হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

ছোট্ট একটা জায়গা। মাত্র তিন-চারটে এক-দু’কামরার কাঠের বাড়ি, যেগুলোর সামনের অংশটা দোকান হিসাবে ব্যবহৃত হয়। মোমো, চিপসের প্যাকেট, নরম পানীয়, এমনকী ক্ষেত্রবিশেষে একটু লুকিয়ে সস্তা দামের মদও বিক্রি হয়। আর বিক্রি হয় টুকিটাকি শীতবস্ত্র। যার অধিকাংশই আসলে ব্যবহৃত। অতি ক্ষুদ্র পাহাড়ি জনবসতি যেমন হয়, এ জায়গাও ঠিক তেমনই।
এ জায়গা থেকে পায়েচলা রাস্তা সোজা এগিয়ে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছে অজানার উদ্দেশে। পথের দু’পাশে পাইন বন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে গিয়েছে আকাশের দিকে। তারই ফাঁক গলে শেষ দুপুরের সোনালি আলো এসে পড়েছে দোকান ঘরগুলোর ঢালু ছাদে আর সামনের ওই আঁকাবাঁকা রাস্তায়। ওটাই শর্মিষ্ঠার ট্রেকিং রুট। ওই পথেই এগোবে সে।
ট্রেকিং শর্মিষ্ঠার পুরোনো নেশা। অফিসে ছুটিছাটা পেলে আজও একলাই পথ চলতে বেরিয়ে পড়ে সে নানা অচেনা পাহাড়ি পথে। যারা ‘সোলো ট্রেকার্স’ অর্থাৎ একলা পথ চলে, তারা জানে এ পথ চলার রোমাঞ্চই আলাদা, বিশেষত সে পথ যদি অচেনা অথবা ‘নন-কনভেনশনাল’ হয়। ঠিক যেমন এবারের পথটা, ওই সামনের পথটা, যে পথে এগোবে শর্মিষ্ঠা। এ ট্রেকিং রুটের খবর সে পেয়েছে ট্রেকিং বিষয়ক একটা ম্যাগাজিন থেকে।
গত বসন্তে একটা দল এসেছিল এ পথ ট্রেক করতে। তাদেরই কেউ একজন লিখেছিল সেই লেখাটা। বিস্তৃত নয়, সংক্ষিপ্ত একটা বিবরণ। এ পথ যেখানে শেষ হয়েছে তার চারপাশটা নাকি উন্মুক্ত। সেখান থেকে নাকি হাত বাড়িয়ে ছোঁয়া যায় কাঞ্চনজঙ্ঘাকে! আর বলতে গেলে এ ব্যাপারটাই শর্মিষ্ঠাকে এ-পথে আসার জন্য প্ররোচিত করেছে।
নীচ থেকে প্রায় ঘণ্টা পাঁচেক ট্রেক করে বর্তমানে এই ছোট্ট গ্রামটায় উঠে এসেছে শর্মিষ্ঠা। একটা দোকানে সে বসেছিল কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার জন্য, আর তার যাত্রাপথ সম্পর্কে কিছুটা তথ্য সংগ্ৰহ করার জন্য।
পাহাড়ি জনজাতির দোকানদার মহিলা বলল, ‘এ পথে তেমন কিছু সমস্যা নেই। পাইন বনে লেপার্ড আছে বটে, তবে তারা মানুষকে কোনওদিন আক্রমণ করেছে বলে শুনিনি। আর চোর-ডাকাতের কোনও ভয় নেই, কারণ এখানকার কোনও লোকজনই খারাপ নয়। অসুবিধা শুধু একটাই। শেষ পাঁচ-সাত মাইল পথ অসম্ভব চড়াই, আর পায়ের তলার নুড়িগুলো বড্ড ঝুরো। সাবধানে পা ফেলতে হয়। তবে তোমায় যে এ পথেই নামতে হবে, ফিরতে হবে এমন কোনও ব্যাপার নেই। ওদিকের পথটা নীচে নামার জন্য তুলনামূলক সহজ।’
তার কথা শুনে শর্মিষ্ঠা জানতে চাইল, ‘রাতে মাথা গোঁজার জায়গা কি আছে? আজ রাতটা তো থাকতে হবে। হয়তো-বা কাল রাতটাও থাকতে হতে পারে।’
মাঝবয়সি মহিলা শর্মিষ্ঠার কথা শুনে বলল, ‘কয়েকটা ট্রেকার্স হাট আছে এক কামরার। সরকার থেকে বানানো। দরজা খুলে ঢুকে পড়লেই হল। এছাড়া একটা বাড়ি অবশ্য ওদিকে আছে...।’ এ কথা বলার পর সেই মহিলা তার ব্যবসায়িক প্রসঙ্গ পাড়ল। সে বলল, ‘খাড়াই পথে ওঠার জন্য ওয়াকিং স্টিক লাগবে কিন্তু। পথে আর দোকান পাবে না। আমার থেকে নিয়ে যাও।’—এই বলে সে আঙুল তুলে দেখাল ঘরের কোণে দেওয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে রাখা একগোছা ওয়াকিং স্টিক বা পথচলা লাঠির দিকে।
হ্যাঁ, এ জিনিস শর্মিষ্ঠার প্রয়োজন হতে পারে। তাই সে প্রশ্ন করল, ‘দাম কত?
