তটিনী ও আকাতরু

বুদ্ধদেব গুহ

ইটা কী জানোয়ার? বাপ রে! বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচির মতো ব্যাপার দ্যাখতাছি।

আকা বলল।

খাঁচার কাছে বনবিভাগের, যে-ভদ্রলোক দাঁড়িয়েছিল, তিনি বললেন, এই হচ্ছে ক্লাউডেড লেপার্ড। এদের লেজ শরীরের থেকেও লম্বা হয়।

তাই?

তটিনী কিছু না বলে, সানগ্লাসটা খুলে, ডানদিকের ডাঁটিটা নীচের দিকে দাঁতে কামড়ে ধরে সেদিকে চেয়ে রইল।

সে খাঁচার পাশে অন্য খাঁচায় একটি মাদি শম্বর। ছোটো। দু-তিনটি হরিণ। একটা বেশ বড়োচিতাবাঘ। এদের কেউ বাচ্চা বেলায় ধরা পড়ে, কেউ বড়ো হওয়ার পরে। ক্লাউডেড লেপার্ডটা নাকি, এক বুড়িকে আহত করেছিল।

বনবিভাগের সেই ভদ্রলাক বললেন।

তারপর বললেন, লেজ সবচেয়ে বেশি লম্বা হয় অবশ্য স্নো-লেপার্ড-এর।

কোথায় পাওয়া যায় স্নো-লেপার্ড?

তটিনী জিজ্ঞেস করল।

বরফ-ঘেরা পর্বতে। নামেই তো আবাসের ঠিকানা।

অবনী বলল।

অবনী মিত্তির আলিপুরদুয়ারের নন্দাদেবী ফাউণ্ডেশনের সদস্য। পবর্তারোহী। পাহাড়ে চড়েন। বন, বন্যপ্রাণী, ফুল, পাখি, প্রজাপতি ভালোবাসে, তার ওপর সংস্কৃতি এবং নাটক ও সংগীতমনস্ক। তাই ওই, বিনিপয়সার গাইডের কাজ করছিল ওদের। পেশাতে স্কুলমাস্টার। পেশাটা শখ। এমনিতে বাড়ির অবস্থা বেশ সচ্ছল।

এসেছে ওরা ভাড়া গাড়িতেই। অবনীর সঙ্গে ওর বন্ধু আকাতরুও জুটে গেছে। তটিনী রায় ও মৃদল দাশ এখানে তিনদিন রেস্ট নিয়ে ধুবড়িতে যাবে। সেখানেও বায়না আছে পরপর চারদিন। যাত্রার নাম ‘হলুদ গোলাপ’। একটি কুড়িয়ে-পাওয়া কানীন বালিকাকে নিয়ে উত্তাল মেলোড্রামা।

যাত্রাতে আজকাল অনেক-ই পয়সা। কিন্তু মাঝে মাঝেই বিদ্রোহ করতে ইচ্ছে হয়। ‘পয়সা’ই জীবনের সব নয়।— তটিনী এ-কথা জানে।

জলপাইগুড়ি জেলার বক্সা ব্যাঘ্র-প্রকল্পের রাজাভাতখাওয়ার ওয়াইল্ড লাইফ ইনফরমেশন সেন্টার থেকে বাংলোতে ফেরার সময়ে পথের ওপরে ‘Rescue Centre’ করেছেন বক্সা টাইগার প্রোজেক্টের কতৃপক্ষ, তার-ই খোঁজে তারা বেরিয়েছিল।

ফাল্গুনের শেষ। পারুল গাছে ফুল এসেছে সিঁদুরে লাল। অশোক গাছেও। এখানে মাদার গাছ নেই। নিম্ন আসামের গোয়ালপাড়া বা ধুবড়ির দিকে মাদারের স্নিগ্ধ লালে চোখে ঘোর লাগে। গরম পড়ে গেছে। খুব একচোট ঝড়-বৃষ্টি হয়ে যাওয়াতে আজ আবহাওয়াটা বেশ নরম।

ইনফরমেশন সেন্টারে ঢুকেছিল ওরা মেইন গেট দিয়ে। ড্রাইভার নগেনকে বলে দিয়েছিল গাড়ি নিয়ে বাংলোতে ফিরে যেতে বড়োরাস্তা দিয়েই। আকার সঙ্গে ওরা Rescue Centre-টি দেখে বনবিভাগের নানা কর্মচারীদের দু-দিকে ঘরের মাঝের মাটির পথ বেয়ে, পোস্ট অফিস হয়ে, স্টেশনের কিছুদূর দিয়ে লাইন পেরিয়ে একটি বড়ো বাঁশঝাড় ডান দিকে রেখে বাংলোতে পৌঁছে খাওয়াদাওয়া করে আজ-ই চলে যাবে জয়ন্তী। জয়ন্তীর বন-বাংলোতেই থাকবে।

আলিপুরদুয়ারে পর পর চাররাত, ‘হলুদ গোলাপ’ যাত্রাপালা করে তটিনী রীতিমতো ক্লান্ত। কাল রাতেই প্রথম ঘুমিয়েছে ভালো করে। আজ সকাল থেকেই বেশ তাজা লাগছে ওর নিজেকে।

তটিনী একটা খড়কে-ডুরে তাঁতের শাড়ি পরেছে। খয়েরি জমির ওপরে কালো ডোরা। কালো পাড়। দীর্ঘ বেণীতে দু-তিনটি রুপোর কাঁটা। তাতে চুটকি লাগানো। গলাতে অ্যানোডাইজড স্টিল-এর একটি পুরোনো দিনের ডিজাইনের বিছে-হার। বাঁ-হাতে রুপোর হালকা মকরবালা। ডান হাতে টাইমেক্স-এর কালো ব্র্যাণ্ডের কালো ডায়ালের ঘড়ি। ডায়ালে রেডিয়াম আছে। কাল রাতে যখন, আলো নিভিয়ে ওরা সকলে রাজাভাতখাওয়ার বাংলোর বারান্দাতে বসেছিল, তখন-ই চোখে পড়েছিল আকার। তটিনীর দু-পায়ে রুপোর পাঁয়জোর। দু-পায়ের মধ্যমাতে রুপোর চুটকি। তার গায়ের রংটি ফিঙের মতন কালো কিন্তু মেক-আপ নিলে খুব-ই ফর্সা। যখন যাত্রা করে না তখন, মেক-আপ নেয় না তটিনী। কিন্তু কাটা কাটা নাক চিবুক। ছোট্ট কপাল। দিঘল দু-টি কালো চোখ। কাজল পরেছে গাঢ় করে। মনে হচ্ছে চোখ তো নয়, যেন একজোড়া ফিঙে। পলকে পলকে স্পন্দিত হচ্ছে। আলো প্রতিসারিত হচ্ছে উজ্জ্বল কালো দু-টি চোখের মণি থেকে।

ওর মুখে এবং চোখের দৃষ্টিতে ভারি এক শান্তশ্রী আছে, বৃষ্টির পরে মুথা-ঘাসে ভরা গাঢ় সবুজ মাঠের মতন।

তটিনীর শরীরের কাছে এলেই, ওর গা থেকে দারুণ এক গন্ধ পায় আকা। গায়ে কী সেন্ট মাখে সে, কে জানে! কখনোও তার বুকের আঁচল হঠাৎ খসে গেলে অথবা ইচ্ছে করেই সে, কখনোও খসিয়ে দিলে, যেমন একটু আগেই দিয়েছিল, ফলসা-রঙা সুডৌল মতন স্তনসন্ধি, যেন, পৃথিবীর সব আলো-আঁধারি রহস্যের খনি হয়ে ওঠে। সেদিকে চোখ পড়তেই পারুল আর অশোকের লালে লাল হওয়া বৈশাখের নীল আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে আকার মাথা ঘুরতে থাকে বনবন করে। বমি বমি পায়।

কালকে এখানে আসার পর থেকে নয়, তার চারদিন আগে থেকেই, মানে, যেদিন থেকে যাত্রাদলটি এসেছিল আলিপুরদুয়ারে, আকার খাওয়াদাওয়া সব-ই গেছে।

ফি-বছর ম্যালেরিয়া হয়, বার দুই ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া হয়েছিল। জণ্ডিস, কালাজ্বর, কী হয়নি ওর! কিন্তু এমন অসুখে সে, জীবনে পড়েনি আগে। বুকের মধ্যে ভারি একটা কষ্ট। আবার, ভারি একটা আনন্দও। মাঝে মাঝেই ‘হু হু’ করে উঠেছে আকার বুকের মধ্যেটা। খিদে-তৃষ্ণা চলে গেছে পুরোপুরি। তার ওপরে তটিনী যখন, ওর মুখটি তুলে, তার চোখের মধ্যে নিজের দু-চোখ, টায়ে টায়ে রেখে তাকায়, এমন-ই করে, যাতে চাউনি একটুও উপছে পড়ে না যায়, তখন আকার মনে হয়, ও আর বাঁচবেই না। রোদটা হঠাৎ-ই ঠাণ্ডা মেরে যায়। জগৎসংসার সব, মিথ্যে বলে মনে হয়। কিছুই ভালো লাগে না আকার।

কে জানে! এই অসুখের নাম কী?

পায়ে পায়ে ওরা যখন, রেললাইনের কাছে পৌঁছে গেছে, হঠাৎ-ই চোখে পড়ল ডান দিকে পোস্ট অফিস। পোস্ট অফিস দেখেই বোধ হয়, তটিনীর খাম কেনার কথা মনে পড়ল।

বলল, একটা চিঠি লিখতে হবে।

চলুন, ভেতরে যাই সকলে। নাকি আকাই গিয়ে নিয়ে আসবে?

না না। চলুন সকলে মিলে যাই। কাজ কী এখানে আমাদের?

তা নেই। কিন্তু ওদিকে মৃদুলবাবু, আপনার হিরো তো বাংলোর দো-তলার বারান্দাতে একা বসে কাপের পর কাপ চা খেয়ে, শিডনি শিলডন পড়ে পড়ে হেদিয়ে গেলেন। দেরি হলে ভারি রাগ করবেন।

অবনী বলল।

রাগ করলে তো আমার-ই ওপরে করবেন।

তটিনী বলল।

তটিনী হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, মোটে তো সাড়ে এগারোটা। আশ্চর্য! মনে হচ্ছে কতক্ষণ হল যেন, বেরিয়েছি। দেড়টা দুটোর আগে কোনদিন খাই দুপুরে? আর রাতে তো কথাই নেই। যাত্রা যেদিন থাকে সেদিন তো মেক-আপ-টেক আপ তুলে খেতে করতে সেই একটা-দেড়টাই হয়।

আপনার হিরোও কি ওই সময়েই খান রোজ? বেড়াতে বেরিয়ে?

মৃদুল আমার হিরো নন, ‘হলুদ গোলাপ’ যাত্রার নায়িকা শুক্লার প্রেমিক, বসন্ত। আমার নাম তো তটিনী। মঞ্চ থেকে নেমে আসার পর মৃদুলবাবু শুক্লার কেউ-ই নন। তটিনীর তো নন-ই! জীবনে আমার কোনো নায়ক নেই। তা ছাড়া উনি বেড়াতে বেড়িয়ে কখন খান, তাও আমার জানা নেই কারণ আমি আর উনি একসঙ্গে কোথাও-ই যাইনি বেড়াতে এর আগে। ‘হলুদ গোলাপ’-এর আগে আর কোনো পালাও করিনি ওঁর সঙ্গে।

হাউ স্যাড।

অবনী বলল।

কেন? স্যাড কেন?

পোস্ট অফিসে ঢুকতে ঢুকতে তটিনী বলল।

না। আপনার মতন মহিলারও জীবনে, কোনো নায়ক নেই কথাটা।—

তটিনী অবনীর দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, দর্শকদের বা উদ্যোক্তাদের কিন্তু উচিত নটনটীদের মঞ্চের ভূমিকাতেই নিজেদের ঔৎসুক্য সীমিত রাখার। ব্যক্তিগত জীবনটাতে উঁকিঝুঁকি না মারাই ভালো নয় কি?

অবনী বলল, বিলক্ষণ। কিন্তু সংসারে যা-ঘটে তার কতটুকুই বা ভালো বলুন? যাঁরা পাদপ্রদীপের আলোতে থাকেন তাঁদের ফুলের মালা আর প্রণামের সঙ্গে এইসব অত্যাচার একটু-আধটু সহ্য তো করে নিতেই হয়।

তারপর বলল, আপনার মতন মেয়েরও যদি নায়ক না থাকে, তবে থাকবে কার?

নেই মানে, আছে নিশ্চয়ই। এই পৃথিবীর-ই কোনো কোণে। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা হয়নি আমার।

তটিনী বলল।

আকার বুকটা ভেঙে গেল।

আকাকেই পরমুহূর্তে তটিনী বলল, কী বলেন আকাবাবু?

তারপর-ই বলল, আপনার মতো স্মার্ট সুন্দর ইয়াং পুরুষের নাম, আকা কে রাখল বলুন তো?

আমার বড়োমায়ে রাখছিল।

সরল, ভালোমানুষ হায়ার সেকেণ্ডারি পাশ Die Hard বাঙাল আকা বলল।

‘বড়োমা’ মানে?

বড়োমা বোঝলেন না? বড়োমা মানে, আপনারা যারে কন জ্যাঠাইমা, তাই।

ও।

খাম আছে?

পোস্ট অফিসের ভেতর ঢুকে অবনী জিজ্ঞেস করল।

এক ভদ্রলোক, একাই কাউন্টারের পেছনে, কাঠের ছোটোটেবিলের সামনে ততোধিক ছোটো একটি চেয়ারে বসে একগাদা কাগজের ওপরে মান্ধাতার আমলের একটি হাতঅলা লোহার স্ট্যাম্প দিয়ে, বড়োস্ট্যাম্প প্যাডের কালিতে জোরে ঠাপ্পা মেরে তারপরে আরও জোরে স্ট্যাম্প করছিলেন, সেই কাগজগুলিতে।

ওদের দেখেই ভদ্রলোক উঠে এলেন।

বললেন নমস্কার।

অত্যন্ত উত্তেজিত এবং কিঞ্চিৎ দ্বিধাগ্রস্ত গলাতে বললেন, আপনি তটিনী দেবী নন?

হঃ। এতক্ষণ লাগে নাকি চিনতে?

আকা বলল ওঁকে, তাচ্ছিল্যের সঙ্গে।

তা নয়, মঞ্চে তো সাজেপোশাক আলাদা থাকে, মেক-আপ, টেক-আপ থাকে। তাই!

আপনি ‘হলুদ গোলাপ’ যাত্রা দেখলেন কোথায়? আলিপুরদুয়ারে?

ভদ্রলোক লম্বা, একটু গোলগাল চেহারা, মুখে তিন-চারদিন, না-কামানো খোঁচা-খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি, একটি নীল-রঙা হাফ-শার্ট, খাকি প্যান্টের ওপরে পরা, একটি ‘উইলসন’ বলপেন গোঁজা শার্টের বাঁ-দিকের বুক-পকেটে। পোস্টাপিসের দেওয়ালে রামকৃষ্ণদেবের একটি ছবি এবং ঠিক তার উলটোদিকেই মুরশিদাবাদের ‘মৃণালিনী’ বিড়ি কোম্পানির একটি ক্যালেণ্ডার।

মাস্টারবাবু তটিনীকে বললেন, আজ্ঞে না ম্যাডাম। আমি দেখেছি আপনাকে হ্যামিলটনগঞ্জে। যখন আপনাদের ‘মনমোহন অপেরা’ গেছিল গতবছর তখন। আমার ফেমিলি তো সেইখানেই থাকে। ছুটিতে সেখানে গেছিলাম গতবছরের আগের বছরে পুজোর সময়ে।

একবছর আগে দেখেও মনে রেখেছেন আমাকে! কী পালা যে, নিয়ে গেছিলাম আমরা সেবারে হ্যামিলটনগঞ্জে তা তো আমার নিজের-ই মনে নেই!

‘ভানুমতী’।

তাই তো। তা আমাকে মনে রেখেছেন, আশ্চর্য!

আকা বলল, আপনারে একবার দ্যাখলে কি কারো পক্ষেই ভোলা সম্ভব?

মাস্টারবাবু বললেন, তা ঠিক।

আকা বলল, আপনের নাম কী মাস্টারমশয়?

আমার নাম শ্রীদেবেন্দ্রনাথ বসু। অরিজিনালি আমি আপনাদের কলকাতার বালিগঞ্জের-ই মানুষ মশাই। আমার ছেলেবেলা কেটেছে সেখানেই।

তারপর, পাছে রাজাভাতখাওয়া পোস্টমাস্টার যে, কলকাতার বালিগঞ্জের-ই বাসিন্দা এ-কথা কলকাতার কেউ অবিশ্বাস করেন তাই যেন বললেন, রায়বাহাদুর নগেন বোস-এর নাম শুনেছেন কি?

অবনী না শুনেও বলল, হ্যাঁ।

তিনিই হচ্ছেন গিয়ে আমার সাক্ষাৎ ন-ঠাকুরদা। দাদু জ্যাঠতুতো ভাই যদিও।

অবনী বলল, ও, তাই বুঝি?

একটু চা খাবেন-না?

দেবেনবাবু শুধোলেন।

চা?

তটিনী অবাক হয়ে গেল।

স্ট্যাম্প আছে, এক টাকার? অথবা খাম?

না:।

খুব-ই লজ্জিত হয়ে বললেন উনি।

স্টক ফুরিয়ে গেছে, তবে আসার কথা আছে, দিন সাতেকের মধ্যে। পোস্টকার্ড আর ইনল্যাণ্ড নিতে পারেন।

খাম বা স্ট্যাম্প নাই-বা থাকল, চা তো আছে।

অবনী বলল।

শুনেই মাস্টারমশাই হাঁক দিলেন, এই মান্তু! চা আন তাড়াতাড়ি। ওঁদের সকলকে দে। আমাদের আজ কী সৌভাগ্য! স্ট্যাম্প না থাকল তো কী হল? তটিনী দেবী এবং এতসব গণ্যমান্য মানুষ এসেছেন আমার পোস্ট অফিসে।

অবনী বলল, এটা তো আপনার বাড়ি নয়, অফিস। আপনি কেন আতিথেয়তা করবেন?

কেন করব না, তাই বলুন! আপনাদের মতন মানুষদের পায়ের ধুলো কি রোজ রোজ পড়বে এই জঙ্গুলে রাতভাতখাওয়ার ছোট্ট পোস্ট অফিসে!

জায়গাটার নাম রাতভাতখাওয়া হল কেন বলুন তো?

তটিনী বলল।

শুনেছি, বহুদিন আগে কুচবিহারের রাজা ভুটানের রাজাকে এখানে ভাত খাইয়েছিলেন।

মাস্টারমশাই বললেন।

কেন? জামাই তিনি? না শ্বশুর?

আকা বলল, আউজ্ঞা তা নয়। যুদ্ধ লাগছিল ত দুই রাজার মইধ্যে। যুদ্ধে যখন সন্ধি হইল গিয়া তখনে হেই দুই রাজা একলগ্যে বইস্যা ইখানে ভাত খাইছিলেন। তাই, ই জাগার নাম রাজাভাতখাওয়া।

তারপরেই তটিনীকে বলল, আপনে দ্যাখেন নাই যে, ইনফরমেশন সেন্টারের দেওয়ালে একখান ফাস ক্লাস রঙিন ছবি আঁকাইছেন কলকাতার থনে আর্টিস্ট আইন্যা, বিস্ট সাহেব?

বিস্ট সাহেব কে?

তটিনী আবার প্রশ্ন করল।

বিস্ট সাহেব হইলেন গিয়া বক্স-টাইগার প্রোজেক্টর। তাঁর রাইজ্যেই ঘুরতাছেন আপনেরা আর তাঁর-ই নাম জানেন না? অবনীদাটা থার্ড ক্লাস। কইবা ত ওনাদেরকে।

এমন সময় বাইরে থেকে পায়জামার ওপরে খাকি শার্ট-পরা এক মাঝারি উচ্চতার ভদ্রলোক একটি ভাঁজ-করা খাম-এর মধ্যে কিছু কাগজপত্র বগলে নিয়ে ঢুকলেন। মুখে পান। জর্দার গন্ধ বেরোচ্ছে।

দেবেনবাবু বললেন, এই যে রেবতী, ঠিক সময়েই এসেছ। ইনিই হলেন সেই তটিনী দেবী। ‘ভানুমতী’ পালার কথা বলেছিলাম-না তোমাকে? গত-বছরের আগের বছর পুজোর সময়ে হ্যামিলটনগঞ্জে গেছিলেন ওঁরাই। আর এ-বছর, এই সময় আলিপুরদুয়ারে এসেছিলেন।

ওঁকে চিনুম না দাদা! আপনার মুখে ত হেই নাম-ই কৃষ্ণনাম আছিল বহুদিন।

নবাগন্তুক বললেন।

অবনী কারেক্ট করে বলল, রাধানাম বলুন। জেণ্ডার ভুল করছেন কেন?

সকলেই সেই কথাতে হেসে উঠলেন এবং উঠল।

এই সময়টা কি যাত্রার পক্ষে উপযুক্ত? প্রায় রোজ-ই তো ঝড়-বৃষ্টি হয়।

দেবেনবাবু বললেন।

আকা বলল, ইনি হইতেছেন সাক্ষাৎ জগদম্বা। ম্যাঘ, বিদ্যুৎ সর্বক্ষণ ওঁর শাসনেই থাহে। এমনিই কইতাছি না। চারদিন মানে, চার রাইত পরপর হইল যাত্রা, তাও সার্কিট হাউসের সামনের মাঠে। কুনোরকম উপদ্রব-ই ত হয় নাই। না ঝড়, না বাতাস, না জল!

ও, আলাপ করিয়ে দিতে ভুলে গেছিলাম। ইনি হলেন রেবতীভূষণ ভৌমিক। পোস্টম্যান।

পোস্টমাস্টার দেবেনবাবু বললেন, নবাগন্তুককে দেখিয়ে।

রেবতীবাবু দু-হাত তুলে নমস্কার করলেন।

করেই আকার দিয়ে চেয়ে বললেন, আপনারে য্যান চিনা-চিনা লাগে! আপনের বাড়িও কি সলসলাবাড়িতে?

না। আমার বাড়ি হইল গিয়া আলিপুরদুয়ারে। আর এই অঞ্চলে আসল-যাওন তো লাইগ্যাই আছে। তা ছাড়া, আমরা পেরতি বচ্ছর-ই জয়ন্তী ছাড়াইয়া ভুটান পাহাড়ে মাউন্টেইনারিং-এর ক্যাম্প করি না! ছুটো-ছুটো ছাওয়াল-মাইয়াদেরও তো লইয়া আসি আলিপুরদুয়ার থিক্যা। দ্যাখছেন নিশ্চয়ই!

পোস্টম্যান রেবতীবাবু এবারে একটু ভেবে বললেন, বুঝেছি, বুঝেছি। আপনে আলিপুরদুয়ারের তপনবাবুর লগে আসেন ত!

হ। ঠিকোই ধরছেন।

পোস্টমাস্টার জিজ্ঞেস করলেন, কোন তপনবাবু?

আরে, আলিপুরদুয়ারের অ্যাসিস্ট্যান্ট পাবলিক প্রসিক্যুটার।

অ। বুঝেছি। টাক মাথা তো।

আউজ্ঞা। এক্কেরে টাক না, কিছু চুল এহনও আছে। তবে পিছনে।

অবনী জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি কোথায় রেবতীবাবু?

মানে, দ্যাশ কই ছিল, তাই জিগান ত?

হ। বাড়ি মানে তো দ্যাশ! ওই হইল আর কী!

দ্যাশ তো আছিল মইমনসিংহ। এহনে থাহি সলসলাবাড়িতে। উদবাস্তু। বোঝেন-ই তো!

হ। হ। বুঝেছি। আমরাও ত তাই-ই। মানে উদবাস্তুর পোলা আর কী! না-বোঝনের আছেটা কী?

মাস্টারমশয়ের বাড়ি তো বললেন হ্যামিলটনগঞ্জ। আলিপুরদুয়ার থেকে যেতে পথে কী একটা জায়গা পড়ে-না, কী যেন, নাম?

তটিনী বলল।

পড়ে তো! আটিয়াবাড়ি। গারোপাড়া ভাতখাওয়া টি এস্টেট হয়ে, কালচিনি হয়ে ডিমা নদী পেরিয়ে যেতে হয়।

মাস্টারমশাই যেন, বলতে বলতে স্মৃতিমেদুর হয়ে উঠলেন।

মুখ-চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল তটিনীর। বলল, হ্যাঁ, হ্যাঁ আটিয়াবাড়ি। মনে আছে, আমরা বাস দাঁড় করিয়ে চা আর শিঙাড়া খেয়েছিলাম সেখানে।

তটিনী বলল, স্মৃতিচারণ করে।

আপনি আগে কোথায় ছিলেন মাস্টারমশাই?

এখানে আসার আগে?

হ্যাঁ।

অবনী জিজ্ঞেস করল।

আজ্ঞে, আগে ছিলাম পানাতে।

পানা? সেটা কোথায়?

তটিনী জিজ্ঞেস করল।

একেবারে ভুটানের বর্ডারে। ভুটান দেখা যায় সেখান থেকে। বাসরা আর পানা এই দুই নদীই বেরিয়েছে ভুটান থেকে। ওঃ। নাইনটি-টুতে সে কী বন্যা! বন্যায়...

ওঁকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে অবনী বলল, চা তো খাওয়া হল, আপনাদের সঙ্গে আলাপ হয়ে খুব ভালো লাগল। এবারে আমরা এগোই। কী বলেন মাস্টারমশাই? রোদ চড়া হয়ে যাবে।

তটিনী বলল, হ্যাঁ।

মাস্টারমশাই হাঁক দিলেন, মান্তু। ছাতাটা নিয়ে মেমসাহেবের মাথার ওপরে ধরে পৌঁছে দিয়ে আয় বাংলো অবধি।

তটিনী বলল, আপনি কি পাগল হলেন? কিচ্ছু লাগবে না। চলি তাহলে। আচ্ছা, খুব ভালো লাগল। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। আপনাদের।

তারপর-ই বলল, এই মান্তুকে আমি দশটা টাকা বকশিস দিতে পারি কি চা খাওয়াবার জন্যে?

দশ টাকা? সে কী! অত টাকা দেবেন কেন?

আমার কাছে দশ টাকার দাম নেই, তা ছাড়া চেঞ্জও নেই। কিন্তু আপনি অনুমতি দিলেই দিতে পারি। অনুমতি দিলে খুব-ই খুশি হই।

দিন। যখন বলছেন।

মাস্টারমশাই দেবেন্দ্রনাথ বসু বললেন।

পোস্টম্যান রেবতীবাবু বললেন, আজ সকালে কার মুখ দেইখ্যা উঠছিলি রে ছুঁড়ি?

মান্তু নামক মেয়েটি নির্বিকার নিরুত্তাপ মুখ মাটির দিকে নামিয়ে চুপ করে রইল।

আমরা এবারে যাই।

অবনী বলল।

ইনল্যাণ্ড, খাম কিছুই নিলেন না তো চিঠি লিখবেন কী করে?

মাস্টারমশাই বললেন।

তটিনী ঘুরে দাঁড়িয়ে, একটি পুরুষ-হনন হাসি হেসে বলল, চৈত্রদিনের ঝরা পাতায়।

অবনী বলল, ব্রাভো! ব্রাভো! এই নইলে আপনি নায়িকা। আপনি বর্ন-হিরোইন। সাধে কি গেটেদা বলেন যে, তটিনীর কারোর-ই ডিরেকশনের দরকার নেই। ও হচ্ছে ন্যাচারাল অ্যাক্টে=স।

দু-হাত তুলে ওঁদের নমস্কার করে তটিনী বাইরে বেরোল। পেছনে পেছনে অন্যরা।

অবনী বলল, যাঁরা চিঠি বিলি করেন, মানে, এই পোস্টম্যানেরা কতবড়ো কাজ করেন, তাই-না? এঁরাও তো আমাদের-ই মতন মানুষ। এঁদেরও আমাদের মতন সুখ-দুঃখ থাকে, সংসার থাকে, ছেলেমেয়ে থাকে, এঁরা নিছক-ই আমাদের দুঃখ বা আনন্দের ডেলিভারি-মেশিন নন। তাই-না? জীবনে আজ এই প্রথম প্রত্যেক পোস্টম্যানের মধ্যে যে, আমাদের-ই মতন, একজন ‘মানুষ’ও থাকেন, তাঁকেই আবিষ্কার করলাম।

তটিনী বলল, হুঁ।

আকা বলল, ক্যান? আমার জন্যে নয়? আজ না-হয় আমি স্যা চাকরি ছাইড়্যা দিছি, একদিন ত চিঠি বিলিও করছি, ঘরে ঘরে ঘুইর‌্যা।

করেছেন। না?

তটিনী বলল।

করি আর নাই? কত মানুষের কত খবর লইয়া লাড়াচারা করছি! হা:! স্যা আছিল একদিন।

তটিনীর আসলে মনে পড়ে গেছিল ওর নিজের ছেলেবেলার কথা। ওর বাবা মেদিনীপুরের এক অখ্যাত সাব-ডিভিশনের এক অখ্যাত দুর্গম গ্রামের একটি পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার-কাম-পোস্টম্যান ছিলেন। সে তার বাবার বিনি-মাইনের ঝিই ছিল মাত্র। অতিমোটা ভাত, মোটা কাপড়ের বিনিময়ে সে, তার মাতাল বাবার সব প্রয়োজন মেটাত। রান্নাবান্না করত, সেবা-শুশ্রূষা। একেবারে শিশুকালে মা-হারানো তার বাবার সঙ্গে কোনোরকম আত্মিক যোগ ছিল না। অনেক মেয়ের-ই থাকে না। ওর বয়েস যখন ওই দশ-এগারো বছরের মান্তুর-ই মতন ছিল, সেইসময়েই গ্রামের মহাজন শ্রীমন্ত জানা মেদিনীপুর শহরে ভালো কাজ দেবে, সুখে রাখবে, এই লোভ দেখিয়ে মাতাল বাবাকে মোটা টাকা দিয়ে, মা-মরা তটিনীকে তার কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে গেছিল। তারপরের সেইসব গ্লানি আর ক্লেদ-ভরা দিনগুলির কথা মনে পড়ে যাওয়াতেই ওর মন ভারী হয়ে এল।

মান্তু দাঁড়িয়েছিল দরজার একপাশে মাস্টারমশাই আর পোস্টম্যানবাবুর থেকে তফাতে, অপরাধীর মতন। তটিনী পেছন ফিরে চেয়ে একবার দেখল মান্তুকে পূর্ণদৃষ্টিতে।

তারপর হাত তুলল। বা-ই-ই করার মতন করে। কিন্তু মুখে কিছুই না বলে, মনে মনে বলল, আসি। যেন, বিদায় নিল। ওই মান্তুর কাছ থেকে যেমন, ওর ছেলেবেলার নিজের কাছ থেকেও তেমন-ই।

হঠাৎ-ই ঘুরে দাঁড়ানো তটিনীর মরালীর মতন গ্রীবা দেখে আকা আবারও কষ্ট পেল। চৈতি হাওয়াতে।

আন্দোলিত কয়েকটি এলোমেলো অলকচূর্ণ সেই তন্বী সুঠাম গ্রীবার সৌন্দর্য হঠাৎ-ই আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল।

পোস্ট অফিসের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এসে, পেছন ফিরে অবনী দেখল, দরজাতে দাঁড়িয়ে থাকা দেবেনবাবুর খাকি ফুল-প্যান্টের তিনটি বোতাম-ই খোলা। হয়তো ওরা যাওয়ার ঠিক আগেই বাথরুম থেকে এসেছিলেন। ভুল হয়ে গেছিল লাগাতে। ভুলোমনের পুরুষমাত্রকেই এমন নানা এমবারাসমেন্টের মধ্যে পড়তে হয়। একজন পুরুষ হিসেবে, দেবেনবাবুর সমব্যথী হল অবনী।

ভাবছিল, পুরুষও যদি পুরুষকে ফেলে দেয়, বিনা দোষে, তবে সে-বেচারারা, এই পুরুষ-নিগ্রহর যুগে যায় কোথায়?

