পল্লবী সেনগুপ্ত
আমি আজ ছাড়া পাব। ছাড়া পাব এই অন্ধকূপ থেকে। এই পাগলা গারদের অন্ধকূপ। সবাই এতদিন ভেবে এসেছে আমি পাগল, মানে একেবারে বদ্ধ উন্মাদ যাকে বলে আর কী। কিন্তু আমি কি সত্যি পাগল? কী মনে হয় আপনাদের? না, আমি একেবারেই পাগল নই। আমি একদম সুস্থ আর স্বাভাবিক। ঠিক আপনাদের মতোই। শুধু কয়েকটা ঘটনার ক্ষেত্রে হয়তো আমার আর আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গির কিছুটা তফাত হয়ে গেছিল তাই আপনাদের আমায় পাগল মনে হল তাই তো? কেন বলুন তো? কেন আপনাদের মনে হয় কেবল একপেশে ভাবেই সর্বদা ভেবে যেতে হবে সবাইকে? সবার জানা বোঝার গতিটা একমুখী কেন হতেই হবে? কেন কেউ আলাদা কিছু দেখতে পারবে না বা বুঝতে পারবে না? একটু অন্যরকম কিছু হলেই সে পাগল?
যাকগে আজ ভালো দিন। আজ আমি ছাড়া পাব । অন্তত এখানকার ডাক্তার আর বোদ্ধাদের মনে হয়েছে যে এবার আমায় ছাড়া যায়, আমার পাগলামির প্রকোপ কমেছে আগের চেয়ে। তাই ছুটি পাব আমি পাগলা গারদ থেকে। আমি আবার খোলা আকাশ দেখতে পাব, টাটকা হাওয়ায় নিশ্বাস নিতে পারব, ফুল, পাখি, দিনের আলো সব কিছু দু-চোখ ভরে দেখতে পাব। উফফ! কত বছর ধরে যে আজকের এই মুহূর্তটার জন্য আমি অপেক্ষা করে গেছি। কয়েকদিন একটু ভালো করে টাটকা হাওয়া উপভোগ করে নিই, তারপর আমি লেগে পড়ব। আমি প্রমাণ করে দেব শেষ অবধি যে মোটেই আমি পাগল নই। কক্ষনো না। একেবারে না। আমি প্রমাণ করব ঠিক, হ্যাঁ করেই ছাড়ব এই বলে রাখলাম।
'মা, মা শিগগির একবার এই ঘরে এস। শুনে যাও মা'।ছোট ছেলের এক রাশ খুশি মাখা চিৎকার ঝপ করে আছড়ে পড়ল কল্যাণী বসুর কানে। আর অমনি নিজের অজান্তেই বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল ওর । অত্রির এই খুশি ঠিক কী কারণে হতে পারে, সেটা যে একেবারে আন্দাজ করতে পারছে না কল্যাণী তা তো নয়, বরঞ্চ যথেষ্ট স্পষ্ট আন্দাজই আছে তার। আর সেই অনুমান আছে বলেই অনাগত অমূর্ত কোনো আতঙ্কের আশঙ্কায় হয়তো এভাবে থর থর করে কাঁপছে বুকের ভেতরটা। কিন্তু তবুও যুক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে নিজের মনকে ক্রমাগত বুঝিয়ে চলেছে ও। মনের সবটুকু ভয় ধুয়ে মুছে সাফ করে দিতে চেষ্টা করে চলেছে আপ্রাণ। সমস্ত উদ্বেগকে সরিয়ে রান্নায় আরও বেশি করে মনটা গাঁথতে চেষ্টা করল কল্যাণী।
'ও মা কোথায় গেলে তুমি? এস একবার ঝটপট'... অত্রির গলার খুশি আর উদ্দীপনা যেন আরও দ্বিগুণ হয়ে উথলে পড়ছে। নিজের মনকে শক্ত করার সবটুকু চেষ্টা একত্র করে, আঁচলে হাত মুছতে মুছতে ছেলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল কল্যাণী।
'হুম বল'। স্বর ঈষৎ ক্লিষ্ট।
'মা মা উফফ আমার যে কী আনন্দ হচ্ছে! আমার চাকরিটা হয়ে গেছে মা, আমার চাকরিটা ফাইনালি হয়ে গেছে। অফার লেটার এসে গেছে।'
'কোন চাকরি?'
'কোন চাকরি মানে? টেকম্যাক্স সফটওয়ার প্রাইভেট লিমিটেড এর চাকরি। ভুলে গেলে নাকি তুমি?' চোখ কপালে তুলে বলল অত্রি।
'ও আচ্ছা। কিন্তু এই চাকরিটা কি না নিলেই নয়? এই কলকাতা শহরে কি কোনো চাকরি পাবি না তুই? শুধু কলকাতা কেন, সারা দেশের যে কোন শহর। শুধু ব্যাঙ্গালোর বাদ দিয়ে', ভীষণ অস্থির শোনাল এবার কল্যাণীর স্বর।
'কেন মা? এরকম ভাবে কেন বলছ? আমার জীবনের প্রথম চাকরি। তুমি খুশি হও নি'?' পলকেই কালো ছায়া অত্রির মুখে।
'ব্যাঙ্গালোর জায়গাটা নিয়ে তোমার কেন এত ভয় মা? যে ঘটনাটা আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে ঘটে গেছে সেই ঘটনাটা কি আজও ভুলতে পার না তুমি? সেটা নেহাতই একটা দুর্ঘটনা ছিল মা।'
'জানি না। আমি সত্যি জানি না এসব। কিন্তু আমি তো মা। তাই সব সময়ে আতঙ্কে আমার বুক কাঁপে।' অসহায় স্বরে বলল এবার কল্যাণী।
'কিন্তু মা দাদা তো আজ বেশ কয়েক বছর হল ওই ব্যাঙ্গালোর শহরেই রয়েছে। নিরাপদেই রয়েছে। তাহলে? তোমার ভয় যে নেহাতই অমূলক এতেও কি তুমি বুঝতে পার না মা?'
'তুই কি জানিস তোর দাদার চিন্তায় রাতে ঘুম হয় না আমার। তুই কি জানিস আমার সব সময় বুকের মধ্যে ধড়ফড় করে একটা অমানুষিক ভয় তোর দাদাকে নিয়ে। অবশ্য এসব জেনে তোদের আর লাভ কী বল। মা বুড়ি হয়েছে, এখন তার সব কথাই তো তোদের কাছে অর্থহীন। মা কী বলল না বলল তাতে আর কী বা যায় আসে তোদের?' কথাটা বলতে গিয়েই দু-চোখ জলে ভরে উঠল কল্যাণীর।
'মা তুমি কিচ্ছু চিন্তা কর না। আমি একদম ঠিক থাকব ওখানে। দাদাও একদম সেফ থাকবে। আর সব থেকে বড় কথা হল এতদিন দাদা নিজের চাকরির জন্য একা থাকত ওখানে, এবার থেকে আর একা থাকবে না ও। আমিও যেহেতু একই শহরে চাকরি করতে যাচ্ছি তাই আমিও তো ওর সাথেই থাকব। আমরা দুজনে দুজনের খেয়াল রাখব মা।' মা কে জড়িয়ে ধরে বলল এবার অত্রি।
'তোমরা ভালো থাক, নিরাপদে থাক এইটুকু ছাড়া তো আমি আর কিছুই চাই না বাবা। তোমরা ছাড়া আমার যে আর কেউ নেই। কিন্তু তাতেই বা কী বল। আমার কথা কেনই বা রাখবে তোমরা? এতদিন তোমার দাদার জন্য চিন্তায় ঘুম হত না, এবার থেকে সাথে তুমিও জুড়লে।'
'বিশ্বাস কর মা চাকরির বাজারটা ভীষণ কঠিন। সেখানে এত ভালো চাকরি পেয়ে সেটাকে হেলায় হারানো সম্ভব নয়। তাই জন্যই না দাদা ওই শহরের চাকরিকে উপেক্ষা করতে পেরেছে না আমি পারব সেটা। ব্যাঙ্গালোর শহরেই যে এখন আই টি ইঞ্জিনিয়ারদের স্বর্গরাজ্য।'
'জানি না। হয়তো তোমরাই ঠিক। আমি আর কী বলব বল। শুধু এই টুকুই বলতে পারি ভালো থেকো তোমরা।' গম্ভীর গলায় বলল কল্যাণী।
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে সুখটান দিতেই মনটা একেবারে ফুরফুরে হয়ে গেল সুমনের। নিকোটিনের ধোঁয়া যেমন মস্তিষ্কের শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে শিথিল করে দিচ্ছে সারাদিনের সমস্ত ক্লেদ, ঠিক তেমনি বাতাসে ভেসে আসা পিয়ানোর সুরের অদ্ভুত মূর্ছনাও আশ্চর্য এক সুখ হিল্লোল যেন বিছিয়ে দিচ্ছে সুমনের হৃদয়ের সবকটা তন্ত্রীতে। তন্ময় দৃষ্টিতে ও চেয়ে রয়েছে রোহিণী এপার্টমেন্টের তিন তলার ঐ ফ্ল্যাটটার ফালি জানালাটার আধখোলা পাল্লার দিকে।
সুমন তা প্রায় বছর আড়াই হল এসেছে এই ব্যাঙ্গালোর শহরে, নিজের পেশার খাতিরে। ও একটা সফটওয়ার কোম্পানিতে ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করে। এই ফ্ল্যাটটায় থাকে সুমন এই শহরে পা রাখার সেই প্রথম দিন থেকেই। আসলে এই ফ্ল্যাটটা ছিল সুমনের ছোট কাকার। ছোট কাকা ছিলেন অকৃতদার, তিনিও চাকরি করতেন এই ব্যাঙ্গালোর শহরেই। কিন্তু বেশ কয়েক বছর আগে চলে যান সুমনের ছোটকাকা। তারপর থেকে এই ফ্ল্যাট খালিই পড়ে ছিল। কিন্তু সুমন আবার এই শহরে চাকরি পাবার পর এই ফ্ল্যাটটা কাজে লেগে গেল। যেহেতু কাকার কোনো স্ত্রী বা সন্তান নেই, তাই আইনত তার অবর্তমানে সম্পত্তির ওপর অধিকার তার ভাইপোদেরই বর্তায়। সেই হিসেবে দেখতে গেলে সুমনই এই ফ্ল্যাটের আইনগত মালিক এখন।
ব্যাঙ্গালোর শহরটা খুব কেজো। পেশাদারিত্ব এখানে সবার মধ্যে ভীষণ বেশি। কেউ এখানে কারোর ব্যাপারে একদমই মাথা ঘামায় না। আর কলকাতা বিশেষত উত্তর কলকাতার মতো পাড়া কালচার বা আড্ডা মারার হুজুগ তো এখানে একেবারেই নেই। এই শহরের বেশির ভাগ মানুষই এখানে থাকে তাদের পেশার খাতিরে। সারাদিন সকলে কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, দিনের শেষে কেউ কেউ পাবে যায় মদ্যপানের আসক্তিতে, কেউ কেউ ডিস্ক-এ যায়, আবার কেউ হয়তো নাইট লাইফ উপভোগের জন্য আশ্রয় খোঁজে নাইট ক্লাবে। আর সুমনের মতো যারা তারা বেশিরভাগ দিনেই বাড়ি চলে আসে অফিসের পর, মাঝে মাঝে সোনালি তরল ঘরে বসেই গলায় ঢেলে ক্লান্তি মোছার চেষ্টা করে আর নয়তো কোলবালিশ জড়িয়ে ধরে বিছানায় চিৎপাত হয়ে পাড়ি লাগায় ঘুমের দেশে। মোট কথা এখানে বেশিরভাগ মানুষই খোঁজই রাখে না যে তার একদম পাশের ঘরের প্রতিবেশীর কী হল।
সুমনও এই শহরের গড়পরতা বেশিরভাগ মানুষের থেকেই মোটেই আলাদা নয়। সেও নিজের চাকরি, কিছু বন্ধুবান্ধব এই নিয়েই মেতে থাকে দিনের সিংহভাগ সময়। না, সুমন জানেও না ওদের এই এপার্টমেন্টের অনান্য ফ্ল্যাটগুলোয় ঠিক কারা থাকে, কে কে থাকে। দু-একজনের সাথে হালকা আলাপ আছে, যাতায়াতের পথে কখনো সখনো মুখামুখি হয়ে গেলে ওই হাই হ্যালোর ফর্মালিটি হয়, ব্যস এইটুকুই। এছাড়া এই ফ্ল্যাট বা আশেপাশের অন্য কোন এপার্টমেন্টের বাসিন্দাদের কারোকে নিয়েই বেশি আগ্রহ নেই ওর, কারোর সমন্ধে খুব বেশি কিছু জানাও নেই।
কিন্তু ইদানীং হিসাবটা আচমকাই উলটে পালটে গেছে অদ্ভুত ভাবে। সুমনদের এপার্টমেন্টের ঠিক উলটো দিকেই মাথা উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে যে মস্ত বিল্ডিংটা তার নাম রোহিণী এপার্টমেন্ট। এই রোহিণী এপার্টমেন্ট এর বিল্ডিংটা বোধহয় বেশ খানিকটাই পুরোনো। অন্তত দেখে তো তাই লাগে। কেমন যেন রং চটা ধরনের, বড্ডই যেন জরাজীর্ণ। আর সবচেয়ে বড় কথা হল ওই এপার্টমেন্টের বেশিরভাগ ফ্ল্যাটই বোধহয় খালি, বেশিরভাগ ঘরেই বোধ হয় লোকজন থাকে না। অন্তত সুমনের তো তাই মনে হয়। কারণ বেশিরভাগ ঘরই অন্ধকার থাকে, মাত্র গুটিকয়েক ফ্ল্যাটেই আলো জ্বলতে দেখা যায় ওই বিল্ডিঙে।
সুমন যে এপার্টমেন্টে থাকে তার নাম শাহি দুর্গ। এই শাহি দুর্গ-এর তিনতলার একটা ফ্ল্যাটে থাকে ও। দুটো কামরা, বাথরুম, কিচেন আর বেশ লম্বা টানা একটা ব্যালকনি। এই ব্যালকনিটা প্রথম দিন থেকেই কেন কে জানে বড্ড বেশি প্রিয় সুমনের। রোজ অফিস থেকে ফিরে এসে সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়েই ফুরফুরে হাওয়ার আমেজ উপভোগ করে ও। আর এই ব্যালকনির একেবারে উলটো দিকে মানে সুমনের ব্যালকনির একেবারে সোজাসুজি নিজের থমথমে অস্তিত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রোহিণী এপার্টমেন্টের তিনতলার ফ্ল্যাটটা। ঐ ফ্ল্যাটেও কেউ থাকে না নির্ঘাত। কারণ ঘুটঘুটে অন্ধকার সর্বক্ষণ বিছিয়ে থাকে ওই ফ্ল্যাটে। জানলা দরজাও সব বন্ধই থাকে। অন্তত গত আড়াই মাসে সুমন তো তাই দেখে এসেছে। মাঝে মাঝে ফ্ল্যাটটার অন্ধকার অস্তিত্ব আর বন্ধ জানলাটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন গা ছমছম করে উঠত সুমনের।
কিন্তু গত একমাসে সব চেনা ছবি যেন আচমকাই এলোমেলো হয়ে গেছে। আর তার সাথে সাথেই এলোমেলো হয়ে গেছে সুমনের মনও। মাস খানেক আগের সেই দিনটা আজও বেশ স্পষ্টভাবেই মনে পড়ে ওর। সেদিনও রোজকার মতোই এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছিল সুমন। কিন্তু আচমকা তিনতলার বন্ধ ঐ ফ্ল্যাটের দিকে চোখ পড়তেই ভীষণ চমকে গেছিল ও। একি! ওই ফ্ল্যাটে আজ আলো জ্বলছে যে! তবে কি ওখানে কেউ থাকতে এল? তবে আলো মানে কোনো বৈদ্যুতিক আলো নেই, মোমবাতির কেমন যেন নীলাভ হলুদ রঙের শিখার আলো। আর সুমনের ব্যালকনি বরাবর যে জানালা সেই জানালার একটা পাল্লাও অল্প একটু ফাঁক করা। সেই ফাঁক দিয়েই চুইয়ে আসছে মোমের আলোর রেশ। কিন্তু আচমকে কে এল ওখানে এতদিন বাদে? কেনই বা সে এভাবে মোম জ্বালিয়ে রেখেছে? এই সব প্রশ্নগুলো যখন একের পর এক ওর মস্তিষ্ককে ভাবিয়ে তুলছে ঠিক তখনই ওকে চমকে দিয়ে ওই ফ্ল্যাট থেকে ভেসে এসেছিল একটা অদ্ভুত সুরেলা পিয়ানোর মূর্ছনা। কী তীব্র আকর্ষণ যেন সেই সুরে, কী ভীষণ মায়াবী যেন সেই পিয়ানোর ধ্বনি। সুমন জীবনে এর আগেও অনেকবার পিয়ানোর সুর শুনেছে, কিন্তু এমন অদ্ভুত মাদকতাময় পিয়ানোর মূর্ছনা ও আগে কোনোদিন শোনেনি।
তন্ময় হয়ে ওই সুরে ডুবে গেছিল সুমন। কতক্ষণ যে মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওই সুর শুনেছিল ও তার বোধহয় কোনো হিসাবই ছিল না। নিজের সম্বিৎ ফেরার পর ও দেখতে পেয়েছিল মোমের আলো নিভে গেছে ওই ফ্ল্যাটে, আবার ওটা ডুবে গেছে নিকষ কালো অন্ধকারে। আর থেমে গেছে পিয়ানোর সেই মায়াবী মূর্ছনাও। টলতে টলতে কোনোরকমে ঘরের ভিতর ফিরে এসেছিল সুমন। কেমন যেন ঘোরের মধ্যে আটকে পড়েছিল ও সেই সুর শুনতে শুনতে। আর বারবার সেদিন ওর মনে হচ্ছিল ওই অদ্ভুত মায়াবী সুর শোনার মতো সৌভাগ্য আর কি কোনোদিন হবে ওর?