দোকানি তেরছা চোখে বলল, ‘হাজার টাকা দিলেই হবে।’
দাম শুনেই বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়াল শর্মিষ্ঠা। সে বুঝতে পারল সুযোগ বুঝে এ মহিলা তাকে ঠকানোর চেষ্টা করছে। নইলে একটা সাধারণ কাঠের লাঠির দাম কেউ হাজার টাকা বলে! শর্মিষ্ঠার হাজার টাকা দেওয়ার ক্ষমতা আছে ঠিকই, কিন্তু এক্ষেত্রে তার মনে হল লাঠিটা কিনলে অন্যায়ের সঙ্গে আপস করা হবে। তাছাড়া যাত্রাপথে পড়ে থাকা গাছের ডাল দিয়েও কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। তাই সে দোকানি মহিলাকে হতাশ করে দিয়ে বলল, ‘থাক, স্টিকের দরকার নেই।’ একথা বলে সে চা ইত্যাদির দাম মিটিয়ে পিঠের রুকস্যাক তুলে নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল।
এদিকে এখানকার পথ খুব বেশি খাড়াই নয়। এঁকেবেঁকে ধীরে ধীরে উপরে উঠেছে। পাইন বনের ভিতর রোদের ঝিকিমিকি খেলা করছে। কখনও বা উপর থেকে দেখা যাচ্ছে নীচের পাকদণ্ডী, যে পথে শর্মিষ্ঠা উপরে উঠে এসেছে। বাতাসও খুব বেশি একটা ঠান্ডা নয়, অক্সিজেনের মাত্রাও প্রচুর। সব মিলিয়ে পরিবেশ খুব ভালোই বলা চলে।
শর্মিষ্ঠার হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল। হঠাৎই একটা পাখি দেখতে পেল। উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের লেজঝোলা একটা পাখি। পিক পিক ডাক দিতে দিতে পাইন বনের মাথা থেকে নেমে বলতে গেলে শর্মিষ্ঠার নাকের ডগা দিয়ে নীচের জঙ্গলের দিকে নেমে গেল। কী পাখি ওটা? আর এর পরই একজনের কথা মনে পড়ে গেল শর্মিষ্ঠার। নীলের কথা। তার পুরো নাম অবশ্য শুভ্রনীল, কিন্তু শর্মিষ্ঠা একান্তে নীল বলেই ডাকত তাকে।
নীল, পাখি চিনত। বিশেষত এই সব পাহাড়ি রাস্তায় ট্রেকিংয়ের পথে সে পাখি দেখলেই বলে দিতে পারত সেটা কোন পাখি? এ পাখিটা দেখলেও নিশ্চিত সে চিনতে পারত। নীলের কথা ভাবতেই হাঁটতে হাঁটতে অনেকদিন পর পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে পড়তে লাগল শর্মিষ্ঠার। নীলের কথা, তার সঙ্গে নানা জায়গায় ট্রেকিংয়ের কথা।
আসলে নীলের একটা ছোট ট্রেকিং ইনস্টিটিউট ছিল। ছোটখাটো দলকে নিয়ে ছোটখাটো ট্রেকিং করাত সে। একবার বক্সায় ট্রেকিং টিম নিয়ে গিয়েছিল নীল। সেই দলের সঙ্গেই শর্মিষ্ঠার প্রথম ট্রেক করতে যাওয়া। বলা যেতে পারে নীলের হাতে সেবারই প্রথম ট্রেকিংয়ের হাতেখড়ি হয়েছিল শর্মিষ্ঠার। তারপর ধীরে ধীরে সে কীভাবে যেন মানসিকভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল নীলের সঙ্গে।
দুজনে একসঙ্গে হেঁটেছে কত অচেনা পাহাড়ি পথে, অজানা রাস্তায়। কিন্তু নীলের সঙ্গে শর্মিষ্ঠার যোগাযোগ, ঘনিষ্ঠতা যেমন অদ্ভুতভাবে তৈরি হয়েছিল তেমন তাদের মধ্যে বিচ্ছেদও সৃষ্টি হয়েছিল বেশ অদ্ভুতভাবে। না, কোনও ঝগড়াঝাঁটি নয়, তারা নিজেরাই পরস্পরের থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিয়েছিল। শর্মিষ্ঠা তখন নীলের প্রায় ছায়াসঙ্গী বলা যেতে পারে।
সেবার নীল আট-দশ জনের একটা ছোট টিম নিয়ে চলেছে সান্দাকফু-ফালুট ট্রেক করার জন্য। যে টিমে নন্দিতা বলে বড়লোকের এক তনয়া আছে। তার সবসময় সবকিছুতে এগিয়ে থাকা চাই। যাত্রা শুরুর দিন ভোরবেলায় শর্মিষ্ঠাকে আলাদা ডেকে নীল বলেছিল, কৌশলে নন্দিতাকে প্রথমে পৌঁছে দিতে হবে গন্তব্যে। কারণ সে সেটাই চায়।
শর্মিষ্ঠা বিস্মিত হয়ে বলেছিল, ‘ও চাইলেই ওকে আগে পৌঁছে দিতে হবে? মেয়েটার হাঁটার যা ধরন, তাতে তো মনে হয় সবশেষে ও পৌঁছোবে।’
নীল শর্মিষ্ঠার কথার জবাবে বলেছিল, ‘ব্যবসায়িক দিকটাও আমার দেখা প্রয়োজন। ও প্রথম ট্রেক শেষ করলে পাঁচ হাজার দেবে বলেছে।’
