গন্ধবাবা

জয়দীপ চক্রবর্তী

পরিদাদু বলছিলেন, ‘অতিমারিতে সাবধান থাকাটা যেমন জরুরি, একই রকম দরকারি অযথা ভয় পেয়ে সিঁটিয়ে না থাকাটাও৷’

সুছন্দা চা-এর সঙ্গে খাওয়ার জন্যে বেসনে টুকরো টুকরো আলু মিশিয়ে পকোড়া তৈরি করছিলেন রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে৷ পরিদাদুর কথাটা কানে যেতে, সেখান থেকেই বলে উঠলেন, ‘ওইসব বলে টলে নাতিটাকে আর খেপিও না পরিকাকু৷ এমনিতেই বিকেল চারটে বাজতে না বাজতেই আজকাল সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে বাড়ি থেকে৷ কোথায় যে যায়, কার সঙ্গে ঘোরে, কিছুই জানতে পারি না৷ জিজ্ঞেস করলে এমন উত্তর দেয় যে কিছুই বোঝা যায় না ভালো করে৷ এখন তুমি যদি বেশি সাহসী হয়ে ওঠার কথা বলো, একে আর ঠেকানো যাবে না৷ বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে আবার মাঠ দাপিয়ে হুল্লোড় করে বেড়াবে৷’

‘খুব ভালো’, পরিদাদু সুছন্দার কথাটাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বললেন, ‘তুই তো ভালো করেই জানিস খুকু, চিরকাল আমি দস্যি ছেলেদেরই দলে৷ দিন রাত বই মুখে বসে থাকা গুড বয়দের আমার না-পসন্দ...’

‘ব্যস হয়ে গেল’, সুছন্দা গজগজ করতে শুরু করলেন, ‘শানুটা এমনিতেই বিশ্ব ফাঁকিবাজ৷ এখন অনলাইন ক্লাসের চক্করে পড়ে সেই ফাঁকিবাজি আরও বেড়েছে৷ তোমার কথা শুনে এইবার বইপত্তরে আর বোধহয় হাতই ছোঁয়াবে না৷’

শানু চুপ করে পরিদাদু আর মায়ের কথাবার্তা শুনতে শুনতেই ল্যাপটপ থেকে নিজের খাতায় অ্যাকটিভিটি টাস্ক টুকে নিচ্ছিল৷ এইবার প্রতিবাদ করে উঠল, ‘আমি মোটেও পড়াশুনোয় ফাঁকি দিই না পরিদাদু৷ লাস্ট সামেটিভ এগজামেও আমি কিন্তু অ্যাবোভ নাইনটি পারসেন্ট পেয়েছি...’

পরিদাদু এগিয়ে এসে শানুর পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘তোর মা তোকে গড়পড়তা বাঙালি করে রাখার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে রে শানু৷ আমি যতই তোকে ডাকাবুকো আর ডানপিটে করে তোলার চেষ্টা করছি, তোর মা ততই ভয় পেয়ে বেঁকে বসছে৷ এরপর কোন দিন দেখবি আমার সঙ্গে খুকু তোকে আর মিশতেই দেবে না...’

‘পরিকাকু, খুব খারাপ হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বলে দিচ্ছি’, ট্রে-তে সাজিয়ে গরম গরম চা আর পকোড়া নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে হাসিমুখে বললেন সুছন্দা, ‘তুমি ইচ্ছে করে শানুকে আমার বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলছ৷’

অরুণাংশু খবরের কাগজে রোব্বারের পাতায় বেরনো গল্প পড়ছিলেন গম্ভীর মুখে৷ এইবার কাগজ রেখে সোজা হয়ে উঠে বসলেন৷ হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপ নিলেন ট্রে থেকে৷ তারপর চায়ে একটা আলতো চুমুক দিয়ে পরিদাদুর দিকে চাইলেন, ‘তোমার মতলবটা কী, এইবার ঝেড়ে কাশো তো দেখি বাপু৷ নাতির জন্যে হঠাৎ এমন দরদ তো এমনি এমনি নয় নিশ্চিত?’

পরিদাদুও চায়ের কাপে একটা লম্বা চুমুক দিলেন৷ তারপর হেসে বললেন, ‘শানুটার কথা ভাবলে মায়া লাগে অরুণ৷ সারাদিন কম্পিউটার, মোবাইলে মুখ গুঁজে রয়েছে৷ মাঝেমধ্যে কাছেপিঠে হলেও একটু বেড়িয়ে টেড়িয়ে আসা উচিত৷’

‘এই অবস্থায় কোথায় যাবে বলো তো? অবিশ্যি অনেকেই বেরিয়ে পড়ছে৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবিও পোস্ট করছে তারা, চোখে পড়ছে৷ তাদের দোষও দিই না৷ কাঁহাতক আর ভয়ে ভয়ে নিজেদের ঘরের মধ্যে বন্দি করে রাখবে মানুষ? কিন্তু আমার বাপু ভরসা হয় না৷ আমাদের তবু ভ্যাকসিনেশন হয়েছে৷ বুস্টার ডোজও হয়ে গেছে৷ শানুটার তো সে সুরক্ষাটুকুও নেই৷’

‘ওরও তো স্কুল থেকে ভ্যাকসিনের বন্দোবস্ত হয়েছে শুনলাম’, পরিদাদু শাওনের দিকে চাইলেন৷

