পাখসাট

বুদ্ধদেব গুহ

কুসুমের বয়স যখন তার মেয়ে সল্লির বর্তমান বয়েসের সমান ছিল, তখন সল্লিও ছিল কুসুমের একমাত্র মেয়ে। আজকের জলপিপির-ই মতন বয়সি।

চার বছরের জলপিপি। খুব পাকা-পাকা কথা বলে। মাথাভরতি কোঁকড়া চুল। ‘গ্ল্যাক্সো’ বেবির প্রাইজ পেয়েছিল। একা বাড়িতে শেষবসন্তর দুপুরে বসে এইসব ভাবছিলেন কুসুম।

তাঁর পঁয়ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে একবার-ই আলোড়ন উঠেছিল। একজন এসেছিলেন।

অবিবাহিত পুরুষকে কি পরপুরুষ বলে? কে জানে! অত ভালো বাংলা জানেন না উনি। একজন-ই এসেছিল বটে কিন্তু সেই সম্পর্কের মাধুর্যের মধ্যে যে, গভীর এবং তীব্র দুঃখ মেশানো ছিল তা আজও কুসুম ভুলতে পারেনি। সেই মানুষটিকে একদিন দুঃখ দিয়ে এবং নিজেও দুঃখ পেয়ে সরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি তাঁর জীবন থেকে। সেই অপরাধবোধে আজও তিনি ক্লিষ্ট। কুসুম জানেন যে, ‘প্রেমের আনন্দ থাকে শুধু স্বল্পক্ষণ, প্রেমের বেদনা থাকে সমস্ত জীবন।’

তাঁদের প্রজন্মের মানুষেরা, বিশেষ করে মেয়েরা, বড়ো গোঁড়া ছিলেন। তাঁর মেয়ে সল্লিদের প্রজন্ম অনেক অন্যরকম। অসতী না হয়েও যে, সুস্থভাবে স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষদের সঙ্গে অবাধে মেশা যায়— তা ওদের দেখে বোঝেন এবং নিজেদের ঘেরাটোপের মধ্যের দানা-খাওয়া ময়নার জীবনের কথা ভেবে একধরনের দুঃখবোধও করেন। কিন্তু যে-দিন গিয়েছে তা তো আর ফিরবে না।

সেই মানুষটি তাঁর স্বামী শিরীষের বন্ধুস্থানীয়ই ছিলেন। তিনি শিরীষের-ই মতন অধ্যাপনাই করতেন। মাঝ-জীবনে বহরমপুর কলেজে, ওদের দু-জনেরই অধ্যাপক জীবনের এক অধ্যায়ে একে অন্যের কাছাকাছি এসেছিলেন। আজ অবধি, কুসুমের জীবনে সেই প্রসাদ ঘোষ একাই। একমাত্র প্রসাদ।

অকৃতদার প্রসাদও শিরীষের-ই মতন এখন অবসর নিয়েছেন কলকাতার একটি কলেজ থেকে। শিরীষের কাছে শুনেছিলন কুসুম যে, বিহারের কোডারমা শহরের কাছে ঝুমরিতিলাইয়াতে প্রসাদ জমি কিনে রেখেছিলেন প্রথম যৌবনেই। সস্তার সময় ছিল। দু-বিঘা জমি। জলের দামে। তাতে তখন থেকেই অনেক গাছগাছালিও লাগিয়েছিলেন তিনি। গাছপালা-ফুল-পাখি, খুব-ই ভালোবাসতেন মানুষটি। হয়তো নারীও। জমির চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া ছিল এবং জমি কেনার পরে পরেই সমবয়েসি একটি কাহার ছেলেকে কেয়ারটেকার রেখেছিলেন জমি এবং বাগানের। তার বাড়ি ছিল ডোমচাঁচে। কোডারমার কাছেই। তখন মাটির তৈরি এক-কামরার ঘর ছিল। শুধু একটিই। গোবর-লেপা। এখনও নাকি সেই কাহার-ই তাঁর জমি-বাড়ি এবং তাঁর নিজেরও দেখভাল করে। সেই খিদমদগারেরও চুল পেকে গেছে।

রিটায়ার করার পরে ছোট্ট পাকাবাড়ি করেছে প্রসাদ দু-কামরার, সেই ফুল-ফলন্ত জমির ওপরে। শুনেছেন কুসুম। শিরীষের কাছে লেখা প্রসাদের চিঠিতেও জেনেছেন। বসার ও খাওয়ার ঘর অবশ্য আলাদা। মানে শোয়ার-ঘর দু-টির একপাশে। চারদিকে বারান্দা। আর বাড়ির সেই কেয়ারটেকারের জন্যেও হাতার-ই অন্যপ্রান্তে বাড়ি করে দিয়েছেন। তার ছেলেকে লেখাপড়াও শিখিয়েছেন প্রসাদ। তখনকার দিনের অনেক অধ্যাপকেরাই অধ্যাপনাকে জীবনের ব্রত হিসেবে দেখতেন, নিছক-ই একটি ‘জীবিকা’ হিসেবে নয়।

কেয়ারটেকার-এর ছেলে লেখাপড়ার পাঠ শেষ করে এখন হাজারিবাগের স্টেট ব্যাঙ্কে ভালো কাজ করে। তপশিলিদের জন্যে সংরক্ষিত আসনে সহজেই কাজ পেয়ে গেছে। বিয়েও দিয়েছেন কেয়ারটেকার-এর ছেলের। তার একটি দামাল ছেলে আছে নাকি, বছর চারেকের। কুসুমের নিজের ছেলে ছিল না বলেই, একটি নাতির শখ ছিল খুব-ই। যাক, নাতনি নিয়েও তিনি অখুশি নন।

প্রসাদ সংসার করেননি বটে, কিন্তু সেই কেয়ারটেকার সময়েই করেছিল।

সেই সংসারের যাবতীয় দায়-দায়িত্বও প্রসাদ-ই নিয়েছেন।

তাই ফুল-ফলের সঙ্গে পরজাত ছেলে-বউ এবং নাতিও ফুটেছে সেই লালমাটির জমিতে সবুজ গাছগাছালির মধ্যে। প্রসাদের কোনো দুঃখ নেই। বলেন, কুসুমের স্বামী শিরীষ।

কিছু মানুষ এই সংসারে চিরদিন-ই থাকেন, সব বয়েসি, যাঁদের নিজেদের নিজস্ব দায় কিছু না থাকলেও, অন্য দায়-দায়িত্ব তাঁদের চুম্বকের মতন-ই আকর্ষণ করে।

শিরীষ, প্রসাদের সেই ঝুমরি-তিলাইয়াতেই বেড়াতে গিয়েছিলেন এবারে। একা। বহুদিনের এবং পৌনঃপুনিক নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। কুসুমকে অনেকবার বলা সত্ত্বেও কুসুম যাননি।

দুপুরবেলায় অবসরে শুয়ে শুয়ে কুসুম এইসব কথাই ভাবছিলেন। সল্লির কথা, বাজ-এর কথা, জলপিপির কথা। তাঁর পর্ণমোচী জীবনের কথা। শুধু তাঁর জীবন-ই কেন, হয়তো প্রত্যেক মানুষের জীবন-ই পর্ণমোচী। তবে শীতার্ত গাছেরা পাতা ঝরালেও পরের বসন্তে আবার নতুন, কচি-কলাপাতা-রঙা চিকন পাতাতে নবীকৃত হয়। শুধু পর্ণমোচী মানুষের-ই নবীকরণ হয় না কোনো। ভাবলে মন খারাপ লাগে।

ঠিক এমন-ই সময়ে ডোর-বেলটা বাজল, তাঁর তন্দ্রা ভাঙিয়ে দিয়ে।

কে এল এই অসময়ে কে জানে!

কুসুম উঠে বাইরের ঘরের বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ভেতর থেকে বললেন, কে?

আমি। আমি। আর কে আসবে, তোমার কাছে এই রোদে-তাতা গরমের দুপুরে? তোমার একমাত্র স্বামী ছাড়া?

বিরক্তির সঙ্গে ঠাট্টা মিশিয়ে বললেন শিরীষ।

দরজা খুলতে খুলতে কুসুম ভাবলেন, কে যে, কার কাছে আসে, কখন আসে, আর কেন আসে, তা কি কেউ বলতে পারে! স্ত্রী বলেই, পুরোনো বলেই, এমন হেলা করতে নেই। যে-কেউই যখন তখন এসে পড়তে পারে একজনের জীবনে। এসে পড়ার আগে-পর্যন্ত বোঝা যায় না।

কুসুম দরজা খোলার পরে, ওভারনাইটারটি নিয়ে ভেতরে ঢুকেই শিরীষ বললেন, ট্রেন পাঁচ ঘণ্টা লেট ছিল। বুঝলে!

খাবে কিছু?

না, না, চা খাব শুধু এককাপ। খবর তো দেওয়া ছিল না তোমাকে, তাই হাওড়া স্টেশনের রেস্তরাঁতেই খেয়ে নিয়েছি ভাত আর মাংস।

পাঁঠার মাংস? আবারও খেলে! তোমার কোলেস্টেরলটা-না বেড়েছে! পূর্ণিমা-অমাবস্যাতে হাঁটুর আর কোমরের বাতে ‘কোঁ কোঁ’ করেও শিক্ষা হয় না?

পাঁঠার মাংস ছাড়া অন্য কোনো মাংস খাবার যোগ্যতা নিয়ে তো আসিনি। নারী-মাংস বা বুদ্ধিমানের মাংস আর পাচ্ছি কই? পাঁঠার মাংস মাঝে-মধ্যে খেলে কিছু হবে না।

কুসুম তাঁর কামুক-চড়াই স্বামীর কথার উত্তর না দিয়ে, উঠে চা করতে গেলেন।

জামা-কাপড় ছেড়ে চা খাওয়ার পরে শিরীষ শুধু প্রসাদ আর ঝুমরি-তিলাইয়ার গল্পই করে চলেছেন। কত যে গল্প! তার আর শুরু-শেষ নেই।

উঃ! সত্যি কুসুম। কী আদর-যত্নটাই না করল প্রসাদটা!

তারপর বললেন, জানো, ওর বাড়িতে ওর পরলোকগতা মা ও বাবার দু-টি বড়োফোটো আছে। সবচেয়ে মজার কথা এই যে, আর একটিমাত্র আছে ফোটো।

কার?

কার বলো তো?

ঢং! আমি কী করে বলব?

আমাদের তিনজনের।

আমাদের মানে?

‘ধ্বকধ্বক’ করে উঠেছিল কুসুমের বুক।

শিরীষ বললেন, মধ্যিখানে তুমি আর দু-পাশে আমি আর প্রসাদ। মনে নেই? সেই একবার, বেড়াতে গেছিলাম আমরা একসঙ্গে। তখন সল্লি বছর চারেকের হবে। আরে সেই দার্জিলিং-এ গো! বাতাসিয়া লুপ-এর সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা আর দার্জিলিং হিমালয়ান রেইলওয়েজের টয়-ট্রেনটা চক্রাকারে ঘুরে ঘুরে লুপটিকে বেড় দিচ্ছে সাপের মতন। আশ্চর্য! সেই ছবিটিতে কিন্তু সল্লি নেই। শুধু আমরা তিন-জন। কতদিনের কথা!

তারপরেই বললেন, আচ্ছা সল্লি নেই কেন? ওকেও তো নিয়ে গেছিলাম।

ছবিটা কে তুলেছিল, মনে আছে তোমার?

কুসুম শিরীষের মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন।

না। কে?

দার্জিলিং-এর নেপালি ট্যাক্সি-ড্রাইভার। তার নাম ছিল গুরুং। নইলে তুলত কে? আমরা তিনজনেই তো ফোটোতে আছি।

ঠিক। কিন্তু এতবছর আগের কথা, তোমার ট্যাক্সি-ড্রাইভারের নামও মনে আছে? আশ্চর্য তো!

কুসুম না-বলে বললেন, আছে। মনে যা-থাকার, তা ঠিক-ই মনে থাকে। সময় কোনো ব্যাপার নয়।

তারপর মুখে বললেন, সল্লিকে যে, শিখামাসিমার কাছে রেখে গেছিলাম ল্যুইস জুবিলি স্যানাটোরিয়ামে। ভুলে গেলে? তাই সল্লি নেই ছবিতে।

আমার কিছু মনে থাকে না।

শিরীষ বলেছিলেন।

তারপর স্বগতোক্তির মতন বলেছিলেন, ভাবলেও ভালো লাগে যে, আমাদের ছবিও বড়ো করে বাঁধিয়ে কেউ অত যত্ন করে রেখেছে। সত্যি!

তারপর-ই উজ্জ্বল মুখে বলেছিলেন, প্রসাদটা কিন্তু ট্যাক্সি-ভাড়া বাবদ আমাদের একপয়সাও দার্জিলিং-এ খরচ করতে দেয়নি। সে-কথা কিন্তু মনে আছে আমার আজও।

কুসুম বলেছিলেন, আমার মনে আছে, আমি একটা হলুদ-জমি কালো-পাড়ের মুরশিদাবাদি সিল্ক-এর শাড়ি পরেছিলাম। আর কালো ব্লাউজ। সিল্কের-ই। আমার ওই একটিমাত্রই ছিল তখন সিল্ক-শাড়ি। ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশান তো তখনও অধ্যাপকদের আজকের মতন, এমন বড়োলোক করে দেয়নি! আমাদের বিয়ের সময়ে তোমাদের বহরমপুর কলেজের প্রিন্সিপালসাহেব ওই শাড়িটি দিয়েছিলেন। ভারি ভালো, ভোলা-ভালা মানুষ ছিলেন ভদ্রলোক। শাড়ি-ব্লাউজের ওপরে হলুদ-কালো চেক-চেক একটা মলিদা। পাশের বাড়ির বড়োলোক এবং বড়োমনের রিনি-বউদি ধার দিয়েছিলেন।

তাই? তা ব্ল্যাক অ্যাণ্ড হোয়াইট ফোটো তো। শাড়ির রং বোঝা যায় না। দেখলাম তো, শুধু সাদা-কালোই শুধু।

তারপর-ই বললেন শিরীষ, সত্যি! তোমরা মেয়েরা কিছু মনেও রাখতে পারো ডিটেইলস-এ। কবেকার কথা!

বলেই, বলেছিলেন, আশ্চর্য! ওর চলে-যাওয়া, বাবা-মায়ের ছবির পাশেই আমাদের তিন-জনের ছবি একসঙ্গে কেন বাঁধিয়ে রেখেছে বলো তো প্রসাদটা? আমাদের যাওয়ার সময় হয়েছে বলেই কি?

বলেই হাসলেন শিরীষ।

কুসুম বিষণ্ণ হাসি হেসে বললেন, কী করে বলব? জীবনে সহকর্মীর এই স্ত্রী ছাড়া আর কোনো মেয়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াবার সুযোগ হয়নি হয়তো তোমার বন্ধুর। তখনকার দিনের আমরা তো ওইরকম-ই ছিলাম। আমাদের দিন তো আজকের মতন ছিল না।

তারপরেই বললেন, মানুষটি বড়ো ভীতু ছিলেন। পুরুষমানুষ ভীতু হলে ভালো লাগে না। অন্তত আমার কোনোদিনও ভালো লাগেনি।

তা তোমাকে নিয়ে পালিয়ে গেলে কি প্রসাদ বীরপুরুষ বলে গণ্য হত? কে জানে! হত হয়তো।

তা কী করে বলব! নিয়ে পালালে তবেই না বুঝতাম। খুব রোমান্টিক আর অ্যাডভেঞ্চারাস হত ব্যাপারটা। কত মানুষের বুক ফেটে যেত ঈর্ষায়, কত নারী-পুরুষ, যা-নয়-তা করে গালমন্দ করত আমাকে আর তোমার বন্ধুকে। আর তাতে আমাদের সুখ-ই বাড়ত। এই পানাপুকুরের জীবনে একটা তোলপাড় হত। মাছরাঙারা চিৎকার করত, ডাহুক ডেকে উঠত, জল ছিটকে উঠে রোদের কণাতে হিরের ফুল হয়ে যেত। আহা! বেশ হত কিন্তু।

বলেছিলেন, উদাস গলাতে কুসুম।

শিরীষ বললেন, এইজন্যেই বলে, ‘স্ত্রীয়াশ্চরিত্রম দেবা ন জানন্তি, কুতো মনুষ্যা:’।

একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, জানো, আমার না...

কী? কী তোমার?

আমার একটা জিনিস খুব অবাক লেগেছিল। মানে, লাগছে এখনও।

কী? তা বলবে তো।

আমি প্রসাদের ঝুমরি-তিলাইয়ার বাড়ির এত প্রশংসা করছিলাম, ওর আদর-যত্নর, অথচ ও কিন্তু একবারও বলল না, তোমাকে একবার সেখানে নিয়ে যেতে।

একবারও বলল না?

কুসুম জিজ্ঞেস করলেন।

তারপর বললেন, নাইবা বলল, তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই।

সত্যি! শুধু সেই বাঁধানো ফোটোটার দিকে চেয়ে, মিষ্টি মিষ্টি হাসত শুধু। মাঝে মাঝে বলত, যে-দিনগুলো চলে যায় সেগুলোই সবচেয়ে সুন্দর দিন। বুঝেছিস, শিরীষ? একদিন বিকেলে হঠাৎ জিজ্ঞেস করেছিল, কুসুম কি এখনও তেমন-ই সুন্দরী ও প্রাণোচ্ছল আছে? দেখিনি প্রায় পঁচিশ বছর। তাই-না?

হয়তো বেশিই হবে।

শিরীষ বলেছিলেন।

ফোটোটা সত্যি হয়ে রয়েছে। বর্তমান হয়ে জীবন্ত।

প্রসাদ বলেছিল।

শিরীষ স্বগতোক্তির মতন বললেন, জানো, কুসুম...তারপর একদিন, মানে, এক শেষ বিকেলে...

কী?

কুসুম চোখ তুলে শুধিয়েছিলেন।

আকাশ খুব কালো করে এল। মোরব্বখেতে ঘন ঘন তিতির ডাকছিল। আমি কী জানতাম নাকি যে, ওই ঝোপগুলোর নাম ‘মোরব্বা’ আর ওই পাখিগুলোর নাম ‘তিতির’? প্রসাদ-ই চিনিয়ে দিল। তারপরেই কী বৃষ্টি যে, নামল। কিন্তু অঝোরধারে কিছুক্ষণ ঝরেই থেমে গেল। বিহারের বৃষ্টি তো! আমি আর ও বারান্দাতে বসেছিলাম। রোদ্দুরে-পোড়া মাটিতে প্রথম বৃষ্টির জল পড়ায় ‘সোঁদা সোঁদা’ গন্ধ উঠে ভেসে যাচ্ছিল বাতাসে, তারসঙ্গে নানা ফুল-পাতার গায়ের গন্ধও। তারপর হঠাৎ-ই প্রসাদ গান ধরল নীচু গলায়। আশ্চর্য! এখনও ওর গলা শুনলে মনে হয় যেন ও যুবক-ই আছে। এমন-ই তারুণ্যের দীপ্তি ওর গলাতে।

তারওপরে হঠাৎ কথাটা মনে পড়ে যাওয়াতে শিরীষ বললেন, মনে আছে, বহরমপুরে তোমরা দু-জনে প্রতিশনিবার বটুকবাবুদের লালদিঘির পারের বাড়িতে গান গাইতে? রিমি, শান্তি, মৃগেনরাও সব আসত।

আঃ, কী গান? কী গান গাইল সেটা বলো-না?

আরে আমি আবার গান-টান জানি নাকি? আমার মনে থাকে না। গান-টান তোমাদের ব্যাপার।

কুসুম শিরীষের চোখে চোখ রেখে, কেটে কেটে অতীত রোমন্থন করে বলেছিলেন, আমার মা ছোটোবেলা থেকেই বলতেন, ‘দেখ কুসুম! সব সময়েই মনে রাখবি যে, আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। উচ্চবিত্ত এবং অত্যন্ত নিম্নবিত্তদের সমাজে সবকিছুই মানিয়ে যায়। আমরা এই দুই আর্থিক শ্রেণির মধ্যে জাঁতাকলে-পড়া ইঁদুরের-ই মতন আটকে আছি। আমাদের বাড়িতে চাল-ডাল না থাকলেও ছেঁড়া শাড়ি পরে বাইরে যাওয়া বারণ। সবতাতেই আমাদের বারণ।’

একটু চুপ করে থেকে আবার বললেন, ওঁর গলার স্বর গাঢ় হয়ে এল, মা বলতেন, ‘এই জীবনে, যত বেশি ভুলতে পারবি কুসুম, তোর সংসার ততই সুন্দর হবে।’

তারপর শিরীষের দিকে ফিরে বললেন, যাই বলো আর তাই বলো, আমরা এই মধ্যবিত্তরা অধিকাংশই কিন্তু ভন্ড। জানি না, তুমি স্বীকার করবে কি না!

ধ্যাৎ।

বিরক্ত হলেন শিরীষ।

বললেন, আমি কী বললাম আর তুমি কী বুঝলে। বড়ো হেঁয়ালি হেঁয়ালি কথা বলো তুমি আজকাল। আর বড়ো তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গান্তরেও চলে যাও।

চিরদিন-ই বলতাম। তুমিই কোনোদিন বুঝতে পারোনি। তেমন করে শোনোওনি হয়তো।

তারপরেই বললেন, তা গানটা কী গাইল, মানে কোন গান, তা-ই তো বললে না।

আরে ওই তো। সব গান-ই তো সমান। বিশেষ করে তোমাদের রবীন্দ্রসংগীত।

তা বটে! রবীন্দ্রনাথের গানকে অপমান করতে এখন কত নতুন নতুন অবতারের আবির্ভাব ঘটেছে। ‘এইচ-এম-ভি’-র রবীন্দ্রসংগীতের ক্যাসেটের বিজ্ঞাপন দ্যাখো-না? সেই মহাজনেরা কেটে-ছেঁটে টেনেটুনে রবীন্দ্রনাথের সব গানকে ‘সাইজ’ করে দিয়েছেন, তোমাকে আর তাদের সঙ্গে ভিড়ে গিয়ে দলভারী করতে হবে না। কত রথী-মহারথী গায়ক।

সেইসব গায়কেরা কারা?