কিন্তু শর্মিষ্ঠা সেদিন রাজি হয়নি নীলের প্রস্তাবে। অন্য মেয়েদের নিয়ে নন্দিতা নামের ওই মেয়েটাকে পিছনে ফেলে সে অনেক আগেই পৌঁছেছিল গন্তব্যে। নন্দিতাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রাখা সম্ভব হয়নি নীলের। হয়তো-বা তার আর্থিক ক্ষতিও হয়েছিল। নীল অবশ্য এ ব্যাপার নিয়ে শর্মিষ্ঠাকে মুখে কিছু বলেনি। কিন্তু তারপর থেকেই দুজনের সম্পর্কে চিড় ধরেছিল।
প্রথমে বন্ধ হয়েছিল তাদের দুজনের একসঙ্গে ট্রেকিংয়ে যাওয়া। তারপর ধীরে ধীরে একদিন কীভাবে যেন তারা পরস্পরের থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। গত দশ বছর নীলের কোনও খবর নেই শর্মিষ্ঠার কাছে। তার ট্রেকিং ইনস্টিটিউটটাও আছে কি না, জানা নেই তার। তবে নীল তার রক্তে যে নেশাটা ধরিয়ে দিয়েছিল সে নেশাটা এখনও রয়ে গিয়েছে—ট্রেকিংয়ের নেশা। কোনও দলের সঙ্গে নয়, একলাই ট্রেক করে সে।
নীলের কথা, পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে আর চারপাশ দেখতে দেখতে চলতে চলতে শর্মিষ্ঠার বেশ কয়েক ঘণ্টা পথ কীভাবে যেন কেটে গেল। নীচের সেই দোকানগুলো ছেড়ে বেশ অনেকটাই উপরে উঠে এল সে।
বিকেল হয়ে গিয়েছে এখন। পাইন বনের ভিতর থেকে ভেসে আসা বাতাসও ঠান্ডা হতে শুরু করেছে। ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এরপর অন্ধকার নামবে। তার আগেই মাথা গোঁজার একটা আস্তানা খুঁজে বের করতে হবে শর্মিষ্ঠাকে। একান্ত যদি তা না পাওয়া যায় তবে সঙ্গে আনা তাঁবুতে রাত্রিবাস করতে হবে।
শর্মিষ্ঠার একটা ট্রেকার্স হাট চোখে পড়ল। কিন্তু তার দরজাটা ভেঙে একপাশে ঝুলছে। এর আগে কেউ বা কারা সেখানে এসে থেকেছিল। থার্মোকলের প্লেট, বিয়ারের খালি ক্যান ইত্যাদি ফেলে রেখে জায়গাটা তুমুল অপরিচ্ছন্ন করে রেখেছে। এসব লোকজনের কোনও সিভিক সেন্স নেই, মনে মনে বলল শর্মিষ্ঠা। থাকার জন্য সে জায়গা পছন্দ না হওয়াতে আবারও হাঁটতে শুরু করল। পাইন বনের আড়ালে সূর্য ঢলতে শুরু করেছে।
শর্মিষ্ঠা দেখার চেষ্টা করতে লাগল তাঁবু ফেলার জন্য কোনও উপযুক্ত স্থান মেলে কি না। এমন জায়গা, যেখানে কোনও কারণে প্রচণ্ড বাতাস হলেও তাঁবু উড়ে যাবে না। যে ম্যাগাজিনে শর্মিষ্ঠা এই ট্রেকিং রুটের কথা পড়েছিল, সেখানে লেখা ছিল চাঁদনি রাতেও নাকি এ-পথে ট্রেক করা যায়। কিন্তু শর্মিষ্ঠার ইচ্ছা, বিশ্রাম নিয়ে পরদিন ধীরেসুস্থে বাকি পথটা ট্রেক করে সেই জায়গায় পৌঁছোবে, যেখান থেকে উন্মুক্ত হিমালয় দেখা যায়।
চারপাশে তাকাতে তাকাতে হঠাৎই একটা বাঁক পেরিয়ে একটা ছোট সমতল মতো জায়গায় পৌঁছে রাস্তার প্রায় গায়েই পাহাড়ের ঢালে একটা বাড়ি দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল শর্মিষ্ঠা। সত্যি কথা বলতে কী এমন জায়গায় কোনও বাড়ি দেখতে পাবে বলে আশা করেনি সে।
সবুজ ঢালু ছাদওয়ালা একটা কাঠের বাড়ি। সামনে কাঠের রেলিং দেওয়া বারান্দা ও তার গায়ে কাচের শার্সি বসানো সার সার বেশ কয়েকটা ঘর। অনেকটা দেখতে হোম স্টের বাড়িগুলো যেমন, ঠিক তেমনই। তবে কিছুটা অপরিচ্ছন্নতার ছাপ আছে বাড়িটায়। তার ঢালু ছাদ আর বারান্দার নীচের উঠোনটায় জমে আছে ঝরা পাতা। ঠিক মতো ঝাঁট পড়ে না মনে হয়।
শর্মিষ্ঠা এগিয়ে গেল বাড়িটার কাছে। বারান্দায় ওঠার সিঁড়ির মুখে একটা বুড়ো লোক উবু হয়ে বসেছিল। পাহাড়ি লোক, মুখে অসংখ্য বলিরেখা, মাথায় একটা ভেড়ার চামড়ার টুপি, গায়ে শতচ্ছিন্ন জ্যাকেট। বিড়ি টানছিল লোকটা। শর্মিষ্ঠা তাকে প্রশ্ন করল, ‘ওটা কি তোমার হোম স্টে? রাতে থাকার জায়গা পাওয়া যাবে?’