পরের দিন অফিস থেকে ফিরেই সেই একই সময়ে কী যেন এক অদৃশ্য অমোঘ টানে ও ছুটে গিয়েছিল ব্যালকনিতে। কী এক অদ্ভুত প্রতীক্ষা যেন আস্তে আস্তে আবিষ্ট করছিল ওকে, বারবার কেন কে জানে মনে হচ্ছিল আবার নিশ্চয়ই আজও মৃদু মোমের আলো নির্ঘাত জ্বলে উঠবে ওই ফ্ল্যাটে, আবার বেজে উঠবে পিয়ানোর সেই যাদু মূর্ছনা। না, সেদিনকে শেষ অবধি মিথ্যা হয়নি ওর প্রতীক্ষা। সত্যি আবার সেই একইভাবে মোম জ্বলে উঠেছিল নির্দিষ্ট ওই ফ্ল্যাটটায়, পিয়ানোর মূর্ছনা ভেসে এসেছিল একই ভাবে, একইভাবে ফাঁক হয়ে গিয়েছিল বন্ধ জানলার পাল্লাটা।
এইভাবেই ক্রমাগত একই জিনিস ঘটে চলেছে গত একমাস ধরে। প্রতিদিন পড়ি কি মরি অফিস থেকে প্রায় ছুটতে ছুটতে রাত ন-টা বাজার আগেই ফিরে আসে সুমন। অদৃশ্য কী এক যাদুবলে যেন ও রোজ নিয়মমাফিক পৌঁছে যায় ও নিজের প্রিয় ব্যালকনিতে। ঠিক সময়ে জ্বলে ওঠে আলো, বেজে ওঠে পিয়ানোর মাদকতাময় সুর আর সুমন কেমন যেন অদ্ভুতভাবে ডুবে যায় তাতে। আর প্রতিদিনই যখন ঘোর ভেঙে সম্বিৎ ফেরে সুমনের ততক্ষণে আবার আলো নিভে অন্ধকারে ডুবে যায় ওই ফ্ল্যাটটা। থেমে যায় পিয়ানোর সুর।
না সুমন সত্যি জানে না কি রহস্য লুকিয়ে আছে ঘোর লাগান এই সুরের আড়ালে। কে যে বাজায় পিয়ানো কে জানে! আর সারাদিন সে কোথায় থাকে? সুমন লক্ষ করে দেখেছে বিশেষ ওই সময়টুকু ছাড়া সারাদিন বন্ধই থাকে ওই ফ্ল্যাটটা। অন্ধকার নিজের কালো চাদর বিছিয়ে রাখে সেখানে। তাহলে কে? কে আসে সামান্য সময়টুকুর জন্য ফাঁকা ফ্ল্যাটে পিয়ানো বাজাতে?
'দাদা এই দাদা দাদা কী করছিস তুই? বাইরে ভীষণ ঝড় উঠেছে তো। তবুও ওই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে পাগলের মতো কী করছিস তুই? দরজা বন্ধ করে তাড়াতাড়ি চলে আয়। অত্রি উচ্চস্বরে চিৎকার করছে ঘরের ভেতর থেকে। আর সেই চিৎকারেই ঘোরটা ঝপ করে কেটে গেল সুমনের। অত্রির প্রতি রাগ আর বিরক্তিতে পলকে মনটা বিষিয়ে উঠল ওর। অত্রি ওর ভাই। নিজের ভাই, দিন সাতেক হল চাকরি নিয়ে এই ব্যাঙ্গালোর শহরেই এসে রয়েছে। কিন্তু আসার পর থেকেই যেন অতিরক্ত জ্যাঠামো শুরু করেছে। সুমনের ব্যাপারে একটু বেশিই মাথা ঘামাচ্ছে যেন, যেটাই ক্রমশ ভাইয়ের প্রতি বিরক্ত করে তুলছে ওকে।
'আমি যাব না এখন। তুই বিরক্ত করিস না অত্রি আমায়।' কোনো রকমে দায়সারা করে উত্তর দিল সুমন। উফফ এই সামান্য সময়টুকুর এক মুহূর্তও যে ব্যয় করতে নারাজ ও। এখনও বয়েই চলেছে সুরের ওই মূর্ছনা। দিনের মধ্যে অল্প একটু সময়ই তো সুমন শুধু পায় এই সুর মদিরায় ডুব দিতে। সেই সময়টুকুর মধ্যে কোনো বাধা এলে ভালো লাগে নাকি!
তবে আজ এখন এই মুহূর্তে ঝড়ের গতিবেগ সত্যি যেন বাঁধনহারা হয়ে উঠেছে। সাঁই সাঁই করে ক্রমশই বাড়ছে হাওয়ার জোর। ঝড়ের দাপটে উড়ছে রাস্তার ধুলো। সুমনের চোখে মুখেও ঢুকে যাচ্ছে ধুলো বালি। এই অবস্থায় এই ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কঠিন হচ্ছে বইকি, কিন্তু তবুও সুমন যে নড়তে পারবে না। ওকে যে প্রাণ ভরে পান করতেই হবে ওই সুর সুধা।
হঠাৎ কী একটা যেন হয়ে গেল। হাওয়ার তোড়ে আচমকা ঝপ করে অনেকখানি খুলে গেল ওই ফ্ল্যাটের জানালাটা, আর নিমেষেই ঘরের ভেতরের অনেকখানি উন্মুক্ত হয়ে গেল সুমনের চোখের সামনে। মুহূর্তের মাঝেই যেন দামামা বেজে উঠল সুমনের বুকের ভেতর। ঘরের ভেতরটা খানিক অস্পষ্ট হলেও এখন বেশ দেখতে পাচ্ছে ও। কেমন যেন ফ্যাকাশে একটা মোম জ্বলছে ঐ ঘরে। আর সেই মোমটা রাখা রয়েছে একটা বেশ পেল্লায় মার্কা বড়সড় পিয়ানোর ওপর। সেই পিয়ানোর ওপারেই বসে রয়েছে এক রমণী। পরনে তার সাদা গাউন, চোখ বন্ধ করে নিবিষ্ট চিত্তে একভাবে বাজিয়ে চলেছে পিয়ানো। মেয়েটার দু-চোখ বন্ধ থাকলেও সে দিক থেকে চোখ সরাতে পারল না সুমন। কী অসাধারণ সুন্দর দেখতে ওই নারীকে। মনে হচ্ছে যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোনো অপসরা অথবা রূপকথা গল্পের কোনো পরী। দু-চোখ বন্ধ করে সে বাজিয়ে চলেছে পিয়ানো, বোঝাই যাচ্ছে নিজের সমস্ত একাগ্রতাটুকু ঢেলে দিচ্ছে সে। আসলে-সব টুকু একাগ্রতা এভাবে উজাড় করে না দিলে বোধহয় এত অপার্থিব সুন্দর সুর সৃষ্টি করাই যায় না। হঠাৎ মেয়েটা থামিয়ে দিল বাজান। চোখ মেলল এবার সে, আর অমনি ধক করে উঠল সুমনের হৃৎপিণ্ডটা। চোখ মেলার পর যেন আরও বেশি চোখ ধাঁধানো সুন্দর লাগছে ওকে। উফফ! স্রষ্টা এত সুন্দর বলেই বোধহয় তার সৃষ্টি সুরও এমন সুন্দর আর অনবদ্য।
মেয়েটা আস্তে আস্তে উঠে পড়ল নিজের জায়গা থেকে। ধীর পায়ে এগিয়ে এল এবার সে জানালা বরাবর। পাল্লাটা খুলে দিল আরও খানিকটা ভালো করে। জানলার বহুকালের অব্যবহৃত শ্যাওলা পড়া গ্রিল ধরে এবার সে দাঁড়াল। মেয়েটা এবার একেবারে সুমনের মুখোমুখি। ওর চোখে চোখ রাখল সে সরাসরি। ঠোঁটের কোণে তার ফুটে উঠল চিলতে হাসি। কি ভীষণ মোহময় সেই হাসির ঝিলিক। সুমনের বুকের ভেতর যেন একসাথে এক লক্ষ প্রজাপতি লাফাতে শুরু করেছে। মেয়েটার এবার ঠোঁট নড়ল সামান্য। তার চোখ এখনও স্থির সুমনের চোখের তারায়। তবে কী মেয়েটা ওকেই কিছু বলছে? সুমন কি করবে বুঝতে পারল না। ভীষণ অস্থির লাগছে, কেমন যেন উথালপাথাল করছে বুকের ভেতর। এবার মেয়েটা হাত নাড়াচ্ছে। অদ্ভুত ভঙ্গিমায় হাত ঘোরাচ্ছে। কিছু ইশারা করছে কি? নাকি হাতছানি দিয়ে ডাকছে সুমনকে?
'দাদা কী করছিস তুই এইভাবে এখানে বলতো এই ঝড়ের মধ্যে?' এবার অত্রি এসে দাঁড়িয়েছে ঠিক সুমনের পাশে।
'তুই যাবি এখান থেকে'? ভাইয়ের উদ্দেশ্যে বিশ্রীভাবে কথাটা বলল সুমন। চলে গেলে অত্রি। ভাই চলে যেতেই ফের ও তাকাল ঐ মেয়েটার দিকে। কিন্তু একি! কোথায় সে? সে তো চলে গেছে। জানলাটা তো বন্ধ, আর ওই ফ্ল্যাটও ফের ঘুটঘুটে অন্ধকার। কয়েক মুহূর্ত আগেও যে ওখানে একটা জলজ্যান্ত মানুষ ছিল সেটা দেখে বোঝাই তো যাচ্ছে না আর।
কম্পিউটার এর মাউসটা এলোমেলোভাবে নাড়াচ্ছিল অত্রি। দাদার যে ঠিক কী হয়েছে সেটাও একেবারেই বুঝতে পারছে না। দাদা তো চিরকালই বেশ শান্ত স্বভাবের ছেলে, ভালোমানুষ ধরনের। সেই ছেলেটার কী এমন হল এই নতুন শহরে এসে যে এতটা বদলে গেল ও?
সুমন এই ব্যাঙ্গালোর শহরে এসে রয়েছে তা প্রায় বছর আড়াই তো হলই। এর মাঝে কলকাতায় নিজের বাড়িতেও গিয়েছে বেশ কয়েকবার। কিন্তু কই, তখন তো ওর এমন বদল একবারের জন্যও চোখে পড়েনি অত্রির, কিংবা ওদের মায়ের। তবে কি এই বদলটা খুব নতুন? আকস্মিক এই বদলের কি বা কারণ হতে পারে? তবে কি সুমন ভালো ভাবে মেনে নিচ্ছে না অত্রির এই ফ্ল্যাটে এসে থাকাটা? আজকাল সব সময়ই কেমন যেন অন্যমনস্ক থাকে ও, ভালো করে কথা তো বলেই না উলটে কেমন যেন রুক্ষ ব্যবহার করে।
'কী ব্যাপার ডিনার শেষে শুয়ে না পড়ে এখন এই কম্পিউটার চালিয়ে কী করছিস'? দাদার আচমকা গলার স্বরে হুট করে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল অত্রি। কখন যেন সুমন এসে দাঁড়িয়েছে দরজার বাইরে।
'না মানে'... একটু অগোছালো উত্তর হল বোধহয় অত্রির। হাত তুলে ওকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল সুমন।
'না আমি তোর কাছে কোন কারণ জানতে চাই না। হতেই পারে তোর কোনো ব্যক্তিগত কাজ আছে। আমি কারোর ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের পক্ষপাতী নই। প্রত্যকেকে তার নিজস্ব স্পেস দিতে হয়। জোর করে কখনো সেখানে ঢুকতে নেই। তুইও সেটা বুঝে নিলেই ভালো।' খুব গম্ভীর আর রুক্ষ স্বরে কথাগুলো বলে বড় বড় পা ফেলে নিজের শোবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেল সুমন। তারপরেই দড়াম করে বন্ধ করে দিল সে ঘরের দরজাটা।
কয়েকমুহূর্ত ঝুম মেরে বসে রইল অত্রি। সত্যি কি যে হয়েছে ছেলেটার। কেন যে কথায় কথায় এভাবে নিজের ভাইকেই ভুল বোঝে ও! আজকাল সত্যি কেমন যেন বড্ড বেশি রহস্যজনক হয়ে উঠছে সুমন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরেই অদ্ভুত মোহগ্রস্ত এক মানুষের মতো টলতে টলতে ব্যালকনিতে চলে যায় ও। পাগলের মতো পড়ে থাকেওখানে। ঝড় জল যাই হোক না কেন, কিছুতে সে ব্যালকনি ছেড়ে নড়ে না নির্দিষ্ট ওই সময়টায়। কেন? কোন আকর্ষণ লুকিয়ে আছে এর পিছনে?