আকাও ভাবছিল, মস্ত ভুল হয়েছিল তার তটিনীর সঙ্গে এবারে এই বক্সার জঙ্গলে আসা ল্যাংবোটের মতন, খিদমদগারের মতন। আর বাঁচা হবে না! মরবে সে এবারে। একেবারেই মরবে।

দূরে ভুটান পাহাড়ের মেঘের মতো নীলচে শরীর দেখা যাচ্ছে ঘন জঙ্গলের মাথা ছাড়িয়ে। আস্তে একটা হাওয়া বইছে। হাওয়ার চেয়েও আস্তে আলতো পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তটিনী ভাবছিল, তার সমস্ত জীবনটাই ভুল। যৌবন আর কত বছর থাকবে? এবার থিতু হওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে একটা। তবে, জীবনে নিজের চেষ্টাতে, নিজের চাঁদমুখের জোরে ঈশ্বরের অশেষ আশীর্বাদে সে অনেক-ই দূরে চলে এসেছে। এই এতখানি পথ আসাটা তার কাছে একদিন সত্যিই অভাবনীয় ছিল। কী করে মোটামুটি ইংরেজি বাংলা শিখেছিল, যিনি তার মধ্যে সাহিত্য-বোধ জাগিয়ে তুলেছিলেন, সুরুচি, সেই চালকলের মালিক নারীদেহ-বিলাসী মোটা কুৎসিত মানুষটার কাছেও, শুধু এই কারণেই আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবে।

প্রত্যেক মানুষের-ই মধ্যে ভালো-মন্দ থাকেই। যদিও শুধু ভালো, শুধুই মন্দ মানুষ দেখেনি যে, জীবনে ও তাও নয়। একথা ঠিক যে, সাহিত্যই তাকে তার আজকের যতটুকু প্রাপ্তি তার পারায় সবটুকুই দিয়েছে। বাংলা গল্প উপন্যাস পড়ে সে, নিজেকে গড়ে-পিটে নিয়েছে। তার সেই প্রথম বাবু প্রাণধন খাঁ পয়সাওয়ালা হলেও শিক্ষিত ছিলেন।

বাবু বলতেন, মুনিয়া রে! Literature makes a person. সাহিত্য পড়। তার চেয়ে বড়োশিক্ষা আর নেই।

শরীর-ভাঙিয়ে খাওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু দেখেনি ও। কিন্তু নিদারুণ অসহায়তা অবশ্যই দেখেছে। সেই জীবিকা যে, অতিস্বল্পমেয়াদি তাও ও জেনেছে। এবং জেনে, শরীরের চেয়ে মনের ওপরে, গুণের ওপরে, ক্রমশই অনেক-ই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

সে একাই জানে, শুধু সে একাই, এই দীর্ঘ, দুর্গম, বন্ধুর পথের দু-পাশে কী ছিল?

লোভ কিন্তু আদৌ বেশি নেই ওর। ও একজন সাদা-সিদে, ভালোমানুষ, কম বুদ্ধিসম্পন্ন সচ্চরিত্র পুরুষ চায়, যার সঙ্গে ঘর বেঁধে ও, বাকিজীবনটা কাটাতে পারে। একটি কোলজোড়া ছেলে। তারপরে একটি মেয়ে। ব্যস।

আর কিছু চাইবার নেই ওর জীবনের থেকে। চারবার অ্যাবর্শন করতে হয়েছে ওকে। প্রথমবার চোদ্দো বছর বয়সে, শেষবার সাতাশ বছর বয়সে। সহবাস আর দাম্পত্যর মধ্যে তফাত যে, কী, তা ও বোঝে। তার সঞ্চয়ের সুদ থেকে, আড়ম্বর করে নয়, সাদামাটাভাবে কেটে যাবে বাকিজীবন। গুমা-হাবড়াতে দশ কাঠা জমিও কিনে রেখেছে। এখন...

তবে পুরুষ দেখে ওর ঘেন্না ধরে গেছে, পুরুষ জাতটার-ই ওপরে। শুয়োরের জাত এই পুরুষ।

হাঁটতে হাঁটতে তটিনী ভাবছিল, ওর পায়ে পায়ে মুগ্ধ, বাধ্য কুকুরের মতন হেঁটে-আসা আকা মানুষটি কিন্তু বেশ! ভালো নাম আকাতরু রায়। আজব নাম। মানুষটি এক-শো ভাগ খাঁটি মানুষ। আর তটিনী বুঝতে পেরেছে যে, তাকে মানুষটা পাগলের মতন ভালোবেসে ফেলেছে। একমাত্র নির্বুদ্ধি মানুষেরাই, সৎ, উদার, নিজ স্বার্থবোধহীন পুরুষেরাই এমন করে ভালোবাসতে পারে কোনো নারীকে, প্রথম দর্শনেই। তবে এখনও জানে না ও, এটা ভালোবাসা না মোহ না কাম! অনেক সময়েই এই তিনের মধ্যে তফাত করা ভারি কঠিন হয়ে ওঠে। অনেকবার দেখেছে ও। অধিকাংশ পুরুষেরাই স্বভাবে শুধু শুয়োর-ই নয়, গর্দভও বটে। তা ছাড়া, পুরুষের ভালোবাসা আর মুসলমানের মুরগি পোষা সমগোত্রীয় ব্যাপার-ই।

ঠিক সেই সময়েই পারুল গাছের মগডাল থেকে একটা কোকিল ডেকে উঠল খুব জোরে, ‘কুহু-কুহু-কুহু’ করে।

তটিনীর বুকের মধ্যেটা চমকে উঠল।

আকা নাক তুলে উঁচু পারুল গাছটার মগডালে চোখ সরু করে আকুল হয়ে খুঁজতে লাগল। ওর চোখে রোদ পড়েছে। পাখিটা যে, কোথায় তা কিছুতেই ও দেখতে পাচ্ছে না।

তটিনী ভাবছিল, বেচারা! বোকা মানুষটা জানেই না যে, কোকিলটার বাসা মানুষটার নিজের-ইবুকের মধ্যে।

দুই

যখন রাজাভাতখাওয়া বন-বাংলোতে এসে পৌঁছোল ওরা, তখন প্রায় বারোটা বাজে।

মৃদুলের সামনে টেবিলটার ওপরের অ্যাশট্রেটা সিগারেটের টুকরোতে ভরে গেছে। সে কালকের THE STATESMAN-টা পাশের চেয়ারে সরিয়ে রেখে, উঠে দাঁড়িয়ে বলল, বাবা:! হল তোমাদের ইনফরমেশন সেন্টার দেখা! এত ইনফরমেশন জড়ো করলে তা স্থানান্তরিত করতেও তো পুরোসপ্তাহ লাগবে।

তটিনী মৃদুলের উলটোদিকের চেয়ারে বসে বলল, সত্যি! কত কীই-না জানলাম, দেখলাম। গেলে পারতেন আপনিও।

থ্যাঙ্ক ইউ। আমার নিজের মধ্যে এত ইনফরমেশন জমে আছে যা, হজম করতে বহুযুগ লেগে যাবে। আমি আমাতেই টইটম্বুর।

সত্যি! আপনি ভারি ভালো কথা বলেন কিন্তু মৃদুলবাবু। আপনি নিজেই একটা কিছু লিখুন না!

কী?

নাটক, শ্রুতি নাটক, নয়তো যাত্রা।

লিখলেই হত। মাঝে মাঝে শুধু যাত্রার ডায়ালগ-ই নয়, সিনেমার ডায়ালগও এমন বোকা-বোকা অপার অশিক্ষিতর মতন শোনায়, নিজে লিখতে ইচ্ছে যে-হয় না, তা নয়। প্রায়-ই মনে হয়, রেগেমেগে খাতা-কলম নিয়ে বসে যাই।

তারপর?

তারপর আর কী! লিখতে কোনো কিছু যে, পারি এই ভাবনাটাকে ফোঁড়ার মতন লালন করতে খুব ভালো লাগে আমার। ইচ্ছে করলেই, মানে, যে-জিনিস আমার করতলগত, তা করে ফেললেই পুরো মজাটাই মাটি হয়ে যায় বলে মনে হয়।

অবনী বলল, তা ছাড়া, একেবারে ঝুলও তো হতে পারে! সেই ভয়টাও থাকে।

মৃদুল হেসে বলল, তাও বটে!

জানেন, ‘আকাতরু’ গাছ দেখলাম আমরা।

আকাতরু? গাছের নাম আকাতরু?

তাহলে আর বলছি কী? লালি, দুধে লালি, চাঁপ, চিকরাসি, গামহার, কাট্টুস, উদাল, ঝিমুনি আর খয়ের। খয়ের গাছও দেখলাম তো!

অবনী বলল।

না, না। সেসব গাছের নাম তো আমরা জানিই! কিন্তু যেসব গাছ এখানেই প্রথম দেখলাম সেগুলোর কথা শুনি। ভারি আশ্চর্য সব নাম তো! তা আকাতরু গাছ দেখতে কেমন?

বলেই ডান হাতের তর্জনী নির্দেশ করে বলল, আচ্ছা, এই গাছটা কী গাছ? এই যে, আমাদের বাংলোর গেট-এর ডান পাশে?

আকা বলল, ইটারেই তো কয় গামার। বা, গামারি।

অবনী বলল, আমাদের এখানে বলে গামার বা গামারি কিন্তু বিহারে এবং মধ্যপ্রদেশে বলে গামহার। জানিস আকা?

তাই?

ইয়েস।

তা আকাতরু গাছ কেমন, তা তো বললেন না?

মৃদুল শুধোল আকাকে।

জামগাছ দ্যাখছেন।

জামগাছ? না তো। গাছ দেখিনি তবে খেয়েছি। কালোজাম। গোলাপজাম।

শ্যামবাজারের মৃদুল আকাশ থেকে পড়ল।

হায়! হায়! জামগাছও দ্যাখেন নাই?

না।

খাইলে কী হয়? আকাতরু, জামগাছের-ই মতো মস্ত গাছ—পাতাগুলান কিন্তু ঠিক পাকুড় গাছের পাতার মতন। পাকুড় গাছ দ্যাখছেন তো?

পাকুড় গাছ? না:।

খাইছে। এ তো মহা সাহেবেরে লইয়া পড়লাম দ্যাখতাছি।

তারপর বলল, মস্ত বড়ো বড়ো গাছ হয় আকাতরু। সাদারঙা আমের বোলের মতন ফুল ফোটে, মার্চ-এপ্রিল মাসে আকাতরু গাছে।

এখন-ই তো মার্চ মাস।

তয় দেখবেন। চোখ খুইল্যা থাককেন য্যান?

ইংরেজি, মানে বটানিকাল নামে জানেন নাকি? আকাতরুর?

মৃদুল সংকোচভরে আকাকে আবার জিজ্ঞেস করল।

আমি জানুম কোত্থনে? তবে কল্যাণ দাস সাহেবে আর ভগবান দাস সাহেবে এই বাংলোতেই বইস্যা কয়দিন আগে কথা কইত্যাছিল, আমি শুইন্যা লইছি। খালি শুইন্যাই লই নাই, টুইক্যাও থুইছি। তা না হলে আমার-ই ব্রেন তো। হঃ। এক্কেরেই বেগ-বেগা!

‘বেগ-বেগা’টা আবার কী বস্তু?

মানে, আমার ব্রেনে যা কিছুই ঢোকে, তা বেগে ঢুইক্যাই আবার তৎক্ষণাৎ বেগে বাইরাইয়া যায়, বোঝলেন কি না!

কী? মানে, বটানিকাল নামটা কী?

HEYNEE TRIJUGA.

হেইল হিটলার-এর মতন শোনাল যে!

অবনী বলল।

সে এক, ইংরেজ সাহেব আছিল B. Rox. স্যায় নাম থুইয়া গ্যাছে গিয়া ওই গাছের।

তিনি কোথায়? সেই রক্স সাহেব?

কেডা জানে ত। কবে মইর‌্যা ভূত হইয়া গ্যাছে গিয়া।

কল্যাণ দাসটা কে?

বাবা:। তিনি ত হইলেন গিয়া অ্যাডিশানাল ডি.এফ.ও। এ.ডি.এফ. কইলে আবার মহা চইট্যা যান গিয়া। তিনিই ত সব। ডিরেক্টরে রোজ আসেন থোরি।

অ্যাডিশনাল ডি.এফ.ও.-ও তো এ.ডি.এফ.ও.-ই।

তা ঠিক। কিন্তু অ্যাসিস্ট্যান্ট ডি.এফ.ও.ও, এ.ডি.এফ.ও। তাই পুরাডা না কইলে তাঁর মানহানি হয়।

তাই?

আসলে কী আর হয়? তিনি ভুল কইর‌্যা ভাবেন, যে হয়।

আর ভগবান দাস সাহেব?

তিনি শিলিগুড়ির থনে আইছিলেন। সিলভিকালচারের এ.ডি.এফ.ও।

ও।

তারপর-ই বলল, এইসব কথা থাউক। এহনে কয়েন, এঁচড় কি খাইবেন? ফাসকেলাস এঁচড় হইছে বাবুর্চিখানার পিছনের গাছে।

এঁচড় তো অমৃত।

মৃদুল বলল।

গাছপাঁঠা।

অবনী বলল।

তাহলে কই যাইয়া নর্বুরে।

নর্বুটা কে?

আরে? তারেই চিনলেন-না? এই বাংলোর চৌকিদার-কাম-কুক-কাম-কেয়ারটেকার। হোয়াট নট? তার পুরা নাম হইতাছে নর্বু তামাং।

এতসব কথা আকা বলছিল বটে মৃদুল আর অবনীর সঙ্গে কিন্তু তার সমস্ত বাক্যাড়ম্বরের লক্ষ্য ছিল তটিনী।

কী যে হবে আকার, আকা জানে না।

তটিনী, ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটি চটির মধ্যে ঘষতে ঘষতে বলল, আপনার নাম যে, আকা, সে কি ‘আকাতরু’ থেকেই?

তটিনী তাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলতেই ছাই-চাপা আগুন যেমন, ফুঁ দিলেই দপ করে জ্বলে ওঠে, আকা তেমনি করে জ্বলে উঠল।

বলল, হ। বড়োমায়ে তো তাই কইতেন। মস্ত গাছ তো! ভাবছিলেন আমিও মস্ত হইব বুঝি মানুষের মইধ্যে, আকাতরুর-ই মতন।

হয়েছেন-ই তো।

মৃদুল বলল।

হঃ। স্যা তো চেহারায়। মানুষ আর হইতে পারলাম কই? বনমানুষ-ই রইয়্যা গ্যালাম।

তটিনীর হাসি পাওয়ার কথা ছিল আকার এই কথাতে। কিন্তু অন্যদের মুখ স্মিতহাসিতে ভরে উঠলেও তটিনী হাসল না।

একটু চুপ করে থেকে ও বলল, আপনারা সবাই কখন খাবেন?

তুমি যখন খাবে। তুমিই একমাত্র মহিলা দলে। তোমার ইচ্ছেতেই সব হবে।

মৃদুল বলল।

বা: তা কেন? একদিকে পুরুষের সমান বলে দাবি করব আর অন্যদিকে নেকুপুষুমুনু হয়ে সব সুযোগ নেব, তেমন মহিলা আমি নই। না, বলুন-না?

অবনী বলল, কী রে আকা? যা না নীচে একবার। নর্বু তামাং না, কী নাম বললি, তাকে একবার জিজ্ঞেস করে আয়, ক-টা নাগাদ তৈরি হয়ে যাবে লাঞ্চ। আর এঁচড়ের লোভ যখন জাগিয়েই দিলি আমাদের মনে, তখন দেখিস যেন...

আরে কুনোই চিন্তা নাই তর। এঁচড়টা আমিই রাঁধুম।

তবেই সেরেছে। মুখে দেওয়া যাবে না।

তারপর তটিনীর দিকে ফিরে বলল, যা ঝাল আর তেল দেবে আকা!

তারপর বলল, তোর গুণপনা দেখাবার আরও অনেক জায়গা পাবি, জয়ন্তী, সান্ত্রাবাড়ি, বক্সাদুয়ার, ভুটানঘাট। অদ্যই তো আর শেষ রজনি নয়। কিন্তু যেখানে বাবুর্চি আছে সেখানে তোর হাতের রান্না খেতে আদৌ রাজি নই আমি।

ঠিক আছে।

আকা বলল।

আকা সিঁড়িতে ‘ধপ ধপ’ শব্দ করে নীচে নেমে গেলে, মৃদুল স্বগতোক্তির মতন বলল, ভেরি গুড সোল। আপনার বন্ধু মানুষটি একটি ওরিজিনাল। ভারি ভালো। ওঁর কোনো ‘প্রোটোটাইপ’ এই ধরাধামে খুঁজে বের করা যাবে বলে মনে হয় না।

তারপরেই বলল, করেন কী ভদ্রলোক? মানে অকুপেশান কী?

পরোপকার।

যা:। সত্যি বলুন-না।

সত্যিই পরোপকার। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। অথচ বড়োলোক যে, তাও আদৌ নয়। একটা বই-এর আর স্টেশনারির দোকান আছে আলিপুরদুয়ার বাজারে কিন্তু সেখানে সে, দিনের মধ্যে দু-ঘণ্টা থাকে কি না সন্দেহ। বাকি সময়টা সত্যিই দশের উপকার করে বেড়ায়। ‘স্বার্থগন্ধ’হীন উপকার। আলিপুরদুয়ার এবং আশপাশে ও হয়তো আজ অবধি শ-খানেক মড়া পুড়িয়েছে, পনেরোটি মেধাবী কিন্তু গরিব ছেলেকে পড়াশুনা শিখিয়ে পায়ে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, জনা কুড়ি দুঃস্থা মেয়ের ভালো বিয়ে দিয়েছে। একমাত্র মিডওয়াইফ-এর কাজটাই করতে পারে না অথবা করতে দেওয়া হয় না সহজবোধ্য কারণে। তা নইলে, ওর মতন সেবাশুশ্রূষা হয়তো সদরের হাসপাতালের কম ট্রেইনড নার্স-ই জানে!

কুড়িটি মেয়ের বিয়ে দিলেন আর নিজের বিয়ে?

তটিনী জিজ্ঞেস করল।

ওই তো! করল কোথায় আর?

কেন? বিয়ে করেন না কেন?

কেন?

বলে, হেসে ফেলে অবনী।

হাসছেন কেন?

তটিনী বলল।

অবনী বলল, সময় তো যায়নি।

তারপরে বলল, আকা রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ আউড়ে ডান হাতটা হাওয়ায় নেড়ে নেড়ে বলে, ‘‘মোর তরে যদি কেউ প্রতীক্ষিয়া থাকে/সেই ধন্য করবে আমাকে।’’

তারপরেই বলে, হে বন্ধু ‘‘আয়’’।

বাক্যটা তো ‘‘হে বন্ধু বিদায়’’।

তা তো জানাই। কিন্তু ও বলে, ‘হে বন্ধু আয়’।

তারপর বলল, কাঙাল তো আমিও। কিন্তু ওর মতন, ‘হোল-হার্টেড হোলসাম বাঙাল’ পাওয়া ভার।

এইকথাতে ওরা সমস্বরে হেসে উঠল।

রিফিউজি হয়ে এসেছিলেন, ওর বাবা-মা ফরিদপুর থেকে। আমার বাবার কাছে গল্প শুনেছি। আমরা পূর্ববঙ্গীয় হলেও আলিপুরদুয়ারে দেশভাগের আগে থেকেই থিতু হয়েছি। আমার বাবা ভারি ভালোবাসতেন আকাকে। বলতেন Gem of ও Boy. যখন আসেন, তখন ও ছিল কিশোরী বয়েসের মায়ের স্বপ্নে আর পুতুল খেলাতে। উনিশ-শো বাষট্টিতে ওর জন্ম। বড়োদাদারা সব অবস্থাপন্ন। কিন্তু আলাদা হয়ে গেছে। একজন গোয়ালপাড়ার গৌরীপুরের প্রফেসর। অন্যজন ধুবড়ির বড়ো কন্ট্রাক্টর। শুধু ওই ছোটো থেকে গেল। ওর বৃদ্ধা মার সব দায়িত্ব ওর-ই। পরোপকার করে আর মায়ের যত্ন করে। মানুষ না-হওয়া আকাই ‘মানুষ’-এর ভূমিকা পালন করে গেল। শুধু করলই না, ও আদর্শ মানুষের দৃষ্টান্তস্বরূপ।

বড়োভায়েরা দেখেন-না? মাকে?

ওই ওপর ওপর।

পড়াশোনা?

আকা স্কুল ফাইনালের পরে আর পড়েনি বটে কিন্তু প্রচুর পড়াশোনা ওর। বন-জঙ্গল খুব ভালোবাসে। আলিপুরদুয়ারের ‘‘নন্দাদেবী ফাউণ্ডেশন’’ আর ‘‘ঋজুদা ফ্যান ক্লাব’’-এর সক্রিয় সদস্য। প্রতিশীতে ভুটানের সীমান্তের পাহাড়ে বাচ্চাদের দল নিয়ে যায়। ও যেহেতু অজাতশত্রু, ওর দোকানের বিক্রি খুব-ই ভালো। ওর সাহায্যকারী, যে-ছেলেটি দোকান দেখে, সে বই আর স্টেশনারি জিনিস বিক্রি করেই হিমসিম খেয়ে যায়। তা ছাড়া প্রায় পঞ্চাশটি পরিবারের মাসের সব স্টেশনারি যায় ওর-ই দোকান থেকে। গৃহিণীরা লিস্ট করে পাঠিয়ে দেন। সাইকেল-ভ্যানে করে ও, বাড়ি বাড়ি আর একটি ছেলেকে দিয়ে তা সাপ্লাই করে ধারে। মাস শেষ হলে টাকা দেন, ওর পাতানো বউদি, মাসিমা, পিসিমা, বোনেরা, দিদিরা।

আকা গর্ব করে বলে, দ্যাখ অবনী, ক্রেডিটে কারবার করি বটে, কিন্তু এক পয়সাও মার যায়নি আজ অবধি।

আমি বলি, তা যাবে কেন? তুই তো প্রায় কস্ট প্রাইসেই দিস সবকিছু, সকল-ই। প্রফিট আর কতটুকুই রাখিস? সস্তাতে হয়, তাই সকলেই নেন।

তাতে কী বলেন উনি?

তটিনী বলল।

বলবে আবার কী? জিভ কেটে বলে, ‘ছি: ছি:। যা বাজার। প্রত্যেকের সংসার চালানোই যে, এক বিষম ব্যাপার। বেশি প্রফিট করে কী করব? আর আমার সংসার তো শুধু আমার এবং আমার মায়ের। আমাদের প্রয়োজনটাই বা কতটুকু?’ কিন্তু ওর ব্যাবসার যা ভল্যুম, তাতে ও ন্যায্য প্রফিট রাখলে এতদিনে গাড়ি কিনতে পারত, দো-তলা পাকাবাড়িও করে ফেলতে পারত সহজেই। তার ওপরে খয়রাতিও তো কিছু কম নয়। সাইকেল চড়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘোরা কিন্তু সবসময়েই পরিষ্কার পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে ঘুরে বেড়ায় যখন, তখন মনে হয়, দেবদূত এল সাদা পক্ষীরাজে চড়ে। এ যুগে ওর মতন, চরিত্র সত্যিই দেখা যায় না।

বা:।

তটিনী বলল, স্বগতোক্তির মতন।

তারপর বলল, এরকম চরিত্র থিয়েটারেই দেখা যায়, বাস্তবেও যে, আছেন তা জানা ছিল না।

কী যে বলো তটিনী! যাত্রা থিয়েটারে সিনেমাতে এখন ভালো বলতে কোন চরিত্রই বা দেখতে পাও? একটাও কি পাও? সমাজের, জীবনের যত কাদা, তাই নিয়েই তো আমাদের মাখামাখি।

সত্যি!

অবনী বলল।

কাদা মাখতে বা তাতে ডুব দিতেও দোষ নেই। যদি কখনো সেই পঙ্কে ‘পঙ্কজ’ও ফুটত দু-একটি!

মৃদুল বলল।

ঠিক!

তটিনী বলল।

এমন সময়ে সিঁড়িতে আবার ‘ধপ ধপ’ শব্দ হল। ঋজু, কালো, প্রায় ছ-ফিট লম্বা আকা উঠে এল দো-তলার বারান্দাতে নীচ থেকে।

ওর পায়ের শব্দ শুনেই ওর সম্বন্ধে আলোচনা বন্ধ করে দিয়েছিল ওরা।

কী বুঝলি?

অবনী বলল।

কী? আকা বলল।

আরে তোর নর্বু তামাং কী বলল?

নর্বু বলল, দেড়টার সময়ে টেবিলে খাবার লাগিয়ে আমাদের খবর দেবে।

মেনু কী?

অবনী বলল।

হেঁটে বেশ খিদে হয়েছে, না? কিন্তু যা ঘেমে গেছি। আমার কিন্তু স্নান করতে হবে।

তটিনী বলল।

তা ছাড়া ফ্রেশ, আন-পলিউটেড পরিবেশ। তার একটা এফেক্ট নেই। আমার কিন্তু বেশ ভালো লেগেছে এই, আলিপুরদুয়ার আর দুধ-ভাত-খাওয়া।

মৃদুল বলল।

তটিনী হেসে উঠল জোরে। বলল, দুধ-ভাত-খাওয়া নয়, রাজা-ভাত-খাওয়া। ভুটানের রাজা আর কুচবিহারের রাজার মধ্যে জোর যুদ্ধ লেগেছিল। কিন্তু সেই যুদ্ধশান্তি হয়েছিল। এখানেই। আর দুই রাজাই একসঙ্গে তাঁবুতে বসে ভাত খেয়েছিলেন বলেই জায়গার নাম হয়ে গেছে রাজাভাতখাওয়া। কুচবিহার তো কাছেই, ভুটানও তাই।

অবনী বলল মৃদুলকে, আপনি তো নড়লেন-ই না বারান্দা ছেড়ে। গেলে, দেখতে পেতেন ‘ওয়াইল্ড লাইফ ইনফরমেশন’ সেন্টারের একটি দেওয়ালে চমৎকার রঙিন ছবি মানে, মানে ফ্রেসকোর আঁকিয়েছেন বিস্ত সাহেব।

বিস্ত সাহেব কে?

উনি ছিলেন, বক্সা টাইগার প্রোজেক্টের ফিল্ড ডিরেক্টর। এখন চলে গেছেন কনসার্ভেটর (হিলস) হয়ে দার্জিলিং-এ। ওঁর সময়েই এই ইনফরমেশন সেন্টারটি তৈরি হয়েছে। বিস্ত সাহেব এবং ‘ঋজুদা ফ্যান’ ক্লাবের তপন সেন ইত্যাদিদেরও খুব ইচ্ছে ছিল কলকাতা থেকে ‘‘জঙ্গলের লেখক’’ বুদ্ধদেব গুহকে এনে ওই সেন্টারটির উদবোধন করানোর কিন্তু তিনি কাজে বম্বে চলে যাওয়াতে এবং উদবোধনের তারিখ আগেই স্থিরীকৃত হয়ে যাওয়াতে বর্ষীয়ান ও শ্রদ্ধেয় সাহিত্যিক, উত্তরবঙ্গের-ইবাসিন্দা অমিয়ভূষণ মজুমদারকে সসম্মানে এনে তাঁকে দিয়েই ওটি উদবোধন করানো হয়।

অবনী বলল।

তাই?

হ্যাঁ।

তা বুদ্ধদেব গুহ জংলি লেখক না, জঙ্গলের লেখক?

তা জানি না। একবার কাগজে পড়েছিলাম মন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ‘জঙ্গলের লেখক’ বলে অভিহিত করেছেন ওঁকে।

জংলিও বলতে পারতেন।

ছাড়ুন তো! বুদ্ধদেব গুহ এমন কেউ নন যে, তাঁকে নিয়ে সকালটা নষ্ট করতে হবে।

আপনি কি কোনো লেখা পড়েছেন ওঁর?

আকা বলল।

না। সাহিত্যিক বিচারে বই যে, পড়তেই হবে তার কি মানে আছে? উনি বুর্জোয়া এবং বুর্জোয়াদের লেখক এইটুকু জানলেই যথেষ্ট।

আঁতেল মৃদুল দু-শো পার্সেন্ট আত্মপ্রত্যয় এবং যুক্তির সঙ্গে বলল।

আকা বলল, বিস্ত সাহেব মানুষটা ফাস কেলাস। বাড়ি দেরাদুনে কিন্তু বাংলা কন এক্কেরে বাঙালির মতো, আর বই-ও যা পড়েন। কী আর কম্যু! বিশেষ কইর‌্যা বন-জঙ্গলের বই-এর, যারে কয় ‘‘পুকা’’ উনি তাই।

‘পুকা’টা কী বস্তু?

মৃদুল বলল।

অবনী হেসে উঠে বলল, পোকা।

তাতে ওরা সকলেই হেসে উঠল।

‘মেনু’টা কী তা তো বলবি।

ছিম্পল-এরই উপর করতাছে। যেমন কয়্যা দিছি।

তা-ও। কী কী বল-না?

অবনী বলল।

এই হলুদ পোলাউ, যারে কয় বাঙালি পোলাউ, একটু মিষ্টি মিষ্টি, শিলবিলাতি আলু ভাজা, নারকোল, ছুটো-ছুটো চৌকো-চৌকো কইর‌্যা কাইট্যা তা ডালের মধ্যে ফ্যালাইয়া ছোলার ডাল। বকফুল ভাজা। তেকাটা মাছের ঝাল। বোরোলি মাছের ঝোল। কচি পাঁঠার মাংস। পুদিনা পাতা, ধইন্যা আর কারিপাতা একসঙ্গে কইর‌্যা বাটতে কইছি, চাটনি হইব। আর তটিনী দেবীর লইগ্যা পুস্ত বাটা। সঙ্গে হাঁসের ডিম সিদ্ধ।

মৃদুল ঠাট্টা করে বলল, মাত্র এই? আর কিছুই বললেন না রাঁধতে?

না:। কইলাম-ই তো! ছিম্পল-এর উপরেই কয়্যা দিছি। রাতে জয়ন্তীতে ভালো কইর‌্যা হইবখন। সেই বাংলার চৌকিদার অজয় ছেত্রী, নর্বুর চাইয়া বয়সেও বড়ো আর ইক্সপিরিয়েন্সডও বটে। ফাস কেলাস ডিনার খাওয়াইম্যু আজ।

বলেই, তটিনীর দিকে ফিরে বলল, আর আপনে দই খাইতে ভালোবাসেন, তাই আপনার লইগ্যা আনছি বাণেশ্বরের দই।

কোথায় পেলি?

অবনী হাসল, অবাক হয়ে।

আরে! লোক পাঠাইয়াছিলাম যে, কুচবিহারে। বাণেশ্বর। ম্যাডাম খাইতে ভালোবাসেন।

আপনাকে কে বলল?

তটিনী বলল।

কী?

যে, আমি দই খেতে ভালোবাসি?

তটিনী আবার বলল।

আমি জানি। আপনেরা যখন ছার্কিট-হাউসে কাল রাতে ডিনার খাইতেছিলেন তখন তো আমিই আড়ালে থাইক্যা সব খাবার-দাবার এক এক কইর‌্যা পাঠাইতেছিলাম আপনাগো। নাইলে বাবুর্চি বাণেশ্বরের দই পাইথ কোত্থনে?

মৃদুল বলল, তার আগে এগুলো কী জিনিস একবার ব্যাখ্যা করে বলুন।

কী জিনিস?

ওই যে বললেন, শিলবিলাতি আলু, তেকাটা মাছের ঝাল, আর বোরোলি মাছের ঝোল? হাঙর তিমিও খাওয়াবেন না তো?

মৃদুল কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল।

অবনী বলল, এইসব-ই ইখানকার স্থানীয়। তেকাটা মাছ বা বোরোলি মাছ, ডিমা, নোনাই কালজানি, রায়ডাক ইত্যাদি নদীতে হয়। ছোটোমাছ, কিন্তু দারুণ স্বাদ। আর শিলবিলাতি আলুও এই অঞ্চলের স্পেশ্যালিটি, হয়ও শুধু বছরের এই সময়টাতেই।

বিশেষত্ব কী?

অবনী বলল, খুব ছোটো ছোটো হয় আলুগুলো। আঁশফলের চেয়েও ছোটো। একেবারে নিটোল গোল। খেতেও ভারি ভালো।

বা:।

আপনাদের এইসব অঞ্চলে, কত যে, অবাক-করা সব ভালো লাগার জিনিস আছে।

শুধুই ভালো লাগার! ভালোবাসার নেই?

তটিনী চুপ করে রইল।

আকা মনে মনে বলল, হায়রে! চোখে কেবল শিলবিলাতি আলু আর বাণেশ্বরের দই-ই পড়ল, চোখের সামনে এই যে, মস্ত এই আকাতরু, প্রায় মহিরুহর-ই মতন, তাকেই চোখে পড়ল না।

তটিনী বলল, খেতে যখন দেরিই আছে অনেক, তখন আমি আর একবার চানটা করেই ফেলি।

অবনী বলল, সে কী? সকালে তো করলেন।

সে তো কাকচান। আপনারা সব তৈরি হয়ে তাড়া লাগালেন। ঘুম থেকেও দেরি করে উঠেছিলাম। কী সুন্দর ঠাণ্ডা ছিল রাতে! আমার তো দুটো কম্বল লেগেছিল। কে বলবে, মার্চের শেষ। কলকাতাতে তো পাখা চলছে সরস্বতী পুজোর পর থেকেই।

কিন্তু মজা দেখেছ? রোদ উঠলেই চারদিক গরম হয়ে গেল।

মৃদুল বলল।

তা ঠিক।

তটিনী বলল।

এখানে থেকে গেলে হত বাকিজীবন।

মৃদুল বলল।

আপনি?

বলে, হাসল তটিনী।

কেন? আমি নই কেন?

বাবা:, আপনার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউস, শনিবারের রেস-এর মাঠ, রবিবারের দুপুরে লেক-ক্লাবের ভডকা-সেশান, আড্ডা। আপনি তো ইনটেলেকচুয়াল। আপনি কি...এসব কথার-ই কথা। আর...

আর কী?

আর তো আমার জানা নেই। যতটুকু জানি, তাই বললাম। আপনি থোড়াই থাকতে পারবেন এমন জায়গাতে। আর কলকাতায় প্রতিমুহূর্তের প্রতিযোগিতা। পিকলু ব্যানার্জি বা বুলু চৌধুরী যেন, জনপ্রিয়তাতে, যশে, বুদ্ধিজীবীদের জগতের নানাপ্রকার ক্ষমতার ক্রিয়াবিক্রিয়াতে আপনাকে ছাড়িয়ে না যায়, তাও তো দেখতে হবে। সব সময়েই পায়ের পাতার ওপরে ভর দিয়ে খাড়া দাঁড়িয়ে থাকতে হবে যে। এই যে, অভ্যেস আপনার। সকাল থেকে সন্ধে এই তো একমাত্র এক্সারসাইজ। আপনি পারবেন এই শান্ত ঘটনাবিহীন জায়গাতে থাকতে? কোন কাগজ আপনার কোন ভূমিকা সম্বন্ধে কী লিখল, তা না জানলে রাতে আপনার ঘুম-ই হবে না। তা ছাড়া, যাতে ভালো লেখা হয় সেজন্যেও তো কলকাঠি নাড়তে হবে, অঢেল মদ খাওয়াতে হবে। মদ-ই তো আপনার তরল অস্ত্র। কত শত্রুকে নিধন করলেন আপনি আজ অবধি তা দিয়ে।

মৃদুলের চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে এল। বলল, তাই? তুমি আজকাল অনেক বুঝছ তো তটিনী। এসব কি অনিমেষের শেখানো কথা?

ভুল মৃদুলবাবু। আমি কারো তোতা নই। কারো শেখানো কথাই আমি বলি না। আমি যেখানে পৌঁছেছি, সেখানে অনেক উঁচুনীচু পথ নিজপায়ে হেঁটে এসেই পৌঁছেছি। কেউ-ই আমাকে সাহায্য করেনি।

মৃদুল বিদ্রূপের গলাতে বলল, তোমার তো তুমি-ই আছ। এক-শোতে এক-শো নম্বর তো সেখানেই। আমার তো...

অবনী কথা ঘুরিয়ে বলল, মৃদুলবাবুর কথা জানি না। তবে অনেকেই টেনশানকে, স্ট্রেসকে, গালাগালি করেন বটে কিন্তু স্ট্রেস এবং টেনশান ছাড়া কি আধুনিক কোনো মানুষ আদৌ বাঁচতে পারে? ‘টেনশান’-ই তো টানটান করে রাখে মানুষকে, আধুনিক মানুষের জীবনকে। এ-কথা অবশ্যই ঠিক যে, প্রতিযোগিতা না থাকলে, সব সময়েই দৌড় না থাকলে, হেরে যাওয়ার, সর্বক্ষণ-ই পিছিয়ে পড়ার আতঙ্ক না থাকলে, মানুষ কী আদৌ এগোতে পারত? জীবনের কোনোক্ষেত্রেই? অমনভাবে বাঁচলে স্থিতপ্রজ্ঞ, সর্বজ্ঞ, নাদুসর্বস্ব বুদ্ধদেব হয়ে যেত।

তুমি কোন বুদ্ধদেবের কথা বলছ?

বুদ্ধদেব আর ক-জন আছেন? যিনি বোধিলাভ করেছিলেন তিনিই তো একমাত্র বুদ্ধ। আদি এবং এক নম্বর।

আজকাল বুদ্ধদেব বললে, একনম্বর বুদ্ধদেবের কথা কারোর-ই মনে পড়ে না। দু-নম্বর বুদ্ধদেবেই দেশ হয়ে গেছে, সরোদিয়া, চিত্র-পরিচালক, মন্ত্রী, লেখক, এমনকী পাঁঠার কারবারিও।

পাঁঠার ব্যাবসাদারের নামও আছে বুদ্ধদেব?

আছে বই-কী। আমাদের আলিপুরদুয়ারে বুদ্ধ মজুমদার নেই?

হ। হ। আছে জলপাইগুড়ির ফ্যামাস রাইটার সমরেশ মজুমদারের কী য্যান, ডিসট্যান্ট রিলেশান হয়।

আকা বলল।

আরে আসলে হয়তো হয় না কিছুই! কোনো মানুষের একটু নাম-টাম হলেই, গুড়ের ব্যবসায়ী, পাঁঠার ব্যবসায়ী সকলেই তার ‘‘আত্মীয়’’ এবং ‘‘গ্রেট ফ্রেণ্ড’’ বলে দাবি করে। অথচ জলপাইগুড়ির মানুষ সমরেশ মজুমদার হয়তো এই আত্মীয়র কথা জীবনেও শোনেননি।

যাক গে। আপনারা দু-নম্বর বুদ্ধদেবদের নিয়ে থাকুন। আমি চানে যাই, গানে যাই-এর মতন?

মানে?

ও, অল ইণ্ডিয়া রেডিয়ো-এর এফ.এম. চ্যানেলের প্রোগ্রাম শোনেন-না বুঝি? ‘‘ভোরাই’’, ‘‘আলাপন’’, ‘‘আজ রাতে?’’

না তো!

সে কী? আজকাল তো সেটাই ক্রেজ।

তাই? শুনতে হবে তো।

শুনলে, তবেই জানতেন। ‘‘গানে যাওয়া’’ বা ‘‘চানে যাওয়া’’ যে, কত্তরকম হয়!

মানে?

সেখানে অনেকেই ন্যাকা পুরুষ ও মহিলার গলা শুনবে, যাদের জন্যে, হয়তো শিগগিরি বাংলা ভাষাটিই বিনা কারণে বিকৃত হয়ে যাবে। ন্যাকা মহিলা তাও সহ্য হয়, ন্যাকা পুরুষ দেখলে আমার গা বমি-বমি করে। এঁদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যেক শব্দের শেষ অক্ষরটিকে নিয়ে রাবারের বেলুনের মতন টানটানি করে, টেনে লম্বা করে ফুলিয়ে যাচ্ছেতাই করে দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন এমন চললে তাদের-ই মতন শ্রোতারাও অনবধানে বিকৃত হয়ে যাবে।

অবনী বলল, কত দিকের কত বিকৃতি আর রোধ করবেন আপনি মৃদুলবাবু? ‘বিকৃতি’ই তো এখন জীবনের সমার্থক হয়ে গেছে।

মৃদুল একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তা ঠিক।

তারপর-ই বলল, একটা ইন্টারেস্টিং খবর দেখেছেন অবনীবাবু?

কোথায়?

THE STATESMAN-এ

না:। আমি কোনো খবরের কাগজ পড়ি না।

কেন?

অকারণ সময় নষ্ট হয় বলে, তাই। টিভি-ও দেখি না। শুনে হয়তো অবাক হবেন আপনি, আজকালকার খবরের কাগজের ইণ্ডাস্ট্রি, পুরোপুরিই বিবেক এবং কর্তব্যজ্ঞানরহিত। দেশ ও দশের প্রকৃত ভালো নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্রই মাথাব্যথা নেই। পাটের অথবা গুড়ের অথবা নরকঙ্কালের ব্যাবসা ছেড়ে তাঁরা দয়া করে খবরের কাগজ যে, কেন করতে এলেন ভেবে পাই না। পয়সা ছাড়া তাঁরা আর কিছুই বোঝেন না।

আর যা বোঝেন, তা হল বাঁদরকে শিব বানানো আর শিবকে বাঁদর।

যাত্রার বিজ্ঞাপন দেখতে, পাত্র-পাত্রীর বিজ্ঞাপন দেখতে যাঁরা কাগজ পড়েন তাঁরা পড়ুন। আমার বিন্দুমাত্রও দরকার নেই।

চেয়ার পেছনে সরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে তটিনী বলল, অবনীবাবু, আপনি মানুষটি কিন্তু ওরিজিনাল। দশজনের মতো নন।

মানে, প্রোটোটাইপ নন আর কী!

মৃদুল বলল।

অনেক ভাবনা-চিন্তা করেন, বাছবিচারও। খুব-ই ভালো।

বাছবিচার না করলে আপনাকে এবং অবশ্য মৃদুলবাবুকেও খুঁজে-পেতে আমাদের আলিপুরদুয়ারে নিয়ে আসব কেন কলকাতা থেকে? যাত্রার কোম্পানি অথবা নটনটীর কী অভাব ছিল?

হ। এটা তুই ঠিক-ই কইছস।

আমি তাহলে যাই। আপনারা তো সকলে-ই সকালেই স্নান সেরে নিয়েছেন। আবারও করবেন না কেউই নিশ্চয়ই।

না। যাও তটিনী। তুমি তটিনী! কোথায় তুমি অন্যকে চান করাবে না, নিজে চললে চান করতে।

উত্তর না দিয়ে তটিনী ওর ঘরে গিয়ে দুয়ার দিল ভেতর থেকে। স্নানঘরটি বেডরুমের সঙ্গে লাগোয়া। সকালেই চানঘরটা খুব-ই পছন্দ হয়েছে ওর। ঘেমেও গেছে খুব-ই। খুব ভালো করে চান করবে। চানঘর পছন্দ না হলে, চান করতে ইচ্ছেও হয় না ওর। গান গাইতেও নয়।

তিন

এই একটা জায়গা, যেখানে প্রত্যেক মানুষ-ই, কী স্ত্রী, কী পুরুষ, স্বচ্ছন্দ, সৎ অশুভ এবং ঢিলেঢালা। এই চানঘর। এখানে কারোর-ই কোনো মুখোশ থাকে না। যে-মুখখানি মাকে দেখানো যায়, মুখোশহীন মুখ, আর দেখানো যায় শুধুমাত্র চানঘরের আয়নাকেই।

একে একে জামা-কাপড় সব খুলে ফেলল তটিনী। তারপর দাঁড়াল আয়নার সামনে। তার প্রিয় শরীরের ছায়া ফেলে। ও কালো হলে কী হয়, ওর ফিগারটা যে, এত সুন্দর তা শুধু নিজেকে পুরোপুরি নিরাবরণ করলেই ও বুঝতে পারে। আর বুঝতে পারে পুরুষমানুষের চোখের আয়নাতে। কিন্তু পুরুষদের চোখের আয়নাতে যে, শুধুই ‘স্তুতি’ থাকে না, এই মুশকিল!

নিরাবরণ কিন্তু ও নিরাভরণ নয়। দু-কানে দু-টি রুবির দুল। মস্ত বড়োজুয়েলার গেঁদু সেন দিয়েছে ওকে। ম্যাচ করা রুবির হারও আছে। দু-হাতে রুবির বালা। শুধু দুলজোড়াই নিয়ে এসেছে। অভিনয়ের সময়ে তো ইমিটেশন জুয়েলারিই পরতে হয়। সবসুদ্ধু লাখ তিনেক টাকা দাম হবে কম করে পুরো সেটটির।

গেঁদুবাবু বলেন, আহা! তোমার ফিঙের মতো কালো শরীরে এই রুবির বেদানাদানার গয়নাগুলোযে, কী জেল্লাই দিয়েছে! যেন, পলাশ ফুটেছে কালো গাছ আলো করে।

কিন্তু মুখে কাব্যি করলে কী হয়! মানুষটা বড়োই জংলি। কোন পুরুষ যে, আসলে কোন ‘প্রজাতি’র তা বোঝা যায় যখন সে, নগ্ন হয়ে বিছানাতে ওঠে শুধুমাত্র তখন। কচুবনের শুয়োরের মতন ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে গেঁদুবাবু তার শরীরে। নরম, নিভৃত, আদ্র শরীরী মাটি ছিটকোয় শক্ত খুরের আঘাতে আঘাতে। শুয়োরের-ই মতন গেঁদু তার দাঁত দিয়ে তটিনীর নবনী-শরীর যেন, চিরে চিরে দেয়।

শরীরী আদরও একটা মস্ত বড়োআর্ট। পনেরো বছর বয়স থেকে অনেক পুরুষকে আদর করে আর অনেক পুরুষের আদর খেয়ে এই ভর তিরিশে পৌঁছে এসবের পুঙ্খানুপুঙ্খ জেনেছে তটিনী।

চালকলের মালিক, সেই মোটা, বেঁটে, কালো, মুখে বসন্তের দাগঅলা পানখাওয়া বাবুটি, যিনি তার বাবার চেয়েও বড়ো ছিলেন বয়েসে, ধুতি আর পাঞ্জাবি পরতেন, সেই মানুষটিই কিন্তু তাকে যা-কিছু শেখাবার সব শিখিয়েছিলেন। সব শরীরী ইতিবৃত্ত। মনের-ই মতন, শরীরের মধ্যেও কম জটিলতা নেই। নারী-বিলাসী ছিলেন কিন্তু ভেতরে বড়োনরম, বুঝদার। কী সুন্দর করে কথা কইতেন তিনি, হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন কী করলে ওঁর নিজের ভালোলাগা বাড়বে আর কী করলে তটিনীরও। পুরুষের আর নারীর শরীরের আলোছায়ার অলিগলিতে, খানা-কন্দরে, পাহাড়চুড়োয়, উপত্যকায় যে, কত অগণ্য সুইচ আছে, যেখানে আঙুল ছোঁয়ালেই এক একটি পাঁচ-শো পাওয়ারের বালব দপ দপ করে জ্বলে ওঠে, কত কঠিন হিমবাহ অবলীলায় গলে যেতে থাকে নারী শরীরের অভ্যন্তরে, তা উনি না শেখালে, তটিনী কি কখনো জানত? মাস্টার রেখে গান ও নাচও তো প্রথমে উনিই শেখান তাকে। উনিই নামও রাখেন ‘তটিনী’। ওর আসল নাম তো ছিল মান্তুই। ডাকনাম যদিও। ভালো নাম ছিল ফুল্ললোচনী। ওই নামের-ই জন্যে পোস্ট অফিসে ফাই-ফরমাশ খাটা মান্তুকে দেখেই ফ্ল্যাশব্যাকে ওর পুরোনো দিনে ফিরে গেছিল তটিনী। কিন্তু সে-নামে পরবর্তী জীবনে কেউই ডাকেনি ওকে। মা-মরা, মাতাল বাবার পরম অবহেলার মেয়েকে বাবা এবং অন্য সকলেও যে, মান্তু বলেই ডাকত।

ওই প্রাণ খাঁ-ই মান্তুর, থুড়ি, তটিনীর প্রকৃত শিক্ষাদাতা বাবা ছিলেন। যদিও সেই মানুষটার সঙ্গে তার শরীরী সম্পর্কও ছিল। সে তাঁর রাখস্তি ছিল কিন্তু একটি দিনও জোর করেননি তার ওপরে প্রাণবাবু। না শরীরের ওপরে, না মনের ওপরে।

তটিনীর শোয়ার ঘরে ছাগলের দুধ খেয়ে এবং চরকা কেটে অথবা অক্সোনিয়ান ইংরেজিতে বক্তৃতা করে ভারত স্বাধীন করা গান্ধিজির বা জওহরলাল নেহরুর কোনো ফটো নেই। একটি মা-কালীর আর অন্যটি প্রাণ খাঁর। গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি আর চুনোট ধুতি পরা। পাঞ্জাবিতে হিরের বোতাম। রিমলেস চশমা। তাতে হালকা গোলাপি আভা। হাতের কবজিতে রোলেক্স ঘড়ি, সোনার। বুকভরা কাঁচা পাকা চুল। পাকানো ছুঁচোলো গোঁফ। মাথাতে ব্যাকব্রাশ-করা চুল। ব্রাইলক্রিমে চকচকে।

সেই এক বহিরঙ্গ মূর্তি। আর তার কুৎসিত নিরাবরণ মুর্তিটার কথা ভাবলে আজও গা ঘিন ঘিন করে। অধিকাংশ সময়েই চোখ দু-টি বন্ধই করে রাখত তটিনী। প্রাণ খাঁ বলতেন, থাক থাক। চোখ বন্ধই থাক। শরীরের ও চোখ ছাড়াও অন্য হাজারো চোখ আছে। তোর সব চোখ আমি একে একে খুলতে শেখাব দেখিস। সব মেয়েই অক্টোপাস!

শিখিয়েওছিলেন।

পরে পরে চোখ দুটো খুলে থাকলেও কুরূপ মানুষটাকে দেখতেই পেত না। সেই অপার অন্ধকারেই মানুষটার শরীর অগণ্য ফুল ফোটাত ওর শরীরে। কখনো কিছু হুলও ফোটাত। গান গাইত তটিনীর শরীরে।

‘বুঁ-উ-উ-উ-উ’ শব্দ করে একটা বোলতা নগ্না তটিনীকে চমকে দিয়ে উড়ে এল। মনে হল, যেন, ওর বুকেই কামড়াবে।

চিৎকার করে উঠেছিল ও একটু হলেই। করলে, সিন ক্রিয়েটেড হত। বাইরের দরজাতে ধাক্কা পড়ত। ওর শান্তি বিঘ্নিত হত।

বোলতাটা পরমুহূর্তেই ঘুরে অন্য দিকে চলে গেল। ভাগ্যিস!

তটিনী নজর করে দেখল, কমোডটা যেদিকে তার পাশের-ই কাঠের দেওয়ালে একটা ফুটো। জানলার পর্দার ওপর দিয়ে দেখল, একটি মস্ত কাঁঠাল গাছ, অসংখ্য এঁচড় এসেছে, সে-গাছে আর সেই গাছেই একটি মস্ত মধুর চাক। এই গাছ থেকেই বোধ হয় আকাতরুবাবু এঁচড়ের বন্দোবস্ত করবেন। চানঘরের মধ্যে ওই ফুটো দিয়ে তারা ঢোকে আর বেরোয়। সকালে লক্ষ করেনি যে, পেছনের দেওয়ালে লাইন দিয়ে বোলতা পিল পিল করছে।

ও সাবধানে ডান দিকের জানলাটা খুলে দিল হাঁটু গেড়ে বসে। মেয়েদের এই অসুবিধে। ছেলেদের ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো লজ্জাস্থান নেই। সে পুরুষ হলে দাঁড়িয়েই জানলাটা খুলতে পারত। জানলার পর্দার আড়ালে তার নিম্নাঙ্গ।

জানলাটা খুলতেই দেখল, পাশ দিয়ে একটি পাহাড়ি ঝোরা বয়ে গেছে পাথরে পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে। আর অন্য পারে, রাজাভাতখাওয়ার ডরমেটরিটা যেদিকে, তার পেছন দিকে একটি দো-তলাবাংলো। অনেকগুলি নেপালি পরিবার অথবা একটি যৌথ পরিবার সেখানে থাকে। ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা খেলছে। তাদের চিকন চিৎকারে এই নির্জনের বিলম্বিত সকাল চমকে চমকে উঠছে। লাল-নীল-হলুদ নানা রঙের ব্লাউজ আর শাড়ি পরা নেপালি মেয়েরা কেউ চুল আঁচড়াচ্ছে। কেউ চুল আঁচড়ে দিচ্ছে কারো। কেউ-বা রঙিন উলের লাছি নিয়ে বসে সোয়েটার বা গরম ব্লাউজ বুনছে আর সকলেই নীচুস্বরে নিজেদের মধ্যে গল্প করছে।

বাংলোটার পেছনে একটা মস্তবড়ো গাছ। কী গাছ, কে জানে? আকাতরু কি?

আকাতরু! গাছের নাম আকাতরু। আশ্চর্য মানুষের নাম আকাতরু। গাছটা কী গাছ, আকাবাবু এখানে থাকলে হয়তো বলতে পারতেন। ভাবনাটা ভেবেই ওর শরীর শিউরে উঠল। ভয়ে কি?

না, ঠিক ভয়ে নয়, এক মিশ্র অনুভূতিতে।

ওই জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে তটিনীর মন বড়োউদাস হয়ে গেল। উদাস হয়ে গেল নানা মিশ্র কারণে। প্রাণবাবুর একটা কটেজ ছিল কালিম্পং-এ। গরমের সময়ে তটিনীকে নিয়ে প্রতিবছর-ই তিনি দিন পনেরোর জন্য যেতেন সেখানে। সেই কটেজটিতে প্রাণবাবুর শোয়ার ঘরের লাগোয়া যে-চানঘরটি ছিল সেই চানঘরের জানলা দিয়ে এইরকম একটি জোরা নেপালিদের বাড়ি দেখা যেত।

প্রাণবাবু প্রতিদিন ওকে, নিজে হাতে রান্না করে খাওয়াতেন। রান্না শেখাতেন। কালিম্পং-এর সেই কটেজে সময় পেতেন তো অনেকেই। কলকাতাতে তো বড়োজোর ঘণ্টাখানেক থাকতে পারতেন। খাওয়াদাওয়া, গান শোনা, বই পড়া, তারপর বিকেলে তটিনীকে নিজে হাতে সাজিয়ে-গুজিয়ে নিয়ে কালিম্পং-এর হেলিপ্যাডের দিকে হাঁটতে বেরোতেন প্রত্যেক দিন।

যদি কেউ দেখে ফেলে?

ভয়ে ভয়ে, তটিনী বলত, প্রথম প্রথম।

দেখলেই-বা। আমি তো কারো মেয়ে-বউ ভাগিয়ে আনিনি। তোকে তো আমি ফুটিয়েছি কুঁড়ির-ই মতন। প্রাণ খাঁ বাঘ। তাকে পেছন থেকে, আড়াল থেকে অনেকেই ‘ফেউ’ অনেক কিছু বলবে হয়তো কিন্তু সামনে এসে দাঁড়াবার সাহস কারোর-ই নেই।

কলকাতায় পুরোদস্তুর বাঙালি প্রাণবাবু কালিম্পং-এ গেলেই সাহেব হয়ে যেতেন। থ্রি-পিস স্যুট পরতেন, বাড়িতে গরম ড্রেসিং গাউন, মুখে পাইপ, গর্ডর্নস জিন আর রাতে হালকা সবুজ চারকোণা বোতলের Ancestor স্কচ হুইস্কি খেতেন। তটিনীকে ভদকা আর টোম্যাটো জুস দিয়ে ‘‘ব্লাডি মেরি’’ বানিয়ে দিতেন যত্ন করে নিজে হাতে। ডিনারের পরে যখন দু-জনে শীতের মধ্যে লেপের তলায় যেতেন তখন, স্বর্গ নামত পৃথিবীতে। মানুষটা জীবনকে কী করে ভালোবাসতে হয়, টাকা কী করে খরচা করতে হয়, তা জানতেন।

খেতে এবং খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন মানুষটা। খাদ্য, পানীয়, শরীর এবং মন এই চার নিয়েই ছিল তাঁর জীবন। জীবন যে, ভোগ করার-ই জিনিস, হা-হুতাশ করে বেদনা-বিলাস নিয়ে কাটিয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে চিতাতে গিয়ে ওঠার জন্য নয়, তা প্রাণবাবু বিশ্বাস করতেন এবং সকলকে বিশ্বাস করতে বলতেনও।

নামহীন, যশহীন ছোট্টপরিধির মধ্যে তৃপ্ত সদা হাসিখুশি মানুষটি মারাও গেলেন অমনি হঠাৎ-ই। যেমনটি চেয়েছিলেন। কাজ করতে করতেই।

তাঁর চালকলের বিরাট বিরাট বয়লারগুলো আর চাল সেদ্ধ করার ভ্যাটগুলোর সামনেই একদিন সকালে জলখাবার খাওয়ার পরে হার্ট ফেল করে পড়ে মারা গেলেন। তটিনী, কলের একজন কর্মচারীর মুখেই শুনেছিল।

প্রাণবাবু ওকে বলেছিলেন, দেখ তটিনী, তোর আমার সম্পর্ক কিন্তু শুধুমাত্র জীবনের-ই। মরণের পরে আমার আর কোনোই দাবি রইবে না তোর ওপরে। আমি মরে গেলে তুই আমার কেউ নোস। তুই তখন যা-খুশি করিস। পাছে তোকে কেউ অপমান করে বা বঞ্চিত করে তাই আমার জীবদ্দশাতেই তো তোকে সবকিছু করে দিয়ে গেলাম। মরে গেলে তোর জীবনে আমি শুধু একটা ফটোই হয়ে যাব। তাই এই ফটোটা তোকে দিয়ে গেলাম। তোকে নাচ-গান, অভিনয়, পড়াশোনা শিখিয়ে দিয়ে গেলাম তটিনী। সুখেই তোর দিন চলে যাবে। তোর ঘরের জোড়াখাটে শুয়ে যখন, তুই অন্য পুরুষের সঙ্গে সোহাগ করবি, তাকে ভালোবাসবি, তখন আমার এই ফটোটা ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রাখিস। নইলে তোর আনন্দে হয়তো কাঁটা বিঁধবে। আমারও হয়তো খারাপ লাগবে। মরার পরে কি সে বোধ বেঁচে থাকবে? কে জানে!’

গায়ে সাবান মাখতে মাখতে ভাবছিল তটিনী, কত গভীরভাবে ভাবতেন প্রাণবাবু ওর কথা, ওর ভবিষ্যতের কথা। অমন করে বোধ হয়, খুব কম স্বামীও ভাবেন তাঁদের স্ত্রীদের জন্যে।

তাকে প্রাণবাবু তাঁর বিবাহিত স্ত্রীর সমান মর্যাদাই দিয়েছিলেন।

তটিনীর খুব-ই ঔৎসুক্য ছিল, প্রাণবাবুর স্ত্রী কেমন তা জানতে। একদিন প্রাণবাবু নিজেই স্বগতোক্তির মতন বলেছিলেন, জানিস তটিনী, আমার গিন্নী ভারি ভালো মানুষ। রূপও তার অঢেল। গুণের শেষ নেই। আমাকে খুব ভালোওবাসে।

তবে? আপনি আমাকে...

ওসব তুই বুঝবি না। এক এক জন মেয়ে, এক এক রকম। ভগবান পুরুষকে অমনি অতৃপ্ত করেই গড়েছেন। ক্ষতিই বা কী? আমি তো তাকে কোনোদিক দিয়েই ঠকাইনি। সত্যিই তো ভালোবাসি। তোকেও ঠকাইনি।

তবু....

তটিনী বলেছিল।

ও তুই বুঝবি না। তোর নিজের যখন একের বেশি নাগর হবে, সেদিন হয়তো বুঝবি। হয়তো নাও বুঝতে পারিস। মেয়েরা অন্যরকম। এসব-ই ভগবানের ‘লীলাখেলা’। আমাদের বোঝাবুঝির বাইরে।

তটিনীও অবশ্য কোনোদিনও অসতী হয়নি। যতদিন প্রাণবাবু তাকে রেখেছিলেন ততদিনে শত প্রলোভনেও সে, নিজেকে উড়িয়ে দেয়নি অন্য দিকে।

একবার প্রাণবাবুর বড়োজামাই ওর কাছে এসেছিল, এক বর্ষার দুপুরে, প্রচুর মদ গিলে, বেহেড মাতাল হয়ে। একটি চকোলেট-রঙা ব্যুইক গাড়ি চড়ে। শুনেছিল, সেটা প্রাণবাবুর-ই দেওয়া। নাদুসনুদুস। নানারকম বীজ-এর মস্তবড়ো ব্যাবসাদার জামাই।

ফ্রিজ থেকে রসগোল্লা বের করে আর লেমন স্কোয়াশ দিয়ে শরবত করে খাইয়ে তটিনী বলেছিল, ‘শুনুন জামাইবাবু, বাড়ির উলটোদিকের রক-এ কিন্তু একজন গুণ্ডা সবসময়েই বসে থাকে। তার কোমরে রিভলবার বাঁধা। আপনার শ্বশুরমশায়ের নির্দেশে। চোখের ইশারা করলেই আপনাকে খতম করে দেবে। কখনো আর এমুখো হবেন না। আপনার শ্বশুরমশাই-এর চরিত্রর নরম দিকটা দেখেছেন আপনি, কঠিন দিক দেখেননি। আপনার ভালোর জন্যই একথা বলছি। মানুষটার মধ্যে অনেকগুলো মানুষ আছে’।

কতক্ষণ যে, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এমন, আবোল-তাবোল ভাবছিল তা বলার নয়।

অটোম্যাটিক গিজারে গরম জল ছিলই। অনেকক্ষণ ধরে ভালো করে চান করে তোয়ালে দিয়ে সারাশরীর মুছতে মুছতে আবার ও ওর শরীরের দিকে তাকাল।

শরীর, সব শরীর-ই ভারি সুন্দর। এবং ভারি নোংরাও। গাছের পাতারা এলোমেলো হাওয়াতে যখন আন্দোলিত হয়, যখন উলটে যায়, যখন তাদের পেটের দিকটা দেখা যায়, তখন পিঠের রং যাইহোক-না কেন। মানুষের শরীরেও যেখানে রোদ পড়ে না, তলপেট, ঊরু, জঘন, বুক, মেয়েদের নাভির ওপর থেকে বুকের নীচ অবধি পেটের অনাবৃত অংশটুকু ছাড়া আর ফিঙের মতন কালো শরীরকেও পাতিকাকের গলার-ই মতন মসৃণ, ছাই-রঙা দেখায়। সে রূপ, ফর্সা যারা, তাদের চেয়েও ভালো। যারা দেখেছে তারাই জানে।

পাতাদের ভেতরদিকের রং যে, অন্যরকম হয় তা কি জানে আকাতরুও?

এই লম্বা-চওড়া, পেটা, রোদ-জলে তামাটে হওয়া শরীরে, শিশুর মতন মনের এই যুবক, তটিনীর মনে ভারি একটি শিহরন তুলেছে। খরগোশ বা ছাগলছানাকে নিয়ে খেলতে যেমন ভালো লাগে, আকাতরুর সঙ্গও যেন, তার মনকে তেমন-ই নিষ্পাপ, স্বর্গীয় ভালোলাগায় ভরিয়ে দিয়েছে। দিচ্ছে।

শরীরও যেন, মেঘলা আকাশ হয়ে গেছে। পরতের পর পরত মেঘের আড়ালে যেন, ‘গুরুগুরু’ধ্বনি শুনতে পাচ্ছে। হয়তো বৃষ্টি নামবে। তবে কখন? কোথায়? কবে? তা ও জানে না। নাও নামতে পারে। কিন্তু নামতে যে, পারে, এই ভাবনাটুকুর মধ্যেও ভারি শিহরন আছে একটি।

আকাতরুর দৃষ্টিতে কোনো পাপ নেই। কিন্তু মৃদুলের দৃষ্টিতে আছে। অবনীর দৃষ্টিতে পাপও নেই, পুণ্যও নেই।

মৃদুলের চোখ তো নয়, যেন এক্স-রে মেশিন। ওর সামনে গেলেই তটিনীর মনে হয় যে, ও বিবস্ত্র হয়ে গেল। অধিকাংশ পুরুষ-ই ওইরকম। তারা মেয়েদের শরীর ছাড়া অন্য কিছুই দেখে না। মেয়েরাও যে, সমান সমান মানুষ, বুদ্ধিতে, শিক্ষাতে, রুচিতে, তাদের মনও পুরুষের মনের চেয়ে কোনোদিক দিয়ে, কোনো অংশেই যে, কম নয়, এই সরল সত্যটি অধিকাংশ পুরুষ-ই বোঝে না। পুরুষেরা প্রেম বোঝে না, কাম বোঝে। এমনকী, আশ্চর্য, তারা মোহ পর্যন্ত বোঝে না।

সেই কারণেই, এই সোজা, সরল, উদার, ভালো, কাঠ-বাঙাল আকাতরুকে এতভালো লেগেছে তটিনীর। আর আকাতরুও প্রাণে বাঁচলে হয়! তার যে, কী অবস্থা তা, তটিনী ভালো করেই বুঝতে পারছে এবং পারছে বলেই, তার কষ্টটাকে আরও গভীর করে তুলে নিজের আনন্দকে দীপ্যমান করছে।

এও কি এক ধরনের স্যাডিজম?

কে জানে! মনস্তাত্ত্বিকেরাই বলতে পারবেন।

ভাবল, তটিনী।

মৃদুলের মতন শিক্ষিত পুরুষেরা আপাদমস্তক ভন্ড, মিথ্যাচারী, পাজি। মৃদুল বিয়ে করেছে প্রমাকে। লিটন থিয়েটারের একটি দলে অভিনয় করে প্রমা। যেমন দেখতে মিষ্টি, তেমন-ই ভালো মেয়ে। তটিনীর মতন নয়। ভালো ঘরের। সচ্চরিত্র। মৃদুলের চেয়ে বয়সে অনেক-ই ছোটো। প্রায় শিশুবধ-ই করেছে বলতে গেলে। প্রমা, মৃদুলের কন্ঠস্বর, তার বুদ্ধি, তার ইংরেজি উচ্চারণ নিয়ে দারুণ গর্বিত। আবৃত্তিও ভালো করে মৃদুল। আজকাল যেমন, অনেক আবৃত্তিকারেরাই জুটি বেঁধে নানা জায়গাতে আবৃত্তি, পাঠ, শ্রুতি-নাটক, এসবে প্রায় রোজই অংশ নেন এবং কিছু উপরি রোজগারও করেন, ওরা দু-জনেও তা করতে শুরু করেছে। নাটক করে মিডিয়ার নজর যেটুকু কাড়া যায়, এইসব করে কাড়া যায়, তার চেয়ে অনেক-ই বেশি, পৌনঃপুনিক প্রচারও হয়, এইসব যদি মিডিয়ার সুনজরে থাকে।

কিন্তু প্রমা জানে না যে, মৃদুলের শিক্ষা আর সব গুণ সত্ত্বেও সে, একজন বাজে স্বামী। অসৎ। নীতিহীন। সে প্রমাকে ভালোওবাসে না। এক পার্টির একজন মাঝারি শ্রেণির নেতা প্রমার মামা হন, বলেই হয়তো প্রমাকে বিয়ে করেছে ও। সেই নেতা এবারের নির্বাচনে হেরে গেলেই প্রমাকে ছেড়ে দিতে পারে মৃদুল। তার নিজের কেরিয়ারের জন্যে সে, সবকিছুই করতে পারে।

কাব্য-সাহিত্য-সংগীত-আবৃত্তির জগতের এইসব মানুষের চেহারার ভন্ড বদমাশদের তটিনীর মতন ভালো কেউই চেনেনি হয়তো। এই প্রেক্ষিতে তার প্রথম ‘‘বাবু’’ চালকলের মালিক প্রাণবাবু আর আকাতরু তার চোখে দুই আলাদা মেরুর মানুষ হয়েও অনেক-ই শ্রেয়, এইসব এঁটো-কুড়োনো, পাত-চাটা, শুধুমাত্র পচাগলা বাতিল মাংস ছিঁড়ে-খাওয়া শকুনদের চেয়ে। এদের কন্ঠস্বর কৃত্রিম, উচ্চারণ বিকৃত, এরা চরম অসৎ।

‘সৎ’ শব্দটায় শুধু অর্থনৈতিক সততাই বোঝায় না। যদিও এই হা-ভাতেদের দেশে অর্থনীতিই সবচেয়ে মান্য বিষয়। শুধু অর্থনৈতিক সততাই নয়, কোনোরকমের সততাই নেই এদের। অথচ এদের সঙ্গেই তটিনীর ওঠা-বসা। এইসব আঁতেলদের চেয়ে প্রাণবাবু, গেঁদুবাবুরা অনেক-ই ভালো। তাঁরা ভন্ড নন অন্তত। অনেক দিয়ে, সোজাসুজি বদলে কিছু চান। তাঁরা ব্যাবসাদার। তাঁদের বাণিজ্যের রকমটা তবু বোঝা যায়। এরা সত্যিই চিজ এক একটি। অথচ পেশাদার যাত্রা করার বা নাটক করার কারণে, মৃদুলের মতন মানুষদের সঙ্গেই তটিনীর দিনরাতের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়। যাত্রাতে যে আজকাল অনেক-ই পয়সা। এই বছরে ওর চুক্তি পাঁচ লাখের। পঁচিশ চেক-এ দেবে প্রডিউসার। আর চার লাখ পঁচাত্তর ক্যাশ-এ। প্রডিউসার সরকারি ঠিকাদার। যাদের বানানো রাজপথ প্রথম বর্ষাতেই ধুয়ে যায় তাদের পক্ষে চেক-এ বেশি দেওয়া মুশকিল তো। তটিনীদেরও সুবিধে। মিথ্যে বলবে না।

সরকারকে ট্যাক্স দেবেই বা কেন? কী দেয় সরকার বদলে? চোখরাঙানি ছাড়া?

চার

খেতে করতে সেই তিনটেই হয়েছিল। তবে খাওয়াদাওয়ার পরে বিশ্রাম আর নেওয়া হয়নি। রাজভাতখাওয়া থেকে জয়ন্তীর পথ অবশ্য খুব একটা বেশি নয়। কল্যাণ দাস, অ্যাডিশনাল ডি. এফ. ও. ওয়্যারলেস টেলিফোনে খবর পাঠিয়েছিলেন যেন, ওয়াচ-টাওয়ারটা ঘুরিয়ে নিয়ে যায় ওদের। কল্যাণ দাস-এর হেডকোয়ার্টার্স আলিপুরদুয়ারে। জিপ নিয়ে প্রায় রোজ-ই তাঁকে আসতে হয় নানা জায়গাতে। সান্ত্রাবাড়ি, ভুটানঘাট, কোনোদিন সাংহাই রোডের মধ্যে দিয়ে বন দেখতে যেতে হয় কলকাতা থেকে ওপরওয়ালারা এলে অথবা ফিল্ড-ডিরেক্টর নিজে এলে। কখনো বা হাতির দলের গতিবিধির ওপর নজর রাখার জন্যে তাদের দলের কোনো হাতিকে রেডিয়ো-অ্যাকটিভ কলার পরানোর জন্যে ঘুমপাড়ানি গুলি ছুড়ে বেহুঁশ করে তারপর সেই কলার পরানো হয়। তখন অবশ্য কলকাতা থেকে সুব্রত পালচৌধুরী আসেন। টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট। তা ছাড়া, অবনী বলেছিলেন, ‘কল্যাণ দাসের ওপরওয়ালাও তো কম নয়। এখন কনসার্ভেটরের তো ছড়াছড়ি’। ওয়াইল্ড লাইভ-এর কনসার্ভেটর শ্রী অতনু রাহা। সিলভিকালচারের কনসার্ভেটর সুব্রত পালিত। তাঁদের ওপরে আছেন চিফ কনসার্ভেটর। তবে ওঁদের নাকি খুব-ই দুঃখ যে, ফরেস্ট সেক্রেটারি কল্যাণ বিশ্বাস একবারও বক্সা টাইগার প্রোজেক্টে আসেননি। এলে, এখানের সকলেই খুব খুশি হতেন, নিজেদের অভাব অভিযোগের কথা বলতে পারতেন।

তটিনী গাড়ির সামনে বসেছে একা ড্রাইভারের পাশে। মারুতি ভ্যান একটি, লাল রঙা। পেছনে ওরা তিনজন। আকাতরু, অবনী আর মৃদুল। মৃদুল ঘন ঘন সিগারেট খায় বলে, জানলার পাশে বসেছে।

এখন ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলেছে গাড়িটা। আলোছায়ার শতরঞ্জি বিছানো আছে পথে। দু-পাশে মাথা উঁচু সব প্রাচীন মহিরুহ।

অবনী বলল, কি রে আকা! ঘুমিয়ে পড়লি নাকি? তোকে বললাম, অত খাস না! তুই ঘুমিয়ে পড়লে তটিনী দেবী আর মৃদুলবাবুকে এইসব গাছগাছালি চেনাবে কে? তুই মানুষ নোস, বনমানুষ। সেইজন্যেই তো তোকে সঙ্গে আনা।

তটিনী বাঁ-হাতটা খোলা জানলার ওপরে রেখে বসেছিল। মাথায় পনিটেইল করেছে। লো-কাট একটা হালকা বাদামি রঙা ব্লাউজ। ঘাড়ের কাছে সাদা লেস-এর কাজ। তাতে যেন, তটিনীর গ্রীবাকে মরালীর গ্রীবার মতন দেখাচ্ছিল।

তটিনী মুখটা পেছনে ঘুরিয়ে অবনীর কথার প্রতিবাদ করে বলল, উনি ‘ভালোমানুষ’ বলে আপনার ওর পেছনে, অমন করে লাগাটা উচিত নয় অবনীবাবু।

অবনী বলল, ‘বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’। বনে এসেছি বলেই তো বনমানুষকে এত ইম্পর্ট্যান্স দিচ্ছি। কিছুদিন আগে আমার চেয়েও বড়ো বনমানুষ এখানে এসেছিলেন। সব ঘুরে ফিরে দেখে গেলেন। বলেছেন ফিরে গিয়ে এখানকার কথা লিখবেন।

কে?

লেখকদের মধ্যে তো লেজবিশিষ্ট একজন-ই আছেন। বনমানুষ।

ও। বুঝেছি।

তটিনী বলল।

তাঁকে আমিও দেখেছি। ‘নন্দাদেবী ফাউণ্ডেশন’-এ এসেছিলেন। চেহারা দেখলে মনে হয় না, কোনোদিন বনে-জঙ্গলে ঘুরেছিলেন বলে।

তটিনী বলল, বয়স হলে তারপর শহরে দিনের পর দিন থাকলে মানুষের চেহারা তো বদলে যেতেই পারে। তা বলে তাঁর অতীতটা তো আর মুছে ফেলা যায় না। ‘বাহ্যিক’ চেহারাটা কিছুর-ই পরিচায়ক নয় মানুষের। না বিদ্যা-বুদ্ধির, না অভিজ্ঞতার, না মানসিকতার।

সেটা ঠিক।

মৃদুল বলল। তোমাকে দেখলেও কি বোঝা যায় যে, তুমি কাছিম?

কেন? কাছিম কেন?

দেখলে মনে হয় গন্ধরাজ ফুল। শিশুও যেন, সে ফুলের পাপড়ি ছিঁড়তে পারে। কিন্তু তোমার ভেতরটা কাছিমের পিঠের মতো শক্ত।

তা হবে। আপনার চোখ তো নয়, এক্স-রে মেশিন। আপনি বলেই যা, অন্যে দেখতে পায় না, তা আপনি পারেন সহজেই।

এই ফ্যাকল্টিটা ডেভালাপ করতে হয়েছে অনেক যত্ন করে তটিনী। কোনো কিছুই ‘সহজ’-এ পাওয়া যায় না। চাওয়া যতই তীব্র হোক-না কেন?

যাক। সারকথাটা বুঝেছেন যে, এইটাই আনন্দের। এই সরল সত্যটাই বোঝে না অধিকাংশ মানুষ।

সামনে ওটা কী?

আকা বলল, ওইটারেই ত টাওয়ার কয়।

কীসের টাওয়ার?

ওয়াচ টাওয়ার। ওর-ই উপরে বইস্যা ত মান্যিগণ্যিরা জানোয়ার দেখে। মানে, যারে কয় ‘ওয়াচ’ করে। তাই তো নাম, ওয়াচ-টাওয়ার।

তাই?

আউজ্ঞা।

সামনে ওই ন্যাড়া জায়গাটা কী? ডান দিকে? এখানে কি মান্যিগণ্যি মানুষেরা কুস্তি লড়েন? দেখতে কুস্তির আখড়ার মতন।

আকাতরু হেসে উঠল।

তটিনী লক্ষ করল যে, আকাতরুর হাসির মধ্যেও সত্যিই একটা বন্য-ব্যাপার আছে। তার হাসিতেও যেন, ডিমা নোনাই জয়ন্তী রায়ডাক এইসব নদীর আর চিকরাসি আর গামারি আর লালি গাছের আর বোরোলি আর তেকাটা মাছের গন্ধ লেগে আছে। আকাতরু এই আকাতরু—বনে না জন্মালে যেন, ওর জীবন বৃথা হত। কলকাতার মেকি আর ভন্ড আর তথাকথিত বুদ্ধিজীবীদের প্রেক্ষিতে ও যেন, সত্যিই এক প্রতিবাদ। আকাতরু সঙ্গে না থাকলে এই বক্সার বনে তটিনীর আসাই বৃথা হত।

আকাতরু বলল, এরে কয় নুনী।

‘নুনী’! মানে?

অবনী বলল, ইংরেজিতে একেই বলে SALT LICK.

সেটা কী বস্তু?

মৃদুল বলল।

ন্যাচারাল সল্ট-লিক থাকে, সব বনের-ই ভেতরে। মাটিতে বা পাথরে নুন থাকে। সেই নুন চাটতে আসে তৃণভোজী সব জানোয়ার। আর তাদের পেছনে পেছনে আসে মাংসাশীরা। তবে এটি ন্যাচারাল নয়। বন-বিভাগ বস্তা বস্তা নুন ফেলে রাখেন। নইলে মান্যিগণ্যিরা জানোয়ার দেখবেন কী করে?

অবনী বলল।

আই সি।

মৃদুল বলল।

আমার কিন্তু ভালো লাগে না। এই নুনীতে যেসব জানোয়ার নুন চাটতে আসে নির্ভয়ে, এই টাওয়ার ওখানে আছে জেনেও তাদের মধ্যে ‘বন্যতা’ থাকে না। তার চেয়ে আমি মানুষটা বেশি বন্য।

তা ঠিক। কাজিরাঙার গন্ডার, বান্ধবগড়ের বাঘ যেমন, দেখতে লাগে আর কী। এমনকী আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি বা গেরোংগোরোর সিংহ বা চিতা। মনে হয় চিড়িয়াখানার জানোয়ার দেখছি।

মৃদুল বলল।

আপনি কি আফ্রিকাতে গেছেন নাকি?

মৃদুল বলল, আজকাল পৃথিবী দেখতে বেরোয় গাধারা। সমস্ত পৃথিবীটাই তো স্যাটেলাইট আর টিভির নানা চ্যানেলের দৌলতে মানুষের বসার বা শোয়ার ঘরের মধ্যে ঢুকে এসেছে। আমি যাব কোন দুঃখে? পাশে হুইস্কির বোতল, বরফ আর সিগারেট নিয়ে সোফাতে বসে মোড়ার ওপরে পা তুলে দিয়ে সারাপৃথিবী ঘুরে বেড়াই।

আর প্রমা? প্রমা তখন কী করে?

তটিনী বলল।

মেয়েদের যা করা উচিত। আমার জন্যে ভালোমন্দ রান্না করে।

বা:।

বা:। কেন? এতে ‘বা:’-এর কী আছে? আমি একজন নাট্যকার, অভিনেতা, যাত্রা করলেও ওয়ান অফ দ্য লিডিং স্টেজ অ্যাক্টর, আমিই রোজগারটা করি। আমি আমার কর্তব্য করলে সে, তার কর্তব্য করবে না?

প্রমাও তো অভিনয় করে। ভালো গান গায়। আবৃত্তিও করে।

তটিনী বলল।

ছাড়ো তো। সেসব তো আমার-ই কালেকশানস-এর জন্যে।

তটিনী আহত হল। মৃদুলের এই স্বার্থপর-আত্মম্ভরী রূপের সঙ্গে পরিচয় ছিল না তটিনীর। হেসে ও যেন, নিজেই লজ্জিত হল। ভারি কষ্ট হল প্রমার জন্যে।

মৃদুল বলল, আসলে প্রমা খুব হোমলি। স্বামীকে নিজে হাতে ভালো-মন্দ রান্না করে খাওয়াতে খুব ভালোবাসে।

সময় পায় কী করে? বেশিরভাগ দিন-ই তো আপনারা দু-জনে একইসঙ্গে বাড়ি ফেরেন!

সময় করে নেয় প্রমা। আমার জন্যে সময় করে। সব পুরুষের ক্যারিশমা তো সমান নয়। কিছু পুরুষ থাকে তারা প্রত্যেক মেয়ের কাছেই জাস্ট ইরেজিস্টিবল।

তটিনী মুখে কিছু বলল না। মনে মনে বলল, ভাবছ তাই! ক-জন মেয়েকে দেখেছ? কী যে, ভাবে নিজেকে! আর—

তারপর-ই বলল, ও মা:! কী লাল লাল বলের মতন? ওই মানুষেরা ওগুলো কুড়িয়ে জড়ো করছে কেন? নিয়ে যাব ক-টা ঘর সাজাবার জন্যে?

টাওয়ারের সামনে থেমে-থাকা গাড়ির দরজা খুলে আকাতরু নামতে নামতে বলল, ঘর তো সাজায় মানুষে এ-দিয়ে। তারপর বনবিভাগও জমিয়ে রাখে বীজের জন্যে।

দেখে মনে হয়, যেন মাকাল ফল। তাই-না? ছোটো মাকাল ফল।

মৃদুল বলল।

মাকাল ফল দেখেছেন আপনি?

তটিনী বলল।

দেখব না?

আপনি তো গ্রামে থাকতেন না। আমি না-হয় গ্রামের মেয়ে।

চিনি। চিনি। আমি সব চিনি।

সর্বজ্ঞর মতন বলল মৃদুল।

তটিনী মনে মনে বলল, মাকাল তো মাকাল চিনবেই। গায়ের রং একগাদা ফর্সা হলেই এদেশে মানুষ ‘সুন্দর’ বলে গণ্য হয়। এই পদ্ধতিতে মিত্তির সাহেবের পিগরিতে সুইজারল্যাণ্ড থেকে ইমপোর্ট করা সাদা শুয়োরগুলোও সুন্দর।

তারপর, আকাতরুকে প্রশ্ন করল, ওগুলো কোন গাছের ফল?

দুধে লালি। লইবেন তো কয়টা, নাকি?

নেব।

সোৎসাহে বলল তটিনী।

দুধে লালির ফল সংগ্রহ করার পরে তটিনী বলল, যেখানে যাচ্ছি সেখানে গিয়ে একটু ধুয়ে নিতে হবে। কোথায় যেন, যাচ্ছি আমরা?

জয়ন্তী। অবনী বলল।

তারপর বলল, আকা তুই কিন্তু ফাঁকি মারছিস। ওইসব গাছগাছালি তো অন্য বেশি জমিতে হয় না, সব গাছগুলো চেনা মৃদুলবাবু আর তটিনী দেবীকে। চুপ করেই যদি বসে থাকবি তো এলি কেন?

উত্তরে আকাতরু চুপ করেই রইল। কী আর বলবে। কেন যে, এল সে, ওই জানে। আকাতরুর সেই গানটি মনে পড়ে গেল। ইন্দ্রনীল সেন সেদিন গেয়ে গেলেন আলিপুরদুয়ারে—

কী সুর বাজে আমার প্রাণে
আমিই জানি, মনই জানে।
কীসের লাগি সদাই জাগি,
কাহার কাছে কী ধন মাগি
তাকাই কেন পথের পানে।।
আমি জানি, মনই জানে।

এটা কার গান কে জানে! অতুলপ্রসাদের কি? না:। ওর গলাতে যদি ভগবান একটু সুর দিতেন তবে ও অবশ্যই গান শিখত। তটিনী যে, কী সুন্দর গান গায়। যখন স্টেজে উঠে ও সেজেগুজেগান গায় তখন মনে হয় আকাতরুর যে, ওর গলাতে চুমু খায়! একটা গান আছে ‘হলুদ গোলাপ’-এ। কার লেখা গান অতশত ও জানে না আকা, কিন্তু গানের কথা আর তটিনীর গলা মিলে যেন, ওর প্রাণে রাভাদের ছোড়া বর্শার-ই মতন গেঁথে গেছে সেই গানটি।

প্রাণ তুমি প্রেম সিন্ধু হয়ে, বিন্দুদানে কৃপণ হলে
ওগো পিপাসিত জনে, উপায় কী দেহ বলে...।

দানাদার টপ্পার দানাগুলি যেন, একটি হিরের মতন ঝকঝক করে।

গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে। ওরা চলেছে জয়ন্তীর দিকে।

এটা কী গাছ?

এবারে মৃদুল বলল।

কোনটা?

লম্বা আকা ঘাড় হেঁট করে মুখ বাড়িয়ে দেখবার চেষ্টা করে বলল, কোন গাছটা?

ওই যে। ওই সামনের ওই মোড়ের বাঁ-দিকে, যে-গাছটি আছে, সেটি।

ও ওইটারে ইখানে আমরা কই মেড়া গাছ।

কী গাছ?

তটিনী জিজ্ঞেস করল।

কইলাম-না। মেড়া গাছ।

কী নাম রে বাবা:। এ কোন লিঙ্গ? পুরুষ তো?

অবনী বলল, ‘মেড়া’ যখন, তখন নিশ্চয়ই পুরুষ। ‘‘দুর্বলে সবলা নারী সসা: প্রাণঘাতিকা:’’।

মৃদুল আর তটিনী খুব জোরে হেসে উঠল।

তটিনী বলল, আপনি খুব রসিক আছেন মশাই। যাই বলুন আর তাই বলুন।

অবনী বলল, আকা আমার চেয়েও বেশি রসিক। তবে ওর জার্মান ভাষাটা বোধ হয়, আপনাদের বিশেষ রপ্ত হচ্ছে না। ল্যাঙ্গোয়েজ ব্যারিয়ারে আটকে যাচ্ছেন।

তটিনী বলল, এইজন্যেই আমার মনে হয়, পৃথিবীর সব মানুষদের-ই বোধগম্য হয়, এমন একটা Instrumental ভাষা উদ্ভাবন করা উচিত। ভাষার ‘বাধা’ না থাকলে, মানুষে কতসহজে সারাপৃথিবীর কাছে পৌঁছোতে পারত। পন্ডিত রবিশঙ্কর, আলি আকবর খাঁ সাহেব, আমজাদ আলি খাঁ সাহেব বা নিখিল ব্যানার্জি বা বুধাদিত্য মুখার্জি যতসহজে সারাপৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছেছেন, তত সহজে কি আবদুল করিম খাঁ সাহেব বা ওস্তাদ বড়ে গুলাম আলি খাঁ সাহেব, সিদ্ধেশ্বরী দেবী অথবা কিশোরী আমনকার কখনো পৌঁছোতে পারবেন?

অবনী বলল, পারবেন অবশ্যই তবে হৃদয়ের সঙ্গে বোধ ও অনুভূতির মাধ্যমে যতখানি পৌঁছোনো যায় ততখানিই পৌঁছোবেন। তার বেশি নয়।

আকা বলল, ওই দেখেন। ওইটা হইল গিয়া সিঁদুরে গাছ। বড়োগাছ তা ত দেখতাই আছেন। ওই গাছের ডাল পুড়াইয়া যে, কাঠকয়লা হয় তা গুঁড়া কইর‌্যা গান-পাউডার হয়। গারো রাভা মেচিয়া নেপালি ডুবকা হক্কলেই, যাদের কাছে বে-পাশী গাদা বন্দুক আছে, তারা বারুদ বানায়।

গাদা বন্দুক কী জিনিস?

তটিনী বলল।

হেইডাই ত অরিজিনাল বন্দুক। গান পাউডারের নলের মধ্যে ঠুইস্যা দিয়া সামনে সিসা বা লোহার বল বা খুচড়া টুকরা-টাকরা ভইর‌্যা দিয়া ‘BALL’ আর ‘SHOTS’ হয়। তারপরে না, সব একে একে অন্য বন্দুক রাইফেল সব আইছে। কর্ডাইট, হ্যামারলেস, চোক, ইজেক্টর, রিপিটর। আর বন্দুক-ই বা কত, সিংহল-ব্যারেল, ডাবল-ব্যারেল, ওভার-আণ্ডার, প্যারাডক্স, লেখা জোকা আছে নাকি?

আপনি এত জানলেন কী করে?

ওর বড়োমামা ছিলেন খুব নামকরা শিকারি জলপাইগুড়ির। চা-বাগানের সব সাহেবরাই বন্ধু ছিলেন। চা-বাগান ছিল মামার। তার-ই শাগরেদি করে শিখেছে আর কী। আমাদের আকা কিন্তু গোটা চারেক চিতা মেরেছে। হরিণ, কুমির, ঘড়িয়াল, পাখি, এসবের তো গোনাগুনতি নেই।

ছি:। কী নিষ্ঠুর আপনি! কী করে মারেন অমন সব, প্রাণী আর পাখিদের।

আকা বলল, যখন মারছি, তখন মেলাই ছিল। আর শিকারি হিসাবেই মারছি। Butcher হিসাবে নয়। আমাগো ছুটোবেলায় আইনকানুন ছিল দ্যাশে। এমন পূর্ণস্বাধীনতা তো ছিল না তখন।

বলেই, মনে মনে বলল, হায়রে সুন্দরী। বন্দুকে আওয়াজ হয় বইল্যা বন্দুকের মার বোঝন যায় আর তুমি যে, আমারে এক এক চাউনি দিয়াই প্রতিক্ষণে মারতাছ তার বেলা? শালার ভগবানের কুনোই বিচার নাই।

ওইগুলো কী গাছ?

মৃদুলবাবু একটা সিগারেট ধরিয়ে বললেন।

ও তো আমলকী।

অবনী বলল, এ গাছ আমিও চিনি। একেবারে বন হয়ে রয়েছে যে।

আকাতরু বলল, চিতল হরিণে আমলকী খাইতে খুব ভালোবাসে। আর কোটরা বা বার্কিং ডিয়ারে খুব-ই ভালো বাইস্যা খায় শিমুলের ফুল।

ওই সিঁদুরে গাছের বটানিক্যাল নাম জানিস?

অবনী শুধোল আকাতরুকে।

জানি।

কী?

MALLOTUS PHILPINENSIS. মুয়্যের সাহেব নাম দিছিল।

তিনি আবার কিনি?

তা আমিই কী ছাই জানি?

এটি কি ফিলিপাইনস-এর গাছ?

সম্ভবত তাই। নাম শুইন্যা তো তাই মনে হয়।

আপনি এত জানলেন কী করে? আকাতরুবাবু?

মৃদুল বিস্ময়ের সঙ্গে জিজ্ঞেস করল।

জানবার ইচ্ছা হইল তাই। আমাগোর মধ্যে অধিকাংশরই কুনো ইনকুইজিটিভনেসই নাই? আপনে যদি ফরেস্ট ডিপার্টের সাহেবদেরও জিগান, ইটা কী গাছ মশয়? তয় উত্তর পাইবেন: ‘গাছ’। যদি জিগান, ইটা কী পাখি মশয়? তবেও উত্তর পাইবেন: ‘পাখি’। তবে এই অঞ্চলে ময়নাবাড়ি বিট-এর বিট অফিসার আছেন সুভাষ রায়। সেই ভদ্রলোক জঙ্গল এক্কেরে গুইল্যা খাইছেন। অত বটানিক্যাল নাম টাম জানেন না, ইংরাজ বা ল্যাটিন, কিন্তু দিশি নাম জানেন হক্কলের।

অবনী বলল, ময়নাবাড়ি বিট কোন ফরেস্ট রেঞ্জ-এর আণ্ডারে?

নর্থ রায়ডাক রেঞ্জ। ওই রেঞ্জের রেঞ্জার সুধীর বিশ্বাসও ভালো মানুষ। নতুন আইছেন। তবে জঙ্গলের ‘পুকা’ হইলেন গিয়া সুভাষবাবু।

মৃদুল বলল, পুকা-ফুকা দিয়ে আমি কী করব যখন জয়ন্তী থেকে ভুটানঘাটে যাব তখন আপনার ওই সুভাষবাবু বা রেঞ্জার সাহেব কি ভুটানি হুইস্কি খাওয়াতে পারবেন? ‘‘ভুটান মিস্ট’’ বলে একটা হুইস্কির নাম শুনেছিলাম আলিপুরদুয়ারে।

অবনী বলল, সর্বনাশ। সে তো স্মাগলড জিনিস।

হ্যাঁ।

মৃদুল বলল।

তারপর বলল, ভুটান থেকে সস্তা এক বোতল ‘‘ভুটান মিস্ট’’ জোগাড় করলেই জেলে যেতে হবে হয়তো আমাকে। কিন্তু ভারতে স্মাগলড জিনিস তো কিছুই আসে না। কলকাতার খিদিরপুর, মেট্রো সিনেমার পাশের গলি, পুরো চৌরঙ্গি এলাকা, শিলিগুড়ির বাজার, নকশালবাড়ির কাছে ধুলাবাড়ি বাজার, এ-সমস্ত জায়গাতেও কোনো স্মাগলড জিনিস বিক্রি হয় না। কলকাতার নিউমার্কেট, এয়ারকণ্ডিশানড মার্কেট, নিউ দিল্লির পালিকা বাজার, বম্বের ‘হিরা-পান্না’, স্মাগলড জিনিস কি কোথাওই পাওয়া যায়? আমাদের দেশের পুলিশ আর কাস্টমস ডিপার্টমেন্ট যখন, সততার গল্প ফাঁদে তখন, তাদের বলতে ইচ্ছে হয় যে, আর কোনো গুণ যদি নাই থাকে তো ‘চক্ষুলজ্জা’টা তাদের অন্তত থাকা উচিত। বজ্র আঁটনি ফস্কা গেরো।

আপনি বেশি সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছেন মৃদুলবাবু।

মৃদুল, দুশ্চরিত্র হলেও, ভন্ড হলেও মনে হয়, মানুষটা অসৎ নয়।

সে বলল, ‘সিরিয়াস’ একটা ইংরেজি শব্দ। তাতে কোনো ম্যাগনেচুয়ড নেই। তাই, আমি সিরিয়াস হতে পারি কিন্তু বেশি বা কম সিরিয়াস হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

যাকগে।

অবনী বলল।

অবনী ভাবছিল, মৃদুলবাবুর গলার স্বরটি ভারি ভালো। কলকাতার এফ-এম-এ প্রোগ্রাম যাঁরা কনডাক্ট করেন তাঁদের গলার স্বরের মতন। কিন্তু গলার স্বরের ভালোত্ব আর বক্তব্যের ভালোত্ব বোধ হয় সমার্থক নয়।

তটিনী বলল, আমাকেও কলকাতাতে একজন বলেছিল, ‘ভুটান মিস্ট’ বলে একটা হুইস্কি ভুটান থেকে আসে। সেটা নাকি চমৎকার।

তুমি কি আজকাল হুইস্কির সমঝদার হয়েছ নাকি তটিনী?

যে-পরিবেশে থাকি তাতে এতদিনে যে, পাঁড় মাতাল হয়ে যাইনি তাই তো যথেষ্ট। আমি মাঝে মাঝে একটু-আধটু খাই না যে, তা নয়, তবে শুধুই সাধুসঙ্গে খাই।

আমি কি সাধু নই?

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, সে-প্রশ্ন নিজেকেই করবেন। আমি তো জজসাহেব নই, আপনার আয়নাও নই। আমার মতামতের দাম-ই বা কী?

মৃদুল বলল, যাইহোক অবনীবাবু, তটিনী যখন খোঁজ দিলই তখন, ‘ভুটানি কুয়াশা’ একটু জোগাড় করুন। আপনাকে দিয়ে হবে না মনে হচ্ছে। পারলে ওই আকাতরুবাবুই পারবেন। দাম আমি দিয়ে দেব।

আকাতরু চুপ করে থাকল। সে মদ খায়ও না, কেউ খাক তা, পছন্দও করে না। তটিনী যে মাঝে মাঝে খায়— এইকথাটা তাকে ব্যথিত করেছে।

সুভাষচন্দ্র রায়, ময়নাবাড়ি বিট-এর বিট অফিসারের কথা যখন, উঠলই তখন বলি প্রমীলার কথাও।

আকাতরু বলল।

প্রমীলাটি কে? তার রক্ষিতা নাকি? নাকি অনূঢ়া কন্যা?

মৃদুল বলল।

ছি:। ছি:।

বলল অবনী।

‘যাদৃশী ভাবনা যস্য’। কী করা যাবে? মৃদুলবাবুর ভাবনার জগৎটা হয়তো ছোটো।

তটিনী বলল।

হয়তো তাই। রক্ষিতাদের বৃহৎ জগৎ সম্বন্ধে তোমার যতখানি জ্ঞান আমার তো ততখানি নয়।

মৃদুল বলল।

আকাতরু বলল, ভদ্রলোক সংসারী। ওখানে একা থাকেন। ফ্যামিলি অন্যত্র থাকেন। তারপর একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, এইরকম বাজে ইয়ার্কি ভালো নয়।

যাক সে-কথা। এখন বলুন, প্রমীলা কে?

প্রমীলা বনবিভাগের পোষা হাতি। ময়নাবাড়ি বিটেই থাকে। নানা কাজে লাগে। মাদি হাতি।

প্রমীলা যে, মরদও হয় তা তো আগে জানতাম না। তবে প্রমীলাদের মধ্যেও মরদের স্বভাব থাকে যদিও অনেকের-ই।

মৃদুল বলল।

খোঁচাটা যে, তটিনীর-ই প্রতি তা, তটিনী যেমন বুঝল, অন্যরাও বুঝল।

তটিনী বলল, তা ঠিক। আবার উলটোটাও দেখা যায় অনেক সময়ে।

কী বললে?

মৃদুল বলল।

খ্যাতিতে পুরুষসিংহ, আসলে নখদন্তহীন, ম্যাদামারা।

মৃদুল চুপ করে গেল।

আকাতরু শুনছিল সব আর তার কপালের শিরা দু-টি দপদপ করছিল। ওর বন্ধু ডাক্তার মৃগেন বলে যে, ওর ব্লাড-প্রেশার হাই হয়ে গেছে। ওষুধ খাওয়া দরকার। সবরকম উত্তেজনা বর্জন করাও উচিত। কিন্তু কী করবে। তার-ই সামনে কেউ তটিনীকে ঠুকবে আর তার ব্লাড-প্রেশার ঠিক থাকবে তা তো হবার কথা নয়।

এটা কী গাছ?

তটিনী বলল, আকাতরুকে।

ওইটা হলুদ। সফট উড। কাঠের রংও হয়। কাঁঠাল কাঠ দেখেছেন কখনো?

হ্যাঁ। গ্রামের কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি দেখেছি। আমাদের বাড়িতেও ছিল। সস্তার কাঠ।

ঠিকোই কইছেন! হলুদও তাই।

এবারে আপনি পর পর গাছগুলো চিনিয়ে দিন তো আমাকে। এই ‘হলুদ গোলাপ’ যাত্রা নিয়ে এসে তো অনেককিছুই ভুলতে বসলাম। কিছু শিখেও যাই এখান থেকে।

বেশ। কইতাছি। শোনেন আপনে।

মৃদুল বলল, মনেই ছিল না। আমাদের সঙ্গে ফ্লাস্কে তো কফি আছে। এই নিবিড় নিশ্ছিদ্র জঙ্গলে একটু কফি খেয়ে অ্যাডভেঞ্চার করলে হত নাকি? নাকি রাতের বেলা হবে।

রাতের বেলা হাতির লাথি খেতে কে আসবে এখানে? উত্তরবঙ্গের হাতিরা ডেঞ্জারাস এবং আনপ্রেডিক্টেবল। হ্যাবিট্যাট নষ্ট হয়ে গেছে।

অবনী বলল।

হাতির হ্যাবিট্যাট নষ্ট হয়েছে বলে প্রায়-ই নানা কাগজে বন্যপ্রাণী দরদি আর পন্ডিতদের আর্টিকেল দেখি। অথচ মানুষের ‘হ্যাবিট্যাট’ যে, কবেই পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে সে-কথা আর কে বলে? মানুষের নিজের প্রতিই তার কোনো দরদ নেই। ভারি আশ্চর্যের কথা।

মৃদুল বলল।

তা যা বলেছেন। মানুষ-ই এখন সবচেয়ে ইম্পর্ট্যান্ট প্রাণী পন্ডিতদের কাছে।

অবনী বলল।

আকাতরু বলল, রবিঠাকুরে ঠিকোই কইছিলেন— ‘যারা সবকিছুই পন্ড করে তারাই হইল গিয়া পন্ডিত।’

মানুষের মধ্যে আবার পুরুষ মানুষ-ই হচ্ছে সবচেয়ে বেশি নেগলেগটেড। কবে যে, এই প্রজাতির পুংলিঙ্গ পুরোপুরি extinct হয়ে যাবে, তা কে বলতে পারে? তাদের জন্যে কাঁদবার কেউই নেই। আর তাদের জন্যে কেঁদে, পুরুষের দু-চোখ দিয়ে ধারা বইছে অবিরত।

দ্যাখেন ম্যাডাম, ওইটা কী গাছ কন দেহি?

আমাকে ‘ম্যাডাম’ বলবেন না।

তা! কী কম্যু? মানে, কী বইল্যা ডাকুম?

নাম ধরেই ডাকবেন। আমি কি আপনার পিসিমা, না শাশুড়ি?

নাম ধইর‌্যা ডাকুম?

হ্যাঁ।

আকাতরুর সারাশরীরে যেন, বিদ্যুৎতরঙ্গ বয়ে গেল। ভালো করেই বুঝতে পারল যে, এক একবার ‘তটিনী’ বলবে আর তার শরীর মনের ব্যাটারি একটু একটু করে ডিসচার্জ হতে থাকবে। ডায়নামোটা যে, চারদিন আগে তটিনীর সঙ্গে প্রথমবার দর্শনেই গেছে। আকাতরুর রবিঠাকুরের সেই গানটা মনে পড়ে গেল—

বিনা প্রয়োজনের ডাকে ডাকব তোমার নাম,
সেই ডাকে মোর শুধু শুধুই পুরবে মনস্কাম।
শিশু যেমন মাকে নামের নেশায় ডাকে,
বলতে পারে এই সুখেতেই মায়ের নাম সে বলে
তোমারি নাম বলব নানা ছলে।

মনে মনে বলল, তটিনী! তটিনী!

অন্যমনস্ক হয়ে গেছিল আকাতরু।

কী হল আকাতরু, গাছ চেনাচ্ছেন না যে? জয়ন্তীতে পৌঁছে গেলে কি আর এতগাছ পাব? সে জায়গাটা কেমন?

দারুণ জায়গা।

অবনী বলল। কত গাছ চাই? সব গাছ-ই পাবেন।

তারপর বলল, মনে হবে, যেন, নদীর মধ্যেই রয়েছেন। চানঘরে যখন চান করবেন, যদি জানালা খুলে রাখেন, তা রাখতে কোনো বাধাও নেই, কারণ বাংলোটা অনেক-ই উঁচু আর দিনের বেলাতে তো বাইরে থেকে কিছু দেখা যাবে না, তাহলে মনে হবে যেন, নদীতেই চান করছেন। নদীর ওপারে ভুটানের দিকে পাহাড়। আকাশ প্রায় ঢেকে দিয়েছে। বাঁ-দিকে দূরে বাঁক নিয়ে একটি দ্বীপের সৃষ্টি করে হারিয়ে গেছে।

আহা! আর বলবেন না। নিজের চোখে দেখব।

নদী যেখানে বাঁক নিয়ে চোখের আড়ালে চলে যায়, মনে হয় নাকি যে, নদীর সব রহস্য সেখানেই আছে? সব ফুল, সব পাখি, তার গায়ের গন্ধ...

তটিনী বলল।

আকাতরু বলল, আপনের কথাগুলানও য্যান যাত্রার ডায়ালগের-ই মতন মিষ্টি। কী কইর‌্যা যে, অমন কথা কন আপনে, আপনেই জানেন।

তটিনী হেসে উঠল।

তটিনী হাসলে আকাতরুর বুকটা ভালোলাগায় কেঁদে ওঠে। ভালোবাসা যে, ঠিক এইরকম বেদনাদায়ক কোনো হাড্ডি পিলপিলানো অসুখ, সে-সম্বন্ধে তার কোনো ধারণাই ছিল না! বড়ো কষ্ট। এ কেমন আনন্দ, যারমধ্যে এমন কষ্ট থাকে?

ভাবছিল আকাতরু।

ওই গাছটার নাম আকাশপ্রদীপ।

বা:। কী সুন্দর গাছ। আর আরও সুন্দর নাম।

হ্যাঁ। গাছটা অস্ট্রেলিয়ান।

তাই?

হ্যাঁ।

বটানিকাল নাম কি জানেন নাকি?

বটানিকাল নাম অ্যাকাসিয়া মানগিয়াম।

তটিনী বলল, রাঁচিতে একবার নাটক নিয়ে গেছিলাম। ওঁরা বেতলাতে নিয়ে গেছিলেন, পালামৌ ন্যাশনাল পার্ক-এ। বেতলার সবচেয়ে পুরোনো বনবাংলোর কম্পাউণ্ডে একটি অস্ট্রেলিয়ান ফুল গাছ দেখেছিলাম। দেখিয়েছিলেন, ডি.এফ.ও কাজমি সাহেব আর গেম-ওয়ার্ডেন সংগম লাহিড়ী। ভারি সুন্দর তবে গাছটা আকাশমণির মতন বড়ো নয়। মানে, আমি যখন দেখেছিলাম তখন বড়ো রাধাচূড়ার অথবা স্থলপদ্মর মতন ছিল। ফুলগুলো কাগজের ফুলের মতন দেখতে।

নাম কী? মনে আছে?

অবনী বলল।

দাঁড়ান। দাঁড়ান। মনে করি। নামটাও ভারি সুন্দর। ফুল হয় মার্চ-এপ্রিলে। কাগজের ফুলের মতন। সাদা ফুল! হ্যাঁ মনে পড়েছে। গ্লিনিসিডিয়া সুপার্বা।

বাবা:। এ কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা! কখন যে, আমার পিতৃদেবের বটানিকাল নাম জিজ্ঞেস করে বসবেন আপনারা মশাই, সেই ভয়ে আছি এখন। জঙ্গলে বেড়াতে এসে এমন বিপদে পড়ব আগে জানলে আসতাম না। কোথায় একটু নির্জনে তাস খেলব, মাল খাব শান্তিতে, তা নয় এ কী বিপদ রে বাবা!

অবনী ও আকাতরু এমনকী ভাড়াগাড়ির ড্রাইভার মদন পর্যন্ত হেসে উঠল মৃদুলের কথাতে। কিন্তু তটিনী হাসল না।

সে বলল, আশ্চর্য। অথচ আমাদের মধ্যে আপনিই সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির এম.এ.।

বাংলায় এম.এ. পাশের সঙ্গে বাঁশ অথবা ঘেটুফুল চেনার কী সম্পর্ক?

আমরা কেউই তো এম.এ. পাশ নই। আমি তো কলেজেই যাইনি। অবনীবাবু ও আকাবাবুর কথা জানি না। কিন্তু জানার ইচ্ছের সঙ্গে ডিগ্রির তো কিছুমাত্র সম্পর্ক আছে বলে বুঝতে পারি না। যদিও থাকা উচিত ছিল কথাতেই বলে ‘The purpose of a University is to bring the horse near the water and to make it thirsty’. জ্ঞানের আসল স্পৃহা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের পাকানো কাগজটি হাতে পাওয়ার পরেই জাগবার কথা। তাই নয় কি? সব মানুষের সব ডিগ্রিই তো পাকানো কাগজমাত্র। ‘শিক্ষা’ তো মানুষ তার কথাবার্তা, তার ব্যবহারেই, তার চলায়-বলায়, তার জ্ঞান-পিপাসার মধ্যেই বয়ে বেড়ায়। প্রকৃত শিক্ষাতে আর ডিগ্রিতে কোনোদিন-ই কোনো মিল ছিল না।

তুমি বলতে চাইছ সাযুজ্য? শব্দটা ‘সাযুজ্য’ই কি?

হ্যাঁ। আমি তো ভালো বাংলা জানি না।

তটিনী বলল।

ইংরেজি আর ফ্রেঞ্চটা বুঝি, বাংলার চেয়েও ভালো জান?

মৃদুল বলল।

তটিনী অপমানিত হয়ে বলল, আমি যাত্রাদলের অশিক্ষিতা নায়িকা—বাংলাটাই ভালো করে জানি না আর ওসব তো! তা ছাড়া আমি তো মৃদুলবাবু আপনার এবং অনেক তাবড় তাবড় বুদ্ধিজীবীদের মতন হেলিকপ্টার থেকে গড়িয়াহাটের মোড়ে পড়িনি। মেদিনীপুরের গ্রাম থেকে অতিসাধারণ প্রায় লজ্জাকর অতীত থেকে এতখানি ধুলো-ময়লা মাড়িয়ে হেঁটে এসেছি অনেক কষ্ট করে।

জানি। ধুলো-ময়লা মাড়ায় অনেকেই কিন্তু মন্দিরে ঢোকার আগে যে-জুতো পরে তা মাড়িয়ে এল, তা খুলে রাখে বাইরে। শোয়ার ঘরে বা মন্দিরে জুতো পায়ে ঢোকার দরকার-ই বা কী? আমি তো তোমার অতীত সম্বন্ধে কিছু জানি। একেবারেই জানি না, তা তো নয়।

মৃদুল বলল।

কী জানেন?

তোমার অতীতের সব কথা জানি না। কিছু অবশ্যই জানি। তোমার বর্তমানটাও কি খুব একটা গৌরবের?

তটিনী দাঁত চেপে বলল, তাই-বা বলি কী করে? আপনি যখন, স্টেজে আমার নায়ক, বর্তমানটাও যে, গর্ব করার মতন কিছু, তাই-বা বলি কী করে? আমার মতন অনেকেই আছেন যাঁরা সমস্ত জীবনেই গর্বিত হওয়ার মতন কিছু করতে পারেন না। কী করা যাবে? তাদের সবকিছুকেই মানিয়ে নিতে হয়।

আকাতরু মনে মনে খুব রেগে গেল মৃদুলের ওপরে। মানুষটা একটা বাজে মানুষ। এবং শ্রদ্ধা বাড়ল তটিনীর ওপরে।

তটিনী বলল, এই সমাজে যে-মেয়ে একা থাকে, একা কাজ করে, যার সংসার নেই সে, সবসময়েই খারাপ, সমালোচনার পাত্রী। আর পুরুষমাত্রই দেবতা, সে একাই থাকুক কী সংসারীই হোক।

তুমি কি ধোওয়া-তুলসী পাতার কথা বলছ? তুমি....

আমি তুলসী পাতার ‘পবিত্রতা’ কোথায় পাব? তুলসীই নই! তার ধোওয়া আর অধোওয়া!

অবনী প্রসঙ্গান্তরে গিয়ে বলল, কী রে আকা, গাছ চেনবার কী হল?

গাছ চিনাইতে যাইয়াই ত এমন বিপত্তি। দেখতাছি যে, মানুষ চিনোনের চাইয়া গাছ চিনোন অনেক-ই সোজা।

মৃদুল বুঝল কথাটা আকাতরু তাকে উদ্দেশ্য করেই বলেছে। কিন্তু এই ষাঁড়ের মতন মানুষটাকে না ঘাঁটানোই মনস্থ করল। মৃদুলকে সে, জঙ্গলে ছুড়েও ফেলে দিতে পারে। আর বাঙালের রাগ বলে কথা!

ওটা কী পাখি?

তটিনী হঠাৎ বলল, বাঁ-দিকের জঙ্গলের মধ্যে ঝুঁটিঅলা একটা বাদামি আর সাদা পাখিকে দেখিয়ে।

অবনী বলল, ওটা হুপী।

আর ওইগুলো?

ওগুলো ছাতারে। ইংরেজি নাম BABBLER। সবসময় মানুষের মতন-ই কলকলিয়ে কথা বলে।

অবনী বলল।

BABBLER? না ThRASHER?

আকাতরু বলল।

THRASHER বুঝি? তা হবে।

মানুষই কি সবচেয়ে বেশি কথা বলে? সব প্রাণীদের মধ্যে?

তটিনী শুধোল।

নট আনলাইকলি।

অবনী বলল।

পাঁচ

জয়ন্তীতে পৌঁছে তটিনী অভিভূত হয়ে গেছিল একেবারে। তবে ভয়ও যে, পায়নি তাও নয়। সন্ধেবেলা গা ধোওয়ার সময়ে হঠাৎ জানলার কাচে একটা বড়ো অথচ দৈর্ঘ্যে কম সরীসৃপের ছায়া দেখে ভয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠেছিল। ঘরে ঢুকে জামাকাপড় পরে বাইরে বেরিয়েই আকাতরুকে বলেছিল, ভীষণ-ই ভয় পেয়ে গেছিলাম। বাথরুমে, খাবার ঘর দিয়ে দিয়ে দেখুন, কী-একটা জিনিস বাথরুমের জানলার কাচের বাইরে সেঁটে আছে। ভয়ে হার্টফেল-ই করে গেছিলাম বলতে গেলে।

আকাতরু দেখে এসে হাসল, বলল, জিনিসটা কী তা আপনি চিনেন তবে এতবড়ো হয়তো আগে দেখেন নাই কুখনও।

কী?

তটিনী বলল।

তক্ষক।

তক্ষক? সে তো অনেক-ই দেখেছি পেপে গাছে, অন্যান্য গাছে। ‘ঠিক! ঠিক! ঠিক’! করে ডাকে।

ওগুলো ছোটো প্রজাতির। তারপরেই বলল, একটু চুপ কইর‌্যা থাহেন। শুনতে পাইবেন আনে ওদের ডাক। নদীর ওপরে থিক্যা ডাকলে এপার থিক্যা শুনতে পাইবেন। ডাকবআনে ‘টাকটু-উ-উ! টাকটু-উ-উ’ কইর‌্যা। ডাকোনের আগে আবার একটু গলা খাঁকড়াইয়া লয়। বড়ো বড়ো উচ্চাঙ্গ সংগীতের পন্ডিতেরা বোধ হয় মইর‌্যা তক্ষক হন।

ওদের ইংরেজি নাম কী?

GECKO। অন্য নাম Tucktoo। ওই ‘টাকটু-উ-উ’ বলে ডাকে বলেই।

হাসল তটিনী।

আকাতরু যেন, অবশ হয়ে গেছে। চান-করে-ওঠা তটিনীর গায়ের সাবান আর পারফুমের গন্ধ, বনের গন্ধ, নদীর গন্ধ, ওই চাঁদনি রাতের গন্ধ সব মিলেমিশে আকাতরুর জীবনের সব স্বপ্ন যেন, সত্যি হয়ে মর্তে নেমে এসেছে। আর ওপারের পাহাড় থেকে গেকো ডাকছে ‘টাকটু-উ-উ’ আর এপার থেকে দোসর সাড়া দিচ্ছে ‘টাকটুউ’। পাহাড়ের কন্ঠার কাছে দাবানল জ্বলছে। আগুনটা সোনালি চিতার মতন একবার এদিক আর একবার ওদিক করে নীচে নামার চেষ্টা করছে যেন। আগুনের মালা গড়ে উঠছে ধীরে ধীরে। গাঁথছে কেউ। এখনও অসম্পূর্ণ আছে। মালা গাঁথা শেষ হয়নি। তটিনী অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে সেদিকে।

আকাতরুর কথা শেষ হতে না হতেই জয়ন্তীর বন-বাংলোর ছাদের নীচে ফলস-শিলিং-এর মধ্যে থেকেই একটা ডেকে উঠল ‘টাকটু-উ-উ’ বলে আর অন্য একটা সাড়া দিল নদীর ওপার থেকে। নদীটা বাংলোর সামনে অনেক-ই চওড়া—চাঁদের আলোয় শঙ্খের মতন রঙে আর ওপারের কালো রোমশ কাছিম-পেঠা আকাশ-ছোঁওয়া পাহাড়ের পটভূমিতে আরও যেন, সুন্দর দেখাচ্ছে। বাংলোর সামনে ঠিক নদীর উপরেই একটা বসার জায়গা। বাঁধানো। হাতার মধ্যে কয়েকটি শাল গাছ।

শাল ইখানের স্বাভাবিক গাছ নয়। বনবিভাগ-ই লাগাইছেন।

আকাতরু বলল।

ওরা দু-জনেই ছিল একা। মৃদুল অবনীকে নিয়ে গাড়ি নিয়ে রেঞ্জার বিমান বিশ্বাসের বাড়িতে গেছে আলাপ করতে। আসলে বোধ হয় ভুটানি হুইস্কি কী করে পাওয়া যায়, তার-ই তত্ত্বতালাশ করতে।

আকাতরু বলল, বিশ্বাস সাহেবের মিসেস খুব-ই সুন্দরী।

তাই? আপনার সঙ্গে আলাপ আছে?

আমি একটা ফালতু লোক। আমার সঙ্গে আলাপ কার-ই বা আছে। আপনেই দয়া কইর‌্যা আমারে এত ইজ্জত দিয়া কথা কন। নইলে আমার কী আছে? না বিদ্যা, না বুদ্ধি, না টাকা, না রূপ। আমি ত একটা মাকনার চায়্যাও অধম।

‘মাকনা’ কী?

ওঃ তাও জানেন না? মাকনা হইল গিয়া পুরুষ হাতি কিন্তু যাঁর দাঁতি নাই। তার আর দাম কী?

তবে দাম কোন হাতির?

দাঁতালের আর গণেশের। গণেশের আবার পূজাও করে অনেকে।

গণেশটা কী বস্তু?

ওঃ। যে-পুরুষ হাতির একদাঁত তারে কয় ‘গণেশ’।

তাই?

হঃ।

আপনি কত্ত জানেন। সত্যি!

হঃ। আপনার পায়ের নখেরও যগ্যি যদি হইতে পারতাম।

কী যে বলেন! আপনি মানুষটা খুব ভালো। আপনাকে আমার খুব ভালো লেগেছে আকাবাবু।

আকাতরুর হৃৎপিন্ডটা বন্ধ হয়ে গেল যেন। ওর বুকের মধ্যে আকাশ-বাতাস-নদী-পাহাড়-চাঁদনি রাত সব যেন, একসঙ্গে গান গেয়ে উঠল। জন্মের পর থেকে সে, এতখুশি কোনোদিন হয়নি। ওর ইচ্ছে করল তটিনীর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে, ওর পায়ের পাতাতে চুমু খায় নীচু হয়ে।

কিন্তু কিছুই করতে পারল না।

শুধু মুখে বলল, আপনে কী যে কন! আপনারে আমার হৃদয়টা একখান লাল বারোমাইস্যা জবার মতন নিজে হাতে ছিঁইড়্যা দিতে পারি। কিন্তু আপনের তাতে কী প্রয়োজন?

তটিনী চুপ করে আকাতরুর মুখের দিকে চেয়ে রইল।

পুরুষ মানুষ সে অনেক-ই দেখেছে। অনেক পুরুষের সঙ্গে সে শুয়েছে। পুরুষ জাতটা সম্বন্ধে একমাত্র প্রাণধন খাঁ ছাড়া, তার মনে শ্রদ্ধার কোনো আসন নেই। কিন্তু আকাতরুর মতন নিষ্পাপ, শিশুর মতন সরল, পবিত্র পুরুষ সে, আগে দেখেনি কখনো। বড়োই আবিষ্ট হয়ে গেছে তটিনী। ওর মনে হচ্ছে নিজেই নষ্ট করে দেওয়া ওর কোনো ভ্রূণ যেন, জীবন্ত হয়ে ওর প্রেমিক হয়ে আকাতরুর মাধ্যমে ওর কাছে এসেছে। ভ্রূণও প্রাণ। ভ্রূণহত্যাও পাপ। মেরি স্টোপস ক্লিনিকের অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান লেডি ডাক্তার তাকে বলেছিল। কে জানে! হয়তো তাই!

আকাতরু বলল, আমি ম্যামসাহেবের দেখিও নাই কুনোদিন। তবে শুনছি যে, সুন্দরী। সুন্দরী বইল্যাই ত কারোর-ই দেখান না ওয়াইফরে বিশ্বাস সাহেব। না দেখানোই ভালো।

কেন?

তটিনী বলল।

মৃদুলবাবুর মতন মানুষদের ত এক্কেরেই বাইরে বাইরেই রাখন উচিত। অবনী যে, কোন আক্কেলে তারে লইয়া গেল সিখানে কে জানে! মৃদুলবাবু হাইলি এডুকিটেড হইতে পারেন, পার্টও দারুণ করেন কিনু মানুষডা ইক্কেরে থার্ড ক্লাস। আপনের সাথে এমন কইর‌্যা কথা কইতাছিল না, আমার মনে হইতাছিল, দিই গলাডা টিইপ্যা ইক্কেরে শেষ কইর‌্যা।

তটিনী আতঙ্কিত গলায় বলল, না, না। অমন করতে যাবেন না। ওঁরা মানীগুণী লোক। এস.ডি.ও., এস.ডি.পি., এস.পি., ডি.এম সকলেই ওঁদের একনামে চেনে। আপনিই সারাজীবন জেল খেটে মরবেন। আপনার কী ধারণা যে, হাজার হাজার মানুষ আমাদের দেশের শয়ে শয়ে জেলে পচে মরছে, ঘানি ঘুরোচ্ছে, যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে গেছে তারা সকলেই দোষী। বদমাইশ, চোর, ডাকাত, খুনে, রেপিস্টদের মধ্যে অধিকাংশই বাইরে আছে। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ পড়েননি আপনি? ‘‘আইন সে তো তামাশামাত্র। বড়োলোকেরাই পয়সা খরচ করিয়া সে তামাশা দেখিতে পারে।’’ ডেপুটি বঙ্কিম এ-কথা বলেছিলেন, পরাধীন ভারতবর্ষ সম্বন্ধে। আজ বঙ্কিম এই পূর্ণ-স্বাধীন ভারতবর্ষে বেঁচে থাকলে কী বলতেন, তা কে জানে? জানেন আকাতরু। বড়োলজ্জা হয় ভাবলে। না, না আপনি ওরকম কিছু করার কথা ভাববেন না। কখনো না।

তটিনী ভাবছিল, এ জীবনে অনেক-ই ছদ্ম-ভালোবাসা পেয়েছে অসংখ্য পুরুষের। কিন্তু আকাতরুর মতন কোনো এক-শো ভাগ সৎ, এক-শো ভাগ পবিত্র, এক-শো ভাগ নারীসঙ্গর অভিজ্ঞতাহীন পুরুষ তাকে এমন শুদ্ধ, সুন্দর ভালোবাসা বাসেনি। তার ওপরে জয়ন্তীর এই পরিবেশ। মাথার উপরে একজোড়া কাঠগোলাপের গাছ। বিস্তৃত চওড়া নদীরেখা। চাঁদের আলোতে মোহময়, রহস্যাবৃত। দূরের বাঁকে হারিয়ে গেছে নদী, বিপরীতের কাছিম-পেঠা আকাশ-ছোঁওয়া পাহাড়। তার কন্ঠার কাছে দাবানলের আলোর মালা। লাল। রাতের বাঘের চোখের মতন লাল। ও ভাবল যে, এমন পরিবেশে, এমন শুদ্ধ পবিত্র একজন মানুষের অস্ফুট প্রার্থনা, অশুচি বহুভোগ্যা তটিনী মঞ্জুর করে নিজেই ধন্য হবে।

পরক্ষণেই হাসি পেল তটিনীর।

ভাবল, এই মহিরুহর মতন পুরুষটা এতটাই ছেলেমানুষ যে, সে যদি, তাকে এই মুহূর্তে বলে যে, তোমাকে আমার অদেয় কিছুই নেই, তবে এই নিষ্পাপ অনভিজ্ঞ শিশুটি হয়তো তার পায়ের একপাটি চটি, তটিনীর সাদা-রঙা স্পিৎজ কুকুর জিম-এরই মতন, তুলে নিয়ে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে যাবে। তার চাহিদা যে কী, একজন পূর্ণযুবতী নারী তাকে যে, কী দিতে পারে, সে-সম্বন্ধেও তার হয়তো কোনোই স্পষ্ট ধারণা নেই। এই দেবশিশুর ভালোবাসা যে, কোথায় রাখবে, কী করে তার দাম দেবে, ভেবেই পেল না তটিনী।

পরমুহূর্তেই ভাবল, একমাত্র আকাতরুর মতন অকলুষিত, নিষ্পাপ, গ্রাম্য প্রবল পুরুষ আর তার জার্মান স্পিৎজ জিম-এর মতন মদ্দা কুকুর-ই একজন নারীকে প্রকৃত নি:স্বার্থ ভালোবাসা দিতে পারে। নইলে, তটিনীর দেখা পুরুষ প্রজাতির অধিকাংশই শুয়োর। শুয়োর যে, তা তো সমারসেট মম বহুদিন আগেই তাঁর ‘RAIN’ গল্পেই বলে গেছেন। ‘All men are pigs.’

আকাতরু বলল, আমি আজ আত্মহত্যা করুম।

আত্মহত্যা?

চমকে উঠে আতঙ্কিত গলাতে বলল তটিনী।

তারপর বলল, কেন?

সে আপনে বোঝবেন না।

আমার কোনো অপরাধ হয়েছে কি?

হ্যাঁ। হইছেই ত!

কী?

আপনে আমারে মানুষের মর্যাদা দিছেন।

এটা কি অপরাধ?

হ! হ! হ! আপনের আগে আমারে সবাই Exploit-ই করছে। আমারে কেউই মানুষ বইল্যা ভাবে নাই।

কেন? আপনার বন্ধু অবনী? তিনি তো আপনাকে ভালোবাসেন খুব।

আমি মাইয়াদের কথা কইতাছি।

ও। তটিনী বলল।

তারপর স্তম্ভিত, দুঃখিত হয়ে তটিনী বলল, আপনি আমার পাশে এসে বসুন তো একটু।

আকাতরু পাশে না বসে তটিনীর পায়ের কাছে বসল।

তটিনী আকাতরুর মাথার কেয়াবনের মতন ঠাসবুনোন এবং ফিঙের মতন কালো চুলগুলো নিজের ডান হাতে নেড়ে চেড়ে এলোমেলো করে দিয়ে ওর মাথার তালুতে একটা চুমু খেল। যে-ঠোঁট দিয়ে সে অনেক অসৎ, দুষ্ট, অপবিত্র পুরুষের সর্বাঙ্গে চুমু খেয়েছে, সেই ঠোঁট দিয়ে।

তটিনীর মনে হল, আকাতরুর মাথাটাকেই অপবিত্র করে দিল যেন সে।

আকাতরু আনন্দে শিউরে উঠল। আর তটিনী লজ্জায়।

এমন সময়ে জয়ন্তীর বন-বাংলোর হাতাতে একটা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি এসে ঢুকল। একজন নেমে গেটটা খুলল। গাড়িটা হেডলাইট জ্বেলে গেটের ও-পাশে দাঁড়িয়ে রইল। আলোর বন্যাতে জঙ্গল পাহাড় আর নদীর অনুষঙ্গের জ্যোৎস্না রাতের মোহময়তা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। তার ওপরে গাড়ির ইঞ্জিনের আওয়াজ। গাড়িটার সাইলেন্সার পাইপটা ফুটো হয়ে গেছে। তাতে ইঞ্জিনের আওয়াজের সঙ্গে ‘গাঁক গাঁক’ আওয়াজ যোগ হয়েছে। হেডলাইট জ্বালা থাকায় ওদের দু-জনের চোখ ধেঁধে গেছিল। দেখতে পাচ্ছিল না কিছুই। গাড়িটা ভেতরে ঢুকে ওদের কাছে চলে এল। যে-লোকটি গাড়ি থেকে নেমে গেট খুলেছিল সে রোগামতো। চেহারাটা বড়োলোকের মোসাহেবের মতন। গাড়ি থেকে চারজন লোক নামল। সেই প্রথম লোকটিকে নিয়ে। ড্রাইভার গাড়িতেই বসে রইল।

কে যেন বলল, এই তো পাখি এখানে।

আকাতরু চিনতে পারল একজনকে। চানু রায়। আলিপুরদুয়ারেরর কুখ্যাত বড়োলোক। নামি মাতাল। নানারকম ব্যাবসা তার। লোকে বলে জঙ্গলের চোরাই কাঠেরও ব্যাবসা আছে। শিলিগুড়ি জলপাইগুড়ির কাঠ-চেরাই কল-এ সরাসরি ট্রাক-ট্রাক কাঠ চালান যায়। বনবিভাগের কোনো কোনো আমলার সঙ্গেও তার আঁতাত আছে বলে মনে হয়, নইলে অতকাঠ বের করে কী করে? মানুষটাকে দু-চোখে দেখতে পারে না আকাতরু। তবে বড়োলোক এবং ক্ষমতাবান বলে এড়িয়ে চলে।

চানু রায় এগিয়ে এসে বলল, অবনী নেই?

আকাতরু বলল, না। রেঞ্জার সাহেবের কাছে বাংলোয় গেছেন গিয়া।

তাই?

তারপর-ই বলল, নমস্কার তটিনী দেবী। আপনার সঙ্গে একটু কথা ছিল।

আমার সঙ্গে?

তটিনী উঠে দাঁড়িয়ে বলল।

তারপর বলল, আপনাকে তো আমি চিনি না।

কে আর কাকে চেনে বলুন? চিনতে আর কতক্ষণ লাগে? যদি চেনার ইচ্ছা থাকে। চা-বাগানে আজ আমরা একটু আমোদ-আহ্লাদের ব্যবস্থা করেছি। আপনাকে তাই নিতে এলাম। যদি গান করেন একটু। রাতে গেস্ট-হাউসেই থাকার বন্দোবস্তও করা হয়েছে। আপনার কোনো অসুবিধে হবে না। আর সম্মানী দেব আমরা দশ হাজার। কাল সকাল আটটার মধ্যে এখানে ফেরত দিয়ে যাব আবার।

দশ হাজার?

টাকার অঙ্কটা শুনে আকার মাথা ঘুরে গেল।

তটিনী বলল, আপনার বোধ হয় মাথা খারাপ হয়েছে। চিনি না শুনি না, আপনি কীভাবে এমন প্রস্তাব করেন? তা ছাড়া আমি এদিকে বেড়াতে এসেছি। মৃদুলবাবুও এসেছেন।

কে মৃদুলবাবু?

হলুদ গোলাপ-এর নায়ক, মৃদুল দাস।

অ। তাতে কী? ওঁর তো আপত্তি নেই কোনো।

উনিও যাবেন। মানে যাবেন বলে বলেছেন আপনাকে?

না, না উনি গিয়ে কী করবেন। ওঁর সঙ্গে আমার আলিপুরদুয়ারেই কথা হয়েছে। বলেছিলেন দশ হাজার অফার করলেই আপনি রাজি হয়ে যাবেন।

তটিনী প্রচন্ড রেগে গেল।

বলল, আমি তো মৃদুলবাবুর স্ত্রীও নই, বোনও নই। আমার ওপরে তাঁর কোন অধিকার যে, উনি আমার সম্বন্ধে বে-এক্তিয়ারে এমন কথা বলেন?

তা তো আমি জানি না তটিনী দেবী।

অবনীবাবুও কি আপনাকে কিছু বলেছিলেন এ-ব্যাপারে?

তটিনী বলল।

না। অবনী তো লোকাল ছেলে। সে কী করে আপনার সম্পর্কে আমার সঙ্গে কথা বলবে।

তারপর আকাতরুর দিকে ফিরে, চানু রায় বলল, আপনিও তো লোকাল। কলেজ পাড়াতে বাড়ি নয় আপনার?

হ।

আকা বলল।

আপনি এখানে কী করছেন?

আমি ওঁর বডিগার্ড।

চানু রায় হো হো করে হেসে উঠল।

বলল, বডিগার্ড। ব্ল্যাক-ক্যাট কমাণ্ডো। বাবা:। তটিনী দেবী যে, সঙ্গে বডিগার্ড নিয়ে ঘোরেন তা তো জানা ছিল না। সঙ্গে কি সেলফ-লোডিং রাইফেল টাইফেল আছে নাকি? এ. কে. ফর্টি সেভেন? চাইনিজ?

আকা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত রেখে বলল, না। সেসব তো থাকে স্মাগলারদের-ই।যারা কাঠ বা সোনার বিস্কিট-এর স্মাগলিং করে নানা ব্যাবসার ছুতার আড়ালে। আমার হাত দুইখান-ই যথেষ্ট।

চানু রায় খোঁচাটা নীরবে হজম করল।

তারপর বলল, বাবা: আপনি অনেক-ই খবর রাখেন দেখছি।

আপনার সম্বন্ধে রাখি না তবে স্মাগলারদের মোডাস-অপারেণ্ডির খবর কিছু কিছু রাখি। ডি.আই.জি. সাহেবের লগেও আলাপ আছে। একসঙ্গে ফুটবল খ্যালতাম আমরা।

চানু রায়ের মুখটা কালো হয়ে গেল। বলল, চক্রবর্তী সাহেব?

হ।

খুব অনেস্ট অফিসার।

হ। একশৃঙ্গ গন্ডার আর অনেস্ট পুলিশ অফিসার ত কেরমেই একেবারে দুষ্পাপ্য হইয়া উঠতাছে।

তাহলে আপনি যাবেন না আমাদের সঙ্গে তটিনী দেবী? আমি ফালতু লোক নই। আমার নাম চানু রায়। বাঘে-গোরুতে একঘাটে জল খায় এখানে আমার নামে। আপনার বডিগার্ডকে জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন। অবনী এবং এই ভদ্রলোকও মানে, আপনার বডিগার্ডও আমাকে চেনেন। আপনার নামটা যেন, কী?

আকাতরু রায়।

তাই বলুন। তা নইলে দুধে লালির সঙ্গে এতভাব।

মুখ সামলাইয়া কথা কইয়েন য্যান চানু বাবু। আপনের নামে বাঘে-গোরুতে এক ঘাটে জল ক্যান খায় তা আমি জানি। কিন্তু ইখানে গোরুর কারবার নাই। খালিই বাঘ।

তাই?