লোকটা জবাব দিল, ‘যারা বাড়িটা বানিয়েছিল তারা আর আসে না। তাই আমিই দেখাশোনা করি। ঘর পাওয়া যাবে।’
শর্মিষ্ঠা জানতে চাইল, ‘কত টাকা ভাড়া?’
বুড়ো জবাব দিল, ‘যা ইচ্ছা দিলেই হবে। তবে খাট ছাড়া আর কিছু নেই। বারান্দায় উঠে ডান দিকের শেষ ঘর। গিয়ে ঢুকে পড়লেই হল।’—এই বলে সে ঝিমাতে শুরু করল। বুড়োর কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে কড়া দেশি মদের গন্ধও এসে লাগল শর্মিষ্ঠার নাকে। সে বুঝতে পারল বুড়োর সঙ্গে এই মুহূর্তে বেশি কথা বলে লাভ নেই। তাই সে বুড়োর কথামতো বারান্দায় উঠে নির্দিষ্ট ঘরের কাচের দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল। একটা খাট-বিছানা ছাড়া সে ঘরে কিছু না থাকলেও ঘরটা মোটামুটি পরিষ্কার আর রাত্রিবাসের উপযুক্ত।
ঘরটা পছন্দ হয়ে গেল শর্মিষ্ঠার। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বার করে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরটাকে সাজিয়ে নিল সে। শর্মিষ্ঠা হিসাব করে দেখল সূর্য ডুবতে শুরু করলেও এখনও অন্ধকার নামতে আধ ঘণ্টা বাকি। সে ভাবল এ সময়টুকু বাইরে বসে সূর্যাস্তের ছবি দেখা যাক। এ কথা ভেবে সে ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা বেয়ে নীচে নামল। বুড়োটা আর তখন সেখানে নেই।
বাড়িটার সামনেই রাস্তা নীচ থেকে উপরে এসে উঠে গিয়েছে আরও উপর দিকে, যে পথে শর্মিষ্ঠা কাল উঠতে শুরু করবে। বাড়িটার ঠিক উল্টো দিকেই একখণ্ড ফাঁকা জমি ঝুলছে পাহাড়ের গা থেকে। বেশ কয়েকটা পাথরের চাঁইও রয়েছে সেখানে। সে জায়গায় বসে ভালো করে সূর্যাস্তটা উপভোগ করা যাবে মনে করে শর্মিষ্ঠা রাস্তাটা পেরিয়ে সেখানে গিয়ে হাজির হল। তারপর মাটিতে একটা জিনিস পড়ে থাকতে দেখে সেটা হাতে তুলে নিল।
একটা ওয়াকিং স্টিক! কেউ ট্রেক করতে এসে ফেরার পথে জিনিসটা ফেলে রেখে গিয়েছে। স্টিকটার গায়ের ধুলো দেখলে বোঝা যায় জিনিসটা বেশ কিছুদিন ধরে এখানেই পড়ে ছিল। যাই হোক স্টিকটা যে শর্মিষ্ঠার কাজে লাগবে এ ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আকস্মিক জিনিসটা পেয়ে খুশিই হল সে। জিনিসটা নিয়ে গিয়ে কাছেই সে একটা পাথরের উপর বসে মাটিতে ঠুকে ঠুকে লাঠিটার গা থেকে ধুলো ঝাড়তে শুরু করল।
সূর্য ডুবে যাচ্ছে। পাহাড়ের মাথায় পাইন বনের আকাশে বেলা শেষের সোনালি আলো। ঘরে ফেরা পাখির ডাক ভেসে আসছে জঙ্গলের ভিতর থেকে। হঠাৎ-ই কিছুটা তফাতে একটা পাথরের আড়ালে বসে থাকা একটা লোকের পাশ দেখতে পেল শর্মিষ্ঠা। লোকটার পায়ে ট্রেকিং শ্যু, পরনে জিন্স আর হলুদ রঙের উইন্ডচিটার। হয়তো-বা কোনও ট্রেকার হবে। নইলে সাধারণ টুরিস্ট বলতে যা বোঝায় তারা তো এ পথে বিশেষ একটা আসে না।
এ কথাই লোকটাকে দেখতে পেয়ে মনে মনে শর্মিষ্ঠা ভাবছিল। ঠিক এই সময় লোকটা উঠে দাঁড়িয়ে পাথরের আড়াল থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। আর তাকে ভালো করে দেখামাত্রই নিজের অজান্তে যেন ওয়াকিং স্টিকটা হাতে উঠে দাঁড়াল শর্মিষ্ঠা। আর তাকে দেখেও যেন একইরকম বিস্ময় ফুটে উঠল লোকটার মুখে।
দুজনেই কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত তারা দুজন কোনও কথাই বলল না প্রবল বিস্ময়বোধের জন্য। তারপর শর্মিষ্ঠাই প্ৰথম মুখ খুলল, ‘তোমাকে যে ৩৩ বছর পর হঠাৎ এভাবে দেখব আমি ভাবিনি!’ নীল বলল, ‘আমিও ভাবিনি ৩৩ বছর পর এ পথে আবার তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে। কেমন আছ তুমি?’
শর্মিষ্ঠা হেসে জবাব দিল, ‘ভালোই আছি। তবে ঘর-সংসার পাতিনি। স্বাধীন মানুষ। মাঝে-মাঝে ইচ্ছা হলে সোলো ট্রেকিংয়ে বেরিয়ে পড়ি, এই যেমন এখানে এসেছি। তা তুমি কেমন আছ বলো?
