ভূতের নাম আক্কুশ

শৈলেন ঘোষ

অনেকদিন আগে একটা পুঁচকে ভূত ছিল। তার নাম আক্কুশ। পুঁচকে হলে কী হয়, ভূত তো! তাই তার ঠ্যাং দুটো যেমন লম্বা-লম্বা, তেমনি নড়া দুটো ল্যাকপ্যাকে। ডিগডিগে ঘাড়ের ওপর মুন্ডুখানা এমন লটর-পটর করে দুলত যে, মনে হত, একটা ফুটো হাঁড়ি গড়াগড়ি খাচ্ছে!

আক্কুশ থাকত একটা মাঠে। মাঠের মধ্যিখানে একটা দেবদারু গাছে। গাছের ডালে চুপটি করে বসে থাকত, আর গা-ছমছম রাত্তিরে যখন কোনো মানুষ সেই গাছের নীচ দিয়ে যেত, তখন তাকে দেখে আক্কুশ আনন্দে তুড়তুড়ি কাটত। নয়তো, ডালের ওপর থেকে হেঁট হয়ে ঝুলে তার পেটে অ্যায়সা কাতুকুতু দিয়ে দিত যে, সে ‘বাপ রে, মা রে’ বলে দে লম্বা! উঃ! তারপর আক্কুশের সে কী হাসি! সারা মাঠ কাঁপিয়ে হিঁ-হিঁ-হিঁ করে হেসে গাছের ওপর লাগিয়ে দিত ডিগবাজি!

মাঠেই বেশ ছিল আক্কুশ। হয়তো মাঠেই থাকত। কিন্তু একবার হল কী, এমন হাড়-কাঁপানি শীত পড়ল যে, কার সাধ্যি মাঠে থাকে। শীত বলে শীত! তার ওপর ভূতের গায়ে শীত, মানে আরও সাংঘাতিক। ভূতের গায়ে তো চামড়াও নেই, মাংসও নেই। তাই শীতের কামড়ে হি-হি, হু-হু করতে করতে আক্কুশ যায় আর কী! শেষকালে গাছ থেকে লাফিয়ে, মাঠ ডিঙিয়ে পালা, পালা! কিন্তু পালাবে কোথায়? যতই হোক, ভূত বলে কথা। কে আর আদর করে ঘরে ঠাঁই দেবে? অবিশ্যি ভূতের একটা সুবিধে আছে, ইচ্ছে করলেই ফুস! মানে, দেখতে দেখতেই অদৃশ্য। আবার মন চাইলেই হুশ! মানে, চোখের পলকে একটি কঙ্কালের মূর্তি, একেবারে তোমার সামনে। যাকে বলে, এই আছি, এই নেই! কিন্তু তাহলেও যেখানে-সেখানে তো আর ভূত থাকতে পারে না! বেশ একটা নিরিবিলি জায়গা হবে, গা-ছমছম অন্ধকার থাকবে, ভয়-থমথম ফিসফাস থাকবে, এমনই জায়গা ভূতেদের খুব পছন্দ। তা, এমন একটা জায়গা কোথায় যে পাওয়া যাবে, তা তো আক্কুশের জানাই ছিল না। অথচ বিশ্বাস করো, ধু-ধু মাঠের মধ্যিখানে, ঠাণ্ডার খপ্পরে পড়ে, বেচারার হাড় ক-খানা এমন ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল যে কী বলব! একেবারে অসহ্য এই শীতে আক্কুশ ‘কী করি, কী করি’ করতে-করতে ছটফটানি লাগিয়ে দিলে। কখনো গাছের এ-ডালে ওঠে। কখনো ও-ডালে লাফায়। পাতার ফাঁকে লুকিয়ে পড়ে। ডালের ওপর লুটিয়ে থাকে। তাতে কি আর শীত যায়! এ তো আর তুমি-আমি নই যে, বাক্স-প্যাঁটরা থেকে গরমজামা বার করে শীতের সঙ্গে লড়াই করব। আক্কুশের জামাও নেই, প্যান্টও নেই। যাকে বলে একদম—ইশ, ছি: ছি:, কী লজ্জা!

যেদিন ঠাণ্ডাটা খুবই জাঁকিয়ে পড়ল, সেদিন নিশুতিরাতে একটা কান্ড হল। হয়েছে কী, একদল লোক, এই জনপাঁচেক হবে, সেই মাঠের ওপর দিয়ে ফিরছিল। শীতের হাত থেকে বাঁচবার জন্যে পা থেকে মাথা অবধি মোটা-মোটা চাদর জড়িয়েছে। কে জানে, এই সাংঘাতিক শীতের রাতে কোথায় গেছল লোকগুলো! হয়তো নেমন্তন্ন খেতে গেছল বিয়েবাড়িতে। ব্যস! যেই না ওদের দেখা, অমনি আক্কুশের মাথায় ভূত-মার্কা দুষ্টু বুদ্ধিটা কিলবিল করে উঠেছে। ভাবল, এই তাল। একটা চাদর হাতাতে হয়। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। একে শীত, তার ওপর এই গভীর রাত। লোকগুলো শীতের ঠেলায় হি-হি করে হাঁটছে। ভয়ে কাঁপছে। আর দুগ্গা নাম জপছে। এই দেবদারু গাছের নীচে যে অনেক মানুষ চলতে-চলতে ভূতের কাতুকুতু খেয়েছে, সেটা তো কারো অজানা নয়। কিন্তু কে জানে, সে-কথা শুনেও যে মানুষগুলো কেন রাতদুপুরে এ-পথে পা বাড়াল! হয়তো ভেবেছে, পাঁচজনা দল বেঁধে গেলে কাছে ঘেঁষতে সাহস হবে না ভূতের। কিংবা এমনও হতে পারে, তারা তো আর ভূতের পাল্লায় পড়েনি কোনোদিন, তাই হয়তো ভেবেছে, ভূত না ঘেঁচু। যতসব গাল-গপ্পো। তাই সেই নিশুতিরাতে, ফাঁকা মাঠে ভয় তাড়াতে গলা ছেড়ে কী গাওনা জুড়ে দিল তারা। গাইতে-গাইতে গাছবরাবর চলে এসেছে। এই রে! ওই তো আক্কুশ গাছের ওপর বসে! এই বুঝি ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে! যাচ্চলে! আক্কুশ তো লাফাল না! ওই তো লোকগুলো গাছের নীচ দিয়ে এগিয়ে চলে যাচ্ছে! তবু আক্কুশ কিচ্ছু না-বলে বেমালুম গাছের ডালে বসে ঠ্যাং দোলাচ্ছে!

না, লোকগুলোকে যেতে দাও। আর একটু যেতে দাও। মাঠের ধারে ওই পুকুরটার কাছাকাছি যাক না একবার, তারপর দেখো কাকে মজা বলে।

আর ঠিক তাই। ওই পুকুরটার পাড়-বরাবর যেই না লোকগুলো পৌঁছে গেছে, ঠিক তক্ষুনি ঘটে গেল দক্ষযজ্ঞ কান্ড! আক্কুশ কী করেছে, নি:সাড়ে গাছ থেকে নেমে পড়েছে। লম্বা-লম্বা ঠ্যাং ফেলে একেবারে পুকুরপাড়ে। ঠিক লোকগুলোর পেছনে। হাত বাড়িয়ে একজনের চাদর ধরে মেরেছে এক টান। লোকটা থতমত খেয়ে গেছে। ঝট করে পেছন ফিরে দেখে, ভোঁ-ভোঁ! কেউ তো নেই! থাকবে কী করে! তখন তো আক্কুশ অদৃশ্য হয়ে আছে। কাউকে না-দেখে লোকটা ভাবল, হয়তো তারই ভুল। আবার যখন লোকগুলো আর একটু এগিয়ে গেছে, তখন আক্কুশ করেছে কী, আর একজনের চাদর ধরে এক হ্যাঁচকা! ওমা! লোকটা কোনো কিছু না-ভেবে তারই পাশের লোকটাকে তেড়ে উঠল, ‘এই, চাদর টানছিস কেন?’

পাশের লোকটা তো অবাক। বলল, ‘যা: বাবা! তোর চাদর আমি টানতে যাব কেন! দেখতে পাচ্ছিস না, শীতে হাতদুটো চাদরের ভেতর গুটিয়ে রেখেছি।’

‘তবে কি ভূতে টানল?’ লোকটা চড়া-মেজাজে খেঁকিয়ে উঠল।

ফাঁক বুঝে আক্কুশ আবার আর একজনের চাদর টেনে দিয়েছে। টানতে গিয়ে এক বিপদ ঘটিয়ে বসল। ঠাওর করতে পারেনি, মেরেছে তার ঠ্যাঙে খটাস করে এক ঠোক্কর। ব্যস! লোকটা মাটির ওপর চিতপটাং। পড়েই চিৎকার। চিৎকার মানে ভূতের ভয়ে একেবারে মরাকান্না! বন্ধুর বিপদ দেখে কোথায় তার সঙ্গীরা তাকে সামলাবে, তা না, তারা চোখকান বুজে মারলে চোঁ-চাঁ দৌড়। তাই না দেখে, আক্কুশও দৌড়ে গিয়ে একজনের ঘাড়ে দিল খিমচে। লোকটা মাটির ওপর ধপাস। এই বুঝি ভিরমি লেগে অক্কা যায়। আর একজনের পেটের মধ্যে ঝাড়লে এক গোঁত্তা। লোকটা পেট চাপড়ে সেইখানেই বসে পড়ে কোঁকাতে লাগল। আর একজনকে দু-হাত দিয়ে এমন জাপটে ধরল, বুঝি লোকটা দম আটকে এক্ষুনি মরে। তাই না দেখে শেষ লোকটা ‘বাপ রে…মা রে…’ বলে এমন ছুট দিল যে, সামনে কী আছে দেখলই না। বেটপকা পা পিছলে পড়ল গিয়ে ঝপাং করে পুকুরের জলে। পড়েই ‘বাঁচাও, বাঁচাও’ বলে চিৎকার শুরু করে দিলে। কিন্তু এই রাতদুপুরে শূন্য মাঠে তার চিৎকার কে শুনছে! বেচারা চেঁচাতে-চেঁচাতে এই শীতের রাতে পাঁকে-জলে হাবুডুবু খাচ্ছে আর ঠাণ্ডায় জমে হাঁসফাঁস করছে।

পাঁচটা লোকেরই যখন এই হাল, তখন আক্কুশও দেখল, এই তাল। দেখল কী, একটা লোক ভয়ে পড়ে-পড়ে গোঁ গোঁ করছে। আক্কুশ আর কিছু না-ভেবে টেনেমেনে তার গা থেকেই চাদরটা খুলে নিলে। নিয়ে, নিজের গায়ে জড়িয়ে দে হাওয়া! আর দাঁড়ায় ওখানে! বাবা! তারপর কেউ দেখতে পাক! দেখতে তো পাবেই। কারণ, আক্কুশ যদিও অদৃশ্য হয়ে আছে, তার গায়ের চাদরটা তো তা নয়। চাদরটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে! আক্কুশ ছুটছে আর মনে হচ্ছে, যেন একটা ভেলকি-লাগা উড়ন্ত চাদর শূন্যে ঘুরপাক খাচ্ছে!

এ তো তা হলে আচ্ছা ফ্যাসাদ। ফ্যাসাদই তো! কারণ, এই চাদরটা গায়ে জড়িয়ে আক্কুশ যদি এখন গাছে লুকিয়ে থাকে, লোকের চোখ এড়াবে কী করে। কেউ-না-কেউ দেখতে পাবেই। গাছে না-বসে যদি এধার-ওধার ঘোরাঘুরি করে, তা হলে আর দেখতে হবে না, লোকের চোখে পড়বেই। যেখানেই যাক, নজর এড়াবার যো নেই। তাহলে কী করা! চাদরটা ফেলে দেবে? শীতের কামড় থেকে বাঁচবার জন্যে এমন যে একটা চাদর এতকান্ড করে হাতড়াল, সেটা ফেলে দিতে হবে! এ কখনো হয়! সুতরাং এখন আর গাছে বসা নয়। তাকে পালাতেই হবে। একটা ঘুপচি জায়গা তাকে খুঁজে বার করতেই হবে। আর তাই সে আগু-পিছু কিছু না-ভেবে ছুটতেই লাগল। ভূতের ছোটা তো। অত বড়ো মাঠটা ফুস বলতেই পেরিয়ে গেল! পেরিয়েই তার সামনে পড়ল একটা ভাঙাবাড়ি। ভাঙা মানেই কতকালের পুরোনো। দেওয়ালের পলস্তরা খসেছে। পাঁচিলে বট গাছের শেকড় গজিয়েছে। শ্যাওলা ধরেছে। এধার-ওধার ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে। দেখলেই মনে হবে, যেন একটা রাগী রাক্ষস দাঁত খিঁচিয়ে ভয় দেখাচ্ছে! ঢুকে পড়! ঢুকে পড়! আক্কুশ চোখ-কান বুজে সেই বাড়িতেই ঢুকে পড়ল। সটান ভেতরে। বাড়িতে কে আছে, কী আছে এসব কি তখন ভাববার সময়? ঢুকেই একটা অন্ধকার কোণে ঘাপটি মেরে সিঁটিয়ে রইল আক্কুশ। অবশ্য এটা আর কে না জানে, বাড়িতে লোকজন থাকলেও এত রাতে তো কেউ আর জেগে বসে নেই! সুতরাং আপাতত আক্কুশ এইখানে বেশ কিছুক্ষণ লুকিয়ে থাকতে পারবে।

‘খুক-খুক-খুক।’

হঠাৎ যেন কে কেশে উঠল! আক্কুশ চমকে উঠেছে। তা হলে তো এ-বাড়িতে লোকজন আছে বলে মনে হয়। এই রে, এই আবার আর এক ফ্যাচাং। কোথায় ভাবল, ভাঙাবাড়িটা বুঝি খাঁ-খাঁ বাড়ি, তা নয়, এখানেও মানুষের বাস! সুতরাং আক্কুশ এখন একদম স্পিকটি নট! শুধু চোখ দুটোকে ওই চাদরের ফোকর দিয়ে অন্ধকারে মেলে রইল!

যাক বাবা, আর কোনো শব্দ শোনা গেল না। দেখাও গেল না কাউকে। শুধু ক-টা চামচিকে হঠাৎ অন্ধকারে ঘুরপাক খেতে শুরু করে দিলে। এই সেরেছে! চামচিকে দেখেই আক্কুশের হাত-পা’গুলো কেমন যেন চনমন করে উঠল। উঠবেই তো। কারণ, এই চামচিকেদের সঙ্গে ভূতের যেন একটা বেশ দোস্তি আছে। যে-বাড়িতে ভূতের গন্ধ পাবে, সে-বাড়িতে ঠিক দেখতে পাবে চামচিকেদের আড্ডা। সুতরাং চামচিকে দেখে আক্কুশ যদি ভাবে, এ-বাড়িতে তার মতো আরও ভূত আছে, তা হলে সে তো মিথ্যে কিছু ভাবছে না। তার ওপর তক্ষুনি যেন আক্কুশের নাকে সোঁদা-সোঁদা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। আক্কুশ ধড়ফড় করে গায়ের চাদরটা দিয়ে মাথামুন্ডু জড়িয়ে নিলে। এমনভাবে জড়ালে তাকে যেন কেউ দেখতে না পায়! কারণ, আক্কুশ জানে সোঁদা-সোঁদা গন্ধ মানেই, খেঁদা-খেঁদা ভূত। আর সেই খেঁদা-খেঁদা ভূত যদি সত্যিই এ-বাড়িতে থাকে, তাহলে সে যে দেখতে পেলে আক্কুশকে ছেড়ে কথা বলবে না, এটা আর কে না জানে! এ-বাড়ির ভূতটা যদি বেশ বড়োসড়ো হয়, তবে সে নিশ্চয়ই ক্যাঁক করে আক্কুশের ঘাড় ধরবে। ধরে, হয় গাছে বেগুন ঝোলার মতো ঝুলিয়ে রাখবে, না হয় তো, টান মেরে আঁস্তাকুড়ে ফেলে দেবে। আর ভূতটা যদি বেঁটেখাটো হয়, তবে আক্কুশের সঙ্গে একটা তুমুল ভুতুড়ে লড়াই বেঁধে গেলে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

‘খুক-খুক-খুক।’

আবার কাশির শব্দ। এবার কাশির শব্দ শুনে আক্কুশের বুকটা ধড়াস করে কেঁপে উঠল না। আক্কুশ আন্দাজ করতে পারল, এটা কখনোই ভূতের কাশি নয়। এ-কাশি নিশ্চয়ই মানুষের। এবং কাশির শব্দটা যে কোনো পুরুষ মানুষের নয়, সেটা বুঝতেও আক্কুশের অসুবিধে হল না। যিনিই কেশে থাকুন, তাঁর গলায় কেমন যেন একটা বুড়ি-বুড়ি খকখকানি। অবিশ্যি পেত্নি বা শাঁকচুন্নি কাশলে অমন নরম গলায় তো কাশত না! শাঁকচুন্নির কাশি শুনলে মনে হবে, বাবা, যেন সাঁঝের বেলা ফেউ ডাকছে।

সুতরাং ওই খুকখুকে বুড়িকে দেখার জন্যে আক্কুশের মনটা কেমন যেন ছোঁক-ছোঁক করতে লাগল। অন্ধকার সেই কোণ থেকে আক্কুশ এদিক-ওদিক একটু উঁকিঝুঁকি মারল বটে, কিন্তু কিছুই ঠাওর করতে পারল না। অগত্যা দু-পা ফেলে একটু এগিয়ে গেল। না, তবুও কাউকে দেখা গেল না। আরও দু-পা ফেলে এগিয়ে গেল। ফোক্কা! কেউ নেই! তখন আক্কুশ দু-পা দু-পা করে আরও ক-পা এগিয়ে যেতেই সামনে পড়ল একটা ঘুরঘুট্টি অন্ধকার ঘর! দরজা বন্ধ বলে ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারল আক্কুশ। না, এ-ঘরেও কেউ নেই। আঁই-ইঁ-ইঁ! আক্কুশ এমনি একটা শব্দ করল মুখে। তারপর হুশ করে জানলা গলে সেই অন্ধকার ঘরটায় ঢুকে পড়ল। ভূতের চোখ তো অন্ধকারেও ‘সব কিছু দেখতে পায়। তাই আক্কুশ স্পষ্ট দেখতে পেল, ঘর-ভরতি আসবাব। দেরাজ, আলমারি, কেদারা, আলনা, খাটপালঙ্ক, যেমনকে তেমন সাজানো। অবিশ্যি ধুলো ময়লা থিকথিক করছে চারিদিকে। মনে হচ্ছে, একযুগ ঝাড়পোঁছ নেই। ঘরটা নোংরা বলে আক্কুশের গা-টা তা বলে ঘিনঘিন করছে না। ময়লা ধুলো থাকলেই তো ভূতের মন আহ্লাদে আটখানা। ধুলোর ওপর গড়াগড়ি খাও, আর নাকি সুরে গাওনা চালাও! ওঃ! এই ঘরটায় ঢুকে এখন যা আরাম লাগছে না আক্কুশের! মাঠের মধ্যিখানে কী শীত! আর এখন, এই ঘরের মধ্যে, গরম গরম মজা! আক্কুশ টপাস করে উঠে পড়ল খাটের ওপর। গা থেকে চাদরটা সাঁই করে ছুড়ে দিল। সেটা ঝপ করে পড়ল গিয়ে ঘরে টাঙানো একটা মস্ত আয়নার ওপর। কোথায় পড়ল সেসব না-দেখে আক্কুশ খাটের ওপর লাগিয়ে দিল গড়াগড়ি। এদিক থেকে ওদিক, ওদিক থেকে এদিক। বালিশ নিয়ে খামচে ধরে। তারপর ধামসাধামসি। মাথার বালিশ পায়ে নামায়। শূন্যে ছোড়ে। লুফে নেয়! পা দিয়ে মারে শুট! ধাঁই করে সেটা দেরাজের ওপর ধাক্কা মারল। ঝন-ঝন-ঝন! কী ভাঙল রে বাবা! মনে হচ্ছে, যেন একটা ফুলদানি! চমকে উঠেছিল আক্কুশ! টুকরো-টুকরো কাচের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখল! তারপর যখন বুঝল, বড়ো রকমের দুর্ঘটনা কিছু ঘটেনি, তখন প্রায় গলা ফাটিয়ে হেসে ওঠে, হিঁ-হিঁ-হিঁ।

‘খুক খুক খুক!’

এই রে, আবার! মুখের হাসিটাকে ঝট করে গলায় গিলে স্থির হয়ে গেল আক্কুশ। তাই তো, আবার সেই কাশির খুকখুকানি। এ তো আচ্ছা ঝামেলায় পড়া গেল! ঘরে ঢুকেও নিস্তার নেই! না, দেখতেই হচ্ছে, কে কাশে!

বিছানা ছেড়ে নেমে পড়ল আক্কুশ! চাদরটা? হ্যাঁ, ওই তো ঝুলছে। হাত বাড়িয়ে টান দিল! আয়নার গা থেকে ফস করে চাদরটা আক্কুশের হাতে নেমে আসতেই আক্কুশ থতমত খেয়ে গেছে। এই রে, আয়নার গায়ে একটা ভূতের ছায়া! আক্কুশ আঁতকে উঠেছে! আক্কুশ লাফ দিয়ে ডিগবাজি মারতে, আয়নার ভূতটাও ডিগবাজি মারল। আক্কুশ ভেংচি কাটল! আয়নার ভূতটাও ভেংচি কাটল। তখন তো আক্কুশ বুঝতেই পেরেছে, আয়নার গায়ের ভূতটা অন্য কোনো ভূতই নয়, তারই ছায়া! তখন সে হেসে কুটোপাটি! হাসতে-হাসতে ভাবল, ছ্যা: ছ্যা:, তার এ বোকামির কথাটা জানাজানি হয়ে গেলে লজ্জার একশেষ! ভাগ্যিস কেউ দেখে ফেলেনি! কেউ দেখলে নিশ্চয়ই ভাবত, ভূত না তো, একটা গর্দভ!

আক্কুশ তাড়াতাড়ি লজ্জাটাকে লুকিয়ে ফেলে, গায়ে চাদরটা আবার জড়াল। আগের মতো এবারও হুশ করে জানলা গলে বাইরে এল। তারপর উঁকি মারতে লাগল এপাশ-ওপাশ। বোঝা যাচ্ছে, বাড়িটা বুড়িয়ে গেলেও একেবারে গুঁড়িয়ে পড়েনি। ঘরগুলো কী বড়ো-বড়ো বলো! পেল্লায়-পেল্লায় নকশা-কাটা শ্বেতপাথরের থাম। তবে, শ্বেতপাথর আর ধবধবে সাদা নেই। নোংরা ধরেছে। লম্বা দালানের ওপর অমন কত যে থাম বসানো, গুনে শেষ করা যায় না! দালানের মেঝেটাও দ্যাখো, কী সুন্দর চকমিলানো। অবিশ্যি অর্ধেক পাথরই হাওয়া। তার ওপর যে ক-টা আছে, তারও যা হাল! এবড়োখেবড়ো। পা পড়লেই গোঁত খাচ্ছে আর নাচছে। দালানের সামনে চওড়া উঠোনটা নজরেই পড়বে না। আগাছা, ঝোপজঙ্গল আর খানাখন্দ। সাপটা-খোপটা যদি বাসা বেঁধে ঘর-সংসার পেতে থাকে, তবে আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

‘খুক খুক খুক!’

ব্যাপারটা কী বলো তো! এ তো আচ্ছা ভাবনায় পড়ল আক্কুশ! মানুষটা কাশছে, অথচ কোথায় কাশছে হদিস করতে পারছে না! এতগুলো ঘর। কোন ঘরটায় যে মানুষটাকে খুঁজবে, ভেবে পাচ্ছে না আক্কুশ! এ তো আচ্ছা ভূতের ছা! একটু আন্দাজ নেই!

পারে, আক্কুশ ইচ্ছে করলে এক্ষুনি পারে। কিন্তু ওই যে বললুম, আক্কুশের মনে-মনে সন্দেহ, যদি আর কোনো ভূত থাকে এ-বাড়িতে! কিচ্ছু বলা যায় না!

আচ্ছা ওইদিকটা দ্যাখো তো! ওইদিকে ওই ঘরটা!

কী দেখা যাচ্ছে বলো তো! মনে হচ্ছে, যেন এক টুকরো আবছা আলোর আভা চোখে লাগছে! সত্যিই তো! আর তর সয় আক্কুশের! যেখানে দাঁড়িয়েছিল, সেখান থেকেই ঠ্যাং ছুড়ে এমন একটা লম্বাই লাফ মারল যে, এক লাফেই ঘরের সামনে হাজির! হ্যাঁ, যা ভেবেছে, ঠিক তা-ই। ঘরটার ফাটা জানলার ফোকর দিয়ে মিটিমিট করে আলো আসছে!

‘খুক খুক খুক!’

ও, তাই বলি! এই ঘরেই সেই কাশির শব্দ! আক্কুশ আঁকপাঁকিয়ে জানলার ফোকরে চোখ গলিয়ে দিল। যা ভেবেছে, ঠিক তাই। একটা বুড়ি। একটা শতচ্ছিন্ন কাঁথার ওপর শুয়ে আছে। তার না আছে জামা, না চাদর। গায়ে জড়িয়েছে একফালি কাপড়! সেই কাপড়েরও যা অবস্থা! না বলাই ভালো! এতে কি আর শীত মানে! ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে-মুকড়ে এমন করে শুয়ে আছে যে, দেখলেই মায়া লাগে! তা হলে আর কাশির কী দোষ বলো! এই হাড়-কাঁপানি শীতে মানুষটা যদি অমন করে পড়ে থাকে, তবে ঠাণ্ডা তো আর ছেড়ে কথা বলবে না! তার ওপর দেখেশুনে মনে হয়, বয়সেরও গাছপাথর নেই বুড়ির। এই যার হাল, তার বুকে সর্দি বসলে ঠাণ্ডাকে তো আর দুষতে পার না।

আরও ভালো করে দেখার জন্যে আক্কুশ জানলার ফাঁকের ভেতর মাথাটা গলিয়ে উঁকি মারলে! অবিশ্যি আক্কুশ ইচ্ছে করলে জানলা টপকে ভেতরেও ঢুকে যেতে পারে। কিন্তু না, হুট করে কিছু না-করাই ভালো। সে বাইরে থেকেই প্যাটপ্যাট করে দেখতে লাগল। আলোর আভাটা যে কোত্থেকে আসছে, এখন সে স্পষ্ট দেখতে পেয়েছে। দেখতে পেল, ঘরের মধ্যে একটা পিদিম মিটমিট করে জ্বলছে। আলোর ছায়া পড়েছে সারা ঘরে। একটু-একটু ছায়া ঘরের আঁধারটাকে যেন থমকে-থমকে চমকে দিচ্ছে। আর মাঝে মাঝে একটা চাপা নিশ্বাস, হয়তো বুড়িরই হবে, বুক ঠেলে বেরিয়ে আসছে! কী ভয়ঙ্কর ভুতুড়ে-ভুতুড়ে ঘরখানা! দেখেশুনে আক্কুশের ভীষণ লোভ হয়ে গেল! এই ঘরখানা যদি দখল করা যায়, তা হলে যা হয় না! ভূত-পেরেতের জন্যে বাসাখানি একদম খাসা!

‘খুক খুক খুক!’

ওই দ্যাখো, আবার কাশল! আহা রে, কী কষ্টই না পাচ্ছে বুড়িটা! অন্তত গায়ে যদি একটুকরো চাদরও থাকত, তা হলে কিছুটা কষ্ট থেকে তো মানুষটা রেহাই পেত। কিন্তু চাদর তাকে কে দিচ্ছে বলো! বুড়ির দশা দেখে আক্কুশের মনটা ভারী খারাপ হয়ে গেল।

ওহো! দ্যাখো, দ্যাখো, এতক্ষণ মনেই ছিল না আক্কুশের। যাচ্চলে, তার নিজের গায়েই তো একটা চাদর! সঙ্গেসঙ্গে চাদরটা গা থেকে খুলে ফেলল আক্কুশ। লাগুক তার ঠাণ্ডা। সে তো ভূত! ভূতের তো আর সর্দিকাশির ভয় নেই। বরঞ্চ বুড়ির গায়ে জড়িয়ে দিলে, শীতের হাত থেকে মানুষটা তো বাঁচে!

তা তুমি আক্কুশকে ভূত বল আর যাই বল, এখন তো মনে হচ্ছে, মনটা তার বড্ড নরম। অবিশ্যি এখন নরম গরমের কথা মনে না আনাই ভালো! ভূতকে বিশ্বাস আছে! কখন যে তিনি নরম হবেন, আর কখন গরম, কে বলতে পারে! বাছাধনদের গাঁটে-গাঁটে শয়তানি!

কিন্তু দ্যাখো, আক্কুশ সত্যি সত্যি জানলার ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে! ঘরে ঢোকা কি, ব্যস, একেবারে সঙ্গেসঙ্গে কে আচমকা চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভূত! ভূত!’

চেঁচানিটা যে মানুষের গলার স্বরের মতো নয়, সেটা বুঝতে আক্কুশের একটুও গোলমাল হয়নি। কিন্তু বোকাটা ঠাওর করতে পারেনি, ঘরের এককোণে দাঁড়ে বসে তাকে দেখে ফেলেছে একটা কাকাতুয়া! নিশ্চয়ই বুড়ির পোষা! ব্যস! যেই না চেঁচানি শোনা, ভড়কে গেছে আক্কুশ! আর এমন ভড়কাল যে, তার চোখে সর্ষেফুল! ঘরে ছিল একটা কাঠের সিন্দুক। আর কিছু না পেয়ে মেরেছে এক লাফ। মেরেই, উঠবি তো ওঠ তারই মাথায়।

কাকাতুয়াটা আবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘সিন্দুকের মাথায় ভূত বসেছে, ভূত বসেছে!’

আসলে ভুল তো আক্কুশ নিজেই করে বসেছে। সে নিজে অদৃশ্য, কিন্তু সঙ্গে তো তার চাদর! সেটি যাবে কোথায়? চাদর তো আর চোখকে ফাঁকি দিতে পারছে না!

পাখির ক্যারক্যারানিতে এমন বেসামাল হয়ে গেল আক্কুশ যে, সিন্দুকের মাথা থেকে মারল এক লাফ। মেরেই, পাঁই-পাঁই করে চরকিবাজি লাগিয়ে দিলে। সঙ্গেসঙ্গে ঘরের মধ্যে একটা দমকা হাওয়া ছুটে গেল। ব্যস! দমকা হাওয়ায় পিদিমটা ফুস! ঘর একেবারে জমাট অন্ধকারে ডুবে গেল! অমনি কাকাতুয়া আবার চিল্লিয়ে উঠল, ‘ভূতে পিদিম নেবাল, ভূতে পিদিম নেবাল!’

হট্টগোলে বুড়ির ঘুম গেছে চটকে। ফিনফিনে গলায় বুড়ি খিনখিন করে ধমকে উঠল, ‘চেঁচাস কেন রে কাতুয়া! ঘুম নেই চোখে? নিদটা আমার চমকে গেল!’ বুড়ি বোধহয় আদর করে পাখির নাম রেখেছে কাতুয়া।

কাকাতুয়া ভয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে বললে, ‘না গো ঠানি, মিথ্যে বলছি না। ঘরে একটা ভূত ঢুকে আলো নিবিয়ে দিয়ে গেল।’ কাকাতুয়াও বোধহয় ঠানদি কথাটা বলতে পারে না। তাই তাঁকে ঠানি বলে।

বুড়ি বললে, ‘তোমার মুন্ডু করল। ঘরে বাতাস ঢুকল, তাই আলো নিবল। দেখছিস না, জানলাটা হাট হয়ে আছে।’

কাকাতুয়া বললে, ‘ঠানি, ঠানি, তোমার চোখে ছানি! আমি নিজের চোখে দেখলুম। উড়তে-উড়তে জানলা দিয়ে ঘরের ভেতর একটা চাদর ঢুকল। আমি ‘ভূত, ভূত’ বলে চেঁচাতেই চাদরটা উড়ে গিয়ে সিন্দুকের মাথায় বসল। আমি আবার যেই তেড়ে উঠলুম, চাদরটা সিন্দুক থেকে নেমে শূন্যে চরকি খেতে-খেতে পিদিমটা নিবিয়ে দিল!’

বুড়ি কড়কে উঠল। বললে, ‘পাখির কথা শোনো! হাসব, না কাঁদব! রাতদিন গান্ডেপিন্ডে গিলবে। হজম করতে পারবে না। রাতদুপুরে আজেবাজে স্বপ্ন দেখবে! জ্বালিয়ে খেল! নাও, আর ন্যাকাপনা করতে হবে না। এখন চোখের পাতা-দুটো এক করে আমাকে একটু স্বস্তি দাও! দিনরাতই তো কপচাচ্ছ! রাতদুপুরেও মুখের বুলি থামে না! একে আমি ঠাণ্ডায় মরছি!’

বুড়ির কড়কানি খেয়ে কাকাতুয়া চুপ মেরে থমকে গেল। এই ফাঁকে অন্ধকারে আক্কুশও হাওয়া। জানলা গলে সটান বাইরে। কিন্তু যাবে কোথায়! নিজেকে অন্যের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখতে তো কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু যত ঝঞ্ঝাট বাধাচ্ছে এই চাদরটা। এই চাদরটার জন্যেই ছ্যা: ছ্যা:, এই রকম একটা বিচ্ছিরি ঘটনা ঘটে গেল! আর একটু সাবধানে সামলে-সুমলে কাজটা করতে পারলে তাকে এমন বিপদে পড়তে হত না।

হেসে ফেলল আক্কুশ, নিজের মনেই, আচমকা। ছি: ছি:, কী মুখখু সে! পালাচ্ছে! কার ভয়ে পালাচ্ছে! তারই ভয়ে সবাই পালায়, এখন তাকেই পালাতে হচ্ছে! তাও কী, না একটা তুচ্ছ কাকাতুয়ার ভয়ে! তা ছাড়া এখনও পর্যন্ত আক্কুশ যা দেখেছে, তাতে এত বড়ো একটা বাড়িতে প্রাণী বলতে দু-টি। একটি বুড়ি, আর একটি ওই পাখি। ভূত হয়ে সে এদের ভয় পায়! ভূতের নামে বদনাম! আক্কুশ কি পারে না? ইচ্ছে করলেই পারে। এমন কেরামতি দেখাতে পারে যে, এক খিঁচুনিতেই পাখির চক্ষু কপালে! ধুত! পাখির নিকুচি করেছে।

সুতরাং আক্কুশ আবার বুড়ির ঘরের সেই জানলাটার সামনে হাজির হল। এখন জানলাটা পুরো খোলা। আক্কুশ পড়িমরি করে সেই যে বেরিয়ে গেল, সেই থেকে হাট হয়ে আছে। জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়া হু-হু ঘরে ঢুকছে। ওই তো বুড়িটা ছটফট করে কাঁপছে। না, আর ঘরের ভেতর বাহাদুরি করে না-ঢোকাই ভালো। বরঞ্চ এই বাইরে থেকে জানলা দিয়েই চাদরটা বুড়ির গায়ে ছুড়ে দেবে আক্কুশ। সেই ভালো। চাদরটা সে সত্যি সত্যি ছোড়বার জন্যে তুলেছে! এই বুঝি ছুড়ে দেয়! না, ছুড়তে-ছুড়তে সে ছুড়ল না। কী মনে হল, চাদরটাকে জানলায় রেখে, আক্কুশ দু’হাতে ভর দিয়ে ঝুঁকি দিল। ঘরের ভেতরটা আর একবার দেখল। পিদিমটা নিবে যাবার পর থেকেই অন্ধকার যেন ঘরটাকে গিলে খাচ্ছে! অন্ধকার দেখলে আক্কুশের যে কী আনন্দ হয়! শুধু আক্কুশ কেন, অন্ধকার মানেই তো ভূতেদের তিড়িং-তিড়িং নৃত্য আর হাঁউ-মাঁউ-খাঁউ দস্যিপনা। এখন অবশ্য অন্ধকার দেখে আক্কুশের আনন্দের কথা মনে পড়ল না। মনে পড়ল, সেই কাকাতুয়ার কথাটা! উঃ! শয়তানটা কী প্যাঁচেই না ফেলেছিল আক্কুশকে! ওই যে তিনি দাঁড়ে বসে আছেন! আক্কুশ তাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে বটে, কিন্তু ঘুমুচ্ছে কি না বুঝতে পারছে না! পাখিগুলো তো ভারী চালাক! একটু ফুট-ফাট শব্দ করার যো নেই! তা হলেই একেবারে চ্যাঁচ্যাঁ-ট্যাঁট্যাঁ করে পাড়া মাত করবে! সুতরাং তাকে আর-একটু নজরে রাখা দরকার! দেখা যাক, কতদূরের জল কোথায় গড়ায়!

এই কথা ভেবেই আক্কুশ সামলে-সুমলে আর একবার ঘাড়টাকে উঁচিয়ে ধরল অন্ধকারে! থমথমে সেই আঁধার ঘরে আক্কুশের সেই ভুতুড়ে চাউনি, কী ভয়ঙ্কর! বাবা, মনে হচ্ছে যেন গিলে খাবে। সে চাউনি নড়ে না, চড়ে না। ওঠে না, পড়ে না। শুধু ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে।

ফড়ফড়, ফুড়ফুড়! হঠাৎ কীসের শব্দ! এই রে, একটা চামচিকে! উড়ছে! কোথায় ছিল! আনিমানি ফুড়ুত! ব্যস সেই জানলা গলে পালাতে গিয়ে সুড়ুত করে আক্কুশের নাকের ভেতর ঢুকে পড়েছে! সব্বোনাশ! কী হবে! কী আর হবে। আক্কুশের নাকটা তো আর তোমার আমার মতো মাংস দিয়ে ঠাসা নয়। সে-নাকে তো নাকই নেই! ফুটোফাটা খাবলা গর্ত! চামচিকেটা নাকের গর্তে ঢুকে পড়েই চোখের গর্ত দিয়ে ফসকে বেরিয়ে পড়েছে। বেরিয়েই হুশ! সে না হয় হল! কিন্তু এদিকে যে আক্কুশ বেসামাল। আক্কুশের নাকের গর্তে চামচিকের নখের খোঁচা লেগে এমন সুড়সুড়িয়ে উঠল যে, আক্কুশ সামলাতে পারলে না। ফ্যাচাং করে হেঁচে ফেলেছে! ব্যস! একদম হিতে বিপরীত। সঙ্গেসঙ্গে কাকাতুয়াটা ছটফটিয়ে কপচে উঠল, ‘শুনলে তো ঠানি।’

বুড়িও ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছে। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘হ্যাঁ, কে হাঁচল বল তো?’

কাকাতুয়াটা ছটফটিয়ে বললে, ‘ভূতের হাঁচি! তুমি বুঝতে পারলে না?’

বুড়ি বললে, ‘দূর হতভাগা, ভূত কখনো হাঁচে!’

কাকাতুয়া এবার বেশ চটে গেল। খ্যাঁকখেঁকিয়ে বুড়িকে বললে, ‘তোমার তো গঙ্গাযাত্রার সময় হল, অথচ ভূতে যে হাঁচে এটা জানার সময় হল না এখনও! এমন নেদা বুড়ি আমি জন্মে দেখিনি।’

কাকাতুয়ার কথা শুনে বুড়ির মেজাজ গেছে বিগড়ে। রেগে টং। কিন্তু বুড়ি তো আর কাকাতুয়ার মতো চিল্লাতে পারে না। বুড়ি শুকনো গলায় ধমক মেরে বললে, ‘দ্যাখ কাতুয়া, পাখি পাখির মতো থাকবি। আমায় নেদা বলিস তুই কোন সাহসে! দাঁড়ে বসিয়ে ছোলা খাওয়াচ্ছি, ছাতু খাওয়াচ্ছি, গায়ে-মাথায় হাত বোলাচ্ছি, আস্পর্ধা তো কম নয়! যার খায়, তাকেই ভেঙায়! তবে শোন হতচ্ছাড়া পাখি, আমি যদি নেদা হই তো, তুই ছেঁদা!’

পাখিরও মাথার ঝুঁটি রাগে ফুলে উঠল। সেও ছাড়বে কেন? বললে, ‘দ্যাখো ঠানি, আমায় ছেঁদা বলছ কোন সাহসে শুনি! তোমার এই শেকল-বাঁধা দাঁড়ে বসিয়ে-বসিয়ে দুটো খেতে দিচ্ছ বলে কি মাথা কিনে নিয়েছ! খেতে কি অমনি-অমনি দিচ্ছ? গাদা গাদা সোনাদানা এই ঘরের মাটির তলায় লুকিয়ে রেখেছ, সেগুলো পাহারা দিচ্ছে কে শুনি? তুমি? অত গঞ্জনা আমি শুনতে চাই না। আর আমার পায়ে শেকল বেঁধে, আমাকে নিয়ে তোমার আদিখ্যেতাও করতে হবে না। আমাকে ছেড়ে দাও! ভালো কথা বলছি, তা না, ঝগড়া করে মরছে! মানুষগুলোই এমনি! স্বার্থপর!’

বুড়ি খেঁকিয়ে উঠল, ‘পাখির মরণ! ভয় দেখাচ্ছে ভূতের, আবার বলছে ভালো কথা। ভূত কি আমার সোনাদানার খোঁজ পেয়েছে যে, আমার ঘরে ঢুকবে? বুদ্ধির ফুলঝুরি!’

পাখি উত্তর দিলে, শুনি চোর মরে ভূত হলে, সে-ভূত চোর হয় না তো কি সাধু হয়!’

বুড়ি পাখির কথার কী উত্তর দিল, শোনা হল না আক্কুশের। ঝগড়াটাও যে আর কতদূর গড়াল, তাও দেখা হল না আক্কুশের। গাদাগাদা সোনাদানা এই ঘরের মাটির নীচে লুকোনো আছে, পাখির মুখে এই কথা শুনে চমকে উঠেছে আক্কুশ! একে হেঁচে ফেলতেই সব গুবলেট, তার ওপরে সোনাদানা! আর দাঁড়ায়! ঠ্যাং নেংচিয়ে মার ছুট! যা:! হুড়োহুড়িতে একটা ঠিকে ভুল হয়ে গেল যে! আসল চাদরটাই তো আনা হল না। সেটা তো বুড়ির ঘরের জানলায় ঝুলিয়েই পালিয়ে এসেছে আক্কুশ! ইশ! কী বেআক্কেলে ভূত রে বাবা! কোথায় লোকে তোকে দেখে ভিরমি খাবে, তা নয়, তুই একটা কাকাতুয়া আর বুড়ির ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিস! না, আক্কুশের দ্বারা কিচ্ছু হবে না। দুয়ো!

সত্যিই, চাদরটা ফেলে আসা একেবারে আহাম্মকি হয়ে গেল! কী করবে এখন? আবার যাবে? আবার যদি ঝঞ্ঝাট বাধে?

বাধুক। তাই বলে শীতের রাতে একটা চাদর ঝুটমুট জানলায় ঝুলবে আর একটা বুড়ি খামোখা ঠাণ্ডায় কষ্ট পাবে, এ হতে পারে না। একবার কোনো রকমে ঘরের মধ্যে ফেলে দিতে পারলে নিশ্চিন্তি!

এই ভেবে আবার আক্কুশ এগিয়ে গেল বুড়ির ঘরের দিকে। জানলার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়তেই ফোক্কা! এ কী! চাদর তো নেই! কোথায় গেল! আশ্চর্য! আক্কুশ একবার জানলা দেখে, জানলার নীচে মেঝেটা দেখে। পিছন দেখে, সামনে তাকায়। কই রে বাবা! চাদরটা কি ভেলকি হয়ে গেল!

‘ফিসফিস-হিসহিস।’

ধড়ফড় করে ঘুরে দাঁড়িয়েছে আক্কুশ! মনে হচ্ছে, কারা যেন ফিসফিস করে কথা কইছে! ফিসফিসানিটা যে দরদালানের ওই পাশ থেকে আসছে, আক্কুশ সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারল! সুতরাং এখন আর জানলার ধারে না দাঁড়িয়ে সে নি:শব্দে ডিঙি মারল! দেখতে তো হয়, কে কথা কয়! এগিয়ে চলল আক্কুশ ওই দিকেই। যতই এগোচ্ছে ফিসফিসানিটা ততই বাড়ছে। আর আক্কুশের মুন্ডুখানাও ততই এপাশ-ওপাশ ঘুরছে। হ্যাঁ, আর কোনো ভুল নেই, এ নির্ঘাত মানুষের গলার স্বর! আরও একটু এগিয়ে চলো! আর একটু। ওই তো! ওই তো! কারা যেন দরদালানের থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে! দেখার সঙ্গেসঙ্গে একেবারে নি:সাড়ে তাদের পেছনে গিয়ে দাঁড়াল আক্কুশ। দেখল দুই মূর্তিমান চোরের মতো দাঁড়িয়ে কী যেন পরামর্শ করছে! আরি ব্বাস! একজনের হাতে আক্কুশেরই চাদরটা! আক্কুশ দেখেই থতমত খেয়ে গেছে। সুতরাং তাদের কথাবার্তাগুলো শোনার জন্যে আক্কুশ কানখাড়া করে দাঁড়াল। আক্কুশ স্পষ্ট শুনতে পেল একজন আরেকজনকে বলছে, ‘চাদরটা জানলায় কে রাখল?’

আরেকজন উত্তর দিল, ‘আমারও তো অবাক লাগছে।’

‘আমাদের মতলবটা কেউ জানতে পেরে, আমাদের পিছু নেয়নি তো!’

‘এখানে এই পোড়োবাড়িতে কেউ ঢুকতে সাহসই পাবে না। বুড়ির সোনাদানার কথাটা আমরা ছাড়া আর জানেই বা কে!’

‘জানতে কতক্ষণ। কাজটা আমাদের এখনই হাসিল করতে হবে।’

‘কিন্তু বুড়ি তো জেগে আছে।’

‘তুই দেখলি?’

‘শুনতে পেলুম বুড়ি পাখির সঙ্গে ঝগড়া করছে।’

‘তাহলে এখনই বুড়ির ঘরে ঢোকাটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।’

‘আমারও তাই মনে হয়। এখানে একটু অপেক্ষা করতে হয়। বুড়ি কতক্ষণ আর জেগে থাকবে! এক্ষুনি ঘুমিয়ে পড়বে।’

‘সেই ভালো, এখানেই একটু বসি। চাদরটা পেয়ে ভালো হয়েছে। আয় দু-জনে ভাগাভাগি করে চাদরটা গায়ে দিই।’

সত্যিই দু-জনে সেইখানেই ঘাপটি মেরে বসে পড়ল। দু-জনেই ভাগাভাগি করে চাদরটা গায়ে দিল। তারপর চুপ মেরে গেল!

দেখেশুনে আক্কুশ থ হয়ে গেছে। তার মতো ভূতের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কোন ফাঁকে যে চাদরটা বাছাধন হাতসাফাই করল, আক্কুশ টেরই পেল না। না, চোরই বটে! একদম পাকা-পোক্ত গাঁটকাটা! আর মতলবটা শুনলে তো? বুড়ির সোনাদানাগুলো হাতড়াবেন! বা:! বাহাদুরি কাকে বলে! দিচ্ছে! তোমাদের সোনাদানা দেবে না ছাই দেবে! এমন প্যাঁচ মারবে না আক্কুশ, চুরি করা ঘুচে যাবে চিরদিনের মতো!

হেসে ফেলল আক্কুশ হঠাৎ! অবিশ্যি চিৎকার করে হাসল না সে। মুখের ভেতর হাসিটাক চেপে খিলখিলিয়ে উঠল! হাসবেই তো! দ্যাখো, লোকদুটো বসতে-না-বসতেই কেমন নাক ডাকাতে শুরু করে দিয়েছে! একে রাত হয়েছে, তার ওপর চাদরটা জড়িয়ে কী আরাম! দু-জনে মোষের মতো ফোঁসফোঁসানি লাগিয়ে দিয়েছে। যার চাদর, সে কোথায় শীত-টিত গ্রাহ্যি না-করে চাদরটা বুড়িকে দেবে বলে ঠিক করেছে, আর ওনারা কোথাকার কে, দিব্যি চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুম দিচ্ছেন। কী আব্দার দ্যাখো! দাঁড়াও না, আয়েস বার করছি! আর একটু ঘুমুতে দাও!

সত্যি, লোকদুটো বসে ঢুলতে ঢুলতে যখন মাটির ওপর নেতিয়ে পড়ল, তখন আক্কুশ ভাবল এই তাল। চুপিচুপি হাত বাড়িয়ে আক্কুশ চাদরে মেরেছে এক টান। একটানেই চাদরটা ছিটকে একেবারে আক্কুশের হাতে। চাদর নিয়ে মার ছুট। ছুটতে-ছুটতে চটপট দরদালানের একটা থামের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। লুকিয়ে উঁকি মেরে দেখতে লাগল! এই রে! অমন লাগতাই ঘুমটা একটানেই দু-জনের চোখ ফসকে টসকে গেল। দু-জনেই উঠে পড়েছে। বিলিতি বেগুনের মতো লাল টকটকে চোখ টেরিয়ে দু-জনে ড্যাবড্যাব করে দেখতে লাগল! এমন ঘাবড়ে গেল, মুখ দিয়ে আর বাক্যি সরে না! ও বাবা! এ যে দেখি পা-পা হাঁটি-হাঁটি করতে-করতে এদিকেই এগিয়ে আসছে! লোকদুটো পালাবার পথ খুঁজছে না, লুকোবার জায়গা খুঁজছে! এদিকে যে আক্কুশের প্রায় কাছেই চলে এসেছে! এক্ষুনি তো দেখে ফেলতে পারে! কী করবে আক্কুশ! আর দাঁড়ায়! অন্ধকারের ভেতর দিয়ে আবার ছুট! সামনে কী আছে, কী নেই সেসব দেখার এখন কি সময়! দুটো চোরের ভয়ে এখন সে নিজেই যেন একটা চোর! কোনদিকে পালালে যে এ-যাত্রা লোকদুটোর হাত থেকে নিস্তার পাবে, আক্কুশ বুঝতেই পারছে না। তাই সে দরদালানটার ওপরই ঘুরপাক খাচ্ছিল। খেতে-খেতে হঠাৎ নজরে পড়ে গেল, উঠোনের ওপর একটা ঝাঁকড়া বট গাছ। আর দাঁড়ায়, মার লাফ সেই গাছের ওপর। মেরেই পাতার ফাঁকে সিঁটিয়ে থাকে! আর তাকে দেখতে হচ্ছে না!

আচ্ছা, আক্কুশের মাথায় কী আছে বল তো? কী করে তুই ভাবছিস তোকে আর কেউ দেখতে পাবে না। চাদরটা যাবে কোথায়? গাছে ওঠার সময় সেটা তো ঝোপের মধ্যে ফেলে দিবি, তা নয়, সেটা সঙ্গে নিয়ে উঠেছিস! বলিহারি বুদ্ধি!

ওই দ্যাখো, লোক দুটো এবার সত্যিই চোরের মতো হাঁটছে! আলতো-আলতো পা ফেলছে। সামনে যাচ্ছে, পিছন ফিরছে। চোখ দুটো সন্দেহে এদিক-ওদিক ঘোরাচ্ছে-ফেরাচ্ছে। হাঁটতে-হাঁটতে পড়বি তো পড়, একদম বুড়ির ঘরের সামনে। হ্যাঁ, এই ঘরেই তো সোনাদানা আছে! দুই চোর চোখে-চোখে ইশারা করল! তারপর বুড়ির ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারল। অমনি তুলকালাম কান্ড! বুড়ির ঘরের ভেতর থেকে সেই কাকাতুয়াটা জানলায় ওদের ছায়া দেখে আচমকা চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘কে র‌্যা, জানলার কাছে উশখুশ করছে!’

ব্যস! দুজনেই পাঁই-পাঁই করে ছুট! প্রাণের ভয় কি আর বাধা-বিপত্তি মানে? না, অন্ধকারে কোথায় ঝোপজঙ্গল? কোথায় খানা, কোথায় গর্ত, তার নজরে পড়ে? তখন চোখ-কান বুজে দে লম্বা! ব্যস! ধপাস! একটা চোর হোঁচট খেয়েছে! দরদালান থেকে ছিটকে একেবারে ওই উঠোনে ঝোপের মধ্যে। তার পেছনে যে-লোকটা ছুটছিল, সে-ও টাল সামলাতে পারলে না। হুড়মুড় করে পড়ল গিয়ে তারই ঘাড়ের ওপর। ঘাড় থেকে হুমড়ি খেয়ে সটান বটগাছের নীচে চিতপাত!

‘হিঁ-হিঁ-হিঁ।’ যা:! লোক দুটোর দশা দেখে মুখ ফসকে হেসে ফেলেছে আক্কুশ।

লোক দুটোর মাথায় যেন বাজ পড়ল। ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে পড়েছে দু-জনেই। হাসিটা যে গাছের ওপর থেকে শোনা গেল, এটা বুঝতে কষ্ট হয়নি তাদের। দু-জনেই একসঙ্গে গাছের ওপরে তাকিয়েছে! তারপরেই চক্ষু কপালে! অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সেই চাদরটা গাছের ডালে ঝুলছে! তাই না দেখে, লোক দুটোর তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া! ভয়ে মুখ আমচুর! পা-ও নড়ে না, কথাও সরে না! কেউ তাদের দেখল, না, তারা ভূতের পাল্লায় পড়ল! সঙ্গেসঙ্গে ঠকঠকানি ভয়ে কাঁপুনি!

তাই না দেখে আক্কুশের এমন মজা লেগে গেল যে, আর চুপ করে থাকতে পারল না। আবার হেসে ফেলেছে, ‘হিঁ-হিঁ-হিঁ।’

অমনি লোক দুটো চিল-চেঁচিয়ে উঠল, ‘মা রে! বাবা রে!’ চেঁচিয়েই ঝোপের মধ্যে ঝাঁপাঝাঁপি করতে-করতে মার ছুট!

তাদের ছুটতে দেখে আক্কুশও তরতর করে গাছ থেকে নেমে এসেছে। নেমে এসে, লাগাও তাড়া! লোক দুটো যেদিকে পালায়, আক্কুশও সেদিকে ছোটে! লোক দুটো বাঁয়ে গেলে আক্কুশও বাঁয়ে যায়। লোক দুটো ডাইনে গেলে আক্কুশও ডাইনে যায়! শেষে লোক দুটো ‘ভূত, ভূত’ বলে চিৎকার শুরু করে দিলে!

চিৎকার শুনে কাকাতুয়া চেঁচিয়ে উঠল ঘরের মধ্যে, ‘ঠানি, ঠানি, উঠে পড়ো, উঠে পড়ো! ওই শোনো, ঘরে ভূত!’

চিৎকার শুনে বুড়ির তো আগেই ঘুম ভেঙে গেছে। ঘরের আগল খুলে পড়িমরি বাইরে বেরোতে যাবে কি, কাকাতুয়া আবার চেঁচাল, ‘ঠানি, ঠানি, বাইরে যেওনি, বিপদে পড়বে!’

বুড়ি কি আর কাকাতুয়ার কথা শোনে! বাইরে তো সে বেরিয়েই পড়েছে! আর অমনি সঙ্গে-সঙ্গে সেই চোর দুটো ‘ভূত-ভূত’ বলে ছুটতে গিয়ে একেবারে বুড়ির সামনে! বুড়ি অন্ধকারে ঠাওর করার আগেই লোক দুটো ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে! যেই না ঢোকা, পড়বি তো পড় কাকাতুয়ার ঠোঁটের সামনে! কাকাতুয়া একজনের চোখে ঝেড়েছে এক ঠোক্কর! ব্যস! একেবারে রক্তগঙ্গা বয়ে গেল! আর একজন তাই না দেখে ঘরের দরজা ডিঙিয়ে যেই পালাতে গেছে, কাকাতুয়া চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভাগল, ভাগল।’ অমনি বুড়ি ঘরে ঢুকে লোকটার নাকে দিয়েছে এক চিমটি! বুড়ির নখ তো! নাক-টাক কেটে-ছড়ে একশা!

এদিকে তো আক্কুশও এসে পড়েছে! মজা দেখতে-দেখতে সে যেন আর থাকতে পারছে না। শেষকালে বুড়ি যখন লোকটার নাকে চিমটি কেটে দিল, আক্কুশ তখন সত্যি আনন্দে লাফালাফি লাগিয়ে দিলে! লাফাতে-লাফাতে তার আর খেয়ালই রইল না যে, সে ভূত! খুশিতে হাড়ে-হাড়ে তালি দিয়ে সে অদ্ভুতুড়ে গলায় চেঁচিয়ে উঠল:

বেঁশ হঁয়েছেঁ, খোঁচা মেঁরেছেঁ

চোঁরেঁর নাঁকেঁ বুঁড়ি

চুঁলেঁরঁ মুঁঠিঁ খাঁমঁচেঁ এঁবাঁরঁ

দাঁওঁ নেঁড়েঁ ধুঁধঁধুঁড়িঁ।

ব্যস! আর যাবে কোথায়! পাখির ঠোঁটের ঠোক্কর খাওয়া সেই কানা চোরটা, আর বুড়ির নখের খোঁচা খাওয়া সেই বোঁচা চোরটা ‘বাবা গো, ভূত’ বলে এমন ছোটা ছুটল যে, আর কে ধরে তাদের! দেখেশুনে বুড়ির হাত-পা বুঝি পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়! সঙ্গেসঙ্গে পাখি চিল্লিয়ে উঠেছে, ‘ঠানি, ঠানি, ওই দ্যাখো ভূত, গায়ে চাদর! ঘরের ভেতর পালিয়ে এসো, পালিয়ে এসো!’

পাখির কথা শুনে আক্কুশও ঘাবড়ে গেছে। বুড়ি ঘরে ঢুকতে যাবে কি, আক্কুশ চাদরটা গা থেকে ছুড়ে ফেলে দে ছুট! ছুড়ল তো ছুড়ল, এমন ছুড়ল, চাদরটা গিয়ে পড়ল সটান বুড়ির মাথায়! বুড়ি ‘বাপ রে, মা রে’ বলে ঘরের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে চিতপাত!

কাকাতুয়াটা ঝুঁটি ফুলিয়ে চেঁচাল, ‘ভূতের মরণ, আর লোক পেল না, বুড়ির ঘাড়ে চাপতে এসেছে!’ তারপর বুড়িকে বললে, ‘বললুম, বাইরে যেওনি, তা গরিবের কথা তো কানে নেবে না! নাও, এখন বোঝো!’

বুড়ি সুড়সুড় করে উঠে বসল। চোখ ঠেরিয়ে এদিক-ওদিক চাইল। তারপর বলল, ‘কাতুয়া রে, কাতুয়া, কী দেখলুম আমি!’

‘কী দেখলে গো ঠানি!’

‘ভূত নয় রে, ভূত নয়!’

‘তবে?’

‘আমার মাসি এসেছে রে, মাসি।’

‘কই?’

‘ওই! আমার কষ্ট দেখে আমার গায়ে চাদর দিল। আমায় হাতছানি দিয়ে ডাকল। আমার মুখের দিকে চেয়ে মুচকি হাসল।’ বলেই বুড়ি হাঁক পাড়ল, ‘মাসি, তুমি কোথায় গেলে গো…’ বলতে-বলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এল।

পাখি ডাকল, ‘ঠানি যেওনি, ঠানি যেওনি।’

কে কার কথা শোনে! বুড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে মাসির খোঁজে ঘুরতে লাগল সেই ভাঙাবাড়ির অন্দরে। আর আক্কুশ চোঁ-চোঁ দৌড়োতে-দৌড়োতে ভাঙাবাড়ির পাঁচিল ডিঙিয়ে একেবারে বাইরে! মেরেছে লাফ! এই রে, পাঁচিলের নীচে একটা ছাগল বসে ছিল। পড়বি তো পড় তার ওপর! ছাগল তো তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে এমন ব্যা-ব্যা করে মরাকান্না জুড়ে দিলে যে, বলার কথা নয়। নিঝুম রাতে তার সেই চেঁচানি শুনে, এপাশ-ওপাশ থেকে ঘেউ-ঘেউ, ঘেউ-ঘেউ করে কুকুর চিল্লিয়ে একেবারে পাড়া মাত করলে। আক্কুশ আর দাঁড়ায় সেখানে! যেদিকে দু-চোখ যায় ছোট, ছোট!

এই রে! একটা কুকুর বুঝতে পেরেছে, আক্কুশ ছুটছে! ভূতের হাওয়া লেগে গেছে তার গায়ে! আর কী, কুকুরটা একেবারে দাঁত খিঁচিয়ে ছুটতে লাগল হাওয়ার দিকে আর গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল, ঘেউ-ঘেউ! আক্কুশ যে গাছে উঠে পড়বে, গাছ নেই। পুকুরে ঝাঁপ দেবে, পুকুর নেই। নিদেন একটা বাড়ির ছাদে যে উঠে পড়বে, ছাদ নেই! উঃ! কী দুর্ভোগেই না পড়েছে আক্কুশ! আর কুকুরকেও বলিহারি, গায়ে একটু হাওয়া লেগেছে কী, অমনি ধরে ফেলেছে ভূতের গন্ধ!

আরে! আরে! সামনে ওটা কী! কী তো কী! আক্কুশ শুধু বুঝতে পেরেছে ওটা একটা বেশ লুকিয়ে থাকার মতো জায়গা। ভেতরে কী আছে, না-আছে সেসব এখন কে দেখে! এখন তো কুকুরের হাত থেকে বাঁচুক!

হ্যাঁ, সেইখানে ঢুকে পড়েছে আক্কুশ! এই মরেছে! এ যে একটা ঘোড়ার আস্তাবল! আর কে দেখে আক্কুশকে! মেরেছে এক লাফ। মেরেই একটা ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়েছে। ভড়কে গেছে ঘোড়া। একেবারে সঙ্গেসঙ্গে ঘোড়া চিঁহিঁ-হিঁ করে ডাক ছেড়ে, চার পা তুলে নাচানাচি শুরু করে দিলে! এমন চিৎকার আর এমন লাফালাফি করতে লাগল, ঘোড়ার গলায় যে দড়িটা বাঁধা ছিল, সেটা ছিঁড়ল। দড়ি ছিঁড়ে ঘোড়া আস্তাবল থেকে বেরিয়ে এসে ছুটতে ছুটতে চরকি খেতে লাগল! দেখলেই ভয়ে আঁতকে উঠতে হয়! তারপর একদম রাস্তায়! রাস্তায় এসে ল্যাজ তুলে পালা, পালা! উঃ! কী ছুট! কী ছুট! আর কী চিৎকার! ঘোড়ার ওই মূর্তি দেখে কোথায় কুকুর আর কোথায় ছাগল! সব ভয়ে একেবারে ঠাণ্ডা!

আর আক্কুশ? ঘোড়ার পিঠে চেপে তার দারুণ মজা লেগে গেছে। ঘোড়া তো একেবারে তিরের মতো ছুটছে! থেমেছে কী আক্কুশ দিয়েছে খিমচি! একেবারে পেটের নীচে। আর তা না হলে ল্যাজ ধরে এক মোচড়! ঘোড়া লাফায়! ছুটতে-ছুটতে হাঁপায়! সামনে গর্ত দেখে না। তার ওপরই লাফিয়ে পড়ে। ভাঙাচোরা রাস্তা, খোঁড়া, দুড়দাড়িয়ে ছুটে চলে। এই দেখছি হোঁচট খাচ্ছে, পড়তে-পড়তে সামলে যাচ্ছে! বাব্বা! সে কী দৌড়! কিন্তু একবার সত্যিই ঘোড়া আর সামলাতে পারল না। মেরেছে ঠোক্কর একটা পাথরের ওপর। ব্যস! ঘোড়া বেটাল হয়ে ছিটকে গেল! আর আক্কুশ চিতপটাং! পড়েই, আক্কুশের ভয়ে বুক চুপসি! জায়গাটা কেমন যেন ঘুপচি-ঘুপচি! থেকে-থেকে খুসখাস শব্দ! শুকনো পাতার সড়সড়ানি। গাছে-গাছে মড়মড়ানি! মনে হয় পেছন থেকে এই বুঝি কেউ হাত-পা ছুড়ে জাপটে ধরে! অবিশ্যি জায়গাটা আক্কুশের পছন্দসই। কারণ বেশ সুনসান, নিরিবিলি! তবুও অচেনা জায়গা তো! মনটা একটু কিন্তু কিন্তু করে বই কী!

চিঁহিঁ-হিঁ! ঘোড়াটা ডেকে উঠল! আক্কুশ থতমত খেয়ে গেছে! এই বুঝি কেউ তেড়ে এল! আক্কুশ একছুটে ঘোড়ার কাছে! তাড়াতাড়ি লাগাম ধরে টানতে-টানতে, একটা গাছের কাছে নিয়ে এল। লাগামটা বাঁধল গাছের সঙ্গে। ঘোড়াটা পা পিছলে পড়েছে বটে, কিন্তু তেমন একটা লেগেছে বলে মনে হয় না। লাগেনি ঠিকই, তবে ভয়ে যে ঘোড়ার প্রাণটি শুকিয়ে গেছে, সে চোখ দেখলেই বোঝা যায়!

‘হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ!’

হঠাৎ যেন কে হেসে উঠল! আঁতকে উঠেছে আক্কুশ! মুখ তুলতেই চক্ষু চড়কগাছ! দেখে কী, একটা গর্তের ভেতর থেকে একটা বুড়ো-ভূতের ছায়া তার দিকে মুখ ভেংচিয়ে দেখছে! তারপর আর একটু টেরিয়ে চাইতেই বাছাধনের কম্ম সারা! দ্যাখে, অমন পঞ্চাশটা গর্ত থেকে, পঞ্চাশটা ভূতের মুখ ড্যাবড্যাব করে তার দিকে চেয়ে আছে! আক্কুশের আর কি বুঝতে বাকি থাকে যে, সে একটা কবরখানায় ছিটকে এসেছে, আর ভূতে তাকে ঘিরে ফেলেছে! বুড়ির সেই ভাঙাবাড়িতে যা ভয় পাচ্ছিল, এখানে তা-ই হল! আক্কুশ তাই না দেখে, মারল টেনে এক ছুট! অমনি সঙ্গেসঙ্গে অদ্ভুতুড়ে কান্ড! বুড়ো ভূতটা ধাঁ করে তার হাতটা ইয়া লম্বা করে ফেলল! সেই লম্বা হাত দিয়ে খপ করে আক্কুশের ঘাড়টা চেপে খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হেসে উঠেছে! সঙ্গে-সঙ্গে পঞ্চাশটা গর্তের পঞ্চাশটা ভূতও বিকট চিৎকার করে হাসি জুড়ে দিলে। কী ভয়ঙ্কর সেই হাসি! হাসির শব্দে, সেই চত্বরটা যেন থরথর করে কাঁপছে! বুড়ো ভূত আক্কুশের ঘাড়টা ধরেই খিঁচিয়ে উঠল, ‘কোঁন পাঁড়ার ভুঁত তুঁই? বেঁপাঁড়ায় এঁসে ফুঁক্কুঁড়ি কঁরছিস!’

বুড়ো ভূতের কথা শুনে একটা ঢ্যাঙা ভূত নাকিয়ে উঠল, ‘দিঁন না এঁক নম্বর ঠুঁকে! আঁমাদের আঁস্তানায় কোঁত্থেকে এল পুঁচকেটা? দেঁখুন, আঁবার কোঁনো ছোঁয়াচে রোঁগে মঁরে ভূঁত হঁয়েছে কিঁনা!’

তখন বুড়ো ভূতটা তাকে থামতে বলে আক্কুশকে জিজ্ঞেস করলে, ‘কোত্থেকে এঁসেছিস?’

আক্কুশ উত্তর দিল, ‘গাঁছ থেঁকে।’

‘মঁরলি কিঁসে?’

আক্কুশ বলল, ‘জলে ডুবে।’

ভয় পেলে যেমন পিলে চমকে ওঠে আমাদের, তেমনি পঞ্চাশটা ভূতেরও পিলে চমকায়। তারা আর্তনাদ করে উঠল, ‘আঁ-আঁ-আঁ!’

সঙ্গেসঙ্গে বুড়ো ভূতটা চেঁচিয়ে উঠল, ‘তাঁর মাঁনে, অঁপঘাঁতে!’

আক্কুশ বললে, ‘নৌঁকোঁ-ডুঁবি।’

পঞ্চাশটা ভূত আবার আঁতকে ওঠে, ‘ই-শ-শ!’

বুড়ো ভূত জিজ্ঞেস করল, ‘নৌঁকো চেঁপে কোঁথা যাঁচ্ছিলি?’

আক্কুশ উত্তর দিল, ‘যাচ্ছিলুম না, মাঁছ ধঁরছিলুম। ঝঁড় উঠল। নৌঁকোঁ ডুঁবে গেঁল। আঁমাকে হাঁঙরে ধঁরল। খেঁয়ে ফেঁলল।’

বুড়ো ভূতটা সঙ্গেসঙ্গে আক্কুশের ঘাড়টা ছেড়ে দিয়ে ছিঁছিঁয়ে উঠল, ‘ছিঁ-ছিঁ, আঁমার জাঁত গেঁল! তুঁই মাঁছ খাঁস! তুঁই মেঁছো ভূঁত !’

অমনি পঞ্চাশটা ভূত নাক সিঁটিয়ে খিঁকিয়ে উঠল, ‘মেঁছো, গাঁয়ে গঁন্ধ!’

‘মেছো’ বলতেই আক্কুশের মেজাজ বিগড়ে গেছে। যাবারই কথা! কারণ, মেছো বলে ঠাট্টা করাটা সে মোটেই পছন্দ করে না। তাই সে রেগে তেড়ে উঠল, ‘খঁবরদার বঁলছি, আঁমায় মেছো বঁলবে না! ভূঁতের আঁবার জাঁত বিঁচার! বুঁড়োর ভীঁমরঁতি ধঁরেছেঁ!’

এই কথা যেই না শোনা, অমনি একটা ভূত বুড়ো ভূতের কান-ভাঙচাল, ‘দাঁদু, দাঁদু, তোঁমাকে বুঁড়ো বঁললঁ।’

বুড়ো ভূত তো রেগেই ছিল! ওই কথা যেই শোনা, আর দেখতে হয় না, আগুনে যেন ঘি পড়ল। দপ করে জ্বলে উঠে গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মার ব্যাঁটাকে।’

অমনি হুলুস্থুলু কান্ড শুরু হয়ে গেল। পঞ্চাশ ভূত আক্কুশের পেছনে মারলে তাড়া। বুড়ো ভূতটা তো আর তেমন ছুটতে পারে না, তাই দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়েই ‘ধঁর, ধঁর’ করতে লাগল। উরি বাবা! সে কী দৃশ্য! একটা পুঁচকে ভূতকে মারবার জন্যে যে ভূতেরা যুদ্ধে নেমেছে! ভূতেদের সে কী তিড়িং-বিড়িং লম্ফঝম্ফ!

আক্কুশ তো আর ল্যাবাকান্ত নয় যে, দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে মার খাবে! সে ছোট্টভূত! তাকে ধরাও কি অত সহজ! পঞ্চাশটা ভূত ওকে ধরার জন্যে ছুটছে, আর আক্কুশও এর ঠ্যাঙের ফাঁক দিয়ে, ওর নড়ার নীচ দিয়ে এমন ভড়কি মেরে পালাচ্ছে যে, কেউ ধরতেই পারছে না। শেষকালে আক্কুশের হাড়গুলো যখন ছুটতে-ছুটতে টনটন করে উঠল, তখন আর কিছু না-পেয়ে মাটি থেকে ইট তুলেই সে ছুড়তে লাগল, সাঁই সাঁই! পঞ্চাশটা ভূতের মধ্যে অন্তত দশটা ভূতের তো দফারফা! কারো হাড়ে লাগে, কারও ঘাড়ে লাগে। কেউ সটকে পড়ে, কেউ পটকে যায়! শেষকালে ভূতগুলোও আক্কুশকে তাক করে ইট ছুড়তে শুরু করে দিলে। আক্কুশ একটা ইট ছোড়ে তো অন্যগুলো দশটা মারে। এই রে! আক্কুশ কী বিপদেই না পড়ল! এমন সময় হয়েছে কী, সেই বুড়ো ভূতটা তাল বুঝে এগিয়ে এসেছে! নি:সাড়ে আক্কুশের পেছন দিকে গিয়ে, ঝপ করে আক্কুশকে ধরে ফেলেছে। যেই না ধরা, আক্কুশ বুড়ো ভূতের পেটে মেরেছে ধাঁই করে একটা থান ইট। আর যায় কোথা? বুড়ো ইট খেয়েই চিত! চিত হয়ে হাত-পা ছুঁড়ে কোঁকাতে লাগল। ইট ছোড়া বন্ধ করে ভূতের দল হাঁয়, হাঁয় করে ছুটে এল বুড়োর কাছে। ফাঁকতালে আক্কুশও সামনের একটা বেলগাছে তরতর করে উঠে পড়েছে। উঠেই পাতার আড়ালে লুকিয়ে রইল। কিন্তু ভূতের চোখ তো! পাঁচটা না দেখতে পাক, একটা ভূত ঠিক দেখতে পেয়েছে। দেখেই চিৎকার করে উঠেছে, ‘বেঁলগাঁছে উঁঠেছে, বেঁলগাছে উঁঠেছে!’

ওমা! এই কথা শুনে ইটের ঘায়ে কাত সেই বুড়োটা তিড়িং করে লাফিয়ে উঠে কান্না জুড়ে দিলে, ‘কঁই রে, কোঁথা রে?’

তখন বাকি ভূতগুলো সব গাছের দিকে তাকিয়ে হৈ-হৈ করে উঠল, ‘ওঁই যেঁ, হোঁথা রে!’ বলে, গাছে ওঠবার জন্যে ঠ্যাং বাড়িয়ে হুড়োহুড়ি লাগিয়ে দিলে।

আক্কুশ দেখল, আর রক্ষে নেই। ভূতেরা মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে, কিন্তু ভূত তো আর ভূতের চোখকে ফাঁকি দিতে পারে না! অন্ধকারে মিশেই থাকো, কী অদৃশ্য হও, ঠিক দেখতে পাবে। সুতরাং আক্কুশ এবার গেল!

গেল বললেই কি আক্কুশ যায়! মনে করেছ ভূতগুলোকে সে গাছে উঠতে দেবে! হুঁ! ওর নাম আক্কুশ! গাছে উঠে ওকে ধরা অত সহজ? ভূতগুলো যেই গাছে ওঠার জন্যে হাত বাড়াচ্ছে, আক্কুশ অমনি করে কী, বেলগাছ থেকে একটা করে বেল ছেঁড়ে আর ভূতের গায়ে ছুড়ে মারে। যে উঠতে যায়, সে-ই ডিগবাজি খায়। যতবার যায় ততবারই বেল পড়ছে ঠাঁই-ঠাঁই! শেষকালে পালাই-পালাই হুড়োহুড়ি!

এরই ফাঁকে বুড়ো ভূতটা করেছে কী, গুটিগুটি এগিয়ে এসেছে! যেই-না হাত বাড়িয়ে আক্কুশের ঘাড়টা ধরতে গেছে, আক্কুশও ঠ্যাং ঝুলিয়ে ক্যাঁত করে মেরেছে এক ঘা। বুড়ো মুখ থুবড়ে চিতপটাং! পড়েই সে কী চেঁচানি!

এখন আক্কুশের আর নিস্তার নেই! বুড়ো যখন কাত হয়েছে, এবার আক্কুশ ঠিক মরেছে! একবার ধরতে পারলে হয়, আক্কুশের হাড় ক-খানা আর আস্ত থাকবে না! কী করবে তা হলে এখন আক্কুশ! এখন তাকে যেমন করে হোক পালাতে হবে! আর এই তাল। ওই দ্যাখো, বুড়ো-ভূতটা পড়ে-পড়ে কোঁকাচ্ছে! আর ক-টা ভূত বেলের ঘায়ে কোঁকাচ্ছে। বাকি ক-টা ভেগে-ভেগে চেঁচাচ্ছে! আক্কুশ ঠ্যাং ঝুলিয়ে ঝপাং করে গাছ থেকে মারলে লাফ! মেরেই, বাপ রে, বাপ! সে কী ছুট! আর কে ধরে! আক্কুশকে ছুটতে দেখে ভূতগুলো সব ধাঁধিয়ে গেছে! ওদের টনক যখন নড়ল, তখন আক্কুশ লাফটি মেরে ঘোড়ার পিঠে চড়ল! ঘোড়া তো তার গাছের গোড়ায় বাঁধাই ছিল! আক্কুশের ঘোড়া যখন আক্কুশকে পিঠে নিয়ে কদম-পায়ে ছুটল, ভূতগুলোর তখন আক্কেলগুড়ুম! ‘ভাঁগলঁ, ভাঁগলঁ,’ বলে তারা চিল-চেঁচিয়ে উঠল! ঘোড়া তখন ল্যাজ উঁচিয়ে পগার পার! ভূতগুলো যখন ‘ধঁর, ধঁর, মাঁর’ করে হম্বিতম্বি শুরু করে দিল, ঘোড়া তখন ছুটতে-ছুটতে

হিল্লি দিল্লি, কুত্তা বিল্লি,

চিল্লা-চিল্লি, ভয়ে ঢোক গিললি!

ঘোড়া তখন ভালো জানে না, মন্দ জানে না। ভূত জানে না, পুত জানে না। সে শুধু বুঝতে পেরেছে, তার পিঠে কেউ বসে আছে। পেটে কেউ ঢুঁ মারছে। ল্যাজে কেউ পাক দিচ্ছে। তাই সে চিঁ-হিঁ, চিঁ-হিঁ ডাক ছাড়ছে। টগবগ টগবগ ছুট দিচ্ছে আর বেদম জোরে লাফ মারছে। একটা যেন পাগলা-ঘোড়া!

ছুটতে-ছুটতে পাগলা-ঘোড়ার দিকবিদিক জ্ঞান নেই। আগুপিছু ধ্যান নেই। কী বললুম, কী শুনলুম, কান নেই! জান-প্রাণ লড়িয়ে দিয়ে সে একটা অচেনা, অজানা শহরে ঢুকে পড়ল। তখন রাতও কেটে গেছে। ভোরও ফুরিয়ে গেছে। সকালও গড়িয়ে গেছে। তখন ভরদুপুরে শীতের রোদে শহর যেন ঝকঝক করছে।

শহর-ভরতি লোকজন, শয়ে শয়ে গাড়ি-ঘোড়া, চোখ-ঝলমল বাজার-হাট। কান্না-হাসির হাজার বাত। ঠিক এই সময়ে, এই ব্যস্ত দুপুর—

পথের মাঝখানে ঘোড়ার দৌরাত্ম্যি দেখে তো সবাই থ। ঘোড়ার পিঠে কোনো সওয়ার নেই। লাগাম-ছাড়া হয়ে এমন ছুটছে, কিংবা লম্ফঝম্ফ করছে, দেখলেই মনে হচ্ছে, এক্ষুনি বুঝি অঘটন কিছু ঘটে গেল। ঘোড়াকে দেখে দুড়দাড়িয়ে সব ভয়ে ভাগে। কেউ কেউ আড়াল থেকে অবাক হয়ে চেয়ে দেখে। গাড়ি থামে। রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়ে খাঁ-খাঁ করে। আর ঘোড়ার পিঠে আক্কুশ ‘ফুস’ হয়ে বসে। মানে একদম ফোক্কা! কেউ তাকে দেখতেও পাচ্ছে না, কেউ কিছু বুঝতেও পারছে না।

এমন সময় হয়েছে কী, রাস্তার এক পাহারাদার পুলিশ, লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে এসেছে ঘোড়ার দিকে! আক্কুশ তো তাই দেখে ভয়ে কাঠ। এই বুঝি লাঠির ঘা পড়ল তার ঘাড়ে! অমনি আক্কুশ ঠক করে মেরেছে এক হাড়ের ঠোক্কর ঘোড়ার পিঠে। ঘোড়া তখন চিঁহিঁ-হিঁ-হিঁ করে চেঁচিয়ে, চার পা তুলে লাফিয়ে, ছুটতে-ছুটতে হাঁফিয়ে নাচন-কোঁদন শুরু করে দিলে। একদল ছেলে স্কুলের মাঠে খেলা করছিল, ঘোড়া লাফ মেরে সেখানেই ঢুকে পড়ল। ছেলের দল ভয়ে পালাতে গিয়ে কেউ আছাড় খায়, কারো পা ফসকায়! সেখান থেকে ছুটতে-ছুটতে ঘোড়া মারল গিয়ে এক মিষ্টির দোকানে ধাক্কা! আলমারির কাঁচ ভাঙল ঝন-ঝন-ঝনাত। দইয়ের হাঁড়ি উলটিয়ে ছত্রাকার। রসগোল্লার গামলাটা ছিটকে গড়াগড়ি! ঘোড়া সেখান থেকে ভোঁ-কাট্টা! চিঁহিঁ-চিঁহিঁ হাঁকতে-হাঁকতে ঢুকে পড়ল এক জলসার প্যান্ডেলে। জলসায় তখন গান চলছে। ওস্তাদজি তানপুরাতে তান ধরেছেন, আ-আ-আ! লোকে-লোকে প্যাণ্ডেলে ফুল। গানের তালে সবার মুখে ‘বাহা, বাহা’। ঘোড়া করেছে কী, প্যাণ্ডেলে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে, একেবারে লঙ্কাকান্ড শুরু করে দিলে! প্যাণ্ডেলের বাঁশ ওপড়ায়, টিন দোমড়ায়। এদিক ভাঙে, ওদিক হেলে। প্যাণ্ডেলের মধ্যে যেন ঘূর্ণিঝড় উঠল। কোথায় গান, কোথায় কী! ওস্তাদজির গলার গান মাথায় উঠল। তিনি ‘বাপ রে বাঁচাও, বাপ রে বাঁচাও’ বলে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার শুরু করে দিলেন। প্যাণ্ডেলে-ভরতি লোক ‘মরে গেলুম, মরে গেলুম’ বলে প্যাণ্ডেলের মধ্যে ধস্তাধস্তি লাগিয়ে দিলে। সে কী হুলুস্থুলু কান্ড! যে পারল, পালাল। কেউ মাচার ওপর উঠে পড়ল। কেউ ঠেলামেলিতে মাটির ওপর হুমড়ি খেয়ে লুটিয়ে পড়ল। সে যেন এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধক্ষেত্র। আর্তনাদ আর আতঙ্ক! অমন জমাটি জলসাটা একদম পন্ড।

ঠিক সেই সময়ে ধাক্কাধাক্কিতে প্যাণ্ডেলের একদিককার ঘেরা টিন মড়মড় করে দুমড়ে ভেঙে একেবারে উলটে পড়ল। আর দেখতে! চোখের পলকে যে যেখানে ছিল, ওই টিনের ওপর দিয়ে দে হাওয়া। দেখতে-দেখতে ছত্রভঙ্গ গানের আসর, এখন যেন একটা থমথমে শ্মশানপুরী!

ওঃ! কী জোর হেসে উঠেছে আক্কুশ তাই দেখে! এতগুলো লোককে এমন করে ভাগতে দেখে সে যেন খুশিতে লুটোপুটি খাচ্ছে! না, ঘোড়াটাকে আর ছুটিয়ে লাভ নেই! এখন একটু দম নিক। মনে হয় না, এখনই কেউ প্যাণ্ডেলে আবার ঢুকছে। সুতরাং সে নিজেও একটু জিরিয়ে নিতে পারে! যদিও ভূতের জিরেনের দরকার হয় না, তবুও ঘোড়ার পিঠে ছুটতে-ছুটতে তারও হাড়গোড়গুলো সব টাটিয়ে গেছে। আক্কুশ ফুস বললেই গাছে চড়তে পারে। তাতে এমনকী আর বাহাদুরি! কিন্তু ঘোড়ায় চড়া? মজা আর মজা, দারুণ মজা।

আরে, আরে! একটা ছেলে! ফাঁকা প্যাণ্ডেলে একটি জনপ্রাণীও নেই, এনার কোত্থেকে আবির্ভাব ঘটল! দ্যাখো, দ্যাখো, একদম ছোট্ট! হয়তো-বা আক্কুশের মতোই বয়সে ছোট্ট হবে। অবিশ্যি ভূতের তো কোনো বয়স নেই। কারণ কে না জানে, যে-মানুষটার বুড়োবয়সে প্রাণটি বের হয়, তিনি ভূত হলে তাঁকে বলে বুড়োভূত। জোয়ান বয়সে মরণ হয়ে ভূত হলে, সে হয় জোয়ান-ভূত। আর আক্কুশের মতো ছোটোবেলায় চোখ বুজলে তাকে বলি পুঁচকে ভূত। ভূতের বাড়-বাড়ন্ত কিছুই নেই। আজ যা দেখবে, দশ বছর পরেও তাই। ঠিক যেমন আক্কুশ। সেই যখন জলের তলায় তলিয়ে বেচারার প্রাণটি গেল, তখন যা বয়স ছিল, এখনও তাই। মানে আট পেরিয়ে তখন ছিল নয় ছুঁই-ছুঁই আক্কুশের। আর ওই ছেলেটার? ওরও বোধহয় এখন তাই! বোধহয় নয়ে পড়ব-পড়ব করছে।

আরি শাবাশ! ছেলেটার ভয়ডর নেই। সেই যেখানে ওস্তাদজি গান গাইছিল, সেই উঁচু মঞ্চের ওপর উঠে পড়েছে। একেবারে ডোনট কেয়ার! ধন্যি সাহস তো! এদিকে মঞ্চের ওপরটা দ্যাখো! একেবারে ভেঙেচুরে সব তছনছ হয়ে আছে! খুব জোরে ভূমিকম্প হলে যেমন সব লন্ডভন্ড হয়ে থাকে, তেমনি অবস্থা মঞ্চটারও। একটা হারমোনিয়াম ওদিকে উলটে পড়ে। তবলাটা এদিকে গড়াচ্ছে। তানপুরার তার ছিঁড়ে চিত হয়ে ঝিমুচ্ছে যেন!