হ। তাই।

তাহলে আপনি যাবেন-ই না তটিনী দেবী?

কী করে বলেন আপনি যাওয়ার কথা ভেবে পাই না আমি।

এমন সময়ে ওদের মারুতি ভ্যানটা ফিরে এল। মৃদুল আর অবনী নামল।

এই যে অবনী!

অবনী চানু রায়কে দেখে অবাক হয়ে গেল।

বলল, আপনি চানুবাবু? এখানে।

অবাক হলেন নাকি? যেখানে মধু সেখানেই মৌমাছি। আমি যে, কখন কোথায় থাকি, বিশেষ করে উইক-এণ্ডে তা কি আমি নিজেই জানি?

মৃদুল তাড়াতাড়ি পকেট থেকে সিগারেট-এর প্যাকেট বের করে সিগারেট ধরাল। দেখে মনে হল সে যেন, বেশ নার্ভাস।

চানু রায় বলল, এই যে হিরো। কেসটা কী হল? আমি এদিকে বাগানে সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছি। ইয়ার দোস্তরা সব বসে আছে। আর এ কী শুনি মন্থরার মুখে? পিপিং থেকে আমার এক শাগরেদ আপনার জন্যে ভুটান মিস্ট হুইস্কিও জোগাড় করেছে।

পিপিং? সে তো চায়নাতে।

মৃদুল, বলার মতন কিছু খুঁজে পেয়ে, স্বস্তি পেয়ে যেন বলল।

দুর মশাই। পিপিং কী চায়নার কেনা নাকি? ভুটানেও ‘পিপিং’ আছে। ভুটানঘাট থেকে এগিয়ে গেলেই পিপিং। ভুটানের গিরিখাদ থেকে বেরিয়ে ওয়াঞ্চু নদী যেখানে এসে রায়ডাক হয়ে সমতলে ছড়িয়ে গেছে।

তাই?

মৃদুল বলল।

সে কথার উত্তর না দিয়ে চানু রায় বলল, এখন কী হবে মৃদুলবাবু?

কীসের কী?

আপনার হিরোইন যদি আমাদের সঙ্গে না যায় তবে তো আপনাকেই আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। ফাসখাওয়া অথবা জয়ন্তী নদীর শুকনো বুকের উপরে কাল সকালে যদি আপনার উলঙ্গ ডেডবডি পাওয়া যায় তবে আমাকে দোষ দেবেন কি?

মৃদুল বলল, কী হল কী? আপনি এসব কী বলছেন?

কী বলছি তা বুঝতে পারছেন না?

অবনী তাড়াতাড়ি মাঝে পড়ে বলল, চানুদা আপনি একটু ওদিকে চলুন তো! ব্যাপারটা কী বুঝি।

ব্যাপার বোঝার জন্য ওদিকে যাওয়ার দরকার কী অবনী? তোমাদের হিরো আমার কাছ থেকে পরশু শোয়ের শেষে পাঁচ-শো টাকার নতুন নোট নিয়েছেন দশখানি। দালালি। তোমাদের হিরোইনকে একরাতের জন্যে ঠিক করে দেবেন বলে। রেট নাকি দশ। বলেই পাঞ্জাবির ডান পকেটে হাত ঢুকিয়ে একটা খাম বের করল। বলল, এতে কুড়িখানি বড়োপাত্তি আছে। একেবারে টাঁকশালের গন্ধমাখা। এমন নেশাধরানো গন্ধ কোনো মেয়েছেলের শরীরেও নেই।

সাবধান। আপনেরে আমি সাবধান কইর‌্যা দিতাছি।

বলেই আকা চানু রায়ের দিকে এগিয়ে গেল।

সেই মোসাহেব গাড়ির দিকে ফিরে গিয়ে হাতে করে কী একটা নিয়ে ফিরে এল। তটিনীর মনে হল, রিভলভার টিভলবার হবে হয়তো।

তটিনী আকার হাত ধরল পেছন থেকে এসে।

চানু রায় বলল, এই পালাটার নাম কী অবনী?

কোন পালা?

এই এখন আকাতরু রায় আর তটিনী দেবী যে-পালাটি চালু করলেন।

মোসাহেব প্যাকেটটা মৃদুলের হাতে দিয়ে বলল, ভুটান মিস্ট-এর বোতলটা। যেমন কথা ছিল।

চানু রায় বলল, কথা আর কিছু নেই। ফেরত নিয়ে যা, গদাই বোতলটা। শালা বেইমানকে আর হুইস্কি খাওয়াতে হবে না।

গোলমাল শুনে ভেতর থেকে বাংলোর চৌকিদার অজয় ছেত্রী বাবুর্চিখানা থেকে দৌড়ে এল ফিনফিনে জাল লাগানো স্প্রিং-এর দরজা ঠেলে। বলল, কী হইছে স্যার? রেঞ্জার সাহেবরে কি খবর দিমু?

বলেই বলল, নমস্কার চানুবাবু।

চানুবাবু একটি লাল পঞ্চাশ টাকার নোট বের করে অজয়কে দিয়ে বললেন ভালো খবর তো সব অজয়।

হ্যাঁ স্যার।

নোটটা নিয়ে সেলাম করে অবস্থাটা যে, মনোরম নয় তা আন্দাজ করেই অজয় ভেতরে চলে গেল। যাওয়ার আগে একবার দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, আপনেরা কেউ কি জল খাইবেন স্যার?

না অজয়। জল খাব না। তবে একগ্লাস আমাকে দিতে পারো। মাথায় দেব। মাথা গরম হয়ে গেছে।

এরপর-ই চানু রায় সেই, গদাই নামক মোসাহেবকে বলল, ‘গদাই, মালটা ফেরত নিয়ে নে হিরোর কাছ থেকে। হিরো। কালচার্ড মানুষ। কথায় কথায় ইংরেজি ফোটায়। কবিতার আবৃত্তিকার। রোজ খবরের কাগজে নাম বেরোয়, প্রশংসা বেরোয় এইসব মানুষদের। ছবি বেরোয়। ছি:। কাগজ রাখাই বন্ধ করে দেব। শুধু যাত্রার বিজ্ঞাপন আর এইসব হিরোদের হিরোসিমা।’

ওই প্রচন্ড অস্বস্তিকর অবস্থাতেও হাসি পেল অবনীর চানু রায়ের সেন্স অফ হিউমার লক্ষ করে।

গদাই বলল, ‘মৃদুলকে, টাকাটা ছাড়ুন হিরো। যাত্রা করে তো অনেক-ই টাকা পান তার ওপরেও মেয়ের দালালি করে রোজগার কি, না করলেই নয়? তাও যদি মাল কন্ট্রোলে থাকত।’

মৃদুলের মুখ ছাই-এর মতন সাদা হয়ে গেছিল।

বলল, ‘নিয়ে আসছি। স্যুটকেস-এ আছে।’

যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়ে একবার আকাতরুর দিকে তাকাল ও। দেখল আকাতরু সত্যিই বাঘের মতন লাল চোখ করে তাকিয়ে আছে মৃদুলের দিকে। অবনী, তটিনী, এমনকী চানু রায়ও বুঝতে পারল যে, চানু রায় অ্যাণ্ড কোং চলে গেলেই আকাতরু মৃদুলকে আজ মেরেই ফেলবে।

মৃদুল বলল, চানুবাবু, আপনারা যেখানে যাচ্ছেন আজ রাতটা আমাকেও সেখানে নিয়ে যাবেন? তারপর আপনাদের সঙ্গেই ফিরে যাব আলিপুরদুয়ারে।

তারপর?

চানু রায় বলল। তারপর কী করবেন?

কলকাতায় যাব।

অবনী বলল, এখান থেকে জলপাইগুড়ি যাওয়ার কথা যে, আপনাদের। তাঁরা তো নিতে আসবেন পরশু। আপনাদের পুরো ইউনিটও কাল রাতেই বাস ভরতি করে ফিরে আসবেন কুচবিহার থেকে যে।

আমি যাব না জলপাইগুড়ি।

মেরে তক্তা করে দেবে। হাবু ঘোষকে তো চেনেন না।

সে ভেবে দেখব। আজকে নিয়ে যাবেন আমাকে?

ভিখিরির মতন ভিক্ষা চাইল মৃদুল চানু রায়ের কাছে।

চানু রায় বলল, চলুন। হিরো বলে ব্যাপার। গেলেই দেখবেন চানু রায় এক তটিনীর ভরসাতে বাঁচে না। ডিমা, নোনাই, কালজানি, জয়ন্তী, রায়ডাক নদীর দেশে অভাব নেই কোনো। কলকাতার হিরোইন না হলেও চলে যাবে। আমাদের মোদেশিয়া, নেপালি, ডুবকা, টোটো, রাভা, মেচিয়া, বাঙালিদের মধ্যে কি সুন্দরী নেই নাকি? তারা নাচ-গান জানে না?

থার্ড ক্লাস যত্ত।

বলেই, দু-হাত জড়ো করে তটিনীর কাছে ক্ষমা চাইল চানু রায়। বলল, তটিনী দেবী, বুঝতেই পারছেন, দোষটা আমার নয়। আমি যে, খারাপ তা সকলেই যেমন জানে, তেমন আমি নিজেও জানি। সপ্তাহে ছ-দিন হাজার ঝামেলাতে কাটে। বউ, পূজা-আচ্চা আর তার হা-ভাতে বাপের বাড়ির কল্যাণেই লেগে থাকে।

আর সে গুষ্টি তো নয়, রাবণের গুষ্টি। আমার নিজের প্রয়োজনে আমি বরবাদ হইনি। হয়েছি ওই হারামজাদা গুষ্টির জন্যে। আমার ওপরে বিয়ের পরদিন থেকে তারা বডি ফেলে দিয়েছে। শ্বশুরবাড়ি মানুষের কত আদর-যত্ন-সম্মানের-ভালোবাসার বাড়ি। আমার আজ ঘেন্না ছাড়া তাদের প্রতি কিছুমাত্রও নেই! এইটুকুই আমার আনন্দ ম্যাডাম।

এক একজন মানুষ, এক একরকম করে খুশি হয়। তার খুশি অন্যকে দুখি না করলেই হল। আমি খারাপ হতে পারি কিন্তু আমি ভন্ড নই আপনার হিরোর মতন। এইসব মানুষকেই সমাজ ‘শিক্ষিত’ বলে মানে। দূরদর্শনে এদের মুখ-ই দেখতে হয় আমাদের প্রতিসপ্তাহে একবার করে। এরাই নানা পুরস্কার পায়, পুরস্কার পাইয়ে দেয় অন্যকে। এই বঙ্গভূমের এই কালচার্ড খচ্চরদের মতন এমন হাড় হারামজাদা খচ্চর আর বোধ হয় হয় না।

এমন সময় মৃদুল বেরিয়ে এল হাতে ব্যাগ নিয়ে। তটিনীর মুখের দিকে তাকাল না। তাকাতে পারল না। আকাতরুর মুখের দিকেও নয়। অবনীর দিকে একটি চোরা চাউনি দিয়ে বলল, ‘চললাম’।

চানু রায় তটিনীকে আবারও নমস্কার করে বলল, ‘ক্ষমা কি পেলাম?’

তটিনী বলল, ‘সত্যি তো। দোষ তো আপনার নয়।’

চানু রায় আকাতরুকে বলল, ‘আচ্ছা ব্ল্যাক ক্যাট। চললাম। ভায়া—মেজাজটা বড়োগরম। আসলে মানুষটা তুমি বড়োসোজা। যে-জগৎটাকে মৃদুল সেন আর চানু রায়েরা কন্ট্রোল করছে সেই জগতে সটান সোজা আকাতরু গাছ হয়ে যদি কেউ বাঁচতে চায় তবে তার মরার দিন-ই এগিয়ে আসবে। দেখেশুনে পথ চলো ভাই। আগে তো নিজের প্রাণটা। নেহরুদের তিন জেনারেশান দেশটার যে-অবস্থা করে রেখে গেছে এখানে মানুষের মতন বাঁচার চেষ্টা করার মতন মূর্খামি আর নেই। হয় কুকুর-বিড়ালের মতন বাঁচো নয় সাপের মতন বাঁচো। Like snakes in the grass। এই বক্সাতে বিস্ট সাহেব বাঘ বাঁচাবার, বাঘ বাড়াবার চেষ্টা করলে হবে কী, বাঘ-ফাঘ-এর দিন শেষ হয়ে গেছে এই দেশে। খল, ধূর্ত শেয়াল হও, সুখে থাকবে। বেঁচে থাকবে।’

গাড়ির দরজা খুলে উঠতে উঠতে বলল, ‘আকাতরু ভাই তোমাকে এই আমার ফ্রেণ্ডলি অ্যাডভাইস। আমাদের বাড়িও আগে আলিপুরদুয়ারের কলেজ পাড়াতেই ছিল। তুমি আমার পুরোনো পাড়ার লোক বলেই এতকথা বললাম, চলি। গুড নাইট।’

ছয়

গাড়িটা হেডলাইট জ্বেলে চলে যেতেই আবার চাঁদের আলো স্পষ্ট হল। নদীর সাদা বালি আর পাথরের বুকের ওপরে, কী-একটা পাখি ভূতুড়ে ডাক ডেকে ফিরছে চমকে চমকে। সেই ডাক তটিনীর বুকের ভেতরটা পর্যন্ত চমকে দিচ্ছে। পাখিটা বলছে, ‘ডিড উ্য ডু ইট? ডিড উ্য ডু ইট? ডিড উ্য ডু ইট?’

পাহাড়ের ওপরে দাবানল আরও ছড়িয়ে গেছে। আলোর মালা ফুটে উঠেছে। কার গলাতে উঠবে সে মালা কে জানে!

উঠবে হয়তো কোনো অনাঘ্রাত সতী কুমারীর গলাতে। উলু দেওয়া হবে, শাঁখ বাজবে, আতর-জল ছড়াবে আর লাল গোলাপ দেবে ছোটোমেয়েরা। কবিতা ছাপা হবে দিদার, দাদুর। ঠাকুরদা, ঠাম্মার। বর আসবে টোপর মাথায় দিয়ে ফুল সাজানো গাড়িতে।

নদীর দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে তটিনীর দু-টি চোখ জলে ভরে এল।

অবনী বলল, আমি চান করে শুয়ে পড়ছি রে আকা। আমার একদম খিদে নেই। তুই কিন্তু তটিনী দেবীকে দেখাশোনা করিস। উনি আমাদের অতিথি। আলিপুরদুয়ারের সকলের-ই অতিথি। অনেক অপমান অসম্মান করেছি ওঁকে আমরা। তোর ওপরে ভার দিলাম যদি ক্ষততে সামান্য প্রলেপও দিতে পারিস।

আকাতরু অথবা তটিনী কেউই অবনীর কথার কোনো উত্তর দিল না। কিছু কিছু কথা থাকে, সেসব কথার উত্তর হয় না। কিছু কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন কোনো কথা না বললেই সব বলা হয়।

নদীর ওপারের পাহাড় থেকে গেকো ডাকল ‘টাকটু-উ-উ’। এপার থেকে তার দোসর সাড়া দিল টাকটু-উ-উ। তক্ষক যে তক্ষক, তারও প্রেমিক আছে। স্বার্থহীন, সৎ, ভালো প্রেমিক। অবশ্য তক্ষকের প্রেমিকাও ভালো। সে নিশ্চয়ই সতী।

আকাতরু বলল, ‘ফির‌্যা যাই আমি আলিপুরদুয়ারে। ওই মৃদুল দাসের মুখের জিয়োগ্রাফি আমি যদি না পালটাইয়া দিই ত আমার বাবা-মায়ের বড়ো-মায়ের দেওয়া নামডাই আমি বদলাইয়া ফেলাইম্যু। দেইখ্যেন আনে!’

তটিনীর দু-চোখের জল গড়িয়েই যেতে লাগল দু-গাল বেয়ে। গাল থেকে বুক বেয়ে এসে ব্লাউজ ভিজিয়ে দিল।

তটিনী বলল, দোষ তো ওদের কারোর-ই নয়।

ক্যান? নয় ক্যান?

আমিই যে, খারাপ, খারাপ, খারাপ।

আমারে ভগবান যদি, স্বয়ং আইস্যা এইকথা কয় তবুও আমি বিশ্বাস করুম না। আপনে খারাপ হইতেই পারেন না। পিরথিবীর যা-কিছু ভালো সেইসব ভালোর প্রতিনিধি আপনে।

হাতের ইশারায় ডাকল তটিনী আকাতরুকে কাছে। তারপর তার সামনে সিমেন্ট-বাঁধানো বসার জায়গাতে বসতে বলল।

আকাতরু তার সামনে গিয়ে বসল। তটিনী তার নিজের হাত দু-টি দিয়ে সারল্য, ভালোত্ব আর পবিত্রতার প্রতিমূর্তি আকাতরুর দু-টি গাল স্পর্শ করল, বড়ো আদরে, বড়ো যতনে।

আকাতরু কাছে আসাতে বুঝতে পারল যে, তটিনী কাঁদছে অনেকক্ষণ হল।

আকাতরু বলল, ম্যাডাম, আপনের দুই পায়ে পড়ি। আমার সামনে আপনে কাইন্দেন না, কোনোদিনও কাইন্দেন না। আমার পরানডা ভাইঙ্গা যায়। প্লিজ! প্লিজ! ম্যাডাম। বিশ্বাস করেন। আপনে আমারে বিশ্বাস...

দুধলি রাত আর তারাভরা আকাশ আর দাবানলের মালা আর রাতের নদীর বুকে চমকে চমকে ডেকে বেড়ানো ‘ডিড-ইউ-ডু-ইট’ পাখিটাই শুধু জানল আকাতরুর বুকের মধ্যে কী হচ্ছে।

এবং হয়তো তটিনীও জানল।

সাত

সারারাত-ই প্রায় জেগে কাটল তটিনী। এমন সুন্দর স্বপ্নের পরিবেশে, এর আগে কোনো রাত কাটায়নি ও। মিষ্টি মিষ্টি ঠাণ্ডা। এক চাদরের মতন। ছমছমে জ্যোৎস্নার রাত। চওড়া নদীর সাদা বুকে জ্যোৎস্না পড়ে নদীটাই আকাশ বা আকাশটাই নদী তা যেন, বোঝা যাচ্ছিল না। জয়ন্তী বন-বাংলোর উলটোদিকে, নদীর ওপারের পাহাড়ের মাথাতে আগুনের মালাটা মাঝরাতে নিভে এসেছিল। তটিনীর-ই মতো মালা পরাবার কোনো মনের মানুষ জোটেনি হয়তো সেই পাহাড়ের। চাঁদনি রাতে পাহাড়টাকে আরও রহস্যময় দেখাচ্ছিল। যা-কিছুই, যে-জনই একা, তাই ‘রহস্যময়’। তা নারীই হোক কী পাহাড়, কী পুরুষ। তারা দুঃখীও। সেই দুঃখের স্বরূপ শুধু তারাই জানে।যেকোনো অবিবাহিত পুরুষ অথবা নারীকে ভালো করে লক্ষ করলেই এইকথার সত্যতা বোঝা যায়। লক্ষ্য পাহাড় অথবা নদীকেও করা যায় কিন্তু প্রশ্ন করা যায় শুধুমাত্র মানুষকেই। নিজেদের দুঃখের কথা মানুষ যেমন, প্রকাশ করতে পারে, অন্য প্রাণীরা অথবা নদী বা পাহাড় তা পারে না। সারারাত কত কী পাখি ও প্রাণী ডাকল চারধারের বন থেকে, নদীর বুক থেকে, পাহাড় থেকে। কোনটা যে, কার ডাক তা তটিনী জানে না। আকাতরু তার পাশে থাকলে বলতে পারত। তার পাশে, শুধু তার মনকে ভালোবেসে আজ অবধি একজনও থাকেনি। কী জীবনে, কী খাটে। পুরুষগুলো বড়োবোকা। মেয়েদের শরীরে এসেই তাদের সব চাওয়া থেমে যায়। শরীরের কবরেই মন লীন হয়। ‘ভালোবাসা’ কাকে যে, বলে তা খুব কম পুরুষ-ই জানে। পুরুষেরা অধিকাংশই ওই চানু রায় বা মৃদুলদের-ই মতন পরম মূর্খ। তাই নিজেদের বুদ্ধিমান ভাবে। পুরুষমাত্রই ওভারকনফিডেন্ট নিজেদের সম্বন্ধে। বিধাতা প্রত্যেক নারীকে তারা অন্যরকম বলেই তাদের এক সহজাত বুদ্ধি দিয়েছে তাদের বর্ম হিসেবে। সে বর্ম সাদা চোখে দেখা যায় না।

জয়ন্তী নদীর চওড়া বুক ধরে, ঠিক আড়াআড়ি নয়, কোনাকুনি চলেছে ওদের জিপ। সাদা শুকনো পাথরময় নদীরেখা ধরে উথাল-পাতাল হতে হতে চলেছে ওরা। তবে বালি উড়ছে না। রাতের শিশিরে এখনও বালিতে আদ্রতা আছে।

একজোড়া পাখি বাংলোর হাতার মধ্যে অথবা হাতার সীমানার বাইরে, জয়ন্তী নদীর ধারের একটি গাছে শেষরাত থেকে মহা শোরগোল তুলেছিল। ভোরে উঠে বাইরে এসে, আকাতরুর সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করেছিল তটিনী সেই গাছ ও পাখিদের দেখিয়ে। আকাতরু বলেছিল, পাখিগুলোরনাম র‌্যাকেট ট্রেইলড ড্রঙ্গো। ফিঙে একধরনের। তবে মহা মারকুট্টে নাকি। ওদের ভয় পায় ওদের চেয়ে আয়তনে বড়ো অনেক পাখিই। যেখানেই থাকুক ওরা এমনি করেই সকলের ঘুম ভাঙায়। ভোরের ময়ূর-মুরগি জাগারও অনেক আগে ওরা জাগে। আর গাছেদের নাম, ‘ডিকরাসি’।

এবারে জয়ন্তী নদী ছেড়ে ওপাড়ে উঠল জিপ। সকালে জয়ন্তী বনবাংলোয় চৌকিদার অজয় ছেত্রী জবরদস্ত নাস্তা করিয়ে দিয়েছিল। জয়ন্তী গ্রামে রসগোল্লাটা নাকি গৃহশিল্প। দুধ প্রচুর এবং সস্তা বলে এখানের বাড়ি বাড়ি রসগোল্লা বানিয়ে রাজাভাতখাওয়া এবং আলিপুরদুয়ারে চালান দিয়ে দু-পয়সা রোজগার করে নেয় স্থানীয় মানুষেরা।

অবনী বলছিল ওদের।

নদীটা পেরোবার পথেই একটি দো-তলা কাঠের বাড়ি বাঁ-পাশে। ওটি একটি লাইমস্টোন কোয়ারির বাড়ি। বন্যা দয়া করে গ্রাস করতে করতেও করেনি। ছেড়ে গেছে।

তটিনী বলল, এসব অঞ্চলে অনেক খনিজ জিনিস পাওয়া যায়, না? মানে ধাতু?

যায়-ই তো। পাহাড়ের গায়ে গায়ে যে, সাদা সাদা দাগ দেখছেন, চাঁদনি রাতে যেসব জায়গাকে মনে হয় বরফাবৃত, সেইসব জায়গাতে হয় ধস নেমেছিল, কখনো, নয় খোঁড়াখুঁড়ি করে নানা ধাতব আকর বের করা হয়েছিল একসময়।

কী কী ধাতব আকর পাওয়া যায় এখানে?

অনেক কিছু।

তবু।

ডলোমাইট, লাইমস্টোন, ক্যালসেরাস টুফা, কপার ওর, কয়লা, আয়রন ওর, ক্লে ইত্যাদি। এইসব ধাতব আকরের জন্যেই তো পুরো বক্সা বনাঞ্চল-ই বিপদগ্রস্ত। পাহাড়ে পাহাড়ে খোঁড়াখুঁড়ি চললে, ট্রাকের পর ট্রাক চললে, বনের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাবে না। একোলজিকাল ব্যালান্স নষ্ট হয়ে যাবে তো।

তাই?

তাই তো।

বাবা:! আপনি কত জানেন।

তটিনী বলল।

অবনী লজ্জিত হয়ে বলল, আমি তো এই অঞ্চলেই জীবন কাটালাম। এসব জানি একটু-আধটু তবে গাছ, পাখি, ফুলের কথা আকা জানে আমার চেয়ে অনেক বেশি। এসব আমরা জানলে কী হবে? আমরা কি আপনার মতন অভিনয় জানি না, গান গাইতে জানি?

অভিনয় আর আমি কতটুকু জানি?

তা ঠিক।

অবনী বলল।

তারপর বলল, অভিনয়ে মৃদুলবাবু আপনাকে অনেক গোল দিয়ে দেবেন।

আকা বলল, সক্কালবেলা! তুই আর অন্য কোনো মানুষের নাম পাইলি না? ওই লোকটার নামও উচ্চারণ করিস যদি আর একবার।

সত্যি তো। কিন্তু মানুষটা গেল কোথায়?

তটিনী বলল।

যেখানেই যাক। থাকা-খাওয়ার অসুবিধে হবে না চানু রায়ের হেপাজতে যখন আছে। চানু রায় মানুষটা যেমন খারাপ, আবার ভালোও।

তুই অরে ভালো কইতাছিস?

আকা ধমকে বলল।

ভালোই তো। যে-খারাপ মানুষকে খারাপ বলে চেনা যায়, যে, নিজেও স্বীকার করে যে, সে খারাপ তাকে নিয়ে ভয় নেই। কিন্তু মৃদুলবাবুদের মতন আঁতেল যাঁরা, যাঁদের আমরা দূরদর্শনে দেখি প্রায়-ই, দেখি খবরের কাগজের পাতায়, ধুমসো চেহারা আর থুম্বো মুখের, যাঁরা মদ খেয়ে আর দলবাজি করে বঙ্গভূমের তাবৎ সংস্কৃতির সাহিত্যিক সাংগীতিক পরিবেশের স্বনিয়োজিত রক্ষক, তাঁদের নিয়েই বিপদ। এই জানোয়ারগুলোর মাত্র দুটো পা থাকাতেই এরা এ-জন্মে বেঁচে গেল।

কদ্দিন বাঁইচা থাকব। আমি হালারে হালুয়া বানাইয়া ছাড়ুম। আর্ট-কেলচার করণ চিরজীবনের মতো বন্ধ কইর‌্যা দিমু।

আঃ। ছাড়-না।

অবনী বলল।

তারপর বলল, তোর এই এক দোষ আকা। তোর হাতে কি এই পৃথিবীর ভার দিয়েছেন ভগবান? তুই কি ডন কিয়টে? যে পৃথিবীর, যে-প্রান্তে যা অন্যায় হচ্ছে, তার-ই প্রতিবিধান করার দায় নিয়ে এখানে এসেছিস। শান্ত হ। তোর নিজের জীবনের শান্তি বাহ্যিক কারণে নষ্ট করে লাভ কী?

সেই ত হইল গিয়া কথা। পরের অশান্তি যে, একদিন নিজের হইয়া উঠব এ-কথা বোঝে কোন ব্যাটায়। আমাগো স্বভাবও হইল গিয়া ওইরকম। নিজের পায়ে জুতার চাপ না পড়ন পর্যন্ত আমাগো হুঁশ-ই আসে না। ইটাই ট্রাজেডি।

আবারও নদী!

স্বগতোক্তি করল তটিনী।

তটিনী আজ সকালে একটা ছাইরঙা তাঁতের শাড়ি পরেছে। কালোরঙা ব্লাউজ। চোখে কাজল দিয়েছে গাঢ় করে। কালো টিপ পরেছে কপালে। সাদারঙা ঝুঠো মুক্তোর মালা আর বালা পরেছে গলাতে আর ডান হাতে। শ্যাম্পু করেছে না, শিকাকাই বুঝতে পারছে না আকাতরু কিন্তু সদ্যস্নাতা তটিনীকে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে যাওয়া জিপের মধ্যে, খুব-ই কাছ থেকে দেখতে পেয়ে খুশিতে সে, মরে যাচ্ছে। কী গন্ধ মেখেছে তটিনী কে জানে? বিলিতি সেন্ট-টেন্ট-এর নাম তো ও জানে না। জানতে চায়ও না। তটিনীর কোনো পারফ্যুমের দরকার-ই নেই। তার গায়ের নিজস্ব গন্ধটা যদি একবার পেতে পারত আকাতরু তবে তাতেই ভালো লাগাতে অজ্ঞান হয়ে যেত। তটিনীর মতন মেয়েরা যে। কেন নিজের গায়ের গন্ধে আকাতরুর মতন হতভাগ্য পুরুষদের পেতে দেয় না। তটিনী যেন, কোনো ফুল! কাছে থাকাতেই আমোদিত হচ্ছে আকা।

আবারও বলল তটিনী, আবারও নদী!

অবনী বলল। হুঁ।

কী যেন, ভাবছিল সে।

তারপর বলল, একটা নয়। তিন তিনটে নদী পেরিয়ে যেতে হয়, জয়ন্তী থেকে ভুটানঘাটে যেতে হলে। জয়ন্তী, ফাসখাওয়া আর চুনিয়া ঝোড়া। এখন সহজে যেসব নদীর বুকের উপর দিয়ে জিপ পেরিয়ে যাচ্ছে বর্ষাতে সেইসব নদীর চেহারা যদি, দেখতে পারতেন তাহলে বুঝতেন এরা কীরকম।

কীরকম মানে?

মানে, প্রলয়ংকরী। মানে, আপনার যেমন রূপ এই সকালে। কত পুরুষ-ই যে ঐরাবতের মতন ভেসে যাবে না জেনেই।

শব্দ না করে মুখ টিপে হাসল তটিনী একটু।

প্রশংসাতে খুশি ভগবানও হন। আর তটিনী তো কোন ছার।

বেশ ভালো লাগছিল ওর। বহুবছর এমন ভালো লাগেনি। পুরুষের মুগ্ধ-দৃষ্টিতে ভালো লাগে সব মেয়ের-ই। কিন্তু সেই মুগ্ধতা —একধরনের বন্যতা আকাতরুর মতন বন্য কোনো পুরুষের জংলি চোখের দিকে চেয়ে।

একটি গান শোনান-না।

অবনী বলল।

পাগল! এই লাফানো-ঝাঁপানো জিপে বসে! সে তো পপ মিউজিক হয়ে যাবে। গান থাক। তার চেয়ে আপনি বলুন তো কী কী নদী আছে আপনাদের এই বক্সা অঞ্চলে।

নদীর অভাব কী? কত্ত নদী।

স্বগতোক্তি করল, ভেতরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টায় ব্যাপৃত আকাতরু। ও ভাবছিল, ও যদি অবনীর মতন কলকাত্তাইয়া ভাষাতে কথা বলতে পারত। তবে ও, তটিনীকে সব-ই বলত। পশ্চিমবঙ্গবাসী সংস্কৃতিসম্পন্ন তটিনী আকাতরুর ভাষার ধাক্কাতে যেন চমকে চমকে ওঠে। কিন্তু আকাতরুর পুববাংলার ভাষাতে যা-প্রাণ, যা-দম, যা-ফুর্তি তা কী চিবিয়ে চিবিয়ে বলা পশ্চিমবঙ্গীয় ভাষাতে আছে!

অবনী বলল, পানা, ডিমা, বালা, ফাসখাওয়া, রায়ডাক আর সংকোশ।

আর একটু ডিটেইলস-এ বলুন, ওইসব নদীদের সম্বন্ধে কি আর কিছুই বলার নেই?

আছে বই কী। বলছি। একটু পরে কিন্তু আমরা একটা চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে যাব। তার নাম ‘তুরতুরি’।

তুরতুরি? বা: কী সুন্দর নাম!

হ্যাঁ। এই বক্সা অঞ্চলে তুরতুরি ছাড়াও আরও অনেক চা-বাগান আছে। যেমন রায়ডাক, ঢালাঝোড়া, কোহিনুর, নিউল্যাণ্ডস, সংকোশ, কুমারগ্রাম, রায়মাটাঙ্গ, চিঞ্চুলা, গাঙ্গুটিয়া, মাজেরডাবরি, আচাপাড়া।

আকাতরু বলল, ভাটপাড়া, চুয়াপাড়া, রাধারানি, ডিমা, কানখাওয়ায় দোষ করল কী? আর...

আর থাম এবারে। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-না? ‘ভালো, বেশি হয়ে গেলে আর ভালো থাকে না। কম বলেই তা ভালো।’ চা-এর সেলসম্যান আমি থোরিই। ওইতেই হবে।

তা-যা কইছস।

কলকাতার তটিনী হাসি হাসি মুখে আলিপুরদুয়ারের এই দু-জন মানুষের সঙ্গ খুব-ই উপভোগ করছিল। এই সারল্য, কলকাতার কোনো মানুষের-ই মধ্যে পাওয়ার নয়। কলকাতাতে ‘সারল্য’র মতন পাপ আর দু-টি নেই। অপরাধও নয়। বক্র আর কুটিলদের শহর ওই কলকাতা।

এবারে নদীর কথা বলুন।

তটিনী বলল।

তারপর ভাবল,কী চমৎকার কাটছে আজকের সকালটা। আকাশে মেঘ করে এসেছে। বোধ হয় বৃষ্টি হবে। উদলা আকাশের নীচে বসন্তে বাদলা বাতাস বইছে। ‘‘আজ সকালবেলার বাদল আঁধারে/আজ বনের বীণায় কী সুর বাঁধা রে।’’

বনে না এলে, প্রকৃতির মধ্যে একাত্ম না হতে পারলে, রবীন্দ্রনাথের গানকে বোধ হয় হৃদয়ংগম করা যায় না। বাণীর মানেই না বোঝা গেলে গান যে, গান হয়ে ওঠে না। কলকাতার লাল রায়, নীল সেন, বাসন্তী রায়, বেগুনি দাশগুপ্ত, সর্বজ্ঞ গুহঠাকুরতাদের মতন ঝাঁক ঝাঁক রবীন্দ্রসংগীত শিল্পীদের এইকথাটা যদি বোঝানো যেত।

অবনী সিগারেটটা হাত বাড়িয়ে পথে ফেলে বলল, ‘পানা’ নদীর জন্ম ভুটানে। এই পানা নদী বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পর পশ্চিমের সীমানা নির্ধারণ করে বয়ে গেছে। ‘ডিমা’র উৎসও ভুটান পাহাড়েই। ভুটান পাহাড় থেকে নেমে এসে পানা আলাইকরি নদীর সঙ্গে মিশেছে। তারপর বয়ে গেছে আলিপুরদুয়ারের মধ্যে দিয়ে। আর ডিমা নদীর সঙ্গে গাঙ্গুটিয়া এবং রায়মাটাঙ্গ নদী এসে মেশার পর এই একত্রিত তিন নদীর নাম হয়েছে ‘কালজানি’।

আর বলার কথা কইলি না?

আকাতরু বলল, ইন্টারাপ্ট করে।

বলছি তো। তুই-ই বল-না তাহলে। আমি বললে কথার মধ্যে এতকথা বললে বলতে পারব না।

হ। হ। আমি আর কথা কম্যু না। তুই-ই ক। তটিনী দেবী কি আর কখনো আইবেন এই আমাগো ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে? তাই ভালো কইর‌্যা সব বুঝাইয়া দে উনারে।

বক্সা পাহাড় থেকে নেমে এসেছে বালা নদী। থেলচাঙ্গ আর কালকূট নদী এসে মিশেছে বালাতে। বালা গিয়েও পড়েছে সেই কালজানি নদীতেই।

তাই?

হ্যাঁ।

আর যে জয়ন্তী পেরিয়ে এলেন, তা বেরিয়েছে ভুটানের সীমান্তের জয়ন্তী পাহাড় থেকে। ফাসখাওয়া আর হাতিপোতা ফরেস্ট ব্লক-এর সীমানা চিহ্নিত করে বয়ে গেছে জয়ন্তী।

আর ফাসখাওয়া?

অন্য নদীগুলোর কথা এখন থাক। একটু জল খাই। বলেই প্লাস্টিকের পার্লপেট-এর জলের বোতল খুলে, ড্রাইভারকে বলল, একটু থামো তো ভাই। জল খেয়েনি।

অবনীর জল খাওয়া হলে তটিনী বলল, আপনি এতসব জানলেন কী করে?

অবনী হাসল, আমার বড়দা ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টেই কাজ করতেন। বাবার মৃত্যুর পরে এই দাদাই আমাদের মানুষ করেন। সেই সময়ে এই সমস্ত অঞ্চলে আমার থাকবার সুযোগ হয়েছিল।

তাই বলুন। আচ্ছা, আমরা যে, ভুটানঘাট বাংলোতে থাকব, সেখান থেকে ভুটান কত দূর?

কাছেই। তাই তো নাম ভুটানঘাট। বাংলোর সামনে দিয়ে বয়ে গেছে রায়ডাক নদী। আশ্চর্য সুন্দর তার রূপ। এক একরকম রূপ, এক এক ঋতুতে। এই রায়ডাক নদীও এসেছে ভুটান থেকে। পিপিং-এ নিয়ে যাব আপনাকে। ভুটানের সেই পিপিং-এ পৌঁছে ওয়াঞ্চু নদী সমতলে পড়েছে। ভারতে। পড়েই চওড়া হয়ে গেছে। পিপিং অবধি পর্বতের পর পর্বতের মধ্যের গিরিখাত দিয়ে প্রবাহিত হয়ে এসেছে ওয়াঞ্চু। ভুটানঘাট-এর সামনে দিয়ে বয়ে গিয়ে নর্থ রায়ডাক, সেন্ট্রাল রায়ডাক, মারাকাটা এবং নারাখালি ফরেস্ট ব্লক-এর মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে রায়ডাক নদী। এই নদীর বিশেষত্ব হচ্ছে যে, সমতলে এসে সে, গতএক-শো বছরে বহুবার গতিপথ বদলেছে। একঘেয়েমি বোধ হয় রায়ডাক-এর একেবারেই পছন্দ নয়। আমাদের কার-ই বা ইচ্ছে করে একই পথ বেয়ে আজীবন চলতে। কিন্তু নদী তো নদীই। আমরা নদী হলে আমরাও আমাদের গতিপথ বার বার বদলে ফেলে নিজেদের নবীকৃত করতাম। উনিশ-শো পাঁচ, উনিশ-শো তিরিশ, উনিশ-শো তেত্রিশ, উনিশ-শো পঞ্চাশ এবং সবশেষ উনিশ-শো আটষট্টিতে গতিপথ বদলেছে রায়ডাক। এই গতি পরিবর্তনের পাগলামির খেসারত দিতে হয়েছে মারাত্মকারে বনকে। সেন্ট্রাল রায়ডার আর মারাকাটা ব্লক একেবারে তছনছ হয়ে গেছিল। আটষট্টির পরে রায়ডাক-এর পুরোনো খাত-এর ওপরে একটা ‘সসেজ’ বোল্ডার-বাঁধ বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর থেকে বর্ষাতে সেন্ট্রাল রায়ডাক আর মারাকাটার তেমন ক্ষতি হয়নি।

এমন সময় আকাতরু হঠাৎ বলে উঠল, থামা ত, তর নদীর ইতিহাস।

বলেই বলল, তটিনীকে উদ্দেশ্য করে, অ্যাই দ্যাখেন, আমরা এহনে চূর্ণঝোড়াও পার হইয়া আইলাম। ফাসখাওয়া ত আগেই পারাইছি। তা বোঝবেন ক্যামনে? রিভার রিসার্চ ইনস্টিট্যুটের অফিসারের মতন যা বকবকান বকবকাইতাছে পোলায় তার আর কী কম্যু! তুরতুরি বাগানে ঢুকুম আমরা একটু পর-ই। তারপর ময়নাবাড়ি বিটে পৌঁছামু। মাইমেনসিঙ্গা সুভাষবাবু আছেন বিট অফিসার। শুঁটকি মাছ খাইবেন নাকি ম্যাডাম?

শুঁটকি মাছ?

চোখ কপালে তুলে বলল তটিনী।

তারপর বলল, আপনি শুঁটকি মাছ খান? ইস। আপনি বাঙাল যে, তা জানতাম, এমন পচা বাঙাল তা তো জানতাম না!

হঃ।

অপমানটাকে ঝেড়ে ফেলে আকাতরু বলল। শুঁটকি মাছের ট্যাস্ট যে, একবার পাইছে, স্যা মানুষের অবস্থা মাংসর সোয়াদ পাওনের পর মানুষখেকো বাঘের মতন হইয়া যায় আর কী। বোঝলেন কি না!

তারপর বলল, জলে না নাইম্যাই সাঁতার শেখন কি যায়? আপনেই কয়েন।

আকাতরুর উদ্ভট উপমাতে হাসি পেল তটিনীর। সাধে কী আর বাঙালদের ‘বাঙাল’ বলে পশ্চিমবঙ্গের পুরোনো বাসিন্দারা! ঠিক-ই বলে।

ও হেসে বলল, আমার সাঁতার শিখে কাজ নেই। ভুটানঘাট আর কতদূর?

এই ত তুরতুরি বাগানের এলাকা প্রায় পেরিয়ে এলাম। বাঁ-দিকে সামনে একটু দাঁড়াতে হবে। সুভাষদার সঙ্গে দেখা করে যেতে হবে।

অবনী বলল।

একটু পরেই গাড়িটা দাঁড়াল বাঁ-দিকে।

বিট অফিস এটা।

অবনী বলল।

সেটা কী আবার?

ফরেস্ট-এর নানা ভাগ থাকে। তেমন থাকে আমলাদেরও। এক একটি ফরেস্ট ডিভিশন-এর বড়োসাহেব হচ্ছেন ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার। মানে ডি.এফ.ও.। তাঁর নীচে থাকেন কয়েকজন রেঞ্জার। এক একটি রেঞ্জ-এর ভারপ্রাপ্ত অফিসার। এক একটা রেঞ্জ আবার কয়েকটি বিট-এ ভাগ করা থাকে। প্রত্যেকটি বিট-এর জন্যে থাকেন, এক একজন বিট অফিসার। এক একজন বিট অফিসারের নীচে থাকেন, কয়েকজন ফরেস্ট গার্ড। এবারে বুঝলেন।

হ্যাঁ। তাহলে এ.ডি.এফ.ও-টা কী জিনিস?

এ.ডি.এফ.ও. দুরকম হয়। অ্যাসিস্যান্ট ডি.এফ.ও. বা সিনিয়র রেঞ্জার। আর অ্যাডিশনাল ডি.এফ.ও। আজকাল সারাদেশেই সরকারি চাকুরেদের মধ্যে গাজোয়ারি ওপরে ওঠার এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কী কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে, কী রাজ্য সরকারের। ওপরওয়ালার খেতাবটি ব্যবহার করার বড়োই লোভ দেখা যায়। যেমন ওপরওয়ালাদের দেখা যায়, গাড়িতে লাল বাতি জ্বালিয়ে পদমর্যাদা বেড়েছে এমন ভাবা। এদিকে তাঁদের মধ্যে অনেকেই জানেন না যে, সাধারণ মানুষের মনোভাব বিচার করলে তাঁদের গাড়ির মাথাতে লাল বাতি না জ্বালতে দিয়ে তাঁদের প্রত্যেকের পেছনে একটা করে লাল বাতি জ্বেলে দেওয়া উচিত। তাই অ্যাডিশনাল ডি.এফ.ও-দের ভুলক্রমে এ.ডি.এফ.ও. বললেই তাঁরা হামলে পড়ে কল্যাণবাবুর মতন বলেন ‘‘অ্যাডিশনাল বলুন, অ্যাডিশনাল।’’

একজন পান-খাওয়া রোগা-সোগা ভদ্রলোক বিট অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন।

অবনী বলল, সুভাষদা, এই যে, তটিনী দেবী। আলিপুরদুয়ারে এসেছিলেন যাত্রার জন্যে।

আসেন আসেন। নামেন একটু। পায়ের ধুলা দিয়ে ধন্য করেন আমাগো চা খাইয়া যান এককাপ।

মাত্র পঁয়তাল্লিশ মিনিট হল সকালের জলখাবার খেয়ে বেরিয়েছি। আজ থাক মানে, এখন থাক। ফেরার পথে হবেখন।

তটিনী বলল, বিনয়ের সঙ্গে।

অবনী ও আকাতরু গাড়ি থেকে নামল। অবনী বলল, পাঁচ মিনিট একটু সুভাষদার সঙ্গে দেখা সেরে আসছি ম্যাডাম।

ঠিক আছে।

তটিনী বলল।

তটিনীর মন বলল, ওঁরা নিশ্চয়ই চানু রায় আর মৃদুলবাবু সম্বন্ধে কথা বলতে গেলেন। গত রাতের ঘটনাটার কথা মনে হতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল তটিনীর। মৃদুলকে ও পছন্দ কোনোদিনও করেনি। কিন্তু অপছন্দ করা আর ঘৃণা করার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান আছে। কলকাতার পরিবেশ যেমন প্রতিদিন দূষিত থেকে দূষিততর হয়ে যাচ্ছে, দূষিত হচ্ছে প্রতিবেশও। এইসব মানুষদের সঙ্গেই দিন কাটাতে হয়। ভাবলেই বুকের মধ্যে একটা কষ্ট অনুভব করে। পুরুষগুলো কি সবাই এমন বজ্জাত? কে জানে! তা নয় বোধ হয়। আকাতরুরাও তো আছে। মেয়েদের মধ্যেও বজ্জাত কম নেই। সে নিজেও তো বজ্জাত-ই। তাকে ভালো কে বলবে?

গাড়ির পেছনের সিটে বসে সামনে তাকাল। কাঁচা, কোরা রঙের ধূলিধূসরিত পথটি সোজা চলে গেছে গাছগাছালির মধ্যে দিয়ে। বাগানের প্রান্ত এলাকা। বাগানের মধ্যে যে, বড়ো বড়ো গাছগুলোলাগানো হয়, কী নাম কে জানে! আকাতরু জানবে। সেই গাছগুলো ছাড়া অন্য গাছ নেই। বাঁ-দিকে গভীর জঙ্গল দেখা যাচ্ছে।

ওপরে চেয়ে দেখল, চমৎকার নীল আকাশ। ঝকমক করছে রোদ। রোদের কুচি উড়ছে যেন, হাওয়ার সঙ্গে। বিট অফিসে যাওয়ার পথের বাঁ-দিকে পথপাশে একটা ছোট্টডোবা মতন। তার কিনারে কলমিশাক ফুটেছে। অজস্র। চার-পাঁচটি পাতিহাঁস ভেসে বেড়াচ্ছে ‘প্যাঁ-এ-ক প্যাঁ-এ-ক’ শব্দ করে। সামনের মাটির বাড়ির দাওয়াতে একটা তিন-চার বছরের ছেলে, যার নিম্নাঙ্গ নগ্ন কিন্তু ঊর্ধ্বাঙ্গে একটি নীলরঙা বুকছেঁড়া হাফ-শার্ট, কোঁচড়ে মুড়ি রেখে নিবিষ্টমনে একটি একটি করে মুড়ি তুলে, তা সে গুনে গুনে খাচ্ছে। কোথাও কোনো তাড়াহুড়ো নেই। অবকাশ-ই অবকাশ। দু-টি ছাগল নিয়ে এক বুড়ি হেঁটে চলেছে পথ বেয়ে। কে জানে, কোথায় চলেছে। আজ বোধ হয় হাট আছে, এই ময়নাবাড়িতে। দু-একজনকে ধামাতে করে আনাজপাতি নিয়ে যেতেও দেখল। কারোর-ই কোনো তাড়া নেই। না হাঁসেদের, না ছেলেটির, না বুড়ির, না অন্য কারোর। ভারি ভালো লাগছিল তটিনীর। ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল ওর। পুকুরপাড়ে মধুচুষি ফুলের ঝোপের মধ্যে বসে থাকত ছোট্টমেয়ে তটিনী এমন-ই নিস্তব্ধ দুপুরে। ফড়িং উড়ত। মরা নদীর সোঁতার পাশের সজনে গাছের ডালে নীলকন্ঠ পাখি উড়ে এসে বসত। হরেকৃষ্ণ দলুই-এর বাড়ি থেকে তার নব্বুই বছরের বুড়ি মা বাতের ব্যথায় কঁকিয়ে কাঁদত। নিস্তব্ধ ঘুঘুডাকা দুপুরে চিলের কান্নার সঙ্গে সেই কান্না মিশে যেত। তটিনীর সমস্ত ছেলেবেলাটা ফ্রেমে-বাঁধানো কোনো ছবির-ই মতন তার মনের চোখে একঝলক ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল। খুব-ই গরিব ছিল ওরা। কিন্তু আজকে কলকাতার ফ্ল্যাট, মারুতি গাড়ি, চাকর-ঝি, ফ্রিজ, ভিসিআর, টিভি, বেডরুমে এয়ার কণ্ডিশনার, বসবার ঘরে সোফাসেট, কার্পেট এসব কোনো কিছুর মূল্যেই ছেলেবেলার সেই, আশ্চর্য দিনগুলিকে কেনা যাবে না। যা গেছে, তা গেছে চিরদিনের-ই মতন।

অবনীবাবুরা ফিরে এল। ড্রাইভারও। বোধ হয় সিগারেট খাচ্ছিল গাড়ির পেছনে গিয়ে। সুভাষবাবু গাড়ি অবধি এসে বিদায় জানালেন। দু-টি গন্ধরাজ লেবু দিলেন তটিনীর হাতে। বললেন, আমার বাগানের। ওখানে লেবু পাওয়া যায় না। তাই দিলাম। ভুটানঘাট বাংলোর চৌকিদার মানবাহাদুর খুব ভালো মসুর ডাল রাঁধে। মসুর ডালের সঙ্গে খাইবেন ভাত দিয়া।

তটিনী মুখে ধন্যবাদ না দিয়ে, হাসল একটু। ধন্যবাদ বা ‘‘থ্যাঙ্ক ইউ’’ সব জায়গাতে বলা যায় না। বলা উচিতও নয়। গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা পাতাসুদ্ধু দু-টি গন্ধরাজ লেবুও যে, এক মস্ত উপহার হতে পারে এ-কথা কলকাতাতে বসে ভাবা পর্যন্ত যায় না।

গাড়ি ছেড়ে দিল। একটু এগিয়ে গিয়েই গাড়িটা বাঁ-দিকে মোড় নিল। পথে একটি চেকনাকা ছিল বনবিভাগের। সেটি পেরিয়ে, নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে পড়ল গাড়ি।

হাতি। হাতি। ওই যে।

বলে, চেঁচিয়ে উঠল তটিনী।

আকাতরু হাসল। বলল, না।

হাতি-না?

হাতি হইব না ক্যান? হাতি নিশ্চয়ই!

তবে?

হাতি দেখে উত্তেজিত গলাতে বলল তটিনী, ছোট্টমেয়ের মতো।

হাতি নিশ্চয়ই। কিন্তু জংলা হাতি না।

তবে? জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, আর জংলা হাতি নয় কেমন?

আপনেও ত জঙ্গলেই আইছেন। তাই বইল্যা আপনেও কি ‘জংগলি’? কী যে কন?

অবনী আকার কথাতে হেসে ফেলল।

আকা আবার বলল, ওই হাতিটা মাইয়া হাতি।

মানে? হস্তিনী?

হ! হেইটার নাম হইল গিয়া প্রমীলা।

তাই?

হ! ফরেস্ট ডিপার্টের হাতি। অনেকদিন আগে চান করণের সময়ে পায়ের ছিকলখান খুইল্যা দিছিল ওর মাহুতে। জঙ্গলের মধ্যের ঝোড়াতে চান করতাছিল প্রমীলা। হেই সময়েই সে, পেরথমবার জঙ্গলে পলাইয়া যায়।

তার এক প্রেমিক আছে।

অবনী বলল।

তারপর বলল, এক-ই প্রেমিক। প্রকান্ড দাঁতাল। অল্প ক-দিন আগেই একবার রাতের বেলা পালিয়ে গেছিল। বার বার পালায় জঙ্গলে কিন্তু প্রেমিক বদলায় না। খুব ভালোবাসা দু-জনের।

তটিনী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তাই?

হ। হাতিটা সুভাষদার-ই সম্পত্তি কইতে পারেন। ময়নাবাড়ির বিটের এই সম্পত্তি।

কী করেন সুভাষবাবু হাতি দিয়ে?

তটিনী বলল।

কী করেন না তাই কন?

আকাতরু বলল।

ডুয়ার্স আর আসামের জঙ্গলে হাতি, উড়িষ্যার জঙ্গলে মোষ, উত্তরপ্রদেশের ড্রাই ইলাকায় উট কত কাজেই যে, লাগে তা কহনের নয়।

তাই?

বলল তটিনী।

আট

মসুর ডাল, কাঁচালঙ্কা, কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে রাঁধা, কড়কড়ে করে আলু ভাজা, এঁচড়ের তরকারি, খুব বড়ো বড়ো পিস করে কাটা তেলঅলা পাকা রুইয়ের ঝোল, ভেটকি মাছের কাঁটা চচ্চড়ি দিয়ে দুপুরের খাওয়া সেরে ঘুম লাগিয়েছিল তটিনী। এতঘুম যে, কোথায় কী করে জমে ছিল তা তটিনী ভেবেই পাচ্ছে না। শরীর এবং মনও যেন, ছেড়ে দিয়েছে একেবারে। এলিয়ে দিয়েছে। ‘আনওয়াইজিং প্রসেস’ শুরু হয়েছিল রাজাভাতখাওয়াতেই। তা গতিজাড্য পেয়েছিল জয়ন্তীতে এসে। আর ভুটানঘাটে এসে সেই চড়াই যেন, শেষ হল আপাতত।

ভারি সুন্দর বাংলোটি ভুটানঘাটের। কাঠের দো-তলা বাংলো। চওড়া বারান্দা ও বসবার ঘর আছে দো-তলাতে। একতলাতেও বারান্দা আছে। বাংলোর কিছুটা দূর দিয়েই ওপারের ভুটানের উত্তুঙ্গ পাহাড়শ্রেণির পা ছুঁয়ে আর গভীর বনরাজির মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে রায়ডাক নদী। ঝরঝর শব্দ করে। কাছেই বোধ হয় জলের মধ্যে একাধিক প্রপাত আছে। একই ডেসিবেল-এ জোরে জল পড়ার শব্দ। হয়েই যাচ্ছে অবিরাম। শব্দটি হয়তো এক-ই থাকবে কিন্তু রাতের বেলা যখন বন-বাংলো সংলগ্ন পরিবেশ অনেক বেশি শান্ত হবে, বনবাণীও নিথর হবে তখন এই শব্দকেই নিশ্চয়-ই আরও অনেক জোর বলে মনে হবে।

নদীতে যাওয়ার পথ করা আছে একটা। নদীর কাছেই পাম্প-হাউস। আর আছে একটি বানানো ‘‘নুনী’’। SALT LICK। রাজাভাতখাওয়া-জয়ন্তী রোডের ওপরের টাওয়ারের কাছে যেমন আছে, সাংহাই রোডের মোড়ে, এখানেও বস্তা বস্তা নুন ফেলে রেখেছেন বনবিভাগ বাংলোর কাছেই। সেখানে ভরদুপুরেও চিতল হরিণেরা নুন চাটতে এসেছে। গভীর হরজাই জঙ্গলের মধ্যে সেই নুনী। রায়ডাক নদী, নদীর ওপাড়ের ভুটানের আকাশছোঁয়া পাহাড় এবং তারও উপরে নির্মেঘ কলুষহীন সুনীল আকাশ মিলেমিশে মনে হচ্ছে একটি ফ্রেমে-বাঁধানো ছবি।

আকাতরু আর অবনীবাবু বলেছিলেন, বিকেলে নদীতে বেড়াতে নিয়ে যাবেন বাংলোর সামনের পথ দিয়ে হাঁটিয়ে। তারপর নদীর বিস্তীর্ণ বালি আর নুড়িময় বুক ধরে হেঁটে ফিরে আসবে বাংলোতে।

ঘুম থেকে উঠে ও দো-তলার বাংলোতে বারান্দার ডানকোণে চেয়ার পেতে নদীর দিকে চেয়ে বসেছিল। ওরা দু-জনে নীচের ঘরে উঠেছেন একইসঙ্গে। ওঁরাও বারান্দাতে বসে কথা বলছিলেন। মনে হচ্ছিল যেন, ওর পাশে বসেই কথা বলছেন ওঁরা। এমন নিস্তব্ধ পুরো অঞ্চল। বাংলোর পেছন দিকে বাবুর্চিখানা। কে যেন, বালতি নামাল সিমেন্ট-বাঁধানো চবুতরাতে। তাতেই কত শব্দ হল। তবে হাওয়া আছে জোর। নদীর উপর দিয়ে বয়ে আসছে সে-হাওয়া। বেশ ঠাণ্ডা হাওয়া। এখন-ই শীত শীত করছে। রাতে কম্বল গায়ে দিয়ে শুতে হবে সব দরজা-জানলা বন্ধ করে।

কথা আছে বিকেল চারটেতে চা নিয়ে আসবে চৌকিদার মানবাহাদুরের হেল্পার। তারপর ওরা হেঁটে বেরোবে যাতে, দিনের আলো থাকতে থাকতে বাংলোতে ফিরে আসতে পারে। এইসব অঞ্চলেরজঙ্গল এমন-ই নিশ্ছিদ্র যে, ভেতরে চোখ যায় না। দু-পাশ থেকে জঙ্গল ঝুঁকে পড়েছে পথের ওপরে। ভয় করে দেখে। তা ছাড়া এইসব জঙ্গলে বাঘ তো আছেই, কিন্তু বাঘের থেকে যত না ভয় তার চেয়ে অনেক-ই বেশি ভয় সাপের এবং হাতির।

নীচ থেকে অবনীবাবু বললেন, লুঙ্গি-টুঙ্গি ছেড়ে তৈরি হয়ে নে আকা। সাড়ে তিনটে বেজে গেছে। চারটেতে চা খেয়ে না বেরোলে আলো থাকতে থাকতে ফিরে আসা যাবে না।

হ।

আকা বলল।

তারপর বলল, আমার কিছুই ভালো লাগতাছে না রে অবু।

বুঝেছি।

কী বুঝছস? আমি এহনে কী করুম তাই ক!

মরেছিস তুই। আমি কিছুই করতে বলি না।

তার মানেডা কী? তুই আমার বন্ধু কি বন্ধু না?

বন্ধু বলেই তো বলছি। সারাটা জীবন তুই উলটোপালটা কাজ করে এলি। কলেজপাড়ার নমিতা তোকে এত ভালোবাসে। পালটি ঘর। কত গুণের মেয়ে। এত করে বললাম তোকে। মাসিমারও ভীষণ-ই পছন্দ অথচ তোর...

হঃ। কার সঙ্গে কার তুলনা!

তটিনীকে নিয়ে তুই কী করতে চাস?

সকলেই যা করে। বাড়ির বউ। তুই নলিনীকে নিয়ে যা করছস। সকলেই যা করে।

তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে।

তটিনী কত ঘাটের জল খাওয়া মেয়ে, সে-সম্বন্ধে তোর কোনো ধারণা আছে?

আস্তে কথা ক। শুইন্যা ফ্যালাইলে বেচারি মনে দুঃখ পাইবনে।

দুঃখ পাওয়ার তো কিছু নেই। তটিনী কি নিজে জানে না এ-কথা? তা ছাড়া আমি তো তাকে শোনাবার বা আঘাত দেওয়ার জন্য এ-কথা বলছি না। বলছি, তোর-ই ভালোর জন্যে। ওর ঘর তো দো-তলার বাঁ-দিকে। এই দিকের কথা শুনতে পাবে না। তা ছাড়া সে তো এখনও ঘুমোচ্ছে। মানবাহাদুরকে বলা আছে, চারটের সময়ে চা নিয়ে গিয়ে দরজাতে ধাক্কা দেবে।

তবু। তুই আস্তে আস্তে কথা ক।

অবনী আকাতরুর কথার কোনো উত্তর দিল না।

আকা বলল, কথা কইস না ক্যান?

কোনো কথা নেই আমার। তোর মাথাটা গেছে।

হয়তো। অবশ্য আমি কী আর বুঝি না যে, আমার কুনোই যুগ্যতা নাই তারে পাওনের। আমার ভালোবাসাই হইব আমার সব যুগ্যতা। আমি বাকিজীবন তার চাকর হইয়া থাকুম।

তোকে সে চাকর রাখলে তো? যাদের সকাল বিকেল চাকর পালটানো অভ্যেস তাদের তোর মতো গোঁয়ার-গোবিন্দ বাঙাল চাকরের প্রয়োজন নেই। তাদের প্রয়োজন টাকার। তোর ভালোবাসাতে তাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বারো বছর বয়স থেকে তারা ভালোবাসা টেনে-ছিঁড়ে ভালোবাসার ওপরে বিরক্ত হয়ে গেছে। পুরুষের ভালোবাসা আর মুসলমানের মুরগিপোষা যে, এক-ই গোত্রীয় তা তারা ভালো করেই জানে। ভালোবাসার কথা বললে, তারা হাসবে।

হাসব? কইস কী রে? এমন বুকা মাইয়াও আছে নাকি এই পৃথিবীতে যে, ভালোবাসা বুঝে না। বিশেষ কইর‌্যা যে, কুখনো পেরকৃত ভালোবাসা কারে কয় তাই জানে নাই।

অবনী হেসে উঠল আকাতরুর কথাতে।

হাসলি ক্যান? ইডিয়ট?

হাসলাম এইজন্যে যে, তোর পেরকৃত ভালোবাসা তটিনীর চোখে বিকৃত ভালোবাসা বলে ঠেকবে। ও যাত্রার নায়িকা। তুই ওর সঙ্গে যাত্রার ডায়ালগ দিয়ে পারবি? তুই একটা ছাগল।

মুখ সামলাইয়া কথা কইস য্যান।

না হলে কী করবি?

তোর মাথা ফাটাইয়া দিমু।

হ্যাঁ। জানিস তো ওই গুণ্ডাগিরি। তুই একটা ঘটোৎকচ। তোর মতন একটা গ্রস, দুর্গন্ধ বাঙালকে কলকাতার তটিনীর ভালো লাগবে কেন, তার একটা কারণ আমাকে দেখাতে পারিস? জাস্ট একটা?

ক্যান পারুম না। আমার মতন শুদ্ধ ভালোবাসা অরে অর জীবনে আর কেউই বাসে নাই যে, এইটাই হইল গিয়া যথেষ্ট কারণ। ও মাইয়ার মগজ বইল্যা কিছু যদি থাইক্যা থাকে ত সে নিশ্চয়ই বুঝবো আনে। সে তোর মতন ছাগল নাকি?

অবনী বলল, ঘটোৎকচ!

তারপর-ই বলল, তোর যা ইচ্ছে হয় তাই কর। তোর এলেম থাকে তুই ভালোবাস, তুই তার সঙ্গে শুয়ে পড়, বিয়ে কর, যা খুশি তাই কর। কিন্তু সব-ই করতে হবে নিজের এলেমে। আমার বিন্দুমাত্র সাহায্য তুমি পাবে না তা বলে দিলাম। জিইয়ে রাখা কইমাছের মতন নমিতাকে আমি আর মাসিমা জিইয়ে রেখেছি তোর জন্যে। তুই জানিস কত ভালো সম্বন্ধ এসেছিল মেয়েটার, আমরা সেসব সাবোটাজ করেছি দিনের পর দিন। তুই হলি গিয়ে ধাঙ্গড় বস্তির শুয়োর। ময়লা খাওয়াই তোর অদৃষ্ট। ফলমূল তোর ভোগে লাগবে কেন?

আকাতরু কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল। তারপর বলল, ঠিক আছে। আজ চা খাওনের পর তর আর যাইতে হইব না। আমি একাই তটিনীরে লইয়া যামু নদীতে।

মাথা খারাপ। তোর এখন যা-অবস্থা। তোর সঙ্গে একা তটিনীকে ছেড়ে দেওয়ার মতন দায়িত্বজ্ঞানহীন আমি নই। আমার নিজের দায়িত্বে তাকে এই জঙ্গলে এনেছিলাম। তাও মৃদুলবাবু সঙ্গে থাকলে আমার দায়িত্ব অনেক কম থাকত। কাল রাতে উনি চলে যাওয়াতে আমার দায়িত্ব বেড়ে গেছে অনেক। অমন কাঁচাকাজ আমার দ্বারা হবে না। তুই যদি স্বাভবিক থাকতিস তাহলেও অন্যকথা ছিল। তুই তো এখন খ্যাপা কুকুর। কামড়াবি না, আঁচড়াবি ওকে একা পেলে তা ঈশ্বর-ই জানেন!

আকাতরু আহত হয়ে চুপ করে গেল।

একটু পরে বলল, অরে পিপিং-এ লইয়া যাবি না?

যাব। কাল সকালে।

হুঁ।

পিপিং-এ গিয়ে কীই বা দেখবে।

ক্যান? ওয়াঞ্চু নদী কেমন কইর‌্যা ভুটানের দুই পাহাড়ের চিপা থিক্যা বারাইয়া হঠাৎ ছড়াইয়া গেছে সমতলে তা কী দেখার নয় নাকি? তর চক্ষু কখনো আছিল যে, তুই দেখতে পাইবি। হঃ।

তাও শীতকালে হলে হত। ভুটান থেকে কমলালেবু এসে পিপিং-এর হাটে কমলালেবুর পাহাড় জমত তখন। এই ন্যাড়া পিপিং দেখে কী হবে?

স্যা তর বোঝনের কাম নাই। যার চক্ষু আছে স্যা ন্যাড়া মাথাতেও চুল দেইখ্যা লয়। অ্যারে কয় ইমাজিনেশান। বুঝলি কিনা মাস্টর। ইম্যাজিনেশান! তুই ইসবের কী বোঝস?

নয়

চা খাওয়ার পর ওরা তিন-জনে বেরিয়ে পড়ল।

গাড়ি নেবেন না?

তটিনী বলল।

নিতে পারেন। ড্রাইভার তো বসেই আছে। কিন্তু হেঁটে গেলে পথটাকে অনেক ভালো করে দেখতে পেতেন। তা ছাড়া, আকার মতন গাইড তো আর রোজ রোজ পাবেন না। সে তো এখানে প্রতিটি গাছ, ফুল, লতা, পাতা সব-ই চেনে। চিনতে চিনতে পথ চলতে পারবেন।

হাতি বা বাঘ যদি বেরিয়ে পড়ে।

বাঘ বেরোবে না। এখানের বাঘেরা সব অসূর্যম্পশ্যা। যদিও নাম ‘‘টাইগার প্রোজেক্ট’’, কেউই এ-অঞ্চলে বাঘ দেখতে পান না। বাঘেরা শহুরে কবি-সাহিত্যিক-গায়ক-বাদকদের মতন ‘এগবিশিনাস্টি’ প্রাণী নয়। ‘অন্তর্মুখীনতা’ শব্দটার মানে যে কী, তা বাঘদের দেখে শিখতে হয়। ‘‘আমাকে দ্যাখো’’, ‘‘আমাকে দ্যাখো’’ —এই সস্তা স্লোগান নেই তাদের। তবে বাঘ যে আছে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। আর হাতি যদি বেরোয় তবেও ভয়ের কিছু নেই। আমার বন্ধু আকাতরু নিজেই সাক্ষাৎ গণপতি। চেহারা দেখে কি আপনার ওকে হাতি নয় বলে মনে হয়। হাতি বটে, তবে মাকনা। দাঁত নেই।

তারপর একটু চুপ করে থেকে অবনী বলল, আকাতরুর নিজের ধড়ে প্রাণ থাকতে আপনার বিন্দুমাত্র ক্ষতি কোনো মানুষ কী জানোয়ার-ই করতে যে, পারবে না, তা কি গতরাতে বোঝেননি?

তটিনী আকার দিকে মুখ তুলে হাসল একফালি। অমন সুন্দর বৈশাখী বিকেলে অমন ফুল-ফলন্ত বনে, অমন সুন্দর অথচ বিবাগি নদীতটে, অমন মৌনী, আকাশচুম্বী পাহাড়শ্রেণির পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না তটিনীর। ও ভাবছিল, মানুষ বড়োবেশি কথা বলে।

অবনীর মন বলল, গেল। গেল। ছেলেটার সর্বনাশের যা-বাকি ছিল, তা সম্পূর্ণ হল। এমন মার সে, সইবে কী করে যখন, অভিজ্ঞ অবনীর বুকের মধ্যেটাও তটিনীর মরা আলোর মতো সুন্দর, আশ্চর্য সেই হাসির ছোঁয়া লেগে ‘ধড়াস ধড়াস’ করতে লেগেছে?

সকালে পরা শাড়ি-জামা ছেড়ে একটি চাঁপারঙা সিল্কের শাড়ি পরেছে তটিনী। লাল ব্লাউজ।

কে দেখবে, কে জানে!

মেয়েরা বোধ হয় কারোকে দেখাবার জন্যে সাজগোজ যতটা করে, তার চেয়ে বেশি করে, নিজেদের মধ্যে নিজেকে স্বীকৃত করার যে-জন্মগত তাগিদ আছে, সেই তাগিদেই। নইলে এই পান্ডববর্জিত জায়গাতে, ঘন ঘন পোশাক বদলাবার কী আছে? অবনী তার আকাতরু তো মানুষের মধ্যেই গণ্য নয়।

হাতে পরেছে প্লাস্টিকের লালরঙা চুড়ি অনেকগুলো করে। দু-হাতেই। লাল প্লাস্টিকের দুল। কাজলও পরেছে। ওই চোখে কাজল লাগালে যে, দু-চোখের কণীনিকার পটভূমিতে চোখ দু-টির মণিতে, আঁখিপল্লবে, উড়ে যাওয়া কালো পাখির ডানার মতন ভুরুতে অতলান্ত হয়ে ওঠে সে-কথা কি তটিনী নিজে জানে? হয়তো জানে। জানে বলেই হয়তো ইচ্ছে করে বধ্যভূমিতে আকর্ষণ করে বোকা পুরুষদের।

এটা কী বাঁশ?

তটিনী বলল, আঙুল তুলে দেখিয়ে।

বলল, এর আগে কোথাওই দেখিনি তো!

‘‘আগে কখনোও’’ দেখেননি এমন জিনিস এই ‘‘পুরোনো’’ পৃথিবীর আনাচে কানাচে পাবেন। মৃদুলবাবুর মতন যাঁরা বলেন যে, এই পৃথিবীটা বড়োই পুরোনো হয়ে গেছে তাঁরা বোধ হয়, কখনোই দু-চোখ মেলে, এই সুন্দর পৃথিবীর দিকে একবারও তাকাননি!

ওই বাঁশের নাম ‘মাকলা বাঁশ’।

আকা বলল।

বাঁশ অনেকরকম হয় বুঝি?

হয় না ত কী?

তটিনীর আকার কথা শুনে মজা লাগল খুব। সবসময়েই যে, ধমকে ধমকে কথা বলে। যেন, কোনো অদৃশ্য শত্রুর সঙ্গে অনুক্ষণ লড়াই করছে সে।

আর কী কী বাঁশ হয় এইসব অঞ্চলে?

মাকলা ছাড়াও হয় দাওয়া বাঁশ, লাঠি বাঁশ, তামা অথবা ছোয়া বাঁশ।

লাঠি বাঁশ দিয়ে কি লাঠি হয়?

হয় তো।

বা:। আমাকে জোগাড় করে দেবেন তো একটা। বেশি মোটাও নয়, বেশি সরুও নয়।

কাকে মারবেন লাঠি দিয়ে?

অবনী হেসে বলল।

কত লোক আছে মারার। চোর-ছ্যাঁচোড়ের তো অভাব নেই। তা ছাড়া মাঝে মাঝে নিজেকে মারার কথাও মনে হয়। নিজের মধ্যেও তো খারাপত্ব কম নেই!

বা:! সুন্দর বলেছেন।

অবনী বলল।

তারপর বলল, আপনি এমন কথা বলেন তটিনী দেবী যে, মনে হয় সবসময়েই যাত্রার ডায়ালগ বলছেন। তবে এ-ডায়ালগ কোনো গ্রাম্যযাত্রা নয়, যেন, ভীষণ সফিস্টিকেটেড কোনো অডিয়েন্সের জন্যে বিশেষভাবে পরিকল্পিত কোনো সফিস্টিকেটেড যাত্রা।

হঠাৎ আকা বলল আঙুল তুলে, ওই দ্যাখেন। লজ্জাবতী লতা।

কই? কই?

ওই যে। চান। আগে দ্যাখেন নাই কুখনো?

না:।

ওইগুলির ইংরেজি নাম হইল গিয়া ‘মিমোসা পুডিকা’।

বাবা:। আপনার কি ‘বটানি’ ছিল নাকি? কলেজে?

আকা উত্তর দিল না।

একটু চুপ করে থেকে বলল, আমি ল্যাখ্যাপড়া তেমন শিখি নাই। মাঝে মাঝে মনে হয়, না শিখ্যা দুষ করি নাই কুনো। শিখলে হয়তো মৃদুলবাবু হইয়া যাইতাম।

তটিনী চুপ করে থাকল।

অবনী বলল, থাক, ওই অপ্রিয় প্রসঙ্গ থাক।

মানুষটা কোথায় চলে গেল বলুন তো? ওই চানুবাবুরা তাকে মেরেটরে ফেলবে না তো? হয়তো শুকনো নদীর বেড-এ কোথাও ডেডবডি ফেলে রাখল।

তারপর-ই বলল, আচ্ছ, বৈশাখের একেবারে গোড়াতেই এখানের সব নদীর এমন শুকনো অবস্থা কেন? অন্য সব জায়গাতে তো বৈশাখের শেষে অথবা জ্যৈষ্ঠ মাসেই নদী শুকোয় দেখেছি।

তারপরে একটু থেমে বলল, অবশ্য আমি আর কত জায়গাতেই বা গেছি?

অবনী বলল, ঠিক-ই বলেছেন। কিন্তু এসব তো ভাববার অঞ্চল।

‘ভাববার’ মানে?

এইসব অঞ্চলের এই বিশেষত্ব। হিমালয়ের পাদদেশে দুরকমের জঙ্গল দেখা যায়। ভাববার আর তেরাই। ভাববার জঙ্গলের বিশেষত্ব হচ্ছে, এই অঞ্চলের নদীগুলো পাহাড় থেকে সমতলে নেমে কিছুদূর যাওয়ার পর-ই ডুবসাঁতার দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।

আকা বলল মানে, অন্তঃসলিলা হইয়া যায় আর কী!

অবনী বলল, সেই কারণেই এখানকার সব গাছাগাছালির শিকড় মাটির নীচে অনেকদূর অবধি নেমে যায় জলের সন্ধানে। এই শিকড়গুলোর নাম ‘ট্যাপ রুটস’।

নদীগুলো কি আর মাথা তোলে না?

তোলে বই কী। বেশ কিছুদূর ডুবসাঁতারে গিয়ে মাথা তোলে। ওই কারণেই ভাববার অঞ্চলে নানা গাছগাছালি দেখা যায়, যা, অন্যান্য অঞ্চলে দেখা যায় না।

একবার সুন্দরবনে গেছিলাম। সেখানে দেখেছিলাম, গাছেদের শিকড়গুলো সব দাঁত বের করে থাকে ভাটার সময়ে।

তাই তো। সেই শিকড়ের নাম এরিয়্যাল রুটস। তারা দিনের মধ্যে দু-বার মাথা উঁচিয়ে বারো ঘণ্টা না থাকতে পারলে তো পচেই যেত।

অবনী বলল।

সত্যি! প্রকৃতির মধ্যে কত যে, রহস্য। আমার জঙ্গলে আসতে ভারি ভালো লাগে। ভালো লাগে বলেই তো আলিপুরদুয়ারে যাত্রা শেষ হতেই আপনাদের জ্বালিয়ে দিয়ে এখানে এলাম।

আকাতরু বলল, আমরা দাহ্য পদার্থ না। আমরা নিজেরা যদি নিজেদের ইচ্ছাতে না জ্বলি তবে অন্যর সাধ্য কী আমাগো জ্বালায়? কী বল অবনী?

ঠিক।

অবনী বলল।

ওরা পাটকিলেরঙা ধুলোর পথ বেয়ে হাঁটতে হাঁটতে নদীর কাছে পৌঁছে গেল। বাঁ-দিকে পথ চলে গেছে পিপিং-এ।

নদী এখানে অনেকটাই চওড়া। পথের দিকে বিস্তীর্ণ চর। তার ওপরে নুড়ি বিছানো। পথের ধুলোতে ট্রাকের চাকার দাগ দেখল। তটিনী বলল, বা: কী সুন্দর! কিন্তু ট্রাক এখানে কী করতে আসে?

কী করতে আর? নুড়ি-পাথর বয়ে নিয়ে যায়।

ইস। নদীর বুক যে, ফাঁকা হয়ে যাবে।

তটিনী চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বলল।

নদীর বুক নারীর বুক নয়। অত সহজে তা ‘শূন্য’ হয় না। যা হারায় নদী, তা পরের বছর-ই পুরিয়ে নেয়। রবীন্দ্রনাথের সেই গানটার মতন।

কী গান?

তটিনী শুধোল।

‘‘আমারে তুমি অশেষ করেছ এমনি লীলা তব

ফুরায়ে দিয়ে আবার ভরেছ জীবন নব নব।’’

অবনী বলল।

বা:।

তটিনী স্বগতোক্তি করল।

এমন সময়ে হঠাৎ কী মনে পড়াতে অবনী বলল, আমার একবার বাংলোতে ফিরে যেতে হবে।

ক্যান?

আকাতরু শুধোল।

রাতে কী রান্না হবে তাই বলে আসতে ভুলে গেছি মানবাহাদুরকে। তা ছাড়া আগামীকাল একটা পাঁঠা কিনতে বলেছিলাম। সেজন্যে আজ-ই টাকা দিয়ে কারোকে পাঠাতে হবে ময়নাগুড়িতে সুভাষদার কাছে। রেঞ্জার সাহেবের জিপ আসবে কী যেন কাজে একটু পরেই। ড্রাইভারের হাতে টাকাটা পাঠাতে হবে। নইলে সকালে পাঁঠা কিনে তা কেটেকুটে ভুটানঘাটে পাঠাতে পারবেন না সুভাষদা। সাইকেল নিয়ে লোক আসবে ময়নাগুড়ি থেকে রোদ চড়া হওয়ার আগে আগে।

কাল সকালে পাঠাবার বন্দোবস্ত করলে হত-না? আমাদের ড্রাইভারও তো পৌঁছে দিয়ে আসতে পারে।

তটিনী বলল।

তা হবে না। আমরা কাল চা খেয়েই চলে যাব পিপিং।

পিপিং শুদামুদা যাইয়া কী অইব? এখন তো কমলার সময় নয়। কমলার সময়ে পিপিং-এ যখন কমলার পাহাড় লাগে তখন যাইলেই না মজা!

আকাতরু বলল।

সবসময়ই মজা। ওয়াঞ্চু নদী হ্যাঙ্গিং ব্রিজ-এর নীচ দিয়ে বয়ে এসে যখন, সমতলে ছড়িয়ে গেল তখনকার দৃশ্যই আলাদা।

ঋষিকেশ-এর গঙ্গার মতন?

হ্যাঁ। প্রায় সেরকম-ই।

বলেই বলল, না। আর সময় নষ্ট করলে অন্ধকার হয়ে যাবে। অন্ধকারে এই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়া সেফ হবে না। সঙ্গে টর্চ পর্যন্ত নেই একটা। কিন্তু তোরাই বা ফিরবি কী করে? তোদের সঙ্গেও তো টর্চ নেই।

আমরা নদীর বুকে বুকে ফিরব ত, জলের উপর আলো থাকে অনেকক্ষণ। তর যদি যাইতেই হয় ত আর দেরি কইর‌্যা কাম নাই। চইল্যাই যা তুই।

হ্যাঁ। তাই যাই।

অবনী বলল।

তারপর বলল, আপনাদের জন্যে চায়ের জল বসিয়ে, পেঁয়াজি বেসনে ডুবিয়ে রাখতে বলব, যাতে গিয়ে পৌঁছোলেই গরম গরম পেঁয়াজির সঙ্গে চা খেতে পারেন। আমি চলি। তোরা সাবধানে আসিস আকা এই সময় নদীতে সব জানোয়ার জল খেতে যাবে। নজর রেখে চলিস। বাংলোর কাছে অনেকখানি জায়গাতে পৌঁছোতে পৌঁছোতে তো সন্ধে হয়ে যাবে। না:। আমরা বড্ড দেরি করে বেরোলাম বাংলো থেকে। কী করবি? আমার সঙ্গেই ফিরে যাবি?

আকাতরুর মুখটি যেন, শুকিয়ে গেল।

তটিনী বলল, এমন এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে চাই না আমি। ভুটান পাহাড়ের পায়ের কাছ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পাশে পাশে এই আশ্চর্য সুন্দর নুড়িময় নদীরেখা ধরে হেঁটে যাওয়ার সুযোগ কী জীবনে আর আসবে? আপনি যান অবনীবাবু। এমন জায়গাতে এসে, এমন অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে চাই না আমি।

বেশ। তবে আমি যাই।

বলে, অবনী বড়ো বড়ো পা ফেলে যে-পথে এসেছিল, সেই পথেই ফিরে গেল।

অবনী ঘন বনের মধ্যের পথের বাঁকে অদৃশ্য হয়ে যেতেই আকা বলল, আসেন। আমরা আউগ্যাইয়া যাই।

চলুন।

তটিনী বলল, স্বপ্নাদিষ্টর মতন।

পায়ে পায়ে ওরা দু-জনে বালি পেরিয়ে নদীর নুড়িময় বুকে এসে দাঁড়াল। রায়ডাক নদীটা একটু এগিয়েই সুন্দর একটা বাঁক নিয়ে মিলিয়ে গেছে বনের মধ্যে। পিপিং-এর দিকে গেছে নদী। ওরা আরও কিছুটা গিয়ে জলের পাশে দাঁড়াল। তারপর-ই সেই সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে গিয়ে বোবা হয়ে গেল তটিনী। ঠিক এইরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সামনে, এর আগে কখনোই দাঁড়ায়নি সে।

বেলা পড়ে এসেছে। হালকা কমলারঙা আলোয় হাসছে যেন, সাদা নুড়িময় তটভূমি, দ্রুতবেগে ধাবমানা নদী, পেছনের গভীর জঙ্গলাবৃত উঁচু পাহাড়শ্রেণি, ভুটান হিমালয়ের। আর ওদের পেছনেও গভীর জঙ্গল, হরজাই গাছের। গভীর বললেও সব বলা হয় না। বলতে হয় নিশ্ছিদ্র। কোথাও কোনো শব্দ নেই, শুধু জলের শব্দ আর জলের উপরে হাওয়ার শব্দ ছাড়া। পিপিং-এর দিক থেকে হাওয়াতে সাদা সাদা কী যেন, উড়ে আসছে আলতো হয়ে। তারপর নদীর জলে এসে পড়ছে। তারপর নদী তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দ্রুতবেগে। নদীতে, ভাঁটিতে দু-তিনটি ছোট্টপ্রপাত এই এক কোমর বা এক মানুষ মতন হবে। তাতেই প্রচন্ড শব্দ উঠছে। কাছে গেলে, ভালো করে দেখা যাবে। শব্দও নিশ্চয়ই আরও অনেক জোর হবে।

মন্ত্রমুগ্ধের মতন দাঁড়িয়ে রইল তটিনী সেই ভুটান-কন্যা ত্রস্ত তটিনীর দিকে চেয়ে। তার নিজের শরীরে মনেও এমন আগলখোলা বিবসনা হয়ে দৌড়ে যাওয়ার এক তাগিদ অনুভব করল যেন ও। তার পাশেই দাঁড়িয়ে শালপ্রাংশু এক আদিম পুরুষ। ভান-ভন্ডামিহীন, তথাকথিত শিক্ষাহীন, খাঁটি, ভন্ডামিহীন একজন মানুষ। ‘‘আদম’’-এর মতন আদিম। সেই মানুষটা তাকে ভালোবাসে। খুব-ই ভালোবাসে। জানে তটিনী। তার আদম-এর পাশে দাঁড়িয়ে তারও ‘‘ইভ’’ হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল। আদম আর ইভ-এর মতন নগ্ন হয়ে, এই সমুখের বয়ে যাওয়া নৃত্যরতা আদিম তটিনীর মতন বিরাট এবং পাহাড়ের মতন সকল, মহিরুহর মতন নীরব আকাতরুকে সমর্পণ করে দেয় নিজেকে। সে নিজে প্রকৃতি বলেই, পুরুষের মধ্যে, যথার্থ পুরুষের মধ্যে লীন হয়ে যেতে, এই পরম লগ্নে, এই গোধূলি লগনে ভারি ইচ্ছে করল ওর।

শব্দটি বোধ হয় ‘ইচ্ছে’ নয়। তার চেয়েও তীব্রতর, তীব্রতম কিছু। একেই কি কাম বলে? কে জানে! ঋতুমতী হওয়ার পর থেকে পুরুষের কাম-এর শিকার হয়েছে ও, ঠিক-ই কিন্তু নিজের ভেতরের কাম-এর উপস্থিতি সম্বন্ধে সম্পূর্ণই অনবহিত ছিল এতগুলো বছর। অন্য দশজন মেয়ের মতন সেও শালীন, সভ্য এবং চাপা ছিল তার শরীরী অভিব্যক্তিতে। তার ভেতরে এই অনুভূতিও যে, এমন তীব্রভাবে উপস্থিত ছিল, তা এই মূহূর্তের আগে ও জানেনি।

আকাতরু কোনো আদিম আদিবাসী শিমুলের মতন তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। না, বহমান রায়ডাকের দিকে চেয়ে নয়। বহমানা ভুটান-দুহিতার দিকে চেয়ে নয়, অনড় দাঁড়িয়ে থাকা, কনে-দেখা আলোর মধ্যে চাঁপারঙা শাড়ি আর লালরঙা ব্লাউজ-পরা তটিনীর দিকে, সেই আশ্চর্য অবিশ্বাস্য সুন্দর পটভূমিতে। কম-কথা-বলা আকাতরু যেন, না বলে বলছিল, ‘চলেন। জামাকাপড় সব খুইল্যা ফ্যালাইয়া আমরা দু-জনে এই নদীতে চান করি। এখানে আমাগো দ্যাখনের কেউই নাই। আকাশ আর বাতাস আর পাহাড় আর জঙ্গল আর নদী ছাড়া আমাদের দেখার মতন কোনো নোংরা চোখ-ই নাই। আইস্যেন! আইস্যেন!’

তটিনীও চুপ করেই ছিল। যেমন আকাতরুও। কিন্তু মুখে চুপ করে থাকলে কী হয়? প্রত্যেক মানুষ-ই সারাজীবনে মুখ দিয়ে আর ক-টি কথা বলে? যত কথা, তার অধিকাংশই তো বলে চোখ দিয়ে নয়তো মনে মনে। এই সরল সত্যটি বোঝেন ক-জনে?

অনেকক্ষণ পরে তটিনী বলল, এগুলো কী?

কোন গুলান?

ওই যে, উড়ে আসছে হাওয়ায় ভেসে, সাদা প্রজাপতির মতন? জলে গিয়ে পড়ে ভেসে যাচ্ছে। ওগুলো কি প্রজাপতি?

না। তবে ওইরকম-ই। ওগুলান শিমুল তুলা। বীজ ফাইট্যা বাহির হইয়াই হাওয়ায় ভাইস্যা আসতেছে।

বা:।

বলে উঠল তটিনী।

শিমুল তুলোর লেপ তোশক বালিশ সে, ব্যবহার করেছে কিন্তু কখনো বীজ-ফাটা তুলো দেখেনি। কী সুন্দর! ওর ইচ্ছে করল ও, নিজের ভেতরের বীজ থেকে ফুটে, ফেটে বেরিয়ে এমন হাওয়াতে ভেসে ভেসে কোনো দ্রুতধাবমনা নদীতে আছড়ে পড়ে ভেসে যায়, নদী যেদিকে নিয়ে যায় সেই দিকে।

ইচ্ছে করল। ইচ্ছেই। জীবনে কত কীই তো ইচ্ছে করল এ-পর্যন্ত কিন্তু ক-টি ইচ্ছেই বা পূরিত হল? হবে? পরক্ষণেই ভাবল, ওর একার-ই এমন দুঃখ নয়, হয়তো সব মানুষের-ই এমন মনে হয়। এক মানুষের বুকের কষ্ট অন্য মানুষে বোঝে কই? ক-জন বোঝে?

আকাতরুর চোখের দিকে তাকিয়ে তটিনী বুঝতে পারল, ওর বুকের মধ্যে কী হচ্ছে এখন, কী বলতে চাইছে ও, তটিনীকে। কিন্তু ও তো কথার কারিগর নয়। কথা দিয়ে যে, চতুরেরা কথার মালা গাঁথে, আকাতরু তো সেই মৃদুলদের মতন কথাসার মানুষ নয়। সে যে, খাঁটি। সে যে, সরল। তার দুঃখের কথা সে, নিজমুখে প্রকাশ করতে পারবে না কোনোদিন-ই। কিন্তু তটিনী বুঝেছে তার কথা।

কিন্তু বুঝলে কী হবে? যা কিছুই জীবনে চাওয়া যায় তাই কী পাওয়া যায়? যা চাওয়া যায় তার কতটুকু পাওয়া যায়? ওরা গুহাবাসী মানুষ হলে, ভাল্লুক-ভাল্লুকী হলে আকাতরু যা-চায়, তা দিয়ে এই পাহাড়ের-ই কোনো গুহাতে বা প্রস্তরাশ্রয়ে আদিম অনাবৃত মানুষের মতন বাকিজীবন কাটিয়ে দিতে পারত। কিন্তু অনাবৃত মানুষ তার শরীরকে পরতে পরতে অন্তর্বাস-এ আর নানা পোশাকে আবৃত করার সঙ্গে সঙ্গে তার আগলমুক্ত মনকেও যে, আগল-তোলা ঘরে ঢুকিয়েছে। তার শরীরের পোশাকের ভারের চেয়ে তার মনের ভূষণের ভার কিছু কম নয়। আধুনিক মানুষ বা মানুষী যেমন, এই উন্মুক্ত জায়গাতে সহজে তার শরীরকে অনাবৃত করতে পারে না, তেমন-ই পারে না তার মনকে নিরাবরণ করতে কোথাওই। সভ্যতা, এই লক্ষ লক্ষ বছরের অভ্যেস তাকে শরীরে মনে বড়োই ভারী করে তুলেছে, যাত্রাদলের নায়ক-নায়িকাদের মতন অনেক রাংতা আর জরি আর গর্জন তেল-এর ভারে সে, ন্যুব্জ হয়ে গেছে শরীরে মনে। আলোয় ফেরা, সারল্যে ফেরা তার পক্ষে ভারী কঠিন। আকাকে তার এইজন্যে এতভালো লেগেছে। সে, এই আধুনিক মানসিকতার মানুষদের থেকে এখনও বহুদূরে আছে। আকাশ, মাটি, নদী, পাহাড়ের খুব-ই কাছাকাছি। যত কাছাকাছি বহুশত মাইল পেছনে হেঁটেও তটিনী পৌঁছোতে পারবে না।

আকাতরু হঠাৎ তটিনীর স্বপ্নভঙ্গ করে তার নিথর ভাবনার জাল ছিঁড়ে দিয়ে বলল, চলেন। আউগ্যাই গিয়া। অন্ধকার হইলে ত অনেক-ই বিপদ।

তটিনী অস্ফুটে বলল, হুঁ।

মনে মনে বলল, এখন-ই বা বিপদ কম কী? মানুষের নিজের কাছ থেকে যত বিপদ, তত বিপদ কোনোদিনও অন্যের কাছ থেকে আশঙ্কার ছিল না।

এটা কী?

একটু এগিয়েই তটিনী বলল, বালির দিকে তাকিয়ে। আকাতরু ঝুঁকে পড়ে দেখল এক সেকেণ্ড। তারপর বলল, চলেন। ইটা কিছু না। বাঘ জল খাইয়া ফিইর‌্যা গেছে জঙ্গলে।

বাঘ! তবু কিছু না?

অবাক হল তটিনী।

বলল, কতক্ষণ আগে গেছে?

দু-তিন দিন আগের দাগ। ছাঁচ ভাইঙ্গা গেছে গিয়া।

বাঘ না বাঘিনি?

দাঁড়ান এক সেকেণ্ড।

তারপর ভালো করে দেখে বলল, বাঘিনি। আমাগো পেছনের জঙ্গল থিক্যাই আইছিল আবার সিখানেই ফিরত গ্যাছে গিয়া। সামনের পাহাড়টা যেমন, খাড়া উঠছে, কোনো জানোয়ার তেমন বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া খামোকা উটায় উঠব নামব বইল্যা, মনে হয় না।

আলো ক্রমশই কমে আসছে এবং খুব-ই তাড়াতাড়ি। এমন সময়ে ওদের বাঁ-পাশ থেকে, পাহাড়ের গা থেকে হাতির বৃংহণ ভেসে এল। চমকে উঠল ভয়ে, তটিনী।

আকাতরু বলল, ও কিছু না। জলে নামব ওরা।

একজোড়া মস্ত বড়ো সাদা-কালো হাঁস উড়ে আসছিল সামনে থেকে। পিপিং-এর দিকে উড়ে যাচ্ছে ওরা।

এতবড়ো আর এত সুন্দর কী হাঁস ওগুলো। তটিনী শুধোল, চোখ দিয়ে যতক্ষণ পর্যন্ত সোনালি বিধুর আলোতে ওদের মসৃণ ছন্দবদ্ধ ডানার কাঁপন দেখা যায়, ততক্ষণ তা দেখে।

এগুলান সাধারণ হাঁস না, যে। এগুলান হইল গিয়া ভারি দুইষ্প্রাপ্য হাঁস। উড-ডাক। এই হাঁস রাতের বেলা ত বটেই, দিনের বেলাতেও ইচ্ছা হইলে গাছে চইড়া বইস্যা থাকে। সচরাচর জলের পাখি জঙ্গলের মধ্যেই গাছে বসে না, এক পানকৌড়ি-মানকৌড়ি ছাড়া। তাও সিসব পাখিও জলের আনাচ-কানাচেই থাকে। আপনার ভাগ্য ভালো যে, উড-ডাক-এর দর্শন পাইল্যেন।

পাখিরা অদৃশ্য হলে, ওরা আবার পা বাড়াল। আর ক-পা গিয়েই আবার বালির দিকে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তটিনী।

বলল, এটা কীসের পায়ের ছাপ?

কোনটা? অ। ইটা? ইটা চিতাবাঘের। ওই জল খাইতে আইছিল। ওঃ। এ-ব্যাটা মিনিট পনেরো আগেই ফিরছে জল খাইয়া। দ্যাখতাছেন না, বালি এখনও ভিজা।

বলেই, আকাতরু নদীর বুকে হাঁটু গেড়ে বসে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল দাগটাকে, বোঝার জন্যে যে, কতখানি আগে গেছে সে-চিতাবাঘ। এবারে ওরা সেই প্রপাত দুটোর কাছে চলে এসেছে। এত যে, আওয়াজ তা দূর থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। হাওয়াটাও যেন, সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে আরও জোর হয়েছে। অন্ধকারো হয়ে আসছে দ্রুত। ভুটানঘাটের বাংলো তো এখনও অনেক দূরে। এই নদীর প্রপাতের পাশে দাঁড়িয়ে তড়িতাহত হওয়ার-ই মতন প্রকৃতিহত হয়ে গেল তটিনী। এত মুগ্ধ সে, কোনো কিছু দেখেই এর আগে হয়নি আর ওর জীবনে।

আকাতরু ওর চার হাত দূরে দাঁড়িয়ে ওকে কী যেন বলল। বারে বারে বলল। প্রপাতের আওয়াজ আর হাওয়ার বেগ উড়িয়ে নিল সেইকথাকে। শুনতে পেল না তটিনী।

আকাতরু আবারও বলল, এবার দৃশ্যত গলা তুলে। কিন্তু দৃশ্যতই। কানে তার কথা সেবারেও শোনা গেল না।

তটিনীর মনে হল, আকাতরুর কথাগুলোও বীজ-ফাটা শিমুল তুলোর-ই মতন উড়ে গিয়ে নদীতে পড়ে ভেসে গেল। আর তাদের ফেরানো যাবে না।

তটিনী পা দু-টি শক্ত করে নুড়ি আর বালির মধ্যে পুঁতে দিয়ে গলা তুলে চেঁচিয়ে বলল, যা বলার তা কাছে এসে বলুন।

হাওয়া ওর চুলগুলো ওর বুকের আঁচল, ওর শাড়ির পায়ের দিকে উথাল-পাতাল করছিল। ওর বুকের মধ্যেও প্রপাত ঝরছিল।

তটিনী বলল, কাছে আসুন। কাছে এসো। আরও কাছে। আমার আকাতরু, প্রাচীন, আদিম, অকৃত্রিম আকাতরু। তুমি কী চাও তা আমি জানি। বারে বারে চেয়ে নিজেকে ছোটো করার দরকার নেই। তুমি আমাকে চিরদিনের করে পাবে না। পাওয়া সম্ভব নয় বলে। এই নির্জনতা, এই সৌন্দর্য যে, আমার জন্যে নয়। চড়া মেক-আপ নিয়ে অনেক হাজার ওয়াটের আলো মুখে নিয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাজার পুরুষের মনোরঞ্জন-ই যে, আমার জীবন। সেই উচ্চরবের তীব্র আলোর জীবন যে, আমার ধমনিতে মিশে গেছে আকা। সেই জীবনে তুমি সম্পূর্ণই বেমানান হবে। এই ‘উড-ডাক’ হাঁসেদেরই মতন। বন্যেরা বনেই সুন্দর। তোমাকে যা দিতে পারব না, তা চেয়ে নিজেকে ছোটো কোরো না। যা দিতে পারি, তা দিতে কার্পণ্য করব না। নাও নাও, তুমি আমাকে নাও। এই নদীচরে এই নির্জনে, ঈশ্বরকে সাক্ষী রেখে। তোমরা পুরুষেরা, যা মেয়েদের সবচেয়ে দামি বলে মনে করো তাই তোমাকে দেব আজ। তোমরা সকলেই এ-বাবদে সমান। কী মৃদুলবাবু, কী চানু রায় আর কী তুমি। আমাদের কাছে কীসের ‘দাম’ সবচেয়ে বেশি, তা তোমরা কেউই বুঝলে না কোনোদিনও। বুঝবেও না।

তারপর মনে মনে বলল, হয়তো বোঝে, বুঝবে কেউ কেউ। বুঝবে কেউ। সে, যতদিন না আসে আমাকে ‘অপেক্ষা’ করতেই হবে, তার জন্যে আকাতরু। যা পেলে তুমি খুশি হও, তাই নাও। এই বালিশয্যায়, আকাশের তারাদের দিকে চেয়ে, নদীর গান শুনতে শুনতে তুমি আমাকে নি:শেষে পাও যে, ‘‘নি:শেষ’’-এ তোমাদের বিশ্বাস। সেই মিথ্যে বিশ্বাসের কথা মনে করে, আমি বড়ো বড়ো নিশ্বাস নেব। নাও আকা, তুমি নাও, আমাকে চেটেপুটে খাও। এই একটি সন্ধের জন্যে, একটিবারের জন্যে আমি তোমার। কিন্তু এরপর অন্য দশ জন মানুষের-ই মতন একবার বিস্কুট খেতে দিয়ে লোভী করে তোলা নেড়িকুত্তার মতন আমার পেছনে পেছনে ঘুরো না। তুমি অন্যরকম হোয়ো আকাতরু। তুমি তুমিই। তুমি আকাতরু। মহিরুহ। তুমি ঝোপঝাড়, বিচুটি হোয়ো না।

আমাদের মতো লজ্জাবতীরা চিরদিন-ই আকাতরুদের দিকেই চেয়ে থেকে জীবন কাটিয়েছে। তাদের জীবনে পাক আর নাই পাক।

এসো, আকাতরু, এসো। আমাকে গ্রহণ করো। এই নদীতীরে, আমার এই অপবিত্র শরীরকে তুমি মন্দিরের মতো পবিত্র করে দাও। দাও, দাও তোমার অকলুষ পরশে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%