শর্মিষ্ঠার কথা শুনে নীলও মৃদু হাসল। তারপর বলল, ‘আমিও একইরকম আছি। একটা ছোট দল নিয়ে ট্রেকিংয়ে এসেছি এখানে। ছেলেমেয়েগুলো ওই বাড়িটারই ঘরে রেস্ট নিচ্ছে। তুমি কি এই রুটে এবার প্রথম এলে?’
শর্মিষ্ঠা জবাব দিল, ‘হ্যাঁ, তুমি?’
নীল বলল, ‘আমি আগেও এসেছি এখানে। পূর্ণিমায় এসেছি।’
শর্মিষ্ঠা বলল, “হ্যাঁ, শুনেছি পূর্ণিমার আলোয় নাকি যাত্রা শেষে অসাধারণ দেখায় কাঞ্চনজঙ্ঘা-সহ হিমালয় রেঞ্জ। আর দিনে তো অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা মেলে।’
নীল বলল, ‘ঠিক তাই। এখান থেকে ঘণ্টা তিনেক সময় লাগে সে জায়গায় পৌঁছোতে। তা তুমি কখন ট্রেক শুরু করবে? রাতে? নাকি কাল ভোরে?’
শর্মিষ্ঠা যদিও ঠিক করে রেখেছে সে পরদিন ভোরেই যাবে। কিন্তু উত্তর দেওয়ার আগে সে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘তোমরা কখন রওনা হবে?’
নীল জবাব দিল, ‘আজ রাতেই।
শর্মিষ্ঠা এবার রহস্য করে জবাব দিল, ‘আমি এখনও ঠিক করিনি কখন যাব। রাতেও রওনা হতে পারি। আবার কাল ভোরেও।’
তার জবাব শুনে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল নীল। তারপর শর্মিষ্ঠার হাতে ধরা স্টিকটার দিকে তাকিয়ে তাকে একটু অবাক করে দিয়ে বলল, ‘আমার একটা অনুরোধ রাখবে তুমি? আজ রাতে না গিয়ে বরং তুমি কাল রওনা দিও।’
শর্মিষ্ঠা কথাটা শুনে হেসে বলল, ‘কেন বলো তো? তুমি কি তোমাদের টিমের ছেলেমেয়েদের কথা দিয়েছ যে আজ রাত তাদেরই শুধু ট্রেক করিয়ে পূর্ণিমা রাতের কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখাবে?’ বলা বাহুল্য শর্মিষ্ঠার কথার মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন খোঁচা ছিল নীলের প্রতি। তবে নীল সেটা গায়ে মাখল না। সে হেসে বলল, ‘নন্দিতার সেই ঘটনাটা তোমার এখনও মনে আছে দেখছি! না, তেমন কোনও ব্যাপার নয়। আসলে তুমি তো আর আমাদের সঙ্গে যাবে না। রাতে একলা অতটা পথ যাবে। তাই সকালে যেতে বলছিলাম।’
নীলের কথাটা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হঠাৎই সূর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার নামতে শুরু করল।
নীল বলল, ‘এবার তবে আসি? যাত্রা শুরুর জন্য কিছু প্রস্তুতি আছে।’—এ কথা বলে সে হাঁটতে শুরু করল, তারপর রাস্তা পেরিয়ে বাড়িটার দিকে কোথায় যেন মিলিয়ে গেল।
ঠান্ডাও বেশ পড়তে শুরু করেছে। শর্মিষ্ঠাও আর তাই সেই খোলা জায়গায় দাঁড়াল না। রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির বারান্দায় উঠে এল সে। নিজের ঘরের দিকে এগোতে এগোতে কোনও একটা ঘরের ভিতর থেকে কথাবার্তার শব্দও যেন কানে এল তার। সম্ভবত নীল যাদের ট্রেক করতে নিয়ে এসেছে তাদেরই গলা হবে। নিজের ঘরের সামনে পৌঁছে গেল শর্মিষ্ঠা। তারপর ওয়াকিং স্টিকটা দরজার গায়েই এক জায়গায় হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে রেখে ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
ঘরে ঢুকে সামান্য কিছু খেয়ে কম্বল মুড়িয়ে খাটে শুয়ে শর্মিষ্ঠা ভাবতে লাগল নীলের কথা। কী আকস্মিক। অদ্ভুত যোগাযোগ! শর্মিষ্ঠা যেন এখনও ভাবতে পারছে না নীলের সঙ্গে তার দেখা হল! আচ্ছা নীলের মনে কি এখনও কোনও ভালোবাসা জেগে আছে? নইলে কেন সে রাতে একা ট্রেক করতে নিষেধ করল? তবে কি নীল এখনও তার ভালোমন্দ চিন্তা করে? এসব কথাই ভাবতে লাগল সে।
হঠাৎ এরপর একটা জিনিস খেয়াল করল। কাচের দরজার বাইরে হেলান দেওয়া লাঠিটা দেখা যাচ্ছে। সেটা বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে অন্ধকারের মধ্যে। অর্থাৎ ফ্লুরোসেন্ট রং মাখানো আছে ওয়াকিং স্টিকটায়। রাতে চলার সুবিধার জন্য। লাঠিটার দিকে তাকিয়ে নীলের কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন অম্লমধুর স্মৃতি নিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল শর্মিষ্ঠা।
একসময় তার মনে হল, কে যেন এসে দাঁড়িয়েছে তার দরজার ঠিক বাইরে। ততক্ষণে চাঁদ উঠেছে পাইন বনের মাথায়। কে ও? নীল নাকি? যদিও ঘষা কাচের আড়ালে তাকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে না। তবে কেউ একজন যেন দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে লাঠিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। তন্দ্রা জড়ানো চোখে এসব দেখতে দেখতেই সারা দিনের পথশ্রমের ক্লান্তিতে গাঢ় ঘুমে তলিয়ে গেল শর্মিষ্ঠা।
তার যখন ঘুম ভাঙল তখন অনেকটা সময় কেটে গিয়েছে। ঘষা কাচের দরজা-জানালার বাইরেটা চাঁদের আলোয় উজ্জ্বল। রিস্ট ওয়াচের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠল সে। রাত দশটা বেজে গিয়েছে! অন্তত একটানা চার ঘণ্টা ঘুমিয়েছে সে। আর এরপরই তার মনে পড়ল নীলের কথা। সে কি আছে? নাকি চন্দ্রালোকে দলবল নিয়ে রওনা হয়ে গিয়েছে ট্রেক করতে?