‘হয়েছে’, শাওন ঘাড় কাত করে বলল৷

‘তা হলে আর কী৷ ধেই ধেই করে নেচে বেড়াও’, সুছন্দা রাগী চোখে চাইলেন শাওনের দিকে, ‘মনে রাখতে হবে, দেশ থেকে সংক্রমণ এখনও কিন্তু দূর হয়ে যায়নি পুরোপুরি৷ তাছাড়া তোর তো বুস্টার ডোজ হয়নি আমাদের মতো৷’

‘হুঁ’, পরিদাদু মাথা নাড়িয়ে সুছন্দার কথায় সম্মতি জানালেন৷ তারপর বললেন, ‘বেড়ানো মানে দূরে যেতে হবে তারই বা কী মানে আছে? ঘর থেকে বেরিয়ে চারদিকে চোখ মেলে তাকালেই যে কত দেখার জিনিস আছে, আমরা তার খবরই রাখি না৷’

শাওন অমনি বলে উঠল, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শিষের ওপর/ একটি শিশিরবিন্দু...’

‘ঠিক’, পরিদাদু চায়ের শূন্য কাপ ট্রে-তে নামিয়ে রেখে বললেন, ‘তেমনই একটা শিশিরবিন্দু দেখে আসি চল৷ আজ বিকেলে৷ কাছেই৷’

‘কোথায়?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন চোখ সরু করে৷

‘আঁধারমানিক৷’

‘অ্যাঁ’, সেটা আবার কোন জায়গা? কী আছে সেখানে?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷

‘বারুইপুর থেকে যে রাস্তাটা সোজা আমতলার দিকে চলে গেছে, সেই পথে পড়ে৷ দূর নয়৷ চল, একটা অটো ভাড়া করে ঘুরে আসি৷ বারুইপুর, পদ্মপুকুর থেকে খুব বেশি হলে মিনিট কুড়ি-পঁচিশের জার্নি৷’

‘কী ব্যাপার বলো তো? হঠাৎ আঁধারমানিক নিয়ে পড়লে কেন?’ অরুণাংশু চোখ সরু করে পরিদাদুর দিকে চেয়ে বললেন৷

পরিদাদু এক মুহূর্ত চুপ করে বসে রইলেন ঘরের ছাদের দিকে মুখ করে৷ তারপর ধীরে ধীরে বললেন, ‘এই ছোট্ট ট্রিপটা সাজেস্ট করছি মূলত খুকুর জন্যেই...’

‘তাই নাকি?’ সুছন্দা উৎসাহিত হয়ে বললেন৷

‘ইয়েস ম্যাডাম’, পরিদাদু হাসলেন, ‘আমরা বাকিরা এই ট্রিপে ফাউ৷

‘কেন?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন৷

‘আসলে দিন দুই-তিন হল, প্রায়ই নানান সোর্স মারফত এক আশ্চর্য সাধুর খবর কানে আসছিল৷’

‘কী রকম?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন এইবার কৌতূহলী হয়ে৷

‘আঁধারমানিক এলাকাতেই ফকিরপাড়ায়, বট-অশ্বত্থের ঝুরির ফাঁকে বহু প্রাচীন এক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে৷ এমন মন্দির টন্দির দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বহু জায়গাতেই দেখতে পাওয়া যায় অবিশ্যি...’

‘কোন ঠাকুরের মন্দির গো পরিকাকু?’ সুছন্দা জিজ্ঞেস করলেন আগ্রহের সঙ্গে, ‘আমরা কি ওখানে পুজো দিতে যাব? তা হলে তো কিছু কিনে টিনে...

‘না’, সুছন্দাকে কথার মাঝখানেই থামিয়ে দিলেন পরিদাদু, ‘মন্দিরটা কোন ঠাকুরের তা কেউ জানে না৷ জানার উপায়ও নেই৷’

‘কেন?’

‘ওটা এতই প্রাচীন যে মন্দিরটা কার বানানো, কোন দেবতা সেখানে অধিষ্ঠিত ছিলেন, কিছুই জানা যায়নি আজ পর্যন্ত৷ মাটি খুঁড়তে গিয়ে ওই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটুকুই পাওয়া গেছে শুধু৷ তবে ওই এলাকার মানুষেরা জায়গাটিকে খুব মানে৷ ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা দু’-একখানা পাথরকেই শিব হিসেবে পুজো করে ওরা৷ মানত চড়ায়৷ মেলা বসে চৈত্র-বৈশাখ মাসের দিকে৷’

‘এখন তো মেলার সময় নয়?’ শাওন বলল৷ পরিদাদুর কথা শোনার জন্যে স্কুলের কাজ টাজ এতক্ষণে বন্ধ করে ফেলেছে সে৷

‘না, এখন মেলার সময় নয়’, পরিদাদু শাওনের কথারই প্রতিধ্বনি করলেন যেন, ‘আমরা সেখানে যাব অন্য একটি কারণে৷ প্রায় সপ্তাখানেক হল প্রাচীন মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আঁকড়ে থাকা সেই গাছের নীচে এক সাধু এসে আস্তানা গেড়েছেন৷ এলাকার লোক তাঁকে গন্ধবাবা নাম দিয়েছেন৷’

‘গন্ধবাবা! এ আবার কী রকম নাম?’ শাওন মজা পেয়ে জিজ্ঞেস করল৷

‘তিনি সর্বক্ষণ কুমকুম-চন্দন লেপে রাখেন কপালে, গায়ে৷ আর একটিই কথা বলেন, আমি এক বিশেষ পুষ্পগন্ধ খুঁজতে এসেছি এই এলাকায়৷’

‘কী ফুলের গন্ধ?’ সুছন্দা আশ্চর্য হয়ে বলে উঠলেন৷ শাওন আড়চোখে দেখল মায়ের চোখে-মুখেও এখন রীতিমতো কৌতূহল ফুটে উঠেছে৷

‘সেইটেই তো রহস্য!’ পরিদাদু ঠোঁট ওল্টান, ‘এলাকার মানুষ যে যেমন ফুল সংগ্রহ করতে পারছে, নিয়ে আসছে সাধুর কাছে৷ অথচ সাধু নির্বিকার৷ ফিরেও তাকাচ্ছেন না সেসব ফুলের দিকে৷ অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে মাথা নাড়ছেন আর বলে চলেছেন, ইয়ে নেহি, ইয়ে নেহি৷’

‘তাঁর খাওয়াদাওয়া, থাকা?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷

‘গ্রামের লোকই খাওয়ার ব্যবস্থা করছে রোজ৷ আহার তাঁর সামান্যই৷ একমুঠো নিরামিষ সেদ্ধ ভাত৷ রাতে একবাটি দুধ...’

‘ব্যস?’ সুছন্দা অবাক হয়ে বলেন৷

‘হ্যাঁ ওইটুকুই’, পরিদাদু মাথা নাড়লেন, ‘রাতে ওই পুরনো বট অশ্বত্থ গাছের চারদিকে তিনি আপন মনে ঘুরতে ঘুরতে মন্ত্রোচ্চারণের ঢঙে এক অদ্ভুত গান গান...’

‘কী গান?’ শাওন বেশ আগ্রহী এখন৷ কী একটা যেন রহস্যের গন্ধ উড়তে শুরু করেছে পরিদাদুর কথাগুলোর মধ্যে থেকে৷

পরিদাদু একটা অর্থহীন ছড়া কাটতে শুরু করলেন,

‘যে ফুল থেকে রক্ত ঝরে যে ফুল ঝরায় রক্ত

যে ফুল ভক্ত শক্তেরও নয় যে ফুল সত্যভক্ত...

সেই ফুলেরই গন্ধে ছোটে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি

জাদুকরের ঝোলায় ঘুমোয় শুভেচ্ছা ও প্রীতি...

কার হাতে দিই, কার হাতে দিই আঁকড়ে রাখা সুতো

যে বোঝে সে বুঝবে জানি ছল, চাতুরি, ছুতো...

বুঝতে পেলেই আসুক ছুটে সেই ফুলটির গন্ধ

আলো যখন কালোয় ঢেকে দু-চোখ রাখে বন্ধ...’

‘আরে, এ তো বাংলা গান!’ সুছন্দা বলে উঠলেন বিস্মিত কণ্ঠে, ‘একটু আগে তাঁর ‘ইয়ে নেহি’ বলা শুনে ভেবেছিলাম সাধু নন বেঙ্গলি৷ সত্যি বলতে কী, আমি একটু হতাশই হয়েছিলাম মনে মনে৷ সাধুর কাছে গিয়ে মন খুলে কথাই বলতে পারব না৷ যাই বলো বাপু, মাতৃভাষা ছাড়া মনের ভাব ঠিকঠাক বোঝানো মুশকিল...’

‘কবিতাটা কিন্তু খুবই ইন্টারেস্টিং’, সুছন্দার কথাটাকে গুরুত্ব না দিয়ে অরুণাংশু চোখ গোল গোল করে বলে উঠলেন, এটা একটা হেঁয়ালি নাকি হে পরিমল? নাকি কোনও গুপ্তধনের সূত্র টুত্র? কী মনে হচ্ছে তোমার?’

‘কী, সেইটেই তো বুঝতে চাইছি’, পরিদাদু মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললেন, ‘আর সেইজন্যেই এ মুহূর্তে সাধুর সামনাসামনি হওয়াটা বড্ড দরকারি৷’

‘তাই বলো’, সুছন্দা অভিমানী গলায় বললেন, ‘আমার জন্যে ট্রিপ প্ল্যান করার কথাটা তার মানে শুধুই ফাঁকা বুলি৷’

‘তা কেন’, পরিদাদু নরম গলায় বললেন, ‘তেমন হলে আমি একাই তো গিয়ে ঘুরে দেখে আসতে পারতাম৷ আমার বন্ধু শ্যামল থাকে ওখানে৷ কোনওই অসুবিধে ছিল না৷ আমি ভাবলাম, তোর সাধু-টাধুর ওপরে এত ভক্তি-শ্রদ্ধা৷ গন্ধবাবাকে দেখে এলে তোর ভালোই লাগবে...’

‘শ্যামলবাবুই কি এত সব কথা জানিয়েছেন তোমায়?’ অরুণাংশু সুছন্দাকে উত্তরে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই জিজ্ঞেস করলেন৷

‘হ্যাঁ’, পরিদাদু সম্মতি জানালেন, ‘শ্যামল সাধুর এই উদ্ভট গান নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করছিল৷ বলছিল, এলাকায় কোথা থেকে একটা আধ পাগল সাধু এসে জুটেছে৷ সারাক্ষণ সে শুধু প্রলাপ গাইছে আর অপ্রকৃতিস্থ আচরণ করছে৷ অথচ গ্রামের লোক তাকে নিয়েই মেতে আছে৷ এসব লোক দেখলে আজকাল ভয়ও হয়৷ লোকটা সত্যি সত্যিই পাগল না হতেও তো পারে৷ কে যে কী মতলব নিয়ে ঘুরছে, ওপর থেকে দেখে কি বোঝা যায়?’