সারাদিন অফিসের ক্লান্তি, নানা ভাবনাচিন্তার জটাজাল সবকিছুর দাপটে আজ যেন বড় বেশি ক্লান্ত লাগছে অত্রির। হাই উঠছে ঘন ঘন। কিন্তু তবুও এক অনাবিল প্রতীক্ষায় চোখ খুলে রেখে জেগে থাকার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ও। না আজ বোধহয় আর সবুজ আলো জ্বলবে না ময়ূরী শ্রীবাস্তব এর নামের পাশে।
হ্যাঁ মানুষের জীবনে কখনো কখনো নিজের অজান্তেই হয়তো এইভাবেই জুড়ে যায় কিছু অপ্রত্যাশিত অপেক্ষা আর ভালো লাগা। যেমন অত্রির জীবনেও জুড়ে গেছে এখন। ময়ূরী শ্রীবাস্তব । না, ময়ূরীকে এখনও সামনে থেকে একবারও দেখেনি অত্রি। যতটুকু চেনা জানা তার সবটাই ভার্চুয়াল পৃথিবীতে। ফেসবুক নামের এই সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মেই অত্রির সাথে প্রথম পরিচয় হয়েছিল ময়ূরীর। সোশ্যাল মিডিয়ার উপস্থিতি বলতে অত্রির যেটুকু আনাগোনা ছিল, তার সবটাই অর্কুট নামের প্লাটফর্মটাকে ঘিরে। এই ফেসবুকে যুক্ত হওয়াটাই নানা বন্ধুদের হাজার অনুরোধের তাগিদে। বিশেষ করে নিজের শহর, নিজের পুরোনো বন্ধুদের ছেড়ে আসার পরেই যেন আরও বেশি করে এই ফেসবুকে যুক্ত হবার তাগিদটা অনুভব করেছিল ও। এই ফেসবুক যেন একেবারে দ্বিতীয় একটা পৃথিবী, কত নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় ঘটেছে এখানে। কত নতুন বন্ধু হয়েছে। এই নতুন পরিচিতদের মধ্যেই অন্যতম হল ময়ূরী। মেয়েটা নিজে থেকেই বন্ধুত্বের অনুরোধ ওকে পাঠিয়েছিল প্রথমে। প্রথম বারেই ঐ মেয়েটার প্রোফাইল ছবিটা দেখে কেমন যেন চোখ ধাঁধিয়ে গেছিল অত্রির। এত সাঙ্ঘাতিক সুন্দর কোনো মেয়ে হতে পারে! একেবারে যেন ছবির রূপকথার বই থেকে উঠে আসা কোনো পরী। কাঁপা হাতে সেদিন ওকে বন্ধুবৃত্তে যুক্ত করেছিল অত্রি। তারপর আস্তে আস্তে কখন যে ময়ূরীর সাথে এত গভীর একটা বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে সেটা যেন টেরই পায়নি ও। রোজ রাতে অফিসের ক্লান্তি সত্ত্বেও কম্পিউটার খুলে বসে ও ময়ূরীর জন্যই। প্রতিদিন রাতের বেলায় চ্যাটের মাধ্যমে কথা বলে ওরা। ময়ূরী কত কিছু যেন বলে যায়, টাইপ করতে শুরু করে যেন শেষ আর হয় না ওর টাইপ করা। ও বারবার বলে,
'জান অত্রি আমার ভালো বন্ধু খুব কম আছে। কে জানে কেন আমার বেশি বন্ধুই হয় না। একদম মনের মতো বন্ধু খুঁজে পাওয়াটা বোধহয় সত্যি বড্ড কঠিন তাই না? অথচ দেখ তুমি আমার থেকে বয়সে বড়, তোমায় কখনো দেখিওনি কিন্তু তোমার সাথে কত ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে আমার। মনে হয় যেন না বলতেই তুমি আমার সব কথা বুঝে ফেল। যেন আমার মনের ভেতরটা পড়ে ফেল। আজকাল তো আমার সারাদিনের সমস্ত কথা তোমায় না বলতে পারলে শান্তিই হয় না। তোমার এই বন্ধুত্বটা আমার কাছে দিন দিন বড্ড বেশি অপরিহার্য হয়ে উঠছে জান। এই বন্ধুত্বটা না থাকলে হয়তো আমি মরেই যাব আমার মনে হয়।'
ময়ূরীর আঙুলের ছোঁয়ায় সৃষ্টি হয়ে এই শব্দগুচ্ছ যখন ভেসে ওঠে অত্রির চোখের সামনে তখন সবটা কেমন যেন স্বপ্ন স্বপ্ন মনে হয় ওর। অত্রি দেখতে অতি সাধারণ, দুর্দান্ত চালাক চতুর বা নিদারুণ বলিয়ে কইয়েও নয়। এই সব নানা কারণেই বোধহয় মেয়ে বান্ধবীর সংখ্যাটা ওর চিরকালই কম। আর যে দু-একজনও বা আছে, তাদের সাথে সম্পর্কটা সাদামাটা বন্ধুত্বের বাইরে কোনোদিন আর অন্য কোনো মাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি। কিন্তু আজ ময়ূরীর মতো এমন অপরূপ সুন্দরী একটা মেয়ে যখন অত্রিকে এমন কথাগুলো বলে, আঁকড়ে ধরতে চায় ওর বন্ধুত্বকে তখন ভালো লাগায় কেমন যেন দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। ওরও ময়ূরীকে বলতে ইচ্ছে করে
'আমিও তোমার বন্ধুত্ব ছাড়া বাঁচব না। আমি যে নিজের অজান্তেই কখন যেন ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে।' কিন্তু সাহসে কুলায় না। তাই আর মনের কথা বলাও হয় না। ও বলে
'শুধু এই চ্যাটের ওপর ভরসা করে না থেকে আমরা তো ফোনেও কথা বলতে পারি।' কিন্তু সে তখন বলে যে ওর ফোন নেই। ও স্টুডেন্ট। সবে কলেজে উঠেছে। এই সময় বাবা ওকে কোনো মোবাইল ফোন এখনও কিনে দেননি। আর বাড়ির ল্যান্ড ফোন ব্যবহার করে ও অত্রির সাথে কথা বলতে পারবে না। ওর বাবা পছন্দ করেন না ছেলেদের সাথে তার মেয়ে বন্ধুত্ব করুক। তাই যদি কোনোদিন তিনি টের পান যে ময়ূরী ছেলেদের সাথে ফোনে কথা বলে তাহলে হয়তো কম্পিউটার ব্যবহার করার সুযোগটাও হারাতে হবে ওকে।
না না, ময়ূরীকে অত্রি হারাতে পারবে না কোনো মুল্যেই। তাই কখনো জোর করেনি ওকে। শুধু একবার বলেছিল
''আমাদের কি কোনোদিন দেখা হবে না ময়ূরী? তুমি তো এই শহরেই থাক। এই শহরের কলেজেই পড় ফার্স্ট ইয়ারে। আমি যদি একদিন কলেজের পর তোমার সাথে দেখা করি?'
'না অত্রি ইচ্ছা থাকলেও যে উপায় নেই আমার। কলেজের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে আমার বাড়ির গাড়ি আর ড্রাইভার। তাই একটু সময়ের এদিক ওদিক দেখলেই সে বলে দেবে বাবাকে। তবে তুমি ভেব না অত্রি। আমাদের দেখা হবেই। আমি তোমার সাথে দেখা করতে যে ভীষণভাবে চাই। শুধু সঠিক সময়টা আসতে দাও। আমি নিজেই দেখা করব তোমার সাথে। একটু অপেক্ষা কর। দেখবে সেই দিনটা হবে তোমার জীবনের অভাবনীয় একটা দিন।'
সেই অভাবনীয় দিনটার জন্যই তো অপেক্ষা করছে অত্রি। হয়তো সারাজীবন অপেক্ষা করবে যদি ময়ূরী বলে। দেখা যাক কবে ময়ূরী নিজে থেকে এসে ধরা দেয় বাহুডোরে।
'অত্রি তুমি জেগে আছ তো? সরি আজ আমার একটু দেরি হয়ে গেল।' টিং শব্দ জানান দিল নতুন বার্তা এসে পৌঁছেছে অত্রির ফেসবুকের ইনবক্সে। পলকেই নিজের ঘুমন্ত ভাব ঝেড়ে ফেলল ও। এসে গেছে ময়ূরী। ওই তো সবুজ আলো জ্বলছে ওর নামের পাশে।
'আমি তো ভাবলাম তুমি আজ হয়তো খুব ব্যস্ত। হয়তো আজ আর আসবেই না'। একটু অভিমান জড়িয়েই মেসেজটা টাইপ করল অত্রি।
'পাগল ছেলে! আমি কখনো আসব না এটা হয়? তুমি বোঝো না কিছু'?
'কি বুঝব'? বুকটা কেমন যেন দুরু দুরু করছে আজ অত্রির।
'তুমি বোঝো না আমি তোমার সাথে একদিনও কথা না বলে থাকতে পারব না। একেবারে পাগল পাগল লাগে আমার তোমার সাথে কথা না বলতে পারলে'। মেসেজের টুং টাং শব্দের সাথে সাথেই জলতরঙ্গ বেজে উঠল অত্রির বুকের ভেতর। ক্ষণিকের জন্য ওর মনে হল এটা স্বপ্ন নয় তো?
আজ ন্যাতানো বিড়ালের মতো বিছানায় পড়ে রয়েছে সুমন। কী করে যে সবকিছু এভাবে তছনছ হয়ে গেল এখনও মাথায় আসছে না ওর। অত্রি! সব কিছুর জন্য ওই বেয়াদপ ছেলেটাই দায়ী। সেইদিন ঝড়ের রাতে যদি অমন করে হঠাৎ ও ব্যালকনিতে চলে না আসত তাহলে নিশ্চয় আজও সব ঠিক থাকত। নিশ্চয় এভাবে তাহলে সে হারিয়ে যেত না সহসা, এমনটাই বারবার মনে হচ্ছে সুমনের।
সেদিন প্রথমবার সব টুকু আড়াল ভেঙে সেই সুরের যাদুকরী এসেছিল সুমনের সামনে। ওর চোখে চোখ রেখেছিল, কিছু বলতে চেয়েছিল ওকে প্রথমবারের জন্য। হয়তো বলতও, সুমন তো শুনতেই চেয়েছিল। কিন্তু কিচ্ছু হল না। অত্রির ওই হঠাৎ করে চলে আসাটা নিশ্চয়ই একেবারে ভালো ভাবে মেনে নেয়নি সে। সেই জন্যই তো অমনভাবে হুট করে চলে গেল সেদিন। আর ফিরে এল না তারপর। গত তিনদিন অফিস থেকে এসে পাগলের মতো ছটফট করেছে সুমন। লক্ষাধিক বার ঘর বার করেছে, বারবার ছুটে গেছে গেছে ব্যালকনিতে। কিন্তু না একবারের জন্যও আর আলো জ্বলে ওঠেনি চৌখুপি ঐ ফ্ল্যাটে। একবারও ভেসে আসেনি মায়াবী সুরের মূর্ছনা, শুধু পাগলের মত বিদ্রুপ করে গেছে ওকে একরাশ চাপা কালো অন্ধকার। আজ আর মিথ্যা আশা নিয়ে ব্যালকনিতে যায়নি ও। প্রত্যাশাও করছে না তার সুর শুনতে পাবার, ও জানে সে আর আসবে না। হারিয়ে গেছে বরাবরের জন্য সে।
বোধহয় একটা হালকা তন্দ্রা এসে ভিড় করেছিল সুমনের চোখে। হঠাৎ ধড়মড় করে উঠে বসল ও। ও কি ঠিক শুনছে? নাকি শ্রুতি বিভ্রম? না না, শোনার ভুল নেই। এই ভুল ওর হতেই পারে না। বাজছে, আবার পিয়ানোর সেই মদিরা সুর ফিরে এসেছে। প্রায় এক লাফে নিজের ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে পৌঁছে গেল সুমন। হ্যাঁ আলো আজ জ্বলছে ওই ফ্ল্যাটে। ফ্যাকাসে মোমের আলো। হৃদয় উথলে দেওয়া সেই আবেগের সুর বেজেই চলেছে পিয়ানোতে। কিন্তু সুমন গিয়ে দাঁড়াতেই থেমে গেল সুরটা। একি! কেন থেমে গেল সুর? বুকটা ঢিপ ঢিপ করে উঠল ওর। হঠাৎ আচমকা খুলে গেল গোটা জানালার পাল্লাটা। সুরের সেই যাদুকরী এসে দাঁড়িয়েছে জানালায় আবার আগের দিনের মতো। সরাসরি সে আজ চোখ রাখল সুমনের চোখে। চোখ যেন ধাঁধিয়ে গেল সুমনের। উফফ! কী অপূর্ব সুন্দরী এক নারী। এত সুন্দর মেয়ে সুমন আগে কোনোদিন কোথাও দেখেছে বলে ওর মনে পড়ছে না। মেয়েটার পরনে আজ হালকা গোলাপি রঙের নেটের গাউন, টানা টানা কাজল কালো দুটো চোখ আর ঠোঁটটাও যে গোলাপের পাপড়ির মতো সেটা এই তফাতে দাঁড়িয়েও বেশ বুঝতে পারছে সুমন। আর কানে ও দুটো ঝকঝক করছে কী? হীরের কুচি কি?
কয়েক মুহূর্ত মেয়েটাও অপলক চোখে দেখল সুমনকে। তারপর হাতছানি দিল। কাকে ডাকছে? সুমন ইশারা করে জানতে চাইল সে কি ওকেই ডাকছে? মেয়েটা ঘাড় নাড়ল মৃদুভাবে। আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না ও। তড়তড় করে নেমে গেল ও সিঁড়ি বেয়ে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ও রাস্তায়। মেয়েটাও ততক্ষণে নেমে এসেছে নীচে। সুমন আর সে একেবারে মুখোমুখি এবার। উফফ! মেয়েটা তো সামনে থেকে আরও বেশি অপরূপা।
'হাই, আপনি আমার বাজনা শুনতে খুব পছন্দ করেন না'? ভাঙা ভাঙা ইংরিজিতে বলল মেয়েটা।
'হ্যাঁ খুব পছন্দ করি। আপনার হাতে যাদু আছে। রিয়েল ম্যাজিক'। বোকার মতো ঘাড় কাত করে হেসে বলল সুমন।
'থ্যাংক ইউ। আসলে আমি লক্ষ্য করেছি যে আমি যখনই পিয়ানো বাজাই, আপনি ব্যালকনিতে চলে আসেন তাই না''? মৃদু হেসে জিজ্ঞাসা করল মেয়েটা।
'হ্যাঁ ঠিক। আপনি ঠিকই লক্ষ্য করেছেন। আমি আসলে একেবারে আপনার অন্ধ ভক্ত।'
হি হি মুক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁত খেলিয়ে এবার হাসল মেয়েটা। তারপর কেটে কেটে বলল,
'আমার নাম দিব্যা। দিব্যা গোমস। আমি বেসিকালি একজন পিয়ানো টিচার। আর এই ফ্ল্যাটটা আমার স্কুল। পিয়ানো স্কুল। এখানেই আমার স্টুডেন্টদের পিয়ানো ক্লাস নিয়ে থাকি আমি।'
'স্টুডেন্ট? এখানে আপনার স্টুডেন্ট আসে বুঝি? কিন্তু আমি তো কোনোদিন কাউকে দেখিনি। আমার তো ধারণা ছিল যে আপনি একাই'... না বলতে চেয়েও বললেই ফেলল কথাটা সুমন।
পলকেই দিব্যার মুখটা পাংশু হয়ে গেল। ও একটু গম্ভির গলায় বলল
'হ্যাঁ আসে না। এখন আমার স্টুডেন্টরা আর আসে না। আসলে বেশ কয়েক বছর আগে আমার এই পিয়ানো স্কুলে একটা খারাপ ঘটনা ঘটে। একটা খুব বাজে এক্সিডেন্ট । আমার চোখের সামনে প্রাণ হারিয়েছিল আমার এক ছাত্রী। তারপর থেকে আমি বহু বছর আর পিয়ানো বাজাইনি। বাড়িতে চার দেওয়ালের মধ্যে বন্ধ করে রেখেছিলাম নিজেকে। কিন্তু ফাইনালি আর পারলাম না। আসলে আমি যে পিয়ানো আর পিয়ানোর সুরকে বড্ড বেশি ভালোবাসি। সেই সুর থেকে বেশিদিন নিজেকে সরিয়ে রাখবো কী করে? আর সবচেয়ে বেশি আমি ভালোবাসি আমার এই পিয়ানো স্কুলকে। আমার ছাত্রছাত্রীদের। আজ হয়তো আর কেউ আমার কাছে শিখতে আসে না, কিন্তু তবুও আমি এসে পিয়ানো বাজাই এখানে। এর মাধ্যমেই আমি ফিল করতে পারি আমার স্টুডেন্টদের, আমার মনে হয় ওরা আমার কাছেই আছে। ওরা শুনছে আমার পিয়ানো, ওরা শিখছে আমার থেকে। এটাতেই অনেকটা রিলিফ পাই আমি। আর সেই ভালো লাগাটুকু সঙ্গে নিয়েই বাড়ি চলে যাই। শান্তিতে ঘুমাতে পারি রাতে'। দিব্যার কথাগুলো কেমন যেন আর্তির মতো ঠেকল সুমনের কানে। এই মেয়েটার বুকের ভেতর এতটা কষ্ট জমান রয়েছে?
'আমি সুমন। আমার নামটা তো বলাই হয়নি। আমি কিন্তু রিয়েলি খুব এনজয় করি তোমার পিয়ানো। বলতে পার পাগল হয়ে যাই'। নিজের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল সুমন।
কিন্তু দিব্যা হ্যান্ডশেকের জন্য নিজের হাত বাড়াল না। শুধু গলা নিচু করে বলল,
'থ্যাংকস সুমন। আমার পিয়ানো এখন আর কারোর ভালো লাগে না বলেই আমার ধারণা ছিল। কিন্তু তুমি আমার সেই ধারণা ভেঙে দিলে। অনেকটা কনফিডেন্স ফিরিয়ে দিলে আমায়। আমার বন্ধু হবে প্লিজ? পাশে থাকবে আমার?'
'শিওরলি। তোমার বন্ধু হতে পারলে তো নিজেকে আমি ভাগ্যবান মনে করব দিব্যা। তোমার ফোন নম্বরটা দাও।'
'আমার এখন আর নিজস্ব কোনো ফোন নেই। আসলে সবাই এখন আমায় পাগল ভাবে জান। একদম পাগল। বদ্ধ পাগল। কিন্তু বিশ্বাস কর আমি পাগল নই। রোজ এই টাইমে যখন আমার বোন বিজি থাকে ওর স্টুডেন্টদের নিয়ে, ওদের পড়ান নিয়ে তখন ওকে লুকিয়ে এখানে চলে আসি আমি। নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে আসি, ঐ যে আমার গাড়ি'। দিব্যা হাত তুলে দেখাল একটু দূরে। সুমনও তাকাল সেই দিকে। সত্যি পার্ক করা রয়েছে একটু পুরনো দিনের একটা গাড়ি।
'জান সুমন, এই বাড়িটায় ইচ্ছা করে আমি ইলেকট্রিক আলো নিই না। আমার অন্ধকার ভালো লাগে, আবছা আলো ভালো লাগে। এই আধো আলো, আধো ছায়ার একটা নিজস্ব ভাষা আছে। এই আলো অন্ধকারের লুকোচুরি আমায় অনেকটা সাহায্য করে আমার অপ্রাপ্তির কষ্টগুলোকে ভুলতে'।
এবার একটু গা-টা ছমছম করল সুমনের। দিব্যা মানসিক ভারসাম্যহীন কি সত্যি? এমন অদ্ভুত ধরনের কথা বলছে কেন? সুমন কি বলবে ঠিক ভেবে পেল না। শুধু হাসল অল্প।
'তুমি ভয় পেয়ে গেলে তাই না সুমন? আমি জানতাম তুমিও শেষ পর্যন্ত ফ্রেন্ডশিপ করবে না আমার সাথে। তুমিও পিছিয়ে যাবে। আসলে আমি যে একা। একদম একা'। দিব্যার চোখ ছলছল করছে এবার। এত সুন্দর দীঘল দুটো চোখে অশ্রু যে একেবারে মানায় না। বুকটা টনটন করল সুমনের। ও বেশ জোরের সাথে এবার বলল
'না দিব্যা আমি আছি। সব সময় থাকব তোমার সাথে।'
'সত্যি? সত্যি বলছ'? অপার্থিব সুন্দরভাবে হেসে এবার সুমনের হাত চেপে ধরল দিব্যা। মুহূর্তের মাঝে ঝনঝন করে উঠল ওর শরীর। কি ভীষণ অন্যরকম যেন দিব্যার স্পর্শটা। আস্তে আস্তে কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে সুমনের শরীরটা।
ব্যাঙ্গালোর শহরে এসে যেন হুহু করে ঝড়ের মতো কেটে যাচ্ছে দিনগুলো। অত্রির এখনো বিশ্বাস হয় না যে দেখতে দেখতে প্রায় সাড়ে তিন মাসেরও এই বেশি সময় কাটিয়ে ফেলেছে এই নতুন শহরটায়। নতুন চাকরি, নতুন বন্ধুবান্ধব এগুলো নিয়ে দিব্য দিনগুলো কাটছে ওর। আর তার সাথে ময়ূরী। ময়ূরী শ্রীবাস্তব এত কম সময়ের মধ্যে যে এভাবে ওর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে উঠবে সেটা ভুলেও কোনোদিন আন্দাজ করতে পারেনি অত্রি।
আজকাল সারা রাত চ্যাট করে ওরা। নিজের সারাদিনের সব জমান কথা অত্রিকে না বলতে পারলে নাকি একেবারে শান্তি পায়না ময়ূরী। অবশ্য অত্রিও তার থেকে আলাদা নয়। নিজের রোজনামচার সব খুঁটিনাটি ময়ূরীকে বলতে না পারলে ওর নিজেরও কি মন হালকা হয় নাকি! মেয়েটার বয়স হয়তো কম, কিন্তু ভাবনার গভীরতা আর জীবনের মূল্যবোধ অপরিসীম। মাঝে মাঝে ওর কথা পড়তে পড়তে অত্রির তো মনে হয় বুঝিই ময়ূরীই বয়সে বড় আর ও ছোট।
কিন্তু আচমকাই সেদিন অত্রিকে ভীষণ অবাক করে দিয়েছিল ময়ূরী। দিন দশেক আগের ঘটনা। সেদিনও বেশ অনেক রাত অবধিই চ্যাট করছিল ওরা। আচমকা সেই স্বপ্নালু শব্দগুলো ফুটে উঠেছিল অত্রির চোখের সামনে ময়ূরীর হাতের ছোঁয়ায়।
'তোমায় একটা কথা বলব অত্রি? জানি না তুমি ঠিক কীভাবে নেবে। আমাদের কখনো দেখা হয়নি তো, তাই বলতে সাহস পাইনা। আসলে আমি তো জানিও না কবে সঠিক সুযোগ পাব তোমার সাথে দেখা করার।'
'কি বলতে চাও বল। আমায় কিছু বলার জন্য এত হেজিটেড কেন করছ'? দ্রুত হাতে লিখেছিল অত্রি।
'বলব? জান, অত্রি আমি না তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। না কোনো মোহ নয়, এটা সত্যিকারের ভালোবাসা। সব সময় এটা তো জরুরি নয় যে প্রতিটা ভালোবাসার গল্প একইভাবে শুরু হবে। এটাও পৃথিবীর কোনো বইতে লেখা নেই যে প্রতিটা প্রেমিকা তার প্রেমিককে সামনে থেকে চাক্ষুষ দেখে তবেই তার প্রেমে পড়বে। প্রেমের জন্য তো শুধু প্রয়োজন একে অন্যকে জানা। একে অন্যকে বোঝা। সেটার জন্য তো আমাদের সাক্ষাতের প্রয়োজন পড়েনি। একে অন্যকে না দেখেও তো আমরা দুজন দুজনকে পুরোপুরি জানতে আর বুঝতে শুরু করেছি তাই না?'
ময়ূরীর লেখা শব্দগুলো প্রথমে যেন নিজের চোখে দেখেও বিশ্বাসই করতে পারছিল না অত্রি। যে মেয়েটাকে গোপনে এতদিন একান্তভাবে চেয়ে এসেছে ও, সেই মেয়েটা আজ নিজে থেকে ধরা দিতে চাইছে ওর ভালোবাসার বাঁধনে? এটা স্বপ্ন নয় তো? কয়েক মুহূর্ত চুপ করেছিল ও। নিজের অনুভূতিগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছিল শব্দে। তারপর কিবোর্ড চেপে লিখেছিল
'আমার মনের কথাগুলো আমি না বলা সত্ত্বেও কী করে তুমি টের পেয়ে গেলে বল তো? কী করে জেনে গেলে বড্ড বেশি ভালোবেসে ফেলেছি তোমায়? কিন্তু ময়ূরী কবে দেখা হবে আমাদের? আমি যে তোমায় না দেখে আর থাকতে পারছি না।'
'হবে অত্রি। খুব তাড়াতাড়িই হবে'। বলেছিল সেদিন ময়ূরী। এর মধ্যে ময়ূরী নিজের আরও কতগুলো ছবি পাঠিয়েছে ওকে। সেই ছবিগুলো দেখে নিজেকে ধরে রাখাটা যেন আরও বেশি কঠিন বলে মনে হয়েছে অত্রির। এত সুন্দর ময়ূরী! কোনো মেয়ে এত অপূর্ব হয়? ওর ছবিগুলো দেখার পর থেকে অপেক্ষা যেন আরও কঠিন হয়েছিল ওর। কবে ওর দু-চোখের সামনে আসবে সে স্বপ্ন পরী।
কিন্তু যাইহোক শেষমেশ অপেক্ষার অবসান হয়েছে। আগামীকালই সেইদিন। আগামীকালই দেখা হবে অত্রির সাথে তার ময়ূরী। কাল ওদের বাড়িতে কেউ থাকবে না। সবাই কোনো একটা পারিবারিক অনুষ্ঠানে যাবে বেশ অনেকটা দূরে। তাই আগামিকালকালকের দিনটাই বেছে নিয়েছে ময়ূরী। যেতে বলেছে ওর বাড়িতে। বাড়িতে কাল একাই থাকবে ও সন্ধ্যার পর। ঠিকানাও পাঠিয়ে দিয়েছে। এই ব্যাঙ্গালোর শহরেরই সেন্ট মার্ক রোডে। ওদিকটায় আগে কখনো যায়নি অত্রি, ভালো করে চেনেও না। তাই জিজ্ঞাসা করেছিল দু-একজন বন্ধুকে। তারা মোটামুটি বুঝিয়ে দিল। তবে কেউ কেউ তো এলাকাটার নাম শুনে হেসেই কুটিপাটি। তাদের বক্তব্য ওই এলাকায় নাকি নাম করা একটা 'হনটেড হাউজ' আছে। রফিক তো বলেই বসল,
'দেখিস ভাই তোর প্রেমিকা আবার কোন ভূতনী নয় তো'? হে হে হে ......
ওদের হাসি দেখে মনে মনে অত্রিও হাসছিল খুব। যেদিন এরা দেখবে ময়ূরীকে সেদিনকে তো পুরোপুরি চমকে যাবে। এমন অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে ওরা কেউ কোনোদিন দেখেছে বলে তো মনে হয় না।
ধুপধাপ করে একটা আক্সমিক শব্দে ভাবনার ঘোরটা ছিঁড়ল অত্রির। দাদা কোথাও একটা বেরোচ্ছে। তাই সশব্দে বন্ধ করল বাইরের দরজাটা। সুমন আজকাল হুটহাট করে প্রায়ই বাইরে বেরিয়ে যায় যখন তখন, বাড়িতে থাকার বেশিরভাগ সময়টাই কাটায় ব্যালকনিতে। মোটের ওপর ওর অস্বাভাবিকত্ব যেন বেড়েই চলেছে দিন দিন। কিন্তু আজকাল আর এসব নিয়ে মাথা ঘামায় না অত্রি। কারণ সুমনকে কিছু বলতে গিয়ে লাভ নেই। ও কিছু বুঝবে তো না, উলটে তাতে অশান্তি বাড়বে আরও। অত্রি আজকাল ওর সাথে দূরত্ব বজায় রেখেই চলে। এই ভালো, যে যার মতো থাকুক। কারোরই দরকার নেই অপরজনের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর। যে যার নিজের জীবনে নিজের মতো করে বাঁচুক। সম্পর্কের মিষ্টতা এতেই বজায় থাকে বেশি।
আজ কোনো কাজেই ঠিক করে মন বসাতে পারছে না সুমন। অবশ্য সেটা বসাতে পারার কথাও নয়, গতকাল সন্ধ্যার ঘোর এত সহজে কি কাটতে পারে।
দিব্যা গোমসের সাথে ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব ঘন হয়ে উঠছিল সুমনের গত দু-মাসে। দিব্যা আজকাল প্রায়ই আসে নিজের পরিত্যক্ত ওই পিয়ানোর স্কুলে। আপনমনেই পিয়ানো বাজাতে থাকে ও মায়াবী মূর্ছনার ঝড় তুলে। আর সুমন তন্ময় হয়ে শুনতে থাকে সেই সুরের হিল্লোল। প্রতিদিন বাজান শেষে জানালায় এসে দাঁড়ায় দিব্যা। হাতছানি দিয়ে ডাকে সুমনকে। সুমন নিচে নেমে যায় তৎক্ষণাৎ। নেমে আসে দিব্যাও। তারপর ওরা দুজন মিলে গিয়ে বসে দিব্যার পার্ক করে রাখা গাড়িটার ভিতর। নিজেদের মন উজাড় করে গল্প করতে থাকে ওরা। দিব্যা যেন নিজের সমস্ত জমান কথার ঝাঁপি খুলে বসে সুমনের সামনে। আসলে মেয়েটা জীবনে বড্ড একা। বাবা মা মারা গেছেন অনেকদিন আগেই, ভালোবাসার কোনো মানুষও জীবনে ধরা দেয়নি সেভাবে। এখন দিব্যা নিজের দিদির সাথে থাকে। দিদি ইংরাজির টিচার, সেও ব্যস্ত থাকে নিজের মত নিজের জীবনে। বোনকে নিয়ে খুব বেশি ভাবনা করার মতো কোন ইচ্ছা বা সময় তার নেই। দিব্যা নিজেকে ডুবিয়ে রাখত তাই বরাবরই সুরের সাধনায়। পিয়ানোই ছিল ওর সবটুকু ভালো লাগার উৎস। তাই বাবার কিনে রেখে যাওয়া এই ফ্ল্যাটেই পিয়ানোর স্কুল বানিয়েছিল ও। পিয়ানো বাজানোর শিক্ষা ও ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিল আগামী প্রজন্মের ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের মধ্যে। কিন্তু সেটুকুও টিকল না শেষ অবধি। ভয়াবহ এক দুর্ঘটনায় নিজের প্রিয় ছাত্রীকে শেষ হয়ে যেতে দেখেছিল ও নিজের চোখের সামনেই। তারপর থেকেই মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল ও। নিজেকে বন্ধ করে রাখত সব সময়। আস্তে আস্তে সকলের ধারণা হয়েছিল যে দিব্যা হয়তো একেবারে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে।
তারপর ধীরে ধীরে বয়ে গেছে অনেকটা সময়। দিব্যার মনের ক্ষততেও প্রলেপ পড়েছে আর একাকীত্বের ভয়াবহতা আস্তে আস্তে ওকে মরিয়া করে তুলেছে আরও বেশি। তাই তো এভাবে ও এখানে ছুটে আসে। পিয়ানোর সুরে খুঁজে নিতে চায় আশ্রয়, অনুভব করতে চায় ওর হারিয়ে যাওয়া ছাত্রছাত্রীদের। আজ দিব্যা ভীষণ একা। একটা বন্ধুও আজ আর অবশিষ্ট নেই ওর জীবনে। এই একলা জীবনে সুমনের সঙ্গে ওর গড়ে ওঠা এই বন্ধুত্বটা মেয়েটার কাছে তাই মেঘ না চাইতে জলের মতো। ভীষণভাবে আঁকড়ে রাখতে চায় ও এই বন্ধুত্বটাকে। সুমনও হারাতে চায় না দিব্যাকে। দিব্যাকে যে নিজের অজান্তেই ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে ও। কিন্তু কখনো বলতে পারেনি। সাহসে কুলায়নি। কে জানে কী ভাবে নেবে ও! যদি বন্ধুত্বটাই হারিয়ে যায়, যদি এখানে আসাটাই বন্ধ করে দেয় ওকে ভুল বোঝে দিব্যা? সুমন যে ওকে কোনোভাবেই হারাতে পারবে না, কিছুতেই আবার ওকে হারিয়ে যেতে দিতে পারবে না অসহায়তার অন্ধকারে।
কিন্তু গতকাল আচমকাই সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল। রোজকার মতোই দিব্যার গাড়িতে বসে গল্প করছিল ওরা। দিব্যা ওর ছোটবেলার কথা বলছিল, সুমনও তাই। কিন্তু হঠাৎ নিজের কথা থামিয়ে কেমন যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ও হাত চেপে ধরেছিল সুমনের। নিজের মাথাটা সুমনের বুকে চেপে ধরে বলেছিল,
'একটা কথা বলব সুমন? তুমি পার না আবার আমার জীবনে সুন্দর একটা সময় ফিরিয়ে দিতে? তুমি পার না আমায় বিয়ে করতে? আমি জানি হয়তো আমি তোমার যোগ্য নই, কিন্তু বিশ্বাস কর আমি সত্যি চেষ্টা করব তোমার যোগ্য হয়ে ওঠার।' পুরো ঘটনার আক্সমিকতায় প্রথমটায় ভীষণ ঘাবড়ে গেছিল সুমন। কিন্তু দিব্যা কাঁপছিল অদ্ভুতভাবে। আর সবটা ভালো করে বুঝে ওঠার পর সুমনের বুকের ভেতরও খুশির ফল্গুধারা বইতে শুরু করেছিল যেন। ও দিব্যার হাত চেপে ধরে বলেছিল
'কে বলেছে তুমি আমার যোগ্য নও, তোমার থেকে বেশি যোগ্য মেয়ে আমি আর কোনদিন কাউকে দেখিনি। তোমার মতো এমন অপূর্ব সুন্দরী, এমন চমৎকার শিল্পী ভু ভারতে আছে কিনা সন্দেহ। আমি তো সেই কবে থেকেই তোমার প্রেমে নিজেকে হারিয়ে বসে আছি দিব্যা। শুধু বলে উঠতে পারিনি সাহস করে'।
'সত্যি? সত্যি বলছ সুমন'? চোখে একরাশ খুশি আর বিস্ময় নিয়ে বলেছিল সে। তারপর নিজের ঠোঁটটা ডুবিয়ে দিয়েছিল সুমনের ঠোঁটে। সুমনও হারিয়ে ফেলেছিল নিজেকে। তারপর কখন যেন ভালো লাগার তাপে পুড়তে পুড়তে দুটো শরীর মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল গাড়ির মধ্যেই।
রমণ শেষে নিজেকে কেমন যেন পাগল পাগল লাগছিল সুমনের। এই প্রথম কোনো নারী শরীরকে পাওয়া, তাও আবার সেই নারী যে কিনা স্বপ্নচারিণী। দিব্যার মোম পেলব শরীরে নিজেকে ডুবিয়ে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছিল ও। মনে হচ্ছিল এই সুখের মুহূর্ত যদি থমকে স্থির হয়ে যেত কী ভালোই না হত তাহলে!
'আমি আসি সুমন আজ। অনেকটা দেরি হয়ে গেল'। নিজের গাউন ঠিক করতে করতে বলেছিল দিব্যা।
'কিন্তু দিব্যা আমি যে তোমায় ছেড়ে আর থাকতে পারব না। আমার যে সর্বক্ষণের জন্য তোমাকে চাই'। দিব্যার ঘাড়ে গভীর একটা চুমু খেয়ে বলেছিল সুমন।
'তাহলে আমায় বিয়ে করে নিয়ে এস তোমার কাছে'। খিলখিল করে হেসে উঠে বলেছিল দিব্যা গোমস।
'চল, এক্ষুনি বিয়ে করি আমরা'।
'ধুস! ওভাবে হয় নাকি। আগে তোমায় আমার বাড়িতে গিয়ে আমার দিদির কাছ থেকে চেয়ে নিতে হবে আমায় । তবেই না বুঝব তুমি কত বাহাদুর।'
'বেশ। চল। এখনি চল তোমার দিদির কাছে।'
'না এখন নয়। কাল। আগামীকাল তুমি এস আমার বাড়িতে। কাল সন্ধার পর দিদি বাড়িতেই থাকবে। আমার বাড়ি সেন্ট মার্ক রোডে। বুঝলে।'
'কী? সেন্ট মারক্স রোড? মানে সেখানে এটা ভূতুড়ে বাড়ি'... সুমনের কথাটা শেষ হবার আগেই দিব্যা কঠিন গলায় বলে উঠেছিল।
'বোকা বোকা কথা বল না সুমন। সেন্ট মারক্স রোড এর সব বাড়িই নিশ্চয় ভূতুড়ে নয় তাই না'?
দিব্যার রাগত স্বরের সামনে পলকেই নিভে গেছিল ও। শুধু মাথা নেড়েছিল ছোট্ট করে।
হ্যাঁ আজই সেই দিন। আজই সেন্ট মার্ক রোডে দিব্যার বাড়ি যেতে হবে সুমনকে। দিব্যার দিদির সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভালোবাসার কথা জানিয়ে চেয়ে নিতে হবে ওকে সারাজীবনের জন্য। অল্প বুক দুরু দুরু ওর করছে বইকি! কিন্তু সেই জন্য তো পিছিয়ে গেল চলবে না। আজ যেতেই হবে সুমনকে, দিব্যাকে নিজের করে পাবার প্রথম পদক্ষেপে আজ যে করেই হোক সফল হতেই হবে ওকে।
বিছানায় শুয়ে ছটফট করেই চলেছে কল্যাণী। গত পরশু থেকেই কেন কে জানে মনটা মারাত্মক কু গাইছে। সুমন আর অত্রি দুই ছেলেরই হাব ভাব, মতি গতি কেমন যেন বড্ড বেশি অন্যরকম লাগছে আজকাল ওর। দুজনেরই কলকাতায় এর মধ্যে আসারও কোনো নামগন্ধ নেই। দুই ভাইয়েরই নাকি ভীষণ চাপ কাজের। কে জানে হয়তো সত্যি তাই। আর খামোখা মিথ্যা বলতেই বা যাবে কেন ওরা। আসলে নিজের মনটাই সব সময় বড্ড অস্থির হয়ে থাকে কল্যাণীর। সত্যি কথা বলতে কী ও তো কোনোদিনই চায়নি সুমন বা অত্রি কেউই কোনোভাবে পা ও রাখুক ওই ব্যাঙ্গালোর শহরটায়। ওই শহরের নামটা শুনলেই যে অসম্ভব একটা আতঙ্কের দলা আজও পাক দিয়ে ওঠে কল্যাণী বসুর মনে। ঠিক দশ বছর আগেই যে ঐ শহরেই মর্মান্তিকভাবে শেষ হয়ে গিয়েছিল কুণাল।
কুণাল, মানে কুণাল বসু। কল্যাণীর একমাত্র আদরের ছোট দেওর, সুমন আর অত্রির ছোট কাকা। কুণাল তার দাদার থেকে প্রায় সতেরো বছরের ছোট ছিল। মানে অনেকটাই বয়সের ব্যবধান আর কী। কল্যাণীও কুণালকে একেবারে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো ভালোবাসত। কল্লোল মানে সুমন আর অত্রির বাবা অকালে চলে যাবার পর কুণাল সেই কম বয়সেই যেন আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছিল ওদের অভিভাবক। সুমন আর অত্রি দুজনেই ভীষণ ভালোবাসত তাদের ছোট কাকাকে আর কুণালও চোখে হারাত নিজের দুই ভাইপোকে। কল্যাণী বারবার বলত—
'এবার একটা বিয়ে করে ঘরে বউ নিয়ে আয় কুণাল'। কিন্তু সে ছেলে কথা কানে নিলে তো। সবকিছু বড্ড সুন্দরভাবে চলছিল। ভীষণ সুন্দর সাজানো, গোছানো আর পরিপাটিভাবে এগোচ্ছিল সবকিছু। কিন্তু বিধাতা পুরুষের বোধহয় পরিকল্পনা একেবারে অন্যরকমই কিছু ছিল।
হঠাৎ একদিন আচমকা কুণালকে বদলি করে দিল ওর অফিস ব্যাঙ্গালোরে। ইচ্ছে না থাকলেও কুণাল বসুকে নিজের প্রিয় শহর ও কাছের মানুষদের ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল সেই ব্যাঙ্গালোর শহরে। তারপরই সবকিছু এলোমেলো হতে শুরু করল ওদের জীবনে। কুণাল চলে যাবার পর পর প্রথমদিকে সব ঠিকই ছিল। যথেষ্ট ঘন ঘন ফোন করত সে, বাড়ির সকলের পর্যাপ্ত খোঁজখবরও নিত, টাকাও পাঠাত নিয়মিত। কিন্তু বছর খানেক পর থেকেই বদলাতে শুরু করল ছবিটা। আস্তে আস্তে কুণাল যেন দূরে সরতে সরল করল বড্ড বেশি। কলকাতায় সে বেশি আসতেও চায় না, বাড়িতে খুব একটা বেশি ফোনও করে না। তবে হ্যাঁ টাকা পাঠায় সে নিয়মিত। কিন্তু কল্যাণী বা তার ছেলেরা কবেই শুধু টাকার প্রত্যাশী ছিল! বাড়ির আপনজনই যদি এভাবে দূরে সরতে শুরু করে তাহলে কি আর মানতে চায় মন? সুমন, অত্রি, কল্যাণী সবাই ভিতরে ভিতরে ভীষণ কষ্ট পাচ্ছিল চেনা মানুষটার আচমকা এই বদলে। সুমন তবুও নিজে থেকেই ফোন করত ছোট কাকাকে মাঝে মাঝে। কিন্তু কুণাল বেশি কথাই বলতে চাইত না ঠিক করে। সব সময়ই তার মধ্যে অদ্ভুত এক পালাই পালাই ভাব। তবুও এর মধ্যেই সে একদিন জানাল সে ফ্ল্যাট কিনেছে নতুন, ব্যাঙ্গালোর শহরেই। ফ্ল্যাট কেনার এই খবরটা শুনে বেশ খানিকটা অবাক হয়েছিল কল্যাণী। হ্যাঁ এটা ঠিক যে কুণাল যথেষ্ট বড় চাকরি করে, কিন্তু তাই বলে আচমকা একটা অচেনা শহরে দুম করে একটা ফ্ল্যাট কিনে ফেলল! এমনিতেই তো নাকি ব্যাঙ্গালোরে এখানকার থেকে সব কিছুর দামই অনেকটা বেশি। হঠাৎ করে এত বেশি টাকা কোথা থেকে পাচ্ছে কুণাল? প্রশ্নটা মনে সেদিন বারবার হানা দিলেও এটা ওকে জিজ্ঞাসা করে উঠতে পারেনি কল্যাণী। যত যাই হোক কুণাল পরের ছেলে, আর তা ছাড়া সে যখন সচেতনভাবেই জেনে বুঝে দূরত্ব তৈরি করতে চাইছে পুরোনো সম্পর্কগুলোর সাথে সেখানে ওকে ব্যাক্তিগত প্রশ্ন করাটা তো একেবারেই উচিত নয়। এই ভাবনা থেকেই সেদিন থেমে গেছিল কল্যাণী। কিন্তু অত্রি তার কাকাকে আবদার করে বলেই বসেছিল
'ছোটকা আমাদের তোমার নতুন ফ্ল্যাটে নিয়ে যাবে না'?
'না এখন নয়। এখনও সেই সময় আসে নি। যদি মনে করি উপযুক্ত সময় এসেছে, তখন নিশ্চয় বলব'। মুখের ওপর অত্রিকে সেদিন বলে দিয়েছিল ওর ছোট কাকা। এই ঘটনার পরেই নিজেকে একেবারে সরিয়ে নিয়েছিল অত্রি আর কুণাল, আর কল্যাণী তো গুটিয়ে গেছিল আগেই।
তারপর প্রায় সাত মাস একেবারে কোনো যোগাযোগ ছিল না ওদের কুণালের সাথে। কিন্তু সেই দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার পরেই হঠাৎ বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একদিন আছড়ে পড়েছিল মারাত্মক দুঃস্বপ্নের মতো বিপর্যয়টা। হঠাৎ একদিন খবর এল কুণাল নাকি খুন করেছে। হ্যাঁ খুন, মানুষ খুন। মানুষ খুনের অভিযোগ। পঁচাত্তর বছরের এক বৃদ্ধা মহিলাকে নাকি তার বাড়ির ভিতরে ঢুকেই খুন করেছে কুণাল। সেই মহিলা আর তার বৃদ্ধা দিদি থাকতেন ওই বাড়িতে। তার দিদির চোখের সামনেই মেরে ফেলা হয় ডোলসি নামের ঐ বৃদ্ধাকে।
'না এটা হতে পারে না'... এটাই ছিল কল্যাণীর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া খবরটা পাবার পর। হ্যাঁ সত্যি তো, কুণাল কিনা মানুষ খুন করেছে! এটা কী করে সম্ভব? ছেলেদের কলকাতায় রেখেই সেদিন ব্যাঙ্গালোর ছুটেছিল কল্যাণী। তাকে যে জিজ্ঞাসা করতেই হত কুণালের মুখোমুখি হয়ে কেন এ সর্বনাশ করল সে? কিন্তু সে সুযোগ আর কোনোদিন পায়নি কল্যাণী। কারণ কুণালের সাথে তো আর দেখাই হয়নি কখনো। ওই খুনের রাতের পর থেকেই আশ্চর্যজনকভাবে উধাও হয়ে গিয়েছিল কুণাল। না আর তাকে পাওয়া যায় নি। কেউ জানে কী পরিণতি হয়েছে তার।
কিন্তু কল্যাণীর টানাপোড়েন হয়েছিল বিস্তর। থানা, পুলিশ, উকিল, কেস, কোর্ট। সবই হয়েছিল, শুধু খোঁজ আর মেলেনি কুণালের। তদন্তে উঠে এসেছিল নানা তথ্য। জানা গেছিল কুণাল নাকি মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছিল আস্তে আস্তে, তা ছাড়া কোনো কুচক্রেও নাকি জড়িয়ে গেছিল সে। সম্ভবত কোনো মাফিয়া গ্যাঙে। সেই মাফিয়া গ্যাং এর কুনজর ছিল ডোলসি নামের ওই বৃদ্ধার বসত বাড়িটার প্রতি। সম্ভবত তারাই কুণালকে ব্যবহার করেছিল এই কাজে। অন্তত প্রাপ্ত তথ্যসূত্র সেই রকমই ইঙ্গিত দিয়েছিল।
আজও কল্যাণী ভাবে সত্যি কি মানসিক ভারসাম্য হারাচ্ছিল কুণাল? কিন্তু কেন? কিসের অভাব ছিল তার? কেন সে বাড়ির কাউকে কিচ্ছু জানতে দিল না? তবে কি ওকে কোনোরকম ভয় দেখিয়ে কেউ যুক্ত করেছিল মাফিয়া দলে? সেই মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরেই আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছিল সে? না হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর কোনোদিন আর পাওয়া যাবে না। হয়তো কুণালও আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। দশ বছর তো কেটে গেল। ২০০২-তে মরে গেছিল ডোলসি, আর আজ ২০১২। তবে ডোলসির মৃতদেহ নাকি কবরস্থ করা হয় ওদের ঐ বাড়িরই চৌহদ্দিতে। বোনের মৃত্যুর পর নাকি নিখোঁজ হয়ে যায় তার দিদি ভিরাও। কিন্তু ওদের সেই বাড়ি নাকি আজও রয়ে গেছে একই ভাবে। অনেকেই বিশ্বাস করে ব্যাঙ্গালোর শহরের সেন্ট মারক্স রোডের ওই বাড়িতে আজও নাকি গুমরে রয়েছে ওই বৃদ্ধার অতৃপ্ত প্রতিশোধকামী আত্মা। সে নাকি নিজের হিসাব না মিটিয়ে কাটাতেই পারবে না এই ইহলোকের মায়া। স্থানীয় অনেকেই মনে করেন এমনটা, শুনেছে কল্যাণী। সেই জন্যই তো আরও বেশি ভয়ে বুক কাঁপে ওর। ছেলেদুটো যে একেবারে ওই শহরের বুকেই রয়েছে। এমনকী কুণালের ওই ফ্ল্যাটেই থাকে এখন ওরা। ওদের কোনো বিপদ হবে না তো? ওরা ভালো থাকবে তো? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই আবার কেমন যেন ধক কর উঠল ওর বুকের ভিতরটা।
সন্ধ্যা নেমে গেছে ব্যাঙ্গালোর শহরের অলিতে গলিতে। কেমন যেন গুমোট গরম ছড়িয়ে রয়েছে আজ চারিদিকে। মনে হচ্ছে যেন আসন্ন কোনো ঝড়ের প্রতীক্ষায় নিঃশব্দে প্রহর গুনছে প্রকৃতি। বুকের ভেতর অসম্ভব তোলপাড় চলছে আজ সুমনের। আজ প্রথমবার দিব্যার বাড়িতে যাচ্ছে ও। দিব্যার দিদির সাথে কথা বলে আজ চেয়ে নিতে হবে ওকে।
দিব্যার ঠিকানা মিলিয়ে অবশেষে সঠিক পথে এসেই পড়েছে সুমন। সেন্ট মারক্স রোড। এই রাস্তাটার নাম শুনে প্রথমেই বেশ চমকে উঠেছিল সুমন। এই এলাকার কোন একটা বাড়িতেই তো ঘটেছিল দশ বছর আগের সেই বিভীষিকাময় ঘটনাটা। ছোটকাকা! আজও যেন বিশ্বাস হয় না সুমনের। ছোটকাকা সত্যি খুন করেছিল এক বৃদ্ধাকে! ছোটকাকা মাফিয়া চক্রে জড়িয়েছিল সত্যি? সত্যি সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছিল? অথচ একেবারে কিছু টের পেল না ওরা? আর সত্যি সে একেবারে হারিয়েও গেল ওদের জীবন থেকে! ফিরেই এল না আর। কোথায় হারিয়ে গেল জলজ্যান্ত একটা মানুষ? পুলিশের ভয়ে গা ঢাকা দিয়েছিল? নাকি তার নিজের দলেরই কেউ প্রমাণ লোপাট করতে সরিয়ে দিল চিরতরে তাকে? দ্বিতীয়টাই বোধহয় হবে। বেঁচে থাকলে গত দশ বছরে একবারও সামনে আসত না সে?
আনমনে চলতে চলতে হঠাৎ এবার সুমন খেয়াল করল ও এসে পৌঁছে গেছে সঠিক গন্তব্যে। বুক পকেট থেকে ঠিকানাটা বের করল এবার। ওই তো ওই তো দিব্যার বাড়িটা। এবার একটু দ্রুত গতিতে পা চালাল সুমন। অল্প একটু এগোতেই চমকে গেল ও। দিব্যা দাঁড়িয়ে আছে রাস্তায়। ওর পরনে হালকা নীল গাউন, কানে ঝোলান দুল আর ঠোঁটে দামী লিপস্টিক।
'সুমন, তুমি এসে গেছ। আই অ্যাম সো হ্যাপি। আমি যে কতকাল ধরে এই দিনটার অপেক্ষা করছিলাম তুমি ভাবতেই পারবে না।' এবার এগিয়ে এসে দিব্যা হাত ধরল ওর।
'কিন্তু দিব্যা, তুমি এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি করছিলে'?
'তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম তো আমি। আমি নিজে হাত ধরে তোমায় নিয়ে যেতে চাই আমার বাড়িতে'। এবার সুমনের হাত ধরে এগিয়ে চলেছে দিব্যা গোমস। আর সুমনও কেমন যেন মোহগ্রস্তের মতো এগিয়ে চলেছে ওর সাথে পায়ে পা মিলিয়ে। কেমন যেন সম্মোহিতের মতো লাগছে ওর নিজেকে। নিজের বুদ্ধি, মস্তিষ্ক, ভাবনা সবকিছুই যেন মুহূর্তের মাঝে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।
ফটক পেরিয়ে নিজের বাড়ির চৌহদ্দিতে এবার ঢুকল দিব্যা। সুমনও চলেছে ওর পিছু পিছু। বাড়িটা যে বেশ পুরোনো সেটা দেখলেই বোঝা যায়, অযত্নের ছাপও সেখানে সুস্পষ্ট। গাড়ি বারন্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছে দিব্যার প্রিয় গাড়িটা। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল দিব্যা। থেমে গেল সুমনও।
'কি হল দিব্যা'? জিজ্ঞাসা করল সুমন।
'সুমন, আমার খুব ভয় করছে জান। সে আসছে সুমন। সে কেড়ে নেব আমায় তোমার কাছ থেকে। সে আলাদা করে দেবে আমাদের চিরদিনের মতো। কিন্তু তোমায় ছেড়ে যে আমি বাঁচতে পারব না'। সুমন দেখল হঠাৎ একটা অদ্ভুত, অপার্থিব ভয় যেন কাবু করে ফেলেছে দিব্যাকে। ভীষণ ভাবে কাঁপছে ও।
'কে? কে আলাদা করবে আমাদের? কার কথা বলছ তুমি?'
'আছে। সে আছে একজন। সে আসছে সুমন। প্লিজ তুমি বাঁচাও আমায়'। সুমনকে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরল এবার দিব্যা।
'কেউ আমাদের আলাদা করতে পারবে না দিব্যা। আমি আছি তো তোমার সঙ্গে।'
'সত্যি বলছ তুমি? আই লাভ ইউ সুমন। আই লাভ ইউ সো মাচ'। এবার দিব্যা পরম আশ্লেষে চুমু খাচ্ছে সুমনকে। পাগল হরিণীর মতো ব্যস্ত হাতে উন্মুক্ত করছে সুমনের শার্টের বোতামগুলো। সুমনও বুঝতে পারছে নিজের স্নায়ুর ওপর থেকে ও নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে পুরোপুরি। দিব্যার আলিঙ্গন, স্পর্শ সবকিছু পুরোপুরিভাবে নিজের মধ্যে মিশিয়ে নিতে চাইছে ও। আর যেন কিছুই খেয়াল নেই ওর । মনেও নেই আজ এই বাড়িতে আসার ওর আসল উদ্দেশ্য কী?
ওকে টানতে টানতে এবার গাড়ি বারন্দার দিকে নিয়ে যাচ্ছে দিব্যা। সুমনও এগিয়ে চলেছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। ওর যে এক্ষুনি দিব্যাকে চাই। পুরোপুরি ভাবে। দিব্যার ঠোঁটটা কামড়ে ধরেছে এবার সুমন। দিব্যাও নিজের ঠোঁট মিশিয়ে দিচ্ছে ওর ঠোঁটে। কাঁপা হাতে এবার ও টান মারতে গেল দিব্যার গাউনের সরু ফিতায়। এক্ষুনি ওই আবরণ যে সরাতেই হবে ওকে। কিন্তু হল না। ঠিক সেই মুহূর্তেই একটা বাজখাঁই চিৎকার আছড়ে পড়ল ওর কানে, একটা অতি পরিচিত গলায়।
'ময়ূরী ইউ ব্লাডি চিটার'। অত্রি। এটা তো অত্রির গলা। এই ছেলেটা পিছু করতে করতে এখানেও চলে এসেছে! এত কেন কৌতূহল ওর সুমনকে নিয়ে? বাজখাঁই চিৎকারের সাথে সাথেই দিব্যা ছিটকে সরে গেল সুমনের থেকে। ভয়ার্ত গলায় বলল
'সুমন এসে গেছে সেই শয়তানটা। এর কথাই আমি বলছিলাম। এ আমায় মেরে ফেলতে চায়, তোমায় কেড়ে নিতে চায় আমার থেকে।'
সুমন কোনো উত্তর দেবার আগেই অত্রি হনহন করে এগিয়ে এল দিব্যার দিকে। সপাটে এক চড় কসাল ওর গালে। অত্রিকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাথায় খুন চেপে গেছে ওর। পিশাচের মতো চিৎকার করে ও বলল,
'কেন? কেন আমায় ঠকালে? কেন নোংরামি করছ আমাদের দুই ভাইয়ের সাথে? কী ক্ষতি করেছি আমরা তোমার?'
দিব্যা কিছু বলার আগেই আবার অত্রি মারতে গেল ওকে। কিন্তু এবার ওর হাত সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরল সুমন।
'অত্রি, এত বড় স্পর্ধা তোর? তুই আমার সামনে আমার ভাবী স্ত্রীয়ের গায়ের হাত তুলছিস! আজ তোকে শেষ করে ফেলব আমি''।
'ভাবী স্ত্রী? কে ভাবী স্ত্রী? এই প্রতারকটা? এই মেয়েটা একটা ভণ্ড দাদা। এ কোন মায়াবিনী। কারোর নির্দেশে এ ক্ষতি করছে আমাদের। তুই জানিস, এই মেয়েটাই আমার সাথে দিনের পর দিন চ্যাট করেছে ময়ূরী নাম নিয়ে। নিজের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করে গেছে, আমায় বোকা বানিয়ে গেছে। এই আকাশি গাউন পরেই ও নিজের ছবি পাঠিয়েছিল আমায়। এই গাড়িটার সামনে দাঁড়িয়েও ও ছবি তুলে দিয়েছিল আমায়। আমার সাথে ভালোবাসার নোংরা খেলা চালানোর সাথে সাথে আবার তোকেও ফাঁসিয়েছে। কিন্তু আর হবে না। আমি চিনে নিয়েছি এই নোংরা মেয়েটাকে'। তাই এবার অত্রি এগিয়ে গেল দিব্যার পার্ক করে রাখা গাড়িটার দিকে, যেটার মধ্যে এখন লুকিয়ে ঢুকে বসে আছে দিব্যা।
'না, অত্রি না। তুই আর এক পা এগোবি না আমি বলে দিলাম। তুই যদি দিব্যার দিকে আর এক কদমও এগোস তাহলে তোকে কিন্তু শেষ করে দেব আমি'। কিন্তু অত্রির কোনো হেলদোল হল না। উন্মত্তের মতো ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে চলেছে ও।
'সুমন, আমায় বাঁচাও তুমি। প্লিজ শেষ করে ফেল এই শয়তানটাকে''। অদ্ভুত আর্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল এবার দিব্যা। আর অমনি কী যেন একটা ওলটপালট হয়ে গেল সুমনের মাথার মধ্যে। দৌড়ে গিয়ে ও হাতে তুলে নিল একটু দূরে পড়ে থাকা জঞ্জাল সাফাই করার কোদালটা। সেটা নিয়েই হিংস্র গতিতে একলাফে ও ঝাঁপিয়ে পড়ল অত্রির ওপর। ঝপাং করে এক কোপে ও নামিয়ে দিল নিজের ছোট ভাইয়ের মাথাটা ধড় থেকে। এক খাবলা রক্ত এসে ভিজিয়ে এল ওকে মুহূর্তের মাঝে। নিজের সহোদরের রক্তে লাল হয়ে গেল সুমন।
'আ আ' একটা যন্ত্রণাময় কাতর চিৎকার দিয়ে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে অত্রি। কয়েক মুহূর্ত ছটফট করল ওর মুণ্ডু কাটা দেহটা। তারপর নিথর হয়ে গেল প্রাণহীন শরীরটা ক্রমে ক্রমে।
হি হি হি খিল খিল করে হাসছে এবার দিব্যা। গাড়ির মধ্যে থেকেই এবার মুখ বাড়াচ্ছে ও। এখন সে সম্পূর্ণ নগ্ন। সুমনকে এবার হাতছানি দিয়ে ডাকল ও। চোখে চটুল ইশারা। আদিম খেলায় মাতার আহবান জানিয়ে সুমনকে ডাকছে সে। সুমনের ঠোঁটেও এখন বিজয়ী নায়কের হাসি। ভালোবাসার মানুষের মনের ভয়, তার শত্রুকে শেষ করে দিতে পেরেছে ও। দিব্যার আহ্বানে যে এক্ষুনি এবার সাড়া দিতেই হবে ওকে। হাসতে হাসতেই এবার ওই গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল সুমন। নগ্ন দিব্যার শরীরের ওমে মিশিয়ে দিল নিজেকে।
ভাড়ার ক্যাব সাঁইসাঁই করে ছুটছে আধুনিক ব্যাঙ্গালোর শহরের রাস্তা দিয়ে। পিছনের সিটে কাঠের পুতুলের মতো বসে রয়েছে কল্যাণী। পাশেই এলিয়ে পড়ে রয়েছে ওর বড় ছেলে সুমন, যে সদ্য মানসিক হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেল আজ। দীর্ঘ সাত বছর মানসিক চিকিৎসা চলেছে সুমনের, তারপরে আজ হয়তো কিছুটা ঠিক হয়েছে ও। ২০১২ থেকে ২০১৯, মাঝের এই সাতটা বছরের প্রতিটাদিন দুঃস্বপ্ন যাপন করেছে কল্যাণী প্রতিটা মুহূর্তে বা বলা ভালো এখনও করে চলেছে সেই দুঃস্বপ্ন যাপন।
বিভীষিকাময় সেই দিনটা আজও যেন প্রতি ক্ষণে তাড়া করে বেড়ায় ওকে। একটা টেলিফোন। শুধু একটা টেলিফোন এক মুহূর্তে তছনছ করে দিয়েছিল কল্যাণীর জীবনটা ২০১২ সালের কোন একটা দিনে।
'হ্যালো আপনি কি মিসেস কল্যাণী বোস বলছেন? আমি ব্যাঙ্গালোর পুলিশ থেকে বলছি'। বুক কেঁপে উঠেছিল কল্যাণীর। থরথরে কাঁপা গলায় ও বলেছিল
'কি হয়েছে'?
'মার্ডার। আপনার ছোট ছেলে খুন হয়েছে'।
'না, এটা হতে পারে না'। চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়েছিল কল্যাণী। কিন্তু এটাই হয়েছিল। খুন হয়েছিল অত্রি। আর খুনি অন্য কেউ নয়। খুনি তার নিজেরই বড় ভাই সুমন। ব্যাঙ্গালোর এর একটা পরিত্যক্ত, তথাকথিত ভূতুড়ে বাড়িতে সুমন নৃশংসভাবে খুন করেছিল নিজের ছোট ভাইকে। ওই ভর সন্ধ্যাবেলায় ওরা ঐ বাড়িতে কেন গিয়েছিল আজও জানা যায়নি। কারণ কোনো কিছু জানানোর অবস্থায় ছিল না সুমন। সে যখন ধরা পড়ে ওই বাড়ি থেকে সে তখন বদ্ধ উন্মাদ। রক্ত মেখে নগ্ন শরীরে পড়েছিল সে? বাড়িতে পড়ে থাকা একটা পুরোনো গাড়ির ভিতরে। পুলিশ তাকে উদ্ধার করে এক অদ্ভুত অবস্থায়। সে তখন এমন ভাবে পড়েছিল যেন ওই পরিত্যক্ত গাড়িটার সাথেই রমণরত সে।
বহুদিন আগে ওই বাড়িতেই থাকত দুই বৃদ্ধা বোন। ডোলসি আর ভেরা। যে ডোলসি খুন হয়ে যায় দশ বছর আগে আর নিরুদ্দেশ হয়ে যায় ভেরা। ওই ডোলসির প্রিয় গাড়ি যে আজও পড়ে আছে এখানে। সেই গাড়িতেই তো পাওয়া গেছিল সুমনকে। স্থানীয় সকলে সবাই বলে ওই বাড়ি ভূতের বাড়ি। আজও নাকি ডোলসির অতৃপ্ত আত্মা বন্দি আছে ও বাড়িতে। ওখানেই যে আজও সমাধিস্থ রয়েছে ওর মৃতদেহটা। মাঝে মাঝেই নাকি মাঝরাতে পিয়ানো বাজার শব্দ ভেসে আসে ওই বাড়ি থেকে। ওই মায়াবী মূর্ছনা নাকি ডোলসিরই মায়া যাদু। সেও যে পিয়ানোর টিচারই ছিল।
হ্যাঁ এটাই সেই ডোলসি যাকে নাকি দশ বছর আগে গুলি করে মেরে ফেলেছিল কুণাল, মানে সুমন আর অত্রিরই ছোটকাকা। আবার সেই বাড়িতেই আজ ভাইয়ের হাতে ভাই মরল! তবে কি ডোলসির অতৃপ্ত আত্মাই কোনো ছলনায় প্রতিশোধ নিল তার খুনির পরবর্তী প্রজন্মের প্রতি? এই একই প্রশ্ন বারবার কল্যাণীকে দংশন করেছে গত সাত বছর ধরে। কিন্তু কোনো উত্তর পায়নি ও।
সুমনের খুনের কোনো শাস্তি আইনের মারফৎ হয়নি। কারণ সুমন যখন খুন করেছিল তখন সে ছিল বদ্ধ পাগল। বিচারেই প্রমাণ হয়েছিল সেটা। গাড়ির সাথে রমণ এর প্রচেষ্টাও নাকি একটা বীভৎস মানসিক ব্যাধি যার বৈজ্ঞানিক পরিভাষার নাম ল্যুভার ব্রুসি সিনড্রোম। বিচার চলেছিল সুমনের অনেকদিন ধরে। কিন্তু ঐ পাগল যে শুধু একরাশ অসংলগ্ন কথা ছাড়া আর কিছুই বলতে পারে না, তার আর কি শাস্তি হবে! পাগলা গারদের অন্ধকূপ ছাড়া তার আর কিই বা ঠিকানা হতে পারে। এই ব্যাঙ্গালোর শহরেরই এক মেনটাল রিহ্যাবে জায়গা হয় সুমনের। দীর্ঘ সাত বছর চিকিৎসা চলেছে তার। কল্যাণীও এই সাত বছর এই অচেনা শহরেই পড়েছিল মাটি কামড়ে। যদি ছেলেটা সুস্থ হয়! না পুরোপুরি সুস্থ হয়তো হয়নি সুমন, তবে আগের থেকে অনেকটা ভালো। তাই আজ ছুটি পেয়েছে ও আপাতত। ডাক্তাররা বলছেন খুব সতর্ক থাকতে হবে যাতে ওর কোন মানসিক চাপ তৈরি না হয়। হ্যাঁ কল্যাণী সে দিকে সতর্ক থাকবে, কারণ এই ছেলে ছাড়া পৃথিবীতে আজ আর কেউ নেই। কিন্তু ও যেমন সুমনের মা, তেমনি অত্রিও তো ওর সন্তান। সেই অত্রিকেই খুন করেছিল সুমন। কেন করেছিল? উত্তরটা যে আজও পায়নি কল্যাণী। ওর যে ভীষণ ভাবে হৃদয় ব্যাকুল হচ্ছে সুমনকে ধরে ঝাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা করতে।
'কেন সুমন? কেন করলি তুই এই সর্বনাশ'?
কিন্তু ও জিজ্ঞাসা করতে পারবে না। কারণ ডাক্তারদের কড়া নিষেধ আছে। তাই হয়তো কোনোদিনই ওর আর জানা হবে না জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্নের উত্তরটা।
এই দীর্ঘ সাত বছর, যতদিন ছেলেটা মানসিক হাসপাতালে ভরতি ছিল ততদিন এই ব্যাঙ্গালোর শহরেই পড়ে ছিল কল্যাণী। নিজের শহরে ফেরেনি, নিজের বাড়িতে ফেরেনি। পরিচিত সকলে বারবার বলেছিল ওকে ফিরে যেতে। কিন্তু ও পারেনি। যার ছেলে এই অভিশপ্ত শহরে বদ্ধ পাগল হয়ে পড়ে রয়েছে, ধুঁকে ধুঁকে লড়াই চালাচ্ছে প্রতিদিন সে কি কখনো পারে নিজের নিশ্চিত ঠিকানায় ফিরে গিয়ে সুখ নিদ্রায় ডুব দিতে! কোন মা-ই তা পারে না। তাই কল্যাণীও পারেনি। আতঙ্ক চেরা রাতের মতো কালো দিন কাটিয়েছে তিল তিল করে এই অচেনা শহরের বুকে বসে। মাঝে মাঝেই ছুটে গেছে ছেলেটাকে একটিবার দেখার আশায়। বেশিরভাগ সময়েই বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে এসেছে, আবার কখনো হয়তো বা দেখা পেয়েছে নিজের মানসিক ভারসাম্যহীন সন্তানের। রাতের পর রাত চোখের জলে বিনিদ্র রাত কাটিয়ে গেছে এক অসহায় মা, আর প্রশ্ন করে গেছে ঈশ্বরের কাছে কেন? কেন এই শহরটা তিল তিল করে কেড়ে নিল ওর সব কিছু? কেন একটা সাজান সংসার এইভাবে তছনছ করে দিল ব্যাঙ্গালুরুর মাটি?
যাইহোক, তবে আর নয়। এই অভিশপ্ত শহরে আর কোনোভাবেই থাকবে না কল্যাণী। সব ব্যবস্থা করেই ফেলেছে ও। কোনোমতে আজকের রাতটা কাটিয়ে আগামীকালই ও ছেলেটাকে নিয়ে ফিরে যাবে নিজের পুরোনো চেনা শহর কলকাতায়।
আজ ছুটি হয়েছে আমার মানসিক হাসপাতাল থেকে। আমি, মানে সুমন বোস। এতদিন ধরে সবাই পাগল মনে করে এসেছে আমায়। আমি নাকি পাগল! দিব্যা বলে নাকি কেউ নেই। আমি নাকি পাগল! হে হে। আসলে এরা নিজেরা পাগল। যে জলজ্যান্ত মেয়েটাকে আমি দিনের পর দিন ভালোবেসে গেছি সে নাকি নেই। আসলে ষড়যন্ত্র। সব ষড়যন্ত্র। আমি কি বুঝি না নাকি? অত্রির শয়তানি বরদাস্ত না করে ওকে শেষ করে ফেলেছিলাম আমি। তাই মা আমায় সহ্য করতে পারবে কেন? মায়ের যে চিরকালই ছোট ছেলে বড্ড বেশি প্রিয়। সেইজন্য তো ডাক্তারদের সাথে মিলে আমায় পাগল সাজাল মা। আমি সব জানি, সব বুঝতে পারি। ইচ্ছে তো করছে ঐ মহিলার মাথাটাও থেঁতলে দিতে। কিন্তু কী আর করব! হাজার হোক মা তো।
সাত সাতটা বছর আমায় ফেলে রাখল মানসিক হাসপাতালের দমবন্ধ করা নারকীয় পরিবেশে। আমি নাকি পাগল! আমি যা কথা বলি তাই পাগলামি, যা ভাবনাচিন্তা করি তাই পাগলামি। কী নরক যন্ত্রণা যে বয়ে গেছে আমার ওপর দিয়ে সেটা আমি বলে বোঝাতে পারব না। চিকিৎসার নাম করে আসলে মেরে ফেলার চেষ্টা চলেছে আমায় দিনের পর দিন। আর এই সবকিছুর পিছনে ছিল ওই একজন, যিনি নাকি আমার জন্মদাত্রী। তার নির্দেশেই হয়েছে এগুলো আমি সব জানি। ছোট ছেলের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিল সে।
কিন্তু ওদের হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও আমি মরিনি। কী করে মরতাম? আমার সাথে যে আমার দিব্যার ভালোবাসা ছিল। দিব্যার কাছে আবার ফিরে আসার জন্য তো আমায় বাঁচতেই হত। কিন্তু কোথায় আছে এখন আমার দিব্যা? কেমনই বা আছে সে? আমায় যে তার কাছে যেতেই হবে যে করেই হোক। আগামীকাল আমায় জোর করে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে মা। কিন্তু এই শহর ছেড়ে চলে গেলে আমি দিব্যার কাছে পৌঁছব কেমন করে? আমি তো তাহলে ওকে চিরকালের মতো হারিয়ে ফেলব। না, না না। এটা হতে পারে না। আমি দিব্যার থেকে কোনো ভাবেই আলাদা হতে পারব না। আমি যাব ওর কাছে। আমার হাতে বেশি সময় নেই। সময় বলতে শুধু আজকের রাতটুকুই। এর মধ্যেই যা করার করতে হবে আমায়। এখন গভীর ঘুমে আছন্ন গোটা শহর। মাও তো ঘুমাচ্ছে এখন। তাই যা করার আমায় এখনই করতে হবে। কিন্তু দিব্যাকে আমি পাব কোথায়? ও কি এখনও সেখানেই থাকে? সেই সেন্ট মারক্স রোডের বাড়িতে? হ্যাঁ তাই হবে নিশ্চয়। ওখানে গিয়েই খুঁজতে হবে আমাকে। কিন্তু ও আমায় চিনতে পারবে তো? ভুলে যায়নি তো ও আমায়?
একি! একি এটা কি শুনছি আমি? পিয়ানো! হ্যাঁ এটাই তো দিব্যার সেই মায়া সুরের মূর্ছনা। এই সুর তো শুধু আমার জন্যই বাজাতো আমার দিব্যা? তবে কি ও এসেছে? তবে কি ও নিজে থেকেই নিতে এসেছে আমায়? ও এতগুলো দিন ধরে একই ভাবে তাহলে অপেক্ষা করে গেছে আমার জন্য?
উফফ! না। কেন এত কিছু ভাবছি আমি ঘরে বসে বোকার মতো? এটা কী ভাবার সময়? এটা তো মিলনের সময়। এক্ষুনি আমায় যেতে হবে ওর কাছে। ওই মায়া সুরের মূর্ছনার রেখা ছুঁয়ে আমি ঠিক পৌঁছে যাব দিব্যার কাছে আবার।
মর্গ থেকে বেরিয়ে ধপ করে চেয়ারের ওপর বসে পড়ল কল্যাণী। চোখের সমস্ত জল বোধহয় শুকিয়ে গেছে ওর। মাথা আর কাজ করছে না। এখনও কিছুই যেন ও বুঝে উঠতে পারছে না স্পষ্টভাবে।
যেদিন সুমন ছুটি পেয়েছিল মানসিক হাসপাতাল থেকে, শুধু সেই রাতটা এই শহরে থেকে পরেরদিনই তো চলে যাবে ভেবে রেখেছিল কল্যাণী। আর এই এক রাতের মধ্যেই হয়ে গেল এত কিছু? সারাটা রাত নিজে দু-চোখের পাতা এক না করে ছেলেটাকে চোখে চোখে রাখবে এমনটাই তো ভেবে রেখেছিল ও। কিন্তু তবুও কখন নেমে এল যে চোখে সর্বনাশা ঘুম তা যে কল্যাণী টের অবধিই পায়নি।
সেই সুযোগেই ঘর ছেড়ে চুপিসারে কখন যেন বেরিয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। কেন বেড়িয়েছিল? না এই প্রশ্নের উত্তর জানা নেই। মাঝ রাতে ঘুম ভাঙার পর আর ছেলেকে খুঁজে পায়নি কল্যাণী। থানা পুলিশ, মিডিয়া নানা রকম ঝক্কির পর অবশেষে পাওয়া গেল সুমনকে চব্বিশ ঘণ্টা পর। সেন্ট মার্ক রোডের সেই অভিশপ্ত বাড়িতেই পাওয়া গেছিল সুমনকে, মানে সুমনের মৃতদেহ। এখন ওই বাড়িটা আর নেই, ভেঙে দেওয়া হয়েছে ঐ বাড়ি ২০১৪ সালে। কিন্তু ভাঙাচোরা ধ্বংসস্তূপটা রয়েই গেছে। আর তারই সাথে রয়েই গেছে ডোলসির আত্মার অতৃপ্ত হাহাকার। ওই ভগ্নস্তূপে আবার কেন ফিরে এসেছিল সুমন? শুধুই কি আত্মহত্যা করবে বলে? হ্যাঁ ওখানেই এক কোণে গলায় ফাঁস লাগিয়ে নিজেকে শেষ করে দিয়েছে ছেলেটা। প্রাথমিক তদন্ত ও অনুমানে মনে করা হচ্ছে অনুশোচনাই হয়তো এর প্রধান কারণ। আসলে সুমন নিজের ছোট ভাইকে এই জায়গাতেই খুন করেছিল সাত বছর আগে। তখন ও মানসিক ভারসাম্য হারিয়েছিল, তাই ঘটিয়ে ফেলেছিল এই বীভৎস কাণ্ডটা। কিন্তু আজ সুমন অনেকটা সুস্থ। তাই নিজের অপরাধবোধের তীব্র জ্বালা সহ্য করতে না পেরেই হয়তো ঠিক সেই জায়গায় এসেই নিজেকে শেষ করে ফেলেছে ও।
'ম্যাডাম,আপনি আজ আসুন। বডি পোস্টমর্টেম এর পর কাল পাবেন'। এক মহিলা হাসপাতাল কর্মীর গলায় কেমন যেন ঘুম থেকে জেগে ওঠার মতো করে জেগে উঠল ও। কোনোরকমে টলতে টলতে বেরিয়ে গেল হাসপাতাল থেকে। না, ও হেরে যাবে না। হেরে যাবে না ডোলসির অতৃপ্ত আত্মার কাছে। ডোলসি যেমন নিজের প্রতিশোধ নিতে শেষ করে দিয়েছে ওর দুই সন্তানকে, তেমনি কল্যাণীও ছাড়বে না। ফিরে গিয়ে আগে নিজেকে শেষ করবে ও। ডোলসির সাথে লড়তে গেলে আগে তো ওর সমকক্ষ হতে হবে। তাই নিজেকে শেষ করে এবার কল্যাণীও প্রেত হবে। তারপর শুরু হবে লড়াই। দুই প্রেতের লড়াই। সেই লড়াইতে যদি আরও কিছু মানুষ মরে তো মরুক না। কল্যাণীর তো তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। ও শুধু চায় প্রতিশোধ, সন্তানদের মৃত্যুর প্রতিশোধ। লম্বা লম্বা পা ফেলে হনহন করে এগিয়ে চলেছে কল্যাণী। এগিয়ে চলেছে মৃত্যুর দিকে, এগিয়ে চলেছে মৃত্যু পরবর্তী একটা নতুন লড়াই এর দিকে।
—সমাপ্ত—
নেপথ্য কাহিনি —মায়াবী মূর্ছনা
মায়াবী মূর্ছনা একটি সম্পূর্ণ কল্পিত কাহিনি। কিন্তু এই কল্পিত কাহিনী অনুপ্রানিত হয়েছে এক বাস্তব অভিশপ্ত ঘটনা ও কয়েকটি চরিত্র থেকে।
প্রসঙ্গ টেরা ভেরা
ব্যাঙ্গালোর বা ব্যাঙ্গালুরু বর্তমান ভারতবর্ষের এক অন্যতম মেট্রোপলিটন শহর। কিন্তু এই অতি আধুনিক শহরের বুকেই বিগত আঠারো বছর ধরে লালিত হয়ে চলেছে এক মূর্তিমান আতঙ্ক যার কথা স্থানীয় কিছু মানুষের বাইরে অনেকেই জানেন না। চলতি কথায় এই সাক্ষাৎ আতঙ্কের নাম 'টেরা ভেরা'।
Mr. E J Vaz, যিনি পেশাগতভাবে ছিলেন একজন আইনজীবী তিনি 'টেরা ভেরা' নামক বাংলোটির মালিকানা প্রাপ্ত করেন ১৯৪৩ সালে। এই 'টেরা ভেরা' এর অবস্থান ছিল ব্যাঙ্গালোর শহরের সেন্ট মারক্স রোডে।
E J Vaz মারা যাবার পর ঐ বাংলোটির মালিকানা প্রাপ্ত হন তার দুই অবিবাহিতা মেয়ে ডোলসি ভাজ এবং ভেরা। এই দুই বোন এক সাথেই ওই বাড়িতে থাকতেন এবং নিজস্ব ছন্দে দিন যাপন করতেন। ডোলসি পেশায় ছিলেন একজন পিয়ানো শিক্ষক, অপূর্ব সুন্দর ছিল তার পিয়ানো বাজানোর হাত। ভেরা ছিলেন একজন ইংরিজির টিচার।
২০০২ সালে এই ডোলসিকে কেন্দ্র করেই ঘটে যায় এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। কোন এক বুধবার এক অজ্ঞাত পরিচয় আততায়ী তাদের বাংলোতে অনুপ্রবেশ করে কোনোমতে এবং নৃশংসভাবে খুন করে ৭৫ বছর বয়সি বৃদ্ধা ডোলসিকে তার আশি বছরের দিদি ভেরার চোখের সামনেই। ভেরা আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠে নিজের বোনকে চোখের সামনে অমন বীভৎসভাবে মরতে দেখে। কিন্তু একজন ৮০ বছরের বৃদ্ধার ক্ষমতা আর কতটুকু! নিজের বোনকে খুন হতে দেখে অসহায় দর্শক হওয়া ছাড়া আর সেদিন কি বা করার ছিল ভেরার?
ডোলসির মৃত্যুর পর তাকে সমাধিস্থ করা হয় তাদের নিজেদের বাংলো অর্থাৎ টেরা ভেরা বাংলোটির বাগানের চৌহদ্দির মধ্যেই। আর ভেরাকে পুলিশ ও প্রশাসন এর তরফ থেকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কোনো একটা নিরাপদ স্থানে। কারণ সেই সময় অনুমান করা হয়েছিল যে ভেরা ভেজ ওখানে থেকে গেলে তার প্রাণেরও ঝুঁকি তৈরি হতে পারে । প্রাথমিক তদন্তের সাপেক্ষে প্রাপ্ত কিছু প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ অনুমান করে যে কোন মাফিয়া চক্র সম্ভবত হাত করে নিতে চেয়েছিল 'টেরা ভেরা', তাই ডোলসি ভেজ আর ভেরা ভেজ কে হত্যা করে ওই বাড়ির দখল নেবার কোনো জঘন্য পরিকল্পনা থেকেই হয়তো তারা বেছে নিয়েছিল এই নারকীয় পদক্ষেপ। এ ছাড়াও পুরো ঘটনায় ছিল আর একটা অন্য মোড়ও । ডোলসি ও ভেরার ছিল একজন তৃতীয় সহোদরা, যে পরিবারের সকলের অমতে বিবাহ করে নিজের জীবন অতিবাহিত করছিল তার নিজের বোনদের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়েই। এই তৃতীয় ভগিনীর সাথেও ডোলসি ও ভেরার সম্পত্তির মালিকানাগত দ্বন্দ্ব ও বাড়ির অধিকার নিয়ে নানারকম আইনি চাপান উতর ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু যাই হোক ডোলসি ভেজ হত্যা মামলার কোনো সুনির্দিষ্ট নিষ্পত্তি এখনও পর্যন্ত হয়েছে বলে জানা যায় না।
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ২০০২ সালে ডোলসির মৃত্যু এবং ভেরার চলে যাওয়ার পর থেকে পরিত্যক্ত ও শূন্য অবস্থায় পড়ে থাকতে শুরু করে তাদের সাধের বসতবাড়ি টেরা ভেরা। আর মূল ঘটনার সূত্রপাত হয় সেখান থেকেই। আশেপাশের স্থানীয় বাসিন্দারা জানাতে থাকেন ঐ পরিত্যক্ত খালি বাংলো থেকে নাকি গভীর রাতে ভেসে আসে নানা শব্দ। কখনো ওই বাড়ি থেকে ভেসে আসতে শোনা যায় পিয়ানোর ঝঙ্কার মধ্য রাতে, আবার কখনো কখনো ওই বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে অনেকেই শুনতে পান ওই অন্ধকার ফাঁকা বাড়ি থেকে চাপা গুঞ্জন যেন কোনো মানুষ চাপা স্বরে কথা বলছেন বাড়ির ভেতর থেকে। কেউ কেউ শুনতে পেয়েছেন ওই বাড়ির ভেতর থেকে কোনো বৃদ্ধার পা টেনে টেনে চলার শব্দও (ডোলসি ভেজ যখন জীবিত ছিলেন, তিনিও নাকি ঠিক এইভাবেই পা টেনে চলতেন এমনটাই জানা যায় তার পরিচিত মানুষদের থেকে)। আর শুধু তাই নয়, অনেকে বলেন গভীর রাতে একলা দাঁড়িয়ে থাকা থমথমে ওই টেরা ভেরা বাংলোর জানলায় নাকি ভেসে উঠতে দেখা যায় বীভৎস দর্শন নারী মুখের অবয়বও, যে অবয়ব আবার মুহূর্তের মাঝেই মিলিয়ে যায় বলে দাবি করেন মানুষজন।
টেরা ভেরাকে নিয়েই ক্রমেই ঘনীভূত হতে থাকে রহস্য, নানা অতিপ্রাকৃত ঘটনার কাহিনি গজিয়ে উঠতে থাকে পরিত্যক্ত এই বাংলোটাকে জড়িয়ে। আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে এই সব খবর চারদিকে। প্যারানরমাল গোষ্ঠীর লোকজনও আসেন এই বিশেষ বাংলোটির পরিদর্শনে। কিন্তু যখনই যেই আসুক না কেন, সকলেই সম্মুখীন হয়েছেন একাধিক এমন ঘটনার যার ব্যাখা সাধারণ যুক্তি বা বুদ্ধির দ্বারা করা যায়না। সকলেই প্রত্যক্ষ করেছেন যে এই টেরা ভেরা বাংলোটির ভিতরে কোনো ছবি তোলা কখনো যায় না, বাংলোর ঘরগুলির ভিতর অনুভূত হয় এক অদ্ভুত কনকনে শৈত্য ভাব একেবারে কট্টর গ্রীষ্মকালেও। অনেকে পরিদর্শকই জানিয়েছেন যে ওই বাংলোতে তারা যখনই প্রবেশ করেছেন, মনে হয়েছে যেন বিরাজমান রয়েছে এখানে এমন কারোর অপার্থিব অস্তিত্ব যাকে দেখা বা শোনা না গেলেও অনুভব করা যায় ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে বিলক্ষণ। শুধু তাই নয় বারবার বহু প্রচেষ্টার ফলেও এই বাড়ির বহু আসবাব সরান যায়নি তার নির্দিষ্ট স্থান থেকে।
ক্রমে ক্রমেই আতঙ্ক ছড়াতে থেকে টেরা ভেরা এর এই অদ্ভুত বিষয়গুলোকে ঘিরে এবং এটি মানুষের কাছে চিহ্নিত হয় ব্যাঙ্গালোর শহরের অন্যতম ভৌতিক স্থান বা Huanted Place হিসেবে।
অবশেষে ২০১৪ সালে এই বাড়িটাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় প্রশাসন ও তৎকালীন ওয়ারিশদের মধ্যস্থতায় সবরকম আইনি জটিলতা কাটিয়ে। তাই বর্তমানে টেরা ভেরা এর অস্তিত্ব আজ আর খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু অদ্ভুতভাবে আজও টেরা ভেরার ওই চৌহদ্দিতে দণ্ডায়মান অবস্থায় দেখা যায় ডোলসিভেজ এর অন্যতম প্রিয় হিলম্যান মিক্স গাড়িটিকে। এই ভিনটেজ গাড়িটি কোন এক অজ্ঞাত কারণে স্থানচ্যুত করা যায় না কোনোমতেই।
ইট কাঠ পাথরের তৈরি বাংলো টেরা ভেরার অস্তিত্ব আজ আর না থাকেলও মানুষের মনের আতঙ্ক রয়ে গেছে আজও। রয়ে গেছে অনেক অপার্থিব গুজব (?)ও। আজও নাকি ডোলসি ভেরার আত্মা খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের মৃত্যুর প্রতিশোধ। আজও তার মৃতদেহ শায়িত রয়েছে সেই একই জায়গাতেই। আজও নাকি স্থানীয় বাসিন্দারা শুনতে পান ভেসে আসছে ডোলসি ভেরার পিয়ানোর টং টাং শব্দ, তার অট্টহাসির আওয়াজ।
টেরা ভেরা ব্যাঙ্গালোর শহরের এক অন্যতম ভয়াল আতঙ্ক যাকে বিশ্বাস করেন বর্তমান প্রজন্মও। আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে ডোলসি ভেজ-এর মর্মান্তিক মৃত্যুর গল্প। এই মূল ঘটনাকেই কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আমার কল্পকাহিনি 'মায়াবী মূর্ছনা'।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন