিল। অরুণবাবু, এটা এমন অস্থানে এল কেন?

অরুণ যথাসম্ভব সহজ কণ্ঠে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলে, 'জানি না।'

ইনস্পেকটর বললে, 'একটা তুচ্ছ তামাকের নল নিয়ে ভাববার সময় এখন নেই। দেখছেন তো প্রশান্তবাবু, আপনার অনুমান ঠিক নয়। আসামি সরে পড়েছে।'

—হ্যাঁ, এখন হয়তো সরে পড়েছে! কিন্তু এই রবারের নলটাই প্রমাণিত করছে, আমরা প্রথম বারে যখন এখানে এসেছিলুম, দীনবন্ধু তখন এইখানে জলে ডুব নিয়ে— খুব সম্ভব— শুয়ে ছিল।

—ধেৎ!

—রবারের নলটা ছিল তার মুখে, আর সে নিঃশ্বাস ছাড়ছিল মুখ দিয়েই।

—অ্যাঁ!

—হ্যাঁ। আমি—খালি আমি কেন— আমরা সকলেই হচ্ছি গাধার মতন নির্বোধ, তাই তখন লাঠি নিয়ে সিস্টার্নের তলদেশ পর্যন্ত পরীক্ষা করিনি! এখন চোর পালিয়েছে, তাই আমাদের বুদ্ধিও বেড়েছে।

ইনস্পেকটর গর্জন করে বললে, 'আসামি নিশ্চয়ই এখনও এই বাড়ির ভিতরে আছে! আমরা আবার খুঁজে দেখব!'

প্রশান্ত নিরাশ কণ্ঠে বললে, 'খুঁজতে চান, খুঁজে দেখুন। কিন্তু আর কোনো আশা নেই। দীনবন্ধু হচ্ছে মহা সুচতুর! হাতের কাছে পেয়েও তাকে ছুঁতে পারলুম না, এতক্ষণ সময় পেয়েও সে কি আর ধরা দেবার জন্যে বসে আছে?'

আবার খোঁজাখুঁজি শুরু হল।

দোতলায় নেমে শ্রীধরকে ডেকে প্রশান্ত হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলে, 'তোমারই নাম শ্রীধর?'

—আজ্ঞে!

—তোমাদের বাবু শোবার ঘরে বসে একটু আগে কার সঙ্গে কথা কইছিলেন?

—আজ্ঞে, আমার সঙ্গে।

—বাপু শ্রীধর, আমি যদি বলি তোমাদের বাবু অন্য একটি ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা কইছিলেন?

—আজ্ঞে, তাহলে সত্যকথা বলা হবে না!

অরুণ রুষ্ট স্বরে বললে, 'প্রশান্তবাবু, আপনি কি আমাকেও সন্দেহ করছেন?'

বিনয়ে নত হয়ে প্রশান্ত বললে, 'ক্ষমা করবেন। পুলিশের লোক আমি, সকলকেই সন্দেহ করা রীতিমতো বদ-অভ্যাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। প্রায় মুদ্রাদোষের মতন আর কী?'

দোতলার পর একতলায় সন্ধান আরম্ভ হল। কোথাও আসামি নেই।

তখন অন্ধকারের নিবিড়তা কমে আসছে প্রভাতের আভাসে। এখনও ঘোর-ঘোর ভাব কাটেনি বটে, কিন্তু দৃষ্টি নয় আর অন্ধ।

ইনস্পেকটর বললে, 'সব ঘরই তো দেখা হল, সব ফক্কা! বাকি আছে শুধু ওই বাইরের ঘরটা।'

প্রশান্ত নিস্তেজ ভাবে বললে, 'সদর দরজায় পুলিশের পাহারা, তার পাশেই ওই বাইরের ঘর— ওর সব দরজা-জানলাই খোলা রয়েছে, ওর ভিতরটাও এখানে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দীনবন্ধু ওখানে থাকবার ছেলে নয়।'

ইনস্পেকটর তবু দরজা দিয়ে মাথা গলিয়ে ভিতরটা একবার দেখে নিয়ে বললে, 'নাঃ, ভিতরে কৌচ-সোফা ছাড়া আর কিছুই নেই। আসামি একেবারে পগার পার, আমাদের কাদাঘাঁটাই সার!'

পুলিশের সবাই রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল।

দরজার চৌকাঠের উপরে দাঁড়িয়ে অরুণ সহাস্যে বললে, 'কী মশাই, এবার দরজা বন্ধ করি, না আরও-একবার ভিতরে পায়ের ধুলো দিতে চান?'

প্রশান্ত বললে, 'না, আর বোধহয় দরজার কড়া নাড়ব না।'

—নাড়লেও দরজা আর খুলব না! উল্টে খবরের কাগজে আজকের সব কথা জাহির করে দেব। জানেন, আমি সাংবাদিক?

প্রশান্ত ত্রস্তকণ্ঠে বললে, 'আজকে যে-রকম ল্যাজেগোবরে হলুম তাই কি আমাদের পরম শাস্তি নয় মশাই? এর মধ্যেই তো কাগজওয়ালারা দীনবন্ধুর ব্যাপার নিয়ে আমাদের যথেষ্ট দুয়ো দিচ্ছে, তার ওপরে আজকের কেলেঙ্কারিটাও ছাপার হরফে বেরুলে আমাদের যে মুখ দেখাবার জো থাকবে না! অতখানি উপকার না করলেই খুশি হব।'

উপরের ঘরে ঢুকে অরুণ অত্যন্ত করুণভাবে একেবারে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কিন্তু শ্রীধর অমন মস্তবড়ো শরীর নিয়েও ঘরময় যেন নেচে-নেচে বেড়াতে লাগল ছোট্ট টুনটুনির মতন হালকা পায়ে।

অরুণ মুখ ভার করে বললে, 'তোমার অত ফুর্তি আমার ভালো লাগছে না শ্রীধর!'

—ছোটদা, আমার ফুর্তি হচ্ছে, আমার কিন্তু বেশ লাগছে।

—তাই নাকি? এবারে গড়গড়ার নল তো হয়েছে অচল, বরুণ তোমার কাছ থেকে কী চেয়ে নিয়ে গিয়েছে? গড়গড়ার কলকে নাকি?

—এবারে বড়দাও কলকে চায়নি, পুলিশও কলকে পায়নি।

—তোমাদের দীনবন্ধু করবে ডাকাতি আর আমি সামলাব তার ঠেলা?

—তুমি আর কী ঠেলা সামলালে ছোটদা? নাকানি-চোবানি খেয়ে মরল তো পুলিশই!

একটু চুপ করে থেকে অরুণ বললে, 'আচ্ছা শ্রীধর, বরুণ-শয়তান কেমন করে পালাল বল তো?'

—Talk of the devil and he will appear! শয়তানের নাম করলেই শয়তান হয় মূর্তিমান!

অরুণের মুখের কথা ফুরোতে না ফুরোতেই বরুণ আবার ঘরের ভিতরে এসে ঢুকল!

ধড়মড় করে বিছানার উপরে উঠে বসে অরুণ যেন নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলে না!

শ্রীধর তারিফ করে বললে, 'ধন্যি, বড়দা, ধন্যি! তুমি কি উবে যাওয়ার মন্ত্রও শিখেছ?'

—Devil a bit! মোটেই না শ্রীধর, মোটেই না! আমি বাইরের ঘরে কৌচে আসীন হয়ে মুক্তিলাভের স্বপ্ন দেখছিলুম।

অরুণ অবিশ্বাস-ভরা কণ্ঠে বললে, 'বাইরের ঘরে? দরজা-জানলা খুলে, পাহারাওয়ালাদের কাছ থেকে হাতকয়েক তফাতে বসে? কী যে বল বরুণ!'

—ঠিক তাই!

—উঠোন থেকে আমরা সবাই দেখেছি বাইরের ঘরে কেউ ছিল না।

—উঠোন থেকে তোমরা উঁচু কৌচের কেবল পিছনদিকটাই দেখতে পাচ্ছিলে। আমি ছিলুম কৌচের কোলে গুটিসুটি মেরে।

—এত দুঃসাহস তোমার হল?

—কেন হবে না? প্রথমত, আমার হচ্ছে মরিয়ার সাহস। দ্বিতীয়ত, আমি মানুষের মনের রহস্য জানি।

—মনের রহস্য?

—হ্যাঁ। শোনো । ভেবে দেখলুম, প্রশান্ত আবার যখন ফিরে আসছে তখন গড়গড়ার নল আর ব্যবহার করা নিরাপদ হবে না। অথচ আমাকে লুকোতে হবে। কিন্তু কোথায় লুকোই? বাড়ির গোপনীয় স্থানগুলোর দিকেই পুলিশের চোখ পড়বে বিশেষভাবে। কিন্তু দরজা-জানলা-খোলা বাইরের ঘরের মতন প্রকাশ্য জায়গা নিশ্চয়ই কারুর সন্দেহ জাগ্রত করবে না। বিশেষ ওই বাইরের ঘরটা একটু আগেই যখন ভালো করে খুঁজে দেখা হয়েছে। কৌচখানা দরজা-জানলার দিকে পিছন ফেরানো ছিল বলে আমার আরও সুবিধা হল। তার ভিতরেই আশ্রয় নিলুম। দেখতেই পাচ্ছ, আমি ভুল করিনি! খোলা ঘর দেখে পুলিশ অবহেলা করে চলে গেল।

দুই হাতে তালি নিয়ে শ্রীধর বললে, 'শাবাশ বুদ্ধি— শাবাশ বুদ্ধি! আগে যদি এমন সর্দার পেতুম তাহলে কি আমাকে দু-দুবার জেল খেটে মরতে হত!'

বরুণ বললে, 'আমি জানি আমাকে ধরবার জন্যে পুলিশ আজ ফাঁদ পেতেছিল! কিন্তু তার ভিতর থেকেই আমি বংশীবদনের ট্যাঁক হালকা করে বেরিয়ে এসেছি। কিন্তু পুলিশকে আরও শিক্ষা দেওয়ার দরকার। তুমি দেখে নিয়ো অরুণ, এইবারে আমিও ফাঁদ পাতব পুলিশের জন্যে... শ্রীধর, তুমি হাঁ-করে থাকার অভ্যাস ছাড়ো। যাও, নিয়ে এস তোয়ালে, জামা আর কাপড়!'

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

আমার নাম হুনুমান

বংশীবদন সাহার বাড়ির চুরির কথা গোপন রইল না, সমস্ত খবরের কাগজেই বেরিয়ে গেল।

আরও প্রকাশ পেল, ওখানে যে চুরি হবে পুলিশ আগেই সে-খবর পেয়েছিল এবং চোর ধরবার জন্যে যথাসময়েই উপস্থিত হয়েছিল ঘটনাক্ষেত্রে। তবু তাদের চোখে ধুলো দিয়ে দীনবন্ধু বামাল সমেত উধাও হয়ে গিয়েছে।

কাগজওয়ালারা কম নিষ্ঠুরও নয়। এই ঘটনা অবলম্বন ও পুলিশকে ঠাট্টা করে তারা হরেক-রকম ব্যঙ্গচিত্র ছাপাতেও ছাড়লে না।

তার উপরে আর এক কাণ্ড! জনৈক পত্রপ্রেরক বলে কে একজন কাগজে একখানা পত্র পাঠিয়ে অরুণের বাড়িতে পুলিশের দুর্দশার সমস্ত কাহিনি প্রকাশ করে দিলে এবং সেইসঙ্গে এটাও জানালে যে, বংশীবদনের চোরাই গহনা বিক্রি করে যত টাকা পাওয়া গিয়েছে, দীনবন্ধু তার এক কপর্দকও নিজে গ্রহণ করেনি, সমস্তই বিলিয়ে দিয়েছে দীন-দুঃখীদের।

প্রশান্ত হাত কামড়াতে কামড়াতে মানসচক্ষে স্পষ্ট দেখলে, গোটা দেশটা তার শোচনীয় দুরবস্থা দেখে কেবল অট্টহাসির ঐকতানই তুলছে না, সকলের কাছে পুলিশই হয়ে পড়েছে ঘৃণ্য; আর চোর দীনবন্ধুই হয়ে উঠেছে শ্রদ্ধার পাত্র!

উপরওয়ালাদের কাছে ধমক খেয়ে প্রশান্ত আরও দমে গেল। প্রথম শ্রেণীর গোয়েন্দা বলে তার নামডাক ছিল যথেষ্ট; দীনবন্ধুর পাল্লায় পড়ে এইভাবে তার সব সুনাম বুঝি লুপ্ত হয়ে যায়!

অত্যন্ত অশান্ত হয়ে প্রশান্ত ফোনে অরুণকে ডেকে বললে, 'অরুণবাবু, এই কি আপনার উচিত ছিল?' প্রভৃতি।

জবাব এল; 'আপনি উচিত-অনুচিত কী বলছেন?...ও, বুঝেছি, কাগজে সেদিনকার ব্যাপার নিয়ে যা বেরিয়েছে? বিশ্বাস করুন, ও-পত্র আমি পাঠাইনি।'

খানিকক্ষণ ভেবেচিন্তে প্রশান্ত আন্দাজ করলে, এ হচ্ছে নিশ্চয়ই স্বয়ং দীনবন্ধুর কীর্তি! সে তখনই উঠে খবরের কাগজের আফিসে গিয়ে হাজির হল।

সম্পাদক বললে, 'চিঠিখানা ডাকে আসেনি, কোনো লোক দিয়ে গিয়েছে।'

—তার চেহারা কীরকম?

—আমি তাকে দেখিনি। আপনি সহকারী সম্পাদক সত্যবাবুর কাছে যান।

সত্যবাবু পত্রবাহকের চেহারার এই বর্ণনা দিলেন—'না বেঁটে, না ঢ্যাঙা; না রোগা, না মোটা; না কালো, না ফর্সা!'

—বয়স?

—না বুড়ো, না ছোকরা।

—মশাই কি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন?

—বাপরে, পুলিশ আর বাঘ কি ঠাট্টার পাত্র?

প্রশান্তের বক্র দৃষ্টি দেখলে, সত্যবাবুর চোখে ভয়ের ভাব বটে, কিন্তু কালো মেঘের পিছনে বিদ্যুতের আভাসের মতন তার গোঁফের আড়ালে যেন ঈষৎ হাসির ইঙ্গিত!

সহ-সম্পাদকের এই দুঃসহ ব্যবহার কোনোক্রমে সহ্য করে প্রশান্ত বললে, 'নাম আর ধাম না থাকলে আপনারা তো চিঠি ছাপেন না। পত্রপ্রেরক তার নাম-ধাম দেয়নি?'

দপ্তরের দিকে দৃষ্টিপাত করে সহ-সম্পাদক বললেন, 'হ্যাঁ, দিয়েছে বই কি! আসল নাম হচ্ছে অশান্ত মজুমদার।'

প্রশান্ত মজুমদার নিজের দ্বিতীয় রিপুকে প্রাণপণ চেষ্টায় দমন করে বললে, 'আর ঠিকানা?'

সহ-সম্পাদক যা বললেন তা হচ্ছে প্রশান্তের নিজের বাড়ির ঠিকানা!

দাঁতে ঠোঁট কামড়ে প্রশান্ত বললে, 'মশাই, পত্রপ্রেরকরা ভুল ঠিকানা দেয় কি না, সে খোঁজ রাখা আপনারা দরকার মনে করেন না বুঝি?'

সহ-সম্পাদক জবাব দিলেন, 'তাহলে প্রত্যেক কাগজের মালিককে একটি বিরাট গোয়েন্দাবাহিনী পুষতে হয়।'

প্রশান্ত আর বাক্যব্যয় না করে নিজের বাড়ির দিকে দ্রুত পদচালনা করলে। এবং যেতে যেতে প্রতিজ্ঞা করলে যে, এই দুঃসহ সহ-সম্পাদকটিকে যদি কোনোদিন হাতের মুঠোর মধ্যে পাই, তাহলে আমার হাতের মুঠো খোলবার জন্যে বড়ো অল্প আয়োজনের প্রয়োজন হবে না!

চারিদিকেই দীনবন্ধুর নাম! প্রশান্তের যশের প্রদীপ ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে এবং খবরের কাগজে কাগজে দীনবন্ধুর উদারতা ও পরদুঃখকাতরতার নূতন কাহিনির আকার হয়ে উঠছে অধিকতর দীর্ঘ!

দীনবন্ধু কোথাও অনাথা বিধবার একমাত্র আশ্রয়স্থল বাঁধা-পড়া বাড়ি উদ্ধার করে দিচ্ছে, কোথাও হাজার হাজার দরিদ্র ও ভিখারির মধ্যে বস্ত্র বিতরণ করছে, কোথাও কন্যাদায়গ্রস্তের কাছে মোটা টাকার বান্ডিল পাঠাচ্ছে, কোথাও অত্যাচারী জমিদারের পিঠে বেতের ও কপালে তপ্ত লোহার ছাপ বসিয়ে দিয়ে আসছে।

কেউ দীনবন্ধুর নামে ভয়ে কাঁপে, কেউ-বা দেবতা ভেবে তার নামে জয়ধ্বনি দেয়!

দীনবন্ধুর পিছনে ছুটে ছুটে প্রশান্তের অন্তরাত্মা পর্যন্ত যেন হাঁপিয়ে পড়ল। সে যেন ছায়াকে অনুসরণ করছে—দেখতে পাচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারছে না! প্রশান্তের দৃঢ় ধারণা হল, পুলিশকে গোপনে খবর জোগানো যাদের পেশা, তাদের দলেও দীনবন্ধুর একাধিক গুপ্তচর আছে।

সেদিন বাসায় ফিরতেই তার স্ত্রী নবতারা বললে, 'ওগো, একটি ভদ্রলোক তোমার পথ চেয়ে বটুকখানায় অনেকক্ষণ ধরে বসে আছেন! তোমার ফিরতে এত দেরি হল কেন?'

প্রশান্ত ভার-ভার মুখে গজগজ করে বললে, 'সাধ করে কি আর দেরি করেছি! ছুটতে হয়েছিল বজবজে!'

—কেন গো, এত জায়গা থাকতে বজবজে?

—একখানা উড়োচিঠিতে খবর পেলুম, দীনুডাকাত নাকি সেখানে মস্ত এক ভোজের আয়োজন করেছে—

গালে হাত দিয়ে নবতারা বললে, 'ওমা, অবাক! কালে-কালে হল কী! ডাকাত আবার ভোজ দেয় নাকি?'

—এ হচ্ছে আধুনিক ডাকাত গিন্নি, আধুনিক ডাকাত! কাগজওয়ালারা এর নাম দিয়েছে বিশ শতাব্দীর রবিনহুড! কেউ কেউ তাকে বিশ শতাব্দীর বিশেডাকাত বলেও ডাকে!

—সবই আদিখ্যেতা! মরুক গে, তারপর?

—বজবজে এক গরিব বিধবার মেয়ের বিয়ে হচ্ছিল না, দীনুডাকাতের টাকার জোরে আজ তার মেয়ের বিয়ে হয়ে গেল।

নবতারা একেবারে বিগলিত হয়ে বললে, 'দীনুর তো তাহলে খুব দয়ার শরীর! আহা, তার ভালো হোক, মঙ্গল হোক—'

বাঘের ঘরেও হরিণের শুভকামনা! প্রশান্ত মর্মাহত হয়ে গর্জন করে উঠল, 'গিন্নি! তুমিও কাগজওয়ালাদের দলে!'

মুখ ফসকে ফস করে বেসুরো কথা বেরিয়ে গিয়েছে বুঝে নবতারা অনুতপ্তের মতন জড়সড়ো হয়ে রইল।

প্রশান্ত খানিকক্ষণ গজগজ করে বললে, 'কিন্তু বজবজে যাওয়াই সার হল! সেখানে দীনুর টাকায় বিধবার মেয়ের বিয়েও হচ্ছে, ভোজও হচ্ছে— কিন্তু দীনু হাজির নেই।'

স্বামীর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে নবতারা বললে, 'আহা, তবে তো তোমার ভারি কষ্ট হয়েছে! কিন্তু কী আর করবে বল, যে পুজোয় যে মন্ত্র! এখন বটুকখানায় গিয়ে ভদ্রলোকটির সঙ্গে একবার দেখা করে এস!'

—আমি বাড়িতে ঢোকবার সময়ে দেখে এসেছি, বৈঠকখানায় কেউ নেই।

—তাহলে তিনি বসে বসে চলে গিয়েছেন।

আর কিছু না বলে নবতারা গিয়ে ঢুকল রান্নাঘরের ভিতরে।

উপরের ঘরে প্রবেশ করে প্রশান্ত জামা-কাপড় পরিবর্তন করছে, হঠাৎ তার নজর পড়ল ঘরের একদিকে! সেখানে বড়ো টেবিলটার দেরাজগুলো খোলা এবং টেবিলের উপরেও কাগজপত্র ছড়ানো রয়েছে এলোমেলো ভাবে! এবং তার উপরে কাগজচাপার নীচে রয়েছে এমন একখানা বড়ো আকারের নীল খাম— প্রথমেই যা দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

ছুটে গিয়ে প্রশান্ত খামখানা তুলে নিয়ে ছিঁড়ে ভিতরের চিঠিখানা বার করে পড়তে লাগল :—

শ্রীযুক্ত প্রশান্ত মজুমদার

করকমলেষু

বন্ধুবর,

এসে ফিরে গেলুম। আপনার সঙ্গে দেখা হল না বলে আমি দুঃখিত। যদিও আপনার মুখচন্দ্র দেখবার আশা আমার ছিলও না।

আপনার স্ত্রী নবতারাঠাকুরাণী হচ্ছেন প্রথম শ্রেণীর গৃহিণী। রান্নাঘরে বসে এমন একমনে তিনি হাতা ও খুন্তির সদ্ব্যবহার করছিলেন যে, কখন-যে আমি পা টিপে ছায়ার মতন উপরে উঠে এসেছি সেটা দেখবার অবকাশও তাঁর হয়নি। ঝি গিয়েছে আপনার শিশু পুত্র-কন্যাদের নিয়ে বেড়াতে এবং চাকর গিয়েছে বাজারে, কাজেই আমাকে বাধা দেবার কেউ ছিল না।

আমার সম্পর্কীয় কতগুলো দরকারি কাগজপত্র আপনি হস্তগত করেছেন। সেগুলো আমার কাছে থাকাই নিরাপদ। তাই সেগুলো নিয়ে যেতেই আমি এসেছি এবং সেগুলো নিয়েই চললুম। আপনার বিশেষ অসুবিধা হবে বলে আমিও বিশেষ দুঃখিত।

একটা সুখবরও দিই। আপনি চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের নাম শুনেছেন তো? তারা দুই ভাই কলকাতার সবচেয়ে না হোক— সর্বপ্রধান বস্ত্রব্যবসায়ীদের মধ্যে গণ্য। পথে পথে নগ্ন বা প্রায়নগ্ন নর-নারীর জনতা, কিন্তু অতিরিক্ত লাভে তারা করছে অগ্নিমূল্যে কাপড় বিক্রি। চুনিচাঁদ বহু লক্ষ টাকা জমিয়ে ফেলেছে। টাকার ভার তারা প্রায় সইতে পারছে না— এই ভারের খানিকটা আমি কমিয়ে নিতে চাই। তাই স্থির করেছি, আগামী অমাবস্যার রাতে আমি চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের বাড়িতে যাব অনাহূত অতিথির মতো। আপনি আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবার জন্যে ব্যাকুল। সেই রাত্রে আমাদের দেখাশোনা হতে পারে।

কিন্তু সাবধান! আপনার ভালোর জন্যেই বলছি, এ শুভখবরটা যেন চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদ ভ্রাতৃযুগলের দুই জোড়া কর্ণকুহরের মধ্যে প্রবেশ না করে। কারণ তাহলে তারা মূল্যবান জিনিসগুলো নিশ্চয়ই স্থানান্তরিত করে ফেলবে এবং কোনো রহস্যজনক উপায়ে আমিও যথাসময়ে তা জানতে পারব। বলা বাহুল্য তাহলে ঘটনাক্ষেত্রে আমার উপস্থিতির দরকার হবে না এবং আমাকে গ্রেপ্তার করবার সুযোগ থেকে আপনিও হবেন বঞ্চিত। ইতি—

আপনার অনুগত

দীনবন্ধু

পুনশ্চ। আর একটা কথা জানাতে ভুলে গিয়েছি। শ্রীমতী নবতারাঠাকুরাণীর রান্নার হাত বোধহয় খুব মিঠে। কারণ রান্নাঘর থেকে যেসব সুগন্ধ এসে আমার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করছে, তা যেমন মোহনীয় তেমনি লোভনীয়। আজ 'ঘ্রাণে অর্ধ্বভোজন' হল, একদিন রসনায় পূর্ণভোজন করবার দুর্দমনীয় সাধ হচ্ছে। চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের বাড়িতে যদি আপনার প্রচণ্ড আলিঙ্গনপাশ থেকে অব্যাহতি পাই, তাহলে একদিন স্বেচ্ছায় এখানে এসে নবতারাঠাকুরাণীর স্বহস্তে পরিবেশিত অমৃত গলাধঃকরণ করে ধন্য হয়ে যাব। আমি নিজেই নিমন্ত্রণ করছি নিজেকে— আপনাকে আর কষ্ট দিলুম না।'

পত্র পাঠ করে প্রশান্তের মুখ হয়ে উঠল হত্যাকারীর মতো। দাঁতে দাঁতে ঘষে সে বললে, 'দীনু আসবে আবার এখানে? ইঁদুর আসবে বিড়ালের কাছে নিমন্ত্রণের খাবার খেতে? একবার এসে আরামটা দেখুক না!'

তারপর কিছু শান্ত হয়ে প্রশান্ত একখানা টুলের উপরে বসে পড়ে ভাবতে লাগল।

চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদ মস্তবড়ো ব্যবসায়ী, তাদের ঘরে টাকা ধরে না, আর তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তিও যথেষ্ট।

দীনবন্ধু হানা দেবে ওদের ভাণ্ডারেই। এখন কী করা উচিত? পুলিশের বড়োসাহেবের কাছে সব কথা খুলে বলবে? অসম্ভব!

কারণ, প্রথমত, তাহলে দীনবন্ধুর চিঠিখানাও সাহেবের কাছে দাখিল করে জানিয়ে দেওয়া হবে যে, সে কেমন করে, কত অনায়াসে তাকে বাঁদরনাচ নাচিয়ে বেড়াচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, বড়োসাহেব ব্যাপার দেখে তাকে অযোগ্য ভেবে তার বদলে যদি আর কারুর হাতে চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের ভার অর্পণ করেন? তাহলে দীনুডাকাতকে গ্রেপ্তার করবার গৌরব সে কেমন করে অর্জন করবে?

অতএব ব্যাপারটা চেপে যাওয়াই ভালো বুদ্ধিমানের মতো। হঠাৎ দীনুডাকাতকে বন্দি করে সে নিজের পদোন্নতির ব্যবস্থা করবে, কাগজওয়ালাদের উপরে টেক্কা মারবে, গোটা বাংলাদেশকে চমকে দেবে।

চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদও থাকুক অন্ধকারে। তাদের খবর দিলেও সব ভেস্তে যাবার সম্ভাবনা। খুব সম্ভব তাদের বাড়ির ভিতরেও দীনুর চর আছে। চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদ ভয় পেয়ে যদি টাকাকড়ি গহনাপত্র সরিয়ে ফেলে, তবে দীনুর কানে সে খবর পৌঁছোতে দেরি হবে না। তাহলে তাকে আর পাওয়া যাবে না নাগালের মধ্যে।

দীনু বিশেডাকাতের উপরেও একহাত নিতে চায়! বিশে যাদের বাড়িতে ডাকাতি করবে, খবর পাঠাত তাদেরই কাছে। আর দীনু বিজ্ঞাপনী পাঠায় খোদ পুলিশের কাছেই। কী স্পর্ধা!

রও, তুমি বড়ো বাড় বেড়েছ, এইবারে তোমার দর্প যদি চূর্ণ না করতে পারি তবে আমার নাম হনুমান!

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

ঢাকের বদলে নরুন

বুদ্ধু হচ্ছে মস্ত একদল চোর ও গুন্ডার সর্দার। জোড়াবাগানের একটা প্রকাণ্ড বস্তির মধ্যে তার প্রধান আড্ডা।

বাইরের লোক জানে, সে গোরু ও মোষের গাড়ির গাড়োয়ানদের সর্দারি করে। তার খাটালে পঞ্চাশ-ষাটটা গোরু ও মোষ থাকে এবং গাড়ি ও গাড়োয়ানও থাকে অনেক। তার এই আইনসংগত পেশার জন্যে বুদ্ধুর উপরে দৃষ্টি দিয়েও পুলিশ বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারে না।

তার আসল লাভ হয় চোর, গাঁটকাটা ও গুন্ডা পুষে। এইসব চোর, পকেটমার ও গুন্ডা কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় দিনেরাতে যা হস্তগত করে, সমস্ত এনে দেয় বুদ্ধুর হাতে। তাদের সকলেরই জন্যে এক-একটা নির্দিষ্ট অংশ থাকে। বাকি বা প্রধান অংশ জমা হয় বুদ্ধুর নিজের ভাণ্ডারে।

চোর, পকেটমার ও গুন্ডাদের মধ্যে যারা মাঝে মাঝে ধরা পড়ে জেলে যায়, তারা খালাস না পাওয়া পর্যন্ত তাদের পোষ্য বা পরিবার প্রতিপালনের ভার নেয় বুদ্ধু স্বয়ং। ফলে তার দলের লোকরা নির্ভয়ে চুরি ও রাহাজানি করে এবং ভারী ভারী পকেট হালকা করে বেড়ায়। জেলকে তারা ভয় করে না। তারা এমন অনায়াসে জেলে যায়, যেন বায়ুপরিবর্তনে যাচ্ছে!

কলকাতার দিকে দিকে এমনি আরও অনেক সর্দার আছে। অনেকের এমনি হোমরাচোমরা চেহারা যে, বাহির থেকে দেখলে কেউকেটা বলে মনে হয়। পুলিশ তাদের স্বরূপ চিনেও আইনের পাকে জড়াতে পারে না সহজে।

তাদের অনেকের বিশেষ বিশেষ চর আছে। তারা এসে নানারকম খবর দিয়ে যায়। কেউ এসে জানায় তাদের প্রধান শত্রুপক্ষের অর্থাৎ পুলিসের ভিতরের কথা। পুলিশের দৃষ্টি কোন আড্ডার উপরে পড়েছে, তারা কবে কোথায় খানাতল্লাশ করতে আসবে, চরের মুখে প্রায়ই সে খবর পেয়ে সর্দাররা আগে থাকতে সাবধান হতে পারে।

আর একদল চরের কাজ, কোন বাড়িতে হানা দিলে দামি মাল বা টাকাকড়ি পাওয়া যাবে তার সঠিক খবর আনা। এদের সঙ্গে প্রায়ই গৃহস্থদের বাড়ির ভৃত্য বা অন্য কোনো লোকের যোগ থাকে। কোন পথে, কোন ঘরে, কখন গেলে নিরাপদে চুরি করা চলবে, এই চরেরা সেসব সংগ্রহ করে আনে যথাসময়ে।

সম্প্রতি একজন চর বুদ্ধুর কাছে একটা লোভনীয় সংবাদ বহন করে এনেছে। চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের লোহার সিন্দুকের গর্ভে আছে একলক্ষ টাকার নোট। পঞ্চাশ হাজার টাকার মোহরের থলি, ষাটহাজার টাকার জড়োয়া গহনা। বাড়ির দুই মালিক ভীষণ কৃপণ, বেশি চাকর-বাকর-দ্বারবান প্রভৃতির জাঁকজমক নেই— এত টাকা, অথচ একখানা মোটর পর্যন্ত রাখেনি, ইত্যাদি।

কোন পথ দিয়ে কোন ঘরে গেলে খুব সহজে লোহার সিন্দুকের নিকটস্থ হওয়া যাবে, তা জানতেও বাকি রইল না।

আসছে পরশুদিন চুনিচাঁদ বাড়ির সমস্ত মেয়ে ও ছেলেদের নিয়ে দেওঘরে গমন করবে। বাড়িতে থাকবে খালি মানিকচাঁদ, একজন পাচক, দুজন চাকর ও একজন দ্বারবান।

চুনিচাঁদ দেওঘরে একদিন মাত্র থেকেই কলকাতায় ফিরে আসবে। কাজেই আসছে অমাবস্যার রাত্রেই প্রায় খালি বাড়ির ভিতরে ঢুকে কেল্লা মাৎ করবার বড়োই সুবিধা।

বুদ্ধুর বিরাট দেহ মহা উত্তেজনায় ফুলে আরও বড়ো হয়ে উঠল। লোভে জ্বলন্ত দুই চক্ষু বিস্ফারিত করে সে বললে, 'এ যে পয়লা নম্বরের শিকার রে বেটা! জয় মা কালী, বেটিকে জোড়া পাঁঠা বলি দেব!'

—সর্দার তাহলে রাজি!

—খালি রাজি নই রে বেটা, এবারে দলের সাথে হামি বি যাব।

—আপনি নিজে!'

—'হাঁ রে, হাঁ! ছিঁচকে চোট্টা পাঠিয়ে কি এত ভারী কাম হয়? এ দাঁও ফসকালে আফশোস করে মরতে হবে যে!'

* * * *

অমাবস্যার রাত গায়ে মা কালীর রং মেখে করছে থমথম।

জনশূন্য পথে বাস করছে খালি হিংস্র অন্ধকার। তার কালিমা এত ঘন যে সন্দেহ হয়, এর মধ্যে তীব্র বিদ্যুৎ জ্বললেও সে দীপ্তি করবে না কারুর দৃষ্টি আকর্ষণ।

গির্জার ঘড়ি সেই বুকচাপা কালো স্তব্ধতার মধ্যে আর যেন চুপ করে থাকতে না পেরে হঠাৎ দুইবার চিৎকার করে উঠল— ঢং, ঢং!

একটা গলির ভিতর থেকে মুখ বাড়িয়ে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে প্রশান্ত বললে, 'রাত দুটো।'

পিছন থেকে ইন্সস্পেক্টর বললে, 'দীনুডাকাতটা সময়ের মূল্য বোঝে না। রাত কাবার হতে চলল, এরপরে কাজ সেরে লম্বা দেবার অবসর পাবি না যে!'

হঠাৎ খানিক তফাতে তিন-চারটে কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠল।

প্রশান্ত বললে, 'চুপ! কুকুরগুলো কী দেখে চিৎকার করছে?'