‘শ্যামলবাবুর কথাটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয় কিন্তু’, অরুণাংশু সিরিয়াস গলায় বললেন৷

‘কে উড়িয়ে দিচ্ছে?’ পরিদাদু গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আমি যথেষ্ট সিরিয়াসলিই নিচ্ছি ব্যাপারটা৷ এমনকি ওই আপাত অদ্ভুত গানটাও রীতিমতো ভাবাচ্ছে আমায়৷’

‘তোমার কি মনে হয় ওই গানটার নির্দিষ্ট কোনও অর্থ আছে?’ শাওন জিজ্ঞেস করল৷

‘হুঁ’, পরিদাদু ওপর নীচে মাথা নাড়ালেন৷

বট-অশ্বত্থের ঝুরির ফাঁকে দক্ষিণমুখী পুরনো মন্দিরটা প্রায় ধ্বংসই হয়ে গেছে৷ উঁচু ভিতের ওপরে তিন দিকের ফুট সাতেক উঁচু দেওয়াল ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই৷ দেওয়ালগুলো কাদার গাঁথনিযুক্ত খুব পাতলা পাতলা ইট দিয়ে তৈরি৷

‘এই মন্দির কত দিনের পুরনো?’ অরুণাংশু জিজ্ঞেস করলেন৷

‘খুব পুরনো এটুকুই বলতে পারি’, শ্যামল মণ্ডল হাসলেন, ‘কিন্তু সেই খুবটা যে ঠিক কত, তা কেউ বলতে পারে না৷ একবার মন্দিরের সামনে মাটি কাটার সময় একটা তামার সিকি পাওয়া গিয়েছিল৷ ১৮৩৫ সালের৷ সম্ভবত মন্দিরে পুজো দিয়েছিল কেউ৷ লোকে বলে এটা শিবমন্দির৷ কয়েকটা প্রাচীন কালো পাথর আছে মন্দিরের মধ্যে৷ ওগুলোকেই শিবজ্ঞানে পুজো করে সবাই৷’

‘হুঁ’, মাথা নাড়লেন অরুণাংশু, ‘তার মানে অন্তত দুশো বছরের পুরনো৷

‘তার থেকে অনেকই বেশি’, পরিদাদু বললেন, ‘মন্দিরের ইটের গঠন তাই বলে৷ এসব অঞ্চল অত্যন্ত পুরনো৷ সঠিক উপায়ে উৎখনন করলে প্রচুর পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়ার সম্ভাবনা এই অঞ্চলে৷’

গন্ধবাবা বসেছিলেন মন্দির থেকে খানিক তফাতে৷ মাটির একটা চ্যাটালো ঢিবির ওপরে৷ আধবোজা চোখ৷ পরনে ত্যাগবস্ত্র৷ লম্বা চুলে জটা পড়েছে৷ গোঁফ দাড়িতে মুখ প্রায় ঢাকা৷ মুখের সামান্য যে অংশটুকু ফাঁকা, সেখানেও চন্দন লেপে রাখা৷ তাঁর হাতে পায়ে মাথায় নানান ধরনের সুগন্ধী ফুলের সাজ৷ ভক্তদের দেওয়া শ্রদ্ধার্ঘ্য৷ ফুলের মিষ্টি গন্ধে ভরে আছে পুরো চত্বরটা৷

শ্যামল মণ্ডল চাপা গলায় বললেন, ‘বুঝলি পরিমল, গন্ধবাবা দু’ বেলা নিজের আহার্যটুকু ছাড়া দক্ষিণা, ফল, মিষ্টি, কিচ্ছুটি নেন না৷ কথাও বলেন না তেমন কারও সঙ্গে৷’

‘আশ্চর্য!’ সন্ন্যাসীর দিক থেকে চোখ না সরিয়ে বললেন পরিদাদু৷

সুছন্দা বললেন, ‘কী একটা যেন ম্যাজিক আছে মানুষটার চেহারার মধ্যে৷ দেখলেই মনে ভক্তি আসে৷’

‘চল খুকু, সামনে গিয়ে সন্ন্যাসীকে প্রণাম করে আসি’, বলেই সামনের দিকে হাঁটা লাগালেন পরিদাদু৷ শাওন মনে মনে উত্তেজনা বোধ করছিল৷ অবিশ্বাসী না হলেও সাধু টাধুর প্রতি এমন ভক্তিও পরিদাদুর নেই যে দেখামাত্র তাঁকে প্রণাম করতে ছুটবেন৷ তার মানে এই সাধুর সম্পর্কে নিশ্চিত কোথাও একটা খটকা লেগেছে পরিদাদুর৷ তিনি তাই তাঁর আরও কাছে গিয়ে সরেজমিনে কিছু একটা যাচাই করে নিতে চাইছেন৷

গন্ধবাবার সামনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে কিছু মানুষ বসে ছিল৷ শাওনরা এগিয়ে যেতেই তারা সরে গিয়ে ওদের জন্যে জায়গা করে দিল৷ সুছন্দা সামনে গিয়েই মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন৷ শাওন আর অরুণাংশুকেও বললেন প্রণাম করতে৷ পরিদাদু গন্ধবাবার সামনে গিয়ে মাটির ওপরে বসে পড়লেন৷ দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে প্রণাম জানালেন তাঁকে৷ গন্ধবাবা স্থির চোখে তাকিয়ে রইলেন পরিদাদুর দিকে৷ তাকিয়েই রইলেন৷ গোঁফ দাড়ির আড়ালে তাঁর মুখে ধীরে ধীরে একটা রহস্যময় মৃদু হাসি ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল৷ সে হাসিটুকু শাওনের চোখ এড়াল না৷ শাওন নিশ্চিত পরিদাদুর চোখও নিশ্চিত এই হাসি লক্ষ করেছে৷

সুছন্দা নিজের পার্স থেকে একটা ঝকঝকে একশো টাকার নোট বের করে গন্ধবাবার দিকে বাড়িয়ে দিলেন৷ প্রণামী৷ কিন্তু গন্ধবাবা সজোরে দু’ দিকে মাথা নাড়াতে লাগলেন৷ সুছন্দা প্রায় জোর করেই টাকাটা তাঁর পায়ের ওপরে রাখলেন৷ গন্ধবাবা দ্রুত মাটি থেকে টাকাটা তুলে নিয়ে নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে মুঠো বন্ধ করলেন৷ চোখ বুজিয়ে বসে রইলেন দু’-এক মুহূর্ত৷ তারপর শাওনের ডান হাতটা টেনে নিয়ে তার তালুর ওপরে নিজের মুঠো খুলে ফেললেন৷ শাওন অবাক হয়ে গেল৷ মায়ের একশো টাকার নোটটার সঙ্গে আরও একটা এক টাকার কয়েন!

সুছন্দার বিস্ময়ে হাত কাঁপতে লাগল৷ পরিদাদু আড়চোখে ব্যাপারটা দেখলেন৷ তাঁর কপালে ভাঁজ পড়েছে৷

গন্ধবাবার মুখে আবার একটা অদ্ভুত হাসি ছড়াল৷ হঠাৎই পরিদাদুর দিকে চাইলেন তিনি৷ গলায় কৌতুক নিয়ে বললেন, ‘অপেক্ষা করতে করতে যে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম৷’

‘আমার জন্যে?’ পরিদাদু সত্যিই অবাক হলেন এইবার৷

‘তা নইলে কার জন্যেই বা এখানে আসন বিছিয়ে বসে আছি তিন রাত্তির পার করার পরেও?’

‘কিন্তু কেন?’ খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন পরিদাদু৷

গন্ধবাবা সে প্রশ্নের আর উত্তর দিলেন না৷ চোখ বুজিয়ে দু’ হাত তুলে দুলে দুলে গাইতে শুরু করলেন,

‘‘যে ফুল থেকে রক্ত ঝরে যে ফুল ঝরায় রক্ত

যে ফুল ভক্ত শক্তেরও নয় যে ফুল সত্যভক্ত...

সেই ফুলেরই গন্ধে ছোটে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি

জাদুকরের ঝোলায় ঘুমোয় শুভেচ্ছা ও প্রীতি...’’

ফেরার সময় অটোতে পরিদাদু অন্যমনস্ক গলায় একবার বললেন, ‘গন্ধবাবার হাতের আঙুলগুলো, গলার স্বর, চেনা চেনা লাগছে কেন? তাঁকে কি আগে দেখেছি, নাকি সবটাই আমার মনের ভুল?’

শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘গন্ধবাবাকে কি সত্যিই কোনও বদলোক মনে হল তোমার, পরিদাদু?’

পরিদাদু উত্তর দিলেন না৷ গম্ভীর মুখে তাকিয়ে রইলেন বাইরের দিকে৷

সুছন্দা বললেন, ‘আজ রাতে আমাদের ওখানেই রাতের খাওয়াটা সেরে যেও৷’

‘উঁহু’, দু’দিকে মাথা নাড়ালেন পরিদাদু, ‘আমাকে বাড়ি যেতে হবে৷’

‘কেন?’ অরুণাংশু ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী এমন জরুরি কাজ মনে পড়ে গেল তোমার?’

‘আমার একটু একা থাকা দরকার৷’

‘আমার বাড়িতে একা থাকতে কে আটকাচ্ছে তোমাকে?’ অরুণাংশু বললেন বিরক্ত গলায়, ‘তোমার জন্যে একখানা ঘর তো রাখাই থাকে৷ সেখানে বসে শুয়ে যত খুশি ভাবো না৷ তুমি বাড়ি চলে গেলে আমরা যে মনে মনে ছটফট করতে থাকব সর্বক্ষণ৷ বুঝতেই তো পারছি, কিছু একটা রহস্য দানা পাকিয়ে উঠছে৷ সে রহস্যটা যে কী, তা না জানা পর্যন্ত আমরাই কি নিশ্চিন্ত হতে পারব?’

পরিদাদু শেষে নিমরাজি হলেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে৷ তাই চলো৷ আজ রাতটা তোমাদের সঙ্গেই কাটিয়ে যাই৷’

শাওন মনে মনে খুশি হল৷ পরিদাদু সঙ্গে থাকলে তাকে আর পায় কে৷ হরেক গল্প পরিদাদুর ভাণ্ডারে৷ আর তার চেয়েও যেটা বড় কথা, পরিদাদুর সঙ্গে থাকলে সন্ধেবেলা পড়তে না বসলেও মা তেমন বকাবকি করতে পারবে না আজ৷

তেমনটা অবশ্য হল না৷ বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুয়ে, চেঞ্জ করে সেই যে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করলেন পরিদাদু, বেরোবার নামটিও করলেন না আর৷ সন্ধে গড়িয়ে রাত নামল৷

ঘড়ির কাঁটা যখন দশটার দিকে গড়াতে শুরু করেছে, সুছন্দা উদ্বেগের সঙ্গে অরুণাংশুকে বললেন, ‘পরিকাকুর ব্যাপারটা কী বলো তো? খাওয়া-দাওয়াও কি করবে না?’

‘ডাকব?’ একটু ইতস্তত ভঙ্গিতে বললেন অরুণাংশু৷ আর ঠিক তখনই দরজা খুলে বেরোলেন পরিদাদু৷ পুরো মুখটা খুশিতে ঝলমল করছে৷ সুছন্দার দিকে তাকিয়ে তাড়া দিলেন পরিদাদু, ‘খুকু, দ্রুত খাওয়ার বন্দোবস্ত কর৷ এক্ষুনি বেরোতে হবে৷’

‘এখন, এই রাতে? কোথায়?’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন অরুণাংশু৷

‘আঁধারমানিক’, পরিদাদু একগাল হাসলেন, ‘শ্যামলকেও বলে দিয়েছি৷ ও অপেক্ষা করবে৷ চটজলদি রেডি হয়ে নিতে হবে আমাদের৷ হাতে সময় নেই আর৷’

‘ব্যাপারটা কী?’ সুছন্দা চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করেন৷

‘আমি সত্যিই এবার বুড়ো হচ্ছি’ পরিদাদু হো হো করে হেসে উঠলেন, ‘একেবারে নির্বোধ হয়ে গেছি আমি, যাকে বলে বোকার হদ্দ৷ তা নইলে এই সামান্য বিষয়টা বুঝতে এত সময় লেগে গেল আমার!’

‘অত ভনিতা না করে ব্যাপারটা একটু খুলে বলবে দয়া করে?’ অরুণাংশু অসহিষ্ণু গলায় বললেন৷

পরিদাদু হাসতে হাসতেই বললেন, ‘গন্ধবাবার গানটা আমার উদ্দেশে একটা অত্যন্ত সরল এবং সোজাসাপটা মেসেজ৷ সুচিন্তন আমাকে গভীর রাত্রিতে তার সঙ্গে দেখা করতে নির্দেশ দিচ্ছে ওই গানের মধ্যে দিয়ে৷’

‘সুচিন্তনটা আবার কে? সে আবার এর মাঝখানে কোথা থেকে হাজির হল?’ সুছন্দা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন৷

সুচিন্তন আমার এবং শ্যামলের বহুদিনের বন্ধু৷ আঁধারমানিকেই থাকত৷ ছেলেবেলা থেকেই অত্যন্ত মেধাবী এবং খামখেয়ালি ছিল৷ কেমিস্ট্রি নিয়ে পড়ে দারুণ রেজাল্ট করেও চাকরি-বাকরি না করে পেশাদার ম্যাজিশিয়ান হয়ে গেল ছেলেটা৷ ব্ল্যাক ম্যানড্রেক নামে দেশে-বিদেশে খেলা দেখিয়ে বেড়াত এক সময়...’

‘ঠিক, ঠিক’, অরুণাংশু মাথা নাড়লেন, ‘মনে পড়েছে৷ আমিও সম্ভবত ব্ল্যাক ম্যানড্রেকের খেলা দেখেছিলাম একবার৷ কিন্তু বহুদিন তাঁর শো-এর আর কোনও বিজ্ঞাপন দেখি না কাগজপত্রে৷’

‘দেখবে কী করে?’ অন্তত বারো-তেরো বছর ধরে সে তো নিরুদ্দেশ৷ কেউ তার খবর পাইনি৷ আজ এতদিন বাদে তাকে আবার দেখলাম সামনে থেকে৷ দেখে অবশ্য তখন চিনতে পারিনি৷’ পরিদাদু থামলেন৷ হেসে বললেন, ‘আর শ্যামল তো এখনও চিনে উঠতে পারেনি তাকে...’

‘গন্ধবাবা?’ শাওন পরিদাদুর কথার মাঝখানেই বলে ওঠে৷

‘আবার কে?’ হো হো করে হাসতে হাসতে মাথা নাড়লেন পরিদাদু, ‘ওই গানটার মানে খুঁজতে বসে এতক্ষণে সবটা পরিষ্কার হল আমার কাছে৷’

সুছন্দা টেবিলে রাতের খাবার সাজিয়ে ফেলেছেন ততক্ষণে৷ পরিদাদু জামালকাকুকে ফোন করে অটো নিয়ে চলে আসতে বলে দিয়েছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব৷

খেতে খেতে শাওন জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু ওই গানটার মানে আমি তো এখনও বুঝতে পারছি না পরিদাদু৷’

‘আমিও বুঝিনি৷’ সুছন্দাও বললেন৷

‘বোঝার জন্যে মাথা ঘামাতে হবে’, পরিদাদু মৃদু হাসলেন৷

‘মাথা আমাদের অত সহজে ঘামে না’, খেতে খেতেই অরুণাংশু বললেন, ‘তুমিই বলে দাও বাপু৷’

জামালকাকু এসে গেছে ততক্ষণে৷ দ্রুত তৈরি হয়ে নিয়ে শাওনরা গাড়িতে চড়ে বসল৷ পথে যেতে যেতে পরিদাদু বলতে থাকলেন, ‘সুচিন্তনটা সন্ন্যাসী হয়েও পাল্টায়নি৷ একইরকম ইন্টেলিজেন্ট আর রহস্যপ্রিয়৷ আমাদের কাছে সরাসরিই পরিচয়টা ভাঙতে পারত৷ তা নয়, সেই আমাকে পরীক্ষায় ফেলা৷ আগেরই মতো৷’

‘কিন্তু গানের মানেটা?’ শাওন অধৈর্য হয়ে বলে৷

‘পরিমল শব্দটার মানে জানিস শানু?’ পরিদাদু হাল্কা গলায় জিজ্ঞেস করলেন৷

‘হুঁ৷’

‘কী?’

‘ফুলের গন্ধ’, বলেই চমকে উঠল শাওন, ‘আরিব্বাস, পরিদাদু, কী দারুণ! যে ফুল থেকে রক্ত ঝরে/ যে ফুল ঝরায় রক্ত... তুমি সেনাবাহিনীতে ছিলে বলেই...’

‘সাবাস’, পরিদাদু পিঠ চাপড়ে দেন শাওনের৷

‘তুমি তো সত্যি সত্যিই চিরকাল শক্তের নয়, সত্যেরই ভক্ত...’, অরুণাংশু হাসলেন, ‘গন্ধবাবা যে বিশেষ পুষ্পগন্ধ খুঁজছেন তার সন্ধান তো পাওয়া গেল৷ কিন্তু জাদুকরের ঝোলায় কী প্রীতি উপহার আছে বলো তো তোমার জন্যে?’

‘গিয়ে দেখা যাক’, পরিদাদু হাসলেন৷

সুছন্দা বললেন, ‘কিন্তু এই মাঝরাত্তিরে তাঁর কাছে যাওয়া কেন?’

‘সেটাও সুচিন্তনই বলতে পারবে’, পরিদাদু বললেন, ‘আমি শুধু তার নির্দেশ পালন করছি৷ ওই যে সে তার গানের ধাঁধার শেষে বলে দিয়েছে, আলো যখন কালোয় ঢাকা থাকবে এবং সকলের দু’চোখ বন্ধ থাকবে, তখনই ছুটে যেতে হবে তার কাছে...’

গন্ধবাবা সেই মাটির বেদির ওপরেই বসেছিলেন৷ আকাশে চাঁদ জ্বলজ্বল করছে৷ সেই আলো এসে পড়েছে তাঁর গায়ে৷ পরিদাদুদের দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন৷ দু’ হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘জানতাম, পরিমল আমার বার্তাটা বুঝবেই এবং আজই ফিরে আসবে সঠিক সময়ে৷ আমিও তাই সব প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছি শুধু তোদেরই অপেক্ষায়৷’

শ্যামল অভিমানের সুরে বললেন, ‘আমাকে নিজের পরিচয়টা দিতে কী হয়েছিল তোর? শুধু শুধু এই ক’দিন এত কষ্ট করে খোলা আকাশের নীচে পড়ে রইলি এইখানে গাছতলায়৷ আগে জানলে কিছুতেই এখানে থাকতে দিতাম না৷ নিজের বাড়িতে নাও যদি যেতিস, আমার বাড়িতে ঠিক ধরে নিয়ে যেতাম তোকে...’

‘ওইজন্যেই তো পরিচয় দিইনি’, গন্ধবাবা ভারি মিষ্টি করে হাসলেন, ‘সন্ন্যাসীর পূর্বাশ্রমের নাম মুখে নেওয়া নিষেধ৷ গৃহীর বাড়িতে গিয়ে ওঠাও তার পক্ষে সমীচীন নয়...’

‘তাই বলে...’

‘আমার এখানকার কাজ শেষ৷ সন্ন্যাসের নিয়মানুযায়ী গৃহত্যাগের বারো বছর পরে একবারের জন্যে এসেছিলাম ভিটে দেখতে৷ আর এসে মনে হল, একটা কাজ যে বাকি থেকে গেছে এখনও! তখনই পরিমলের কথা মনে এল৷ মনে হল, আমার এই কাজে পরিই ঠিকঠাক সাহায্য করতে পারবে আমাকে৷ সে কাজের জন্যেই তোর মারফত পরিমলকে ডেকে আনতে চেয়েছিলাম আমার কাছে ওই গানের মধ্যে দিয়ে,’ শ্যামলকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলে ওঠেন গন্ধবাবা৷

পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন শান্ত কণ্ঠে, ‘তুই কিছু একটা বোধহয় দিতে চাস আমাকে৷’

‘হ্যাঁ, এইটে’, বলে ঝোলা থেকে একটা ইঞ্চি ছয়েক লম্বা কালো পাথরের মূর্তি বের করে এনে পরিদাদুর হাতে দিলেন গন্ধবাবা, ‘জাগতিক এই একটি জিনিসের মোহই আমি ত্যাগ করতে পারিনি এতদিন৷ সঙ্গে করে বয়ে বেড়িয়েছি৷ অনেকদিন থেকেই মনে হচ্ছিল, সন্ন্যাসীর পক্ষে এ আসক্তিটুকুও বেমানান৷ এখানে আসার পর মনে হল, এই ঠিক সময়৷ নিজের পুরনো ভিটের মায়া যখন চিরকালের মতো ত্যাগ করতে চলেছি, সে বাসগৃহের ইষ্টমূর্তিকেই বা বয়ে বেড়াই কেন! এঁকেও ত্যাগ করার সময় এসেছে মনে হতেই মানসপটে তোর মুখ ভেসে উঠল পরিমল৷ মনে হল সংসারের সঙ্গে আমার এই শেষ সূত্রটির সঠিক মূল্য এখানে একমাত্র তুই-ই হয়তো বুঝবি৷ তাই চাইছিলাম, তোর হাতে এঁকে তুলে দিয়ে যাই যাতে গুরুত্ব বুঝে এই মূর্তির একটা কোনও উপযুক্ত বিলিবন্দোবস্ত করতে পারিস৷’

‘কী মূর্তি এটা?’ পরিদাদু, শ্যামল মণ্ডল, অরুণাংশু তিনজনেই প্রায় একইসঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন৷

‘প্রায় হাজার খানেক বছরের পুরনো, খুব রেয়ার তারামূর্তি৷ আঁধারমানিকের এই প্রাচীন মন্দিরের কাছে মাটি খুঁড়েই পাওয়া গিয়েছিল একসময়৷ আমার ঠাকুর্দা পেয়েছিলেন৷ আমাদের বাড়ির দক্ষিণ দিকের পুকুরটা খুঁড়তে গিয়ে৷ জেনে আশ্চর্য লেগেছিল, আমার ঠাকুর্দা সেই সেকালেও কত আধুনিক মনের মানুষ ছিলেন৷ দেবীমূর্তি নয়, এই পাথরের মূর্তিটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্ননিদর্শন হিসেবেই সংরক্ষণ করেছিলেন তিনি৷

‘জিনিসটা পেলি কোথায়?’ পরিদাদু জিজ্ঞেস করলেন৷’

‘বাড়ির একটা পুরনো ট্রাঙ্ক থেকে মূর্তিটা উদ্ধার করেছিলাম৷ সঙ্গে ঠাকুর্দার হাতে লেখা একটা নোটবুক’, ঝোলা থেকে একটা জীর্ণ খাতার মতো কিছু বের করে মূর্তিটার সঙ্গে একইসঙ্গে পরিদাদুর হাতে দিলেন গন্ধবাবা, ‘এই যে৷ এই দুটো জিনিস তোকে দিয়ে আজ সত্যিকারের ফকির হলাম আমি পরিমল৷ ঠাকুর্দাদার নোটবইটা সময় করে পড়িস৷ লেখাগুলো পড়ে দেখলে বুঝতে পারবি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার ইতিহাস নতুন করে লেখা সত্যিই কতখানি জরুরি...’

‘এগুলোর কথা পাঁচকান করতে চাস না বলেই এত রাতে ডেকে পাঠালি আমায়?’ পরিদাদু হাসলেন৷

‘ঠিক তাই’ গন্ধবাবা দু’ হাত দিয়ে একবার পরিদাদু আর একবার শ্যামল মণ্ডলের দু’কাঁধ স্পর্শ করলেন, ‘বুঝিসই তো সব৷ এলাকার মানুষের সেন্টিমেন্ট অন্যরকম হতেই পারত৷ তারা এসব জানলে হয়তো এই মূর্তি ভাঙা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করারই দাবি করে বসত৷ অথচ তুই তো জানিস, আইনত তা হয় না...’

‘ঠিকই’, পরিদাদু সম্মতি জানালেন তাঁর কথায়৷

‘এখন তুই যা ভালো বুঝিস করিস’, বলে পরিদাদুর কাঁধে হাত রাখলেন গন্ধবাবা৷ তারপর মৃদু গলায় বললেন ‘আসি৷ রাতে না হলে এত সহজে এ গ্রামের মানুষের কাছ থেকে ছুটি পাওয়াও ভারি মুশকিল হত৷ আমার প্রকৃত পরিচয় এরা কেউ জানে না৷ সে পরিচয় কেউ জানুক তা আমি চাইওনি৷ কিন্তু একজন অচেনা সন্ন্যাসী হিসেবেও যে ভালোবাসার বাঁধনে এরা আমাকে বেঁধেছে, সে বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়াও কম কঠিন নয়৷ আর যদি বেশি দেরি করি, এদের ভালোবাসা আমার পিছুটান বাড়িয়ে দেবে ভাই পরিমল৷ সে আমার সন্ন্যসধর্মের পক্ষে বড় হানিকর৷’

‘আসি মানে?’ শ্যামল দু’হাত দিয়ে ধরে ফেললেন তাঁকে, ‘এতক্ষণ ধরে তোর অনেক লেকচার শুনেছি মুখ বুজে৷ কিন্তু আর নয়৷ এবার তোকে আমি কিছুতেই ছাড়ব না৷ আমাদের সকলকে ফাঁকি দিয়ে এভাবে কিছুতেই তুই চিরকালের জন্যে চলে যেতে পারিস না সুচিন্তন৷’

‘আমি রমতা সাধু’, গন্ধবাবা হাসেন, ‘এক জায়গায় বেশিদিন থাকার যে জো নেই আমার৷’

‘কোথায় যাচ্ছিস সেটুকু অন্তত বলে যা আমাদের৷’

‘তা হয় না শ্যামল৷ ছেলেমানুষি করিস না৷ আমাকে যেতে দে এইবার৷’

‘সব ত্যাগ করে এভাবে ঘুরে ঘুরে তুই কী পেতে চাস জীবনে?’

‘আনন্দ, যা বহু ধন দৌলতের বিনিময়েও মানুষ কিনতে পারে না,’ বলেই আর কারও দিকে না তাকিয়ে জ্যোৎস্নাভেজা পথের ওপর দিয়ে কোন অজানা গন্তব্যের দিকে হাঁটতে থাকেন গন্ধবাবা৷

শাওন একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে সেই ক্রমশ ফিকে হয়ে যাওয়া ছায়ামূর্তির দিকে৷ ঋজু শরীর৷ দৃপ্ত পদক্ষেপ৷ এ পৃথিবীর কোনও পার্থিব সম্পদের দিকে দৃকপাত মাত্র না করে সোজা দিগন্তের দিকে হেঁটে চলেছেন তিনি৷

তাঁর কিচ্ছুটি নেই, তবু একমাত্র তিনিই যেন পরিপূর্ণ৷

অধ্যায় ১ / ৫
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%