নাম বলে কী হবে? তুমি কাকেই বা চেনো? তা গানটা কী গাইলে তোমার বন্ধু, বলবে কি দয়া করে?

কুসুম বিরক্তির গলাতে বললেন।

ওই যে! আরে, দাঁড়াও মনে করি।

অনেক কষ্টে গানটি মনে করে ফেলতে পেরে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন শিরীষ। ‘ইউরেকা! ইউরেকা!’ বলার-ই মতন হঠাৎ গলা তুলে বললেন, মনে পড়েছে, মনে পড়েছে।

কী গান?

ও গান গাসনে গাসনে...

কুসুম মনে মনে না গেয়েই গাইলেন গানটা!

ও গান আর গাস নে, গাস নে, গাস নে।

যে দিন গিয়েছে সে আর ফিরিবে না—

তবে ও গান গাস নে।।

হৃদয়ে যে কথা লুকানো রয়েছে সে আর জাগাস নে।।

ভাবছিলেন কুসুম, ভুলেই গেছেন একেবারেই যে, তাঁরও একদিন যৌবন ছিল, অতীত বলে কিছু একটা ছিল। দাম্পত্যর অভ্যেসের বাইরেও একটি প্রেম ছিল। ভাগ্যিস শিরীষ তাঁর বন্ধু প্রসাদের কাছে গিয়েছিলেন! নইলে....। কুসুম তো ভুলেই গিয়েছিলেন যে, একদিন তিনিও মোটামুটি ভালো রবীন্দ্রসংগীত গাইতেন। শিরীষের মা ও কাকিমা তাঁর রূপ দেখে যত-না পছন্দ করেছিলেন কুসুমকে, তাঁর গান শুনে পছন্দ করেছিলেন তার চেয়ে অনেক বেশি।

কুসুম ভাবছিলেন, আজ বড়োই বিস্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি, বন্ধুর কাছ থেকে ফিরে-আসা শিরীষের ঝুমরি-তিলাইয়ার গল্প শুনে।

আকাশে মেঘ ঘনাচ্ছে। কলকাতাতেও বৃষ্টি হবে বলে মনে হচ্ছে আজ। হলেও কী! বেরসিক শিরীষের মুখে ঝুমরি-তিলাইয়ার বৃষ্টির যে-বর্ণনা শুনলেন তাতে, মন বড়ো উদাস হয়ে গেছে কুসুমের। কলকাতায় বৃষ্টি তো তেমন হবে না। এখানে মোরব্বা-খেত নেই, তিতিরপাখিরা ডাকবে না এখানে, পোড়া লালমাটিতে প্রথম বৃষ্টির জল পড়ে সোঁদা গন্ধ উঠবে না, বৃষ্টিশেষে নানা ফুল ও পাতার গন্ধ বয়ে নিয়ে হাওয়াটাও ছুটোছুটি করবে না। এখানে কিছুই নেই।

প্রসাদ তো নেই-ই!

দুই

কুসুম আর শিরীষের একমাত্র মেয়ে সল্লির বিয়ে হয়ে গেছে। বেশ কয়েক বছর হল।

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক স্বামী। নিজেও একটা স্কুলে পড়াতেন। ছেড়ে দিয়েছেন। এখন আর তেমন কিছুই করেন না। জীবনময় অবসর-ই থাকার কথা ছিল কুসুমের। কিন্তু এখন অন্য সবকিছুই কম কম হলেও, আছে। শুধু অবসর-ই নেই। আজ শিরীষ পেনশন তুলতে গেছেন। প্রতিমাসের প্রথমেই যেতে হয়।

এমনিতে প্রতিদিন-ই দুপুর দুটোর পরেই একটু অবসর পান কুসুম। দুটো থেকে চারটে। ঠিক চারটেতে উঠে শিরীষকে চা করে দিতে হয়। আজ অবশ্য করতে হবে না কারণ শিরীষের ফিরতে ফিরতে সন্ধে হয়ে যাবে। ও-পাড়াতে গেলে পুরোনো অফিসে, একবার ঘুরে আসেন, এর ঘর তার ঘরে একটু আড্ডা মেরে চা খেয়ে অবসরপ্রাপ্ত জীবনের একঘেয়েমি আর অনন্ত অবসরকে ভুলে থাকেন কিছুক্ষণ।

দুপুর দুটো থেকে চারটে। এই দু-টি ঘণ্টাও কুসুম যে, ঘুমোন তা নয়। তিনি ছেলেবেলা থেকেই অত্যন্ত সাহিত্যমনস্ক। যে-গভীর আনন্দ তিনি সাহিত্য পড়ে পান, সে উপন্যাস বা গল্প সংকলন-ই হোক, কী মাসিক বা সাপ্তাহিক পত্রিকা অথবা পাক্ষিক, তা অন্য দশজন মহিলার মতো টিভি দেখে বা পরনিন্দা-পরচর্চা করে কখনো পাননি।

‘দেশ’ পড়ছেন, তিনি যখন পনেরো বছরের মেয়ে তখন থেকেই। বিয়ের পরও দেখেছেন শ্বশুরবাড়িতে শিরীষদের তিনভাই এবং বাবা-মাও সাহিত্যমনস্ক। তাঁরা ‘দেশ’, ‘পরিচয়’, ‘অমৃত’, ‘নবকল্লোল’ ইত্যাদি রাখতেন। অনুষ্টুপ, বিভাব, প্রমা, ধ্রুবপদ ইত্যাদি কিছু ভালো লিটল ম্যাগও রাখতেন। তবে ‘দেশ’-এর আলাদা দাম ছিল। কিন্তু বছর দশেক আগে থেকেই হঠাৎ-ই ‘দেশ’-এর চরিত্রই বদলে গেল। বিজ্ঞাপনবহুল এবং প্রায় ‘ইঙ্গ-বঙ্গ’ সংস্কৃতির একটি কাগজ হয়ে উঠল। ওই পাক্ষিক পত্রিকার জন্যে, মাসে ত্রিশ টাকা নষ্ট করার মতন সামর্থ্য আজ অবসরপ্রাপ্ত হওয়ায় তাঁদের আর নেই। ‘দেশ’ বন্ধ করে দেবেন বলে সিদ্ধান্ত নেন প্রতিপক্ষর গোড়াতে। কিন্তু শেষপর্যন্ত কাগজওয়ালাকে বলতেই হয় যে, কাল একটা ‘দেশ’ দিয়ে যেয়ো। একেই বোধ হয় বলে, ‘Old habits die hard’।

শিরীষ অবসর নিয়েছেন আজ চার বছর হয়ে গেল। চাকরির শেষদিকে অধ্যাপনা করতেন কলকাতার-ই একটি কলেজে। রিটায়ার করার আগেই তাঁদের একমাত্র মেয়ে সল্লির বিয়ে দিয়ে, যা-সামান্য সঞ্চয়, প্রভিডেন্ট ফাণ্ড এবং গ্র্যাচুইটি জমেছিল তার সিংহভাগ-ই খরচ করে ফেলেছেন। এখন যতটুকু বাকি আছে, তার-ই সুদে সংসার চলে। পেনশনেও। বছরে অবশ্য একটি করে পাঠ্যপুস্তক লেখেন শিরীষ সারাবছর পরিশ্রম করে। খররৌদ্রে ছাতা হাতে ভবানীপুরের এই ছায়াচ্ছন্ন গলির জরাজীর্ণ ভাড়া-বাড়ি থেকে ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে যেতে হয় অনেকদিন-ই। ‘ফাঁকি’তে তিনি কোনোদিনও বিশ্বাস করেননি। তবে রয়্যালটি-টয়্যালটি পান না তেমন কিছু। হিসেব-টিসেবও নয়। যা দেন, প্রকাশক শিরীষকে তা একবার-ই দেন। থোক। তাতে যেন একটু দয়ার গন্ধও থাকে। তবে, তা দিয়ে পুজো আর নববর্ষের দেওয়া-থোওয়াটা হয়ে যায়, নিজেদের বিছানার চাদর, বেডকভার, পাপোশ, তাঁর গোটা চারেক শাড়ি-শায়া-ব্লাউজ, শিরীষের দু-জোড়া করে গেরুয়া খদ্দরের পাঞ্জাবি আর পায়জামা। আরও রোজগার শিরীষ সহজেই করতে পারতেন। তাঁর সমসাময়িক অনেক অধ্যাপক-ই কোচিং-ক্লাস করে বাড়ি-গাড়িও করে ফেলেছেন। কিন্তু শিরীষ বলেন, অবসর নিয়েছি মানে অবসর-ই নিয়েছি। টাকার প্রয়োজন কোনোদিনও মিটবে না। জীবিকার জন্যে জীবন তো নয়, জীবনের জন্যেই জীবিকা। একেবারে শান্ত, নিরুপদ্রব জীবন কাটাব। কষ্ট একটু হবে, তা হোক।

এখন তাঁদের জীবনের সবচেয়ে বড়ো আনন্দ, সবচেয়ে বড়ো অবলম্বন, তাঁদের মেয়ে সল্লি আর জামাই বাজ-এর একমাত্র সন্তান, তাদের নাতনি জলপিপি। ‘আসলের চেয়ে সুদ বড়ো’ —একথাটি শুনে এসেছিলেন ছোটোবেলা থেকে কিন্তু কথাটি যে, এতখানি সত্যি তা জানতেন না। চার বছর বয়স এখন জলপিপির। সল্লি একহাতে সংসার সামলাতে হিমসিম খায়। যদিও একটি কাজের মেয়ে আছে। হাসি। সমস্তক্ষণ-ই খাটে। কিন্তু তাঁদের জামাই বাজ তো সপ্তাহের প্রায় পুরোটাই ওয়ার্ক-সাইটেই থাকে। সে ইঞ্জিনিয়ার। তাদের কোম্পানির কী একটা কাজ হচ্ছে, বীরভূমে সিউড়ির কাছে। সিউড়ি-কীর্ণাহার-দুবরাজপুরে ঘুরে বেড়াতে হয় তাকে। শনিবার শেষবিকেলে ফিরেই সে, আবার সোমবার ভোরের বাসেই চলে যায়। কখনো-কখনো কোম্পানির গাড়িতেও।

সল্লিদের গড়পারের ভাড়াবাড়িতে কুসুমের পক্ষে একা যাওয়া সম্ভব হয় না, এই ভিড়ের বাসে মারামারি করে। শরীরও তো আর আগের মতো শক্ত নেই। তবুও যেতে ইচ্ছে করে খুব-ই। ঘনঘন যেতে পারেন না বলেই ফোন করে নাতনির সঙ্গে কথা বলেই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান। ভাগ্যিস ফোনটা ছিল। আজকে রিং হতেই জলপিপিই ফোনটা ধরল।

কুসুম বললেন, কে বলছি বলো তো?

দানি, দানি, দিদা, আমি দলপিপি বলতি।

সে তো আমি জানিই! আমার জলপিপি ছাড়া, কার আর গলার স্বর এমন মিষ্টি হবে?

কুসুম বললেন।

দানো দিদা, আমাদের দানলার ধারের নিমগাতে একতা কাক-মা, না ডিম পেলেচে। কাকতা কালো কুতকুতে। কিন্তু ডিমতা পর্সা। আবার একতু নীলতে—নীলতে আতে। হাথিদিদি কাপড় কাতার থময়ে থাদা কাপড়ে নীল দিলে, দেমন দেকতে হয়, তেমন। আর দানো, হাথিদিদিকে না, পাথের বালির মদনদাদা বলেতে যে, ওই ডিম ভেঙে ওমলেট ভেদে কাওয়াবে হাথিদিদিকে। দানো?

ওমা। তাই?

কুসুম বললেন, হাসিকে তাই বলেছে বুঝি?

হ্যাঁ। তো। আমি বলেতি, তা দদি কায় তো আমি কককনো কতা বলব না হাথিদিদির থঙ্গে।

কিন্তু মদনদাদাটা কে? চিনলাম না তো।

কুসুম জিজ্ঞেস করলেন।

ওই দে, পাথের বালির মিনামাসিদের মালুতি গাড়ি তালায়-না, থে! দাইভার।

ও-ও বুঝেছি।

এমন সময়ে জলপিপির মা সল্লি কোথা থেকে এসে ফোন কেড়ে নিয়ে বলল, ভারি পাকা মেয়ে তো! কতবার বলেছি না, তুমি ফোন ধরবে না। কার সঙ্গে এত গল্প হচ্ছে? আমার ফোন তো, আমাকে ডেকে দিতে পারো না? হাসিদিদিই বা গেল কোথায়?

বা: লে:! তোমাল ফোন কোতায়? দিদা আমাল থঙ্গেই কতা বলতিল।

কুসুম সল্লিকে বকে বললেন, তোকে আমার দরকার নেই, ওকে দে। একটু ওর গলার স্বর শোনার জন্যেই বুকটা উথাল-পাতাল করে। বিশ্বাস করবি না সল্লি, জলপিপিই এখন আমাদের জীবনের একমাত্র আনন্দ। তোর তো বাজ আছে, যৌবন আছে, এখন হাসবি, খেলবি, মজা করবি কতরকম। কিন্তু আমাদের ওই নাতনিটি ছাড়া কে আর কীই বা আছে বল! তোর বাবার মতন সর্বক্ষণ লেখাপড়া করা গুরুগম্ভীর মানুষেরও দিনে-রাতে চারবার জলপিপির খোঁজ না নিলে চলে না। নতুন লিচু উঠেছে। বলছিলেন যে, জলপিপির জন্যে লিচু নিয়ে যাবেন। আর তার জামাই বাজ সিঁদুরে আম খেতে ভালোবাসে, তার জন্যে সিঁদুরে আমও শিগগির নিয়ে যাবেন একদিন।

তোমরা কেমন আছ বলো মা? বাবাকে চোখের ডাক্তার কী বললেন? গ্লুকোমা-টুকোমা হয়নি তো?

সল্লি কথা ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল মাকে।

না, না। সেসব কিছু হয়নি। আমাদের আবার থাকা-না-থাকা। বাজ কেমন আছে? এই বর্ষার পচা গরমে সিউড়িতে কত কষ্টই না করতে হয় বেচারাকে। নাকি এখন দুবরাজপুরে আছে? ইঞ্জিনিয়ার জামাই চেয়েছিলাম, তা তুই তো ভালোওবাসলি ইঞ্জিনিয়রকেই, সম্বন্ধও তো করতে হল না কিন্তু সিউড়ি-দুবরাজপুর—দুবরাজপুর-সিউড়ি করে করে ছেলেটার শরীরে যেন, কালি ঢেলে দিয়েছে। আহা! এবারে তো জামাইষষ্ঠীতেও আসতে পারবে না বলল। কীরকম কাজ জানি না বাবা।

শাশুড়িদের চোখ-ই অমন মা। আর জামাইমাত্রর-ই শরীর যেন, ননির-ই শরীর। ভোরের রোদ লাগলেও গলে যায়।

কুসুমের গলাতে বিরক্তি ঝরল। বললেন, মোটেই তা নয়। আমাদের জামাই তো আর অন্যদের মতন নয়। সাক্ষাৎ কন্দর্প। ওইরকম ফর্সা রং ক-জন বাঙালির আছে?

তারপর বললেন, উইক-এণ্ডে যখন আসে তখন, ভালো করে যত্ন-আত্তি, খাওয়ানো-টাওয়ানো, আদর-টাদর করিস তো?

সল্লি চুপ করে রইল। জবাব দিল না কোনো কথার।

কী রে?

হুঁ।

তোর বাবা তো ঝুমরি-তিলাইয়াতে তোর প্রসাদকাকার কাছে গিয়ে ক-দিন খুব মজা করে এল।

কবে ফিরল বাবা?

গতকাল। এ-সপ্তাহে বাজ যদি আসে, তোরা দু-জনে জলপিপিকে নিয়ে এই শনিবার রাতেই আয়। দুপুরে পটলপোস্ত করব, কাঁচা কলাই-এর ডাল, বাজ ভালোবাসে। আর জলপিপির জন্যে পটল ভাজা, আর বাজ-এর জন্যে কুমড়োফুল ভাজা। ট্যাংরা মাছের চচ্চড়ি খেতে ভালোবাসিস তুই, তাও করব পেঁয়াজ-কাঁচালঙ্কা-কালোজিরে দিয়ে। মাখা-মাখা করে। আসবি তো? বিকেল বিকেল-ই চলে আসিস। আর রাতে ময়দা করব। খুরশেদ-এর দোকানের কচি পাঁঠার কষা মাংস, লুচি আর পায়েস।

তারপরেই বললেন, জলপিপিকে তো দু-একদিন আমাদের কাছে রেখেও যেতে পারিস। নাকি, দাদু-দিদার কাছে দু-একদিন থাকলেই মেয়ে অমানুষ হয়ে যাবে, ইংরেজি বলার অভ্যেস চলে যাবে, কিণ্ডারগার্টেন স্কুলের আন্টি বিরক্ত হবেন!

তারপর-ই স্বগতোক্তির মতন বললেন, কী জানি বাবা! আমাদের ছেলেমেয়েরা তো আর মানুষ হয়নি!

সল্লি চুপ করেই রইল ফোনের ও-প্রান্তে।

কী রে? কথা বলছিস না যে!

দেখি মা, ও যদি আসে।

ও মানে?

মানে, তোমার জামাই।

মানে? তোর কথার মানে বুঝলাম না। ‘যদি আসে’ মানে কী? ও কি, আজকাল সপ্তাহান্তেও আসছে না নাকি?

গত তিনসপ্তাহ তো আসেনি।

সে কী রে? অসুখ-বিসুখ করেনি তো? খোঁজ নিয়েছিস? ফোন করেছিলি? কত যেন কোড নাম্বারটা 03642? তাই-না?

হুঁ।

তুই না করে থাকলে আমিই করব। ভালো আছে তো? সে-খবরটা পেয়েছিস?

হ্যাঁ।

তবে আসছে না কেন?

কাজ পড়ে গেছে।

কী এমন কাজ থাকে যে, এত আদরের, ভালোবাসার, সুন্দরী যুবতী স্ত্রী আর চার বছরের সোনামণি মেয়েকে শনি-রবিবারেও দেখে যেতে, মন চায় না কাজ ফেলে?

থাকে মা। কতরকম কাজ থাকে। ও-ই তো প্রোজেক্ট-ম্যানেজার কিনা!

তা তো জানিই। তোর কথাও তো ভাবব। আমারও তো একদিন তোর বয়স ছিল! হেলিকপ্টার তো আর আমাকে এই প্রৌঢ়ত্বের বারাণসীতে আচমকা নামিয়ে দিয়ে যায়নি! কী ভাবিস তোরা? সত্যি!

তারপর-ই বললেন, আমি তোর বাবাকে বলছি—আজ-ই রাতে বাজকে ফোন করবে দুবরাজপুরে। নাকি সিউড়িতেই আছে এখন? রাতে তো কোয়ার্টারে থাকবেই?

না মা। পয়সা নষ্ট কোরো না।

মানে?

মানে, কোয়ার্টারে হয়তো পাবে না তাকে! যদি-বা থাকেও তবুও কোরো না।

তোর এই হেঁয়ালি-হেঁয়ালি কথার কোনো মানে বুঝছি না।

মাথাটা হঠাৎ-ই ঘুরে গেল কুসুমের।

হেঁয়ালি কোথায় দেখলে এরমধ্যে? এ তো অফিসের হোয়াইট-কলার্ড কাজ নয় মা! কত রাত কোয়ার্টারেই ফিরতে পারে না।

কিন্তু সে-খবরটা তো রাখা দরকার। তুইও জানিস না?

না। জেনে আমার দরকার নেই। বেশি ঔৎসুক্য আর অভব্যতা তো এক-ই। তুমিই না শিখিয়েছিলে?

আশ্চর্য! তবে কে জানে?

তাও বলতে পারব না। আমি ভাবছি, আগামী শনিবারে নিজেই একবার যাব, জলপিপিকে তোমাদের কাছে রেখে।

তুই কী যাবি? একা যুবতী মেয়ে, ওয়ার্ক-সাইটে। কুলি-মজুর, ধুলো-বালি। তোর বাবাকেই পাঠাব।

তারপরে কী ভেবে বললেন, তুইও তো একাই থাকিস। তেমন বুঝলে এসে থাকিস এখানে মেয়েকে নিয়ে। নইলে, আমিই বাসা বন্ধ করে গিয়ে, তোর ওখানে থাকব এখন। তোর বাবা গিয়ে থাকবেন না-হয়, ক-দিন কাকার বাড়িতে।

তা হয় না মা।

কেন? হয় না কেন?

আঃ! পিপির স্কুল নেই! এ-বছরেই তো অ্যাডমিশান টেস্ট। আগামী শুক্রবার ক্লাস হয়ে স্কুল বন্ধ হয়ে যাবে। ভালো ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলে ভরতি হতে না পারলে তো জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে।

কুসুম ভাবছিল, জীবন সার্থক হওয়ার সঙ্গে ইংলিশ-মিডিয়াম স্কুলের সম্পর্ক যে, কতটুকু সে-সম্বন্ধে গভীর সংশয় আছে। আসলে সল্লিরা, এই স্বাধীনোত্তর ভারতের মানুষেরা সম্ভবত জীবন আর জীবিকা গুলিয়ে ফেলেছে।

পরক্ষণেই সল্লি গম্ভীর গলাতে বলল, ‘মা’।

কুসুমের বুকের মধ্যেটা যেন, কেমন করে উঠল। স্কুলের ছাত্রী সল্লি পরীক্ষা খারাপ দিয়ে এসে স্কুল থেকে ফিরে যেমন করে ‘মা’ ডাক ডাকত, তার ভরসাস্থল মাকে, আশ্রয়দাত্রী মাকে, বহুবছর পর তেমন করেই যেন ডাকল, সে তার মাকে। ছেলে-মেয়েরা ছোটো থেকে বড়ো হয়, কিন্তু মা যুবতীই হন কী বৃদ্ধা, চিরদিন মা-ই থেকে যান। যতদিন বাঁচেন।

কী?

তোমরা তো আমাকে সম্বন্ধ করে বিয়ে দাওনি। আমার পছন্দ মতন-ই তো আমি বিয়ে করেছিলাম। আমার বিয়ে দিলে, কত জিনিসপত্র, গয়নাগাটি দিয়ে। তোমার সব গয়নাই তো দিয়ে দিয়েছিলে আমাকে। কতবার মানা করলাম, শুনলে না। লোক-খাওয়াতেই বাবার জীবনের সব সঞ্চয়শেষ করে ফেললে তোমরা। বাবা বলল, প্রত্যেকের আশীর্বাদ চাই। নইলে জীবনে সুখী হবি কী করে! হুঁ:! যাদের খাওয়ালে, কত যেন, শুভার্থী তারা! আঁচাতে না আঁচাতেই তো নিন্দে করতে করতে গেল। তোমাদের যা করার সব-ই করেছ। এখন এ-বিয়ের ভালো-মন্দ আমাকেই বুঝতে দাও।

বাজেকথা বলিস না।

কুসুম অত্যন্ত ভীত, নীচু গলায় বললেন।

পরক্ষণেই ভয়টা উত্তেজনা হয়ে গেল। গলা চড়িয়ে বললেন, আমরা এখনও মরে যাইনি। তা ছাড়া, তুই নিশ্চয়ই বাজে ভাবনা ভাবছিস। আসলে আজকাল বাজ-এর মতন ছেলেই হয় না। আমরা সম্বন্ধ করে দিলেও কি অমন ছেলে পেতাম রে? তোর নজরটাই আলাদা। ছেলেবেলা থেকেই। হিরের টুকরো ছেলে সে। দেখ, কাজে এমন আটকে পড়েছে—রাত কাটাচ্ছে হয়তো সাইটেই—বিরাট বিরাট যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ তাদের। ‘রিগ’ না কী বলে যেন?

হুঁ। যতই কাজ থাকুক একটা ফোনও কী করতে পারত না? কারোকে পাঠাতেও কী পারত না? আজকালকার ছেলেরা পুরোনো দিনের ছেলেদের চেয়ে অনেক-ই অন্যরকম। তুমি বলে সবসময়ে বাজ-এর প্রশংসা করো। আসলে তুমি জানো না মা, তারা কতখানি অন্যরকম। ভালোই হোক, কী মন্দ!

তোকে কাজের চাপেই মনে পড়ে না। না-হয় মেনেই নিলাম যে, তোকে তার আর ভালোও লাগে না। কিন্তু পিপিকেও কী মনে পড়ে না? এমন পাথর কী কেউ হতে পারে? যত্তসব আজেবাজে ভাবনা ভাবছিস তুই। তিলকে তাল করছিস।

একটু চুপ করে সল্লি বলল, আমি নানাজনের কাছ থেকে নানাকথা শুনতে পাচ্ছি মা।

সেই নানাজনেরা কারা?

এই যেমন নীলকমল। ওর কলিগ। ও তো কলকাতার অফিসেই আছে। প্রায়-ই খোঁজখবর করে। ওদিকের খবর আমাকে দেয়। আমাদের খবর ওদিকে পাঠায়। ওদের অফিসে ফ্যাক্স মেশিন আছে তো সুবিধে খুব-ই।

তা, নীলকমল কী বলেছে তোকে?

সে-কথা থাক মা।

ওই ছেলেটা ভালো নয়।

কুসুম বললেন।

কে?

ওই নীলকমল। তোর ওপর ওর খারাপ নজর আছে। আমি যেদিন ওকে, প্রথমবার দেখি সেদিন ওর চোখের দৃষ্টি থেকেই বুঝেছিলাম।

হয়তো আমাকে ভালোবাসে। ভালোবাসাটা কি খারাপ নজর মা?

না তো কী? ভালোবাসতে হয় তো নিজে বিয়ে করে নিজের বউকেই ভালোবাসুক। তার-ই হাতের রান্না খেয়ে তারিফ করুক। তোর কাছে ‘হ্যাংলামি’ করতে আসে কেন? বিশেষ করে, যখন বাজ কলকাতাতে থাকে না?

তারপর একটু চুপ করে থেকে উষ্মার সঙ্গে বললেন, হুঁ! ভালোবাসা! পুরুষের ভালোবাসার রকম আমাকে তোর কাছ থেকে শিখতে হবে না।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সল্লি বলল, মা, কার কাছে কে কেন আসে, কাকে কার কেন ভালো লাগে, তা বোঝা কি অতসহজ? কেন ভালো লাগে না বোঝাও যেমন সহজ নয়, কেন ভালো লাগে, তা বোঝাও নয়।

কথা তো অনেক-ই শিখেছিস। আমি তোর পেটে হয়েছি, না তুই আমার পেটে? অবাক করলি! তোর মতো অত কি আমি বুঝি?

কী যে, বলো মা! তোমার জামাই-ই তো নীলকমলকে পাঠায় আমাদের খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্যে। এই তো সেদিন বাজ-এর জন্যে তোমার পাঠানো কুলের আচার নিয়ে গেল। আর এক দিন, ধোকার ডালনা রেঁধেছিলাম, নিজেই আগ্রহ করে টিফিন-ক্যারিয়ারে করে সবটুকু নিয়ে গেল। বলল, ফতে সিং ড্রাইভার আজ-ই বেরোবে গাড়ি নিয়ে একটু পরে। নতুন করে গরম করে আমার হট-কেস-এ করে পাঠিয়ে দেব। রাতে বাজ, গরম গরম খেতে পারবে ভাত দিয়ে। তুমি আবার রেঁধে নিয়ো সল্লি।

যেদিন রাঁধব সেদিন, আপনাকেও খবর দেব। আপনি খাবেন এসে।

আমি বলেছিলাম।

নীলকমল উত্তরে কী বলেছিল, জান?

বলেছিল, অত বাড়াবাড়ি কোরো না। দূরে দূরে থাকাই ভালো। সর্দি লাগার মতন কখন যে, প্রেম হয়ে যায় কার সঙ্গে কার, কেউই বলতে পারে না।

তাতে কী? ধোকা খেতেই তো আসবেন। ধোঁকা খেতে তো নয়।

আমি বলেছিলাম।

নীলকমল তার উত্তরে কী বলেছিল, তা তার মাকে আর বলল না সল্লি, কিন্তু মনে পড়ে গেল ঠিক-ই।

নীলকমল বলেছিল, না না, সেজন্য নয়। তোমার সঙ্গে খুব-ই কম মিশেছি বলেই, তোমার উজ্জ্বল চোখের একটুখানি চাওয়া, তোমার গলার স্বরের গাঢ়তা, চান-করে ওঠা সমস্ত ‘তুমি’র সুগন্ধ—ফুলেল তেল-মাখা ভেজা চুল, পাউডার, পারফিউম, পাট-ভাঙা শাড়ির খসখসানির শব্দ সব মিলেমিশে আমাকে খুব-ই দুর্বল করে দেয়। বিশ্বাস করো। বড়োই দুর্বল করে দেয়। বাজ যে আমার বন্ধু, সে যে, আমাকে বিশ্বাস করে।

ভারি সুন্দর কথা বলে নীলকমল। তাই চাই না যেতে।

নীলকমল ওকে বলে যে, একা একা, মানে যখন বাজ না থাকে, তখন আমাদের দেখা না হওয়াই ভালো। আমি সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। বড়দাদা টিউশনি করে অনেক কষ্টে আমাকে ইঞ্জিনিয়ার করেছেন, দিদির বিয়ে দিয়েছেন, রুমি আমার ছোটোবোন, তাকে তো তুমি দেখেইছ, তার বিয়ে দিতে হবে আমায়, তারপর দাদারও একটা বিয়ে জোর করেই। এই হচ্ছে নীলকমল ঘোষের ভবিষ্যতের ছক। অতিসাদামাটা ডাহুক-ডাকা কচুরিপানার ফুল আর সজনে গাছের ছায়ার জীবন আমার। সেখানে সোনালি সল্লি হাঁসকে আঁটানো যাবে না। তোমার সঙ্গে আমার হঠাৎ প্রেম হয়ে গেলে সে ভীষণ-ই অন্যায় হবে।

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সল্লি বলেছিল, তার মা কুসুমকে—

নীলকমল বলেছিল, জানো সল্লি মধ্যবিত্তর বিবেক পাড়ার দিশি কুকুরদের মতন। বেপাড়ার কুকুর তো ছাড়, পাড়ার বেড়াল দেখলেও হল্লা তোলে বুকের ভেতর। চিৎকারে চিৎকারে পাড়া মাত করে দেয়। আমার কোনো লাভ হবে না, উলটে ক্ষতি হবে তোমার-ই। আমি যা বলি তাই শুনবে। ফোনেই খবরাখবর দেবে-নেবে। আমার সঙ্গে তুমি ভালো ব্যবহারও কোরো না কখনো। অধিকাংশ পুরষেরাই বড়ো বোকা। ভালো ব্যবহারকেই ‘ভালোবাসা’ বলে ভুল করে ফেলে তারা। বিশেষ করে আমার মতন, মেয়েদের সঙ্গে যারা বেশি মেশার সুযোগ পায়নি।

এই ‘হঠাৎ’ প্রেম’ কথাটা নীলকমলের মুখে প্রথমবার শুনে হাসি পেয়েছিল সল্লির। প্রেম তো অধিকাংশ ক্ষেত্রে হঠাৎ-ই হয়ে যায়। ধীরে ধীরেও যে, হয় না, তা নয়। তবে হঠাৎ-প্রেমের অভিঘাত-ই আলাদা। তারমধ্যে কোনো হিসেব নেই, অঙ্ক নেই। সে বড়ো সর্বনেশে প্রেম। বাজ-এর সঙ্গেও তো তার হঠাৎ-প্রেমই হয়েছিল। মা-বাবার কোনো বারণ তো সে শোনেনি! কুসুম চুপ করে তাঁর একমাত্র সন্তান সল্লির একটানা কথা শুনতে শুনতে খুব-ই চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ভুরু দুটো কুঁচকে গেল। নীলকমলের কথা বলতে গিয়ে সল্লির কন্ঠস্বরে যে, উষ্ণ উচ্ছ্বাস লক্ষ করলেন তা তাঁর মোটেই ভালো লাগল না।

কুসুম বললেন, তোরা বড়ো হয়েছিস। আমাদের চেয়েও বেশি বুঝিস এখন। আমি আর কী বলব। ওই নীলকমল যেমন করে কথা বলে, মানে, তোর কাছে যা-শুনলাম, তাতে তো মনে হয় যে, নাটক-টাটক করে। কবিতা লেখে নাকি? এই কথার জালেই তো তুই অজানিতে জড়িয়ে যাবি। এ আবার কী? বিবাহিতা মেয়ে, মেয়ের মা, এখনও এত প্রেম প্রেম বাতিক কীসের? তোদের মতি বোঝা ভার। বিয়েও তো করলি বাজকে ভালোবেসেই। তোদের ভালোবাসা তো নয়, মুসলমানের ‘মুরগি পোষা’।

সল্লি বলল, বেচারা! না, না, নীলকমল ভারি ভালো ছেলে। ওকে কোনোরকম দোষ দিয়ো না।

ফোনটা ছেড়ে দিয়ে বিছানাতে এসে শুলেন কুসুম। শিরীষ বাড়িতে নেই। থাকলেও কিছু বলতেন না কুসুম শিরীষকে। অধিকাংশ পুরুষ-ই এসব ব্যাপারে মাথা-মোটা। খামোকা হই চই বাধাবেন। কাজ করতে গিয়ে অকাজ করবেন। শুয়ে শুয়ে অনেক কথাই ভাবছিলেন কুসুম।

আজকে সল্লির কাছে নীলকমল ভালো তো হবেই। ক-বছর আগে বাজ যেমন, ভালো ছিল। ওঃ কী ভালো কী ভালো! অমন ভালো আর হয়-ই না। মেয়ে একেবারে পাগল ছিল তার জন্যে। ভালো থাকলেই ভালো। ভালো যখন খারাপ হয়ে যায়, তখন-ই ভালোত্ব-খারাপত্বর পরীক্ষা আসে।

কেন জানেন না, তাঁর মেয়ের মুখে নীলকমলের কথা শুনে কুসুমের প্রসাদের কথা মনে আসতে লাগল ভিড় করে। কত কথা। শিরীষ কতটুকুই বা জানে। ভালোবাসা ব্যাপারটা যে, কী? সে-সম্বন্ধে শিরীষের কোনো ধারণাই নেই। ভালোবাসার চেয়ে মোগল পিরিয়ডের ইতিহাস অনেক-ইভালো বোঝেন শিরীষ। সত্যি। সংসারে কতরকম মানুষ-ই থাকেন। অথচ তাঁর স্বামী শিরীষ মানুষটি অতিভালো। এত ভালো না হয়ে একটু খারাপ হলে মানুষটি অনেক-ই বেশি ইন্টারেস্টিং হতেন হয়তো। স্ত্রীকে শিরীষ আজীবন ভালোবেসে এসেছেন তাঁর সর্বস্ব দিয়ে। ভালোবাসার সংজ্ঞাই আলাদা। একজনের সংজ্ঞার সঙ্গে অন্যজনের সংজ্ঞা মেলে না বলেই যত গোলমাল। গোল বাধে এই সংসারে। শিরীষের ভালোবাসা একটি সরলরেখার মতন। উঠোনে কাচা-কাপড় শুকোতে দেওয়ার বাঁশের-ই মতন। তাতে কাচা-পায়জামাও যেমন ঝোলে, ঝোলে শায়া-সালোয়ার কামিজ, তেমন তার ওপরে, কখনো আবার কারো এসে বসে, পচা মাছের কানকো-ঠোকরানো ঠোঁট তাতে ঘষে ঘষে ধার তোলে।

তিন

এই নিয়ে পর পর চার সপ্তাহ হল। একমাস। বাজ একটি সপ্তাহান্তেও আসেনি। ওদের সপ্তাহে সপ্তাহে মাইনে হয়। নিজে যখন আসতে পারেনি নীলকমলকে বলে দিয়েছে অথবা সিউড়ি বা দুবরাজপুর বা কীর্ণাহার থেকে কারোকে না কারোকে দিয়ে সংসার-খরচের টাকা পাঠিয়ে দিয়েছে। কিন্তু গত তিনসপ্তাহে টাকাও পাঠায়নি। গতবুধবারে মাত্র তিন-শো টাকা পাঠিয়েছিল একজন ড্রাইভারের হাতে। একটি চিঠিও পাঠিয়েছিল। তাও সতেরো-আঠারো দিন হয়ে গেছে। চিঠিটা যেন আর এক হেঁয়ালি। তবে চিঠিটা পাওয়ার পর থেকেই সল্লির মনটা শান্ত হয়েছিল অনেকটা। মিছিমিছি কীসব দুশ্চিন্তা করছিল এতদিন! কিন্তু সেই হেঁয়ালি হেঁয়ালি চিঠির প্রলেপও আর এখন তাকে শান্ত করতে পারছে না! বাইরে যেমন গরম, তার ভেতরেও।

বাজ লিখেছিল:

সল্লি,

আমি খুব-ই লজ্জিত।

বিশেষ কারণে টাকা পাঠাতে পারছি না। জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে তুলে খরচ চালিয়ে নাও। আগামী সপ্তাহ থেকে নিয়মিত পাঠাব যাতে, তোমার ও পিপির কোনো কষ্ট না হয়।

বেশ কয়েকমাস আমার পক্ষে কলকাতাতে যাওয়া সম্ভব নয়। নতুন পাইপ লাইন বসছে। আরও একটি আমেরিকান কোম্পানি আমাদের সঙ্গে কাজ করছে। আমাদের কোম্পানিও তো মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি। অন্য কোম্পানিটি যেন, দরজাতে ঘোড়া বেঁধে রেখেছে। কত তাড়াতাড়ি ‘ফুরোনে’ কাজ সেরে সবচেয়ে বেশি প্রফিট করে ফিরে যেতে পারে, তাদের এই একমাত্র উদ্দেশ্য। অনেক ডলার তাদের দিতে হয়েছে আমাদের কোম্পানিকে। তাই তাদের কাছ থেকে কাজ কড়ায়-গন্ডায় বুঝে না নিলে এবং মেইনটেনেন্সের কাজও শিখে না নিলে, চলবে না।

এ-বছরে যা গরম পড়েছে তাতে তাড়াতাড়ি কাজ শেষ না করলেও চলবে না। বৃষ্টি থেমে গেলে আবার আমাদের কাজের অসুবিধে হবে।

চাড্ডা সাহেব আমার ওপরে কতখানি নির্ভর করেন তা তো তুমি জানোই। সকলেই ঈর্ষাকাতর হয়ে বলে, ‘আমি নাকি ডিরেক্টরদের Blue eyed boy’। যে যা, বলে বলুক। এই কাজটা ভালোভাবে এবং সময়মতো শেষ হলে আমার ওপরে উনি আরও খুশি হবেন।

আমার ভালো হওয়া মানেই তোমার-ই ভালো। পিপিরও ভালো। খুব রোদ আর লু-এর মধ্যে এমন ঝাঁঝাঁ-পোড়া হওয়ার সেইটেই তো সবচেয়ে বড়ো সান্ত্বনা। এ-বছরে এরইমধ্যে ‘লু’ বইতে শুরু করেছে। নামেই পশ্চিমবঙ্গ, আবহাওয়া বিহারকেও হারিয়ে দিয়েছে।

অযোধ্যা পাহাড়ে জেঠ শিকারের সময়ে যে-মেলা বসেছিল, সেই মেলাতে গিয়ে তোমার জন্যে খুব সুন্দর রুপোর গয়না কিনেছি। আদিবাসী ডিজাইনের। পিপির জন্যেও কিনেছি পাঁয়জোর। নিজহাতে নিয়ে যাব বলেই কারোকে দিয়ে পাঠাইনি। যখন যাব তখন-ই নিয়ে যাব।

তুমি মনে কোরো না যে, এখানে আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে। ধরসাহেব, আমাদের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর তো এখানেই থাকেন সপরিবারে। মিসেস ধর আমাকে প্রায় তোমার মায়ের-ই মতন আদর-যত্ন করেন। আমার মাকে তো কবেই হারিয়েছি সেই শিশুকালে তাই মায়ের মতন কারোকে পেলে মন ভারি নরম হয়ে যায়। ওঁদের একটিমাত্র মেয়ে ঝিঁঝি। তোমার-ই বয়েসি। আহমেদাবাদের ইন্সটিট্যুট অফ ডিজাইনস থেকে পাশ করে সবে এসেছে। অনেক চাকরির অফার পেয়েছে ইতিমধ্যেই। পঞ্চাশ-ষাট হাজার টাকা মাইনে শুরুতেই। কিন্তু কোনটা নেবে, কোথায় যাবে তা ঠিক করতে পারছে না। সব চাকরিই মুম্বই, দিল্লি, ব্যাঙ্গালুরু, চেন্নাইয়ে। কলকাতাতে চাকরি-টাকরি আর নেই।

ধরসাহেব খুব-ই চাইছেন ঝিঁঝির বিয়ে দিতে। কিন্তু ঝিঁঝি এক্ষুনি বিয়ে করতে চায় না। তা ছাড়া, চাইলেই বর-ই বা কোথায় পাওয়া যাবে বলো? তারও তো সত্তর হাজার টাকা মাইনে পাওয়া চাই। নইলেই স্বামীর নানা ধরনের হীনম্মন্যতা জাগবে। পুরুষেরা এত যুগ ধরে মেয়েদের ‘খাইয়ে পরিয়ে’ —এসেছে সেই গর্ব বা অহং-এ আঘাত লাগলে এদেশীয় অনেক শিক্ষিত পুরুষেরও বিষম প্রতিক্রিয়া হয়। এই মানসিকতা হাস্যকর মনে হলেও, এর পেছনে বহুযুগের অভ্যেস থাকাতে এই মানসিকতা ত্যাগ করতে আমাদের অনেক সময় লাগবে।

এবারে যা গরম পড়েছে এদিকে তা সত্যিই বলার নয়। অবশ্য কাগজে এবং টিভিতে দেখি, যে সবদিকেই পড়েছে। কলকাতায় তো খুব-ই গরম। গরমে প্রাণ বাঁচাতে ইলেকট্রাল খাচ্ছি, যবের ছাতুর শরবতও আমার মজুর আর ফিটারদের সঙ্গে। এবং মাঝে মাঝে বিয়ারও। বিয়ারের দাম এখানে খুব বেশি। তা ছাড়া Flat-ও হয়ে যায় অধিকাংশই।

বোলপুরের একটিমাত্র মদের দোকানের অসভ্য দোকানির পোটকা মাছের মতন মুখ আর তিরিক্ষি ব্যবহার দেখলে তালু এমনিতেই শুকিয়ে যায়। বিয়ারে কিছুই হয় না। তবু মাঝে মাঝে ওইখান থেকেই আনতে হয়। ওই দোকানিকে দেখলে রক্ত এমনিতেই মাথায় চড়ে যায়। একসাইজ ডিপার্টমেন্ট কেন যে, ওই দোকানির লাইসেন্স ক্যানসেল করে না বা অন্য নতুন দোকানের লাইসেন্স দেয় না তা জানি না। সৎ সুঁড়ি এবং সুভদ্র মাতালদের জন্যে অবিলম্বে এবাবদে ভাবনাচিন্তা করা দরকার।

ধরসাহেবদের বাড়ি গেলে কোল্ড বিয়ার বেকন অ্যাণ্ড ফিঙ্গার চিপস (আলুর) এবং ঝিঁঝির হাসি ও সঙ্গ বটগাছের ছায়ার মতন শরীর-মনকে স্নিগ্ধ করে। তোমার কোনো বোন নেই। নেই কেন? আপন বোন তো নেই-ই এমনকী কাজিনসও নেই—তাই মাঝে মাঝে মনে হত, এই শালিহীন দাম্পত্য বৃক্ষহীন অরণ্যের-ই মতন। ঝিঁঝি-ই আমার শালির অভাব পূরণ করেছে।

ভালো থেকো।

প্রচন্ড গরমের রাতে নির্মেঘ তারাভরা আকাশের নীচে নেয়ারের খাটে ছটফট করতে করতে পাগল পাগল লাগে। তখন তোমার চান-করে-আসা স্নিগ্ধ, ঠাণ্ডা শরীরের কথা মনে করি। তুমিই এই মরুভূমিতে আমার একমাত্র মরূদ্যান।

ভালো থেকো। জলপিপিকে সাবধানে যেন, রাস্তা পার করায় হাসি, হাসিকে বোলো। মেয়েটা কেবলি আছে। কলকাতা শহরে বাড়ি থেকে বেরোবার পরে যতক্ষণ-না, কেউ বাড়ি ফিরছে ততক্ষণ-ই দুশ্চিন্তা হয়।

ইতি—তোমার বাজ, যে সল্লি হাঁস-এর যম

হেঁয়ালি মনে হওয়া সত্ত্বেও চিঠিটা হাতে পাওয়ার পরেই সল্লি ফোন করেছিল তার মাকে। চিঠির যেসব অংশ মাকে শোনানো যায় না, সেইসব অংশ বাদ দিয়ে প্রায় পুরো চিঠিটিই পড়ে শুনিয়েছিল।

কুসুম বলেছিলেন, সত্যি! বাজ-এর মতন ছেলে হয় না। তোর তো বুদ্ধি বলে কোনোদিন-ইকিছু ছিল না। নিজের বিয়ের ব্যাপারে যাহোক বুদ্ধিটা খুলেছিল। তোর চেয়ে সবদিক দিয়ে ভালো কত মেয়ে ভালোবেসে বিয়ে করার সময়ে, কত আজে-বাজে ছেলেকে বিয়ে করে বসে। আজকালকার ছেলেদের মধ্যে ভালো বাছতে তো গাঁ উজাড় হয়ে যায়।

সল্লি হেসে বলে, যাই বলো আর তাই বলো মা, যদি বলো যে, বিয়েটা ভালোই করেছিলাম তবে বলব ও-ব্যাপারে আমার কোনো বিশেষ কৃতিত্ব ছিল না। বিয়েটা একটা কপালের ব্যাপার। সব বিয়েই। সেটা অঙ্ক আদৌ নয়। বিয়ের আগে অঙ্ক মিলে গেলেই বিয়ের পরেও যে, মিলবে সে-কথা কেউই বলতে পারে না। এইজন্যেই তো বলে যে, ‘ম্যারেজেস আর মেড ইন হেভেন’।

নীলকমল কি তাহলে সত্যিই খারাপ ছেলে? না হলে ও আভাসে ইঙ্গিতে বাজ-এর চরিত্র সম্বন্ধে কিছু কথা কেন চালাচালি করবে?

ভাবছিল সল্লি।

ঠিক সেই সময়েই কুসুম বলেছিলেন, আমার কিন্তু ছেলেটিকে মোটেই ভালো মনে হয় না।

সেদিন-ই নীলকমল কলকাতার অফিস থেকে ফোন করেছিল যখন, তখন বাজ-এর চিঠির কথাটা বেশ একটু শ্লেষের সঙ্গেই বলেছিল, সল্লি, নীলকমলকে।

মনে পড়ে গেল সল্লির।

নীলকমল হয়তো আহতও হয়েছিল একটু। কিন্তু তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে সল্লিকে বলেছিল, বা:। এ তো খুব-ই ভালো খবর। সত্যি খুব ভালো খবর। এই খবরে আমি সত্যিই খুব খুশি হলাম।

তারপর বলেছিল, তা বাজ এখানে আসছে কবে, তা কি লিখেছে কিছু?

না। তা লেখেনি।

যাইহোক, আবার কিছু ভালো রান্নাটান্না করলে আমাকে ফোন কোরো, পাঠাবার বন্দোবস্ত করে দেব। আমার নিজেরও যেতে হবে, এ-মাসের শেষে একবার। অডিটরেরা নাকি কীসব কোয়্যারি করেছেন। আমার পাশ-করা কিছু ভাউচার সম্বন্ধে। তারমধ্যে বাজ নিশ্চয়ই এক-দু-বার ঘুরে যাবে এখানে। যদি কোনো কারণে না আসতে পারে তাহলেই আমার কিছু বয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রশ্ন উঠবে। তবে, সংকোচ কোরো না কোনোরকম। যা ইচ্ছে করে, পাঠিয়ো।

সল্লি নীলকমলের কথার উত্তর দেয়নি কোনো। চুপ করেই ছিল। মাঝে মাঝে মনে হয় সল্লির যে, নীলকমল বড়োবেশি কথা বলে। এবং এমন সব কথা, যেসব কথাতে সল্লির কোনো ঔৎসুক্য নেই।

পরমুহূর্তে সল্লি বলল, এবারে ছাড়ি ফোন। মা আসবেন দুপুরে তাঁর নাতনির সঙ্গে খাবেন বলে। এঁচড়ের তরকারি বসিয়ে এসেছি।

শুধুই এঁচড়?

তা কেন? ধোকার ডানলা, পাবদা মাছ, ধনেপাতা, কালোজিরে-হলুদ, কাঁচালঙ্কা দিয়ে।

আর বাবা? বাবা আসবেন না?

বাবার কলেজের রি-ইউনিয়ন আছে, সেখানেই কাটাবেন সারাদিন।

এই ‘রি-ইউনিয়ন’ শব্দটাই একটা মিসনমার। ছেলেমানুষদের রি-ইউনিয়ন অবশ্যই হতে পারে। কলেজ ছাড়বার পরে পরে হলেও হতে পারে। বৃদ্ধবয়সে রি-ইউনিয়ন কখনোই হয় না। প্রত্যেক মানুষের জীবনের গতি ও গন্তব্য আলাদা আলাদা। গ্র্যাণ্ড কর্ড আর মেইন লাইন একে অন্যকে কেটে হয়তো যায় কখনো কখনো, কিন্তু তাদের মিলন কখনোই হতে পারে না। আর মিলন-ই যদি না হয়, তবে আর পুনর্মিলন হবে কোত্থেকে!

কী জানি! অত জানি না। ছাড়লাম এখন।

আচ্ছা।

সল্লি ছেড়ে দিল বটে, মানে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল কিন্তু নীলকমল অনেকক্ষণ কানে ধরে রাখল রিসিভারটা। সল্লির গলার মিষ্টিস্বর যেন, তখনও তার কানে মধুর মতন গলে গলে পড়ছিল। সল্লিই তার জীবনের একমাত্র আনন্দ। নির্মল আনন্দ। সল্লি কি সে-কথা জানে? ভাবছিল, নীলকমল।

অফিসের অপারেটর বলল, নীলবাবু, আপনার কথা কি হয়ে গেছে লোকাল লাইনের সঙ্গে?

চমকে উঠে নীলকমল বলল, না, হ্যাঁ, কেন?

না, দুবরাজপুর থেকে কল আছে।

স্যরি।

আপনি রিসিভারটা নামিয়ে রাখুন, আমি ট্রান্সফার করে দিচ্ছি কলটা। ধরসাহেবের কল।

আজকাল সব অফিসেই এই ‘ঝিং-চ্যাক’ এক্সচেঞ্জ লেগে গেছে। ‘টুং-টাং টাং-টাং’ নয়তো কবে সাহেবরা চলে গেলেও তাদের নানারকম সাইকেডিলিক, বাজনা, নয়তো পিয়ানোর টুংটাং আর ভালো লাগে না। তার চেয়ে রথীন ঘোষ বা ব্রজেনবাবুর কেত্তন টেপ করে বাজালে পারে। ‘মাথুর’ কিংবা ‘নৌকাবিলাস’। আহা, ‘চার আনাতে হবে না, চার আনাতে হবে না। পাঁচ আনা দিব কড়ি, পার করো তাড়াতাড়ি।’ এই ‘কীর্তন’ জিনিসটা বাঙালির একেবারে নিজস্ব ছিল সেটাই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেল। বাঙালির নিজস্ব জিনিস বলতে ক-টা জিনিস-ই বা আছে? কে আর ভাবে এসব নিয়ে। ওদের অফিসের সহকর্মী জিকু জোয়ারদারকে এ-প্রসঙ্গে একদিন বলতে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে সে খেঁকিয়ে উঠে বলেছিল, কোন যুগে বাস করছেন নীললোটুদা? কেত্তন-ফেত্তন এখন কোনো ভদ্দরলোকে শোনে নাকি? এখন মডার্ন শুনবেন তো ঊষা উত্থুপ, নয় নচিকেতা। আর রবীন্দ্রসংগীত শুনবেন তো পীযূষকান্তি। পুরোনোরা তো সব তামাদি হয়ে গেছে। বস্তাপচা মাল সব।

নীললোটুদা মানে, নীলকমলদা। নীল-লোটাস।

হ্যালো। বাজনা থেমে গেল। মাথার মধ্যের চিন্তার জালও ছিঁড়ে গেল।

ধরসাহেবের ফোন। ঘোষ?

বলুন স্যার। বলছি।

ধরসাহেব নীলকমলকে বিশেষ পছন্দ করে না। সে বাজ-এর মতন ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েনি। অমন স্মার্টও নয়। আর সে-কারণেই যেন, ধরসাহেব ফোন করলেই আরও ক্যাবলা বনে যায় নীলকমল। অথচ ও-ও যাদবপুর থেকেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেছিল। বাজও তাই। এক-ই স্কুল কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরোনো ছেলেদের মধ্যেও অনেক সময়ে আকাশ-পাতাল তফাত থাকে। পারিবারিক পরিবেশ, নিজের নিজের বড়ো হওয়ার জেদ-ই, সম্ভবত আলাদা আলাদা করে দেয় মানুষদের। সত্যজিৎ রায় বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের ছাত্র হয়েও বি.বি.সি রেডিয়ো শুনে কী দারুণ ইংরেজি বলতেন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো শেখায় সকলকেই। সমানভাবেই। কিন্তু সকলে যে, সমানভাবে বা পুরোপুরি সেই শিক্ষা নিতে পারে না। ‘ভালো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান যেমন জরুরি, সেই প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিংড়ে নেওয়াটাও তেমন-ই জরুরি।’ —এই কথাটা বোঝে নীলকমল। বাজ-এর তুলনাতে সে যে, অনেক-ই নিষ্প্রভ, আনস্মার্ট, অ-চটপটে সে-কথা ও স্বীকার করে নিয়েছে জীবনে অথচ বাজ-এর চেয়েও রেজাল্ট অনেক-ই ভালো করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাতে। বাজ ছিল যাদবপুরের ক্রিকেট ব্লু, ভালো ইংরেজি গান গাইত, পিয়ানো বাজাত, অভিনয় করত লিটল থিয়েটারে, অ্যাংরি কবিতা লিখত লিটল ম্যাগ-এ—যাদবপুরের মেয়েদের কাছে ও হিরো ছিল। আর নীলকমল ছিল...বোকা বোকা। বোকার-ই মতো। তার সাধারণ কেরানি বাবা, স্কুলমাস্টার মা, তাদের ভবানীপুরের গলির মধ্যের অতিসাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনযাত্রাই তাকে এই মালটি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে বাজ-এর তুলনাতে এমন নিষ্প্রভ করে রেখেছে।

এখন নীলকমল বোঝে যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাই আসল পরীক্ষা নয়, জীবনের পরীক্ষা, Battle of Life-ই আসল। যারা সেই পরীক্ষাতে সফল হয়, তারাই সফল হয় জীবনে। ‘নাথিং সাকসিডস লাইক সাকসেস’।

ধরসাহেব বললেন, তোমার অ্যাকাউন্ট্যান্ট কোথায়? এ-সপ্তাহের স্টেটমেন্ট পাঠায়নি কেন? কীরকম ম্যানেজারি করো তুমি?

ভীষণ লোডশেডিং হচ্ছে স্যার, আর যা গরম। পোখরান-এর জন্যেই হয়তো হয়েছে। তার ওপরে আবার লোডশেডিং শুরু হয়েছে। কম্পিউটার কাজ করছে না স্যার।

সে তো জানা কথাই। গোয়েঙ্কারা যখন নিয়ে নিলেন ‘সি. ই. এস. সি.’ তখন-ই জানা ছিল কী হবে। ফুয়েল সারচার্জ দিচ্ছ তো? বাঙালিদের আর কলকাতাতে থাকতে হবে না। শুধু ইলেকট্রিসিটিই নয়, এখন ক্ল্যাসিকাল গান বাজনা, রবীন্দ্রসংগীত এইসব কিছুর-ই মালিক হয়ে গেছে গোয়েঙ্কারা। শুনতে পাই যে, তাঁদের নাকি এক বাঙালি অ্যাডভাইসার আছেন। সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং সংগীতের জগতের ‘শেষকথা’ নাকি তিনিই! তাঁর উপদেশেই কি হচ্ছে সব কিছু?

পরক্ষণেই ধরসাহেব সিংহগর্জনে বললেন, তবে তোমাকে বলছি নীলকমল, স্টপ দিস টিপিক্যালি বেঙ্গলি ‘এক্সকিউজেস’। এনাফ ইজ এনাফ। কম্পিউটার কাজ করলেই বা তোমাদের ওয়েস্ট বেঙ্গলে হবেটা কী? কম্পিউটারে গারবেজ ফিড করলে তো গারবেজ-ই বেরোবে। ইন্টারভিউর সময়েই বলেছিলাম যে, ওই অ্যাকাউন্ট্যান্ট ছোঁড়াটাকে নিয়ো না। তা তুমি দয়ার অবতার হয়ে বললে, ‘স্যার রোজগেরে বাবা সদ্য মারা গেছেন। দু-টি বোন। বিধবা মা। এটসেটরা এটসেটরা’।

একটু চুপ করে থেকে ধরসাহেব বললে, শোনো নীলকমল, কাজের লোক যখন নেবে, তখন শুধু কাজটাই কনসিডার করবে। দাতব্য করতে চাও তো পাড়ার মোড়ের গ্যারাজে হোমিয়োপ্যাথি ক্লিনিক করো। নইলে, মাসোহারা দাও ওইসব ভিখারিদের। ইনএফিশিয়েন্ট, ইনডিসিপ্লিনড ছোঁড়াগুলোকেঢুকিয়ে কোম্পানিটাকে অচল কোরো না। ফর গডস সেক। আমি ওকে স্যাক করে দেব। পিল্লাই বলে যে-ছেলেটাকে ইন্টারভিউতে ডেকেছিলে তার ঠিকানা কি রেখেছ? থাকলে, দেখো, সে যদি এখনও অন্য জায়গাতে চাকরি না পেয়ে থাকে তো তাকেই ডেকে পাঠাও। একে দিয়ে চলবে না। কম্পিউটার চলুক আর না-ই চলুক হাতে তৈরি করে স্টেটমেন্ট পাঠাতে বলো। আমাদের ট্রানজাকশানের কী এমন ভলিউম যে, প্রয়োজনে এবং ইচ্ছে থাকলে হাতে করা যায় না?

হ্যাঁ স্যার।

কী ‘হ্যাঁ স্যার’?

পিল্লাই-এর খোঁজ করব স্যার।

তার আগে তোমার এই লগনচাঁদা ভোঁদা ঘোষ অ্যাকাউন্ট্যান্টটাকে বলো যে, স্টেটমেন্ট তৈরি করে, কাল সকালেই যেন ফ্যাক্স করে দেয়। নইলে আমি ওকে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দূর করে দিয়ে পিল্লাইকে নেব।

হ্যাঁ স্যার।

সে আছে?

না স্যার।

কোথায় গেছে?

ওর মায়ের ক্যান্সার হয়েছে স্যার। হাসপাতালে গেছে। আজ অপারেশন।

মাই গড! কোথায় ক্যান্সার?

লিভারে।

লিভারে! ওঃ শিট! মদ খাই আমি আর সেই বিধবার হল লিভারে ক্যান্সার!...তুমি কী করছ, ওই ইনএফিশিয়েন্টটার মায়ের জন্যে?

স্যার ও তো সবে ঢুকেছে। এখনও তো এনটাইটেলমেন্ট...

হ্যাং ইট। শোনো লালকমল, স্যরি, নীলকলম, আমি এই তোমাকে একটা ফ্যাক্স পাঠাচ্ছি। তিরিশ হাজার টাকা তুমি আজ-ই দেবে ওকে।

স্যার! আমাদের তো মেডিক্যাল বেনিফিটস নেই। এই চেক কোথায় অ্যাডজাস্ট করব?

কোথাও-ই নয়। ইনকমপিটেন্টটাকে আমার সাহায্য। আমার পার্সোনাল ড্রয়িংস-এ ডেবিট করবে। নাথিং টু ডু উইথ দি ফার্ম। যাইহোক, তোমার পেয়ারের অ্যাকাউন্ট্যান্টকে মেসেজটা দিয়ো। আজ তিনি ফিরবেন তো? কোন রত্নগর্ভা মায়েরা যে, এরকম ব্যাঙাচি আর ম্যালামাণ্ডার গর্ভে ধরেন।

না স্যার।

মানে?

মানে, সই করেই চলে গেছে অপারেশন যদি শেষ না, হয় তবে আজ আর আসবে না।

সত্যি! আনথিঙ্কেবল। ফার্মটাকে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপিস করে তুললে যে! না:, আমি ওকে স্যাক-ই করব। তুমি পিল্লাইকে খবর দাও। আজ-ই।

ইয়েস স্যার।

নীলকমল ভাবছিল, কতরকমের পাগল হয়। মনে মনে বলছিল, ‘পাগল ভালো করো মা’!

অ্যাণ্ড রিপোর্ট ব্যাক টু মি।

ইয়েস স্যার।

বাজ কেমন আছে? অফিসে আছে না, সাইট-এ আছে জিজ্ঞেস করবে ভাবল একবার নীলকমল, কিন্তু ধরসাহেবের সঙ্গে কথা বলতেই যে, ভয় করে। হাওড়ার ব্যাটরার দুর্যোধন কুন্ডুর বড়োমেয়ের ছোটোছেলে নিস্তারণ ধর যে, এতবড়ো আমেরিকান হবেন, তা কি তাঁর ঘরজামাই বাবা ননিগোপাল-ই জানতেন? না, মা কৃষ্ণভামিনী? হাওড়ার সঙ্গে সম্পর্ক অবশ্য রাখেন না ধরসাহেব কিন্তু তাঁকে তো সারস অথবা হেলিকপ্টার সোজা ফিলাডেলফিয়াতে নিয়ে গিয়ে ওপর থেকে ধপ করে ফেলেনি। নীলকমল নানা মানুষের কানাঘুসোতে শুনেছিল যে, ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা পাঁচবারেও পাশ করতে না পেরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কিছুদিন পরেই ক-বন্ধুতে মিলে জাহাজে করে প্রথমে জার্মানিতে চলে যান। পশ্চিম জার্মানিতে। শীতে জমে-যাওয়া টেলিগ্রাফের তারে নুন ছিটিয়ে বরফ পরিষ্কার করে জীবন আরম্ভ করেন। তারপর সেখান থেকে ইংল্যাণ্ড, তারপর স্টেটস। শ্রীহাদিদোয়ানিয়া ধর। ওরফে হেরর এইচ. ডি. ধর। তবে সেসব কোনো ব্যাপার নয়। ‘নাথিং সাকসিড লাইক সাকসেস’ এ-কথা নীলকমল জানে। জীবনে যে, সফল হতে পেরেছে সে কী করে সফল হল— তা নিয়ে অন্য কেউ তো বটেই, সে নিজেও মাথা ঘামায় না। কিছুক্ষণ আগে বাজ-এর কথা মনে পড়াতেও এই প্রবাদটি মনে পড়েছিল।

সেল্ফ-মেড মানুষেরা একটু ‘দাম্ভিক’ হয়েই থাকেন আর সেই দম্ভ তাঁদের মানিয়েও যায়। বলরাম ঘোষ ঘাট রোডের নীলকমল বোস সে-কথা অবশ্যই মানে। সব-ই ভালো। কিন্তু বড়োভয় পায় ও জয়েন্ট ম্যানেজিং ডিরেক্টর ধরসাহেবকে।

ম্যানেজিং ডিরেক্টর চাড্ডা সাহেবকে কিন্তু ভয় করে না অত, যদিও তিনি স্টেটস-এই জন্মেছেন, সেখানেই বড়ো হয়েছেন। তিনি অবশ্য কলকাতার হেড অফিসে বসেন। নীলকমলের সঙ্গে বিশেষ যোগাযোগ হয় না। তবে ন-মাসে, ছ-মাসে হেড অফিসে গেলে এবং হঠাৎ করিডোরে দেখা হয়ে গেলে হেসে কুশল জিজ্ঞাসা করেন। মানুষে মানুষে তফাত তো হয়-ই। আর ভাগ্যিস হয়।

ফোনটা ছেড়ে, ইন্টারভিউর ফাইলটা বের করে জন এম. পিল্লাই-এর অ্যাপ্লিকেশন, ইন্টারভিউ লেটার ইত্যাদি বের করল। কনফিডেনশিয়াল বলে সব নিজের ঘরেই রাখা ছিল। তারপরেই কী মনে করে, সেগুলো আবার ফাইলে যথাস্থানে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর নীলকমল, তার পি.এ. নমিতা বাগচিকে ডেকে পাঠাল।

নমিতা এলে বলল, আমার ঘরটা কী হয়ে আছে বলুন তো? কবে থেকে বলছি যে, অপ্রয়োজনীয় কাগজ-এর ফাইল সব ডেস্ট্রয় করে দিন। আমরা কি ইট-কাঠ বা চাল-ডালের ব্যাবসা করি? আমরা ব্যাবসাদার নই, পেশাদার, প্রফেশনালস। এটা ভুলে যাবেন না মিস বাগচি। রেফারেন্স-বই রাখার জায়গা নেই আমার ঘরে। কী যে, করেন আপনারা! আমি তো একটা অফিস-অর্ডারও করে দিয়েছিলাম। করিনি? তা ছাড়া আমার ঘরেও আগামী সপ্তাহে কম্পিউটার বসবে। এখনও যদি এসব জঞ্জাল সাফ না করান তো কী করে কী হবে!

হ্যাঁ স্যার।

কই? অর্ডারটা আনুন তো? কোন ডেট-এর অর্ডার?

গতমাসের পাঁচ তারিখের?

তা ডেস্ট্রয় করেননি কেন?

ভেবেছিলাম, আপনাকে দেখিয়ে করব। তা আপনি তো ট্যুরের ওপরেই আছেন।

তার মানে? ট্যুরে যাওয়া মানে কী হানিমুনে যাওয়া?

স্যার, আমি কী তাই বলছি?

মুখে মুখে কথা বলবেন না।

না।

আজকেই ডেস্ট্রয় করুন।

স্যার, আমার মাসতুতো দিদির বিয়ে পরশু। তাই নিয়েই গত পনেরো দিন খুব ব্যস্ত আছি।

বাঙালির আর কাজ কী বলুন? বিয়ে করা আর সন্তান উৎপাদন করা।

বলেই বুঝল, ‘জাত’ তুলে কথা বলাটা ঠিক হয়নি, যা দিনকাল পড়েছে। কেন যে, মেয়ে হয়ে জন্মায়নি তা ভেবে বড়োই মনস্তাপ হয় আজকাল নীলকমলের। তাই সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে বলল, চাড্ডাসাহেব ফোন করেছিলেন বইগুলোও আজ-ই এসে যাবে। যা-হয় আজ করুন। করা হয়ে গেলে আমার অর্ডারের ওপরে ‘এগজিকিউটেড’ লিখে, ব্যাক ডেট দিয়ে সই করে ফেরত দেবেন। ধরসাহেব আমার অফিস ইন্সপেকশন-এ আসবেন শিগগির।

তারপর-ই বলল, ওই ফাইলটাতে আছে কী?

ওই ইন্টারভিউ-এর কাগজপত্র।

মিস বাগচি বললেন।

লোক তো সব পোস্টেই নিয়ে নিয়েছেন সাহেবরা ইন্টারভিউ করেই। এগুলোর আর কি কোনো দরকার আছে?

আমি কী করে বলব স্যার?

কমনসেন্স-এ বলবেন। দ্যা most uncommon quality common sense-এ। আর কী করে?

আজ-ই সব পুড়িয়ে দিচ্ছি রামলগনকে বলে।

সাবধান! রেকর্ডে যেন থাকে যে, গতমাসের পাঁচ তারিখেই পুড়িয়েছেন নইলে ধর সাহেব..

বুঝেছি, স্যার, বুঝেছি। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন।

বলেই, চলে যেতে গিয়ে বললেন, আজ তিনটেতে যাব স্যার?

কেন?

হবু জামাইবাবুকে নিয়ে ওঁর ঘড়ি আর জুতো কিনতে নিয়ে যাব।

এই গরমের দুপুরে? সেদ্ধ হয়ে যাবেন যে।

কী করা যাবে স্যার? জামাইদের বাড়ি কেষ্টনগরের নেদেরপাড়াতে। দুপুর দুপুর না-হলে সাড়ে চারটের লোকালে কেষ্টনগরে ফিরবেন কী করে? ওদিকেও তো কাজ কম নেই।

যান যান, যা-খুশি করুন।

একেবারে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল নীলকমল।

ভাবল, না:! একজন বাঙালিকেও আর চাকরিতে নেব না। সত্যি! দে ডোন্ট ডিসার্ভ। দে ডোন্ট ডিসার্ভ এনিথিং। আজকে সি পি এম-এর বনধ, কালকে ই. কংগ্রেস-এর, পরশু ও কংগ্রেস-এর, তার পরদিন ভাজপার, তারপরদিন তৃণমূলের, তারপর দিন কন্দমূলের, তারও পরদিন সাপের পাঁচ পা-র। আজ ওয়ার্ল্ড কাপ, কাল ওয়ান ডে ক্রিকেট, পরশু ভীষণ গরম, তারপর দিন গরম কম কিন্তু হিউমিডিটি বেশি, তারপরের দিন অসম্ভব বৃষ্টি, তারপর দিন জব্বর ঠাণ্ডা, তারপর দিন রেল রোকো, তারপর দিন বাস রোকো। তারপর দিন লোকাল ট্রেনে মোষ কাটা পড়েছে। আর তাও যদি না থাকে, তো পিসতুতো দিদির বিয়ে, জামাইষষ্ঠী, তারপর নিজের বিয়ে, ডেলিভারি। উইমেন্স লিব-এর পরাকাষ্ঠা! পুরুষদের পেট যে, ভগবান কেন ফোলালেন না, তা তিনিই জানেন! কী অবিচার! ভাবছিল, নীলকমল।

পরক্ষণেই নীলকমলের মনে পড়ে গেল যে, নমিতা বাগচি ধরসাহেবের-ই এক বন্ধুর শালির মেয়ে না ভায়রাভায়ের মেয়ে যেন। তাঁর রেকমেণ্ডাশনেই আধুনিক ইতিহাসে ফর্টি-টু পার্সেন্ট নম্বর পেয়ে পার্ট টু পাশ করেও এই ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম-এ ঢুকেছিল।

সর্বনাশ! যদি ধর সাহেবকে বলে দেয়! চিন্তিত মনে, তাই কথা ঘোরাবার জন্যে বলল, তাড়াতাড়ি বলল, তখনও দাঁড়িয়ে-থাকা নমিতা বাগচিকে, আপনার হবু-জামাইবাবু খুব-ই বোকা বলতে হবে।

কেন?

একটু অবাক হয়ে নমিতা বলল।

এই গরমে কেউ বিয়ে করে? তোয়ালে দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বউকে আদর করবে? তা ছাড়া লেপও তো পাবেন না শ্বশুরবাড়ি থেকে একটিও। লেপ-ই না পেলে, বিয়ে করে লাভ কী?

আপনি কি বিবাহিত স্যার?

কে, কে?

চমকে উঠে বলল নীলকমল।

আপনি?

না, না।

আপনি যখন বিয়ে করবেন তখন শীতকালে করবেন। নমিতা বলল।

আর আপনি? আপনি কি বিবাহিত?

ধমকের সুরে বলল নীলকমল।

না।

তাহলে আপনিও।

মানে?

মানে, শীতে।

চার

এখন খর সকাল।

পথপাশের প্রাচীন নিমগাছটার ফিনফিনে পাতারা হাওয়ায় নড়ছে। কাক ডাকছে কা-খা-কা।

শিরীষ গেছেন পাশের বাড়ির চিরন্তনবাবুর কাছে। উনিও রিটায়ার্ড তবে ভদ্রলোকের নানা বিষয়ে শখ আছে। গান-বাজনা-সাহিত্য। তবে খেলাধুলোতে নেই। বলেন, যার যা গড়ন। কোনোদিন যা করিনি আজ বুড়োবয়সে টিভি-র দৌলতে ঘরে বসে দেখা যায় বলেই যে, সময় নষ্ট করে খেলা দেখতেই হবে তার কী মানে আছে? প্রত্যেকের জীবনেই একটা priority-র ব্যাপার থাকা উচিত। মানুষের জীবন তো নদী নয়, কী সমুদ্র নয় যে, চিরদিন বয়ে যাবে! জীবন বড়ো ছোটো বলেই এই জীবন নিয়ে কী করব আর কী না করব, সে-বিষয়ে অত্যন্ত সচেতন থাকা উচিত ছেলেবেলা থেকেই।

আসলে চিরন্তনবাবুর সঙ্গে কুসুমের-ই বন্ধুতা বেশি। ঘণ্টার পর ঘন্টা চা-মুড়ি আর তেলেভাজা খেয়ে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা হয়। বিদেশি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, জয় গোস্বামী, হর্ষ দত্ত, অনীতা অগ্নিহোত্রী, অনিল ঘড়াই, স্বপ্নময় চক্রবর্তী, শিবতোষ ঘোষ, সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরও নানা আধুনিক বাঙালি সাহিত্যিকের নানা বই নিয়ে।

বেশ মানুষটি।

আনাজ কেটে দিয়েছে গীতা। রাতে পাতলা করে কালোজিরে কাঁচালঙ্কা ফোড়ন দিয়ে মুসুর ডাল করবেন। পোস্ত-বাটা। ডিম সেদ্ধ। কড়কড়ে করে আলু ভাজা আর কুচো চিংড়ি দিয়ে লাউ। মধ্যে ধনেপাতা পড়বে। লোক তো দু-জন। বেশিকিছু করতে ইচ্ছে যায় না। প্রথমত, সামর্থ্য নেই, দ্বিতীয়ত, ইচ্ছেও করে না। খেতে হয়, তাই খাওয়া। সব-ই গোছানো আছে। করতে আধঘণ্টাও লাগবে না।

কুসুম ভাবলেন, ওই ফাঁকে একবার নাতনির সঙ্গে কথা বলেন। নিজের জন্যে মনোমতো করে এককাপ চা বানিয়ে নিয়ে ফোনের কাছে গেলেন। ডায়ালের বোতাম টিপতেই যথারীতি তিনি—

হ্যালো।

জলপিপি পাখি আছে?

নেই। পাথি তো নেই, আমি আথি।

তুমি কী?

আমি মানুথ। কিন্তু পাখিও। ও-ও বুদেথি, বুদেথি। তুমি দিদা! তাই-না? তুমি দে বলেথিলে আমাকে অবন টাকুলেল ‘লাদকাহিনী’ পলে থোনাবে আর বিভূতিভূষণের ‘তাঁদের পাহাড়’ তার কী হল দিদা?

শোনাব, শোনাব। তুমি আমাদের বাড়ি এসো, তবে-না।

আমি তো ক-দিন তোমাল কাথেই তাকব। মা তো নীলকমলকাকুর সঙ্গে বেলাতে দাবে।

বেড়াতে যাবে? কোথায়?

ভুরু কুঁচকে গেল কুসুমের। ভীমরতি ধরেছে মেয়ের। নিজের গর্ভের সন্তান-ই দিনে দিনে হেঁয়ালি হয়ে উঠছে যেন।

তা তো দানি না দিদা। তবে বলেথে, আমাকে লেখে দাবে। এখন কুব গলম কিনা।

চিন্তান্বিত গলাতে কুসুম বললেন, তাই?

তারপর বললেন, তোমার মা কোথায়?

মা তান কলতে গেথে। দানো দিদা, মা-না, আদকাল আর তানঘলে গান গায় না তান কলার থময়ে। থবথময়ে গম্ভীল হয়ে থাকে। আমাল থঙ্গেও ভালো করে কথা বলে না।

কেন? কী হয়েছে তোমার মায়ের, পিপি?

কী হয়েথে তা আমি কী কলে দানব? তোমাল তো মেয়ে হয় আমাল মা, তুমি দানো না? আমাল মা তো আমাল থব কথাই দানে।

গম্ভীর হয়ে গেলেন কুসুম।

কী করে বলবেন, চার বছরের জলপিপিকে যে, মেয়েরা বড়ো হয়ে গেলে, তাদের বিয়ে হয়ে গেলে, তারা পরের বাড়িতে পরের বউ হয়ে গেলে, মায়েরা মা হওয়া সত্ত্বেও, মেয়েদের সব কথা জানতে পারেন না। তারা বড়ো হলে তাদের ব্যক্তিত্বের কারণেই সব কথা বলতেও চায় না। নিজের মনকে কোটরে ঢুকিয়ে ফেলে। মায়ের পক্ষেও সব জানা সম্ভব হয় না।

কুসুমকে চুপ করে থাকতে দেখে জলপিপি বলল, আমাল মন বালো নেই দিদা।

কুসুম নিজের কোটরে-ঢোকা মনকে বাইরে এনে বললেন, কেন গো দিদা? মায়ের জন্যে?

না না। থে দন্যে নয়, তবে থে দন্যেও একতু বতে। আথলে হাথিদি না, আজ কাকের বাথাটা ভেঙে দিমগুলো থব নীচে ফেলে দিয়েথে। পাথেল বাড়ির হুলো বেড়ালটা কচকচ কলে দিমগুলো কেয়ে ফেলল দিদা। দিম-এর মধ্যে যে-বাত্তাগুলো থিলো থেগুলো আর তো উড়তে পালবে না, দাকতে পালবে না, তাই-না?

তাই তো। কিন্তু হাসি এমন করল কেন? ভারি অসভ্য তো! নিষ্ঠুর! মায়াদয়া নেই একটুও। ভারি নিষ্ঠুর! মেয়ে হয়ে কেউ এমন করে?

মা-ই তো বলল, ভাঙতে। হাথিদিদি তো ভাঙতে তায়নি।

মা! তোমার মাই ভাঙতে বলল?

হ্যাঁ তো।

কেন?

মা বলল, বাথা বানাবার আর দায়গা পেল না হতচ্ছালি! পাখিল নীল! ফু:! দত্তসব নোংলা ব্যাপাল। বাজে ব্যাপাল।

বাজে ব্যাপার? তোমার মা বলল পিপি?

হ্যাঁ তো। মা তান করে বেরোলে মাকে দিগগেথ কোলো তুমি।

হাসি কোথায়?

বাদালে গেথে। তোমার দন্যে মাংথ আনতে গেথে। তুমি তো কাল আথবে আমাদের একানে, দুপুলে কাবে। আমি থব জানি। কাল তো বেথপতিবার, মাংথ পাওয়া যায় না।

কুসুম বললেন, আচ্ছা দিদা, এখন আমি ফোনটা ছাড়ি। পরে আবার কথা বলব কেমন? তোমার মাকে বোলো বাথরুম থেকে বেরিয়ে একটা ফোন করতে আমাকে।

হ্যাঁ হ্যাঁ। নিততই বলব।

কুসুম রিসিভারটা নামিয়ে রেখে চা-টা একচুমুকে শেষ করে বিষণ্ণ মুখে রান্নাঘরে গেলেন। মনটা ভালো লাগছিল না ওঁর। সল্লি যে, কেন ডিমসুদ্ধু কাকের বাসাটা ভাঙতে গেল? যত্তসব অলক্ষুণে কান্ড। পাখিও তো মা। নিজে মা হয়েও...। সত্যি! আজকালকার মেয়েদের বোঝা যায় না। দাম্পত্যর ওপরে, নীড়ের ওপরেই কী তার ঘেন্না জন্মে গেল? নতুন করে আবার কী হল কে জানে!

রান্নাঘরে গেলেন কিন্তু কিছুই করতে পারলেন না। গ্যাসের উনুনের সামনে যে, লম্বা টুলটি বানিয়েছেন বসে বসে রান্না করার জন্যে তাতে গিয়ে বসলেন। মেঘ জমেছে যেন, আকাশে। হাওয়াও আছে একটা মৃদুমন্দ। পাশের বাড়িটাই চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট বসুসাহেবের। মস্ত লন আছে। সেই লনে নানারকম ফুলের গাছ। সব গাছ তো চেনেন না কুসুম, সব ফুলও নয়। অথচ মা-বাবা তাঁর নাম দিয়েছিলেন কুসুম। সেই হাওয়াতে মিশ্র ফুলের ও পাতার ও গাছের গায়ের গন্ধ ভাসছে। কিসকিস করে আলতো চুম খাওয়ার মতন শব্দ করে পাখি ডাকছে কোনো। কুসুম, পাখিও চেনেন না তেমন। চেনেন শুধু শালিখ, কোকিল, চড়াই এবং কাক।

আলস্য ও বিষণ্ণতা কাটিয়ে উঠে কাঁচালঙ্কা, কালোজিরে সম্বার দিলেন মসুর ডালে। ফুলের গন্ধর-ই মতন সম্বারের গন্ধে বাড়ি ম-ম করে উঠল। কুসুম ভাবছিলেন, সল্লি কেন জলপিপিকে তাঁর কাছে রেখে নীলকমলের সঙ্গে দুবরাজপুরে যাবে? আবার কী হল? দুবরাজপুরেই কি যাবে, না নীলকমলের সঙ্গে ফুর্তি করতে অন্য কোথাও? তাঁর-ই মেয়ে হয়ে এমন কুরুচি হল কী করে সল্লির? মনটা ভারি খারাপ হয়ে আছে তাঁর নাতনির সঙ্গে কথা বলার পর থেকেই। ঠিক এমন-ই সময়ে দুর্গাবাড়ির আলসের ওপর থেকে কালচে কবুতরেরা যেমন অলক্ষুণে স্বরে ডাকে ভরদুপুরে তেমন-ই স্বরে ফোনটা কিরিরিং করে উঠল। অমন আওয়াজ হলে বোঝা যায় যে, এস টি ডি কল এল কোথাও থেকে। অলক্ষুণে স্বরে বাজলেই কুসুমের ভয় করে। কোনো খারাপ খবর নিয়ে আসেই ওইরকম আওয়াজের দূরাগত ফোন।

ডালটা কড়াইতে বসিয়েই গেলেন ফোন ধরতে। শিরীষের আর কী? বাড়িতে থেকে রান্নার সময়ে ফোনটা ধরে যে, একটু সাহায্য করবেন তাও কী করেন! অধিকাংশ রিটায়ার্ড বুড়োগুলোই একরকম। কুচুটে। রামগড়ুরের ছা। প্রসাদের কাছে গিয়ে কিছুদিন থাকলে হয়তো বদলাতেন একটু। এঁরা সবাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অপাঠ্য খবরের কাগজ পড়বেন পত্রিকার নাম থেকে শুরু করে ‘প্রিন্টেড অ্যাণ্ড পাবলিশড বাই’ পর্যন্ত। তারপর ব্রেকফাস্টের পর ছাতা হাতে করে পাড়া বেড়াতে বেরোবেন, গেজেট অফ ইণ্ডিয়ার চলমান সংস্করণ হয়ে। ফিরে এসে, স্ত্রীর রান্না করা নানা পদ তরিবত করে খাবেন আর খুঁত গালবেন।

তারপর শিবা-ভোগ খেয়ে দিবা-শয়নে পদ্মনাভ। তারপরে বিকেলে চা এবং টা। ছাতা হস্তে বৈকালিক ভ্রমণ। গুচ্ছের রিটায়ার্ড বুড়োদের সঙ্গে পার্কের বেঞ্চে বসে ছেলে-বউ-এর শ্রাদ্ধ করবেন আর মেয়ে-জামাই-এর প্রশংসা। তারপর বাড়ি ফিরে এসে, বগলতলিতে সাবান মেখে চান করে টি.ভি.র সামনে বসে সর্বজ্ঞ সর্বজ্ঞ মুখ করে রাজনীতি থেকে গল্ফ, টেনিস থেকে রবীন্দ্রসংগীত, নৃত্য থেকে ক্রিকেট, সর্ববিদ্যা বিশারদ হবেন। রাতের কথা আর না বলাই ভালো। সাধ্য নেই অথচ সাধ অসীম! বাজ্জে! এবং বর্জ্য! এরা সবাই-ই কি একইরকম? কে জানে!

আসলে যেসব মানুষ জীবিকা নিয়েই সারাটা জীবন কাটিয়ে দেন, জীবিকাকেই ‘জীবন’ বলে ভেবে নেন, জীবিকা যে, জীবনের কারণেই শুধু দরকার —এই সরল সত্যটা না বোঝেন, জীবিকা ছাড়া অন্য আর কোনো ব্যাপারেই যাঁদের কোনো ঔৎসুক্য না থাকে, সেই মানুষেরাই অবসর নেওয়ার পরে ফেটে-যাওয়া টায়ারের মতন ঘষে ঘষে জীবনের পথে চলেন। পরনিন্দা-পরচর্চা আর ছিদ্রান্বেষণ ছাড়া তাঁদের আর কিছুই করার থাকে না। তাই কুসুমের মনে হয়, প্রসাদকে দেখে শিরীষদের শেখা উচিত। জীবিকাতে নিমজ্জিত থাকার সময়েই যাঁরা অবসর জীবনের স্বপ্ন না দেখেন, তখন কী করবেন, না করবেন তা না ভাবেন, তাঁদের মাথার গোলমাল আছে বলেই মনে হয়। অথচ এইসব মানুষের অধিকাংশই অত্যন্তই উচ্চশিক্ষিত। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, অ্যাকাউন্ট্যান্ট, আর্কিটেক্ট, আর্মি-অফিসার। শিক্ষার সঙ্গে সাধারণ বুদ্ধির সাযুজ্য কেন যে, একেবারেই থাকে না, তা ভেবে পান না কুসুম।

চিরন্তনবাবু অন্যরকম। মানুষটাকে খারাপ লাগে না। তিনি সত্যিই সাহিত্য-বোদ্ধা। তাঁর সঙ্গে বসে সহজ আনন্দে সময় কেটে যায়। কিন্তু হলে কী হয়! রোমান্টিক সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতে করতে মেয়ের ঘর এবং ছেলের ঘরে নাতি-নাতনি থাকা বুড়ো, কুসুম বাড়িতে একা থাকলেই ব্লাউজের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে দেন। ঘেন্নায় মরেন কুসুম। যখন বারোমাসেই ফুল ফুটত গাছে, যখন সুগন্ধে ‘ম-ম’ করত পাড়া, পাখি ডাকত সর্বাঙ্গে তখন-ই এলি না আর এখন মরা এবং শুকনো গাছে হাত ঘষে লাভ কী?

আসলে পুরুষমাত্রই বোধহয় শরীর-সর্বস্ব। যাহা পাই তাহা খাই ভাব ছুকছুকুদের। ‘ভালোবাসা’ যে, কাকে বলে তা প্রসাদের মতন খুব কম পুরুষ-ই বোঝেন। ‘‘প্রেমের আনন্দ থাকে শুধু স্বল্পক্ষণ, প্রেমের বেদনা থাকে সমস্ত জীবন।’’ —এই পঙক্তি দু-টির তাৎপর্য ক-জনে বোঝেন? বিশেষ করে পুরুষেরা?

চিরন্তনবাবুর স্ত্রী চামেলি অত্যন্ত সুন্দরী, ব্যক্তিত্বসম্পন্না এবং বয়সেও চিরন্তনবাবুর চেয়ে বছর দশেকের ছোটো। তবুও কেন যে, অমন করেন চিরন্তনবাবু! কে জানে! হয়তো বৈচিত্র্যের প্রতি সব পুরুষের-ই এক দুর্নিবার আকর্ষণ থাকে। জানেন না কুসুম। কুসুম ভাবেন যে, চামেলি যদি জানতে পারে কখনো, তবে চিরন্তনের সর্বনাশ হবে। তবে কুসুম কখনো বলেননি। জীবনে অনেক বসন্ত পার করে এসে এখন বোঝেন কোন মানুষের যে, কোথায় দুঃখ তা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। স্ত্রী-পুরুষ সকলের বেলাতেই এই কথা খাটে। কে যে, কেন কার কাছে আসে, তা শুধু সেই জানে। শরীরকে নিয়ে ভয়ের আজ আর কিছু নেই বলেই বুদ্ধিমতী কুসুম সহজে মমতাময়ী হতে পারেন। ‘আনন্দম। আনন্দম। আনন্দম।’ দু-দিনের পৃথিবী। অত অল্পেতেই যদি কেউ সুখী হন তো করলেন-ই বা তাঁকে একটু সুখী। তাঁর তো হারাবার কিছু নেই। ভালোত্ব, খারাপত্ব, সতীত্ব, এসব কথার মানে বদলে গেছে। প্রেক্ষিত বদলে গেছে। তা ছাড়া, এই শব্দগুলি আপেক্ষিকও বটে।

কুসুম ফোন তুলে বললেন, হ্যালো।

মা তুমি ফোন করেছিলে?

হ্যাঁ কীসব বলল পিপি। তুই নাকি নীলকমলের সঙ্গে বাইরে যাচ্ছিস? কোথায় যাচ্ছিস?

হ্যাঁ মা। দুবরাজপুরে।

এই আগুন-গরমের মধ্যে?

কী করা যাবে? আমার ঘরেও যে, আগুন মা!

তার মানে?

সেসব অনেক কথা। ফিরে এসে তোমাকে সব বলব।

তা বলে নীলকমলের সঙ্গে কেন? তোর বাবার সঙ্গে যা। আমিও তো যেতে পারি। তোর বাবা দু-তিনদিন চিরন্তনবাবুদের বাড়ি খেয়ে নেবেন।

না মা। বিয়ে তো আমিই করেছিলাম তোমাদের মতের বিরুদ্ধে। লুকিয়ে রেজিস্ট্রি করে এসেছিলাম। পরে তোমরা না-হয় জাঁকজমক করে ফর্ম্যাল বিয়ে দিলে। বিয়ে করার সময়ে যখন তোমাদের কথা শুনিনি, বিয়ে ভাঙার সময়েই বা তোমাদের জড়াতে যাব কেন?

বিয়ে ভাঙবেই, সে-বিষয়ে তুই এখানে বসেই এমন নিশ্চিন্ত হলি কী করে? নীলকমলের দুর্বুদ্ধিতে তুই এখনও চলছিস?

ওর বুদ্ধিই নেই মা। তার সুবুদ্ধি আর দুর্বুদ্ধি! তা ছাড়া, ধরসাহেব নিজে ফোন করেছিলেন। উনি চান যে, আমি নিজে একবার যাই। উনিই নীলকলমকে অর্ডার করেছেন, আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। এটাও নীলকমলের অফিসের কাজ। সে শখ করে যাচ্ছে না আমার সঙ্গে।

ধরসাহেব ডাকলেন কেন? তাঁর মেয়ের সঙ্গে বিয়ে দেবেন নাকি বাজ-এর? কী জাহাঁবাজ মানুষ। অঢেল টাকা থাকলে আর এন. আর. আই. হলেই কি যা-খুশি তাই করা যায়?

মা-মা-মা! তুমি কেন না জেনে, ভদ্রলোককে দোষারোপ করছ! ভদ্রলোক কতখানি ভালো হলে...। এইসব ব্যক্তিগত ব্যাপার নিয়ে কি অন্য কেউই, এত কনসার্নড হতেন? ওঁর কী প্রয়োজন ছিল!

না: তুই কতটুকু বুঝিস? কারো পৌষ মাস, কারো সর্বনাশ। হয়েছেটা কী?

তা তো আমি নিজেও জানি না। গিয়েই দেখব।

ওই নীলকমলও জানে না? আমি বিশ্বাস করি না।

হয়তো ও জানে কিন্তু ও হয়তো চায় না যে, ওর মুখে শুনে আমি বায়সড হই। ও আমার সঙ্গে বাজ-এর সম্পর্কটা যাতে না ভাঙে তাই চাইছে হয়তো।

জানি না। যা খুশি কর। কিন্তু মাত্র ক-দিন আগে এরকম একটি চিঠি যে-ছেলে তার স্ত্রীকে লিখতে পারে সে তার স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটাবে কেন, তা আমার বুদ্ধির বাইরে। তোর কি কমনসেন্সও নেই।

কে জানে মা? হয়তো নেই। কমনসেন্স-ই তো সবচেয়ে আনক-মন। শোনো মা! কাল বিকেলে গিয়ে আমি পিপিকে তোমার কাছে রেখে আসব। ওকে আদর দিয়ে গোবর কোরো না। এমনিতেই তো যা, পাকা হয়েছে তা বলার নয়।

না, না, তোর চিন্তা নেই। আর কারোকেই আদর দেব না। একমাত্র কন্যাসন্তানকে আদর দিয়ে কী লাভ যে, হল আমার তা কী আর বুঝছি না।

একটুক্ষণ চুপ করে থেকে সল্লি বলল, একটা স্যুটকেস-এ ওর প্যান্টি, নিমা, জামা, পাউডার, ক্রিম সব দিয়ে আসব ওর সঙ্গে। বড়োজোর তিনদিন লাগবে আমার ফিরতে। সম্ভব হলে ফোন করে জানাব যাতে, সোজা তোমাদের ওখানেই ফিরতে পারি। যেদিন যাব সেদিনও ফিরে আসতে পারি।

ঠিক আছে। কাল রাতে পিপি কী খাবে? তুই-ও আসবি যখন এখানেই খেয়ে যাস। রাতে থাকবি তো?

হ্যাঁ রাতটা তোমার ওখানেই কাটাব মা—খুব ভোরে ট্যাক্সি নিয়ে হাওড়াতে যাব। গণদেবতা ধরে শান্তিনিকেতন। সেখানে স্টেশনে ধরসাহেব গাড়ি পাঠাবেন।

‘গণদেবতা’? সেটা আবার কী? ‘শান্তিনিকেতন’ এক্সপ্রেস-এর কথাই তো জানতাম।

হয়েছে। নতুন গাড়ি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের নামে গাড়ির নাম। তারাশঙ্কর তো বীরভূমের-ই মানুষ ছিলেন।

ও। আর নীলকমল?

সে আমার জন্যে হাওড়া স্টেশনের বড়োঘড়ির নীচে অপেক্ষা করবে। টিকিটও তো ওর-ই কাছে।

ঠিক আছে।

কুসুম বললেন।

তারপর বললেন, হ্যাঁরে নিজে সন্তানের মা হয়ে কোন আক্কেলে তুই কাকের বাসাটা ভেঙে দিলি? ডিম পাড়বার আগে যদি, ভাঙতিস তাও বুঝতাম।

কত নীড়-ই তো ভেঙে যায়। মানুষের যদি এত ভাঙে তো কাকের নীড়ও না-হয় ভাঙল কিছু। তিক্ত গলাতে বলল, সল্লি।

কিন্তু ডিম পাড়ার পর! তুই কীরকম মা?

সল্লি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমিও তো ডিম পেড়েছিলাম মা। ডিম ফুটে বাচ্চাও...। তবে আমার নীড় কেন ভাঙল? কেউ তো ভাঙল। নীড়-এ আমার আর বিশ্বাস নেই। কী মানুষের নীড়ে আর কী পাখির।

কুসুমের গলা কান্নাতে বুজে এল। কথা বলতে না পেরে চুপ করে রইলেন। সন্তানেরা আর কতটুকু বোঝে তাদের কষ্টে তাদের মা-বাবার কতখানি কষ্ট হয়! সল্লিও বুঝবে না। হয়তো জলপিপিও বুঝবে না বড়ো হয়ে।

তারপর কুসুম নিজেকে সংযত করে নিয়ে বললেন, রোদ পড়লে তবে আসিস। এ-বছর যা গরম পড়েছে, মানুষ আর বাঁচবে না।

হুঁ।

বলল, সল্লি।

পাঁচ

‘গণদেবতা’ এক্সপ্রেস নতুন গাড়ি। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বীরভূম-এর ওপরে এক বিশেষ দুর্বলতা ছিল। তাঁর প্রজন্মের অনেক দুষ্টুলোক তারাশঙ্করের এই বীরভূমপ্রীতির জন্যে তাঁকে আড়ালে ডাকতেন ‘ট্যারাশংকর’ বলে। শুনেছিল নীলকমল তার জ্যাঠামশায়ের লাভপুরের জমিদার এক মক্কেলের কাছ থেকে। ভদ্রলোক নিজে জমিদার হয়েও ভিখিরিরও অধম ছিলেন আর মিথ্যাচারী। গরিব মানুষদের মামলায় মামলায় উত্যক্ত করাই ছিল তাঁর কাজ। অধিকাংশ উকিলদের কাজ-ই ভালো নয়। তার জ্যাঠামশাইকে দেখেই নীলকমল উকিল হয়নি। হলে নি:সন্তান জ্যাঠামশায়ের সেরেস্তা ও মক্কেলও পেয়ে যেত। অনেকই আয় করতে পারত।

ভাবছিল, নীলকমল।

রাঢ় বাংলার মানুষদের নিয়েই বেশি লিখেছেন। বলল নীলকমল। ‘গণদেবতা’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, আরও কত বই।

জানি। ‘গণদেবতা’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কালিন্দী’, ‘দুই পুরুষ’ আরও কত বই! আমার তো ওঁর লেখা খুব-ই ভালো লাগে। সল্লি বলল।

এই ট্রেনের নামকরণটি ভালো হয়নি?

হুঁ। দেশে কিছু কিছু ভালো কাজ তো নিশ্চয়ই হয়। শক্তিপুঞ্জ এক্সপ্রেস-এর নাম করে দেওয়া উচিত কোয়েলের কাছে বা কোয়েল এক্সপ্রেস অথবা একটু উষ্ণতার জন্যে এক্সপ্রেস।

হ্যাঁ। বলে, হাসল নীলকমল। বলল, বুদ্ধদেব গুহর কু-প্রভাব এখনও কাটিয়ে উঠতে পারলে না।

না। পারলাম আর কই? সত্যি! কু-প্রভাবই বটে!

শান্তিনিকেতনে কখন পৌঁছোব আমরা? শান্তিনিকেতন হয়েই যেতে বললেন কেন ধরসাহেব?

কথা ঘুরিয়ে বলল, সল্লি।

এয়ার-কণ্ডিশানড কোচ আছে বলে। চেয়ার কার। শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস-এও যেতে পারতাম, সে গাড়িতেও তো এসি কোচ আছে। কিন্তু সাড়ে বারোটা নাগাদ পৌঁছে এ.সি. কোচ থেকে নামলেই গায়ে ফোসকা পড়বে। গতসপ্তাহে বেয়াল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। এখন হয়তো আরও বেড়েছে। শ্রীনিকেতনের হিসেব। দুবরাজপুরে আরও কয়েক ডিগ্রি বেশিই হবে। তার ওপর লোডশেডিং হলে তো কথাই নেই।

কতক্ষণ লাগবে শান্তিনিকেতন থেকে দুবরাজপুর যেতে? আমি তো যাইনি কখনো।

শান্তিনিকেতন থেকে দুবরাজপুর পঁয়তাল্লিশ কিমি মতো। গাড়িতে যেতে ঘণ্টা দেড়েক মতো লাগবে। পথে চা-টা খেয়ে।

আমরা তো পানাগড় বা দুর্গাপুর হয়েও যেতে পারতাম।

তা পারতাম। তবে গ্র্যাণ্ড-ট্রাঙ্ক রোডের যা-অবস্থা তা দেখে শেরশাহ বেঁচে থাকলে আত্মহত্যাকরতেন। ও-পথ দিয়ে গেলে অনেক বেশি সময় লাগত। ধরসাহেব জানেন বলেই হয়তো...

শান্তিনিকেতনে পৌঁছোবে কখন ‘গণদেবতা’?

সাড়ে নটাতে বোধ হয়। এই গাড়িতে আমি কখনো যাইনি। তবে ঠিক সময়ে পৌঁছোলে রোদ চড়া হওয়ার আগেই দুবরাজপুরে পৌঁছে যাব।

ভেস্টিবিউল গাড়ি। কিছুক্ষণ পরেই একটি ছেলে ‘লেবু চা’ ‘লেবু চা’ করতে করতে ওদের কামরাতে এল অন্য কামরা থেকে।

খাবে?

নীলকমল জিজ্ঞেস করল সল্লিকে।

ট্রেনের লেবু চা কি ভালো হবে?

লেবু চা, তারমধ্যে গোলমরিচের গুঁড়ো। চিনি-দুধ-এর চা-এর চেয়ে ভালো। খেয়ে দেখতে পারো।

আপনিই খাওয়াবেন?

এর চেয়ে, বেশিকিছু করি এমন সাধ্য কী আমার আছে?

সল্লির চোখে চোখ পড়লেই নীলকমলের সব গোলমাল হয়ে যায়। হাত-পা অবশ হয়ে আসে। অবশ্য সেই ভাব গোপন করার চেষ্টা করে খুব-ই।

সল্লি মুখে কথা না বলে, দু-টি গাঢ় গভীর কালো চোখ তুলে তাকাল নীলকমলের দিকে।

নীলকমল লক্ষ করেছিল, বড়োঘড়ির নীচেই, যে, সল্লি একটা সাদা জমি আর সবুজ পাড়ের শাড়ি পরেছে। সবুজ ব্লাউজ। হালকা কোনো পারফিউম মেখেছে। সাদা আর সবুজ চৌখুপি চামড়ার চৌখুপি ব্যাগ একটা। স্নান করে উঠে চুলটা পনি-টেইল করে বেঁধেছে। মাথার তেলের সুগন্ধ উড়ছে বাতানুকূল কামরাতে ওপরের পাখার হাওয়ায়। তখনও ভিজে আছে চুল। সল্লির ডান হাতের কনুই নীলকমলের বাঁ-হাতের কনুই-এর সঙ্গে লেগে রয়েছে। প্রথমবার ইলেকট্রিক শক লাগার মতন মনে হয়েছিল নীলকমলের। লাগতেই, হাত তুলে নিয়েছিল। তারপরে আবার সাহস করে আস্তে আস্তে সইয়ে সইয়ে ছুঁইয়েছে। যেন অনবধানেই ঠেকে গেল, এমন করে! খুব ভালো লাগছে নীলকমলের সল্লির এতকাছে, গা ঘেঁসে বসে। এইরকম বুদ্ধিমতী, ছিপছিপে, সুন্দরী, সুগায়িকা একজন স্ত্রী যদি তারও থাকত, বেশ হত। সল্লিকে প্রথমবার দেখেছিল নীলকমল দূরদর্শনের একটি প্রভাতি অনুষ্ঠানে। সাদা খোলের ওপর হলুদ ফুল তোলা এবং হলুদ পাড়ের একটি ঢাকাই শাড়ি পরে সে তাদের গানের স্কুলের একটি ব্লক-প্রোগ্রামে গান গাইছিল গানের স্কুলের হয়ে। রবীন্দ্র জন্মোৎসবে। গান-ই শুনবে, না ঢাকাই শাড়িই দেখবে, না দেখবে গায়িকাকে, তা বুঝতেই পারছিল না নীলকমল। বসন্তের বিকেলের মতন, বৈশাখের ভোরের মতন, শ্রাবণের দুপুরের মতন এমন সৌন্দর্য কোনো নারীর মধ্যে আগে দেখেনি নীলকমল। তার সর্বনাশ হয়েছিল সেই নাম-না জানা মেয়েটিকে দেখামাত্র। টিভির সামনে-বসা, ওর গাইয়ে সহোদরা রুমা বলেছিল, ‘দাদা কী চমৎকার গায় রে মেয়েটি আর তেমন-ই ব্যক্তিত্ব! সুন্দরী তো অবশ্যই। তোর জন্যে বউ আনলে এইরকম বউদিই আনব।’

নীলকমল করুণ হাসি হেসে বলেছিল শাড়িটা দেখেছিস? আমাকে বিক্রি করলেও কী অমন একটা শাড়ি হবে? কত দাম হবে রে?

তা ঠিক জানি না। আমিও তো রোজ রোজ এমন শাড়িই পরি কিনা! তবে মনে হয় হাজার দু-তিন তো হবেই।

হাজার দু-তিন! বলিস কী রে! এই কন্যার জন্যে কত রাজপুত্র অপেক্ষা করে আছে অর্ধেক রাজত্ব নিয়ে। অমন ফুলকে তুলে এনে ঘর সাজাই এমন ফুলদানি কী আমার আছে? না কোনোদিন হবে! তা ছাড়া, আমার বিদ্যা-বুদ্ধি এবং যোগ্যতাই বা কতটুকু যে, এমন মেয়ে আমাকে মানুষ বলে গণ্য করবে! আমি একটা যা-তা। দূরদর্শনে সেই প্রভাতি অনুষ্ঠান দেখার বছর দুয়েক পরে সেই মেয়েটিকেই যখন নববধূর বেশে বাজ-এর বিয়ের রাতে সুবেশা, সালংকারা দেখল বাজ-এর সঙ্গে মালাবদল করতে তখন বরযাত্রী নীলকমলের বুকের মধ্যে কে যেন, ছুরি আমূল বিদ্ধ করে দিয়েছিল।

বিয়ের পর পর যখন, বরযাত্রীদের মধ্যে ফিরে এল বর তখন, বাজ তার কলেজের সতীর্থ এবং সহকর্মী নীলকমলকে বলেছিল, কিরে নীল, আমার বউকে পছন্দ হয়নি তোর? মুখটা অমন ব্যাজার করে আছিস কেন?

নীলকমল মাথা নীচু করে বলেছিল, খুউব, খুউব।

মুখে বলেছিল বটে সে-কথা, কিন্তু এক অদ্ভুত অপরাধবোধে আচ্ছন্ন হয়েছিল ও। বাজ-এর মুখে তাকাতে পর্যন্ত পারেনি।

সপ্রতিভ বাজ বলেছিল, আরে আমার বউ তো পালাচ্ছে না। আর তুইও তো আমার কলিগ-ই। পরে তোর সঙ্গে ভালো করে আলাপ করিয়ে দেব। রুমার সঙ্গেও। তোরাই তো রবীন্দ্রসংগীত-টংগীত করিস। ওকে অ্যাপ্রিশিয়েট করবি তোরা। আমার তো ওসব একেবারেই আসে না। গান-ফান ওসব মেয়েলি ব্যাপার! আমার কোনোই ইন্টারেস্ট নেই।

তারপর দেখতে দেখতে ছ-বছর কেটে গেল। জলপিপি জন্মাল। তারও বয়স হল চার বছর। ওদের দু-জনেরই চাকরিতে অনেক উন্নতি হল।

সল্লির সঙ্গে বাজ যেদিন আলাদা করে নীলকমল-এর আলাপ করিয়ে দিয়েছিল সেদিন সল্লিরও মনে হয়েছিল যে বলে, এতদিন কোথায় ছিলেন? ভেবেছিল, এতবড়ো পৃথিবীতে, কে আর কাকে চেনে? একজনকে পছন্দ করে জীবনসাথি করার পর কতজনের সঙ্গে চেনাজানা হয় আর তখন মনে হয়, ইশ এর সঙ্গে আগে যদি দেখা হত! এই তো আমার স্বপ্নের মানুষ! অথবা মানুষী।

বিয়ের পরে, মা হওয়ার পরে, সল্লি যেন, আরও সুন্দরী হয়ে উঠল। আরও ব্যক্তিত্বময়ী। নীলকমলের কষ্ট আরও বাড়ল। সে কষ্টের কথা মুখ ফুটে কাউকে বলতেও পারেনি। বললেও সল্লি কি বুঝতে পারত? কে জানে! Love at firstsight বলে একটা কথা শোনা ছিল ওর। কিন্তু তা যে, এমন সত্যি হবে ওর নিজের জীবনে আর এমন কষ্টেরও, তা ও দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। বাজ-এর বিয়ের রাতের দিন থেকেই শয়নে-স্বপনে-জাগরণে ও শুধু, সল্লিকেই দেখেছে। সল্লির কথাই ভেবেছে। কত নিদ্রাহীন বাসন্তী ও, বর্ষার রাতে তাকে কল্পনাতে কতরকম করে আদর করেছে। কোনো রাতে কল্পনাতে আদর করার পরেই যেদিন প্রথম দেখা হয়েছে সল্লির সঙ্গে, ভারি লজ্জিত হয়েছে ও। সল্লির চোখের দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারেনি।

সপ্রতিভ, রসিকা সল্লি হেসে বলেছে, কী হলটা আপনার নীলকমলবাবু? আমার প্রেমে পড়লেন নাকি?

সল্লির এই নিষ্ঠুরতাতে মরমে মরে গিয়ে, নীলকমল বোকা-বোকা মুখ করে বলেছে, কী যে বলো!

কেন? আমাকে ভালো লাগে না আপনার? আমি কি প্রেমের অযোগ্যা?

লাগে, লাগে, খুব-ই লাগে।

মুখ নীচু করে বলত নীলকমল।

তারপরে বলত, কিন্তু তুমি তো বাজ-এর স্ত্রী। আমার বন্ধুপত্নী। তা ছাড়া...

তা ছাড়া কী?

প্রেমের কতরকম হয় সল্লি!

সল্লি হেসে বলেছে, কী জানি বাবা। আমি তো একরকম-ই জানি। একরকমেই অস্থির। আবার কতরকম! তারপর কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে, ‘প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে...কে কোথা ধরা পড়ে কে জানে!’

নীলকমলের চোখ সল্লির পোশাকের ওপরে পড়ল। হঠাৎ-ই। সল্লি তা লক্ষ করে স্বগতোক্তির মতন বলল, আমাদের গানের স্কুলের এই পোশাক। সবুজ পাড় সাদা শাড়ি। সঙ্গে সবুজ ব্লাউজ। অনেকদিন পরে পরলাম। স্কুলের সঙ্গে সম্পর্ক তো চুকে গেছে কবেই। তা ছাড়া আগের মতন আর নেইও স্কুল। হয়তো আমিও বদলে গেছি।

আর হলুদ টিপটা?

সেটা ইচ্ছে হয়েছে বলে পরেছি।

তারপর বলল, জানেন, ভাবছি গান আবার শুরু করব নতুন করে। বাড়িতেও শেখাব সপ্তাহে দু-দিন মেয়েদের।

নীলকমল হেসে বলল, এমন করছ তুমি যেন, বাজ-এর সঙ্গে তোমার সম্পর্ক সব চুকেবুকেই গেছে। বাতিল করার আগে বিচার তো করতে হবে। বেচারি আদৌ অপরাধী কি না তা না জেনেই দন্ড ধার্য করছ? Ex-parte order! এটা ঠিক নয়। ধৈর্য ধরো। ‘ধৈর্যর’ মতন বড়োগুণ আর নেই।

হঠাৎ-ই সল্লি বলল, আমার সঙ্গে বাজ-এর যদি সব, চুকেবুকেই যায়, আপনি আমার জন্যে, মানে, সসম্মানে আমাকে বেঁচে থাকতে দেওয়ার জন্যে কিছু কি সাহায্য করতে পারবেন?

সাহায্য? হাসালে তুমি? আগে থাকতেই আজেবাজে ভাবছ যে, কেন তা আমি বুঝতে পারছি না।

বুঝেছি। আপনি প্রশ্নটা এড়িয়ে যেতে চান।

নীলকমল সল্লির দু-চোখে নিজের দু-চোখকে কানায় কানায় ভরিয়ে বলল, কী চাও তুমি বলো? কোন সাহায্য...কতখানি সাহায্য?

আপনি কী দিতে পারেন, কতটুকু পারেন, তা না-জেনে বলি কী করে?

সল্লি একনিশ্বাসে কথাটা বলে তাকিয়ে রইল নীলকমলের চোখে।

নীলকমল বলল, সব, সব দিতে পারি, আমার সর্বস্ব। তোমাকে অদেয় আমার কিছুমাত্রই নেই।

বাক্যদু-টি বাক্যবাগীশের মতন বলে ফেলেই নীলকমল ভাবল, বানিয়ে বলল না তো! ও কি নিজেই বলল কথাগুলো?

সল্লি নীরবে হাসছিল। শুধু ঠোঁট নয়। ওর দু-টি চোখ, ওর চিবুক, ওর মুখের শান্তশ্রী সব-ই যেন ধীরে ধীরে হেসে উঠল, শুক্লপক্ষের রাতে চাঁদের আলো যেমন, ধীরে ধীরে ফোটে। চাঁদের আলোয় যেমন, ধীরে ধীরে ফোটে কুমুদিনী।

নীলকমল-এর মনে হল ও ভালো লাগাতে অজ্ঞান হয়ে যাবে।

সল্লি অস্ফুটে বলল, আমি জানতাম। আপনি মানুষটা খুব ভালো। খাঁটি মানুষ। এই যুগে, এই সময়ে আপনার মতন মানুষ বেশি দেখা যায় না।

ভালো নই, ভালো নই, খাঁটিও নই...

বলতে গিয়ে, নীলকমলের কথাগুলি মুখের মধ্যেই ভিজে গিয়ে নেতিয়ে গেল। সম্পূর্ণ করতে পারল না বাক্যটা।

ছয়

শান্তিনিকেতন থেকে ফেরার ‘গণদেবতা’ ছটা-কুড়ি নাগাদ বোলপুর স্টেশনে আসে এবং মিনিট দু-তিন দাঁড়িয়েই ছেড়ে যায়। ওরা যখন দুবরাজপুর থেকে ফেরার সময়ে বোলপুরে ঢুকেছে বোলপুর স্টেশনে পৌঁছোবে বলে, বোলপুর কোর্টের সামনে এসেছে, ঠিক তখন-ই ট্রেন-এর সময় হয়ে গেল।

ধরসাহেবের ড্রাইভার বদরুদ্দিন-এর হাত খুব-ই ভালো। শেষ পনেরো মিনিট গাড়ি চালাল না হেলিকপ্টার-ই চালাল তা বোঝা যাচ্ছিল না। তবে ভয়ও করছিল। রুদ্ধশ্বাসে বসেছিল ওরা দু-জনে। এই ট্রেনটা ফেল করলে ওদের হয় সিউড়ি বা দুবরাজপুর ফিরে যেতে হবে নয়তো শান্তিনিকেতনের কোনো, হোটেলে বা টুরিস্ট লজ-এ রাত কাটাতে হবে। পরস্ত্রীর সঙ্গে রাত কাটালেই, আলাদা ঘরেই যদিও, যুধিষ্ঠিরেরও চরিত্রদোষ খুঁজে বের করবেন আত্মীয়-পরিচিতরা, বিশেষ করে সল্লির বিয়েটাই যখন নড়বড়ে হয়ে গেছে।

একথা ভেবেই টেনশান হচ্ছিল নীলকমলের।

সল্লির তো হচ্ছিলই!

ফ্যাকাশে মুখে সল্লি একবার বলল, পাব তো ট্রেন নীলকমল?

দেখি।

নীলকমল বলল।

বদরুদ্দিন বলল, এগারো বছর গাড়ি চালাচ্ছি স্যার, আজপর্যন্ত আমার একজন প্যাসেঞ্জারও কখনো কোনো গাড়ি ফেল করেননি। নিশ্চিন্তে থাকুন স্যার। আমি নিজে আপনাদের ট্রেনে তুলে দেব। এ.সি. চেয়ারকার প্ল্যাটফর্মের কোথায় দাঁড়ায় তা আমি জানি। একটাই অসুবিধা এই যে, ওদিকের প্ল্যাটফর্মে আসবে ট্রেনটা। ওভারব্রিজ পেরুতে হবে।

ওভারব্রিজ পেরুতে হবে? সেকী! তবে আর পেয়েছি ট্রেন!

এবারে একেবারে হতাশ গলাতে বলল, নীলকমল।

তাতে কী? মাল তো আপনাদের কিছুই নেই। ওই দুটো হালকা স্যুটকেস আমিই নিয়ে নেব। দৌড়োতে হবে কিন্তু।

ওরা জবাব দিল না। উদবেগে ওদের দু-জনেরই গলা শুকিয়ে গেছিল। তেষ্টাও পাচ্ছিল ভীষণ। মিনারেল ওয়াটারের বোতল দুটোও শেষ হয়ে গেছে। গরমও পড়েছে কিছু। সমস্ত শরীর জ্বলছে। যেন লঙ্কাবাটা লাগিয়ে দিয়েছে কেউ।

গাড়িটা স্টেশনের কার পার্কে রেখেই অন্য একটি পার্ক করা গাড়ির ড্রাইভারকে বলল, ‘বদরু, এই যতীন, গাড়ি দেখিস, গাড়ি খোলা রইল—আসছি এখুনি।’

বলেই, সামনের সিট থেকে ওদের স্যুটকেস দুটো তুলে নিয়েই বলল, ‘আসুন স্যার’।

তারপর দৌড় লাগাল।

সল্লি স্কুল-কলেজের স্পোর্টস-এর অনেক ইভেন্টে ফার্স্ট হত। তারপরে নাচতও। শ্যামা হয়েছিল একবার। কিন্তু দৌড়োনোর অভ্যেস বহুদিন চলে গেছে। তবুও দৌড়োল। রাত নেমে আসছে। রাত নেমে আসার ভয়টা এক এক জন নারীর বুকে, এক এক সময়ে এক একরকম হয়ে জাগে। এ-কথার সত্যতা শুধু নারীরাই জানে।

হাঁফাতে হাঁফাতে ওরা যখন, সামনের যে-দরজা পেল, তা দিয়েই উঠে পড়ল কম্পার্টমেন্টে, বদরু বলল, কনডাক্টর গার্ড ওই দিকে আছেন। কোনো চিন্তা নেই মেমসাহেব, গাড়ি উইকডেইজ-এ ফাঁকাই থাকে।

ভুলেই গিয়েছিল সল্লি। কম্পার্টমেন্টে উঠেই দাঁড়িয়ে পড়ে ওর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটি খুলে একটি পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে বদরুর হাতে দিতে গেল। সকাল আটটা থেকে, যে-মুহূর্তে ওরা ‘গণদেবতা’ এক্সপ্রেস থেকে নেমেছিল শান্তিনিকেতনে, বদরু ওদের খিদমগারি করছে এই অসহ্য গরমে।

সল্লি হাত বাড়িয়ে বলল, এই যে, এইটে রাখো।

বদরু বলল, না মেমসাহেব।

কেন?

অপ্রতিভ হয়ে বলল সল্লি।

এরপরের বারেই নেব। তখন বড়োপাত্তি দেবেন মেমসাহেব। এবারে থাক।

সল্লির মুখটা কালো হয়ে গেল।

বদরুদ্দিন জানে না যে, সল্লির দুবরাজপুরে এই শেষবার আসা।

ও বলল, পরেরবার আবারও দেব। এখন এটা রাখো।

বদরু এবারে নিল, হাসিমুখেই। তারপর হাত তুলে সেলাম করল।

পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এখনও সহবত, ভদ্রতা ইত্যাদি বেঁচে আছে। সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠানের ড্রাইভারদের অনেকেই যেমন অসভ্য-অভব্য হয়, বদরু তেমন নয়। তেলও চুরি করবে, ওভার-টাইমও নেবে, আবার অসভ্য ব্যবহারও করবে তারা।

ট্রেনটা নি:শব্দে ছেড়ে দিল। কখন যে, ছাড়ল বোঝা পর্যন্ত গেল না।

নীলকমল হাতঘড়ির দিকে চেয়ে বলল, একেবারে অন ডট। হল কী আমাদের দেশের? এ-যে, জাপান হয়ে গেল দেখছি।

অফিস থেকে ওকে মাস ছয়েক আগে জাপানে পাঠিয়েছিল পনেরো দিনের জন্যে। এখন কিছুদিন কথায় কথায় জাপানের প্রসঙ্গ এসেই যায় অসাবধানে।

তারপর ওরা ভেতরে ঢুকল স্যুইং-ডোর খুলে। নীলকমল বলল, তুমি এখানে বোসো একসেকেণ্ড আমি কনডাক্টর গার্ডকে বলে আসি।

কোথায় বসব?

যেখানে খুশি, সব-ই তো ফাঁকা। তবুও আমি জিজ্ঞেস করে আসছি।

কনডাক্টর গার্ডও এসে পড়লেন। বললেন, সব-ই তো ফাঁকা। যেখানে খুশি বসুন।

দু-চারজন প্যাসেঞ্জার ছিলেন মাত্র পুরো কম্পার্টমেন্টে তবে বগির সামনের কম্পার্টমেন্টটাতে কিছু বেশি যাত্রী।

ফাঁকাই ভালো। সল্লি ভাবছিল। এখন অনেক-ই জায়গা দরকার সল্লির। Space-এর দরকার ট্রেনে তো বটেই, জীবনেও। নীলকমলও যেন, স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল কম্পার্টমেন্টটা ফাঁকা পেয়ে। সল্লির মনের অবস্থাও ও বুঝতে পারছিল।

বদরুকে দেখা গেল, এরইমধ্যে একদৌড়ে ওভারব্রিজ পার হয়ে উলটোদিকের প্ল্যাটফর্মে নেমে পার্কিং লট-এর দিকে যাচ্ছে। ওকে দেখে সল্লির মনটাও খারাপ হয়ে গেল। সল্লি জানে, আর এখানে আসা হবে না। ওকে এক-শো টাকার একটা নোট দিলেই হত। পরক্ষণেই ভাবল, টাকা তো ওর নয়, বাজ-এর। ওই টাকা ছুঁতে ঘেন্না হবে এবার থেকে। ছুঁতে যাতে না-হয়, তার একটা বন্দোবস্তও করতে হবে যত, তাড়াতাড়ি সম্ভব। এ-কথা ভাবতে ভাবতে সল্লির চোয়াল শক্ত হয়ে এল।

দুবরাজপুরে ও আর আসবে না কখনো। না কখনোই নয়। শান্তিনিকেতনে আসতে পারে। বসন্তোৎসবে, পৌষমেলাতে, বৃক্ষরোপণ উৎসবে, বা হলকর্ষণ উৎসবে।

নীলকমল-এর এক উদবেগ গেল তো অন্য উদবেগ জাগল।

ধরসাহেব নিজে সল্লিকে নিয়ে গিয়েছিলেন মেঝেন-এর বাড়িতে। এখন যার সঙ্গে থাকে বাজ। ওই গ্রামে আগে বাজ-এর সঙ্গে নীলকমলও গেছে। একাধিকবার গেছে। মেয়েটিকে দেখেওছে। সুন্দর ঝকঝকে তকতকে গ্রাম। গোবর নিকোনো। ঘুঘু ডাকছে পেয়ারা গাছে। মোরগ ডাকছে। ধান ভাঙছে কেউ ঢেঁকিতে। সুন্দর চিত্র-বিচিত্র করা। পোড়া-মাটির রঙা বা কালো-রঙা দেওয়ালে। সাঁওতালেরা ভারি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন, সুরুচিসম্পন্ন। বাজ নাকি তিনদিনের ছুটিতে আছে এখন। বিয়ে করবে কয়নাকে। দেনা-পাওনার কথাও হয়ে গেছে। আগামীকাল পূর্ণিমা। নাচ-গান হবে। শুয়োরের মাংস আর ভাত রান্না হবে। হাঁড়িয়া খাবে সকলে। তারপর সারারাত মাদল আর ধামসার সঙ্গে কাচভাঙা কন্ঠস্বরের গান শোনা যাবে।

কয়না মেয়েটি খুব-ই প্রাণোচ্ছল। অত্যন্তই সুন্দরী। যেমন মুখ-চোখ, তেমন-ই ফিগার। সিনেমাতে নামলে মুম্বইতে হিরোইন হতে পারত। তা ছাড়া খুব ভদ্রসভ্যও। লেখাপড়া জানে। সম্ভবত ক্লাস ফাইভ-সিক্স অবধি পড়েছিল মিশনারি স্কুলে। বাংলা তো পড়তে পারেই, ইংরেজিও পড়তে পারে। বলতেও পারে একটু-আধটু।

নীলকমলের সহপাঠী বিবাহিত বাজ প্রথম যেদিন, এখানে আসে সেদিন নীলকমলকেও নিয়ে এসেছিল। এক পূর্ণিমার রাতে। ওই মেয়েকে দেখিয়ে বলেছিল, এই কয়না শোন, আমার তো বিয়ে হয়েই গেছে, তুই বিয়ে কর নীলকমলকে। তাহলে মাঝেমধ্যে তোকে দেখতে পাব।’

নীলকমল মুখে কিছু বলেনি। মনে মনে বলেছিল, তোর জন্যে আমি যেমন, মাঝে মাঝে সল্লিকে দেখতে পাই।

কয়না দারুণ শরীরিণী। কিন্তু মেয়েদের শরীর-ই কি সব? সল্লির শরীরও তো কিছু খারাপ নয়। শুধু শরীরের প্রতিযোগিতা হলেও দু-জনে সমান নম্বর-ই পাবে। সল্লির পারিবারিক পটভূমি, অধ্যাপক বাবা, স্কুল-শিক্ষিকা মা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি, সাহিত্য-মনস্কতা, অমন সুন্দর রবীন্দ্রসংগীত সব-ই কি শুধু, ওই কৃষ্ণাঙ্গীর শরীরের কাছে তুচ্ছ হয়ে যাবে? কে জানে! বাজ চিরদিন-ই দুর্বোধ্য ছিল নীলকমলের কাছে, সেই কলেজের দিন থেকেই। আজ বাজ আরও বেশি দুর্বোধ্য হয়েছে।

সল্লি যতবার-ই বাজ-এর লেখা চিঠিটির কথা মনে করছিল ততবার-ই হতবাক হয়ে যাচ্ছিল। যে, মানুষটা তার স্ত্রী আর শিশুকন্যা সম্বন্ধে এমন সংবেদনশীল, সেই কী করে এমন হয়? তবে কী সল্লি ওকে বুঝতে পারেনি? বাজ কী একজন তঞ্চক? এতবড়ো মারাত্মক ভুল যে, কী করে করল সল্লি, যে-ভুলের মাশুল দিতে হবে সমস্ত জীবন দিয়ে, তা ভেবে পর্যন্ত পাচ্ছিল না ও। বড়ো অসহায় লাগছিল সল্লির। আজকালকার ছেলেরা সকলেই কী এমন-ই তঞ্চক, ভন্ড, মিথ্যাচারী? লেখাপড়া শেখা উচ্চশিক্ষিত পুরুষমানুষদের চরিত্রও যদি এমন-ই হয় তবে আর কী বলার থাকতে পারে? কিন্তু নীলকমল-এর মতো পুরুষেরাও তো পুরুষ! আশ্চর্য! পুরুষের কত্তরকম হয়। কে জানে! হয়তো নারীরও হয়। ও একরকম, কয়না একরকম। তুলনা করতেও ঘেন্না হচ্ছিল ওর। শরীর! শরীর কী এতই বড়ো? নীলকমল পাশে থাকাতে মনে হচ্ছিল, সল্লির তার শেষ অবলম্বন হয়তো সেই হবে, কিন্তু তাকেই বা বিশ্বাস কী? সেও তো আর একজন পুরুষ-ই!

এই মুহূর্তে সল্লির মনের মধ্যে কী হচ্ছে তা নীলকমল বুঝতে পারছে। কতখানি অপমানিত হয়েছে সল্লি, যে-অপমান, এই শরীরে জ্বালা-ধরানো গরমের চেয়েও অসহ্য, তা নীলকমল বুঝতে পারছে। কিন্তু, করার তো কিছুই নেই।

বদরু যখন ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছিল তখন হঠাৎ পকেট থেকে বের করে নীলকমলকে একটা মুখবন্ধ লেফাফা দিয়েছিল। বলেছিল, সাহেব দিয়েছেন।

কোন সাহেব? ধরসাহেব?

না না।

তবে। বাজ?

হ্যাঁ।

কাকে?

আপনাকে।

নীলকমল অবিশ্বাসী গলাতে বলল, ঠিক জানো, আমাকেই?

হ্যাঁ স্যার। আপনার নাম-ই তো লেখা।

ঠিক আছে।

বলেছিল, নীলকমল।

সল্লি তাকাল একবার চিঠিটার দিকে কিন্তু কোনো ঔৎসুক্য ফুটল না তার চোখে-মুখে। সব ঔৎসুক্যই যেন মরে গেছে ওর।

ও চিঠি এখন পড়তে পারবে না। নীলকমল ওর মুখের ভাব গোপন করতে পারে না। কী লিখেছে? কে জানে বাজ। জলপিপির কথাও কী মনে পড়ল না! চার বছরের অমন সুন্দরী বুদ্ধিমতী একমাত্র মেয়েকেও অন্য নারীর শরীরের জন্য ত্যাগ করতে পারে এমন নিষ্ঠুর মানুষ যে, সংসারে থাকতে পারে এবং সে-মানুষ যে, তার সহপাঠী ছিল, তার ‘বন্ধু’ বলে পরিচিত ছিল এত দীর্ঘদিন, এ-কথা বিশ্বাস পর্যন্ত করতে পারছিল না নীলকমল। ভালোবেসে, বাড়ির এবং শ্বশুরবাড়িরও অমতে বিয়ে করেছিল যে-স্ত্রীকে, নিজেদের পরিবারের সব নিরাপত্তার দেওয়ালকে অগ্রাহ্য করে নিজস্ব নীড় করে তুলেছিল বাসা-বাড়িকে, অমন সুন্দর আধো-আধো কথা বলা মেয়ে জলপিপিকে যে, এত ভালোবাসত, সে কী-এমন দেখল, এই নিকষ-কালো সাঁওতাল মেয়ে কয়নার মধ্যে, কে জানে!

এই ভাবনাটাই বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে নীলকমলকে। আর সল্লির বুকের মধ্যে যে, কী হচ্ছে তা কে জানে! কোন মুখে সে, কলকাতা পৌঁছে তার মা-বাবাকে বলবে যে, বাজ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে, এমনকী জলপিপিকেও সে ত্যাগ করেছে। কী করে বলবে সে-কথা?

শিরীষবাবু হয়তো বলবেন, ‘কেস করব। ডিভোর্স চাইব, খোরপোশ চাইব। টাইট করে ছেড়ে দেব ছোকরাকে।’ শিক্ষিত, সংযত, অধ্যাপক শিরীষবাবু হয়তো মুখ খারাপও করবেন। কখন যে, কোন আঘাতে, কোন নির্মোক ছিঁড়ে যায়, তা আগের মুহূর্তেও জানা যায় না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, আভিজাত্য —এইসব মোড়কের কোনোটাই যথেষ্ট মজবুত নয়। মুহূর্তের মধ্যে ঝড়ে উড়ে যেতে পারে এইসব রঙিন র‌্যাপিং-পেপার।

সল্লির মুখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছে না নীলকমল। চুপ করে বসেছিল ও। বাতানুকূল কামরা থেকে রাতের বেলাতে বাইরে ছাই কিছু দেখাও যায় না। দৃষ্টি যখন অস্বচ্ছতাতে বাধা পেয়ে প্রতিহত হয় তখন, মস্তিষ্কে তা বোবা ধাক্কা মারে। কোথায় যেন, পড়েছিল অনেকদিন আগে, ‘‘When there is nothing to be done, there is no point in trying to do something.’’

ঠিক এমন সময়ে প্রায় নিস্তব্ধ কামরার মধ্যে ‘মা-আ-আ-আ’ করে জোরে চিৎকার করে উঠল একটি শিশুকন্যা। একেবারে জলপিপির-ই বয়সি। তবে চিৎকার করল দুঃখে নয়, আনন্দে। আনন্দের আতিশয্যে তার মা সম্ভবত পাশের কম্পার্টমেন্টে কারো সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। বাচ্চাটি যে, উঁচু পিঠ-অলা সিটের মধ্যে কোথায় ডুবে বসেছিল, তা পেছন থেকে বোঝা পর্যন্ত যায়নি আগে। পাশ থেকে তার ছোট্টখাট্ট বাবা রাশভারী গলাতে শিশুটিকে শাসন করে বললেন, ‘শ-শ-শ। এটা কি আমাদের বসবার ঘর? ছি:। আস্তে মৌ।’

পাশের কামরা থেকে হেঁটে আসা মহিলার মুখে কিন্তু এক আশ্চর্য উজ্জ্বল হাসি জ্বলজ্বল করছিল, যেমন হাসি শুধুমাত্র সন্তান-গর্বে গর্বিতা অল্পবয়েসি মায়েদের মুখেই দেখা যায়। মায়ের বয়েসও সল্লির-ই মতো। মৌ-এর মা কিন্তু মৌকে বকলেন না বরং তাকে তার সিট থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে কোলে টেনে নিয়ে নিজের সিটে বসালেন।

একপাশে বাবা অন্যপাশে মা আর মায়ের কোলে স্বাস্থ্যোজ্জ্বল, সুন্দরী শিশুকন্যা। কী সুন্দর নিটোল একটি ছবি। এইরকম সব টুকরো-টাকরা ছবিই বোধ হয় নীলকমলের-ই মতন অগণ্য অবিবাহিত পুরুষ ও নারীকেও নীড়-এর স্বপ্ন দেখায়। আবার যেমন, সেই স্বপ্ন ভাঙায় আজকের রাতের সল্লির ছবির মতো ছবিও।

সল্লির জন্যে নীলকমলের বুকটা নতুন করে ‘হু হু’ করে উঠল। ওর কপালটাই এমন। পৃথিবীর যত দুঃখ সব-ই যেন, নীলকমল চুম্বকের মতন আকর্ষণ করে নিয়ে আসে তার নিজের বুকে অথচ সেইসব দুঃখের অধিকাংশই প্রতিকার করে এমন সাধ্য তার নেই। একেবারেই নেই।

নীলকমল পকেট থেকে চিঠিটা বের করে সল্লিকে দেখিয়ে বলল, চিঠিটা কি তুমি পড়তে চাও?

না। আপনাকে লেখা চিঠি আমি পড়ব কেন?

আমি পড়েই বা কী করব?

সে আপনি জানেন। না পড়বেন তো ছিঁড়ে ফেলুন।

ফেলব?

ফেলুন।

নীলকমল বাজ-এর চিঠিটাকে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে সামনের সিট-এর পেছনে যে-পকেট ছিল, তাতে ফেলে দিল। চিঠিটা তাকে বড়োঔৎসুক্য ও অস্বস্তিতে ফেলেছিল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল নীলকমল। সেই পকেটের দিকে একবার চেয়ে মুখটা জানলার দিকে ফেরাল সল্লি। কিন্তু রঙিন কাচের মধ্যে দিয়ে কিছু দেখা গেল না। সল্লি জানত যে, দেখা যাবে না। অথচ আশ্চর্য! তবু চেয়েছিল।

সাত

কালোজাম উঠেছে বাজারে। হিমসাগর আমও, পল্টুবাবুর দোকানের লেবুর গন্ধ দেওয়া সন্দেশ, ‘ব্রিটানিয়া’র ডেইন্টি-ক্রিম বিস্কিট, যা যা তাঁর নাতনি খেতে ভালোবাসে, সব-ই মনে করে নিয়ে এসেছেন শিরীষবাবু। ‘পিশপ্যাশ’ খেতেও ভালোবাসে জলপিপি। তাই ভালো দেখে ছোটোদেশি মুরগিও কাটিয়ে এনেছেন বাজার থেকে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে। কুসুমের কথা মতন পাঁচ-শো ‘আমুল’ মাখন। দশ টাকা কেজির আলু, দু-কেজি পেঁয়াজ গাজর, বিনস ইত্যাদিও। জলপিপি ‘পিশপ্যাশ’-এর সঙ্গে কড়কড়ে করে আলুভাজা খেতে ভালোবাসে খুব।

জলপিপি এখন তার দিদার সঙ্গে পাশের বাড়ির মিসেস সেন-এর কাছে গেছে। মিসেস সেন-এরও একটিমাত্র সন্তান। মেয়ে। সে এবং তার স্বামী দু-জনেই অধ্যাপনা করে মহারাষ্ট্রের পুণে বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁরও একটি নাতনি আছে জলপিপির-ই বয়েসি। তাই জলপিপি এ-বাড়িতে এলেই তাকে নিয়ে একবার যেতে হয়-ই কুসুমের প্রতিবেশীর কাছে। খুব-ই ভালোবাসেন উনি জলপিপিকে। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটান। তিনি জলপিপির জন্যে কুচো নিমকি আর নারকোলের নাড়ু বানিয়ে রেখেছিলেন। চিনি দিয়ে। গুড়ের নাড়ু জলপিপির পছন্দ নয়। তাঁর নিজের নাতনি শ্রী আবার গুড়ের নাড়ুই বেশি পছন্দ করে। শিরীষবাবু চানে গেলেন। গীতাকে বলে গেলেন, ফোনটা এলে ধরতে। চিরদিন-ই গরমের সময়ে দু-বার চান করেন-ই। কিন্তু এবারে যা-গরম পড়েছে অসম্ভব, অসহ্য গরম। এমন গরম কলকাতাতে বহুদিন পড়েনি। রাতে চার-পাঁচবার চান করেও যেন, শান্তি হচ্ছে না।

শরীরের অন্য সব গরমের-ই নিবৃত্তি হয়ে গেছে। অনেক দিন হল। কিন্তু এই গরম আবহাওয়ার কষ্টটা থেকে বাঁচার কোনোই উপায় নেই।

নবজীবনবাবু, কাস্টমস-এর, বলেছিলেন হায়ার পারচেজ-এ, একটা এয়ার-কণ্ডিশনার কিনে নিতে। বলেছিলেন, আগে তো প্রাণ মশাই!

শিরীষবাবু ভাবেন বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। জীবনের শেষে এসে প্রয়োজন আর বাড়াতে চান না উনি। ইউ. জি. সি. এখন কত মাইনে বাড়িয়ে দিল। অবসরের বয়েসও বেড়ে গেল। তিনি যদি চার বছর আগেই রিটায়ার না করতেন তবে আজকে তাঁর অবস্থা অনেক-ই ভালো হতে পারত। কী করা যাবে! সোশ্যাল সায়ান্সের শ্যামল সেনগুপ্তর মতন পাঁচ বছর বয়স ভাঁড়িয়ে তো চাকরিতে ঢোকেননি! কিছু মানুষ আছে, চিরকাল-ই ছিল সংসারে, যারা আপাদমস্তক দু-নম্বরি। ভন্ডামি আর ধূর্তামি তাদের রন্ধ্রে সেঁধিয়ে গেছে। মানুষগুলো কাছে এলেই ঘেন্না করে, ঘিন-ঘিন করে ওঠে শরীর, জ্বালা করে।

কালোজাম তো আনলেন কিন্তু কালোজাম খেলে জিভ ও মাড়ি কালো হয়ে যায় বলে সল্লি খুব রাগ করে, করবে তার মা-বাবার ওপরে, জলপিপিকে খাইয়েছেন বলে। তা আর কী করা যাবে, করলে করবে। তাঁদেরও তো আত্মজা জলপিপি। আসলের ওপর সুদ। তাঁদেরও তো কিছু অধিকার, কিছু দাবি-দাওয়া থাকবে জলপিপির ওপরে। শুধুমাত্র তাঁদের মেয়ে-জামাই তো আর মালিক নয় জলপিপির।

শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে শাওয়ারটা পুরো খুলে দিলেন। তার আগে ভালো করে ‘নবরত্ন’ তেল মাখলেন মাথাতে। শিবকালী ভট্টাচার্যের ফরমুলাতে বানানো। মাথাটা এই গরমে বেশ ঠাণ্ডা হয়। তারপরে চন্দন সাবান মাখলেন সারাশরীরে ঘষে ঘষে।

আয়নার সামনে আর দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না আজকাল। জানেন না তিনি, কুসুমের করে কি না! কুসুমের শরীরের বাঁধন বয়েস অনুপাতে এখনও বেশ ভালোই। তিনি যেন, বুড়ো মেরে গেছেন। তাঁর যা বয়স তাতে, পুরো পশ্চিমি দেশে যুবক বলে চলে যাওয়ার কথা।

ফোনটা কি বাজল? মনে হল। শাওয়ারটা বন্ধ করলেন। গলা তুলে বললেন, গীতা। ও গীতা। কে? কার ফোন?

জামাইবাবুর অফিস থেকে জানাল যে, দিদি আজ রাতের গাড়িতেই ফিরে আসছে।

কোথা থেকে?

দুবরাজপুর থেকে।

কোন গাড়ি? ‘শান্তিনিকেতন’ এক্সপ্রেস?

বলেই ভাবলেন, না:। সে গাড়ি তো বিকেলে আসে। রাতে আবার কোন গাড়ি? ‘দার্জিলিং’ মেল-এর কথাও শুনেছিল। কে জানে! কত নতুন নতুন গাড়ি হয়েছে এখন। ‘শান্তিনিকেতন’ এক্সপ্রেস হয়েছিল অধ্যাপক নিমাইসাধন বোস-এর জন্যে, যখন তিনি বিশ্বভারতীর উপাচার্য।

পরমুহূর্তেই ভাবলেন, কিন্তু আজ রাতেই ফিরে আসছে কেন সল্লি?

স্নানঘরের বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে গীতা বলল, বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে সাড়ে দশটা-এগারোটাও হতে পারে। চিন্তা করতে মানা করেছেন।

ফোন কে করেছিলেন? জামাইবাবু?

না। অন্য লোক। অফিসের লোক।

জামাইবাবুও কি আসছেন?

সে-কথা তো বললেন না। শুধু দিদির কথাই তো শুনলাম। ওঃ। হ্যাঁ। বললেন, নীলকমলবাবুর সঙ্গে আসছেন।

অ।

মনে মনে বেশ উদবিগ্ন হলেন শিরীষবাবু। কুসুম শুনলে হয়তো আরও হবেন। বাজ আসে না তাই খোঁজে গেল মেয়ে। কোনো গোলমাল না হলে তো তার আজ রাতেই ফিরে আসার কথা ছিল-না। ফিরলে হয়তো জোড়ে ফিরত। চারদিন বাদে জামাইষষ্ঠী। নইলে মেয়ে থেকেই আসত বাজ-এর কাছে।

তোয়ালে দিয়ে গা মুছতে মুছতে শিরীষবাবু ভাবছিলেন, সল্লি যখন পাগলের মতন প্রেমে পড়ল বাজের, তখন-ই কুসুম বলেছিলেন, ওরে সল্লি হাঁস তো বাজপাখির খাদ্য। এক ছোঁ-এ পুকুর থেকে টুঁটি কামড়ে উঠিয়ে নিয়ে যায় সল্লি হাঁসকে বাজপাখি। কত দেখেছি আমাদের গুসকরার বাড়িতে। বাজ-এর সঙ্গে সল্লি হাঁসের কখনো প্রেম হয়?

প্রেমকাতরি সল্লি মায়ের হাত জড়িয়ে ধরে বলত, ‘হয় মা, হয়। তুমি দেখো হবে। খু-উ-ব প্রেম।’

চান সেরে, লুঙ্গি পরে, টাক আঁচড়ে বাইরের বারান্দায় পাখাটা চালিয়ে দিয়ে ইজিচেয়ারটাতে বসলেন শিরীষবাবু। পথের পাশেই বারান্দাটা। যদিও আওয়াজ আর ধুলো-ধুঁয়ো আছে কিন্তু জীবন বয়ে চলে পথ দিয়ে অবিরত। অবসরপ্রাপ্ত মানুষমাত্রই এই চলচ্ছবিকে ভালোবাসেন। নিজেদের চলাচল কমে আসে বলেই অন্যের চলাচল দেখতে ভালোবাসেন।

অন্ধকার হয়ে গেছে আধঘণ্টা খানেক। খবরটা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ওঁর। এমন সময়ে দেখতে পেলেন উলটোদিকের ফুটপাথ ধরে কুসুম আসছেন। জলপিপি আসছে তার দিদার হাত ধরে পাশে পাশে। ঝুনুর দোকানে বোধ হয় কিছু কেনার জন্যে দাঁড়ালেন কুসুম। শিরীষবাবুদের বাড়ির প্রায় উলটোদিকেই ঝুনুর স্টেশনারি দোকান। ঠিক সেই সময়েই জলপিপি দেখতে পেল শিরীষবাবুকে। কুসুমও দেখতে পেল শিরীষবাবুকে। কুসুম একটা ক্যাডবেরি চকোলেট-এর বার দিলেন ওর হাতে। আর জলপিপি, ‘দাদু! দাদু! দাদু!’ বলতে বলতে হঠাৎ-ই কুসুমের হাত ছাড়িয়ে রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে আসতে গেল শিরীষবাবুর কাছে। কুসুম চেঁচিয়ে উঠলেন আতঙ্কে। শিরীষবাবু একপাটি চটি পায়ে গলিয়েই বারান্দা থেকে দৌড়ে নামলেন ফুটপাথে। চেঁচিয়ে উঠল চেনাজানা অনেকেই। এই পাড়াতেই তো আছেন গত চল্লিশ বছর, সবাই সবাইয়ের চেনাজানা। অচেনা যাঁরা, পথচলতি, তাঁরাও সকলে চেঁচিযে উঠলেন। কিন্তু গাড়িটা দাঁড়াল না। ঝড়ের বেগে যেমন আসছিল, তার চেয়েও গতি বাড়িয়ে পালিয়ে গেল। গন্তব্যে রওনা একবার হয়ে পড়লে কেই বা থামতে চায়? বাস মিনিবাসের যাত্রীরাই থামতে চায় না, আর প্রাইভেট কার-এর! তা ছাড়া, থামলে চালকের এবং অন্যদেরও প্রাণ যেত, গাড়িও ছাই হয়ে যেত। তারা দোষী না হলেও। জনতার রোষ সবসময়েই অবুঝ। তার কোনো প্রতিষেধক নেই।

লাল জামা, লাল জুতো, কুচকুচে-কালো চুলভরা মাথাতেও লাল-রিবন লাগানো মেয়েটার শরীরের ওপর দিয়ে যে, গাড়ির সামনের ও পেছনের চাকাটাও চলে গেল তা জানলেনও না অনেকে। যাঁরা দেখলেনও তাঁরা দেখে চুপ করে রইলেন, হতভম্ব হয়ে।

সবচেয়ে আগে কুসুম দৌড়ে গিয়ে পৌঁছোলেন তাঁর আদরের নাতনির কাছে। হাঁটুতে অসম্ভব ব্যথা সত্ত্বেও হাঁটু গেড়ে বসলেন তার পাশে। জলপিপি বলল, ‘দিদা! মা!’

বলতেই, তার ফুলের মতন নরম ছোট্টমুখের দুই কষ বেয়ে রক্ত গড়িয়ে এল। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল। চকোলেট-ধরা মুঠিভরা হাতটার মুঠি শক্ত হয়ে গেল।

লাল জামাটা আরও লাল।

আট

জলপিপি এখন কী করছে কে জানে! সল্লি বলল নীলকমলকে।

ট্রেনটা বর্ধমান পেরিয়ে গেল। এখানে দাঁড়ায় না। দাঁড়ায় শুধুমাত্র ব্যাণ্ডেল-এ।

তারপর নিজেই বলল, বাবা-মাকে জ্বালাচ্ছে হয়তো।

জ্বালাবে কেন? জলপিপি তোমার ভারি ভালো মেয়ে হয়েছে। বড়ো হলে তোমার চেয়েও সুন্দরী হবে ও। ওকে গান শেখাবে না?

জানি না, জানি না, আমি কিছুই জানি না।

একটু চুপ করে নীলকমল বলল, আমার আশ্চর্য লাগছে এইকথা ভেবে যে, তোমাকে আমি অনেকবার আভাস দেওয়া সত্ত্বেও তোমার কোনোরকম সন্দেহ হয়নি?

কীসের? কাকে?

না। মানে, বাজ-এর ব্যবহার সম্বন্ধে?

না। ভালোবেসেছিলাম—তখন তো সকলের মতের বিরুদ্ধেই নিজের বুদ্ধির ওপরে পুরোপুরি আস্থা রেখেই বেসেছিলাম। জানেন, কারোকে হয় এক-শোভাগ ভালোবাসা যায়, নয়তো একভাগও যায় না। ভালোবাসা আর ভালোলাগার মধ্যে তফাত আছে। আমি যে, ওকে ভালোইবেসে ছিলাম।

ও-ও তোমাকে ভালোবেসেছিল?

হয়তো! তবে পুরুষের ভালোবাসাতে আর ভরসা রাখি না।

তারপর-ই গলা নামিয়ে সংকোচের সঙ্গে বলল, ওইসব ওর চিরদিন-ই বেশি ছিল। এতটাই বেশি ছিল যে, মাঝে মাঝে মনে হত ওর রুচি বুঝি বিকৃত। বুঝতে পারতাম শরীরের ব্যাপারে ও আমাকে নিয়ে সুখী নয়। কিন্তু আমরা তো মানুষ-মানুষী, কুকুর-কুকুরি তো নই। পছন্দ-অপছন্দ, রুচি, নানা বিষয়ে মতামত আমাদের এক-ই ছিল বলেই তো ভালোবাসা হয়েছিল। গান খুব-ই ভালোবাসত বাজ। একসময়ে। ইদানীং কখনো আকাশে মেঘ করে এলে, বা বৈশাখে ভোরের হাওয়া ছুটলে আমি যদি দু-কলি গান গেয়ে উঠতাম তাতে ও বিরক্ত হত। আমি থেমে যেতাম অবাক হয়ে। ধীরে ধীরে আমার এবং জলপিপির প্রতিও ওর ব্যবহার বড়োই রুক্ষ হয়ে উঠছিল। ও সরে যাচ্ছে, আমি হেরে যাচ্ছি —একথা আমার মনে হত না, মাঝে মাঝেই তাও নয়, কিন্তু আমি যে, ওই গ্রামের সাঁওতাল মেয়ে কয়নার কাছে হেরে যাব এমন আশঙ্কা দুঃস্বপ্নেও করিনি।

বলেই বলল, ‘কয়না’। অদ্ভুত নাম কিন্তু। মানে আছে কি কোনো?

আছে বই কী! বিহারের সিংভূম জেলার সারাণ্ডা ফরেস্ট ডিভিশনে তিনটি নদী আছে। কোয়েল-কারো-কয়না। ‘কয়না,’ নদীর নাম।

নীলকমল বলল।

কোন কোয়েল? ‘কোয়েল’-এর কাছের কোয়েল-ই?

হ্যাঁ। সেই কোয়েল বিহারের সারাণ্ডাতেও আছে, ওড়িশাতে আছে আবার বিহারের পালামৌতেও। তারপর বলল, নদীকে হয়তো সকলেই নিজস্ব করে চায় কিন্তু নদী নদীর-ই, সে নিজের খেয়ালে বয়ে যায়। অন্যকে সে তার করে নেয় কিছুক্ষণের জন্যে কিন্তু সে কারোর-ই হয় না।

সল্লি বলল, হবে। কয়না নদী নইলে বাজকে এমন করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় কী করে! তার ওপর পাহাড়ি নদী। সেখানে বান তো হঠাৎ-ই আসে।

তারপর বলল, সারাণ্ডা জায়গাটা কেমন? গেছেন কখনো?

হুঁ। বড়োজামদা—বড়োবিল—কিরিবুরুর কাছেই তো। অমন শালের জঙ্গল আমাদের দেশের কম জায়গাতেই আছে। সাতশো পাহাড় আছে সারাণ্ডাতে। ইংরেজরা নাম দিয়েছিল—The land of seven hundred hills.

তাই?

হ্যাঁ।

পরক্ষণেই প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে সল্লি বলল, আমরা বাবার বাড়ি পৌঁছোতে পৌঁছোতে জলপিপিটা ঘুমিয়ে না পড়ে! ট্রেনটা এতদেরিতে না পৌঁছোলে আজ-ই ওকে নিয়ে ফিরে যেতাম আমাদের, মানে আমার বাড়িতে।

কেন? মা-বাবার কাছে তুমি নিজেও ক-দিন থেকে যাও। তুমি কি ভাবছ তোমার অপমানে তাঁরা সম্মানিত হবেন? সুখী হবেন?

না, না, তা নয়।

তবে?

কোন মুখে আমি মা-বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়াব? আমি যে, সবজান্তা ছিলাম। আমি যা-বুঝতাম অত তো আর কেউই বুঝত না এই পৃথিবীতে। মা-বাবা কত বারণ করেছিলেন। তখন বুঝতে পারিনি কেন বারণ করেছিলেন। আজও বুঝতে পারছি না।

মা-বাবার মতন ভালো, সন্তানকে আর কে বোঝে? তাদের ভালো তাঁদের মতন আর কেই বা করতে পারে?

ঠিক তাই।

কিন্তু এমন ঘটনা তো মা-বাবার পছন্দ করে দেওয়া বিয়েতেও আকছার ঘটছে আজকাল। কোথাও স্বামীর কারণে, কোথাও স্ত্রীর কারণে।

তা অবশ্য ঠিক। তবে তুমি নিজেকে এত দুষছ কেন?

নীলকমলের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে সল্লি বলল, আমার জলপিপিকে আমি এমন করে মানুষ করব যাতে, ও যেন, আমার মতন বোকা না হয়।

তারপর-ই দাঁতে দাঁত চেপে বলল, এ-পৃথিবীতে আমার আর কারোকেই দরকার নেই। জলপিপিকে বুকে আঁকড়েই কাটিয়ে দেব বাকিজীবন। ওকে যেন, কোনো ‘বাজ’ ছোঁ না মারতে পারে তা আমি দেখব। আমার মা কিন্তু সাবধান করেছিলেন আমাকে।

কীভাবে?

বলেছিলেন, বাজপাখিকে সল্লি হাঁসেদের ছোঁ মেরে টুঁটি কামড়ে নিয়ে যেতে দেখেছেন উনি দাদুর গুসকরার বাগানবাড়িতে। আমাকে, আমাদের সম্পর্কটা হয়তো প্রেমের হওয়ার কথাই ছিল না, ছিল খাদ্য-খাদকের-ই।

বলেই বলল, না, না, জলপিপিকে কেউই ছোঁ মেরে নিতে পারবে না আমার কাছ থেকে।

আর পনেরো মিনিট।

নীলকমল ঘড়ি দেখে বলল।

সল্লি ভাবছিল, কতক্ষণে বাড়ি পৌঁছে স্নান করে উঠে, নাইটি-পরা পাউডার-মাখা সুগন্ধি জলপিপিকে ঘুম ভাঙিয়ে আদর করবে। বুকে জড়িয়ে ধরে চুমু খাবে। জলপিপি ছাড়া, তার নিজস্ব বলতে যে, আর কেউই রইল না এতবড়ো পৃথিবীতে!

অধ্যায় ৬ / ৬
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%