ওমা! ছেলেটা ও কী করছে! হারমোনিয়ামটা ধরে টানাটানি করছে যেন! হ্যাঁ তো রে। ও কী! বাজাতে শুরু করে দিলে যে! তাই তো! বাঁহাতে বেলো টানছে, ডানহাতে প্যাঁ-পোঁ-পা-নি! কেমন উপুড় হয়ে বসেছে! এই রে, এই বুঝি প্যান্টটা ছেঁড়ে! আর বলতে! সত্যিই ছিঁড়ল ফড়াত! ছেলেটা উলটে পড়ল সড়াত! খুব জোর বরাত, একটু ছিঁড়েছে! তা নইলে লজ্জার শেষ থাকত না।

‘হিঁ-হিঁ-হিঁ!’ এই রে, ছেলেটার ওই দুর্দশা দেখে আচমকা হেসে ফেলেছে আক্কুশ! এঃ হে:!

চমকে চেয়ে দেখেছে ছেলেটা।

আক্কুশও থতমত খেয়ে থমকে গেছে। ইশ! কী বে-আক্কেলের মতো একটা কাজ করে বসল আক্কুশ! আরে তুই যে ভূত, এ-কথাটা তুই ভুলিস কী বলে! নাও, এখন ঠেলা সামলাও! ওই তো ছেলেটা ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়িয়েছে। ড্যাবড্যাব করে চেয়ে দেখছে। এই রে, ছেলেটা যেন ঘোড়াটাকে দেখে ফেলেছে মনে হয়!

মনে হয় কী, দেখেই ফেলেছে। দেখছ না, ঘোড়ার ওপর ছেলেটার চোখ পড়ে কেমন স্থির হয়ে আছে চোখের পাতা। দেখতে-দেখতে ওর চোখের তারা দু-টি যেন খুশিতে ঝকঝক করে উঠল! হ্যাঁ, তাই তো! ওই দ্যাখো না, মঞ্চ থেকে নীচে নেমে আসছে। আসতে-আসতে একদম ঘোড়াটার সামনে এসে দাঁড়াল। অবিশ্যি একেবারে কাছে এল না, দূর থেকে দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ছু:-ছু: করতে লাগল।

কী করবে এখন আক্কুশ? পালাবে নাকি!

তোমরা কী ভেবেছ আক্কুশকে! ভাবছ, আক্কুশ ভয় পাচ্ছে! ওই একফোঁটা একটা ছেলেকে! আরে বাবা, আক্কুশ নিজেই তো দেখতে পাচ্ছে, ঘোড়াটার কাছে আসতে ছেলেটার নিজেরই যেন ভয়-ভয় পাচ্ছে! অমনি আক্কুশের মজা-মজা লাগল! ভয় দেখলেই আক্কুশের মজা! তাই ভাবল, ছেলেটাকে আর একটু ভয় দেখালে কেমন হয়! যেমন ভাবা, সঙ্গেসঙ্গে কাজ! ঘোড়ার পেটে এক কোঁতকা! ঘোড়া মারলে লাফ, বাপ রে বাপ! তারপর শুরু করে দিলে তিড়িং-তিড়িং চরকিবাজি।

কিন্তু যা:চ্চলে! এ তো ভারী আশ্চর্য! আক্কুশ যা ভেবেছিল তা তো হল না! ছেলেটা ভয় পেল কই! উলটে খিলখিল করে হেসে হাততালি দিয়ে নিজেই নাচতে লাগল! তাকে নাচতে দেখে ঘোড়াটাও চিঁ-হিঁ-চিঁ-হিঁ করে ডেকে উঠেছে! ডেকেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আক্কুশ আর ভয় দেখাবে কী, ছেলেটার হাসি দেখে সে নিজেই কেমন হয়ে গেল। এত ভালো লেগে গেছে ছেলেটাকে যে, তার মনে হল, এক্ষুনি ওর গলাটা জড়িয়ে ধরে তার মতো আক্কুশও হেসে ওঠে। ওমা! হঠাৎ দেখে কী, ছেলেটা সটান ঘোড়ার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। এই সব্বনাশ! ঘোড়াটা যদি কামড়ে দেয়! আশ্চর্য, ভয় নেই একদম! উলটে চোখ পাকিয়ে, ঘোড়ার মুখের সামনে হাত ঘুরিয়ে কেমন সুর করে গান গাইছে শোনো:

চার ঠ্যাং-এ ঘোড়া তুই, কান দুটো খাড়া,

চিঁ-হিঁ, চিঁ-হিঁ ডাক ছেড়ে ল্যাজটাকে নাড়া।

গান শুনে আর যেন থাকতে পারল না আক্কুশ। মনে-মনে ভীষণ ভালোবেসে ফেলল ছেলেটাকে। মনে হল, এই ঘোড়ার পিঠ থেকে এক্ষুনি সে লাফিয়ে পড়ে। ছেলেটার সামনে দাঁড়িয়ে তার মতো আক্কুশও একটা গান শুনিয়ে দেয়।

এই দ্যাখো, আর এক কান্ড! ছেলেটা ঘোড়ার গায়ে হাত দিচ্ছে যে! ও বাবা, গলাটা জড়িয়ে ধরার জন্যে হাত বাড়াচ্ছে! কী সাহস দেখেছ! হায় কপাল! ওইটুকু একটা পুঁচকে ছেলের ঘোড়ার গলায় কখনো হাত পৌঁছোয়! হাত গেল না বলে ছেলেটা নিজেই কথা বললে ‘এই ঘোড়া, একটু হেঁট হ না, আমি তোর পিঠে চাপি।’

ঘোড়া তো আর মানুষের কথা বুঝতে পারে না। তার ওপর তার ঘাড়ে ভূত চেপেছে। সে নড়ে না, কিছু করেও না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। তাই দেখে আক্কুশের মনটাও খুব খারাপ লাগে। আক্কুশ ভাবে, আহা রে, ছেলেটা যদি সত্যি ঘোড়ার পিঠে চড়ত, তা হলে বেশ হত। অন্তত একজন তো ঘোড়ায়-চড়া বন্ধু মিলত তার! না, ছেলেটাকে ঘোড়ার পিঠে চড়াতেই হবে। এই কথা ভেবেই, আক্কুশ ঘোড়ার পিঠ থেকে ঝপাং করে নেমে পড়েছে। যেই নেমেছে, ব্যস, আর দেখতে, ঘোড়া ছুট মেরেছে, এমন ছুট মারল যে আর ধরে কে! ছুটতে-ছুটতে সেই ভাঙা প্যাণ্ডেলে বাঁই-বাঁই করে ঘুরপাক খেতে শুরু করে দিলে। তাই দেখে ছেলেটার কী মজাই না লেগেছে। সেও ঘোড়ার পিছু ছুটতে শুরু করলে। ছুটতে-ছুটতে কী চিৎকার। ঘোড়াটা ছোটে আর চিঁ-হিঁ, চিঁ-হিঁ ডাকে। ছেলেটা তাড়া দেয়, হি-হি করে হাসি পায়। সেই ভাঙা প্যাণ্ডেলে, ঘোড়াতে আর ছেলেতে যেন সার্কাস পার্টির খেলা হচ্ছে।

তাই না দেখে আক্কুশেরও খুব হাসি পেয়ে গেল! অবিশ্যি এখন সে একদম হাসল না। কেননা, ছেলেটা শুনে ফেললে, এমন ঘোড়া-ঘোড়া খেলাটা যদি ভেস্তে যায়! তাই আক্কুশের যতই হাসি পাচ্ছে, সে ততই হাসিটাকে মুখে টিপে লাফালাফি জুড়ে দিলে। দেখতে-দেখতে এমন হল, একবার আর থাকতে পারল না। দারুণ জোরে চেঁচিয়ে উঠল, ‘শাঁবাঁশ! শাঁবাঁশ!’ চেঁচিয়েই থমকে গেছে আক্কুশ! ইশ! এ কী করল সে! চেঁচিয়ে ফেলল! একটু আক্কেল নেই তোর! ছেলেটা শুনে ফেললে, তখন কী করবি! তুই যে ভূত, সেটা ভুলে যাস কী করে! ভৃতের এমন ফসকা-ঠোঁট জন্মে দেখিনি! ছি:! ছি:!

ও হরি, তুমি-আমি ভেবে মরি! কে চেঁচাল আর কে খেঁকাল সেদিকে ছেলের খেয়ালই নেই। দ্যাখো, দ্যাখো, সে তো ছুটতে-ছুটতে দিব্যি ঘোড়ার গলাটা জড়িয়ে চ্যাং-ঝোলা হয়ে দুলছে! ঘোড়া এখনও ছুটছে! ছেলের একফোঁটা ভয় নেই! হাত ফসকে পড়লে, হাড়গোড় কি থাকবে ভেবেছিস! কী দস্যি, কী দস্যি! নেমে পড়, নেমে পড়!

হ্যাঁ, সেই ছেলে কি না যে, বললেই নামছে! চেয়ে দ্যাখো, ছেলে ঘোড়ার ঘাড় ধরে আঁকপাঁক করছে! কী মতলব রে বাবা! ওই দ্যাখো, কেমন ভল্ট মারল! স্যাট! একেবারে ঘোড়ার পিঠে! উঠেই, ‘হ্যাট, হ্যাট’ চিৎকার জুড়ে দিলে। ঘোড়া জোড়া-পায়ে ছোটা দিলে! সেই প্যাণ্ডেলের মধ্যেই চলল ঘোড়দৌড়ের খেলা!

আক্কুশের খুশিটা আর যেন বাগ মানছে না। কখনো হাসিটা মুখ ফসকে বেরিয়ে পড়ব-পড়ব করছে, আবার কখনো পা-দুটো ছটফটিয়ে নাচি-নাচি করছে! হাসা না-গেলেও নাচা তো যায়! এই কথাটা যেই না আক্কুশের মনে এসেছে, আক্কুশের আর তর সয় না, সে নাচতে শুরু করে দিলে! উঃ! কী নাচ, কী নাচ! যেমন ঘোড়া দৌড়ায়, তেমনি আক্কুশ নাচে! নাচতে-নাচতে আক্কুশ কখনো শাঁ করে প্যাণ্ডেলের ওপর দিকে লাফ মারে! বাঁশ ধরে ঝুলে থাকে। কখনো ধাঁ করে ডিগবাজি খায়। মাটির ওপর লাফিয়ে পড়ে! কখনো হু-শ-শ করে শূন্যে উঠে চারটে পাঁচটা ছটা চরকি খেয়ে ফুস-স-স করে হাওয়ায় ভেসে বেড়ায়! আজব কান্ড! হবেই তো! ভূতের আনন্দ তো! সে কি কোনো বাধা মানে! তবু রক্ষে যে, আনন্দে আক্কুশ এখনও গান ধরেনি! বাব্বা! ভূতের গলায় গান! ধরলে যে কী হত, কেউ জানে না!

আর গান শুনতে হবে না! ওই দ্যাখো, কারা আসছে! ঘণ্টা শুনতে পাচ্ছ না? ঢং ঢং ঢং! হ্যাঁ, হ্যাঁ! এ যে দেখি দমকল-গাড়ি। আবার দ্যাখো আর একটা গাড়িতে কত সিপাই পুলিশ! প্যাণ্ডেলের সামনে এসেই তো দাঁড়াল! চটপট সব গাড়ির থেকে নেমে পড়ল। ছটফট করে ছুটতে-ছুটতে প্যাণ্ডেলের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দুর্ঘটনাটা আর না গড়ায়, সেটা সামাল দিতে দমকল এল। আর এই দুর্ঘটনার আসামি ঘোড়ার খোঁজে পুলিশ এল। কিন্তু এসেই তারা হতভম্ব! দ্যাখে কী, একটা ঘোড়া পাগলের মতো প্যাণ্ডেলের মধ্যে চরকি খেয়ে ছুটছে। আর একটা হ্যাংলা-মতো ছেলে ঘোড়ার পিঠে বসে ‘হ্যাট-হ্যাট’ করে তাকে রোখবার চেষ্টা করছে! আর তাদের বুঝতে বাকি থাকে এ-ঘোড়া কার! সুতরাং ঘোড়াসমেত ছেলেকে পাকড়াও করো! অমনি পুলিশের বাঁশি বেজে উঠল, পি-পি! যে-যেখানে ছিল, সঙ্গেসঙ্গে লাঠি উঁচিয়ে ঘোড়ার পিছু ধাওয়া করলে। আর কি সামলানো যায়! অত লোকের তাড়া খেয়ে ঘোড়া একদম লাগাম ছাড়া! এদিক, ওদিক, যেদিক পারে ছুটতে-ছুটতে লাফায়। নয়তো লাফিয়ে-লাফিয়ে চেঁচায়!

আক্কুশ তো দেখেশুনে থমকে গেছে! ভাবল, আর বুঝি বাঁচানো গেল না। এই বুঝি ঘোড়াটা ধরা পড়ে। এই বুঝি পুলিশের হাতে ছেলেটাও মরে। ভূত তো! যাকে ভালো লেগে যাবে, তার জন্য কী না করতে পারে। সুতরাং এখন কি আর চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার সময়! ওই পুলিশের পেছনে আক্কুশও ছুটল। ছুটতে-ছুটতে একজনের পায়ে দিল এক ল্যাং! ধপাস! একজনের চুল ধরে দিল টান! সে তো চিতপটাং! একজনের ঘাড়ে এক রদ্দা! সে তো ‘বড়দা, বড়দা’ বলে নর্দমায় মুখ গুঁজড়ে খাবি খেতে লাগল। ওঃ, সে কী তুলকালাম কান্ড! কেউ পড়ে, কেউ ওঠে, কেউ চেঁচায়, কেউ গড়ায়! আর ঠিক এই ফাঁকে ঘোড়াও লাফ দিয়ে, ঝাঁপ দিয়ে, ছেলেটাকে পিঠে নিয়ে ভোঁ-কাট্টা! ভাঙা-প্যাণ্ডেল ডিঙিয়ে সটান রাস্তায়। সঙ্গেসঙ্গে দমকলের ঘণ্টি বেজে উঠেছে, ঢং ঢং ঢং! আক্কুশ কি আর অত কাঁচা! ঘণ্টি যেই শোনা, তিড়িং! একলাফে গাড়ির ওপর আক্কুশ! দমকল অমনি চোখের পলকে হুশ-শ-শ! ঘোড়ার পেছনে ছুট! দমকলের লোকেরা কেউ জানতেও পারছে না, তাদের পাশে ভূত!

ঢং-ঢং-ঢং। দমকল ছুটছে।

খট-খট-খট। ঘোড়া ছুটছে।

কটমট চেয়ে আক্কুশ দেখছে!

কিন্তু দমকলের সঙ্গে ছুটে তো আর ঘোড়া পারে না। নির্ঘাত ধরা পড়ল। আক্কুশের হাত-পাগুলো নিশপিশ করছে! ধরা পড়বে মানে! ধরা পড়ল বলে! দমকল এখন ঘোড়ার ল্যাজের আগায়!

আর স্থির থাকতে পারল না আক্কুশ! এতক্ষণ ধরে যে গাড়ি চালাচ্ছিল তাকে দেখেছে সে! দেখেছে, তার হাতের চাকাটা ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে গাড়ি বাঁয়ে ফেরাচ্ছে, ডাইনে মুড়ছে। আক্কুশ মনে-মনে ভাবল, ও, এই ব্যাপার! আর দেখতে! চুপিসাড়ে ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বসে পড়ল আক্কুশ! ড্রাইভার হাতের চাকা যেমন ডাইনে ঘোরাতে যায়, অমনি আক্কুশ দেয় বাঁয়ে ঘুরিয়ে। গাড়ি বোঁ-ও-ও করে ঝাঁকি মেরে থমকে যায়! ঘোড়া ধরা পড়তে-পড়তেও পড়ে না! আবার ড্রাইভার যখন গাড়ির চাকা বাঁয়ে ফেরাতে চায়, আক্কুশ তার হাতের চাকা ডাইনে দেয় ঘুরিয়ে! এই পড়ল, গাড়ি বুঝি উলটে পড়ল! না, এবারও বেঁচে গেল! কিন্তু ওই দ্যাখো, দমকলের ওপর থেকে একটা লোক দড়ি ঘোরাচ্ছে মাথার ওপর! এই বুঝি ছোড়ে! এই বুঝি ছেলেটার গলায় গলিয়ে দেয়!

আক্কুশ দেখল ছেলেটাকে আর বুঝি বাঁচানো গেল না! তবু, শেষ চেষ্টা তো করতে হবে! আচমকা ঝট করে এক ধাক্কা ড্রাইভারকে! ড্রাইভার টাল খেয়ে বেসামাল। হাত ফসকে লোকটা এই বুঝি গাড়ি থেকে মারল ডিগবাজি। না, বেঁচে গেল। ঝটপট গাড়ির হাল আবার সামলাল! কিন্তু লোকটা একেবারে হতভম্ব! কী থেকে যে কী হল, সে তো কিছুই বুঝতে পারে না। কিন্তু এখন অত ভাববার সময় কই! গাড়ি ছুটছে। একটু এদিক-ওদিক হলে অ্যাকসিডেন্ট! সুতরাং সামলে চালাও, জোরসে চালাও!

বলতে-বলতেই অ্যাকসিডেন্ট! আক্কুশ ড্রাইভারটার ঘাড়ের ওপর এবার মেরেছে এক ঘুঁসি! ওরে বাবা, এ যে ভূতের ঘুঁসি! ড্রাইভার মুখ গুঁজড়ে পড়ল। তার হাতের চাকায় নিজের মাথা ঠুকল, ঠক। কপাল ফুলে গুলি হয়ে গেল।

গাড়ির চাকা টালমাটাল। রাস্তা থেকে গোঁত্তা খেয়ে এই বুঝি মারল ধাক্কা!

না, খুব রক্ষে! ধাক্কা হল না বটে, কিন্তু ড্রাইভার এমন ঘাবড়ে গেল! কোথাও কিছু নেই অথচ কে যেন তাকে ঠেলা মারে! এ কী গোলমেলে কান্ড রে বাবা! তাই বলে তো আর হাত-পা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লে চলবে না। ঝটপট সামলে নিয়ে গাড়ি চালাও জোরসে, ঢং-ঢং-ঢং। বোঁ—ও।

আবার ঘোড়ার পেছনে দমকল ছুটল।

ঘোড়া লাফাচ্ছে, টগবগ, টগবগ। গাড়ি ছুটছে বোঁ-বোঁ, বোঁ-বোঁ। আর আক্কুশ ভাবছে, আর বুঝি ছেলেটাকে বাঁচানো গেল না। তাই এবার আক্কুশ একদম মরিয়া। ড্রাইভারের হাতটা ঝট করে টেনে ধরলে। ধরে নিজেই চাকাটা ঘুরিয়ে দিলে। ব্যস! দমকলগাড়ি রাস্তার গর্ত-খানায় ঠোক্কর খেতে-খেতে হুড়মুড় করে এই বুঝি পড়ল গিয়ে ঘোড়ার ঘাড়ে! ঘোড়া তো প্রাণের ভয়ে মেরেছে লাফ! বাপ রে বাপ! এক্ষুনি কম্ম শেষ হয়ে গেছল! ভাগ্যিস লাফাল! নইলে নির্ঘাত গাড়ির নীচে ছিটকে পড়ে কাঁপকাঠি ছটকে যেত! ইশ! তখন ঘোড়ার পিঠে ওই ছেলেটার কী হত? ভাবলেই গা শিউরে ওঠে! কাজটা খুবই বে-আক্কেলের মতো করে বসেছে আক্কুশ। নিজের মনেই আক্কুশ নিজেকে ‘ছি: ছি:’ করে ওঠে!

ওই দ্যাখো, আর এক বিপত্তি! এদিকে ঘোড়া যে ঠায় দাঁড়িয়ে পড়ল। ছোটেও না, নড়েও না। ছেলেটা যতই ‘হ্যাট হ্যাট’ করে, ঘোড়া ততই বেঁকে বসে। লাফও মারে না, হাঁকও ছাড়ে না। এ কী গোঁ রে বাবা! আর দেখতে! দমকলের লোকেরা ঝপাঝপ গাড়ি থেকে নেমে, চটপট ছেলেটাকে ধরে ফেললে। ছেলেটা যতই চেঁচায়, ‘আমায় ছেড়ে দাও, আমায় ছেড়ে দাও’, ততই ওরা কব্জা করে পাকড়ে ধরে। তারপর ঘোড়াটার গলায় দড়ি দিয়ে আচ্ছা করে বাঁধলে। বেঁধে, ছেলেটার ঘাড় ধরে, আর ঘোড়াটার দড়ি ধরে টানতে টানতে নিয়ে চলল। চলো কয়েদখানায়।

এইবার? এইবার আক্কুশ কী করবে? এবার দেখাক বাহাদুরি!

না, আক্কুশ এখন কিচ্ছু করলও না, কিচ্ছু বললও না। যেতে দাও। অবিশ্যি সে-ও চলল পিছু-পিছু। একেবারে নি:শব্দে! কাকপক্ষীরও সাধ্যি নেই টের পায়।

হ্যাঁ, যা ভাবা গেছে, তাই হল। ওরা ছেলেটাকে আর ঘোড়াটাকে পুলিশ-থানায় ধরে আনল। এতটা রাস্তা এল, অথচ ছেলেটা মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না। দিব্যি বুক চিতিয়ে হেঁটে এল। শাবাশ! নাকি-কান্না ছেলেদের দু-চক্ষে দেখতে পারে না আক্কুশ। ঘ্যানঘ্যানে ছেলেদের ভয় দেখাতে আক্কুশের দারুণ মজা লাগে।

থানার সামনে এসে দু-জন ঘোড়ার দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে রইল বাইরে, আর বাকি ক-জন ছেলেটাকে নিয়ে গেল ভেতরে। ভেতরে একজন জাঁদরেল লোক বসেছিলেন। ছেলেটাকে তাঁর সামনে আনা হল। ইনি বোধহয় পুলিশের বড়ো-দারোগাবাবু। দারোগাবাবুর গোঁফ দেখেছ! কী পেল্লাই রে বাবা!

ওই দ্যাখো, আক্কুশ কেমন নি:সাড়ে, হাজির হয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দারোগাবাবুর গোঁফ দেখে আক্কুশের হাত যেন নিশপিশ করছে। এই বুঝি খামচে ধরে।

ছেলেটাকে আগাপাশতলা কটমট করে দারোগাবাবু দেখলেন। বাব্বা! দারোগাবাবুর চোখ দেখেছ! রাগে লাল। তিনি বাজখাঁই গলায় ছেলেটাকে ধমক মারলেন, ‘এই-ই!’

অন্য কেউ হলে ওই একটি ধমকেই তার চালচিত্তির ছটকে পড়ত। কিন্তু ছেলেটা টলেও না, কিছু বলেও না। যেন গ্রাহ্যিই নেই।

দারোগাবাবু আবার চেঁচালেন, ‘গানের জলসাটা কি ঘোড়দৌড়ের মাঠ?’

ছেলেটার মুখে রা নেই।

ছেলেটাকে অমন বোবার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দারোগাবাবু খিঁচিয়ে উঠলেন, ‘হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? জবাব দে, নইলে এমন একখানা ঘুষি মারব, চিরদিনের মতো কথা বলা শেষ হয়ে যাবে।’

তবুও ছেলেটা হাঁ করে দাঁড়িয়েই রইল।

দারোগাবাবু খেপে থরথর করে কেঁপে হাত-পা ছুঁড়ে হম্বিতম্বি শুরু করে দিলেন।

সত্যি, কী হাসিই না পাচ্ছে! ওই দ্যাখো, আক্কুশ দারোগাবাবুর একদম পাশে দাঁড়িয়ে। একবার তিনি যদি জানতে পারেন, তাঁর পাশে একটি সাক্ষাৎ ভূত দাঁড়িয়ে, তখন যা মজা হবে না! গাঁক-গাঁক করে এই চেঁচানি তখন কোথা থাকে দেখা যাবে!

তিনি আবার গর্জে উঠলেন, ‘ঘোড়াটা কার?’

ছেলেটা এতক্ষণে হঠাৎ মুখ খুলল, ‘ঘোড়া কার, জানি না তো।’

দারোগাবাবু কড়কালেন, ‘শয়তানি করার জায়গা পাসনি। ঘোড়া ছুটিয়ে জলসা ভন্ডুল করে দিয়ে, এখন বলা হচ্ছে জানি না! হতচ্ছাড়া!’

ছেলেটা হেসে ফেলল। বলল, ‘আমি হতচ্ছাড়া হতে যাবে কোন দুঃখে? কার ঘোড়া আমি জানি না। কে জলসা ভন্ডুল করল, তাও জানি না। রাস্তায় দু-জন লোক বলাবলি করছিল, জলসায় নাকি দাঙ্গাবাজি হচ্ছে। সেই শুনে আমি দেখতে এসেছিলুম। এসে দেখলুম সব ফোক্কা!’

দারোগাবাবু আবার খেপে উঠলেন, ‘ফোক্কা! ফোক্কা আবার কী কথা? আমার সঙ্গে ফুক্কুড়ি হচ্ছে!’

ছেলেটা হঠাৎ হেসে উঠল, ‘হি-হি-হি।’

দারোগাবাবু কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন।

ছেলেটা তবু হাসছে, ‘হি-হি-হি।’

‘এই-ই,’ দারোগাবাবু ধমক মারলেন, ‘হাসি হচ্ছে কেন?’

‘আপনার গোঁফদুটো কী পেল্লাই!’ বলে ছেলেটা আবার তেমনি হাসতে লাগল, ‘হি-হি-হি।’

ব্যস! দারোগাবাবু আর কেমন করে রাগ সামলান! তিনি লাফিয়ে উঠলেন। চিৎকার করলেন। ছেলেটার গলাটা খামচে ধরতে গেলেন। অমনি, আক্কুশ করেছে কী, খপ করে একটা টিকটিকি ধরে, ঝপ করে দারোগাবাবুর মাথায় ফেলে দিয়েছে! টিকটিকিটা যে কে ফেলল, কোথা থেকে পড়ল, সে আর কে বুঝছে! কিন্তু দারোগাবাবু তো ‘ই-ই-ই’ করে চেঁচিয়ে উঠে তিড়িং করে মারলেন লাফ। তাঁর সেই লাফালাফি দেখে ছেলেটা হেসে গড়িয়ে নাচানাচি লাগিয়ে দিলে।

দারোগাবাবুর তো লজ্জার একশেষ। ততক্ষণে টিকটিকিটাও কেটে পড়েছে। দারোগাবাবুও হাঁকডাক শুরু করে দিলেন, ‘হাবিলদার।’

একজন হাবিলদার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এল। আর ছেলেটাও হাসি থামিয়ে টিকটিকিটা যেদিক দিয়ে পালাল, সেদিকে তাকিয়ে রইল।

দারোগাবাবু তেমনি তিরিক্ষি মেজাজে হাবিলদারকে ধমকে উঠলেন, ‘আমার অফিস-ঘরে টিকটিকি এল কী করে?’

হাবিলদার কাঁচুমাচু হয়ে উত্তর দিলে, ‘হুজুর, স্যার, আপোনার ঘোরে কেমোন কোরে টিকটিকি ঘুঁসবে? আপোনি ঠিক দেখেন নাই।’

হাবিলদারের কথা শুনে দারোগাবাবু যেন তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। মুখখানা বিচ্ছিরি ভেংচিয়ে উত্তর দিলেন, ‘কেমোন কোরে জানিলেন স্যার, আপনি ঠিক দেখেন নাই!’

হাবিলদারও তেমনি ঠান্ডা মেজাজে বলল, ‘স্যার, থানামে চোর আসিবেন, ডাকাত আসিবেন, খুনি আসিবেন, কিন্তুক টিকটিকি আসিবেন না স্যার।’

‘তবে কি আমার মাথায় ভূতে টিকটিকি ফেলল?’ তেমনি চটেই দারোগাবাবু মাথার চেটোয় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

হাবিলদার একেবারে সঙ্গেসঙ্গে দারোগাবাবুর মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে উত্তর দিল, ‘দেখেন স্যার, ভূতের কোথা যদি বোলেন, হামি আপনাকে বলতে পারেন, এইহি কোঠিমে ভূত আছেন!’

তখন রাগী দারোগাবাবু হাবিলদারের কথা শুনে হঠাৎ একেবারে হো-হো করে হেসে ফেটে পড়লেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘তোমার মুন্ডু আছেন।’

হাবিলদার দারোগাবাবুর হাসি শুনে একটু থতমত খেয়ে থমকে গেল বটে, কিন্তু এবার চোখ দুটো বেশ ভয়ে ড্যাবড্যাব করে বলল, ‘আপোনি বিশওয়াস কোরেন স্যার, এই কোঠিটার উপরকার কামরা মে ভারী রাতে একঠো ভূত তবলা বাজাতা হ্যায়!’