প্রশান্ত তার পুলিশচক্ষু চালিয়ে অন্ধকারের গাঢ়তাকে ছিন্নভিন্ন করবার চেষ্টা করলে। কিন্তু কিছু বোঝবার উপায় নেই। না কোনো ছায়া, না কোনো কানাকানি, না কোনো পদশব্দ।

খানিকক্ষণ গেল।

আচম্বিতে দূরে জাগল একখানা দ্রুতগামী মোটরের শব্দ। গাড়িখানা ভয়ানক বেগে কাছে এসেই ছুটে গেল অন্যদিকে এবং সেই সঙ্গে-সঙ্গে শোনা গেল একটা উচ্চ কণ্ঠস্বর— 'বন্ধু প্রশান্ত! হাজির আছ তো? আমি হাজির!'

তাহলে দীনবন্ধু বাক্যরক্ষা করেছে!

ইনস্পেকটর বললে, 'উঃ, বেটার সাহস দেখলে স্তম্ভিত হতে হয়! পুলিশকে কেয়ার করে না!'

প্রশান্ত একেবারে বোবা। বুকের ভিতরে তার রক্ত যেন টগবগ করে ফুটতে লাগল। এখন ভগবান স্বয়ং কাছে এসে দাঁড়ালেও সে বোধহয় গ্রাহ্যের মধ্যেও আনবে না। সে কান পেতে শুনলে, দীনবন্ধুর মোটরখানার শব্দ কয়েক সেকেন্ড পরেই থেমে গেল। তাহলে মোটরখানা কাছেই দাঁড়িয়েছে!

কয়েক মিনিট কাটল। চারিদিকে আবার সমাধিক্ষেত্রের নীরবতা।

ইনস্পেকটর অধীর কণ্ঠে বললে, 'দলবল নিয়ে বেরিয়ে পড়ব নাকি?'

নিম্ন অথচ কর্কশ স্বরে প্রশান্ত বললে, 'না। সময় হয়নি।'

ইন্সস্পেক্টর বললে, 'স্যার, আপনি আজও হালে পানি পাবেন না দেখছি। দীনুবেটা অন্ধকারে চুপিসারে কাজ সেরে এতক্ষণে সরে পড়িমরি করছে। চলুন, বেরিয়ে পড়ি!'

প্রশান্ত এবারে প্রায় গর্জন করে বললে, 'না!'

আরও মিনিট-কয় কাটল। গির্জার ঘড়িতে বাজল আড়াইটের ঘণ্টা।

সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে তীব্র স্বরে ফুকরে উঠল একটা পুলিশবাঁশি!

প্রশান্তের দেহ হঠাৎ সিধা হয়ে উঠল ছিলাছেঁড়া ধনুকের মতো। লম্বা এক লাফ মেরে গলির বাইরে এসে সে চিৎকার করে উঠল—'চল সবাই চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের বাড়ির ভিতরে!'

এক মুহূর্তে স্তব্ধতা গেল পালিয়ে! দিকে-দিকে পায়ের জুতোর ছুটোছুটি-শব্দ, বহু কণ্ঠের হই-হই রব, অনেকগুলো টর্চের আলোকে অন্ধকার হয়ে গেল খণ্ড-বিখণ্ড!

একজন লোক দৌড়ে এসে বললে, 'স্যার, চোরেরা ওইদিক দিয়ে বাড়িতে ঢুকেছে!'

—দীনু তাহলে দল বেঁধে এসেছে?

—হ্যাঁ, দশ-বারোজন লোক!

ইনস্পেকটর ছুটতে-ছুটতে ভীষণ স্বরে বললে, 'হোক লড়াই। আমি মরব, তবু দীনুকে ছাড়ব না!'....

পুলিশের কতক লোক বাইরে রইল, কতক বাড়ির ভিতরে গিয়ে ঢুকল। তারপর মহা হুড়োহুড়ি শব্দ, গোলমাল, রিভলবারের আওয়াজ, আর্তনাদ! রাত্রি যেন শব্দ-হলাহলে জর্জরিত! পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে আলো জ্বলে উঠল, জানলার পাল্লাগুলো খুলে গেল! ডাকাত পড়েছে ভেবে মেয়ে-পুরুষের চিৎকার, ভীত শিশুদের কান্না!

তারপর ধীরে ধীরে নানা ধ্বনি-প্রতিধ্বনির উচ্চতা নেমে এল আবার নীচের পর্দায়।...

প্রশান্ত দেখলে, দশজন চোর হাতে পরেছে হাতকড়ি এবং তাদের মধ্যে একজন দাঁড়িয়ে আছে সকলের উপরে মাথা তুলে, সগর্বে! সে বুদ্ধু।

প্রশান্তের মুখে ফুটল গভীর নিরাশার কাতরতা। এ দলে দীনবন্ধু নেই। সে আবার ফাঁকি দিয়েছে!

ইনস্পেকটর বললে, 'আরে, এ যে দেখছি আমাদের বুদ্ধু!'

বুদ্ধু বুক ফুলিয়ে বললে, 'হাঁ, হাঁ, হামি বুদ্ধু! পুলিশকে ডর করে না বুদ্ধু!'

ইনস্পেকটর বললে, 'আমি তো জানতুম তুমি একটা মস্ত দলের সর্দার! তাহলে এখন দেখছি তুমি সর্দারি ছেড়ে দীনুর তাঁবেদারি করছ?'

বুদ্ধু ক্রুদ্ধ স্বরে বললে, 'হামি, করব তাঁবেদারি! কে তোমাদের দীনু?'

—আবার শাক দিয়ে মাছ ঢাকবার চেষ্টা হচ্ছে! দীনুডাকাতকে তুমি চেনো না?

—ও হো হো, সেই বেটা স্বদেশি ডাকু? তার খবর হামরা রাখি না।

—রাখো না? আজ সে তোমাদের সঙ্গে করে এখানে আনেনি।

—না, না, হামরা দীনু-ফিনুর তোয়াক্কা রাখি না। হামরা এসেছি নিজেদের ধান্দায়। নসিব মন্দ, তাই ধরা পড়ে গেলুম!

ইনস্পেকটর অবাক হয়ে প্রশান্তের মুখের পানে চাইলে।

কিন্তু প্রশান্তের বিশ্বাস হল না যে, বুদ্ধু দীনুর দলের লোক নয়। ঠিক একদিনে এক সময়ে, একই বাড়িতে বুদ্ধু ও দীনুর আবির্ভাব, অথচ দুজনের মধ্যে কোনোই সম্পর্ক নেই, এও কি সম্ভব? প্রশান্ত বুদ্ধুকে জেরা করতে উদ্যত হল।

ঠিক সেই সময়ে বাড়ির অপর প্রান্ত থেকে একটা প্রচণ্ড চিৎকার শোনা গেল—'সর্বস্ব নিয়ে গেল—সর্বস্ব নিয়ে গেল—সর্বস্বান্ত করে গেল!'

ইনস্পেকটর চমকে উঠে বললে, 'ও আবার কে চ্যাঁচায় বাবা?'

একজন চাকর বললে, 'এ যে ছোটোবাবুর গলা!'

প্রশান্ত সচকিত স্বরে বললে, 'কোথায় তোদের ছোটোবাবুর ঘর?'

—হুজুর, অন্দর মহলে!

—শিগগির আমাদের সেখানে নিয়ে চল!

—আসুন হুজুর, এই পথে।

জনকয়েক পাহরাওয়ালার জিম্মায় আসামিদের রেখে বাকি সকলে প্রশান্তের পিছনে পিছনে ছুটল।

ইন্সস্পেক্টর বললে, 'এ যে বাবা হেঁয়ালি-নাট্য! যবনিকা পড়বে কখন?'

মস্ত বাড়ি। এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে গিয়ে দীর্ঘ সিঁড়ি ভেঙে একেবারে তেতলায় উঠতে সময় লাগল।

তারপর সকলে একটা মাঝারি আকারের ঘরে ঢুকে দেখলে, মেঝের উপরে খাটের পায়ার সঙ্গে বাঁধা রয়েছে এক মাঝবয়সি পুরুষের দেহ।

পুলিশ দেখেই সে চিৎকার করে উঠল—'এখনও দৌড়ে যান, এখনও হয়তো তাকে ধরতে পারবেন!'

প্রশান্ত বললে,'কাকে?'

—চোর, চোর, চোরকে!

—এ ঘরে চোর এসেছিল?

—হ্যাঁ মশাই, হ্যাঁ! আমার সর্বস্ব নিয়ে পালিয়েছে! আমার মুখ পর্যন্ত বেঁধে রেখে গিয়েছিল, কোনোরকমে মুখের বাঁধন খুলে ফেলেছি, তাই কথা কইতে পারছি! এখনও যান মশাই, এখনও গিয়ে তাকে ধরে ফেলুন!

—কজন চোর এসেছিল?

—একজন —হাতে তার রিভলবার!

—সে কতক্ষণ গিয়েছে?

—ছ-সাত মিনিট আগে।

প্রশান্ত গম্ভীর স্বরে বললে, 'তাহলে তাকে ধরবার চেষ্টা মিছে! এ চোর কে তা বুঝেছি। সে মোটরে চড়ে পালিয়েছে। এখন বলুন দেখি, আপনার কী চুরি গিয়েছে?'

— 'সর্বস্ব মশাই, সর্বস্ব! ওই লোহার সিন্দুকে আমাদের তিনলাখ টাকার সম্পত্তি ছিল! সব গিয়েছে গো, সব গিয়েছে! ওগো আমার কী হবে গো!'... 'সা রে গা মা'-র সব পর্দা ছুঁয়ে মানিকচাঁদ এইবার বিনিয়ে বিনিয়ে কাঁদতে শুরু করলে।

প্রশান্ত বুঝলে মানিকচাঁদকে এখন আর কোনো প্রশ্ন করা মিছে— টাকার শোকে সে পাগল হয়ে গিয়েছে!

প্রশান্ত লোহার সিন্দুকের সমুখে গিয়ে দাঁড়াল। সিন্দুকের দরজা খোলা। তার ভিতরে এক বান্ডিল কোম্পানির কাগজ ছাড়া আর কোনো মূল্যবান জিনিস খুঁজে পাওয়া গেল না।

হঠাৎ তার কানে গেল, মানিকচাঁদ কাঁদতে কাঁদতে বলছে— 'এ আবার কোন দেশি চোর গো। সর্বস্ব লুট করে, মালিককে খুন করব বলে রিভলবার তোলে, তার সর্বাঙ্গ দড়ি দিয়ে বাঁধতে বাঁধতে বলে— 'মশাইয়ের লাগছে বলে আমি দুঃখিত'! আবার নিশ্চিন্ত হয়ে বসে হাসতে হাসতে চিঠি লিখে—'

—কী বললেন? সে চিঠি লিখেছে? — প্রশান্ত জিজ্ঞাসা করলে সচমকে।

—হ্যাঁ, গো, চিঠি লিখেছে— নিজের সোনা বাঁধানো ফাউন্টেন পেন দিয়ে চিঠি লিখে রেখে গেছে!

—কোথায় সেই চিঠি?

—ওই বিছানার উপরে দেখুন। ... খালি তো চিঠি লিখলে না— আমার সর্বস্ব নিয়ে গেল গো! আমি এখন কী করব গো, দাদা এলে কী বলব গো— কান্না ও কথা সমান চলল।

খাটের কাছে গিয়ে প্রশান্ত দেখলে, বিছানার উপরে পড়ে আছে মস্ত একখানা নীল খাম! প্রশান্তের বুকটা ধুক করে উঠল— খাম দেখেই বুঝলে, এ কার চিঠি!

চিঠিখানা এই :

'গর্দভরাজ শ্রীমান প্রশান্ত মজুমদার

সমীপেষু

তোমাকে আগে 'বন্ধুবর' বলে ডেকে নিজেই আমি নিজেকে অপমান করেছি। তোমার মতন নির্বোধচূড়ামণি আমার বন্ধু হবার যোগ্য নয়। তোমার মাথায় একমাত্র পদার্থ আছে আর তার নাম হচ্ছে 'গোবর।' একে গাধা, তায় গোবরভরা মাথা। হয়তো তুমি গাধাও নও, গোরুও নও। তাদেরও চেয়ে নিম্নশ্রেণীর জীব— যার নাম নেই অভিধানে।

মূর্খ! যখন তোমাকে স্পষ্টাক্ষরে জানালুম যে, আমি এখানে নির্দিষ্ট তারিখে আবির্ভূত হব, তখনই তোমার বোঝা উচিত ছিল, পুলিশকে ফাঁকি দেবার জন্যে আমি এক নূতনরকম ফাঁদ পাতব।

চোর কখনও পুলিশকে জানিয়ে চুরি করতে আসে না। সেটা অস্বাভাবিক। কারণ চুরি হচ্ছে লুকোচুরি ব্যাপার! যখনই তোমাকে আমার ইচ্ছা জানিয়েছি, তখনই তোমার বোঝা উচিত ছিল যে, আমি তোমাদের জন্যে ফাঁদ তৈরি করছি। আমি আজ চুরি করেছি তোমাদের সাহায্যেই।

বুদ্ধু আজ যাতে এখানে নির্দিষ্ট সময়ে চুরি করতে আসে, সে ব্যবস্থা করেছি আমিই। আমারই চর গিয়ে তাকে এখানে ভাগ্যপরীক্ষা করবার জন্যে প্রলুব্ধ করেছিল।

আমি ঠিক জানতুম, বুদ্ধুর দল যখন এখানে আবির্ভূত হবে, তখন আঁধার-রাতে তাদের আমারই দল ভেবে সমস্ত শক্তি নিয়ে তোমরা আক্রমণ করবে। আর সেই ফাঁকে আমিও ধীরে-সুস্থে নিশ্চিন্ত হয়ে করব নিজের কার্যোদ্ধার।

একদিন তুমি আমাকে বিপাকে ফেলেছিলে। আমি তামাক খাই না। তবু গড়গড়ার নল মুখে দিয়ে আমাকে জলের তলায় শুয়ে থাকতে হয়েছিল— তোমার জন্যেই। আজ তার প্রতিশোধ নিলুম।

তবে তোমার একটা উপকার করে গেলুম। আমি সমাজের শত্রু নই— আমি হচ্ছি অত্যাচারীর শত্রু। কিন্তু আজ আমার কৃপায় তোমরা বুদ্ধু নামে যে জীবটিকে ধরতে পারলে, সে হচ্ছে দেশ ও দশের শত্রু। তাকে তোমরা এতদিন বহু চেষ্টা করেও ধরতে পারোনি। আমি আজ তাকে তোমাদের হাতে সমর্পণ করে গেলুম। ঢাকের বদলে নরুন পেলে বলে আমাকে ধন্যবাদও দিয়ো। ইতি—

দীনবন্ধু'

পত্র পাঠ করবার পর প্রশান্তের মুখ ভয়ানক গম্ভীর হয়ে উঠল।

সে এগিয়ে এসে মানিকচাঁদকে বললে, 'দেখছি আপনি এখন অনেকটা সুস্থ হয়েছেন। এখন বলুন দেখি, যে চোরটা এসেছিল তাকে দেখতে কেমন?'

—মাঝবয়সি! মাথায় সাদা পাকা লম্বা চুল। চোখে নীল রঙের চশমা। গোঁফ আছে, আর আছে ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। গালে একটা বড়ো আঁচিল। রং উজ্জ্বল শ্যাম। মাথায় বোধহয় সাড়ে ছ-ফুট উঁচু। বেজায় চওড়া বুক। আর তার হাত-দুখানা যে লোহার মতন শক্ত, সেটা আমি টের পেয়েছি যখন সে আমাকে ধরে দড়ি দিয়ে বাঁধছিল!

প্রশান্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মানসপটে এই বর্ণনা অনুযায়ী একখানি ছবি এঁকে নিলে। সে নিজে কোনোদিন দীনবন্ধুর চেহারা দেখবার সুযোগ পায়নি।

ইনস্পেকটর কৌতূহলী স্বরে বললে, 'চিঠিখানা কী? আমাকে যে দেখালেন না?'

প্রশান্ত শুষ্ক স্বরে বললে, 'ও চিঠি আমাকে লেখা। আপনার দেখবার দরকার নেই।'

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

দীনবন্ধু কলাবিদ

দুদিন পরেই শহরের প্রত্যেক খবরের কাগজে সব কথা প্রকাশিত হয়ে গেল। সব কথা মানে, প্রশান্তের বাড়িতে দীনবন্ধুর আবির্ভাব থেকে চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের বাড়ির চুরি পর্যন্ত সমস্ত ইতিহাস সবিস্তারে।

দেশের লোক বিস্ময়স্তম্ভিত! চোরের এমন দুঃসাহস এবং চুরির এমন আশ্চর্য কৌশল নিয়ে পথে-ঘাটে পাড়ায়-পাড়ায় জোর আলোচনা চলতে লাগল। যেখানে তিন-চার-পাঁচ জন লোক জমে, সেইখানেই দীনবন্ধুর নাম ও কীর্তিকাহিনি!

একখানা কাগজ লিখলে : 'আমার চৌর্যবৃত্তির সমর্থন করছি না। নিজের জন্যে হোক আর পরের জন্যেই হোক, চুরি সব সময়েই নিন্দনীয়।

কিন্তু দীনবন্ধু যে মস্ত প্রতিভার অধিকারী, সে সত্য আর অস্বীকার করা চলে না। প্রতিভার প্রধান লক্ষণ, নব নব উন্মেষশালিনী বুদ্ধি। দীনবন্ধুর তা আছে। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সে পুলিশকে ঠকাবার জন্যে যেসব নূতন নূতন উপায় আবিষ্কার করছে, তা যেমন সহজ ও স্বাভাবিক, তেমনি অভাবিত।

চোর-ডাকাত ধরবার জন্যে পুলিশ শিক্ষিত হয়েছে পুরাতন পদ্ধতিতে। কিন্তু দীনবন্ধুকে ধরতে গেলে সে পদ্ধতি হবে অচল। কারণ অন্যান্য চোরের মতন সে চুরির সময়ে সেকেলে কৌশল অবলম্বন করে না। বাঙালি গোয়েন্দারা যতদিন না এই সত্য উপলব্ধি করতে পারছে, ততদিন দীনবন্ধু ধরা পড়বে না।

হিন্দুদের চৌষট্টি কলা— চুরিকেও আর্টের একটি অঙ্গ বলে স্বীকার করেছে। সুতরাং দীনবন্ধুকেও আমরা একজন উঁচুদরের কলাবিদ বলে গ্রহণ করতে পারি।'

প্রশান্তের আর কোথাও মুখ দেখাবার জো নেই। সে যেখানেই যায়, সকলে তার কাছ থেকে শুনতে চায় দীনবন্ধুর কথা। শুধু শুনতেই চায় না, দীনবন্ধুকে তারিফ এবং তাকে ঠাট্টাও করতে চায়! শেষটা এমন হয়ে উঠল যে, দীনবন্ধুর নাম করলেই প্রশান্তের মনে হয়, কে যেন বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছে তার সর্বাঙ্গে!

পুলিশের বড়োসাহেব অর্থাৎ ডেপুটি কমিশনার তাকে ডেকে পাঠালেন। প্রশান্তের বুক ধড়াস ধড়াস করতে লাগল।

বড়োসাহেব গম্ভীর স্বরে বললেন, 'তোমার জন্যে পুলিশের কী-রকম অখ্যাতি হচ্ছে বুঝতে পারছ?

—স্যার, আমি যথাসাধ্য চেষ্টার ত্রুটি করিনি। তবু যদি সফল না হই, সেটা আমার দুর্ভাগ্য।

—ভুল চেষ্টা সফল হয় না।

—আমি কি ভুল করেছি স্যার?

—নিশ্চয়ই! চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের বাড়িতে দীনুডাকাত যে চুরি করতে যাবে, তুমি আগেই সেই খবর পেয়েও আমাকে জানাওনি। এই হচ্ছে তোমার প্রথম ভুল।

প্রশান্ত নিরুত্তর হয়ে মাথা হেঁট করে রইল।

—তোমার দ্বিতীয় ভুল, চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের বাড়ির চারিদিকে তুমি পাহারা বসাওনি কেন? বাড়ি ঘেরাও করলে দীনুডাকাত তো পালাতে পারত না!

—স্যার, আমরা সকলেই জানি, দীনু একলাই চুরি করে। কাজেই আমরা খুব বেশি লোক নিয়ে যাইনি। বুদ্ধুর দলকে আমরা ভেবেছিলুম দীনুর দল— বুঝে দেখুন, তাই ভাবাই আমাদের পক্ষে স্বাভাবিক কিনা! অতবড়ো একটা দলের জন্যে আমরা প্রস্তুত ছিলুম না, আর দু-চারজন লোক নিয়েও আমরা তাদের ঠেকাতে পারতুম না। কাজেই আমাদের বাধ্য হয়ে একেবারে সব লোক নিয়ে তাদের আক্রমণ করতে হয়েছিল।

বড়োসাহেব তার যুক্তি শুনে খুশি হলেন বলে মনে হল না। একটু চুপ করে থেকে বললেন, 'ভাবছি দীনুর মামলার ভার অন্য লোকের হাতে দেওয়া উচিত কিনা!'

প্রশান্তের মাথায় হল যেন বজ্রাঘাত! খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে সে বসে রইল। তারপর ছলছল চোখে প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায় বললে, 'স্যার, সে অপমান আমি সহ্য করতে পারব না— আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে!'

তার অবস্থা দেখে বড়োসাহেবের মনে দয়ার সঞ্চার হল। তিনি বললেন, 'আচ্ছা, আপাতত মামলার ভার তোমার হাতেই রইল। ... তুমি আজকের কাগজ দেখেছ?'

—আজ্ঞে না।

—রোজ সকালে খবরের কাগজ পোড়ো। দীনু লোকটা দেখছি নানা ব্যাপারেই কাগজের সাহায্য নেয়। কাগজ পড়লে তার গতিবিধির অনেক খবর পাওয়া যায়।

এ সত্য প্রশান্তও জানে। কিন্তু সংবাদপত্রে রোজ বেরোয় তাকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা বা ব্যঙ্গচিত্র। সেসব পড়লে বা দেখলে মাথা এমন বিগড়ে যায় যে, সারাদিন আর কাজকর্মে মন বসে না। তাই সে খবরের কাগজগুলোকে বয়কট করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু নিজের এই হাস্যকর দুর্বলতার কথা তো বড়োসাহেবের কাছে প্রকাশ করা যায় না, অতএব উপদেশ হজম করতে হল নীরবে।

বড়োসাহেব একখানা খবরের কাগজ বার করে তার এক জায়গায় অঙ্গুলি নির্দেশ করে বললেন, 'এই বিজ্ঞাপনটা পড়ে দেখ।'

বিজ্ঞাপনটা হচ্ছে এই :

'দীনবন্ধুর বুদ্ধি ও শক্তি দেখে প্রশান্ত মজুমদার চমৎকৃত হয়েছেন।

দীনবন্ধু তাঁর শত্রু হলেও উদার প্রশান্ত মজুমদার তাকে অভিনন্দন দিতে চান।

দীনবন্ধু ও তার বন্ধুবান্ধবকে প্রশান্ত মজুমদার নিজের বাড়িতে জলযোগের নিমন্ত্রণ করেছেন।

ফলাফল শীঘ্রই সর্বসাধারণকে জানানো হবে।'

বিষম রাগে মুখ রাঙা করে প্রশান্ত নিষ্ফল আক্রোশে ফুলতে লাগল।

বড়োসাহেব হাসতে হাসতে বললেন, 'রাগ করা মিছে, প্রশান্ত! খবরটা ঠাট্টা বলেই ধরে নাও।'

প্রশান্ত মাথা নেড়ে বললে, 'না স্যার, ঠাট্টা নয়!'

—তবে?

—আমার বিশ্বাস, দীনুর নিশ্চয়ই কোনো কুমতলব আছে।

—এ বিশ্বাসের কারণ?

—দীনু অকারণে কিছু করে না। আমার বিরুদ্ধে নতুন কোনো ষড়যন্ত্রের আয়োজন করছে।

—তাতে তার লাভ?

—জনসমাজে আমাকে হাস্যাস্পদ করা।

হঠাৎ ফোনের ঘণ্টা বেজে উঠল। রিসিভারটা তুলে নিয়ে কথা শুনতে শুনতে বড়োসাহেবের মুখ হয়ে উঠল অতিশয় গম্ভীর।

রিসিভারটা রেখে দিয়ে তিনি বললেন, 'প্রশান্ত, পাঁচ মিনিটের মধ্যে কলকাতা ছাড়বার জন্যে প্রস্তুত হও।'

—কোথায় যাব স্যার?

—মোহনপুরে। সেখানে যাবার শেষ ট্রেন কলকাতা ছাড়বে আর বিশ মিনিট পরে।... আমাদের এক চর এইমাত্র খবর দিলে, দীনুডাকাত আজ বৈকালে মোহনপুরের দুর্ভিক্ষপীড়িত বাসিন্দাদের মধ্যে অন্ন, বস্ত্র আর অর্থ বিতরণ করবে!

—আমায় একলা যেতে হবে?

—নিশ্চয়ই নয়! যে-কয়জন লোক দরকার মনে কর, নিয়ে যাও। কিন্তু ভুলো না, এক মিনিটও নষ্ট করবার সময় নেই।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

মাংস কেমন লাগল?

বৈকালে নবতারা বসে বসে কুটনো কুটছে, চাকর এসে বললে,—'একটা পাহারাওলা এই চিঠিখানা আমাকে দিয়ে গেল।'

নবতারা দেখলে তারই চিঠি। প্রশান্তের লেখা চিঠিখানা পড়তে লাগল:

'নবতারা,

কাজের ভিড়ে গতকল্য তোমাকে একটা দরকারি কথা জানাতে পারিনি।

আজকে আমার জনাদশেক বন্ধুকে আহারের নিমন্ত্রণ করেছিলুম। আমাকে এখনই হঠাৎ মোহনপুরে চলে যেতে হচ্ছে, বন্ধুদের সে খবরটা জানিয়ে যাবার সময় পেলুম না। সন্ধ্যার সময়ে তাঁরা নিশ্চয়ই আমাদের বাড়িতে আসবেন। তুমি তাঁদের জন্যে খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত কোরো।

যাঁরা নিমন্ত্রিত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে উপেনবাবু আছেন, তাঁর নাম তুমি আমার মুখে শুনেছ বোধহয়। তিনি আমার দেশের লোক, বয়সেও প্রাচীন। তাঁর সামনে তোমার লজ্জা করবার দরকার নেই। আমার অনুপস্থিতির কারণ তাঁকে বোলো। আমার অবর্তমানে তিনিই যেন বন্ধুদের ভার নেন।

আমি রাত আটটার ট্রেনে কলকাতায় ফিরব। সুতরাং বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে।

আর এক কথা। দীনুডাকাত শাসিয়েছে, সে আমার বাড়িতে নিমন্ত্রণের খাওয়া খাবে। দীনু মহা ধূর্ত। এই ফাঁকে সেও যেন আমার বাড়িতে ঢুকে পড়ে তোমাকে ভোগা দিয়ে না যায়। বাড়িতে পাহারা দেবার জন্যে সন্ধ্যার সময় দুজন পাহারাওয়ালারও ব্যবস্থা করে গেলুম। ইতি—

প্রশান্ত।'

চিঠি পড়ে নবতারা ব্যস্ত স্বরে ডাকলে, 'ও বেহারী, শীগগির গোপালের মাকে ডাক!'

বেহারী ও গোপালের মা দাস ও দাসী।

বেহারী বললে, 'কী হয়েছে মা? চিঠিতে কী লেখা আছে?'

—লেখা আছে আমার মাথা আর মুণ্ডু। বাবুর আজ ভোজ দেবার শখ হয়েছে, অথচ নিজে হাজির থাকবেন না!

—ভোজ? কীসের ভোজ?

—ভূত ভোজন রে, ভূত ভোজন! বাড়িতে আজ দশ ভূতের পাত পাততে হবে! ডাক, ডাক, গোপালের মাকে ডাক, বেশি করে বাটনা বাটুক, দুটো উনুনে আগুন দিক! তুই বাজারে ছোট! বেলা সাড়ে-চারটে বেজেছে, সন্ধ্যে আর কার নাম!

নবতারা দুড়দাড় করে কখনও উপরে ওঠে, কখনও নীচে নামে, কখনও ঝি-চাকরকে বকে, কখনও ছেলে-মেয়ের পিঠে চড়-থাপড় বসিয়ে দেয়, কখনও রান্নাঘরে ঢুকে তরকারির জল মরে গেল কিনা দেখে আসে এবং কখনও প্রশান্তের উদ্দেশে এমন সব মতপ্রকাশ করে, যা স্বামীদেবতার পক্ষে বিশেষ গৌরবজনক নয়। সে একাই একশো হয়ে বাধিয়ে তুললে যেন একটা রসাতলকাণ্ড!

সন্ধ্যার মুখে সর্বাগ্রে এলেন উপেনবাবু। নবতারা আত্মপ্রকাশের আগে দরজার ফাঁকে উঁকি মেরে দেখে নিলে, লোকটিকে দেখে লজ্জা করা উচিত কিনা!

বুড়ো-সুড়ো মানুষ, বয়স বোধহয় ষাট পার হয়েছে। একমাথা পাকা চুল, গোঁপদাড়িও সাদা, চোখ-মুখ শিশুর মতন সরল হাসিখুশিতে ভরা।

তখন সামনে বেরিয়ে নমস্কার করে নবতারা বললে, 'বাবা, বড়ো মুশকিলে পড়েছি!'

—কেন বউমা?

—লোক নেমন্তন্ন করে উনি চলে গিয়েছেন বিদেশে। এই খানিক আগে খবর পেয়েছি। এখন আমি একলা কেমন করে সব দিক সামলাই বলুন দেখি?

—প্রশান্ত ওই-রকমই আলাভোলা মানুষ। সে কি আজ আর আসবে না?

—আসবেন, রাত আটটার পরে। এতক্ষণ ওঁর বন্ধুদের দেখাশোনা করতে হবে আপনাকেই।

—দেখব বই কি বউমা, সব দেখব! প্রশান্ত তো আমার পর নয়! তা রান্নার ব্যবস্থা হয়েছে তো?

—ব্যবস্থা তো হয়েছে, কিন্তু রাঁধতে হবে আমাকেই।

—তোমাকে! কেন, বামুন আসেনি নাকি?

—উনি বামুন রাখতে চান না। বলেন, যার-তার হাতে খেতে ঘেন্না করে।

—তাই নাকি? তাহলে এত লোককে নেমন্তন্ন করা প্রশান্তের উচিত হয়নি।

উপেনবাবু সহানুভূতি প্রকাশ করতেই নবতারার বাঁধ ভেঙে গেল। গলার আওয়াজ যথাসম্ভব করুণ করে সে বললে, 'বলুন তো বাবা, কত বড়ো অন্যায়! নিত্যি-নিত্যি হাতা-খুন্তি নাড়তে-নাড়তেই জীবনটা বয়ে গেল। তার ওপর মাঝে মাঝে এইসব অত্যাচার! কত আর সয়?'

—তা কিছু ভেবো না বউমা, আমি যখন এসে পড়েছি সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে। এখন বল দেখি মা, রান্নার কী আয়োজন হয়েছে?

—বেশি কিছু করবার নেই। লুচি, বেগুনভাজা, আলুর দম, মাছের কালিয়া, মাংস আর একটা চাটনি হলেই চলবে তো?

—খুব চলবে মা, খুব চলবে।

—বাজার থেকে দই, রাবড়ি আর কিছু খাবারও আনিয়ে নেব।

—ব্যস, এ তো রাজভোগ! এখন শোনো বউমা! ময়দা ঠাসা, লুচি ব্যালা আর মাংস রান্নার ভার নিচ্ছি আমি। দুহাতে কাজ এগুবে তাড়াতাড়ি।

—সে কী বাবা, আপনাকে আমি কষ্ট দিতে পারব না!

একগাল মিষ্টি হেসে উপেনবাবু বললেন, 'পাগলি মেয়ে! এ আবার কষ্ট কী? রাঁধতে আমি ভালোবাসি, তুমি যদি আমাকে পর ভাবো তাহলে আমি দুঃখিত হব। প্রশান্ত যে আমার ছোটোভাইয়ের সমান।'

উপেনবাবু তখনই উপরের জামাটা খুলে ফেলে রান্নাঘরে ঢুকে কাজে মেতে গেলেন বিপুল উৎসাহে। কাজ করতে করতে তাঁর মুখ চলতে লাগল অশ্রান্ত ভাবে। প্রশান্তের ছেলেবেলার গল্প, নিজের অবিবাহিত জীবনের গল্প এবং আরও নানাজাতীয় গল্পের দ্বারা তিনি আসর এমন জমিয়ে তুললেন যে, নবতারার মনে হল তিনি যেন তার কতদিনের আপনার লোক।

আটটার আগেই বন্ধুরা সব একে একে এসে হাজির হলেন। নবতারা বাড়ির ভিতর থেকেই শুনতে পেলে, বৈঠকখানায় গিয়ে উপেনবাবু সকলকে বলছেন; 'প্রশান্ত একটু পরেই ফিরে আসবে। ততক্ষণ তোমরা নিজেরাই গল্পগুজব কর, তাস-দাবা-পাশা খ্যালো, পান-তামাক খাও।'

দুজন পাহারাওয়ালাও বৈঠকখানার দরজার কাছে বসে ছিল।

বাড়ির ভিতরে এসে উপেনবাবু বললেন, 'বাড়িতে আবার লালপাগড়ি কেন বউমা?'

—দীনুডাকাতের ভয়ে। সে নাকি জোর করে আমাদের বাড়িতে খেতে চায়!

—জোর করে খেতে চায় মানে? এটা কি তার বাবার বাড়ি?

—তার বাবার বাড়িতে সে কী করে জানি না বাবা, কিন্তু পরের বাড়িতে হানা দেওয়াই যে তার পেশা!

—গোটা বাংলাদেশটা উচ্ছন্নে যেতে বসেছে! যেখানে যাই সেখানেই শুনি দীনুর সুখ্যাতি! একটা চোরকে নিয়ে এত বাড়াবাড়ি ভালো লাগে না!

—তা বাবা, দীনু বোধহয় আসলে মন্দ লোক নয়। দাতাকর্ণের মতন তার প্রাণ। তার দয়ায় এই অভাবের দিনে হাজার হাজার দুঃখীর অন্নবস্ত্রের দুঃখ দূর হচ্ছে।

—যার ধন তার ধন নয়, ন্যাপা মারে দই! কার টাকা, আর দান করে নাম কিনছে কে! পরের টাকায় অনেকেই পোদ্দারি করতে পারে!

—তা যাইই বলুন বাবা, দীনু ধরা পড়লে আমি খুশি হব না।

কথাটা বোধকরি উপেনবাবুর মনের মতন হল না। তিনি উত্তর না দিয়ে বেলুন ও চাকি নিয়ে লুচি বেলতে বসলেন।

ঘড়িতে রাত সাড়ে নয়টা বাজল। রান্নাবান্নার কাজ চুকল।

উপেনবাবু বললেন, 'কই বউমা, প্রশান্ত তো এখনও এল না!'

—দেখছেন তো বাবা, পুলিশের বউ হওয়ার এই সুখ! ওঁর কি আক্কেল বলে পদার্থ আছে? হাড় কালি হয়ে গেল!

—খাবার-দাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, এই বেলা সকলকে খাইয়ে দি—কী বলো?

—সেই কথাই ভালো। ওঁর জন্যে বসে থাকলে রাত কাবার হয়ে যেতে পারে।

খাওয়া-দাওয়া শেষ হল সাড়ে দশটায়। বন্ধুরা প্রশান্তের জন্যে আরও ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করে একে একে বিদায় নিলে।...

প্রশান্ত ফিরে এল রাত সাড়ে বারোটায়। তার জামাকাপড় ধূলিধূসরিত, মুখে-চোখে শ্রান্তির ভাব।

নবতারা তার জন্যে তখনও জেগে বসে ছিল। তাকে দেখেই বলে উঠল, 'আমার মতন দাসী পেয়েছিলে বলে এজন্মে বেঁচে গেলে। প্রভু, তোমার পায়ে গড় করি!'

সারাদিন গাধার খাটুনির পর ঘরে ফিরে এই অভাবিত অভ্যর্থনায় ভড়কে গেল প্রশান্ত। কিছুই বুঝতে না পেরে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

—হ্যাঁ গা, তোমার কবে বুদ্ধি হবে? নিজের সংসারের জ্বালায় নিজেই জ্বলেপুড়ে মরি, তার ওপরে আবার উটকো আপদ!

—নবতারা, ভূমিকা রাখো। আসল কথা বলো। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

—সব জেনেশুনে আবার ন্যাকা সাজা হচ্ছে? তুমি জানো না কিছু? ভাগ্যিস উপেনবাবু ছিলেন—

বাধা দিয়ে প্রশান্ত বললে, 'উপেনবাবু? কে উপেনবাবু!'

—উপেনবাবু গো, উপেনবাবু! তোমার দেশের লোক উপেনবাবু!

—উপেন বলে কোনো লোক আমাদের দেশে জন্মায়নি।

ব্যঙ্গভরে একখানা কাগজ বার করে নবতারা বললে, 'এইবারে বল, এ চিঠিখানাও তুমি লেখোনি!'

পত্রখানা পড়তে পড়তে প্রশান্তের চোখ ক্রমেই বেশি বিস্ফারিত হয়ে উঠতে লাগল। পড়া সাঙ্গ করে মাথায় হাত দিয়ে সে ধুপ করে একখানা চেয়ারের উপরে বসে পড়ে ক্ষীণস্বরে বললে, 'এক গেলাস জল গিন্নি, এক গেলাস জল!'

প্রশান্তের অবস্থা দেখে নবতারা ভাবলে, তার স্বামী বোধহয় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে তাড়াতাড়ি জল এনে দিলে।

জল-পান করে প্রশান্ত বললে, 'তাহলে তারা এসেছিল?'

—শুধু এসেছে? পেট ভরে খেয়ে গিয়েছে। বাবা, তোমার এক-একটি বন্ধুর পেট এক-একটি ধামার মতো। তা কানায়-কানায় ভর্তি করা চারটিখানিক কথা নয়।

বেদনাবিকৃত মুখে ক্লিষ্ট কণ্ঠে প্রশান্ত বললে, 'থামো নবতারা, থামো। তোমার মুখে যত শুনছি, আমার বুক তত ধড়ফড় করছে। আপাতত আর কিছু শোনবার ইচ্ছে নেই।'

—তোমার কী হল বল তো?

—যা হয়েছে, তার নাম নেই। শোনো। এ চিঠি আমি লিখিনি। এখানা জাল।

—জাল? তাহলে যারা এসেছিল—

—তারা হচ্ছে দীনুডাকাত আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ।

নবতারা চিৎকার করে উঠে প্রশান্তের পায়ের কাছে বসে পড়ল।

হঠাৎ প্রশান্তের চোখ গেল টেবিলের দিকে। আবার সেখানে পড়ে আছে একখানা নীল রঙের বড়ো খাম!

কম্পিত হস্তে চিঠি বার করে প্রশান্ত পড়লে:

'শ্রীমান প্রশান্ত মজুমদার

সমীপেষু

ভায়া,

নবতারাঠাকুরাণীর করকমল থেকে যে পত্র তুমি পেয়েছ, ওখানি আমার বিশ্রী হস্তে জন্মগ্রহণ করেনি। ওখানির ভাষা আমার, কিন্তু হস্তাক্ষরের জন্যে বাহাদুরির দাবি করতে পারে আমার এক জালিয়াত বন্ধু।

মোহনপুরে অন্ন-বস্ত্র-অর্থ বিতরিত হয়েছে আমার নামে, চুনিচাঁদ-মানিকচাঁদের অনিচ্ছাকৃত দানের ফলে। কিন্তু ওখানে যে আমি উপস্থিত থাকব, পুলিশের কাছে এই মিথ্যা খবর পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলুম আমিই। জানতুম, রাহু কখনও চাঁদকে গ্রাস করবার লোভ ছাড়তে পারবে না।

মোহনপুর থেকে কলকাতায় ফেরবার ট্রেন আছে একখানি মাত্র। তুমি যে রাত বারোটার আগে কলকাতায় ফিরতে পারবে না, এ-বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলুম।

আজ দুজন জাল পাহারাওয়ালা তোমার বাড়িতে এসেছিল নবতারার বিশ্বাসকে দৃঢ়তর করবার জন্যে। তাদের সন্ধান পেলে গ্রেপ্তার কোরো, আমার আপত্তি নেই।

তোমাকে ধন্যবাদ—মোহনপুর যাত্রার জন্যে। নইলে তোমার বাড়িতে না-নিমন্ত্রণে স্বয়মাহূত অতিথি হবার সৌভাগ্য লাভ করতে পারতুম না।

নবতারাঠাকুরাণী হচ্ছেন স্ত্রীরত্ন। দীনুডাকাত সম্বন্ধে শ্রীমতীর কী উচ্চ ধারণা! তাঁর শ্রীহস্তের আলুর দম এবং কালিয়া কী সুমধুর! তাঁর শ্রীমুখের সদালাপ কী চিত্তাকর্ষক!

আমার রন্ধিত মাংসের কোর্মার অবশিষ্ট ভাগ তোমার জন্যে রেখে গেলুম, কৃপাপরবশ হয়ে।

যদি ভালো লাগে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে আমাকে জানিয়ো, আর একদিন স্বহস্তে রেঁধে তোমাকে খাইয়ে আসব। অলমতিবিস্তরেণ।

'উপেনবাবু' বা 'দীনবন্ধু'

অষ্টম পরিচ্ছেদ

অদৃশ্য মানুষ

—বুরুশ! বুরুশ!

বৈঠকখানা থেকে অরুণ চেঁচিয়ে বললে, 'শ্রীধর, মুচিটাকে ডাকো তো!'

শ্রীধর মুচি ডেকে আনলে।

অরুণ বললে, 'ওরে, এই জুতোজোড়ার তলায় হাফসুল বসিয়ে দিতে কত নিবি?'

জুতো পরীক্ষা করে দেখে মুচি বললে, 'এক টাকা।'

—এক টাকা! বলিস কীরে?

—চামড়ার দাম ভারি চড়েছে হুজুর!

—যা, যা, বারোআনায় হয় তো করে দিয়ে যা।

মুচি নারাজ হয়ে বাড়ি থেকে একবার বেরিয়ে গিয়ে আবার ফিরে এল। বললে, 'এখনও বউনি হয়নি, জুতো দিন।'

বৈঠকখানার দরজার সামনে সে জুতো নিয়ে কাজে নিযুক্ত হল।

এমন সময়ে প্রশান্তের প্রবেশ।

অরুণ বললে, 'কী ব্যাপার! আবার দীনুডাকাত আমার বাড়িতে এসে লুকোয়নি তো?'

প্রশান্ত একখানা চেয়ারের উপরে দেহভার অর্পণ করে বললে, 'আজ এসেছি আপনার খোঁজে।'

—আমি কোনো অপরাধ করিনি তো?

—আপনি কোনো অপরাধ করেছেন কিনা জানি না, তবে আপনার অপরাধের সরাসরি প্রমাণ আমার হাতে নেই বটে।

—কথাটা একটু বেসুরো হল না কি?

—মশাই, আমরা হচ্ছি পুলিশ, সুর-বেসুরের হেরফের বুঝি না।

—বেশ, তবে বেসুরেই কথা বলুন।

তীক্ষ্ননেত্রে অরুণের মুখের পানে তাকিয়ে প্রশান্ত বললে, 'বরুণ বলে কারুকে আপনি চেনেন?'

অরুণ ভুরু কুঁচকে সচকিত স্বরে বললে, 'বরুণ?'

—হ্যাঁ। বরুণকে আপনি চেনেন না?

—চিনি।

—তার সঙ্গে কবে থেকে আপনার আলাপ?

—ছেলেবেলা থেকে।

—এক গ্রামে আপনাদের জন্ম?

—হ্যাঁ।

—এম-এ পর্যন্ত আপনারা একসঙ্গে পড়েছেন?

—হ্যাঁ।

—বরুণ আপনার পরম বন্ধু?

—হ্যাঁ।

—তারপর?

—বরুণ বহুদিন নিরুদ্দেশ হয়েছে।

—কথা ঠিক হল না।

—কেন?

—আপনি জানেন, বরুণ এখন নিরুদ্দেশ নয়।

—তবে?

—সে আবার ফিরে এসেছে!

—তার কথা আর কী জানেন?

—বরুণের নতুন নাম দীনবন্ধু।

—এত খবর যখন রাখেন, আমাকে প্রশ্ন করে মুখ ব্যথা করছেন কেন?

—দেখছি আপনি সত্য অস্বীকার করেন কিনা?

—কী ভয়ে অস্বীকার করব?

—পুলিশের ভয়ে।

—পুলিশকে ভয় করবে অপরাধীরা। আমি অপরাধী নই।

—কিন্তু দীনুডাকাত আপনার বন্ধু।

—দীনু চুরি করলে পুলিশ কী আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে?

—পারে। সহচর বলে।

—না, পারে না। আমি বরুণের বন্ধু, দীনুডাকাতের সহচর নই।

—দীনু এ-বাড়িতে লুকিয়ে থেকে পুলিশকে ফাঁকি দেয়।

—হ্যাঁ, আমার অজান্তে।

—তার প্রমাণ কী?

—আমার অজান্তে আমার বাড়িতে হয়তো অনেক বিছে, সাপ লুকিয়ে আছে। তারা কেউ আপনাকে কামড়ালে কি আমি দায়ী হব?'

—অরুণবাবু উপমা দেবেন না, উপমায় কোনো কিছু প্রমাণিত হয় না।

—প্রশান্তবাবু, অনুমানও প্রমাণ নয়, অনুমান আদালতে টেকে না।

—তাহলে বোঝা যাচ্ছে, আপনি আমার কাছে কিছুই স্বীকার করবেন না?

—স্বীকার! আমি কি আসামি, যে অপরাধ স্বীকার করব?

—না, এখনও আপনি আসামি নন। কিন্তু হতে কতক্ষণ?

—প্রশান্তবাবু, বারবার আমাকে ভয় দেখাবেন না। ভয় দেখিয়ে আমার কাছ থেকে কিছুই আদায় করতে পারবেন না।

যেন কেল্লা ফতে করেছেন, মুখে এমনই ভাব ফুটিয়ে প্রশান্ত উৎসাহিত কণ্ঠে বললে, 'এতক্ষণে আপনি স্বীকার করলেন যে, আপনার কাছে আদায় করবার মতন কিছু আছে?'

—আপনার কথা শুনলে হাসি পায়। আপনার অবস্থা জলমগ্ন লোকের মতন। খড় ধরে বাঁচবার চেষ্টা করছেন।

—অর্থাৎ?

—দীনবন্ধুর কাছে পদে পদে নাকাল হয়ে নিজের মান বাঁচাবার জন্যে আপনি পাগল হয়ে গিয়েছেন। লোকে যেমন আসল শত্রুকে না পেলে তার খড়ের মূর্তি গড়ে পুড়িয়ে মনের ঝাল ঝাড়ে, আপনিও তেমনি দীনবন্ধুকে না পেয়ে তার বদলে একটা নকল বলির পশু খুঁজছেন— নইলে পূজার লগ্ন উত্তীর্ণ হয়ে যায়! চমৎকার!

প্রশান্তের মুখ লাল হয়ে উঠল— অরুণ তার যথার্থ দুর্বল স্থানে আঘাত করেছে। গম্ভীর স্বরে সে বললে, 'আমি দীনবন্ধুর ঠিকানা চাই।'

—কার কাছে?

—আপনার কাছে।

অরুণ হো হো করে হেসে উঠে বললে, 'প্রশান্তবাবু, আমি দীনবন্ধুর ঠিকানা আপনাকে দিতে পারি।'

—পারেন? দিন তবে।

—কিন্তু এক শর্তে।

—কী?

—আগে আপনাকেও দিতে হবে একটি ঠিকানা।

—কার?

—কালবোশেখির।

—মানে?

—কালবোশেখি হচ্ছে দীনবন্ধুর মতো। সকলকে ত্রস্ত করে আচম্বিতে তার আবির্ভাব, চারিদিক তোলপাড় করে আচম্বিতে তার অন্তর্ধান! সে কোথা থেকে আসে? সে কোথায় চলে যায়? প্রশান্তবাবু, আমাকে কালবোশেখির ঠিকানা দিন!'

প্রশান্ত আরও বেশি গম্ভীর স্বরে বললে, 'আপনি সাহিত্যিক। কবিত্ব প্রকাশ করছেন। কিন্তু পুলিশ কবিত্ব বোঝে না, বোঝে খালি কর্তব্য। বেনা বনে কেন মুক্তো ছড়াচ্ছেন?'

—লোকে মুদির দোকানে যায় চাল-ডাল আর ময়রার দোকানে যায় মন্ডা কিনতে। আপনি এসেছেন সাহিত্যিকের কাছে। কবিত্ব ছাড়া আর কিছু মেলে না। রুচি না হয়, পথ দেখুন।

মাটির উপরে ঠক ঠক শব্দে লাঠি ঠুকে প্রশান্ত বললে, 'আমি দীনুডাকাতের ঠিকানা চাই!'

পাশের টেবিলে পটাশ করে চড় মেরে অরুণ উত্তপ্ত কণ্ঠে বললে, 'জানি না, জানি না, জানি না! কতবার এক কথা বলব? আপনার অসভ্যতা সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে আর আমি সহ্য করব না!

—তাহলে আপনাকে আমি গ্রেপ্তার করব।

—তাহলে আপনাকে আমি বাধা দেব।

—বাধা দেবেন?

—নিশ্চয়ই! আমার নামে ওয়ারেন্ট কোথায়?

—ওয়ারেন্ট আনতে কতক্ষণ!

—আগে আনুন, তারপর কথা। বলেই অরুণ একখানা খবরের কাগজ নিয়ে মুখের সামনে তুলে ধরলে।

প্রশান্ত বুঝলে মৌখিক তর্জন-গর্জনে ভয় পাবার ছেলে নয় অরুণ। কিন্তু সে হচ্ছে পুলিশ, তার তূণে ভিন্নরকম বাণেরও অভাব নেই। একটুখানি চুপ করে থেকে সে আর-একদিক দিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করলে।

কণ্ঠস্বরে মধু মাখিয়ে ততোধিক মিষ্টি হাসি হাসতে হাসতে প্রশান্ত ধীরে ধীরে ডাকলে, 'অরুণবাবু!'

কিন্তু অরুণ বিগলিত হল না। নীরবে কাগজের হরপগুলোর উপর চোখ বুলিয়ে যেতে লাগল।

প্রশান্ত কিংকবর্তব্যবিমূঢ়ের মতন এদিকে-ওদিকে তাকাতে লাগল।

হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশের টেবিলের উপরে। সেখানে পড়ে আছে ভীষণরূপে পরিচিত নীল রঙের একখানা কার্ড!

প্রশান্ত টেবিলের উপর থেকে কার্ডখানা তুলে নিলে ঠিক যেন ছোঁ মেরে! কিন্তু কার্ডের উপরে দৃষ্টিপাত করেই তার চক্ষুস্থির!

তাতে লাল কালির লেখা—

'প্রশান্ত, নির্দোষ অরুণকে যেদি গ্রেপ্তার করবে সেইদিনই তোমার মৃত্যুদিন। তুমি জানো, আমি দীনবন্ধু— আমার যে কথা, সেই কাজ। কেল্লার ভিতরে লুকোলেও তুমি মরবে।'

প্রশান্ত মড়ার মতন সাদা মুখে তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। ধাঁ করে রিভলবার বার করে ঘরের চারিদিকে তাকাতে লাগল উদভ্রান্তের মতো। কিন্তু ঘরের মধ্যে তৃতীয় ব্যক্তি নেই।

অকস্মাৎ প্রশান্তের এই যুদ্ধবেশ দেখে অরুণ বিস্মিত হয়ে বললে, 'ব্যাপার কী?'

প্রশান্ত কার্ডখানা অরুণের চোখের সামনে ধরলে। লেখা পড়ে অরুণ হতভম্বের মতন বললে, 'আশ্চর্য! কার্ডের কালি এখনও কাঁচা, কথাগুলো এইমাত্র লেখা হয়েছে!'

কর্কশ স্বরে প্রশান্ত বললে, 'হুঁ। এইতেই প্রমাণিত হচ্ছে দীনুডাকাত এই বাড়িতেই আছে!'

ঘরের উত্তর কোণ থেকে আওয়াজ এল—'কেবল এই বাড়িতেই নয়, ছায়ার মতন তোমারই সঙ্গে সঙ্গে!'

প্রশান্ত দুই হাত উঁচু একটা লাফ মারলে। উত্তর কোণে জনপ্রাণী নেই!

অরুণ একেবারে থ!

এবার শোনা গেল হা-হা-হা-হা করে একটা সুদীর্ঘ অট্টহাস্য! হাসির আওয়াজটা ঘরের ভিতরে প্রশান্তের চারিদিকে বেড়ে-বেড়ে ঘুরে আবার থেমে গেল।

প্রশান্তের সর্বাঙ্গে দিলে কাঁটা! দীনুডাকাত কি অদৃশ্য মানুষ? সে কি ভূতুড়ে মন্ত্র জানে? সে কি হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে মিশিয়ে থাকে?

প্রশান্ত আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে ভরসা করল না। পদে পদে চমকাতে চমকাতে দৌড় মেরে একেবারে রাস্তায় গিয়ে পড়ল!

কিন্তু রাস্তাতেও কে তার কানের কাছে অদৃশ্য মুখ এনে বললে, 'খুন করব, খুন করব— আমি তোকে খুন করব!'

প্রশান্ত এবার দৌড়োতে লাগল ঘণ্টায় পনেরো মাইল বেগে!

অরুণ স্তম্ভিত ও আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল— ভাবলে, হয় সে কোনো আজগুবি দুঃস্বপ্নলোকে বাস করছে, নয় পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে!

হঠাৎ তার কানের কাছে মুখ এনে কে কোমল স্বরে বললে, 'ভাই অরুণ!'

অরুণ সচমকে ফিরে দেখলে, কেউ কোথাও নেই! অথচ সে হলপ করে বলতে পারে, এইমাত্র তার পাশে দাঁড়িয়ে কথা কয়েছে বরুণ নিজে!

এমন সময়ে শ্রীধর ঘরে ঢুকে বললে, 'ছোটদা, এখানে এমন বিচ্ছিরি হাসি হাসছিল কে?'

অদৃশ্য কণ্ঠ বললে, 'আমি শ্রীধর, আমি!'

—এ কী, বড়দা? তুমি কোথায় বড়দা?

—এই যে শ্রীধর, তোমার পাশেই!

বড়দাকে আবিষ্কার করবার জন্যে মহাবিস্মিত শ্রীধর চরকির মতন ঘরময় ঘুরতে লাগল— কিন্তু কেউ কোথাও নেই!

—শ্রীধর, তোমার হাঁ বন্ধ কর। আমায় কেউ দেখতে পাবে না, আমি প্রেতাত্মা!

পর মুহূর্তে দুই চক্ষু কপালে তুলে শ্রীধর ঘরের ভিতর থেকে অদৃশ্য হল।

রোমাঞ্চিত দেহে অরুণ কাঠের পুতুলের মতন বসে বসে ভাবতে লাগল, তবে কি এই কথাই ঠিক? বরুণ কি হঠাৎ মারা পড়েছে, এখানে এসেছে তার প্রেতাত্মা? প্রেততত্ত্ববিদদের কথা সত্য? মৃত্যুর পরেও দেহহীন আত্মার অস্তিত্ব থাকে?...

এমন সময় ঘরের বাহির থেকে মুচি ডাকলে, 'জুতো হয়ে গেছে বাবুজি!'

অরুণের তখন ওঠবারও ক্ষমতা ছিল না। সে ক্ষীণ স্বরে বললে, 'জুতো এইখানে নিয়ে এসো।'

মুচি এগিয়ে এসে তার হাতে জুতাজোড়া দিলে। তারপর সামনের চেয়ারের উপরে বেশ আরাম করে বসে পড়ল।

অরুণ ভাবলে, আজ কি পৃথিবীটা উল্টে গেছে? অনুপস্থিত লোক চিঠি নিয়ে আসে,অদৃশ্য মানুষ কথা কয়, মুচি মস্তবড়ো বাবুসায়েবের মতো ড্রইংরুমের গদিমোড়া চেয়ারের উপরে বসে পড়ে!

কিন্তু শেষোক্ত দৃশ্যটা হজম করা শক্ত। অরুণ রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললে, 'তবে রে পাজি ছুঁচো! আমার সামনে বেয়াদপি? ওঠ— এখনই ঘর থেকে বেরো, নইলে জুতো মেরে মুখ ছিঁড়ে দেব!'

মুচি দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললে, 'বাবুজি, জুতো মেরে জুতো ছিঁড়লে আর আমি মেরামত করতে পারব না!'

এ বরুণের কণ্ঠস্বর! কিন্তু কথাগুলো বেরুল মুচির মুখ দিয়েই!

বিস্ফারিত চক্ষে অরুণ মুচির চোখের পানে তাকিয়ে রইল— নিজের চোখ-কানকেও আর বিশ্বাস করতে পারলে না!

মুচি বললে, 'অরুণ, তুমি কি এখনও আমাকে চিনতে পারছ না? আমি বরুণ!'

—মুচির বেশে?

—এটা আমার ছদ্মবেশ।

—কিন্তু তোমার গায়ের রং কালো কেন?

—শিল্পীর তুলিকা চালনায়।

—আর ওই ফুলো-ফুলো গাল?

—দুই গালের ভিতরদিকে দুখণ্ড রবার আছে। রগের পাশে এই যে মস্ত আব দেখছ, এও কৃত্রিম।

—তুমি জুতো সেলাই করতেও জানো দেখছি!

—জুতো সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ, সব জানি। আমি কি ঘাস কাটবার জন্যেই আটবৎসরব্যাপী অজ্ঞাতবাসে গিয়েছিলুম?

—এতক্ষণে সব বুঝলুম! কিন্তু তুমি তো আমাদের সমুখে বসেই একমনে জুতো সেলাই করছিলে। তবে তোমার হাতে লেখা নীলরঙের কার্ডখানা টেবিলের ওপরে এল কেমন করে?

—ম্যাজিকের মহিমায়।

—ধ্যেৎ!

—সত্যি বলছি। যখন তুমি খবরের কাগজের আড়ালে মুখ ঢাকলে আর প্রশান্ত উত্তেজিত হয়ে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল, কার্ডখানা আমি টেবিলের ওপরে ছুড়ে ফেলে দিলুম।

—আবার বাজে কথা! একখানা হালকা কার্ড দূর থেকে কখনও নির্দিষ্ট জায়গায় ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়?

—বলছি তো, ও হচ্ছে, ম্যাজিক অর্থাৎ হাতের কায়দা! রঙ্গমঞ্চে তুমি কি কখনও সায়েব জাদুকরদের ম্যাজিক দেখনি? হাতের পাতলা তাস তারা অনেক দূরে নির্দিষ্ট জায়গায় যথেচ্ছভাবে ছুড়ে ফেলে দেয়?

—হুঁ, অজ্ঞাতবাসে গিয়ে তুমি দেখছি 'সবজান্তা লরেন্স'* হয়ে ফিরে এসেছ! তোমাকে আর কিছু ব্যাখ্যা করতে হবে না—এইবারে তোমার কণ্ঠস্বরের রহস্যটাও আন্দাজ করতে পারছি।

মুখ টিপে হাসতে হাসতে বরুণ বললে, 'তাই নাকি?'

—হ্যাঁ। এ আর কিছু নয়—'ভেন্ট্রিলোকুইজমে'র মহিমা। বাংলায় যাকে বলে 'দূরাগতশব্দানুকরণ!'

—ঠিক। কিন্তু তোমার বুদ্ধি দেখছি বড়ো দেরিতে সচেতন হয়!

—কী করে বুঝব ভাই? বরুণের রূপান্তর যে মুচি, এটা সহজে কার মাথায় ঢোকে? মুচির স্বরূপ ধরতে পারলে আমি আর কিছুতেই বিস্মিত হতুম না! বাহাদুর বরুণ! কী নিখুঁত ছদ্মবেশই ধারণ করেছ!... কিন্তু এ ছদ্মবেশের কারণ কী?

—এমন সব জায়গায় যেতে হবে, যেখানে এই ধরনের ছদ্মবেশ না থাকলে সুবিধা হয় না। আমি এখন গোটা কলকাতার পল্লীতে পল্লীতে ঘুরে বেড়াতে চলেছি। আমার কাজ এখন শহরের নাড়িপরীক্ষা। আজ আর এর বেশি কিছু বলব না!

—কিন্তু তুমি আজ আমার বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে গেলে।

—কেন?

—প্রশান্ত একে আমাদের পূর্ব ইতিহাস জানতে পেরেছে, তার উপরে আমার বাড়িতে আজ যে অভিনয়টা হয়ে গেল, সে নিশ্চয়ই মনে করবে আমি হচ্ছি তোমার সহকারী। হয়তো কালকেই আমার নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বেরুবে।

—বৈধ কারণ দেখাতে না পারলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বার করা যায় না। আজ এখানে সে কি প্রমাণ পেয়েছে? দীনুডাকাত নেই, অথচ সে নিজে এসে চিঠি লিখে সামনে রাখে। অদৃশ্য দীনুডাকাত কথা কইতে কইতে পলাতক গোয়েন্দার পিছনে তাড়া করে! এসব কি আইনে গ্রাহ্য হবার প্রমাণ! বিশেষ, প্রশান্তের ধাত আমি জানি। এইসব আজগুবি গল্প বলে নিজের ভীরুতা আর বোকামি জাহির করে কখনোই সে হাস্যাস্পদ হতে রাজি হবে না। সব চেপে যাবে।... থাক এসব বাজে কথা। আমার দেরি হয়ে গেল। চললুম।

অরুণ দাঁড়িয়ে উঠে দুঃখিত ভাবে বললে, 'ভাই বরুণ, আর কতদিন তুমি এমন সমাজছাড়া ভবঘুরে জীবন যাপন করবে?'

বরুণ চলে যেতে যেতে মুখ ফিরিয়ে পূর্ণকণ্ঠে বলে গেল, 'যতদিন-না দরিদ্র-নারায়ণদের শূন্য ভাণ্ডারে মা লক্ষ্মী আবার তাঁর ঝাঁপি নিয়ে এসে দাঁড়ান।'

অরুণ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার কাগজ নিয়ে বসল।

মিনিট দশেক পরে হঠাৎ তার বাড়ির সামনে মোটর দাঁড়ানোর শব্দ হল। তারপরেই বাড়ির ভিতরে হন্তদন্তের মতো এসে ঢুকল প্রশান্ত এবং একদল পাহারাওয়ালা!

অরুণ ভাবলে প্রশান্ত এসেছে তাকে গ্রেপ্তার করতে।

প্রশান্ত কিন্তু এসেই চেঁচিয়ে উঠল, 'মুচি, মুচি! সেই মুচিব্যাটা কোথায় পালাল?'

ব্যাপারটা খানিক আন্দাজ করে অরুণ মনে মনে হেসে বললে, 'মুচি জুতো সেলাই করে চলে গিয়েছে!'

—হায় হায়, চলে গিয়েছে? কতক্ষণ চলে গিয়েছে?

—মিনিট পনেরো আগে।

প্রশান্ত প্রায় ধমক নিয়ে বলে উঠল, 'কেন তাকে চলে যেতে দিলেন?'

—কাজ শেষ হয়ে গেলে কে আবার মুচিকে ধরে রাখে?

—সে মুচি না ঘেঁচু! সেই বেটাই দীনুডাকাত!

অরুণ অট্টহাস্য করে বলে উঠল, 'প্রশান্তবাবু, আর লোক হাসাবেন না, বাড়ি যান। 'দীনু দীনু' করে আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, মুচি ধাঙড় হাড়ি ডোম সকলেরই মধ্যে দেখতে পান দীনুডাকাতকে। গল্পে শুনেছিলুম, কুমড়োর কথা ভাবতে ভাবতে কোনো লোক জগন্নাথ দেখতে গিয়েও রত্নবেদীর উপরে দেখেছিল কুমড়োকেই!'

—আরে রাখুন মশাই গল্প! আমার মাথায় জ্বলছে আগুন, আর উনি নিয়ে এলেন কিনা কুমড়ো আর জগন্নাথের রূপকথা! অমানুষিক গলার আওয়াজ শুনে হঠাৎ ভড়কে গিয়েছিলুম— এমন অবস্থায় কে না ভড়কে যায়? তারপর বাসায় ফিরে একটু চিন্তা করতেই বুঝলুম, সবটাই হচ্ছে ছেলেভুলানো ভুয়ো ব্যাপার! মানুষ নেই, কথা আছে! অদৃশ্য মানুষ! রামচন্দ্র! এ হচ্ছে ভেন্ট্রিলোকুইজম! মুচিটার দিকে তাচ্ছিল্য করে তাকাইনি—এ হচ্ছে তারই কাজ! আর যে মুচি ভেন্ট্রিলোকুইজম-এর সাহায্যে দীনু ডাকাত হয়ে ভয় দেখায়, সে নিজে দীনুডাকাত ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না! তাই তো দলবল নিয়ে ছুটে এলুম— কিন্তু আবার তাকে হারালুম, হাতে পেয়েও!

অরুণ বললে, 'আপনার অনুমান সত্য কিনা আপনিই জানেন! কিন্তু দেখছি আপনার স্বভাব হচ্ছে ছেড়ে দিয়ে তেড়ে ধরা।'

প্রশান্ত বললে, 'হায় রে, আমার যে মান বাঁচানো দায় হয়ে উঠল!'

নবম পরিচ্ছেদ

নতুন ফাঁদের ব্যবস্থা

বড়োসাহেবের কাছ থেকে জরুরি তলব এসেছে।

প্রশান্তের বুক ঢিপঢিপ করতে লাগল। কারণ দিন তিনেক আগে খবরের কাগজে 'মুচি এবং অদৃশ্য মানুষের কাহিনি' বেরিয়ে জনসমাজে তার মাথা দস্তুরমতো হেঁট করে দিয়েছে।

গল্পের নায়ক রূপে প্রশান্তের নাম ব্যবহার করা হয়নি— 'প্রশান্তে'র বদলে বসানো হয়েছে 'অশান্ত'। কিন্তু ওই অশান্তই যে প্রশান্ত, কারুর একথা বুঝতে বাকি থাকেনি।

নিশ্চয়ই এ দীনুডাকাতেরই নিজের কীর্তি! বারবার বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে এবং সাত ঘাটের জল খাইয়েও দীনু তাকে যতটা কাবু করতে না পেরেছে, কাগজে কাগজে ধারাবাহিক ভাবে এই লেখনীবাণ ত্যাগ করে সে তাকে তারও চেয়ে ঢের বেশি আহত করে ফেলছে। একেবারে আধুনিক যুদ্ধরীতি! কেবল অস্ত্রে-অস্ত্রে যুদ্ধ নয়, তার সঙ্গে রীতিমতো প্রোপাগান্ডা ও বাক্যবন্ধুদের যুদ্ধ! দীনু দেখছি তার ভাত না মেরে ছাড়বে না!

আচ্ছা, দীনুর চেহারা কেমনধারা? দীনু তার এতবড়ো শত্রু, এতবার সে তার কাছাকাছি এসেছে, এমনকি, কথাবার্তা পর্যন্ত কয়েছে, তবু সে তাকে একবারও ভালো করে দেখবার সুযোগ পায়নি!

তবে তার চেহারার কতকটা বর্ণনা পাওয়া গেছে বটে, মানিকচাঁদের মুখে। সে বর্ণনার প্রত্যেকটি কথা পরীক্ষার্থী ছাত্রের মতো সে মুখস্থ করে রেখেছে:

'মাঝবয়সি। মাথায় সাদা-পাকা লম্বা চুল। চোখে নীলরঙের চশমা। গোঁফ আছে, আর আছে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। গালে একটা বড়ো আঁচিল। রং উজ্জ্বল শ্যাম। মাথায় বোধহয় সাড়ে ছ-ফুট উঁচু। বেজায় চওড়া বুক।'

এটা তার আসল চেহারা, না ছদ্মবেশ? বলা শক্ত। ছদ্মবেশের ব্যাপারে দীনু যে কতবড়ো আর্টিস্ট, এই সেদিনে মুচিকে দেখেই প্রশান্ত সেটা ভালো করেই বুঝতে পেরেছে!

ভাবতে ভাবতে সে পুলিশ আপিসে এসে পৌঁছোল। তারপর বড়োসাহেবের ঘরে গিয়ে ঢুকল যূপকাষ্ঠের নিকটস্থ ছাগবৎসের মতো। যা ভেবেছে তাই! বড়োসাহেব প্রথমেই 'মুচি ও অদৃশ্যমানুষের কাহিনি'র প্রসঙ্গ তুললেন। বললেন, 'প্রশান্ত, তোমার আর দীনুডাকাতের ব্যাপারটা ক্রমেই থিয়েটারি প্রহসনের মতন হয়ে উঠছে না?'

প্রশান্ত ঘাড় হেঁট করে মৃদু স্বরে বললে, 'স্যার, গল্পটা অতিরঞ্জিত।'

—কিন্তু কাল্পনিক তো নয়?

—গল্পে আমাকে খালি দুর্দশাগ্রস্ত, ভীরু, বোকা ভাঁড়ের মতন করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আমি যে একটু পরেই আসল রহস্য বুঝতে পেরে দীনুকে ধরবার জন্যে আবার ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হয়েছিলুম, তার কোনো উল্লেখ নেই।

বড়োসাহেব বললেন, 'যাক ও প্রসঙ্গ। তোমার দুর্দশার কথা নিয়ে আলোচনা করবার জন্যে তোমাকে ডাকিনি। আমি এখনও তোমার উপরে বিশ্বাস হারাইনি। জানি, তুমি পরিশ্রমী, সুচতুর, সুযোগ্য কর্মচারী। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে এই, দীনুর বুদ্ধি আর চাতুর্য তোমার চেয়ে বেশি।'

প্রশান্ত কোলকুঁজো হয়ে পড়ে ভাবতে লাগল, বড়োসাহেব তার সুখ্যাতি করছেন না নিন্দা করছেন?

বড়োসাহেব বললেন, 'আচ্ছা, ওই অরুণ লোকটাকে তোমার কী মনে হয়?'

—ধড়িবাজ স্যার, মহা ধড়িবাজ! অনেক কথাই জানে, কিন্তু কিছুই ভাঙে না। একেবারে পাকা বাঁশ, একটুও নোয় না। ও দীনুর বাল্যবন্ধু।

—আমি ওদের কাগজপত্র দেখেছি। আটবৎসর অজ্ঞাতবাসের পর বরুণ যেদিন থেকে দীনবন্ধু নাম ধারণ করে ফিরে এসেছে, ওদের দুজনের মধ্যে আর তেমন ঘনিষ্ঠতা নেই।

—কিন্তু স্যার, দীনু এখনও মাঝে মাঝে অরুণের বাড়িতে যায়।

—হতে পারে। সেটা বাল্যবন্ধুতার খাতিরে। আমার নিজেরও এমন বাল্যবন্ধু থাকতে পারে, এখন হয়তো যে দুরাত্মা। কিন্তু তার অপকর্মের জন্যে আমাকে কেউ দায়ী করতে পারবে না! অরুণ যে দীনুর সহকারী, তুমি এমন কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওনি তো?

—না স্যার। তবে শীঘ্রই পাব বলে আশা করি।

—বেশ, তারপর তোমার সঙ্গে অরুণকে নিয়ে আলোচনা করা যাবে।...এখন তোমাকে কী জন্যে ডেকেছি শোনো।

প্রশান্ত কান পেতে রইল। বড়োসাহেব দপ্তর থেকে একখানা কাগজ বার করে বললেন, 'পাটনা শহরে দিন-তিনেক আগে একটা বড়ো রকমের ডাকাতি হয়ে গিয়েছে, সে খবর পেয়েছ?'

—পেয়েছি স্যার!

—অনেকের অনুমান, এই ডাকাতির সঙ্গে দীনুর সম্পর্ক আছে।

—ওই ডাকাতিতে তিনজন লোক আহত, আর দুজন হত হয়েছে। দীনু কিন্তু নরহত্যা করতে চায় না।

—আমি ও-কথা শুনেছি। কিন্তু এরকম ডাকাতির ব্যাপারে ইচ্ছার বিরুদ্ধে দৈবগতিতে খুন-জখম হওয়া স্বাভাবিক নয় কি?

—হ্যাঁ স্যার।

—দীনু এখন পাটনাতেই আছে। এই চিঠিখানা পড়লেই সব বুঝবে। এখানা নকল,আসল চিঠি যথাস্থানে গিয়ে পৌঁছেছে।

চিঠিখানা এই :

'ধনীরাম,

আগামী পনেরোই তারিখে আমি এখান থেকে পাঞ্জাব মেলে যাত্রা করে ১৬ই তারিখে সকালে কলকাতায় গিয়ে পৌঁছোব। আমাদের 'ক্লাবে' তুমি দলের সবাইকে নিয়ে হাজির থেকো। বিশেষ জরুরি পরামর্শ আছে। ইতি

দীনবন্ধু'

বড়োসাহেব বললেন, 'চিঠিখানা ছিল খামের ভিতরে। কিন্তু নির্বোধরা জানে না, খামে চিঠি লিখলেও পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায় না।'

—ধনীরাম কে স্যার?

—এক পাঞ্জাবি হোটেলওয়ালা। নিজের অজান্তেই সে এখন পুলিশের নজরবন্দি হয়ে আছে।

—আজ তো চৌদ্দ তারিখ। দীনু কাল পাটনা ত্যাগ করবে?

—হ্যাঁ।

—আমায় কী করতে হবে?

—পরশু সকালে দলবল নিয়ে হাওড়া স্টেশনে হাজির থাকবে।

দীনবন্ধুকে বন্দি করাই তার জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এবারে সুযোগ পেয়েও প্রশান্তের মন সম্ভাবনার আনন্দে নৃত্য করে উঠল না। দীনু যে কতবড়ো পিচ্ছল ও ঘ্যাঁচড়া মাছ, বারবার মুখে চুন-কালি মেখে এটা সে টের পেয়েছে হাড়ে হাড়ে। এখন দীনুর কাছে যেতেও তার হৃৎকম্প হয়! কর্তব্যপালনের জন্যে প্রাণ দিতেও সে রাজি, কিন্তু আবার যদি তেমনই লাঞ্ছিত ও হাস্যাস্পদ হতে হয় সেই ভয়েই তার মন করতে লাগল খুঁত-খুঁত।

বড়োসাহেব শুধোলেন, 'কী প্রশান্ত, তোমার সাহস হচ্ছে না নাকি?'

—না স্যার, তা নয়।

—তবে?

—আমার একটি নিবেদন আছে।

—বলো।

—এবারে দায়িত্বের খানিকটা যদি আপনি নিজে নেন, তাহলে বেঁচে যাই।

—তার অর্থ?

—আমি আপনারও সাহায্য চাই।

—কী সাহায্য?

—বলছি স্যার।... দেখুন, দীনু বড়োই আটঘাট বেঁধে কাজ করে। পাটনা থেকে কলকাতা— মাঝে অনেক স্টেশন। দীনুর চর চারিদিকে। পুলিশের গন্ধ পেয়ে দীনু যদি মাঝের কোনো স্টেশনে নেমে সরে পড়ে?

—অসম্ভব নয়।

—তার চেয়ে আর এক কাজ করলে হয় না?

—কী?

—আমি আজই পানটায় যাই জনকয় লোক নিয়ে। কালকের ট্রেনে পাটনা থেকে বেরিয়ে দীনুর সঙ্গেই পরশুদিন কলকাতায় এসে পৌঁছোব।

—মন্দ কথা নয়।

—সেই সময়ে আপনি যদি দয়া করে লোকজন নিয়ে হাওড়া স্টেশনে আমাকে সাহায্য করেন, তাহলে আমি অনেকটা আশ্বস্ত হই!

বড়োসাহেব হেসে বললেন, 'কে বলে প্রশান্তের বুদ্ধি নেই? আমাদের প্রশান্ত অতিশয় বুদ্ধিমান! আবার যদি তাকে একলা হাস্যাস্পদ হতে হয়, সেই ভয়ে সে উপরওয়ালাকেও দলে টানছে! সাধু প্রশান্ত, সাধু! বেশ, আমি রাজি।'

দশম পরিচ্ছেদ

দীনদা

প্রশান্ত পাটনা স্টেশনে পায়চারি করছে। তার আশেপাশে ঘুরছে কলকাতা পুলিশের সাত-আটজন লোক। কারুর ইউনিফর্ম নেই। কারুকে পুলিশের লোক বলেও চেনা যায় না।

পাঞ্জাব মেল এল। সঙ্গে সঙ্গে প্রশান্তের চোখ আর কান সজাগ হয়ে উঠল।

স্টেশনে ছুটোছুটি হুড়োহুড়ি! কেউ গাড়িতে উঠছে, কেউ গাড়ি থেকে নামছে।

প্রশান্ত যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তার পাশেই ট্রেনের একটি ফার্স্ট ক্লাস কামরা— রিজার্ভ করা। কামরার ভিতর থেকে শোনা যাচ্ছে একাধিক স্ত্রী-কণ্ঠের কান্না।

প্রশান্ত কামরার ভিতরে একবার উঁকি মেরে দেখলে।

গাড়ির একদিকে একখানা খাটিয়া। তার উপরে একটা মৃতদেহ— তার গায়ে দড়ি-দিয়ে বাঁধা নতুন কাপড় জড়ানো। খাটের এপাশে-ওপাশে জন-চারেক মাড়োয়ারি স্ত্রীলোক কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে এবং কেউবা চিৎকার করে কাঁদছে।

জনাছয়েক মাড়োয়ারি পুরুষও চুপ করে গম্ভীর মুখে বসে আছে।

পুলিশের মন, সব বিষয়েই কৌতূহল! একজন মাড়োয়ারিকে জিজ্ঞাসা করে প্রশান্ত এই খবরটুকু সংগ্রহ করলে।

কলকাতার বিখ্যাত ধনী অর্জুনদাস আগরওয়ালা ব্যবসায়সূত্রে মোগলসরাইয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হওয়াতে মারা পড়েছে। দেহ কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

শুনতে শুনতে প্রশান্ত বরাবর স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের উপরে রেখেছিল তীক্ষ্ন দৃষ্টি। কিন্তু দীনুডাকাত বলে মনে হয়, এমন কারুকেই দেখা গেল না।

পায়ে পায়ে প্রশান্ত এদিকে-ওদিকে ঘুরে এল। একটা সন্দেহজনক মূর্তি পর্যন্ত চোখে পড়ল না। মনে মনে ভাবলে, না জানি দীনু আজ কী নূতন ছদ্মবেশ ধারণ করেছে!

কিন্তু প্রথম ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই একদল হিন্দুস্থানি হল্লা করতে করতে গাড়ির একটা কামরায় এসে উঠল এবং প্রশান্তের চোখ সেই দলে আবিষ্কার করলে কলকাতার তিনজন পুরাতন পাপীকে। সেও সেই কামরায় উঠে পড়ল।

কিন্তু কামরার জানলায় মুখ বাড়িয়ে তখনও সে প্ল্যাটফর্মের উপরে নজর রাখতে ভুললে না।

শেষ ঘণ্টা দিলে। গার্ডের বাঁশি বাজল।

এমন সময়ে একটি লোক বেগে ছুটতে ছুটতে এসে গাড়ি ধরলে।

মুহূর্তে প্রশান্তের চোখ চমকে উঠল। মানিকচাঁদের বর্ণনা তার মনের মধ্যে জেগে উঠল বিদ্যুৎ-চিত্রের মতো!

নিজেকে বোধ হল বন্দি বলে। তার পা-দুটো তখন ও-কামরার দিকে ছোটবার জন্যে অধীর হয়ে উঠেছে, কিন্তু ট্রেন তখন চলছে। সন্দেহজনক হিন্দুস্থানিদের ভালো করে দেখবার ইচ্ছাও তার হল না— প্রশান্তের মন ছটফট করে খালি বলতে লাগল, কখন গাড়ি থামবে, কখন গাড়ি থামবে!

পরের স্টেশন এল। প্রশান্ত এক লাফে নীচে নেমে খানিকটা এগিয়ে যেতেই একখানা ইন্টার ক্লাস কামরায় দেখতে পেলে সেই লোকটাকে।

বিনা বাক্যব্যয়ে কামরায় উঠে সে একেবারে একপ্রান্তে গিয়ে নিজের জন্যে একটুখানিক জায়গা করে নিলে। লোকটা তখন ওদিককার জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ছিল, তাকে দেখতে পায়নি। প্রশান্ত টাইম-টেবল খানা নিজের মুখের সামনে তুলে ধরলে এবং তারই আড়াল থেকে লোকটাকে লক্ষ করতে লাগল।

আবার মানিকচাঁদের বর্ণনা স্মরণ করলে:

'মাঝবয়সি। মাথায় সাদা-পাকা চুল। চোখে নীল রঙের চশমা। গোঁফ আছে, আর আছে ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। গালে একটা বড়ো আঁচিল। রং উজ্জ্বল শ্যাম। মাথায় বোধহয় সাড়ে ছ-ফুট উঁচু। বেজায় চওড়া বুক।'

বর্ণনার সঙ্গে এই লোকটার চেহারার অধিকাংশই যে মিলে যায়! প্রশান্ত পরম উৎসাহিত হয়ে উঠল।

কিন্তু— হ্যাঁ, একটু-আধটু অমিলও আছে। এর রং শ্যাম, উজ্জ্বল শ্যাম নয়। আর এ বোধকরি সাড়ে পাঁচফুটের চেয়ে বেশি উঁচু হবে না।

কিন্তু এমন একটু-আধটু অমিল ধর্তব্যের মধ্যেই নয়। মানিকচাঁদ যে-অবস্থায় দীনুকে দেখেছিল, তখন তার মাথার ঠিক ছিল না। চোখের ভ্রম না-হওয়াই আশ্চর্য!

বাকি সব চমৎকার মিলে যাচ্ছে। 'মাঝবয়সি। মাথায় সাদা-পাকা চুল। নীল রঙের—'

না, এর চোখে নীল রঙের চশমা নেই। তাতে কী হয়েছে? চশমা তো আর দেহের অঙ্গ নয়, এখন খুলে রেখেছে।

এরও গোঁফ আছে, আর ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি। এমনকি গালে একটা বড়ো আঁচিলেরও অভাব নেই— যদিও আঁচিলটা কোন গালের, মানিকচাঁদের কাছ থেকে আমার তা জেনে নেওয়া উচিত ছিল।... এরও বুক বেজায় চওড়া!

আরে, আরে—এ কী?

লোকটা পকেট থেকে একখানা চশমা বার করে পরলে। কিন্তু তার কাচ নীল রঙের নয়— কালো রঙের ঠুলি-চশমা, ট্রেনে অনেকেই যা ব্যবহার করে।

লোকটার পাশে বসেছিল দুজন ছোকরা। একজন তাকে শুধোলে, 'হ্যাঁ মশাই, আপনি তো পাটনা থেকে উঠলেন! ওখানে নাকি একটা বিষম ডাকাতি হয়ে গিয়েছে?'

লোকটা সংক্ষিপ্ত স্বরে জবাব দিলে, 'হ্যাঁ।'

দ্বিতীয় ছোকরা জিজ্ঞাসা করলে, 'শুনছি নাকি ডাকাতরা এক লাখেরই বেশি টাকা নিয়ে সরে পড়েছে?'

—না, বিশ হাজার।

—মোটে বিশ হাজার? ওরে হরি, দীনুডাকাত এবারে তাহলে বেশি টাকা পায়নি! আরে ছিঃ, বিশ হাজার টাকার জন্যে দীনু শেষটা খুন-জখম করলে!

লোকটা এইবারে জাগ্রত হয়ে উঠল। রুক্ষকণ্ঠে বললে, 'দীনবন্ধুর সঙ্গে এ ডাকাতির সম্পর্ক কী?'

—সম্পর্ক কী জানি না, তবে সবাই তো তাই বলছে।

—সবাই বলছে না, বলছে খালি পুলিশ!

হরি নামধেয় যুবকটি বললে, 'ঠিক ধরেছেন স্যার! সুরেন যে পুলিশ ইনস্পেকটর ছেলে!'

সুরেন প্রতিবাদ করে বললে, 'আমি একথা বাবার মুখ থেকে শুনিনি।'

লোকটা বললে, 'দীনবন্ধু মানুষ খুন করে না— বুঝেছ? সে খুনি নয়। সে ডাকাতি করে মানুষের প্রাণ বাঁচাবার জন্যে—প্রাণবধ করবার জন্যে নয়।'

উৎকর্ণ হয়ে প্রশান্ত টাইম-টেবল-এর আড়াল থেকে প্রত্যেক কথা শ্রবণ করছিল। মনে-মনে বললে, 'হুঁ, দীনুর জন্যে ভারি প্রাণের টান— তার হয়ে আবার সাফাই গাওয়া হচ্ছে! আচ্ছা, সবুর করো!'

গাড়ি ছুটছে— যেন জয়যাত্রার হট্টগোল তুলে। বাইরেকার রুপোলি জ্যোৎস্নায় চোবানো বন-মাঠ-নদী আসছে-যাচ্ছে যেন চলচ্চিত্রের মতো।

কতক্ষণ আর টাইম-টেবলের আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা যায়? সে বইখানা নামিয়ে রেখে উড়ানি দিয়ে মুখের খানিকটা ঢাকা দিলে। কিন্তু যার জন্যে এত সাবধানতা, সেই লোকটা তার দিকে একবারও ফিরে তাকালে না।

একটু পরেই সে কোনোরকমে হেলে পড়ে বোধহয় যেন ঘুমোতে লাগল।...

গাড়ি যখন আসানসোলে, লোকটা হঠাৎ উঠে বসল। জানলা দিয়ে বাইরে মুখ বাড়িয়ে দেখলে। তারপর কামরা থেকে নেমে গেল।

বলা বাহুল্য, প্রশান্ত তাকে চোখের আড়ালে যেতে দিলে না, সেও নেমে পড়ল সঙ্গে-সঙ্গে। লোকটা খানিকক্ষণ প্ল্যাটফর্মের এদিকে-ওদিকে পায়চারি করে আবার কামরায় এসে ঢুকল।

বর্ধমানেও লোকটা আবার নামল। সে যেখানে যায়, প্রশান্তও পিছু নেয়। সে সীতাভোগ-মিহিদানা কিনলে, দরকার না থাকলেও প্রশান্তও কিছু মিষ্টি ক্রয় করলে।

এবারে কামরায় উঠে লোকটা খানিকক্ষণ তীক্ষ্ন চোখে প্রশান্তের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মুখের ভাব অপ্রসন্ন।

প্রশান্ত বুঝলে সে ধরা পড়ে গেছে, আর লুকোচুরি মিছে। সেও সপ্রতিভ ভাবে তার সঙ্গে দৃষ্টি-বিনিময় করলে।

লোকটা হঠাৎ কী ভেবে একটুখানি হাসলে। চশমাখানা খুলে রেখেছিল, আবার পরে নিলে। তারপর চুপ করে বসে রইল জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে।

প্রশান্ত মনে মনে বললে, 'ভায়া, কালো চশমা পরে আবার চোখ ঢাকতে চাও? ঢাকো, কিন্তু আর ঢাকাঢাকি করে বিশেষ সুবিধে হবে কি?'

এমন সময়ে কামরায় এসে উঠল অরুণ! প্রথমেই লোকটার সঙ্গে তার চোখাচোখি হতেই সে বললে, 'আরে দীনদা যে! পাটনা থেকে আজ লম্বা দৌড় মেরেছেন দেখছি!'

দীনদা বললে, 'এই যে, এসো এসো! বর্ধমানে কী করতে এসেছ?'

—নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে।

প্রশান্তের দেহের মধ্যে তার আত্মা তখন নৃত্য করছে! যেখানে অরুণ, সেখানেই দীনুডাকাত এবং যেখানে দীনু, সেখানেই অরুণ! এখানে অরুণের আকস্মিক আবির্ভাবের আর কোনো মানে হয় না! হুঁ, এইবারে অরুণও যেন তার জালের ভিতরে ঢুকি-ঢুকি করছে! তা করবেই তো, যতই চতুর-চূড়ামণি হও, ফাঁকের ঘরে পা ফেলে-ফেলে চিরদিন কি কাটানো যায়?

লোকটার সম্বন্ধে যা-কিছু সন্দেহ ছিল, অরুণের আবির্ভাবে প্রায় তার সবটাই পাতলা হয়ে গেল রোদের ছোঁয়ায় কুয়াশার মতো। প্রথমত, এই লোকটা আর অরুণ পরস্পরের সঙ্গে সুপরিচিত। দ্বিতীয়ত, এর নাম দীনদা— যা দীনবন্ধুরই সংক্ষিপ্ত রূপ ছাড়া আর কী হতে পারে? দৈবগতিকে কখনও এমন যোগাযোগ সম্ভবপর নয়! নিশ্চয়ই অরুণের সঙ্গে আগে থাকতেই একটা কিছু বন্দোবস্ত ছিল!

প্রশান্ত একসঙ্গে সব প্রমাণ ভালো করে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। ১নং— ওই লোকটার চেহারার সঙ্গে মানিকচাঁদের বর্ণনা প্রায় হুবহু মিলে যায়।

২নং— দীনুর যেদিনে যে ট্রেনে পাটনা থেকে কলকাতায় ফেরবার কথা, ওই লোকটাও ঠিক সেই দিনে আর সেই ট্রেনে কলকাতায় আসছে।

৩নং— কামরায় বসে দীনুর পক্ষ সমর্থন করবার জন্যে লোকটা যথেষ্ট উৎসাহ দেখিয়েছে। অবশ্য প্রশান্ত যে সেই কামরাতেই বিদ্যমান, এটা টের পেলে সে বোধহয় কোনো উৎসাহই দেখাত না!

৪নং— অরুণেরও ঠিক এই ট্রেনেরই এই কামরায় আগমন।

৫নং—এরা দু'জনেই দু'জনের বন্ধু— কারণ অরুণ একে 'দাদা' সম্বোধন করলে।

৬নং— অরুণ একে ডাকলে দীনদা বলে— যা দীনবন্ধুরই অপভ্রংশ। এ একটা মস্ত প্রমাণ!

প্রমাণগুলোকে একে একে সে মনের দাঁড়িপাল্লায় ওজন করছে, এমন সময়ে অরুণও তাকে দেখতে পেলে!

সে বলে উঠল— 'অ্যাঁ। এ কামরার ভিতরে দেখছি আমার বন্ধুসভা বসেছে! এদিকে দীনদা, ওদিকে প্রশান্তবাবু, ব্যাপার কী?'

প্রশান্ত অরুণের এই আত্মীয়তাস্থাপনের চেষ্টাটা পছন্দ করলে না। ভারিক্কে চালে সংক্ষিপ্ত জবাব দিলে, 'কলকাতায় ফিরছি।'

অরুণ ফিক করে হেসে বললে, 'আহা, সে তো ফিরবেনই! আমরা হচ্ছি শহুরে পতঙ্গ, আর আমাদের কাছে কলকাতা হচ্ছে জ্বলন্ত অগ্নিপ্রাসাদ! ওখানে না ছুটলে, আমাদের যে অগ্নিমান্দ্য হয়! ও-কথা জানতে চাইছি না!'

—তবে?

—বলি, আজ আবার কার পিছনে?

—মানে?

—নতুন কোনো হরিণের সন্ধান পেয়েছেন নাকি?

—হরিণ?

—হ্যাঁ, হ্যাঁ, হরিণ! আপনারা হচ্ছেন ব্যাঘ্রজাতীয় বন্য জীব, হরিণের মাংস না হলে তো চলে না!

কাষ্ঠহাসি হেসে ঠাট্টার ছলে প্রশ্নটা উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে প্রশান্ত বললে, 'আপনি দেখছি উপমাসম্রাট— দুই হাতে ছড়িয়ে যান খালি উপমার ঐশ্বর্য!' বলেই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসল।

সেই অবস্থাতেই তার সতর্ক কান শুনতে পেলে হরি নামক যুবকটি চাপা গলায় অরুণকে জিজ্ঞাসা করলে, 'ও ভদ্রলোকটি কে মশাই?'

অরুণ বললে, 'ডিটেকটিভ।'

দীনদা নিম্নস্বরে বললে, 'আজ উনি আমার পিছনে আঠার মতন লেপটে আছেন।'

—তাই নাকি?

—হ্যাঁ। আমি উঠলে উনি ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ান, আমি বসলে উনি নিশ্চিন্ত হয়ে বসে পড়েন, আমি বাইরে বেরুলে উনি পশ্চাদ্ধাবন করেন, আমি সীতাভোগ কিনলে উনিও নগদ দামে সীতাভোগ কেনেন। এখনও পরীক্ষা করে দেখিনি, তবে আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমি খাবি খেলে উনি খাবি খেতে বাধ্য হবেন!

হরি খিলখিল করে উচ্চস্বরে হেসে উঠল, কিন্তু নিম্নস্বরে বললে, 'পুলিশরা কি ফুলিস!'

সুরেন নামক যুবকটি জিজ্ঞাসা করলে, 'ওঁর নাম কী?'

অরুণ বললে, 'প্রশান্ত মজুমদার।'

হরি বললে, 'ও, উনিই সেই সুবিখ্যাত দীনুডাকাতের বন্ধু কুবিখ্যাত অশান্ত মজুমদার?'

চারিদিকে জাগল কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিবিনিময়ের সঙ্গে চাপা গলায় টিটকিরির গিটকিরি!

রুদ্ধ ক্রোধে ও আক্রোশে প্রশান্তের বুকটা টনটন করে উঠল। হরি নামক যুবকটির কর্ণযুগল আচ্ছা করে মর্দন করে দেবার জন্যে তার হাত দুটো যেন নিশ-পিশ করতে লাগল। কিন্তু এখানে একটা প্রচণ্ড দৃশ্যের অবতারণা করে সব পণ্ড করবার ভরসা তার হল না। সেই গোলে-হরিবোলে দুই ডানা মেলে পাখি যদি ফাঁকি দেয়? দীনুর পিছনে ছুটে বরাবরই ঘাটের কাছে এসে ডুবেছে তার নৌকা। বারংবারই দীনু এসেছে তার নাগালের মধ্যে, কিন্তু শেষ-ছোঁ মারতে গিয়ে তাকে আর ছুঁতে পারেনি। দীনু আলেয়ার চেয়ে কাছে আসে, কিন্তু হাত বাড়ালেই আলেয়ার চেয়ে দূরে পালায়!

আজ আর সে অনুতাপ বা আত্মভর্ৎসনা করবার কোনো পথই খোলা রাখবে না। আজ তার একমাত্র কর্তব্য হচ্ছে ওই লোকটিকে চোখে-চোখে রাখা। আজ প্রশান্তকে ধর, মারো, গালি দাও, ঠাট্টা করো— সে কিন্তু এখানেই বৈদ্যনাথের পাথুরে ষাঁড়ের মতন 'নট-নড়ন-চড়ন-নট-কিচ্ছু' হয়ে থাকবে।

তারপর? হাওড়া স্টেশনে গাড়ি থামলেই তার সমস্ত কর্তব্য খতম! সেখানে আছেন বড়োসাহেব, সেখানে আছে পুলিশ পাহারা— সব দায়িত্ব উপরওয়ালার ঘাড়ে চাপিয়ে সে হবে একেবারে নিশ্চিন্ত!

অরুণ বললে, 'প্রশান্তবাবু, আপনার মুখখানা আজ অমন মারাত্মক বলে মনে হচ্ছে কেন?'

প্রশান্ত মিষ্টি হাসি হেসে বললে, 'তাই নাকি? আপনার কবির চোখ, নতুনরকম কত কী দেখতে পায়!'

অরুণ আবার জিজ্ঞাসা করলে, 'সেদিনকার সেই মুচিটার কোনো পাত্তা পেলেন নাকি?'

—না, এখনও তাকে দরকার হয়নি। যেদিন জুতো সেলাই করাব সেদিন তার খোঁজ নেব।

কিন্তু কামরার অনেক লোক তখন মুখ টিপে-টিপে হাসতে শুরু করেছে। খবরের কাগজে বোধহয় তারা পাঠ করেছে 'মুচি ও অদৃশ্য মানুষের কাহিনি!'

হাওড়া স্টেশন, হাওড়া স্টেশন!

প্রশান্তের মনে হল, এতক্ষণ নরকভোগের পর এইবার সে এল স্বর্গে! সেই লোকটা বা দীনদা গাড়ি থেকে নেমে কুলি ডাকলে।

সঙ্গে সঙ্গে পশ্চাদবর্তী অনুগত ছায়ার মতো নামল প্রশান্ত। এত কাছাকাছি দাঁড়িয়ে রইল যে, হাত বাড়ালেই শিকার হবে হস্তগত।

লোকটা মুখ ফিরিয়ে প্রশান্তকে দেখলে। বিরক্ত স্বরে বললে, 'মশাই যদি আর-একটু কম-ঘনিষ্ঠ হন তাহলে খুশি হব।'

প্রশান্ত দাঁত বার করে নির্লজ্জ হাসি হাসলে, মুখে কিছু বললে না।

পিছনে রোল উঠল, 'রাম নাম সত্য হায়'— সঙ্গে-সঙ্গে মেয়ে গলায় কান্না!

অর্জুনদাস আগরওয়ালার শবদেহ নিয়ে মাড়োয়ারিরা চলে গেল।

এমন সময়ে বড়োসাহেব এসে হাজির— সঙ্গে একদল পুলিশের লোক।

দীনদার দৃষ্টি হল সচকিত। সে তাড়াতাড়ি অগ্রসর হতে গেল।

প্রশান্ত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

দীনদা বললে, 'পথ ছাড়ুন। আপনার মতন অসভ্য লোক আমি আর দেখিনি।'

—আপনার নাম কী?

দীনদা ক্রুদ্ধস্বরে বললে, 'বলব না!'

প্রশান্ত বললে, 'নাম বলুন, আর নাই-ই বলুন, আপাতত আমার সঙ্গে আপনাকে একটু বেড়িয়ে আসতে হবে।'

—কেন? আমাকে কি গ্রেপ্তার করতে চান? পরোয়ানা কই?

—আপাতত আপনাকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। খালি আমাদের সঙ্গে আসতে বলা হচ্ছে।

—আমি যদি না যাই?

—আপনাকে যেতেই হবে।

—এ কী অত্যাচার!

এমন সময় একদল হিন্দুস্থানি সেইখানে এসে দাঁড়াল। তারা হচ্ছে, পাটনা স্টেশনের সেই দল—প্রশান্ত যাদের মধ্যে লক্ষ করেছিল কলকাতার তিনজন পুরাতনপাপীকে। তাদের ভিতর থেকে একজন পালোয়ানের মতন লোক বেরিয়ে এসে শুধোলে,'কী হয়েছে দীনবাবু?'

—পুলিশের পাল্লায় পড়েছি।

প্রশান্ত বড়োসাহেবের কানে কানে বললে, 'স্যার, নাম শুনলেন তো? দীনবাবু! ও লোকগুলো হচ্ছে গুন্ডা— দীনুর দলের লোক!'

বড়োসাহেব ভিড় সরাবার হুকুম দিলেন।

প্রশান্ত বললে, 'দীনুবাবু, এখানে দাঁড়িয়ে অপদস্থ হবেন, না আমার সঙ্গে আসবেন?'

—বেশ, চলুন।

অরুণ একটু তফাতে দাঁড়িয়ে ভয়ানক হতভম্বের মতন দৃশ্যটা দেখছিল।

প্রশান্ত আবার বড়োসাহেবের কানে কানে বললে, 'স্যার ওই হচ্ছে দীনুর বন্ধু অরুণ! ওকেও কি এইসঙ্গে নিয়ে যাব?'

বড়োসাহেব চোখ ফিরিয়ে অরুণকে একবার দেখে নিয়ে বললেন, 'ওর বিরুদ্ধে নতুন কোনো প্রমাণ পেয়েছ?'

—না স্যার!

বড়োসাহেব বললেন, 'তবে থাক। ওর কথা পরে ভাবা যাবে।'

অরুণ বুঝলে এবারে শনির দৃষ্টি পড়েছে তারই উপরে। সে কেমন অস্বস্তি বোধ করলে। আস্তে আস্তে পা চালিয়ে দিলে অন্যদিকে।

একাদশ পরিচ্ছেদ

দীনবন্ধুর পত্র

পরদিন বৈকালে এই পত্রখানি প্রশান্তের হস্তগত হল:

'শ্রীমান প্রশান্ত মজুমদার

সমীপেষু

ভায়া, পাটনার ডাক্তার দীনদয়াল দত্তকে তুমি দীনবন্ধু বলে চালিয়ে দিতে ও ধরে রাখতে পারলে না বলে আমি অত্যন্ত দুঃখিত হয়েছি।

মানিকচাঁদের মুখে তুমি আমার চেহারার বর্ণনা পেয়েছ? তাহলে তোমার ভ্রম-সংশোধনের জন্যে শুনে রাখো, দীনবন্ধুর আসল চেহারার বর্ণনা দুর্লভ। কারণ আমি এক-এক অভিযানে বহির্গত হই এক-এক নূতন ছদ্মবেশে।

আমি পাটনায় ছিলুম না, ছিলুম মোগলসরাইয়ে। তবে চিঠিখানা ডাকে দেওয়া হয়েছিল পাটনা থেকেই। এ সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছিল তোমাদের কৃপাদৃষ্টি থেকে অব্যাহতিলাভের জন্যেই। আর আমার প্রেরিত পত্রখানা যে তোমাদের কৃপাদৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হয়নি, যথাসময়ে টেলিগ্রামে সে গুপ্তকথাও আমি জানতে পেরেছিলুম।

কিন্তু তোমরা বোধহয় এখনও আবিষ্কার করতে পারোনি যে, আমি তোমাদের সঙ্গে-সঙ্গেই কলকাতায় এসে উপস্থিত হয়েছি?

অর্জুনদাস আগরওয়ালা বলে কলকাতায় কেউ আছে কিনা জানি না।

কিন্তু তারই নাম ধারণ করে খাটিয়ার উপরে মৃতদেহের মতন শুয়ে আমার জীবন্ত দেহ কলকাতা শহরে প্রবেশ করেছে।

পুলিশের চিনের প্রাচীন কখন, কোথায়, কেমন করে ভেদ করতে হয়, তোমাদের চেয়ে সে জ্ঞান আছে আমার বেশিমাত্রায়।

হাওড়া স্টেশনে খাটে শুয়ে আমি যখন তোমাদের পাশ দিয়ে আসছিলুম, তখন তোমার শ্রীমুখের বচনামৃত পর্যন্ত আমার কর্ণগোচর হয়েছে।

চেষ্টা করো, চেষ্টা করো,— আরও চেষ্টা কর! চেষ্টা ও সাধনার দ্বারা ভগবানও ধরা দেন। আমিই বা তোমার হাতে ধরা দেব না কেন? চাঙ্গা হও, চেষ্টা কর!

দীনবন্ধু'


*সিপাহ-বিপ্লবের সময়ে স্যর জন লরেন্সকে সিপাহীরা ঐ নামে ডাকত।

অধ্যায় ১ / ৮
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%