বহু দিন পর নীলের সঙ্গে দেখা হওয়ায় পুরোনো দিনের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই নীলের প্রতি মনটা ভিজে উঠেছে শর্মিষ্ঠার। এ সম্পর্ক আর কোনওদিন জোড়া লাগবে না। তবুও শর্মিষ্ঠার মনে হতে লাগল নীলের সঙ্গে একটু কথা বলতে পারলে, গল্প করতে পারলে ভালো লাগবে তার। একথা ভেবে একটু দোনামনা করে একসময় বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল সে। দরজার কাছে গিয়ে কাঠের প্যানেলের গায়ের হ্যান্ডেলটা ঘোরাল দরজাটা খোলার জন্য।
সেটা ঘুরল ঠিকই, শব্দ শুনে মনে হল লকটাও খুলল, কিন্তু দরজার পাল্লা খুলল না। দরজার পাল্লা খোলার জন্য এরপর হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আরও কয়েকবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই সে ব্যর্থ হল। শেষ পর্যন্ত সে আসল ব্যাপারটা ধরতে পারল। দরজার বাইরে থেকে উপর দিকের ছিটকিনিটা তুলে দিয়েছে কেউ! সেজন্যই দরজা খুলছে না! এ কাজ কে করল? আর কেনই-বা করল?
শর্মিষ্ঠা এবার ধাক্কা দিতে শুরু করল দরজায়। যদি সেই ধাক্কা দেওয়ার শব্দ শুনে নীল বা তার লোকজন দরজা খুলে দেয়, সেজন্য। কিন্তু বাইরে থেকে সে শব্দ শুনে কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে এল না। উত্তেজনায় এবার ঘামতে শুরু করল শর্মিষ্ঠা। কেমন যেন দমবন্ধ হয়ে আসতে লাগল তার। আর তার মনে হতে লাগল, এ কাজ কে করল।
তার হঠাৎ মনে পড়ে গেল তন্দ্রাজড়ানো চোখে দেখা সেই লোকটার কথা, যে ফ্লুরোসেন্ট রং মাখানো লাঠিটা নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল! তাহলে কি সে দেখা সত্যি ছিল শর্মিষ্ঠার? ওই লোকটাই কি দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছে।
শর্মিষ্ঠা এবার খেয়াল করল বাইরে স্টিকটা নেই। অর্থাৎ স্টিকটা নিয়ে গিয়েছে লোকটা! কিন্তু কীভাবে দরজাটা খোলা যায়। শেষে একটা বুদ্ধি এল শর্মিষ্ঠার মাথায়। শক্ত সোলওয়ালা জুতোটা পরে নিল সে। তারপর ঘরের কোণ থেকে ছুটে এসে লাথি মারতে শুরু করল দরজায়।
বার কয়েক লাথি মারার পর কাজ হল। পুরোনো ছিটকিনিটা ভেঙে গেল। খুলে গেল দরজা। বাইরে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ কিছুক্ষণ খোলা বাতাসে দম নিল শর্মিষ্ঠা। তারপর বারান্দা ধরে এগোল কোনও ঘরে কেউ আছে কি না দেখার জন্য। কিন্তু ঘরগুলোর দরজা খোলা। নীল বা অন্য কেউ কোথাও নেই। সম্ভবত তারা ট্রেকিংয়ে বেরিয়ে গিয়েছে।
কিন্তু বারান্দা থেকে নীচে নেমে সে দেখতে পেল বুড়োটাকে। একটা পাথরের উপর চাদর মুড়ি দিয়ে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে। শর্মিষ্ঠা তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার ঘরের দরজায় বাইরে থেকে ছিটকিনি দিয়েছিল কে? এতক্ষণ ধরে যে দরজা ধাক্কাচ্ছিলাম শুনতে পাওনি?’
বুড়ো তার কথার কোনও জবাব দিল না। যেন শুনতেই পেল না কথাগুলো! শর্মিষ্ঠা এরপর বেশ একটু জোর গলায় তার কাঁধটা ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, ‘আমার কথাগুলো তুমি শুনতে পাচ্ছ না? হলুদ রঙের জ্যাকেট পরা যে বাবু আর ছেলেমেয়েরা ছিল, তারা কোথায় গেল?