হাসি থামিয়ে দারোগাবাবু গলার স্বর উঁচিয়ে বললেন ‘তোমার পিন্ডি চটকাতা হ্যায়। তোম ভূত কভি দেখা হ্যায়?’

দারোগাবাবুর এই কথা শোনার সঙ্গেসঙ্গে হাবিলদারের চোখ দুটো কেমন যেন ফ্যাকাসে হয়ে গেল। গলার স্বর যেন কেঁপে উঠল। কাঁপা-কাঁপা স্বরে সে বলল, ‘হ্যাঁ স্যার, হামি দেখা।’

দারোগাবাবু আবার হেসে ফেললেন। হাসতে-হাসতে হাবিলদারের মুখের দিকে চেয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোম ভূত দেখা হ্যায়!’

‘হাঁ হুজুর, হাম দেখা।’

‘তোম পাগল হ্যায়।’

হাবিলদার উত্তেজিত হয়ে বললে, ‘নেহি হুজুর, পাগল নেহি। একরোজ রাতে হাম যব উপরকার ওই কামরাকা সামনে ডিউটিমে থা, ওই তবলাকা আওয়াজ হামি শুনা। ওই শুনকে একদম তাজ্জব বনে গেলুম হামি! চিন্তান কোরলুম, এতনা ভারী রাত মে কামরাকা ভিতর কোন তবলা বাজানে শেকতা! হামি চিল্লিয়ে উঠলুম, ‘কৌন হ্যায় রে?’ হুজুর হাম কেয়া বোলেগা, ওই তবলাকা আওয়াজমে আওয়াজ মিলাইকে একদম সাথ-সাথ একঠো আদমি সাড়া দিল, ‘আমি হ্যায় রে!’ হামার সাফ মালুম হয়ে গেল, কামরাকা অন্দর মে কোই ঘুঁসেছে। কিন্তুন স্যার বাহারমে তো তালা! হামি হঠাৎ দেখলুম কী, কামরাকা একঠো জানালা একদম খুলা। জানালাকা সামনে দাঁড়িয়ে হামি দেখতে লাগলুম। ভিতর মে এতনা অন্ধকার, কুছুই দেখা গেল না। হঠাৎ স্যার দেখলুম কী, একঠো লম্বা হাত, হামার দিকে এগিয়ে আসছে। আর হামি ভি ছুট দিবার জন্যে তৈয়ার। ছুটভি দিলুম। লেকিন স্যার—’ বলেই লোকটা চিৎকার করে থমকে গেল।

এতক্ষণ ধরে হাবিলদারের কথা শুনতে-শুনতে দারোগাবাবুরও চক্ষু ছানাবড়ার মতো ড্যাবডেবিয়ে উঠেছে। হাবিলদার হঠাৎ অমন চুপ মেরে যেতে তিনি ব্যস্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তারপর কী হল?’

হাবিলদার আর কথা বলে না। একদম বোবা। সামনে সে যেন কী দেখছে! চোখের পাতা পড়ে না। একেবারে স্থির।

শেষটুকু শোনার জন্য দারোগাবাবু উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কথা বলছ না কেন? তারপর কী হল বলো?’

হাবিলদার চক্ষু কপালে তুলে ঘন-ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে।

দারোগাবাবু এবার লোকটার গায়ে একটা ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হাঁপাতা হ্যায় কাহে?’

হাবিলদার ভূত দেখার মতো হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল, ‘স্যার, স্যার, আর একঠো টিকটিকি।’

‘কই?’

‘ভাগেন, ভাগেন স্যার, মাথায় পড়ল।’

আর ভাগতে হল না। একটা টিকটিকি সত্যিই দারোগাবাবুর মাথায় ছুড়ে দিল আক্কুশ। টিকটিকিটা মাথায় পড়ে সঙ্গেসঙ্গে জামার বুকপকেটে ঢুকে পড়েছে। অমন জাঁদরেল লোক দারোগাবাবু টিকটিকির ভয়ে ধেই-ধেই করে নাচানাচি শুরু করে দিলেন। নাচতে-নাচতে নিজের জামা নিজেই টানেন আর চেঁচান। টানাটানিতে টিকটিকিই বা কতক্ষণ পকেটে থাকতে পারবে। প্রাণের ভয়ে পকেট থেকে বেরিয়েই সুড়ুত করে হাওয়া। কিন্তু গেল গেল, যাবার সময় আর এক বিচ্ছিরি ঝামেলা পাকিয়ে গেল যে! তার ল্যাজটি খসে জামার পকেট থেকে উঁকি মারছে!

ছেলেটা তাই না-দেখে হেসে গড়াগড়ি।

দেখেশুনে আক্কুশেরও খুব হাসি পাচ্ছিল। কিন্তু সে একেবারে মুখটি টিপে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল।

দারোগাবাবুর তো লজ্জার একশেষ! একটা বাচ্চা ছেলে, তার ওপরে হাবিলদার। টিকটিকির ভয়ে তাদের সামনে তিনি নাচছেন কী বলে! যাই হোক, তিনি নাচ থামালেন। মুখখানা ভীষণ গম্ভীর করে ছেলেটার দিকে তাকালেন। কিন্তু ছেলেটা ভয়ও পেল না, হাসিও থামাল না। উলটে হাসতে-হাসতে বলল, ‘আপনার পকেটে টিকটিকির ল্যাজ!’

‘কই?’ একেবারে বাজ-পড়ার মতো গলা চড়িয়ে দারোগাবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন। জামার পকেট ঝাড়াঝাড়ি লাগিয়ে দিলেন।

ঠিক যা ভাবা, তাই। টুকুস করে টিকটিকির ছেঁড়া ল্যাজটি জামার পকেট থেকে বেরিয়ে মেঝেয় পড়ল। তখনও ল্যাজটি তিরতির করে কাঁপছে। এর পর একদম স্থির হয়ে যাবে।

শেষ অবধি হাবিলদারও আর সামলাতে পারল না। মজাটা তাকেও এমন খোঁচা মারল যে, সে-ও মুচকি-মুচকি হেসে ফেলল।

তাই না দেখে দারোগাবাবু ভীষণ অপ্রস্তুত। তিনি লজ্জাটাকে ঢাকবার জন্যে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘হাসতা হ্যায় কেন? এঁ:? হাসতা হ্যায় কেন?’

হাবিলদারের হাসি-মুখ চুপসে এইটুকু। বড়ো-দারোগার সামনে হেসে ফেলাটা যে ভীষণ অন্যায়, সেটা তো আর হাবিলদারের অজানা নয়!

দারোগাবাবু আবার চেঁচালেন, ‘বোলো, কেন হাসতা হ্যায়?’

হাবিলদার যখন কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে ‘কী বলব, কী বলব’ ভাবছে, তখন ছেলেটা ফস করে বলে বসল, ‘হাসবেই তো। আপনি টিকটিকির ভয়ে নাচছিলেন যে। ভাগ্যিস ভূত দেখেননি! তাহলে না-জানি কী করতেন!’

‘তুমি থামো, তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি?’ ছেলেটার কথা শুনে থতমত খেয়ে তিনি খেঁকিয়ে উঠেছেন।

ছেলেটা আবার কিছু বলতেই যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই হাবিলদার বলে উঠল, ‘দেখেন স্যার, ওই খোঁকাটো ঠিকই কইছেন। ভূত যো হ্যায়, ও ঢিকটিকিসে শয়তান। টিকটিকি দেখে আপনি যদি ভয় পায়েন, তো ভূত দেখনেসে একদম—’

দারোগাবাবু হাবিলদারের মুখের কথাটা শেষ করতে না দিয়ে বেশ কড়া মেজাজেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী একদম? অ্যাঁ? একদমটা কী?’

দারোগাবাবুর কড়া মেজাজ দেখে হাবিলদার যা বলতে যাচ্ছিল, বলতে পারল না। সে তো ভয়ে জুজু। কিন্তু ছেলেটার ওসব ভয়ডর নেই। সে নিজেই বলে বসল, ‘টিকটিকি দেখেই যখন আপনার এত ভয়, ভূত দেখলে তো আপনি ভিরমি খাবেন।’

‘কী!’ আবার চেঁচিয়ে উঠলেন দারোগাবাবু, ‘আমাকে ভূতের ভয় দেখায়! কোন বোলতা হ্যায় ভূতকে আমি ডরতা? ছো:! ভূত হ্যায় না কলা হ্যায়! আরে বাবা হামি একেলা অমাবস্যার রাত মে শ্মশান পেরিয়ে চোর ধরতে গেছি, জানতা হ্যায়!’

‘লেকিন স্যার, আপনি একা উপরকার কামরামে থাকতে না-শেকবে।’ হাবিলদার একটু ভয়ে-ভয়েই উত্তর দিল।

হাবিলদারের কথা শুনে দারোগাবাবু তাচ্ছিল্যের সুরে গলা ঝাড়লেন, ‘হুঃ,’ বললেন, ‘লোকটা বলে কী! আমায় চেনে না দেখছি! ঠিক হ্যায়, আজ রাতে ওই কামরা মে আমি থাকেগা।’

‘একেলা?’ একটু অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল হাবিলদার।

‘তবে কী। আমি কেঁচো নেহি হ্যায় যে, ভয়ে পালায় গা।’

ছেলেটা সঙ্গেসঙ্গে বলে উঠল, ‘তবে আপনার যদি ভয় করে আমি থাকতে পারি আপনার সঙ্গে। আমার ভূত-টুতে একদম ভয় নেই। আমার পাশে শুয়ে নিশ্চিন্তে আপনি নাক ডাকিয়ে ঘুমুবেন।’

দারোগাবাবু তার মুখের লালচে দাঁতগুলো ছরকুট্টে বিচ্ছিরি সুরে হেসে উঠলেন। হাসতে-হাসতে বললেন, ‘আস্পর্ধা দ্যাখো। জলসার প্যাণ্ডেলে ঘোড়া ছুটিয়ে মানুষ মেরে, এখন আমায় পাশে নিয়ে উনি ঘুমোতে চাইছেন। তোমার শোবার জায়গা আগেই যে ঠিক হয়ে আছে বাছাধন,’ বলেই তিনি হাবিলদারকে হুকুম করলেন, ‘হাবিলদার, ইসকো গারদ মে ভর দেও। আর ঘোড়াটো খোঁয়াড় মে লে যাও। আমার যা করার, কাল করেগা।’

ছেলেটাকে যে গারদে আটকে রাখা হবে, এ-কথাটা শুনে কিন্তু ছেলেটা একটুও ঘাবড়ে গেল না। খুব শান্ত স্বরেই সে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি বাড়ি যাব না?’

‘চপ,’ খ্যাঁক-খ্যাঁক করে উঠলেন দারোগাবাবু, ‘বাড়ি যাবে! তোমায় যমের বাড়ি পাঠাব!’

‘সে কী, বাড়ি না গেলে যে খুব বিপদ! আমার মা বাড়িতে একা থাকে। তার ওপর আমার মা-র দুটো চোখই অন্ধ। আমি মা-র কাছে না গেলে মাকে কে দেখবে?’ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল ছেলেটি।

‘তোর মাকে যমে দেখবে!’ বলে, দারোগাবাবু আচমকা ঠাস করে ছেলেটার গালে চড়িয়ে দিলেন।

ওই দ্যাখো, আক্কুশের হাত দুটো দারোগাবাবুর গলাটা খামচে ধরার জন্যে কীরকম ছটফটিয়ে উঠল!

চড় খেয়ে ছেলেটা খেপে উঠেছে। চেঁচিয়ে উঠল সে, ‘আপনি আমায় মারলেন কেন?’

‘বেশ করেছি। চড় মারব না তো কি আদর করব?’ তারপর হাবিলদারের দিকে আঙুল তুলে গর্জে উঠলেন, ‘লে যাও ইসকো।’

হাবিলদার ছেলেটার ঘাড় ধরল।

ওই দ্যাখো, আক্কুশের মুখখানা। রাগে কী ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছে। হাবিলদার ছেলেটাকে টানতে-টানতে নিয়ে চলল।

একটা গরম চাপা নিশ্বাসের মতো শব্দ আক্কুশের নাকের ভেতর থেকে ছিটকে বেরোচ্ছে। সে-ও হাবিলদারের পেছনে-পেছনে এগিয়ে চলেছে।

হাবিলদার ছেলেটাকে গারদের মধ্যে ঠেলে ফেলে দিয়ে তালায় চাবি লাগিয়ে দিল।

ছেলেটা অন্ধকার গারদে ছিটকে পড়ে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল। সে কাঁদল না একটুও। শুধু ভাবল, মায়ের কী হবে!

আক্কুশের নজর এখন হাবিলদারের হাতের ওপর। গারদের চাবিটা সে কোথায় রাখে, সেটাই আক্কুশের লক্ষ্য। হ্যাঁ, সে দেখেছে। তারপর সে অপেক্ষা করেছে রাতের অন্ধকারের জন্যে। সে-অন্ধকার জমাট, ভয়ঙ্কর!

এতক্ষণে ওই হাসিখুশি ছেলেটি কেমন যেন একটু মুষড়ে পড়েছে মনে হয়! কেমন যেন ফ্যাকাসে চোখের চাউনি। হবেও-বা। কারণ সে তো জেলখানা দেখেনি কোনোদিন। অবিশ্যি জেলখানার গল্প সে অনেক শুনেছে। সে জানে যারা চুরি-ডাকাতি করে, তারাই জেলে বাস করে। কিন্তু সে তো চোরও নয়, ডাকাতিও করেনি। তবে কেন মিথ্যে-মিথ্যে তাকে বন্দি করা হল!

রাতের অন্ধকার নেমে এসেছিল ঠিক সময়ে। নেমে এসেছিল গারদের লোহার গরাদ ডিঙিয়ে সেই ছোট্ট ছেলেটির মুখের ওপর। ক্লান্ত সেই ছেলেটি হয়তো তখন গারদের মেঝের ওপর ঘুমিয়ে পড়েছিল। হয়তো তার ঘুমন্ত চোখ দু-টি তখনও মা-কে খুঁজছে। মাঝে মাঝে ঘুমের ঘোরে সে চমকে ওঠে কেন? উঠবেই তো। দেখতে পাচ্ছ না, রাতের প্রহরী পাহারা দিচ্ছে? খট খট খট! তার পায়ের শব্দ অন্ধকার ভেঙে গারদের দেওয়ালে ধাক্কা দিয়ে ঘুরে ঘুরে ফিরে আসছে।

থানার বড়ো-দারোগাবাবু নিয়মমাফিক তদারকির কাজটা শেষ করার জন্যে থানার আনাচে-কানাচে একবার অন্তত ঘুরে যাবেন রোজ। আজও তিনি ঘুরে-ঘুরে দেখছেন। কিন্তু তিনি জানতেও পারছেন না, আক্কুশ নামে একটা ভূতও তাঁর পিছু নিয়েছে। তার সাড়া নেই, শব্দ নেই। অন্ধকারে যেন একটা ছায়া। যেদিকে দারোগাবাবু হাঁটেন, আক্কুশের ছায়াও সেদিকে অনুসরণ করে! হয়তো এখনই আক্কুশের হাত দুটো দারোগাবাবুর গলাটা টিপে ধরবে!

অবিশ্যি আক্কুশ তা করল না।

দারোগাবাবু কাজ শেষ করে হাঁক দিলেন, ‘হাবিলদার!’

‘জি, হুজুর?’

‘উপরকার কামরা রেডি?’

‘হুজুর, আপোনি সত্যি শুবেন?’

‘ভদ্রলোক যা বলে তা করে।’

‘একেলা শুবেন?’ যেন ভয়ে হাবিলদারের গলা শুকিয়ে যাচ্ছে।

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, হামি একেলাই শোব। আরে হাম বাঘকো থোড়াই কেয়ার করতা, তো, ভূত! ভূতকা তবলা আজ আমি ফাঁসায়গা। কত বড়ো তবলচি হ্যায়, হামি আজ দেখে নেব।’

‘লেকিন হুজুর,’ হাবিলদার আমতা-আমতা করতে লাগল।

দারোগাবাবু কড়কে উঠলেন। বললেন, ‘শোব আমি, তোমার এত ভয় পাবার কী আছে? উপরকার কামরা খুলে দেও!’

‘জো হুকুম।’

সত্যি, ওপরের ঘর দারোগাবাবুর শোবার জন্যে ঝাড়পোঁছ হল। ঘরে খাট-বিছানা, চেয়ার-টেবিল সবই আছে। তবে পড়ে পড়ে সব যাচ্ছে। আসলে ঘরটা কত দিন ধরে তালা-আঁটা। কালেভদ্রে কেউ এলে-গেলে খোলা হয়! নইলে ওদিকে কেউ ফিরেও তাকায় না।

দারোগাবাবু শুতে গেলেন। এতক্ষণ ধরে আক্কুশও তো এই সুযোগটাই খুঁজছিল। দারোগাবাবুর পিছু-পিছু আক্কুশও ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন দারোগাবাবু। তিনি জানতেও পারলেন না, সাক্ষাৎ একটি ভূতের ছা তাঁর পিছু নিয়ে, গুটিগুটি তাঁরই সঙ্গে ঘরের মধ্যে সেঁধিয়ে পড়েছে। দারোগাবাবু পোশাক পালটে আলনায় ঝুলিয়ে দিলেন। মাথার টুপি খুলে টেবিলে রাখলেন। বালিশের নীচে রিভলবারটি রেখে, আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লেন তিনি। অবিশ্যি টর্চটি হাতের গোড়ায় রাখতে ভুল করলেন না। তিনি হাই তুললেন। পাশ ফিরলেন। চোখ বুজলেন।

চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল আক্কুশ। অপেক্ষা করতে লাগল, কখন তিনি ঘুমোন। হ্যাঁ, আক্কুশ জানে, রিভলবারটাই দারোগাবাবুর আসল অস্ত্র। ওইটা যদি একবার হাতড়াতে পারে, তবে মজা কাকে বলে বুঝতে পারবেন দারোগাবাবু। কিন্তু যেভাবে বালিশের নীচে রেখে, মাথা চেপে শুয়ে আছেন তিনি, তাতে অস্ত্রটা হাতড়ানো খুব একটা সহজ কাজ নয়।

দারোগাবাবু ঘুমোলেন কি? আর কতক্ষণ অপেক্ষা করা যায়! ভূত তো আর শান্তশিষ্ট ল্যাজবিশিষ্ট জীব নয়। সুতরাং আক্কুশ অনেকক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে এখন ছটফটানি শুরু করে দিলে। এই একবার হাত নাড়ছে, নয়তো ঘাড় বেঁকাচ্ছে। এই ঘুরে দাঁড়াচ্ছে, নয়তো ফিরে তাকাচ্ছে। হঠাৎ কী মনে হল, টেবিলের কাছে যাবার জন্যে পা বাড়াল। ব্যস! ঠকাস! আলপটকা কিসে যেন মেরেছে ঠোক্কর। বেসামাল হয়ে মারল ধাক্কা টেবিলে। দারোগাবাবুর টুপিটা আক্কুশের হাত লেগে টেবিল থেকে ছিটকে মারল দেওয়ালে ধাক্কা। দেওয়ালে একটা কালীঠাকুরের ছবি-আঁকা ক্যালেণ্ডার। পড়বি তো পড় তার ওপরে। ছবিটা খসখস, খসখস করে দুলে উঠল। ধড়ফড় করে উঠে পড়লেন দারোগাবাবু। তিনি ঝটপট টর্চ জ্বাললেন। ক্যালেণ্ডারের ওপর আলো পড়তেই তিনি শিউরে উঠলেন। বালিশের নীচ থেকে পলকে রিভলবারটা বার করে তিনি বিছানা থেকে নেমে এলেন। রিভলবার উঁচিয়ে ঘরের মধ্যে ডিঙি মেরে তিনি এধার-ওধার দেখতে লাগলেন। মুখে-চোখে ভীষণ আতঙ্ক। চাপা উত্তেজনা।

হঠাৎ তিনি চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘আরে বাপ রে।’ চেঁচিয়েই থেমে গেছেন। কারণ তিনি বুঝতে পারলেন, তাঁর পায়ের ওপর দিয়ে একটা নেংটি ইঁদুর ছুটে পালাল। উফ! তাঁর যেন ধড়ে প্রাণ এল! কিন্তু লজ্জায় যেন মাথা কাটা যায়! ছি:, ছি:, পুলিশের একজন এত বড়ো কেউকেটা হয়ে শেষে একটা ইঁদুরের ভয়ে তাঁর ধাত ছেড়ে যাবার গোত্তর! তিনি নিজের মনেই হেসে ওঠেন। হাসতে-হাসতে ভাবেন, ও, তাহলে এটা নেংটির কাজ! নেংটির বাহাদুরি আছে বলতে হয়। অত বড়ো টুপিটা টেবিলের ওপর থেকে ছিটকে দিল। ওঃ! কী ভাগ্য! একটা ইঁদুর দেখে তিনি যে ভয় পেয়েছেন, এ-কথাটা কেউ জানতে পারেনি। জানতে পারলে, কী কেলেংকারি কান্ডটাই না হত!

অবিশ্যি এর জন্যে তুমি দারোগাবাবুকে দোষ দিতে পার না! যত গন্ডগোল পাকিয়ে বসে আছে তো সেই হাবিলদার। সে যদি না বলত ঘরে ভূত আছে, তাহলে ব্যাপারটা কি এতদূর গড়াত! এই চুপচাপ অন্ধকার ঘরের মধ্যে, এই রাতদুপুরে, হঠাৎ যদি খটাস করে শব্দ ওঠে, কিংবা ফটাস করে টুপিটা ছিটকে পড়ে, আর সঙ্গেসঙ্গে ক্যালেণ্ডারের কালীঠাকুর টুকুস টুকুস নাচতে থাকেন, তখন কে এমন আছে যে, ভয়ে আঁতকে উঠবে না? সুতরাং এটা ভূতের কান্ড বলে মনে হওয়াটা এমন-কিছু অন্যায্য নয়!

যাক, ইঁদুর দেখে তিনি নিশ্চিন্ত হলেন। এটা তাহলে ভূত-টুতের কান্ড নয়। এতক্ষণ বুকের ভেতরটা যা ধকধক করছিল! এখন তিনি অনেকটা ধাতস্থ হয়েছেন। হাতের টর্চটা টেবিলে রেখে তিনি ঘরের আলো জ্বাললেন। মাটি থেকে টুপিটা তুলে আবার টেবিলে রাখলেন। হেঁট হয়ে বসে ঘরের আনাচে-কানাচে উঁকি মেরে দেখে আবার আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়লেন। শুয়ে-শুয়ে তিনি হেসে ফেললেন। যে-লোকটা কোনোদিন ভূতের কথা বিশ্বাস করেননি, শেষে কিনা ইঁদুর দেখে তিনিও আঁতকে ওঠেন! ওঃ, মাঝে মাঝে হাবিলদারের ওপর যা খেপে উঠছেন না। একঘর ইঁদুর পুষে বলে বেড়াচ্ছে, ঘরে ভূত বাস করছে! এমন মুখখু হাবিলদার দেখিনি বাবা! ভূতে ইঁদুরে তফাত জানে না! ঠিক আছে, কাল সকালে হাবিলদারের সঙ্গে একটা হেস্তনেস্ত হবে! ইঁদুরকে যে ভূত বলে, কোকিলকে তো সে কাক বলতেই পারে। এমন লোক পুলিশে থাকে কেমন করে! দাঁড়াও কাল হবে!

তিনি শুলেন বটে, তবে এবার রিভলবারটা বালিশের নীচে না-রেখে বালিশের পাশে রাখলেন। একবার ইঁদুর দেখতে পেলেই হয়, রিভলবার তুলেই ‘দুম’। এক টিপেই ইঁদুরের কম্ম শেষ। এখন তো ঘুম দেওয়া যাক। আঃ! তিনি একটা লম্বা হাই তুললেন। তারপর সত্যি-সত্যি ঘুমিয়ে পড়লেন।

এইবার আক্কুশের পালা। সে উঁকি মেরে দেখল। হ্যাঁ, দারোগাবাবু ঘুমুচ্ছেনই বটে। এবার তার চাই একটি নেংটি ইঁদুর। একটি ইঁদুর তাকে ধরতেই হবে। ধরে, দারোগাবাবুর ওই বাজখাঁই গোঁফের সঙ্গে ইঁদুরের ল্যাজটা বেঁধে দিতে হবে! ওঃ, তারপর যা হবে না! ইঁদুর ধরা অবিশ্যি আক্কুশের পক্ষে এমন কিছু একটা শক্ত কাজ নয়। তাকে তো ইঁদুর দেখতে পাচ্ছে না। ওই দ্যাখো না, আক্কুশের সামনে দিয়েই কেমন হুটোপাটি লাগিয়ে দিয়েছে ক-টা ইঁদুর! আরে! একটা নেংটি কেমন টেবিলের পায়া বেয়ে ওপরে উঠছে! ওমা! উঠে পড়েছে! দারোগাবাবুর টুপিটার ওপর কেমন নাচানাচি শুরু করে দিয়েছে, দ্যাখো! নাচছে, ছুটছে, হাঁটছে, খেলছে। আক্কুশ হাত বাড়াল। এই খামচে ধরল! যা:! ফসকে গেছে! নেংটি তিড়িং! ওপর থেকে এক লাফ! মার ছুট। সিধে কাট, একদম গর্তের ভেতরে! টুপিটা আক্কুশের হাতে লেগে পড়তে-পড়তে সামলে গেল! অ্যাঁ! শেষে কিনা একটা নেংটির কাছে আক্কুশের মতো একটা ভূত চিত! ইঁদুরের বদলে এখন তার হাতে দারোগাবাবুর টুপি! টুপি হাতে কেমন হাঁদার মতো দাঁড়িয়ে আছে আক্কুশ।

কই হাঁদা! দেখছ না, টুপিটা নিয়ে কেমন দেখতে-দেখতে নাড়াচাড়া করছে আক্কুশ! এ কী ব্যাপার! টুপিটা মাথায় দিচ্ছে যে! কী বুদ্ধি! অত বড়ো টুপিটা তোর মাথায় হবে কী করে! করুক ঢলঢল, কিন্তু মাথাটা নাড়তে আক্কুশের ভারী মজা লাগছে। এখন যদি আক্কুশকে দ্যাখো, তোমারও মজা লাগবে। কেননা, দেখবে কেউ কোথাও নেই, অথচ শূন্যে একটা টুপি নাচছে। এধার-ওধার ঘুরছে। হাওয়ায় যেন হাঁটছে! আচ্ছা, সে যদি এখন ওই আলনায় ঝোলানো দারোগাবাবুর পোশাকগুলোও পরে ফেলে! আর ওই টেবিলের নীচের জুতো-মোজা! আর বলতে হল না। যেমন ভাবা, তেমনি কাজ। ঝটপট জামাটা গায়ে চড়িয়ে, প্যান্টটা কোমরে গলিয়ে, মোজা-জুতো পায়ে জড়িয়ে লটরপটর হাঁটতে লাগল। মনে হচ্ছে, অন্ধকার ঘরের ভেতর যেন দেহহীন, মুন্ডু-কাটা দারোগাবাবুর ছায়াটা ঘুরে বেড়াচ্ছে!

খট-খট-খট!

এই সব্বনাশ! আক্কুশ নাচতে শুরু করে দিলে যে!

নাচে সে যে ধেই-ধেই

ধড় মাথা কিছু নেই।

টুপি নাচে টুপটাপ,

নাচে জামা ঝুপঝাপ।

জুতো পায়ে গটমট,

খটখট লটপট।

‘কে!’ আঁতকে চেঁচিয়ে উঠেছেন দারোগাবাবু। এই রে! ঘুম ভেঙে গেছে!

আক্কুশের নাচ মাথায় উঠেছে! থমকে দাঁড়িয়ে ড্যাবড্যাব করে দেখছে!

‘কে!’ আবার কাঁপা-গলায় চিৎকার করে উঠলেন দারোগাবাবু। চিৎকার করেই হাঁকপাঁক করে টর্চ খুঁজতে লাগলেন। একবার চাদর হাতড়ান। একবার বালিশ ওলটান। শেষে হাত কামড়ান। কোথায় গেল টর্চটা? কোথায় আবার যাবে? তিনি তো নিজেই তখন টর্চটি ভুলে টেবিলে ফেলে এসেছেন!

এখন তো আক্কুশের নড়ন-চড়নের উপায় নেই। কারণ, গা-টি তার পোশাকে ঢাকা। মাথায় তার টুপি আঁটা। পায়ে জুতো-মোজা সাঁটা। ঘুরঘুর করলেই ক্যাঁক করে ধরা পড়বে!

আচমকা স্যাট করে বসে পড়ল আক্কুশ। বসে-বসে হামাগুড়ি দিতে শুরু করল। হামা দিয়ে কোথা যাচ্ছে সে? দারাগাবাবুর খাটের নীচে সেঁধিয়ে পড়ল যেন! হ্যাঁ তো রে! দ্যাখো, দ্যাখো, ভূতের কীর্তি দ্যাখো! তুই শেষে খাটের নীচে গা-ঢাকা দিলি!

চিঁক-চিঁক-চিঁক! একটা ইঁদুর ডেকে উঠল কি?

ইঁদুরই তো! এই দ্যাখো, খাটের নীচে লুকোতে গিয়ে আক্কুশ একটি নেংটির ঘাড়ে পা তুলে দিয়েছে। খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে এসে ইঁদুর তো ভয়ে চরকিবাজি শুরু করে দিলে, চিঁক-চিঁক, চিঁক-চিঁক!

যেই-না ইঁদুরের ডাক শোনা, অমনি দারোগাবাবুর ভয়ে চুন মুখখানা ফিক করে হেসে উঠল। প্রথমটা তিনি হাসলেন ঠিকই, তারপর তিনি রাগলেন, ‘এবারও সেই ইঁদুর! আঃ! জ্বালিয়ে খেলে। দাঁড়া, রাত কাটুক! তারপর দেখছি।’ বলে তিনি আবার টর্চটা খুঁজতে লাগলেন।

ঠক!

কী পড়ল? এই রে, টর্চ খুঁজতে গিয়ে দারোগাবাবুর হাত লেগে রিভলবারটা পড়ে গেল যে!

যাকগে! এখন এই অন্ধকারে থাক সেটা পড়ে। এই ঘর থেকে সেটা তো আর হাত-পা গজিয়ে পালাচ্ছে না! কিংবা হারাচ্ছে না। ঘরে ঢুকে সেটা নিয়ে কেউ পালাচ্ছেও না। ঘরের দরজা তো বন্ধ। সুতরাং এখন নির্বিঘ্নে ঘুম দাও। কাল সকালে দেখা যাবে।

দারোগাবাবু আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।

আক্কুশও খাটের নীচে ঘাপটি মেরে বসে-বসে বুঝতে পেরেছে, দারোগাবাবু আবার ঘুমোলেন। কেননা, দারোগাবাবু এখন আর খাটের ওপর এপাশ-ওপাশ করছেন না। বা বিছানা বালিশ ধামসাচ্ছেন না। অন্ধকারে থমথম করছে ঘরের ভেতরটা। শুধু মাঝে মাঝে ইঁদুরের খুটখাট, ছোটাছুটি। আর দারোগাবাবুর নিশ্বাসের ফুরফুর শব্দ। আর কিছু না। আর সব থির, নিশ্চুপ!

আক্কুশের চোখ এখন ওই রিভলবারটার ওপর। ওই যে পড়ে আছে! আক্কুশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রিভলবারটা। আক্কুশ জানে, ওর থেকে গুলি ছিটকে কারো বুকে লাগলে নির্ঘাত তার মরণ। অবিশ্যি আক্কুশ কোনোদিন, কাউকে রিভলবারের গুলি ছুড়তে দেখেনি। তাই সে জানে না, ওটা কেমন করে ছুড়তে হয়! আক্কুশ রিভলবারটা তাক করে খাটের নীচ থেকেই হাত বাড়াল। রিভলবারটা সে তুলে নিলে। খাটের নীচ থেকেই সেটা পরখ করতে লাগল।

দুম!

এই সব্বনাশ! রিভলবার থেকে গুলি ছিটকেছে।

কেঁপে উঠেছে অন্ধকার ঘরটা। ধড়ফড় করে জেগে উঠেছেন দারোগাবাবু! তিনি আবার চেঁচিয়ে উঠেছেন, ‘কে?’ বিছানা থেকে নেমে পড়েছেন। তিনি অন্ধকারে হুমড়ি খেয়ে রিভলবারটা খুঁজতে লাগলেন। খুঁজতে-খুঁজতে হাঁপাতে লাগলেন। আক্কুশ তখন খাটের নীচে সিঁটিয়ে আছে। যেন একটা চোর!

না, সে চোর নয়। সে তক্কে-তক্কে আছে, কখন দারোগাবাবু পিছু ফেরে! কোনটা টিপলে যে রিভলবার থেকে গুলি বের হয় সেটা এবার আক্কুশ বুঝতে পেরেছে। সুতরাং আর সে মোটেই ভয় পায় না কাউকে। এখন সে ইচ্ছে করলে তার ওই ছোট্ট বন্ধুকে এই লোকটার হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

হ্যাঁ, এবার বেরিয়ে এল নি:সাড়ে খাটের নীচ থেকে। অত্যন্ত সতর্ক হয়ে পা ফেলল আক্কুশ। টের পায় কার সাধ্যি। জুতোর খুটখাট শব্দটি পর্যন্ত শোনা গেল না। সে দারোগাবাবুর ঠিক পেছনে এসে দাঁড়াল। হাতের রিভলবারটি উঁচিয়ে সে আচমকা হেসে উঠল, ‘হিঁ-হিঁ-হিঁ!’

দারোগাবাবু আঁতকে উঠেছেন। ঝট করে তিনি ঘুরে দেখেছেন। আচমকা আক্কুশের ওই মূর্তি দেখে তিনি চিৎকার করতে গিয়েও পারলেন না। তাঁর মুখ দিয়ে কথা সরল না। তিনি ঠকঠক করে কেঁপে উঠলেন। তারপর মেঝের ওপর ধপাস করে হুমড়ি খেয়ে মূর্ছা গেলেন।

আক্কুশ ঝটপট ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে থেকে ঘরের দরজায় সে শিকল এঁটে দিল। সে জানে তার বন্ধু কোথা! সেই গারদের ফটকের কাছে যাবার আগে গারদের চাবিটা তাকে বার করে আনতে হবে। সে তো চাবি রাখার জায়গাটা আগেই দেখে রেখেছিল, এ তো আমরাও জানি। চাবিটা সে ঠিক খুঁজে আনল। ওই দ্যাখো, রাতের চৌকিদার গারদ পাহারা দিচ্ছে। আক্কুশের পায়ের ওই জুতোর শব্দ খুব অস্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কে জানে চৌকিদার শুনতে পেয়েছিল কিনা! নইলে সে এমন সজাগ দৃষ্টিতে দেখছে কেন এদিক-ওদিক। আক্কুশ থমকে দাঁড়াল খানিক। গারদের ঠিক সামনে আলো জ্বলছে। ভয়ঙ্কর অন্ধকার টপকে সেই আলোর রশ্মি আক্কুশের পোশাকের ওপর পড়েছে। নিজেকে দেখল আক্কুশ। হাতের রিভলবারটা শক্ত করে ধরল। আরও ক-পা এগিয়ে গেল। চৌকিদারের একেবারে সামনে গিয়ে দাঁড়াল আক্কুশ।

চৌকিদার থতমত খেয়ে চেঁচিয়ে উঠেছে, ‘বাপ রে, বাপ!’ বলেই হাত-পা ছেড়ে মারল ছুট।

চৌকিদার পালিয়ে যেতেই আক্কুশ ঝটপট রিভলবারটা জামার পকেটে পুরে ফেললে। চাবি দিয়ে গারদের তালাটা খুলে ফেললে। ফটকটা ঠেলে সে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ছেলেটা পড়ে আছে গারদের মেঝেতে। পড়ে-পড়ে ঘুমুচ্ছে। আক্কুশ তার গায়ে যেই ঠেলা দিয়েছে, অমনি রাইফেলের গুলি ছুটে এল। গুড়ুম, গুড়ুম! চৌকিদার গুলি ছুড়েছে গারদ লক্ষ করে। ছেলেটার ঘুম ভেঙে গেছে। ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে। চোখ কচলে সে দেখে গারদের ফটক খোলা। সে উঁকি মারল। বাইরে বেরিয়ে এল।

আবার গুলি ছুটল, গুড়ুম, গুড়ুম! একদম ছেলেটার মাথার ওপর দিয়ে শাঁই-শাঁই করে উড়ে গেল রাইফেলের গুলি। ছেলেটা চমকে উঠে মারলে ছুট। একেবারে গারদের বাইরে। সে ফিরেও দেখল না, আক্কুশ নামে একটা ভূতও তার পিছনে ছুটে আসছে! তার হাতে রিভলবার। ছেলেটা ছুটতে-ছুটতে থানা ডিঙিয়ে রাস্তায় নেমে এল। আক্কুশও ছুটল।

সঙ্গেসঙ্গে সরগরম হয়ে উঠল পুলিশ-থানা। পাগলা-ঘণ্টি বেজে উঠল। হৈ-হৈ, হুটোপাটি লেগে গেল চারিদিকে। কেউ ওপরে গেল, কেউ নীচে নামল। কেউ রাস্তায় নামে, কেউ রাইফেলে টোটা ভরে। কিন্তু ততক্ষণে পাখি ফুড়ুত!

পাঁইপাঁই করে ছেলেটা যেমন ছোটে, আক্কুশও ছোটে তেমনি। মানে ভূতের ছোটা তো! কী লম্বা ঠ্যাং রে বাবা! এই দ্যাখো, ছুটতে-ছুটতে আক্কুশের মাথা থেকে ফস করে টুপিটা উড়ে গেল যে! ও হরি, আক্কুশের মাথায় তো সেই দারোগাবাবুর টুপিটা এখনও ছিল। শুধু টুপি কেন, জুতো-মোজা, জামা-প্যান্ট এখনও তো ছুটতে-ছুটতে গায়ে লটপট করছে। টুপিটা গেছে ভালোই হয়েছে! ছেলেটা দেখতে পেলে! আর কী দরকার গায়ে জামা-প্যান্ট জড়িয়ে রেখে। সব ফেলে দাও! ছুটতে-ছুটতে আক্কুশ একটু দাঁড়ায়! জামা-প্যান্ট, জুতো-মোজা সব খুলে ফেলে। তারপর এধার ওধার ফেলে দিয়ে আবার ছোটে! ছেলেটার পেছনে! এ কী করল আক্কুশ!

কেন, কী করল?

জামার পকেটে যে রিভলবার ছিল! সেটা যে পকেটেই রয়ে গেল!

থাকগে! কাজ তো হাসিল হয়ে গেছে! ছেলেটাকে তো সে গারদ থেকে বার করে আনতে পেরেছে। বলিহারি যাই ওইটুকু এক পুঁচকে ভূতের বুদ্ধি দেখে! যেমন বুদ্ধি, তেমনি কেরামতি! বাস রে বাস! একেই বলে ভুতুড়ে কান্ড!

ছেলেটা ছুটতে-ছুটতে দাঁড়াল যেন!

হ্যাঁ তো!

আক্কুশও ছেলেটাকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ছেলেটা হাঁপাতে-হাঁপাতে একটা ঘরের সামনে এগিয়ে গেল।

হুঁ:! ঘর না ঘেঁচু! কী ছিরি ঘরের। মাথার ওপর ছাত ফুটো। দরজা ভাঙা। জানলা নেই. কী ঘিঞ্জি চারদিক। নোংরা। জঞ্জালের ছড়াছড়ি।

ছেলেটা ভাঙা দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

আক্কুশও তক্কে-তক্কে এগিয়ে গেল।

‘বাবা বুদ্ধু এলি?’ কে ডাকে?

‘হ্যাঁ মা।’ ছেলেটা সাড়া দিল।

‘সারাদিন কোথা ছিলি বাবা?’

‘সে-কথা পরে বলব মা।’ ছেলেটা উত্তর দিল।

‘খেয়েছিস তো বাবা?’

ছেলেটা চুপ করে রইল।

‘চুপ করে আছিস কেন বাবা? কিছু খাসনি বুঝি?’

ছেলেটা উত্তর দিল, ‘আজ খাবার নেই। তোমার জন্যও কিছু আনতে পারিনি মা।’

‘উপোস করে আছিস বাবা?’

‘আজ আমার একটুও খিদে নেই মা। কিন্তু মা গো, তোমার যে কষ্ট হচ্ছে।’

‘ছেলের খিদে না থাকলে, মায়েরও যে খিদে থাকে না বাবা।’

ছেলেটা মায়ের কথা শুনে মাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তারপর কাঁদতে-কাঁদতে বললে, ‘মা গো, আমি তোমায় শুধু কষ্ট দিই মা, শুধু কষ্ট দিই।’

অন্ধ চোখে, অন্ধকারে মাও ছেলেকে বুকে নিয়ে কেঁদে ফেলল। সে-কান্নায় কোনও শব্দ নেই। শুধু জল, চোখভরা অশ্রু।

দেখেশুনে আক্কুশ নামে ভূতটা, সে-ও বুঝি আর ভূত থাকে না। মা ও ছেলের কান্না দেখে সে-ও যেন চোখের জল রুখতে পারে না। হ্যাঁ, সে এখন বুঝতে পেরেছে, ওই ছেলেটার নাম বুদ্ধু। আর ওই তার মা! যে-মা দু-চোখে দেখে না কিছুই। না আলো, না ফুল, না তার ছেলের মুখ। আক্কুশের মনটা সত্যিই ভারী মুষড়ে গেল।

আশ্চর্য! কাঁদতে-কাঁদতে মা আর ছেলে কখন দ্যাখো ঘুমিয়ে পড়েছে। রাত তো এখন বেশ গভীর! এখন আক্কুশ এখানে একা-একা কী করে? অবিশ্যি ওর মন বলছে কিছু খাবার যদি যোগাড় করা যেত! হ্যাঁ, তাহলে মায়ে-ছেলে খেয়ে বাঁচত। কিন্তু এত রাতে খাবার সে কোথা পাবে?

আক্কুশ ঘুরে ফিরে এদিক-ওদিক ভালো করে দেখল। সেই ভাঙা ঘরটার ঠিক কিনারে একটা তেঁতুলগাছ তার নজরে পড়ল। আর কথা বলতে হল না। সঙ্গে সঙ্গে সে উঠে পড়ল গাছে। যদিও শীতটা আগের মতোই তখনও তার হাড়ে কাঁটা ফোটাচ্ছিল, তবু যেন সে-কষ্ট আর কষ্ট বলে মনে হচ্ছে না। শুধু মা আর ছেলের জন্যে দুটো খাবার সে কোথা থেকে যোগাড় করবে, সেই তার ভাবনা। তেঁতুলগাছের একেবারে মগডালে একটা জুতসই জায়গা খুঁজে বসে পড়ল আক্কুশ। দূর ছাই, ভূত বলেই যেন তার যত ঝামেলা। সবাই তাকে ভয় পায়। কী জ্বালা! সে যে ছেলেটার সামনে গিয়ে একবার দাঁড়াবে, তারও উপায় নেই। আক্কুশের মূর্তি দেখে ‘ভূত, ভূত’ বলে চিৎকার শুরু করে দিলে, তখন সে-ঠেলা কে সামলাবে বল? হায় রে! কে ওই বুদ্ধু নামে ছোটো ছেলেটিকে বলে দেবে, না, না, আক্কুশকে তোমার একদম ভয় নেই। বুঝতে পারছ না, সে যে মনে-মনে তোমার সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতিয়ে ফেলেছে? ওরও তো ইচ্ছে যায় খেলা করতে কিংবা গল্প করতে তোমার মতো একটি ছেলের সঙ্গে। ভূত মানেই কি শুধু ভয়? না, আর কিছু? সে-কথাটা জানছে কে? জানার চেষ্টাই বা করছে কে?

এ কী! গাছের ডালের ওপর হঠাৎ কেন আক্কুশ চনমন করে উঠল! মনে হচ্ছে, ওর দৃষ্টি এখন এই গাছের ওপর থেকে ওই দূরে থমকে চেয়ে আছে! হ্যাঁ, ঠিক তাই। ও দেখতে পেয়েছে, দূরে-দূরে মস্ত উঁচু সব বাড়ি। অন্ধকার রাত্তিরে রাস্তার এপাশে-ওপাশে মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আক্কুশ তো গেঁয়োভূত, সে গ্রাম ছেড়ে শহরে হঠাৎই এসে পড়েছে। তাই শহুরে ব্যাপার-স্যাপার সে আর জানবে কী করে। শহরের বাড়িগুলোকে এমন ঢ্যাঙা-ঢ্যাঙা দেখে, সে একদম ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। সত্যি বলতে কী, পুলিশের থানা-বাড়ি দেখেই সে ঘাবড়ে গেছল। বাব্বা! সে-বাড়িতে ভেতরে-ভেতরে কত কী ব্যবস্থা। অথচ দ্যাখো, শহরে থেকেও বুদ্ধু নামে ওই ছেলেটা আর তার মা কেমন একটা বিচ্ছিরি ভাঙা ফুটো বাড়িতে বাস করছে!

হঠাৎ আক্কুশের ভুতুড়ে মাথায় একটা অদ্ভুতুড়ে চিন্তা পেয়ে বসল। আচ্ছা, ওই যে মস্ত-মস্ত বাড়ি, ওখানে একবার ঢুঁ মারলে কেমন হয়! ওখান থেকে যদি কিছু খাবার যোগাড় করতে পারে আক্কুশ! কথাটা যেই-না মাথায় এসেছে, অমনি আক্কুশ ঝুপ করে গাছ থেকে নেমে পড়েছে। চটপট পা ফেলে ওই শহুরে-বাড়ির দিকেই হাঁটা দিলে সে। এতক্ষণ গাছের মগডাল থেকে বাড়ির চুড়োগুলোই আক্কুশের নজরে পড়ছিল। কিন্তু যতই সে কাছে এগিয়ে আসছে, ততই সে দেখছে ছোটো-বাড়ি, বড়ো-বাড়ি, বাড়ির পর বাড়ি। গায়ে-গায়ে গলিঘুঁজি! যেন ধাঁধা লেগে যায়! ওই গলিঘুঁজিতে আক্কুশ হারিয়ে না যায়! অবিশ্যি হারিয়ে গেলেও বুদ্ধুদের বাড়িটা সে ভুল করবে না। কেননা, ইয়া লম্বা সেই তেঁতুলগাছটা তো তার চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে না।

তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, এখন এই নিশুতিরাতটা যেমন নিশ্চুপ, তেমনি নিস্তব্ধ এই বাড়িগুলোও। অন্ধকারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে এক-একটা বোবা দৈত্যের মতো। দরজা-জানলা বন্ধ। মানুষজনের সাড়া নেই। চারদিক সুনসান। শুধু দেখা যাচ্ছে, একটা ছায়া। সে-ছায়া আক্কুশ নামে এক পুঁচকে ভূতের।

আক্কুশ ভাবে, বাড়িগুলো যখন এত বড়ো-বড়ো, তখন না-জানি বাড়ি-ভরতি কত খাবার! একবার ঢুকতে পারলে হয়! কিন্তু মুশকিল তো সেইখানেই। দরজা-জানলা এমনভাবে বন্ধ, শীত তো কোন ছার, একটা উইচিংড়ে পর্যন্ত ফোকর দিয়ে ঘরে সেঁধুতে পারবে না।

হঠাৎ একটা বাড়ি দেখল আক্কুশ, তার সামনে একটা লোহার গেট। গেটের ভেতরে বাগান। কিছু ফুল। দু-একটা আম-কাঁঠালের গাছ। গেটের দু-পাশে দুটো ঝাউ গাছ। আচ্ছা, আমগাছের ফাঁক দিয়ে কি একঝলক আলো উঁকি মারছে? হ্যাঁ তো! আরও একটু ভালো করে নজর ফেলে আক্কুশ দেখল, আলোটা ওপরের একটা ঘর থেকে ছড়িয়ে পড়ছে। দেখা যাচ্ছে, একটা ঝুলবারান্দা। বারান্দার সঙ্গে ঘর। আলো আসছে ওই ঘর থেকেই।

আর কে রুখবে আক্কুশকে? ওখানে আলো জ্বলে কেন, সে তো তাকে দেখতেই হবে। সুতরাং ওইখানে যাবার রাস্তাটা সে আঁতিপাতি করে খুঁজতে লাগল। কিন্তু রাস্তা আর পাবে কোথা! এই রাতদুপুরে কে আর ঘরের দরজা খুলে রাখবে তোমার জন্যে। সব বন্ধ। অগত্যা আক্কুশ খপাত করে একটা আম গাছের ডাল ধরে ঝুলে পড়ল। তারপর ঠ্যাং-ঝোলা হয়ে গাছের ওপর মারল এক লাফ। মেরেই, পা দুটো আগিয়ে, হাত দুটো বাগিয়ে ঝুলবারান্দাটা ধরে ফেলল। গাছ থেকে সটান নেমে পড়ল বারান্দার ওপর। তারপর খুঁজেখাঁজে একটা ছোট্ট ফুটোয় চোখ গলিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখতে লাগল।

উঃ! বাব্বা, ঘরটা তো দারুণ। দেখে তো ভূতের চোখ ছানাবড়া। ঘরটা যেমন ঝকঝকে পরিষ্কার, তেমনি সব রংচঙে আসবাব। ও বাবা, ওটা আবার কী? একটা বাঘ! কী পেল্লাই দেখতে! মুখখানা একদম হাঁড়ি। হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘হালুম’ বলে লাফ মেরে এই বুঝি ধরে! চোখ দুটো দ্যাখো! আহা রে, যেন কিচ্ছু জানেন না। কত লক্ষ্মী! কী রে বাবা, ঘরের মধ্যে একটা জ্যান্ত বাঘ ঢুকে বসে আছে নাকি!

ধ্যাত, তাই আবার হয়! দেখছ না, বাঘের ল্যাজও নড়ে না, চোখও পড়ে না। হাঁটছেও না, ডাকছেও না। একদম নট নড়ন-চড়ন।

আক্কুশ হেসে ফেলেছে। দেখেছ, একটা মরা বাঘকে কেমন ঘরের মধ্যে সাজিয়ে রেখেছে! আক্কুশ ভাবল, বাঘটাকে পাওয়া গেলে যা হয় না, দারুণ! শখ করে যারা ঘরের ভেতর এত বড়ো বাঘ সাজিয়ে রাখতে পারে, তারা না-জানি কত বড়োলোক। আর যারা বড়োলোক তাদের বাড়িতে নিশ্চয়ই খাবারও আছে অঢেল। ওঃ! আহ্লাদে একেবারে আটখানা হয়ে গেল আক্কুশ। কিন্তু তারপরেই তার আহ্লাদ চুপসে গেল। কেন? বলি, ঘরে ঢুকবে কেমন করে? আক্কুশ তো আর কানা নয়! সে কি আর দেখছে না, ঘরে ঢোকার সব রাস্তাই বন্ধ!

ও হ্যাঁ! তাই তো! তাহলে? এত করে শেষে এই! না, তা বলে হাল ছাড়লে চলবে না। আক্কুশকে ঘরে ঢুকতেই হবে। আক্কুশ ফুটো থেকে চোখ সরিয়ে সামনের জানলাটায় আলতো করে ঠেলা মারল, ঠক-ঠক-ঠক।

কোনো সাড়াও নেই, শব্দও নেই।

তবে কি ঘরে কেউ নেই?

হতে পারে। কারণ যে-ছোট্ট ফুটোটার মধ্যে চোখ গলিয়ে আক্কুশ এতক্ষণ বাঘ দেখছিল, সেই ফুটো দিয়ে তো আর ঘরের চারকোণ দেখতে পাচ্ছিল না। সুতরাং ঘরে কেউ আছে কি নেই, তা কেমন করে জানা যাবে? অথচ ঘরে আলো জ্বলছে। মানুষজন না-থাকলে আলোই বা কে জ্বালল তাহলে?

আক্কুশ এবার জানলায় ঠেলা না-মেরে দরজায় টোকা মারল, টক-টক-টক।

যাচ্চলে! এবারও কেউ ট্যাঁও করে না, টুঁও করে না।

কিন্তু অমন করে দরজা-জানলায় টোকা মারাটা কি উচিত কাজ হচ্ছে আক্কুশের? আচ্ছা ধরো, ঘরে যদি সত্যিই কেউ থাকে, সে কি এক্ষুনি দরজা খোলার জন্যে, ছুটে আসবে না? ধরা পড়লে তখন?

ধরা পড়বে কে? ভূত? কখনো ধরা পড়েছে? ভূত ধরা অত সহজ নয়! ধরতে এলেই সুড়ুত! তোমার চোখে ধুলো দিয়ে নিমেষে উধাও! দেখলে তো, এমন যে জাঁদরেল দারোগাবাবু, তিনিই ভয়ে ঠ্যাং উলটিয়ে চোখ কপালে তুললেন, তো অন্যের কথা! আক্কুশ কি আর না-ভেবে টোকা মারছে? দরজা খুললেই হয়, অমনি ফুসমন্তরে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে। কেউ টেরও পাবে না। আর বেশি বেগড়বাঁই করলে নিজ-মূর্তি ধরতে আক্কুশেরও বেশি সময় লাগবে না। নিজ-মূর্তি ধরে সে যে কী কান্ড করতে পারে, সে যারা তাকে জানে, তাদের নতুন করে বলতে হবে না।

কিন্তু এত কথা বলেই-বা কী লাভ। মিথ্যে-মিথ্যে বকবকানি। কারণ দরজা খোলার কোনো লক্ষণই নেই। সুতরাং আক্কুশ যদি হতাশ হয়ে ভাবে, এখানে খামোকা দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই, তবে তুমি তাকে দোষ দিতে পার না। হ্যাঁ, আক্কুশ আবার ওই গাছের ওপর লাফ মারতেই যাচ্ছিল, কিন্তু থমকে গেল যেন!

দরজার ঠিক ওপরে চোখ পড়তেই তার হাড়-ভরতি হাত-পাগুলো শিরশির করে উঠল। দ্যাখে কী, দরজার ঠিক মাথায়, একটু ওপরে, কাচের শার্সি দেওয়া একটা জানলামতো! আক্কুশ তো আর জানে না, ওটাকে বলে স্কাইলাইট। জানলাটার ধরন দেখে আক্কুশ বুঝতে পেরেছে, হাত দিয়ে ঠেললেই জানলাটা খুলে যাবে। কিন্তু এত উঁচুতে জানলাটা, ওখানে আক্কুশের হাত যাবে কী করে? সে কী কথা! ভূতের হাত যদি ওখানে না পৌঁছোয়, তো আর কার পৌঁছোবে? সে তো বুঝলুম। কিন্তু মশাই আক্কুশ তো আর ধেড়ে-ভূত নয় যে, হাত বাড়ালেই কেল্লা ফতে! তা ঠিক। এ-কথাটা সবাই স্বীকার করবে। কিন্তু আক্কুশ হাত না-বাড়িয়ে যদি লাফ মারে, তখন? তখন এক লাফেই কাজ সারা। আর হলও তাই। চোখের পলকে টেনে এক লাফ। মেরেই, খপ করে খামচে ধরলে জানলার খাঁজটা! শাবাশ! একেই বলে ভূতের কেরামতি! তারপর হাতের ওপর ঝাঁকি দিয়ে উঠে পড়ল ওপরে। হাত দিয়ে ঠেলা মারতেই জানলা হাঁ। মানে, খুলে গেছে! বোঝা যাচ্ছে, জানলায় দেহটা গলিয়ে ঘরে ঢুকতে আর বাধা নেই। ঢুকে পড়লেই হয়! না, না, অত হড়বড় করা উচিত হবে না। ঘরে পা দেওয়ার আগে ভেতরের ব্যবস্থাপত্তরটা অন্তত একবার দেখে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। তাই আক্কুশ মাথাটি জানলায় গলিয়ে, ভেতরটা দেখতে লাগল। হ্যাঁ, হ্যাঁ, দ্যাখো, ওই তো বাঘটা! উফ! কী বলব, ঘর-ভরতি কত জিনিসপত্তর। আক্কুশ অত জিনিসের অর্ধেক নামই জানে না। আলমারি ভরতি কত বই সে দেখতে পেল। টেবিলের ওপরেও একগাদা বই ছড়ানো। আর একটু নজর করতেই আক্কুশ দ্যাখে কী, একজন লোক, বুকে বই রেখে বেমালুম ঘুম দিচ্ছে। লোকটাকে দেখেই আক্কুশ শিউরে উঠেছে। বুঝতে পারল লোকটা বই পড়তে-পড়তে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই যেমনকে তেমন আলো জ্বলছে। যেমনকে তেমন এটা-ওটা এদিক-ওদিক ছড়িয়ে-মড়িয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আক্কুশ ভাবল, এই তাল। জানলায় দেহটা গলিয়ে, ঠ্যাং দুটো গুটিয়ে ঘরের মধ্যে মারল টেনে এক লাফ!

ঝন-ঝন-ঝন!

সব্বনাশ! আক্কুশের ঠ্যাং লেগেছে জানলার কাচে। কাচ ভেঙে ঘরময় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নৈরাকার!

‘কে?’ এবার বোঝো ঠেলা! লোকটার ঘুম ছটকে গেছে। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছে।

আক্কুশ যেন এখন একটা শুধু ছায়া। কেউ তাকে দেখতে পাবে না। কিন্তু ভয়ে লোকটার মুখের চেহারাটা কী হয়েছে দ্যাখো!

‘চোর, চোর।’ হঠাৎ লোকটা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠেছে। কিন্তু অত চিৎকারেও কেউ সাড়া দিল না।

কারো সাড়া না-পেয়ে লোকটা যেন প্রাণের দায়ে হাঁক পাড়ল, ‘রামু, রামু?’

রামু ছুটে এসে দরজায় ঠেলা মারল, ‘কী হয়েছে বাবু?’ দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল।

‘চোর!’ বাবু আঁতকে উঠল।

‘কোথায় বাবু?’

‘ওই যে স্কাইলাইট!’ বাবু ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে।

রামু স্কাইলাইটের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘হ্যাঁ বাবু, স্কাইলাইটের কাচ ভেঙেছে।’

বাবু একেবার ভয়ে পাগলের মতো চিৎকার করে উঠল, ‘আমায় বাঁচাও, বাঁচাও!’

রামু বলল, ‘বাবু চেঁচাবেন না। চোর পালাবে।’

বাবু তখন হিহি করে কান্না জুড়ে দিলে। আর রামু প্রাণটিকে হাতে নিয়ে ভয়ে-ভয়ে এদিক-ওদিক উঁকি মারতে লাগল।

কোথায় চোর! আক্কুশ তখন করেছে কী, বাঘের পিঠে বসে পড়েছে। বসে-বসে বাঘটাকে দেখছে, আর মনে-মনে ভাবছে, ‘মানুষের বুদ্ধি দেখেছ, বাঘের আসল চোখ দু-টি উপড়ে ফেলে, দু-টি চকচকে পাথর বসিয়ে রেখেছে।’ বাঘটাকে আক্কুশের বড্ড ভালো লেগে গেছে। বাড়ির বাবু আর বাবুর কাজের লোক রামু যখন চোরের ভয়ে ঘরের ভেতর তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে, তখন আক্কুশের সেদিকে খেয়ালই নেই। সে তখন বাঘের পেটে দিব্যি পায়ের আঙুল দিয়ে খোঁচা মারছে! আরে বাবা! এ তো আর জ্যান্তঘোড়া নয় যে, খোঁচা মারলেই ছুটবে! খোঁচাই মার, কি ল্যাজে পাক দাও, বাঘ লাফও মারবে না, গাঁক করে ডাকও ছাড়বে না।

কিন্তু এখন বাঘের কথা রাখো! ওদিকটা দ্যাখো! দেখতে পাচ্ছ, রামু আর রামুর বাবু চোরের তল্লাশে কী কান্ড শুরু করেছে! চেঁচিয়ে-মেচিয়ে, কেঁদে-ককিয়ে পাড়া যেন মাথায় নিয়ে নাচছে! হল্লা শুনে এ-বাড়ি, ও-বাড়ি থেকে হৈ-হৈ করে সব লোকজন বেরিয়ে পড়েছে। ‘কই, কই’ করে তারা সব ঘরে, বাগানে, বাইরে, ভেতরে চোরের খোঁজে হন্যে হয়ে তোলপাড় শুরু করে দিলে।

হায় কপাল! চোর যে তখন বাঘের পিঠ থেকে নেমে লোকগুলোকে দেখছে, মনে-মনে হাসছে, আর ঘুরঘুর করে ঘুরে-ঘুরে খাবারের খোঁজ করছে।

আচ্ছা, বাড়িটা তো এত বড়ো, ঘর কেন একটা? আর এত বড়ো বাড়িতে লোকই-বা কেন দু-টি?

না, তা নয়। বাড়িতে লোকজন অনেক। বাবুটিকে রামুর জিম্মায় রেখে, বাড়ির গিন্নিমা কোন দূরদেশে হাওয়া খেতে গেছেন। সুতরাং এখন বাবুটি একলা ঘরে থাকেন। বইপত্তর ঘাঁটেন। কাজের সময় বেরোন। খাবার সময় খান। সময় হলেই ঘুমোন। নইলে যখন-তখন হাঁকেন, ‘রামু!’ রামু বাবুর হাঁক শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। হাতের গোড়ায় এটা ওটা জুগিয়ে দেয়, কিংবা খাবার-দাবার এগিয়ে দেয়। জামাকাপড় গুছিয়ে দেয়।

সে তো হল। কিন্তু চোরের তো পাত্তা মিলল না। অগত্যা অতগুলো লোক যে-যার ঘরে ফিরে গেল। যাবার সময় হাজারটা পরামর্শ দিয়ে গেল। ইনি বললেন, ‘ওটা করবেন না।’ তিনি বললেন, ‘সেটা করবেন না।’ রামু আর রামুর বাবুও তাদের উপদেশ শুনে, ঘরে খিল এঁটে হাঁপাতে লাগল। হাঁপাতে-হাঁপাতে আলমারি-দেরাজ ঘেঁটেঘুঁটে যখন কী আছে, কী গেছে হদিস করতে পারল না, তখন বাবু বললে, ‘ব্যাটা চোর আমার ধমকানি শুনে ভেগেছে।’

রামু বললে, ‘বাবু, আবার আসতে পারে। এ ব্যাটা সন্ধানী-চোর।’

বাবু যেন রামুর কথায় মুষড়ে গেল। বলল, ‘তবে তুই এক কাজ কর। আমার ঘরে শো।’

সুতরাং রামু বাবুর ঘরে শুয়ে পড়ল। শোবার সময় বলল, ‘বাবু, আলোটা জ্বলুক তাহলে।’

বাবু একটু গম্ভীর হয়েই উত্তর দিল, ‘না, দরকার নেই। নিবিয়ে দে!’

‘যদি অন্ধকারে আবার আসে!’

‘লাঠিটা নিয়ে শো।’

রামু হাতের কাছে লাঠি নিয়ে, আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়ল।

ওই দ্যাখো আক্কুশকে। কী হল আক্কুশের! অমন চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে কেন? পেটে পেটে কি বুদ্ধি আঁটছে? বুদ্ধি আঁটছে না। ওর মুখের দিকে চেয়ে বুঝতে পারছ না, ওর মুখখানা অবাক হয়ে থমকে আছে! ওই যে রামু সুইচ টিপে আলো নেবাল, ওই দেখেই আক্কুশ চমকে গেল! এ কী কান্ড, দেওয়ালে আঁটা একটা বোতাম ফুট করে টিপতেই আলোটা কেমন টুক করে নিবে গেল! এ তো ভারী মজার ম্যাজিক! সবার যা হয়, আক্কুশেরও তাই হল। তক্ষুনি বোতাম টিপে আলো জ্বালার জন্যে তার হাত নিশপিশ করে উঠল। না, এখন না। আগে ওদের ঘুমুতে দাও। নইলে, আলো জ্বললেই আবার হুড়োহুড়ি লেগে যাবে। সুতরাং আক্কুশ এক কোণে চুপটি করে দাঁড়িয়ে, ওদের নাকের ঘড়ঘড়ানি শোনার জন্যে কান পেতে রইল।

কিন্তু ঘড়ঘড়ানির শব্দ সে শুনতে পেল না। তার কানে এল একটা টিক-টিক শব্দ। অন্ধকার নিঝুম এই ঘরের মধ্যে হঠাৎ শব্দটা শুনে আক্কুশ কেমন যেন একটু থতমত খেয়ে গেল। অবিশ্যি শব্দটা অনেক আগে থেকেই টিক-টিক করছে, কিন্তু শোনার ফুরসত তো পায়নি আক্কুশ। তখন থেকে যা ঝামেলা চলছে ঘরের মধ্যে!

থাকগে! ওই টিক-টিক শব্দটা নিয়ে মাথা ঘামালে, আসল কাজটাই ঠিক-ঠিক হবে না। ওই দেওয়ালে আঁটা একাট বোতাম টিপতেই একঝাঁক আলো হঠাৎ নিবে অন্ধকার হয়ে গেল। আবার টিপতেই ঘরভরতি আলো ছড়িয়ে পড়ল। বোতামটি দেখেছে যখন থেকে, তখন থেকেই ওইটি টেপবার জন্যে আক্কুশের মনটি ছোঁক-ছোঁক করছে।

ওই শোনো ফুর-ফুরর, ফুর-ফুরর শুরু হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, রামু আর বাবু দুজনেই ঘুমে কাবু। হ্যাঁ, যা বলেছি। ওই তো আক্কুশ টুকটুক করে সুইচ-বোর্ডের কাছে এগিয়ে চলেছে। ওই তো আক্কুশ বোর্ডের সামনে এসে দাঁড়াল। হাত বাড়াল। দিয়েছে টিপে। ব্যস! কোন বোতামটা টিপতে কোনটা টিপেছে, দ্যাখো! ইশ! কোথায় আলো জ্বলবে, তা নয়, পাখা চলতে শুরু করে দিয়েছে। নাও, এখন বোঝো ঠেলা! এই কনকনে শীতের রাতে, যদি ঘরের মধ্যে বাঁই-বাঁই শব্দে পাখা ঘোরে তখন কী অবস্থা হয় বলো? কুম্ভকর্ণের চোখ থেকে ঘুম ভাগবে তো এই বাবুটি কোন ছার! এমনিতেই তো বাবুটি চোরের ভয়ে ফাটা বেলুনের মতো চুপসে ছিল। তারও পরে হঠাৎ পাখাটা ঘুরে উঠতেই সে ধড়মড় করে উঠে বসেছে। বসেই, ‘ওরে বাবা রে,’ বলে এমন চিৎকার করে উঠল যে, সেই চিৎকারে রামুরও বুকের ধুকধুকিটা বুঝি থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। রামুও ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে। রামুকে দেখে, বিছানা থেকে বাবু মারল একলাফ। মেরেই রামুকে জাপটে ধরল। রামুও প্রাণের ভয়ে বাবুকে বুকে জড়িয়ে চেঁচানি শুরু করে দিলে। ওঃ! সে যা দৃশ্য!

এদিকে আক্কুশও তো পাখাটাকে ঘুরতে দেখে ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেছে। এ কী রে বাবা! জ্বালতে গেল আলো, ঘুরে গেল পাখা! থামা, থামা! সঙ্গেসঙ্গে আবার বোতামটা টিপে দিয়েছে। বাঁই-বাঁই করে ঘুরন্ত সেই পাখাটা, তক্ষুনি ফুসসস করে ডাক ছেড়ে, মাথা নাড়তে-নাড়তে থামতে লাগল।

তাই না দেখে, বাবু তো ভয়ে প্যাকাটি। আর রামুরও দাঁতকপাটি! দু-জনেই হাঁদা গঙ্গারাম! এ কেমন করে হল? দু-জনেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। ঘনঘন নিশ্বাস ছাড়তে লাগল। তারপর আপনমনেই বাবু বলে উঠল, ‘এ ব্যাটা চোর তো ভারী বেয়াদপ। চুরি করতে এসে পাখা ঘোরায়! আশ্চর্য!’ তারপর রামুকে বলল, ‘আলোটা একবার জ্বাল তো!’

রামু বাবুর হুকুম শুনে আমতা-আমতা করে জিজ্ঞেস করলে, ‘জ্বালব বাবু?’

‘হ্যাঁ, জ্বাল। দ্যাখ কে পাখা চালাল।’

রামু ভয়ে-ভয়েই আবার সুইচ-বোর্ডের কাছে এগিয়ে গেল। সুইচ টিপল। আলো জ্বলল। কিন্তু ফুসফুস! চোরও নেই, ছ্যাঁচোড়ও নেই। খাট, আলমারি, বই-এর শেলফ, টেবিলের নীচে গলিয়ে হাত বাড়িয়ে, আঁতিপাতি করে খুঁজেও চোরের টিকিটি দেখা গেল না। দেখবে কেমন করে? অকম্মের পান্ডা শ্রীআক্কুশচন্দ্র ভূত তখন বাবুর খাটে বসে, তাকিয়ায় ঠেসান দিয়ে পা দোলাচ্ছেন, আর মজা দেখছেন। কী হাসিই-না পাচ্ছে তার। হাসিটা যখন সত্যিই আর চাপতে পারছিল না আক্কুশ, তখন আবার তার শুকনো মাথায় দুষ্টু বুদ্ধিটা কিলবিল করে উঠল। সে খাট ছেড়ে উঠে পড়ল। আবার চুপিচুপি সুইচ-বোর্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দিয়েছে আলোর বোতামটা টিপে! ব্যস! আর দেখতে। পলক পড়তে-না-পড়তেই ঘুরঘুট্টি অন্ধকার।

‘বাপ রে!’ রামু আর্তনাদ করে উঠেছে। মেরেছে ছুট। ঘরের দরজা খুলে একেবারে হাওয়া।

রামুকে পালাতে দেখে, রামুর বাবুও ‘রামু দাঁড়া, রামু বাঁচা,’ বলে চিৎকার শুরু করে দিলে। চিৎকার করে অন্ধকার ঘরে ঠোক্কর খেতে-খেতে এদিক-ওদিক হাতড়াতে লাগল। শেষে বাইরের দরজাটা হাতে ঠেকতেই দরজা ঠেলে মারলে দৌড়! বাপ রে, বাপ! এই বুঝি লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ে! তাই না-দেখে আক্কুশের কী হাসি আর কী হাসি!

যাক, এখন আক্কুশ বাঁচল। ঘর ফাঁকা। এখন ইচ্ছে করলে, আক্কুশ বাড়ির বাবুটির মতো বুকে বই নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়তে পারে। হ্যাঁ, আক্কুশ সত্যিই তাই করল। আলমারির কাছে গিয়ে, কাচের পাল্লা টেনে একটা বেশ মোটাসোটা বই সে বার করল। বিছানায় এসে বসল। বালিশে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে পড়ল। আঃ! কী আরাম! ঠ্যাং-এর ওপর ঠ্যাং ঠেকিয়ে বই খুলে দেখতে লাগল! ভূত নয়তো, যেন বিদ্যেদিগগজ! কত ছবি দ্যাখো বইটার পাতায় পাতায়। অন্ধকারেও ঝলসে উঠছে ছবির রং। আচ্ছা, এই বইটা বুদ্ধুর জন্যে নিয়ে গেলে তো বেশ হয়! এই দ্যাখো কী কান্ড! কোথায় মা আর ছেলের জন্যে খাবার খুঁজে নিয়ে যাবে, তা নয়, ঠ্যাং-এর ওপর ঠ্যাং দিয়ে সে বইয়ের ছবি দেখছে! ছি:! ছি:!

বই-টই ফেলে তড়াং করে উঠে পড়ল আক্কুশ। উঠেই আবার খাবার খুঁজতে শুরু করে দিলে।

কিন্তু এ তো আচ্ছা ঝামেলা। দেখেছ, সেই টিকটিক শব্দটা কিন্তু একনাগাড়ে বেজেই চলেছে। আক্কুশ যে একটু নির্ঝঞ্ঝাটে খাবার খুঁজবে, তার জো নেই। যেদিকেই হাঁটছে, সেদিকেই টিকটিক। সামনে যাও টিকটিক। পেছন ফেরো টিকটিক। কান একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেল। আচ্ছা দাঁড়া, তোর টিকটিক করা বার করছি!

হ্যাঁ, সত্যিই, আক্কুশ খাবার খোঁজা ছেড়ে কান খাড়া করে শোনবার চেষ্টা করল, শব্দটা আসছে কোনদিক থেকে। মনে হচ্ছে, শব্দটা যেন টেবিলের আশপাশ থেকেই ভেসে আসছে। এক-পা, এক-পা করে টেবিলের দিকেই এগিয়ে গেল আক্কুশ। আরি ব্বাস! দ্যাখো, টেবিলের ওপর কী সুন্দর একটা ঘড়ি। ঘড়ির মাথার ওপর আবার একটা পুতুল-মোরগ। ঘড়িটা টিকটিক করছে আর মোরগটা তালে-তালে একবার ডাইনে হেলছে, একবার বাঁয়ে ফিরছে। দেখে এত ভালো লেগে গেল আক্কুশের। ধাঁ করে সেটা তুলে নিল টেবিল থেকে। এই ঘড়িটা ছেলেটার জন্যে নিয়ে গেলে তো মন্দ হয় না! যা সবার মনে হয়, আক্কুশেরও তাই হল। মনে হল, ঘড়ির ভেতরে কী আছে দেখলে তো হয়! দেখলে তো হয়, মোরগটা ঘুরে-ঘুরে অমন নাচছে কেমন করে। যেই মনে হওয়া, অমনি তার কলকবজাগুলো টানা-হ্যাঁচড়া করতে শুরু করে দিলে। এই দ্যাখো, ভূতের হাতে ঘড়ির কম্ম বুঝি শেষ হয়ে গেল! ওমা! না, না! ঘড়িটা যে আচমকা বেজে উঠল, ক্রি-ই-ই-ইং! ক্রি-ই-ই-ইং! আক্কুশ তো চমকে লাফিয়ে উঠেছে। ভয়েময়ে ঘড়িটা সে ছুড়ে ফেলে দিতেই যাচ্ছিল। কিন্তু এ কী! বাজতে-বাজতে ঘণ্টাটা হঠাৎ থেমে গেল কেন? আরে! এ তো বেড়ে মজার ব্যাপার! সত্যি, এই ঘড়িটা বুদ্ধুর জন্যে নিয়ে গেলে যা হবে না! দারুণ! একেবারে তাক লেগে যাবে। এবার খাবার পেলেই হয়। আক্কুশ এখন ঠিক বুঝতে পেরেছে, এ-ঘরে খাবারের নাম-গন্ধ নেই, তাকে অন্য কোথাও ঢুঁ মারতে হবে। এত বড়ো বাড়ির, সে যায় কোনদিকে বলো তো! দেখতে পাচ্ছ, রামু আর রামুর বাবু দরজাটা হাট করে খুলে রেখে পালিয়েছে? হ্যাঁ, আক্কুশ ঘড়িটা বাগিয়ে নিয়ে, ওই দরজা দিয়েই বেরিয়ে পড়ল। বাব্বা! বাইরে যে দেখি একটা লম্বা-চওড়া দরদালান! মধ্যিখানে মস্ত একটা টেবিল। কাপ-ডিশ। কাচের গেলাস। খাবারের প্লেট। আর কি সন্দেহ থাকে? আক্কুশ ঠিক বুঝতে পেরেছে, এটাই খাবার ঘর। অমনি সঙ্গে সঙ্গে সে কাপ-ডিশ-প্লেট ঘেঁটেঘুঁটে, উলটে-পালটে খাবার খুঁজতে লাগল।

‘আঁ!’ হঠাৎ আনন্দে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল আক্কুশ। রক্ষে, কোনোরকমে সামলেছে! চিৎকারের তো কোনো দোষ নেই! সামনে কী ওটা? তাকের ওপর? নির্ঘাত একটা রসগোল্লার হাঁড়ি। আক্কুশ সাঁ-আ-আ করে হাত বাড়িয়ে হাঁড়িটাকে খামচে ধরল। আর বলার দরকার নেই। হাঁড়ির গতর দেখে যদি মনে হয়, একশোটা গোল্লা রসে হাবুডুবু খাচ্ছে, তবে হলপ করে বলতে পারি, মনে হওয়াটা একটুও ভুল নয়। হাঁড়িতে টান দিল আক্কুশ। অমনি ঠাঁই-ঠন, ঝন-ঝন-ঝন! পড়েছে, আক্কুশের হাত লেগে বেটক্কা তাক থেকে বাসন ছিটকে মেঝেয় পড়েছে! আচ্ছা, আক্কুশ ভূত, না কানা! দেখতে পাস না হাতের গোড়ায় বাসনের গাদা!

‘চোর, চোর, চোর।’

ওই শোনো বাইরে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেছে। আক্কুশ তো আর জানে না, বাড়ির বাবু আর রামু ঘর থেকে পালিয়ে পাড়ার লোক ডেকে এনেছে। এতক্ষণ তো পাড়ার লোক চোর ধরার জন্যে বাড়ির আনাচে-কানাচে ওত পেতে বসেছিল। যেই-না বাসন পড়ার শব্দ শোনা, অমনি চিৎকার, ‘চোর, চোর।’ অমনি ছোটাছুটি, ‘চোর, চোর।’

অত লোকের হঠাৎ অমন হল্লা শুনে আক্কুশের তো চক্ষু কপালে। এক হাতে তার ঘড়ি আর অন্য হাতে হাঁড়ি। ঘর থেকে বেরিয়ে পালাতে গেলেই ধরা পড়বে! সুতরাং আক্কুশ এখন না পারে এগোতে, না পিছোতে।

কিন্তু এদিকে যে হল্লা ঘরে ঢুকে পড়ে। গেল বুকি কেঁচে আক্কুশের সব মতলব। বুঝি ওই হাঁড়ির মায়া না ছাড়লে তার রেহাই নেই। হায়! হায়! এত মেহনত করে, রসগোল্লার হাঁড়ি যোগাড় করে শেষে বুঝি সেই হাঁড়ি হাতছাড়া হয়! না, আক্কুশকে ওই অতগুলো লোকের কাছে হারলে চলবে না। পুলিশকে ভড়কি দিয়ে বুদ্ধুকে যে বাঁচাতে পারে, সে কখনো হার মানে! লোকের চিৎকারে ভূতের হাত-পা কাঁপলে চলে? তাই সে রসগোল্লার হাঁড়িটা ঝট করে টেবিলের নীচে লুকিয়ে ফেললে। ফেলেই চটপট একটা শেলফের আড়ালে নিজে লুকিয়ে পড়ল। যা:! তাড়াহুড়োতে ঘড়িটা লুকোবার ফুরসতই পেল না।

ততক্ষণে যা হবার তাই হয়েছে। লাঠিসোটা নিয়ে পাড়ার লোক একেবারে হৈ-হৈ করে ঢুকে পড়েছে সেখানে। ঢুকে পট-পট করে সুইচ টিপে আলো জ্বেলে ফেললে। আলোয় দ্যাখে, বাসনপত্তর ভেঙে ছড়িয়ে একাক্কার। কিন্তু চোর নামক চিজটিকে হন্যে হয়ে খুঁজেও তার টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পেল না তারা। দেখতে না-পেয়ে, সেই ঘর থেকে আর এক ঘরে যাবার জন্যে যেই পা বাড়িয়েছে, ব্যস! আক্কুশের হাতে আবার সেই ঘড়িটা বেজে উঠেছে, ক্রি-ই-ই-ইং! লোকগুলো থতমত খেয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে পড়েছে থমকে! তাই তো, ঘড়ি বাজে কোথায়! আক্কুশ তো বুঝতে পেরেছে, আর রক্ষে নেই! তাই চোখের পলকে ঘড়িটা শেলফের মাথায় রেখে চুপটি করে দাঁড়িয়ে রইল। আক্কুশকে দেখতে না-পেলেও ঘড়িটা তো কারো নজর এড়াল না! তাই তো! হঠাৎ ঘড়িটা এখানে এল কোত্থেকে! নিশ্চয়ই চোর এই ঘড়িটা হাতিয়ে এখানে লুকিয়ে ছিল। তাহলে তো বাছাধন বাড়ির ভেতরেই কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে। শুরু হয়ে গেল তুলকালাম কান্ড। টেবিল, চেয়ার, শেলফ সব উলটে-পালটে তছনছ করেও যখন চোরের পাত্তা মিলল না, তখন সবাই আবার ছুটল অন্য ঘরে! যেই-না তারা বেরিয়ে গেল, আক্কুশ দেখল, এই সুযোগ। ঘড়িটা আবার শেলফের মাথা থেকে নিয়ে, রসগোল্লার হাঁড়িটা টেবিলের নীচ থেকে বার করে, মার ছুট। ব্যস! বিপদের ওপর আবার বিপদ। ঘড়িটা আবার বেজে উঠেছে, ক্রি-ই-ই-ইং!

ঘড়ির শব্দ শুনে লোকগুলো যেই আবার সেইদিকে ছুটে এসেছে, আক্কুশের আক্কেল-গুড়ুম। সে ছুটছে, ঘড়িটাও বাজতে-বাজতে ছুটছে। লোকগুলোর তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া! এ কী আজগুবি কান্ড রে বাবা! কেউ কোত্থাও নেই, একটা ঘড়ি হাওয়াতে উড়ছে, ঘণ্টা বাজছে। একটা হাঁড়ি শূন্যে ভাসছে, দুলে উঠছে! অমনি সবাই সেই দিকে ছুটল। আক্কুশ টেনেমেনে মারল লাফ। সামনে সিঁড়ি। লম্বা-লম্বা ঠ্যাং টপকে সটান বাগানে। তখন আর আক্কুশকে পায় কে? বাগানের ভেতর দিয়ে, হাঁড়িটা মাথায় নিয়ে, আর ঘড়িটা মুঠোয় পাকড়ে, ফটক ডিঙুল, রাস্তায় নামল। তারপর হুস-স-স! একদম চোখের আড়ালে হারিয়ে গেল।

এখন দ্যাখো, লোকগুলোর হুল্লোড়বাজি শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু চোর যদি নিজেই ভূত হয়, তাকে ধরবে কে? সুতরাং তোমরা এখন দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে আঙুল চোষো আর মনে-মনে ভাবো, এ কোনদেশি হাঁড়ি! শূন্যে ভেসে উড়ে যায়! হাঁড়ির ভেতর ভূত নেই তো!

বুদ্ধুদের বাড়ির পাশে সেই যে তেঁতুলগাছটা, আক্কুশ তো সেটা চিনেই রেখেছিল। সুতরাং বুদ্ধুদের বাড়িটা খুঁজে বার করতে তার কষ্টই হল না। হাঁড়িটা মাথায় নিয়ে বাড়ির ভাঙা জানলার ভেতর দিয়ে আক্কুশ উঁকি মারল। হ্যাঁ, মা আর ছেলে এখন দু-জনেই ঘুমুচ্ছে। অন্ধকার এখনও যদিও আছে, তবে রাত কেটে আসছে। রাত কাটলে তখন তো আর লুকিয়ে-ছাপিয়ে কিছু করা যাবে না। তাই আক্কুশ তক্ষুনি ভাঙা দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়ল। হাঁড়িটা এককোণে রেখে, কলাই-চটা একটা বাটি চাপা দিয়ে হাঁড়ির মুখটা ঢেকে দিলে। কে না জানে পিঁপড়েপোকা রসগোল্লার গন্ধ পেলে এক্ষুনি সব লাইন দিতে শুরু করবে। তা ছাড়া ঘরটারও যা ছিরি! ঝাড়পোঁছ না করলে যা হয়! কে করবে? বুদ্ধুর অন্ধ মা? আহা রে! পারে কখনোও!

কা-কা। কাক ডাকছে। মানে ভোর হচ্ছে। চটপট ঘড়িটা ঘরের একটা কুলুঙ্গিতে রেখে দিল আক্কুশ। সে তো হল! কিন্তু এখন কোথায় যাবে আক্কুশ? কোথাও যাবার দরকার কী? সে তো এই ঘরেই থাকতে পারে! কেউ তো আর দেখতে পাচ্ছে না তাকে!

তা ঠিক। সে ঘরেই থাকবে। অনেক কষ্ট করে একহাঁড়ি রসগোল্লা যোগাড় করা গেছে। মা ও ছেলে খাবে। অন্তত ওদের ঘুম না-ভাঙা পর্যন্ত এই ঘরেই আক্কুশের থাকা দরকার। চোর-ছ্যাঁচোড়ের তো আর অভাব নেই দুনিয়ায়। একবার রসের গন্ধ নাকে গেলেই হল! তখন আর দেখতে হবে না। কম্ম শেষ!

টি-ই, টি-টি। টি-ই, টি-টি। গাছে পাখি ডাকছে। ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। আঃ! কী সুন্দর লাগে। এইসময় আকাশটা দেখলেই মনে হয়, যেন ঝাঁকে-ঝাঁকে আলোর ফোঁটা নেমে আসছে ঝুরঝুর করে। ভোরের আলো মানেই তো যেন একঝাঁক খুশি।

অবিশ্যি আক্কুশের ওসব ভোর-টোর নিয়ে খুশি হবার মতো কিছু নেই। আক্কুশের যত মজা সেই অন্ধকার রাত্তিরে। নিস্তব্ধ থমথমে ফেউ-ডাকা রাত্তিরে ঘুরঘুর করতে কী মজা। চাইকি, বুক-ঢিপঢিপ আঁধার রাতে ফিসফাস করে গান গাইতে কী দারুণ লাগে! সেই ধু-ধু মাঠ। মধ্যিখানে একটা গাছ, একা দাঁড়িয়ে। বাতাসের শিরশির শব্দ। শুকনো পাতার খসখসানি। আঃ! সেইসময় গাছের ডালে ঠ্যাং দুলিয়ে গান গাইলে যা জমে ওঠে না!

কিন্তু এখন তো আর ওসব গানটান শোনার সময় নেই আক্কুশের। ভোর গড়িয়ে রোদ ছড়িয়ে পড়ল। অথচ দ্যাখো, মা আর ছেলের তবুও ঘুম ভাঙে না! কাল থেকে পেটে কিছু পড়েনি দু-জনের। তবুও ঘুমের শেষ নেই। আচ্ছা ঘুমকাতুরে তো! ওঠো না! চোখ মেলে দ্যাখো, আক্কুশ তোমাদের জন্যে একহাঁড়ি রসগোল্লা এনেছে। তাড়াতাড়ি হাঁড়িটা সাবাড় করে আক্কুশকে রেহাই দাও দিকিনি!

হুঁ:! রেহাই দেবে! তাহলেই হয়েছে! দেখছ না, মনে হচ্ছে, এইমাত্তর চোখে ঘুম নেমেছে।

এই দ্যাখো, ও কী করছে আক্কুশ? ওর হাতে যেন একটা কাঠি। কোত্থেকে বার করল? আরে! আরে! কাঠিটা নিয়ে সে যেন বুদ্ধুর কাছে এগিয়ে যাচ্ছে! এই সব্বনাশ! কাঠিটা নিয়ে বুদ্ধুর নাকের ডগায় সুড়সুড়ি দিচ্ছে যে! উফ! কী তেঁয়েটে ভূত দেখেছ?

হ্যাঁ, যা ভেবেছি ঠিক তাই। বুদ্ধুর ঘুম তো ভাঙলই, সঙ্গেসঙ্গে এমন একখানা হাঁচি দিল যে, বুদ্ধুর মায়েরও ঘুম-টুম সব কোথায় পালাল। বুদ্ধুর মা ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে! আক্কুশ তো সঙ্গেসঙ্গে কাঠিটা ফেলে দিয়ে ঘরের কোণে লুকিয়ে পড়েছে! মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলে, ‘কী হল রে বুদ্ধু?’

বুদ্ধু বলল, ‘হাঁচি পেল মা।’

‘কেন, ঠাণ্ডা লেগেছে?’

‘না মা। মনে হল কে আমার নাকে কাঠি দিয়ে সুড়সুড়ি দিল।’

মা জিজ্ঞেস করলে, ‘স্বপ্ন দেখিসনি তো বাবা?’

বুদ্ধু অবাক সুরে বলল, ‘কই, না তো!’

‘তবে নে, শুয়ে পড়।’

বুদ্ধু বললে, ‘না মা। আর শোব না। রোদ উঠে গেছে। কাজে যাবার সময় হল। তুমি কাল থেকে খাওনি। তোমার জন্যে খাবার আনি।’

মা উত্তর দিল, ‘তুইও তো উপোস করে আছিস বাবা।’

বুদ্ধু কিছু বলবে কী! মুখে তার কথা নেই। হঠাৎ সেই রসগোল্লার হাঁড়িটা দেখে সে থ হয়ে গেছে।

মা জিজ্ঞেস করল, ‘কথা বলছিস না, বেরিয়ে গেলি বুদ্ধু ?’

বুদ্ধু বলল, ‘না মা। ঘরে একটা হাঁড়ি!’

‘হাঁড়ি?’ অবাক হল মা।

‘হ্যাঁ মা, হাঁড়ির মুখে কলাই-এর বাটি ঢাকা।’

মা ব্যস্ত গলায় বলল, ‘দ্যাখ তো, দ্যাখ তো বাবা, হাঁড়ির ভেতর কী আছে!’

মাকে আর বলতে হল না। তার আগেই বুদ্ধু হাঁড়ির ঢাকা খুলে ফেলেছে। আক্কুশ চক্ষু দু-টি তার একেবারে ছানাবড়ার মতো গোল্লা পাকিয়ে দেখছে! আর মুরুব্বির মতো দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে ঘাড় নাড়াচ্ছে। যেন বলতে চাইছে, হুঁ হুঁ বাবা, আমার নাম আঙ্কুশ। আর আমার এই ভেলকির নাম রসগোল্লা।

‘এ কী মা!’ বুদ্ধু যেন সত্যিই বুদ্ধুর মতো আঁতকে উঠল।

মা জিজ্ঞেস করলে, ‘কী হল রে?’

‘এ যে রস-ভরতি হাঁড়ি!’

মা অবাক হয়ে বলল, ‘সে কী রে? শুধু রস?’

এবার বুদ্ধু হেসে ফেলল। হাসতে-হাসতে বলল, ‘এ তো দেখছি আচ্ছা ভুতুড়ে কান্ড! রসগোল্লাগুলো সব সাঁটিয়ে শুধু একহাঁড়ি রস রেখে গেছে আমাদের ঘরে। আর জায়গা ছিল না! কে এমন বেআক্কেলে?’

ওই দ্যাখো আক্কুশের মুখখানা! হাঁদার মতো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে হাঁড়িটার দিকে। কেমন দেখতে লাগছে! যেন ভ্যাবাচাকা হাম্বা। ছি:! ছি:! হাঁড়ি মানেই যে রসগোল্লার হাঁড়ি নয়, এটা তোর মাথায় ঢুকল না। ভূতের মাথা কাকে বলে! নাও, এখন বোঝো! যেমন অন্ধের মতো করতে যাওয়া! চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলি কেন? নে, মুরুব্বির মতো এবার ঘাড় নাড়া! ছি:! ভূতের মুখে চুনকালি!

বুদ্ধু আর দেরি করল না। হাঁড়িটা ঘরের বাইরে ফেলে দিল। মাটির হাঁড়ি, ও আর কী হবে! তারপর মুখ-হাত-পা ধুয়ে মুছে, ছেঁড়া জামাটা গায়ে চড়িয়ে মাকে বললে, ‘মা, আসছি।’

মা বললে, ‘তাড়াতাড়ি আসিস বাবা!’

‘হ্যাঁ মা, তাড়াতাড়িই আসব।’ বেরিয়ে গেল বুদ্ধু, আর তার দিকে বোকারামের মতো চেয়ে রইল আক্কুশ।

ইশ! কী লজ্জা বলো! রাগে, অপমানে আক্কুশের ভেতরটা ফুঁসে উঠছে। যে-বাড়িতে রসগোল্লার বদলে হাঁড়িতে রস ভরতি থাকে, সে-বাড়ি হোক না লম্বা-চওড়া, একদম ফালতু! ঠিক আছে, ওর নাম আক্কুশ। খাবার যদি সে যোগাড় করতে না পারে, তবে এ-মুখো আর সে কোনোদিন হবে না। ছি:! ছি:! শেষে কিনা হাঁড়ি-ভরতি রস! শুধুই রস!

আক্কুশ আর দাঁড়াল না সেখানে। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল। তখন রোদও উঠে গেছে; বেলাও বেড়ে চলেছে। রাস্তাঘাটে লোকজন, গাড়িঘোড়ার আনাগোনাও শুরু হয়ে গেছে। সুতরাং আক্কুশও হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে হাঁটছে আর অবাক চোখে দেখছে!

হঠাৎ আক্কুশ থামল কেন? কী দেখছে বলো তো কটমট করে?

আরিব্বাস একটা মিষ্টির দোকান!

হ্যাঁ তো রে! চেয়ে দ্যাখো, গামলা-ভর্তি কত রসগোল্লা! ওই দ্যাখো পানতুয়া, কালোজাম, দরবেশ। উফ! কত রসোমালাই! গামলার ভেতর হাবুডুবু খাচ্ছে! আর কি থাকতে পারে আক্কুশ! ভূতের আনন্দ হলে যা হয়! নড়া-ঠ্যাং ছরকুট্টে লাফিয়ে চিৎকার করে উঠল! সব্বনাশ! এই বুঝি কেউ শুনে ফেলল। না, শুনবে কী! শহুরে হট্টগোলে কে তার চিৎকার শোনার জন্যে কান পেতে আছে! আঃ! আক্কুশের চোখের সামনে এখন মুঠো-মুঠো খাবার। না, আক্কুশ আর অপেক্ষা করতে পারল না। ছুট্টে ঢুকে গেল দোকানের ভেতর। খাবার চুরির ধান্ধায় মিষ্টির দোকানে ভূত ঢুকেছে, এটা কেউ টেরও পেল না! ভূত হওয়ার কী মজা বলো?

তুমি বলতে পার মজা, কিন্তু ঝঞ্ঝাটও তো হাজারটা! চোখের সামনে খাবার, আক্কুশ নিক না একটা! নিলেই ভাবছ, পার পেয়ে যাবে? আরে বাবা একঘর লোক। ফাঁকি দেবে কাকে? এক যদি তুমি ছোঁ মেরেই ভোঁ-কাট হও! কিন্তু তাতেও কি কম বিপদ! এ তো আর গ্রামগঞ্জের মাঠঘাট নয় যে, চোঁ চোঁ দৌড় মারবে, আর বনবাদাড়ে লুকিয়ে পড়বে। এ বাবা শহর। তুমি খাবার নিয়ে পালালে, আর সে-খাবার যদি হাওয়ায় ছোটে, তখন কী ভাবছ, তোমায় ছেড়ে দেবে কেউ? এমন তাড়া লাগাবে যে, একটুকরো সন্দেশ তোমায় ঘরে নিয়ে যেতে হবে না। তখন সব গুবলেট!

দ্যাখো দিকিনি দুর্ভোগ কাকে বলে! এত কষ্ট করে যদিও-বা দোকানের দেখা মিলল, কিছুই করার উপায় রইল না! তবে কি আবার সেই নিশি-রাতের জন্যে বসে থাকতে হবে!

‘কাঁচাগোল্লা আছে?’ একজন ভদ্রলোক খাবার কিনতে এসেছেন।

আক্কুশ চমকে উঠেছে।

‘হ্যাঁ, আছে। ক-টা দেব?’ দোকানদার জিজ্ঞেস করলেন।

‘দশ টাকার।’ ভদ্রলোক উত্তর দিলেন।

আক্কুশ রসগোল্লা অনেক দেখেছে। কিন্তু কাঁচাগোল্লার কখনো নাম শোনেনি। তাই অবাক-চোখে দোকনদারের হাতের দিকে চেয়ে-চেয়ে দেখতে লাগল। দেখল, দোকানদার একটা কাগজের বাক্স বার করে গুনে-গুনে দশটা কাঁচাগোল্লা তার ভেতরে সাজিয়ে ভদ্রলোককে দিলেন। আক্কুশ স্পষ্ট দেখল, মিষ্টিগুলো যেন গোল-গোল সন্দেশ। আক্কুশ আরও দেখল, ভদ্রলোকের হাতে বাজারের থলি। বোধহয় বাজার করে ফিরছেন। সন্দেশের বাক্সটা থলির মধ্যে রেখে, দাম শোধ করে তিনি হাঁটা দিলেন।

ব্যস! অমনি সঙ্গেসঙ্গে আক্কুশের মাথায় দুষ্টু বুদ্ধিটা চাগাড় দিয়ে উঠেছে। আক্কুশ ভাবল, মার দিয়া কেল্লা। ভদ্রলোকের পেছনে-পেছনে আক্কুশও হাঁটতে শুরু করে দিলে। আবার কী মতলব এঁটেছে আক্কুশ?

কেন, কী মতলব এঁটেছে সে কি তুমি জান না? দেখছ না, থলির ভেতর থেকে বাক্সটি কেমন উঁকি মেরে ভদ্রলোকের হাতে দোল খেতে-খেতে চলেছে? একবার ফাঁক পেলেই যে বাক্সটি আক্কুশ হাপিস করার তালে আছে, সে-কথা আবার নতুন করে বলতে হবে নাকি কাউকে? কিন্তু যেখানে এত লোকজন গিজগিজ করছে, সেখানে আক্কুশ ফাঁক পাবে কোথায়? সুতরাং আক্কুশের মতলব যে মাঠে মারা যাবে, সে আমরা সবাই জানি।

ও কী! ও কী! হাত বাড়াচ্ছে যে আক্কুশ! হ্যাঁ, সত্যিই হাত বাড়িয়ে থলির ভেতর থেকে মিষ্টির বাক্সটা ফট করে তুলে নিল। আরে! আরে! করছেটা কী! এই বুঝি লোকটা টের পেয়ে গেল!

আরে বাবা ওর নাম ভূত। টের কে পাবে? থলির ভেতর থেকে বাক্সটা ছোঁ মেরেই, তিড়িং করে পাশের বাড়ির পাঁচিলের ওপর উঠে পড়ল। বলব কী, কারো নজরেই পড়ল না। হা-হা-হা! কী হাসিই না পাচ্ছে। থলি হাতে বাবুটি জানতেই পারলেন না কিছু। কেমন নিশ্চিন্ত মনে তিনি চলেছেন। বাড়িতে গিয়ে তিনি যখন দেখবেন, বাক্স হাওয়া, তখন ব্যাপারটা যে কোথায় গড়াবে কে জানে বাবা!

এবার আর কেউ বলতে পারবে না, আক্কুশ ঠকেছে। মানে, রসগোল্লার বদলে শুধু হাঁড়ি-ভরতি রস জুটেছে তার কপালে! নিজের চোখে সে দোকানদারকে বাক্সের মধ্যে কাঁচাগোল্লা ভরতে দেখেছে। আর এটা যে সেই বাক্সটাই, এতে কোনোই ভুল নেই। তবু হাতে পাঁজি মঙ্গলবার। মনে খটকা থাকে কেন? খুলে একবার দেখে নেওয়াই ভালো। সঙ্গেসঙ্গে আক্কুশ সত্যিই বাক্সটা খুলে ফেললে। আরি ব্বাস! একেবারে ঠাসা-ঠাসা মিষ্টি।

ফুড়ুত। একটা কাক উড়ে এসেছে।

কা-কা-কা।

আক্কুশ চমকে উঠেছে। কাকটা ঝাঁপিয়ে পড়ল বাক্সটার ওপর। মারল ছোঁ। পালাল একটা গোল্লা ঠোঁটে নিয়ে। যা:! খানিকটা কাকের ঠোঁটে রইল; খানিকটা মাটিতে পড়ল। দেখতে-দেখতে আরও কত কাক জুটে গেছে দ্যাখো! একদম সঙ্গেসঙ্গে আক্কুশ বাক্সের ঢাকনাটা বন্ধ করে দিয়েছে। দিয়েই সেই পাঁচিলের ওপর থেকে হেঁট হয়ে ঢেলা তুলে কাকের দিকে ছুড়ে মারে। ভড়কে-ভড়কে কাকগুলো উড়ে-উড়ে পালায় আর অবাক হয়ে তাকায়! ভাবে, কাছেপিঠে কেউ নেই অথচ ঢেলা পড়ে কোত্থেকে! আর পারে না বাক্সটার কাছে উড়ে যেতে। এদিক, ওদিক, দূরে, কাছে, ছাতে, চাতালে বসে-বসে ক্যাকাতে লাগল। কানে বুঝি তালা লাগে। এদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার।

ঠিক সেই সময়, মাথায় ঝাঁকা-ভর্তি বাসনকোসন নিয়ে একটা লোক হেঁকে চলেছে, ‘বাসন নেবে, থালা-বাটি নেবে!’ আক্কুশ যেন হাতে চাঁদ পেল। করল কী, বাক্সটা ঝট করে বাসনওলার ঝাঁকার মাথায় ফেলে দিল। ব্যস! নিশ্চিন্ত! বাসনওলা বুঝতেই পারল না, তার মাথায় চেপে একবাক্স কাঁচাগোল্লা তার সঙ্গে পাড়ি জমিয়েছে। অবিশ্যি নি:সাড়ে আক্কুশও তার পিছু নিয়েছে। তার ধান্দা, লোকটা যেই বুদ্ধুদের বাড়ির কাছে সেই তেঁতুলগাছটার নীচ দিয়ে যাবে, আক্কুশ তখন খপ করে বাক্সটা নিয়ে, ঝপ করে বুদ্ধুদের ঘরে ঢুকে পড়বে।

কিন্তু দ্যাখো, কাকগুলো তো নাছোড়বান্দা। বাক্সটাকে তাক করে কাকগুলোও যে বাসনওলার মাথার ওপর ‘কা, কা’ করে উড়নবাজি লাগিয়ে দিলে। কিন্তু কতক্ষণ আর! খানিক যেতেই কাকগুলো সব রণে ভঙ্গ দিয়ে সরে পড়ল। যাই বল, কাক হোক, চাই বাঘ হোক বেপাড়ায় গিয়ে ওস্তাদি করার মুরোদ কত জানা আছে!

‘থালা-বাসন-বাটি চাই।’ বাসনওলা হাঁক পেড়ে-পেড়ে হাঁটছে। আক্কুশও তেরছা চোখে দেখছে।

‘ও বাসনওলা!’ হঠাৎ যেন কে ডাকল।

সামনের বাড়ির জানলা দিয়ে গিন্নি ডাকল।

বাসনওলা দাঁড়াল। আক্কুশের তো পেটের মধ্যে হাত-পা সেঁধিয়ে গেছে। কারণ, ঝাঁকা নামালেই তো মিষ্টির বাক্সটি নজরে পড়ে যাবে! তখন? বাক্স বেহাত! আর কিছু করার নেই। আর কিছু করা মানেই তো বাক্সটা নিয়ে কেটে পড়া। সেটি করতে গেলেই ভূতের জারিজুরি সব ফাঁস!

ওই জানলা থেকেই গিন্নি-মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ও বাসনওলা, তোমার কাছে স্টিলের বাটি আছে।’

‘হ্যাঁ মা, আছে।’

‘দাঁড়াও, আমি যাচ্ছি।’

বলার আগেই বাসনওলা তার মাথার মোট নামিয়ে ফেলেছে। নামাতেই মিষ্টির বাক্সটি দেখে ফেলেছে বাসনওলা। তাই তো বাক্স এল কোত্থেকে? গিন্নি আসার আগেই বাক্সটি খুলে ফেলেছে। চক্ষু ছানাবড়া! বাব্বা! এ যে দেখি, একবাক্স কাঁচাগোল্লা! আক্কুশের তো শুকনো বুক আরও শুকিয়ে গেল।

বেশি ভাববার সময় পেল না বাসনওলা। কেননা, বাড়ির গিন্নি বেরিয়ে এসেছেন। বাসনওলাও চটপট বাক্স এঁটে বাসন নিয়ে দরাদরি শুরু করে দিলে। তারপর গিন্নিমা-কে স্টিলের বাটি বেচে, আবার মাথায় মোট তুলে, হনহন করে হাঁটতে শুরু করে দিলে বাসনওলা।

আক্কুশও পিছু নিলে। হাঁটতে-হাঁটতে আক্কুশ ভাবতে লাগল, ‘এবার?’

এ কী কান্ড! লোকটা যে হাঁটতে হাঁটতে বুদ্ধুদের বাড়ির সামনেই এল! আশ্চর্য, সেই তেঁতুলগাছটার নীচে এসেই দাঁড়াল। মাথার থেকে মোট নামিয়ে গাছের ছায়ায় বসল! মিষ্টির বাক্সটি হাতে নিল। খুলে ফেলল। একটা গোটা কাঁচাগোল্লা গালে পুরল। উফ! আক্কুশের বুকের পাঁজরগুলো যেন মোচড় দিচ্ছে!

এ কী করছে! এ কী করছে! লোকটা যে আর একটা গোল্লা গালে দিচ্ছে! কেমন গপগপ করে গিলছে? যেন সাক্ষাৎ একটি রাক্ষস! রাগে আক্কুশের হাত-পাগুলো ঠকঠক করে কাঁপছে! শেষে কি পুরো বাক্সটাই গিলে খাবে! যতই চিবুচ্ছে, ততই মুখখানি কেমন ঝকঝক করে উঠছে বাসনওলার! আদিখ্যেতা দেখে বাঁচিনে! এবার আর একটা গালে দাও! এমন ঠেলা বুঝবে তখন যে, সাতজন্মে মিষ্টির নাম করতে হবে না। তোমার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে, একটি ভূত, আক্কুশ!

কিন্তু না। বাসনওলা আর তো গালে পুরল না। দু-টি খেয়েই আবার বাক্সটা বন্ধ করে রাখল। বন্ধ করে, বাসনের ফাঁকে পাচার করে দিলে, তারপর বাসনের ঝাঁকাটা ওইখানেই রেখে দু-পা এগিয়ে গেল। একটা জলের কল। ঢক-ঢক করে জল খেতে লাগল।

আক্কুশ দেখল এই সুযোগ। যদি কিছু করতে হয় এখনই। ঠিক এইসময় এদিকে লোকজনও চলাফেরা করছে না। পলকে আক্কুশ সন্দেশের বাক্সটা হাতিয়ে, ঝটপট তেঁতুলগাছটায় উঠে পড়ল।

ততক্ষণে বাসনওলাও একপেট জল খেয়ে, হাউহাউ করে ঢেঁকুর তুলে নিজের মোটের কাছে হাজির। কাঁধের গামছাটা মাথায় জড়িয়ে, মোট তুলে, হাঁকতে-হাঁকতে আবার হাঁটল, ‘বাসন নেবে, থালা-বাটি নেবে!’

আক্কুশ তো হেসে মরে আর কী! কেমন ঠকেছে লোকটা। বাসনওলা চোখের আড়ালে চলে যেতে আক্কুশও গাছ থেকে মারল লাফ। ছুট্টে বুদ্ধুদের ঘরে ঢুকে পড়ল। ভাগ্যিস তখনও বুদ্ধু ঘরে আসেনি! ভাঙা দরজায় টুক করে একটু শব্দ উঠতেই, বুদ্ধুর মা থতমত খেয়ে গেছে। ব্যস্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, ‘কে এলি রে? বুদ্ধু এলি?’

আক্কুশ কী বলবে, কী করবে কিছুই বুঝতে না পেরে কাঁচাগোল্লার বাক্সটি হাতে নিয়ে হাঁদার মতো দাঁড়িয়েই রইল।

বুদ্ধুর মা কারো কোনও উত্তর না-পেয়ে অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কথা বলছিস না, কে ঘরে ঢুকেছিস?’

আক্কুশ থাকতে পারল না। মুখ থেকে ফুট করে কথা বেরিয়ে পড়ল তার। বলল, ‘আমি গোঁ আমি।’

‘কে তুই?’ যেন ধমক দিল বুদ্ধুর মা।

‘আমি আঁক্কুশ। আঁমি তোঁমার জঁন্যে কাঁচাগোঁল্লা এঁনেছিঁ গোঁ মা!’

মা বলে ডাকতেই বুদ্ধুর মায়ের গলার স্বর নরম হল। বলল, ‘তোকে তো চিনি না বাবা! তুই বুদ্ধুর বন্ধু?’

‘নাঁ গোঁ মাঁ, বুঁদ্ধুঁর মতোঁ আঁমিও তোঁমাঁর ছেঁলে। তোঁমাঁর কঁষ্ট দেঁখে থাঁকতেঁ নাঁ পেঁরেঁ, তোঁমাঁরঁ কাঁছেঁ ছুঁটে এঁসেছিঁ মা! এঁই নাঁও মা, এঁকটা কাঁচাগোঁল্লা খাঁও।’ বলে আক্কুশ বাক্স থেকে একটা কাঁচাগোল্লা বার করে বুদ্ধুর মায়ের মুখে তুলে দিল।

‘না, না। এখন আমি খাব না বাবা,’ বলে বুদ্ধুর মা যেই না আক্কুশের হাতটা নিজের মুখের কাছ থেকে সরিয়ে দিতে গেছে, ঠক করে হাতে হাত লেগে গেছে। বুদ্ধুর মা থতমত খেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোর হাতে কী হয়েছে বাবা? তোর হাতটা এমন শক্ত কেন?’

‘তুঁমি আঁগেঁ খেঁয়ে নাঁও মাঁ, তাঁরপঁরে আঁমার কঁথাঁ শুঁনো!’

‘কেন বাবা, পরে কেন? তুই কথাও বলছিস খুনিয়ে-খুনিয়ে। কী হয়েছে বল তো?’

‘মাঁগো, আঁমার কিঁচ্ছুঁ হঁয়নি। আঁমার নাঁকঁ নেই মাঁ।’

‘কেন বাছা?’

‘আঁগেঁ এঁইটাঁ মুঁখেঁ দাঁওঁ, তাঁরপঁর বঁলছিঁ।’

‘কেমন করে মুখে দেব বাছা? আমার ছেলে না-খেলে, আমি কেমন করে খাই?’

‘মাঁগোঁ, আঁমি, বাঁক্সঁ ভরতি কঁরেঁ এঁনেছি। বুঁদ্ধুঁ খাঁবেঁ, তুঁমিঁওঁ খাঁবেঁ। আঁমিঁওঁ তোঁমাঁর ছেঁলে মাঁ। আঁমারঁ কঁথাঁ বিঁশ্বাসঁ কঁরোঁ। এঁকটা খাঁওঁ তাঁতেঁই আঁমারঁ তৃঁপ্তি মাঁগোঁ।’

‘আহা রে বাছা, বল বল তুই কে! আমার এত দুঃখেও আমার আপনজনও যে কোনোদিন এমন করে আমার মুখে খাবার তুলে দেয়নি! তুই যে আমার ছেলের চেয়েও বড়ো।’ বলে, আক্কুশের হাত থেকে কাঁচাগোল্লাটা মুখে দিয়ে কেঁদে ফেলল। তারপর চোখ মুছল।

আক্কুশ বলল, ‘তুঁমি কাঁদছঁ কেঁন মাঁ? তুঁমি কেঁদোঁ না, কেঁদো না। তুঁমিঁ কাঁদলে আঁমারঁ যেঁ কঁষ্ট হঁবেঁ মাঁ।’

‘বেশ আমি কাঁদব না। তবে বল, তুই কে?’

‘মাঁগোঁ, আঁমারঁ ঘঁরঁও নেই, দোরঁও নেঁই। আঁর পঁরও নেঁই, আঁপনঁও নেঁই। কেঁউ আঁমায় ভাঁলঁবাঁসে নাঁ মাঁ। সঁবাঁই আঁমাঁকে ভঁয় পাঁয়।’

‘ভয়?’ অবাক হল বুদ্ধুর মা। জিজ্ঞেস করল, ‘ভয় কেন বাবা?’

‘মাঁগোঁ, আঁমি যেঁ ভূঁত!’

‘ভূত!’ বুদ্ধুর মা চমকে উঠল। তারপর গলা ফাটিয়ে চেঁচাতে লাগল, ‘ওগো, তোমরা কে কোথায় আছ, আমায় বাঁচাও, আমার ঘরে ভূত ঢুকেছে!’

আক্কুশ একদম চুপ! চিৎকার শুনে হতবাক। ঠিক সেইসময়ে ছুটতে-ছুটতে বুদ্ধুও ঘরে ঢুকল! মাকে জড়িয়ে ধরে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কই ভূত, মা, কই ভূত?’

আক্কুশ কি আর দাঁড়ায় সেখানে? পালা, পালা, পালা! মিষ্টির বাক্সটা সেই ঘরে রেখে দিয়ে হাওয়ায় মিশে গেল সে। চোখের নিমেষে উড়তে-উড়তে বুদ্ধুদের বাড়ি ছাড়িয়ে, সেই গাড়িঘোড়ার শহর ডিঙিয়ে, হাসিহল্লার হট্টগোল পেরিয়ে সে ছুটল। ছুটতে-ছুটতে পৌঁছে গেল এক নদীর ধারে। নির্জন, নিশ্চুপ চারদিক। নদীর জলে-জলে ঢেউ। তারই ছলাতকার ছড়িয়ে পড়ছে। সে নদীর ধারে বসল। অনেকক্ষণ বসে রইল। ওপারে শুধু গাছ, সবুজ। হাওয়ায় দোল খাচ্ছে। আক্কুশ দেখল, নদীর জলে ঢেউ নাচছে, গাছে গাছে পাতা উড়ছে। দেখল, একটা সবুজ পাতা নদীর জলে উড়ে পড়ল। দুলতে-দুলতে ভাসছে। হঠাৎ দেখল, কোত্থেকে একটা এইটুকুনি ফড়িং উড়তে-উড়তে সেই পাতাটার ওপর বসে পড়েছে। পাতার ওপর বসে-বসে সেও ভাসছে। কী মজা! ওমা! ওই দ্যাখো, আর একটা ফড়িং! ছোট্ট ফড়িংটার বুঝি মা? হবেও-বা। সেও পাতার ওপর বসে পড়েছে। ছেলেকে কোলের কাছে আগলে নিয়ে, সেও দুলছে!

দেখতে-দেখতে আক্কুশ কেঁদে ফেলল। ভাবল, পৃথিবীতে সবার মা আছে, শুধু ভূতের নেই। আক্কুশ যদি কাকেও মা বলে ডাকে, কেউ তাকে ছেলে বলে আদর করবে না! কোনোদিনও না।

তারপর আক্কুশ কাঁদতে-কাঁদতে ওই নদীর ঢেউয়ের মতো কোথায় হারিয়ে গেল। আর দেখা গেল না।

অধ্যায় ১ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%