এবার মুখ খুলল বুড়োটা। সে বলল, ‘সেই বাবু তো আপনার ঘরের সামনে গিয়েছিলেন লাঠিটা নিতে। অন্ধকারের মধ্যে জ্বলছিল লাঠিটা। তিনি লাঠিটা নিয়ে এসেছিলেন ওখান থেকে। তারপর সেই লাঠি আর ছেলেমেয়েগুলোকে নিয়ে একটু আগে এই রাস্তা ধরে উপরে ওঠার জন্য রওনা হয়ে গেলেন।’
কথাটা শুনে শর্মিষ্ঠা অবাক হয়ে গেল। তার মনে হল তাহলে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় সে নীলকেই দেখেছিল। সে শুধু লাঠিটাই নেয়নি, শর্মিষ্ঠা যাতে বাইরে বেরোতে না পারে তার জন্য বাইরে থেকে দরজাও বন্ধ করে দিয়েছিল। আর এর পিছনে কারণটাও জলের মতো পরিষ্কার। যাতে শর্মিষ্ঠা আজ রাতে ট্রেক শেষ করে গন্তব্যে পৌঁছোতে না পারে!
এ কথা ভাবতে ভাবতে শর্মিষ্ঠার মনে হল, নীল আজও বদলায়নি। সম্ভবত সে মোটা টাকার বিনিময়ে দলটাকে কথা দিয়েছে যে আজ রাতে শুধু সে তাদের নিয়েই পৌঁছোবে সেখানে। কিন্তু তা বলে সেই কাজটা কীভাবে করল নীল? তাকে আটকানোর জন্য সে বাইরে থেকে দরজায় ছিটকিনি তুলে দিল!
এ ব্যাপারটা ভাবতে ভাবতে নীলের প্রতি ভালোলাগা মুছে গিয়ে উষ্মায় ভরে উঠতে শুরু করল শর্মিষ্ঠার মন। আর তার সঙ্গে সঙ্গে সে আরও একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। আজই বাকি রাস্তাটা ট্রেক করবে শর্মিষ্ঠা। সে বুঝিয়ে দেবে আগেও সে নীলের অন্যায় প্রস্তাবের সঙ্গে আপস করেনি, আজও করবে না। তাকে আটকানোর সাধ্য নীলের নেই। শর্মিষ্ঠা চেষ্টা করবে নীলদের আগেই পথটা শেষ করার।
এ কথা ভেবে নিয়ে শর্মিষ্ঠা পথে নেমে হাঁটতে শুরু করল। শীতবস্ত্র, জুতো তার পরনেই আছে। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। তাই পথ চলতে তার অসুবিধা হবে না বলেই মনে হল। কিছুটা এগনোর পর সে একটা গাছের ডালও কুড়িয়ে পেল। শর্মিষ্ঠা সেটাকেই ওয়াকিং স্টিকের মতো ব্যবহার করে চড়াই ভেঙে দ্রুত হাঁটতে থাকল।
মাথার উপর ফটফটে জ্যোৎস্না। দু-পাশে ঘুমন্ত পাইন বন তার মধ্যে লাঠিতে ভর দিয়ে যথাসম্ভব দ্রুত এগিয়ে চলল শর্মিষ্ঠা। পথ একটাই, এ পথেই গিয়েছে তারা। শর্মিষ্ঠাকে ধরতে হবে নীলকে। এ ভাবনাই এগিয়ে নিয়ে চলতে লাগল শর্মিষ্ঠাকে। সময় এগিয়ে চলল তার সঙ্গে সঙ্গে।
প্রায় ঘণ্টা দুই পথ অতি করার পর বেশ খানিকটা দূর থেকে শর্মিষ্ঠা অবশেষে দেখতে পেল তাদের। ওই তো হেঁটে চলেছে তারা। প্রথমে নীল, তার হাতে ধরা ফ্লুরোসেন্ট রং মাখানো ওয়াকিং স্টিক থেকে উজ্জ্বল আলো ছড়াচ্ছে। আর তার পিছন পিছন নানাবয়সি কিছু ছেলেমেয়ে।
শর্মিষ্ঠা তাদের দেখে উৎসাহিত বোধ করে আরও দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করতে লাগল। টপকে যেতে হবে ওদের। নীলকে দেখিয়ে দিতে হবে সে তাকে হারিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ব্যবধান যেন একই রয়ে যেতে লাগল। শর্মিষ্ঠা যে গতিতে হাঁটছে, তারাও সে গতিতে হাঁটছে। পারস্পরিক দূরত্ব কিছুতেই কমছে না। সময় আর মাথার উপরের চাঁদ ক্রমশ এগিয়ে চলতে লাগল।
একসময় শর্মিষ্ঠার মনে হল তাদের পথ যেন শেষ হয়ে এসেছে। ওই তো সামনে উন্মুক্ত ফাঁকা অংশের মধ্যে দিয়ে চন্দ্রালোকিত পাহাড়শ্রেণি দেখা যাচ্ছে! তবে কি শর্মিষ্ঠার তাদের আগে পথের শেষে পৌঁছোনো হল না? হেরে গেল শর্মিষ্ঠা?
এই ভাবনাটা তাকে প্রচণ্ড ক্ষিপ্র করে তুলল, সে প্রায় ছুটতে শুরু করল নীল আর তার দলটাকে ধরার জন্য। এবার অবশ্য দু’পক্ষর ব্যবধান ক্রমশ কমে আসতে লাগল। তার সঙ্গে সঙ্গে পথের শেষটাও স্পষ্ট হয়ে যেতে লাগল। দেখা যেতে লাগল উন্মুক্ত পৃথিবীর বুকে চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে থাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা। চাঁদের আলো যেন গলে পড়ছে তার শৃঙ্গ বেয়ে।
শেষ পর্যন্ত শর্মিষ্ঠার মনে হল যে এবার ধরে ফেলতে পারবে নীলকে। তাদের মধ্যে ব্যবধান দ্রুতই কমছে। পথটা যেখানে শেষ হয়েছে সেই উন্মুক্ত জায়গাটা দেখা যাচ্ছে। হাঁটার গতিবেগ আরও বাড়াল শর্মিষ্ঠা।
সে দলটাকে প্রায় ধরে ফেলেছে, ঠিক এমন সময় টান লাগল তার জামার হাতায়। শর্মিষ্ঠা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছনে তাকিয়ে দেখতে পেল সেই বুড়োটাকে। কখন যে সে তার পিছন পিছন চলে এসেছে তা শর্মিষ্ঠা বুঝতে পারেনি। বিস্মিত শর্মিষ্ঠা তাকে জিগ্যেস করল, ‘কী হল? আমাকে থামালে কেন?’
বুড়োটা বলল, ‘আর এক পা-ও এগোবেন না দিদিমণি। সামনে বিপদ।’
শর্মিষ্ঠা প্রশ্ন করল, ‘কীসের বিপদ? ওই তো ওরা এগিয়ে যাচ্ছে। আমাকে যেতে দাও।’
বুড়ো বলল, ‘ওরা যাচ্ছে যাক। কিন্তু দোহাই আপনার, আপনি যাবেন না। এখান থেকেই আপনি দেখতে পাবেন কী হতে চলেছে।’
বুড়োটার কথার মধ্যে এমন একটা কিছু ছিল যা থামিয়ে দিল শর্মিষ্ঠাকে। বুড়োটার কথামতো সে চেয়ে রইল সামনের দিকে। নীল আর তার দলবল এগোচ্ছে ফাঁকা জায়গার দিকে।
একসময় জায়গাটায় পৌঁছে গেল তারা। তাদের সামনে উন্মুক্ত আকাশের বুকে চন্দ্রালোকে দাঁড়িয়ে থাকা হিমালয় পর্বতমালা। নীল তার সঙ্গীদের নিয়ে পথের শেষে খাদের কিনারে গিয়ে দাঁড়াল। ট্রেকিং শেষ তাদের। ফ্লুরোসেন্ট রং মাখানো ওয়াকিং স্টিকটা সে মাথার উপর তুলে ধরল সফলতার আনন্দে। তার সঙ্গীরাও মাথার উপর হাত তুলল। এরপরই শর্মিষ্ঠার মনে হল তার পায়ের তলার মাটিটা যেন কেঁপে উঠল। শর্মিষ্ঠার চোখের সামনে নীল আর তার সঙ্গীরা যে জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল, সে জায়গাটা তাদের সকলকে নিয়ে ধসে পড়ল অতলান্ত খাদের ভিতর! নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল পুরো জায়গাটাই—হতভম্ব, বাকরুদ্ধ শর্মিষ্ঠা!
তার হুঁশ ফিরল বুড়োটার ডাকে। সে বলল, ‘এবার ফিরে চলুন।’ তার পেছন পেছন টলতে টলতে কোনওরকমে সেই বাড়িটায় ফিরে এল শর্মিষ্ঠা।
পরদিন ভোরের আলো ফুটল একসময়। শর্মিষ্ঠার মনে জেগে আছে গত রাতের ভয়ঙ্কর স্মৃতি! তার চোখের সামনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল নীল আর তার দলটা! শর্মিষ্ঠা ফেরার মুহূর্তে বুড়োটা এসে দাঁড়াল তার সামনে। শর্মিষ্ঠা তাকে প্রশ্ন করল, ‘ওরা কি কেউ বেঁচে নেই?’
বুড়ো বলল, ‘না, ওরা কেউ বাঁচেনি। ওই বাবু তার দলটাকে নিয়ে প্রথম এসেছিল বছর পাঁচেক আগে। সেই পূর্ণিমার রাতে তারা রওনা হয়েছিল ট্রেকিংয়ের জন্য। সেদিন ধস নামল। ওরা আর কেউ ফিরল না। তারপর থেকে প্রতি পূর্ণিমায় ওরা আসে, এখানে থাকে, রওনা হয় ট্রেকিংয়ের জন্য। তারপর আর ফেরে না। আপনি যদি কাল আর একটুও এগোতেন তবে আপনারও ওই অবস্থাই হতো। আর রাতে জ্বলতে থাকা ওয়াকিং স্টিকটা কিন্তু ওই বাবুরই, যেটা আপনি কুড়িয়ে এনেছিলেন। ওই স্টিকটা আপনাকে টেনে নিয়ে যেত অতল খাদে। যেমন নিয়ে গিয়েছিল ওদের।’
বুড়োটার কথা শুনে হতবাক হয়ে গেল শর্মিষ্ঠা। তার মনে পড়ে গেল নীলের গতকালের অনুরোধের কথা। সে যাতে বাইরে বেরোতে না পারে সেজন্যই তো দরজার ছিটকিনি তুলে দিয়েছিল নীল। তবে কি তার প্রতি নীলের মনে এখনও কোথাও কোনও ভালোবাসা আছে? তাই কি তার বিদেহী আত্মা গতকাল বিপদ থেকে রক্ষা করতে চেয়েছিল তাকে? এ কথা ভাবতে ভাবতে এক অবিশ্বাস্য বেদনাময় অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে ট্রেকিং শেষে ফেরার পথ ধরল শর্মিষ্ঠা। বিচ্ছেদ হয়। তবু থাকে প্রেম। হয়তো-বা সে অপার্থিব।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন